নির্বাচনে এবারও খেলা হবে, তবে রান্নাবাটি

আমরা যেমন বিহারের খবর রাখি না, তেমন ওড়িশার খবরও রাখি না। ফলে আমরা অনেকেই জানি না, সেখানে গত বিধানসভা নির্বাচনের ভোটগণনায় কী কাণ্ড হয়েছে।

এই লেখা যখন লিখছি, তখন পর্যন্ত আমার এলাকায় বিজেপি প্রার্থীর কোনো প্রচার চোখে পড়েনি। অথচ সিপিএম প্রার্থী অলিতে গলিতে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। প্রায় বাড়ি বাড়ি যাচ্ছেন, কোনো কোনো ফ্ল্যাটেও উঠে পড়ছেন। রাস্তায় বেরোলেই কোথাও না কোথাও তাঁর অথবা সিপিএমের অন্য কর্মীদের মিছিল, মিটিং চোখে পড়ছে। তৃণমূল প্রার্থীকেও হাত জোড় করে হাসি হাসি মুখ নিয়ে ঘুরে বেড়াতে দেখা গেছে। দেয়াল লিখনেও সিপিএম আর তৃণমূলের উপস্থিতিই চোখে পড়ছে, বিজেপি নেই। বিজেপি যে আছে তার প্রমাণ হিসাবে কোনো কোনো পাড়ায় তিনকোণা গেরুয়া পতাকা শোভা পাচ্ছে, তবে সেগুলো লাগানো হয়েছিল রামনবমী উপলক্ষে। হনুমানপুজোর দিনও এলাকায় গত কয়েক বছরে তৈরি হওয়া, হিন্দিভাষীপ্রধান ফ্ল্যাটগুলোর সামনে রাম, সীতা, হনুমানের কাট আউটের পাশে ওই পতাকাগুলো দেখা গেছে। কোনো কোনো বাইকচালককে ওই গেরুয়া পতাকা লাগিয়ে ঘুরতে দেখা যাচ্ছে, কিন্তু নির্বাচনী প্রচার বলতে যা বোঝায় তাতে বিজেপির বিশেষ উৎসাহ আছে বলে মনে হচ্ছে না। একাধিক কেন্দ্রের অধিবাসী পরিচিতদের সঙ্গে কথা বলে একইরকম তথ্য পাচ্ছি। এদিক ওদিক দু-একজন প্রার্থীর মাছ হাতে প্রচার করা বা প্রাক্তন এনএসজি কমান্ডোর সেই পোশাক পরে প্রচারে বেরিয়ে পড়ার মত ঘটনা বাদ দিলে, সংবাদমাধ্যম বা সোশাল মিডিয়াতেও কেন্দ্রের শাসক দলের প্রচারের প্রাবল্য নেই।

প্রশ্ন হল, এমন কেন হচ্ছে? বিজেপি কেবল ভারতের নয়, তাদের কথা অনুযায়ী, পৃথিবীর বৃহত্তম রাজনৈতিক দল। নির্বাচনী বন্ডের কল্যাণে এবং আরও নানা কারণে তাদের টাকাপয়সারও অভাব নেই যে খরচের কথা ভেবে প্রচারে রাশ টানতে হবে। তাহলে এই কার্পণ্য কেন? দীর্ঘদিন ধরে যাঁরা নির্বাচন দেখে আসছেন, তাঁদের কাছে এর সহজ ব্যাখ্যা হল— বিজেপির সংগঠন নেই। অতএব সিদ্ধান্ত হল— ভোট পাবে না। দুঃখের বিষয়, এই ব্যাখ্যা প্রাক-২০১৯ নির্বাচনগুলোর জন্যে নির্ভুল। কিন্তু সেবার থেকে দেখা গেছে— এ রাজ্যে বিজেপির সংগঠন নেই, ভোট আছে। বামপন্থীদের আবার নয় নয় করেও খানিকটা সংগঠন আছে, কিন্তু ভোট নেই। ২০১৯ লোকসভা নির্বাচন, ২০২১ বিধানসভা নির্বাচন এবং ২০২৪ লোকসভা নির্বাচন— প্রত্যেকবার ফল বেরোবার পর এই ব্যাপারটাই উপলব্ধি করা গেছে। এর কারণ বামের ভোট রামে চলে যাওয়া, নাকি তৃণমূল-বিজেপি সেটিং—সে আলোচনা এবারকার মত মুলতুবি থাক। কারণ পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার এবারের নির্বাচন অভূতপূর্ব। অথচ কথাটা বামপন্থীরা এবং তৃণমূল যেন বুঝেও বুঝতে চাইছে না। ফলে তাদের প্রচারকে রান্নাবাটি খেলা ছাড়া আর কিছু ভাবা যাচ্ছে না। শয়ে শয়ে লোক সঙ্গে নিয়ে, পার্টির পতাকায় এলাকা ছয়লাপ করে, ক্ষমতায় এলে পশ্চিমবঙ্গের ভোল পালটে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া বা গত ১৫ বছরের উন্নয়নের পাঁচালী শোনানোর যে কোনো মানে হচ্ছে না, সেকথা সাধারণ ভোটারদের কথাবার্তায় কান পাতলে দিব্যি টের পাওয়া যাচ্ছে। কিন্তু রাজনৈতিক দলগুলো যেন কানে গুঁজেছে তুলো আর পিঠে বেঁধেছে কুলো।

১) ৬ এপ্রিল রাতে নির্বাচন কমিশন দয়া করে বিচারাধীন থাকা ভোটারদের মধ্যে কাদের ভাগ্যে ভোটদানের শিকে ছিঁড়ল আর কাদের ছিঁড়ল না— তার সর্বশেষ তালিকা প্রকাশ করেছে। রাজ্যসুদ্ধ লাখ লাখ লোক উৎকণ্ঠায় জীবন কাটাচ্ছিলেন, সেই উৎকণ্ঠা সহ্য করতে না পেরে রিষড়ার মিনতি সেন আত্মহত্যা করেছেন বলেও অভিযোগ উঠেছে। সোশাল মিডিয়া খুললে আরও বহু মানুষের কথা জানা যাচ্ছে, যাঁরা গত কয়েক দিনে এই দুর্ভাবনায় অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। শেষমেশ জানা গেছে, ৬০ লাখের বেশি ভোটারের মধ্যে প্রায় ২৭ লাখ বাদ।

২) আগেই বাদ পড়েছিলেন ৫৮ লাখ, এবার আরও ২৭ লাখ। আগের ৫৮ লাখের মধ্যে অবশ্য কিছু মৃত ভোটার ছিল, তবে ডিসেম্বরের খসড়া তালিকা থেকেই জীবিতকে মৃত বানিয়ে দেওয়ার ঘটনাও ছিল। অনেক প্রগতিশীলও যা কীসব রাজনৈতিক অঙ্ক কষে মানতে চাইছিলেন না, তাও প্রমাণ হয়ে গেছে শেষ তালিকা বেরোবার পরে— মুসলমানদের বাদ পড়ার হার তাঁদের ভোটার তালিকায় উপস্থিতির হারের চেয়ে বেশি। অল্ট নিউজ এই তথ্য টেনে বের করেছিল কলকাতার দুটো বিধানসভা কেন্দ্রের বিশেষ নিবিড় সংশোধনী পরবর্তী ভোটার তালিকা থেকে, সবর ইনস্টিটিউট এই তথ্য বের করেছে বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারীর দুই কেন্দ্রের অন্যতম, নন্দীগ্রামের, তালিকা বিশ্লেষণ করে। উপরে দেওয়া নির্বাচন কমিশনের নিজের তালিকাতেও দেখা যাচ্ছে— মুর্শিদাবাদ, উত্তর ২৪ পরগণা, মালদার মত যে জেলাগুলোতে মুসলমান সম্প্রদায়ের মানুষ অন্যান্য জেলার তুলনায় বেশি, সেখানেই বাদ পড়া মানুষের সংখ্যা বেশি। তাছাড়া যাঁরা বাদ পড়েছেন, তাঁদের মধ্যে মহিলা, নিম্নবর্গীয় হিন্দু, আদিবাসীদের উপস্থিতি প্রধান। অর্থাৎ যাঁদের বিজেপিকে ভোট দেওয়ার সম্ভাবনা শূন্য থেকে শুরু, তাঁদের ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়ার ব্যবস্থারই ভালো নাম এসআইআর। বাংলাদেশের হিন্দুদের জন্যে এত প্রাণ কাঁদে বিজেপি নেতাদের, অথচ সেখান থেকে তাড়া খেয়ে চলে আসা মতুয়াদের উপরেও কোপ পড়েছে। আমরা ছাপ্পা ভোট দেখেছি, বুথ দখল দেখেছি, ‘সায়েন্টিফিক রিগিং’ শুনেছি, ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিনে কারচুপির অভিযোগও শুনতে পাই। গণনার সময়ে ব্যালট খেয়ে নেওয়া, ধানখেতে বা নালায় ফেলে দেওয়ার দৃশ্যও নতুন নয়। কিন্তু সেসবই ভোটদানের দিন বা ভোটদানের পরের ব্যাপার। ভোটগ্রহণের আগেই নির্বাচন জিতে নেওয়ার এমন ভবিষ্যনিধি প্রকল্প আমরা দেখিনি।

৩) ধরা যাক, আপনি নিরীহ লোক। আপনাকে মেরে ধরে এলাকার গুন্ডারা সর্বস্ব কেড়ে নিল। আপনি পুলিশের কাছে গেলেন, বাকি যা দু-চার পয়সা ছিল সেগুলোও তারা কেড়ে নিল, আপনি পথে বসলেন। এমতাবস্থায় আমাদের দেশের মানুষ কোনো একটা উপায় বের করতে পারলে যায় আদালতের কাছে। এক্ষেত্রেও তাই হয়েছিল। তা আমাদের সর্বোচ্চ আদালতের বিচারপতিদের এমন দয়ার শরীর যে তাঁরা বলেছেন যাদের নাম জজসাহেবদের বিচারেও বাদ গেছে, তাঁরাও ফের আবেদন করতে পারবেন। তবে তাঁদের আবেদনের নিষ্পত্তি হোক আর না-ই হোক, ভোট ভোটের সময়েই হতে হবে। যাঁরা এবার ভোট দিতে পারছেন না, তাঁরা নাহয় পরেরবার দেবেন। পৃথিবীর সব গণতান্ত্রিক দেশে ভোট হয় ভোটারের স্বার্থে। এখন ধর্মাবতাররা যা সিদ্ধান্ত নিলেন তাতে বোঝা গেল, পশ্চিমবঙ্গে ভোট হবে ভোটের স্বার্থে। ভোটার হলেন ফাউ। ভোটার জনপ্রতিনিধি নির্বাচন করবেন না, নির্বাচন কমিশন ভোটার নির্বাচন করবে। তারা না পারলে বিচারপতিরা করবেন। যেভাবে পারবেন সেভাবে করবেন, যখন ইচ্ছে হবে তখন করবেন। ভোটার অধিকার হারালে প্রতিবাদ করতেও পারবেন না। করলে পাইক, বরকন্দাজ ডাকা হবে, হাজতবাস হবে, ভোটার সন্ত্রাসবাদী কিনা তাও খতিয়ে দেখা হবে। ডিগ্রিধারী উচ্চবর্গীয় সাংবাদিকরা স্টুডিওতে বসে বিচারকদের জন্যে চোখের জল ফেলবেন আর প্রতিবাদী ভোটারদের ভীষণ বকে দেবেন।

৪) সন্ত্রাসবাদের কবলে থাকা কাশ্মীর বা বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনে দীর্ণ আট-নয়ের দশকের পাঞ্জাব বা উত্তর-পূর্বাঞ্চলের রাজ্যগুলো ছাড়া কোথাও কখনো নির্বাচনে এত বাইরে থেকে আনা সশস্ত্র বাহিনী ব্যবহৃত হয়েছে কিনা সন্দেহ। অনেকদিন যাবৎ একটা কথা চালু হয়েছে— ভোট নাকি গণতন্ত্রের উৎসব। এবারে দেখে মনে হচ্ছে যুদ্ধ। সে যুদ্ধে আসার জন্যে রওনা দেওয়ার আগে কেন্দ্রীয় বাহিনীর জওয়ানরা আবার অযোধ্যার রামমন্দিরে মাথা ঠুকে আসছেন। মানে যুদ্ধকে পশ্চিমবঙ্গের ভোটারদের চোখে একেবারে ধর্মযুদ্ধে পরিণত করার চেষ্টা। কীরকম নিরপেক্ষ ভোটদান নিশ্চিত করতে আসছে কেন্দ্রীয় বাহিনী, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।

৫) মানুষের ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়ার জন্যই যে এসআইআর, সেটা অবশ্য বাঙালি বুদ্ধিমানরা বিহারের এসআইআরের দিকে চোখ রাখলে প্রথমেই টের পেতেন। কিন্তু পাননি। যা-ই হোক, বিহারে ও জিনিস আগে করা হয়েছে বলেই বাংলায় যা হল তাকে অভূতপূর্ব বলা চলে না। তবে ভাববেন না, এসআইআরেই কমিশনের গাফিলতি শেষ হয়। আমরা যেমন বিহারের খবর রাখি না, তেমন ওড়িশার খবরও রাখি না। ফলে আমরা অনেকেই জানি না, সেখানে গত বিধানসভা নির্বাচনের ভোটগণনায় কী কাণ্ড হয়েছে। ফ্রন্টলাইন পত্রিকার এক প্রতিবেদন অনুযায়ী বহু বুথে যত ভোট পড়েছে (যার হিসাব থাকে ফর্ম ১৭সি-তে) আর যত ভোট গোনা হয়েছে (যার হিসাব থাকে ফর্ম ২০-তে) তা মেলেনি। বিজু জনতা দল ২০২৪ সালের ডিসেম্বর মাসে তাদের প্রেস নোটে জানায়— ১৪৭ খানা বিধানসভা কেন্দ্রের ৫৮ খানা বুথে পড়া ভোট আর গোনা ভোটের তফাত এক থেকে ৯০৮ পর্যন্ত পৌঁছেছে। দুটো চোখ কপালে তোলা উদাহরণ দিয়ে চক্করটি বোঝানো যাক। ফুলবনী কেন্দ্রের ৫৭ নম্বর বুথে ভোট পড়েছে ৬৮২, কিন্তু ফর্ম নং ২০ বলছে একটা ভোটও গোনা হয়নি। তালসারার ১৬৫ ও ২১৯ নম্বর বুথে মোট ১,৪৪৪ জন ভোট দিয়েছেন বলছে ফর্ম নং ১৭সি। অথচ ফর্ম নং ২০ বলছে ও দুটোরও কোনো ভোট গোনা হয়নি। উলটো উদাহরণও আছে। পদমপুরের ১৪ খানা বুথ মিলিয়ে নাকি ভোট পড়েছে ৮২, গোনা হয়েছে ৯,৩০৪। এসব নিয়ে বিজু জনতা দল দুবার নির্বাচন কমিশনে অভিযোগ জানিয়েছে, তথ্যের অধিকার আইনেও আবেদন জানিয়েছে। কেউ পাত্তা দেয়নি।

৬) কলকবজা কী আছে না আছে না জেনেও যেমন আমরা ট্রেনে বাসে চড়ি, সেভাবেই জনপ্রতিনিধিত্ব আইনে কী আছে বা অমুক নম্বর ফর্ম আর তমুক নম্বর ফর্ম দিয়ে কী হয় না জেনেও সেই ১৯৫২ সাল থেকে ভারতের মানুষ ভোট দিয়ে আসছিল। এবারে জ্ঞানেশ কুমারের দৌরাত্ম্যে আমরা কিছু কিছু কল বা গ্যাঁড়াকল সম্পর্কে জানতে বাধ্য হয়েছি। সেরকম দুটো গ্যাঁড়াকল হল ফর্ম নং ৬ আর ৭। এমনিতে ফর্ম নং ৬ খুবই নিরীহ জিনিস। ওটা দিয়ে ভোটার হওয়ার আবেদন করতে হয়। কিন্তু বিহারের অভিজ্ঞতা থেকে এবং পশ্চিমবঙ্গেও গত কয়েকদিনের অভিজ্ঞতায় আমরা জেনে গেছি যে, ওটা ব্যবহার করে ভিনরাজ্যের লোককে রাতারাতি ভোটার তালিকায় ঢোকানোর কাজ করা হয় বলে প্রচুর অভিযোগ আছে। সে কাজ করতে গিয়ে কিছু লোক হাতেনাতে ধরা পড়েছে বলে দাবি করেছে তৃণমূল কংগ্রেস, কিন্তু সব যে ধরা সম্ভব হবে না তা বলাই বাহুল্য। ফর্ম নং ৭-এর ব্যবহার আরও চমৎকার। ও দিয়ে কমিশনে অভিযোগ জানানো যায়— অমুক বৈধ ভোটার নয়, ওকে বাদ দিন। সেটাকে ব্যবহার করে মুসলমানদের বাদ দেওয়ার চেষ্টা করা হবে— একথা কিছুদিন আগে সগর্বে জানিয়েছিলেন আসামের বিজেপি মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মা। এসব সম্ভব হয় না নির্বাচন কমিশন ওই ফর্মগুলোর আবেদনকারীদের ব্যাপারে নিয়মমাফিক যাচাই করলে। কিন্তু তা কি করা হয়? হলে আসামের বিএলও সুমনা চৌধুরী, ফর্ম নং ৭-এর উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ব্যবহার ক্যামেরার সামনে ফাঁস করে দেওয়ার জন্যে, চাকরি থেকে সাসপেন্ড হলেন কেন? পশ্চিমবঙ্গেও গুচ্ছ গুচ্ছ ফর্ম নং ৭ নিয়ে ধরা পড়ার অভিযোগ উঠেছে বিজেপির কর্মীদের বিরুদ্ধে।

৭) নির্বাচন কমিশনের এতরকম কীর্তিকলাপ দেখে ভারতের প্রায় সব বিরোধী দল তার উপর আস্থা হারিয়েছে। ফলে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশকে অপসারণের প্রস্তাব এনেছিলেন বিভিন্ন দলের ১৯৩ জন সাংসদ। লোকসভার স্পিকার এবং রাজ্যসভার চেয়ারম্যান সেই প্রস্তাব নিয়ে আলোচনাই হতে দেননি। কোনো কারণও দেখাননি।

এই সাত কাণ্ড রামায়ণ জানার পরে, বিজেপি যে অমিত শাহ আর নরেন্দ্র মোদীর জনসভা ছাড়া প্রচারে বিশেষ মন দিচ্ছে না, তাতে অবাক হওয়ার কিছু থাকে কি? অন্যদিকে পশ্চিমবঙ্গের বিজেপিবিরোধী দলগুলো যে প্রাণপণ প্রচার করে চলেছে, তাকে শিশুদের আপন মনে রান্নাবাটি খেলা ছাড়া অন্য কিছু বলা চলে কি? ভোটারদের অধিকারের কথা নির্বাচন কমিশন ভাবেনি, সুপ্রিম কোর্ট ভাবেনি— একথা ঠিক। কিন্তু তৃণমূল কংগ্রেস, কংগ্রেস বা বামপন্থীরা যে ভাবছেন, তারই বা প্রমাণ কোথায়? কোনো পক্ষই প্রথম থেকে একবারও বলেনি যে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র মানে হল, জনগণের বেছে নেওয়া তন্ত্র। এ তো তন্ত্র জনগণ বেছে নিচ্ছে। এ অধিকার রাষ্ট্রের নেই, অতএব এই প্রক্রিয়া বাতিল করতে হবে। কেবল পশ্চিমবঙ্গের দলগুলো বলেনি তা নয়, যে ১২ খানা রাজ্যে এসআইআর হল, কোথাও কোনো দলই বলেনি। সবাই মেনে নিল যে এটা সাংবিধানিক প্রক্রিয়া। অথচ সংবিধানে এমন কোনো প্রক্রিয়ার কথা আছে— একথা আজ পর্যন্ত সুপ্রিম কোর্টও বলে উঠতে পারল না। জনপ্রতিনিধিত্ব আইনেও আছে নিবিড় সংশোধনের কথা, যা ভারতে এর আগেও বহুবার হয়েছে, পশ্চিমবঙ্গে শেষ হয়েছিল ২০০২ সালে। তার জন্যে ভোটারকে ফর্ম পূরণ করতে হয় না, নিজের নাগরিক হওয়ার প্রমাণ দিতে হয় না, বাপ-মা নাগরিক ছিলেন কিনা তাও দেখাতে হয় না। নির্বাচন কমিশনই নিজের উদ্যোগে নিজের ভুল সংশোধন করে। বিশেষ নিবিড় সংশোধন বলে যে আদৌ কিছু নেই, তা নাগরিক ডট নেটের পডকাস্টে এসে পরিষ্কার বলে গিয়েছেন নির্বাচন কমিশনের প্রাক্তন সিইও জহর সরকার।

বিহারে এই প্রক্রিয়ার শুরু থেকেই বোঝা গিয়েছিল মতলবখানা কী। অথচ রাষ্ট্রীয় জনতা দল, কংগ্রেস এবং বামপন্থীরা সেই প্রক্রিয়া মেনে নিয়েই নির্বাচনে লড়লেন। বোধহয় ভেবেছিলেন এত মানুষ নীতীশ কুমারের সরকারের উপর খাপ্পা যে যত ভোটারই বাদ যাক, ঠিক জিতে যাবেন। তা যখন হল না এবং অপ্রত্যাশিত বড় ব্যবধানে হার হল, তখন বিস্তর গণ্ডগোল আছে বলে অভিযোগ জানিয়েও দু-একবার মৃদু প্রতিবাদ করে বাধ্য ছেলেমেয়েদের মত তাঁরা বিধানসভায় গিয়ে বসে পড়লেন। কোথাও কোনো আন্দোলন, অবরোধ কিছু দেখা গেল না। যে রাহুল গান্ধী ভোট চুরি ধরে ফেলেছেন বলে কর্ণাটক ও মহারাষ্ট্র নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে এ বোমা সে বোমা ফাটানো সাংবাদিক সম্মেলন করেছিলেন, তিনিও চুপসে গেলেন। সেই যে চুপ করেছেন, পশ্চিমবঙ্গে কোটিখানেক মানুষের ভোটাধিকার হরণ নিয়ে আজ পর্যন্ত এক লাইন সোশাল মিডিয়া পোস্টও করে উঠতে পারেননি। তাহলে তো ধরে নিতে হবে, কর্ণাটক আর মহারাষ্ট্রের ভোট চুরি নিয়ে তাঁর ভাবনা আছে, কারণ সেখানে তাঁর দল জেতার অবস্থায় থাকে। পশ্চিমবঙ্গে খুব ভালো ফল করলেও যেহেতু কংগ্রেস গোটা পাঁচেকের বেশি আসন জিতবে না, সেহেতু এ রাজ্যের লোক বাঁচুক, মরুক বা ডিটেনশন ক্যাম্পে যাক, তাঁর কিছু এসে যায় না। মহব্বতের দোকান দেখা যাচ্ছে খুবই ছোট।

তৃণমূল কংগ্রেস যে মতলবটা প্রথমে ধরতে পারেনি তা পরিষ্কার। ভেবেছিল তাদের সাংগঠনিক জোর দিয়ে ভোটার বাদ দেওয়া সামলে নেবে। তাই মোড়ে মোড়ে ভোটার সহায়তা কেন্দ্র খুলে বসে এসআইআরে সাহায্য করেছে। সিপিএমের পলিট বুরো যতই প্রথম থেকে এই প্রক্রিয়ার বিরোধিতা করুক, বঙ্গীয় নেতা ও কর্মীরা ভেবেছিলেন এতে তৃণমূলের ভুয়ো ভোটার বাদ যাবে। তাই তাঁরাও মহা উৎসাহে এই কর্মযজ্ঞের আগুনে ঘি ঢেলেছিলেন, ‘লজিকাল ডিসক্রিপেন্সি’ ঢুকে পড়ার পর থেকে ঢোঁক গিলে প্রতিবাদ করছেন। এখনো ভাঙবেন তবু মচকাবেন না, বলে যাচ্ছেন ওই জিনিসটা না থাকলেই ভালো এসআইআর হত। অথচ বিহারে ওটা না থেকেও প্রান্তিক মানুষের ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়ার কাজটা হয়েছিল।

যা-ই হোক, ভুল মানুষমাত্রেই করে, ফলে মানুষের তৈরি রাজনৈতিক দলও করতেই পারে। কিন্তু ভুল বুঝতে পারার পর, ‘বাদ পড়ে যাওয়া ভোটারদের তালিকায় না ঢোকানো পর্যন্ত ভোট করা চলবে না এবং করলে সে ভোটে অংশগ্রহণ করব না’, একথা তৃণমূল, বামেরা বা কংগ্রেস বলতে পারছে না কেন? সাধারণ বুদ্ধিতে এর উত্তর হল— মমতা ভাবছেন, এসব সত্ত্বেও কোনো মতে জিতে গেলে ক্ষমতায় টিকে যাব। আর বাম, কংগ্রেস শূন্যের গেরো কাটিয়ে গোটা কয়েক বিধায়ক বাগানোর সুযোগ ছাড়তে চায় না। কিন্তু কথা হল, অক্টোপাসের মত যে ফাঁদ পাতা হয়েছে, তাতে ওই আশায় থেকে আর পাঁচটা ভোটের মত প্রচার চালিয়ে যাওয়ার কি কোনো মানে আছে? জিতলেও তো গণতন্ত্রের শবদেহের উপর নৃত্য করেই জেতা হবে।

ছোটবেলায় রান্নাবাটি খেলার সময়ে আমরা ধুলোকেই ভাত হিসাবে প্লেটে নিতাম বটে, তবে মুখ পর্যন্ত তুলে নামিয়ে রাখতাম। খেতাম না কিন্তু।

নাগরিক ডট নেট ওয়েবসাইটে প্রকাশিত

ক খ গ ঘ ও প্রতীক-উর: দুই মেরুর বাম বাসিন্দা

দেশের এবং বাংলার চরম সংকট মুহূর্তে যখন বামপন্থীদের দিক থেকেই সবচেয়ে কঠিন চ্যালেঞ্জ আসার কথা, তখন দেশের সবচেয়ে বড় সংসদীয় কমিউনিস্ট পার্টি ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদীদের গুঁতোয় টলমল করছে দেখে মোহন ভাগবত, নরেন্দ্র মোদী আর অমিত শাহ নির্ঘাত খুব হাসছেন।

পশ্চিমবঙ্গে লোকসভা ও বিধানসভা মিলিয়ে পরপর তিনটে নির্বাচনে শূন্য পাওয়া, ভোট শতাংশও তলানিতে ঠেকে যাওয়া সিপিএম দলটার সদস্য, সমর্থক এখনো কারা? সোশাল মিডিয়ার সরব শহুরে মধ্যবিত্ত, যাদের অনেকেরই সিপিএম হওয়ার প্রধান কারণ পারিবারিক, তারা ছাড়া আর কেউ আছে কি? সাংবাদিকসুলভ বদভ্যাসে এই প্রশ্নের উত্তর প্রায়ই খুঁজি। খুঁজতে গিয়ে চোখের সামনে যে উদাহরণগুলো পাই, তাঁদের কথাই বলি। এঁরা সকলে আমারই আশপাশে থাকেন, নামধামও জানি, কিন্তু এঁদের ক খ গ ঘ বলেই উল্লেখ করব। কারণ এঁদের তো গায়ে গতরে খেটে খেতে হবে, আর শাসক দল যদি মনে করে এঁদের নিজেদের দলে টানতেই হবে, তাহলে প্রতীক-উর রহমানের মত সাদরে সাংবাদিক সম্মেলন করে হাতে পতাকা ধরাবে না। যেভাবে ধরাবে সেটা পশ্চিমবাংলার প্রাচীন পদ্ধতি, এবং শান্তিপূর্ণ পদ্ধতি নয়। তাছাড়া নিজেদের দলের শত্রুরাও আছে।

রেল বাজারে সবজির জোগান নিয়ে আসা ভারি ভারি বস্তা ট্রাক থেকে নামিয়ে বাজারের বিভিন্ন দোকানির কাছে পৌঁছে দেওয়াই ক দাদার পেশা। মাথার সমস্ত চুল পেকে গেছে, কিন্তু শরীর এখনো শক্তপোক্ত বলে কাজটা করতে পারছেন। আমার পেশা বা রাজনৈতিক মতামত সম্পর্কে এঁর কিছুই জানা নেই, আমার নামও জানেন না সম্ভবত। কিন্তু আমার বাবাকে চিনতেন এবং যেহেতু তিনি সিপিএম করতেন, অতএব ক-দা ধরে নিয়েছেন আমিও একই মতের। আমি দাদাকে বছর তিনেক আগে অবধিও চিনতাম না, কিন্তু উনি আমাকে দেখলেই চিরপরিচিতের মত কুশল সংবাদ জিজ্ঞেস করতেন বলে উত্তর দিতাম। সন্দেহ ছিল— আমাকে অন্য কারও সঙ্গে গোলাচ্ছেন। কিন্তু একদিন আমার বাবার সম্পর্কে এক দোকানিকে বিস্তারিত বললেন এবং আমার বোনের কোথায় বিয়ে হয়েছে তা-ও দেখলাম জানেন, ফলে নিশ্চিত হওয়া গেল। মে দিবসে দেখা হয়ে গেলে ক-দা আমাকে বুকে জড়িয়ে ধরে গুপ্তচরদের সংকেত বলার মত কানে কানে বলেন ‘লাল সেলাম, কমরেড’।

খ একজন টোটোচালক। হ্যান্ডেলের উপর বসানো মোবাইল ফোনের ওয়াল পেপারে সবসময় থাকে মীনাক্ষী মুখার্জির ছবি, গাঁক গাঁক করে গান শোনার জন্যে লাগানো স্পিকারে প্রায়শই বাজে মীনাক্ষীর কোনো বক্তৃতা। ব্যাপারটা খ-এর পক্ষে কতটা দুঃসাহসিক, সেটা যাঁরা বেড়াতে যাওয়া ছাড়া হাওড়া ব্রিজ পেরোন না তাঁদের পক্ষে বোঝা শক্ত।

গ দাদার পেশা গাড়ি চালানো। একসময় মিনিবাস চালাতেন, তারপর আমাদের মত ঊর্ধ্বগামী মধ্যবিত্তদের প্রাইভেট গাড়ি চালাতেন। তাতে রোজগার যথেষ্ট না হওয়ায় কিছুদিন এক কারখানার অ্যাম্বুলেন্স চালকের চাকরি নিয়েছিলেন। সেখানে অধিকাংশ সময় বসেই থাকতে হয় এবং কারখানার অন্যান্য গাড়ির ড্রাইভারদের মধ্যে বিজেপি সমর্থকদের প্রাধান্য, ফলে গ-দার সঙ্গে তাদের প্রায়শই ঝগড়া লেগে যেত। তাই গ-দার ও চাকরি বেশিদিন পোষাল না। গত পঞ্চায়েত নির্বাচনে দেয়ালে সিপিএমের পোস্টার লাগাতে গিয়ে স্থানীয় তৃণমূল কর্মীদের সঙ্গেও মারামারি হয়েছে। যা-ই হোক, কারখানার গাড়ির চাকরি ছেড়ে কিছুদিন দূরপাল্লার বাস চালিয়েছেন, এখন উবের বাস চালান। পার্টির প্রতি প্রচুর ক্ষোভ আছে, পার্টিকে লড়াকু চেহারায় দেখতে চান। নেতৃত্ব তা চায় না বলে অনুযোগ করেন। আমার সঙ্গে আলাপ বছর সাতেক হল। এই সাত বছরে ১২-১৫ বার বলেছেন ‘ধুর, সব ছেড়েছুড়ে দেব।’ এখনো ছেড়েছেন বলে খবর নেই।

ঘ আমার ছোটবেলার সহপাঠী। এখন ছোট ব্যবসায়ী। পারিবারিক পুঁজি বলতে কিছুই নেই— না অর্থনৈতিক, না সাংস্কৃতিক। প্রচুর পরিশ্রম করতে হয় জীবিকার্জনের জন্যে। তা সত্ত্বেও এলাকায় সিপিএমের কোনো মিটিং, মিছিলে ঘ নেই— এমন হয় না। পার্টি সম্পর্কে তার বিস্তর সমালোচনা আছে, তার কিছু কিছু কখনো কখনো সোশাল মিডিয়ায় লিখে ফেলে। কিন্তু একটা স্তরে গিয়ে নিজেই নিজেকে লাগাম পরায়। তবে কখনোই অন্য কোনো পার্টিকর্মী বা নেতাকে ব্যক্তিগত আক্রমণ করে না।

ক-দা সমাজবিপ্লবের স্বপ্ন-টপ্ন নিয়ে পার্টির সঙ্গে যুক্ত হয়েছিলেন কিনা, তা জানার সুযোগ আমার আজ পর্যন্ত হয়নি। কারণ আমি যখন বাজারে যাই তখন আমার গ্যাঁজানোর সময় থাকলেও, উনি প্রায় দৌড়তে দৌড়তে কথা বলেন।

খ-ও সারাক্ষণ যাত্রীদের গন্তব্যে পৌঁছে দিতে ব্যস্ত। ফলে সে কেন সিপিএম সমর্থক, সিপিএম প্রকৃত কমিউনিস্ট পার্টি কিনা— এসব তার সঙ্গে আলোচনা করার সুযোগ আমার হয় না। স্থানীয় সিপিএম নেতৃত্বের আলোচনা করা কর্তব্য, তাঁরা করেন কিনা জানি না।

গ-দার সঙ্গে এসব নিয়ে আমার কিঞ্চিৎ আলাপ আলোচনা হয়। তিনি মার্কস, এঙ্গেলস, লেনিন, স্তালিন, হো চি মিন, মাও সে তুং, ফিদেল কাস্ত্রো, চে গেভারা – এসব নাম জানেন। ম্যাক্সিম গোর্কির মাদার পড়েছেন। বাকিটা নেতাদের থেকে শুনে শুনে নিজের মত করে বুঝে নিয়েছেন। দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদ, ঐতিহাসিক বস্তুবাদ, উদ্বৃত্ত মূল্যতত্ত্ব, ‘উপনিবেশবাদ হল পুঁজিবাদের চরমতম রূপ’, ‘কংক্রিট অ্যানালিসিস অফ কংক্রিট কন্ডিশনস’— এসব কথা উনি জানেন না। ওঁর বরং রাগ হয় স্থানীয় পার্টিনেতারা গলায় মা কালীর পুজোর ফুল পোরা মাদুলি দেখে হাসাহাসি করলে। সরল মনে প্রশ্ন করেন— মার্কস, লেনিন কি কোথাও বলেছেন যে পুজোআচ্চা করলে কমিউনিস্ট হওয়া যায় না? প্রশ্নটা নাকি পার্টির দাদাদেরও করেছিলেন। তাঁরা আমতা আমতা করেছেন এবং যা বলেছেন তার মোটের উপর মানে হল— আমরা যখন বলছি এটা ঠিক নয়, তখন এটা ঠিক নয়। গ-দার নেতাদের প্রতি অবিশ্বাস এতে বাড়ে, মা কালীর প্রতি বিশ্বাস কমে না। তাঁর মতে, না জেনেশুনে মানুষের বিশ্বাসে অকারণ আঘাত করা পার্টির আজকের জনবিচ্ছিন্নতার অন্যতম কারণ। উপরন্তু গ-দা মনে করেন, এই ফাঁক দিয়েই বিজেপি ঢুকে পড়েছে। তাদের মত বদ পার্টি দুটো নেই। তাদের সঙ্গে মারামারি ছাড়া কমিউনিস্টদের অন্য কোনো সম্পর্ক হয় না, হতে পারে না। গ-দা আরও বলেন, হিন্দু আর মুসলমানে কোনো লড়াই নেই। ওটা বিজেপি আর তৃণমূল খুঁচিয়ে তুলছে নিজেদের অপদার্থতা ঢাকতে। আসলে সব বাঙালির পক্ষেই বিপজ্জনক হল বিজেপি সমর্থক অবাঙালি হিন্দুরা।

ঘ নিজের আগ্রহে বেশ খানিকটা পড়াশোনা করে। মার্কসবাদী বইপত্রের বাইরে বাবাসাহেব ভীমরাও আম্বেদকর নিয়েও তার আগ্রহ আছে। জাতপাতের রাজনীতিকে অগ্রাহ্য করে ভারতে গরিব মানুষের জন্যে কিছু করা সম্ভব কিনা তা নিয়ে তার ঘোর সন্দেহ।

গ-দা আর ঘ, দুজনেরই বক্তব্য হল, পার্টির দাদারা ওঁদের কথায় পাত্তা দেন না। পার্টির প্রতি আনুগত্যের নামে নিজেদের মতই চাপিয়ে দেন। নিজেদের পেশার কারণেই রোজ নানা ধরনের মানুষের কথা এঁদের কানে আসে। সেইসব মানুষ সিপিএম বৃত্তের বা বাম বৃত্তেরও বাইরের, সুতরাং তাঁদের সমর্থন ফেরাতে না পারলে বিপ্লব-টিপ্লব দূরের কথা, ক্ষমতায় ফেরাও সম্ভব নয়। কিন্তু সেইসব কথা নেতাদের কানে তুলতে গেলে গুরুত্ব দেওয়া হয় না। যা নেতারা ভাবেন তা-ই সাধারণ মানুষের ভাবনা— এই নীতি নিয়ে পার্টি চলে।

যেখানে প্রতীক-উর ঠিক

ক, খ, গ, ঘ-র জায়গায় ইচ্ছামত নাম বসিয়ে নিন। সিপিএম সম্পর্কে সারা পশ্চিমবঙ্গের কর্মী সমর্থক তো বটেই, সাধারণ ভোটারদেরও মোটের উপর এই অভিযোগগুলোই রয়েছে। তৃণমূল, বিজেপির বিকল্প কোনো নীতি তুলে ধরতে না পারা বা তৃণমূল সরকারের আমলে একের পর এক আন্দোলন করার মত ইস্যু উঠে আসা সত্ত্বেও আন্দোলন গড়ে তুলতে না পারার ব্যর্থতা তো সবাই জানে। কিন্তু এই ভুলগুলো ১৫ বছর ধরে হয়েই চলেছে কেন— এ প্রশ্ন যদি করা হয়, তাহলে উত্তর হিসাবে এগুলোই উঠে আসে। সে কারণেই প্রেম দিবসের দুদিন পরে প্রতীক-উরের পার্টির প্রতি অপ্রেম প্রকাশ্যে আসার পরে তিনি বেশকিছু সদস্য, সমর্থকের মন পেয়েছেন। এমনকি তৃণমূলের ঝান্ডা হাতে নিচ্ছেন— এই সম্ভাবনা প্রকাশিত হওয়ার পরেও যতজন তাঁকে বিশ্বাসঘাতক বলে ভেবেছে, তার চেয়ে কম লোক সহানুভূতি প্রকাশ করেনি। আসলে প্রতীক-উরের মুখ দিয়েই এই গোপন প্রকাশ্যটি সর্বসমক্ষে এসে পড়ল যে, বঙ্গ সিপিএম হয়ে দাঁড়িয়েছে একুশ শতকের ব্রাহ্ম সমাজ। এটা কোনো বিপ্লবী দল তো নয়ই, স্রেফ সংসদীয় রাজনীতির নিয়ম মেনে জনপ্রিয়তা আদায় করে ক্ষমতা দখল করার পরিশ্রম করার মত দলও নয়। এ হল চেনা পরিচিতদের এক সংঘ, যেখানে যতদূর সম্ভব দ্বন্দ্ব এড়িয়ে চলার চেষ্টা করা হয়। যেটুকু দ্বন্দ্ব হয় তার বিষয় এই সংঘের বাইরে রাজ্যে বা দেশে কী হচ্ছে, তার মোকাবিলা কীভাবে করা হবে তা নয়। কে অমুক কমিটির তমুক হবে, কার লোককে কে তমুক কমিটি থেকে বাদ দিতে পারবে— সেইসব।

এই চেনা পরিচিত কারা? মূলত পশ্চিমবঙ্গের ভদ্রলোক শ্রেণি বলতে যাদের বোঝায়, তার পুরুষ ও মহিলারা। বাংলার মুসলমান, আদিবাসী, নিম্নবর্গীয় মানুষ— অর্থনৈতিক হিসাবে বললে গরিব মানুষ— অনুবীক্ষণ দিয়ে খুঁজতে হয়। এমনিতেই ক্ষমতা চলে যাওয়ার পরে পার্টির সদস্যসংখ্যা কমেছে, ফলে এই ধরনের মানুষের সংখ্যাও অঙ্কের নিয়মেই কমে গেছে। তার উপর আবার এমন সব ইস্যু নিয়ে পার্টি ভাবিত এবং যৎসামান্য আন্দোলন করে, যা দিয়ে পশ্চিমবঙ্গের গরিব মানুষের কিচ্ছু এসে যায় না।

যেমন রাজ্য সরকারি কর্মচারীদের ডিএ বাড়ানো নিয়ে সিপিএম ভীষণ সোচ্চার। এটা অবশ্যই কর্মীদের সাংবিধানিক অধিকারের প্রশ্ন, কিন্তু চাকুরে মধ্যবিত্তদের স্বার্থের সঙ্গে জড়িত। ডিএ বাড়লে এ রাজ্যের গরিব মানুষের কী? আশা কর্মীরা বরং অনেক পিছিয়ে থাকা শ্রেণি। তাঁদের আন্দোলনে সিপিএমের অবদান কতটুকু?

স্কুলের মিড ডে মিল নিয়ে যে ধাষ্টামো রাজ্য সরকার করে চলেছে, তার বিরুদ্ধেও সিপিএমের কোনো আন্দোলন নেই। অথচ ওটার সঙ্গে রাজ্যের সবচেয়ে গরিব মানুষের স্বার্থ জড়িয়ে আছে।

স্মার্ট মিটারের বিপদ নিয়ে গোটা রাজ্যে আন্দোলন গড়ে তুললে মধ্যবিত্তদের পাশাপাশি কৃষকদের সমর্থনও পাওয়া যেত। কিন্তু কিছু বিচ্ছিন্ন আন্দোলন ছাড়া সিপিএম কিছুই করেনি।

২০১৩ সালে চিট ফান্ড কেলেঙ্কারি ফাঁস হয়ে গেল, তা নিয়েও সিপিএম রাজ্যজুড়ে কোনো ঝড় তোলেনি। অথচ ওই কেলেঙ্কারিতে কপর্দকশূন্য হয়ে গিয়েছিলেন গৃহ সহায়িকা, রিকশাচালক, রাস্তার চায়ের দোকানের মালিকদের মত মানুষ।

আর জি কর আন্দোলনের মত ভয়ঙ্কর ঘটনা, যার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ উল্কার গতিতে ছড়াচ্ছিল, সেটাকেও রাজ্যের গ্রামাঞ্চলে এবং গরিব মানুষের কাছে নিয়ে গিয়ে লাগাতার আন্দোলন করতে ব্যর্থ হল। সফল হওয়া সম্ভবও ছিল না। কেন?

ভারতের আর পাঁচটা কমিউনিস্ট পার্টির মত সিপিএম নেতৃত্বেও মধ্যবিত্তদেরই আধিক্য ছিল বরাবর, কিন্তু তাঁদের মধ্যে গরিব মানুষের সঙ্গে সংযোগ রক্ষার তাগিদ দেখা যেত, ফলে তাঁরা জানতেন কোনগুলো গরিব মানুষের সমস্যা। নইলে বামফ্রন্ট ক্ষমতায় এসে অপারেশন বর্গা করত না। কিন্তু ক্ষমতার অলিন্দে সময় যত গড়িয়েছে, পশ্চিমবঙ্গের অর্থনৈতিক অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে রাজ্যে মধ্যবিত্ত যত বেড়েছে, তাদের ভোট আদায় করে ক্ষমতায় টিকে থাকার প্রবণতা বেড়েছে। গরিব মানুষের সঙ্গে সংযোগ তত কমেছে। নয়ের দশকের শেষ থেকে একেবারেই সরকারি ও বেসরকারি চাকুরেদের পার্টি হয়ে গেছে সিপিএম। আপনার পাড়ার শহিদবেদীতে নভেম্বর বিপ্লব দিবসে কারা পতাকা তোলে লক্ষ করবেন। কোনো রিকশাচালক, অটোচালক, টোটোচালক কি সবজি বিক্রেতাকে দেখতে পান? যাঁরা তোলেন তাঁরাই এরিয়া কমিটি থেকে রাজ্য কমিটি পর্যন্ত নেতৃত্ব দখল করে ফেলেছেন। ফলে তাঁদের চোখই পার্টির চোখ, সেই চোখ দিয়েই রাজ্যটাকে দেখা হয়। শেয়ার বাজারে টাকা খাটানো, শীতাতপনিয়ন্ত্রিত গাড়ি চড়ে স্কুলে যাওয়া শিক্ষক নেতা কী করে ভেবে উঠতে পারবেন যে মিড ডে মিল নিয়ে আন্দোলন করা দরকার?

সিপিএম যে এঁদেরই দল এবং এঁদের চোখ দিয়েই রাজ্যটাকে তারা দেখে, তার সবচেয়ে জ্বলজ্বলে প্রমাণ হল লক্ষ্মীর ভাণ্ডার সম্পর্কে সিপিএমের কটুকাটব্য। যে বলতে গেছে— মানুষের হাতে সরাসরি টাকা দেওয়া আসলে কল্যাণমূলক অর্থনীতি এবং এতে লাভ হয় বলে বহু বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদের মত, তাকেই শুনতে হয়েছে ‘চটিচাটা’। শূন্যের হ্যাটট্রিক হওয়ার আগে রাজ্য সম্পাদক মহম্মদ সেলিমেরও মনে হয়নি যে পার্টি মুখপাত্র এবং রাম শ্যাম যদু মধুদের বোঝানো দরকার— সরকারি ভাতাকে ভিক্ষা বলা মানে গরিব মানুষকে অপমান করা। শূন্যের ঠেলায় যতদিনে তিনি কথাটা বললেন, ততদিনে মধ্যবিত্ত সদস্য ও সমর্থককুল এতবার ‘মরা মরা’ বলে ফেলেছে যে আর ‘রাম রাম’ বলা সম্ভব নয়। মুখপাত্ররা তাই ঢোঁক গিলে বলতে শুরু করলেন— ভাতা দিচ্ছে ঠিক আছে, কিন্তু কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা না করলে শুধু ভাতা দিয়ে কি চলবে?

প্রতীক-উর পার্টির যা যা দোষ চিহ্নিত করেছেন তার প্রায় সবের জন্যেই দায়ী করেছেন বর্তমান রাজ্য সম্পাদককে। কিন্তু এই দোষগুলো সেলিমের পূর্বসুরি সূর্যকান্ত মিশ্রের আমলেও ছিল। কারণ এ রোগের জন্ম ক্ষমতায় থাকার সময়েই। উপরে যে ক খ গ ঘ-দের কথা বলেছি, তাঁদের পার্টির তত্ত্ব, গঠনতন্ত্র ইত্যাদি শিখিয়ে পড়িয়ে নেওয়ার দায়িত্ব ছিল পার্টির। পৃথিবীর সমস্ত কমিউনিস্ট পার্টিতে এটাই নিয়ম। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে সেসব উদ্যোগ স্তিমিত হয়ে গেছে বামফ্রন্ট আমলেই। এখন তো এমন অবস্থা যে কেউ ‘কমিউনিস্ট পার্টি করতে গেলে পড়াশোনা করতে হয়’ বললে, যাঁদের পড়াশোনা করার মত সময় এবং সংস্থান আছে তাঁরাও বক্তাকে মনে মনে খিস্তি করেন। ফলে কোনটা নয়া উদারবাদী অর্থনীতি আর কোনটা কল্যাণমূলক অর্থনীতি— সেটা ব্রাহ্মসমাজের হাতেগোনা কজন বুদ্ধিজীবী ছাড়া কেউ জানে না। তাঁরা অন্যদের জানানোর প্রয়োজনও বোধ করেন না। ‘আমরা কমিউনিস্ট, আমরা শিক্ষিত, আমরা ভালো। যে জানে না সে অশিক্ষিত (নইলে চটিচাটা)। তাকে আমাদের দরকার নেই’— এই অঘোষিত নীতিতে চলেন ওঁরা।

দেবেন ঠাকুরদের ব্রাহ্মসমাজের তবু একটা গুণ ছিল। পড়াশোনা এবং লেখালিখিকে গুরুত্ব দেওয়া হত, তত্ত্ববোধিনী-র মত পত্রিকা বেরোত। সিপিএম ব্রাহ্মরা এত পণ্ডিত যে পার্টি মুখপত্রটিকে মোটেই পাত্তা দেন না। প্রথম পাতা থেকে শেষ পাতা পর্যন্ত ভুলে ভরা থাকে। যেমন তথ্যের ভুল তেমন ভাষার। যে কোনো কাগজে যে পাতা সবচেয়ে যত্ন করে সময় নিয়ে তৈরি হয়, সেই সম্পাদকীয় পাতাতেই কোনোদিন নিজেদের পার্টির নেতা কলতান দাশগুপ্তের নাম হয়ে যায় ‘কালতান’, কোনোদিন আবার দীঘার ওপারে ভেসে ওঠে আন্টার্কটিকা। ক খ গ ঘ ঙ কমরেডরা, যাঁরা টেক স্যাভি নন, মৈত্রীশ ঘটকের সাক্ষাৎকার পড়ার বা দেখার মত প্রাথমিক পড়াশোনা নেই, তাঁরা গণশক্তি পড়ে নিজেদের যেটুকু শান দিয়ে নিতে পারতেন তার পথও বন্ধ। আসলে তাঁদের কথা নেতৃত্ব ভাবে না। কারণ ব্রাহ্মসমাজের লোকেরা কাগজ-ফাগজ পড়েন না, তাই পড়েন যা অ্যান্ড্রয়েড বা আইফোনে পড়া যায়।

এঁরাই ভেবে বের করেছেন যে দিনকাল বদলে গেছে। এখন রাজনীতি করা মানে পথে পথে ঘোরা নয়, মানুষের সঙ্গে মেশা নয়। ক্ষমতাসীন সিপিএমও অন্তত মনে করত— ভোটের প্রচার ৩৬৫ দিনের ব্যাপার, প্রত্যেক বাড়ির প্রত্যেকটা লোকের মুখ চেনার ব্যাপার। এঁরা মনে করেন হোয়াটস্যাপ ফরোয়ার্ড আর ফেসবুক পোস্টের লাইক গুনেই মানুষের মন বুঝে নেওয়া যায়। সোশাল মিডিয়া প্রচার দিয়েই ভোটে জেতার ব্যবস্থা পাকা করে ফেলা যায়। তাই প্রমোদ দাশগুপ্ত, বিনয় চৌধুরী, জ্যোতি বসুরা কীভাবে রাজনীতি করতেন সেকথা মনে করিয়ে দিলে বলেন ‘ওসব ওই যুগে চলত’। বিরক্তি চেপেই বলেন, যেহেতু ওই নামগুলো কেউ করে দিলে তাকে চটিচাটা বলতে এখনো জিভে আটকায়।

আরও অনেক গণ্ডগোলের কথা বলা যায়। কিন্তু মোদ্দাকথা হল, এই পরিমাণ আভিজাত্যের চাষ করে প্রত্যেক নির্বাচনের ফল বেরোবার পর ‘এই রাজ্যের লোক এদেরই ডিজার্ভ করে’, ‘লোকে তো ভাতা পেলেই খুশি, আর সবকিছু গোল্লায় যাক’ ইত্যাদি বলার যে ঔদ্ধত্য তা অতুলনীয়। তাই ২০১১ সালের পর থেকে এ রাজ্যের সিপিএমের পতনের গতিও অতুলনীয়। প্রতীক-উরের ঘটনায় অভিনবত্ব এটুকুই যে এতদিন ক খ গ ঘ ঙ চ-রা যেসব কথা বলে পাত্তা পেতেন না, উনি সেগুলোই রাজ্য কমিটির সদস্য থাকা অবস্থায় ক্যামেরার সামনে বলে দিয়েছেন।

যেখানে প্রতীক-উর বেঠিক

২০২২ সালে সিপিএমের রাজ্য সম্মেলনের প্রথম দিনের একখানা ছবি ভাইরাল হয়েছিল। সেই ছবিতে দেখা যাচ্ছে, মঞ্চের উপর এক নেতা বক্তৃতা দিচ্ছেন আর পিছনে বসা একাধিক বয়স্ক নেতা ঝিমোচ্ছেন বা ঘুমোচ্ছেন। এই সহস্রাব্দের গোড়া থেকে আনন্দবাজার গোষ্ঠীর পৌরোহিত্যে এ রাজ্যের সংবাদমাধ্যম ক্রমাগত বলে যাচ্ছিল যে সিপিএমে বৃদ্ধতন্ত্র চলে, তরুণ রক্ত দরকার। অনিল বিশ্বাসোত্তর সিপিএমের মিডিয়াসর্বস্বতা ক্রমশ বাড়ে, ফলে ‘তাজা রক্ত’ মাথায় উঠে যায় এবং ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পরে (মধ্যবিত্তায়ন সম্পূর্ণ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে), তাজা রক্ত আনলেই পার্টি ঘুরে দাঁড়াবে— একথা পাড়ার সিপিএম কর্মীরাও বলতে শুরু করেন। ওই ভাইরাল ছবিটা বৃদ্ধতন্ত্রের একেবারে প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠেছিল। মনে রাখা দরকার, সম্মেলনের ওই অধিবেশনে কিন্তু পার্টির বাইরের কোনো লোকের থাকার কথা নয়। সুতরাং ছবিটা তুলে বাইরে পাঠিয়েছিলেন পার্টি সদস্যরাই কেউ।

এখন পদত্যাগপত্র ভাইরাল হওয়া নিয়ে তদন্ত দাবি করে বসলেন যে প্রতীক-উর, সদস্যপদ নবীকরণ করানো হয়েছে কি হয়নি, সে খবর বাইরে এসে যাওয়ায় চক্রান্তের অভিযোগ তুলছেন যে দীপ্সিতা ধর, তাঁরা ওই ছবি কী করে ভাইরাল হল— সেকথা জানতে চেয়ে তখন চেঁচামেচি করেছিলেন? কোনো সংবাদমাধ্যমে তেমন খবর বেরিয়েছিল বলে তো দেখছি না। কেন করেননি? তাহলে কি একমাত্র নিজের তথ্য ফাঁস হয়ে গেলেই এঁদের রাগ হয়? অন্য কিছু বেরিয়ে গেলে পার্টির শৃঙ্খলা ইত্যাদি মনে থাকে না, বা কিছু এসে যায় না? একথা ভাবলেও কি অন্যায় হবে যে, সিপিএমের তরুণ তুর্কিরা তখন ভেবেছিলেন— বেশ হয়েছে বুড়োগুলোর ঘুমোবার ছবি বেরিয়ে গেছে। এদের জায়গা আমরা নেব?

প্রশ্নগুলো এখন মনে আসছে কারণ স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে, সিপিএম যে তরুণ তুর্কিদের উপর হাল ফেরানোর জন্য ভরসা রেখেছিল, তাঁরা কেউই হাল ফেরাতে পারেননি। সে না পারতেই পারেন। রাজনীতি এত সোজা জিনিস নয় যে কেউ চাইলেই কিছু করে ফেলতে পারবে। কিন্তু ২০২১ সালে যেসব ‘তাজা রক্ত’ ঢুকেছিলেন সিপিএমের প্রার্থী তালিকায়, তাঁদের মধ্যে মীনাক্ষী মুখার্জি ছাড়া আর কাউকে তো লড়াইয়ের ময়দানে দেখাই গেল না সেভাবে। প্রতীক-উরের প্রায় খুন হয়ে যাওয়া তো আরও আগের কথা। মীনাক্ষী গত পাঁচ বছরে রাস্তায় নেমে লড়তে গিয়ে পুলিসের মার খেলেন, গ্রেফতারও হলেন। শতরূপ ঘোষকে বেশি দেখা গেল টিভি স্টুডিওতে, থিয়েটার শোতে, সিনেমার প্রিমিয়ারে আর ইউটিউবে। সৃজন ভট্টাচার্য, দীপ্সিতা, প্রতীক-উর লোকসভায় ফের প্রার্থী হলেন এবং বৃদ্ধ নেতাদের চেয়ে বেশি সুবিধা করতে তো পারলেনই না; ভোটের প্রচারে কদিন প্রচুর দৌড়াদৌড়ি করে হারার পর, সেই এলাকা থেকে স্রেফ উধাও হয়ে গেলেন। সৃজনের গিটার বাজিয়ে গান গাওয়া আর দীপ্সিতার নাচ যদি রাজনৈতিক কার্যকলাপ বলে ধরা হয়, তাহলে অবশ্য আলাদা কথা। কোথায় গেলেন ঐশী ঘোষ? কেউ জানেন? দিল্লিতে আছেন বলবেন না আবার। কথা হল, পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে নেই কেন? যদি থাকবেন না এমনই কথা ছিল, তাহলে উড়ে এসেছিলেন কেন? পার্টি এরকম যাওয়া আসা স্রোতে ভাসার সুযোগ দিয়েছিলই বা কেন? নাকি এরকম উদ্দেশ্যহীন ওড়াউড়িই নেতৃত্বের অভিপ্রেত?

২০২১ সালে যখন সিপিএমের প্রার্থী তালিকা প্রকাশিত হয়েছিল এবং তালিকায় অত তরুণ মুখ দেখে বাংলার মিডিয়া হাততালি দিচ্ছিল আর সিপিএম কর্মী সমর্থকরা উল্লাস করছিলেন, তখন উত্তরবঙ্গ সংবাদের পাতায় প্রশ্ন তুলেছিলাম ‘তরুণ কৃষক নেতা, শ্রমিক নেতারা কোথায়?’ অর্থাৎ তরুণ নেতা বলতেই সিপিএম ছাত্রনেতা বা যুবনেতা বুঝছে কেন? সিপিএমের রাজনীতি থেকে ‘শ্রেণি’ শব্দটা বহুকাল নির্বাসিত বলেই এই প্রশ্নটা আমাদের মত সাংবাদিকদের তুলতে হয়। শতরূপের মত নীতি, নৈতিকতার দায় নিতে না চাওয়া নেতারা তোলেন না; প্রতীক-উরের মত আপাত বিপ্লবীও তুললেন না। তাঁর অভিযোগের তির সরাসরি রাজ্য সম্পাদকের দিকে, অথচ ক খ গ ঘ-রা পার্টির কার্যকলাপ নিয়ে যেসব মৌলিক প্রশ্ন তুলেছেন, সেগুলো সেই গভীরতায় গিয়ে কিন্তু প্রতীক-উর তোলেননি। তাঁর যাবতীয় অভিযোগের কেন্দ্রে ‘আমি’।

আমি পার্টির জন্যে এত করলাম অত করলাম, খুন হয়ে যাচ্ছিলাম, আর পার্টি কী করল? অমুকে কেন বেশি গুরুত্ব পেল? তমুককে কেন অমুক দায়িত্ব দেওয়া হল? এই হল তাঁর ক্ষোভের নির্যাস। স্পষ্টতই, পার্টির থেকে তাঁর কিছু প্রত্যাশা ছিল। সে প্রত্যাশা পূরণ হয়নি বলেই তিনি এই চরম সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। সাংবাদিক সুমন দে যা-ই বলুন, এটা মাও সে তুংয়ের কথা অনুযায়ী, সদর দফতরে কামান দাগা নয়। এটা তৃণমূল ভবনের দরজায় রবীন্দ্রসঙ্গীত গাওয়া ‘খোলো খোলো দ্বার, রাখিয়ো না আর/বাহিরে আমায় দাঁড়ায়ে’।

অথচ সত্যি সত্যি পার্টির সমালোচনা করতে চাইলে বলার মত অনেককিছু ছিল। তিনি বলেছেন— পার্টির মধ্যে সংখ্যালঘু হয়ে গিয়েছিলাম, তবে আমি তো এদেশে সংখ্যালঘু হয়েই জন্মেছি, ইত্যাদি। চমৎকার সিনেমাসুলভ সংলাপ। কিন্তু দুরকম সংখ্যালঘুকে এক করে দেখা রাজনৈতিক বোধের দিক থেকে অত্যন্ত কাঁচা ব্যাপার। সিপিএম যে বাংলার মুসলমানদের থেকে অনেক দূরে সরে গেছে, বিজেপির বিরুদ্ধে সোচ্চারে দাঁড়ায়নি সেই ২০১৪ সাল থেকে, এসআইআর যে মূলত মুসলমানদের ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার চক্রান্ত সেকথাও যে সিপিএম আজও স্বীকার করল না, অথচ সেলিম নিজে জিতে আসার জন্যে ঘুরে ফিরে মুসলমানগরিষ্ঠ আসনে গিয়ে দাঁড়ান— এই সমালোচনাটা প্রতীক-উর করতে পারতেন। করলে নিজেকে ধর্মীয় সংখ্যালঘু হিসাবে চিহ্নিত করার একটা মানে থাকত। সিপিএম যে পুরোপুরি ভদ্রলোকের পার্টি হয়ে গেছে এবং সেখানে রাজ্য সম্পাদক একজন মুসলমান হলেও রাজ্যের মুসলমানদের প্রতি পার্টির অবহেলা দূর হয় না— সেই জরুরি কথাটা উঠে আসত। রাজ্য কমিটিতে জায়গা পেয়েও দেবলীনা হেমব্রমের মত আদিবাসী নেত্রী যে তেমন কিছুই করার সুযোগ পাচ্ছেন না, সেকথাটাও প্রতীক-উর বলতে পারতেন। তাহলে সরকারি দলে চলে গেলেও ভাবার অবকাশ থাকত যে, তিনি এত বিদ্রোহ নিজের উচ্চাকাঙ্ক্ষা চরিতার্থ করতে করেননি, দলটা যেনতেনপ্রকারেণ ছাড়তে হবে বলে করেননি, পার্টির বা বামপন্থী আন্দোলনের ভালোমন্দ নিয়ে চিন্তিত বলেই করেছেন।

পার্টিতে সংখ্যালঘু হয়ে যাওয়া নিয়ে হাহুতাশ করা রীতিমত হাস্যকর। একটা দল মানে সব ব্যাপারে সবাই একমত হয়, না হওয়া মানেই লবিবাজি, যা একটা নোংরামি— এরকম অতিসরলীকৃত ধারণা তৈরি করে বৃহৎ পুঁজি নিয়ন্ত্রিত সংবাদমাধ্যম, কারণ তারা চায় দলীয় রাজনীতির বাইরের মানুষ বিশ্বাস করুন, রাজনীতি ব্যাপারটাই নোংরামি। অথচ সত্যিটা হল, পৃথিবীর সব দলে (কমিউনিস্ট পার্টিতে তো বটেই) চিরকাল বিভিন্ন লবি ছিল। ভবিষ্যতেও থাকবে। কারণ সব ব্যাপারে এক দলেরও সব মানুষ কখনো একমত হতে পারে না। তখন যে মত সংখ্যাগরিষ্ঠের সেটা প্রতিষ্ঠিত হওয়াই গণতন্ত্র। কেবল কমিউনিস্ট পার্টিতে নয়, সব পার্টিতেই।

দেশভাগের প্রশ্নে স্বয়ং মহাত্মা গান্ধী কংগ্রেসে সংখ্যালঘু হয়ে গিয়েছিলেন। তিনি নিজের মত করে নিজের অবস্থান বজায় রেখেছিলেন। সারা দেশ যখন স্বাধীনতা দিবস পালন করছিল, তিনি অনশন করছিলেন। মিডিয়াকে ডেকে অন্য কংগ্রেস নেতাদের গাল পাড়েননি।

১৯৯৬ সালে কেন্দ্রের সরকারে যোগ দেওয়ার প্রশ্নে সিপিএমের অবিসংবাদী নেতা জ্যোতি বসুও পার্টিতে সংখ্যালঘু হয়ে পড়েছিলেন। প্রকাশ্যে বলেও দিয়েছিলেন যে পার্টি ঐতিহাসিক ভুল করল। তিনি যে ঠিকই বলেছিলেন সেটা পরবর্তীকালে বিজেপির ক্রমাগত শক্তিবৃদ্ধিতে প্রমাণিত হয়েছে। কিন্তু বলার কথাটা হল, জ্যোতিবাবু কখনো বলেননি— অমুক আমাকে প্রধানমন্ত্রী হতে দিল না, পার্টি আমার এতদিনের লড়াইয়ের মর্যাদা দিল না।

বলেননি মানে জ্যোতিবাবু মহাপুরুষ ছিলেন তা নয়। বলেননি, কারণ কমিউনিস্ট পার্টি করা মানে ব্যক্তির ঊর্ধ্বে দল— একথা বিশ্বাস করা। কংগ্রেস বা তৃণমূল কংগ্রেসে ‘গো অ্যাজ ইউ লাইক’-এর বহু ইতিহাস আছে। অনেকে সেটাই ভাল, সেটাই উদার বলেও মনে করেন। কিন্তু রাজ্য কমিটি পর্যন্ত পৌঁছে যাওয়া একজন নেতা কমিউনিস্ট পার্টির এই সামান্য নিয়মটা যদি না জেনে থাকেন, তাহলে তাঁকে রাজ্য কমিটিতে যাঁরা নির্বাচিত করেছেন তাঁদের যোগ্যতা এবং শৃঙ্খলা নিয়েই প্রশ্ন তোলা উচিত।

এমনিতে মতপার্থক্যের কারণে কমিউনিস্ট পার্টি ছেড়ে দেওয়া বা বিতাড়িত হওয়া এমন কিছু অভিনব ব্যাপার নয়। ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি ১৯৬৪ সালের পর থেকে বহুবার ভেঙেছে তো বটেই, তাছাড়াও অনেকেই এই বাম দল ছেড়ে ওই বাম দলে গেছেন। সৈফুদ্দিন চৌধুরী, সমীর পুততুণ্ডদের মত কেউ কেউ নতুন দলও খুলেছেন।

অশোক মিত্রের মত উদাহরণও আছে। দ্বিতীয় বামফ্রন্ট সরকারের অর্থমন্ত্রী থাকার সময়ে মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতিবাবুর সঙ্গে মতভেদ হওয়ায় একইসঙ্গে মন্ত্রিত্ব আর পার্টির সদস্যপদ ত্যাগ করেন। আজীবন সিপিএমের অনেক সমালোচনাও করেছেন, কিন্তু কখনো কাউকে ব্যক্তিগত আক্রমণ করেননি এবং বারবার বলতেন/লিখতেন যে এমন কিছু করবেন না যাতে বামপন্থার ক্ষতি হয়। সেই কারণে সকলেরই শ্রদ্ধা অর্জন করেছেন। পরবর্তীকালে বামফ্রন্টই তাঁকে রাজ্যসভায় পাঠিয়েছিল।

ত্রিপুরার একদা মুখ্যমন্ত্রী নৃপেন চক্রবর্তী কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য থাকাকালীন বহিষ্কৃত হয়েছিলেন, সরাসরি জ্যোতিবাবুর সঙ্গে সংঘাত ছিল। তারপরেও তিনি পার্টির বিরুদ্ধে বিষোদ্গার করে বেড়াননি। আমৃত্যু আড়ম্বরহীন বামপন্থী জীবনযাপনই চালিয়ে গেছেন।

এর বাইরে অসংখ্য অখ্যাত কমিউনিস্ট ছিলেন এবং আছেন, যাঁরা প্রতীক-উরের মত সংখ্যালঘু হয়ে গিয়েছেন। অনেকেই পার্টির খারাপ লোকেদের জোটের কাছে হেরেই সংখ্যালঘু হয়েছেন। ফলে কেউ বসে গেছেন, কেউ পার্টি ছেড়ে দিয়েছেন, কেউ মানুষের জন্যে কাজ করার অন্য কোনো পথ খুঁজে নিয়েছেন। নিজের পার্টির লোকেদের নাম করে বা আকারে ইঙ্গিতে কটু কথা বলে, যাদের বিরুদ্ধে সারাজীবনের লড়াই, যাদের হাতে খুন হয়ে গিয়েছিলেন আরেকটু হলেই, তাদের দলেই মিশে যাননি ওঁরা।

লেখার শুরু করেছিলাম ক খ গ ঘ দিয়ে। চারজনই প্রতীক-উরের থেকে বয়সে বড়, কোনোদিন এরিয়া কমিটি পেরোবেন বলেও মনে হয় না। অথচ তাঁদের নিজের দলের বিরুদ্ধে রুষ্ট হয়ে ক্ষমতাসীন দলে যেতে ইচ্ছা করে না, করল তিরিশে পা দেওয়ার আগেই রাজ্য কমিটির সদস্য হয়ে যাওয়া একজনের। কেন? একটাই কারণ থাকা সম্ভব। ওঁরা নিজের জন্যে কিছু প্রত্যাশা করে রাজনীতি করতে আসেননি, প্রতীক-উর এসেছিলেন। ওঁরা প্রতীক-উরের থেকে লেখাপড়া কম জানেন, ওঁর তুলনায় মার্কসবাদী বইপত্রও কিছুই পড়েননি বলা যায়। কিন্তু ব্যক্তির আগে সমষ্টিকে স্থান দেওয়ার যে প্রাথমিক পাঠ, সেটা খুব ভালো করে নিতে পেরেছেন। প্রতীক-উর পারেননি। সুমন দে-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বারবার তিনি ‘ব্যক্তি’ আর ‘ব্যক্তিগত’ শব্দ দুটো ব্যবহার করছিলেন। একখানা এ আই টুলকে জিজ্ঞেস করলাম— শব্দ দুটো কতবার ব্যবহৃত হয়েছে এই ৫৪ মিনিট ৩০ সেকেন্ডের ভিডিওতে? উত্তর এল— ‘ব্যক্তি’ চারবার, ‘ব্যক্তিগত’ সাতবার। অর্থাৎ দুটো মিলিয়ে ১১ বার। মানে প্রায় পাঁচ মিনিট অন্তরই ব্যক্তিস্বার্থের কথা এসে পড়ে গতকাল পর্যন্ত কমিউনিস্ট পার্টির রাজ্য কমিটির একজন সদস্যের সঙ্গে কথা বলতে গেলে।

দুঃখের বিষয়, সিপিএম নেতৃত্বের অনেকেই ব্যক্তির আগে সমষ্টিকে রাখার পাঠটাকে গুরুত্ব দেন না। সেই কারণেই তাঁদের কাছে পরিশ্রমী শ্রমিক, কৃষক ফ্রন্টের পার্টিকর্মীদের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে গেছেন সুদর্শন ছাত্রনেতা, যুবনেতারা। এঁরা যে স্রেফ ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদী উচ্চাকাঙ্ক্ষী এবং পার্টির স্বার্থের পরিপন্থী, তা অগ্রজ নেতারা হয় বোঝেন না, নয় নিজেরাও উচ্চাকাঙ্ক্ষী বলে ওরকম ছেলেমেয়েদেরই পছন্দ হয়। শৃঙ্খলা গোল্লায় যায়। বিজেপির মুসলমানবিদ্বেষী মিউজিক ভিডিওতে মুখ দেখানো অভিনেতাদের পার্টির কমিউনিটি ক্যান্টিনে নিয়ে এসেও শাস্তি পান না শতরূপ ঘোষ; লাল পতাকার সামনে বসে সাংবাদিক সম্মেলন করে বলতে পারেন— বিলাসবহুল গাড়ি চড়ি আমার বাবার টাকায়, তাতে কার বাবার কী? সিপিএমের যে সদস্য সমর্থকরা ওই আচরণকে কোনো যুক্তিতে সমর্থন করেন, তাঁদের মেনে নিতে হবে— যে পার্টি থেকে শতরূপরা উঠে আসেন, সে পার্টি থেকে প্রতীক-উররাও উঠে আসবেন।

এই দ্বন্দ্বে জয়ী পক্ষের নাম তৃণমূল কংগ্রেস। সিপিএম এমন এক বিরোধী দল, যারা নির্বাচন এসে পড়লেই ব্যস্ত হয়ে পড়ে কী করে কার সঙ্গে কটা আসনে সমঝোতা করে কোনোমতে কিছু নেতাকে বিধায়ক বা সাংসদ বানানো যায় তার তাল করতে। সরকারের কাজের সমালোচনা গৌণ হয়ে যায়। নিজেরা মানুষের স্বার্থে কী করবেন তা কেবল ইশতেহারে লেখা হয়, যা আমাদের দেশে প্রায় কেউ পড়ে না। তাতেও যে খুব সুনির্দিষ্ট কোনো পরিকল্পনা লেখা থাকে তা নয়। ২০১৬ সালের নির্বাচনে এই ঘটনা ঘটানো হয়েছিল কংগ্রেসের সঙ্গে জোট করতে গিয়ে, ২০২১ সালে সঙ্গে যোগ হল ইন্ডিয়ান সেকুলার ফ্রন্টের সঙ্গে জোট করার প্রয়াস নিয়ে ডামাডোল, এবারে একা হুমায়ুন কবীরে রক্ষে নেই, প্রতীক-উরকে নিয়ে উত্তেজনা দোসর। এমন বিরোধী থাকতে মমতা ব্যানার্জির আর চিন্তা কী?

বিজেপির মত ফ্যাসিবাদী দলেরও চিন্তা নেই। দেশের এবং বাংলার চরম সংকট মুহূর্তে যখন বামপন্থীদের দিক থেকেই সবচেয়ে কঠিন চ্যালেঞ্জ আসার কথা, তখন দেশের সবচেয়ে বড় সংসদীয় কমিউনিস্ট পার্টি ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদীদের গুঁতোয় টলমল করছে দেখে মোহন ভাগবত, নরেন্দ্র মোদী আর অমিত শাহ নির্ঘাত খুব হাসছেন।

নাগরিক ডট নেট ওয়েবসাইটে প্রকাশিত

ভোটচুরির অভিযোগ আমাদের এনে ফেলেছে এক সন্ধিক্ষণে

গণতন্ত্রকে অস্বীকার করা এবং গণতন্ত্র নষ্ট করার অভিযোগ উঠলে সগর্বে ‘বেশ করেছি’ বলার এই ঔদ্ধত্যই ফ্যাসিবাদ। এর সঙ্গে অন্য কোনও সরকারের অন্যায়ের, অপশাসনের তুলনা চলে না। এ-কথা যাঁরা আজ বুঝবেন না, ফ্যাসিবাদ জাঁকিয়ে বসতে পারলে ভারতের গণতন্ত্রের পাশাপাশি তাঁদেরও ঠাঁই হবে জাদুঘরে।

এক যুগ পরে এমন একটা ঘটনা ঘটল স্বাধীনতা দিবসের ঠিক দুদিন আগে, যা এতদিনের অনভ্যস্ত কানে অবিশ্বাস্য মনে হল— ভারতের শাসক দল আর বিরোধী দল একমত হয়েছে। কোন বিষয়ে? ভোটচুরি সম্বন্ধে। যে সে লোক নয়, দেশের গদ্দারদের দেখলেই গুলি করার পক্ষপাতী যিনি, সেই অনুরাগ ঠাকুর স্বয়ং সাংবাদিক সম্মেলন করে ঠিক তাই বললেন, যা লোকসভার বিরোধী দলনেতা তথা কংগ্রেসের সবচেয়ে বড় নেতা রাহুল গান্ধী তার হপ্তাখানেক আগে বলেছিলেন— ভোটার তালিকায় ব্যাপক কারচুপি করে ভোটচুরি করা হয়েছে। সত্যি কথা বলতে, অনুরাগ রাহুলের বক্তব্যকে আরও জোরদার করে দিয়েছেন।

রাহুল তো বলেছিলেন তাঁর দলের লোকেরা নির্বাচন কমিশনের দেওয়া কম্পিউটার স্ক্যানেরও অযোগ্য সাত ফুট উঁচু কাগজ ঘেঁটে ভোটচুরির প্রমাণ বের করেছেন মোটে একখানা লোকসভা কেন্দ্রের একখানা বিধানসভা অঞ্চলে। চাইলে কমিশন বলতেই পারত যে এত বড় দেশে একটা লোকসভা কেন্দ্রে ভুলচুক হয়ে থাকতেই পারে। এ দিয়ে প্রমাণ হয় না যে সারা দেশে এ জিনিস হয়েছে। কিন্তু অনুরাগ আরও গভীরে গবেষণা করেছেন। তিনি সারা দেশের নানা রাজ্যের আধ ডজন লোকসভা আসনের তথ্য তুলে ধরেছেন। সেগুলোতেও দেখা যাচ্ছে রাহুল-চিহ্নিত মাধবপুরা আসনের মতোই কাণ্ড ঘটেছে।

৭ আগস্ট ছিল বৃহস্পতিবার, অর্থাৎ হিন্দুমতে লক্ষ্মীবার। সেদিন রাহুলের সাংবাদিক সম্মেলন এবং তারপর থেকে যা যা হয়ে চলেছে, তাতে মা লক্ষ্মী হিন্দুত্ববাদীদের উপর অপ্রসন্ন বলেই বোধ হচ্ছে। ২০১৪ সালে বিজেপি কেন্দ্রে ক্ষমতায় আসার পর থেকেই কংগ্রেস, আম আদমি পার্টির মতো একাধিক বিরোধী দল ভোটে কারচুপির অভিযোগ করে যাচ্ছে। প্রায় সব অভিযোগের ক্ষেত্রেই আঙুল উঠেছে ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিনের দিকে। কমিশন পাত্তা দেয়নি, বিজেপি তো দেয়নি বটেই। নিজেরা জিতলে বলেছে ‘হেরো পার্টি অজুহাত খুঁজছে’, আর বিরোধীরা জিতলে বলেছে ‘এবার কেন ওরা ইভিএমের কথা বলছে না?’ অথচ ইভিএমের বিরুদ্ধে অভিযোগগুলো মোটেই ফেলে দেওয়ার মতো ছিল না, অভিযোগকারীরা যে শলাপরামর্শ করে অভিযোগ করেছে তা-ও নয়। কেবল বিরোধীরাই অভিযোগ করেছে এমনও নয়। সাংবাদিকরা খবর করেছেন ইভিএম বেপাত্তা, গণতান্ত্রিক অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠন অভিযোগ করেছে যে প্রদত্ত ভোট আর ইভিএমে গোনা ভোটের সংখ্যার তফাত হয়েছে প্রচুর আসনে— সবই মাছি তাড়ানোর মতো করে উড়িয়ে দিয়েছে নির্বাচন কমিশন। আদালতে আবেদন করেও লাভ হয়নি। বিজেপিবিরোধী ভোটাররাও বিশ্বাস করেছেন যে বিরোধীরা নিজেদের কাজটা ঠিকমতো করে না, তাই এসব বলে। যতটুকু যা কারচুপি হয় তা চিরকালই হত, যখন যে ক্ষমতায় থাকে সে-ই করে। ফলে হিন্দুত্ববাদীরা বেশ নিশ্চিন্তেই ছিল।

কিন্তু বিষ্যুদবার দুপুরে রাহুল একেবারে অন্যদিক থেকে আক্রমণ করলেন। বললেন, গোড়ায় গলদ। ভোটার তালিকা ঘেঁটে বের করা তথ্য চোখের সামনে তুলে ধরলেন, দিস্তা দিস্তা কাগজ হাতে দেখিয়ে দিলেন— অভূতপূর্ব কারচুপি হচ্ছে। আমাদের গণতন্ত্রের নানা ত্রুটি থাকলেও, সেরা বৈশিষ্ট্য হল— মুকেশ আম্বানির একটা ভোট, আমার বাড়ির কাজের দিদিরও একটাই ভোট। ওটাই ভারতের গণতন্ত্রের জোর, আমাদের গর্বের জায়গা। এই জায়গাটা সেই ১৯৫২ সালের প্রথম নির্বাচন থেকেই স্বাধীন ভারতে তৈরি করা হয়েছে। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার প্রথম দিন থেকে ধনী-গরিব, নারী-পুরুষ, হিন্দু-বৌদ্ধ-শিখ-জৈন-পারসিক-মুসলমান-খ্রিস্টান, উঁচু জাত-নিচু জাত— সবার ভোটাধিকার আছে, এই গর্ব করার অধিকার গোটা দুনিয়ায় একমাত্র আমাদের। এমনকি গ্রেট ব্রিটেন বা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেরও এই ইতিহাস নেই। আর ৭৮ বছরের অবহেলায় অর্থবল, বাহুবলের গুরুত্ব বাড়তে বাড়তে ভারতীয় গণতন্ত্র যেখানে পৌঁছেছে তাতে আজ আপামর ভারতবাসীর গণতান্ত্রিক সম্বল বলতে ওই ভোটটুকুই। সেটাই যে চুরি হয়ে যাচ্ছে তা রাহুল আক্ষরিক অর্থে কাগুজে প্রমাণ দিয়ে দেখিয়ে দিলেন। যতই ডিজিটাল ইন্ডিয়ার ঢাক বাজানো হোক, দেশের অধিকাংশ মানুষ এখনও মোবাইল ছাড়া আর কোনও ইলেকট্রনিক জিনিসের ব্যবহার জানেন না। তাঁদের কাছে কাগজে ছাপা জিনিসের মর্যাদা এখনও বেশি। এই কথাটা আমরা অনেকেই বুঝতে পারি না, গরিব মানুষের পার্টি বলে যারা নিজেদের দাবি করে তারাও অনেকে বোঝে না। রাহুল বা কংগ্রেস যে সেটা বুঝেছে, সেদিনের সাংবাদিক সম্মেলন তার প্রমাণ। পাওয়ার পয়েন্ট প্রেজেন্টেশনে দেশের বড় অংশের মানুষকে কিছুই বোঝানো যেত না, যদি রাহুল ইয়া মোটা মোটা বইয়ের মতো করে প্রমাণগুলো চোখের সামনে হাজির না করতেন। লক্ষ করার মতো ব্যাপার হল, সাংবাদিকরা কিন্তু ইভিএম কারচুপির প্রশ্নও তুলেছিলেন। রাহুল সেদিকে গেলেনই না, বললেন আসল গলদ নির্বাচন কমিশনের। ওই জায়গাটা ঠিক না থাকলে ব্যালটেই ভোট হোক আর ইভিএমে— ভোটচুরি হবেই।

আরও পড়ুন বিধবা, পিতৃহীন শিশু – সকলকে জবাব দিতে হবে সেকুলারদের

বিষ্যুদবারের ক্ষত মেরামত করার চেষ্টা করতে করতে এক সপ্তাহ কাটিয়ে ফেলল নির্বাচন কমিশন আর বিজেপি। কিন্তু দেখা যাচ্ছে এ-দেশের নির্বাচন হয়ে দাঁড়িয়েছে কেশব নাগের অঙ্ক বইয়ের চৌবাচ্চার মতো। রাহুল জল বেরোবার এত বড় গর্ত করে দিয়েছেন যে জল ঢোকার নল দিয়ে কমিশন আর বিজেপি যতই জল ঢোকাক, চৌবাচ্চা দ্রুত খালি হয়ে যাওয়ার দিকে এগোচ্ছে। প্রথমে কমিশন বলল হলফনামা জমা না দিলে রাহুলের অভিযোগ নিয়ে তদন্ত করব না। অবিলম্বে জানা গেল নিয়মানুযায়ী এতে হলফনামা জমা দেওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। তারপর নির্বাচন কমিশনের কর্ণাটকের সিইও একখানা হাস্যকর কাজ করে বসলেন। রাহুলকে নোটিস পাঠালেন, তিনি যেন অভিযোগ তথ্যপ্রমাণ-সহ জমা দেন। একে তো যার বিরুদ্ধে চুরির অভিযোগ সে-ই দাবি করছে তার কাছে চুরির প্রমাণ দিতে হবে, তার উপর তারই কাছ থেকে নেওয়া নথিকে প্রমাণ বলে মানতে সে রাজি নয়। জনপ্রিয় বাংলা ছবির ফুটো মস্তানের সংলাপই এখানে পরিস্থিতির সবচেয়ে যথার্থ বর্ণনা দিতে পারে— ‘এ কে রে সান্তিগোপাল! এ তো আজব কালেকসন!’

এদিকে রাহুল ভাঙা বেড়া দেখিয়ে দিতেই শেয়ালরা বেরিয়ে এল পালে পালে। মহম্মদ জুবেরের মতো সাংবাদিক থেকে শুরু করে বিভিন্ন রাজ্যের কংগ্রেস কর্মী, সাধারণ উৎসাহী মানুষ, এমনকি গোদি মিডিয়ার একটা অংশও (যেমন ইন্ডিয়া টুডে গ্রুপ) তদন্তে নেমে পড়ল এবং দেখা গেল, যেখানে ছাই উড়ছে সেখানেই অমূল্য রতন পাওয়া যাচ্ছে।

এমতাবস্থায় রেফারির হয়ে মাঠে নামতে হত বিজেপির চাণক্যকে, যদি তিনি সত্যিই চাণক্যের মতো কূটবুদ্ধিসম্পন্ন হয়ে থাকেন। কিন্তু তিনি স্পিকটি নট, মাঠে নামিয়ে দিলেন অনুরাগকে। তিনি ভাবলেন রাহুল আর প্রিয়াঙ্কা গান্ধীর জেতা রায়বেরিলি আর ওয়ায়নাড়, তৃণমূল কংগ্রেস নেতা অভিষেক ব্যানার্জির জেতা ডায়মন্ড হারবার আসনের ভোটার তালিকাতেও গোলমাল আছে দেখালেই সব কোলাহল থেমে যাবে। কিন্তু বাপু তা কী হয়? অতি বুদ্ধিমান বাঙালি ভদ্রলোক আর সারা দেশের অন্ধ ভক্তরা ছাড়া সকলেই বুঝতে পারছে, নির্বাচন কমিশনকে দিয়ে বিজেপি যে কাণ্ডটি ঘটিয়ে চলেছে বলে মনে হচ্ছে, তা চিরাচরিত ভোটের দিনের রিগিং নয়। পেশিশক্তির জোরে লোককে ভয় দেখিয়ে ভোট দিতে না দেওয়া, নিজের লোক ঢুকিয়ে পরের পর ভোট দেওয়ানো বা ভোটার তালিকা দেখে অনুপস্থিত ভোটারের জায়গায় নিজের লোককে ভোট দেওয়ানো দেশের সব দলই করেছে কোনও না কোনও সময়ে। কিন্তু নির্বাচন কমিশন নিজেই এমন ব্যবস্থা করে দিচ্ছে যাতে একটা নির্দিষ্ট দলের সমর্থকরা যতবার ইচ্ছে যেখানে ইচ্ছে ভোট দিতে পারে (এখনও আমরা জানি না ব্যাপারটা ঠান্ডা ঘরে বসে মেশিনের মাধ্যমেই সম্পন্ন হয়ে যাচ্ছে কিনা), ভোটার তালিকায় নাম যোগ-বিয়োগ করা হচ্ছে একটা দলকে হারা আসনও জিতিয়ে দেওয়ার উদ্দেশ্যে— এ জিনিস অভূতপূর্ব। এটা চলতে থাকলে দেশে আর ত্রুটিপূর্ণ গণতন্ত্রও আছে বলা যায় না। ভ্লাদিমির পুতিনের রাশিয়া হয়ে উঠতে আর দেরি নেই আমাদের।

এই সেদিনও রাহুলকে বিজেপির বিরুদ্ধে উপযুক্ত নেতা বলে মনে করত না তৃণমূল কংগ্রেস। সেই অজুহাতে ত্রিপুরা, মণিপুর, মেঘালয়, গোয়ার মতো রাজ্যে জিতবে না জেনেও লড়তে চলে গেছে। সেই তৃণমূলের দু-নম্বর নেতা অভিষেক ৭ তারিখের সাংবাদিক সম্মেলনের পর থেকেই রাহুলের প্রত্যেক কথায় সায় দিচ্ছেন। তাঁর দলের সাংসদরা দৃশ্যতই রাহুলের বাহিনীর সৈনিক হয়ে উঠেছেন। একইভাবে বিভিন্ন সময়ে কংগ্রেসকে সাবোতাজ করতে গোয়া, গুজরাতের মতো রাজ্যে নির্বাচনে লড়তে চলে যাওয়া আম আদমি পার্টির সাংসদরা দিল্লি বিধানসভা নির্বাচনে হেরে যাওয়ার পরে প্রায় উধাও হয়ে গিয়েছিলেন। তাঁরাও রাহুলের পাশে দাঁড়িয়ে পড়েছেন, ১১ তারিখের নির্বাচন সদন অভিযানেও যোগ দিয়েছিলেন। সমাজবাদী পার্টির অখিলেশ যাদবের ব্যারিকেড টপকে যাওয়ার স্পর্ধা আর রাষ্ট্রীয় জনতা দলের তেজস্বী যাদবের মারমুখী মেজাজের রাজনৈতিক স্বার্থ সহজবোধ্য। সামনে বিহারে বিধানসভা নির্বাচন, ২০২৭ সালে উত্তরপ্রদেশে। তেজস্বী আর অখিলেশ ওই দুই রাজ্যের প্রধান বিরোধী নেতা, ক্ষমতায় আসতে মরিয়া হওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু তৃণমূল তো ২০২৬ বিধানসভা নির্বাচনেও হইহই করে জিতবে বলছেন বোদ্ধারা। বিরোধীরাও আড়ালে তা স্বীকার করে। আর আপের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে নির্ঘাত স্বয়ং অরবিন্দ কেজরিওয়ালও আশাবাদী নন, তাই এত বড় কাণ্ড নিয়ে একটা সোশাল মিডিয়া পোস্ট পর্যন্ত করছেন না। তাহলে এই দুই দলের কংগ্রেসের সঙ্গে এমন শক্ত জোট বাঁধার কারণ কী?

কারণ গত এক সপ্তাহে যা ঘটছে তার সঙ্গে বিহারে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধনীর নামে যেভাবে মানুষের ভোটাধিকার হরণ চলছে (এরপর পশ্চিমবঙ্গে এবং তারপর গোটা দেশে চলবে), তা মিলিয়ে দেখলে যে কেউ বুঝতে পারে— এরপর থেকে সব ভোটে জিতবে বিজেপিই। এখন বিজেপি বাদে সবাই একজোট না হলে কোনও দলেরই আর অস্তিত্ব থাকবে না। ফলে অসুস্থ হয়ে পড়া তৃণমূল সাংসদ মিতালী বাগকে একদিক থেকে রাহুল, অন্যদিক থেকে সিপিএম সাংসদ জন ব্রিটাস ধরে আছেন— এই ভাইরাল ছবি আসলে মানুষের বিপদে জোট বাঁধার আদিম অভ্যাসের চিত্র। সবাই মিলে রাস্তার দখল নিয়ে, পাহাড়প্রমাণ আন্দোলনের ঢেউ তুলে যদি বিজেপির ইমারত ভাঙতে পারেন, তবেই আলাদা আলাদা দল করার মানে থাকবে। তখন কে ভালো কে মন্দ, কে কম রিগিং করে কে বেশি রিগিং করে, কে বুর্জোয়া কে কমিউনিস্ট, কোনটা ফ্যাসিবাদ কোনটা নয়া ফ্যাসিবাদ— এসব নিয়ে তর্কাতর্কি, মারামারি করার ফুরসত পাওয়া যাবে। না পারলে কী হবে? তার ট্রেলার বিজেপি দেখিয়ে দিয়েছে ১১ তারিখেই। প্রায় সমস্ত বিরোধী সাংসদ যখন পথে এবং দিল্লি পুলিশ তাঁদের আটক করেছে, তখন কোনও আলোচনা ছাড়াই একাধিক বিল পাশ করিয়ে নিয়েছে সংসদ থেকে, যার মধ্যে আছে নতুন আয়কর আইনও। এই আইন অনুযায়ী আয়কর বিভাগ যে কোনও করদাতার ইমেল, সোশাল মিডিয়া হ্যান্ডেল পর্যন্ত দেখতে পারে। বলা বাহুল্য, এ কেবল ব্যক্তিগত গোপনীয়তায় হস্তক্ষেপ নয়। আইনের এই ধারা ব্যবহার করে সরকারবিরোধী যে কোনও মানুষকে হয়রান করা সম্ভব, গ্রেপ্তার করাও সম্ভব। এই সরকারের আমলে একবার গ্রেপ্তার হলে আপনি দোষী না নির্দোষ তার বিচার কত কঠিন তা যদি না বুঝে থাকেন, শুধু দুটো নাম মনে করুন— স্ট্যান স্বামী আর উমর খালিদ।

বিরোধীশূন্য সংসদে বিল পাশ করানো সম্পর্কে সেদিন সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী কিরেন রিজিজু কী বলেছিলেন?

‘কংগ্রেস পার্টি আর বিরোধীরা অনেক সময় নষ্ট করেছে। এখন আমরা আর দেশের সময়, সংসদের সময় নষ্ট করতে দেব না। সরকার গুরুত্বপূর্ণ সব বিল পাশ করাতে চায়। আমরা আজ সেগুলো লোকসভা আর রাজ্যসভা— দুই জায়গাতেই পাশ করাব। দেশ একজন লোকের আর একটা পরিবারের বোকামির জন্যে এত ক্ষতি সহ্য করতে পারে না। অনেক বিরোধী সাংসদও এসে বলেছেন তাঁরা নিরুপায়। তাঁদের নেতারা জোর করে গোলমাল পাকাতে বলে। আমরা প্রতিদিন একটা ইস্যু নিয়ে দেশের সময় আর সংসদের সময় নষ্ট হতে দেব না। সুতরাং আমরা গুরুত্বপূর্ণ বিলগুলো পাশ করাব।’

এই একটা ইস্যু কোনটা? ভোটচুরি। অর্থাৎ যা দিয়ে সংসদ তৈরি হয়েছে, সেটাকেই ফালতু বলে উড়িয়ে দিচ্ছে সরকার। সংসদ ব্যাপারটার গুরুত্বই আসলে স্বীকার করছে না, প্রকারান্তরে বলা হচ্ছে— আমরা যা চাইব সেটাই আইনে পরিণত করব।

গণতন্ত্রকে অস্বীকার করা এবং গণতন্ত্র নষ্ট করার অভিযোগ উঠলে সগর্বে ‘বেশ করেছি’ বলার এই ঔদ্ধত্যই ফ্যাসিবাদ। এর সঙ্গে অন্য কোনও সরকারের অন্যায়ের, অপশাসনের তুলনা চলে না। এ-কথা যাঁরা আজ বুঝবেন না, ফ্যাসিবাদ জাঁকিয়ে বসতে পারলে ভারতের গণতন্ত্রের পাশাপাশি তাঁদেরও ঠাঁই হবে জাদুঘরে। তবে গণতন্ত্রের এখনও বাঁচার আশা আছে, কারণ এই অতি বুদ্ধিমান অবুঝরা সংখ্যায় কম এবং রাজনৈতিকভাবে অপ্রাসঙ্গিক। রাহুল, অখিলেশ, তেজস্বী, ব্রিটাসরা জানেন কোনটা নির্বাচনী বাধ্যবাধকতা আর কোনটা ঐতিহাসিক প্রয়োজন। তাছাড়া ও পক্ষে আছেন অনুরাগের মতো কালিদাসের বংশধররা।

চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম ওয়েবসাইটে প্রকাশিত

অপারেশন সিঁদুর যে যে কারণে ভাল লাগল

গত কয়েকদিনে যা বুঝলাম, মোদিজি যতই স্লোগান দিন ‘বেটি বচাও, বেটি পঢ়াও’, এদেশের প্রগতিশীলরাও সিঁদুরকেই মেয়েদের সবচেয়ে দামি সম্পত্তি বলে মনে করেন।

২০২৫ সালের ৭ মে তারিখটা এ-জীবনে আর ভুলতে পারব বলে মনে হয় না। সকালে ঘুম থেকে উঠেই খবর পেলাম— বিশ্ব যখন নিদ্রামগন গগন অন্ধকার, তখন পহলগামে পাক-মদতপুষ্ট সন্ত্রাসবাদীদের হাতে মৃত ২৬ জনের হয়ে শোধ তুলে নিয়েছে ভারতীয় বায়ুসেনা। পাড়ার দোকানে, মোড়ের মাথায় জোর আলোচনা— পাকিস্তানকে টের পাইয়ে দেওয়া গেছে। যে-সব দোকানে খদ্দের কম হলেও আমদানি বেশি, সেখানে দেয়ালে লাগানো টিভিতে পাড়া কাঁপিয়ে চিৎকার করছেন বিভিন্ন চ্যানেলের অ্যাঙ্কররা। শুনে মনে হল, তাঁরাই প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে বোম ফেলে এসেছেন সীমান্তের ওপারে। বায়ুসেনার অফিসাররা নন। ভালো লাগল সকাল সকাল, মনে হল— আমিও পারি। আমরা যারা জীবনে কিছুই পারি না, ফ্ল্যাট কেনার পর ২-৩ বছর কেটে গেলেও প্রোমোটার লিফট লাগাচ্ছে না দেখে ক্রেতা সুরক্ষা আদালতে মামলা ঠুকতেও ভয় পাই, তাদের আত্মবিশ্বাস তুঙ্গে তুলে দিতে পারেন একমাত্র টিভি চ্যানেলের সাংবাদিকরা।

তবে এখানেই শেষ নয়। দিনটা আরও স্মরণীয় হয়ে গেল বেলা দশটার পরে, যখন নতুন দিল্লিতে ভারত সরকারের পক্ষ থেকে সরকারিভাবে সংবাদমাধ্যমকে জানানো হল ঠিক কী ঘটানো হয়েছে এবং কীভাবে। চারপাশে খুশির পরিবেশ তৈরি হলে নিজেরও ভাল লাগে। দেখলাম ব্রিফিং শেষ না হতেই আমার আত্মীয়, প্রতিবেশী, বন্ধু— সকলেই দারুণ খুশিয়াল হয়ে উঠেছে। না, সরকারের সমর্থকদের কথা বলছি না। যারা সরকারবিরোধী তাদের কথাই বলছি। যারা ধর্মনিরপেক্ষ তাদের খুশির কারণ মূলত দুটো। বিদেশসচিব বিক্রম মিশ্রি এ-কথা বলেননি যে পহলগামে হিন্দুদের আলাদা করে মারা হয়েছে। তার উপর তিনি বলেছেন যে সন্ত্রাসবাদীদের অনেক লক্ষ্যের মধ্যে একটা ছিল জম্মু ও কাশ্মীরে এবং বাকি ভারতে সাম্প্রদায়িক অশান্তি সৃষ্টি করা।

তবে! এই যে ধর্মনিরপেক্ষ বন্ধুদের সেদিন থেকে সেকু বলে গাল দেওয়া হচ্ছিল, এখন হল তো? ভারত সরকার নিজেই বলল তো, যে ধর্মনিরপেক্ষ লোকেদের কোনও দোষ নেই, বরং মানুষে মানুষে ধর্মের ভিত্তিতে ভেদাভেদ করা সন্ত্রাসবাদীদের কাজ? এত বড় সরকারি সিলমোহর ভারতের ধর্মনিরপেক্ষ মানুষ সেই ২০১৪ সাল থেকে পাননি। আহ্লাদ হবে না? পরিষেবা বেসরকারি হলে ভালো হবে জানি, কিন্তু স্বীকৃতিটা যে সরকারি না হলে আমাদের চলে না। তা পেয়ে গিয়ে আমারও গর্বে বুকটা ফুলে উঠল। ময়ূখ ঘোষ যা-ই বলুন, এতদ্বারা আমরা সেকুরাই জিতে গেলাম শেষমেশ। নরেন্দ্র মোদির মতো লোকের সরকার পর্যন্ত মানতে বাধ্য হল— ধর্মনিরপেক্ষতাই আমাদের সবচেয়ে বড় শক্তি। নেহাত সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের মতো প্রতিভা নিয়ে জন্মাইনি, নইলে গেয়েই উঠতাম ‘কী মিষ্টি, দেখো মিষ্টি/কী মিষ্টি এ সকাল’।

ওটুকু মিষ্টিতেই গোটা দিনটা কেটে যেতে পারত। কিন্তু আমাদের ধর্মনিরপেক্ষ পাতে রসগোল্লার পরে কালাকাঁদের ব্যবস্থাও করে রেখেছিল সরকার। বিক্রমবাবুর দুইদিকে বসিয়ে দেওয়া হয়েছিল দুই মহিলা সেনা অফিসারকে— ব্যোমিকা সিং আর সোফিয়া কুরেশি। একজন হিন্দু, একজন মুসলমান। আহা! কী বুদ্ধিই না করেছেন বিদেশমন্ত্রী জয়শঙ্করবাবু। পাকিস্তানের লক্ষ্য ছিল ভারতীয় হিন্দু আর ভারতীয় মুসলমানের মধ্যে বিভাজন তৈরি করা। কিন্তু জয়শঙ্করবাবু কি সোজা লোক? জেএনইউয়ের প্রাক্তনী বলে কথা। না হয় মন্ত্রী-টন্ত্রী হবেন বলে বিজেপিতে ভিড়েছেন। তা বলে কি আর অ্যালমা মাটারকে ভারতমাতার চেয়ে কম গুরুত্ব দেন? বিশ্বগুরুর মন্ত্রিসভায় ঢোকার অনেক আগেই বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে বাঙালি সেকু, মাকু বন্ধুদের মুখে নির্ঘাত কবিগুরুর কবিতা শুনেছিলেন। তাই তো প্রেস ব্রিফিংয়ে একেবারে ‘ভারততীর্থ’ দেখিয়ে দিলেন পাকিস্তানকে। ওঃ! মাস্টারস্ট্রোক। বিজেপি সমর্থকদের চেয়েও জোরে জোরে সমস্বরে আমার ধর্মনিরপেক্ষ বন্ধুরাই বলতে শুরু করলেন।

এখানেই শেষ নয়। আনন্দ আরও বেড়ে গেল নারীবাদী বন্ধুদের আনন্দ দেখে। এরকম একটা গুরুতর সন্ত্রাসবাদী আক্রমণের জবাব দেওয়ার অপারেশনের নাম দেওয়া হয়েছে ‘অপারেশন সিঁদুর’। মানে যে মহিলাদের সিঁদুর সেদিন সন্ত্রাসবাদীরা মুছে দিয়েছে তাদের সরকার সম্মান জানাল। তাও আবার দায়সারাভাবে নয়, প্রত্যাঘাতের ব্রিফিংয়ে দুই মহিলা অফিসারকে পাঠিয়ে। এমন ‘সিম্বলিজম’ অতুলনীয়। পাকিস্তান পারবে এরকম? পারবে যে না, তা নিয়ে দেখলাম বিজেপিবিরোধী নারীবাদী আর বিজেপি সমর্থকরা একমত। দুই পক্ষেরই বক্তব্য মোটামুটি এক— পাকিস্তানের মেয়েরা বোরখায় বন্দি, এদিকে আমাদের মেয়েরা যুদ্ধে যাচ্ছে শুধু নয়, নেতৃত্বও দিচ্ছে। মোদি সরকার যতই খারাপ হোক, এই ব্যাপারটা হেব্বি দিয়েছে।

আনন্দে ভাসতে ভাসতেই দেখলাম একে একে ভারতের সংসদীয় মার্কসবাদী দলগুলোর বিবৃতিও এসে পড়েছে। সকলেই সেনাবাহিনীকে বাহবা দিয়েছে। লিবারেশন ছাড়া কেউ যুদ্ধ যেন না হয় সে চেষ্টা করতে হবে— এ-কথা বলেনি। পাকিস্তান সরকারকে অনেক পরামর্শ-টরামর্শ দিয়েছে সন্ত্রাসবাদীদের ঘাঁটি ভেঙে দেওয়া, দোষীদের ভারতের হাতে তুলে দেওয়া ইত্যাদি সম্পর্কে। কিন্তু ভারত সরকারের কাছে পহলগামের ঘটনার তদন্তের কী হল— সে প্রশ্ন তোলেনি। কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খড়্গে কদিন আগেই অভিযোগ করেছিলেন যে, প্রধানমন্ত্রীর কাছে আগে থেকেই খবর ছিল যে কাশ্মীরে পর্যটকদের উপর হামলা হতে পারে। সেই কারণেই নাকি তিনি কাশ্মীর সফর বাতিল করেন। তাহলে নিরস্ত্র মানুষগুলোর প্রাণ বাঁচানো গেল না কেন? সে-প্রশ্নের জবাবও কোনও মার্কসবাদী দলের বিবৃতিতে চাওয়া হয়নি। এমনকি এতজন নিরপরাধ, নিরস্ত্র ভারতীয়ের মৃত্যুর ঘটনা নিয়ে যে দুটো সর্বদলীয় বৈঠক হল তার একটাতেও প্রধানমন্ত্রী উপস্থিত থাকলেন না কেন— সে-প্রশ্নও মাত্র দ্বিতীয় বৈঠকের পরে তোলা হয়েছে। সিপিআই দলের বিবৃতিতে তবু দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা প্রশমিত করার দাবি জানানো হয়েছে, সিপিএমের বিবৃতিতে কেবলই ভারত সরকারের জন্যে হাততালি আর পাকিস্তানের উপর চাপ বজায় রাখার পরামর্শ। দ্বিতীয় বৈঠকে সিপিএম সাংসদ জন ব্রিটাসের বক্তব্যে তবু খানিকটা সরকারের কাছে জবাবদিহি চাওয়ার প্রবণতা দেখা গেছে।

দেখে শুনে বুঝলাম, আমার মার্কসবাদী বন্ধুরাও খুবই আনন্দ পেয়েছে। অ্যাদ্দিন জানতাম তারা উল্লসিত হলে ‘লাল সেলাম’ বলে। এবার দেখলাম ‘জয় হিন্দ’ চালু হয়েছে। ‘ভারত মাতা কি জয়’ নেই দেখে অবাক হলাম। কারণ অনেকে বলেই দিয়েছে— রাজনৈতিকভাবে বিজেপির সঙ্গে মতপার্থক্য থাকতে পারে, কিন্তু দেশের সুরক্ষার প্রশ্নে সবাই এক। সিঁদুরকৌটোর ছবিওলা পোস্টারও অনেক কমরেড সগর্বে শেয়ার করেছেন।

সত্যি বলছি, বামে-ডানে এমন ঐক্য জন্মে দেখিনি। স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাস পড়েছিলাম হোয়াটস্যাপ ইউনিভার্সিটির দ্বারোদ্ঘাটনের অনেককাল আগে। তাতেও এমন ঐক্যের গল্প পাইনি। তাই খুব আনন্দ হল। এই যে সবকিছুতে রাজনীতি করার অভ্যাসের ঊর্ধ্বে উঠে সকলে এক হতে পেরেছে— এই তো আমাদের শক্তি। এইজন্যেই তো আমরা সভেরেন সোশালিস্ট সেকুলার ডেমোক্র্যাটিক, আরও কী কী সব, রিপাবলিক।

আরও পড়ুন হিন্দুরাষ্ট্রের হিন্দু নাগরিকের পিঠ বাঁচানোর চিঠি

তবে এসব হল ছোটখাটো আনন্দের কারণ। বেশি আনন্দ পেয়েছি অপারেশন সিঁদুরের সুদূরপ্রসারী ফলগুলো টের পেয়ে। যেমন ধরুন, সোফিয়া ব্রিফিংয়ে এসে বসার পর থেকে ভারতে মুসলমানদের বাড়িঘরের উপর দিয়ে বুলডোজার চালানো বন্ধ হয়ে গেছে। মুসলমান ডেলিভারি বয়ের কাছ থেকে খাবার না নেওয়ার বদভ্যাস সকলে ত্যাগ করেছে। মুসলমান মানেই সন্ত্রাসবাদী— এ-কথা তো আর ভুলেও কেউ উচ্চারণ করছে না। ব্যোমিকা আর সোফিয়াকে দেখামাত্র দেশের যেখানে যত ক্লিনিক বেআইনিভাবে ভ্রূণের লিঙ্গ পরীক্ষা করে কন্যাভ্রূণ হত্যা করত, সবকটার ব্যবসা লাটে উঠেছে। এপিজে আব্দুল কালামের পর আবার এতদিনে সোফিয়ার দেখা পেয়ে হিন্দুত্ববাদীদের বিশ্বাস হয়েছে যে মুসলমানরা ভারি দেশপ্রেমিক।

অপারেশন সিঁদুর যখন এত ভালো ভালো ব্যাপার একসঙ্গে ঘটিয়ে ফেলেছে, তখন অনুমান করছি মুনমুন সেনের শেষ হয়ে যাওয়া কেরিয়ারও নতুন করে শুরু করিয়ে দেবে। হয়ত ব্যবধান ছবির একখানা দেশপ্রেমিক হিন্দি রিমেক তৈরি হবে। আশা ভোঁসলের বয়সটা বড্ড বেশি হয়ে গেছে, তাই বৃদ্ধা মুনমুনের ঠোঁটে কণ্ঠদান করবেন শ্রেয়া ঘোষাল। সঙ্ঘ পরিবারের ঘনিষ্ঠ ভিক্টর ব্যানার্জিকে হয়তো শহিদ-টহিদ হিসাবে দেখানো হবে। তাঁর ছবির দিকে তাকিয়ে মুনমুন সেই ‘কত না ভাগ্যে আমার এ জীবন ধন্য হল/সিঁথির এই একটু সিঁদুরে সবকিছু বদলে গেল’-র হিন্দিটা ধরবেন। হয়তো গীতিকার হবেন প্রসূন জোশি আর সুর দিয়ে দেবেন এআর রহমান। তাহলেই বেশ ধর্মনিরপেক্ষ হয়ে যাবে ব্যাপারটা। গত কয়েকদিনে যা বুঝলাম, মোদিজি যতই স্লোগান দিন ‘বেটি বচাও, বেটি পঢ়াও’, এদেশের প্রগতিশীলরাও সিঁদুরকেই মেয়েদের সবচেয়ে দামি সম্পত্তি বলে মনে করেন। আজকের বাজারে ছবিটা চলবেও ভালো, প্রযোজক পেতেও অসুবিধা হবে না। কারণ ‘অপারেশন সিঁদুর’ ট্রেডমার্কের জন্যে একাধিক আবেদন জমা পড়ে গেছে। আবেদনকারীদের মধ্যে রিলায়েন্স গ্রুপও ছিল, তবে মুকেশ আম্বানি লোক ভালো। তিনি আবেদন প্রত্যাহার করে নিয়েছেন, বলেছেন কোনও অপোগণ্ড নিচুতলার কর্মচারী নাকি ভুল করে আবেদনটা করে ফেলেছিল তা সে যা-ই হোক, ট্রেডমার্ক কেউ নিক আর না-ই নিক, নামটার বিক্রয়যোগ্যতা তো প্রমাণ হয়ে গেল। এরপর ছবির প্রযোজক পেতে কি আর অসুবিধা হবে? আমরা ধর্মনিরপেক্ষ, বামপন্থী, প্রগতিশীল লোকেরা দল বেঁধে দেখতে যাব। কারণ ওই যে— রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকতেই পারে, কিন্তু দেশের প্রশ্নে আমরা সকলে এককাট্টা।

অর্থাৎ আগামীদিনে ভারতের আনন্দযজ্ঞে সবার নিমন্ত্রণ। তবে এই যজ্ঞে পুঞ্চে যে ১৫ জন ভারতীয়কে পাকিস্তান বোম ফেলে মেরেছে আর যে ৪৩ জনকে আহত করেছে বলে খবর, তাদের পরিবার-পরিজন যোগ দেবে কিনা ঠিক বুঝতে পারছি না। অবশ্য কাশ্মীর আমাদের বলেই যে কাশ্মীরিদেরও আমাদের লোক বলে ধরতে হবে এমন মাথার দিব্যি কেউ দেয়নি। কাশ্মীরিরা যেহেতু ঘরপোড়া গরু, তারা সিঁদুরে মেঘ দেখলে ডরাতে পারে। আমরা আনন্দ করব না কেন?

চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম ওয়েবসাইটে প্রকাশিত

বিধবা, পিতৃহীন শিশু – সকলকে জবাব দিতে হবে সেকুলারদের

যদি এই লেখায় তথ্যের গুরুতর ভ্রান্তি বা সত্যের অপলাপ আছে বলে মনে হয়, তার জন্যে নিবন্ধকার দায়ী নন। কারণ সব সত্যি লেখা লেখকের পক্ষে বিপজ্জনক

কাশ্মীরের পহলগামে মঙ্গলবারের ইসলামিক সন্ত্রাসবাদী হানার পরে দুদিন হতে চলল। এখনো প্রধানমন্ত্রী রাহুল গান্ধী সুনির্দিষ্টভাবে জানাতে পারলেন না সরকার এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে কী ব্যবস্থা নিচ্ছে। অবশ্য একটি জনসভায় তিনি বলেছেন যে সন্ত্রাসবাদীদের কড়া জবাব দেওয়া হবে, তারা যা করেছে তার বহুগুণ তীব্র জবাব তারা ফেরত পাবে। কিন্তু বৃহস্পতিবার সরকারের পক্ষ থেকে বিরোধীদের দাবি মেনে এই ইস্যুতে যে সর্বদলীয় বৈঠক ডাকা হয়েছিল নিউ দিল্লিতে, সেই বৈঠকে রাহুল উপস্থিত ছিলেন না। এমনি এমনি তো আর রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা রাজনীতিকে তিনি সত্যিই কতখানি গুরুত্ব দেন তা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন না। এই সেদিন সৌদি আরব থেকে ফিরলেন, আবার হয়ত কয়েকদিন পরেই দেখা যাবে অন্য কোনো দেশে চলে গেছেন।

এদিকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অখিলেশ যাদব এই ঘটনায় নিজের মন্ত্রকের ব্যর্থতা নিয়ে একটি কথাও বলেননি। অথচ অন্য অনেক ব্যাপারেই তিনি সদা সরব। যখনই আর্কিওলজিকাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়া আদালতের নির্দেশে কোনো মসজিদের নিচে কী ছিল তা জানার জন্যে খোঁড়াখুঁড়ি করতে যায়, তখন অখিলেশ এবং তাঁর দল সমাজবাদী পার্টির অন্যান্য নেতারা তাতে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করেন। ফলে বিপুল অশান্তি সৃষ্টি হয়। অথচ দেশের নিরীহ, নিরস্ত্র নাগরিকদের উপরে এই ভয়াবহ হামলার পরে অখিলেশ চুপ। ২০১৬ সালের ৮ নভেম্বর নোটবন্দির পর, ২০১৯ সালের ৫ অগাস্ট সংবিধানের ৩৭০ নম্বর অনুচ্ছেদ বিলোপ এবং জম্মু ও কাশ্মীর রাজ্যকে ভেঙে দিয়ে কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে পরিণত করার পর রাহুল-অখিলেশের সরকার বলেছিল – কাশ্মীরে সন্ত্রাসবাদের কোমর ভেঙে দেওয়া হয়েছে। আর কোনোদিন সন্ত্রাসবাদীরা মাথা তুলে দাঁড়াতে পারবে না। সেক্ষেত্রে পৃথিবীর সর্বাধিক সেনা মোতায়েন থাকা অঞ্চলে এই ঘটনা ঘটল কী করে – সেই প্রশ্নের কোনো উত্তর অখিলেশ এখন পর্যন্ত দিতে পারেননি। কাশ্মীরের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে তিনি যে বৈঠক করেছেন তাতে আবার মুখ্যমন্ত্রী ওমর আবদুল্লাকে ডাকা হয়নি। এর কারণ কী? ভবিষ্যতে এরকম কোনো ঘটনা ঘটলে ওমর যাতে নিজের দায়িত্ব অস্বীকার করতে পারেন, অখিলেশ কি সেই ব্যবস্থা করছেন? ইন্ডিয়া জোটের শরিকের স্বার্থরক্ষা করতে তিনি কি দেশের সাধারণ নাগরিকদের জীবনকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলছেন না?

ভারতের সেকুলার নেতাদের এইসব আচরণের মাশুল অতীতেও হিন্দুদের দিতে হয়েছে, এভাবে চললে ভবিষ্যতেও দিতে হবে। এই সেকুলার সরকারের আমলে একটার পর একটা ইসলামিক সন্ত্রাসবাদী হামলার ঘটনা ঘটেই চলেছে, অথচ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হিসাবে অখিলেশের স্থান নিয়ে কেউ কোনো প্রশ্ন তুলছে না। অথচ ২০০৮ সালের ২৬ নভেম্বর মুম্বাইয়ের ভয়াবহ সন্ত্রাসবাদী হানার পর তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শিবরাজ পাতিল পদত্যাগ করেছিলেন। এই সরকারের আমলে বারবার ইসলামিক সন্ত্রাসবাদীরা ভারতের উপর হামলা চালাচ্ছে, বিশেষত কাশ্মীরে। ২০১৬ সালের ২-৫ জানুয়ারি পাঞ্জাবের পাঠানকোটে ভারতীয় বায়ুসেনার ছাউনিতে জৈশ-ই-মহম্মদের সন্ত্রাসবাদীরা হানা দেয়। তিনদিন লেগেছিল চারজন সন্ত্রাসবাদীকে হত্যা করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে। রাহুল আর অখিলেশের সরকার সেই ঘটনার কড়া জবাব দেওয়ার বদলে এক অভূতপূর্ব ঘটনা ঘটায়। পাকিস্তানের প্রতিনিধি দলকে পাঠানকোটের সেনা ছাউনিতে গিয়ে ঘটনা সম্পর্কে সাক্ষীদের জিজ্ঞাসাবাদ করার অধিকার দেওয়া হয়। পাকিস্তান যে প্রতিনিধি দল পাঠিয়েছিল ২৯ মার্চ, তাতে কুখ্যাত পাক গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআইয়ের এক সদস্যও ছিলেন। পাঠানকোটে ওই হামলার সপ্তাহখানেক আগেই ভারতের প্রধানমন্ত্রী রাহুল আচমকা পাক প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফের নাতনির বিয়েতে গিয়ে হাজির হন। সেইসময় সরকার পক্ষ এই পদক্ষেপকে একজন সত্যিকারের রাষ্ট্রনেতার ব্যবহার বলে প্রশংসা করেছিল। ওই ব্যবহারের কী প্রতিদান দিয়েছিল পাকিস্তান? এক সপ্তাহের মধ্যেই তাদের মাটিতে পুষ্ট জঙ্গি সংগঠন ভারতের সেনা ছাউনি আক্রমণ করে এবং তাদের সঙ্গে লড়াইয়ে সাতজন ভারতীয় জওয়ানের প্রাণ যায়।

সেবছরের ১৮ সেপ্টেম্বর উরিতে হামলা চালিয়ে ১৯ জন ভারতীয় সৈনিককে হত্যা করে ইসলামিক সন্ত্রাসবাদীরা। তার জবাব হিসাবে ২৯ সেপ্টেম্বর নিয়ন্ত্রণরেখা পেরিয়ে ‘সার্জিকাল স্ট্রাইক’ করে ভারতীয় সেনাবাহিনি।

তবে এসবের চেয়ে অনেক বড় আঘাত ছিল ২০১৯ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি পুলওয়ামার ঘটনা। আড়াই হাজার সিআরপিএফ জওয়ানকে নিয়ে জম্মু-শ্রীনগর হাইওয়ে দিয়ে যাচ্ছিল ৭৮ খানা বাসের লম্বা কনভয়। পুলওয়ামা জেলার লেথাপোরার কাছে এক আত্মঘাতী জঙ্গি, পরে যাকে চিহ্নিত করা হয় আদিল আহমেদ দার বলে, সে ৩৫০ কিলোগ্রাম বিস্ফোরকে ঠাসা গাড়ি নিয়ে ওই কনভয়ের একটি বাসে ভিড়িয়ে দেয়। ফলে ৪০ জন সিআরপিএফ জওয়ানের মৃত্যু হয়। এই ঘটনার প্রত্যাঘাত হিসাবে ২৬ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তানের বালাকোটে বোম ফেলা হয়। কিন্তু ওই বিপুল পরিমাণ বিস্ফোরক নিয়ে একটি গাড়ি কী করে সশস্ত্র বাহিনির কনভয়ের কাছে পৌঁছতে পারল, সে প্রশ্নের জবাব আজ পর্যন্ত রাহুল-অখিলেশের সরকার দিতে পারেনি। এই ঘটনার কোনো পূর্ণাঙ্গ তদন্ত পর্যন্ত হয়েছে বলে খবর নেই। দাভিন্দর সিং নামে জম্মু-কাশ্মীর পুলিসের এক ডিএসপিকে গ্রেফতার করা হয়েছিল ২০২০ সালের ১১ জানুয়ারি। তাঁর বিরুদ্ধে ন্যাশনাল ইনভেস্টিগেশন এজেন্সি (এনআইএ), ভারত রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালানোর চেষ্টা এবং অন্যান্য অভিযোগে ইউএপিএ আইনে মামলা দায়ের করে। তাঁকে চাকরি থেকে বরখাস্তও করা হয়। তিনি এই মুহূর্তে এনআইএ-র দায়ের করা মামলায় বিচারবিভাগীয় হেফাজতে আছেন বটে, কিন্তু দুটি মামলার একটিতে জামিন হয়ে বসে আছে, অন্য মামলার কোনো অগ্রগতি নেই। পুলওয়ামার ঘটনায় আর একটিও গ্রেফতার হয়নি।

এদিকে পহলগামের ঘটনার পরে এই সরকারের দীর্ঘদিনের গুণমুগ্ধ প্রাক্তন সেনাকর্তা মেজর জেনারেল জি ডি বক্সী রিপাবলিক টিভিতে বসে প্রধানমন্ত্রীর ভক্ত সাংবাদিক অর্ণব গোস্বামীর মুখের উপর বলে দিয়েছেন, কোভিডের সময়ে নাকি তিন বছর ধরে সেনাবাহিনিতে কোনো নিয়োগ হয়নি। টাকা বাঁচানোর জন্যে ভারতীয় সেনার সংখ্যা ১,৮০,০০০ কমিয়ে ফেলা হয়েছে। ফলে আগে যতজন সেনা কাশ্মীরে একটা সেক্টরে নজরদারি করত, এখন ততজনকেই দুটো সেক্টরে নজরদারি করতে হচ্ছে। এই তথ্য সত্য না মিথ্যা তা আমরা জানি না, কিন্তু এই বক্তব্যকে খণ্ডন করে এখন পর্যন্ত প্রতিরক্ষা মন্ত্রী তেজস্বী যাদব কোনো বিবৃতি দেননি।

পশ্চিমবঙ্গে বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী এবং বাংলার সংবাদমাধ্যম আশ্চর্যভাবে সেকুলার সরকারের অযোগ্যতা সম্পর্কে একটি কথাও বলছে না। দেশের অন্য ভাষার মূলধারার সংবাদমাধ্যমগুলিও প্রায় রাহুল-অখিলেশের সরকারের গেলানো ভাষ্যই উগরে যাচ্ছে। তবে অন্য রাজ্যের সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গের তফাত হল, যদি অন্য রাজ্যগুলির দিকে তাকাই তাহলে দেখব, ক্ষমতাসীন সেকুলার দলগুলির নেতারা যেখানেই পহলগামে নিহত মানুষদের পরিবারের সঙ্গে দেখা করতে যাচ্ছেন, সেখানেই ক্ষোভের সম্মুখীন হচ্ছেন। একটি ছয় বছরের শিশু, যে বাবাকে হারিয়েছে, সে-ও সটান টিভি ক্যামেরার সামনে বলে দিচ্ছে – সরকার কিছুই জানে না, সরকার প্রায় অস্তিত্বহীন। বড়দের উদাহরণও দেখে নিন নিচের লিংকগুলিতে

অন্যদিকে কাশ্মীর থেকে যে হিন্দু পর্যটকরা বেঁচে ফিরেছেন তাঁদের দিয়ে কাশ্মীরি মুসলমানদের সম্পর্কে খারাপ কথা বলাতে ঘাম ছুটে যাচ্ছে অমিশ দেবগনের মত সরকারপন্থী সাংবাদিকদের।

বহু হিন্দু পর্যটক তো রীতিমত সোশাল মিডিয়ায় ভিডিও আপলোড করে জানাচ্ছেন, কাশ্মীরিরা তাঁদের সঙ্গে কত ভাল ব্যবহার করেছেন।

অনেকেই মিডিয়ার সামনেও একই বয়ান দিচ্ছেন।

এই প্রবণতা বিপজ্জনক, কারণ এ থেকে মনে হচ্ছে, রাহুল-অখিলেশ-তেজস্বী প্রমুখের অপদার্থতা সত্যেও সেকুলারিজমের ভূত এই লোকগুলির মাথাতেও ঢুকে যাচ্ছে। চোখের সামনে ইসলামিক সন্ত্রাসবাদের নগ্ন রূপ দেখার পরেও, সন্ত্রাসবাদীরা বেছে বেছে হিন্দুদের খুন করেছে জানার পরেও।

আরও পড়ুন বাধ্যতামূলক মহানতার একাকিত্বে ইমাম রশিদি

এই যে দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি ভারতের হচ্ছে, এর দায় কেবল সেকুলার নেতাদের নয়, দলবিহীন সেকুলার ব্যক্তিদেরও নিতে হবে। সেই ২০১৪ সাল থেকে যতগুলি সন্ত্রাসবাদী হামলা হয়েছে এদেশে এবং তাতে যত মানুষের মৃত্যু হয়েছে – সবকিছুর দায় এই সেকুলারদের। এদের জন্যেই আজ ভারতে কোনো শক্তিশালী সরকার নেই। থাকলে এভাবে বারবার দেশের মানুষকে ইসলামিক সন্ত্রাসবাদীদের হাতে অসহায়ভাবে প্রাণ দিতে হত না। ওই ছয় বছরের পিতৃহারা ছেলেটির সামনেও এদের জবাব দিতে হবে।

নাগরিক ডট নেট ওয়েবসাইটে প্রকাশিত

এসএসসি: স্থান কাল পাত্র গুলিয়ে যাওয়া সাংবাদিকের স্বীকারোক্তি

কখন সিপিএমের নেতৃত্বে ক্ষমতায় ফিরল বামফ্রন্ট, কখন বিকাশ ভট্টাচার্য মুখ্যমন্ত্রী হয়ে গেলেন, ২৬,০০০-এর বেশি শিক্ষক, শিক্ষাকর্মীর চাকরি খেয়ে নিলেন – কিছুই খেয়াল করলাম না! এর চেয়ে লজ্জার কথা আর কী হতে পারে?

কয়েকদিন হল বেশ লজ্জায় পড়ে গেছি। ২০০৫ সাল থেকে সাংবাদিকতায় আছি। শিশু যেমন হাঁটতে শেখার সময়ে বারবার হোঁচট খায়, পড়ে যায়, তেমন আমিও সাংবাদিকতার শুরুর দিনগুলোতে বিস্তর ভুল করেছি। তখন সিনিয়রদের ধমক খেয়েছি, খেতে খেতে কাজে ভুল কমেছে। সব সাংবাদিকেরই বেড়ে ওঠার এটাই প্রক্রিয়া। তিনি খেলা, গান-নাটক-সিনেমা-সাহিত্য, রাজনীতি, অর্থনীতি – যে শাখার সাংবাদিকই হোন। কিন্তু বিশ বছর কাজ করার পরেও এরকম বিচ্ছিরি ভুল করে ফেলেছি জানতে পারলে আমাকে যাঁরা সাংবাদিকতা শিখিয়েছিলেন তাঁরা আজও কান মুলে দেবেন। খেয়ালই করিনি কবে অষ্টম বামফ্রন্ট সরকার এসে গেছে রাজ্যে।

২০১১ সালে মমতা ব্যানার্জির নেতৃত্বে ক্ষমতায় আসা তৃণমূল কংগ্রেস সরকার কখন পড়ে গেল, কখন সিপিএমের নেতৃত্বে ক্ষমতায় ফিরল বামফ্রন্ট, কখন বিকাশ ভট্টাচার্য মুখ্যমন্ত্রী হয়ে গেলেন, ২৬,০০০-এর বেশি শিক্ষক, শিক্ষাকর্মীর চাকরি খেয়ে নিলেন – কিছুই খেয়াল করলাম না! এর চেয়ে লজ্জার কথা আর কী হতে পারে? একদা এক সম্পাদকের অধীনে কাজ করতাম, তাঁর একটা অদ্ভুত ধারণা ছিল। কোনো সাংবাদিক কাজে ভুল করেছে মানেই নাকি সে কাজ করতে করতে ঘুমোচ্ছিল। ভুলটা যা-ই হোক, যেমনই হোক, ভুলের কারণ যে এই একটাই – সে ব্যাপারে তিনি আশ্চর্য রকমের নিশ্চিত ছিলেন। আমরা যারা তাঁর অধীনস্থ তারা এতে যারপরনাই রেগে যেতাম, কারণ সাংবাদিকদের নানাবিধ চাপের মধ্যে কাজ করতে হয়। রিপোর্টারদের একরকম চাপ থাকে, সাব-এডিটরদের অন্যরকম। একেকটা চাপের কারণে একেকরকম ভুল হওয়া সম্ভব। কিন্তু সকলকেই এত গতির মধ্যে সারাক্ষণ কাজ করতে হয় যে ঘুমোবার বা ঝিমোবার কোনো অবকাশ নেই। ফলে বস ওই অভিযোগ করলে যে কোনো সাংবাদিকের প্রবল ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠাই স্বাভাবিক। অথচ এই যে ভুলটা আমার হল সারাক্ষণ খবরের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকা সত্ত্বেও – এর ব্যাখ্যা সেই খড়্গহস্ত সম্পাদকের অনড় মতটা ছাড়া আর কী দিয়েই বা করা যায়?

২০১৬ সালের এসএসসি পরীক্ষার ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে ছিল তৃণমূল পরিচালিত সরকার দ্বারা নিযুক্ত স্বায়ত্তশাসিত সংস্থা স্কুল সার্ভিস কমিশন। তার আধিকারিকদের নিযুক্ত করেছিল তৃণমূল সরকার। সেবারের এসএসসি পরীক্ষার ফল বেরোবার সময়ে শিক্ষামন্ত্রী ছিলেন তৃণমূল নেতা পার্থ চট্টোপাধ্যায়। পরীক্ষার ফল নির্ধারণে এবং চাকরিতে নিযুক্তির ক্ষেত্রে দুর্নীতি হয়েছে বলে মামলা করেন সেবারে পরীক্ষা দিয়ে চাকরি না পাওয়া প্রার্থীরা। তাঁদের কৌঁসুলি সিপিএম নেতা এবং একদা কলকাতা কর্পোরেশনের মেয়র বিকাশবাবু। তদন্তে পার্থবাবুর বিস্তর স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তির হদিশ মেলে এবং তিনি সমেত যতজন গ্রেফতার হন, সকলেই হয় সরাসরি তৃণমূল কংগ্রেস দলের নেতা, মন্ত্রী, কর্মী; নয়ত কোনো না কোনোভাবে ওই দলের সঙ্গে যুক্ত অথবা তৃণমূল সরকারের আমলে শিক্ষাক্ষেত্রের কোনো প্রশাসনিক পদে ছিলেন।

এই পর্যন্ত জানতাম। কিন্তু ২০১৬ সালের এসএসসি পরীক্ষার নিয়োগ দুর্নীতি সংক্রান্ত মামলায় সুপ্রিম কোর্টের রায় বেরোতেই সব গুলিয়ে গেল। ভিনগ্রহের জীবদের এই গ্রহে আগমন নিয়ে তৈরি হলিউডি ছবিতে যেমন দেখায়, আমার বোধহয় তেমন কোনো অভিজ্ঞতা হয়েছিল যার স্মৃতি মুছে গেছে। ফলে মাঝের সময়টার হিসাব মেলাতে পারছি না। এমনও হতে পারে যে বর্তমান শিক্ষামন্ত্রী, নট ও নাট্যকার ব্রাত্য বসু রচিত উইঙ্কল টুইঙ্কল নাটকের কেন্দ্রীয় চরিত্রটার মত কিছু একটা হয়েছিল আমার। কারণ কখন যে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বিরোধী দলনেত্রী হয়ে গেছেন তা টেরই পাইনি। গতকাল বাড়ির সামনে দিয়ে একটা মিছিল যাচ্ছে আওয়াজ পেলাম। ভাবলাম চাকরিহারাদের দাবি নিয়ে, বা সামগ্রিকভাবে পশ্চিমবঙ্গের স্কুলশিক্ষার দুরবস্থা নিয়ে, বামেদের মিছিল-টিছিল হবে (রামনবমী পেরিয়ে গেছে বলে বিজেপির মিছিল আশা করিনি)। ও মা! বারান্দায় গিয়ে দেখি তৃণমূল ছাত্র পরিষদের মিছিল যাচ্ছে – ধিক্কার মিছিল। ছাব্বিশ হাজার শিক্ষকের চাকরি যাওয়ায় সিপিএম ও বিজেপিকে ধিক্কার। এমনিতেই নিজেকে কেমন ‘টাইম ট্র্যাভেলার’ মনে হচ্ছিল, আরও ঘেঁটে গেলাম কারণ দেখলাম মিছিল যেখান দিয়ে যাচ্ছে, ঠিক সেখানেই একটা দেওয়ালে বিরোধী দলনেত্রী আর তাঁর ভাইপো অভিষেক ব্যানার্জির ছবিওলা একখানা লম্বালম্বি পোস্টার। তাতে সিপিএম যে পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনে শূন্য পাওয়ার হ্যাটট্রিক করে ফেলেছে সেকথা স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়েছে। স্পষ্ট দেখলাম – বছরগুলো হল ২০১৯, ২০২৪, ২০২১।

তৃণমূল
ছবি লেখকের

বিপদটা বুঝুন একবার! ৩ এপ্রিলের পর থেকে সব গুলিয়ে যাচ্ছে দেখে সবে নিজেকে বোঝাতে শুরু করেছিলাম যে কোনোভাবে টাইম মেশিনে চড়ে বসেছি। পিছিয়ে বাম আমলে চলে গেছি। তাই দেখছি নিয়োগ কেলেঙ্কারির জন্যে আগুনে বিরোধী নেত্রী সিপিএমের মুণ্ডপাত করছেন আর তাঁর দলের ছাত্র সংগঠন সরকারকে ধিক্কার জানাতে মিছিল বার করেছে। বেশ করেছে। এত বড় কেলেঙ্কারি যে সরকারের আমলে হয়, যে সরকার যোগ্য শিক্ষক, শিক্ষাকর্মীদের চাকরি যাওয়ার উপক্রম হলেও হাইকোর্ট থেকে সুপ্রিম কোর্টে অযোগ্য ব্যক্তিদের তালিকা দেয় না, সেই সরকারকে ধিক্কার জানানোই তো উচিত। কিন্তু তাহলে পোস্টারে ওই বছরগুলো জ্বলজ্বল করছে কী করে! তবে কি টাইম মেশিন আমাকে ভবিষ্যতে নিয়ে গিয়ে ফেলল? এমনিতেই এখনো আর জি কর কাণ্ডের পর রাজ্যের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তথা স্বাস্থ্যমন্ত্রীর নিজেরই সরকারের বিরুদ্ধে (নাকি ধর্ষকের বিরুদ্ধে?) প্রতিবাদ মিছিলের ধাক্কা এখনো কাটিয়ে উঠতে পারিনি, তার উপর এই? এ যে শিশুর আত্মার উপর নরকের দুঃস্বপ্ন!

যত দিন যাচ্ছে, মাথাটা পরিষ্কার হওয়ার বদলে আরও ঘেঁটে যাচ্ছে। তিন তারিখ এসএসসি মামলায় সুপ্রিম কোর্টের রায় বেরোবার পরে আমরা সকলেই বলছিলাম – যোগ্য ব্যক্তিদের চাকরি যাওয়া অন্যায়। ক্রমশ দেখছি সুরটা বদলে যাচ্ছে। নেতাজি ইন্ডোরের সভা থেকে মুখ্যমন্ত্রীই (নাকি বিরোধী নেত্রী?) বোধহয় অন্য সুর বেঁধে দিলেন। এখন অনেককে বলতে শুনছি – সকলের চাকরি যাওয়াই অন্যায়, অমানবিক। মানে যারা ঘুষ দিয়ে চাকরি পেয়েছে, তাদেরও চাকরি যাওয়া উচিত নয়। মুখ্যমন্ত্রী সেদিন মঞ্চ থেকেই বলেছেন যে আগে তিনি যোগ্যদের ব্যবস্থা করবেন, তারপর যারা অযোগ্য তাদের ব্যাপারটাও দেখবেন। এখন দেখছি চারপাশে অনেকেরই সেরকম মনোভাব। বরং যাঁরা মামলাকারী, অর্থাৎ যাঁরা ২০১৬ সালের এসএসসি পরীক্ষায় বসেছিলেন এবং দুর্নীতির কারণে আদৌ চাকরি পাননি, তাঁদের কথা কাউকে আর বিশেষ বলতে শুনছি না। তাঁদের উকিল বিকাশবাবুকেই যেহেতু এত শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মীর চাকরি হারানোর জন্যে দায়ী করেছেন মমতা, সেহেতু সেই মামলাকারীরাই প্রায় খলনায়ক হয়ে গেছেন অনেকের চোখে। বিশেষত আদালতের রায়ে যাঁরা চাকরি হারিয়েছেন তাঁদের চোখে। পার্থবাবু নির্ঘাত এখন প্রেসিডেন্সি সংশোধনাগারে বসে হাসছেন। এই মামলায় একে একে জামিন পেয়ে বেরিয়ে আসা শুরু হয়ে গিয়েছিল সুপ্রিম কোর্টের রায়ের আগেই, এই সংক্রান্ত আরেক মামলার রায়ে রাজ্য মন্ত্রিসভার অতিরিক্ত পদ তৈরি করার সিদ্ধান্ত নিয়ে সিবিআইয়ের তদন্তও বন্ধ করে দিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট। ফলে পার্থবাবু নিশ্চয়ই অদূর ভবিষ্যতে বসন্তের হাওয়ায় শ্বাস নেবেন বলে আশা করছেন।

পশ্চিমবঙ্গ জটিল জায়গা। আমার মত ঘেঁটে যাওয়া লোকের পক্ষে তো আরও জটিল। চুরি হয়েছে তা প্রমাণিত, কিছু চোর ধরাও পড়েছে। আরও চোর ভিড়ের মধ্যে মিশে আছে বলে আদালত রায় দিয়েছে। অথচ এ রাজ্যে সবাই মিলে বলছে না ‘যারা চোরকে দরজা খুলে দিয়েছে তারা দোষী।’ বরং যারা দরজা খুলে দিয়েছে বলে সন্দেহ, তাদের সঙ্গেই গলা মিলিয়ে অনেকে বলছে ‘যাদের জিনিস চুরি হয়েছে তারা মামলা করল কেন? ও ব্যাটারাই দোষী। ওদের উকিলটাই যত নষ্টের গোড়া।’ আইনের চোখে, বিচারসভায় উকিল যে মক্কেলের চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ, তিনি ভাল লোক না মন্দ লোক তা তিনি কোন মামলায় কাদের হয়ে লড়ছেন তা দিয়ে প্রমাণিত হয় – এ কথাটাও নতুন জানছি। এই যুক্তি সমাজ মেনে নিলে সবচেয়ে বড় বিপদ কিন্তু কোনো কারণে রাষ্ট্রের বা সংখ্যাগুরুর বিরাগভাজন হন যাঁরা, তাঁদের। এমনিতেই ভারতে মাওবাদীদের উকিলকে মাওবাদী বলে দাগিয়ে দেওয়া, সন্ত্রাসবাদী হানার অভিযোগে গ্রেফতার হওয়া মুসলমানদের আইনজীবীকে জেহাদি বলা – এসব চালু আছে। মক্কেল আর তার আইনজীবীকে এক ধরলে গোটা বিচারব্যবস্থারই যে আর কোনো মানে থাকে না তা দেখছি পশ্চিমবঙ্গের প্রগতিশীল, বামপন্থী মানুষরাও অনেকে ভুলে গেছেন। এই যুক্তিতে খুনির উকিলকেও খুনি, ডাকাতের উকিলকেও ডাকাত বলে ধরতে হয়। পশ্চিমবঙ্গ অবশ্য আরও জটিল জায়গা। এখানে যারা দোষী সাব্যস্ত হয়েছে তাদের উকিলদের কেউ দোষী বলছে না (নামও করছে না), অভিযোগকারীদের উকিলকে দোষী বলছে।

আরও পড়ুন সততা ও বাংলার সংবাদমাধ্যম: কোনো প্রশ্ন নয়

আপনারা কী করে মাথা ঠিক রাখছেন জানি না, আমার ঘেঁটে যাওয়া কিন্তু এখানেই শেষ নয়। বিরোধী দলনেত্রী, থুড়ি মুখ্যমন্ত্রী, চাকরি যাওয়া শিক্ষক, শিক্ষাকর্মীদের এমনি এমনি হরলিক্স খাওয়ার মত এমনি এমনি স্কুলে গিয়ে কাজ করতে বলেছিলেন। বলেছিলেন তা নাকি কেউ আটকাতে পারে না। অথচ তার কদিন পরেই ডি আই অফিসে প্রতিবাদ জানাতে গিয়ে পশ্চিমবঙ্গ পুলিসের হাতে বেধড়ক মার খেয়ে গেলেন চাকরিহারা মানুষগুলো। কেবল পুলিসের চিরপরিচিত লাঠি নয়, লাথির ব্যবহারও বাদ থাকেনি। শিক্ষক, শিক্ষাকর্মীরা জেলার স্কুল ইন্সপেক্টরের অফিসে গেলে মার জুটবে আর স্কুলে গেলে গোল্লা? কোন মহাপাপে এই শাস্তি? শিক্ষামন্ত্রী জানিয়েছেন – পাপটা হল আলোচনার টেবিলে এসে বসার পাশাপাশি আন্দোলন করতে ডি আই অফিসে চলে যাওয়া। আর জি কর আন্দোলনের সময়ে সরকারি দলের প্রতিনিধিদের মুখে শোনা গিয়েছিল রাজনীতি করা অন্যায়, এখন শোনা যাচ্ছে আন্দোলন করা অন্যায়। এটা ২০২৫ সালের গণতান্ত্রিক পশ্চিমবঙ্গ তো? নাকি অতীত বা ভবিষ্যতের কোনো একনায়কতান্ত্রিক ব্যবস্থায় ঢুকে পড়েছি? কেবল গুলিয়ে যাচ্ছে।

নাঃ! আর বেশি বলব না। বিজ্ঞজনে বলেছেন ‘বোবার শত্রু নেই’। সেই তুলনায় এমনিতেই অনেক বেশি কথা বলে ফেলেছি। থেমে যাওয়ার আগে সাম্প্রতিকতম ঘেঁটে যাওয়ার কারণটা বলে নিই। ১১ এপ্রিল শিক্ষামন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করে বেরিয়ে চাকরিহারারা সংবাদমাধ্যমের সামনে বেশ আশ্বস্ত গলায় বলেছেন, শিক্ষামন্ত্রীর উপস্থিতিতে নাকি এসএসসি জানিয়েছে যে যোগ্য আর অযোগ্যের আলাদা তালিকা তৈরি করা ইতিমধ্যেই শুরু হয়ে গেছে। ২১ এপ্রিল নাগাদ প্রকাশও করা হতে পারে।

এখন কথা হল, ব্যাপারটা যদি এতই জলভাত হয়, তাহলে এতদিন এসএসসি এই তালিকা তৈরি করেনি কেন আদালত বারবার বলা সত্ত্বেও? এখনই বা কিসের ভিত্তিতে বলা হচ্ছে তালিকা তৈরি করে দেওয়া হবে? এর উত্তরে চাকরিহারাদের মুখপাত্ররা জানিয়েছেন যে, ওএমআর শিটের ‘মিরর ইমেজ’ এসএসসির কাছে না থাকলেও তাঁরা সিবিআইয়ের আদালতে দাখিল করা মিরর ইমেজকেই ‘সার্টিফাই’ করতে রাজি। সেই ২২ লক্ষ ‘মিরর ইমেজ’ থেকেই জানা যাবে কে যোগ্য আর কে অযোগ্য।

কিমাশ্চর্যম তৎপরম! সিবিআইয়ের দেওয়া ওই প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও তো সুপ্রিম কোর্ট গোটা প্যানেল বাতিল করার রায় দিয়েছে। কেন দিয়েছে? কারণ রায়ের ৩৮ নম্বর অনুচ্ছেদে উল্লেখ করা হয়েছে যে ‘টেইন্টেড ক্যান্ডিডেট’-দের আইনজীবী বলেছেন – ওএমআর শিটের স্ক্যানড কপি বা ‘মিরর ইমেজ’-কে প্রমাণ হিসাবে ধরে তাঁদের শাস্তি দেওয়া উচিত নয়। কারণ ওগুলো তাঁরা যে শিটে পরীক্ষা দিয়েছিলেন সেই শিট নয়। আদালত তাঁদের আপত্তি উড়িয়েও দেয়নি। কেন দেয়নি তার ব্যাখ্যা পরের কয়েকটা অনুচ্ছেদে রয়েছে। নিচে দেখুন:

‘টেইন্টেড ক্যান্ডিডেট’-দের কথা সত্যি না মিথ্যে, তা পরীক্ষা করার কোনো উপায় ছিল না, আজও নেই। কারণ ওএমআর শিটগুলো তো নষ্ট করে ফেলা হয়েছে, যা এসএসসি আদালতে স্বীকার করেছে। তাহলে এখন যদি ওই মিরর ইমেজগুলোকে যোগ্যতার প্রমাণ হিসাবে দাখিল করা হয়, তা কি সকলে মেনে নেবেন? অবশ্য হিন্দিতে বলা হয় – মিঞা বিবি রাজি হলে কাজির কিছু করার থাকে না। তাই এখানেই থেমে যাই। নইলে কে আবার বলবে – আমারও কোনো দুরভিসন্ধি আছে, আমিও চাই না চাকরিহারারা চাকরি ফিরে পান।

পশ্চিমবঙ্গ বড় শক্ত ঠাঁই।

নাগরিক ডট নেট ওয়েবসাইটে প্রকাশিত

জয় শাহের দুয়ারে হাস্যকর ট্রফি প্রকল্প

ফাইনালের মঞ্চে পুরস্কার দেওয়ার সময় আয়োজক দেশ পাকিস্তানের কাউকে দেখা গেল না কর্তাদের মধ্যে। বিশ্বের কোথাও কোনও টুর্নামেন্টে এ দৃশ্য দেখেছেন?

নহবত বসেছিল, গায়ে গোলাপ জল ছেটানোর জন্যে লোক তৈরি ছিল, হেঁশেলের দিক থেকে ভেসে আসছিল বেগুনির সুগন্ধ, বরকে অভ্যর্থনা করার জন্যে কনে কর্তা জমাটি পোশাক পরে তৈরি, কিন্তু শেষপর্যন্ত বর এসে পৌঁছল না। ফলে সব আয়োজন ভেস্তে গেল। কনে কর্তা ব্যাজার মুখ করে অতিথিদের কোনোমতে নমস্কার করে খাইয়ে দাইয়ে বাড়ি পাঠিয়ে কর্তব্য সমাধা করলেন।

এই ছিল ২০২৩ বিশ্বকাপ ফাইনালের পরের অবস্থা। ভারত জিতে গেলে গোটা দলকে নিয়ে কী বিপুল নির্বাচনী প্রচারাভিযান চালাত বিজেপি, সে পরিকল্পনা কোথাও কোথাও প্রকাশিত হয়েছিল। কংগ্রেস মুখপাত্র সুপ্রিয়া শ্রীনেত দাবি করেছিলেন, রাজস্থানের এক বিজেপি নেতা তাঁকে বলেছিলেন যে বিজেপির সমস্ত হোর্ডিংয়ে বিশ্বকাপ হাতে মোদীর ছবি দেওয়ার ব্যবস্থা তৈরি ছিল। কিন্তু সে গুড়ে বালি ছড়িয়ে দিয়েছিল প্যাট কামিন্সের বাহিনি। ২০২৪ সালের ওয়ার্ল্ড টি টোয়েন্টি অবশ্য রোহিত শর্মারা জিতেছিলেন, কিন্তু ততদিনে লোকসভা নির্বাচন মিটে গেছে। ক্রমশ বিরাট হয়ে ওঠা নরেন্দ্র মোদীকে কেটে ছেঁটে দেশের অন্য নেতাদের মাপে এনে দিয়েছেন ভোটাররা। তখন আর হইচই করে কী লাভ?

সেই শোক বুঝি এতদিনে দূর হল। বিশ্বকাপ ফাইনালের পরে মোদীর পিছনে যেরকম বেচারা ভঙ্গিতে হাঁটছিলেন তৎকালীন বিসিসিআই যুগ্ম সচিব জয় শাহ, তাতে মনে হচ্ছিল বাবার বন্ধু নরেনজেঠু প্রচণ্ড ধমকেছেন ‘একটা কাজ যদি তোকে দিয়ে হয়!’ কিন্তু তাঁর নামও জয় শাহ। তিনি পরাজয় মেনে নিয়ে চুপ করে বসে থাকার লোক নন। ইতিমধ্যে আইসিসির শীর্ষপদ দখল করে জেঠুকে এবার তিনি যে উপহার দিলেন তা একেবারে নিখুঁত।

নিজে মাঠে নেমে তো খেলতে পারেন না, কিন্তু রোহিতদের সর্বোচ্চ সুযোগসুবিধা দেওয়ার ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। ১৯৩৪ সালের ফুটবল বিশ্বকাপ ইতালিকে জেতানোর জন্যে বেনিতো মুসোলিনি কী করেছিলেন বা ১৯৭৮ সালের বিশ্বকাপ আর্জেন্টিনাকে জেতাতে সে দেশের জুন্টা সরকার কত কলকাঠি নেড়েছিল তা আজ খুব গোপন তথ্য নয়। কিন্তু সেই দুই বিশ্বকাপেও ইতালি আর আর্জেন্টিনা সে আরাম পায়নি যা এবারে রোহিতরা পেলেন।

আইসিসি চেয়ারম্যান হিসেবে ভারতের জয়ে মাঠে তাঁর উচ্ছ্বাস প্রকাশও অত্যন্ত দৃষ্টিকটু, হাসির খোরাক। ডালমিয়া, শ্রীনিবাসন, শশাঙ্ক মনোহররা অতীতে এই পদে থেকেছেন, এমন বালখিল্যসুলভ আচরণ করেননি কোনওদিন। আরও অবাক কাণ্ড, ফাইনালের মঞ্চে পুরস্কার দেওয়ার সময় আয়োজক দেশ পাকিস্তানের কাউকে দেখা গেল না কর্তাদের মধ্যে। বিশ্বের কোথাও কোনও টুর্নামেন্টে এ দৃশ্য দেখেছেন? শোয়েব আখতারের ক্ষোভ প্রকাশ স্বাভাবিক। বৈষম্য তো আরও আছে!

প্রতিযোগিতার অন্য সব দল খেলল পাকিস্তানের একাধিক মাঠে ঘুরে ঘুরে, ভারতীয় দল একেবারে অন্য দেশের একটা শহরেই পায়ের উপর পা তুলে বসে রইল। অন্য দলগুলোকে পাকিস্তান থেকে উড়ে আসতে হল, আবার ফিরে যেতে হল। এই কাণ্ড করতে গিয়ে সবচেয়ে বিরক্তিকর অবস্থা হল দক্ষিণ আফ্রিকার। ভারত কোন সেমিফাইনালে উঠবে তা জানা না থাকায় অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে তাদেরও দুবাই যেতে হল সেমিফাইনালের আগে। তারপর যখন বোঝা গেল ভারতের সঙ্গে অস্ট্রেলিয়ারই সেমিফাইনাল হবে, তখন ফেরত আসতে হল পাকিস্তানে। বিশ্রাম নেওয়ার বিশেষ সময় না পেয়েই নিউজিল্যান্ডের বিরুদ্ধে সেমিফাইনাল। সেই সেমিফাইনালে হারলেও, ৬৭ বলে অপরাজিত ১০০ রান করা ডেভিড মিলার বিরক্তি প্রকাশ করেই ফেললেন

আরও পড়ুন জয় জয় জয় জয় হে

ভারত অন্যায় সুবিধা পেয়েছে – একথা বলার সাহস ক্রিকেট দুনিয়ায় কারোর হয় না। যেমন বিশ্ব রাজনীতিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে ধমকানোর সাহস এই সেদিন পর্যন্ত কারোর হত না। কারণটা একই – সোজা কথায় টাকার গরম। আমরা আইসিসিকে সবচেয়ে বেশি ব্যবসা দিই, অতএব আইসিসির আয়ের বেশিরভাগটা আমরাই নেব – এই গা জোয়ারি যুক্তিতে ভারত, অস্ট্রেলিয়া আর ইংল্যান্ড দীর্ঘদিন হল বাকি ক্রিকেট দুনিয়াকে শুকিয়ে মারছে।

এরা যেটুকু উচ্ছিষ্ট ছুড়ে দেয় বাকিদের প্রতি, তা নিয়েই তাদের চলতে হয়। তাই কোনো বোর্ড মুখ খোলে না। বোর্ডের বারণ আছে বলে ক্রিকেটাররাও কিছু বলেন না। কিন্তু পাকিস্তানে চলল চ্যাম্পিয়নস ট্রফি আর ভারত খেলল দুবাই ট্রফি – এটা বোধহয় সহ্যের সীমা ছাড়িয়ে গেছে। তাই বোর্ডগুলো কিছু না বললেও অনেক বিদেশি সাংবাদিক ও প্রাক্তন ক্রিকেটার এবার এ নিয়ে প্রশ্ন তুলে ফেলেছেন, মিলারও মুখ খুলেছেন। সুবোধ বালক ভারতীয় মিডিয়া আর ধারাভাষ্যকাররা অবশ্য মানছেন না। তাঁরা দিল্লির প্রাক্তন বিজেপি বিধায়ক, অধুনা ভারতীয় দলের কোচ গৌতম গম্ভীরের সঙ্গে একমত। কিন্তু মহম্মদ শামি সোজা সরল লোক, তিনি মেনে নিয়েছেন যে সব ম্যাচ একই মাঠে খেলায় ভারত বিশেষ সুবিধা পেয়েছে।

বস্তুত, ক্রিকেটের অ আ ক খ জানলে এবং অন্ধ ভক্ত না হলে যে কেউ মানবেন যে সব ম্যাচ এক মাঠে খেললে সুবিধা হয়। কারণ ক্রিকেট অন্য যে কোনো খেলার চেয়ে অনেক বেশি নির্ভর করে আবহাওয়া এবং পিচের উপরে। চার স্পিনার খেলানোর জন্যে বিস্তর হাততালি কুড়োচ্ছেন গম্ভীর, রোহিত আর প্রধান নির্বাচক অজিত আগরকর। এই সিদ্ধান্ত তাঁরা নিতে পেরেছেন কারণ জানতেন, একই মাঠে ভারত সব ম্যাচ খেলবে আর সে মাঠের পিচ হবে স্পিন সহায়ক। অন্য সব দলকে কিন্তু একাধিক মাঠের পিচের কথা ভেবে দল গড়তে হয়েছিল।

একথা বললেই যা বলা হচ্ছে, তা হল – আর কী উপায় ছিল? ভারত তো পাকিস্তানে খেলতে যেতে পারত না। কারণটা রাজনৈতিক, অর্থাৎ ভারত সরকারের বারণ। কথাটা ঠিক। কিন্তু সেক্ষেত্রে ভারতের গ্রুপের সবকটা খেলাই সংযুক্ত আরব আমিরশাহীতে করা যেতে পারত, দুবাই আর শারজা মিলিয়ে। তাহলে অন্তত গ্রুপের অন্য দলগুলোও একই ধরনের পিচে একাধিক ম্যাচ খেলার সুযোগ পেত।

পাকিস্তানে খেলতে না যাওয়ার রাজনৈতিক কারণটাকেও প্রশ্ন করা দরকার। ২০০৮ সালের সন্ত্রাসবাদী হানার কথা তুলে আর কত যুগ দুই দেশের ক্রিকেটিয় সম্পর্ক অস্বাভাবিক করে রাখা হবে? মোদীর আচমকা নওয়াজ শরীফের নাতনির বিয়েতে খেতে যাওয়া, পাঠানকোটের সন্ত্রাসবাদী হানার তদন্ত করতে পাক গোয়েন্দা বিভাগকে ভারতের সেনা ছাউনিতে ঢুকতে দেওয়া – এসব তো ২০০৮ সালের অনেক পরে ঘটেছে। এমনকি গতবছর ফেব্রুয়ারি মাসে ডেভিস কাপে ভারতের টেনিস দল ইসলামাবাদে গিয়ে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে খেলে এসেছে। কেবল ক্রিকেট দল পাকিস্তানে গেলেই মহাভারত অশুদ্ধ হবে?

আজ্ঞে না, পুলওয়ামা ভুলিনি। সে ঘটনা যারা ঘটিয়েছিল তাদের শাস্তি হয়েছে? কোনো জোরদার তদন্ত হয়েছে? দাভিন্দর সিং বলে এক ভারতীয় পুলিস অফিসারকে গ্রেফতার করা হয়েছিল। তিনিও জামিন পেয়ে গেছেন ২০২০ সালে। তাহলে ক্রিকেট দলের ঘাড়ে বন্দুক রেখে জাতীয়তাবাদের নাটক করা কেন? আর সত্যিই যদি পাকিস্তান অচ্ছুত হয়, তাহলে প্রত্যেক আইসিসি প্রতিযোগিতায় ভারত আর পাকিস্তানকে এক গ্রুপে রাখাই বা কেন?

ধরা যাক, রাখা হয় না। ওটা এমনিই হয়ে যায়। তাহলেই বা ভারতীয় দল ম্যাচটা খেলে কেন? বোর্ড তো বলতে পারে – পাকিস্তানের সঙ্গে আমরা খেলব না, ওই ম্যাচের পয়েন্ট পাকিস্তানকে দিয়ে দেওয়া হোক। কেন বলে না? টিভি সম্প্রচার থেকে যে বিপুল টাকা আয় হয় তার নেশা তাহলে জাতীয়তাবাদের চেয়েও বেশি তো?

উত্তরগুলো অস্বস্তিকর। ফলে যিনি ভিন্নমত হবেন, তিনি সহজ রাস্তাটা নেবেন। বলবেন – এসব বলে ভারতের জয়কে ছোট করবেন না। ওরা পাকিস্তানে খেললেও জিতত। দুবাইতেও জিততে তো হয়েছে। আজ্ঞে হ্যাঁ, সেকথা ঠিক। তবে কথা হচ্ছে, আমাদের দেশের নির্বাচনগুলোতে যেসব দল রিগিং করে, অনেক ক্ষেত্রে রিগিং না করলেও তারাই জিতত। তাহলে কি ‘আহা! কী সুন্দর রিগিং করে!’ বলে হাততালি দিতে হবে?

উত্তরবঙ্গ সংবাদে প্রকাশিত

বাঙালির অরাজনৈতিক নিরপেক্ষতার নিচে চাপা পড়ছে ছাত্রছাত্রীরা

গণতন্ত্র-ফন্ত্র কে চায়? বিশেষ করে শিক্ষাঙ্গনে গণতন্ত্র তো বাবা-মায়েরা মোটেই চান না। ছেলেমেয়ে কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে যাবে লেখাপড়া করতে। ওটা রাজনীতি করার জায়গা নাকি?

ক্রিকেটের ধারাভাষ্যকাররা প্রায়ই বলেন – ক্রিকেট হল মিলিমিটারের খেলা। মানে কয়েক মিলিমিটার এদিক-ওদিক হলে নট আউটটা আউট হয়ে যেতে পারে, ছয়টা চার হয়ে যেতে পারে, ফলে জয়টা পরাজয়ে বদলে যেতে পারে। ব্রাত্য বসু আর তাঁর গাড়ির চালক বোধহয় ক্রিকেট দেখেন না। পশ্চিমবঙ্গের লেখাপড়া, নাটক, সিনেমা – এত কিছু সামলে কি আর সময় পাওয়া যায়? নইলে ইন্দ্রানুজ রায়ের গায়ে উঠে পড়ার কয়েক মিলিমিটার আগেই গাড়ির ব্রেক কষে ফেলতেন। তাহলেই কোনো সমস্যা থাকত না। কোনো চ্যানেল তাদের সাংবাদিককে পাঠিয়ে দিত ক্যাম্পাসে পড়ে থাকা মদের বোতল আর কন্ডোম গুনতে, কোনো চ্যানেল অতীতে ছড়িয়ে লাট করা কোনো প্রাক্তন উপাচার্যকে ডেকে এনে বোঝাত যাদবপুরে কোনো ‘ডিসিপ্লিন’ নেই এবং ‘ডিসিপ্লিন’ প্রতিষ্ঠা করতে গেলে কী করতে হবে। কোনো তথাকথিত স্বাধীন সাংবাদিক নিশ্চিন্তে তাঁর ইউটিউব চ্যানেলে বলে দিতে পারতেন ব্যাপারটা স্রেফ শিক্ষাক্ষেত্রে নৈরাজ্য তৈরি করার জন্যে সিপিএমের চক্রান্ত, কে কে বামপন্থী ছাত্র সংগঠনগুলোকে পৃথিবীর কোথা থেকে কত টাকা চাঁদা দিয়েছে তার এক্সেল শীট বানিয়ে ‘বিগ এক্সপোজে’ বলে প্রকাশ করতে পারতেন। আর জি কর আন্দোলনে যেসব বামপন্থীরা কর্পোরেট হাসপাতালের চক্রান্ত, স্বাস্থ্যসাথী প্রকল্প বানচাল করার ষড়যন্ত্র, বিজেপিকে ক্ষমতায় আনার পরিকল্পনা দেখতে পাচ্ছিলেন তাঁরাও নিশ্চিন্তে শিক্ষার বেসরকারিকরণের চক্রান্ত, কন্যাশ্রী প্রকল্প বানচাল করার ষড়যন্ত্র, ২০২৬ সালে বিজেপিকে ক্ষমতায় আনার পরিকল্পনা নিয়ে সোশাল মিডিয়ায় লম্ফঝম্প করতে পারতেন। নিজেদের ছাত্রজীবনে মুখে চোখে বিপ্লবের স্বপ্ন মেখে যথেষ্ট অশান্ত ছাত্র আন্দোলন করে, এখন পুলিসের সত্যবাদিতায় এবং শিক্ষামন্ত্রীর সম্ভ্রম রক্ষায় দারুণ বিশ্বাসী হয়ে যাওয়া অনাবাসী ফেসবুক ইনফ্লুয়েন্সার সদগুরুরাও দীর্ঘ পোস্ট লিখতে পারতেন – যাদবপুরের চ্যাংড়ারা ছাত্র সংসদের নির্বাচন ইত্যাদি দাবি করে ক্যাম্পাসে যে ফ্যাসিবাদ প্রবেশের রাস্তা খুলে দিচ্ছে – এই মর্মে। এমনকি সাংস্কৃতিক কর্মী ব্রাত্যবাবুর নাটক, সিনেমার বন্ধুরাও টিভি ক্যামেরাকে বড় মুখ করে বলতে পারতেন ‘কোনো রাজনীতির মধ্যে না গিয়ে বলছি – একজন শিক্ষিত, রুচিবান মানুষ, যিনি আবার মাস্টারমশাইও, তাঁর উপরে এই আক্রমণ নিন্দাযোগ্য।’ এই জাতীয় কিছু। সব বানচাল করে দিল ওই মিলিমিটার।

একটা জলজ্যান্ত ছেলের উপর দিয়ে গাড়ি চালিয়ে দেওয়া হয়েছে। সেই দৃশ্য ভাইরাল হয়ে গেছে, অস্বীকার করা যাবে না। ফলে অরূপ বিশ্বাস বা দেবাংশু ভট্টাচার্যের মত সরাসরি তৃণমূল কংগ্রেস করেন না যাঁরা, তাঁদের এখন ঢোঁক গিলে মানবিকতা দেখাতেই হচ্ছে। নইলে ভবিষ্যতে নিরপেক্ষতা (সংবাদমাধ্যমের), ফ্যাসিবাদবিরোধিতা (বামপন্থী ও উদারপন্থীদের) ইত্যাদি ভাল ভাল জিনিস করি বলে দাবি করা যাবে না। না, মানে করতে কে আর আটকাত? কিন্তু নিজেদেরই একটু বিবেকে লাগত বোধহয়। তাই ওঁদের এই মহানুভবতা। বোধহয় অনেকের মহানুভবতার কারণ এটাও যে ইন্দ্রানুজ রাজ্যের কোনো বিরোধী রাজনৈতিক দলের ছাত্র সংগঠনের সদস্য নয়। সেটা হলে সংবাদমাধ্যম তো বটেই, বিকল্প বামেরাও অনেকে শিক্ষামন্ত্রীকে ঘিরে ধরা, তাঁর গাড়ির কাচ ভাঙা ইত্যাদির নিন্দা করতেন এবং একে ওই বিরোধী রাজনৈতিক দলটার ক্ষমতা দখলের ঘৃণ্য চেষ্টা বলে সাংবাদিক সম্মেলন করতেন। যেমনটা আর জি কর আন্দোলনের শেষ পর্বে আমরা দেখেছি।

দেখুন, সত্যি কথা সোজা করে বলাই ভাল। গণতন্ত্র-ফন্ত্র কে চায়? বিশেষ করে শিক্ষাঙ্গনে গণতন্ত্র তো বাবা-মায়েরা মোটেই চান না। ছেলেমেয়ে কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে যাবে লেখাপড়া করতে। ওটা রাজনীতি করার জায়গা নাকি? বাবা-মায়েরা বিলক্ষণ জানেন যে যাদবপুরে লেখাপড়া হয় না। ওখানে কেবল ছেলেরা গাঁজা খায়, মেয়েরা ছেলেদের সঙ্গে বসে হাফপ্যান্ট পরে সিগারেট খায়। কিন্তু সেসবও মেনে নেওয়া যেত যুগের ধর্ম হিসাবে। এসবের থেকেও বড় অপরাধ যেটা করে যাদবপুরের ছেলেমেয়েরা, সেটা হল রাজনীতি করে। তাও আবার মূলত বামপন্থী রাজনীতি। এই রাজনীতির ছোঁয়াচ বাঁচাতে অর্থনৈতিকভাবে সক্ষম বাবা-মায়েরা পাঁচতারা হোটেলের মত যেসব বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় হয়েছে ছেলেমেয়েদের সেখানে পাঠাতেই বেশি স্বচ্ছন্দ বোধ করেন। যাদবপুর, প্রেসিডেন্সির মত দু-একটা জায়গা বাদে পশ্চিমবঙ্গের কোনো কলেজে যে ২০১৭ সাল থেকে ছাত্র সংসদের নির্বাচন হয় না তাতে বাবা-মায়েরা তো বটেই, অনেক ছাত্রছাত্রীও খুশি। ভোট দেব পঞ্চায়েত, পৌরসভা, বিধানসভা, লোকসভার জন্যে। পড়াশোনার জায়গায় আবার ভোট কিসের? এইসব করতে গিয়েই তো বাম আমলে পশ্চিমবঙ্গে লেখাপড়া হত না, তাই না? এদিকে ২০১১ সাল থেকে কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্রমশ ছাত্র রাজনীতি তুলে দিয়ে কীরকম দুর্দান্ত পড়াশোনা হচ্ছে তা সমস্ত ছাত্রছাত্রী এবং অভিভাবক জানেন। আরও নিদারুণভাবে জানেন মাস্টারমশাই, দিদিমণিরা। বছরের পর বছর নির্বাচন না হওয়া মানে যে একনায়কতন্ত্র – সেকথা তাঁরা দেশের রাজনীতি সম্পর্কে মানতে রাজি। পশ্চিমবঙ্গের ভোটে হিংসা, রিগিং ইত্যাদি নিয়েও অসন্তুষ্ট হন। কিন্তু কলেজ ক্যাম্পাসে তাঁরা রাজনীতি চান না, ভোট-ফোট চান না। কেন? জিজ্ঞেস করলেই উত্তর পাওয়া যাবে ‘ওতে লেখাপড়ার ক্ষতি হয়। অশান্তি হয়।’ প্রথম যুক্তিটা সত্যি হলে যাদবপুর বছরের পর বছর ইউজিসি, ন্যাক, বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মূল্যায়নে কী করে দেশের সেরা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে থাকে, সে প্রশ্নের উত্তর কিন্তু কারোর কাছে নেই। দ্বিতীয় যুক্তিটা ঠিক হলে অন্য শান্তিপূর্ণ কলেজগুলোতে ছাত্রসংখ্যা কমছে কেন, যাদের নাম খাতায় আছে তারাও ক্লাস করতে আসে না কেন, এসব প্রশ্নও কেউ নিজেকে করে না। ছাত্র রাজনীতির প্রায় পঞ্চত্বপ্রাপ্তি হওয়া পশ্চিমবঙ্গে যাদবপুরের মত জায়গাতেও খাতা না দেখেই নম্বর দিয়ে দেওয়া হচ্ছে, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে ১২০ জনের খাতা হারিয়ে যাচ্ছে কেন?

দীর্ঘ চেষ্টায় গোটা রাজ্যের মাথায় ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে যে ছাত্রছাত্রীরা রাজনীতি করলে লেখাপড়া হয় না আর শ্রমিকরা রাজনীতি করলে শিল্প হয় না। ২০১১ সালের পর থেকে সরকারি প্রচেষ্টায় দুটোই প্রায় তুলে দেওয়া হয়েছে সফলভাবে। অথচ না লেখাপড়া হচ্ছে, না শিল্প হচ্ছে। এসব বললে উত্তর আসবে, অত সালে অমুক কলেজে ছাত্র ইউনিয়নের নির্বাচনে হিংসায় অমুকের প্রাণ গিয়েছিল, তমুকের চোখ নষ্ট হয়েছিল। তমুক কলেজে এসএফআই বাম আমলে তোলাবাজি করেছিল, তৃণমূল নতুন কিছু করছে না। ঠিক কথা। একথাও ঠিক যে বহু কারখানায় বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠনের নেতারা (শ্রমিক ইউনিয়ন কেবল সিপিএম বা অন্য বামপন্থী দলের নেই; কংগ্রেস, তৃণমূল, এমনকি আরএসএসেরও আছে। এটা আবার এ যুগের সবজান্তারা জানেন না) মালিকপক্ষের সঙ্গে তলে তলে আপোস করে শ্রমিকদের বারোটা বাজিয়েছেন। কিন্তু তার জন্যে ইউনিয়ন, রাজনীতি, গণতন্ত্র সব তুলে দেওয়া উচিত – এই প্রত্যয় তৈরি হলে মাথায় ব্যথা হওয়া মাত্রই ব্যথার ওষুধ না খেয়ে বা দীর্ঘকালীন মাথাব্যথার কারণ সন্ধানে ডাক্তারের কাছে না গিয়ে পত্রপাঠ মাথাটা কেটে ফেলা উচিত। তাতে অচিরেই পশ্চিমবঙ্গ স্কন্ধকাটাদের রাজ্যে পরিণত হবে। ইতিমধ্যেই দু-কান কাটাদের রাজ্যে পরিণত হয়েছে। তাই চার্জশিটে যার নাম লেখা আছে সে বুক ফুলিয়ে সভায় বলতে পারে – ওটা কার নাম, নির্দিষ্ট করে বলুক। টিভি স্টুডিওর সান্ধ্য আলোচনায় গভীর জল্পনা কল্পনা চলে – নামটা কার।

এমন রাজ্যে সরকার যে নিতান্ত কোণঠাসা না হলে কোনো আন্দোলনকে গ্রাহ্য করবে না, কোনো দাবিকেই পাত্তা দেবে না তাতে আশ্চর্যের কিছু নেই। আর জি কর আন্দোলন যখন তুঙ্গে, তখন জুনিয়র ডাক্তাররা মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকে কলেজগুলোতে ছাত্র সংসদের নির্বাচন করানোর দাবি করেছিলেন। সরকারপক্ষ থেকে অমনি প্রচার করা শুরু হয় ‘এই দেখুন, এরা আসলে ক্ষমতা চায়’। সেই প্রচার অনেকের পছন্দও হয়ে যায়। মানে গণতান্ত্রিক দেশে নির্বাচন চাওয়া মহা অপরাধ। তর্কের খাতিরে যদি ধরে নেওয়া যায় তারা ক্ষমতা চায় বলেই নির্বাচন চেয়েছিল, সেটাই বা অপরাধ হবে কেন? নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতা হস্তান্তর তো গণতন্ত্রের লক্ষণ। গায়ের জোরে ক্ষমতা দখল করতে তো চায়নি। অথচ বহু বিপ্লবীও সেইসময় সরকারি দলের এই অন্যায় প্রচারের প্রতিবাদ করেননি। ব্রাত্যবাবুর গাড়ির বেপরোয়া মেজাজ তখনই তৈরি হয়েছে। এমনিতেই আমাদের দেশে গণতন্ত্র সংকুচিত হতে হতে এমন জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছে যে শাসক দলগুলোর যে কোনো অন্যায় নিয়ে প্রশ্ন তুললেই তারা বলে দেয়, কাজটা করার পরেও তারাই জিতেছে। অতএব মানুষের তাদের উপর আস্থা আছে। সুতরাং ওটা অন্যায় নয়। তার উপর লেখাপড়া জানা নাগরিকরা যদি নিজেরাই নানা ভাষায় বলতে শুরু করেন যে কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদ, স্কুলের ম্যানেজিং কমিটি বা টিচার্স কাউন্সিল, সমবায় সংস্থা ইত্যাদি ছোট ছোট পরিসরেও নির্বাচন চাওয়াই অপরাধ – তাহলে তো সোনায় সোহাগা।

অর্থাৎ ছাত্রের উপর দিয়ে শিক্ষামন্ত্রীর গাড়ি চালিয়ে দেওয়ার ঔদ্ধত্য শাসককে আমরাই উপহার দিয়েছি বললে বিশেষ ভুল হয় না। বিরোধী দলগুলো অবশ্যই দায়হীন নয়। বিধানসভার বিরোধী দল বিজেপির স্বর যে যাদবপুর বা ছাত্র রাজনীতির প্রসঙ্গ উঠলে তৃণমূলের সঙ্গে মিশে যায় তা অতীতেও দেখা গেছে, গতকাল থেকেও দেখা যাচ্ছে। এটা কাকতালীয় নয়। জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের মত যেসব প্রতিষ্ঠানের ছাত্রছাত্রীরা আজও মূলত বামপন্থী সেইসব প্রতিষ্ঠানকে তৃণমূল কংগ্রেসের মত বিজেপিও শত্রুই মনে করে এবং সেগুলোর সাড়ে বারোটা বাজাতে চেষ্টার ত্রুটি রাখে না। মতপার্থক্য যা নিয়ে হয় সেটা হল যারা বাবুল সুপ্রিয়র মাথায় চাঁটি মেরেছে বা ব্রাত্যবাবুকে আঘাত করেছে তাদের কী বলা হবে তাই নিয়ে। নকশাল, নাকি আর্বান নকশাল, নাকি দেশদ্রোহী, নাকি পাকিস্তানি ইত্যাদি প্রভৃতি। অমন মতপার্থক্য তৃণমূলের নিজের ভিতরেও তো হয়। কাল থেকে যেমন কোনো তৃণমূল নেতা বলছেন এটা সিপিএমের বদমাইশি, কেউ বলছে অতিবামদের গুন্ডামি ইত্যাদি প্রভৃতি। বিধানসভা, লোকসভায় বারবার শূন্য পেলেও যাদের হাতে নাকি এই রাজ্যের প্রগতিশীলতার ঐতিহ্য রক্ষা করার দায়িত্ব, সেই সিপিএম বা বামফ্রন্টের দলগুলোর আবার অন্য সমস্যা। বিভিন্ন ক্যাম্পাসে তাদের ছাত্রনেতারা যতটা লড়াকু, বিশেষত অন্য বামেদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে, ক্যাম্পাসের বাইরে পার্টির ততটা লড়াই দেখা যায় না। তার উপর ইদানীং আবার সিপিএম নেতারা ডিপার্টমেন্টাল স্টোর সিস্টেম চালু করেছেন। ব্রিগেডের ডাক দেয় যুব সংগঠন বা খেতমজুরদের সংগঠন। যাদবপুরে ছাত্রের উপর দিয়ে মন্ত্রীর গাড়ি চলে গেছে বলে ছাত্র ধর্মঘটের ডাক দিয়েছে ছাত্র সংগঠন। স্কুলশিক্ষার অব্যবস্থা নিয়ে আন্দোলন করতে হলে সে আন্দোলন হয় শিক্ষক সংগঠনের ব্যানারে। পার্টির নাম, পার্টির পতাকা দেখা যায় কেবল সম্মেলনে আর সাংবাদিক সম্মেলনে। পার্টির ‘নতুন মুখ’, ‘তরুণ মুখ’ বলে খ্যাত নেতৃবৃন্দকে কলকাতায় বিভিন্ন ছায়াছবির প্রিমিয়ারে আর টিভি স্টুডিওতে রোজ দেখা যায়। কিন্তু মীনাক্ষী মুখার্জি বাদ দিলে কাউকে প্রত্যন্ত এলাকার আন্দোলনে নিয়মিত দেখা যায় না। ক্ষমতাসীন তৃণমূলে এত জটিলতা নেই। একটাই বুলডোজার, সব জায়গায় চালানো হয়।

পশ্চিমবঙ্গে এর বাইরেও তৃণমূলবিরোধী দল আছে। কয়েকটা কোণে কংগ্রেস আছে, যাদের কথা বলাই বাহুল্য। তাছাড়া কিছু বাম দল আছে। ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে যখন বামফ্রন্ট শূন্য হয়ে গেল, তখন এক ওয়েব ম্যাগাজিনে লিখেছিলাম, তাঁদের অনেককালের অভিযোগ, সিপিএম বামপন্থার বদনাম করছে। একটিবার সুযোগ পেলেই তাঁরা দেখিয়ে দিতে পারেন আসল বামপন্থা কী, কিন্তু সিপিএম তাঁদের জায়গা ছাড়ে না। এবার সিপিএম শূন্য হয়ে গেল, সামনে ফ্যাসিবাদের বিপদ। এইবার তাঁরা সিপিএমের জায়গাটা নিন, দেখিয়ে দিন। কিন্তু ২০২৬ আসতে চলল, তাঁরা জায়গা ভরাট করতে পারলেন না। এখনো বলছেন যা ঘটছে সবই সিপিএমের দায়িত্ব। সে দায়িত্ব পালনে সিপিএম যে ব্যর্থ তা নিয়ে সন্দেহের অবকাশ নেই। কিন্তু ওটুকু বলে ওঁরা সন্তুষ্ট নন। আবার সিপিএমের উপর অভিমান করাও চাই। ‘বিজেপিকে ফ্যাসিবাদী না বলে নয়া ফ্যাসিবাদী বললি কেন? এরম কল্লে খেলব না।’ আবার সিপিএমও বলে ‘তোরা মমতাকে লেসার ইভিল বলেছিলিস না? এখন কেন?’ মানে রবীন্দ্রনাথের কাছে কথাঞ্জলি পুটে ক্ষমা চেয়ে নিয়ে ব্যাপারটাকে এরকমভাবে বলা যায় যে ‘বাম ভাবে আমি দেব/বিকল্প ভাবে আমি/নিউট্রাল ভাবে আমি দেব/হাসে ফ্যাসিনামী।’

আরও পড়ুন আন্দোলন, ন্যায়বিচার, পুজো: একটি অরোম্যান্টিক বয়ান

পশ্চিমে গুজরাট থেকে শুরু হয়ে বিজেপির বিজয়রথ পূর্বে ওড়িশা পর্যন্ত এসে পড়েছে। পশ্চিমবঙ্গে ঢুকতে পারেনি বলে আমরা অনেকেই আহ্লাদিত। সেই ২০২১ সাল থেকেই ফ্যাসিবাদকে হারিয়ে দিয়ে বেশ একটা বিপ্লবী অনুভূতি হচ্ছে। এদিকে সেবার নির্বাচন পর্ব মিটতেই তৃণমূল থেকে বিজেপিতে চলে যাওয়া নেতারা গুটিগুটি ফিরে এসেছেন, ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে লড়াকু নেত্রী মমতা ব্যানার্জি ফিরিয়েও নিয়েছেন। আসানসোল দাঙ্গায় উস্কানি দেওয়া বাবুলবাবু তো তৃণমূলে এসে মন্ত্রীও হয়ে গেছেন। মুকুল রায় বিজেপিতে আছেন, না তৃণমূলে – সে আবার এক রহস্য। রাজ্যের রাজনৈতিক বিতর্কও উন্নয়ন থেকে ধর্মে সরে গেছে। অযোধ্যার রামমন্দিরের পালটা দীঘায় জগন্নাথের মন্দির হয়েছে সরকারি টাকায়। দুর্গাপুজোয় সরকারি সাহায্য তো ছিলই, কাশীর অনুকরণে কলকাতায় গঙ্গার ঘাটে সন্ধ্যারতিও চালু হয়ে গেছে। কোথাও নির্বাচন হলে অশান্তি শুধু নয়, দেখা যাচ্ছে নির্বাচন চাইলেও অশান্তি হয়। দেশের সবচেয়ে বড় সিনেমা শিল্প বলিউডকে দখল করে ফেলেছে বিজেপি, একের পর এক হিন্দুত্ব প্রোপাগান্ডা ছবি চলছে। অথচ তৃণমূল সাংসদ, বিধায়কে ভর্তি টলিউডে কিন্তু তার পালটা প্রোপাগান্ডা ছবি হচ্ছে না। বরং প্রবল মুসলমানবিদ্বেষী বয়ানে ছবি হয়েছে, তাতে যাদবপুরের তৎকালীন তৃণমূল সাংসদ অভিনয় করেছেন। গোয়েন্দা ব্যোমকেশকে ত্রিশূলধারী শিব সাজানো ছবি হয়েছে ঘাটালের তৃণমূল সাংসদের প্রযোজনায়, শ্রেষ্ঠাংশেও তিনি। উপরন্তু ইতিমধ্যেই রুগ্ন শিল্প হয়ে যাওয়া আঞ্চলিক ভাষার এই ইন্ডাস্ট্রির অবস্থা আরও কাহিল হচ্ছে তৃণমূল নেতাদের প্রতাপে। টেকনিশিয়ানদের গিল্ড আর নির্দেশকদের দ্বন্দ্বে গতবছর জুলাই মাসে একবার বেশ কয়েকদিন শুটিং বন্ধ ছিল। তারপর অক্টোবর মাসে ২৩৩ জন পরিচালক তৃণমূলের টলিপাড়ার নেতা স্বরূপ বিশ্বাসের বিরুদ্ধে মানহানির মামলা করেন। সম্ভবত তারই প্রতিক্রিয়ায় টেকনিশিয়ানদের গিল্ড কয়েকজন পরিচালকের ছবির কাজে বাগড়া দেয়। ফলে গতমাসে পরিচালকরা কর্মবিরতি পালন শুরু করেছিলেন, তবে তাঁদের একতার অভাবে ব্যাপারটা দাঁড়ায়নি। সমস্যা কিন্তু রয়েই গেছে।

এ রাজ্যে অনেকে তো মানেন ভারতে ফ্যাসিবাদ এসে গেছে এবং ফ্যাসিবাদী বলেই আরএসএসের বিরুদ্ধে লড়াইটা আসলে সাংস্কৃতিক লড়াই। তাঁদের অনেকেই আবার বলেন তৃণমূল ফ্যাসিবাদী নয়, কারণ খুব খারাপ শক্তি হলেও তাদের কোনো আদর্শ নেই। আদর্শ না থেকেই যদি ফ্যাসিবাদ যে যে লক্ষ্য পৌঁছতে চায় সেই সেই লক্ষ্যে পৌঁছে যায় কোনো দল, তাহলেও কি সে ফ্যাসিবাদী হয় না?

কে জানে বাপু! বাঙালি তাত্ত্বিক জাতি। স্বৈরাচারী না ফ্যাসিবাদী; ফ্যাসিবাদী না নয়া ফ্যাসিবাদী? এসব তাত্ত্বিক লড়াই আমরা সারাদিন করে যেতে পারি। করছিও তাই। কাজের কাজ তো কিছু করছি না। অবশ্য করতে যাবই বা কেন? আমাদের তো অরাজনৈতিক, নিরপেক্ষ থাকতে হবে। কলকাতা থেকে প্রকাশিত বাঙালির গর্বের প্রগতিশীল খবরের কাগজ দ্য টেলিগ্রাফ-এর মত, যারা আজ যাদবপুরের খবরের শিরোনামে লিখেছে ‘Bratya, student hurt in JU clash’। ভাবুন! যার হাতে কাচ ঢুকেছে সে-ও ‘hurt’, যে গাড়ির তলায় পড়েছে, মারা যেতে পারত, সে-ও ‘hurt’। তুলনাহীন নিরপেক্ষতা।

নাগরিক ডট নেট ওয়েবসাইটে প্রকাশিত

মমতা যা করেছেন তাতে তিনি জিতলেও হিন্দুত্ববাদ হারবে না পশ্চিমবঙ্গে

সারা ভারতে হিন্দুত্ববাদী নেতারা মুসলমানদের যে কুৎসিত ভাষায় আক্রমণ করেন তাঁদের ভাষণে, তারই অন্য পিঠে আছে মমতার ‘যে গরু দুধ দেয় তার লাথি খাওয়া উচিত’ মন্তব্য। ইসলাম ধর্মাবলম্বী মানুষকে মনুষ্যেতর প্রাণির সঙ্গে তুলনা করাই ওই মন্তব্যের একমাত্র খারাপ দিক নয়। ওতে বিজেপির এই প্রোপাগান্ডাতেও সিলমোহর দেওয়া হয়েছে যে মুসলমানরা মমতার দলকে ভোট দেয় বলে তারা যা ইচ্ছে তাই করতে পারে এই রাজ্যে।

ললিপপ বনাম আমলকী। যে ভূখণ্ডে রাজনীতি করেছেন এবং বক্তৃতা দিয়েছেন সুরেন্দ্রনাথ ব্যানার্জি, চিত্তরঞ্জন দাশ, সুভাষচন্দ্র বসু, ফজলুল হক, শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জি, যোগেন মন্ডল, জ্যোতি বসু, হীরেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়, মওলানা ভাসানী, তাজউদ্দীন, মুজিবুর রহমানরা – সেই ভূখণ্ডের রাজনৈতিক বিতর্ক হয়ে দাঁড়িয়েছে ললিপপ বনাম আমলকীর বিতর্ক।

নিজেদের দূরদৃষ্টিহীন বিদেশনীতির চক্করে পড়ে যাওয়া ভারত সরকার শেষপর্যন্ত শীর্ষস্থানীয় কূটনীতিবিদদের মাধ্যমে বাংলাদেশের তদারকি সরকারের সঙ্গে আলোচনার পরিবেশ তৈরি করতে সফল হয়েছে। সেই বৈঠকে উত্তেজনার পারদ নেমেছে। ভারত সরকারের পক্ষ থেকে সংখ্যালঘুদের উপর নির্যাতনের প্রতিকার করতে যেমন বলা হয়েছে, বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকেও জানানো হয়েছে কী কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে এবং হবে। অথচ পশ্চিমবঙ্গে উত্তেজনা কমার নাম নেই। তাতে ধুয়ো দিচ্ছেন স্বয়ং মুখ্যমন্ত্রী, যাঁর এ বিষয়ে গরম গরম কথা বলার কোনো প্রয়োজন ছিল না, সাংবিধানিক এক্তিয়ারও নেই। পশ্চিমবঙ্গ বিজেপির নেতা, কর্মীরা লোকসভা নির্বাচনে এবং সদ্যসমাপ্ত উপনির্বাচনে পর্যুদস্ত হওয়ার পর ভেসে যেতে যেতে খড়কুটোর খোঁজ করছিলেন, চট্টগ্রামের অশান্তি তাঁদের পাড়ে তুলে দিয়েছে। ফলে তাঁরা যে দায়িত্বজ্ঞানহীন মন্তব্য করে, ওপারের হিন্দুদের প্রতি প্রবল প্রীতি প্রদর্শন করে এপারের হিন্দু ভোট একত্রিত করতে চাইবেন তা প্রত্যাশিত। তবলার বাঁয়ার মত যুদ্ধবাজ এবং টিআরপিবাজ মিডিয়ার সাংবাদিকরাও যে যা মুখে আসে তাই বলবেন তাও জানা কথা। কিন্তু মমতা ব্যানার্জির কী প্রয়োজন ছিল বাংলাদেশি সেনার কিছু অবসরপ্রাপ্ত আধিকারিক আর বাংলাদেশ ন্যাশনালিস্ট পার্টির (বিএনপি) একজন নেতা, যাঁরা বাংলাদেশ সরকারের কেউ নন, তাঁদের মন্তব্যের জবাবে খোদ বিধানসভায় দাঁড়িয়ে বলার ‘এত বড় হিম্মত, আপনাদের কেন, কারো নেই যে বাংলা, বিহার, উড়িষ্যা সব নিয়ে নেবেন আর আমরা বসে বসে ললিপপ খাব’?

এর জবাবে আবার বিএনপির ওই নেতা, রুহুল কবীর রিজভি, বলেছেন ‘আপনারা যদি চট্টগ্রামের দিকে তাকান, তাহলে আমরা কি আমলকী মুখে চুষব?’

মানে দুই দেশের সরকার – যাদের হাতে বিদেশনীতি এবং প্রতিরক্ষা – তারা কেউ কারোর এলাকা দখল করার হুমকি দেয়নি। পশ্চিমবঙ্গের কিছু বিজেপি নেতা আর বিজেপি প্রোপাগান্ডার প্রচারক (নামে সাংবাদিক) বাংলাদেশের বিরুদ্ধে আক্রমণাত্মক মন্তব্য করলেন। তার জবাবে বাংলাদেশের কিছু লোক, যাঁদের কোনো ক্ষমতাই নেই, তাঁরা পালটা গা গরম করা মন্তব্য করলেন। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী সেই মন্তব্যের ততোধিক অর্থহীন জবাব দেওয়ার জন্য বেছে নিলেন রাজ্যের আইনসভাকে। কেন? বাংলাদেশের অবসরপ্রাপ্ত সেনা অফিসারদের আর বিএনপি নেতার মেজাজ কেন বিগড়ে গেল, সে ভাবনা ওঁদের দেশের মানুষের উপর ছেড়ে দিয়ে আমরা বরং আমাদের মুখ্যমন্ত্রীর উত্তেজনার কারণ অনুসন্ধান করি।

বাংলাদেশের ঘটনাবলীতে প্রথম থেকেই মনে হচ্ছে মমতা যেন কত কট্টরপন্থী প্রতিক্রিয়া দিতে পারেন তার প্রতিযোগিতায় নেমেছেন বিজেপির সঙ্গে। ললিপপের বদলে আমলকীর হাস্যকর মন্তব্য করার সময়ে রিজভি এমন একটা কথা বলেছেন যা প্রণিধানযোগ্য। বলেছেন মমতাকে ওঁরা ধর্মনিরপেক্ষ, অসাম্প্রদায়িক বলে ভাবতেন। কিন্তু বাংলাদেশে সম্মিলিত জাতিপুঞ্জের শান্তিরক্ষী বাহিনী পাঠানোর কথা বলে মমতা নাকি প্রমাণ করে দিয়েছেন যে তিনিও আসলে কট্টরপন্থী হিন্দু। মমতার ওই প্রস্তাবে সত্যিই তা প্রমাণ হয় কিনা তা তর্কসাপেক্ষ, কিন্তু একথা অস্বীকার করার উপায় নেই যে ওই মন্তব্য বিজেপির চেয়েও চরমপন্থী। নরেন্দ্র মোদীর সরকার সেই জওহরলাল নেহরুর আমল থেকে চলে আসা সর্বসম্মত বিদেশনীতি ত্যাগ করে বহু ক্ষেত্রে আমূল পরিবর্তন ঘটিয়েছে। যেমন প্যালেস্তাইনের প্রতি মিত্রতার নীতি ত্যাগ করে ইজরায়েলের বন্ধু হয়ে উঠেছে। কিন্তু একটা ব্যাপারে এখনো চিরকালীন নীতি বজায় রাখা হয়েছে, তা হল অন্য দেশের সঙ্গে ভারত সরকারের গোলমালকে দ্বিপাক্ষিক বিষয় হিসাবে দেখা। এমনকি কাশ্মীর সমস্যাকেও অতীতের কংগ্রেস এবং যুক্তফ্রন্ট সরকারগুলোর মতই মোদী সরকার ভারত-পাকিস্তানের দ্বিপাক্ষিক সমস্যা হিসাবেই দেখে। কোনো তৃতীয় পক্ষের হস্তক্ষেপ চায় না। অথচ মমতা সটান একটা সার্বভৌম প্রতিবেশী রাষ্ট্র, যেখানকার সংখ্যালঘুরা আক্রান্ত হলে ভারতের স্বার্থও বিঘ্নিত হতে পারে, তাদের আভ্যন্তরীণ গোলমালে সম্মিলিত জাতিপুঞ্জের শান্তিবাহিনী পাঠানোর দাবি করে বসলেন!

মমতা প্রবীণ রাজনীতিবিদ, মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার আগে একাধিকবার কেন্দ্রীয় মন্ত্রীও ছিলেন। ফলে তাঁর এত চরমপন্থী অবস্থানের রাজনৈতিক প্রভাব সম্পর্কে তিনি সচেতন নন এমন ভাবার কারণ নেই। যা হওয়ার তাই হয়েছে, পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রীর এহেন আচরণে বাংলাদেশে প্রতিক্রিয়া হয়েছে। শান্তিবাহিনীর কথা বলায় খোদ বাংলাদেশ সরকার অসন্তোষ প্রকাশ করেছে। মহম্মদ ইউনুসের প্রেস সচিব শফিকুল আলম বলেছেন ‘আমরা অবাক হয়েছি ওঁর মন্তব্যে। এক জন মুখ্যমন্ত্রীর তো কথার ওজন থাকবে? তা ছাড়া এখানে যাঁরা পড়তে বা কোনও কাজে এসেছেন, সেই ভারতীয়রা নিরাপত্তার অভাব বোধ করছেন, এমন কোনও খবর আমাদের কাছে নেই।’ এরপরেও মমতা সুর নরম করেননি। ললিপপ-আমলকীর যুদ্ধে এসে পৌঁছেছেন। এর একটাই অর্থ হয়। কোনো বিষয়ে আন্দোলন করে রাজ্য সরকারকে ফ্যাসাদে ফেলতে অক্ষম বঙ্গ বিজেপি বাংলাদেশে হিন্দুদের উপর নির্যাতনকে যেভাবে আঁকড়ে ধরেছে, তাতে মমতা হিন্দু ভোট হারানোর আশঙ্কা করছেন। আশঙ্কা সত্যি হলে ক্ষমতা হাতছাড়া হতে পারে। তাই আর বছর দেড়েক পরের বিধানসভা নির্বাচনের কথা মাথায় রেখে তিনি যে বিজেপির চেয়েও বড় হিন্দু তা প্রমাণ করতে উঠে পড়ে লেগেছেন। তাতে প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষতি হল কি না হল তা ভেবে দেখার সময় নেই।

বিজেপিকে আটকানোর তাড়নায় এবং বামপন্থীদের দুর্বলতায় পশ্চিমবঙ্গের ধর্মীয় সংখ্যালঘু ভোটারদের কাছে একমাত্র পছন্দ হয়ে দাঁড়িয়েছে তৃণমূল কংগ্রেস। তার সুযোগ নিয়ে মমতা বাংলার মুসলমানদের প্রতি যথেচ্ছ অন্যায় করে চলেছেন। মমতার শাসনে এ রাজ্যের মুসলমানদের বলার মত আর্থসামাজিক উন্নয়নের কোনো দৃষ্টান্ত নেই। অথচ সারা ভারতে হিন্দুত্ববাদী নেতারা মুসলমানদের যে কুৎসিত ভাষায় আক্রমণ করেন তাঁদের ভাষণে, তারই অন্য পিঠে আছে মমতার ‘যে গরু দুধ দেয় তার লাথি খাওয়া উচিত’ মন্তব্য। ইসলাম ধর্মাবলম্বী মানুষকে মনুষ্যেতর প্রাণির সঙ্গে তুলনা করাই ওই মন্তব্যের একমাত্র খারাপ দিক নয়। ওতে বিজেপির এই প্রোপাগান্ডাতেও সিলমোহর দেওয়া হয়েছে যে মুসলমানরা মমতার দলকে ভোট দেয় বলে তারা যা ইচ্ছে তাই করতে পারে এই রাজ্যে। রেড রোডে ঈদের নমাজে গিয়ে নির্বাচনী কথাবার্তা বলেও তিনি রাজ্যের মুসলমানদের বিপদ বাড়িয়েছেন। রাজ্যের হিন্দুদের মধ্যে যতজন ইমাম, মোয়াজ্জেমদের সরকারি ভাতা দেওয়া সংখ্যালঘু তোষণ বলে মনে করেন, তার অর্ধেকও বোধহয় পুরোহিত ভাতার কথা মনে রাখেননি। দুর্গাপুজো করতে সরকারের টাকা দেওয়াও যে হিন্দু তোষণ, তা তিন শতাংশে নেমে আসা বামপন্থী ভোটারও মানতেই চান না। মমতা এসব ভালই বোঝেন। তাই সম্ভবত তিনি ঠিক করেছেন, ২০১১ সাল থেকে চালিয়ে আসা নরম হিন্দুত্ববাদ আর যথেষ্ট নয়। এবার একেবারে কট্টর হিন্দুত্ববাদী হয়ে উঠতে হবে।

অযোধ্যায় যেখানে বাবরি মসজিদ ছিল ঠিক সেখানেই সুবিশাল রামমন্দির বানিয়ে দেখিয়ে দিয়েছেন মোদী। ২০২৪ লোকসভা নির্বাচনের আগেই কাজ শেষ না হওয়া সত্ত্বেও সেই মন্দির উদ্বোধন করেছেন। তাতে নির্বাচনী লাভ হয়েছে কি হয়নি তা অন্য আলোচনার বিষয়। কিন্তু ২০২৬ বিধানসভার অনেক আগেই মমতাও দীঘায় জগন্নাথধাম বানিয়ে, বাংলা খবরের চ্যানেলের ভাষায়, ‘পালটা দিলেন’। বাংলাদেশে যে ইস্কন এই মুহূর্তে আক্রান্ত বলে অভিযোগ, সেই সংগঠনের সাধুদের পাশে নিয়েই মমতা বুধবার ঘোষণা করলেন যে আগামী অক্ষয় তৃতীয়ায় ওই মন্দিরের উদ্বোধন হবে।

কে জানে মোদীর মত মমতাও প্রাণপ্রতিষ্ঠা ইত্যাদি দায়িত্ব নিজেই পালন করবেন কিনা। তাঁর প্রগতিশীল সমর্থকরা যতই তাঁর উপর সাবল্টার্নত্ব আরোপ করুন, মুখ্যমন্ত্রী যে সাক্ষাৎ ব্রাহ্মণসন্তান তাতে তো ভুল নেই। সুতরাং করতেই পারেন। প্রধানমন্ত্রী ও জিনিস করায় আমরা বিস্তর চেঁচামেচি করেছিলাম রাষ্ট্রের সঙ্গে ধর্মের দূরত্ব ঘুচিয়ে দিয়ে ধর্মনিরপেক্ষ সংবিধানের শ্রাদ্ধ করা হল অভিযোগ তুলে। কিন্তু সরকারি টাকায় জগন্নাথের মন্দির বানালেও যে একই কাজ হয় সেকথা আমরা বলিনি, বলবও না। কারণ আমরা বাঙালি প্রগতিশীলরা জানি, মমতার সিদ্ধান্তে তৈরি মন্দির হল ধর্মনিরপেক্ষ মন্দির। আর তিনি যদি নিজে হাতে প্রাণপ্রতিষ্ঠা করেন তাহলে তা দেখে বিজেপির ভোটাররাও তৃণমূলকে ভোট দিয়ে দেবেন। সুতরাং সেটা হবে হিন্দুত্ববাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে ধর্মনিরপেক্ষতার জয়।

শুভেন্দু সম্ভবত সেই আশঙ্কাতেই চেঁচামেচি আরম্ভ করেছেন। তিনি হঠাৎ রাষ্ট্র আর ধর্মের পৃথকীকরণ সম্পর্কে ভারি সচেতন হয়ে বলে উঠেছেন ‘সরকারি টাকায় কোনো মন্দির, মসজিদ, গির্জা, গুরদোয়ারা করা যায় না…আমরা রামমন্দির বানিয়েছি হিন্দুদের টাকায়, সরকারের টাকায় নয়’। আরও বলেছেন, মমতা যা বানিয়েছেন ওটা নাকি মন্দিরই নয়। তিনি কাদের যেন মেদিনীপুরে নিয়ে এসে ধর্মসম্মেলন করে প্রমাণ করে দেবেন যে ওটা মন্দির নয়, ফলে মমতার ভণ্ডামি ফাঁস হয়ে যাবে। আরেক নেতা তরুণজ্যোতি তিওয়ারি আবার টিভি স্টুডিওতে বসে হুগলী আর মালদা জেলার দুটো মসজিদকে আসলে মন্দির বলে দাবি করে সেখানে পুজো দেওয়া যাবে কিনা সে প্রশ্ন খুঁচিয়ে তুলেছেন।

মোদ্দাকথা, ক্রমশ পরিষ্কার হয়ে যাচ্ছে যে ২০২১ সালের মত ২০২৬ সালের নির্বাচনও তৃণমূল সরকার পাঁচ বছরে কতটা কী কাজ করল না করল, তা নিয়ে হবে না। সরকারি দল এবং সরকারের দুষ্কর্ম বা দুর্নীতি নিয়েও নয়। কারণ কেবল সরকার নয়, রাজ্যের প্রধান বিরোধী দলও তা চায় না। আর জি কর কাণ্ড নিয়ে আন্দোলনে তারা কোনো ভূমিকা নিতে পারেনি বলে ও ব্যাপারটা সকলে ভুলে গেলেই তারা খুশি হত। ঠিক সেটাই হয়েছে। আন্দোলনকারীরা মিইয়ে গেছেন তো বটেই; মৃতার জন্যে ন্যায়বিচার চাই, কিন্তু ডাক্তাররা ধান্দাবাজ ও দুর্নীতিগ্রস্ত – এই যুক্তিতে যাঁরা আর জি কর আন্দোলনের প্রাণপণ বিরোধিতা করেছিলেন, তাঁরাও আর খবর রাখছেন না যে সরকারি কর্মচারী সন্দীপ ঘোষের বিরুদ্ধে চার্জশিট দিতে গেলে রাজ্য সরকারের যে অনুমতি প্রয়োজন সেটা সরকার দিচ্ছে না। তা নিয়ে তাঁরা সরকারের কৈফিয়ত তলব করছেন না, টুঁ শব্দটিও করছেন না। বরং অনেকে বলছেন, সন্দীপ ছাড়া কি আর কোনো দুর্নীতিগ্রস্ত ডাক্তার নেই রাজ্যে? একা ওকেই কেন শাস্তি পেতে হবে? সত্যিই তো। বেচারা সন্দীপ! যা নিয়ে টানা আড়াই মাস আন্দোলন চলল, মাস চারেক যেতেই যখন সে ব্যাপারটা এরকম দাঁড়িয়েছে, তখন আগামী দেড় বছরে সরকার যা-ই করুক না কেন, সেগুলো ভুলতেও সময় লাগবে না।

তাহলে কোন প্রশ্নে ভোট হবে? বাংলাদেশ নিয়ে হাওয়া গরম করে রাজ্য বিজেপি এইটুকু নিশ্চিত করতে পেরেছে যে মমতাকেও হিন্দু ভোটের জন্যে ঝাঁপাতে হবে। অর্থাৎ সংখ্যালঘুদের ভোটার হিসাবে অপ্রাসঙ্গিক করে দেওয়ার যে কাজ সঙ্ঘ পরিবার সারা ভারতে করতে চায় এবং অনেকটা করেও ফেলেছে, তৃণমূল সরকারের ১৫ বছরের মাথায় সে কাজ মোটামুটি সম্পূর্ণ হয়েছে পশ্চিমবঙ্গে। ২০২১ সালে বিজেপিকে আটকাতে হবে – এই প্রশ্নে ভোট হয়েছিল। তাই বহু ধর্মনিরপেক্ষ মানুষ তৃণমূলের কাজকর্মে বিরক্ত হওয়া সত্ত্বেও মমতাকেই ভোট দিয়েছিলেন। এবার মমতাও কে বড় হিন্দু – সেই প্রশ্নের দিকেই নির্বাচনকে নিয়ে যাচ্ছেন। হিন্দুদের মধ্যে যাঁরা নিজেদের ধর্মনিরপেক্ষ বলে এতদিন দাবি করতেন, তাঁদের অনেকের গত একমাসে যে চেহারা বেরিয়ে পড়েছে তাতে বিজেপিকে আটকাতে তাঁরা সকলে আর আগ্রহী কিনা তাতে সন্দেহ আছে। হিন্দুত্ববাদের এর চেয়ে বড় সাফল্য আর কী হতে পারত? এরপর মমতা হারলে হিন্দুত্ববাদ জিতবে তো বটেই, মমতা জিতলেও হিন্দুত্ববাদ হারবে না।

অবশ্য মমতা হারবেন কেন? শুভেন্দু যতই লাফালাফি করুন, মোহন ভাগবত কি আর শুভেন্দুর মত কোনো মন্দিরকে ‘কালচারাল সেন্টার’ বলে হেলাফেলা করতে রাজি হবেন? বাংলাদেশ সম্পর্কে মমতা যা যা বলেছেন, সেগুলো কি মোদী বা অমিত শাহেরও মন কি বাত নয়? নেহাত প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর মত পদে থাকলে ওসব কথা বলা যায় না তাই। অন্য কেউ বলে দিলে মন্দ কী? যা নিয়ে কথা বললে মোদী, শাহদের পছন্দ না-ও হতে পারে তা নিয়ে তো মমতা বা তাঁর দল কিছু বলছে না। সংসদের শীতকালীন অধিবেশন শুরু হওয়ার পর থেকে তো মনে হচ্ছে মহুয়া মৈত্র কংগ্রেস সাংসদ বা নির্দল। কারণ গৌতম আদানি নিয়ে আলোচনা চেয়ে রাহুল গান্ধীরা যে হল্লা করছেন তাতে মমতার দল যোগ দিতে চাইছে না। একা মহুয়াই সোশাল মিডিয়ায় আদানি নিয়ে গলা ফাটিয়ে যাচ্ছিলেন। তৃণমূল বলেছে ওটা নাকি সাধারণ মানুষের ইস্যু নয়, যদিও আদানি গ্রুপে শুধু স্টেট ব্যাংক আর এলআইসির মাধ্যমে মধ্যবিত্তের টাকা আটকে আছে তা নয়। বিদ্যুৎ বিতরণের ব্যবসা থেকে শুরু করে ভোজ্য তেলের ব্যবসা পর্যন্ত সবেতে আদানি গ্রুপ থাকায় তাদের হাতে লুণ্ঠিত হচ্ছেন গরিব মানুষও। আবার এই যে চতুর্দিকে মসজিদের নিচে, মাজারের নিচে মন্দির ছিল দাবি করে মামলা ঠুকছে হিন্দুত্ববাদীরা – তা নিয়েও ধর্মনিরপেক্ষ চূড়ামণি মমতা একটি শব্দ উচ্চারণ করেননি। কংগ্রেস হরিয়ানা, মহারাষ্ট্রে হারের সম্মুখীন হতেই ইন্ডিয়া জোটের নেতৃত্ব মমতার হাতেই তুলে দেওয়া উচিত – এই মর্মে বয়ান দিতে শুরু করেছেন তৃণমূলের মুখপাত্ররা; সমর্থন করছেন অখিলেশ যাদব, শরদ পাওয়ার, লালুপ্রসাদ প্রমুখ। অথচ এইসব জাতীয় স্তরের ব্যাপার বা অখিলেশের রাজ্যের সম্ভলের সাম্প্রদায়িক হিংসা নিয়ে এক লাইন প্রতিক্রিয়া দেননি নেত্রী।

একমাত্র রাজ্যসভার চেয়ারম্যান হিসাবে জগদীপ ধনখড়ের বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাবে কংগ্রেসের সঙ্গে একমত হয়েছে তৃণমূল। কিন্তু লোকসভা নির্বাচনের আগে শেষ অধিবেশনে অন্য দলের মত মমতার দলের সাংসদদেরও ধনখড় সাসপেন্ড না করলে কি সেটুকুও করা হত? সন্দেহ করতেই হচ্ছে, কারণ পশ্চিমবঙ্গের রাজ্যপাল পদে ধনখড়ের উত্তরসূরি সি ভি আনন্দ বোসের সঙ্গে প্রায় সব বিষয়ে ‘কাম অন ফাইট, কাম অন ফাইট’ করার পরে, এমনকি তাঁর বিরুদ্ধে রাজভবনের এক মহিলা কর্মীকে যৌন হয়রানি করার মত গুরুতর অভিযোগ ওঠার প্রেক্ষিতে বৈঠক করতে পর্যন্ত রাজ্যপালের কাছে যাবেন না বলার পরে হঠাৎ গত সোমবার কোন দেবতা সে, কার পরিহাসে, দুজনের ভাব হয়ে গেছে। ধনখড়ের বেলাতেও একটুখানি আড়ি আর সারাজীবন ভাব হয়েছিল। রাজ্যপাল পদে যাঁকে ঘোর অপছন্দ ছিল, উপরাষ্ট্রপতি পদে তাঁর বিরুদ্ধে বিরোধীদের প্রার্থী মার্গারেট আলভাকে সমর্থন করেনি তৃণমূল।

এভাবে একে অন্যকে বিপদে না ফেলে এবং নিঃশব্দে বিরোধ মিটিয়ে ফেলে যদি দিন চলে যায়, তাহলে আর মমতাকে হারানোর জন্যে বিজেপির উতলা হবার দরকার কী? তবে এখানে একটা বিধিসম্মত সতর্কীকরণ দিয়ে রাখা দরকার – পাশেই ওড়িশায় এমনই সাতে পাঁচে না থাকা, দীর্ঘদিনের নিরঙ্কুশ বিজয়ী নবীন পট্টনায়ককে এবছর বিজেপির কাছে মসনদ খোয়াতে হয়েছে।

আরো পড়ুন ভীরুদের হাতে ভারতের গণতন্ত্র রক্ষার ভার, তাই বিরোধী জোট নড়বড়ে

লেখাটা এখানেই শেষ করা যেত। কিন্তু ভারতের অন্য রাজ্যের সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গের তফাত আছে। অন্যত্র শাসক, বিরোধী – দুই পক্ষের সমালোচনা করলে মিটে যায়। কিন্তু এ রাজ্যে সেখানেই থেমে গেলে চলে না। প্রকৃত বিরোধীর অভাব এবং তেমন একটা শক্তির জন্যে মানুষের হাহাকার এমন জায়গায় পৌঁছেছে যে গায়ক, নায়ক, কবি – সকলের থেকেই তাঁরা বিরোধিতা দাবি করেন এবং দাবি পূরণ না হলে গাল দেন। ইদানীং লক্ষ করছি, আমাদের মত চুনোপুঁটি সাংবাদিকের লেখা পড়েও অনেকে মন্তব্য করছেন ‘অল্টারনেটিভটা কী’ বা ‘করণীয় কী’? অনেকে আরও এক ধাপ এগিয়ে বলে দিচ্ছেন যে বিকল্প না বলতে পারলে কিছু লেখাই উচিত নয়। যেন প্রশ্ন তোলা নয়, সব প্রশ্নের উত্তর দেওয়াই সংবাদমাধ্যমের কাজ। আবার কেউ কেউ ঘোষণা করে দিচ্ছেন, বিকল্প বলছে না মানে ও আসলে অমুক পক্ষে বা তমুক পক্ষে। সংবাদমাধ্যম সম্পর্কে এই ভুল ধারণা তৈরি হওয়ার জন্যে অবশ্য সাংবাদিকরাই দায়ী। আসলে যে নিরপেক্ষতা বলে কিছু হয় না, বিশেষত আজকের পৃথিবীতে সাংবাদিকের নৈর্ব্যক্তিকতার ধারণাও বদলে ফেলা দরকার, তা নিয়ে বিস্তর লেখালিখি আছে। আগ্রহীরা উদাহরণ হিসাবে এই লেখাটা পড়ে দেখতে পারেন। তা সত্ত্বেও একথা ঠিকই যে সাংবাদিকরা তাঁদের উদ্দেশ্যকে সন্দেহ করার একাধিক কারণ রোজ জুগিয়ে চলেছেন।

ঠিক তেমনই পশ্চিমবঙ্গের মানুষের রাজনীতির বাইরের লোকের মধ্যে বিরোধী খোঁজা এবং না পেলে ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠার জন্যেও বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোই দায়ী। বিজেপি আর তৃণমূল যে মুদ্রার এ পিঠ ও পিঠ সেকথা কেউ না-ও মানতে পারেন, কিন্তু বিজেপি যে বিধানসভার ভিতরে বা বাইরে সাধারণ মানুষের দাবিদাওয়া নিয়ে আন্দোলন করে না তা সাদা চোখেই দেখা যায়। কংগ্রেস তো বামফ্রন্ট আমলেই প্রান্তিক শক্তি হয়ে গিয়েছিল, রইল বাকি বামপন্থীরা।

রাজ্যের বৃহত্তম বামপন্থী দল বিরোধিতা করবে কী; ইদানীং বুঝেই উঠতে পারে না তারা কোনো পার্টি, নাকি এনজিও, নাকি কোম্পানি। তাই কখনো কিছুটা জনপ্রিয় হয়ে ওঠা যুবনেত্রী মীনাক্ষী মুখার্জিকে পাহাড় থেকে সাগর হাঁটিয়ে ভাবে ভোট পাওয়া যাবে, কখনো মনে করে অতিমারীতে বা অন্য সময়ে অসুস্থ মানুষের শুশ্রূষা করে বা অক্সিজেন সিলিন্ডার পৌঁছে দিয়ে ভোট পাওয়া যাবে, কখনো পতাকা বাদ দিয়ে কোনো আন্দোলনে ঢুকে পড়ে জনসমর্থন ফেরত আসবে মনে করে, কখনো আবার পেশাদার লোক দিয়ে কিছু হিসাবনিকাশ করালেই সব ঠিক হয়ে যাবে মনে করে। নির্বাচনের ফল বেরোলে কোনোটাই কাজে লাগল না দেখে সদস্য, সমর্থকরা অভিমান করেন আর সোশাল মিডিয়ায় — নেতৃত্বের বারণ অমান্য করে – সরকারি প্রকল্পে উপকৃত গরিব মানুষকে গালাগালি দেন। এই ‘বাহির-পানে চোখ মেলেছি, আমার হৃদয়-পানে চাই নি’ অবস্থা কাটিয়ে উঠতে না পারলে তৃণমূল, বিজেপিকে পরাস্ত করার জায়গায় পৌঁছনো শক্ত। নবীন ইন্ডিয়ান সেকুলার ফ্রন্ট না পুরনো নকশাল, নাকি প্রাচীন কংগ্রেস – কাদের সঙ্গে জোট করলে ভোট ফেরত আসবে তা ভাবতেই দিন যাবে।

সিপিএম বা বামফ্রন্টের বাইরেও কিছু বামপন্থী আছেন পশ্চিমবঙ্গে। কিন্তু তাঁরা সিপিএমের শূন্যস্থান পূরণ করার কোনো সম্ভাবনা তৈরি করতে পারেননি সিপিএম হীনবল হয়ে যাওয়ার পরেও।

সুতরাং হতাশাজনক হলেও, সত্যি কথাটা হল, ফ্যাসিবাদ বা হিন্দুত্ববাদকে পরাজিত করেছি বলে যে উল্লাস পশ্চিমবঙ্গবাসী ২০২১ এবং ২০২৪ সালের নির্বাচনের ফল বেরোবার পর করেছিলেন তা যে অকারণ ছিল সেকথা স্বীকার করার সময় এসে গেছে। এখন ‘আমাদের ডান পাশে ধ্বস/আমাদের বাঁয়ে গিরিখাত…।’

নাগরিক ডট নেট ওয়েবসাইটে প্রকাশিত

পাখির চোখ বাংলাদেশের হিন্দুর নিরাপত্তা, না পশ্চিমবঙ্গের হিন্দুর ভোট?

তথাগত রায়, তরুণজ্যোতি তিওয়ারি প্রমুখের সোশাল মিডিয়া হ্যান্ডেলে যেসব কথোপকথন চলে সেগুলোতে চোখ রাখুন। তাঁরা কিন্তু সজলবাবুর মতো আবেগপ্রবণ হয়ে বাংলাদেশ আক্রমণ করার কথা-টথা বলেন না। বরং বিপন্ন হিন্দুদের এ-দেশে জায়গা দেওয়ার কথা উঠলেই তাঁরা এবং তাঁদের সাঙ্গপাঙ্গরা বলতে শুরু করেন— ভারতবর্ষ ধর্মশালা নয়।

একটা দেশের সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সরকারের দায়িত্ব।

এই কথাটা বলামাত্র সেই ২০১২-১৩ সাল থেকে যেসব আত্মীয়-বন্ধু-সহপাঠী-সহকর্মী রেগে-আগুন তেলেবেগুন হয়েছেন, সম্পর্ক তুলে দিয়েছেন (বা আমিই তুলে দিয়ে বেঁচেছি), হঠাৎ সেদিন আবিষ্কার করলাম তাঁরা সকলে ঠিক ওই কথাটাই বলছেন। দেখে অ্যাইসা ফুর্তি হল যে লতা মঙ্গেশকরের মতো মিহি গলায় শতবর্ষে পা দেওয়া সলিল চৌধুরী রচিত ও সুরারোপিত ‘হঠাৎ ভীষণ ভাল লাগছে’ গানটা গাইতে শুরু করলাম। কিন্তু কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে নিজের কানই জানিয়ে দিল যে আমার গলার সঙ্গে লতার গলার তফাত বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে মহাত্মা গান্ধির মতো। ফলে চুপ করে গেলাম। ফুর্তিটাকেও কান ধরে টেনে নামিয়ে আনন্দের বেঞ্চে বসিয়ে দিলাম। একটু আনন্দ তো করাই উচিত। কারণ কবি বলেছেন— কেবল রাত্রির অবসান হলে প্রভাত হয় না। চিত্ত জাগলেও প্রভাত হয়। তা চারপাশে এত মানুষের চিত্ত জেগেছে মানে প্রভাত হয়েছে, অচিরেই প্রভাতফেরি বেরোবে, তার আওয়াজের ঠ্যালাতেই বাকি অন্ধকার দূরীভূত হবে— এরকম ভাবছিলাম আর কি। কিন্তু সে আনন্দও দিন দুয়েকের বেশি টেকানো গেল না। কেন? সে-কথাই বলব।

গোঁফ গজানোর বয়সে আমরা মাধুরী দীক্ষিত বলতে পাগল ছিলাম। যেহেতু বলিউডের হাত অনেক লম্বা, সেহেতু কেবল ভারতে নয়, গোটা উপমহাদেশেই তখন মাধুরী অধরা বলে নানা বয়সের পুরুষদের হৃদয় দাউদাউ করে জ্বলে। এতটাই, যে কাগজে পড়েছিলাম, পাকিস্তানিরা নাকি সকৌতুকে বলত ‘তোমরা মাধুরী আর শচীন তেন্ডুলকরকে দিয়ে দাও, আমরা কাশ্মিরের দাবি ছেড়ে দেব।’ তা সেই মাধুরী নেপালে এক অনুষ্ঠানে গিয়ে একখানা কেলেঙ্কারি করে বসেছিলেন। আদর-আপ্যায়নে আহ্লাদিত হয়ে বলে বসেছিলেন— নেপাল তো ভারতেই ছিল… ইত্যাদি। সে অবশ্য ১৯৯৮-৯৯ সালের কথা। তখন ভারত সরকারের সঙ্গে নেপাল সরকারের সম্পর্ক মন্দ ছিল না, ফলে নায়িকা ক্ষমা-টমা চাওয়াতেই ব্যাপারটা মিটে গিয়েছিল। মুশকিল হল, বাংলাদেশের ব্যাপারে পশ্চিমবঙ্গীয় বাঙালিরা অনেকে এখনও মাধুরী হয়ে আছেন। ১৯৪৭ সালে দেশভাগ তথা বাংলা ভাগ হয়েছে। পরে ১৯৭১ সালে পূর্ব পাকিস্তান মুক্তিযুদ্ধের মধ্যে দিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশ হয়ে গেছে। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের অনেকেই এখনও ওটাকে আলাদা দেশ বলে মেনে নিতে পারেন না। আরও সমস্যার কথা হল, যেহেতু বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পাশে দাঁড়িয়ে ভারত পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছিল, তাই আমাদের অনেকেরই ধারণা— বাংলাদেশের যে-কোনও ব্যাপারে ভারতের ছড়ি ঘোরানোর অধিকার আছে। দুটো দেশের সরকার এবং মানুষের মধ্যে আন্তর্জাতিক রীতিনীতি অনুসারে যেমন সম্পর্ক কাঙ্ক্ষিত, তার বদলে বাংলাদেশের সঙ্গে বড়দাসুলভ ব্যবহার করা উচিত— এমনটাই মনে করেন আমাদের ভাই-বেরাদররা অনেকে। ফলে যে যে-দলেরই সমর্থক হোন, বাংলাদেশে কোনও গোলমাল শুরু হলেই একযোগে আশ্চর্য সব দাবি করতে শুরু করেন এঁরা। যেমন এই মুহূর্তে কলকাতা কর্পোরেশনের বিজেপি কাউন্সিলর সজল ঘোষের মতো অনেক সিপিএম সমর্থককেও ভারতীয় সেনাবাহিনিকে দিয়ে বাংলাদেশ আক্রমণের দাবি তুলতে দেখা যাচ্ছে।

এমনিতে সজলবাবুকে যত গুরুত্ব পশ্চিমবঙ্গের সংবাদমাধ্যম দেয় তত গুরুত্ব তাঁর নিজের দলের নেতা অমিত শাহও দেন না। দিলে সজলবাবুর আপ্রাণ চেষ্টা সত্ত্বেও কলকাতায় এসে আরজিকর-কাণ্ডে মৃতার বাবা-মায়ের সঙ্গে দেখা না করেই চলে যেতেন না। সুতরাং সজলবাবুর ওই চ্যানেল গরম করা মন্তব্যে যে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শাহ, বিদেশমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর, প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং বা প্রধানমন্ত্রী মোদি কানই দেবেন না তা বলাই বাহুল্য। কিন্তু দলমতনির্বিশেষে বাঙালিরা যে এই দাবিকে ন্যায্য বলে মনে করছেন— তা যথেষ্ট উদ্বেগজনক। একে তো অন্য একটা দেশ সম্পর্কে এত প্রবল অধিকারবোধ মনের মধ্যে পুষে রেখেছে কয়েক লক্ষ লোক— এই ব্যাপারটাই ভয়ঙ্কর। তার উপর দেখা যাচ্ছে বাম দলগুলোর সমর্থকরাও দাবি করছেন— এখানকার বামপন্থীদের বাংলাদেশের হিন্দুদের জন্যে পথে নামতে হবে, তৃণমূল সমর্থকরা দাবি করছেন তাঁদের দলকেও পথে নামতে হবে। অবশ্য বামেরা যেহেতু ক্ষমতায় নেই, সেহেতু তাঁরা যেমন প্যালেস্তাইনের মানুষের উপর ইজরায়েলি গণহত্যার বিরুদ্ধে মিছিল করেন তেমন বাংলাদেশে হিন্দুদের উপর আক্রমণের বিরুদ্ধেও মিছিল করা যেতে পারে (যদিও এখন পর্যন্ত প্যালেস্তাইনে ইজরায়েল যা চালাচ্ছে তার সঙ্গে বাংলাদেশের পরিস্থিতির পরিমাণগত বা গুণগত কোনও মিল নেই), তবে দুই মিছিলেরই গুরুত্ব প্রতীকী। কিন্তু বাংলাদেশের ঘটনা নিয়ে পশ্চিমবঙ্গের শাসক দলকে পথে নামতে হবে— এ আবার কী আবদার? যে-কোনও দলের সরকারকেই ভারতের সংবিধান মেনে চলতে হয় আর সংবিধান অনুসারে বিদেশনীতি কেন্দ্রীয় সরকারের কাজের তালিকাভুক্ত। নেহাত বাংলাদেশ প্রায় এক শতাব্দী আগে একই প্রদেশ ছিল এবং দুই জায়গার ভাষা অভিন্ন, দুইপারে রক্তের সম্পর্কে জড়িয়ে থাকা বহু পরিবার রয়েছে, তাই পশ্চিমবঙ্গ সরকার সম্পূর্ণ উদাসীন থাকতে পারে না। সেই কারণে মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি একখানা বিবৃতি দিয়েছেন। কিন্তু তিনি পথে নামতে যাবেন কেন? সত্যিই তো এ-ব্যাপারে কেন্দ্রীয় সরকার যা সিদ্ধান্ত নেবে তা মেনে নিতে তিনি বাধ্য। অথচ এই দাবি কেবল আইনকানুনের ধারণাবিহীন সাধারণ মানুষ সোশাল মিডিয়ায় তুলছেন তা নয়। এবিপি আনন্দের মতো জনপ্রিয় চ্যানেলে বসে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক বিশ্বনাথ চক্রবর্তীও এই কিম্ভূত দাবি তুলে ফেলেছেন।

নিজের এক্তিয়ারের বাইরে গিয়ে কেন এমন কাজ করতে হবে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রীকে? রাজনৈতিক বিশ্লেষক বিশ্বনাথবাবুর দর্শানো কারণটি চিত্তাকর্ষক। এতে নাকি মহম্মদ ইউনুসের সরকারের উপরে চাপ তৈরি হবে এবং বাংলাদেশের ধর্মনিরপেক্ষ মানুষজন বুকে বল পাবেন। বাংলাদেশ যত ছোট রাষ্ট্রই হোক, পশ্চিমবঙ্গের মতো একটা অঙ্গরাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী নিজের রাজ্যে বাংলাদেশের বিষয় নিয়ে মিছিল করেছেন বলে চাপে পড়বে কেন? বিশেষত ভারত সমেত পৃথিবীর কোনও বড় রাষ্ট্রই যখন এই তদারকি সরকারকে স্বীকৃতি না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়নি? আর বাংলাদেশের ধর্মনিরপেক্ষ মানুষজনই বা মমতার মিছিলে আলাদা করে সাহস কেন পাবেন? ইসলামিক মৌলবাদীরা তাঁদের আক্রমণ করলে কি মমতার পুলিশ বা অনুব্রত মণ্ডলের ঢাক তাঁদের বাঁচাতে যাবে? নাকি কেন্দ্রীয় সরকারকে না জানিয়ে, মমতা নিজের সিদ্ধান্তে তাঁদের কাউকে পশ্চিমবঙ্গে আশ্রয় দিতে পারবেন?

কিমাশ্চর্যম অতঃপরম! মমতা এই হাস্যকর দাবি মেনে নিয়ে পথে নামলেন না বটে, আরও এককাঠি সরেস কাজ করলেন। দাবি করে বসলেন যে সম্মিলিত জাতিপুঞ্জকে বাংলাদেশে শান্তিরক্ষা বাহিনি পাঠাতে হবে। তাঁর সঙ্গে প্রায় হুবহু মিলে গেল পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার বিরোধী দলনেতা এবং মমতার একদা-স্নেহভাজন শুভেন্দু অধিকারীর বয়ান ‘রাষ্ট্রপুঞ্জের কাছে আবেদন করছি, বাংলাদেশে হিন্দুদের অস্তিত্ব বাঁচানোর জন্য হস্তক্ষেপ করুক’।

বাংলাদেশে গত কয়েকদিনের নতুন অশান্তিতে ঠিক কত মানুষ নিহত, কটা পরিবার বাস্তুহারা, কোনও নারীনির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে কিনা— এসবের কোনও সুনির্দিষ্ট তথ্য কিন্তু ভারতের সংবাদমাধ্যম আমাদের জানাতে পারেনি। সজলবাবু, বিশ্বনাথবাবু, শুভেন্দুবাবু বা আমাদের মুখ্যমন্ত্রীও জানাননি। অথচ ক্রমাগত এরকম আক্রমণাত্মক মন্তব্য বেড়েই চলেছে। এসবের একটাই ফল— বাংলাদেশ নিয়ে পশ্চিমবঙ্গে উত্তেজনা বৃদ্ধি এবং তার ফলে সাম্প্রদায়িক উন্মাদনা তৈরি হওয়া। যেহেতু বাংলাদেশে শেখ হাসিনার অপসারণের পর থেকেই হিন্দুরা আক্রান্ত হচ্ছেন বলে খবরে প্রকাশ, তাই পশ্চিমবঙ্গের হিন্দু বাঙালি এখন বাংলাদেশ বলতেই মুসলমান ভাবছেন। জুলাই অভ্যুত্থানের সময় থেকেই দেখা যাচ্ছিল, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের মতোই এবারেও যে লড়াইয়ে লিপ্ত শক্তিগুলো সমসত্ত্ব নয় তা মেনে নিতে পশ্চিমবঙ্গের ভদ্রলোকদের ঘোর আপত্তি। ছাত্রনেতাদের মধ্যে হিন্দু নামগুলোর উপস্থিতিকে তাঁরা অগ্রাহ্য করে যাচ্ছেন, তাতে ধুয়ো দিয়ে যাচ্ছে পশ্চিমবঙ্গ তথা ভারতের মূলধারার সংবাদমাধ্যম। যখন বাংলাদেশের রাস্তায় সোজা বুকে গুলি চালিয়ে মানুষ মারছিল হাসিনার পুলিশ, তখনও হাসিনা না থাকলে বাংলাদেশের কী হবে তার আলোচনায় পশ্চিমবঙ্গের সংবাদমাধ্যম ব্যবহার করে যাচ্ছিল— ‘বাংলাদেশ আফগানিস্তান হওয়ার দিকে এগোচ্ছে’, ‘বাংলাদেশে তালিবানি শাসন প্রতিষ্ঠা হতে চলেছে’ ইত্যাদি শব্দবন্ধ।

পৃথিবীর ইতিহাসে বিদ্রোহ, তারপর নৈরাজ্য এবং অত্যাচারী শাসনের অজস্র উদাহরণ আছে। যেমন বলা যেতেই পারত বাংলাদেশ রোবসপিয়রের গিলোটিনের ফ্রান্স হওয়ার দিকে এগোচ্ছে। তুলনায় সাম্প্রতিক উদাহরণ দিতে চাইলে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাওয়ার পরে পূর্ব ইউরোপের দেশগুলোর কথা বলা যেত। আরও সাম্প্রতিক উদাহরণ দেওয়ার ইচ্ছে থাকলে গৃহযুদ্ধোত্তর সিরিয়া হওয়ার দিকে এগোচ্ছে বললেও চলত। তেমন কিছু না বলে আফগানিস্তান এবং তালিবানের কথা বলার উদ্দেশ্য পরিষ্কার— মাথায় ফেজ পরা, গালে লম্বা দাড়িওয়ালা মুসলমানের ছবি তুলে ধরে আতঙ্ক ছড়ানো, যার সঙ্গে অপরিহার্যভাবে এসে পড়বে বোরখা পরা মহিলাদের ছবি। হিন্দুত্ববাদীরা মুসলমানের ঠিক যে স্টিরিওটাইপ হিন্দুদের গেলাতে চায়। অথচ তদারকি সরকারের প্রধান মহম্মদ ইউনুস কিন্তু কামানো গালের, মাথায় ফেজ না-পরা পুরুষ। তাঁর সরকারের গুরুত্বপূর্ণ সদস্যদের একজন হলেন সাঈদা রিজওয়ানা হাসান, যিনি ২৯ নভেম্বর সাংবাদিক সম্মেলনে জানিয়েছেন যে গ্রেফতার হওয়া সন্ন্যাসী চিন্ময়কৃষ্ণ দাসের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের তদন্ত হবে, কিন্তু তার জন্যে ইস্কনকে বাংলাদেশে নিষিদ্ধ করার কোনও ভাবনা তদারকি সরকারের নেই। রিজওয়ানা বোরখা পরেন না, এমনকি হিজাবও নয়।

নিয়মিত নির্বাচন হচ্ছে মানেই যে একটা দেশ গণতান্ত্রিক পথে আছে তা নয়— এ-কথা বুঝতে আজকের ভারতীয়দের অন্তত কোনও অসুবিধা হওয়ার কথা নয়। দেশদ্রোহবিরোধী আইনের দোহাই দিয়ে উমর খালিদ, শার্জিল ইমাম-সহ আরও বহু মানুষকে বিনা বিচারে বন্দি করে রাখার কাজ এ-দেশের ভোটে জিতে আসা সরকারই করে চলেছে দশ বছর ধরে। রাস্তায় নেমে প্রতিবাদ করলে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ঘরবাড়ি, দোকানপাট বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়ার কাজও করছে বিভিন্ন রাজ্যের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় নির্বাচিত সরকারগুলোই। কোনও আইনকানুনের তোয়াক্কা না করে, এমনকি সুপ্রিম কোর্টের নিষেধকেও বুড়ো আঙুল দেখিয়ে জঘন্য পলাতক অপরাধীদের মতো করে প্রতিবাদীদের ছবি দেওয়ালে দেওয়ালে সেঁটে দেওয়ার কাজ করছে ভোটে জিতে ক্ষমতায় আসা উত্তরপ্রদেশের আদিত্যনাথ সরকার। গত দশ বছরে কতজন সংখ্যালঘুকে গোমাংস খাওয়ার, বিক্রি করার বা স্রেফ বহন করার ‘অপরাধে’ মেরে ফেলা হয়েছে এবং রাষ্ট্র হত্যাকারীদের শাস্তি দেওয়ার বদলে মদত দিয়েছে, তার তালিকা চিনের প্রাচীরের মতো লম্বা হবে। কদিন হল মুসলমানদের উত্যক্ত করার নতুন কায়দা চালু হয়েছে। যে-কোনও মসজিদের নিচেই মন্দির ছিল কিনা মাটি খুঁড়ে দেখার দাবিতে আদালতে মামলা ঠুকে দিচ্ছে হিন্দুত্ববাদীরা, আর আদালত পত্রপাঠ খোঁড়ার নির্দেশও দিয়ে দিচ্ছে। অথচ দেশে স্পষ্ট আইন আছে— ১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট দেশের যেখানে যে ধর্মস্থান ছিল সেগুলোর চরিত্র পরিবর্তন করা যাবে না। সে আইনের তোয়াক্কা করছে না এমনকি নিম্ন আদালতগুলোও। এই বেমক্কা রায়ের জেরে হিংসা ছড়িয়ে উত্তরপ্রদেশের সম্ভলে ইতিমধ্যেই কিছু মানুষের প্রাণ গেছে। এখন এমনকি প্রাচীন আজমের শরীফ নিয়েও তেমন একটা মামলা ঠোকা হয়েছে। এমন রায় দেওয়ার পথ কিন্তু খুলে দিয়ে গেছেন সুপ্রিম কোর্টের প্রাক্তন প্রধান বিচারপতি ডিওয়াই চন্দ্রচূড়, জ্ঞানবাপী মসজিদে মাটি খুঁড়ে সার্ভে করার অনুমতি দিয়ে। কিন্তু এতে কি প্রমাণ হয় যে ভারতের অধিকাংশ মানুষ, এমনকি অধিকাংশ হিন্দু ভারতীয়, সাম্প্রদায়িক? একেবারেই না।

হাসিনার আমলেও বাংলাদেশে হিন্দু হত্যা ঘটেছে। আর সব ভুলে গিয়ে থাকলেও ব্লগার অভিজিৎ রায়ের খুনের কথা আশা করি এপারের হিন্দু বা মুসলমান কোনও বাঙালিই ভোলেননি। সেইসময় হিন্দুদের পুজোআচ্চায় আক্রমণ হয়েছে, সম্পত্তি দখল করে নেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। সুতরাং ভোট হত আর হাসিনা জিততেন মানেই বাংলাদেশ দারুণ গণতান্ত্রিক ছিল— এ-কথা বলার কোনও মানে নেই। আবার সেই আমলে বা এই আমলে বাংলাদেশে হিন্দুদের উপর আক্রমণও প্রমাণ করে না যে অধিকাংশ বাংলাদেশি, এমনকি অধিকাংশ মুসলমান বাংলাদেশি, সাম্প্রদায়িক।

কিন্তু সোশাল মিডিয়া আর ভারতের মিডিয়ার কল্যাণে ঠিক উল্টো ছবিটাই গাঢ় রঙে আঁকা হয়ে গেছে পশ্চিমবঙ্গের সংখ্যাগুরু সম্প্রদায়ের বাঙালির মনে। তাই ‘একটা দেশের সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সরকারের দায়িত্ব’— এই কথাটা তাঁরা আজ যখন বলছেন, তখন বলছেন বাংলাদেশের দিকে মুখ করে। নিজের দেশের দিকে না-তাকিয়ে। তাই আমার আনন্দ টিকল না। দেখলাম বিজেপি সমর্থকরা তো বটেই, সিপিএম সমর্থকরাও গোটা উপমহাদেশে সংখ্যাগুরুবাদের প্রসারের নিন্দা করে পার্টির রাজ্য সম্পাদক মহম্মদ সেলিমের বিবৃতিতে অসন্তুষ্টি প্রকাশ করছেন। বলছেন, এসব চালাকি। বাংলাদেশের ঘটনার নিন্দা করতে গেলেই সঙ্গে এ-দেশের সংখ্যালঘুদের উপর যে আক্রমণ হচ্ছে তার কথা কেন বলতে হবে? গোদা বাংলায় তাঁদের মত হল— বাংলাদেশের সংখ্যালঘু হিন্দুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সে-দেশের সরকারের দায়িত্ব, কিন্তু এ-দেশের সংখ্যালঘু মুসলমানদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এ-দেশের সরকারের দায়িত্ব নয়।

এই তো সেদিন এ-রাজ্যের মহিলারা রাত দখল করলেন, ধর্ষকের মৃত্যুদণ্ডের দাবিতে রাস্তায় নামলেন মহিলা মুখ্যমন্ত্রীও, পরে নতুন আইনও পাশ করালেন বিধানসভায়। আন্দোলনকারীদের অনেকেরই বক্তব্য ছিল আরজিকর-কাণ্ডে দোষী একজন নয়, অনেকে। তাদের সকলের শাস্তি চাই। তা নিয়েও টানা আন্দোলন হল। অথচ আজ চিন্ময়কৃষ্ণের বিরুদ্ধে যে শিশুদের যৌন নিপীড়নের অভিযোগ আছে, সে-অভিযোগে তাঁর উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে তাঁর নিজেরই সংগঠন— তা নিয়ে আলোচনা করতে দেখছি না এমনকি মহিলাদেরও। উনি অবশ্য সেই অভিযোগে গ্রেফতার হননি। কী অভিযোগে গ্রেফতার হয়েছেন? তা নিয়েও পশ্চিমবঙ্গের মিডিয়ায় বা সোশাল মিডিয়ায় বিশেষ আলোচনা নেই। অর্থাৎ হয় এখানকার মানুষ জানার প্রয়োজন বোধ করেন না, নয়তো নিঃসংশয়ে জানেন ব্যাপারটা স্রেফ রাষ্ট্রের বদমাইশি। সেটা হওয়া অবশ্যই অসম্ভব নয়। কিন্তু একইরকম অভিযোগে উমর, শার্জিলের জামিনের তো শুনানিই হয় না এ-দেশে। তা নিয়ে কারও এত মাথাব্যথা নেই তো?

সব মিলিয়ে যা বুঝলাম, ‘হঠাৎ ভীষণ ভাল লাগছে’ গানটা আমার নয়, শুভেন্দুবাবুর গাওয়া উচিত। কারণ রাজ্য বিজেপি যতই অন্তর্দ্বন্দ্বে নাজেহাল হোক, যতই লোকসভা নির্বাচনে বা উপনির্বাচনে ভোট কমুক, দেশজুড়ে মোদি-ম্যাজিক যতই ফিকে হয়ে যাক, ঘৃণার জমি এমন চমৎকার চষা হয়ে গেছে পশ্চিমবঙ্গে যে, সঙ্ঘ পরিবারের ফসল তোলা স্রেফ সময়ের অপেক্ষা। সে-ফসল ২০২৬ সালে তোলা হবে, নাকি আরও পরে— সে আলাদা কথা। নিজের মালিকানাধীন হাসপাতালে বাংলাদেশি রোগীদের চিকিৎসা বন্ধ করার ঘোষণা করে সজলবাবু আপ্রাণ চেষ্টা করছেন ২০২৬ সালেই ফসল তুলতে। অনেক ডাক্তারও সগর্বে সোশাল মিডিয়ায় ঘোষণা করছেন বাংলাদেশি রোগী দেখবেন না। বহু ঘোষিত বিজেপিবিরোধীও এই সিদ্ধান্তকে বাহবা দিচ্ছেন। কেন? না দেখা গেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভারতের পতাকার অবমাননা করা হয়েছে। ক-জন ওই কাজে লিপ্ত আর তাদের অপকর্মের দায় সমস্ত বাংলাদেশির ঘাড়ে চাপবে কেন— এই যুক্তিতর্কের পরিবেশই আর পশ্চিমবঙ্গে নেই। এ-তথ্যও প্রচারিত হচ্ছে না যে ২৮ নভেম্বরই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সংশ্লিষ্ট হলের প্রভোস্ট ‘অতীব জরুরি বিজ্ঞপ্তি’ জারি করে শিক্ষার্থীদের ওই কাজ করা থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দিয়েছেন।

যে রাজনৈতিক বিশ্লেষক বাংলাদেশের ধর্মনিরপেক্ষ মানুষকে সাহস দেওয়ার জন্যে মমতাকে মাঠে নামতে হবে বলেছেন, তিনি এই রাজ্যে এমন অমানবিক এবং ডাক্তারি নীতিবোধবিরোধী পদক্ষেপের বিরুদ্ধে মমতাকে মুখ খুলতে হবে বলে দাবি করেছেন বলে শুনিনি। রাজ্যের প্রশাসনিক প্রধান হিসাবে মমতা নিজে থেকেও বলতে পারতেন— এ-জিনিস এখানে করতে দেওয়া হবে না, করলে ওই হাসপাতালের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বলেছেন কি? তাঁর দলের নেতা ফিরহাদ হাকিম তবু বলেছেন যে এই সিদ্ধান্ত সমর্থনযোগ্য নয়। কিন্তু ফিরহাদ নিজে মুসলমান হওয়ায় যথারীতি তাঁর বক্তব্যকে বাংলাদেশের সংখ্যাগুরুর প্রতি দরদ বলে দেখা হচ্ছে। সোশাল মিডিয়ায় গালিগালাজ করা হচ্ছে।

এসব থেকে একটা জিনিস পরিষ্কার। আমাদের রাজ্যে হিন্দুত্ববাদকে আটকাতে তৃণমূল কংগ্রেসের যাবতীয় কুকর্ম সত্ত্বেও তাদের ভোট দেওয়াই যে শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষের কর্তব্য— এ-কথা যে-যুক্তিতে ২০১৯ সাল থেকে বলা হয়ে আসছে, সেই যুক্তিটাকে আর বিশ্বাস করার মানে হয় না। বিজেপি এ-রাজ্যে ক্ষমতায় আসেনি ঠিকই, কিন্তু তাতে সমাজে সঙ্ঘবাদের প্রসারে কোনও বাধা সৃষ্টি হয়নি। সঙ্ঘ একই মডেলে সর্বত্র লড়ে না। পশ্চিমবঙ্গে সম্ভবত ওড়িশা মডেল অনুসরণ করা হচ্ছে।

ওড়িশায় কংগ্রেস থেকে বেরিয়ে এসে তৈরি হওয়া বিজু জনতা দলের নেতা নবীন পট্টনায়ক কংগ্রেসকে শেষ করে বিজেপিকেই তাঁর একমাত্র বিকল্প করে তুলেছিলেন। জাতীয় রাজনীতির ইস্যুগুলোতে তিনি বিজেপিকে ঘাঁটাননি। তৃণমূল সাংসদদের মতোই নবীনের দলের সাংসদরাও বহু বিলে ভোটাভুটির সময়ে হয় ভোট দিতেন না, অথবা সরকারের পক্ষে ভোট দিতেন। ওড়িশায় বিজেপিও তাঁর দলকে হারাতে গা লাগায়নি বহুকাল, কেবল নিচুতলায় আরএসএস নিবিড় কাজ চালিয়ে গেছে। শেষমেশ ২০২৪ সালে এসে নবীনের রথ উল্টে দেওয়া হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গে কংগ্রেস তো বটেই, তার চেয়েও বড় কথা, কমিউনিস্টদের শেষ করার কাজ প্রায় শেষ করে এনেছে কংগ্রেস থেকে বেরিয়ে এসে তৈরি হওয়া তৃণমূল কংগ্রেস। নিচুতলায় আরএসএসের বাড়বাড়ন্ত ঠেকাতেও তারা কোনও ভূমিকা নিয়েছে বলে অভিযোগ নেই। এখন বাংলাদেশে হিন্দুদের উপর অত্যাচার পশ্চিমবঙ্গে আরএসএস-বিজেপির কাজ আরও সহজ করে দেবে। তারপর কবে মমতার রথ উলটানো হবে, কীভাবে হবে— সেসব সিদ্ধান্ত বোধহয় দিল্লি থেকে নেওয়া হবে।

আরো পড়ুন জাতীয় সঙ্গীত এবং নেশন: ইরান যা ভাবায়

তা শুভেন্দুবাবুরা গান-টান করুন, কেবল হিন্দুদের উদ্দেশে একটা কথা বলে যাই। বিজেপি বা সঙ্ঘ পরিবারের আসল লক্ষ্য যে পশ্চিমবঙ্গের হিন্দুদের ভোট পাওয়া, বাংলাদেশের হিন্দুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা নয়— তা বুঝতে খুব বেশি কষ্ট করার দরকার নেই। তথাগত রায়, তরুণজ্যোতি তিওয়ারি প্রমুখের সোশাল মিডিয়া হ্যান্ডেলে যেসব কথোপকথন চলে সেগুলোতে চোখ রাখলেই বোঝা যায়। তাঁরা কিন্তু সজলবাবুর মতো আবেগপ্রবণ হয়ে বাংলাদেশ আক্রমণ করার কথা-টথা বলেন না। বরং বিপন্ন হিন্দুদের এ-দেশে জায়গা দেওয়ার কথা উঠলেই তাঁরা এবং তাঁদের সাঙ্গপাঙ্গরা বলতে শুরু করেন— ভারতবর্ষ ধর্মশালা নয়। বাংলাদেশি হিন্দুদের প্রতি সত্যিই টান থাকলে এই উপমহাদেশের মুসলমান বাদে অন্য ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের নাগরিকত্ব দেওয়ার জন্য যে আইন তথাগতবাবুদের সরকার তৈরি করেছে, তাতে নির্দিষ্ট এ-দেশে আসার শেষ তারিখটা তুলে দিলেই তো হত। ৩১ ডিসেম্বর ২০১৪-র পরে বিপদে পড়া হিন্দুরা কি যথেষ্ট হিন্দু নন? আজ বাংলাদেশে যে হিন্দুরা বিপন্ন, তাঁদের জন্য তাহলে বিজেপির ভারতে কোনও জায়গা নেই? তাঁরা কেবল এ-দেশের মুসলমানদের বিরুদ্ধে ঘৃণা উৎপাদন করার খেলায় ব্যবহৃত বোড়ে?

চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম ওয়েবসাইটে প্রকাশিত