শিক্ষক দিবসের প্রশ্ন: শিক্ষকদের বাঁচাবে কে?

কাকিমার এখন লক্ষ্মীর ভান্ডার থেকে মাসে এক হাজার টাকা পাওয়ার কথা। কিন্তু ছেলের উপর যে আশা ছিল, সে আশা পূরণ হল না।

কালের গতি রোধ করা যমেরও অসাধ্য। তাই আজ পশ্চিমবঙ্গেও শিক্ষক দিবস। নইলে যেখানে শিক্ষিকারা বিষ খেতে বাধ্য হন, সেখানে শিক্ষক দিবস বলে কিছু থাকতে পারে না। অণিমা নাথ, ছবি দাস, শিখা দাস, পুতুল মন্ডল, জোশুয়া টুডু, মন্দিরা সর্দারদের বিষ খাওয়া আসলে একটা ষড়যন্ত্র, অশান্তি সৃষ্টি করাই আসল উদ্দেশ্য ছিল — এমন অভিযোগ অবশ্য উঠেছে। [১] ওঠাই স্বাভাবিক। কৃষকরা আত্মহত্যা করলে যেমন ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দল এবং তাদের অনুরাগীরা বলে থাকে “ক্ষতিপূরণের লোভে করেছে।” কবি এমনি এমনি লেখেননি, সকল দেশের সেরা সে যে আমার জন্মভূমি। এ দেশে না জন্মালে আত্মহত্যা যে মরণোত্তর কিছু পাওয়ার লোভে করা সম্ভব এ তথ্য আপনি জানতে পারতেন? তেমনি প্রাথমিক স্কুলের কয়েকজন নগণ্য শিক্ষিকা যে একটা বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ সরকারকে অস্থির করে দেওয়ার ষড়যন্ত্রে মানববোমার মত কাজ করতে পারেন — এ-ও অন্য কোথাও থাকলে জানা কঠিন হত। তাও আবার বিস্ফোরকবিহীন মানববোমা। মানে চারপাশে আর কেউ মরবে না, কারোর কোনো ক্ষতি হবে না। কেবল শিক্ষিকা নিজে মরবেন, আর তাতেই সরকার কেঁপে উঠবে। শিক্ষক-শিক্ষিকার প্রতি আমাদের এত শ্রদ্ধা অবশিষ্ট আছে?

নেই। থাকলে ২০১৫ সালের মাদ্রাসা শিক্ষকদের অনশন আন্দোলনের কথা, ২০১৯ সালের প্যারাটিচারদের অনশনের কথা এবং স্কুল সার্ভিস কমিশনের মাধ্যমে চাকরির প্রত্যাশায় থাকা হবু শিক্ষকদের অনশনের কথা মনে থাকত। কয়েকশো শিক্ষক বা হবু শিক্ষক ওই আন্দোলনগুলোতে অনশন করেছেন, খবরের কাগজের তিনের পাতায়, বা পাঁচের পাতায়, কি সাতের পাতায় খবর বেরিয়েছে। আমরা পাতা উল্টাতে গিয়ে হয়ত খেয়ালও করিনি। ছন্দা সাহার মৃত্যু (২০১৫) [২], রেবতী রাউতের মৃত্যু এবং তাপস বরের ব্রেন স্ট্রোক নিয়ে বিতর্ক (২০১৯) [৩] তৈরি হলে কখনো সখনো একটু হৈ চৈ হয়েছে। তারপর যে কে সেই। গত দশ বছরে এ রাজ্যে যে কোন আন্দোলনের প্রতি সরকারি উদাসীনতা এবং সামাজিক উদাসীনতার কারণে (শুধু সরকার কেন? আন্দোলনের ‘আ’ শুনলেই কারণ জানার বিন্দুমাত্র চেষ্টা না করে আমরাও কি অভিসম্পাত দিই না?) সব ধরনের আন্দোলনকারী ভেবে নিতে বাধ্য হয়েছেন, জীবনের ঝুঁকি না নিলে সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করা যাবে না। তাই কেবল শিক্ষক, হবু শিক্ষকরা নয়, ডাক্তাররাও এই পর্বে অনশনের রাস্তা বেছে নিয়েছেন। বিষ খাওয়ার চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে এক দিনে পৌঁছানো হয়নি।

এ রাজ্যে শিক্ষক-শিক্ষিকারা কেমন আছেন খোঁজ নিতে গেলে প্রথমেই বিরাট অর্থনৈতিক বিভেদ চোখে পড়ে। স্কুলশিক্ষার সঙ্গে যুক্ত স্থায়ী চাকরি করা শিক্ষক-শিক্ষিকাদের অবস্থা যথেষ্ট সচ্ছল, অভিযোগের অবকাশ বলতে মহার্ঘ ভাতা নিয়ে রাজ্য সরকারের নিয়ে টালবাহানা। কিন্তু সেই অভিযোগ সমস্ত রাজ্য সরকারি কর্মচারীরই রয়েছে, কেবল তাঁদের নয়। চুক্তির ভিত্তিতে কাজ করা প্যারাটিচারদের অবস্থা এর বিপরীত। তাঁরা মাস গেলে তেরো হাজার টাকার আশেপাশে মাইনে পান। প্রভিডেন্ট ফান্ড, প্রফেশনাল ট্যাক্স ইত্যাদি কেটে এগারো হাজার টাকার মত হাতে আসে, যোগ্যতা যা-ই হোক, অভিজ্ঞতা যত বছরেরই হোক। নিয়োগের শর্ত অনুযায়ী তাঁদের দায়িত্ব ছিল ক্লাসের পিছিয়ে পড়া ছাত্রছাত্রীদের যত্ন নেওয়া, স্কুলছুট ছাত্রছাত্রীদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে স্কুলে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করা। অথচ স্কুল সার্ভিস কমিশনের মাধ্যমে নিয়োগ যেহেতু বন্ধ, তাই স্কুলগুলোতে শূন্য পদের অভাব নেই, ফলত কাজের চাপ যথেষ্ট। অতএব স্কুল কর্তৃপক্ষ অনন্যোপায়। প্যারাটিচাররা পুরো সময়ের শিক্ষক-শিক্ষিকাদের সমান ক্লাস নিচ্ছেন, সমানে সমানে পরীক্ষার খাতাও দেখছেন। এমনকি, গোড়ায় কথা ছিল সপ্তাহে তিনদিন তাঁরা কাজ করবেন। তা অবস্থা বিশেষে ছদিনই হয়ে দাঁড়িয়েছে। অর্থাৎ কাজ বেশি, মাইনে কম — প্যারাটিচারদের জন্য এটাই নিয়ম।

কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রেও একইরকম বিভাজন তৈরি হয়েছে। পুরো সময়ের অধ্যাপনা শুরু করেই যেখানে হাজার পঞ্চাশেক টাকা মাইনে পাওয়া যাচ্ছে, বছরের পর বছর আংশিক সময়ের অধ্যাপক (যাঁদের এখন বলা হয় State Aided College Teacher — SACT) হয়ে থাকা নেট/স্লেট পাশ করা পিএইচডি অধ্যাপক, অধ্যাপিকারাও অভিজ্ঞতা অনুযায়ী পঁচিশ থেকে পঁয়ত্রিশ হাজার টাকায় আটকে আছেন। কলেজের মর্জি মাফিক কোথাও কোথাও আরও কম। কলেজ সার্ভিস কমিশনের নিয়োগও অনিয়মিত। ফলে কলেজ চালানোর ক্ষেত্রে কিন্তু বড় ভূমিকা পালন করেন SACT-রা। অথচ ওঁদের পদগুলো, পরিভাষায়, নোশনাল। মানে কোনো SACT কোনো কারণে বিদায় নিলে তাঁর জায়গায় নতুন লোক পাওয়া যাবে না।

পশ্চিমবঙ্গে শিল্প নেই বহু বছর, কর্মসংস্থানের অভাব বর্তমান সরকারের আমলেই তৈরি হয়েছে এমন বললে নিতান্ত অন্যায় হবে। কলেজ সার্ভিস কমিশনের নিয়োগ নিয়ে বামফ্রন্ট আমলেও বিস্তর ডামাডোল ছিল। কিন্তু দীর্ঘ অভাবের তালিকার পাশে যা ছিল, তা হল লেখাপড়া শিখতে পারলে এবং এসএসসি পরীক্ষায় পাশ করলে শিক্ষকতার চাকরির নিশ্চয়তা। বাম আমলেই একসময় স্কুলের চাকরির নিয়োগে স্থানীয় স্তরে দুর্নীতির প্রচুর অভিযোগ উঠত। টাকা নিয়েই হোক অথবা নেতার সাথে পরিচিতি বা আত্মীয়তার সুবাদে যোগ্য প্রার্থীর বদলে অযোগ্য শিক্ষক, শিক্ষিকা নিয়োগ করা হচ্ছে — এমনটা কান পাতলেই শোনা যেত। স্কুল সার্ভিস কমিশন চালু হওয়ার পর ছবিটা বদলে গিয়েছিল। কতটা বদলেছিল? আমার পাড়ায় চপ ভাজেন এক কাকিমা; কাকুর ছোট দোকান ছিল। তাঁদের বড় ছেলে এম এ পড়ছিল। বছর কয়েক আগে একবার চপ কিনতে গিয়েছি, কাকিমা বড় মুখ করে বললেন “এরপর এসএসসিটা পাস করলে মাস্টারি পাবে। আমাদের সংসারটা দাঁড়িয়ে যাবে।” সেই এসএসসি আর তার দেওয়া হয়নি, কারণ পরীক্ষাটাই হয়নি। কাকিমার এখন লক্ষ্মীর ভান্ডার থেকে মাসে এক হাজার টাকা পাওয়ার কথা। কিন্তু ছেলের উপর যে আশা ছিল, সে আশা পূরণ হল না। ছেলে এখন কাকিমাকে ব্যবসায় সাহায্য করে। এইভাবেই কি ভবিষ্যতের শিক্ষক, শিক্ষিকা পাব আমরা?

এমন মনে করার কারণ নেই, যে পুরো সময়ের শিক্ষক-শিক্ষিকারা খুব ভাল আছেন। মাস গেলে মাইনেটা পেলেই মাস্টাররা খুশি, আর কিছু নিয়ে তারা ভাবে না। এমনিতেই একগাদা ছুটি পায়, অতিমারির ফলে তো আরও মজা হয়েছে। শিক্ষক, শিক্ষিকাদের সম্বন্ধে এমন ভাবনা সাম্প্রতিককালে বেশ জনপ্রিয় হয়েছে। ফাঁকিবাজ পৃথিবীর সব পেশায়, সব কালে, সব দেশে থাকে। কিন্তু নিজের ধারণা নিয়ে বসে না থেকে শিক্ষক, শিক্ষিকাদের সাথে কথা বললে বোঝা যায় তাঁরা সুখে নেই।

মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিক বাতিল হয়ে যাওয়ার পর এক শিক্ষকের সাথে কথা হচ্ছিল। তিনি বললেন, পরীক্ষা বাতিল হয়ে যাওয়া খুবই দুঃখের। কিন্তু লেখাপড়াটা ঠিক করে হয়েছিল কি? অধিকাংশ স্কুলে শিক্ষক অপ্রতুল, এদিকে পড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে হাজারটা কাজ চেপেছে তাঁদের ঘাড়ে। সরকারের কল্যাণমূলক প্রকল্পের কাজকর্ম অনেকটাই তাঁদের করতে হয়। করতে গিয়ে পড়ানোর সময় কাটছাঁট হয়। আরও বললেন, পশ্চিমবঙ্গে গত দশ বছরে যে হারে জনসংখ্যা বেড়েছে, সে হারে মাধ্যমিক পরীক্ষার্থী বাড়েনি। কাগজে, টিভিতে ছাত্রীর সংখ্যা বাড়া নিয়ে উল্লাস হয়, কিন্তু ছাত্রের সংখ্যা যে কমে যাচ্ছে সে কথা কেউ বলে না। এই ছাত্ররা যাচ্ছে কোথায়? তাঁর মতে লেখাপড়া ছেড়ে দিয়ে জীবিকার সন্ধানে চলে যাচ্ছে। তাঁর আশঙ্কা, এই প্রবণতা অতিমারীর প্রকোপে আরও বেড়ে গেল। একেই দারিদ্র্য বেড়ে যাওয়া এবং বছর দুয়েক স্কুল বন্ধ থাকার কারণে অনেক ছাত্রীর বিয়ে হয়ে যাচ্ছে বলে বিভিন্ন সমীক্ষায় উঠে আসছে। ওই শিক্ষকের আশঙ্কা, এরপর যখন স্কুল খুলবে তখন দেখা যাবে স্কুলছুট ছাত্রের সংখ্যাও পাল্লা দিয়ে বেড়ে গেছে।

উনি যা বলেননি, তা হল সরকারি বাংলা মাধ্যম স্কুলে ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা গত দশ-পনেরো বছর ধরেই কমছে। গ্রামাঞ্চলের কথা জানি না, শহর ও শহরতলি এলাকায় তার একটা বড় কারণ বেসরকারি ইংরেজি মাধ্যম স্কুলের প্রতি মধ্যবিত্ত, উচ্চবিত্ত বাবা-মায়েদের পক্ষপাত। এর প্রভাবে কোথাও কোথাও ছাত্রসংখ্যা এমনভাবে কমছে, যে স্বয়ং বিদ্যাসাগর প্রতিষ্ঠিত স্কুলও উঠে যেতে বসেছিল বছর দুয়েক আগে। ইংরেজি মাধ্যম করে দিয়ে বাঁচানো হয়েছে। [৪] বাংলা মাধ্যম অনেক স্কুলকেই ইংরেজি মাধ্যম করে বাঁচানোর চেষ্টা রাজ্য সরকার করছেন। বাঁচছে কিনা বুঝতে আরও কয়েক বছর লাগবে, কিন্তু ওই রুগ্ন স্কুলগুলোর মাস্টারমশাই, দিদিমণিদের নিশ্চিন্ত থাকার দিন গিয়েছে। কারণ ১৯৯১-এর পর থেকে শিক্ষার বেসরকারিকরণের সঙ্গে সঙ্গেই এ কথা প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে যে শিক্ষা (স্বাস্থ্যের মতই) আরও একটা ব্যবসা। আর রুগ্ন ব্যবসা যে রাখতে নেই তা কেন্দ্র বা রাজ্য, কোনো সরকারই অস্বীকার করে না। ফলে আজকের পাকা চাকরি মানেই আর কালকের পাকা চাকরি নয়।

মুশকিল হল, পঞ্চাশ হাজার, ষাট হাজার, এমনকি এক-দেড় লাখ টাকা খরচ করে যেসব ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে বাবা-মায়েরা ছেলেমেয়েদের ভর্তি করছেন, সেখানকার শিক্ষক-শিক্ষিকারা অনেকেই ভদ্রজনোচিত মাইনে পান না। স্কুল মালিক কোটিপতি হচ্ছেন, অথচ মাস্টাররা যে তিমিরে সেই তিমিরেই। ব্যাঙের ছাতার মত গজিয়ে ওঠা বেসরকারি কলেজগুলোতে যাঁরা পড়ান, তাঁদের অবস্থাও তথৈবচ। সরকারি সাহায্যপ্রাপ্ত কলেজের আংশিক সময়ের শিক্ষকদের কথা উপরে বলেছি। একই যোগ্যতার অনেকে মাসে পনেরো-কুড়ি হাজার টাকা বেতনে বেসরকারি কলেজগুলোতে পড়িয়ে থাকেন। কেউ কেউ আবার ক্লাস পিছু টাকা পান। কত পাবেন, কেমনভাবে পাবেন তা অনেক ক্ষেত্রেই কলেজ কর্তৃপক্ষের মেজাজ মর্জির উপর নির্ভর করে। বেসরকারি স্কুল এবং হাসপাতালের খরচ আকাশছোঁয়া হয়ে যাওয়ার সমস্যা নিয়ে মাঝেমধ্যেই সংবাদমাধ্যমে হইচই হয়। মুখ্যমন্ত্রী বরাভয় নিয়ে আবির্ভূত হন, কাউকে ধমকে, কাউকে বাবা বাছা করে বুঝিয়ে অভিভাবকদের উপর চাপ কমাতে বলেন। কিন্তু মাস্টারদের মাইনে কোনো আলোচনার বিষয় হয় না। অবশ্য সরকারের বেতনভুক যে মাস্টাররা, তাঁদের আর্থিক দাবিদাওয়াই যখন কুকুরের ঘেউ ঘেউয়ের সঙ্গে তুলনীয় হয়ে দাঁড়ায়, তখন বেসরকারি স্কুল, কলেজের শিক্ষকরা কার কাছে কী আশা করবেন?

২০১৮ সালে জগদ্বিখ্যাত টাইম পত্রিকা আমেরিকার পাবলিক স্কুলগুলোর মাস্টারদের পারিশ্রমিক নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল। ওঁদের অবস্থা এত সঙ্গীন, যে একজন বলেছেন তিনি দিন গুজরান করার জন্য একসাথে তিনটে কাজ করেন, উপরন্তু ব্লাড প্লাজমা দান করেন।[৫] পৃথিবীর সবচেয়ে খারাপ দৃষ্টান্তটা দেখিয়ে নিজেদের তার চেয়ে উন্নত প্রমাণ করায় আমরা ভারতীয়রা ওস্তাদ। অতএব সে প্রতিবেদন তুলে ধরে পশ্চিমবঙ্গের শিক্ষক-শিক্ষিকাদের ভাগ্যনিয়ন্তারা বলতেই পারেন, “আমরা অনেক ভাল রেখেছি।” সত্যিই তো। মাস্টারদের নিয়ে সরকারের তো বিশেষ মাথা ঘামানোর দরকার নেই। কী পড়ানো হবে, কেন পড়ানো হবে — সেসব কর্পোরেট জগত ইতিমধ্যেই ঠিক করতে শুরু করেছে, আগামী দিনে আরও করবে। যে শিক্ষা কর্পোরেটের কাজে লাগে না, তা যে শিক্ষাই নয় — সে ব্যাপারে ঐকমত্য শিগগির তৈরি হয়ে যাবে। কদিন পর আপনি নিজেই বলবেন, আপনার সন্তানের ছবি আঁকা, খেলাধুলো করা, গান গাওয়া, সাহিত্য পড়া বা ভাল করে অঙ্ক শেখাও তত জরুরি নয়, যত জরুরি কোডিং শেখা। আর সেটা করতে কড়া বা স্নেহময় মাস্টারমশাই, দিদিমণি লাগে না। লাগে একটা অ্যাপ। যাদের অ্যাপ নেই তারা শিখবে না। মিটে গেল।

শিক্ষক দিবসে দাঁড়িয়ে ভয় হচ্ছে, শেরনি ছবিতে যেমন ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে মানুষের কুকর্মের ফলে একসময় বাঘ দেখতে মিউজিয়ামে যেতে হবে, শিক্ষক-শিক্ষিকাদেরও না সেই অবস্থা হয়।

তথ্যসূত্র:

১) হিন্দুস্তান টাইমস
২) ওল্ড ইন্ডিয়া টুমোরো
৩) সংবাদ প্রতিদিন
৪) আনন্দবাজার পত্রিকা
৫) টাইম ডট কম

https://nagorik.net এ প্রকাশিত

তালিবান শাসন: ঘর হতে শুধু দুই পা ফেলিয়া

এ দেশের শাসকরা তালিবান নন। কারণ তাঁরা অনেকেই গড়গড়িয়ে ইংরেজি বলতে পারেন। উচ্চশিক্ষিত বলেই পাঠ্যের দিকে সজাগ দৃষ্টি।

খুব আতঙ্কে কাটছে আমাদের। পাশেই আফগানিস্তানে তালিবান ক্ষমতায় ফিরে এসেছে। ভীষণদর্শন বন্দুকধারীদের ছবি, মানুষের প্রাণপণ পালানোর ছবি আমরা টিভি, খবরের কাগজ অথবা সোশাল মিডিয়ার কল্যাণে দেখছি। আফগান মানেই বর্বর, অথবা মুসলমানরা ওরকমই হয় — এরকম ভাবনার লোকেরা একরকম শান্তি পাচ্ছেন। কিন্তু রবীন্দ্রনাথের ‘কাবুলিওয়ালা’ মনে পড়লে অশান্তি দ্বিগুণ। আফগানিস্তানের মানুষ, বিশেষ করে মহিলাদের কথা ভেবে ঘুম উড়েছে। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ কেবল ‘কাবুলিওয়ালা’ লেখেননি। লিখেছিলেন “বহু দিন ধরে বহু ক্রোশ দূরে/ বহু ব্যয় করি বহু দেশ ঘুরে/ দেখিতে গিয়েছি পর্বতমালা/ দেখিতে গিয়েছি সিন্ধু।/ দেখা হয়নি চক্ষু মেলিয়া/ ঘর হতে শুধু দুই পা ফেলিয়া/ একটি ধানের শিষের উপরে/ একটি শিশির বিন্দু।” এই লাইনগুলো স্মরণ থাকলে আতঙ্কিত হওয়ার জন্য আফগানিস্তান দেখার প্রয়োজন নেই। তালিবান যা যা করে থাকে তার প্রায় কোনোটাই এ দেশে ঘটতে বাকি নেই।

তারা যখন নব্বইয়ের দশকে প্রথম ক্ষমতায় আসে, তখন থেকেই এ কথা বলে অনেকে প্রবল নিন্দার মুখে পড়েছেন। বামিয়ানের বুদ্ধ মূর্তি ভেঙে ফেলা গর্হিত কাজ, কিন্তু বাবরি মসজিদ ভেঙে ফেলা ঐতিহাসিক অন্যায়ের প্রতিকার — এমন ব্যাখ্যাই চিৎকৃত প্রতিষ্ঠা পেয়েছে। কারণ তালিবান কাজটা করেছিল ক্ষমতায় এসে, বাবরি ভেঙেছিল ‘স্বতঃস্ফূর্ত জনতা’। এখন সেই স্বতঃস্ফূর্ত জনতাই দেশের ভাগ্যনিয়ন্তা। নেশন কী চায় তারাই জানে। সেই চাহিদা অনুযায়ী এডিট করা ভিডিও ক্লিপ জুগিয়ে দেয় ক্ষমতাসীন দলের আই টি সেল, পুলিস তার ভিত্তিতেই সত্য মিথ্যা যাচাই না করে মানুষকে হাজতে পুরে দেয়, সে পচতে থাকে ইউএপিএ আইনে। শরিয়তি আইনের অবিচার এর চেয়ে আর কত বেশি?

তবু এ দেশের শাসকরা তালিবান নন। কারণ তাঁরা অনেকেই গড়গড়িয়ে ইংরেজি বলতে পারেন। উচ্চশিক্ষিত বলেই পাঠ্যের দিকে সজাগ দৃষ্টি। তাই রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস নিয়ে মহাশ্বেতা দেবীর গল্প বাতিল করেন, দলিত লেখক বামা এবং সুখরথারিনিও বাতিল হন। এঁরা গান নিষিদ্ধ করে লোকসঙ্গীত গায়ককে হত্যা করেন না, অপছন্দের লেখা সরিয়ে দেন। সে কালের জার্মানির মত বই পোড়ানোও শুরু হয়ে গেছে। আমেদাবাদের বইয়ের দোকানে ঢুকে বাৎস্যায়নের ‘কামসূত্র’ পুড়িয়ে হুমকি দেওয়া হয়েছে, আবার এসব বই পাওয়া গেলে দোকানই জ্বালিয়ে দেওয়া হবে। আফগানিস্তানে তালিবরা যেটাকে ইসলাম বলে সেটাই ইসলাম। ভারতেও এখন সঙ্ঘ যাকে হিন্দুধর্ম বলে সেটাই হিন্দুধর্ম। তাই বাৎস্যায়নও হিন্দু সংস্কৃতি বিরুদ্ধ।

আরও পড়ুন সাহিত্য ও সাংবাদিকতা অপ্রিয় সত্য ছাড়া বৃথা

তালিবান নেতারা সগর্বে বলে, মেয়েদের কাজকর্ম, লেখাপড়া করতে হলে ইসলামের নির্দেশ মেনে বোরখা পরে বাইরে বেরোতে হবে। ইসলামে ঠিক কী বলা আছে তা তর্কসাপেক্ষ, কিন্তু তালিবানি শাসনে তাদের মুখের কথাই আইন। এ দেশে এখনো ১৯৫০ সালের সংবিধান চালু আছে বটে, কিন্তু মহিলাদের জীবনসঙ্গী নির্বাচন, জামাকাপড়ের মাপ, মোবাইল ফোন ব্যবহার, এমনকি চাউমিন খাওয়ার অভ্যাসেও যে সংস্কৃতির বারোটা বাজছে — তা বহুবার পরিষ্কার করে দিয়েছে সঙ্ঘ পরিবার। স্বয়ং মোহন ভাগবত প্রকাশ্যেই বলে থাকেন, মেয়েদের কাজ ঘর সামলানো। উত্তরপ্রদেশের দাসনার মন্দিরের মহন্ত যতি নরসিংহানন্দের ছাপার অযোগ্য ভাইরাল বিষোদ্গারে মহিলাদের সম্পর্কে ভাবনায় তালিবান-সঙ্ঘ ঐকমত্য পরিষ্কার। এখন বিজেপি এই ঘোর মুসলমান বিদ্বেষী লোকটিকে জিহাদি আখ্যা দিচ্ছে, কিন্তু তিনি দীর্ঘদিন ধরে কপিল মিশ্রর মত গুরুত্বপূর্ণ নেতার ঘনিষ্ঠ।

আর হত্যা? গোবিন্দ পানসারে, নরেন্দ্র দাভোলকর, গৌরী লঙ্কেশদের কথা আমাদের মনে নেই। আরও অদরকারি আখলাক আহমেদ, পেহলু খানের মত অসংখ্য গণপিটুনির শিকারদের স্মৃতি। কারণ তাঁরা গরুর অবমাননার অভিযোগে অভিযুক্ত। গত পরশু এলাহাবাদ হাইকোর্টের এক বিচারপতি তো বলেই দিয়েছেন, গরুকে জাতীয় পশু ঘোষণা করে তার মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করার জন্য আইন দরকার। গরুর কল্যাণ হলেই দেশের কল্যাণ হবে।

আশা করা যায় তালিবান সরকার শুয়োরের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করার আগেই ভারত সরকার বিচারপতির স্বপ্ন সত্যি করবেন।

উত্তরবঙ্গ সংবাদে প্রকাশিত

সেলিব্রিটি কাল্ট দরদী সিপিএমকে খোলা চিঠি

শিখেছিলাম যে কমিউনিস্ট শহিদের বেদিতে মালা দিতে গেলেও যোগ্যতা অর্জন করতে হয়। পার্টি সদস্যের সে যোগ্যতা আছে, আমার নেই।

আমার খ্যাতি নেই, ইউটিউব চ্যানেল নেই, পোষ্য জীবজন্তুও নেই। পাড়ার কুকুরকে মাঝে মধ্যে উচ্ছিষ্ট খেতে দেওয়া ছাড়া পশুপ্রেমিক হিসাবে আমার কোনো কীর্তি নেই। আমি রেড ভলান্টিয়ার নই, সিপিএম দলের সদস্য নই, কোনোদিন ছিলাম না, ভবিষ্যতেও হব বলে মনে হয় না। অতএব যা লিখছি তা না লিখলেও কিছু এসে যেত না। তবু লিখছি একেবারে ব্যক্তিগত মন্দ লাগার কারণে। সব পক্ষকে সমান চোখে দেখার দায় এ লেখায় আমি নিচ্ছি না, নিতে চাইছি না। সেই কারণেই নাগরিক ডট নেটে এ লেখা লিখব না ভেবেছিলাম। ফেসবুক দেয়ালে লেখাই সমীচীন হবে মনে করছিলাম। কিন্তু সম্পাদকমণ্ডলীর অন্য সদস্যরা বললেন, আমরা ব্যক্তিগত অনুভূতিকে আগেও জায়গা দিয়েছি এই মঞ্চে, এবারেও দেব।

২০০০ সালে ভোটাধিকার পেয়েছি, তারপর থেকে সিপিএমকেই ভোট দিয়ে আসছি। সেই দল জেলেপাড়ার সঙেদের দলে পরিণত হলে খারাপ লাগে। সেই খারাপ লাগার কারণেই কিছু অপ্রিয় কথা এখানে বলব।

পশ্চিমবঙ্গের ভদ্রলোক পরিসরে বরাবর দেখেছি, রাজনৈতিক পরিবার বলে একটা কথা খুব চালু। অরাজনৈতিক পরিবার বলে কিছু হয় কিনা জানি না, তবে দেখেছি সাধারণভাবে ওই শব্দবন্ধ দিয়ে বোঝানো হয় এমন পরিবারকে, যাদের একাধিক সদস্য এক বা একাধিক রাজনৈতিক দলের সদস্য। ধরেই নেওয়া হয়, ওই পরিবারের লোকেরা অন্যদের চেয়ে রাজনীতিটা বেশি বোঝে। অন্যদের চেয়ে রাজনৈতিক ব্যাপারে মতামত দেওয়ার অধিকার একটু বেশি, সে নিজে রাজনীতির ধারে কাছে না গেলেও। এই ধারণার পিছনে আদৌ কোনো যুক্তি নেই, আছে পরিবারতন্ত্রের প্রতি সুপ্ত ভালবাসা। ভারতে এই ভালবাসা সকলেরই অল্পবিস্তর আছে, বদনাম শুধু গান্ধীরা কুড়োয়। সেই কারণে স্বাধীনতার পর থেকে কমিউনিস্ট দলগুলো ছাড়া প্রায় সব বড় রাজনৈতিক দলের নেতৃত্বই কোনো না কোনো পরিবার কুক্ষিগত করেছে। কমিউনিস্টদের মধ্যে ব্যাপারটা ঘটেনি মানে বুঝতে হবে, ব্যক্তিগতভাবে যে যা-ই মনে করুক, অমুকের ছেলে বা তমুকের মেয়ে পরিচয়কে নেতা হওয়ার যোগ্যতা বলে স্বীকৃতি দেয়নি এই দলগুলো। এখনো দেয় না, কিন্তু আমার মতে সিপিএমের সাম্প্রতিক খিল্লিযোগ্য কার্যকলাপগুলোর কারণ হল পার্টির শুভানুধ্যায়ীদের পারিবারিক অতীতকে অত্যধিক গুরুত্ব দেওয়া।

ক্ষমতা চলে যাওয়ার পরের দশ বছরে সিপিএমের সমস্ত স্তরে এটা ব্যাধিতে পরিণত হয়েছে। সিপিএমের সেলিব্রিটি সমর্থকরা বলে থাকেন “আমার বাবা-মাকে ছোট থেকে দেখেছি লাল পতাকা নিয়ে…” ইত্যাদি। কেউ বলেন লাল পতাকার সঙ্গে তাঁর নাড়ির টান, তাই তিনি সিপিএম সমর্থক। এসব খুবই পবিত্র আবেগ সন্দেহ নেই। কিন্তু মুশকিল হল, সাধারণত এই উচ্চমধ্যবিত্ত বা উচ্চবিত্ত পার্টি দরদিরা মনে করেন, তাঁর বাবা জেল খেটেছিলেন বলে তিনি নিজেই একজন বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ হয়ে ওঠার ক্ষমতা ধরেন। রাজনীতি ব্যাপারটা যে অত সহজ নয়, উপরন্তু কমিউনিস্ট পার্টির রাজনীতি, সেটা এঁদের অনেকেরই বোধগম্য হয় না। অথচ গত দশ বছরে সিপিএম দল এঁদের বিপুল গুরুত্ব দেওয়া শুরু করেছে। বিখ্যাত মানুষদের বাম প্রীতি অন্যায় তো নয়ই, অভিনবও নয়। পৃথিবীর সমস্ত কমিউনিস্ট পার্টির জন্মলগ্ন থেকে শিল্পী, সাহিত্যিকদের সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক। অনেকে একেবারে সদস্য হয়েছেন, অনেকে বাইরে থেকে সমর্থন করেছেন। অনিল চ্যাটার্জির মত জনপ্রিয় অভিনেতা তো সিপিএমের হয়ে নির্বাচনেও দাঁড়িয়েছেন। কিন্তু গত কয়েক বছরে দেখছি শ্রীলেখা, বাদশা, রাহুল, কমলেশ্বররা সিপিএমের মুখ হয়ে দাঁড়িয়েছেন। অনিল চ্যাটার্জির সময়েও কিন্তু জ্যোতি বসু, বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যরাই মুখ ছিলেন। এখন পার্টি কলেবরে কমেছে, আর নেতারা পার্টি দরদি আর পার্টি সদস্যের তফাত করতে ভুলে গেছেন। নিজেদের মুখগুলো মানুষের পছন্দ নয় বুঝেই কিনা কে জানে, বিখ্যাত দরদি পেলেই প্রবল আগ্রহে জড়িয়ে ধরছেন, তাঁর জনপ্রিয়তাকে ব্যবহার করার চেষ্টা করছেন। ফলে কেরিয়ারের মধ্যগগনেও সঠিক অর্থে তারকা হতে ব্যর্থ অভিনেত্রী সিপিএমের স্টার ক্যাম্পেনার হয়ে রাজ্য চষে বেড়াচ্ছেন। টিভি চ্যানেলের বিতর্কে সিপিএমের হয়ে বলতে যাচ্ছেন বাদশা মৈত্র বা কমলেশ্বর মুখোপাধ্যায়। ব্রিগেডের মঞ্চেও তাঁরা যারপরনাই গুরুত্ব পাচ্ছেন। এত গুরুত্ব পেলে আমার আপনারও মনে হতে বাধ্য, আমি একজন দারুণ গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব এবং দলটা আমার পৈতৃক সম্পত্তি। দলের কর্মীদের চেয়ে আমি কোনো অংশে কম নই, তাদের সাথে আমি যেমন ইচ্ছা ব্যবহার করতে পারি।

শুধু সেলিব্রিটি নয়। মূলত পারিবারিক ইতিহাসের কারণে সিপিএম সমর্থক বা একদা পার্টির কোনো সংগঠনের সাথে যুক্ত ছিলেন, তাই ভালবেসে এখনো মোটা টাকা চাঁদা দেন — এরকম অনেক দরদিকেই সিপিএম নেতৃত্ব প্রয়োজনের চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্ব দেন। সিপিএমের যেসব সিদ্ধান্ত ভুল ছিল বলে পার্টির নথিতে পর্যন্ত স্বীকার করা হয়েছে, সেগুলোও ঠিক ছিল বলে এঁরা ফেসবুকে ঝগড়া করে বেড়ান, শোনা যায় সোশাল মিডিয়া স্ট্র‍্যাটেজি ইত্যাদিও এঁরা ঠিক করেন। টুম্পা প্যারডি নিয়ে যখন পক্ষে-বিপক্ষে নানা কথা হচ্ছে, এক সিপিএম বন্ধুকে আমার মন্দ লাগা জানাতে ফোন করেছিলাম। তার কাছে শুনলাম “ওটা তো পার্টি বানায়নি, বানিয়েছে পার্টিকে ভালবাসে এরকম কিছু ছেলেপুলে।” তারপর দেখলাম মহম্মদ সেলিম, শতরূপ ঘোষের মত নেতারা ওই প্যারডির সপক্ষে অনেককিছু বলেছেন। প্যারডিটা ভাল ছিল কি মন্দ ছিল সে প্রশ্ন আর নতুন করে তুলছি না। বলছি এটা যা প্রমাণ করে, তা হল হয় পার্টি নিজের কাজ দরদিদের আউটসোর্স করে দিয়েছে, অথবা দরদিরা ভালমন্দ যা-ই করুক, পার্টি তার পক্ষ নিচ্ছে। এত বিরাট হৃদয় কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্বের হওয়া উচিত কিনা সেটা বোধহয় ভেবে দেখা প্রয়োজন।

দরদিরা নিশ্চয়ই রেগে যাচ্ছেন। একটু বিস্তারিত বলি। দরদ খারাপ নয়, যদি তা দাবিহীন হয়। কমিউনিস্ট পার্টির নানারকমের দরদি থাকে। আমি যাদের কথা বলছি, তাদের কতকগুলো সামান্য লক্ষণ আছে। ১) পরিবারের কেউ অবিভক্ত সিপিআই বা সিপিএম করতেন, ২) অর্থনৈতিকভাবে অত্যন্ত সচ্ছল, পার্টিকে আর্থিকভাবে সাহায্য করেন নিয়মিত বা মাঝে মাঝে, ৩) সিপিএমের সমালোচনাও করেন, কিন্তু যেগুলো পার্টির দোষ বলে উল্লেখ করেন, সেগুলো শোধরালে সিপিএম উন্নততর কংগ্রেস বা তৃণমূল হবে। উন্নততর কমিউনিস্ট পার্টি নয়। ৪) সোশাল মিডিয়ায় সিপিএমের বিরুদ্ধে কেউ কিছু বললেই তাকে বিজেপি বা তৃণমূল বলে দেগে দিতে দেরি করেন না। হয়ত যার উপরে ঝাঁপিয়ে পড়েছেন তার পার্টির জন্যে আত্মত্যাগ বেশি। কিন্তু সোশাল মিডিয়ায় পার্টির বিরুদ্ধ মত প্রচার আটকানোর পবিত্র দায়িত্ব কাঁধে তুলে নেওয়ার পর অত আগুপিছু দেখার সময় থাকে না।

এই ধরনের দরদিরা মনে করেন যেহেতু এঁরা সিপিএমকে ভালবাসেন এবং সাধ্যমত সাহায্য করেন, অতএব এঁদের মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া এবং পরামর্শ অনুযায়ী চলা সিপিএমের কর্তব্য। অর্থাৎ সিপিএম একটি কোম্পানি আর এঁরা তার শেয়ার হোল্ডার। এই দরদিদের ভুল অচিরেই ভেঙে যেত, যদি পার্টির আচরণ তেমন হত। কিন্তু পার্টিও বোধহয় নিজেকে কোম্পানি হিসাবেই দ্যাখে। তাই দরদিদের সঙ্গে কর্মীদের বিবাদে চুপ করে থাকে, নয়ত বিপ্লবী নেতা তন্ময় ভট্টাচার্যের মত দরদিকে সান্ত্বনা দিয়ে বলে, “তুমিও একটা ভুল করেছ… আমাকে জানাতে পারতে….” ইত্যাদি।

তবে এই দোষে কেবল রাজ্য স্তরের নেতারা দুষ্ট এমন বললে মিথ্যে বলা হয়। সিপিএম পার্টিটা ভাল, জ্যোতিবাবু লোকটা ভাল নয়। বুদ্ধবাবু মানুষটা ভাল, কিন্তু পার্টি ওঁকে কাজ করতে দিল না। এই বাক্য দুটো শুধু বাজারি প্রোপাগান্ডা নয়, ব্যাখ্যা হিসাবে অমার্কসিয়ও বটে। সিপিএমের উপর, নীচ সর্বত্রই কর্মীর গুরুত্ব কমিয়ে দরদির গুরুত্ব বাড়িয়ে ফেলা হয়েছে। উদাহরণ দিই।

সাতই নভেম্বর সকালে বাজারে যাচ্ছি। পার্টির এক শহিদের বেদির সামনে নভেম্বর বিপ্লব দিবস উদযাপন হচ্ছে, জনা পাঁচেক পার্টি সদস্য রয়েছেন। আমাকে দেখে এক তরুণ পার্টিকর্মী যোগ দিতে বললেন। দাঁড়িয়ে পড়লাম। সামান্য বক্তৃতা হল, তারপর শহিদবেদিতে মাল্যদান। পার্টি সদস্যরা দিচ্ছেন, হতবুদ্ধি করে দিয়ে আমার হাতেও তুলে দেওয়া হল মালা। পথচারীদের মধ্যে থেকে আমাকেই যে ডাকা হয়েছিল তার একমাত্র কারণ এই এলাকায় সিপিএম দলকে নিজের পায়ে দাঁড় করিয়েছিলেন যাঁরা, তার মধ্যে আমার প্রয়াত পিতা একজন। আমি তাঁর কাছে শিখেছিলাম যে কমিউনিস্ট শহিদের বেদিতে মালা দিতে গেলেও যোগ্যতা অর্জন করতে হয়। পার্টি সদস্যের সে যোগ্যতা আছে, আমার নেই। বুঝলাম এই তরুণ কর্মীটিকে তা শেখানো হয়নি। আশপাশে যে প্রবীণরা ছিলেন তাঁদের কাকু, জেঠু বলি। তাঁরাও চাইছেন আমি দিই।

মনে শহিদের প্রতি অশ্রদ্ধা নেই বলে দিয়েই ফেললাম। কিন্তু তাতে রাজনীতির ফাঁকিবাজিটা আড়াল হয় না। আসলে সারা বছর ধরে পাড়ার রিকশা চালকদের বোঝানো হয়নি নভেম্বর বিপ্লব কী এবং কেন? দরকারের সময় একজন পরিচিত দরদিকে ডেকে নেওয়া হল। অর্থাৎ পার্টিকে ব্রাহ্মসমাজে পরিণত করা হয়েছে। আদর্শ প্রগতিশীল, উদ্দেশ্য মহৎ। কিন্তু তা নিয়ে সভা-সমিতি, উপাসনা করব আমরা ভদ্রলোকেরা। ওরা ওসবের কী বুঝবে?

প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে এখনো গরীব মানুষ সিপিএম করেন জানি। কিন্তু সব মিলিয়ে সিপিএম হয়ে দাঁড়িয়েছে মধ্যবিত্তের, মধ্যবিত্তের জন্য, মধ্যবিত্তের দ্বারা চালিত পার্টি। ফলে এখন পার্টিকর্মীকে কুকুরের উপর হিংস্রতার অজুহাতে কেউ দল বেঁধে পিটিয়ে গেলেও কমিউনিস্টদের বিখ্যাত (এবং কুখ্যাত) পার্টিজানশিপ বোতাম আঁটা জামার নীচে শান্তিতে শয়ান। সংগঠন বাড়ানোর কী হবে তা কেউ ভাবছে না। ভাবছে কী করে সেলিব্রিটি দরদি বাড়ানো যায়। বিজেপি ফেরত হলেও চলবে।

দরদির উপরে কর্মীকে স্থান না দিলে সিপিএমের নিস্তার নেই।

https://nagorik.net এ প্রকাশিত

হারানো অধিকারবোধ ও আমাদের স্বাধীনতা

সরকারগুলো অমানবিক, সাধারণ মানুষের কথা ভাবে না — শুধু এটুকু বিপদ নয়। বিপদ আরও বড় এই জন্যে, যে বিরোধীরাও বিশেষ ভাবিত নন।

রাত পোহালেই স্বাধীনতা দিবস। স্বর্ণ নয়, রৌপ্য নয়, একেবারে হীরক জয়ন্তীর সূচনা। স্বাধীনতা মানে প্রথমত অধিকার। স্বাধীন ভারতের সংবিধানে নাগরিকদের যতগুলো মৌলিক অধিকার স্বীকার করা হয়েছে তার মধ্যে একটা হল মতপ্রকাশের স্বাধীনতার অধিকার। এই অধিকারের মধ্যে কী কী পড়ে তা বলা আছে সংবিধানের ১৯ নম্বর অনুচ্ছেদে। সেই অনুচ্ছেদের (১)(ডি) বলছে অন্যতম অধিকার হল “to move freely throughout the territory of India”। অর্থাৎ ভারতের সীমানার মধ্যে স্বাধীনভাবে চলে ফিরে বেড়ানোর অধিকার। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে তর্কাতর্কি গত কয়েক বছরে এক মুহূর্তের জন্যও থামেনি সঙ্গত কারণেই। কিন্তু কবিতা লেখার অধিকার, ব্যঙ্গ করার অধিকার, সভা সমিতি করার অধিকার নিয়ে যত আলোচনা হয়েছে তার এক শতাংশও স্বাধীনভাবে চলে ফিরে বেড়ানোর অধিকার নিয়ে হয়নি। অথচ ২০২০ সালের মার্চ মাসের পর থেকে দেশের সবচেয়ে বেশি মানুষ এই অধিকারটাই হারিয়েছেন।

এ কথা ঠিক যে পৃথিবীর সব দেশেই বিশেষ প্রয়োজনে নাগরিক অধিকার খর্ব করা হয়, সংবিধানেই তার বিধান থাকে। প্রয়োজনটা যদি কোরোনা অতিমারির মত হয়, তাহলে বলা চলে অধিকার খর্ব করা হয়েছে নাগরিকেরই কল্যাণার্থে। পৃথিবীর সব দেশে একসময় লকডাউন হয়েছে, ভারতেও হয়েছে। সব দেশের নাগরিকের চলা ফেরা করার অধিকারই খর্ব করা হয়েছে, এ দেশের নাগরিকরাই বা ব্যতিক্রম হবেন কেন? সেই সময়ে লকডাউনের বিকল্প কিছু ছিল কিনা তা প্রকৃতপক্ষে ডাক্তার, ভাইরোলজিস্ট, জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের আলোচনার বিষয়। কিন্তু দেড় বছর হতে চলল, সকলের চলে ফিরে বেড়ানোর সম্পূর্ণ অধিকার কেন ফেরত এল না, তা নিয়ে ঝড় ওঠা উচিত। উঠছে না কারণ ঝড় তুলতে পারেন যাঁরা, জনপরিসরে আলোচনার বিষয়গুলো আসলে নির্ধারিত হয় যাঁদের মর্জিতে, তাঁরা চলে ফিরে বেড়ানোর অধিকারের গুরুত্ব উপলব্ধি করছেন না। ওই অধিকারটা না থাকলে যে কাজের অধিকার থাকে না, এমনকি বেঁচে থাকার অধিকারটাও অবলুপ্ত হয় — তা বোঝার মত দুর্গতি তাঁদের হচ্ছে না। পশ্চিমবঙ্গে লোকাল ট্রেন পুরো দমে না চললে অসুবিধা কোথায়, তা তিনি বুঝবেন না, যাঁর নিজের গাড়ি আছে। তিনি দিব্যি অফিস যাচ্ছেন, অসুবিধা বলতে বাড়তি যানজট, আর পেট্রোলের দাম আকাশছোঁয়া হওয়ায় পকেটের উপর বাড়তি চাপ। তিনি সেই বাদাম বিক্রেতাকে চেনেন না, যার সংসার চলত তারকেশ্বর-হাওড়া লোকাল ট্রেনে বাদাম, ছোলা, মটর বিক্রি করে। চলছে না বলে কোভিডের প্রথম ঢেউয়ের সময়েই আত্মহত্যা করেছেন। ল্যাপটপ আর বাড়িতে ওয়াই-ফাই কানেকশন থাকলেই আমার অর্থ উপার্জন হয়, মাসের শেষে প্রাপ্য টাকা ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে জমা পড়ে। আমাকে রোজ কোন্নগর থেকে কলকাতা যেতে হয় না। হাতের মোবাইলের মাধ্যমে কলকাতা বা ক্যানকুন — যেখানে ইচ্ছা পৌঁছে যেতে পারি এক নিমেষে। আমি কী করেই বা বুঝব বড়বাজারের শাড়ির দোকানে হাজার পনেরো টাকা মাইনেয় কাজ করা প্রতিবেশীর নিত্যযাত্রা কি অসহনীয় হয়ে উঠেছে শহরতলির ট্রেন না থাকায়? মুশকিল হল, কেন্দ্র আর রাজ্য — দুই সরকারই আমার সরকার, আমি তাদের রাজনৈতিক বিরোধী হলেও। আর দুটোর কোনোটাই সেই বাদাম বিক্রেতার সরকার নয়, আমার প্রতিবেশীর সরকারও নয়। তাঁরা বিজেপি এবং তৃণমূলকে ভোট দিয়ে থাকলেও নয়। অতএব রাজ্যসভার অধিবেশন থেকে বিরোধীদের মার্শালের বাহুবল প্রয়োগ করে বহিষ্কার করা ভুল নয় — অন্তত এই মিথ্যাটুকু কেন্দ্রীয় সরকারকে বলতে হয়। লোকাল ট্রেন বন্ধ রাখা অন্যায় নয় — রাজ্য সরকারকে এ কথা প্রমাণ করতে হয় না।

সরকারগুলো অমানবিক, সাধারণ মানুষের কথা ভাবে না — শুধু এটুকু বিপদ নয়। বিপদ আরও বড় এই জন্যে, যে বিরোধীরাও যে ১৯(১)(ডি) লঙ্ঘন নিয়ে বিশেষ ভাবিত নন। কোনো বিরোধী নেতার মুখে শোনা গেছে কথাটা? পরপর কয়েকদিন শহরতলির বিভিন্ন স্টেশনে সাধারণ মানুষ স্টাফ স্পেশালে উঠতে দেওয়ার দাবিতে রেল অবরোধ করেছেন, টিভিতে দেখানো হয়েছে, কাগজে ছাপা হয়েছে। তারপর বিধিনিষেধের মেয়াদ ফুরোবার দিন এগিয়ে এলে মুখ্যমন্ত্রী বা কোনো উচ্চপদস্থ আধিকারিক যথারীতি জানিয়ে দিয়েছেন অমুক তারিখ পর্যন্ত লোকাল ট্রেন বন্ধই থাকবে, কেবল স্টাফ স্পেশাল চলবে। কারণ লোকাল ট্রেন চালু হলেই সংক্রমণ মাত্রা ছাড়াবে। এর প্রতিবাদে পশ্চিমবঙ্গের কোনো বিরোধী দল রাজ্যব্যাপী আন্দোলন গড়ে তুলেছে? কোনো রাজনৈতিক দলের উদ্যোগে সারা রাজ্যে রেল রোকো হয়েছে? স্বতঃস্ফূর্ত অবরোধগুলোর পাশে থাকার বার্তা দিয়ে সাউন্ড বাইট ছাড়া আর কিছু পাওয়া গেছে কোনো দলের নেতৃবৃন্দের থেকে?

লক্ষ্মী ছেলের মত নতুন বিধিনিষেধের তালিকা প্রকাশ করা ছাড়া পশ্চিমবঙ্গের সংবাদমাধ্যমও বিশেষ কিছু করেনি। সঙ্গে অবধারিতভাবে প্রকাশিত হয়েছে এই মুহূর্তে কত জোড়া লোকাল ট্রেন চলছে তার ফিরিস্তি। টিভির পর্দায় দেখানো হয়েছে ট্রেন, বাসের বাদুড় ঝোলা ছবি। যিনি রোজ বেরোচ্ছেন না, কর্মক্ষেত্রে যেতে গিয়ে স্বাভাবিকের দ্বিগুণ ভাড়া গুনছেন না, স্টাফ স্পেশালে উঠে জরিমানা গুনছেন না — তিনি স্বভাবতই ভাববেন ট্রেনও চলছে, লোকেও চড়ছে। বরং লোকে কোনো বিধিনিষেধ না মেনে যাতায়াত করছে দেখে উষ্মা প্রকাশ করবেন।

দুঁদে সাংবাদিকদের দিন গিয়েছে। সে আমল হলে হয়ত এতদিনে একটা তদন্তমূলক প্রতিবেদন বেরোত — ট্রেন বন্ধ থাকায় পেট্রোল, ডিজেল বেশি বিক্রি হওয়ার ফলে রাজস্ব খাতে রাজ্য সরকারের কতটা মুনাফা হচ্ছে। অথবা জরিমানা আদায় করে কতখানি লাভবান হচ্ছে কেন্দ্রীয় সরকারের অধীন রেল। আশ্চর্যের কথা, মুখ্যমন্ত্রীর হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসার প্রতিভা সম্পর্কে ওয়াকিবহাল ঝানু সম্পাদকরাও আমাদের জানাতে পারছেন না, ট্রেন কমিয়ে ভিড় বাড়ালে সংক্রমণ কমবে — একাধারে সমাজবিজ্ঞান ও প্রকৃতিবিজ্ঞানের এই অসামান্য সূত্রটি মুখ্যমন্ত্রীর নিজের আবিষ্কার, নাকি তাঁর কোনো অপরিহার্য অফিসারের মস্তিষ্কপ্রসূত।

নাগরিক অধিকারের কথা থাক। যে সংবাদমাধ্যমকে নিজের পিঠ বাঁচাতে হয়, সে আর নাগরিক অধিকারের প্রশ্ন তুলবে কী করে? কিন্তু সরকারের ভালর জন্যও তো এইসব প্রশ্নের উত্তর আমাদের জানা দরকার। আমরা তো গত তিরিশ বছরে শিখেই গেছি, সরকার যদি কোনোভাবে আয় বাড়াতে পারে, তার চেয়ে বড় সুখবর কিছু নেই। সরকার চালানো আর ব্যবসা চালানোর মধ্যে তেমন কোনো তফাত নেই। দুটো কাজেই ঠিক তা-ই করা উচিত যাতে আয় হয়, মুনাফা বাড়ে। তা যদি জানা যায় অল্প ট্রেন চালালে সরকারের আয় বাড়ছে, তাতে আপত্তি করার মত আহাম্মক কে আছে ভূভারতে?

লোকাল ট্রেন তো তবু মাঝে পুরো মাত্রায় চালু হয়েছিল, গত দেড় বছর যে টানা স্কুল-কলেজ বন্ধ, তাতে কি কেউ আপত্তি করেছে? যারা অনলাইন ক্লাস করছে, তাদের তো লেখাপড়া দিব্যি চলছে। যারা করতে পারছে না, তারা পরের ছেলে পরমানন্দ। যত গোল্লায় যায় তত আনন্দ। কিছু মাস্টারমশাই, দিদিমণি, শিক্ষাবিদ কিছুদিন হল বারবার বলে চলেছেন অবিলম্বে স্কুল খোলা দরকার। গ্রামাঞ্চলে ড্রপ আউট চড়চড় করে বাড়ছে, গরীব পরিবারের পড়ুয়া মেয়েদের বিয়ে দিয়ে দেওয়া হচ্ছে। দীর্ঘস্থায়ী ক্ষতি হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু কে শোনে কার কথা? মাস্টাররা বসে বসে মাইনে পায়, কোনো কাজ করে না, কিচ্ছু জানে না — এই সিদ্ধান্ত বহুদিন আগেই হয়ে গিয়েছিল। অতএব এদের কথা শুনে হবেটা কী? স্কুল কলেজ থাক তালাচাবি বন্ধ। মাঝে মাঝে শিক্ষক-শিক্ষিকাদের স্কুলে যেতে বলো, ওঁরা সরকারের শ্রীবৃদ্ধির কাজগুলো করে আসুন, তাহলেই যথেষ্ট। ভারত বা পশ্চিমবঙ্গের চেয়ে অনলাইন ক্লাস করার সামর্থ ইউরোপের ছেলেমেয়েদের অনেক বেশি, পরিকাঠামোও নিঃসন্দেহে অনেক ভাল। অথচ সেখানে স্কুল খুলেছে। কোথাও কোথাও প্রয়োজন হলে ফের বন্ধ করা হয়েছে। কিন্তু স্কুল খুলেছে, ছেলেমেয়েরা স্কুলে গেছে। গ্রেট ব্রিটেনে স্কুল খুলেছে এ বছর মার্চ মাসে, ফ্রান্সে মে মাসে। অথচ পৃথিবীর বৃহত্তম সংসদীয় গণতন্ত্রে শোনা যাচ্ছে অক্টোবরে স্কুল খুলবে। ইতিমধ্যে কোভিডের তৃতীয় ঢেউয়ের ভ্রুকুটি। দ্বিতীয় ঢেউয়ে অক্সিজেনের অভাবে যে কারো মৃত্যু ঘটেনি সে কথা সরকার জানিয়েছে, কিন্তু ইতিমধ্যে হাসপাতালের সংখ্যা বা ভেন্টিলেটরের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে কিনা জানায়নি। সুতরাং তৃতীয় ঢেউ থেকে নাগরিকদের বাঁচাতে হয়ত আবার বের করা হবে লকডাউন নামক কুমিরছানা। স্কুল, কলেজ আবার চলে যাবে বিশ বাঁও জলে।

এই সমস্যার ক্ষেত্রেও কেবল সরকারী ঔদাসীন্য সমস্যা নয়। স্কুল, কলেজ খোলার দাবিতে সিপিএমের ছাত্র সংগঠন পথে নেমেছে সবে মাত্র। এতদিন কোথায় ছিলেন? অন্যদের কথা না বলাই ভাল। রাজ্যের প্রধান বিরোধী দলের এসব ছোটখাটো ব্যাপার নিয়ে মাথা ঘামানোর বোধহয় সময় নেই, ওঁরা দেশ চালাতে ব্যস্ত।

স্কুল কি তবে আর খুলবে না? লোকাল ট্রেন কি তবে পুরো শক্তিতে আর চলবে না? তা কেন? মুখ্যমন্ত্রী কাউকে নিরাশ করেন না। স্কুল, কলেজ যেমন পুজোর পর খুলতে পারে বলে আশা দিয়েছেন; তেমনি কলকাতা, হাওড়া, দুই ২৪ পরগণা, হুগলী আর বীরভূমের অর্ধেক মানুষের টীকাকরণ হয়ে গেলেই সকলের জন্য লোকাল ট্রেন চলবে বলে আশ্বাস দিয়েছেন। ২০১১ জনগণনার ভিত্তিতে অনুমান করা যায়, এখন এই জেলাগুলোর সম্মিলিত জনসংখ্যা চার কোটির আশেপাশে [১]। মুখ্যমন্ত্রী অর্ধেক মানুষ বলতে শিশুদেরও বুঝিয়েছেন কিনা জানা নেই, শিশুদের টীকাকরণ কবে থেকে চালু হবে, তার অপ্রতুলতা বড়দের টীকার চেয়ে বেশি হবে না কম হবে দেবা ন জানন্তি। সব মিলিয়ে তাঁর কথার অর্থ দাঁড়ায় এই ছটা জেলার অন্তত দু কোটি মানুষ দু ডোজ ভ্যাক্সিন পেলে তবে লোকাল ট্রেনের চলাচল স্বাভাবিক হবে[২]। জুলাই মাসের শেষ সপ্তাহ পর্যন্ত পাওয়া পরিসংখ্যান অনুযায়ী ভারতের মাত্র ১০ শতাংশ মানুষ এ পর্যন্ত ভ্যাক্সিনের দুটো ডোজই পেয়েছেন। তাহলে মুখ্যমন্ত্রী কথিত ছটা জেলার এতগুলো মানুষের দুটো ডোজই পেতে কতদিন লাগবে? হিং টিং ছট প্রশ্ন এসব মাথার মধ্যে কামড়ায়। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে ফ্যাসিবাদ না থাকলেও, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা থাকলেও সাংবাদিক সম্মেলনে জিজ্ঞেস করা যায় না। মুখ্যমন্ত্রী অবশ্য স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে বলেছেন তিনি চেষ্টা করবেন যেন টীকাকরণের গতি বাড়ে। কিন্তু মুখ্যমন্ত্রী তো ভাল করেই জানেন দেশে ভ্যাক্সিনের অপ্রতুলতার কথা। তিনি নিজেই প্রধানমন্ত্রীকে চিঠি লিখে অভিযোগ করেছেন বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলোকে বেশি ভ্যাক্সিন দেওয়া হচ্ছে, পশ্চিমবঙ্গ বঞ্চিত। [৩]তাহলে ট্রেন চালু করার জন্য এই প্রায় অসম্ভব লক্ষ্যমাত্রা স্থির করা কেন? বিশেষত নিজেই যখন বারবার বলছেন রাজ্যে সংক্রমণ এখন কম?

আসলে সবটাই অব্যবস্থা ঢাকার নিষ্ফল প্রয়াস নয় কি? পৃথিবীর যেসব দেশে স্কুল, কলেজ খুলেছে বা সাধারণ জনপরিবহণ খুলে গেছে, সেই দেশগুলো আসলে যথাসময়ে পর্যাপ্ত সংখ্যক নাগরিকের টীকাকরণ করেছে। ফলে অতিমারীর বিপদ নিয়ন্ত্রণে এনে তবেই জনজীবন স্বাভাবিক করা হয়েছে। ভারতে সে ব্যবস্থাই করা হয়নি। কেন্দ্রীয় সরকারের তেমন কোনো সদিচ্ছাই দেখা যায়নি। ২০২১ ডিসেম্বরের মধ্যে সকলে ভ্যাক্সিন পেয়ে যাবে — এই প্রতিশ্রুতি যে পূরণ হবার নয়, তা নরেন্দ্র মোদীও জানেন। পূরণ করা উদ্দেশ্যও নয়। কারণ তাহলে সত্যিই বিনামূল্যে বহু মানুষকে টীকা দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হয়। কিন্তু ওই যে, সরকার আমার। মানে আমার মত যারা কয়েকশো টাকা খরচ করে বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় ভ্যাক্সিন নিতে পারে। আমার বাড়ির পরিচারিকার মত যাঁরা পারেন না, তাঁদের অনন্তকাল অপেক্ষা করতে হবে। মানতেই হবে এই ব্যবস্থায় তেমন কিছু করার ক্ষমতা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেই। কেন্দ্রীয় সরকারের তৈরি নিয়ম অনুযায়ী রাজ্য সরকার মোট উৎপাদিত ভ্যাক্সিনের মাত্র ২৫% সরাসরি কিনতে পারে [৪]। কিন্তু তাহলে সাত পাঁচ না ভেবে এ বছর জানুয়ারি মাসে সকলকে বিনামূল্যে টীকা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন কেন [৫]? ওই ঘোষণার পিছনে তাহলে নাগরিকের বেঁচে থাকার অধিকার ছিল গৌণ, জুমলার খেলায় সমানে সমানে টক্কর দেওয়াই ছিল আসল কথা?

স্বাধীনতার হীরক জয়ন্তীর আরম্ভে দাঁড়িয়ে আসলে বোঝা যাচ্ছে, আমাদের অধিকারের ধারণাগুলোই গুলিয়ে গেছে। নইলে যে দেশের শিশুরা জন্মেই বিনামূল্যে ভ্যাক্সিন পাওয়ার অলিখিত অধিকার পেত, সে দেশে বিনামূল্যে ভ্যাক্সিন দেওয়া নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি হয়ে ওঠে কী করে?

অধিকারবোধ হারিয়েও কি স্বাধীন থাকা যায়?

তথ্যসূত্র:

১। https://www.indiacensus.net/states/west-bengal

২। https://www.indiatoday.in/diu/story/ten-percent-of-india-adults-are-fully-vaccinated-so-far-1833391-2021-07-27

৩। https://www.deccanherald.com/national/east-and-northeast/bjp-ruled-states-getting-more-vaccines-than-bengal-mamata-tells-pm-modi-1016569.html

৪। https://scroll.in/article/994606/state-governments-can-purchase-only-25-of-vaccines-belying-centres-claim-of-equitable-policy

৫। https://www.thestatesman.com/bengal/mamata-banerjee-promises-free-covid-19-vaccine-west-bengal-citizens-1502945668.html

https://nagorik.net এ প্রকাশিত। ছবি ইন্টারনেট থেকে।

পেগ্যাসাসের বিপদ নিয়ে গণসচেতনতা না বাড়ালে সর্বনাশ, বলছেন পরঞ্জয়

বোঝা দরকার যে প্রথমত, ব্যক্তিগত গোপনীয়তার অধিকার (right to privacy) লঙ্ঘিত হয়েছে, যা তোমার মৌলিক অধিকার। দ্বিতীয়ত, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা।

পেগ্যাসাস স্পাইওয়্যার দিয়ে সারা পৃথিবীর বহু দেশের রাষ্ট্রনেতা, বিরোধী নেতা, মানবাধিকার কর্মী, বিজ্ঞানী এবং সাংবাদিকের ফোন হ্যাক করা হয়েছে বলে সতেরোটা সংবাদমাধ্যমের করা তদন্তে জানা গেছে। এই ঘটনা ভয়ানক এই জন্যে যে পেগাস্যাস নির্মাতা সংস্থা এনএসও-র বক্তব্য তারা কোনো দেশের সরকারের অনুমতিক্রমে সরকারি সংস্থাগুলোকেই কেবল এই সফটওয়্যার বিক্রি করে থাকে। তাহলে যে ভারতীয়দের নাম পেগ্যাসাসের তালিকায় পাওয়া গেছে, তাদের উপর কি ভারত সরকারই বিদেশী সংস্থার সাহায্যে নজরদারি চালিয়েছে? এ প্রশ্নের কোনো সন্তোষজনক উত্তর এখনো পাওয়া যায়নি। বরং এই আন্তর্জাতিক তদন্তকে ষড়যন্ত্র বলে উড়িয়ে দেওয়ার প্রয়াস দেখা গেছে সরকারের তরফে। অন্যদিকে বিরোধীরা রুষ্ট, সংসদ সরগরম। এ নিয়ে বিশদে জানতে নাগরিক ডট নেট কথা বলল বিশিষ্ট সাংবাদিক পরঞ্জয় গুহঠাকুরতার সঙ্গে। ভারতের যে সাংবাদিকদের নাম পেগ্যাসাসের তালিকায় ছিল এবং যাঁদের ফোন হ্যাক হয়েছে বলে অভিযোগ, পরঞ্জয়বাবু তাঁদের অন্যতম।

আপনি ইতিমধ্যেই বলেছেন, মার্চ মাসে যখন ফরবিডন স্টোরিজের পক্ষ থেকে সন্ধ্যা রবিশঙ্কর যখন আপনার কাছে এ ব্যাপারে প্রথম আসেন, তখন থেকেই আপনি ফোন ট্যাপ হয়েছে এ ব্যাপারে মানসিকভাবে তৈরি ছিলেন। কারণ ফোন ট্যাপিং কোনো নতুন ব্যাপার নয়। তাহলে এই পেগ্যাসাস কাণ্ডের অভিনবত্ব কী, সেটা যদি একটু বুঝিয়ে বলেন।

সত্যি কথা বলতে কি ফোন ট্যাপ হতে পারে, এ আমি বহু বছর ধরে জানি। আমার যে বন্ধুবান্ধবরা ভারত সরকারের গোয়েন্দা বিভাগ-টিভাগে কাজ করে, তারা আমাকে অনেকদিন আগেই বলেছে যে, আমাদের কাজই এই। আমাদের মাঝে মাঝেই সাংবাদিকদের ফোন ট্যাপ করতে বলা হয়, আমরা নিরুপায়। তবে আমার ফোন যে সত্যিই ট্যাপ করা হচ্ছে, বলা চলে সেইটা আমি এইবার জানতে পারলাম। এবার এই ঘটনার নতুনত্ব কোথায় বলি।

আমি প্রায় সাড়ে চার বছর আগে একটা বেশ দামি আইফোন কিনি। তখন আমার স্ত্রীকে হাসতে হাসতে বলেছিলাম, দ্যাখো, এখন থেকে আমি যেখানেই যাই না কেন, আমার দপ্তরটা আমার সঙ্গে থাকবে। কারণ আইফোন থেকে সব কাজ করা যায়। এবং সেইসময় বলা হচ্ছিল, আইফোনের মত সুরক্ষা কোনোকিছুতেই পাওয়া যায় না। হোয়াটস্যাপ বা সিগনাল কি টেলিগ্রামের উপরেও গুপ্তচরবৃত্তি করা যায়, কিন্তু এ এমন একটা যন্ত্র অ্যাপল বানিয়েছে, যা হ্যাক করা যায় না। কিন্তু এখন বুঝতে পারছি, অ্যাপল যতই টাকাপয়সা নিক, পেগ্যাসাস সেসব ভেদ করেও ঢুকে যেতে পারে। আমাদের এই কথাবার্তা শুনে নিতে পারে, আমার ফোনে হয়তো পাঁচ হাজার লোকের নাম, ঠিকানা, ফোন নম্বর, ইমেল আই ডি আছে। সেইসব জেনে নিতে পারে, হোয়াটস্যাপ বা সিগনালের কয়েক হাজার মেসেজ পড়তে পারে, ফোনের সমস্ত ছবি এবং ভিডিও পেয়ে যেতে পারে। সুতরাং ফোন ট্যাপিংয়ের থেকে এটা অনেক বেশি ভয়ঙ্কর।

কিন্তু ফোন ট্যাপিং যদি আগেও হয়ে থাকে, তাহলে আমাদের গণতন্ত্রের পক্ষে পেগ্যাসাস কাণ্ড কেন আলাদা করে ভয়ঙ্কর?

এটা ঠিকই যে ফোন ট্যাপিং প্রাচীন ব্যাপার। কর্ণাটকের এক সময়ের মুখ্যমন্ত্রী রামকৃষ্ণ হেগড়েকে এই অভিযোগের মুখে পদত্যাগ করতে হয়েছিল, তামিলনাড়ুর একদা মুখ্যমন্ত্রী এম জি রামচন্দ্রনের বিরুদ্ধে, মহারাষ্ট্রের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী এ আর আন্তুলের বিরুদ্ধেও এই অভিযোগ উঠেছিল, এমনকি জ্ঞানী জৈল সিং রাষ্ট্রপতি থাকার সময় সন্দেহ করতেন যে প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধীর লোকেরা তাঁর ফোনে আড়ি পাতছে। এই কিছুদিন আগেও তো রাজস্থানে শচীন পাইলটের অনুগামী বিধায়করা অভিযোগ করছিলেন যে মুখ্যমন্ত্রী অশোক গেহলত তাঁদের ফোনে আড়ি পাতছেন। পেগ্যাসাসে নতুন হল এর মাত্রাটা। একটা ইজরায়েলি কোম্পানির বানানো এই একটা সফটওয়্যার দিয়ে শুধু সাংবাদিক নয়, রাজনৈতিক নেতা, নির্বাচন কমিশনার, সিবিআই কর্তা, ভীমা কোরেগাঁও কেসের অভিযুক্তরা, এমনকি সর্বজনশ্রদ্ধেয় ভাইরোলজিস্ট ডঃ গগনদীপ কাং — এতজনের ফোনের উপর নজরদারির চেষ্টা হয়েছে। দলাই লামার উপদেষ্টারাও তালিকায় আছেন। আলাদা নাগা রাষ্ট্রের দাবিদার নেতাদের সাথে এক দিকে ঢাকঢোল পিটিয়ে মিটিং করা হয়েছে, আবার তাদের ফোন ট্যাপও করা হয়েছে। রাফালে কোম্পানির প্রতিনিধির ফোনও এই তালিকায়। এরকম ব্যাপক নজরদারি আগে কখনো হয়নি।

আপনি নিজে ইন্টারনেট স্নুপিং নিয়ে কাজ করেছেন। সিরিল স্যামের সাথে মিলে ফেসবুক সম্বন্ধে বইও লিখেছেন। ফেসবুক কীভাবে সরকারের প্রোপাগান্ডা মেশিনারি হিসাবে কাজ করে তা দেখিয়েছেন। সেই প্রেক্ষিতে আপনার কি মনে হয় যে স্পাইওয়্যার দিয়েই হোক আর সোশাল মিডিয়ার মাধ্যমেই হোক, নাগরিকদের উপর নজরদারির ঘটনা সরকারের রাজনৈতিক মতাদর্শ নির্বিশেষে, আজকের দুনিয়ায় অনিবার্য?

এ নিয়ে অনেকেই বেশ কয়েক বছর ধরেই অনেকে লেখালিখি করছেন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের খুব নামকরা একজন অধ্যাপক শোশানা জুবভ খুব মোটা একটা বই লিখেছেন The Age of Surveillance Capitalism নামে। সেই আলোচনা থেকে যা বেরিয়ে আসে, তা হল এটা পুঁজিবাদের নতুন রূপ। আজ সারা বিশ্বে গোটা পাঁচেক বড় বড় কর্পোরেশন আছে। যেমন ফেসবুক, সঙ্গে হোয়াটস্যাপ আর ইন্সটাগ্রাম; অ্যালফাবেট অর্থাৎ গুগলের নানারকম প্রোডাক্ট ও পরিষেবা, যার মধ্যে পড়ে ইউটিউব, তার উপর বেশিরভাগ মোবাইল ফোনের অপারেটিং সিস্টেম, মানে অ্যান্ড্রয়েড। এই দুটো সংস্থা ছাড়া আছে অ্যামাজন, মাইক্রোসফট। এরা পৃথিবী জুড়ে মনোপলি চালায়। যেমন তুমি কী কিনছ, কী বিক্রি করছ তার উপর অ্যামাজনের একচেটিয়া আধিপত্য আছে। এই কোম্পানিগুলো ক্রেতা বা গ্রাহকদের উপর মনোপলির সুবাদে এক ধরনের শোষণ চালাচ্ছে কিনা তা নিয়ে মার্কিন দেশে অনেক মামলা চলছে, জো বাইডেনের সরকারও তদন্ত চালাচ্ছে। দেখা যাক কী হয়। যে ভদ্রমহিলা এখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ফেডেরাল ট্রেড কমিশনের (FTC) শীর্ষে আছেন, লীনা খান, তিনি যখন ওকালতি পড়াতেন সেই সময় একটা অসাধারণ পেপার লিখেছিলেন অ্যামাজন সম্বন্ধে। তাতেও প্রায় একই কথা ছিল। বলা হয়েছিল, একমাত্র সরকারের পক্ষেই সম্ভব এই কর্পোরেশনগুলো যেন সাধারণ মানুষকে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করতে না পারে তা নিশ্চিত করা।

ফ্রান্সে ইতিমধ্যেই পেগ্যাসাস কাণ্ডকে জাতীয় নিরাপত্তা সংক্রান্ত বিষয় বলে গণ্য করে তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, অথচ ভারত সরকার তো এখনো ব্যাপারটাকে উড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছে।

খুবই দুঃখের যে ভারত সরকার এখনো পেগ্যাসাস কেনা হয়েছিল কিনা তা নিয়ে হ্যাঁ-ও বলছে না, না-ও বলছে না। এই সফটওয়্যার কিনতে কোটি কোটি টাকা লাগে। আবার তোমার আমার কাছে অত টাকা থাকলেও আমরা কিনতে পারব না। কারণ সফটওয়্যার নির্মাতা এনএসও বলছে, সে শুধু সরকারি সংস্থাকেই ওরা এটা বিক্রি করে। অথচ ভারত সরকার কে কিনেছে, কবে কিনেছে সে বিষয়ে কিছুই বলছে না। নাগরিক হিসাবে আমার তো এটা জানার অধিকার আছে। আমার করের টাকাতেই তুমি এই বিরাট খরচ করে আমার ফোনে আড়ি পাতছ, আর আমাকে তুমি জবাব দেবে না? সরকার বলছে আমরা কোনো বেআইনি কাজ করিনি। যদি তাই হয়, তাহলে বলুক কার অনুমতি নিয়ে এটা করা হয়েছে? স্বরাষ্ট্রমন্ত্রকের যিনি সর্বোচ্চ আধিকারিক, তাঁর অনুমতি নিয়ে? এসব প্রশ্নের কোনো জবাব নেই এখন পর্যন্ত।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ বলেছেন এটা নাকি একটা আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র। আমার কথা হল পঁয়তাল্লিশটা দেশের কয়েক হাজার ফোন নিয়ে বিভিন্ন দেশের সতেরোটা সংবাদমাধ্যম এই তদন্ত চালিয়েছে। এরা সবাই ভারত সরকারের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছে? উনি ক্রনোলজি বোঝার কথা বলেছেন। কারণ আমাদের সংসদের বাদল অধিবেশন শুরু হওয়ার আগের দিন সন্ধ্যায় পেগ্যাসাস সম্বন্ধে এই রিপোর্ট বেরিয়েছে। আচ্ছা, বাকি চুয়াল্লিশটা দেশেও কি একই সময়ে সংসদের অধিবেশন শুরু হয়েছে? ফ্রান্সের সরকার পেগ্যাসাস নিয়ে তদন্ত করছে, ইজরায়েলের সরকারও করছে। আমাদের দেশেও একটা স্বাধীন তদন্ত দরকার।

আচ্ছা, এই নিয়ে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো শোরগোল করলেও সাধারণ মানুষদের অনেকের কিন্তু তেমন হেলদোল নেই। তাঁরা ভাবছেন, আমি সাংবাদিক নই, রাজনীতিও করি না। নিজের চাকরি বাকরি আর পরিবার নিয়ে ব্যস্ত থাকি। আমার পেগ্যাসাস কাণ্ডে উদ্বিগ্ন হওয়ার কী আছে? এর উত্তরে কী বলবেন?

আসলে অধিকাংশ মানুষ এখনো ক্ষতিটা বুঝতে পারছেন না। যে মধ্যবিত্ত লোকেরা ইন্টারনেট ব্যবহার করে, তাদের মধ্যে যারা কিছুটা লেখাপড়া করেছে, তারা অনেকটা বুঝছে। কিন্তু একেবারে সাধারণ মানুষ এর গুরুত্ব স্বভাবতই বুঝতে পারছেন না। বোঝা দরকার যে প্রথমত, ব্যক্তিগত গোপনীয়তার অধিকার (right to privacy) লঙ্ঘিত হয়েছে, যা তোমার মৌলিক অধিকার। দ্বিতীয়ত, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা। এটাও মৌলিক অধিকার। তোমার সব গোপন তথ্যই যদি সরকারের হাতে চলে যায়, তাহলেও ওই স্বাধীনতাটা আর থাকবে কী করে? তৃতীয়ত, এটা শুধু সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা বা সাংবাদিকের স্বাধীনতা হরণের প্রশ্ন নয়। শুধু তাদের ফোনে আড়ি পাতা হয়েছে এমন তো নয়। পেগ্যাসাস ভারতের এবং সামগ্রিকভাবে সারা পৃথিবীর গণতন্ত্রকে বিরাট প্রশ্নচিহ্নের মুখে ফেলে দিয়েছে।

এডওয়ার্ড স্নোডেন দ্য গার্ডিয়ানকে এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন এই স্পাইওয়্যারের ব্যবসাটাই সারা পৃথিবীতে নিষিদ্ধ করে দেওয়া উচিত, কারণ এর নির্মাতারা যা-ই বলুক, আসলে এরা যা তৈরি করে তার কোনো ইতিবাচক ব্যবহার নেই।

আমি স্নোডেনের সাথে সম্পূর্ণ একমত। আজকের পৃথিবীতে রাষ্ট্রের সুরক্ষার নামে অনেককিছু চলছে। এই নিয়েই রাজনীতি চলছে, অর্থনীতি চলছে। যারা এই ধারা মানতে রাজি নয় তাদের দেশদ্রোহী, রাষ্ট্রদ্রোহী বলে দেগে দেওয়া হচ্ছে। সুতরাং এখন আমাদের সকলকে অনেক বেশি সচেতন হতে হবে এবং আমাদের সবাইকে এই ব্যবস্থার বিরুদ্ধে একসঙ্গে লড়াই, আন্দোলন করতে হবে। এ ছাড়া আমাদের সামনে অন্য কোনো পথ নেই। আমরা যদি এখনো বুঝতে না পারি যে আমাদের নিজেদের জীবনের সবকিছুর নিয়ন্ত্রণ বড় বড় কর্পোরেশনের হাতে, সরকারগুলোর হাতে চলে যাচ্ছে, তাহলে আমাদের সর্বনাশ। এটা লেখাপড়া করা মধ্যবিত্ত হয়তো একটু তাড়াতাড়ি বুঝতে পারবে। কিন্তু প্রয়োজন একেবারে সাধারণ মানুষকে বোঝানো। মানে যে মানুষ এই সবে হাতে একটা মোবাইল ফোন পেয়েছে, তার কথা বলছি।

টেলিকম রেগুলেটরি অথরিটি অফ ইন্ডিয়ার (TRAI) হিসাব অনুযায়ী এখন ভারতে ১৩৫ কোটি মানুষ আর ১১০ কোটি সিম কার্ড রয়েছে। তার মানে ভারতের বেশিরভাগ জায়গায় মানুষের চেয়ে সিম বেশি আছে। একসময় মনে করা হত মোবাইল বা স্মার্টফোন একটা শহুরে ব্যাপার। এখন ছোট শহর থেকে গ্রাম — সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েছে। এতজন মানুষকে বিপদটা বোঝানো খুব দরকার।

তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা অনেকে বলছেন যে স্মার্টফোনের ক্ষেত্রে পৃথিবী জুড়ে যে ডুয়োপলি চলছে, অর্থাৎ অধিকাংশ ফোনই হয় অ্যান্ড্রয়েড নয় আইওএস অপারেটিং সিস্টেমে চলে — এর ফলে এই ধরনের স্পাইওয়্যার বা ম্যালওয়্যার দিয়ে ফোনগুলো নিয়ন্ত্রণ করা সহজ হয়ে গেছে। কারণ এক ধরনের একটা ফোনের নিরাপত্তা ব্যবস্থার ফাঁক দিয়ে ঢুকে পড়া গেলেই ওই ধরনের সব ফোন হ্যাক করার রাস্তা জানা হয়ে যায়। এ থেকে কি আমরা এই সিদ্ধান্তে আসতে পারি, যে পৃথিবী জুড়ে কয়েকটা হাতে গোনা বহুজাতিকের সবকিছু দখল করে নেওয়ার যে অর্থনীতি, পেগাস্যাসের মত অভিশাপ আটকাতে হলে সেই অর্থনীতিকেও আক্রমণ করা দরকার?

অবশ্যই। আশি শতাংশের বেশি ফোনে অ্যান্ড্রয়েড ব্যবহৃত হয়। অর্থাৎ এগুলোর নিয়ন্ত্রণ অ্যালফাবেটের হাতে। আর বাকি অ্যাপলের হাতে। যেমন বললাম আর কি, এটা হল পুঁজিবাদের নতুনতম রূপ। এই সংস্থাগুলো এক বছরে যা ব্যবসা করে সেটা অনেক দেশের জাতীয় আয়ের চেয়ে অনেক বেশি। এরাই এখন নিয়ন্ত্রণ করে তুমি কী দেখবে, কী পড়বে, কী গান শুনবে। তুমি কোন সিনেমা পছন্দ করো, কোন অভিনেতা তোমার প্রিয়, কী ধরনের খাবার ভালবাসো — সব এদের নখদর্পণে। উপরন্তু তোমার রাজনৈতিক বিচারধারা, তোমার মাথার ভিতরে কী ঘটছে — সেগুলো ওরা আগে থেকে বুঝে ফেলার চেষ্টা করছে। এ নিয়ে আমাদের প্রত্যেককে সতর্ক হতে হবে। কারণ ইন্টারনেট বাদ দিয়ে আমরা থাকতে পারব না, কিন্তু এই তলোয়ারের অন্য দিকের ধারটা সম্বন্ধে আমাদের সাবধান হতে হবে।

https://nagorik.net এ প্রকাশিত। ছবি https://paranjoy.in/ থেকে।

ফাদার স্ট্যান স্বামী: একটি শোকহীন মৃত্যু

স্ট্যান স্বামীর জামিনের আবেদন করার লোক কম ছিল না। বারবার আবেদন করা হয়েছে, বারবার শুনানি হয়েছে আর রাষ্ট্র আপ্রাণ চেষ্টা করেছে তিনি যেন জামিন না পান।

৬ জুলাই ছিল দলাই লামার ৮৬তম জন্মদিন। সেই উপলক্ষে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এই তিব্বতি ধর্মগুরুকে ফোন করে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন। মোদী যা করেন, সবই ইতিহাসে প্রথমবার ঘটে। দলাই লামাকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানানোর ব্যাপারেও নাকি তিনিই প্রথম। সে প্রথম বা চতুর্দশ যা-ই হোন, ব্যাপারটা আপত্তিকর নয়। ভারতবর্ষ সাধুসন্তদের দেশ, ধর্মভীরু মানুষের দেশ। আমাদের প্রধানমন্ত্রী ধর্মগুরুকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানাবেন — এ আর বেশি কথা কী? তাছাড়া দলাই লামা কেবল ধর্মগুরু নন, বহু বছর ধরে ভারতেরই বাসিন্দা এবং চীনা আগ্রাসনের বিরুদ্ধে তিব্বতি জনগণের অধিকার রক্ষার লড়াইয়ের নেতা। ভারতের মত গণতান্ত্রিক দেশের প্রধানমন্ত্রী তো তাঁর পাশেই থাকবেন। অধিকার রক্ষার লড়াই পৃথিবীর সর্বত্র, সব সরকারের আমলেই কেউ না কেউ করে চলে। তেমনই আরেকটা লড়াইয়ের সৈনিক ছিলেন স্ট্যান স্বামী — আরেকজন ধর্মযাজক। দলাই লামার চেয়ে বছর দুয়েকের ছোট এই মানুষটা দলাইয়ের জন্মদিনের আগের দিনই মারা গেলেন। ধর্মভীরু এবং মানুষের অধিকারের লড়াইয়ে সহমর্মী প্রধানমন্ত্রী শোক প্রকাশ করে টুইট করেননি।

যে মানুষটা রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে অভিযুক্ত; এমনকি সুধা ভরদ্বাজ, গৌতম নভলাখা, ভারভারা রাও, সোমা সেন, জি এন সাইবাবা, আনন্দ তেলতুম্বড়ে, হ্যানি বাবুদের সাথে মিলে নাকি প্রধানমন্ত্রীকে হত্যার ছক কষছিলেন, তাঁর মৃত্যুতে সেই প্রধানমন্ত্রীই শোক প্রকাশ করবেন! অন্যায় আবদার, তাই না? কিন্তু স্ট্যান স্বামীর বিরুদ্ধে যে অভিযোগ রয়েছে, দলাই লামার বিরুদ্ধে চীনা সরকারের অভিযোগ যে তার চেয়েও সাংঘাতিক। তিনি কেবল রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত তা নয়, রীতিমত নেতা। সেই কারণেই ১৯৫৯ সালে চীনা বাহিনীর সাথে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের পর তাঁকে ছদ্মবেশ ধারণ করে ভারতে পালিয়ে এসে আশ্রয় নিতে হয়েছিল। তখনকার প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু থেকে শুরু করে মোদীর পূর্বসুরী মনমোহন সিং পর্যন্ত সব দলের সব প্রধানমন্ত্রী দলাই লামাকে আশ্রয় দেওয়ার সিদ্ধান্তকে সমর্থন জানিয়েছেন। বিরোধী দলগুলোও এ নিয়ে কখনো সরকারকে আক্রমণ করেনি। এতে চীনের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্কের ক্ষতি হলেও নীতি বদলানো হয়নি, কারণ ভারত সরকার তিব্বতের মানুষের অধিকারকে গুরুত্ব দিতে চেয়েছে। ভাবা যেত মোদী সেই ধারাই অনুসরণ করছেন, যদি নিজের দেশের আন্দোলনকারীদের প্রতি তাঁর সরকার সংবেদনশীল হত। অন্য অনেককিছুর মত বিচারাধীন অবস্থায় বৃদ্ধ ধর্মযাজকের মৃত্যুও বোধহয় মোদীর আমলেই প্রথম হল।

এমনিতে ভারতে বিনা বিচারে পুলিশ বা বিচারবিভাগীয় হেফাজতে বছরের পর বছর আটকে থাকা নতুন কিছু নয়। নানা সমীক্ষায় দেখা যায় দলিত, আদিবাসী, ধর্মীয় সংখ্যালঘু মানুষের কপালে এই দুর্ভোগ সহজেই জোটে। ট্যাঁকের জোর না থাকলে বা লোকলস্কর না থাকলে মাত্র কয়েকশো টাকা চুরি করা বাচ্চা ছেলেকেও বিনা বিচারে বহু বছর কারাবাস করতে হয়। মৃত্যুও অস্বাভাবিক নয়। এমনই এক মৃত্যুর ঘটনায় মঙ্গলবার সারাদিন উত্তপ্ত ছিল বর্ধমান জেলার বরাকর। কিন্তু স্ট্যান স্বামীর জামিনের আবেদন করার লোক কম ছিল না। বারবার আবেদন করা হয়েছে, বারবার শুনানি হয়েছে আর রাষ্ট্র আপ্রাণ চেষ্টা করেছে তিনি যেন জামিন না পান। কেবল জামিন নয়, পার্কিনসন্স অসুখে ভোগা এই মানুষটা যাতে জল খাওয়ার জন্য একটা স্ট্র পর্যন্ত না পান তার জন্য প্রাণপণ আইনি লড়াই করেছে মোদী সরকার। দেশদ্রোহীদের এমনটাই হওয়া উচিত — এই মত অনেকেরই। মুশকিল হল, ফাদারের দেশদ্রোহের এক বিন্দু প্রমাণ দিতে পারেনি তদন্তকারী সংস্থা। দিল্লি দাঙ্গার জন্য এই একই আইনে অভিযুক্ত উমর খালিদের মত স্ট্যান, ভারভারা, গৌতম, সুধা, সোমাদের বিরুদ্ধেও এখন পর্যন্ত কোন প্রমাণ নেই। প্রমাণ বলতে যা জমা দেওয়া হয়েছে, তা বড়জোর কিছু বইপত্র বা লিফলেট।

ফাদার স্ট্যান সম্বন্ধে যা জানা যায়নি, তা বাদ দিয়ে যা জানা আছে সেগুলো আলোচনা করে দেখা যাক তিনি কেমন ভয়ঙ্কর লোক ছিলেন। তিনি এমন ঘোর সন্ত্রাসবাদী যে মাওবাদী সন্দেহে গ্রেপ্তার হওয়া আদিবাসীদের পরিবার পরিজনের হাতে অস্ত্র তুলে না দিয়ে ন্যায়বিচারের দাবিতে জনস্বার্থ মামলা করতেন। সংবিধানের পঞ্চম তফসিল অনুযায়ী কেন আদিবাসী এলাকায় ট্রাইব অ্যাডভাইসরি কাউন্সিল গড়া হয়নি, সে প্রশ্ন তুলতেন। খনিজ পদার্থের জন্য বা শিল্প গড়তে আদিবাসীদের জল-জঙ্গল-জমির অধিকার কেড়ে নেওয়ার বিরুদ্ধে বোমা, বন্দুক, গুলিবিহীন আন্দোলন করতেন।

আরও পড়ুন বাধ্যতামূলক মহানতার একাকিত্বে ইমাম রশিদি

আসলে প্রমাণের দরকার নেই, আটক করে রাখার ইচ্ছাই যথেষ্ট। Unlawful Activities (Prevention) Act বা ইউএপিএ এমন এক আইন, যে আইনে জামিন হল ব্যতিক্রম, অভিযুক্তকে আটক করে রাখাই নিয়ম। অন্য সব আইনের সাথে এই আইনের এখানেই তফাত। মনে রাখা ভাল, ১৯৬৭ সালে চালু হওয়া এই আইনকে ২০০৪ সালে ইউপিএ সরকার সংশোধনী এনে আরো কঠোর করে তোলে। বিপুল অপব্যবহারের অভিযোগে Prevention of Terrorism Act বা পোটা বাতিল করতে হওয়ায়, সেই আইনের বহু আপত্তিকর ধারা এই সংশোধনীর মাধ্যমে ইউএপিএ-তে ঢুকিয়ে দেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পি চিদম্বরম। কোন দল প্রতিবাদে মুখর হয়নি। চার্জশিট ছাড়াই গ্রেপ্তারির ব্যবস্থা, জামিন পাওয়ার বিষয়ে নানা শর্ত আরোপ করা এবং “সন্ত্রাসবাদী কার্যকলাপ”-এর অস্পষ্ট সংজ্ঞার আওতা বৃদ্ধি — সবই ইউপিএ আমলেই করা হয়েছিল, ২০০৮ ও ২০১২ সালে আরো দুটো সংশোধনীর মাধ্যমে। বিজেপি সরকার ২০১৯ সালের সংশোধনীর মাধ্যমে ব্যক্তিকে সন্ত্রাসবাদী হিসাবে দেগে দেওয়ার ব্যবস্থা করে, আগে কেবল কোনো সংগঠনকে সন্ত্রাসবাদী গণ্য করা যেত। রাজ্যসভায় বাম দলগুলো, তৃণমূল কংগ্রেস, ডিএমকে, এমডিএমকে, আরজেডি এবং এআইএমআইএমের মত কয়েকটা ছোট পার্টি ছাড়া সেই সংশোধনীর বিরুদ্ধে কেউ ভোট দেয়নি। লোকসভায় এআইএমআইএম, বিএসপি, আইইউএমএল, ন্যাশনাল কনফারেন্স এবং এইউডিএফ দলের মোট আটজন সাংসদ সংশোধনীর বিরুদ্ধে ভোট দেন। কংগ্রেস ভোটাভুটির সময় ওয়াক আউট করলেও রাজ্যসভায় পক্ষে ভোট দিয়েছিল।

বরাবরই ইউএপিএ-কে আরো শক্তিশালী করার পক্ষে সন্ত্রাসবাদের জুজু দেখানো হয়েছে, কিন্তু কার্যক্ষেত্রে এই আইন প্রয়োগ করা হয়েছে সরকারবিরোধী মানুষের উপর। পশ্চিমবঙ্গে বাম আমলে এই আইনে রাজনৈতিক কর্মী, সমাজকর্মীদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তৃণমূল সরকারের আমলেও সেই ট্র্যাডিশন সমানে চলেছে। তবে যেহেতু এ দেশে বিজেপি বিরোধী শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি, তাই এই আইনে গ্রেপ্তার হওয়া মানুষের সংখ্যা এখন কয়েকশোতে পৌঁছেছে।

আসলে ফাদার স্ট্যান স্বামীর মৃত্যু আমাদের সকলকেই আয়নার সামনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। শুধু রাজনৈতিক দলগুলো নয়, আমরা সাধারণ নাগরিকরাও সন্ত্রাসবাদের নাম করলেই যে কোন সরকারি দমনপীড়নকে বৈধ বলে মেনে নিয়ে থাকি। তাই এমন সব একুশে আইন দেখে ক্ষেপে ওঠার বদলে খুশি হই। আমাদের মধ্যে অনেকে নিশ্চয়ই স্ট্যান স্বামীর মৃত্যুতেও “বেশ হয়েছে” মনে করছে। কারণ আমাদের সাধু সন্তদের প্রতি ভক্তির সীমা বাবা রামদেব অব্দি। কোন ফাদারের কাজকর্মের কারণে তাঁর প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়ার যুগ আমরা পেরিয়ে এসেছি। এক্ষেত্রে কিন্তু মানুষটাকে শ্রদ্ধা করার প্রয়োজন নেই। এটুকু বোঝা দরকার যে কোন কারণে সরকারের (এমনকি স্রেফ পুলিশের) চক্ষুশূল হলেই বিনা প্রমাণে এইভাবে আমাকে, আপনাকেও দিনের পর দিন কারাগারে ফেলে রাখা সম্ভব। গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় এমনকি জল খাওয়ার পথে বাধা সৃষ্টি করে তিলে তিলে মেরে ফেলা সম্ভব। আইন মেনেই।

উত্তরবঙ্গ সংবাদে প্রকাশিত

দলে দলে দলবদলের খেলায় বাঙালি এখন দিব্যি দড়

পেপ বার্সেলোনার একগুচ্ছ খেলোয়াড়কে বায়ার্ন মিউনিখ বা ম্যাঞ্চেস্টার সিটিতে আনতে পারেননি। মুকুল দলে দলে বিজেপি নেতা, কর্মীকে তৃণমূলে আনছেন। আস্ত জেলা কমিটি তুলে আনছেন।

টিভিতে ইউরো দেখছেন? হিংসা হচ্ছে না? প্রায় সব মাঠেই দর্শক আছে। অথচ এ দেশে আমরা ভয়ে ভয়ে বাজার যাচ্ছি, ট্রেন চলছে না বলে বিস্তর কাঠখড় পুড়িয়ে কাজে যেতে হচ্ছে, তিতিবিরক্ত মানুষ স্পেশাল ট্রেন আটকে দিচ্ছেন, ছেলেমেয়েরা স্কুল কলেজ যাওয়া ভুলে গেছে, বড় বড় পরীক্ষা বাতিল, খেলাধুলোর তো প্রশ্নই নেই। ফাঁকা মাঠে ইন্ডিয়ান সুপার লিগ আর অর্ধেক ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগ ছাড়া ভারতে দেখার মত খেলা হয়নি সেই গত বছরের মার্চ থেকে। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের খেলাপাগল লোকেদের খেলা দেখার তেষ্টা যে কমেনি, বরং বেড়েছে — সেকথা রাজ্যের নেতৃবৃন্দ বিলক্ষণ জানেন। অতএব নির্বাচনে স্লোগান হল “খেলা হবে”। ঘ্রাণেন অর্ধভোজনম কথাটা যদি সত্যি হয়, তাহলে শ্রবণেন সোয়া ভোজনম তো বটে। সোয়াই বা কেন? এক জনসভায় তো মুখ্যমন্ত্রী হুইল চেয়ার থেকে দর্শকদের দিকে একটা সত্যিকারের ফুটবলই ছুঁড়লেন। হাড্ডাহাড্ডি খেলার মাঠে দর্শকদের প্রাণ যাওয়ার ইতিহাস সারা পৃথিবীতেই আছে। ইডেনে মোহনবাগান-ইস্টবেঙ্গল ম্যাচ দেখতে গিয়ে ১৬ জনের মৃত্যুর কথা এ রাজ্যের কে না জানে? এবারের নির্বাচনও ছিল মরণপণ লড়াই, অতএব বেশকিছু প্রাণ গেল।

তবে মাঠের খেলার সাথে রাজনীতির খেলার বড় তফাত হল মাঠের খেলার শুরু আছে, শেষ আছে। শেষ হলে জয়ী দলের অধিনায়ক কেন উইলিয়ামসন পরাজিত অধিনায়ক বিরাট কোহলির কাঁধে মাথা রাখতে পারেন, কোহলি ঠেলে সরিয়ে দেন না। আইসিসির কাছে অকারণ নালিশ ঠুকে ট্রফি ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টাও করেন না। কিন্তু রাজনীতির খেলার সূচনা, উপসংহারের ঠিক নেই। অনেকে ভাবেন কেবল নির্বাচনটুকু খেলা। “খেলা হবে” স্লোগান যাঁর মাথা থেকে বেরিয়েছিল, তিনিও হয়ত তাই ভেবেছিলেন। কিন্তু নির্বাচনের ফল বেরোনো মাত্রই পরাজিত বিজেপি বুঝিয়ে দিল, বিধানসভা নির্বাচনটা বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপ ফাইনালের মত ‘ওয়ান-অফ’ খেলা নয়, লম্বা সিরিজ।

খেলা হবে আর আনুষঙ্গিক উত্তেজনাগুলো থাকবে না তা কি হয়? সৌরভোত্তর বাঙালি না হয় ক্রিকেটের দিকে বেশি ঝুঁকেছে, কিন্তু তার সেরা খেলা এখনও ফুটবল। নইলে ইস্টবেঙ্গলকে আই এস এল খেলানোর জন্য মুখ্যমন্ত্রী মাঠে নামেন? ফুটবলের অন্যতম আকর্ষণ হল ‘ট্রান্সফার মার্কেট’। এই বিলিতি কথাটা হালের আমদানি। গত শতকের আশি-নব্বইয়ের দশক অব্দি যখন টিভির চ্যানেল ঘোরালেই ইউরোপের লিগ দেখা যেত না; সেইসময় আমরা বলতাম ‘দলবদল’। দিবারাত্র খবরের চ্যানেল ছিল না, ডিজিটাল মাধ্যম ছিল না, কিন্তু সকালের কাগজ তেতে থাকত দলবদলের খবরে। আজ পড়লাম কৃশানু-বিকাশ মোহনবাগানে যাচ্ছেন, কালই ছবি বেরোল “ইস্টবেঙ্গলের গোপন আস্তানায় আড্ডার আসরে অভিন্ন জুটি”। সঙ্গে হয়ত পল্টু দাসের উক্তি “ওরা ঘরের ছেলে, আমাদের ছেড়ে কোথায় যাবে?” মহমেডান ছাড়ছেন চিমা? সুদীপ চ্যাটার্জি কি দল বদলাবেন? কার অফার নিয়ে ভাবছেন শিশির ঘোষ? বিজয়ন-সত্যেন কি সত্যিই কেরালা পুলিস ছেড়ে মোহনবাগানে আসছেন? এইসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে খুঁজতে মাঠে বল পড়ার আগেই ফুটবল মরসুম শুরু হয়ে যেত। একসময় রীতিমত অপহরণের অভিযোগে জেরবার হয়ে আই এফ এ চালু করল টোকেন ব্যবস্থা। টোকেন যার, ফুটবলার তার। তখন আবার এক ক্লাবকে টোকেন দিয়ে ফেলে পুলিসে ডায়রি করা শুরু হল টোকেন হারিয়ে গেছে বা কেড়ে নেওয়া হয়েছে বলে।

আই এস এল যুগের তরুণ বাঙালির কাছে এসব গল্পকথা মনে হবে। কলকাতা লিগকে দুয়োরানি করে দিয়েছিল যে আই-লিগ, তাও তো এখন সবার পিছে সবার নীচে। কিন্তু মাঝবয়সী বা বার্ধক্যে উপনীত ফুটবলপ্রেমীরা নিশ্চয়ই গত কয়েক মাস স্মৃতিমেদুরতায় ভুগছেন। ভোটের মরসুমে ফিরে এসেছে তিরিশ-চল্লিশ বছর আগের উত্তেজনা। প্রত্যেকবার অমিত শাহ উড়ে আসার কয়েকদিন আগে থেকে চ্যানেলে, কাগজে, ফেসবুকে আলোচনা চলেছে কোন কোন তৃণমূল নেতা বিজেপিতে যাচ্ছেন, কোন কোন সাংসদ ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রাখছেন, কোন সিপিএম কাউন্সিলর কোন দিনের সভায় বিজেপিতে যোগ দেবেন। সন্দেহ নেই বিজেপির রিক্রুটারদের কাছে সে আমলের টুটু বসু, পল্টু দাস, মহম্মদ ওমররা নস্যি। তৃণমূল মন্ত্রিসভার সদস্য শুভেন্দু অধিকারী থেকে প্রবীণ সিপিএম নেতা অশোক ভট্টাচার্যের ডান হাত শঙ্কর ঘোষ পর্যন্ত কাকে না বঁড়শিতে গেঁথেছেন? তৃণমূলও হাত গুটিয়ে বসে ছিল না, তবে দলে টানা লোকেদের ধারে এবং ভারে তারা পিছিয়ে ছিল। সৌমিত্র খাঁয়ের ঘর ভাঙা ছাড়া আর তেমন সাফল্য কোথায়? তাছাড়া কৃশানু এক দলে, বিকাশ অন্য দলে থাকলে লাভ কী?

ফুটবলের দলবদল শেষ হয়ে যেত মরসুম শুরু হওয়ার আগেই। ‘মিড-সিজন ট্রান্সফার উইন্ডো’ ব্যাপারটা ইউরোপ থেকে শেখা হল অনেক পরে। কিন্তু সে তো উইন্ডো, মানে জানলা। নির্বাচনের পরে যা খুলে গেছে তা সিংহদুয়ার। ধীরেন দে, জ্যোতিষ গুহ পর্যন্ত ফেল পড়ে যাবেন মুকুল রায়ের সামনে। বাংলা সংবাদমাধ্যমে তাঁকে চাণক্য বলা হচ্ছে ইদানীং, অচিরেই মোরিনহো বা গুয়ার্দিওলার সাথে তুলনা করতে হবে। যদিও তাঁদেরও এমন চৌম্বকশক্তি নেই। পেপ বার্সেলোনার একগুচ্ছ খেলোয়াড়কে বায়ার্ন মিউনিখ বা ম্যাঞ্চেস্টার সিটিতে আনতে পারেননি। মুকুল দলে দলে বিজেপি নেতা, কর্মীকে তৃণমূলে আনছেন। আস্ত জেলা কমিটি তুলে আনছেন। খেলার আরও রোমহর্ষক হয়ে উঠছে। মুকুলবাবু বিধানসভার পাবলিক অ্যাকাউন্টস কমিটির চেয়ারম্যান হতে চলেছেন। বিরোধীরা আপত্তি করেছিলেন, ও পদটায় বিরোধী দলের বিধায়ককে বসানোই তো দস্তুর। কারণ শাসক দলে থাকা বিধায়ক সরকারি হিসাবপত্র পরীক্ষা করলে যে গলতি মাপ করে দেবেন না, তার নিশ্চয়তা নেই। জবাবে মুখ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন মুকুলবাবু তো বিজেপিরই বিধায়ক, তৃণমূল তাঁকে সমর্থন করবে কেবল।

পিকে ব্যানার্জি আর অমল দত্ত যখন যথাক্রমে ইস্টবেঙ্গল আর মোহনবাগানের কোচ ছিলেন, তখন উত্তেজনার পারদ চড়েই থাকত। ডায়মন্ড ম্যাচের আগে সে কি প্রবল বাদানুবাদ! একবার ভাবুন তো, যদি পিকে একইসঙ্গে দুই দলেরই কোচ হতেন? সাইডলাইনের এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্ত দৌড়ে বেড়াতেন, বাইচুংকে নির্দেশ দিতেন “অপেক্ষা করলে হবে না, বল কাড়তে হবে।” তারপর বাইচুং গোল করতেই বাসুদেব মণ্ডলকে বকতেন “হচ্ছেটা কী? তুই থাকতে বাইচুং সাপ্লাই পাচ্ছে কেন?” মুকুল রায় খেলাটাকে সেই উচ্চতায় নিয়ে গেছেন। অর্জুন শ্রীকৃষ্ণের বিশ্বরূপ দর্শন করেছিলেন, বাঙালি মুকুলবাবুর বিশ্বরূপ দেখছে। এদিকেও তিনি, ওদিকেও তিনি।

আরও পড়ুন রাহুলে না, বাবুলে হ্যাঁ: তৃণমূলের প্রকৃত এজেন্ডা নিয়ে কিছু প্রশ্ন

যে সময়ের কথা বলে লেখা শুরু করেছিলাম, সে সময় বাঙালির গুমোর ছিল, আর যা-ই হোক, ফুটবলে আমরা ভারতসেরা, কলকাতা হল ভারতীয় ফুটবলের মক্কা। সে গর্ব গোয়ায় গুঁড়িয়ে গেছে অনেককাল আগে। আরেক অহঙ্কার ছিল বাংলার রাজনীতি। এখানে মারামারি, খুনোখুনি হয়। কিন্তু আয়ারাম গয়ারাম সংস্কৃতি নেই, ওসব গোবলয়ের ব্যাপার। আজকের ট্রান্সফার মার্কেটে সে গর্বও ধূলিসাৎ।

অবশ্য রাজনীতি খেলা হয়ে দাঁড়ালে এসব হবেই। যে কোন ঘটনাই প্রথমবার ঘটলে চোখ কপালে ওঠে, দ্বিতীয়বার আর কেউ উচ্চবাচ্য করে না। ফলে খেলা যত এগোবে, নেতাদের যাওয়া আসা বাঙালিরও গা-সওয়া হয়ে যাবে। রবি শাস্ত্রী ধারাভাষ্য দেওয়ার সময় উত্তেজক ম্যাচের শেষে বলতেন, আসলে জয়ী হল খেলাটা। এ ক্ষেত্রেও যে খেলাটাই জিতবে তাতে সন্দেহ নেই। কারণ হারবে, হারছে সাধারণ নাগরিক।

উত্তরবঙ্গ সংবাদে প্রকাশিত

বিবি বিদায় নিলেও বদলাবে না ইজরায়েল

বিবি লঙ্কা প্রতিষ্ঠা করে গেছেন, এখন সেখানে যে যাবে সে-ই হবে রাবণ।

“… সরে যাওয়ার পর তাঁর উত্তরাধিকার বলতে আরও সুরক্ষিত একটা দেশ থাকবে না, থাকবে একটা গভীরভাবে বিভাজিত সমাজ, যা দেওয়ালের আড়ালে বাস করে।” কথাগুলো লিখেছিলেন একজন প্রধানমন্ত্রীর জীবনীকার, ২০১৮ সালে প্রকাশিত জীবনীতে। দেশটা নানা ভাষা নানা মতের দেশ ভারত নয়। নেতার নাম নরেন্দ্র মোদী নয়। দেশটার নাম ইজরায়েল, নেতার নাম বেনইয়ামিন নেতানিয়াহু, বইটার নাম বিবি, লেখক ইজরায়েলি সাংবাদিক আনশেল ফেফার। একটানা বারো বছর, সব মিলিয়ে ১৫ বছর, ক্ষমতায় থাকার পর আমাদের প্রধানমন্ত্রীর প্রিয় বন্ধু বিবি সম্প্রতি পদচ্যুত হলেন।

বিবির বন্ধু, শত্রু উভয়েই বলেন পদ আঁকড়ে থাকায় তাঁর জুড়ি নেই। বহুদিন থেকেই গদি টলোমলো। দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে, ২০১৯ সালে প্রথম ক্ষমতাসীন ইজরায়েলি নেতা হিসাবে ফৌজদারি মামলায় অভিযুক্ত হয়েছেন। অভিযোগ তিনি কোটিপতিদের কাছ থেকে দামি উপহার নিয়েছেন, তার বদলে সংবাদমাধ্যম ও টেলিকম কোম্পানির মালিকদের অন্যায় সুযোগ সুবিধা দিয়েছেন। বিবির বন্ধুর দেশে এসব কোনও অভিযোগই নয়। যারা অভিযোগ করছে তাদের পাপ্পু, দেশদ্রোহী, আর্বান নকশাল ইত্যাদি বলে দিলেই ঝামেলা চুকে যায়। কিন্তু ইজরায়েলে তা হবার জো নেই। অতিমারীর মধ্যেও বিরাট মিছিল হয়েছে বিবিকে সরানোর দাবিতে। কিন্তু বিবির অমিত শাহ না থাকলেও কৌশল আছে। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা বলছেন কৌশলের জোরেই তিনি বিরোধীদের দ্বিধাবিভক্ত করে রেখে এতদিন ক্ষমতায় টিকে গেলেন। শেষমেশ তাঁরই প্রাক্তন চিফ অফ স্টাফ, প্যালেস্তাইন সম্বন্ধে তাঁরই মত গোঁড়া মানসিকতার নাফতালি বেনেত্তে থেকে শুরু করে আরব ইসলামিস্ট পর্যন্ত সকলে হাত মিলিয়ে নেতানিয়াহুকে পদচ্যুত করতে পারলেন।

যা যা অভিযোগ আছে তাতে বছর দশেক কারাবাসের সম্ভাবনা প্রবল। কিন্তু বিবি সফলভাবে ইজরায়েলকে প্রবলভাবে যুযুধান দেশে পরিণত করেছেন। তিনি যখন ক্ষমতায় আসেন তখন প্যালেস্তাইন সমস্যার শান্তিপূর্ণ সমাধানের যেটুকু সম্ভাবনা ছিল, এখন আর তা-ও নেই বলে মনে করা হচ্ছে। পিটিয়ে সবকিছুই ঠান্ডা করে দেওয়া যায় — এই মানসিকতা দেশের রাজনীতিতে প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে। উত্তরসূরী বেনেত্তের সাথে নেতানিয়াহুর মতাদর্শগত তফাত নেই। অর্থাৎ বিবি লঙ্কা প্রতিষ্ঠা করে গেছেন, এখন সেখানে যে যাবে সে-ই হবে রাবণ।

আরও পড়ুন বিবিসিকে বাদ দিয়ে বিশ্বগুরু থাকতে পারবেন মোদী?

ইজরায়েল অবশ্য রাষ্ট্র হিসাবে বিবির আগে থেকেই আধিপত্যবাদী। তবে বিবির মত বুক ফুলিয়ে আধিপত্যবাদকে আদর্শ হিসাবে খাড়া করতে সকলে পারে না। ১০ই জুলাই ১৯৯৬ তারিখে মার্কিন কংগ্রেসে প্রথম বক্তৃতাতেই তিনি বলেছিলেন হিব্রু ধর্মশাস্ত্রে লেখা আছে, ঈশ্বর তাঁর ভক্তদের শক্তি দেবেন এবং শান্তি দিয়ে আশীর্বাদ করবেন। অতএব শক্তি থেকেই যে শান্তি আসে — এটাই সত্য। গোদা বাংলায় বললে, সবই ব্যাদে আছে এবং ব্যাদে যা আছে তা-ই শেষ সত্য। বোঝা শক্ত নয়, কেন বিবি আর মোদী সাহেবের গলাগলি হয়েছিল। কেনই বা স্বাধীনতার পর থেকে সব সরকারের অনুসৃত বিদেশনীতি থেকে সরে এসে ইজরায়েলের দিকে ঝুঁকে পড়ল মোদী সরকার, কেন ভারতের আন্দোলনকারীদের মোবাইল ফোনে পেগ্যাসাসের মত ইজরায়েলি সফটওয়্যারের উঁকি ঝুঁকি শুরু হল।

মোদীর মতাদর্শগত শিক্ষা রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘের হাতে আর সেই সঙ্ঘের গুরু গোলওয়ালকর ছিলেন নাজি ভক্ত। ‘উই, অর আওয়ার নেশনহুড ডিফাইনড’ বইতে ইহুদী নিধনের জন্য তিনি জার্মানির ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। তা সত্ত্বেও মোদী কী করে ইজরায়েলের সাথে গা মাখামাখি করেন, তা নিয়ে বিজেপি-বিরোধীদের প্রায়ই বিস্ময় প্রকাশ বা কটাক্ষ করতে দেখা যায়। তাঁরা আসলে এখনও হলোকস্টের যুগে পড়ে আছেন, মোদী আর বিবি এগিয়ে গেছেন। দুজনেই জানেন এ যুগে আর এক লপ্তে গণহত্যা করে ‘শত্রু’ জনগোষ্ঠীকে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়া সম্ভব নয়। শক্তি প্রদর্শন করে ক্রমশ প্রান্তিক করে দেওয়াই পথ। সে কাজ করতে পারলে কে ক্ষমতায়, তাতে কিছু এসে যায় না। ভারতকে ইজরায়েলের মত লঙ্কায় পরিণত করতে বিবির সাহায্য প্রয়োজন ছিল। মোদীর পরে যে দলের যিনিই আসুন, তিনি যেন বেনেত্তির মতই ধারাবাহিকতা রক্ষা করেন তা নিশ্চিত করতে হবে তো।

উত্তরবঙ্গ সংবাদে প্রকাশিত

শাহেনশাহ ও ফ্যাসিবিরোধী ইশতেহার

তৃণমূল-বিজেপির লড়াইটা তাহলে রাজনৈতিক নয়, আদর্শগতও নয়? ওটা আক্ষরিক অর্থেই খেলা? এসব প্রশ্ন কোন সংবাদমাধ্যমকে করতে দেখা যাচ্ছে না।

অমিতাভ বচ্চনের নায়ক জীবনের শেষ দিকের ছবি শাহেনশাহ । সেখানে অমিতাভের একই অঙ্গে দুটো রূপ। রাতের বেলায় তিনি সাদা চুল, সাদা দাড়িতে অদ্ভুতদর্শন কালো পোশাক পরে লোহার হাত দিয়ে দুষ্টের দমন, শিষ্টের পালন করে বেড়ান। দিনের বেলায় খাকি উর্দি পরে যা যা করা উচিৎ নয়, পান খেয়ে ঠোঁট লাল করে ঠিক সেগুলোই করে বেড়ান। অপরাধীদের সমঝে চলেন, একটু আধটু ঘুষ-টুষও নিয়ে থাকেন। গত ৩০-৪০ বছরে বলিউডি নীতিবোধ আমাদের রন্ধ্রে রন্ধ্রে সেঁধিয়ে গেছে, সে আমরা ভারতের যে প্রান্তেই থাকি আর যে ভাষাতেই কথা বলি। আমরা এখন বিশ্বাস করি, একই লোক দিনের বেলায় ঘুষ খেয়ে রাতের বেলায় গুন্ডা বদমাইশদের টাইট দিতেই পারে। তাই সন্ন্যাসী রাজা ছবিতে উত্তমকুমার ফিরে এসেছেন দেখে গ্রামের লোক যেমন আপ্লুত হয়, মুকুল রায় বিজেপি থেকে তৃণমূল কংগ্রেসে ফিরে এসেছেন দেখেও আমরা তেমনি আবেগে ভাসি। আমরা মানে বিজেপি-বিরোধী, ফ্যাসিবাদ-বিরোধীদের কথা বলছি। আসলে যাঁদের উদ্যোগে বিজেপির পশ্চিমবঙ্গ দখল করার আন্তরিক প্রচেষ্টা বিফল হল আর কি। এ তো নেহাত বানিয়ে বলা নয়, স্বয়ং মমতা ব্যানার্জি স্বীকার করেছেন।

এ রাজ্যে তো এখন দুটোই পক্ষ — বিজেপি আর বিজেপি-বিরোধী। বিজেপি মানে কেবল ৭৭ জন বিধায়ক নয়। রাজ্য সরকারের যে কোনও বিষয়ে যারা সমালোচনা করে, তারা সকলেই বিজেপি। এমনটাই বিজেপি-বিরোধীরা, মানে যাঁরা এ যাত্রায় বাংলাকে বাঁচালেন, তাঁরা বলে দিয়েছেন। আপাতত তর্কের খাতিরে কথাটা সত্য ধরে নিয়ে বলি, এর বাইরে একটা পক্ষ থাকার কথা ছিল, যে কোনও চালু গণতন্ত্রে থাকে। তা হল সংবাদমাধ্যম। দুঃখজনকভাবে সে পক্ষটা আর পশ্চিমবঙ্গে আছে বলে মনে হচ্ছে না। থাকলে কোনও কাগজ, কোনও চ্যানেল প্রশ্ন তোলে না, যে বিজেপিকে আটকানোর জন্য মানুষ তৃণমূলকে ঢেলে ভোট দিলেন সেই বিজেপির সর্বভারতীয় পদাধিকারীকে মমতা ব্যানার্জি কেন দলে নিচ্ছেন? উল্টে সোৎসাহে আলোচনা চলছে, মুকুলবাবু বিজেপির কত বড় “অ্যাসেট” ছিলেন, তাঁকে কেড়ে নেওয়ায় বিজেপির কেমন কোমর ভেঙে দেওয়া গেল। সংবাদমাধ্যমের একটা মস্ত সুবিধা হল, রাজনৈতিক নেতাদের যা-ও বা প্রশ্ন করা যায়, তাদের প্রশ্ন করা যায় না। নইলে জিজ্ঞেস করা যেত, নিজে জেতা ছাড়া মুকুল রায় বিজেপির আর কোন লাভের কারণ হয়েছেন? নিজের এলাকায় নিজের ছেলেকেও যিনি জেতাতে পারেন না, তিনি কোন বিচারে “অ্যাসেট”? এই প্রশ্নগুলো আগাম আন্দাজ করে কোন কোন সংবাদমাধ্যম বলেছে ২০১৯-এর লোকসভা ভোটে পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির সাফল্যের কাণ্ডারী ছিলেন মুকুলবাবু। কিমাশ্চর্যম তৎপরম! পশ্চিমবঙ্গের মত এত বড় রাজ্যের একটা জেলার একজন প্রভাবশালী নেতা নাকি গোটা রাজ্যের লোকসভা নির্বাচনের ফলাফলে প্রভাব ফেলেছিলেন! আচ্ছা, নাহয় ফেলেছিলেন। তাহলে বিধানসভায় পারলেন না কেন? তবে কি ইচ্ছা করেই এবার আর প্রভাব ফেললেন না? যদি তা-ই হয় তাহলে কেন করলেন এমন? এসব প্রশ্নের উত্তর না থাকতে পারে, কিন্তু সর্বদা উত্তর জোগানো তো সংবাদমাধ্যমের কাজ নয়, তাদের কাজ সর্বদা প্রশ্ন করা। সেসব করতে বিশেষ কাউকে দেখা যাচ্ছে না। বরং বেচারা মুকুলবাবুকে বিজেপি কেমন প্রান্তিক করে দিয়েছিল, তা দিনরাত আমাদের জানানো হচ্ছে।

এই প্রান্তিক তত্ত্বটা খেয়াল করার মত। কারণ ভোটের ফল বেরোবার পরপর পড়া যাচ্ছিল দিলীপ ঘোষের মত জননেতাকে বিজেপি এবারের নির্বাচনে প্রান্তিক করে দিয়েছিল, তাই এই ফল। এখন আবার মুকুলবাবুর প্রান্তিকতার কথা শোনা যাচ্ছে। এদিকে মুকুলবাবুর প্রস্থান সম্পর্কে দিলীপবাবুর বক্তব্য হল, বিজেপিতে যারা আসে তাদের সবাই টিকতে পারে না, কারণ ওখানে “তপস্যা” করতে হয়। টিএমসি-র মত কাট মানি আর সিন্ডিকেট কালচারের দল থেকে এসে বিজেপিতে টেকা মুশকিল।১ তা এই দুজনেই যদি প্রান্তিক হয়ে থাকেন, তাহলে কেন্দ্রে ছিলেন কে? শুভেন্দু অধিকারী? আচ্ছা, যদি কদিন পরে তাঁকেও বিজেপি প্রান্তিক করে দেয়, তাহলে তিনিও কি তৃণমূলে ফেরত আসবেন? এখন সংবাদমাধ্যম বলছে বিজেপি যখন ২০০ আসনের স্বপ্নে বুঁদ ছিল, তখন মুকুলবাবু তিন-তিনটে পরামর্শ দিয়েছিলেন। যার মধ্যে দুটো হল ধর্মীয় মেরুকরণ না করা আর মমতা ব্যানার্জিকে ব্যক্তিগত আক্রমণ না করা। তার ফলেই নাকি তাঁকে কোণঠাসা হয়ে পড়তে হয়।২ বিজেপিতে যোগ দিয়েও ধর্মীয় মেরুকরণের বিপক্ষে বলার মত নায়কোচিত দু-একটা কাজ কি আর শুভেন্দুবাবুও করেননি? তিনি যখন ফিরে আসবেন, তখন নিশ্চয়ই আমরা সেসব জানতে পারব।

অবশ্য মুখ্যমন্ত্রী নিজ মুখে বহুবার বুঝিয়ে দিয়েছেন তাঁর কাছে মুকুল আর শুভেন্দু এক নয়। মুকুলবাবুকে মাতৃক্রোড়ে ফিরিয়ে নেওয়ার দিন সাংবাদিক সম্মেলনে তো বলেছেনই, মুকুলের সাথে কোনদিন মতপার্থক্য হয়নি এবং মুকুল বিজেপিতে গিয়েও কোনদিন পার্টির বিরুদ্ধে খারাপ কথা বলেনি। মুখ্যমন্ত্রী নানা কাজে ব্যস্ত থাকেন, বয়সও হয়েছে। হয়ত স্মৃতি সবসময় ঠিকমত কাজ করে না। তার উপর মনটা দরাজ, ছোটখাট কথা মনে রাখেন না। কিন্তু সাংবাদিকদের কেউ কি প্রশ্ন তুলেছেন, মতপার্থক্য না হয়ে থাকলে একটা লোক পার্টি ছেড়ে অন্য পার্টিতে গেল কেন? গেলেও যদি সম্মুখসমরে ছেড়ে আসা পার্টির বিরুদ্ধে সত্যিই একটা কথাও না বলে থাকে, সে-ও তো ভারী আশ্চর্যের কথা। ইউরো চলছে, ফুটবলপ্রেমীরা জানেন যে ইউরোপের এক ক্লাবের ফুটবলার নিজের দলে খুব একটা খেলার সুযোগ না পেলে অনেকসময় সেই মরসুমেই অন্য ক্লাবে খেলতে চলে যান। কখনো কখনো দেখা যায় পুরনো ক্লাবের বিরুদ্ধে খেলায় গোলও করে ফেলেছেন। তাতে কিন্তু পরে আবার পুরনো ক্লাবে খেলা আটকায় না। মুকুলবাবুর বিজেপিতে যাওয়াও কি তেমন ব্যাপার ছিল? তৃণমূল-বিজেপির লড়াইটা তাহলে রাজনৈতিক নয়, আদর্শগতও নয়? ওটা আক্ষরিক অর্থেই খেলা? এসব প্রশ্ন কোন সংবাদমাধ্যমকে করতে দেখা যাচ্ছে না। দেখে শুনে মনে হয় তাঁরাও পক্ষ নিয়ে বসে আছেন। স্রেফ লাভ ক্ষতির অঙ্কে চলা সংবাদমাধ্যমের মালিকরাও ফ্যাসিবিরোধী সঙ্ঘে যোগ দিয়েছেন নাকি? হবেও বা।

অবশ্য মুকুলবাবুর ঘরে ফেরা আরও কিছু প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে, যে প্রশ্নগুলো করা ফ্যাসিবিরোধী সংবাদমাধ্যমের কর্তব্য। যেমন ‘নো ভোট টু বিজেপি’ ক্যাম্পেনের মানুষজন এবং লিবারেশন দলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক দীপঙ্কর ভট্টাচার্য — যাঁদের মমতা ব্যানার্জি নাম করে ধন্যবাদ জানিয়েছিলেন — তাঁরা কি মিথ্যে এত মেহনত করলেন? ওঁরা তো বরাবরই বলছিলেন এবারের লড়াই বাংলার মনীষা বাঁচানোর লড়াই। এটা কেবল রাজনৈতিকও নয়, রীতিমত সামাজিক সাংস্কৃতিক লড়াই। তৃণমূলের জয় এবং বিজেপির পরাজয়ের পরেও তো দীপঙ্করবাবু একাধিক সাক্ষাৎকারে এবং খবরের কাগজে নিজের লেখাপত্রে বারবার বলেছেন বাংলার মানুষ বিভাজনের বিপক্ষে ভোট দিয়েছেন বলেই এই ফলাফল হয়েছে। তা সেই ফলাফলের সুবিধা পেল যে দল, সেই দলের তাহলে কিছুই এসে যায় না মানুষ কী জন্যে ভোট দিয়েছে তা নিয়ে? তারা ফ্যাসিবাদী দলের নেতাকে দলে নিতেই পারে? বিজেপি ফ্যাসিবাদী নাকি স্রেফ অগণতান্ত্রিক স্বৈরাচারী, তা নিয়ে শূন্য পাওয়া সিপিএমে সেই ২০১৪ থেকে বিতর্ক চলেছে। বিজেপিকে ফ্যাসিবাদী বলে না মেনে নেওয়াই যে সিপিএমের কমতে কমতে শূন্য হয়ে যাওয়ার কারণ — সে কথা বিকল্প বামেরা বারবার বলেছেন। অর্থাৎ তাঁদের নিজেদের কোন সংশয় নেই যে বিজেপি ফ্যাসিবাদী। তাহলে সেই দলের নেতাকে দলে নেওয়ার পরেও কি তৃণমূল ফ্যাসিবিরোধী দল রইল? লিবারেশন মুকুলবাবুর প্রত্যাবর্তন নিয়ে যে বিবৃতি দিয়েছে তার বয়ান এইরকম:

রাজ্যের গণ রায় সার্বিকভাবে বিজেপির বিরুদ্ধে ছিল। ক্ষমতার লোভে দলবদল করে বিজেপিতে গিয়ে যারা প্রত্যাখ্যাত হয়েছে আজ আবার ক্ষমতার আকর্ষণেই তারা বিজেপি ছেড়ে তৃণমূলে ফিরে এলে আবার জনতার রায় নিতে হবে। এই দলবদলের সুবিধাবাদী রাজনীতি থেকে পশ্চিমবঙ্গের ও দেশের রাজনৈতিক পরিসরকে মুক্ত করা আজ গণতন্ত্রপ্রেমী মানুষের কাছে একটা বড় চ্যালেঞ্জ।

এই বিবৃতিতে কোথাও ফ্যাসিবিরোধী দল হিসাবে তৃণমূলের বিশ্বাসযোগ্যতা বাড়ল না কমল, নাকি একই রইল তা নিয়ে কোন মন্তব্য নেই। “মৌনং সম্মতি লক্ষণম” কথাটা যদি ঠিক হয়, তাহলে ধরে নিতে হবে লিবারেশন মনে করছে বিশ্বাসযোগ্যতা যেমন ছিল তেমনই আছে। কেবল “আবার জনতার রায় নিতে হবে”, অর্থাৎ মুকুলবাবু (আরও যাঁরা আসতে চলেছেন, বোধহয় তাঁরাও) পদত্যাগ করে আবার ভোটে দাঁড়িয়ে বিধায়ক হলেই আর আপত্তি নেই। লিবারেশনের কর্মী সমর্থকরা সোশাল মিডিয়ায় যা বলছেন, তাতে মনে হচ্ছে তাঁদের অনেকের ধারণা এতে বিজেপির শক্তি কমল। তাই তাঁরা বরং উল্লসিত। সত্যিই শক্তি কমল কিনা তা অচিরেই বোঝা যাবে, কিন্তু ফ্যাসিবাদী বলতে কী বোঝায় সেই প্রশ্ন নিয়ে তাহলে আবার আলোচনা করা প্রয়োজন। ভারতে বিজেপি-বিরোধী সাধারণ মানুষ, রাজনৈতিক দল ও বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে ক্রমশই জনপ্রিয় হয়ে উঠছে যে মতটা, তা হল বিজেপিকে যে ভোট দেয় সে-ই ফ্যাসিবাদী। এই মত ঠিক না ভুল সেটা আলাদা কথা, কিন্তু বিজেপি নেতারা ফ্যাসিবাদী, তবে অন্য দলে চলে গেলেই আর ফ্যাসিবাদী থাকে না — এই চিন্তায় নতুনত্ব আছে। গোয়বেলস বা গোয়রিং যদি নাজি পার্টি ছেড়ে দিতেন, তাহলে কি তাঁরা আর নাজি থাকতেন না? এই প্রশ্নের উত্তর কিন্তু দিতে হবে। কেবল লিবারেশনকে নয়, সমস্ত বিজেপি-বিরোধী তৃণমূলে উদ্ধার খোঁজা মানুষকেই দিতে হবে। আজ সংবাদমাধ্যম এসব প্রশ্ন তুলছে না বলে হয়ত দিতে হচ্ছে না, অদূর বা সুদূর ভবিষ্যতে দিতেই হবে। দীপঙ্করবাবুর মত নেতৃস্থানীয়দের হয়ত প্রকাশ্যে দিতে হবে, বাকিদের নিজেদের বিবেকের কাছে উত্তর দিতে হবে। কারণ ফ্যাসিবাদ এত সহজে হারে না। পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনে পর্যুদস্ত হয়েছে বলেই বিজেপি-আরএসএস হেরে গেছে, এমন ভাবার কোন যুক্তিসঙ্গত কারণ নেই।

নেই বলেই সাধারণ অবস্থায় যে কোন সরকারকে তার যেসব কাজকর্ম নিয়ে প্রশ্নের মুখে ফেলা উচিৎ, তৃণমূল সরকারকে সেগুলোর ক্ষেত্রে ছাড় দেওয়ার কোন কারণ নেই। অথচ সকলেই তা করে চলেছেন। আমি একটা বিজেপি-বিরোধী ওয়েবসাইটের হয়ে লিখতাম। আমার লেখায় সাধারণত উল্লিখিত খবরগুলোর তথ্যসূত্র দিয়ে থাকি। কোন একটা লেখায় পশ্চিমবঙ্গ সরকারও যে কোরোনা আক্রান্তের সংখ্যায় কারচুপি করছে, মৃতের সংখ্যা গোপন করছে — এমন অভিযোগের কথা লিখেছিলাম। অভিযোগটা আমার নয়। যে কাগজ সেই অভিযোগ তুলেছিল, সেই কাগজের প্রতিবেদনের লিঙ্ক দিয়েছিলাম। সাইটের সম্পাদকমণ্ডলীর একজন লেখাটা নিয়ে আমার সাথে আলোচনা করতে গিয়ে বললেন “এ কি আর একা পশ্চিমবঙ্গ সরকার করে? সবাই তো করে। এ আর লেখার কী আছে?” আমার লেখাটা অবিকৃত অবস্থাতেই প্রকাশিত হয়েছিল, কিন্তু সাইটের মনোভাব এ থেকে বোঝা যায়। মূলধারার সংবাদমাধ্যমেরও একই মনোভাব। যোগী বা শিবরাজ সিং চৌহানের রাজ্যের যেসব কুকর্ম নিন্দাযোগ্য, তা এ রাজ্যে অধিকাংশ ক্ষেত্রে প্রকাশযোগ্যও নয়।

পশ্চিমবঙ্গের সাথে সাথেই কেরালায় বিধানসভা নির্বাচন হল। এখানে যেমন তৃণমূল কংগ্রেস হৈ হৈ করে জিতল, ওখানে তেমনই আধিপত্য নিয়ে জিতেছে সিপিএম নেতৃত্বাধীন এলডিএফ। সেই মন্ত্রিসভার কে কে সদস্য হলেন, কেন হলেন — তা নিয়ে এ রাজ্যের এবং সারা দেশের সংবাদমাধ্যমে বিস্তর আলোচনা-সমালোচনা হল। বিজেপি-বিরোধীরাই সমালোচনার পুরোভাগে ছিলেন। এ রাজ্যের মন্ত্রিসভার সদস্যদের নিয়ে কিন্তু একটা শব্দও কেউ উচ্চারণ করলেন না। অথচ যাঁদের মন্ত্রী করা হয়েছে তাঁদের সম্বন্ধে নারদকাণ্ড সামনে আসার পর মুখ্যমন্ত্রী বলেছিলেন এরা এরকম জানলে মন্ত্রী করতেন না। এবার জানা সত্ত্বেও কেন করলেন, তা নিয়ে কেউ প্রশ্ন তুললেন না। সংবাদমাধ্যমের কথা নাহয় বাদ দেওয়া গেল, যাঁরা আগামী দিনে সর্বভারতীয় ক্ষেত্রে মোদীর বিকল্প হিসাবে মমতাকে ভাবছেন — তাঁদেরও কি দায়িত্ব নয় মমতার সরকারকে উন্নততর করতে চাপ দেওয়া?

এ রাজ্যে এখন সংসদীয় ক্ষমতার দিক থেকে কংগ্রেস টিমটিম করে জ্বলছে, বামপন্থীরা নেই। বিধানসভায় বামফ্রন্ট নেই, বাইরেও থাকবে কিনা তা নিয়ে সন্দেহ দেখা দিয়েছে ফরোয়ার্ড ব্লকের ঘোষণায়। গত দশ বছরে এরা যে বিরোধী দলের দায়িত্ব পালন করতে ব্যর্থ তা-ও স্পষ্ট। নইলে সারদার মত সবচেয়ে গরীব মানুষকে সর্বস্বান্ত করে দেওয়া আর্থিক কেলেঙ্কারির পরেও দুবার কোন দল ক্ষমতায় ফিরতে পারে না। তা এই যখন অবস্থা, তখন সরকারকে কড়া প্রশ্ন করার কাজটা বিজেপি-বিরোধী শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষ কেন করছেন না? নিজ নিজ ক্ষমতায় ইয়াসের পর ত্রাণ পৌঁছে দিতে তাঁরা যত উৎসাহী, গত দশ বছরে পশ্চিমবঙ্গে যেভাবে পরিবেশের বারোটা বাজানো হয়েছে তা নিয়ে প্রশ্ন তুলতে তাঁরা তত উৎসাহী নন কেন? পৃথিবীর কোন সমুদ্র সৈকত আগাগোড়া কংক্রিটে বাঁধিয়ে দিয়ে সমুদ্রের দোরগোড়ায় বাজার বসানো হয়? দীঘা নিয়ে এই প্রশ্ন এ রাজ্যের পরিবেশবিদরা করবেন না? বাঁধ তৈরি, মেরামতি — এসব প্রশ্নই বা কাদের জন্য তোলা রয়েছে? ই এম বাইপাসের দু ধারের অজস্র গাছ কেটে কংক্রিটে বাঁধিয়ে রেলিং দেওয়াকে যখন সৌন্দর্যায়ন বলে চালানো হয়, তখন নাহয় চুপ ছিলেন। এখন অন্তত মুখ খুলুন। যশোর রোডের ধারের গাছগুলোকে বাঁচাতে গিয়েছিল যে পড়ুয়ারা, তাদের কথা কারো মনে আছে আজ? নাকি এসব প্রশ্ন পরের সাইক্লোন অব্দি থুড়ি পরের নির্বাচন অব্দি তোলা থাকবে?

নির্বাচনের ফল বেরোবার পরের দেড় মাস বামপন্থীদের, বিশেষ করে সিপিএমের, কী করা উচিৎ তা নিয়ে কয়েক গিগাবাইট লেখা হয়ে গেল (আমিও লিখেছি)। সরকারের কী করা উচিৎ সে আলোচনা কি এবার শুরু হওয়া উচিৎ নয়? নাকি বাকি দেশে ক্ষমতাকে প্রশ্ন করাই সংবাদমাধ্যম এবং বিরোধীদের কাজ, কিন্তু এ রাজ্যে সরকারকে রক্ষা করা কাজ? ভারতের ফ্যাসিবিরোধী ইশতেহার কি সেরকমই বলছে?

https://nagorik.net/ এ প্রকাশিত। ছবি টুইটার থেকে।

কেন্দ্র-রাজ্য সংঘাত: পুরনো পড়া ভুলে গেছেন কমরেডরা?

তরুণরা না জানলেও মাঝবয়সী বা প্রবীণদের নিশ্চয়ই মনে আছে কেন্দ্র-রাজ্য সংঘাত ব্যাপারটা একেবারেই নতুন নয়।

“কেন্দ্র-রাজ্য সংঘাত বলতে তোর কী মনে পড়ে, তোপসে?”

“মোদী বনাম মমতা।”

জয়বাবা ফেলুনাথ ছবির সংলাপ অদল বদল করে নিয়ে আজকাল সোশাল মিডিয়ায় অনেক মিম ঘুরে বেড়ায়। এরকম একটা মিম তৈরি হওয়াও আশ্চর্য নয়। তবে তরুণরা না জানলেও মাঝবয়সী বা প্রবীণদের নিশ্চয়ই মনে আছে কেন্দ্র-রাজ্য সংঘাত ব্যাপারটা একেবারেই নতুন নয়। সাংবিধানিকভাবেই রাজ্য সরকারগুলোকে কেন্দ্রীয় সরকারের তুলনায় পিগমি করে রাখা হয়েছে এবং এই সম্পর্কের পুনর্বিন্যাস দরকার — এই দাবিতে সবচেয়ে সরব ছিলেন যে মুখ্যমন্ত্রী, তাঁর নাম জ্যোতি বসু। বস্তুত, আশির দশকে অকংগ্রেসি রাজ্যগুলোর কেন্দ্রের বঞ্চনার বিরুদ্ধে আন্দোলনে নেতৃত্ব দিত বামফ্রন্ট সরকার। ১৯৭৭-এ তৈরি হওয়া বামফ্রন্ট সরকারের অর্থমন্ত্রী অশোক মিত্র তাঁর আপিলা-চাপিলা গ্রন্থে সেকথা সবিস্তারে লিখেছেন। আজকের বাংলা সংবাদমাধ্যম এই সংঘাতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রতি সহানুভূতিশীল, কিন্তু সেদিনের সরকারকে বিস্তর টিটকিরি সহ্য করতে হয়েছিল। বলা হত, কেন্দ্রের টাকা না পাওয়া নিয়ে কাঁদুনি গেয়ে সরকার নিজের দায়িত্ব এড়াচ্ছে।

ব্যাপারটা যে তা ছিল না, বরং সমস্ত রাজ্যের প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক অধিকার বাড়ানোর জন্য অতি প্রয়োজনীয় লড়াই ছিল, তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ, ১৯৮৩ সালে শ্রীনগরে রাজ্যগুলোর দাবি জোরদার করতে ফারুক আবদুল্লার ডাকা সম্মেলনে খসড়া দাবি সনদ তৈরি করার জন্য গঠিত উপসমিতির সঞ্চালক হিসাবে অশোকবাবুর উপস্থিতি। ঐ বছরই ডিসেম্বরে কলকাতায় জ্যোতিবাবুর আমন্ত্রণে ঐ মর্মে আরো একটি বৈঠক হয়েছিল। ১৯৮৪ সালে যখন জম্মু ও কাশ্মীরের রাজ্যপাল ন্যাশনাল কনফারেন্স সরকারকে পদচ্যুত করেন, তখন জ্যোতিবাবুর নির্দেশে অশোকবাবু দিল্লী গিয়ে কংগ্রেস বিরোধীদের সভায় যোগ দেন এবং পরদিন শ্রীনগরে রাজ্যপালের সাথে দেখা করে প্রতিবাদ করেন; কাশ্মীরের মানুষের প্রতি সহমর্মিতা জ্ঞাপন করে ন্যাশনাল কনফারেন্সের সদর দপ্তরের ব্যালকনি থেকে জড়ো হওয়া জনতার উদ্দেশে ভাষণও দেন।

১৯৮৩-তে কেন্দ্র-রাজ্য সম্পর্কের পুনর্মূল্যায়নের জন্য গঠিত সারকারিয়া কমিশনের সুপারিশ কার্যকর করতে হবে — এ ছিল সেইসময় জ্যোতিবাবু, অশোকবাবুদের জোরালো দাবি। কিন্তু কেন্দ্রীয় সরকার তা মানেনি। মানলে মমতা দেবীর জগদীপ ধনখড়কে সহ্য করতে হত না। তার চেয়েও বড় কথা, জম্মু ও কাশ্মীরকে দ্বিখণ্ডিত করে কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল করে দেওয়া; দিল্লীর রাজ্য সরকারকে আইন বদলে ফেলে ঠুঁটো জগন্নাথ করে দেওয়া এবং মন্ত্রীদের গ্রেপ্তার, মুখ্যসচিবকে নিয়ে টানাটানি করে পশ্চিমবঙ্গে অস্থিরতা তৈরি করা — যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোর উপর এই ধারাবাহিক আঘাত হানা বিজেপির পক্ষে শক্ত হত।

আরও পড়ুন Has the CPI(M) forgotten its strong federal roots?

দুর্ভাগ্যজনক যে যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোর জন্যে পূর্বসুরীদের এই লড়াইয়ের ইতিহাস সিপিএমের বর্তমান নেতৃত্বের মনে আছে, এমন কোন লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফল সম্বন্ধে পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটির মতামত প্রকাশিত হয়েছে। বলা হয়েছে “তৃণমূল কংগ্রেস ও বিজেপির মধ্যে তীব্র মেরুকরণ হয়ে যায়। নির্বাচনী ফলাফলের এটিই সম্ভবত মূল কারণ।” নির্বাচনের প্রচারেও সিপিএমের (বা সংযুক্ত মোর্চার) পক্ষ থেকে এই বাইনারি ভাঙতে চাওয়ার কথা বলা হয়েছিল। গত এক মাসের ঘটনাবলীকে সিপিএম নিজেই কিন্তু ওই বাইনারির ঊর্ধ্বে উঠে দেখতে পারছে না। ভোট পরবর্তী এই লড়াই যে কেবল বিজেপি বনাম তৃণমূল নয়, বরং কেন্দ্রীয় সরকার বনাম রাজ্য সরকার — তা তারা এখনো বুঝছে না। মন্ত্রীদের গ্রেপ্তারিকে সিপিএমের আইনজীবী নেতা বিকাশ ভট্টাচার্য চটজলদি সমর্থন করেছিলেন। পার্টির মতামত তাঁর সঙ্গে মেলেনি, কিন্তু সে জন্যে বিকাশবাবুকে তিরস্কার করা হয়েছে বলেও খবর নেই। মুখ্যসচিবের ঘটনায় সুজন চক্রবর্তী যদিও বলেছেন এটা কেন্দ্রের প্রতিহিংসামূলক আচরণ, সাথে জুড়ে দিয়েছেন আলাপন বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাজের সমালোচনা।

প্রশ্ন উঠতেই পারে, বিধানসভা, লোকসভায় অনুপস্থিত দলের যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামো-টাঠামো নিয়ে ভেবে লাভ কী? উত্তর হল, বাইনারি ভেঙে যে বিরোধী পরিসর পুনরায় দখল করা এখন সিপিএমের লক্ষ্য, যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামো ভেঙে গেলে সেই পরিসরই আর থাকবে না। কারণ কেন্দ্রের হাতে সমস্ত ক্ষমতা চলে যাওয়া একদলীয় শাসন প্রতিষ্ঠার ঠিক আগের ধাপ।

উত্তরবঙ্গ সংবাদে প্রকাশিত