নো ভোট টু বিজেপি: কিন্তু কাকে, সে বার্তা কই

অতীতে অমল মেরে কমলের মাথা ফাটিয়ে দিয়েছিল জানতে পারলে আজ কমলের হাতে মার খেয়ে বিমলের ব্যথা কম হয় না।

প্রায় চল্লিশটা বসন্ত পার করে ফেললাম। বাবা এবং মামারা রাজনীতিবিদ হওয়ার কারণে স্লোগানের সঙ্গে আমার পরিচয় হয়ে গেছে প্রথম দু’তিন বসন্তের মধ্যেই। ভোটের বছরে বসন্তকাল মানেই প্রচারের মরসুম, আর প্রচার মানেই স্লোগানে স্লোগানে আঁকা দেওয়াল। সেখানে ‘চুপচাপ ফুলে ছাপ’-মার্কা চোখ-মটকানো স্লোগান থেকে শুরু করে সোচ্চার ‘শোষকের কালো হাত ভেঙে দাও গুঁড়িয়ে দাও’— সবই দেখেছি। প্রধানমন্ত্রীর নামে ‘গলি গলি মে শোর হ্যায় / রাজীব গান্ধি চোর হ্যায়’ স্লোগান দিতে দিতে বাড়ির সামনে দিয়ে মিছিল গেছে বুক ফুলিয়ে, কেউ তাদের ফিসফিসিয়েও দেশদ্রোহী বলেনি। স্লোগানের বিবর্তন বা পরিবর্তন নিয়ে মজা করে এবং না-করে অনেক কথাই লেখা সম্ভব, গবেষকরা হয়তো বা তা লিখবেনও। কিন্তু এবার প্রচারের মরসুমে একটা নতুন জিনিস চোখে পড়ছে। চিরকাল দেখেছি স্লোগান দেয় যুযুধান রাজনৈতিক দলগুলো। এবার কিন্তু দলগুলোর বাইরে থেকেও স্লোগান উঠে আসতে দেখছি!

বরাবর দলগুলো স্লোগান দেয় “আমাদের ভোট দিন”— এই মর্মে। কখনও কখনও কোনও কোনও স্লোগানে বিরোধী দলকে একটিও ভোট না-দেওয়ার কথাও বলা হয়ে থাকে। তবে সেই স্লোগানে প্রচ্ছন্ন থাকে এই বার্তা যে, “ওদের ভোট না-দিয়ে আমাদের ভোট দিন”। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনে এক নতুন ঘটনা ঘটছে। ভোটে লড়ছেন না এমন কিছু মানুষ গোষ্ঠীবদ্ধ হয়ে স্লোগান তুলেছেন, “নো ভোট টু বিজেপি”, অর্থাৎ বিজেপি-কে একটিও ভোট নয়।

ঘটনাটা নতুন হলেও আপত্তিকর নয়। গণতন্ত্র মানেই যে আমরা এখন নির্বাচন বুঝি, আর নির্বাচন বলতেই রাজনৈতিক দল— তা ভারতীয় গণতন্ত্রের দুর্বলতারই প্রমাণ। আসলে তো ব্যবস্থাটা ভোটার বা নাগরিকদের জন্য। সুতরাং দলীয় বৃত্তের বাইরে থাকা এক বা একাধিক নাগরিকও বলতেই পারেন, এদের ভোট দিন অথবা ওদের ভোট দেবেন না। তাছাড়া, পশ্চিমবঙ্গের এবারের নির্বাচন অতীতের সব নির্বাচনের চেয়ে যে আলাদা তা এখন আর নিছক মতামত নয়, রীতিমত ঘটনা। আমার মতো বছর চল্লিশেকের মাঝবয়সিরা তো বটেই, প্রবীণতর মানুষও মনে করতে পারছেন না, কবে নির্বাচনের নির্ঘণ্ট ঘোষণার আগেই রাজ্যে এসে পড়েছে কেন্দ্রীয় বাহিনী; শুরু হয়ে গেছে ভোটকর্মীদের প্রশিক্ষণ, এবং এত আগাম প্রস্তুতি সত্ত্বেও আট দফায় নির্বাচন হয়েছে।

এ রাজ্যে সাম্প্রতিক নির্বাচনগুলোতে ব্যাপক কারচুপির অভিযোগ এবং হিংসার ইতিহাসই এই তৎপরতার কারণ ভেবে নিয়ে নিশ্চিন্ত হওয়া যেতে পারত। কিন্তু ভারতে নির্বাচনের চরিত্র যেভাবে বদলে গেছে গত কয়েক বছরে, প্রত্যেকটি নির্বাচনের দিন যেভাবে প্রধানমন্ত্রীর প্রকল্প ঘোষণা শেষ হওয়ার পরই ঘোষিত হয়, নেতারা আচরণবিধি ভঙ্গ করলে নির্বাচন কমিশনের প্রতিক্রিয়ায় যে রকম তারতম্য দেখা যায়, পাঁচ রাজ্যের নির্বাচনের অব্যবহিত পূর্বে যেভাবে সোশাল মিডিয়াকে পর্যন্ত নিয়ন্ত্রণে আনার আইন প্রস্তাবিত হল— তাতে সন্দেহ প্রবল হচ্ছে যে কেন্দ্রের শাসক দল যেন তেন প্রকারেণ পশ্চিমবঙ্গের ক্ষমতা দখল করতে চায় বলেই এত লম্ফঝম্প। সেই পরিপ্রেক্ষিতে কিছু সচেতন নাগরিক যদি মনে করেন বিজেপি ক্ষমতায় এলে রাজ্যের সর্বনাশ হবে, তাই এদের ভোট দেওয়া উচিত নয়— সে কথা যেভাবে ইচ্ছা সেভাবেই বলার অধিকার তাঁদের নিশ্চয় আছে।

কিন্তু, “নো ভোট টু বিজেপি” স্লোগান নিয়ে সমস্যা অন্যত্র।

যে যা-ই বলুন, ২০১৯-এর লোকসভা নির্বাচনে প্রাপ্ত ভোটের হার এবং আসনসংখ্যার নিরিখে ২০২১ পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনে দুই প্রধান পক্ষ অবশ্যই তৃণমূল কংগ্রেস আর বিজেপি। যদি তৃণমূল কংগ্রেস স্লোগান দিত, বিজেপিকে একটিও ভোট নয়, ভোটারের পক্ষে তা সমস্যার হত না। কারণ তিনি জানতেন, এ স্লোগানের মানে হল তৃণমূল কংগ্রেসকে ভোট দিন। দেবেন কিনা, সেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য তাঁর সামনে আছে তৃণমূল সরকারের দশ বছরের কাজকর্ম, নেত্রী হিসাবে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মুখ, সঙ্গে জুড়তে পারে তৃণমূল দলের নির্বাচনী ইশতেহার। কিন্তু “নো ভোট টু বিজেপি” ক্যাম্পেন চালাচ্ছেন যাঁরা, তাঁরা ভোটারকে ধন্দে ফেলেছেন। বিজেপিকে না-হয় দেব না, কিন্তু দেব কাকে? কেনই বা দেব?

যাঁরা এই ক্যাম্পেন চালাচ্ছেন তাঁরা সম্ভবত বুঝতে পারছেন না, পশ্চিমবঙ্গের একজন গ্রামীণ ভোটার বা শহর-মফস্বলের নিম্নবিত্ত, মধ্যবিত্ত ভোটারের কাছে নির্বাচনটা হিন্দুত্ব এবং/অথবা ফ্যাসিবাদ বনাম উদারবাদ এবং/অথবা ধর্মনিরপেক্ষতার নয়। এমনকী সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষের কাছেও নির্বাচন বস্তুত বাঁচামরার প্রশ্ন। শিল্পী, সাহিত্যিক, সাংবাদিক, অভিনেতা, চলচ্চিত্রনির্মাতাদের আশঙ্কা— বাংলার সংস্কৃতি বিপন্ন হবে। সরকারের বিরুদ্ধে যারা কথা বলে, লেখালিখি করে তাদের কারারুদ্ধ করা হবে, যেমনটা বিজেপি-শাসিত রাজ্যগুলোতে হচ্ছে। এই আশঙ্কা নির্ভুল। কিন্তু বীরভূম বা মেদিনীপুরের গ্রামের যে ভোটার লেখেন না, ছবি আঁকেন না, সিনেমা বানান না, কোনওদিনই কোনও শাসক দলের বিরুদ্ধে সোচ্চার নন— তিনি ভোট দেওয়ার সময় চিরকাল বিবেচনা করেন তাঁর রুজিরোজগারের সুবিধা হবে কাকে ভোট দিলে? কোন প্রার্থী তাঁর এলাকার রাস্তাঘাট ভালো করে দেবেন? এলাকায় গুন্ডা বদমাইশের দাপট কমবে কি অমুককে ভোট দিলে?

প্রত্যেকটা প্রশ্নের উত্তরেই বলা সম্ভব যে, বিজেপিকে ভোট দিলে এই প্রশ্নগুলোর একটারও উত্তর সন্তোষজনক হবে না। কিন্তু সাধারণ ভোটদাতা এতে সন্তুষ্ট হওয়ার পাত্র নন। তিনি তাঁর চাহিদা পূরণের গ্যারান্টি চান। যখন প্রত্যাশা তলানিতে এসে ঠেকে, যেমনটা বিজেপির ‘জয় শ্রীরাম’ হুঙ্কারে সারা দেশের সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গের ধর্মীয় সংখ্যালঘুদেরও হয়েছে, তখনও একজন সাধারণ ভোটদাতা চান আক্রমণের মুখে তাঁকে কে বাঁচাবেন, তার গ্যারান্টি। সেই গ্যারান্টি দিতে পারে একটা রাজনৈতিক দল বা জোট। নোটা (NOTA) পারে না, ‘নো ভোট টু বিজেপি’-ও পারে না। রাজনৈতিক দলগুলো নিজেদের দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হলে নাগরিক সমাজকে এগিয়ে আসতে হবে— এ কথা খুব বলা হয় আজকাল। সেই ভাবনা থেকেই ‘নো ভোট টু বিজেপি’-র মতো ক্যাম্পেনের জন্ম।

কিন্তু গোলমালটা ‘নাগরিক সমাজ’ শব্দবন্ধের মধ্যেই লুকিয়ে আছে। কারণ ‘গ্রামসমাজ’ বলে এর দোসর কোনও শব্দবন্ধ নেই আমাদের নাগরিক চেতনায়। বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর আলিপুরদুয়ারে বা নামখানায় কোনও মানুষের ঘরে যদি আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়, নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা সেখানে পৌঁছনোর আগেই সর্বস্ব পুড়ে ছাই হয়ে যাবে। নাগরিক সমাজ বড় জোর আইনি লড়াইতে সাহায্য করতে পারবে, পুলিশ এফআইআর নিতে না-চাইলে তাকে চাপ দিতে পারবে। বাঁচতে হলে স্থানীয় রাজনৈতিক দলের নেতা, কর্মী, তারা যত খারাপই হোক না কেন, তাদের উপরেই নির্ভর করতে হবে। সুতরাং অধিকাংশ ভোটারের কাছেই কাকে ভোট দেব তা না-বললে, কাকে দেব না তা নিয়ে পরামর্শ দেওয়া নিরর্থক।

পশ্চিমবঙ্গে আরও একটা নিদারুণ বাস্তবতা রয়েছে। বিজেপি-শাসিত রাজ্যগুলোতে সমাজকর্মী, বিরোধী রাজনৈতিক দলের কর্মী সমর্থক, শিল্পী সাহিত্যিক, ছাত্রছাত্রী এবং বিভিন্ন দাবিতে চলা গণতান্ত্রিক আন্দোলনের উপর যে দমনপীড়ন, বাক্‌স্বাধীনতার উপর যেরকম হস্তক্ষেপ চলে বলে বিজেপিকে একটিও ভোট নয় বলা হচ্ছে, তা পশ্চিমবঙ্গেও কেন্দ্রে বিজেপি ক্ষমতায় আসার আগে থেকেই চলছে। সোশাল মিডিয়া পোস্টের জন্য অম্বিকেশ মহাপাত্র গ্রেফতার হয়েছেন, মুখ্যমন্ত্রীর সভায় তাঁকে সরাসরি প্রশ্ন করার মহাপাপ শিলাদিত্যকে গরাদের পিছনের অন্ধকার দেখিয়েছে। সুদীপ্ত গুপ্ত, মইদুল ইসলাম মিদ্যার মৃত্যুও বিজেপির কারণে হয়নি। ভাঙড়ের পাওয়ার গ্রিড-বিরোধী আন্দোলন করার কারণে একাধিক মানুষকে দমনমূলক কেন্দ্রীয় আইন প্রয়োগ করে গ্রেফতার করা হয়েছে (এঁদের অনেকে ‘নো ভোট টু বিজেপি’ ক্যাম্পেনের সদস্য। সে তাঁদের মহত্ব, কিন্তু সকলেই অমন মহৎ হবেন এমনটা আশা করা যায় না)। আন্দোলনরত মাদ্রাসা শিক্ষকদের উপর লাঠি চালানো হয়েছে। টেট পরীক্ষা দিয়ে চাকরি না-পাওয়া ছেলেমেয়েদের আন্দোলনে শীতের রাতে জলকামান চালানো হয়েছে। এক অনশনরত প্যারাটিচারের মৃত্যুও হয়েছে খাস কলকাতায়।

দিল্লির মূলধারার সংবাদমাধ্যম সরকারবিরোধী আন্দোলনকে দেশবিরোধী বলে দেগে দেয়, কলকাতার এঁরা মোটের উপর অগ্রাহ্য করেন। তাই আমাদের অনেকের চোখেই পড়ে না। মুখ্যমন্ত্রীর অনুপ্রেরণায় বর্ণাঢ্য চলচ্চিত্র উৎসব হয় যে শহরে, সেখানে অনীক দত্তের ছবি ‘ভবিষ্যতের ভূত’ সমস্ত আইনি ছাড়পত্র পাওয়ার পরেও মুক্তি পায়নি, সুপ্রিম কোর্টকে হস্তক্ষেপ করতে হয়েছে। ফলে ত্রিপুরা বা উত্তরপ্রদেশের উদাহরণ অনেককেই বিজেপি সম্বন্ধে নতুন করে আতঙ্কিত করতে পারছে না। আমরা যারা এগুলোর কোনওটাতেই ক্ষতিগ্রস্ত হইনি, তাদের ভবিষ্যতের কথা ভেবে যতটা হৃদ্‌কম্প হচ্ছে, ক্ষতিগ্রস্তদের যদি ততটা না হয়, তাদের দোষ দেওয়া যায় কি?

এসব প্রশ্ন তুললে ‘নো ভোট টু বিজেপি’ ক্যাম্পেনের দিক থেকে বামফ্রন্ট আমলের বিভিন্ন ঘটনা তুলে এনে বলা হচ্ছে, এমনটা পশ্চিমবঙ্গে আগেও ঘটেছে। অতএব বিজেপি যেহেতু অনেক বড় বিপদ, তাই এসব ভুলে গিয়ে বিজেপির রাস্তা আটকানোকে পাখির চোখ করে ভোট দেওয়াই উচিত। বিজেপি (প্রকৃতপক্ষে আরএসএস) যে এ দেশের সব দলের থেকে আলাদা এবং বেশি ভয়ঙ্কর, তা নিয়ে সন্দেহ নেই। কিন্তু দুঃখের বিষয়, অতীতে অমল মেরে কমলের মাথা ফাটিয়ে দিয়েছিল জানতে পারলে আজ কমলের হাতে মার খেয়ে বিমলের ব্যথা কম হয় না। সে ওঁত পেতে থাকা শ্যামলের কুকীর্তিগুলো অগ্রাহ্য করে কমলকে পাল্টা মার দিতে চাইলে তাকে অবশ্যই অদূরদর্শী বলা চলে। কিন্তু “আর যা-ই করো বাপু, শ্যামলকে ডেকে এনো না” বলে লাভ হবে না। বরং যদি নির্দিষ্ট করে বলা যায় “কমল/অমল তাদের অতীতের কুকীর্তিগুলোর জন্য লজ্জিত, ওসবের পুনরাবৃত্তি করবে না। ওদের আর একটা সুযোগ দিয়ে দেখো।” তাহলে তবু কিছু হতে পারে। কিন্তু এমন কথা ‘নো ভোট টু বিজেপি’ ক্যাম্পেনের লোকেরা বলতে পারছেন না। পারার কথাও নয়, কারণ তাঁরা তৃণমূল কংগ্রেসের সদস্য নন; সিপিএম, কংগ্রেস বা হঠাৎ গজানো ইন্ডিয়ান সেকুলার ফ্রন্টেরও সদস্য নন। এদের হয়ে তাঁরা প্রতিশ্রুতি দেবেন কোন অধিকারে? ওঁরা তাই বলছেন, যে কেন্দ্রে বিজেপির বিরুদ্ধে যে প্রার্থী সবচেয়ে শক্তিশালী, তাকেই ভোট দিন। এই তত্ত্ব অনুযায়ী ভোট দিতে হলে ভোটারকে নিজের দাবিদাওয়া তো ভুলতে হবে বটেই, উপরন্তু হয় জ্যোতিষ, নয় সেফোলজিস্ট হতে হবে।

আজকের রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে হৃদয়বান মানুষের বিড়ম্বনার শেষ নেই। পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছি বিজেপি এলে সমূহ সর্বনাশ, অথচ বুক ঠুকে “তৃণমূলকে ভোট দিন” বলতে পারছি না। আমার কথা শুনে লোকে ভোট দিল, তারপর নির্বাচিত ব্যক্তি নিজেই হয়তো বিজেপিতে চলে গেলেন। তখন বল মা তারা দাঁড়াই কোথা! আবার যদি বলি “বাম-কংগ্রেস জোটকে ভোট দিন”, তাহলে ধর্মীয় ফ্যাসিবাদী বিজেপির বিরুদ্ধে লড়াই করতে এদের ধর্মীয় নেতারই হাত ধরতে হল কেন, সে ব্যাখ্যা দিতে হয়। তা আমি কোথা থেকে দিই? আমি দলের লোক নই বলে আমার কাছেও ব্যাখ্যা নেই। সম্ভবত এই দ্বন্দ্বেই ‘নো ভোট টু বিজেপি’ ক্যাম্পেনের পাত্রপাত্রীরা দীর্ণ। এর চেয়ে ভাল হত, এঁরা নিজেরাই যদি একটা দল গড়ে নির্বাচনে দাঁড়াতেন। যে পথে হেঁটে ‘ইন্ডিয়া এগেন্সট করাপশন’ আজকের আম আদমি পার্টির চেহারা নিয়েছে।

পশ্চিমবঙ্গ অবশ্য অনেক বড় রাজ্য। এখানে কেবল শিল্পী বা সাহিত্যিক হয়ে ভোটে জেতা শক্ত।

https://4numberplatform.com/ এ প্রকাশিত

প্রতিবাদের ভাষা, প্রতিরোধের নিভু নিভু আগুন

গত দশ বছরে তৃণমূল নেত্রীর উচ্চারণের ত্রুটি নিয়ে খোদ সূর্যকান্ত মিশ্রের টুইটার হ্যান্ডেল থেকে কম কটাক্ষ করা হয়নি। ‘টুম্পা’ তেমন উচ্চারণকেই বাম রাজনীতির ভাষা করে দিল।

বেশিদিন আগের কথা নয়। মাত্র কয়েক বছর আগে হোয়াটস্যাপ, ফেসবুক ভরে গিয়েছিল নারী কণ্ঠে গাওয়া ভূপেন হাজারিকা খ্যাত ও গঙ্গা তুমি গানে। সেখানে গায়িকা প্রথমে পল রোবসনের ‘ওল্ড ম্যান রিভার’ গাইছিলেন। তারপর ঐ গানের অনুসরণে রচিত ‘ও গঙ্গা তুমি’। বলা হচ্ছিল গলাটা কলম্বিয়ান শিল্পী শাকিরার। কয়েক দিন পরে জানা গেল, আসলে ঐ কণ্ঠ পূরবী মুখার্জির। যিনি এক সময়কার পরিচিত শিল্পী, প্রচুর গণসঙ্গীত গেয়েছেন। বাঙালি, বিশেষত বামপন্থী বাঙালি, নিজেদের সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার কত দ্রুত হারিয়ে ফেলছে তা দেখে অবাক লেগেছিল। সেই বিস্মৃতি আরো কুৎসিত চেহারায় প্রতিভাত হয়েছে গত কয়েক দিনে। বামফ্রন্টের ডাকা ব্রিগেড সমাবেশের প্রাক্কালে ঐ সভায় যোগ দেওয়ার আহ্বান হিসাবে মোবাইল থেকে মোবাইলে ছড়িয়ে পড়েছে জনপ্রিয় গান টুম্পার প্যারডি।

কুৎসিত বলায় সিপিএম কর্মীরা রাগ করবেন। কাগজে পড়ছি কেবল শতরূপ ঘোষের মত তরুণ তুর্কিরাই নয়; মহম্মদ সেলিম, শমীক লাহিড়ির মত বর্ষীয়ান নেতারাও “শতফুল বিকশিত হোক”, “বয়সের নিজস্ব ভাষা” প্রভৃতি যুক্তিতে সিপিএম ডিজিটালের সদস্যদের তৈরি এই প্যারডির পক্ষে চেতেশ্বর পূজারার মত ব্যাট করছেন।

বিধানসভা নির্বাচনের আগে পশ্চিমবঙ্গে অকথা কুকথার বান ডেকেছে। লাইভ টিভিতে বিজেপি আর তৃণমূলের দুই নেতা একে অপরের জন্মদাতাকে পর্যন্ত গালাগালি করেছেন। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর চেহারা নিয়ে কটাক্ষ করেছেন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁকে এবং তাঁর ভাইপোকে ব্যক্তিগত আক্রমণ করা হয়েছে বিজেপির দিক থেকেও। বামপন্থীরা সঙ্গত কারণেই দুপক্ষেরই সমালোচনা করছিলেন, বলছিলেন সাধারণ মানুষের ইস্যু বাদ দিয়ে কদর্য ভাষায় কুৎসিত রাজনীতি করা হচ্ছে, যা বাংলার সংস্কৃতির পরিপন্থী। সেই আবহে হিন্দি মিশ্রিত, অভিধান বহির্ভূত শব্দ সম্বলিত টুম্পাকে ব্রিগেডে নিয়ে যাওয়ার সঙ্কল্প কোন সংস্কৃতিকে ধারণ করছে কে জানে! ইদানীং কিছু ভোজপুরি গান নানা উপলক্ষে বাজতে শোনা যায়। সেগুলোর অন্যতম বৈশিষ্ট্য কয়েকটা শব্দ পরে পরেই শিল্পীর কণ্ঠের সাথে এক যান্ত্রিক আওয়াজের ক্যাকোফোনি। মূল ‘টুম্পা’ গানটা সেই ধারা অনুসরণ করেছে, প্যারডিও তাই। বামপন্থীরা যে ইস্যুভিত্তিক বিতর্কের কথা বলছিলেন, এ গানে তা-ই বা কোথায়? কেবল তৃণমূল-বিজেপির ‘সেটিং’-এর কথা রয়েছে, মমতা বা মোদী সরকারের কার্যকলাপের কড়া সমালোচনাও নেই। শুধু বার দুয়েক চাকরির প্রসঙ্গ আছে। অর্থাৎ এই প্যারডি রাজনৈতিক বক্তব্যে দুর্বল এবং আঙ্গিকে অবাঙালি। তবুও ভাইরাল, সুতরাং জনপ্রিয়। এতেই বাম নেতারা উল্লসিত। ভাইরাল মানেই ভোট বলে ভাবছেন হয়ত। ঠিক ভাবছেন কিনা তা সময় বলবে। তবে মজা লাগল অন্য কারণে।

আরও পড়ুন বাঙালির চেতনার রঙে শিল্প হল গো অ্যাজ ইউ লাইক

গত দশ বছরে তৃণমূল নেত্রীর উচ্চারণের ত্রুটি নিয়ে খোদ সূর্যকান্ত মিশ্রের টুইটার হ্যান্ডেল থেকে কম কটাক্ষ করা হয়নি। ‘টুম্পা’ তেমন উচ্চারণকেই বাম রাজনীতির ভাষা করে দিল। নীচের তলার বাম কর্মীদের আকছার বলতে শোনা যায়, তৃণমূল কংগ্রেসের আমলে বাঙালির “কালচারে আলকাতরা মিশে গেছে”। টুম্পার প্রেমে পড়ে এখন দেখছি কালচারের ধারণাটাকেই তাঁরা “এলিটিস্ট” আখ্যা দিচ্ছেন। মুখ্যমন্ত্রীর লেখা কবিতা নিয়ে বিস্তর হাসাহাসি করতেন ওঁরা, আর মমতাপ্রেমী বুদ্ধিজীবীরা বলতেন কে কবি কে নয়, তা দাগিয়ে দেওয়া ভদ্রলোকদের এলিটিজম। জীবনানন্দ দাশের ভাষায় এমন অসাহিত্যিক প্রলাপ শুনে শিউরে উঠতাম। এখন ‘টুম্পা’-র পক্ষে দেখছি একইরকম যুক্তি দেওয়া হচ্ছে। শমীকবাবু বলেছেন “উচ্চাঙ্গসঙ্গীতই যে একমাত্র সংস্কৃতি, সেটা কোথায় সিদ্ধান্ত হল?”

উচ্চাঙ্গসঙ্গীত মনে পড়ল অথচ গণসঙ্গীত মনে পড়ল না! জনপ্রিয় সাংস্কৃতিক প্রতীক ব্যবহার করে প্রতিবাদী গান বাঁধার কথা বললেই যে কোন ইতিহাস সচেতন কমিউনিস্টের মাউন্টব্যাটেন মঙ্গলকাব্য মনে পড়ার কথা। লর্ড মাউন্টব্যাটেনের কংগ্রেসের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরকে ব্যঙ্গ করে তৈরি সেই গান মঙ্গলকাব্যের ভাষায় হওয়ায় অক্ষর পরিচয় না থাকা মানুষকেও ছুঁয়ে ফেলত।

আর আজ কমিউনিস্টরা মনে করছেন সাধারণ মানুষের ভাষা মানে কিছু অভিধান বহির্ভূত শব্দ।

অবশ্য হেমাঙ্গ বিশ্বাস, জ্যোতিরিন্দ্র মৈত্র, সলিল চৌধুরীদের যুগ কবেই চলে গেছে। তখন সম্ভবত সংসদীয় কমিউনিস্টরাও চাইতেন মানুষকে বিকল্প বৈপ্লবিক সংস্কৃতির খোঁজ দিতে। এখন পাবলিক যা খাচ্ছে, সেটাকেই ব্যবহার করে ভোটে জিততে চান।

টুম্পা দীর্ঘজীবী হোক।

উত্তরবঙ্গ সংবাদে প্রকাশিত

বাংলার কূপমণ্ডূক হাসি

বাঙালি বিদূষকদের সেই মেধা নেই, সেই সাহস নেই — যা থাকলে ভাঁড় মোসাহেব হয়ে থাকেন না, বিদূষক হয়ে ওঠেন।

দুটো বিপরীতার্থক শব্দ নিয়ে বাঙালির দুই আইকন বিস্তর ভাবনা চিন্তা করেছেন। রবীন্দ্রনাথ “বিশ্বনাগরিক” শব্দটা আমাদের দিয়েছেন, আর সত্যজিৎ রায় তাঁর সারাজীবনের কাজে সিধু জ্যাঠা, প্রফেসর শঙ্কুর মত বিশ্বনাগরিককে আঁকার পর শেষ ছবি ‘আগন্তুক’-এ পর্যটক মনমোহনের মাধ্যমে “কূপমণ্ডূক” হতে বারণ করেছেন। বাঙালি নিজেকে বিশ্বনাগরিক বলে পরিচয় দিতে বিলক্ষণ ভালবাসে। কিন্তু দুঃখের বিষয় যত দিন যাচ্ছে, তার মধ্যে কূপমণ্ডূকতার লক্ষণগুলোই প্রকট হতে দেখা যাচ্ছে। বাঙালির সংস্কৃতি নিয়েও গর্বের শেষ নেই। সংস্কৃতি প্রায় নির্বাচনী ইস্যু হয়ে দাঁড়িয়েছে, অনেকের ধারণা কালচার শব্দটা বাংলাই। সেই কালচারেই আপাদমস্তক কূপমণ্ডূকতা দেখা যাচ্ছে। গোপালকৃষ্ণ গোখেল দেড়শো বছর আগে বলেছিলেন আজ বাংলা যা ভাবে, কাল ভারত তাই ভাবে। তা নিয়ে আমরা আজও গর্ব করি। অথচ এখন শিল্প, সাহিত্য, সিনেমা — সবেতেই ভারত আজ যা ভাবছে, বাংলা আগামী পরশুও ভেবে উঠতে পারবে বলে ভরসা হচ্ছে না।

গুরুগম্ভীর ব্যাপার বাদ দিয়ে হাসি তামাশা নিয়েই আলোচনা করা যাক। হাতে হাতে স্মার্টফোন আর শস্তা ইন্টারনেটের কারণে এখন অ্যামাজন, নেটফ্লিক্সের মত ওটিটি প্ল্যাটফর্ম আর ইউটিউবের রমরমা। এসবে বিনোদন বলতে শুধু সিনেমা আর ওয়েব সিরিজ বোঝায় না, স্ট্যান্ড আপ কমেডিও বোঝায়। মানে একজন শিল্পী মাইক হাতে লোক হাসান। ব্যাপারটা কিছুটা বক্তৃতা, কিছুটা অভিনয়। কিন্তু উদ্দেশ্য লোক হাসানো। সারা পৃথিবীতেই ব্যাপারটা এখন দারুণ জনপ্রিয়। তবে এই স্ট্যান্ড আপ কমেডিয়ানরা শুধু লোক হাসানোয় থেমে নেই। সারা পৃথিবীতে গত কয়েক বছরে গণতন্ত্রের সঙ্কটে এঁরা প্রতিবাদী স্বর। এই বিদূষকদের পিচকিরি থেকে ছুটে আসা রসিকতার রঙে ডোনাল্ড ট্রাম্প, ভ্লাদিমির পুতিন, জেয়ার বলসোনারো, নরেন্দ্র মোদী, অ্যাঞ্জেলা মেরকেল, জাস্টিন ট্রুডো — সকলের কাপড় চোপড় নষ্ট হচ্ছে। ট্রেভর নোয়া, হাসান মিনহাজরা রীতিমত তারকা হয়ে উঠেছেন অল্প সময়েই। ব্রিটিশ কমেডিয়ান জন অলিভার হাসানোর শিল্পকে অন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন। তাঁর শো লাস্ট উইক টুনাইট রীতিমত খবরের বুলেটিন। শুধু পরিবেশনের আঙ্গিকে নয়, বিষয় নির্বাচন আর গবেষণার গভীরতাতেও। সারা পৃথিবীর শাসক, ক্ষমতাশালী, অতি ধনীরা তাঁর রসিক বুলেটিনের চাঁদমারি।

ইউরোপ, আমেরিকার বিদূষকদের সুবিধা এই, যে তাঁদের বিরুদ্ধে গণ আক্রমণ বা রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস হয়নি এখনো। ভারতে হয়েছে, হচ্ছে। কুণাল কামরা শো করতে গিয়ে বাধা পেয়েছেন একাধিক জায়গায়, অনলাইন হুমকি তো পেয়েই থাকেন। আরেক বিদূষক বরুণ গ্রোভার তো একটা শোতে হাসতে হাসতে বলেছিলেন “আমাকে অনেকে জিজ্ঞেস করে ‘এত যে হুমকি পান, ভয় করে না?’ আমি বলি আমার আগে তো কামরার নম্বর আছে। ওর ভাল মন্দ কিছু একটা হয়ে যাক, তারপর ভয় পাব।” এসবের ফলে যা হয়েছে, তা হল ভারতে বিদূষকরা হয়ে দাঁড়িয়েছেন প্রতিবাদের মুখ। ক্ষমতা যত টুঁটি টিপে ধরছে, এঁরা তত বেপরোয়া হচ্ছেন। কুণালের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টকে অবমাননার অভিযোগ আনা হয়, তিনি ক্ষমা চাইতে অস্বীকার করেন। তার কয়েক মাস আগেই জনপ্রিয় দক্ষিণপন্থী সংবাদ পরিবেশককে তাঁরই কায়দায় প্রশ্ন করার “অপরাধে” কুণালের বিমানে চড়ার অধিকার কেড়ে নেওয়া হয় ছ মাসের জন্য। তবে সবকিছু ছাপিয়ে গেছে মুনাওয়ার ফারুকির উপর আক্রমণ। শোতে ঢুকে পড়ে তিনি কী বলতে পারেন (বলেননি কিন্তু), তা ধরে নিয়ে গ্রেপ্তারি এবং দিনের পর দিন বিনা জামিনে হাজতবাস করানো হয়েছে দিনের পর দিন। স্বাধীন ভারতে দলীয় রাজনীতির বাইরে থাকা কোন মানুষের সাথে রাষ্ট্রের এরকম ব্যবহার বিরল। কুণাল মুনাওয়ারের পাশে দাঁড়িয়েছেন, আইনি লড়াইয়ে সবরকম সাহায্য করেছেন।

দেশ বিদেশের বিদূষকরা যখন এরকম ধুন্ধুমার কাণ্ড করে বেড়াচ্ছেন, তখন বাংলার বিদূষকদের দেখুন। বিভিন্ন বাংলা চ্যানেলে লাফটার চ্যালেঞ্জ মার্কা একাধিক অনুষ্ঠান দেখা যায়। তার উপর আছে ফেসবুক, ইউটিউব চ্যানেল। এতজন হাস্যরস উৎপাদন করছেন অথচ কারোর রসিকতা কোন নেতা নেত্রী আমলা ব্যবসায়ীর গায়ে লাগছে না। কারণ লোক হাসাতে বাঙালি বিদূষকরা কেবল বেঁটে লোককে বেঁটে, মোটা লোককে মোটা বলছেন আর অতি স্থূল, নারীবিদ্বেষী যৌন রসিকতা করছেন। নিজস্ব কুয়োয় নিরাপদ হাসি চলছে। অথচ এমন নয় যে বাংলার রাজনীতি বৈকাল হ্রদের মত নির্মল আর ডেড সি-র মত শান্ত। গত এক-দেড় দশকে জানা গেছে এখানে একজন রাজনীতিবিদ আছেন, যিনি প্রতিপক্ষকে খুনের হুমকি দেন কারণ তাঁর মস্তিষ্কে ঠিকমত অক্সিজেন যায় না। আরেকজন আছেন, যিনি সাংবাদিকের পশ্চাদ্দেশে পিন ফোটাতে চান। আরো একজন আছেন, যিনি গরুর দুধ থেকে নিষ্কাশন করতে পারেন। অতি সম্প্রতি আবার এক দম্পতিকে পাওয়া গেছে, যাঁদের বৈবাহিক জীবনের সবকিছুই রাজনীতির স্বার্থে প্রকাশ্য। তার উপর আছে দলবদলান্তে ভোল বদল। এক কথায় বাংলার জমি এখন হাসি তামাশার পক্ষে অতি উর্বর। কুণাল কামরার ভাষায় বলতে গেলে “কাঁহা মিলেগা ইতনা কনটেন্ট?” এমনও বলা যায় না যে সাধারণ দর্শক এসব নিয়ে হাসি তামাশা পছন্দ করেন না। হোয়াটস্যাপ, ফেসবুকে তাঁরা বাংলার রাজনীতি নিয়ে অনর্গল রসিকতা করছেন, রসিকতা শেয়ার করছেন। আসলে বাঙালি বিদূষকদের সেই মেধা নেই, সেই সাহস নেই — যা থাকলে ভাঁড় মোসাহেব হয়ে থাকেন না, বিদূষক হয়ে ওঠেন।

আরও পড়ুন হাসছি মোরা হাসছি দেখো: বীর দাসের বীরত্বে দুই ভারতের পর্দা ফাঁস

হাস্যরস উৎপাদনে বাঙালির এই কূপমণ্ডূকতা দ্বিগুণ দুঃখজনক, কারণ উনবিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে হুতোম প্যাঁচার নকশার প্রবল শ্লেষ থেকে শুরু করে শরচ্চন্দ্র পণ্ডিত, সুকুমার রায়, রাজশেখর বসু হয়ে সদ্য শতবর্ষ পার করা ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়, জহর রায়, রবি ঘোষ যে হাস্যরসের পরম্পরা প্রতিষ্ঠা করেছেন বাঙালির সাহিত্যে, সিনেমায়, মঞ্চে দাঁড়িয়ে হাস্যকৌতুক বলায় — তা কখনো সমকালীন সমাজ, রাজনীতিকে পাশ কাটিয়ে যায়নি। উদাহরণের তালিকা দীর্ঘ না করে শুধু এইটুকু বলা থাক, ভানুবাবুর ‘নবরামায়ণ’ যদি এ যুগে অ্যামাজন বা নেটফ্লিক্সের জন্য তৈরি করা হত, তাহলে ক্ষমতাসীনরা প্রবল তাণ্ডব করতেন। হয়ত ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি থেকে নির্বাসনের ব্যবস্থাও করে দেওয়া হত। উনি অবশ্য পিছু হটতেন বলে মনে হয় না। সে যুগে বামপন্থী সংগঠন করার জন্য টালিগঞ্জে কাজ না পেয়ে ডোন্ট কেয়ার মনোভাব নিয়ে যাত্রা করতে চলে গিয়েছিলেন। এ যুগে হয়ত বলতেন “তগো ইন্ডাস্ট্রি নিয়া তোরা থাক। আমাগো ইউটিউব চ্যানেলে আমি ড্যাং ড্যাং কইরা অভিনয় করুম।”

উত্তরবঙ্গে সংবাদে প্রকাশিত

স্বরচিত চক্রব্যূহে মূলধারার সংবাদমাধ্যম

যেন তেন প্রকারেণ লাভের কড়ি বাড়ানো শুধু নয়, সংবাদমাধ্যমের মালিক হওয়ার সুযোগ নিয়ে ক্ষমতাবানদের থেকে ব্যবসায়িক সুবিধে হাসিল করাই মূল উদ্দেশ্য।

প্রজাতন্ত্র দিবসের রেশ তখনও কাটেনি। ২৮ জানুয়ারি সন্ধ্যায় একাধিক নিউজ চ্যানেল ঘোষণা করল, দুমাস ধরে চলতে থাকা উত্তাল কৃষক আন্দোলনের অদ্যই শেষ রজনী। আগের দিন গভীর রাতে বাগপতে কৃষকদের তাঁবু ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। এবার গাজিপুর সীমানায় অবস্থানকারী কৃষকদের পালা। এমনিতেই সাধারণতন্ত্র দিবসের হিংসার পরে আন্দোলনের সেই ঝাঁঝ তখন অনেকটাই কম। অবস্থানের জায়গাগুলো কার্যত ভাঙা হাট, কৃষকরা বাক্স-বিছানা বেঁধে বাড়ি ফেরার জন্য তৈরি হচ্ছেন, তার ওপর উত্তরপ্রদেশ সরকারের নোটিস— রাস্তা আটকে নাগরিকদের অসুবিধায় ফেলা চলবে না। চব্বিশ ঘন্টার মধ্যে পথ ছেড়ে দিতে হবে। নিজে থেকে ছাড়তে না-চাইলে বলপূর্বক সরিয়ে দেওয়ার জন্য উত্তরপ্রদেশ পুলিশের বিরাট বাহিনীও হাজির। অতএব ছন্নছাড়া কৃষক আন্দোলনের সমাপ্তি তখন কেবলই সময়ের অপেক্ষা। খবর রটে গেল, গাজিপুরের অবস্থানের প্রধান নেতা রাকেশ টিকায়ত কিছুক্ষণের মধ্যেই আত্মসমর্পণ করতে চলেছেন।

এই ভবিষ্যদ্বাণীর পরের কয়েক ঘন্টায় যা ঘটেছে, তা একদিন হয়তো বিশ্ববিদ্যালয়ে ইতিহাসের ক্লাসে পড়ানো হবে। কিন্তু আমাদের আলোচ্য, আন্দোলন উঠে যাচ্ছে, রাকেশ টিকায়েত আত্মসমর্পণ করতে চলেছেন— এই তথ্যগুলো। বেশ কয়েকজন স্বাধীন সাংবাদিক স্রেফ হাতের মোবাইলকে ব্যবহার করে অকুস্থল থেকে কৃষক আন্দোলনের খবর সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে গত দু মাস ধরে মানুষের কাছে পৌঁছে দিচ্ছেন। তাঁদেরই একজন সাহিল মুরলী মেঙ্ঘানি। সাহিল সন্ধে সোয়া ছটা নাগাদ টুইট করেন, টিকায়েত তাঁকে নিজে বলেছেন, তিনি আত্মসমর্পণ করছেন না।১ এর খানিকক্ষণ পরে টিভি ক্যামেরার সামনে টিকায়েত কান্নায় ভেঙে পড়েন এবং বলেন, “আমি দরকার হলে এখানেই প্রাণ দেব, তবু এই ময়দান ছেড়ে নড়ব না।” সেই ভিডিও কিন্তু টিভি চ্যানেলগুলো বারবার দেখায়, কারণ কৃষক নেতা কাঁদছেন। অ্যাঙ্কররা ঘটনাপ্রবাহে নিজেদের উল্লাস গোপন করার বিশেষ চেষ্টা করেননি। না ক্যামেরার সামনে, না নিজেদের টুইটে। কিন্তু ফল হল উলটো। টিকায়েতের এই ভিডিও দেখে হরিয়ানা এবং উত্তরপ্রদেশ থেকে হাজার হাজার কৃষক রাত না-পোহাতেই ফের এসে পড়লেন গাজিপুর সীমান্তে। শেষ রাতে দেখা গেল আন্দোলনকারীরা যেখানে ছিলেন সেখানেই আছেন, বরং রণসাজে সজ্জিত পুলিসবাহিনীকে ব্যর্থমনোরথ হয়ে ফিরে যেতে হয়েছে। অর্থাৎ বোঝা গেল, আন্দোলনের আজই শেষ রাত, এই ঘোষণায় তথ্যের চেয়ে অনুমান; এবং যুক্তিনির্ভর অনুমানের চেয়ে অভিলাষের মাত্রা বেশি ছিল।

এই প্রবন্ধের কপি তৈরি করতে করতেই খবর পাচ্ছি, কৃষকদের অবস্থানের অন্য আর এক ফ্রন্ট সিংঘু সীমানায় একদল লোক এসে আন্দোলনকারীদের উপর পাথর ছুড়ছে পুলিশের উপস্থিতিতেই, এবং অকুস্থলে থাকা স্বাধীন সাংবাদিক বা অন্যান্য স্থানীয় মানুষের পোস্ট করা ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে, যারা আক্রান্ত পুলিস তাদের উপরেই সোৎসাহে লাঠিবর্ষণ করছে। টিভি চ্যানেলগুলোর কাছে অবশ্য এই ঘটনা অবিরাম লাইভ দেখানোর মতো গুরুত্বপূর্ণ নয়, অথবা হয়তো এতটাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ যে, সম্পাদনা না-করে এসব ছবির রাশ দেখানোর ঝুঁকি নেওয়া যায় না। অতএব সংসদে সরকারের পেশ করা আর্থিক সমীক্ষা নিয়ে তখন চুলচেরা বিশ্লেষণ চালিয়ে যাওয়া হল অধিকাংশ চ্যানেলে। অন্যত্র কেবল টিভি-র পর্দায় ফ্ল্যাশ করা হতে থাকল ‘সংঘর্ষের খবর’, আর গ্রাফিক্‌স প্লেটের পেছন থেকে শোনা যেতে লাগল প্রতিবেদকের কণ্ঠস্বর। একটি চ্যানেলের প্রতিবেদককে তো নিজের অজ্ঞাতে ফোনে কাউকে বলতেও শোনা গেল, “না না, আমি বাড়িয়ে বলছি না।”২ যে সংবাদমাধ্যম আগের দিন সন্ধেবেলা সোল্লাসে আন্দোলনের সমাপ্তি ঘোষণা করেছিল, তারা তখন আবেগশূন্য। সাধারণতন্ত্র দিবসে আহত পুলিসকর্মীদের জন্য, উলটে যাওয়া বাসটির জন্য এবং ভেঙে যাওয়া ব্যারিকেডগুলোর জন্য তখনও বিলাপ করে চলেছে। কিন্তু নিরস্ত্র আন্দোলনকারীদের উপর একযোগে মুখোশধারী ভাড়াটে দুষ্কৃতি আর পুলিশের ঝাঁপিয়ে পড়াকে তারা বলছিল ‘সংঘর্ষ’, ‘আক্রমণ’ নয়!

আসলে নিরপেক্ষতার ভানটুকুও এ দেশের মূল ধারার সংবাদমাধ্যম ইদানিং সফলভাবে বিসর্জন দিয়ে উঠতে পেরেছে। গত এক দশকে প্রতিবাদী মানেই যে দেশবিরোধী সন্ত্রাসবাদী, সেকথা বারবার ঘোষণা করে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। তারই ধারাবাহিকতা রক্ষা করা হচ্ছে মাত্র। সাধারণতন্ত্র দিবসের দিনও একই ঘটনা ঘটেছে। হিংসা একপাক্ষিক ছিল বলে অনবরত প্রচার করা হয়েছে, নিহত কৃষককে ফুটনোট করে দেওয়া হয়েছে, যে ব্যাখ্যা দিল্লি পুলিস তথা ভারত সরকার দিয়েছে তাকেই শিরোধার্য করেছে অধিকাংশ সংবাদমাধ্যম। এমনকী ওই মৃত্যু নিয়ে কৃষকদের যা বক্তব্য, তা ক্যামেরার সামনে বলা তথা টুইট করার ‘অপরাধে’ ইন্ডিয়া টুডে-র বর্ষীয়ান সাংবাদিক রাজদীপ সরদেশাইয়ের মাইনে কেটে নিয়েছে এবং তাঁকে দু সপ্তাহের জন্য সাসপেন্ড করেছে চ্যানেল-কর্তৃপক্ষ। উপরন্তু, সুযোগ পাওয়া মাত্রই সোশ্যাল মিডিয়ার ভুয়ো সংবাদচক্রকে আরও একবার মান্যতা দিয়ে ‘লালকেল্লায় জাতীয় পতাকার জায়গায় খালিস্তানি পতাকা লাগিয়ে দেওয়া হয়েছে’ বলে প্রচার করা হয়েছে। লালকেল্লায় আদৌ জাতীয় পতাকা ছাড়া অন্য কোনও পতাকা লাগানো উচিত কিনা, তা ভিন্ন আলোচনার বিষয়। কিন্তু আন্দোলনকারীদের দেশদ্রোহী বলে প্রমাণ করার উদ্দেশ্যে শিখ ধর্মের পবিত্র পতাকা ‘নিশান সাহিব’-কে খালিস্তানি অভিজ্ঞান বলে চালিয়ে দেওয়া সরকারের পক্ষে দাঁড়ানোর জন্য সংবাদমাধ্যমের উদগ্র বাসনাই প্রমাণ করে।

কোনও কোনও সংবাদমাধ্যম, আরও নির্দিষ্ট করে বললে, কোনও কোনও সাংবাদিক, গত এক দশকে সাধারণ মানুষের চোখে ‘ভগবান’ হয়ে বসেছেন। তাঁরা যা দেখান, যা বলেন, তা-ই বেদবাক্য। তাঁরা যে কোনও ছবি, অডিও বা ভিডিও ক্লিপের সাহায্যে যে কোনও লোককে খুনি বা সন্ত্রাসবাদী বা ড্রাগ পাচারকারী বলে ঘোষণা করে দিতে পারেন, দর্শকরা আইন-আদালতের তোয়াক্কা করবেন না। সেই সত্য, যা রচিবে অ্যাঙ্কর। বেশ কিছু দর্শকের বিশ্বাস এমন জায়গায় পৌঁছেছে, এই সাংবাদিকদের দিনরাত দেশপ্রেমের দোহাই দিয়ে রণহুঙ্কার তাঁদের এমন বধির করে দিয়েছে যে, তাঁদের শোনানোর জন্য কোনও বিস্ফোরণই যথেষ্ট নয়। এই সাংবাদিকদের কারও মধ্যে দেশদ্রোহের লক্ষণ দেখা গেলেও ভক্তি টলে না, নিঃসংশয়ে বলেন, ওসব ষড়যন্ত্র!

একদিকে একটি বিশেষ ঘটনা সম্বন্ধে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের মতামত জানানোর দায়ে রাজদীপ-সহ ছ’জন সাংবাদিকের বিরুদ্ধে দুটো রাজ্য সরকার রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগে এফআইআর করেছে, অন্যদিকে তথাকথিত দেশপ্রেমিক অ্যাঙ্করদের শিরোমণি অর্ণব গোস্বামীর কয়েক হাজার পাতার হোয়াটস্যাপ চ্যাট সামনে এসেছে।৩ মুম্বাই পুলিসের সাপ্লিমেন্টারি চার্জশিটের অঙ্গ এই চ্যাট যদি সত্যিই অর্ণবের হয়, তাহলে টিআরপি রেটিং-এ বৃত সংস্থা বার্ক (BARC)-এর ভূতপূর্ব সিইও পার্থ দাশগুপ্তকে অর্ণব দেশের সেনা-অভিযান সংক্রান্ত গোপন তথ্য তো সরবরাহ করেছেন বটেই, পুলওয়ামা বিস্ফোরণে সৈনিকদের মৃত্যুতে উচ্ছ্বসিতও হয়েছেন। অর্থাৎ তাঁর শো-তে দিবারাত্র তিনি যে অভিযোগগুলো কোনও সাক্ষ্যপ্রমাণ ছাড়াই বিরোধী রাজনৈতিক দলের সদস্য, বুদ্ধিজীবী বা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদের বিরুদ্ধে করেন, ঠিক সেই কাজগুলোই নিজে করেছেন। এমন হতেই পারে যে ওই চ্যাট অর্ণবের নয়, কিন্তু এমন গুরুতর অভিযোগ উঠে আসার পরে কোথাও কোনও রাষ্ট্রদ্রোহ বা রাষ্ট্রের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতার মামলা দায়ের হয়নি, কোনও তদন্ত হচ্ছে না। অর্ণব নিজেও গগনবিদারী চিৎকারে বলছেন না যে, আমার বিরুদ্ধে তদন্ত হোক, কেবল প্রাক্তনী সহকর্মী, টাইমস নাও-এর আর এক দেশপ্রেমী সাংবাদিক নাভিকা কুমারের বিরুদ্ধে মানহানির মামলা করেছেন।৪ ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসকে আইনি নোটিস দিয়েছেন বটে, কিন্তু তা পার্থ দাশগুপ্তকে ঘুষ দেওয়ার অভিযোগের কথা লেখা হয়েছে বলে। ওই চ্যাটের কথা প্রকাশ করার জন্য নয়।৫ এ ভারী আশ্চর্য!

কিন্তু তার চেয়েও আশ্চর্যের কথা, দেশপ্রেমিক অ্যাঙ্করের দেশপ্রেম সম্বন্ধে এত বড় প্রশ্ন উঠে যাওয়ার পরেও তাঁর জনপ্রিয়তায় বিশেষ ভাটা পড়েনি। তাঁর সপক্ষে হাজার হাজার টুইট আর ফেসবুক পোস্ট তার প্রমাণ। সর্বদাই সরকারের পক্ষে থাকেন বলে সরকার তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিল না, আজকের ভারতে এমনটা মেনে নিতে অসুবিধা হয় না। কিন্তু দর্শকমনে তাঁর সিংহাসন অটুট থাকার রহস্য কী? একটু তলিয়ে দেখা যাক।

একটা কারণ যে কেউ বিনা আয়াসেই বুঝতে পারেন। দর্শকের এই বিশ্বাস আসলে অর্ণব গোস্বামীর প্রতি বিশ্বাস নয়। সরকার বা প্রধানমন্ত্রী যাঁকে বিশ্বাস করেন, তাঁর প্রতি বিশ্বাস। কিন্তু সেটুকুই কি সব? রিপাবলিক টিভি কি কেবল নিতান্ত নির্বোধ, অশিক্ষিত মানুষজন দেখেন? শিক্ষিত, বুদ্ধিমান মানুষদের মনে হচ্ছে না, এই লোকটা শুধু যে ভণ্ড তা-ই নয়, দেশের পক্ষে বিপজ্জনক? গুরুত্বপূর্ণ সামরিক অভিযান, যার কথা সরকার আর সেনাবাহিনীর সর্বোচ্চ স্তরের দু-একজন ছাড়া অন্য কারও জানার কথা নয়, তার খবর এই লোকটা আগে থেকেই জানতে পারছে, এটা দেশের জন্য সুখবর নয়। কারও মনে হচ্ছে না এ কথা? সাধারণ দর্শকের প্রতিক্রিয়া থেকে দিব্য টের পাওয়া যাচ্ছে, হচ্ছে না। না হওয়ার জন্য, বলা বাহুল্য, জরুরি অবস্থা-উত্তর ভারতীয় সাংবাদিকতার পটপরিবর্তন অনেকটা দায়ী।

১৯৭৫ থেকে ৭৭ সালে ইন্দিরা গান্ধি-আরোপিত জরুরি অবস্থার সময় যে সাংবাদিকরা মেরুদণ্ড সোজা রাখার জন্যে নন্দিত, তাঁদের মধ্যে একজন, এম জে আকবর, পরবর্তীকালে ইন্দিরাপুত্র এবং প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধির বিশেষ ঘনিষ্ঠ হয়ে ওঠেন। সম্পাদক হিসেবে কাউকে ছেড়ে কথা না-বলা এবং ক্ষমতাকে প্রশ্ন করার মতো যেসব গুণাবলি তাঁকে প্রবাদপ্রতিম করেছিল, সেইসব গুণ ক্রমশ ক্ষয়ে যেতে থাকে। পরবর্তীকালে তিনি সর্বদাই ক্ষমতার আশেপাশে থেকেছেন। বাবরি মসজিদ ধ্বংসের কালে প্রবল বিজেপি-বিরোধী আকবর অনতিঅতীতে কেবল বিজেপিতে যোগ দেননি, কেন্দ্রীয় মন্ত্রী পর্যন্ত হয়েছেন। তিনি উদাহরণমাত্র। তাঁর প্রজন্মের অনেক সাংবাদিকই জন্ম দিয়েছেন এমন এক সাংবাদিকতার, যাকে ইংরেজিতে বলে ‘অ্যাক্সেস জার্নালিজম’। অর্থাৎ সাংবাদিক কতটা জানেন সেটা বড় কথা নয়, কতজনের তিনি ঘনিষ্ঠ সেটাই বড় কথা। বাংলায় বোধ করি একে ‘দাদা-দিদি সাংবাদিকতা’ বলা উচিত হবে। অর্থাৎ আসলে কী ঘটছে, প্রতিবেদক তা জানেন কিনা তার চেয়েও অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ, তিনি অমুক নেতার বা তমুক নেত্রীর কাছের লোক কিনা বা কতটা কাছের লোক। নেতাদের সঙ্গে গা ঘষাঘষির ক্ষমতাই তাঁর যোগ্যতার প্রমাণ।

এই ধরনের সাংবাদিকতা ক্রমশ অপ্রাসঙ্গিক করে দেয় ঘটনাকে, ঘটনার অনুসন্ধানকে। অপ্রিয় প্রশ্ন, যা সাংবাদিকতার প্রাণ, তা হয়ে দাঁড়ায় নিষিদ্ধ। কারণ, অমুকদার সঙ্গে সাংবাদিকের দারুণ সম্পর্ক। বাড়িতে আসাযাওয়া, একসঙ্গে খানাপিনা করা। সামান্য একটা প্রশ্নের জন্য কি আর সেই সম্পর্কটা নষ্ট করা যায়? জ্যেষ্ঠরা এই ধারা চালু করেছেন, কনিষ্ঠরা দেখে দেখে শিখেছেন। কাগজের কাছে, চ্যানেলের কাছে, বিষয়ের প্রতি নিবেদিতপ্রাণ, অনুসন্ধিৎসু, খুঁতখুঁতে সাংবাদিকের দাম কমেছে। লক্ষ করলে দেখা যাবে, জরুরি অবস্থার পরের ৪৪ বছরে ক্রমশ এমনটা ঘটেছে ভারতীয় সাংবাদিকতায়। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সেল্‌ফি তোলার জন্য সাংবাদিকদের হুড়োহুড়ির সংস্কৃতি একদিনে তৈরি হয়নি। সাংবাদিকরা ক্ষমতাবানদের সঙ্গে, বিখ্যাতদের সঙ্গে তাঁদের গলাগলির কথা খবরের অছিলায় লিখেছেন। ক্রীড়া সাংবাদিক পর্যন্ত অবলীলায় লিখেছেন, “তাঁর নতুন কেনা মার্সিডিজে যেতে যেতে ইমরান খান আমাকে বললেন…” ইত্যাকার বাক্যবন্ধ। যেন ইমরান খান কী বলেছেন সেটুকু লেখা যথেষ্ট নয়, তিনি যে ইমরানের নতুন কেনা গাড়িতে তাঁর সঙ্গেই যাত্রা করতে পারেন, সে তথ্যটাও পাঠককে জানানো অতি গুরুত্বপূর্ণ। ফলে সাধারণ পাঠক, দর্শকও দেখেশুনে একথাই বুঝেছেন যে, অমুক বড় সাংবাদিক, কারণ দিদি ওঁর বাড়িতে গিয়ে চা খান। তমুক বড় সাংবাদিক কারণ অমুকদার মেয়ের বিয়েতে ওঁর নেমন্তন্ন ছিল। স্বভাবতই আজ যখন দর্শক জানতে পারেন বালাকোটে আক্রমণের কথা অর্ণব গোস্বামী তিনদিন আগেই জানতেন, তখন তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা বেড়ে যায়। রাহুল গান্ধি যখন অভিযোগ করেন প্রধানমন্ত্রীই অর্ণবকে খবর দিয়েছেন, তখন দর্শক ভাবেন “কত বড় সাংবাদিক! প্রধানমন্ত্রী নিজে খবর দেন!”

দাদা-দিদি সাংবাদিকতার দোষে কেবল দক্ষিণপন্থী গলাবাজ সাংবাদিকরাই দুষ্ট ভাবলে ভুল হবে। অরুণ জেটলির মৃত্যুর পর তাঁর স্মৃতিচারণে রাজনৈতিক কাজকর্ম নিয়ে কোনও সাংবাদিকই বিশেষ কথাবার্তা বলেননি, ব্যক্তিগত স্মৃতির ঝাঁপি খুলে বসেছিলেন। রাজদীপ সরদেশাই যেমন টুইট করেছিলেন, কোন এক বিদেশ সফরে গিয়ে জেটলি তাঁকে বলে দিয়েছিলেন কোন রেস্তোরাঁয় সেরা বাটার চিকেন পাওয়া যায়।

এই ধরনের সাংবাদিকতা বছরের পর বছর চলতে থাকলে যা পরিণতি হয়, ভারতে আজ তা দেখতে পাওয়া যাচ্ছে। গত চল্লিশ-পঞ্চাশ বছরে ব্রিটেন এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতো বড় গণতন্ত্রে সাংবাদিকতা যে পথে হেঁটেছে, তার ঠিক উলটো পথে হেঁটেছে এ দেশে। ওই দেশগুলোর কাগজ বা টিভি চ্যানেলের ওয়েবসাইটে সাক্ষাৎকারের স্বল্পতা আর আমাদের দেশের মূল ধারার সংবাদমাধ্যমে তার বাহুল্য দেখলেই তা পরিষ্কার হয়। বিখ্যাত মানুষ, ক্ষমতাবান মানুষ অমৃতবাণী বিতরণ করবেন আর স্টেনোগ্রাফারের একনিষ্ঠতায় সাংবাদিক তা লিখে দেবেন বা রেকর্ড করে নেবেন— এ জিনিস বাকি পৃথিবীতে ক্রমশ বাতিল হয়ে যাচ্ছে। অথচ আমাদের দেশের কাগজের প্রথম পাতা থেকে শেষ পাতা পর্যন্ত ভরে থাকছে “তিনি বলেন”, “তিনি আরও বলেন”— গোছের বয়ানে। টিভি খুললেই দেখা যাচ্ছে, “অমুক স্পিকস টু তমুক”। দু-একটা লোকদেখানো শক্ত প্রশ্ন থাকলেও, ব্যাপারটা যিনি সাক্ষাৎকার দিচ্ছেন তাঁর পক্ষে কত আরামদায়ক তা বোঝার জন্য এটুকু তথ্যই যথেষ্ট, যে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি গত সাত বছরে একাধিক সাক্ষাৎকার দিয়ে থাকলেও একটাও সাংবাদিক সম্মেলন করেননি। সেল্‌ফি-লালায়িত সাংবাদিকদের সঙ্গেও নয়। ২০১৯ নির্বাচনের ক’দিন আগে একবার মিট দ্য প্রেস-এ পায়ের ধুলো দিয়েছিলেন, কিন্তু সাংবাদিকদের যাবতীয় প্রশ্নের উত্তর দিয়েছিলেন পাশে বসা অমিত শাহ।

গত শতকের নয়ের দশকে অর্থনৈতিক উদারীকরণের পরে সংবাদমাধ্যমের মালিকদেরও ব্যবসা সম্বন্ধে চিন্তাভাবনায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন এসেছে। তাঁদের পুঁজি এমন ফুলেফেঁপে উঠেছে যে, আগের মতো কাগজের (অধুনা চ্যানেলেরও) ব্যবসাটাকে অন্য ব্যবসার চেয়ে আলাদা করে ভাবার আর ইচ্ছা নেই। যেন তেন প্রকারেণ লাভের কড়ি বাড়ানো শুধু নয়, সংবাদমাধ্যমের মালিক হওয়ার সুযোগ নিয়ে ক্ষমতাবানদের থেকে ব্যবসায়িক সুবিধে হাসিল করাই মূল উদ্দেশ্য। সে উদ্দেশ্য চরিতার্থ করতেও দাদা-দিদি সাংবাদিকতার জুড়ি নেই। অতএব সূর্য পূর্ব দিকে উঠলেও, যদি দাদা বা দিদি বলেন পশ্চিমে উঠেছে, তাহলে ক্যামেরা উল্টোদিকে বসিয়ে পশ্চিমকে পূর্ব করে নেওয়া হয়।

আশ্চর্য নয় যে, এই ছকে যে সাংবাদিকরা পড়তে রাজি নন, তাঁরা যতই পরিশ্রমী বা প্রতিভাবান হন, মূল ধারার সংবাদমাধ্যমে তাঁদের জায়গা হবে না; সাধারণ দর্শক বা পাঠকও তাঁদের দেশদ্রোহী ভাববেন, ‘প্রেস্টিটিউট’ বলবেন। খুব বেশি পরিশ্রম করলে অবশ্য সরকারের তরফ থেকে গ্রেফতারির পুরস্কার পাওয়া যাবে; যেমন সিদ্দিক কাপ্পান, প্রশান্ত কানোজিয়ারা পেয়েছেন। কিন্তু মুশকিল হল, যে স্বরচিত চক্রব্যূহে ভারতীয় সাংবাদিকতা প্রবেশ করেছে, তা থেকে বেরিয়ে আসার পথ ক্রমশ সঙ্কীর্ণ হয়ে আসছে। অর্ণব গোস্বামী, সুধীর চৌধুরী, রুবিকা লিয়াকত, দীপক চৌরাসিয়া, নাভিকা কুমারেরা যে ব্র্যান্ডের সাংবাদিকতা করেন, বা বেশিরভাগ সংবাদপত্র করে, তার জন্য বিপদসঙ্কেত চলতি কৃষক আন্দোলনের গত কয়েক দিন। কারণ পঞ্জাব, হরিয়ানা, উত্তরপ্রদেশ থেকে যে কৃষকরা বিপুল উদ্যমে দিল্লির সীমানায় ফিরে এসে কৃষক আন্দোলনের ঝিমিয়ে পড়া খাতে নতুন জোয়ার আনলেন তাঁরা অধিকাংশই ‘লিবারাল’, ‘কমিউনিস্ট’ বা ‘আরবান নকশাল’ নন। ফলে তাঁরা ওঁদের চ্যানেলই দেখে এসেছেন এতদিন। ইংরেজি-বলা দর্শকদের এই কৃষকবিরোধী প্রচার পছন্দ হলেও হতে পারে, হিন্দি চ্যানেলের এই দর্শকরা অতটা ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিভঙ্গি নেবেন কিনা, যথেষ্ট সন্দেহ আছে।

তথ্যসূত্র

https://twitter.com/saahilmenghani/status/1354772468217483267

https://www.thequint.com/explainers/arnab-goswami-leaked-whatsapp-chats-partho-dasgupta-explainer
https://www.newslaundry.com/2021/01/28/navika-kumar-is-jealous-republic-tv-files-defamation-case-against-times-now-anchor
https://www.barandbench.com/news/republic-tv-legal-notice-indian-express-arnab-goswami-trp-scam

https://4numberplatform.com এ প্রকাশিত

রাজদীপের দ্বীপান্তর: নিরপেক্ষতার পুরস্কার?

মনে করা হত নিরপেক্ষ থাকলে তবেই সত্য উদ্ঘাটন করা যায়; পক্ষপাতিত্ব করলে মিথ্যা প্রশ্রয় পায়। উত্তরসত্য (post truth) আর ভুয়ো খবরের যুগে এই সহজ সমীকরণ যে বাতিল হয়ে গেছে।

“সংবাদপত্রের স্বাধীনতা আর সাংবাদিকের স্বাধীনতা সমার্থক নয়। কোন দেশেই নয়। সংবাদপত্রের স্বাধীনতা কিংবা যাকে বলা হয় মুদ্রাযন্ত্রের স্বাধীনতা তার জন্য লড়াইটা এযাবৎ প্রধানত চলেছে রাষ্ট্রশক্তির বিরুদ্ধে, স্বৈরতান্ত্রিক শাসন-নিয়ন্ত্রণের বিরুদ্ধে। এ লড়ায়ের মোটামুটি মানে, স্বাধীনভাবে মতামত এবং সমকালীন ঘটনাবলীর বিবরণ প্রকাশের অধিকার দাবি করেছে খবরের কাগজ। সে অধিকার মোটের উপর স্বীকৃত হয়েছে অনেক দেশে। কিন্তু খবরের কাগজের স্বাধীনতা মানে, সাংবাদিকের, এমন কী সম্পাদকেরও স্বাধীন মত প্রকাশের অধিকার নয়, এই সোজা কথাটা পরিষ্কারভাবে না বোঝার ফলে অনেক ক্ষোভ এবং অভিযোগ জমে উঠেছে। ক্ষোভ সাংবাদিকের মনে, অভিযোগ সাংবাদিকের বিরুদ্ধে।”

‘সাংবাদিকতা ও কিংবদন্তী’ প্রবন্ধে কথাগুলো লিখেছিলেন অধুনালুপ্ত ‘হিন্দুস্থান স্ট্যান্ডার্ড’ কাগজের একদা অ্যাসিস্ট্যান্ট এডিটর সরোজ আচার্য। হকি খেলায় যেমন সবুজ কার্ড দেখিয়ে খানিকক্ষণের জন্য কোন কোন খেলোয়াড়কে মাঠের বাইরে পাঠিয়ে দেওয়া হয়, তেমনভাবে ইন্ডিয়া টুডে কর্তৃপক্ষ অভিজ্ঞ সাংবাদিক রাজদীপ সরদেশাইকে দু সপ্তাহের জন্য চ্যানেল থেকে নির্বাসন দিয়েছেন, উপরন্তু তাঁর মাইনে কেটে নিয়েছেন। এই ঘটনা নিয়ে ভাবতে গিয়ে সরোজ আচার্যের এই প্রবন্ধের কথা মনে পড়ল। সরোজবাবুর জীবদ্দশায় এ দেশে নিউজ চ্যানেল বলে কোন বস্তু ছিল না, কিন্তু এখানে সংবাদপত্রের জায়গায় অনায়াসে সংবাদমাধ্যম শব্দটা বসিয়ে নেওয়া যায়। তাতে অর্থের হেরফের হবে না, আমাদের কাজও হয়ে যাবে। জানি না রাজদীপবাবু বাংলা পড়তে পারেন কিনা, পারলেও সরোজবাবুর লেখা চোখে পড়ার সম্ভাবনা কম। কারণ ইনি পশ্চিমবঙ্গেই অধুনা বিস্মৃত একজন লেখক-সাংবাদিক। বাংলার দিকপাল সাংবাদিকরাই কজন এঁর নাম জানেন সন্দেহ আছে। কিন্তু ভারতীয় সাংবাদিকতার বর্তমান অবস্থা যাঁদের হতাশ করেছে এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে যাঁরা চিন্তিত, তাঁদের জন্য এই প্রবন্ধ চিন্তার খোরাক হতে পারে।

রাজদীপবাবুর ট্র্যাজেডি হল, তিনি অর্ণব গোস্বামী ও সম্প্রদায়ের মত দেশপ্রেমের দোহাই দিয়ে সরাসরি সরকারি দলের মুখপাত্র হয়ে উঠতে পারেননি। আবার রানা আয়ুব বা সিদ্ধার্থ বরদারাজনের মত বিজেপিকে প্রকাশ্যে দেশের শত্রু আখ্যা দিয়ে প্রতিষ্ঠানবিরোধী সাংবাদিকতা করার সাহস দেখাতে পারেননি। ফলে অর্ণববাবু যেখানে টাইমস গ্রুপের মত বিরাট কর্পোরেট সংস্থার চাকরি ছেড়ে দিয়ে নিজের মালিকানায় চ্যানেল খোলার রেস্ত পেয়ে গেছেন; সিদ্ধার্থবাবু যেখানে ওয়েব মাধ্যমে চলে গিয়ে মূলত পাঠকের অনুদানের উপর ভিত্তি করে সরকারি আক্রমণের মুখে দাঁড়িয়েও নিজে সাংবাদিকতা বলতে যা বোঝেন তা চালিয়ে যাচ্ছেন; সেখানে রাজদীপবাবুকে নিজের হাতে তৈরি চ্যানেল সস্ত্রীক ছেড়ে আসতে হয়েছে কয়েক বছর আগে। ২০০২-এর গুজরাট দাঙ্গা যেভাবে রিপোর্ট করেছিলেন, তার জন্য বিজেপির কর্মী-সমর্থকরা তাঁকে নিত্য গাল পাড়ে, বাগে পেয়ে আমেরিকার রাস্তায় কয়েক ঘা বসিয়েও দিয়েছিল। অথচ এখন রাহুল কাঁওয়াল, গৌরব সাওয়ান্তের মত ব্যাজহীন বিজেপি মুখপাত্রের সাথে বসে সাংবাদিকতার ভান করতে হয়। আর সেজন্যে এমনকি বিজেপি বিরোধী সাধারণ মানুষও রাজদীপবাবুর উপর রুষ্ট। প্রবীণ সাংবাদিকের লাঞ্ছনার দ্ব্যর্থহীন ভাষায় নিন্দা করার বদলে অনেকেই বলছেন, যে জন আছে মাঝখানে, তার ঠাঁই নাই কোনখানে — একথা রাজদীপবাবুকে বুঝতে হবে।

পুঁজিবাদী আনন্দবাজার গ্রুপের কাগজের সাংবাদিক অথচ মার্কসবাদী সরোজবাবু তাঁর প্রবন্ধে সারা পৃথিবীর একাধিক প্রবাদপ্রতিম সংবাদপত্র ও সম্পাদকের উদাহরণ দিয়ে দেখিয়েছেন “ব্যক্তিগতভাবে সাংবাদিকের বিরুদ্ধে ভীরুতা, কপটাচরণ, দাস-মনোভাব ইত্যাদির অভিযোগ আনবার কোনো অর্থই হয় না। অন্য সব প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের যেমন তাদের কাজ সম্পর্কে কতকগুলি নির্দেশ মেনে চলতে হয় সাংবাদিকদেরও তেমনি। অন্য সব প্রতিষ্ঠানেও কাজের নীতি নির্ধারণ এবং দায়ভাগটা সাধারণ কর্মীর ইচ্ছা অনুযায়ী হয় না, হওয়া সম্ভব নয়। প্রতিষ্ঠানের কর্তৃত্ব গণতান্ত্রিক উপায়ে সমানভাবে ভাগ করে দেবার পদ্ধতি সোভিয়েট ইউনিয়নেও আবিষ্কৃত হয়নি। ‘কর্তার ইচ্ছায় কর্ম’ যেমন কলকারখানায়, তেমনই খবরের কাগজেও…”

এই কথাটা উপলব্ধি করতে পারলে রাজদীপবাবুর ত্রিশঙ্কু অবস্থা নিয়ে রাগ করা অযৌক্তিক হয়ে পড়ে। কিন্তু সেক্ষেত্রে সঙ্গতভাবেই এই প্রশ্ন আসে, যে একই যুক্তিতে রাহুল, গৌরব, হিন্দি চ্যানেলগুলোর আরো উগ্রভাষী রুবিকা লিয়াকত, রোহিত সারদানাদের বা বিভিন্ন কাগজের সম্পাদকদের ছাড় দেওয়া হবে না কেন? তাঁদেরও তো মালিকের মর্জি মেনে চলতে হয়। যদি রবীশ কুমার এনডিটিভি-তে চাকরি না করে রিপাবলিক টিভিতে চাকরি করতেন, তাহলে কি তাঁর পক্ষে এখনকার মত সাংবাদিকতা করা সম্ভব হত?

এতক্ষণ সরোজ আচার্যের প্রবন্ধের প্রাসঙ্গিকতা আলোচনা করেছি। এই প্রশ্নগুলোর উত্তর পেতে গেলে অপ্রাসঙ্গিকতার দিকগুলো বুঝতে হবে। এর জন্য প্রবন্ধকার দায়ী নন, দায়ী সময়।

প্রথমত, সরোজবাবু যে সময়ের লোক, সেই সময়ের সংবাদমাধ্যমের মালিকরা যেরকম পুঁজির প্রতিভূ ছিলেন, তার সাথে আজকের পুঁজির চরিত্রগত ফারাক অনেক। সেই সময় আমাদের দেশের কাগজের মালিকরা, সে আনন্দবাজার পত্রিকার মালিক সরকারবাবুরাই হোন আর হিন্দুস্তান টাইমসের মালিক বিড়লা কিংবা ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের গোয়েঙ্কা, ব্যবসায়িক স্বার্থে কাগজ চালিয়েও মনে করতেন কাগজের দায়িত্ব সাধারণ মানুষের কথা বলা, রাষ্ট্রশক্তির গলদ প্রকাশ করা। স্বাধীনতা আন্দোলনের উত্তরাধিকার এই চিন্তাভাবনার পিছনে অবশ্যই বড় কারণ ছিল। ১৯৯১ পরবর্তী নিও-লিবারাল পুঁজি কিন্তু লাভের কড়ি ছাড়া কিছু নিয়েই ভাবতে রাজি নয়। ফলে এখন তার স্বার্থ আর রাষ্ট্রশক্তির স্বার্থ অভিন্ন, কারণ কল্যাণমূলক রাষ্ট্রের ধারণা পরিত্যক্ত। রাষ্ট্রের উপর অতি ধনীদের নিয়ন্ত্রণ গত তিরিশ বছরে বাড়তে বাড়তে এখন চূড়ান্ত। অতএব আগে সংবাদমাধ্যমের মালিকরা অনেক বিষয়ে সম্পাদককে স্বাধীনতা দিতেন, এখন আর দেন না। সচেতন সাংবাদিক অস্বীকার করতে পারবেন না, যে এখন স্রেফ প্রতিষ্ঠানের নির্দেশ মেনে চলা মানে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সাংবাদিকতা বলতে যা বোঝায়, ঠিক তার উল্টোটা করা। এ অবস্থা সরোজ আচার্যের প্রবন্ধের কালে ছিল না। উদাহরণস্বরূপ, ঘুষখোর সাংবাদিক চিরকাল ছিল। পি সাইনাথের পেইড নিউজ নিয়ে কাজ এবং কোবরাপোস্টের স্টিং অপারেশন দেখিয়ে দিয়েছে, এখন ঘুষ নেয় খোদ সংবাদমাধ্যম। অতএব এ যুগে সম্পাদক প্রতিষ্ঠানের নিয়ম মেনে চলাকেই যদি চূড়ান্ত মনে করেন, তাহলে স্বীকার করে নেওয়া ভাল যে তিনি সাংবাদিকতা করছেন না, মালিকের ব্যবসার প্রচারাভিযান চালাচ্ছেন।

দ্বিতীয়ত, বিংশ শতাব্দীতে স্বাধীন সাংবাদিকতা, ইংরেজিতে যাকে বলে ফ্রিলান্স জার্নালিজম, তার পরিসর ছিল নিতান্ত সংকীর্ণ। সঠিক অর্থে স্বাধীনতাও তাতে ছিল না। কারণ খবর প্রকাশের জন্য কোন না কোন সংবাদমাধ্যমের দ্বারস্থ হতেই হত। অতএব বিবেক দংশন মেনে নেওয়া ছাড়া উপায় কী? এখন ইন্টারনেট, সোশাল মিডিয়ার যুগ। নয় নয় করে কম সাংবাদিক ইউটিউব, ফেসবুক, টুইটার, ইন্সটাগ্রামের মাধ্যমে সাংবাদিকতা করছেন না। রোজগারের নিরিখে কর্পোরেট সংবাদমাধ্যমের চাকরির তুলনায় এখনো সেসব নগণ্য, কিন্তু কর্পোরেট যথার্থই বুঝেছে যা বলে দেওয়া হচ্ছে, হুবহু তাই লিখতে বা দেখাতে সাংবাদিকের দরকার হয় না। তাই ছাঁটাইয়ের হিড়িক পড়েছে। এমতাবস্থায় প্রতিষ্ঠানের নিয়ম মেনে সাংবাদিকতা করা না হয় না-ই গেল, নিজের চাকরিটা বাঁচানো যাবে কি? যাবে না। এখানে আমরা অবশ্যই সম্পাদক স্তরের সাংবাদিকদের কথা বলছি, কারণ যে সাংবাদিকরা কর্পোরেট মইয়ের নীচের দিকে আছেন, তাঁদের সামনে বিকল্প নেই। কোন পেশাতেই তাঁদের স্তরের লোকেরা নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়ার দায়িত্বে থাকেন না। কিন্তু উপরতলার লোকেরা স্রেফ চাকরি বাঁচানোর জন্য দিনকে রাত, রাতকে দিন করেন — এমন ছেঁদো যুক্তি আর হয় না। এ হেন সম্পাদকদের শরীরী ভাষাও প্রমাণ করে, তাঁরা যা করছেন সোৎসাহে করছেন। কথাটা যেমন টিভি সাংবাদিকদের ক্ষেত্রে সত্যি, তেমন কাগজের সম্পাদকদের ক্ষেত্রেও সত্যি। কাগজের সম্পাদকদের পাঠক দেখতে পান না, এই যা।

রাজদীপ সরদেশাই ঠিক এখানেই মার খেয়ে গেলেন। এনডিটিভি বা সিএনএন-আইবিএন আমলে যিনি ছিলেন পরিপাটি সাংবাদিক, ইন্ডিয়া টুডের বিভিন্ন শো-তে প্রায়শই তাঁকে অপটু জোকার বলে মনে হয়, কারণ রাহুল বা গৌরবের স্বতঃস্ফূর্ততা তাঁর মধ্যে থাকে না। স্টুডিওর অতিথিরাও লাইভ অনুষ্ঠানে তাঁকে বিজেপি বিরোধী বলে ঠেস দেন, আর তিনি প্রাণপণে প্রমাণ করার চেষ্টা করেন তিনি নিরপেক্ষ। ভুল হোক আর ঠিক হোক, মানতেই হবে, সাংবাদিকতায় সারা পৃথিবীতেই দীর্ঘদিনের প্রতিষ্ঠিত ধারণা ছিল, সাংবাদিকের একমাত্র দায়বদ্ধতা নিরপেক্ষতার প্রতি। কারণ মনে করা হত নিরপেক্ষ থাকলে তবেই সত্য উদ্ঘাটন করা যায়; পক্ষপাতিত্ব করলে মিথ্যা প্রশ্রয় পায়। উত্তরসত্য (post truth) আর ভুয়ো খবরের যুগে এই সহজ সমীকরণ যে বাতিল হয়ে গেছে, অনেককেই তা এখনো বোঝানো যায় না। রাজদীপবাবু তেমন লোকেদেরই একজন। এঁরা এখনো বোঝেননি, সাংবাদিকের একমাত্র দায়বদ্ধতা সত্যের কাছে, যা এখন অধিকাংশ সময়ে রাষ্ট্রের বিপক্ষে যাবে। কারণ মিথ্যা এখন তার অন্যতম হাতিয়ার। ফলে মতামতহীন সাংবাদিকতার এখন জলে কুমির, ডাঙায় বাঘ।

লক্ষ করলে দেখা যাবে, রাজদীপ মতামতহীন হয়েই ডুবলেন। ২৬শে জানুয়ারি দিল্লির রাজপথে যে কৃষকের মৃত্যু হয়, তাঁর সম্বন্ধে নিজের চ্যানেলের ক্যামেরার সামনে উনি পুলিসের বক্তব্য (ট্র্যাক্টর উল্টে মৃত্যু) আর আন্দোলনকারী কৃষকদের বক্তব্য (পুলিশের গুলি ট্র্যাক্টর উল্টে যাওয়ার কারণ) — দুটোই বলেন। আসলে সাংবাদিকের ঠিক তাই করার কথা। কিন্তু তিনি বুঝতে পারেননি, তাঁর চ্যানেলের মালিক তা চাইছেন না। তিনি চাইছেন কেবল পুলিসের বক্তব্যটাই প্রচারিত হোক। দেরিতে উপলব্ধি করে রাজদীপ কৃষকদের বক্তব্য জানিয়ে যে টুইট করেছিলেন তা মুছে দেন এবং কারণ হিসাবে পুলিসের বক্তব্য লেখেন। তাতে চিঁড়ে ভেজেনি। কেবল মালিক শাস্তি দিয়েছেন তা নয়, দুটো রাজ্য সরকার রাজদীপের বিরুদ্ধে (সঙ্গে আরো পাঁচজনের বিরুদ্ধে) রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগে এফ আই আর করেছে। এর চেয়ে তিনি কেবল পুলিসের বক্তব্যই বলতে পারতেন।

নির্বাসন এবং মাইনে কাটা যাওয়ার পর, ২৯শে জানুয়ারি হিন্দুস্তান টাইমসে নিজের কলামে রাজদীপ ২৪ বছর বয়সী নবরীত সিং-এর মৃত্যুর জন্য ফের ট্র্যাক্টর উল্টে যাওয়াকেই দায়ী করেছেন। এই শুভ বুদ্ধির উদয়ে তাঁর বিরুদ্ধে দেশদ্রোহিতার অভিযোগ প্রত্যাহার করা হয় কিনা সেটাই এখন দেখার। ভবিষ্যতে তিনি সরোজ আচার্যের নিম্নলিখিত কথাগুলো মনে রেখে এগোলে হয়ত উভয়সঙ্কট এড়াতে পারতেন। অন্তত যে বাংলা জানা দর্শকরা রাজদীপের নিরপেক্ষতা নিয়ে রুষ্ট, তাঁরা পড়ুন। সমস্যাটা বুঝতে পারবেন। এই কথাগুলো আজও একইরকম সত্যি:

“খবরের কাগজ [পড়ুন সংবাদমাধ্যম] জনসাধারণের সেবক হোক বা না হোক, গোড়ার কথা হল খবরের কাগজ আর পাঁচ রকম জিনিসের মতই ‘প্রপার্টি’ অর্থাৎ সেই প্রপার্টির স্বত্ত্বাধিকার যতক্ষণ সব বিষয়ে শেষ কথা বলতে অধিকারী ততক্ষণ সংবাদপত্রের [সংবাদমাধ্যমের] স্বাধীনতা, জন স্বার্থরক্ষা ইত্যাদি বিষয় প্রপার্টির স্বার্থদ্বারা নিয়ন্ত্রিত।”

https://nagorik.net/ এ প্রকাশিত। ছবি ইন্টারনেট থেকে।

নেমে আসুন ভোটারের সমতলে

ভারতের উত্তরপ্রদেশের প্রত্যন্ত গ্রামে যখন একজন মানুষ ভোট দিচ্ছেন বা কলকাতার কোন বস্তিবাসী যখন ভোট দিচ্ছেন, তিনি ফ্যাসিবাদের পক্ষে বা বিরুদ্ধে ভোট দিচ্ছেন না।

কিছুদিন পরে পরেই, বিশেষ করে কোন নির্বাচনের ফল প্রকাশের পরে, বিজেপি-বিরোধী মানুষজন সমাজ মাধ্যমে, একান্ত আলাপচারিতায় এবং লিখিত রাজনৈতিক বিশ্লেষণে বিস্ময় প্রকাশ করেন “এত কিছুর পরেও লোকে ওদের সমর্থন করছে!” বা “এত কিছুর পরেও বিজেপি জিতে গেল!” এত কিছু, অর্থাৎ অর্থনীতির ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়া; সংখ্যালঘু ও দলিতদের উপর পরিকল্পিত, রাষ্ট্রের আশীর্বাদপুষ্ট হিংসা; আইনশৃঙ্খলার অবনতি; গরীব ও মধ্যবিত্ত মানুষের চরম আর্থিক দুর্দশার পাশাপাশি অতি ধনীদের আরো ফুলে ফেঁপে ওঠা; দুর্বার গতিতে একের পরে এক রাষ্ট্রীয় সম্পদ বিক্রি হওয়া; দুর্নীতির বৈধতা পেয়ে যাওয়া; সাংবিধানিক অধিকারের পঞ্চত্বপ্রাপ্তি। ২০২০-তে এর সাথে যোগ হল কোরোনাভাইরাসকে প্রথমে সরকারের পাত্তা না দেওয়া, পরে আচমকা লকডাউন, তার ফলে গরীব দিন আনি দিন খাই মানুষের অবর্ণনীয় জীবনযাপন ও মৃত্যু। তার সাথে যোগ হল চিকিৎসার অব্যবস্থা সম্বন্ধে কোন পদক্ষেপ না নিয়ে কেন্দ্রীয় সরকারের থালা বাজানো, মোমবাতি জ্বালানোর মত গিমিক। কম পরীক্ষা করে রোগীর সংখ্যা কমিয়ে দেখানো হয়েছে বলেও অনেকের অভিযোগ।

এত কিছুর পরেও বিজেপি নির্বাচনে জেতে। অন্তত উড়ে যায় না। কেন হয় এরকম? দেখা যায় বিজেপির বিরুদ্ধে যাঁরা — রাজনৈতিক দল, চিন্তাবিদ, সাধারণ মানুষ — তাঁরা সকলেই এর কতকগুলো সাধারণ কারণ খুঁজে পান। সেগুলো মোটামুটি এরকম — ১) সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দুদের মুসলমান বিদ্বেষ, ২) বিজেপির অসম আর্থিক প্রতিপত্তি, ৩) বিজেপি আই টি সেলের প্রোপাগান্ডার তীব্রতা এবং ৪) নির্বাচন কমিশনের গান্ধারীবৃত্তি। কেউ কেউ মূল ধারার সংবাদমাধ্যমের বৃহদংশের নির্লজ্জ চাটুকারিতা এবং ক্ষেত্র বিশেষে সরকারের মুখপাত্রের ভূমিকা পালন করাকেও সঙ্গে যোগ করেন।

সব সত্যি। কিন্তু কবির ভাষায় বললে “সত্য, তবু শেষ সত্য নয়।”

২০১৪ সালে ক্ষমতায় আসার পর থেকে এন ডি এ সরকারের কর্মতৎপরতার যে তালিকা সকলের সামনে রয়েছে, তাতে গত কয়েক মাসে যোগ হয়েছে নতুন কৃষি আইন। এই আইন পাশ করা হয়েছে অভূতপূর্ব অগণতান্ত্রিক উপায়ে এবং এর বলে ভারতীয় কৃষকদের একেবারে কর্পোরেট গোলামে পরিণত করা যাবে। গরীব, নিম্ন মধ্যবিত্ত মানুষের ভাত ডাল আলুসেদ্ধটুকুর নিশ্চয়তাও উধাও হবে। এর পরেও কিন্তু সাধারণ মানুষের মধ্যে বিজেপির জনপ্রিয়তায় ধস নামতে দেখা যাচ্ছে না। উপরন্তু পশ্চিমবঙ্গের মত রাজ্যে বিজেপির জনপ্রিয়তা যেন ক্রমশ বেড়ে যাচ্ছে বলে অনেকের আশঙ্কা। ফলে যাঁরা দক্ষিণপন্থার ঘোষিত বিরোধী — রাজনৈতিক দলের সদস্য বা পার্টি আনুগত্যহীন ব্যক্তি — যা-ই হোন না কেন, তাঁদের মধ্যে প্রথম অনুচ্ছেদে উল্লিখিত বিস্ময় ক্রমবর্ধমান। এমনকি সক্রিয় রাজনৈতিক কর্মীরাও বলে থাকেন “এত কিছুর পরেও…!” ফলত হতাশা। আর সেই হতাশার কারণে নির্বাচনের ফল বেরোবার পর বিজেপি-বিরোধীরা কিছু ভয়াবহ দক্ষিণপন্থী আচরণ শুরু করেন। যেমন অনেকে বলতে শুরু করেন “মুসলমানগুলো কেন অমুক পার্টিকে ভোট না দিয়ে তমুক পার্টিকে ভোট দিল?” কেউ আবার সমস্ত দোষ ইভিএমের ঘাড়ে চাপিয়ে দেন (যদিও মনে করার কারণ নেই যে ইভিএম সম্পূর্ণ নির্দোষ)। এই আচরণ সাধারণ সমর্থক থেকে উচ্চস্তরের পার্টি নেতা পর্যন্ত সকলকেই করতে দেখা যায়। এই বিশ্লেষণে “সবাই বিজেপি হয়ে গেছে” — এই বিশ্বাস ক্রমশ ঘাড়ে চেপে বসে, বিজেপির লাভ হয়। কিন্তু এই বিশ্লেষণ একমাত্রিক। বিরোধী বিশ্লেষক, বুদ্ধিজীবী এবং রাজনৈতিক কর্মীরা ভেবে দেখবেন, নির্বাচনে (বিশেষ করে বিধানসভায়) যে মাইক্রো ইস্যুগুলো কাজ করে, সেগুলোকে এই বিশ্লেষণে অগ্রাহ্য করা হয়। সে কারণেই বিজেপিকে আটকানোর উদ্দেশ্যে বলা হয় “আর যাকে ইচ্ছা ভোট দিন, বিজেপিকে দেবেন না।”

একথা যাঁরা বলেন, বা বিজেপির বিরুদ্ধে বিরোধীদের রামধনু জোটের কথা যাঁরা বলেন, তাঁরা সকলেই ন্যূনতম লেখাপড়া জানেন। শ্রেণীর দিক থেকে মধ্যবিত্ত বা তদূর্দ্ধ। প্রায় সকলেরই নির্দিষ্ট রাজনৈতিক মতাদর্শ আছে; নিদেন পক্ষে রাজনীতি, সমাজনীতি, ইতিহাস সম্পর্কে কিছুটা জ্ঞান এবং স্পষ্ট মতামত আছে। এঁরা জানেন রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘের মতবাদ ও কার্যকলাপ কতটা ভয়ঙ্কর। ফলে তাঁদের কাছে সব নির্বাচনই হিন্দুত্বের বিরুদ্ধে ভারতীয়ত্বের লড়াই। বিজেপি যেমন বাইনারি তৈরি করেছে সারা দেশে — দেশদ্রোহী আর দেশপ্রেমিক — অনেকটা একই আদলের আরেকটা বাইনারি এঁদের মনেও তৈরি হয়ে রয়েছে। ভারতের উত্তরপ্রদেশের প্রত্যন্ত গ্রামে যখন একজন মানুষ ভোট দিচ্ছেন বা কলকাতার কোন বস্তিবাসী যখন ভোট দিচ্ছেন, তিনি যে ফ্যাসিবাদের পক্ষে বা বিরুদ্ধে ভোট দিচ্ছেন না, দেওয়া সম্ভব নয় — একথা বুঝতে সারা দেশের বিজেপি-বিরোধীদের কেবলই ভুল হয়ে যাচ্ছে। এ ভুল না করলে কত দূর লড়া যায়, তার প্রমাণ পাওয়া গেছে বিহারের নির্বাচনে।

কোন সন্দেহ নেই, যদি দেশের সর্বত্র সবকটা নির্বাচন ভারত ধর্মনিরপেক্ষ থাকবে কি থাকবে না, গণতান্ত্রিক থাকবে নাকি একদলীয় একনায়কতন্ত্র হয়ে যাবে — কেবল এই ইস্যুতে লড়া যেত, তবে চমৎকার হত। দুঃখের বিষয়, তা সম্ভব নয়। তেমন দেশ তৈরি করার জন্য আমরা সঙ্ঘবিরোধীরা ৬৭ বছর (১৯৪৭-২০১৪) সময় পেয়েছিলাম। পারিনি। এখন রাতারাতি ভারতেরে সেই স্বর্গে জাগরিত করতে চেয়ে অ্যালার্ম ঘড়ি বাজিয়ে দিলেই রাত শেষ হয়ে সূর্য উঠবে না। আপনি জানেন হিটলার কে, নাজি কারা, ফ্যাসিবাদ কী ক্ষতি করে। আপনার বাড়ির কাজের মেয়ে জানে না। এখন যদি ন্যুরেমবার্গ ল-এর সাথে সাদৃশ্য আছে বলে মোদী সরকারের পাশ করা নাগরিকত্ব আইনের বিরোধিতা করতে বলেন, সাবধান করেন “আর যাকে ইচ্ছে ভোট দাও, বিজেপিকে দিও না”, তার বয়ে গেছে আপনার কথা শুনতে। কেবল গ্রামের গরীব মানুষ, শহরের বস্তিবাসী বা কাজের মেয়ের কথাই বা কেন? নিজেদের লেখাপড়া জানা আত্মীয়স্বজনদেরই জিজ্ঞাসা করে দেখুন না, ফ্যাসিবাদ কী কজন জানে? যে চেতনা তৈরিই হয়নি, সে চেতনার কাছে আবেদন করে কোন সাড়া পাওয়ার আশা করা কি উচিৎ?

সত্যি কথা বলতে, পৃথিবীর কোথাও কোন নির্বাচনই সম্পূর্ণত মতাদর্শের লড়াই হয় না। হওয়া উচিৎ কিনা তা-ও ভেবে দেখা দরকার। ধরা যাক, একটা দেশের সরকার রাস্তাঘাট সারায়নি পাঁচ বছর ধরে, রোজ দুর্ঘটনা ঘটছে। অথচ তারা দেশের বিজ্ঞানীদের প্রতি মাসে সংবর্ধনা দেয়। এই দলের কি ভোট পাওয়া উচিৎ? গণতন্ত্রে নাগরিকের ভোট দেওয়ার অধিকারই শিরোধার্য, রাজনৈতিক দলের ভোট পাওয়ার অধিকার নয়। ভোটার ঠিক করবেন তিনি কোন কোন ইস্যুর ভিত্তিতে ভোট দেবেন। রাজনৈতিক শক্তিগুলো, সে কোন দল হোক বা ব্যক্তি, ভোটারের মত পাওয়ার জন্য অন্যদের চেয়ে উন্নত হওয়ার চেষ্টা করতে পারে। “আমরা বিজেপি নই, অতএব আপনার ভোট পাওয়া আমাদের অধিকার” — কোন দল এমন বলতে পারে না। বললে সেটাই অগণতান্ত্রিক। যদি কেউ বলে “অমুক দল বিজেপি নয়, অতএব ওকে ভোট দেওয়া আপনার কর্তব্য”, তাহলে তা-ও অগণতান্ত্রিক। কারণ রাজনৈতিক দলের কর্তব্য ভোটারের চোখে নিজেকে অন্যদের চেয়ে উন্নত (অন্তত স্বতন্ত্র) হিসাবে প্রমাণ করা। তা করতে না পারলে, বিজেপির চেয়ে ভাল কোন বিকল্প দিতে না পারলে, ভোটার কেন ভোট দিতে যাবেন?

দেশের অধিকাংশ নির্বাচনেই কিন্তু বিজেপি-বিরোধীরা বিকল্পহীন হয়ে নির্বাচনে লড়ছেন। ভোটারের সামনে বিজেপির অন্যায়গুলোর তালিকা প্রস্তুত করছেন কেবল। নিজেরা তার বদলে কী কী সদর্থক কাজ করবেন, তা বলছেন না। অনেক ক্ষেত্রে আবার বিজেপির রাজনীতিই অনুসরণ করে নির্বাচনে লড়ছেন। মধ্যপ্রদেশের নির্বাচনে যেমন কংগ্রেস গোশালা বানিয়ে দেওয়া, রাম পথ তৈরি করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে জিতেছিল। সরকারটা স্বভাবতই বেশিদিন টেকেনি। আমরা যারা ভারতের ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তিত, তারা কংগ্রেসের সেই জয়ে উল্লসিত (অন্তত আশ্বস্ত) হয়েছিলাম। গণ্ডগোলটা ওখানেই। বিজেপির নীতি কংগ্রেস নিলে যদি আমাদের আপত্তি না থাকে, কার্টুনিস্টকে তামিলনাড়ু সরকার গ্রেপ্তার করলে যদি আমরা হট্টগোল না করি, আন্দোলনরত চাকরিপ্রার্থীদের উপর তৃণমূল কংগ্রেস সরকার জলকামান চালালেও যদি আমরা চুপ করে থাকি এবং বলি ওরা বিজেপি নয়, তাই ভোট ওদেরই প্রাপ্য, তাহলে বিজেপির হাতই শক্ত হয়। কথাটা আরো বেশি করে সত্যি পশ্চিমবঙ্গের মত রাজ্যে, যেখানে বিজেপি কখনো ক্ষমতায় আসেনি। জলকামানে ভিজে যাওয়া ছেলেমেয়েগুলো বা তাদের পরিবার ফ্যাসিবাদ দ্যাখেনি, জলকামান দেখেছে। ত্রিপুরা রাজ্যের চাকরি চলে যাওয়ায় আত্মঘাতী শিক্ষক উত্তম ত্রিপুরার দৃষ্টান্ত দেখিয়ে তাদের বিজেপিকে ভোট দেওয়া থেকে নিরস্ত করা কি সম্ভব তখন আর?

এ রাজ্যে এখন পর্যন্ত লড়াইটা বিজেপির ইউটোপিয়া বনাম বিরোধীদের ইউটোপিয়া। বিজেপি সোনার বাংলার কথা বলছে। সে বাংলায় কর্মসংস্থান কী করে হবে বলছে না। আলটপকা ৭৫ লক্ষ চাকরির কথা বলেই ঢোঁক গিলেছে। অন্যদিকে ক্ষমতাসীন তৃণমূল কংগ্রেস মানুষের সমস্যা জানতে এবং মেটাতে সরকারকে দুয়ারে দুয়ারে নিয়ে গেছে, অথচ কর্মসংস্থানের সমস্যা নিয়ে মুখে কুলুপ। বহুকাল ধরে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্কুলে নিয়োগ নিয়ে চলতে থাকা অচলাবস্থার কোন স্থায়ী সমাধানের কথা সরকার বলছে না। কেবল এক প্রস্থ নিয়োগের ঘোষণা হয়েছে। তৃণমূল বরং বিজেপির ইউটোপিয়ার বিপক্ষে দাঁড় করিয়েছে এমন এক বাংলার ইউটোপিয়া, যার ইতিহাসে কেবল রবীন্দ্রনাথ, বিদ্যাসাগর, রামমোহন, নজরুল, লালন, ডিরোজিও, মাইকেল মধুসূদনরা আছেন। একে ইউটোপিয়া বলছি, কারণ বাংলায় এঁদের পাশাপাশি তারাও ছিল যারা রামমোহনের বিরোধিতা করেছিল, বিদ্যাসাগরকে খুনের চেষ্টা করেছিল, নজরুল সম্বন্ধে বলত “ফার্সি শব্দে কবিতা লেখে! সবে দাও পাজিটার জাত মেরে।” ডিরোজিওকে হিন্দু কলেজ (অধুনা প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয়) থেকে তাড়িয়ে ছেড়েছিল বাঙালিরাই। শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জির কথা তো সকলেই জানে। এই ইউটোপিয়ার লড়াইয়ে বিজেপিকে পরাস্ত করা শক্ত। এমনিতেও এই ইউটোপিয়াগুলো অধিকাংশ মানুষকে ছুঁতে পারছে না।

তৃতীয় পক্ষ বাম-কংগ্রেস জোট এসবের বাইরে গিয়ে বলবেন কি, কী হবে রাজ্যের ধুঁকতে থাকা স্কুলশিক্ষার? স্কুল সার্ভিস কমিশনের পরীক্ষা কি আবার স্বমহিমায় ফেরত আসবে তাঁরা ক্ষমতায় এলে? রাজ্য সরকারী কর্মচারীদের পাওনাগন্ডারই বা কী হবে? সারা দেশের কৃষকদের সাথে এদেশের কৃষকরাও তো স্বখাতসলিলে ডুবছেন। তাঁদের জন্যই বা কী পরিকল্পনা? শিল্পায়ন নিয়ে কী চিন্তা ভাবনা তাঁদের? ওটা না হলে গরীব মানুষের কর্মসংস্থানের কী হবে? কেন্দ্র যেভাবে রাজ্যের প্রায় সব ক্ষমতাই কেড়ে নিচ্ছে, সরকারে এলে কিভাবে লড়বেন তার বিরুদ্ধে?

শুধু পশ্চিমবঙ্গ নয়, সর্বত্রই বিজেপি বিরোধীদের বিকল্প কর্মসূচী হাজির করতে হবে, নতুন দিনের স্বপ্ন দেখাতে হবে। সরকারের অন্যায় তুলে ধরা, সমালোচনা করা বিরোধীদের একটা কাজ। একমাত্র কাজ নয়। বর্তমান পরিস্থিতি দেখে শিল্পী, সাহিত্যিক, সাংবাদিক, সাধারণ মানুষ নিরাশ হয়ে পড়তে পারেন। বিরোধী রাজনীতি কিন্তু নৈরাশ্যবাদের জ্বালানিতে চলে গন্তব্যে পৌঁছাতে পারে না। ভোটারের চারপাশের বাস্তব পরিস্থিতি, তার কাছে জরুরী ইস্যুগুলো কী, সেসব না ভেবে যদি লাল, সবুজ, ধূসর সব রং মিলে গিয়ে এমন একটা ইস্যুতে লড়াই করে — যা অধিকাংশ ভোটারের কাছে কোন ইস্যুই নয়, তাহলে দক্ষিণপন্থা জিতেই চলবে। আমি ইউটোপিয়ায় প্রাণপণে যা-ই চাই না কেন।

প্রসঙ্গ কৃষক-আন্দোলন: প্রশ্নগুলো সহজ, উত্তর কে জানায়?

অধুনা ক্ষমতার বিরুদ্ধে কলম ধরলে কারাবাস হয় পরে, আগে সাংবাদিকের চাকরি যায়।

দেশে একটা কৃষক-আন্দোলন চলছে। দেশে মানে ‘সন্ত্রাসবাদীদের জায়গা’ কাশ্মিরে নয়, ‘বিচ্ছিন্নতাবাদী’ উত্তর-পূর্বাঞ্চলে নয়, এমনকি ‘দুর্বোধ্য’ ভাষায় কথা বলা তামিলনাডু, অন্ধ্র, তেলেঙ্গানা বা কেরলেও নয়। আন্দোলনটা চলছে খোদ রাজধানী দিল্লিকে ঘিরে। রাজনৈতিক মতপার্থক্য ভুলে গিয়ে অনেকগুলো কৃষক সংগঠনের সদস্যরা দিল্লির এই হাঁড়-কাঁপানো শীতে পথে বসে আছেন সপরিবার। তাঁরা ভারত বন্‌ধ ডাকলেন, বিজেপি ছাড়া প্রায় সব রাজনৈতিক দল সমর্থন করল। এই আন্দোলনের দাবিগুলো কী কী? খুব লম্বা কোনও দাবি সনদ নেই। অতিমারির মওকায় বিনা আলোচনায় অর্ডিন্যান্স জারি করে, পরে সংসদে বুলডোজার চালিয়ে (রাজ্যসভায় ভোটাভুটি হতে না দিয়ে) পাশ করিয়ে নেওয়া কৃষি আইনগুলো বাতিল করতে হবে, আর প্রস্তাবিত বিদ্যুৎ আইন (সংশোধনী) বিল বাতিল করতে হবে— দাবি এটুকুই। দাবিগুলো কি ন্যায্য, না অন্যায্য? সরকার যে বলছে এই আইনগুলোতে কৃষকদের ভালই হবে— সে কি নেহাত বানানো কথা? মনে এসব প্রশ্ন জাগলে আপনি কোথায় যাবেন? খবরের কাগজ পড়বেন অথবা টিভি দেখবেন তো? কিন্তু সেখানে এসবের উত্তর পাওয়ার সম্ভাবনা কম।

প্রথমত, সর্বভারতীয় খবরের চ্যানেল আপনাকে অনেক বেশি করে দেখাবে চিনকে ভারত ‘কেমন দিল’ (যদিও চিনই প্রতিনিয়ত ভারতকে ‘দিয়ে চলেছে’ সীমান্তবর্তী এলাকায়। বদলে ভারত বিবৃতি ছাড়া বিশেষ কিছুই দিতে পারেনি এখনও পর্যন্ত); পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রীর একদা-ঘনিষ্ঠ নেতা শুভেন্দু অধিকারী তৃণমূল ছেড়ে বিজেপিতে যোগ দেবেন কিনা, দিলে কবে দেবেন, আর কে-কে অপেক্ষমান যাত্রীর তালিকায় আছেন, ইত্যাদি। সর্বভারতীয় কাগজগুলোতে এসব খবরের পাশাপাশি ঢালাও লেখা থাকবে নরেন্দ্র মোদি ‘মন কি বাত’-এ কী বললেন। পশ্চিমবঙ্গের সংবাদমাধ্যমও তথৈবচ। টিভি খুলে বিজেপি আর তৃণমূলের প্রত্যেকটি গ্রামীণ ঝগড়ার পুঙ্খানুপুঙ্খও আপনি জেনে যাবেন, খবরের কাগজের প্রথম পাতায় থাকবেই রাজ্য সরকারি কর্মচারীদের বহুবিলম্বিত ডিএ প্রাপ্তির ঘোষণা (যেন মহানুভব সরকারের দয়ার শরীর, তাই ওটা দিচ্ছেন)। বিধানসভা নির্বাচন এগিয়ে এলে যে ধরনের ঘোষণা দেশের সব সরকারই করে থাকে, সেগুলোও পাবে যথাযোগ্য মর্যাদা। কৃষক-আন্দোলনের ভাগ্যে শিকে ছিঁড়বে কেবল কোনও সংবাদসংস্থার প্রতিভাবান আলোকচিত্রী আন্দোলনকারীদের দৃষ্টিনন্দন ছবি তুলতে পারলে তবেই। সঙ্গে থাকবে দুই কি তিন কলমে ছড়ানো একটুকরো খবর (যা আন্দোলনের শুরুর কয়েকদিন ছবিহীন এক কলম বা দু কলমেই সীমাবদ্ধ ছিল)। ‘এরপর অমুক পাতায়’…

দ্বিতীয়ত, এটুকু খবরেও আপনাকে তথ্য দেওয়া হবে যৎসামান্য। ‘সরকারের ভাবনাচিন্তা সম্পর্কে ওয়াকিবহাল সূত্র থেকে জানা যাচ্ছে’, ‘কৃষকরা বলছেন’-জাতীয় ধরি-মাছ-না-ছুঁই-পানি শব্দবন্ধে আপনাকে কেবল জানিয়ে দেওয়া হবে ব্যাপারটা খুব পুঁদিচ্চেরি (টেনিদার ভাষায়) এবং সত্বর মিটে যাওয়ার সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না। কিন্তু কৃষকদের দাবিদাওয়া সম্বন্ধে আপনি তেমন কিছু জানতে পারবেন না, তার ভালমন্দ নিয়ে কোনও গভীর আলোচনা পাবেন না, আন্দোলনকারীদের সম্বন্ধে বা আন্দোলনের প্রধান নেতাদের মতামত কিংবা রাজনীতি নিয়ে প্রায় কিছুই জানতে পারবেন না।

তবুও তো আপনি জেনে যাচ্ছেন। কী করে জানতে পারছেন? ভেবে দেখুন, আপনি জানছেন মূলত সোশাল মিডিয়া থেকে। বিভিন্ন খবর ও মতামতের সাইটের লিঙ্ক শেয়ার হচ্ছে সোশাল মিডিয়ায়। কোনও-কোনও সাংবাদিক অকুস্থল থেকে সরাসরি টুইট করছেন। আপনি সেখান থেকেই জানতে পারছেন। কিন্তু ওভাবে জানার সমস্যা হল, যাঁরা এই আন্দোলনের পক্ষে, তাঁদের কাছে কৃষকদের বার্তা পৌঁছাচ্ছে, আর যাঁরা বিপক্ষে তাঁরা নির্বিবাদে ‘খালিস্তানি জুজু’ দেখে যাচ্ছেন। তথাকথিত স্বাধীন সংবাদমাধ্যমগুলো যে নিরপেক্ষতার কথা বলে অনবরত, ‘বোথ সাইডস অফ দ্য স্টোরি’ নামক যে জিনিসটার পোশাকি আলোচনা চলে, সেটাকে এইভাবে তারাই ধ্বংস করে দিচ্ছে।

কিন্তু এমন হচ্ছে কেন? এককথায় বিজেপি মিডিয়াকে নিয়ন্ত্রণ করছে বললে এর উত্তর হয় না। কারণ কৃষক বা শ্রমিক আন্দোলনকে অগ্রাহ্য করা, তার পিছনে দুরভিসন্ধি আবিষ্কার করা ভারতের (প্রায় সব দেশেরই) সংবাদমাধ্যমের পুরনো অসুখ। তফাত এইটুকু যে, অতীতে কৃষক-শ্রমিক বিরোধী সরকারও আলোচনার প্রয়োজন স্বীকার করত, মোদি-সরকার বাধ্য হয়ে আলোচনায় বসেছে। ভেবেছিল, এর আগের আন্দোলনগুলোকে যেমন শহুরে নকশাল বা পাকিস্তানিদের আন্দোলন বলে দেগে দিয়ে দাঙ্গা আর দমননীতি দিয়ে চুপ করিয়ে দেওয়া গিয়েছিল— এ ক্ষেত্রেও তেমনটাই করা যাবে। তাহলে আর একটু তলিয়ে দেখা যাক, কেন এ হেন অবহেলা।

মূলধারার সংবাদমাধ্যম বলতে বোঝায় খবরের কাগজ আর টিভি চ্যানেলগুলোকে। আমাদের দেশে বিরাট পুঁজি না থাকলে দৈনিক সংবাদপত্র বা টিভি চ্যানেল চালানো বরাবরই দুষ্কর। ফলে কাগজ আর চ্যানেলের মালিকরা সকলেই বড়-বড় শিল্পপতি। টাইমস গ্রুপের জৈনদের মতো অনেকের সংবাদ-ব্যবসাটাই মূল ব্যবসা। আবার ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস কাগজের মালিক গোয়েঙ্কারা বা হিন্দুস্তান টাইমসের বিড়লারা অন্য নানা ব্যবসাতে আছেন, আবার সংবাদের ব্যবসাতেও আছেন। সংবাদের ক্রেতা কারা? মূলত ভদ্রলোকেরা, চাষাভুষোরা নন। নব্বইয়ের দশকের অর্থনৈতিক উদারীকরণের ফলে নিশ্চয়ই মধ্যবিত্তের সংখ্যা বেড়েছে। কিন্তু তাতে সংবাদমাধ্যমের ক্রেতার চাহিদা বদলে যায়নি। যে পাঠক কাল কোনওমতে সংসার চালাতেন, তিনিও আজ হাতে কিছু বেশি টাকা পেয়ে বহু বছরের বড়লোকের মতোই শেয়ার বাজারের খবর চান, ব্যাঙ্কক বা ফুকেত বেড়াতে যান। কাল যে শ্রমিক কারখানায় ধর্মঘট করে দাবি আদায় করতে চাইতেন, আজ তাঁর আইটি এঞ্জিনিয়ার সন্তান ধর্মঘট করার অধিকার জরুরি বলে মনে করে না, ধর্মঘট কর্মনাশা বলেই মনে করে। তার সকালবেলার কাগজ তাকে তার পছন্দের কথাই পড়াতে চায়, তার প্রিয় চ্যানেল সে যা শুনতে চায় বা দেখতে চায় তা-ই দেখায়। নীল বিদ্রোহের যুগের হরিশ মুখার্জির কথা ভেবে লাভ নেই। বিংশ শতাব্দীর প্রথম ভাগের ভারতীয় প্রেসের কথা ভেবেও লাভ নেই। তখন পুঁজিপতি কাগজ মালিকদেরও লক্ষ ছিল স্বাধীনতা আন্দোলনকে শক্তিশালী করা। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর পুঁজি যে পুঁজির নিয়মেই চলবে, তাতে আর আশ্চর্য কী? শ্রমিক-কৃষকের আন্দোলনকে কেনই বা সে গুরুত্ব দিতে যাবে?

এ পর্যন্ত পড়ে অনেকেরই মন বিদ্রোহ করবে। আজকের ডিসটোপিয়া কি একেবারেই নতুন নয়? হ্যাঁ, নতুনত্ব নিশ্চয়ই আছে।

কৃষক-আন্দোলনের খবরকে প্রাপ্য গুরুত্ব না-দেওয়া এক জিনিস, আর আন্দোলনকে সরাসরি অতীতের এক বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত করে দেওয়া আরেক জিনিস। এটা নতুন, তবে এ-ও মনে রাখা ভাল যে, গত দশ বছরে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রনেতাদের বিচ্ছিন্নতাবাদী হিসেবে দেগে দিয়েছে এই মিডিয়াই, ইসলাম ধর্মাবলম্বীদের নাগরিকত্ব আইনের বিরুদ্ধে আন্দোলনকেও পাকিস্তানের চক্রান্ত বলে দেগে দিয়েছে এই মিডিয়াই। সেদিক থেকে এবারের আচরণটাও নতুন নয়।

আসলে লাভের কড়ি মূল কথা হলেও, দশ-পনেরো বছর আগে পর্যন্তও সংবাদমাধ্যমের মালিকরা মনে করতেন, কিছুটা সামাজিক দায়িত্ব তাঁদের আছে। এর পিছনে স্বাধীনতা আন্দোলনের স্মৃতি হয়তো একটা কারণ। অথবা হয়তো ভারতীয় মধ্যবিত্তের দুর্বলতর মানুষের প্রতি যে সহমর্মিতা ছিল, সেকথা মাথায় রেখে সংবাদমাধ্যম সবরকম লড়াই আন্দোলনকেই খবর হিসেবে দেখতে বাধ্য হত। এখন আর সে দায় নেই, কারণ মধ্যবিত্ত বদলে গেছে— ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে চলতি কৃষক-আন্দোলনের অন্যতম নেতা হান্নান মোল্লা সখেদে যা বলেছেন। হেতু যা-ই হোক, সংবাদমাধ্যমের মালিকরা আগে মনে করতেন সংবাদসংগ্রহ বিশেষজ্ঞের কাজ এবং সংবাদ পরিবেশন মানে আসলে, মোটের উপর, ক্ষমতার দোষত্রুটি প্রকাশ করা। সেই কারণেই দোর্দণ্ডপ্রতাপ ইন্দিরা গান্ধি জরুরি অবস্থা জারি করেও সংবাদমাধ্যমকে পোষা তোতাপাখি বানাতে পারেননি। বরুণ সেনগুপ্ত, গৌরকিশোর ঘোষ, কুলদীপ নায়ারের মতো সম্পাদকরা কারাবাস করে ফেরত এসে আবার কলম ধরতে পেরেছেন। অধুনা ক্ষমতার বিরুদ্ধে কলম ধরলে কারাবাস হয় পরে, আগে সাংবাদিকের চাকরি যায়। আজকের মালিক সংবাদসংগ্রহ চান না, চান মুনাফা বৃদ্ধির জন্য বিত্তবান ক্ষমতাশালীর অনুগ্রহ। যেমন দিল্লিতে, তেমনই রাজ্যে-রাজ্যে। এ কাজে বিশেষজ্ঞ লাগে না, লাগে যা-বলেন-তাই-লিখি বাহিনী। তাই চতুর্দিকে সাংবাদিক ছাঁটাই হচ্ছে, কাগজ বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে, চ্যানেল তুলে দেওয়া হচ্ছে এমন একটা সময়ে, যখন স্বাধীনতার পরে ভারতের অর্থনৈতিক অবস্থা সবচেয়ে খারাপ, সামাজিক বিভাজন তুঙ্গে, বিচারব্যবস্থার নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন উঠে গিয়েছে, মৌলিক সাংবিধানিক অধিকারগুলো নেহাত কথার কথা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। অর্থাৎ যখন আরও বেশিসংখ্যক এবং বেশি সমালোচক সাংবাদিক দরকার ছিল, সেই সময় সংবাদসংগ্রহের কাজটাই তুলে দেওয়া হচ্ছে। অজুহাত হিসেবে কয়েক মাস আগে ছিল কোভিড-১৯, এখন অর্থনৈতিক মন্দা। সিংঘুতে সংবাদসংগ্রহ করতে যাবে কে, লোক কোথায়? লোক যেন না থাকে সে ব্যবস্থাই তো করা হয়েছে সযত্নে।

ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের মালিক রামনাথ গোয়েঙ্কাকে একবার এক রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী বলেছিলেন “আপনার অমুক রিপোর্টার খুব ভাল কাজ করছে।” রামনাথ তৎক্ষণাৎ সেই রিপোর্টারকে বরখাস্ত করেন। এখন যুগ বদলেছে। কোথায় কে কোন কাগজের সম্পাদক হবেন, অমুক চ্যানেলের তমুক জেলার সংবাদদাতা কে হবেন, তা-ও ঠিক করছেন মন্ত্রীরা। রবীশ কুমারের মতো কয়েকজন কথা শুনছেন না, ফলে দেখাই যাচ্ছে “ফিরিছে রাজার প্রহরী সদাই কাহার পিছু পিছু”। সুতরাং কোনটা খবর কোনটা নয়, কোনটা কত বড় খবর সেটাও যে মন্ত্রীসান্ত্রীরাই ঠিক করে দিচ্ছেন তা বোঝা কি খুব শক্ত?

আমরা যারা কাগজের পাঠক আর টিভির দর্শক, তারা না-বুঝলেও আন্দোলনকারী কৃষকরা বিলক্ষণ বোঝেন। তাই বেশকিছু চ্যানেলের সাংবাদিককে প্রোপাগান্ডা সংগ্রহে গিয়ে ব্যর্থ মনোরথ হয়ে ফিরতে হয়েছে।

তথ্যসূত্র

https://theprint.in/theprint-essential/what-is-electricity-amendment-bill-2020-and-why-farmers-are-opposing-it/555186/
https://indianexpress.com/article/india/hannan-mollah-idea-exchange-farmer-protests-farm-laws-7094428/
https://www.firstpost.com/india/bad-journalism-makes-a-lot-more-noise-raj-kamal-jhas-speech-at-ramnath-goenka-awards-3088184.html

https://4numberplatform.com এ প্রকাশিত

প্রতিবাদ সংবাদে বাদ?

অনুপ্রেরণা ছাড়া এ রাজ্যে ফ্যাসিবাদের বিরোধিতা করাও মানা

গত ২৭শে নভেম্বর পাঞ্জাব, হরিয়ানার কৃষকরা তিনটে কৃষি বিল বাতিলের দাবীতে এবং প্রস্তাবিত বিদ্যুৎ বিলের বিরুদ্ধে দিল্লী অভিযান শুরু করেন। ইতিমধ্যে উত্তরাখণ্ড, উত্তরপ্রদেশের মত রাজ্যগুলোর কৃষকরাও পথে নেমে পড়েছেন। মহারাষ্ট্রের কৃষকরা নামবেন বলে ঘোষণা করেছেন। কাউকে কেয়ার না করা মোদী সরকার বুঝেছে ঠ্যালার নাম বাবাজি। এ রীতিমত কৃষক বিদ্রোহ। তাই গায়ের জোর ভুলে অমিত শাহ ও সম্প্রদায় হঠাৎ আলোচনার জোরে বিশ্বাসী হয়ে উঠেছে। চিড়ে কিন্তু ভিজছে না। একগুঁয়ে চাষাদের এক কথা — সংসদ ডাকো, আইন বাতিল করো। সারা দেশের বাম, মধ্য, দক্ষিণ — যে কোন পন্থার মানুষের কাছেই এই মুহূর্তে এর চেয়ে বড় কোন ঘটনা নেই, কোন ইস্যু নেই, থাকার কথাও নয়।

অথচ বাংলা মূলধারার সংবাদমাধ্যমগুলোর দিকে তাকালে কিন্তু সেটা বোঝার উপায় নেই। গতকালই পি সাইনাথ এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন এই কৃষক বিদ্রোহ এক দিনে তৈরি হয়নি। গত কয়েক বছরে রাজস্থান, মহারাষ্ট্র, মধ্যপ্রদেশের কিষাণ লং মার্চের ধারাবাহিকতায় এই আন্দোলন এসেছে। সেই আন্দোলনগুলো যেমন বাংলার সর্বাধিক টি আর পি প্রাপ্ত দুটো খবরের চ্যানেলে প্রাধান্য পায়নি, এই আন্দোলনও পাচ্ছে না।

২৬শে নভেম্বর কেন্দ্রীয় ট্রেড ইউনিয়নগুলোর ডাকে দেশব্যাপী সাধারণ ধর্মঘট ছিল। সেই ধর্মঘটকেও সমর্থন জানিয়েছিল কৃষক সংগঠনগুলো। সেদিন বহু জায়গায় ট্রেন চলেনি, বাস চলেনি, দোকানপাট বন্ধ ছিল। অথচ সেদিন দুপুরেও কূপমন্ডুক বাংলা চ্যানেলের প্রধান খবর ছিল মাঝেরহাট ব্রিজ খোলার দাবিতে বিজেপির দাপাদাপি। যে ব্রিজ আজ বিকেলে উদ্বোধন হওয়ার কথা আগেই ঘোষণা হয়ে গিয়েছিল।

বাংলা খবরের কাগজগুলোতেও গত কয়েক দিন ধরে কৃষক বিদ্রোহ নয়, বেশি জায়গা অধিকার করে থাকছে শুভেন্দু অধিকারীর ধাষ্টামো বা মাননীয় মুখ্যমন্ত্রীর ভোটমুখী প্রকল্প ঘোষণা। গত দু-তিন দিনে তবু কৃষক বিদ্রোহের খবর বা ছবি বাড়ির কাগজটার প্রথম পাতায় ভাল করে দেখতে পাচ্ছি, তার আগে এ কোণে এক কলম বা ও কোণে দু কলমেই সন্তুষ্ট থাকতে হচ্ছিল। সে অবশ্য চব্বিশ ঘন্টার আনন্দময় চ্যানেলগুলোর তুলনায় মন্দের ভাল। কারণ ওগুলোতে খবর বলতে সারাদিন যা পাওয়া যায়, তা হল — অমুক জায়গায় তৃণমূলের লেখা দেওয়াল মুছে দিল বিজেপি। তমুক জায়গায় বিজেপির পার্টি অফিসে তৃণমূলের ভাঙচুর। বিজেপি নেতার মাচার লাউ কেটে নেওয়ার অভিযোগ তৃণমূল পঞ্চায়েত সদস্যের বিরুদ্ধে। তৃণমূলের পঞ্চায়েত প্রধানের বিরুদ্ধে চরিত্রহীনতার অভিযোগ করলেন বিজেপি সদস্য — এইরকম আর কি।

অর্থাৎ যে খবরগুলো আজ থেকে পাঁচ বছর আগেও নেহাত দেখানোর বা ছাপার মত কিছু না থাকলে জায়গা ভরাতে ব্রিফ হিসাবে ব্যবহার করা হত — সেগুলোই বাঙালিকে দিনরাত পড়ানো এবং দেখানো হচ্ছে। ব্যাপারটা মোটেই হাস্যকর নয়। আসলে দিল্লী ভিত্তিক হিন্দ্রেজি সংবাদমাধ্যম যেমন দেশের আসল সমস্যাগুলোকে আড়াল করতে পাকিস্তানকে কেমন দিলাম, লাভ জিহাদ, সিভিল সার্ভিস জিহাদ ইত্যাদি আবর্জনা পরিবেশন করে, বাংলার সংবাদমাধ্যমও কৃষক বিদ্রোহ, শ্রমিকদের আন্দোলনকে আড়াল করতে আবর্জনা পরিবেশন করছে। হিন্দ্রেজি সংবাদমাধ্যমগুলোর খবর থেকে মস্তিষ্কে বিষক্রিয়া হয়, বাংলার আবর্জনা কেবল দুর্গন্ধ ছড়ায় — তফাত এটুকুই।

কিন্তু কেন এমন করা হচ্ছে? কৃষক আন্দোলনকে প্রাপ্য গুরুত্ব দিলে কী ক্ষতি? পশ্চিমবঙ্গের শ্রমিকরা কি টিভি দ্যাখেন না, নাকি কৃষি আইন, শ্রম কোডের প্রভাব এ রাজ্যের শ্রমিক, কৃষকদের উপর পড়বে না?

আসলে প্রকাশ্যে স্বীকার না করলেও, যারা জানার তারা জানে, হিন্দ্রেজি সংবাদমাধ্যমের অধিকাংশ যেমন একচোখা, এ রাজ্যের অধিকাংশ সংবাদমাধ্যমও তাই। তাদের অনেকেই ফ্যাসিবিরোধী, কিন্তু কোনটাকে ফ্যাসিবাদ বলা হবে, তার কতটা বিরোধিতা করা হবে, আদৌ করা হবে কিনা — সেসব তারা ঠিক করে না। অনুপ্রেরণা ছাড়া এ রাজ্যে ফ্যাসিবাদের বিরোধিতা করাও মানা।

অতএব শিক্ষক-শিক্ষিকার চাকরি খুঁজছে যারা, তাদের আন্দোলনের কথা জানতে হলে আপনাকে ফেসবুকই খুলতে হবে। টিভির স্থানীয় সংবাদ লাউমাচা পুঁইমাচা নিয়েই চলবে। কৃষক বিদ্রোহের খবর জানতে চাইলেও হাতে গোনা হিন্দ্রেজি সংবাদমাধ্যম অথবা খবরের সাইটের শরণাপন্ন হতে হবে। টিভি আর কাগজ জুড়ে দলবদলের হট্টগোলই চলবে।

ছবিটা অবশ্য কাল থেকে বদলে যাবে বলে আশা করছি। কারণ আজ দিদি ঘোষণা করেছেন তিনি কৃষকদের পাশে আছেন, ঐ আইনগুলো খুব খারাপ, অবিলম্বে বাতিল করা উচিৎ এবং এই দাবিতে তাঁর দল কোমর বেঁধে আন্দোলনে নামছে। আশা করি এবার আর বাংলা সংবাদমাধ্যমের অনুপ্রেরণার অভাব হবে না।

খাপ বলেছে খাব খাব, বলিউডকে খাই

এক ভাষা, এক ধর্ম, এক রাষ্ট্রের যে ছবি সঙ্ঘ সকলের মাথায় ঢোকাতে চায়, সে ছবি বলিউডে এসেই বর্ণহীন হয়ে পড়ে।

খাপ কথাটা শুনলেই অনিবার্যভাবে পঞ্চায়েত শব্দটা মনে আসে। আর পঞ্চায়েত যেহেতু গেঁয়ো ব্যাপার, সেহেতু শহুরে মানুষ নাক সিঁটকান। কিন্তু ভারতবর্ষ আজও আসলে গ্রামীণ সভ্যতা। মানে শহরে গ্রামের মৃদুল মলয়, মাঠে মাঠে ধান আর গাছে গাছে পাখি থাক বা না থাক; পরনিন্দা, পরচর্চা, পরশ্রীকাতরতা বিলক্ষণ থাকে। তাই যাঁরা নাক সিঁটকান তাঁরাও সুযোগ পেলে খাপ পঞ্চায়েত বসাতে ছাড়েন না। ১৪ জুন অভিনেতা সুশান্ত সিং রাজপুতের মৃতদেহ উদ্ধার হওয়ার পরের ঘটনাবলী এর প্রমাণ। তদন্তে যদি শেষ পর্যন্ত প্রমাণিত হয় সুশান্ত খুনই হয়েছেন এবং রিয়া চক্রবর্তীই খুনটা করিয়েছেন (যদিও সি বি আই, ই ডি, এন সি বি এই মুহূর্তে খুনের নামও করছে না), তাহলেও গত তিন মাস ধরে টিভি স্টুডিও আর আমাদের বৈঠকখানার মধ্যে সংযোগ স্থাপন করে যা চলছে, তা আসলে ই-খাপ পঞ্চায়েত বা খাপিনার (ওয়েবিনার বলে ওয়েবিনারকে অপমান করা অনুচিত)।

খাপ পঞ্চায়েত কেমনভাবে কাজ করে? প্রথমত, খাপ নিজেই নিজের আইন; দেশের আইন ফালতু। দ্বিতীয়ত, ওখানে অভিযুক্ত আর অপরাধী সমর্থক। অভিযোগ খতিয়ে দেখা হয় না, কী শাস্তি দেওয়া হবে তা ঠিক হয়। তৃতীয়ত, অপরাধ যে বা যারাই করে থাক, শাস্তি হয় গোটা পরিবারের। তিন মাস ধরে ঠিক তাই চলছে সুশান্তের মৃত্যু নিয়ে, আর গেঁয়ো ভূত থেকে শুরু করে আলোকপ্রাপ্ত মহানগরের মানুষ পর্যন্ত সকলেই শখ মিটিয়ে বিচারকের ভূমিকা পালন করছেন। কিন্তু এই খাপ পঞ্চায়েত বসাল কে? কেনই বা এই ঘটনা নিয়েই জাতীয় খাপ পঞ্চায়েত বসল? সেসব ভেবে দেখা দরকার।

সুশান্তের চেয়ে অনেক কম বয়সে জিয়া খান আত্মহত্যা করেছিলেন মাত্র তিন বছর আগে। কে বা কারা তাঁকে এমন করতে বাধ্য করল তা ছ পাতার সুইসাইড নোটে লেখা ছিল। তখন এমন আবেগমথিত খাপ বসেনি, সুপ্রিম কোর্টে যাওয়া হয়নি। প্রধান অভিযুক্ত পাঞ্চোলিপুত্র গ্রেপ্তার হয়েছিলেন, তবে এখন বহাল তবিয়তে আছেন।১ অতএব সুশান্তের মৃত্যু দুঃখজনক, বিহ্বল করে দেওয়ার মত, তবু অভূতপূর্ব নয়। তাহলে এভাবে খাপ প্রবৃত্তিকে জাগ্রত করতে পারল কী করে? ভাবা যাক।

ঘটনার কেন্দ্রে রয়েছে বলিউড। ব্যাপারটা ভাল হোক আর মন্দ হোক, যতজন ভারতীয় বলিউডি ছবি দেখেন, ততজন নরেন্দ্র মোদীর বক্তৃতা শোনেন না। ফিল্মের মাধ্যমে কোন বার্তা দিলে সে বার্তা যে অনেক বেশি মানুষের কাছে পৌঁছায় এবং বার্তার জোর অনেক বেশি হয় সেকথা বামপন্থী, মধ্যপন্থী, দক্ষিণপন্থী — সকলেই বোঝেন। উপরন্তু বলিউড ভারতের মানুষের কাছে পুরাণকথিত স্বর্গলোক, যেখানে দেবদেবীদের বসবাস। সুতরাং বলিউডি ছবির বার্তা বিরাট অংশের মানুষের কাছে বেদবাক্য — কখনো সচেতনভাবে, কখনো অবচেতনে — এ কথা বুঝতে আধুনিক চাণক্য হওয়ার প্রয়োজন পড়ে না। অতএব যাদের ফেসবুক, হোয়াটস্যাপ দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করা যায় না, তাদেরও কিন্তু হিন্দি ছবি দিয়ে বশ করা যায়। বাজপেয়ী-আদবানির আমলে বিজেপি নেতাদের এবং অনেক নিরপেক্ষ বিশ্লেষককেও জোর গলায় বলতে শোনা যেত “বিজেপি আর রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘ এক জিনিস নয়।” মোদীশাহির শুরুর দিকেও এ কথা বলা হত, ইদানিং তত শোনা যায় না। অনেকেই বুঝছেন যে সঙ্ঘের হিন্দুরাষ্ট্রের স্বপ্নপূরণই বিজেপির আসল অ্যাজেন্ডা। হিন্দুরাষ্ট্র শুধু রাজনৈতিক ক্ষমতা দিয়ে নির্মাণ করা যায় না, সাংস্কৃতিক বিজয় প্রয়োজন। সে বিজয় বলিউডকে করতলগত করতে না পারলে সম্পূর্ণ হয় না। প্রথমে স্বজনপোষণের অভিযোগ, তারপর মাদক নেওয়ার অভিযোগ — এসব আসলে বলিউডকে পেড়ে ফেলার প্রয়াস কিনা তা ভাবা বিশেষ প্রয়োজন।

ভারতীয় জনতার এখন দুটো আফিম — ক্রিকেট আর বলিউড। প্রথমটাকে সরকারপক্ষ নির্বিঘ্নে নিজেদের কাজে লাগাতে পেরেছে। যে কোন বড় সরকারি সিদ্ধান্তে দারুণ ক্ষিপ্রতায় ভারতের বর্তমান এবং প্রাক্তন ক্রিকেটাররা উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেন। বিমুদ্রাকরণের চব্বিশ ঘন্টার মধ্যেই ভারত অধিনায়ক বিরাট কোহলি জানিয়ে দিয়েছিলেন ওটা স্বাধীন ভারতের ইতিহাসে সবচেয়ে বৈপ্লবিক সিদ্ধান্ত। শচীন তেন্ডুলকর, অনিল কুম্বলে, বীরেন্দ্র সেওয়াগ — সকলেই অর্থনীতিবিদ হয়ে বসেছিলেন। অতঃপর তো খোদ ক্রিকেট বোর্ডটাই দখল করা গেছে। বাংলার গৌরবের নেতৃত্বে চাণক্যপুত্র স্বয়ং বোর্ডের অন্যতম কর্ণধার হয়েছেন, এবং মেয়াদ ফুরিয়ে যাওয়ার পরেও উভয়েই আদালত ও অতিমারীর দয়ায় চেয়ারে গ্যাঁট হয়ে বসে আছেন। অথচ বলিউডকে কিন্তু বাগে আনা যাচ্ছে না।

নাগরিকত্ব বিল, এন আর সি, এন পি আরের বিরুদ্ধে দেশব্যাপী যে আন্দোলন চলছিল অনতি অতীতে, সেই আন্দোলনের কথা স্মরণ করুন। বলিউডের একটা বড় অংশ কেবল টুইট করে ক্ষান্ত হয়নি। স্বরা ভাস্কর, অনুরাগ কাশ্যপরা রাস্তায় নেমে পড়েছিলেন। সেই আন্দোলনের অসংখ্য মনে রাখার মত দৃশ্যের মধ্যে একটা ছিল — মুম্বাইয়ের কার্টার রোডে দাঁড়িয়ে স্বানন্দ কিরকিরে গাইছেন “বাওরা মন দেখনে চলা এক সপনা”, আর সামনে বসা বলিউডি সহকর্মীরা গলা মেলাচ্ছেন। বিশাল ভরদ্বাজ, অনুভব সিনহা, রিমা কাগতি, দিয়া মির্জা, রিচা চাড্ডা প্রমুখ ছিলেন সেখানে। যারা প্রশান্ত ভূষণের বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার মামলা ঠুকেছিল, তারা স্বরার বিরুদ্ধে দিল্লির এক পথসভায় বক্তৃতা দেওয়ার জন্য একই মামলা দায়ের করতে চেয়েছিল। অ্যাটর্নি জেনারেল কে কে বেণুগোপালের আপত্তিতে হয়ে ওঠেনি।

বলিউড অভিনেতা-অভিনেত্রীদের এভাবে রাস্তায় নেমে আসা হিন্দুরাষ্ট্রের ভবিষ্যতের জন্য নিঃসন্দেহে সুখবর নয়। কিন্তু বলিউডি বিদ্রোহ সেখানেও শেষ হল না। জে এন ইউ তে সশস্ত্র হামলা হল, প্রতিবাদের মঞ্চে পৌঁছে গেলেন দীপিকা পাড়ুকোন। এঁর জনপ্রিয়তাকে স্বরার মত “ফ্লপ অভিনেত্রী” তকমা দিয়ে উপেক্ষা করার উপায় নেই। ফিল্মফেয়ার পত্রিকার মতে গত এক দশকে যে দশটা ভারতীয় ছবি সবচেয়ে বেশি ব্যবসা করেছে২, তার মধ্যে অষ্টম ছবিটার নাম ‘পদ্মাবত’। দীপিকা সেই ছবির নায়িকা। ইন্ডাস্ট্রির প্রায় সব বড় ব্যানারে সব বড় অভিনেতার সাথে কাজ করে ফেলেছেন তার আগেই।

ফিল্মফেয়ারের তালিকার দশটা ছবির মধ্যে তিনটের কেন্দ্রীয় চরিত্রে আমির খান (দঙ্গল ৩৮৭.৩৮ কোটি; পি কে ৩৪০.৮ কোটি; ধুম থ্রি ২৮৪.২৭ কোটি) আর তিনটের সলমন খান (টাইগার জিন্দা হ্যায় ৩৩৯.১৬ কোটি; বজরঙ্গি ভাইজান ৩২০.৩৪ কোটি; সুলতান ৩০০.৪৫ কোটি)। প্রযোজক, পরিচালকদের মধ্যে একাধিকবার নাম পাচ্ছি রাজকুমার হিরানি-বিধু বিনোদ চোপড়া জুটির (পি কে; সঞ্জু ৩৪২.৫৩ কোটি), আদিত্য চোপড়া (টাইগার জিন্দা হ্যায়; ওয়ার ৩১৭.৯১ কোটি; ধুম থ্রি ২৮৪.২৭ কোটি) এবং আব্বাস জাফরের (টাইগার জিন্দা হ্যায়; সুলতান ৩০০.৪৫ কোটি)। দুই খানের নামও প্রযোজক হিসাবে এসে পড়ছে।

‘পদ্মাবত’ ছাড়া ফিল্মফেয়ার উল্লিখিত দশটা ছবির কোনটাই হিন্দু জনগণের কয়েক শতাব্দীব্যাপী নিপীড়নের কাহিনি নয়, আধ সেদ্ধ ইতিহাস ঘেঁটে ঐস্লামিক অত্যাচারের গল্প বলে না। অর্থাৎ দর্শকের কাছে হিন্দুরাষ্ট্রের ঔচিত্য প্রতিষ্ঠায় এই ছবিগুলোর কোন ভূমিকা নেই। উল্টে ‘পি কে’ ধর্ম সম্বন্ধে এক প্রস্থ অস্বস্তিকর প্রশ্ন তোলে। ছ নম্বরে থাকা ‘বজরঙ্গি ভাইজান’ আবার ভারত-পাকিস্তান শত্রুতার বদলে সৌহার্দ্যের বার্তা দেয়।

এদিকে ২০১৯-এ একগুচ্ছ সরকারি বয়ানের অনুগত ছবি মুক্তি পেয়েছে। সেগুলোর মধ্যে সবচেয়ে ভাল ব্যবসা করেছে ‘উরি: দ্য সার্জিকাল স্ট্রাইক’ (২৪৪.০৬ কোটি)৩, অথচ এই দশকের সবচেয়ে ভাল ব্যবসা করা ছবিগুলোর তালিকায় দশ নম্বরে থাকা ধুম থ্রি ও তার চেয়ে বেশি ব্যবসা করেছে। অবশ্য সর্বজন মান্য ফিল্ম ব্যবসার বিশ্লেষক তরণ আদর্শের তালিকায় ধুম থ্রি আছে ন নম্বরে, উরি দশে।

অজয় দেবগন অভিনীত ‘তানহাজি’৪, যেখানে হিন্দু-মুসলমান লড়াইয়ের কাহিনি আছে, তা অবশ্য তরণবাবুর মতে ২৭৫ কোটি টাকার বেশি বাণিজ্য করেছে। তবু এই দশকের প্রথমে দশে ঢুকতে পারেনি।

শোচনীয় অবস্থা সুশান্তের সুবিচার তথা বলিউডের মাদকচক্রের পর্দা ফাঁস আন্দোলনের নেত্রী কঙ্গনা রানাওয়াত নির্দেশিত ও অভিনীত (যিনি মহারাষ্ট্র সরকারের পক্ষ থেকে তাঁর মাদক সেবনের উল্লেখ হওয়ার পরেই রিটায়ার্ড হার্ট হয়ে মুম্বাই ছেড়েছেন) ‘মণিকর্ণিকা’৫ র। যাঁরা বলিউডের খবর রাখেন, তাঁরা জানেন যে অমন জাঁকজমকের ছবি বানাতে একশো কোটি খরচ হয়েই যায়। ‘মণিকর্ণিকা’র আয় কিন্তু ৯০.৭৬ কোটি।

সঙ্ঘ পরিবারের বর্ষীয়ান পোস্টার বয় অনুপম খেরকে মনমোহন সিং এর চরিত্রে রেখে ‘দি অ্যাকসিডেন্টাল প্রাইম মিনিস্টার’ বলে একটা ছবি হয়েছিল। কোন সূত্রই ছবিটার আয় ৯৫-৯৬ কোটির বেশি হয়েছে বলছে না।

সবচেয়ে বেশি দুর্দশা অবশ্য বিবেক ওবেরয় অভিনীত ‘পি এম নরেন্দ্র মোদী’৬ ছবিটার। ২০১৯ লোকসভা নির্বাচনের মুখে, প্রধানমন্ত্রীর উত্তুঙ্গ জনপ্রিয়তার মুহূর্তে মুক্তি পেয়েও ছবিটা ২৫ কোটির বেশি ব্যবসা করতে পেরেছে এমন কথা কোন সূত্র বলছে না।

স্পষ্টতই মনোগ্রাহী প্রোপাগান্ডা বলিউডে তৈরি হচ্ছে না। এমনকি বিজেপি সমর্থকদের সকলকেও আকর্ষণ করতে পারছে না এইসব ছবি। তাতে আর্থিক ক্ষতির চেয়েও বড় ক্ষতি যা হচ্ছে তা হল ভারতীয় জনতার মস্তিষ্কের একচেটিয়া দখল ফসকে যাচ্ছে। কঙ্গনা, বিবেক, অজয়, অক্ষয়দের দিয়ে যে ও কাজ হবে না, তা নাগপুরের সঙ্ঘ বিল্ডিং রোড থেকে দিল্লির অশোকা রোড, রেসকোর্স রোড পর্যন্ত সকলেই বুঝে ফেলেছে। আমির বা সলমন লোককে যতটা মন্ত্রমুগ্ধ করে রাখতে পারেন, অজয় বা বিবেক পারেন না। রাজু হিরানি জানেন কেমন করে দর্শক টানতে হয়, সঙ্ঘের সঙ্গী পরিচালকরা জানেন না।

এটা শৈল্পিক উৎকর্ষের আলোচনা নয়। বক্স অফিসই বলে দিচ্ছে দক্ষিণপন্থী প্রোপাগান্ডিস্টরা বলিউডের দ্বিতীয় বা তৃতীয় সারির লোক। প্রথম সারির লোকেদের দিয়ে সঙ্ঘ কিছুতেই নিজেদের কথা বলাতে পারছে না। তাঁরা স্বেচ্ছায় বা চাপে পড়ে প্রধানমন্ত্রীর সাথে সেলফি তুলে যাচ্ছেন, কিন্তু ফিল্ম বানানোর সময় নিজেদের মর্জি মতই চলছেন।

সুশান্তের মৃত্যুতদন্ত ক্রমে বলিউডে মাদক যোগের তদন্ত হয়ে দাঁড়াল কয়েক গ্রাম গাঁজার জন্য। এক টিভি চ্যানেল বলে দিল রিয়া নারকোটিক্স কন্ট্রোল ব্যুরোর জিজ্ঞাসাবাদে আরো জনা বিশেক মাদকাসক্ত অভিনেতা-অভিনেত্রীর নাম জানিয়েছেন, তার মধ্যে জনা দুয়েকের নাম প্রকাশও করে দিল। অথচ এন সি বি বলছে এমন কোন নাম তারা রিয়ার কাছ থেকে পায়নি।৭ স্পষ্টতই এরকম ভুয়ো খবর ছড়ানোর পিছনে উদ্দেশ্য বলিউডে প্রতিষ্ঠিত, কিন্তু ক্ষমতাবানদের অপছন্দের ব্যক্তিদের এবং তাদের পরিবারকে সাধারণ মানুষের চোখে অপরাধী প্রতিপন্ন করা। ভেবে দেখুন, স্বজনপোষণ নিয়ে চেঁচামেচি করে কাদের আক্রমণ করা হয়েছে?

প্রথমত, করণ জোহর। নব্বইয়ের দশক থেকে এঁর তৈরি বিপুল জনপ্রিয় ছবিগুলো সঙ্ঘ পরিবারের সামাজিক আদর্শকে, ভারতীয়ত্ব ও দেশপ্রেমের সংজ্ঞাকে মানুষের মধ্যে চারিয়ে দিতে নিঃসাড়ে সাহায্য করেছে। কিন্তু তার সুবিধা বিজেপি ক্ষমতায় আসার সঙ্গে সঙ্গেই ফুরিয়ে গেছে। সফটওয়্যারের ভাষায় যাকে পরের প্রজন্ম বলে, সেই পরের প্রজন্মের প্রোপাগান্ডা ফিল্ম করণের প্রোডাকশন হাউস থেকে এখন অব্দি বেরোয়নি। বরং তিনি বা তাঁর প্রোডাকশন হাউস নাচ-গানওলা ছবিই করে যাচ্ছেন, এমনকি বিকল্প যৌনতার গল্পও ইদানীং উঠে আসছে তাঁর ক্যামেরায়। দুটোই সঙ্ঘের লক্ষ্যবিরোধী। করণ এমনিতে লক্ষ্মী ছেলে। পাকিস্তানের অভিনেতা-অভিনেত্রীদের যখন মহারাষ্ট্র নবনির্মাণ সেনা বাদ দিতে বলেছিল, তিনি মেনে নিয়েছিলেন।৮ অথচ ২০১৮ তে মুক্তি পাওয়া ‘রাজি’ ছবির তিনি অন্যতম প্রযোজক। সে ছবিতে এমনকি পাক সেনাবাহিনীর লোকেদেরও রক্তমাংসের মানুষ হিসাবে দেখানো হয়েছে।

দ্বিতীয়ত, মহেশ ভাট আর আলিয়া ভাট। আলিয়া সাধারণত রাজনীতি এড়িয়ে চলেন। কিন্তু তাঁর বাবা মহেশ বরাবরই সোচ্চার বিজেপিবিরোধী। মহেশের দোষ হল রিয়ার সঙ্গে তাঁর বেশ কিছু ছবি আছে, তাঁর প্রোডাকশন হাউসের সাথে রিয়ার যোগ আছে। এ ছাড়াও জাভেদ আখতার-ফারহান আখতার, নাসিরুদ্দিন শাহ।

এবং অনুরাগ। গত এক সপ্তাহে সুশান্ত ক্রমশ আলোচনার বাইরে চলে গেছেন। বাঙালিদের কেউ কেউ বাঙালি মেয়ে রিয়ার উপর আক্রমণে ক্ষুব্ধ হয়েছেন। এখন সে ক্ষোভের অভিমুখ ঘুরে যাবে অনুরাগ কাশ্যপের দিকে। আরেক বাঙালি অভিনেত্রী পায়েল ঘোষ অনুরাগের বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির অভিযোগ এনেছেন। অনুরাগ নাকি পায়েলকে যৌন সংসর্গে রাজি করাতে বেছে বেছে সোচ্চার বিজেপিবিরোধী অভিনেত্রীদের নাম (হুমা কুরেশি, রিচা চাড্ডা, মাহি গিল) করে বলেছেন তাঁরা অনুরাগকে নিয়মিত তৃপ্ত করেন। এই প্রথম বোধহয় কোন #মিটু অভিযোগে অন্য মহিলাদের নাম করা হল। প্রধানমন্ত্রীকে ট্যাগ করা পায়েলের টুইট দেখে অবিলম্বে অভিযোগ জমা দিতে বলেছে জাতীয় মহিলা কমিশন। এ হেন তৎপরতা সব মহিলার কাঙ্ক্ষিত হলেও, কার্যক্ষেত্রে তাঁরা ধর্ষিত হলেও মহিলা কমিশনের মনোযোগ জোটে না ।

এই মুহূর্তে বিজেপিবিরোধী সকলেই আক্রমণের লক্ষ্য। সুতরাং যে পরিমাণ গাঁজা যে কোন মুহূর্তে নেহাত অনামী সাধুদের আখড়াতেও পাওয়া যায় অথবা অধুনা আই টি সেলের সদস্য হওয়া ইঞ্জিনিয়ারদের হোস্টেলে পাওয়া যেত, তা নিয়ে অক্লান্ত ত্রিমুখী তদন্ত এবং প্রতিদিন প্রাইম টাইম খাপিনার স্রেফ সুশান্তের প্রতি ভালবাসায় বা রিয়ার প্রতি ঘৃণায় চালিত — একথা মেনে নেওয়া শক্ত।

কঙ্গনা রানাওয়াতের ৯ই সেপ্টেম্বর তারিখের একটা টুইট লক্ষ্য করার মত। ততদিনে তিনি বলে ফেলেছেন মহারাষ্ট্রের অবস্থা পাক অধিকৃত কাশ্মীরের মত। উত্তরে মারাঠি অস্মিতার স্বনিযুক্ত অভিভাবক শিবসেনা অভব্য ভাষা ব্যবহার করেছে, বলেছে কঙ্গনা মহারাষ্ট্রকে অপমান করেছেন। প্রতিক্রিয়ায় কঙ্গনা কী টুইট করলেন?

“ইন্ডাস্ট্রির একশো বছরে এরা মারাঠি অস্মিতা নিয়ে একটাও ছবি বানাতে পারেনি, আমি মুসলিম অধ্যুষিত ইন্ডাস্ট্রিতে নিজের জীবন এবং কেরিয়ার বাজি রেখেছি, শিবাজি মহারাজ আর রানি লক্ষ্মীবাঈয়ের সম্বন্ধে ছবি বানিয়েছি, আজ মহারাষ্ট্রের এই ঠিকেদারদের জিজ্ঞেস করো মহারাষ্ট্রের জন্য এরা করেছে কী?” (ভাষান্তর আমার)

এই টুইট থেকে পরিষ্কার যে কঙ্গনা জানেন না মারাঠি ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির পৃথক অস্তিত্ব আছে। বলিউড হিন্দি ফিল্ম তৈরির জায়গা, মারাঠি অস্মিতা নিয়ে ছবি করার দায়িত্ব তার নয়। কিন্তু এই টুইটে কঙ্গনার মেধার যে অভাব প্রকাশিত, তার দিকে নজর না দিয়ে বরং “মুসলিম অধ্যুষিত ইন্ডাস্ট্রি” কথাটায় মন দেওয়া যাক। বলিউড সম্বন্ধে কঙ্গনার তথা সঙ্ঘ পরিবারের প্রকৃত আপত্তি অনেকটাই ঐ শব্দবন্ধে ধরা আছে।

এক ভাষা, এক ধর্ম, এক রাষ্ট্রের যে ছবি সঙ্ঘ সকলের মাথায় ঢোকাতে চায়, সে ছবি বলিউডে এসেই বর্ণহীন হয়ে পড়ে। উপরে উল্লিখিত বক্স অফিসের যে হিসাব পাওয়া গেছে, তাতে পরিষ্কার যে সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দুর দেশে গত দশ বছরে সঙ্ঘের ক্রমবর্ধমান আধিপত্য সত্ত্বেও আমির খান, সলমন খান জনপ্রিয়তায় অনেক এগিয়ে। আরেক খান — শাহরুখ — এখন আর তত ছবি করেন না, করলেও আগের মত হিট হয় না। তবু তাঁর তারকা চূর্ণের এক কণা গায়ে এসে পড়লে যে এখনো লক্ষ লক্ষ ভারতীয় হিন্দু আত্মহারা হন, তা মোহন ভাগবতও বিলক্ষণ জানেন। ধর্মীয় ফ্যাসিবাদের সামনে দেশের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো একে একে সাষ্টাঙ্গ হয়েছে। দেশে সব ক্ষেত্রে ইসলাম ধর্মাবলম্বীদের আরো প্রান্তিক, আরো ভীত এক জনগোষ্ঠীতে পরিণত করা গেছে। কিন্তু বলিউডে এখনো ভরদ্বাজ ব্রাক্ষ্মণ বিশালের সমান দাপটে (জনপ্রিয়তার নিরিখে বেশি দাপটেও বলা যায়) কাজ করে যাচ্ছেন কবীর খান। চাওলা জুহি আর তাঁর স্বামী মেহতা জয়ের সাথে মিলে প্রোডাকশন হাউস চালাচ্ছেন খান শাহরুখ। অন্তত এই একটা ব্যাপার প্রাক-স্বাধীনতা যুগের বলিউডের মতই রয়ে গেছে। উপরন্তু আগে যা কখনো হয়নি, নিম্নবর্গীয় মানুষের নিষ্পেষণ মধ্যে মধ্যে পর্দায় উঠে আসছে (‘আর্টিকল ফিফটিন’), ছোট শহরে আর এস এস – বিজেপির কার্যকলাপকে হাসির খোঁচায় এফোঁড় ওফোঁড় করে দিচ্ছে কোন কোন ছবি (‘লুকাছুপি’,‘দম লাগাকে হাইশা’)। ভারতের সবচেয়ে জনপ্রিয় ইন্ডাস্ট্রিতে এমন বেনিয়ম চলতে থাকলে হিন্দি, হিন্দু, হিন্দুস্তান নিরঙ্কুশ হবে কী করে?

তাই বিহার জয় বা মহারাষ্ট্র জয় আশু লক্ষ্য হলেও রাষ্ট্রীয় খাপের দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য অবশ্যই বলিউড জয়। নইলে সি বি আই তদন্ত চলাকালীন বিজেপি সাংসদ রবি কিষণ কেন সংসদে বলিউডের বিরুদ্ধে বিষোদগার করতে যাবেন? উদ্দেশ্য মহৎ বুঝলে একই দলের সাংসদ হয়েও হেমা মালিনী কেন বিপক্ষে দাঁড়াবেন? জয়া বচ্চনের অসন্তুষ্টি না হয় অগ্রাহ্য করলাম।

তথ্যসূত্র:
১। https://www.indiatoday.in/movies/celebrities/story/rabia-khan-blasts-sooraj-pancholi-on-truth-always-wins-post-in-ssr-case-all-criminals-use-that-phrase-1713284-2020-08-20
২। https://www.filmfare.com/news/bollywood/10-highest-grossing-bollywood-films-of-the-decade-38316.html
৩। https://www.hindustantimes.com/bollywood/vicky-kaushal-s-uri-is-among-10-highest-hindi-grossers-ever-with-rs-244-cr-here-s-how-it-ranks-against-aamir-salman-films/story-PruGX0G1eHE07alRJuUkhP.html
৪। https://www.republicworld.com/entertainment-news/bollywood-news/tanhaji-the-unsung-warrior-collections.html
৫। https://timesofindia.indiatimes.com/entertainment/hindi/bollywood/box-office/manikarnika-final-box-office-collection-the-kangana-ranaut-starrer-period-drama-finishes-with-rs-90-76-crore/articleshow/68405988.cms
৬। https://www.bollywoodhungama.com/movie/pm-narendra-modi/box-office/
৭। https://www.freepressjournal.in/entertainment/bollywood/fpj-fact-check-did-rhea-chakraborty-really-name-sara-ali-khan-rakul-preet-singh-to-ncb
৮। https://www.bbc.com/news/world-asia-india-37701024

https://guruchandali.com/ এ প্রকাশিত। ছবি ঋণ: টাইমস নাউ

সাংবাদিক ছাঁটাই: আনন্দ সংবাদ নয়, বিপদ-সংকেত

বুঝে উঠতে পারেননি চুক্তিভিত্তিক চাকরিতে ঠিকা শ্রমিকের চেয়ে বেশি অধিকার দাবি করা যায় না।

দুরাত্মার যেমন ছলের অভাব হয় না, ছাঁটাইয়ের কারণেরও অভাব হয় না। সে কারণ কখনো অতিমারী, যা কোভিড-১৯ এর প্রভাবে এখন চলছে; আবার কখনও আর্থিক মন্দা, যেমনটা ২০০৮-০৯ এ হয়েছিল। কখনও শুধুই “লোক বেশি ছিল”। অনেক সময় আবার কারণ দর্শানোর দরকারই পড়ে না, কারণ খবরটা বিশেষ কারো চোখেই পড়ে না। যেমন এই মুহূর্তে বি এস এন এলের মত রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থায় স্থায়ী, অস্থায়ী কর্মীদের স্রেফ খেদিয়ে দেওয়া হচ্ছে, অথচ তা নিয়ে কর্মী এবং কর্মী ইউনিয়ন ছাড়া বিশেষ কারো মাথাব্যথা নেই। কারণ সংবাদমাধ্যমগুলো ইদানীং মানুষের কাজ হারানোকে আর খবর বলে মনে করে না। পথ অবরোধ, হাতাহাতি বা তারও বেশি কিছু ঘটলে দু একদিন খবরের চ্যানেলে নিউজফ্ল্যাশ হিসাবে এসে পড়ে, বিয়েবাড়িতে ঢুকে পড়া বুভুক্ষু ভিখারির মত খবরের কাগজের ভিতরের পাতায় এক কোণে জায়গা হয়। সেটুকু জায়গাও অবশ্য ঘটনাটা রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থায় হলে তবেই পাওয়া যায়। বেসরকারি সংস্থায় ছাঁটাই হওয়া পূর্ব দিকে সূর্য ওঠা আর পশ্চিমে অস্ত যাওয়ার মতই স্বাভাবিক ঘটনা।

আপনি যদি নাম করা কোম্পানির ভাল মাইনের কর্মচারী হন, তাহলে নিশ্চিত থাকতে পারেন আপনার কাজ হারানোটা খবর নয়। আপনাকে যখন সুললিত ভাষায় জানানো হবে কোম্পানির আর আপনাকে প্রয়োজন নেই, তখন চুপচাপ বাড়ি চলে আসা ছাড়া আপনার আর কিচ্ছু করার নেই। আপনার বা আপনাদের কথা কোথাও এক লাইন লেখা হবে না। আপনাদের কেউ যদি ফ্যান থেকে ঝুলে পড়েন, একমাত্র তাহলেই টিভি চ্যানেলগুলো দৌড়ে আসতে পারে বা কাগজওয়ালারা আগ্রহী হয়ে উঠতে পারে। কোভিডের প্রতাপে কাজ হারিয়ে এই মুহূর্তে আপনারা কেউ যদি নিজের এবং পরিবারের তেমন সর্বনাশ করবেন বলে ভেবে থাকেন, তাহলে তাঁদের যন্ত্রণার উপশমের জন্য একটা খবর আছে। আপনারা যে তিমিরে, সাংবাদিকরাও সেই তিমিরে। সেই মার্চ মাসের শেষ থেকে এই আগস্ট মাসের তৃতীয় সপ্তাহ পর্যন্ত সারা দেশে কয়েক হাজার সাংবাদিক কর্মহীন হয়ে পড়েছেন। আপনি যতগুলো কাগজের নাম জানেন, যতগুলো খবরের চ্যানেলের হদিশ আপনার জানা আছে, তার প্রায় সবকটাই কিছু সাংবাদিককে ছাঁটাই করেছে, বাকিদের মাইনে কেটেছে নানা মাত্রায়। তাঁরা মুখ বুজে সহ্য করছেন, আপনিই বা করবেন না কেন?

অনেকদিন অনেক সংখ্যাতাত্ত্বিক চালাকি চলল। এখন রিজার্ভ ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়া নিজেই বলছে অর্থনীতির অবস্থা মোটেও ভাল নয়, জি ডি পি ঋণাত্মকও হয়ে যেতে পারে। প্রবাসী শ্রমিকদের আমরা মাইলের পর মাইল হাঁটতে হাঁটতে মরে যেতে দেখে ফেলেছি। সমস্ত ক্ষেত্রেই বহু মানুষ কর্মহীন হয়েছেন। এমতাবস্থায় হাজার পাঁচেক সাংবাদিকের চাকরি যাওয়া নিয়ে আলাদা করে বলবার কী আছে। সংখ্যার বিচারে হয়ত নেই, কিন্তু সাংবাদিকদের যদি প্রেস্টিটিউট আর শকুন — এই দুই স্টিরিওটাইপের বাইরে গিয়ে মানুষ বলে ভাবতে রাজি থাকেন, তাহলে সাংবাদিকদের কাজ হারানো আপনার কাজ হারানোর মতই বেদনাদায়ক। কিন্তু তার চেয়েও বড় কথা, এত সাংবাদিকের চাকরি যাওয়া এই দেশের গণ>তন্ত্রের পক্ষে মারাত্মক দুঃসংবাদ। আর গণতন্ত্র বিপদে পড়া মানে শুধু আমার আপনার নয়, আমাদের সন্তানদেরও ভবিষ্যৎ অন্ধকার।

আপনি বলবেন, কেন? সাংবাদিকদের চাকরি গেলে গণতন্ত্র বিপন্ন হবে কেন? আসলে হবে নয়, গণতন্ত্র ইতিমধ্যেই বিপন্ন। সেই কারণেই সাংবাদিকরা অপ্রয়োজনীয় হয়ে পড়েছেন, তাঁদের একটা বড় অংশকে বিদায় দেওয়া হচ্ছে। অনস্বীকার্য যে কিছু ব্যতিক্রম বাদ দিলে বেশিরভাগ সংবাদমাধ্যমই এখন “কলের গান, কুকুর মাথা”, তাদের কিনেছে বিজ্ঞাপনদাতা। আর সবচেয়ে বড় বিজ্ঞাপনদাতা হল সরকার (কেন্দ্র এবং রাজ্য)। বিজ্ঞাপনদাতাদের চটানো চলে না, অথচ সাংবাদিকদের সংবাদ সংগ্রহ করতে দিলেই চটবার মত খবর এসে হাজির হবে। মালিকপক্ষ তা চান না। তাঁরা ব্যবসা করতে নেমেছেন, জনসেবা করতে নয়। আপনি যদি সংবাদমাধ্যমগুলোর বিজ্ঞাপনী স্লোগানে মোহিত হয়ে থাকেন, সে আপনার দোষ। আসলে কাগজ তা-ই লেখে যা তাকে লিখতে বলা হয়। সে কাজ করতে তো আর সাংবাদিক লাগে না। তাই সাংবাদিকরা এখন উদ্বৃত্ত। এর প্রভাব আপনার উপর কীভাবে পড়বে বুঝলেন তো? আপনার সুখ দুঃখ বিপদ আপদের খবর ক্রমশই বিরলতর হবে কাগজের পাতায় আর টিভির পর্দায়। পাড়াসুদ্ধ লোকের চাকরি চলে গেলেও, জিনিসপত্রের দাম আকাশছোঁয়া হয়ে গেলেও, করোনায় আক্রান্ত রোগীর সংখ্যায় এবং মৃত্যুতে ভারত জগৎসভায় শ্রেষ্ঠ আসন নিলেও, কাগজ খুললে বা টিভি দেখলে মনে হবে অন্য দেশের খবর দেখছেন। কারণ সংবাদমাধ্যমগুলোকে তেমনটাই করতে বলা হয়েছে। কে বলেছে তা অনুমান করার জন্য স্বর্ণপদক চেয়ে বসবেন না যেন।

করোনার জন্য প্রায় সব পেশাতেই কর্মহানি হয়েছে প্রবল। বিভিন্ন ক্ষেত্রের প্রতিবেদন ও বিশ্লেষণ নিয়ে এ বিষয়ে দুটি সংখ্যা ভাবা হয়েছে। পরের সংখ্যায় থাকছে হকারদের নিয়ে বিশ্বেন্দু নন্দের, গৃহসহায়িকাদের নিয়ে মৌসুমী বিলকিসের প্রতিবেদন ও অর্থনীতির একটি মডেল নিয়ে অনির্বাণ মুখোপাধ্যায়ের বিশ্লেষণ।

এত তেতো কথা পড়ে যে কেউ বলতেই পারেন, এ সমস্ত প্রোপাগান্ডা। সত্যিই তো অতিমারীর ফলে বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক বিপর্যয় ঘটেছে, বেশিরভাগ ব্যবসা বাণিজ্যই ধুঁকছে। কাগজ বা চ্যানেলের মালিকরা কি পকেটের পয়সা দিয়ে ব্যবসা চালাবেন? তাঁদেরও নিশ্চয়ই ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, সে ক্ষতি পূরণ করতে কর্মী সঙ্কোচন ছাড়া পথ ছিল না।

আচ্ছা, তাহলে অতিমারী নিয়েই কথা হোক। ভারতে করোনার পদার্পণ যেদিনই ঘটে থাক, চার ঘন্টার নোটিশে দেশ জুড়ে লকডাউন চালু হওয়ার আগে পর্যন্ত অর্থনীতির চাকা তো পুরো দমে ঘুরছিল। প্রধানমন্ত্রী ঘোষিত লকডাউন শুরু হয় ২৫শে মার্চ মধ্যরাতে, তার আগে ২২শে মার্চ ছিল জনতা কারফিউ। পশ্চিমবঙ্গে লকডাউন শুরু হয়েছিল ২৩শে মার্চই; মহারাষ্ট্র, তামিলনাড়ুর মত কয়েকটা রাজ্যও দেশব্যাপী লকডাউনের কয়েকদিন আগে থেকেই লকডাউন ঘোষণা করে। অর্থাৎ অর্থনীতির চাকা ঘুরতে ঘুরতে একেবারে বন্ধ হয়ে যায় মার্চের শেষ সপ্তাহে। আচ্ছা আর্থিক বর্ষ শেষ হয় কত তারিখে? ৩১শে মার্চ। তাহলে কোভিড-১৯ এর প্রভাব ২০১৯-২০ আর্থিক বর্ষে কদিন পড়েছে ভারতের সংবাদমাধ্যমের উপর? বড় জোর দশ দিন। এই দশ দিন এমনই কাঁপিয়ে দিল মহীরূহদের যে বাকি আর্থিক বর্ষের লাভ কমতে কমতে বিপুল ক্ষতিতে চলে গেল! তাই এপ্রিল-মে থেকেই মাইনে কাটা এবং ছাঁটাই শুরু করতে হল বড় বড় সংবাদমাধ্যমগুলোতে? এ যদি সত্য হয়, তাহলে পি সি সরকারের এখনই প্রকাশ্যে নাক খত দিয়ে বলা উচিৎ তাঁর বংশের কেউ আর কোনওদিন ম্যাজিক দেখাবে না।

বলা যেতেই পারে যে এটা অতিসরলীকরণ হল। বিগত আর্থিক বর্ষের ক্ষতি নয়, এই বিপুল ছাঁটাই এবং মাইনে কাটার কারণ হল বর্তমান আর্থিক বর্ষের বিপুল ক্ষতির সম্ভাবনা। স্রেফ সম্ভাবনার কথা ভেবে মানুষের চাকরি খাওয়া কতটা যুক্তিযুক্ত সে প্রশ্ন তুলব না। কারণ কর্পোরেট দুনিয়া মানবিক যুক্তিতে চলে না, চলে লাভ ক্ষতির যুক্তিতে। সেখানে মানুষকে নিয়ে আলোচনা বামপন্থী সেন্টিমেন্টালিজম মাত্র। অন্য একটা প্রশ্ন আছে। কর্মীদের মাইনে দেওয়ার খরচ কমালে কতটা খরচ কমে? একটা উদাহরণই যথেষ্ট।

২০১৭ সালের জানুয়ারি মাসে এক অতিকায় সর্বভারতীয় সংবাদপত্র তাদের উত্তর সম্পাদকীয় স্তম্ভে দাবি করেছিল কাগজ চালানো দুষ্কর হয়ে পড়েছে। যা যা কারণ বলা হয়েছিল, তার মধ্যে একটা ছিল কর্মচারীদের মাইনে দিতে বিপুল খরচ। তার দুদিন পরেই দিল্লি ইউনিয়ন অফ জার্নালিস্টস নামে সাংবাদিকদের এক সংগঠন পাবলিক রেকর্ড উদ্ধৃত করে বলেছিল, ঐ সংবাদপত্রের মোট আয়ের মাত্র ১১% খরচ হয় মাইনে দিতে। পরিসংখ্যানটা অবশ্য ২০১০-১১ আর্থিক বর্ষের। ধরা যাক সিংহহৃদয় মালিকপক্ষ এতদিনে সে খরচ দ্বিগুণ করে ফেলেছেন। তা এই বিপুল ক্ষতির মরসুমে কর্মী ছাঁটাই করে ঐ ২২% খরচের কতটা কমানো গেল? বাকি ৭৮% থেকে কিছু সাশ্রয় হল কি? এসব প্রশ্ন তুললেই সংবাদপত্রের স্বাধীনতা, ব্যবসার গোপনীয়তা, কোম্পানি আইনের রক্ষাকবচ ইত্যাদি প্রসঙ্গ এসে যাবে। কোভিডের ক্ষতিপূরণে শ্রম আইন এলেবেলে হয়ে গেছে, আট ঘন্টা কাজের অধিকারের মত ন্যূনতম অধিকারও সরকার ইচ্ছামত স্থগিত রাখছেন। কেউ কিন্তু কোম্পানি আইন দেশমাতৃকার স্বার্থে বলি দিতে রাজি নয়। তাই বলছি, কোভিড নেহাত অজুহাত। এই বিপুল ক্ষতি নিয়ে তিন দিন ব্যাপী অশ্রু বিসর্জন সভা প্রতি বছরের মত এ বছরেও কোন কোম্পানি মরিশাসে কেউ বা মারাকেশে করবেন, নিদেন মুম্বাইয়ের সেভেন স্টার হোটেলে। এদিকে কাজ হারানো সাংবাদিকরা গৃহঋণের ই এম আই দিতে না পেরে ব্যাঙ্কের রিকভারি এজেন্টদের থেকে পালিয়ে বেড়াবেন।

কেউ কেউ হয়ত অগত্যা ধনী রাজনৈতিক দলের টোপ গিলে প্রকাশ্যে বা কৌশলে প্রোপাগান্ডার কাজে লাগবেন। কিন্তু সে সুযোগই বা কজন পাবেন? পশ্চিমবঙ্গে তো এক লহমায় সংবাদমাধ্যমের অনেকের কাজ হারানো অনতি অতীতেই ঘটেছে, যখন সুদীপ্ত সেনের পুঁজিতে পুষ্ট খবরের কাগজ এবং টিভি চ্যানেলগুলো উঠে গেল। অনেকেই আর কাজ পাননি। বাধ্য হয়ে মুদির দোকান, স্টেশনারি দোকান খুলে বসেছেন, কোনও মতে দিন গুজরান হয় — এমন মানুষও আছেন।

যাঁরা কোন পয়সাওয়ালা রাজনৈতিক দলের দাক্ষিণ্য পাবেন, তাঁরা যদি আপনার পছন্দের দলটির প্রোপাগান্ডা না করেন তাহলে বিলক্ষণ তেড়ে গাল দেবেন। কিন্তু, প্রিয় পাঠক, সাংবাদিকদের এই দুর্দশার কাহিনীতে আপনার ভাববার মত যে উপাদান আছে তা দয়া করে অগ্রাহ্য করবেন না। আজকাল সরকারী চাকরি অনেক কমে গেছে, বেশিরভাগ মানুষই কোন না কোন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মী। অতএব কর্পোরেটের কর্মচারী সাংবাদিকদের সাথে বিশেষ অবস্থাভেদ নেই।

সাংবাদিকদের এমন অবস্থা হল কেন? যাঁরা অমিতশক্তিধর, সরকার গড়তে পারেন আবার ফেলেও দিতে পারেন বলে জনশ্রুতি, তাঁদের কাতারে কাতারে চাকরি যাচ্ছে আর কেউ টুঁ শব্দটি করছে না — এমন হল কেন? হল, কারণ নয়ের দশকে বিশ্বায়নের যুগে দিকপাল সাংবাদিকরা মালিকদের প্ররোচনায় রিমের পর রিম লিখে দেশসুদ্ধ লোককে বোঝালেন যে কর্মী ইউনিয়নের মত খারাপ জিনিস দুটি নেই। ওটি সর্বতোভাবে কর্মনাশা, শিল্পবিরোধী। এর ফলে সরকারি মদতে, মালিকদের ইচ্ছায় সব শিল্পেই ইউনিয়নগুলো দুর্বল হয়ে পড়ল, কোথাও নামমাত্রে পরিণত হল। সংবাদমাধ্যমে ইউনিয়ন কার্যত উঠে গেল। তারপর এল চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ। দিকপালরা ভাবলেন তাঁরা ঐতিহাসিক কাজ করলেন। ঠিকই ভাবলেন। তবে ভেবেছিলেন পানিপথের যুদ্ধ জয় করলেন, আজকের সাংবাদিকরা বুঝছেন (বুঝছেন কি? কে জানে!) আসলে ওটা ছিল পলাশীর পরাজয়। হাতে যন্ত্রপাতির বদলে কলম (এ যুগে ল্যাপটপ) থাকে বলে সাংবাদিকরা ভেবেছিলেন তাঁরা শ্রমিক নন। তাই বুঝে উঠতে পারেননি চুক্তিভিত্তিক চাকরিতে ঠিকা শ্রমিকের চেয়ে বেশি অধিকার দাবি করা যায় না। আর জোট বেঁধে দাবি পেশ করার অধিকার না থাকলে কোন অধিকারই থাকে না, মালিকের খেয়ালে চলতে হয়।

খেয়াল মানে খিদে, লাভের খিদে। বাঘের ক্ষুধামান্দ্য হতে পারে, কর্পোরেটের খিদে কখনও কমে না। এই একবিংশ শতকে লাভের নতুন সংজ্ঞা তৈরি হয়েছে। কর্পোরেট বয়ানে লাভের মানে হল গত বছরের চেয়ে বেশি লাভ। সেই নতুন টার্গেটে না পৌঁছাতে না পারলেই কোম্পানির ক্ষতি হয়, আর তখনই কর্মী ঘচাং ফু। সাংবাদিকও তেমনই এক কর্মী, তার বেশি কিছু নয়। সেই কারণেই আগেকার সম্পাদকরা রাজনৈতিক গুন্ডার হাতে প্রতিবেদক নিগৃহীত হলে বুক দিয়ে আগলাতেন এবং প্রশাসনের বাপান্ত করতেন। এখন খবর পর্যন্ত ছাপেন না অনেক সময়, এফ আই আর ও করতে দেন না। উলটে শাসক দলকে কুপিত করার অপরাধে ঐ প্রতিবেদককে বরখাস্তও করতে পারেন।

তাই আজ সহকর্মী কাজ হারিয়ে গলায় দড়ি দিলেও সাংবাদিকদের এক লাইন লেখার উপায় নেই, ফেসবুকে লিখতেও বুক কাঁপে। নির্জনে শোক পালন ছাড়া গতি নেই।

প্রিয় পাঠক, আপনি যে পেশাতেই থাকুন, কর্মস্থলে আপনার অবস্থা কি এর চেয়ে উন্নত? ভেবে দেখুন তো?

https://www.guruchandali.com/ এ প্রকাশিত