দিমাগী নকশাল: সমস্যা নকশাল নিয়ে, নাকি মগজ নিয়ে?

শুনেছি মার্কিন দেশে অ্যালবার্ট আইনস্টাইনের মগজ নানা ভাগে ভাগ করে রীতিমত সংরক্ষণ করে রাখা হয়েছে, কারণ এক জীবনে অত বিরাট বিরাট কাজ করে যাওয়া লোক মানুষের ইতিহাসে বিরল। কিন্তু সে তো তাঁর আশ্চর্য মেধার প্রকাশ দেখে তাঁর মৃত্যুর পর করা হয়েছে। জ্যান্ত লোকের মগজ দেখতে পান নাকি আমাদের প্রধানমন্ত্রী! তাঁর কাছে কি সুকুমার রায় বর্ণিত ফুটোস্কোপ রয়েছে?

আনন্দময় বর্মণকে বোধহয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এবং তাঁর মন্ত্রিসভার সদস্যরা চেনেন না। চিনে নিতে চাইলে কাজটা কঠিন নয়, কারণ উনি ভারতীয় জনতা পার্টির টিকিটেই নির্বাচিত বিধায়ক।

স্বাধীনতা দিবসের ভাষণে ‘দিমাগী নকশাল’ বলতে প্রধানমন্ত্রী ঠিক কী বুঝিয়েছেন তার ব্যাখ্যা দিতে হয়েছে মন্ত্রিসভার সদস্য কিরেণ রিজিজুকে। নকশাল আন্দোলন কী এবং নকশাল কারা— সে ব্যাপারে যাঁদের সামান্য ধারণা আছে তাঁদের রিজিজুর ব্যাখ্যা শুনে হাসি পাওয়া স্বাভাবিক। তিনি যেসব বৈশিষ্ট্য নির্ধারণ করেছেন তার সঙ্গে নকশাল হওয়ার কোনও আবশ্যিক সম্পর্ক নেই। তার উপর আলাদা করে ‘দিমাগী’ বলতে কী বোঝানো হয়েছে তার ব্যাখ্যাও নেই।

অথচ ভারতের নকশাল আন্দোলন যেখান থেকে শুরু হয়েছিল, সেই নকশালবাড়ি জায়গাটা যে বিধানসভার অধীনে (মাটিগাড়া-নকশালবাড়ি), তা এখন বিজেপিরই দখলে। সেখানকারই বিধায়ক আনন্দময়বাবু। প্রধানমন্ত্রী বা কিরেণবাবু যদি একবারটি তাঁর সঙ্গে কথা বলতেন, তাহলেই হয়ত এমন ঘেঁটে ঘ অবস্থা হত না যাতে প্রধানমন্ত্রীর বক্তৃতার ‘মেড ইজি’ দিতে হয় আরেকজন মন্ত্রীকে; তাতেও এমন সব অদ্ভুত কথা বেরোয় যে সোশাল মিডিয়ায় হাসাহাসি চলে।

অবশ্য এসব গ্রহের কারসাজিও হতে পারে। কারণ ২০১৪ থেকে এই সেদিন পর্যন্ত মোদীজি ও তাঁর দল কাউকে ‘আর্বান নকশাল’, ‘টুকড়ে টুকড়ে গ্যাং’, ‘অ্যান্টি-ন্যাশনাল’, ‘আন্দোলনজীবী’, ‘খালিস্তানি’ ইত্যাদি তকমা দিলে দেশসুদ্ধ লোক তা শিরোধার্য করে সেইসব লোককে দেশের শত্রু হিসাবে মেনে নিত। যারা চিহ্নিত হল তাদের পত্রপাঠ গ্রেফতারি, তাদের নামে এফআইআর দায়ের, বাড়িতে বা অফিসে তল্লাশি চলত। তাদের বন্ধুবান্ধবরাও কিঞ্চিৎ ভীত হয়ে পড়তেন, পাছে সঙ্গদোষে তাঁদেরও একই হাল হয়। কিন্তু কে জানে কোন গ্রহের ষড়যন্ত্রে সেসব চলতে থাকলেও ভয় আউট, ঠাট্টা ইন হয়ে গেছে। দেশের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত আন্দোলনকারী, মানবাধিকার কর্মী, তথ্যের অধিকার আইন নিয়ে মামলা মোকদ্দমা করা লোকজনের (যাদের মধ্যে আবার তরুণ আইনজীবীরাও আছেন) উপর ক্ষিপ্ত হয়ে তাদের আরশোলার সঙ্গে তুলনা করলেন। ও মা! কিছুদিনের মধ্যেই ককরোচ জনতা পার্টি তৈরি হয়ে গেল! তারপর তাদের সঙ্গে গুচ্ছের বামপন্থী ও আম্বেদকরপন্থী ছেলেমেয়ে জুটে গেল। দিল্লির যন্তর মন্তর থেকে শুরু হয়ে তারা গোটা উত্তর ভারতে ওড়াউড়ি শুরু করে দিল; বিভিন্ন রাজ্যের পুলিশ ‘হিট’ দিতে দিতে নাজেহাল, কিছুতেই কিছু হয় না। অমিত শাহের চাণক্যসুলভ বুদ্ধি পর্যন্ত ফেল। আরশোলা মারতে গিয়ে এমন হল যে তিনি নিজেই সংসদে ঢোকা ছেড়ে দিতে বাধ্য হলেন। প্রধানমন্ত্রী বাংকারে আশ্রয় নিয়েছিলেন কিনা কে জানে! যা-ই হোক, আরশোলাদের ইনস্টাগ্রামে ক্ষমা করে দিয়ে তিনি লালকেল্লা থেকে দেশের মানুষকে ‘দিমাগী নকশাল’ সম্পর্কে সাবধান করলেন। এবারে দেখা গেল মোটেই কেউ ঘাবড়াচ্ছে না। সোশাল মিডিয়ায় দিমাগী নকশাল পার্টিও তৈরি হয়ে গেছে। কেউ আর ভয় তো পাচ্ছেই না, এমনকী ব্যাপারটা এমন ‘কুল’ হয়ে দাঁড়িয়েছে যে নকশাল (মাওবাদী) সংগঠনগুলোর বিরুদ্ধে অপারেশন গ্রীন হান্ট চালু করে অমিত শাহকে অপারেশন কাগারের পথ দেখিয়েছিলেন যে পি চিদম্বরম, তিনিও নিজেকে দিমাগী নকশাল বলে দাবি করে বসেছেন। বল মা তারা দাঁড়াই কোথা!

প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন, নকশালরা শেষ হয়ে গেছে। কিন্তু দিমাগী নকশালরা এখনও আছে। তাদের থেকেই সাবধান হতে হবে। একথা শুনে আমার মত ছাপোষা নাগরিকদের কিছুটা আশ্বস্ত লাগে। নকশালরা নিজেরাও গুনে বলতে পারবে না তাদের কতরকমের প্রকারভেদ আছে, তার মধ্যে কারা অবশিষ্ট আছে আর কারা অপারেশন কাগারের ফলে অবলুপ্ত। কিন্তু মোদীজি যখন বলছেন আর কেউ নেই, তখন নিশ্চিত নেই।

আরও পড়ুন ওয়ারেন হেস্টিংস যা শেখালেন

সেই ২০১৬ সালে নোটবন্দির পর থেকে শুনে আসছি, নকশালরা শেষ হয়ে গেছে। কথাটা এতবার বলা হয়েছে যে এবার গুনে দেখতে হবে এ পর্যন্ত কতবার নকশালরা শেষ হয়েছে। যা-ই হোক, আরও একবার শেষ হলে ক্ষতি কী? শাস্ত্রে বলেছে অধিকন্তু ন দোষায়। তাই স্বাধীনতা দিবসের বক্তৃতা শুনে আশায় বুক বেঁধেছিলাম। কিন্তু দিমাগী নকশাল আবার কোথা থেকে এল রে বাপু! দিমাগ মানে তো মগজ। তাহলে দিমাগী নকশাল মানে হল মগুজে নকশাল। এটা কি কাগুজে বাঘের মত ব্যাপার? তা বাপু বাঘশুমারির সময়ে আলাদা করে কাগুজে বাঘও গোনা হয় বলে তো শুনিনি। কাগুজে বাঘ আসল বাঘের সমান বিপজ্জনক, এমনও শুনিনি। তাহলে নকশালরা আর না থাকলে মগুজে নকশালদের নিয়ে এত চিন্তা কীসের? তাছাড়া কোন মানুষটারই বা মগজ নেই? যারা প্রধানমন্ত্রীর দলের লোক তারা কি বিনা মগজেই এত বড় দেশ চালাচ্ছে?

তাহলে সমস্যা কি কিছু মানুষের মগজে যা আছে তা নিয়ে? তবে তো ভারি মুশকিল। শুনেছি মার্কিন দেশে অ্যালবার্ট আইনস্টাইনের মগজ নানা ভাগে ভাগ করে রীতিমত সংরক্ষণ করে রাখা হয়েছে, কারণ এক জীবনে অত বিরাট বিরাট কাজ করে যাওয়া লোক মানুষের ইতিহাসে বিরল। কিন্তু সে তো তাঁর আশ্চর্য মেধার প্রকাশ দেখে তাঁর মৃত্যুর পর করা হয়েছে। জ্যান্ত লোকের মগজ দেখতে পান নাকি আমাদের প্রধানমন্ত্রী! তাঁর কাছে কি সুকুমার রায় বর্ণিত ফুটোস্কোপ রয়েছে? অবশ্য মোদীজি পারেন না এমন জিনিস নেই। সেই কোন ছেলেবেলায় কুমিরের মুখ থেকে খেলার বল উদ্ধার করে এনেছিলেন। এই তো সেদিন সশরীরে উপস্থিত না হয়েও কয়েক ঘন্টার জন্যে রুশ-ইউক্রেন যুদ্ধ থামিয়ে দিয়েছিলেন। তাঁর পক্ষে জ্যান্ত মানুষের মগজে কী আছে তা জানা আর এমন কী ব্যাপার?

কিন্তু যদি জানেনই যে যা আছে তা দেশের পক্ষে ক্ষতিকর, তাহলে এতদিন কোনো ব্যবস্থা নেননি কেন? তিনিই তো আমাদের দণ্ডমুণ্ডের কর্তা। পেট্রল পাম্প থেকে ভ্যাকসিন সার্টিফিকেট (সুনীল শেঠির ঠাকুরঘরেও)— তিনি সর্বত্রগামী। কেবল দেশের শত্রুদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার বেলাতেই সব দায়িত্ব আমাদের ঘাড়ে এসে পড়বে নাকি? করোনা ভাইরাস আটকানোর মত মগুজে নকশালদের আটকানোর জন্যেও এবার থালা বাজানোর হোমটাস্ক দেবেন আমাদের, নাকি মোমবাতি জ্বালানোর? নাকি কোথাও লাইন-টাইন দিতে হবে আবার? গত বারো বছরে এই একটা শিল্পেই তো নিয়মিত কর্মসংস্থান হয়েছে। টাকা তুলতে লাইন, অমুকের সঙ্গে তমুকের লিংক করাতে লাইন, এসআইআরে নাম তুলতে লাইন, ট্রাইব্যুনালে লাইনে দাঁড়ানোর পর এবার কি মগুজে নকশাল নই প্রমাণ করতে লাইনে দাঁড় করানো হবে আবালবৃদ্ধবণিতাকে?

নাকি সমস্যা মগজ থাকলেই? তাই যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় বা জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের মত মগজের চর্চা করার জায়গাগুলোতে রাত বিরেতে হামলা হবে? সে সরকার মাইবাপ, যদি তাই চান তো তাই হবে। ঠেকাবে কে? কিন্তু যাদবপুর বা জেএনইউ-কে মেরে ধরে গলগোটিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের স্তরে নামিয়ে আনলেই কি মগজের সমস্যা মিটবে? মগজ যে সকলেরই আছে, আর সেটা থাকে মুণ্ডুতে। তা মুণ্ডু গেলে খাবটা কী? অবশ্য গ্যাসের দাম, জিনিসপত্রের দাম যেভাবে বাড়ছে তাতে খাওয়ার খরচ অনেক। হিতৈষী সরকার হয়ত খরচ বাঁচিয়ে দিতে চাইছেন। এটাই মাস্টারস্ট্রোক।

a2onuswor.com ওয়েবসাইটে প্রকাশিত

বাকস্বাধীনতা এখন রীতিমতো কমেডি

পাটনার আন্দোলনে এক যুবক উপস্থিত পুলিশকর্মীকে জিজ্ঞেস করছেন “কাঁদানে গ্যাস, জলকামানের ব্যবস্থা করেছেন?” উত্তরে তিনি না বলায় বলছেন “এ কে ৪৭?” তাতেও না বলায়, যেন ভারি হতাশ হয়ে বলছেন “কিছুরই ব্যবস্থা করেননি?”

দেশ স্বাধীন হতে না হতেই কমিউনিস্টরা স্লোগান তুললেন “ইয়ে আজাদি ঝুঠা হ্যায়”;অর্থাৎ এই স্বাধীনতা মিথ্যা। তাঁদের বক্তব্য— এ কেবল রাজনৈতিক স্বাধীনতা, দেশের গরিব নিপীড়িত মানুষ অর্থনৈতিকভাবে স্বাধীন না হলে সেটা স্বাধীনতাই নয়। কেবল স্লোগান তুললে তো রাজনীতি হয় না,যে কোনো পার্টিকেই তার বার্তা উদ্দিষ্ট মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার একাধিক পথ বের করতে হয়। আজকের রিলের যুগে যেমন, সে যুগেও তেমন গানের মাধ্যমে বার্তা দিলে অনেক সহজে অনেক বেশি মানুষের কাছে পৌঁছত। বিশেষ করে গান একেবারে লেখাপড়া না জানা মানুষের কাছেও বার্তা পৌঁছে দিতে পারে,যা অনেকসময় বক্তৃতা বা প্যামফ্লেট পারে না। তাই অবিভক্ত কমিউনিস্ট পার্টির সাংস্কৃতিক শাখা,ভারতীয় গণনাট্য সঙ্ঘের সদস্যরা ১৯৪৮ সালে গান বাঁধলেন—মাউন্টব্যাটেন মঙ্গলকাব্য। বাংলার প্রাচীন মঙ্গলকাব্যের প্রকরণ মেনে তাতে ভারতের স্বাধীনতাকে তুলে ধরা হল স্রেফ ক্ষমতা হস্তান্তর হিসাবে। “মাউন্টব্যাটন সাহেব ও/তোমার সাধের ব্যাটন/কার হাতে থুইয়া গেলায়ো।” সেই গানে মাউন্টব্যাটেনের স্থলাভিষিক্ত গভর্নর জেনারেল চক্রবর্তী রাজাগোপালাচারী নয়, প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু এবং বল্লভভাই প্যাটেল, মৌলানা আবুল কালাম আজাদের মত মন্ত্রিসভার অন্য সদস্যদের নিয়েও একেবারে নাম করে প্রচণ্ড ব্যঙ্গ করা হয়। সে গান নিষিদ্ধ করেনি ভারত সরকার বা পশ্চিমবঙ্গ সরকার। সেই গান যাতে ছড়াতে না পারে তার ব্যবস্থা করেছিল বলেও জানা যায় না। কমিউনিস্ট পার্টি ওই ১৯৪৮ সালেই নিষিদ্ধ হয়েছিল, কিন্তু সেটা ওই গানের জন্যে নয়।

বছর চল্লিশেক এগিয়ে আসা যাক। ১৯৮৯ লোকসভা নির্বাচনের আগে বিদায়ী প্রধানমন্ত্রী সম্পর্কে বিরোধীরা স্লোগান তোলেন “গলি গলি মে শোর হ্যায়/রাজীব গান্ধী চোর হ্যায়।” কারণ তার কিছুদিন আগেই অভিযোগ উঠেছে— ভারতীয় সেনাবাহিনীর জন্য সুইডেনের অস্ত্র নির্মাণ কোম্পানি বোফর্সের কাছ থেকে অস্ত্র কেনায় প্রায় ১,৪০০ কোটি টাকার দুর্নীতি হয়েছে এবং স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী ঘুষ খেয়েছেন। গোটা নির্বাচন পর্ব এই স্লোগান চলে,আমরা দেখতাম দেয়াল জুড়ে এই স্লোগান লেখা হচ্ছে পাড়ায় পাড়ায়। রাজীব তথা কংগ্রেস আগাগোড়া এই অভিযোগ অস্বীকার করে, কিন্তু নির্বাচনে কংগ্রেস জনসমর্থন হারায়। একদা রাজীবের মন্ত্রিসভার সদস্য বিশ্বনাথ প্রতাপ সিং প্রধানমন্ত্রী হন। কিন্তু একবারের জন্যও রাজীব নিজে বা কংগ্রেস বলেনি যে প্রধানমন্ত্রী চেয়ারটা সাংবিধানিক, তাঁকে চোর বলা মারাত্মক পাপ। অথবা যারা তাঁকে চোর বলছে তারা দেশদ্রোহী, বা তাদের পাকিস্তানে চলে যাওয়া উচিত। ফলে আজ আরও প্রায় ৪০ বছর পরে যখন প্রধানমন্ত্রীকে ঠাট্টার পাত্র বানিয়ে ফেলার জন্যে ছাত্রছাত্রীদের গ্রেফতার করা হচ্ছে; ১৫ বছরের মেয়ের বাড়িতে ঢুকে পড়ে তাকে এবং তার মাকে এমন ভয় দেখানো হচ্ছে যে তাঁরা বাড়ি ছেড়ে দিতে বাধ্য হচ্ছেন; যারা প্রধানমন্ত্রীকে হাসি ঠাট্টা, কার্টুনের বিষয়বস্তু বানিয়ে ফেলেছেন তাঁদের বিরুদ্ধে এফআইআর হচ্ছে এবং উন্মত্ত জনতা তাঁদের বাড়ি পৌঁছে যাচ্ছে, তখন সত্যিই প্রশ্ন করতে ইচ্ছে হয় “ইয়ে আজাদী সচ হ্যায় ইয়া ঝুঠা হ্যায়?”এই স্বাধীনতা সত্য না মিথ্যা?

যে দেশে প্রকাশ্যে কিছু বলতে গেলে বা লিখতে গেলে শতবার ভাবতে হয়— বাড়িতে পুলিশ অথবা গুন্ডাবাহিনী আসবে কিনা, সে দেশে বাকস্বাধীনতা যে ঘোর বিপদে তা নিয়ে সন্দেহের অবকাশ নেই। তবু যে আমাদের ৮০তম স্বাধীনতা দিবসে দাঁড়িয়ে নিজেদের শেষ বিচারে স্বাধীন দেশের নাগরিক বলেই মনে হচ্ছে, তার কৃতিত্ব কিন্তু সরকার বা আদালতের নয়। কৃতিত্ব দেশের নাগরিকদের। যাবতীয় হুমকি,পুলিশের পেরেক বসানো লাঠি, এ কে ৪৭, জলকামান,কাঁদানে গ্যাস,বুলডোজার সহ্য ও অগ্রাহ্য করে এদেশের সবুজ, অবুঝ,কাঁচা নাগরিকরা দেখিয়ে দিয়েছেন— বাঁধন যত শক্ত হবে তত বাঁধন টুটিয়ে দেওয়ার সাহস তাঁদের আছে। নিজেদের মর্ত্যে আগত ভগবান মনে করা যে নেতাদের চিরাচরিত প্রতিবাদের ভাষা দিয়ে মাটিতে নামিয়ে আনা যাচ্ছিল না, তাঁদের দম ফাটানো হাসি দিয়ে ফুৎকারে উড়িয়ে দিয়েছেন নাগরিকরা। প্রধানমন্ত্রী নিজের ৫৬ ইঞ্চির ছাতি নিয়ে গর্ব করেছিলেন, এখন সেই ৫৬ ইঞ্চিকেই ব্যুমেরাং করে তাঁর দিকে ছুড়ে দিয়েছে তরুণ প্রজন্ম। কী করে বাঁচবেন তার আঘাত থেকে? ভাবতে গিয়ে রাতে না ঘুম হচ্ছে প্রধানমন্ত্রীর, না তাঁর কোটি কোটি টাকা মাইনের জনসংযোগের দায়িত্বে থাকা মানুষজনের। এক্স আর মেটাকে বলে সব অপছন্দের ভিডিও মোছানোর ব্যবস্থা করছে সরকার। নরেন্দ্র মোদী সরকারের এক মন্ত্রী নীতিন গড়করি তো সোজা আদালতে চলে গেছেন তাঁর সম্পর্কে পোস্ট মোছানোর জন্যে। কিন্তু কত মোছা হবে? যা ছড়িয়ে গেছে তা তো ছড়িয়েই গেছে,মানুষের মন থেকে মুছে দেওয়ার তো কোনো উপায় নেই। তার উপর সোশাল মিডিয়া এমন এক গ্যাঁড়াকল যে যত পোস্ট মোছা হয়, তত নতুন পোস্ট এসে পড়ে। এই যৌবন জলতরঙ্গ রুধিবে কে? ক্ষমতাশালীর ভাবমূর্তি ধূলিসাৎ,প্রেস্টিজে গ্যামাক্সিন।

এখন দেশের প্রধান বিরোধী দল কংগ্রেসও সংসদ চত্বরেই প্রধানমন্ত্রীকে বাঁদর বলছে,তাঁর যাকে তাকে জড়িয়ে ধরার অভ্যাস নিয়ে ঠাট্টা করছেন লোকসভার বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধী।

এমন নয় যে কংগ্রেস যতদিন সরকারে ছিল ততদিন ভারত বাকস্বাধীনতার স্বর্গ ছিল আর বিজেপি ক্ষমতায় আসতেই নরক হয়ে গেছে। রাহুলের ঠাকুমা ইন্দিরার আমলেই ভারতে জরুরি অবস্থা ঘোষিত হয়। তখন খবরের কাগজের অফিসে সরকারি অফিসার এসে বসে থাকতেন কোথায় কী ছাপা হচ্ছে না হচ্ছে দেখতে। বাবু দেখে মাথা দোলাবেন, তবে ছাপা হবে। তার প্রতিবাদে সেইসময় কোনো কাগজ সম্পাদকীয় স্তম্ভ খালি রেখেছিল, কেউ বা কাটা চিহ্ন ছেপে দিয়েছিল। অবাধ্য সাংবাদিকদের ব্যাপক গ্রেফতারি তো ছিলই,অবাধ্য হওয়ায় কিশোরকুমারের গান বাজানো বন্ধ করে দিয়েছিল অল ইন্ডিয়া রেডিও। এমনকী ইন্দিরার সঙ্গে নায়িকার চরিত্রের মিল আছে— এই অলিখিত অভিযোগে নিষিদ্ধ করে দেওয়া হয়েছিল সুচিত্রা সেন ও সঞ্জীবকুমার অভিনীত, গুলজারের ছবি আন্ধী। খোদ পশ্চিমবঙ্গে প্রয়াত সুব্রত মুখোপাধ্যায়ের উদ্যোগে রবীন্দ্রনাথের ‘চিত্ত যেথা ভয়শূন্য’ নিষিদ্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। মৃত্যুর আগে পর্যন্তও তা নিয়ে তাঁর কোনো আক্ষেপ ছিল না।

বাকস্বাধীনতায় সরকারি হস্তক্ষেপের আরও অজস্র দৃষ্টান্ত আছে স্বাধীন ভারতে। রাজীবের প্রধানমন্ত্রিত্বেই সলমন রুশদির স্যাটানিক ভার্সেস নিষিদ্ধ করে দেওয়া হয়েছিল মুসলমান মৌলবাদীদের চাপে। পশ্চিমবঙ্গে বামফ্রন্ট আমলে তসলিমা নাসরিনের দ্বিখণ্ডিত নিষিদ্ধ করার ইতিহাস আছে,মৌলবাদীদের সামান্য গণ্ডগোলের ভয়ে তসলিমাকে কলকাতা থেকে বিদেয় করে দেওয়ার ইতিহাসও আছে। একবার তো কলকাতা ফিল্মোৎসবে আসা একখানা ছবিতে (টরাস) লেনিনকে যেভাবে দেখানো হয়েছে তা রাজ্য সরকারের পছন্দ হয়নি বলে চলতে দেওয়া হয়নি— এমন অভিযোগও উঠেছিল। ফলে শিল্প,সাহিত্যের বাকস্বাধীনতা রক্ষায় ভারতের কোনো রাজনৈতিক শক্তির ভূমিকাই ধারাবাহিকভাবে ভালো নয়। কিন্তু গত এক যুগে মোদী সরকারের আমলে বা ডবল ইঞ্জিন সরকারগুলোর শাসনে যা হয়েছে তার মধ্যে বিলক্ষণ নতুনত্ব আছে।

এর আগে বিভিন্ন মতকে বিভিন্ন সময়ে দমন করার চেষ্টা হয়েছে; কিন্তু সিনেমা, সাহিত্য, নাটক, শিল্পকলা, এমনকী ইতিহাস রচনাতেও একটাই বয়ান সর্বত্র সবার উপরে চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা হয়নি। উপরন্তু, ইন্দিরার ঘোষিত জরুরি অবস্থার বছর দুয়েক (১৯৭৫-৭৭) বাদ দিলে, যাবতীয় সংবাদমাধ্যমের গলা টিপে ধরে তাকে দিয়ে সরকারি বয়ান বলিয়ে নেওয়ার চেষ্টা হিমাচল থেকে কন্যাকুমারী পর্যন্ত বিরল। মোদী সরকারের আমলে কিন্তু সব মিডিয়ার এক রা,জরুরি অবস্থার ঘোষণা ছাড়াই। যে কারণে গোদি মিডিয়া কথাটার উদ্ভব হয়েছে। ভারত জুড়ে এত সাংবাদিকের গ্রেফতার ও হত্যার খতিয়ানও কোনো রাজ্যে পাওয়া যাবে না। স্বভাবতই আন্তর্জাতিক প্রেস ফ্রিডম ইনডেক্সে আমাদের দেশের অবস্থা দেখে বাস কন্ডাক্টরদের মত বলতে হয় “পেছন দিকে এগিয়ে যান।”

আরও পড়ুন কুণাল, যাঁর কৌতুক আজ কামড়ায়

তবে মানুষ এত অদ্ভুত জীব, ভারত এমন আশ্চর্য দেশ যে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেললেও কোথাও কোনো বিদ্রোহ মাথাচাড়া দেবে না— এমনটা বেশিদিন হয় না। যেমন রাজনীতিতে হয় না, তেমনি বাকস্বাধীনতার ক্ষেত্রেও হয় না। এখন যে ঠাট্টার স্রোতে স্বয়ং মোদী টালমাটাল এবং রাহুল যাকে রাজনীতির ভাষা করে তুলছেন,সেটা কিন্তু শুরু করেছিলেন ঋজু বিদূষকরা। সাম্প্রতিক জেন জি আন্দোলনের এক ভাইরাল ভিডিওতে দেখা গেছে,পাটনার আন্দোলনে এক যুবক উপস্থিত পুলিশকর্মীকে জিজ্ঞেস করছেন “কাঁদানে গ্যাস, জলকামানের ব্যবস্থা করেছেন?” উত্তরে তিনি না বলায় বলছেন “এ কে ৪৭?” তাতেও না বলায়, যেন ভারি হতাশ হয়ে বলছেন “কিছুরই ব্যবস্থা করেননি?” ক্ষমতাকে এইভাবে খেলো করে দেওয়ার পথ কিন্তু দেখিয়েছেন ঋজু বিদূষকরা। কুণাল কামরার ২০১৯ সালের এক ভিডিওতে দেখা যায়,তিনি বলছেন— প্রত্যেকবার রামনবমীতে নেতারা তলোয়ার হাতে এসে বলেন, মন্দির ইয়হি বনায়েঙ্গে। তলোয়ার দেখেই মুড খারাপ হয়ে যায়। এত ট্যাক্স দিই, তাও এই ব্যাকডেটেড ওয়েপন! রকেট লঞ্চার-টঞ্চার আনুন, যাতে পাবলিকেরও আস্থা থাকে যে নেতা ঠিকঠাক এগোচ্ছেন। প্রায় এই ভাষাই উঠে এসেছে পাটনার ওই যুবকের মুখে।

এই হাস্যরস যে বিরোধী রাজনীতিবিদদের সমান বিপজ্জনক তা বুঝতে পেরে এই বিদূষকদের উপর বহুদিন ধরেই খড়্গহস্ত ডবল ইঞ্জিন সরকারগুলো। কুণাল, মুনাওয়ার ফারুকি সমেত অনেকের বিরুদ্ধে বারবার মামলা মোকদ্দমা হয়েছে; উন্মত্ত জনতার আক্রমণ হয়েছে; তাঁদের শো করার অপরাধে হল ভেঙে দেওয়া হয়েছে। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মুনাওয়ারকে তো কারাবাস পর্যন্ত করতে হয়েছে। এমনকী এসব নিয়েও ঠাট্টা করেছেন বরুণ গ্রোভার,যাঁকে কুণালরা ওঁদের গুরু বলে মানেন। বরুণ তাঁর ‘নাথিং মেকস সেন্স’ শীর্ষক শোয়ের শুরুতেই বলেন— এমন হতে পারে যে কিছুদিন পরে আপনাদের পুলিশ স্টেশন থেকে ডাক এল। ভয় পাবেন না,শুধু তিনটে প্রশ্নের উত্তর মনে রাখবেন। প্রথমত, শো কোথায় দেখেছেন? বলবেন,অ্যান্টিলায়। দ্বিতীয়ত,কমেডিয়ান কে ছিল?বলবেন,সময় রায়না। তৃতীয়ত,জোক কাকে নিয়ে ছিল?বলবেন,রাহুল গান্ধী।

তাহলে ভারতে এখন বাকস্বাধীনতার অবস্থা কি ভালো, না খারাপ? উত্তরটাও বরুণের কথাতেই দেওয়া যাক।

“ভারতে এখন কমেডি করা খুব শক্ত কাজ, কারণ কমেডির সরাসরি প্রতিযোগিতা বাস্তবের সঙ্গে।”

সত্যি কথা। নইলে সরকার বদলের পর অ্যাকাডেমি অফ ফাইন আর্টসের টিকিট কাউন্টারের রং গেরুয়া করে দিল কর্তৃপক্ষ, আজ এক দল শিল্পী গিয়ে সাদা করে দিলেন, আবার কাল আরেক দল শিল্পী এসে গেরুয়া রং করলেন লাল রং নিয়ে আপত্তি জানিয়ে— এ কি সম্ভব?

a2onuswor.com ওয়েবসাইটে প্রকাশিত

তসলিমার জয়ধ্বনি: রাজনীতি ভুলে সংস্কৃতি চর্চা স্থগিত রাখলে হয় না?

ভয় পেলে চুপ করে থাকা যায়। ক্ষমতার পক্ষ নিয়ে, সংখ্যাগুরুর পক্ষ নিয়ে ইনিয়েবিনিয়ে বা সোচ্চারে বলাবলি, লেখালিখি করার দরকার হয় না। তাদের মঞ্চে যাওয়ারও দরকার হয় না। সে কাজ যাঁরা করছেন এবং করাকে যাঁরা সমর্থন করছেন, তাঁরা ওটা না করলে মোটেই খাওয়া-পরা বন্ধ হবে না। খুব বেশি হলে যা হবে তা হল, পুজোর ছুটিতে প্যারিস বা মায়ামি বেড়াতে যাওয়ার সঙ্গতি থাকবে না, মন্দারমণি দিয়ে কাজ সারতে হবে।

কারও কাছে কিছু দাবি করা চলবে না। নেতাদের কাছ থেকে তাদের কাজের কৈফিয়ত দাবি করা চলবে না। ফুটবলারদের কাছ থেকে অন্য ফুটবলারদের অপমানে প্রতিবাদ দাবি করা চলবে না। দেশের যুবসমাজের উন্মাদনা এবং পকেটের পয়সায় যারা কোটিপতি, সেই খেলোয়াড় বা অভিনেতাদের কাছ থেকে ওই যুবসমাজের উপর দমনপীড়ন নেমে এলে তার বিরোধিতা দাবি করা চলবে না। সংবাদমাধ্যমের কাছে সত্যনিষ্ঠা দাবি করা চলবে না। এমনকী সাহিত্যিকরা বিবেকবান হবেন, যিনি ধর্মীয় মৌলবাদের ও সংখ্যাগুরুবাদের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার কারণে দেশছাড়া, তিনি অন্য দেশের মৌলবাদ ও সংখ্যাগুরুবাদের সঙ্গে আপস করবেন না— এ দাবিও করা চলবে না। এমনটাই আমাদের সময়ের দাবি।

কারণ? সকলেরই নাকি রুটিরুজির প্রশ্ন আছে, অস্তিত্বের প্রশ্ন আছে। যেন ইতিহাসের একমাত্র এই কালখণ্ডেই সত্যি কথা বলতে হলে, প্রতিবাদ করতে হলে মানুষকে নিজের রোজগার, নিজের অস্তিত্বের ঝুঁকি নিতে হচ্ছে। যেন অতীতে সর্বদেশে সর্বকালে প্রতিবাদ করা ভারি আরামের কাজ ছিল। দমনপীড়নে বিশ্বাসী সরকার বা মৌলবাদীরা প্রতিবাদীদের চাকরি দিত, চাকুরে হলে মাইনে বাড়িয়ে দিত, বোনাস দিত, মাঝেমধ্যে পুরস্কারও দিত। একে-৪৭ হাতে নিয়ে ভিন্ন মতের মানুষের বাড়ির বাইরে নিজেরাই পাহারা দিত, বলত “আমি আপনার বিরোধী হতে পারি, কিন্তু আপনার কথা বলার অধিকার আমি নিজের জীবন দিয়েও রক্ষা করব।”

মজা হল, রুটিরুজির যুক্তি যাঁরা দিচ্ছেন তাঁরা কেউ ‘দিন আনি দিন খাই’ শ্রেণির মানুষ নন। সরকারি দমন বা সংখ্যাগুরুবাদী গুন্ডাদের হাতে মারধর, হয়রানির ভয় সকলের আছে (এই লেখকেরও আছে)। নাট্যকর্মী থেকে শুরু করে ১৫ বছরের বাচ্চা মেয়েকে পর্যন্ত যেভাবে সদলবলে আক্রমণ করা হচ্ছে, তাতে ভয় পেলে কাউকে দোষ দেওয়াও যায় না। কিন্তু ভয় পেলে চুপ করে থাকা যায়। ক্ষমতার পক্ষ নিয়ে, সংখ্যাগুরুর পক্ষ নিয়ে ইনিয়েবিনিয়ে বা সোচ্চারে বলাবলি, লেখালিখি করার দরকার হয় না। তাদের মঞ্চে যাওয়ারও দরকার হয় না। সে কাজ যাঁরা করছেন এবং করাকে যাঁরা সমর্থন করছেন, তাঁরা ওটা না করলে মোটেই খাওয়া-পরা বন্ধ হবে না। খুব বেশি হলে যা হবে তা হল, পুজোর ছুটিতে প্যারিস বা মায়ামি বেড়াতে যাওয়ার সঙ্গতি থাকবে না, মন্দারমণি দিয়ে কাজ সারতে হবে। পশ্চিমবঙ্গের বাঙালি লেখকদের রবীন্দ্র পুরস্কার, বঙ্কিম পুরস্কার, বাংলা আকাদেমি পুরস্কার, সাহিত্য আকাদেমি পুরস্কারের দরজা বন্ধ হয়ে যাবে। তেতো সত্য হল— ভোগবাদ আর ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদে আমরা এমন গলা পর্যন্ত ডুবে গেছি যে ওসব ছাড়াও যে বাঁচা যায় তা আমাদের পাড়ার ছাপোষা গোঁসাই থেকে শুরু করে নামকরা কবি গোঁসাই পর্যন্ত কেউ কল্পনাও করতে পারে না। কিন্তু সকলের বাড়িতেই আয়না আছে। যিনি যত বিখ্যাত, তাঁর আয়না তত বড়। তার সামনে দাঁড়ালে নিজের এই চেহারা দেখে আমাদের সকলেরই লজ্জা করে। সেই লজ্জা ঢাকতে পাতার পোশাক হল “রুটিরুজি”। এ রাজ্যের বাংলা ভাষার লেখকরা ভালো করেই জানেন (এখন সোশাল মিডিয়ার দৌলতে অনেক পাঠকও জেনে ফেলেছেন) যে বাংলায় সাহিত্য রচনা করে রুটিরুজির ব্যবস্থা হয় না। লেখকদের প্রায় সকলেরই অন্য পেশা আছে, যাঁদের নেই তাঁরা অন্য পেশার খোঁজে আছেন। শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের পসার বিখ্যাত, তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় বইয়ের রয়্যালটি দিয়ে গাড়ি কিনেছিলেন শোনা যায়। গজেন্দ্রকুমার মিত্র আরেকজনের সঙ্গে মিলে আস্ত প্রকাশনা সংস্থা খুলে ফেলেছিলেন। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, বুদ্ধদেব গুহ, শংকরও বহুবিক্রীত ছিলেন। কিন্তু সেসব দিন চলে গেছে। আজকের সবচেয়ে জনপ্রিয় লেখকের বইও পাঁচশো বা হাজার কপি বিক্রি হয় বলে তাঁদের প্রকাশকদের দাবি করতে দেখা যায় না। সেই কারণে কি পুরস্কারই কি রুটিরুজি হয়ে দাঁড়িয়েছে? যাঁদের ব্যাপারটা তাই, তাঁরা মনের সুখে তসলিমা থেকে সন্তোষী মা— যাকে খুশি বন্দনা করুন, আপত্তি নেই। যাঁদের তেমন স্বার্থ নেই, তাঁরাও নিজ নিজ প্রিয় সাহিত্যিকের পাশে দাঁড়ানোর জন্যে যদি এমন করতে চান তো করুন। কিন্তু একে বাকস্বাধীনতার পক্ষে দাঁড়ানো বলে তত্ত্বায়ন করা চলছে। তাই কিছু কথা না বলে থাকা যাচ্ছে না।

বাংলার কালচার্ড বাবু-বিবি আজও যাঁকে নিয়ে “আহা! সত্যিকারের ভদ্রলোক ছিলেন” বলে হাহুতাশ করে, সেই বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য নিজের দলের তথা ভারতবর্ষের বামপন্থী আন্দোলনের যে দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি করেছিলেন মুখ্যমন্ত্রী থাকার সময়ে, তা সিপিএমের কর্মী-সমর্থকরা কেউ কেউ আজকাল জনান্তিকে স্বীকার করেন। পার্টি স্বীকার করে না, হয়তো কোনওদিন করবেও না। তাতে অবশ্য ইতিহাস বদলাবে না। বুদ্ধদেব সরকারের যেসব ভুলভাল সিদ্ধান্ত নরেন্দ্র মোদি, শুভেন্দু অধিকারীদের অক্সিজেন জুগিয়েছে তার অন্যতম হল কলকাতা থেকে তসলিমা নাসরিনকে বিদায় নিতে বাধ্য করা। হাতে ২৩৫ জন বিধায়ক আর তিরিশের বেশি সাংসদ থাকা সত্ত্বেও, দিন দুয়েকের কলকাতাকেন্দ্রিক অশান্তিতে যদি কোনও সরকারের মনে হয়ে থাকে যে একজন সাহিত্যিককে নিরাপত্তা দিতে তারা অপারগ এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সামলে উঠতে পারবে না, তাহলে সেই সরকার অযোগ্য। জ্যোতি বসুর আমলে ভারতজুড়ে শিখ গণহত্যার সময়ে এ রাজ্যে কেউ ট্যাঁ ফোঁ করতে পারেনি, বাবরি মসজিদ ভাঙা-পরবর্তী দাঙ্গাও পশ্চিমবঙ্গে লাগামছাড়া হতে পারেনি। সেখানে বুদ্ধবাবুরা একজন সাহিত্যিকের বিরুদ্ধে কিছু সংগঠিত অশান্তিতে ঘাবড়ে গেলেন এবং তাঁকে রাজ্যছাড়া করলেন। ফলে হিন্দুত্ববাদীরা দ্বিবিধ সুবিধা পেয়ে গেল। প্রথমত, পশ্চিমবঙ্গের গোটা মুসলমান সমাজ ভীষণ অসহিষ্ণু— এ-কথা প্রচার করার পরিসর তৈরি হয়ে গেল। দ্বিতীয়ত, বামপন্থীরা সংখ্যালঘু তোষণ করে, মুসলমান মৌলবাদীদের প্রশ্রয় দেয়— এ-কথা বলার জন্যেও চিরকালীন দৃষ্টান্ত হাতে এসে গেল। তসলিমা যে স্বমহিমায় তার আগে বহুবছর কলকাতায় ছিলেন, সেই সত্য সম্পূর্ণ অর্থহীন হয়ে গেল। আজ দেখা যাচ্ছে অনেকের সে-কথা মনেই নেই। না থাকা দোষেরও নয়। এক বালতি দুধে এক ফোঁটা চোনা ফেলে দেওয়ার পর কাটা দুধ আগে ভালো ছিল বলে বিক্রি করতে গেলে কেউ কিনবে না। যে সময়ে দিল্লি, মুম্বইতে শিবসেনার হুমকিতে ভারত-পাকিস্তান টেস্ট ম্যাচ হতে পারত না সেইসময় এই কলকাতাতেই যে ম্যাচ হয়েছে, বা এই বামফ্রন্ট সরকারই যে কাশীতে শুটিং করতে না পারা চলচ্চিত্র পরিচালক দীপা মেহতাকে কলকাতায় শুটিং করলে নিরাপত্তার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল— সেই সত্য তসলিমার বিতাড়নে নতুন অর্থ পরিগ্রহ করে। হিন্দুত্ববাদীদের পক্ষে বলা সহজ হয়ে যায় যে ওগুলো ধর্মনিরপেক্ষতার লক্ষণ নয়। কমিউনিস্টরা আসলে হিন্দুবিরোধী, তাই ওগুলো করেছিল। বাকস্বাধীনতার পক্ষে বলে করেনি।

এই পর্যন্ত মানতে অসুবিধা আজকের সাহিত্যিক, শিল্পী, বাকস্বাধীনতাপ্রেমী নাগরিকদের প্রায় কারও নেই দেখা যাচ্ছে। কিন্তু এসব বুঝেও কী করে যে তসলিমার এতদিন পরে কলকাতায় আগমনকে বাকস্বাধীনতার জয় বলে অভিনন্দিত করা যাচ্ছে তা বোঝা দায়। তাঁকে ফিরিয়ে এনেছে কারা এবং কী উদ্দেশ্যে, তা নিয়ে সংশয়ের অবকাশ কী করে থাকছে? যে-ই আনুক, যে উদ্দেশ্যেই আনুক— এটা আপাতদৃষ্টিতে ভারি উদার যুক্তি মনে হলেও, আসলে হাস্যকর। যাদের অধীনে থাকা সাহিত্য আকাদেমি এমএম কলবুর্গির মতো লেখকের হত্যার কোনও নিন্দা করেনি, যারা অপছন্দের কথা লেখার জন্যে (সিদ্দিক কাপ্পানের ক্ষেত্রে, স্রেফ লিখতে পারে ভেবেই) সারা দেশে বহু সাংবাদিককে গ্রেপ্তার করে কঠোরতম আইনে মামলা ঠুকে দিনের পর দিন কারাবন্দি করে রাখে, যারা তাদের অপছন্দের কথা সোশাল মিডিয়ায় পোস্ট করার জন্যে নিত্য লেখক, শিল্পীদের বিরুদ্ধে এফআইআর দায়ের করছে, এমনকি দলবদ্ধভাবে বাড়ি গিয়ে ভয়ও দেখাচ্ছে, তারাই আজ পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতায়। সেই দল তসলিমাকে কলকাতায় ফিরিয়ে নিয়ে এসেছে বাকস্বাধীনতায় বিশ্বাস করে বলে, রাজনৈতিক অ্যাজেন্ডার স্বার্থে নয়— এ-কথায় কেন বিশ্বাস করতে হবে? বা উদ্দেশ্য সেটা হলেও ব্যাপারটা ভালো— এ-কথারই বা মানে কী? তাহলে আগামীকাল তালিবানরা যদি অরুন্ধতী রায়কে কাবুলে ডেকে সংবর্ধনা দেয়, আমরা তালিবানদের প্রশংসা করব? বলব, উদ্দেশ্য যা-ই হোক, ব্যাপারটা ভালো?

তা-ই করব হয়তো, কারণ আমাদের সাহিত্যিক, শিল্পীরা তো সেরকমই। তাঁরা একেবারে আজকের জয় গোস্বামীর মতই, ক্ষমতাসীনের বিরুদ্ধে মুখ খোলেন সে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর। অন্তত ২০১১ সালের পর থেকে তাই। ২০১৫ সালে যখন সারা ভারতের শিল্পী, সাহিত্যিকরা কেন্দ্রীয় সরকারের কাছ থেকে পাওয়া পুরস্কার ফিরিয়ে দিচ্ছিলেন তথাকথিত গোরক্ষকদের হাতে গণপিটুনিতে হত্যা; কলবুর্গি, নরেন্দ্র দাভোলকরের মতো মানুষের হত্যা এবং তা নিয়ে সাহিত্য আকাদেমির মতো সংস্থাগুলোর নীরবতার প্রতিবাদে, তখন এই বাংলা থেকে কেবল মন্দাক্রান্তা সেন পুরস্কার ফিরিয়ে দিয়েছিলেন। আর জ্ঞানপীঠ পুরস্কার নিতে গিয়ে নিজের প্রতিবাদ জ্ঞাপন করেছিলেন প্রয়াত শঙ্খ ঘোষ। আজ তসলিমার নামে জয়ধ্বনি করা, আনন্দবাজারের প্রথম পাতায় তাঁর গুণগান করা জয় গোস্বামীই বা কোথায় ছিলেন আর বাকিরাই বা কটা মিটিং, মিছিল করেছিলেন? আচ্ছা, জাতীয় স্তরের ব্যাপারস্যাপার থাক। তসলিমাকে ফেরানোর দাবিতেই বা কটা মিটিং, মিছিল হয়েছিল তৃণমূল কংগ্রেস সরকারের আমলে? জয়-সহ কত গুণীজনই তো মমতা ব্যানার্জির ঘনিষ্ঠ ছিলেন, তখন উদ্যোগ নেননি কেন? আজ জয় বলছেন, আরও অনেকেই বলছেন, তাঁরা নাকি চুপ করে থাকতে বাধ্য হয়েছিলেন হুমকি সংস্কৃতির কারণে। তাহলে সোজা মেনে নিলেই তো হয়— আমরা ভীতু, তাই মুখ খুলতে পারব না। আবার তত্ত্বায়নের দরকার কী? কালের নিয়মে যখন বিজেপি সরকার চলে যাবে, তখন আবার বাকস্বাধীনতার ধ্বজাধারী শিল্পী, সাহিত্যিক, সাহিত্যপ্রেমীরা বলবেন না তো “আমাদের দিয়ে জোর করে তসলিমা বন্দনা করানো হয়েছিল?”

তসলিমা কলকাতায় আসার পর থেকে অভ্যর্থনা আর শেষ হচ্ছে না। সম্ভবত রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নোবেল পুরস্কার নিয়ে দেশে ফেরার পরে বা স্বামী বিবেকানন্দ শিকাগো বক্তৃতা দিয়ে ফেরার পরেও এই শহরে এরকম লাগাতার অভ্যর্থনার ব্যবস্থা হয়নি। জয়কে দুয়ো দিয়ে যারা মঞ্চ থেকে নামিয়ে দিয়েছে তারা যদি ভেবে থাকে বিরাট কাজ করেছে, তাহলে তারা নেহাতই বোকা। পরদিন পড়তে হয় নইলে পিছিয়ে পড়তে হয় যে কাগজ, তার প্রথম পাতার তসলিমামুখী কলামটা কিন্তু জয়ই লিখেছেন। একদা যে শহরে ছিলেন সে শহরে ফিরে এসেছেন বলে নামকরা পত্রিকার প্রচ্ছদকাহিনি হয়েছে কোনও কবির কবিতা— এমনটাই বা আমাদের অকাব্যিক যুগে কতবার কোন শহরে ঘটেছে? তসলিমার বেলায় কলকাতায় ঘটল। কলকাতার সংবাদমাধ্যমগুলোর অন্যতম খবর হয়ে গেছেন তসলিমা। তিনি স্রেফ কলকাতায় পা রাখতেই ধন্য হল ধন্য হল আমাদের বাঙালি জীবন। সমস্তটাই বাংলার মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত ভালোবাসা, সংবাদমাধ্যমের স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিক্রিয়া— এই যদি বিশ্বাস করতে হয়, তাহলে মা দুর্গা সত্যি, মহিষাসুর সত্যি, ক্যাপ্টেন স্পার্ক সত্যি।

আরও পড়ুন মঈন সম্পর্কে কুৎসিত বিদ্রূপে সন্দেহ জাগে, তসলিমা কি হিন্দুত্বের ট্রোজান ঘোড়া? 

এবার কেউ চোখ রাঙিয়েই বলতেই পারেন “তবে রে, এসব সত্যি না হলে সত্যিটা কী?” সবিনয়ে বলব, আজ্ঞে সত্যিটা হল তসলিমা এই বাংলায় একে একটি বিক্রয়যোগ্য ব্র্যান্ড, তার উপর ডবল ইঞ্জিন সরকার পশ্চিমবঙ্গকে যে ছাঁচে ঢালতে চায় তার পক্ষেও নিখুঁত। কারণ তিনি কেবল মুসলমান মৌলবাদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী চরিত্র নন। একবার টুইটারে ইংল্যান্ডের মুসলমান ক্রিকেটার মঈন আলি লম্বা দাড়ি রাখেন বলে তিনিও সন্ত্রাসবাদী হতে পারেন বলে রসিকতা করেছিলেন খাঁটি হিন্দুত্ববাদী কায়দায়। ইংল্যান্ডের খ্রিস্টান ক্রিকেটাররা দল বেঁধে প্রতিবাদ করায় বুঝতে পারেন বাড়াবাড়ি হয়ে গেছে। তখন টুইটটি মুছে দিয়ে দাবি করেন ওটা নাকি সারকাজম ছিল। বলা বাহুল্য, সে-কথা সত্যি হলে টুইট মুছে দেওয়ার দরকার ছিল না। যা-ই হোক, লম্বা দাড়ি মানেই মৌলবাদী, হিজাব বা বোরখা পরে মানেই মৌলবাদের শিকার— এগুলো আমার মতো পশ্চিমবঙ্গীয় ভদ্রলোকের খুব পছন্দের স্টিরিওটাইপ। অতএব তসলিমাকে দিয়ে সেইসব বয়ান বাঙালি সমাজে চারিয়ে দেওয়া সহজ হতে পারে, যেগুলো বাকি ভারত আস্তাকুঁড়ে ফেলে দিচ্ছে ক্রমশ। সাম্প্রতিক ‘জেন জি’ আন্দোলন তার প্রমাণ।

সুতরাং তসলিমার আগমন, জয়ের গমন— সবই রাজনৈতিক। আমরা যে খুবই কালচারাল জাতি তা দুনিয়াসুদ্ধ লোক জানে। নইলে বিপুল উৎসাহে ঠিক অন্য সংস্কৃতি দ্বারা আক্রান্ত হওয়ার যুগেই রামমোহন, বিদ্যাসাগর, রবীন্দ্রনাথের মতো আইকনদের ক্যানসেল কালচারে ফেলে দিই? তাই করতে করতে এখন এমন হাল হয়েছে যে নেতাজি সুভাষচন্দ্র পড়েছেন জুতোর তলায়, আর তসলিমা চড়েছেন মাথায়। রাজনীতির ঊর্ধ্বে উঠে সাংস্কৃতিক হওয়ার চেষ্টা অন্তত এবারটা না করলেই নয়?

চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম ওয়েবসাইটে প্রকাশিত

হকারদের নিয়ে বেকার গোলমাল!

আমরা যারা লেখাপড়া শিখেছি খানিকটা, মাথার উপরে পাকা ছাদ আছে এবং ঘরে এসি, গ্যারেজে গাড়ি আছে— তারা চাই আইন একেবারে অক্ষরে অক্ষরে পালিত হোক। রেলের জমিতে কেবল রেলের জিনিস থাকবে। দোকান কেন থাকবে? ঘরবাড়ি কেন থাকবে? অটো, টোটো কেন দাঁড়াবে?

যদি উচ্ছেদই উদ্দেশ্য হয়, তাহলে এসব ভাবার প্রয়োজন নেই। সরকারি সম্পত্তি মানে যে আসলে নাগরিকের সম্পত্তি— সেকথা কজন নাগরিকই বা জানে, বোঝে এবং বিশ্বাস করে? সমাজের উপর থেকে নিচ পর্যন্ত সকলকে জানানোর ব্যবস্থা তো কোনোদিন করাই হয়নি। আর এখন তো কে নাগরিক তা ঠিক করছে রাষ্ট্র। ফলে যদি কাল রেলের জমিতে ব্যবসা করা বা বসবাস করা মানুষকে অনাগরিক বলে প্রতিষ্ঠা করে দেওয়া হয়, তাহলেই মুশকিল আসান।

পশ্চিমবঙ্গে নতুন সরকারের শপথ গ্রহণের একমাস পূর্ণ হয়েছে। রাজ্যটা যে বদলে গেছে তা অস্বীকার করার উপায় নেই। ৯ মে-র আগে পর্যন্ত রাজ্যের সাধারণ মানুষ বলুন, বিরোধী রাজনৈতিক দলের লোকেরা বলুন আর সংবাদমাধ্যমই বলুন— সকলেই বলত যে পশ্চিমবঙ্গের বিরাট সমস্যা হল বেকার সমস্যা। গত একমাসে বেকার সমস্যার সমাধান হয়ে গেছে, প্রধান হয়ে গেছে হকার সমস্যা। হকাররা কার সমস্যা? এখন পর্যন্ত তাঁরা রেলের সমস্যা। কেন? না তাঁরা গোটা রাজ্যজুড়ে রেলের জমি দখল করে রেখেছেন। সম্ভবত সেই কারণেই লোকাল ট্রেন ঠিক সময়ে চলছে না, দূরপাল্লার ট্রেন ৩-৪ ঘন্টা লেট। রেলের জমি দখলমুক্ত হলেই স্টেশনগুলো হয়ে যাবে হলিউডি সিনেমার স্টেশনগুলোর মত। শিয়ালদা বা হাওড়া স্টেশন দখলমুক্ত করা হয়েছে, বাকিগুলোকেও করতে পারলেই আমাদের আর পাঁচ টাকার ভাঁড়ের চা বাদাম বিস্কুট দিয়ে খেতে হবে না। আমরা উন্নত দেশের লোকেদের মত এই অসহ্য গরমে আড়াইশো-তিনশো টাকার আইসড টি বা কোল্ড কফি খাব, সঙ্গে থাকবে কনফেকশনারির সম্ভার। যে নিত্যযাত্রীদের স্টেশনে পৌঁছলেই খিদেয় পেট চুঁই চুঁই করে, তাঁদেরও আর ডিম-পাঁউরুটি, ঘুগনি, মুড়ি-তরকারি— এ সমস্ত ছাইপাঁশ খেয়ে থাকতে হবে না। গত নভেম্বরেই রেল বোর্ড খাবারদাবার সম্পর্কে নিয়ম বদলে স্টেশন চত্বরে কেএফসি, ম্যাকডোনাল্ড’স, পিৎজা হাট, হলদিরামদের দোকান খোলার অনুমতি দিয়েছে। কিন্তু দোকান খুলবে কোথায়? হকাররা বসে আছেন যে। হকারদের পাশেই দোকান খুললেও চলবে না। কজন আর ভাঁড়ের চা থাকতে লাটে, ফ্র্যাপে, ক্যাপুচিনো খেতে যাবে? এই সমস্যার সমাধান করতেই হত। অতএব পশ্চিমবঙ্গের নতুন সরকার রেলের জায়গা খালি করতে নেমেছে।

যতই আসুক বিঘ্ন বিপদ, হাওয়া হোক প্রতিকূল, সরকার হকার ও বস্তি উচ্ছেদ করেই ছাড়বে। কাজটা দক্ষভাবে করতে রাজ্যের মুখ্যসচিবকে চেয়ারম্যান করে, রেলমন্ত্রক আর রাজ্য সরকারের গুরুত্বপূর্ণ সচিব এবং রাজ্য পুলিশের ডিজি আর কলকাতার পুলিশ কমিশনারকে নিয়ে গঠন করা হয়েছে টাস্ক ফোর্স। টাস্কটি এমন যে ফোর্স ব্যবহার করতেই হবে। প্রথমে কেবল হকার উচ্ছেদ, বস্তি উচ্ছেদ চলছিল। এখন দেখা যাচ্ছে উত্তরপাড়া বা কোন্নগরের মত জায়গায় হকার উচ্ছেদের সমান বা তার চেয়েও বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে টোটো স্ট্যান্ড, অটো স্ট্যান্ড স্টেশন চত্বর থেকে সরিয়ে দেওয়ার কাজকে। আপনি বয়স্ক হতে পারেন, অসুস্থ হতে পারেন, প্রতিবন্ধী হতে পারেন। আইন আপনাকে মানতেই হবে, অর্থাৎ ৫০/৬০/১০০ মিটার দূর থেকে হেঁটে স্টেশনে আসতে হবে। আইন সকলের জন্য এক। কথাটা আমাদের সংবিধানে লেখা আছে। তাই আমরা যারা লেখাপড়া শিখেছি খানিকটা, মাথার উপরে পাকা ছাদ আছে এবং ঘরে এসি, গ্যারেজে গাড়ি আছে— তারা চাই আইন একেবারে অক্ষরে অক্ষরে পালিত হোক। রেলের জমিতে কেবল রেলের জিনিস থাকবে। দোকান কেন থাকবে? ঘরবাড়ি কেন থাকবে? অটো, টোটো কেন দাঁড়াবে?

ঠিক কথা। আমার জমিতে যেমন কেবল আমার সম্পত্তিই থাকতে পারে। সেখানে অন্য কাউকে কিছু করতে গেলে আমার অনুমতি নিতে হবে, আমার থেকে জমি কিনতে হবে বা লিজ নিতে হবে। নিদেনপক্ষে আমাকে ভাড়া দিতে হবে। রেলের বেলাতেই বা অন্য নিয়ম হবে কেন? তুমি গরিব বলে নিয়মকানুন মানবে না? যাদবপুর হোক আর ব্যারাকপুর। তোমাকে উঠে যেতেই হবে, না উঠলে বুলডোজার দিয়ে তুলে দেওয়া হবে। আইনে বুলডোজারের কথা কোথায় লেখা আছে সেটা অবশ্য জানা একটু শক্ত। আইনে বরং আদালতের দ্বারস্থ হওয়ার কথা আছে, দেশের সব আইনেই থাকে। কিন্তু আদালতের স্থগিতাদেশেও যে আইনের কিছু এসে যায় না সেটা যাদবপুরের ক্ষেত্রে দেখা গেল। যাক সে কথা। দুনিয়া জুড়েই তো দেখা যাচ্ছে একটা আইনই স্বতঃসিদ্ধ— জোর যার মুলুক তার। নাহয় আমাদের এখানেও তাই হল। তাছাড়া অতীতে কি কখনো হকার উচ্ছেদ হয়নি? ২০২৪ সালে লোকসভা নির্বাচনে বিপুল জয় পাওয়ার পরে পরেই তৃণমূল কংগ্রেসের সরকারও করেছিল, তার বহু আগে বামফ্রন্ট সরকার কলকাতা শহরে ‘অপারেশন সানশাইন’ করেছিল। রেল করলেই দোষ?

হক কথা। আইন মেনে চলা উচিত, তার বাইরে কারও পা দেওয়া উচিত নয়। স্ট্রিট ভেন্ডার্স (প্রোটেকশন অফ লাইভলিহুড অ্যান্ড রেগুলেশন অফ স্ট্রিট ভেন্ডিং) অ্যাক্ট, ২০১৪ নামে একখানা আইন আছে। সেই আইনে বলে আছে, ততক্ষণ রাস্তার বিক্রেতাদের উচ্ছেদ করা যাবে না যতক্ষণ না টাউন ভেন্ডিং কমিটি সমস্ত বিক্রেতাদের বিষয়ে সমীক্ষা চালাচ্ছে এবং তারা যে বিক্রেতা, সেই সার্টিফিকেট দিচ্ছে। তারপর কোনো প্রয়োজনে ওইসব দোকান সরানোর দরকার থাকলে বিক্রেতাদের কমপক্ষে ৩০ দিনের নোটিশ দিতে হবে। আরও বলা আছে, উচ্ছেদ শেষ অস্ত্র। বরং বিক্রেতাদের প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনা করে তাঁদের অন্যত্র ব্যবসা করার সুযোগ দিতে হবে এবং এমন জায়গা চিহ্নিত করে দিতে হবে যেখানে তাঁরা ব্যবসা চালাতে পারেন। এই আইন অবশ্য চালু হয়েছিল ১ মে ২০১৪, মানে নরেন্দ্র মোদীর সরকার তৈরি হওয়ার হপ্তা দুয়েক আগে। এমন হতেই পারে যে আইনটি ওঁদের পছন্দ নয়। ওঁরা মনে করছেন এসব আদিখ্যেতা। তাহলেও তো আইনটি আগে বদল করতে হবে সংসদে পাশ করিয়ে। রাষ্ট্রপতিকে দিয়ে স্বাক্ষর করাতে হবে। অবশ্য উন্নয়নে দেরি করা ঠিক নয়। সোনার বাংলা যত তাড়াতাড়ি বানানো যায় তত ভালো। সেক্ষেত্রে অত আইনকানুনের তোয়াক্কা করলে চলবে না।

আরও পড়ুন এসএসসি: স্থান কাল পাত্র গুলিয়ে যাওয়া সাংবাদিকের স্বীকারোক্তি

বোধহয় এই সূত্র মেনেই দিকে দিকে উচ্ছেদ চলছে। তবে ওই রেলের জমি সম্পর্কে দু-একখানা কথা আছে। রেল তো বি আর চোপড়ার বানানো দূরদর্শনের মহাভারতের কালচক্র নয় যে আদি অনন্তকাল ধরে ছিল। ১৮৫৩ সালের আগে ভারতে রেল বলে কিছু ছিল না। পশ্চিমবঙ্গের রেলপথ এবং যেসব স্টেশনে উচ্ছেদ হয়েছে এখন পর্যন্ত, তাদের বয়স আরও কম। তা এই স্টেশনগুলো বানানোর জন্য রেল জমি পেল কোথায়? রেলের আগে এসব জমির মালিক ছিল কারা? ভারতের বহু সরকারি স্কুল, কলেজ, হাসপাতালের মত রেলের ইতিহাস ঘাঁটলেও দেখা যাবে যে এইসব জমি এক বা একাধিক ব্যক্তির সম্পত্তি ছিল। কোথাও বা কোনো গোষ্ঠীর সম্পত্তি ছিল। তাঁদের থেকে যৎসামান্য দামে, কখনো বা বিনামূল্যে রেল এইসব জমি পেয়েছিল। মানুষ সানন্দে দিয়েছিলেন, কারণ রেল হলে অনেক মানুষের সুবিধা হবে, তাঁদের নিজেদেরও হবে। সরকারি সম্পত্তি কথাটার ইংরিজি যে public property, সে তো আর এমনি এমনি নয়। এই পাবলিকের মধ্যে কিন্তু স্টেশন চত্বরের দোকানদার, টোটোচালক, অটোচালক— সবাই পড়েন। ফলে রেলের মালিক তথা রেলের জমির মালিক তাঁরাও। অন্তত যতক্ষণ না ভারতীয় রেল সরকারি সম্পত্তি থেকে এক বা একাধিক কর্পোরেটের সম্পত্তি হয়ে যাচ্ছে। সুতরাং বক্তব্য যদি এই হয় যে, রেলকে ভাড়া দিচ্ছ না বা লিজ নাওনি বলে তোমাকে রেলের এলাকায় ব্যবসা করতে দেওয়া হবে না, তাহলে সমাধান খুব সহজ। এই হকার, বস্তিবাসী, টোটোচালক, অটোচালকদের সঙ্গে কাগজে কলমে চুক্তি করা। তাতে রেলেরও আয় হয়, এঁদেরও চোখের জল ফেলতে হয় না।

অবশ্য যদি উচ্ছেদই উদ্দেশ্য হয়, তাহলে এসব ভাবার প্রয়োজন নেই। সরকারি সম্পত্তি মানে যে আসলে নাগরিকের সম্পত্তি— সেকথা কজন নাগরিকই বা জানে, বোঝে এবং বিশ্বাস করে? সমাজের উপর থেকে নিচ পর্যন্ত সকলকে জানানোর ব্যবস্থা তো কোনোদিন করাই হয়নি। আর এখন তো কে নাগরিক তা ঠিক করছে রাষ্ট্র। ফলে যদি কাল রেলের জমিতে ব্যবসা করা বা বসবাস করা মানুষকে অনাগরিক বলে প্রতিষ্ঠা করে দেওয়া হয়, তাহলেই মুশকিল আসান। যে নাগরিক নয় তার আবার অধিকার কী? বুলডোজার চালানোর চেয়ে এটা করা সহজ কাজ। বুলডোজার চালিয়ে দোকানপাট, ঘরদোর ভেঙে দিতে গিয়ে খামোকা বহু জায়গায় রক্তারক্তি হচ্ছে। সরকারবিরোধী নেতাদের হাজতে পুরতে হচ্ছে। তাতে তাদের প্রতি সাধারণ মানুষের সমর্থন নতুন করে তৈরি হচ্ছে। এসব বাজে ঝামেলার কোনো মানে হয়?

অ2অনুস্বর ডট কম ওয়েবসাইটে প্রকাশিত

গণতন্ত্রের কঙ্কাল দেখিয়ে দিলেন জিতু মুন্ডা

যে ‘গণতন্ত্রের উৎসব’ সম্পর্কে আমাদের প্রত্যাশা নামতে এইখানে এসে ঠেকেছে— এ থেকেই প্রমাণ হয় যে ভারতীয় গণতন্ত্রের চামড়া, মাংস, মজ্জা সব খুবলে খাওয়া হয়ে গেছে। পড়ে আছে কঙ্কাল।

নির্বাচনের ভরা মরশুমে একথা বললে নিশ্চয়ই মহাপাপ হবে যে গণতন্ত্র মানে কেবল ভোট দেওয়া, ভোট নেওয়া আর সরকার গঠন নয়। কিন্তু আমরা অনেকেই অনেক পাপ জানতে বা অজান্তে রোজ করে চলেছি। সুতরাং এ পাপও করেই ফেলা যাক। পশ্চিমবঙ্গে এবারে যেভাবে ভোট হচ্ছে, তার সঙ্গে নাজি জার্মানির নির্বাচনের মিল খুঁজতে খুব বেশি কষ্ট করতে হবে না, অমিল বোধহয় একটাই— এখনো কোনো বুথে ভোটারের পাশে দাঁড়িয়ে সশস্ত্র বাহিনীর লোককে কাকে ভোট দেওয়া হচ্ছে নজর রেখেছে বলে খবর নেই। আশা করা যাক, দ্বিতীয় দফার শেষেও অন্তত এইটুকু সান্ত্বনা থাকবে যে তেমনটা হয়নি। এই যে ‘গণতন্ত্রের উৎসব’ সম্পর্কে আমাদের প্রত্যাশা নামতে এইখানে এসে ঠেকেছে— এ থেকেই প্রমাণ হয় যে ভারতীয় গণতন্ত্রের চামড়া, মাংস, মজ্জা সব খুবলে খাওয়া হয়ে গেছে। পড়ে আছে কঙ্কাল।

ব্যাপারটা একেবারে সাদা চোখে দেখতে পাওয়ার ব্যবস্থা করে দেওয়ার জন্যে ধন্যবাদ প্রাপ্য আমাদের প্রতিবেশী রাজ্য ওড়িশার কেওনঝার জেলার বাসিন্দা জিতু মুন্ডার। ‘আমরা পৃথিবীর বৃহত্তম গণতন্ত্র, আমরা পৃথিবীর চতুর্থ বৃহত্তম অর্থনীতি’ বলে গোরিলা গোষ্ঠীর দলনেতার মত বুক বাজানো আমাদের অভ্যাসে দাঁড়িয়ে গেছে। কিন্তু জিতুকে মাত্র হাজার বিশেক টাকা ব্যাংক থেকে তোলার জন্যে যা করতে হয়েছে, তাতে প্রমাণ হয় যে পৃথিবীর যে কোনো গোরিলা সমাজ আজকের ভারতের চেয়ে সভ্য। গোরিলা সমাজে প্রয়াত বোনের কষ্টার্জিত ফলমূল অধিকার করতে বোনের কঙ্কাল মাটি খুঁড়ে তুলে এনে অপেক্ষাকৃত বেশি ক্ষমতাশালী গোরিলার সামনে যে রাখতে হত না— একথা ডায়ান ফসির মত কোনো বিশেষজ্ঞকে জিজ্ঞেস না করেই হলফ করে বলা যায়। জিতুর বোন গবাদি পশু বিক্রি করে ওই কটা টাকা পেয়েছিলেন, তারপর তাঁর মৃত্যু হয়। হতদরিদ্র জিতুকে বারবার ব্যাংকে গিয়ে শুনতে হয়েছে— মৃত্যুর প্রমাণ চাই, অর্থাৎ কাগজ চাই। জিতুর পক্ষে ‘কাগজ দেখাব না’ বলার বিলাসিতা করা সম্ভব নয়, এদিকে তাঁর কাগজও অমিল। জিতুর মত আদিবাসী, প্রান্তিক মানুষের কাছে অনেক কাগজই থাকে না। আগামীদিনে ওড়িশায় এসআইআর হলে হয়ত জিতুকে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার বাইরে ছুড়ে ফেলা হবে, যেভাবে পশ্চিমবঙ্গের ৬৬ লাখ মানুষকে ফেলা হয়েছে (অধিকাংশের কাগজ থাকা সত্ত্বেও)। এমনই রক্তমাংসহীন হিংস্র একটা ব্যবস্থা আমাদের দেশে গণতন্ত্রের নামে চলছে।

অনেকেই বলবেন, ব্যাংকের সঙ্গে গণতন্ত্রের সম্পর্ক কী? কারণ শুরুতেই বললাম, গণতন্ত্র মানে কেবল ভোট— একথা বিশ্বাস করা আমাদের বদভ্যাসে দাঁড়িয়ে গেছে। নিজের টাকা বা প্রয়াত নিকটাত্মীয়ের ব্যাংকে গচ্ছিত টাকা তোলা যে একজন মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার— তা আমাদের মনেই হয় না। যে কোনোদিন যে কোনো ব্যাংকে গেলেই কোনো না কোনো মানুষকে দেখা যায় মৃত আত্মীয়ের টাকাপয়সার ব্যাপারে এসেছেন। ব্যাংক থেকে কিছু কাগজপত্রের তালিকা দিয়ে দেওয়া হয় ভাবলেশহীন মুখে। তার মধ্যে অবশ্যই থাকে KYC, যা জীবিত অবস্থায় ওই গ্রাহক নির্ঘাত ৯৯ বার জমা দিয়েছেন। ডিজিটাল ইন্ডিয়াতেও কেন ব্যাংকের একজন গ্রাহককে বারবার KYC জমা দিতে হবে— এ প্রশ্ন করা হলে নিম্নতম ব্যাংককর্মী থেকে জেনারেল ম্যানেজার পর্যন্ত সকলেই হাত উলটে উত্তর দেন— নিয়ম। এমন নির্বোধ নিয়ম আছে কেন, বাতিল হচ্ছে না কেন— এসব প্রশ্ন আমরা করি না। নিয়ম যে দৈবনির্দেশিত নয়, মানুষের তৈরি, তাতে গোলমাল থাকতে পারে এবং তা পরিবর্তনযোগ্য— সেকথা আমরা ভুলে গেছি। যেমন আমরা মাঝেমধ্যে কাগজে পড়ি বা হাতের মোবাইলে দেখতে পাই, অমুক জায়গায় তমুক লোক আধার কার্ডের বায়োমেট্রিক্স মেলেনি বলে সরকারি প্রকল্পের টাকা পাচ্ছেন না। তারপর আমরা স্ক্রোল করে অন্যকিছুতে চলে যাই। ২০১৮ সালে আমাদের আরেক প্রতিবেশী রাজ্য ঝাড়খণ্ডের পাকুড় জেলার লুখি মুর্মু অনাহারে মারা গিয়েছিলেন ২৩ জানুয়ারি, কারণ অক্টোবর মাস থেকে বায়োমেট্রিক্স মিলছিল না বলে রেশন তুলতে পারেননি। ওই রেশন ছিল তাঁর বেঁচে থাকার চাবিকাঠি। এসব দেখে আমরা আধার কার্ড সম্পর্কে কোনো প্রশ্ন তুলি না। অথচ সুপ্রিম কোর্ট ২০১৬ সালেই রায় দিয়েছে যে সরকারি প্রকল্পে আধার কার্ড ব্যবহার করা যেতে পারে, কিন্তু বাধ্যতামূলক করা যাবে না।

এগুলো আমাদের গণতান্ত্রিক আলোচনার বিষয় নয়। কারণ আমাদের বায়োমেট্রিক্স মেলা না মেলা নিয়ে ভাবতে হয় কেবল মোবাইলের নতুন সিম কার্ড দরকার হলে। দোকানের মালিক বা কর্মচারীদের নিজেদের দায় সিম বিক্রি করা, তাই তারা বেজায় ভদ্রতা করে। আধার না মিললে ‘ভোটার কার্ড আর প্যান কার্ড দিয়ে হয়ে যাবে স্যার’। জিতুর বা লুখির কাছে হয়ত জরুরি কাগজ নেই, বিকল্প কাগজও নেই। কিন্তু তাঁদের জন্যে কেউ অন্য রাস্তার খোঁজ করবে না। কারণ তাঁদের ক্রয়ক্ষমতা নেই, তাই কানাকড়ি দাম নেই। না দোকানে, না ব্যাংকে, না নির্বাচন কমিশনের কাছে। কারণ আমাদের ব্যবস্থায় মানুষের দাম (পড়ুন বৈধতা, শুনতে গণতান্ত্রিক হবে) মানুষ দিয়ে নয়, কাগজ দিয়ে। কোন কাগজ? সেটা আবার ব্যাংক বা রাষ্ট্র ইচ্ছামত বদলে ফেলতে পারে রোজ। পশ্চিমবঙ্গের এসআইআরে ঠিক তাই হয়েছে, এখনো হয়ে চলেছে। ভোটার তালিকায় উঠে যাওয়া নামও এখন ট্রাইব্যুনালের আদেশে বাদ হয়ে যাচ্ছে।

এদিকে এসআইআরে বাদ যাওয়া বিচারাধীন ভোটারদের মধ্যে যাঁদের বিচার হয়েছে, তাঁদের প্রায় ৯৯% বৈধ ভোটার বলে গণ্য হয়েছেন। মানে তাঁদের অবৈধ ঘোষণা করার কোনো কারণই ছিল না। অর্থাৎ গণতন্ত্রের লাগাম আর জনগণের হাতে নেই। এখনো কেউ কেউ ভোট দিতে পারছেন, এই যা। মানে ওই কঙ্কালটাই এখনো অবশিষ্ট আছে। তারও উপকারিতা আছে, দেখালে একটু-আধটু অধিকার পাওয়া যায়। জিতু যেমন ব্যাংকের দরজার সামনে বোনের কঙ্কালটাকে শুইয়ে দেওয়ায় হঠাৎ ব্যাংক সদয় হয়ে গেছে, তাদের KYC-র প্রয়োজনও রাতারাতি মিটে গেছে। জিতুর হাতে বোনের গচ্ছিত টাকা তো তুলে দেওয়া হয়েছেই, সঙ্গে সাহায্য বাবদ আরও টাকা দেওয়া হয়েছে। আহা! দয়ার শরীর বাবুদের!

আরও পড়ুন ভোটচুরির অভিযোগ আমাদের এনে ফেলেছে এক সন্ধিক্ষণে

আমরা অনেকে অবশ্য এটুকু গণতন্ত্রেই খুশি। আমাদের আধ কোটি সহনাগরিক বিনা দোষে ভোট দিতে পারলেন না, তাতে কী হয়েছে? রিগিং হলেও তো কত লোক ভোট দিতে পারে না। আমি ভোট দিতে পারছি মানেই গণতন্ত্র সজীব। আমাদের ফ্ল্যাটের বাইরে পর্যন্ত পা রাখতে হচ্ছে না, হাউজিংয়েই বুথ হয়েছে। এমন গণতন্ত্র কোথাও খুঁজে পাবে নাকো তুমি। রাজ্যটা কাশ্মীর এবং সব নিয়মকানুনের বাইরে চলে যাওয়া মণিপুরের চেয়েও বেশি সশস্ত্র বাহিনীতে ভরে গেল দেখে আমরা আরও নিশ্চিত হচ্ছি যে দেশে গণতন্ত্র বেঁচে আছে। ফরসা টুকটুকে, সুবেশী, হিন্দিভাষী পুলিশ অফিসার আঙুল উঁচিয়ে গ্রামে ঢুকে লোককে শাসাচ্ছেন দেখে আমাদের দারুণ লাগছে। কারণ আমরা হিন্দি সিনেমায় নায়ককে ওরকমভাবে খলনায়ক ও তার দলবলকে শাসাতে দেখেছি। মিডিয়া আবার বলছে, লোকটা ‘এনকাউন্টার স্পেশালিস্ট’। সোনায় সোহাগা। যে অফিসাররা এনকাউন্টার করে তাদের মত বাহাদুর যে আর হয় না, সে তো আমরা সেই অব তক ছপ্পন থেকেই জানি। মিডিয়া লোকটার নাম দিয়েছে সিঙ্ঘম। ওই ছবিটা আরও সাম্প্রতিক, ফলে আমাদের আরও ভালো মনে আছে। অতএব আমরা আহ্লাদে আটখানা। যে লোক আইন আদালতের তোয়াক্কা না করে সোজা ঠুকে দেয়, তার হাতেই যে আমাদের গণতন্ত্র সবচেয়ে নিরাপদ— এতে আর সন্দেহ কী? বিশেষত যার পরিবার পরিজনকে শাসাচ্ছে, সে নিজেই যখন অনেকের মতে অপরাধী। উত্তরপ্রদেশের মত, জাহাঙ্গীরের বাড়ির উপরেই বুলডোজার চালিয়ে দিলে আমরা আরও নিশ্চিত হতে পারতাম যে আমাদের গণতন্ত্রের এই রক্ষীটি জবরদস্ত। ডান, বাম নির্বিশেষে আমাদের এই যে ভাবনা— এটাই প্রমাণ করে যে গণতন্ত্রের কঙ্কালকে জ্যান্ত জিনিস বলে ভুল করছি। জিতু একেবারে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিলেন।

কঙ্কালপুজোর শুভেচ্ছা।

নাগরিক ডট নেট ওয়েবসাইটে প্রকাশিত

এসআইআর মওকায় অনুপ্রবেশ নিয়ে কিছু কথা

যার ওই তথাকথিত যোগ্যতা নেই, টাকা বা পরিচিতিও নেই, তারও কিন্তু উন্নততর জীবনের অভিলাষ আছে। সেই জীবনকে ধাওয়া করার মানবিক অধিকারও আছে। কথাটা যেমন ভারত থেকে যে আমেরিকায় যেতে চায় তার বেলায় সত্যি, তেমন যে বাংলাদেশ থেকে ভারতে আসতে চায়, তার বেলাতেও সত্যি। এই লোকগুলো তাহলে কী করে? বেআইনি পথে বাংলাদেশ থেকে ভারতে ঢোকে, বা ভারত থেকে আমেরিকায় যায়। রাষ্ট্রের ভাষায় বললে— অনুপ্রবেশ করে।

সম্প্রতি নাগরিক ডট নেটের পডকাস্টে এসে সিপিএম নেতা সৃজন ভট্টাচার্য বলেছেন ‘অনুপ্রবেশ শুধু ধর্মীয় কারণে ঘটে না।’ সবিস্তারে বলেছেন— সারা পৃথিবীতেই মানুষ নিজের দেশ থেকে উন্নততর অর্থনীতির দেশে যাওয়ার চেষ্টা করে, ফলে এটা সারা পৃথিবীর সমস্যা। এই কথাগুলো রিল হিসাবে ছড়িয়ে পড়তেই এক শ্রেণির মানুষ রেগে কাঁই হয়েছেন। সেই মওকায় আরও চাট্টি কথা বলে নেওয়ার ধান্দায় এই লেখার অবতারণা।

সৃজন যা বলেছেন তাকে তথ্য হিসাবে অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই। ওই ভিডিওর নিচে ছাপার অযোগ্য ভাষায় যাঁরা মন্তব্য করে যাচ্ছেন, তাঁরা নিজেরাই অনেকে অন্য দেশে বসে আছেন বিভিন্ন পেশার সঙ্গে যুক্ত হয়ে। অমৃতকালের ভারত বা তার আগের ভারত পেশাগতভাবে বা জীবনযাত্রার অন্য মাপকাঠিতে তাঁদের খুব পছন্দের জায়গা হলে নিশ্চয়ই বিদেশে গিয়ে বসবাস করতেন না। সোশাল মিডিয়ায় বামপন্থী বা উদারপন্থী চিন্তাভাবনাকে আক্রমণ করা যাঁদের দৈনন্দিন কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছে গত এক যুগে (পারিশ্রমিকে বা বিনা পারিশ্রমিকে), তাঁদের বড় অংশ তথ্যপ্রযুক্তি ক্ষেত্রের ইঞ্জিনিয়ার এবং ওই পেশার বহু মানুষের গত দুই-আড়াই দশক ধরেই জীবনের লক্ষ্য— কোম্পানির কাজে প্রথম বিশ্বের দেশগুলোতে যাওয়া, তারপর সেই কাজটাকেই স্থায়ী করে নিয়ে, অথবা অন্য কোনো কোম্পানির চাকরি নিয়ে, সেদেশেই থিতু হওয়া। অনেকে তো এক দেশ থেকে আরেক দেশে ভেসেও বেড়ান। দেশে ফেরার কোনো আশু পরিকল্পনা নেই, সুদূর ভবিষ্যতেও নেই। অথচ মানুষ উন্নত অর্থনীতির দেশে চলে যেতে চায় শুনলেই এঁরা তেলে বেগুনে জ্বলে ওঠেন। অবশ্য ওঁরা বলবেন ‘সেটা অভিবাসন, অনুপ্রবেশ নয়।’ সে প্রসঙ্গে আসব, ফাঁকি দেব না।

বলতে দ্বিধা নেই, বছর দশ-পনেরো আগেও, যারা পড়াশোনা করতে বা স্বল্পমেয়াদি কাজের সূত্রে আমাদের দেশ থেকে বিদেশে গিয়ে সেখানকার স্থায়ী বাসিন্দা হয়ে যায়, তাদের খুব ভালো চোখে দেখতাম না। প্রথম বিশ্বের দেশগুলোকে ২০০ বছর ধরে অন্য কোনো দেশ শোষণ করেনি, বরং ভারতের মত দেশগুলোকে শুষেই ওরা ধনী হয়েছে। সুতরাং এদেশের চেয়ে ওসব দেশের জীবনযাত্রা, কাজের সুযোগ ইত্যাদি উন্নত হওয়ারই কথা। সেসবের জন্যে এদেশের গরিব, মধ্যবিত্ত মানুষের ভর্তুকির টাকায় লেখাপড়া শেখা (সরকারি ভর্তুকির জন্যেই এদেশে লেখাপড়ার খরচ কম ছিল বছর পনেরো আগে পর্যন্তও। সরকারের টাকা মানে সাধারণ মানুষের করের টাকা, আর কর মানে কেবল আয়কর নয়) যেসব ছেলেমেয়ে বিদেশেই থেকে যেত, তাদের সম্বন্ধে ‘পলাতক’ শব্দটাই আমি ব্যবহার করতাম। এখন আর করি না, কারণ একাধিক কারণে আমার মত বদলেছে।

প্রথমত, স্বাধীনতার ৮০ বছর হতে চলল, এখনো আমরা দেশটাকে এমন করে তুলতে পারিনি, যেখানে সাদামাটা মানুষও জীবনের ন্যূনতম প্রয়োজনগুলো সুস্থভাবে সোজা পথে মিটিয়ে শান্তিতে বসবাস করতে পারে। উচ্চাকাঙ্ক্ষী হলে তো কথাই নেই। ফলে ইতিহাসের নিয়ম মেনে মানুষ উন্নততর জীবনযাত্রার দিকে দৌড়বেই। এমনকি আদিম মানুষও তাই করত, নইলে মানুষ নামক প্রাণীটি কখনো আফ্রিকা মহাদেশ ছেড়ে বেরোত না (যাঁরা জীববিজ্ঞান ও ইতিহাস মানেন না, তাঁরা এই লেখা পড়া এখানেই বন্ধ করে দিন)।

দ্বিতীয়ত, ভারতের বেশকিছু সম্প্রদায়ের জন্যে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে দেশের অবস্থা শেষ দেড় দশকে এমন করে ফেলা হয়েছে যে সেই সম্প্রদায়ের যে কোনো মানুষই সুযোগ থাকলে দেশ ছেড়ে চলে যেতে চাইবে। তাদের উপরেও রাগ করা চলে না।

তৃতীয়ত, দেশ আর রাষ্ট্র এক জিনিস নয়। আমরা দুটোকে সমার্থক শব্দ বলে ভাবি, কিন্তু আসলে তা নয়। রাষ্ট্র প্রশাসনিক ব্যাপার, দেশ মূলত মনোভূমি। ফলে ভারত রাষ্ট্রের ভূগোল আছে, সরকার আছে। ভারত দেশটার ভূগোল নেই, ইতিহাস আছে। সরকার নেই, সংস্কৃতি আছে। কেউ বুকে করে সেই সংস্কৃতি পৃথিবীর যে কোনো প্রান্তে নিয়ে গিয়ে বাস করতে পারে। সেই কারণেই গ্রীন কার্ড পেয়ে যাওয়া লোকও আমেরিকায় ভারতীয় ক্রিকেট দলের ম্যাচ হলে নীল জার্সি পরে গলা ফাটাতে পারে। মার্কিন রাষ্ট্রের নাগরিকের দায়িত্ব পালন করেও পারে। তার উপর ভারত এমন মজার দেশ যে ভারতীয় সংস্কৃতি মানে আসলে সাড়ে বত্রিশ ভাজা ‘একটি বিরাট হিয়া’। হিয়া মানে মন। সুতরাং ভারতীয় হিয়া যে পৃথিবীর যেখানে নিয়ে যেতে পেরেছে, সেখানেই ভারত আছে বললে ভুল হয় না। যার মনটা ভারতীয়, সে-ই ভারতীয়। তার ধর্ম যা-ই হোক, মুখের ভাষা যা-ই হোক, পেশা যা-ই হোক, বড়লোকই হোক আর গরিবই হোক। ভারতে থাকুক আর না-ই থাকুক। একথা মাথায় ঢোকার পরে আর অনাবাসী ভারতীয়দের উপর রাগ করি না। কিন্তু এইসব প্রিয় কথা বলতে গেলেই কিছু অপ্রিয় কথা এসে পড়ে, যেগুলো বর্তমান আলোচনায় প্রাসঙ্গিক।

উন্নততর জীবনের সন্ধানে যাওয়া আসলে সব মানুষের জন্মগত অধিকার, অথচ দুনিয়ার কোনো রাষ্ট্র সেকথা স্বীকার করে না। তাই এক দেশ থেকে আরেক দেশে ভাগ্যান্বেষণে যেতে হলে নিজের এবং যে রাষ্ট্রে যেতে চান, দুপক্ষেরই সম্মতি আদায় করতে হয়। মানে পাসপোর্ট, ভিসা, ওয়ার্ক পারমিট, পরে নাগরিকত্ব ইত্যাদি। ওগুলো পেতে কী লাগে? আপনি বলবেন যোগ্যতা, আসলে লাগে টাকা এবং/অথবা পরিচিতি। ভেবে দেখুন, নিজেই বুঝতে পারবেন। GRE, CIEFL, TOEFL না কীসব আছে আপনাদের? সেগুলো পাশ না করে কি কেউ বিদেশ যাচ্ছে না, নাকি গিয়ে বাসিন্দা হয়ে যাচ্ছে না? আপনি যাকে যোগ্যতা বলছেন, সেটা কীসের যোগ্যতা? আপনাকে অন্য দেশে ঢোকার অনুমতি আদায় করে দেবে সেদেশের কেউ (আপনি যেখানে পড়তে বা পড়াতে যাচ্ছেন সেই শিক্ষা প্রতিষ্ঠান অথবা আপনি যে কোম্পানির চাকুরে) – এই ব্যবস্থা করার যোগ্যতা।

এখন কথা হল, যার ওই তথাকথিত যোগ্যতা নেই, টাকা বা পরিচিতিও নেই, তারও কিন্তু উন্নততর জীবনের অভিলাষ আছে। সেই জীবনকে ধাওয়া করার মানবিক অধিকারও আছে। কথাটা যেমন ভারত থেকে যে আমেরিকায় যেতে চায় তার বেলায় সত্যি, তেমন যে বাংলাদেশ থেকে ভারতে আসতে চায়, তার বেলাতেও সত্যি। এই লোকগুলো তাহলে কী করে? বেআইনি পথে বাংলাদেশ থেকে ভারতে ঢোকে, বা ভারত থেকে আমেরিকায় যায়। রাষ্ট্রের ভাষায় বললে— অনুপ্রবেশ করে। এ তো গেল আরও ভালো জীবনের আকাঙ্ক্ষায় দেশ বদলানোর কথা। এছাড়া স্রেফ প্রাণে বাঁচতেও মানুষ এক রাষ্ট্র থেকে আরেক রাষ্ট্রে যায়। তাদের উদ্বাস্তু বলাই দস্তুর, কিন্তু যখনই কোনো রাষ্ট্রের মনে হয় ‘ব্যাটারা বড্ড বেশি সংখ্যায় আসছে’, তখনই লাঠিসোটা গুলি বন্দুক বের করে তাদের তাড়াতে লেগে পড়ে। তখন আর উদ্বাস্তু বলে না, বলে অনুপ্রবেশকারী।

কোনটা অনুপ্রবেশ আর কোনটা নয়, সেটা ঠিক করে রাষ্ট্র। আর সংজ্ঞাটা সে যেদিন ইচ্ছে যখন ইচ্ছে বদলে ফেলতে পারে। উদ্বাস্তুদের কথা বাদ দিন। আপনি হয়ত রাতে ঘুমোলেন নাগরিক হিসাবে, সকালে উঠে দেখলেন অনুপ্রবেশকারী হয়ে গেছেন। এই কথাটা কমাস আগে বললেও অনাবাসী বন্ধুরা নির্ঘাত হেসে উড়িয়ে দিতেন, এখন আর পারবেন না। ডোনাল্ড ট্রাম্পের মুখটা একবার মনে করে দেখুন। কদিন আগেই হাড়ে ঠকঠকানি ধরিয়ে দিয়েছিলেন না? স্বীকার না করলেও, অনেকের হাড় এখনো ঠকঠক করেই চলেছে। তা সত্ত্বেও কিন্তু ‘পশ্চিমবঙ্গে বড্ড বেশি বাংলাদেশি আর রোহিঙ্গা ঢুকে পড়েছে’ বলে রাতে ঘুম না হওয়া বাঙালি বাবা-মায়েরা ছেলেমেয়েকে কী করে বিদেশে পাঠানো যায় তার খোঁজখবর জারি রেখেছেন। ‘আমার ছেলে স্টেটসে থাকে’ বলে বিয়েবাড়িতে দূর সম্পর্কের আত্মীয় এবং নতুন পরিচিতের কাছে রেলা নেওয়াও জারি আছে। কয়েক মাস আগে এক বিয়েবাড়িতে তেমন এক আত্মীয়ের সঙ্গে আমার কথা হচ্ছিল। তাঁর ছেলেও ‘স্টেটসে থাকে’, তার উপর বউমা আমেরিকান। স্বভাবতই ভদ্রমহিলা মাটির দু ইঞ্চি উপর দিয়ে হাঁটেন। বউমা আমিষ খান না, কারণ তিনি ‘অ্যানিমাল ক্রুয়েলটি’-র বিরুদ্ধে। সমাজবিজ্ঞান নিয়ে লেখাপড়া করে এখন কী একটা এনজিও-তে ‘আন্ডার-প্রিভিলেজড’ মানুষের জন্য কাজ করেন। গর্বিত শাশুড়ি এসব শোনাচ্ছিলেন আমাদের। বাঙালিসুলভ বোকামিতে জিজ্ঞেস করে ফেলেছিলাম ‘আপনার ছেলে-বউমা কি তাহলে ডেমোক্র্যাট?’ উত্তর এল ‘সেরকম কিছু না, যার যেটা ভালো সেটা বলে। আমার বউমা যেমন বলে, ট্রাম্প ইজ দ্য বেস্ট প্রেসিডেন্ট।’ এই কথোপকথনের আগেই H1B ভিসা নিয়ে ট্রাম্পের বিষোদ্গার শুরু হয়ে গেছে। আমার মনে তার চেয়েও দগদগে ঘা তৈরি করেছে ভারতীয়দের হাতে-পায়ে শেকল বেঁধে বিমানে তুলে আমেরিকা থেকে বের করে দেওয়ার দৃশ্য।

সেসব উল্লেখ করে জিজ্ঞেস করলাম— এসব কাণ্ড করে ট্রাম্প কী করে মার্কিন বউমার চোখে সেরা রাষ্ট্রপতি হন? বাঙাল (নিজেই বললেন) শাশুড়ি উত্তর দিলেন ‘না, ওরা তো বেআইনিভাবে আমেরিকায় গেছিল। ওরা তো অনুপ্রবেশকারী। ওরা আমেরিকায় গেছে স্রেফ টাকা রোজগার করতে। ওদের তো বের করে দিতেই হবে’। উত্তরে বলেই ফেললাম, আপনার ছেলেও তো টাকা করতেই গেছে। ভদ্রমহিলার উত্তর ‘আমার ছেলে তো পাসপোর্ট, ভিসা করিয়ে গেছে।’ অর্থাৎ ঘুরে ফিরে ব্যাপারটা দাঁড়াল ওই— রাষ্ট্রের দেওয়া কাগজ যাকে অভিবাসী বলে সে-ই অভিবাসী, অন্যরা অনুপ্রবেশকারী। এই কাগজ জোগাড় করা কিন্তু যোগ্যতার ব্যাপার নয়, নেহাতই রাষ্ট্রের দয়া। এ দয়া যদি ১৯৪৭ সালের পরে ভারত রাষ্ট্র না দেখাত, তাহলে আজ যে বাঙালরা এবিপি আনন্দ ইত্যাদি চ্যানেলে দেখানো হাজার হাজার লোকের বাংলাদেশে পালানোর ভুয়ো ভিডিও দেখে উল্লসিত, এসআইআরে বাদ পড়া লোকেরা ঢিট হয়েছে ভেবে নাচছেন, তাঁদের বাপ-মায়েরা কিন্তু অনুপ্রবেশকারী হয়ে যেতেন।

তবে একটা কথা মানতেই হবে। ট্রাম্প, তাঁর উপরাষ্ট্রপতি জে ডি ভান্স, যতই অভিবাসীদের বাড়ির মেয়ে বিয়ে করে ভণ্ডামি করুন, নরেন্দ্র মোদীর বিজেপির কিন্তু অন্য দেশ থেকে আসা লোকেদের ব্যাপারে চিন্তাভাবনা অনেক পরিষ্কার। তথাগত রায় যখন রাজ্য সভাপতি ছিলেন, সেই জুরাসিক যুগ থেকে বঙ্গ বিজেপি বলে আসছে— বাংলাদেশ থেকে আসা মুসলমানরা অনুপ্রবেশকারী, হিন্দুরা শরণার্থী। কেন্দ্রে একক শক্তিতে ক্ষমতায় আসার পরে তারা নাগরিকত্ব আইনের যে সংশোধন করেছে, তাতেও এই ভাবনাকেই স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। এতক্ষণ ধরে যা যা বলেছি, সবকিছুর বিপরীতে পুরনো ও নতুন বাঙালরা সেই আইনকে তুলে ধরতে পারেন। কিন্তু ডেভিল (ডিমের নয়, বিজেপির প্রতি বিশ্বস্ত হতে চাইলে আমিষ-চিন্তা মাথা থেকে তাড়ান) যে ডিটেলে। এসআইআর থেকে বাদ দেওয়ার সময়ে কই হিন্দুদের রেখে দেওয়া হল না তো! এখন যে নিত্য হিন্দু বীর অমিত শাহ এসআইআর থেকে বাদ পড়া মানুষকে দেশছাড়া করার হুমকি দিচ্ছেন, তাতেও তো বলছেন না যে হিন্দুদের রেখে দেওয়া হবে? অনুপ্রবেশকারী আর শরণার্থী বলে দুটো গোষ্ঠীর কথা তো বলছেন না? একটা শব্দই তো ব্যবহার করছেন— ‘ঘুসপ্যায়েট’।

আরো পড়ুন রামদাসী, লালদাসের ধর্ম এবং রামমন্দির

আসামের ডিটেনশন ক্যাম্পেও কিন্তু কেবল মুসলমানদের ঢোকানো হয়নি। উলটে একাধিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ওই রাজ্যের ডিটেনশন ক্যাম্পে আটক বেশিরভাগ মানুষ হিন্দু বাঙালি।

সংঘ পরিবারের সোশাল মিডিয়া যোদ্ধারা যে নেহাত পুতুলখেলায় লিপ্ত নন, সংঘের মনের কথাই যে তাঁদের মুখ দিয়ে বেরোয়— একথা যদি জানা থাকে, তাহলে বুঝতে অসুবিধা হওয়ার কথা নয় যে এক্ষেত্রেও অমিত শাহরা অত্যন্ত সৎ। কারণ ওঁদের আই টি সেলের লোকেরা ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বাসিন্দা হিন্দুদের জন্যে কেঁদে ভাসালেও তাদের এদেশে আশ্রয় নেওয়ার প্রসঙ্গ উঠলেই বলে ‘দেশটা কি ধর্মশালা নাকি?’ অর্থাৎ এঁদের হিন্দু বাঙালির প্রতি প্রীতি আসলে, গোদা বাংলায় যাকে বলে, মায়ের চেয়ে মাসির দরদ বেশি। মানে আহা উহু করব, কিন্তু দায়িত্ব নেব না। তাহলে আহা উহু করাই বা কেন, ভেবে দেখেছেন কি? কারণটা খুব সহজ। যাতে ওদেশের সংখ্যালঘুর প্রতি অত্যাচারকে এদেশের সংখ্যালঘুর অত্যাচারের পক্ষে যুক্তি হিসাবে তুলে ধরা যায়। মানে শুঁড়ির সাক্ষী যেমন মাতাল, সংঘ পরিবারের সাক্ষী জামাত। মুশকিল হল, বাংলাদেশের মানুষ জামাতকে হারিয়ে ভূত করে দিলেন; পশ্চিমবঙ্গের মানুষের হিন্দুত্বের নেশা কিন্তু কাটছে না। আই টি সেল নিরুপায় হয়ে আঁকড়ে ধরেছে পশ্চিমবঙ্গের সীমান্তবর্তী আসনগুলোতে জামাতের জয়কে, তাই দিয়ে হোয়াটস্যাপ গ্রুপগুলোর মাধ্যমে ‘পশ্চিমবঙ্গ বিপন্ন, বাংলাদেশ হয়ে যাবে’ বলে ভয় দেখানো হচ্ছে। বাঙালি সে প্রোপাগান্ডা এখনো গিলছে। কারণ মুসলমানদের প্রতি অকারণ ভয় থেকে তৈরি হওয়া ঘৃণা এতদিনে ঘাড়ে এমন চেপে বসেছে যে সৃজন যখন বলছেন ‘রাষ্ট্র কোনোদিনই খুব ভালো জিনিস নয়’, তখন এঁরা মনে করছেন— পশ্চিমবঙ্গকে বাংলাদেশ বানানোর চক্রান্ত করছে। ফলে যে হিন্দুর নিজের নাম এসআইআরে বাদ পড়েনি, তিনি আর যাঁর নাম বাদ পড়েছে তাঁকে নিয়েও চিন্তিত নন। রাষ্ট্রের প্রতি এমন অচলা ভক্তি তৈরি হয়েছে যে ভেবে নিচ্ছেন— এমনি এমনি তো আর বাদ দেয়নি, ওরা হিন্দু হলেও নির্ঘাত বাংলাদেশ থেকে এসেছে।

এখন বুঝবেন না, যখন বুঝবেন তখন অনেক দেরি হয়ে যাবে জেনেও একবার বলে রাখা যাক— রাষ্ট্র, বিশেষ করে আধুনিক জাতিরাষ্ট্র, নেহাতই সেদিনের ছেলে। বয়স আড়াইশো-তিনশো বছরের বেশি নয় এবং জিনিসটা মানুষের তৈরি। যদি ভগবান বলে কেউ থেকেও থাকেন, তিনি রাষ্ট্রগুলোর সীমানা এঁকে দিয়ে পৃথিবীর রাজনৈতিক ম্যাপটা তৈরি করেননি। স্রেফ গত একশো বছরেই কতগুলো রাষ্ট্র তৈরি হয়েছে আর ভেঙে গেছে গুগল করে দেখে নিলেই চলবে, সৃজনকে বা এই নিবন্ধকারকে বিশ্বাস করার দরকার নেই।

সুতরাং মানুষের তৈরি রাষ্ট্র, নাগরিকদের সিদ্ধান্তে তৈরি রাষ্ট্র যখন নিজের মর্জি মত নির্ধারণ করে— এ নাগরিক আর ও নাগরিক নয়, তখন প্রতিবাদ করাই বুদ্ধিমানের কাজ। কারণ এ জিনিস একবার শুরু হলে থামবার নয়। কাল মর্জি বদলালে রাষ্ট্র নাগরিক হওয়ার মাপকাঠি বদলে দেবে। আজকের মাপকাঠিতে আপনি নাগরিক, সেদিনের মাপকাঠিতে বাদ পড়ে যেতে পারেন। কী করবেন তখন? আপনারাই তো বলেন— মুসলমানদের ভারতে থাকার দরকার নেই, তাদের যাওয়ার জন্যে নাকি ৫৭ খানা দেশ আছে। আপনাদের এই একটাই দেশ।

নাগরিক ডট নেট ওয়েবসাইটে প্রকাশিত

নির্বাচনে এবারও খেলা হবে, তবে রান্নাবাটি

আমরা যেমন বিহারের খবর রাখি না, তেমন ওড়িশার খবরও রাখি না। ফলে আমরা অনেকেই জানি না, সেখানে গত বিধানসভা নির্বাচনের ভোটগণনায় কী কাণ্ড হয়েছে।

এই লেখা যখন লিখছি, তখন পর্যন্ত আমার এলাকায় বিজেপি প্রার্থীর কোনো প্রচার চোখে পড়েনি। অথচ সিপিএম প্রার্থী অলিতে গলিতে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। প্রায় বাড়ি বাড়ি যাচ্ছেন, কোনো কোনো ফ্ল্যাটেও উঠে পড়ছেন। রাস্তায় বেরোলেই কোথাও না কোথাও তাঁর অথবা সিপিএমের অন্য কর্মীদের মিছিল, মিটিং চোখে পড়ছে। তৃণমূল প্রার্থীকেও হাত জোড় করে হাসি হাসি মুখ নিয়ে ঘুরে বেড়াতে দেখা গেছে। দেয়াল লিখনেও সিপিএম আর তৃণমূলের উপস্থিতিই চোখে পড়ছে, বিজেপি নেই। বিজেপি যে আছে তার প্রমাণ হিসাবে কোনো কোনো পাড়ায় তিনকোণা গেরুয়া পতাকা শোভা পাচ্ছে, তবে সেগুলো লাগানো হয়েছিল রামনবমী উপলক্ষে। হনুমানপুজোর দিনও এলাকায় গত কয়েক বছরে তৈরি হওয়া, হিন্দিভাষীপ্রধান ফ্ল্যাটগুলোর সামনে রাম, সীতা, হনুমানের কাট আউটের পাশে ওই পতাকাগুলো দেখা গেছে। কোনো কোনো বাইকচালককে ওই গেরুয়া পতাকা লাগিয়ে ঘুরতে দেখা যাচ্ছে, কিন্তু নির্বাচনী প্রচার বলতে যা বোঝায় তাতে বিজেপির বিশেষ উৎসাহ আছে বলে মনে হচ্ছে না। একাধিক কেন্দ্রের অধিবাসী পরিচিতদের সঙ্গে কথা বলে একইরকম তথ্য পাচ্ছি। এদিক ওদিক দু-একজন প্রার্থীর মাছ হাতে প্রচার করা বা প্রাক্তন এনএসজি কমান্ডোর সেই পোশাক পরে প্রচারে বেরিয়ে পড়ার মত ঘটনা বাদ দিলে, সংবাদমাধ্যম বা সোশাল মিডিয়াতেও কেন্দ্রের শাসক দলের প্রচারের প্রাবল্য নেই।

প্রশ্ন হল, এমন কেন হচ্ছে? বিজেপি কেবল ভারতের নয়, তাদের কথা অনুযায়ী, পৃথিবীর বৃহত্তম রাজনৈতিক দল। নির্বাচনী বন্ডের কল্যাণে এবং আরও নানা কারণে তাদের টাকাপয়সারও অভাব নেই যে খরচের কথা ভেবে প্রচারে রাশ টানতে হবে। তাহলে এই কার্পণ্য কেন? দীর্ঘদিন ধরে যাঁরা নির্বাচন দেখে আসছেন, তাঁদের কাছে এর সহজ ব্যাখ্যা হল— বিজেপির সংগঠন নেই। অতএব সিদ্ধান্ত হল— ভোট পাবে না। দুঃখের বিষয়, এই ব্যাখ্যা প্রাক-২০১৯ নির্বাচনগুলোর জন্যে নির্ভুল। কিন্তু সেবার থেকে দেখা গেছে— এ রাজ্যে বিজেপির সংগঠন নেই, ভোট আছে। বামপন্থীদের আবার নয় নয় করেও খানিকটা সংগঠন আছে, কিন্তু ভোট নেই। ২০১৯ লোকসভা নির্বাচন, ২০২১ বিধানসভা নির্বাচন এবং ২০২৪ লোকসভা নির্বাচন— প্রত্যেকবার ফল বেরোবার পর এই ব্যাপারটাই উপলব্ধি করা গেছে। এর কারণ বামের ভোট রামে চলে যাওয়া, নাকি তৃণমূল-বিজেপি সেটিং—সে আলোচনা এবারকার মত মুলতুবি থাক। কারণ পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার এবারের নির্বাচন অভূতপূর্ব। অথচ কথাটা বামপন্থীরা এবং তৃণমূল যেন বুঝেও বুঝতে চাইছে না। ফলে তাদের প্রচারকে রান্নাবাটি খেলা ছাড়া আর কিছু ভাবা যাচ্ছে না। শয়ে শয়ে লোক সঙ্গে নিয়ে, পার্টির পতাকায় এলাকা ছয়লাপ করে, ক্ষমতায় এলে পশ্চিমবঙ্গের ভোল পালটে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া বা গত ১৫ বছরের উন্নয়নের পাঁচালী শোনানোর যে কোনো মানে হচ্ছে না, সেকথা সাধারণ ভোটারদের কথাবার্তায় কান পাতলে দিব্যি টের পাওয়া যাচ্ছে। কিন্তু রাজনৈতিক দলগুলো যেন কানে গুঁজেছে তুলো আর পিঠে বেঁধেছে কুলো।

১) ৬ এপ্রিল রাতে নির্বাচন কমিশন দয়া করে বিচারাধীন থাকা ভোটারদের মধ্যে কাদের ভাগ্যে ভোটদানের শিকে ছিঁড়ল আর কাদের ছিঁড়ল না— তার সর্বশেষ তালিকা প্রকাশ করেছে। রাজ্যসুদ্ধ লাখ লাখ লোক উৎকণ্ঠায় জীবন কাটাচ্ছিলেন, সেই উৎকণ্ঠা সহ্য করতে না পেরে রিষড়ার মিনতি সেন আত্মহত্যা করেছেন বলেও অভিযোগ উঠেছে। সোশাল মিডিয়া খুললে আরও বহু মানুষের কথা জানা যাচ্ছে, যাঁরা গত কয়েক দিনে এই দুর্ভাবনায় অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। শেষমেশ জানা গেছে, ৬০ লাখের বেশি ভোটারের মধ্যে প্রায় ২৭ লাখ বাদ।

২) আগেই বাদ পড়েছিলেন ৫৮ লাখ, এবার আরও ২৭ লাখ। আগের ৫৮ লাখের মধ্যে অবশ্য কিছু মৃত ভোটার ছিল, তবে ডিসেম্বরের খসড়া তালিকা থেকেই জীবিতকে মৃত বানিয়ে দেওয়ার ঘটনাও ছিল। অনেক প্রগতিশীলও যা কীসব রাজনৈতিক অঙ্ক কষে মানতে চাইছিলেন না, তাও প্রমাণ হয়ে গেছে শেষ তালিকা বেরোবার পরে— মুসলমানদের বাদ পড়ার হার তাঁদের ভোটার তালিকায় উপস্থিতির হারের চেয়ে বেশি। অল্ট নিউজ এই তথ্য টেনে বের করেছিল কলকাতার দুটো বিধানসভা কেন্দ্রের বিশেষ নিবিড় সংশোধনী পরবর্তী ভোটার তালিকা থেকে, সবর ইনস্টিটিউট এই তথ্য বের করেছে বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারীর দুই কেন্দ্রের অন্যতম, নন্দীগ্রামের, তালিকা বিশ্লেষণ করে। উপরে দেওয়া নির্বাচন কমিশনের নিজের তালিকাতেও দেখা যাচ্ছে— মুর্শিদাবাদ, উত্তর ২৪ পরগণা, মালদার মত যে জেলাগুলোতে মুসলমান সম্প্রদায়ের মানুষ অন্যান্য জেলার তুলনায় বেশি, সেখানেই বাদ পড়া মানুষের সংখ্যা বেশি। তাছাড়া যাঁরা বাদ পড়েছেন, তাঁদের মধ্যে মহিলা, নিম্নবর্গীয় হিন্দু, আদিবাসীদের উপস্থিতি প্রধান। অর্থাৎ যাঁদের বিজেপিকে ভোট দেওয়ার সম্ভাবনা শূন্য থেকে শুরু, তাঁদের ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়ার ব্যবস্থারই ভালো নাম এসআইআর। বাংলাদেশের হিন্দুদের জন্যে এত প্রাণ কাঁদে বিজেপি নেতাদের, অথচ সেখান থেকে তাড়া খেয়ে চলে আসা মতুয়াদের উপরেও কোপ পড়েছে। আমরা ছাপ্পা ভোট দেখেছি, বুথ দখল দেখেছি, ‘সায়েন্টিফিক রিগিং’ শুনেছি, ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিনে কারচুপির অভিযোগও শুনতে পাই। গণনার সময়ে ব্যালট খেয়ে নেওয়া, ধানখেতে বা নালায় ফেলে দেওয়ার দৃশ্যও নতুন নয়। কিন্তু সেসবই ভোটদানের দিন বা ভোটদানের পরের ব্যাপার। ভোটগ্রহণের আগেই নির্বাচন জিতে নেওয়ার এমন ভবিষ্যনিধি প্রকল্প আমরা দেখিনি।

৩) ধরা যাক, আপনি নিরীহ লোক। আপনাকে মেরে ধরে এলাকার গুন্ডারা সর্বস্ব কেড়ে নিল। আপনি পুলিশের কাছে গেলেন, বাকি যা দু-চার পয়সা ছিল সেগুলোও তারা কেড়ে নিল, আপনি পথে বসলেন। এমতাবস্থায় আমাদের দেশের মানুষ কোনো একটা উপায় বের করতে পারলে যায় আদালতের কাছে। এক্ষেত্রেও তাই হয়েছিল। তা আমাদের সর্বোচ্চ আদালতের বিচারপতিদের এমন দয়ার শরীর যে তাঁরা বলেছেন যাদের নাম জজসাহেবদের বিচারেও বাদ গেছে, তাঁরাও ফের আবেদন করতে পারবেন। তবে তাঁদের আবেদনের নিষ্পত্তি হোক আর না-ই হোক, ভোট ভোটের সময়েই হতে হবে। যাঁরা এবার ভোট দিতে পারছেন না, তাঁরা নাহয় পরেরবার দেবেন। পৃথিবীর সব গণতান্ত্রিক দেশে ভোট হয় ভোটারের স্বার্থে। এখন ধর্মাবতাররা যা সিদ্ধান্ত নিলেন তাতে বোঝা গেল, পশ্চিমবঙ্গে ভোট হবে ভোটের স্বার্থে। ভোটার হলেন ফাউ। ভোটার জনপ্রতিনিধি নির্বাচন করবেন না, নির্বাচন কমিশন ভোটার নির্বাচন করবে। তারা না পারলে বিচারপতিরা করবেন। যেভাবে পারবেন সেভাবে করবেন, যখন ইচ্ছে হবে তখন করবেন। ভোটার অধিকার হারালে প্রতিবাদ করতেও পারবেন না। করলে পাইক, বরকন্দাজ ডাকা হবে, হাজতবাস হবে, ভোটার সন্ত্রাসবাদী কিনা তাও খতিয়ে দেখা হবে। ডিগ্রিধারী উচ্চবর্গীয় সাংবাদিকরা স্টুডিওতে বসে বিচারকদের জন্যে চোখের জল ফেলবেন আর প্রতিবাদী ভোটারদের ভীষণ বকে দেবেন।

৪) সন্ত্রাসবাদের কবলে থাকা কাশ্মীর বা বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনে দীর্ণ আট-নয়ের দশকের পাঞ্জাব বা উত্তর-পূর্বাঞ্চলের রাজ্যগুলো ছাড়া কোথাও কখনো নির্বাচনে এত বাইরে থেকে আনা সশস্ত্র বাহিনী ব্যবহৃত হয়েছে কিনা সন্দেহ। অনেকদিন যাবৎ একটা কথা চালু হয়েছে— ভোট নাকি গণতন্ত্রের উৎসব। এবারে দেখে মনে হচ্ছে যুদ্ধ। সে যুদ্ধে আসার জন্যে রওনা দেওয়ার আগে কেন্দ্রীয় বাহিনীর জওয়ানরা আবার অযোধ্যার রামমন্দিরে মাথা ঠুকে আসছেন। মানে যুদ্ধকে পশ্চিমবঙ্গের ভোটারদের চোখে একেবারে ধর্মযুদ্ধে পরিণত করার চেষ্টা। কীরকম নিরপেক্ষ ভোটদান নিশ্চিত করতে আসছে কেন্দ্রীয় বাহিনী, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।

৫) মানুষের ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়ার জন্যই যে এসআইআর, সেটা অবশ্য বাঙালি বুদ্ধিমানরা বিহারের এসআইআরের দিকে চোখ রাখলে প্রথমেই টের পেতেন। কিন্তু পাননি। যা-ই হোক, বিহারে ও জিনিস আগে করা হয়েছে বলেই বাংলায় যা হল তাকে অভূতপূর্ব বলা চলে না। তবে ভাববেন না, এসআইআরেই কমিশনের গাফিলতি শেষ হয়। আমরা যেমন বিহারের খবর রাখি না, তেমন ওড়িশার খবরও রাখি না। ফলে আমরা অনেকেই জানি না, সেখানে গত বিধানসভা নির্বাচনের ভোটগণনায় কী কাণ্ড হয়েছে। ফ্রন্টলাইন পত্রিকার এক প্রতিবেদন অনুযায়ী বহু বুথে যত ভোট পড়েছে (যার হিসাব থাকে ফর্ম ১৭সি-তে) আর যত ভোট গোনা হয়েছে (যার হিসাব থাকে ফর্ম ২০-তে) তা মেলেনি। বিজু জনতা দল ২০২৪ সালের ডিসেম্বর মাসে তাদের প্রেস নোটে জানায়— ১৪৭ খানা বিধানসভা কেন্দ্রের ৫৮ খানা বুথে পড়া ভোট আর গোনা ভোটের তফাত এক থেকে ৯০৮ পর্যন্ত পৌঁছেছে। দুটো চোখ কপালে তোলা উদাহরণ দিয়ে চক্করটি বোঝানো যাক। ফুলবনী কেন্দ্রের ৫৭ নম্বর বুথে ভোট পড়েছে ৬৮২, কিন্তু ফর্ম নং ২০ বলছে একটা ভোটও গোনা হয়নি। তালসারার ১৬৫ ও ২১৯ নম্বর বুথে মোট ১,৪৪৪ জন ভোট দিয়েছেন বলছে ফর্ম নং ১৭সি। অথচ ফর্ম নং ২০ বলছে ও দুটোরও কোনো ভোট গোনা হয়নি। উলটো উদাহরণও আছে। পদমপুরের ১৪ খানা বুথ মিলিয়ে নাকি ভোট পড়েছে ৮২, গোনা হয়েছে ৯,৩০৪। এসব নিয়ে বিজু জনতা দল দুবার নির্বাচন কমিশনে অভিযোগ জানিয়েছে, তথ্যের অধিকার আইনেও আবেদন জানিয়েছে। কেউ পাত্তা দেয়নি।

৬) কলকবজা কী আছে না আছে না জেনেও যেমন আমরা ট্রেনে বাসে চড়ি, সেভাবেই জনপ্রতিনিধিত্ব আইনে কী আছে বা অমুক নম্বর ফর্ম আর তমুক নম্বর ফর্ম দিয়ে কী হয় না জেনেও সেই ১৯৫২ সাল থেকে ভারতের মানুষ ভোট দিয়ে আসছিল। এবারে জ্ঞানেশ কুমারের দৌরাত্ম্যে আমরা কিছু কিছু কল বা গ্যাঁড়াকল সম্পর্কে জানতে বাধ্য হয়েছি। সেরকম দুটো গ্যাঁড়াকল হল ফর্ম নং ৬ আর ৭। এমনিতে ফর্ম নং ৬ খুবই নিরীহ জিনিস। ওটা দিয়ে ভোটার হওয়ার আবেদন করতে হয়। কিন্তু বিহারের অভিজ্ঞতা থেকে এবং পশ্চিমবঙ্গেও গত কয়েকদিনের অভিজ্ঞতায় আমরা জেনে গেছি যে, ওটা ব্যবহার করে ভিনরাজ্যের লোককে রাতারাতি ভোটার তালিকায় ঢোকানোর কাজ করা হয় বলে প্রচুর অভিযোগ আছে। সে কাজ করতে গিয়ে কিছু লোক হাতেনাতে ধরা পড়েছে বলে দাবি করেছে তৃণমূল কংগ্রেস, কিন্তু সব যে ধরা সম্ভব হবে না তা বলাই বাহুল্য। ফর্ম নং ৭-এর ব্যবহার আরও চমৎকার। ও দিয়ে কমিশনে অভিযোগ জানানো যায়— অমুক বৈধ ভোটার নয়, ওকে বাদ দিন। সেটাকে ব্যবহার করে মুসলমানদের বাদ দেওয়ার চেষ্টা করা হবে— একথা কিছুদিন আগে সগর্বে জানিয়েছিলেন আসামের বিজেপি মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মা। এসব সম্ভব হয় না নির্বাচন কমিশন ওই ফর্মগুলোর আবেদনকারীদের ব্যাপারে নিয়মমাফিক যাচাই করলে। কিন্তু তা কি করা হয়? হলে আসামের বিএলও সুমনা চৌধুরী, ফর্ম নং ৭-এর উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ব্যবহার ক্যামেরার সামনে ফাঁস করে দেওয়ার জন্যে, চাকরি থেকে সাসপেন্ড হলেন কেন? পশ্চিমবঙ্গেও গুচ্ছ গুচ্ছ ফর্ম নং ৭ নিয়ে ধরা পড়ার অভিযোগ উঠেছে বিজেপির কর্মীদের বিরুদ্ধে।

৭) নির্বাচন কমিশনের এতরকম কীর্তিকলাপ দেখে ভারতের প্রায় সব বিরোধী দল তার উপর আস্থা হারিয়েছে। ফলে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশকে অপসারণের প্রস্তাব এনেছিলেন বিভিন্ন দলের ১৯৩ জন সাংসদ। লোকসভার স্পিকার এবং রাজ্যসভার চেয়ারম্যান সেই প্রস্তাব নিয়ে আলোচনাই হতে দেননি। কোনো কারণও দেখাননি।

এই সাত কাণ্ড রামায়ণ জানার পরে, বিজেপি যে অমিত শাহ আর নরেন্দ্র মোদীর জনসভা ছাড়া প্রচারে বিশেষ মন দিচ্ছে না, তাতে অবাক হওয়ার কিছু থাকে কি? অন্যদিকে পশ্চিমবঙ্গের বিজেপিবিরোধী দলগুলো যে প্রাণপণ প্রচার করে চলেছে, তাকে শিশুদের আপন মনে রান্নাবাটি খেলা ছাড়া অন্য কিছু বলা চলে কি? ভোটারদের অধিকারের কথা নির্বাচন কমিশন ভাবেনি, সুপ্রিম কোর্ট ভাবেনি— একথা ঠিক। কিন্তু তৃণমূল কংগ্রেস, কংগ্রেস বা বামপন্থীরা যে ভাবছেন, তারই বা প্রমাণ কোথায়? কোনো পক্ষই প্রথম থেকে একবারও বলেনি যে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র মানে হল, জনগণের বেছে নেওয়া তন্ত্র। এ তো তন্ত্র জনগণ বেছে নিচ্ছে। এ অধিকার রাষ্ট্রের নেই, অতএব এই প্রক্রিয়া বাতিল করতে হবে। কেবল পশ্চিমবঙ্গের দলগুলো বলেনি তা নয়, যে ১২ খানা রাজ্যে এসআইআর হল, কোথাও কোনো দলই বলেনি। সবাই মেনে নিল যে এটা সাংবিধানিক প্রক্রিয়া। অথচ সংবিধানে এমন কোনো প্রক্রিয়ার কথা আছে— একথা আজ পর্যন্ত সুপ্রিম কোর্টও বলে উঠতে পারল না। জনপ্রতিনিধিত্ব আইনেও আছে নিবিড় সংশোধনের কথা, যা ভারতে এর আগেও বহুবার হয়েছে, পশ্চিমবঙ্গে শেষ হয়েছিল ২০০২ সালে। তার জন্যে ভোটারকে ফর্ম পূরণ করতে হয় না, নিজের নাগরিক হওয়ার প্রমাণ দিতে হয় না, বাপ-মা নাগরিক ছিলেন কিনা তাও দেখাতে হয় না। নির্বাচন কমিশনই নিজের উদ্যোগে নিজের ভুল সংশোধন করে। বিশেষ নিবিড় সংশোধন বলে যে আদৌ কিছু নেই, তা নাগরিক ডট নেটের পডকাস্টে এসে পরিষ্কার বলে গিয়েছেন নির্বাচন কমিশনের প্রাক্তন সিইও জহর সরকার।

বিহারে এই প্রক্রিয়ার শুরু থেকেই বোঝা গিয়েছিল মতলবখানা কী। অথচ রাষ্ট্রীয় জনতা দল, কংগ্রেস এবং বামপন্থীরা সেই প্রক্রিয়া মেনে নিয়েই নির্বাচনে লড়লেন। বোধহয় ভেবেছিলেন এত মানুষ নীতীশ কুমারের সরকারের উপর খাপ্পা যে যত ভোটারই বাদ যাক, ঠিক জিতে যাবেন। তা যখন হল না এবং অপ্রত্যাশিত বড় ব্যবধানে হার হল, তখন বিস্তর গণ্ডগোল আছে বলে অভিযোগ জানিয়েও দু-একবার মৃদু প্রতিবাদ করে বাধ্য ছেলেমেয়েদের মত তাঁরা বিধানসভায় গিয়ে বসে পড়লেন। কোথাও কোনো আন্দোলন, অবরোধ কিছু দেখা গেল না। যে রাহুল গান্ধী ভোট চুরি ধরে ফেলেছেন বলে কর্ণাটক ও মহারাষ্ট্র নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে এ বোমা সে বোমা ফাটানো সাংবাদিক সম্মেলন করেছিলেন, তিনিও চুপসে গেলেন। সেই যে চুপ করেছেন, পশ্চিমবঙ্গে কোটিখানেক মানুষের ভোটাধিকার হরণ নিয়ে আজ পর্যন্ত এক লাইন সোশাল মিডিয়া পোস্টও করে উঠতে পারেননি। তাহলে তো ধরে নিতে হবে, কর্ণাটক আর মহারাষ্ট্রের ভোট চুরি নিয়ে তাঁর ভাবনা আছে, কারণ সেখানে তাঁর দল জেতার অবস্থায় থাকে। পশ্চিমবঙ্গে খুব ভালো ফল করলেও যেহেতু কংগ্রেস গোটা পাঁচেকের বেশি আসন জিতবে না, সেহেতু এ রাজ্যের লোক বাঁচুক, মরুক বা ডিটেনশন ক্যাম্পে যাক, তাঁর কিছু এসে যায় না। মহব্বতের দোকান দেখা যাচ্ছে খুবই ছোট।

তৃণমূল কংগ্রেস যে মতলবটা প্রথমে ধরতে পারেনি তা পরিষ্কার। ভেবেছিল তাদের সাংগঠনিক জোর দিয়ে ভোটার বাদ দেওয়া সামলে নেবে। তাই মোড়ে মোড়ে ভোটার সহায়তা কেন্দ্র খুলে বসে এসআইআরে সাহায্য করেছে। সিপিএমের পলিট বুরো যতই প্রথম থেকে এই প্রক্রিয়ার বিরোধিতা করুক, বঙ্গীয় নেতা ও কর্মীরা ভেবেছিলেন এতে তৃণমূলের ভুয়ো ভোটার বাদ যাবে। তাই তাঁরাও মহা উৎসাহে এই কর্মযজ্ঞের আগুনে ঘি ঢেলেছিলেন, ‘লজিকাল ডিসক্রিপেন্সি’ ঢুকে পড়ার পর থেকে ঢোঁক গিলে প্রতিবাদ করছেন। এখনো ভাঙবেন তবু মচকাবেন না, বলে যাচ্ছেন ওই জিনিসটা না থাকলেই ভালো এসআইআর হত। অথচ বিহারে ওটা না থেকেও প্রান্তিক মানুষের ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়ার কাজটা হয়েছিল।

যা-ই হোক, ভুল মানুষমাত্রেই করে, ফলে মানুষের তৈরি রাজনৈতিক দলও করতেই পারে। কিন্তু ভুল বুঝতে পারার পর, ‘বাদ পড়ে যাওয়া ভোটারদের তালিকায় না ঢোকানো পর্যন্ত ভোট করা চলবে না এবং করলে সে ভোটে অংশগ্রহণ করব না’, একথা তৃণমূল, বামেরা বা কংগ্রেস বলতে পারছে না কেন? সাধারণ বুদ্ধিতে এর উত্তর হল— মমতা ভাবছেন, এসব সত্ত্বেও কোনো মতে জিতে গেলে ক্ষমতায় টিকে যাব। আর বাম, কংগ্রেস শূন্যের গেরো কাটিয়ে গোটা কয়েক বিধায়ক বাগানোর সুযোগ ছাড়তে চায় না। কিন্তু কথা হল, অক্টোপাসের মত যে ফাঁদ পাতা হয়েছে, তাতে ওই আশায় থেকে আর পাঁচটা ভোটের মত প্রচার চালিয়ে যাওয়ার কি কোনো মানে আছে? জিতলেও তো গণতন্ত্রের শবদেহের উপর নৃত্য করেই জেতা হবে।

ছোটবেলায় রান্নাবাটি খেলার সময়ে আমরা ধুলোকেই ভাত হিসাবে প্লেটে নিতাম বটে, তবে মুখ পর্যন্ত তুলে নামিয়ে রাখতাম। খেতাম না কিন্তু।

নাগরিক ডট নেট ওয়েবসাইটে প্রকাশিত

ক খ গ ঘ ও প্রতীক-উর: দুই মেরুর বাম বাসিন্দা

দেশের এবং বাংলার চরম সংকট মুহূর্তে যখন বামপন্থীদের দিক থেকেই সবচেয়ে কঠিন চ্যালেঞ্জ আসার কথা, তখন দেশের সবচেয়ে বড় সংসদীয় কমিউনিস্ট পার্টি ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদীদের গুঁতোয় টলমল করছে দেখে মোহন ভাগবত, নরেন্দ্র মোদী আর অমিত শাহ নির্ঘাত খুব হাসছেন।

পশ্চিমবঙ্গে লোকসভা ও বিধানসভা মিলিয়ে পরপর তিনটে নির্বাচনে শূন্য পাওয়া, ভোট শতাংশও তলানিতে ঠেকে যাওয়া সিপিএম দলটার সদস্য, সমর্থক এখনো কারা? সোশাল মিডিয়ার সরব শহুরে মধ্যবিত্ত, যাদের অনেকেরই সিপিএম হওয়ার প্রধান কারণ পারিবারিক, তারা ছাড়া আর কেউ আছে কি? সাংবাদিকসুলভ বদভ্যাসে এই প্রশ্নের উত্তর প্রায়ই খুঁজি। খুঁজতে গিয়ে চোখের সামনে যে উদাহরণগুলো পাই, তাঁদের কথাই বলি। এঁরা সকলে আমারই আশপাশে থাকেন, নামধামও জানি, কিন্তু এঁদের ক খ গ ঘ বলেই উল্লেখ করব। কারণ এঁদের তো গায়ে গতরে খেটে খেতে হবে, আর শাসক দল যদি মনে করে এঁদের নিজেদের দলে টানতেই হবে, তাহলে প্রতীক-উর রহমানের মত সাদরে সাংবাদিক সম্মেলন করে হাতে পতাকা ধরাবে না। যেভাবে ধরাবে সেটা পশ্চিমবাংলার প্রাচীন পদ্ধতি, এবং শান্তিপূর্ণ পদ্ধতি নয়। তাছাড়া নিজেদের দলের শত্রুরাও আছে।

ক

রেল বাজারে সবজির জোগান নিয়ে আসা ভারি ভারি বস্তা ট্রাক থেকে নামিয়ে বাজারের বিভিন্ন দোকানির কাছে পৌঁছে দেওয়াই ক দাদার পেশা। মাথার সমস্ত চুল পেকে গেছে, কিন্তু শরীর এখনো শক্তপোক্ত বলে কাজটা করতে পারছেন। আমার পেশা বা রাজনৈতিক মতামত সম্পর্কে এঁর কিছুই জানা নেই, আমার নামও জানেন না সম্ভবত। কিন্তু আমার বাবাকে চিনতেন এবং যেহেতু তিনি সিপিএম করতেন, অতএব ক-দা ধরে নিয়েছেন আমিও একই মতের। আমি দাদাকে বছর তিনেক আগে অবধিও চিনতাম না, কিন্তু উনি আমাকে দেখলেই চিরপরিচিতের মত কুশল সংবাদ জিজ্ঞেস করতেন বলে উত্তর দিতাম। সন্দেহ ছিল— আমাকে অন্য কারও সঙ্গে গোলাচ্ছেন। কিন্তু একদিন আমার বাবার সম্পর্কে এক দোকানিকে বিস্তারিত বললেন এবং আমার বোনের কোথায় বিয়ে হয়েছে তা-ও দেখলাম জানেন, ফলে নিশ্চিত হওয়া গেল। মে দিবসে দেখা হয়ে গেলে ক-দা আমাকে বুকে জড়িয়ে ধরে গুপ্তচরদের সংকেত বলার মত কানে কানে বলেন ‘লাল সেলাম, কমরেড’।

খ

খ একজন টোটোচালক। হ্যান্ডেলের উপর বসানো মোবাইল ফোনের ওয়াল পেপারে সবসময় থাকে মীনাক্ষী মুখার্জির ছবি, গাঁক গাঁক করে গান শোনার জন্যে লাগানো স্পিকারে প্রায়শই বাজে মীনাক্ষীর কোনো বক্তৃতা। ব্যাপারটা খ-এর পক্ষে কতটা দুঃসাহসিক, সেটা যাঁরা বেড়াতে যাওয়া ছাড়া হাওড়া ব্রিজ পেরোন না তাঁদের পক্ষে বোঝা শক্ত।

গ

গ দাদার পেশা গাড়ি চালানো। একসময় মিনিবাস চালাতেন, তারপর আমাদের মত ঊর্ধ্বগামী মধ্যবিত্তদের প্রাইভেট গাড়ি চালাতেন। তাতে রোজগার যথেষ্ট না হওয়ায় কিছুদিন এক কারখানার অ্যাম্বুলেন্স চালকের চাকরি নিয়েছিলেন। সেখানে অধিকাংশ সময় বসেই থাকতে হয় এবং কারখানার অন্যান্য গাড়ির ড্রাইভারদের মধ্যে বিজেপি সমর্থকদের প্রাধান্য, ফলে গ-দার সঙ্গে তাদের প্রায়শই ঝগড়া লেগে যেত। তাই গ-দার ও চাকরি বেশিদিন পোষাল না। গত পঞ্চায়েত নির্বাচনে দেয়ালে সিপিএমের পোস্টার লাগাতে গিয়ে স্থানীয় তৃণমূল কর্মীদের সঙ্গেও মারামারি হয়েছে। যা-ই হোক, কারখানার গাড়ির চাকরি ছেড়ে কিছুদিন দূরপাল্লার বাস চালিয়েছেন, এখন উবের বাস চালান। পার্টির প্রতি প্রচুর ক্ষোভ আছে, পার্টিকে লড়াকু চেহারায় দেখতে চান। নেতৃত্ব তা চায় না বলে অনুযোগ করেন। আমার সঙ্গে আলাপ বছর সাতেক হল। এই সাত বছরে ১২-১৫ বার বলেছেন ‘ধুর, সব ছেড়েছুড়ে দেব।’ এখনো ছেড়েছেন বলে খবর নেই।

ঘ

ঘ আমার ছোটবেলার সহপাঠী। এখন ছোট ব্যবসায়ী। পারিবারিক পুঁজি বলতে কিছুই নেই— না অর্থনৈতিক, না সাংস্কৃতিক। প্রচুর পরিশ্রম করতে হয় জীবিকার্জনের জন্যে। তা সত্ত্বেও এলাকায় সিপিএমের কোনো মিটিং, মিছিলে ঘ নেই— এমন হয় না। পার্টি সম্পর্কে তার বিস্তর সমালোচনা আছে, তার কিছু কিছু কখনো কখনো সোশাল মিডিয়ায় লিখে ফেলে। কিন্তু একটা স্তরে গিয়ে নিজেই নিজেকে লাগাম পরায়। তবে কখনোই অন্য কোনো পার্টিকর্মী বা নেতাকে ব্যক্তিগত আক্রমণ করে না।

ক-দা সমাজবিপ্লবের স্বপ্ন-টপ্ন নিয়ে পার্টির সঙ্গে যুক্ত হয়েছিলেন কিনা, তা জানার সুযোগ আমার আজ পর্যন্ত হয়নি। কারণ আমি যখন বাজারে যাই তখন আমার গ্যাঁজানোর সময় থাকলেও, উনি প্রায় দৌড়তে দৌড়তে কথা বলেন।

খ-ও সারাক্ষণ যাত্রীদের গন্তব্যে পৌঁছে দিতে ব্যস্ত। ফলে সে কেন সিপিএম সমর্থক, সিপিএম প্রকৃত কমিউনিস্ট পার্টি কিনা— এসব তার সঙ্গে আলোচনা করার সুযোগ আমার হয় না। স্থানীয় সিপিএম নেতৃত্বের আলোচনা করা কর্তব্য, তাঁরা করেন কিনা জানি না।

গ-দার সঙ্গে এসব নিয়ে আমার কিঞ্চিৎ আলাপ আলোচনা হয়। তিনি মার্কস, এঙ্গেলস, লেনিন, স্তালিন, হো চি মিন, মাও সে তুং, ফিদেল কাস্ত্রো, চে গেভারা – এসব নাম জানেন। ম্যাক্সিম গোর্কির মাদার পড়েছেন। বাকিটা নেতাদের থেকে শুনে শুনে নিজের মত করে বুঝে নিয়েছেন। দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদ, ঐতিহাসিক বস্তুবাদ, উদ্বৃত্ত মূল্যতত্ত্ব, ‘উপনিবেশবাদ হল পুঁজিবাদের চরমতম রূপ’, ‘কংক্রিট অ্যানালিসিস অফ কংক্রিট কন্ডিশনস’— এসব কথা উনি জানেন না। ওঁর বরং রাগ হয় স্থানীয় পার্টিনেতারা গলায় মা কালীর পুজোর ফুল পোরা মাদুলি দেখে হাসাহাসি করলে। সরল মনে প্রশ্ন করেন— মার্কস, লেনিন কি কোথাও বলেছেন যে পুজোআচ্চা করলে কমিউনিস্ট হওয়া যায় না? প্রশ্নটা নাকি পার্টির দাদাদেরও করেছিলেন। তাঁরা আমতা আমতা করেছেন এবং যা বলেছেন তার মোটের উপর মানে হল— আমরা যখন বলছি এটা ঠিক নয়, তখন এটা ঠিক নয়। গ-দার নেতাদের প্রতি অবিশ্বাস এতে বাড়ে, মা কালীর প্রতি বিশ্বাস কমে না। তাঁর মতে, না জেনেশুনে মানুষের বিশ্বাসে অকারণ আঘাত করা পার্টির আজকের জনবিচ্ছিন্নতার অন্যতম কারণ। উপরন্তু গ-দা মনে করেন, এই ফাঁক দিয়েই বিজেপি ঢুকে পড়েছে। তাদের মত বদ পার্টি দুটো নেই। তাদের সঙ্গে মারামারি ছাড়া কমিউনিস্টদের অন্য কোনো সম্পর্ক হয় না, হতে পারে না। গ-দা আরও বলেন, হিন্দু আর মুসলমানে কোনো লড়াই নেই। ওটা বিজেপি আর তৃণমূল খুঁচিয়ে তুলছে নিজেদের অপদার্থতা ঢাকতে। আসলে সব বাঙালির পক্ষেই বিপজ্জনক হল বিজেপি সমর্থক অবাঙালি হিন্দুরা।

ঘ নিজের আগ্রহে বেশ খানিকটা পড়াশোনা করে। মার্কসবাদী বইপত্রের বাইরে বাবাসাহেব ভীমরাও আম্বেদকর নিয়েও তার আগ্রহ আছে। জাতপাতের রাজনীতিকে অগ্রাহ্য করে ভারতে গরিব মানুষের জন্যে কিছু করা সম্ভব কিনা তা নিয়ে তার ঘোর সন্দেহ।

গ-দা আর ঘ, দুজনেরই বক্তব্য হল, পার্টির দাদারা ওঁদের কথায় পাত্তা দেন না। পার্টির প্রতি আনুগত্যের নামে নিজেদের মতই চাপিয়ে দেন। নিজেদের পেশার কারণেই রোজ নানা ধরনের মানুষের কথা এঁদের কানে আসে। সেইসব মানুষ সিপিএম বৃত্তের বা বাম বৃত্তেরও বাইরের, সুতরাং তাঁদের সমর্থন ফেরাতে না পারলে বিপ্লব-টিপ্লব দূরের কথা, ক্ষমতায় ফেরাও সম্ভব নয়। কিন্তু সেইসব কথা নেতাদের কানে তুলতে গেলে গুরুত্ব দেওয়া হয় না। যা নেতারা ভাবেন তা-ই সাধারণ মানুষের ভাবনা— এই নীতি নিয়ে পার্টি চলে।

যেখানে প্রতীক-উর ঠিক

ক, খ, গ, ঘ-র জায়গায় ইচ্ছামত নাম বসিয়ে নিন। সিপিএম সম্পর্কে সারা পশ্চিমবঙ্গের কর্মী সমর্থক তো বটেই, সাধারণ ভোটারদেরও মোটের উপর এই অভিযোগগুলোই রয়েছে। তৃণমূল, বিজেপির বিকল্প কোনো নীতি তুলে ধরতে না পারা বা তৃণমূল সরকারের আমলে একের পর এক আন্দোলন করার মত ইস্যু উঠে আসা সত্ত্বেও আন্দোলন গড়ে তুলতে না পারার ব্যর্থতা তো সবাই জানে। কিন্তু এই ভুলগুলো ১৫ বছর ধরে হয়েই চলেছে কেন— এ প্রশ্ন যদি করা হয়, তাহলে উত্তর হিসাবে এগুলোই উঠে আসে। সে কারণেই প্রেম দিবসের দুদিন পরে প্রতীক-উরের পার্টির প্রতি অপ্রেম প্রকাশ্যে আসার পরে তিনি বেশকিছু সদস্য, সমর্থকের মন পেয়েছেন। এমনকি তৃণমূলের ঝান্ডা হাতে নিচ্ছেন— এই সম্ভাবনা প্রকাশিত হওয়ার পরেও যতজন তাঁকে বিশ্বাসঘাতক বলে ভেবেছে, তার চেয়ে কম লোক সহানুভূতি প্রকাশ করেনি। আসলে প্রতীক-উরের মুখ দিয়েই এই গোপন প্রকাশ্যটি সর্বসমক্ষে এসে পড়ল যে, বঙ্গ সিপিএম হয়ে দাঁড়িয়েছে একুশ শতকের ব্রাহ্ম সমাজ। এটা কোনো বিপ্লবী দল তো নয়ই, স্রেফ সংসদীয় রাজনীতির নিয়ম মেনে জনপ্রিয়তা আদায় করে ক্ষমতা দখল করার পরিশ্রম করার মত দলও নয়। এ হল চেনা পরিচিতদের এক সংঘ, যেখানে যতদূর সম্ভব দ্বন্দ্ব এড়িয়ে চলার চেষ্টা করা হয়। যেটুকু দ্বন্দ্ব হয় তার বিষয় এই সংঘের বাইরে রাজ্যে বা দেশে কী হচ্ছে, তার মোকাবিলা কীভাবে করা হবে তা নয়। কে অমুক কমিটির তমুক হবে, কার লোককে কে তমুক কমিটি থেকে বাদ দিতে পারবে— সেইসব।

এই চেনা পরিচিত কারা? মূলত পশ্চিমবঙ্গের ভদ্রলোক শ্রেণি বলতে যাদের বোঝায়, তার পুরুষ ও মহিলারা। বাংলার মুসলমান, আদিবাসী, নিম্নবর্গীয় মানুষ— অর্থনৈতিক হিসাবে বললে গরিব মানুষ— অনুবীক্ষণ দিয়ে খুঁজতে হয়। এমনিতেই ক্ষমতা চলে যাওয়ার পরে পার্টির সদস্যসংখ্যা কমেছে, ফলে এই ধরনের মানুষের সংখ্যাও অঙ্কের নিয়মেই কমে গেছে। তার উপর আবার এমন সব ইস্যু নিয়ে পার্টি ভাবিত এবং যৎসামান্য আন্দোলন করে, যা দিয়ে পশ্চিমবঙ্গের গরিব মানুষের কিচ্ছু এসে যায় না।

যেমন রাজ্য সরকারি কর্মচারীদের ডিএ বাড়ানো নিয়ে সিপিএম ভীষণ সোচ্চার। এটা অবশ্যই কর্মীদের সাংবিধানিক অধিকারের প্রশ্ন, কিন্তু চাকুরে মধ্যবিত্তদের স্বার্থের সঙ্গে জড়িত। ডিএ বাড়লে এ রাজ্যের গরিব মানুষের কী? আশা কর্মীরা বরং অনেক পিছিয়ে থাকা শ্রেণি। তাঁদের আন্দোলনে সিপিএমের অবদান কতটুকু?

স্কুলের মিড ডে মিল নিয়ে যে ধাষ্টামো রাজ্য সরকার করে চলেছে, তার বিরুদ্ধেও সিপিএমের কোনো আন্দোলন নেই। অথচ ওটার সঙ্গে রাজ্যের সবচেয়ে গরিব মানুষের স্বার্থ জড়িয়ে আছে।

স্মার্ট মিটারের বিপদ নিয়ে গোটা রাজ্যে আন্দোলন গড়ে তুললে মধ্যবিত্তদের পাশাপাশি কৃষকদের সমর্থনও পাওয়া যেত। কিন্তু কিছু বিচ্ছিন্ন আন্দোলন ছাড়া সিপিএম কিছুই করেনি।

২০১৩ সালে চিট ফান্ড কেলেঙ্কারি ফাঁস হয়ে গেল, তা নিয়েও সিপিএম রাজ্যজুড়ে কোনো ঝড় তোলেনি। অথচ ওই কেলেঙ্কারিতে কপর্দকশূন্য হয়ে গিয়েছিলেন গৃহ সহায়িকা, রিকশাচালক, রাস্তার চায়ের দোকানের মালিকদের মত মানুষ।

আর জি কর আন্দোলনের মত ভয়ঙ্কর ঘটনা, যার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ উল্কার গতিতে ছড়াচ্ছিল, সেটাকেও রাজ্যের গ্রামাঞ্চলে এবং গরিব মানুষের কাছে নিয়ে গিয়ে লাগাতার আন্দোলন করতে ব্যর্থ হল। সফল হওয়া সম্ভবও ছিল না। কেন?

ভারতের আর পাঁচটা কমিউনিস্ট পার্টির মত সিপিএম নেতৃত্বেও মধ্যবিত্তদেরই আধিক্য ছিল বরাবর, কিন্তু তাঁদের মধ্যে গরিব মানুষের সঙ্গে সংযোগ রক্ষার তাগিদ দেখা যেত, ফলে তাঁরা জানতেন কোনগুলো গরিব মানুষের সমস্যা। নইলে বামফ্রন্ট ক্ষমতায় এসে অপারেশন বর্গা করত না। কিন্তু ক্ষমতার অলিন্দে সময় যত গড়িয়েছে, পশ্চিমবঙ্গের অর্থনৈতিক অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে রাজ্যে মধ্যবিত্ত যত বেড়েছে, তাদের ভোট আদায় করে ক্ষমতায় টিকে থাকার প্রবণতা বেড়েছে। গরিব মানুষের সঙ্গে সংযোগ তত কমেছে। নয়ের দশকের শেষ থেকে একেবারেই সরকারি ও বেসরকারি চাকুরেদের পার্টি হয়ে গেছে সিপিএম। আপনার পাড়ার শহিদবেদীতে নভেম্বর বিপ্লব দিবসে কারা পতাকা তোলে লক্ষ করবেন। কোনো রিকশাচালক, অটোচালক, টোটোচালক কি সবজি বিক্রেতাকে দেখতে পান? যাঁরা তোলেন তাঁরাই এরিয়া কমিটি থেকে রাজ্য কমিটি পর্যন্ত নেতৃত্ব দখল করে ফেলেছেন। ফলে তাঁদের চোখই পার্টির চোখ, সেই চোখ দিয়েই রাজ্যটাকে দেখা হয়। শেয়ার বাজারে টাকা খাটানো, শীতাতপনিয়ন্ত্রিত গাড়ি চড়ে স্কুলে যাওয়া শিক্ষক নেতা কী করে ভেবে উঠতে পারবেন যে মিড ডে মিল নিয়ে আন্দোলন করা দরকার?

সিপিএম যে এঁদেরই দল এবং এঁদের চোখ দিয়েই রাজ্যটাকে তারা দেখে, তার সবচেয়ে জ্বলজ্বলে প্রমাণ হল লক্ষ্মীর ভাণ্ডার সম্পর্কে সিপিএমের কটুকাটব্য। যে বলতে গেছে— মানুষের হাতে সরাসরি টাকা দেওয়া আসলে কল্যাণমূলক অর্থনীতি এবং এতে লাভ হয় বলে বহু বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদের মত, তাকেই শুনতে হয়েছে ‘চটিচাটা’। শূন্যের হ্যাটট্রিক হওয়ার আগে রাজ্য সম্পাদক মহম্মদ সেলিমেরও মনে হয়নি যে পার্টি মুখপাত্র এবং রাম শ্যাম যদু মধুদের বোঝানো দরকার— সরকারি ভাতাকে ভিক্ষা বলা মানে গরিব মানুষকে অপমান করা। শূন্যের ঠেলায় যতদিনে তিনি কথাটা বললেন, ততদিনে মধ্যবিত্ত সদস্য ও সমর্থককুল এতবার ‘মরা মরা’ বলে ফেলেছে যে আর ‘রাম রাম’ বলা সম্ভব নয়। মুখপাত্ররা তাই ঢোঁক গিলে বলতে শুরু করলেন— ভাতা দিচ্ছে ঠিক আছে, কিন্তু কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা না করলে শুধু ভাতা দিয়ে কি চলবে?

প্রতীক-উর পার্টির যা যা দোষ চিহ্নিত করেছেন তার প্রায় সবের জন্যেই দায়ী করেছেন বর্তমান রাজ্য সম্পাদককে। কিন্তু এই দোষগুলো সেলিমের পূর্বসুরি সূর্যকান্ত মিশ্রের আমলেও ছিল। কারণ এ রোগের জন্ম ক্ষমতায় থাকার সময়েই। উপরে যে ক খ গ ঘ-দের কথা বলেছি, তাঁদের পার্টির তত্ত্ব, গঠনতন্ত্র ইত্যাদি শিখিয়ে পড়িয়ে নেওয়ার দায়িত্ব ছিল পার্টির। পৃথিবীর সমস্ত কমিউনিস্ট পার্টিতে এটাই নিয়ম। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে সেসব উদ্যোগ স্তিমিত হয়ে গেছে বামফ্রন্ট আমলেই। এখন তো এমন অবস্থা যে কেউ ‘কমিউনিস্ট পার্টি করতে গেলে পড়াশোনা করতে হয়’ বললে, যাঁদের পড়াশোনা করার মত সময় এবং সংস্থান আছে তাঁরাও বক্তাকে মনে মনে খিস্তি করেন। ফলে কোনটা নয়া উদারবাদী অর্থনীতি আর কোনটা কল্যাণমূলক অর্থনীতি— সেটা ব্রাহ্মসমাজের হাতেগোনা কজন বুদ্ধিজীবী ছাড়া কেউ জানে না। তাঁরা অন্যদের জানানোর প্রয়োজনও বোধ করেন না। ‘আমরা কমিউনিস্ট, আমরা শিক্ষিত, আমরা ভালো। যে জানে না সে অশিক্ষিত (নইলে চটিচাটা)। তাকে আমাদের দরকার নেই’— এই অঘোষিত নীতিতে চলেন ওঁরা।

দেবেন ঠাকুরদের ব্রাহ্মসমাজের তবু একটা গুণ ছিল। পড়াশোনা এবং লেখালিখিকে গুরুত্ব দেওয়া হত, তত্ত্ববোধিনী-র মত পত্রিকা বেরোত। সিপিএম ব্রাহ্মরা এত পণ্ডিত যে পার্টি মুখপত্রটিকে মোটেই পাত্তা দেন না। প্রথম পাতা থেকে শেষ পাতা পর্যন্ত ভুলে ভরা থাকে। যেমন তথ্যের ভুল তেমন ভাষার। যে কোনো কাগজে যে পাতা সবচেয়ে যত্ন করে সময় নিয়ে তৈরি হয়, সেই সম্পাদকীয় পাতাতেই কোনোদিন নিজেদের পার্টির নেতা কলতান দাশগুপ্তের নাম হয়ে যায় ‘কালতান’, কোনোদিন আবার দীঘার ওপারে ভেসে ওঠে আন্টার্কটিকা। ক খ গ ঘ ঙ কমরেডরা, যাঁরা টেক স্যাভি নন, মৈত্রীশ ঘটকের সাক্ষাৎকার পড়ার বা দেখার মত প্রাথমিক পড়াশোনা নেই, তাঁরা গণশক্তি পড়ে নিজেদের যেটুকু শান দিয়ে নিতে পারতেন তার পথও বন্ধ। আসলে তাঁদের কথা নেতৃত্ব ভাবে না। কারণ ব্রাহ্মসমাজের লোকেরা কাগজ-ফাগজ পড়েন না, তাই পড়েন যা অ্যান্ড্রয়েড বা আইফোনে পড়া যায়।

এঁরাই ভেবে বের করেছেন যে দিনকাল বদলে গেছে। এখন রাজনীতি করা মানে পথে পথে ঘোরা নয়, মানুষের সঙ্গে মেশা নয়। ক্ষমতাসীন সিপিএমও অন্তত মনে করত— ভোটের প্রচার ৩৬৫ দিনের ব্যাপার, প্রত্যেক বাড়ির প্রত্যেকটা লোকের মুখ চেনার ব্যাপার। এঁরা মনে করেন হোয়াটস্যাপ ফরোয়ার্ড আর ফেসবুক পোস্টের লাইক গুনেই মানুষের মন বুঝে নেওয়া যায়। সোশাল মিডিয়া প্রচার দিয়েই ভোটে জেতার ব্যবস্থা পাকা করে ফেলা যায়। তাই প্রমোদ দাশগুপ্ত, বিনয় চৌধুরী, জ্যোতি বসুরা কীভাবে রাজনীতি করতেন সেকথা মনে করিয়ে দিলে বলেন ‘ওসব ওই যুগে চলত’। বিরক্তি চেপেই বলেন, যেহেতু ওই নামগুলো কেউ করে দিলে তাকে চটিচাটা বলতে এখনো জিভে আটকায়।

আরও অনেক গণ্ডগোলের কথা বলা যায়। কিন্তু মোদ্দাকথা হল, এই পরিমাণ আভিজাত্যের চাষ করে প্রত্যেক নির্বাচনের ফল বেরোবার পর ‘এই রাজ্যের লোক এদেরই ডিজার্ভ করে’, ‘লোকে তো ভাতা পেলেই খুশি, আর সবকিছু গোল্লায় যাক’ ইত্যাদি বলার যে ঔদ্ধত্য তা অতুলনীয়। তাই ২০১১ সালের পর থেকে এ রাজ্যের সিপিএমের পতনের গতিও অতুলনীয়। প্রতীক-উরের ঘটনায় অভিনবত্ব এটুকুই যে এতদিন ক খ গ ঘ ঙ চ-রা যেসব কথা বলে পাত্তা পেতেন না, উনি সেগুলোই রাজ্য কমিটির সদস্য থাকা অবস্থায় ক্যামেরার সামনে বলে দিয়েছেন।

যেখানে প্রতীক-উর বেঠিক

২০২২ সালে সিপিএমের রাজ্য সম্মেলনের প্রথম দিনের একখানা ছবি ভাইরাল হয়েছিল। সেই ছবিতে দেখা যাচ্ছে, মঞ্চের উপর এক নেতা বক্তৃতা দিচ্ছেন আর পিছনে বসা একাধিক বয়স্ক নেতা ঝিমোচ্ছেন বা ঘুমোচ্ছেন। এই সহস্রাব্দের গোড়া থেকে আনন্দবাজার গোষ্ঠীর পৌরোহিত্যে এ রাজ্যের সংবাদমাধ্যম ক্রমাগত বলে যাচ্ছিল যে সিপিএমে বৃদ্ধতন্ত্র চলে, তরুণ রক্ত দরকার। অনিল বিশ্বাসোত্তর সিপিএমের মিডিয়াসর্বস্বতা ক্রমশ বাড়ে, ফলে ‘তাজা রক্ত’ মাথায় উঠে যায় এবং ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পরে (মধ্যবিত্তায়ন সম্পূর্ণ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে), তাজা রক্ত আনলেই পার্টি ঘুরে দাঁড়াবে— একথা পাড়ার সিপিএম কর্মীরাও বলতে শুরু করেন। ওই ভাইরাল ছবিটা বৃদ্ধতন্ত্রের একেবারে প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠেছিল। মনে রাখা দরকার, সম্মেলনের ওই অধিবেশনে কিন্তু পার্টির বাইরের কোনো লোকের থাকার কথা নয়। সুতরাং ছবিটা তুলে বাইরে পাঠিয়েছিলেন পার্টি সদস্যরাই কেউ।

এখন পদত্যাগপত্র ভাইরাল হওয়া নিয়ে তদন্ত দাবি করে বসলেন যে প্রতীক-উর, সদস্যপদ নবীকরণ করানো হয়েছে কি হয়নি, সে খবর বাইরে এসে যাওয়ায় চক্রান্তের অভিযোগ তুলছেন যে দীপ্সিতা ধর, তাঁরা ওই ছবি কী করে ভাইরাল হল— সেকথা জানতে চেয়ে তখন চেঁচামেচি করেছিলেন? কোনো সংবাদমাধ্যমে তেমন খবর বেরিয়েছিল বলে তো দেখছি না। কেন করেননি? তাহলে কি একমাত্র নিজের তথ্য ফাঁস হয়ে গেলেই এঁদের রাগ হয়? অন্য কিছু বেরিয়ে গেলে পার্টির শৃঙ্খলা ইত্যাদি মনে থাকে না, বা কিছু এসে যায় না? একথা ভাবলেও কি অন্যায় হবে যে, সিপিএমের তরুণ তুর্কিরা তখন ভেবেছিলেন— বেশ হয়েছে বুড়োগুলোর ঘুমোবার ছবি বেরিয়ে গেছে। এদের জায়গা আমরা নেব?

প্রশ্নগুলো এখন মনে আসছে কারণ স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে, সিপিএম যে তরুণ তুর্কিদের উপর হাল ফেরানোর জন্য ভরসা রেখেছিল, তাঁরা কেউই হাল ফেরাতে পারেননি। সে না পারতেই পারেন। রাজনীতি এত সোজা জিনিস নয় যে কেউ চাইলেই কিছু করে ফেলতে পারবে। কিন্তু ২০২১ সালে যেসব ‘তাজা রক্ত’ ঢুকেছিলেন সিপিএমের প্রার্থী তালিকায়, তাঁদের মধ্যে মীনাক্ষী মুখার্জি ছাড়া আর কাউকে তো লড়াইয়ের ময়দানে দেখাই গেল না সেভাবে। প্রতীক-উরের প্রায় খুন হয়ে যাওয়া তো আরও আগের কথা। মীনাক্ষী গত পাঁচ বছরে রাস্তায় নেমে লড়তে গিয়ে পুলিসের মার খেলেন, গ্রেফতারও হলেন। শতরূপ ঘোষকে বেশি দেখা গেল টিভি স্টুডিওতে, থিয়েটার শোতে, সিনেমার প্রিমিয়ারে আর ইউটিউবে। সৃজন ভট্টাচার্য, দীপ্সিতা, প্রতীক-উর লোকসভায় ফের প্রার্থী হলেন এবং বৃদ্ধ নেতাদের চেয়ে বেশি সুবিধা করতে তো পারলেনই না; ভোটের প্রচারে কদিন প্রচুর দৌড়াদৌড়ি করে হারার পর, সেই এলাকা থেকে স্রেফ উধাও হয়ে গেলেন। সৃজনের গিটার বাজিয়ে গান গাওয়া আর দীপ্সিতার নাচ যদি রাজনৈতিক কার্যকলাপ বলে ধরা হয়, তাহলে অবশ্য আলাদা কথা। কোথায় গেলেন ঐশী ঘোষ? কেউ জানেন? দিল্লিতে আছেন বলবেন না আবার। কথা হল, পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে নেই কেন? যদি থাকবেন না এমনই কথা ছিল, তাহলে উড়ে এসেছিলেন কেন? পার্টি এরকম যাওয়া আসা স্রোতে ভাসার সুযোগ দিয়েছিলই বা কেন? নাকি এরকম উদ্দেশ্যহীন ওড়াউড়িই নেতৃত্বের অভিপ্রেত?

২০২১ সালে যখন সিপিএমের প্রার্থী তালিকা প্রকাশিত হয়েছিল এবং তালিকায় অত তরুণ মুখ দেখে বাংলার মিডিয়া হাততালি দিচ্ছিল আর সিপিএম কর্মী সমর্থকরা উল্লাস করছিলেন, তখন উত্তরবঙ্গ সংবাদের পাতায় প্রশ্ন তুলেছিলাম ‘তরুণ কৃষক নেতা, শ্রমিক নেতারা কোথায়?’ অর্থাৎ তরুণ নেতা বলতেই সিপিএম ছাত্রনেতা বা যুবনেতা বুঝছে কেন? সিপিএমের রাজনীতি থেকে ‘শ্রেণি’ শব্দটা বহুকাল নির্বাসিত বলেই এই প্রশ্নটা আমাদের মত সাংবাদিকদের তুলতে হয়। শতরূপের মত নীতি, নৈতিকতার দায় নিতে না চাওয়া নেতারা তোলেন না; প্রতীক-উরের মত আপাত বিপ্লবীও তুললেন না। তাঁর অভিযোগের তির সরাসরি রাজ্য সম্পাদকের দিকে, অথচ ক খ গ ঘ-রা পার্টির কার্যকলাপ নিয়ে যেসব মৌলিক প্রশ্ন তুলেছেন, সেগুলো সেই গভীরতায় গিয়ে কিন্তু প্রতীক-উর তোলেননি। তাঁর যাবতীয় অভিযোগের কেন্দ্রে ‘আমি’।

আমি পার্টির জন্যে এত করলাম অত করলাম, খুন হয়ে যাচ্ছিলাম, আর পার্টি কী করল? অমুকে কেন বেশি গুরুত্ব পেল? তমুককে কেন অমুক দায়িত্ব দেওয়া হল? এই হল তাঁর ক্ষোভের নির্যাস। স্পষ্টতই, পার্টির থেকে তাঁর কিছু প্রত্যাশা ছিল। সে প্রত্যাশা পূরণ হয়নি বলেই তিনি এই চরম সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। সাংবাদিক সুমন দে যা-ই বলুন, এটা মাও সে তুংয়ের কথা অনুযায়ী, সদর দফতরে কামান দাগা নয়। এটা তৃণমূল ভবনের দরজায় রবীন্দ্রসঙ্গীত গাওয়া ‘খোলো খোলো দ্বার, রাখিয়ো না আর/বাহিরে আমায় দাঁড়ায়ে’।

অথচ সত্যি সত্যি পার্টির সমালোচনা করতে চাইলে বলার মত অনেককিছু ছিল। তিনি বলেছেন— পার্টির মধ্যে সংখ্যালঘু হয়ে গিয়েছিলাম, তবে আমি তো এদেশে সংখ্যালঘু হয়েই জন্মেছি, ইত্যাদি। চমৎকার সিনেমাসুলভ সংলাপ। কিন্তু দুরকম সংখ্যালঘুকে এক করে দেখা রাজনৈতিক বোধের দিক থেকে অত্যন্ত কাঁচা ব্যাপার। সিপিএম যে বাংলার মুসলমানদের থেকে অনেক দূরে সরে গেছে, বিজেপির বিরুদ্ধে সোচ্চারে দাঁড়ায়নি সেই ২০১৪ সাল থেকে, এসআইআর যে মূলত মুসলমানদের ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার চক্রান্ত সেকথাও যে সিপিএম আজও স্বীকার করল না, অথচ সেলিম নিজে জিতে আসার জন্যে ঘুরে ফিরে মুসলমানগরিষ্ঠ আসনে গিয়ে দাঁড়ান— এই সমালোচনাটা প্রতীক-উর করতে পারতেন। করলে নিজেকে ধর্মীয় সংখ্যালঘু হিসাবে চিহ্নিত করার একটা মানে থাকত। সিপিএম যে পুরোপুরি ভদ্রলোকের পার্টি হয়ে গেছে এবং সেখানে রাজ্য সম্পাদক একজন মুসলমান হলেও রাজ্যের মুসলমানদের প্রতি পার্টির অবহেলা দূর হয় না— সেই জরুরি কথাটা উঠে আসত। রাজ্য কমিটিতে জায়গা পেয়েও দেবলীনা হেমব্রমের মত আদিবাসী নেত্রী যে তেমন কিছুই করার সুযোগ পাচ্ছেন না, সেকথাটাও প্রতীক-উর বলতে পারতেন। তাহলে সরকারি দলে চলে গেলেও ভাবার অবকাশ থাকত যে, তিনি এত বিদ্রোহ নিজের উচ্চাকাঙ্ক্ষা চরিতার্থ করতে করেননি, দলটা যেনতেনপ্রকারেণ ছাড়তে হবে বলে করেননি, পার্টির বা বামপন্থী আন্দোলনের ভালোমন্দ নিয়ে চিন্তিত বলেই করেছেন।

পার্টিতে সংখ্যালঘু হয়ে যাওয়া নিয়ে হাহুতাশ করা রীতিমত হাস্যকর। একটা দল মানে সব ব্যাপারে সবাই একমত হয়, না হওয়া মানেই লবিবাজি, যা একটা নোংরামি— এরকম অতিসরলীকৃত ধারণা তৈরি করে বৃহৎ পুঁজি নিয়ন্ত্রিত সংবাদমাধ্যম, কারণ তারা চায় দলীয় রাজনীতির বাইরের মানুষ বিশ্বাস করুন, রাজনীতি ব্যাপারটাই নোংরামি। অথচ সত্যিটা হল, পৃথিবীর সব দলে (কমিউনিস্ট পার্টিতে তো বটেই) চিরকাল বিভিন্ন লবি ছিল। ভবিষ্যতেও থাকবে। কারণ সব ব্যাপারে এক দলেরও সব মানুষ কখনো একমত হতে পারে না। তখন যে মত সংখ্যাগরিষ্ঠের সেটা প্রতিষ্ঠিত হওয়াই গণতন্ত্র। কেবল কমিউনিস্ট পার্টিতে নয়, সব পার্টিতেই।

দেশভাগের প্রশ্নে স্বয়ং মহাত্মা গান্ধী কংগ্রেসে সংখ্যালঘু হয়ে গিয়েছিলেন। তিনি নিজের মত করে নিজের অবস্থান বজায় রেখেছিলেন। সারা দেশ যখন স্বাধীনতা দিবস পালন করছিল, তিনি অনশন করছিলেন। মিডিয়াকে ডেকে অন্য কংগ্রেস নেতাদের গাল পাড়েননি।

১৯৯৬ সালে কেন্দ্রের সরকারে যোগ দেওয়ার প্রশ্নে সিপিএমের অবিসংবাদী নেতা জ্যোতি বসুও পার্টিতে সংখ্যালঘু হয়ে পড়েছিলেন। প্রকাশ্যে বলেও দিয়েছিলেন যে পার্টি ঐতিহাসিক ভুল করল। তিনি যে ঠিকই বলেছিলেন সেটা পরবর্তীকালে বিজেপির ক্রমাগত শক্তিবৃদ্ধিতে প্রমাণিত হয়েছে। কিন্তু বলার কথাটা হল, জ্যোতিবাবু কখনো বলেননি— অমুক আমাকে প্রধানমন্ত্রী হতে দিল না, পার্টি আমার এতদিনের লড়াইয়ের মর্যাদা দিল না।

বলেননি মানে জ্যোতিবাবু মহাপুরুষ ছিলেন তা নয়। বলেননি, কারণ কমিউনিস্ট পার্টি করা মানে ব্যক্তির ঊর্ধ্বে দল— একথা বিশ্বাস করা। কংগ্রেস বা তৃণমূল কংগ্রেসে ‘গো অ্যাজ ইউ লাইক’-এর বহু ইতিহাস আছে। অনেকে সেটাই ভাল, সেটাই উদার বলেও মনে করেন। কিন্তু রাজ্য কমিটি পর্যন্ত পৌঁছে যাওয়া একজন নেতা কমিউনিস্ট পার্টির এই সামান্য নিয়মটা যদি না জেনে থাকেন, তাহলে তাঁকে রাজ্য কমিটিতে যাঁরা নির্বাচিত করেছেন তাঁদের যোগ্যতা এবং শৃঙ্খলা নিয়েই প্রশ্ন তোলা উচিত।

এমনিতে মতপার্থক্যের কারণে কমিউনিস্ট পার্টি ছেড়ে দেওয়া বা বিতাড়িত হওয়া এমন কিছু অভিনব ব্যাপার নয়। ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি ১৯৬৪ সালের পর থেকে বহুবার ভেঙেছে তো বটেই, তাছাড়াও অনেকেই এই বাম দল ছেড়ে ওই বাম দলে গেছেন। সৈফুদ্দিন চৌধুরী, সমীর পুততুণ্ডদের মত কেউ কেউ নতুন দলও খুলেছেন।

অশোক মিত্রের মত উদাহরণও আছে। দ্বিতীয় বামফ্রন্ট সরকারের অর্থমন্ত্রী থাকার সময়ে মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতিবাবুর সঙ্গে মতভেদ হওয়ায় একইসঙ্গে মন্ত্রিত্ব আর পার্টির সদস্যপদ ত্যাগ করেন। আজীবন সিপিএমের অনেক সমালোচনাও করেছেন, কিন্তু কখনো কাউকে ব্যক্তিগত আক্রমণ করেননি এবং বারবার বলতেন/লিখতেন যে এমন কিছু করবেন না যাতে বামপন্থার ক্ষতি হয়। সেই কারণে সকলেরই শ্রদ্ধা অর্জন করেছেন। পরবর্তীকালে বামফ্রন্টই তাঁকে রাজ্যসভায় পাঠিয়েছিল।

ত্রিপুরার একদা মুখ্যমন্ত্রী নৃপেন চক্রবর্তী কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য থাকাকালীন বহিষ্কৃত হয়েছিলেন, সরাসরি জ্যোতিবাবুর সঙ্গে সংঘাত ছিল। তারপরেও তিনি পার্টির বিরুদ্ধে বিষোদ্গার করে বেড়াননি। আমৃত্যু আড়ম্বরহীন বামপন্থী জীবনযাপনই চালিয়ে গেছেন।

এর বাইরে অসংখ্য অখ্যাত কমিউনিস্ট ছিলেন এবং আছেন, যাঁরা প্রতীক-উরের মত সংখ্যালঘু হয়ে গিয়েছেন। অনেকেই পার্টির খারাপ লোকেদের জোটের কাছে হেরেই সংখ্যালঘু হয়েছেন। ফলে কেউ বসে গেছেন, কেউ পার্টি ছেড়ে দিয়েছেন, কেউ মানুষের জন্যে কাজ করার অন্য কোনো পথ খুঁজে নিয়েছেন। নিজের পার্টির লোকেদের নাম করে বা আকারে ইঙ্গিতে কটু কথা বলে, যাদের বিরুদ্ধে সারাজীবনের লড়াই, যাদের হাতে খুন হয়ে গিয়েছিলেন আরেকটু হলেই, তাদের দলেই মিশে যাননি ওঁরা।

লেখার শুরু করেছিলাম ক খ গ ঘ দিয়ে। চারজনই প্রতীক-উরের থেকে বয়সে বড়, কোনোদিন এরিয়া কমিটি পেরোবেন বলেও মনে হয় না। অথচ তাঁদের নিজের দলের বিরুদ্ধে রুষ্ট হয়ে ক্ষমতাসীন দলে যেতে ইচ্ছা করে না, করল তিরিশে পা দেওয়ার আগেই রাজ্য কমিটির সদস্য হয়ে যাওয়া একজনের। কেন? একটাই কারণ থাকা সম্ভব। ওঁরা নিজের জন্যে কিছু প্রত্যাশা করে রাজনীতি করতে আসেননি, প্রতীক-উর এসেছিলেন। ওঁরা প্রতীক-উরের থেকে লেখাপড়া কম জানেন, ওঁর তুলনায় মার্কসবাদী বইপত্রও কিছুই পড়েননি বলা যায়। কিন্তু ব্যক্তির আগে সমষ্টিকে স্থান দেওয়ার যে প্রাথমিক পাঠ, সেটা খুব ভালো করে নিতে পেরেছেন। প্রতীক-উর পারেননি। সুমন দে-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বারবার তিনি ‘ব্যক্তি’ আর ‘ব্যক্তিগত’ শব্দ দুটো ব্যবহার করছিলেন। একখানা এ আই টুলকে জিজ্ঞেস করলাম— শব্দ দুটো কতবার ব্যবহৃত হয়েছে এই ৫৪ মিনিট ৩০ সেকেন্ডের ভিডিওতে? উত্তর এল— ‘ব্যক্তি’ চারবার, ‘ব্যক্তিগত’ সাতবার। অর্থাৎ দুটো মিলিয়ে ১১ বার। মানে প্রায় পাঁচ মিনিট অন্তরই ব্যক্তিস্বার্থের কথা এসে পড়ে গতকাল পর্যন্ত কমিউনিস্ট পার্টির রাজ্য কমিটির একজন সদস্যের সঙ্গে কথা বলতে গেলে।

দুঃখের বিষয়, সিপিএম নেতৃত্বের অনেকেই ব্যক্তির আগে সমষ্টিকে রাখার পাঠটাকে গুরুত্ব দেন না। সেই কারণেই তাঁদের কাছে পরিশ্রমী শ্রমিক, কৃষক ফ্রন্টের পার্টিকর্মীদের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে গেছেন সুদর্শন ছাত্রনেতা, যুবনেতারা। এঁরা যে স্রেফ ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদী উচ্চাকাঙ্ক্ষী এবং পার্টির স্বার্থের পরিপন্থী, তা অগ্রজ নেতারা হয় বোঝেন না, নয় নিজেরাও উচ্চাকাঙ্ক্ষী বলে ওরকম ছেলেমেয়েদেরই পছন্দ হয়। শৃঙ্খলা গোল্লায় যায়। বিজেপির মুসলমানবিদ্বেষী মিউজিক ভিডিওতে মুখ দেখানো অভিনেতাদের পার্টির কমিউনিটি ক্যান্টিনে নিয়ে এসেও শাস্তি পান না শতরূপ ঘোষ; লাল পতাকার সামনে বসে সাংবাদিক সম্মেলন করে বলতে পারেন— বিলাসবহুল গাড়ি চড়ি আমার বাবার টাকায়, তাতে কার বাবার কী? সিপিএমের যে সদস্য সমর্থকরা ওই আচরণকে কোনো যুক্তিতে সমর্থন করেন, তাঁদের মেনে নিতে হবে— যে পার্টি থেকে শতরূপরা উঠে আসেন, সে পার্টি থেকে প্রতীক-উররাও উঠে আসবেন।

এই দ্বন্দ্বে জয়ী পক্ষের নাম তৃণমূল কংগ্রেস। সিপিএম এমন এক বিরোধী দল, যারা নির্বাচন এসে পড়লেই ব্যস্ত হয়ে পড়ে কী করে কার সঙ্গে কটা আসনে সমঝোতা করে কোনোমতে কিছু নেতাকে বিধায়ক বা সাংসদ বানানো যায় তার তাল করতে। সরকারের কাজের সমালোচনা গৌণ হয়ে যায়। নিজেরা মানুষের স্বার্থে কী করবেন তা কেবল ইশতেহারে লেখা হয়, যা আমাদের দেশে প্রায় কেউ পড়ে না। তাতেও যে খুব সুনির্দিষ্ট কোনো পরিকল্পনা লেখা থাকে তা নয়। ২০১৬ সালের নির্বাচনে এই ঘটনা ঘটানো হয়েছিল কংগ্রেসের সঙ্গে জোট করতে গিয়ে, ২০২১ সালে সঙ্গে যোগ হল ইন্ডিয়ান সেকুলার ফ্রন্টের সঙ্গে জোট করার প্রয়াস নিয়ে ডামাডোল, এবারে একা হুমায়ুন কবীরে রক্ষে নেই, প্রতীক-উরকে নিয়ে উত্তেজনা দোসর। এমন বিরোধী থাকতে মমতা ব্যানার্জির আর চিন্তা কী?

বিজেপির মত ফ্যাসিবাদী দলেরও চিন্তা নেই। দেশের এবং বাংলার চরম সংকট মুহূর্তে যখন বামপন্থীদের দিক থেকেই সবচেয়ে কঠিন চ্যালেঞ্জ আসার কথা, তখন দেশের সবচেয়ে বড় সংসদীয় কমিউনিস্ট পার্টি ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদীদের গুঁতোয় টলমল করছে দেখে মোহন ভাগবত, নরেন্দ্র মোদী আর অমিত শাহ নির্ঘাত খুব হাসছেন।

নাগরিক ডট নেট ওয়েবসাইটে প্রকাশিত

হুলিগানের গুঁতোয় যা যা টের পাওয়া গেল

তখন বাঙালির রাজনীতির সর্বজনস্বীকৃত পদ্ধতি ছিল – জ্যোতি বসু, প্রমোদ দাশগুপ্তেরা ধুন্ধুমার আন্দোলন করবেন। নিজেদের শিল্পের মাধ্যমে রাজনৈতিক বার্তা দেবেন উৎপলবাবু বা মৃণাল সেনরা। এখন ডান, বাম নির্বিশেষে বাঙালির চাহিদা হয়েছে উলটো – শতরূপ, দিলীপদের স্টুডিওয় যেতে হবে। মিছিলে যেতে হবে অনির্বাণদের।

পশ্চিমবঙ্গের বই বাজারে সহায়িকা জিনিসটার বেশ বিক্রি আছে বোঝা যায়। কারণ প্রকাশকরা টিভিতে ওসব বইয়ের বিজ্ঞাপন দিতে টাকা খরচ করেন। ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসাডর হিসাবে নিয়ে আসেন মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিকে প্রথম দশে থাকা ছেলেমেয়েদের। এদিকে এ রাজ্যের শিল্পীদের রোজগার ক্রমশ কমছে বলে খবর পাই। বাংলা সিনেমা, বাংলা নাটক, বাংলা গান – কোনোকিছুই যে আর লাভজনক ব্যবসা থাকছে না, তা তো আমরা অনেকেই এখন জেনে গেছি। কিন্তু পকেটে টান পড়লেও এবার থেকে সঙ্গীতশিল্পীদের গানের সহায়িকা প্রকাশ করা উচিত। গানের অনুষ্ঠান শুরু হওয়ার আগে প্রত্যেক দর্শকের হাতে এক কপি করে সেই সহায়িকা ধরিয়ে দেওয়া উচিত। সেখানে কোন গানের কোন কথাটা আক্ষরিক অর্থে নয়, শ্লেষার্থে বলা; কোন লোকের নাম কেন নেওয়া হয়েছে, কার নাম কেন নেওয়া হয়নি, কোন ঘটনার উল্লেখ কেন এসেছে, শিল্পী অতীতে কোন ঘটনা নিয়ে গান বেঁধেছেন, কোনটা নিয়ে বাঁধেননি, না বাঁধলে কেন বাঁধেননি; কোন মিছিলে গেছেন আর কোন মিছিলে যাননি, না গেলে কেন যাননি – এসব পরিষ্কার করে লিখে দেওয়া উচিত। একজন শিল্পীর অনুষ্ঠান হলে এটুকু করলেই চলবে, কিন্তু গানের দল হলে দলের প্রত্যেক সদস্যের অতীতের কোন ঘটনায় কী মতামত ছিল তাও লিখে দিতে হবে। তবে এটুকু করাই যথেষ্ট নয়। অনুষ্ঠানের প্রচারের সময়ে এই সহায়িকার বিজ্ঞাপনও দিতে হবে। ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসাডর হিসাবে নিতে হবে রাজনৈতিক দলের নেতাদের। প্রত্যেকটা সহায়িকার বিজ্ঞাপনেই কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে উপস্থিত সব দলের নেতাকে রাখতে হবে। নইলে নিরপেক্ষতা বজায় থাকবে না। এইসব শর্ত মেনে গান না করলে বুঝতে হবে সংশ্লিষ্ট শিল্পী বা শিল্পীদের দল হয় চটিচাটা, নয় চাড্ডি, নইলে মাকু অথবা সেকু। কখনো কখনো তিনটের মধ্যে দুটো, বা একসঙ্গে তিনটেই।

এখানে দুটো আপত্তি উঠতে পারে।

১) গানের অনুষ্ঠান দেখতে গিয়ে বই কে পড়বে?

২) অনলাইনে কে কী বলল তাতে কী এসে যায়?

যে কোনো ফেসবুক-শিক্ষিত বাঙালিই ১ নম্বর প্রশ্নের উত্তরে জানিয়ে দেবেন যে ওটা অজুহাত, কোনো প্রশ্ন নয়। কেউ পড়বে কি পড়বে না সেটা ভাবার দায়িত্ব শিল্পীর নয়। শিল্পীকে আমাদের শর্তাবলী মানতে হবে। আমরা অত পড়বও না, সব গান মন দিয়ে শুনবও না। আমরা যারা টিকিট কেটে অনুষ্ঠান দেখতে যাইনি, তারা অনুষ্ঠানে পরিবেশিত গোটা আষ্টেক গানের মধ্যে গোটা একটা গানের ভিডিও-ও দেখব না অনলাইনে। দেখব সাড়ে তিন মিনিটের ভাইরাল হওয়া ক্লিপ, তারপর লিখব সাড়ে তিন হাজার শব্দের ফেসবুক-প্রবন্ধ। কারণ শিল্প যিনি বা যাঁরা সৃষ্টি করেন, যাবতীয় দায়িত্ব তাঁদেরই। শিল্পের রসাস্বাদন করতে কয়েক হাজার বছর ধরে মানুষ যে মানসিক পরিশ্রম করে এসেছে, সেসব করার দায়দায়িত্ব আমাদের নেই। উৎকর্ণ হয়ে গান শোনার দায়িত্ব নেই, গানের কথাগুলো নিয়ে ভাবার দায়িত্ব নেই, যে কথাগুলো বলা হচ্ছে সেগুলো কেন বলা হচ্ছে, যেভাবে বলা হচ্ছে সেভাবেই বা কেন বলা হচ্ছে? এসব নিয়ে ভাবা আমাদের কাজ নয়। আমরা শুধু দেখব আমাদের পছন্দের কথা বলা হচ্ছে কিনা। হলে প্রশংসায় ভরিয়ে দেব, ফেসবুকে লাইক দেব, শেয়ার করব। অপছন্দের কথা হলে বলব ‘ছ্যাঃ! এটা গান?’, ‘একে প্রতিবাদ বলে?’, ‘রকের ভাষা স্টেজে উঠে বলে দিলেই শিল্প হয়?’ শ্লেষ বোঝার ধৈর্য না রেখে গান বা কৌতুকের স্রেফ আক্ষরিক অর্থ দেখেই চিল চিৎকার জুড়ে দেব ‘ইশ! নারীবিদ্বেষী কথা বলে চলে গেল, আর লোকে এই নিয়ে উল্লাস করছে!’

২ নম্বর প্রশ্নটা যে ২০২৫ সালে দাঁড়িয়ে অবান্তর, তা নিয়ে বোধহয় বিতর্কের অবকাশ নেই। সোশাল মিডিয়া কেবল শিল্পচর্চার নয়, সাধারণ জীবনচর্যারই অবাঞ্ছিত কিন্তু অপরিহার্য অঙ্গ হয়ে গেছে। যে কোনো শিল্পের জনপ্রিয়তা, তা থেকে আয় – অনেকটাই নির্ধারিত হচ্ছে জিনিসটা কতখানি ভাইরাল হল তার উপরে। ফলে কোনো শিল্পমাধ্যমই আজ আর অনলাইন প্রতিক্রিয়াকে অগ্রাহ্য করতে পারে না। সিনেমা বা নাচগান, নাটকের ক্ষেত্রে আগে মুখে মুখে প্রচারের যে ব্যাপারটা ছিল, তা এখন প্রায় উঠে গেছে। যা ঘটে তা অনলাইনেই ঘটে। কোন ছবি দেখতে যাব, কাদের গান শুনতে যাব বা কোন নাটক দেখব – আমরা সকলেই ঠিক করি ফেসবুক রিভিউ পড়ে বা ইউটিউবে কেমন হিট হচ্ছে তাই দিয়ে। তাছাড়া অনলাইনে কে কী বলল তাতে যদি কিছু না-ই এসে যায়, তাহলে অনলাইনে ঘৃণাভাষণ বা মহিলাদের প্রতি লিঙ্গবিদ্বেষী মন্তব্য, ধর্ষণের হুমকি দেওয়া নিয়ে আমরা আপত্তি করি কেন?

বলা বাহুল্য, এতগুলো কথা উঠে আসছে গত কয়েক দিনে মিলনমেলা প্রাঙ্গণে একাধিক ব্যান্ডের এক অনুষ্ঠানে হুলিগানইজম ব্যান্ডের একখানা গানের কিয়দংশ নিয়ে তৈরি হওয়া উত্তেজনা সম্পর্কে।

সাড়ে তিন মিনিটের ওই ভিডিওর ভাইরাল হওয়া প্রমাণ করে, যাবতীয় ডানপন্থী ও বামপন্থী আপত্তি সত্ত্বেও বহু মানুষের ওই পরিবেশনা ভাল লেগেছে। লাগারই কথা, কারণ আজকের পশ্চিমবঙ্গে যেসব কথা সাধারণ মানুষ আলোচনা করেন ফিসফাসে, সেসব কথা হুলিগানইজম মঞ্চে দাঁড়িয়ে গলা তুলে বলে দিয়েছে। এই বাংলায় যাঁরা ঠিক করেন কোনটা গান, কোনটা প্রতিবাদ, কোনটা সিনেমা; যাঁদের সম্পর্কে নচিকেতা সেই বাম আমলে লিখেছিলেন “সংস্কৃতির গ্রাফ উঠছে না নামছে/ফিতে দিয়ে মাপছেন তাঁরা”, সেইসব লোক ও মহিলাদের চোখে ওটা গান না-ই হতে পারে, প্রতিবাদও না হতে পারে। কিন্তু যে মফস্বলের টোটোচালক এই আমলেও সিপিএম করেন আর নিয়মিত কুণাল ঘোষের দলের কর্মীদের কাছ থেকে হাতে ও ভাতে মরার হুমকি শোনেন, তিনি দেখছেন তাঁর কথা একটা গানের দল কলকাতা শহরের বুকে ঝলমলে মঞ্চে উঠে বলে দিয়েছে। যে সিপিএম করা বাসচালক নিজে বেশিদূর লেখাপড়া করতে পারেননি, ভেবেছিলেন ছেলেকে অনেকদূর পড়াবেন অথচ দেখছেন স্কুল-কলেজের বারোটা বেজে গেছে, এদিকে কেন্দ্রের শাসক দলের নেতা গরুর দুধে সোনার তত্ত্ব দিচ্ছেন, পাশের পাড়ায় বাচ্চাদের শেখানো হচ্ছে পাকিস্তান স্বাধীন হওয়ার সময়ে এগারো হাজার হিন্দু মারার গালগল্প – তিনি নিজের ছেলের ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তিত। তিনি দেখছেন, একটা জনপ্রিয় মুখ গরুর দুধে সোনার তত্ত্ব দেওয়া সাম্প্রদায়িক নেতাকে হাসির পাত্র করে দিচ্ছে। ভাবছেন যদি তাতে ছেলেপুলেদের উপর একটু প্রভাব পড়ে।

শতরূপ ঘোষের বাবুয়ানি নিয়ে দু-চার কথা বললে এঁদের কিচ্ছু এসে যায় না, বরং হয়ত ভালই লাগে। কারণ বামপন্থী দলের সংস্পর্শে এসে যদি তাঁরা একটা জিনিসও শিখে থাকেন তা এই, যে লোকে কপালের দোষে গরিব হয় না। দুনিয়ায় বড়লোক আছে বলেই গরিব আছে। সে বড়লোকের টাকা আইনি পথেই আয় করা হোক বা বেআইনি পথে।

কথাটা আলালের ঘরের দুলাল সিপিএমদেরও শেখার কথা ছিল, কিন্তু হুলিগানইজমের হুল্লোড়ে তাঁদের প্রতিক্রিয়া দেখে মনে হচ্ছে না পার্টির পক্ষ থেকে শেখানো হয়েছে। ফলে এক আশ্চর্য কাণ্ড ঘটছে গত কয়েক দিন ধরে। যে নেতাকে নিয়ে টিপ্পনী কাটা হয়েছে, তিনি ক্রুদ্ধ প্রতিক্রিয়া দেননি। অথচ সমর্থকদের ক্রোধ আর ফুরোচ্ছে না। নেতা বুদ্ধিমান, তিনি একবার, আমার বাবার টাকায় আমি গাড়ি কিনেছি বেশ করেছি – এই মর্মে আস্ফালন করেই সম্ভবত বুঝে গেছেন যে কমিউনিস্ট পার্টি করে ওকথা বলা চলে না। কিন্তু বিদেশে ছুটি কাটাতে যাওয়া, দামি গাড়ি চড়া ভক্তবৃন্দের এ যে অস্তিত্বের সংকট। যে ভোগে আপাদমস্তক ডুবে আছেন, তা কমিউনিস্টসুলভ নয় – এ বার্তা দিকে দিকে রটি গেলে বামপন্থী হওয়ার রেলাটি বজায় রাখা যে শক্ত হয়ে যাবে। মঞ্চের হুলিগানরা যেভাবে তাঁদের নেতাকে নিয়ে খিল্লি করল, তাতে সাহস পেয়ে যদি গরিব নিম্নবিত্ত বামপন্থীরা এঁদের নিয়ে খিল্লি করতে শুরু করে! এই আতঙ্কেই ‘ওটা কোনো গান নয়’, ‘ওটা প্রতিবাদ হয়নি’, ‘ওই আক্রমণে হুল নেই’ ইত্যাদি বাণী সাড়ে তিন দিনে সাড়ে তিন লক্ষ বার সোশাল মিডিয়ায় লেখা, সাড়ে তিন কোটি শেয়ার করা নয় তো? কিছুই যখন হয়নি, তখন রিমের পর রিম এ নিয়ে লেখার দরকার কী? যাদের জিনিসটা ভাল লেগেছে তাদের দিকে তেড়ে যাওয়ার দরকারই বা কী?

ব্যাপারটাকে খিস্তি খেউড় বলে উড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা যাঁরা করছেন, তাঁরা ভুলে যাচ্ছেন – এটা বাংলা। এখানে কবির লড়াই, তরজা, খেউড়ও খাঁটি দিশি সংস্কৃতি। হুলিগানইজমের অন্যতম প্রধান গায়ক অনির্বাণ ভট্টাচার্য নাহয় ‘গরিবের উত্তমকুমার’ (এই অভিধার প্রকট সাহেবিয়ানা এবং গরিবের সংস্কৃতিকে নিকৃষ্ট বলার প্রচ্ছন্ন বাবুয়ানিটি কি বামপন্থী?), শতবর্ষে পা দেওয়া আসল উত্তমকুমারের এন্টনী ফিরিঙ্গী (১৯৬৭) দেখলেই ব্যাপারটা জানা যায়। অবশ্য শহুরে মধ্যবিত্ত, উচ্চবিত্ত বামপন্থীদের অনেকে সত্যজিৎ-ঋত্বিক-মৃণালের বাইরে বাংলা ছবি দেখেননি। ফলে তাঁরা না-ও জানতে পারেন। কিন্তু আজকের পৃথিবীতে কীভাবে প্রতিবাদের ভাষা এবং ভাষ্য পালটে ফেলছেন শিল্পীরা; শিল্পমাধ্যম এবং সাংবাদিকতার সীমারেখা কীভাবে প্রায়শই মুছে যাচ্ছে – সেটুকু তো জানা উচিত। বামপন্থী নেতাদের থেকে সাধারণ জীবনযাপন আশা করা অনুচিত – এমনটা প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা হচ্ছে। এরপর কি শুনতে হবে তাঁদের কাছে আন্তর্জাতিক চেতনাও আশা করা উচিত নয়? নাকি সেটা বছর বছর ১ সেপ্টেম্বরের মিছিলেই সীমাবদ্ধ থাকবে বলে মেনে নিতে হবে?

চলতি বামাবেগের অরাজনৈতিকতা আরও স্পষ্ট হয়ে যায় হুলিগানইজমের পরিবেশনা নিয়ে ডানপন্থী আপত্তির দিকে তাকালে। বিজেপি নেতা দিলীপ ঘোষকে নিয়ে টিপ্পনী কাটা হয়েছে, তিনি প্রতিক্রিয়ায় বলেছেন – বাকস্বাধীনতা আছে বলেই যা খুশি বলা যায় না। অথচ তাঁর দলের আইনজীবী নেতা তরুণজ্যোতি তিওয়ারি হুলিগানইজম, এবং দুই তাদের প্রধান গায়কের অন্যতম, অনির্বাণের নামে পুলিসে যে লিখিত অভিযোগ জানিয়েছেন তা কিন্তু দিলীপের প্রতি কটূক্তি নিয়ে নয়, সনাতন ধর্ম সম্পর্কে অন্য একটা টিপ্পনীর জন্য। সোশাল মিডিয়ার ডানপন্থীদেরও ওই সাড়ে তিন মিনিট নিয়ে আপত্তির কারণ সনাতন সম্পর্কে রসিকতা – যা ভারতের দক্ষিণপন্থী রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু। ব্যক্তি নেতাকে নিয়ে তাঁরা ভাবিত নন। অথচ বামেরা উত্তেজিত শতরূপের গাড়ির মান বাঁচাতে। তাহলে কি নেতা আর পার্টি অভিন্ন এঁদের কাছে? যেমন হিন্দুত্ববাদীদের কাছে ২০২৪ নির্বাচনের আগে পর্যন্তও নরেন্দ্র মোদী আর বিজেপি অভিন্ন ছিলেন? শতরূপ কি এত বড় নেতা? যদি তা-ই হয়, তাহলে আবার ‘সাহস থাকলে মহম্মদ সেলিমকে আক্রমণ করতে পারত, সফট টার্গেট বেছেছে’ – এমন কথা উঠছে কেন? যে নেতার এত অনুরাগী, তিনি ‘সফট টার্গেট’ হন কী করে? আর যদি ‘সফট টার্গেট’-ই হন, তাহলে তাঁকে নিয়ে সামান্য একটা গানের দলের টিপ্পনীকে পার্টির প্রতি আক্রমণ বলে ভেবে ফেলা কেন? তৃণমূল সরকার যখন খামোকা মীনাক্ষী মুখার্জিকে হাজতবাস করাল, তখন এর অর্ধেক উৎসাহ নিয়ে সিপিএমের এই সদস্য সমর্থকরা তাঁকে ছাড়িয়ে আনতে গেলেও বোধহয় সরকারের হৃদকম্প হয়ে যেত, তাঁকে ছেড়ে দিতে বাধ্য হত। তা তো করা হয়নি। তাহলে ‘সফট টার্গেট’ আসলে কে? শতরূপ না মীনাক্ষী? বামেরা বলছেন হুলিগানদের অন্য দুই টার্গেটও ‘সফট’। হয়ত ঠিকই বলছেন, কারণ কুণাল আর দিলীপকে নিয়ে তাঁদের পার্টির সদস্য, সমর্থকরা কিন্তু এত হইচই করলেন না।

এইবার যে যুক্তিটা উঠে আসা অনিবার্য, সেটা শিল্প সম্বন্ধে নয়, শিল্পী সম্বন্ধে। শিল্পীর অধিকার সম্বন্ধে বললেও ভুল হয় না। নিশ্চয়ই বলা হবে, হুলিগানইজম বলে গুলিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করবেন না। আসল হল অনির্বাণ। তিনি সুবিধাবাদী, তিনিই চটিচাটা, তিনিই আর জি কর আন্দোলন নিয়ে চুপ ছিলেন, তিনিই শিক্ষা দুর্নীতি নিয়ে কথা বলেননি। এখন তিনি জ্ঞান দিলে শুনতে হবে?

এ থেকেও বামপন্থীদের সম্বন্ধে ভারি মজার কিছু কথা টের পাওয়া যাচ্ছে। দক্ষিণপন্থীদের আক্রমণের তির অনির্বাণের উপর স্থির থাকার কারণ সহজবোধ্য। ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে, সনাতন নিয়ে রসিকতা তিনিই করেছেন। শতরূপ ঘোষকে নিয়ে রসিকতা কিন্তু তাঁর মুখ দিয়ে বেরোয়নি। অন্য দুই ঘোষকে নিয়ে তিনি ফুট কাটলেও, শতরূপকে নিয়ে ছড়া কেটেছেন দেবরাজ ভট্টাচার্য। অথচ তিনি চটিচাটা – এমন অভিযোগ কেউ তুলছেন না। এ বোধহয় ব্যক্তির ঊর্ধ্বে দল – মার্কসবাদের এই প্রাথমিক পাঠ ভুলে মেরে দেওয়ার ফল। বস্তুত, ব্যাপারটাকে শতরূপ বনাম অনির্বাণ বানিয়ে ফেলা বামেদের বয়ান দেখে মনে হচ্ছে না তাঁরা কেউ জানেন যে গানগুলো ‘অনির্বাণের গান’ নয়, ব্যান্ডটার গান। এমনও হতে পারে, ওই গা জ্বালানো ছড়াগুলো অনির্বাণের লেখাই নয়। সেক্ষেত্রে ব্যান্ডের বাকিদের তৃণমূলী সংযোগের ফর্দ দেওয়াও কর্তব্য ছিল। অথচ হুলিগানদের উপর রেগে কাঁই হয়ে যাওয়া জনপিণ্ডের কতজন ওই ব্যান্ডের বাকি সদস্যদের নাম বলতে পারবেন তা নিয়েই সন্দেহ আছে। কেবল গৌরবে বহুবচন করা তো ঠিক নয়, তাই হুলিগানইজমের বাকি সাতজনের নাম এইবেলা স্মরণ করে নেওয়া যাক – শুভদীপ গুহ, কৃশানু ঘোষ, সোমেশ্বর ভট্টাচার্য, নীলাংশুক দত্ত, প্রীতম দাস, প্রীতম দেব সরকার, সুশ্রুত গোস্বামী।

সে যা-ই হোক, ওই দলের সবচেয়ে জনপ্রিয় মুখ যখন অনির্বাণ, তখন তাঁকেই আক্রমণ করার যুক্তি ভুল নয়। অনির্বাণের বিজেপির লোক হওয়ার প্রমাণ হাজির করতে না পারলেও, তৃণমূলের পক্ষের লোক হওয়ার প্রমাণ হাজির করেছেন সোশাল মিডিয়ার বীরপুঙ্গবরা। তিনি খোদ মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জির হাত থেকে সরকারি সম্মান গ্রহণ করেছেন। এ একেবারে বামাল সমেত ধরা পড়া যাকে বলে। মুশকিল হল, সরকার আর দলের ভেদরেখা মুছে যাচ্ছে বলে এ রাজ্যের বিরোধীরা সঙ্গতভাবেই চেঁচামেচি করে থাকেন। কিন্তু সরকারি সম্মানকে এক্ষেত্রে তৃণমূল দলের দেওয়া সম্মান বলে ধরে নিতে একটুও ইতস্তত করছেন না। যদি তাও হয়, তাহলে একই যুক্তিতে প্রয়াত সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়কেও তৃণমূলের লোক বলতে হয়। কারণ শেষ বয়সে তিনিও রাজ্য সরকারের দেওয়া বঙ্গবিভূষণ পুরস্কার (২০১৭) গ্রহণ করেছিলেন। সুখের বিষয়, তেমনটা কোনো সিপিএম সদস্য সমর্থক আজ পর্যন্ত বলেননি। আমৃত্যু সৌমিত্র প্রকাশ্যেই বামপন্থী ছিলেন, তাঁর সেই সম্মান আজ পর্যন্ত কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা বামপন্থীরা করেননি। ফলে গুটিটা গোড়াতেই কেঁচে যাচ্ছে।

অনেকের অবশ্য সূক্ষ্মতর বক্তব্য আছে। অনির্বাণ তৃণমূলী নন, কিন্তু সুবিধাবাদী। কারণ তিনি আর জি কর আন্দোলনে যোগ দেননি। পশ্চিমবাংলার এত বড় নিয়োগ কেলেঙ্কারির কথা তাঁদের ব্যান্ডের গানে নেই। কেন আর জি কর আন্দোলনে যোগ দেননি, তার ব্যাখ্যা অনির্বাণ ইতিমধ্যেই বহুবার দিয়েছেন। সে ব্যাখ্যা কেউ অবিশ্বাস করতেই পারেন, বিশ্বাস করলেও অপছন্দ করতে পারেন। কিন্তু সমস্যা অন্য। যে কোনো ব্যক্তিরই নিন্দা করা যেতে পারে কোনো বিষয়ে প্রতিবাদ না করার জন্যে। কিন্তু পরবর্তীকালে কোনো বিষয়ে তিনি কথা বললেই ‘তখন কথা বলেননি, অতএব এখনো চুপ করে থাকতে হবে’ – এই দাবি প্রথমত বনলতা সেনগিরি, দ্বিতীয়ত গা জোয়ারি। এতে মানুষের বাকস্বাধীনতা কেড়ে নেওয়ার ইচ্ছাই প্রকাশ পায়। শেষ বিচারে সেটা দক্ষিণপন্থাই।

এটাই বা কীরকম আবদার, যে একজন শিল্পীর শিল্পকে বিচার করতে হবে তিনি শিল্পের বাইরে কী করেছেন বা করেননি তা দিয়ে? আমি জানি অমুক ডাক্তার চমৎকার পেটের চিকিৎসা করেন। আমার পেটের অসুখ দীর্ঘদিন ধরে সারছে না, হাজারটা ডাক্তার দেখিয়ে হয়রান হয়ে গেছি, তবু তাঁর কাছে যাব না, যেহেতু তিনি বিবাহ বহির্ভূত প্রেম করেন? এরকম হাস্যকর যুক্তিতে আর কোন জিনিসটা করি আমরা? শিল্পীদের নিয়ে ভাবতে গেলেই আমাদের এরকম ভাবনার উদয় কেন হয় – তা নিয়ে বোধহয় রাজ্যের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর পিএইচডি করানোর ব্যবস্থা করা উচিত এবার।

পৃথিবীর যে কোনো দেশে, যে কোনো কালে শিল্পীদের প্রধান কাজ ক্ষমতাবানের ত্রুটি ধরা, শাসককে এবং সমাজকে নিয়ে বিদ্রুপ করা। প্রতিবাদ, প্রতিরোধ, আন্দোলনে অনুপ্রেরণা দেওয়া। আন্দোলনে নামলে ভাল, না নামলে মহাপাপ হয় না। আন্দোলন করা রাজনীতির লোকেদের কাজ। শিল্পীরা চাইলেই যে আন্দোলন করতে পারবেন তাও নয়। সবাই রবীন্দ্রনাথ হন না যে স্বয়ং স্বদেশি আন্দোলনে নেতৃত্ব দেবেন। লক্ষণীয়, সে আন্দোলন থেকে তিনি আবার বেরিয়েও এসেছিলেন। কারণ তাঁর মনে হয়েছিল, ওই আন্দোলনে সত্যের চেয়ে ভান বেশি। এই সিদ্ধান্তের কারণে তাঁকে তখনকার জাতীয়তাবাদীদের বিষনজরেও পড়তে হয়েছিল। তারপরেও হিজলি জেলে বন্দিহত্যা নিয়ে তিনি ‘প্রশ্ন’ কবিতাটা লিখেছেন। সে কবিতায় না আছে হিজলি জেলের নাম, না আছে ইংরেজ সরকারের উল্লেখ। এখন হলে নির্ঘাত তাঁকে শুনতে হত ‘ওসব চালাকি। দম থাকলে গভর্নর জেনারেলের নাম করে লিখত।’ ভাগ্যিস তখনকার বাঙালির সহায়িকা দরকার হত না!

কদিন আগেই উৎপল দত্তের জন্মদিন গেছে। তিনি ঘোষিত বামপন্থী, আমৃত্যু সিপিএম দলের ঘনিষ্ঠ, নাট্যজগতে তাঁর অবদান অনস্বীকার্য এবং মঞ্চে তাঁর সব কাজই রাজনৈতিক। কিন্তু গত কয়েক দিনের ঘটনাপ্রবাহ দেখে সন্দেহ হচ্ছে – তাঁর জন্মদিনকে ব্যবহার করে যাঁরা ফেসবুক পোস্টে লিখছিলেন উৎপলবাবুর মেরুদণ্ড ছিল, আজকের শিল্পীদের নেই, উৎপলবাবুকে আজ পেলে তাঁকেও মেরুদণ্ডহীন বলতেন। কারণ তিনি রোজগারের জন্যে জনপ্রিয় হিন্দি বাণিজ্যিক ছবিতে অভিনয় করেছেন। এমনকি প্রথম বামফ্রন্ট সরকারের অর্থমন্ত্রী অশোক মিত্র তো লিখেছেন, নাটক করার অপরাধে কংগ্রেস আমলে কারারুদ্ধ উৎপলকে ছাড়িয়ে নিয়েছিলেন বম্বের কোনো ছবির প্রযোজক, যাতে তাঁর শুটিং নষ্ট না হয়। এই লোকের কল্লোল বা দুঃস্বপ্নের নগরী যতই সরাসরি রাজনৈতিক হোক, আজকের কমরেডরা কি আর পাত্তা দিতেন? তখন বাঙালির রাজনীতির সর্বজনস্বীকৃত পদ্ধতি ছিল – জ্যোতি বসু, প্রমোদ দাশগুপ্তেরা ধুন্ধুমার আন্দোলন করবেন। নিজেদের শিল্পের মাধ্যমে রাজনৈতিক বার্তা দেবেন উৎপলবাবু বা মৃণাল সেনরা। এখন ডান, বাম নির্বিশেষে বাঙালির চাহিদা হয়েছে উলটো – শতরূপ, দিলীপদের স্টুডিওয় যেতে হবে। মিছিলে যেতে হবে অনির্বাণদের।

আরও পড়ুন অনির্বাণ কাজ পাচ্ছেন না: টালিগঞ্জের অর্ধসত্য বা হিমশৈলের চূড়া

এই উলটো বুঝলি প্রজার দেশে গানের দলের সমালোচনায় তাদের গান নিয়ে আলোচনা হবে না। হুলিগানইজমের এর আগে প্রবল ভাইরাল হওয়া ‘মেলার গান’-এর রাজনীতি আজ পর্যন্ত খেয়াল করার সময় সুযোগ পাননি বামপন্থীরাও। অনির্বাণের সমালোচনা করতে হলেও তাঁর কাজের সমালোচনা করা হয় না। হয় তিনি কাকে বিয়ে করেছেন আর কাকে করেননি তা দিয়ে সুবিধাবাদী প্রমাণের চেষ্টা, নয় কোন মিছিলে গেছেন আর কোন মিছিলে যাননি তা নিয়ে ক্রিকেটের ধারাভাষ্যকারদের মত গ্রাফিক বিশ্লেষণ। এসব আলোচনার সিদ্ধান্ত আগে থেকেই স্থির থাকে। নইলে ভুলে যাওয়ার কথা নয় যে অনির্বাণ নির্দেশিত মন্দার সাম্প্রতিককালের বাংলা বিনোদন জগতের সবচেয়ে রাজনৈতিক দুটো ওয়েব সিরিজের অন্যতম (অন্যটা প্রদীপ্ত ভট্টাচার্য নির্দেশিত বিরহী)। মন্দারে গোড়াতেই একটা রাজনৈতিক হত্যা দেখানো হয়, যিনি খুন হন তিনি একজন বামপন্থী শ্রমিক নেতা। তাঁর রাজনৈতিক পরিচয় নিয়ে বিন্দুমাত্র ধোঁয়াশা রাখা হয়নি। তাছাড়া বাংলা ছবির ইতিহাসে একটা অভূতপূর্ব ঘটনা গতবছর ঘটিয়েছেন অর্ণ মুখোপাধ্যায় আর অনির্বাণ। তাঁদের যুগ্ম নির্দেশনায় মুক্তি পেয়েছে অথৈ। মঞ্চসফল নাটক থেকে করা এই ছবিতে পশ্চিমবাংলার ভদ্রলোকদের মুখোশ ছিঁড়ে ফেলে দেখানো হয়েছে তাদের জাতপাতের বাছবিচার কত ভয়ঙ্কর।

তালিকা দীর্ঘতর করা যায়, তবে লেখা দীর্ঘতর করে লাভ নেই। কারণ একবিংশ শতাব্দীতে আমাদের মনোযোগের আয়ু মাত্র আড়াই মিনিট। কিন্তু এই ভাবনা পীড়াদায়ক যে সংস্কৃতি আর রাজনীতি নিয়ে চিরকাল কলার তোলা বাঙালির এখন ভোট চুরি, ভোটার তালিকার আসন্ন বিশেষ নিবিড় সংশোধনী, দেশের বিভিন্ন প্রান্তে বাঙালি বিতাড়ন নিয়ে দিনরাত উত্তেজিত থাকার কথা ছিল এবং সব দলের নেতাদের ব্যতিব্যস্ত করে রাখার কথা ছিল। অথচ বাঙালিদের একটা অংশ মেতে আছে থিয়েটার ও সিনেমার একজন জনপ্রিয় শিল্পীর যাবতীয় কাজ নস্যাৎ করে দিতে, যেহেতু তাঁর গানের দল তাদের আদুরে নেতার ত্রুটি তুলে ধরেছে। দেখছি, মেলার গানে যথার্থই লেখা হয়েছে ‘আমাদের জীবনতলায় মোটরগাড়ি ঘুরছে মরণকুয়ায়…’।

ইনস্ক্রিপ্ট ওয়েবসাইটে প্রকাশিত

ভোটচুরির অভিযোগ আমাদের এনে ফেলেছে এক সন্ধিক্ষণে

গণতন্ত্রকে অস্বীকার করা এবং গণতন্ত্র নষ্ট করার অভিযোগ উঠলে সগর্বে ‘বেশ করেছি’ বলার এই ঔদ্ধত্যই ফ্যাসিবাদ। এর সঙ্গে অন্য কোনও সরকারের অন্যায়ের, অপশাসনের তুলনা চলে না। এ-কথা যাঁরা আজ বুঝবেন না, ফ্যাসিবাদ জাঁকিয়ে বসতে পারলে ভারতের গণতন্ত্রের পাশাপাশি তাঁদেরও ঠাঁই হবে জাদুঘরে।

এক যুগ পরে এমন একটা ঘটনা ঘটল স্বাধীনতা দিবসের ঠিক দুদিন আগে, যা এতদিনের অনভ্যস্ত কানে অবিশ্বাস্য মনে হল— ভারতের শাসক দল আর বিরোধী দল একমত হয়েছে। কোন বিষয়ে? ভোটচুরি সম্বন্ধে। যে সে লোক নয়, দেশের গদ্দারদের দেখলেই গুলি করার পক্ষপাতী যিনি, সেই অনুরাগ ঠাকুর স্বয়ং সাংবাদিক সম্মেলন করে ঠিক তাই বললেন, যা লোকসভার বিরোধী দলনেতা তথা কংগ্রেসের সবচেয়ে বড় নেতা রাহুল গান্ধী তার হপ্তাখানেক আগে বলেছিলেন— ভোটার তালিকায় ব্যাপক কারচুপি করে ভোটচুরি করা হয়েছে। সত্যি কথা বলতে, অনুরাগ রাহুলের বক্তব্যকে আরও জোরদার করে দিয়েছেন।

রাহুল তো বলেছিলেন তাঁর দলের লোকেরা নির্বাচন কমিশনের দেওয়া কম্পিউটার স্ক্যানেরও অযোগ্য সাত ফুট উঁচু কাগজ ঘেঁটে ভোটচুরির প্রমাণ বের করেছেন মোটে একখানা লোকসভা কেন্দ্রের একখানা বিধানসভা অঞ্চলে। চাইলে কমিশন বলতেই পারত যে এত বড় দেশে একটা লোকসভা কেন্দ্রে ভুলচুক হয়ে থাকতেই পারে। এ দিয়ে প্রমাণ হয় না যে সারা দেশে এ জিনিস হয়েছে। কিন্তু অনুরাগ আরও গভীরে গবেষণা করেছেন। তিনি সারা দেশের নানা রাজ্যের আধ ডজন লোকসভা আসনের তথ্য তুলে ধরেছেন। সেগুলোতেও দেখা যাচ্ছে রাহুল-চিহ্নিত মাধবপুরা আসনের মতোই কাণ্ড ঘটেছে।

৭ আগস্ট ছিল বৃহস্পতিবার, অর্থাৎ হিন্দুমতে লক্ষ্মীবার। সেদিন রাহুলের সাংবাদিক সম্মেলন এবং তারপর থেকে যা যা হয়ে চলেছে, তাতে মা লক্ষ্মী হিন্দুত্ববাদীদের উপর অপ্রসন্ন বলেই বোধ হচ্ছে। ২০১৪ সালে বিজেপি কেন্দ্রে ক্ষমতায় আসার পর থেকেই কংগ্রেস, আম আদমি পার্টির মতো একাধিক বিরোধী দল ভোটে কারচুপির অভিযোগ করে যাচ্ছে। প্রায় সব অভিযোগের ক্ষেত্রেই আঙুল উঠেছে ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিনের দিকে। কমিশন পাত্তা দেয়নি, বিজেপি তো দেয়নি বটেই। নিজেরা জিতলে বলেছে ‘হেরো পার্টি অজুহাত খুঁজছে’, আর বিরোধীরা জিতলে বলেছে ‘এবার কেন ওরা ইভিএমের কথা বলছে না?’ অথচ ইভিএমের বিরুদ্ধে অভিযোগগুলো মোটেই ফেলে দেওয়ার মতো ছিল না, অভিযোগকারীরা যে শলাপরামর্শ করে অভিযোগ করেছে তা-ও নয়। কেবল বিরোধীরাই অভিযোগ করেছে এমনও নয়। সাংবাদিকরা খবর করেছেন ইভিএম বেপাত্তা, গণতান্ত্রিক অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠন অভিযোগ করেছে যে প্রদত্ত ভোট আর ইভিএমে গোনা ভোটের সংখ্যার তফাত হয়েছে প্রচুর আসনে— সবই মাছি তাড়ানোর মতো করে উড়িয়ে দিয়েছে নির্বাচন কমিশন। আদালতে আবেদন করেও লাভ হয়নি। বিজেপিবিরোধী ভোটাররাও বিশ্বাস করেছেন যে বিরোধীরা নিজেদের কাজটা ঠিকমতো করে না, তাই এসব বলে। যতটুকু যা কারচুপি হয় তা চিরকালই হত, যখন যে ক্ষমতায় থাকে সে-ই করে। ফলে হিন্দুত্ববাদীরা বেশ নিশ্চিন্তেই ছিল।

কিন্তু বিষ্যুদবার দুপুরে রাহুল একেবারে অন্যদিক থেকে আক্রমণ করলেন। বললেন, গোড়ায় গলদ। ভোটার তালিকা ঘেঁটে বের করা তথ্য চোখের সামনে তুলে ধরলেন, দিস্তা দিস্তা কাগজ হাতে দেখিয়ে দিলেন— অভূতপূর্ব কারচুপি হচ্ছে। আমাদের গণতন্ত্রের নানা ত্রুটি থাকলেও, সেরা বৈশিষ্ট্য হল— মুকেশ আম্বানির একটা ভোট, আমার বাড়ির কাজের দিদিরও একটাই ভোট। ওটাই ভারতের গণতন্ত্রের জোর, আমাদের গর্বের জায়গা। এই জায়গাটা সেই ১৯৫২ সালের প্রথম নির্বাচন থেকেই স্বাধীন ভারতে তৈরি করা হয়েছে। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার প্রথম দিন থেকে ধনী-গরিব, নারী-পুরুষ, হিন্দু-বৌদ্ধ-শিখ-জৈন-পারসিক-মুসলমান-খ্রিস্টান, উঁচু জাত-নিচু জাত— সবার ভোটাধিকার আছে, এই গর্ব করার অধিকার গোটা দুনিয়ায় একমাত্র আমাদের। এমনকি গ্রেট ব্রিটেন বা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেরও এই ইতিহাস নেই। আর ৭৮ বছরের অবহেলায় অর্থবল, বাহুবলের গুরুত্ব বাড়তে বাড়তে ভারতীয় গণতন্ত্র যেখানে পৌঁছেছে তাতে আজ আপামর ভারতবাসীর গণতান্ত্রিক সম্বল বলতে ওই ভোটটুকুই। সেটাই যে চুরি হয়ে যাচ্ছে তা রাহুল আক্ষরিক অর্থে কাগুজে প্রমাণ দিয়ে দেখিয়ে দিলেন। যতই ডিজিটাল ইন্ডিয়ার ঢাক বাজানো হোক, দেশের অধিকাংশ মানুষ এখনও মোবাইল ছাড়া আর কোনও ইলেকট্রনিক জিনিসের ব্যবহার জানেন না। তাঁদের কাছে কাগজে ছাপা জিনিসের মর্যাদা এখনও বেশি। এই কথাটা আমরা অনেকেই বুঝতে পারি না, গরিব মানুষের পার্টি বলে যারা নিজেদের দাবি করে তারাও অনেকে বোঝে না। রাহুল বা কংগ্রেস যে সেটা বুঝেছে, সেদিনের সাংবাদিক সম্মেলন তার প্রমাণ। পাওয়ার পয়েন্ট প্রেজেন্টেশনে দেশের বড় অংশের মানুষকে কিছুই বোঝানো যেত না, যদি রাহুল ইয়া মোটা মোটা বইয়ের মতো করে প্রমাণগুলো চোখের সামনে হাজির না করতেন। লক্ষ করার মতো ব্যাপার হল, সাংবাদিকরা কিন্তু ইভিএম কারচুপির প্রশ্নও তুলেছিলেন। রাহুল সেদিকে গেলেনই না, বললেন আসল গলদ নির্বাচন কমিশনের। ওই জায়গাটা ঠিক না থাকলে ব্যালটেই ভোট হোক আর ইভিএমে— ভোটচুরি হবেই।

আরও পড়ুন বিধবা, পিতৃহীন শিশু – সকলকে জবাব দিতে হবে সেকুলারদের

বিষ্যুদবারের ক্ষত মেরামত করার চেষ্টা করতে করতে এক সপ্তাহ কাটিয়ে ফেলল নির্বাচন কমিশন আর বিজেপি। কিন্তু দেখা যাচ্ছে এ-দেশের নির্বাচন হয়ে দাঁড়িয়েছে কেশব নাগের অঙ্ক বইয়ের চৌবাচ্চার মতো। রাহুল জল বেরোবার এত বড় গর্ত করে দিয়েছেন যে জল ঢোকার নল দিয়ে কমিশন আর বিজেপি যতই জল ঢোকাক, চৌবাচ্চা দ্রুত খালি হয়ে যাওয়ার দিকে এগোচ্ছে। প্রথমে কমিশন বলল হলফনামা জমা না দিলে রাহুলের অভিযোগ নিয়ে তদন্ত করব না। অবিলম্বে জানা গেল নিয়মানুযায়ী এতে হলফনামা জমা দেওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। তারপর নির্বাচন কমিশনের কর্ণাটকের সিইও একখানা হাস্যকর কাজ করে বসলেন। রাহুলকে নোটিস পাঠালেন, তিনি যেন অভিযোগ তথ্যপ্রমাণ-সহ জমা দেন। একে তো যার বিরুদ্ধে চুরির অভিযোগ সে-ই দাবি করছে তার কাছে চুরির প্রমাণ দিতে হবে, তার উপর তারই কাছ থেকে নেওয়া নথিকে প্রমাণ বলে মানতে সে রাজি নয়। জনপ্রিয় বাংলা ছবির ফুটো মস্তানের সংলাপই এখানে পরিস্থিতির সবচেয়ে যথার্থ বর্ণনা দিতে পারে— ‘এ কে রে সান্তিগোপাল! এ তো আজব কালেকসন!’

এদিকে রাহুল ভাঙা বেড়া দেখিয়ে দিতেই শেয়ালরা বেরিয়ে এল পালে পালে। মহম্মদ জুবেরের মতো সাংবাদিক থেকে শুরু করে বিভিন্ন রাজ্যের কংগ্রেস কর্মী, সাধারণ উৎসাহী মানুষ, এমনকি গোদি মিডিয়ার একটা অংশও (যেমন ইন্ডিয়া টুডে গ্রুপ) তদন্তে নেমে পড়ল এবং দেখা গেল, যেখানে ছাই উড়ছে সেখানেই অমূল্য রতন পাওয়া যাচ্ছে।

এমতাবস্থায় রেফারির হয়ে মাঠে নামতে হত বিজেপির চাণক্যকে, যদি তিনি সত্যিই চাণক্যের মতো কূটবুদ্ধিসম্পন্ন হয়ে থাকেন। কিন্তু তিনি স্পিকটি নট, মাঠে নামিয়ে দিলেন অনুরাগকে। তিনি ভাবলেন রাহুল আর প্রিয়াঙ্কা গান্ধীর জেতা রায়বেরিলি আর ওয়ায়নাড়, তৃণমূল কংগ্রেস নেতা অভিষেক ব্যানার্জির জেতা ডায়মন্ড হারবার আসনের ভোটার তালিকাতেও গোলমাল আছে দেখালেই সব কোলাহল থেমে যাবে। কিন্তু বাপু তা কী হয়? অতি বুদ্ধিমান বাঙালি ভদ্রলোক আর সারা দেশের অন্ধ ভক্তরা ছাড়া সকলেই বুঝতে পারছে, নির্বাচন কমিশনকে দিয়ে বিজেপি যে কাণ্ডটি ঘটিয়ে চলেছে বলে মনে হচ্ছে, তা চিরাচরিত ভোটের দিনের রিগিং নয়। পেশিশক্তির জোরে লোককে ভয় দেখিয়ে ভোট দিতে না দেওয়া, নিজের লোক ঢুকিয়ে পরের পর ভোট দেওয়ানো বা ভোটার তালিকা দেখে অনুপস্থিত ভোটারের জায়গায় নিজের লোককে ভোট দেওয়ানো দেশের সব দলই করেছে কোনও না কোনও সময়ে। কিন্তু নির্বাচন কমিশন নিজেই এমন ব্যবস্থা করে দিচ্ছে যাতে একটা নির্দিষ্ট দলের সমর্থকরা যতবার ইচ্ছে যেখানে ইচ্ছে ভোট দিতে পারে (এখনও আমরা জানি না ব্যাপারটা ঠান্ডা ঘরে বসে মেশিনের মাধ্যমেই সম্পন্ন হয়ে যাচ্ছে কিনা), ভোটার তালিকায় নাম যোগ-বিয়োগ করা হচ্ছে একটা দলকে হারা আসনও জিতিয়ে দেওয়ার উদ্দেশ্যে— এ জিনিস অভূতপূর্ব। এটা চলতে থাকলে দেশে আর ত্রুটিপূর্ণ গণতন্ত্রও আছে বলা যায় না। ভ্লাদিমির পুতিনের রাশিয়া হয়ে উঠতে আর দেরি নেই আমাদের।

এই সেদিনও রাহুলকে বিজেপির বিরুদ্ধে উপযুক্ত নেতা বলে মনে করত না তৃণমূল কংগ্রেস। সেই অজুহাতে ত্রিপুরা, মণিপুর, মেঘালয়, গোয়ার মতো রাজ্যে জিতবে না জেনেও লড়তে চলে গেছে। সেই তৃণমূলের দু-নম্বর নেতা অভিষেক ৭ তারিখের সাংবাদিক সম্মেলনের পর থেকেই রাহুলের প্রত্যেক কথায় সায় দিচ্ছেন। তাঁর দলের সাংসদরা দৃশ্যতই রাহুলের বাহিনীর সৈনিক হয়ে উঠেছেন। একইভাবে বিভিন্ন সময়ে কংগ্রেসকে সাবোতাজ করতে গোয়া, গুজরাতের মতো রাজ্যে নির্বাচনে লড়তে চলে যাওয়া আম আদমি পার্টির সাংসদরা দিল্লি বিধানসভা নির্বাচনে হেরে যাওয়ার পরে প্রায় উধাও হয়ে গিয়েছিলেন। তাঁরাও রাহুলের পাশে দাঁড়িয়ে পড়েছেন, ১১ তারিখের নির্বাচন সদন অভিযানেও যোগ দিয়েছিলেন। সমাজবাদী পার্টির অখিলেশ যাদবের ব্যারিকেড টপকে যাওয়ার স্পর্ধা আর রাষ্ট্রীয় জনতা দলের তেজস্বী যাদবের মারমুখী মেজাজের রাজনৈতিক স্বার্থ সহজবোধ্য। সামনে বিহারে বিধানসভা নির্বাচন, ২০২৭ সালে উত্তরপ্রদেশে। তেজস্বী আর অখিলেশ ওই দুই রাজ্যের প্রধান বিরোধী নেতা, ক্ষমতায় আসতে মরিয়া হওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু তৃণমূল তো ২০২৬ বিধানসভা নির্বাচনেও হইহই করে জিতবে বলছেন বোদ্ধারা। বিরোধীরাও আড়ালে তা স্বীকার করে। আর আপের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে নির্ঘাত স্বয়ং অরবিন্দ কেজরিওয়ালও আশাবাদী নন, তাই এত বড় কাণ্ড নিয়ে একটা সোশাল মিডিয়া পোস্ট পর্যন্ত করছেন না। তাহলে এই দুই দলের কংগ্রেসের সঙ্গে এমন শক্ত জোট বাঁধার কারণ কী?

কারণ গত এক সপ্তাহে যা ঘটছে তার সঙ্গে বিহারে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধনীর নামে যেভাবে মানুষের ভোটাধিকার হরণ চলছে (এরপর পশ্চিমবঙ্গে এবং তারপর গোটা দেশে চলবে), তা মিলিয়ে দেখলে যে কেউ বুঝতে পারে— এরপর থেকে সব ভোটে জিতবে বিজেপিই। এখন বিজেপি বাদে সবাই একজোট না হলে কোনও দলেরই আর অস্তিত্ব থাকবে না। ফলে অসুস্থ হয়ে পড়া তৃণমূল সাংসদ মিতালী বাগকে একদিক থেকে রাহুল, অন্যদিক থেকে সিপিএম সাংসদ জন ব্রিটাস ধরে আছেন— এই ভাইরাল ছবি আসলে মানুষের বিপদে জোট বাঁধার আদিম অভ্যাসের চিত্র। সবাই মিলে রাস্তার দখল নিয়ে, পাহাড়প্রমাণ আন্দোলনের ঢেউ তুলে যদি বিজেপির ইমারত ভাঙতে পারেন, তবেই আলাদা আলাদা দল করার মানে থাকবে। তখন কে ভালো কে মন্দ, কে কম রিগিং করে কে বেশি রিগিং করে, কে বুর্জোয়া কে কমিউনিস্ট, কোনটা ফ্যাসিবাদ কোনটা নয়া ফ্যাসিবাদ— এসব নিয়ে তর্কাতর্কি, মারামারি করার ফুরসত পাওয়া যাবে। না পারলে কী হবে? তার ট্রেলার বিজেপি দেখিয়ে দিয়েছে ১১ তারিখেই। প্রায় সমস্ত বিরোধী সাংসদ যখন পথে এবং দিল্লি পুলিশ তাঁদের আটক করেছে, তখন কোনও আলোচনা ছাড়াই একাধিক বিল পাশ করিয়ে নিয়েছে সংসদ থেকে, যার মধ্যে আছে নতুন আয়কর আইনও। এই আইন অনুযায়ী আয়কর বিভাগ যে কোনও করদাতার ইমেল, সোশাল মিডিয়া হ্যান্ডেল পর্যন্ত দেখতে পারে। বলা বাহুল্য, এ কেবল ব্যক্তিগত গোপনীয়তায় হস্তক্ষেপ নয়। আইনের এই ধারা ব্যবহার করে সরকারবিরোধী যে কোনও মানুষকে হয়রান করা সম্ভব, গ্রেপ্তার করাও সম্ভব। এই সরকারের আমলে একবার গ্রেপ্তার হলে আপনি দোষী না নির্দোষ তার বিচার কত কঠিন তা যদি না বুঝে থাকেন, শুধু দুটো নাম মনে করুন— স্ট্যান স্বামী আর উমর খালিদ।

বিরোধীশূন্য সংসদে বিল পাশ করানো সম্পর্কে সেদিন সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী কিরেন রিজিজু কী বলেছিলেন?

‘কংগ্রেস পার্টি আর বিরোধীরা অনেক সময় নষ্ট করেছে। এখন আমরা আর দেশের সময়, সংসদের সময় নষ্ট করতে দেব না। সরকার গুরুত্বপূর্ণ সব বিল পাশ করাতে চায়। আমরা আজ সেগুলো লোকসভা আর রাজ্যসভা— দুই জায়গাতেই পাশ করাব। দেশ একজন লোকের আর একটা পরিবারের বোকামির জন্যে এত ক্ষতি সহ্য করতে পারে না। অনেক বিরোধী সাংসদও এসে বলেছেন তাঁরা নিরুপায়। তাঁদের নেতারা জোর করে গোলমাল পাকাতে বলে। আমরা প্রতিদিন একটা ইস্যু নিয়ে দেশের সময় আর সংসদের সময় নষ্ট হতে দেব না। সুতরাং আমরা গুরুত্বপূর্ণ বিলগুলো পাশ করাব।’

এই একটা ইস্যু কোনটা? ভোটচুরি। অর্থাৎ যা দিয়ে সংসদ তৈরি হয়েছে, সেটাকেই ফালতু বলে উড়িয়ে দিচ্ছে সরকার। সংসদ ব্যাপারটার গুরুত্বই আসলে স্বীকার করছে না, প্রকারান্তরে বলা হচ্ছে— আমরা যা চাইব সেটাই আইনে পরিণত করব।

গণতন্ত্রকে অস্বীকার করা এবং গণতন্ত্র নষ্ট করার অভিযোগ উঠলে সগর্বে ‘বেশ করেছি’ বলার এই ঔদ্ধত্যই ফ্যাসিবাদ। এর সঙ্গে অন্য কোনও সরকারের অন্যায়ের, অপশাসনের তুলনা চলে না। এ-কথা যাঁরা আজ বুঝবেন না, ফ্যাসিবাদ জাঁকিয়ে বসতে পারলে ভারতের গণতন্ত্রের পাশাপাশি তাঁদেরও ঠাঁই হবে জাদুঘরে। তবে গণতন্ত্রের এখনও বাঁচার আশা আছে, কারণ এই অতি বুদ্ধিমান অবুঝরা সংখ্যায় কম এবং রাজনৈতিকভাবে অপ্রাসঙ্গিক। রাহুল, অখিলেশ, তেজস্বী, ব্রিটাসরা জানেন কোনটা নির্বাচনী বাধ্যবাধকতা আর কোনটা ঐতিহাসিক প্রয়োজন। তাছাড়া ও পক্ষে আছেন অনুরাগের মতো কালিদাসের বংশধররা।

চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম ওয়েবসাইটে প্রকাশিত