সাইক্লোনে ডিজাস্টার পর্ন: সব দোষ প্রতিবেদকের নয়

প্রতিবেদকরা পুতুল, এঁরাই বাজিকর। এঁরা যা দেখাতে চাইবেন, যেভাবে দেখাতে চাইবেন — প্রতিবেদকরা সেভাবেই খবর করবেন।

কয়েক বছর আগে আমার তদানীন্তন অফিসের খুব কাছেই একটা অতি পুরনো বাড়ি ভেঙে পড়েছিল। যতদূর মনে পড়ে, একজন মারাও গিয়েছিল। স্বভাবতই সেই ঘটনার খবর করতে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের সাংবাদিকরা সেখানে উপস্থিত হন। কিন্তু শুধু তাঁরা নন, দেখেছিলাম বেশকিছু সাধারণ মানুষ সেখানে হাজির হয়েছেন স্রেফ ফোনের ক্যামেরায় ধ্বংসস্তুপের ছবি তুলতে। কেউ কেউ আবার অকুস্থলে দাঁড়িয়ে সেলফি তুলছিলেন। ব্যাপারটা খুব অনন্যসাধারণ নয়। সাম্প্রতিককালে এরকম পরিস্থিতিতে এমন দৃশ্য অনেকেরই চোখে পড়েছে। আজকাল সবকিছুই বিনোদন হয়ে উঠেছে। এমনকি ধ্বংসের দৃশ্য দেখেও বিনোদন হয়। আবার শুধু দেখেই সন্তুষ্টি হয় না, অন্যকে দেখাতেও ইচ্ছা করে। সুতরাং বলাই বাহুল্য বন্যার ছবি, ধসের ছবি, ভূমিকম্পের ছবির চাহিদা আছে। ফলে টিভি চ্যানেলগুলো যে গতকাল সাইক্লোন ইয়াসের ধ্বংসলীলার ছবি তুলতে রিপোর্টারদের বিপজ্জনক এলাকাগুলোতে পাঠিয়েছিল, তাতে আশ্চর্যের কিছু নেই। সাংবাদিকতার পেশাগত নৈতিকতার প্রশ্নে পরে আসা যাবে, আগে মেনে নেওয়া দরকার যে চ্যানেলগুলো বাজারের চাহিদা মেনে কাজ করে, আর বাজারে ধ্বংসের দাম আছে। সেই কারণে ইংরেজিতে অনেকে আজকাল একে বলেন ডিজাস্টার পর্ন।

এখন কথা হল, ব্যাপারটা কি সত্যিই এরকম অবিমিশ্র অন্যায়? সংবাদমাধ্যমের কি যা ঘটেছে তা দেখানো কর্তব্য নয়? ধ্বংস হলে ধ্বংস দেখাবে না, মৃত্যু ঘটলে মৃত্যু দেখাবে না? কোভিডের দ্বিতীয় ঢেউয়ে ল্যাজে গোবরে কেন্দ্রীয় সরকার যে দাবি করছে সংবাদমাধ্যমের ইতিবাচক ছবি দেখানো উচিৎ; কেবল মৃত্যু, বেদনা, অব্যবস্থা, লাঞ্ছনা দেখানো উচিৎ নয় — সেটাই তাহলে ঠিক?

একেবারেই তা নয়। সত্য দেখানো নিশ্চয়ই সংবাদমাধ্যমের কাজ। ক্ষমতাকে প্রশ্ন করা, তার ত্রুটি বিচ্যুতি ফাঁস করে দেওয়াও সংবাদমাধ্যমের কাজ। বরং কোথায় কী ভাল কাজ করল ক্ষমতাসীন মানুষ, সেটা না দেখালেও চলে। কারণ গণতন্ত্রে সেটাই তাদের করার কথা। অধিকার রক্ষিত হয়েছে, কর্তব্য করা হয়েছে — এগুলো খবর নয়, কারণ ওটাই নিয়ম। অধিকার লঙ্ঘিত হয়েছে, কর্তব্যে অবহেলার ঘটনা ঘটেছে — এগুলোই খবর, কারণ নিয়ম ভাঙা হয়েছে। এক কথায়, যা স্বাভাবিক নয় তা-ই খবর। সাংবাদিকতার ছাত্রছাত্রীদের তাই গোড়াতেই শেখানো হয়, কুকুর মানুষকে কামড়ালে সেটা খবর নয়। মানুষ কুকুরকে কামড়ালে সেটাই খবর। সুতরাং সাইক্লোন হয়নি, সেটা খবর নয়। সাইক্লোন হয়েছে, সেটাই খবর। আর যা খবর, তা টিভি চ্যানেলগুলো দেখাতে বাধ্য। যেমন বাজারে চাহিদা আছে বলে দেখানো উচিৎ, তেমনই পেশাগত নৈতিকতার দিক থেকেও দেখানো উচিৎ।

আসলে ধ্বংস দেখালেই ডিজাস্টার পর্ন হয় না; হয় ধ্বংসকে বলপূর্বক উত্তেজক, আকর্ষণীয় করে তোলার চেষ্টা করলে। ২৬ মে, ২০২১ সারাদিন টিভিতে সাইক্লোন ইয়াসের কভারেজ যেভাবে চলেছে তাতে ব্যাপারটাকে যৎপরোনাস্তি উত্তেজক করে তোলার চেষ্টা পরিষ্কার। কোন চ্যানেলে সাঁতরে যাওয়া মানুষের মুখে বুম ধরে প্রশ্ন করছেন একই জায়গায় হাঁটু জলে দাঁড়িয়ে থাকা প্রতিবেদক, কোথাও প্রতিবেদক নিজেই গলা জলে। ব্যাপারটাকে উত্তেজক করে তোলা এতটাই জরুরি যে একটা চ্যানেল ২০১৬ সালের উরুগুয়ের টর্নেডোর দৃশ্যও ইয়াসের ছবি বলে দেখিয়েছে। [১]

ফলত বিরাট অংশের দর্শক প্রশ্ন তুলেছেন, এ কী রকম কভারেজ? অনেক দর্শকেরই মনে হয়েছে চ্যানেলগুলো অকারণে এই ভয়ঙ্কর ঝড়ের মধ্যে ঠেলে দিয়ে প্রতিবেদকদের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলছে। এই বক্তব্য আবার অনেক সাংবাদিকের গায়ে লেগে গেছে। প্রথিতযশা সাংবাদিকরা কেউ কেউ সোশাল মিডিয়ায় জবাব দিয়েছেন, এসব ঝুঁকির অ্যাসাইনমেন্ট নেওয়ার মধ্যেই সাংবাদিক জীবনের সার্থকতা। অনেকে সিনিয়রদের সাবধানবাণী উড়িয়ে দিয়ে এমন অ্যাসাইনমেন্ট নিয়ে থাকেন। কথাটা সম্পূর্ণ মিথ্যে নয়। এক ধরনের বেপরোয়া মনোভাব না থাকলে ভাল ভাল খবর করা যায় না, ভাল প্রতিবেদক হওয়া যায় না। অন্য অনেক পেশার বদলে এই পেশা বেছে নেওয়ার কারণ অনেকের কাছেই এইসব “থ্রিল”। বরখা দত্তের মত গোলাগুলির মাঝখানে দাঁড়িয়ে যুদ্ধের খবর করার ইচ্ছা অনেক সাংবাদিকেরই থাকে। তাদের কেউ কেউ যে “ঝড়কে আমি করব মিতে, ডরব না তার ভ্রূকুটিতে” গাইতে গাইতে পশ্চিমবঙ্গের উপকূল এলাকায় চলে যাননি সে কথা জোর দিয়ে বলা যাবে না। কিন্তু একটা বুনিয়াদি প্রশ্ন আছে।

প্রশ্নটা হল এই থ্রিল কী উৎপাদন করছে? মানে সংবাদ যদি স্রেফ পণ্য হয়, তাহলে থ্রিলড সাংবাদিক কী পণ্য তুলে দিচ্ছেন ক্রেতার (অর্থাৎ দর্শকের) হাতে? সংবাদ যদি পণ্য না হয়, জনকল্যাণের পক্ষে প্রয়োজনীয় বস্তু হয়, তাহলেই বা কী কল্যাণ হচ্ছে থ্রিলড সাংবাদিকের দ্বারা? যে সাংবাদিক নিজের জীবন বিপন্ন করে গঙ্গাসাগরে বা দীঘা কি শঙ্করপুরে সাইক্লোন ইয়াসের মধ্যে দাঁড়িয়ে আছেন, তিনি কী খবর সরবরাহ করছেন? ঐ সময়ে ওখানে দাঁড়িয়ে থেকে কি তিনি এমন কিছু জানাতে পারছেন, যা আবহাওয়াবিদদের দেওয়া তথ্য থেকে স্টুডিওয় বসে জানা সম্ভব নয়? তিনি কি এমন কোন দুর্গত মানুষের খবর বাকি দুনিয়াকে (তদ্দ্বারা সরকারকেও) জানাতে পারছেন যার খবর এমনিতে কেউ জানতেও পারত না? যদি করার মত প্রশ্ন হয় “আপনার এখন কেমন লাগছে?” বা “আপনি সাঁতার কাটছেন?”, তাহলে সেই থ্রিলের প্রয়োজন কী? এতে কোন জনকল্যাণ সাধিত হচ্ছে? পণ্য হিসাবেই বা কী এমন নতুন জিনিস দর্শককে দেওয়া হচ্ছে? সাংবাদিকতা কি এত তুচ্ছ ব্যাপার যে একজন সাংবাদিক থ্রিলড হচ্ছেন বলেই এসব দেখাতে হবে টিভির পর্দায়? ইংরেজিতে embedded journalism বলে একটা কথা চালু আছে। তার নিদর্শন আমাদের দেশে বড় একটা দেখা যায় না। বিবিসি, সিএনএন বা আল জাজিরা খুললে দেখা যায় সিরিয়া, আফগানিস্তান, ইয়েমেন, প্যালেস্তাইনের মত জায়গায় সাংবাদিকরা ঘুরে ঘুরে বহু অচেনা জায়গায় পৌঁছে যান। অজানা ঘটনা তুলে আনেন। বহু মনে রাখার মত খবর হয়, সেসব খবর করতে গিয়ে তাঁদের বহু বিপদের মধ্যেও পড়তে হয়। কেউ কেউ বিদেশ বিভুঁইয়ে বন্দী হয়ে থাকেন বছরের পর বছর, কেউ বা খুন হয়ে যান, কেউ গোলাগুলির মাঝে পড়ে গিয়ে নেহাত দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান। নিশ্চয়ই থ্রিলের আকর্ষণ না থাকলে কেউ অমন করতে যায় না। কিন্তু তাঁদের করা খবরগুলোর মধ্যে মৌলিক গবেষণা থাকে, পরিশ্রম থাকে, ফলে উদ্ঘাটন থাকে। অমন সাংবাদিকতা সময়সাপেক্ষ। ঝড়ের দিন ক্যামেরা নিয়ে গিয়ে ছবি তুলে, পিস টু ক্যামেরা দিয়ে চলে আসার কাজ নয়। আমাদের এখানকার কজন সাংবাদিক আগামী একমাস ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় পড়ে থেকে কোথায় কীভাবে জনজীবন স্বাভাবিক হল বা হল না, সরকারি সাহায্য প্রতিশ্রুতিমাফিক পৌঁছল বা পৌঁছল না — সে খবর করবেন? যদি না করেন, তাহলে বিপর্যয়ের দিনের প্রয়াসকে ডিজাস্টার পর্ন বললে দোষ কোথায়?

এবার ভাবা যাক, এই যে আমাদের চ্যানেলগুলোর প্রতিবেদকরা কেউ অতটা সময় দেন না, কোন নতুন কথা তুলে আনতে পারেন না — এর কারণ কী? সকলেই অযোগ্য, অদক্ষ? বিদেশি চ্যানেলগুলোর প্রতিবেদকরা সকলে দেবতা, গন্ধর্ব আর আমাদের সব প্রতিবেদক শর্টকাট খোঁজা ফাঁকিবাজ? তা তো হতে পারে না। তাহলে তফাত কোথায়?

তফাত চ্যানেলগুলো খবর বলতে যা বোঝে আর প্রতিবেদকদের যেভাবে দ্যাখে তাতে। রোজ এবিপি আনন্দ বা ২৪ ঘন্টা দ্যাখেন এমন মানুষও পাঁচজন প্রতিবেদকের নাম বলতে গেলে হোঁচট খাবেন, কিন্তু গড়গড় করে বলে দেবেন অ্যাঙ্করদের নাম। এবিপি আনন্দ আর সুমন দে অধিকাংশ মানুষের কাছেই সমার্থক, ২৪ ঘন্টা বললেই মনে পড়বে প্রয়াত অঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায় বা মৌপিয়া নন্দীর নাম। রিপাবলিক টিভি বললেই একমেবাদ্বিতীয়ম অর্ণব গোস্বামী। অর্থাৎ প্রতিবেদকরা পুতুল, এঁরাই বাজিকর। এঁরা যা দেখাতে চাইবেন, যেভাবে দেখাতে চাইবেন — প্রতিবেদকরা সেভাবেই খবর করবেন। সঙ্গে অমুক, সঙ্গে তমুক শো চলে সব চ্যানেলেই। ভারতীয় খবরের চ্যানেলগুলোতে স্পেশাল শো মানেই সেটা অ্যাঙ্করের শো। প্রতিবেদকের শো বলে কিছু নেই। অথচ বিদেশি চ্যানেলগুলোতে কিন্তু বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে থাকা প্রতিবেদকদের কারও কারও নিজস্ব শো থাকে। এই প্রতিবেদকরা যে কোন বিপজ্জনক অ্যাসাইনমেন্টে যেমন জীবন বিপন্ন করে খবর করেন, তেমনি পাদপ্রদীপের আলোর ভাগও পান। আবার অ্যাঙ্কররাও বেরিয়ে পড়েন অনেক সময়। আমাদের দেশের চ্যানেলগুলোতে কিন্তু ৩৬৫ দিন স্টুডিও আলো করে থাকেন সুমন, মৌপিয়া, অর্ণব, নবিকা কুমাররা। হ্যাঁ, তাঁরাও বেরোন বটে। রিও কি রাশিয়া যেতে অথবা আউট্রাম ঘাটে বিতর্কসভা সঞ্চালনা করতে। সাইক্লোন ইয়াস নিয়ে রিপোর্ট করতে নৈব নৈব চ। আমরি অগ্নিকাণ্ডের অকুস্থলে সুমনবাবুর পৌঁছে যাওয়া বা ইয়াসের প্রতিবেদনে সুচন্দ্রিমা দেবীর উপস্থিতি ব্যতিক্রম, যা নিয়মকেই সুচিহ্নিত করে। নির্বাচনের ফল প্রকাশ বা বড় কিছু ঘটলে এঁদের সকাল থেকে রাত পর্যন্ত টিভির পর্দায় দেখা যায়, পরিশ্রম করার অসীম ক্ষমতা দেখে দর্শকদের ঘাড় শ্রদ্ধায় নুয়ে পড়ে। ট্রাম্প বনাম বাইডেন দ্বৈরথের ফল প্রকাশের দিনগুলোতে সিএনএন-এর অ্যাঙ্কররা কিন্তু এসে বসতেন, কিছু সময় পরে আবার অন্যদের জায়গা ছেড়ে দিয়ে চলে যেতেন।

এসবের জবাবে অবশ্যই যে যুক্তি উঠে আসবে, তা হল “ওদের অনেক টাকা, অনেক লোকজন।” ঠিক কথা। তাহলে এ-ও মেনে নেওয়া দরকার যে এখানকার টিভি চ্যানেলগুলোতে দরকারের চেয়ে কাজের লোক কম এবং তাঁরাও প্রয়োজনের চেয়ে কম পারিশ্রমিক পান। অতএব থ্রিল পরের কথা, সাইক্লোন ইয়াসকে ধাওয়া করে (রিপাবলিক টিভির ভাষায়) যে চ্যানেল, তার প্রতিবেদকের প্রাথমিক চিন্তা চাকরি বাঁচানোই। তার সাধ্য কি সত্যিকারের খবরের খোঁজ করে? মহাজন যে পথে হাঁটেন সেটাই পথ, অ্যাঙ্করের পথেই প্রতিবেদককে হাঁটতে হবে। যে দেশের টিভি অ্যাঙ্কর প্রধানমন্ত্রীর সাক্ষাৎকার নিতে গিয়ে নালে ঝোলে অম্বলে হয়, সে দেশের প্রতিবেদকের ঝড়ের দিনে ডিজাস্টার পর্ন তৈরি না করে উপায় নেই। দর্শকও দেখবেন, কারণ ওখানে দাঁড়িয়ে সেলফি নিতে পারার দুধের স্বাদ এভাবে ঘোলে মিটবে।

সূত্র:

১। https://bangla.boomlive.in/fact-check/fake-news-cyclone-yaas-2016-video-of-tornado-in-dolores-uruguay-falsely-shared-as-yass-effect-in-odisha-abp-ananda-factcheck-13283

https://nagorik.net এ প্রকাশিত

তারুণ্যের হাড়িকাঠে বলি দেওয়া হয়নি শৈলজাকে

সংবাদমাধ্যম এবং এল ডি এফ-বিরোধী দল ও ব্যক্তিবর্গ রেগে আগুন। রাগ আবর্তিত হচ্ছে কে কে শৈলজাকে কেন্দ্র করে।

ভারতে প্রবীণ মানে প্রাজ্ঞ ভাবাই রীতি, কিন্তু সম্প্রতি তরুণদের সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় রাজনীতিতে যৌবনই অধিক প্রার্থিত। সেই ধারা মেনে কমিউনিস্ট নেতৃত্ব থেকে জীর্ণ, পুরাতন যাক ভেসে যাক — এই দাবি উঠেছে। পশ্চিমবঙ্গে বাম প্রার্থী তালিকায় নতুন মুখের ভিড় প্রশংসিত হয়েছে, কোন আসনে না জিতলেও তরুণ প্রার্থীরা নিজ নিজ কেন্দ্রে পার্টির ভোট বাড়াতে পেরেছেন। কিন্তু কেরালার ৭৫ বছর বয়সী সিপিএম মুখ্যমন্ত্রী পিনারাই বিজয়ন তরুণ মন্ত্রিসভা তৈরি করে সমালোচিত হচ্ছেন।

বিজয়নের ২১ জনের মন্ত্রিসভায় দশজন প্রথমবারের বিধায়ক, বেশিরভাগ আগে কখনো মন্ত্রী হননি। এ নিয়ে সংবাদমাধ্যম এবং এল ডি এফ-বিরোধী দল ও ব্যক্তিবর্গ রেগে আগুন। রাগ আবর্তিত হচ্ছে কে কে শৈলজাকে কেন্দ্র করে। স্বাস্থ্যমন্ত্রী হিসাবে অতিমারীর সময় তাঁর কাজ আন্তর্জাতিকভাবে প্রশংসিত। কেন তাঁকে বাদ দেওয়া হল? সিপিএমের ব্যাখ্যা — শৈলজার ব্যাপারে আলাদা কোন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি, তারুণ্যকে গুরুত্ব দেওয়ার সামগ্রিক সিদ্ধান্তের অঙ্গ হিসাবেই তিনি বাদ। কিন্তু বাতাসে নানাবিধ অভিযোগ ভেসে বেড়াচ্ছে। প্রথমত, কেরালার কমিউনিস্টরা নারীবিদ্বেষী। দ্বিতীয়ত, বিজয়ন শৈলজাকে মুখ্যমন্ত্রী পদের দাবিদার মনে করছিলেন। তাই পথের কাঁটা সরিয়ে দিলেন। তৃতীয়ত, তারুণ্যের অজুহাতে তিনি স্বজনপোষণ করছেন। তাঁর জামাই মন্ত্রিসভার সদস্য হলেন অথচ শৈলজার জায়গা হল না?

প্রথম অভিযোগটা নিয়ে কদিন বহু নারীবাদী সোশাল মিডিয়ায় বিস্তর লড়েছেন। কিন্তু মন্ত্রিসভা শপথ নেওয়ার পর দেখা গেল সেখানে তিনজন মহিলা রয়েছেন, যা কেরালায় সচরাচর হয় না। উপরন্তু শৈলজার দপ্তরের দায়িত্বও দেওয়া হয়েছে একজন মহিলাকে। সেই বীণা জর্জ অনভিজ্ঞ, কিন্তু পাঁচ বছর আগে শৈলজাও অনভিজ্ঞ ছিলেন।

দ্বিতীয় অভিযোগের মুশকিল হল, জয়ী দলের মধ্যে মুখ্যমন্ত্রী বদলানোর কোন দাবি উঠেছিল — এমন ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে না। শৈলজাকে মন্ত্রিসভায় রেখে দেওয়া হোক — রাজ্য কমিটির অন্তত সাতজন এমনটা চেয়েছিলেন বলে এক সংবাদপত্র জানিয়েছে। কিন্তু নেতৃত্ব বদলের দাবির খবর নেই। তাহলে বিজয়ন চ্যালেঞ্জের আশঙ্কা করলেন কখন এবং কেন? কেরালা সিপিএম পরপর দুবার কাউকে মন্ত্রী না করার নীতি ঘোষণা করেছে। সেই অনুযায়ী ২০২৬-এ এল ডি এফ ফের জিতলেও বিজয়ন মুখ্যমন্ত্রী হতে পারবেন না। তাহলে কার পথ, কে-ই বা কাঁটা? পরবর্তীকালে দলের নিয়ম স্রেফ বিজয়নের জন্য ভাঙা হলে তা নিশ্চয়ই নিন্দাযোগ্য। কিন্তু তার জন্য পাঁচটা বছর অপেক্ষা করতে হবে। ইতিমধ্যে শৈলজাকে বিধানসভায় পার্টির হুইপ করা হয়েছে। মন্ত্রিত্ব যাদের মোক্ষ, তাদের কাছে এটা অবশ্যই পদাবনতি। শৈলজার মনোভাব অদূর ভবিষ্যতেই বোঝা যাবে।

বিজয়নের জামাই মহম্মদ রিয়াজ কি স্রেফ জামাই বলেই মন্ত্রী হয়েছেন? তাহলে বিজয়ন অবশ্যই ‘ডাইনেস্টি’ প্রতিষ্ঠা করছেন। রিয়াজ স্কুলে পড়ার সময় থেকে সিপিএমের ছাত্র সংগঠনের সাথে যুক্ত, ইউনিট কমিটি থেকে রাজনীতি করা শুরু করেছেন, পার্টি সদস্য ১৯৯৩ থেকে। বিজয়ন কন্যার সাথে বিয়ে হয়েছে ২০২০-তে। এ যদি ডাইনেস্টি হয়, তাহলে ডাইনেস্টির সংজ্ঞা নিয়ে আলোচনা দরকার।

আরও পড়ুন কংগ্রেস-সিপিএম জোট নিয়ে সীতারামায়ণ

পশ্চিমবঙ্গে বাম শাসনের ৩৪ বছরে এই আলোচনার দরকার পড়েনি। সংসদীয় রাজনীতিতে কোন কমিউনিস্ট দলের এত দীর্ঘ শাসনকাল যেমন বিরল, তেমনি নির্বাচনে ক্ষমতা হারানোর পর বারবার ফিরে আসাও পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল। জার্মানি, ইতালি বা স্পেনে একদা কমিউনিস্ট দলগুলো যথেষ্ট জনপ্রিয় ছিল। গত শতাব্দীর দ্বিতীয় ভাগ থেকে ক্ষমতার বৃত্তের বাইরে থাকতে থাকতে ক্রমশ ক্ষয়প্রাপ্ত হয় (অনেকটা বঙ্গ সিপিএমের মত)। পরবর্তীকালে অন্য চেহারায় অন্য নামে, সমাজবাদী বা কোন মধ্যপন্থী দলের সাথে মিলে কমিউনিস্টরা ক্ষমতায় ফিরেছে। কমিউনিস্ট পরিচয়ে নয়। সুতরাং কেরালাও বিশ্বের কমিউনিস্ট আন্দোলনের ইতিহাসে বিরল দৃষ্টান্ত। এহেন দৃষ্টান্ত স্থাপন করে কেরালার কমিউনিস্টরা যে মন্ত্রিসভা বানালেন, তার ফল ক্রমশ বোঝা যাবে। তবে যে দেশে কোন রাজ্যে দাগী আসামী মুখ্যমন্ত্রী হয়, কোথাও বা মন্ত্রীদের গ্রেপ্তারি আটকাতে মুখ্যমন্ত্রীকে নিজের গ্রেপ্তারি চাইতে হয় — সে দেশে এক রাজ্যের মন্ত্রিসভায় কেন একজন কর্মঠ মন্ত্রীর পুনর্বার জায়গা হল না, তা নিয়ে বিতর্ক ভারতীয় গণতন্ত্রের স্বাস্থ্য নিয়ে কিঞ্চিৎ আশার আলো দেখায়।

উত্তরবঙ্গ সংবাদে প্রকাশিত

দ্যাট লিডার, দিস ম্যান: মহাশূন্যের দুটি বিন্দু

‘দিস ম্যান’ (অবশ্যই উওম্যানও) যারপরনাই পরিশ্রম করল স্বেচ্ছাসেবকের ভূমিকায় আর ‘দ্যাট লিডার’ পারমুটেশন-কম্বিনেশনের অঙ্ক কষে গেলেন।

২০০৪ লোকসভা নির্বাচনের প্রচার পর্বের রিপোর্টিং করতে জাপানের কমিউনিস্ট পার্টির মুখপত্র আকাহাতা তাদের দক্ষিণ এশিয়ার প্রতিবেদক জুনিচি কোদামাকে পাঠিয়েছিল পশ্চিমবঙ্গে। আমার তখন সেই বয়স যে বয়সে মনে হয় কাল বাদে পরশুই বিপ্লবটা করে ফেলব। ভারতের ছাত্র ফেডারেশনের সদস্য হওয়ার সুবাদে এবং এক বন্ধুর সক্রিয়তায় জুনিচির সহকারী হওয়ার সৌভাগ্য হল। পার্টি মুখপত্রের সাংবাদিক হলেও, পার্টির বিরোধীদের বক্তব্য জানায় তার সমান উৎসাহ। সম্ভবত ধনী দেশের কমিউনিস্ট পার্টির মুখপত্র বলেই আকাহাতা খরচ করার ব্যাপারেও অকৃপণ। তাই জুনিচি ভাড়া করা গাড়িতে চেপে যে কোন এলাকায় চলে যেত। বিভিন্ন দলের শীর্ষ নেতা থেকে শুরু করে হাতে টানা রিকশার চালক পর্যন্ত সকলের সাথে কথা বলাই তার সাংবাদিকতার অভিজ্ঞান। আমার কাজ মূলত জুনিচির আপাত দুর্বোধ্য ইংরেজি আর স্থানীয় লোকের বাংলা, হিন্দির সংযোগ স্থাপন এবং গাড়ির চালককে পথনির্দেশ দিয়ে জুনিচি আর তার স্ত্রী, ছায়াসঙ্গিনী রিয়েকোকে অচেনা জায়গাগুলোতে নিয়ে যাওয়া। দিন সাতেকের সেই অভিজ্ঞতা থেকে শিখলাম যে বিপ্লবটা পরশু হচ্ছে না, অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত রাখা হয়েছে।

ঐ সাতদিনের একদিন সকালে আমরা গিয়েছিলাম বারাসত চাঁপাডালি মোড়ের কাছে সিপিএমের পার্টি অফিসে। সে অফিসের শীতাতপনিয়ন্ত্রিত একটি ঘরে জুনিচির জন্য অপেক্ষায় ছিলেন তখনকার এক দোর্দণ্ডপ্রতাপ নেতা। ভদ্রলোকের ধোপদুরস্ত সাদা পাঞ্জাবি পাজামা আর মুখের কর্পোরেট হাসিটি মনোমুগ্ধকর। টেবিলের উপর দেখলাম তিনটি মোবাইল ফোন। অমন অত্যাধুনিক হ্যান্ডসেট বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার ক্লাসের ধনীর দুলাল-দুলালিদের হাতেও দেখিনি। বেরিয়ে আসার পর দেখলাম জাপানি কমরেডরাও বেশ অবাক। জুনিচি নিজে তখনো নোকিয়ার সেই ছুঁড়ে মানুষ মারা যায় এমন একখানা হ্যান্ডসেট ব্যবহার করে, তার স্ত্রীর নিজস্ব মোবাইল নেই।

সেখান থেকে আমরা গেলাম ছোট জাগুলিয়া। কমরেড দোর্দণ্ডপ্রতাপ বলে দিয়েছিলেন কার খোঁজ করতে হবে। খুঁজতে খুঁজতে আমরা পৌঁছলাম একটা ছোট্ট পার্টি অফিসে। বারাসতে যদি প্রাসাদে ঢুকে থাকি, এ তাহলে কুঁড়েঘর। দোর্দণ্ডপ্রতাপ যত রাজকীয়, ইনি তত সাদাসিধে। একমাথা পাকা চুল, চোখে ঘোলাটে চশমা, মুখভর্তি পাকা দাড়ি, পরনে সাধারণ লুঙ্গি, গায়ে ফুটো হয়ে যাওয়া গেঞ্জি। কানেও কম শোনেন। কিন্তু যেই মাত্র শুনলেন সুদূর জাপানের কমিউনিস্ট পার্টির দুই কমরেড এসেছেন, মনে হল বয়স দশ বছর কমে গেল ভদ্রলোকের। বলা বাহুল্য এ অফিসে এসি ঘর নেই। একতলায় গোটা দুয়েক ঘর, দোতলায় একখানা। ইনি আমাদের বেঞ্চে বসালেন। দোর্দণ্ডবাবু ঠান্ডা পানীয় খাইয়েছিলেন, ইনি হাঁক পেড়ে রাস্তার দোকান থেকে আনালেন লাল চা। জুনিচি গিয়েছিল নির্বাচন সম্বন্ধে খোঁজখবর করতে, কিন্তু এই ব্যক্তিটি সম্বন্ধে তার অসীম আগ্রহ তৈরি হল। তার হয়ে আমাকেই জিজ্ঞেস করতে হল কবে থেকে পার্টি করছেন (পঞ্চাশের দশক থেকে), এখন পার্টিতে কোন পদে আছেন (লোকাল কমিটির সদস্য), কী করেন (পার্টিই করেন, সারাজীবন তা-ই করেছেন), কোথায় থাকেন (ঐ অফিসেই থাকেন)। ছোট জাগুলিয়ায় গরীব মানুষ কতজন, ধনী কারা, কোথায় কেমন ভোট হয় — এসব প্রশ্নের জবাবও বৃদ্ধ যেভাবে দিলেন, তাতে বোঝা যায় এলাকাটা তাঁর হাতের তালুর মত চেনা।

কমিউনিস্ট পার্টির এরকম দু-একজন সদস্যকে স্বচক্ষে দেখার সৌভাগ্য আমার ছেলেবেলাতেই হয়েছে, আরো অনেকের গল্প শুনেছি। কিন্তু জুনিচি আর রিয়েকোর এমন অভিজ্ঞতা ছিল না। তারা আপ্লুত। আর সবচেয়ে মোক্ষম কথাটি জুনিচি বলল গাড়িতে উঠে। “হোয়াট ডিফারেন্স! দ্যাট লিডার, দিস ম্যান!” সত্যিই জগতের বিশ্লেষণে কার্ল মার্কস অভ্রান্ত। কমিউনিস্ট পার্টির ভিতরেও এমন শ্রেণি বিভাজন!

সতেরো বছর আগের সেই দিনটা বারবার মনে পড়ছে দোসরা মে-র পর থেকে। বামফ্রন্ট তথা সিপিএমের ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার এক দশক পূর্ণ হল। সেটা বড় কথা নয়। নির্বাচনে কোন দল হারে, কোন দল জেতে। একটানা ৩৪ বছর একই পার্টির নেতৃত্ব একই ফ্রন্টের সরকার ছিল, সেটাই বরং বিরল। কিন্তু একটা রাজ্যে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার দশ বছরের মধ্যে একটা দল লোকসভায় শূন্য, বিধানসভায় শূন্য — এরকম ঘটতে দেখা যায় না চট করে। উদাহরণস্বরূপ কংগ্রেসকেই দেখা যাক। তারা পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতায় নেই ১৯৭৭ সাল থেকে। কিন্তু দীর্ঘদিন প্রধান বিরোধী দল ছিল। নব্বইয়ের দশকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় দল ভেঙে বেরিয়ে যাওয়ার পর দ্রুত ক্ষমতা কমতে থাকলেও ২০১১-র পালাবদলেও কংগ্রেসের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। তারা এতদিন পরে বিধানসভায় শূন্য হয়েছে, লোকসভায় এখনো এ রাজ্য থেকে তাদের দুইজন প্রতিনিধি। পাশাপাশি বামফ্রন্টের বড় শরিক এই অল্প সময়েই ব্রিগেড ময়দান ছাড়া সর্বত্র শূন্য। এমতাবস্থায় যে কোন দলে রাজ্য স্তরের নেতাদের জবাবদিহি করতে হয়, জায়গা ছাড়তে হয়। গত কুড়ি বছরে কতবার প্রদেশ কংগ্রেসের সভাপতি বদলেছে গুনে দেখতে হবে। কিন্তু সিপিএমে ওসব হবার নয়। তারা মার্কসবাদী, লেনিনের আদর্শে চলে, তাদের আছে রেজিমেন্টেশন। সবই নাকি যৌথ দায়িত্বের ব্যাপার। রেজিমেন্টেশন ভাল না মন্দ তা নিয়ে বিস্তর বিতর্ক আছে। সেটুকু বাদ দিলে বাকিটা কিন্তু দিব্য শুনতে লাগে। বিশেষত কর্পোরেট দুনিয়ায় যেন তেন প্রকারেণ অন্যের ঘাড়ে দোষ চাপিয়ে দেওয়ার যে ধারা আছে, তার তুলনায় এ তো স্বর্গ। কিন্তু সিপিএমের ক্ষেত্রে যৌথ দায়িত্ব কথাটার অর্থ দাঁড়িয়েছে যৌথভাবে দায়িত্ব এড়ানো। ২০১৮-র পঞ্চায়েত নির্বাচনের মনোনয়ন পর্বে যখন রাস্তায় দাঁড়ানো উন্নয়ন খড়গ হাতে বাম কর্মীদের তাড়া করল, খুন করল, মহিলাদের কাপড় খুলে নিল — তখন রাজ্যের কোথাও নেতাদের যৌথ দায়িত্ব নিয়ে ধরনায় বসতে দেখা যায়নি, কোথাও কোন অবরোধ হয়নি। যে মুখ্যমন্ত্রীর বিরুদ্ধে তাঁদের এত অভিযোগ, তিনি নিশ্চিন্তে হরিশ চ‍্যাটার্জি স্ট্রিটের বাড়ি থেকে বিদ্যাসাগর সেতু পেরিয়ে রোজ নবান্নে গেছেন, এসেছেন। কোন লাল ঝান্ডা তাঁর পথ আটকায়নি।

অর্থাৎ “দিস ম্যান” মার খেয়েছে আর “দ্যাট লিডার” আলিমুদ্দিন স্ট্রিটে সাংবাদিক সম্মেলন ডেকে বিবৃতি দিয়েছেন। কেউ কেউ ফেসবুক বিদীর্ণ করে স্ট্যাটাস দিয়েছেন। কবে কোন জেলার কোন প্রত্যন্ত এলাকায় কোন পার্টি অফিস ভাঙা হয়েছে তা সারা রাজ্যের বাম কর্মী সমর্থকরা ফেসবুকের মাধ্যমে জানতে পেরেছেন। কিন্তু তার বিরুদ্ধে নেতারা কী ব্যবস্থা নিয়েছেন, কজন পার্টিকর্মীর সাথে গিয়ে দেখা করেছেন, কটা থানা ঘেরাও করেছেন — সেসব প্রচারিত হয়নি। ফলত বিরাট সংখ্যক নীচুতলার কর্মী সমর্থকের বিজেপির দিকে সরে যাওয়া, ২০১৯ লোকসভা নির্বাচনে ৩৭% থেকে ৭% হয়ে যাওয়া। তৃণমূল ও সম্প্রদায় স্বভাবতই বললেন বাম রাম হয়েছে। এতদূরও রটে গেল যে জেলার বাম নেতারা সচেতনভাবে ভোট ট্রান্সফার করিয়েছেন বিজেপির বাক্সে। সচেতন, অবচেতনের বিতর্কে না গিয়েও অনস্বীকার্য যে বামেদের ভোট সে সময় বিজেপির খাতায় জমা পড়েছে। অর্থাৎ একেবারে রাস্তায় দাঁড়িয়ে কাজ করা কর্মীরা মারও খেলেন, বদনামের ভাগীও হলেন।

অতঃপর নেতারা কী ব্যবস্থা নিলেন? কংগ্রেসের সঙ্গে জোট করতে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। ২০১৬ নির্বাচনের সময় থেকেই সূর্যবাবু, বিমানবাবুদের সঙ্গে অধীরবাবু, মান্নানবাবুদের যা ভাব তা দেখে অমর আকবর অ্যান্টনি বা ইয়াদোঁ কি বারাত ছবির শৈশবে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া ভাইয়েদের কথা মনে পড়ে। ভাগ্যিস মার্কসবাদে ভূত জিনিসটা নেই। থাকলে শহিদদের ভূতেরা যে কী করত ভাবলে গা শিরশির করে। তবে অন্ধের মত অতীত আঁকড়ে রাজনীতি হয় না। তাই পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতির কথা ভেবে বাম কর্মী সমর্থকরা হয়ত ব্যাপারটা মেনে নিয়েছিলেন (ভোটের অঙ্ক দেখলে কংগ্রেস কর্মী সমর্থকরা মন থেকে মেনেছিলেন কিনা নিশ্চিত হওয়া শক্ত), কিন্তু ২০১৯ লোকসভা নির্বাচনে শেষ মুহূর্তে সে জোটও হল না। তার দু বছরের মাথায় বিধানসভা নির্বাচন। মে মাসের নির্বাচনের জন্যে বামেদের নতুন উদ্যম দেখা গেল ফেব্রুয়ারিতে, যখন জোয়ানরা নবান্ন অভিযান করলেন। প্রচণ্ড মার খেলেন, মইদুল ইসলাম মিদ্যা প্রাণ হারালেন। কিন্তু ততদিনে রাজ্যে বিজেপি বিরোধী শক্তি হিসাবে নিজেদের জায়গা পাকা করে ফেলেছে। এস এফ আই নেতা সৃজন ভট্টাচার্য নাগরিক ডট নেটকে নবান্ন অভিযানের আগের দিন বলেছিলেন, বাইনারি ভাঙতেই নবান্নে যাচ্ছি। অর্থাৎ তদ্দিনে তৃণমূল-বিজেপি বাইনারি প্রতিষ্ঠিত।

এই বাইনারি তৈরি হল কেন? কোন সন্দেহ নেই তৃণমূল তেমনটাই চেয়েছিল। কারণ প্রতিযোগিতামূলক হিন্দুত্ব চালানো বা মুখরোচক কুৎসার দৌড়ে জেতা কর্মসংস্থানের প্রশ্ন, দুর্নীতির প্রশ্নের সুরাহা করার চেয়ে সহজ। কিন্তু সঙ্গত দাবি নিয়েও কেবল বিবৃতি দিলে আর মামলা ঠুকলে কি আর বিরোধী রাজনীতি হয়? সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে স্রেফ মামলা ঠুকে ঠুকেই তৃণমূলকে নাজেহাল করে দেবেন — এমন একটা দাবি সিপিএমের আইনজীবী নেতা বিকাশ ভট্টাচার্য লোকসভা নির্বাচনের প্রচারে করতেন (“মারব কম, দৌড় করাব বেশি”)। আদতে প্রসব হল অশ্বডিম্ব। যাদবপুর কেন্দ্রে আনকোরা অভিনেত্রীর কাছে হারলেন। রাজ্যের কোথায় তাঁর মামলার ভয়ে শাসক দল বাম কর্মী সমর্থকদের মারা বন্ধ করে দিয়েছে তা তিনিই জানেন। তবে কেবল বিকাশবাবুকে দোষ দেওয়া অন্যায়। বামেদের বরাবরের বদনাম তাঁরা কথায় কথায় আন্দোলন করেন; মিছিল, ধর্মঘট কিছুই বাদ যায় না। ক্ষমতায় থাকাকালীনও এ স্বভাব যায়নি। এই করেই পশ্চিমবঙ্গের শিল্প টিল্প সব তাঁরা তাড়িয়েছেন বলে এখনো অভিযোগ করা হয়। ২০১১-র পরের বঙ্গ সিপিএম সম্বন্ধে কিন্তু এমন অভিযোগ করার উপায় নেই। কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব বনধ ডাকলে আলাদা কথা, নিজেরা ওসবের মধ্যে যাননি। রাজ্যের মন্ত্রীদের হাসিমুখে টাকা নেওয়ার ছবি প্রকাশ্যে আসার পরেও আন্দোলনের ঠ্যালায় জনজীবন বিপর্যস্ত করেননি। আদালত যেদিন রায় দিলেন এস এস সি পরীক্ষায় দুর্নীতি হয়েছে; সেদিনও সূর্যবাবু, সেলিমবাবু, সুজনবাবু বা বিমানবাবু সরকারের গদি নাড়িয়ে দেওয়ার মত কোন কাজ করেননি। সেদিন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বিরোধী আসনে থাকলে কী ঘটত তা বামপন্থীরাও বিলক্ষণ বোঝেন। অশোক মিত্র নাকি একবার বলেছিলেন “আমি ভদ্রলোক নই, কমিউনিস্ট।” সিপিএমের বর্তমান নেতৃত্ব কিন্তু নিপাট ভদ্রলোক। তাঁদের ভদ্রতার সুযোগেই মমতাকে মমতাজ বেগম আখ্যা দিয়ে, অনবরত অকথা কুকথা বলে, রামনবমী বনাম বজরংবলীর বাইনারি ব্যবহার করে বিজেপি রাজ্যে প্রধান বিরোধী দল হয়ে গেল।

অন্য দিকে বিজেপি শক্তিশালী হওয়ার পর থেকেই বাম নেতৃত্বের বক্তব্য, তৃণমূল আর বিজেপি সমান বিপজ্জনক। এখনো বলি, কথাটা উড়িয়ে দেওয়ার মত নয়। যাঁরা অন্যরকম বলেন তাঁদের একটা বড় যুক্তি হল তৃণমূল খুব খারাপ এবং দুর্নীতিগ্রস্ত দল হতে পারে, কিন্তু বিজেপি এমন একটা দল যারা গণতান্ত্রিক কাঠামোটার পক্ষেই বিপজ্জনক। আমার প্রশ্ন, মেরে ধরে বিরোধীদের মনোনয়নই জমা দিতে না দিলে আর কোন গণতান্ত্রিক কাঠামো অবশিষ্ট থাকে? উত্তরে অবধারিতভাবে বলা হবে পশ্চিমবঙ্গে রাজনৈতিক হিংসা তৃণমূল শুরু করেনি, ইত্যাদি। এসব বলার সময় তৃণমূলপন্থী এবং উদারপন্থীরা মনে রাখেন না বা ইচ্ছা করেই ভুলে যান যে ১৯৭৮ সালে পঞ্চায়েত নির্বাচন চালু হওয়ার পর থেকে ২০১৮-র মত এত বেশি আসনে কখনো বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় এক পক্ষ জেতেনি। এই রইল প্রমাণ [১]। কিন্তু কথা হল, দুটো দল যদি সমান বিপজ্জনক হয়, তাহলে বড় দলটিকে সর্বশক্তি দিয়ে হারালেই তো ছোট দলকে হারানো সহজ হওয়ার কথা। উল্টোটা কী করে সম্ভব? তৃণমূলকে হারাতে পারলেও বিজেপির বিপদ তো থেকেই যেত। এই সোজা কথাটা বাম নেতারা বুঝলেন না। ফলে বিজেপি বিরোধী হিসাবে একেবারেই বিশ্বাসযোগ্য হয়ে উঠতে পারলেন না। শ্যাম পেলেন না, কুলও হারালেন।

মোদ্দা কথা এক পয়সা ট্রাম ভাড়া বৃদ্ধির প্রতিবাদে কলকাতা অচল করে দেওয়ার জন্য খ্যাত (আচ্ছা, কুখ্যাতই হল) বামপন্থীরা কোনরকম দীর্ঘমেয়াদি আন্দোলন গড়ে তোলার মধ্যে গেলেন না। ধর্মতলায় টেট পরীক্ষার অবিচারের প্রতিবাদে অনশনরত ছেলেমেয়েদের আন্দোলনে বিমানবাবু অতিথি শিল্পীর মত গিয়ে বসলেন। সুজনবাবু রাজভবনের গেটে অপেক্ষারত টিভি সাংবাদিকদের নিয়মিত বাইট দিলেন। সেলিমবাবু হিন্দি বাংলা মিশিয়ে সকৌতুক সাংবাদিক সম্মেলন আর ফেসবুক লাইভ করে গেলেন। মানুষের আশীর্বাদ কুড়োবার দায়িত্ব পড়ল নীচের তলার কর্মীদের উপর — কমিউনিটি ক্যান্টিন আর রেড ভলান্টিয়ার্সের মাধ্যমে। ‘দিস ম্যান’ (অবশ্যই উওম্যানও) যারপরনাই পরিশ্রম করল স্বেচ্ছাসেবকের ভূমিকায় আর ‘দ্যাট লিডার’ পারমুটেশন-কম্বিনেশনের অঙ্ক কষে গেলেন। কংগ্রেসের সাথে জোট করা যথেষ্ট হবে না, অতএব নতুন জোটসঙ্গী চাই। আমি কোথায় পাব তারে, আমার মনের মানুষ যে রে? খুঁজতে খুঁজতে পাওয়া গেল ফুরফুরা শরীফে। ভদ্রলোক ভোটাররা চটবেন জেনেও নেতারা যে উদ্যমে আব্বাস সিদ্দিকিকে আলিঙ্গন করেছিলেন, সিদ্ধান্তের কারণ ব্যাখ্যা করে শমীক লাহিড়ী যেরকম সন্দর্ভ রচনা করেছিলেন পার্টি মুখপত্রে — তাতে ভাবা গিয়েছিল সিপিএম সত্যিই কৌম পরিচয়ের রাজনীতিকে এড়িয়ে যাওয়ার যে ঐতিহাসিক ভুল, তা সংশোধন করতে চায়। কিন্তু পরীক্ষায় শূন্য পাওয়ার পর যেভাবে ইন্ডিয়ান সেকুলার ফ্রন্টের সাথে জোটকে দায়ী করা হচ্ছে, তাতে স্পষ্ট তাঁরা কর্মী সমর্থকদের যা-ই বলে থাকুন, আই এস এফের সাথে জোট করা শর্টকাটে জিতে যাওয়ার কৌশলের বেশি কিছু ছিল না।

অশোক ভট্টাচার্য আর শিলিগুড়ি নাকি সমার্থক। সেই শিলিগুড়িতে তাঁর এক বিশ্বস্ত অনুচর বিজেপিতে চলে যাওয়াতেই ভটচায্যিমশাই একেবারে তৃতীয় হয়ে গেলেন! তাহলে প্রশ্ন ওঠা উচিৎ তাঁর এতদিনের দাপট কি তাঁর ছিল, না অনুচরের? তিনি কি টের পাননি যে জনবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছেন? যে কিসের ভিত্তিতে একটা ধর্মীয় ফ্যাসিবাদী দলে চলে যাওয়ার মানসিকতাসম্পন্ন শঙ্কর ঘোষ তাঁর ডান হাত হয়ে উঠেছিলেন? কমিউনিস্ট পার্টির নেতা হিসাবে এ প্রশ্নের জবাবও দিতে হবে। অথচ প্রবীন ভটচায্যিমশাই অত গভীরে না গিয়ে নিজের পরাজয়কে স্রেফ বাকি রাজ্যের প্রবণতার অংশ বলেই ক্ষান্ত হলেন।

দক্ষিণবঙ্গের ভটচায্যিমশাই আরো এক কাঠি সরেস। তিনি যে কেবল আই এস এফের সাথে জোটে দোষ দেখেছেন তা নয়, কংগ্রেসকে অবহেলা, অবজ্ঞা, অপমান — আরো কী কী সব করা হয়েছে বলে তিনি বেজায় আহত। বলেছেন সে অপমানের জবাব নাকি কংগ্রেসের সদস্য সমর্থকরা দিয়ে দিয়েছেন। যে দল নিজের লড়া ৯১টা আসনেই পেয়েছে ২০১৯ লোকসভার চেয়ে ২.০৬% কম ভোট, তাদের সদস্য সমর্থকরা কি আকাশের চাঁদ এনে দেবে ভেবে ভটচাযমশাই তন্ময় হয়ে ছিলেন? চক্ষুশূল আই এস এফ কিন্তু ২৮টা আসনে ২০১৯ সালে প্রাপ্ত বাম ভোটের চেয়ে ৬.৬০% বেশি ভোট পেয়েছে। এমনকি বাম, কংগ্রেস যোগ করলে যা হয় তার চেয়েও বেশি ভোট পেয়েছে। অতএব তারাই ডুবিয়ে দিল, এ তত্ত্ব দাঁড়াচ্ছে না। তাদের নেওয়া হল বলে অনেক বাম ভোটার বিমুখ হলেন — এই যদি বক্তব্য হয়, তাহলে সে আশঙ্কা আগে কেন প্রকাশ্যে বলেননি? ফল বেরোবার পরে শৃঙ্খলাকে আর গুরুত্ব দিচ্ছেন না, কারণ গোটা সিস্টেমটাই উলঙ্গ হয়ে গেছে। আগেই শৃঙ্খলাভঙ্গ করে উলঙ্গ হওয়া বাঁচানোর চেষ্টা করতে পারতেন তো। তাহলে কি আশা করছিলেন আর যা-ই হোক নিজের আসনটি জিতে যাবেন? এবং জিতে গেলে আর বিদ্রোহী হওয়ার দরকার বোধ করতেন না? অবশ্য এই ভটচায্যির সবচেয়ে চমকপ্রদ মন্তব্য জোট নিয়ে নয়, বাটি নিয়ে। কমিউনিস্টদের রাস্তায় দাঁড়িয়ে রাজনীতি করাকে তিনি যে ভাষায় কটাক্ষ করেছেন, স্বয়ং তথাগত রায়কেও তা করতে দেখিনি কখনো। নেতাদের বাটি হাতে রাস্তায় দাঁড়িয়ে পড়ার পরামর্শ শুনে মনে পড়ল, ছোটবেলা থেকে যে কমিউনিস্টদের দেখেছি, তাঁরা এ রাজ্যের বন্যা থেকে শুরু করে কিউবার বিরুদ্ধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক অবরোধে মানুষের পাশে দাঁড়াতে আক্ষরিক অর্থেই ভিক্ষার বাটি নিয়ে লোকের বাড়ি বাড়ি যেতেন, স্টেশনে এবং বাসস্টপে দাঁড়াতেন। নির্বাচনের খরচও এখনো বাড়ি বাড়ি ঘুরে জোগাড় করেন ভটচাযমশায়ের কমরেডরা। এ ভিক্ষা যদি ভটচায্যিমশায়ের কাছে লজ্জার বিষয় হয়, তাহলে তাঁর শ্রেণিচরিত্র নিয়ে প্রশ্ন তোলা উচিৎ। “আমি মার্কসবাদী, আজীবন তা-ই থাকব” বলেছেন বলেই সন্দেহের ঊর্ধ্বে রাখা চলে না।

মিলে মিশে লড়া এমনই সর্বরোগহর বটিকা হিসাবে সিপিএম মহলে নন্দিত যে সুন্দরবনের লড়াকু নেতা কান্তি গাঙ্গুলি পর্যন্ত ভবিষ্যতে তৃণমূলের সাথে হাত মেলানোর দিকে ইঙ্গিত করেছেন। এদিকে ভোটের ফল বেরোবার পর থেকে যত্রতত্র বাম কর্মী সমর্থকরা তৃণমূলের হাতে মার খাচ্ছেন, ঘরছাড়া হচ্ছেন। এমনকি কোভিডের দ্বিতীয় ঢেউয়ে প্রাণের মায়া অগ্রাহ্য করে যে রেড ভলান্টিয়াররা কাজ করছেন, তাঁরাও খুনের হুমকি, ধর্ষণের হুমকি পাচ্ছেন। বেশ মনে আছে, নির্বাচনের কিছুদিন আগে ফেসবুকে মহম্মদ সেলিমের বিজেপির প্রতি নরম মনোভাবের সমালোচনা করে লিখেছিলাম, বিজেপি ক্ষমতায় এলে নীচের তলার কর্মীরা মার খাবেন, সেলিমবাবুরা পাশে দাঁড়াবেন না। এর প্রতিক্রিয়ায় বহু সিপিএম কর্মী আমার দিকে ধেয়ে এসেছিলেন। অনেকে বলেছিলেন তাঁদের পার্টিতে কোন উপরতলা-নীচতলা নেই। কথাটা সত্যি হলে সত্যিই ভাল লাগত। কিন্তু গত এক সপ্তাহে দেখা যাচ্ছে ‘দিস ম্যান’ মার খাচ্ছে, ‘দ্যাট লিডার’ কী যে করছে কেউ জানে না। ক্ষুব্ধ পার্টিকর্মীরা সোশাল মিডিয়ায় বিষোদ্গার করছেন। বর্ধমান, বাঁকুড়া, মেদিনীপুর বা ডুয়ার্সের প্রত্যন্ত এলাকার কথা বাদ দিন। কর্মীদের অভিযোগ খোদ দমদমে পার্টি অফিস বেদখল হয়ে যাচ্ছে, তবু নেতৃত্ব সংঘাতে যেতে চাইছেন না। নিরপেক্ষরা নিশ্চয়ই বলবেন নির্বাচনের পরে পশ্চিমবঙ্গে এসব ঘটনা চিরকাল ঘটে। কিন্তু যে দলের কর্মীরা আক্রান্ত হচ্ছেন, তাঁরা যে এরকম মুহূর্তে দলাই লামাকে নেতা হিসাবে চাইবেন না তা বলাই বাহুল্য। তাঁরা চাইবেন নেতারা এসবের প্রতিবাদে রাস্তায় নামুন। তাঁরা আশা করবেন নেতারা বোঝেন যে একটাও আসন না পাওয়ার পর শাসক দলের অত্যাচার নিয়ে সাংবাদিক সম্মেলন করতে চাইলে আলিমুদ্দিন স্ট্রিটে সাংবাদিক পাওয়াও মুশকিল হবে। ফলে সংবাদমাধ্যম দেখে সাধারণ মানুষ ভাববেন কেবল বিজেপির লোকেরাই নির্যাতিত হচ্ছে।

এতদিন পরে নন্দীগ্রামে একটা মিছিলের ব্যবস্থা হয়েছে। সীমিত শক্তির অজুহাতে বামেদের শীর্ষ নেতৃত্ব কতদিন হাত গুটিয়ে বসে থাকবেন আর কতজন নিরুপায় কর্মী সমর্থককে বিজেপির কাছে আশ্রয় নিতে হবে — তার উপর নির্ভর করছে ভবিষ্যতে বামেদের ভোট শতাংশও শূন্যের দিকে হাঁটবে কিনা। পরাজিত, আক্রান্ত মানুষ কিন্তু দেখতেই পাচ্ছেন বিজেপির সর্বভারতীয় সভাপতি জে পি নাড্ডা দিল্লি থেকে জেলায় চলে আসতে পারেন দলের আক্রান্ত লোককে দেখতে। সূর্যকান্ত মিশ্ররা কলকাতা থেকে গিয়ে উঠতে পারেন না।

তথ্যসূত্র

[১] দ্য হিন্দু পত্রিকা

https://nagorik.net/ এ প্রকাশিত

ইভিএমে তিনবার কারচুপি করার সুযোগ আছে: জহর সরকার

এই প্রথম একজন নির্বাচন কমিশনার হলেন, যাঁর পক্ষপাতিত্ব সম্বন্ধে গোটা ভারতবর্ষ একমত। সেটাই সমস্যা বাড়িয়েছে।

দু দশকেরও বেশি সময় ধরে ভারতের লোকসভা ও বিধানসভা নির্বাচনে ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিনে ভোটগ্রহণ চলছে। শুরু থেকেই এই মেশিনগুলোর বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে কেউ না কেউ প্রশ্ন তুলেছেন। সাম্প্রতিক অতীতে বিশেষত বিজেপি-বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো বারবার নানারকম অভিযোগ করেছে। রাজনৈতিক নেতার বাড়ি থেকে ইভিএম উদ্ধার হওয়া বা ইভিএমের হিসাব না মেলার মত ঘটনা সন্দেহ আরো বাড়িয়েছে। কিন্তু নির্বাচন কাছে এসে পড়লে দলগুলো যতখানি উৎসাহ নিয়ে ইভিএমের দোষ ত্রুটি নিয়ে আলোচনা করে, ভোটপর্ব মিটে গেলে আর সে উৎসাহ থাকে না, বিশেষত যদি ফলাফল বিজেপির বিপক্ষে যায়। তাহলে ইভিএম নিয়ে আপত্তি কি স্রেফ রাজনৈতিক স্টান্ট, নাকি সত্যিই আপত্তি করার মত কিছু আছে? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে নাগরিক ডট নেট কথা বলল প্রবীণ আই এ এস জহর সরকারের সঙ্গে।

১৯৯৯ সালে যখন প্রথমবার ইভিএম ব্যবহার করা হয়, তখন তিনি পশ্চিমবঙ্গের চিফ ইলেক্টোরাল অফিসার ছিলেন। বর্তমানে জহরবাবু দ্য সিটিজেন্স কমিশন অন ইলেকশনস (CCE) নামে একটি সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত, যার সদস্য সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি, সরকারি আমলা, সাংবাদিক, অর্থনীতিবিদ এবং গবেষকরা। এই সংগঠনের পক্ষ থেকে ইভিএম কারচুপি নিয়ে এ বছরের শুরুতে একটি রিপোর্ট তৈরি করা হয় এবং নির্বাচন কমিশন, রাষ্ট্রপতি ও সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কাছে পাঠানো হয়।

আপনারা জানুয়ারি মাসে একটা সাংবাদিক সম্মেলন করেন, তাতে বলেন যে ইভিএমে কারচুপি করা যায় না এমন কোন প্রমাণ নেই। তাই একমাত্র সমাধান হল যত বেশি সম্ভব ভিভিপ্যাট গণনা করা। এই নিয়ে আপনারা যে রিপোর্ট তৈরি করেছিলেন এবং বিভিন্ন মহলে পাঠিয়েছিলেন, তাতে কোন প্রতিক্রিয়া হয়েছে কি?

নাগরিকরা জবাব দিয়েছে। নির্বাচন কমিশন কোন জবাব দেয়নি, সরকারও কোন জবাব দেয়নি।

২০১৮ সালের ইকনমিক টাইমসের একটা প্রতিবেদন দেখছিলাম। বৎসোয়ানায় আমাদের এখান থেকে ইভিএম রপ্তানি করা হয়েছিল এবং সেখানকার বিরোধী দল অভিযোগ করে যে ওগুলো এমনভাবে তৈরি যাতে ভোটে ক্ষমতাসীন দল জেতে। আপনারাও বলছেন কারচুপি সম্ভব। তাহলে কি বলছেন একেবারে মেশিন বানানোর স্তরেই এই ধরনের কারচুপি সম্ভব?

না, ওটা সম্ভব নয়। গণতন্ত্রে অতটা কারচুপি করা যায় না, কারণ সমস্ত প্রক্রিয়াটা একটা প্রতিষ্ঠিত ব্যবস্থার মধ্যে দিয়ে যায়। ভারতে আমি প্রথম যখন নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার শুরু করেছিলাম ১৯৯৯-তে, তখন যন্ত্রটার উপর যথেষ্ট ভরসা ছিল। আমরা যথেষ্ট নিশ্চিত ছিলাম, কারণ তখন হ্যাকিং কী জিনিস সেটা বিশেষ কেউ জানত না, প্রযুক্তি তখনো অনেক পিছিয়ে। কিন্তু ১৫-২০ বছর পরে প্রযুক্তি এমন জায়গায় চলে এসেছে, যে স্কোপ অফ ইন্টারভেনশন থাকলেই কারচুপি করা সম্ভব।

তাহলে আপনি কী ধরনের কারচুপির কথা বলছেন যদি একটু বুঝিয়ে বলেন।

ইভিএমে তিনবার স্কোপ অফ ইন্টারভেনশন আছে। প্রথম সুযোগ যখন পরীক্ষা করার জন্যে ইভিএম বার করে নিয়ে যাওয়া হয়। বাইরের আউটসোর্সড এজেন্টরা ভারত ইলেকট্রনিক্স (BEL) বা অন্য সরকারি ম্যানুফ্যাকচারারদের হয়ে টেস্টিং-এ নিয়ে যায়। সেখানে একটা বড় ঘরে বসে তারা টেস্টিং করে, দেখার কেউ থাকে না। আমরা জানতাম যে BEL নিজেই কাজটা করে। স্বভাবতই সরকারি সংস্থা কাজটা করলে সন্দেহ কম থাকে, কারণ সরকারি কর্মচারীদের চাকরি বা পেনশনের ব্যাপার আছে। তারা চট করে গন্ডগোল করতে সাহস পাবে না। কিন্তু পরে জানা গেল এই কাজটা আউটসোর্স করে দেওয়া হয় বিভিন্ন এজেন্সিকে। এই আউটসোর্সিং একটা দুর্বলতার জায়গা।

দ্বিতীয় সুযোগ যখন সেট বার করে রিটার্নিং অফিসারের অফিসে নিয়ে আসা হয়। প্রার্থী ঘোষণা হয়ে যাওয়ার পর মেশিনগুলোকে রিসেট করতে হয়। সেটটা একটা কোড দিয়ে রিসেট করা হয়। প্রত্যেকটা নির্বাচন কেন্দ্রে এই কাজটা করা হয়, কারণ আগে থেকে তো আর জানা থাকে না কোন বোতামে কোন প্রার্থী থাকবে। প্রার্থীদের নাম ঠিক হলে তবেই এই কাজটা করা সম্ভব। এই রিসেটের সময়ে কারচুপির সুযোগ থাকে। কারণ রিসেটও যে সরকারি আধিকারিক বসে করেন তা নয়। এই কাজটাও আউটসোর্সড লোককে দিয়ে করানো হয়। তাদের দুরভিসন্ধি থাকলে ইভিএমে কারচুপি করা সম্ভব। ব্যাপারটা অনেকটা বাড়ির টিভি সারানোর মত। যার টিভি সারানো হচ্ছে সে তো আর বুঝতে পারে না যে সারাচ্ছে সে কী করছে। ঐ সময়টায় কোন সফটওয়্যার নিয়ে এসে এমন ব্যবস্থা করা সম্ভব যাতে বেশ কয়েকটা ভোট, যাকেই দেওয়া হোক, একজন প্রার্থীর কাছেই যাবে।

তৃতীয় সুযোগ যখন মেশিনটাকে পোলিং বুথে নিয়ে গিয়ে আবার খোলা হয়। তবে এই সময়টায় কারচুপির সম্ভাবনা কম, কারণ তখন সব দলের পোলিং এজেন্ট ভোট দিয়ে মেশিন পরীক্ষা করেন। যে যেমন ইচ্ছা ভোট দেন এবং কাগজে লিখে নেন কে কটা ভোট দিলেন। তারপর ফলাফল দেখাতে বলেন। সেই ফলাফল মিললে বোঝা যায় সব ঠিক আছে। একে আমরা বলি মক রান। এরপর যখন মেশিন সেট করা হয় তখন কারচুপির সুযোগ থাকে। কিন্তু এবারে ব্যাপারটা লক্ষ্য করার লোক থাকে বলেই বলছি সম্ভাবনা কম।

কিন্তু বুঝতেই পারছেন যে তিনবার মেশিন খোলা হয়, তার মধ্যে দুবার গোপনে খোলা হয় এবং প্রযুক্তিবিদরা মনে করেন এই সময়গুলোতে কারচুপি করা সম্ভব। ভারত এবং আরো ষাটটা দেশের প্রযুক্তিবিদরা বলেছেন যখন কারচুপি সম্ভব, তখন আমরা ইভিএম ব্যবহার করব না। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকটা রাজ্য এখনো ইভিএম ব্যবহার করে, কিন্তু সাথে ব্যালট পেপারও রাখে। আর লাতিন আমেরিকার দুটো দেশ ইভিএম ব্যবহার করে। পৃথিবীর ১৮০টা গণতান্ত্রিক দেশের মধ্যে আর কেউ এই যন্ত্র ব্যবহার করে না।

এত উন্নত প্রযুক্তি থাকা সত্ত্বেও এতগুলো দেশ ব্যবহার করে না কেন? এটা ঠিকই যে কিছু দেশ করে না পুরনো সংস্কারবশত। কিন্তু জার্মানি বা ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের অন্য উন্নত দেশগুলোতে এই নিয়ে প্রচুর বিচার বিশ্লেষণ হয়েছে। ই ইউ-এর জাজ বলে দিয়েছেন এই মেশিন আমরা ব্যবহার করতে দেব না, এক শতাংশ সন্দেহ থাকলেও নয়। তাই গোটা ইউরোপিয়ান ইউনিয়নে কোথাও ইভিএম ব্যবহার হয় না। ব্রিটেনেও হয় না। তাহলে এতগুলো উন্নত দেশ কি নেহাত বোকা, যে উন্নত প্রযুক্তি থাকতেও ব্যবহার করছে না?

অনেক ভোটকর্মীর সাথে কথা বলে দেখেছি, তাঁরা খুব জোর দিয়ে বলেন যে কারচুপি অসম্ভব এবং নিজের কথা প্রমাণ করার জন্যে ইভিএম হাতে পাওয়া থেকে শুরু করে ভোটকেন্দ্র থেকে ফিরে মেশিন জমা দেওয়া পর্যন্ত যে লম্বা প্রক্রিয়া, সেটার ফিরিস্তি দিয়ে বলেন এর মধ্যে কোনরকম কারচুপি করার সুযোগই নেই। এই ধারণাটা ভোটকর্মীদের মধ্যে কেন তৈরি হয়েছে বলে আপনার মনে হয়?

আসলে ভোটকর্মীরা গোটা প্রক্রিয়ার মাঝের একটা ছোট অংশ দেখতে পান। আমি বৃহত্তর ছবিটা বললাম। ওঁদের বক্তব্য একদম সঠিক। অর্থাৎ বুথে যাওয়া আর বুথ থেকে ফেরত আসা — এর মধ্যে ট্যাম্পারিং অসম্ভব। কারণ ভোটকর্মীদের যে পার্টি তৈরি করা হয় সেটা কম্পিউটারে র‍্যান্ডম সিলেকশনের মাধ্যমে হয়, যাতে কেউ কারোর পরিচিত না হয়। প্রথম দিকে এটা কেরানিদের উপর ছেড়ে দেওয়া হত। তখন প্রায়ই চার বন্ধু বলত, আমাদের একসাথে দিয়ে দিন। কোন বদ মতলব আছে বলে নয়, চেনা জানা লোক হলে সুবিধা হবে ভেবে। আবার পার্টির লোকেরাও দাবি করত প্রতি পোলিং পার্টিতে তাদের একজনকে রাখতে হবে। কিন্তু এখন পুরো ব্যাপারটাই কম্পিউটারের মর্জিতে চলে। ফলে একই পোলিং পার্টির সবার সবাইকে চেনার সম্ভাবনা দশ লাখে এক। অতএব পাঁচজন অচেনা লোক, যারা একে অপরের রাজনীতি জানে না, তারা তো আর দলবদ্ধভাবে কারচুপি করতে পারে না। সুতরাং ভোটকর্মীদের স্তরে কারচুপির সম্ভাবনা শূন্য।

আচ্ছা অনেক ভোটেই যে একটা অভিযোগ ওঠে, পশ্চিমবঙ্গে এবারের ভোটেও উঠেছিল, যে ভোটার বলছেন আমি এক দলের বোতাম টিপলাম, অন্য দলের বোতামের পাশে আলো জ্বলল। এটা কি সম্ভব?

না, এটা একেবারেই সম্ভব নয়। এই ধন্দ এড়াতেই তো ভিভিপ্যাট (ভোটার ভেরিফায়েড পেপার অডিট ট্রেল)-এর ব্যবস্থা করা হয়েছে। বর্তমান নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে আমাদের যে অভিযোগ সেটা হল এত কোটি টাকা দিয়ে ভিভিপ্যাট মেশিনগুলো কেনা হয়েছে, অথচ ওঁরা স্লিপগুলো গুনতে রাজি নন। আমরা যারা সমস্ত ভিভিপ্যাট গোনার দাবি করেছি, তারা নির্বাচন প্রক্রিয়ার সাথে যুক্ত ছিলাম। আমরা বলছি ওঁরা যে বলছেন ভিভিপ্যাট গুনতে পাঁচদিন লাগবে, এটা একেবারে বাজে কথা। ভিভিপ্যাটের স্লিপগুলো তাসের মত গুছিয়ে নিতে হবে। একজন ব্যাঙ্ককর্মী রাখতে হবে, যিনি নোট গোনার মত ওগুলো গুনে যাবেন আর আলাদা আলাদা বাক্সে ফেলবেন। তারপর রাজনৈতিক দলের এজেন্টদের বলবেন, নিজের নিজের বাক্স তুলে দেখে নিন আপনাদের প্রাপ্ত ভোটের সাথে মিলল কিনা। এতে কতক্ষণ লাগে? এইটুকু করতে না চেয়ে নির্বাচন কমিশনার সুনীল অরোরা যে আচরণ করেছেন তা থেকে সন্দেহ হওয়া স্বাভাবিক যে ভিভিপ্যাটের সাথে ইভিএম না-ও মিলতে পারে। আমরা যদি এটার প্রমাণ পাই, তখন দুটো মেশিনের কেন সমন্বয় হচ্ছে না সেটা নিয়ে অনুসন্ধান করতে হবে। সেটা পরের পদক্ষেপ।

অনেকদিন আগে আপনার একটা বক্তৃতায়শুনেছিলাম, তাতে আপনি বলেছিলেন একটা যন্ত্র হয়, যাতে বিভিন্ন বুথ থেকে আসা ইভিএমগুলোর ভোট মিশিয়ে ফেলা যায়। সেই যন্ত্র কিনতে কেন্দ্রীয় সরকার আপত্তি করেছিল। তাহলে কি ধরে নিতে পারি যে শুধু কারচুপি করা যায় তা-ই নয়, ইভিএমে আমার ভোটের গোপনতাও সুরক্ষিত নয়?

যন্ত্রটার নাম টোটালাইজার। ওটা অবশ্যই ব্যবহার করা উচিৎ, কিন্তু কোন রাজনৈতিক দলই টোটালাইজার চায় না। কারণ তারা বুথভিত্তিক ফলাফল চায়, নিজেদের এলাকাভিত্তিক সাফল্য বা ব্যর্থতা বোঝার জন্যে। কিন্তু রিটার্নিং অফিসার হিসাবে আমি মনে করি বুথভিত্তিক ফলাফল অত্যন্ত বিপজ্জনক। কারণ এই ফল জেনে নিয়ে কোন দল যারা তাদের ভোট দেয়নি, তাদের উপর চড়াও হতে পারে। টোটালাইজার যেটা করে সেটা হল পাঁচটা ইভিএমকে একসাথে যুক্ত করে দেয়, তারপর মোট ভোটটা পাওয়া যায়। এই মোট ভোট থেকে আর ধরা যায় না কোন পাড়ার লোক কোথায় ভোট দিয়েছে।

ইভিএমের পক্ষে যাঁরা সওয়াল করেন, তাঁদের বক্তব্য যখন ব্যালটে ভোট হত তখন গণনায় তো বেশি সময় লাগতই, তার চেয়েও বড় কথা ভোট লুঠ করা বা ছাপ্পা ভোট দেওয়া অনেক সহজ ছিল। এটা কি আপনি মানবেন?

শেষের দিকে ছাপ্পা ভোটকে নিয়ন্ত্রণ করারও নানা কৃৎকৌশল বার করা হয়েছিল। এমন উপায় বার করা হয়েছিল যে গণনার সময়েও ছাপ্পা ভোট আমরা ধরে ফেলতাম। তাছাড়া সেইভাবে তো ইভিএম-ও দখল করা যায়। সেই ভয়ে ইভিএম ব্যবহার করার কোন যুক্তি নেই। তবে ইভিএম যে সুবিধাজনক তাতে ভুল নেই। কিন্তু প্রক্রিয়াটা সম্বন্ধে সন্দেহ থেকে যাচ্ছে। আমি ব্যালটেই ফেরত যেতে বলছি তা নয়। আমার বক্তব্য হল ইভিএমের সাথে ভিভিপ্যাটও গুনে নেওয়া হোক। কিন্তু সুনীল অরোরা গোঁ ধরে বসে রইলেন, গুনব না। তাতেই সন্দেহ আরো বেড়ে গেল।

মনে রাখতে হবে টি এন শেষনের পর থেকে কোনদিন নির্বাচন কমিশনকে আমরা এত নীচু চোখে দেখিনি। সব নির্বাচন কমিশনারই কম বেশি সমালোচিত হয়েছেন, কিন্তু এস ওয়াই কুরেশি, ওমপ্রকাশ রাওয়াত বা এন গোপালস্বামীকে তো আমরা কোনদিন সন্দেহ করিনি। শেষন একটা মানদণ্ড তৈরি করে গিয়েছিলেন। তারপর এই প্রথম একজন নির্বাচন কমিশনার হলেন, যাঁর পক্ষপাতিত্ব সম্বন্ধে গোটা ভারতবর্ষ একমত। সেটাই সমস্যা বাড়িয়েছে।

https://nagorik.net/ এ প্রকাশিত। ছবি টুইটার থেকে।

বামেদের মধ্যবিত্ত-কেন্দ্রিকতার সংকট কিংবা দ্বিমেরু-বঙ্গের এক নিশ্চিন্ত নাগরিকের প্রলাপ

বিজেপির রামনবমীর বিপরীতে তৃণমূলের হনুমানপুজো, অযোধ্যার রামমন্দিরের বিপরীতে দীঘার জগন্নাথ মন্দির… এগুলোই বাংলার রাজনীতির অভিজ্ঞান হয়ে উঠতে পারে।

পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনের ফল প্রকাশের অন্তিম লগ্নে ভারতীয় জনতা পার্টির রাজ্য সহ-সভাপতি জয়প্রকাশ মজুমদারের সাংবাদিক সম্মেলন দেখছিলাম। ২০০১-এর বিধানসভা নির্বাচনে বিরাট আশা জাগিয়ে বিধ্বস্ত হওয়ার পর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের চেহারাটা অনেকেরই মনে আছে। জয়ের জন্য প্রাণপণ লড়াই করার পর পরাজিত হলে কোনও নেতা বা নেত্রীর প্রতিক্রিয়া ওরকমই হওয়ার কথা। অথচ, জয়প্রকাশবাবু দেখলাম বেশ স্থিতধী। তিন থেকে ৭৭-এ পৌঁছনোতেই তিনি সাফল্য (নাকি সান্ত্বনা?) খুঁজে পেয়েছেন। ২০১৯ লোকসভা নির্বাচনে শতাধিক বিধানসভা আসনে এগিয়ে থাকার কথা সুবিধামত ভুলেই গেলেন বোধহয়। কিংবা হয়তো ওটা কর্মীদের মনোবল ভাঙতে না-দেওয়ার কৌশল। তবে যে-কথা বলতে গিয়ে তাঁর মাস্ক-পরা মুখও মনে হল উদ্ভাসিত, কণ্ঠস্বরে স্পষ্ট তৃপ্তি— তা হল তৃতীয় শক্তির অবলুপ্তি। বাম, কংগ্রেস, আইএসএফ যে রাজ্যের রাজনীতিতে কোনও সাড়াই ফেলতে পারেনি এবং আগামী দিনে এই রাজ্যের রাজনীতি যে বিজেপি আর তৃণমূলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে— এই ঘোষণায় রীতিমত জয়ের প্রকাশ দেখলাম। বোঝা গেল, রাজ্য জয়ের স্বপ্ন সফল না-হলেও পশ্চিমবঙ্গকে দ্বিমেরু রাজনীতির দিকে নিয়ে যাওয়াও বিজেপির পক্ষে যথেষ্ট সন্তোষজনক ফলাফল।

২০১৪-র পর থেকে পশ্চিমবঙ্গের আয়তনের কোনও রাজ্যে বিজেপি-কে এরকম বিশ্রী হারের মুখ দেখতে হয়নি। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষের সংখ্যা, দেশভাগের ইতিহাস ইত্যাদি নানা কারণে পশ্চিমবঙ্গে ধর্মীয় মেরুকরণের খেলা শুরু হয়েছিল। আরও নানাবিধ মেরুকরণের আশঙ্কাও প্রকট হয়ে উঠেছিল। উপরন্তু, বিজেপি এই রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচনে জিতে গেলে ২০২৪-এ তাদের লোকসভায় জেতার পথ পরিষ্কার হয়ে যাবে, এরকমও অনেকে ভাবতে শুরু করেছিলেন। তা ছাড়াও বিজেপি-শাসিত রাজ্যগুলোর যা সার্বিক অবস্থা, সেসব দেখে পশ্চিমবঙ্গবাসীর শঙ্কিত হওয়ার যথেষ্ট কারণ ছিল। সর্বোপরি অন্য রাজ্যের মানুষও উদগ্রীব ছিলেন দেখার জন্য যে, বাঙালি সংস্কৃতি হিন্দুত্বের কাছে হার মানে কি না। সেটা ঘটলে সঙ্ঘ পরিবারের হিন্দুরাষ্ট্রের বৌদ্ধিক জয় হত। ফলে, তৃণমূল কংগ্রেসের জয় অনেকের কাছেই উল্লাসের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। রাজ্যের বাইরের মানুষের এই উল্লাস শতকরা একশো ভাগ সঙ্গত, কারণ যে কোনও মূল্যে বিজেপির পরাজয়ই তাঁদের প্রয়োজন ছিল। এই রাজ্যে বিজেপি ক্ষমতাসীন হলে দেশব্যাপী তার সুদূরপ্রসারী প্রভাব পড়তই। যেমন, এই মুহূর্তে করোনা সামলানোয় গাফিলতি এবং অনিচ্ছা প্রকাশ হয়ে যাওয়ায় কেন্দ্রীয় সরকার প্রবল চাপে পড়েছে বলেই দিল্লিতে আন্দোলনরত কৃষকদের করোনার দোহাই দিয়ে তুলে দিতে পারছে না— যা গত বছর শাহিনবাগের সিএএ-বিরোধী আন্দোলনের বেলায় করতে পেরেছিল। পশ্চিমবঙ্গে জিতে গেলে মোদি-অমিত শাহ জুটি কৃষকদের ওপর বলপ্রয়োগ করতেও পিছপা হতেন বলে মনে হয় না। কিন্তু সেসব সংক্রান্ত স্বস্তি ও উল্লাস পেরিয়েও, এই রাজ্যের মানুষের ভবিষ্যতের স্বার্থে কিছু কথা ভেবে দেখা প্রয়োজন বই কী!

প্রায় ৩৮ শতাংশ ভোট পেয়েছে বিজেপি। এর সবটাই সরকারবিরোধী ভোট তো বটেই, কিন্তু কী কারণে এই ভোটাররা সরকারের বিরোধী? যদি জনপ্রিয় যুক্তি অনুযায়ী ধরে নিই এদের বিজেপিকে ভোট দেওয়ার একটাই কারণ— মুসলমান বিদ্বেষ, তা হলে বিশেষ উদ্বেগের কারণ রয়েছে। গত পাঁচ বছরে বিজেপির ক্রমবর্ধমান শক্তিতে আসানসোল, ধূলাগড়, বসিরহাট, তেলেনিপাড়ার মতো নানা জায়গায় সাম্প্রদায়িক অশান্তি হতে দেখা গিয়েছে। এর কোনওটাই তৃণমূলের সংগঠন আটকাতে পারেনি। বহু জায়গাতেই মানুষের অভিযোগ, প্রশাসনিক প্রতিক্রিয়াও পর্যাপ্ত ছিল না। পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার পর নড়েচড়ে বসেছে। ২০১৬-তে ১০.১৬ শতাংশ ভোট পাওয়া সাকুল্যে তিন বিধায়কের বিজেপিই যখন এত অশান্তি পাকাতে পেরেছে, তখন প্রায় চার গুণ বেশি ভোট পাওয়া ৭৭ জন বিধায়কের বিজেপি লক্ষ্মী ছেলেটি হয়ে থাকবে কি? মনে রাখতে হবে, এখন তাদের ১৮ জন সাংসদও আছেন, কেন্দ্রে তাদের সরকার। পান থেকে চুন খসলে তা নিয়ে একটা বড়সড় কাণ্ড ঘটিয়ে ফেলার রসদ তাদের আছে। গত কয়েক বছরে বাংলার সমাজে যে গভীর সাম্প্রদায়িক ক্ষত তৈরি হয়েছে তা যে বিজেপির পরাজয়ের সঙ্গে সঙ্গে বাতাসে মিলিয়ে যাবে, এমন মনে করার কোনও কারণ নেই। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিপুল সমর্থন নিয়ে প্রত্যাবর্তনে প্রমাণিত হল যে, ইমাম ভাতা দিলে অন্যায় হয় না, পুরোহিত ভাতা দেওয়াও ভালো। যেহেতু বিজেপির প্রচার ছিল পশ্চিমবঙ্গে দুর্গাপুজো করতে দেওয়া হয় না, সেই প্রচারকে মিথ্যা প্রমাণ করতে সরকারের ক্লাবগুলোকে পুজোর খরচ দেওয়াও অন্যায় নয়। অতএব আগামী পাঁচ বছর বিজেপির প্ররোচনা দেওয়ার মতো ইস্যুর অভাব হবে না, আর তৃণমূল সরকার সে সব প্ররোচনার রাজনৈতিক মোকাবিলা না-করে দড়ির উপর ব্যালান্সের খেলা খেলে যাবেন— এমন সম্ভাবনা তাই প্রবল।

যা গত দশ বছরে হয়নি, আগামী পাঁচ বছরে হবে— এমন আশা করা যুক্তিযুক্ত নয়। তাই ২০১১ থেকে সারা বাংলায় ছড়িয়ে পড়া আরএসএস-এর সংগঠনের বিরুদ্ধে শাসক দল সত্যিকারের কোনও রাজনৈতিক প্রতিরোধ গড়ে তুলবে— এমন ভাবা, অতএব, বাতুলতা হবে। অবশ্য সরকারি দল প্রতিরোধ করতে যাবেই বা কেন? মুখ্যমন্ত্রী তো এই সেদিন ইন্ডিয়া টুডে-র সাংবাদিক রাহুল কাঁওয়ালকে বলেছেন, আরএসএস-কে নিয়ে তাঁর কোনও সমস্যা নেই, কারণ তারা ভোটে লড়ে না তাঁর সমস্যা বিজেপিকে নিয়ে। বিজেপিকে হারানো হয়ে গেছে, অতএব আরএসএস এবং তৃণমূলের শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান চলতেই পারে বোধহয়। আগামী পাঁচ বছর, বা জয়প্রকাশবাবুর কথা ঠিক হলে, অতিদূর ভবিষ্যৎ পর্যন্ত বিজেপির রামনবমীর বিপরীতে তৃণমূলের হনুমানপুজো, অযোধ্যার রামমন্দিরের বিপরীতে দীঘার জগন্নাথ মন্দির… এগুলোই বাংলার রাজনীতির অভিজ্ঞান হয়ে উঠতে পারে।

দুর্নীতির অভিযোগ, সে আম্ফানের ত্রাণেই হোক কিংবা এসএসসি পরীক্ষার মাধ্যমে চাকরি দেওয়ার ক্ষেত্রেই হোক, বাংলার নির্বাচনে সে সব যে কোনও ইস্যু নয় তা এবারের নির্বাচনে পরিষ্কার হয়ে গেছে। ফলত কর্মসংস্থানও ইস্যু নয়, হয়তো আগামীদিনেও হবে না। শিল্প হবে কি হবে না, শিক্ষিত বেকাররা চাকরি পাবে কি পাবে না— প্রচারে অনবরত সে সব কথা বলে এবং ইশতেহারে লিখে বিরাট গোল্লা পেয়েছে বাম দলগুলো এবং কংগ্রেস, আইএসএফ একটার বেশি আসনে জিততে পারেনি। সাংবাদিক সম্মেলনে তাদের সম্বন্ধে প্রশ্ন আসতে মুখ্যমন্ত্রী একটাও শব্দ খরচ করতে চাইলেন না, করার কথাও নয়। তারা যে ইস্যুগুলো তুলে ধরেছিল, সেগুলো তাঁর মাথায় থাকলেই নাগরিকদের পক্ষে যথেষ্ট। কিন্তু মুখ্যমন্ত্রীর দিক থেকে ভাবলে মানতেই হয়, তাঁর সে সব মনে রাখার কোনও প্রয়োজন নেই। যারা মনে রেখেছিল, তাদের সব মিলিয়ে সাড়ে আট শতাংশ মানুষ ভোট দিয়েছেন। অত কম মানুষের চাওয়া-পাওয়া নিয়ে একজন মুখ্যমন্ত্রীর মাথা ঘামানোর অর্থ হয় না। আর বিজেপি যে ওসব নিয়ে ভাবতে রাজি নয় তা কেন্দ্রীয় সরকার এবং তাদের দখলে থাকা অন্য রাজ্য সরকারগুলোর কার্যকলাপ দেখলেই বোঝা যায়। সুতরাং পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতি এখন থেকে ইস্যুকেন্দ্রিক না-হয়ে চিহ্নকেন্দ্রিক হয়ে উঠলে অবাক হওয়ার কিছু নেই। অর্থাৎ মুখ্যমন্ত্রী কালীঘাট মন্দিরে গেলেন কি না, মহরমের দিন প্রতিমা বিসর্জনের অনুমতি দেওয়া হল কি না— এই সব।

সাধারণ নাগরিকের স্বস্তি এইখানে, যে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের চালু করা একগুচ্ছ জনমুখী প্রকল্প, যার সুবিধা গরিব প্রান্তিক মানুষ পেয়ে থাকেন, সেগুলো অন্তত চালু রইল। বিজেপি যেখানে যেখানে ক্ষমতায় আছে, সেখানে এরকম প্রকল্পের কোনও স্থান নেই। আয়ুষ্মান ভারত[3] বা ফসল বিমা যোজনার[4] মতো দু-একটা কেন্দ্রীয় সরকারি প্রকল্প যা-ও বা আছে, সেগুলো সবই প্রকৃতপক্ষে ধোঁকার টাটি বলে অভিযোগ।

স্পষ্টত, আর একটা আশা নিয়ে মানুষ তৃণমূলকে বিপুল ভোটে জয়যুক্ত করেছেন, তা হল, বাংলায় এনআরসি হবে না। আইনত এনআরসি করা বা না-করা কেন্দ্রীয় সরকারের সিদ্ধান্ত। তবে মানুষ নিশ্চয়ই আশা করেন দিদি এই রাজ্যে এই প্রক্রিয়া প্রাণপণে আটকাবেন। গত বছর যখন বিভিন্ন ধারার বামপন্থীরা, নানা বয়সের মহিলারা সিএএ-এনআরসি-এনপিআর আটকাতে আন্দোলন করছিলেন তখন দেখা গিয়েছিল মুখ্যমন্ত্রী নিজে এই নিয়ে মিছিল-মিটিং করলেও অন্যদের আন্দোলনের প্রতি রাজ্য প্রশাসন বিশেষ সদয় নয়। আশা করা যায়, এখন আর সে সমস্যা হবে না। প্রধান বিরোধী দল বিজেপি তো আর এ নিয়ে আন্দোলন করতে যাবে না, শক্তিহীন বামফ্রন্টই বা কী এমন আন্দোলন করবে? হাতে রইলেন বিকল্প বামেরা, যাঁরা এরপর ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে আন্দোলন আরও তীব্র করবেন বলে শোনা যাচ্ছে। তাঁরা তো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিবেক। তৃণমূলের এই বিপুল জয়ে তাঁদের ‘নো ভোট টু বিজেপি’ আন্দোলনের যথেষ্ট অবদান— এই দাবিতে রবিবাসরীয় আকাশ-বাতাস তাঁরা মুখর করে তুলেছিলেন। সুতরাং তাঁরা আন্দোলন করলে মমতা নিশ্চয়ই আপত্তি করবেন না। আশা করা যায়, দিদি আগামী পাঁচ বছর ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে এঁদের সংগ্রামকে মমতাময়ী পক্ষিমাতার মতো দুই ডানা দিয়ে আগলাবেন। ২০১৮ সালে যেমন চেয়েছিলেন পঞ্চায়েতে শুধু তাঁর দলই থাকুক, এখন তেমন দাবি আশা করা যায় করবেন না যে, ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধেও শুধু তাঁর দলই লড়ুক।

শূন্যে পৌঁছে যাওয়া কংগ্রেসের এ-রাজ্যে ভবিষ্যৎ কী, বলা দুষ্কর। একা কুম্ভ অধীর চৌধুরীর গড় মাটিতে মিশে গেছে, প্রবীণ জনপ্রিয় নেতা আব্দুল মান্নান ধরাশায়ী। বৃদ্ধতান্ত্রিক সিপিএমেও একগুচ্ছ নতুন মুখ দেখা গেছে, কিন্তু কংগ্রেসে? সিপিএমের কচিকাঁচারা যদি ‘একলা চলো রে’ নীতিতে ফিরে যেতে চান তা হলে কংগ্রেসের কী হবে, দেবা ন জানন্তি।

অবশ্য ফলপ্রকাশের পর আটচল্লিশ ঘন্টা কেটে গিয়ে থাকলেও রাজ্য সিপিএমের শীর্ষ নেতাদের কেউ দায়িত্ব স্বীকার করে পদত্যাগ করেছেন, এমন খবর নেই। একটি তথাকথিত বিপ্লবী পার্টির শান্ত হ্রদের মতো অন্দরমহলে একমাত্র ঢেউ বলতে টিভির পর্দায় পরাজিত সিপিআইএম প্রার্থী তন্ময় ভট্টাচার্যের নেতৃত্বের বিরুদ্ধে অকস্মাৎ বিষোদ্গার। কমিউনিস্ট পার্টির কর্মীর বাইরে এ-ভাবে কথা বলা শৃঙ্খলাভঙ্গ কি না, সে বিতর্কে না-গিয়েও বলা যায়, তাঁর সমালোচনায় গঠনমূলক কিছু ছিল না। এই ফলের জন্য “পলিটব্যুরোর দু-একজন নেতা” ছাড়া তিনি দুটো কারণ দেখিয়েছেন। সর্বক্ষণের কর্মীদের যথেষ্ট ভাতা না-পাওয়া আর আইএসএফ-এর সঙ্গে জোট করা। দ্বিতীয়টার ব্যাখ্যা দেননি, আর প্রথমটা ঠিক থাকলে কীভাবে শূন্যের বদলে খাতায় পাঁচটা বা দশটা আসন জমা পড়ত, তা বুঝতে চেষ্টা করার চেয়ে বাইফোকাল চশমা হারানো মানুষের পক্ষে সূচে সুতো পরানো সহজ। উপরন্তু তন্ময়বাবু যে ভাষায় বামপন্থীদের রাস্তার রাজনীতিতে বিশ্বাস রাখাকে কটাক্ষ করেছেন, তাতে তাঁর মার্কস্‌বাদে আস্থাকে সন্দেহ করার যথেষ্ট কারণ আছে। আইএসএফ-এর সঙ্গে জোট করা নিয়ে আপত্তি আর কংগ্রেসের সঙ্গে জোট করা নিয়ে প্রবল আবেগ দেখে মনে হয়নি, আন্দোলনের মাধ্যমে মানুষের সঙ্গে নিবিড় যোগাযোগ স্থাপন করার মতো কোনও পথ তিনি নিজের দলকে দেখাতে চান। বোধহয় তাঁর মনে হয়েছে স্রেফ আইএসএফ-কে জোটের বাইরে রাখলেই মানুষ তাঁদের ঢেলে ভোট দিতেন। মীনাক্ষী, ঐশী, দীপ্সিতা, সৃজন, প্রতীকুরদেরও তা-ই ধারণা কি না, কে জানে! যদি তা-ই হয়, তা হলে অদূর ভবিষ্যতে বামেদের বাংলায় ঘুরে দাঁড়ানোর সম্ভাবনা শূন্য।

আসলে সিপিএমের রাজনীতিতে শ্রেণির প্রশ্ন বহুদিন ধরেই অবহেলিত। তা না-হলে ওঁরা আগেই বুঝতে পারতেন যে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পক্ষে নির্ণায়ক ভোট দেন গরিব মানুষ, যাঁরা তাঁর বিভিন্ন সরকারি প্রকল্পে উপকৃত। আমাদের দেশে যে কোনও নির্বাচনেই নির্ণায়ক ভোট আসলে গরিব মানুষের, কারণ তাঁরাই সংখ্যাগরিষ্ঠ। গত কয়েক বছরে সিপিআইএম-এর সোশাল মিডিয়া নির্ভরতা, এবং কারা সোশাল মিডিয়ায় ওই পার্টির জয়পতাকা ওড়ান তা দেখলে পরিষ্কার বোঝা যায় সিপিআইএম-এর মূল ভোটার হয়ে দাঁড়িয়েছেন মধ্যবিত্ত এবং উচ্চবিত্ত মানুষ। এঁদের অনেকেই আসলে অভ্যাসে সিপিআইএম। পরিবার সিপিআইএম সমর্থক বলে এঁরা সিপিআইএম সমর্থক, অথবা অল্প বয়সে কোনও বাম গণসংগঠনের সদস্য ছিলেন, সেই আবেগ রয়ে গেছে। গরিব মানুষ কোনও পার্টির দ্বারা, সরকারের দ্বারা উপকৃত হলে তা তাঁর ভোটকে প্রভাবিত করে। কিন্তু উপর্যুক্ত শ্রেণির মানুষের সেভাবে উপকৃত হওয়ার ব্যাপার নেই, তাঁরা চলতি হাওয়ার পন্থী। এ বারের ভোটে হাওয়া ছিল বামেরা জিতবে না, অতএব ভোট দিয়ে লাভ নেই। উপরন্তু দাড়ি-টুপি পরা মুসলমান ধর্মগুরুর সঙ্গে জোট বাঁধাও এঁদের পছন্দ হয়নি। তাই লোকসভা নির্বাচনে পাওয়া সাত শতাংশের মধ্যে থেকেও এই দুই বা তিন শতাংশ বেরিয়ে গিয়ে বিজেপি-বিরোধিতার কারণে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে ভোট দিয়েছেন, এখন সোশাল মিডিয়া ভরিয়ে তুলছেন স্বীকারোক্তিতে। এরই মধ্যে হঠাৎ দ্বিমেরু রাজনীতির বিপদগুলো খেয়াল হওয়ায় কেউ কেউ লম্বা পোস্ট লিখে তৃণমূল কংগ্রেসকে খেয়াল করাচ্ছেন, তাঁদের ভোট দেওয়া হয়েছে স্রেফ বিজেপিকে আটকাতে। পার্টিটাকে পছন্দ হয়েছে বা সরকারের কাজ পছন্দ হয়েছে বলে নয়।

শ্রেণি সচেতনতার অভাবে, সমাজবিজ্ঞানের অ-আ-ক-খ জ্ঞানের অভাবে এই শ্রেণির চিন্তাভাবনাই কিন্তু বর্তমান বাম নেতা এবং প্রার্থীদের বিপুলভাবে প্রভাবিত করে। তাই মমতার জনকল্যাণমূলক প্রকল্পগুলোকে সিপিআইএম কর্মীরা প্রায়ই হেয় করেন। “মানুষ আপনার দান/ ভিক্ষা চায় না, মানুষের রোজগারের ব্যবস্থা করুন”— এই চরম নব্য উদারনীতিবাদী কথাটা মিটিং-এ বা সোশাল মিডিয়ায় সিপিআইএম-এর লোকেদের প্রায়শই বলতে দেখা যায়। ওঁরা জানেন না অথবা উপলব্ধি করেন না যে, সরকারের টাকা আসলে করদাতাদের টাকা এবং সে কর একজন ধনী ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে একজন রিকশাচালক পর্যন্ত সকলেই দেন। সুতরাং নাগরিকের জন্য চালু করা কোনও সরকারি প্রকল্প আদতে দান নয়। কন্যাশ্রীর সাইকেল যেমন দান নয়, স্বাস্থ্যসাথী কার্ডের প্রিমিয়ামও দান নয়। শুধু তা-ই নয়, পুঁজিবাদী ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতার মধ্যে পিছিয়ে পড়া মানুষের জন্য এগুলো করা কল্যাণকামী রাষ্ট্রের বহু পুরনো কৌশল। বামফ্রন্ট সরকারও এমন প্রকল্প চালাত। কথাগুলো কিন্তু বিস্তর প্রশংসা কুড়োয় মধ্যবিত্ত, উচ্চবিত্ত সমর্থকদের থেকে। ফলে, ওঁরা ভাবেন, একেবারে ঠিক কথাই বলা হয়েছে এবং বাস্তবে গরিব মানুষের থেকে আরও দূরে সরে যান।

এই মধ্যবিত্ত-কেন্দ্রিকতা না-কাটলে সিপিআইএম-এর আর কোনও ভবিষ্যৎ নেই।

অতএব দ্বিমেরু পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে রুজিরোজগারের প্রশ্ন জিইয়ে রাখার দায়িত্ব এখন পড়ল বিকল্প বামেদের কাঁধে। তাঁদের অনেককালের অভিযোগ, সিপিআইএম বামপন্থার বদনাম করছে। একটিবার সুযোগ পেলেই তাঁরা দেখিয়ে দিতে পারেন আসল বামপন্থা কী, কিন্তু সিপিআইএম তাঁদের জায়গা ছাড়ে না। সিপিআইএম ক্ষমতা থেকে চলে যাওয়ার পরের দশ বছরেও সে সুযোগ ওঁরা পাননি। অনেকটা ওই ‘আনফিট’ বর্ষীয়ান ক্রিকেটার যেমন অতীতের পারফরম্যান্সের জোরে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে খেলেই যান, আর বেচারা তরুণ প্রতিভাবানদের রিজার্ভ বেঞ্চে বসেই জীবন কাটাতে হয়। নির্বাচকদের অসীম কৃপা, এবার তাঁরা দলের সেই বোঝাগুলিকে বিদেয় করার বন্দোবস্ত পাকা করে দিলেন। আশা করা যাক, তরুণরা সেঞ্চুরি, ডবল সেঞ্চুরির ফুলঝুরি ছোটাতে পারবেন শিগগিরই।

https://4numberplatform.com/ এ প্রকাশিত

সোশাল মিডিয়ায় চোখ ধাঁধিয়েই বামেদের সর্বনাশ

ইদানীংকালে বামপন্থী কর্মীদের মধ্যে, বিশেষত তরুণদের মধ্যে, এক অদ্ভুত প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। তাঁরা মনে করেন সোশাল মিডিয়াকে নিয়ন্ত্রণ করা ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ।

এই স্তম্ভে আমার প্রথম লেখা ছিল সিপিএমের প্রচারে ব্যবহৃত টুম্পাসোনা প্যারডি নিয়ে। সেই ভিডিও সোশাল মিডিয়ায় ব্যাপক জনপ্রিয় হয়েছিল, ইউটিউবে কয়েক কোটি হিট হয়। কারো কারো অপছন্দ হলেও, শেয়ার, লাইক এবং ইউটিউব হিটের সংখ্যাই প্রমাণ করে বহু মানুষ সেই ভিডিও পছন্দ করেছিলেন। সেই ভিডিও তখন একাধিক কাগজে খবর হয়ে দাঁড়িয়েছিল। সিপিএম নেতারা দাবি করেছিলেন যুবসমাজের ভাষায়, সাধারণ মানুষের ভাষায় কথা বলার ক্ষেত্রে তাঁদের যে ঘাটতি, ওই ভিডিও তা পূরণ করার প্রচেষ্টা। সোশাল মিডিয়ায় সাফল্য প্রমাণ করে তাঁরা সফল। অর্থাৎ বিজ্ঞাপন সংস্থা যেভাবে বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে ক্রেতার কাছে পৌঁছতে চায়, বামপন্থীরাও সেইভাবে বার্তা পৌঁছে দিতে চেয়েছিলেন ভোটারদের কাছে। বিজ্ঞাপন সংস্থাগুলো নিজেদের ক্যাম্পেনের সাফল্য মাপে আর্থিক বর্ষের শেষে বিজ্ঞাপিত পণ্য বা পরিষেবার বিক্রির পরিসংখ্যান দেখে। সেই যুক্তি মানলে বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফল যেহেতু দেখাচ্ছে বামেদের হাত খালি, সেহেতু টুম্পাসোনাও যে ফ্লপ তা এবার মেনে নেওয়া দরকার। যে যুবসমাজকে ওঁরা ধরতে পেরেছেন বলে ভাবছিলেন, তাঁদের কত শতাংশ ভোট দিয়েছেন তা বিস্তারিত ফলাফল এলে তবেই বোঝা যাবে। কিন্তু রাজ্যের অধিকাংশ মানুষ যে তাঁদের প্রত্যাখ্যান করেছেন তা পরিষ্কার। এবার তাহলে ভাবার সময়, কোথায় ভুল হল? তীব্র বামবিরোধী মানুষও ভাবেননি যে স্বাধীন ভারতে বাংলার বিধানসভা নির্বাচনের সবচেয়ে খারাপ ফল বামেরা এবার করবে।

চুলচেরা বিশ্লেষণ করতে হলে অপেক্ষা করতে হবে সম্পূর্ণ ফলাফল হাতে নিয়ে পর্যালোচনা পর্যন্ত। কিন্তু প্রাথমিকভাবে যা বোঝা যাচ্ছে, তা হল জনগণের ভাবনা চিন্তার সাথে বামপন্থীদের চিন্তাভাবনার দুস্তর ফারাক। ইদানীংকালে বামপন্থী কর্মীদের মধ্যে, বিশেষত তরুণদের মধ্যে, এক অদ্ভুত প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। তাঁরা মনে করেন সোশাল মিডিয়াকে নিয়ন্ত্রণ করা ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ। টুম্পাসোনা নিয়ে আপ্লুত হওয়াও তারই প্রকাশ। সন্দেহ নেই যে সমস্ত আলোচনায় উঠে আসে বিজেপি কিভাবে হাজার হাজার হোয়াটস্যাপ গ্রুপকে ব্যবহার করে ভুয়ো খবর এবং নিজেদের বার্তা ঘরে ঘরে ছড়িয়ে দিয়ে ২০১৪ থেকে নির্বাচন জিতে চলেছে। কিভাবে টুইটারের হ্যাশট্যাগ যুদ্ধ চালিয়ে তাদের বহু শাখাবিশিষ্ট প্রোপাগান্ডা মেশিনারি ভোটারের মস্তিষ্কের দখল নেয়। এসবের বিরুদ্ধে লড়তে হবে ঠিক কথা, কিন্তু মানুষের সাথে নিবিড় যোগাযোগের যে কোন বিকল্প নেই, সেকথা বললে আজকালকার অনেক সিপিএম কর্মী বেশ রেগেই যান। “ওসব করে আজকাল আর জেতা যায় না” — এটা তাঁদের অনেকের প্রিয় বাক্যবন্ধ।

আরও পড়ুন বৃদ্ধতন্ত্র নয়, সিপিএমের সমস্যা মধ্যবিত্ততন্ত্র

আপত্তি উঠবে, যে তরুণ সিপিএম কর্মীরা কি গত বছরের লকডাউনের সময় থেকে শুরু করে উম্পুনের বিপর্যয় হয়ে এখনকার দ্বিতীয় কোরোনা ঢেউয়ে একেবারে নীচের তলার মানুষের পাশে থাকেননি? নিঃসন্দেহে থেকেছেন। তৃণমূল বা বিজেপির উপস্থিতি বরং সেখানে নগণ্য। এই মুহূর্তেও দলমত নির্বিশেষে বহু মানুষ অক্সিজেন সিলিন্ডার, অ্যাম্বুলেন্স বা হাসপাতালের বেডের দরকারে রেড ভলান্টিয়ার্সের খোঁজ করছেন। গ্রীন ভলান্টিয়ার্স বা স্যাফ্রন ভলান্টিয়ার্স বলে কিছুর অস্তিত্ব কারোর জানা নেই। কিন্তু সিপিএম নেতৃত্বের ভাবা প্রয়োজন, কর্মীদের এই অক্লান্ত পরিশ্রমের ফসল ভোট বাক্সে উঠছে না কেন? স্পষ্টতই মানুষ কোন ইস্যুকে ভোটের ইস্যু বলে মনে করেন, তা বুঝতে তাঁদের ভুল হচ্ছে। তাঁরা মনে করছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকারের বিরুদ্ধে ভোটারদের মধ্যে ব্যাপক অসন্তোষ আছে। অথচ দেখা গেল ভোটারদের কাছে প্রধান ইস্যু ছিল বিজেপি শাসনের ভয়। কর্মসংস্থান, পরিকাঠামো, দুর্নীতি — যেগুলো বামেদের ইশতেহার এবং নির্বাচনী প্রচারের কেন্দ্রে ছিল — তার চেয়ে ভোটারদের বেশি জরুরি মনে হয়েছে বিজেপি জিতলে এনআরসি, সিএএ-র বিপদের কথা। হয়ত এসএসসি পরীক্ষা দিয়ে চাকরি না পাওয়ার চেয়েও তরুণ ভোটারদের বড় বিপদ মনে হয়েছে অ্যান্টি রোমিও স্কোয়াডের হুমকিকে। সোশাল মিডিয়ার বিজেপির সাথে টক্কর দেওয়া বামেরা এসব বুঝতেই পারেননি, তাই মাটিতে দাঁড়িয়ে না পেরেছেন তৃণমূল কংগ্রেসের সাথে টক্কর দিতে, না পেরেছেন বিজেপির প্রতিপক্ষ হিসাবে বিশ্বাসযোগ্য হয়ে উঠতে।

উত্তরবঙ্গ সংবাদে প্রকাশিত

একজিট পোল: অঙ্কে কাঁচার সমীক্ষা

ভোটদান হয়ে যাওয়া মাত্রই সমীক্ষক, সাংবাদিক তো বটেই; এমনকি ভোটারদেরও বোধহয় আর ইস্যু নিয়ে আগ্রহ থাকে না। সংখ্যাই তখন শেষ কথা।

অঙ্কে ভাল হতে না পারলে জীবন বৃথা — কথাটা বাবা বলতেন। অঙ্কের থেকে পালিয়ে বেড়িয়ে, কোনমতে মাধ্যমিক পাস করার পরে আর অঙ্কের ছায়া না মাড়িয়ে দিব্যি চাকরি বাকরি পেয়ে গিয়ে বাবার দিকে সগর্বে তাকাতাম, ভাবখানা “হুঁ হুঁ, কেমন দিলাম?” বাবা বুঝতেন কিন্তু কিছু বলতেন না। এখন জীবিত থাকলে নির্ঘাত পাল্টা বলতেন “কেমন দিলাম?” বুথফেরত সমীক্ষা বা এক্সিট পোলের ফলাফল এসে পড়েছে। সেগুলোতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের হৈ হৈ করে প্রত্যাবর্তন[১] (পি মার্কসের সমীক্ষা) থেকে শুরু করে বিজেপির নিরঙ্কুশ পরিবর্তন[২] (ইন্ডিয়া টিভি-পিপলস পালসের সমীক্ষা) পর্যন্ত সবকটা সম্ভাবনাই দেখা গেছে। যেন এক্সিট পোলের ঈশ্বর রাবীন্দ্রিক দাড়িওয়ালা রবি শাস্ত্রী। বলছেন “মিত্রোঁ, অল থ্রি রেজাল্টস পসিবল।” একই নির্বাচনের এক্সিট পোলের ফলাফল কেন এমন আকাশ পাতাল হয় তা নিয়ে মাথা চুলকানো ছাড়া আর উপায় নেই। কারণ খেলা যখন ছিল অঙ্কের সনে, তখন লুকোচুরি খেলেছি। যা নয়ে হয় না, তা কি আর নব্বইতে হয়?

একা এক্সিট পোলে রক্ষে নেই, অতিমারী দোসর। টিভির পর্দা জুড়ে সম্ভাব্য আসন সংখ্যা, ভোট শতাংশ — এসবের সাথেই নেচে বেড়াচ্ছে করোনায় আক্রান্ত আর মৃতের সংখ্যা। কাল তিন লাখ আক্রান্ত হলে আজ চার লাখ, কাল আড়াই হাজার মানুষ মরে থাকলে আজ সাড়ে তিন হাজার। মাঝে মাঝে মনে হচ্ছে খবর নয়, লোটোর ফলাফল দেখছি। যাদের সংখ্যা মিলে যাচ্ছে তারা হয়ত আনন্দে আত্মহারা। যাদের মিলছে না তারা হয়ত কলসী দড়ি খুঁজছে। বা হয়ত দু পক্ষই কলসী দড়ি খুঁজে রাখছে, কারণ চাইলেই তো নিজের পছন্দসই একখানা সমীক্ষার ফল হাতের কাছে পাওয়া যায়। অপছন্দের ফলের সাথে চোখাচোখি হয়ে গেলে ভোরবেলা গঙ্গার পাড়ে প্রাতঃকৃত্য করতে বসা লোকেদের মত নিজের চোখ ঢেকে ফেললেই আরো দুটো দিন নিজস্ব বুদ্বুদে নিশ্চিন্ত থাকা যায়। সে বুদ্বুদ সময় হলে আপনি ফাটবে, আঙুল দিয়ে ফাটানোর প্রয়োজন হবে না। তৃণমূল, বিজেপির বাইরে বাম, কংগ্রেস বা আই এস এফের সমর্থকদেরও উৎকণ্ঠ হয়ে থাকার কারণ আছে। তাঁদেরও শূন্য (ইন্ডিয়া টুডে-অ্যাক্সিস মাই ইন্ডিয়ার সমীক্ষা) থেকে ২৫ (এবিপি-সি ভোটারের সমীক্ষা) পর্যন্ত সবরকম সম্ভাবনা দেখানো হয়েছে।

এমন বহু বাসনায় প্রাণপণে চাইতে চাইতে মনে হয় আমরা সকলেই সংখ্যা হয়ে গেছি। ৪৭ফ, ৬৯ঙ ইত্যাদি। নইলে আমার মত অঙ্কে কাঁচা লোকের সাথে উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী, দেশের স্বাস্থ্যমন্ত্রীর কোন তফাতই থাকে না! তাঁরাও অঙ্কের সাথে লুকোচুরি খেলেন! টিভি ক্যামেরা দেখাচ্ছে, মানুষ নিজে টুইট করছে, ফেসবুকে পোস্ট করছে অক্সিজেনের অভাবের কথা, হাসপাতালে শয্যার অপ্রতুলতার কথা। অথচ ঐ মহামান্য জনসেবকরা সগর্বে বলে চলেছেন কোথাও কোন অভাব নেই। ফুটপাথে সার বেঁধে মড়া পোড়ানোর দৃশ্য সবাই দেখতে পাচ্ছে, অথচ তাঁদের খাতায় মৃতের সংখ্যা দুই অঙ্কে পৌঁছাতেই চাইছে না। হরিয়ানার মুখ্যমন্ত্রী মনোহরলাল খট্টর আরো সোজাসাপ্টা লোক। তিনি বলে দিয়েছেন চেঁচামেচি করলে মৃতেরা ফিরে আসবে না। অতএব সংখ্যা নিয়ে ভেবে লাভ নেই। অনেকের অভিযোগ পশ্চিমবঙ্গেও নাকি সংখ্যা কমিয়ে বলা চলছে, তবে ওসব বলতে নেই। বিজেপি এসে যাবে। তাই আমিও বলছি না।

এখন কথা হচ্ছে সংখ্যা কি কথা বলে? আমাদের কী কথা তাহার সাথে, তার সাথে? কোভিড জনিত সংখ্যার ভাষা তো মন্ত্রীসান্ত্রীরা বুঝছেন না দেখাই যাচ্ছে। আমরা কি বুঝছি? বুথফেরত সমীক্ষা থেকে তার কোন আঁচ পেলাম না। বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গের শেষ তিন দফা ভোটের সময় দেশের কোভিড পরিস্থিতি ক্রমশ খারাপ হয়েছে, রাজ্যেরও। উত্তরপ্রদেশ, দিল্লি, হরিয়ানার পথে এবং পার্কে মড়া পোড়ানোর ছবি সারা দেশে ছড়িয়ে পড়েছে। তা সত্ত্বেও কি সোনার বাংলার প্রতিশ্রুতিতে বিশ্বাস করলাম আমরা? সমীক্ষায় তার কোন উত্তর পেলাম না। অবশ্য প্রশ্নটা করা হয়েছিল কিনা তা জানি না। দেড় বছর ধরে যে অতিমারী চলছে, তার মোকাবিলায় রাজ্যের তৃণমূল সরকার আর কেন্দ্রের বিজেপি সরকারের মধ্যে কোন তফাত দেখলেন কি ভোটাররা? তারও উত্তর রবিবার নির্বাচনের ফলে থাকবে হয়ত। নাকি থাকবে না? সিপিএমের কমিউনিটি ক্যান্টিন কি ভোটারদের প্রভাবিত করেছে? নাকি বিপদের সময়ে ত্রাণমূলক কাজ করার সঙ্গে সরকার চালানোর যোগ্যতার কোন সম্পর্ক নেই — এমনটাই ভোটারদের রায়? সে প্রশ্নের জবাবও খুঁজছিলাম। টিভিতে জনমত সমীক্ষা দেখানোর সময় যেভাবে ইস্যুভিত্তিক মত দেখানো হত, বুথফেরত সমীক্ষায় তেমন দেখলাম না। ফলে এ প্রশ্নের উত্তরও পেলাম না।

আসলে ভোটদান হয়ে যাওয়া মাত্রই সমীক্ষক, সাংবাদিক তো বটেই; এমনকি ভোটারদেরও বোধহয় আর ইস্যু নিয়ে আগ্রহ থাকে না। সংখ্যাই তখন শেষ কথা। খুব সম্ভবত ভোটের ফল বেরোবার সময়েও একই ঘটনা ঘটবে। “খেলা হবে” না “সোনার বাংলা” — কোন স্লোগান জিতল তা নিয়েই সরগরম থাকবে টিভি স্টুডিও। আমরাও বাহারী গ্রাফিক্স দেখে বোঝার চেষ্টা করব কোন এলাকা সবুজ ছিল, গেরুয়া হল; কোথায় গেরুয়া হয়ে গেল সবুজ। কারণ খোঁজার পরিশ্রম কে আর করতে চায়? শীতলকুচির আগে পরে ভোটদানে কোন পরিবর্তন লক্ষ করা গেল কিনা এ নিয়ে কোন আলোচনা হবে কি? একসময় হত। আজকাল এসব দুরাশা মনে হয়, কারণ যুগ বদলে গেছে, রোজ আরো বদলাচ্ছে। কদিন আগে অব্দিও জানতাম দলবদল হয় ভোটের পর। উত্তর-পূর্ব ভারতে হয়েছে, কর্ণাটকে হয়েছে, মধ্যপ্রদেশে হয়েছে, মহারাষ্ট্রে চেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনে দেখা গেল ভোটের আগেই দলবদল। পশ্চিমবঙ্গের ভবিষ্যতের চেয়ে প্রচারে অনেক বেশি আলোচিত হল দলবদল। বুথফেরত সমীক্ষা নিয়ে আলোচনাতেও একটি চ্যানেলে বিজেপির মুখপাত্র একটুও লজ্জা না পেয়ে বলে দিলেন, মুখ্যমন্ত্রী তো নিজেই বলেছেন ওঁরা দুশো আসন না পেলে গদ্দাররা চলে যাবে। সুতরাং ফল যা-ই হোক, সরকার তো আমাদেরই হবে। আশঙ্কা হয়, ফল প্রকাশের দিনও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হবে কে কে দল বদল করছেন। করলে বিধানসভার চেহারাটা কেমন হবে? মুহুর্মুহু রং বদলানো একটা গ্রাফিক হয়ত অনবরত আসবে আমাদের টিভির পর্দায়। জয়ী দলের মুখপাত্র গেয়ে উঠতেও পারেন “যদি আমাকে অসৎ বলো, আমি বলব অঙ্কে কাঁচা।”

তথ্যসূত্র:
[১]। https://www.anandabazar.com/elections/west-bengal-assembly-election/west-bengal-exit-poll-result-2021-tmc-may-win-this-election-with-a-tough-fight-with-bjp-maximum-exit-poll-shows-dgtl/cid/1278553

[২]। https://www.indiatvnews.com/elections/news-west-bengal-election-exit-poll-2021-with-india-tv-tmc-mamata-banerjee-bjp-congress-left-live-updates-701359

https://guruchandali.com/ এ প্রকাশিত

হিন্দির হাতে বাংলা বিপন্ন: বাঙালি কি নির্দোষ?

এত দিনে মাথায় ঢুকেছে যে শক্তিশালী জাতিবিদ্বেষী যখন মারতে আসে তখন স্রেফ নামটা দেখেই মারে।

প্রত্যেকটা নির্বাচন কিছু ইস্যু নিয়ে প্রবল আলাপ আলোচনা বাকবিতণ্ডা সৃষ্টি করে আর কিছু ইস্যুকে পাশ কাটিয়ে চলে যায়। ২০২১ বিধানসভা নির্বাচন সেইভাবেই একটা উত্তেজনার বিষয় আড়চোখে লক্ষ্য করে, মুখ ফিরিয়ে নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। এমনিতেই এবারের নির্বাচন এত কিছু নিয়ে এত বেশি উত্তাপ, কদর্যতা, হিংসার উদ্রেক করেছে যে এই বিষয়টা যদি অষ্টম দফা পর্যন্তও নির্বাচনী ইস্যু না হয়ে ওঠে, তাহলে হয়ত আপাতত ভালই হয়। কিন্তু অদূর ভবিষ্যতে ইস্যুটাকে আর পাশ কাটিয়ে যাওয়া যাবে বলে মনে হয় না।

বিষয় বাঙালির উপর হিন্দি চাপিয়ে দেওয়া। ডাক্তার মহেন্দ্রলাল সরকার প্রতিষ্ঠা করেছিলেন ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশন ফর কাল্টিভেশন অফ সায়েন্স। আর সেখানেই কিনা সরকারি ফতোয়া জারি হয়েছে কাজকর্মে যতদূর সম্ভব হিন্দি ব্যবহার করতে হবে। উচ্চশিক্ষায় যুক্ত বাঙালিদের মধ্যে ব্যাপক আলোড়ন। বাঙালিকে নিজ দেশে পরবাসী করে দেওয়ার চক্রান্ত; বাংলার ভাষা সংস্কৃতির বিরুদ্ধে কেন্দ্রীয় সরকারের পরিকল্পিত আক্রমণ — এইসব অভিযোগ উঠেছে। সংস্থার গবেষকরা তাঁদের মত করে প্রতিবাদ করেছেন। সংস্থা বেগতিক দেখে নিজেদের আদেশের অন্যরকম ব্যাখ্যা দেওয়ার চেষ্টা করেছে।১ এদিকে আবার শান্তিনিকেতন এক্সপ্রেস থেকে রবীন্দ্রনাথের ছবি সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল, প্রতিবাদের মুখে ফেরত আনা হয়েছে। নির্বাচনের পরেই আবার রবীন্দ্রনাথ উধাও হবেন কিনা তা সময় বলবে। তাঁর প্রতিষ্ঠা করা বিশ্ববিদ্যালয় সম্বন্ধে তো এখন নিশ্চিন্তে বলা চলে “সে মন্দিরে দেব নাই”। বিশ্বভারতীর চতুর্দিকে পাঁচিল তুলে বসুধাকে খণ্ড ক্ষুদ্র করেই উপাচার্য সন্তুষ্ট নন, তিনি নাকি বলেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ঝাঁপ বন্ধ করে দিয়ে যাবেন।২

এই ঘটনাগুলো দীর্ঘ মেয়াদে পশ্চিমবঙ্গের বা সারা পৃথিবীর বাঙালি সংস্কৃতির পক্ষে যতই ক্ষতিকর হোক, শতকরা নব্বই জন বাঙালির ভাবিত না হলেও চলত। আজকাল মহেন্দ্রলাল সরকার নামটা শুনলে কেউ কেউ আনন্দবাজার গোষ্ঠীর মালিকদের আত্মীয় বলে সন্দেহ করে, আর রবীন্দ্রনাথের পদবি বহুকাল হল তাঁর নামকে অতিক্রম করে গেছে। ফলে ঘরে একখানা ছবি ঝুলিয়ে দিলেই ল্যাঠা চুকে যায়। কিন্তু এসবের পাশাপাশি এমন কিছু ঘটনা ঘটতে শুরু করেছে, যেগুলো উচ্চশিক্ষা, বিজ্ঞান গবেষণা বা শিল্প সাহিত্যের সাথে দৈনন্দিন সম্পর্কহীন ছা পোষা মধ্যবিত্তেরও ঘুম কেড়ে নেওয়ার পক্ষে যথেষ্ট। ঘটনাগুলো সংখ্যায় এখনো বেশ কম, হয়ত সোশাল মিডিয়ার যুগ না হলে খুব বেশি লোক জানতেও পারত না। কিন্তু লক্ষণ হিসাবে ভাল নয়। কদিন আগেই ফেসবুকে ভাইরাল হওয়া ভিডিওতে রোহিত মজুমদার নামে এক বাঙালি যুবক অভিযোগ করলেন, বড়বাজার অঞ্চলে ব্যবসার কাজে এসে বেশ কিছু হিন্দিভাষী লোকের হাতে তিনি হেনস্থা হন এবং হিন্দি বোঝেন না বলে তাঁদের বাংলায় কথা বলতে অনুরোধ করায় তাঁকে বলা হয় বাংলা বলতে হলে বাংলাদেশে চলে যেতে হবে।৩ প্রায় একই সময়ে এক যুবক ফেসবুকেই ভিডিও পোস্ট করে অভিযোগ করেন হুগলী জেলার হিন্দমোটরে এক হিন্দিভাষী নাকি তাঁকে বাড়ি ভাড়া দেননি আমিষাশী হওয়ার অপরাধে। এ পর্যন্ত প্রকাশ পাওয়া সবচেয়ে কুৎসিত অভিযোগ উঠেছে কোন্নগরে। হোলির দিন অবাঙালি যুবকরা জোর করে ঘরে ঢুকে বাঙালি মহিলাকে নাকি রঙ মাখিয়েছে। প্রতিবাদ করায় এবং হোলি বাঙালিদের উৎসব নয়, বাঙালিরা দোল খেলে বলায় নাকি উত্তর এসেছে নেমপ্লেটে লিখে রাখা উচিৎ যে বাঙালি। এবং ২ তারিখের পর মজা দেখানো হবে।৪

কোন্নগরের ঘটনায় এফ আই আর দায়ের করা হয়েছে। হুমকির কথাটা সত্য হোক আর না হোক, সোশাল মিডিয়ায় কিন্তু সত্যিই এমন ভিডিও ঘুরছে, যেখানে হিন্দিভাষী কয়েকজন লোক আঙুল নেড়ে চোখ রাঙিয়ে বলছে ২ তারিখের পর বাঙালিদের দেখে নেওয়া হবে, কারণ “পশ্চিমবঙ্গে এবার আমাদের সরকার হচ্ছে।” এখানে আমরা কারা — সে ভারী কঠিন প্রশ্ন। এখন অব্দি দেশে যেটুকু সাংবিধানিক নিয়মকানুন অবশিষ্ট আছে, তাতে সরকার কোন দলের বা জোটের হয়। বাঙালির সরকার বা অবাঙালির সরকার হয় বলে তো জানি না। তবে রোজ কত কি ঘটে যাহা তাহা। সব কি আর জানি? সত্যি কথাটা এই, যে অতীতে যে জায়গাটা হুগলী শিল্পাঞ্চল ছিল সেখানে বা কলকাতার বেশকিছু অঞ্চলে মধ্যবিত্ত বাঙালিরা নিজেদের মধ্যে আলাপচারিতায় প্রায়শই আশঙ্কা প্রকাশ করছেন যে শিগগির এমন একদিন আসবে যখন হিন্দিভাষীরা তাঁদের উপর ছড়ি ঘোরাবেন। বাঙালি বাংলাতেই দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক হয়ে যাবে, সংস্কৃতি ধ্বংসপ্রাপ্ত হবে। এই আতঙ্কই চলতি নির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেসের বহিরাগত তত্ত্বে উঁকি মেরেছিল। কিন্তু সম্ভবত হিন্দিভাষী ভোটারদের সংখ্যা ফেলে দেওয়ার মত নয় বলে ও তত্ত্ব নিয়ে বেশি কাটাছেঁড়া করা হল না।

রাজনৈতিক দলগুলো উপর্যুক্ত ঘটনাবলী নিয়ে মাথা না ঘামালেও, বাংলা পক্ষের মত সংগঠন কিন্তু বীর বিক্রমে মাঠে নেমে পড়েছে। “গুটখাখোর” জাতীয় কিছু সগর্ব জাতিবিদ্বেষী শব্দাবলী তাদের হাতিয়ার। যেন বাঙালিরা কেউ গুটখার ধারে কাছে যায় না, অথবা গুটখা খেলেই যে কোন মানুষ আক্রমণাত্মক, বাঙালি বিদ্বেষী, ধর্ষণোদ্যত পুরুষে পরিণত হয়। শুধু তা-ই নয়, এদের ফেসবুক লাইভগুলো লক্ষ্য করলে দেখা যায়, ঠিক যেভাবে হিন্দুত্ববাদীরা মুসলমানদের একগাদা সন্তান, তাই তাদের রাজনৈতিক দলগুলো তোষণ করে বলে বক্তৃতা দিয়ে থাকে; বাংলাপক্ষের নেতৃবৃন্দও সুযোগ পেলেই হিন্দিভাষীদের সন্তানের সংখ্যা বাঙালিদের চেয়ে বেশি, তাই তাদের রাজনৈতিক দলগুলো তোষণ করে — এসব বলে থাকেন। বেশিক্ষণ সেসব বক্তৃতা শুনলে মনে হয় ‘হিন্দু খতরে মে হ্যায়’ নামক হিন্দি ছবির বাংলায় ডাব করা প্রিন্ট দেখছি, যার নাম ‘বাঙালি বিপন্ন’।

বাঙালি যে বিপন্ন তা নিয়ে অবশ্য সন্দেহের অবকাশ নেই। যা রটে তার কিছু তো বটে। তাছাড়া কেন্দ্রীয় গবেষণা সংস্থা বা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে হিন্দি চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা কেবল বাংলায় হচ্ছে তা নয়, সারা ভারতে চলছে। কিন্তু কোন পক্ষের উগ্রতাকে শিরোধার্য না করে এই বিপন্নতার কারণ খুঁজতে গেলে বাঙালির পক্ষে একগাদা অস্বস্তিকর প্রশ্ন উঠে আসে।

পৃথিবীতে এমন কোন ভাষা সংস্কৃতি নেই যাকে বাঁচিয়ে রাখার দায়িত্ব অন্য ভাষার লোকেরা নিয়েছে। কেনই বা নেবে? এমন ভাষাও পাওয়া যাবে না, যা বিপুল সংখ্যক মানুষ ব্যবহার করেন অথচ অনেকেই ব্যবহার যে করেন তা স্বীকার করতে কুণ্ঠিত বোধ করেন। এই অনন্য গুণটি পশ্চিমবঙ্গের বাঙালি গত দুই-তিন দশকে আয়ত্ত করেছে। শহর ও মফস্বলের সম্পন্ন বাঙালি এখন ছেলেমেয়েকে কেবল ইংরেজি মাধ্যমে পড়িয়ে সন্তুষ্ট নয়, দ্বিতীয় ভাষা হিসাবে রাখে হিন্দি। বাংলা নৈব নৈব চ। দুনিয়া অনেক বদলে গেছে, ভাল করে ইংরেজি জানা না থাকলে চাকরি বাকরি পাওয়া যাবে না — এ যুক্তি অনস্বীকার্য। কিন্তু হিন্দি লিখতে পড়তে শেখা বঙ্গসন্তানদের কী করে কোটিপতি হতে সাহায্য করবে তা বোঝা দুষ্কর। হিন্দি বলয়ের রাজ্যগুলোতে কর্মসংস্থানের অবস্থা পশ্চিমবঙ্গের তুলনায় খারাপ বৈ ভাল নয়; দিল্লী, মুম্বইতে থেকে কাজকর্ম করতে হলে হিন্দি বলতে পারাই যথেষ্ট। সেটুকু আমাদের সোনার ছেলেমেয়েরা হিন্দি সিনেমার দৌলতে যথেষ্ট ভাল আয়ত্ত করে ফেলে। তবু ২০১৭ সালে যখন তৃণমূল সরকার ঘোষণা করল প্রথম শ্রেণি থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত বাংলা পড়াতেই হবে, সম্ভ্রান্ত বাঙালি বাবা-মায়েদের মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়ল। দার্জিলিঙের গোর্খা, নেপালি, ভুটিয়া, লেপচা বা দক্ষিণবঙ্গের আদিবাসীরা এর প্রতিবাদ করলে কারণ বোঝা যায়। হিন্দি বা ইংরেজির মত বাংলাও তাঁদের মাতৃভাষা নয়। তাঁদের কেন এই ভাষা শিখতেই হবে? কিন্তু কলকাতা ও তার আশপাশের বাঙালির যে উষ্মা প্রকাশ, তা হিন্দিভাষী হয়ে ওঠার দুর্মর আকাঙ্ক্ষা ছাড়া আর কিছু দিয়ে ব্যাখ্যা করা সম্ভব কি? তা এই যখন ইচ্ছা, তখন আর “ওরা আমাদের টিকতে দেবে না” — এই চিন্তা করা কেন? দোল কথাটা তো এমনিও ভুলেই গেছেন, হোয়াটস্যাপ করেন ‘হ্যাপি হোলি’। তা এবার থেকে না হয় হোলিই খেলবেন।

সম্প্রতি চেন্নাইয়ের এক অনুষ্ঠানে ঘোষিকা হিন্দিতে কথা বলায় ভারত বিখ্যাত এ আর রহমান৫ মুচকি হেসে আপত্তি জানিয়ে মঞ্চ ত্যাগ করেছেন। ভিডিওটা দেখে মনে পড়ল, বছর দুয়েক আগে হংস মধ্যে বক যথা বাঙালি বুদ্ধিজীবীদের এক বৈঠকে হাজির হয়েছিলাম। সেখানে তাঁরা আলোচনা করছিলেন হিন্দুত্ববাদের সাংস্কৃতিক আগ্রাসন থেকে বাংলাকে কী করে বাঁচানো যায়। সকলেই একমত হলেন যে ওঁদের কিছু করার নেই। রাজনৈতিক কর্মীদের সরকারে এসে বাংলার অর্থনীতির হাল ফেরাতে হবে, তাহলেই সংস্কৃতি বাঁচবে। বাংলায় লিখে পুরস্কারপ্রাপ্ত এক সাহিত্যিক জোর দিয়ে বললেন, প্রয়োজন না থাকলে নিজের সন্তানকে তিনি বাংলা পড়াবেন না। আরেক বিপ্লবী সাহিত্যিকও তাঁকে সমর্থন করলেন। এই কারণেই তামিলনাড়ুর তামিলরা বিপন্ন নয়, পশ্চিমবঙ্গের বাঙালি বিপন্ন। মনে রাখা ভাল, রহমান মোটেই তামিলপক্ষের ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসাডর নন। ভারতের বেশিরভাগ লোক বরং তাঁকে চিনেছে তিনি হিন্দি ছবিতে কাজ করেছেন বলেই। কিন্তু তিনি বোঝেন কোথায় সীমারেখা টানতে হয়। তার চেয়েও বড় কথা, নিজের ভাষা সংস্কৃতির প্রতি শিল্পী হিসাবে তাঁর যে দায়িত্ব তা তিনি রাজনৈতিক কর্মীদের ঘাড়ে চাপিয়ে দিয়ে নিশ্চিন্ত থাকেন না।

অনেককাল আগে থেকেই বাঙালি ভদ্রসমাজ ইংরেজি ভাল করে শিখলেই হবে, বাংলা এলেবেলে — এই তত্ত্ব চালু করে বিরাট অংশের বাঙালির থেকে নিজেদের আলাদা করেছেন। সত্যেন্দ্রনাথ বসুর বড় সাধ ছিল বাংলায় বিজ্ঞানচর্চা হবে। সে প্রয়াসে বহুকাল আগেই জল ঢালা হয়ে গেছে, কারণ বাঙালি বিদ্বানরা নিজে শিখতে পারলেই যথেষ্ট হল মনে করেন। বিদ্বানের সংখ্যা বাড়িয়ে কী লাভ? এইভাবে বাংলা ক্রমশ কেবল শিল্প, সাহিত্যের ভাষায় পরিণত হয়েছে। এখন উল্টে তারই বিরুদ্ধে অভিযোগ “কোন কাজে লাগে না তো।” যেন যুগ বদলের সাথে সাথে কাজের ভাষা হিসাবে বাংলা ভাষার পরিবর্তন করা, নতুন পরিভাষা, নতুন শব্দ তৈরি করা অন্য ভাষার লোকেদের কাজ ছিল। সে যা-ই হোক, কথা হচ্ছে কাজে লাগে না বলে সাধারণ চাকুরিজীবী মধ্যবিত্ত, উচ্চবিত্ত যখন নিজের সংস্কৃতিকে বাতিলই করে দিয়েছেন তখন আর ভয় কী? ছেলেমেয়েকে বাংলা বই পড়ানো দূরে থাক, বাংলা টিভি চ্যানেল পর্যন্ত দেখতে বারণ করেছেন। তা কেন্দ্রীয় সরকার আর আপনার হিন্দিভাষী প্রতিবেশীরা যদি বাংলা বলাটুকুও বন্ধ করে দেন, সে তো ভালই, তাই না?
আসলে এত দিনে মাথায় ঢুকেছে যে শক্তিশালী জাতিবিদ্বেষী যখন মারতে আসে তখন স্রেফ নামটা দেখেই মারে। “জানেন দাদা, আমার ছেলের বাংলাটা ঠিক আসে না” বললে তখন রেহাই পাওয়া যাবে না। তাই আপ্রাণ জাতি পরিচয় তুলে ধরে পিঠ বাঁচানোর চেষ্টা। তবে বাঙালির সে চেষ্টাতেও ফাঁকিবাজির ছাপ স্পষ্ট। আক্রমণের লক্ষ্য বড়বাজারের বিহারী ঠেলাওয়ালা থেকে কোটিপতি ভুজিয়াওয়ালা পর্যন্ত সকলেই। অথচ নিজের ভুলে যাওয়া ভাষা সংস্কৃতিকে নতুন করে জানার চেষ্টা নেই। ক্রমশ শক্তি বাড়িয়ে চলা হিন্দুরাষ্ট্র আগামী দিনে হয়ত আইন করে সমস্ত সরকারি কাজে হিন্দি ভাষা ছাড়া অন্য ভাষাগুলোকে ব্রাত্য করে দেবে। তখন নির্ঘাত বাঙালির প্রতিরোধ হবে বিহারী গোয়ালার থেকে দুধ না কেনা, উত্তরপ্রদেশ থেকে আসা সবজিওয়ালাকে বয়কট করা ইত্যাদি। আমরা পশ্চিমবঙ্গের ভদ্রলোকেরা জানি, যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে না পারলে “কম্পিটিশনে” পিছিয়ে পড়তে হয়। বরাক উপত্যকা বা বাংলাদেশের বাঙালিদের মত বোকা হাঁদা নই যে ভাষার জন্যে প্রাণ দিতে যাব।

বাংলা ছবির টাইটেল কার্ড, যা আজকাল বাংলা হরফের চেয়ে রোমানে বেশি লেখা হয়, অনতিবিলম্বেই দেবনাগরীতেও লেখা হবে। কারণ বাঙালি শিল্পীর মত সুবোধ প্রজাতি ভূভারতে নেই। ওঁরা ছটপুজোয় পশ্চিমবঙ্গ সরকার ছুটি দেয় কেন সে প্রশ্ন করেননি, এ রাজ্যে হঠাৎ হিন্দি বিশ্ববিদ্যালয়ের কী প্রয়োজন তাও জিজ্ঞেস করেননি। রবীন্দ্রনাথ, বিদ্যাসাগর, রামমোহন, রামকৃষ্ণ, বিবেকানন্দ, বঙ্কিমচন্দ্র, শরৎচন্দ্রদের পাশে মুখ্যমন্ত্রীর ছবি কোন সংস্কৃতির লক্ষণ, সে নিয়েও তাঁরা ভাবেননি। সুতরাং আশা করা যায় কলকাতা চলচ্চিত্র উৎসবে কেবল ভক্তিমূলক আর পুরাণাশ্রয়ী হিন্দি ছবি দেখানো হলেও তাঁরা আপত্তি করবেন না। এমনিতেও আজকের চিত্রতারকাদের অনেকেই বাংলা বলেন শেক্সপিয়রের মত।

পুরস্কারপ্রাপ্ত এবং বিপ্লবী সাহিত্যিকরাও নিশ্চয়ই হিন্দিতে লেখা শিখে নেবেন। বাংলার আর মার্কেট কই? হিন্দি লেখার মার্কেট গোটা ভারত।

তথ্যসূত্র
১। https://www.telegraphindia.com/west-bengal/calcutta/indian-association-for-the-cultivation-of-sciences-climbdown-on-hindi-after-protest/cid/1810549
২। https://thewire.in/education/visva-bharati-vice-chancellor-in-fresh-row-over-leaked-audio-clip
৩। https://www.facebook.com/100000786783881/posts/3841532379216284/?d=n
৪। https://www.facebook.com/BanglaPokkhoHooghly/videos/813827019481916
৫। https://www.instagram.com/p/CM3_bzEFc6R/?utm_source=ig_web_button_share_sheet

https://guruchandali.com/ এ প্রকাশিত

এই মৃত্যু উপত্যকাই আমার দেশ

এখন কোথায় গেল কোলবালিশ আর কোথায় গেল প্রাচীন ভারতের বিজ্ঞান, যা সবদিক থেকে পাশ্চাত্যের চেয়ে উন্নত? কোনটাই পারল না তো বাঁচাতে?

কাব্যি করবেন না। এই মৃত্যু উপত্যকাই আমার দেশ, এই জল্লাদের উল্লাসমঞ্চের প্রত্যেকটা বাঁশ আমাদের নিজের হাতে পোঁতা। এখন চোখ বড় বড় করে বিস্ময় প্রকাশ করলে চলবে না। যখন বেসরকারিকরণকে সর্বসন্তাপহর বটিকা বলেছিলেন, যখন সিগারেটে সুখটান দিয়ে বলেছিলেন “ফেলো কড়ি মাখো তেল”, তখন ভেবেছিলেন হাসপাতালে শয্যা খালি থাকলে তবে আপনার মেডিক্লেম কাজে লাগবে? মনে ছিল না অক্সিজেন কম পড়লে আপনি কোটিপতি হলেও লাভ হবে না?

ডাক্তার কাফিল খান নিজের পকেটের পয়সা দিয়ে অক্সিজেন আনিয়ে শিশুদের প্রাণ বাঁচাতে গিয়েছিলেন। সেই অপরাধে উত্তরপ্রদেশ সরকার তাঁকে হাজতবাস করাল দীর্ঘদিন। আজ সেই রাজ্যে শ্মশানে জায়গা নেই বলে ফুটপাথে পোড়ানো হচ্ছে মৃতদেহ।

A report by @lokeshRlive from Ghaziabad tearing into govt’s suppression of Covid casualties in UP.

pic.twitter.com/Elt9Rl9baZ

— Piyush Rai (@Benarasiyaa) April 18, 2021

অথচ সরকার বলছে এপ্রিল মাসে কোভিডে মৃতের সংখ্যা মাত্র দুই!

Story of Ghaziabad. pic.twitter.com/Q6JXjLHIJK

— Aditya Raj Kaul (@AdityaRajKaul) April 18, 2021

কে নির্বাচিত করেছিল এমন সরকারকে? ক্রেনিয়াস গ্রহের অ্যাং আর তার জাতভাইরা? এখন সে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ নিজেও কোভিডাক্রান্ত। কিন্তু গত বছর যখন প্রধানমন্ত্রীর বিধানে ভাইরাস তাড়াতে থালা বাজিয়েছিলেন, সে দৃশ্য যারা হাঁ করে টিভিতে দেখেছে, নিজেও সোৎসাহে থালা বাজিয়েছে — তারা তো এই দেশেরই মানুষ। পথে ঘাটে ঝগড়া করেছে, হোয়াটস্যাপ ফরোয়ার্ডকে বেদবাক্য বলে ধরে নিয়ে আওয়াজের চোটে করোনা ভাইরাস মরে যাবে, এই তত্ত্ব প্রচার করেছে যে বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রিধারীরা — তারা সবাই এ দেশের মানুষ। এর বিপরীতে করোনা অতিমারী আসলে এক পাহাড়প্রমাণ ফাঁকি, লড়াই আন্দোলন দমন করার জন্য সরকারের তৈরি এক ধাপ্পা, করোনা সাধারণ সর্দিকাশি, ফ্লু-এর চেয়ে বেশি কিছু নয় — প্রবল আত্মবিশ্বাসে এসব বলে গেছে যারা, তারাও কেউ ভিনগ্রহের বাসিন্দা নয়।

ইন্ডিয়ান মেডিকাল অ্যাসোসিয়েশন জানাচ্ছে এখন অব্দি চলতি অতিমারীতে অন্তত ৭৩৯ জন এম বি বি এস ডাক্তার মারা গেছেন, এই দ্বিতীয় ঢেউতেই তিনজন। আই এম এ না বললেও আমরা নিজেদের অভিজ্ঞতায় জানি — ডাক্তার, নার্সরা বারো ঘন্টা, ষোল ঘন্টা ডিউটি করছেন সেই গত বছরের মার্চ থেকে। খাওয়ার সময় নেই, বাথরুমে যাওয়ার সময় নেই, ঋতুমতী মহিলারা ন্যাপকিন বদলানোর সময় পর্যন্ত পাচ্ছেন না। তাঁদের ধন্যবাদ জানানোর জন্যই নাকি মহামতি নরেন্দ্র মোদী থালা বাসন বাজাতে বলেছিলেন দেশের সকলকে। এ দেশের অনুগত মানুষ তাঁর নির্দেশ অক্ষরে অক্ষরে পালন করেছিল। অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারামণ ঘটা করে ১.৭ লক্ষ কোটি টাকার কোভিড-১৯ ত্রাণ প্যাকেজ ঘোষণা করেছিলেন। তাতে সাফাই কর্মচারী, ওয়ার্ড বয়, নার্স, আশা কর্মী, প্যারামেডিক, টেকনিশিয়ান, ডাক্তার, বিশেষজ্ঞ প্রমুখের জন্য ৫০ লক্ষ টাকার বিমা প্রকল্প ছিল। ২৬শে মার্চ, ২০২০ তারিখে মন্ত্রী বলেছিলেন এতে নাকি প্রায় ২২ লক্ষ স্বাস্থ্যকর্মী উপকৃত হবেন। এ বছরের ২৪শে মার্চ কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্য মন্ত্রক সার্কুলার জারি করে সেই বিমা প্রকল্প বন্ধ করে দিয়েছে। [১]

‘দ্য নিউ ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’ জানাচ্ছে এই এক বছরে মাত্র ২৮৭ জন এই বিমার টাকা দাবি করেছেন। এই ধূর্ত, নির্দয় সরকারকে গদিতে বসিয়েছে কি পাকিস্তানের মানুষ? রাজ্যে রাজ্যে (পশ্চিমবঙ্গে তো বটেই) এদেরই ক্ষমতায় আনতে উদগ্রীব কি বাংলাদেশের মানুষ?

পশ্চিমবঙ্গে তো আবার আজকাল বাংলাদেশ বাদ দিয়ে কোন আলোচনা চলে না। ওটা যে আলাদা দেশ তা গুলিয়ে যায় অনেকসময়। ও দেশের ধর্ষিতাকে এ রাজ্যের নির্বাচনে ইস্যু করার চেষ্টা হয়। ও দেশের লোকে পশ্চিমবঙ্গ ভরে গেছে বলে যারা ভীষণ চিন্তিত, তাদের স্বভাবতই এ দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার অব্যবস্থা নিয়ে ভাবার সময় নেই। মুশকিল হল আমরা এ দেশে ভ্যাক্সিন পাঠাচ্ছি, সে দেশে ভ্যাক্সিন পাঠাচ্ছি বলে প্রধানমন্ত্রী আস্ফালন করছেন, এদিকে ওষুধের জন্য বাংলাদেশের কোম্পানিগুলোর কাছে হাত পাততে হচ্ছে। ঝাড়খণ্ডের মুখ্যমন্ত্রী হেমন্ত সোরেন এই অবস্থায় এসে দাঁড়িয়েছেন। মোদী সরকারের কাছে বাংলাদেশ থেকে এই ওষুধ আমদানি করার অনুমতিও চেয়েছেন।

माननीय मुख्यमंत्री श्री हेमंत सोरेन जी ने रेमडेसिविर की कमी को पूरा करने के लिए बांग्लादेश की दवा कंपनियों से संपर्क साधा। केन्द्र सरकार से भी आयात की अनुमति मांगी।@HemantSorenJMM @JmmJharkhand @narendramodi @DVSadanandGowda @AmitShah @PMOIndia pic.twitter.com/ejhh40M05O

— JMM_पश्चिमी सिंहभूम (@WestsinghbhmJMM) April 18, 2021

অনুমতি পাবেন কিনা কে জানে? মোদীর অনুমতি দেওয়ার সময় হবে কি? উনি তো গোড়াতেই বলেছিলেন উনি প্রধানমন্ত্রী নন, প্রধান সেবক। ফলে ওঁর অনেক কাজ। মহারাষ্ট্রের মুখ্যমন্ত্রী উদ্ধব ঠাকরে নাকি অতিমারীর জরুরি পরিস্থিতিতে প্রধানমন্ত্রীর অফিসে ফোন করে শুনেছেন তিনি পশ্চিমবঙ্গে ভোটের প্রচারে ব্যস্ত, ফিরলে উত্তর পাবেন। ইতিমধ্যে কত মানুষ আর হাসপাতাল থেকে বাড়ি ফিরবেন না, সে খবরে প্রধানমন্ত্রীর দরকার নেই। এমন নয় যে তিনি এই প্রথম অযোগ্যতার বা নৃশংসতার পরিচয় দিচ্ছেন। গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী থাকার সময়ই তিনি নিজের জাত চিনিয়েছেন। সেসব জেনেশুনে বিষ পান তো আমরাই করেছি। এখন বিষের জ্বালায় এই মৃত্যু উপত্যকা আমার দেশ না বললে চলবে কেন?

পৃথিবীর সব দেশে কোভিডের প্রকোপে লকডাউন হয়েছে, কিন্তু লক্ষ লক্ষ মানুষকে কয়েক শো মাইল পায়ে হেঁটে বাড়ির উদ্দেশে যাত্রা করতে হয়নি, পথে ক্ষিদে তেষ্টায় মরতে হয়নি। এ দেশে হয়েছে। যখন তারা মরেছে, তখন আমরাই তো অসন্তোষ প্রকাশ করেছি, লকডাউন সত্ত্বেও এরা হাঁটছে কেন? অবৈজ্ঞানিক হলেও পোকামাকড় জ্ঞানে মানুষগুলোকে পথে বসিয়ে গায়ে স্প্রে করে স্যানিটাইজ করা হয়েছে। ওতেই নাকি কোভিড ছড়ানো বন্ধ হবে। তাতেই বা আমাদের কজনের আপত্তি হয়েছে? বিদেশ থেকে আসা বড়লোকেরা বেমালুম পরিচিতি বা টাকার জোরে কোয়ারান্টিনের বালাই না রেখে দেশের ভিতর সেঁধিয়ে গেছে আর আমরা আশঙ্কা প্রকাশ করেছি বাড়ির কাজের লোক, ক্যাটারিং-এর কাজ করা লোক, রিকশাওয়ালা, পথের ভিখারি আর প্রবাসী শ্রমিকরাই ভাইরাস ছড়াচ্ছে। লেখাপড়া শিখে অবিজ্ঞানের চাষ করেছে যারা, অমুক পাঁপড় খেলে করোনা হয় না, তমুক আসন করলে করোনা হয় না, মাথায় গোমূত্র ছেটালে করোনা হয় না — এসব বিশ্বাস করেছে যারা, তারা কোন দেশের লোক?

কত না কালক্ষেপ করেছি গোটা পৃথিবীর দখল নেওয়ার জন্য ভাইরাসটা চীন গবেষণাগারে বানিয়ে সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে দিয়েছে কিনা সেই আলোচনায়। অথচ চীন যে কয়েক মাসের মধ্যে একগাদা নতুন হাসপাতাল বানিয়ে ফেলেছিল সেদিকে নজর দিইনি। না দেশ, না রাজ্য — কোন সরকারকে প্রশ্ন করিনি আমাদের একটাও নতুন হাসপাতাল হল না কেন? মুখ্যমন্ত্রী রাস্তায় নেমে গোল কেটেছেন কাকে কোথায় দাঁড়াতে হবে, আমরা হাততালি দিয়ে বলিনি “ওঃ, কি দারুণ লিডার! সামনে দাঁড়িয়ে লড়ছেন।” করোনাকে বালিশ করে শুয়ে পড়তে বলেছেন, আমরা বলেছি “বিজ্ঞানীরাও তো তা-ই বলছেন। এ ভাইরাস তো অনেকদিন থাকবে।” এখন কোথায় গেল কোলবালিশ আর কোথায় গেল প্রাচীন ভারতের বিজ্ঞান, যা সবদিক থেকে পাশ্চাত্যের চেয়ে উন্নত? কোনটাই পারল না তো বাঁচাতে? এতদিন পরে গণেশের প্লাস্টিক সার্জারির প্রাচীন কৌশলে বিশ্বাসী প্রধানমন্ত্রীর সরকার বলছে একশোটা হাসপাতালে নতুন অক্সিজেন প্ল্যান্ট বানানো হবে পিএম কেয়ারস ফান্ডের টাকায়।[২]

দেড়শো কোটি মানুষের দেশের মোটে একশোটা হাসপাতালে অক্সিজেনের ব্যবস্থা করার টাকার খোঁজ এত দিনে পাওয়া গেল। এদিকে দুর্গাপুজোর টাকা জোগানো রাজ্য সরকার এখনো কোভিডের প্রথম ঢেউয়ের চিকিৎসা বাবদ শ্রীরামপুর শ্রমজীবী হাসপাতালের প্রাপ্য আট কোটি টাকা দেয়নি।[৩]

আহা, নিজ রাজনৈতিক এজেন্ডার স্বার্থে আমরা কত কূট তর্কই না করেছি! কেউ পশ্চিমবঙ্গের অবস্থা খারাপ বললে বলেছি “গুজরাটের অবস্থা কি ভাল? মধ্যপ্রদেশের অবস্থা কি ভাল?” যেন ঐ রাজ্যগুলোর চেয়ে কম লোক মরলেই এ রাজ্যের সরকারকে মেডেল দিতে হবে, এ রাজ্যের মানুষের জীবনের দাম নির্ভর করে ঐ রাজ্যগুলোর মানুষের জীবনের উপর। সারা দেশে কয়েকটা হাতে গোনা সংবাদমাধ্যম সাহস করে খবর করেছে যে কেন্দ্রীয় সরকার এবং অনেকগুলো রাজ্য সরকার রোগীর সংখ্যা, মৃতের সংখ্যা লুকোচ্ছে। তাদের বিরুদ্ধে অকর্মণ্য সরকারগুলো দারুণ তৎপরতায় গর্জে উঠেছে, মামলা মোকদ্দমার হুমকি দেওয়া হয়েছে। কোন পার্টির সরকার তা দেখে আমরা ঠিক করেছি খবরগুলো বিশ্বাস করব কিনা। যদি কেউ কখনো বলে ফেলে কেরালা করোনা ভাল সামলাচ্ছে, অমনি আমরা তক্কে তক্কে থেকেছি কেরালায় কেস বাড়ে কিনা, মৃত্যু বাড়ে কিনা। বাড়লেই সে কি উল্লাস! “বাঃ বাঃ! কেরালায় লোক মরেছে। হল তো? কেরালা মডেল?” এই শকুনবৃত্তি যে দেশের মানুষ করে, সে দেশই তো মৃত্যু উপত্যকা। এখন আমার দেশ না বলে এড়িয়ে গেলে হবে?

যখন সরকার বলেছিল করোনা তেমন চিন্তার ব্যাপার নয়, তখন আয়োজিত তবলিগী জামাতের মর্কজকে দেশের করোনা ছড়ানোর জন্য দায়ী করে কত না চেঁচিয়েছি। হিন্দু এলাকায় মুসলমান ফলওয়ালা, সব্জিওয়ালাকে ঢুকতে দিইনি কারণ নিশ্চিত খবর ছিল, কোভিড-১৯ ওদের বাধ্য ছেলে। ওদের শরীরে থেকে অসুস্থ করছে না, কিন্তু ওদের কথায় হিন্দুদের দেহে ঢুকে পড়ছে। এখন লক্ষ লক্ষ লোক কুম্ভমেলায় গা ঘেঁষাঘেঁষি করলেও চিন্তা নেই, কারোর করোনা হবে না। এ কথা বলছে কোন দেশের মন্ত্রীসান্ত্রীরা?[৪]

তাদের মন্ত্রী বানিয়েছে কারা? টিমবাকটুর লোকেরা?

নেতা মন্ত্রীরা নাহয় সাধারণ মানুষের জীবনের তোয়াক্কা করেন না, ভোটের জন্য লালায়িত — তাই সমাবেশ করেই চলেছেন। সে সমাবেশ বন্ধ করার দাবি তুলছে না যে সাহিত্যিক, শিল্পী, সাংবাদিক, বুদ্ধিজীবী — তারা কিসের জন্য লালায়িত? কোন দেশের লোক তারা?

এই মৃত্যু উপত্যকাই আমার দেশ, কারণ কেবল মানুষ মরছে না। কয়েক কোটি জীবন্ত মানুষের বিবেক মরে গেছে, মরে যাচ্ছে প্রতিদিন। করোনায় এখনো দ্বিতীয় স্থানে থাকলেও, যে অতিমারীতে মৃত্যু হয় বিবেকের, তাতে ভারত ইতিমধ্যেই পৃথিবীতে প্রথম স্থানে।

সূত্র:

[১] New Indian Express
[২] LiveMint
[৩] আনন্দবাজার পত্রিকা 
[৪] Firstpost

https://nagorik.net এ প্রকাশিত

শীতলকুচির প্রতি ঈষদুষ্ণ ব্যবহার: সঙ্কোচের বিহ্বলতায় বাম রাজনীতি ম্রিয়মান

বামপন্থীরা কি কেবল বুলিতেই আটকে থাকবেন? বরাবর তো তাঁদের শক্তি ছিল দ্রুত প্রতিক্রিয়ায় পথে নেমে আন্দোলন।

“এই নির্বাচন গুলি দিয়ে নয়, বুলি দিয়ে হওয়া উচিৎ”, বললেন সিপিএম নেতা মহম্মদ সেলিম। মনে পড়ে গেল সুকুমার রায়ের ‘লক্ষ্মণের শক্তিশেল’ নাটকে রাম বিভীষণকে খোঁড়াতে দেখে বলছেন “যত তেজ বুঝি তোমার মুখেই।” জাম্বুবান পাশ থেকে টোন কাটছে “আজ্ঞে হ্যাঁ, মুখেন মারিতং জগৎ”। আসলে ভারতের কমিউনিস্ট আন্দোলনের ইতিহাস এবং সিপিএম দলের ইতিহাস সম্বন্ধে ন্যূনতম, লোকের মুখে শোনা ধারণা থাকলেও বিশ্বাস করা শক্ত হবে যে গণতন্ত্রের চরম সঙ্কটের মুহূর্তে একজন কমিউনিস্ট পার্টির নেতা লড়াই আন্দোলনের কথা বলছেন না, রাজ্য অচল করে দেওয়ার হুমকি দিচ্ছেন না। কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য এক কবি একদা লিখেছিলেন “রাস্তাই একমাত্র রাস্তা”, আর সেলিম বললেন বাকযুদ্ধই একমাত্র রাস্তা!

রাষ্ট্রের বন্দুকের গুলিতে চারজন মানুষের প্রাণ চলে যাওয়ার পর অনেকগুলো দিন কেটে গেছে। দোষীদের শাস্তি হয়নি, হবেও না। কারণ নির্বাচনকালীন প্রশাসন অজস্র অস্বস্তিকর প্রশ্ন না শোনার ভান করে আত্মরক্ষার স্বার্থে জওয়ানরা গুলি চালিয়েছিল বলে রায় দিয়ে ফেলেছে। ব্যবস্থা নেওয়া বলতে নির্বাচন কমিশন ৭২ ঘন্টা রাজনৈতিক নেতাদের ঐ এলাকায় ঢুকতে বারণ করেছে আর বাকি চার দফা নির্বাচনের প্রচার এক দিন করে কমিয়ে দিয়েছে। স্পষ্টতই, যে চারজনের প্রাণ গিয়েছে, সেই মনিরুজ্জামান, ছামিউল, হামিদুল আর নুর সম্বন্ধে নির্বাচন কমিশনের মনোভাব — পরের ছেলে পরমানন্দ। কেন্দ্রের শাসক দল বিজেপির নেতা দিলীপ ঘোষ বলেই দিয়েছেন দরকার পড়লে আরো শীতলকুচি হতে পারে। ফলত নির্বাচন কমিশন স্বয়ংশাসিত সংস্থা — এ কথা এখন কলেজের ছাত্রদের রাষ্ট্রবিজ্ঞান পরীক্ষার উত্তর মাত্র। এমতাবস্থায় লক্ষ্মী ছেলের সংসদীয় রাজনীতি যে ভোটারদের সমর্থন আদায় করা আর গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার সঙ্কটের মোকাবিলা করা — দুটোর কোনটার জন্যেই যথেষ্ট নয়, তা বিজেপি বিরোধী যে কোন রাজনৈতিক নেতার বুঝতে পারা উচিৎ। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বিলক্ষণ বুঝেছেন। তাই ঘটনার দিনই কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের পদত্যাগ দাবি করেছেন, শীতলকুচিতে তাঁর যাওয়ার রাস্তা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় মৃতদের পরিবার পরিজনের সাথে ভিডিও কলে কথা বলেছেন, প্রতিবাদ মিছিলে হেঁটেছেন। আর বামপন্থীরা ইতিমধ্যে কী করলেন?

তাঁরাও প্রতিবাদ কর্মসূচি ঘোষণা করেছেন। জেলায় জেলায় প্রতিবাদ হবে। যেমন প্রতিবাদ দলীয় বৃত্তের বাইরে থাকা কোন কোন সংগঠনও করছে। শীতলকুচির ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়ার পরেই সিপিএম নেতা সুজন চক্রবর্তী যে প্রতিক্রিয়া দিয়েছিলেন, সেখানে দ্ব্যর্থহীন ভাষায় কেন্দ্রীয় বাহিনীর আচরণের নিন্দা ছিল। বলেছিলেন যে দলের লোকই মারা গিয়ে থাক, নিন্দার ভাষা নেই। সঙ্গে ছিল এই বক্তব্য, যে কেন্দ্রীয় বাহিনীকে ঘেরাও করার প্রস্তাব দিয়ে মুখ্যমন্ত্রী সাধারণ মানুষকে প্ররোচিত করেছেন। মুখ্যমন্ত্রী কেন ঘেরাও করার কথা বলেছিলেন, তার আগের ঘটনাবলী কী, সেসব গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করার সময় সম্ভবত সিপিএম নেতৃত্ব পাননি।

কোন সন্দেহ নেই তৃতীয় দফা পর্যন্ত পশ্চিমবঙ্গে যে মোটের উপর শান্তিপূর্ণ ভোটদান হয়েছে, বহু জায়গায় মানুষ দশ বছর পর নিজের ভোট নিজে দিতে পেরেছেন, ২০১৮-র পঞ্চায়েত নির্বাচনের আতঙ্ক কেটেছে, তাতে কেন্দ্রীয় বাহিনীর বড় ভূমিকা রয়েছে। যাঁরা কেন্দ্রীয় বাহিনীকে বাদ দিয়ে ভোট করানো হোক দাবি তুলছেন এখন, তাঁদের চোখে হঠাৎ রাজ্য পুলিস ধোয়া তুলসীপাতা হয়ে গেছে। রাজ্যের বহু মানুষ তাঁদের সাথে একমত হবেন না। কিন্তু কেন্দ্রীয় বাহিনীও চুপচাপ ভোটারদের নিরাপত্তা দেওয়ার কাজ করে যাচ্ছে তা নয়। রাজ্যের একাধিক জায়গা থেকে তাদের আচার আচরণ নিয়ে মানুষ প্রথম দফা থেকেই অসন্তোষ প্রকাশ করছিলেন। কেউ বলছিলেন তারা বিজেপিকে ভোট দেওয়ার জন্য প্রভাবিত করার চেষ্টা করছে, কেউ বলছিলেন তারাই উত্তেজনার সৃষ্টি করছে। কোন কোন ক্ষেত্রে আরো গুরুতর কিছু অভিযোগ উঠেছে, ভোটের ডিউটি করে এসে প্রিসাইডিং অফিসাররা সেসব সোশাল মিডিয়ায় লিখেছেন। কিন্তু সবচেয়ে মারাত্মক অভিযোগ উঠেছিল হুগলী জেলা থেকে। সেখানে ৫ই এপ্রিল রাতে একটি দশম শ্রেণির ছাত্রীকে স্কুলবাড়িতে টেনে নিয়ে গিয়ে কেন্দ্রীয় বাহিনীর এক জওয়ান শ্লীলতাহানির চেষ্টা করে বলে অভিযোগ। সেই জওয়ানকে পুলিস গ্রেপ্তার করেনি। [১]

এই বাহিনীকে যদি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ঘেরাও করার কথা বলে থাকেন, তার নিন্দা করা যেতে পারে বড় জোর এই মর্মে, যে এতে উত্তেজনা ছাড়বে, ভোটের মরসুমে তা কাম্য নয়। কিন্তু কেন্দ্রীয় বাহিনীর গুলিতে মানুষের মৃত্যুর পর মমতার ঐ উক্তিকেও উস্কানিমূলক আখ্যা দিয়ে সমানভাবে দায়ী করলে মনে হয়, মৃতেরা বা স্থানীয় মানুষ সত্যি সত্যিই জওয়ানদের আক্রমণ করেছিলেন, তাই তারা গুলি চালিয়েছে। অথচ তেমন কোন ভিডিও ফুটেজ বা প্রত্যক্ষদর্শীর বিবরণ দুদিন পেরিয়ে গেলেও পাওয়া যায়নি। সাত তাড়াতাড়ি পুলিসের বক্তব্য বিশ্বাস করে ঐ বিবৃতি সুজনবাবু দিলেন কেন? ‘দ্য টেলিগ্রাফ’ কাগজের আজকের সংস্করণ পড়লে সুজনবাবু আরো ধন্দে পড়বেন। কারণ মঈনুদ্দিন চিস্তির প্রতিবেদন বলছে, যে মৃণাল হক অসুস্থ হয়ে পড়েছিল বলে নাকি জওয়ানরা তাকে সাহায্য করতে যায় এবং গুজব রটে তাকে মারধর করা হয়েছে, তা থেকে অশান্তি শুরু হয়, সেই মৃণাল হকের বাবা-মা বলছেন সে বাজারে গিয়েছিল, তাকে জওয়ানরা অকারণে মারধর করে। সত্য যা-ই হোক, নির্বাচন কমিশনে জমা পড়া রিপোর্টের সাথে এই বয়ান যে মিলছে না। [২] সংযুক্ত মোর্চার নেতৃবৃন্দের চোখেও এইসব অসঙ্গতি ধরা পড়েছে। আজ কলকাতায় নির্বাচন আধিকারিকের সাথে দেখা করে বেরিয়ে তাঁরা যে সাংবাদিক সম্মেলন করলেন তাতে তা-ই বোঝা গেল। তাহলে অন্য নেতার মুখ্যমন্ত্রীকে দায়ী করার অত তাড়া ছিল কেন, সে প্রশ্ন রয়ে গেল। [৩]

তবু তো সুজনবাবুর বিবৃতিতে ঘটনার জন্য কেন্দ্রীয় বাহিনীকে নিন্দার ভাগ বেশি ছিল। যত সময় গড়িয়েছে, বাম নেতা কর্মীদের ভাষ্যে নিক্তিতে মেপে বিজেপি আর তৃণমূলকে সমান দায়ী করার প্রবণতা বেড়ে গেছে। শীর্ষবিন্দু স্পর্শ করেছে সেলিমবাবুর সাংবাদিক সম্মেলন। শেষকালে তিনি অমিত শাহ আর মমতা — দুজনেরই পদত্যাগ দাবি করে বসলেন। অমিত শাহ কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, তাঁরই অঙ্গুলিহেলনে এই ঘটনা ঘটেছে — এমন অভিযোগ অনেকেই করছেন। ফলে সেলিম তাঁর পদত্যাগ দাবি করতেই পারেন। কিন্তু কেবল কেন্দ্রীয় বাহিনীকে ঘেরাও করতে বলেছেন বলে মুখ্যমন্ত্রীকে পদত্যাগ করতে হবে, এ যুক্তি হাস্যকর। অবশ্য সেলিমের পক্ষ সমর্থনে বলা যেতে পারে যে তিনি ঐ দুজনের পদত্যাগ করা উচিৎ বলেই সাংবাদিক সম্মেলন শেষ করে দেন, ফলে মমতার কেন পদত্যাগ করা উচিৎ তার যুক্তি ব্যাখ্যা করার সময় পাওয়া যায়নি। মনে কী দ্বিধা রেখে তিনি চলে গেলেন!

কোন যুক্তি যদি থেকেও থাকে, তা দুর্বোধ্য। কেউ বুঝেছেন বলে মনে হয় না। সাধারণ ভোটারের কাছে বরং এ কথাই প্রতিভাত হল, যে মানুষকে ভয় পাইয়ে দেওয়ার জন্যই যে এই গুলি চালনা, বিজেপি-বিরোধী ভোটারদের বার্তা দেওয়ার জন্যই যে এই নৃশংসতা — বামপন্থীরা তা বুঝলেন না বা বুঝতে চাইলেন না। আমরা তৃতীয় পক্ষ, আমাদের অন্য দুই পক্ষকেই আক্রমণ করতে হবে — এই রাজনৈতিক হীনমন্যতা তাঁদের বিজেপি-বিরোধী ভোটারদের নিজেদের দিকে টেনে আনার প্রয়োজন ভুলিয়ে দিল। বরং এই ভারসাম্য বজায় রেখে চলার চেষ্টা কেবল সংখ্যালঘু নয়, সবরকম বিজেপি-বিরোধী মানুষ, যাঁরা তৃণমূলের উপর বীতশ্রদ্ধ হয়ে মোর্চাকে ভোট দেবেন ভাবছিলেন, তাঁদের কাছে বিশ্বাসযোগ্যতা কমিয়ে দিল। অন্য দিকে এই নির্বাচন পর্বে সম্ভবত প্রথমবার, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে শক্তিশালী মনে হল। কারণটা আর কিছুই নয়। বিরোধিতাই তাঁর শক্তি, প্রশাসন চালানো নয়। এই নির্বাচনে ক্ষমতাসীন দলের নেত্রী হিসাবে তাঁকে আগাগোড়াই রক্ষণ সামলাতে হচ্ছিল। শীতলকুচির ঘটনা তাঁকে আবার বিরোধী নেত্রীর মত আক্রমণে যাওয়ার সুযোগ এনে দিল।

এ তো গেল বুলি নিয়ে কথাবার্তা। কিন্তু বামপন্থীরা কি কেবল বুলিতেই আটকে থাকবেন? বরাবর তো তাঁদের শক্তি ছিল দ্রুত প্রতিক্রিয়ায় পথে নেমে আন্দোলন। এ বারের নির্বাচনে যে তাঁরা প্রবলভাবে আলোচনার মধ্যে চলে এলেন, তা-ও তো ছাত্র-যুবদের নবান্ন অভিযানের পর। এবার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পদত্যাগ চাওয়ার ক্ষেত্রে তাঁরা দ্বিতীয় তো হলেনই, উপরন্তু সকালবেলায় শীতলকুচিতে গুলি চলার পরে সারাদিনে কোথাও নির্বাচন কমিশনের পর্যবেক্ষকদের বা বিজেপি নেতাদের ঘেরাও করার মত কোন ঘটনা ঘটল না। শুধু বিচারবিভাগীয় তদন্তের দাবি করা হল, ঘটনার দুদিন পরে নির্বাচন আধিকারিকের সাথে দেখা করে মোর্চার আপত্তিগুলো জানানো হল কেবল। এই ঈষদুষ্ণ ব্যবহার কি মৃতেরা তৃণমূলের লোক বলে? তাহলে এ-ও তো হীনমন্যতা।

প্রথম দুটো বেঞ্চের মধ্যে মারামারি হচ্ছে, আমি শেষ বেঞ্চের ছেলে, আমার কী আসে যায়? এই মানসিকতা নিয়ে কি বিরোধী রাজনীতি হয়? সমর্থন বাড়ানো যায়? সময় বলবে। তবে নব্বইয়ের দশকের গোড়ায় সিপিএম বলে একটা পার্টি ছিল, যারা কংগ্রেস নেতা রাজীব গান্ধী খুন হওয়ার পর তাঁর নিজের পার্টি বনধ ডাকার আগেই বনধ ডেকে দিয়েছিল। যুক্তি ছিল, ভারতের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রীকে নির্বাচনী প্রচার চলাকালীন হত্যা করা আসলে ভারতের গণতন্ত্রকে হত্যার চেষ্টা। তারই প্রতিবাদে বনধ। জানি না ভোট দানের সময় অবাধ নির্বাচন নিশ্চিত করতে আসা বাহিনীর গুলিতে সাধারণ ভোটারের হত্যা গণতন্ত্রকে হত্যা করার চেষ্টা কিনা, সে দিনের নেতারা থাকলে তৎক্ষণাৎ পরদিন বাংলা বনধ ডাকতেন কিনা। কোন রাজনৈতিক দল, বিশেষ করে বিরোধী আসনে থাকা দল, যদি প্রমাণ করতে চায় তার কাছে মানুষের জীবনের দাম আছে, তাহলে শুধু বুলিতে কি কাজ হয়? জাম্বুবানের ভাষায় “ঢাল নেই তলোয়ার নেই খামচা মারেঙ্গা”?

সূত্র :
১. NDTV
২. Telegraph India
৩. CPIM West Bengal Facebook Page

https://nagorik.net এ প্রকাশিত। ছবি ইন্টারনেট থেকে।