নাম তার ছিল: ৩৫

পূর্বকথা: স্কুল থেকে অবসর নেওয়ার দিন রবীনের মনে পড়ে পাগল মহারাজের কথা। একবার বলেছিলেন যখন আর কোন কাজ বাকি নেই, চলে যাওয়ার সঠিক সময় তখনই।

সপ্তাহান্তের সন্ধেগুলোয় নেকলেস রোড গমগম করে। হুসেন সাগরের পাড়ে সেই সময় অল্পবয়সী ছেলেমেয়েদের ভিড়। আসলে কোন আড়াল নেই, কিন্তু প্রেমিকযুগল চিরকালই তো একে অপরের আড়াল। বিপ্লব বেশ কয়েকবার ঐ সময়ে গেছে ওখানে। কিন্তু ঝটপট খাওয়াদাওয়া সেরেই ফিরে এসেছে। ঐ পরিবেশে একা বসে থাকা অস্বস্তিকর। সেসব অবশ্য হায়দরাবাদ বাসের একেবারে গোড়ার দিকের কথা। মাস ছয়েক হল মাঝে মধ্যেই বিপ্লবকে নেকলেস রোডের সন্ধ্যায় কোন বেঞ্চে বসে থাকতে দেখা যায়। হায়দরাবাদের আলো চুঁইয়ে পড়া মল বা রেস্তোরাঁগুলোর তুলনায় এই জায়গাটা ওর ভাল লাগে। এখানে যে বিলাস খুব কম তা নয়, তবু এখানে পথ আছে, জল আছে, আকাশ আছে, রাস্তার ধারে দোকান খুলে বসা মানুষ আছে। পা দুটো মাটিতে থাকে। শুরুতে আপত্তি করলেও মালিনী এখন মেনে নিয়েছে ব্যাপারটা।

নিজেদের রাজনীতি উচ্চাকাঙ্ক্ষার পায়ে নিবেদন করে ভোগসুখের সন্ধানে জীবন কাটাচ্ছিল যে দুটো মানুষ, লোকসভা নির্বাচনে বামফ্রন্টের হার তাদের কাছাকাছি নিয়ে এসেছে। বিপ্লব মজা করে প্রায়ই বলে “পশ্চিমবাংলার ইতিহাসে মমতার এটাই সবচেয়ে বড় অবদান হয়ে থাকবে।” মালিনীর মোটেই পছন্দ হয় না রসিকতাটা। সে বলে “এতে আবার মমতার কী ক্রেডিট? বরং প্রসূন কিছুটা ক্রেডিট দাবী করতে পারে। ও-ই তো হৈ হল্লা করে পার্টিটা অর্গানাইজ করেছিল। সেখানে আমরা গেলাম, ঝামেলা হল, তাই আমাদের মধ্যে রেগুলার কথাবার্তা আরম্ভ হল।”

সেদিন রোহিতের ফ্ল্যাট থেকে দুজনে একসাথে বেরিয়ে এসেছিল। মালিনী যে বাড়িতে মেস করে থাকত সেটা ওখান থেকে হেঁটে মিনিট পনেরো। প্রচণ্ড উত্তেজিত দুজনে হনহনিয়ে দশ মিনিটে পৌঁছে গেছিল। ঐ দশ মিনিট দুজনে যত কথা বলেছিল, এক ডিপার্টমেন্টে কাজ করা সত্ত্বেও আগের দেড় দু বছরে তত কথা বলেনি। বিপ্লবের যত রাগ, ক্ষোভ, দুঃখ জমা হয়েছিল বাম রাজনীতি সম্পর্কে, বাবার বিরুদ্ধে যত অভিযোগ ছিল — সব ও উত্তেজনার বশে উপুড় করে ফেলেছিল মালিনীর সামনে। আর মালিনী, যে তখন মনে করত সি পি এম কখনো কোন দোষ করে না, সে গোটা রাস্তা ঝগড়া করতে করতে গিয়েছিল। ও ঝগড়া কি দশ মিনিটে ফুরোবার? অগত্যা ওদের ফ্ল্যাটের বাইরে দাঁড়িয়ে আরো কিছুটা, তারপর মালিনীর সঙ্গিনীদের ডাকে ওদের ফ্ল্যাটে কফি খেতে খেতে আরো অনেকক্ষণ সেই ঝগড়া চলেছিল। শেষে ওর এক রুমমেট ঘড়ি দেখিয়ে বলল “ভাই, এর পরে যদি তুমি থেকে যাও, বাড়িওয়ালা কিন্তু পুলিশ ডাকবে।” অপ্রস্তুত হয়ে বেরিয়ে পড়তে হয়েছিল।

পরদিন ঘুম থেকে উঠে বিপ্লব দ্যাখে মেয়েটা ঝগড়া বন্ধ করতে একদমই রাজি নয়৷ সকাল সকাল এস এম এস করেছে “রাজ্যটাকে বাঁচাতে হলে ইন্ডাস্ট্রি ছাড়া চলবে না।” বিপ্লবও দাঁত মেজেই কোমর বেঁধে লেগে পড়ল শিল্প কী, শিল্পায়ন কী, সমাজতান্ত্রিক উন্নয়ন বলতে কী বোঝায়, পুঁজিবাদী উন্নয়নের সাথে তার তফাত কী — এসব বোঝাতে। দ্রুত এস এম এস করতে ও একদমই স্বচ্ছন্দ নয়। অতএব ফোন করা ছাড়া গতি নেই। যত দিন গেল ঝগড়া কমে এল। দু একটা বিষয় নিয়ে এখনো ঝগড়া হয়। যেমন বিপ্লব বলে “তোর বাবা মায়ের কিন্তু উচিৎ হয়নি তোকে কনভেন্টে ভর্তি করা।”

“কেন?”

“কেন মানে? পার্টি প্রাথমিক শিক্ষা থেকে ইংরিজি তুলে দিল, আর পার্টির লোকের মেয়ে কনভেন্টে গিয়ে ইংরিজি শিখবে?”

এরকম কিছু ঝগড়া থেকেই যাবে বলে বিপ্লবের ধারণা। সে কথা বললেই মালিনী বলে “তাহলে আমার সাথে ঘুরঘুর করিস কেন? যা না, ঐ যে ফোর্থ ফ্লোরের সুন্দরী মেয়েটার সাথে প্রেম কর গিয়ে। বহু বছর ধরে তো আলাপ করার ইচ্ছা।”

“সে করতেই পারি। কিন্তু ওর সাথে এরকম ঝগড়া করা যাবে কি?”

“তুই যা ঝগড়ুটে। সবার সাথে ঝগড়া হবে।”

“ধুর। এরকম ঝগড়া করার লেভেলই নেই ঐ মেয়েটার।”

“ঝগড়ার আবার লেভেল কী?”

“ও বাবা! লেভেল নেই? সবাই তো আর তোর মত কিশোর বাহিনী করেনি ছোটবেলায়। কোলে চড়ে ব্রিগেডেও যায়নি। আর গেলেও এখন রং বদলে ফেলেছে। তাদের সাথে কী নিয়ে ঝগড়া করব?”

“ও। তার মানে তুই ঝগড়া করার জন্যে আমার সাথে ঘুরিস?”

“ঐ আর কি। ঝগড়া করতে করতে ভাল লেগে গেল। উপায় ছিল না।”

এ কথার পর আরেক চোট ঝগড়া হয়। ঠিক ঝগড়া নয় হয়ত, কারণ মালিনী রেগেমেগে চুপ হয়ে যায়, ক্রমশ লাল হয়ে ওঠে। বিপ্লব শুধু মজা দ্যাখে আর মিটিমিটি হাসে। তাতে মালিনীর রাগ আরো চড়ে যায়।

বিপ্লব আর মালিনীর হঠাৎ এতদিন পরে ভাব, এবং যাকে বলে প্রেম, সেটা নিয়ে অফিসের ওরা খুব ঠাট্টা করে। তার মধ্যে কিছুটা ঈর্ষা মিশে আছে। কারণ অমরেশ অনেকদিন চেষ্টা করেও কিছু করে উঠতে পারেনি। প্রসূনের অবশ্য মনটা পরিষ্কার। পেছনে কথা বলে না। বিপ্লব, মালিনীর সামনেই বলে “রতনে রতন চেনে, সি পি এমে চেনে সি পি এম।”

বিপ্লব হেসে জিজ্ঞেস করে “তাতে দোষ কী?”

“দোষ একটাই। সবাই বলে আই লাভ ইউ, তোরা বলিস লাল সেলাম।”

এ কথায় না হেসে উপায় নেই। অমরেশ ছাড়া সবাই হাসে। বিপ্লব, মালিনীও। প্রসূন বলে “সত্যি কথা বল, তাই কিনা?” ওদের জবাব দিতে না দিয়েই নওয়াজ বলে “ইয়ার, মুঝে তো লগতা ইনকা বচ্চা বাহর নিকলতে হি চিল্লায়গা ‘ইনকলাব জিন্দাবাদ।’”

ওরা বড্ড বাড়িয়ে বলে, তবে মালিনী আর বিপ্লব একান্তে যে অনেকক্ষণ রাজনীতির কথাই বলে তা সত্যি। দুজনের ছোটবেলা এমন আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে আছে রাজনীতির সাথে, ওটা বাদ দিয়ে চলবে কী করে?

মালিনীর বাবা হোলটাইমার, মা-ও পার্টি সদস্য, তবে সরকারী কর্মচারী। ওর মামাও পার্টি করতেন, সিদ্ধার্থশঙ্করের আমলে খুন হয়ে যান। মেয়েটার সাথে যে ঝগড়ার চেয়ে বেশি কিছু হতে পারে, কথাটা বিপ্লবের প্রথম মনে হয়েছিল যেদিন ওদের মেসে বসে ও গেয়ে শুনিয়েছিল “নাম তার ছিল জন হেনরি / ছিল যেন জীবন্ত ইঞ্জিন।”

প্রাথমিক ঝগড়ার পর্ব মিটে যাওয়ার পর আর কিছু নয়, শুধু কতকগুলো চেনা গান, চেনা গল্প নতুন করে শোনবার লোভেই ছুটির দিনে মালিনীর কাছে পৌঁছে যেত বিপ্লব। অনেক সময় যেতে চেয়েও যেতে পারত না। মালিনী হয়ত বন্ধুদের সাথে কোথাও বেরোচ্ছে, সিনেমায় যাচ্ছে। ভীষণ রাগ হত তখন। নিজেকে বোঝাত — এ অন্যায় রাগ। কেনই বা বন্ধুবান্ধব বাদ দিয়ে ওর জন্যে বসে থাকবে মেয়েটা? পরদিন অফিসে হাজার চেষ্টা সত্ত্বেও মুখখানা হাঁড়ি হয়ে থাকত, মালিনীর দিকে তাকাতেই পারত না বিপ্লব। তারপর মালিনী একদিন বলল “অ্যাই শোন, তোর আমার উপর এত রাগ কিসের রে?”

“রাগ? কোথায়?”

“মিথ্যে কথা বলিস না। আমি কিছু বুঝি না নাকি?”

“কী বুঝিস?”

“আমি কালকে আসতে বারণ করলাম বলে রাগ করেছিস?”

“না তো! রাগ করব কেন? তোর বন্ধুদের সাথে প্রোগ্রাম করা ছিল, তাই বেরিয়েছিস। এতে আমার রাগ করার কী আছে?”

“শোন, বিপ্লব। আমি সোজা কথা পছন্দ করি। তুই আমাকে বললেই পারতিস, বেরোস না। আমি বেরোতাম না।”

“তা বলতে যাব কেন? ওটা তোর ব্যক্তিগত ব্যাপার।”

“তা বলবি কেন? একা একা সাল্ক করবি কেবল। ডিসগাস্টিং।”

“সাল্ক করলাম কখন? যাব্বাবা!”

“থাক। তোকে আর কিছু বলতে হবে না। তুই যে বলার কথাগুলোই বলে উঠতে পারিস না সেটা আমি বুঝে গেছি।”

বিপ্লব ভেবে দেখেছিল, মালিনী ভুল কিছু বলেনি। বাবার সাথেও তো কত কথা বলার ছিল। সেগুলো না বলেই চলে এসেছে। পরে মনে হয়েছে, রাগ করে চলে না এসে বরং বাবাকে চেপে ধরা উচিৎ ছিল। শুধু রিগিং নয়, সবকিছু নিয়েই।

বিপ্লবের না বলা কথা মালিনী বুঝে নিয়েছিল তাই রক্ষে। বিপ্লব তো কোনদিনই বলে উঠতে পারত না, আর নেকলেস রোডের মনোরম সন্ধ্যার কোন স্মৃতিও গড়ে উঠত না। অন্ধকারে হুসেন সাগরের ঠিক মাঝখানের বুদ্ধ মূর্তিটার দিকে নীরবে তাকিয়ে থাকতে থাকতে একদিন বিপ্লব বলল “মাঝে মাঝে ফিরে যেতে খুব ইচ্ছে করে, জানিস?”

“কোথায়? কলকাতায়?”

“সবুজগ্রামে। এখানে সবই আছে, তবু যেন কেমন ফাঁকা ফাঁকা লাগে অনেক সময়। আগে তো আরো লাগত, এখন তবু তুই আছিস বলে… আসলে আমি বোধহয় খুব ঘরকুনো।”

“আমার থেকে কম। মাস তিনেক অন্তর বাবা-মাকে না দেখলে আমার চলেই না। ঐ জন্যে বারবার ওদের এখানে দৌড়ে আসতে হয়। বুঝি ওদের বয়স হচ্ছে, হয়ত কষ্টই হয়। কিন্তু কী করব? আমি তো আর ঘনঘন ছুটি পাব না।”

“তার মানে তুই চান্স পেলেই কলকাতায় চলে যাবি?”

“চান্স তো খুঁজলেই পাব। কিন্তু মা-ই তো সারাক্ষণ বলে ‘এখানে ফিরো না, এখানে ফিরো না’।”

“কেন?”

“বলে ওখানে কোন ফিউচার নেই, চাকরি বাকরি নেই…”

“সে হয়ত উনি জানেন না বলে বলেন। তুই বল যে আই টি তে কলকাতায় চাকরি পাওয়া যাবে না এমন নয়।”

মালিনী খানিক চুপ করে থেকে বলে “এখন তো আর চাইলেই যাওয়া যাবে না।”

“কেন? কে আটকাবে?”

“ওমা! সে কি রে! আমি কলকাতায় চলে যাব তোর কষ্ট হবে না? কি নিষ্ঠুর ছেলে রে বাবা!”

“কষ্ট কি আর হবে না…”

কথাটা শুনেই মুহূর্তে রাগ পড়ে যায় মালিনীর।

“তাহলে তুইও চল না রে। একটা কিছু খোঁজ। ঠিক করে খুঁজলে কয়েক মাসের মধ্যেই পাওয়া যাবে।”

“না। থাক।”

বিপ্লব এমন জোর দিয়ে বলে কথাটা যে মালিনী হতভম্ব হয়ে যায়। বিপ্লব অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে নেয়, মালিনী বুঝতে পারে না এ প্রসঙ্গে আর কথা বলা যাবে কিনা। মনস্থির করতে সময় নেয়, তারপর বলেই ফেলে “এইমাত্র তো বললি ফিরে যেতে ইচ্ছে করে। তাহলে?”

বিপ্লব চোখ বন্ধ করে শরীরটা এলিয়ে দেয় বেঞ্চিতে। তারপর বলে “ইচ্ছে তো করে, কিন্তু ভরসা হয় না।”

“ভরসা হয় না? কাকে?”

“কাউকেই না। চারপাশটা অনেক বদলে গেছে। দেখে বুঝিস না? এমনকি আমরাও অনেক বদলে গেছি। নইলে কী বলে আমরা সেদিন সেলিব্রেট করতে গেছিলাম?”

“ভাল করিনি কাজটা। আসলে এইভাবে কম্প্রোমাইজ করাটা তো আমাদের অভ্যেস হয়ে গেছে। হোয়েন অ্যাট রোম, অ্যাক্ট লাইক রোমানস।”

“এক কথায় সুবিধাবাদী। তুই, আমি — সবাই সুবিধাবাদী। সুতরাং আর পাঁচজনও সুবিধাবাদী হবে এটাই তো স্বাভাবিক। সেখানে আমি কিনা ফেরত যেতে চাইছি সবুজগ্রামে। কোন সবুজগ্রামে? যেখানে মানুষ মানুষের পাশে দাঁড়াত। কোন প্রতিবেশীর বাড়িতে রান্না হচ্ছে না জানলে তার ছেলেমেয়েদের ডেকে খাওয়াত। আমার বাবাকে পুলিশ ধরতে এলে যে পার্টির ধার কাছ দিয়েও যায় না, সে লুকিয়ে রাখত। আর পার্টিটাও তেমন ছিল। যাকগে। সে সবুজগ্রাম তো আর নেই। কী হবে ফিরে গিয়ে? শুধু কষ্ট বাড়বে।”

“এরকম বলছিস কেন? আমাদের ছেলেবেলার সবকিছুই কি বদলে গেছে নাকি?”

“বদলায়নি? তুই নিজেই বল? তোর কলকাতা সেই আগের কলকাতা আছে? গরীব লোকের শহর দিন দিন বড় লোকের শহর হয়ে যাচ্ছে না? কাঁড়ি কাঁড়ি শপিং মল হচ্ছে কেবল। আর কিচ্ছু হচ্ছে না।”

বিপ্লবের চোখ বন্ধ, তাই ও দেখতে পায় না কথাগুলো কেমন বুকে বেঁধে মালিনীর। রামধন মিত্র লেনের বাড়ি, পাশের বাড়ির জেঠিমা, জ্যাঠামশাই, ওদের পোলিও আক্রান্ত ছেলে বাবুদা, উল্টোদিকের ফ্ল্যাটবাড়ির মানাইদি, ওর বোন টুপাই, মোড়ের মুড়ির দোকানের বিহারী কাকু, তার ডালমুট, ট্রামলাইনের দু পাশের দোকানগুলো, স্টার থিয়েটারের সামনের ফুচকাওয়ালা, পাড়ার বারোয়ারী পুজোর ভাসানের সিদ্ধি — সবাইকে মনে পড়ে একে একে। তারা সবাই বদলে গেছে? বদলে যাচ্ছে? বিশ্বাস করতে একদম ইচ্ছে করে না। কিন্তু কলকাতা যে ভরে যাচ্ছে শপিং মলে, মানুষের সাথে মানুষের কথা বলার সুর যে বদলে যাচ্ছে, যাতায়াত যে কমে যাচ্ছে তা তো ঠিকই। বিপ্লব তো নেহাত ভুল বলছে না। পার্টি? হ্যাঁ পার্টিও যে বদলে যাচ্ছে তাতে সন্দেহ কী? মা তো সেই জন্যেই আজকাল আর খুব জরুরী মিটিং না থাকলে পার্টি অফিসের দিকে যায় না। মালিনী নিজের কানে দু একবার শুনেছে মা বাবাকে বলছে “এবার আর ভাবছি রিনিউ করাব না।” বাবা তাতে প্রচণ্ড রেগে গিয়ে গোটা দিন খাওয়াদাওয়া বন্ধ রেখেছিল একবার। আরেকবার ঠান্ডা গলায় বলেছিল “তাহলে আমার শ্রাদ্ধশান্তি যা করবে ঠিক করে রেখেছ সেগুলো সেরে ফেলো। দেহ দান তো করতে দেবে না।”

কান্না চেপে মালিনী বলে “আর সবাই বদলালেও বাবা-মা তো বদলায়নি।”

“তোর বাবা-মা হয়ত বদলায়নি,” বিপ্লব চোখ না খুলেই বেশ নিশ্চিন্তে বলে।

মালিনী দিশাহারা হয়ে যায়। কোন সাড়াশব্দ নেই দেখে বিপ্লব একবার মালিনীকে চোখ খুলে দেখে নেয়। তারপর বলে “এই ভাল। প্রত্যেকের ভাল স্মৃতিগুলোই বেঁচে থাক। জোয়ান বিপ্লবীদের রক্ষণশীল বুড়ো বয়স দেখার শখ নেই আমার।”

মালিনীর দীর্ঘশ্বাসের শব্দ হুসেন সাগরের অপর পাড় থেকেও বোধহয় শোনা যায়। আবহাওয়া হালকা করার জন্যে বিপ্লব মনে করায় “তুই যেন কবে থেকে ছুটিতে যাচ্ছিস?”

“২৩শে জানুয়ারী।”

“যাওয়ার সময় একটা জিনিস দেব। আমার বাড়ি গিয়ে একদিন দিয়ে দিবি? অনেকদিন ধরে পড়ে আছে, কুরিয়ারে দিতে সাহস পাচ্ছি না।”

ভাল লাগলে টাকা দিতে পারেন Google Pay / Paytm / BHIM বা অন্য UPI অ্যাপের মাধ্যমে journopratik@okhdfcbank কে

অথবা

নেট ব্যাঙ্কিং বা অন্য উপায়ে নিম্নলিখিত অ্যাকাউন্টে

Pratik Bandyopadhyay
A/c No. 14041140002343
HDFC Bank
Branch: South Calcutta Girls’ College
IFS Code: HDFC0001404
MICR Code: 700240048

নাম তার ছিল: ৩৪

পূর্বকথা: বহুদিন পরে জেলা সম্পাদকের তলব পেয়ে পার্টির জেলা অফিসে যেতে হল রবীনকে। সম্পাদকমশাই অভিযোগ করলেন, সে উপদল করছে। ফাল্গুনী আর শিবুর বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ আছে জানিয়ে হুমকি দিলেন, ওদের সংস্রব ত্যাগ না করলে পার্টি সদস্যপদ কেড়ে নেওয়া হতে পারে।

আজ রবীনের চাকরি জীবনের শেষ দিন। সকাল থেকে পাগল মহারাজের কথা মনে পড়ছে খুব।

আড্ডা মারতে গিয়ে এক দিন ওঁকে জিজ্ঞেস করেছিল “আচ্ছা, কত বছর বাঁচা ভাল বলে মনে হয় আপনার?”

“বয়স দিয়ে হিসাব করলে হবে না মাস্টারমশাই।”

“তবে? কর্মঠ থাকতে থাকতে মারা যাওয়াই ভাল বলছেন?”

“ঐ যে, আপনার প্রিয় ঠাকুর যা লিখেছেন? ঐটেই ঠিক।”

“উনি তো এত লিখেছেন যে হাজার খানেক গীতা হয়ে যাবে। আপনি কোনটার কথা বলছেন?”

“চাহি না রহিতে বসে, ফুরাইলে বেলা। তখনি চলিয়া যাব, শেষ হলে খেলা।”

“হুঁ। কিন্তু তেমন কি আর সবার হয়, মহারাজ? ভীষ্মের ছিল ইচ্ছামৃত্যু। তেমন সুবিধে থাকলে তো হয়েই যেত।”

“না, সে আর আমাদের কেমন করে হবে? তবে কি জানেন, কারোর বাঁচার ইচ্ছে চলে গেলে তাকে আর হাজার চেষ্টা করেও রাখা যায় না।”

কথাটা ভারী আশ্চর্য লেগেছিল রবীনের। সত্যিই তো! বাঁচতে গেলে তো সবচেয়ে প্রথমে বাঁচতে চাইতে হবে। এ কথাটা এভাবে মনে আসেনি কখনো। সে যখন অবাক হয়ে নিজের বাঁচার ইচ্ছে মাপছে, তখন মহারাজ যোগ করেছিলেন “কর্মী লোকেদের কাজ ফুরিয়ে গেলে বাঁচার ইচ্ছে চলে যায়। তখন তারা চলে যাবার জন্যে তৈরি হয়ে থাকে।”

পাগল মহারাজের অনেক কথাই রবীনকে অনেক সময় ভাবিয়েছে। ভাবনার খোরাক পাওয়া যায় বলেই তো তাঁর কাছে বারবার ছুটে যাওয়া। কিন্তু সেদিনের কথাগুলোর মত আর কোন কিছু কখনো ভাবায়নি। সেবার ওঁর কাছ থেকে ঘুরে আসার পরের কয়েকটা দিন খুব ব্যস্ততায় কেটেছিল। হঠাৎ একদিন সকালে ফাল্গুনী এসে খবর দিল পাগল মহারাজ অসুস্থ। ওর শ্বশুরবাড়ি মহারাজের আশ্রমের পাড়াতেই। সেখান থেকেই খবর পেয়েছে।

রবীন স্কুল থেকে ফিরেই ছুটল। সেই প্রথম মহারাজকে শুয়ে থাকতে দেখা।

“আমার তেমন কিছু হয়নি, মাস্টারমশাই। এরা সব ভয় পেয়েছে, তাই আমাকে জোর করে শুইয়ে রেখেছে।”

“হয়নি বললেই হল? আমি অপু মহারাজের সাথে কথা বলে এ ঘরে এলাম। আপনার রীতিমত একটা স্ট্রোক হয়ে গেছে। এখন কদিন কথার অবাধ্য হওয়া চলবে না।”

“না, অবাধ্য আমি হব কেন? অপুর মত যোগ্য লোক আশ্রমের দায়িত্বে আছে, আমার তো শুয়ে থাকতে অসুবিধে নেই। তবে বেশিদিন শুয়ে থাকতে হবে না।”

“সে তো বটেই। আপনার মত কাজের লোক বেশিদিন শুয়ে থাকলে চলবে? আপনি নিয়ম মেনে চলুন, ঝটপট সুস্থ হয়ে যাবেন।”

“কাজ আমার ফুরিয়েছে। এবার বিদায় নেব।”

কথাটা শুনে যে ধাক্কাটা লেগেছিল সেটা এত বছর পরেও রবীনের মনে একেবারে টাটকা। সে চমকে উঠে বলেছিল “এসব কী বলছেন?”

“ঠিকই বলছি। আমার স্কুলটা দাঁড়িয়ে গেছে, কাকে ভার দিয়ে যাব সেই নিয়ে চিন্তা ছিল। অপুকে পেয়ে সে চিন্তাও দূর হয়েছে। আর তো আমার কিছু পাওয়ার নেই, মাস্টারমশাই। কিছু দেয়ারও নেই। যতটুকু আমার ছিল, সব দিয়ে দিয়েছি। আর থাকলে যে লোকের হেলা শ্রদ্ধার পাত্র হব। তার চেয়ে চলে যাওয়াই ভাল নয়?”

“অন্যদের কথা জানি না মহারাজ। আমি তো সাধারণ মানুষ, বড় স্বার্থপর। শুধু নিজের দরকারটাই ভাবি। আমার যে আপনাকে এখনো দরকার? এই যে জীবনযুদ্ধে ক্লান্ত হয়ে পড়লে আপনার কাছে আসি, দুটো কথা বলি, থোড় বড়ি খাড়া আর খাড়া বড়ি থোড়ের বাইরে আলাপ আলোচনা হয়… আপনি না থাকলে কার কাছে যাব বলুন তো?”

কথাটা শুনে মহারাজ ভারী স্নিগ্ধ হেসে হাতটা মেলে দিয়েছিলেন। রবীন দুহাত দিয়ে সেটাকে জড়িয়ে ধরতে বলেছিলেন “সঙ্গী পেয়ে যাবেন, মাস্টারমশাই। আর কেউ না থাক, কিচ্ছু না থাক, আপনার ছাত্রছাত্রীরা আছে না? ওরাই বাঁচার রসদ জুগিয়ে দেবে।”

ভারী অশান্ত মন নিয়ে সেদিন ফিরে এসেছিল রবীন। শিগগির আবার দেখতে যাবে ভেবেছিল। সে সুযোগ আর পাওয়া যায়নি। মৃত্যুসংবাদ পেয়ে আর ও মুখো হয়নি। মহারাজ শেষ কথাটা অবশ্য ভুল বলেননি। উনি মারা গেছেন বছর পাঁচেক হল। স্কুল আর ছাত্রছাত্রীগুলো আছে বলেই একেবারে নিঃসঙ্গ হয়ে পড়তে হয়নি। পার্টির সাথে যোগ তো কমে গেছে অনেকটাই, জোনাকির সাথে কতটুকু যোগ আছে সে কথা ভাবতেও রবীন ভরসা পায় না। আছে যে, সেই বিশ্বাসটুকুই বেঁচে থাক না হয়। আর ছেলেটা? সে যে কত দূরে তা মাপাও অসম্ভব। ইদানীং অবশ্য আগের তুলনায় ফোনে কথাবার্তা বলে বেশি। ওদিককার এক আধটা খবর নিজে থেকেই দেয়, এদিককার খবরও জিজ্ঞেস করে না তা নয়। রবীন তাতেই সন্তুষ্ট থাকার চেষ্টা করে। ছেলেমেয়ে বয়ঃসন্ধিতে পৌঁছলেই বাবার সাথে সেই ছোটবেলার সখ্য থাকে না, এমনটাই তো দেখে গেল সারা জীবন। তবু তো বিপ্লবের ক্ষেত্রে কলেজে ভর্তি হওয়া পর্যন্তও তেমনটা হয়নি।

সেদিন বৃহস্পতিবার। রবীনের দিনের শেষ ক্লাসটা থাকে সিক্স বি সেকশনে। কিন্তু হেডমাস্টার অনিল বলেই দিয়েছিল, সেদিন টিফিনের পর আর ক্লাস হবে না। রবীনের ফেয়ারওয়েল, তারপর ছুটি। অনিল কলকাতার ছেলে, মফস্বলের স্কুলের হেডমাস্টার হয়ে এসেছে। তবু নাক উঁচু ভাবটা নেই। প্রথম দিনই রবীনকে বলেছিল “সিনিয়র টিচাররা আমাকে নাম ধরেই ডাকতে পারেন। আর ‘আপনি আপনি’ করবেন না, প্লিজ। আমি আপনাদের চেয়ে বেশ কিছুটা ছোট।” রবীনের অবশ্য হেডমাস্টারকে তুমি বলা না-পসন্দ। তাই নাম ধরেও “আপনি” বলে এসেছে। ফেয়ারওয়েলের আয়োজনে আপত্তি করে বলেছিল “এসব আবার কেন করছেন, অনিল? আর কি আমার ইস্কুলে আসা বারণ?”

“ছি ছি! এ কী বলছেন, মাস্টারমশাই? এই স্কুল সব সময় আপনার। যখন ইচ্ছে আসবেন। কিন্তু এত বছর এই স্কুলটাকে যা দিলেন, স্কুলের তো কর্তব্য তার জন্যে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা। সামান্য একটু আয়োজন। এতে আপত্তি করবেন না।”

সামান্য বললেও, রবীন দেখল ব্যাপার নেহাত সামান্য নয়। দোতলায় জীবনের শেষ ক্লাসটা নিয়ে বারান্দায় বেরিয়ে দেখতে পেল, ইউ আকৃতির স্কুলের বড় উঠোনটায় দু তিনটে টেবিল জুড়ে রাখা আছে, বসবার চেয়ার দেওয়া হয়েছে। সামনে সতরঞ্চি পাতা ছেলেমেয়েরা বসবে বলে। এর আগে যতজন বিদায় নিয়েছেন, এই ব্যবস্থাই ছিল বটে, তবু যেন নতুন লাগছে। কারণ অনুষ্ঠান সূচী তো রবীন নিজেই ঠিক করত। কোন ছাত্র স্যার বা দিদিমণি সম্পর্কে দু কথা বলবে, কে শুরুতে একটা গান গাইবে — এসব খুঁটিনাটি তো সে নিজেই দেখত বরাবর। মানপত্রটাও বাংলার দিদিমণি শ্রাবন্তী লিখে বাঁধাতে পাঠানোর আগে একবার দেখিয়ে নিত। এবার সবটাই অজানা। একতলায় নেমে টিচার্স রুমে গিয়ে অবশ্য বোঝা গেল এবারের আয়োজন সত্যিই একটু ব্যতিক্রমী। থুড়থুড়ে বুড়ি হয়ে পড়া রজনীদি, যিনি না থাকলে জোনাকির সাথে বিয়েটা হত না, তিনি এসেছেন। সেই কাঁকুড়গাছি থেকে! আবার নবাও হাজির। সপ্তাহের মাঝখানেই! অনিল ওকেও ডেকে এনেছে? হেডমাস্টার অনিল অতিথিদের নিয়ে গিয়ে যথাস্থানে বসাল। রবীনের দু পাশে। নবা যে স্কুলের গভর্নিং বডির সদস্য সেটা তখন খেয়াল হল।

সামনে ছেলেমেয়েগুলোকে ওরই মুখের দিকে চেয়ে বসে থাকতে দেখে প্রথমবার রবীনের চোখ দুটো একটু ছলছলিয়ে উঠল। সকলের বসার জায়গা হয়নি। অনেকেই দাঁড়িয়ে আছে ধার ঘেঁষে, দেয়ালে হেলান দিয়ে। দোতলার বারান্দাতেও অনেকে। কী বিষাদময় কচি মুখগুলো! এতগুলো অপাপবিদ্ধ তরুণ মন তাকে ভালবাসে ভেবে বুকটা কেঁপে উঠল রবীনের। নিজের কানে কানে বলল “এদের ভালবাসার যোগ্য কি আমি?”

ওরা সব মাইক ঠিক করছে, হারমোনিয়াম, ফুলদানি ইত্যাদি নিয়ে আসছে। চারদিক দেখতে দেখতে খেয়াল হল, সতরঞ্চি যেখানে শেষ সেখানে দাঁড়িয়ে আছে সুবিমল। ছেলেটা মাধ্যমিকের পর উচ্চমাধ্যমিকেও এক দাঁড়ি পেয়েছে। রবীনের ইচ্ছে ও প্রফেসর হোক। হতভাগাটা কলেজ কামাই করে এসেছে। ওর উপর চোখ পড়তেই এক গাল হাসল, রবীনও হাসল। কিন্তু এতদূর থেকেও রবীন পরিষ্কার দেখতে পেল বোকাটার চোখে জল। ঠিক তখুনি নবা মুখটা কানের কাছে নিয়ে এসে বলল “ঐ কোণের মেয়েটা কে রে? ঐ যে স্কুল পাহারা দেয় রিকশাওয়ালা, ওর গিন্নী?”

প্রথমটায় রবীনের অচেনা মনে হল। হবে না-ই বা কেন? এই সেদিনের ফ্রক পরা, বিনুনি দোলানো মেয়েটা যদি শাড়ি ব্লাউজ পরে একটা বছর খানেকের বাচ্চা কোলে নিয়ে বসে থাকে তাহলে চট করে কি চেনা যায়? রবীন যখন ভুরু কুঁচকে তাকাচ্ছে, তখন ওর হাসিটা দেখে শেষ অব্দি চিনতে পারা গেল। শিউলি। প্রচুর ধমক খেয়ে শেষে ট্রান্সলেশনটা ঠিক হলে এইরকম হাসত। রবীন উঠে দাঁড়িয়ে হাত নেড়ে ডাকে। ও বাচ্চা কোলে এগিয়ে আসে।

“কী রে? একেবারে গিন্নী হয়ে গেছিস যে। ছেলেটা কবে হল?”

“এই তো। এক বচ্ছর হবে, স্যার।”

“তোর যেন কোথায় শ্বশুরবাড়ি?”

“বড়িহাটায়।”

“ও হ্যাঁ। তা তোকে কে বলল আমার আজকে ফেয়ারওয়েল?”

“ও মা! আমাদের পাড়ার কত ছেলেমেয়ে পড়ে এই ইস্কুলে।”

“তা বটে।” রবীন কোলের ছেলেটার দিকে হাত বাড়াতেই সে নিঃসঙ্কোচে চলে আসে। “বা রে, ভারী লক্ষ্মী ছেলে তো তোর? চেনা অচেনা নেই!”

“শিশুরা ভাল মানুষ খারাপ মানুষ বোঝে স্যার।”

“হ্যাঁ হ্যাঁ। খুব বোঝে। ছেলের মা হয়েও তোর বুদ্ধিটা পাকেনি রে পাগলি।”

রবীন পকেট হাতড়ে একটা একশো টাকার নোট পায়। সেটা শিউলির হাতে দিয়ে বলে “এটা রাখ। দাদুভাইকে রসগোল্লা খাওয়াস। নাকি তোরা চকলেট খাওয়াস আজকাল? সে যা-ই হোক।”

“এ মা! না স্যার।”

“না আবার কী? বলছি নে। আর যে কদিন বাপের বাড়িতে আছিস, একদিন আমার বাড়ি আয় ওকে নিয়ে। তোর জেঠিমা খুব খুশি হবে। জামাইকে তো ওভাবে আসতে বলা যায় না। ওটা নয় পরে হবে।”

“যাব স্যার।”

শিউলি টেবিলের তলা দিয়েই মাথা গলিয়ে পায়ের ধুলো নেয়।

“আহা, মাথা ঠুকে যাবে রে। যা যা বোস গিয়ে।”

“স্যার, আমরা তৈরি। শুরু করি এবার?” অ্যাসিস্টেন্ট হেডমাস্টার অমৃতেন্দু জিজ্ঞেস করল।

“ও হো। হ্যাঁ হ্যাঁ, শুরু করো। ছেলেমেয়েগুলো টিফিনটাও খেতে পারেনি আজকে। শিগগির শেষ করতে হবে,” বলতে বলতে রবীন বসে পড়ে।

সব বিদায়ের অনুষ্ঠানই এক রকম। শেষ দিনে সবাই অনুপ্রেরণা, সবচেয়ে ফাঁকিবাজ মাস্টারটাও জ্ঞানতাপস, আর সবথেকে মারকুটে মাস্টারও করুণাধারা। এই কথাটা বলে রবীন টিচার্স রুমে হাসির ফোয়ারা তুলেছে বহুবার। একের পর এক নিজের স্তুতি শুনতে শুনতে সেটা মনে পড়ে হাসি পাচ্ছিল। শেষে যখন মানপত্রটা পাঠ করতে করতে শ্রাবন্তীর গলা বুজে এল, তখন রবীন হেসেই ফেলল। থমথমে পরিবেশে ঐ হাসিতে সবাই থতমত খেয়ে গেল। মানপত্রটা হাতে তুলে দেওয়ার পর হেডমাস্টার ঘোষণা করলেন “এবার আমাদের সকলের প্রিয়, শ্রদ্ধেয় রবীন ঘোষালকে তাঁর প্রিয় ছাত্রছাত্রীদের উদ্দেশে কিছু বলতে অনুরোধ করছি।”

রবীন হাসিমুখে বলতে উঠল।

“সবার মুখ এমন ভার কেন? এটা তো স্মরণসভা নয়। আমি এখনো অন্তত দশ বছর বাঁচব। শুভেন্দু স্যার আমাদের জুনিয়র মোস্ট। ওনার বিয়েতে বরযাত্রী না গিয়ে আমি মোটেই মরছি না।”

হাসির রোল উঠল। সকলের সাথে খুব খানিকটা হেসে নিয়ে রবীন আবার শুরু করল।

“না, সত্যিই। একটা অবসর নিয়ে এত মুহ্যমান হয়ে পড়ার কিছু নেই। আমার বরং বেশ ভাল লাগছে, ভদ্রমণ্ডলী। আমি এই অনুষ্ঠানের আয়োজকদের কাছে কৃতজ্ঞ যে ওঁদের উদ্যোগে বহু বছর পরে রজনীদির সাথে দেখা হল। আমার বাল্যবন্ধু নবারুণ খুব ব্যস্ত মানুষ। সে-ও এসেছে। আর সবচেয়ে বড় কথা, এই উঠোনে সবাই মিলে জড়ো হওয়াতে আমার প্রিয় ছেলেমেয়েগুলোকে শেষ দিনে একসাথে দেখতে পাচ্ছি। আজ তো টিফিনের আগে আমার মোটে দুটো ক্লাস ছিল, ফলে মনটা একটু খারাপই হচ্ছিল টিফিনের পরে যাদের ক্লাস নিই তাদের সাথে দেখা হল না বলে। সে দুঃখও মিটে গেল।

সত্যি কথা বলতে, আমি হেডস্যারকে বারণই করেছিলাম এমন কিছু করতে। উনিই জোর করলেন। তা এখন মনে হচ্ছে ভালই করেছেন। কয়েকটা কথা বলা যে আমার দরকার সেটা নিজেরই খেয়াল ছিল না। এখন সামনে এই মুখগুলো দেখে খেয়াল হল।

স্কুলের কয়েকজন প্রাক্তনীকেও দেখতে পাচ্ছি। আরো অনেকে হয়ত রয়েছে, আমি মনে করতে পারছি না। তোরা দুঃখ পাস না, মনা। বুড়ো হয়েছি, চোখের জ্যোতি কমে আসছে, স্মৃতির জোরও কমে গেছে। তবে চোখের জ্যোতি কমে গেলে হয় কি, মন দিয়ে অনেক কিছু দেখে ফেলা যায়। ঐ যে কবি বলেছেন না “চোখের আলোয় দেখেছিলেম চোখের বাহিরে, অন্তরে আজ দেখব যখন আলোক নাহি রে?” তা অন্তরে ইদানীং যা দেখতে পাই, তাতে দেখছি ছাত্রছাত্রীদের কাছে আমার ক্ষমা চাওয়া দরকার। কী জন্যে? কারণটা এখনকার ছেলেমেয়েরা জানে না, সদ্যপ্রাক্তন যারা তারাও বুঝবে না, কিন্তু আমার পুরনো সহকর্মীরা আর প্রথম দিককার ছাত্রছাত্রীরা জানে, রবীন স্যার এক সময় কিরকম মারকুটে ছিল। রবীন স্যার আসছে শুনলে ছেলেমেয়েরা থরথর করে কাঁপত। অনিলের আগে যে হেডমাস্টারমশাই ছিলেন, তিনি অ্যানুয়াল স্পোর্টসে বা সরস্বতীপুজোয় ছেলেমেয়েরা খুব বাড়াবাড়ি করলে আমায় বলতেন ‘একটু ঠান্ডা করে দিন তো’। আমিও মহানন্দে ছড়ি নিয়ে নেমে পড়তাম। কাজটা ভাল করিনি। যাদের মেরেছি তাদের সকলের কাছে হাত জোড় করে ক্ষমা চাইছি।

এখন তো বুঝতে পারি, চাকরিজীবনের প্রথম দশ পনেরো বছর আমি ছেলেমেয়েদের অভিভাবক হয়ে উঠতে পারিনি। তার পেছনে রাজনৈতিক কারণ ছিল ঠিকই। পালিয়ে পালিয়ে বেড়াতে হয়েছে, মাঝে মাঝে স্কুলে এসেছি, তখন কী আর পড়ানোয় মন বসে? কিন্তু যে কারণই থাক, অন্যায় আমারই। পড়া না পারলেই মারতে শুরু করেছি। কেন পড়েনি, পড়লে কেন মনে নেই, বুঝেছে কি বোঝেনি — সেসব ভাবার চেষ্টাই করিনি। পরে যখন বাবা হলাম, পালানোর দিনও শেষ হল, তখন মারতে গেলেই আমার ছেলের মুখটা চোখের সামনে ভেসে উঠত। তারপর দেখলাম, কোন ছেলে পড়া করে আসেনি, কারণ তাকে আগের দিন সন্ধেবেলা কোন বিয়েবাড়ির টেবিল পরিষ্কার করার কাজে যেতে হয়েছিল। কোন মেয়ের মা অনেকদিন বিছানায়, ছোট ছোট ভাই বোন আছে। সে বেচারি পড়া করবে না সংসার সামলাবে? কারো হয়ত বয়স পনেরো, বুদ্ধি সাত আট বছরের মত। দুবেলা পেট ভরে খেতেই পায়নি কখনো, বুদ্ধি পাকবে কী করে? এদের মারধোর করলে মানুষ হবে না, উল্টে ওরা যে মানুষ সেই বিশ্বাসটাই চলে যাবে।

কত যে গলদ আমাদের ব্যবস্থায়! যে ছেলেটা প্রত্যেকবার স্পোর্টসে হাই জাম্প, লং জাম্পে ফার্স্ট হয় তাকে আরো বড় লাফ দেয়ার শিক্ষা দেয়া আমাদের নাগালের বাইরে। কিন্তু সে অঙ্ক না পারলে আমরা বলে দিই ‘তোর দ্বারা কিস্যু হবে না।’ অথচ যে অঙ্কে ভাল কিন্তু স্পোর্টসে হিটও পেরোতে পারে না, তাকে কিন্তু বলি না ‘তোর দ্বারা হবে না।’

এসবের সমাধান ছড়িতে তো নেই বটেই, স্কুল চত্বরেও সবটা নেই। সমাধানের যে চেষ্টা দুনিয়া জুড়ে মানুষ করছে, আমি নিজের সামান্য সামর্থ্য নিয়ে সেই চেষ্টায় সামিল হতে চেয়েছিলাম। সেখানেও সফল হতে পারিনি। হয়ত সৎভাবে, সর্বশক্তি দিয়ে চেষ্টা করিনি। সে জন্যেও ক্ষমা চাইছি।

সহকর্মীরা আমার অনেক ফাঁক পূরণ করে দিয়েছেন, আমার শারীরিক প্রতিবন্ধকতার জন্যে কখনো আমায় ছোট করেননি, সে জন্যে অনেক ধন্যবাদ। রজনীদির মত কয়েকজন বরাবর পাশে না থাকলে আমার পক্ষে জীবনটা দুর্বিষহ হয়ে উঠতে পারত।

সর্বোপরি এই স্কুলের ছেলেমেয়েরা, যারা আমার সব দোষ ত্রুটি, অসুবিধা ভুলে আমাকে ভালবেসেছে, বিশেষ করে গত পাঁচ সাত বছর যারা আমার সমস্ত সময়টা ভরিয়ে রেখেছে, তাদের আর কী দিতে পারি আমি? তারাই আমায় এত দিয়েছে যে কুবেরের ধন তার কাছে তুচ্ছ। আমার এক পুরনো বন্ধুর কথা বলে শেষ করি। তিনি একটা রবীন্দ্রসঙ্গীতের দুটো লাইন মনে করিয়ে দিয়ে বলেছিলেন বেলা ফুরিয়ে গেলে আর বসে থাকতে চাই না। আমি তাই বলি, আমার বেলা ফুরিয়েছে। এবার আমায় হাসিমুখে বিদায় দিন। তবে স্কুলটাকে সবাই মিলে আগলে রাখতে হবে কিন্তু। এ স্কুল থেকে হয়ত গণ্ডায় গণ্ডায় ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার বেরোয় না। কিন্তু এই স্কুলে বহু প্রথম প্রজন্মের ছাত্রছাত্রী পড়তে আসে। তার মানে এই স্কুল শিক্ষার আলো আরো আরো দূরে ছড়িয়ে দেয় প্রতি বছর। একটা স্কুলের এর চেয়ে বড় কাজ আর কী আছে? নমস্কার। ভাল থাকবেন সবাই।”

ভাল লাগলে টাকা দিতে পারেন Google Pay / Paytm / BHIM বা অন্য UPI অ্যাপের মাধ্যমে journopratik@okhdfcbank কে

অথবা

নেট ব্যাঙ্কিং বা অন্য উপায়ে নিম্নলিখিত অ্যাকাউন্টে

Pratik Bandyopadhyay
A/c No. 14041140002343
HDFC Bank
Branch: South Calcutta Girls’ College
IFS Code: HDFC0001404
MICR Code: 700240048

নাম তার ছিল: ৩৩

পূর্বকথা: লোকসভা নির্বাচনে বামফ্রন্টের হার হয়েছে বলে বিপ্লবের বাঙালি সহকর্মীরা উল্লসিত। তাদের উৎসবে কমিউনিস্টদের আসন্ন মৃত্যুর আনন্দে পান করা হয়। প্রতিবাদ করে বিপ্লব আর মালিনী। এতদিন চেপে রাখা বামপন্থী পরিচয় প্রকাশ পেয়ে যাওয়ার পর বিল্পব ঘোষণা করে সে বামপন্থী। আজীবন বামপন্থীই থাকবে।

অপারেশন বর্গা। ভূমি সংস্কার। পঞ্চায়েত। তারপর? সবচেয়ে গরীব, ভূমিহীন চাষীর হাতে জমি তুলে দেওয়া? যৌথ খামার? সে আর হল কোথায়?

জেলা সম্পাদক ডাক পাঠিয়েছেন। ট্রেনে যেতে যেতে জানলা দিয়ে যতদূর চোখ যায় ছড়িয়ে থাকা ক্ষেতজমি দেখতে দেখতে সে কথাই ভাবছিল রবীন। ইদানীং মাঝে মাঝে বেশ দুর্বল লাগে। তাই ট্রেনে করে যাওয়া হলেও একা যেতে ভরসা হল না আজ। শিবুকে বলতে হল “আমার সাথে একটু যাবি? যদি তোর অসুবিধা না থাকে?”

কারখানা বন্ধ হওয়ার পর থেকে শিবুর কাজ বলতে তো পার্টি করাটাই। রবীনের ঘনিষ্ঠ হওয়ার ফলে গত বছর সম্মেলনে বেচারা লোকাল কমিটিতেও জায়গা পায়নি। রবীন যেন এল সি এমও না থাকে তা নিশ্চিত করতে বলরাম আর শ্যামল কংসবণিক অক্লান্ত পরিশ্রম করেছিল। আর ওদের আটকাতে পাগলের মত লড়ে গিয়েছিল ফাল্গুনী আর শিবু। রবীন বলেছিল ওসব না করতে। বয়স তো কম হল না। এল সি এম থাকা না থাকা দিয়ে কী আসে যায়? পার্টির কাজ করতে কোন তকমা লাগে না। রবীন লোকাল কমিটিতে থেকেই বা এমন কী করতে পারবে? কলকাঠি তো নাড়বে সেই বলরাম, আর তাল দেবে শ্যামল। অমন লোকাল কমিটিতে থাকা না থাকা সমান। কিন্তু ফাল্গুনী আর শিবু নাছোড়বান্দা। ওরা দৌড়াদৌড়ি করে এল সি এস শ্যামলের প্যানেলের পালটা প্যানেল ঠিক তৈরি করে ফেলল। দুজনে মিলে দিন রাত রবীনকে বোঝানোর পরে ও খানিকটা ক্লান্ত হয়েই রাজি হয়ে গিয়েছিল প্যানেলে থাকতে। কারণ আশা করেছিল শেষ অব্দি প্যানেল করাই যাবে না। কোন কমরেড বল, শ্যামলের চক্ষুশূল হতে রাজি হবে? ওকে অবাক করে সত্যি সত্যি এগারো জনের প্যানেল বানিয়ে ফেলল ছেলে দুটো মিলে। সম্মেলনের আগের দিন সকালে প্যানেলটা দেখিয়ে শিবু রবীনকে রীতিমত বিজ্ঞের মত বলেছিল “রবীনদা, আপনি জানেন না কমরেডরা একনো আপনাকে কত সন্মান করে। সবকটা ব্রাঞ্চে গিয়ে আমরা কমরেডদের সাথে কতা বলেচি। আপনি লোকাল কমিটিতে থাকবেন না কেউ মানতে পারচে না। ফাল্গুনীকে, আমাকে পচন্দ করে না যারা তারাও বলচে ‘রবীনদাকে অসম্মান করা হবে এটা আমরা মানতে পারি না।’”

“মুখে তো অনেকেই অনেক কথা বলে। শেষে পরশু দিন দেখবি তোদের প্যানেলের লোকের নাম ওদের প্যানেলেও আছে,” রবীন হাসতে হাসতে বলেছিল।

“তা হোক। আমরা লোকাল কমিটিতে থাকি বা না থাকি, তোমাকে রাখবই,” ফাল্গুনী একেবারে গোঁয়ার গোবিন্দের মত বলেছিল। রবীনের মনে হয়েছিল এ যেন সবুজগ্রামের জনপ্রিয় ফিজিক্স টিচার, দাড়ি পাকতে শুরু করা ফাল্গুনী গুপ্ত নয়, সেই হাফপ্যান্ট পরা সদ্য গোঁফের রেখা ওঠা ফাল্গুনী, যে বাবার সাইকেল হাফ প্যাডেল করে রবীনের স্কুলে গিয়ে হাঁপাতে হাঁপাতে খবর দিয়েছিল পাড়ায় পুলিশ ঢুকেছে, রবীনকে পালাতে হবে।

সম্মেলনের দিন দেখা গেল রবীন ঠিক, ফাল্গুনী আর শিবুও ঠিক। দুজন কমরেডের নাম দুই প্যানেলেই আছে। ডায়াস থেকে তুমুল চেষ্টা করা হল ভোটাভুটি যেন না হয়, কিন্তু ফাল্গুনী আর শিবুর সঙ্গে আরো বেশ কয়েকজন কমরেড লড়ে গেল। ভোট হল। একজন বাদে বল, শ্যামলের পুরো প্যানেল জিতে গেল। আর জিতল রবীন। গো হারান হেরে সম্মেলন শেষে যখন বেরোনো হল, ক্ষ্যাপা দুটোর হাবভাব দেখে মনে হচ্ছিল ওরা বিশ্বকাপ ফুটবল জিতে উঠল। আর বল যখন পাশ দিয়ে হেঁটে বেরিয়ে গেল, মুখখানা দেখে রবীনের হাসিই পেল। যেন খুব কাছের কেউ মারা গেছে।

তারপর থেকে সকালে গণশক্তি বিলি করা আর বউয়ের দোকানে নাম কা ওয়াস্তে মুখ দেখানো ছাড়া শিবুর আর বিশেষ কাজ থাকে না। রবীন ওদিকটায় গেলেই শিবুর গিন্নী অভিযোগ করে “ওকে একটু বলবেন তো দাদা, দোকানে যেন একটু সময় দেয়। আমি একা আর কত করব? একা একাই তো এত বছরের চেষ্টায় ব্যবসাটা বাড়ি থেকে দোকানে আনতে পারলাম। আমাকে একটুও সাহায্য করবে না? এই দোকানটাই তো আমাদের ভাত যোগায়।”

রবীন মাথা নেড়ে বলে “অ্যাই শিবু, বউডারে একটু হেল্প কর। ঠিকই তো কইতাছে। ব্যবসার কি খাটুনি কম?”

“তবে? বলুন দেখি? আগে তো বলত পার্টির কাজে সময় পায় না। এখন তো শুধু সকালে কাগজটা দিতে যায়। তবু একটু দোকানে বসবে না? এই বিকেলবেলাটা ঘন্টা খানেক বসে। তাও কোন দায়িত্ব নেবে না। খদ্দের এলে মাপও নিচ্ছি আমি, ক্যাশও সামলাচ্ছি আমি। আর পারি না বাপু।”

এসব কথার সময়ে শিবু সাত চড়ে রা কাড়ে না। রবীন বলে “শিবু, তুই কিন্তু বউয়ের কথা শোন। দুনিয়ার সব বুদ্ধিমান পুরুষ তাই করে। আর এই ব্যাপারে আমি ওর পক্ষই নিমু। হাঁটতে হাঁটতে তগো দোকানে আইলে যে সন্ধ্যাবেলা এক কাপ চা পাই, হেইডা বন্ধ করনের রিস্ক আমি নিতে পারুম না।”

রবীন আর শিবু হাসে, ওর বউ জিভ কেটে বলে “এ রাম! দাদা, তা কখনো হয়? আপনি এলে আমরা নিজেদের পাতের ভাতও আপনাকে দিয়ে দিতে পারি।”

রবীন হাসতে হাসতে বলে “জানি গো, জানি। আমার ভাই বোন, আত্মীয়, বন্ধু যা কও, সবই তো তোমরা। এই সবুজগ্রামে আমার জন্যে তোমরা আছ বইল্যাই তো কাউরে কেয়ার করি না। কিচ্ছু থাকে না, বুঝলা? পদও থাকে না, গায়ের জোরও থাকে না। মানুষের ভালবাসাডাই থাকে।”

সেই ভালবাসার জোরেই শিবুকে সঙ্গী হতে বলা।

“শিবু, রথীন রায়ের হঠাৎ আমায় কেন মনে পড়ল বল দেখি?” রবীন উল্টো দিকে বসা মানুষটাকে জিজ্ঞেস করে।

“আপনাকে ফোনে কী বলল?”

“খুলে তো বলল না কিছু। ফোনটা তো করেছিল ঐ রামকৃষ্ণ বলে ছেলেটা। ওনার ডান হাত। আমাকে শুধু বলল, রথীনদা আপনাকে একবার দেখা করতে বলেছে। যত তাড়াতাড়ি পারেন। তা আমি বললাম ‘ঠিক আছে, আমি রোববার আসছি।’”

“আমার মনে হয় পার্টিটাকে ঢেলে সাজানোর কোন প্ল্যান। এবারের ভোটের ফলটা তো নেতাদের চিন্তায় ফেলেচে ঠিকই। ফেলাই উচিৎ।”

“বলছিস? কি জানি! আমার ঠিক ভরসা হচ্ছে না রে। পার্টিটাকে ঠিক করা নিয়ে কত কথাবার্তা, কত পার্টি চিঠি, কত কী হল… সেই শৈলেন দাশগুপ্তর সময় থেকে। ফল তো কিছু দেখলাম না। আর এগুলো পার্টির যখন পায়ের তলায় মাটি আছে তখন করা অনেক সহজ। এখন তো মাটি সরতে শুরু করেছে। এখন কি আর ওসবের মধ্যে যাবে নেতারা?”

“কিন্তু দু হাজার এগারো যদি জিততে হয়, রবীনদা, অদল বদল কিন্তু কত্তে হবে। আপনি অনেক আগেই বুঝতে পেরেচিলেন, আমরা বুঝিনি। লোকসভা ভোটের রেজাল্ট বেরোবার পর থেকে কিন্তু সবাই বুঝতে পারচে। মানুষ কিন্তু রেগে আচে। আগে ভয়ে হোক বা যে কারণে হোক, মুখ খুলত না। এখন কিন্তু রাস্তাঘাটে বলাবলি করচে।”

“বলাবলি আগেও করত। আমাদের শোনার কান ছিল না। এখন পিঠে বাড়ি পড়েছে তাই কানগুলো খাড়া হয়েছে, বুঝলি? পার্টিকে অনেক আগেই সাবধান করা হয়েছিল। ভাল ভাল লোক সাবধান করেছে। তখন কেউ কথা কানে তোলেনি। অশোক মিত্রর মত লোককে আমরা রাখতে পারলাম না। উনি তাও অন্যরকম লোক। পার্টি ছেড়ে দিয়েও পার্টিবিরোধী কাজে জড়াননি…”

“পরে তো পার্টি ওনাকে রাজ্যসভাতেও পাটাল।”

“হ্যাঁ। তারপর সঈফুদ্দিন চৌধুরী। সে কি আর খারাপ লোক? লেখাপড়া জানা লোক। সে লোকটাকেও রাখতে পারলাম না। তিনি আলাদা পার্টি খুলে বসলেন। ওদিকে ত্রিপুরার নীরেন চক্কোত্তি। এখন কি আর সময় আছে?”

“ভোটের তো এখনো বচর দেড়েক দেরী। এর মদ্যে চেষ্টা কল্লে ঠিক সব গুচিয়ে নেয়া যাবে।”

“ভোটের সময়ের কথা বলছি না রে, বলছি মানুষের বিশ্বাস পুনরুদ্ধার করার কি আর সময় আছে? ভোট তো আসবে যাবে। পরপর এতগুলো ভোট আমরা জিতেছি, চিরকালই কি জিতব? তা তো হয় না। এক সময় তো হারতেই হবে। সেটা বড় কথা না।”

“কিন্তু সংসদীয় ব্যবস্তায় যতক্ষণ আচি, ভোটের কথা একেবারে ভাবব না বললে কি চলে, রবীনদা?”

“ঐখানেই তো গণ্ডগোল রে, শিবু। ঐ ভাবতে ভাবতেই আমাদের ভারসাম্য নষ্ট হয়ে গেল। ভোটে জেতার চিন্তা এত বড় হয়ে গেল, যে আসল দিকগুলোয় আর নজর দেয়া হল না। এখন আর হবেও না, তুই দেখে নে। এখন শর্ট কাটে কী করে ভোট ফেরত পাওয়া যায় তার ব্যবস্থা হবে।”

“কিন্তু… আপনাকে তলবটা তা’লে কী জন্যে?”

“নির্ঘাত কোন নালিশ আছে। মানে আমার নামে কেউ নালিশ করেছে। শাস্তি দেয়ার আগে হুঁশিয়ারি দেবে বোধহয়।”

“শাস্তি!” শিবু একেবারে হাঁ হয়ে যায়। “অপরাদটা কী?”

“শাস্তি দিতে কি অপরাধের দরকার হয় সব সময়?”

শিবু কথাটার মানে বুঝতে পারে না।

জেলা অফিসে অনেকদিন পরে আসা হল রবীনের। হীরুদার মৃত্যুর পরে বার দুয়েক এসেছে। একবার সুব্রতদা, যিনি হীরুদার পরে জেলা সম্পাদক হলেন, তাঁর সাথে এলাকার একটা সমস্যা নিয়ে কথা বলতে এসেছিল। তারই এক বছরের মধ্যে আরেকবার। সুব্রত মণ্ডল একদিন দুম করে স্ট্রোক হয়ে মারা গেলেন। তাঁর স্মরণসভায় এসেছিল। তখনো রবীন জোনাল কমিটির সদস্য। সেও প্রায় এক দশক আগেকার কথা। জোনাল কমিটি থেকে বাদ পড়ে গেছে নতুন সহস্রাব্দের গোড়ার দিকেই। আর কোনদিন জেলা পার্টির কারোর তাকে দরকার হবে রবীন ভাবেনি।

দোতলায় সম্পাদকের ঘরের সামনে ভিড়। দুটো বেঞ্চে লাইন দিয়ে লোক বসে আছে। প্রশস্ত টাকওয়ালা, অবশিষ্ট চুলগুলো আর সব দাড়ি পেকে যাওয়া একজন রবীনকে দেখেই উঠে দাঁড়িয়ে বলল “আসেন, মাস্টারমশাই। বসেন।” এত বয়স্ক একটা লোক তাকে আপনি আজ্ঞে করছে দেখে রবীন একটু অবাকই হল। শিবু তো খুক করে হেসেই ফেলল। লোকটা সেটা খেয়াল না করে বলল “আপনি আমাকে চিনতে পারেননি তো?”

রবীন মাথা নেড়ে না বলল।

“চেনার কথাও না। সেই কবেকার কথা। আমার আজাদপুরে বাড়ি। আপনি পঞ্চায়েত সমিতির সভাপতি থাকার সময় আমাদের ওখানে একটা লাইব্রেরি করলেন মনে আছে?”

“খুব মনে আছে।”

“আমি তখন ওখানে এস এফ আই করতাম। লাইব্রেরি উদ্বোধন করতে শিক্ষামন্ত্রী, গ্রন্থাগার মন্ত্রী – এঁরা সব এলেন, আপনিও ছিলেন। আমি একটা কবিতা…”

“ও হ্যাঁ হ্যাঁ,” রবীন বুড়োটাকে জড়িয়ে ধরে। “রাস্তা কারো একার নয়। বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। নিশ্চয় মনে আছে, খুব মনে আছে। কিন্তু তোমার নামটা যে মনে নেই গো।”

“আপনি তো অনেকটাই মনে রেখেছেন, স্যার। এতটা আমি আশা করিনি। আমার নাম ফরিদুর।”

“হ্যাঁ হ্যাঁ। এইবার মনে পড়েছে। তুমি শুধু এস এফ আই করতে? তুমি তো আজাদপুর কলেজে এস এফ আইয়ের প্রথম জি এস, তাই না? তোমাকে ভোটের দিন সি পি মেরে হাসপাতালে পাঠিয়ে দিয়েছিল।”

“আপনার তো অনেক কিছু মনে আছে স্যার!” লোকটা অবাক।

“আরে এসব যেদিন ভুলে যাব সেদিন আর পার্টি অফিসে পা দেয়ার অধিকার থাকবে না, বুঝলে? সেই হেমাঙ্গ বিশ্বাস দলবল নিয়ে একটা গান গাইতেন না? ‘আমরা তো ভুলি নাই শহীদ, কখনো ভুলব না, তোমার কইলজার খুনে রাঙাইল কে, আন্ধার জেলখানা।’ পার্টির জন্যে যারা মার খায়, প্রাণ দেয় তাদের ভুলে গেলে আর পার্টির থাকল কী? কিন্তু বাবা, তুমি এত বুড়িয়ে গেলে কী করে?”

“আর বলবেন না। দুবার জন্ডিস, একবার টাইফয়েড। একবার তো ম্যালিগন্যান্ট ম্যালেরিয়ায় মরতে মরতে বেঁচে গেলাম। চুল সব আগেই উঠে গেছিল। মনের দুঃখে দাড়িই রাখতে শুরু করলাম। সেও সব পেকে গেছে চল্লিশের মধ্যে।”

উপস্থিত সবাই হেসে ওঠে। সবচেয়ে জোরালো হাসিটা রবীনের। সম্পাদকমশাইয়ের ঘর থেকে রামকৃষ্ণ পর্দা তুলে মুখ বাড়িয়ে বলে “একটু আস্তে। দাদার অসুবিধা হচ্ছে।” অপ্রস্তুত কমরেডরা চুপ করে যায়। রবীন ফরিদুরের কাঁধে হাত দিয়ে বলে “আমরা তো লাইনে অনেক পেছনে। চলো নীচে গিয়ে একটু চা খাই আর আজাদপুর কেমন আছে শুনি তোমার থেকে। যেতে খুব ইচ্ছে করে। কিন্তু আজকাল আর অতটা সাইক্লিং করতে পারি না, বুঝলে? বয়স হয়েছে তো। এ বছর রিটায়ারমেন্ট।”

চা, বিড়ি খেয়ে এসে বেঞ্চে বসতে না বসতেই রবীনের ডাক এসে গেল। রবীন বলল “ফরিদুর, তুমি সেরে এসো আগে। আমার আগে থেকে বসে আছ তো?” কিন্তু রামকৃষ্ণ জোর দিয়ে বলল “না, রথীনদা আপনাকেই আগে ডাকছে।” অগত্যা।

রবীন আর শিবু ঘরে ঢুকতেই রথীন রায় বললেন “এটা কে?”

“কমরেড শিবু মণ্ডল,” রবীন শিবুর কাঁধে হাত রেখে বলল। “আমাদের এলাকার সবচেয়ে পার্টি অন্তপ্রাণ কমরেডদের মধ্যে একজন।”

“অ। তুমি বাইরে বসো।”

বলার ধরনটা একেবারেই ভাল লাগল না রবীনের। শিবু চুপচাপ বেরিয়ে গেল। রবীনের মনে হল ওরই ভুল। রথীন রায় কেমন লোক জেনেও শিবুকে আজকে নিয়ে আসা উচিৎ হয়নি। ওর ভুলেই বেচারাকে অপমানিত হতে হল।

“বসুন, কমরেড,” কাঠখোট্টা রথীন বলল। “আপনি ঐ লেজুড়টাকে নিয়ে এসেছেন কেন?”

রবীনের মাথাটা দুম করে গরম হয়ে গেল।

“আমি চল্লিশ বছরের উপর পার্টি করছি। আজ অব্দি কোন লেজুড় হয়নি আমার, অনেক কমরেড হয়েছে। কাজের কথায় এলে ভাল হয়। অনেকটা পথ যেতে হবে আমাদের।”

রথীন যে এরকম জবাব আশা করেনি সেটা মুখ দেখে ভালই বোঝা গেল। মুখ থেকে পাইপটা নামিয়ে রেখে বলল “হ্যাঁ, আমার হাতেও বেশি সময় নেই। আপনার বিরুদ্ধে অভিযোগ এসেছে। অন্য কেউ হলে পার্টির যা নিয়মকানুন সেই অনুযায়ী কাজকর্ম শুরু করার নির্দেশ দিতাম। কিন্তু আপনি প্রবীণ লোক, চল্লিশ বছর ধরে পার্টি করছেন নিজেই বললেন, তাই মনে হল আপনাকে মুখে বললে যদি কাজ হয়। তাই ডেকে পাঠিয়েছি।”

“অভিযোগটা কী?”

“আপনার বিরুদ্ধে উপদল করার অভিযোগ আছে। এবং যাদের নিয়ে করছেন তাদের বিরুদ্ধে আরো গুরুতর অভিযোগ আছে।”

“তারা কারা?”

“বাবা! আপনি কিছুই জানেন না বলতে চান?”

“আমি আসলে পুরনো দিনের লোক তো। আজকাল অনেক নতুন নতুন কথা চালু হয়েছে, পুরনো কথার নতুন মানে হয়েছে। সেসব আমি সত্যিই বুঝি না। ফলে আপনার কথা বুঝতে আমার একটু অসুবিধাই হচ্ছে।”

“তার মানে আপনি বলছেন আপনি উপদলীয় কাজকর্ম করছেন না?”

“উপদল বলতে আপনি কী বোঝাচ্ছেন আমি জানি না। আমি উপদল বলতে বুঝি দলের মধ্যে কয়েকজন যদি নিজেদের স্বার্থকে পার্টির স্বার্থের উপরে স্থান দেয় এবং পার্টির ক্ষতির কথা মাথায় না রেখে এই গোষ্ঠীর জন্যে ছোট বড় সুবিধা আদায় করার চেষ্টা করে, ক্ষমতা দখল করার চেষ্টা করে, তাদেরকে। আমি এরকম কিছু করেছি বলে তো মনে পড়ে না।”

“তাহলে গত বছর লোকাল কমিটির সম্মেলনে আপনার নেতৃত্বে সরকারী প্যানেলের পাল্টা প্যানেল উঠল কী করে?”

“আমার নেতৃত্বে? আপনি ঘটনাটা ঠিক করে জানেন না, কমরেড। ঐ প্যানেলে প্রস্তাবিত এল সি এস হিসাবে কমরেড ফাল্গুনী গুপ্তর নাম ছিল, আমার নয়।”

“জানি, জানি। ঐ ফাল্গুনী তো আপনারই চ্যালা।”

“আপনি আমার চেয়ে বয়সে একটু ছোট হলেও পার্টির জেলা সম্পাদক। সেই জন্যে আপনার প্রশ্নগুলোর জবাব দিচ্ছি। লেজুড়, চ্যালা — এইসব শব্দ যদি কমরেডদের সম্বন্ধে ব্যবহার করেন তাহলে আর জবাব দেব না। আপনি যা ইচ্ছা ব্যবস্থা নিতে পারেন,” বলতে বলতে রবীন উঠে দাঁড়ায়।

“আপনার ঐ প্রিয় কমরেডদের সম্পর্কে অভিযোগগুলো শুনবেন না?”

“আপনি বললে শুনতেই পারি, কিন্তু তাঁদের হয়ে অভিযোগের জবাব দেয়া আমার কাজ নয়।”

“আপনার জবাব পার্টি শুনবেও না। অভিযোগগুলো শুনে যান, তাদের বলে দেবেন জবাব যেন তৈরি রাখে। শিগগির তাদের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু হবে।”

রবীন হ্যাঁ, না কিছুই বলে না, তবে দাঁড়িয়ে থাকে। রথীন রায় টেবিলের উপর থেকে একটা কাগজ হাতে নিয়ে বলেন “আপনার ঐ ফাল্গুনী কি যেন, তার বিরুদ্ধে একটি বিবাহ বহির্ভূত সম্পর্কের অভিযোগ আছে। এক বিধবা মহিলার সাথে। আর এই যাকে নিয়ে এসেছেন ট্যাঁকে করে, তার বিরুদ্ধে পার্টি মুখপত্র বিক্রির টাকা মেরে দেয়ার অভিযোগ। এদের পাশ থেকে সরে আসুন, কমরেড। নইলে কিন্তু আপনার সদস্যপদও বিপদে পড়তে পারে।”

“আপনি মাই বাপ, পার্টি আপনার,” রবীন চওড়া হেসে বলে। “আপনি কাকে পার্টিতে রাখবেন, কাকে বার করে দেবেন সে আপনার ব্যাপার। আমি যখন পার্টি করতে এসেছিলাম তখন ঐ সদস্যপদ পেতে গেলে অনেক রকম পরীক্ষা দিতে হত, কমরেড। সেগুলো পাশ করতে করতেই মানুষ পার্টির লোক হয়ে যেত। ফলে আগে পার্টির লোক হয়েছি, পরে সদস্যপদ পেয়েছি। আজ সদস্যপদ চলে গেলেও পার্টির লোকই থাকব। যদ্দিন বাঁচি। চলি।”

জেলা সম্পাদকের ঘর থেকে বেরিয়ে রবীন কিছু বলেনি, শিবুও কিছু জিজ্ঞেস করেনি। স্টেশনে এসে শিবু যখন বিড়ি ধরিয়ে দিচ্ছে, তখন রবীন বলল “আমাকে এবার ত্যাগ কর, বুঝলি? আমার দিন শেষ। বাঁচতে চাস তো বলরামকে ধর। দু বেলা ওর বাড়ি যা, মিষ্টি কথা টথা বল। অপমান হজম করে বাজার টাজার যদি করে দিতে পারিস তাহলে আরো ভাল। বাঁচতে তো হবে, ভাই। আমার আর তোদের বাঁচানোর শক্তিটুকুও নেই রে।”

শুনে শিবু হো হো করে হাসতে থাকে। সে কি হাসি! আর থামেই না। লোকজন তাকাতে শুরু করে। রবীন বলে “কি রে? এত হাসির কী হল? সিরিয়াসলি বলছি।”

“রবীনদা, আপনি পারেন বটে,” হাসি সামলাতে সামলাতে শিবু বলে। “আচ্ছা ধরুন আমি আপনাকে ত্যাগ কল্লাম। আপনি পারবেন আমায় ত্যাগ কত্তে? যদি শোনেন শিবু হাসপাতালে, ঠিক তো গিয়ে হাজির হবেন। যদি শোনেন শিবুর বাড়ি হাঁড়ি চড়চে না, ছুতো করে কারো হাত দিয়ে বাড়ির এটা সেটা তো ঠিক পাঠাবেন। এত বচ্চর যারা আপনাকে ত্যাগ করেচে, সকলের সাথেই তো এই জিনিস করে এসেচেন আপনি। যে আপনার সাথে কতা বলা পয্যন্ত ছেড়ে দিয়েচে তারও চাকরির জন্যে একে তাকে বলেচেন, বাপ-মা মরলে শ্মশান গেচেন।”

রবীন বলে “আরে বোকা, সে তো করতেই হবে। আমায় পছন্দ করুক আর না-ই করুক, পার্টির লোকের পাশে দাঁড়াতে হবে না? নইলে আর কমরেড কিসের?”

“তা’লে আর আমায় এসব বলবেন না।”

“এমনি এমনি বলছি না রে। বড় ক্ষতির সম্ভাবনা দেখেই বলছি। পার্টির আর আমার মধ্যে যদি বাছতে হয়, পার্টিটাকেই তো বাছা উচিৎ।”

ভাল লাগলে টাকা দিতে পারেন Google Pay / Paytm / BHIM বা অন্য UPI অ্যাপের মাধ্যমে journopratik@okhdfcbank কে

অথবা

নেট ব্যাঙ্কিং বা অন্য উপায়ে নিম্নলিখিত অ্যাকাউন্টে

Pratik Bandyopadhyay
A/c No. 14041140002343
HDFC Bank
Branch: South Calcutta Girls’ College
IFS Code: HDFC0001404
MICR Code: 700240048