ভারতীয় ক্রিকেট: জাহান্নামের আগুনে পুষ্পের হাসি

কেবল টি টোয়েন্টি নয়। রোহিত, শিখর ধাওয়ান, কোহলিরা একদিনের ক্রিকেটে যে ব্যাটিংটা করেন সেটাও প্রায় প্রাক-জয়সূর্য-কালু যুগের ব্যাটিং।

হে (ক্রিকেট) অতীত, তুমি হৃদয়ে আমার…

রোহিত শর্মা, বিরাট কোহলিরা সোশাল মিডিয়া প্রজন্মের ক্রিকেটার। তাঁরা খুব ইতিহাসের তোয়াক্কা করবেন এমন ভাবা অন্যায়। কিন্তু ভারতীয় দলের কোচ রাহুল দ্রাবিড়ের খেলোয়াড় জীবন থেকেই একটা ব্যাপারে দারুণ সুনাম। তিনি নাকি নিজের প্রজন্মের ক্রিকেটারদের মধ্যে সবচেয়ে পড়ুয়া। যে কোনো সফরে তিনি কিছু না কিছু পড়েন। সেসব বইয়ের একটা বড় অংশ জুড়ে থাকে ক্রিকেটের ইতিহাস। বিভিন্ন ক্রিকেট সাংবাদিক একাধিকবার এসব কথা লিখেছেন, তাই বিশ্বাস না করার কোনো কারণ নেই। উপরন্তু দ্রাবিড় যে সুবক্তা তা আমরা সকলেই জানি। শুধু ইংরেজিটা চমৎকার বলেন তা নয়, বক্তব্যও থাকে জোরালো। দ্রাবিড়ের ২০১১ সালের ‘স্যার ডোনাল্ড ব্র্যাডম্যান ওরেশন’ এত উৎকৃষ্ট ছিল যে তা নিয়ে বিস্তর লেখালিখি হয়েছিল। যে লোক বই পড়ে না তার পক্ষে অত সুন্দর কথা বলা সম্ভব নয়।

এহেন পড়ুয়া এবং ক্রিকেট ইতিহাস সচেতন দ্রাবিড় কি জানেন না যে অস্ট্রেলিয়া যেমন গ্লেন ম্যাকগ্রা, ডেনিস লিলি, জেফ থমসন, ব্রেট লি-র দেশ তেমনই রিচি বেনো আর শেন ওয়ার্নেরও দেশ? বল ঘোরাতে জানেন এমন লেগস্পিনাররা বরাবরই অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে সফল হন, কারণ সে দেশের পিচের অতিরিক্ত বাউন্স তাঁদের ঘূর্ণিকে আরও বিষাক্ত করে তোলে। এই মুহূর্তে পায়ে গুলি খেয়ে হুইলচেয়ারে বন্দি ইমরান খান জানেন, ১৯৯২ সালে পাকিস্তানের বিশ্বকাপ জয়ে কত বড় ভূমিকা ছিল লেগস্পিনার মুস্তাক আহমেদের। নটা ম্যাচে ১৬ খানা উইকেট নিয়েছিলেন ১৯.৪৩ গড়ে, ওভার পিছু রান দিয়েছিলেন চারেরও কম। সেরা বোলিং করেছিলেন একেবারে ফাইনালে। মেলবোর্নের বিশাল মাঠে ইংল্যান্ড অধিনায়ক গ্রাহাম গুচ আর অলরাউন্ডার ডারমট রিভ মুস্তাককে মারতে গিয়ে আউটফিল্ডে ক্যাচ তুলে আউট হন। গ্রেম হিক ঠকে যান মুস্তাকের গুগলিতে।

লেগস্পিনারদের কথা বলে আলোচনা শুরু করলাম কেন? ওয়ার্ল্ড টি টোয়েন্টি ফাইনালে ১৯৯২ সালের মতই আবার পাকিস্তান আর ইংল্যান্ড মুখোমুখি বলে? না। ভাগবত চন্দ্রশেখর আর অনিল কুম্বলের দেশ ভারত একজন পরীক্ষিত ও সফল লেগস্পিনারকে ডাগআউটেই বসিয়ে রেখে প্রতিযোগিতা থেকে বিদায় নিল বলে। যজুবেন্দ্র চহলের অস্ট্রেলিয়া সফর বেঞ্চে বসে শেষ হয়ে যাওয়াই ভারতের এবারের অভিযানের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা। কারণ ভারতীয় টিম ম্যানেজমেন্ট যে আগাগোড়া ভুল পরিকল্পনা নিয়ে বিশ্ব খেতাব জিততে গিয়েছিল, তার এর চেয়ে বড় প্রমাণ নেই। মাঠে নেমে যেসব ভুলভ্রান্তি হয়েছে সেসবের আলোচনা তো হবেই। কিন্তু পরিকল্পনাতেই ভুল থাকলে মাঠে নেমে আর ঠিক কাজটা করা হবে কী করে?

ভারতের মত দেশে ক্রিকেট বোঝে না এরকম লোকের সংখ্যা খুবই কম। ফলে অগণিত ক্রিকেটবোদ্ধাদের মধ্যে কেউ বলে বসতেই পারেন, ১৯৯২ সালের বস্তাপচা ৫০ ওভারের ক্রিকেটের ধারণা দিয়ে আজকের টি টোয়েন্টি ক্রিকেটকে ব্যাখ্যা করতে যাওয়া বোকামি। আচ্ছা, ইতিহাস চুলোয় যাক। এবারে ওয়ার্ল্ড টি টোয়েন্টিতে লেগস্পিনাররা কী করেছেন সেটাই না হয় দেখা যাক।

সুপার ১২ স্তর থেকে ফাইনালের আগে পর্যন্ত মোট নজন লেগস্পিনার খেলেছেন (ইংল্যান্ডের দুজন; আফগানিস্তান, অস্ট্রেলিয়া, আয়ারল্যান্ড, নিউজিল্যান্ড, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, জিম্বাবোয়ের একজন করে)। এঁরা মোট ১৩১ ওভার বল করে তুলে নিয়েছেন ৪১টা উইকেট। উইকেট পিছু খরচ করতে হয়েছে মাত্র ২২.২৯ রান, ওভার পিছু রান দিয়েছেন সাতেরও কম। একজনও লেগস্পিনারকে খেলায়নি ভারত, দক্ষিণ আফ্রিকা, নেদারল্যান্ডস আর বাংলাদেশ – ঠিক যে চারটে দেশ সেমিফাইনালে পৌঁছতে পারেনি।

যা শত্রু পরে পরে

এই আলোচনা শুরুতেই সেরে নেওয়ার আরেকটা কারণ হল, ভারত অধিনায়ক রোহিত শর্মা সেমিফাইনালে গোহারা হারার পর সটান দোষ চাপিয়ে দিয়েছেন বোলারদের ঘাড়ে। স্বয়ং অধিনায়ক সমেত ব্যাটাররা কী করেছেন সে প্রশ্নে যাওয়ার আগে তাই বলে নেওয়া দরকার যে ঠিকঠাক বোলারদের খেলানোই হয়নি। অস্ট্রেলিয়ায় খেলা হলেই সমস্ত আলোচনা জোরে বোলারদের নিয়ে হয়ে থাকে। কারণ সবাই জানে সে দেশের পিচ অন্য দেশের তুলনায় গতিময় হয়, বাউন্স বেশি থাকে। কিন্তু সত্যি কথা বলতে অস্ট্রেলিয়ায় জিততে হলে দলে ভাল স্পিনার থাকা একইরকম জরুরি, বিশেষ করে সীমিত ওভারের খেলায়। কারণ পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ক্রিকেটমাঠগুলো অস্ট্রেলিয়াতেই। যাঁরা নিয়মিত টি টোয়েন্টি ক্রিকেট দেখে অভ্যস্ত তাঁরা জানেন, এই ফরম্যাটে সর্বত্রই বাউন্ডারি ছোট করে ফেলা হয়। ফলে দৌড়ে তিন রান নেওয়ার ঘটনা প্রায় দেখাই যায় না ভারত বা সংযুক্ত আরব আমীরশাহীর মাঠে। কিন্তু অস্ট্রেলিয়ার মাঠগুলো এতটাই বড় যে বাউন্ডারি কমিয়ে আনার পরেও এবারের ওয়ার্ল্ড টি টোয়েন্টিতে প্রচুর তিন রান হতে দেখা গেছে। ভারতের সঙ্গে সেমিফাইনালে মহম্মদ শামির অবিমৃশ্যকারিতায় জস বাটলার একবার দৌড়ে চার রান পর্যন্ত নিয়ে ফেলেছেন। তা এত বড় বড় মাঠে স্পিনারকে চার, ছয় মারতে গেলে আউট হওয়ার সম্ভাবনা বাড়ে। তাই টি টোয়েন্টি যুগের আগেও যে দলে ভাল স্পিনার আছে তারা অস্ট্রেলিয়ায় ভাল ফল করেছে।

১৯৯২ সালে কেবল পাকিস্তানের মুস্তাক নয়, নিউজিল্যান্ডের অফস্পিনার দীপক প্যাটেলও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিলেন এই কারণে। স্পিনার যে বোলিং ওপেন করতে পারে তার আগে কেউ কখনো ভাবেনি। প্রয়াত মার্টিন ক্রোয়ের ওই চাল প্রতিপক্ষকে কিংকর্তব্যবিমূঢ় করে দিয়েছিল। প্যাটেল বেশি উইকেট নিতে পারেননি, কিন্তু ওভার পিছু রান দিয়েছিলেন ৩.১০। আরও আগে ১৯৮৫ সালে ভারত যখন অস্ট্রেলিয়ায় বেনসন অ্যান্ড হেজেস কাপ জেতে, সেই জয়েরও অন্যতম স্থপতি ছিলেন লেগস্পিনার লক্ষ্মণ শিবরামকৃষ্ণণ।

অথচ এবার চহলের বদলে খেলে গেলেন অক্ষর প্যাটেল। যিনি উচ্চতার কারণে পিচ থেকে বাউন্স আদায় করতে পারেন বটে, কিন্তু বল ঘোরাতে হলে তাঁর দরকার স্লো টার্নার। অস্ট্রেলিয়ায় অমন পিচ পাওয়া যায় না, বরং সমান বাউন্সের পিচ হওয়ায় অক্ষরের মত বোলারকে মনের সুখে প্রহারেণ ধনঞ্জয় করা যায়। হয়েছেও তাই। অক্ষর প্রায় ৪০ গড়ে পাঁচ ম্যাচে মোটে তিনটে উইকেট নিয়েছেন, ওভার পিছু সাড়ে আটের বেশি রান দিয়েছেন। কিন্তু বোলিং আক্রমণের একমাত্র সমস্যা তিনি নন। দীর্ঘদিন সাদা বলের ক্রিকেটে টিম ম্যানেজমেন্টের অপছন্দের বোলার হয়ে থাকার পর রোহিত-দ্রাবিড়ের আমলে অশ্বিন হঠাৎই প্রিয় হয়ে উঠেছেন। কিন্তু তিনি প্রায় কোনো ম্যাচেই কোনো প্রভাব ফেলতে পারেননি। অথচ পিচে স্পিনারদের জন্য যথেষ্ট সাহায্য ছিল। সেমিফাইনালের অ্যাডিলেডে তো ছিলই। চহলের চেয়ে অক্ষরের ব্যাটিং ক্ষমতা বেশি, তাই তাঁকে খেলানোই সমীচীন – এমন একটা যুক্তি টিম ম্যানেজমেন্টের পক্ষ থেকে ভাসিয়ে দেওয়া হয়েছিল। অথচ দেখা গেল প্রায়ই তাঁর আগে ব্যাট করতে নামছেন অশ্বিন। তাহলে আর চহল খেললে কী ক্ষতি ছিল?

পেস বোলিং বিভাগে আবার গোড়ায় গলদ। তড়িঘড়ি আহত যশপ্রীত বুমরাকে ফেরানোর চেষ্টা হয়েছিল, সে চেষ্টা সফল হয়নি। শামি অতীতে টি টোয়েন্টিতে ভাল করেননি, তা সত্ত্বেও তাঁকেই বুমরার জায়গায় নেওয়া হল। সুপার ১২-তে তবু ঠিকঠাক চলছিল, সেমিফাইনালে যখন তাঁরই বোলিং আক্রমণকে নেতৃত্ব দেওয়ার কথা, তখনই শামি ব্যর্থ হলেন। তরুণ অর্শদীপ (১০ উইকেট, ওভার পিছু ৭.৮০ রান) আর অভিজ্ঞ ভুবনেশ্বর কুমার (মাত্র চার উইকেট, কিন্তু ওভার পিছু ৬.১৬) গোটা প্রতিযোগিতায় নেহাত খারাপ বল করেননি। কিন্তু সমস্যা হল তাঁরা একইরকম গতির সুইং বোলার। যেদিন বল তত সুইং করে না, সেদিন দু প্রান্ত থেকে দুজনকে খেলতে হলে ব্যাটারদের কাজ অনেক সহজ হয়ে যায়। শামির গতি এঁদের চেয়ে বেশি, কিন্তু সুইং না হলেও ব্যাটারকে ঘামিয়ে তোলার মত নয়; যা পাকিস্তানের হ্যারিস রউফ, ইংল্যান্ডের মার্ক উড বা দক্ষিণ আফ্রিকার অ্যানরিখ নর্খ্যে পারেন। ফলে ভারতের বোলিং হয়ে গেল বৈচিত্র্যহীন। ভারতের দ্রুততম বোলার হয়ে গেলেন অলরাউন্ডার হার্দিক পান্ডিয়া, যিনি আবার বিশেষ ফর্মে ছিলেন না। আসলে বিশেষ করে বুমরা অনুপস্থিত বলেই দরকার ছিল একজন এক্সপ্রেস গতির পেসার। কিন্তু ঘন্টায় ১৫০ কিলোমিটারের বেশি গতিতে বল করতে পারা উমরান মালিক বা মহসীন খানকে তো স্কোয়াডেই রাখা হয়নি।

শশী তারকায় তপনে

নির্বাচক এবং টিম ম্যানেজমেন্টের পরিকল্পনার অভাব বোলারদের ঘাড়ে চাপিয়ে রোহিত আসলে যাদের আড়াল করেছেন, এবার তাদের আলোচনায় আসা যাক। ক্রিকেটের যে ফরম্যাটে মাত্র ১২০টা বল খেলার জন্য হাতে দশখানা উইকেট থাকে, সেখানে বোলারদের ভূমিকা যে স্রেফ সহায়কের – একথা বোঝার জন্য ক্রিকেট বোদ্ধা হওয়ার দরকার পড়ে না। টি টোয়েন্টি জেতানোর দায়িত্ব সর্বদা মূলত ব্যাটারদের কাঁধে। যে দলের ব্যাটিং লাইন আপ বাংলাদেশ, জিম্বাবোয়ে, নেদারল্যান্ডসের মত দলের সঙ্গেও ২০০ রান করতে পারে না; পার্থের সবচেয়ে গতিময় পিচে ১৪০ পর্যন্তও পৌঁছতে পারে না – সেই দলের অধিনায়ক যখন স্রেফ সেমিফাইনাল ম্যাচটা দশ উইকেটে হারার জন্য বোলারদের দিকে আঙুল তোলেন তখন হেসে ফেলা ছাড়া উপায় থাকে না।

অধিনায়ক নিজে ছটা ম্যাচে মাত্র ১১৬ রান করেছেন, গড় ১৯.৩৩। তাঁর নির্ভরযোগ্য ওপেনিং পার্টনার কে এল রাহুলের গড় ২১.৩৩। দুটো অর্ধশতরান করেছেন জিম্বাবোয়ে আর বাংলাদেশের বিরুদ্ধে। তাসকিন আহমেদকে খেলতে গিয়েই তাঁর গলদঘর্ম অবস্থা। কিন্তু সবচেয়ে বড় কথা, রোহিত আর রাহুলের স্ট্রাইক রেট যথাক্রমে ১০৬.৪২ আর ১২০.৭৫। এই দুই বীরপুঙ্গবের কল্যাণে ওপেনিং জুটির ওভার পিছু রান করার দিক থেকে ভারত সুপার ১২-তে খেলা দলগুলোর মধ্যে সবার নিচে, সবার পিছে (৪.৯৮, অর্থাৎ ১০৬ বল খেলে ৮৮ রান)।

যোগ্যতার্জন পর্ব পেরিয়ে সুপার ১২-তে উঠতে পারেনি যারা, তাদের মধ্যেও একমাত্র নামিবিয়া এক্ষেত্রে ভারতের চেয়ে পিছিয়ে (৪.৪৪)।

এবার সবচেয়ে অপ্রিয় প্রসঙ্গে আসা যাক – বিরাট কোহলি। তিনি প্রতিযোগিতা শেষ করেছেন ব্র্যাডম্যানোচিত ৯৮.৬৬ গড়ে, স্ট্রাইক রেট ১৩৬.৪০। অতএব কোহলির ভক্তরা এবং তিনি যে শুধু ভারতের নয় পৃথিবীর সর্বকালের সেরা ব্যাটার তা প্রমাণ করতে ব্যস্ত বিশেষজ্ঞরা, বলে চলেছেন – আর কী করবে লোকটা? ঘটনা হল সূর্যকুমার যাদব গোটা প্রতিযোগিতায় অবিশ্বাস্য স্ট্রাইক রেটে (১৮৯.৬৮) ব্যাট না করলে এবং সেমিফাইনালে হার্দিক একই কাজ (১৯০.৯০) না করলে কোহলির ওই অর্ধশতরানগুলো সত্ত্বেও ভারত সম্ভবত আরও আগেই প্রতিযোগিতা থেকে বিদায় নিত। কারণ মোট রান জেতার মত হত না। একমাত্র ব্যতিক্রম পাকিস্তান ম্যাচ। সত্যিই ওই হারা ম্যাচটা কোহলি একা হাতে জিতিয়েছেন। একথাও সত্যি যে শেষ দু ওভারে কোনোদিন ভুলতে না পারার মত দুটো ছক্কা মারার প্রতিভা এই মুহূর্তে বিশ্বের আর কোনো ব্যাটারের নেই। কিন্তু প্রথম ওভারে ব্যাট করতে নেমে ১৬০ রান তুলতে তাঁকে শেষ ওভার অবধি খেলতে হয়েছে এবং শেষ ওভারেও ম্যাচের লাগাম নিজের হাতে রাখতে পারেননি। শেষ বল খেলে উইনিং স্ট্রোক নিতে হয়েছে টেল এন্ডার অশ্বিনকে। সেদিন যা ঘটেছিল তা এককথায় কামাল। কিন্তু কামাল একবারই ঘটে। কামাল ভুল প্রণালীকে সঠিক বলে প্রমাণ করে না। শেষ দু ওভারে গোটা তিরিশেক রান বারবার তোলা যায় না। সুতরাং ‘আগে ধরে খেলব, পরে মেরে পুষিয়ে দেব’ নীতি অচল। ইংল্যান্ড ম্যাচই তা প্রমাণ করে দিয়েছে। পঞ্চাশ করতে ৪০ বল খরচ করে ফেলার পর কোহলি ১৮তম ওভারে আউট হয়ে গেলেন, দলের রান তখন মাত্র ১৩৬।

কোহলির এই নীতির সপক্ষে যুক্তি হল – ওপেনাররা ডুবিয়েছে, তিনে নেমে খেলাটা ধরতে হবে না? নইলে তো ইনিংস আগেই শেষ হয়ে যেত। পাটীগণিত কিন্তু এই ধরাধরি সমর্থন করে না। হিসাবটা একেবারে সোজা। টি টোয়েন্টিতে একটা দলের জন্য বরাদ্দ ১২০টা বল, হাতে দশটা উইকেট। মানে উইকেট পিছু মাত্র ১২টা বল। একজন ব্যাটার ওর চেয়ে বেশি বল না খেললে কিচ্ছু এসে যায় না, বরং সেক্ষেত্রে পরের ব্যাটার বেশি সুযোগ পেয়ে যাবেন রান করতে। সুতরাং বারোটা বলে যত বেশি সম্ভব রান করার চেষ্টা করা উচিত, তার চেয়ে বেশি বল খেললে আরও বেশি রান করার চেষ্টা করা দরকার। তা না করে ১৩৬.৪০ স্ট্রাইক রেটে পুরো ইনিংস ব্যাট করা মানে পরের ব্যাটারদের কাজ কঠিন করে দেওয়া, হাতে থাকা উইকেটের অপচয়। মনে রাখা ভাল, এই প্রতিযোগিতায় পাওয়ার প্লে-তে ওভার পিছু রান করায় শেষ থেকে দ্বিতীয় হয়েছে ভারত (৫.৯৭; প্রথম স্থানে নেদারল্যান্ডস)।

পাওয়ার প্লে-তে অত কম রান করে টি টোয়েন্টি খেতাব জেতা যায় না। এতে কোহলির দায় কিন্তু কম নয়। কারণ তিনি প্রায়শই পাওয়ার প্লে চলাকালীনই ব্যাট করতে নেমেছেন। টি টোয়েন্টি একেবারেই স্ট্রাইক রেটের খেলা। কোহলির কেরিয়ার স্ট্রাইক রেট ১৩৭.৯৬। মোট রান আর গড়ে যত উপরেই থাকুন, এতে তিনি পৃথিবীর প্রথম ৭০ জনের মধ্যেও নেই। নিজে অধিনায়ক থাকার সময়ে কোহলি টেস্ট ম্যাচের ব্যাটিং নিয়ে বলতে গিয়েও ‘ইনটেন্ট’ শব্দটা বারবার ব্যবহার করতেন। অর্থাৎ পিচ যেমনই হোক, পরিস্থিতি যা-ই হোক, প্রতিপক্ষের বোলিং সবল না দুর্বল সেসব দেখা চলবে না। সারাক্ষণ রান করার চেষ্টা করে যেতে হবে, মন্থর গতিতে রান করা মানেই নাকি নিজের দলের উপর চাপ তৈরি করা। কথাটা অবশ্য চালু করেছিলেন মহেন্দ্র সিং ধোনি। এই ইনটেন্টের অভাবেই তো অজিঙ্ক রাহানের সাদা বলের কেরিয়ার বলে কিছু হল না। চেতেশ্বর পূজারাকে বহুবার শতরান করেও শুনতে হয়েছে তাঁর ইনটেন্টের অভাব আছে। আশ্চর্যের কথা, ক্রিকেটের সবচেয়ে ছোট ফরম্যাটে কোহলির নিজের ইনটেন্টের দেখা পাওয়া যায় না। সুনীল গাভস্কর, গুন্ডাপ্পা বিশ্বনাথ, শচীন তেন্ডুলকর, মহম্মদ আজহারউদ্দিন, ভিভিএস লক্ষ্মণের দেশের কোহলি অ্যাডাম জাম্পা, লিয়াম লিভিংস্টোন, আদিল রশিদের মত স্পিনারকেও পিটিয়ে উঠতে পারেন না।

ঘটনা হল, এসব দোষ এবারের ওয়ার্ল্ড টি টোয়েন্টিতে প্রথম জানা গেল এমন নয়। গত বছর সংযুক্ত আরব আমীরশাহীর ওয়ার্ল্ড টি টোয়েন্টিতে এইসব দোষেই ভারত সেমিফাইনালেও পৌঁছতে পারেনি। এ বছর এশিয়া কাপেও এইসব কারণেই আফগানিস্তান ছাড়া কারোর সঙ্গেই পরাক্রম দেখানো সম্ভব হয়নি। তা সত্ত্বেও কেন এই তারকাদের বাদ দেওয়া যায় না, কীভাবে ভারতীয় ক্রিকেটের নির্বাচন প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করে আইপিএল – সেসব নিয়ে এই ওয়েবসাইটেই আগে লিখেছি, পুনরাবৃত্তি নিষ্প্রয়োজন। বরং অন্য কয়েকটা প্রশ্ন নিয়ে নাড়াচাড়া করা যাক।

কচি তারা, কথা ফোটে নাই

২০১৩ সালের চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফির পরে ভারত আর কোনো খেতাব জেতেনি। আজ দ্রাবিড়-রোহিতের ব্যর্থতায় শাস্ত্রী-কোহলির যে ভক্তরা উল্লসিত, তাঁরাও নিশ্চয়ই এ তথ্য ভুলে যাননি। সর্বগ্রাসী মিডিয়া হাইপ আর মনভোলানো বিজ্ঞাপনী চাকচিক্য এতদিন সব ধামাচাপা দিয়ে রেখেছিল, ইংল্যান্ড একেবারে দশ উইকেটে জিতল বলেই সম্ভবত আর সামলাতে পারা যাচ্ছে না। বহু চাটুকারেরও মুখ খুলে গেছে। তবু এই চূড়ান্ত পণ্যায়নের যুগে যেহেতু ক্রিকেট তারকাদের একেকজনের উপর কোটি কোটি টাকা লগ্নি হয়ে আছে, সেহেতু এঁদের ঢাল হয়ে এখনো কিছু সংবাদমাধ্যম, ক্রিকেট লেখক এবং অতশত না বোঝা নিষ্পাপ ভক্ত দাঁড়িয়ে পড়েছেন। তাঁরা ভাঙবেন তবু মচকাবেন না। নরেন্দ্র মোদীর সরকারের একটা ব্যর্থতাও অস্বীকার করতে না পেরে যেমন এক শ্রেণির মানুষ বলেন “ইফ নট মোদী, দেন হু”, তেমনি এঁরাও বলতে শুরু করেছেন, এদের বাদ দিলে খেলবে কারা?

ঘটনা হল, এই মুহূর্তে ভারতীয় ক্রিকেটে এর চেয়ে অবান্তর প্রশ্ন নেই। মুম্বাইয়ের পৃথ্বী শ দেশের হয়ে এখন পর্যন্ত একটাই টি টোয়েন্টি খেলেছেন এবং কোনো রান করতে পারেননি। কিন্তু আইপিএল এবং ঘরোয়া টি টোয়েন্টিতে ৯২ ম্যাচে তিনি করে ফেলেছেন ২৪০১ রান; স্ট্রাইক রেট ১৫১.৬৭; সর্বোচ্চ ১৩৪। ওই ১৩৪ রান তিনি করেছেন মাত্র ৬১ বলে, গত মাসে আসামের বিরুদ্ধে সৈয়দ মুস্তাক আলি ট্রফিতে। ওই প্রতিযোগিতাটি হল ভারতের ঘরোয়া টি টোয়েন্টি প্রতিযোগিতা। তাহলে আইপিএল কী? এ প্রশ্ন উত্থাপন করিয়া লজ্জা দিবেন না।

ভারতীয় দলের তারকারা ইদানীং যত খেলেন তার সমান বা হয়ত তার চেয়েও বেশি বিশ্রাম নেন। সেই সুবাদে ঝাড়খণ্ডের উইকেটকিপার ব্যাটার ঈশান কিষণকে তো অনেকেই চিনে গেছেন। ভারতের হয়ে যে কটা টি টোয়েন্টি আর একদিনের ম্যাচ তিনি এখন অব্দি খেলেছেন তাতে ধোনির মত অভাবনীয় কিছু না করলেও প্রমাণ হয়েছে তাঁর আরও সুযোগ প্রাপ্য। স্রেফ ওপেনিং ব্যাটার হিসাবেও তিনি খেলেছেন এবং খেলতে পারেন।

কিন্তু কাব্যে সবচেয়ে উপেক্ষিত কেরালার সঞ্জু স্যামসন। তিনি যে সিরিজে দলে সুযোগ পান সেখানে একটা-দুটো ম্যাচে খেলেন, সেখানে সফল বা ব্যর্থ যা-ই হোন, পরের সিরিজে বাদ পড়ে যান। আবার হয়ত তার পরের সিরিজে ফেরত আসেন। তারকাদের ট্র্যাফিক জ্যামে মাথা গলাতে পারেন না আর কি। এ পর্যন্ত ভারতের হয়ে ১৬টা টি টোয়েন্টিতে ১৩৫.১৫ স্ট্রাইক রেটে ২৯৬ রান করেছেন। উইকেটের পিছনে সাতটা ক্যাচ নিয়েছেন, দুটো স্টাম্পিং করেছেন। সঞ্জুর বয়স ইতিমধ্যেই ২৮, ঈশান ২৪, পৃথ্বী ২৩। এছাড়াও আছেন শ্রেয়স আয়ার, শুভমান গিলরা। আছেন আইপিএলে সাফল্য পাওয়া ঋতুরাজ গায়কোয়াড় (২৫), রাহুল ত্রিপাঠী (৩১), ফিনিশার হিসাবে একাধিকবার চমকে দেওয়া রাহুল টেওয়াটিয়া (২৯)। ইংল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ডের মত বহু দেশ টি টোয়েন্টিতে এমন অনেককে খেলায় যাঁরা অন্য কোনো ফরম্যাটে সুযোগ পান না। ভারতও চাইলে তেমন করতেই পারে। টি টোয়েন্টি অন্যরকম, তার চাহিদাও অন্যরকম।

মাঝখানে নদী ওই

উপরের নামগুলো গত কয়েক মাসে তারকাদের অনুপস্থিতিতে যেটুকু সুযোগ পাওয়া গেছে তার সদ্ব্যবহার করা ক্রিকেটারদের। কিন্তু ওয়ার্ল্ড টি টোয়েন্টি থেকে শুকনো মুখে ফেরা দলের মধ্যেই এমন দুজন আছেন যাঁরা উপর্যুপরি ব্যর্থ হওয়া তারকাদের জায়গা নিতে পারেন। একজন ঋষভ পন্থ। টেস্ট ক্রিকেটে মাত্র ৩১ ম্যাচের কেরিয়ারেই যেসব ইনিংস তিনি খেলে ফেলেছেন তাতে তাঁর প্রতিভাকে সন্দেহ করার আর উপায় নেই। কিন্তু তার সঙ্গে মানানসই সাফল্য সাদা বলের কেরিয়ারে এখনো দেখা যায়নি। তার অনেকখানি দায় শাস্ত্রী-কোহলি এবং দ্রাবিড়-রোহিতের। পাঁচ বছর হয়ে গেল, ব্যাটিং অর্ডারে ঋষভের জায়গা কোথায় তা এখনো স্থির হল না। অথচ সাদা চোখেই দেখা যায়, তাঁর মত আক্রমণাত্মক ব্যাটার যত বেশি বল খেলার সুযোগ পায় দলের পক্ষে তত ভাল। ইংল্যান্ডে একটা ম্যাচে ওপেনার হিসাবে খেলিয়েই সে পরীক্ষায় দাঁড়ি টেনে দিলেন দ্রাবিড়-রোহিত; আগের কোচ, অধিনায়ক তো সে চেষ্টাও করেননি। ভাবলে শিউরে উঠতে হয়, শচীন একদিনের ক্রিকেটে কত নম্বরে ব্যাট করবেন তা নিয়ে অজিত ওয়াড়েকর-আজহার ১৯৯৪ সালে অকল্যান্ডের সেই ইনিংসের পরেও এমন টালবাহানা করলে কী হত।

অন্যজন দীপক হুড়া। বরোদার এই ২৭ বছর বয়সী ব্যাটার ভারতের হয়ে ১৩টা টি টোয়েন্টিতে ১৫৩.৪০ স্ট্রাইক রেটে শ তিনেক রান করে ফেলেছেন। জুন মাসে আয়ারল্যান্ডের বিরুদ্ধে তিন নম্বরে ব্যাট করতে নেমে মাত্র ৫৭ বলে ১০৪ করেছেন। তবু তাঁর জায়গা পাকা নয়, কারণ ওই ট্র্যাফিক জ্যাম। ওয়ার্ল্ড টি টোয়েন্টিতে মাত্র একটা ম্যাচ খেলতে পেলেন পার্থে সবচেয়ে কঠিন উইকেটে।

বলে রাখা ভাল, কেবল টি টোয়েন্টি নয়। রোহিত, শিখর ধাওয়ান, কোহলিরা একদিনের ক্রিকেটে যে ব্যাটিংটা করেন সেটাও প্রায় প্রাক-জয়সূর্য-কালু যুগের ব্যাটিং। বিশেষত ২০১৫ সালের বিশ্বকাপের পর থেকে ও ব্যাটিং সব দল বাতিল করে দিয়েছে। সে কারণেই ভারত ৫০ ওভারের ক্রিকেটেও ঝুড়ি ঝুড়ি দ্বিপাক্ষিক সিরিজ জিতেছে গত ন বছরে, কিন্তু বড় প্রতিযোগিতা এলেই ব্যর্থ। কারণ কোনো বড় দল, বিশেষ করে নক আউট স্তরের ম্যাচে, শেষের দিকের ওভারে এত লুজ বল ফেলে না বা ফিল্ডিংয়ে এত ভুলভ্রান্তি করে না যে পাওয়ার প্লে-তে কম রান করার ক্ষতি পুষিয়ে দেওয়া যাবে। বরং সে সময় আসার আগেই আউট হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা প্রবল। ২০১৯ বিশ্বকাপ সেমিফাইনালে যেমন নতুন বলেই রোহিত, রাহুল, কোহলি আউট হয়ে গিয়েছিলেন। ফলে শুধু খেলোয়াড় পরিবর্তন নয়, পরিকল্পনায় আমূল পরিবর্তন না আনলে সামনের বছর ঘরের মাঠে ৫০ ওভারের বিশ্বকাপেও একইরকম বিপর্যয় ঘটবে।

আরও পড়ুন বিরাট, রোহিত, রাহুলদের সত্য রচনা চলছে চলবে

একই প্রণালী বারবার প্রয়োগ করে যদি ভারতীয় বোর্ড ভিন্ন ফলের আশা করে তাহলে বলতে হয় জেতা হারায় তাদের কিছু এসে যায় না। তেমনটা হওয়া অস্বাভাবিক নয়, কারণ আইপিএল আর ভারতীয় ক্রিকেট দলের ম্যাচের সম্প্রচার সত্ত্ব থেকে এত বিপুল অর্থ আয় হয় যে দলের জয় পরাজয়ে কেবল ক্রিকেটপ্রেমীদেরই উত্তেজিত হওয়া সাজে। বোর্ডকর্তারা অ্যাকাউন্ট ব্যালান্স দেখে নিয়ে সুখে নিদ্রা যেতে পারেন।

এতক্ষণে অরিন্দম…

কারা যেন ভারতের টি টোয়েন্টি ক্রিকেট দলের ভবিষ্যৎ নিয়ে বিষম চিন্তিত হয়ে দ্রাবিড়কে প্রশ্ন করে ফেলেছিল, ভারতীয় ক্রিকেটারদের কি অন্য দেশের টি টোয়েন্টি লিগে খেলতে দেওয়া উচিত? ইংল্যান্ডের ক্রিকেটাররা তো অনেকেই অস্ট্রেলিয়ার বিগ ব্যাশ লিগে খেলেন। হয়ত তারই সুবিধা পেয়ে গেলেন। দ্রাবিড়, ভারতের সর্বকালের সেরা টেস্ট ক্রিকেটারদের একজন, মহা উদ্বিগ্ন হয়ে বলেছেন, সে তো ভারি মুশকিলের ব্যাপার হবে। অন্য দেশের লিগগুলোর সময়ে আমাদের ঘরোয়া ক্রিকেট চলে যে! ভারতীয়রা ওখানে খেলতে গেলে আমাদের রঞ্জি ট্রফিটা উঠে যাবে যে! শুনে মাইকেল মধুসূদন মনে পড়ে: “এতক্ষণে” –অরিন্দম কহিলা বিষাদে / “জানিনা কেমনে আসি লক্ষণ পশিল/রক্ষঃপুরে!…”

ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড আর্থিক পেশির জোরে যখন আইপিএলের জন্য আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিলের ফিউচার টুরস প্রোগ্রামে জায়গা খালি করিয়েছে তখন আর পাঁচজন অনুগত প্রাক্তন ক্রিকেটারের মতই দ্রাবিড় চুপচাপ ছিলেন। ইতিমধ্যে বোর্ড আইপিএলে আরও দুটো দল যোগ করেছে, সম্প্রচার সত্ত্বের দাম যত বাড়ানো হচ্ছে তত টাকা পাওয়া যাচ্ছে দেখে আগামী কয়েক বছরে ম্যাচের সংখ্যাও বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে। এখন সারা পৃথিবীতে একের পর এক ফ্র্যাঞ্চাইজ লিগ গজাচ্ছে। সেসব দেশের ক্রিকেট বোর্ড নিজেদের খেলোয়াড়দের এতকাল আইপিএলের জন্য ছেড়ে এসেছে, আন্তর্জাতিক ক্রিকেট বন্ধ রেখে আইপিএল চলবে – এ ব্যবস্থাও মেনে নিয়েছে। এখন যদি বিস্মিত দ্রাবিড় বলেন – হায়, তাত, উচিত কি তব/একাজ – তাতে তো চিড়ে ভিজবে না। উচিত-অনুচিতের সীমা তো ক্রিকেট কবেই পেরিয়ে এসেছে।

ইনস্ক্রিপ্ট-এ প্রকাশিত

বিপুল ক্ষমতা ভোগ করেও মিস্টার বেচারা বাংলার সৌরভ?

সুযোগ পেলে যা ইচ্ছে তাই করতে প্রাক্তন খেলোয়াড়রা যে কম যান না তার সবচেয়ে বড় উদাহরণ ফরাসি ফুটবলের কিংবদন্তি মিশেল প্লাতিনি।

পি সতশিবম আর রঞ্জন গোগোইয়ের বেশ নিন্দা হয়েছিল। কারণ তাঁরা সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি হিসাবে অবসর নেওয়ার পর যথাক্রমে কেরালার রাজ্যপাল আর রাজ্যসভার মনোনীত সদস্যের পদ গ্রহণ করেছিলেন। নিজেরে করিতে গৌরব দান নিজেরে কেবলই করি অপমান – এ কথার এমন জলজ্যান্ত উদাহরণ আমাদের দেশেও বিরল। সব পেশাতেই কিছু কাজ আছে যা বেআইনি না হলেও অশোভন বলে সাধারণত কেউ করেন না। যেমন মনমোহন সিং প্রধানমন্ত্রিত্ব চলে যাওয়ার পর পাঞ্জাব বা অসমের বিধানসভা নির্বাচনে কংগ্রেসের টিকিটে মুখ্যমন্ত্রী পদপ্রার্থী হতে যাননি। কাল মুখ্যমন্ত্রিত্ব চলে গেলে মমতা ব্যানার্জিও কলকাতা কর্পোরেশনের নির্বাচনে তৃণমূলের মেয়র পদপ্রার্থী হবেন না সম্ভবত। কিন্তু সতশিবম আর গোগোই শোভনতার ধার ধারেননি। তাঁদের সিদ্ধান্তে ভারতের বিচারব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা কতখানি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সে প্রশ্ন আলাদা, কিন্তু ক্ষমতার জন্য তাঁরা কতখানি লালায়িত তা পরিষ্কার হয়ে গেছে। স্বেচ্ছায় পদাবনতিও যে কারোর অভীষ্ট হতে পারে তা না দেখলে বিশ্বাস করা শক্ত হত। বিশ্বাস করা আরও সহজ করে দিলেন আমাদের ঘরের ছেলে সৌরভ গাঙ্গুলি। আরও ছোট পরিসরে আরও ছোট একটা পদের জন্য তিনি ঝাঁপিয়েছেন। পৃথিবীর সবচেয়ে ধনী তথা শক্তিশালী ক্রিকেট বোর্ডের সভাপতি পদে প্রায় তিন বছর কাটানোর পর এখন তিনি ঘোষণা করেছেন ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশন অফ বেঙ্গলের সভাপতি পদের প্রার্থী হবেন।

সৌরভ ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডে পৌঁছেছিলেন সিএবি হয়েই। কিন্তু সিএবির মসনদে তাঁকে বসিয়ে দিয়েছিলেন স্বয়ং মুখ্যমন্ত্রী। দীর্ঘদেহী সৌরভ খর্বকায় মুখ্যমন্ত্রীর পিছনে লক্ষ্মী ছেলের মত দাঁড়িয়ে আছেন আর মুখ্যমন্ত্রী তাঁর বিশাল ছায়া দিয়ে সৌরভকে আড়াল করে সিএবি সভাপতি হিসাবে তাঁর নাম ঘোষণা করছেন – এ দৃশ্য অনেকেরই এখনো মনে আছে। দুর্জনে বলে মুখ্যমন্ত্রী ওভাবে হাতে ধরে চেয়ারে বসিয়ে না দিলে সৌরভের পক্ষে সিএবি সভাপতি হওয়া শক্ত ছিল। কারণ খেলার মাঠে অধিনায়ক হিসাবে তিনি দলের মধ্যে যতটা জনপ্রিয় ছিলেন, মাঠের বাইরে বাংলার ক্রিকেট প্রশাসকদের মধ্যে ততটাই অপ্রিয়। কারণটাও সহজবোধ্য। সৎ বা দুর্নীতিগ্রস্ত যা-ই হোন, ময়দানে যাঁরা ক্লাব চালান তাঁরা বছরের পর বছর বহু সময় ব্যয় করে নিজেদের ব্যবসা বা চাকরির খানিকটা ক্ষতি করেই কাজটা করেন। সেই কাজের মধ্যে দিয়ে প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা অর্জন করে অ্যাসোসিয়েশনের রাজনীতিতে সফল হয়ে সিএবির পদাধিকারী হতে হয়। কথাটা বিশ্বনাথ দত্ত বা জগমোহন ডালমিয়ার মত প্রবাদপ্রতিম প্রশাসকদের ক্ষেত্রে যতটা সত্যি, একদা সিএবির যুগ্ম সচিব প্রয়াত শরদিন্দু পাল বা গৌতম দাশগুপ্তের ক্ষেত্রেও ততটাই সত্যি। তাঁরা যথাক্রমে কুমোরটুলি আর শ্যামবাজার ক্লাব চালিয়েছেন কয়েক দশক। অথচ সৌরভ সেসব কিছুই করলেন না। খেলা ছাড়ার পরের কয়েক বছর ধারাভাষ্য, বিজ্ঞাপনে মুখ দেখানো, টিভির পর্দায় দাদাগিরি করতে করতেই সিএবির যুগ্ম সচিব হয়ে গেলেন। তারপর স্রেফ মুখ্যমন্ত্রীর আশীর্বাদে ডালমিয়ার মৃত্যুর পর সিএবি সভাপতি হয়ে বসলেন।

সৌরভভক্তরা স্বভাবতই রেগে যাবেন, বলবেন খেলাটা যখন ক্রিকেট, তখন সৌরভ কত বড় ক্রিকেটার সেটাই তো আসল কথা। মাঠে অত বড় বড় কীর্তি যার, তাকেও প্রশাসনে আসতে হলে আগে ক্লাবের হেঁশেল ঠেলতে হবে – এ অন্যায় দাবি। শরদিন্দু, গৌতমরা ক্রিকেটের কী জানেন? কত হাজার রান আছে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে? তাঁদের মত দীর্ঘকাল লড়তে হবে কেন সৌরভকে? এই মনোভাব কেবল ভক্তদের নয়। সুপ্রিম কোর্ট নিযুক্ত কমিটি অফ অ্যাডমিনিস্ট্রেটর্সের প্রধান বিনোদ রাইও নবগঠিত বোর্ডের হাতে দায়িত্ব ছেড়ে দিয়ে যাওয়ার সময়ে সন্তোষ প্রকাশ করেছিলেন সৌরভের মত মানুষ বোর্ড সভাপতি হলেন বলে। রাই বলেছিলেন সৌরভই ওই পদের পক্ষে যোগ্যতম। স্বাধীনতার আগে থেকে মূলত অক্রিকেটার লোকেদের দ্বারা চালিত ভারতীয় বোর্ডে যে পরিমাণ অব্যবস্থা এবং দুর্নীতি চলেছে, যার ফলে সুপ্রিম কোর্ট এন শ্রীনিবাসনকে পদচ্যুত করে বোর্ডের আমূল সংস্কার করার নির্দেশ দিয়েছিল, তাতে প্রাক্তন ক্রিকেটারদের উপরে অত্যধিক ভরসা করা হয়ত স্বাভাবিক। কিন্তু দুঃখের বিষয়, প্রাক্তন খেলোয়াড়রা প্রশাসনে এলেই প্রশাসন দুর্নীতিমুক্ত হবে, স্বেচ্ছাচার চলবে না – এমনটা পৃথিবীর কোথাও প্রমাণিত হয়নি। সুযোগ পেলে যা ইচ্ছে তাই করতে প্রাক্তন খেলোয়াড়রা যে কম যান না তার সবচেয়ে বড় উদাহরণ ফরাসি ফুটবলের কিংবদন্তি মিশেল প্লাতিনি। যদিও তিনি কোনো মুখ্যমন্ত্রীর প্রসাদে ফরাসি ফুটবল ফেডারেশনের সর্বোচ্চ পদে আসীন হননি, দস্তুরমত ফুটবল রাজনীতি করেই অতদূর উঠতে হয়েছিল। আসলে ফিফা প্রাক্তন খেলোয়াড় মানেই ঈশ্বরপ্রেরিত প্রশাসক – এমনটা বিশ্বাস করে না। প্রাক্তন ফুটবলারদের জন্য আলাদা করে জায়গা সংরক্ষণও ফিফার নীতিবিরুদ্ধ। সম্প্রতি যে যে কারণে ফিফা সর্বভারতীয় ফুটবল ফেডারেশনকে নির্বাসন দিয়েছিল, তার অন্যতম হল সুপ্রিম কোর্ট নিযুক্ত কমিটি অফ অ্যাডমিনিস্ট্রেটর্সের প্রস্তাবিত সংবিধানে প্রাক্তন ফুটবলারদের জন্য আলাদা করে পদের ব্যবস্থা। ফিফার সাফ কথা – প্রাক্তন ফুটবলার প্রশাসনে স্বাগত, কিন্তু তাকে আসতে হবে রাজ্য অ্যাসোসিয়েশনের মাধ্যমেই। অর্থাৎ ফুটবলারকে প্রশাসক হয়ে উঠতে হবে, প্রাক্তন বলে প্রশাসনকে বাইপাস করা চলবে না।

সৌরভ যেরকম মসৃণভাবে অফ সাইডে ফিল্ডিংয়ের ফাঁক দিয়ে বাউন্ডারি খুঁজে ফেলতেন, সেরকমভাবেই ক্ষমতায় পৌঁছনোর বাইপাস খুঁজে নেন। নবান্নে ধরনা দিয়ে সিএবি সভাপতি হয়েছিলেন, বোর্ড সভাপতি হয়েছিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের প্রসাদে। তাঁকে ওই পদে থাকতে দেওয়া হল না বলে এই মুহূর্তে ডান, বাম নির্বিশেষে বাঙালি ক্ষুব্ধ। সেই বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনের পরে আর কোনো ঘটনায় বোধহয় বাঙালিকে এতখানি ঐক্যবদ্ধ করা যায়নি। সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদন থেকে পরিষ্কার, যাঁর প্রসাদে বোর্ডের সভাপতি হওয়া গিয়েছিল, তাঁর বিরক্তিতেই পদ হাতছাড়া হয়েছে। একটি প্রতিবেদনে তো সবিস্তারে লেখা হয়েছে, ৬ অক্টোবর গভীর রাতে অমিত শাহের বাড়িতে এক বৈঠকে ঠিক হয় সৌরভকে এবার সরিয়ে দেওয়া হবে। মজার কথা, সেখানে সৌরভের কার্যকলাপ নিয়ে নানা আপত্তি তোলেন শ্রীনিবাসন এবং উপস্থিত অন্য বোর্ডকর্তারা তাঁর কথায় সায় দেন। কোন শ্রীনিবাসন? যাঁর কুকীর্তির ফলে বোর্ডে ওলোট-পালট হয়ে সর্বোচ্চ আদালতের নজরদারিতে সংস্কার হয়েছিল। সেই শ্রীনিবাসন দেখা যাচ্ছে আজও যথেষ্ট ক্ষমতাশালী। কে বোর্ড সভাপতি হবে তা তিনি এখনো নির্ধারণ করতে পারেন। বস্তুত ২০১৯ সালে সৌরভের সভাপতি হওয়ার পিছনেও তাঁর সম্মতি ছিল। তাহলে কী লাভ হল লোধা কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী সংস্কার করে? কী লাভ হল সৌরভের মত প্রবাদপ্রতিম ক্রিকেটার বোর্ড সভাপতি হয়ে?

সংবাদমাধ্যমে জোর জল্পনা, সৌরভকে নাকি অমিত শাহ সরিয়ে দিলেন তিনি বিজেপিতে যোগ দিতে রাজি হননি বলে। একথা পাতে পড়তে না পড়তেই ভারতের বিজেপিবিরোধী, উদারপন্থী মানুষ একেবারে টপ করে গিলে নিয়েছেন। সৌরভের কেমন শক্ত মেরুদণ্ড তা গ্রেগ চ্যাপেলের পর অমিত শাহও টের পেয়ে গেলেন ইত্যাদি মর্মে সোশাল মিডিয়া বিদীর্ণ করছেন অনেকেই। এরপর ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে যদি সৌরভের দিদি তাঁকে তৃণমূল কংগ্রেসের টিকিটে প্রার্থী করে ফেলেন তাহলে ‘লিবারেল’ হিসাবে সৌরভের দর আকাশছোঁয়া হয়ে যাবে। সকলে ইতিমধ্যেই ভুলে গেছেন, সৌরভ এতদিন চেয়ারে বসেছিলেন দেশের দু নম্বর বিজেপি নেতা অমিত শাহ ও তদীয় পুত্র জয় শাহের সৌজন্যেই। শুধু তা-ই নয়, বোর্ডের নতুন সংবিধান অনুযায়ী সৌরভের কার্যকাল সভাপতি হওয়ার দশ মাস পরেই শেষ হয়ে যাওয়ার কথা। বর্তমান কর্মকর্তাদের মেয়াদ বাড়ানো হোক – সুপ্রিম কোর্টে এই সংবিধানবিরোধী আর্জি জানিয়ে ফেভিকলের বিজ্ঞাপনের নেতার মত নিজ নিজ চেয়ারে এতদিন বসেছিলেন সৌরভ, জয়রা। সুপ্রিম কোর্ট এত ব্যস্ত যে সে আর্জির শুনানির দিন কেবলই পিছিয়েছে। আড়াই বছর পর গত মাসে বিচারপতি ডি ওয়াই চন্দ্রচূড় (যিনি আগামী মাসে সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি হিসাবে কার্যভার গ্রহণ করবেন) ও হিমা কোহলি রায় দিলেন, তিন বছর নয়, বোর্ড সভাপতি, যুগ্ম সচিব ও অন্যরা একটানা ছ বছর বহাল থাকতে পারবেন। অর্থাৎ ২০১৮ সালের রায়ের একেবারে উল্টো পথে হেঁটে নতুন সংবিধান বদলে অনেকাংশে পুরনো জায়গায় ফিরে যাওয়া হল। এ হেন ক্ষমতাশালীদের সঙ্গে ক্ষমতা ভাগ করে নেওয়া সৌরভ আজ বাংলার চোখে মিস্টার বেচারা। এতটাই বেচারা যে বাংলার মুখ্যমন্ত্রী বলেছেন তিনি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীকে বলবেন, সৌরভকে যেন আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিলের চেয়ারম্যানের পদের জন্য লড়ার ব্যবস্থা করে দেওয়া হয়। সৌরভের পদচ্যুতি বাঙালির জাতীয় সংকট। মুখ্যমন্ত্রী কি চুপ করে থাকতে পারেন?

তবে রবীন্দ্রনাথের পরে বাঙালিকে সবচেয়ে বেশি ঐক্যবদ্ধ করতে পেরেছেন যিনি, সেই সৌরভ দেখা যাচ্ছে কম রাবীন্দ্রিক নন। বিপদে মোরে রক্ষা করো, দিদির কাছে এ নহে তাঁর প্রার্থনা। তিনি চন্দ্রচূড়-কোহলির রায় নির্ঘাত খুঁটিয়ে দেখেছেন, আইনের ফাঁক খুঁজে ক্ষমতা ধরে রাখার বুদ্ধিতে তিনি সুপ্রিম কোর্টের দুই প্রাক্তন প্রধান বিচারপতি সতশিবম আর গোগোইয়ের উপর দিয়ে যান। রায়ে বলা আছে, ক্রিকেট প্রশাসনের একেক স্তরে ছ বছর ক্ষমতায় থাকার পরে কুলিং অফ পিরিয়ড থাকবে, স্তর বদলে গেলে নয়। ফলে সিএবি সভাপতি হয়ে তিনি আরও কিছুদিন নিশ্চিন্তে ক্ষমতা ধরে রাখতে পারবেন; বোর্ড সভাপতি হওয়ার পরে রাজ্য সংস্থার সভাপতি হওয়া দু-চারজনের যতই দৃষ্টিকটু মনে হোক।

এতে বাংলার ক্রিকেটের কী লাভ হবে সে প্রশ্ন অবান্তর। সৌরভ এর আগেও সিএবি সভাপতি ছিলেন, তাতে বাংলার ক্রিকেট কতটা উন্নত হয়েছে সে হিসাব কেউ দেন না। বোর্ড সভাপতি হয়ে ভারতীয় ক্রিকেটের কেমন ছন্নছাড়া অবস্থা করে ছেড়েছেন তা তো চোখের সামনেই দেখা যাচ্ছে। সাফল্য বলতে অতিমারীর মধ্যেও আইপিএল আয়োজন। অবশ্য আইপিএল চালানো ছাড়া অন্য কাজ আছে বলে হয়ত সৌরভ-জয় মনেই করেননি। তাই আইপিএল চালু ছিল, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়েও চালু থাকা রঞ্জি ট্রফি বন্ধ ছিল। ওদিকে জাতীয় দলে বিশৃঙ্খলার চূড়ান্ত। বিরাট কোহলির অধিনায়কত্ব যাওয়া নিয়ে নাটক; বিরাট প্রধান নির্বাচক চেতন শর্মা, সভাপতি সৌরভসুদ্ধ গোটা বোর্ডকে সাংবাদিকদের সামনে মিথ্যাবাদী সাব্যস্ত করলেন, কিন্তু কোনো শাস্তি হল না। সমস্ত ক্রিকেট খেলিয়ে দেশে জাতীয় দল ঘোষণা হলে তা নিয়ে প্রশ্নের উত্তর দেন নির্বাচকরা। কে আহত, কাকে বাদ দেওয়া হল তা নিয়ে পরিষ্কার বিবৃতি দেন। ভারতেও বরাবর এমন ব্যবস্থাই চালু ছিল। সৌরভের আমলে সেসব উঠে গেছে। কে যে কখন বিশ্রাম নিচ্ছেন আর কে চোটের জন্য বাইরে থাকছেন তা বোঝা দুষ্কর। নানারকম খবর সংবাদমাধ্যমে ভাসতে থাকে আর যে ক্রিকেটপ্রেমীর যা বিশ্বাস করতে ইচ্ছা করে তিনি তা-ই মেনে নেন।

আরও পড়ুন নিশীথিনী-সম

সৌরভের নিজের আচরণও প্রশ্নের ঊর্দ্ধে নয়। বোর্ড সভাপতির বিজ্ঞাপনী মডেল হওয়া ক্রিকেট-পৃথিবীর অষ্টমাশ্চর্য। তাও আবার বোর্ডের সাথে স্পনসরশিপ চুক্তিতে আবদ্ধ সংস্থার প্রতিদ্বন্দ্বী সংস্থার বিজ্ঞাপনে। এসব প্রশ্ন গত তিন বছরে বোর্ডের সভায় উঠেছে, কিন্তু লাভ হয়নি। কারণ সৌরভের ঢাল ছিলেন জয় শাহ। তাছাড়া যে দেশে প্রধানমন্ত্রী স্বয়ং অমুক কোম্পানি, তমুক কোম্পানির বিজ্ঞাপন আলো করে খবরের কাগজগুলোর প্রথম পাতায় বসতে পারেন, সেখানে ক্রিকেট বোর্ডের সভাপতিকে আটকাবে কে?

এইভাবে দুহাতে কামানো সৌরভ বাংলার আপামর মানুষ ও মুখ্যমন্ত্রীর চোখে আজ বঞ্চিত, নিপীড়িত। সেই নিপীড়নের অবসান হবে কী হলে? সৌরভকে বিশ্বক্রিকেটের নিয়ামক সংস্থার প্রধানের নির্বাচনে প্রার্থী হতে দিলে। তা নিয়ে মুখ্যমন্ত্রী প্রধানমন্ত্রীর কাছে সৌরভের হয়ে আর্জি জানিয়েছেন। ক্রিকেটের এহেন গণতন্ত্রীকরণ গভীর আশাব্যঞ্জক। বোর্ডটা তুলে দিয়ে সরাসরি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রকের হাতে দিয়ে দিলে হয় না? সংসদে তো আজকাল রাজনৈতিক বিতর্ক বিশেষ হয় না। না হয় ক্রিকেট দল নির্বাচনটা ওখানে হবে।

ইনস্ক্রিপ্টে প্রকাশিত

জাতীয় ফুটবল দলের ইতিহাসের এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্ত

মুখবন্ধে সম্পাদক জয়দীপ বসু ও তাঁর সহকারী সায়ন মুখার্জি নির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন, স্রেফ প্রচ্ছদ দেখলেও টের পাওয়া যাচ্ছে যে এ বই ততটা ভারতীয় ফুটবলের ইতিহাস নয়, যতটা ভারতীয় ফুটবল দলের ইতিহাস।

ভারতের ফুটবল এখন কোথায় দাঁড়িয়ে তা সংক্ষেপে বোঝাতে হলে এটুকু বলাই যথেষ্ট যে ইন্ডিয়ান সুপার লিগের দলগুলো ঝাঁ চকচকে হোটেলে সর্বোচ্চ মানের সুযোগসুবিধা নিয়ে থাকে, বিমানে যাতায়াত করে; জাতীয় গেমসে সোনার পদক জয়ী বাংলা দলের ফুটবলাররা বাড়ি ফেরেন দু রাত ট্রেনে কাটিয়ে। ট্রেনে চড়ায় কোনো অন্যায় নেই, অপমানও নেই। কিন্তু দু ধরনের ফুটবলের দুস্তর ব্যবধান এতে স্পষ্ট হয়। ভারতীয় ফুটবল অবশ্য এভাবেই চলে। রাজ্য দল দূরের কথা, জাতীয় দলও ক্লাব দলগুলোর মত সুযোগসুবিধা ভোগ করে না। ভারতের জাতীয় দলের পরিচর্যায় ইদানীং বিপুল উন্নতি হয়ে থাকলেও দীর্ঘকাল জাতীয় দলে খেলা সম্মানের, সেখানে দেশপ্রেম জড়িত – এই আবেগের শাক দিয়ে পারিশ্রমিকের মাছ ঢেকে রেখেছিলেন ফুটবল কর্তারা। তখন থেকেই ভারত আন্তর্জাতিক ফুটবলে অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়েছে। পৃথিবীর সমস্ত ফুটবলোন্নত দেশেই ক্লাব ফুটবল বেশি অর্থকরী, তার গ্ল্যামারও বেশি। তা বলে জাতীয় দল হেলা শ্রদ্ধার পাত্র নয়। সুনীল ছেত্রী ব্যক্তিগত দক্ষতায় লায়োনেল মেসি, ক্রিস্টিয়ানো রোনাল্ডোর পাশে জায়গা করে নিলেও আন্তর্জাতিক ফুটবল মানচিত্রে কিন্তু ভারতীয় দল কোথাও নেই। অথচ ফুটবলে যখন বিশ্বকাপ নয়, অলিম্পিককেই মনে করা হত সর্বোচ্চ প্রতিযোগিতার মঞ্চ, তখন এই ভারতই ১৯৫৬ সালের মেলবোর্ন অলিম্পিকে চতুর্থ হয়েছিল। এই অবনমনের ইতিহাস ধরা পড়েছে ভারতীয় ফুটবল দলের ৭৫ বছরের ইতিহাস নিয়ে লেখা বক্স টু বক্স বইতে।

মুখবন্ধে সম্পাদক জয়দীপ বসু ও তাঁর সহকারী সায়ন মুখার্জি নির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন, স্রেফ প্রচ্ছদ দেখলেও টের পাওয়া যাচ্ছে যে এ বই ততটা ভারতীয় ফুটবলের ইতিহাস নয়, যতটা ভারতীয় ফুটবল দলের ইতিহাস। তরুণ ফুটবলপ্রেমীদের প্রায়শই হা হুতাশ করতে দেখা যায় ভারত বিশ্বকাপ ফুটবলের ত্রিসীমানায় পৌঁছতে পারে না বলে। অথচ তাঁদের ধ্যান জ্ঞান ক্লাব ফুটবল। মোহনবাগান, ইস্টবেঙ্গল আইএসএল খেলতে পারল কি না পারল তা নিয়ে যত আগ্রহ তার ছিটেফোঁটাও জাতীয় ফুটবল দল নিয়ে দেখা যায় না। সুনীল ছেত্রী যদি বর্তমান প্রজন্মের খেলোয়াড় না হয়ে প্রাক্তন হতেন তাহলে তাঁর কীর্তি নিয়ে কার কতটা আগ্রহ থাকত যথেষ্ট সন্দেহ আছে। সন্দেহ নেই এর জন্যে অনেকখানি দায়ী ভারতীয় ফুটবল দলের সাফল্যের অভাব। ১৯৭০ সালের এশিয়ান গেমস আর মারডেকা কাপে ব্রোঞ্জ মেডেলের পর বলার মত সাফল্য আর কোথায়? সাফ কাপ বা এশিয়ান চ্যালেঞ্জ কাপের খেতাব যে খুব বড় কোনো সাফল্য নয় তার প্রমাণ পাওয়া যায় এশিয়ান কাপের মূলপর্ব বা বিশ্বকাপের যোগ্যতামান পর্বের খেলা এসে পড়লেই। কিন্তু ব্যর্থতার ইতিহাসও তো জানা জরুরি। সম্ভবত সাফল্যের ইতিহাস জানার চেয়েও বেশি জরুরি, কারণ ব্যর্থতার সত্যনিষ্ঠ ইতিহাসই সাফল্যের ইমারত গড়ার মশলা। আইএসএলে মত্ত ফুটবলপ্রেমীদের সামনে সেই ইতিহাস তুলে ধরার কাজ করেছে বক্স টু বক্স। ফুটবলপ্রেমীদের প্রেম কতটা এ বইয়ের কপালে জুটবে তা বলা শক্ত, কিন্তু নথি হিসাবে এ বইয়ের গুরুত্ব অপরিসীম।

তথ্য সংকলন করা পরিশ্রমসাধ্য হতে পারে, অসম্ভব নয়। কিন্তু কেবল তথ্য ইতিহাস হয়ে ওঠে না। পাহাড়প্রমাণ তথ্য ঘেঁটে একজন বা দুজন যদি ভারতীয় ফুটবল দলের ইতিহাস লিখতেন তাহলে গভীরতায় ঘাটতি থাকতে পারত, একপেশে ইতিহাস তৈরি হওয়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না। এই বইয়ের সবচেয়ে বড় গুণ হল দুই সম্পাদক এবং পরিসংখ্যানবিদ গৌতম রায় ছাড়া আরও ১৪ জন ফুটবল সাংবাদিকের বয়ানে ইতিহাসকে তুলে ধরা। বাকি পৃথিবীর সাংবাদিকতায় ‘সুপার স্পেশালাইজেশন’-ই দস্তুর। কিন্তু ভারতে তা নানা কারণে অসম্ভব। অতিমারীর আগে পর্যন্ত তবু ফুটবল সাংবাদিক, ক্রিকেট সাংবাদিক, টেনিস সাংবাদিক – কাজের এরকম বিভাজন অন্তত বড় সংবাদমাধ্যমগুলোতে দেখা যেত। করোনার ধাক্কা থেকে নিজেদের লাভের কড়ি বাঁচাতে গিয়ে মালিকরা ওটুকুও লাটে তুলে দিয়েছেন। এমন আবহে এই বইয়ে হায়দরাবাদের ফুটবল নিয়ে লিখেছেন সেখানকার সাংবাদিক (এন গণেশন ও জি রাজারমণ), বাংলার ফুটবল নিয়ে কলকাতার সাংবাদিক (পুলকেশ মুখোপাধ্যায়), কেরালা (লেসলি জেভিয়ার), গোয়া (মার্কাস মারগুলহাও), মুম্বাই (মারিও রডরিগেজ) সম্বন্ধে লিখছেন সেখানকার অভিজ্ঞ সাংবাদিকরা; পাঞ্জাব (এস এস শ্রীকুমার) ও উত্তর-পূর্বাঞ্চল (বৈভব রঘুনন্দন) নিয়ে বিশেষজ্ঞরা – এই ব্যবস্থার জন্য সম্পাদকদের আলাদা প্রশংসা প্রাপ্য। ভারতীয় ফুটবল দলের সাফল্য-ব্যর্থতার ইতিহাস নথিবদ্ধ করতে হলে যে এইসব এলাকার ফুটবল নিয়ে স্বতন্ত্র আলোচনা দরকার, এই ভাবনাও প্রশংসার যোগ্য।

এত বড় দেশের খেলা নিয়ে আলোচনা বিকেন্দ্রীভূত হলে তবেই যে গভীর হয় তার বড় প্রমাণ পুলকেশবাবুর প্রবন্ধ ‘Royal or Not, Bengal’। পিকে ব্যানার্জি, অমল দত্ত বা বাঘা সোমের কোচিংয়ের খ্যাতি তো দেশজোড়া। কিন্তু কজন জানেন হুগলী-ব্যান্ডেল এলাকার অশ্বিনী বরাটের কথা? পুলকেশবাবু লিখেছেন, সুরজিৎ সেনগুপ্তের বাঁ পা প্রথম দিকে তেমন সচল ছিল না। অশ্বিনী (নিজের অঞ্চলে ভোলাদা নামে খ্যাত) বেশ কিছুদিন প্র্যাকটিসের প্রথম আধ ঘন্টা সুরজিৎকে ডান পায়ে বল ছুঁতে বারণ করে দিয়েছিলেন। তার ফলে ১৯৭৩ সালের রোভার্স কাপের প্রথম প্র্যাকটিস সেশনের পরেই সুরজিতের ক্লাব কোচ পিকে স্ত্রীকে চিঠিতে লেখেন তাঁর নতুন ছাত্রটির মধ্যে এক বিরল গুণ দেখা যাচ্ছে। তার দুটো পা-ই সমান সচল।

এমন মণিমুক্তো ছড়িয়ে আছে রাজ্যভিত্তিক প্রবন্ধগুলোর সবকটাতেই। তবে ভারতীয় দলের সর্বকালের সেরা কোচ সৈয়দ আব্দুল রহিমের শহর এবং মহম্মদ হাবিব, আকবর, সাবির আলির মত ফুটবলারের জায়গা হায়দরাবাদ নিয়ে প্রবন্ধটি অসম্পূর্ণ মনে হয়েছে সর্বভারতীয় ফুটবল ফেডারেশন থেকে অন্ধ্রপ্রদেশ ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের এই শতকের গোড়ায় দশ বছর সাসপেন্ড থাকার অনুল্লেখে। ভারতীয় ফুটবলে হায়দরাবাদের যে স্থান ছিল সেখান থেকে আজ স্রেফ এক আইএসএল ফ্র্যাঞ্চাইজে পরিণত হওয়ার ঘটনাক্রমে দেশের ফুটবল মানচিত্রে ওই দীর্ঘ অনুপস্থিতি অবশ্যই বড় কারণ।

ভারতীয় ফুটবল দল কীভাবে অলিম্পিক আবির্ভাবেই ইউরোপকে চমকে দিয়েছিল, এক অজ্ঞাতনামা ব্রিটিশ সাংবাদিকের কলমে সেই বয়ান দিয়ে আরম্ভ হয়েছে বক্স টু বক্স, আর বইয়ের দ্বিতীয় অংশ শুরু হয়েছে জয়দীপবাবুর লেখা ‘Doomsday: Cash vs Country’ দিয়ে। জাতীয় দলের পাতাল প্রবেশের সেই শুরু। এ লেখার শুরুতেই দেশপ্রেমের দোহাই দিয়ে যেমন তেমনভাবে ফুটবলারদের জাতীয় দলের খেলিয়ে নেওয়ার যে প্রচেষ্টার কথা লিখেছি, তার সূচনাবিন্দু রয়েছে জয়দীপবাবুর ওই প্রবন্ধে।

১৯৮২ এশিয়ান গেমসের প্রস্তুতি হিসাবে ১৯৮১ থেকেই লম্বা শিবির এবং মারডেকা কাপে অংশগ্রহণ ছাড়াও জাতীয় দলের জন্য একাধিক টুরের বন্দোবস্ত করেছিল সর্বভারতীয় ফুটবল ফেডারেশন (এআইএফএফ)। কিন্তু ফুটবলারদের জন্য যথাযোগ্য পারিশ্রমিকের ব্যবস্থা করা হয়নি। ১৯৮১ সালের গোড়ায় সল্টলেক স্টেডিয়ামে জাতীয় দলের শিবির বসে। খেলোয়াড়দের রাখা হয়েছিল নির্মীয়মান স্টেডিয়ামে মশামাছিতে ভর্তি অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে। তার উপর তাঁদের ১৯৮১-৮২ মরসুমে ক্লাবের হয়ে খেলার অনুমতিও দেওয়া হচ্ছিল না। বিপুল আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন খেলোয়াড়রাও নাছোড়বান্দা। ফুটবল ফেডারেশন তখন তাঁদের লিখিত বিবৃতি দিতে বলে, যে তাঁরা ক্যাম্প ছেড়ে ক্লাবের হয়ে খেলতে যেতে চান এবং জাতীয় দলের টুর্নামেন্টের আগে আবার ফেরত আসবেন। জয়দীপবাবু লিখেছেন, ওই মর্মে দেওয়া বিবৃতিতে সই করে বেরিয়ে যাওয়া খেলোয়াড়দের ‘রেবেলস’, ‘ডেজার্টার্স’, ‘অ্যান্টি-ন্যাশনালস’ আখ্যা দেয় সংবাদমাধ্যমগুলো। ইন্দিরা গান্ধীর নেতৃত্বাধীন কেন্দ্রীয় সরকার এবং জ্যোতি বসুর নেতৃত্বাধীন পশ্চিমবঙ্গ সরকার ওই ফুটবলারদের কড়া নিন্দা করে। জ্যোতিবাবু স্বয়ং বিধানসভায় মুলতুবি প্রস্তাবের জবাবে এঁদের বিরুদ্ধে বিবৃতি দেন। এসবের জেরে ভাস্কর গাঙ্গুলি, মনোরঞ্জন ভট্টাচার্য, সুব্রত ভট্টাচার্য, প্রসূন ব্যানার্জি, প্রশান্ত ব্যানার্জির মত ফুটবলাররা প্রায় একমাস বাড়ি থেকে বেরোতে পারেননি বলে উল্লেখ করেছেন জয়দীপবাবু। কলকাতার তিন প্রধান, যারা ওই খেলোয়াড়দের উস্কেছিল, তারাও পাশে দাঁড়ায়নি। শেষমেশ খেলোয়াড়দের বাবা-মায়েরা ফেডারেশন সেক্রেটারি অশোক ঘোষের কাছে ক্ষমা চান, কিন্তু ফেডারেশন অনমনীয় মনোভাব বজায় রাখে। নিয়ম করা হয়, জাতীয় শিবিরে সুযোগ পেলে মেডিকাল কারণ না থাকলে বা বাদ না পড়লে শিবির ছেড়ে যাওয়া চলবে না।

তখনো ভারতীয় ফুটবলে পেশাদারি কাঠামো তৈরি হয়নি। কিন্তু খেলোয়াড়রা অনেকেই যে নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে আসেন এবং ক্লাবগুলোর কাছ থেকে যথেষ্ট ভাল পারিশ্রমিক পান তা গোপন ছিল না। ফেডারেশন সেই ব্যবস্থাকে আইনি কাঠামোয় নিয়ে এসে কোনো বিকল্পের কথা ভাবতে পারত। তা না করে গা জোয়ারি ব্যবস্থা করা হয়। শেষপর্যন্ত অধুনালুপ্ত ন্যাশনাল স্পোর্টস কাউন্সিলের কর্তা প্রয়াত ফিল্ড মার্শাল স্যাম মানেকশর মধ্যস্থতায় দেশদ্রোহী বলে দেগে দেওয়া ফুটবলাররা সে মরসুমে ক্লাবের হয়ে খেলার অনুমতি পান এবং মরসুমের পর থেকে এশিয়ান গেমসের শিবিরে থাকবেন বলে ঠিক হয়। জাতীয় শিবিরে থাকলে মাসে ২,০০০ টাকা করে পারিশ্রমিক দেওয়া হবে বলেও সিদ্ধান্ত হয়। জয়দীপবাবু যথার্থই লিখেছেন, শান্তি প্রতিষ্ঠা হলেও সম্মানহানি আটকানো গেল না। জাতীয় দলে জায়গা পাওয়ার সম্মান, ফুটবলারদের সম্মান।

অবশ্য জাতীয় দলের খেলার গুরুত্ব লঘু করে দেওয়ার সর্বনাশা প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল আগেই। তা নিয়ে বিশেষ কাউকে লেখালিখি করতে দেখা যায় না। জয়দীপবাবু এই একই প্রবন্ধে সবিস্তারে সে সম্পর্কে লিখেছেন। বস্তুত প্রবন্ধটি শুরুই হয় ১ জুন, ১৯৭৩ তারিখের ঘটনা দিয়ে। সেদিন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী সিদ্ধার্থশঙ্কর রায় সশরীরে দিল্লি গিয়ে কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী (খেলাধুলো তখন ওই মন্ত্রকের অধীনে) নুরুল হাসানকে জানিয়ে আসেন, কলকাতার তিন প্রধানের পক্ষে মারডেকা কাপের জন্য জাতীয় শিবিরে খেলোয়াড় পাঠানো সম্ভব নয়। কারণ তখন কলকাতা ফুটবল লিগ পুরোদমে চলবে। সে বছর মোহনবাগান, ইস্টবেঙ্গল, মহমেডান স্পোর্টিংয়ের খেলোয়াড়দের ছাড়াই ভারত মারডেকা কাপে যায় এবং ষষ্ঠ স্থানে শেষ করে। জয়দীপবাবুর মতে, নকশাল আন্দোলন পরবর্তী বাংলার যুবসমাজকে রাজনীতি থেকে দূরে সরিয়ে রাখতে সিদ্ধার্থশঙ্কর কলকাতার ফুটবলকে ব্যবহার করেন। আদতে ক্ষতি হয় ভারতীয় ফুটবলের। ক্লাবের স্বার্থে জাতীয় দলের স্বার্থকে বিসর্জন দেওয়া চলে – এই তত্ত্ব প্রতিষ্ঠা পায় একজন মুখ্যমন্ত্রীর হাত ধরে। এসব পড়তে পড়তে তির্যক হাসি না হেসে পারা যায় না। কারণ যে কলকাতা লিগের খেলার জন্য জাতীয় দলের খেলাকে তুচ্ছ করা হয়েছিল, সেই কলকাতা লিগ আজ ধুলোয় গড়াগড়ি খাচ্ছে। মোহনবাগান সগর্বে বলে দিতে পারছে তারা লিগে খেলবে না। সেকালের কর্মকর্তারা মনে করতেন কলকাতা লিগ খেতাবের চেয়ে বড় পুরস্কার ফুটবল বিশ্বে নেই, আজকের কর্তারা মনে করেন আইএসএল খেললেই মোক্ষলাভ, কলকাতা লিগ ফালতু। মাঝখান থেকে ভারতীয় ফুটবল গোলকধাঁধায় ঘুরে মরছে, এগোতে পারছে না।

ঠিক সে কথাই লিখেছেন ধীমান সরকার। তাঁর প্রবন্ধের নাম ‘Going Around In Circles’। তিনি শুরুতেই অপ্রিয় সত্যটা বলে দিয়েছেন। ১৯৯৮ থেকে ২০২২ – এই আড়াই দশকে শুটিং, বক্সিং, ভারোত্তোলন, ব্যাডমিন্টন, কুস্তির মত যেসব খেলায় ভারত অলিম্পিকে যেত স্রেফ অংশগ্রহণ করতে; সেসবে পদক জিতে ফেলেছে, বিশ্বনাথন আনন্দ প্রথম ভারতীয় গ্র্যান্ডমাস্টার হিসাবে শুরু করে পাঁচবার বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়ে গেছেন। অথচ ভারতীয় ফুটবল দল লুই ক্যারলের থ্রু দ্য লুকিং গ্লাস গল্পের অ্যালিসের মত প্রাণপণ দৌড়েও সেই দক্ষিণ এশিয়ার এক শক্তিশালী দলই হয়ে রয়েছে। আই লিগকে দুয়োরানিতে পরিণত করা আইএসএল যে ভারতীয় ফুটবলে কোনো যুগান্তকারী পরিবর্তন আনতে পারেনি, বরং ভারতের ক্লাব ব্যবস্থার আরও ক্ষতিই করেছে তা ধীমানবাবুর লেখায় স্পষ্ট। এমতাবস্থায় জাতীয় দলের উন্নতির আশাও যে দুরাশা তা উচ্চারণ করতে তিনি কসুর করেননি।

আরও পড়ুন বড়লোকের খেলা

বক্স টু বক্স এভাবে ইতিহাস আলোচনার মধ্যে দিয়ে বর্তমান বিশ্লেষণ ছাড়া আরও একটা জরুরি কাজ করেছে, তা হল ভারতীয় দলের হয়ে অবিস্মরণীয় খেলা দেখানো যে কিংবদন্তীরা আজকের প্রজন্মের অচেনা, তাঁদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়া। ডাঃ টি আওকে নিয়ে লিখেছেন শারদা উগ্রা, তুলসীদাস বলরামকে নিয়ে সিদ্ধার্থ সাক্সেনা, রহিম সাহেবকে নিয়ে জয়দীপবাবু। অত্যন্ত মূল্যবান অরুণ সেনগুপ্তের নেওয়া সুধীর কর্মকারের সাক্ষাৎকারও। নিজের খেলা, নিজের প্রজন্মের খেলা এবং বর্তমান প্রজন্মের খেলার মান সম্পর্কে এত নির্মোহ মূল্যায়ন করতে আজকাল কোনো খেলার প্রাক্তনদেরই দেখা যায় না।

দু মলাটের মধ্যে শ আড়াই পাতায় ভারতীয় ফুটবল দলের ইতিহাসের নানা দিক জানতে চাইলে, বর্তমানকে ভাল করে বুঝতে চাইলে বক্স টু বক্স চমৎকার। ভুয়ো খবরের যুগে ভারতীয় ফুটবল দলের ১৯৫০ বিশ্বকাপে না খেলা নিয়ে নিয়মিত ব্যবধানে যে গুজবটা ছড়ানো হয়ে থাকে সোশাল মিডিয়ায়, তা খণ্ডন করতেও সাহায্য করবে কাশীনাথ ভট্টাচার্য এবং জয়দীপবাবুর লেখা দুটো প্রবন্ধ। তবে কিছু অসঙ্গতি এড়ানো গেলে ভাল হত। যেমন সায়নবাবুর ‘Golden Quarter’ বলছে ১৯৪৮ সালের লন্ডন অলিম্পিকের পর ইউরোপ টুরে একটা ম্যাচে আজাক্স আমস্টারডামকে ভারতীয় দল হারিয়েছিল ৫-১ ব্যবধানে। কিন্তু শারদা উগ্রার লেখায় ব্যবধানটা হয়ে গেছে ২-১। প্রথম তথ্যটাই সঠিক, কিন্তু এই অসঙ্গতি পাঠককে দিগভ্রান্ত করবে। যে বইতে যত্ন করে ভারতীয় দলের ৭৫ বছরের গুরুত্বপূর্ণ পরিসংখ্যান পর্যন্ত সৃজন করা হয়েছে, ছাপা হয়েছে একগুচ্ছ মূল্যবান ছবি, সে বইতে এ ধরনের ভুল কাম্য নয়।

বক্স টু বক্স
সম্পাদনা: জয়দীপ বসু
প্রকাশক: আইএমএইচ
দাম: ৬৫০ টাকা

নাগরিক ডট নেট-এ প্রকাশিত

বিরাট, রোহিত, রাহুলদের সত্য রচনা চলছে চলবে

টি টোয়েন্টিতে যে সেট হওয়ার সময় নেওয়া চলে না, সেকথা এঁদের বলবে কে? বোর্ড প্রেসিডেন্ট সৌরভ গাঙ্গুলি, সেক্রেটারি জয় শাহ, নির্বাচক কমিটির প্রধান চেতন শর্মা বা কোচ রাহুল দ্রাবিড় – কারোরই ঘাড়ে অতগুলো মাথা নেই।

এশিয়া কাপ থেকে ভারতের বিদায়

প্রতিক্রিয়া ১

কিচ্ছু ভাববেন না। আমাদের সেরা দল তো খেলেনি। সেরা বোলার যশপ্রীত বুমরা চোটের জন্য বিশ্রামে ছিল, ওয়ার্ল্ড টি টোয়েন্টিতে তো খেলবে। সঙ্গে থাকছে টি টোয়েন্টি স্পেশালিস্ট হর্ষল প্যাটেল। সে-ও চোটের কারণে এশিয়া কাপ খেলেনি। তার উপর টুর্নামেন্টের মাঝখানেই আমাদের ভরসা অলরাউন্ডার রবীন্দ্র জাদেজা চোট পেয়ে বেরিয়ে গেল। এভাবে জেতা যায়?

প্রতিক্রিয়া ২

বিরাট কোহলি শেষমেশ ৭১ নম্বর সেঞ্চুরিটা করে ফেলেছে। আর চিন্তা নেই। এবার তো রানের বন্যা বইবে। বিরাট যেমন খেলছে খেলে যাক, ওয়ার্ল্ড টি টোয়েন্টি আমরা ঠিক জিতে যাব। এশিয়া কাপ জিতিনি তো হয়েছে কী? বিরাট তো সেঞ্চুরি করেছে।

আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে কাউন্সিলের র‍্যাঙ্কিং অনুযায়ী বিশ্বের এক নম্বর টি টোয়েন্টি দল ভারত এশিয়ার ছটা দলের মধ্যে তিন বা চারে শেষ করায় মোটামুটি এই দুরকম প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে। আজকাল এসব ক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞে আর ভক্তে বিশেষ তফাত হয় না। নগদ নারায়ণ বিশেষজ্ঞদের মধ্যেও ভক্তি সঞ্চার করেছেন। যেসব বিশেষজ্ঞ এখনো ভক্তির কাছে আত্মসমর্পণ করেননি, তাঁদেরও সোশাল মিডিয়ার ভক্তকুলকে ভয় করে চলতে হয়। ট্রোলরা খাঁটি সাম্যবাদী, কাউকে ছাড়ে না। এই লেখায় আমরা উপরের দুই প্রতিক্রিয়াকেই পাশ কাটিয়ে এশিয়া কাপে ভারতের ব্যর্থতার কারণ এবং ফলাফলকে তৃতীয় রকমে দেখার চেষ্টা করব।

প্রথমত, বুমরা যে এই মুহূর্তে বিশ্বের সেরা দু-তিনজন বোলারের মধ্যে পড়েন তা নিয়ে তর্কের অবকাশ নেই। ফলে এশিয়া কাপে তাঁর অনুপস্থিতি এবং আসন্ন ওয়ার্ল্ড টি টোয়েন্টিতে উপস্থিতিতে যে অনেকখানি তফাত ঘটবে সেকথা ঠিকই। কিন্তু মুশকিল হল, তিনি এত তাড়াতাড়ি নিজের সেরা ফর্ম ফিরে পাবেন কিনা তা বলা শক্ত। যে কোনো চোট সারিয়ে ফেরার পরেই প্রথম কিছুদিন বোলারদের মধ্যে একই জায়গায় আবার চোট পাওয়ার আশঙ্কা কাজ করে। সে আশঙ্কা কাটে বেশকিছু ওভার বল করা হলে। নেটে বল করে স্বচ্ছন্দ হয়ে গেলেও ম্যাচ খেলার চাপ অন্য। সেই চাপ অনেকসময় সদ্য সেরে ওঠা শরীর নিতে পারে না। ফলে ম্যাচ প্র্যাকটিস দরকার। কিন্তু ওয়ার্ল্ড টি টোয়েন্টির আগে আর মাত্র ছটা টি টোয়েন্টি খেলবে ভারত। সঙ্গে তিনটে একদিনের ম্যাচ। সবকটা ম্যাচেই কি খেলবেন বুমরা? সেটাও কি যথেষ্ট? কেউ হলফ করে বলতে পারবে না। সুতরাং বুমরা এসে পড়েছেন বলেই সব জাদুর মত ঠিক হয়ে যাবে ভেবে নিলে তাঁর প্রতিই অবিচার করা হবে।

দ্বিতীয়ত, হর্ষল প্যাটেল। তাঁর উপর হঠাৎই দেখা যাচ্ছে অনেকের প্রবল ভরসা। সে ভরসার কারণ অবশ্যই গত দুই বছরের আইপিএলে তাঁর বোলিং। হর্ষল ভারত বা সংযুক্ত আরব আমিরশাহীর পিচে নিঃসন্দেহে একজন গুরুত্বপূর্ণ বোলার তাঁর গতির হেরফের, নিখুঁত লাইন লেংথ এবং বৈচিত্র্যের জন্য। কিন্তু অস্ট্রেলিয়ার পিচ নব্বইয়ের দশকের তুলনায় মন্থর হয়ে এলেও দু-আড়াই মাসব্যাপী আইপিএলে শেষের দিকে পিচগুলো যতটা ‘ক্লান্ত’ হয়ে পড়ে, সেরকম হবে না। অস্ট্রেলিয়ায় সাধারণত সমান বাউন্সের পিচ হয়, বল নির্বিঘ্নে ব্যাটে আসে। ঘন্টায় ১৩০-৩৫ কিলোমিটার গতিতে বল করা হর্ষল সেখানে প্রতিপক্ষের ব্যাটারদের কতটা সমস্যায় ফেলতে পারবেন তা বলা মুশকিল। ওরকম পিচে ভুবনেশ্বর কুমার আর হর্ষল একই ধরনের বোলার হয়ে পড়তে পারেন। পরপর দুটো ম্যাচে ১৯তম ওভারে একগাদা রান দিয়ে ফেলায় এখন ভুবনেশ্বর অনেকেরই চক্ষুশূল, কিন্তু আসলে টি টোয়েন্টিতে তাঁর গুরুত্ব অপরিসীম। এই ফর্ম্যাটে সারা পৃথিবীতে খুব বেশি বোলার নেই যাদের গোটা কেরিয়ারে ইকোনমি রেট, অর্থাৎ ওভার পিছু রান দেওয়ার হার, সাতের নিচে। সহজাত সুইং বোলার ভুবনেশ্বরের আরেকটা গুণ, তিনি নিয়মিত উইকেট নেন। সাতাত্তর ম্যাচে তাঁর ঝুলিতে ৮৪টা উইকেট, গড় মাত্র ২১.৭৩।

আসলে এশিয়া কাপ দেখিয়ে দিল, পেস ব্যাটারি নিয়ে গত কয়েক বছরে বিরাট আর রবি শাস্ত্রী যতই উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে থাকুন, আমাদের হাতে এখনো খুব বেশি বিকল্প নেই। আবেশ খানকে সুযোগ দেওয়া হয়েছিল, তিনি মোটেই সুবিধা করতে পারেননি। আশা জাগিয়েছেন বাঁ হাতি অর্শদীপ সিং, তাই ওয়ার্ল্ড টি টোয়েন্টির দলেও জায়গা পেয়েছেন। কিন্তু তাঁরও মূল অস্ত্র স্লোয়ার এবং ইয়র্কার। বুমরা বাদে আমাদের সত্যিকারের গতিময় বোলার নেই। এবারের আইপিএলে দ্রুততম বোলারদের অন্যতম ছিলেন সানরাইজার্স হায়দরাবাদের উমরান মালিক। অথচ তাঁর উপর নির্বাচকদের বা ভারতীয় টিম ম্যানেজমেন্টের বিশেষ ভরসা নেই। তাই জুন-জুলাই মাসে আয়ারল্যান্ডের বিরুদ্ধে দুটো (প্রথম ম্যাচে মাত্র এক ওভার বল করার সুযোগ পেয়েছিলেন), ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে একটা ম্যাচ খেলানোর পর আর সুযোগ দেওয়া হয়নি। বেগতিক দেখে বিশেষজ্ঞরা হঠাৎ মহম্মদ শামির নাম জপতে শুরু করেছিলেন। কিন্তু শামির গতি আর সুইং দুটোই থাকলেও তিনি টি টোয়েন্টিতে মোটেই নির্ভরযোগ্য নন। সতেরোটা টি টোয়েন্টি ম্যাচে তাঁর উইকেট সংখ্যা মাত্র ১৮। উইকেট পিছু ৩১.৫৫ রান খরচ করেন আর ওভার পিছু প্রায় দশ (৯.৫৪) রান দিয়ে ফেলেন। সেই কারণেই বোধহয় শেষমেশ তাঁকে স্ট্যান্ডবাই হিসাবে রাখা হয়েছে ওয়ার্ল্ড টি টোয়েন্টির জন্য। মূলত সুইং বোলার দীপক চহরের উপরেও তার চেয়ে বেশি ভরসা নির্বাচক বা টিম ম্যানেজমেন্টের নেই দেখা গেল।

স্পিন বোলিংয়ের অবস্থা তুলনায় ভাল। জাদেজা চোটের কারণে আপাতত হারিয়ে গেলেও আমাদের সাদা বলের সেরা স্পিনার যজুবেন্দ্র চহল আছেন, রবিচন্দ্রন অশ্বিনও মন্দ ফর্মে নেই দেখা গেল। আর আছেন অক্ষর প্যাটেল। ব্যাটের হাতটাও ভাল হওয়ার কারণে হয়ত শেষপর্যন্ত চহলের পাশে দ্বিতীয় স্পিনারের জায়গাটা বেশিরভাগ ক্ষেত্রে তিনিই নেবেন। কিন্তু ভুবনেশ্বরের উনিশ-বিশ আর ঋষভ পন্থের রান আউট করতে না পারার ঘাড়ে সব দোষ চাপিয়ে দিয়ে যে সত্য ধামাচাপা দিয়ে দেওয়া হচ্ছে, তা হল এশিয়া কাপে ভারতের ব্যর্থতার আসল কারণ ব্যাটিং। ওয়ার্ল্ড টি টোয়েন্টি নিয়ে সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তার কারণও ব্যাটিংই।

আফগানিস্তান ম্যাচের বাহাদুরি দেখে না ভোলাই ভাল। আগের দিন টুর্নামেন্টে টিকে থাকার ম্যাচে প্রচণ্ড স্নায়ুর চাপ নিয়ে শেষ বল পর্যন্ত লড়েছিলেন আফগান ক্রিকেটাররা। বিশ্বের সবচেয়ে ধনী ক্রিকেট বোর্ড শারজায় আইপিএল ম্যাচের আয়োজন হলে আপত্তি করে না, কিন্তু জাতীয় দলকে সেখানে খেলতে দেবে না। তাই চালচুলোহীন আফগানদের পরপর দুদিন দুটো আলাদা জায়গায় খেলতে হল। আগের দিন শারজায়, পরের দিন দুবাইতে। স্বভাবতই তাঁরা শারীরিক বা মানসিকভাবে ভারতীয় দলের বিরুদ্ধে লড়াই করার অবস্থাতেই ছিলেন না। অন্যদিকে গুরুত্বহীন ম্যাচে ভারতীয়দের উপর প্রত্যাশা বা স্নায়ু – কারোর চাপই ছিল না। ফলে ওই ম্যাচের ২১২ রান দিয়ে কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছনো যায় না।

বাকি সব ম্যাচেই কিন্তু ব্যাটিং একগাদা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। সুপার ফোরের পাকিস্তান ম্যাচে প্রথম ছ ওভারে ৬০ পেরিয়ে যাওয়ার পরে এবং প্রথম তিন ব্যাটারের একজন (বিরাট) শেষ ওভার পর্যন্ত খেলে যাওয়া সত্ত্বেও ভারত দুশো পেরোতে পারেনি। একবার শক্ত ম্যাচ জিতিয়ে দিয়েছেন বলেই হার্দিক পান্ডিয়া রোজ জেতাবেন তা হতে পারে না। সুপার ফোরের ম্যাচের দিন তিনি পাঁচ বলের বেশি টেকেননি। যিনি শেষ কয়েক ওভারে ব্যাটিংয়ের বিশেষজ্ঞ হিসাবে দলে জায়গা পেয়েছেন, সেই দীনেশ কার্তিক গ্রুপের পাকিস্তান ম্যাচে খেলতে পেয়েছিলেন একটা বল, হংকংয়ের বিরুদ্ধে ব্যাট করার সুযোগই পাননি। অথচ এই ম্যাচে তাঁকে খেলানো হল না। খেললেন ঋষভ পন্থ, যিনি টেস্টে অসাধারণ, একদিনের ক্রিকেটেও অসাধারণ হয়ে ওঠার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। কিন্তু ৫৮টা টি টোয়েন্টি খেলা হয়ে গেল, এখনো পায়ের নিচে মাটি পাননি। দল তাঁকে দিয়ে ঠিক কী করাতে চায় তা-ও পরিষ্কার নয়। ইংল্যান্ড সফরে মাত্র একবার তাঁকে দিয়ে ইনিংস শুরু করানো হল, তারপর আবার মিডল অর্ডারে ঠেলে দেওয়া হল। তরুণ দীপক হুড়া আদ্যন্ত টপ অর্ডার ব্যাটার। এ পর্যন্ত মোটে বারোটা ম্যাচ খেলেছেন, তার মধ্যেই শতরান করে বসে আছেন। গড় ৪১.৮৫, স্ট্রাইক রেট – যা টি টোয়েন্টি ক্রিকেটে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ – দেড়শোরও বেশি। তাঁকে গোটা টুর্নামেন্টে খেলানো হল নিচের দিকে। ইদানীং যিনি মাঠে নামলেই প্রতিভার বিচ্ছুরণে হাঁ হয়ে যেতে হয়, সেই সূর্যকুমার যাদবও সুপার ফোরের পাকিস্তান ম্যাচে সফল হননি। সে অবস্থায় বিরাট করেছেন ৪৪ বলে ৬০ রান, স্ট্রাইক রেট ১৩৬.৩৬। সংখ্যাগুলো যে যথেষ্ট ভাল, তার প্রধান কারণ বিরাটের চোখধাঁধানো রানিং বিটুইন দ্য উইকেটস। কিন্তু মনে রাখা ভাল, সপ্তম ওভারে ব্যাট করতে নেমে শেষ ওভারের চতুর্থ বল অবধি ব্যাট করেও বিরাট মেরেছেন মাত্র চারটে চার আর একটা ছয়।

শ্রীলঙ্কা ম্যাচের ব্যাটিং সম্পর্কে তো যত কম কথা বলা যায় তত ভাল। অধিনায়ক রোহিত আর কিছুটা সূর্যকুমার ছাড়া বাকি সবাই ব্যর্থ। রানটা যে যথেষ্ট হয়নি তা তো ফলেই প্রমাণিত। এমনকি হংকং ম্যাচেও সূর্যকুমার ২৬ বলে ৬৮ রান না করলে বিরাটের ৫৯ (মাত্র একটা চার, তিনটে ছয়) সত্ত্বেও ভারতের রান ১৫০-৬০ অবধি গিয়ে আটকে যেত। ম্যাচের স্কোরবোর্ড প্রমাণ করছে, ব্যাপারটা মোটেই স্বস্তিদায়ক হত না।

অর্থাৎ গত বছরের ওয়ার্ল্ড টি টোয়েন্টিতে ঠিক যে যে রোগ ভারতীয় দলকে ভুগিয়েছিল, এখনো সেসবের ওষুধ পাওয়া যায়নি। এই এক বছরে ভারত বেশকিছু টি টোয়েন্টি খেলেছে। তাতে চোট, বিশ্রাম ইত্যাদি নানা কারণে এশিয়া কাপ এবং ওয়ার্ল্ড টি টোয়েন্টির দলে জায়গা না পাওয়া অনেক ক্রিকেটার খেলেছেন। ঈশান কিষণ, সঞ্জু স্যামসন, ঋতুরাজ সিংরা যে সেই সুযোগগুলোর একেবারেই সদ্ব্যবহার করতে পারেননি তা-ও নয়। তাহলে অবস্থার পরিবর্তন হল না কেন? না হওয়ার কারণটা খুব সহজ। আপনার অসুখ করল, ডাক্তার এলেন, কী কী ওষুধ খেতে হবে লিখে দিয়ে গেলেন। তারপর দোকান থেকে ওষুধ কিনে আনা হলে যদি আপনি শরৎচন্দ্রের ‘অভাগীর স্বর্গ’ গল্পের অভাগীর মত ওষুধগুলো মাথায় ঠেকিয়ে এক কোণে ছুঁড়ে ফেলে দেন, তাহলে রোগ সারবে? ভারতীয় দলেরও একই অবস্থা।

কে এল রাহুল ইনিংস শুরু করতে যাবেন রোহিতের সঙ্গে এবং টেস্ট ওপেনারদের মত লম্বা ইনিংস খেলার দিকে মনোযোগ দেবেন। রোহিত তো পঞ্চাশ ওভারের ক্রিকেটেও পাওয়ার প্লের বিষম ঝড়ের বায়ে মারের সাগর পাড়ি দিতে নারাজ। বেশ কয়েক ওভার নেন সেট হয়ে নিতে, তারপর ভয়ভাঙা নায়ে ওঠেন। কুড়ি ওভারের খেলাতেও একই পথে চলেছেন এতদিন। ইংল্যান্ড সফরে টি টোয়েন্টি সিরিজে অন্যরকম পথ ধরেছিলেন, কিন্তু এশিয়া কাপের প্রথম দুই ম্যাচে পুনর্মূষিক ভব। তৃতীয় ম্যাচ থেকে অবশ্য পরিবর্তন দেখা গেছে। আবার পুরনো গলিতে ফেরত যাবেন কিনা সেটা এ মাসে অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে সিরিজেই টের পাওয়া যাবে। আর আছেন বিরাট। তিনি পঞ্চাশ ওভারের ব্যাটিংয়ের রাজা। সেখানে যে কায়দায় ইনিংস গড়েন, তা বদলাতে রাজি নন। এক-দুই রান নিয়ে স্কোরবোর্ড সচল রাখবেন, সেট হয়ে গেলে তবেই চার-ছয় মারার কথা ভাববেন।

টি টোয়েন্টিতে যে সেট হওয়ার সময় নেওয়া চলে না, সেকথা এঁদের বলবে কে? বোর্ড প্রেসিডেন্ট সৌরভ গাঙ্গুলি, সেক্রেটারি জয় শাহ, নির্বাচক কমিটির প্রধান চেতন শর্মা বা কোচ রাহুল দ্রাবিড় – কারোরই ঘাড়ে অতগুলো মাথা নেই। কেন নেই?

বিরাট তো কেবল বড় ক্রিকেটার নন, তিনি গোটা ক্রিকেট দুনিয়ার বৃহত্তম ব্র্যান্ড। তাঁর উপর বিপুল পরিমাণ টাকা লগ্নি হয়ে আছে। জিততে হবে বলে লগ্নিকারীদের হতাশ করা চলে না। বিরাট আর রোহিত যে বয়সে পৌঁছেছেন তাতে নিজেদের খেলার ধরন পাল্টে ফেলা হয়ত কঠিন। সেক্ষেত্রে ওষুধ হল তাঁদের জায়গায় অন্যদের সুযোগ দেওয়া। কিন্তু দুজনেই বড় ব্র্যান্ড। অতএব ওষুধ জানা থাকলেও সে ওষুধ প্রয়োগ করা চলবে না। আর রাহুল? তিনি নিজে অতবড় ব্র্যান্ড নন বটে, কিন্তু তিনি আইপিএলে লখনৌ সুপার জায়ান্টসের অধিনায়ক। অন্তত আইপিএল ব্র্যান্ডকে তো গুরুত্ব দিতে হবে। ব্র্যান্ডের যুক্তিতেই কার্তিককে খেলানোর চেয়ে পন্থকে খেলানো বেশি জরুরি। তিনিও এক আইপিএল দলের (দিল্লি ক্যাপিটালস) অধিনায়ক। হার্দিক আবার গুজরাট লায়ন্সের অধিনায়ক। এখন ফর্মে আছেন, যখন থাকবেন না তখন তিনিও ব্র্যান্ডের সুবিধা নিশ্চয়ই পাবেন।

নব্বইয়ের দশকে জাতীয় দলের নির্বাচকদের প্রায় সব সভার আগে-পরেই খবরের কাগজে লেখা হত আঞ্চলিক কোটার কথা। অমুকের ঘরোয়া ক্রিকেটে তেমন পারফরম্যান্স নেই, কিন্তু পূর্বাঞ্চলের কোটায় সুযোগ পেয়ে গেল। অথবা তমুকের বাদ পড়া অনিবার্য ছিল, শেষমেশ পশ্চিমাঞ্চলের কোটায় টিকে গেল। এখনকার সংবাদমাধ্যম তখনকার মত বোর্ডের প্রভাবমুক্ত হলে নির্ঘাত অমুক ব্র্যান্ডের কোটা, তমুক ফ্র্যাঞ্চাইজের কোটার কথা জানা যেত।

রোহিত-রাহুল-বিরাট-ঋষভদের গুণমুগ্ধরা বলতেই পারেন, এসব একেবারেই মনগড়া কথাবার্তা। ওঁরা নিজেদের যোগ্যতাতেই দলে আছেন। ব্র্যান্ড ভ্যালুর ভারে দলে ঢোকার কোনো প্রয়োজনই নেই। তাছাড়া ব্র্যান্ড ভ্যালু কি বোলারদের থাকে না? তাহলে বোলারদের সম্পর্কে এরকম মূল্যায়ন করছি না কেন?

আসলে ভারতে বোলাররা কোনোদিনই ব্যাটারদের মত জনপ্রিয় হন না। ফলে ব্র্যান্ড ভ্যালুতেও ব্যাটারদের ধারে কাছে পৌঁছতে পারেন না। শচীন তেন্ডুলকরের এক শতাংশ বিজ্ঞাপন চুক্তিও কোনোদিন অনিল কুম্বলে পাননি। যুবরাজ সিংয়ের চেয়ে ভারতীয় ক্রিকেটে জাহির খানের অবদান খুব কম নয়। কটা বিজ্ঞাপনে দেখেছেন তাঁকে? গত কয়েক বছরে ভারত তিন ধরনের ক্রিকেটেই যত ম্যাচ জিতেছে তাতে বিরাট, রোহিতের চেয়ে বুমরার অবদান নেহাত কম নয়। তবু তিনি এনডর্সমেন্টের দিক থেকে এখনো বেশ কয়েক মাইল পিছিয়ে।

অতএব ব্যাটারদের আলোচনায় ফেরা যাক। ঋষভ এখন পর্যন্ত এমন কিছু করেননি টি টোয়েন্টিতে, যা দিয়ে তাঁকে যেনতেনপ্রকারেণ দলে রাখা যুক্তিযুক্ত বলে প্রমাণ করা যায়। তিনি যদি বাঁহাতি ব্যাটার বলে অপরিহার্য হন, তাহলে তো বিশেষজ্ঞ ব্যাটার হিসাবেই খেলানো উচিত। হয় কার্তিক খেলবেন, নয় ঋষভ খেলবেন – এমন ব্যবস্থা কেন? অবশ্য ঋষভের এখনো বয়স কম, তাই আরও সুযোগ প্রাপ্য – এই যুক্তি দেওয়া চলে। কিন্তু রোহিত-রাহুল-কোহলি সমস্যা বিশদে আলোচনা করা প্রয়োজন। তাঁরা কাঁচা বয়স পেরিয়ে এসেছেন।

রাহুল ৬১ বার ভারতের হয়ে টি টোয়েন্টি খেলতে নেমে ইতিমধ্যেই হাজার দুয়েক রান করে ফেলেছেন। কেরিয়ার স্ট্রাইক রেট ১৪০-এর বেশি, অর্থাৎ পর্যাপ্ত। কিন্তু বছর দুয়েক হল তিনি ওই টেস্টসুলভ ব্যাটিং শুরু করেছেন। কেবল ভারতের হয়ে নয়, এ বছরের আইপিএলেও তিনি ওভাবেই ব্যাট করেছেন। ঝুঁকি কমিয়ে ফেলায় ধারাবাহিকভাবে রান করে যাচ্ছেন বটে, কিন্তু যে স্ট্রাইক রেটে করছেন তা দলের কাজে আসে না প্রায়শই। ফলে নিজের যোগ্যতাতেই দলে থাকায় দলের কী লাভ হচ্ছে সে প্রশ্ন ওঠা উচিত।

রাহুল যে রোহিত আর বিরাটের স্তরের ব্যাটার নন তা নিয়ে কোনো তর্ক নেই। শেষ দুজন বিস্তর রান করেছেন টি টোয়েন্টিতে। গড়ের দিক থেকে বিরাট বিশ্বের এক নম্বর (৫১.৯৪)। মোট রানে রোহিত এক (৩৬২০), বিরাট দুই (৩৫৮৪)। অথচ রোহিতের টি টোয়েন্টি অভিষেকের পর থেকে ভারত ওয়ার্ল্ড টি টোয়েন্টি জিতেছে মাত্র একবার (২০০৭)। সেবার তিনি মিডল অর্ডারে ব্যাট করেছিলেন। বিরাটের অভিষেকের পর থেকে একবারও নয়। এমনকি সেমিফাইনালে পৌঁছতেও হিমসিম খেতে হয়েছে, ফাইনাল খেলা হয়েছে শুধু ২০১৪ সালে। কী করে হয় এমনটা? ফর্ম্যাটটা তো ব্যাটার নির্ভর। বিশ্বের সেরা দুজন ব্যাটার ভারতের, অথচ ভারত কেন সুবিধা করতে পারে না? এর খানিকটা উত্তর পাওয়া যাবে স্ট্রাইক রেটের তালিকার দিকে তাকালে।

শুনতে অবিশ্বাস্য লাগবে, প্রথম তিনটে জায়গা দখল করে আছেন যথাক্রমে রোমানিয়া, হাঙ্গেরি আর বেলজিয়ামের তিন ব্যাটার। টেস্ট খেলিয়ে দেশের ক্রিকেটারদের মধ্যে সবচেয়ে উপরে নাম আছে সূর্যকুমারের (১৭৩.২৯)। প্রথম পনেরো জনের মধ্যে টেস্ট খেলিয়ে দেশের প্রতিনিধি আর মাত্র তিনজন – নিউজিল্যান্ডের জেমস নিশাম (১৬৫.৮৪), তাঁর দেশেরই কলিন মানরো (১৫৬.৪৪) আর ওয়েস্ট ইন্ডিজের আন্দ্রে রাসেল (১৫৬.০০)। তারপর বারবার নাম আসে ওয়েস্ট ইন্ডিজ, পাকিস্তান, অস্ট্রেলিয়ার ক্রিকেটারদের। ২০০৭ সালের পরের ছটা ওয়ার্ল্ড টি টোয়েন্টির চারটেই এই তিন দেশের কেউ না কেউ জিতেছে। দক্ষিণ আফ্রিকার বেশ কয়েকজন ব্যাটারের নামও পাওয়া যায়। সূর্যকুমারের পর ভারতীয় নাম খুঁজতে খুঁজতে চলে যেতে হবে অনেক নিচে ৩৪ নম্বরে, যেখানে আছেন বীরেন্দ্র সেওয়াগ (১৪৫.৩৮)। আরও কয়েক ধাপ নামলে পাওয়া যাবে হার্দিকের নাম (১৪৪.৬৮)। রোহিত বা কোহলি – কেউই প্রথম পঞ্চাশেও নেই। এই তালিকাটা ব্যাটারদের ‘ক্লাস’ প্রমাণ করে না একেবারেই। যা প্রমাণ করে তা হল টি টোয়েন্টি ক্লাস ব্যাটিংয়ের জায়গা নয়, কম বলে যত বেশি সম্ভব রান করার জায়গা। সেটা করলে তবেই দল জেতার মত পরিস্থিতিতে পৌঁছয়, আর সেখানেই ভারতীয় ব্যাটাররা অনেক পিছিয়ে। রোহিত আর বিরাট তো বটেই।

এই দুজনের পরিসংখ্যান খতিয়ে দেখলে আরও একটা দিক ধরা পড়ে। এমনিতে কোহলির কেরিয়ার স্ট্রাইক রেট ১৩৮.৩৭। কিন্তু পাঁচের বেশি দল খেলেছে এমন টুর্নামেন্টে (অর্থাৎ ওয়ার্ল্ড টি টোয়েন্টি এবং এশিয়া কাপ) তাঁর গড় প্রায় আশি হলেও স্ট্রাইক রেট নেমে আসে ১৩০.৩৯-এ। রোহিতের গড় ৩২ থেকে ৩৬-এ পৌঁছে যায়, কিন্তু স্ট্রাইক রেট ১৪০.৬৩ থেকে নেমে আসে ১৩৩.৭৩-এ। অর্থাৎ দুজনেরই নৈপুণ্য দ্বিপাক্ষিক সিরিজে বেশি। অথচ টি টোয়েন্টিতে দ্বিপাক্ষিক সিরিজগুলোর আসলে কোনো গুরুত্ব নেই। সব দলই ওগুলোকে ব্যবহার করে ওয়ার্ল্ড টি টোয়েন্টির প্রস্তুতি হিসাবে। প্রমাণ চান? টাটকা প্রমাণ আছে। গত ওয়ার্ল্ড টি টোয়েন্টির কিছুদিন আগেই অস্ট্রেলিয়া বাংলাদেশে একটা সিরিজ খেলেছিল। সেই সিরিজ অস্ট্রেলিয়া শোচনীয়ভাবে হারে (৪-১)। এমনকি শেষ ম্যাচে মাত্র ৬২ রানে অল আউট হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু তাতে কী এসে গেল? ওয়ার্ল্ড টি টোয়েন্টি খেতাব জেতে অস্ট্রেলিয়াই, বাংলাদেশ গ্রুপ স্তরই পেরোতে পারেনি। এই কারণেই র‍্যাঙ্কিংয়ে কোন দল এক নম্বর তাতেও কিছু এসে যায় না।

এখন কথা হল, ভারতীয় দলের দুই সেরা ব্যাটার, যাঁরা ব্যাট করেন একেবারে উপরের দিকে, তাঁদের স্ট্রাইক রেট যদি এত মাঝারি মানের হয়, তাহলে দল মোক্ষম ম্যাচে জেতে কী করে? জেতে না। ঠিক যে কারণে পাকিস্তানও বারবার এশিয়া কাপ ফাইনাল বা ওয়ার্ল্ড টি টোয়েন্টি সেমিফাইনালের মত বড় ম্যাচে বারবার ব্যর্থ হয়। রোহিত-রাহুল-কোহলি বা পাকিস্তানের বাবর-রিজওয়ান যে ব্যাটিং করেন, তাতে আসলে যা হয়, তা হল সূর্যকুমারের মত ৩৬০ ডিগ্রি ব্যাটিংয়ে সিদ্ধহস্ত খেলোয়াড়দের উপর বেশি চাপ পড়ে। কার্তিকের মত ফিনিশাররা এক-দু বলের বেশি খেলারই সুযোগ পান না। অথচ টি টোয়েন্টিতে ঝুঁকি বর্জন করে লম্বা ইনিংস খেলার কোনো প্রয়োজনই নেই। কারণ এখানে ব্যাটিং দলকে পঞ্চাশ ওভারের খেলার অর্ধেকের চেয়েও কম বল খেলতে হয়, অথচ হাতে থাকে একই সংখ্যক উইকেট। ঝুঁকি না নিলে রান করে ব্যক্তিগতভাবে ধারাবাহিক হওয়া খুব কঠিনও নয়। কারণ ফিল্ডিং দলের অধিনায়ককে সারাক্ষণই রক্ষ্মণাত্মক থাকতে হয়, ক্যাচ নেওয়ার মত জায়গায় বেশি ফিল্ডার রাখা যায় না। বোলারদেরও ব্যাটারকে আউট করার চেয়ে চার-ছয় মারতে না দেওয়ার দিকেই বেশি মনোযোগ দিতে হয়।

আফগানিস্তান ম্যাচে দুশো স্ট্রাইক রেটে বিরাটের শতরান দেখার পরে এসব কথা অনেকেরই অবান্তর মনে হতে পারে। কেউ আশা করতেই পারেন, এতদিন ফর্মে ছিলেন না (বিরাট নিজে অবশ্য বলেন তিনি কোনোদিনই ফর্ম হারাননি, নিন্দুকে নিন্দে রটিয়েছে) বলে বিরাটের দ্রুত রান করতে সমস্যা হচ্ছিল। এশিয়া কাপে ফর্মে এসে গেছেন, এবার আফগানিস্তান ম্যাচের মত স্ট্রাইক রেটেই তিনি খেলবেন। কিন্তু সে গুড়ে বালি পড়ে যেতে পারে ক্রিকেট বোর্ডের ওয়েবসাইটের জন্য বিরাট রোহিতকে যে সাক্ষাৎকার দিয়েছেন তা দেখলে। সেখানে বিরাট বলেছেন তিনি কোচেদের বলেই দিয়েছেন, ১০-১৫ বল খেলে নেওয়ার পর বাউন্ডারি মারার দিকে যাবেন। নিজের স্বাভাবিক খেলাই তিনি খেলবেন। সেই ছকের বাইরে যেতে গিয়েই সমস্যা হচ্ছিল। কবে যে তিনি বাইরে যাওয়ার চেষ্টা করেছিলেন তা অবশ্য ম্যাচের পর ম্যাচ স্ট্রাইক রেট দেখলে টের পাওয়া যাচ্ছে না। তবে যা-ই হোক, তিনি বলেছেন এশিয়া কাপে তিনি যেভাবে ব্যাট করতে চান টিম ম্যানেজমেন্ট তাঁকে সেভাবেই ব্যাট করতে দিয়েছে এবং তিনি নিজের পারফরম্যান্সে সন্তুষ্ট। যোগ করেছেন, কেবল তিনি নয়, রাহুলকেও তিনি যেভাবে খেলতে স্বচ্ছন্দ বোধ করেন সেভাবে খেলতে দিলেই দলের পক্ষে ভাল হবে। রোহিতকেও বলেছেন, তুমি-আমি এতদিন খেলে ফেলেছি যে আমরা নিজেদের মত খেলতে পারলেই দলের পক্ষে ভাল। অর্থাৎ অস্ট্রেলিয়ার মাঠে ওয়ার্ল্ড টি টোয়েন্টিতেও লম্বা ইনিংস খেলার দিকেই তাঁদের নজর থাকবে। শয়ে শয়ে ব্র্যান্ড এবং লক্ষ লক্ষ ভক্ত পকেটে আছে, অতএব “সেই সত্য যা রচিবে তুমি,/ঘটে যা তা সব সত্য নহে।”

আরও পড়ুন ভারতীয় ক্রিকেট বয়স ঢেকে ফেলছে বিজ্ঞাপনে

মুশকিল হল, ওয়ার্ল্ড টি টোয়েন্টিতে আফগানদের ক্লান্ত বোলিং পাওয়া যাবে না। ফলে লম্বা ইনিংস দুশো স্ট্রাইক রেটে খেলা একটু কঠিন হতে পারে। আরেকটি ঐতিহাসিক সত্য হল, অস্ট্রেলিয়া বড় শক্ত ঠাঁই। এশিয়ার উইকেটে দ্রুত রান করতে যে ব্যাটারের অসুবিধা হয়েছে, অস্ট্রেলিয়ায় গিয়ে তার রান করা সহজ হয়ে গেছে – এমন দৃষ্টান্ত খুব বেশি পাওয়া যায় না। ফলে ব্যাটিং নিয়ে নিশ্চিন্ত হওয়া যাচ্ছে না। দলের জেতা-হারার চেয়ে বিরাট, রোহিতদের ব্যক্তিগত গৌরব যদি আপনার কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়, তাহলে অবশ্য আলাদা কথা।

ইনস্ক্রিপ্টে প্রকাশিত

 

ফিফা থেকে নির্বাসন মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা মাত্র

এমন কি হতে পারে যে ফিফা সর্বভারতীয় ফুটবল ফেডারেশনকে (এআইএফএফ) নির্বাসন দেওয়ায় কোনো ভারতীয় খুশি হয়েছে? খেলোয়াড় বা ফুটবলপ্রেমীদের খুশি হওয়ার তো প্রশ্নই ওঠে না। ক্লাবকর্তারাই বা খুশি হবেন কী কারণে? এমনিতেই তো ইন্ডিয়ান সুপার লিগের বাইরের ক্লাবগুলো ধুঁকছে। তার উপর ফিফার নির্বাসন মানে ফিফা থেকে এশিয়ান ফুটবল কনফেডারেশন (এএফসি) মারফত যা টাকাকড়ি এআইএফএফের কাছে আসত তা-ও বন্ধ থাকবে। ফলে ছিটেফোঁটা যা চুঁইয়ে পড়ত ক্লাবগুলোর দিকে, সে পথও বন্ধ হয়ে যাবে। স্পনসরদেরও খুশি হওয়ার কারণ নেই। স্পনসর মানে মোটের উপর আইএসএলের স্পনসরদের কথাই ধরতে হবে, কারণ তার বাইরে ভারতীয় ফুটবলে আগ্রহী স্পনসর পাওয়া বেশ কঠিন। নিষেধাজ্ঞার ফলে ভারতের আর সব ফুটবল প্রতিযোগিতার মত আইএসএলও হয়ে গেল ফিফার অনুমোদনহীন লিগ। অর্থাৎ আগামী জানুয়ারির ট্রান্সফার উইন্ডোতে নতুন করে বিদেশি ফুটবলার আর নেওয়া যাবে না। বিদেশিরাই যে আইএসএলের জাঁকজমকের অর্ধেক, তাতে সন্দেহ নেই। তাহলে এই নির্বাসনে খুশি হতে পারে কে?

আপাতদৃষ্টিতে মনে হয় কেউ না। কিন্তু ভারত হল রামায়ণ-মহাভারতের দেশ। এখানে গল্পের মধ্যে গল্প, তার মধ্যে গল্প, সে গল্পের মধ্যেও আরেকখানা গল্প থাকে। এখানে আপাতদৃষ্টির ধোঁকা খাওয়াই স্বাভাবিক। সুতরাং হতেই পারে যে একদল ফুটবল প্রশাসক এই নির্বাসনে খুশিই হয়েছেন। দেশের ফুটবল এতে গোল্লায় গেলেও তাঁদের কিছু যায় আসে না। ভারতীয় ফুটবল ফেডারেশনকে পৈতৃক জমিদারি বানিয়ে ফেলেছিলেন তাঁরা, সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে সেই জমিদারি হাতছাড়া হয়েছে মাত্র কয়েক মাস আগে। তখনই তাঁরা হুমকি দিয়েছিলেন, আদালত দেশের ফুটবল প্রশাসনে হস্তক্ষেপ করলে ফিফা এ দেশের ফেডারেশনকে ব্যান করে দিতে পারে। সেই হুমকি ফলে যাওয়ায় আজ তাঁরা বাঁকা হাসতেই পারেন, মনে মনে বলতেই পারেন “দ্যাখ কেমন লাগে।” এই তাঁরা কারা? রহস্য করবার দরকার নেই, কারণ দেশের আপামর ফুটবলপ্রেমী জানেন প্রফুল প্যাটেল আর তাঁর সাঙ্গোপাঙ্গরাই আইনত মেয়াদ ফুরিয়ে যাওয়ার পরেও এআইএফএফ এক্সিকিউটিভ কমিটি আলো করে বসেছিলেন। সুপ্রিম কোর্টের গুঁতোয় আসনচ্যুত হওয়ার পর এবার যদি তিনি প্রফুল্ল অন্তরে এস্রাজ বাজান তাহলে অবাক হওয়ার কিছু নেই।

আদালতের নির্দেশে ভারতীয় ফুটবল ফেডারেশনের সভাপতি পদ হারালেও প্রফুল কিন্তু এখনো ফিফায় ভারতের প্রতিনিধি। ফলে কোনো কোনো মহল থেকে এমন আশঙ্কাও প্রকাশ করা হচ্ছে, যে ফিফার সিদ্ধান্তে তাঁর হাত আছে। কিন্তু ঘটনা হল, এর জন্য প্রফুলকে খুব একটা দায়ী করা চলে না। ফিফা আন্তর্জাতিক অলিম্পিক কমিটির (আইওসি) সনদে স্বাক্ষরকারী। সেই সনদ অনুযায়ী বিশ্বের কোনো দেশের কোনো খেলার জাতীয় ফেডারেশনে সরকার বা কোনো তৃতীয় পক্ষ হস্তক্ষেপ করলে সেই ফেডারেশনের অনুমোদন বাতিল করা হয়। সুতরাং যে মুহূর্তে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট কমিটি অফ অ্যাডমিনিস্ট্রেটর্স (সিওএ) গঠন করে ফেডারেশনের দায়িত্ব তাদের হাতে দিয়েছে, সেই মুহূর্তেই নির্বাসনের সম্ভাবনা তৈরি হয়ে গিয়েছিল।

১৬ অগাস্ট সিওএ যে বিবৃতি দিয়েছে, তাতে বলা হয়েছে ফিফার সিদ্ধান্ত তাদের অবাক করেছে। কারণ সর্বোচ্চ আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী, ভারত সরকারের জাতীয় ক্রীড়া বিধি মেনে নতুন এক্সিকিউটিভ কমিটি গঠনের জন্য নির্বাচনের কাজ দ্রুত এগোচ্ছিল এবং এই প্রক্রিয়া নিয়ে অনবরত ফিফা, এএফসি সহ সব পক্ষের সঙ্গে আলাপ আলোচনা চলছিল। উপরন্তু, ২৫ জুলাই ফিফা-এএফসি এআইএফএফের অ্যাক্টিং সেক্রেটারি জেনারেলকে যে চিঠি দিয়েছিল প্রস্তাবিত স্ট্যাটিউট সম্পর্কে, সেই চিঠির সুপারিশ মেনে স্ট্যাটিউটে বদলও করা হয়েছে। কিন্তু ২৫ জুলাইয়ের চিঠিটি পড়লে সিওএ-র যুক্তি অসার বলে মনে হবে। কারণ ওই চিঠিতে প্রস্তাবিত স্ট্যাটিউট সম্পর্কে ফিফা-এএফসি কিছু আপত্তি প্রকাশ করেছিল। সেই আপত্তিগুলোতে বিশেষ আমল দেওয়া হয়নি, কোনো মতে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। ১৫ অগাস্ট সাসপেনশনের চিঠিতে ফিফা সেকথাই উল্লেখ করেছে।

তবে এই নির্বাসন দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার সম্ভাবনা কম। ফিফা কাউন্সিল নির্বাসনের সিদ্ধান্ত জানানোর পাশাপাশিই বলেছে, ভারত সরকারের ক্রীড়া ও যুবকল্যাণ দপ্তরের সঙ্গে তারা যোগাযোগ রাখছে এবং আশাবাদী যে সমস্যা মিটে যাবে। আসলে এই সিদ্ধান্তের তাৎক্ষণিক ফলগুলোর অন্যতম হল অক্টোবর মাসে এ দেশে যে মেয়েদের অনূর্ধ্ব-১৭ ফুটবল বিশ্বকাপ হওয়ার কথা, তা বাতিল হয়ে যাওয়া। সেটা হলে এ দেশের মেয়েদের ক্ষতি, ফিফাও তেমনটা চায় না। এমনকি ভারত সরকারও চায় না। সবেমাত্র স্বাধীনতা দিবসের ভাষণে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী নারী অধিকার নিয়ে একগাদা ভাল ভাল কথা বলেছেন, এখনই মহিলাদের বিশ্বকাপ ভারত থেকে সরে গেলে তাঁর ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে বলেই হয়ত সরকারপক্ষের বিশ্বাস। নইলে সলিসিটর জেনারেল তুষার মেহতা স্বয়ং সুপ্রিম কোর্টের কাছে জরুরি ভিত্তিতে ১৭ তারিখই এ বিষয়ে শুনানির আর্জি জানাবেন কেন? সকাল সকাল শুনানি হওয়ার কথা এবং সর্বোচ্চ আদালত যদি সিওএকে ফিফার কথামত কাজ করার নির্দেশ দেন, তাহলে ভারতের নির্বাসন উঠে যেতে সপ্তাহ খানেকের বেশি লাগবে না।

কিন্তু নির্বাসন ক্ষণস্থায়ী বা দীর্ঘস্থায়ী – যা-ই হোক না কেন, দেশের ফুটবল এ অবস্থায় পৌঁছল কেন তা নিয়ে কিন্তু আলোচনা করতেই হবে। সুপ্রিম কোর্ট তো স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে ফুটবল প্রশাসনে নাক গলায়নি। দিল্লির আইনজীবী রাহুল মেহরাকে আদালতের দ্বারস্থ হতে হয়েছিল কেন? সেসবের বিস্তারিত আলোচনা এখানে পাবেন।

প্রফুল প্যাটেল শুধু অগণতান্ত্রিক উপায়ে ফেডারেশনের মাথায় বসেছিলেন তা নয়, তাঁর আমলে কুকীর্তির তালিকা বেশ লম্বা। তাঁর আমলেই ফেডারেশনকে কার্যত ঠুঁটো জগন্নাথে পরিণত করে দেশের ফুটবলের দণ্ডমুণ্ডের কর্তায় পরিণত হয়েছে একটি ফ্র্যাঞ্চাইজ লিগ, যার দৃষ্টান্ত পৃথিবীর কোনো দেশের ফুটবল ইতিহাসে পাওয়া যাবে না। আজ যে ফুটবলপ্রেমীরা গেল গেল রব তুলছেন, তাঁদের স্বীকার করে নেওয়ার সময় এসেছে, যে ফিফার সিদ্ধান্ত আসলে মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা। এমন নয় যে ভারতীয় ফুটবল দারুণ স্বাস্থ্যের অধিকারী ছিল, হঠাৎ বিনা মেঘে বজ্রপাত হয়ে প্রাণহানি হয়েছে। মোহনবাগান আর ইস্টবেঙ্গল আইএসএল খেলছে – বাংলার ফুটবলপ্রেমীরা এতেই খুশি হয়েছেন। দেশের আর কোথায় ফুটবল খেলাটার কী হল না হল তা নিয়ে তাঁরা মাথা ঘামাতে রাজি হননি। তাঁরা খেয়ালই করেননি কলকাতা লিগটা পর্যন্ত ছেলেখেলায় পরিণত হয়েছে। কখন হয়, কেমন করে হয় তার কোনো ঠিক নেই। দুই বড় ক্লাব নিজেদের মর্জি অনুসারে খেলে অথবা খেলে না। বছর ১০-১৫ আগে কলকাতায় তিন প্রধান ছাড়াও কিছু ক্লাব দেখা যেত যারা চমকে দেওয়ার মত ফুটবল খেলত। একসময় জাতীয় লিগে খেলা টালিগঞ্জ অগ্রগামী গেল কোথায়? নতুন দল গড়ে মোহনবাগান, ইস্টবেঙ্গলের সাথে সমানে সমানে লড়ে যাওয়া ইউনাইটেড এসসি তো আইএসএল থেকে শত হস্ত দূরে। এমনকি মহমেডান স্পোর্টিংও অনেকখানি পিছিয়ে পড়েছে।

একই চিত্র জাতীয় স্তরে। মাহিন্দ্রা কোম্পানি দল তুলে দিয়েছে অনেকদিন হল। জেসিটির নাম আর শোনা যায় এখন? সবই আইএসএলের দোষে হয়েছে তা নয়, কিন্তু আইএসএল সব সংকটের শীর্ষবিন্দু। মুমূর্ষু ভারতীয় ফুটবলের চিকিৎসা করার বদলে প্রফুলের আমলে স্যালাইন, অক্সিজেন খুলে নিয়ে শেষ করে দেওয়ার ব্যবস্থা হয়েছে আইএসএলের মাধ্যমে। গত দুই দশকে জাতীয় দলের সেরা খেলোয়াড়দের ধাত্রীভূমি উত্তর-পূর্বাঞ্চলের ছোট ছোট ক্লাবগুলো। শিলং লাজং, আইজল এফসির মত ক্লাবের বহু বছরের পরিশ্রমকে পাত্তা না দিয়ে তাদের করে দেওয়া হয়েছে দ্বিতীয় শ্রেণির (অর্থাৎ আই লিগের) নাগরিক। আর স্রেফ বিত্তের জোরে প্রথম সারির নাগরিক হয়েছে ইতিহাসবিহীন নর্থ ইস্ট ইউনাইটেড এফসি। ডেম্পো বা সালগাঁওকারের মত দল পড়ে রইল, গোয়া ফুটবলের ধারক ও বাহক হয়ে গেল এফসি গোয়া। বিজয়ন, সত্যেন, আনচেরি, পাপ্পাচানদের কেরল পুলিস কোথায় মিলিয়ে গেছে। টাইটেনিয়াম ক্লাবের কথা কজনেরই বা মনে আছে? সারা ভারত চিনছে কেরালা ব্লাস্টার্সকে।

আরও পড়ুন বড়লোকের খেলা

যে মোহনবাগান, ইস্টবেঙ্গলকে ফুটবল জগতের কেন্দ্রবিন্দু মনে করেন বাংলার ফুটবল পাগলরা, তাদের অবস্থাও তো কহতব্য নয়। প্রতি মরসুমের শুরুতেই মনে হয় এই বুঝি ইস্টবেঙ্গল দলটা উঠে গেল। তখন মুখ্যমন্ত্রী হস্তক্ষেপ করেন আর একটি জোড়াতালি দেওয়া ব্যবস্থা হয়। আর মোহনবাগান? তাদের নাম আদৌ মোহনবাগান কিনা তা নিয়েই সন্দেহ দেখা দেয় মাঝেমধ্যে। আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার প্রস্তুতি হিসাবে কলকাতা লিগ খেলে না দলটি, তারপর সেই প্রতিযোগিতায় হজম করে আসে আধ ডজন গোল।

এভাবে ভারতীয় ফুটবল কোনদিকে যাচ্ছিল? সুনীল ছেত্রী গোল করায় লায়োনেল মেসি আর ক্রিস্টিয়ানো রোনাল্ডোর সঙ্গে পাল্লা দেন বটে, কিন্তু জাতীয় দলের ফলাফলে বিশেষ তারতম্য হয়নি। বাইচুং ভুটিয়া থেকে সুনীল হয়ে জেজে লালপেখলুয়া – জাতীয় দল ফিফা র‍্যাঙ্কিংয়ে সেই একশোর আশপাশে ঘোরাফেরা করছে (২৩ জুন ২০২২ তারিখে সর্বশেষ আপডেটের সময়ে ১০৪)।

এই নির্বাসনে আশু ক্ষতি হল বরং মেয়েদের ফুটবলের। আমরা অনেকেই খবর রাখি না, মেয়েদের ফুটবলে ভারত অনেক এগিয়ে (৫ অগাস্ট ২০২২ তারিখে সর্বশেষ আপডেটের সময়ে র‍্যাঙ্কিং ৫৮)। সেই ফুটবল নিয়েও চরম ছেলেখেলা চলেছে প্রফুলের আমলে। শুধু যে অতি অযত্নে ইন্ডিয়ান উইমেন্স লিগ চালানো হয় তা-ই নয়, এ বছরের গোড়ায় দেশে এশিয়ান কাপের আয়োজন করতে গিয়ে চরম কেলেঙ্কারি হয়েছে। প্রতিযোগিতা চলাকালীন ভারতীয় দলের ১২ জন কোভিডাক্রান্ত হওয়ার মেয়েদের আর সেই প্রতিযোগিতায় খেলাই হয়নি। অথচ তার জন্যে কে দায়ী তা নিয়ে ফেডারেশন মাথা ঘামায়নি, আজ অবধি কারোর শাস্তিও হয়নি। ভারতের ফুটবল মহল, সংবাদমাধ্যম – সকলেই এত সচেতন যে ওসব হওয়ার আশাও বোধহয় কেউ করেনি। শুধু কি তাই? অনূর্ধ্ব-১৭ মহিলাদের জাতীয় দলের সহকারী প্রশিক্ষক অ্যালেক্স অ্যামব্রোসের বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির অভিযোগ পর্যন্ত উঠেছে। সিওএ পত্রপাঠ তাঁকে বরখাস্ত করেছে। প্রফুলের আমল হলে কী হত কে জানে?

স্বভাবতই ফেডারেশনের নির্বাসনের খবরে যেরকম চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়েছে, কোমর ভেঙে যাওয়া ভারতীয় ফুটবলকে উঠে দাঁড়াতে গেলে কী করতে হবে তা নিয়ে সেরকম আলোচনা হবে না ধরে নেওয়া যায়। কারণ কোনো উপায়ে আইএসএল যথাসময়ে অনুষ্ঠিত হওয়া নিশ্চিত করা গেলেই কোমর যে আদৌ ভাঙেনি তা বিশ্বাস করে নেবেন ফুটবলপ্রেমীরাও।

নাগরিক ডট নেট-এ প্রকাশিত

আন্তর্জাতিক ক্রিকেটকে মরে প্রমাণ করতে হবে সে মরেনি

যদি ২০১১ বিশ্বকাপ ফাইনালের সেরা খেলোয়াড় মহেন্দ্র সিং ধোনি ২০১৫ বিশ্বকাপের বছর খানেক আগে ঘোষণা করতেন তিনি আর একদিনের ক্রিকেট খেলবেন না, কেমন হত ব্যাপারটা? তখন ধোনির বয়স সবে ৩৩ বছর। চোট আঘাতে বেশ কিছুদিন মাঠের বাইরে থাকতে হয়েছিল এমন নয়, উইকেটরক্ষায় শিথিলতা দেখা যাচ্ছিল বা ব্যাটে রান ছিল না তা-ও নয়। সে অবস্থায় ক্রিকেটের অন্যতম বক্স অফিস ধোনি একদিনের ক্রিকেট থেকে অবসর নিলে অবশ্যই হইচই পড়ে যেত। কিন্তু এমন কিছু তখন ঘটেনি। সাদা বলের ক্রিকেটের সর্বকালের সেরাদের একজন ধোনি শুধু ২০১৫ বিশ্বকাপ নয়, ২০১৯ সালের বিশ্বকাপও খেলেছেন। কিন্তু ধোনি তখন ৫০ ওভারের ক্রিকেট থেকে অবসর নিয়ে ফেললে যতটা অবাক কাণ্ড হত, অতি সম্প্রতি তার চেয়েও অবাক কাণ্ড ঘটে গেছে। যে কোনো ধরনের ক্রিকেটে বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় অলরাউন্ডারদের একজন এবং ২০১৯ বিশ্বকাপ ফাইনালের সেরা খেলোয়াড় বেন স্টোকস একদিনের ক্রিকেট থেকে অবসর নেওয়ার সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেছেন। ১৯ জুলাই (মঙ্গলবার) দক্ষিণ আফ্রিকার বিরুদ্ধে ইংল্যান্ডের প্রথম একদিনের আন্তর্জাতিকই ছিল তাঁর খেলোয়াড় জীবনের শেষ একদিনের ম্যাচ।

ধোনি অবসর নিলে যা হত, স্টোকসের অবসর তার চেয়েও বেশি আশ্চর্যের কারণ স্টোকসের বয়স এখন ৩১। ব্যাটিংয়ের ক্ষেত্রে বলা হয়, এই বয়সে এসে একজন ব্যাটার আরও পরিণত হয়ে ওঠেন। আর স্টোকস তাঁর বোলিং বাদ দিয়ে শুধু ব্যাটার হিসাবেই ইংল্যান্ড দলে জায়গা পেতে পারেন তিন ধরনের ক্রিকেটেই। অতীতে বয়স বাড়লে, শরীরের ধকল নেওয়ার ক্ষমতা কমে গেলে অনেক অলরাউন্ডারই বোলিং করা ছেড়ে দিয়েছেন। ১৯৯৯ বিশ্বকাপে স্টিভ ওয় ব্যাট হাতেই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিলেন। সুপার সিক্সের শেষ ম্যাচে দক্ষিণ আফ্রিকার বিরুদ্ধে তাঁর অপরাজিত ১২০ রান ছাড়া অস্ট্রেলিয়ার শেষ অব্দি ফাইনালে পৌঁছত না। টাই হয়ে যাওয়া সেমিফাইনালেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ অর্ধশতরান করেছিলেন। স্টোকসও যে আগামী বছর ভারতীয় উপমহাদেশের বিশ্বকাপে ব্যাট হাতে পার্থক্য গড়ে দিতে পারতেন না তা বলা যায় না। কিন্তু তিনি সে বিকল্পের দিকে গেলেন না। এমন একজন ক্রিকেটার, যিনি নিঃসন্দেহে একদিনের ক্রিকেটের একজন গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড় এবং যাঁর খেলা সারা বিশ্বের ক্রিকেটপ্রেমীদের বিলক্ষণ আনন্দ দেয়, তিনি কেন এত তাড়াতাড়ি অবসর নিয়ে নিলেন?

ভবিষ্যতে যখন ক্রিকেটের ইতিহাস লেখা হবে, তখন ২০২২ সালের জুলাই মাসের তৃতীয় সপ্তাহ নিয়ে একটা আলাদা অধ্যায় লিখতে হবে। এই এক সপ্তাহে এমন তিনটে ঘটনা ঘটে গেছে যা আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের যুগ বদলে যাওয়ার সূচক। একটা অবশ্যই স্টোকসের মত একজন সক্রিয়, জনপ্রিয় এবং অল্পবয়সী ক্রিকেটারের একদিনের ক্রিকেট থেকে অবসর নেওয়া। কিন্তু ক্রিকেট দলগত খেলা। সেদিক থেকে আরও বড় ঘটনা স্টোকসের অবসরের ঠিক পাঁচদিন আগে দক্ষিণ আফ্রিকার ক্রিকেট বোর্ডের একটা সিদ্ধান্ত। ২০২৩ সালের জানুয়ারি মাসে অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে দক্ষিণ আফ্রিকার একটা একদিনের ম্যাচের সিরিজ খেলার কথা ছিল। কিন্তু ১৩ জুলাই ক্রিকেট সাউথ আফ্রিকা ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়াকে জানায় যে তারা ওই সিরিজ খেলতে অপারগ, কারণ ওই সময়ে তারা নিজেদের দেশে যে নতুন টি টোয়েন্টি ফ্র্যাঞ্চাইজ লিগ চালু করছে তার খেলা চলবে। সেই লিগ সামলে জাতীয় দলকে অস্ট্রেলিয়ায় পাঠানো সম্ভব নয়। আর বাকি বছরের ব্যস্ত ক্রীড়াসূচি থেকে আর কোনো সময় বার করাও সম্ভব নয়।

টি টোয়েন্টি ফ্র্যাঞ্চাইজ লিগের গুরুত্ব কতটা বেড়ে গেছে আর একদিনের আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের গুরুত্ব কতটা কমে গেছে তা এই ঘটনা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল। কারণ দক্ষিণ আফ্রিকার এই সিদ্ধান্তে তাদের আগামী বছরের বিশ্বকাপ খেলার উপরে প্রশ্নচিহ্ন তৈরি হল। আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিলের নিয়মানুযায়ী, এখন একদিনের আন্তর্জাতিক ম্যাচগুলো আইসিসি ক্রিকেট ওয়ার্ল্ড কাপ সুপার লিগের অংশ। ঠিক যেমন টেস্ট ম্যাচগুলো বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের অংশ। তফাত বলতে সুপার লিগের পয়েন্ট দিয়ে একদিনের ক্রিকেটের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন নির্ধারিত হয় না, ঠিক হয় কোন কোন দল সরাসরি বিশ্বকাপে খেলবে। ওই পয়েন্ট টেবিলের প্রথম আটটা দল (ভারত বাদে সাতটা, কারণ ভারত আয়োজক দেশ) ২০২৩ বিশ্বকাপে সরাসরি খেলার যোগ্যতা অর্জন করবে, বাকিদের পাঁচটা অ্যাসোশিয়েট দেশের সঙ্গে যোগ্যতা অর্জনকারী প্রতিযোগিতায় খেলতে হবে। সেখান থেকে মাত্র দুটো দেশ বিশ্বকাপে খেলার যোগ্যতা অর্জন করবে। ওই পয়েন্ট টেবিলে দক্ষিণ আফ্রিকা এই মুহূর্তে এগারো নম্বরে আছে। জানুয়ারি মাসের অস্ট্রেলিয়া সিরিজ বাদ যাওয়ায় মে মাসে ওই টেবিল চূড়ান্ত হওয়ার আগে দক্ষিণ আফ্রিকা আর মাত্র দুটো সিরিজ খেলার সুযোগ পাবে – ইংল্যান্ড আর ভারতের বিরুদ্ধে। সেই দুটো সিরিজ জিতে প্রথম পাঁচে উঠে আসা মোটেই সহজ নয়। যোগ্যতা অর্জনকারী প্রতিযোগিতাও নেহাত সহজ হবে না, কারণ সেখানে প্রতিদ্বন্দ্বী হিসাবে থাকতে পারে শ্রীলঙ্কা, আয়ারল্যান্ডের মত দলগুলো। এককথায়, দক্ষিণ আফ্রিকা বিশ্বকাপ খেলার সুযোগও ছেড়ে দিতে রাজি হয়ে গেল ফ্র্যাঞ্চাইজ টি টোয়েন্টি লিগ আয়োজন করার জন্য।

আইসিসির পূর্ণ সদস্য কোনো দেশের ক্রিকেট বোর্ডের এই মনোভাব ইঙ্গিত দিচ্ছে, পঞ্চাশ ওভারের ক্রিকেট হল অতীত। কুড়ি ওভারের ক্রিকেটই ভবিষ্যৎ। যুগপৎ এই ইঙ্গিতও পাওয়া যাচ্ছে, যে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের চেয়ে ফ্র্যাঞ্চাইজ ক্রিকেট বেশি গুরুত্বপূর্ণ। অন্তত একটা ক্রিকেট বোর্ড সেরকমই মনে করছে। ১৩ তারিখ ক্রিকেট সাউথ আফ্রিকা এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার ঠিক এক সপ্তাহ পরে ঘটেছে তৃতীয় ঘটনা। দক্ষিণ আফ্রিকার বোর্ড যে টি টোয়েন্টি লিগের জন্য অস্ট্রেলিয়া সফর বাতিল করেছে, সেই লিগের ফ্র্যাঞ্চাইজগুলোর নিলাম ছিল ২০ তারিখ। সেখানে ছটা ফ্র্যাঞ্চাইজের সবকটাই কিনে নিয়েছেন আইপিএলের বিভিন্ন ফ্র্যাঞ্চাইজের মালিকরা। মুম্বাই ইন্ডিয়ানস, চেন্নাই সুপার কিংস, দিল্লি ক্যাপিটালস, লখনৌ সুপার জায়ান্টস, সানরাইজার্স হায়দরাবাদ এবং রাজস্থান রয়্যালসের মালিকরাই এখন দক্ষিণ আফ্রিকার ওই লিগের ভাগ্যনিয়ন্তা। বহুদিন আগে থেকেই ক্যারিবিয়ান প্রিমিয়ার লিগ এবং আমেরিকার লিগে দল আছে কলকাতা নাইট রাইডার্সের মালিকদের, মুম্বাই ইন্ডিয়ানসের মালিকরা সংযুক্ত আরব আমিরশাহীর লিখে একটা দলের মালিক। ক্যারিবিয়ান লিগে পাঞ্জাব কিংস আর রাজস্থান রয়্যালসের মালিকদেরও দল রয়েছে। কিন্তু এর আগে কোনো লিগের সম্পূর্ণ দখল আইপিএল ফ্র্যাঞ্চাইজের মালিকদের হাতে আসেনি। তাদের ইচ্ছাতেই ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড এ পর্যন্ত পৃথিবীর অন্য কোনো দেশের ফ্র্যাঞ্চাইজ লিগে ভারতীয় ক্রিকেটারদের খেলার অনুমতি দেয়নি। এখন কথা হল, অন্য দেশের লিগের দলগুলোও যখন আইপিএলের ফ্র্যাঞ্চাইজ মালিকদেরই দখলে, তখন তাঁরা বিরাট কোহলি, রোহিত শর্মা, ঋষভ পন্থ, হার্দিক পাণ্ড্যার মত জনপ্রিয় ক্রিকেটারদের চাইবেন না কেন? চাইলে ভারতীয় বোর্ড কতদিন না বলতে পারবে? যদি না পারে, তখন ক্রিকেটাররা আর কত ক্রিকেট খেলবেন?

ক্রিকেটের মরসুম বলে আর কিছু নেই বহুকাল হল। বিশেষ করে ভারত, ইংল্যান্ড আর অস্ট্রেলিয়া যে পরিমাণ ক্রিকেটে খেলে তাতে ক্রিকেটারদের চোট, আঘাত লেগেই আছে। জেমস অ্যান্ডারসন, স্টুয়ার্ট ব্রড, চেতেশ্বর পুজারার মত যাঁরা শুধু টেস্ট খেলেন একমাত্র তাঁদেরই দেখা যায় চোট আঘাত কম। বিশেষ করে জোরে বোলাররা দুটো সিরিজ খেলেন তো চারটে সিরিজ মাঠের বাইরে থাকেন। ভারতীয় ক্রিকেটারদের চোট, আঘাত এবং ক্লান্তি তো এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে চলতি বছরের সাত মাস পূর্ণ হওয়ার আগেই সাতজন ভারত অধিনায়ক (বিরাট, রোহিত, কে এল রাহুল, হার্দিক, ঋষভ পন্থ, যশপ্রীত বুমরা, শিখর ধাওয়ান) দেখে ফেলব আমরা। স্টোকসও কিন্তু ক্রীড়াসূচিকে দোষ দিয়েছেন। তিনি বিবৃতিতে জানিয়েছেন, তিন ধরনের ক্রিকেটেই দলকে একশো শতাংশ দেওয়া তাঁর পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না। তাই পঞ্চাশ ওভারের ক্রিকেট থেকে অবসর নিচ্ছেন।

ঘটনা হল, এভাবে চললে আরও অনেককেই তিরিশের আশেপাশে অবসর নিয়ে ফেলতে দেখা যাবে। একেকজন একেক ধরনের ক্রিকেট ছেড়ে দেবেন, কিন্তু নিশ্চিতভাবে বলা যায়, কেউই টি টোয়েন্টি ক্রিকেট ছাড়বেন না। দেশের হয়ে না খেললেও ফ্র্যাঞ্চাইজ ক্রিকেট খেলবেনই। ওয়েস্ট ইন্ডিজের মত যেসব দেশে ক্রিকেটের অবস্থা সঙ্গীন, ক্রিকেট বোর্ড তেমন টাকাপয়সা দিতে পারে না, সেখানকার ক্রিকেটাররা গত এক দশক ধরেই দেশের হয়ে খেলার তোয়াক্কা না করে সারা পৃথিবীর ফ্র্যাঞ্চাইজ লিগ খেলে বেড়িয়েছেন। কারণ ওখানে অনেক টাকা রোজগার করার সুযোগ রয়েছে। এই সুযোগ আরও বাড়ছে এবং বাড়বে। দক্ষিণ আফ্রিকার নতুন লিগে উৎসাহের কারণও আর্থিক। তাদের ক্রিকেটও ধুঁকছে। কিন্তু শুধু ওই একটা লিগ চালু হচ্ছে তা তো নয়, এ বছর থেকে আইপিএল আট দলের বদলে দশ দলের লিগ হয়ে গেছে। সম্প্রচার সত্ত্ব বিক্রি করে যে বিপুল পরিমাণ টাকা ভারতীয় বোর্ড আয় করছে, তাতে অদূর ভবিষ্যতে আরও দল যোগ করে আইপিএলকে আরও লম্বা করতে চাইলেও অবাক হওয়ার কিছু নেই। এদিকে আইসিসির কেন্দ্রীয় ক্রীড়াসূচি, যার পোশাকি নাম ফিউচার টুরস প্রোগ্রাম, তাতে আইপিএলের জন্য আলাদা করে আড়াই মাস সময় ছেড়ে রাখা হবে বলে একরকম সিদ্ধান্ত হয়ে গেছে। অস্ট্রেলিয়ার বিগ ব্যাশ লিগ এবং ইংল্যান্ডের একশো বলের লিগ দ্য হান্ড্রেড – সেসবের জন্যেও আলাদা করে সময় ধার্য করা হবে। শীর্ষস্থানীয় ক্রিকেটাররা এত লিগ ক্রিকেট খেলে আর দেশের হয়ে খেলবেন কখন? কেনই বা খেলবেন? ভারত, অস্ট্রেলিয়া, ইংল্যান্ডের মত যেসব দেশের বোর্ড সফল ফ্র্যাঞ্চাইজ লিগের রোজগার থেকে জাতীয় দলের ক্রিকেটারদের ভাল পারিশ্রমিক দিতে পারবে, তারা না হয় তবু পারবে। পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, ওয়েস্ট ইন্ডিজ, নিউজিল্যান্ড – এরা কী করবে? এমনকি অস্ট্রেলিয়া, ইংল্যান্ডও খাবি খেতে পারে। এই সাইটেই আগে লিখেছি, এক অস্ট্রেলিয় সাংবাদিক আগামী মরসুমে আইপিএলে ক্রিকেটারদের পারিশ্রমিক এমন জায়গায় পৌঁছতে পারে যা ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়া অধিনায়ক প্যাট কামিন্সকে যা পারিশ্রমিক দেয় তার চেয়ে পাঁচ গুণ বেশি।

কিন্তু ক্রিকেটাররা নয়, আন্তর্জাতিক ক্রিকেটকে বিপদে ফেলছে বোর্ডগুলো এবং আইসিসির লোভ। এই শতাব্দীর প্রথম দশকেও পঞ্চাশ ওভারের ক্রিকেটে বেশ জনপ্রিয় ছিল ত্রিদেশীয়, চতুর্দেশীয় প্রতিযোগিতা; যদিও তার টান ক্রমশ কমে আসছিল। টি টোয়েন্টি যুগে আইসিসি ওই ধরনের প্রতিযোগিতা একেবারেই বন্ধ করে দিল, যাতে শুধুমাত্র আইসিসি আয়োজিত প্রতিযোগিতাগুলোই বহুদলীয় হয়। কেন? সম্প্রচারের লাভের গুড় যাতে কম না পড়ে। অথচ আইসিসি কিন্তু একই যুক্তিতে ওয়ার্ল্ড টি টোয়েন্টি ছাড়া কোনো বহুদলীয় টি টোয়েন্টি প্রতিযোগিতা হবে না বলেনি। একের পর এক ফ্র্যাঞ্চাইজ লিগ চালু হয়েছে। আসলে আইসিসির বলার উপায় ছিল না। কারণ সবচেয়ে প্রভাবশালী সদস্য ভারতই সবচেয়ে বড় লিগটা চালায়।

সুতরাং কুড়ি ওভারের ক্রিকেট তথা ফ্র্যাঞ্চাইজ ক্রিকেটের জনপ্রিয়তা ক্রমশ বাড়তে থাকল। ২০১১ বিশ্বকাপের পর পঞ্চাশ ওভারের খেলায় নতুন নিয়ম হল, দুই প্রান্ত থেকে দুটো বলে খেলা হবে। টি টোয়েন্টির মতই ছোট করে আনা হল বাউন্ডারি, তার উপর সারাক্ষণই পাওয়ার প্লে। ফলে পঞ্চাশ ওভারের খেলার নাটকীয়তার বারোটা বাজল। রিভার্স সুইং বন্ধ, স্পিনারদের ভূমিকা নগণ্য। কারণ বল পুরনো হয় না বলে ঘুরতে চায় না, ইনিংসের শেষ প্রান্তে বল নরম হয়ে গিয়ে আর মারা শক্ত হয় না। ফলে খেলাটা হয়ে দাঁড়াল টি টোয়েন্টিরই বড় সংস্করণ। সে জিনিস আলাদা করে দেখতে কার ভাল লাগে? এ নিয়ে শচীন তেন্ডুলকরের মত লোক আপত্তি করেছেন, আইসিসি কান দেয়নি। এখন একদিনের ক্রিকেট ভালবাসেন এমন অনেকে চাইছেন আইসিসি খেলাটাকে বাঁচানোর উদ্যোগ নিক। স্বয়ং ভারত অধিনায়ক রোহিত কদিন আগে মনে করিয়ে দিয়েছেন ত্রিদেশীয় সিরিজগুলোর কথা, বলেছেন ওগুলো আবার চালু করলে হয়ত খেলার সংখ্যা কমানো যাবে, ক্রিকেটারদের চাপ কমবে।

কিন্তু ক্রিকেটারদের চাপ কমাতে চাইছে কে? কেরি প্যাকারও ব্যবসায়ী ছিলেন। তিনি যখন ওয়ার্ল্ড সিরিজ চালু করে রঙিন জামা, সাদা বলের ক্রিকেটের রাস্তায় হাঁটেন, স্বার্থটা একেবারেই ব্যবসায়িক ছিল। কিন্তু তিনি ক্রিকেটকে ব্যবহার করে টাকা রোজগার করতে চেয়েছিলেন, আজকের ক্রিকেটকর্তারা টাকা রোজগার করার জন্যে ক্রিকেটকে ব্যবহার করতে চান। কথায় বলে, মানুষের প্রয়োজনের শেষ আছে, লোভের শেষ নেই। মুনাফার লোভ তো অসীম। একবিংশ শতকে যে কোনো বড় ব্যবসার আর্থিক বছরের লক্ষ্য ঠিক হয় আগের বছরের মুনাফা অনুসারে। এ বছর আরও বেশি মুনাফাই লক্ষ্য। অতএব ক্রিকেটের ব্যবসায় ফ্র্যাঞ্চাইজ লিগগুলোকে দৈর্ঘ্যে প্রস্থে বাড়িয়ে চলাই লক্ষ্য। তাতে শুধু একদিনের ক্রিকেট নয়, সব ধরনের আন্তর্জাতিক ক্রিকেটই গোল্লায় গেলে ক্ষতি নেই। বরং গোল্লায় না পাঠালেই নয়।

আরও পড়ুন IPL auction: Where privilege holds court

তার জন্য জনমত তৈরি করার কাজ আরম্ভ হয়ে গেছে পুরোদমে। ভারতীয় দলের কোচ হিসাবে সাফল্যের মুখ দেখে ক্রিকেটজগতে বিলক্ষণ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছেন রবি শাস্ত্রী। তিনি সম্প্রতি এজবাস্টন টেস্ট চলাকালীন সম্প্রচার সংস্থার স্টুডিওতে বসে বলেছিলেন, ক্রিকেটের ফুটবলের মতই ক্লাবভিত্তিক হয়ে ওঠা উচিত। ইংল্যান্ডের দ্য টেলিগ্রাফ কাগজের পডকাস্টে বুধবার ফের একথা বলেছেন। যোগ করেছেন, বিশেষ করে টি টোয়েন্টিতে দ্বিপাক্ষিক ক্রিকেট কমিয়ে ফেলা উচিত। শুধু বিশ্বকাপের সময়ে, আইসিসি টুর্নামেন্টগুলোর সময়ে জাতীয় দলগুলোর মধ্যে ক্রিকেট হওয়া উচিত। বাকি সময়টা দেশে দেশে ফ্র্যাঞ্চাইজ ক্রিকেট চলুক। তারপর, যেন টেস্ট ক্রিকেট বলে একটা বস্তু আছে সেকথা মনে পড়ায়, বলেছেন এমনটা করলে উপরের ছটা দেশের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক টেস্ট খেলার জন্যে বেশি সময় পাওয়া যাবে। টেস্ট ক্রিকেটকে দুটো স্তরে ভাগ করে দেওয়া দরকার। নইলে দশ বছর পরে টেস্ট ক্রিকেট বাঁচবে না। গোটা পডকাস্টের মধ্যে থেকে এই যে এক মিনিট তুলে টুইট করা হয়েছে, তাতেই কতগুলো চমকপ্রদ কথা!

পূর্ণ আত্মবিশ্বাসে আপেলের সঙ্গে কমলালেবুর তুলনা করার সাহস বোধহয় একমাত্র শাস্ত্রীরই আছে। তিনি এমন একটা খেলার সঙ্গে ক্রিকেটের তুলনা করেছেন যে খেলার একটাই ফরম্যাট – নব্বই মিনিট। সেই খেলার পথে হেঁটে নাকি টি টোয়েন্টি, টেস্ট, একদিনের ক্রিকেট – সবই বাঁচবে। উপরন্তু তিনি বলছেন দেশে দেশে ফ্র্যাঞ্চাইজ লিগগুলোকে উৎসাহ দেওয়া উচিত, তাহলে নাকি টেস্ট খেলার সময় পাওয়া যাবে। বছরে মাসের সংখ্যা না বাড়ালে যে দুটো একইসঙ্গে কী করে সম্ভব তা তিনিই জানেন। সব দেশে সফল ফ্র্যাঞ্চাইজ লিগ নেই। পাকিস্তানের মত দেশে থাকলেও রাজনৈতিক কারণে ক্রিকেট বিশ্বে পাকিস্তান পিছিয়ে, তাই পাকিস্তান সুপার লিগের অদূর ভবিষ্যতে আর্থিকভাবে আইপিএল বা বিগ ব্যাশের সমকক্ষ হয়ে ওঠার সম্ভাবনা কম। তাহলে ওই দেশগুলোতে ক্রিকেট বাঁচবে কী করে? ভারত, অস্ট্রেলিয়া, ইংল্যান্ডের দয়ায়? সে দয়ার বহর তো যথেষ্ট দেখা গেছে। আইসিসির রাজস্বের বেশিরভাগটা তাদেরই দিতে হবে, কারণ তারাই সবচেয়ে বেশি টাকা এনে দেয় – এই যুক্তিতেই তো তারা চলে। নিজেদের মধ্যে ছাড়া অন্য দেশগুলোর সাথে এক সিরিজে দুটোর বেশি টেস্টও তারা খেলতে চায় না।

আসলে শাস্ত্রী যা বলেছেন তা আইসিসি তথা বিসিসিআই কর্তাদের মনের কথা। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের যে ভবিষ্যৎ তিনি নির্দেশ করেছেন তা আরও সংকীর্ণ। ফলে মুনাফার ভাগীদার আরও কম, মুনাফার ভাগ বেশি। মুশকিল হল, ফুটবল খেলা হয় পৃথিবীর প্রায় সব দেশে, ক্লাবও অসংখ্য। ক্রিকেট এখনো গোটা পনেরো দেশের খেলা। কর্তারা যে পথে যেতে চাইছেন তাতে ওই পনেরোও কমতে কমতে পাঁচে এসে ঠেকতে পারে। আরও ভাল করে ভেবে দেখলে বোঝা যায়, যে দেশে ক্রিকেটের জনপ্রিয়তা সবচেয়ে বেশি, সেই ভারতেও আসলে খেলাটা নয়, খেলোয়াড়রা জনপ্রিয়। মাঠে, টিভির সামনে এবং মোবাইলের পর্দায় ভিড় হয় আন্তর্জাতিক তারকাদের টানে। আইপিএলের রমরমাও তাঁদের তারকাচূর্ণেই। ওটা বাদ গেলে কী হয়? ঘরোয়া ফুটবলের অবহেলিত প্রতিযোগিতা সন্তোষ ট্রফির ফাইনালে মাঠ ভরে যায়, অনলাইন স্ট্রিমিং দ্যাখে কয়েক লক্ষ লোক। কিন্তু রঞ্জি ট্রফি ফাইনালের স্কোরের খবরও রাখে না বিশেষ কেউ। সুতরাং আন্তর্জাতিক ক্রিকেট দুয়োরানী হয়ে গেলে ফ্র্যাঞ্চাইজ লিগ নিয়ে মাতামাতি থিতিয়ে যেতে বেশি সময় না-ও লাগতে পারে।

তবে ভবিষ্যৎ চিন্তা করার বদভ্যাস ক্রিকেটকর্তাদের নেই। শোনা যাচ্ছে অন্য দেশের লিগে দল কিনেছেন যাঁরা, তাঁদের চাপে আসন্ন সাধারণ সভায় বিসিসিআই নাকি ভারতীয় ক্রিকেটারদের বিদেশের লিগে খেলার অনুমতি দিয়ে দিতে পারে। হয়ত এখনই শীর্ষস্থানীয়দের ছাড়া হবে না, সরাসরি বোর্ডের সাথে চুক্তিবদ্ধ নন এমন ক্রিকেটারদের ছাড়া হবে। তা যদি ঘটে তাহলে ইতিমধ্যেই অবহেলিত ঘরোয়া ক্রিকেট আরও রক্তশূন্য হয়ে যাবে। বিপুল অর্থের হাতছানি উপেক্ষা করে কে পড়ে থাকবে জনশূন্য স্টেডিয়ামে চারদিন, পাঁচদিনের ক্রিকেট খেলার জন্য? তারপর শাস্ত্রীদের ফ্র্যাঞ্চাইজ লিগের বাড়বাড়ন্তে টেস্ট ক্রিকেট তথা আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের দীর্ঘজীবন প্রাপ্তির ফ্যান্টাসি কী করে পূরণ হবে কে জানে!

ইনস্ক্রিপ্টে প্রকাশিত

ইংল্যান্ডের নতুন ক্রিকেট ভারতীয়দের যা শেখাল

১৯৯৬ বিশ্বকাপে একদিনের ক্রিকেটের ব্যাটিংয়ে সনৎ জয়সূর্য আর রমেশ কালুভিথরনার জুটি বিপ্লব ঘটিয়ে দেওয়ার কিছুদিন পরের কথা। একটা ম্যাচে শ্রীলঙ্কার কাছে দুরমুশ হওয়ার পর ভারত অধিনায়ক শচীন তেন্ডুলকরকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, আগে ব্যাট করে কত রান করলে এই শ্রীলঙ্কাকে হারানো যাবে বলে মনে হয়? শচীন অসহায়ের মত উত্তর দিয়েছিলেন, বোধহয় এক হাজার। গত মঙ্গলবার এজবাস্টনে পুরস্কার বিতরণের সময়ে যশপ্রীত বুমরার মুখ দেখে মনে হচ্ছিল, মার্ক বুচার যদি জিজ্ঞেস করতেন চতুর্থ ইনিংসে কত রানের লক্ষ্যমাত্রা দিলে ইংল্যান্ডকে হারানো যাবে বলে মনে হয়, তাহলে বুমরা শচীনের উত্তরটাই দিতেন। টেস্ট ম্যাচের চতুর্থ ইনিংসে যদি কোনো দল ৩৭৮ রান মাত্র তিন উইকেট হারিয়ে তুলে পঞ্চম দিন মধ্যাহ্নভোজের বিরতির আগেই খেলা শেষ করে দেয়, তাহলে হেরে যাওয়া দলের অধিনায়ক এছাড়া আর কী-ই বা বলতে পারেন? এজবাস্টনে যা ঘটেছে তা আরও বেশি চমকপ্রদ, আরও সুদূরপ্রসারী এই জন্যে যে টেস্টের ইতিহাসে এই প্রথমবার কোনো দল পরপর চারটে ম্যাচ চতুর্থ ইনিংসে আড়াইশোর বেশি রান তুলে জিতল। এই রানগুলো যে গতিতে তোলা হয়েছে সেটাও টেস্ট ক্রিকেটে চট করে হয় না। ইংল্যান্ডের ক্রিকেট সাংবাদিক, সমর্থকরা আদর করে এই ধারার ব্যাটিংয়ের নাম দিয়েছেন ‘ব্যাজবল’ – দলের কোচ ব্রেন্ডন ম্যাককালামের ডাকনাম ব্যাজ, সেই কারণে। ঘটনাটা যেহেতু একবার মাত্র ঘটেনি, পরপর চারবার ঘটে গেল, সুতরাং মানতেই হবে ব্যাজবল একটা নতুন ধারা। ব্যাজবল টেস্ট ক্রিকেটের প্রচলিত ব্যাটিংয়ের বিরুদ্ধে এক বিদ্রোহ। যতক্ষণ ইংল্যান্ডের বাইরে নানারকম পরিবেশে, নানারকম পিচে এ জিনিস করা হচ্ছে ততক্ষণ একে বিপ্লব বলা চলবে না ঠিকই। কিন্তু প্রয়াসটা যে বৈপ্লবিক তা অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই।

এই সহজ কথাটা মেনে নিতে কিন্তু ভারতীয়দের প্রচণ্ড অসুবিধা হচ্ছে। এজবাস্টন টেস্টের আগে থেকেই ইংল্যান্ড যা করছে তা যে নতুন কিছু নয়, তা ঠারেঠোরে ভারতের প্রাক্তন ক্রিকেটার থেকে সাধারণ দর্শক – সকলেই বলছিলেন। জোর গলায় ব্যাজবল নিয়ে ঠাট্টা ইয়ার্কি শুরু হয়ে যায় ঋষভ পন্থ ভারতের ক্রিকেট ইতিহাসের অন্যতম স্মরণীয় ইনিংসে খেলে ফেলতেই। ইংল্যান্ড ব্যাটিং প্রথম ইনিংসে ব্যর্থ হওয়ায় তাচ্ছিল্যের মাত্রা বেড়ে যায়। জনি বেয়ারস্টোর একা কুম্ভের মত শতরানকে ধর্তব্যের মধ্যেই আনা হয়নি। বিশেষজ্ঞদের দেখাদেখি ক্রিকেটভক্তদের মধ্যেও সিরিজ সম্প্রচারকারী টিভি চ্যানেলের বিজ্ঞাপন মাফিক ইংল্যান্ডকে ধোলাই দেওয়া হচ্ছে বলে উল্লাস চলছিল। চতুর্থ দিন দুপুরে ভারত যখন ৩৭৮ রানের লক্ষ্যমাত্রা খাড়া করে অল আউট হয়ে গেল, তখন আমরা কত অসাধারণ দল, আমাদের সাথে প্রথম সাক্ষাতেই ব্যাজবল কেমন অশ্বডিম্ব প্রসব করল – এসব উচ্চমার্গীয় আলোচনা চলছিল। কিন্তু বার্মিংহামে সন্ধে নামার আগেই গলা নামিয়ে ফেলতে হল সকলকে। বেয়ারস্টো আর ইংল্যান্ড অধিনায়ক বেন স্টোকস ফর্মে থাকলে তবেই ব্যাজবল খেলা সম্ভব – এমনটা ভেবে নিশ্চিন্ত ছিলেন যে বিশেষজ্ঞরা, তাঁরা দেখলেন ইংল্যান্ডের দুই নড়বড়ে ওপেনারই দারুণ আত্মবিশ্বাসে আক্রমণাত্মক ব্যাট করলেন। জ্যাক ক্রলি কিছুটা সাবেকি ওপেনারদের ঢঙে খেললেও অ্যালেক্স লিজ শামি, বুমরা, সিরাজ – সকলকেই আক্রমণ করলেন। বাঁহাতি ব্যাটারের অফস্টাম্পের বাইরে তৈরি হওয়া পিচের ক্ষত কাজে লাগিয়ে রবীন্দ্র জাদেজা ভেলকি দেখাবেন বলে আশা ছিল। লিজ প্রথম ওভার থেকেই তাঁকে আক্রমণ করে সে আশায় জল ঢেলে দিলেন। সব মিলিয়ে ওভার পিছু পাঁচ রান করে নিয়ে ইংল্যান্ড একশো পেরিয়ে গেল। এরপর অস্থায়ী অধিনায়ক বুমরা দ্রুত দুটো উইকেট তুলে নিয়ে কিছুটা আশা দেখিয়েছিলেন। কিন্তু অতঃপর যা ঘটল, তাকে ক্রিকেটের সাহেবি পরিভাষায় কী বলে সে কথা থাক, গোদা বাংলায় বলে দুরমুশ করা। ক্ষণেকের জন্য বুদ্ধিভ্রংশ হয়ে জো রুট লিজের রান আউটের কারণ হয়ে না দাঁড়ালে হয়ত ভারতের হারের ব্যবধানটা আরও হতভম্ব করার মত হত। যা-ই হোক, শেষপর্যন্ত রুট আর বেয়ারস্টো যথাক্রমে ৮২.০৮ আর ৭৮.৬২ স্ট্রাইক রেটে ৩৪টা চার আর দুটো ছয় মেরে কার্য সমাধা করেছেন।

ভারতীয় পণ্ডিতরা ভাঙবেন তবু মচকাবেন না। ম্যাচের পর স্টুডিওতে বসে সঞ্জয় মঞ্জরেকর মাথা নেড়ে বললেন এই ব্যাটিংটা ব্যাজবল নয়, এটা হল “সেন্সিবল ব্যাটিং”। মানে মোগলসরাইয়ের নাম দীনদয়াল উপাধ্যায় নগর, টালিগঞ্জের নাম উত্তমকুমার। সঞ্জয় একা নন। ম্যাচটা শেষ হয়েছে বেশ কয়েকদিন কেটে গেল; অজিত আগরকর, বীরেন্দর সেওয়াগ, ওয়াসিম জাফররা এখনো অক্লান্ত পরিশ্রম করে যাচ্ছেন এটা প্রমাণ করতে যে ইংল্যান্ড নতুন কিছু আবিষ্কার করেনি। আপাতত যে তত্ত্বটি খাড়া করা হয়েছে, তা হল এমন ব্যাটিং তো ঋষভ পন্থই করে। এ আর নতুন কী? অনেকে ভিভ রিচার্ডস, সেওয়াগ, জয়সূর্য, অ্যাডাম গিলক্রিস্টেরও নাম করেছেন। পণ্ডিতদের (এবং ভারতীয় ক্রিকেট দলের ভক্তদের) বোঝানো দুঃসাধ্য যে কোনো একজন ব্যাটারের টেস্টে একদিনের ক্রিকেটের মেজাজে ব্যাটিং ব্যাজবল নয়, নতুন কিছুও নয়। স্বয়ং ডন ব্র্যাডম্যানই তো একবার একদিনে ৩০০ রান করেছিলেন (১১ জুলাই ১৯৩০)। কিন্তু একটা আস্ত টেস্ট দলের ব্যাটিং কৌশল হয়ে দাঁড়িয়েছে অন্য কিছু না ভেবে রান তাড়া করে যাওয়া, এক থেকে এগারো নম্বর, সবাই সেই নীতি মেনে ব্যাট করছে – এমনটা টেস্টের ইতিহাসে হয়নি। জো রুটের মত কপিবুক ব্যাটার নিয়মিত স্পিনারদের সুইচ হিট মারছেন, জোরে বোলারদের ব্যাট উল্টে স্লিপের মাথার উপর দিয়ে মাঠের বাইরে পাঠাচ্ছেন। অর্থাৎ দলের পরিচালকরা এটাই চাইছেন। স্টোকস এজবাস্টনে টস জিতে বলেছিলেন, তাঁর দল রান তাড়া করার ব্যাপারে আত্মবিশ্বাসী। টেস্ট ম্যাচে টসে জিতে ফিল্ডিং নেওয়া হবে না প্রথমে ব্যাট করা হবে, তা ঠিক হচ্ছে পিচ বা আবহাওয়ার চরিত্র দেখে নয়, রান তাড়া করার পারদর্শিতা মাথায় রেখে – এ জিনিস অভূতপূর্ব। শুধু টেস্ট খেলা নয়, খেলাটাকে নিয়ে আলোচনা করার মানদণ্ডটাই তো বদলে দিল ইংল্যান্ড। ব্যাজবল বলুন বা অন্য কিছু বলুন, নামে কী আসে যায়? ব্যাজবলকে যে নামেই ডাকা হোক, তার সুগন্ধ কমে না। মুশকিল হল, আমরা ভারতীয়রা আর খেলার সুগন্ধ পাই না, সেটা সামরিক লড়াইসুলভ প্রতিহিংসার পূতিগন্ধে চাপা পড়ে যায়। আমাদের দলকে প্রত্যেক খেলায় জিততে হবে, আম্পায়ারের প্রত্যেকটা সিদ্ধান্ত আমাদের পক্ষে যেতে হবে। অন্যথা হলে আমাদের খেলোয়াড়রা দাঁত নখ বের করে ফেলেন, আমরাও গ্যালারিতে বা টিভির/মোবাইলের সামনে বসে ব্যাপারটা জাতীয় সংকট হিসাবে ধরে নিয়ে ফুঁসতে থাকি। প্রতিপক্ষের ভাল বোলিং বা ব্যাটিং দেখে মুগ্ধ হওয়ার ক্ষমতাই যখন হারিয়ে গেছে, তাদের দলগত উদ্ভাবনী ক্ষমতা দেখে তারিফ করার ক্ষমতা আর থাকবে কী করে?

তবে প্রাক্তন ক্রিকেটাররা কী বললেন; বিশ্লেষক, সাংবাদিকরা কী টুইট করলেন আর তার প্রভাবে সাধারণ ক্রিকেটভক্তদের কী প্রতিক্রিয়া হল তা নিয়ে আলোচনার দরকার হত না, যদি না প্রতিপক্ষের অভিনবত্বকে গুরুত্ব না দেওয়ার প্রবণতা খোদ ভারতীয় ক্রিকেট দলের মধ্যেই দেখা যেত। এজবাস্টনে ভারত যেভাবে খেলেছে, তাতে মনে করা অমূলক নয় যে বুমরা আর কোচ রাহুল দ্রাবিড়ও ব্যাজবল ব্যাপারটাকে স্রেফ ইংরেজ মিডিয়ার অতিকথন বলেই ধরে নিয়েছিলেন। তাই তার জন্যে আলাদা করে কোনো পরিকল্পনা করেননি। নইলে হু হু করে রান হয়ে যাচ্ছে দেখেও রানের গতি কমানোর জন্যে চতুর্থ দিন রক্ষ্মণাত্মক ফিল্ডিং সাজানো, রক্ষণাত্মক বোলিং করা হল না কেন? তাহলে কি ধরে নেওয়া হয়েছিল, কোনোভাবে কয়েকটা উইকেট ফেলতে পারলেই ইংল্যান্ড ম্যাচ বাঁচানোর কথা ভাববে, যেমনটা টেস্ট ক্রিকেটে চিরকাল হয়ে এসেছে? দ্বিতীয় ইনিংসে ভারতের ব্যাটিং দেখেও মনে হয়নি, তারা এমন একটা দলের জন্য লক্ষ্য স্থির করছে যারা পরপর তিনটে টেস্টে ঝড়ের গতিতে আড়াইশোর বেশি রান তাড়া করে জিতেছে। চেতেশ্বর পুজারা ছাড়া আর কেউ যত বেশি সময় সম্ভব ব্যাট করে ইংল্যান্ডের রান তোলার সময় কমিয়ে ফেলার কথা ভেবেছেন, এমন লক্ষণ দেখা যায়নি। ঋষভ যে সময়ে যে শট খেলার সিদ্ধান্ত নিয়ে আউট হলেন, তাতেও মনে হয় তাঁর ধারণা হয়েছিল যথেষ্ট রান উঠে গেছে। এরপর দ্রুত যা পাওয়া তা-ই বোনাস। এমনিতে ৩৭৮ রান যথেষ্ট বলে মনে হওয়া দোষের নয়। কিন্তু ভিডিও অ্যানালিস্ট, পরিসংখ্যানবিদ ইত্যাদি বাহিনী সঙ্গে নিয়ে ঘুরে বেড়ানো বিশ্বের সবচেয়ে ধনী ক্রিকেট দল নিউজিল্যান্ড সিরিজের কথা জেনেও এত নিশ্চিন্ত থাকতে পারল?

অল্প সময়ের ব্যবধানে তিনটে টেস্টে (দক্ষিণ আফ্রিকায় শেষ দুটো টেস্ট আর এজবাস্টন) চতুর্থ ইনিংসে বোলাররা চরম ব্যর্থ হওয়ার পর যে ভারতীয় বোলিংকে এতদিন পাইকারি হারে সর্বকালের সেরা তকমা দেওয়া হচ্ছিল, তাকে নিয়েও প্রশ্ন তুলছেন অনেকে। আসলে অন্ধ হলে যে প্রলয় বন্ধ থাকে না, সে কথাটা অন্য সব ক্ষেত্রের মত ক্রিকেটেও আমরা অনেকদিন হল ভুলে থাকা অভ্যাস করেছি। তার ফল দেখে এখন মাথা চুলকোতে হচ্ছে। বোলারদের আর দোষ কী? ইংল্যান্ডের মত ফর্মে থাকা, জয়ের ছন্দে থাকা ব্যাটিংয়ের বিরুদ্ধে যদি আপনি তিনজন বোলার আর দুজন আধা অলরাউন্ডার নিয়ে খেলতে নামেন, তাহলে এমন ফল হওয়া তো অস্বাভাবিক নয়। বিশেষ করে যখন পিচ ম্যাচের শেষ দুদিনে বোলারদের যতটা সাহায্য করার কথা ততটা করল না।

তিনজন খাঁটি পেসারের সঙ্গে রবিচন্দ্রন অশ্বিনের মত একজন খাঁটি স্পিনারকে খেলানো হয়নি, খেলেছেন শার্দূল ঠাকুর আর রবীন্দ্র জাদেজা। এই একই কৌশল বিরাট কোহলি আর রবি শাস্ত্রীও নিয়েছিলেন ম্যাচের পর ম্যাচ। তা নিয়ে বিস্তর বিতর্ক হয়েছিল, কিন্তু দেখা যাচ্ছে রোহিত শর্মা (এ ম্যাচে বুমরা)-দ্রাবিড় জুটিও একই কৌশল নিচ্ছে। জাদেজাকে আধা অলরাউন্ডার বললে অনেকে যারপরনাই রাগ করেন, কিন্তু সত্যিটা হল দেশের মাঠে তিনি একজন ম্যাচ জেতানো স্পিনার। কিন্তু বিদেশে ক্রিকেট খেলার সময়ে তিনি একজন শক্তিশালী ব্যাটার, যিনি সামান্য হাত ঘোরাতে পারেন। গত ৪-৫ বছরে বিদেশের মাঠে ভারতের সবচেয়ে ধারাবাহিক ব্যাটার হলেন ঋষভ আর জাদেজা। ভারতের তিন, চার আর পাঁচ নম্বর সেই ২০১৮-১৯ সালের অস্ট্রেলিয়া সফরের পর থেকেই নড়বড়ে। পুজারা, বিরাট আর অজিঙ্ক রাহানে যতগুলো ইনিংসে একসাথে সফল হয়েছেন তার চেয়ে বেশি ইনিংসে ব্যর্থ হয়েছেন। উদ্ধার করেছেন নীচের সারির ব্যাটাররা। কখনো ঋষভ, কখনো বোলারদের সঙ্গে নিয়ে জাদেজা। অতএব উপরের তিনজনের ব্যর্থতা ঢাকতে তাঁর ব্যাটটা দরকার, তাতে বোলিং শক্তিতে যতই ঘাটতি হোক। একই কারণে বল হাতে তেমন সাফল্য না পেলেও হার্দিক পাণ্ড্যাকে এগারোটা টেস্ট খেলানো হয়েছিল। চোটের কারণে হার্দিক সরে যাওয়ার পর আনা হয়েছে শার্দূলকে। হার্দিকের তবু কিছুটা গতি ছিল, শার্দূলের তা-ও নেই। পিচ থেকে একেবারে সাহায্য না পেলে, প্রধান বোলাররা প্রথম দিককার উইকেটগুলো না নিতে পারলে শার্দূলের পক্ষে সফল হওয়া কঠিন। মূলত বুমরা আর শামি দীর্ঘকাল দারুণ ফর্মে থাকায় এইসব ফাঁকফোকর ধরা পড়েনি। তাঁরা এখন প্রাকৃতিক নিয়মেই ফর্ম হারাচ্ছেন, আর ফাঁকগুলো বিরাট হাঁ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।

রাহানেকে অনেক ব্যর্থতার পরে বাদ দেওয়া হয়েছে, কিন্তু পুজারা আর বিরাট এখনো খেলে যাচ্ছেন। পুজারার কোনো ব্র্যান্ড ভ্যালু নেই, তিনি সাদা বলের ক্রিকেটে জায়গা করে নিতে পারেননি, আইপিএলও খেলেন না। তাই তাঁর যোগ্যতা নিয়ে তবু প্রশ্ন তোলা চলে। তিনি প্রথম একাদশ থেকে বেশ কয়েকবার বাদ গেছেন। উপর্যুপরি ব্যর্থতার পর ঘরের মাঠে শ্রীলঙ্কা সিরিজেও বাদ পড়েছিলেন, কাউন্টি ক্রিকেটে ঝুড়ি ঝুড়ি রান করে ফেরত আসতে হয়েছে। কিন্তু বিরাট হলেন অনির্বচনীয় গুণের আধার। ২০১৮-১৯ মরসুমের অস্ট্রেলিয়া সফরের পর থেকে বিরাট বা পুজারা কেউই ধারাবাহিকভাবে রান করেননি। নভেম্বর ২০১৯ থেকে দুজনের পারফরম্যান্স পাল্লা দিয়ে খারাপ হয়েছে। প্রথম জনের গড় ২৯.৬৪, দ্বিতীয় জনের ২৮.৩১। কিন্তু দলে বিরাটের জায়গা নিয়ে কোনো প্রশ্ন করা চলবে না। সকলেই জানে, তিনি যে কোনো দিন আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে তাঁর ৭১তম শতরানটি করে রানে ফিরবেন। ততদিন জাদেজা, শার্দূলরা তাঁর রানগুলো করে দেবেন না কেন?

আরও পড়ুন বড় ক্রিকেটারে নয়, বিরাট ব্র্যান্ডে মোহিত জনগণমন

শাস্ত্রী-কোহলির দেখানো এই পথেই রাহুল-রোহিত হাঁটছেন যখন, তখন এই পথে আলো জ্বেলে এ পথেই ভারতীয় ক্রিকেটের ক্রমমুক্তি হবে নিশ্চয়ই। বছরের গোড়ায় যখন নতুন লোকেদের হাতে ভারতীয় ক্রিকেট দলের দায়িত্ব তুলে দেওয়া হল, তারপর সাঁইত্রিশ পেরনো ঋদ্ধিমান সাহাকে দ্রাবিড় জানিয়ে দিলেন তাঁর কথা আর ভাবা হবে না, তখন মনে হয়েছিল ভারতীয় ক্রিকেট সত্যিই বদলাচ্ছে। কিন্তু এখন আবার সবাই চলতি হাওয়ার পন্থী। অফ ফর্মে থাকা বিরাট, সদ্য কোভিডের জন্য টেস্ট না খেলা অধিনায়ক রোহিত প্রমুখ বিশ্রাম নেবেন। তাই ওয়েস্ট ইন্ডিজে একদিনের ম্যাচে ভারতের অধিনায়কত্ব পাচ্ছেন সাঁইত্রিশের দিকে এগোনো শিখর ধাওয়ান।

ইনস্ক্রিপ্টে প্রকাশিত

বোর্ডের ঘরে যে ধন আছে, ক্রিকেটের ঘরে সে ধন আছে?

রাজা বাদশারা বিশেষ আনন্দের দিনে দাঁড়িপাল্লার এক দিকে বসতেন আর অন্যদিকে চাপানো হত সোনাদানা। হুজুরের ওজনের সমান সম্পদ গরীবগুরবোদের মধ্যে বিলিয়ে দেওয়া হত। সবকিছুকেই কতটা ধন পাওয়া যাবে তার সাপেক্ষে মাপার সেই কি শুরু? কে জানে! তবে আমরা এমন এক সময়ে বাস করছি যখন সাফল্য-ব্যর্থতা তো বটেই, উৎকর্ষ-অপকর্ষ, উচিত-অনুচিতও টাকা দিয়েই মাপা হয়। তাই খেলার খবরেও ঢুকে পড়ে টাকার হিসাব; খেলোয়াড়দের রান, উইকেট, ক্যাচের চেয়েও বড় আলোচনার বিষয় হয়ে ওঠে ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগের নিলামে তাঁদের দর। স্বভাবতই ক্রিকেট দলের সাফল্য দিয়ে ক্রিকেট বোর্ডের সাফল্য মাপার দিনও শেষ, দলের ব্যর্থতায় বোর্ডের কাছে জবাবদিহি চাওয়ার যুগও গত হয়েছে। ভারতীয় ক্রিকেট দলের মতই ক্রিকেট বোর্ডও আমাদের নয়নের মণি, কারণ বোর্ড সফল। তাই আমরা প্রশ্ন তুলি না, বোর্ড সভাপতি সৌরভ গাঙ্গুলি আর সচিব জয় শাহের মেয়াদ উত্তীর্ণ হয়ে যাওয়ার পরেও তাঁরা কেন চেয়ার ছাড়ছেন না। কেন তুলব? বোর্ড তো সফল। বহু বছর হল ক্রিকেট দুনিয়ার সবচেয়ে ধনী বোর্ডের নাম বোর্ড অফ কন্ট্রোল ফর ক্রিকেট ইন ইন্ডিয়া। এর চেয়ে বড় সাফল্য আর কী আছে? যদি কোনোদিন দেখা যায় ভারতীয় বোর্ডের আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে, আয়ের দিক থেকে এক নম্বর জায়গাটা অন্য কোনো দেশের হাতে চলে গেছে, তখন কাঠগড়ায় তোলা হবে সৌরভ-জয়কে।

তা সম্প্রতি ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড আরও একটা বড়সড় সাফল্য পেয়েছে। এ যুগের বিচারে বিখ্যাত সৌরভ-শচীন জুটির সব সাফল্যের দাম এর চেয়ে কম। কারণ তাঁরা গোটা কয়েক ম্যাচ জিতিয়েছেন ভারতকে, কিছু গুরুত্বপূর্ণ সিরিজ এবং টুর্নামেন্ট জিতিয়েছেন। সেসবের স্মারক মুম্বাইয়ের ওয়াংখেড়ে স্টেডিয়ামে বোর্ডের সদর দপ্তরে গেলে দেখা যায়। কিন্তু সৌরভ-জয় জুটি বোর্ডকে সদ্য এনে দিয়েছে ৪৮,৩৯০ কোটি টাকা। এ একেবারে নগদ লাভ। এ জিনিস কেবল ব্যাঙ্কে গেলে দেখা যায় তা নয়, এর উপস্থিতি প্রতি মুহূর্তে টের পাওয়া যায়। পাঁচ বছরের জন্য আইপিএলের সম্প্রচার স্বত্ব বেচে এই রোজগার হয়েছে। প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই মহামতি জয় শাহ সংবাদসংস্থা পিটিআইকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেছেন, আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিলের পরের ফিউচার টুরস প্রোগ্রামে, অর্থাৎ কোন দেশ কবে কার বিরুদ্ধে কোথায় খেলবে তার যে বিস্তারিত সূচি তৈরি হয় তাতে, আলাদা করে আইপিএলের জন্য আলাদা করে আড়াই মাস সময় দেওয়া থাকবে। মানে সেইসময় পৃথিবীর কোথাও কোনো আন্তর্জাতিক ক্রিকেট খেলা হবে না, যাতে সব দেশের শীর্ষস্থানীয় ক্রিকেটাররা শুধু আইপিএল খেলতে পারেন। লক্ষ করুন, এই ঘোষণা করে দিলেন বিসিসিআইয়ের সচিব, আইসিসির কোনো কর্মকর্তা নয়। জয় বলেছেন এ নিয়ে আইসিসি এবং বিভিন্ন ক্রিকেট বোর্ডের সঙ্গে আলোচনা হয়ে গেছে। তা হতেই পারে। কিন্তু ফিউচার টুরস প্রোগ্রাম তো তৈরি করে আইসিসি। তাহলে কোন এক্তিয়ারে জয় এই ঘোষণা করতে পারেন? উত্তর ওই ৪৮,৩৯০ কোটি। এই মূল্যে সম্প্রচার সত্ত্ব বিক্রি হওয়ায় ম্যাচ পিছু সম্প্রচার মূল্যের বিচারে আইপিএল সারা বিশ্বে জনপ্রিয় ইংল্যান্ডের প্রিমিয়ার লিগ ফুটবলের চেয়েও এগিয়ে গেল।

স্রেফ অর্থের জোরে যেমন সম্মিলিত জাতিপুঞ্জ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বশংবদ, আইসিসি তেমন ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের অনুগত। বিশ্ব রাজনীতিতে তবু অবাধ্য চীন আছে, দুর্বিনীত রাশিয়া আছে। ফলে নিজের স্বার্থরক্ষায় যা খুশি করতে পারলেও পৃথিবীর সর্বত্র সর্বদা আমেরিকার কথাই শেষ কথা হয়ে দাঁড়ায় না। কিন্তু ক্রিকেট দুনিয়ায় ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের প্রতিস্পর্ধী কোনো শক্তি নেই। যে কটা দেশ দীর্ঘদিন ধরে ক্রিকেট খেলে, যাদের দেশে ক্রিকেটের উল্লেখযোগ্য বাজার আছে, তাদের মধ্যে ভারত সবচেয়ে জনবহুল এবং ক্রিকেটের জন্য পাগল দেশ। ফলে এখানকার বাজার সবচেয়ে বড়। বিশ্বায়নের আগে, ভারতীয় অর্থনীতির উদারীকরণের আগের যুগে যে বোর্ডগুলো ক্রিকেটের উপর ছড়ি ঘোরাত, সেই ইংল্যান্ড আর অস্ট্রেলিয়ার একাধিপত্যের জবাব দিচ্ছে বিসিসিআই – এমন একটা কথা ভেবে অনেকে উত্তর-ঔপনিবেশিক আনন্দ পান। বিসিসিআইয়ের যে কোনো অন্যায়কে এই যুক্তিতে ভারতের ক্রিকেটবোদ্ধারা বৈধ বলে ঘোষণা করে থাকেন বলেই সাধারণ ক্রিকেটপ্রেমীর মনে অমন ধারণা তৈরি হয়। কিন্তু ঘটনা হল, বিসিসিআই মোটেই কোনো বৈপ্লবিক কায়দায় আইসিসির উপর আধিপত্য কায়েম করেনি। ইংল্যান্ড অ্যান্ড ওয়েলস ক্রিকেট বোর্ড (ইসিবি) আর ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়ার (সিএ) সাথে সমঝোতা করেই এই ছড়ি ঘোরানো চলছে।

২০১৪ সালে এন শ্রীনিবাসন আইসিসি চেয়ারম্যান থাকার সময়ে রীতিমত আইন করে তৈরি হয় আইসিসির নতুন রাজস্ব বন্টন পদ্ধতি, যাকে সাধারণত ‘বিগ থ্রি মডেল’ বলা হয়ে থাকে। এই মডেল অনুযায়ী ২০১৫-২০২৩ সালে আইসিসির আয় থেকে ৪৪০ মিলিয়ন ডলার পেতে পারত বিসিসিআই, প্রায় ১৫০ মিলিয়ন ডলার পেত ইসিবি আর প্রায় ১৩২ মিলিয়ন ডলার পেত সিএ। যা পড়ে থাকত তা বাকিদের মধ্যে নানা পরিমাণে ভাগ হত। কিন্তু পরে শ্রীনিবাসনের স্থলাভিষিক্ত হন আরেক ভারতীয় – শশাঙ্ক মনোহর। তিনি নিজে ভারতীয় হয়েও তেলা মাথায় তেল দেওয়া বিগ থ্রি মডেলের বিরোধিতা করেন এবং শেষপর্যন্ত ২০১৭ সালে বিগ থ্রি মডেল বাতিল করে ১৪-১ ভোটে পাস হয় নতুন মডেল। সেখানে আইসিসির রাজস্ব থেকে ভারতীয় বোর্ডের প্রাপ্য হয় ২৯৩ মিলিয়ন ডলার, ইংল্যান্ডের বোর্ডের ১৪৩ মিলিয়ন ডলার, বাকি সাত (অস্ট্রেলিয়া, শ্রীলঙ্কা, পাকিস্তান, দক্ষিণ আফ্রিকা, ওয়েস্ট ইন্ডিজ, নিউজিল্যান্ড, বাংলাদেশ) পূর্ণ সদস্য বোর্ডের ১৩২ মিলিয়ন ডলার করে আর জিম্বাবোয়ের প্রাপ্য হয় ৯৪ মিলিয়ন ডলার। বিসিসিআই এই নতুন ব্যবস্থায় যারপরনাই রুষ্ট হয়; ইংল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়ার ক্রিকেট বোর্ডও খুশি হয়নি। বিগ থ্রি মডেলের পক্ষে তাদের সোজাসাপ্টা যুক্তি – আমরা সবচেয়ে বেশি টাকা এনে দিই, অতএব আমরাই সবচেয়ে বেশি টাকা নেব। এমন নির্ভেজাল বৈষম্যবাদী যুক্তি প্রকাশ্যে বলতে জেফ বেজোস বা ইলন মাস্কের মত ধনকুবেরও লজ্জা পেতেন। মনে করুন, কোনো পরিবারে দশ ভাই। যে তিন ভাই সবচেয়ে বেশি রোজগার করে, তারা যদি খেতে বসে বলে খাবারের বেশিরভাগ অংশ তাদের দিয়ে দিতে হবে – তাহলে যেমন হয় আর কি। ব্যাপারটা যে শুধু দৃষ্টিকটু তা নয়। এই ব্যবস্থা চলতে দিলে যা হবে, তা হল ওই তিন ভাই ক্রমশ মোটা হবে আর বাকিরা অপুষ্টিতে ভুগবে, হয়ত শুকিয়ে মরবে।

পুঁজিবাদ এমনিতে তেলা মাথায় তেল দেওয়ারই ব্যবস্থা; মানুষের সাধ্যমত অবদান গ্রহণ করে তার প্রয়োজন মত ফিরিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা নয়। কিন্তু পুঁজিবাদকেও বাঁচতে হলে খেয়াল রাখতে হয়, যেন শোষণ করার উপযুক্ত শোষিত থাকে। রিজার্ভ ব্যাঙ্কের ভূতপূর্ব গভর্নর এবং পুঁজিবাদী অর্থনীতিবিদ রঘুরাম রাজন ও লুইগি জিঙ্গেলসের একটা বইয়ের নামই হল সেভিং ক্যাপিটালিজম ফ্রম দ্য ক্যাপিটালিস্টস ক্রিকেটের বাজার তো এমনিতেই ছোট, কারণ নিয়মিত আন্তর্জাতিক ক্রিকেট খেলে ডজনখানেক দেশ। মনোপলি কায়েম করতে গিয়ে ছোট ছোট দেশগুলোকে শুকিয়ে মারলে যে ব্যবসার ভাল হবে না – তা বুঝতে অসুবিধা হওয়ার কথা নয়।

কিন্তু একে নব্য উদারবাদী অর্থনীতির যুগ, তার উপর বিসিসিআই হল সর্বশক্তিমান। তাই গোঁসাঘরে মিলিত হয়ে তিন ক্রিকেট বোর্ড নতুন ফিকির বার করল। আইসিসি তো বন্টন করে আইসিসি আয়োজিত প্রতিযোগিতাগুলোর রাজস্ব, কিন্তু আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের বেশিটাই তো দ্বিপাক্ষিক সিরিজ। সেই সিরিজের আয় পুরোটাই ভাগ হয় দুই দেশের ক্রিকেট বোর্ডের মধ্যে। তাই এই তিন দেশ নিজেদের মধ্যে ঘুরে ফিরে বেশি খেলা আরম্ভ করল। আইসিসির ফিউচার টুরস প্রোগ্রামকে ফেলে দেওয়া যায় না। কারণ প্রথমত, তা করলে আইসিসি ভেঙে বেরিয়ে আসতে হয়। ব্যবসার মুনাফা বাড়ানো উদ্দেশ্য, বিদ্রোহ করা তো নয়। দ্বিতীয়ত, ২০১৯ থেকে চালু হয়েছে টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপ। সবার সাথে সবাইকে খেলতে হবে (যদিও রাজনৈতিক কারণে ভারত-পাকিস্তান সিরিজ হয় না), পয়েন্টের প্রশ্ন আছে। তাই ত্রিদেব করলেন কী, নিজেদের মধ্যে চার-পাঁচ টেস্টের সিরিজ খেলা শুরু করলেন। ওদিকে নিউজিল্যান্ডের মত ভাল দলের সঙ্গে ভারত দুটো টেস্টের বেশি খেলে না। দক্ষিণ আফ্রিকার সঙ্গে কটা ম্যাচ খেলা হবে; একই সফরে একদিনের ম্যাচ, টি টোয়েন্টি খেলা হবে কিনা তা নিয়ে দরাদরি চলে। ওই যে বলেছি, খেলার উৎকর্ষ বিচার্য নয়। বিচার্য হল কোন সিরিজ বেচে বেশি টাকা আসবে। এই কারণেই অস্ট্রেলিয়ায় করোনা পরিস্থিতি যখন বেশ খারাপ, তখনো ভারতের অস্ট্রেলিয়া সফর দিব্যি চালু ছিল। অথচ করোনার কারণেই অস্ট্রেলিয়া ২০২০ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার সাথে তিন টেস্টের সিরিজ বাতিল করে দিয়েছিল।

বিসিসিআই আইসিসিকে ঠুঁটো জগন্নাথ করে ফেলতে পেরেছে এবং ইসিবি আর সিএকে লেজুড় বানিয়ে ফেলতে পেরেছে। এর একমাত্র কারণ টাকা। আর সেই টাকার সবচেয়ে বড় উৎস হল আইপিএল। এই প্রতিযোগিতা কতটা এগিয়ে দেয় বিসিসিআইকে? উদাহরণ হিসাবে এই ৪৮,৩৯০ কোটি টাকাকেই ব্যবহার করা যাক। আগেই বলেছি, ২০১৭ সালের এপ্রিল মাসে পাস হওয়া আইসিসির নতুন রাজস্ব বন্টন মডেল অনুযায়ী আট বছরের জন্য বিসিসিআইয়ের প্রাপ্য ২৯৩ মিলিয়ন ডলার। মানে আজকের বিনিময় মূল্যে প্রায় ২,২৯৫ কোটি টাকা। যখন এই সিদ্ধান্ত হয় তখন ডলারের সাপেক্ষে টাকার দাম আরও বেশি ছিল, ফলে বিসিসিআইয়ের প্রাপ্য ছিল আরও কম। এই টাকা পাওয়া যায় কিস্তিতে। আগামী দিনে শেষ কিস্তি পাওয়ার সময়ে টাকার দাম পড়তে থাকলে হয়ত আরেকটু বেশি পাওয়া যাবে। কিন্তু শেষপর্যন্ত যা-ই পাওয়া যাক, স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে শুধু আইপিএলের পাঁচ বছরের সম্প্রচার স্বত্ব বিক্রি করেই বিসিসিআই তার ২৩-২৪ গুণ বেশি টাকা আয় করতে পারে। এর আগের বছরগুলোর (২০১৫-২২) স্বত্ব বিক্রি করে বোর্ড পেয়েছিল ১৬,৩৪৭.৫০ কোটি টাকা। আইসিসির দেয় টাকা তো তার কাছেও নস্যি। সুতরাং বিসিসিআইয়ের যদি আর কোনো আয়ের উৎস না-ও থাকে, কেবল আইপিএলই ক্রিকেট জগতে আধিপত্য বজায় রাখার জন্য যথেষ্ট।

এই আধিপত্য খাটিয়ে যা যা করা হচ্ছে তা নিয়ে ক্রিকেট বিশ্বে নানারকম আপত্তি উঠছে, দুশ্চিন্তা প্রকাশ করা হচ্ছে। ইংল্যান্ড আর অস্ট্রেলিয়া আজব দেশ। সেখানকার প্রাক্তন ক্রিকেটাররা, বড় বড় সংবাদমাধ্যমের সাংবাদিকরা নিজেদের ক্রিকেট বোর্ডের দোষ ধরেন। ফলে বিসিসিআইয়ের সাথে হাত মিলিয়ে তারা বিলক্ষণ লাভ করছে জেনেও তাঁরা অস্বস্তিকর প্রশ্ন তোলেন। অস্ট্রেলিয়ার ‘দি এজ’ পত্রিকার ক্রিকেট লিখিয়ে ড্যানিয়েল ব্রেটিগ যেমন লিখেছেন, আইপিএলের আয় আকাশ ছোঁয়ার ফলে টেস্ট ক্রিকেট ক্রমশ মাইনর লিগে পরিণত হতে পারে। তাঁর আশঙ্কা যে অমূলক নয় তার ইঙ্গিত জয়ের সাক্ষাৎকারে রয়েছে।

এমনিতেই আইসিসির উপর প্রভাব খাটিয়ে বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের প্রথম মরসুমে (২০১৯-২১) এক অত্যাশ্চর্য পয়েন্ট সিস্টেম চালু করা হয়েছিল। সব ম্যাচের পয়েন্ট মূল্য সমান ছিল না, কিন্তু সব সিরিজের পয়েন্ট মূল্য সমান ছিল। কারণটা সহজবোধ্য – ত্রিদেব তো নিজেদের মধ্যে যতগুলো টেস্ট খেলবেন, অন্যদের সাথে ততগুলো খেলবেন না। ফলে পাঁচ টেস্টের অ্যাশেজ সিরিজেও সব ম্যাচ জিতলে পাওয়া যাচ্ছিল ১২০ (২৪x৫) পয়েন্ট, আবার ভারত-নিউজিল্যান্ডের দুই টেস্টের সিরিজেও সব ম্যাচ জিতলে সেই ১২০ (৬০x২)। এত বায়নাক্কা বজায় রেখেও অবশ্য খেতাবটা জিততে পারেনি তিন প্রধানের কেউ। বর্তমান মরসুমে এই বায়না আর মানা হয়নি, কিন্তু জয়ের বয়ান অনুযায়ী, আগামী দিনে বছরে আড়াই মাস আইপিএলকে ছেড়ে দেওয়া হবে বলে ঠিক হয়েছে। এদিকে পাকিস্তান, ওয়েস্ট ইন্ডিজ, অস্ট্রেলিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকাতেও এখন ফ্যাঞ্চাইজ লিগ চালু হয়েছে। ইংল্যান্ডে চালু হয়েছে ১০০ বলের খেলার ফ্যাঞ্চাইজ লিগ – দ্য হান্ড্রেড। সেগুলো অত টাকার খনি নয় বলে আইসিসির আনুকূল্য পাবে না, কিন্তু উপার্জনের প্রয়োজনে বেশকিছু আন্তর্জাতিক ক্রিকেটার সেগুলোতেও খেলেন এবং খেলবেন। নয় নয় করে সারা বিশ্বে কেবল ফ্র্যাঞ্চাইজ লিগই খেলে বেড়ানো ক্রিকেটারের সংখ্যা এখন কম নয়। তাঁদের দর ক্রমশ বাড়ছে, ফলে আরও বেশি সংখ্যক ক্রিকেটার যে আগামী দিনে ওই পথ বেছে নেবেন তাতে সন্দেহ নেই, শীর্ষস্থানীয়রা তো থাকবেনই। তাহলে জাতীয় দলের হয়ে ক্রিকেট খেলবেন কোন ক্রিকেটাররা এবং কখন?

এদিকে বিসিসিআই ছাড়া অন্য বোর্ডগুলোর পক্ষে ক্রিকেটারদের পারিশ্রমিক সেভাবে বাড়ানো কিন্তু সম্ভব হচ্ছে না। ব্রেটিগ লিখেছেন, আইপিএলের সম্প্রচার স্বত্ব থেকে আয় করা অর্থের ২৫ শতাংশও যদি আইপিএল ফ্র্যাঞ্চাইজগুলোর স্যালারি ক্যাপ বাড়াতে ব্যবহার করা হয়, তাহলেই আন্তর্জাতিক ক্রিকেট হয়ে দাঁড়াবে “ফাইন্যানশিয়াল আফটারথট”। অর্থাৎ “ওটা সময় পেলে খেলা যাবে এখন”। কারণ আইপিএলের সম্প্রচার স্বত্ব যখন ১৬,৩৪৭.৫০ কোটি টাকায় বিক্রি হয়েছিল, তখন তার ১৪ শতাংশ ছিল স্যালারি ক্যাপ। আগামী নিলামে সেই অনুপাত বজায় রাখলেই স্যালারি ক্যাপ হয়ে যাবে এখনকার তিন গুণ। তখন কেমন পারিশ্রমিক হবে শীর্ষস্থানীয় ক্রিকেটারদের? ব্রেটিগ প্যাট কামিন্সের উদাহরণ দিয়েছেন। কামিন্স এখন ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়ার থেকে পান মরসুম পিছু ২ মিলিয়ন ডলার, যা আইপিএলে খেলার জন্য সর্বোচ্চ যা পাওয়া যায় তার তুল্য। নতুন সম্প্রচার স্বত্বের পরিমাণ অনুসারে পারিশ্রমিক বাড়লে আইপিএলের সবচেয়ে দামি ক্রিকেটারের পারিশ্রমিক কিন্তু ১০ মিলিয়ন ডলারেও পৌঁছে যেতে পারে।

এখানেই শেষ নয়। যে প্রিমিয়ার লিগকে আইপিএল ছাপিয়ে গেছে বলে এত হইচই, সেই লিগের সম্প্রচার স্বত্বের অর্ধেকেরও বেশি খেলোয়াড়দের পারিশ্রমিক হিসাবে দেওয়া হয়। আইপিএল যদি সেই মডেল অনুসরণ করে তাহলে ক্রিকেটারদের পারিশ্রমিক কত হবে ভাবুন। তখন পাঁচদিনের ক্রিকেট খেলার উৎসাহ কজনের থাকবে? অন্য ফর্ম্যাটেই বা দেশের জার্সি গায়ে খেলার কতটুকু গুরুত্ব থাকবে? স্রেফ আইপিএল ফ্যাঞ্চাইজগুলোর চোখে পড়ার মঞ্চ হয়ে উঠবে কি আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের ময়দান?

কেউ বলতেই পারেন, তেমন হলে ক্ষতিটা কোথায়? আন্তর্জাতিক ফুটবল তো কবে থেকেই ওভাবে চলছে। বিশ্বকাপ, কোপা আমেরিকা, আফ্রিকান নেশনস কাপ থেকে ইউরোপের বড় বড় ক্লাবগুলো ফুটবলার পছন্দ করে। তারপর তারা ইউরোপের লিগগুলোতে খেলতে এসে আকাশছোঁয়া পারিশ্রমিক পান। দেশের হয়ে খেলার জন্যে তাঁদের পাওয়া যাচ্ছে না – এমন অভিযোগে মাঝেমধ্যে বিবাদ বিসম্বাদও হয়। তাই সেসবের জন্য বিশ্ব নিয়ামক সংস্থা ফিফাকে আলাদা নিয়মও তৈরি করতে হয়েছে। না হয় আইসিসিও তেমন কিছু করবে। ক্রিকেটারদের রোজগার বাড়লে ক্ষতি কী? ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের রোজগার বাড়লে, প্রভাব প্রতিপত্তি বাড়লেই বা অসুবিধা কোথায়?

ঠিক কথা। খেলা তো আসলে ব্যবসা। যে ফর্ম্যাট বেশি বিক্রি হবে সে ফর্ম্যাটই টিকে থাকবে। ফলে টেস্ট ক্রিকেটের জন্য চোখের জল ফেলে লাভ নেই। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের বদলে ফ্র্যাঞ্চাইজ ক্রিকেটই আসল খেলা হয়ে দাঁড়ালেও কালের গতি হিসাবেই মেনে নিতে হবে। কিন্তু মুশকিল হল, ইউরোপের ফুটবল মাঠে খেলা দেখতে যাওয়ার অভিজ্ঞতা আর ভারতের ক্রিকেট মাঠে খেলা দেখতে যাওয়ার অভিজ্ঞতায় এখনো আকাশ-পাতাল তফাত। বিশ্বের ধনী ফুটবল ক্লাবগুলো অর্জিত অর্থের বেশ খানিকটা ব্যয় করে দর্শক স্বাচ্ছন্দ্য নিশ্চিত করতে। অথচ ভারতের বহু ক্রিকেট মাঠে সাধারণ দর্শকদের জন্য অপেক্ষা করে থাকে পূতিগন্ধময় বাথরুম। কোথাও তিনতলায় খেলা দেখতে বসলে পানীয় জলের জন্য নামতে হয় একতলায়।

ইউরোপে নিয়মানুযায়ী ক্লাবগুলোর নিজস্ব অ্যাকাডেমি থাকে, সেখানে শিশু বয়স থেকে ফুটবলার তৈরি করা হয়। আইপিএলে ওসব তো নেই বটেই, শুরু হওয়ার সময়ে ‘ক্যাচমেন্ট এরিয়া’-র ক্রিকেটের উন্নতিকল্পে ফ্র্যাঞ্চাইজগুলো কীসব করবে শোনা গিয়েছিল। এখন ক্যাচমেন্ট এরিয়া ব্যাপারটারই আর নামগন্ধ নেই। কলকাতা নাইট রাইডার্সে বাংলার ক্রিকেটার দূরবীন দিয়ে খুঁজতে হয়, গুজরাট টাইটান্সে খুঁজতে হয় গুজরাটের খেলোয়াড়। উপরন্তু ফুটবলে উন্নত দেশে আন্তর্জাতিক মানের স্টেডিয়ামগুলোর মালিক ক্লাবগুলোই। সেই পরিকাঠামো আন্তর্জাতিক ফুটবলের জন্য ব্যবহৃত হয়। ক্রিকেটে কিন্তু ব্যাপারটা উল্টো। দেশের ক্রিকেট বোর্ডের অর্থে তৈরি পরিকাঠামোই ব্যবহার করছে ফ্র্যাঞ্চাইজগুলো। মানে খেলাটার থেকে তারা নিচ্ছে সবকিছু, কী ফিরিয়ে দিচ্ছে তার হদিশ নেই।

আর বিশ্বের সবচেয়ে বিত্তশালী ক্রিকেট বোর্ডের কথা যত কম বলা যায় তত ভাল। আইপিএলের বিন্দুমাত্র সমালোচনা করলেই বিসিসিআই ও তার অনুগত প্রাক্তন ক্রিকেটার, বিশেষজ্ঞ, সাংবাদিকরা বলতে শুরু করেন ঘরোয়া ক্রিকেটের উন্নতি হয়েছে আইপিএল থেকে আসা অর্থের জন্যই। ক্রিকেটারদের পারিশ্রমিক, প্রাক্তনদের পেনশন বেড়েছে সে কথা সত্যি। কিন্তু সেগুলো তো যে কোনো পেশাতেই নির্দিষ্ট সময় অন্তর বাড়ার কথা। গত দুই দশকে দেশে যে হারে মূল্যবৃদ্ধি হয়েছে, সে অনুপাতে কিন্তু ওই টাকার অঙ্কগুলো বাড়েনি। আর ওটুকুই তো একটা খেলার উন্নতির সব নয়। বাকি চেহারাটা কেমন?

আরও পড়ুন বড়লোকের খেলা

কোভিড পর্বে বোর্ড প্রবল উৎসাহে আইপিএল আয়োজন করেছে (প্রয়োজন পড়লে বিদেশে), জাতীয় দলের বিদেশ সফরের ব্যবস্থা করেছে। অথচ রঞ্জি ট্রফি খেলা ক্রিকেটারদের টাকা দেওয়ার কথা ভুলেই গিয়েছিল। আম্পায়ার, স্কোরার, মাঠ পরিচর্যার দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিরাও বিস্মৃত হয়েছিলেন। মুম্বাই আর মধ্যপ্রদেশের মধ্যে এবারের রঞ্জি ট্রফি ফাইনালে ডিসিশন রিভিউ সিস্টেমের ব্যবস্থা নেই, কারণ খরচে কুলোবে না। উত্তরাখণ্ডের রঞ্জি দলের ক্রিকেটারদের দুর্দশার কথা জানলে অবশ্য মনে হবে এসব কিছুই নয়। এ মাসের গোড়ায় সাংবাদিক জেমি অল্টারের প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে, ওই ক্রিকেটাররা এক বছর ধরে পারিশ্রমিক পাচ্ছেন দিনে মাত্র ১০০ টাকা। সে টাকাও মাসের পর মাস বকেয়া থাকে। অধিনায়ক জয় বিস্তা বিসিসিআইকে ২০২০-২১ ও ২০২১-২২ মরসুমের বকেয়ার ব্যাপারে চিঠি লিখে কোনো জবাব পাননি।

মেয়েদের ক্রিকেট বিসিসিআই কীভাবে চালাচ্ছে তা নিয়ে লিখতে বসলে আরও হাজার দুয়েক শব্দ লিখতে হবে। এটুকু বলা যাক, যে চলতি ভারত-শ্রীলঙ্কা সিরিজ ভারতে বসে টিভিতে সরাসরি দেখা যাচ্ছে না। বহু টালবাহানার পর আগামী বছর অবশ্য মেয়েদের আইপিএল শুরু হবে বলে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে।

অর্থাৎ বিসিসিআই নিঃসন্দেহে একটি সফল কোম্পানি, কিন্তু সে সাফল্যে ক্রিকেটের কী লাভ হচ্ছে তা ঠিক বোঝা যাচ্ছে না। একসময় সারা পৃথিবীতে অর্থনীতির আলোচনায় ‘ট্রিকল ডাউন’ কথাটা বেশ জনপ্রিয় ছিল। বলা হত সচ্ছলতা চুঁইয়ে পড়বে নীচের দিকে, তাতেই নীচের তলার মানুষের হাল ফিরবে। বাস্তবে তা কতটা ঘটে তা নিয়ে অর্থনীতিবিদরা তর্ক করবেন, কিন্তু অন্তত ভারতীয় ক্রিকেটে বিসিসিআইয়ের সচ্ছলতা চুঁইয়ে পড়তে দেখা যাচ্ছে না। টেস্ট ক্রিকেটের জন্য চোখের জল না হয় না-ই ফেললাম, আন্তর্জাতিক ক্রিকেট চুলোয় যাওয়াও না হয় মেনে নিলাম। কিন্তু বিসিসিআইয়ের সমান ওজনের সমৃদ্ধি যে দেশীয় ক্রিকেটে দেখা যাচ্ছে না।

ইনস্ক্রিপ্টে প্রকাশিত

ভারতীয় ক্রিকেট বয়স ঢেকে ফেলছে বিজ্ঞাপনে

অ্যালাস্টেয়ার কুককে নিশ্চয়ই ভারতীয় ক্রিকেটপ্রেমীদের মনে আছে। টেস্ট ক্রিকেটে বারো হাজারের বেশি রান করা ব্যাটারকে এমনিতেই কোনো ক্রিকেটপ্রেমী ভোলেন না। তার উপর কুক জীবনের প্রথম এবং শেষ টেস্ট খেলেছিলেন ভারতের বিরুদ্ধেই, আর দুটোতেই তিন অঙ্কের রান করেছিলেন। শুধু তা-ই নয়, ২০১১ সালে ভারতের অভিশপ্ত ইংল্যান্ড সফরের সময়ে এজবাস্টন টেস্টে ক্রিকেটজীবনের সর্বোচ্চ স্কোরেও (২৯৪) পৌঁছন। ২০১৮ সালে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে অবসর নিয়ে ফেলা কুক এখনো দাপটে কাউন্টি ক্রিকেট খেলছেন। এ মরসুমে এসেক্সের এই ওপেনারের গড় এখন ৬০। পাঁচটা ম্যাচেই তিনটে শতরান করে ফেলেছেন এবং দুই দশকব্যাপী প্রথম শ্রেণির ক্রিকেট কেরিয়ারে আগে কখনো যা পারেননি, তা ঘটিয়ে ফেলেছেন গত ম্যাচে। দুই ইনিংসেই শতরান করেছেন।

এদিকে কুক অবসর নেওয়ার পর থেকে ইংল্যান্ডের টেস্ট দলের অবস্থা ক্রমশ খারাপ হয়েছে। জো রুটের কাছে ইংল্যান্ডের কর্মকর্তা, ক্রিকেটপ্রেমী – সকলেরই বিরাট আশা ছিল। কিন্তু ব্যাটার হিসাবে যথেষ্ট সফল হলেও অধিনায়ক হিসাবে রুট একেবারে ব্যর্থ হয়েছেন। গত আঠারোটা টেস্টের মধ্যে মাত্র একটা জিতেছে ইংল্যান্ড। ফলে তিনি পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছেন। যে যে কারণে ইংল্যান্ডের এমন হাঁড়ির হাল, তার অন্যতম হল ওপেনারদের ব্যর্থতা। কুক অবসর নেওয়ার পর থেকে অনেককে নির্বাচকরা সুযোগ দিয়েছেন, কিন্তু কেউই ধারাবাহিকতা দেখাতে পারেননি। কুক ইতিমধ্যে স্যার অ্যালাস্টেয়ার কুক হয়ে গেছেন। মানে ক্রিকেট মাঠে তাঁর কীর্তিকে স্বীকৃতি দিয়েছেন স্বয়ং রানী এলিজাবেথ। জাতীয় দলের ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তিত ইংল্যান্ড অ্যান্ড ওয়েলস ক্রিকেট বোর্ড সম্প্রতি খোলনলচে বদলে ফেলেছে। নতুন ডিরেক্টর অফ ক্রিকেট হয়েছেন প্রাক্তন ক্রিকেটার রব কী, নতুন টেস্ট অধিনায়ক বেন স্টোকস আর টেস্ট দলের কোচের দায়িত্বে এসেছেন ব্রেন্ডন ম্যাককালাম। দেশটার নাম ভারত হলে এতদিনে হাউস অফ কমন্সে সব দলের সাংসদরা মিলে রেজলিউশন পাস করাতেন, নতুন অধিনায়ক আর কোচকে কুককে অবসর ভেঙে ফিরে আসতে বলতেই হবে। কুক নিজেও শতমুখে সংবাদমাধ্যমকে বলে বেড়াতেন, তিনি এখনো দারুণ ফিট এবং জীবনের সেরা ফর্মে রয়েছেন।

কিন্তু দেশটার নাম ইংল্যান্ড। কয়েকদিন আগে কুককে এক সাক্ষাৎকারে রব কীর নিয়োগ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল। তিনি বলেছেন, ভালই তো। ইংল্যান্ডের ক্রিকেটের এখন একেবারে নতুন করে শুরু করা উচিত। নিজের সম্পর্কে কোনো কথাই বলেননি। বরং বলেই দিলেন যে পুরনো সবকিছু ভুলে এগোনো উচিত।

স্নেহময় জ্যাঠামশাইরা পরীক্ষায় ফেল করা ভাইপোদের উৎসাহ দেওয়ার জন্যে এরকম বলতেন। তা কুকজেঠুর বয়স কত? সাঁইত্রিশ বছর চার মাস। চলতি আইপিএলে গত ম্যাচটা (তা-ও বিপক্ষের দ্রুততম বোলার লকি ফার্গুসন কোনো অজ্ঞাত কারণে বল করতে এলেন বিরাট আর ফ্যাফ দু প্লেসি সেট হয়ে যাওয়ার পর এবং মাত্র দু ওভার বল করলেন) বাদ দিলে চূড়ান্ত ব্যর্থ (তিনটে ম্যাচে প্রথম বলে আউট; ১৪ ম্যাচে ৩০৯ রান, গড় ২৩.৭৬) বিরাট কোহলির বয়স কত? সাড়ে তেত্রিশ। অর্থাৎ কুক বিরাটের বয়সেই আন্তর্জাতিক ক্রিকেটকে বিদায় জানিয়েছিলেন। তাঁর এখনকার ফর্ম দেখে মনে করা অমূলক নয় যে অবসর না নিলে তিনি এতদিনে শচীন তেন্ডুলকরের টেস্ট ক্রিকেটে মোট রানের রেকর্ড (১৫,৯২১) আর সবচেয়ে বেশি টেস্ট খেলার রেকর্ড (২০০) – দুটোরই কাছাকাছি পৌঁছে যেতেন। অথচ এখন কনিষ্ঠরা পারছে না দেখেও ফিরে আসার নাম করছেন না। বোর্ডও এখন পর্যন্ত তাঁর নাম করেনি। ভক্তরা কেউ কেউ সোশাল মিডিয়ায় কুকের নাম ভাসিয়ে দিয়েছে, কিন্তু প্রাক্তন ক্রিকেটাররাও তা নিয়ে বিশেষ উৎসাহ প্রকাশ করছেন না। এদিকে বিরাটকে ভারতের প্রাক্তন ক্রিকেটার, ধারাভাষ্যকার, সাংবাদিক – অনেকেই একটু বিশ্রাম নেওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন। তিনি নাকি একটানা অনেকদিন খেলে ফেলেছেন, কদিন বিশ্রাম নিলেই হইহই করে রানে ফিরবেন। বিরাটও গ্রুপ লিগের শেষ ম্যাচের আগে আইপিএলের সরাসরি সম্প্রচারকারী সংস্থাকে সাক্ষাৎকারে বললেন তাঁর উপর দিয়ে সত্যিই অনেক ধকল গেছে, তাই বিশ্রাম নিলে ভালই হয়। মজার কথা, বিশ্রাম নেওয়া যে প্রয়োজন সেটা তাঁর আইপিএলের শেষ লগ্নে এসে খেয়াল হল। বিরাট মনে করেন আমাদের প্রাক্তন ডিরেক্টর অফ ক্রিকেট রবি শাস্ত্রীর চেয়ে বড় শুভাকাঙ্ক্ষী তাঁর নেই। তিনি শুধু বিরাটকে বিশ্রাম নেওয়ার পরামর্শ দেননি, বলেছেন বিশ্রামের পর বিরাট আরও ছ বছর খেলতে পারে। অর্থাৎ কুক যে বয়সে ফর্মে থেকেও জ্যাঠামশাইয়ের ভূমিকা উপভোগ করছেন, বিরাট সেই বয়সেও খেলে যাবেন। অথচ বিরাটের ফর্ম কিন্তু এবারের আইপিএলে হঠাৎ উধাও হয়েছে এমন নয়। এই সাইটেই আগে লিখেছি, কোনো ধরনের ক্রিকেটেই তিনি তেমন প্রভাব ফেলতে পারছেন না অনেকগুলো বছর হয়ে গেল।

ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড নতুন করে শুরু করার কাজটা আগেই করেছে, কারণ আইসিসি টুর্নামেন্টে বারবার ব্যর্থতা কাটিয়ে ওঠা দরকার। শাস্ত্রীর জায়গায় এসেছেন রাহুল দ্রাবিড় আর সাদা বলের অধিনায়ক করা হয়েছিল রোহিত শর্মাকে। বিরাট টি টোয়েন্টি ক্রিকেট ছাড়া অন্যগুলোর লাগাম নিজের হাতে রাখতে চেয়েছিলেন, বোর্ড সে গুড়ে বালি দিয়ে পরে টেস্ট ক্রিকেটেও রোহিতকেই নেতা করে দিয়েছে। তা রোহিতের বয়স কত? পঁয়ত্রিশ। টেস্ট ক্রিকেট কোনোদিনই রোহিতের সেরা মঞ্চ ছিল না। ন বছর আগে টেস্ট অভিষেক হলেও এতদিনে মোটে পঁয়তাল্লিশটা টেস্ট খেলেছেন, শতরান মাত্র আটটা। বিদেশে প্রথম শতরান পেলেন গত ইংল্যান্ড সফরে। তিনি আসলে সাদা বলের যম। অথচ গত ওয়ার্ল্ড টি টোয়েন্টিতে বিরাটের পাশাপাশি তিনিও ব্যর্থ হয়েছিলেন, এবার আইপিএলেও মোটেই রানের মধ্যে নেই (১৩ ম্যাচে ২৪৮ রান; গড় ২০.৪৬)। একাধিকবার আইপিএল খেতাব জয়ী মুম্বাই ইন্ডিয়ানস যে এবার পয়েন্ট টেবিলের একেবারে তলায় পড়ে আছে, তার অন্যতম কারণ রোহিতের খারাপ ফর্ম।

এ বছর ফের ওয়ার্ল্ড টি টোয়েন্টি। স্বয়ং অধিনায়ক এরকম ফর্মে থাকলে দলের অবস্থা কী হবে? উপরন্তু দলের সবচেয়ে বড় তারকা বিরাটকে দীর্ঘদিন ধরে টি টোয়েন্টির উপযোগী দেখাচ্ছে না। তিনি ইদানীং এত সাবধানে ব্যাট করছেন (বৃহস্পতিবার গুজরাট টাইটান্সের বিরুদ্ধে ৫৪ বলে ৭৩ রান করার আগে অব্দি স্ট্রাইক রেট ছিল ১১৩.৪৬), যে তিনি বড় রান করলে দলের মোট রান ভাল জায়গায় পৌঁছনো শক্ত। অথচ এই দুই তারকা থাকতে ঋতুরাজ গায়কোয়াড়, রাহুল ত্রিপাঠী, রাহুল টেওটিয়াদের মত বড় শট নিতে পারা ব্যাটারদের দলে জায়গা হবে না।

তবে ভারতীয় ক্রিকেট যে ভারত দেশটার মতই পিছন দিকে এগোতে চাইছে, তার সবচেয়ে বড় উদাহরণ এই দুজন নন। সাঁইত্রিশ বছরের কুক যদি জেঠু হন, আগামী ৭ জুলাই একচল্লিশে পা দিতে চলা মহেন্দ্র সিং ধোনি নিঃসন্দেহে পিতামহ ভীষ্ম। তাঁর যে ইচ্ছামৃত্যু, তা সেই ২০১১ সালেই প্রমাণ হয়ে গেছে। দল পরপর আটটা টেস্ট হারার পরেও ধোনির অধিনায়কত্ব যায়নি, বরং সে প্রস্তাব নির্বাচন কমিটির মিটিংয়ে তোলার পরে মোহিন্দর অমরনাথের নির্বাচকের চাকরি গিয়েছিল। ভারতের একদিনের ক্রিকেটের দলও ধোনিকে বয়ে বেড়িয়েছে বছর চারেক। স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল আর বড় শট নিতে পারেন না, অন্য প্রান্ত থেকে কেউ সে কাজটা করলে তিনি বড়জোর এক-দুই রান নিয়ে স্কোরবোর্ড সচল রাখতে পারেন, যা অনেকসময় জেতার পক্ষে যথেষ্ট নয়। তবু তাঁকে অবসর নিয়ে প্রশ্ন করলে বেজায় রেগে যেতেন। ২০১৬ ওয়ার্ল্ড টি টোয়েন্টি থেকে ভারতের বিদায়ের পর তো নির্লজ্জতার শিখরে উঠেছিলেন। এক অস্ট্রেলিয় সাংবাদিক এই প্রশ্ন করায় তাঁকে সাংবাদিক সম্মেলনের ডায়াসে ডেকে পাশে বসিয়ে জিজ্ঞেস করেছিলেন তিনি ধোনির অবসর দেখতে চান কিনা। তিনি তো আর ভারতীয় নন, যে কোনো আত্মীয় পরিজন থাকবে যে ধোনির জায়গায় খেলতে পারে।

এন শ্রীনিবাসনের থেকে ইচ্ছামৃত্যুর বর পেয়েছিলেন বলেই ধোনি একদিনের ক্রিকেট খেলতে পেরেছেন ২০১৯ বিশ্বকাপ অব্দি। অথচ ২০১৫ বিশ্বকাপের পর থেকে চার, ছয় মারার ক্ষমতা তো বটেই, গড়ও কমে গিয়েছিল। কেরিয়ারের ব্যাটিং গড় যেখানে পঞ্চাশ, সেখানে এই চার বছরের গড় নেমে এসেছিল চুয়াল্লিশে। চারে নেমে খেলতে না পারলে টিভি স্টুডিওতে বসে বিশেষজ্ঞ প্রাক্তন ক্রিকেটাররা বলতেন ধোনিকে পাঁচে খেলানো উচিত। পাঁচে না পারলে বলতেন ছয়ে। অর্থাৎ দল তাঁকে বয়ে বেড়াত। কালে ভদ্রে একটা ম্যাচে উইনিং স্ট্রোক নিলেই ফের সবাই মনে করিয়ে দিত, ধোনি সর্বকালের সেরা ফিনিশার। আর ধোনিকে এসব জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বারবার বলতেন, আগের মত অত ছয় মারেন না তো কী হয়েছে? তিনি তো ফিট আছেন। যেন খেলাটা ক্রিকেট নয়, জিমন্যাস্টিক্স।

আসলে প্রচারযন্ত্র অনুকূল হলে অনেক সমস্যা মিটে যায়। তাই ধোনি নির্বিঘ্নেই খেলে ফেলেন আরও একটা বিশ্বকাপ। কিছু বিশেষজ্ঞ আর অন্ধ ভক্ত আজও বলেন “যদি গাপ্টিলের থ্রোটা উইকেটে না লাগত…”। ভুলে যান যে ধোনি সেদিন পঞ্চাশে পৌঁছতে লাগিয়েছিলেন বাহাত্তরটা বল, মাত্র একটা চার আর একটা ছয় মেরেছিলেন। রবীন্দ্র জাদেজা ৫৯ বলে ৭৭ রান করেছিলেন বলে নিউজিল্যান্ডের জয়ের ব্যবধান আরও বড় হয়নি – এটুকুই সান্ত্বনা। নইলে শেষ ওভারে ধোনির ভেলকি দেখানোর সম্ভাবনা আরও আগেই শেষ হয়ে যেত। রাজনীতিতে প্রচারযন্ত্র অনুকূল হলে নির্বাচনের ফলাফলকে প্রভাবিত করা যায়। কিন্তু খেলার মাঠে পরিণাম বদলানো যায় না।

আরও পড়ুন টুপির আমি টুপির তুমি?

এতদিন পরে হৃদয় খুঁড়ে আবার এসব বেদনা জাগাতে হচ্ছে, কারণ এবারের আইপিএলে ধোনি ওই জাদেজাকেই হাসির পাত্র বানিয়ে ছেড়েছেন। এমনিতে চেন্নাই সুপার কিংসের মালিক শ্রীনিবাসনের কোম্পানি ইন্ডিয়া সিমেন্টসের অন্যতম ডিরেক্টর ধোনি। সুপার কিংস দলটা সে অর্থে তাঁর নিজের সম্পত্তি। যার ব্যাট, যার উইকেট তাকেই খেলতে নেব না – এ জিনিস পাড়া ক্রিকেটেই চলে না, আইপিএলে কী করে চলবে? ফলে ধোনির উইকেটরক্ষায় যতই শিথিলতা আসুক, ব্যাট হাতে ধারাবাহিকতা যতই কমে যাক, এ দলে তিনি যতদিন খেলতে চাইবেন ততদিনই খেলবেন। সমস্যা হল, তিনি কেবল খেলছেন না, খেলতে গিয়ে অন্যদের কোণঠাসা করছেন। আইপিএল শুরু হওয়ার মুখে ঘটা করে ঘোষণা করা হয়েছিল, পিতামহ অধিনায়কের সিংহাসনটি স্নেহভাজন জাদেজার হাতে ছেড়ে দিচ্ছেন। কিন্তু টুর্নামেন্ট শুরু হতেই দেখা গেল ফিল্ডিং সাজানো, বোলিং পরিবর্তন – সবকিছুতেই ধোনির কথাই শেষ কথা। জাদেজা নেহাতই রাবার স্ট্যাম্প। অবশ্য তাতেও সুপার কিংস দলের ছেড়ে দে মা কেঁদে বাঁচি অবস্থা হওয়া আটকায়নি। কিন্তু ব্যাটে, বলে ব্যর্থ জাদেজা নটা খেলার মধ্যে ছটা হারার পর অধিনায়কত্ব ছেড়ে দিতে চাইলেন। ধোনি মুকুট ফিরিয়েও নিলেন, ভবিষ্যতের কথা ভেবে ঋতুরাজ সিংয়ের মত তরুণতর কাউকে দায়িত্ব দিলেন না। তাহলে মরসুমের শুরুতে নেতৃত্ব ছেড়ে দেওয়ারই বা কী প্রয়োজন ছিল? জাদেজাও তো তেত্রিশ পেরিয়েছেন, কচি খোকাটি নন। তাঁর হাতে নেতৃত্ব তুলে দিয়ে কোন মহৎ উদ্দেশ্যসাধনের আশা ছিল? জাদেজা এই মুহূর্তে চোট-আঘাতের কারণে মাঠের বাইরে। এই টানাপোড়েনে তাঁর আত্মবিশ্বাসে চিড় ধরল কিনা তিনি মাঠে না ফেরা পর্যন্ত জানা যাবে না। যদি ধরে থাকে, তাহলে সুপার কিংসের চেয়ে বেশি ক্ষতি কিন্তু ভারতীয় ক্রিকেট দলের।

আসলে বাকি পৃথিবী সামনের দিকে তাকাতে চায়, আর আমরা চাই অতীতের গৌরবে বুঁদ হয়ে থাকতে। এ আমাদের জাতীয় চরিত্র। তাই বয়সের সঙ্গে সঙ্গে যে অতি বড় ক্রিকেটারেরও ক্ষমতা কমে আসে, আজ না কমে থাকলেও পরের বড় টুর্নামেন্টটা আসতে আসতে যে কমে যেতে পারে – এসব কথা না তাঁরা নিজেরা মানেন, না তাঁদের ভক্তকুল মানে। তারকারা আয়নায় মুখ দেখতে পান না, কারণ মুখ ঢেকেছে বিজ্ঞাপনে। ফলে ব্যাটে বলে হচ্ছে না, পা বলের লাইনে যাচ্ছে না, রিফ্লেক্স কমে গেছে, বহু বছর ধরে অতিমাত্রায় জিম করার ফলে টানা দু ঘন্টা ব্যাট করলেই পেশি ক্লান্ত হয়ে পড়ছে – এসব যখন ক্রিকেটার নিজে বুঝতে শুরু করেন, তখনো সবাই মিলে কানের কাছে বলতে থাকে “ও কিছু নয়। কদিন ব্রেক নিলেই সব ঠিক হয়ে যাবে।” এমনটাই এনডর্সমেন্টের যুগে ভারতীয় ক্রিকেটে হয়ে আসছে। যেনতেনপ্রকারেণ চল্লিশ অব্দি খেলে যাওয়ার দৃষ্টান্ত স্থাপন করে গেছেন শচীন। ধোনি ভাবলেন তিনিই বা কম কিসে? হয়ত পঁয়তাল্লিশকে পাখির চোখ করে এগোচ্ছেন। বিরাট ভাবছেন তিনি তো কোনো অংশে ধোনির চেয়ে কম যান না। রোহিত সবে অধিনায়ক হলেন, পঞ্চাশ ওভার আর কুড়ি ওভারের ক্রিকেটে তাঁরও ঝুড়ি ঝুড়ি রান আছে। তিনিই বা চল্লিশ অব্দি খেলার কথা ভাববেন না কেন? “ক্রিকেটের ঈশ্বর” তো শচীন, কুক তো নন। ফলে টেওয়াটিয়া, ত্রিপাঠীদের বেলা মেঘে মেঘেই বাড়বে।

ঋদ্ধিমান সাহার বেলায় দ্রাবিড় ভদ্রভাবে বুঝিয়ে দিয়েছিলেন এই ছেলেখেলা তিনি চলতে দেবেন না। এই ২০২২ সালেও উনবিংশ শতকের সংস্কার আন্দোলনের গন্ধে মাতাল বাঙালি তা নিয়ে বিস্তর গোল করেছিল। এবারের আইপিএলে গুজরাট টাইটান্সের ওপেনার হিসাবে ঋদ্ধিমানের সাফল্যে আবার গুঞ্জন শুরু হয়েছে। ওয়ার্ল্ড টি টোয়েন্টির দল নির্বাচনের সময়ে যদি তরুণদের সুযোগ দেওয়ার নীতি ভুলে গিয়ে তারকাদের প্রাধান্য দেওয়া হয়, তাহলে কিন্তু মানতেই হবে, পোর্টফোলিওতে যথেষ্ট পরিমাণ এনডর্সমেন্ট থাকলে ঋদ্ধিমানের বয়সও ঢেকে যেত।

*সব পরিসংখ্যান ১৯ মে, বৃহস্পতিবারের গুজরাট টাইটান্স বনাম রয়াল চ্যালেঞ্জার্স ব্যাঙ্গালোর ম্যাচ পর্যন্ত

ইনস্ক্রিপ্টে প্রকাশিত

ক্রিকেটের লুপ্তপ্রায় সৌন্দর্যের নাম উমরান

ক্রিকেটের মরশুম বদলে গেছে। আগে ক্রিকেট মরশুমের সূচনা বলতে বোঝাত অঘ্রাণ মাস। যখন সন্ধে না নামতেই শিশির পড়তে শুরু করে, গা শিরশির করে ভোরের দিকে। আর মরশুমের শেষ, যখন মাঘের শীত বাঘের গায়। মাঝের মাসগুলোতে ইডেন উদ্যানে বসত টেস্ট বা একদিনের ক্রিকেটের আসর। প্রবীণ ক্রিকেটপ্রেমীরা এখনও শোনান ভাগবত চন্দ্রশেখরের ম্যাচ জেতানো স্পেলের কথা বা সোনালি চুলের টনি গ্রেগকে প্রথম দেখার অভিজ্ঞতা। আমাদের প্রজন্মের কাছে অমূল্য স্মৃতি নয়ের দশকের মাঝামাঝি হিরো কাপের সেমিফাইনাল, ওই দশকের গোড়ায় দুর্বার গতির অ্যালান ডোনাল্ড আর অফসাইডের চিনের প্রাচীর জন্টি রোডসকে প্রথম দেখার অভিজ্ঞতা। মরশুম দীর্ঘায়িত হয়েছে অনেকদিন হল। ২০০১ সালে যেদিন অস্ট্রেলিয়ার সর্বনাশ সম্পূর্ণ হল হরভজনের হ্যাটট্রিক আর রাহুল দ্রাবিড়-ভিভিএস লক্ষ্মণের যুগলবন্দিতে, সেদিন চৈত্র মাস। অবশ্য গত শতাব্দীতেই জৈষ্ঠ্যের প্রখর তপন তাপে পাকিস্তানকে হারিয়ে ইডেন থেকে ইন্ডিপেন্ডেন্স কাপ জিতে নিয়ে গেছে অর্জুনা রণতুঙ্গার শ্রীলঙ্কা। ঠান্ডা পানীয়ের কোম্পানি টুর্নামেন্টের টাইটেল স্পনসর হলে যা হয়! এরপর আরও দুটো দশক কেটে গেছে। এখন খেলা হয় সারা বছর, আর ক্রিকেট ক্যালেন্ডারের সবচেয়ে বড় উৎসব হয়ে দাঁড়িয়েছে বিজ্ঞাপনদাতাদের প্রিমিয়ার লিগ– আইপিএল। তাই এবারও কাঠফাটা গরমে ইডেনে বসবে ক্রিকেটের আসর– আইপিএল প্লে অফ।

শুধু মরশুম নয়, খেলাটাও বদলে গেছে বিস্তর, আবিশ্ব। সারা বছর ক্রিকেটের যুগে বিশ্রামের সময় নেই, গতি আসবে কোথা থেকে? অতএব, এখন চাহিদা আস্তে বল করতে পারা জোরে বোলারের। স্লোয়ার, চেঞ্জ অফ পেস ইত্যাদি বাহারি নামের মন্থরতা আবিষ্কৃত হয়েছে। স্পিন শিল্পে শান দিয়ে আরও ধারালো হয়ে ওঠারও সময় নেই। তাই চাহিদা জোরে বল করতে পারা স্পিনারের, যার বল সাধারণত সোজা যাবে, ঘুরলেই রহস্য তৈরি হবে। শুধু কি তাই? এখন ক্রিকেট খেললে গ্লেন ম্যাকগ্রা, কোর্টনি ওয়ালশ-রা বিশেষ পাত্তা পেতেন না। কারণ তাঁরা ব্যাট করতে পারতেন না একেবারেই। এখন প্যাট কামিন্সের মতো বোলারেরও ব্যাট হাতে ম্যাচ জেতানোর ক্ষমতা থাকা দরকার। সুনীল নারিনকেও ইনিংসের শুরুতে বা মিডল অর্ডারে চার-ছক্কা হাঁকাতে জানতে হয়। অর্থাৎ, অসামান্য বোলার বা ব্যাটারের চেয়ে মাঝারি মানের অলরাউন্ডার বেশি প্রার্থনীয়।

ফলে ক্রিকেটের আদি অকৃত্রিম সম্পদ– কাঁপুনি ধরিয়ে দেওয়া ফাস্ট বোলার, যে কোনও পরিবেশে বল দু’দিকে সুইং করানোর ক্ষমতাসম্পন্ন মিডিয়াম ফাস্ট বোলার, খাঁটি লেগ স্পিন বা অফ স্পিনের রহস্যে ব্যাটারদের নাজেহাল করে দেওয়া স্পিনার, নিখুঁত ডিফেন্সসম্পন্ন এবং ছবির মত কভার ড্রাইভ মারতে পারা ব্যাটাররা ডোডোপাখি হয়ে যাচ্ছেন। কেবল কুড়ি বিশের ক্রিকেটে নয়, পঞ্চাশ ওভারের ক্রিকেটে বা টেস্টেও তাঁদের পক্ষে দলে টিকে থাকা শক্ত হচ্ছে। বরং এইসব গুণ থাকা দোষ হয়ে দাঁড়াচ্ছে অনেকের ক্ষেত্রে। ভুবনেশ্বর কুমারের মতো সুইং শিল্পীর যেমন টেস্ট কেরিয়ার বলে কিছু হলই না। কারণ প্রাক্তন ক্রিকেটার, ধারাভাষ্যকার, সাংবাদিক– সকলে সিদ্ধান্ত করে ফেললেন, এ সুইং সহায়ক পিচ ছাড়া সুবিধা করতে পারবে না। অথচ স্রেফ লম্বা, বেশি বাউন্স আদায় করতে পারেন– এই যুক্তিতে হাতে গোনা কয়েকটা বলার মতো পারফরম্যান্স নিয়েই একশো টেস্ট খেলে ফেললেন ইশান্ত শর্মা (জোরে বোলারদের মধ্যে একশোর বেশি টেস্ট খেলার পরেও উইকেট পিছু ৩২-এর বেশি গড় ইশান্ত ছাড়া কেবল জাক কালিসের, কিন্তু তিনি ব্যাট হাতে তেরো হাজার রানও করেছেন)। ব্যাট করতে পারেন বলে রবীন্দ্র জাদেজা টেস্টেও রবিচন্দ্রন অশ্বিনের মতো প্রবল শক্তিধর এবং মেধাবী বোলারের জায়গা দখল করে রাখতে পেরেছেন ম্যাচের পর ম্যাচ।

অর্থাৎ, ছোট ছোট মাঠে ঘণ্টায় ১৩০-১৪০ কিলোমিটার গতির বল আর দড়কচা ‘মিস্ট্রি’ স্পিনারদের বিরুদ্ধে পেশিবহুল ব্যাটারদের চার, ছক্কার বন্যা– এই হল আজকের ক্রিকেটোৎসব। যে দলের ব্যাটাররা ব্যর্থ হবেন, তাঁরা হারবেন। সেদিন প্রতিপক্ষের বোলারদের মনে হবে অসাধারণ, পরের দিনই হয়তো অতি সাধারণ দেখাবে। এই মরশুমে যাকে মনে হচ্ছে জিনিয়াস, পরের মরশুমেই সে ভিড়ে হারিয়ে যাবে। নামটা স্বপ্নিল অসনোদকর, পল ভালথাটি, মনপ্রীত গোনি, বরুণ চক্রবর্তী– যা খুশি হতে পারে। এমনকী, রতিতেও ক্লান্তি আসে, আর এই জিনিস দিনের পর দিন দেখতে হলে ক্লান্তি আসবে না? লাইভ সম্প্রচারের জাঁকজমক যাই-ই প্রমাণ করার চেষ্টা করুক, আইপিএল দেখতে দেখতেও দর্শকের ক্লান্তি আসে। সম্প্রচারকারী, বিজ্ঞাপনদাতা এবং আইপিএল কর্তৃপক্ষ সে কথা বিলক্ষণ জানে। তাই এবারের আইপিএলে প্রত্যেক ম্যাচে যত্ন করে দেখানো হচ্ছে, ম্যাচের দ্রুততম বলটা কে করল। সেই বোলারের জন্য এক লক্ষ টাকা পুরস্কারও থাকছে। বারবার কে পাচ্ছেন সেই পুরস্কার? ক্যারিবিয়ান দ্বীপপুঞ্জের কেউ নন, কোনো অস্ট্রেলিয়ানও নন, এমনকী নিউজিল্যান্ডের লকি ফার্গুসনও নন। পরপর ছ’টা ম্যাচে এই পুরস্কার পেয়েছেন সানরাইজার্স হায়দরাবাদের উমরান মালিক।

আগেই বলেছি, বিশ্ব ক্রিকেটে এখন যথার্থ ফাস্ট বোলার, অর্থাৎ ধারাবাহিকভাবে যে কোনো পিচে গড়ে ৯০ মাইলের (প্রায় ১৪৫ কিলোমিটার) বেশি গতিতে বল করতে পারেন এরকম বোলার বিরল। নিজেদের সেরা দিনে যশপ্রীত বুমরা আর মহম্মদ শামি পৌঁছে যান ওই গতিতে। মাঝে মাঝে নতুন বলে মিচেল স্টার্ক আর কামিন্সও পারেন। উমরান কিন্তু নিয়মিত ওই গতিতে বল করছেন, ১৫০ কিলোমিটারের গণ্ডিও পেরিয়ে যাচ্ছেন প্রায়ই। উমরানের মন্থরতম বলটাও ঘণ্টায় ১৪০ কিলোমিটারের আশপাশে থাকে। মুম্বইয়ের প্রবল গরমে এত জোরে বল করছেন কী করে? বিস্মিত হর্ষ ভোগলের এই প্রশ্নের উত্তরে উমরান বলেছেন, আমাদের জম্মুতে তো প্রচণ্ড গরমেও খেলি। ওতে কষ্ট হয় না, বরং মজা লাগে। কিন্তু গতিই শেষ কথা নয়। নইলে ব্রেট লি আর শন টেটের তফাত থাকত না। বলের লাইন, লেংথ ঠিক না থাকলে গতিময় বোলিংয়ে কোনও লাভ হয় না। উমরানের সেখানেও ভুল নেই। নেই বলেই রবিবার (১৭ এপ্রিল) পাঞ্জাব কিংসের বিরুদ্ধে শেষ ওভারে একটাও রান না দিয়ে তুলে নিতে পেরেছেন তিন-তিনটে উইকেট, টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটের ইতিহাসে প্রথমবার। ওই ম্যাচের চার উইকেট নিয়ে আইপিএলে ছ’টা ম্যাচ খেলে ন’টা উইকেট নেওয়া হয়ে গেল।

কিন্তু উমরানের আসল প্রভাব পরিসংখ্যানে ধরা পড়েনি। সত্যিকারের ফাস্ট বোলিং যা করে তার সবটা কখনওই স্কোরবোর্ডে ধরা পড়ে না। ২০১৩-‘১৪ অ্যাশেজ সিরিজে অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে মিচেল জনসন ইংল্যান্ডের কী অবস্থা করেছিলেন, তা কেবল পাঁচ টেস্টে ৩৭টা উইকেট নেওয়ার তথ্য থেকে বোঝা যাবে না। ওই বোলিং দেখলে তবেই বোঝা যায়, ইংল্যান্ডের ব্যাটাররা কেমন মরার আগেই মরে বসে থাকতেন জনসনাতঙ্কে। কেভিন পিটারসেনের মতো বড় ব্যাটার কেমন ছেলেমানুষের মতো আক্রমণাত্মক খেলতে গিয়ে বোল্ড হয়েছেন, না দেখলে বিশ্বাস করা যায় না। ক্লাইভ লয়েডের পেস চতুষ্টয়ের কোনও স্পেল দেখুন ইউটিউবে, জেফ থমসনের বোলিং দেখুন, বা কার্টলি অ্যামব্রোসের অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে এক রান দিয়ে সাত উইকেট তুলে নেওয়া দেখুন। ইডেন উদ্যানে তখনও অখ্যাত শোয়েব আখতারের পরপর দু’বলে রাহুল আর শচীন তেণ্ডুলকরকে আউট করা ফিরে দেখুন। পয়লা বৈশাখ সন্ধ্যায় উমরান কলকাতা নাইট রাইডার্স অধিনায়ক শ্রেয়স আয়ারকে বোল্ড করার পর ছেলেমানুষের মতো উল্লাস করছিলেন যিনি, সেই ডেল স্টেইনের বোলিংয়ের ভিডিও দেখুন। বুঝতে পারবেন ভয়ংকর সুন্দর কাকে বলে। এমন সৌন্দর্যের প্রতি মানুষের আকর্ষণ চিরন্তন, আর এই নেশা ধরানো সৌন্দর্যেরই মালিক উমরান।

আরও পড়ুন বেলা ফুরোতে আর বসে রইলেন না শেন ওয়ার্ন

তিনি আইপিএলের চার, ছক্কায় ঝলমলে সন্ধেবেলায় ব্যাটারদের প্রাগৈতিহাসিক জঙ্গলে প্রাণ হাতে করে বাঁচা তৃণভোজীদের স্তরে নামিয়ে আনতে পারেন। কেকেআর ম্যাচে শ্রেয়স আর আন্দ্রে রাসেলের বিরুদ্ধে তাঁর বোলিং যে কোনও ক্রিকেট-রসিকের চোখে লেগে থাকবে। শ্রেয়স বারবার লেগের দিকে সরে গিয়ে উমরানকে খেলার চেষ্টা করছিলেন। অফসাইডে সীমানার কাছাকাছি একাধিক ফিল্ডার থাকা সত্ত্বেও এই কৌশল কেন, তা ধারাভাষ্যকাররা বুঝে উঠতে পারছিলেন না। সম্ভবত, বোর্ডের সঙ্গে চুক্তিই তাঁদের বুঝতে দিচ্ছিল না। কারণ পাড়ার মাঠে টেনিস বলে ক্রিকেট খেলার অভিজ্ঞতা থাকলেও বোঝা যায় ওটা কৌশল ছিল না, ছিল আত্মরক্ষার তাগিদ। একনাগাড়ে সামান্য শর্টপিচ বল করে ব্যাটারকে ওভাবে কুঁকড়ে দিয়ে, তারপর ইয়র্কারে বোল্ড করে দিতে আমরা দেখেছি ওয়াকার ইউনিসকে। রোমাঞ্চিত হয়েছি। এই রোমাঞ্চ গত দশ বছরে বিশ্ব ক্রিকেট থেকে প্রায় উধাও হয়ে গেছে। এখনও আন্তর্জাতিক ক্রিকেট না খেলা উমরান সেই রোমাঞ্চ ফিরিয়ে দিচ্ছেন আইপিএলের মঞ্চে।

ওই গতি দর্শককে রোমাঞ্চিত করে, ক্রিকেট দেখার সাবেকি আনন্দ ফিরিয়ে আনে। কিন্তু খেলাটার জন্য কী করে? মাঝারিয়ানাকে উলঙ্গ করে দেয়, খুব ভাল ক্রিকেটার আর মহান ক্রিকেটারের তফাত গড়ে দেয়। পৃথিবীজুড়ে চার, ছয় মেরে বেড়িয়ে ভূয়সী প্রশংসা পাওয়া রাসেল যেমন শুক্রবার ওই একটি ওভারে টের পেয়ে গেলেন তিনি ভিভ রিচার্ডস তো দূরের কথা, গর্ডন গ্রিনিজেরও যোগ্য উত্তরসূরি নন। ব্যাটে-বলে করতেই বিস্তর ঝামেলায় পড়লেন, একটা বাউন্সারে তো মাথা বাঁচাতে একেবারে শুয়ে পড়তে হল। উমরান হাসলেন।

কুড়ি বিশের ক্রিকেটের মুশকিল হলো, উমরানের সৌন্দর্য তারিয়ে তারিয়ে উপভোগ করার উপায় নেই। মাত্র চব্বিশটা বল, তার ওপর সীমানা এত ছোট করা আছে যে চোখ বুজে ব্যাট ছোঁয়াতে পারলেও এক-আধটা ছয় হয়ে যায়। এখন অবধি মাত্র তিনটে প্রথম শ্রেণির ম্যাচ খেলা উমরান দিনে ১৫-২০ ওভার বল করলেও এই গতি বজায় থাকবে কি না, তা ভবিষ্যৎ বলবে। উমরানের আগুনে সৌন্দর্য আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে প্রতিপক্ষ ব্যাটারদের দগ্ধ করবে কি না, সে আলোচনাও এখন থাক। আপাতত জম্মুর ছেলের শ্বাসরোধকারী সৌন্দর্য চেটেপুটে উপভোগ করে নিন। যৌবন আর গতি, দুটোই হারিয়ে যায়। বিশেষত জম্মু, কাশ্মীরের যৌবন আগলে বসে থাকা যায় না।

ঋণ: সাহেবদের থেকে শেখা খেলা দেখার অভিজ্ঞতাকে বাংলা ক্যালেন্ডার অনুযায়ী সাজিয়ে নেওয়ার চেষ্টা অধ্যাপক অভীক মজুমদারের এক সাম্প্রতিক উত্তর-সম্পাদকীয় প্রবন্ধের প্ররোচনায়। দেখা গেল তাতে ভাষাটা বেশি কাব্যিক হল। উমরানের ক্রিকেট কাব্যময়।

ইনস্ক্রিপ্টে প্রকাশিত

%d bloggers like this: