নাম তার ছিল: ২১

পূর্বকথা: অনেকদিন পরে বিপ্লবের মনে পড়ে বাবার কথা, নিজের ছোটবেলার কথা। সে আবিষ্কার করে, ভাল রোজগারের সাথে সাথে তার জীবনযাত্রার মান অনেক উন্নত হয়েছে। কিন্তু শৈশবে যে জীবনের কল্পনা করত সে, তার সাথে এই জীবনের কোন মিল নেই

“তোকে এসব গল্প বলি দিন রাত, তুই আবার অতীতচারী দুঃখবিলাসী তৈরি হোস না, বাবা। ইতিহাস জানা ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেয়ার জন্যে। তা বলে ‘আহা কি ভাল দিন ছিল’ বলে হা হুতাশ করার কোন মানে হয় না কিন্তু। সবাই যদি তাই করত তাহলে আর সভ্যতাটা এগোত না, বুঝলি? তাছাড়া কোনদিনই কোন স্বর্ণযুগ ছিল না। অনেক লড়াই করে মানুষ সভ্যতাটাকে এই জায়গায় নিয়ে এসেছে। আরো অনেক পথ যেতে হবে…”

“তুমি পারো বটে। ঐটুকু ছেলে ইতিহাস, সভ্যতা — এসব কী বোঝে?”

“বোঝে, বোঝে। সবটা বোঝে না ঠিকই, কিন্তু মনে একটা ছাপ পড়েই। আবছা ছাপ হয়ত, কিন্তু পড়ে। সেই ছাপটাই ফেলার চেষ্টা করছি, বুঝলে? ছোটদের আমরা যত ছোট ভাবি তারা তত ছোট নয় গো। আমাদের চেয়ে অনেক নরম মন তো ওদের, তাই অনেক ছোট ছোট জিনিস যেগুলো আমরা দেখি বা শুনি আর সাথে সাথে ভুলে যাই, সেগুলো ওদের উপর খুব প্রভাব ফেলে। সেই জন্যেই… যতটা পারি ভাল ভাল জিনিসের ছাপ দেয়ার চেষ্টা করছি।”

কথোপকথনটা ছবির মত মনে আছে বিপ্লবের। ও তখন ক্লাস ওয়ান টোয়ানে পড়ে। বর্ষাকাল। রবিবার। সন্ধের মুখে বাবা বেরোতে যাবে, ঝেঁপে বৃষ্টি এল। বারান্দার বেঞ্চে বসে পড়ল, বৃষ্টি থামলে বেরোবে বলে। বিপ্লবের একদমই ইচ্ছে ছিল না বাবা সেদিন বেরোক। কিন্তু পার্টির কাজ থাকলে বাবাকে কোনদিন ও বেরোতে বারণ করত না।

বৃষ্টি আর থামলই না। শিল পড়তে শুরু করল। বাড়িতে তখন বারান্দার মাথায় টিনের চাল। বিপ্লবের জন্মের পরপরই বাবা, জ্যাঠাদের মধ্যে ভাগ হয়ে গিয়েছিল দাদুর তৈরি বাড়িটা। দোতলাটা ছেড়ে দিয়ে একতলার দুটো ঘরে জায়গা হয়েছিল বাবা, মা আর বিপ্লবের। দাদুর তৈরি একতলার বারান্দাটা পড়েছিল ছোটজেঠুর ভাগে। যদিও সেদিকটা তালাবন্ধই থাকত, কারণ জেঠু চাকরিসূত্রে বাইরে। কিন্তু বারান্দা একটা দরকার। নইলে সকালবেলা বাবার সাথে দেখা করতে এসে লোকে বসবে কোথায়? বসছিল বটে বাইরের ঘরটায়। কিন্তু তখন আশির দশক, রবীন ঘোষাল এলাকার পার্টির গুরুত্বপূর্ণ নেতা। তার উপর পঞ্চায়েত সমিতির সভাপতি। ঐটুকু ঘরে লোক উপচে পড়ত। রোদে জলে অনেককে খোলা উঠোনটাতেই দাঁড়িয়ে থাকতে হত। তাই বিপ্লবের যখন বছর চারেক বয়স, তখন মাসে মাসে টাকা দিয়ে অল্প গাঁথনি করে একটা কাঁচা মেঝের বারান্দা করা হয়েছিল, মাথার উপর টিনের চাল দিয়ে। বাবার ইচ্ছে ছিল পরে পাকা করে নেবে। হয়ে ওঠেনি বহু বছর।

তা সেদিন শিলাবৃষ্টি শুরু হতেই মা মুখটা আকাশের মতই কালো করে বাবাকে বলল “হ্যাঁ গো, এত শিল পড়ছে, টিনগুলো ভেঙে যাবে না তো?”

বাবা ততক্ষণে বুঝে গেছে মিটিঙে যাওয়া আর হবে না। পাঞ্জাবি খুলতে খুলতে বলল “গেলে যাবে। কি সুন্দর বৃষ্টি হচ্ছে সেটা এনজয় করো এখন।” তারপর বিপ্লবকে বলল “দৌড়ে গিয়ে বাথরুম থেকে ছোট বালতিটা নিয়ে আয়।”

“কী করছ কি? এই বৃষ্টিতে ভিজবে নাকি? মাথা ফেটে যাবে তো!”

“আরে ভিজতে বালতি লাগে নাকি? শিল জমাব। নিয়ে আয়, নিয়ে আয়।”

বিপ্লব দৌড়ে নিয়ে এসেছিল অ্যালুমিনিয়ামের বালতিটা। বাবা হাত বাড়িয়ে সেটা রেখে দিয়েছিল উঠোনে। টং টং আওয়াজে তার ভেতর শিল পড়ে অল্পক্ষণের মধ্যেই ভরে উঠেছিল। বাবা সেটাকে টেনে তুলল বারান্দায়, এক মুঠো শিল তুলে নিয়ে ডাকল “আয় আয়, এদিকে আয়।” তারপর মুঠো দুটো বিপ্লবের গালে ঠেকিয়ে বলল “দ্যাখ, কি ঠান্ডা!” কাঁপা মুঠোর মধ্যে থেকে সেই শিলগুলো কাঁপুনি ধরিয়ে দিল।

মা বলল “একি, একি! বারো মাস সর্দি কাশিতে ভোগে ছেলেটা। তুমি আবার এইসব শেখাচ্ছ?”

“আরে কিচ্ছু হবে না। শিল কি জিনিস হাতে নিয়ে দেখবে না? আয়, আয়। হাত দে।”

বিপ্লব মহা উৎসাহে কনুই অব্দি ডুবিয়ে দিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করতে করতে শোনে মা চ্যাঁচাচ্ছে “না, হবে না। তোমার আর কী? তুমি তো দেশোদ্ধার করতে বেরিয়ে যাবে। রুগ্ন ছেলেটাকে নিয়ে ভুগব তো আমি।”

বাবা তখনই মহানন্দে বলে “আজ আর বেরোব না। বৃষ্টিটাও চট করে থামবে মনে হচ্ছে না।”

আশির দশকের শেষের সেই দিনগুলোতে ঝড় উঠলেই কারেন্ট চলে যেত সবুজগ্রামে। কখন আসবে কেউ ভাবত না, ভাবত কবে আসবে। সেদিনও কারেন্ট নেই, তার উপর বাবা অপ্রত্যাশিতভাবে বাড়িতে। বিপ্লব কিছুতেই পড়তে বসল না। ব্যর্থ হয়ে হ্যারিকেন জ্বালিয়ে গজগজ করতে করতে রান্নাঘরে চলে গেল মা, আর বিপ্লব চিৎ হয়ে থাকা বাবার উপর চড়ে উপুড় হয়ে শুয়ে পড়ল। বাবা বলতে শুরু করল ম্যাক্সিম গোর্কির মাদারের গল্পটা। অনেকবার শোনা, তবু বাবা এমন ভাল বলত, মনে হত প্রতিবার নতুন। সে বয়সে গল্প শোনার ক্ষিদে ছিল এমন, যে একটা শেষ হলে আরেকটা, সেটা শেষ হলে আরো একটা — এইভাবে চলতেই থাকত, বাবা বলতেই থাকত। সেদিন অন্ধকারে একের পর এক গল্প বলতে বলতেই হঠাৎ বাবা বলেছিল কথাগুলো। “আমাদেরও সব ভাল নয়, যা যা করার সব আমরা করতে পারিনি। লেনিনও পারেননি, বুঝলি? পারলে আজকের অবস্থা হয়? মানুষের উপর নিশ্চয় খুব অন্যায় হচ্ছিল। নইলে আর কমিউনিস্টদের উপর মানুষ এত রেগে গেল কেন দেশগুলোতে?”

এই কথাগুলো, ঠিক এই কথাগুলোই বিপ্লব ফেরত দিয়েছিল, যখন বাবা ওকে বোঝানোর চেষ্টা করেছিল এস এফ আই ছেড়ে দেওয়াটা উচিৎ হবে না। ব্যক্তির চেয়ে সংগঠন বড়।

“সংগঠন? এমন সংগঠন ভেঙে দেওয়া উচিৎ,” প্রচণ্ড উত্তেজনায় সেদিন বলেছিল বিপ্লব। বাবার সাথে দূরত্ব তৈরি হওয়ার সেই শুরু। ও তখন কলেজে বি সি এ ফার্স্ট ইয়ার।

“তোর এখন মাথা গরম, তাই এসব বলছিস। মাথা ঠান্ডা হোক, তারপর কথা বলা যাবে।”

“আমার মাথা ঠান্ডাই আছে। তুমি তোমার পার্টি করেছে বলেই যে কোন অন্যায়কে জাস্টিফাই কোরো না, বাবা।”

“আমি জাস্টিফাই করব কি? আমি তো ঘটনাটাই সবটা জানি না। তোর থেকেই যা শুনেছি। কোন ঘটনারই এক পক্ষ শুনে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিৎ না।”

“এক পক্ষ! এর আবার অন্য পক্ষ কী থাকবে? জাস্ট অন্য পার্টির সংগঠন করে বলে একটা ছেলেকে অমানুষিকভাবে মারবে ওরা! শুধু তাতেও তো থামেনি, আবার সুকৃতিকে হুমকি দিয়েছে ‘জিনস খুলে নেব।’ এর নাম সংগঠন! আবার কমিউনিস্ট পার্টির ছাত্র সংগঠন? এদের সাথে সংগঠন করতে বলো তুমি?”

“এরাই সব নয়, বিপ্লব।”

“হ্যাঁঃ! সব নয়। দেখা হয়ে গেছে আমার। ব্যাপারটা নিয়ে আমাদের জেলা সেক্রেটারিকে বললাম, সে কী করল? না ঐ ক্রিমিনালটাকেই ফোন করে জিজ্ঞেস করল ‘কী হয়েছে রে?’ তারপর তার কথায় বিশ্বাস করে আমায় বলল রঞ্জন আর সুকৃতি নাকি ছেলেমেয়েদের থ্রেট করছিল, তাই ওদেরকে ভয় খাইয়ে দেয়া দরকার ছিল।”

“হতেও তো পারে…”

“না, পারে না। গোটা কলেজে ডি এস ওর পঞ্চাশটা স্টুডেন্ট নেই। ওরা থ্রেট করবে? কখনো সম্ভব? আর রঞ্জন, সুকৃতি আমার ক্লাসের। ওদের আমি চিনি না? ওরা থ্রেট করার লোকই না।”

“দুনিয়াটা অত সোজা নয়, বাবা…”

কথাটা শেষ করতে না দিয়েই বিপ্লব বলেছিল “তাই দেখছি। যেমন তোমাকে বরাবর ভাবতাম সৎ কমিউনিস্ট। এখন দেখছি সৎ ফৎ কিছু না। আর সকলের মত তোমারও একটা মুখোশ আছে হয়ত।”

বাবা যেন পাথর হয়ে গিয়েছিল। মা ধমকে উঠেছিল “এ কি রে! এসব কী বলছিস বাবাকে? ছি ছি ছি!”

“থামো তো। অত ছি ছি করার কিছু নেই। এরা সব এক। আমার তো এখন সন্দেহ হচ্ছে বাবাও রিগিং করে ভোটে জিতত।”

মা ঠাস করে এক চড় কষিয়ে দিয়েছিল। “এই চিনেছিস বাবাকে? হ্যাঁ? এই চিনেছিস?” বলে কান ধরে টেনে আরো কয়েকটা মারতেই বাবা আর্তনাদ করে দৌড়ে এসেছিল “কী করছ কি! এত বড় ছেলের গায়ে কেউ হাত তোলে?”

বাবা সর্বশক্তি দিয়ে ছাড়িয়ে নিল, কিন্তু মা বলতেই থাকল “ছেলে? কিসের ছেলে? এইভাবে বাপের সাথে কথা বলে কোন ছেলে? কে ওকে বলেছে কলেজে রাজনীতি করতে? আমি বারণ করিনি? করাও চাই আবার এইসব নিয়ে বাড়ির মধ্যে অশান্তি করাও চাই! এগুলো সহ্য করব না আমি বলে দিলাম।”

বিপ্লব রাগের চোটে দোতলায় নিজের ঘরে গিয়ে দুমদাম করে দরজা জানলা বন্ধ করে দিয়ে বসে থাকে। কিন্তু মায়ের গলা বরাবরই সরেস। কানে আসতে থাকে “তুমিই এর জন্যে দায়ী। আমি বারবার বলেছিলাম কলেজে পার্টি ফার্টি করবে না, কলেজটা লেখাপড়া করার জায়গা। তুমি তখন ওকে প্রশ্রয় দিয়েছ। এখন বোঝো। ছি ছি ছি! যা মুখে আসছে তাই বলছে! কোন শিক্ষা দীক্ষা হয়নি ছেলের!” উত্তরে বাবাও কিছু একটা বলে, কিন্তু সেটা ঠিক শুনতে পাওয়া যায় না। শুধু শোনা যায় মা আরো উঁচু গলায় চিৎকার করছে “হয় ছেলে পার্টি ছাড়বে, নয় তুমি পার্টি ছাড়বে, আমি বলে দিলাম। তোমার রাজনীতি করার জন্যে আমার জীবনটা নষ্ট হয়ে গেছে, এখন আমি ঘরের মধ্যে এই অশান্তি আর সহ্য করব না। হয় কেউ একজন পার্টি ছাড়ো, নয় আমি এই বাড়ি থেকে চলে যাব।”

এরপরই শোনা যায় গ্রিলের গেট খোলার শব্দ। মা তখনো চেঁচিয়েই চলেছে।

বাবাকে পার্টি ছাড়তে হয়নি, মাকেও বাড়ি ছাড়তে হয়নি। আর রাজনীতি না করার সিদ্ধান্তটা নিয়েই ফেলেছিল বিপ্লব। বন্ধ ঘরে বসে একটা লম্বা পদত্যাগপত্র লিখে ফ্যালে। তারপর বোঝে এত নাটক করার কোন দরকার নেই। কিসের আবার পদত্যাগ! সি আর বৈ তো নয়। তাও আবার বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত। আর এস এফ আইয়ের জোনাল কমিটির সদস্য। এসব আর কী এমন পদ? আর পদত্যাগপত্র দেবেই বা কাকে? ঐ সাত্যকি সরকারকে? ও নামেই জি এস। আসলে একটা গাঁটকাটা। বিপ্লব এস এফ আই ছেড়ে দিলে ও খুশিই হবে। অস্বস্তিকর প্রশ্নগুলোর সম্মুখীন হতে হবে না, স্তাবকদের নিয়ে আরামে থাকতে পারবে। অতএব তিন পাতার পদত্যাগপত্রটা পাকিয়ে, নর্দমার দিকের জানলাটা খুলে ছুঁড়ে ফেলে দেয় বিপ্লব।

চিঠিটা লেখায় অবশ্য একটা লাভ হয় — উত্তেজনা অনেকটা কমে যায়। রাতে খাওয়ার টেবিলে বিপ্লব বুঝতে পারে, বাবাকে একটু বেশিই খারাপ কথা বলা হয়ে গেছে। কিন্তু ও কেনই বা ভুল স্বীকার করতে যাবে? বাবাই তো ছোটবেলায় শিখিয়েছিল, কমিউনিস্টদের যে সবই ভাল তা নয়। তাদেরও দোষ আছে, দোষ থাকতেই পারে। সমালোচনা করাই কর্তব্য। সে কথা বাবা আজ ভুলে গেল কেন? রঞ্জনকে ওভাবে মারা আর সুকৃতিকে রেপের হুমকি দিয়ে যে ওর কলেজের এস এফ আই অন্যায় করেছে — এটুকু মেনে নিতে কী অসুবিধা ছিল বাবার? ভুল বাবা করেছে, মিটমাট করতে হলে বাবাই করবে। ও নত হতে যাবে না। এই ভেবে কোন কথা না বলেই খাওয়া শেষ করে উঠে গিয়েছিল সে রাতে।

পরদিন ভোরবেলা দরজা ধাক্কিয়ে ঘুম থেকে তুলল মা। “শিগগির গিয়ে ফোনটা ধর। কে একটা মেয়ে ফোন করেছে, হাউ হাউ করে কাঁদছে। কেন জানি না।”

শুনেই বিপ্লব বুঝল কার ফোন। সুকৃতি। একটু আগে রঞ্জন মারা গেছে। কালই নার্সিংহোম থেকে শুনে এসেছিল ওর মাথার চোট গুরুতর। তা বলে মরে যাবে ছেলেটা! বিপ্লব ছুটল নার্সিংহোমে।

কোত্থেকে যেন এসে পড়েছে অনেক অচেনা ছেলেমেয়ে। এত লোক ডি এস ও করে কখনো স্বপ্নেও ভাবেনি বিপ্লব। ওরা রঞ্জনের দেহ নিয়ে মিছিল করে কলেজ ক্যাম্পাসে যেতে চেয়েছিল। ওর বাবা রাজি হলেন না। তাই প্রথমে ওর বাড়ি, তারপর সোজা শ্মশানে যাওয়া হল। অবশ্য গোটা সময়টা স্লোগান দিয়ে গেল ছেলেমেয়েগুলো। বিপ্লব গলা মেলাতে পারল না। হাজার হোক, ওরা তো ডি এস ও। এস এফ আই ছাড়লেও অন্য কারোর হয়ে গলা ফাটানো কি ঠিক হবে? মনস্থির করতে পারল না কিছুতেই। শ্মশানেই একটা মিটিং মত করল ওরা। তাতে বিপ্লবের চেয়ে বয়সে বেশ খানিকটা বড় একটা ছেলে বলল “কমরেড রঞ্জনের হত্যার জন্যে যারা দায়ী, তাদের আমরা ছেড়ে দেব না। প্রশাসনের কাছ থেকে বিচার আদায় করেই ছাড়ব। আগামীকাল সকালে কলেজ চত্বরে ঠিক সকাল দশটায় আমরা জমায়েত হব, কমরেড রঞ্জনকে স্মরণ করব। আপাতত, দাহ হয়ে গেলে আমরা থানায় যাব। আমাদের প্রতিনিধিরা ওসির সাথে দেখা করবেন। রঞ্জনকে কারা মেরেছিল সেটা সবাই জানে, অনেকেই দেখেছে। কমরেড সুকৃতি নিজে ঘটনার সাক্ষী। এরপরও খুনীদের ধরতে না পারার কোন অজুহাত থাকতে পারে না। সে কথাই আমরা পুলিশকে জানিয়ে দিয়ে আসব। আমরা ২৪ ঘন্টার মধ্যে অপরাধীদের গ্রেপ্তারের দাবী জানাচ্ছি। অন্যথায় আমরা থানার সামনে গ্রেপ্তার না হওয়া পর্যন্ত অবস্থান বিক্ষোভ করব।”

রঞ্জনের অস্থি ভাসানো হয়ে যাওয়ার পর ওরা মিছিল করে থানায় গেল। সুকৃতি বিপ্লবকে বলল “ভাই, তুই তো মিছিলে যাবি না। একটু রঞ্জনের বাবাকে বাড়ি পৌঁছে দিবি?”

বিপ্লব পৌঁছে দিল। খুবই শক্ত ধাতের লোক বলতে হবে। বিপ্লব কথা বলার অবস্থায় ছিল না, উনিই রিকশায় কথা বলতে বলতে গেলেন। বিপ্লবের নাম, ধাম, রঞ্জনকে কতটা চিনত — এসব জিজ্ঞেস করলেন। যেন কিছুই হয়নি। এমনকি রঞ্জনের ছোটবেলার অনেক ঘটনাও বললেন। শুনতে শুনতে বারবার চোখ ভরে আসছিল বিপ্লবের। কারণ ভীষণ মিল ওর নিজের ছোটবেলার সাথে। রঞ্জনের বাবাও সি পি এম করতেন। সিদ্ধার্থশঙ্করের আমলে জেল খেটেছেন। কিন্তু ১৯৯৭ এর পর আর মেম্বারশিপ রিনিউ করাননি। বিপ্লব লজ্জায় বলতে পারল না যে ও এস এফ আই, বাবা সি পি এম। ভদ্রলোক বাড়ির সামনে রিকশা থেকে নামার আগে মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন “ভাল থেকো, বাবা। তোমরাই তো ভবিষ্যৎ।” তখনো গলাটা কাঁপল না একবারও।

বিপ্লব যখন বাড়ি ঢুকছে, বাবা তখন সাইকেল নিয়ে বেরোচ্ছে। বলল “ছেলেটা মারা গেল রে?” কোন উত্তর না দিয়ে গটগট করে ঢুকে গেল ও। খুনীর পার্টি আবার সহানুভূতি দেখাচ্ছে! ঠিক এই কথাটাই মনে হচ্ছিল তখন।

পরদিন সকাল থেকে প্রবল বৃষ্টি। ও রোজকার মত স্নান টান করে নীচে নেমে বলল “মা, ভাত দাও।” মা বলল “এই দুর্যোগের মধ্যে কলেজ যাবি? ক্লাস কটায়?”

“ক্লাস যখনই থাক। আমি এখনই বেরোব। দরকার আছে।”

বাবা কাগজ পড়তে পড়তে বলল “ওদের কলেজের একটা ছেলে খুন হয়েছে, জোনাকি। ওকে যেতে দাও।”

“ও মা, সে কি! পরশু মারামারি, কালকে খুন! এসব কী হচ্ছে?”

“আরে বাবা, পরশুর মারামারিতেই আহত ছেলেটা কাল মারা গেছে। একটু কাগজ টাগজ পড়লেও তো পারো।”

অকারণেই ক্ষেপে উঠে বিপ্লব বলে “মারামারি হয়নি। মারা হয়েছে। ছেলেটা মারা যায়নি, মেরে ফেলা হয়েছে।”

বাবা কাগজ হাতে উঠে পড়ে, চলে যেতে যেতে বলে “তা তো বটেই। তাজা ছেলেটা…”

সেদিন কথাটা একেবারেই স্পর্শ করেনি বিপ্লবকে। আজ অটোয় বসে হায়দরাবাদের বৃষ্টির ছাঁট গায়ে লাগতে বুঝতে পারল গলার কত নীচ থেকে ভেসে এসেছিল শব্দ দুটো — “তাজা ছেলেটা”।

বৃষ্টির মধ্যেই কলেজের মেন বিল্ডিঙের সামনে স্মরণসভা হয়েছিল রঞ্জনের। ডি এস ও করা ছেলেমেয়েদের বাদ দিলে হাতে গোনা কয়েকজন এসেছিল। আগেরদিন বিকেলেই পরবর্তী বিজ্ঞপ্তি পর্যন্ত কলেজ বন্ধ রাখার নোটিশ লেগে গিয়েছিল। এই অবস্থায় কে কলেজ মাড়াবে?

সভা শেষের মুখে, ততক্ষণে সবাই কাকভেজা। একেবারে পেছনের সারিতে দাঁড়িয়েছিল বিপ্লব। সভা পরিচালনা করছিল সেই আগের দিনের ছেলেটা। বিপ্লব জেনেছে ওর নাম অনিকেত। এই কলেজের ছাত্র নয়, এস ইউ সি আই নেতা। বলল “আমরা সভা শুরু করেছি নীরবতা পালন করে। শেষ করব কমরেড রঞ্জনের খুব প্রিয় একটা গান দিয়ে। গাইবেন কমরেড অনন্যা।”

মেয়েটাকে বিপ্লব চেনে। থার্ড ইয়ার হিস্ট্রি অনার্স। গানটা ধরল বটে, কিন্তু গলায় মোটেই সুর নেই। বাবার গলায় লোডশেডিং আর বৃষ্টির সন্ধ্যায় বারবার শোনা গল্পগুলোর সাথে যে গানগুলো বহুবার শুনে প্রাণের গান হয়ে গেছে, তারই একটা। “ওরা আমাদের গান গাইতে দেয় না / নিগ্রো ভাই আমার / পল রোবসন।” দু চার লাইন শুনে বিপ্লব আর থাকতে পারেনি, গেয়ে উঠেছে সজোরে “আমরা আমাদের গান গাই / ওরা চায় না / ওরা চায় না।” মাইক ছাড়াই মিটিং হচ্ছিল তো, ওর গলাটা অনন্যার গলাকে ছাপিয়ে গেল। কিছু খেয়াল করার আগেই সবাই ঘুরে গেল ওর দিকে। অনন্যা অপ্রস্তুত হয়ে থেমে গেল। থতমত খেয়ে বিপ্লবও চুপ করে গেল। কয়েক সেকেন্ডের নৈঃশব্দ্য। তারপর অনিকেত বলল “গেয়ে যান, ভাই। চমৎকার গাইছেন। কমরেডস, আসুন গলা মেলাই।” গান চলতে থাকল, সবাই মিলে। খোলা অটোয় বেশ ঠান্ডা লাগছিল। গানটা গেয়ে নিজেকে গরম করার চেষ্টা করল বিপ্লব। গাইতে গাইতে ভাবল, বাবা অতীতচারী হতে বারণ করেছিল। বলেছিল স্বর্ণযুগ বলে কিছু হয় না। অচিন্ত্যদার ছাঁটাইয়ে মনটা চঞ্চল হয়েছে বলে ও খামোকা নস্ট্যালজিক হয়ে এইসব অন্যায়গুলোর কথা ভুলে গিয়ে সেই নরককুণ্ডে ফেরত যেতে চাইছে না তো? হয়ত বাবার প্রতি সত্যিই একটু বেশি কঠোর হয়েছে সে, কিন্তু বাবার কি কোন পরিবর্তন হয়েছে? ওরকম অন্যায় বাবা কখনো করেছে বলে জানা নেই সত্যি, কিন্তু বাবা কি বিরোধিতা করেছে? অন্তত বলেনি তো ওকে! অবশ্য বছর দশেক হল সেভাবে কথাবার্তাই তো বলা হয়নি। রাজনীতি নিয়ে তো নয়ই। ফিরে যাওয়ার আগে একবার কথা বলে দেখবে নাকি? জিজ্ঞেস করবে নাকি সিঙ্গুর নিয়ে কী ভাবছে বাবা? নন্দীগ্রাম? বছর দেড়েক আগে যে অতগুলো লোককে মেরে ফেলল সি পি এমের পুলিশ? কী বক্তব্য বাবার? পার্টির এই অন্যায়টাকেও কি সমর্থন করে?

ভাল লাগলে টাকা দিতে পারেন Google Pay / Paytm / BHIM বা অন্য মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে journopratik@okhdfcbank কে

অথবা

নেট ব্যাঙ্কিং বা অন্য উপায়ে নিম্নলিখিত অ্যাকাউন্টে

Pratik Bandyopadhyay
A/c No. 14041140002343
HDFC Bank
Branch: South Calcutta Girls’ College
IFS Code: HDFC0001404
MICR Code: 700240048

সকল অহঙ্কার হে আমার

সেদিন যথাসময়ে অফিসে ঢুকে দেখি, অনেক দেরি করে ফেলেছি। নিউজরুম আলো করে বসে আছেন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়।

তখন ‘দ্য টাইমস অফ ইন্ডিয়া’ তে কাজ করি। কলকাতা সংস্করণের অধুনা প্রয়াত রেসিডেন্ট এডিটর সুমিত সেন সৌমিত্রবাবুর স্নেহভাজন ছিলেন বলে শুনেছি। সেই সুবাদেই টাইমসের অফিসে আসা। আসবেন জানতাম না। যখন পৌঁছেছি, তখন তাঁর প্রায় ফেরার সময় হয়ে গেছে। ভাগ্যিস আমার মত আরো অনেকেরই আশ মেটেনি সেদিন। তাই কিছুদিন পরেই আরেকবার তিনি আসবেন বলে কথা হল।

সে দিন আসতে আসতে আরো বছর খানেক কি দেড়েক। আগেরবার এসে শুনেছি গটগট করে কাঠের সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠেছিলেন। এবার একতলাতেই ব্যবস্থা করা হয়েছিল। ঐ মানুষটিকে আগে কয়েকবার রবীন্দ্র সদন, বিমানবন্দর ইত্যাদি জায়গায় বহুদূর থেকে দেখেছি। দু হাত দূরত্ব থেকে সেদিন দেখে বাকরুদ্ধ হয়ে গিয়েছিলাম। আড্ডার মেজাজে কথা হল, অনেকে অনেক প্রশ্ন করলেন, আমারও অনেক কথা জিজ্ঞেস করার ছিল। কিন্তু গলা দিয়ে আওয়াজই বেরোল না। বেরোবে কী করে? কেবল আমার কান তো তাঁর কথা শুনছিল না, আমার প্রতিটি রোমকূপ শুনছিল।

তিনি যা যা বললেন তার মধ্যে অনেক কথা বহুবার বহু জায়গায় বলেছেন বা লিখেছেন। আজকের কাগজগুলোতেও সেসব বিলক্ষণ পাওয়া যাবে। যা আমাকে সবচেয়ে চমৎকৃত করেছিল, সেটা বলি। কারণ সেগুলো আর কোথাও পড়েছি বা শুনেছি বলে মনে পড়ছে না।

বলছিলেন অগ্রজ শিল্পীদের কথা। শিশির ভাদুড়ি, অহীন্দ্র চৌধুরী থেকে ছবি বিশ্বাসে এসে দীর্ঘক্ষণ বললেন। সত্যি কথা বলতে, নিজের অভিনয় নিয়ে যা বললেন সেগুলো সবই নানাজনের প্রশ্নের উত্তরে। তার চেয়ে অনেক বেশি কথা বললেন ছবি বিশ্বাসের সম্বন্ধে। কেবল ছবি বিশ্বাসের অভিনয় প্রতিভা নয়, বললেন তাঁর অসম্ভব পরিশ্রম করার ক্ষমতা নিয়েও। ছবি বিশ্বাসের জীবনের শেষ দিকে কোন এক ছবিতে দুজনের একটা দীর্ঘ দৃশ্য ছিল।

“লম্বা সিন, আর সংলাপগুলোও খুব লম্বা লম্বা। আমি বারবার ভুল করছি আর শট এন জি হয়ে যাচ্ছে। ছবিদার তখন শরীরটা এমনিই বেশ খারাপ। ঐ সিনটাতে আবার সুট বুট পরা, অথচ তখন অসম্ভব গরম। শট ওকে হচ্ছে না বলে ফ্যান চালানোও যাচ্ছে না। ফলে ওঁর আরো শরীর খারাপ লাগছে, ক্রমশ রেগে যাচ্ছেন। শেষে পরিচালক বললেন ‘আমরা একটু ব্রেক নিই, আপনারা একটু রেস্ট নিয়ে নিন। তারপর আবার চেষ্টা করা যাবে।’ আমি ছবিদার সাথে বসে সারেন্ডার করলাম। বললাম ‘দেখছেন তো পারছি না। দিন না বাবা একটু দেখিয়ে?’ উনি সেই বিখ্যাত গম্ভীর গলায় বললেন ‘বুঝতে পেরেছ তাহলে’? তারপর তড়াক করে উঠে দাঁড়িয়ে বললেন ‘তুমি আমার ডায়লগ বলো, আমি তোমার ডায়লগ বলছি।’ তারপর অতবড় সিন গোটাটা রিহার্সাল করালেন, মুভমেন্টগুলোও শুধরে দিলেন। তারপর নিজের নিজের ডায়লগ বলিয়ে আবার করালেন। শেষে ডিরেক্টরকে ডেকে এনে শট নেওয়ালেন, শট ওকে হল।

আমি অবাক হয়ে গেলাম শরীরের ঐ অবস্থাতেও ওরকম উদ্যম দেখে। তাছাড়া আমার একটা অহঙ্কার ছিল, আমার সংলাপ সবসময় মুখস্থ থাকে। সেই অহঙ্কারটাও চুরমার হয়ে গেল। কারণ দেখলাম ছবিদার শুধু নিজের নয়, আমার ডায়লগও হুবহু মুখস্থ। বরং আমি দু এক জায়গায় ভুল করে ফেলেছিলাম, উনি ধমকালেন ‘কী যে করো তোমরা! ডায়লগ মুখস্থ রাখতে পারো না?”

প্রবাদপ্রতিম অভিনেতার মুখে এই গল্পটা শুনে আশ্চর্য লেগেছিল, কিভাবে আমাদের সামনে নিজের ত্রুটিগুলো অকপটে বললেন! অগ্রজ অভিনেতার কাছ থেকে কত শিখেছেন সেটাও কেমন সবিস্তারে বললেন! অথচ কত সহজ ছিল “আমি এই, আমি তাই, আমি সেই” বলা। সেরকম বলার মত যথেষ্ট কীর্তি তো তাঁর ছিলই। অবশ্য হয়ত আমরা এই প্রজন্মের লোক বলেই আমাদের এত অবাক লাগে। সৌমিত্রবাবু তো বললেনই “আমাদের সময়ে আমরা এইসব স্টলওয়ার্টদের পেয়েছি আর নিংড়ে নিয়েছি। যতটা পারা যায় শিখে নিতাম। ওঁরাও খুব ভালবেসে শেখাতেন, দরকারে বকাঝকাও করতেন। এখন আর আমি কাকে কী শেখাব? আজকাল তো সবাই সব জানে।”

“নিজেরে করিতে গৌরব দান নিজেরে কেবলি করি অপমান” কথাটা আমরা ভুলে গেছি। তাই কলকাতার ফিল্মোৎসবে সত্যজিৎ রায়, ঋত্বিক ঘটক, মৃণাল সেন, তপন সিংহ, উত্তমকুমার, সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়, সুচিত্রা সেন, সুপ্রিয়া দেবী, সাবিত্রী চট্টোপাধ্যায় বা মাধবী মুখোপাধ্যায়ের কাট আউট ঝোলে না। ঝোলে আয়োজক প্রধান মুখ্যমন্ত্রীর ছবি। মুখ্যমন্ত্রী, প্রধানমন্ত্রীরা অবশ্য আকাশ থেকে পড়েন না, আমাদের মধ্যে থেকেই উঠে আসেন। আমরা সবাই তো এখন আত্মরতিপ্রবণ। নইলে কোন বিখ্যাত মানুষ মারা গেলে সাংবাদিকরা কেন স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে লিখবেন, “অমুক সালে যখন আমি তমুক এক্সক্লুসিভটা করে অমুক প্রোমোশনটা পেয়েছি…”? কেনই বা আসবে মৃত মানুষটি কবে কী কারণে লেখকের প্রশংসা করেছিলেন?

নাম তার ছিল: ২০

পূর্বকথা: বাবার প্রতি, বাবার রাজনীতির প্রতি বিতৃষ্ণায় চাকরি নিয়ে হায়দরাবাদে চলে এসেছিল বিপ্লব। কোনদিন ফিরে যাওয়ার ইচ্ছা ছিল না। সম্প্রতি অর্থনৈতিক ডামাডোলে বস এবং প্রিয় বন্ধু অচিন্ত্যদার দুর্দশা দেখে বাবার কথা, সবুজগ্রামের কথা নতুন করে ভাবতে হচ্ছে।

পাগল ছাড়া কেউ কলকাতায় ফেরত যায় না। বন্ধুবান্ধবরা সকলেই এই এক কথাই বলছে। হায়দরাবাদ ছেড়ে যদি যেতেই হয় তো ব্যাঙ্গালোর যাওয়া উচিৎ, গুরগাঁও যাওয়া উচিৎ। নইলে নয়ডা আছে, পুণে আছে। মরতে কলকাতা কেন? কলেজের সহপাঠীরা, আগের চাকরির সহকর্মীরা — সকলেই একই কথা বলছে। দু একজন তো অন্য বন্ধুদের থেকে শুনে উপযাচক হয়ে ফোন করে বলেছে “এই ব্লান্ডার করিস না ভাই। তুই এখন যে স্টেজে আছিস, আর কিছুদিনের মধ্যেই অফ শোর যাবি। একবার গেলেই তোর অপশন অনেক বেড়ে যাবে। চেষ্টা করবি বাইরে কোথাও সেটল করতে। কলকাতা কোন দুঃখে?”

দুঃখ! সে কি কলকাতার জন্যে? তা তো নয়। দুঃখ বাবার জন্যে। না, বোধহয় তাও নয়। অন্যের জন্যে দুঃখ পাওয়ার যে ক্ষমতা একদিন ছিল, সে আর কোথায়? এখন শুধুই নিজের জন্যে দুঃখ হয় বিপ্লবের। কিসের দুঃখ? বাবার থেকে দূরে সরে যাওয়ার দুঃখ, হয়ত মানুষটাকে ঠিক করে চিনতে না পারার দুঃখ। তাতে কার ক্ষতি হয়েছে? বাবার? ধুর। বাবার পৃথিবীটা অনেক বড়। সে পৃথিবীর একটা কোণ খাবলে নিয়ে ছেলে অন্য গ্রহের বাসিন্দা হয়েছে অনেকদিন। তাতে বাবার দুনিয়ায় কিছুর অভাব ঘটেছে কি? ঘটেনি। বিপ্লব ঠিক জানে, দুঃখবিলাসীদের ভুলে সত্যিকারের দুঃখী মানুষদের দুঃখের ভাগ নিয়ে দিব্যি চলে যাচ্ছে বাবার। তেমন কিছু করার ক্ষমতা নেই বহুকাল হল, কিন্তু পাশে গিয়ে দাঁড়ানোর ক্ষমতা বাবার ততদিন থাকবে যতদিন হেঁটে চলে বেড়াতে পারছে। আর ততদিন বাবা সেই সাত পুরনো সাইকেলটা নিয়ে খুঁজেও বেড়াবে কে একা একা দুঃখ পাচ্ছে। হয়ত যৎসামান্য কিছু একটা করবে। সেটুকুও না পারলে চুপচাপ বাড়ি ফিরে কোন একটা বই মুখে করে থম মেরে বসে থাকবে, তেমন ঘটনা হলে হয়ত নিঃশব্দে কাঁদবে। মা টের পাবে না, কারণ কোনদিন পায়নি। কিন্তু বাবার সম্পর্কে একেবারে শীতল হয়ে যাওয়ার পরেও বিপ্লব ঠিক টের পেত। তবে ছোটবেলায় যেমন বাবাকে দেখে ওর চোখে জল এসে যেত, ভাবত ওরও কর্তব্য কিছু একটা করা — সেরকম আর হয়নি বছর দশেক।

বিপ্লব মনে করার চেষ্টা করে শেষ কবে ওর কান্না পেয়েছিল। মনেই পড়ে না। কান্না পাওয়ার মত কিছু কি ঘটেনি অনেকদিন? ঘটেছে তো। যে অচিন্ত্যদার সাথে এত ঘনিষ্ঠতা, সে অন্ধকার মুখ নিয়ে চাকরিটা ছেড়ে চলে যেতে বাধ্য হল। বিপ্লবের তো কান্না পেল না! তারপর সেই লোক আত্মহত্যার চেষ্টা করল। আরেকটু হলে মরেই যেত। তাকে দেখতে গিয়েও তো কান্না পায়নি! ও হাসপাতালে থাকার সময়ে একদিন বিপ্লব দেখতে গেছে, দ্যাখে মাথার কাছে বসে আছে অচিন্ত্যদার মেয়ে রিচা। বছর দশেকের মেয়েটার মুখটা শুকিয়ে এতটুকু। সে মুখ দেখে বিপ্লবের নিজের কথা মনে পড়ে গিয়েছিল। সেই যেদিন বাবা পঞ্চায়েত সমিতি থেকে প্রায় অজ্ঞান অবস্থায় ফিরল। তা সত্ত্বেও, সেদিনও চোখে জল আসেনি বিপ্লবের। এতটাই কি নির্দয় ও? একটা ফুলের মত বাচ্চার কষ্ট দেখেও কষ্ট হয় না? বাচ্চার কথা ভাবতে গিয়েই শেষ অব্দি মনে পড়ে গেল শেষ কবে কান্না পেয়েছিল।

মাত্র কদিন আগেই। অচিন্ত্যদা কলকাতায় চলে যাওয়ারও পরের ঘটনা। বিপ্লবের বাড়িওয়ালার একটা মহা বিচ্ছু ছেলে আছে, বছর আষ্টেক বয়স। ও সে ব্যাটাকে এড়িয়ে চলারই চেষ্টা করে, কিন্তু তার যে কোন কারণেই হোক “বংলা আঙ্কল” কে ভীষণ পছন্দ। ছুটির দিনে ওকে ঘরে দেখতে পেলেই এসে খেলাধুলো করতে চাইবে। তার খেলা মানে গোটা ঘরটা লণ্ডভণ্ড করা। বিপ্লব একদমই পছন্দ করে না, কিন্তু বাড়িওয়ালার ছেলে বলে কথা। দূর দূর করে তাড়িয়ে দেওয়াও যায় না। ফলে সে আসে এবং ঘন্টা দুয়েক থাকে। মানে সমস্ত ঘরটা তছনছ না করা অব্দি ফেরত যায় না। তা সেদিন যখন আসে, বিপ্লব একটু বেশিই বিরক্ত হয়েছিল। কারণ সেই সপ্তাহটা খুব চাপ গেছে, শনিবারও অফিস যেতে হয়েছে, রাত দুটো অব্দি কাজ করতে হয়েছে। দুপুরে স্নান করে, খেয়ে উঠে সবে শুতে যাবে — এমন সময় উৎপাত। ছেলেটা এসে ঢুকতেই ও ঠিক করেছিল ব্যাটাকে ডাইনিং হলে খেলতে দিয়ে বেডরুমে গিয়ে দরজা বন্ধ করে শুয়ে পড়বে। যা ছেঁড়ে ছিঁড়ুক, যা ইচ্ছে ভাঙুক। করেছিলও তাই। বেশ গভীর ঘুম এসেছিল। দোষের মধ্যে দরজাটার ছিটকিনি আটকানো হয়নি, ভেজানো ছিল। হঠাৎ পায়ের নীচে একটা প্রচণ্ড যন্ত্রণা ঘুমটা ভাঙিয়ে দিল। ব্যথার চোটে চিৎকার করে জেগে উঠে দ্যাখে বাঁদরটা রান্নাঘর থেকে সাঁড়াশি নিয়ে এসে ওর পায়ের আঙুল নিয়ে টানাটানি করছে। আরেকটু হলেই ভেঙে ফেলেছিল ডান পায়ের বুড়ো আঙুলটা! সেই তখন ব্যথায় চোখে জল এসেছিল।

তাহলে চোখে জল আসে, তবে অন্যের কষ্টে নয়। আয়নায় নিজের চেহারাটা দেখে বাঁকা হাসে বিপ্লব। মানুষ যে কত বদলে ফেলতে পারে নিজেকে, ভাবলে অবাক লাগে।

সবুজগ্রাম স্টেশনের কাছে সেই জামার দোকানটা এখনো আছে কিনা কে জানে। সেবার পুজোর আগে উত্তরবঙ্গে খুব বন্যা হল। বাবা এসে মহালয়ার কয়েকদিন আগে মাকে বলল “জোনাকি, এই ত্রাণে তো কিছু দিতে হয়।”

মা গম্ভীর হয়ে বলল “কী দিতে হবে?”

“এই জামাকাপড় টাপড়… পুরনো, নতুন…”

“গুছিয়ে রাখব, কাল নিয়ে যেও।”

“কাল সকালে আমরা তো বাড়ি বাড়ি কালেকশনে বেরোব। তখন দিয়ে দিও।”

মা হ্যাঁ, না কিছুই বলল না। বাবা যেন কী একটা বলব বলব করেও বলছে না। শেষে মা-ই জিজ্ঞেস করল “এত অল্প ফরমাশ তো তোমার হয় না? আর কী যন্ত্রণা দেবে বলে ফ্যালো। ফেলে রেখে লাভ নেই।”

“আসলে কিছু টাকাও তো ত্রাণ তহবিলে দেয়া দরকার,” বাবা আমতা আমতা করে বলে।

“টাকা! কোথায় পাবে টাকা? বাড়িতে তো কিচ্ছু নেই।”

“না না, সে তো জানি। কিন্তু ঐ স্কুল কো অপারেটিভ থেকে একটা টাকা তো পাব। সেটা যদি ওখানে দিই…”

“বাঃ! চমৎকার! তাহলে পুজোর মাসটা চলবে কী করে?”

এই নিয়ে দুজনের রীতিমত লেগে গেল। বাবা শেষ পর্যন্ত চুপচাপ বাইরের ঘরে গিয়ে বসে পড়ল। মা তখনো ঠান্ডা হয়নি। বিপ্লব তখন বলেছিল “বাবা, আমাকে এবার পুজোয় জামা টামা দিতে হবে না। তুমি সেই টাকাটা ত্রাণ তহবিলে দিয়ে দাও।”

বাবার নিভে যাওয়া চোখ দুটো কিভাবে জ্বলে উঠেছিল মনে পড়ে মনটা ভাল হয়ে গেল বিপ্লবের। “দেখেছ, জোনাকি? দ্যাখো। এই হচ্ছে আমার ছেলে।” বাবা চিৎকার করে উঠেছিল।

মা, রাগের মধ্যেই, হেসে ফেলে বলেছিল “তা তো বটেই। ওরও তোমার অবস্থাই হবে। সারাজীবন শুধু দুঃখী মানুষের আশীর্বাদ কুড়োবে।”

বাবা জড়িয়ে ধরে জিজ্ঞেস করেছিল “বাবা, তোর কষ্ট হবে না? পুজোর সময় সবাই নতুন জামা পরবে…”

“আরে বাবা, আমিও তো পরব। মামা তো দিয়েছে একটা। আবার কত লাগে একজন মানুষের?” বিপ্লব বিড়বিড় করে বলল সেদিনের বলা কথাগুলো। আর বলতে বলতে চোখ চলে গেল ওয়ারড্রোবের দিকে। উঠে গিয়ে খুলল সেটা। এক, দুই, তিন, চার, পাঁচ, ছয়, সাত, আট, নয়… ইশ! কত বদলে গেছে ও। পিটার ইংল্যান্ড, টার্টল, অ্যালেন সোলি… কিছু যে বাদ নেই আর! ক্রেডিট কার্ড হওয়ার পর থেকে কত যে ব্র‍্যান্ডেড জামাকাপড় কিনেছে!

সেবার ষষ্ঠীর দিন সকালে বাবার সাথে বাজারে গিয়েছিল। বাজার থেকে বেরিয়ে বাবার বরাবরের অভ্যেস বিন্দুকাকুর চায়ের দোকানে ঢোকা। সেদিন উল্টো দিকে হাঁটা দিয়েছে দেখে বিপ্লব জিজ্ঞেস করল “কোথায় যাচ্ছ?”

“আয় না।”

পিছু পিছু গিয়ে দ্যাখে বাবা একটা জামাকাপড়ের দোকানে ঢুকছে। বাবাকে দেখেই বৃদ্ধ দোকানদার বললেন “বাব্বা! কার পায়ের ধুলো পড়ছে?”

“কী যে কন, কাকা। রোজই তো এই রাস্তা দিয়া আসি যাই।”

“তা তো যাও। কিন্তু আমার দোকানে তো কখনো আসো না। তোমার বাপের লগে কত আইতা।”

“আপনার দোকানে তো আমার দরকার পড়ে না। আমি তো মোটামুটি পাঞ্জাবি পাজামা পইরাই কাটাই। আপনার দোকান তো বাবার আমলে লুঙ্গি, ফতুয়ার দোকান আছিল। এখন তো রেডিমেড। আমার তো লাগব না।”

“তা বটে। তা আইজ কার জইন্যে?”

“এই যে আমার পোলা। একখান ভাল দেইখ্যা জিনস দেখান তো। ওর বয়সী পোলাপান তো জিনসই পরে দেহি। ওরে একখানও কিনে দেই নাই।”

বাবার মতলবটা বুঝতে পেরেই বিপ্লব বলেছিল “আরে না না। আমার জিনস টিনস লাগবে না। বাবা, বাড়ি চলো। মার রান্নার দেরী হয়ে যাবে।”

বাবা ওকে জোর করে টুলটার উপর বসিয়ে দিয়ে বলে “তুই বস তো চুপ করে।” অগত্যা ভারী অস্বস্তি নিয়ে ও বসে। দোকানী জেঠু তিনখানা বিভিন্ন কোম্পানির জিনস বার করে ওদের সামনে রেখে দরদাম বলে। বাবা ওকে দাঁড় করিয়ে সাইজ টাইজ ঠিক হল কিনা দ্যাখে। তারপর বলে “বল এবার, কোনটা পছন্দ?”

বিপ্লব একটা শেষ চেষ্টা করেছিল। “বাবা, আমার প্যান্ট যথেষ্ট আছে। আমার জিনস পরার কোন শখ নেই। সত্যি বলছি।”

বাবা তখন একটু ধমকের সুরেই বলেছিল “আচ্ছা শখ নেই তাও আমি দেব। আমার ইচ্ছা। তুই কোনটা নিবি বল।”

বিপ্লব তখন ক্লাস এইট। সবচেয়ে কম দামীটার দাম ছিল বোধহয় শ দেড়েক। সেটাকেই তুলে নিয়েছিল। প্যান্টটা নিয়ে ফেরার সময় বাবার পাশে সাইকেল চালাতে চালাতে বিপ্লব বলেছিল “বাবা, এটা কিন্তু ঠিক হল না। এবার পুজোয় আমার কিছু লাগবে না বলেছিলাম। ত্রাণ তহবিলে দেয়ার কথা ছিল টাকাটা।”

“দিয়েছি তো।”

“সে তো জানি। তার মানে এই প্যান্টটা কেনার জন্যে তোমায় আবার ধার করতে হল? কী দরকার ছিল?”

“না রে বাবা, ধার করিনি।”

“বললেই হল? তুমি সেদিনই বললে হাতে একদম টাকা নেই। তারপর তো স্কুলে ছুটিই পড়ে গেল। এর মধ্যে কোথায় টাকা পেলে?”

বাবা বেশ নিশ্চিন্ত হেসে বলেছিল “বাড়ি চল, বলছি।”

সেই হাসি দেখে ও নিশ্চিত হয়েছিল বাবা ছেলেকে নতুন জামাকাপড় দিতে পারল না বলে কষ্ট পাচ্ছিল, তাই কোন বন্ধুবান্ধবের থেকে ধার করে এই প্যান্টটা দিল।

বাড়িতে ঢুকে পাখার তলায় ঘেমো পাঞ্জাবিটা ঝুলিয়ে দিয়ে মাটিতে বসেই বাবা বলেছিল “জোনাকি, আলমারি থেকে ঐ টাকার খামটা দাও তো। তোমার ছেলে আমাকে সারা রাস্তা বকতে বকতে এল। আমি নাকি ধার করেছি। ওকে একটু দেখাও তো প্যান্ট কিনে দেয়ার টাকা কোথায় পেলাম।”

মা হেসে একটা সাদা খাম বের করে হাতে দিতে দেখা গেল তাতে লেখা

ফ্রেন্ডস বেনিফিট ফান্ড

রবীন ঘোষাল

জোনাকি ঘোষাল

ফান্ডটার কথা বিপ্লব জানত। পাড়ার অনেকে মিলে বানিয়েছিল। সবাই মিলে টাকা রাখত। তার বদলে বছরে একবার সদস্য পিছু কিছু টাকা পাওয়া যেত।

“এবার বিশ্বাস হল?” বাবা জিজ্ঞেস করেছিল।

“ওমা! কাল তুই সন্ধেবেলা অঙ্ক স্যারের কাছে যাওয়ার সময় যে তোকে বললাম চাবি লাল্টুদের বাড়িতে থাকবে, আমি আর তোর বাবা মিটিঙে যাব, সেটা কিসের মিটিং ছিল?” মা খেয়াল করায়।

“সে আমি কী জানি?”

“আরে ফান্ডেরই তো মিটিং ছিল। ফাল্গুনীদের বাড়ি। প্রতিবার মিটিংটা সেপ্টেম্বরে হয়, এবার অক্টোবরে হল, কারণ ওদের পালা ছিল মিটিংটা করার। কিন্তু গত মাসে ফাল্গুনীর বোনের বিয়ে ছিল বলে হয়নি।”

“হুম।”

“তাও মুখ গোমড়া করে আছিস কেন?” বাবা ধেড়ে ছেলেকে কোলের কাছে টেনে নিয়ে বলেছিল। “শোন, স্কুলের কো অপারেটিভ থেকে দু হাজার টাকা পেয়েছিলাম। গোটাটাই ত্রাণে দিয়েছি। তাছাড়া পার্টি থেকে সব সদস্যকে বলা হয়েছিল এক দিনের মাইনে দিতে। সেটাও দিয়েছি। ওগুলো বাদ দিয়ে আমি তোকে প্যান্ট কিনে দিইনি বাবা।”

“আসলে ও না বন্যাটা নিয়ে খুব ভাবছে, জানো?” মা বলেছিল। “যখন কাগজে ছবিগুলো বেরোচ্ছিল, দেখতাম কিভাবে চেয়ে থাকত।”

“জানি গো, জানি। অন্যের দুঃখে ওর প্রাণটা কাঁদে যে। সেই জন্যেই পুজোয় নিজের জামা প্যান্ট হবে না তাও চলবে, কিন্তু ত্রাণে ও টাকা দিতে বলে,” বলতে বলতে বাবার গলা ধরে এসেছিল। “আবার কেমন ছেলে দ্যাখো। ভেবেছে ওর বাপ সাধ্যের বাইরে গিয়ে কিনে দিচ্ছে, তাই দেখে শুনে সবচেয়ে কম দামী প্যান্টটা পছন্দ করেছে।”

বিপ্লব জোরালো প্রতিবাদ করেছিল। “না না আমি অত ভাবিনি। আমার এটাই পছন্দ হয়েছিল।”

কিন্তু কে শোনে কার কথা? নাস্তিক বাবা তখন ওর মাথায় হাত রেখে মন্ত্রোচ্চারণের মত বলছে “এমনটাই থাকিস, বাবা। এমনটাই থাকিস। তুই কমিউনিস্ট হলে ভাল। যদি নাও হোস, অন্যের দুঃখে যে এগিয়ে আসে না সে কি আবার মানুষের বাচ্চা রে?”

কথাগুলো মনে পড়তে, বোকার মত হাউ হাউ করে কেঁদে ফ্যালে বিপ্লব। উফ! বাবা তো বুঝতেই পারে যে এখন আর অন্যের দুঃখে কিচ্ছু এসে যায় না ওর। কোথায় বন্যা হল, কোথায় খরা হল সেসবের ছবি দেখে স্ক্রোল করে অন্য কিছুতে চলে যায় অনায়াসে। শুধু পুজো নয়, বছরে অন্তত দুবার জামাকাপড় না কিনলে কেমন যেন লাগে। খুব কাছের লোকের কষ্টেও আর চোখে জল আসে না। বাবা বুঝতে পারে। নিশ্চয়ই বুঝতে পারে।

ভাল লাগলে টাকা দিতে পারেন Google Pay / Paytm / BHIM বা অন্য মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে journopratik@okhdfcbank কে

অথবা

নেট ব্যাঙ্কিং বা অন্য উপায়ে নিম্নলিখিত অ্যাকাউন্টে

Pratik Bandyopadhyay
A/c No. 14041140002343
HDFC Bank
Branch: South Calcutta Girls’ College
IFS Code: HDFC0001404
MICR Code: 700240048