মুখ্যমন্ত্রীর আরএসএস: বিশ্বাসে মিলায় বস্তু

পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী কেবল গুণী মানুষ নন, তাঁর প্রতিভা বহুমুখী। তিনি সাহিত্য রচনা করেন, ছবি আঁকেন, গান লেখেন। তার উপর রাজ্যের প্রশাসন চালাতে হয়। একজন মানুষকে এত কাজ করতে হলে কাগজ পড়ার সময়ের অভাব ঘটা খুবই স্বাভাবিক। নিশ্চয়ই প্রতিদিন কাগজ পড়ার সময় মুখ্যমন্ত্রী পান না। পেলে চোখে পড়ত কলকাতা থেকে প্রকাশিত দ্য টেলিগ্রাফ কাগজের একটা খবর, যার শিরোনাম ‘RSS yet to clear air on bombing claim affidavit’। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কংগ্রেসের মিডিয়া বিভাগের প্রধান পবন খেরা রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের (আরএসএস) এক প্রাক্তন প্রচারকের মহারাষ্ট্রের নানদেড় জেলা ও সেশনস আদালতে জমা দেওয়া হলফনামা প্রকাশ্যে এনেছেন। সেই হলফনামায় যশবন্ত শিন্ডে নামক ওই লোকটি দাবি করেছে, সংঘ পরিবারের সদস্য সংগঠনগুলো দেশের বিভিন্ন জায়গায় বোমা বিস্ফোরণ ঘটিয়ে সংবাদমাধ্যমের একাংশ এবং পুলিস প্রশাসনের সহযোগিতায় তার দোষ মুসলমান সম্প্রদায়ের ঘাড়ে চাপিয়েছে। ফলে ২০১৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে বিজেপি লাভবান হয়েছে।

খবরটা মুখ্যমন্ত্রীর চোখ এড়িয়ে গিয়ে থাকতেই পারে, কারণ এ নিয়ে কোনো চ্যানেলে কোনো বিতর্কসভা বসেনি। কলকাতার অন্যান্য তথাকথিত উদার খবরের কাগজগুলোতেও আতসকাচ দিয়ে খুঁজে দেখতে হবে এই খবর। তাছাড়া কংগ্রেস তো বানিয়েও বলতে পারে। কারণ তারা তৃণমূল কংগ্রেসকে বিজেপির প্রধান বিরোধী হয়ে উঠতে দিতে চায় না। কিন্তু মুখ্যমন্ত্রীর শক্তিশালী সোশাল মিডিয়া টিম আছে। টুইটারে তাঁর সাত মিলিয়ন ফলোয়ার, ফেসবুকে ৪.৯ মিলিয়ন। সেই সোশাল মিডিয়া টিমের সাহায্য নিলেই মুখ্যমন্ত্রী জানতে পারবেন যে ওই মর্মে হলফনামা সত্যিই ফাইল করা হয়েছে। চাইলে স্বয়ং যশবন্তের মুখ থেকেই হলফনামায় লিখিত অভিযোগগুলো সংক্ষেপে শুনে নিতেও পারবেন। মারাঠি যশবন্তের ভিডিও ইংরেজি সাবটাইটেল সমেত সোশাল মিডিয়ায় ঘুরে বেড়াচ্ছে।

যশবন্তের হলফনামার কথা প্রকাশ্যে এল বৃহস্পতিবার, কলকাতার কাগজের প্রথম পাতায় সে খবর বেরোল শুক্রবার সকালে। সেদিনই সাংবাদিক সম্মেলনে মুখ্যমন্ত্রী বললেন “আরএসএস এত খারাপ ছিল না, এবং এত খারাপ বলে আমি বিশ্বাস করি না।” মুখ্যমন্ত্রী নিশ্চয়ই খবরটা জানতে পারেননি বলেই ওরকম বলেছেন। স্বীকার্য যে যশবন্তের কথাগুলো অভিযোগ মাত্র। কিন্তু যে সংগঠনের একদা প্রচারকরা এই মুহূর্তে দেশের রাষ্ট্রপতি, উপরাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী এবং বহু রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী – তার বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ যে মারাত্মক, সে কথা না বোঝার মত রাজনীতিবিদ মমতা ব্যানার্জি নন। তাছাড়া তিনদিন হয়ে গেল, এখন পর্যন্ত আরএসএস যশবন্তকে মিথ্যাবাদী বলে কোনো বিবৃতি দেয়নি। অবশ্য জবাবদিহি না চাইলে বিবৃতি দেওয়ার প্রশ্ন ওঠে না। ২০০৬ সালের নানদেড় বিস্ফোরণ কাণ্ডে সরকারি সাক্ষী (অ্যাপ্রুভার) হতে চেয়ে আবেদন করেছিল যশবন্ত। আদালত সবেমাত্র সেই আবেদন গ্রহণ করেছে, আরএসএসকে জবাবদিহি করতে তো ডাকেনি। সাংবাদিকদেরই বা ঘাড়ে কটা মাথা, যে এ নিয়ে মোহন ভাগবতকে প্রশ্ন করবে? অতএব আরএসএসের বয়ে গেছে তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ মিথ্যা বলে ঘোষণা করতে। কথায় আছে, বিশ্বাসে মিলায় বস্তু, তর্কে বহুদূর। মুখ্যমন্ত্রী তো বিশ্বাসই করেন না আরএসএস খারাপ। ফলে যতক্ষণ তারা নিজেরা না বলছে “হ্যাঁ, আমরা খারাপ”, মুখ্যমন্ত্রী নিশ্চিন্ত। কিন্তু খটকা অন্যত্র।

“এত খারাপ ছিল না”। এত খারাপ মানে কত খারাপ? তার মানে মুখ্যমন্ত্রী জানেন যে আরএসএস একটু একটু খারাপ? সেই পরিমাণটা কি তাঁর পক্ষে সুবিধাজনক? খারাপ ছিল না মানেই বা কী? আগে যতটুকু খারাপ ছিল তাতে তাঁর আপত্তি ছিল না, এখন বেশি খারাপ হয়ে গেছে – এ কথাই কি বলতে চেয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী? তাঁর কাছে কোনটা ভাল, কোনটা খারাপ তা অবশ্য আমাদের জানা নেই। মহাত্মা গান্ধীকে হত্যা করা কি খারাপ? সে হত্যায় আরএসএস যোগ প্রত্যক্ষভাবে প্রমাণ হয়নি বটে, তবে সেই ঘটনার পরে ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লিখেছিলেন, আরএসএস নেতাদের ভাষণগুলো যে বিষ ছড়িয়েছে তারই পরিণতি গান্ধীহত্যা। তাই ভারত সরকার আরএসএসকে নিষিদ্ধ করে। কে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ছিলেন তখন? সর্দার বল্লভভাই প্যাটেল। জওহরলাল নেহরুর বদলে যিনি প্রধানমন্ত্রী হলে ভারত সোনার দেশ হত বলে আরএসএস এখন দিনরাত ঘোষণা করে। মুখ্যমন্ত্রী নানা কাজে ব্যস্ত থাকেন, তাই ধরে নিচ্ছি অতকাল আগের ব্যাপার তাঁর মনে নেই। তাই তার ভালমন্দ ভেবে দেখেননি। তবে যেহেতু তিনি একজন সাংবিধানিক পদাধিকারী এবং নিজেকে ধর্মনিরপেক্ষ বলে দাবি করেন, সেহেতু ধরে নিতে দোষ নেই যে যশবন্ত শিন্ডে তার হলফনামায় যে ধরনের কার্যকলাপের কথা লিখেছে সেগুলো আমাদের মুখ্যমন্ত্রীর চোখে খারাপই। কারণ কাজগুলো বেআইনি এবং সাম্প্রদায়িক।

এখন কথা হল, যশবন্ত যে অভিযোগ করেছে আরএসএসের বিরুদ্ধে, সে অভিযোগও কিন্তু এই প্রথম উঠল তা নয়। মুখ্যমন্ত্রী কাগজ পড়ারই সময় পান না যখন, বই পড়ার সুযোগ না পাওয়ারই কথা। তবে তাঁর তো পড়ুয়া পারিষদের অভাব নেই। তাঁরা কেউ কেউ নির্ঘাত মহারাষ্ট্র পুলিসের প্রাক্তন ইন্সপেক্টর জেনারেল এস এম মুশরিফের লেখাপত্র পড়েছেন। তাঁর লেখা আরএসএস: দেশ কা সবসে বড়া আতঙ্কবাদী সংগঠন বইতে ২০০৭ থেকে ২০০৯ পর্যন্ত মোট ১৮টা বোমা বিস্ফোরণে আরএসএস, অভিনব ভারত, জয় বন্দেমাতরম, বজরং দল এবং সনাতন সংস্থা – এই পাঁচটা হিন্দুত্ববাদী সংগঠনকে দায়ী করা হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রীর পার্ষদরা কেন যে এসব কথা তাঁকে জানাননি! জানলে নিশ্চয়ই আরএসএস খারাপ “ছিল না” – একথা মুখ্যমন্ত্রী অতটা আত্মবিশ্বাসী হয়ে বলতেন না। অবশ্য মুশরিফ যা লিখেছেন তার সমস্তই তো স্রেফ অভিযোগ। মালেগাঁও বিস্ফোরণের প্রধান অভিযুক্ত সাধ্বী প্রজ্ঞা যেভাবে ছাড়া পেয়ে সাংসদ হয়ে গেছেন, তাতে ওসব অভিযোগকে আর আমল দেওয়া চলে কিনা সে প্রশ্ন উঠতেই পারে। তবে আরএসএসের উপর অত্যন্ত জোরালো বিশ্বাস না থাকলে এসব জেনে সংঘ পরিবারের সদস্য নয় এমন এক রাজনৈতিক দলের সর্বময় নেত্রীর কিছুটা সন্দিহান হওয়ার কথা। কিন্তু বাংলার মুখ্যমন্ত্রী নিজের বিশ্বাসে অটল।

রাজনীতিতে দুজন ব্যক্তি, দুটো সংগঠন বা একজন ব্যক্তির সঙ্গে একটা সংগঠনের সম্পর্ক চোখ বন্ধ করে ভরসা করার মত পর্যায়ে পৌঁছনো চাট্টিখানি কথা নয়। বিপদের সময়ে পাশে দাঁড়ানোর ইতিহাস না থাকলে তেমনটা হওয়া শক্ত। সেদিক থেকে মমতার আরএসএসের প্রতি এই বিশ্বাস বুঝতে অসুবিধা হয় না। আজকের মুখ্যমন্ত্রী গত শতকের শেষ দশকে যখন ভারতের প্রাচীনতম রাজনৈতিক দল থেকে বেরিয়ে আসেন, তখন এককালের স্বয়ংসেবক অটলবিহারী বাজপেয়ী আর লালকৃষ্ণ আদবানির স্নেহ না পেলে মমতার পক্ষে আস্ত একখানা রাজনৈতিক দল গড়ে তোলা সম্ভব হত কি? হলেও সদ্যোজাত দলটাই মধ্যগগনে থাকা সিপিএম তথা বামফ্রন্টের বিরোধী হয়ে ওঠার ক্ষমতা রাখে – এ বিশ্বাস কংগ্রেসের ভোটার তথা কর্মীদের মধ্যে প্রতিষ্ঠা করা যেত কি? মাত্র আটজন সাংসদ যে দলের, সেই দলের নেত্রীকে রেল মন্ত্রকের দায়িত্ব দিয়ে পশ্চিমবঙ্গের ভোটারদের প্রভাবিত করার মহার্ঘ সুযোগ দিয়েছিল বিজেপি। শুধু কি তাই? তেহেলকা কাণ্ড প্রকাশিত হওয়ার পরেই সততার প্রতীক মমতা দুর্নীতির বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে এনডিএ ত্যাগ করেন। তা সত্ত্বেও ২০০৩ সালে তাঁকে দপ্তরহীন মন্ত্রী করে ফিরিয়ে নেওয়া হয়। আরএসএস আর বিজেপি আলাদা – এই তত্ত্বে এখনো বিশ্বাস করেন যাঁরা, তাঁদের কথা আলাদা। বাকিরা নিশ্চয়ই মানবেন, এভাবে পাশে থাকার পরেও যদি মমতা আরএসএসকে বিশ্বাস না করতেন তাহলে ভারি অন্যায় হত।

আসলে মমতার আরএসএসে বিশ্বাস ততটা অসুবিধাজনক নয়। তাঁর বারংবার আরএসএস প্রীতি ঘোষণা সত্ত্বেও দেশসুদ্ধ ধর্মনিরপেক্ষ শিবিরের কেষ্টবিষ্টুদের মমতায় বিশ্বাস বরং বৃহত্তর বিপদের কারণ। গত বছর বিধানসভা নির্বাচনে যখন বিজেপির ক্ষমতায় আসা আটকানোই মূল এজেন্ডা হয়ে দাঁড়াল, তখন বামপন্থীদের মধ্যে লেগে গেল প্রবল ঝগড়া। সিপিএম নেতৃত্বাধীন বাম দলগুলো বলতে শুরু করল বিজেপি আর তৃণমূল অভিন্ন, তাই তৃণমূলকে ভোট দেওয়া আর বিজেপিকে ভোট দেওয়া একই কথা। উঠে এল একটা নতুন শব্দ – বিজেমূল। অন্যদিকে নকশালপন্থীরা বলতে লাগল, যেখানে যে প্রার্থী বিজেপির বিরুদ্ধে সবচেয়ে শক্তিশালী তাকে ভোট দিতে। বিজেমূল তত্ত্বের প্রমাণ হিসাবে সিপিএম “দলে থেকে কাজ করতে পারছি না” বলে লাইন দিয়ে তৃণমূল থেকে বিজেপিতে চলে যাওয়া শীর্ষস্থানীয় নেতা, মন্ত্রীদের দেখাতে লাগল। আর যত না তৃণমূল, তার চেয়েও বেশি করে নকশালরা তার জবাবে তালিকা দিতে থাকল, কোন ব্লক স্তরের সিপিএম নেতা বিজেপিতে গেছে, কোন জেলা স্তরের নেত্রী বিজেপিতে যোগ দিলেন। অর্থাৎ দুপক্ষের কেউই তৃণমূল কংগ্রেসের রাজনীতি কী, ধর্মনিরপেক্ষতার প্রশ্নে তাদের বিশ্বাসযোগ্যতা থাকলে কেন আছে বা না থাকলে কেন নেই – সে আলোচনায় গেল না। অথচ ঠিক তখনই ইন্ডিয়া টুডে কনক্লেভে বসে লাইভ অনুষ্ঠানে মুখ্যমন্ত্রী বলছেন “আমি সংঘ পরিবারের বিরুদ্ধে লড়ছি না। ওরা তো নির্বাচনে লড়ে না। ওরা বিজেপিকে সমর্থন করে। আমি লড়ছি বিজেপির সঙ্গে।” এই নেত্রীর দল জয়যুক্ত হল, একমাত্র বিরোধী দল হিসাবে উঠে এল বিজেপি। অর্থাৎ ঘোষিতভাবে আরএসএসের বন্ধু দুটো দলের হাতে চলে গেল বাংলার আইনসভা। অথচ পশ্চিমবঙ্গের ধর্মনিরপেক্ষ বুদ্ধিমানরা উল্লসিত হয়ে ঘোষণা করলেন, বাংলার ধর্মনিরপেক্ষ ঐতিহ্য জিতে গেল। রামমোহন, বিদ্যাসাগর, রবীন্দ্রনাথ জিতে গেলেন, ইত্যাদি।

আরও মজার কথা, নির্বাচনে গোল্লা পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই সিপিএমও পরিত্যাগ করল বিজেমূল তত্ত্ব। আরও এক ধাপ এগিয়ে এ বছর রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে দেশের একমাত্র যে নেতা সর্বদা নাম করে আরএসএসকে আক্রমণ করেন, সেই রাহুল গান্ধীর দল কংগ্রেস থেকে শুরু করে সিপিএম, লিবারেশন সমেত সমস্ত বাম দল সমর্থন করে বসল মমতার পছন্দের প্রার্থীকে। সে আরেক যশবন্ত – বিজেপি থেকে তৃণমূলে এসেছেন। এ থেকে যা প্রমাণিত হয় তা হল, মমতার মত আরএসএস-বান্ধব নয় যে রাজনৈতিক শক্তিগুলো, তারাও ব্যাপারটাকে নির্বাচনী লড়াইয়ের বেশি কিছু ভাবে না।

আরএসএসের কাছে ভারতকে হিন্দুরাষ্ট্র করে তোলা মতাদর্শগত মরণপণ লড়াই। সে লক্ষ্যে পৌঁছতে তারা সাংবিধানিক, অসাংবিধানিক – সবরকম পথই নিতে রাজি। প্রয়োজনে আদবানির মত আগুনে নেতাকে বঞ্চিত করে বাজপেয়ীর মত নরমপন্থীকে প্রধানমন্ত্রী করতে রাজি ছিল। জমি শক্ত হওয়ার পর নরেন্দ্র মোদীর মত কড়া হিন্দুত্ববাদীকে নেতা করেছে, ভবিষ্যতে তাঁকেও আস্তাকুঁড়ে নিক্ষেপ করে আরও গোঁড়া আদিত্যনাথকে সর্বোচ্চ নেতার আসনে বসাতে পারে। বিরোধীরা ওই বিস্তারে ভেবেই উঠতে পারেনি এখনো। এমনকি তথাকথিত কমিউনিস্ট দলগুলোও কেবল স্ট্র্যাটেজি সন্ধানে ব্যস্ত। কোথায় কাকে সমর্থন করলে বা কার সাথে নির্বাচনী জোট গড়লে বিজেপির ক্ষমতায় আসা আটকানো যাবে – এটুকুই তাদের চিন্তার গণ্ডি। সে কারণেই বিজেমূল শব্দটা নির্বাচনের আগে ভেসে ওঠে, পরাজয়ের পর মিলিয়ে যায়। যদি সিপিএমের পক্ষ থেকে সংঘমূল কথাটা বলা হত এবং শূন্য হয়ে যাওয়ার পরেও বলে যাওয়া হত, তাহলে জনমানসে সত্যি সত্যি প্রশ্নচিহ্ন তৈরি হতে পারত। হিন্দুরাষ্ট্র কী, তা হওয়া আটকানো কেন দরকার, আটকানোর ক্ষেত্রে মমতাকে সত্যিই প্রয়োজন, নাকি তিনি হিন্দুত্বের ট্রোজান ঘোড়া – শতকরা ৮০-৯০ জন মানুষ এই মুহূর্তে এসব নিয়ে ভাবছেন না (সোশাল মিডিয়া দেখে যা-ই মনে হোক)। সংঘ পরিবারকে সরাসরি রাজনৈতিক ভাষণে, কর্মসূচিতে আক্রমণ করা হলে ভাবতে বাধ্য হতেন।

বিহারে বিজেপিকে ক্ষমতাচ্যুত করার সুযোগ আসা মাত্রই সমস্ত বাম দল একজোট হয়ে নীতীশকুমারকে সমর্থন করেছে। কেবল লিবারেশন নয়, সিপিএমও। সে জোটে কংগ্রেসও আছে। অথচ নীতীশও মমতার মতই বিজেপির সঙ্গে ঘর করেছেন। শুধু তা-ই নয়, মমতার বিজেপির সাথে শেষ জোট ছিল ২০০৬ সালে। নীতীশ কিন্তু ২০১৬ বিধানসভা ভোটে রাষ্ট্রীয় জনতা দলের সঙ্গে লড়ে জিতেও বিশ্বাসঘাতকতা করে বিজেপির কাছে ফিরে গিয়েছিলেন। কেন নীতীশ আরএসএস-বিরোধী বাম দল এবং কংগ্রেসের কাছে গ্রহণযোগ্য আর কেন মমতা নন, তা নিয়ে কোনো আলোচনাই শুনলাম না আমরা। আলোচনাটা হল না সম্ভবত এইজন্যে, যে বামেরা বা কংগ্রেস নিজেরাই ওসব নিয়ে ভাবে না। বিজেপিকে ক্ষমতা থেকে দূরে রাখতে পারলেই খুশি, শেষমেশ আরএসএসের প্রকল্পই সফল হয়ে যাবে কিনা তা ভেবে দেখার প্রয়োজন বোধ করে না। অথবা ‘যখন হবে তখন দেখা যাবে’ নীতি নিয়ে চলছে।

আসলে কিন্তু মমতায় আর নীতীশে তফাত বড় কম নয়। নীতীশ সুযোগসন্ধানী, ক্ষমতালোভী রাজনীতিবিদ। তারই অনিবার্য ফল হিসাবে ভূতপূর্ব জনতা দলের সঙ্গে, একদা সতীর্থ লালুপ্রসাদের সাথে তাঁর বিচ্ছেদ হয়েছিল। কিন্তু তাঁর রাজনীতির সূতিকাগার হল সমাজবাদী রাজনীতি, নিম্নবর্গীয় মানুষের রাজনীতি। সে কারণেই নীতীশ কখনো বিজেপিকে পুরোপুরি বিশ্বাস করতে পারেননি, বিজেপিও পারেনি। নীতীশ কখনো মমতার মত সোচ্চার আরএসএস বন্দনাও করেননি। কারণ আরএসএস হল ব্রাহ্মণদের দ্বারা পরিচালিত, হিন্দু সমাজের উপর ব্রাহ্মণ আধিপত্য বজায় রাখার জন্য গঠিত সংস্থা। নীতীশের দলের নিম্নবর্গীয় সদস্য, সমর্থকদের সঙ্গে আরএসএসের আড়চোখে দেখার সম্পর্কটুকুই হওয়া সম্ভব। তার বেশি নয়।

অন্যদিকে মমতা ব্রাহ্মণকন্যা। তাঁকে দুর্গা বলে সম্বোধন করতে আরএসএসের কোথাও বাধে না। মমতার রাজনীতির ইতিহাস অন্য দিক থেকেও নীতীশের সঙ্গে মেলে না। বস্তুত যুগপৎ কংগ্রেস বিরোধিতা এবং কমিউনিস্ট বিরোধিতার ইতিহাস সম্ভবত মমতা ছাড়া ভারতের কোনো আঞ্চলিক দলের নেই। তামিলনাড়ুর দ্রাবিড় রাজনীতির ভিত্তিতে তৈরি দলগুলোর স্বভাবতই প্যাথোলজিকাল বাম বিরোধিতা নেই, কিন্তু ঐতিহাসিকভাবে কংগ্রেস বিরোধিতা ছিল। তেলুগু দেশম, তেলেঙ্গানা রাষ্ট্র সমিতি, জগন্মোহন রেড্ডির দল বা ওড়িশার বিজু জনতা দলের জন্ম তৃণমূলের মতই কংগ্রেস ভেঙে। কিন্তু তাদেরও বামেদের সাথে ধুন্ধুমার সংঘাতের ইতিহাস নেই। তাদের এলাকায় বামেদের দুর্বলতা তার কারণ হতে পারে, কিন্তু এ কি নেহাত সমাপতন যে বিন্ধ্য পর্বতের উত্তর দিকে আরএসএস বাদ দিলে তৃণমূলই একমাত্র রাজনৈতিক শক্তি, কমিউনিস্ট এবং কংগ্রেস, দু পক্ষই যাদের ঘোষিত শত্রু? লক্ষণীয়, ২০১১ বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূল আর কংগ্রেসের জোট গড়তে দারুণ উদ্যোগী ভূমিকা নিয়েছিলেন প্রণব মুখার্জি। তাঁর জীবনের শেষ প্রান্তে এসে দেখা গেল, তিনি আরএসএসের বিশেষ শ্রদ্ধাভাজন। সেই জোট বামফ্রন্টকে হারাতে পেরেছিল বটে, কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে কংগ্রেসের ভাঙনের গতিও বাড়িয়ে দিয়েছিল।

তাহলে আরএসএসের সাথে সম্পর্ক মমতাকে কী কী দিয়েছে তা বোঝা গেল। এবার আরএসএস কী কী পেয়েছে সে আলোচনায় আসা যাক? রাজনীতিতে তো কেউ “আমি   নিশিদিন তোমায় ভালোবাসি,/ তুমি   অবসরমত বাসিয়ো” গায় না। আরএসএস যা যা পেয়েছে সবকটাই অমূল্য।

১) আরএসএসের দুই ঘোষিত শত্রু মুসলমান আর কমিউনিস্ট। তৃণমূলের উদ্যোগে কমিউনিস্টরা প্রথমে তাদের সবচেয়ে বড় ঘাঁটি থেকে ক্ষমতাচ্যুত, পরে ছত্রভঙ্গ হয়েছে। তার জন্যে আরএসএসের আগমার্কা কোম্পানি বিজেপিকে বিন্দুমাত্র কসরত করতে হয়নি। মুসলমানরা আগে প্রান্তিক ছিলেন, তৃণমূল আমলে বাংলার হিন্দুদের শত্রু হিসাবে চিহ্নিত হয়ে গেছেন। মমতা প্রথমবার ক্ষমতায় এসে ইমাম ভাতা চালু করলেন, বিজেপি প্রায় বিনা আয়াসেই হিন্দুদের বোঝাতে সক্ষম হল, মুসলমানরা মমতার দুধেল গাই। পরে মমতা নিজেই অনবধানবশত (নাকি সচেতনভাবেই?) সেকথা বললেনও। এখন পরিস্থিতি এমন, যে বাম আমলে মুসলমানরা বিভিন্ন এলাকায় বাড়ি ভাড়া পেতেন না, এখন খোদ সল্টলেকে হোটেলের ঘর ভাড়া পান না।

২) মুসলমান তোষণ হচ্ছে – এই প্রোপাগান্ডা হিন্দুদের একটা বড় অংশের বদ্ধমূল ধারণায় পরিণত হয়েছে তৃণমূল শাসনের ১১ বছরে। ইতিমধ্যে বেলাগাম হিন্দু তোষণ চলছে। বিজেপি আজগুবি অনলাইন প্রচার শুরু করল “পশ্চিমবঙ্গে দুর্গাপুজো করতে দেওয়া হয় না”, তৃণমূল সরকার দুর্গাপুজোগুলোকে নগদ অনুদান দিতে শুরু করল। আরএসএস শুরু করল রামনবমীতে অস্ত্র মিছিল, তৃণমূল আরম্ভ করল বজরংবলী পুজো। সুপ্রিম কোর্টের রায়ে অযোধ্যায় রামমন্দির তৈরির পথ খুলে গেল, আরএসএসের প্রতিশ্রুতি পূরণ হল। এদিকে দিদি দীঘায় জগন্নাথ মন্দির নির্মাণের পরিকল্পনা নিলেন। রাজ্যে বিজেপির সরকার থাকলেও এভাবে হিন্দুত্বকে রাজনীতির এজেন্ডায় নিয়ে আসতে পারত কিনা সন্দেহ।

৩) ভারতের একেক রাজ্যের একেকটা বিশিষ্ট গুণ আছে, যা সেই রাজ্যের মানুষের মূলধন। গুজরাটের যেমন ব্যবসা, পাঞ্জাবের কৃষিকাজ। বাংলার ছিল লেখাপড়া, গানবাজনা, সাহিত্য, সিনেমা ইত্যাদি। অন্য রাজ্যের লোকেরা যাকে কটাক্ষ করে এককথায় বলে কালচার। এই কালচার আরএসএসের হিন্দুত্বের একেবারে বিপরীত মেরুর জিনিস। তৃণমূল আমলে সবচেয়ে নির্বিঘ্নে সাড়ে সর্বনাশ ঘটানো গেছে এই কালচারের। বাংলার ছেলেমেয়েরা ফড়ফড় করে ইংরেজি বলতে না পারলেও দেশে বিদেশে গবেষক, অধ্যাপক হিসাবে তাদের দাম ছিল। এখনো সর্বভারতীয় বিজ্ঞান পুরস্কারগুলোর প্রাপকদের তালিকা মাঝে মাঝে সেকথা জানান দেয়। সে দাম ধুলোয় মিশিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা হয়েছে স্কুল, কলেজের চাকরি বিক্রি করে লেখাপড়া লাটে তুলে দিয়ে। নায়ক, নায়িকা, গায়ক, গায়িকারা কাতারে কাতারে বিধায়ক আর সাংসদ হয়ে গেছেন। লেখকরা ব্যস্ত পুষ্পাঞ্জলি দিতে আর চরণামৃত পান করতে। সিনেমার কথা না বলাই ভাল। শৈল্পিক উৎকর্ষ বাদ দিন, পারিশ্রমিকের হাল এত খারাপ যে কলকাতার শিল্পীরা স্রেফ বাংলা ছবিতে, ওয়েব সিরিজে কাজ করে টিকে থাকতে পারবেন কিনা সন্দেহ। মন্ত্রীর বান্ধবীর ফ্ল্যাট থেকে টাকার পাহাড় উদ্ধার হওয়ার ছবি দেখে প্রথম সারির অভিনেতা অনির্বাণ ভট্টাচার্য হা-হুতাশ করছেন, ওই পরিমাণ টাকার অর্ধেক পেলেও বাংলা ছবিগুলো অনেক ভাল করে করা যেত।

কিন্তু এসব গোল্লায় যাওয়ার চেয়েও বড় ক্ষতি হয়েছে। লেখাপড়া, গানবাজনা, সাহিত্য, সিনেমা মিলিয়ে যে বাঙালি মনন ছিল সেটাই নষ্ট হয়ে গেছে। আসল ক্ষতি সেটা। বাঙালি হিন্দু ভদ্রলোকের অন্তত একটা ভান ছিল, যে সে ভারতের অন্য অনেক রাজ্যের লোকেদের মত ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি করে না। দুর্গাপুজো এলে কদিন পাগলামি করে; নিজের বাড়িতে লক্ষ্মীপুজো, সরস্বতীপুজো, সত্যনারায়ণের সিন্নি চলে। কিন্তু বাইরে সে একজন ধর্মনিরপেক্ষ মানুষ। এখন সেসব গেছে। নতুন ফ্ল্যাটবাড়ি হলে তার গায়ে খোদাই করা হচ্ছে গণেশের মুখ, শিবলিঙ্গ বা স্বস্তিকা। কলিং বেলে বেজে উঠছে “ওঁ ভূর্ভুবঃ স্বঃ”। অক্ষয় তৃতীয়ায় এখনো গণেশপুজো এবং হালখাতা হয় এমন দোকান খুঁজে পাওয়া দায়, অথচ গণেশ চতুর্থী এক দশকের মধ্যে ঘরে ঘরে পৌঁছে গেছে। শিগগির পশ্চিমবঙ্গ সরকারের অনন্ত ছুটির তালিকায় যোগ হবে নির্ঘাত। অল্পবয়সী বাঙালি কথা বলছে হিন্দি মিশিয়ে, ছোটরা স্কুলে দ্বিতীয় ভাষা হিসাবে শিখছে হিন্দি। বঙ্গভঙ্গের নাম করতেই লর্ড কার্জনের ঘুম কেড়ে নেওয়া বাঙালি নিজে নিজেই প্রায় উত্তর ভারতীয় হিন্দু হয়ে গেল তৃণমূল আমলে। এই সাংস্কৃতিক অনুপ্রবেশ তামিলনাড়ুতে কিছুতেই হয়ে উঠছে না আরএসএসের দ্বারা। কেরালায় মার খেতে হচ্ছে, এমনকি নিজেদের হাতে থাকা কর্ণাটকেও করতে গিয়ে অনবরত সংঘাত হচ্ছে। বাংলায় কিন্তু ওসবের দরকারই হচ্ছে না। বিনা রক্তপাতে বাঙালি বাঙালিয়ানা বিসর্জন দিচ্ছে।

আরও পড়ুন শাহেনশাহ ও ফ্যাসিবিরোধী ইশতেহার

এর বেশি আর কী চাইতে পারত আরএসএস? মমতা হিন্দুরাষ্ট্রের জন্য রুক্ষ, পাথুরে বাংলার মাটিতে হাল চালিয়ে নরম তুলতুলে করে দিয়েছেন। বীজ বপনও সারা। ফসল তোলার কাজটা শুধু বাকি।

সততা ও বাংলার সংবাদমাধ্যম: কোনো প্রশ্ন নয়

যাদবেন্দ্র পাঁজা
কংগ্রেস করতেন, বিধানচন্দ্র রায়ের মন্ত্রিসভার সদস্য ছিলেন। শঙ্খ ঘোষ এই মানুষটিকে প্রথম দেখার অভিজ্ঞতা লিখে রেখেছেন। বাঘা যতীনের শিষ্য, স্বাধীনতা সংগ্রামী কিরণচন্দ্র মুখোপাধ্যায় ১৯৫০ সালে থাকতেন কলেজ স্ট্রিটে ইউনিভার্সিটি ইনস্টিটিউটের পিছনে এক গলিতে এক অকিঞ্চিৎকর বাড়ির দোতলা কি তেতলার একটি ঘরে। সে ঘরের বর্ণনা এরকম “এক প্রান্তে একটা শতরঞ্চি বিছানো, অন্য প্রান্তে আরেকখানা। শতরঞ্চির ওপর অল্পস্বল্প শয্যাসম্বল আর পাশে একখানা টিনের সুটকেস, দু-প্রান্তেই।” একদিকে বসে কিরণচন্দ্র অন্য দিকে শুয়ে থাকা একজনকে হেঁকে বলেন “সময় হয়নি? যেতে হবে না?” সেই মানুষটি উঠলেন, ব্র্যাকেটে ঝোলানো একখানা আধময়লা পাঞ্জাবি পরে নিয়ে বেরিয়ে গেলেন। শঙ্খ ঘোষ তাঁকে চিনতেন না। কিরণচন্দ্রের মুখে পরিচয় শুনে বিস্মিত হলেন। তারপর:

যাদবেন্দ্র পাঁজা? মন্ত্রী?
আমার চোখে বিস্ময় লক্ষ করে কিরণদা বলেন: ‘মন্ত্রী তো কী হলো, সেটা কোনো কথা নয়, ও হলো যাদবেন্দ্র পাঁজা। এখন বেরিয়ে গিয়ে রাইটার্সে যাবে, হয়তো হেঁটে হেঁটেই।’

সুবোধ ব্যানার্জি
প্রথম যুক্তফ্রন্ট সরকারের শ্রমমন্ত্রী। এঁর বিষয়ে ১৯৯৭ সালে লিখেছিলেন বিখ্যাত আমলা দেবব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়। সুবোধবাবু যখন মৃত্যুশয্যায়, তখন কংগ্রেস সরকারের শ্রমমন্ত্রী গোপাল দাস নাগের মহানুভবতায় বিদেশ থেকে একটি অত্যন্ত দামি এবং এ দেশে পাওয়াই যায় না এমন ওষুধ আনানো হয়েছিল। ডাক্তারদের মতে সেই ওষুধের কয়েকটা ডোজ নিতে পারলে সুবোধবাবুর আয়ু খানিকটা বেড়ে যেতে পারত। কিন্তু বাণিজ্যিক সংস্থার আনুকূল্যে আনানো সেই ওষুধ ফিরিয়ে দেন মৃত্যুপথযাত্রী মানুষটি, তাঁর স্ত্রী এবং কন্যা।

বামফ্রন্ট সরকারের মন্ত্রীদের মধ্যে বিনয় চৌধুরী বা বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের জীবনযাত্রার সারল্য, সততা নিয়ে আজ অবধি মুখে মুখে ফেরে। জ্যোতি বসু স্কচ খেতে ভালবাসতেন, অভিজাত ক্লাবের সদস্য ছিলেন, প্রাসাদোপম সরকারি বাড়িতে থাকতেন। তাঁর ছেলে পিতৃপরিচয় ব্যবহার করে শিল্পপতি হয়েছেন কিনা তা নিয়ে বিস্তর নিউজপ্রিন্ট খরচ হয়েছে একসময়, কিন্তু জ্যোতিবাবুর বিরুদ্ধেও ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ ওঠেনি। বস্তুত, পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রীদের মধ্যে একমাত্র প্রফুল্ল সেনের বিরুদ্ধেই বিরোধীরা (বামপন্থীরা) দুর্নীতির অভিযোগ এনেছিলেন। কিন্তু পরবর্তীকালে প্রমাণিত হয়েছে, সে অভিযোগও মিথ্যা।

উদাহরণের তালিকা আরও দীর্ঘ করা সম্ভব, কিন্তু নিষ্প্রয়োজন। কারণ এই নাতিদীর্ঘ তালিকাই এটুকু প্রমাণ করার জন্য যথেষ্ট, যে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় পশ্চিমবঙ্গের ইতিহাসে প্রথম ক্ষমতাশালী রাজনীতিবিদ নন যিনি সততার পরাকাষ্ঠা বা সাদাসিধে জীবন কাটান। অথচ পশ্চিমবঙ্গের সংবাদমাধ্যম গত এক দশকে তেমনটাই প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করে গেছে ক্রমাগত। আজ যদি আপামর পশ্চিমবঙ্গবাসীর ধারণা হয়ে থাকে, তৃণমূল কংগ্রেসের আর সব নেতা দুর্নীতিগ্রস্ত হলেও দিদি সৎ — তার কৃতিত্ব মমতার চেয়েও এ রাজ্যের সংবাদমাধ্যমের বেশি। জাতীয় স্তরের বেশকিছু সংবাদমাধ্যম মোদী বন্দনার জন্য কুখ্যাত। তাদের প্রচারে তবু একটি সঙ্গতি আছে। তারা কেবল মোদীকে পুরুষোত্তম সত্য হিসাবে উপস্থিত করে না; অনুরাগ ঠাকুর, কিরেণ রিজিজু, স্মৃতি ইরানির মত চুনোপুঁটি বিজেপি নেতা নেত্রী থেকে শুরু করে হেভিওয়েট অমিত শাহ পর্যন্ত সকলকেই সকল গুণের আধার হিসাবে বর্ণনা করে। বাংলার সংবাদমাধ্যম কিন্তু তেমন নয়। অনুব্রত মণ্ডল যে প্রকৃতপক্ষে বাহুবলী, তা দেখাতে এখানকার খবরের চ্যানেলগুলোর আপত্তি নেই। নারদ স্টিং অপারেশনের সময়ে স্টুডিওতে সভা বসিয়ে ফিরহাদ হাকিম, সৌগত রায়, শোভন চ্যাটার্জি, শুভেন্দু অধিকারীদেরও যথেষ্ট নিন্দা করা হয়েছে। গ্রেপ্তারির পর মদন মিত্রের নিন্দাও কাগজে বেরিয়েছে, কুণাল ঘোষ যে দুর্নীতিগ্রস্ত সে কথাও দিবারাত্র উচ্চারিত হয়েছিল যথাসময়ে। আর পার্থ চ্যাটার্জির বেলায়? ইংরেজিতে একটা কথা আছে – washing dirty linen in public। বেলঘরিয়ার ফ্ল্যাট থেকে ২২ কোটি টাকা উদ্ধার হওয়ার পর থেকে তো আক্ষরিক অর্থেই পার্থবাবুর বিছানার চাদর, বালিশের ওয়াড়, অন্তর্বাস জনসমক্ষে ধোলাই করছে মিডিয়া। অর্থাৎ মুখ্যমন্ত্রীর দলের আর সকলকে অসৎ বলতে বাংলার সংবাদমাধ্যম রাজি। কিন্তু মুখ্যমন্ত্রী সব সন্দেহের ঊর্ধ্বে। তিনি যেন পদ্মফুল – পাঁকে থাকেন কিন্তু গায়ে পাঁক লাগে না।

নিয়োগ দুর্নীতি নিয়ে যখন রাজ্য উত্তাল, তখন সংবাদমাধ্যম নিয়ে এই আলোচনার কী দরকার? অভিযুক্ত তো রাজ্যের একজন মন্ত্রী এবং তাঁর বান্ধবী। মুখ্যমন্ত্রী তো নন, সংবাদমাধ্যমও নয়।

দরকার কারণ পশ্চিমবঙ্গ অনেকদিন হল কিছু মৌলিক গণতান্ত্রিক রীতিনীতির উল্টো দিকে হাঁটছে। যেমন গণতন্ত্রে সবাই সবার কার্যকলাপ নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারে। কিন্তু এ রাজ্যে সংবাদমাধ্যম সবার (আক্ষরিক অর্থে নেবেন না) কার্যকলাপ নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারলেও তার কার্যকলাপ নিয়ে কেউ প্রশ্ন তোলে না। প্রকাশ্য সভায় সাংবাদিকরা ভাতার ব্যবস্থা করতে অনুরোধ করেন মুখ্যমন্ত্রীকে। মুখ্যমন্ত্রীও বলেন সরকারি আধিকারিকরা নজর রাখবেন কে কীরকম খবর করছে। ‘ভাল’ খবর করলে সাহায্য পাওয়া যাবে। এতবড় অগণতান্ত্রিক কাণ্ড নিয়ে কোনো কাগজে কোনো সম্পাদকীয় প্রকাশিত হয় না, কোনো চ্যানেলে সান্ধ্য বিতর্কসভা বসে না। বোঝাই যায়, মুখ্যমন্ত্রীর সাংবাদিক সম্মেলনগুলো লাইভ দেখলে কেন শেক্সপিয়রের নাটকের মনোলগের দৃশ্য দেখছি মনে হয়।

পশ্চিমবঙ্গে অল্টনিউজ বা নিউজলন্ড্রি নেই, সংবাদমাধ্যমের কভারেজের ভালমন্দ উচিত-অনুচিত নিয়ে কোনো মিডিয়া কাটাছেঁড়া করে না। ফলে সংবাদমাধ্যমের দিকে কোনো আঙুল ওঠে না, কিন্তু তারা নিশ্চিন্তে অন্যদের দিকে আঙুল তুলতে পারে। যেমন ২২ জুলাই টালিগঞ্জের ফ্ল্যাট থেকে কুবেরের ধনের প্রথম কিস্তি আবিষ্কারের পর আটদিন পেরিয়ে গেল, এখনো জয় গোস্বামী, সুবোধ সরকার, পরমব্রত চট্টোপাধ্যায় প্রমুখরা মুখ খুলছেন না বলে তাঁদের দিকে আঙুল তুলছে। সন্দেহ নেই সরকার ঘনিষ্ঠ এই বিখ্যাতরা, বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠান ও কমিটিতে আসীন এই কৃতীরা, বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন ইস্যুতে সরকারের পক্ষে কথা বলা এই খ্যাতিমানরা এত বড় কাণ্ডে চুপ করে থাকলে এঁদের বিশ্বাসযোগ্যতাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কিন্তু মজার কথা, বাংলার সংবাদমাধ্যম কেবল সেই বিখ্যাতদের দিকেই আঙুল তোলে যাঁরা সরাসরি তৃণমূল কংগ্রেসের সদস্য নন। দেব, মিমি চক্রবর্তী, নুসরত জাহান বা সায়নী ঘোষের মত যে বিখ্যাতরা রীতিমত দলে যোগ দিয়েছেন, কেউ কেউ নির্বাচনে জিতে সাংবিধানিক পদ আলো করে আছেন, তাঁদের প্রতিক্রিয়া অগ্রাধিকার পায় না। বগটুই কাণ্ডের পর কোনো কোনো সংবাদমাধ্যম কোন কোন বিখ্যাত মানুষ কোনো প্রতিক্রিয়া দেননি তার আলাদা তালিকা পর্যন্ত প্রকাশ করেছিল। অথচ দেব, মিমি, নুসরতরা প্রতিক্রিয়া না দিলে কেন দিলেন না তা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয় না। অথচ তাঁরা নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি, এসব নিয়ে কথা বলা তাঁদের সাংবিধানিক দায়।

দায়ের কথা বলতে গেলে এ কথাও বলতে হবে, দুর্নীতিতে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের কথা তুলে ধরা সংবাদমাধ্যমের দায়। গত আটদিনে বাংলার সংবাদমাধ্যম সে দায় পালন করতে উৎসাহী হয়েছে। পার্থবাবুকে ফোন করে চাকরিপ্রার্থীদের যন্ত্রণা জানিয়ে বেকুব হয়েছিলেন – এরকম এক নীচু তলার তৃণমূল কর্মীর ফোনালাপের অডিও প্রকাশ্যে এনেছে একটি চ্যানেল। সেই কর্মীটিকে সাদরে স্টুডিওতে ডেকে এনে সান্ধ্য বিতর্কসভায় স্থানও দেওয়া হয়েছে একদিন। পাঁচশো তিন দিন ধরে যাঁরা রাস্তায় বসে আছেন তাঁদের কয়েকজনকেও এখন এ চ্যানেল সে চ্যানেলে কথা বলতে দেওয়া হচ্ছে। একটি চ্যানেলে তাঁদের কয়েকজনকে কান্নায় ভেঙে পড়তেও দেখা গেল। যৌবন চুরি হয়ে যাওয়া এই অসহায়, বিধ্বস্ত মানুষেরা এখন চ্যানেলগুলির হঠাৎ হাওয়ায় ভেসে আসা ধন হয়ে উঠেছেন। ঝকঝকে চেহারার অ্যাঙ্কররা যথাসম্ভব আবেগ সহকারে ভুরু কুঁচকে প্রশ্ন করছেন “আর কতদিন…?” কিন্তু এই চাকরিপ্রার্থীদের কেউ যদি আচমকা অ্যাঙ্করকে জিজ্ঞেস করে বসেন “আপনারা এতদিন কোথায় ছিলেন”, তাহলে পালাবার পথটা দেখে রাখা ভাল। কারণ লেখাপড়া জানা ছেলেমেয়েরা, আমাদের ছেলেমেয়েদের হবু শিক্ষক-শিক্ষিকারা যে রাস্তায় বসে আছেন – এ দৃশ্য বাংলার চ্যানেলওয়ালা, কাগজওয়ালাদের গত আট দিনে চোখে পড়েছে। তার আগের ৪৯০-৯৫ দিন ক্যামেরা আর ল্যাপটপগুলো অন্য কোনো গুরুতর খবর নিয়ে ব্যস্ত ছিল। কোটি পঞ্চাশেক নগদ টাকা আর গয়নাগাঁটি উদ্ধার না হলে ৫০০ দিন পেরোলেও আন্দোলনকারীদের দিকে নজর পড়ত কিনা সন্দেহ আছে। চক্ষুলজ্জাই এ যাত্রায় ক্যামেরা এবং কম্পিউটারগুলোর মুখ আন্দোলনকারীদের দিকে ঘুরিয়ে দিল হয়ত। গত এগারো বছরে কলকাতার বুকে এসএসসি, টেট, মাদ্রাসা – নানারকম শিক্ষকদের একাধিক অবস্থান বিক্ষোভ হয়েছে, শিক্ষক-হবু শিক্ষকরা পুলিসের লাঠির বাড়ি খেয়েছেন, জলকামান দিয়ে আন্দোলনকারীদের ছত্রভঙ্গ করে দেওয়ার মত ঘটনাও ঘটেছে। মারাও গেছেন বেশ কয়েকজন আন্দোলনকারী। সেসব আন্দোলনকে প্রধান খবরের মর্যাদা দেয়নি কোনো খবরের কাগজ বা চ্যানেল। প্রথম পাতার খবর হয়েছে, যখন দীর্ঘ আন্দোলন ভাঙতে মুখ্যমন্ত্রী গিয়ে আন্দোলনকারীদের শুকনো আশ্বাস দিয়েছেন বা আদালত বলেছে, আপনার অমুক জায়গায় বসবেন না, তমুক জায়গায় বসুন। সাধারণ মানুষের অসুবিধা করে আন্দোলন করা চলবে না।

আরও পড়ুন সত্যান্বেষী পাঠক জাগুন, সরকারি বিজ্ঞাপন পেতে গেলে ইতিবাচক খবর লিখতে হবে

এখনো কভারেজের অনেকটা জায়গা জুড়ে রয়েছে পার্থ-অর্পিতার সম্পর্কের রসাল খুঁটিনাটি। যে অধ্যবসায়ে কোন গাড়িতে লং ড্রাইভে যেতেন আর কোন বাগানবাড়িতে চেটেপুটে খিচুড়ি খেতেন তা রিপোর্ট করা চলছে, তাতে মনে হচ্ছে বাংলার মিডিয়া স্রেফ একটা সেক্স টেপের অপেক্ষায় আছে। সেটা পাওয়া গেলেই আন্দোলনকারীরা আবার অবজ্ঞার অন্ধকারে তলিয়ে যাবেন, দুর্নীতিও চাপা পড়ে যাবে। এই অধ্যবসায় ক্ষমতাকে প্রশ্ন করার ক্ষেত্রে থাকলে, সত্য উদ্ঘাটন করার এই অদম্য উৎসাহ আগে দেখালে নিয়োগ দুর্নীতি প্রকাশ করতে আদালতের হস্তক্ষেপ প্রয়োজন হত না। কাজটা পশ্চিমবঙ্গের সদাজাগ্রত সংবাদমাধ্যমই করতে পারত।

‘বিশ্বাসে মিলায় সততা, তর্কে বহুদূর’ মন্ত্রে বিশ্বাসী মিডিয়া কিন্তু এখনো প্রশ্ন করছে না, মুখ্যমন্ত্রীর ভাইপো আন্দোলনকারীদের আশ্বাস দিতে পারেন কোন প্রশাসনিক অধিকারে? তিনি তো সরকারের কেউ নন। মুখ্যমন্ত্রী নিজে কেন কথা বলছেন না? শুধু কথা বলে কী হবে, সে প্রশ্নও করছে না খুব বেশি মিডিয়া। গত কয়েক দিনে আবার কিছু বর্ষীয়ান সাংবাদিক সোশাল মিডিয়ায় বনলতা সেনগিরি করতে নেমেছেন। বাম আমলে কী হয়েছে, সব জানি। বেশি বাড়াবাড়ি করলে লিখে দেব – এই জাতীয় পোস্ট দেখা যাচ্ছে। এঁরা কি বুঝছেন না, এই উচ্চারণে মিডিয়ার কর্তব্যে অবহেলাই আরও পরিষ্কার হচ্ছে? বাম আমলের দুর্নীতির কথা জানা ছিল, অথচ রিপোর্ট করা হয়নি – এ যদি সত্যি হয়, সে দায় সংবাদমাধ্যম ছাড়া কার?

https://nagorik.net এ প্রকাশিত

অসংসদীয় শব্দ: মুখ বুজে বাঁচা অভ্যাস করতে হবে

“কথা বোলো না কেউ শব্দ কোরো না 
ভগবান নিদ্রা গিয়েছেন 
গোলযোগ সইতে পারেন না।”

মনোজ মিত্রের নরক গুলজার নাটকের এই গান গত শতকের একটা অংশে রীতিমত জনপ্রিয় ছিল। আমাদের এঁদো মফস্বলে কলকাতার গ্রুপ থিয়েটার দেখার অভ্যাস খুব বেশি লোকের ছিল না। তৎসত্ত্বেও নব্বইয়ের দশকে অন্তত দুবার শখের অভিনেতাদের পাড়ার মঞ্চে এই নাটক করতে দেখেছি আর নারদের চরিত্রে যে-ই থাকুক, তার গলায় সুর থাক বা না থাক, এ গান গাওয়া মাত্রই দর্শকদের মজে যেতে দেখেছি। পিতামহ ব্রহ্মা টেনে ঘুমোচ্ছেন, দেবর্ষি নারদ নেচে নেচে এই গান গাইছেন – এই হল দৃশ্য। নাটকটি আগাগোড়া সরস। এখানে ব্রহ্মা একজন মানুষকে পুনর্জন্ম দেওয়ার জন্য ঘুষ নিতে যান, চিত্রগুপ্ত দেখে ফেলে আর্তনাদ করে ওঠে “উৎকোচ”। ব্রহ্মা ট্যাঁকে টাকা গুঁজতে গুঁজতে বলেন “মেলা ফাজলামি কোরো না। উৎকোচ ছাড়া আমাদের ইনকামটা কী, অ্যাঁ? আমরা কি খাটি, না এগ্রিকালচার করি, না মেশিন বানাই? অতবড় স্বর্গপুরীর এস্ট্যাবলিশমেন্ট কস্ট আসবে কোত্থেকে, অ্যাঁ?” তাছাড়া এই নাটকে একজন বাবাজি আছেন, যিনি ব্রহ্মার কৃপায় কল্পতরু থলি পাওয়া মাত্রই রম্ভাকে চেয়ে বসেন। কিন্তু থলিতে হাত ঢোকালে হাতে উঠে আসে একটি মর্তমান কলা।

আর বেশি লিখব না, কারণ বৃদ্ধ বয়সে মনোজ মিত্রকে হাজতবাস করানো আমার উদ্দেশ্য নয়। কথা হল বিশ-পঁচিশ বছর আগে একশো শতাংশ হিন্দু (নব্বই শতাংশ উচ্চবর্ণ) অভিনেতাদের দ্বারা অভিনীত এই নাটক দেখেছি, আর একশো শতাংশ হিন্দু দর্শককুলকে নাটক দেখে হেসে গড়াগড়ি খেতে দেখেছি। কিন্তু বিস্তর ধস্তাধস্তির পর মহম্মদ জুবের আজ দিল্লি পুলিসের দায়ের করা মামলাতেও জামিন না পেলে এবং জজসাহেব তাঁর রায়ে বাকস্বাধীনতা যে সাংবিধানিক অধিকার সেটি ষোড়শোপচারে মনে করিয়ে না দিলে সাহস করে এই লেখা লিখতে বসতাম না। কারণ কী লেখা যাবে, কোনটা বলা যাবে সে ব্যাপারে আজকাল আর সংবিধান চূড়ান্ত নয়, সরকারের বকলমে পুলিস চূড়ান্ত। পুলিসের অধিকারের সীমাও বেড়ে গেছে অনেক। একদা পুলিসের হাত এত ছোট ছিল, যে আশিতে আসিও না ছবিতে ভানু বন্দ্যোপাধ্যায় জলে নেমে পড়ে বলেছিলেন তাঁকে আর ধরা যাবে না, কারণ তিনি তখন জলপুলিসের আন্ডারে। আর এ যুগে আসাম পুলিসের হাত গুজরাট পর্যন্ত লম্বা, পশ্চিমবঙ্গ পুলিসের হাত গোয়া পর্যন্ত পৌঁছে যায়। দেশটা যে প্রেতপুরীতে পরিণত হয়েছে, এই বোধহয় তার সর্বোত্তম প্রমাণ। কারণ ছোটবেলায় জ্যাঠা-জেঠিদের মুখে কলকাতায় মেসে থেকে চাকরি করা এক গ্রাম্য ভদ্রলোকের গল্প শুনেছিলাম। তিনি বহুকাল পরে বাড়ি গিয়ে খেতে বসেছেন, ডালের সাথে মেখে খাবেন বলে দুটি পাতিলেবুর আবদার করেছেন। করেই দেখেন বউয়ের হাতদুটো ইয়া লম্বা হয়ে নিজের বাড়ির সীমানা পেরিয়ে পাশের বাড়ির গাছ থেকে লেবু পেড়ে নিয়ে এল। আসলে ওলাউঠার মহামারীতে গ্রাম সাফ হয়ে গিয়েছিল। ঘৃণার মহামারীতে আমাদের দেশ সাফ হয়ে গেছে। গল্পের ভদ্রলোক শহরে পালিয়ে বেঁচেছিলেন, আমরা কোথায় পালিয়ে বাঁচব জানি না। ভারত জোড়া ফাঁদ পেতেছ, কেমনে দিই ফাঁকি? আধেক ধরা পড়েছি গো, আধেক আছে বাকি।

আমরা ভারতীয়, আমরা মেনে নিতে জানি। যা যা বলা বারণ, লেখা বারণ সেগুলো মেনে নিয়ে চলব বলেই ঠিক করেছিলাম। কিন্তু দেখলাম অবাক কাণ্ড! কেবল আমরা মানিয়ে নিলে চলবে না, হাজার ভণ্ডামি ও নোংরামি সত্ত্বেও যে সংসদের দিকে আমরা তাকিয়ে থাকি তার সদস্যদের জন্যেও তালিকা তৈরি হয়েছে। ভগবান, থুড়ি সরকার, যাতে নিশ্চিন্তে নিদ্রা যেতে পারেন, কেউ গোল করতে না পারে তার নিশ্ছিদ্র ব্যবস্থা করতে কোন কোন শব্দ উচ্চারণ করা যাবে না, অর্থাৎ কোনগুলো অসংসদীয়, তার নতুন ফর্দ প্রকাশিত হয়েছে সংসদের মৌসুমি অধিবেশনের প্রাক্কালে। সেখানেই শেষ নয়, আরও বলা হয়েছে, সংসদ চত্বরে কোনো “ডেমনস্ট্রেশন”, ধর্না, ধর্মঘট করা যাবে না। এমনকি অনশন বা কোনো ধর্মীয় অনুষ্ঠানও করা যাবে না। অর্থাৎ সমস্ত শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদই গণতন্ত্রের মন্দিরে বারণ। এ হল সেই মন্দির, যেখানে প্রথমবার প্রবেশ করার সময়ে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ঘটা করে সিঁড়িতে মাথা ঠেকিয়ে প্রণাম করেছিলেন। ধর্মীয় অনুষ্ঠান করা যাবে না – এই দারুণ ধর্মনিরপেক্ষ আদেশের কারণ অবশ্য দুর্বোধ্য। কারণ মাত্র কয়েকদিন আগে নতুন সংসদ ভবনে দন্তবিকশিত সিংহের মূর্তি স্থাপন করার সময়ে প্রধানমন্ত্রী নিজে পুজো-আচ্চা করেছেন। তাহলে বক্তব্যটি কি এই, যে পুরনো মন্দিরে পুজো চলবে না, নতুন মন্দিরে চলবে? গণতন্ত্রের মন্দিরে শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ নিষিদ্ধ করার অর্থই বা কী? তাহলে কি শান্তিভঙ্গ করে যেসব প্রতিবাদ প্রণালী, সেগুলোর পথ পরিষ্কার করা হচ্ছে? মোদীজির বন্ধু ডোনাল্ড ট্রাম্প মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতি পদ থেকে অপসারিত হওয়ার পর ক্যাপিটল হিলে যেরকম প্রতিবাদ দেখে সারা বিশ্ব শিউরে উঠেছিল, তেমন প্রতিবাদ ছাড়া কি এ দেশে আর কোনো প্রতিবাদ করতে দেওয়া হবে না? করলেই বুলডোজার চালানো হবে? প্রতিবাদের চেহারা অবশ্য বিচিত্র। পার্শ্ববর্তী শ্রীলঙ্কায় আরেক ধরনের প্রতিবাদ হচ্ছে। প্রতিবাদের ধরনধারণ, সীমানা নির্দিষ্ট করে দেওয়া আজ পর্যন্ত কোনো দেশের কোনো শাসকের পক্ষে সম্ভব হয়নি। অবশ্য মোদীজি বালক বয়সে খালি হাতে কুমিরের মুখ থেকে ক্রিকেট বল এবং কুমিরছানা নিয়ে এসেছেন। তাঁর অসাধ্য কী?

মোদীজির সরকার কী কী পারে তা আমরা এতদিনে জেনে ফেলেছি, বিরোধীরা কী পারেন তা দেখা এখনো বাকি আছে। অসংসদীয় শব্দের তালিকার সংযোজনগুলো সেই সুযোগ এনে দিয়েছে। দু-একজন বিরোধী সাংসদ বলছেন বটে, তাঁরা নির্দেশ অগ্রাহ্য করে ওই শব্দগুলো সংসদে ব্যবহার করবেন, কিন্তু সেই ২০১৪ সাল থেকে তাঁরা যেরকম লক্ষ্মীসোনা হয়ে আছেন, তাতে না আঁচালে বিশ্বাস করা যাচ্ছে না। পালানিয়প্পম চিদম্বরমের মত দু-একজন প্রবীণ সাংসদ তো ইতিমধ্যেই টুইট করে দেখিয়েছেন, ভাষার উপর দখল থাকলেই যে শব্দগুলোকে অসংসদীয় বলে ঘোষণা করা হয়েছে সেগুলো বাদ দিয়েও সরকারের সমালোচনা করা সম্ভব। সোশাল মিডিয়ায় মস্করাও চালু হয়েছে, শশী থারুরের মত জ্যান্ত থিসরাস থাকতে আর কিসের চিন্তা? এমন সুবোধ বিরোধী থাকতে আমাদের আর কিসের চিন্তা? ইন্টারনেট জোক আর মিম সংস্কৃতি এমন গভীরে পৌঁছেছে যে সাংসদরাও গভীরে ভাবছেন না। তাঁরা বোধহয় ভেবে দেখছেন না, যে কোনো শব্দ অসংসদীয় বলে ঘোষিত হল মানে জোর করে সে শব্দ উচ্চারণ করলেও সংসদের কার্যবিবরণীতে তা নথিবদ্ধ করা হবে না। অর্থাৎ এমন ব্যবস্থা করা হয়েছে যাতে আজ থেকে পঞ্চাশ বছর পরে অন্তত সংসদের কার্যবিবরণী থেকে কোনো ইতিহাস লেখক জানতে পারবেন না যে ভারতে ‘স্নুপগেট’ বলে কিছু ঘটেছিল, কেউ ‘ডিক্টেটোরিয়াল’ ছিল বা সরকারের বিরুদ্ধে ‘তানাশাহি’-র অভিযোগ ছিল। মনোমত ইতিহাস লেখার যে ব্যবস্থা ভারতে চলছে, এ-ও যে তারই অঙ্গ, সেকথা বিরোধী দলের কেউ বুঝছেন কি? শুধু ইতিমধ্যেই লিখিত ইতিহাস বিকৃত করা নয়, এই অসংসদীয় শব্দের তালিকা যে ভবিষ্যতে যে ইতিহাস লেখা হবে তা-ও বিকৃত করার প্রচেষ্টা, তা বিরোধীরা কেউ ভেবে দেখেছেন বলে তো মনে হচ্ছে না।

আরও পড়ুন পশ্চিমবঙ্গে নির্বাচন প্রহসনে পরিণত হলে ক্ষতি নেই বিজেপির

এত সহজে ইতিহাস থেকে সত্য মুছে ফেলা যায় কিনা সে বিতর্ক নেহাতই বিদ্যায়তনিক। তা নিয়ে মাথা না ঘামিয়ে বিরোধী দলের রাজনীতিবিদদের অধিকার হরণ শুরু হওয়া মাত্রই সর্বশক্তি দিয়ে প্রতিবাদ করা উচিত। কিন্তু আমাদের বিরোধীরা তেমন করেন না। তাঁদের মধ্যে বিদ্যাসাগর কথিত গোপালরাই দলে ভারি। মাঝেমধ্যে রাহুল গান্ধী রাখাল হয়ে ওঠেন বটে, কিন্তু কদিন না যেতেই ইউরোপে দম নিতে চলে যান। সুললিত ইংরেজি বলতে পারা থারুর বা মহুয়া মৈত্র, ডেরেক ও’ব্রায়েনরাই আজকের সংসদীয় বিরোধিতার মুখ। তাঁরা ইন্দ্রজিৎ গুপ্ত বা সোমনাথ চ্যাটার্জির মত জাঁদরেল নন, সেকালের মমতা ব্যানার্জির মত ওয়েলে নেমে গিয়ে স্পিকারের মুখে কাগজ ছুড়ে মারার মত মেঠো রাজনীতিও তাঁদের আসে না। তেমন কাজ করলেও দল যে তাঁদের পাশে দাঁড়াবেই, তার নিশ্চয়তা নেই। এমন বিরোধী পেলে যে কোনো শাসকেরই পোয়া বারো হয়। তারা কাকে রাষ্ট্রপতি পদপ্রার্থী করবে তা নিয়ে অযথা মাথা ঘামায়, শেষ লগ্নে মাথা চুলকে বলে, আগে বললে তো ওনাদের প্রার্থীকেই সমর্থন করতাম। এদিকে সরকার নিশ্চিন্তে একের পর এক অধিকার হরণ করে চলে।

অতএব আমরা, সাধারণ ভারতীয়রা, আধেক ধরা পড়ে বাকি আধেকের আশঙ্কাতেই থাকি। ভ্লাদিমির পুতিনের রাশিয়া বা রচপ তৈয়প এর্দোগানের তুরস্কে মানুষ যেমন মুখ বুজে বাঁচে, তেমনভাবে বাঁচা আমাদের শিগগির অভ্যাস করে নিতে হবে। তবে অসংসদীয় শব্দের তালিকার মত হাজতে পোরার যোগ্য শব্দেরও একটা প্রকাশ্য তালিকা থাকলে আমাদের সুবিধা হয়।

https://nagorik.net এ প্রকাশিত

দেশপ্রেমিক সংগঠনে সন্ত্রাসবাদী স্লিপার সেল?

উমর খালিদ, শার্জিল ইমাম, তালিব হুসেন শাহ, রিয়াজ আত্তারি – এদের মধ্যে মিল কোথায়? চারজনেই যে ইসলাম ধর্মাবলম্বী তা তো নামগুলো দেখেই বোঝা যাচ্ছে। কিন্তু তারপর? এরা কি সবাই দেশদ্রোহী সন্ত্রাসবাদী, নাকি দেশপ্রেমিক? আলোচনা করা যাক।

প্রথম দুজন জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়, আইআইটি বম্বের মত প্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা এবং অধ্যাপনা করেছেন, রাজনীতি করেছেন। দুজনেই প্রকাশ্য সভায় জনতাকে প্রতিবাদ করতে বলার অপরাধে দীর্ঘদিন কারারুদ্ধ রয়েছেন। উমর নিজেকে কমিউনিস্ট মনে করেন, শার্জিল অন্য পথের পথিক। কিন্তু দুজনেই নাগরিকত্ব সংশোধন আইনের বিরুদ্ধে দেশব্যাপী আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেছিলেন। শার্জিলকে ওই আন্দোলনের অঙ্গ হিসাবেই দেওয়া দুটো বক্তৃতার জন্য গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। অভিযোগ – তিনি হিংসায় প্ররোচনা দিচ্ছিলেন। উমরের বিরুদ্ধে দিল্লি দাঙ্গায় উসকানি দেওয়ার অভিযোগ আনা হয়েছে। দুজনের কারোর বিরুদ্ধেই কোনো অভিযোগ আজ অব্দি প্রমাণিত হয়নি, কিন্তু ইউএপিএ আইনের দস্তুর অনুসারে তদন্তকারী সংস্থাগুলোর এরা কারারুদ্ধ থাকা অবস্থাতেই প্রমাণ জোগাড় করে যাওয়ার অধিকার আছে। তাই শার্জিল ২০২০ সালের জানুয়ারি মাস থেকে আর উমর ওই বছরেরই সেপ্টেম্বর মাস থেকে গরাদের পিছনে আছেন। জামিন খারিজ হয়েছে কিছু মামলায়, কোথাও জামিন হয়েছে, কোনোটার আবার শুনানিই হয়নি এখনো।

তৃতীয় ব্যক্তি তালিব ইসলামিক সন্ত্রাসবাদী সংগঠন লস্কর-এ-তৈবার অন্যতম কমান্ডার। তিনি জম্মুর রাজৌরির বাসিন্দা। গত রবিবার রেয়াসি জেলার টুকসানে গ্রামবাসীদের উদ্যোগে বিস্তর অস্ত্রশস্ত্র সমেত ফয়জল আহমেদ দার বলে আরেকজনের সঙ্গে তিনি ধরা পড়েন বলে খবরে প্রকাশ। চতুর্থ ব্যক্তি রিয়াজ মানুষ খুনে অভিযুক্ত। রাজস্থানের উদয়পুরে কানহাইয়া লাল নামে একজনকে সে আর ঘাউস মহম্মদ নৃশংসভাবে খুন করে, সে দৃশ্যের ভিডিও তুলে সগর্বে শেয়ারও করে। এমন করার কারণ কী? কানহাইয়া হজরত মহম্মদ সম্পর্কে বিজেপির সাসপেন্ড হওয়া মুখপাত্র নূপুর শর্মার নোংরা মন্তব্যের সমর্থনে সোশাল মিডিয়ায় কিছু পোস্ট করেছিলেন। রিয়াজ ও ঘাউসের মতে তা মহাপাপ। এ কাজে তাদের দুই স্যাঙাতের সন্ধানও পাওয়া গেছে বলে তদন্তকারী সংস্থার দাবি।

রাজৌরির তালিব আর উদয়পুরের রিয়াজের মধ্যে একটা চমকপ্রদ মিল আছে। দুজনেই বিজেপির সঙ্গে যুক্ত বলে অভিযোগ উঠেছে। তালিব নাকি বিজেপির জম্মু এলাকার মাইনরিটি মোর্চার সোশাল মিডিয়ার ভারপ্রাপ্ত আধিকারিক। জম্মু ও কাশ্মীরের বিজেপি প্রেসিডেন্ট রবীন্দর রায়না তাঁকে পুষ্পস্তবক দিচ্ছেন, এমন ছবিও পাওয়া গেছে। দেশের প্রবল প্রতাপান্বিত স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের পিছনে অন্য বিজেপি নেতাদের সঙ্গে তালিব দাঁড়িয়ে আছেন, এমন একখানা ছবি আছে বলেও জম্মু ও কাশ্মীরের কংগ্রেস দাবি করেছে। অন্যদিকে রিয়াজ যে উদয়পুরের বিজেপির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে ছিলেন তারও একাধিক লক্ষণ দেখা গেছে। বিজেপির বক্তব্য রিয়াজ তাদের দলে ঢুকতে চাইতেন মাত্র, কিন্তু কানহাইয়া হত্যার বহু আগে থেকেই যে বিজেপির সংখ্যালঘু সেলের নেতাদের সাথে রিয়াজের ঘনিষ্ঠতা ছিল, তার একাধিক প্রমাণ সোশাল মিডিয়া থেকেই উঠে এসেছে।

এমন হতেই পারে যে সত্যিই দেশপ্রেমিক বিজেপি নেতারা কিছু বুঝতে পারেননি, সন্ত্রাসবাদীরা তাঁদের মধ্যে সুকৌশলে সেঁধিয়ে গেছে। গত দু-তিন দশকের হিন্দি সিনেমার মনোযোগী দর্শকদের বলে দিতে হবে না, স্লিপার সেল কী জিনিস। শত্রু সংগঠনে ঢুকে পড়ে ভিতর থেকে সেই সংগঠনের ক্ষতি করার কৌশল তো আরও পুরনো। অক্ষয় কুমারের ভক্তদের দায়িত্ব দিলে তো তাঁরা স্লিপার সেল চিহ্নিত করে তাদের শেষ করে দেওয়ার উপায়ও বাতলে দেবেন সম্ভবত। কিন্তু মুশকিল হল, বিজেপির মত এক নিবেদিতপ্রাণ জাতীয়তাবাদী দলের নেতারা বুঝতেই পারেননি এতবড় কাণ্ড হয়ে গেছে। জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভালের মত একজন জেমস বন্ডের উপস্থিতি সত্ত্বেও দেশের শাসক দলে সন্ত্রাসবাদীরা দিব্যি ঢুকে পড়ছে – এ বড়ই চিন্তার বিষয়। আমরা প্রধানমন্ত্রীর আশ্বাসবাণীতে ভরসা করেছিলাম। আমরা জানতাম তিনি পোশাক দেখলেই সন্ত্রাসবাদী চিনতে পারেন। তিনি পারেন আর তাঁর দলের অন্যরা পারেন না – এমন তো আমাদের জানা ছিল না! লেখার শুরুতেই একই পংক্তিতে দুজন রাজনৈতিক বন্দীর সঙ্গে একজন চিহ্নিত সন্ত্রাসবাদী আর একজন সম্ভাব্য সন্ত্রাসবাদীর নাম করেছি, তার কারণ ওরকম নামের লোক মানেই যে নিরপরাধ প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত অপরাধী, তা-ই আমাদের এতদিন শেখানো হয়েছে। কারা দেশদ্রোহী আর কারা দেশপ্রেমিক, তার স্পষ্ট তালিকা আমরা পেয়েছিলাম। কিন্তু তালিব আর রিয়াজ ধরা পড়ায় সব যে গুলিয়ে গেল।

আরও পড়ুন মঈন সম্পর্কে কুৎসিত বিদ্রূপে সন্দেহ জাগে, তসলিমা কি হিন্দুত্বের ট্রোজান ঘোড়া? 

তাহলে কি ধরে নিতে হবে ইউএপিএ আইনে অভিযুক্ত উমর, শার্জিল, সিদ্দিক কাপ্পানের মত মুসলমান বা সুধা ভরদ্বাজ, গৌতম নওলাখা, ভারভারা রাওয়ের মত হিন্দু এবং রোনা উইলসন, ফাদার স্ট্যান স্বামীর মত খ্রিস্টানরাই শুধু নয়; ঘোষিত দেশপ্রেমিক সঙ্ঘ পরিবারের মধ্যেও দেশদ্রোহীদের উপস্থিতি আছে? না হয় স্লিপার সেলই হল। দুটো স্লিপার সেলের কথা জানা গেছে, এমন কত স্লিপার সেল যে আনাচে কানাচে লুকিয়ে আছে তার সন্ধান দেবে কে? যে দেশদ্রোহীরা ধরা পড়েছে, তাদের ব্যবস্থা তো হয়েই গেছে। গত বছর আজকের দিনেই তো পারকিনসন্স ডিজিজের রোগী স্ট্যান স্বামী শেষ কটা দিন জল খাওয়ার জন্য স্ট্র পর্যন্ত না পেয়ে কারাগারেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন। আর গতকাল শার্জিল আদালতকে জানিয়েছেন জেলের মধ্যে ৮-৯ জন বন্দী তাঁকে মারধোর করেছেন, তাঁর নিরাপত্তা সম্পর্কে আর নিশ্চিন্ত থাকা যাচ্ছে না।

কিন্তু দেশপ্রেমিক সর্ষের মধ্যে লুকিয়ে থাকা সন্ত্রাসবাদী ভূতদের কী হবে?

https://nagorik.net এ প্রকাশিত

সাংবাদিক তাড়িয়ে বেড়াচ্ছেন, শিক্ষার মাথায় ছাতা ধরবে কে?

বাংলায় দেরিতে হলেও বর্ষা এসে পড়েছে। এই সময়ে ছাতার চাহিদা বাড়ে। কিন্তু সোশাল মিডিয়া দেখে বোধ হচ্ছে এবার বর্ষায় ছাতা নিয়ে কথা বললে বিপদ হবে। এক সাংবাদিক পূর্বজন্মের পাপের ফল হিসাবেই বোধহয় একটি মেয়েকে ছাতার ইংরেজি প্রতিশব্দ umbrella বানান জিজ্ঞেস করে ফেলেছিলেন। এখন সকলে সাংবাদিকের ‘এলিটিজম’, ‘ক্লাসিজম’, ‘সেক্সিজম’, আরও নানা ইজম নিয়ে দিনরাত শাপ শাপান্ত করছেন। স্বীকার্য যে সাংবাদিকরা কেউ দেবতা, গন্ধর্ব নন। বিভিন্ন চ্যানেলের বুম ধরে কলকাতা শহরে ঘুরে বেড়ান যে সাংবাদিকরা, কাগজগুলো ভরে আছেন যে সাংবাদিকরা তাঁরা অনেকেই আসেন এলিট পরিবার থেকে। ভারতীয় সাংবাদিকতার ধারাটাই এমন। খুব সাধারণ পরিবার থেকে যাঁরা আসেন তাঁরাও তো একই সমাজের উৎপাদন। ‘এলিটিস্ট’, ‘ক্লাসিস্ট’, ‘সেক্সিস্ট’ সমাজ থেকে অন্যরকম সাংবাদিক তো সংখ্যায় কমই বেরোবে। কিন্তু দু-তিনদিন কেটে যাওয়ার পরও বাঙালি ভদ্রলোক, ভদ্রমহিলারা যেভাবে সাংবাদিকটিকে আক্রমণ করে চলেছেন তাতে “সব ব্যাটাকে ছেড়ে বেঁড়ে ব্যাটাকে ধর” মানসিকতাই প্রকট।

সোশাল মিডিয়ার কুপ্রভাব নিয়ে অনেক কথা বলা যায়, অনেকেই আজকাল প্রভাবগুলো সম্পর্কে সচেতন, ফলে সচেতনভাবে সোশাল মিডিয়া থেকে দূরে থাকার চেষ্টা করেন। কিন্তু সাধারণ মানুষ কী নিয়ে চিন্তাভাবনা করছে তা বোঝার জন্য সোশাল মিডিয়া গুরুত্ব আজ অস্বীকার করা যায় না। ফলে সোশাল মিডিয়ায় যা নিয়ে আলোচনা হচ্ছে তাকেও “ওটা ভার্চুয়াল দুনিয়া” বলে অগ্রাহ্য করার উপায় নেই। সোশাল মিডিয়ার সামাজিক, রাজনৈতিক প্রভাব এখন আর গোপন নেই এবং অন্ধ হলে প্রলয় বন্ধ থাকে না।

হজরত মহম্মদের বিরুদ্ধে নূপুর শর্মা আর নবীন জিন্দালের বক্তব্য এবং তা নিয়ে জায়গায় জায়গায় উত্তেজনা, ভাংচুর থিতিয়ে গেছে। বাঙালি ভদ্রসমাজের বুলডোজারের ব্যাপারে চোখ বুজে থেকে “ওরা এত অসহিষ্ণু কেন” পোস্ট করাও বন্ধ হয়ে গেছে। বর্ষা চলে এল অথচ স্কুলে গরমের ছুটি কেন বাড়িয়ে দেওয়া হল, তা নিয়ে কিছু চুটকি আর কয়েকটা মিম ছাড়া রাজ্য সরকারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের ঢেউ নেই ফেসবুকের দেয়ালে দেয়ালে। মাসের পর মাস স্কুল বন্ধ রাখাকে রাজনৈতিক ইস্যু করে বিরোধী দলগুলো কেন রাজ্যব্যাপী রাস্তায় নেমে আন্দোলন করছে না, সে প্রশ্নও বড় একটা কেউ তুলছেন না। দিল্লিতে গত কয়েকদিন ধরে দেশের অন্যতম বিরোধী দল কংগ্রেসের প্রধানতম নেতা রাহুল গান্ধীকে এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেটের অফিসে ডেকে পাঠিয়ে ঘন্টার পর ঘন্টা কী যে জেরা করা হচ্ছে কেউ জানে না। কংগ্রেসের অফিসে ঢুকে পড়ছে দিল্লি পুলিস, নেতা কর্মীদের নানা ছুতোয় শারীরিক নিগ্রহ করা হচ্ছে। ভারতীয় গণতন্ত্রে জরুরি অবস্থার সময়টা বাদ দিলে এরকম ঘটনা খুব বেশি পাওয়া যাবে না। ভয়ানক বিপজ্জনক দৃষ্টান্ত তৈরি হচ্ছে। তা নিয়েও গণতন্ত্রপ্রিয় বাঙালির ফেসবুকে বিশেষ উচ্চবাচ্য নেই। অথচ ইংরেজিতে ফেল করে প্রতিবাদী হয়ে ওঠা একটি মেয়েকে কেন সাংবাদিক আমব্রেলা বানান জিজ্ঞেস করল, তা নিয়ে পোস্ট আর ফুরোচ্ছেই না।

আমাদের রাজ্যে, বিশেষত কলকাতায়, নানা দাবিতে নিয়মিত মিছিল মিটিং হয়ে থাকে (অনেক ভদ্রজনের তাতে বিষম আপত্তি থাকে চিরকালই)। সেইসব আন্দোলনে সাংবাদিকদের যেতে হয় খবর সংগ্রহে। সেখানে গিয়ে আন্দোলনকারীদের সাথে কথা বলেন, জিজ্ঞেস করেন কী কী দাবি নিয়ে আন্দোলন, সেই দাবির সপক্ষে যুক্তিগুলো কী কী। অনেকসময় তা করেন না, কেবল অকুস্থল থেকে নিজের (অধিকাংশ ক্ষেত্রে আসলে চ্যানেলের বা কাগজের) মতামত দর্শককে/পাঠককে গিলিয়ে দেন। সেটা বরং অন্যায়, আন্দোলনকারীর থেকে তাঁদের দাবির ব্যাখ্যা চাওয়া মোটেই অন্যায় নয়। এক্ষেত্রে সাংবাদিক সেই কাজটাই করছিলেন। যে বলে তাকে অন্যায়ভাবে ইংরেজিতে ফেল করানো হয়েছে, তার যোগ্যতার প্রমাণ চাওয়া আদপেই অন্যায় নয়। নইলে এরপর কৃষক আন্দোলন হলে প্রশ্ন করা যাবে না, কোথা থেকে এসেছেন? আপনার কত বিঘা জমি আছে? সেখানে কী চাষ করেন? নতুন কৃষি আইন নিয়ে আপত্তি করছেন কেন? সরকারকে বিশ্বাস করতে অসুবিধা কোথায়? প্রশ্নগুলো করার উদ্দেশ্য আন্দোলন সম্পর্কে তথ্য বের করে আনা। উত্তরে আন্দোলনকারীরা যা বলেন, তা তাঁদের বিরুদ্ধে গেল কিনা তা দেখা কিন্তু সাংবাদিকের কাজ নয়। সাধারণত যদি যা করছেন সে সম্পর্কে আন্দোলনকারীর সম্যক ধারণা থাকে, যদি ইস্যুগুলো সত্যিকারের ইস্যু হয়, তাহলে এমন কিছু বলে ফেলেন না যাতে আন্দোলন লোকের চোখে হাস্যকর হয়ে যায়। তবে হাস্যকর কারণে আন্দোলন করলে উত্তর তো হাস্যকরই হবে।

দাঁড়ান, দাঁড়ান। ক্ষেপে উঠবেন না। কী বলবেন জানি। এক্ষুনি বলবেন, যেভাবে ওই মেয়েটিকে প্রশ্ন করা হয়েছে সেইভাবে সরকারকে প্রশ্ন করতে পারে না? এই দেখুন, বনলতা সেনগিরি হয়ে গেল। সরকারকে যে সংবাদমাধ্যম কড়া কড়া প্রশ্ন করে না তা নিঃসন্দেহে অন্যায়। কিন্তু সেটা পারে না বলে আর কাউকেই কোনো প্রশ্ন করতে পারবে না? এ-ও তো সংবাদমাধ্যমের কণ্ঠরোধ করতে চাওয়াই হল একরকম। তার মানে মমতা ব্যানার্জি বা নরেন্দ্র মোদীর মত আপনিও চান, সংবাদমাধ্যম একমাত্র আপনার পছন্দের প্রশ্নগুলোই করুক। এমন প্রশ্ন যেন না করে যাতে উত্তরদাতা অস্বস্তিতে পড়ে যায়।

পশ্চিমবঙ্গে তথা ভারতবর্ষে আজকাল নানা অভূতপূর্ব ঘটনা ঘটে। একটা ঘটনা প্রায় রোজই ঘটে। সেটা হল কোনো ইস্যুতে যার দায় সবচেয়ে বেশি, তাকে বাদ দিয়ে আর সকলকে আক্রমণ করা। যেমন ধরুন আজকের বেহাল অর্থনীতির জন্য মনমোহন সিংকে আক্রমণ করা, চীন লাদাখে একের পর এক এলাকা দখল করে নিচ্ছে বলে জওহরলাল নেহরুকে আক্রমণ করা, দেশে চাকরি-বাকরি নেই বলে মোগলদের আক্রমণ করা। এগুলো একরকম। আরেকরকম হল এসএসসি নিয়োগে দুর্নীতি নিয়ে সিবিআই তদন্ত হচ্ছে বলে সিপিএমকে আক্রমণ করা, কেকের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে বলে রূপঙ্কর বাগচীকে আক্রমণ করা, বগটুই কাণ্ড নিয়ে রাজ্য সরকারের চেয়ে বিখ্যাতদের বেশি আক্রমণ করা। এক্ষেত্রেও দেখছি সেই ব্যাপার ঘটছে। সাংবাদিক নয়, অভিযোগের আঙুল ওঠা উচিত ছিল শিক্ষাব্যবস্থার দিকে। প্রশ্ন ওঠা উচিত ছিল, সামান্য আমব্রেলা বানান না জেনে ওই মেয়েটি যে ক্লাস টুয়েলভ পর্যন্ত চলে এসেছে সে দায় কার? শিক্ষাব্যবস্থার এমন দুর্দশা হল কী করে? যাঁরা ওই মেয়েটিকে এবং তার সহপাঠীদের ইংরেজি পড়িয়েছেন ছোট থেকে, তাঁরা কেমন শিক্ষক? শিক্ষকদের দিক থেকে এ প্রশ্নের একটা সম্ভাব্য উত্তর – ক্লাস এইট পর্যন্ত পাস-ফেল তুলে দেওয়া হয়েছে। যে কিছুই শিখতে পারেনি তাকে যে আরও এক বছর একই ক্লাসে রেখে দিয়ে শেখাব, তার অবকাশ কোথায়? কথাটা ভেবে দেখার মত। ভাবলে এইট অব্দি পাস-ফেল তুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করা উচিত কিনা সেই আলোচনায় যেতে হবে। চুটকি, মিম, গালাগালি দিয়ে সে আলোচনা চলবে না। সাংবাদিককেও সে আলোচনার চাঁদমারি করা যাবে না।

আরও যে প্রশ্ন ওঠা উচিত ছিল, তা প্রাইভেট টিউশন নিয়ে। দেশের আর কোনো রাজ্যের শিক্ষার্থীরা এত বেশি টিউশনের উপর নির্ভরশীল নয়। ২০২১ সালের Annual Status of Education Report (ASER) অনুযায়ী, আমাদের রাজ্যে ৭৬% ছাত্রছাত্রী প্রাইভেট টিউশনের উপর নির্ভর করে, যা গোটা দেশের গড়ের চেয়ে অনেক বেশি। গত শতাব্দীর আশি, নব্বইয়ের দশক থেকে এ রাজ্যে প্রাইভেট টিউশন এক সমান্তরাল শিক্ষাব্যবস্থা হয়ে উঠেছে। সেই ব্যবস্থা কীভাবে মূল শিক্ষাব্যবস্থার কোমর ভেঙে দিল তার কোনো দীর্ঘমেয়াদি বা স্বল্পমেয়াদি মূল্যায়ন আজ অব্দি হয়নি। অথচ সকলেরই জানা আছে, প্রাইভেট টিউশনের রমরমায় কতরকম নৈতিক ও আইনগত দুর্নীতি শিক্ষাজগতে প্রবেশ করেছে। বাড়িতে টোল খুলে প্রবল পরিশ্রম করে মাস্টারমশাই স্কুলে গিয়ে ঝিমোচ্ছেন – এ দৃশ্য আমাদের ছাত্রাবস্থাতেই বিরল ছিল না। স্কুলের পরীক্ষায় কঠিন প্রশ্ন করে ছেলেমেয়েদের কম নম্বর পাইয়ে দিয়ে অভিভাবকদের নিরুপায় করে দেওয়া হয়েছে। তিনি স্কুলে এসে শিক্ষককে জিজ্ঞেস করেছেন কী করলে সন্তান ওই বিষয়ে উন্নতি করতে পারবে। উত্তরে বলা হয়েছে, আমার কাছে পড়তে পাঠিয়ে দেবেন। এমন ঘটনাও দেখেছি। এ তো গেল স্কুল স্তরের দুর্নীতি। বৃহত্তর ক্ষেত্রে কোচিং সেন্টারের মাধ্যমে বোর্ডের পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁসের ইতিহাসও আছে। সত্যদার কোচিংয়ের কথা সকলেই ভুলে যাননি আশা করি। তা স্কুল আর টিউশন – দুটো জায়গায় পড়াশোনা করেও আমাদের ছেলেমেয়েরা আমব্রেলা বানানটুকুও শিখে উঠতে পারছে না?

আরও পড়ুন প্রখর তপন তাপে পশ্চিমবঙ্গে শিক্ষাব্যবস্থা কাঁপে

ভেবে দেখুন, এতগুলো প্রশ্ন করার পরিসর তৈরি হল ওই সাংবাদিক আপনার অপছন্দের প্রশ্নটা করেছিলেন বলে, এবং এই প্রশ্নগুলো করা উচিত শিক্ষাব্যবস্থা যাঁরা চালান তাঁদের। তা না করে আপনি সাংবাদিকটি কত অযোগ্য তা প্রমাণ করতে উঠে পড়ে লেগেছেন। না হয় মেনে নেওয়া গেল, সাংবাদিক অযোগ্য। তাতে কী? আপনি আত্মপ্রসাদ লাভ করতে পারেন, পশ্চিমবঙ্গের শিক্ষাব্যবস্থার কোনো লাভ হবে কী?

শিক্ষক, অধ্যাপক, শিক্ষা নিয়ে গবেষণারত মানুষজন, ডাক্তার, উকিল নির্বিশেষে মানুষ যেভাবে ফেল করে পাস করিয়ে দেওয়ার আন্দোলনে ব্রতীদের পাশে দাঁড়িয়ে সাংবাদিক খেদাতে নেমেছেন তাতে রাজ্যের ছেলেমেয়েদের ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তা বাড়ে বই কমে না। কোনো সন্দেহ নেই যে এক-আধবার ফেল করা মানেই জীবন শেষ হয়ে যাওয়া নয়। বস্তুত পরীক্ষায় ভাল নম্বর, খারাপ নম্বর সবকিছুর প্রমাণ নয়। ইংরেজিতে কত নম্বর পেলাম তা দিয়ে যে সবকিছু প্রমাণ হয় না তা-ও ঠিক। পৃথিবীতে কত লোক তো আদৌ লেখাপড়াই করে না, পরীক্ষা দেয় না। তারা কি ফেলনা নাকি? কিন্তু মুশকিল হল, ফেল করলে পাস করিয়ে দেওয়ার দাবিতে পথ অবরোধ করব – এই মানসিকতাকে প্রশ্রয় দিলে সমূহ বিপদ। তাহলে স্কুল, কলেজ থেকে পরীক্ষা ব্যবস্থা তুলে দিলেই তো হয়। আহা বাছা, ফেল করেছ তো কী হয়েছে? তোমার দোষ নয়, দুনিয়ার আর সক্কলের দোষ – এই বলে যদি কারোর পাশে দাঁড়ানো হয়, তাহলে আর সে নিজেকে শুধরে নিয়ে পাস করার চেষ্টা করবে কেন? পাস করা যে প্রয়োজন, এটা অন্তত মানেন তো নাকি? না রবীন্দ্রনাথের উদাহরণ টেনে বলবেন, পাস না করলেই বা কী? তা বলতেই পারেন, তবে মনে রাখবেন, অনেকেই দেবেন্দ্রনাথের মত বিত্তশালী, প্রভাবশালী অভিভাবক নয়। ফলে তাদের ছেলেমেয়েদের পরীক্ষায় পাস করে সার্টিফিকেট, ডিগ্রি ইত্যাদি পাওয়ার প্রয়োজন আছে। যাদের পাশে দাঁড়াচ্ছেন তাদেরও দরকার আছে। নইলে রাস্তা অবরোধ করত না।

আসলে রাজ্যের শিক্ষাব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা তলানিতে এসে ঠেকেছে। এমনিতেই ছাত্র-শিক্ষকের সম্পর্ক প্রাইভেট টিউশনের কল্যাণে এবং বিশ্বায়নের গুণে ক্রেতা-বিক্রেতার সম্পর্কে পরিণত হয়েছিল আগেই, এখন আবার শিক্ষার্থী এবং তাদের অভিভাবকরা দেখে ফেলেছে যে বহু শিক্ষক পরীক্ষা না দিয়ে বা সাদা খাতা জমা দিয়ে, স্রেফ ঘুষ দিয়ে মাস্টার হয়েছে। উপরন্তু বাঙালি ভদ্রসমাজের নীতিবোধে আমূল পরিবর্তন এসেছে। যে ছেলে হল ম্যানেজের কথা বাবা-মা জানতে পারলে কী বলবে তা নিয়ে ভয়ে থাকত, সে এখন বাবা হয়ে ছেলেমেয়ের স্কুলে দাবি জানাচ্ছে অতিমারী কেটে গিয়ে থাকলেও পরীক্ষাটা অনলাইনেই হোক। কেন এই দাবি তা বলে দেওয়ার দরকার নেই। মাস্টারমশাই, দিদিমণিরা সোশাল মিডিয়ায় এবং তার বাইরে খাতা দেখার যেসব অভিজ্ঞতা বিবৃত করছেন সেগুলো খেয়াল করলেই বোঝা যাবে।

পশ্চিমবঙ্গে ছাত্র রাজনীতির সুপ্রাচীন ইতিহাস রয়েছে। ছাত্রছাত্রীরা নিজেদের কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন ইস্যু থেকে শুরু করে জাতীয়, আন্তর্জাতিক রাজনীতির ইস্যু নিয়েও আন্দোলন করে থাকে। কিন্তু কদিন আগে দেখা গেল আরও এক অভূতপূর্ব ঘটনা। কিছু বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রী আন্দোলন করল অফলাইন পরীক্ষা দেবে না বলে। তাদের অন্যতম যুক্তি ছিল, সিলেবাস শেষ করানো হয়নি। সেক্ষেত্রে পরীক্ষাই বাতিল হোক দাবি করলেও না হয় কথা ছিল। কিন্তু তারা পরীক্ষা দিতে রাজি, শুধু বাড়িতে বসে পরীক্ষা দেওয়ার স্বাধীনতা চায়। এই দাবির কারণ কি ব্যাখ্যা করার প্রয়োজন আছে? এরা তবু কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রী। বাবা-মা এদের মতামত নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন না। কিন্তু সদ্য স্কুল ছাড়তে অকৃতকার্য ছেলেমেয়েরা যে বাবা-মায়েদের সম্মতি ছাড়া রাস্তা অবরোধ করার সাহস পেত না, তা বলাই বাহুল্য। অনেক বাবা-মাকে তো সগর্বে ক্যামেরার সামনে বাইট দিতেও দেখা যাচ্ছে। একজন যেমন বলেছেন, যারা মোবাইলে বাংলায় মেসেজ করে তারা ইংরেজিতে পাস করে গেল আর তাঁর মেয়ে ইংরেজিতে মেসেজ করেও পাস করতে পারল না – এ অসম্ভব।

এই পরিস্থিতি হেসে উড়িয়ে দেওয়ার মত নয়। রিচার্ড ফাইনম্যান ইংরেজিতে খারাপ ছিলেন, অ্যালবার্ট আইনস্টাইন স্কুলজীবনে অঙ্কে দুর্বল ছিলেন – এইসব আবোল তাবোল কথা বলে এদের পাশে দাঁড়ালে সাড়ে সর্বনাশ। এই অকৃতকার্য শিক্ষার্থী এবং তাদের অভিভাবকদের প্রতিক্রিয়া থেকে এক হাড় হিম করা সত্য বেরিয়ে আসছে। তা হল পড়াশোনা এবং পরীক্ষা ব্যবস্থার সংজ্ঞাগুলোই একেবারে উল্টে গেছে এই রাজ্যে। যেনতেনপ্রকারেণ নম্বর পেলেই হয় এবং নম্বর দেওয়া শিক্ষকদের কর্তব্য – এমন ধারণা সমাজের গভীরে প্রোথিত হয়েছে। আমরা সম্ভবত গণটোকাটুকির যুগে ফেরত যেতে চলেছি। এবার আর রাজনৈতিক অশান্তির কারণে নয়, সামাজিক সম্মতিপূর্বক।

২০১৫ সালে বিহারের একটা ছবি সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছিল। আমেরিকার দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট, ইংল্যান্ডের দি ইন্ডিপেন্ডেন্ট প্রভৃতি বিশ্বখ্যাত কাগজ এ নিয়ে দীর্ঘ প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল। ছবিটা এরকম – পরীক্ষা হচ্ছে একটা স্কুলে, আর পরীক্ষার্থীদের বাবা-মায়েরা দেয়াল বেয়ে উঠে জানলা দিয়ে পরীক্ষার্থীদের সাহায্য করছেন। আগামীদিনে পশ্চিমবঙ্গে এরকম কিছু দেখা গেলে অবাক হবেন না। দয়া করে তখন আলোকচিত্রীকে গাল দেবেন না – এইটুকু অনুরোধ। তিনি সাংবাদিক, তাঁর কাজই ওই।

https://nagorik.net/ এ প্রকাশিত

বিজেপি মুখপাত্র বিতাড়ন: হিন্দুত্বের টাইম আউট, খেলা শেষ নয়

উত্তরপ্রদেশের বাদাউনের যুবক রেহান শাহের গত কয়েকদিন ধরে বারবার খিঁচুনি ধরছে। বেশ কিছুদিন বুলন্দশহর হাসপাতালে ভর্তি থাকার পর গত শনিবার (৪ জুন) বাড়ি এসেছেন। তাঁর পরিবারের অভিযোগ, রেহানের এই অবস্থার কারণ পুলিসি হেফাজতে অকথ্য অত্যাচার। গত ২ মে তাঁকে কাকরালা পুলিস আউটপোস্টে নিয়ে যাওয়া হয়, প্রচণ্ড মারধোর করা হয়, ইলেকট্রিক শক দেওয়া হয় এবং গুহ্যদ্বারে প্লাস্টিকের পাইপ ঢুকিয়ে দেওয়া হয়। ঘটনাটা মাসখানেক আগের হলেও প্রকাশ্যে এসেছে হপ্তাখানেক হল, কারণ রেহানের পরিবারের বক্তব্য, দোষী পুলিসকর্মীরা তাঁদের হুমকি দিয়েছিলেন যে এ নিয়ে মুখ খুললে ফল ভাল হবে না। রেহানের মা নাজমা শাহ শেষপর্যন্ত মরিয়া হয়ে বাদাউনের এসপি ডঃ ওমপ্রকাশ সিংয়ের কাছে অভিযোগ দায়ের করেন। প্রাথমিক তদন্তের পর দাতাগঞ্জের সার্কল অফিসার প্রেমকুমার থাপার সিদ্ধান্ত, রেহানের পরিবার যা বলছে তা সত্যি। ফলে পাঁচ পুলিসকর্মীর বিরুদ্ধে এফআইআর হয়েছে।

এমন নয় যে এ দেশে পুলিস হেফাজতে অত্যাচারের এটাই প্রথম ঘটনা। স্মরণকালে সবচেয়ে বেশি হইচই হয়েছিল যে ঘটনা নিয়ে, তা হল ২০২০ সালে তামিলনাড়ুর শান্তাকুলমে ব্যবসায়ী পি জয়রাজ আর তাঁর ছেলে বেনিক্সের লক আপে মারধোর ও ধর্ষণ এবং তার ফলে মৃত্যু। তামিলনাড়ু পুলিস থার্ড ডিগ্রির জন্য কুখ্যাত, যা বহু আলোচিত জয় ভীম ছবিতেও দেখানো হয়েছে। এ বছরের এপ্রিল মাসেও চেন্নাইতে পুলিস হেফাজতে মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। তবে ভারতের প্রায় কোনো বড় রাজ্যই পুলিস হেফাজতে বা বিচারবিভাগীয় হেফাজতে অত্যাচার ও মৃত্যুর তালিকায় বাদ নেই। বস্তুত, উত্তরপ্রদেশ ২০২১-২২ সালে বিচারবিভাগীয় হেফাজতে মৃত্যুর তালিকায় একেবারে শীর্ষে (৪৪৮) কিন্তু রেহানকে পুলিস যে কারণে জিজ্ঞাসাবাদ করতে নিয়ে গিয়েছিল, তার জন্যই এ ঘটনা আলাদা করে উল্লেখযোগ্য। পুলিস বলেছে উনি নাকি গোহত্যায় জড়িত। শেষপর্যন্ত তাঁর অপরাধের কোনো প্রমাণ না পেয়ে তাঁকে ছেড়ে দেওয়া হয়, যদিও রেহানের পরিবার বলেছে ৫০০০ টাকা ঘুষ দিয়ে তাঁকে ছাড়িয়ে আনতে হয়েছিল। উত্তরপ্রদেশ তথা সারা ভারতে গত কয়েক বছরে গোহত্যার ‘অপরাধে’ কত ইসলাম ধর্মাবলম্বীকে স্রেফ পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে আমরা জানি। এরকম একটা ঘটনা সামলাতে গিয়ে উন্মত্ত জনতার হাতে বুলন্দশহরের পুলিস অফিসার সুবোধ সিং পর্যন্ত খুন হয়েছিলেন। উপরন্তু উত্তরপ্রদেশে বুলডোজারতন্ত্র চলছে। আইনকানুনের তোয়াক্কা না করে হিংসায় অভিযুক্ত সংখ্যালঘুদের বাড়ি ভেঙে দেওয়ার যে প্রক্রিয়া বিজেপিশাসিত রাজ্যগুলোতে শুরু হয়েছে, উত্তরপ্রদেশ তাতেও প্রথম সারিতে রয়েছে। ভারত এমন এক দেশ হয়ে দাঁড়িয়েছে, যেখানে মধ্যপ্রদেশের ৬৫ বছরের বৃদ্ধ ভওরলাল জৈনকে মরতে হয় কারণ এক বিজেপি কর্মীর সন্দেহ হয়েছিল, তিনি মুসলমান। সুতরাং রেহানের দুর্দশার আসল কারণ যে তাঁর ধর্মীয় পরিচয়, তা পরিষ্কার।

কিন্তু সৌদি আরব, কুয়েত, কাতার, ইন্দোনেশিয়া, মালদ্বীপ, মালয়েশিয়া, সংযুক্ত আরব আমিরশাহী বা ইরান ভারতজুড়ে গত কয়েক বছর ধরে রেহানের মত ইসলাম ধর্মাবলম্বী সাধারণ মানুষের উপর যে আক্রমণ চলছে প্রশাসনের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ মদতে – তার কোনো প্রতিবাদ করেনি। এমনকি স্পষ্ট ধর্মীয় বৈষম্যমূলক নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন যখন পাস হয়েছিল, তখনো এই দেশগুলো টুঁ শব্দটি করেনি। হইহই করে উঠেছে কখন? যখন সরকারি দল বিজেপির দুই মুখপাত্র নূপুর শর্মা আর নবীন জিন্দাল হজরত মহম্মদ সম্পর্কে কটূক্তি করেছেন। স্পষ্টত, সাধারণ মুসলমানের বাঁচা মরা নিয়ে ওই দেশগুলো ভাবিত নয়। তারা বিশ্বাসের মর্যাদা রক্ষায় আগ্রহী, বিশ্বাসীদের প্রাণরক্ষায় আগ্রহী নয়। যুক্তি দিয়ে বিচার করলে এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। মুসলমানরা মুসলমান ছাড়া কাউকে চেনে না, ওরা সব এক, ওদের উদ্দেশ্য বিশ্বজুড়ে ইসলামিক স্টেট তৈরি করা – এই তত্ত্বে যাদের মাথা ঘুরেছে তাদের কথা আলাদা, কিন্তু সাধারণ বুদ্ধি থাকলেই বোঝা যায় যে পশ্চিমবঙ্গ বা উত্তরপ্রদেশের ছাপোষা মুসলমানের জন্য আরব দেশের আমির ওমরাহের দরদ থাকার কোনো কারণ নেই। চীনের উইঘুর মুসলমান বাঁচল কি মরল তাতে যে আরব হোমরা চোমরাদের কিছু এসে যায় না, তা আগেই দেখা গেছে। এমনকি প্যালেস্তাইনের উপর আমেরিকার মদতপুষ্ট ইজরায়েলের হানাদারি নিয়েও আমেরিকার মিত্র সৌদি আরব কখনো মুখ খোলে না। এমনকি ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধেও মুসলিম দুনিয়া দ্বিধাবিভক্ত। অতিসরল শিয়া-সুন্নি বিভাজন তো আছেই, তা বাদেও নানা ভূ-রাজনৈতিক জটিল অঙ্ক আছে। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে যে কোনো দুটো দেশ বা দুটো গোষ্ঠীর দেশের মধ্যেই তা থাকে, দেশগুলোর সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ যে ধর্মেরই হোক, দেশটায় গণতন্ত্র বা রাজতন্ত্র – যা-ই চলুক।

কয়েকজন নেহাত মরণশীল ধর্মীয় এবং রাজনৈতিক নেতা রক্ষা না করলে মর্যাদাহানি হবে, হজরত মহম্মদ বা ইসলাম ধর্ম নিশ্চয়ই এত ঠুনকো নয়। হলেও সে জন্যে কাউকে খুনের হুমকি দেওয়া চলে না, যা অনেকে নূপুর আর নবীনকে দিচ্ছে বলে অভিযোগ। কিন্তু বাকস্বাধীনতার নামে মিথ্যার উপর ভর দিয়ে কুৎসা এবং ঘৃণা ছড়ানো যে চিরকাল চলতে পারে না – সে কথা শেষপর্যন্ত আরব দেশগুলোর ধমকানিতে বিজেপি সরকারকে ঢোঁক গিলে মানতে হল। ফরাসি কার্টুন পত্রিকা শার্লি এবদো কার্টুনের মাধ্যমে নিজেদের মতামত প্রকাশ করে, তাদের বক্তব্য তারা মুসলমানবিদ্বেষী নয়। কিন্তু ইসলাম বা অন্য যে কোনো আদর্শকে নিয়ে ব্যঙ্গ করা তাদের বাকস্বাধীনতা। অন্তত তাত্ত্বিকভাবে এ কথায় ভুল নেই। ইসলাম, হিন্দুধর্ম, খ্রিস্টধর্ম, জুডাইজম – যে কোনো ধর্মকে নিয়েই ব্যঙ্গ করার অধিকার সকলের আছে, অন্তত থাকা উচিত। শুধু ধর্মই বা কেন? গান্ধীবাদ, মার্কসবাদ বা হিন্দুত্ববাদ নিয়েও ব্যঙ্গ করা চলে, করা হয়ও। কিন্তু নূপুরদেবী কোনো আদর্শকে ব্যঙ্গ করেননি, গলার জোরে অর্ধসত্য উচ্চারণ করে ইসলাম ধর্মের প্রতিষ্ঠাতাকে হেয় করেছেন। ষষ্ঠ শতাব্দীর একজন পুরুষের স্ত্রীর সঙ্গে বয়সের পার্থক্যের কারণে যদি তাঁকে যে কোনো বিশেষণে ভূষিত করা চলে, তাহলে ভারতে প্যান্ডোরার বাক্স খুলে যাবে। শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসের সঙ্গে সারদামণির বয়সের তফাতও কম নয়, তাঁদের বিয়ের সময় সারদা নিতান্তই শিশু ছিলেন। অথচ তাঁরা হজরত মহম্মদের প্রায় বারোশো বছর পরের মানুষ। উপরন্তু এ দেশের কুলীন ব্রাহ্মণরা বিয়েকে রীতিমত লাভজনক ব্যবসা করে তুলে মনের সুখে ছোট ছোট মেয়েদের বিয়ে করে বেড়াতেন শ দেড়েক বছর আগেও। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর নামক এক অতি দুর্বিনীত পণ্ডিত এ দেশে না জন্মালে সে ব্যবসা বহাল তবিয়তে আরও কতদিন চলত বলা মুশকিল।

দুঃখের বিষয়, ২০২১ সালে ইউনিসেফ প্রকাশিত এক সমীক্ষা বলছে পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়ের বিয়ে এখনো ভারতেই হয়। প্রত্যেক বছর প্রায় ১.৫ মিলিয়ন ১৮ বছরের কমবয়সী মেয়ের বিয়ে হয়ে যায় এ দেশে। ২০১৬ সালে ইন্ডিয়াস্পেন্ড জনগণনা থেকে প্রাপ্ত তথ্য বিশ্লেষণ করে যে সমীক্ষা করেছিল, যদি ইউনিসেফের সমীক্ষার সঙ্গে তা মিলিয়ে পড়েন তাহলে মাথা ঘুরে যাবে। ওই সমীক্ষা বলেছিল, প্রায় ১২ মিলিয়ন ভারতীয় শিশুর ১০ বছর বয়স হওয়ার আগেই বিয়ে হয়ে যায়। তাদের মধ্যে ৮৪% হিন্দু আর ১১% মুসলমান। এই শিশুদের ৬৫% মেয়ে। অতএব বিয়েশাদি নিয়ে কথা না বাড়ানোই ভাল। এই ধর্ম গোঁড়া, ওই ধর্ম উদার – এসব কথাও ধোপে টেকে না। ধর্মকে ধর্মের জায়গায় থাকতে দিয়ে কী করে দেশটা চালানো যায় তাতে মন দিলেই যে সরকারকে অপ্রস্তুতে পড়তে হয় না, এইটুকু সরকার এবং তার সমর্থকরা বুঝলেই যথেষ্ট হয়।

আরও পড়ুন আরএসএসের পছন্দসই অগভীর বিরোধিতার মুখ বাবুল, শত্রুঘ্ন

অবশ্য সে কথা মোদী, অমিত শাহরা বোঝেন না বললে তাঁদের বুদ্ধিসুদ্ধিকে ছোট করা হয়। সমস্যা হল ধর্মীয় জিগির বাদ দিয়ে কী করে রাজনীতি করতে হয় বা সরকার চালাতে হয় তা আজ নতুন করে শিখতে হলে বিজেপি মহা ফাঁপরে পড়বে। সঙ্ঘের একশো বছরের শিক্ষা তাহলে বাতিল করতে হয়, বেহাল অর্থনীতির হাল কী করে ফেরানো যায় তা নিয়ে ভাবনাচিন্তা করতে হয়। সেসব করবে কে? অরবিন্দ পনগরিয়া বা জগদীশ ভগবতীর মত যেসব দক্ষিণপন্থী অর্থনীতিবিদ প্রথম থেকে প্রবল উৎসাহে বিজেপি সরকারের প্রতিটি নীতির সমর্থনে তত্ত্ব খাড়া করতেন, তাঁরাও বেশ কিছুদিন হল নীরব হয়ে গেছেন। ইতিহাসের ছাত্র শক্তিকান্ত দাসকে দিয়ে রিজার্ভ ব্যাঙ্ক চালাতে হচ্ছে। এমন একজনকে অর্থমন্ত্রী করা হয়েছে, যিনি পেঁয়াজের দাম বাড়ার সমস্যা নিয়ে অভিযোগ করলে বলেন “আমি তো পেঁয়াজ খাই না, তাই জানি না।” এমন একজনকে বিদেশমন্ত্রী করা হয়েছে, যিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ভারতের সমালোচনা করলে নির্বোধের মত বলেন “ভোটব্যাঙ্ক পলিটিক্স করছে”। যেন জো বাইডেন ২০২৪ সালে বারাণসীতে মোদীর বিরুদ্ধে প্রার্থী হবেন। এমতাবস্থায় তাজমহল, জ্ঞানবাপী, কুতুব মিনার – সর্বত্র মন্দির প্রতিষ্ঠা করা ছাড়া বিজেপি অন্য কী রাজনীতি করবে? কিন্তু তাদের এই মুহূর্তে যতই অপরাজেয় মনে হোক, রাজনৈতিক বিরোধীরা যতই ক্ষুদ্র স্বার্থে অন্তর্কলহ বা অকারণ রোম্যান্টিকতায় মগ্ন থাকুন না কেন, এই রাজনীতি যে ক্রমশ হিন্দুত্ববাদীদেরও বড় বিপদের দিকে ঠেলে দিচ্ছে, সম্ভবত রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘ তা আন্দাজ করছে। সেই কারণেই সঙ্ঘচালক মোহন ভাগবত সম্প্রতি বলেছেন, সব মসজিদের তলায় শিবলিঙ্গ খুঁজতে যাওয়ার দরকার নেই। সেই অটলবিহারী বাজপেয়ীর আমল থেকে দেখা যেত আরএসএস বা বিশ্ব হিন্দু পরিষদের লোকেরা সবচেয়ে উগ্র মন্তব্যগুলো করেন, বিজেপি নেতারা তুলনায় নরমপন্থা দেখান। একমাত্র ব্যতিক্রম ছিল গুজরাট ২০০২, যেখানে স্বয়ং মুখ্যমন্ত্রী মোদী গরম গরম বক্তৃতা দিয়েছিলেন। সহসা উলটপুরাণ শুরু হয়েছে। বিজেপি মুখপাত্ররা সরাসরি হজরত মহম্মদকে গাল পাড়ছেন, আর সঙ্ঘের প্রধান বলছেন মারামারিতে কাজ নেই, ইতিহাস কি আর বদলানো যায়?

আসলে সঙ্ঘ বরাবরই মুখেন মারিতং জগৎ। অযোধ্যায় রামমন্দির প্রতিষ্ঠা আর কাশ্মীর থেকে সংবিধানের ৩৭০ নং ধারা প্রত্যাহার তাদের মৌলিক ইস্যুগুলোর মধ্যে পড়ে। প্রথমটা নির্বিঘ্নে মিটে গেলেও দ্বিতীয়টার ফলে কাশ্মীর যে হাতের বাইরে চলে গেছে তা আর লুকনো যাচ্ছে না। বাকি ভারতের হিন্দুদের মুসলমান জুজু দেখানোর জন্য তিরিশ বছরেরও বেশি সময় ধরে যাদের উপেন্দ্রকিশোরের গল্পের কুমিরছানার মত বারবার দেখানো হয়েছে – সেই কাশ্মীরি হিন্দুরা এখন বেঘোরে মারা যাচ্ছে, ‘হিন্দু হৃদয়সম্রাট’ মোদী ঠুঁটো জগন্নাথ হয়ে বসে আছেন। নিজেদের তাঁবে অস্ত্রশিক্ষা দিয়ে বেড়ানো অমুক সেনা, তমুক সেনাকে দিয়ে যে কাশ্মীরে জঙ্গি মোকাবিলা করা যাবে না, তা তাঁরা ভালই বোঝেন। আর হিংসা যে হিংসার জন্ম দেয় তা ভাগবত-মোদী-শাহের চেয়ে ভাল আর কে জানে? কাশ্মীরের জঙ্গিপনা যদি বাকি দেশে ছড়িয়ে পড়ে, তাহলে সামলানো কতটা সম্ভব হবে তা নিয়ে সম্ভবত ওঁরা নিজেরাই এখন সন্দিহান। আরব দুনিয়াকে চটালে কেবল অর্থনৈতিক সমস্যা বাড়বে তা নয়, ইসলামিক মৌলবাদের সমস্যাও বাড়তে পারে। অতএব আপাতত ভালমানুষীর বিকল্প নেই।

নূপুর আর নবীনকে সাসপেন্ড করা যে ভালমানুষীর বেশি কিছু নয়, তা সাদা চোখেই বুঝতে অসুবিধা হওয়ার কথা নয়। কারণ তাঁদের সাসপেন্ড করেছে বিজেপি দল, ভারত সরকার কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। সবকিছু আভ্যন্তরীণ বিষয় বলে চালিয়ে দিয়ে যে বিদেশনীতির ক্ষেত্রে পার পাওয়া যায় না – এটা বুঝতে যেমন দেরি হল, তেমনি দল আর সরকারকে দেশের মানুষ এক বলে মেনে নিলেও অন্য দেশগুলো যে না-ও মানতে পারে, তা কোন মূল্যে বিজেপি সরকার বুঝবে তা গডসেই জানেন। ভারত সরকার যেভাবে চলছে তাতে সবচেয়ে বেশি চিন্তায় থাকা উচিত সেইসব অনাবাসী ভারতীয়দের, যাঁরা বিভিন্ন আরব দেশে থেকে সোনামুখ করে কোনো বহুজাতিক বা আরব মালিকের কোম্পানিতে কাজ করে দু পয়সা কামান আর সোশাল মিডিয়ায় ভারতীয় মুসলমানদের অহোরাত্র গালি দিয়ে ভারত হিন্দুরাষ্ট্র হওয়ার অপেক্ষা করেন। কারণ যদিও ভারতীয় মুসলমানের জন্য ও দেশের আমির, মুফতিদের প্রাণ কাঁদে না; ইসলামকে আক্রমণ করলেই তাঁরা কেমন অগ্নিশর্মা হয়ে যান তা একটা ঘটনায় প্রমাণ হয়ে গেল। এসব চলতে থাকলে ওখানকার হিন্দুদের গলাধাক্কা দিতে ওঁরা বেশি সময় নেবেন না। ওই দেশগুলো তো আর ‘মুসলিম এজেন্ট’ গান্ধী, ‘চরিত্রহীন’ নেহরু আর ‘সোনার চাঁদ’ আম্বেদকরের তৈরি গণতান্ত্রিক সংবিধান মেনে চলে না।

যে ভারতীয় উদারপন্থীরা কদিন “দ্যাখ কেমন লাগে” মেজাজে আছেন, তাঁদেরও নিশ্চিন্ত হওয়ার কারণ নেই। আরব দেশগুলো কী বলবে সেই ভাবনায় বুলডোজার থামবে না, বিনা বিচারে সংখ্যালঘু ও বিরোধীদের আটক করে রাখা বন্ধ হবে না, আম্বানি-আদানির হাতে দেশের সমস্ত সম্পদ তুলে দেওয়াও থমকে যাবে না। কারণ বর্তমান বিশ্বে আন্তর্জাতিক গোষ্ঠী বলে আর কিছু অবশিষ্ট নেই। পরমাণু শক্তিধর দেশগুলো নিজের দেশে এবং আশপাশে যথেচ্ছ অনাচার চালাতে পারে। স্রেফ পারমাণবিক যুদ্ধের ভয়েই অন্য কোনো দেশ কিছু বলবে না। নেহাত কাকতালীয় ঘটনা নয় যে পরমাণু শক্তিধর দেশগুলোতেই দক্ষিণপন্থী স্বৈরাচারী শাসকদের উত্থান হয়েছে; মানবাধিকার, সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা প্রবলভাবে লঙ্ঘিত হচ্ছে। বিশ্বায়নের প্রতিশ্রুতি ছিল পৃথিবীটা ‘গ্লোবাল ভিলেজ’ হবে। আসলে পৃথিবী এখন কয়েকটা কূপমণ্ডূক গ্রামে বিভক্ত, যেখানে নির্বাচনে জিতে আসা অগণতান্ত্রিক মোড়লরাই শেষ কথা। ন্যাটো ভ্লাদিমির পুতিনের হাত থেকে ইউক্রেনকে বাঁচাতে আসেনি, কাল চীন তাইওয়ান আক্রমণ করলে বাইডেন মোটেই বাঁচাতে আসবেন না, এখন যা-ই বলুন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মত কোনো মিত্রপক্ষ বা মুক্তিবাহিনী এসে কাউকে উদ্ধার করবে না। নিজেদের মুক্তির ব্যবস্থা নিজেদেরই করতে হবে।

https://nagorik.net/ এ প্রকাশিত

আকাদেমি সমাচার: সাহিত্য পুরস্কার যার যার, তিরস্কার সবার

সাহেবরা বলে থাকে রোম একদিনে তৈরি হয়নি। মমতা ব্যানার্জিকে নিরলস সাহিত্যচর্চার জন্য পুরস্কার দিয়ে মানুষকে হাসির খোরাক জোগানোও একদিনে হয়নি। একে সাহিত্যের অপমান বা সাহিত্যিকদের অপমান – যা-ই বলুন, ঘটনাটি কিন্তু ধারাবাহিকতা মেনে ঘটানো হয়েছে। ২০১৮ সালকে পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক বিরোধী পক্ষ প্রায়শই ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করেন। কারণ ওই বছর পঞ্চায়েত নির্বাচনে পশ্চিমবঙ্গের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি আসনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় শাসক দলের প্রার্থীরা নির্বাচিত হন। যেভাবে এই কাণ্ড ঘটানো হয় তাতে পশ্চিমবঙ্গে আর গণতন্ত্র অবশিষ্ট ছিল না বলে বিরোধীরা অভিযোগ করে থাকেন। কিন্তু রাজ্যের সাংস্কৃতিক ইতিহাসে যাঁদের আগ্রহ আছে তাঁদের একইসঙ্গে খেয়াল থাকা উচিত, মনোনয়ন পর্বের হিংসা নিয়ে শঙ্খ ঘোষের কবিতা প্রকাশিত হওয়ার পরে তৃণমূলের বীরভূম জেলার নেতা অনুব্রত মণ্ডল কবিকে কোন ভাষায় আক্রমণ করেছিলেন।

“বড় বড় কথা বলছেন কবি? এ কোন কবি? আমরা তো কবি বলতে জানতাম রবীন্দ্রনাথ, নজরুল। এ কোন নতুন কবি উঠে এসেছেন, যে আমার উন্নয়ন নিয়ে কথা বলছেন। কবির নাম শঙ্খ রাখা ঠিক হয়নি, শঙ্খ নামের অপমান করেছেন উনি। এখনও বলছি, রাস্তায় উন্নয়ন দাঁড়িয়ে আছে।”

আনন্দবাজার পত্রিকার ১০ মে ২০১৮ তারিখের সংস্করণে এই প্রতিবেদনের সঙ্গেই ছিল আরেকটি প্রতিবেদন, যেখানে অনুব্রতর আক্রমণ সম্পর্কে পশ্চিমবঙ্গের সংস্কৃতি জগতের বিশিষ্টজনদের মতামত প্রকাশিত হয়েছিল। যাঁরা মত দিয়েছিলেন তাঁদের মধ্যে আছেন পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমির দুই বর্তমান সদস্য – শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় ও জয় গোস্বামী। শিক্ষামন্ত্রী ব্রাত্য বসুর কথা যদি সত্যি হয় (মিথ্যে বলে মনে করার কোনো কারণ ঘটেনি, যেহেতু সে কথার কোনো প্রতিবাদ হয়নি এখনো), তাহলে মমতা ব্যানার্জিকে আকাদেমির সর্বপ্রথম রিট্রিভারশিপ (নাকি সাবভার্সিভ? বলতে গিয়ে ভুল হয়েছে?) পুরস্কার দেওয়ার সিদ্ধান্তে এঁদেরও সম্মতি ছিল। কী বলেছিলেন সেদিন ওই দুজন? শীর্ষেন্দুর বক্তব্য ছিল “এটা রাজনৈতিক চাপানউতোর। আমি যেহেতু রাজনীতি করিনা, তাই এ নিয়ে মন্তব্য করতে পারছি না।” আর জয় বলেছিলেন “পঞ্চাশের দশক থেকে অপ্রতিহত গতিতে কবিতা লিখছেন শঙ্খ ঘোষ। তিনি আকাদেমি পুরস্কার পেয়েছেন। জ্ঞানপীঠ পেয়েছেন। এ রকম একজন সম্পর্কে যদি কেউ এ কথা বলেন, তবে কবিতা সম্পর্কে তাঁর কোনও বক্তব্যে মাথা না ঘামানোই ভাল। তাঁর কোনও কথাকে গুরুত্ব দেওয়াই উচিত নয়।”

অর্থাৎ বাংলার শ্রেষ্ঠ জীবিত কবিকে শাসক দলের একজন পদাধিকারী গুন্ডা ব্যক্তিগত আক্রমণ করলে সেটা শীর্ষেন্দুর কাছে রাজনৈতিক চাপান উতোর। যেন শঙ্খ ঘোষ বিরোধী দলের একজন নেতা, সাহিত্য জগতের কেউ নন। অতএব প্রবীণ সাহিত্যিক শীর্ষেন্দুর এ নিয়ে প্রতিক্রিয়া দেওয়ার দায় নেই। আনন্দবাজার পত্রিকার একটি প্রিয় শব্দ আছে – দলদাস। শব্দটি কোনো অজ্ঞাত কারণে শুধুমাত্র বাম দলের সাথে যুক্ত মানুষজনের জন্যই ব্যবহার করা হয়। নইলে দলদাসত্বের এমন চমৎকার উদাহরণ চোখ এড়াত না। পুরোদস্তুর রাজনৈতিক অবস্থান নিলাম, অথচ বললাম আমি রাজনীতি করি না। ভাষার এমন চাতুর্য একমাত্র শীর্ষেন্দুর মত উচ্চাঙ্গের কথাশিল্পীর পক্ষেই সম্ভব।

জয়ের মন্তব্যটিও অতুলনীয়। শঙ্খ ঘোষের মহানতা কোথায়? প্রথমত, অর্ধ শতকের বেশি কবিতা লেখায়। দ্বিতীয়ত, দুটি বড় বড় পুরস্কার পাওয়ায়। অর্থাৎ যদি পনেরো-বিশ বছর কবিতা লিখছেন, কোনো পুরস্কার পাননি – এমন কবি সম্পর্কে অনুব্রত কথাগুলি বলতেন তাহলে তেমন দোষ হত না। তাছাড়া দোষ হয়েছে বলেও জয় মনে করছিলেন কিনা বোঝার উপায় নেই, কারণ তিনি বলছেন যে লোক কবিতা বোঝে না তার কথায় গুরুত্ব দেওয়ার মানে হয় না। অর্থাৎ কথাগুলি কে বলছে তার কোনো গুরুত্ব নেই। জয় এমন এক স্বপ্নলোকে বিচরণ করেন যেখানে ক্ষমতা নেই, ক্ষমতার বিন্যাস নেই। কেবল দু দল মানুষ আছে – এক দল কবিতা বোঝে, আরেক দল কবিতা বোঝে না। যারা বোঝে না তাদের মধ্যে কে কী বলল তা নিয়ে না ভাবলেই মিটে গেল। অর্থাৎ সেদিন পশ্চিমবঙ্গের গদ্য আর পদ্য সাহিত্যের দুই শক্তিশালী ও প্রভাবশালী শিল্পী অন্য দিকে মুখ ঘুরিয়ে ছিলেন। সাহিত্য যে অতি খেলো ব্যাপার – এ কথা পশ্চিমবঙ্গে সেদিনই প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে।

উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরীর একটি গল্পে ভজহরি নামে এক চাকরের কথা আছে। একদিন বাড়িতে চোর এল, ভজহরি ঠিক করল ব্যাটাকে ধরতে হবে। সে মাথায় শিং বেঁধে, লেজ পরে উঠোনের এক কোণে দাঁড়িয়ে রইল। তার ধারণা চোর তাকে ছাগল মনে করে চুরি করতে আসবে, অমনি সে চোরকে জড়িয়ে ধরবে। চোর এল, ঘরে ঢুকল, ভজহরি নিজের জায়গায় দাঁড়িয়ে শুধু বলল “ম্যা-আ-আ-আ”। চোর সব জিনিসপত্র বার করে এনে নিশ্চিন্তে পুঁটুলি বাঁধল, ভজহরি কেবল আওয়াজ করল “ম্যা-আ-আ-আ”। চোর চুরির মাল নিয়ে আস্তাকুঁড় পেরিয়ে ছুটে পালাল, ভজহরি হেসে খুন। বলল “ব্যাটা কি বোকা, আস্তাকুঁড় মাড়িয়ে গেল, এখন বাড়ি গিয়ে স্নান করতে হবে!” নিজেদের বুদ্ধি সম্পর্কে ভজহরিসুলভ মুগ্ধতায় আকাদেমির সম্মানীয় সদস্যরা নিজেদের, বাংলা আকাদেমির এবং বাংলা সাহিত্যের বিশ্বাসযোগ্যতার বারোটা বাজালেন।

এমনিতে বাঙালি চিরকাল গুণ এবং গুণীর দারুণ কদর করে এসেছে বললে ডাহা মিথ্যা বলা হবে। বাঙালি বরাবরই স্বীকৃতির কাঙাল এবং হুজুগে মাততে পছন্দ করে। রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন বিশ্বভারতী গড়ে তুলতে বাঙালিরা তাঁকে একটি পয়সা দিয়ে সাহায্য করেনি, শুধু মোহিত সেন নামে এক অধ্যাপক এক হাজার টাকা দিয়েছিলেন। অথচ মৃত্যুর পর স্যুভেনির হিসাবে সেই লোকের দাড়ি ছিঁড়ে নিতে হুড়োহুড়ি পড়ে গিয়েছিল। পথের পাঁচালী বিদেশে সম্মানিত না হলে সত্যজিৎ রায়কে নিয়েও আমরা গদগদ হতাম কিনা সন্দেহ। এ বিষয়ে সেরা উদাহরণ অবশ্য মাণিক বন্দ্যোপাধ্যায়। দীপেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর অবিস্মরণীয় রিপোর্টাজে লিখেছেন, মাণিক যখন মারা যাচ্ছিলেন তখন কেউ তাঁর খবর নেয়নি। অথচ মারা যাওয়ার পর ফুলে ফুলে ঢেকে যাওয়ার জোগাড়। সে দৃশ্য নিজে চোখে দেখেছিলেন বলেই বোধহয় সুভাষ মুখোপাধ্যায় লিখেছিলেন, ফুল জমে জমে পাথর হয়। এতকিছু সত্ত্বেও বাঙালি গুণীদের মধ্যে ক্ষমতার প্রসাদ পাওয়ার জন্য এ হেন কাতরতা, যা-ই ঘটুক তা মুখ বুজে মেনে নেওয়ার এমন ব্যগ্রতা নিঃসন্দেহে অভিনব। সুভাষ নিজে বামপন্থী হয়েও বামফ্রন্ট সরকারের পেয়ারের লোক ছিলেন না। মৃত্যুর পর বরং মমতা ব্যানার্জি তাঁকে নিজেদের লোক বলে দাবি করেছিলেন। শঙ্খ ঘোষ কংগ্রেস আমলে তাদের বিরুদ্ধে লিখেছেন, বাম আমলে সিপিএম নেতাদের সাথে সুসম্পর্ক সত্ত্বেও নন্দীগ্রাম কাণ্ডের পর মিছিলে হেঁটেছিলেন। তফাতের মধ্যে তাঁকে দলে টানতে বিমান বসু তাঁর বাড়িতে গিয়েছিলেন, ব্যর্থ হওয়ার পরেও “এ কোন কবি” বলেননি।

অল্পবয়সী, কম বিখ্যাতদের স্বীকৃতির লোভ তবু বোঝা যায়। সারাজীবন পাঠক, সমালোচকদের কাছ থেকে সম্মান পাওয়া এবং গত এক দশকে ফণিভূষণ, মণিভূষণ, বিধুভূষণে ভূষিত কৃতীরা কিসের অনুপ্রেরণায় নিজের সাধনার চরম অসম্মানেও রা কাড়েন না – সে এক রহস্য। কিন্তু সে রহস্য বাদ দিয়েও পশ্চিমবঙ্গে সাহিত্য কোথায় এসে দাঁড়িয়েছে এবং কোন পথে চলেছে তা নিয়ে জরুরি ভিত্তিতে আলোচনা করার পরিস্থিতি তৈরি করে দিল মুখ্যমন্ত্রীকে পুরস্কার প্রদান। নিজেদের অজান্তে এই কাজটি করার জন্য হয়ত পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমিকে ধন্যবাদ দেওয়া যেতে পারে। কারণ বাংলার লেখক, প্রকাশক, পাঠক গড্ডলিকা প্রবাহে গা ভাসাতে বিলক্ষণ ভালবাসেন। নিজেদের দোষত্রুটি নিয়ে ভাবতে কেউ রাজি নন। বাংলা সাহিত্য একদিনে এতটা খেলো হয়নি। এই সুযোগে এ বিষয়ে একটু আলোচনা করা যাক।

রত্না রশিদ বলে এক সাহিত্যিক মুখ্যমন্ত্রীকে পুরস্কার দেওয়ার প্রতিবাদে নিজের পুরস্কার ফিরিয়ে দেবেন বলেছেন। তাতে তৃণমূল কংগ্রেস মুখপাত্র দেবাংশু ভট্টাচার্যের প্রতিক্রিয়ার কাটাছেঁড়া করলেই অনেকগুলি দিক বেরিয়ে আসবে। রত্নাকে ফালতু প্রমাণ করতে দেবাংশুর প্রথম যুক্তি, মমতা ব্যানার্জির বই বেস্টসেলার আর রত্নার বন্ধুবৃত্তেরও নব্বই শতাংশ লোকই তাঁর বইয়ের নাম বলতে পারবে না।

প্রথমত, বাংলার প্রকাশনা জগতের সার্বিক অডিট কে করে? একটি বই কত কপি বিক্রি হলে বেস্টসেলার হয়? আরও বড় প্রশ্ন – বেস্টসেলার মানেই ভাল সাহিত্য, এমনটা কে ঠিক করল? রত্নার বইয়ের নাম কজন জানেন তা দিয়ে কেন ঠিক হবে তিনি কেমন লেখেন? দেবাংশু মমতা ব্যানার্জির দলের লোক, তাই এই পুরস্কার প্রদানের পক্ষ নিয়ে যা পেরেছেন বলেছেন – এই যুক্তিতে তাঁর কথাগুলি উড়িয়ে দেওয়া যাবে না। কারণ বেস্টসেলার মানেই ভাল – এ ধারণায় আজকাল বেশিরভাগ পাঠক ভোগেন। প্রকাশকদের মধ্যেও বেস্টসেলার প্রকাশ করার হুড়োহুড়ি। বিপ্লব করে ফেলার প্রতিশ্রুতি নিয়ে বাজারে নামা অনেক ছোট প্রকাশকও চটজলদি রোজগার এবং প্রকাশনা জগতে নাম করার তাগিদে জনপ্রিয় ফেসবুকারদের প্রচুর লাইক পাওয়া পোস্ট একত্র করে বই প্রকাশ করছেন। বেস্টসেলার বই করার তাগিদে কবিরা নিভৃতে সারস্বত সাধনা করার বদলে ফেসবুকেই পরের পর কবিতা প্রকাশ করছেন। এমনকি সাংবাদিকদের মত ঘটনাভিত্তিক কবিতা লিখছেন। বিখ্যাত মানুষদের জন্মদিনে, মৃত্যুদিনে কবিতা; কেউ মারা গিয়ে শ্মশানে পৌঁছবার আগেই কবিতা। সম্পাদনা রুগ্ন শিল্প হয়ে দাঁড়িয়েছে, যা লেখা হয় সবই প্রকাশযোগ্য বলে বিবেচিত হচ্ছে। ভুল, ঠিক বলে আর কিছু নেই। বিশিষ্ট লেখকদের পুরনো বইয়ের যেসব নতুন সংস্করণ প্রকাশিত হচ্ছে দীর্ঘদিনের প্রকাশনা সংস্থা থেকে, সেগুলিতে নতুন নতুন বানান ভুল, যতিচিহ্নের যথেচ্ছ অন্তর্ধান এবং আবির্ভাব দেখা যাচ্ছে।

এর বিপরীতে ‘যাহা বেস্টসেলার, তাহাই বর্জনীয়’ ব্রিগেডও আছে। কোনো লেখকের বই ভাল বিক্রি হচ্ছে জানলেই তাঁরা নিশ্চিত হয়ে যান ওটি আদৌ সাহিত্য নয়। বেস্টসেলার আর লিটারেচার দুটি পৃথক বস্তু – এমন অভূতপূর্ব তত্ত্বও উঠে আসছে। শতাধিক বছরের শেক্সপিয়র চর্চা এই ফল দিচ্ছে জানলে গিরীশ ঘোষ, উৎপল দত্তরা কী করতেন কে জানে! অর্থাৎ প্রকারান্তরে বেস্টসেলার বিরোধীরাও বেস্টসেলার হওয়া বা না হওয়াকেই উৎকর্ষের মাপকাঠি বলে ধরছেন। এভাবে যে ভাষার সাহিত্য চলে, সেখানে আকাদেমি, পুরস্কার – এসব নিয়ে তো ভূতে ফুটবল খেলবেই।

দেবাংশু তাঁর পোস্টে এরপর যা লিখেছেন তা আরও গুরুতর। তিনি লিখেছেন ২০২১ সালে মমতা ব্যানার্জি ক্ষমতায় না ফিরলে বাংলায় এন আর সি হত, রত্না রশিদকেও ডিটেনশন ক্যাম্পে যেতে হত ইত্যাদি। অর্থাৎ মমতা বিজেপির ক্ষমতায় আসা আটকেছেন, তাই তাঁর সাহিত্য পুরস্কার প্রাপ্য। মানে সাহিত্য এমন একটি বিষয়, যার পুরস্কার আদৌ সাহিত্যচর্চা না করেও পাওয়া যেতে পারে। কোনো পুলিসকর্মী হয়ত ভাল গুন্ডা দমন করেন, তার পুরস্কার হিসাবেও সাহিত্য পুরস্কার দেওয়া যেতে পারে। এই যে সাহিত্যকে একটি বিশেষ কাজ, বিশেষ শৃঙ্খলা হিসাবে না ভাবা – এটিও কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে এখন দারুণ ‘কুল’। ২০১৪ সালে যখন যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে হোক কলরব আন্দোলন চলছিল, তখন বাংলার সাংবাদিক কুলচূড়ামণি সুমন চট্টোপাধ্যায় ফেসবুকে লিখেছিলেন যাদবপুর এমন একটি জায়গা, যেখানে তুলনামূলক সাহিত্যের মত অর্থহীন বিষয় পড়ানো হয়। তিনি তবু সাহিত্যের বাইরের লোক, ইদানীং কবিরাও “সকলেই কবি নয়, কেউ কেউ কবি” বললে রেগে যান। চিরকাল গরীব মানুষ, খেটে খাওয়া মানুষ নিজেদের মত করে গান বাঁধেন, ছড়া কাটেন, শিল্প সৃষ্টি করেন – এই যুক্তিতে যে কেউ কবি হতে পারে এই যুক্তি দেওয়া হয়। যেন গরীব, খেটে খাওয়া মানুষদের মধ্যে যাঁরা এসব করেন তাঁদের সৃজনে কোনো অধ্যবসায় নেই, কোনো শৃঙ্খলা নেই। যাঁরা ছৌ নাচেন তাঁদের যেন নাচ শিখতে হয় না, যেমন তেমন লম্ফঝম্প করলেই চলে। যাঁরা পটশিল্পী তাঁদের গল্পটি সযত্নে গড়ে তুলতে হয় না, ছবিগুলি ভেবেচিন্তে আঁকতে হয় না।

স্বতঃস্ফূর্ততা বলে এক আজব ধারণা তৈরি করা হয়েছে, যা কেবল কবিরা নয়, যাঁরা গল্প, উপন্যাস লেখেন তাঁরাও একমাত্র প্রয়োজনীয় জিনিস বলে চালিয়ে দিচ্ছেন। মনে যা এল তা-ই ঝটপট লিখে ফেলা যদি কবিতা বা সাহিত্য হয়, তাহলে সত্যিই মমতার “এপাং ওপাং ঝপাং”-কে কবিতা বলে স্বীকার করতে আপত্তি করা চলে না। অন্নদাশংকর রায়ের সৃষ্টি ছড়া আর মমতা ব্যানার্জির লেখা ছড়া নয়, তার সবচেয়ে বড় কারণ (আর কোনো কারণ দর্শানোর আদৌ প্রয়োজন নেই) যে প্রথমটিতে ছন্দ আছে, দ্বিতীয়টিতে ছন্দের হদ্দমুদ্দ হয়েছে – এ কথাও বলা উচিত নয়। কারণ ছন্দ তো স্বতঃস্ফূর্ত নয়, রীতিমত মাত্রা হিসাব করে অঙ্ক কষে মেলাতে হয়। ২০১১ সালে তৃণমূল কংগ্রেস ক্ষমতায় আসার পর যখন থেকে মুখ্যমন্ত্রীর কাব্যপ্রতিভা প্রকাশ পেয়েছে, তখন থেকে তাঁর লেখা এবং তদনুরূপ লেখা কবিতা হচ্ছে না বললে বা ব্যঙ্গ করলেই বলা শুরু হয়েছে, কবিতা লেখা কি ভদ্রলোকদের মনোপলি নাকি? সবার অধিকার আছে কবিতা লেখার। অর্থাৎ কবিতাকে ভদ্রলোক বনাম সাবল্টার্নের রণভূমিতে পরিণত করা হয়েছে। রাজধানী নিবাসী, বরাবর ক্ষমতার বৃত্তে থাকা ব্রাহ্মণকন্যা কী করে সাবল্টার্ন হন সে প্রশ্ন থাক। কিন্তু সাবল্টার্ন হলেই যে যা-ই লিখুক তাকেই কবিতা বলতে হবে, এমনটা কি গায়ত্রী চক্রবর্তী স্পিভাক লিখেছেন? স্বীকার্য যে কবিতার কোনো সর্বজনস্বীকৃত সংজ্ঞা নেই। এমনকি অ্যান্টি-পোয়েট্রি বলেও একটি জিনিসের অস্তিত্ব আছে। কিন্তু ব্যাকরণ ভাঙতে গেলে আগে তো ব্যাকরণ শিখতে হয়, সে ব্যাকরণ ভদ্রলোকদের তৈরি হলেও।

এসব বললে রে রে করে তেড়ে আসার মত লোক এখন পশ্চিমবঙ্গে কম নেই। এই ক্ষতির তুলনায় মুখ্যমন্ত্রীর হাতে সাহিত্য পুরস্কার তুলে দেওয়া সামান্য ক্ষতি। বস্তুত, ওই ক্ষতিগুলো আটকানো গেলে হয়ত এই ক্ষতি দেখতে হত না।

নাগরিক ডট নেট-এ প্রকাশিত

আরও পড়ুন

পূজার ছলে তোমায় ভুলে

প্রখর তপন তাপে পশ্চিমবঙ্গে শিক্ষাব্যবস্থা কাঁপে

হুগলি জেলায় বসে এই লেখা শুরু করার সময়ে আলিপুর আবহাওয়া দপ্তর জানিয়ে দিয়েছে, চলতি সপ্তাহেই বৃষ্টি হবে দক্ষিণবঙ্গে। সেইসঙ্গে কমবে তাপমাত্রা, তাপপ্রবাহও স্তিমিত হবে। সত্যি কথা বলতে, এমনটা যে হবে তা আলিপুর কদিন ধরেই বলছে। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে শিক্ষার যাঁরা ভাগ্যনিয়ন্তা তাঁরা হয় আবহাওয়াবিদ্যার উপর জ্যোতিষশাস্ত্রের চেয়ে বেশি ভরসা করেন না, অথবা কোনো কারণে স্কুলগুলোকে বন্ধ করে দেওয়ার ভীষণ তাড়া ছিল। নইলে ২৭ এপ্রিল (বুধবার) নবান্নে তাপপ্রবাহ নিয়ে মুখ্যমন্ত্রীর বৈঠকের পরেই ২ মে (সোমবার) থেকে গরমের ছুটি শুরু করে দেওয়ার সিদ্ধান্তের কোনো ব্যাখ্যা হয় না।

গত কয়েক দিনে শিক্ষামন্ত্রকের দুটো সিদ্ধান্ত খবরের শিরোনামে উঠে এসেছে। প্রথমটা গরমের ছুটি এগিয়ে আনা, দ্বিতীয়টা কলেজে ভর্তি কেন্দ্রীয়ভাবে অনলাইনে করা। কয়েক বছর আগে পশ্চিমবঙ্গে উচ্চমাধ্যমিকের ফল বেরোবার পর কলেজে ভর্তি নিয়ে চমকপ্রদ সব কাণ্ড হয়েছিল। পরীক্ষায় যত নম্বরই পান না কেন, তৃণমূল ছাত্র পরিষদকে মোটা টাকা প্রণামী না দিলে কলেজে ভর্তি হওয়া যাচ্ছে না – এমন অভিযোগ উঠেছিল। পছন্দের বিষয়ে অনার্স নিতে গেলে কোথাও কোথাও ৪০-৫০ হাজার টাকা দিতে হচ্ছে, এমনও শোনা যাচ্ছিল। তারপর চালু হয় কলেজের ওয়েবসাইটের মাধ্যমে ভর্তি। কারণ এ দেশে গত দুই দশকে দুর্নীতির একমাত্র সমাধান হিসাবে জনপ্রিয় হয়েছে অনলাইন ব্যবস্থা, সে ব্যবস্থা সকলের নাগালের মধ্যে কিনা তা নিয়ে আলোচনা করলে লোকে বোকা এবং সেকেলে বলে। কিন্তু বোধহয় সে ব্যবস্থাও দুর্নীতিমুক্ত করা যায়নি, তাই এবার সোজা বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইটের মাধ্যমে ভর্তি হবে শোনা যাচ্ছে। যতক্ষণ না ব্যাপারটা চালু হচ্ছে ততক্ষণ এর অসুবিধাগুলো জানা যাবে না। ফলে এই মুহূর্তে ছাত্রছাত্রী, অভিভাবক, শিক্ষক-শিক্ষিকা সকলেই এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানাচ্ছেন। তাই সংবাদমাধ্যমেও তাঁদের প্রতিক্রিয়াগুলো ঘটা করে উপস্থাপন করা হচ্ছে। মজার কথা, গরমের ছুটি এগিয়ে আনার সিদ্ধান্ত সম্পর্কে তাঁরা কী ভাবছেন তা নিয়ে সংবাদমাধ্যমের উৎসাহ তুলনায় কম। কারণটা সোশাল মিডিয়া দেখলেই দিব্যি টের পাওয়া যাচ্ছে। এই সিদ্ধান্তে পুরোপুরি খুশি হয়েছেন এমন কাউকে দূরবীন দিয়ে খুঁজতে হচ্ছে। বলা বাহুল্য, অফলাইন প্রতিক্রিয়াও খুব আলাদা হবে না। পশ্চিমবঙ্গের সংবাদমাধ্যম অত্যন্ত সাবধানী। প্রতিবেদনের শেষ প্যারায় “অমুক শিক্ষক সংগঠন বলেছে এতে তমুক অসুবিধা হবে। কিন্তু তমুক শিক্ষক সংগঠন এই সিদ্ধান্তকে সমর্থন করেছে” লিখেই ক্ষান্ত দিচ্ছে।

পশ্চিমবঙ্গে এমনিতে শিক্ষাবিদের ছড়াছড়ি। অনেকে এত বিদ্বান যে শিক্ষা ছাড়াও নাটক, সিনেমা, সঙ্গীত, রাজনীতি ইত্যাদি বিষয়ে নিয়মিত খবরের কাগজের উত্তর-সম্পাদকীয় স্তম্ভে লিখে থাকেন। কারো কারো মতে এ রাজ্যের সাধারণ মানুষ কাকে ভোট দেবেন তা-ও এঁরা নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম। অথচ কোভিডের প্রতাপে প্রায় দু বছর বন্ধ থাকার পর খোলা স্কুল, কলেজ ফের টানা দেড় মাসের জন্য বন্ধ হয়ে গেল – এ নিয়ে শিক্ষাবিদদের কোনো দুশ্চিন্তা নেই।

কিছু বামপন্থী ছাত্র সংগঠন কয়েক মাস আগে পথে নেমেছিল স্কুল, কলেজ অবিলম্বে খোলার দাবিতে। যখন খুলে গেল, তখন একে আন্দোলনের সাফল্য বলেও সোচ্চারে দাবি করেছিল। এখন পর্যন্ত তারাও চুপ। পশ্চিমবঙ্গে শিক্ষক সংগঠনগুলোর কী অবস্থা তা নিয়োগ থেকে বদলি – সব ক্ষেত্রে শোষিত মাস্টারমশাই, দিদিমণিদের একলা লড়াই বা অস্থায়ী অরাজনৈতিক মঞ্চ তৈরি করে লড়াই করা দেখলেই টের পাওয়া যায়। যে নিখিলবঙ্গ শিক্ষক সমিতি বাম আমলে এমন দোর্দণ্ডপ্রতাপ ছিল যে অর্থমন্ত্রী অসীম দাশগুপ্ত বাজেট বক্তৃতায় সরকারি বেতন পাওয়া মাস্টারদের প্রাইভেট টিউশন বন্ধ করার নিদান দিয়েও পরে পিছিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছিলেন, সেই সমিতির অস্তিত্ব এখন টের পাওয়া যায় কেবল সরকারি সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে সংবাদপত্রে প্রকাশিত বিবৃতি থেকে। তা সেই সমিতি বলেছে আপাতত সাতদিনের ছুটি দিয়ে পরীক্ষা ইত্যাদি আশু কাজগুলো শেষ করে নিয়ে তারপর ছুটি দিলে ভাল হত। আরও দু-একটি শিক্ষক সংগঠন ক্ষীণ স্বরে এরকম নানা পরামর্শ দিয়েছে। মমতা ব্যানার্জির সে পরামর্শ শুনতে বয়ে গেছে। তিনি অবিসংবাদী জননেত্রী, তিনি যখন মনে করেছেন এই গরমে স্কুল করা যায় না, তখন যায় না।

গত বছর অতিমারীর কারণে মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা হয়নি। এ বছরের মাধ্যমিক শেষ করা গেছে, উচ্চমাধ্যমিকেরও লিখিত পরীক্ষা শেষ হয়েছে নবান্নের সভার দিন। কিন্তু একাদশ শ্রেণির প্র্যাকটিকাল পরীক্ষার মত গুরুত্বপূর্ণ জিনিস শুরু হওয়ার কথা ছিল আজ থেকে। সরকার সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময়ে সেসব মাথায় রাখার প্রয়োজন বোধ করেনি। স্কুলের পরীক্ষা আর বোর্ডের পরীক্ষা গুরুত্বের দিক থেকে এক নয় – এমনটা ভাববার কী-ই বা দরকার? ঠিক দুটো অনুচ্ছেদের সরকারি নির্দেশে ছুটির সিদ্ধান্ত জানিয়ে দেওয়া হয়েছে। বাতিল পরীক্ষাগুলো কবে হবে না হবে তা নিয়ে একটা শব্দও খরচ করা হয়নি। ক্লাস ফাইভ থেকে টেন পর্যন্ত ছেলেমেয়েদের এই শিক্ষাবর্ষের প্রথম সামেটিভ পরীক্ষা ৭ মের মধ্যে শেষ করতে হবে – সরকারি নির্দেশ ছিল। সে নির্দেশও চোখের পলকে বাতিল হল। মানে যে ছেলেমেয়েরা কোনো পরীক্ষার মুখোমুখি হয়নি সেই ২০২০ সাল থেকে, তাদের প্রথম পরীক্ষাটাও বাতিল হল। নিজের নির্দেশ বাজে কাগজের ঝুড়িতে ফেলে দিল সরকার নিজেই। এসব অবশ্য ইদানীং প্রায়ই হয়। এমনকি আগের নির্দেশের সাথে পরের নির্দেশের সাযুজ্য বজায় রাখার প্রয়োজনও বোধ করে না পশ্চিমবঙ্গ সরকার। অনেকসময় সাংবাদিক সম্মেলনে মুখ্যমন্ত্রী যা বলেন, কয়েক ঘন্টা পরের সরকারি সার্কুলারেই তা বেশ খানিকটা বদলে যায়।

যাক সে কথা। লক্ষ করার মত বিষয় হল, এই হঠাৎ ছুটিতে পড়াশোনার যে ক্ষতি হবে সরকার তা বোঝে না এমন নয়। বোঝে বলেই বলা হয়েছে কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে অনলাইন ক্লাস চলতে পারে। এমনিতেই বহু বেসরকারি স্কুল পশ্চিমবঙ্গ সরকারের নির্দেশ মেনে গরমের ছুটি শুরু করছে না বলে জানিয়েছে। তারা কেউ কেউ অত্যধিক গরমের কারণে অনলাইন ক্লাস নেবে। আইসিএসই, সিবিএসই-র অধীন স্কুলগুলোর পরীক্ষাও চলবে। তার মানে দেড় মাস লেখাপড়া বন্ধ থাকবে শুধু পশ্চিমবঙ্গের সরকারি এবং সরকারপোষিত স্কুলগুলোর ছাত্রছাত্রীদের। কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়েও যাদের পক্ষে অনলাইন ক্লাস করা সম্ভব নয় তারা বঞ্চিত হবে। সুতরাং অতিমারীর সময়ে যে ডিজিটাল বিভাজন শুরু হয়েছিল, সরকার জেনেশুনে তা বাড়িয়ে তুললেন।

ক্ষুব্ধ অভিভাবকদের অনলাইন এবং অফলাইন প্রতিক্রিয়ায় দেখা যাচ্ছে, তাঁরা যথারীতি স্কুলশিক্ষকদের সৌভাগ্যে বিরক্ত ও ঈর্ষান্বিত। “এরা আর কত ছুটি খাবে” জাতীয় মন্তব্য ছুড়ে দেওয়া চলছে। তৃণমূল সরকারের আমলে নিয়োগের অভাবে যতগুলো ক্লাস নেওয়ার কথা, যতগুলো খাতা দেখার কথা তার চেয়ে অনেক বেশি কাজ করতে হয় শিক্ষক-শিক্ষিকাদের। উপরন্তু সরকার নাগরিকদের শ্রীবৃদ্ধির যতরকম পরিকল্পনা নিয়েছেন সেসবের দায়িত্বও তাঁদেরই ঘাড়ে। গত কয়েক বছর প্রবল গরমে যতবার সরকার গ্রীষ্মাবকাশ বাড়িয়েছেন, ততবার নির্দিষ্ট করে বলে দিয়েছেন, শিক্ষক-শিক্ষিকাদের কিন্তু স্কুলে যেতে হবে। অর্থাৎ গরমে তাঁরা অসুস্থ হয়ে পড়তে পারেন না। এতৎসত্ত্বেও রাজ্যসুদ্ধ বাবা-মা ভাবছেন “এরা আর কত ছুটি খাবে”। অথচ অধিকাংশ মাস্টারমশাই, দিদিমণি এই ছুটি চান না – লেখাপড়ার ক্ষতির কথা ভেবে তো বটেই, তাঁরা যে ক্রমশই গণশত্রু বলে প্রতিপন্ন হচ্ছেন সেই দুশ্চিন্তাতেও। চিন্তাটা অমূলক নয়। এই প্রখর তপন তাপে সরকারের সামনে আর কোন পথ খোলা ছিল, সে আলোচনা করতে গিয়ে যেসব বিকল্পের কথা বলছেন অনেকে, তা থেকে রাজ্যের স্কুলগুলো কী অবস্থায় আছে সে সম্পর্কে ন্যূনতম ধারণার অভাব এবং সে কারণে মাস্টাররা মহা সুখে আছেন – এই ধারণার প্রাধান্য প্রকট হচ্ছে।

যেমন অনেকেই সকালে স্কুল করার কথা বলছেন। এঁরা সম্ভবত জানেন না, স্কুল সার্ভিস কমিশন চালু হওয়ার পর থেকে রাজ্যের স্কুলগুলোতে স্থানীয় শিক্ষক-শিক্ষিকার পরিমাণ অনেক কমে গেছে। অনেকেই স্কুলে আসেন ৩০-৪০ কিলোমিটার বা তারও বেশি দূর থেকে ট্রেন, বাস, আরও নানারকম যানবাহনে। সম্প্রতি উৎসশ্রী নামে বদলির যে প্রকল্প চালু হয়েছে তাতে ইতিমধ্যেই দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে, মামলাও চলছে। ফলে সে সুবিধা নেওয়ার সুযোগ মোটেই খুব বেশি মানুষের হয়নি। হয়ত কোনো স্কুলে ৫০ জন শিক্ষক-শিক্ষিকা, উৎসশ্রীর সুবিধা নিয়ে এসেছেন জনা চারেক। সঙ্গে আরও জনা পাঁচেক স্থানীয় শিক্ষক-শিক্ষিকা থাকা সম্ভব। পঞ্চাশ জনের ক্লাস যদি এই জনা দশেককে নিতে হয় সকালের স্কুলে, তাহলে কেমন পড়াশোনা হবে? নাকি দূর থেকে আসা মাস্টারদের স্কুলেই রাত কাটানোর দাবি করা হচ্ছে? মুখ্যমন্ত্রীর মর্জিই যেখানে আইন সেখানে অদূর ভবিষ্যতে হয়ত এমন নিয়মও হতে পারে। তখন মাস্টাররা কেমন টাইট হল তা দেখে অন্য পেশার লোকেরা প্রভূত আনন্দ পাবেন।

আসলে একটা তৈরি করা সমস্যার সমাধান খুঁজে চলেছি আমরা। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে এবার গ্রীষ্মে একদিনও কালবৈশাখী হয়নি দক্ষিণবঙ্গে, তাপমাত্রা চল্লিশ ডিগ্রি ছুঁয়ে ফেলেছে কোথাও কোথাও। কিন্তু এমন তো নয় যে পশ্চিমবঙ্গ ছিল শীতের দেশ, বিশ্ব উষ্ণায়ন জায়গাটাকে রাতারাতি থর মুরুভূমি করে তুলেছে। পশ্চিমবঙ্গে গরম চিরকালই পড়ত, কিন্তু গরমের ছুটি কবে থেকে কবে অব্দি থাকবে সেই সিদ্ধান্তগুলো নিজেদের বিবেচনা অনুযায়ী স্কুল কর্তৃপক্ষই নিতেন। সাধারণত দক্ষিণবঙ্গের স্কুলগুলোতে মে মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকে টানা ২০-২৫ দিন ছুটি থাকত, স্কুল খুলতে খুলতে এসে যেত বর্ষা। উত্তরবঙ্গের স্কুলেও স্থানীয় আবহাওয়া বুঝে গরমের ছুটি দেওয়া হত। আর ছুটির দিনক্ষণ শিক্ষাবর্ষের গোড়াতেই ঠিক হয়ে যেত, ফলে পড়াশোনা এবং পরীক্ষার নির্ঘণ্ট রাতারাতি বদলাতে হত না। বর্তমান সরকারের আমলে শিক্ষায় দুর্নীতির বিকেন্দ্রীকরণের পাশাপাশি সিদ্ধান্তের চূড়ান্ত কেন্দ্রীকরণ হয়েছে। কবে পরীক্ষা হবে, কবে ছুটি দেওয়া হবে, ছাত্রছাত্রীদের কী অ্যাক্টিভিটি টাস্ক দেওয়া হবে – সবই ঠিক হয় কেন্দ্রীয়ভাবে। ফলে যথেষ্ট সহনীয় আবহাওয়ার জলপাইগুড়ি জেলার স্কুলের সঙ্গেই ২ মে থেকে ছুটি শুরু হয়ে যাচ্ছে পুরুলিয়া জেলার স্কুলের। পশ্চিমবঙ্গে প্রায় প্রতি বছরই দীর্ঘায়িত হচ্ছে গরমের ছুটি। এগারো বছর কেটে গেল, এখনো গরমের ছুটির দিন নির্দিষ্ট করতে পারল না রাজ্য সরকার।

এতদ্বারা সরকারি ও সরকারপোষিত স্কুলগুলোকে সবদিক থেকে পঙ্গু করে দিয়ে পশ্চিমবঙ্গে বেসরকারি শিক্ষার রাস্তা চওড়া করা হচ্ছে কিনা সে প্রশ্নে না গেলেও একটা প্রশ্ন অনিবার্য। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে ২০২২ গ্রীষ্মের মত পরিস্থিতি অদূর ভবিষ্যতে তো আরও বাড়বে। তাহলে কি এবার থেকে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের অধীন স্কুলগুলো গরমকালে বন্ধই থাকবে? ভারত তথা পৃথিবীর যে যে অঞ্চলে প্রচণ্ড গরম পড়ে, সেখানকার ছেলেমেয়েরা কি স্কুল যায় না? নাকি রাজ্য সরকার এ ব্যাপারে পথপ্রদর্শক হতে চাইছে?

নাগরিক ডট নেট-এ প্রকাশিত। ছবি ইন্টারনেট থেকে

বাংলা মাধ্যম ও বাংলা বিপন্ন, কিন্তু রেডিও জকির হাতে নয়

অভিজ্ঞতাকে যুক্তি হিসাবে খাড়া করায় যাদের আপত্তি আছে, তাদের এ লেখা না পড়াই ভাল। কারণ দর্শন বলে একটা বিষয় সারা পৃথিবীতে পড়ানো হয়। জ্ঞান কী করে আহরণ করা যায়, বা সহজ করে বললে, সত্য জানার উপায় কী, তা দর্শনের অন্যতম আলোচ্য বিষয়। নানা দার্শনিক ঘরানা এ নিয়ে নানা কথা বললেও কেউই সত্য জানার উপায় হিসাবে অভিজ্ঞতাকে একেবারে অগ্রাহ্য করে না। কিন্তু দর্শন-টর্শন, মাননীয়া রেডিও জকি অয়ন্তিকা ফেসবুক লাইভে যাদের আঁতেল বলেছেন, তাদের বিষয়। কারণ দর্শন নিয়ে গবেষণা করে কর্পোরেটে চাকরি পাওয়া যায় না। দর্শনের ছাত্রছাত্রীরা বিলক্ষণ কর্পোরেটের চাকরি পেতে পারে এবং পায়, কিন্তু তা অন্য কোনো পারদর্শিতার জন্য। উপরন্তু কেবল অয়ন্তিকার সমর্থকরাই যে দর্শনকে আঁতেল ব্যাপার মনে করেন তা নয়, যাঁরা তাঁর বিপক্ষে তাঁরাও দর্শন-ফর্শনের ধার ধারেন না। কিন্তু বর্তমান লেখকের তাতে বয়ে গেছে। সোশাল মিডিয়ার দস্তুর মেনে অয়ন্তিকার পক্ষে বা বিপক্ষে মুচমুচে কথা লিখে চটজলদি লাইক কুড়োনো এ লেখার উদ্দেশ্য নয়। অয়ন্তিকা যা বলেছেন তার মধ্যে সার কিছু আছে কি, না সবটাই ঘুঁটে? যতটা ঘুঁটে তা দিয়ে উনুন জ্বালানো চলবে কি, নাকি ভিজে নষ্ট হয়ে গেছে? সেসব তলিয়ে দেখাই এ লেখার উদ্দেশ্য।

যাঁরা অয়ন্তিকার বিরুদ্ধে খড়্গহস্ত, তাঁদের অনেকের অনেক যুক্তিপূর্ণ মন্তব্য দেখলাম। কিন্তু একটা কথা চোখে পড়ল না। মাননীয়াকে কেউই ধরিয়ে দিচ্ছেন না, যে কর্পোরেটের চাকরি না পেলেই শিক্ষা বৃথা – এর চেয়ে বড় ভুল ধারণা আর হয় না। লেখাপড়ার উদ্দেশ্য জগতকে জানা, জীবিকা অর্জন করা নয় – রচনাবই মুখস্থ করা এরকম কোনো বক্তব্য রাখছি না। এই চূড়ান্ত বেসরকারিকরণের যুগেও কর্পোরেটের চাকরি নয়, এরকম কত চাকরি আছে নিজেই একবার ভেবে দেখুন। রাজ্য এবং কেন্দ্রীয় স্তরের আমলারা কি কর্পোরেটের চাকরি করেন? একেবারে উচ্চপদস্থদের বাদ দিলে, আমলাদের মাইনেপত্তর, অন্যান্য সুযোগসুবিধা কিন্তু এখনো ভারতে যারা বহুজাতিকের চাকরি করে তাদের সমান বা তার চেয়েও ভাল। স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও অশিক্ষক কর্মীরাও শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত কর্পোরেটের চাকুরে ছিলেন না। তাঁদের লেখাপড়া কি বৃথা গিয়েছে? ডাক্তার, নার্সরা অনেকেই কর্পোরেটের চাকুরে নন। বস্তুত কর্পোরেট হাসপাতালে যে ডাক্তারদের আমরা দেখাই, তাঁরা অনেকেই আসলে সরকারি হাসপাতালে চাকুরিরত। সেই পরিচয়ের কারণে, সেখানে অর্জিত সুনামের ফলেই কর্পোরেট হাসপাতালের মালিকরা ওঁদের নিজের হাসপাতালে নিয়ে যান। অনেক ডাক্তার আবার হাজার পীড়াপীড়ি করলেও যান না। যাঁরা পুলিসে চাকরি করেন তাঁরাও কর্পোরেটের চাকুরে নন, সেনাবাহিনীর লোকেরা তো ননই। স্বাধীনোত্তর ভারতে সম্ভবত সাংবাদিকতাই একমাত্র ক্ষেত্র, যেখানে দূরদর্শন আর অল ইন্ডিয়া রেডিও বাদ দিলে পুরোটাই কর্পোরেটের হাতে (কর্পোরেট শব্দটা যদিও তুলনায় নবীন, আগে প্রাইভেট সেক্টর বা বেসরকারি ক্ষেত্র বলা হত) ছিল। সেই ক্ষেত্রের চেহারাও বদলাচ্ছে, যদিও গতি এখনো মন্থর। ‘স্বাধীন সাংবাদিকতা’ বলে অশ্রুতপূর্ব একটা কথা উঠে এসেছে, বিশাল কর্পোরেট হাউসের বাইরে ছোট ছোট ওয়েবসাইট, ইউটিউব চ্যানেল, ফেসবুক পেজের মাধ্যমে সাংবাদিকতার পরিসর গড়ে উঠছে। আগামীদিনে সাংবাদিকতার চাকরির জন্যও হয়ত সেগুলোর দিকে যেতে হবে ছেলেমেয়েদের।

সুতরাং বাংলা মাধ্যমে পড়লে কর্পোরেটের চাকরি পাওয়া যাবে না, মাথায় আকাশ ভেঙে পড়বে – এই কথাটা আসলে পারিবারিক হোয়াটস্যাপ গ্রুপ এবং উচ্চাকাঙ্ক্ষী মধ্যবিত্ত বন্ধুদের সমসত্ত্ব জনগোষ্ঠীর মতামত, তার বেশি কিছু নয়। তাছাড়া সবাই চাকরি করবেই বা কেন? কেউ খেলোয়াড় হতে পারে। শুধু ক্রিকেট নয়, যত দিন যাচ্ছে এ দেশে অন্য খেলাধুলোতেও রোজগারের পরিমাণ বাড়ছে। কেউ অভিনেতা হবে, কেউ গায়ক বা বাজিয়ে হবে। সকলেরই চোস্ত ইংরেজি বলার দরকার পড়বে কি? কল্পনা করুন, একটি বাঙালি ছেলে শতরান করেছে আর অয়ন্তিকার মত কোনো ইংরেজি মাধ্যমে পড়া ধারাভাষ্যকার নাক সিঁটকে বলছেন “ভাল করে ইংরেজি বলতে পারে না বলে দ্বিশতরান করতে পারল না।” বা ধরুন একটি মেয়ে চমৎকার গান গায়। বলিউডে অডিশন দিতে গেল, ইংরেজি মাধ্যমে পড়া এক সঙ্গীত পরিচালক বললেন “ইংরেজিটা ঠিক বলতে পারে না তো, তাই সা থেকে পা-তে পৌঁছতে পারছে না।”

হাসছেন তো? হাসবেন না। কোনো ধারাভাষ্যকার এত বোকা নন, কোনো সঙ্গীত পরিচালকও এত মূর্খ নন। তাঁরা পেশাদার লোক, যোগ্যতার দাম দিতে জানেন। ফলে এমনটা কখনো ঘটবে না। কিন্তু ইংরেজি জানা (কেবল ইংরেজি মাধ্যমে পড়া নয়) বাঙালি এভাবেই ভাবতে অভ্যস্ত, অর্থাৎ ভাল ইংরেজি বলতে পারা আলাদা একটা যোগ্যতা বলে ভাবতে অভ্যস্ত। অয়ন্তিকা যা বলেছেন সেই অভ্যাস থেকেই বলেছেন। বিতর্ক তৈরি হওয়ায় নিজের অবস্থান পরিষ্কার করতে তিনি যে দীর্ঘ ফেসবুক লাইভ করেছেন সেখানে এই ভাবনাটা আরও পরিষ্কার হয়ে গেছে। তিনি বেশ জোর দিয়ে বলেছেন, বাংলা মাধ্যমে পড়ে যারা ভাল করে ইংরেজি বলতে পারে না, তারা নির্ঘাত হীনমন্যতায় ভোগে।

কথাটা ঠিক। ইংরেজি মাধ্যমে পড়া অনেকেও যে জঘন্য ইংরেজি বলে, কেবল টের পায় না যে ভুলভাল বলছে, সে কথা থাক। কিন্তু বিভিন্ন পেশায় দারুণ সফল অনেককেই চিনি যারা এই হীনমন্যতায় ভুগছে। কদিন আগেই আমার মত বাংলা মাধ্যমে পড়া এক অন্তরঙ্গ বন্ধুর সঙ্গে কথা হল। সে-ও বলল, মনে হয় আরও উন্নতি করতে পারতাম গড়গড়িয়ে ইংরেজি বলতে পারলে। এই হীনমন্যতার কারণ কী? কারণ অন্য বাঙালিরা। আমি কাজ করতাম ইংরেজি কাগজে, বেশকিছু আন্তর্জাতিক ম্যাচের প্রতিবেদন লেখার সুযোগ পেয়েছি। লক্ষ করেছি, সাংবাদিক সম্মেলনে সব রাজ্যের আঞ্চলিক ভাষার সংবাদমাধ্যমের সাংবাদিকরাই ইংরেজিতে প্রশ্ন করতে গিয়ে হোঁচট খান। উত্তর ভারতীয়রা সেই কারণে সাধারণত হিন্দিতে প্রশ্ন করেন বা হিন্দি মিশিয়ে বলেন। দক্ষিণ ভারতের অনেকে আবার হিন্দিতেও সড়গড় নন। তাঁরা কিন্তু বুক ফুলিয়ে যেমন ইংরেজি আসে, তেমন ইংরেজিতেই প্রশ্ন করেন। বুঝে নেওয়ার দায়িত্ব যিনি উত্তর দেবেন তাঁর বা দায়িত্বপ্রাপ্ত মিডিয়া ম্যানেজারের। ইংরেজিটা নেহাত দুর্বোধ্য হলে ওই সাংবাদিকের রাজ্যের ভাল ইংরেজি জানা অন্য সাংবাদিকরা দেখেছি সাহায্য করেন। মাতৃভাষায় প্রশ্নটা জেনে নিয়ে ইংরেজিতে অনুবাদ করে বলে দেন। অথচ কলকাতার বাংলা কাগজ, চ্যানেলের সাংবাদিকদের কাউকে কাউকে দেখেছি ইংরেজি বলতে গিয়ে দরদর করে ঘামছেন। যাঁরা ফরসা তাঁদের মুখচোখ লাল হয়ে যেতে দেখেছি। কারণটা আর কিছুই নয়। উনি জানেন ওঁকে নিয়ে পরে হাসাহাসি করবে ওঁর নিজের শহরের সাংবাদিকরাই। হাতে গোনা দু-একজন ভাল ইংরেজি বলা সাংবাদিক সাহায্য করেন, বাকিরা জুলজুল করে তাকিয়ে থেকে সান্ধ্য মদ্যপানের আসরের হাসির খোরাক সংগ্রহ করেন। কারণ তাঁরাও অয়ন্তিকার দলে। মনে করেন কে কত ভাল ইংরেজি বলে তা দিয়ে প্রমাণ হয় কে কত ভাল সাংবাদিক। কলকাতার এক বহুল প্রচারিত বাংলা কাগজের ক্রীড়া সম্পাদক তো এই সেদিনও বলে বেড়াতেন, তাঁর ভাল বাংলা জানা তরুণ সাংবাদিক দরকার নেই। দরকার ভাল ইংরেজি বলতে পারা সাংবাদিক। সে কাগজের প্রতিবেদনের মান এবং ভাষার মান পাল্লা দিয়ে নেমেছে।

পৃথিবীর কটা জাতি ভাল ইংরেজি বলতে পারা আলাদা যোগ্যতা মনে করে সন্দেহ আছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে পদার্থবিদ্যায় গবেষণা করতে যাওয়া এক বন্ধুর মুখে শুনেছিলাম, প্রথম দিকে টক দিতে উঠে সে ঘেমে নেয়ে যেত। তারপর তার রিসার্চ গাইড, যাঁর মাতৃভাষা ইংরেজি, একদিন জিজ্ঞেস করেন, তুমি তো যথেষ্ট ভাল ফিজিক্স জানো। বলতে গিয়ে অত ঘাবড়ে যাও কেন? সে উত্তরে জানায়, ইংরেজিটা ভুলভাল হয়ে যায় যদি? ভয় লাগে। তিনি তখন তাকে বলেন, ইংরেজি তোমার মাতৃভাষা নয়। তোমাকে আমরা নিয়েছি পদার্থবিদ্যার জন্যে, ইংরেজির জন্যে তো নয়। ও নিয়ে অত ভেবো না, কাজ চালিয়ে নিলেই হল। বাঙালি অধ্যাপক হলে ও কথা বলতেন না বোধহয়। আমার তো ইদানীং সন্দেহ হয়, সত্যজিৎ রায়ের ইংরেজি উচ্চারণ সাহেবদের মত না হলে বাঙালি বোধহয় তাঁকে বড় পরিচালক বলে মানত না।

এবার অন্য দিকটা দেখা যাক। অয়ন্তিকার বিরোধিতায় বাংলা মাধ্যমে পড়া জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে সফল, এমনকি কর্পোরেট চাকরিতেই বহুদূর উঠেছেন এমন অনেক মানুষকে মুখ খুলতে দেখা গেছে। এটা অপ্রত্যাশিত কিছু নয়। মাননীয়ার কথায় যে যুক্তির য আর মেধার ম নেই সে তো আগেই বললাম। নিজের পিঠ বাঁচাতে যিনি বাংলাপক্ষের বাংলায় বাঙালিদের জন্য কাজ সংরক্ষণের দাবিকে সমর্থন করেন, তাঁর যুক্তিবোধ নিয়ে আর শব্দ খরচ করব না। কিন্তু কথা হল এই যে এত বাংলাপ্রেমী ও বাংলা মাধ্যমপ্রেমীর দেখা পাওয়া গেছে, এঁদের অনেকের প্রেমই যে দুষ্মন্তের শকুন্তলার প্রতি প্রেমের মত হয়ে দাঁড়িয়েছে। মানে অভিজ্ঞানটি খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। নিজে পড়েছেন বাংলা মাধ্যমে, তার জন্যে কোথাও হোঁচট খেতেও হয়নি। কিন্তু নিজের সন্তানকে পড়াচ্ছেন ইংরেজি মাধ্যমে। শুধু কি তাই? সন্তানের দ্বিতীয় ভাষা করেছেন হিন্দি। ছেলের ইংরেজি ও হিন্দি শিক্ষায় কোনো ছিদ্র দিয়ে যাতে বাংলা ঢুকতে না পারে, সে জন্য টিভিতে বাংলা অনুষ্ঠান দেখাও নিষিদ্ধ – এমন বাড়ি মফস্বলেও হয়েছে আজকাল। অয়ন্তিকা জনপ্রিয় এফ এম চ্যানেলে কাজ করেন। মুখের ভাষা শুনলেই বোঝা যায় বাংলা কোনোদিন ঠিক করে শেখেননি, তার জন্যে কিঞ্চিৎ গর্বও আছে। তা সত্ত্বেও ভাঙব তবু মচকাব না ফেসবুক লাইভটি করতে হল কেন? বাজারের চাপ। চ্যানেল কর্তৃপক্ষ বাজার সমীক্ষা করে থাকেন, ফলে জানেন এফ এম চ্যানেলের শ্রোতাদের একটা বড় অংশ পশ্চিমবঙ্গের মফস্বল ও গ্রামের বাংলা মাধ্যমে পড়াশোনা করা মানুষজন, বিশেষ করে অল্পবয়সীরা। তারা শোনে কিন্তু হিন্দি গান, নিজেদের মধ্যে কথা বলার সময়ে ইংরেজি, হিন্দি মিশিয়েই কথা বলে। কারণ ওই খিচুড়ি ভাষা না বললে গ্রামের বন্ধুরাও গাঁইয়া ভাববে। এরা ইংরেজি মাধ্যমে পড়ে না, কারণ পড়ার সুযোগ পায় না। হয় বাবা-মায়ের সে সামর্থ্য নেই, নয় এলাকায় তেমন স্কুল নেই। এদের চটিয়ে ফেললে এফ এম চ্যানেলের সমূহ ক্ষতি। আর জে ভদ্রমহিলা ইংরেজি মাধ্যমে পড়েও এমনই অশিক্ষিত, অভব্য যে জানেন না, মানুষকে তার দুর্বলতা নিয়ে খোঁচা দিতে নেই। সেই অভব্যতার দায় চ্যানেল কর্তৃপক্ষ নেবেন কেন? জবাবদিহির আসল কারণ বোধহয় সেইটা।

এখান থেকেই তাহলে এসে গেল পরবর্তী প্রশ্নগুলো। ১) বাংলা মাধ্যমে পড়া পেশাগতভাবে সফল বাবা-মা ছেলেমেয়েকে ইংরেজি মাধ্যমে পড়াতে চান কেন? ২) যারা বাংলা মাধ্যমে পড়ে তারাও অনেকে নিজেদের ইংরেজি মাধ্যমের মত করে তুলতে চায় কেন?

এসবের একটা কারণ অবশ্যই ইংরেজি বলার ক্ষমতাকে অকারণ গুরুত্ব দেওয়া, ইংরেজি শিখতে চাওয়া নয়। কারণ কোনো ভাষা শিখতে হলে সব বিষয় সেই ভাষাতেই পড়তে হয়, নইলে শেখা যায় না – এমনটা পৃথিবীর কোথাও প্রমাণ হয়নি। তাছাড়া যে কোনো বাঙালি বাবা-মাকে জিজ্ঞেস করুন, ইংলিশ মিডিয়ামে কেন পড়ান? উত্তর আসে, আজকালকার দিনে তো ইংলিশটা বলতে না পারলে হবে না। অর্থাৎ ইংরেজি শেখা নয়, অঙ্ক, বিজ্ঞান, ইতিহাস, ভূগোল বেশি ভাল করে শেখা যায় বলেও নয়, ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে ভর্তি করা শুধু ইংরেজি বলতে শেখার জন্য। মানে স্কুলটা মূলত স্পোকেন ইংলিশ ক্লাস। একই যুক্তিতে আজকাল হিন্দিকে বাঙালি শিশুর দ্বিতীয় ভাষা করা হচ্ছে। ভারতের অর্থনৈতিকভাবে সবচেয়ে এগিয়ে থাকা রাজ্যগুলোর মধ্যে মহারাষ্ট্র ছাড়া সবই দক্ষিণে, অথচ বাঙালির নাকি হিন্দি বলতে না পারলে চাকরি হবে না। কিন্তু এটাই একমাত্র কারণ হলে ভাবনা ছিল না।

কিছু ব্যতিক্রম বাদ দিলে এ রাজ্যে বরাবর বাংলা মাধ্যম স্কুল মানে সরকারি স্কুল (সরকারপোষিত স্কুলগুলো সমেত), আর ইংরেজি মাধ্যম স্কুল মানে বেসরকারি স্কুল। ইংলিশটা বলতে না পারলে হবে না – এই যুক্তিতে ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে দেওয়া বরাবর ছিল। কিন্তু গত শতকের আশি-নব্বইয়ের দশকেও, বেসরকারি ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে ছেলেমেয়েকে পড়তে পাঠানো এক ধরনের বিলাসিতা, সরকারি স্কুলে দিব্যি পড়াশোনা হয় – এই ধারণা চালু ছিল। ফলে এখন যারা বাবা-মা, তাদের বাবা-মায়েরা অনেকেই সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও ছেলেমেয়েকে সরকারি স্কুলেই পড়িয়েছেন। ছবিটা এই শতকের শুরু থেকে বদলাতে বদলাতে এখন এমন হয়েছে, যে অবস্থাপন্ন বাড়ির ছেলেমেয়েরা প্রায় কেউই আর সরকারি স্কুলে পড়ে না। কলকাতা থেকে মাত্র ৩০-৩৫ কিলোমিটার দূরে আমাদের নবগ্রাম। এখানকার সবচেয়ে পুরনো এবং সবচেয়ে বড় ছেলেদের স্কুলের এক প্রাক্তন প্রধান শিক্ষক বছর পাঁচেক আগে আমাকে সখেদে বলেছিলেন, আগে আমাদের স্কুলে ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, মাস্টার, ব্যবসাদার, মুচি, মেথর – সবার ছেলেই পড়ত। এখন শুধু রিকশাওলা, দিনমজুর, মেছো, কশাইদের ছেলেরা পড়ে। অর্থাৎ মধ্যবিত্ত, উচ্চবিত্ত আর নেই।

কেনই বা থাকবে? একে তো আর সবকিছুর মত স্কুলও ঝাঁ চকচকে না হলে সেখানে পড়াশোনা হয় না, এমন ধারণা বিশ্বায়নের সঙ্গে সঙ্গে সমাজে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এবং পরিকাঠামোর দিক থেকে অনেক সরকারি স্কুলই পিছিয়ে ছিল সেইসময়। উপরন্তু নব্বইয়ের দশক থেকেই স্কুলের পড়াশোনার মান কমাতে বিরাট ভূমিকা নিয়েছে প্রাইভেট টিউশন। সকালে স্কুল যাওয়ার আগে পর্যন্ত এবং বিকেলে স্কুল থেকে ফিরেই ঘরের বাইরে চটির পাহাড় জমিয়ে প্রাইভেট পড়াচ্ছেন সরকারি স্কুলের মাস্টারমশাই, আর স্কুলে গিয়ে অকাতরে ঝিমোচ্ছেন – এ জিনিস আমরা অনেকেই দেখেছি। স্কুলশিক্ষকদের এই সমান্তরাল শিক্ষাব্যবস্থা এই শতাব্দীর শুরুতে এমন ফুলে ফেঁপে উঠেছিল এবং এতরকম দুর্নীতির জন্ম দিয়েছিল যে ২০০১-০২ আর্থিক বর্ষের বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী অসীম দাশগুপ্ত ঘোষণা করেছিলেন সরকারি স্কুলের শিক্ষক, অধ্যাপকদের প্রাইভেট টিউশন করা চলবে না। তা নিয়ে শিক্ষকদের সংগঠনগুলো এবং অভিভাবক, ছাত্রছাত্রীদের প্রবল দুশ্চিন্তা ও আপত্তি নিশ্চয়ই অনেকের মনে আছে। শেষপর্যন্ত বামফ্রন্ট সরকার ওই সিদ্ধান্ত কার্যকর করে উঠতে পারেনি। সরকারি শিক্ষাব্যবস্থাকে ভিতর থেকে দুর্বল করে দিয়েছিল প্রাইভেট টিউশন। হেনকালে গগনেতে উঠিলেন চাঁদা। অর্থাৎ ব্যাঙের ছাতার মত বিপুল সংখ্যক ঝলমলে বেসরকারি স্কুল।

বর্তমান সরকারের আমলে সরকারি স্কুলে পড়াশোনার হাল কেমন তা শিক্ষক, শিক্ষিকাদের সাথে কথা বললেই জানা যায়। ক্লাস পিছু ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা বরাবরই অসুবিধাজনক ছিল, এ আমলে আবার স্কুলে নিয়োগেও প্রায় দাঁড়ি পড়ে গেছে। রাজ্যে যোগ্য শিক্ষক-শিক্ষিকার অভাব নেই, কিন্তু তাঁরা হয় আদালত চত্বরে পড়ে আছেন, নয় অনশন করছেন কোথাও। কপাল নিতান্ত মন্দ হলে পুলিসের লাঠি, জলকামান হজম করছেন, মরেও যাচ্ছেন কেউ কেউ। যাঁরা স্কুলে আছেন তাঁরা কেবল পড়াবেন আর পরীক্ষা নেবেন, খাতা দেখবেন তার জো নেই। অশিক্ষক কর্মী নিয়োগও অনিয়মিত, ফলে তাদের কাজ ঘাড়ে চাপছে, তার উপর সরকারি প্রকল্পের করণিকও হয়ে উঠতে হবে। শিক্ষাবর্ষে ক্লাসের চেয়ে বেশি সময় যাচ্ছে এই শ্রী, ওই শ্রী, সেই শ্রীর হিসাব রাখতে। গরীব সরকার ওসব কাজের জন্য আলাদা লোক রাখতে পারেন না। মাধ্যমিকের প্রশ্ন ফাঁস না হলে খবর হচ্ছে। কোনো স্কুলে প্রধান শিক্ষক বা টিচার ইন চার্জ জমিদারি কায়েম করে নিয়োগ আটকে দিচ্ছেন। এমন গণতান্ত্রিক শিক্ষাব্যবস্থা কায়েম হয়েছে যে নিয়োগ সংক্রান্ত কেসের বিচারপতি তাঁর রায়ের উপর বারবার স্থগিতাদেশ দেওয়া হচ্ছে বলে ডিভিশন বেঞ্চের বিরুদ্ধে হাইকোর্ট আর সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতির কাছে নালিশ করছেন।

এত ডামাডোল দেখেও কোন বাবা-মা ছেলেমেয়েকে সরকারি স্কুলে পড়তে পাঠাবেন? মাস্টারমশাই, দিদিমণিরা ভুক্তভোগী। তাই তাঁরাও নিজেদের ছেলেমেয়েদের বেসরকারি ইংরেজি মাধ্যমে দিচ্ছেন। সরকারের পোয়া বারো। বহু স্কুল ফাঁকা হয়ে যাচ্ছে, সেগুলোকে তুলে দেওয়া হচ্ছে। শিক্ষা খাতে খরচ আরও কমিয়ে ফেলা যাচ্ছে, ভবিষ্যতের কত খরচ বেঁচে যাচ্ছে ভাবুন। তবে মাঝে মাঝে দেখানো দরকার যে সরকার স্কুলগুলোকে নিয়ে ভাবেন। তাই কিছু সরকারি স্কুলকে ইংরেজি মাধ্যম করে দেওয়া হয়েছে, ভবিষ্যতে হয়ত আরও হবে। এর পাশাপাশি আছে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় হিন্দি বিশ্ববিদ্যালয়। কেবল অয়ন্তিকাকে গাল পেড়ে বাংলা মাধ্যমের মান থাকবে?

ভারতের মত বহুভাষিক দেশে কেবল নিজের মাতৃভাষা শিখলে যে চলে না, তা ঠিকই। কিন্তু নিজের ভাষার বারোটা পাঁচ বাজিয়ে দেওয়ারও প্রয়োজন পড়ে না। তার প্রমাণ তামিল, মালয়ালম, কন্নড় ভাষাভাষীরা। আজকের ভারতে কোনো বিষয়েই তারা অন্য রাজ্যের লোকেদের চেয়ে পিছিয়ে নেই। শিল্প, সাহিত্য, কলা, বিজ্ঞানে বাঙালিদের চেয়ে ঢের এগিয়ে। দুঃখের বিষয় খিচুড়ি ভাষায় কথা না বলেও তারা দিব্যি ইংরেজি আয়ত্ত করে ফেলছে। আর বাঙালি কর্পোরেটের চাকুরে হয়ে উঠতে এত ব্যস্ত যে একসময় বাঙালি পণ্ডিতদের যা বৈশিষ্ট্য ছিল, বাংলা ও ইংরেজিতে সমান মুনশিয়ানা, তা লুপ্তপ্রায়। এখন বাঙালির ভাষা চৌরঙ্গী ছবির স্যাটা বোসকে মনে পড়ায়। বাংলা শেক্সপিয়রের মত, ইংরেজি তুলসীদাসের মত আর হিন্দি রবীন্দ্রনাথের মত। মাননীয়া রেডিও জকির মত লেখাপড়া জানা কূপমণ্ডূক বাঙালি মনে করে হিন্দি, ইংরেজি ছাড়া বাংলা বলে আঁতেলরা। সে বাংলা বঙ্কিমচন্দ্রের। আর খিস্তি হল নবারুণ ভট্টাচার্যের বাংলা। কিন্তু কেবল এফ এমের আর জে নয়, আজকাল সাহিত্যিকরাও খিচুড়ি ভাষাই ব্যবহার করেন। কবিতা পত্রিকায় ওই ভাষায় বাংলা কবিতা নিয়ে প্রবন্ধ লেখা হয়। কদিন আগে বাংলা ভাষার এক ফেসবুক কাঁপানো কবি খিচুড়ি ভাষায় নামকরণ করা এক অনুষ্ঠানের বিচারক হয়েছেন। সোশাল মিডিয়ায় এক বাঙালি মুসলমান যুবক তা নিয়ে প্রশ্ন তোলায় কবির পাল্টা যুক্তি ছিল, আপনার নামটাই তো বাংলা নয়।

আর আপনি ভাবছেন বাংলা বিজেপি বা অয়ন্তিকার হাতে বিপন্ন?

নাগরিক ডট নেট-এ প্রকাশিত। ছবি ইন্টারনেট থেকে

আরও পড়ুন

হিন্দির হাতে বাংলা বিপন্ন: বাঙালি কি নির্দোষ?

বাধ্যতামূলক মহানতার একাকিত্বে ইমাম রশিদি

এক পুত্র আর এক পিতার গল্প বলি। প্রথম জনের বাবা খুন হয়েছিলেন গোরক্ষায় নিবেদিতপ্রাণ মানুষদের হাতে, দ্বিতীয় জনের ছেলে খুন হয়েছিল দাঙ্গাবাজদের হাতে। দ্বিতীয় জনকে আমরা সবাই চিনি — আসানসোলের নূরানী মসজিদের ইমাম ইমদাদুল রশিদি। প্রথম জনের নাম অভিষেক সিং। একবিংশ শতাব্দীতে শোকের আয়ু এক বছরও নয়। অতএব মনে করিয়ে দেওয়া যাক, অভিষেকের বাবা সুবোধ কুমার সিং ছিলেন উত্তরপ্রদেশ পুলিসের ইন্সপেক্টর, একসময় দাদরির আখলাক আহমেদের খুনের ঘটনার তদন্ত করছিলেন। ইমামের ছেলে সিবগাতুল্লা খুন হয়েছিল ২০১৮ মার্চের দাঙ্গায়, ওই বছরেরই ৩ ডিসেম্বর উত্তরপ্রদেশের বুলন্দশহরের এক অঞ্চলে একটি গরুর মৃতদেহ নিয়ে গোহত্যাকারীদের শাস্তির দাবিতে জনতা উন্মত্ত হয়ে ওঠে। পরিস্থিতি সামাল দিতে গিয়ে সুবোধ গুলিবিদ্ধ হন। ইমাম রশিদিকে আমরা মনে রেখেছি দাঙ্গার মাঝখানে দাঁড়িয়ে পুত্রশোক অগ্রাহ্য করে হিন্দু-মুসলমান মৈত্রীর বার্তা দেওয়ার জন্য। মুসলমানদের দিক থেকে বদলা নেওয়ার চেষ্টা হলে আসানসোল ত্যাগ করবেন বলার জন্য। সুবোধপুত্র অভিষেকও পিতৃশোকের মাঝেই সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির বার্তা দিয়েছিলেন, বলেছিলেন বাবা শিখিয়ে গেছেন হিন্দু মুসলমান আলাদা নয়। ভারতীয়দের ঐক্যবদ্ধ থাকা উচিত। যেন এমন না হয় যে বহিঃশত্রুর দরকারই হল না, ভারতীয়রা নিজেরাই নিজেদের সর্বনাশ করে বসল।

কদিন হল ইমাম রশিদি আবার সংবাদের শিরোনামে এসেছেন পুত্র সিবগাতুল্লার খুনের মামলায় সাক্ষ্য দিতে অস্বীকার করার জন্য। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির স্বার্থে এত বড় ত্যাগ দেখে প্রশংসার বন্যা বয়ে যাচ্ছে, সংখ্যাগুরু সম্প্রদায়ের ধর্মনিরপেক্ষ আমরা আপ্লুত। এই তো আমাদের দেশ, ইমামের মত লোকেরাই তো আমাদের আশার আলো, ইত্যাদি বয়ানে সংবাদপত্রের প্রথম পাতা থেকে ফেসবুক ওয়াল পর্যন্ত সবই মুখরিত। একটি সংবাদপত্রে সরকারপক্ষের উকিলের বিবৃতিও বেরিয়েছে। তিনি বলেছেন চার দশকের বেশি ওকালতির অভিজ্ঞতায় কখনো কোনো মৃতের বাবাকে এমন অবস্থান নিতে দেখেননি। যদিও ইমাম সাহেবের এমন আচরণ মোটেই অপ্রত্যাশিত নয়। সিবগাতুল্লার হত্যার পরেই তিনি বলেছিলেন যে একজন হত্যাকারীকে ধরতে পেরেও ছেড়ে দিয়েছেন

সুবোধ কুমারের ছেলে অভিষেক এবং পরিবারের বাকি সদস্যরা কিন্তু এত মহান নন। আর পাঁচটা খুনের মামলার মত করেই সে মামলা এগোচ্ছে। দ্য টাইমস অফ ইন্ডিয়া কাগজের এক প্রতিবেদন থেকে জানা যাচ্ছে, সুবোধের খুনে অভিযুক্ত ৪৪ জনের মধ্যে ৩৬ জনের বিরুদ্ধে পুলিস দেশদ্রোহ আইনে মামলা করার অধিকার পেয়েছে এ বছরের ১৬ মার্চ। শোনামাত্রই কেউ কেউ সিদ্ধান্ত করতে পারেন, যোগীর রাজ্যে ন্যায়বিচার হচ্ছে। কিন্তু ঘটনা হল অভিযুক্তদের মধ্যে মাত্র ছজন জেলে আছে, বাকি সকলেই জামিনে বাইরে। প্রধান অভিযুক্ত বজরং দলের সদস্য যোগেশ রাজও শুরুতেই এলাহাবাদ হাইকোর্ট থেকে জামিন পেয়ে গিয়েছিল, কিন্তু সুপ্রিম কোর্ট বাগড়া দেওয়ায় তার বেরিয়ে আসা হয়নি। বুলন্দশহরের পুলিস এফ আই আর করার সময়েই খুন, হিংসা এবং দেশদ্রোহিতার (সেকশন ১২৪এ) অভিযোগ এনেছিল। কিন্তু পরে আদালত শেষেরটি বাদ দেয়, কারণ রাজ্য সরকারের কাছ থেকে অনুমোদন পাওয়া যায়নি। সে অনুমোদন পাওয়া যায় ২০১৯ সালের জুন মাসে। তারও প্রায় তিন বছর পরে বুলন্দশহর জেলা আদালত এই অভিযোগ অনুমোদন করেছে। অথচ সারা দেশে কয়েকশো মানুষ, যাঁদের একটা বড় অংশ মুসলমান, এই অভিযোগে অভিযুক্ত হয়ে কারাবাস করছেন। এদের মধ্যে সাংবাদিক সিদ্দিক কাপ্পান, ছাত্রনেতা উমর খালিদ, শার্জিল ইমাম আছেন। অশীতিপর ফাদার স্ট্যান স্বামী তো শুনানি ছাড়াই জেলের মধ্যে মারা গেলেন। পারকিনসন্স ডিজিজে আক্রান্ত মানুষটির জন্য তাঁর আইনজীবীরা সামান্য জল খাওয়ার স্ট্রয়ের আবেদন করেও সফল হননি।

অথচ ভারতের বিচারব্যবস্থা কিন্তু অমানবিক নয়। এই তো গতকাল দিল্লির এক আদালত ওঙ্কারেশ্বর ঠাকুরকে জামিন দিয়েছে মানবিকতার কারণে। ওঙ্কারেশ্বর সুল্লি ডিলস বলে একটি অ্যাপ তৈরি করায় অভিযুক্ত, যে অ্যাপে মুসলমান মহিলাদের কাল্পনিক নিলাম করা হয়েছিল। বিচারক ওঙ্কারেশ্বরকে জামিন দিয়ে বলেছেন, অভিযুক্তের এটা প্রথম অপরাধ। তাকে দীর্ঘদিন আটকে রাখলে তার শরীর স্বাস্থ্যের উপর খারাপ প্রভাব পড়তে পারে।

এ তো পাতিয়ালা হাউস কোর্টের এক বিচারকের মন্তব্য। দেশের হাইকোর্টগুলো পর্যন্ত অত্যন্ত মানবিক। গত শনিবার দিল্লি হাইকোর্ট কেন্দ্রীয় মন্ত্রী অনুরাগ ঠাকুর আর পরবেশ কুমারের বিরুদ্ধে বিদ্বেষমূলক বক্তৃতার (হেট স্পিচ) অভিযোগে দায়ের হওয়া পিটিশনের উত্তরে বলেছে, কোনো কথা হেসে বললে অপরাধ হয় না। তাছাড়া ভোটের সময়ে বিদ্বেষমূলক কথা বললেও ক্ষতি নেই।

অর্থাৎ ক্ষেত্র বিশেষে বিচারকরা অত্যন্ত উদার, অত্যন্ত মানবিক। তবে সব ক্ষেত্রে অতটা হওয়া যায় না। ইমাম সাহেবের মত লোকেদের, ভারতের সংখ্যালঘুদের এই তারতম্য বুঝে না নিয়ে উপায় নেই। বিশেষত আজকের ভারতে মহান হওয়া সংখ্যাগুরুর কাছে একটি বিকল্প, সংখ্যালঘুর একমাত্র উপায়। আমাদের মধ্যে যাদের ইমাম সাহেবের প্রশংসা করতে গিয়ে আবেগে গলা বুজে আসে, তারা বুঝতে পারি না যে তিনি ছেলের খুনিদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিলে, তাদের শাস্তি হলে মুহূর্তে সোশাল মিডিয়ার সাহায্যে কেবল আসানসোল কেন, গোটা দেশে মুসলমান সম্প্রদায়ের মানুষের বিরুদ্ধে ঘৃণা ছড়িয়ে পড়তে পারে। দ্য কাশ্মীর ফাইলস-এর চেয়েও দ্রুত প্রতিক্রিয়া হবে। এ দেশ এখন নরকের দক্ষিণ দুয়ারে পৌঁছে গেছে। এখানে দাঁড়িয়ে প্রকাশ্যে গণহত্যার ডাক দেওয়া যায়, মুখে হাসিটি থাকলেই হল। এসব আমরা বুঝি না বলেই আসানসোল দাঙ্গার অগ্রণী নেতা বাবুল সুপ্রিয়র তৃণমূল কংগ্রেসের টিকিটে ভোটে দাঁড়ানোর বিরুদ্ধে ইমাম বিবৃতি দিলেন না বললে আমাদের গোঁসা হয়। আমরা কিছুতেই বোঝার চেষ্টা করি না, পশ্চিমবঙ্গের মুসলমানদের চোখের সামনে এখন এমন কোনো বিকল্প রাজনৈতিক শক্তি নেই, যারা দাঙ্গার সময়ে তাঁদের ঢাল হয়ে উঠবে বলে ওঁরা আশা করতে পারেন। রাজ্যের সর্বময় কর্ত্রীর উদ্দেশে “সকলি তোমারি ইচ্ছা, ইচ্ছাময়ী তারা তুমি” গাওয়া ছাড়া ইমাম সাহেবদের সামনে কোনো পথ খোলা নেই। ধর্মনিরপেক্ষ সংখ্যাগুরুর সামাজিক নিষ্ক্রিয়তা এবং বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর রাজনৈতিক নিষ্ক্রিয়তাই তাঁদের বাধ্যতামূলক মহানতার একাকিত্বে বন্দি করেছে।

https://nagorik.net এ প্রকাশিত

অনুরূপ পোস্ট

রাহুলে না, বাবুলে হ্যাঁ: তৃণমূলের প্রকৃত এজেন্ডা নিয়ে কিছু প্রশ্ন

%d bloggers like this: