সাত শতাংশের অধিকারে

যতই ক্ষমতাচ্যুত হোক, ক্ষমতাহীন হোক, বামপন্থীরা রাস্তায় নামলে ঢেউ উঠবে। আজও এর কোন ব্যতিক্রম পৃথিবীর কোথাও নেই। পার্টির নাম, সংগঠনের নাম যা-ই হোক। আর ন্যায্য দাবীতে রাস্তায় নামলে অকর্মণ্য শাসক মারবে, ধরবে, মাথা ফাটাবে — এরও কোন ব্যতিক্রম হয় না। ফলে গতকালের নবান্ন অভিযানে রাজপথে যেসব দৃশ্যের জন্ম হয়েছে সেগুলো অনভিপ্রেত হলেও অপ্রত্যাশিত নয়। বুক চিতিয়ে পুলিশের সঙ্গে লড়ে গেলেন যে নূতন, সবুজ, কাঁচারা তাঁদেরও সাধুবাদ প্রাপ্য। ফেসবুক বিপ্লবের যুগে রাস্তাই যে একমাত্র রাস্তা সেকথা শিরোধার্য করে এইভাবে রক্তাক্ত হতে যাঁদের বাধে না তাঁদের কুর্নিশ না করে উপায় নেই। সমস্যা অন্যত্র।
কাল সিপিএমের ছাত্র সংগঠন এস এফ আই আর যুব সংগঠন ডি ওয়াই এফ আই যে দাবীগুলোর ভিত্তিতে নবান্ন অভিযান করছিলেন — স্বল্প খরচে শিক্ষার দাবী এবং কাজের দাবী — সেগুলো যে ন্যায্য তা নিয়ে কোন সুস্থ মস্তিষ্কের মানুষের মনে কোন সন্দেহ থাকার কথা নয়, যদি না তিনি রাজ্যে ক্ষমতাসীন দলের অন্ধ সমর্থক হন বা মুখ্যমন্ত্রীকে দৈবী শক্তির অধিকারী, মানবিক ভুলচুকের অতীত বলে মনে করেন। কিন্তু রাজনীতি, বিশেষত বিরোধী রাজনীতি, শুধু দাবী সনদ পেশের ধারাবাহিকতার নাম নয়। উপরন্তু ছাত্র সংগঠনের বা যুব সংগঠনের কেবল তাদের গোষ্ঠীগত স্বার্থের কথাই বলা উচিৎ, বৃহত্তর রাজনীতি তাদের কর্মকাণ্ডের অন্তর্ভুক্ত হওয়া উচিৎ নয় — এমনটা আর যে-ই ভাবুক, বামপন্থীরা নিশ্চয়ই ভাবেন না। সেদিক থেকে দেখলে প্রায় একইরকমের দাবী নিয়ে গত কয়েক বছরে কখনো সিপিএম দলের নবান্ন অভিযান, কখনো কৃষক সভার নবান্ন অভিযান, কখনো ছাত্র, যুব সংগঠনের নবান্ন অভিযান দেশের যে বর্তমান রাজনৈতিক, আর্থসামাজিক সঙ্কট তার সাপেক্ষে কী অবস্থান নিচ্ছে? অভিযানগুলো বারবার নবান্নেই বা যাচ্ছে কেন?
শিক্ষা, স্বাস্থ্যকে পণ্য করে তোলার যে প্রক্রিয়া ১৯৯১ তে শুরু হয়েছিল, ২০১৪ থেকে বিজেপি শাসনে তা আরো প্রকাশ্য, আরো নির্লজ্জ। আম্বানিদের যে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এখনো চালুই হয়নি তাকে সেন্টার অফ এক্সেলেন্স তকমা দিয়েছে কেন্দ্রীয় সরকার। অথচ টাটা ইন্সটিটিউট অফ ফান্ডামেন্টাল রিসার্চের মত সরকারপোষিত প্রতিষ্ঠানের গবেষকদের পুরো মাইনে দেওয়ার ক্ষমতা নাকি সরকারের নেই, ইসরোর গবেষকদের মাইনে কমিয়ে দেওয়া হচ্ছে। অর্থাৎ এ রাজ্যে কলেজে তোলাবাজি, হবু শিক্ষক, প্যারা টিচারদের পুলিশ দিয়ে পেটানো ইত্যাদি কোন বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। দেশের কোথাও শিক্ষাজগতের লোকেরা ভাল নেই। না ছাত্রছাত্রীরা, না গবেষক শিক্ষক শিক্ষিকারা। শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের মৌলিক অধিকার বিপন্ন। তাহলে এসব নিয়ে সিপিএম বা তার গণসংঠনগুলোর সংসদ অভিযান হচ্ছে না কেন?
কাজের অধিকার সারা দেশে কিভাবে বিপন্ন তা তো আলাদা করে বলার অপেক্ষা রাখে না। গত কয়েক মাসে কয়েক হাজার মানুষের চাকরি গেছে, আরো বহু মানুষ আশঙ্কিত। যাদের চাকরি আছে তাঁরাও অনেকে মাইনে পাচ্ছেন না বি এস এন এল কর্মীদের মত। তা নিয়ে বামপন্থী ট্রেড ইউনিয়নগুলো (সিটু তো বটেই) আন্দোলনও করছে। অথচ দল হিসাবে এসব নিয়ে সিপিএমের রাস্তায় নেমে আন্দোলন সংসদ বা সাউথ ব্লকের দিকে যাচ্ছে না কেন? এস এফ আই বা ডি ওয়াই এফ আই এর অভিযানই বা দিল্লীমুখো নয় কেন? অন্য রাজ্যে সাংগঠনিক শক্তির অভাব আছে বলে দিল্লী আক্রমণ করছি না, একথা যদি কেউ বলেন, সেটাকে অজুহাত বলেই ধরতে হবে কারণ মহারাষ্ট্র, রাজস্থান বা হরিয়ানার মত যেসব রাজ্যে সিপিএমের সাংগঠনিক শক্তি পশ্চিমবঙ্গের চেয়ে অনেক কম, সেখানকার কৃষকদের পর্যন্ত সংগঠিত করে দিল্লী, মুম্বইয়ের বুকে সিপিএমের কৃষক সভার উদ্যোগে কিষাণ লং মার্চ সারা দেশ অল্প দিন আগেই দেখেছে। তাহলে?
তার চেয়েও বড় কথা “বুনিয়াদি লড়াইটা হল ভাতের লড়াই। বামপন্থীদের সেই লড়াই জারী রাখতে হবে” — এই জাতীয় যুক্তিতে সমকালের জ্বলন্ত সমস্যাগুলোকে এড়িয়ে যাওয়া কি কোন শুভবুদ্ধিসম্পন্ন রাজনৈতিক দলের উচিৎ? সারা দেশে এই মুহূর্তে সবচেয়ে বড় বিপদ হল হিন্দুত্ববাদী একনায়কতন্ত্রের বিপদ। যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা এবং গণতন্ত্র লুপ্ত হওয়ার বিপদ। সেই বিপদ কোন দিক থেকে এসেছে (এখনো আসছে ভাবার ভুল করবেন না) তা আমরা সবাই জানি। তার বিরুদ্ধে রাস্তার লড়াইকে কি সিপিএম কোন অদূর ভবিষ্যতের জন্যে স্থগিত রেখেছে? রাখতে পারে? রাজ্যের তৃণমূল সরকার তো ২০১১ থেকেই এখনকার মত চলছে। তা নিয়ে বারবার নবান্ন অভিযানে পার্টি সদস্য বা গণসংগঠনের সদস্যদের রক্ত ঝরছে অথচ মানুষের সমর্থন বাড়ার বদলে কমেই চলেছে। এর কারণ কী? আসলে কি মানুষের ইস্যু বুঝতেই ভুল হচ্ছে? নিজেদের পছন্দের ইস্যুকেই মানুষের ইস্যু বলে চালিয়ে দেওয়া হচ্ছে? নেতৃত্ব এগুলো ভাববেন না?
পশ্চিমবঙ্গের গরীব, বড়লোক, মধ্যবিত্ত সকলেই এই মুহূর্তে কোন ইস্যুটা নিয়ে উদ্বিগ্ন? বা নিদেন পক্ষে আগ্রহী? নিঃসন্দেহে এন আর সি। বিজেপি রোজ বলছে, বড় মেজ সেজ ছোট সব নেতা নেত্রী বলছেন বাংলায় এন আর সি হবেই। শুধু বাংলাই বা কেন? আসামে ডিটেনশন সেন্টার তৈরি হয়ে গেছে, অন্যত্রও হচ্ছে। তা নিয়ে সিপিএম নেতৃত্ব এখনো কিন্তু, যদি, তবে করছেন। কখনো শোনা যাচ্ছে আসামের বাইরে এন আর সি হলে ওঁরা বিরোধী, অর্থাৎ আসামে যা হয়েছে বেশ হয়েছে। কখনো বলছেন দেখতে হবে যেন সত্যিকারের নাগরিকরা বাদ না পড়ে যান। এসবের মানে কী? যে পার্টি অসহায় মানুষ, গরীব মানুষ, ছিন্নমূল মানুষের পাশে নির্দ্বিধায় দাঁড়ায় না, মানুষকে ছিন্নমূল করার প্রক্রিয়ার বিপক্ষে পিঠ সোজা করে দাঁড়ায় না — সে আবার কিরকম কমিউনিস্ট পার্টি?
ওদিকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কিন্তু এ নিয়ে রাস্তায় নেমে পড়েছেন। শেষ অব্দি সারদা, নারদের চোখ রাঙানি পেরিয়ে কদ্দূর কী করবেন সেটা পরের কথা, কিন্তু ছিন্নমূল হতে চলা মানুষ কিন্তু দেখছেন তিনি বলেছেন “দু কোটি লোককে বার করে দেবে? দুটো লোকের গায়ে হাত দিয়ে দেখাক।” এরকম কথা সিপিএম তথা বাম নেতাদের মুখে শোনা যাচ্ছে না কেন? তাঁরা কি ভাবছেন বাঙালদের পক্ষ নিলে এদেশীয় ভোটাররা ক্ষেপে যাবেন? উদ্বাস্তুদের জন্যে আন্দোলন কিন্তু স্বাধীনোত্তর ভারতে তথা বাংলায় বামপন্থীদের শক্ত জমিতে দাঁড় করিয়েছিল।
আচ্ছা, রাজ্য সরকারকেও কি সঠিক ইস্যুতে আক্রমণ করা হচ্ছে? মুখ্যমন্ত্রীর সাধের মেট্রো রেল প্রকল্প এমনই কল্পরাজ্যের জিনিস যে তাকে বাস্তবের মাটিতে নামাতে গিয়ে বহু লোকের ভিটেমাটি চাটি হওয়ার যোগাড় হয়েছে। তা নিয়েই বা বামেদের আন্দোলন কই? যে শহরে এই সরকারের আমলেই নির্মীয়মাণ ফ্লাইওভার ভেঙে পড়ে মানুষের মৃত্যু হয়েছে, প্রকল্প শেষ করা সম্ভব নয় বলে ঘোষিত হয়েছে, সেই শহরে আবার এরকম সর্বনাশা প্রকল্প এগোল কী করে তা নিয়ে বামেরা সরকারকে প্রশ্নবাণে, আন্দোলনে জর্জরিত করলেন কই? নেতৃত্ব কি মনে করেন এগুলোতে কারোর কিছু এসে যায় না? নাকি ওখানেও হিসাব? বাড়ি ভেঙে পড়া লোকেদের চেয়ে মেট্রো হলে যারা চড়বে তাদের ভোটসংখ্যা বেশি হওয়ার হিসাব?
যদি তা-ই হয়, তাহলে এই যাঁরা লাল ঝান্ডার জন্যে এখনো প্রাণ বাজি রাখছেন তাঁরা কোন হিসাবে আছেন জানতে ইচ্ছা করে। তাঁদের ত্যাগ, তাঁদের রক্ত অপচয় হচ্ছে না তো? সাম্প্রতিককালে অনেকের মুখে কাছের শত্রু তৃণমূল, তারপর বিজেপির মোকাবিলা করা হবে ইত্যাদি শোনা যাচ্ছে। মনে পড়ল, ছেলেবেলা থেকে দেখি গণশক্তির সম্পাদকীয় স্তম্ভের উপরে কোন মার্কসবাদী ক্লাসিক সন্দর্ভ থেকে কয়েক লাইন উদ্ধৃত থাকে। যখন স্কুলে পড়ি তখন একটা উদ্ধৃতি প্রায়ই দেখতাম। স্মৃতি থেকে যতটুকু উদ্ধার করতে পারছি তাতে কথাটা ছিল খানিকটা এরকম: কমিউনিস্টদের লক্ষ্য, অন্য সব সর্বহারা পার্টির মতই, শ্রমিক শ্রেণীর আশু দাবীগুলি আদায় করা। কিন্তু তার মধ্যেও তারা বৃহত্তর লড়াইয়ের কথা ভোলে না এবং আসন্ন বিপ্লবের জন্যে প্রস্তুতি নেয়।
আশা করি বাম নেতাদের স্মৃতিশক্তি আমার চেয়ে অনেক ভাল, তাঁরা আমার মত ক্লাসিকগুলো না পড়া লোক নন এবং ক্লাসিকগুলোর সময়োপযোগী ব্যাখ্যা করার শক্তিও তাঁদের অনেক বেশি।
কোন সিপিএম/বাম কর্মী বলতেই পারেন “তুমি কে হে, এত কথা বলছ? কোনদিন আমাদের কোন মিছিলে এক ঘা লাঠিও তো খাওনি। তোমার কী অধিকার এসব লেখার?” বললে তিনি ঠিকই বলবেন। তবে উত্তরে আমারও একটু বলার আছে।
আমি এই কথাগুলো লিখলাম সাত শতাংশের অধিকারে। অর্থাৎ আমি সেই সাত শতাংশের মধ্যে পড়ি যারা এখনো আপনাদের ভোট দেয়। অতএব আমার মতামতকে গুরুত্ব দিতে আপনারা বাধ্য। সংসদীয় গণতন্ত্রে কতিপয় লোকের এটুকু বাঁদরামি আপনাদের মেনে নিতেই হবে।

বাধাই হো

পাশ্চিমবাঙ্গালের জানাগাণকে আনেক আনেক বাধাই। উয়ো তেইস তারিখ সে ভাবছি বাধাই দেবো, কিন্তু একটু দেরী হোয়ে গেলো। আমাকে শামা কারিয়ে দেবেন। এখোন তো আপনাদের সোনার সোমোয়, দোনো হাথ মে লাড্ডু। এখোন আপনারা এইটুকু গালতি মাফ কারিয়ে দিতে পারবেন।
আপনাদের ভালোবাষায় আমাদের ভোটবাক্সা একদম ভরে গেছে। আমরা আপনাদের এই ভালোবাষার বদলা বিলকুল সুদসামেত চুকতা কারিয়ে দেব। আপনাদের ছেলেমেয়েরা আনেক দিন ধরে এন্টি ডেভেলাপমেন্ট ভাষা সিখে বিলকুল বাকোয়াস তৈরি হোচ্ছে। আভি ওদের সব্বাইকে আমরা ডেভেলাপমেন্টের ভাষা এমোন আচ্ছা সে সিখাবো যে নকরির গঙ্গা মাইয়া এসে যাবেন ওয়েস্ট বেঙ্গালে।
হাঁ, ইয়ে সাচ বাত আছে কি দেশ মে বেকারি বহুত বেড়ে গেছে। পিছলে পঁয়তাল্লিশ সাল মে ইতনি বেকারি ছিলো না। লেকিন ওটা নিয়ে আপনারা একদম ভাববেন না। সব জায়গায় কিছু এন্টি নেসনাল আদমি থাকে, বেঙ্গালে থোড়া জিয়াদা আছে। ওরাই ইয়ে সব নিয়ে কথা বলছে। আপনারা ওদেরকে এই ভোটে যা থাপ্পাড় দিয়েছেন তার রিওয়ার্ড তো পাবেনই। জালদি আমরা বেঙ্গাল থেকে এন্টি নেসনালদের আউট কারিয়ে দেব। সাব উয়িদেশ থেকে ঘুসপেটি হয়ে ঢুকে আছে আর ওদেরই জন্যে আপনাদের নকরি হচ্ছে না।
বাই দা ওয়ে, আপনারা সাউথ ইন্ডিয়ার এন্টি নেসনালদের কোথায় একদম ভুলবেন না। ওরা ডেভেলাপমেন্ট চায় না। ইসি লিয়ে ওদের নেসনাল লেঙ্গুয়েজ নিয়ে বহুত প্রবলেম আছে। ওরা একদম বেকওয়ার্ড স্টেটস আছে। আপনাদের বেঙ্গালের যে একটা এন্টি নেসনাল ইকনমিস্ট আছে কি সেন? ওনার তৈরি কি সব আনাপ শানাপ ইনডেক্সে ওরা উপর দিকে আছে, লেকিন ভেদিক ইকনমিক্সে ওরা একদম ফেল আছে। রামায়ণ, মাহাভারাত কিচ্ছু ওরা মানে না। রাভাণ, মাহিষাসুরের মত ভিলেনদের ওরা পুজা করে। ওদেরকে ফালো করবেন তো কিচ্ছু ডেভেলাপমেন্ট হোবে না।
পার আমাদের বেঙ্গালিদের উপর ভিশোয়াস আছে। বেঙ্গালিরা সুইসাইড কোরবে না, তাদের মোদ্দে আনেক ইনটেলিজেন্ট মাইন্ডস আছে। আমাদের গালতি ভি সোশাল মিডিয়ায় ওরা এমোন ডিফেন্ড করে দেয় যে আমরা ভাবি “আরে ইয়ে তো গালতি থা হি নহি।“
উপার সে ইতনে সাল বাদ আমরা আপনাদের পার্টিশানের বদলা নেয়ার চান্স দিচ্ছি। আপনারা ছেড়ে দিবেন? রাভিন্দ্রনাথ টেগোর বোলেন, বাঙ্কিমচান্দ্র চাট্টোপাধ্যায় বোলেন, সোকোলেই বেঙ্গালিদের সাওধান করেছেন টার্মাইটদের বিরুদ্ধে। গদ্দার কমনিস্ট আর মমতাজ বেগম আপনাদের কাছে উয়ো সব লুকিয়ে রেখেছিল। এখোন আমরা ইতিহাস নয়া তারিকে সে লিখব তো দেখতে পাবেন।
বেঙ্গালি হিস্ট্রিতে লেকিন আনেক গদ্দার ভি আছে। ওদের এলমিনেট কোরতে হোবে। রামমোহান রয় আছে, ভিদিয়াসাগর আছে। হিন্দুধার্মের এরা যা শাতি কোরেছেন সব আমাদের রিভার্স কোরতে হোবে। তারপর মাইকেল মাদসুদান আছে। ক্রিশ্চান মিশনারিদের টাকায় রামজির বহুত বেইজতি কোরেছে। উসকা ভি উইচার আমরা কোরব। আর কোন কোন বেঙ্গালি এন্টি হিন্দুস্তান কাম করেছে উয়ো দেখার কাম আমরা কানভার্টেড বুদ্ধিজীউয়ীদের দিয়েছি। ওনাদের আর্ডিনারি বুদ্ধি নহি, এক্সট্রা আর্ডিনারি বুদ্ধি। সেগুলোর ইউজ কোরে নিতে হোবে। বাদ মে ওদের জন্যে ভি ডিটেনশন কেম্প হোবে। আমরা কোন বেঙ্গালির সাথে আন্যায় হোতে দিবো না, আপনারা দেখে নিবেন।
মনে রাখবেন, যারা দুর্গা মায়ের পূজা কোরে, রাষ্ট্রভাষা বোলে, তাদের কোন ভয় নাই। ভয় পাবে সির্ফ ভারত মাতার শত্রুরা।
ফির একবার সব বেঙ্গালিকে বহুত বহুত বাধাই।

মেধামেধ যজ্ঞ

আজ কলকাতায় মহোৎসব ছিল। এ বছরের আই পি এল এর প্রথম খেলা। রাজভবনের উল্টোদিকে বাস থেকে নেমে যখন বাঁয়ে ঘুরে হাঁটছি, তখন উলটোদিক থেকে জনস্রোত ধেয়ে আসছে। নানারকম মুখ। রংচঙে, ঝকঝকে, হাত ধরাধরি করে প্রেমিক প্রেমিকা, বাবার হাত ধরে ছেলে, নাইট রাইডার্সের জার্সি পরিহিত বন্ধুদল। সকলেরই মুখ দেখে বোঝা যায় ফুরফুরে মেজাজ, ভর্তি পেট। কারো কারো হাতে ঠান্ডা পানীয়ের বোতল। এঁদের সকলের কাছে মহোৎসবের আহ্বান এসেছে। কিছু কাঞ্চনমূল্যের বিনিময়ে। স্বর্গের বাগানের টিকিট কেটেছেন এঁরা কড়কড়ে নোট খরচ করে। কেনই বা মেজাজ ফুরফুরে থাকবে না?
এঁদের পেরিয়ে ধর্মতলার বাস ডিপোর মধ্যে দিয়ে হাঁটছি, নাকে আসছে ফুটপাথে রাঁধা বিরিয়ানি, ডিমের কারি, মাছের ঝোল, শস্তার চাউমিন, মোগলাই পরোটা, এগ রোল, পেয়ারা, শসার গন্ধ। ধর্মতলার এই আনন্দযজ্ঞে দিনমজুর থেকে শুরু করে আমার মত এ সি ট্যাক্সি চাপতে সক্ষম মানুষ পর্যন্ত সবার নিমন্ত্রণ।
আর এইসব রূপ রস গন্ধের অনতিদূরেই বসে আছেন, বা মাথা ঘুরছে, গা বমি ভাব আসছে বলে শুয়ে আছেন — আমার মেয়ের হবু মাস্টারমশাই, দিদিমণিরা। একদিন দুদিন নয়, পঁচিশ দিন ধরে কিছু না খেয়ে। এমনও হতে পারে যে আগামী দিনে হয়ত এটাই নিয়ম হয়ে যাবে। এক বৃদ্ধকে দেখলাম একটি অসুস্থ মেয়ের পাশে বসে আছেন। সম্ভবত মেয়েটির বাবা। বলা যায় না, হয়ত আমার মেয়েকেও এরকম অনশনে বসতে হবে লেখাপড়া শিখে আর আমি তখন ঐ বৃদ্ধের জায়গায় গিয়ে বসব।
এই লড়াকু ছেলেমেয়েগুলোর প্রতি আমার অক্ষম, নীরব সমর্থন জানাতে কয়েক মিনিটের জন্যে গিয়ে দাঁড়িয়েছিলাম পথপার্শ্বে, যেখানে এরা ত্রিপলের নীচে রাস্তায় বসে দিনের পর দিন, রাতের পর রাত কাটাচ্ছে। বিশ্বাস করুন, জায়গাটায় কোন গ্ল্যামার নেই, কোন বিপ্লব বিপ্লব গন্ধ নেই। কয়েকশো পরীক্ষায় পাশ তরুণ তরুণীর দীর্ঘশ্বাস ছাড়া বিশেষ কোন শব্দও নেই। সোশাল মিডিয়ায় অনেকেই ঠারেঠোরে যা বলতে চাইছেন বা সরকারপক্ষ হয়ত যে আশঙ্কায় এই আন্দোলনকে অগ্রাহ্য করছেন, তেমন কোন রাজনৈতিক আগুনও জায়গাটায় জ্বলছে না। মানুষের পেট যেহেতু ভিসুভিয়াস নয়, সেহেতু পঁচিশ দিন কেটে যাওয়ায় জঠরাগ্নিও বোধহয় নিভে গেছে।
আমার বাবা শিক্ষক ছিলেন, মামারা, জ্যাঠারাও এই পেশায় ছিলেন, স্ত্রীও শিক্ষিকা। নিজের পায়ে দাঁড়াতে পেরেছি যাঁদের জন্যে, তাঁদের মধ্যে বেশিরভাগই শিক্ষক। শুনেছি একসময় শিক্ষকদের সংসার চালানো দুর্বিষহ ছিল, লোকে মেয়ের বিয়ে দিতে চাইত না শিক্ষক পাত্রের সাথে। কিন্তু তখনো শিক্ষকদের এমন অসম্মান করেনি বোধহয় কোন সরকার। বিধানচন্দ্রের সরকার আন্দোলনরত শিক্ষকদের উপর গুলি চালিয়েছিল, সেকথা বাদ দিলে।
বেশ মনে আছে, বামফ্রন্ট আমলে একসময় স্কুলে শিক্ষক নিয়োগে দুর্নীতির অভিযোগ উঠত প্রায়ই। ম্যানেজিং কমিটির ভূমিকা নিয়ে প্রার্থীদের অসন্তোষ থাকত। যোগ্য প্রার্থী ভাল ইন্টারভিউ দিয়ে বেরিয়েও চাকরি পেতেন না। আমারই এক পরিচিত বহুদূর থেকে এক জায়গায় ইন্টারভিউ দিতে গিয়ে স্টেশন থেকে স্কুলে যাওয়ার রিকশায় উঠেই চালকের মুখ থেকে শুনেছিলেন “আপনার চাকরি হবে না। সেক্রেটারির লোক আছে। তাকেই নেবে।”
সম্ভবত কতকটা সেই কারণেই কলেজের জন্যে যেমন নেট বা স্লেট পরীক্ষা, সেই আদলে এস এস সি পরীক্ষা চালু করা হয়েছিল। তার সুফল আমাদের প্রজন্মের বহু শিক্ষিত ছেলেমেয়ে পেয়েছেন। আমাদের বাবা-মায়েরা জানতেন, পশ্চিমবঙ্গে আর কোন চাকরি না হোক, এস এস সি টা পাশ করতে পারলে স্কুলের চাকরি হবেই। কিন্তু তা বললে তো চলবে না। আগের সরকারের কোন ভাল কাজকেও যে পরের সরকার রেয়াত করবে, এমন দাবী এ দেশে আর করা চলে না। পরিবর্তন আর উন্নয়নের জোয়ারে পুরাতন যাক ভেসে যাক। অতএব যে পরীক্ষা প্রতি বছর হওয়ার কথা, সে পরীক্ষা প্রায় প্রতি বিশ্বকাপে হচ্ছে। সে পরীক্ষার ফলাফলে আবার এত বেশি মেধাবী ছেলেমেয়ের নাম উঠে আসছে যে মেধা তালিকা প্রকাশ করাই যাচ্ছে না। তবু এই শ দুয়েক ছেলেমেয়ে চৈত্রের গরমে রাস্তায় বসে আছে সরকারের শুভবুদ্ধি উদয়ের আশায়। অহো, কি দুঃসহ স্পর্ধা!
কয়েকদিন আগেই ‘শিন্ডলার্স লিস্ট’ ছবিটা দেখছিলাম। নাজি অধিকৃত পোল্যান্ডের ক্রাকাউতে বন্দী শিবিরে দরকারী আর অদরকারী লোকেদের তালিকা বানানো হচ্ছে। একজন করে বন্দী এসে দাঁড়াচ্ছে আর নাজি কেরানি তার পেশা জিজ্ঞেস করছে। দরকারী বুঝলে পরিচয়পত্রে একরকম ছাপ, অদরকারী বুঝলে অন্যরকম। একজন বললেন “আমি ইতিহাস আর সাহিত্য পড়াই।” পত্রপাঠ অপ্রয়োজনীয় হওয়ার ছাপ পড়ে গেল। অসহায় শিক্ষক বিস্ফারিত নেত্রে বললেন “I teach history and literature. Since when it’s not essential?”
দেখে শিউরে উঠলাম। সাহিত্য, ইতিহাস — এসব পড়া যে দরকারী নয় তা তো আমরা ছোট থেকে শুনে আসছি। আর এই শেষ যৌবনে এসে দেখতে পাচ্ছি ওগুলো যাঁরা পড়ান তাঁরাও অদরকারী বলে চিহ্নিত হয়ে যাচ্ছেন। এই তো সেদিন এক প্রথিতযশা সাংবাদিক (অধুনা বিচারাধীন বন্দী হিসাবে শ্রীঘরে থাকায় যশে কিঞ্চিৎ টান পড়েছে অবশ্য) সদর্পে ফেসবুকে লিখে দিলেন তুলনামূলক সাহিত্যের মত ফালতু বিষয় তুলে দেওয়া উচিৎ। এসব পড়ে কোন লাভ নেই। লিখলেন শুধু নয়, কয়েকশো লাইকও পেলেন। আর এস এস সি পাশ করা ছেলেমেয়েদের আন্দোলন শুরু হতেই সোশাল মিডিয়ায় অদ্ভুতুড়ে তত্ত্ব জন্মাচ্ছে — যারা বিজ্ঞান পড়ে তারা নাকি বেশিরভাগই ইঞ্জিনিয়ার হয়ে রাজ্যের বাইরে চলে যায়। পড়ে থাকে মেধাহীন বাংলা, ইংরিজি, ইতিহাসের ছেলেমেয়েরা। তাদের এস এস সি ছাড়া গতি নেই, তাই তারাই নাকি যোগ্যতা না থাকলেও চাকরি দাবী করে রাস্তা জুড়ে বসে আছে।
যারা এসব বলছে তারা বোধহয় জানে না গোটা দেশে কত হাজার ইঞ্জিনিয়ার বেকার, কত ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে আসন পূরণ হচ্ছে না কারণ লোকে বুঝে গেছে ওখানেও চাকরি নেই। নির্ঘাত তারা এও জানে না যে ঐ “not essential” এর তালিকায় বিজ্ঞানের শিক্ষক, গবেষকরাও ঢুকে পড়েছেন।
গত মাসের ঘটনা। দেশের গুরুত্বপূর্ণ সরকারপোষিত বিজ্ঞান গবেষণা সংস্থা টাটা ইনস্টিটিউট অফ ফান্ডামেন্টাল রিসার্চ গবেষকদের বিজ্ঞপ্তি দিয়ে বলেছে, শোন বাপু, এখন টাকাকড়ি নেই। অর্ধেক মাইনে দিচ্ছি, তাই নিয়ে চুপচাপ থাকো। পরে দেবখন বাকিটা। এদিকে খবরের কাগজ খুলে দেখুন। সরকারী বিজ্ঞাপনের কমতি নেই। যত অভাব মাস্টারমশাই, দিদিমণি, গবেষকদের মাইনে দেওয়ার বেলায়। এ রাজ্যেও যেমন শিক্ষকদের ডি এ, ইনক্রিমেন্ট দেওয়ার বেলায় শোনা যায় কোষাগার ফাঁকা। অথচ কার্নিভালের টাকা কম পড়ে না, থানা থেকে ডেকে ডেকে দুর্গাপুজোর টাকা দেওয়ার সময়েও টানাটানি হয় না।
আসলে ঐ যে “not essential”, ঐটেই হচ্ছে আসল কথা। যারা শেখায় তাদের যত অপ্রাসঙ্গিক করে দেওয়া যাবে তত মানুষের শেখার আগ্রহ কমে যাবে, মগজ ধোলাই না করলেও সবাই বুঝে যাবে “বিদ্যা লাভে লোকসান, নাই অর্থ নাই মান।” তবে না হীরকের রাজা ভগবান হবে?
আর ভগবান হতে সাহায্য করি আমরা, যারা ফেসবুক ভরে আছি। আমরা ভাবছি এসব ধরনা, অনশন তো করছে বাংলা মাধ্যমের ছাত্রছাত্রীরা, যারা বাংলা মাধ্যমের স্কুলে চাকরি করতে চায়। এতে আমাদের কী? আমার ছেলেমেয়েকে তো ইংরিজি মাধ্যম স্কুলে পড়াব, সে বড় হয়ে চাকরি করলে ওরকম স্কুলেই করবে। তো আমার ভারী বয়ে গেছে। কিন্তু এত নিশ্চিন্ত না থেকে একটু খোঁজ নিয়ে দেখুন দেখি, আপনি কয়েক লাখ টাকা খরচ করে যে স্কুলে সন্তানকে ভর্তি করেছেন সেই স্কুলের শিক্ষক শিক্ষিকারা কত টাকা মাইনে পান? এ ছুতো সে ছুতোয় যে বিপুল পরিমাণ টাকা স্কুল কর্তৃপক্ষ আপনার থেকে নিচ্ছেন প্রতিনিয়ত, তার কত শতাংশ শিক্ষক, অশিক্ষক কর্মীদের বেতনে খরচ হচ্ছে? চিত্রটা কিন্তু ভাল নয়।
আসলে শিক্ষা এখন ব্যবসায় পরিণত। কিসের ব্যবসা? কাঁচামাল সরবরাহের ব্যবসা। কাদের কাঁচামাল। কর্পোরেটের। আপনার ছেলেমেয়ে অঙ্ক করে মজা পাচ্ছে কিনা, তার মধ্যে ভবিষ্যতের গণিতবিদ তৈরি হচ্ছে কিনা তা দেখার দায়িত্ব স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় কেউ নিচ্ছে না। কারো সন্তান স্টিফেন হকিংয়ের মত মহাবিশ্বের রহস্য উদঘাটনে জীবন ব্যয় করুক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান তা চাইছে না। কারণ ওরকম ছাত্রছাত্রীকে মানবসম্পদ হিসাবে কোন কোম্পানি কিনবে না। আর যে শিক্ষা লাভের কড়ি উৎপাদনে কাজে লাগে না, তা “not essential.” একই কারণে সাহিত্য তথা তুলনামূলক সাহিত্যও ফালতু। কোন শিক্ষক বা শিক্ষিকার প্রণোদনায় (অনুপ্রেরণায় নয় কিছুতেই) যদি এক ঘর ছাত্রছাত্রী শিহরিত হয়ে আবিষ্কার করে জীবনানন্দের কোন পংক্তি আজকের প্যালেস্তাইনের কোন কবির প্রায় অনুবাদ বলে মনে হচ্ছে, তাতে আম্বানি বা জ্যাক মায়ের কী লাভ? উল্টে বিপদ। কারণ “এরা যত বেশি শেখে, তত বেশি জানে, তত কম মানে।“
অতএব, এক দিকে ব্যাঙের ছাতার মত প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় গজিয়ে ওঠে, যেখানকার দেয় বেতন মহার্ঘ। অন্যদিকে জহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের বেতন সাধারণ পড়ুয়ার নাগালের বাইরে নিয়ে যাওয়া হয়। আর এ রাজ্যে কম বেশি যা-ই নম্বর পাও, কলেজে ভর্তি হতে হাজার হাজার টাকা উৎকোচ দিতে হয়। যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও চাকরি না পেয়ে খোলা আকাশের নীচে শুয়ে থাকতে হয়, অথচ শিক্ষকের অভাবে স্কুল চলে না, ছাত্রসংখ্যা কমে যায়, স্কুল উঠে যায়।
দেখে শুনে আমি আপনি কী করব? বাবা-মা হিসাবে যেটুকু করতে পারি। অর্থাৎ সামর্থ্য আছে বলে বেসরকারী স্কুলে সরিয়ে নেব, বহুজাতিকের জন্যে মানবসম্পদ তৈরি করব। আর যে বাবা-মায়ের সামর্থ্য নেই, তাঁদের ছেলেমেয়ের আর লেখাপড়া শেখা হবে না, সে মানবসম্পদ হয়ে উঠতে পারবে না। আমরা “essential”, ওরা “not essential”। বিশ্বাস করুন, এখানে মেধার উপস্থিতি বা অনুপস্থিতির কোন ভূমিকা নেই।