নাম তার ছিল: ২৮

পূর্বকথা: ভোটের প্রচারে বেরিয়ে মানুষের শীতলতা দেখে বিপ্লবের ধারণা হয়, খুব খারাপ কিছু ঘটতে চলেছে। যেদিন প্রচার শেষ হল, সেদিন সন্ধেবেলা হঠাৎ বিনা নোটিশে বিপ্লব এসে পড়ল। রবীনের আশঙ্কা হল, চাকরিটা আছে তো?

হঠাৎ এসে বাবাকে চমকে দেবে ভেবেছিল বিপ্লব। কিন্তু বাবা যে দুশ্চিন্তায় পড়বে তা কল্পনা করেনি। মা খুশি হয়েছে, বাবাও। কিন্তু বাবার যেন আনন্দের চেয়ে উদ্বেগ বেশি।

বিপ্লব ঠিক করেই এসেছিল বাবার সাথে সম্পর্কটা স্বাভাবিক করার উদ্যোগ নেবে। কিন্তু এসে বুঝল, ব্যাপারটা অত সহজ নয়। প্রথমে মনে হল এভাবে হঠাৎ এসে পড়ায় বাবা বেশ অসন্তুষ্ট। বিপ্লব বাড়িতে ঢোকার একটু পরেই কারেন্ট এল। বাবা তখনো একটাও কথা বলেনি। বিপ্লবও বলেনি, মায়ের একের পর এক প্রশ্নের জবাব দিতে গিয়ে সুযোগই পায়নি। কারেন্ট আসতেই বাবা দৌড়ে গিয়ে পাম্পটা চালিয়ে দিল। বলল “পাঁচ মিনিট চলুক, তারপর গিয়ে গা ধুয়ে নে।” গা ধুয়ে এসে বিপ্লব যখন ডাইনিং টেবিলে চিনি দিয়ে গরম পরোটা খেতে বসল, তখন বাবা কথা বলতে শুরু করল।

“হ্যাঁ রে, হঠাৎ চলে এলি? চাকরিটা? আছে তো?”

“আরে! চাকরি যাবে কেন?”

“না, তুই খবর টবর না দিয়ে দুম করে চলে এলি…”

“এসেছে তাতে ক্ষতিটা কী হয়েছে?” মা ঝাঁঝিয়ে ওঠে। “ছেলেটা এতদিন পরে বাড়ি এল সেটা তোমার ভাল্লাগছে না?”

“না না, ভাল লাগবে না কেন? কিন্তু ও তো আসতে চায় না খুব একটা…”

“আসতে চায় না তোমাকে বলেছে কখনো? সবকিছুই নিজের মত করে ভেবে নাও তুমি।”

“আরে তুমি সবেতে এভাবে কথা বল কেন, জোনাকি? আজকাল চাকরি বাকরির কী অবস্থা তুমি জান? চিন্তা হবে না?”

“না না, চিন্তার কিছু নেই, বাবা। আমি ছুটি নিয়েই এসছি। এই চাকরিটায় ঢোকার পর থেকে তো কোন বড় ছুটি নিইনি। তাই বস এক কথায় রাজি হয়ে গেল।”

“অ,” বাবা যেন ঠিক নিশ্চিন্ত হল না। “তা পরশুই তো কথা হল। তখন তো বললি না কিছু?”

“তখনো ভাবিনি আসব। কাল সকালে মনে হল, বসকে অফিসে গিয়ে বললাম, রাজি হয়ে গেল। ব্যাস।”

“এরকম ঝট করে টিকিট কাটলি, অনেক টাকা লাগল না?”

“হ্যাঁ, ঐ সাড়ে তিন মত।”

“সাড়ে তিন! কদিন অপেক্ষা করে আসতে পারতিস তো। একটু কমে পেতিস।”

“তুমি থামো তো,” মা আবার ক্ষেপে যায়। “ওর টাকায় ও এসেছে। তুমি এত হিসাব করছ কেন?”

“তা তো ঠিকই,” বাবা মুখ নামিয়ে নিয়ে বলে। বিপ্লবের খুব ইচ্ছে করে বাবাকে সেই ছোটবেলার মত জড়িয়ে ধরতে। পারে না। বাবাই ছোটবেলার মত বিপ্লবের পিঠে একটা চাপড় মেরে উঠে দাঁড়ায়। বলে “দাও, বাজারের ব্যাগটা দাও।”

“এই আটটার সময় বাজার যাবে কেন?”

“ছেলেটা এতদিন পরে এল, একটু মাংস নিয়ে আসি।”

“বাবা, তুমি সারাদিন প্রচার সেরে ফিরলে, এখন আর বেরিয়ো না।”

“আরে আমার শরীর একদম ঠিক আছে। সেদিন রোদে, গরমে মাথাটা ঘুরে গেছিল আর কি। তারপর গত এক মাস দিব্যি চুটিয়ে প্রচার করলাম তো। কোন অসুবিধে হয়নি।”

“তাও। থাক না। কাল সকালে মাংস আনবে নাহয়,” মা বলে। “এখন ডিমের ডালনা করে দিই। ও তো ভালবাসে।”

“হ্যাঁ হ্যাঁ, তাই করো মা। কতদিন খাইনি ওটা। এগ বন্ডা খেতে খেতে ডিমের ডালনার স্বাদই ভুলে যাচ্ছি। আর ওখানে মাংস, বিরিয়ানি তো আকছার খাই।”

“আচ্ছা থাক তাহলে। কাল হবে মাংস। তুই মার সাথে গল্প কর, আমি একটু ঘুরে আসি।”

“আবার কোথায় যাবে? বাড়িতে থাকো না একটু। ছেলেটা এল…”

“চলে আসব তাড়াতাড়ি। এসে একসাথে খাব।”

“কোথায় যাচ্ছ সেটা বলবে তো?”

“একবার মিনতি বৌদিকে দেখে আসি। সকালে স্টেশনের কাছে পটলার সাথে দেখা হল। বলল কদিন ধরে নাকি বৌদির শরীরটা ভাল নেই। শ্বাসকষ্ট।”

“ও। তাহলে তো আমারও একবার যাওয়া দরকার।”

“তুমি যেয়ো পরে, আমি তো সময় পাব না। টুক করে ঘুরে আসি।”

কিছুক্ষণ বিপ্লবের হায়দরাবাদ জীবনের পুঙ্খানুপুঙ্খ নিয়ে খোঁজখবর নেওয়ার পর রান্নার সময় হল। “তুই যা একটু গড়িয়ে নে। আমার হয়ে গেলে তুলে দেব,” বলে মা রান্নাঘরে চলে গেল।

“না, এখন আর শোব না। তারপর রাতে ঘুম আসবে না। আমি একটু ওপরে যাচ্ছি।”

বিপ্লবের নিজের ঘরটার সাথে অনেকদিন পরে সাক্ষাৎ হবে। এই ঘরে একদিন বাবা ওর অবর্তমানে ঢুকে পড়ে পর্ন ম্যাগাজিনগুলো দেখতে পেয়েছিল। খাটের উপর ছড়িয়ে থাকা পত্রিকাগুলো জড়ো করে ড্রয়ারে ঢুকিয়ে রেখে গিয়েছিল, বিপ্লবকে কিছু বলেনি। কিন্তু বুঝতে পেরে লজ্জা পাওয়ার বদলে ও বাবার উপরেই রেগে গিয়েছিল। সেটা চাকরি জীবনের গোড়ার দিকের কথা। তারপর থেকে বাবা আর কখনো কোন প্রয়োজনেই ও ঘরে যায়নি, মা তো মোটা শরীর নিয়ে পারতপক্ষে সিঁড়ি ভাঙে না। এত দিনে নিশ্চয়ই ঝুল কালি ভর্তি হয়ে গেছে ঘরটা।

ও ঘরে অনেক বই। ছোট থেকেই বাবা-মার দেওয়া উপহার মানেই ছিল বই। মামা, মাসি, পিসি, জ্যাঠা — যে যখন কিছু দিতে চেয়েছে, বিপ্লব বইই নিয়েছে। স্কুল, কলেজে আবৃত্তি, এটা সেটা করেও অনেক বই পুরস্কার পেয়েছিল। সেই প্রাণাধিক প্রিয় বইগুলোর জন্যে দেয়াল আলমারি বানিয়ে দিয়েছিল বাবা। কেরিয়ারিস্ট বিপ্লবের পড়ার অভ্যেস চলে গিয়ে সেসব বইতে ধুলো জমেছে এখানে থাকতেই। বইগুলোর মান ভাঙাতে হবে, আলমারিটাকে ঝাড়পোঁছ করতে হবে। একবার সব বার করে রোদে দেওয়াও দরকার। দেখতে হবে কোন বইতে পোকা ধরেছে কিনা। সেগুলোকে আলাদা করতে হবে। কয়েকটা বেছে সঙ্গে নিয়ে যাবে বিপ্লব। অনেক কাজ। ও ভেবেই এসেছে। তাই কাজ এগিয়ে রাখতে দোতলার ঘরে উঠে আসে।

দরজাটা খোলাই ছিল। ঘরে ঢুকে আলো জ্বালিয়ে বেশ ভাল লাগল বিপ্লবের। নিজে উপরে না এলেও মা যে রত্নাপিসিকে দিয়ে নিয়মিত ঝাড়পোঁছ করায় সেটা বেশ বোঝা যাচ্ছে। কোথাও ঝুল নেই, পশ্চিমের জানলার শিকগুলো পর্যন্ত ঝকঝকে। বিপ্লব নিজে যখন থাকত, তখনো এত পরিষ্কার থাকত না ঘরটা। বিছানার চাদরটাও কাচা এবং টানটান করে পাতা, বালিশগুলো পরিপাটি করে চাদর দিয়ে ঢাকা। ঠিক যেমনটা বাবা-মার ঘরে থাকে। মা নতুন কাজের লোক রেখেছে নির্ঘাত। নয়ত রত্নাপিসির মাইনে দ্বিগুণ করে দিয়েছে। সে নিজে থেকে এসব কাজ করার লোক তো নয়! যাকগে, বইগুলোর ব্যবস্থা করা দরকার।

আলমারিটা খুলে আরো অবাক হতে হল। বহুদিন না খোলা বইয়ের আলমারি থেকে যে গন্ধ পাওয়া যায় তা নেই। বিপ্লবের বই গুছিয়ে রাখার অভ্যেস ছিল না। প্রিয়, বারবার পড়া বইগুলো থাকত নীচের তাকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে, বাদ বাকি উপর দিকের তাকগুলোতে। বইয়ের ঠ্যালায় সারাক্ষণ হুলুস্থুল। আলমারি খুললেই দু চারটে বই ধপাধপ মাটিতে পড়ত, কারণ সেগুলো কোন মতে ঠেসে ঠুসে রাখা ছিল। আজ বিপ্লব আলমারি খুলে দেখল ঠাসাঠাসি হলেও বইগুলো সব পরিপাটি করে সাজিয়ে রাখা। উপরের তাকে ওগুলো কী? মোটা মোটা কী বই ওগুলো? অন্য বইগুলোর চেয়ে তফাতে একটার উপর আরেকটা শুইয়ে রাখা? বিপ্লব পা উঁচু করে টানতে গেল, হুড়মুড়িয়ে মাথায় এসে পড়ল বই দুটো। বলা উচিৎ মাথায় ড্রপ খেয়ে মাটিতে পড়ল। ভেতর থেকে কিসব যেন চারদিকে ছড়িয়ে পড়ল। বই নয় তো! বিপ্লবের কবিতা লেখার ডায়রি। আর ছত্রখান হয়ে আছে নানা সময়ে খুচরো কাগজে লেখা কবিতাগুলো। এগুলো এখানে এল কোত্থেকে? বিপ্লব কবিতা টবিতা লেখা ছেড়ে দিয়েছে সেই কবে। কলেজে থাকতেই। হায়দরাবাদ চলে যাওয়ার সময়ে ওগুলোকে বাজে কাগজ মনে করে পুরনো খবরের কাগজ বিক্রির ঝুড়িতে ফেলে এসেছিল। খুচরো কাগজগুলো সম্ভবত এ বই সে বইয়ের মধ্যে গোঁজা ছিল। সেগুলোর কোন ব্যবস্থা করার কথা মনেও আসেনি তখন। “মরে গেলেও ফিরে আসব না” ঠিক করেই তো গিয়েছিল আসলে। এসব উদ্ধার করে এভাবে পরম যত্নে গুছিয়ে রাখল কে? কেন?

“মা, আমার ঘরে কে ঢুকেছিল গো?” বিপ্লব সিঁড়ির মুখে দাঁড়িয়ে চেঁচিয়ে জিজ্ঞেস করল।

“কেন রে? কিছু খুঁজে পাচ্ছিস না?” জোনাকি রান্নাঘর থেকে উত্তর দিল। “রত্না কালকে এলে জিজ্ঞেস করব, দাঁড়া। ওকে যত বলি জিজ্ঞেস না করে কিচ্ছু ফেলবে না, কিছুতেই শোনে না। মাটিতে কিছু পড়ে আছে দেখলেই না দেখে শুনে ঝাঁট দিয়ে ফেলে দেয়…”

“আরে বাবা, তা নয়। আমার বইয়ের তাকটা দেখছি গোছানো, কবিতার ডায়রিগুলো ফেলে দিয়ে গেছিলাম, সেগুলোও দেখছি এখানে?”

“ও, তাই বল। ওটা মনে হয় তোর বাবার কাজ।”

“বাবা!”

“হ্যাঁ তোর বাবা তো এখন তোর ঘরেই শোয়। সারাদিনই টঙে চড়ে বসে আছে। কেউ এলে ডাকতে ডাকতে আমার গলা ফেটে যায়। কী যে খুটুর খুটুর করে সারাক্ষণ! ঐসবই করে বোধহয়। সেই যে সকালবেলা চা খেয়ে কাগজটা নিয়ে তোর ঘরে ঢোকে, লোক না এলে তো আর নামার নামই করে না। বেলা একটার সময় স্নান করতে যায় পুকুরে, তখন নামে, আবার খাওয়াদাওয়া করে উঠে যায়। এই ভোটের কদিন রুটিন বদলেছে। নইলে তো বাড়ি থেকে বেরোয়ই না। সারাক্ষণ ভূতের মত বাড়িতে বসে থাকা।”

বিপ্লব আর কিছু না বলে ঘরে এসে খাটে বসে পড়ল। মা তখনো পাড়া জানিয়ে বাবার গুণকীর্তন করেই চলেছে।

রবীন ঘোষাল আর বাড়ি থেকে বেরোয় না খুব একটা। সারাক্ষণ বাড়ির এক কোণে একা একা সময় কাটায়। কিভাবে কাটায়? হয়ত কাগজ পড়ে, বই পড়ে। আর যে কাজটা অবশ্যই করে বলে দেখা যাচ্ছে, সেটা হল প্রবাসী ছেলের ঘরটাকে যত্ন করে সাজায়। ছেলের প্রিয় বইগুলোকে আলমারিতে সাজিয়ে রাখে, তার পরিত্যক্ত কবিতাগুলো, যেগুলো সে কিলো দরে বিক্রি হয়ে যাওয়া থেকে বাঁচিয়েছে, সেগুলো রক্ষা করে। কেন করে? বিপ্লব ভাবতে চেষ্টা করে। রাজনীতিতে ব্রাত্য হয়ে যাওয়া তার বাবা, সবুজগ্রামের চেহারা বদলাতে বদলাতে দুনিয়া বদলানোর স্বপ্ন দেখা রাজনীতিবিদ বাবা এখন তাহলে অন্য জগতে চলে যাওয়া ছেলের স্মৃতি আঁকড়ে বেঁচে আছে? ছেলের আর পড়তে না চাওয়া এক আলমারি বই আর কৈশোর, যৌবনের অবান্তর আবেগের বহিঃপ্রকাশ অচল কবিতা নিয়ে সারাদিন কাটে সেই লোকটার, যে নিজের রাজনীতি থেকে এক চুল সরে না বলে রাগে, অভিমানে, কতকটা ঘেন্নায় সবুজগ্রাম ছেড়ে চলে গিয়েছিল বিপ্লব? বাবাকে চিনতে কতটা বাকি ছিল তাহলে? তার চেয়েও বড় কথা বাবা এরকম কেন করে? আর কিছু করার নেই বলে? পার্টি, বন্ধুবান্ধব, স্ত্রী সকলের কাছ থেকে নিজেকে গুটিয়ে নিয়ে এই যে একখানা ঘরে জীবন যাপন করছে তার বাবা, সে কি আর সকলের কাছে বাতিল হয়ে গেছে ভেবে? বিপ্লব তো সোচ্চারে বাতিল করে গিয়েছিল রবীন ঘোষালের রাজনীতিকে। সকলের আগে। তাহলে তার স্মৃতিতে কেন আশ্রয় খোঁজে লোকটা? আর কোন উপায় নেই বলে? নাকি আশা করে একদিন ঠিক ছেলে ফিরে আসবে?

কেন এমন আশা করো, বাবা? তুমিই না বলতে ইতিহাসের চাকা সব সময় সামনের দিকে ঘোরে? তোমার কাছেই তো শুনেছিলাম মার্কস বলেছিলেন, ইতিহাস নিজের পুনরাবৃত্তি করে ঠিকই। কিন্তু প্রথমে ট্র্যাজেডি হিসাবে, তারপর প্রহসন হিসাবে। তুমি কী মনে করো? আমি, তোমার ছেলে, একদিন ফিরে এসে বলব ‘না, বাবা। তুমি ভুল নও, আমিই ভুল। তোমার রাজনীতির দিন ফুরোয়নি’? বলে আমি তোমার মতই লাল ঝাণ্ডা নিয়ে বেরিয়ে পড়ব? এ কি হয়? তোমার ট্র্যাজেডিতে আমি কেন অভিনয় করতে যাব? আমি কি সং? আধুনিক পুঁজিবাদের সমস্ত সুবিধা আমি ভোগ করছি এখান থেকে অনেক দূরের একটা শহরে বসে। সেসব ছেড়ে কেন আমি ফিরে আসব তোমার পশ্চিমবঙ্গে? তোমরাই বা মার্কস-লেনিনের কোন স্বপ্নের রাজ্য বানিয়ে রেখেছ এখানে, যে আশা করছ আমি ফিরে আসব? আমি কাগজ পড়ি না? টিভি দেখি না? আমি জানি না তোমরা কী করেছ নন্দীগ্রামে? কী চেষ্টা করছিলে সিঙ্গুরে?

বাবাকে এইসব প্রশ্নে জর্জরিত করে খুব ঝগড়া করবে বলে একলা ঘরে রিহার্সাল দিতে থাকল বিপ্লব। আর এসব শুনে বাবার মুখটা কেমন হবে মনে পড়ে কেঁদে ফেলল ঝরঝরিয়ে। কিছু পরে নীচ থেকে মা হাঁক দিল “নেমে আয়, বাবা। আমার রান্না হয়ে গেছে।”

বিপ্লব নেমে এসে বলল “বাবা ফেরেনি তো এখনো। একটু অপেক্ষা করি।”

“তোর গলাটা ভারী লাগছে কেন রে? ঘুমিয়ে পড়েছিলি?”

“হ্যাঁ, ঐ আর কি।”

“আচ্ছা আমি খাবারদাবার বাড়তে থাকি, এর মধ্যে এসে পড়বে তোর বাবা।”

সত্যিই এসে পড়ল। তালাটা খুলতে গিয়ে বাবার মুখ দেখে বিপ্লবের মনে হল যেন নিজের মুখটাই আয়নায় দেখছে। বাবাও নিশ্চয়ই কাঁদছিল। আগেকার বিপ্লব হলে বাবাকে জড়িয়ে ধরত, জিজ্ঞেস করত “বাবা, কী হয়েছে? তুমি কাঁদছিলে?” এখন আর সেসব করা যায় না। এ বয়সে ওটা ন্যাকা ন্যাকা লাগবে। তবু, বিপ্লবের মনে হল সেটাই করা উচিৎ ছিল।

খাবার টেবিলে এসে বসতেই মা কিন্তু সরাসরি জিজ্ঞেস করল “কি গো! তোমার মুখটা অমন দেখাচ্ছে কেন? কী হয়েছে? বৌদির অবস্থা কি খুব খারাপ?”

“নাঃ”।

শব্দটা প্রায় বেরোলই না বাবার গলা থেকে, মাথা নাড়া দেখে বুঝতে হল।

গলাটা একবার পরিষ্কার করে নিয়ে ভাত ভাঙতে ভাঙতে জিজ্ঞেস করল “তোর চাকরিটা ঠিক আছে তো রে? রাগ করিস না বারবার জিজ্ঞেস করছি বলে। আমি ছা পোষা লোক তো, আই টি ফাই টি তো একদম বুঝি না। বেসরকারী চাকরি মানেই ভাবি আজ আছে কাল নেই। তাই…”

“না, সেটা পুরো ভুল নয়,” বিপ্লব উত্তর দিল। “কিছুদিন আগে তো অনেকের চাকরি গেল ঠিকই। তবে আপাতত মনে হয় আর কিছু হবে না।”

“হ্যাঁ, দেখছিলাম কাগজে। চিন্তা হচ্ছিল…”

“আঃ। ছাড়ো তো,” মা অধৈর্য। “দেখতে পাচ্ছি তুমি কিছু একটা লুকোচ্ছ। বলো না গো কী হয়েছে?”

দীর্ঘ নীরবতার পর বিপ্লবের বাবা উত্তর দিল।

“লাল্টুর বউ আমায় বলল… হেসেই বলল। ‘কাকু, এবার কিন্তু তোমাদের ভোট দিতে পারব না। দিদিই আমাদের লোক, তোমরা না।’ আমি বললাম ‘সে কি রে! তোর বাবা জানে?’ বলে ‘বাবা শুনলে রাগ করবে। কিন্তু আমার যাকে ইচ্ছা আমি তো তাকেই ভোট দেব।’”

“ও মা! তা লাল্টু, পটল — ওরা কিছু বলল না?”

“লাল্টু ছিল। ও দেখলাম না শোনার ভান করল।”

“ছি ছি ছি! তিতলি এরকম বুঝিনি তো! ও তো ওর বাবাকে খুব ভালবাসে ভাবতাম! আর কি অকৃতজ্ঞ! ও জানে না, পার্টি না থাকলে ওর বরের চাকরি হত না, সংসারটা ভেসে যেত?” “ওগুলো কোন কথা নয়, জোনাকি। আমাদের দিন শেষ। আমরা মানুষের হাত ছেড়ে দিয়েছি, এবার মানুষ আমাদের হাত ছেড়ে দিল। আমার এবার গোড়া থেকেই সন্দেহ হচ্ছিল। আজ শিওর হয়ে গেলাম। বামফ্রন্ট সরকারের দিন শেষ।”

ভাল লাগলে টাকা দিতে পারেন Google Pay / Paytm / BHIM বা অন্য UPI অ্যাপের মাধ্যমে journopratik@okhdfcbank কে

অথবা

নেট ব্যাঙ্কিং বা অন্য উপায়ে নিম্নলিখিত অ্যাকাউন্টে

Pratik Bandyopadhyay
A/c No. 14041140002343
HDFC Bank
Branch: South Calcutta Girls’ College
IFS Code: HDFC0001404
MICR Code: 700240048

নাম তার ছিল: ২৭

পূর্বকথা: বাড়িতে ফোন করে বিপ্লব জানতে পারে নির্বাচনী প্রচারে বেরিয়ে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েছে বাবা। জেনে উদ্বিগ্ন হয়। বাবা অবশ্য সে উদ্বেগকে পাত্তা দেয় না। বেশ কড়া ভাষাতেই জানিয়ে দেয়, বাবার শরীর নিয়ে বা সবুজগ্রামের আর পাঁচজনকে নিয়ে তার ভাবার দরকার নেই।

এ বারের ভোটে খুব খারাপ কিছু হতে চলেছে। প্রচারে বেরিয়ে এই অনুভূতিটা রবীনের শেষবার হয়েছিল সেই বাহাত্তরের নির্বাচনে। না, তাও নয়। সেবার মনে হয়েছিল ফলাফল কী হবে সেটা বড় কথা নয়, কংগ্রেস ভোটটা ঠিক করে হতে দেবে তো? এবার তা নয়। এবারের অনুভূতিটা রবীন নিজেকেও ঠিক বুঝিয়ে উঠতে পারছে না। আসলে এবার মানুষ যেন কেমন চুপচাপ। কিছুতেই যেন কিছু এসে যায় না। শেষ কবে এত নির্লিপ্ত লেগেছিল ভোটারদের? রবীন অনেক চেষ্টা করেও কিছুতেই মনে করতে পারল না।

দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে হারব জেনেই অনেকগুলো নির্বাচনের প্রচারে নামতে হয়েছে। তখনো কিন্তু সামনে গিয়ে দাঁড়ালে মানুষের চোখে শ্রদ্ধা দেখতে পেয়েছে সে। কমিটেড কংগ্রেস ভোটারদের বাড়িতেও চা খাওয়ার প্রস্তাব পাওয়া গেছে, গরীব দিনমজুরও জ্বলজ্বলে চোখে তাকিয়ে সামান্য কটা টাকা চাঁদা দিয়েছে। সবুজগ্রাম, ক্ষেত্রগ্রাম, বড়িহাটার প্রত্যেকটা গলি, চণ্ডীমণ্ডপ, পুকুর, ডোবা, ঝোপঝাড় রবীন চেনে তার বাড়ির প্রত্যেক কোণের মত। প্রচারে বেরোলেই আগ্রহী মানুষের এগিয়ে এসে কথা বলা, মৃদু অভাব অভিযোগ, কারো শুধু হেসে হাতটা তোলা — এসব বড় ভাল লাগে রবীনের। আর লম্বা মিছিলে একজন স্লোগান তুললে যেই অন্যরা গলা মেলায়, অমনি আজও সেই জোয়ান বয়সের মত গা শিরশির করে ওঠে। নিজেকে হঠাৎই সর্বশক্তিমান মনে হয়। মানুষের এমন কষ্ট নেই যা একদিন দূর হবে না, এমন মানুষ নেই যাকে সাহায্য করা যাবে না — এমন বোধ হয়। ইদানীং তার সঙ্গে চোখ দুটোও ছলছল করে ওঠে৷ পাঁচ-ছ বছর হল কাঁপার অসুখটা বেড়ে যাওয়ায় স্লোগান দেওয়ার সময় গলাটা আর অত উপরে ওঠে না। সকলের মধ্যে নিজের গলাটা অনেক সময় আলাদা করে শুনতে পায় না রবীন। তবু, এই যে রাস্তায় অনেকের সাথে এক লক্ষ্যে হাঁটা, একসাথে গলা মেলানো — এসবে আশ্চর্য শক্তি পাওয়া যায় আজও। নির্বাচনী প্রচারে বেরিয়ে প্রতিবারই রবীনের মনে হয় মানুষ গাইছে, আর ও সেই সুর শুনতে পাচ্ছে। কিন্তু এবার যেন কেমন বেসুরো ঠেকছে। বহুদিনের চেনা লোকগুলোর থেকেও কোন বেতার তরঙ্গ রবীনের কাছে এসে পৌঁছচ্ছে না। বা হয়ত পৌঁছচ্ছে, রবীন ধরতে পারছে না।

এই নিয়ে বড় দুশ্চিন্তায় কাটছিল। রাতে ঘুম হচ্ছিল না ঠিকঠাক, কেবলই পাগল মহারাজের কথাগুলো মনে পড়ছিল। সেই ৯৬-৯৭ সালের কথা। সে বছর পার্টি সদস্যরা অনেকেই অসন্তুষ্ট জ্যোতিবাবুকে প্রধানমন্ত্রী হতে দেওয়া হল না বলে। জ্যোতিবাবু নিজেও বললেন সিদ্ধান্তটা ঐতিহাসিক ভুল। সেই সময়ে এক বিকেলের আড্ডায় মহারাজ বলেছিলেন “মাস্টারমশাই, যতক্ষণ মানুষ পাশে আছে ততক্ষণ ভুল সিদ্ধান্তও আপনার পার্টির গায়ে লাগবে না। যখন মানুষ মুখ ফিরিয়ে নেবে, তখন আবার ঠিক সিদ্ধান্তেও শাস্তি পেতে হবে।” ইউ পি এ সরকারের থেকে সমর্থন তুলে নেওয়ার সিদ্ধান্তটা কি সেরকমই একটা হয়ে দাঁড়াবে শেষ অব্দি? রবীনের কেবলই মনে হচ্ছে মানুষের মন বদলে গেছে। কেন মনে হচ্ছে?

বড়িহাটার বিরাট ফুটবল মাঠে সেই ষাটের দশক থেকে পার্টি বিরাট বিরাট জনসভা করেছে। জ্যোতিবাবু এসেছেন অনেকবার। প্রমোদ দাশগুপ্ত, বিনয় চৌধুরী, হরেকৃষ্ণ কোঙার, শৈলেন দাশগুপ্ত, বিমান বসু — কেউ বাদ যাননি। সেই মাঠে জনসভা হল। মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন প্রধান বক্তা। যথারীতি মাঠ কানায় কানায় ভরে গেল। কিন্তু দর্শকাসনে বসে রবীনের মনে হল মাঠ জুড়ে মাত্র কয়েকজন মানুষ। বেশিরভাগ যেন কিছু শুনছে না, শুনতে চাইছেও না। টিউশন পালিয়ে কজন ছেলে এসেছে মিটিং শুনতে? রবীন বারবার বোঝার চেষ্টা করল। রাতের রান্নাবান্না দুপুরেই সেরে রেখে কতজন গৃহবধূ এসেছে? কতজন পার্টি সদস্য সপরিবারে এল? মাঠের আশপাশের সম্ভ্রান্ত বাড়ির ছাদগুলো থেকে উঁকি মারছে কি কেউ, অন্তত বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যকে একবার চাক্ষুষ করার লোভে? রবীন হতাশ হল।

পরদিন হরিমতীর ঝিলের ধারে বসে বিড়ি ধরিয়ে আশঙ্কাটার কথা ফাল্গুনী আর শিবুকে বলল রবীন। আজকাল তো এসব কথা যে কোন কমরেডকে বলা যায় না। তাছাড়া এই দু তিনজন ছাড়া আর কোন কমরেডই বা বলরাম আর এল সি এস শ্যামলের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে রবীনের সাথে আড্ডা মারতে আসে?

“না, এবার বিরোদীরা আগের চেয়ে ভাল ফল তো করবেই। মমতা যে মানুষের মধ্যে ছাপ ফেলেচে সে তো ঠিকই,” শিবু বলে।

“আমরাই তো দিনে দিনে বড় নেত্রী বানালাম ওকে। আমরাই ওর মাথা ফাটালাম, আমরাই এক গাদা ভুল করলাম। কি তাই না, রবীনদা?” ফাল্গুনী জিজ্ঞেস করে।

“সেটা আছে, তবে ও-ও ঠিক জায়গায় ঝাঁপিয়ে পড়ে তো। ভিখারি পাসোয়ান বল, সিঙ্গুর বল, নন্দীগ্রাম বল। ও ঠিক গিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছে তো,” চিন্তিত রবীন বলে। “কিন্তু সেটা বড় কথা না। আসলে কে কত বড় নেতা, নেত্রী হবে সেটা ঠিক করে সাধারণ মানুষ। তাদেরই আমরা চটিয়ে ফেলেছি বলে আমার ধারণা।”

“মানুষ চটেচে। তার সুফল মমতা পাবে ঠিকই। গোটা দশেক সিট এবার জিতবে ওরা। তার মধ্যে আমাদেরটাও থাকতে পারে। তার বেশি না,” শিবু বেশ জোরের সঙ্গে বলে। রবীন চুপ করে থাকে।

“ও মা!” ফাল্গুনী অবাক হয়। “তুমি কি বলছ তার চেয়েও বেশি পাবে?”

“ঠিক বুঝতে পারছি না রে। যা যা মনে হচ্ছে সবটার পেছনেই যে কোন যুক্তি দিতে পারব তা না। কিন্তু যা হবে মনে হচ্ছে… তা যেন সত্যি না হয়।”

“আপনি তো ভয় পাইয়ে দিচ্চেন, রবীনদা,” শিবু হেসে বলে। “এতটা খারাপ ভাবচেন কেন? হ্যাঁ, এবারের ভোট শক্ত ভোট। কিন্তু শক্ত ভোট তো আপনি অনেক করেচেন। চুরাশি সালের ভোট ভাবুন। ইন্দিরা খুন হল বলে ওরা কি সমর্থন পেল! তাও পশ্চিমবাংলায় আমাদের থেকে বেশি তো পেল না। এবার তৃণমূলও নয় ১২-১৪ টাই পাবে।”

“রবীনদা অবশ্য সেই সিঙ্গুরের সময় থেকে বলছে মানুষের ধৈর্য শেষ,” ফাল্গুনী বিড়বিড় করে। “তার মধ্যে প্রকাশ কারাত আবার এরকম একটা কাণ্ড করতে গেল… লোকে কিন্তু ভালভাবে নেয়নি।”

“রেখে দে তোর প্রকাশ কারাত,” রবীন একটু রেগেই যায়। “এখানে বত্রিশ বছর আমাদের সরকার চলছে, লোকে কারাত কী করল তাই দেখে ভোট দেবে?”

শেষ অব্দি রবীন ওদের খুলে বলতে পারল না তার ঠিক কী মনে হচ্ছে। আসলে ওদের কথা শুনে নিজেরও মনে হল, হয়ত অতিরিক্ত উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ছে ও। অকারণে। হয়ত তার জন্যে শরীরটাও কিছুটা দায়ী। কদিন ধরে সেই বুকের ভেতর অস্বস্তিটা বেশ ঘনঘন হচ্ছে। বিড়ি খেলেও যাচ্ছে না। তার উপর মিছিলে বেরিয়ে মাথা ঘুরে অজ্ঞান হয়ে গিয়ে এক বিশ্রী কাণ্ড হল। তাই হয়ত একটু বেশি নেতিবাচক চিন্তা ভাবনা মনে আসছে। এসব মন থেকে ঝেড়ে ফেলাই ভাল। জোনাকি বোধহয় ঠিকই বলে। বয়স হচ্ছে সেটা মেনে নিয়ে অনিয়ম করা কমানো উচিৎ। তাহলে শরীর, মন দুটোই ভাল থাকবে।

প্রচারের শেষ দিনেও কিন্তু মনের মধ্যে খুঁতখুঁতুনি থেকেই গেল। সন্ধের পর পার্টি অফিসে একটা মিটিং শেষ করে রবীন বাড়ি ফিরতে গিয়ে বুঝল, হাত পা আর চলছে না। আসলে সেই অসুস্থতার পরেও পরিশ্রমটা তো আর কমানো যায়নি, ভোটের মরসুমে সেটা সম্ভবও না। অনভ্যাস থেকেই হয়ত এত ক্লান্তি। আগের মত তো সারা বছর পরিশ্রমটা করা হয় না। করলে তো ক্ষমতাবানদের গোঁসা হবে। ভাববে রবীন ঘোষাল বুড়ো বয়সে আবার নেতা হওয়ার চেষ্টা করছে। একমাত্র এই ভোটের সময়টাতেই বাবুদের আপত্তি থাকে না। কে জানে, হয়ত তখন বাবুদের মনে হয় এই বুড়োটার এখনো দাম আছে? মরা হাতিও তো লাখ টাকা হয়।

বাড়ি ঢুকতেই লোডশেডিং। আজকাল এই সময়ে লোডশেডিং হয় না সাধারণত। রবীন ভেবেছিল গা ধুয়ে একটা ঘুম দেবে, তাতে যদি শরীরটা ঠিক হয়। তার উপায় রইল না। গা ধুয়ে এসে অবশ্য অনেকটা ভাল লাগল। মুড়ি চা খেয়ে বারান্দায় দাঁড়িয়ে রবীন দেখল ঘরের ভেতর ভীষণ গরম থাকলেও, বাইরে চমৎকার হাওয়া দিচ্ছে। না বলবে ধরে নিয়েই জোনাকিকে বলল “মাদুরটা কোথায় গো? চলো না একটু মাঠে গিয়ে বসি। ঘরে যা গরম।” কে জানে সূর্য সেদিন কোন দিকে অস্ত গিয়েছিল? জোনাকি “তুমি যাও” না বলে বলল “চলো।”

উল্টো দিকের মাঠে মাদুর পেতে বসল দুজনে। কতদিন পরে? রবীন ভেবে দেখল অন্তত কুড়ি বছর পরে তারা দুজন মুখোমুখি বসেছে। শুধু দুজনে। কৃষ্ণ পক্ষ চলছে, তার উপর সারা পাড়ায় লোডশেডিং, তাই মুখ দেখা যাচ্ছে না। ভালই হল। দুজনে দুজনকে দেখে মুগ্ধ হওয়ার দিন কবে চলে গেছে। এখন একান্তে মুখোমুখি হলে হয়ত হাজারটা অভিযোগ মনে পড়বে দুজনেরই। এই আড়ালটুকুর সুযোগে রবীন একটা ঝুঁকি নিয়ে ফেলল।

“একটা গান করো না, জোনাকি?”

“ধুত! দেখছ না মাঠে আরো লোক রয়েছে?”

“তাতে কী?”

“গান ফান আমার আর আসে না। তোমার হেঁসেল ঠেলতে ঠেলতে আমার সব গেছে।”

রবীন আর ঘাঁটাল না।

কিছুক্ষণ চুপ করে থাকার পর নিজেরই গাওয়ার ইচ্ছে হল। গলার অবস্থা, আশপাশে ছড়িয়ে থাকা প্রতিবেশীদের উপস্থিতি সত্ত্বেও রবীন না গেয়ে থাকতে পারল না। “আমার যে দিন ভেসে গেছে চোখের জলে।” গলাটা খুব কাঁপলেও নেহাত খারাপ লাগছিল না নিজের কানে। কিন্তু “তার ছিঁড়ে গেছে কবে” তে গিয়ে একেবারে ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। রবীন প্রাণপণে হেসে উঠে বলল “ধুস শালা। গলাটা অ্যাক্কেরে গেছে গিয়া।” ঠিক তক্ষুণি বাড়ির সামনে একটা রিকশা এসে থামল। অন্ধকারে জোনাকি আর রবীনের বোঝার কোন উপায় ছিল না কে এল। রিকশাওয়ালা ভাড়া নেওয়ার সময় “দে না তোর যা ইচ্ছে” বলছে দেখে রবীন ভুরু কুঁচকে ভাবছিল কে হতে পারে। হঠাৎ জোনাকি লাফিয়ে উঠল “ও মা! তুই?” তারপর কদিন আগে একটা বিয়ের প্যান্ডেল হয়েছিল বলে মাঠে যে গর্তগুলো হয়ে আছে সেগুলোর কথা বেমালুম ভুলে গিয়ে থপথপিয়ে বাড়ির দিকে দৌড় দিল। রবীনের বুকের ভেতরটা ছ্যাঁত করে উঠল। ছেলেটা খবর না দিয়ে এমন হঠাৎ চলে এল! শরীর খারাপ? নাকি অফিসে কোন গোলমাল? চাকরিটা আছে তো? রবীনও তাড়াতাড়ি উঠে পড়ল। মাদুর গোটাতে গোটাতে শুনতে পেল ছেলে মাকে জিজ্ঞেস করছে “বাবা এখনো ফেরেনি? প্রচার তো পাঁচটায় শেষ হয়ে গেছে।”

ভাল লাগলে টাকা দিতে পারেন Google Pay / Paytm / BHIM বা অন্য UPI অ্যাপের মাধ্যমে journopratik@okhdfcbank কে

অথবা

নেট ব্যাঙ্কিং বা অন্য উপায়ে নিম্নলিখিত অ্যাকাউন্টে

Pratik Bandyopadhyay
A/c No. 14041140002343
HDFC Bank
Branch: South Calcutta Girls’ College
IFS Code: HDFC0001404
MICR Code: 700240048

নাম তার ছিল: ২৬

পূর্বকথা: পরিচারিকা পার্বতীদির খোঁজ করতে তার বাড়ি পৌঁছে বিপ্লব বড়পিসির বাড়ির গন্ধ পায়, মনে পড়ে সবুজগ্রামের বাড়িতে তার ছোটবেলায় কাজ করত লক্ষ্মীদি। তার কথা। অনেকদিন পর বাবাকে ফোন করতে ইচ্ছা করে।

তখন ভোটের মরসুম। মেয়াদ ফুরোবার মাত্র কয়েক মাস বাকি থাকতে বিপ্লবের বাবার পার্টি আর অন্য বাম দলগুলো মনমোহন সরকারের উপর থেকে সমর্থন প্রত্যাহার করে নিয়েছিল। মুলায়মের সমর্থনে সরকার বাঁচিয়ে শেষ পর্যন্ত যথাসময়েই লোকসভা নির্বাচনে গেছে সরকার।

“শুধু সরকার ফেলার চেষ্টা করে প্রকাশ কারাতের শান্তি হয়নি, আবার সোমনাথ চ্যাটার্জিকে নিজের মর্জি মত চালাতে গেছিল। লোকটা শোনেনি বলে পার্টি থেকে বার করে দিল! শালাদের একটাও ভোট দেয়া উচিৎ না।”

বিপ্লবের বাঙালি সহকর্মীরা তখন উঠতে বসতে এসব কথা বলছে। বছর দুয়েক আগে হলে সে-ও তেড়ে গাল দিত, এখন শুধু চুপচাপ শুনে যায়। কে ঠিক, কে ভুল তা নিয়ে কিছুতেই আর মনস্থির করতে পারছে না। বাবার সাথে কথা হলে অবশ্য এসব কথা তুলবে না ঠিক করে নিয়েছে।

সাধারণত বার তিনেক রিং হলেই মা ফোনটা ধরে। কিন্তু এবার রিং হয়ে হয়ে কেটে গেল, ধরার নাম নেই। বিপ্লবের তর সইছিল না। তাই সঙ্গে সঙ্গেই আবার ফোন করল। এবার একবারেই মা ধরল।

“মা, বাবা বাড়ি আছে? একটু দাও তো।”

“বাড়িতে তো আছে, কিন্তু ঘুমোচ্ছে। সন্ধেবেলা কথা বলিস,” মা গলাটা বেশ নীচু করে বলল।

“ঘুমোচ্ছে!” বিপ্লব হাতের ঘড়িতে দেখল একটা বাজে। “ভোটের সময় বাবা এই সময় বাড়িতে ঘুমোচ্ছে! স্কুলেও যায়নি? শরীর খারাপ নাকি?”

“দাঁড়া। এখান থেকে কথা বললে ঘুম ভেঙে যাবে। তুই ফোন রাখ, আমি তোকে মোবাইল থেকে করছি।”

প্রবল উৎকণ্ঠা নিয়ে ফোনটা কেটে দিল বিপ্লব। ভোটের মরসুমে বাবাকে কখনো ভরদুপুরে ঘুমোতে দ্যাখেনি। ভোটের প্রচার চলছে মানেই বাবাকে খানিকক্ষণের জন্যেও বাড়িতে পাওয়া যাবে না — এটাই নিয়ম। সাতসকালে ঘুম থেকে উঠে পড়বে, দাঁতটা মেজে দু তিন গ্লাস জল খেয়েই বেরিয়ে যাবে, স্কুল থাকলে একেবারে শেষ মুহূর্তে ফিরেই “জোনাকি, ভাত বাড়ো” বলে দড়িতে টাঙানো গামছাটা নিয়ে পুকুরের দিকে দৌড়বে, ফিরে কোন মতে ভাত মুখে দিয়েই স্কুল, আবার স্কুল থেকে ফিরেই এক কাপ চা আর মুড়ি দুধ বা চিড়ে দুধ খেয়ে সাইকেল নিয়ে বেরিয়ে যাবে, ফিরবে রাত বারোটা নাগাদ। এই হচ্ছে বিপ্লবের বাবার চিরকালের রুটিন। নিজে প্রার্থী হোক বা না হোক, ভোটটা পঞ্চায়েত, মিউনিসিপ্যালিটি, বিধানসভা, লোকসভা — যা-ই হোক, এর অন্যথা কখনো হয়নি। তাহলে এবার হঠাৎ কী হল?

মা মিনিট খানেকের মধ্যেই ফোন করল।

“আরে, এ বারে তো গরমটা ভীষণ পড়েছে। তার মধ্যেই প্রচারে টো টো করে ঘোরা। আজকে মিছিল ছিল প্রবীরদাকে নিয়ে। স্টেশনের ওখানে গিয়ে হঠাৎ সান স্ট্রোকের মত হয়ে গেছে।”

“তারপর? অজ্ঞান হয়ে গেছিল?”

“অজ্ঞানের মতই। তারপর যা-ই হোক, ফাল্গুনী, বল ওরা তো সব ছিল। ওরা ধরাধরি করে বিন্দুর দোকানে বসিয়েছে, মাথায় জল টল দিয়েছে। তারপর প্রবীরদা ওদের বলেছেন ‘আমার গাড়িটা করে রবীনকে বাড়ি পৌঁছে দিয়ে আয় তোরা।’ তাই দিয়ে গেল। এই একটু শুয়েছে।”

“ডাক্তার দেখাতে হবে তো।”

“ওখানেই একজন বুদ্ধি করে অমলেন্দুকে ডেকে এনেছিল। ও তো স্টেশনের কাছেই নার্সিংহোম করেছে।”

“কী বলেছে অমলকাকু?”

“ঐ সান স্ট্রোকই বলেছে। প্রেশারটা একটু লো আছে। তবে বলেছে চিন্তার কিছু নেই। কদিন বাড়ি থেকে একদম না বেরোতে বলেছে। এখন তোর বাবা শুনলে হয়। একটা কথা তো শোনে না। এত করে বলি একটা ছাতা নাও, কি টুপি পরো। শোনে কোথায়?”

“সে তো চিরকালই। কিন্তু এরকম তো আগে হয়নি! বাবার আবার প্রেশার লো হল কবে? কোনদিন তো এসব দেখিনি! অসুস্থ হতে তো সেই একবারই দেখেছি। ছোটখাট শরীর খারাপ তো কোনদিন হয় না বাবার! তাহলে?”

“আরে এতদিন হয়নি। তা বলে কখনো হবে না? বয়সটা তো হচ্ছে। সেটা দ্যাখ। আমি দিন রাত বলি, এখন আর আগের মত উল্টো পাল্টা রুটিনে চললে হবে না। যখন ইচ্ছে চান করলাম, যখন ইচ্ছে খেলাম, দুপুর রোদে টো টো করে ঘুরলাম — এসবের বয়স গেছে। জোর করে অস্বীকার করতে চাইলে তো হবে না..”

“না না, তুমি বুঝতে পারছ না। হঠাৎ করে এরকম হবে কেন? অন্য একটা ডাক্তার ফাক্তার দেখাও, একবার ই সি জি করিয়ে নাও। লাইনের ওপারে কে একজন কার্ডিওলজিস্ট থাকে না? সেই বাবাদের পার্টি অফিসের কাছে?”

“ওরে বাবা, অমলেন্দুর কাছেই তো ই সি জি মেশিন আছে। তেমন কিছু মনে হলে ও-ই করে নিত। তুই এত চিন্তা করিস না। তোর বাবা ঠিক আছে।”

“আমি তাও বলছি তুমি আরেকবার বাবাকে নিয়ে যাও সন্ধেবেলা। দরকার হলে আমার ঘাড়ে চাপিয়ে দাও দোষটা, বলো ‘ছেলে অতিষ্ঠ করে দিচ্ছে ই সি জি, ই সি জি করে।’”

অনেক চাপাচাপি করায় মা শেষ অব্দি রাজি হল, কিন্তু বিপ্লব বুঝতে পারল মা খুব একটা খুশি হল না। ফোনটা রাখার কয়েক মিনিট পরেই অবশ্য বিপ্লব নিজেই বুঝতে পারল, ও অকারণেই বেশি উতলা হয়ে পড়েছে। এ বছর হায়দরাবাদেও যা গরম পড়েছে, সবুজগ্রামে তো অসুস্থ হয়ে পড়া স্বাভাবিক। যা ঘাম হয় ওখানে। আর সত্যিই তো বাবার বয়স হচ্ছে। এ বছরের শেষেই তো বোধহয় রিটায়ারমেন্ট। সেই লোক যে আগের মত দুপুর রোদে ঘুরে ঘুরে ভোটের প্রচার করতে পারবে না তাতে আশ্চর্য কী?

কিন্তু বাবাকে আটকানোই বা যাবে কী করে? আটকানো কি উচিৎ হবে? ওটা বন্ধ হয়ে গেলে কী নিয়ে বাঁচবে লোকটা? এমনিতেই তো গত এক দশকে বাবার রাজনৈতিক কার্যকলাপ অনেক কমে এসেছে মনে হয়। এটুকুও করতে না দিলে তো জীবন্মৃত হয়ে থাকতে হবে মানুষটাকে। বিপ্লব ভাবল আরেকবার ফোন করে মাকে বলবে কদিন যেন বিশ্রাম নিতে বলে, কিন্তু সব ছেড়ে ঘরে বসে থাকতে যেন জোর না করে। ফোনটা আবার হাতে নিয়েও শেষ অব্দি করল না। থাক। বাবা ঘুমিয়ে নিক, না হয় একেবারে রাতে ফোন করা যাবে। ততক্ষণে ই সি জি করিয়ে ফিরে আসবে। “কিছু পাওয়া যায়নি”। এই কথাটাই অমলকাকু পরীক্ষা করে বলে দিলে নিশ্চিন্ত হওয়া যায়।

মৃদু উৎকণ্ঠা কিছুতেই গেল না। সেদিন আর অন্য ছুটির দিনের মত কোথাও বেরোল না বিপ্লব। বারবার ঘড়ি দেখেই কেটে গেল বিকেল, সন্ধে। টিভিটা চালু ছিল সারাক্ষণই, কিন্তু সেখানে কী যে চলছিল বিপ্লবের মনে নেই। সন্ধে নামার পর থেকে বিপ্লব ভাবছিল নিজেই ফোনটা করবে, নাকি মায়ের ফোনের অপেক্ষায় থাকবে? মাকে তো বলেও দেওয়া হয়নি ডাক্তার দেখিয়ে ফিরেই একবার ফোন করতে।

ভাবতে ভাবতে নটা নাগাদ ফোন এল।

“তুই শুধু শুধু এত টেনশন করলি। কিচ্ছু হয়নি বাবার। আমাদের দেখেই অমল বলল ‘কিচ্ছু হয়নি, বৌদি। এই গরমে অনেকেরই ওরকম হচ্ছে।’ তাও আমি বললাম ছেলে ফোন করে বলেছে ই সি জি করাতে, তুমি একবার করেই নাও। তাই করল। কিচ্ছু পাওয়া যায়নি। হার্ট একদম ঠিক চলছে।”

শুনে নিশ্চিন্ত হল বিপ্লব। তারপরই বলল “একবার বাবাকে দাও তো ফোনটা।” বিপ্লব শুনতে পেল মা চেঁচিয়ে বাবাকে ডাকল। বাবা জিজ্ঞেস করল “আমাকে? কেন?” মা গলাটা আরো উপরে তুলে বলল “কী করে জানব? এসে ধরো না।”

অবাক হওয়া স্বাভাবিক। প্রবাসী হয়ে যাওয়ার পর থেকে কখনো বাবাকে ডেকে ফোনে কথা বলেনি বিপ্লব। বাবার সংশয় টের পেয়ে তারও হঠাৎ মনে হল, তাই তো! বাবাকে বলবটা কী? সোজা জিজ্ঞেস করব লক্ষ্মীদির খবর? কেমন অদ্ভুত হবে না ব্যাপারটা? কিছু ঠিক করতে পারার আগেই বাবা এসে ফোনটা ধরে ফেলল।

“হ্যালো।”

যাক, বাবার গলাটা একেবারেই পাল্টায়নি।

“বাবা, শরীর ঠিক আছে… এখন?”

“শরীর তো ঠিকই ছিল৷ ডাক্তারও তো তাই বলল। তোর এত চিন্তা করার দরকার নেই। তুই নিজের দিকে নজর দে, চাকরিটা মন দিয়ে কর। আমরা নিজেদের ঠিক সামলে নেব।”

হয়ত মনের ভুল, বাবা খুব একটা কিছু ভেবে বলেনি। তবু কথাগুলো থাপ্পড়ের মত মনে হল বিপ্লবের। সহসা কথা খুঁজে না পেয়ে ও বলেই ফেলল “বাবা, লক্ষ্মীদি এখন কোথায় থাকে?”

“লক্ষ্মী? কোন লক্ষ্মী? আমাদের মহিলা সমিতির নেত্রী?”

“না না। ঐ যে আমাদের বাড়িতে কাজ করত। আমাকে মাঝে মাঝে নিয়ে যেত সঙ্গে করে…”

“ও আচ্ছা। ও এখানেই আছে। যে বাড়িতে থাকত সে বাড়িতেই। কলকাতায় কোন একটা জামাকাপড়ের কারখানায় কাজ করে। এই তো কাল ওদের পাড়ায় মিটিং ছিল, দেখা হল।”

“একা একাই থাকে?”

“হ্যাঁ হ্যাঁ। ও খুব সাহসী মেয়ে। প্রথম প্রথম এ সে বিরক্ত করত। এখন বুঝে গেছে সুবিধে হবে না। মনের সুখেই তো আছে মনে হল। ঘরটা পাকা করেছে, বলল বর্ষার আগে ছাদটাও ঢালাই করিয়ে নেবে। আমায় বলল ‘কাকু, আমার বাড়ি দেখে যাও।’ দেখাল, চা খাওয়াল। তোর কথাও জিজ্ঞেস করছিল। বলল ‘ভাইয়ের বিয়ে দেবে না?’ আমি বললাম ভাই বিয়ে করবে কিনা সে আমি জানি না বাপু। ভাই জানে আর ভাইয়ের মা জানে। কিন্তু তুই হঠাৎ ওর কথা জিজ্ঞেস করছিস?”

“না, এমনি। হঠাৎ মনে পড়ল…”

“আচ্ছা, ধর। মার সাথে কথা বল।… ও, ভাল কথা। সেদিন তোর মাকে কী একটা বলছিলিস… জোনাকি শুনলাম বলল ‘ওসব নিয়ে তোর ভাবার দরকার নেই… মানিয়ে নিতে হয়। কী ব্যাপার সেটা? অফিসে কিছু…?”

“সেদিন নয়। অনেকদিন আগে বলেছিলাম। আমাদের এখানে অনেকের চাকরি গেল তো…”

“অ। তা তোমার মা তো ঠিকই বলেছে। কার কোথায় চাকরি গেল তা নিয়ে ভেবে কী হবে? ভাবতে শুরু করলে তো সারাদিন ঐ নিয়েই ভাবতে হবে, কাজকম্ম আর কিছু হবে না। তোমরা ওপরে উঠবে, কিছু লোক নীচে পড়বে না? এই তো জগতের নিয়ম। অভ্যেস করে নাও। আমি তো ভেবেছিলাম তোমার অ্যাদ্দিনে অভ্যেস হয়েই গেছে। যাকগে। নাও তোমার মায়ের সাথে কথা বলো।”

আজ বিপ্লব বাবার সাথে কথা বলবে বলেই ফোন করেছিল, মার সাথে তো দু বেলাই কথা হয়। মা ফোনটা ধরে আরো কী সব যেন বলল, বিপ্লব না শুনেই “হ্যাঁ হুঁ” করে গেল। তখন সে ভাবছে, বাবার বকার ধরণটা কত বদলে গেছে। গলা চড়াল না একটুও, তেমন কড়া কথাও বলল না। তবু বোঝা গেল, বাবা বিপ্লবের অন্যের চাকরি যাওয়া নিয়ে উতলা হওয়াকে ন্যাকামির বেশি কিছু মনে করে না। বুঝিয়ে দিল তার জগৎ আর বাবার জগৎ একেবারে আলাদা। বিপ্লবের জগৎ নিয়ে তার বাবার বিশেষ আগ্রহ নেই। যে জীবন নিজে বেছে নিয়েছ, তা নিয়েই থাকো, সবুজগ্রামের জীবন আর তোমার নয়, তা নিয়ে মাথা ঘামিয়ো না। বাবা যেন এই কথাটাই বলে দিল।

ফোনটা ছেড়ে দেওয়ার পর বিপ্লব ভেবে দেখল তার যতই খারাপ লাগুক, সবুজগ্রামের যে মানুষগুলোর কথা সে এত ভাবছে, তারা এখন বহু দূরের কোন গ্রহেরই মত। অনেক দূর থেকে সেসব গ্রহের আলো দেখে বেশ লাগে, ওখানে যেতে ইচ্ছেও করে। কিন্তু মাঝের দূরত্বটা কয়েক আলোকবর্ষের। তাছাড়া ঐসব মানুষগুলোকে, ঐ জায়গাটাকে, ঐ জীবনযাত্রাকে সত্যিই তো প্রবল বিতৃষ্ণায় সে নিজেই ছেড়ে এসেছিল। কেউ কেউ যেমন এখনো বিশ্বাস করে সূর্য পৃথিবীর চারদিকে ঘোরে, তেমনি বিপ্লবও তো এতদিন ভেবে এসেছে তার জীবনের কেন্দ্রে সে নিজে, বাকি সবাই, সবকিছুই তাকে ঘিরে। এখন প্রান্তের প্রতি প্রেম উথলে উঠলে চলবে কেন? বাবার সাথে কার্যত সম্পর্ক তুলে দেওয়ার এত বছর পরে হঠাৎ শরীর নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করলে বাবাই বা কেন বিশ্বাস করবে ছেলে সত্যিই উদ্বিগ্ন?

কিন্তু টানটা তো মিথ্যে নয়, উদ্বেগটাও যে মিথ্যে নয়। বাবার জন্যে আজ এত উতলা হয়ে পড়ে বিপ্লব নিজেও অবাক। এতটা টান যে এখনো ছিল ভেতরে সে কথা সে নিজেও টের পায়নি এতদিন। হায়দরাবাদে চলে আসার পর থেকে মা বেশ কয়েকবার ফোনে বলেছে “বাবাকে দিই? কথা বল একবার?” বিপ্লব সজোরে প্রত্যাখ্যান করেছে। এই যে মা বলল বাবার বয়স হচ্ছে, সেটা হয়ত এই জন্যেই সে টের পায়নি। হয়ত বাড়ি ছেড়ে চলে আসার পরে বাবার আরো কয়েকবার শরীর খারাপ হয়েছে। সে তো বাবার কথা জিজ্ঞেস করা দরকার বলেই মনে করেনি কখনো।

ভাবতে ভাবতে বড় অস্থির লাগে। খেয়াল হয় রান্নাবান্না কিছু করা হয়নি। আসলে শনিবার রাত্তিরে তো বাইরেই খায় বরাবর। কিন্তু আজ আর সে উৎসাহ নেই। খিদেটা কখন মরে গেছে। বিপ্লব কয়েকটা পাঁউরুটি সেঁকে নিয়ে ফ্রিজ থেকে টমেটো সস বের করে লাগিয়ে খাবে বলে। টিভিটা চালিয়ে দেয়। খবর দেখা বন্ধ করে দিয়েছে অনেকদিন। আজ মনে হয় ভোটের খবর দেখলে মন্দ হয় না। কোন পথে চলছে পশ্চিমবঙ্গের ভোটের প্রচার? কোনদিন না দেখা স্টার আনন্দই দেখা যাক না হয়। এ প্রার্থী সে প্রার্থী, তর্কবিতর্ক দেখতে দেখতে বিপ্লবের মন চলে যায় ছোটবেলায়।

সালটা বোধহয় ১৯৯৬। সেবারই প্রথম বিপ্লবদের লোকসভা কেন্দ্র থেকে বামফ্রন্ট মনোনীত সি পি আই (এম) প্রার্থী প্রবীরজেঠু। বাবা একদিন সকালে স্কুলে যাওয়ার সময়ে বলল “আজকে সন্ধেবেলা তোকে নিয়ে যাব। ক্ষেত্রগ্রামে এক জায়গায় পাবলিক মিটিং আছে, প্রবীরদা বলবে ওখানে। তোর খুব ভাল লাগবে। দারুণ বক্তা। মার্কসবাদ একেবারে গুলে খেয়েছে তো।” বিপ্লবের তো দারুণ উত্তেজনা। তখন ও ক্লাস টেন। গণশক্তির পাতায় প্রবীর দাশগুপ্তের লেখা নিয়মিত পড়ে। রুশ বিপ্লব, লাতিন আমেরিকার বামপন্থী আন্দোলন, ভিয়েতনামের কমিউনিস্ট পার্টি — এসব নিয়ে ওঁর লেখাগুলো অসাধারণ লাগে বিপ্লবের। স্কুলে গিয়ে বন্ধুদের কাছে ঐ লেখাগুলোর উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করে। সেই প্রবীর দাশগুপ্ত বলবেন আর ও সামনে বসে শুনবে। ভাবা যায়!

মিটিংটা ছিল লক্ষ্মীদিদের পাড়ার মাঠে। ছোট্ট মঞ্চ, সামনে মাটিতে ত্রিপল পেতে বসার ব্যবস্থা। সাড়ে ছটায় মিটিং শুরু হওয়ার কথা। কিন্তু যাদের জন্যে মিটিং তারা লোকের বাড়িতে কাজ করে, ভ্যান রিকশা টেনে, কোন বাড়ির সেপটিক ট্যাঙ্ক পরিষ্কার করে বাড়ি ফিরবে। তারপর চান করবে, খাবে দাবে, তবে তো মিটিং শুনতে আসবে। তাই শুরু হতে সাতটা বেজে গেল। ওটা বলকাকুর এলাকা। তাই হম্বি তম্বি করে ঝটপট সকলকে ডেকে আনার ব্যবস্থা করল। নইলে হয়ত আরো দেরী হত।

লক্ষ্মীদি বিপ্লবকে দেখতে পেয়েই পাশে এনে বসিয়েছিল। একেবারে সামনের সারিতে। প্রবীর দাশগুপ্ত যথাসময়েই এসে গেছেন এবং এসে থেকেই বারবার ঘড়ি দেখছেন। ভদ্রলোকের বেশ সমীহ জাগানো চেহারা। লম্বা, ফরসা, কামানো গাল, পাটভাঙা ধুতি পাঞ্জাবি। বিপ্লব হাঁ করে দেখছিল। ও বাবার কাছে প্রমোদ দাশগুপ্তের গল্প শুনেছে, বাবার রাজনৈতিক গুরুকে হীরেন্দ্রনাথ ঘোষকে দু একবার দেখেছে। এঁকে যেন তেমনই মনে হচ্ছে, যদিও এঁর বয়স পঞ্চাশের বেশি হবে না। মঞ্চটা যেহেতু বেশ নীচু আর ছোট, তাই সকলের কথাবার্তাই শুনতে পাওয়া যাচ্ছিল। বিপ্লব শুনতে পেল প্রবীর দাশগুপ্ত বলছেন “অ্যাই বল, তোমাদের অনুষ্ঠানসূচী একটু চেঞ্জ করতে হবে ভাই। আমার কলকাতায় একটা জরুরী মিটিং আছে, গাড়িটাও সঙ্গে নেই। একটা অন্য গাড়ি আসার কথা, সেটাকে বসিয়ে রাখা যাবে না। তুমি রবীনকে সভাপতি ঘোষণা করো। তারপরই আমি বলব, বলে বেরিয়ে যাব। রবীন, তুমি লাস্ট বক্তা ভাই।”

বলকাকু মিটিং শুরুর ঘোষণা করতে গিয়েই মিনিট পাঁচেক কাটিয়ে দিল। বিপ্লবের ভাল লাগছিল না, ও লক্ষ্য করল ও পাড়ার লোকেরাও মশা নিয়েই বেশি ব্যস্ত। প্রবীরজেঠু মাইক ধরতে ও নড়ে চড়ে বসল। উনি প্রায় আধ ঘন্টা বললেন। বিপ্লব সবটাই মন দিয়ে শুনল, কিন্তু আর কেউ শুনল কিনা ঠিক বোঝা গেল না। পেছন থেকে নীচু স্বরে কথার আওয়াজ আসছিল, আর এক বৃদ্ধা তো ঢুলতে ঢুলতে বিপ্লবের গায়ে পড়েই গেলেন একবার। অন্যরা খুক খুক করে হেসে তাঁকে সোজা করে বসিয়ে দিল। এসবের মাঝে বক্তা কিন্তু নির্বিকার চিত্তে বলে গেলেন। শেষে হাততালিও পেলেন। বক্তৃতা শেষ হতেই হনহনিয়ে মাঠের পাশের রাস্তায় দাঁড় করানো গাড়ির দিকে চলে গেলেন। বলকাকু আর অন্যান্য স্থানীয় পার্টিকর্মীরা প্রায় সবাই পিছু পিছু গেল। মঞ্চের উপর একা বিপ্লবের বাবা।

বাবা বলতে শুরু করল “আপনারা সকলেই আমাদের পার্টির আপনজন। আপনাদের তো নতুন করে কিছু বলার নেই। এবারের নির্বাচনের প্রেক্ষাপট, আমাদের কর্মসূচী ইত্যাদিও আমাদের প্রার্থী খুব সুন্দর করে বলে গেলেন। আমি আর পুনরাবৃত্তি করব না। আমি বরং একটা গল্প বলি?”

শ্রোতারা, যাদের অধিকাংশই মহিলা, সমস্বরে “হ্যাঁ হ্যাঁ” করে উঠল। বাবা শুরু করল।

“এটা এক মেয়ের গল্প। গরীব পরিবারের মেয়ে, লেখাপড়া শেখেনি প্রায়। ছোট বয়সেই বিয়ে হয়ে গেছে। বর কারখানায় কাজ করে। ডিউটি করে এসে আর শরীরে কিছু থাকে না। কেবল নেশা করে আর ঘুমোয়। আবার সকাল হলে ডিউটি চলে যায়। আর কোন কোনদিন নেশা করে বউকে ধরে পেটায়। এই করেই মেয়েটার কষ্টের জীবন কাটছিল। তারপর হল কি, মেয়েটার একটা ফুটফুটে ছেলে হল। ছেলেকে নিয়েই মায়ের দিন কাটে। মা ভাবে ছেলে আমার বড় হবে, ভাল হবে। তখন আমার সব দুঃখ ঘুচে যাবে। তা ছেলে যখন একটু বড়, তখন তার বাপটা একদিন দুম করে মরে গেল। সারাজীবন এত নেশা করেছে, কী করে আর বেশিদিন বাঁচবে? তা পাড়ার লোকজন মিলে তার জায়গায় ছেলেটাকে কারখানায় ঢুকিয়ে দিল। নইলে দুটো পেট চলবে কী করে? মা তো সামান্য এটা সেটা করে।

যেই না কারখানায় ঢোকা, ছেলেও তার বাপের মত মদ গিলতে শুরু করল। সেই এক জিনিস। প্রায় গোটা দিনটা ডিউটি করে, আর যতক্ষণ বাড়িতে থাকে, কেবল নেশা করে। মায়ের বুকটা একেবারে ভেঙে গেল। কত আশা ছিল ছেলেকে নিয়ে। হায় রে! ছেলেটাও এমন হল!

কিন্তু কিছুদিন পরেই মা দেখল ছেলের ধরন ধারণ কেমন অন্যরকম। আর অত নেশা করছে না, মায়ের সাথে কথা বলার ধরণটাও কেমন মিষ্টি হয়ে উঠেছে, আর কারা সব যেন ওর সাথে দেখা করতে আসছে। তাদের কথাবার্তা সব অন্য ধারা। অমন মানুষ মা আগে দেখেনি। প্রথম প্রথম মাকে ওরা কিছু বলত না। পরে মা জানল এরা সব পার্টি করে। অন্যরকম দুনিয়া গড়ার পার্টি। মায়ের ছেলেও ওদের সাথে পার্টি করে। এরা সব কারখানার মালিকের বিপক্ষে। ধর্মঘট করে, মিটিং করে, মিছিল করে। শুরুতে মায়ের ভারী ভয় করত। নিজের ছেলের জন্যে তো বটেই, অন্য ছেলেমেয়েগুলোর জন্যেও। ওদের যদি পুলিশে ধরে? অত্যাচার করে? তারপর সত্যি পুলিশে ধরল মায়ের ছেলেকে। ব্যাস। মায়ের ভয় গেল কেটে। মা নিজেও নেমে পড়ল পতাকা হাতে।

কোন পতাকা? লাল পতাকা। কাস্তে হাতুড়িওয়ালা। আমাদের পার্টির পতাকা…”

যে বৃদ্ধা বিপ্লবের গায়ে ঢুলে পড়ছিলেন, তিনি হঠাৎ বলে উঠলেন “হ্যাঁ গো রবীন মাষ্টার, এ গপ্প কে লিকেচে গো? এ যেন মনে হচ্চে আমারই গপ্প। তোমাদের পাটির কেউ লিকেচে বুঝি?”

বিপ্লবের বাবা হেসে বলে “মাসিমা, এদেশের লোক লেখেনি। রাশিয়া বলে একটা দেশ আছে। সে দেশের একজন লিখেছেন। আমাদের পার্টির লোকই বটে। নাম ম্যাক্সিম গোর্কি।”

“সে কি গো! সে ছোকরা আমাদের কতা জানলে কেমনে?”

“গরীব মানুষের দুঃখ সব দেশেই একই রকম যে মাসিমা। আর সেই জন্যেই তো আমাদের পার্টি করা। এই পার্টি আপনাদের। তাই এ বারেও আপনাদের আশীর্বাদ চাইতে আমরা এসেছি। আপনারা আমাদের প্রার্থীকে জেতান, যাতে দিল্লী গিয়ে জোর গলায় আপনাদের কথা বলতে পারে। এটুকুই চাওয়া।”

আরেক বৃদ্ধা বললেন “তা এই কতাটাই সোজা করে বলো না বাপু। আমি তো সেই কতাই ভাবচি। আমার কত্তা যকন ছেল সে আলাদা কতা ছেল। সে বলত হাতে ছাপ দাও, আমিও দিতুম। তিনি যাওয়ার পর থেকে তো বাপু তোমাদেরই দিচ্চি। সুখে দুঃখে বিপদে আপদে এই তোমাদের কাচেই তো দৌড়ে যাই। আর কারেই বা চিনি? সেইটে না বলে এতক্ষণ কী যে সব বলচিল তোমাদের বড় নেতা। সে বাবা আমার মাতায় কিচু ঢোকেনি। হ্যাঁ গো, তোমরা কেউ কিচু বুজেচ?”

বৃদ্ধার প্রশ্নের উত্তরে সকলেই নেতিবাচক মাথা নাড়ে। বিপ্লবের চোখে পড়ে মঞ্চের উপরে বাবার পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা ডি ওয়াই এফ আই নেতা মদনকাকু হতাশ হয়ে মাথা নাড়ছে। বাবা সেসব খেয়াল না করে প্রশ্ন করে “তাহলে এ বারেও আপনাদের ভোট আমরা পাব তো নাকি?” সকলে হৈ হৈ করে সম্মতি দেয়। একটা লোক চেঁচিয়ে বলে “সবাই আমরা সারাদিন খেটে খুটে এসে ক্লান্ত বুঝলেন না? আর মিটিং মাথায় ঢোকে, মাস্টারমশাই?” সম্মতি জানিয়ে সভাপতি বিপ্লবের বাবা সভার সমাপ্তি ঘোষণা করল।

বাড়ি ফেরার সময়ে বিপ্লবকে যখন তার বাবা জিজ্ঞেস করে প্রবীর দাশগুপ্তের বক্তৃতা কেমন লাগল, তখন বিপ্লব বলেছিল “তোমারটাই বেশি ভাল। উনি অনেক জানেন বুঝলাম। কিন্তু সে তো গণশক্তির লেখাগুলো পড়েই বোঝা যায়। যে প্লাস মাইনাস শেখেনি তাকে উনি মিডল টার্ম ফ্যাক্টর শেখাচ্ছিলেন। কী করে চলবে?” বাবা কি এখনো মিটিঙে ওরকম গল্প বলে? সে গল্প কি এখনো মানুষকে ছুঁয়ে যায় সবুজগ্রাম, ক্ষেত্রগ্রামে? সবই তো পাল্টে গেছে। মানুষও কি পাল্টে গেছে? ফেরত গেলে কাউকে কি চিনতে পারবে আর? ঝাপসা টিভির পর্দার দিকে তাকিয়ে বিপ্লব ভাবতে থাকে।

ভাল লাগলে টাকা দিতে পারেন Google Pay / Paytm / BHIM বা অন্য UPI অ্যাপের মাধ্যমে journopratik@okhdfcbank কে

অথবা

নেট ব্যাঙ্কিং বা অন্য উপায়ে নিম্নলিখিত অ্যাকাউন্টে

Pratik Bandyopadhyay
A/c No. 14041140002343
HDFC Bank
Branch: South Calcutta Girls’ College
IFS Code: HDFC0001404
MICR Code: 700240048