হকারদের নিয়ে বেকার গোলমাল!

আমরা যারা লেখাপড়া শিখেছি খানিকটা, মাথার উপরে পাকা ছাদ আছে এবং ঘরে এসি, গ্যারেজে গাড়ি আছে— তারা চাই আইন একেবারে অক্ষরে অক্ষরে পালিত হোক। রেলের জমিতে কেবল রেলের জিনিস থাকবে। দোকান কেন থাকবে? ঘরবাড়ি কেন থাকবে? অটো, টোটো কেন দাঁড়াবে?

যদি উচ্ছেদই উদ্দেশ্য হয়, তাহলে এসব ভাবার প্রয়োজন নেই। সরকারি সম্পত্তি মানে যে আসলে নাগরিকের সম্পত্তি— সেকথা কজন নাগরিকই বা জানে, বোঝে এবং বিশ্বাস করে? সমাজের উপর থেকে নিচ পর্যন্ত সকলকে জানানোর ব্যবস্থা তো কোনোদিন করাই হয়নি। আর এখন তো কে নাগরিক তা ঠিক করছে রাষ্ট্র। ফলে যদি কাল রেলের জমিতে ব্যবসা করা বা বসবাস করা মানুষকে অনাগরিক বলে প্রতিষ্ঠা করে দেওয়া হয়, তাহলেই মুশকিল আসান।

পশ্চিমবঙ্গে নতুন সরকারের শপথ গ্রহণের একমাস পূর্ণ হয়েছে। রাজ্যটা যে বদলে গেছে তা অস্বীকার করার উপায় নেই। ৯ মে-র আগে পর্যন্ত রাজ্যের সাধারণ মানুষ বলুন, বিরোধী রাজনৈতিক দলের লোকেরা বলুন আর সংবাদমাধ্যমই বলুন— সকলেই বলত যে পশ্চিমবঙ্গের বিরাট সমস্যা হল বেকার সমস্যা। গত একমাসে বেকার সমস্যার সমাধান হয়ে গেছে, প্রধান হয়ে গেছে হকার সমস্যা। হকাররা কার সমস্যা? এখন পর্যন্ত তাঁরা রেলের সমস্যা। কেন? না তাঁরা গোটা রাজ্যজুড়ে রেলের জমি দখল করে রেখেছেন। সম্ভবত সেই কারণেই লোকাল ট্রেন ঠিক সময়ে চলছে না, দূরপাল্লার ট্রেন ৩-৪ ঘন্টা লেট। রেলের জমি দখলমুক্ত হলেই স্টেশনগুলো হয়ে যাবে হলিউডি সিনেমার স্টেশনগুলোর মত। শিয়ালদা বা হাওড়া স্টেশন দখলমুক্ত করা হয়েছে, বাকিগুলোকেও করতে পারলেই আমাদের আর পাঁচ টাকার ভাঁড়ের চা বাদাম বিস্কুট দিয়ে খেতে হবে না। আমরা উন্নত দেশের লোকেদের মত এই অসহ্য গরমে আড়াইশো-তিনশো টাকার আইসড টি বা কোল্ড কফি খাব, সঙ্গে থাকবে কনফেকশনারির সম্ভার। যে নিত্যযাত্রীদের স্টেশনে পৌঁছলেই খিদেয় পেট চুঁই চুঁই করে, তাঁদেরও আর ডিম-পাঁউরুটি, ঘুগনি, মুড়ি-তরকারি— এ সমস্ত ছাইপাঁশ খেয়ে থাকতে হবে না। গত নভেম্বরেই রেল বোর্ড খাবারদাবার সম্পর্কে নিয়ম বদলে স্টেশন চত্বরে কেএফসি, ম্যাকডোনাল্ড’স, পিৎজা হাট, হলদিরামদের দোকান খোলার অনুমতি দিয়েছে। কিন্তু দোকান খুলবে কোথায়? হকাররা বসে আছেন যে। হকারদের পাশেই দোকান খুললেও চলবে না। কজন আর ভাঁড়ের চা থাকতে লাটে, ফ্র্যাপে, ক্যাপুচিনো খেতে যাবে? এই সমস্যার সমাধান করতেই হত। অতএব পশ্চিমবঙ্গের নতুন সরকার রেলের জায়গা খালি করতে নেমেছে।

যতই আসুক বিঘ্ন বিপদ, হাওয়া হোক প্রতিকূল, সরকার হকার ও বস্তি উচ্ছেদ করেই ছাড়বে। কাজটা দক্ষভাবে করতে রাজ্যের মুখ্যসচিবকে চেয়ারম্যান করে, রেলমন্ত্রক আর রাজ্য সরকারের গুরুত্বপূর্ণ সচিব এবং রাজ্য পুলিশের ডিজি আর কলকাতার পুলিশ কমিশনারকে নিয়ে গঠন করা হয়েছে টাস্ক ফোর্স। টাস্কটি এমন যে ফোর্স ব্যবহার করতেই হবে। প্রথমে কেবল হকার উচ্ছেদ, বস্তি উচ্ছেদ চলছিল। এখন দেখা যাচ্ছে উত্তরপাড়া বা কোন্নগরের মত জায়গায় হকার উচ্ছেদের সমান বা তার চেয়েও বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে টোটো স্ট্যান্ড, অটো স্ট্যান্ড স্টেশন চত্বর থেকে সরিয়ে দেওয়ার কাজকে। আপনি বয়স্ক হতে পারেন, অসুস্থ হতে পারেন, প্রতিবন্ধী হতে পারেন। আইন আপনাকে মানতেই হবে, অর্থাৎ ৫০/৬০/১০০ মিটার দূর থেকে হেঁটে স্টেশনে আসতে হবে। আইন সকলের জন্য এক। কথাটা আমাদের সংবিধানে লেখা আছে। তাই আমরা যারা লেখাপড়া শিখেছি খানিকটা, মাথার উপরে পাকা ছাদ আছে এবং ঘরে এসি, গ্যারেজে গাড়ি আছে— তারা চাই আইন একেবারে অক্ষরে অক্ষরে পালিত হোক। রেলের জমিতে কেবল রেলের জিনিস থাকবে। দোকান কেন থাকবে? ঘরবাড়ি কেন থাকবে? অটো, টোটো কেন দাঁড়াবে?

ঠিক কথা। আমার জমিতে যেমন কেবল আমার সম্পত্তিই থাকতে পারে। সেখানে অন্য কাউকে কিছু করতে গেলে আমার অনুমতি নিতে হবে, আমার থেকে জমি কিনতে হবে বা লিজ নিতে হবে। নিদেনপক্ষে আমাকে ভাড়া দিতে হবে। রেলের বেলাতেই বা অন্য নিয়ম হবে কেন? তুমি গরিব বলে নিয়মকানুন মানবে না? যাদবপুর হোক আর ব্যারাকপুর। তোমাকে উঠে যেতেই হবে, না উঠলে বুলডোজার দিয়ে তুলে দেওয়া হবে। আইনে বুলডোজারের কথা কোথায় লেখা আছে সেটা অবশ্য জানা একটু শক্ত। আইনে বরং আদালতের দ্বারস্থ হওয়ার কথা আছে, দেশের সব আইনেই থাকে। কিন্তু আদালতের স্থগিতাদেশেও যে আইনের কিছু এসে যায় না সেটা যাদবপুরের ক্ষেত্রে দেখা গেল। যাক সে কথা। দুনিয়া জুড়েই তো দেখা যাচ্ছে একটা আইনই স্বতঃসিদ্ধ— জোর যার মুলুক তার। নাহয় আমাদের এখানেও তাই হল। তাছাড়া অতীতে কি কখনো হকার উচ্ছেদ হয়নি? ২০২৪ সালে লোকসভা নির্বাচনে বিপুল জয় পাওয়ার পরে পরেই তৃণমূল কংগ্রেসের সরকারও করেছিল, তার বহু আগে বামফ্রন্ট সরকার কলকাতা শহরে ‘অপারেশন সানশাইন’ করেছিল। রেল করলেই দোষ?

হক কথা। আইন মেনে চলা উচিত, তার বাইরে কারও পা দেওয়া উচিত নয়। স্ট্রিট ভেন্ডার্স (প্রোটেকশন অফ লাইভলিহুড অ্যান্ড রেগুলেশন অফ স্ট্রিট ভেন্ডিং) অ্যাক্ট, ২০১৪ নামে একখানা আইন আছে। সেই আইনে বলে আছে, ততক্ষণ রাস্তার বিক্রেতাদের উচ্ছেদ করা যাবে না যতক্ষণ না টাউন ভেন্ডিং কমিটি সমস্ত বিক্রেতাদের বিষয়ে সমীক্ষা চালাচ্ছে এবং তারা যে বিক্রেতা, সেই সার্টিফিকেট দিচ্ছে। তারপর কোনো প্রয়োজনে ওইসব দোকান সরানোর দরকার থাকলে বিক্রেতাদের কমপক্ষে ৩০ দিনের নোটিশ দিতে হবে। আরও বলা আছে, উচ্ছেদ শেষ অস্ত্র। বরং বিক্রেতাদের প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনা করে তাঁদের অন্যত্র ব্যবসা করার সুযোগ দিতে হবে এবং এমন জায়গা চিহ্নিত করে দিতে হবে যেখানে তাঁরা ব্যবসা চালাতে পারেন। এই আইন অবশ্য চালু হয়েছিল ১ মে ২০১৪, মানে নরেন্দ্র মোদীর সরকার তৈরি হওয়ার হপ্তা দুয়েক আগে। এমন হতেই পারে যে আইনটি ওঁদের পছন্দ নয়। ওঁরা মনে করছেন এসব আদিখ্যেতা। তাহলেও তো আইনটি আগে বদল করতে হবে সংসদে পাশ করিয়ে। রাষ্ট্রপতিকে দিয়ে স্বাক্ষর করাতে হবে। অবশ্য উন্নয়নে দেরি করা ঠিক নয়। সোনার বাংলা যত তাড়াতাড়ি বানানো যায় তত ভালো। সেক্ষেত্রে অত আইনকানুনের তোয়াক্কা করলে চলবে না।

আরও পড়ুন এসএসসি: স্থান কাল পাত্র গুলিয়ে যাওয়া সাংবাদিকের স্বীকারোক্তি

বোধহয় এই সূত্র মেনেই দিকে দিকে উচ্ছেদ চলছে। তবে ওই রেলের জমি সম্পর্কে দু-একখানা কথা আছে। রেল তো বি আর চোপড়ার বানানো দূরদর্শনের মহাভারতের কালচক্র নয় যে আদি অনন্তকাল ধরে ছিল। ১৮৫৩ সালের আগে ভারতে রেল বলে কিছু ছিল না। পশ্চিমবঙ্গের রেলপথ এবং যেসব স্টেশনে উচ্ছেদ হয়েছে এখন পর্যন্ত, তাদের বয়স আরও কম। তা এই স্টেশনগুলো বানানোর জন্য রেল জমি পেল কোথায়? রেলের আগে এসব জমির মালিক ছিল কারা? ভারতের বহু সরকারি স্কুল, কলেজ, হাসপাতালের মত রেলের ইতিহাস ঘাঁটলেও দেখা যাবে যে এইসব জমি এক বা একাধিক ব্যক্তির সম্পত্তি ছিল। কোথাও বা কোনো গোষ্ঠীর সম্পত্তি ছিল। তাঁদের থেকে যৎসামান্য দামে, কখনো বা বিনামূল্যে রেল এইসব জমি পেয়েছিল। মানুষ সানন্দে দিয়েছিলেন, কারণ রেল হলে অনেক মানুষের সুবিধা হবে, তাঁদের নিজেদেরও হবে। সরকারি সম্পত্তি কথাটার ইংরিজি যে public property, সে তো আর এমনি এমনি নয়। এই পাবলিকের মধ্যে কিন্তু স্টেশন চত্বরের দোকানদার, টোটোচালক, অটোচালক— সবাই পড়েন। ফলে রেলের মালিক তথা রেলের জমির মালিক তাঁরাও। অন্তত যতক্ষণ না ভারতীয় রেল সরকারি সম্পত্তি থেকে এক বা একাধিক কর্পোরেটের সম্পত্তি হয়ে যাচ্ছে। সুতরাং বক্তব্য যদি এই হয় যে, রেলকে ভাড়া দিচ্ছ না বা লিজ নাওনি বলে তোমাকে রেলের এলাকায় ব্যবসা করতে দেওয়া হবে না, তাহলে সমাধান খুব সহজ। এই হকার, বস্তিবাসী, টোটোচালক, অটোচালকদের সঙ্গে কাগজে কলমে চুক্তি করা। তাতে রেলেরও আয় হয়, এঁদেরও চোখের জল ফেলতে হয় না।

অবশ্য যদি উচ্ছেদই উদ্দেশ্য হয়, তাহলে এসব ভাবার প্রয়োজন নেই। সরকারি সম্পত্তি মানে যে আসলে নাগরিকের সম্পত্তি— সেকথা কজন নাগরিকই বা জানে, বোঝে এবং বিশ্বাস করে? সমাজের উপর থেকে নিচ পর্যন্ত সকলকে জানানোর ব্যবস্থা তো কোনোদিন করাই হয়নি। আর এখন তো কে নাগরিক তা ঠিক করছে রাষ্ট্র। ফলে যদি কাল রেলের জমিতে ব্যবসা করা বা বসবাস করা মানুষকে অনাগরিক বলে প্রতিষ্ঠা করে দেওয়া হয়, তাহলেই মুশকিল আসান। যে নাগরিক নয় তার আবার অধিকার কী? বুলডোজার চালানোর চেয়ে এটা করা সহজ কাজ। বুলডোজার চালিয়ে দোকানপাট, ঘরদোর ভেঙে দিতে গিয়ে খামোকা বহু জায়গায় রক্তারক্তি হচ্ছে। সরকারবিরোধী নেতাদের হাজতে পুরতে হচ্ছে। তাতে তাদের প্রতি সাধারণ মানুষের সমর্থন নতুন করে তৈরি হচ্ছে। এসব বাজে ঝামেলার কোনো মানে হয়?

অ2অনুস্বর ডট কম ওয়েবসাইটে প্রকাশিত

গণতন্ত্রের কঙ্কাল দেখিয়ে দিলেন জিতু মুন্ডা

যে ‘গণতন্ত্রের উৎসব’ সম্পর্কে আমাদের প্রত্যাশা নামতে এইখানে এসে ঠেকেছে— এ থেকেই প্রমাণ হয় যে ভারতীয় গণতন্ত্রের চামড়া, মাংস, মজ্জা সব খুবলে খাওয়া হয়ে গেছে। পড়ে আছে কঙ্কাল।

নির্বাচনের ভরা মরশুমে একথা বললে নিশ্চয়ই মহাপাপ হবে যে গণতন্ত্র মানে কেবল ভোট দেওয়া, ভোট নেওয়া আর সরকার গঠন নয়। কিন্তু আমরা অনেকেই অনেক পাপ জানতে বা অজান্তে রোজ করে চলেছি। সুতরাং এ পাপও করেই ফেলা যাক। পশ্চিমবঙ্গে এবারে যেভাবে ভোট হচ্ছে, তার সঙ্গে নাজি জার্মানির নির্বাচনের মিল খুঁজতে খুব বেশি কষ্ট করতে হবে না, অমিল বোধহয় একটাই— এখনো কোনো বুথে ভোটারের পাশে দাঁড়িয়ে সশস্ত্র বাহিনীর লোককে কাকে ভোট দেওয়া হচ্ছে নজর রেখেছে বলে খবর নেই। আশা করা যাক, দ্বিতীয় দফার শেষেও অন্তত এইটুকু সান্ত্বনা থাকবে যে তেমনটা হয়নি। এই যে ‘গণতন্ত্রের উৎসব’ সম্পর্কে আমাদের প্রত্যাশা নামতে এইখানে এসে ঠেকেছে— এ থেকেই প্রমাণ হয় যে ভারতীয় গণতন্ত্রের চামড়া, মাংস, মজ্জা সব খুবলে খাওয়া হয়ে গেছে। পড়ে আছে কঙ্কাল।

ব্যাপারটা একেবারে সাদা চোখে দেখতে পাওয়ার ব্যবস্থা করে দেওয়ার জন্যে ধন্যবাদ প্রাপ্য আমাদের প্রতিবেশী রাজ্য ওড়িশার কেওনঝার জেলার বাসিন্দা জিতু মুন্ডার। ‘আমরা পৃথিবীর বৃহত্তম গণতন্ত্র, আমরা পৃথিবীর চতুর্থ বৃহত্তম অর্থনীতি’ বলে গোরিলা গোষ্ঠীর দলনেতার মত বুক বাজানো আমাদের অভ্যাসে দাঁড়িয়ে গেছে। কিন্তু জিতুকে মাত্র হাজার বিশেক টাকা ব্যাংক থেকে তোলার জন্যে যা করতে হয়েছে, তাতে প্রমাণ হয় যে পৃথিবীর যে কোনো গোরিলা সমাজ আজকের ভারতের চেয়ে সভ্য। গোরিলা সমাজে প্রয়াত বোনের কষ্টার্জিত ফলমূল অধিকার করতে বোনের কঙ্কাল মাটি খুঁড়ে তুলে এনে অপেক্ষাকৃত বেশি ক্ষমতাশালী গোরিলার সামনে যে রাখতে হত না— একথা ডায়ান ফসির মত কোনো বিশেষজ্ঞকে জিজ্ঞেস না করেই হলফ করে বলা যায়। জিতুর বোন গবাদি পশু বিক্রি করে ওই কটা টাকা পেয়েছিলেন, তারপর তাঁর মৃত্যু হয়। হতদরিদ্র জিতুকে বারবার ব্যাংকে গিয়ে শুনতে হয়েছে— মৃত্যুর প্রমাণ চাই, অর্থাৎ কাগজ চাই। জিতুর পক্ষে ‘কাগজ দেখাব না’ বলার বিলাসিতা করা সম্ভব নয়, এদিকে তাঁর কাগজও অমিল। জিতুর মত আদিবাসী, প্রান্তিক মানুষের কাছে অনেক কাগজই থাকে না। আগামীদিনে ওড়িশায় এসআইআর হলে হয়ত জিতুকে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার বাইরে ছুড়ে ফেলা হবে, যেভাবে পশ্চিমবঙ্গের ৬৬ লাখ মানুষকে ফেলা হয়েছে (অধিকাংশের কাগজ থাকা সত্ত্বেও)। এমনই রক্তমাংসহীন হিংস্র একটা ব্যবস্থা আমাদের দেশে গণতন্ত্রের নামে চলছে।

অনেকেই বলবেন, ব্যাংকের সঙ্গে গণতন্ত্রের সম্পর্ক কী? কারণ শুরুতেই বললাম, গণতন্ত্র মানে কেবল ভোট— একথা বিশ্বাস করা আমাদের বদভ্যাসে দাঁড়িয়ে গেছে। নিজের টাকা বা প্রয়াত নিকটাত্মীয়ের ব্যাংকে গচ্ছিত টাকা তোলা যে একজন মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার— তা আমাদের মনেই হয় না। যে কোনোদিন যে কোনো ব্যাংকে গেলেই কোনো না কোনো মানুষকে দেখা যায় মৃত আত্মীয়ের টাকাপয়সার ব্যাপারে এসেছেন। ব্যাংক থেকে কিছু কাগজপত্রের তালিকা দিয়ে দেওয়া হয় ভাবলেশহীন মুখে। তার মধ্যে অবশ্যই থাকে KYC, যা জীবিত অবস্থায় ওই গ্রাহক নির্ঘাত ৯৯ বার জমা দিয়েছেন। ডিজিটাল ইন্ডিয়াতেও কেন ব্যাংকের একজন গ্রাহককে বারবার KYC জমা দিতে হবে— এ প্রশ্ন করা হলে নিম্নতম ব্যাংককর্মী থেকে জেনারেল ম্যানেজার পর্যন্ত সকলেই হাত উলটে উত্তর দেন— নিয়ম। এমন নির্বোধ নিয়ম আছে কেন, বাতিল হচ্ছে না কেন— এসব প্রশ্ন আমরা করি না। নিয়ম যে দৈবনির্দেশিত নয়, মানুষের তৈরি, তাতে গোলমাল থাকতে পারে এবং তা পরিবর্তনযোগ্য— সেকথা আমরা ভুলে গেছি। যেমন আমরা মাঝেমধ্যে কাগজে পড়ি বা হাতের মোবাইলে দেখতে পাই, অমুক জায়গায় তমুক লোক আধার কার্ডের বায়োমেট্রিক্স মেলেনি বলে সরকারি প্রকল্পের টাকা পাচ্ছেন না। তারপর আমরা স্ক্রোল করে অন্যকিছুতে চলে যাই। ২০১৮ সালে আমাদের আরেক প্রতিবেশী রাজ্য ঝাড়খণ্ডের পাকুড় জেলার লুখি মুর্মু অনাহারে মারা গিয়েছিলেন ২৩ জানুয়ারি, কারণ অক্টোবর মাস থেকে বায়োমেট্রিক্স মিলছিল না বলে রেশন তুলতে পারেননি। ওই রেশন ছিল তাঁর বেঁচে থাকার চাবিকাঠি। এসব দেখে আমরা আধার কার্ড সম্পর্কে কোনো প্রশ্ন তুলি না। অথচ সুপ্রিম কোর্ট ২০১৬ সালেই রায় দিয়েছে যে সরকারি প্রকল্পে আধার কার্ড ব্যবহার করা যেতে পারে, কিন্তু বাধ্যতামূলক করা যাবে না।

এগুলো আমাদের গণতান্ত্রিক আলোচনার বিষয় নয়। কারণ আমাদের বায়োমেট্রিক্স মেলা না মেলা নিয়ে ভাবতে হয় কেবল মোবাইলের নতুন সিম কার্ড দরকার হলে। দোকানের মালিক বা কর্মচারীদের নিজেদের দায় সিম বিক্রি করা, তাই তারা বেজায় ভদ্রতা করে। আধার না মিললে ‘ভোটার কার্ড আর প্যান কার্ড দিয়ে হয়ে যাবে স্যার’। জিতুর বা লুখির কাছে হয়ত জরুরি কাগজ নেই, বিকল্প কাগজও নেই। কিন্তু তাঁদের জন্যে কেউ অন্য রাস্তার খোঁজ করবে না। কারণ তাঁদের ক্রয়ক্ষমতা নেই, তাই কানাকড়ি দাম নেই। না দোকানে, না ব্যাংকে, না নির্বাচন কমিশনের কাছে। কারণ আমাদের ব্যবস্থায় মানুষের দাম (পড়ুন বৈধতা, শুনতে গণতান্ত্রিক হবে) মানুষ দিয়ে নয়, কাগজ দিয়ে। কোন কাগজ? সেটা আবার ব্যাংক বা রাষ্ট্র ইচ্ছামত বদলে ফেলতে পারে রোজ। পশ্চিমবঙ্গের এসআইআরে ঠিক তাই হয়েছে, এখনো হয়ে চলেছে। ভোটার তালিকায় উঠে যাওয়া নামও এখন ট্রাইব্যুনালের আদেশে বাদ হয়ে যাচ্ছে।

এদিকে এসআইআরে বাদ যাওয়া বিচারাধীন ভোটারদের মধ্যে যাঁদের বিচার হয়েছে, তাঁদের প্রায় ৯৯% বৈধ ভোটার বলে গণ্য হয়েছেন। মানে তাঁদের অবৈধ ঘোষণা করার কোনো কারণই ছিল না। অর্থাৎ গণতন্ত্রের লাগাম আর জনগণের হাতে নেই। এখনো কেউ কেউ ভোট দিতে পারছেন, এই যা। মানে ওই কঙ্কালটাই এখনো অবশিষ্ট আছে। তারও উপকারিতা আছে, দেখালে একটু-আধটু অধিকার পাওয়া যায়। জিতু যেমন ব্যাংকের দরজার সামনে বোনের কঙ্কালটাকে শুইয়ে দেওয়ায় হঠাৎ ব্যাংক সদয় হয়ে গেছে, তাদের KYC-র প্রয়োজনও রাতারাতি মিটে গেছে। জিতুর হাতে বোনের গচ্ছিত টাকা তো তুলে দেওয়া হয়েছেই, সঙ্গে সাহায্য বাবদ আরও টাকা দেওয়া হয়েছে। আহা! দয়ার শরীর বাবুদের!

আরও পড়ুন ভোটচুরির অভিযোগ আমাদের এনে ফেলেছে এক সন্ধিক্ষণে

আমরা অনেকে অবশ্য এটুকু গণতন্ত্রেই খুশি। আমাদের আধ কোটি সহনাগরিক বিনা দোষে ভোট দিতে পারলেন না, তাতে কী হয়েছে? রিগিং হলেও তো কত লোক ভোট দিতে পারে না। আমি ভোট দিতে পারছি মানেই গণতন্ত্র সজীব। আমাদের ফ্ল্যাটের বাইরে পর্যন্ত পা রাখতে হচ্ছে না, হাউজিংয়েই বুথ হয়েছে। এমন গণতন্ত্র কোথাও খুঁজে পাবে নাকো তুমি। রাজ্যটা কাশ্মীর এবং সব নিয়মকানুনের বাইরে চলে যাওয়া মণিপুরের চেয়েও বেশি সশস্ত্র বাহিনীতে ভরে গেল দেখে আমরা আরও নিশ্চিত হচ্ছি যে দেশে গণতন্ত্র বেঁচে আছে। ফরসা টুকটুকে, সুবেশী, হিন্দিভাষী পুলিশ অফিসার আঙুল উঁচিয়ে গ্রামে ঢুকে লোককে শাসাচ্ছেন দেখে আমাদের দারুণ লাগছে। কারণ আমরা হিন্দি সিনেমায় নায়ককে ওরকমভাবে খলনায়ক ও তার দলবলকে শাসাতে দেখেছি। মিডিয়া আবার বলছে, লোকটা ‘এনকাউন্টার স্পেশালিস্ট’। সোনায় সোহাগা। যে অফিসাররা এনকাউন্টার করে তাদের মত বাহাদুর যে আর হয় না, সে তো আমরা সেই অব তক ছপ্পন থেকেই জানি। মিডিয়া লোকটার নাম দিয়েছে সিঙ্ঘম। ওই ছবিটা আরও সাম্প্রতিক, ফলে আমাদের আরও ভালো মনে আছে। অতএব আমরা আহ্লাদে আটখানা। যে লোক আইন আদালতের তোয়াক্কা না করে সোজা ঠুকে দেয়, তার হাতেই যে আমাদের গণতন্ত্র সবচেয়ে নিরাপদ— এতে আর সন্দেহ কী? বিশেষত যার পরিবার পরিজনকে শাসাচ্ছে, সে নিজেই যখন অনেকের মতে অপরাধী। উত্তরপ্রদেশের মত, জাহাঙ্গীরের বাড়ির উপরেই বুলডোজার চালিয়ে দিলে আমরা আরও নিশ্চিত হতে পারতাম যে আমাদের গণতন্ত্রের এই রক্ষীটি জবরদস্ত। ডান, বাম নির্বিশেষে আমাদের এই যে ভাবনা— এটাই প্রমাণ করে যে গণতন্ত্রের কঙ্কালকে জ্যান্ত জিনিস বলে ভুল করছি। জিতু একেবারে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিলেন।

কঙ্কালপুজোর শুভেচ্ছা।

নাগরিক ডট নেট ওয়েবসাইটে প্রকাশিত

এসআইআর মওকায় অনুপ্রবেশ নিয়ে কিছু কথা

যার ওই তথাকথিত যোগ্যতা নেই, টাকা বা পরিচিতিও নেই, তারও কিন্তু উন্নততর জীবনের অভিলাষ আছে। সেই জীবনকে ধাওয়া করার মানবিক অধিকারও আছে। কথাটা যেমন ভারত থেকে যে আমেরিকায় যেতে চায় তার বেলায় সত্যি, তেমন যে বাংলাদেশ থেকে ভারতে আসতে চায়, তার বেলাতেও সত্যি। এই লোকগুলো তাহলে কী করে? বেআইনি পথে বাংলাদেশ থেকে ভারতে ঢোকে, বা ভারত থেকে আমেরিকায় যায়। রাষ্ট্রের ভাষায় বললে— অনুপ্রবেশ করে।

সম্প্রতি নাগরিক ডট নেটের পডকাস্টে এসে সিপিএম নেতা সৃজন ভট্টাচার্য বলেছেন ‘অনুপ্রবেশ শুধু ধর্মীয় কারণে ঘটে না।’ সবিস্তারে বলেছেন— সারা পৃথিবীতেই মানুষ নিজের দেশ থেকে উন্নততর অর্থনীতির দেশে যাওয়ার চেষ্টা করে, ফলে এটা সারা পৃথিবীর সমস্যা। এই কথাগুলো রিল হিসাবে ছড়িয়ে পড়তেই এক শ্রেণির মানুষ রেগে কাঁই হয়েছেন। সেই মওকায় আরও চাট্টি কথা বলে নেওয়ার ধান্দায় এই লেখার অবতারণা।

সৃজন যা বলেছেন তাকে তথ্য হিসাবে অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই। ওই ভিডিওর নিচে ছাপার অযোগ্য ভাষায় যাঁরা মন্তব্য করে যাচ্ছেন, তাঁরা নিজেরাই অনেকে অন্য দেশে বসে আছেন বিভিন্ন পেশার সঙ্গে যুক্ত হয়ে। অমৃতকালের ভারত বা তার আগের ভারত পেশাগতভাবে বা জীবনযাত্রার অন্য মাপকাঠিতে তাঁদের খুব পছন্দের জায়গা হলে নিশ্চয়ই বিদেশে গিয়ে বসবাস করতেন না। সোশাল মিডিয়ায় বামপন্থী বা উদারপন্থী চিন্তাভাবনাকে আক্রমণ করা যাঁদের দৈনন্দিন কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছে গত এক যুগে (পারিশ্রমিকে বা বিনা পারিশ্রমিকে), তাঁদের বড় অংশ তথ্যপ্রযুক্তি ক্ষেত্রের ইঞ্জিনিয়ার এবং ওই পেশার বহু মানুষের গত দুই-আড়াই দশক ধরেই জীবনের লক্ষ্য— কোম্পানির কাজে প্রথম বিশ্বের দেশগুলোতে যাওয়া, তারপর সেই কাজটাকেই স্থায়ী করে নিয়ে, অথবা অন্য কোনো কোম্পানির চাকরি নিয়ে, সেদেশেই থিতু হওয়া। অনেকে তো এক দেশ থেকে আরেক দেশে ভেসেও বেড়ান। দেশে ফেরার কোনো আশু পরিকল্পনা নেই, সুদূর ভবিষ্যতেও নেই। অথচ মানুষ উন্নত অর্থনীতির দেশে চলে যেতে চায় শুনলেই এঁরা তেলে বেগুনে জ্বলে ওঠেন। অবশ্য ওঁরা বলবেন ‘সেটা অভিবাসন, অনুপ্রবেশ নয়।’ সে প্রসঙ্গে আসব, ফাঁকি দেব না।

বলতে দ্বিধা নেই, বছর দশ-পনেরো আগেও, যারা পড়াশোনা করতে বা স্বল্পমেয়াদি কাজের সূত্রে আমাদের দেশ থেকে বিদেশে গিয়ে সেখানকার স্থায়ী বাসিন্দা হয়ে যায়, তাদের খুব ভালো চোখে দেখতাম না। প্রথম বিশ্বের দেশগুলোকে ২০০ বছর ধরে অন্য কোনো দেশ শোষণ করেনি, বরং ভারতের মত দেশগুলোকে শুষেই ওরা ধনী হয়েছে। সুতরাং এদেশের চেয়ে ওসব দেশের জীবনযাত্রা, কাজের সুযোগ ইত্যাদি উন্নত হওয়ারই কথা। সেসবের জন্যে এদেশের গরিব, মধ্যবিত্ত মানুষের ভর্তুকির টাকায় লেখাপড়া শেখা (সরকারি ভর্তুকির জন্যেই এদেশে লেখাপড়ার খরচ কম ছিল বছর পনেরো আগে পর্যন্তও। সরকারের টাকা মানে সাধারণ মানুষের করের টাকা, আর কর মানে কেবল আয়কর নয়) যেসব ছেলেমেয়ে বিদেশেই থেকে যেত, তাদের সম্বন্ধে ‘পলাতক’ শব্দটাই আমি ব্যবহার করতাম। এখন আর করি না, কারণ একাধিক কারণে আমার মত বদলেছে।

প্রথমত, স্বাধীনতার ৮০ বছর হতে চলল, এখনো আমরা দেশটাকে এমন করে তুলতে পারিনি, যেখানে সাদামাটা মানুষও জীবনের ন্যূনতম প্রয়োজনগুলো সুস্থভাবে সোজা পথে মিটিয়ে শান্তিতে বসবাস করতে পারে। উচ্চাকাঙ্ক্ষী হলে তো কথাই নেই। ফলে ইতিহাসের নিয়ম মেনে মানুষ উন্নততর জীবনযাত্রার দিকে দৌড়বেই। এমনকি আদিম মানুষও তাই করত, নইলে মানুষ নামক প্রাণীটি কখনো আফ্রিকা মহাদেশ ছেড়ে বেরোত না (যাঁরা জীববিজ্ঞান ও ইতিহাস মানেন না, তাঁরা এই লেখা পড়া এখানেই বন্ধ করে দিন)।

দ্বিতীয়ত, ভারতের বেশকিছু সম্প্রদায়ের জন্যে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে দেশের অবস্থা শেষ দেড় দশকে এমন করে ফেলা হয়েছে যে সেই সম্প্রদায়ের যে কোনো মানুষই সুযোগ থাকলে দেশ ছেড়ে চলে যেতে চাইবে। তাদের উপরেও রাগ করা চলে না।

তৃতীয়ত, দেশ আর রাষ্ট্র এক জিনিস নয়। আমরা দুটোকে সমার্থক শব্দ বলে ভাবি, কিন্তু আসলে তা নয়। রাষ্ট্র প্রশাসনিক ব্যাপার, দেশ মূলত মনোভূমি। ফলে ভারত রাষ্ট্রের ভূগোল আছে, সরকার আছে। ভারত দেশটার ভূগোল নেই, ইতিহাস আছে। সরকার নেই, সংস্কৃতি আছে। কেউ বুকে করে সেই সংস্কৃতি পৃথিবীর যে কোনো প্রান্তে নিয়ে গিয়ে বাস করতে পারে। সেই কারণেই গ্রীন কার্ড পেয়ে যাওয়া লোকও আমেরিকায় ভারতীয় ক্রিকেট দলের ম্যাচ হলে নীল জার্সি পরে গলা ফাটাতে পারে। মার্কিন রাষ্ট্রের নাগরিকের দায়িত্ব পালন করেও পারে। তার উপর ভারত এমন মজার দেশ যে ভারতীয় সংস্কৃতি মানে আসলে সাড়ে বত্রিশ ভাজা ‘একটি বিরাট হিয়া’। হিয়া মানে মন। সুতরাং ভারতীয় হিয়া যে পৃথিবীর যেখানে নিয়ে যেতে পেরেছে, সেখানেই ভারত আছে বললে ভুল হয় না। যার মনটা ভারতীয়, সে-ই ভারতীয়। তার ধর্ম যা-ই হোক, মুখের ভাষা যা-ই হোক, পেশা যা-ই হোক, বড়লোকই হোক আর গরিবই হোক। ভারতে থাকুক আর না-ই থাকুক। একথা মাথায় ঢোকার পরে আর অনাবাসী ভারতীয়দের উপর রাগ করি না। কিন্তু এইসব প্রিয় কথা বলতে গেলেই কিছু অপ্রিয় কথা এসে পড়ে, যেগুলো বর্তমান আলোচনায় প্রাসঙ্গিক।

উন্নততর জীবনের সন্ধানে যাওয়া আসলে সব মানুষের জন্মগত অধিকার, অথচ দুনিয়ার কোনো রাষ্ট্র সেকথা স্বীকার করে না। তাই এক দেশ থেকে আরেক দেশে ভাগ্যান্বেষণে যেতে হলে নিজের এবং যে রাষ্ট্রে যেতে চান, দুপক্ষেরই সম্মতি আদায় করতে হয়। মানে পাসপোর্ট, ভিসা, ওয়ার্ক পারমিট, পরে নাগরিকত্ব ইত্যাদি। ওগুলো পেতে কী লাগে? আপনি বলবেন যোগ্যতা, আসলে লাগে টাকা এবং/অথবা পরিচিতি। ভেবে দেখুন, নিজেই বুঝতে পারবেন। GRE, CIEFL, TOEFL না কীসব আছে আপনাদের? সেগুলো পাশ না করে কি কেউ বিদেশ যাচ্ছে না, নাকি গিয়ে বাসিন্দা হয়ে যাচ্ছে না? আপনি যাকে যোগ্যতা বলছেন, সেটা কীসের যোগ্যতা? আপনাকে অন্য দেশে ঢোকার অনুমতি আদায় করে দেবে সেদেশের কেউ (আপনি যেখানে পড়তে বা পড়াতে যাচ্ছেন সেই শিক্ষা প্রতিষ্ঠান অথবা আপনি যে কোম্পানির চাকুরে) – এই ব্যবস্থা করার যোগ্যতা।

এখন কথা হল, যার ওই তথাকথিত যোগ্যতা নেই, টাকা বা পরিচিতিও নেই, তারও কিন্তু উন্নততর জীবনের অভিলাষ আছে। সেই জীবনকে ধাওয়া করার মানবিক অধিকারও আছে। কথাটা যেমন ভারত থেকে যে আমেরিকায় যেতে চায় তার বেলায় সত্যি, তেমন যে বাংলাদেশ থেকে ভারতে আসতে চায়, তার বেলাতেও সত্যি। এই লোকগুলো তাহলে কী করে? বেআইনি পথে বাংলাদেশ থেকে ভারতে ঢোকে, বা ভারত থেকে আমেরিকায় যায়। রাষ্ট্রের ভাষায় বললে— অনুপ্রবেশ করে। এ তো গেল আরও ভালো জীবনের আকাঙ্ক্ষায় দেশ বদলানোর কথা। এছাড়া স্রেফ প্রাণে বাঁচতেও মানুষ এক রাষ্ট্র থেকে আরেক রাষ্ট্রে যায়। তাদের উদ্বাস্তু বলাই দস্তুর, কিন্তু যখনই কোনো রাষ্ট্রের মনে হয় ‘ব্যাটারা বড্ড বেশি সংখ্যায় আসছে’, তখনই লাঠিসোটা গুলি বন্দুক বের করে তাদের তাড়াতে লেগে পড়ে। তখন আর উদ্বাস্তু বলে না, বলে অনুপ্রবেশকারী।

কোনটা অনুপ্রবেশ আর কোনটা নয়, সেটা ঠিক করে রাষ্ট্র। আর সংজ্ঞাটা সে যেদিন ইচ্ছে যখন ইচ্ছে বদলে ফেলতে পারে। উদ্বাস্তুদের কথা বাদ দিন। আপনি হয়ত রাতে ঘুমোলেন নাগরিক হিসাবে, সকালে উঠে দেখলেন অনুপ্রবেশকারী হয়ে গেছেন। এই কথাটা কমাস আগে বললেও অনাবাসী বন্ধুরা নির্ঘাত হেসে উড়িয়ে দিতেন, এখন আর পারবেন না। ডোনাল্ড ট্রাম্পের মুখটা একবার মনে করে দেখুন। কদিন আগেই হাড়ে ঠকঠকানি ধরিয়ে দিয়েছিলেন না? স্বীকার না করলেও, অনেকের হাড় এখনো ঠকঠক করেই চলেছে। তা সত্ত্বেও কিন্তু ‘পশ্চিমবঙ্গে বড্ড বেশি বাংলাদেশি আর রোহিঙ্গা ঢুকে পড়েছে’ বলে রাতে ঘুম না হওয়া বাঙালি বাবা-মায়েরা ছেলেমেয়েকে কী করে বিদেশে পাঠানো যায় তার খোঁজখবর জারি রেখেছেন। ‘আমার ছেলে স্টেটসে থাকে’ বলে বিয়েবাড়িতে দূর সম্পর্কের আত্মীয় এবং নতুন পরিচিতের কাছে রেলা নেওয়াও জারি আছে। কয়েক মাস আগে এক বিয়েবাড়িতে তেমন এক আত্মীয়ের সঙ্গে আমার কথা হচ্ছিল। তাঁর ছেলেও ‘স্টেটসে থাকে’, তার উপর বউমা আমেরিকান। স্বভাবতই ভদ্রমহিলা মাটির দু ইঞ্চি উপর দিয়ে হাঁটেন। বউমা আমিষ খান না, কারণ তিনি ‘অ্যানিমাল ক্রুয়েলটি’-র বিরুদ্ধে। সমাজবিজ্ঞান নিয়ে লেখাপড়া করে এখন কী একটা এনজিও-তে ‘আন্ডার-প্রিভিলেজড’ মানুষের জন্য কাজ করেন। গর্বিত শাশুড়ি এসব শোনাচ্ছিলেন আমাদের। বাঙালিসুলভ বোকামিতে জিজ্ঞেস করে ফেলেছিলাম ‘আপনার ছেলে-বউমা কি তাহলে ডেমোক্র্যাট?’ উত্তর এল ‘সেরকম কিছু না, যার যেটা ভালো সেটা বলে। আমার বউমা যেমন বলে, ট্রাম্প ইজ দ্য বেস্ট প্রেসিডেন্ট।’ এই কথোপকথনের আগেই H1B ভিসা নিয়ে ট্রাম্পের বিষোদ্গার শুরু হয়ে গেছে। আমার মনে তার চেয়েও দগদগে ঘা তৈরি করেছে ভারতীয়দের হাতে-পায়ে শেকল বেঁধে বিমানে তুলে আমেরিকা থেকে বের করে দেওয়ার দৃশ্য।

সেসব উল্লেখ করে জিজ্ঞেস করলাম— এসব কাণ্ড করে ট্রাম্প কী করে মার্কিন বউমার চোখে সেরা রাষ্ট্রপতি হন? বাঙাল (নিজেই বললেন) শাশুড়ি উত্তর দিলেন ‘না, ওরা তো বেআইনিভাবে আমেরিকায় গেছিল। ওরা তো অনুপ্রবেশকারী। ওরা আমেরিকায় গেছে স্রেফ টাকা রোজগার করতে। ওদের তো বের করে দিতেই হবে’। উত্তরে বলেই ফেললাম, আপনার ছেলেও তো টাকা করতেই গেছে। ভদ্রমহিলার উত্তর ‘আমার ছেলে তো পাসপোর্ট, ভিসা করিয়ে গেছে।’ অর্থাৎ ঘুরে ফিরে ব্যাপারটা দাঁড়াল ওই— রাষ্ট্রের দেওয়া কাগজ যাকে অভিবাসী বলে সে-ই অভিবাসী, অন্যরা অনুপ্রবেশকারী। এই কাগজ জোগাড় করা কিন্তু যোগ্যতার ব্যাপার নয়, নেহাতই রাষ্ট্রের দয়া। এ দয়া যদি ১৯৪৭ সালের পরে ভারত রাষ্ট্র না দেখাত, তাহলে আজ যে বাঙালরা এবিপি আনন্দ ইত্যাদি চ্যানেলে দেখানো হাজার হাজার লোকের বাংলাদেশে পালানোর ভুয়ো ভিডিও দেখে উল্লসিত, এসআইআরে বাদ পড়া লোকেরা ঢিট হয়েছে ভেবে নাচছেন, তাঁদের বাপ-মায়েরা কিন্তু অনুপ্রবেশকারী হয়ে যেতেন।

তবে একটা কথা মানতেই হবে। ট্রাম্প, তাঁর উপরাষ্ট্রপতি জে ডি ভান্স, যতই অভিবাসীদের বাড়ির মেয়ে বিয়ে করে ভণ্ডামি করুন, নরেন্দ্র মোদীর বিজেপির কিন্তু অন্য দেশ থেকে আসা লোকেদের ব্যাপারে চিন্তাভাবনা অনেক পরিষ্কার। তথাগত রায় যখন রাজ্য সভাপতি ছিলেন, সেই জুরাসিক যুগ থেকে বঙ্গ বিজেপি বলে আসছে— বাংলাদেশ থেকে আসা মুসলমানরা অনুপ্রবেশকারী, হিন্দুরা শরণার্থী। কেন্দ্রে একক শক্তিতে ক্ষমতায় আসার পরে তারা নাগরিকত্ব আইনের যে সংশোধন করেছে, তাতেও এই ভাবনাকেই স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। এতক্ষণ ধরে যা যা বলেছি, সবকিছুর বিপরীতে পুরনো ও নতুন বাঙালরা সেই আইনকে তুলে ধরতে পারেন। কিন্তু ডেভিল (ডিমের নয়, বিজেপির প্রতি বিশ্বস্ত হতে চাইলে আমিষ-চিন্তা মাথা থেকে তাড়ান) যে ডিটেলে। এসআইআর থেকে বাদ দেওয়ার সময়ে কই হিন্দুদের রেখে দেওয়া হল না তো! এখন যে নিত্য হিন্দু বীর অমিত শাহ এসআইআর থেকে বাদ পড়া মানুষকে দেশছাড়া করার হুমকি দিচ্ছেন, তাতেও তো বলছেন না যে হিন্দুদের রেখে দেওয়া হবে? অনুপ্রবেশকারী আর শরণার্থী বলে দুটো গোষ্ঠীর কথা তো বলছেন না? একটা শব্দই তো ব্যবহার করছেন— ‘ঘুসপ্যায়েট’।

আরো পড়ুন রামদাসী, লালদাসের ধর্ম এবং রামমন্দির

আসামের ডিটেনশন ক্যাম্পেও কিন্তু কেবল মুসলমানদের ঢোকানো হয়নি। উলটে একাধিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ওই রাজ্যের ডিটেনশন ক্যাম্পে আটক বেশিরভাগ মানুষ হিন্দু বাঙালি

সংঘ পরিবারের সোশাল মিডিয়া যোদ্ধারা যে নেহাত পুতুলখেলায় লিপ্ত নন, সংঘের মনের কথাই যে তাঁদের মুখ দিয়ে বেরোয়— একথা যদি জানা থাকে, তাহলে বুঝতে অসুবিধা হওয়ার কথা নয় যে এক্ষেত্রেও অমিত শাহরা অত্যন্ত সৎ। কারণ ওঁদের আই টি সেলের লোকেরা ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বাসিন্দা হিন্দুদের জন্যে কেঁদে ভাসালেও তাদের এদেশে আশ্রয় নেওয়ার প্রসঙ্গ উঠলেই বলে ‘দেশটা কি ধর্মশালা নাকি?’ অর্থাৎ এঁদের হিন্দু বাঙালির প্রতি প্রীতি আসলে, গোদা বাংলায় যাকে বলে, মায়ের চেয়ে মাসির দরদ বেশি। মানে আহা উহু করব, কিন্তু দায়িত্ব নেব না। তাহলে আহা উহু করাই বা কেন, ভেবে দেখেছেন কি? কারণটা খুব সহজ। যাতে ওদেশের সংখ্যালঘুর প্রতি অত্যাচারকে এদেশের সংখ্যালঘুর অত্যাচারের পক্ষে যুক্তি হিসাবে তুলে ধরা যায়। মানে শুঁড়ির সাক্ষী যেমন মাতাল, সংঘ পরিবারের সাক্ষী জামাত। মুশকিল হল, বাংলাদেশের মানুষ জামাতকে হারিয়ে ভূত করে দিলেন; পশ্চিমবঙ্গের মানুষের হিন্দুত্বের নেশা কিন্তু কাটছে না। আই টি সেল নিরুপায় হয়ে আঁকড়ে ধরেছে পশ্চিমবঙ্গের সীমান্তবর্তী আসনগুলোতে জামাতের জয়কে, তাই দিয়ে হোয়াটস্যাপ গ্রুপগুলোর মাধ্যমে ‘পশ্চিমবঙ্গ বিপন্ন, বাংলাদেশ হয়ে যাবে’ বলে ভয় দেখানো হচ্ছে। বাঙালি সে প্রোপাগান্ডা এখনো গিলছে। কারণ মুসলমানদের প্রতি অকারণ ভয় থেকে তৈরি হওয়া ঘৃণা এতদিনে ঘাড়ে এমন চেপে বসেছে যে সৃজন যখন বলছেন ‘রাষ্ট্র কোনোদিনই খুব ভালো জিনিস নয়’, তখন এঁরা মনে করছেন— পশ্চিমবঙ্গকে বাংলাদেশ বানানোর চক্রান্ত করছে। ফলে যে হিন্দুর নিজের নাম এসআইআরে বাদ পড়েনি, তিনি আর যাঁর নাম বাদ পড়েছে তাঁকে নিয়েও চিন্তিত নন। রাষ্ট্রের প্রতি এমন অচলা ভক্তি তৈরি হয়েছে যে ভেবে নিচ্ছেন— এমনি এমনি তো আর বাদ দেয়নি, ওরা হিন্দু হলেও নির্ঘাত বাংলাদেশ থেকে এসেছে।

এখন বুঝবেন না, যখন বুঝবেন তখন অনেক দেরি হয়ে যাবে জেনেও একবার বলে রাখা যাক— রাষ্ট্র, বিশেষ করে আধুনিক জাতিরাষ্ট্র, নেহাতই সেদিনের ছেলে। বয়স আড়াইশো-তিনশো বছরের বেশি নয় এবং জিনিসটা মানুষের তৈরি। যদি ভগবান বলে কেউ থেকেও থাকেন, তিনি রাষ্ট্রগুলোর সীমানা এঁকে দিয়ে পৃথিবীর রাজনৈতিক ম্যাপটা তৈরি করেননি। স্রেফ গত একশো বছরেই কতগুলো রাষ্ট্র তৈরি হয়েছে আর ভেঙে গেছে গুগল করে দেখে নিলেই চলবে, সৃজনকে বা এই নিবন্ধকারকে বিশ্বাস করার দরকার নেই।

সুতরাং মানুষের তৈরি রাষ্ট্র, নাগরিকদের সিদ্ধান্তে তৈরি রাষ্ট্র যখন নিজের মর্জি মত নির্ধারণ করে— এ নাগরিক আর ও নাগরিক নয়, তখন প্রতিবাদ করাই বুদ্ধিমানের কাজ। কারণ এ জিনিস একবার শুরু হলে থামবার নয়। কাল মর্জি বদলালে রাষ্ট্র নাগরিক হওয়ার মাপকাঠি বদলে দেবে। আজকের মাপকাঠিতে আপনি নাগরিক, সেদিনের মাপকাঠিতে বাদ পড়ে যেতে পারেন। কী করবেন তখন? আপনারাই তো বলেন— মুসলমানদের ভারতে থাকার দরকার নেই, তাদের যাওয়ার জন্যে নাকি ৫৭ খানা দেশ আছে। আপনাদের এই একটাই দেশ।

নাগরিক ডট নেট ওয়েবসাইটে প্রকাশিত

নির্বাচনে এবারও খেলা হবে, তবে রান্নাবাটি

আমরা যেমন বিহারের খবর রাখি না, তেমন ওড়িশার খবরও রাখি না। ফলে আমরা অনেকেই জানি না, সেখানে গত বিধানসভা নির্বাচনের ভোটগণনায় কী কাণ্ড হয়েছে।

এই লেখা যখন লিখছি, তখন পর্যন্ত আমার এলাকায় বিজেপি প্রার্থীর কোনো প্রচার চোখে পড়েনি। অথচ সিপিএম প্রার্থী অলিতে গলিতে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। প্রায় বাড়ি বাড়ি যাচ্ছেন, কোনো কোনো ফ্ল্যাটেও উঠে পড়ছেন। রাস্তায় বেরোলেই কোথাও না কোথাও তাঁর অথবা সিপিএমের অন্য কর্মীদের মিছিল, মিটিং চোখে পড়ছে। তৃণমূল প্রার্থীকেও হাত জোড় করে হাসি হাসি মুখ নিয়ে ঘুরে বেড়াতে দেখা গেছে। দেয়াল লিখনেও সিপিএম আর তৃণমূলের উপস্থিতিই চোখে পড়ছে, বিজেপি নেই। বিজেপি যে আছে তার প্রমাণ হিসাবে কোনো কোনো পাড়ায় তিনকোণা গেরুয়া পতাকা শোভা পাচ্ছে, তবে সেগুলো লাগানো হয়েছিল রামনবমী উপলক্ষে। হনুমানপুজোর দিনও এলাকায় গত কয়েক বছরে তৈরি হওয়া, হিন্দিভাষীপ্রধান ফ্ল্যাটগুলোর সামনে রাম, সীতা, হনুমানের কাট আউটের পাশে ওই পতাকাগুলো দেখা গেছে। কোনো কোনো বাইকচালককে ওই গেরুয়া পতাকা লাগিয়ে ঘুরতে দেখা যাচ্ছে, কিন্তু নির্বাচনী প্রচার বলতে যা বোঝায় তাতে বিজেপির বিশেষ উৎসাহ আছে বলে মনে হচ্ছে না। একাধিক কেন্দ্রের অধিবাসী পরিচিতদের সঙ্গে কথা বলে একইরকম তথ্য পাচ্ছি। এদিক ওদিক দু-একজন প্রার্থীর মাছ হাতে প্রচার করা বা প্রাক্তন এনএসজি কমান্ডোর সেই পোশাক পরে প্রচারে বেরিয়ে পড়ার মত ঘটনা বাদ দিলে, সংবাদমাধ্যম বা সোশাল মিডিয়াতেও কেন্দ্রের শাসক দলের প্রচারের প্রাবল্য নেই।

প্রশ্ন হল, এমন কেন হচ্ছে? বিজেপি কেবল ভারতের নয়, তাদের কথা অনুযায়ী, পৃথিবীর বৃহত্তম রাজনৈতিক দল। নির্বাচনী বন্ডের কল্যাণে এবং আরও নানা কারণে তাদের টাকাপয়সারও অভাব নেই যে খরচের কথা ভেবে প্রচারে রাশ টানতে হবে। তাহলে এই কার্পণ্য কেন? দীর্ঘদিন ধরে যাঁরা নির্বাচন দেখে আসছেন, তাঁদের কাছে এর সহজ ব্যাখ্যা হল— বিজেপির সংগঠন নেই। অতএব সিদ্ধান্ত হল— ভোট পাবে না। দুঃখের বিষয়, এই ব্যাখ্যা প্রাক-২০১৯ নির্বাচনগুলোর জন্যে নির্ভুল। কিন্তু সেবার থেকে দেখা গেছে— এ রাজ্যে বিজেপির সংগঠন নেই, ভোট আছে। বামপন্থীদের আবার নয় নয় করেও খানিকটা সংগঠন আছে, কিন্তু ভোট নেই। ২০১৯ লোকসভা নির্বাচন, ২০২১ বিধানসভা নির্বাচন এবং ২০২৪ লোকসভা নির্বাচন— প্রত্যেকবার ফল বেরোবার পর এই ব্যাপারটাই উপলব্ধি করা গেছে। এর কারণ বামের ভোট রামে চলে যাওয়া, নাকি তৃণমূল-বিজেপি সেটিং—সে আলোচনা এবারকার মত মুলতুবি থাক। কারণ পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার এবারের নির্বাচন অভূতপূর্ব। অথচ কথাটা বামপন্থীরা এবং তৃণমূল যেন বুঝেও বুঝতে চাইছে না। ফলে তাদের প্রচারকে রান্নাবাটি খেলা ছাড়া আর কিছু ভাবা যাচ্ছে না। শয়ে শয়ে লোক সঙ্গে নিয়ে, পার্টির পতাকায় এলাকা ছয়লাপ করে, ক্ষমতায় এলে পশ্চিমবঙ্গের ভোল পালটে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া বা গত ১৫ বছরের উন্নয়নের পাঁচালী শোনানোর যে কোনো মানে হচ্ছে না, সেকথা সাধারণ ভোটারদের কথাবার্তায় কান পাতলে দিব্যি টের পাওয়া যাচ্ছে। কিন্তু রাজনৈতিক দলগুলো যেন কানে গুঁজেছে তুলো আর পিঠে বেঁধেছে কুলো।

১) ৬ এপ্রিল রাতে নির্বাচন কমিশন দয়া করে বিচারাধীন থাকা ভোটারদের মধ্যে কাদের ভাগ্যে ভোটদানের শিকে ছিঁড়ল আর কাদের ছিঁড়ল না— তার সর্বশেষ তালিকা প্রকাশ করেছে। রাজ্যসুদ্ধ লাখ লাখ লোক উৎকণ্ঠায় জীবন কাটাচ্ছিলেন, সেই উৎকণ্ঠা সহ্য করতে না পেরে রিষড়ার মিনতি সেন আত্মহত্যা করেছেন বলেও অভিযোগ উঠেছে। সোশাল মিডিয়া খুললে আরও বহু মানুষের কথা জানা যাচ্ছে, যাঁরা গত কয়েক দিনে এই দুর্ভাবনায় অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। শেষমেশ জানা গেছে, ৬০ লাখের বেশি ভোটারের মধ্যে প্রায় ২৭ লাখ বাদ।

২) আগেই বাদ পড়েছিলেন ৫৮ লাখ, এবার আরও ২৭ লাখ। আগের ৫৮ লাখের মধ্যে অবশ্য কিছু মৃত ভোটার ছিল, তবে ডিসেম্বরের খসড়া তালিকা থেকেই জীবিতকে মৃত বানিয়ে দেওয়ার ঘটনাও ছিল। অনেক প্রগতিশীলও যা কীসব রাজনৈতিক অঙ্ক কষে মানতে চাইছিলেন না, তাও প্রমাণ হয়ে গেছে শেষ তালিকা বেরোবার পরে— মুসলমানদের বাদ পড়ার হার তাঁদের ভোটার তালিকায় উপস্থিতির হারের চেয়ে বেশি। অল্ট নিউজ এই তথ্য টেনে বের করেছিল কলকাতার দুটো বিধানসভা কেন্দ্রের বিশেষ নিবিড় সংশোধনী পরবর্তী ভোটার তালিকা থেকে, সবর ইনস্টিটিউট এই তথ্য বের করেছে বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারীর দুই কেন্দ্রের অন্যতম, নন্দীগ্রামের, তালিকা বিশ্লেষণ করে। উপরে দেওয়া নির্বাচন কমিশনের নিজের তালিকাতেও দেখা যাচ্ছে— মুর্শিদাবাদ, উত্তর ২৪ পরগণা, মালদার মত যে জেলাগুলোতে মুসলমান সম্প্রদায়ের মানুষ অন্যান্য জেলার তুলনায় বেশি, সেখানেই বাদ পড়া মানুষের সংখ্যা বেশি। তাছাড়া যাঁরা বাদ পড়েছেন, তাঁদের মধ্যে মহিলা, নিম্নবর্গীয় হিন্দু, আদিবাসীদের উপস্থিতি প্রধান। অর্থাৎ যাঁদের বিজেপিকে ভোট দেওয়ার সম্ভাবনা শূন্য থেকে শুরু, তাঁদের ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়ার ব্যবস্থারই ভালো নাম এসআইআর। বাংলাদেশের হিন্দুদের জন্যে এত প্রাণ কাঁদে বিজেপি নেতাদের, অথচ সেখান থেকে তাড়া খেয়ে চলে আসা মতুয়াদের উপরেও কোপ পড়েছে। আমরা ছাপ্পা ভোট দেখেছি, বুথ দখল দেখেছি, ‘সায়েন্টিফিক রিগিং’ শুনেছি, ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিনে কারচুপির অভিযোগও শুনতে পাই। গণনার সময়ে ব্যালট খেয়ে নেওয়া, ধানখেতে বা নালায় ফেলে দেওয়ার দৃশ্যও নতুন নয়। কিন্তু সেসবই ভোটদানের দিন বা ভোটদানের পরের ব্যাপার। ভোটগ্রহণের আগেই নির্বাচন জিতে নেওয়ার এমন ভবিষ্যনিধি প্রকল্প আমরা দেখিনি।

৩) ধরা যাক, আপনি নিরীহ লোক। আপনাকে মেরে ধরে এলাকার গুন্ডারা সর্বস্ব কেড়ে নিল। আপনি পুলিশের কাছে গেলেন, বাকি যা দু-চার পয়সা ছিল সেগুলোও তারা কেড়ে নিল, আপনি পথে বসলেন। এমতাবস্থায় আমাদের দেশের মানুষ কোনো একটা উপায় বের করতে পারলে যায় আদালতের কাছে। এক্ষেত্রেও তাই হয়েছিল। তা আমাদের সর্বোচ্চ আদালতের বিচারপতিদের এমন দয়ার শরীর যে তাঁরা বলেছেন যাদের নাম জজসাহেবদের বিচারেও বাদ গেছে, তাঁরাও ফের আবেদন করতে পারবেন। তবে তাঁদের আবেদনের নিষ্পত্তি হোক আর না-ই হোক, ভোট ভোটের সময়েই হতে হবে। যাঁরা এবার ভোট দিতে পারছেন না, তাঁরা নাহয় পরেরবার দেবেন। পৃথিবীর সব গণতান্ত্রিক দেশে ভোট হয় ভোটারের স্বার্থে। এখন ধর্মাবতাররা যা সিদ্ধান্ত নিলেন তাতে বোঝা গেল, পশ্চিমবঙ্গে ভোট হবে ভোটের স্বার্থে। ভোটার হলেন ফাউ। ভোটার জনপ্রতিনিধি নির্বাচন করবেন না, নির্বাচন কমিশন ভোটার নির্বাচন করবে। তারা না পারলে বিচারপতিরা করবেন। যেভাবে পারবেন সেভাবে করবেন, যখন ইচ্ছে হবে তখন করবেন। ভোটার অধিকার হারালে প্রতিবাদ করতেও পারবেন না। করলে পাইক, বরকন্দাজ ডাকা হবে, হাজতবাস হবে, ভোটার সন্ত্রাসবাদী কিনা তাও খতিয়ে দেখা হবে। ডিগ্রিধারী উচ্চবর্গীয় সাংবাদিকরা স্টুডিওতে বসে বিচারকদের জন্যে চোখের জল ফেলবেন আর প্রতিবাদী ভোটারদের ভীষণ বকে দেবেন।

৪) সন্ত্রাসবাদের কবলে থাকা কাশ্মীর বা বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনে দীর্ণ আট-নয়ের দশকের পাঞ্জাব বা উত্তর-পূর্বাঞ্চলের রাজ্যগুলো ছাড়া কোথাও কখনো নির্বাচনে এত বাইরে থেকে আনা সশস্ত্র বাহিনী ব্যবহৃত হয়েছে কিনা সন্দেহ। অনেকদিন যাবৎ একটা কথা চালু হয়েছে— ভোট নাকি গণতন্ত্রের উৎসব। এবারে দেখে মনে হচ্ছে যুদ্ধ। সে যুদ্ধে আসার জন্যে রওনা দেওয়ার আগে কেন্দ্রীয় বাহিনীর জওয়ানরা আবার অযোধ্যার রামমন্দিরে মাথা ঠুকে আসছেন। মানে যুদ্ধকে পশ্চিমবঙ্গের ভোটারদের চোখে একেবারে ধর্মযুদ্ধে পরিণত করার চেষ্টা। কীরকম নিরপেক্ষ ভোটদান নিশ্চিত করতে আসছে কেন্দ্রীয় বাহিনী, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।

৫) মানুষের ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়ার জন্যই যে এসআইআর, সেটা অবশ্য বাঙালি বুদ্ধিমানরা বিহারের এসআইআরের দিকে চোখ রাখলে প্রথমেই টের পেতেন। কিন্তু পাননি। যা-ই হোক, বিহারে ও জিনিস আগে করা হয়েছে বলেই বাংলায় যা হল তাকে অভূতপূর্ব বলা চলে না। তবে ভাববেন না, এসআইআরেই কমিশনের গাফিলতি শেষ হয়। আমরা যেমন বিহারের খবর রাখি না, তেমন ওড়িশার খবরও রাখি না। ফলে আমরা অনেকেই জানি না, সেখানে গত বিধানসভা নির্বাচনের ভোটগণনায় কী কাণ্ড হয়েছে। ফ্রন্টলাইন পত্রিকার এক প্রতিবেদন অনুযায়ী বহু বুথে যত ভোট পড়েছে (যার হিসাব থাকে ফর্ম ১৭সি-তে) আর যত ভোট গোনা হয়েছে (যার হিসাব থাকে ফর্ম ২০-তে) তা মেলেনি। বিজু জনতা দল ২০২৪ সালের ডিসেম্বর মাসে তাদের প্রেস নোটে জানায়— ১৪৭ খানা বিধানসভা কেন্দ্রের ৫৮ খানা বুথে পড়া ভোট আর গোনা ভোটের তফাত এক থেকে ৯০৮ পর্যন্ত পৌঁছেছে। দুটো চোখ কপালে তোলা উদাহরণ দিয়ে চক্করটি বোঝানো যাক। ফুলবনী কেন্দ্রের ৫৭ নম্বর বুথে ভোট পড়েছে ৬৮২, কিন্তু ফর্ম নং ২০ বলছে একটা ভোটও গোনা হয়নি। তালসারার ১৬৫ ও ২১৯ নম্বর বুথে মোট ১,৪৪৪ জন ভোট দিয়েছেন বলছে ফর্ম নং ১৭সি। অথচ ফর্ম নং ২০ বলছে ও দুটোরও কোনো ভোট গোনা হয়নি। উলটো উদাহরণও আছে। পদমপুরের ১৪ খানা বুথ মিলিয়ে নাকি ভোট পড়েছে ৮২, গোনা হয়েছে ৯,৩০৪। এসব নিয়ে বিজু জনতা দল দুবার নির্বাচন কমিশনে অভিযোগ জানিয়েছে, তথ্যের অধিকার আইনেও আবেদন জানিয়েছে। কেউ পাত্তা দেয়নি।

৬) কলকবজা কী আছে না আছে না জেনেও যেমন আমরা ট্রেনে বাসে চড়ি, সেভাবেই জনপ্রতিনিধিত্ব আইনে কী আছে বা অমুক নম্বর ফর্ম আর তমুক নম্বর ফর্ম দিয়ে কী হয় না জেনেও সেই ১৯৫২ সাল থেকে ভারতের মানুষ ভোট দিয়ে আসছিল। এবারে জ্ঞানেশ কুমারের দৌরাত্ম্যে আমরা কিছু কিছু কল বা গ্যাঁড়াকল সম্পর্কে জানতে বাধ্য হয়েছি। সেরকম দুটো গ্যাঁড়াকল হল ফর্ম নং ৬ আর ৭। এমনিতে ফর্ম নং ৬ খুবই নিরীহ জিনিস। ওটা দিয়ে ভোটার হওয়ার আবেদন করতে হয়। কিন্তু বিহারের অভিজ্ঞতা থেকে এবং পশ্চিমবঙ্গেও গত কয়েকদিনের অভিজ্ঞতায় আমরা জেনে গেছি যে, ওটা ব্যবহার করে ভিনরাজ্যের লোককে রাতারাতি ভোটার তালিকায় ঢোকানোর কাজ করা হয় বলে প্রচুর অভিযোগ আছে। সে কাজ করতে গিয়ে কিছু লোক হাতেনাতে ধরা পড়েছে বলে দাবি করেছে তৃণমূল কংগ্রেস, কিন্তু সব যে ধরা সম্ভব হবে না তা বলাই বাহুল্য। ফর্ম নং ৭-এর ব্যবহার আরও চমৎকার। ও দিয়ে কমিশনে অভিযোগ জানানো যায়— অমুক বৈধ ভোটার নয়, ওকে বাদ দিন। সেটাকে ব্যবহার করে মুসলমানদের বাদ দেওয়ার চেষ্টা করা হবে— একথা কিছুদিন আগে সগর্বে জানিয়েছিলেন আসামের বিজেপি মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মা। এসব সম্ভব হয় না নির্বাচন কমিশন ওই ফর্মগুলোর আবেদনকারীদের ব্যাপারে নিয়মমাফিক যাচাই করলে। কিন্তু তা কি করা হয়? হলে আসামের বিএলও সুমনা চৌধুরী, ফর্ম নং ৭-এর উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ব্যবহার ক্যামেরার সামনে ফাঁস করে দেওয়ার জন্যে, চাকরি থেকে সাসপেন্ড হলেন কেন? পশ্চিমবঙ্গেও গুচ্ছ গুচ্ছ ফর্ম নং ৭ নিয়ে ধরা পড়ার অভিযোগ উঠেছে বিজেপির কর্মীদের বিরুদ্ধে।

৭) নির্বাচন কমিশনের এতরকম কীর্তিকলাপ দেখে ভারতের প্রায় সব বিরোধী দল তার উপর আস্থা হারিয়েছে। ফলে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশকে অপসারণের প্রস্তাব এনেছিলেন বিভিন্ন দলের ১৯৩ জন সাংসদ। লোকসভার স্পিকার এবং রাজ্যসভার চেয়ারম্যান সেই প্রস্তাব নিয়ে আলোচনাই হতে দেননি। কোনো কারণও দেখাননি।

এই সাত কাণ্ড রামায়ণ জানার পরে, বিজেপি যে অমিত শাহ আর নরেন্দ্র মোদীর জনসভা ছাড়া প্রচারে বিশেষ মন দিচ্ছে না, তাতে অবাক হওয়ার কিছু থাকে কি? অন্যদিকে পশ্চিমবঙ্গের বিজেপিবিরোধী দলগুলো যে প্রাণপণ প্রচার করে চলেছে, তাকে শিশুদের আপন মনে রান্নাবাটি খেলা ছাড়া অন্য কিছু বলা চলে কি? ভোটারদের অধিকারের কথা নির্বাচন কমিশন ভাবেনি, সুপ্রিম কোর্ট ভাবেনি— একথা ঠিক। কিন্তু তৃণমূল কংগ্রেস, কংগ্রেস বা বামপন্থীরা যে ভাবছেন, তারই বা প্রমাণ কোথায়? কোনো পক্ষই প্রথম থেকে একবারও বলেনি যে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র মানে হল, জনগণের বেছে নেওয়া তন্ত্র। এ তো তন্ত্র জনগণ বেছে নিচ্ছে। এ অধিকার রাষ্ট্রের নেই, অতএব এই প্রক্রিয়া বাতিল করতে হবে। কেবল পশ্চিমবঙ্গের দলগুলো বলেনি তা নয়, যে ১২ খানা রাজ্যে এসআইআর হল, কোথাও কোনো দলই বলেনি। সবাই মেনে নিল যে এটা সাংবিধানিক প্রক্রিয়া। অথচ সংবিধানে এমন কোনো প্রক্রিয়ার কথা আছে— একথা আজ পর্যন্ত সুপ্রিম কোর্টও বলে উঠতে পারল না। জনপ্রতিনিধিত্ব আইনেও আছে নিবিড় সংশোধনের কথা, যা ভারতে এর আগেও বহুবার হয়েছে, পশ্চিমবঙ্গে শেষ হয়েছিল ২০০২ সালে। তার জন্যে ভোটারকে ফর্ম পূরণ করতে হয় না, নিজের নাগরিক হওয়ার প্রমাণ দিতে হয় না, বাপ-মা নাগরিক ছিলেন কিনা তাও দেখাতে হয় না। নির্বাচন কমিশনই নিজের উদ্যোগে নিজের ভুল সংশোধন করে। বিশেষ নিবিড় সংশোধন বলে যে আদৌ কিছু নেই, তা নাগরিক ডট নেটের পডকাস্টে এসে পরিষ্কার বলে গিয়েছেন নির্বাচন কমিশনের প্রাক্তন সিইও জহর সরকার।

বিহারে এই প্রক্রিয়ার শুরু থেকেই বোঝা গিয়েছিল মতলবখানা কী। অথচ রাষ্ট্রীয় জনতা দল, কংগ্রেস এবং বামপন্থীরা সেই প্রক্রিয়া মেনে নিয়েই নির্বাচনে লড়লেন। বোধহয় ভেবেছিলেন এত মানুষ নীতীশ কুমারের সরকারের উপর খাপ্পা যে যত ভোটারই বাদ যাক, ঠিক জিতে যাবেন। তা যখন হল না এবং অপ্রত্যাশিত বড় ব্যবধানে হার হল, তখন বিস্তর গণ্ডগোল আছে বলে অভিযোগ জানিয়েও দু-একবার মৃদু প্রতিবাদ করে বাধ্য ছেলেমেয়েদের মত তাঁরা বিধানসভায় গিয়ে বসে পড়লেন। কোথাও কোনো আন্দোলন, অবরোধ কিছু দেখা গেল না। যে রাহুল গান্ধী ভোট চুরি ধরে ফেলেছেন বলে কর্ণাটক ও মহারাষ্ট্র নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে এ বোমা সে বোমা ফাটানো সাংবাদিক সম্মেলন করেছিলেন, তিনিও চুপসে গেলেন। সেই যে চুপ করেছেন, পশ্চিমবঙ্গে কোটিখানেক মানুষের ভোটাধিকার হরণ নিয়ে আজ পর্যন্ত এক লাইন সোশাল মিডিয়া পোস্টও করে উঠতে পারেননি। তাহলে তো ধরে নিতে হবে, কর্ণাটক আর মহারাষ্ট্রের ভোট চুরি নিয়ে তাঁর ভাবনা আছে, কারণ সেখানে তাঁর দল জেতার অবস্থায় থাকে। পশ্চিমবঙ্গে খুব ভালো ফল করলেও যেহেতু কংগ্রেস গোটা পাঁচেকের বেশি আসন জিতবে না, সেহেতু এ রাজ্যের লোক বাঁচুক, মরুক বা ডিটেনশন ক্যাম্পে যাক, তাঁর কিছু এসে যায় না। মহব্বতের দোকান দেখা যাচ্ছে খুবই ছোট।

তৃণমূল কংগ্রেস যে মতলবটা প্রথমে ধরতে পারেনি তা পরিষ্কার। ভেবেছিল তাদের সাংগঠনিক জোর দিয়ে ভোটার বাদ দেওয়া সামলে নেবে। তাই মোড়ে মোড়ে ভোটার সহায়তা কেন্দ্র খুলে বসে এসআইআরে সাহায্য করেছে। সিপিএমের পলিট বুরো যতই প্রথম থেকে এই প্রক্রিয়ার বিরোধিতা করুক, বঙ্গীয় নেতা ও কর্মীরা ভেবেছিলেন এতে তৃণমূলের ভুয়ো ভোটার বাদ যাবে। তাই তাঁরাও মহা উৎসাহে এই কর্মযজ্ঞের আগুনে ঘি ঢেলেছিলেন, ‘লজিকাল ডিসক্রিপেন্সি’ ঢুকে পড়ার পর থেকে ঢোঁক গিলে প্রতিবাদ করছেন। এখনো ভাঙবেন তবু মচকাবেন না, বলে যাচ্ছেন ওই জিনিসটা না থাকলেই ভালো এসআইআর হত। অথচ বিহারে ওটা না থেকেও প্রান্তিক মানুষের ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়ার কাজটা হয়েছিল।

যা-ই হোক, ভুল মানুষমাত্রেই করে, ফলে মানুষের তৈরি রাজনৈতিক দলও করতেই পারে। কিন্তু ভুল বুঝতে পারার পর, ‘বাদ পড়ে যাওয়া ভোটারদের তালিকায় না ঢোকানো পর্যন্ত ভোট করা চলবে না এবং করলে সে ভোটে অংশগ্রহণ করব না’, একথা তৃণমূল, বামেরা বা কংগ্রেস বলতে পারছে না কেন? সাধারণ বুদ্ধিতে এর উত্তর হল— মমতা ভাবছেন, এসব সত্ত্বেও কোনো মতে জিতে গেলে ক্ষমতায় টিকে যাব। আর বাম, কংগ্রেস শূন্যের গেরো কাটিয়ে গোটা কয়েক বিধায়ক বাগানোর সুযোগ ছাড়তে চায় না। কিন্তু কথা হল, অক্টোপাসের মত যে ফাঁদ পাতা হয়েছে, তাতে ওই আশায় থেকে আর পাঁচটা ভোটের মত প্রচার চালিয়ে যাওয়ার কি কোনো মানে আছে? জিতলেও তো গণতন্ত্রের শবদেহের উপর নৃত্য করেই জেতা হবে।

ছোটবেলায় রান্নাবাটি খেলার সময়ে আমরা ধুলোকেই ভাত হিসাবে প্লেটে নিতাম বটে, তবে মুখ পর্যন্ত তুলে নামিয়ে রাখতাম। খেতাম না কিন্তু।

নাগরিক ডট নেট ওয়েবসাইটে প্রকাশিত

ক খ গ ঘ ও প্রতীক-উর: দুই মেরুর বাম বাসিন্দা

দেশের এবং বাংলার চরম সংকট মুহূর্তে যখন বামপন্থীদের দিক থেকেই সবচেয়ে কঠিন চ্যালেঞ্জ আসার কথা, তখন দেশের সবচেয়ে বড় সংসদীয় কমিউনিস্ট পার্টি ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদীদের গুঁতোয় টলমল করছে দেখে মোহন ভাগবত, নরেন্দ্র মোদী আর অমিত শাহ নির্ঘাত খুব হাসছেন।

পশ্চিমবঙ্গে লোকসভা ও বিধানসভা মিলিয়ে পরপর তিনটে নির্বাচনে শূন্য পাওয়া, ভোট শতাংশও তলানিতে ঠেকে যাওয়া সিপিএম দলটার সদস্য, সমর্থক এখনো কারা? সোশাল মিডিয়ার সরব শহুরে মধ্যবিত্ত, যাদের অনেকেরই সিপিএম হওয়ার প্রধান কারণ পারিবারিক, তারা ছাড়া আর কেউ আছে কি? সাংবাদিকসুলভ বদভ্যাসে এই প্রশ্নের উত্তর প্রায়ই খুঁজি। খুঁজতে গিয়ে চোখের সামনে যে উদাহরণগুলো পাই, তাঁদের কথাই বলি। এঁরা সকলে আমারই আশপাশে থাকেন, নামধামও জানি, কিন্তু এঁদের ক খ গ ঘ বলেই উল্লেখ করব। কারণ এঁদের তো গায়ে গতরে খেটে খেতে হবে, আর শাসক দল যদি মনে করে এঁদের নিজেদের দলে টানতেই হবে, তাহলে প্রতীক-উর রহমানের মত সাদরে সাংবাদিক সম্মেলন করে হাতে পতাকা ধরাবে না। যেভাবে ধরাবে সেটা পশ্চিমবাংলার প্রাচীন পদ্ধতি, এবং শান্তিপূর্ণ পদ্ধতি নয়। তাছাড়া নিজেদের দলের শত্রুরাও আছে।

রেল বাজারে সবজির জোগান নিয়ে আসা ভারি ভারি বস্তা ট্রাক থেকে নামিয়ে বাজারের বিভিন্ন দোকানির কাছে পৌঁছে দেওয়াই ক দাদার পেশা। মাথার সমস্ত চুল পেকে গেছে, কিন্তু শরীর এখনো শক্তপোক্ত বলে কাজটা করতে পারছেন। আমার পেশা বা রাজনৈতিক মতামত সম্পর্কে এঁর কিছুই জানা নেই, আমার নামও জানেন না সম্ভবত। কিন্তু আমার বাবাকে চিনতেন এবং যেহেতু তিনি সিপিএম করতেন, অতএব ক-দা ধরে নিয়েছেন আমিও একই মতের। আমি দাদাকে বছর তিনেক আগে অবধিও চিনতাম না, কিন্তু উনি আমাকে দেখলেই চিরপরিচিতের মত কুশল সংবাদ জিজ্ঞেস করতেন বলে উত্তর দিতাম। সন্দেহ ছিল— আমাকে অন্য কারও সঙ্গে গোলাচ্ছেন। কিন্তু একদিন আমার বাবার সম্পর্কে এক দোকানিকে বিস্তারিত বললেন এবং আমার বোনের কোথায় বিয়ে হয়েছে তা-ও দেখলাম জানেন, ফলে নিশ্চিত হওয়া গেল। মে দিবসে দেখা হয়ে গেলে ক-দা আমাকে বুকে জড়িয়ে ধরে গুপ্তচরদের সংকেত বলার মত কানে কানে বলেন ‘লাল সেলাম, কমরেড’।

খ একজন টোটোচালক। হ্যান্ডেলের উপর বসানো মোবাইল ফোনের ওয়াল পেপারে সবসময় থাকে মীনাক্ষী মুখার্জির ছবি, গাঁক গাঁক করে গান শোনার জন্যে লাগানো স্পিকারে প্রায়শই বাজে মীনাক্ষীর কোনো বক্তৃতা। ব্যাপারটা খ-এর পক্ষে কতটা দুঃসাহসিক, সেটা যাঁরা বেড়াতে যাওয়া ছাড়া হাওড়া ব্রিজ পেরোন না তাঁদের পক্ষে বোঝা শক্ত।

গ দাদার পেশা গাড়ি চালানো। একসময় মিনিবাস চালাতেন, তারপর আমাদের মত ঊর্ধ্বগামী মধ্যবিত্তদের প্রাইভেট গাড়ি চালাতেন। তাতে রোজগার যথেষ্ট না হওয়ায় কিছুদিন এক কারখানার অ্যাম্বুলেন্স চালকের চাকরি নিয়েছিলেন। সেখানে অধিকাংশ সময় বসেই থাকতে হয় এবং কারখানার অন্যান্য গাড়ির ড্রাইভারদের মধ্যে বিজেপি সমর্থকদের প্রাধান্য, ফলে গ-দার সঙ্গে তাদের প্রায়শই ঝগড়া লেগে যেত। তাই গ-দার ও চাকরি বেশিদিন পোষাল না। গত পঞ্চায়েত নির্বাচনে দেয়ালে সিপিএমের পোস্টার লাগাতে গিয়ে স্থানীয় তৃণমূল কর্মীদের সঙ্গেও মারামারি হয়েছে। যা-ই হোক, কারখানার গাড়ির চাকরি ছেড়ে কিছুদিন দূরপাল্লার বাস চালিয়েছেন, এখন উবের বাস চালান। পার্টির প্রতি প্রচুর ক্ষোভ আছে, পার্টিকে লড়াকু চেহারায় দেখতে চান। নেতৃত্ব তা চায় না বলে অনুযোগ করেন। আমার সঙ্গে আলাপ বছর সাতেক হল। এই সাত বছরে ১২-১৫ বার বলেছেন ‘ধুর, সব ছেড়েছুড়ে দেব।’ এখনো ছেড়েছেন বলে খবর নেই।

ঘ আমার ছোটবেলার সহপাঠী। এখন ছোট ব্যবসায়ী। পারিবারিক পুঁজি বলতে কিছুই নেই— না অর্থনৈতিক, না সাংস্কৃতিক। প্রচুর পরিশ্রম করতে হয় জীবিকার্জনের জন্যে। তা সত্ত্বেও এলাকায় সিপিএমের কোনো মিটিং, মিছিলে ঘ নেই— এমন হয় না। পার্টি সম্পর্কে তার বিস্তর সমালোচনা আছে, তার কিছু কিছু কখনো কখনো সোশাল মিডিয়ায় লিখে ফেলে। কিন্তু একটা স্তরে গিয়ে নিজেই নিজেকে লাগাম পরায়। তবে কখনোই অন্য কোনো পার্টিকর্মী বা নেতাকে ব্যক্তিগত আক্রমণ করে না।

ক-দা সমাজবিপ্লবের স্বপ্ন-টপ্ন নিয়ে পার্টির সঙ্গে যুক্ত হয়েছিলেন কিনা, তা জানার সুযোগ আমার আজ পর্যন্ত হয়নি। কারণ আমি যখন বাজারে যাই তখন আমার গ্যাঁজানোর সময় থাকলেও, উনি প্রায় দৌড়তে দৌড়তে কথা বলেন।

খ-ও সারাক্ষণ যাত্রীদের গন্তব্যে পৌঁছে দিতে ব্যস্ত। ফলে সে কেন সিপিএম সমর্থক, সিপিএম প্রকৃত কমিউনিস্ট পার্টি কিনা— এসব তার সঙ্গে আলোচনা করার সুযোগ আমার হয় না। স্থানীয় সিপিএম নেতৃত্বের আলোচনা করা কর্তব্য, তাঁরা করেন কিনা জানি না।

গ-দার সঙ্গে এসব নিয়ে আমার কিঞ্চিৎ আলাপ আলোচনা হয়। তিনি মার্কস, এঙ্গেলস, লেনিন, স্তালিন, হো চি মিন, মাও সে তুং, ফিদেল কাস্ত্রো, চে গেভারা – এসব নাম জানেন। ম্যাক্সিম গোর্কির মাদার পড়েছেন। বাকিটা নেতাদের থেকে শুনে শুনে নিজের মত করে বুঝে নিয়েছেন। দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদ, ঐতিহাসিক বস্তুবাদ, উদ্বৃত্ত মূল্যতত্ত্ব, ‘উপনিবেশবাদ হল পুঁজিবাদের চরমতম রূপ’, ‘কংক্রিট অ্যানালিসিস অফ কংক্রিট কন্ডিশনস’— এসব কথা উনি জানেন না। ওঁর বরং রাগ হয় স্থানীয় পার্টিনেতারা গলায় মা কালীর পুজোর ফুল পোরা মাদুলি দেখে হাসাহাসি করলে। সরল মনে প্রশ্ন করেন— মার্কস, লেনিন কি কোথাও বলেছেন যে পুজোআচ্চা করলে কমিউনিস্ট হওয়া যায় না? প্রশ্নটা নাকি পার্টির দাদাদেরও করেছিলেন। তাঁরা আমতা আমতা করেছেন এবং যা বলেছেন তার মোটের উপর মানে হল— আমরা যখন বলছি এটা ঠিক নয়, তখন এটা ঠিক নয়। গ-দার নেতাদের প্রতি অবিশ্বাস এতে বাড়ে, মা কালীর প্রতি বিশ্বাস কমে না। তাঁর মতে, না জেনেশুনে মানুষের বিশ্বাসে অকারণ আঘাত করা পার্টির আজকের জনবিচ্ছিন্নতার অন্যতম কারণ। উপরন্তু গ-দা মনে করেন, এই ফাঁক দিয়েই বিজেপি ঢুকে পড়েছে। তাদের মত বদ পার্টি দুটো নেই। তাদের সঙ্গে মারামারি ছাড়া কমিউনিস্টদের অন্য কোনো সম্পর্ক হয় না, হতে পারে না। গ-দা আরও বলেন, হিন্দু আর মুসলমানে কোনো লড়াই নেই। ওটা বিজেপি আর তৃণমূল খুঁচিয়ে তুলছে নিজেদের অপদার্থতা ঢাকতে। আসলে সব বাঙালির পক্ষেই বিপজ্জনক হল বিজেপি সমর্থক অবাঙালি হিন্দুরা।

ঘ নিজের আগ্রহে বেশ খানিকটা পড়াশোনা করে। মার্কসবাদী বইপত্রের বাইরে বাবাসাহেব ভীমরাও আম্বেদকর নিয়েও তার আগ্রহ আছে। জাতপাতের রাজনীতিকে অগ্রাহ্য করে ভারতে গরিব মানুষের জন্যে কিছু করা সম্ভব কিনা তা নিয়ে তার ঘোর সন্দেহ।

গ-দা আর ঘ, দুজনেরই বক্তব্য হল, পার্টির দাদারা ওঁদের কথায় পাত্তা দেন না। পার্টির প্রতি আনুগত্যের নামে নিজেদের মতই চাপিয়ে দেন। নিজেদের পেশার কারণেই রোজ নানা ধরনের মানুষের কথা এঁদের কানে আসে। সেইসব মানুষ সিপিএম বৃত্তের বা বাম বৃত্তেরও বাইরের, সুতরাং তাঁদের সমর্থন ফেরাতে না পারলে বিপ্লব-টিপ্লব দূরের কথা, ক্ষমতায় ফেরাও সম্ভব নয়। কিন্তু সেইসব কথা নেতাদের কানে তুলতে গেলে গুরুত্ব দেওয়া হয় না। যা নেতারা ভাবেন তা-ই সাধারণ মানুষের ভাবনা— এই নীতি নিয়ে পার্টি চলে।

যেখানে প্রতীক-উর ঠিক

ক, খ, গ, ঘ-র জায়গায় ইচ্ছামত নাম বসিয়ে নিন। সিপিএম সম্পর্কে সারা পশ্চিমবঙ্গের কর্মী সমর্থক তো বটেই, সাধারণ ভোটারদেরও মোটের উপর এই অভিযোগগুলোই রয়েছে। তৃণমূল, বিজেপির বিকল্প কোনো নীতি তুলে ধরতে না পারা বা তৃণমূল সরকারের আমলে একের পর এক আন্দোলন করার মত ইস্যু উঠে আসা সত্ত্বেও আন্দোলন গড়ে তুলতে না পারার ব্যর্থতা তো সবাই জানে। কিন্তু এই ভুলগুলো ১৫ বছর ধরে হয়েই চলেছে কেন— এ প্রশ্ন যদি করা হয়, তাহলে উত্তর হিসাবে এগুলোই উঠে আসে। সে কারণেই প্রেম দিবসের দুদিন পরে প্রতীক-উরের পার্টির প্রতি অপ্রেম প্রকাশ্যে আসার পরে তিনি বেশকিছু সদস্য, সমর্থকের মন পেয়েছেন। এমনকি তৃণমূলের ঝান্ডা হাতে নিচ্ছেন— এই সম্ভাবনা প্রকাশিত হওয়ার পরেও যতজন তাঁকে বিশ্বাসঘাতক বলে ভেবেছে, তার চেয়ে কম লোক সহানুভূতি প্রকাশ করেনি। আসলে প্রতীক-উরের মুখ দিয়েই এই গোপন প্রকাশ্যটি সর্বসমক্ষে এসে পড়ল যে, বঙ্গ সিপিএম হয়ে দাঁড়িয়েছে একুশ শতকের ব্রাহ্ম সমাজ। এটা কোনো বিপ্লবী দল তো নয়ই, স্রেফ সংসদীয় রাজনীতির নিয়ম মেনে জনপ্রিয়তা আদায় করে ক্ষমতা দখল করার পরিশ্রম করার মত দলও নয়। এ হল চেনা পরিচিতদের এক সংঘ, যেখানে যতদূর সম্ভব দ্বন্দ্ব এড়িয়ে চলার চেষ্টা করা হয়। যেটুকু দ্বন্দ্ব হয় তার বিষয় এই সংঘের বাইরে রাজ্যে বা দেশে কী হচ্ছে, তার মোকাবিলা কীভাবে করা হবে তা নয়। কে অমুক কমিটির তমুক হবে, কার লোককে কে তমুক কমিটি থেকে বাদ দিতে পারবে— সেইসব।

এই চেনা পরিচিত কারা? মূলত পশ্চিমবঙ্গের ভদ্রলোক শ্রেণি বলতে যাদের বোঝায়, তার পুরুষ ও মহিলারা। বাংলার মুসলমান, আদিবাসী, নিম্নবর্গীয় মানুষ— অর্থনৈতিক হিসাবে বললে গরিব মানুষ— অনুবীক্ষণ দিয়ে খুঁজতে হয়। এমনিতেই ক্ষমতা চলে যাওয়ার পরে পার্টির সদস্যসংখ্যা কমেছে, ফলে এই ধরনের মানুষের সংখ্যাও অঙ্কের নিয়মেই কমে গেছে। তার উপর আবার এমন সব ইস্যু নিয়ে পার্টি ভাবিত এবং যৎসামান্য আন্দোলন করে, যা দিয়ে পশ্চিমবঙ্গের গরিব মানুষের কিচ্ছু এসে যায় না।

যেমন রাজ্য সরকারি কর্মচারীদের ডিএ বাড়ানো নিয়ে সিপিএম ভীষণ সোচ্চার। এটা অবশ্যই কর্মীদের সাংবিধানিক অধিকারের প্রশ্ন, কিন্তু চাকুরে মধ্যবিত্তদের স্বার্থের সঙ্গে জড়িত। ডিএ বাড়লে এ রাজ্যের গরিব মানুষের কী? আশা কর্মীরা বরং অনেক পিছিয়ে থাকা শ্রেণি। তাঁদের আন্দোলনে সিপিএমের অবদান কতটুকু?

স্কুলের মিড ডে মিল নিয়ে যে ধাষ্টামো রাজ্য সরকার করে চলেছে, তার বিরুদ্ধেও সিপিএমের কোনো আন্দোলন নেই। অথচ ওটার সঙ্গে রাজ্যের সবচেয়ে গরিব মানুষের স্বার্থ জড়িয়ে আছে।

স্মার্ট মিটারের বিপদ নিয়ে গোটা রাজ্যে আন্দোলন গড়ে তুললে মধ্যবিত্তদের পাশাপাশি কৃষকদের সমর্থনও পাওয়া যেত। কিন্তু কিছু বিচ্ছিন্ন আন্দোলন ছাড়া সিপিএম কিছুই করেনি।

২০১৩ সালে চিট ফান্ড কেলেঙ্কারি ফাঁস হয়ে গেল, তা নিয়েও সিপিএম রাজ্যজুড়ে কোনো ঝড় তোলেনি। অথচ ওই কেলেঙ্কারিতে কপর্দকশূন্য হয়ে গিয়েছিলেন গৃহ সহায়িকা, রিকশাচালক, রাস্তার চায়ের দোকানের মালিকদের মত মানুষ।

আর জি কর আন্দোলনের মত ভয়ঙ্কর ঘটনা, যার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ উল্কার গতিতে ছড়াচ্ছিল, সেটাকেও রাজ্যের গ্রামাঞ্চলে এবং গরিব মানুষের কাছে নিয়ে গিয়ে লাগাতার আন্দোলন করতে ব্যর্থ হল। সফল হওয়া সম্ভবও ছিল না। কেন?

ভারতের আর পাঁচটা কমিউনিস্ট পার্টির মত সিপিএম নেতৃত্বেও মধ্যবিত্তদেরই আধিক্য ছিল বরাবর, কিন্তু তাঁদের মধ্যে গরিব মানুষের সঙ্গে সংযোগ রক্ষার তাগিদ দেখা যেত, ফলে তাঁরা জানতেন কোনগুলো গরিব মানুষের সমস্যা। নইলে বামফ্রন্ট ক্ষমতায় এসে অপারেশন বর্গা করত না। কিন্তু ক্ষমতার অলিন্দে সময় যত গড়িয়েছে, পশ্চিমবঙ্গের অর্থনৈতিক অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে রাজ্যে মধ্যবিত্ত যত বেড়েছে, তাদের ভোট আদায় করে ক্ষমতায় টিকে থাকার প্রবণতা বেড়েছে। গরিব মানুষের সঙ্গে সংযোগ তত কমেছে। নয়ের দশকের শেষ থেকে একেবারেই সরকারি ও বেসরকারি চাকুরেদের পার্টি হয়ে গেছে সিপিএম। আপনার পাড়ার শহিদবেদীতে নভেম্বর বিপ্লব দিবসে কারা পতাকা তোলে লক্ষ করবেন। কোনো রিকশাচালক, অটোচালক, টোটোচালক কি সবজি বিক্রেতাকে দেখতে পান? যাঁরা তোলেন তাঁরাই এরিয়া কমিটি থেকে রাজ্য কমিটি পর্যন্ত নেতৃত্ব দখল করে ফেলেছেন। ফলে তাঁদের চোখই পার্টির চোখ, সেই চোখ দিয়েই রাজ্যটাকে দেখা হয়। শেয়ার বাজারে টাকা খাটানো, শীতাতপনিয়ন্ত্রিত গাড়ি চড়ে স্কুলে যাওয়া শিক্ষক নেতা কী করে ভেবে উঠতে পারবেন যে মিড ডে মিল নিয়ে আন্দোলন করা দরকার?

সিপিএম যে এঁদেরই দল এবং এঁদের চোখ দিয়েই রাজ্যটাকে তারা দেখে, তার সবচেয়ে জ্বলজ্বলে প্রমাণ হল লক্ষ্মীর ভাণ্ডার সম্পর্কে সিপিএমের কটুকাটব্য। যে বলতে গেছে— মানুষের হাতে সরাসরি টাকা দেওয়া আসলে কল্যাণমূলক অর্থনীতি এবং এতে লাভ হয় বলে বহু বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদের মত, তাকেই শুনতে হয়েছে ‘চটিচাটা’। শূন্যের হ্যাটট্রিক হওয়ার আগে রাজ্য সম্পাদক মহম্মদ সেলিমেরও মনে হয়নি যে পার্টি মুখপাত্র এবং রাম শ্যাম যদু মধুদের বোঝানো দরকার— সরকারি ভাতাকে ভিক্ষা বলা মানে গরিব মানুষকে অপমান করা। শূন্যের ঠেলায় যতদিনে তিনি কথাটা বললেন, ততদিনে মধ্যবিত্ত সদস্য ও সমর্থককুল এতবার ‘মরা মরা’ বলে ফেলেছে যে আর ‘রাম রাম’ বলা সম্ভব নয়। মুখপাত্ররা তাই ঢোঁক গিলে বলতে শুরু করলেন— ভাতা দিচ্ছে ঠিক আছে, কিন্তু কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা না করলে শুধু ভাতা দিয়ে কি চলবে?

প্রতীক-উর পার্টির যা যা দোষ চিহ্নিত করেছেন তার প্রায় সবের জন্যেই দায়ী করেছেন বর্তমান রাজ্য সম্পাদককে। কিন্তু এই দোষগুলো সেলিমের পূর্বসুরি সূর্যকান্ত মিশ্রের আমলেও ছিল। কারণ এ রোগের জন্ম ক্ষমতায় থাকার সময়েই। উপরে যে ক খ গ ঘ-দের কথা বলেছি, তাঁদের পার্টির তত্ত্ব, গঠনতন্ত্র ইত্যাদি শিখিয়ে পড়িয়ে নেওয়ার দায়িত্ব ছিল পার্টির। পৃথিবীর সমস্ত কমিউনিস্ট পার্টিতে এটাই নিয়ম। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে সেসব উদ্যোগ স্তিমিত হয়ে গেছে বামফ্রন্ট আমলেই। এখন তো এমন অবস্থা যে কেউ ‘কমিউনিস্ট পার্টি করতে গেলে পড়াশোনা করতে হয়’ বললে, যাঁদের পড়াশোনা করার মত সময় এবং সংস্থান আছে তাঁরাও বক্তাকে মনে মনে খিস্তি করেন। ফলে কোনটা নয়া উদারবাদী অর্থনীতি আর কোনটা কল্যাণমূলক অর্থনীতি— সেটা ব্রাহ্মসমাজের হাতেগোনা কজন বুদ্ধিজীবী ছাড়া কেউ জানে না। তাঁরা অন্যদের জানানোর প্রয়োজনও বোধ করেন না। ‘আমরা কমিউনিস্ট, আমরা শিক্ষিত, আমরা ভালো। যে জানে না সে অশিক্ষিত (নইলে চটিচাটা)। তাকে আমাদের দরকার নেই’— এই অঘোষিত নীতিতে চলেন ওঁরা।

দেবেন ঠাকুরদের ব্রাহ্মসমাজের তবু একটা গুণ ছিল। পড়াশোনা এবং লেখালিখিকে গুরুত্ব দেওয়া হত, তত্ত্ববোধিনী-র মত পত্রিকা বেরোত। সিপিএম ব্রাহ্মরা এত পণ্ডিত যে পার্টি মুখপত্রটিকে মোটেই পাত্তা দেন না। প্রথম পাতা থেকে শেষ পাতা পর্যন্ত ভুলে ভরা থাকে। যেমন তথ্যের ভুল তেমন ভাষার। যে কোনো কাগজে যে পাতা সবচেয়ে যত্ন করে সময় নিয়ে তৈরি হয়, সেই সম্পাদকীয় পাতাতেই কোনোদিন নিজেদের পার্টির নেতা কলতান দাশগুপ্তের নাম হয়ে যায় ‘কালতান’, কোনোদিন আবার দীঘার ওপারে ভেসে ওঠে আন্টার্কটিকা। ক খ গ ঘ ঙ কমরেডরা, যাঁরা টেক স্যাভি নন, মৈত্রীশ ঘটকের সাক্ষাৎকার পড়ার বা দেখার মত প্রাথমিক পড়াশোনা নেই, তাঁরা গণশক্তি পড়ে নিজেদের যেটুকু শান দিয়ে নিতে পারতেন তার পথও বন্ধ। আসলে তাঁদের কথা নেতৃত্ব ভাবে না। কারণ ব্রাহ্মসমাজের লোকেরা কাগজ-ফাগজ পড়েন না, তাই পড়েন যা অ্যান্ড্রয়েড বা আইফোনে পড়া যায়।

এঁরাই ভেবে বের করেছেন যে দিনকাল বদলে গেছে। এখন রাজনীতি করা মানে পথে পথে ঘোরা নয়, মানুষের সঙ্গে মেশা নয়। ক্ষমতাসীন সিপিএমও অন্তত মনে করত— ভোটের প্রচার ৩৬৫ দিনের ব্যাপার, প্রত্যেক বাড়ির প্রত্যেকটা লোকের মুখ চেনার ব্যাপার। এঁরা মনে করেন হোয়াটস্যাপ ফরোয়ার্ড আর ফেসবুক পোস্টের লাইক গুনেই মানুষের মন বুঝে নেওয়া যায়। সোশাল মিডিয়া প্রচার দিয়েই ভোটে জেতার ব্যবস্থা পাকা করে ফেলা যায়। তাই প্রমোদ দাশগুপ্ত, বিনয় চৌধুরী, জ্যোতি বসুরা কীভাবে রাজনীতি করতেন সেকথা মনে করিয়ে দিলে বলেন ‘ওসব ওই যুগে চলত’। বিরক্তি চেপেই বলেন, যেহেতু ওই নামগুলো কেউ করে দিলে তাকে চটিচাটা বলতে এখনো জিভে আটকায়।

আরও অনেক গণ্ডগোলের কথা বলা যায়। কিন্তু মোদ্দাকথা হল, এই পরিমাণ আভিজাত্যের চাষ করে প্রত্যেক নির্বাচনের ফল বেরোবার পর ‘এই রাজ্যের লোক এদেরই ডিজার্ভ করে’, ‘লোকে তো ভাতা পেলেই খুশি, আর সবকিছু গোল্লায় যাক’ ইত্যাদি বলার যে ঔদ্ধত্য তা অতুলনীয়। তাই ২০১১ সালের পর থেকে এ রাজ্যের সিপিএমের পতনের গতিও অতুলনীয়। প্রতীক-উরের ঘটনায় অভিনবত্ব এটুকুই যে এতদিন ক খ গ ঘ ঙ চ-রা যেসব কথা বলে পাত্তা পেতেন না, উনি সেগুলোই রাজ্য কমিটির সদস্য থাকা অবস্থায় ক্যামেরার সামনে বলে দিয়েছেন।

যেখানে প্রতীক-উর বেঠিক

২০২২ সালে সিপিএমের রাজ্য সম্মেলনের প্রথম দিনের একখানা ছবি ভাইরাল হয়েছিল। সেই ছবিতে দেখা যাচ্ছে, মঞ্চের উপর এক নেতা বক্তৃতা দিচ্ছেন আর পিছনে বসা একাধিক বয়স্ক নেতা ঝিমোচ্ছেন বা ঘুমোচ্ছেন। এই সহস্রাব্দের গোড়া থেকে আনন্দবাজার গোষ্ঠীর পৌরোহিত্যে এ রাজ্যের সংবাদমাধ্যম ক্রমাগত বলে যাচ্ছিল যে সিপিএমে বৃদ্ধতন্ত্র চলে, তরুণ রক্ত দরকার। অনিল বিশ্বাসোত্তর সিপিএমের মিডিয়াসর্বস্বতা ক্রমশ বাড়ে, ফলে ‘তাজা রক্ত’ মাথায় উঠে যায় এবং ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পরে (মধ্যবিত্তায়ন সম্পূর্ণ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে), তাজা রক্ত আনলেই পার্টি ঘুরে দাঁড়াবে— একথা পাড়ার সিপিএম কর্মীরাও বলতে শুরু করেন। ওই ভাইরাল ছবিটা বৃদ্ধতন্ত্রের একেবারে প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠেছিল। মনে রাখা দরকার, সম্মেলনের ওই অধিবেশনে কিন্তু পার্টির বাইরের কোনো লোকের থাকার কথা নয়। সুতরাং ছবিটা তুলে বাইরে পাঠিয়েছিলেন পার্টি সদস্যরাই কেউ।

এখন পদত্যাগপত্র ভাইরাল হওয়া নিয়ে তদন্ত দাবি করে বসলেন যে প্রতীক-উর, সদস্যপদ নবীকরণ করানো হয়েছে কি হয়নি, সে খবর বাইরে এসে যাওয়ায় চক্রান্তের অভিযোগ তুলছেন যে দীপ্সিতা ধর, তাঁরা ওই ছবি কী করে ভাইরাল হল— সেকথা জানতে চেয়ে তখন চেঁচামেচি করেছিলেন? কোনো সংবাদমাধ্যমে তেমন খবর বেরিয়েছিল বলে তো দেখছি না। কেন করেননি? তাহলে কি একমাত্র নিজের তথ্য ফাঁস হয়ে গেলেই এঁদের রাগ হয়? অন্য কিছু বেরিয়ে গেলে পার্টির শৃঙ্খলা ইত্যাদি মনে থাকে না, বা কিছু এসে যায় না? একথা ভাবলেও কি অন্যায় হবে যে, সিপিএমের তরুণ তুর্কিরা তখন ভেবেছিলেন— বেশ হয়েছে বুড়োগুলোর ঘুমোবার ছবি বেরিয়ে গেছে। এদের জায়গা আমরা নেব?

প্রশ্নগুলো এখন মনে আসছে কারণ স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে, সিপিএম যে তরুণ তুর্কিদের উপর হাল ফেরানোর জন্য ভরসা রেখেছিল, তাঁরা কেউই হাল ফেরাতে পারেননি। সে না পারতেই পারেন। রাজনীতি এত সোজা জিনিস নয় যে কেউ চাইলেই কিছু করে ফেলতে পারবে। কিন্তু ২০২১ সালে যেসব ‘তাজা রক্ত’ ঢুকেছিলেন সিপিএমের প্রার্থী তালিকায়, তাঁদের মধ্যে মীনাক্ষী মুখার্জি ছাড়া আর কাউকে তো লড়াইয়ের ময়দানে দেখাই গেল না সেভাবে। প্রতীক-উরের প্রায় খুন হয়ে যাওয়া তো আরও আগের কথা। মীনাক্ষী গত পাঁচ বছরে রাস্তায় নেমে লড়তে গিয়ে পুলিসের মার খেলেন, গ্রেফতারও হলেন। শতরূপ ঘোষকে বেশি দেখা গেল টিভি স্টুডিওতে, থিয়েটার শোতে, সিনেমার প্রিমিয়ারে আর ইউটিউবে। সৃজন ভট্টাচার্য, দীপ্সিতা, প্রতীক-উর লোকসভায় ফের প্রার্থী হলেন এবং বৃদ্ধ নেতাদের চেয়ে বেশি সুবিধা করতে তো পারলেনই না; ভোটের প্রচারে কদিন প্রচুর দৌড়াদৌড়ি করে হারার পর, সেই এলাকা থেকে স্রেফ উধাও হয়ে গেলেন। সৃজনের গিটার বাজিয়ে গান গাওয়া আর দীপ্সিতার নাচ যদি রাজনৈতিক কার্যকলাপ বলে ধরা হয়, তাহলে অবশ্য আলাদা কথা। কোথায় গেলেন ঐশী ঘোষ? কেউ জানেন? দিল্লিতে আছেন বলবেন না আবার। কথা হল, পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে নেই কেন? যদি থাকবেন না এমনই কথা ছিল, তাহলে উড়ে এসেছিলেন কেন? পার্টি এরকম যাওয়া আসা স্রোতে ভাসার সুযোগ দিয়েছিলই বা কেন? নাকি এরকম উদ্দেশ্যহীন ওড়াউড়িই নেতৃত্বের অভিপ্রেত?

২০২১ সালে যখন সিপিএমের প্রার্থী তালিকা প্রকাশিত হয়েছিল এবং তালিকায় অত তরুণ মুখ দেখে বাংলার মিডিয়া হাততালি দিচ্ছিল আর সিপিএম কর্মী সমর্থকরা উল্লাস করছিলেন, তখন উত্তরবঙ্গ সংবাদের পাতায় প্রশ্ন তুলেছিলাম ‘তরুণ কৃষক নেতা, শ্রমিক নেতারা কোথায়?’ অর্থাৎ তরুণ নেতা বলতেই সিপিএম ছাত্রনেতা বা যুবনেতা বুঝছে কেন? সিপিএমের রাজনীতি থেকে ‘শ্রেণি’ শব্দটা বহুকাল নির্বাসিত বলেই এই প্রশ্নটা আমাদের মত সাংবাদিকদের তুলতে হয়। শতরূপের মত নীতি, নৈতিকতার দায় নিতে না চাওয়া নেতারা তোলেন না; প্রতীক-উরের মত আপাত বিপ্লবীও তুললেন না। তাঁর অভিযোগের তির সরাসরি রাজ্য সম্পাদকের দিকে, অথচ ক খ গ ঘ-রা পার্টির কার্যকলাপ নিয়ে যেসব মৌলিক প্রশ্ন তুলেছেন, সেগুলো সেই গভীরতায় গিয়ে কিন্তু প্রতীক-উর তোলেননি। তাঁর যাবতীয় অভিযোগের কেন্দ্রে ‘আমি’।

আমি পার্টির জন্যে এত করলাম অত করলাম, খুন হয়ে যাচ্ছিলাম, আর পার্টি কী করল? অমুকে কেন বেশি গুরুত্ব পেল? তমুককে কেন অমুক দায়িত্ব দেওয়া হল? এই হল তাঁর ক্ষোভের নির্যাস। স্পষ্টতই, পার্টির থেকে তাঁর কিছু প্রত্যাশা ছিল। সে প্রত্যাশা পূরণ হয়নি বলেই তিনি এই চরম সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। সাংবাদিক সুমন দে যা-ই বলুন, এটা মাও সে তুংয়ের কথা অনুযায়ী, সদর দফতরে কামান দাগা নয়। এটা তৃণমূল ভবনের দরজায় রবীন্দ্রসঙ্গীত গাওয়া ‘খোলো খোলো দ্বার, রাখিয়ো না আর/বাহিরে আমায় দাঁড়ায়ে’।

অথচ সত্যি সত্যি পার্টির সমালোচনা করতে চাইলে বলার মত অনেককিছু ছিল। তিনি বলেছেন— পার্টির মধ্যে সংখ্যালঘু হয়ে গিয়েছিলাম, তবে আমি তো এদেশে সংখ্যালঘু হয়েই জন্মেছি, ইত্যাদি। চমৎকার সিনেমাসুলভ সংলাপ। কিন্তু দুরকম সংখ্যালঘুকে এক করে দেখা রাজনৈতিক বোধের দিক থেকে অত্যন্ত কাঁচা ব্যাপার। সিপিএম যে বাংলার মুসলমানদের থেকে অনেক দূরে সরে গেছে, বিজেপির বিরুদ্ধে সোচ্চারে দাঁড়ায়নি সেই ২০১৪ সাল থেকে, এসআইআর যে মূলত মুসলমানদের ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার চক্রান্ত সেকথাও যে সিপিএম আজও স্বীকার করল না, অথচ সেলিম নিজে জিতে আসার জন্যে ঘুরে ফিরে মুসলমানগরিষ্ঠ আসনে গিয়ে দাঁড়ান— এই সমালোচনাটা প্রতীক-উর করতে পারতেন। করলে নিজেকে ধর্মীয় সংখ্যালঘু হিসাবে চিহ্নিত করার একটা মানে থাকত। সিপিএম যে পুরোপুরি ভদ্রলোকের পার্টি হয়ে গেছে এবং সেখানে রাজ্য সম্পাদক একজন মুসলমান হলেও রাজ্যের মুসলমানদের প্রতি পার্টির অবহেলা দূর হয় না— সেই জরুরি কথাটা উঠে আসত। রাজ্য কমিটিতে জায়গা পেয়েও দেবলীনা হেমব্রমের মত আদিবাসী নেত্রী যে তেমন কিছুই করার সুযোগ পাচ্ছেন না, সেকথাটাও প্রতীক-উর বলতে পারতেন। তাহলে সরকারি দলে চলে গেলেও ভাবার অবকাশ থাকত যে, তিনি এত বিদ্রোহ নিজের উচ্চাকাঙ্ক্ষা চরিতার্থ করতে করেননি, দলটা যেনতেনপ্রকারেণ ছাড়তে হবে বলে করেননি, পার্টির বা বামপন্থী আন্দোলনের ভালোমন্দ নিয়ে চিন্তিত বলেই করেছেন।

পার্টিতে সংখ্যালঘু হয়ে যাওয়া নিয়ে হাহুতাশ করা রীতিমত হাস্যকর। একটা দল মানে সব ব্যাপারে সবাই একমত হয়, না হওয়া মানেই লবিবাজি, যা একটা নোংরামি— এরকম অতিসরলীকৃত ধারণা তৈরি করে বৃহৎ পুঁজি নিয়ন্ত্রিত সংবাদমাধ্যম, কারণ তারা চায় দলীয় রাজনীতির বাইরের মানুষ বিশ্বাস করুন, রাজনীতি ব্যাপারটাই নোংরামি। অথচ সত্যিটা হল, পৃথিবীর সব দলে (কমিউনিস্ট পার্টিতে তো বটেই) চিরকাল বিভিন্ন লবি ছিল। ভবিষ্যতেও থাকবে। কারণ সব ব্যাপারে এক দলেরও সব মানুষ কখনো একমত হতে পারে না। তখন যে মত সংখ্যাগরিষ্ঠের সেটা প্রতিষ্ঠিত হওয়াই গণতন্ত্র। কেবল কমিউনিস্ট পার্টিতে নয়, সব পার্টিতেই।

দেশভাগের প্রশ্নে স্বয়ং মহাত্মা গান্ধী কংগ্রেসে সংখ্যালঘু হয়ে গিয়েছিলেন। তিনি নিজের মত করে নিজের অবস্থান বজায় রেখেছিলেন। সারা দেশ যখন স্বাধীনতা দিবস পালন করছিল, তিনি অনশন করছিলেন। মিডিয়াকে ডেকে অন্য কংগ্রেস নেতাদের গাল পাড়েননি।

১৯৯৬ সালে কেন্দ্রের সরকারে যোগ দেওয়ার প্রশ্নে সিপিএমের অবিসংবাদী নেতা জ্যোতি বসুও পার্টিতে সংখ্যালঘু হয়ে পড়েছিলেন। প্রকাশ্যে বলেও দিয়েছিলেন যে পার্টি ঐতিহাসিক ভুল করল। তিনি যে ঠিকই বলেছিলেন সেটা পরবর্তীকালে বিজেপির ক্রমাগত শক্তিবৃদ্ধিতে প্রমাণিত হয়েছে। কিন্তু বলার কথাটা হল, জ্যোতিবাবু কখনো বলেননি— অমুক আমাকে প্রধানমন্ত্রী হতে দিল না, পার্টি আমার এতদিনের লড়াইয়ের মর্যাদা দিল না।

বলেননি মানে জ্যোতিবাবু মহাপুরুষ ছিলেন তা নয়। বলেননি, কারণ কমিউনিস্ট পার্টি করা মানে ব্যক্তির ঊর্ধ্বে দল— একথা বিশ্বাস করা। কংগ্রেস বা তৃণমূল কংগ্রেসে ‘গো অ্যাজ ইউ লাইক’-এর বহু ইতিহাস আছে। অনেকে সেটাই ভাল, সেটাই উদার বলেও মনে করেন। কিন্তু রাজ্য কমিটি পর্যন্ত পৌঁছে যাওয়া একজন নেতা কমিউনিস্ট পার্টির এই সামান্য নিয়মটা যদি না জেনে থাকেন, তাহলে তাঁকে রাজ্য কমিটিতে যাঁরা নির্বাচিত করেছেন তাঁদের যোগ্যতা এবং শৃঙ্খলা নিয়েই প্রশ্ন তোলা উচিত।

এমনিতে মতপার্থক্যের কারণে কমিউনিস্ট পার্টি ছেড়ে দেওয়া বা বিতাড়িত হওয়া এমন কিছু অভিনব ব্যাপার নয়। ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি ১৯৬৪ সালের পর থেকে বহুবার ভেঙেছে তো বটেই, তাছাড়াও অনেকেই এই বাম দল ছেড়ে ওই বাম দলে গেছেন। সৈফুদ্দিন চৌধুরী, সমীর পুততুণ্ডদের মত কেউ কেউ নতুন দলও খুলেছেন।

অশোক মিত্রের মত উদাহরণও আছে। দ্বিতীয় বামফ্রন্ট সরকারের অর্থমন্ত্রী থাকার সময়ে মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতিবাবুর সঙ্গে মতভেদ হওয়ায় একইসঙ্গে মন্ত্রিত্ব আর পার্টির সদস্যপদ ত্যাগ করেন। আজীবন সিপিএমের অনেক সমালোচনাও করেছেন, কিন্তু কখনো কাউকে ব্যক্তিগত আক্রমণ করেননি এবং বারবার বলতেন/লিখতেন যে এমন কিছু করবেন না যাতে বামপন্থার ক্ষতি হয়। সেই কারণে সকলেরই শ্রদ্ধা অর্জন করেছেন। পরবর্তীকালে বামফ্রন্টই তাঁকে রাজ্যসভায় পাঠিয়েছিল।

ত্রিপুরার একদা মুখ্যমন্ত্রী নৃপেন চক্রবর্তী কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য থাকাকালীন বহিষ্কৃত হয়েছিলেন, সরাসরি জ্যোতিবাবুর সঙ্গে সংঘাত ছিল। তারপরেও তিনি পার্টির বিরুদ্ধে বিষোদ্গার করে বেড়াননি। আমৃত্যু আড়ম্বরহীন বামপন্থী জীবনযাপনই চালিয়ে গেছেন।

এর বাইরে অসংখ্য অখ্যাত কমিউনিস্ট ছিলেন এবং আছেন, যাঁরা প্রতীক-উরের মত সংখ্যালঘু হয়ে গিয়েছেন। অনেকেই পার্টির খারাপ লোকেদের জোটের কাছে হেরেই সংখ্যালঘু হয়েছেন। ফলে কেউ বসে গেছেন, কেউ পার্টি ছেড়ে দিয়েছেন, কেউ মানুষের জন্যে কাজ করার অন্য কোনো পথ খুঁজে নিয়েছেন। নিজের পার্টির লোকেদের নাম করে বা আকারে ইঙ্গিতে কটু কথা বলে, যাদের বিরুদ্ধে সারাজীবনের লড়াই, যাদের হাতে খুন হয়ে গিয়েছিলেন আরেকটু হলেই, তাদের দলেই মিশে যাননি ওঁরা।

লেখার শুরু করেছিলাম ক খ গ ঘ দিয়ে। চারজনই প্রতীক-উরের থেকে বয়সে বড়, কোনোদিন এরিয়া কমিটি পেরোবেন বলেও মনে হয় না। অথচ তাঁদের নিজের দলের বিরুদ্ধে রুষ্ট হয়ে ক্ষমতাসীন দলে যেতে ইচ্ছা করে না, করল তিরিশে পা দেওয়ার আগেই রাজ্য কমিটির সদস্য হয়ে যাওয়া একজনের। কেন? একটাই কারণ থাকা সম্ভব। ওঁরা নিজের জন্যে কিছু প্রত্যাশা করে রাজনীতি করতে আসেননি, প্রতীক-উর এসেছিলেন। ওঁরা প্রতীক-উরের থেকে লেখাপড়া কম জানেন, ওঁর তুলনায় মার্কসবাদী বইপত্রও কিছুই পড়েননি বলা যায়। কিন্তু ব্যক্তির আগে সমষ্টিকে স্থান দেওয়ার যে প্রাথমিক পাঠ, সেটা খুব ভালো করে নিতে পেরেছেন। প্রতীক-উর পারেননি। সুমন দে-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বারবার তিনি ‘ব্যক্তি’ আর ‘ব্যক্তিগত’ শব্দ দুটো ব্যবহার করছিলেন। একখানা এ আই টুলকে জিজ্ঞেস করলাম— শব্দ দুটো কতবার ব্যবহৃত হয়েছে এই ৫৪ মিনিট ৩০ সেকেন্ডের ভিডিওতে? উত্তর এল— ‘ব্যক্তি’ চারবার, ‘ব্যক্তিগত’ সাতবার। অর্থাৎ দুটো মিলিয়ে ১১ বার। মানে প্রায় পাঁচ মিনিট অন্তরই ব্যক্তিস্বার্থের কথা এসে পড়ে গতকাল পর্যন্ত কমিউনিস্ট পার্টির রাজ্য কমিটির একজন সদস্যের সঙ্গে কথা বলতে গেলে।

দুঃখের বিষয়, সিপিএম নেতৃত্বের অনেকেই ব্যক্তির আগে সমষ্টিকে রাখার পাঠটাকে গুরুত্ব দেন না। সেই কারণেই তাঁদের কাছে পরিশ্রমী শ্রমিক, কৃষক ফ্রন্টের পার্টিকর্মীদের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে গেছেন সুদর্শন ছাত্রনেতা, যুবনেতারা। এঁরা যে স্রেফ ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদী উচ্চাকাঙ্ক্ষী এবং পার্টির স্বার্থের পরিপন্থী, তা অগ্রজ নেতারা হয় বোঝেন না, নয় নিজেরাও উচ্চাকাঙ্ক্ষী বলে ওরকম ছেলেমেয়েদেরই পছন্দ হয়। শৃঙ্খলা গোল্লায় যায়। বিজেপির মুসলমানবিদ্বেষী মিউজিক ভিডিওতে মুখ দেখানো অভিনেতাদের পার্টির কমিউনিটি ক্যান্টিনে নিয়ে এসেও শাস্তি পান না শতরূপ ঘোষ; লাল পতাকার সামনে বসে সাংবাদিক সম্মেলন করে বলতে পারেন— বিলাসবহুল গাড়ি চড়ি আমার বাবার টাকায়, তাতে কার বাবার কী? সিপিএমের যে সদস্য সমর্থকরা ওই আচরণকে কোনো যুক্তিতে সমর্থন করেন, তাঁদের মেনে নিতে হবে— যে পার্টি থেকে শতরূপরা উঠে আসেন, সে পার্টি থেকে প্রতীক-উররাও উঠে আসবেন।

এই দ্বন্দ্বে জয়ী পক্ষের নাম তৃণমূল কংগ্রেস। সিপিএম এমন এক বিরোধী দল, যারা নির্বাচন এসে পড়লেই ব্যস্ত হয়ে পড়ে কী করে কার সঙ্গে কটা আসনে সমঝোতা করে কোনোমতে কিছু নেতাকে বিধায়ক বা সাংসদ বানানো যায় তার তাল করতে। সরকারের কাজের সমালোচনা গৌণ হয়ে যায়। নিজেরা মানুষের স্বার্থে কী করবেন তা কেবল ইশতেহারে লেখা হয়, যা আমাদের দেশে প্রায় কেউ পড়ে না। তাতেও যে খুব সুনির্দিষ্ট কোনো পরিকল্পনা লেখা থাকে তা নয়। ২০১৬ সালের নির্বাচনে এই ঘটনা ঘটানো হয়েছিল কংগ্রেসের সঙ্গে জোট করতে গিয়ে, ২০২১ সালে সঙ্গে যোগ হল ইন্ডিয়ান সেকুলার ফ্রন্টের সঙ্গে জোট করার প্রয়াস নিয়ে ডামাডোল, এবারে একা হুমায়ুন কবীরে রক্ষে নেই, প্রতীক-উরকে নিয়ে উত্তেজনা দোসর। এমন বিরোধী থাকতে মমতা ব্যানার্জির আর চিন্তা কী?

বিজেপির মত ফ্যাসিবাদী দলেরও চিন্তা নেই। দেশের এবং বাংলার চরম সংকট মুহূর্তে যখন বামপন্থীদের দিক থেকেই সবচেয়ে কঠিন চ্যালেঞ্জ আসার কথা, তখন দেশের সবচেয়ে বড় সংসদীয় কমিউনিস্ট পার্টি ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদীদের গুঁতোয় টলমল করছে দেখে মোহন ভাগবত, নরেন্দ্র মোদী আর অমিত শাহ নির্ঘাত খুব হাসছেন।

নাগরিক ডট নেট ওয়েবসাইটে প্রকাশিত

হুলিগানের গুঁতোয় যা যা টের পাওয়া গেল

তখন বাঙালির রাজনীতির সর্বজনস্বীকৃত পদ্ধতি ছিল – জ্যোতি বসু, প্রমোদ দাশগুপ্তেরা ধুন্ধুমার আন্দোলন করবেন। নিজেদের শিল্পের মাধ্যমে রাজনৈতিক বার্তা দেবেন উৎপলবাবু বা মৃণাল সেনরা। এখন ডান, বাম নির্বিশেষে বাঙালির চাহিদা হয়েছে উলটো – শতরূপ, দিলীপদের স্টুডিওয় যেতে হবে। মিছিলে যেতে হবে অনির্বাণদের।

পশ্চিমবঙ্গের বই বাজারে সহায়িকা জিনিসটার বেশ বিক্রি আছে বোঝা যায়। কারণ প্রকাশকরা টিভিতে ওসব বইয়ের বিজ্ঞাপন দিতে টাকা খরচ করেন। ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসাডর হিসাবে নিয়ে আসেন মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিকে প্রথম দশে থাকা ছেলেমেয়েদের। এদিকে এ রাজ্যের শিল্পীদের রোজগার ক্রমশ কমছে বলে খবর পাই। বাংলা সিনেমা, বাংলা নাটক, বাংলা গান – কোনোকিছুই যে আর লাভজনক ব্যবসা থাকছে না, তা তো আমরা অনেকেই এখন জেনে গেছি। কিন্তু পকেটে টান পড়লেও এবার থেকে সঙ্গীতশিল্পীদের গানের সহায়িকা প্রকাশ করা উচিত। গানের অনুষ্ঠান শুরু হওয়ার আগে প্রত্যেক দর্শকের হাতে এক কপি করে সেই সহায়িকা ধরিয়ে দেওয়া উচিত। সেখানে কোন গানের কোন কথাটা আক্ষরিক অর্থে নয়, শ্লেষার্থে বলা; কোন লোকের নাম কেন নেওয়া হয়েছে, কার নাম কেন নেওয়া হয়নি, কোন ঘটনার উল্লেখ কেন এসেছে, শিল্পী অতীতে কোন ঘটনা নিয়ে গান বেঁধেছেন, কোনটা নিয়ে বাঁধেননি, না বাঁধলে কেন বাঁধেননি; কোন মিছিলে গেছেন আর কোন মিছিলে যাননি, না গেলে কেন যাননি – এসব পরিষ্কার করে লিখে দেওয়া উচিত। একজন শিল্পীর অনুষ্ঠান হলে এটুকু করলেই চলবে, কিন্তু গানের দল হলে দলের প্রত্যেক সদস্যের অতীতের কোন ঘটনায় কী মতামত ছিল তাও লিখে দিতে হবে। তবে এটুকু করাই যথেষ্ট নয়। অনুষ্ঠানের প্রচারের সময়ে এই সহায়িকার বিজ্ঞাপনও দিতে হবে। ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসাডর হিসাবে নিতে হবে রাজনৈতিক দলের নেতাদের। প্রত্যেকটা সহায়িকার বিজ্ঞাপনেই কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে উপস্থিত সব দলের নেতাকে রাখতে হবে। নইলে নিরপেক্ষতা বজায় থাকবে না। এইসব শর্ত মেনে গান না করলে বুঝতে হবে সংশ্লিষ্ট শিল্পী বা শিল্পীদের দল হয় চটিচাটা, নয় চাড্ডি, নইলে মাকু অথবা সেকু। কখনো কখনো তিনটের মধ্যে দুটো, বা একসঙ্গে তিনটেই।

এখানে দুটো আপত্তি উঠতে পারে।

১) গানের অনুষ্ঠান দেখতে গিয়ে বই কে পড়বে?

২) অনলাইনে কে কী বলল তাতে কী এসে যায়?

যে কোনো ফেসবুক-শিক্ষিত বাঙালিই ১ নম্বর প্রশ্নের উত্তরে জানিয়ে দেবেন যে ওটা অজুহাত, কোনো প্রশ্ন নয়। কেউ পড়বে কি পড়বে না সেটা ভাবার দায়িত্ব শিল্পীর নয়। শিল্পীকে আমাদের শর্তাবলী মানতে হবে। আমরা অত পড়বও না, সব গান মন দিয়ে শুনবও না। আমরা যারা টিকিট কেটে অনুষ্ঠান দেখতে যাইনি, তারা অনুষ্ঠানে পরিবেশিত গোটা আষ্টেক গানের মধ্যে গোটা একটা গানের ভিডিও-ও দেখব না অনলাইনে। দেখব সাড়ে তিন মিনিটের ভাইরাল হওয়া ক্লিপ, তারপর লিখব সাড়ে তিন হাজার শব্দের ফেসবুক-প্রবন্ধ। কারণ শিল্প যিনি বা যাঁরা সৃষ্টি করেন, যাবতীয় দায়িত্ব তাঁদেরই। শিল্পের রসাস্বাদন করতে কয়েক হাজার বছর ধরে মানুষ যে মানসিক পরিশ্রম করে এসেছে, সেসব করার দায়দায়িত্ব আমাদের নেই। উৎকর্ণ হয়ে গান শোনার দায়িত্ব নেই, গানের কথাগুলো নিয়ে ভাবার দায়িত্ব নেই, যে কথাগুলো বলা হচ্ছে সেগুলো কেন বলা হচ্ছে, যেভাবে বলা হচ্ছে সেভাবেই বা কেন বলা হচ্ছে? এসব নিয়ে ভাবা আমাদের কাজ নয়। আমরা শুধু দেখব আমাদের পছন্দের কথা বলা হচ্ছে কিনা। হলে প্রশংসায় ভরিয়ে দেব, ফেসবুকে লাইক দেব, শেয়ার করব। অপছন্দের কথা হলে বলব ‘ছ্যাঃ! এটা গান?’, ‘একে প্রতিবাদ বলে?’, ‘রকের ভাষা স্টেজে উঠে বলে দিলেই শিল্প হয়?’ শ্লেষ বোঝার ধৈর্য না রেখে গান বা কৌতুকের স্রেফ আক্ষরিক অর্থ দেখেই চিল চিৎকার জুড়ে দেব ‘ইশ! নারীবিদ্বেষী কথা বলে চলে গেল, আর লোকে এই নিয়ে উল্লাস করছে!’

২ নম্বর প্রশ্নটা যে ২০২৫ সালে দাঁড়িয়ে অবান্তর, তা নিয়ে বোধহয় বিতর্কের অবকাশ নেই। সোশাল মিডিয়া কেবল শিল্পচর্চার নয়, সাধারণ জীবনচর্যারই অবাঞ্ছিত কিন্তু অপরিহার্য অঙ্গ হয়ে গেছে। যে কোনো শিল্পের জনপ্রিয়তা, তা থেকে আয় – অনেকটাই নির্ধারিত হচ্ছে জিনিসটা কতখানি ভাইরাল হল তার উপরে। ফলে কোনো শিল্পমাধ্যমই আজ আর অনলাইন প্রতিক্রিয়াকে অগ্রাহ্য করতে পারে না। সিনেমা বা নাচগান, নাটকের ক্ষেত্রে আগে মুখে মুখে প্রচারের যে ব্যাপারটা ছিল, তা এখন প্রায় উঠে গেছে। যা ঘটে তা অনলাইনেই ঘটে। কোন ছবি দেখতে যাব, কাদের গান শুনতে যাব বা কোন নাটক দেখব – আমরা সকলেই ঠিক করি ফেসবুক রিভিউ পড়ে বা ইউটিউবে কেমন হিট হচ্ছে তাই দিয়ে। তাছাড়া অনলাইনে কে কী বলল তাতে যদি কিছু না-ই এসে যায়, তাহলে অনলাইনে ঘৃণাভাষণ বা মহিলাদের প্রতি লিঙ্গবিদ্বেষী মন্তব্য, ধর্ষণের হুমকি দেওয়া নিয়ে আমরা আপত্তি করি কেন?

বলা বাহুল্য, এতগুলো কথা উঠে আসছে গত কয়েক দিনে মিলনমেলা প্রাঙ্গণে একাধিক ব্যান্ডের এক অনুষ্ঠানে হুলিগানইজম ব্যান্ডের একখানা গানের কিয়দংশ নিয়ে তৈরি হওয়া উত্তেজনা সম্পর্কে।

সাড়ে তিন মিনিটের ওই ভিডিওর ভাইরাল হওয়া প্রমাণ করে, যাবতীয় ডানপন্থী ও বামপন্থী আপত্তি সত্ত্বেও বহু মানুষের ওই পরিবেশনা ভাল লেগেছে। লাগারই কথা, কারণ আজকের পশ্চিমবঙ্গে যেসব কথা সাধারণ মানুষ আলোচনা করেন ফিসফাসে, সেসব কথা হুলিগানইজম মঞ্চে দাঁড়িয়ে গলা তুলে বলে দিয়েছে। এই বাংলায় যাঁরা ঠিক করেন কোনটা গান, কোনটা প্রতিবাদ, কোনটা সিনেমা; যাঁদের সম্পর্কে নচিকেতা সেই বাম আমলে লিখেছিলেন “সংস্কৃতির গ্রাফ উঠছে না নামছে/ফিতে দিয়ে মাপছেন তাঁরা”, সেইসব লোক ও মহিলাদের চোখে ওটা গান না-ই হতে পারে, প্রতিবাদও না হতে পারে। কিন্তু যে মফস্বলের টোটোচালক এই আমলেও সিপিএম করেন আর নিয়মিত কুণাল ঘোষের দলের কর্মীদের কাছ থেকে হাতে ও ভাতে মরার হুমকি শোনেন, তিনি দেখছেন তাঁর কথা একটা গানের দল কলকাতা শহরের বুকে ঝলমলে মঞ্চে উঠে বলে দিয়েছে। যে সিপিএম করা বাসচালক নিজে বেশিদূর লেখাপড়া করতে পারেননি, ভেবেছিলেন ছেলেকে অনেকদূর পড়াবেন অথচ দেখছেন স্কুল-কলেজের বারোটা বেজে গেছে, এদিকে কেন্দ্রের শাসক দলের নেতা গরুর দুধে সোনার তত্ত্ব দিচ্ছেন, পাশের পাড়ায় বাচ্চাদের শেখানো হচ্ছে পাকিস্তান স্বাধীন হওয়ার সময়ে এগারো হাজার হিন্দু মারার গালগল্প – তিনি নিজের ছেলের ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তিত। তিনি দেখছেন, একটা জনপ্রিয় মুখ গরুর দুধে সোনার তত্ত্ব দেওয়া সাম্প্রদায়িক নেতাকে হাসির পাত্র করে দিচ্ছে। ভাবছেন যদি তাতে ছেলেপুলেদের উপর একটু প্রভাব পড়ে।

শতরূপ ঘোষের বাবুয়ানি নিয়ে দু-চার কথা বললে এঁদের কিচ্ছু এসে যায় না, বরং হয়ত ভালই লাগে। কারণ বামপন্থী দলের সংস্পর্শে এসে যদি তাঁরা একটা জিনিসও শিখে থাকেন তা এই, যে লোকে কপালের দোষে গরিব হয় না। দুনিয়ায় বড়লোক আছে বলেই গরিব আছে। সে বড়লোকের টাকা আইনি পথেই আয় করা হোক বা বেআইনি পথে।

কথাটা আলালের ঘরের দুলাল সিপিএমদেরও শেখার কথা ছিল, কিন্তু হুলিগানইজমের হুল্লোড়ে তাঁদের প্রতিক্রিয়া দেখে মনে হচ্ছে না পার্টির পক্ষ থেকে শেখানো হয়েছে। ফলে এক আশ্চর্য কাণ্ড ঘটছে গত কয়েক দিন ধরে। যে নেতাকে নিয়ে টিপ্পনী কাটা হয়েছে, তিনি ক্রুদ্ধ প্রতিক্রিয়া দেননি। অথচ সমর্থকদের ক্রোধ আর ফুরোচ্ছে না। নেতা বুদ্ধিমান, তিনি একবার, আমার বাবার টাকায় আমি গাড়ি কিনেছি বেশ করেছি – এই মর্মে আস্ফালন করেই সম্ভবত বুঝে গেছেন যে কমিউনিস্ট পার্টি করে ওকথা বলা চলে না। কিন্তু বিদেশে ছুটি কাটাতে যাওয়া, দামি গাড়ি চড়া ভক্তবৃন্দের এ যে অস্তিত্বের সংকট। যে ভোগে আপাদমস্তক ডুবে আছেন, তা কমিউনিস্টসুলভ নয় – এ বার্তা দিকে দিকে রটি গেলে বামপন্থী হওয়ার রেলাটি বজায় রাখা যে শক্ত হয়ে যাবে। মঞ্চের হুলিগানরা যেভাবে তাঁদের নেতাকে নিয়ে খিল্লি করল, তাতে সাহস পেয়ে যদি গরিব নিম্নবিত্ত বামপন্থীরা এঁদের নিয়ে খিল্লি করতে শুরু করে! এই আতঙ্কেই ‘ওটা কোনো গান নয়’, ‘ওটা প্রতিবাদ হয়নি’, ‘ওই আক্রমণে হুল নেই’ ইত্যাদি বাণী সাড়ে তিন দিনে সাড়ে তিন লক্ষ বার সোশাল মিডিয়ায় লেখা, সাড়ে তিন কোটি শেয়ার করা নয় তো? কিছুই যখন হয়নি, তখন রিমের পর রিম এ নিয়ে লেখার দরকার কী? যাদের জিনিসটা ভাল লেগেছে তাদের দিকে তেড়ে যাওয়ার দরকারই বা কী?

ব্যাপারটাকে খিস্তি খেউড় বলে উড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা যাঁরা করছেন, তাঁরা ভুলে যাচ্ছেন – এটা বাংলা। এখানে কবির লড়াই, তরজা, খেউড়ও খাঁটি দিশি সংস্কৃতি। হুলিগানইজমের অন্যতম প্রধান গায়ক অনির্বাণ ভট্টাচার্য নাহয় ‘গরিবের উত্তমকুমার’ (এই অভিধার প্রকট সাহেবিয়ানা এবং গরিবের সংস্কৃতিকে নিকৃষ্ট বলার প্রচ্ছন্ন বাবুয়ানিটি কি বামপন্থী?), শতবর্ষে পা দেওয়া আসল উত্তমকুমারের এন্টনী ফিরিঙ্গী (১৯৬৭) দেখলেই ব্যাপারটা জানা যায়। অবশ্য শহুরে মধ্যবিত্ত, উচ্চবিত্ত বামপন্থীদের অনেকে সত্যজিৎ-ঋত্বিক-মৃণালের বাইরে বাংলা ছবি দেখেননি। ফলে তাঁরা না-ও জানতে পারেন। কিন্তু আজকের পৃথিবীতে কীভাবে প্রতিবাদের ভাষা এবং ভাষ্য পালটে ফেলছেন শিল্পীরা; শিল্পমাধ্যম এবং সাংবাদিকতার সীমারেখা কীভাবে প্রায়শই মুছে যাচ্ছে – সেটুকু তো জানা উচিত। বামপন্থী নেতাদের থেকে সাধারণ জীবনযাপন আশা করা অনুচিত – এমনটা প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা হচ্ছে। এরপর কি শুনতে হবে তাঁদের কাছে আন্তর্জাতিক চেতনাও আশা করা উচিত নয়? নাকি সেটা বছর বছর ১ সেপ্টেম্বরের মিছিলেই সীমাবদ্ধ থাকবে বলে মেনে নিতে হবে?

চলতি বামাবেগের অরাজনৈতিকতা আরও স্পষ্ট হয়ে যায় হুলিগানইজমের পরিবেশনা নিয়ে ডানপন্থী আপত্তির দিকে তাকালে। বিজেপি নেতা দিলীপ ঘোষকে নিয়ে টিপ্পনী কাটা হয়েছে, তিনি প্রতিক্রিয়ায় বলেছেন – বাকস্বাধীনতা আছে বলেই যা খুশি বলা যায় না। অথচ তাঁর দলের আইনজীবী নেতা তরুণজ্যোতি তিওয়ারি হুলিগানইজম, এবং দুই তাদের প্রধান গায়কের অন্যতম, অনির্বাণের নামে পুলিসে যে লিখিত অভিযোগ জানিয়েছেন তা কিন্তু দিলীপের প্রতি কটূক্তি নিয়ে নয়, সনাতন ধর্ম সম্পর্কে অন্য একটা টিপ্পনীর জন্য। সোশাল মিডিয়ার ডানপন্থীদেরও ওই সাড়ে তিন মিনিট নিয়ে আপত্তির কারণ সনাতন সম্পর্কে রসিকতা – যা ভারতের দক্ষিণপন্থী রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু। ব্যক্তি নেতাকে নিয়ে তাঁরা ভাবিত নন। অথচ বামেরা উত্তেজিত শতরূপের গাড়ির মান বাঁচাতে। তাহলে কি নেতা আর পার্টি অভিন্ন এঁদের কাছে? যেমন হিন্দুত্ববাদীদের কাছে ২০২৪ নির্বাচনের আগে পর্যন্তও নরেন্দ্র মোদী আর বিজেপি অভিন্ন ছিলেন? শতরূপ কি এত বড় নেতা? যদি তা-ই হয়, তাহলে আবার ‘সাহস থাকলে মহম্মদ সেলিমকে আক্রমণ করতে পারত, সফট টার্গেট বেছেছে’ – এমন কথা উঠছে কেন? যে নেতার এত অনুরাগী, তিনি ‘সফট টার্গেট’ হন কী করে? আর যদি ‘সফট টার্গেট’-ই হন, তাহলে তাঁকে নিয়ে সামান্য একটা গানের দলের টিপ্পনীকে পার্টির প্রতি আক্রমণ বলে ভেবে ফেলা কেন? তৃণমূল সরকার যখন খামোকা মীনাক্ষী মুখার্জিকে হাজতবাস করাল, তখন এর অর্ধেক উৎসাহ নিয়ে সিপিএমের এই সদস্য সমর্থকরা তাঁকে ছাড়িয়ে আনতে গেলেও বোধহয় সরকারের হৃদকম্প হয়ে যেত, তাঁকে ছেড়ে দিতে বাধ্য হত। তা তো করা হয়নি। তাহলে ‘সফট টার্গেট’ আসলে কে? শতরূপ না মীনাক্ষী? বামেরা বলছেন হুলিগানদের অন্য দুই টার্গেটও ‘সফট’। হয়ত ঠিকই বলছেন, কারণ কুণাল আর দিলীপকে নিয়ে তাঁদের পার্টির সদস্য, সমর্থকরা কিন্তু এত হইচই করলেন না।

এইবার যে যুক্তিটা উঠে আসা অনিবার্য, সেটা শিল্প সম্বন্ধে নয়, শিল্পী সম্বন্ধে। শিল্পীর অধিকার সম্বন্ধে বললেও ভুল হয় না। নিশ্চয়ই বলা হবে, হুলিগানইজম বলে গুলিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করবেন না। আসল হল অনির্বাণ। তিনি সুবিধাবাদী, তিনিই চটিচাটা, তিনিই আর জি কর আন্দোলন নিয়ে চুপ ছিলেন, তিনিই শিক্ষা দুর্নীতি নিয়ে কথা বলেননি। এখন তিনি জ্ঞান দিলে শুনতে হবে?

এ থেকেও বামপন্থীদের সম্বন্ধে ভারি মজার কিছু কথা টের পাওয়া যাচ্ছে। দক্ষিণপন্থীদের আক্রমণের তির অনির্বাণের উপর স্থির থাকার কারণ সহজবোধ্য। ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে, সনাতন নিয়ে রসিকতা তিনিই করেছেন। শতরূপ ঘোষকে নিয়ে রসিকতা কিন্তু তাঁর মুখ দিয়ে বেরোয়নি। অন্য দুই ঘোষকে নিয়ে তিনি ফুট কাটলেও, শতরূপকে নিয়ে ছড়া কেটেছেন দেবরাজ ভট্টাচার্য। অথচ তিনি চটিচাটা – এমন অভিযোগ কেউ তুলছেন না। এ বোধহয় ব্যক্তির ঊর্ধ্বে দল – মার্কসবাদের এই প্রাথমিক পাঠ ভুলে মেরে দেওয়ার ফল। বস্তুত, ব্যাপারটাকে শতরূপ বনাম অনির্বাণ বানিয়ে ফেলা বামেদের বয়ান দেখে মনে হচ্ছে না তাঁরা কেউ জানেন যে গানগুলো ‘অনির্বাণের গান’ নয়, ব্যান্ডটার গান। এমনও হতে পারে, ওই গা জ্বালানো ছড়াগুলো অনির্বাণের লেখাই নয়। সেক্ষেত্রে ব্যান্ডের বাকিদের তৃণমূলী সংযোগের ফর্দ দেওয়াও কর্তব্য ছিল। অথচ হুলিগানদের উপর রেগে কাঁই হয়ে যাওয়া জনপিণ্ডের কতজন ওই ব্যান্ডের বাকি সদস্যদের নাম বলতে পারবেন তা নিয়েই সন্দেহ আছে। কেবল গৌরবে বহুবচন করা তো ঠিক নয়, তাই হুলিগানইজমের বাকি সাতজনের নাম এইবেলা স্মরণ করে নেওয়া যাক – শুভদীপ গুহ, কৃশানু ঘোষ, সোমেশ্বর ভট্টাচার্য, নীলাংশুক দত্ত, প্রীতম দাস, প্রীতম দেব সরকার, সুশ্রুত গোস্বামী।

সে যা-ই হোক, ওই দলের সবচেয়ে জনপ্রিয় মুখ যখন অনির্বাণ, তখন তাঁকেই আক্রমণ করার যুক্তি ভুল নয়। অনির্বাণের বিজেপির লোক হওয়ার প্রমাণ হাজির করতে না পারলেও, তৃণমূলের পক্ষের লোক হওয়ার প্রমাণ হাজির করেছেন সোশাল মিডিয়ার বীরপুঙ্গবরা। তিনি খোদ মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জির হাত থেকে সরকারি সম্মান গ্রহণ করেছেন। এ একেবারে বামাল সমেত ধরা পড়া যাকে বলে। মুশকিল হল, সরকার আর দলের ভেদরেখা মুছে যাচ্ছে বলে এ রাজ্যের বিরোধীরা সঙ্গতভাবেই চেঁচামেচি করে থাকেন। কিন্তু সরকারি সম্মানকে এক্ষেত্রে তৃণমূল দলের দেওয়া সম্মান বলে ধরে নিতে একটুও ইতস্তত করছেন না। যদি তাও হয়, তাহলে একই যুক্তিতে প্রয়াত সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়কেও তৃণমূলের লোক বলতে হয়। কারণ শেষ বয়সে তিনিও রাজ্য সরকারের দেওয়া বঙ্গবিভূষণ পুরস্কার (২০১৭) গ্রহণ করেছিলেন। সুখের বিষয়, তেমনটা কোনো সিপিএম সদস্য সমর্থক আজ পর্যন্ত বলেননি। আমৃত্যু সৌমিত্র প্রকাশ্যেই বামপন্থী ছিলেন, তাঁর সেই সম্মান আজ পর্যন্ত কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা বামপন্থীরা করেননি। ফলে গুটিটা গোড়াতেই কেঁচে যাচ্ছে।

অনেকের অবশ্য সূক্ষ্মতর বক্তব্য আছে। অনির্বাণ তৃণমূলী নন, কিন্তু সুবিধাবাদী। কারণ তিনি আর জি কর আন্দোলনে যোগ দেননি। পশ্চিমবাংলার এত বড় নিয়োগ কেলেঙ্কারির কথা তাঁদের ব্যান্ডের গানে নেই। কেন আর জি কর আন্দোলনে যোগ দেননি, তার ব্যাখ্যা অনির্বাণ ইতিমধ্যেই বহুবার দিয়েছেন। সে ব্যাখ্যা কেউ অবিশ্বাস করতেই পারেন, বিশ্বাস করলেও অপছন্দ করতে পারেন। কিন্তু সমস্যা অন্য। যে কোনো ব্যক্তিরই নিন্দা করা যেতে পারে কোনো বিষয়ে প্রতিবাদ না করার জন্যে। কিন্তু পরবর্তীকালে কোনো বিষয়ে তিনি কথা বললেই ‘তখন কথা বলেননি, অতএব এখনো চুপ করে থাকতে হবে’ – এই দাবি প্রথমত বনলতা সেনগিরি, দ্বিতীয়ত গা জোয়ারি। এতে মানুষের বাকস্বাধীনতা কেড়ে নেওয়ার ইচ্ছাই প্রকাশ পায়। শেষ বিচারে সেটা দক্ষিণপন্থাই।

এটাই বা কীরকম আবদার, যে একজন শিল্পীর শিল্পকে বিচার করতে হবে তিনি শিল্পের বাইরে কী করেছেন বা করেননি তা দিয়ে? আমি জানি অমুক ডাক্তার চমৎকার পেটের চিকিৎসা করেন। আমার পেটের অসুখ দীর্ঘদিন ধরে সারছে না, হাজারটা ডাক্তার দেখিয়ে হয়রান হয়ে গেছি, তবু তাঁর কাছে যাব না, যেহেতু তিনি বিবাহ বহির্ভূত প্রেম করেন? এরকম হাস্যকর যুক্তিতে আর কোন জিনিসটা করি আমরা? শিল্পীদের নিয়ে ভাবতে গেলেই আমাদের এরকম ভাবনার উদয় কেন হয় – তা নিয়ে বোধহয় রাজ্যের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর পিএইচডি করানোর ব্যবস্থা করা উচিত এবার।

পৃথিবীর যে কোনো দেশে, যে কোনো কালে শিল্পীদের প্রধান কাজ ক্ষমতাবানের ত্রুটি ধরা, শাসককে এবং সমাজকে নিয়ে বিদ্রুপ করা। প্রতিবাদ, প্রতিরোধ, আন্দোলনে অনুপ্রেরণা দেওয়া। আন্দোলনে নামলে ভাল, না নামলে মহাপাপ হয় না। আন্দোলন করা রাজনীতির লোকেদের কাজ। শিল্পীরা চাইলেই যে আন্দোলন করতে পারবেন তাও নয়। সবাই রবীন্দ্রনাথ হন না যে স্বয়ং স্বদেশি আন্দোলনে নেতৃত্ব দেবেন। লক্ষণীয়, সে আন্দোলন থেকে তিনি আবার বেরিয়েও এসেছিলেন। কারণ তাঁর মনে হয়েছিল, ওই আন্দোলনে সত্যের চেয়ে ভান বেশি। এই সিদ্ধান্তের কারণে তাঁকে তখনকার জাতীয়তাবাদীদের বিষনজরেও পড়তে হয়েছিল। তারপরেও হিজলি জেলে বন্দিহত্যা নিয়ে তিনি ‘প্রশ্ন’ কবিতাটা লিখেছেন। সে কবিতায় না আছে হিজলি জেলের নাম, না আছে ইংরেজ সরকারের উল্লেখ। এখন হলে নির্ঘাত তাঁকে শুনতে হত ‘ওসব চালাকি। দম থাকলে গভর্নর জেনারেলের নাম করে লিখত।’ ভাগ্যিস তখনকার বাঙালির সহায়িকা দরকার হত না!

কদিন আগেই উৎপল দত্তের জন্মদিন গেছে। তিনি ঘোষিত বামপন্থী, আমৃত্যু সিপিএম দলের ঘনিষ্ঠ, নাট্যজগতে তাঁর অবদান অনস্বীকার্য এবং মঞ্চে তাঁর সব কাজই রাজনৈতিক। কিন্তু গত কয়েক দিনের ঘটনাপ্রবাহ দেখে সন্দেহ হচ্ছে – তাঁর জন্মদিনকে ব্যবহার করে যাঁরা ফেসবুক পোস্টে লিখছিলেন উৎপলবাবুর মেরুদণ্ড ছিল, আজকের শিল্পীদের নেই, উৎপলবাবুকে আজ পেলে তাঁকেও মেরুদণ্ডহীন বলতেন। কারণ তিনি রোজগারের জন্যে জনপ্রিয় হিন্দি বাণিজ্যিক ছবিতে অভিনয় করেছেন। এমনকি প্রথম বামফ্রন্ট সরকারের অর্থমন্ত্রী অশোক মিত্র তো লিখেছেন, নাটক করার অপরাধে কংগ্রেস আমলে কারারুদ্ধ উৎপলকে ছাড়িয়ে নিয়েছিলেন বম্বের কোনো ছবির প্রযোজক, যাতে তাঁর শুটিং নষ্ট না হয়। এই লোকের কল্লোল বা দুঃস্বপ্নের নগরী যতই সরাসরি রাজনৈতিক হোক, আজকের কমরেডরা কি আর পাত্তা দিতেন? তখন বাঙালির রাজনীতির সর্বজনস্বীকৃত পদ্ধতি ছিল – জ্যোতি বসু, প্রমোদ দাশগুপ্তেরা ধুন্ধুমার আন্দোলন করবেন। নিজেদের শিল্পের মাধ্যমে রাজনৈতিক বার্তা দেবেন উৎপলবাবু বা মৃণাল সেনরা। এখন ডান, বাম নির্বিশেষে বাঙালির চাহিদা হয়েছে উলটো – শতরূপ, দিলীপদের স্টুডিওয় যেতে হবে। মিছিলে যেতে হবে অনির্বাণদের।

আরও পড়ুন অনির্বাণ কাজ পাচ্ছেন না: টালিগঞ্জের অর্ধসত্য বা হিমশৈলের চূড়া

এই উলটো বুঝলি প্রজার দেশে গানের দলের সমালোচনায় তাদের গান নিয়ে আলোচনা হবে না। হুলিগানইজমের এর আগে প্রবল ভাইরাল হওয়া ‘মেলার গান’-এর রাজনীতি আজ পর্যন্ত খেয়াল করার সময় সুযোগ পাননি বামপন্থীরাও। অনির্বাণের সমালোচনা করতে হলেও তাঁর কাজের সমালোচনা করা হয় না। হয় তিনি কাকে বিয়ে করেছেন আর কাকে করেননি তা দিয়ে সুবিধাবাদী প্রমাণের চেষ্টা, নয় কোন মিছিলে গেছেন আর কোন মিছিলে যাননি তা নিয়ে ক্রিকেটের ধারাভাষ্যকারদের মত গ্রাফিক বিশ্লেষণ। এসব আলোচনার সিদ্ধান্ত আগে থেকেই স্থির থাকে। নইলে ভুলে যাওয়ার কথা নয় যে অনির্বাণ নির্দেশিত মন্দার সাম্প্রতিককালের বাংলা বিনোদন জগতের সবচেয়ে রাজনৈতিক দুটো ওয়েব সিরিজের অন্যতম (অন্যটা প্রদীপ্ত ভট্টাচার্য নির্দেশিত বিরহী)। মন্দারে গোড়াতেই একটা রাজনৈতিক হত্যা দেখানো হয়, যিনি খুন হন তিনি একজন বামপন্থী শ্রমিক নেতা। তাঁর রাজনৈতিক পরিচয় নিয়ে বিন্দুমাত্র ধোঁয়াশা রাখা হয়নি। তাছাড়া বাংলা ছবির ইতিহাসে একটা অভূতপূর্ব ঘটনা গতবছর ঘটিয়েছেন অর্ণ মুখোপাধ্যায় আর অনির্বাণ। তাঁদের যুগ্ম নির্দেশনায় মুক্তি পেয়েছে অথৈমঞ্চসফল নাটক থেকে করা এই ছবিতে পশ্চিমবাংলার ভদ্রলোকদের মুখোশ ছিঁড়ে ফেলে দেখানো হয়েছে তাদের জাতপাতের বাছবিচার কত ভয়ঙ্কর।

তালিকা দীর্ঘতর করা যায়, তবে লেখা দীর্ঘতর করে লাভ নেই। কারণ একবিংশ শতাব্দীতে আমাদের মনোযোগের আয়ু মাত্র আড়াই মিনিট। কিন্তু এই ভাবনা পীড়াদায়ক যে সংস্কৃতি আর রাজনীতি নিয়ে চিরকাল কলার তোলা বাঙালির এখন ভোট চুরি, ভোটার তালিকার আসন্ন বিশেষ নিবিড় সংশোধনী, দেশের বিভিন্ন প্রান্তে বাঙালি বিতাড়ন নিয়ে দিনরাত উত্তেজিত থাকার কথা ছিল এবং সব দলের নেতাদের ব্যতিব্যস্ত করে রাখার কথা ছিল। অথচ বাঙালিদের একটা অংশ মেতে আছে থিয়েটার ও সিনেমার একজন জনপ্রিয় শিল্পীর যাবতীয় কাজ নস্যাৎ করে দিতে, যেহেতু তাঁর গানের দল তাদের আদুরে নেতার ত্রুটি তুলে ধরেছে। দেখছি, মেলার গানে যথার্থই লেখা হয়েছে ‘আমাদের জীবনতলায় মোটরগাড়ি ঘুরছে মরণকুয়ায়…’।

ইনস্ক্রিপ্ট ওয়েবসাইটে প্রকাশিত

ভোটচুরির অভিযোগ আমাদের এনে ফেলেছে এক সন্ধিক্ষণে

গণতন্ত্রকে অস্বীকার করা এবং গণতন্ত্র নষ্ট করার অভিযোগ উঠলে সগর্বে ‘বেশ করেছি’ বলার এই ঔদ্ধত্যই ফ্যাসিবাদ। এর সঙ্গে অন্য কোনও সরকারের অন্যায়ের, অপশাসনের তুলনা চলে না। এ-কথা যাঁরা আজ বুঝবেন না, ফ্যাসিবাদ জাঁকিয়ে বসতে পারলে ভারতের গণতন্ত্রের পাশাপাশি তাঁদেরও ঠাঁই হবে জাদুঘরে।

এক যুগ পরে এমন একটা ঘটনা ঘটল স্বাধীনতা দিবসের ঠিক দুদিন আগে, যা এতদিনের অনভ্যস্ত কানে অবিশ্বাস্য মনে হল— ভারতের শাসক দল আর বিরোধী দল একমত হয়েছে। কোন বিষয়ে? ভোটচুরি সম্বন্ধে। যে সে লোক নয়, দেশের গদ্দারদের দেখলেই গুলি করার পক্ষপাতী যিনি, সেই অনুরাগ ঠাকুর স্বয়ং সাংবাদিক সম্মেলন করে ঠিক তাই বললেন, যা লোকসভার বিরোধী দলনেতা তথা কংগ্রেসের সবচেয়ে বড় নেতা রাহুল গান্ধী তার হপ্তাখানেক আগে বলেছিলেন— ভোটার তালিকায় ব্যাপক কারচুপি করে ভোটচুরি করা হয়েছে। সত্যি কথা বলতে, অনুরাগ রাহুলের বক্তব্যকে আরও জোরদার করে দিয়েছেন।

রাহুল তো বলেছিলেন তাঁর দলের লোকেরা নির্বাচন কমিশনের দেওয়া কম্পিউটার স্ক্যানেরও অযোগ্য সাত ফুট উঁচু কাগজ ঘেঁটে ভোটচুরির প্রমাণ বের করেছেন মোটে একখানা লোকসভা কেন্দ্রের একখানা বিধানসভা অঞ্চলে। চাইলে কমিশন বলতেই পারত যে এত বড় দেশে একটা লোকসভা কেন্দ্রে ভুলচুক হয়ে থাকতেই পারে। এ দিয়ে প্রমাণ হয় না যে সারা দেশে এ জিনিস হয়েছে। কিন্তু অনুরাগ আরও গভীরে গবেষণা করেছেন। তিনি সারা দেশের নানা রাজ্যের আধ ডজন লোকসভা আসনের তথ্য তুলে ধরেছেন। সেগুলোতেও দেখা যাচ্ছে রাহুল-চিহ্নিত মাধবপুরা আসনের মতোই কাণ্ড ঘটেছে।

৭ আগস্ট ছিল বৃহস্পতিবার, অর্থাৎ হিন্দুমতে লক্ষ্মীবার। সেদিন রাহুলের সাংবাদিক সম্মেলন এবং তারপর থেকে যা যা হয়ে চলেছে, তাতে মা লক্ষ্মী হিন্দুত্ববাদীদের উপর অপ্রসন্ন বলেই বোধ হচ্ছে। ২০১৪ সালে বিজেপি কেন্দ্রে ক্ষমতায় আসার পর থেকেই কংগ্রেস, আম আদমি পার্টির মতো একাধিক বিরোধী দল ভোটে কারচুপির অভিযোগ করে যাচ্ছে। প্রায় সব অভিযোগের ক্ষেত্রেই আঙুল উঠেছে ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিনের দিকে। কমিশন পাত্তা দেয়নি, বিজেপি তো দেয়নি বটেই। নিজেরা জিতলে বলেছে ‘হেরো পার্টি অজুহাত খুঁজছে’, আর বিরোধীরা জিতলে বলেছে ‘এবার কেন ওরা ইভিএমের কথা বলছে না?’ অথচ ইভিএমের বিরুদ্ধে অভিযোগগুলো মোটেই ফেলে দেওয়ার মতো ছিল না, অভিযোগকারীরা যে শলাপরামর্শ করে অভিযোগ করেছে তা-ও নয়। কেবল বিরোধীরাই অভিযোগ করেছে এমনও নয়। সাংবাদিকরা খবর করেছেন ইভিএম বেপাত্তা, গণতান্ত্রিক অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠন অভিযোগ করেছে যে প্রদত্ত ভোট আর ইভিএমে গোনা ভোটের সংখ্যার তফাত হয়েছে প্রচুর আসনে— সবই মাছি তাড়ানোর মতো করে উড়িয়ে দিয়েছে নির্বাচন কমিশন। আদালতে আবেদন করেও লাভ হয়নি। বিজেপিবিরোধী ভোটাররাও বিশ্বাস করেছেন যে বিরোধীরা নিজেদের কাজটা ঠিকমতো করে না, তাই এসব বলে। যতটুকু যা কারচুপি হয় তা চিরকালই হত, যখন যে ক্ষমতায় থাকে সে-ই করে। ফলে হিন্দুত্ববাদীরা বেশ নিশ্চিন্তেই ছিল।

কিন্তু বিষ্যুদবার দুপুরে রাহুল একেবারে অন্যদিক থেকে আক্রমণ করলেন। বললেন, গোড়ায় গলদ। ভোটার তালিকা ঘেঁটে বের করা তথ্য চোখের সামনে তুলে ধরলেন, দিস্তা দিস্তা কাগজ হাতে দেখিয়ে দিলেন— অভূতপূর্ব কারচুপি হচ্ছে। আমাদের গণতন্ত্রের নানা ত্রুটি থাকলেও, সেরা বৈশিষ্ট্য হল— মুকেশ আম্বানির একটা ভোট, আমার বাড়ির কাজের দিদিরও একটাই ভোট। ওটাই ভারতের গণতন্ত্রের জোর, আমাদের গর্বের জায়গা। এই জায়গাটা সেই ১৯৫২ সালের প্রথম নির্বাচন থেকেই স্বাধীন ভারতে তৈরি করা হয়েছে। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার প্রথম দিন থেকে ধনী-গরিব, নারী-পুরুষ, হিন্দু-বৌদ্ধ-শিখ-জৈন-পারসিক-মুসলমান-খ্রিস্টান, উঁচু জাত-নিচু জাত— সবার ভোটাধিকার আছে, এই গর্ব করার অধিকার গোটা দুনিয়ায় একমাত্র আমাদের। এমনকি গ্রেট ব্রিটেন বা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেরও এই ইতিহাস নেই। আর ৭৮ বছরের অবহেলায় অর্থবল, বাহুবলের গুরুত্ব বাড়তে বাড়তে ভারতীয় গণতন্ত্র যেখানে পৌঁছেছে তাতে আজ আপামর ভারতবাসীর গণতান্ত্রিক সম্বল বলতে ওই ভোটটুকুই। সেটাই যে চুরি হয়ে যাচ্ছে তা রাহুল আক্ষরিক অর্থে কাগুজে প্রমাণ দিয়ে দেখিয়ে দিলেন। যতই ডিজিটাল ইন্ডিয়ার ঢাক বাজানো হোক, দেশের অধিকাংশ মানুষ এখনও মোবাইল ছাড়া আর কোনও ইলেকট্রনিক জিনিসের ব্যবহার জানেন না। তাঁদের কাছে কাগজে ছাপা জিনিসের মর্যাদা এখনও বেশি। এই কথাটা আমরা অনেকেই বুঝতে পারি না, গরিব মানুষের পার্টি বলে যারা নিজেদের দাবি করে তারাও অনেকে বোঝে না। রাহুল বা কংগ্রেস যে সেটা বুঝেছে, সেদিনের সাংবাদিক সম্মেলন তার প্রমাণ। পাওয়ার পয়েন্ট প্রেজেন্টেশনে দেশের বড় অংশের মানুষকে কিছুই বোঝানো যেত না, যদি রাহুল ইয়া মোটা মোটা বইয়ের মতো করে প্রমাণগুলো চোখের সামনে হাজির না করতেন। লক্ষ করার মতো ব্যাপার হল, সাংবাদিকরা কিন্তু ইভিএম কারচুপির প্রশ্নও তুলেছিলেন। রাহুল সেদিকে গেলেনই না, বললেন আসল গলদ নির্বাচন কমিশনের। ওই জায়গাটা ঠিক না থাকলে ব্যালটেই ভোট হোক আর ইভিএমে— ভোটচুরি হবেই।

আরও পড়ুন বিধবা, পিতৃহীন শিশু – সকলকে জবাব দিতে হবে সেকুলারদের

বিষ্যুদবারের ক্ষত মেরামত করার চেষ্টা করতে করতে এক সপ্তাহ কাটিয়ে ফেলল নির্বাচন কমিশন আর বিজেপি। কিন্তু দেখা যাচ্ছে এ-দেশের নির্বাচন হয়ে দাঁড়িয়েছে কেশব নাগের অঙ্ক বইয়ের চৌবাচ্চার মতো। রাহুল জল বেরোবার এত বড় গর্ত করে দিয়েছেন যে জল ঢোকার নল দিয়ে কমিশন আর বিজেপি যতই জল ঢোকাক, চৌবাচ্চা দ্রুত খালি হয়ে যাওয়ার দিকে এগোচ্ছে। প্রথমে কমিশন বলল হলফনামা জমা না দিলে রাহুলের অভিযোগ নিয়ে তদন্ত করব না। অবিলম্বে জানা গেল নিয়মানুযায়ী এতে হলফনামা জমা দেওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। তারপর নির্বাচন কমিশনের কর্ণাটকের সিইও একখানা হাস্যকর কাজ করে বসলেন। রাহুলকে নোটিস পাঠালেন, তিনি যেন অভিযোগ তথ্যপ্রমাণ-সহ জমা দেন। একে তো যার বিরুদ্ধে চুরির অভিযোগ সে-ই দাবি করছে তার কাছে চুরির প্রমাণ দিতে হবে, তার উপর তারই কাছ থেকে নেওয়া নথিকে প্রমাণ বলে মানতে সে রাজি নয়। জনপ্রিয় বাংলা ছবির ফুটো মস্তানের সংলাপই এখানে পরিস্থিতির সবচেয়ে যথার্থ বর্ণনা দিতে পারে— ‘এ কে রে সান্তিগোপাল! এ তো আজব কালেকসন!’

এদিকে রাহুল ভাঙা বেড়া দেখিয়ে দিতেই শেয়ালরা বেরিয়ে এল পালে পালে। মহম্মদ জুবেরের মতো সাংবাদিক থেকে শুরু করে বিভিন্ন রাজ্যের কংগ্রেস কর্মী, সাধারণ উৎসাহী মানুষ, এমনকি গোদি মিডিয়ার একটা অংশও (যেমন ইন্ডিয়া টুডে গ্রুপ) তদন্তে নেমে পড়ল এবং দেখা গেল, যেখানে ছাই উড়ছে সেখানেই অমূল্য রতন পাওয়া যাচ্ছে।

এমতাবস্থায় রেফারির হয়ে মাঠে নামতে হত বিজেপির চাণক্যকে, যদি তিনি সত্যিই চাণক্যের মতো কূটবুদ্ধিসম্পন্ন হয়ে থাকেন। কিন্তু তিনি স্পিকটি নট, মাঠে নামিয়ে দিলেন অনুরাগকে। তিনি ভাবলেন রাহুল আর প্রিয়াঙ্কা গান্ধীর জেতা রায়বেরিলি আর ওয়ায়নাড়, তৃণমূল কংগ্রেস নেতা অভিষেক ব্যানার্জির জেতা ডায়মন্ড হারবার আসনের ভোটার তালিকাতেও গোলমাল আছে দেখালেই সব কোলাহল থেমে যাবে। কিন্তু বাপু তা কী হয়? অতি বুদ্ধিমান বাঙালি ভদ্রলোক আর সারা দেশের অন্ধ ভক্তরা ছাড়া সকলেই বুঝতে পারছে, নির্বাচন কমিশনকে দিয়ে বিজেপি যে কাণ্ডটি ঘটিয়ে চলেছে বলে মনে হচ্ছে, তা চিরাচরিত ভোটের দিনের রিগিং নয়। পেশিশক্তির জোরে লোককে ভয় দেখিয়ে ভোট দিতে না দেওয়া, নিজের লোক ঢুকিয়ে পরের পর ভোট দেওয়ানো বা ভোটার তালিকা দেখে অনুপস্থিত ভোটারের জায়গায় নিজের লোককে ভোট দেওয়ানো দেশের সব দলই করেছে কোনও না কোনও সময়ে। কিন্তু নির্বাচন কমিশন নিজেই এমন ব্যবস্থা করে দিচ্ছে যাতে একটা নির্দিষ্ট দলের সমর্থকরা যতবার ইচ্ছে যেখানে ইচ্ছে ভোট দিতে পারে (এখনও আমরা জানি না ব্যাপারটা ঠান্ডা ঘরে বসে মেশিনের মাধ্যমেই সম্পন্ন হয়ে যাচ্ছে কিনা), ভোটার তালিকায় নাম যোগ-বিয়োগ করা হচ্ছে একটা দলকে হারা আসনও জিতিয়ে দেওয়ার উদ্দেশ্যে— এ জিনিস অভূতপূর্ব। এটা চলতে থাকলে দেশে আর ত্রুটিপূর্ণ গণতন্ত্রও আছে বলা যায় না। ভ্লাদিমির পুতিনের রাশিয়া হয়ে উঠতে আর দেরি নেই আমাদের।

এই সেদিনও রাহুলকে বিজেপির বিরুদ্ধে উপযুক্ত নেতা বলে মনে করত না তৃণমূল কংগ্রেস। সেই অজুহাতে ত্রিপুরা, মণিপুর, মেঘালয়, গোয়ার মতো রাজ্যে জিতবে না জেনেও লড়তে চলে গেছে। সেই তৃণমূলের দু-নম্বর নেতা অভিষেক ৭ তারিখের সাংবাদিক সম্মেলনের পর থেকেই রাহুলের প্রত্যেক কথায় সায় দিচ্ছেন। তাঁর দলের সাংসদরা দৃশ্যতই রাহুলের বাহিনীর সৈনিক হয়ে উঠেছেন। একইভাবে বিভিন্ন সময়ে কংগ্রেসকে সাবোতাজ করতে গোয়া, গুজরাতের মতো রাজ্যে নির্বাচনে লড়তে চলে যাওয়া আম আদমি পার্টির সাংসদরা দিল্লি বিধানসভা নির্বাচনে হেরে যাওয়ার পরে প্রায় উধাও হয়ে গিয়েছিলেন। তাঁরাও রাহুলের পাশে দাঁড়িয়ে পড়েছেন, ১১ তারিখের নির্বাচন সদন অভিযানেও যোগ দিয়েছিলেন। সমাজবাদী পার্টির অখিলেশ যাদবের ব্যারিকেড টপকে যাওয়ার স্পর্ধা আর রাষ্ট্রীয় জনতা দলের তেজস্বী যাদবের মারমুখী মেজাজের রাজনৈতিক স্বার্থ সহজবোধ্য। সামনে বিহারে বিধানসভা নির্বাচন, ২০২৭ সালে উত্তরপ্রদেশে। তেজস্বী আর অখিলেশ ওই দুই রাজ্যের প্রধান বিরোধী নেতা, ক্ষমতায় আসতে মরিয়া হওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু তৃণমূল তো ২০২৬ বিধানসভা নির্বাচনেও হইহই করে জিতবে বলছেন বোদ্ধারা। বিরোধীরাও আড়ালে তা স্বীকার করে। আর আপের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে নির্ঘাত স্বয়ং অরবিন্দ কেজরিওয়ালও আশাবাদী নন, তাই এত বড় কাণ্ড নিয়ে একটা সোশাল মিডিয়া পোস্ট পর্যন্ত করছেন না। তাহলে এই দুই দলের কংগ্রেসের সঙ্গে এমন শক্ত জোট বাঁধার কারণ কী?

কারণ গত এক সপ্তাহে যা ঘটছে তার সঙ্গে বিহারে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধনীর নামে যেভাবে মানুষের ভোটাধিকার হরণ চলছে (এরপর পশ্চিমবঙ্গে এবং তারপর গোটা দেশে চলবে), তা মিলিয়ে দেখলে যে কেউ বুঝতে পারে— এরপর থেকে সব ভোটে জিতবে বিজেপিই। এখন বিজেপি বাদে সবাই একজোট না হলে কোনও দলেরই আর অস্তিত্ব থাকবে না। ফলে অসুস্থ হয়ে পড়া তৃণমূল সাংসদ মিতালী বাগকে একদিক থেকে রাহুল, অন্যদিক থেকে সিপিএম সাংসদ জন ব্রিটাস ধরে আছেন— এই ভাইরাল ছবি আসলে মানুষের বিপদে জোট বাঁধার আদিম অভ্যাসের চিত্র। সবাই মিলে রাস্তার দখল নিয়ে, পাহাড়প্রমাণ আন্দোলনের ঢেউ তুলে যদি বিজেপির ইমারত ভাঙতে পারেন, তবেই আলাদা আলাদা দল করার মানে থাকবে। তখন কে ভালো কে মন্দ, কে কম রিগিং করে কে বেশি রিগিং করে, কে বুর্জোয়া কে কমিউনিস্ট, কোনটা ফ্যাসিবাদ কোনটা নয়া ফ্যাসিবাদ— এসব নিয়ে তর্কাতর্কি, মারামারি করার ফুরসত পাওয়া যাবে। না পারলে কী হবে? তার ট্রেলার বিজেপি দেখিয়ে দিয়েছে ১১ তারিখেই। প্রায় সমস্ত বিরোধী সাংসদ যখন পথে এবং দিল্লি পুলিশ তাঁদের আটক করেছে, তখন কোনও আলোচনা ছাড়াই একাধিক বিল পাশ করিয়ে নিয়েছে সংসদ থেকে, যার মধ্যে আছে নতুন আয়কর আইনও। এই আইন অনুযায়ী আয়কর বিভাগ যে কোনও করদাতার ইমেল, সোশাল মিডিয়া হ্যান্ডেল পর্যন্ত দেখতে পারে। বলা বাহুল্য, এ কেবল ব্যক্তিগত গোপনীয়তায় হস্তক্ষেপ নয়। আইনের এই ধারা ব্যবহার করে সরকারবিরোধী যে কোনও মানুষকে হয়রান করা সম্ভব, গ্রেপ্তার করাও সম্ভব। এই সরকারের আমলে একবার গ্রেপ্তার হলে আপনি দোষী না নির্দোষ তার বিচার কত কঠিন তা যদি না বুঝে থাকেন, শুধু দুটো নাম মনে করুন— স্ট্যান স্বামী আর উমর খালিদ।

বিরোধীশূন্য সংসদে বিল পাশ করানো সম্পর্কে সেদিন সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী কিরেন রিজিজু কী বলেছিলেন?

‘কংগ্রেস পার্টি আর বিরোধীরা অনেক সময় নষ্ট করেছে। এখন আমরা আর দেশের সময়, সংসদের সময় নষ্ট করতে দেব না। সরকার গুরুত্বপূর্ণ সব বিল পাশ করাতে চায়। আমরা আজ সেগুলো লোকসভা আর রাজ্যসভা— দুই জায়গাতেই পাশ করাব। দেশ একজন লোকের আর একটা পরিবারের বোকামির জন্যে এত ক্ষতি সহ্য করতে পারে না। অনেক বিরোধী সাংসদও এসে বলেছেন তাঁরা নিরুপায়। তাঁদের নেতারা জোর করে গোলমাল পাকাতে বলে। আমরা প্রতিদিন একটা ইস্যু নিয়ে দেশের সময় আর সংসদের সময় নষ্ট হতে দেব না। সুতরাং আমরা গুরুত্বপূর্ণ বিলগুলো পাশ করাব।’

এই একটা ইস্যু কোনটা? ভোটচুরি। অর্থাৎ যা দিয়ে সংসদ তৈরি হয়েছে, সেটাকেই ফালতু বলে উড়িয়ে দিচ্ছে সরকার। সংসদ ব্যাপারটার গুরুত্বই আসলে স্বীকার করছে না, প্রকারান্তরে বলা হচ্ছে— আমরা যা চাইব সেটাই আইনে পরিণত করব।

গণতন্ত্রকে অস্বীকার করা এবং গণতন্ত্র নষ্ট করার অভিযোগ উঠলে সগর্বে ‘বেশ করেছি’ বলার এই ঔদ্ধত্যই ফ্যাসিবাদ। এর সঙ্গে অন্য কোনও সরকারের অন্যায়ের, অপশাসনের তুলনা চলে না। এ-কথা যাঁরা আজ বুঝবেন না, ফ্যাসিবাদ জাঁকিয়ে বসতে পারলে ভারতের গণতন্ত্রের পাশাপাশি তাঁদেরও ঠাঁই হবে জাদুঘরে। তবে গণতন্ত্রের এখনও বাঁচার আশা আছে, কারণ এই অতি বুদ্ধিমান অবুঝরা সংখ্যায় কম এবং রাজনৈতিকভাবে অপ্রাসঙ্গিক। রাহুল, অখিলেশ, তেজস্বী, ব্রিটাসরা জানেন কোনটা নির্বাচনী বাধ্যবাধকতা আর কোনটা ঐতিহাসিক প্রয়োজন। তাছাড়া ও পক্ষে আছেন অনুরাগের মতো কালিদাসের বংশধররা।

চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম ওয়েবসাইটে প্রকাশিত

বাংলা বলে কোনো ভাষা নেই, বাঙালি বলে কোনো জাতি নেই?

আজ থেকে বছর তিরিশেক আগেই বাংলা ভাষা কোনটা, বাঙালি কারা – সে বোধ ভদ্রলোক শ্রেণি হারিয়েছে। ফলে আজ যে বাঙালি সাহিত্যিক, অধ্যাপকদের দেখা যাচ্ছে ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়াররা আক্রান্ত না হলে বাংলা ভাষার উপর আক্রমণ হচ্ছে তা বিশ্বাস না করতে, বা বাঙালি প্রবাসী শ্রমিকদের উপর আক্রমণকে বাঙালিদের উপর আক্রমণ বলে না ধরতে – তাতে অবাক হওয়ার কিছু নেই।

ঠিক এক দশক আগের কথা। সদ্য রাজকাহিনী বেরিয়েছে (অবন ঠাকুরের নয়, সৃজিত মুখার্জির)। ইংরিজি জানা বাঙালি ভদ্রলোক, ভদ্রমহিলারা আপ্লুত হয়ে একটা গান শেয়ার করতে লাগলেন সোশাল মিডিয়ায়। কী গান? ওই যে গানটা আমাদের জাতীয় স্তোত্র। কিন্তু এত আপ্লুত হওয়ার কারণ কী? কারণ রবীন্দ্রনাথের লেখা গানটা আসলে অনেক বড়, অত বড় জাতীয় স্তোত্র রাখা যায় না ব্যবহারিক অসুবিধার কারণেই। তাই আমাদের জাতীয় স্তোত্র হিসাবে ব্যবহৃত হয় শুরুর দিকের খানিকটা অংশ। ওই ছবিতে সৃজিতবাবু গোটা গানটাই ব্যবহার করেছিলেন। এই নিয়ে আপ্লুত হওয়া অন্যায় নয়। কিন্তু মুশকিল হল, দেখা গেল যাঁরা শেয়ার করছেন তাঁদের অনেকেই লিখছেন ‘লিসন টু দ্য বেঙ্গলি ভার্শন অফ আওয়ার ন্যাশনাল অ্যান্থেম। ইট’স বিউটিফুল’ – এই জাতীয় কথাবার্তা। সাধারণত সোশাল মিডিয়ায় কারোর কোনো ভুল ধরলে তিনি প্রবল খেপে গিয়ে যিনি ভুল ধরেছেন তাঁকে অপমান করেন। এক্ষেত্রে যেসব বাঙালি মান-অপমানের তোয়াক্কা না করে ওইসব পোস্টে মন্তব্য করেছিলেন বা নিজে পোস্ট করেছিলেন যে গানটা তো বাংলাতেই লিখেছিলেন রবিবাবু, তার আবার বাংলা ভার্শন কী – তাঁদের ‘আঁতেল’, ‘সবজান্তা’ ইত্যাদি বিশেষণ দেওয়া হচ্ছিল। তবে ভারতবর্ষে ইংরিজি জানা মূর্খদের আত্মবিশ্বাস বেশি। তাই সেই মূর্খরা কেউ কেউ আবার যিনি শুধরে দেওয়ার চেষ্টা করছেন তাঁকেই ভুল প্রমাণ করার চেষ্টা করছিল। ব্যাপার দেখে হাসা উচিত না কাঁদা উচিত তা বুঝতে না পারলেও, এটুকু বুঝে গিয়েছিলাম যে বাঙালি সংস্কৃতির ধারক ও বাহক যে ভদ্রলোক শ্রেণি, তাদের ভবিষ্যৎ ঝরঝরে হয়ে গেছে। আজ অমিত মালব্যকে যতই গালাগালি দিন, একথা নিশ্চিত হয়ে বলার উপায় নেই যে তাঁর ওই গণ্ডমূর্খ পোস্টের যুক্তিগুলো কোনো ইংরিজি শিক্ষিত বাঙালি ভদ্রলোকেরই জুগিয়ে দেওয়া নয়।

এই ভদ্রলোক-ভদ্রমহিলাদের অতি পছন্দের একখানা ধর্মীয় সংগঠন আছে, যাকে তাঁরা ধর্মনিরপেক্ষ সংগঠন বলে ভাবতে ভালবাসেন (মানে আমড়াকে আম বলে ভাবতে ভালবাসেন) – রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশন। রাজকাহিনীর গান নিয়ে ভদ্রলোক শ্রেণির রাজবোকামির দেড় দশক আগে ওই সংগঠন পরিচালিত একটা কলেজের পড়ুয়া ছিলাম। আমার সহপাঠী ছিল মঠের ভিতরেই গড়ে ওঠা, সন্ন্যাসীদের দ্বারা পরিচালিত বেদ বিদ্যালয়ে ছোট থেকে লেখাপড়া করে আসা কয়েকজন ছাত্র। তারা জনগণমন গাইত সংস্কৃত উচ্চারণে। আমরা কয়েকজন ছাত্র মিলে একদিন তাদের জিজ্ঞেস করলাম ‘ওরকম উচ্চারণে গাস কেন?’ তারা অত্যন্ত গর্বের সঙ্গে জানাল, ওটা ছোট থেকে শিখেছে। ওটাই শুদ্ধ সংস্কৃত উচ্চারণ। আমরা জিজ্ঞেস করলাম ‘বাংলা গানের উচ্চারণ সংস্কৃতের মত হবে কেন?’ তারা কিছুতেই মানতে রাজি হল না যে গানটা বাংলায় লেখা। নির্ঘাত তারা আজও জাতীয় স্তোত্র গাওয়ার প্রয়োজন হলে ‘শুদ্ধ সংস্কৃত’ উচ্চারণেই গায়। এরা কেউ কিন্তু প্রান্তিক পরিবারের সন্তান নয়, হিন্দিভাষীও নয়। গ্রাম, শহর – দুরকম জায়গার ছেলেই ছিল সেই দলে। সত্যি কথা বলতে, কেবল এরা নয়। আইসিএসই বা সিবিএসই স্কুলে পড়ে আসা বাঙালি সহপাঠীদেরও দেখেছি সংস্কৃত উচ্চারণে জনগণমন গাইতে। অর্থাৎ আজ থেকে বছর তিরিশেক আগেই বাংলা ভাষা কোনটা, বাঙালি কারা – সে বোধ ভদ্রলোক শ্রেণি হারিয়েছে। ফলে আজ যে বাঙালি সাহিত্যিক, অধ্যাপকদের দেখা যাচ্ছে ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়াররা আক্রান্ত না হলে বাংলা ভাষার উপর আক্রমণ হচ্ছে তা বিশ্বাস না করতে, বা বাঙালি প্রবাসী শ্রমিকদের উপর আক্রমণকে বাঙালিদের উপর আক্রমণ বলে না ধরতে – তাতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। এটাই অনিবার্য ছিল।

এখন কথা হচ্ছে, এমনটা হল কেন? বাংলা ভাষা, সংস্কৃতির লাগাম তো চিরকালই এই ভদ্রলোকদের হাতেই থেকেছে। দুই বাংলা ভাগ হওয়ার পরে তো আরওই। বাংলা সিনেমার যত বিখ্যাত অভিনেতা, অভিনেত্রীর নাম মনে করতে পারেন তাদের কজন হিন্দু নিম্নবর্গীয় বা মুসলমান? পাকিস্তান ভেঙে বাংলাদেশ হওয়ার পরে দু-চারজন মুসলমান অভিনেতা, অভিনেত্রী পশ্চিমবঙ্গে অভিনয় করেছেন বটে, কিন্তু মুসলমান চরিত্র কটা এপারের বাংলা সিনেমায়? মুসলমান সমাজের গল্পই বা কটা? পশ্চিমবঙ্গের বাংলা পত্রপত্রিকার সম্পাদক, সাহিত্যিকদের মধ্যে খুঁজতে গেলেও ঘুরে ফিরে সেই প্রাক-স্বাধীনতা যুগের মীর মোশাররফ হোসেন, কাজী নজরুল ইসলাম, জসীমউদ্দিন, সৈয়দ মুজতবা আলী, এস ওয়াজেদ আলী বা একটু পরের সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজের নাম আসবে। কিছু নিবিষ্ট পাঠক হয়ত আবুল বাশার বা আফসার আহমেদের নাম মনে করতে পারবেন। জনপ্রিয় গাইয়ে, বাজিয়েদের মধ্যেও সেই ইংরিজি শিক্ষিত বামুন, কায়েত, বদ্যিরাই বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ। শিক্ষক, অধ্যাপক, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, উকিল, সাংবাদিক, রাজনীতিবিদ – যেদিকে তাকাবেন সেদিকই তো ভদ্রলোকরা আলো করে আছেন। তাহলে এ অবস্থা হল কেন? স্পষ্টতই পূর্বসুরিরা পতাকা যাদের হাতে দিয়েছেন তাদের বহিবার শকতি দেননি। কিন্তু কেন দেননি, বা দিতে পারেননি?

বামফ্রন্ট সরকার প্রাথমিক স্কুল থেকে ইংরিজি তুলে দেওয়ার জন্যে ভদ্রলোকেরা বেসরকারি ইংরিজি মাধ্যম স্কুলে ছেলেমেয়েদের ভর্তি করতে বাধ্য হন আর তা থেকেই শিক্ষিত বাঙালির সঙ্গে বাংলা ভাষার বিযুক্তি শুরু, কারণ ইংরিজিটা তো শিখতেই হবে। নইলে কাজকর্ম পাওয়া যায় কী করে? ওটাই তো কাজের ভাষা।

এরকম একটা তত্ত্ব প্রায়শই খাড়া করা হয়। এই তত্ত্ব নজর করার মত। শিক্ষা মাতৃভাষাতেই হওয়া উচিত – একথা আমাদের রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, সত্যেন্দ্রনাথ বসু থেকে শুরু করে গোটা দুনিয়ার অনেক বড় বড় পণ্ডিত বলেছেন। আবার বিপক্ষেও যুক্তি আছে। সে বিতর্কে না গিয়ে একথা মেনে নেওয়া যাক যে, কোনো ভাষা কাজের ভাষা হয়ে না থাকলে গুরুত্ব হারায়। বামফ্রন্ট সরকার মাতৃভাষার উপর জোর দিলেও বাংলাকে গোটা রাজ্যের কাজের ভাষা করে তোলার পর্যাপ্ত উদ্যোগ নেয়নি। পাশাপাশি ভারতের মত বহুভাষিক দেশে ইংরিজির গুরুত্ব বিশ্বায়নের সঙ্গে সঙ্গে বেড়েছে এবং ভদ্রলোকরা বাংলা ভাষাকে ক্রমশ ত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছেন – একথা তর্কের খাতিরে নাহয় মেনে নেওয়া গেল। কিন্তু কথা হচ্ছে, বাঙালি ভদ্রলোকদের ছেলেমেয়েরা তো ইংরিজি মাধ্যম স্কুলে পড়ছে বিংশ শতাব্দীর গোড়া থেকেই। যাঁর বই ছেলেমেয়ের হাতে তুলে না দিলে আজও এমনকি অনাবাসী বাঙালিদেরও ‘বাংলার সংস্কৃতি শেখাচ্ছি না’ ভেবে অপরাধবোধ হয়, সেই লীলা মজুমদার নিজেই কনভেন্টের ছাত্রী ছিলেন। তা ইংরিজি মাধ্যম স্কুলে ভর্তি করলেই ছেলেমেয়েকে বাংলা বইপত্তর পড়ানো, বাংলা গান শোনানো, সিনেমা দেখানো, নাটক দেখানো তুলে দিতে হবে – এ নিয়ম কি বামফ্রন্ট সরকারের তৈরি? আগেকার বাঙালির অমন করার দরকার পড়েনি, হঠাৎ বামফ্রন্ট সরকার প্রাথমিক শিক্ষা থেকে ইংরিজি তুলে দিতেই দরকার পড়ল?

সত্যি কথা বলতে, সিপিএম ক্রমশ ভদ্রলোকদের পার্টি হয়ে যাওয়ায় বামফ্রন্টও মেহনতি মানুষের সরকার থেকে ভদ্রলোকদের সরকারেই পরিণত হয়েছিল নয়ের দশকের শেষার্ধে। তাই ভদ্রলোকদের ইংরিজি নিয়ে হাহুতাশের প্রভাবে এই সহস্রাব্দের গোড়ায় কিন্তু প্রাথমিকে ইংরিজি ফিরিয়েও এনেছিল। তারপর কি ভদ্রলোকেরা ছেলেমেয়েদের সরকারি প্রাথমিক স্কুলে ফিরিয়ে এনেছিলেন? মোটেই না। উলটে মাধ্যমিক স্তরেও বেসরকারি স্কুলে ভর্তি করার ঝোঁক বেড়ে গিয়েছিল। এখন নাহয় এসএসসি কেলেঙ্কারি ইত্যাদি যুক্তি দিয়ে বলা যায় সরকারি স্কুলগুলো পড়াশোনার অনুপযুক্ত হয়ে গেছে। বাম আমলে তো প্রতিবছর এসএসসি পরীক্ষা হত, রাজ্যের আনাচে কানাচে গজিয়ে ওঠা ইংরিজি মাধ্যমের স্কুলগুলোর মাস্টারদের চেয়ে অনেক কঠিন প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা দিয়ে মাস্টারমশাই, দিদিমণিরা সরকারি বাংলা মাধ্যম স্কুলগুলোতে যোগও দিতেন। ত্রুটি থাকলেও স্কুলের পরিকাঠামো নিয়ে, পড়াশোনা নিয়ে তখনকার সরকারের আগ্রহ যে বর্তমান সরকারের চেয়ে বেশি ছিল – তা আজকাল অনেক তৃণমূল কংগ্রেস সমর্থকও স্বীকার করেন। তাহলে?

এই প্রশ্নের উত্তর দিতে গেলে আসলে বাঙালি ভদ্রলোকের অভদ্রতা প্রকাশ হয়ে পড়বে। বহু ভদ্রলোকের কাছেই আপত্তিকর ছিল বাম আমলে মুটে, মজুর, রিকশাওয়ালা, বাড়ির কাজের লোক, মুচি, মেথরের ছেলেমেয়েদের তাদের ছেলেমেয়েদের সঙ্গে একই স্কুলে ঢুকে পড়া। আরও বেশি গায়ে লাগত যখন তারা কেউ নিজের ছেলেমেয়ের চেয়ে পরীক্ষায় বেশি নম্বর পেয়ে যেত। পরীক্ষার ফল বেরোবার পর আমাদের অনেককেই বকুনি খেতে হয়েছে ‘তোর লজ্জা করে না? অমুকের বাড়িতে কোনোদিন কেউ স্কুলের গণ্ডি পেরোয়নি, আর ও অঙ্কে ৮৫ পেয়ে গেল। তুই মাস্টারের ছেলে হয়ে ৫৫? ছিঃ!’ মাস্টারের ছেলে বড় হয়ে মাস্টার; ডাক্তারের ছেলেমেয়ে তো বটেই, ছেলের বউ আর জামাইও ডাক্তার; উকিলের ছেলেমেয়ে উকিল; মুদির ছেলে মুদি, তার মেয়ে অন্য ছোট ব্যবসায়ীর গৃহবধূ; রিকশাওয়ালার ছেলে সবজিওয়ালা – এই সামাজিক স্থিতাবস্থায়, গোবলয়ের লোক বলে বাঙালি ভদ্রলোক যাদের দিকে তাকিয়ে নাক সিঁটকোয়, তাদের মত নিজেরাও অভ্যস্ত ছিল। সেই স্থিতাবস্থা ঘেঁটে যাওয়ার সামান্য সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল বাম আমলে। ওটুকুই ভদ্রলোকদের পক্ষে শিশুর আত্মার উপর নরকের দুঃস্বপ্নের মত হয়ে দাঁড়িয়েছিল। এই দুঃস্বপ্ন থেকে মুক্তি পাওয়ার পথ তারা খুঁজে পায় অনেক টাকা মাইনের বেসরকারি স্কুলে। নয়ের দশক থেকে মনমোহনী অর্থনীতির জোরে বাঙালি ভদ্রলোকের জীবনে আমূল পরিবর্তন এসে যায়। তাদের হাতে এসে গেল খরচ করার মত অতিরিক্ত টাকা। ফলে ছোটলোকের ছেলেপুলের সঙ্গে এক স্কুলে পড়ানোর আর দরকার রইল না। পাঠিয়ে দাও ফেলো কড়ি মাখো তেল স্কুলে। এমনকি বামফ্রন্ট সরকারের বদান্যতায় উচ্চমধ্যবিত্ত হয়ে ওঠা সরকারি স্কুলের মাস্টারমশাই, দিদিমণিরাও নিজেদের ছেলেমেয়েকে ইংরিজি মাধ্যম স্কুলে পাঠানো শুরু করেন তখনই। সংখ্যাটা অবশ্যই এখন অনেক বেড়েছে, তার পিছনে বর্তমান সরকারের শিক্ষাজগৎ নিয়ে ছেলেখেলার অবদান কম নয়। কিন্তু আসল কথা হল, ‘ইংরিজি শিখতে হবে বলে ইংরিজি মাধ্যম স্কুলে পড়াচ্ছি’ – এটা স্রেফ অজুহাত। দুর্বল অজুহাত। সেটা বুঝতে পেরেই যুক্তি জোরদার হবে মনে করে নয়ের দশকে অনেক বাবা-মা বলতেন ‘ইংরিজি বলা শিখতে হবে। নইলে কম্পিটিশনে দাঁড়াতে পারবে না। তাই ইংলিশ মিডিয়ামে দিয়েছি।’ এও ভারি মজার কথা। স্কুলটা কি তাহলে ‘স্পোকেন ইংলিশ’ শেখার জায়গা? ওটা জানলেই চাকরিবাকরি পাওয়া যায়? চোস্ত ইংরিজি বলতে পারলেই অঙ্ক, বিজ্ঞান, ভূগোল, ইতিহাস – সব শেখা হয়ে যাবে? অধিকাংশ বাঙালি ভদ্রলোক কিন্তু তেমনই মনে করে আজও। কথা বললেই টের পাওয়া যায়। তবে আজকাল একটা নতুন ব্যাপার ঘটেছে। ইংরেজ আমলে বাঙালি ভদ্রলোকের জীবনের লক্ষ্য ছিল যতটা সম্ভব ইংরেজ হওয়া, স্বাধীনতার পর থেকে – অনাবাসী ভারতীয় হওয়া। আজকের বাঙালি ভদ্রলোকের জীবনে একটা নতুন লক্ষ্য যোগ হয়েছে – মাড়োয়ারি বা গুজরাটি হওয়া। তাই ছেলেপুলেকে ইংরিজি মাধ্যমে পড়িয়ে ইংরিজি বলা শিখিয়েই সে খুশি নয়, দ্বিতীয় ভাষা হিসাবে হিন্দিও গুঁজে দিচ্ছে। সুতরাং বাংলা মাঠের বাইরে। গল্পের বই পড়ার এবং পড়ানোর চল বাঙালি ভদ্রলোক বাড়ি থেকে উঠে গেছে বহুকাল, এখন আবার বাবা-মায়েরা খেয়াল রাখেন, ছেলেমেয়ে যেন বাংলা সিরিয়াল বা সিনেমা দেখে না ফেলে।

এমতাবস্থায় বাংলা ভাষা-সংস্কৃতি কী, কোনটা তার অঙ্গ আর কোনটা নয় – তা নিয়ে স্পষ্ট ধারণা থাকবে কোন চুলোয়? সংজ্ঞাগুলো ঠিক করে দিয়েছি আমরা ভদ্রলোকরা। আমাদের সংজ্ঞায়িত বাংলা ভাষা-সংস্কৃতিকে আমরাই বাংলার বাইরে বাংলা বলে পরিচিত হতে দিইনি, ওগুলোকে আমাদের সংস্কৃতির বৃত্তে জায়গাই দিইনি। কলকাতা ও সংলগ্ন এলাকার ভাষায় লেখা গান আমাদের ‘আধুনিক গান’। বাঙাল ভাষার গানকে তখনই বাংলা গান বলে মেনেছি যখন শচীন দেববর্মণের মত রাজপুত্র গেয়েছেন। গ্রামের মানুষের নিজের গানকে লোকগীতি বলে আলাদা বাক্সে রেখেছি। পনিটেল বাঁধা শহুরে ভদ্রলোকরা গিটার বাজিয়ে ব্যান্ড বানিয়ে গাইলে তবেই সে গানের জায়গা হয়েছে প্রেসিডেন্সি, লেডি ব্র্যাবোর্ন বা যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস মোচ্ছবে। আচ্ছা তাও নাহয় মেনে নেওয়া গেল। কিন্তু নিজেরা যাকে বাংলা ভাষা, বাঙালি সংস্কৃতি বলে দেগে দিয়েছি তাকে সমাজের নিচের তলায় ছড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টাও কি করেছি? ফিল্ম সোসাইটি বানিয়ে ঋত্বিক ঘটকের উদ্বাস্তুদের নিয়ে তৈরি ছবি দেখেছি আর প্রবন্ধ লিখেছি। পরবর্তীকালে বাংলাদেশ থেকে চলে আসা উদ্বাস্তু, যারা এখানে এসে পেটের দায়ে আমাদের বাড়িতে বাসন মাজে বা ঘর ঝাঁট দেয় – তাদের দেখানোর তো চেষ্টা করিনি। সত্যজিৎ রায় বিশ্ববন্দিত পরিচালক বলে জাঁক করেছি, কিন্তু পথের পাঁচালী-র হরিহর রায়ের পরিবারের মত হতদরিদ্র বাঙালিকে ওই ছবি দেখানোর কোনো প্রয়াস তো আমাদের ছিল না। কারণ আমরা নিশ্চিত ছিলাম – ওরা ওসব বুঝবে না। ওদের জন্যে বেদের মেয়ে জ্যোৎস্না-ই ঠিক আছে। ঘটনা হল, যার দুবেলা পেট ভরে ভাত জোটে না, তারও মনের খিদে থাকে এবং সে খোরাক খুঁজে নেয়। বাংলার গরিব মানুষ, নিম্নবর্গীয় মানুষও তাই করেছে। আমাদের তৈরি সংস্কৃতি যখন তাদের পোষায়নি তখন তারা হিন্দি সিনেমা, হিন্দি গানে মজেছে। অধুনা ইউটিউব শর্টস আর ইনস্টা রিলসে। আমাদের অ্যাকাডেমি, আমাদের নন্দন নিয়ে আমরাই বুঁদ ছিলাম। ও জিনিস আজ কেউ বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দিলেই বা ওদের কী? এদিকে আমরা, বিশ্বায়িত ভদ্রলোকরাও, হিন্দি ভাষা-সংস্কৃতির দিকে ঝুঁকেছি। ইংরিজি তো ছিলই। ফলে এখন হঠাৎ আবিষ্কার করছি – হিন্দি-হিন্দু-হিন্দুস্তান তত্ত্বের প্রবক্তারা বলে দিচ্ছে বাংলা বলে আসলে কোনো ভাষা নেই, আর সেটাকেই ঠিক বলছেন বাংলা ভাষায় বইপত্তর লিখে নাম করে ফেলা লেখকরা।

নবজাগরণই বলি আর সমাজ সংস্কার আন্দোলনই বলি, উনিশ শতকে সেই প্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়ে আলোর সন্ধান যে বাঙালি ভদ্রলোক পেয়েছিল তা অনস্বীকার্য। কিন্তু আলো বাড়াতে গেলে আলো ছড়াতে হয়। ভদ্রলোকরা কী করেছে? প্রদীপ নিজের ঘরেই রেখে দিয়েছে, হাতে নিয়ে যাদের ঘরে আলো নেই তাদের কাছে যায়নি, তারা আমাদের প্রদীপ থেকে নিজেদের প্রদীপ জ্বালিয়ে নিতে পারেনি। এখন আমাদের প্রদীপের আয়ু ফুরিয়ে এসেছে, তাই চারপাশ অন্ধকারে ডুবে যেতে বসেছে। আসলে আমাদের বাংলা ভাষা চর্চা, সংস্কৃতি চর্চা বা যে কোনো চর্চাই বহুকাল হল প্রদর্শনীতে পরিণত হয়েছে। ওর মধ্যে ঘাম ঝরানোর কোনো ব্যাপার নেই, তাই ও থেকে আমাদের কোনো অর্জনও নেই। কেন এমন হল? ভাবতে গেলে জ্যোতি ভট্টাচার্য ‘কালচার’ ও ‘সংস্কৃতি’ প্রবন্ধে যে গোলমালের কথা বলেছেন সেটাই মনে পড়ে যাচ্ছে। একবার পড়ে দেখা যাক

ইংরেজি ভাষা থেকে ‘কালচার’ শব্দটার আমরা বাংলা পরিভাষা করেছি ‘সংস্কৃতি’। ঠিক পরিভাষা কী হওয়া উচিত – ‘সংস্কৃতি’ না ‘কৃষ্টি’, তা নিয়ে বিসংবাদ হয়েছে এককালে। রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, ‘কৃষ্টি’ শব্দটা বাংলা ভাষায় কুশ্রী অপজনন। ‘তাসের দেশ’ নাটকে শব্দটা নিয়ে কৌতুকও করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ। তারপরে ‘কৃষ্টি’ শব্দটা ক্রমে লোপ পেয়েছে, ‘সংস্কৃতি’-ই ব্যবহারসিদ্ধ লোকগ্রাহ্য শব্দ হয়ে উঠেছে।

ইংরেজরা ‘কালচার’ শব্দটা নিয়েছিল লাটিন ভাষা থেকে। লাটিন ভাষায় শব্দটার প্রধান অর্থ ছিল কৃষিকর্ম, ‘এগ্রিকালচার’ শব্দের মধ্যে সেই প্রধান অর্থ বাহিত হচ্ছে। এই কারণেই বাংলায় কেউ কেউ ‘কৃষ্টি’ বলতে চেয়েছিলেন, কর্ষণের সঙ্গে তার সম্পর্ক। কৃষিকর্মে কর্ষিত ক্ষেত্রে বীজ বপন করে নতুন শস্য উৎপাদন করা হয়…চিকিৎসাবিজ্ঞানে রোগজীবাণুর প্রতিষেধক জীবাণু ‘কালচার’ করে তৈরি করা হয়; রক্তে রোগজীবাণু বা ক্ষতিকর কোনো পদার্থ থাকলে অণুবীক্ষণে তা দেখতে হলে অনেক সময় রক্তবিন্দুর ‘কালচার’ করে তাকে বর্ধিত করতে হয়। মোট কথা ‘কালচার’ শব্দটার মধ্যে কর্ষণ বা অনুশীলনের দ্বারা নতুন বস্তু অথবা নতুন গুণ সৃষ্টি ইঙ্গিত রয়েছে, এর ঝোঁক উৎপাদনমুখী। কোনো না কোনো রকম বৃদ্ধি এর ফল।

আমাদের ‘সংস্কৃতি’ শব্দটির শব্দার্থগত ঝোঁক কিন্তু এরকম নয়। এর প্রধান অর্থ রূঢ় অবস্থা থেকে মার্জিত অবস্থায় আনয়ন, স্থূল অবস্থা থেকে বাহুল্যবর্জিত করে সূক্ষ্ম অবস্থায় আনয়ন। নতুন বস্তু সৃষ্টি, নতুন গুণ উৎপাদন, বা সংখ্যাবৃদ্ধি এর অভীপ্সিত লক্ষ্য নয়, যা আছে তাকেই একটা পরিশীলিত সংযত সুসমঞ্জস সুকুমার রূপদান এর লক্ষ্য। ‘সংস্কৃতি’ শব্দটির এই প্রধান ঝোঁক আমাদের আজকের পরিস্থিতিতে খানিকটা বাধাস্বরূপ হয়ে উঠছে – এরকম আশঙ্কা করছি।

পঞ্চাশ বছরেরও বেশি আগে লেখা এই কথাগুলো আজ আবার ভাবাচ্ছে। কারণ সংস্কৃতি শব্দের প্রধান ঝোঁক এখন আর খানিকটা বাধা নয়, গভীর কুয়োর দেওয়াল হয়ে গেছে দেখা যাচ্ছে। সেই কুয়োর ব্যাং হয়ে গেছি আমরা ভদ্রলোকরা; বাইরে রয়ে গেছে বাঙালি মুসলমান, বাঙালি নিম্নবর্গীয় হিন্দু এবং সাধারণভাবে, গরিব বাঙালি। কৃষ্টি শব্দটায় রবীন্দ্রনাথ প্রবল আপত্তি করেছিলেন বটে, তবে ভদ্রলোকদের কূপমণ্ডূকতা ধরে ফেলতে তাঁরও ভুল হয়নি। বঙ্গভঙ্গ রদের আন্দোলনে প্রথমে নেতৃত্ব দিয়েও তাই সরে গিয়েছিলেন। কারণ ফাঁকিবাজিটা ধরে ফেলেছিলেন। পরেও তাঁর লেখাপত্রে ভদ্রলোকি চালাকির আবরণ উন্মোচন করেছেন বারবার। ‘হিন্দু-মুসলমান’ প্রবন্ধে যেমন লিখেছেন

অল্পবয়সে যখন প্রথম জমিদারি সেরেস্তা দেখতে গিয়েছিলুম তখন দেখলুম, আমাদের ব্রাহ্মণ ম্যানেজার যে তক্তপোষে গদিতে বসে দরবার করেন সেখানে এক ধারে জাজিম তোলা, সেই জায়গাটা মুসলমান প্রজাদের বসবার জন্যে; আর জাজিমের উপর বসে হিন্দু প্রজারা। এইটে দেখে আমার ধিক্কার জন্মেছিল। অথচ এই ম্যানেজার আধুনিক দেশাত্মবোধী দলের। ইংরেজরাজের দরবারে ভারতীয়ের অসম্মান নিয়ে কটুভাষাব্যবহার তিনি উপভোগ করে থাকেন, তবু স্বদেশীয়কে ভদ্রোচিত সম্মান দেবার বেলা এত কৃপণ। এই কৃপণতা সমাজে ও কর্মক্ষেত্রে অনেকদূর পর্যন্ত প্রবেশ করেছে; অবশেষে এমন হয়েছে যেখানে হিন্দু সেখানে মুসলমানের দ্বার সংকীর্ণ, যেখানে মুসলমান সেখানে হিন্দুর বাধা বিস্তর।

এই ম্যানেজারই বাঙালি ভদ্রলোকের সংস্কৃতি আর কৃষ্টির তফাতের প্রমাণ। এঁর দেশাত্মবোধ হল প্রদর্শনী। ওটার নির্দিষ্ট মঞ্চ আছে, সেখানে নিজের পরিশীলিত দেশাত্মবোধ প্রমাণ করতে ওটা কাজে লাগে। কিন্তু নিজের জীবনে মেনে চলার, মুসলমানও যে তাঁর সমান ভারতীয় তা স্বীকার করার এবং অনুশীলন করার দায় নেই। এমন চরিত্রই এখন হাজারে হাজারে আমাদের চারপাশে ঘুরে বেড়াচ্ছে। রবীন্দ্রনাথ এই প্রবন্ধ লিখেছিলেন স্বাধীনতার আগে। স্বাধীনোত্তর ভারতে আবার সারা দেশের উদারপন্থী এবং বাঙালি ভদ্রলোকদের নিজেকে সংস্কৃতিবান প্রমাণ করতে ধর্মনিরপেক্ষ হওয়া আবশ্যিক হয়ে দাঁড়িয়েছিল। এখন দেশের রাজনীতি বদলে যাওয়ায়, পরিবেশ বদলে যাওয়ায় ওটা আর আবশ্যিক নয়। তাই এই ম্যানেজারবাবুর মনের কথা তিলোত্তমা মজুমদার, পবিত্র সরকারদের মুখে উঠে এসেছে, যার মর্মার্থ হল – ভদ্রলোকরাই বাঙালি। মুসলমানরা বাঙালি নয়। ভদ্রলোকদের উপর আক্রমণ হলে তবেই বলা চলে বাংলা ভাষার উপর আক্রমণ হয়েছে, মুসলমানদের উপর আক্রমণ বাংলা ভাষার উপর আক্রমণ নয়।

এ হল বাঙালি ভদ্রলোকের অন্তত দুশো বছর ধরে আপন মনের মাধুরী মিশায়ে তৈরি সত্য। এর সঙ্গে বাস্তবের কোনো সম্পর্ক নেই। এই তিলোত্তমা, এই পবিত্র, এই সঙ্গীতা বন্দ্যোপাধ্যায়রাই একুশে ফেব্রুয়ারি এসে পড়লে গদগদ উত্তর-সম্পাদকীয় প্রবন্ধ লেখেন বাংলা ভাষা নিয়ে। কিন্তু এখন বোঝা যাচ্ছে, ওগুলো সব প্রদর্শনী। আজকাল যাকে বাংলায় বলে ‘পারফরম্যান্স’। মনের কথা হল – একুশের ভাষা শহিদরা কেউ বাঙালি নয়, তারা ভদ্রলোকদের বাংলা ভাষার জন্যে প্রাণ দিয়েছিল মাত্র। ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধেও এঁরা বিস্তর লেখালিখি, বলাবলি করে চলেছেন সেই ২০১৪ সাল থেকে। কিন্তু স্পষ্টতই ওসবও পারফরম্যান্স। নইলে বিশাল বিশাল গেটওয়ালা আবাসনে থাকা এবং শীতাতপনিয়ন্ত্রিত গাড়িতে চড়া লেখক, বুদ্ধিজীবীরা কী করে বলেন যে এই বাংলায় হঠাৎ চতুর্দিকে প্রচুর নতুন লোক দেখতে পাচ্ছেন, যাদের সঙ্গে বাঙালিদের কোনো সংস্কৃতিগত মিল নেই? কোনো পরিসংখ্যানই এই সত্য প্রতিষ্ঠা করে না। এ যে নাজিদের আতঙ্ক সৃষ্টির ধ্রুপদী কৌশল, তা না জানার মত কম লেখাপড়া এঁদের নয়। উপরন্তু, যদি তর্কের খাতিরে ধরেও নেওয়া যায় চারপাশটা বাংলাদেশি এবং রোহিঙ্গায় ভরে গেছে, তাহলেই বা তাদের সঙ্গে এই ভদ্রমহিলা, ভদ্রলোকদের সংস্কৃতিগত মিলের অভাব হয় কী করে? অনেক বেশি অমিল তো হওয়ার কথা কলকাতা ও শহরতলিতে দ্রুত বেড়ে চলা বহুতলগুলোর বাসিন্দা হয়ে আসা হিন্দিভাষীদের সঙ্গে, যাদের অনেকেই আমিষের গন্ধ পেলে নাক কোঁচকায়। তাদেরই রাজ্যে কাজ করতে যাওয়া পশ্চিমবঙ্গের হিন্দু ও মুসলমান প্রবাসী শ্রমিকদের বাংলাদেশি দেগে দিয়ে কোনো আইনকানুনের তোয়াক্কা না করে, বৈধ কাগজপত্রকে পাত্তা না দিয়ে মারধোর করা হচ্ছে, পে লোডার দিয়ে বাংলাদেশে ছুড়ে ফেলা হচ্ছে।

এই তথাকথিত বুদ্ধিজীবীরা অবশ্য রোগ নন, রোগাক্রান্তের নমুনা। এই রোগে আমাদের আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধব অনেকেই আক্রান্ত। আমাদের যে কোনো একজনকে দেখলেই বোঝা যায়, বাঙালি ভদ্রলোকের কূপমণ্ডূকতা এবং নীতিহীনতা ঐতিহাসিক হলেও, গত অর্ধ দশকে বিশেষ অবনমন হয়েছে। ১৯৪৭ সালে পশ্চিমবঙ্গের ভদ্রলোকদের সংখ্যাগরিষ্ঠের মানসিকতা এরকম থাকলে বাঙালরা উদ্বাস্তু হয়ে এদেশে এসে হয় অনাগরিক বেগার শ্রমিকে পরিণত হত, বা ভিক্ষা করতে করতে অনাহারে মারা যেত। সেক্ষেত্রে ১৯৭১ সালেও পশ্চিমবঙ্গের বাঙালিরা ভারত সরকারকে বাংলাদেশের পাশে দাঁড়াতে যুদ্ধে নামার প্ররোচনা দিত না (অশোক মিত্র লিখিত আপিলা-চাপিলা দ্রষ্টব্য), সাধারণ মানুষের মধ্যে মুক্তিযুদ্ধের প্রতি আবেগ তৈরি হত না, বাঙালরা আরও এক দফা উদ্বাস্তু হওয়ার ধাক্কা সামলে এদেশে থিতু হতে পারত না।

মজার কথা, এখন ভদ্রলোকদের যে অংশের বাংলাদেশি অনুপ্রবেশের চিন্তায় রাতে ঘুম হচ্ছে না, তাদের অনেকে দ্বিতীয়, তৃতীয় বা চতুর্থ প্রজন্মের বাঙাল। এরা বুঝতে পারছে না, বা রিপাবলিক টিভি দেখে দেখে এত অন্ধ হয়ে গেছে যে বুঝতে চাইছে না, যে ভাষাকে বাংলাদেশি ভাষা বলে আজ চালাচ্ছে বিজেপি, সেই ভাষা অনেকাংশে তাদের মা-দিদিমার ভাষা। ওই ভাষাকে অস্বীকার করলেও ওই পরিচিতি যাওয়ার নয়। আগামীদিনে এ কার্ড ও কার্ড সে কার্ড – কোনো কার্ড দিয়েই নিজের নাগরিকত্ব প্রমাণ করে ওঠা যাবে না। কারণ কোনটা নাগরিকত্বের প্রমাণ সেটা ঠিক করে রাষ্ট্র। আর ভারত রাষ্ট্রের এই মুহূর্তে প্রকল্প হল বাঙালিদের অনাগরিক প্রমাণ করা।

ভদ্রলোকের ছেলেমেয়েদের স্মৃতিশক্তি তাজা করে দেওয়ার জন্যে বলি, সেই বামফ্রন্ট আমল থেকে – যখন তৃণমূল কংগ্রেস নেত্রী মমতা ব্যানার্জি প্রথম অভিযোগ তোলেন যে বাংলাদেশ থেকে লোক ঢুকিয়ে ভোটে জেতে বামেরা – বঙ্গ বিজেপির বক্তব্য ছিল, বাংলাদেশ থেকে আসা হিন্দুদের শরণার্থী ধরে নিয়ে আশ্রয় দিতে হবে এবং মুসলমানদের অনুপ্রবেশকারী ধরে নিয়ে শাস্তি দিতে হবে, ফেরত পাঠাতে হবে। অধুনা সোশাল মিডিয়ার বাইরে অপ্রাসঙ্গিক হয়ে যাওয়া তথাগত রায় যখন বঙ্গ বিজেপির সভাপতি ছিলেন, তখন তিনি একাধিক টিভি বিতর্কে বসে একথা বলেছেন। নরেন্দ্র মোদী সরকার যে নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন (সিএএ) পাশ করে ২০১৯ সালে, তার মর্মবস্তুও এটাই। সে কারণেই এ রাজ্যের হিন্দুদের, বিশেষত ভদ্রলোকদের, ওই আইন খুব পছন্দ হয়েছিল। মতুয়াদের মত বাংলাদেশ থেকে অত্যাচারিত হয়ে চলে আসা নিম্নবর্গীয় জনগোষ্ঠীর মানুষও ওই আইন পাশ হওয়ায় উল্লসিত হয়েছিলেন। কিন্তু একটা প্রশ্নের উত্তর না বিজেপি দিতে চায়, না সম্প্রতি বিজেপি সমর্থক হয়ে ওঠা পশ্চিমবঙ্গবাসী তৃতীয়-চতুর্থ প্রজন্মের বাঙাল ভদ্রলোকরা। প্রশ্নটা হল, শরণার্থীদের আশ্রয় দেওয়া এবং নাগরিকত্ব দেওয়ার মত মানবিক প্রকল্পের ‘কাট-অফ ডেট’ থাকবে কেন? সিএএ অনুযায়ী নাগরিকত্ব পাওয়ার ‘কাট-অফ ডেট’ হল ৩১ ডিসেম্বর ২০১৪। এর মানে কী? ওই তারিখের পরে কি বাংলাদেশে হিন্দু নির্যাতন বন্ধ হয়ে গেছে? নাকি ওর পরে যে হিন্দুরা নির্যাতিত হচ্ছে তারা মায়ের ভোগে যাক – এটাই হিন্দু দরদি বিজেপি এবং ভারতের নাগরিকত্ব এতদিনে অধিকারে পরিণত হয়ে গেছে বলে মনে করা বাঙাল ভদ্রলোকদের মনের কথা? এ প্রশ্ন করলেই বিজেপি নেতা তরুণজ্যোতি তিওয়ারি থেকে শুরু করে বাঙাল ভাষা বলতে না পারা সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার বাঙাল, সকলেই এক সুরে ঝাঁঝিয়ে ওঠে ‘যে আসবে তাকেই থাকতে দিতে হবে? দেশটা ধর্মশালা নাকি?’

এখন কথা হচ্ছে, এই আজকের বাঙালদের পূর্বপুরুষরা যখন ভিটেমাটি চাটি হয়ে এপারে চলে এসেছিলেন অধুনা বাংলাদেশ থেকে, তখন কি দেশটা ধর্মশালা ছিল? তখনকার শাসকরা মনে করেছিলেন – ছিল। ভাগ্যিস করেছিলেন, তাই আজকের বাঙাল ভদ্রলোকরা কলার তুলে এই প্রশ্ন করতে পারছেন। ওঁরা অবশ্য বলবেন ‘তখনকার পরিস্থিতি আর এখনকার পরিস্থিতি কি এক নাকি? ১৯৪৭ সালে তো একটা দেশকে আনতাবড়ি কেটে ভাগ করা হয়েছিল। আমাদের পূর্বপুরুষদের এই ভাগটার উপরে ততখানিই অধিকার, যতখানি আগে থেকেই এ ভাগে থাকা লোকেদের।’ ১৯৭১ সালে কিন্তু দেশভাগ-টাগ হয়নি। তখনো বাংলাদেশ থেকে আসা উদ্বাস্তুদের এ দেশের নাগরিকত্ব দেওয়া হয়েছিল। সেকথা মনে রাখলেও মানতেই হবে, যুক্তিটা সঠিক। কিন্তু মুশকিল হল, একবার যদি বিভাজনে হাততালি দেওয়া শুরু করেন, তখন দেখবেন অনেক চেপে রাখা বিভাজন বেরিয়ে পড়ছে। বাঙালরা এপারে চলে আসায় মোটেই পশ্চিমবঙ্গীয়রা (চলতি কথায় যাদের এদেশি বা ঘটি বলা হয়) সকলে খুব আপ্লুত হয়নি। ‘বাংলাদেশ থেকে লোক ঢুকছে পিলপিল করে, রোহিঙ্গায় চারপাশ ভরে গেছে’ – এই প্রোপাগান্ডায় আপনি যত ধুয়ো দিচ্ছেন, তত সেদিনের উদ্বাস্তুদের প্রতি বিদ্বেষ চেপে রাখা পশ্চিমবঙ্গীয়দের স্মৃতি তাজা হয়ে উঠছে। পশ্চিমবঙ্গে গত কয়েক বছরে আরএসএস-বিজেপির শক্তি বাড়ার পাশাপাশি ইস্টবেঙ্গল আর মোহনবাগান সমর্থকদের মধ্যে অনলাইন পা টানাটানির ভাষা যেভাবে বদলেছে, তা খেয়াল করলেই ব্যাপারটা স্পষ্ট হয়। অতএব বাঙাল ভদ্রলোক-ভদ্রমহিলাদের বোঝা উচিত যে তারা হিন্দিভাষীদের ‘রোহিঙ্গা’, ‘বাংলাদেশি’ বলে চিৎকারে যোগ দিয়ে নিজেদের ডিটেনশন ক্যাম্পের রাস্তা বানাচ্ছে।

বাড়াবাড়ি মনে হল কথাটা? আসামে এনআরসি-র সময়েও দেখেছিলাম সেখানকার বাঙাল ভদ্রলোকরা অনেকে বলছে ‘যে আসবে তাকেই থাকতে দিতে হবে? দেশটা ধর্মশালা নাকি?’ ঠিক এই কথাটাই যে হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে বাঙালিদের সম্পর্কে জাতিবিদ্বেষী অসমিয়াদের বক্তব্য, সেকথা তাদের খেয়াল ছিল না। খেয়াল হল, যখন এনআরসি থেকে বাদ পড়ে যাওয়া ১৯ লক্ষ মানুষের মধ্যে সাড়ে ১২ লক্ষ হিন্দু বেরোল এবং তার মধ্যে তারাও পড়ে গেল। নেলি গণহত্যার ইতিহাসও ওই ভদ্রলোকরা ভুলে থাকতে চেয়েছিল, কারণ ওতে যারা মরেছিল তারা মুসলমান। এখন আসামের বিভিন্ন ডিটেনশন সেন্টারে কারা দিন কাটাচ্ছে সেটা পশ্চিমবঙ্গে চতুর্দিকে রোহিঙ্গা দেখতে পাওয়া বাঙাল ভদ্রলোকরা একটু দেখে নিতে পারেন। পশ্চিমবঙ্গে এনআরসি করার পরিকল্পনা এখনো সরকারের নেই, কিন্তু এসআইআরের পরিকল্পনা বিলক্ষণ আছে। সেটাও একটা তালিকা, তারও থাকবে ‘কাট-অফ ডেট’। এসব ভদ্রলোকরা ভালই জানেন, কিন্তু কুয়োর ব্যাং তো কুয়োর বাইরের জগতের কথা জানতে পারলেও মানতে চায় না। যেমন নির্বাচন কমিশনের বানানো আরেকটা তালিকা – ভোটার তালিকা – কেমন হয় আজকাল সেকথা রাহুল গান্ধী চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিলেও ভদ্রলোকরা চোখ বন্ধ করে থাকতে পারে।

১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গবিরোধী আন্দোলনের সময়কার ভদ্রলোকদের ফাঁকিবাজিকে রবীন্দ্রনাথ চিহ্নিত করেছিলেন, নিন্দাও করেছিলেন। তবু মানতে হবে, সেই ভদ্রলোকদের অন্য সময়ে না হলেও বিপদের সময়ে বাঙালি মুসলমানদের সঙ্গে জোট বাঁধার বুদ্ধি ছিল। এখনকার ভদ্রলোক শ্রেণির মস্তিষ্ক এত উর্বর যে বিপদের সময়ে আরও বেশি করে নিজেদের আলাদা করে নিচ্ছে। বিপন্ন বাঙালির পাশে দাঁড়ানোর বদলে ‘আমি স্নান বলি, ও গোসল বলে। অতএব ও বাঙালি না, আমি বাঙালি’ – এসব বোকা বোকা কথা বলে নিজের কুয়োটা আরও গভীর করে খুঁড়ছে। যে হিন্দি আধিপত্যবাদী হিন্দুরা কোনোদিনই বাঙালিকে আপন বলে মনে করেনি এবং করবে না, তারা নিজেদের মনোভাব স্পষ্ট ভাষায় বুঝিয়ে দিলেও ভদ্রলোক, ভদ্রমহিলারা বুক ফুলিয়ে প্রতিপন্ন করতে চাইছে – বাঙালি বলে কোনো জাতি নেই। আছে দুটো আলাদা জাতি – বাঙালি হিন্দু আর বাংলাদেশি। বাংলা বলেও কোনো ভাষা নেই। আছে দুটো আলাদা ভাষা – হিন্দুর বাংলা আর বাংলাদেশি বাংলা। এই ঐতিহাসিক মূর্খামি যে দৃশ্যের সম্ভাবনা বাড়িয়ে তুলছে তা এইরকম – ভদ্রলোকরা বাঙালি বলে মার খাচ্ছে হিন্দিভাষীদের হাতে, আর এখন যে বাঙালিদের মার খাওয়া চলছে, যাদের বাঙালি বলে স্বীকার করতেই রাজি নয় ভদ্রলোকরা, তারা দূর থেকে বলছে ‘ওমা! আপনি ভদ্রলোক? আমি ভেবেছিলাম বাঙালি।’

নাগরিক ডট নেট ওয়েবসাইটে প্রকাশিত

ওয়ারেন হেস্টিংস যা শেখালেন

এঁরা মানুষ ভাল, সাহেবদের মতো নৃশংস নন। আর জেলে দেওয়ার কথা ভাবছেন? জেলেই তো রাখা হয়েছে। অতএব বিচার-টিচারের কী দরকার? উমর, শার্জিল ইমাম, গুলফিশা ফতিমার মতো যাকে যাকে আপদ মনে করেন, ঘপ করে অ্যারেস্টো করে নিলেই হল। তারপর বিচার যখন হবে, সে হবে।

আজকাল প্রকাশ্যে কথাবার্তা হেব্বি সাবধানে বলতে হয়। কে যে কোন কথাটাকে ‘কলোনিয়াল মাইন্ডসেট’ বলে বাতিল করে দেবে! হয়তো বললাম, ‘ভ্যালেন্টাইনস ডে-তে অল্পবয়সি ছেলেমেয়েগুলোকে দেখলে মনটা হু হু করে। বুঝতে পারি, বয়স হয়ে গেল।’ অমনি কেউ তেড়ে এসে বলবে, প্রেমটা পাশ্চাত্য থেকে শিখেছি, এর সঙ্গে আমাদের দেশীয় প্রেমের কোনও সম্পর্ক নেই। হয়তো দুপুর-রোদে আইসক্রিম খেতে গিয়ে একটু বেশি আবেগপ্রবণ হয়ে বলে ফেললাম ‘আহা! স্বর্গীয়’, ব্যস! অমনি আকাশবাণী শোনা যেতে পারে, ‘কেন? লস্যি, আখের রস, ঘোল— এসব খেলে আরাম হয় না? সাহেবদের পা-চাটা স্বভাব আর গেল না।’ আর কোনওভাবে যদি অ্যারিস্টটল বা শেক্সপিয়রের উদ্ধৃতি দিয়ে ফেলি কোনও লেখায়, তাহলে তো হয়ে গেল! কেন অ্যারিস্টটলের চেয়ে চাণক্য বড়, শেক্সপিয়রের চেয়ে কালিদাস— কেউ তা নিয়ে আস্ত প্রবন্ধ লিখে ফেলবে ফেসবুকের মন্তব্যেই। মানে আমি অস্বীকার করছি না যে, ঔপনিবেশিক মানসিকতা খুবই খারাপ জিনিস এবং ‘ভ্যালেন্টাইনস ডে’ নয়, এদেশের প্রেমিক-প্রেমিকাদের বসন্ত-পঞ্চমীতেই সাজুগুজু করে বেরনো উচিত। একথাও ঠিক যে, চাণক্য অ্যারিস্টটলের চেয়ে অনেক বড় দার্শনিক (হোয়াটস্যাপে চাণক্যের বাণীসমূহ পড়লেই সেটা জলের মতো বোঝা যায়)। আমি এটাও মানি যে, লস্যি, আখের রস, ঘোল হল দেবভোগ্য জিনিস; আইসক্রিম নেহাতই মনুষ্যভোগ্য। কিন্তু কথা হচ্ছে, ঔপনিবেশিক শাসকদের থেকে ভাল ভাল জিনিসগুলো কি আমাদের শেখা উচিত নয়? অবশ্যই উচিত! আমাদের দেশের শাসকরা তো শিখেছেন। এই দেখুন না, বড়লাট ওয়ারেন হেস্টিংস সেই যে আড়াইশো বছর আগে মহারাজা নন্দকুমারকে টাইট দিয়েছিলেন (ফাঁসি দেওয়াও ‘কলোনিয়াল কনসেপ্ট’ কি না, নিশ্চিত হতে পারছি না, তাই ঝুঁকি নিলাম না), তা থেকে আমাদের উপনিবেশ-বিরোধী, ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’-বাদী শাসকরা কত কিছু শিখে নিয়েছেন।

দোষ করুক বা না-ই করুক, ঘপ করে অ্যারেস্টো কর, জেলে তো পচুক…
আচ্ছা, উমর খালিদ বলে ছেলেটির অপরাধটা কী? কারও পকেট মেরেছে? কাউকে ছুরি মেরেছে? কারও দিকে গুলি চালিয়েছে? কোথাও বোম ফেলেছে? ব্যাঙ্কডাকাতি করেছে? রেললাইন উড়িয়ে দিয়েছে? বাইকে বোম-টোম ফিট করে রেখেছিল, সেটা ফেটে মেলা লোক মরেছে? কেউ জানে না। কারণ বিচারই হচ্ছে না চার বছর হয়ে গেল। গ্রেপ্তার করা হয়েছিল কিন্তু ভয়ংকর সব অভিযোগে। দাঙ্গা লাগিয়েছে, মারাত্মক সব অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে দাঙ্গা করেছে, খুন করেছে, খুনের চেষ্টাও করেছে, দেশদ্রোহ চালিয়েছে, বেআইনি কাজকম্ম করেছে, সন্ত্রাসবাদী কাজও করেছে, সেসব করতে টাকা তুলেছে, আরও কীসব ষড়যন্ত্র করেছে। তা এসব যদি করে থাকে, এ তো মহা বিপজ্জনক ছেলে! এর তো সাততাড়াতাড়ি বিচার করে চিরতরে জেলে পুরে দেওয়া দরকার, নইলে একেবারে নন্দকুমার করে দেওয়া দরকার। কিন্তু সে আর হচ্ছে কই? আজ পর্যন্ত দোষী সাব্যস্ত করার কাজটাই হল না।

আপনি বুঝি ভাবছেন এটা শাসকদের অক্ষমতা? উঁহু, মোটেই তা নয়। ফাঁসি-টাসি দিলে অনেকসময় লোকে বেজায় খেপে যায়। যাকে ফাঁসি দেবেন, কারও কারও চোখে সে আবার হিরো হয়ে যাবে। যেমন নন্দকুমার এখনও হিরো হয়ে আছেন। হেস্টিংস সাহেব আর এলিয়া ইম্পে সাহেব ভুল করেছিলেন। সেই ভুল থেকে আমাদের শাসকরা শিক্ষা নিয়েছেন। তাছাড়া এঁরা মানুষ ভাল, সাহেবদের মতো নৃশংস নন। ওসব ফাঁসি-টাসির ব্যাপার নেই। আর জেলে দেওয়ার কথা ভাবছেন? জেলেই তো রাখা হয়েছে। অতএব বিচার-টিচারের কী দরকার? উমর, শার্জিল ইমাম, গুলফিশা ফতিমার মতো যাকে যাকে আপদ মনে করেন, ঘপ করে অ্যারেস্টো করে নিলেই হল। তারপর বিচার যখন হবে, সে হবে। বিচার তো আর শাসকের হাতে নয়। সে বিচারকরা বুঝবেন। আপনার গাল দিতে ইচ্ছে হয়, বিচারকদের দিন গে। দিলেই বুঝবেন, ঠ্যালা কত। আদালত অবমাননার দায়ে আপনিও ঘপ করে অ্যারেস্টো হয়ে যাবেন, তারপর কপাল করে যদি তিহার জেলে জায়গা পান, তো পূর্ণিমা চাঁদকে ঝলসানো রুটি মনে করে উমরের সঙ্গে ভাগ করে খেতে পারেন।

আইন আইনের পথে চলবে

হেস্টিংস সাহেব একখানা কাঁচা কাজ করেছিলেন। নিজের দেশের আইনে ভারতীয় নাগরিকের বিচার করিয়েছিলেন। অর্থাৎ কিনা, যে আইন এ-দেশে চালুই নেই, সেই আইনে নন্দকুমারের বিচার হল আর মৃত্যুদণ্ড হয়ে গেল। তাই আজও লোকে একুশে আইন, ঔপনিবেশিক অবিচার ইত্যাদি পাঁচ কথা বলে। কিন্তু আমাদের শাসকরা ওসব ভুল আর করেন না। তাঁরা ইউএপিএ আইন, এনআইএ আইনের মতো ভাল ভাল আইন করেছেন। যেসব আইন ঠিক মনমতো ছিল না, সেগুলোকে গড়েপিটে নিয়েছেন, কলোনিয়াল মাইন্ডসেট থেকে তৈরি ইন্ডিয়ান পেনাল কোডের জায়গায় ভারতীয় ন্যায় সংহিতা চালু করেছেন। ইচ্ছে হলে এটাকে ‘ওয়ান বিগ বিউটিফুল বিল অ্যাক্ট’-ও বলতে পারেন। যার যেরকম রুচি!

আরও পড়ুন কুণাল, যাঁর কৌতুক আজ কামড়ায়

তা এখন আইন আইনের পথে চলবে। চোখে যে কাপড় বাঁধা ছিল, সেটা তো খুলে দেওয়া হয়েছে, ফলে এখন তো আর সরকার-বাহাদুরের হাত ধরে চলতে হয় না। আইন নিজেই নিজের রাস্তা দেখতে পায়। অতএব যা কাজ হবে, সব পাকা কাজ। একেবারে এদেশের আইন মেনে জেলে পোরা হোক, চাবুক মারা হোক আর ফাঁসি দেওয়াই হোক— সেসব হচ্ছে এবং হবে। কারও কিচ্ছুটি বলার নেই।

তোমার কর্ম তুমি করো মা, লোকে বলে করি আমি

সব কিছুতে শাসককে অত দেখা গেলে চলে না। এই সহজ কথাটা হেস্টিংস সাহেব হয় বুঝতে পারেননি, নয় বুঝেও রেলা নিচ্ছিলেন। কারণ ততদিনে বাংলার ভারতীয় শাসকের কোমর ভেঙে গেছে, বুঝে গেছিলেন, যা ইচ্ছে তাই করতে হবে। কিন্তু ওসব কলোনিয়াল মাইন্ডসেট। আমাদের শাসকরা খাঁটি দিশি। তাঁরা ও থেকে শিক্ষা নিয়েছেন, তাই ওরকম অসভ্যতা করেন না। মানে সবেতে নাক গলান না। সারা দেশে এত লোক হাজতবাস করছে, সবার খবর রাখা কি আর সম্ভব? খিদে পেটে কারও পার্স ছিনতাই করে দৌড় দিয়ে ধরা পড়ে যাওয়া গোঁফদাড়ি না গজানো কিশোর থেকে শুরু করে সুধা ভরদ্বাজের মতো বিলেতফেরত নামকরা মহিলা— কতজনই তো জেল খাটে। শাসকদের পক্ষে কি সম্ভব, তাদের সকলের খোঁজ রাখা? উলানবাতার থেকে উদুপি— সবদিকে নজর রেখে এসব ছোট কাজের জন্য সময় থাকে না। নজর না রাখলেই যে ইচ্ছামাফিক অনেক কাজ নিজে নিজে হয়ে যায়, বদনামও হয় না— এই কথাটা কিন্তু হেস্টিংস সাহেবের চেয়ে আমাদের শাসকরা ঢের ভাল বুঝেছেন। উদাহরণ দেব?

এই যে ধরুন ৮০ পেরিয়ে যাওয়া এক বুড়ো পাদ্রি, স্ট্যান স্বামী, তাঁকে পুলিশে ধরেছিল। তারপর মামলার শুনানি তো আজও হচ্ছে, কালও হচ্ছে। আইন আইনের পথে চলছিল, সে পথে ভীষণ জ্যাম। এসে পৌঁছতে সময় লাগবে তো! এদিকে বুড়োটার আবার সাহেবি রোগ ছিল, ‘পারকিনসন্স ডিজিজ’। এসব আমাদের দেশের রোগই নয়, কলোনিয়াল রোগ। তা সে রোগে নাকি গেলাসে করে জল পর্যন্ত খাওয়া যায় না। ভাবুন একবার সাহেবদের আদিখ্যেতা, স্ট্র দিয়ে জল খাওয়ার জন্য আদালতে আর্জি জানানো হয়েছিল। তা আইনকে তো আইনের পথে চলতে হবে। তাই স্ট্র দেওয়া উচিত কি উচিত নয় তা নিয়েও বিস্তর সওয়াল-জবাব চলে। তারপর সিদ্ধান্ত হয়— না, স্ট্র দেওয়া উচিত কাজ হবে না। এসব করতে করতে বুড়োটা অপরাধ করেছে কি করেনি, তার বিচার শুরু না-হতেই জীবন শেষ। দেখুন কেমন ট্যাক্স পেয়ারের টাকা বাঁচিয়ে দিলেন আমাদের শাসকরা। একখানা জল খাওয়ার স্ট্রয়ের দাম কি কম?

এরকম আরও অনেক ভাল ভাল জিনিস হেস্টিংস সাহেবের থেকে শিখেছেন আমাদের শাসকরা। তাই বলছিলাম, সাহেবদের সব জিনিসই ফেলে দেবেন না। ওপরদিকে তাকান, শাসকদের দেখুন এবং শিখুন— কলোনির কোন কোন জিনিস ফেলে দিতে হয় আর কোন কোন জিনিস আপন করে নিতে হয়।

ডাকবাংলা ডট কম ওয়েবসাইটে প্রকাশিত

মরে বেঁচে গেল তমন্না

ওর মত মেয়ের জন্যে আমাদের গ্রামে পড়ার স্কুল নেই, কলেজগুলোও ধুঁকছে। কলেজ পেরিয়ে আরও বড় কোথাও, ভাল কোথাও সে পৌঁছতে পারত – এমন ভাবনাও হাস্যকর।

‘আজ ফির জীনে কি তমন্না হ্যায়/আজ ফির মরনে কা ইরাদা হ্যায়’ – ওয়াহিদা রহমানের মত অনাবিল আনন্দে এই মারাত্মক লাইন দুটো গাইতে গাইতে নাচতে নাচতে তমন্না খাতুন পুকুরে চান করতে যাচ্ছিল কিনা, সে খবর কোথাও পেলাম না। হতেও পারে। ন-দশ বছরের শিশুর পক্ষে চারপাশের তাণ্ডবের মধ্যেও কতটা সরল এবং আপনমনে থাকা সম্ভব – তা আমি ৩৩ বছরের অনভ্যাসে ভুলে গেছি, ফলে আন্দাজ করতে পারছি না। কিন্তু দেখাই যাচ্ছে, এই স্মার্টফোন যুগেও ৯-১০ বছরের শিশু এতটা চৌখস হয়নি যে আঁচ করতে পারবে – বাবা যে দলের লোক তার প্রতিপক্ষ দলের বিজয় মিছিলের ধারেকাছে গেলে বাঁচার অভিলাষ বা তমন্না ‘মরনে কা ইরাদা’, অর্থাৎ মরার ইচ্ছা, হয়ে দাঁড়ায়। পিতামহ ভীষ্মের ছিল ইচ্ছামৃত্যু। মহাভারতের যুগ চলে গেছে; এখন বাপ ঠাকুর্দার বয়সী লোকেদের ইচ্ছা হলেই শিশুদের মৃত্যু হয়। যখন তখন যেখানে সেখানে। গাজা থেকে শুরু করে কালীগঞ্জ।

কী বলছেন? ‘বামফ্রন্টের ৩৪ বছরে’ ইত্যাদি? জানতাম ওটাই বলবেন। তাই তো সোজা মহাভারত থেকে শুরু করলাম। সবাই জানে চক্রব্যূহের সাতজন বীর ছিলেন অভিমন্যুর বাপ-ঠাকুর্দার বয়সী, তুলনায় অভিমন্যু নেহাত বালক। সুতরাং এ পাপের শুরু যে আজ নয় তা বলাই বাহুল্য। কিন্তু কী করব? মহাকালের চক্রান্তই বলুন, অথবা বাবা-মায়ের তমন্না, আমাকে এই কালখণ্ডেই বাঁচতে হচ্ছে। ফলে আজকের শিশুমৃত্যুর ঘা-ই আমার কাছে সবচেয়ে দগদগে। মানুষ নিজের বাবা-মা-ছেলেমেয়ের মৃত্যুশোকই কয়েক দিনে কাটিয়ে ওঠে, আর আপনারা বলছেন, দেড় দশক আগে শেষ হয়ে যাওয়া বামফ্রন্ট আমলে যে শিশুরা খুন হয়েছে তাদের মৃত্যু নিয়ে কথা বললে, তবেই তমন্নার মৃত্যু নিয়ে রেগে ওঠা বৈধ? বনলতা সেনকে লজ্জা দেবেন না মাইরি!

কী বলছেন? বড় বড় কথা বলছি, নিজেও কদিন পরেই তমন্নাকে ভুলে যাব? আজ্ঞে এই কথাটি যথার্থ বলেছেন। মাথাটা পচে যাচ্ছে, পচে গেছে স্ক্রোল করতে করতে। তমন্নাকে নিয়ে কদিন পোস্ট করা আর লাইক দেওয়া হয়ে গেলেই ঠিক স্ক্রোল করে এগিয়ে যাব। নিজের বাবার মৃত্যুশোকের ভার শ্মশানে দাঁড়িয়ে চিতায় তোলার আগেই ফেসবুকে পোস্ট করে নামিয়ে ফেলতে পারছি, আর কোথাকার কোন গণ্ডগ্রামের মেয়ে তমন্না – তার শোকে কদিন মুহ্যমান থাকব? হত কলকাতার কাছাকাছি এলাকার ভদ্দরলোকের মেয়ে, যে লেখাপড়া শিখে নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে গেছিল, কোনো পার্টির সঙ্গে যার গোটা পরিবারের কোনো সম্পর্ক ছিল না – তাহলে অন্তত কয়েক মাস তমন্নার মৃত্যু নিয়ে উত্তেজিত হয়ে থাকতাম। আমাদের দলহীন নারীবাদীরা (নয়-দশে কি নারী হয়? এ বিষয়ে কোনো মত দেব না; শেষে ম্যানস্প্লেনিংয়ের অভিযোগ উঠবে) রাত দখলের ডাক দিতেন, মেয়ে বউয়ের হাত ধরে চলে যেতাম গটগটিয়ে। সেখানে দাঁড়িয়েই গাদা ছবি, ভিডিও তুলে পোস্ট করে দিতাম ফেসবুকে। দায়িত্ব মিটে যেত। সপ্তাহান্তে আন্দোলন করে সোমবার থেকে যথারীতি অফিস কাছারি। এই মেয়েটার বেলায় অত কাণ্ড কেন করতে যাব? ওর তো বাবা সিপিএম করে। আন্দোলন-টান্দোলন করতে হলে সিপিএমই করুক। পশ্চিমবঙ্গে রাজনৈতিক হত্যার ইতিহাস তো লম্বা। ক দল খ দলের ঘর জ্বালিয়ে দেবে, খ দল ক দলের বাড়িতে বোম মারবে, কখনো ক দলের লোক মরবে আর কখনো খ দলের লোক মরবে। এ তো চিরকালই দেখছি। এর মধ্যে আমি ঢুকতে যাব কেন?

সাতে পাঁচে না থাকা মধ্যবিত্তও কি নতুন নাকি? মোটেই না। স্বাধীনতা সংগ্রাম বলুন, নকশাল আন্দোলন বলুন আর সিদ্ধার্থশঙ্কর রায়ের শাসনের দিনগুলোই বলুন। কোনোদিনই সকলে সুখী গৃহকোণ ফেলে পথে নেমে যায়নি। রূপকথায় বিশ্বাস করবেন না। ‘আমার নাম তোমার নাম, দেশের নাম ভিয়েতনাম’ বলে মিছিল করতেও মোটেই সকলে যায়নি। কেউ কেউ গেছিল। মুশকিল হচ্ছে, অনুপাত হিসাব করলে আমাদের মত এ যুগের বাম, প্রগতিশীল প্রমুখকে লজ্জায় পড়তে হবে। অবশ্য সেকালে না গিয়ে উপায় ছিল না। তখন তো মার্ক জুকেরবার্গ, ইলন মাস্কের মত মহাপুরুষদের জম্ম হয়নি, তারা নিজেদের সুসজ্জিত বাগানের গেট খুলে দেয়নি পুঞ্জীভূত গোষ্ঠীবদ্ধ ঘৃণার ব্যক্তিগত প্রকাশের জন্যে। তাই তখন নিদেনপক্ষে বামপন্থী নেতা কর্মী সমর্থকরা কিছু হলেই রাস্তায় নামতেন। মিছিল, মিটিং, পথসভাকেই প্রতিবাদ বা আন্দোলন বলে জানতেন। এখন তাঁরাও শিখে গেছেন – আন্দোলন মানে হল সোশাল মিডিয়া পোস্ট। মিছিল, মিটিং হলেও সেখানে গিয়ে স্লোগান দেওয়ার চেয়ে ফেসবুক লাইভ করা বেশি জরুরি। ওখান থেকেই ৮৮৮ বার কোট করা কবিতা বা গানের লাইন ক্যাপশন হিসাবে দিয়ে মিছিলের ছবি ও ভিডিও পোস্ট করাই রাজনীতি।

ব্যাপারটা সবচেয়ে মন দিয়ে শিখেছেন সবচেয়ে বড় বামপন্থী দল সিপিএমের শহুরে মধ্যবিত্ত নেতা কর্মী সমর্থকরা। গ্রামের দিকে পার্টির গরিবগুরবো সদস্য সমর্থক আক্রান্ত হলে, তাদের ছেলেমেয়েরা তমন্নার মত বেঘোরে প্রাণ হারালে, গিয়ে হাজির হতে হবে ঠিকই। কিন্তু সে দায়িত্ব কেবল একজনের – মীনাক্ষী ছাই ফেলতে ভাঙা কুলো মুখার্জি। বাকিরা ভীষণ ব্যস্ত। কারোর টালিগঞ্জ পাড়ার বন্ধুবান্ধবদের সঙ্গে সোশালাইজ করার দরকার আছে। কারোর গিটার বাজিয়ে ‘বেল্লা চাও’ গেয়ে বা রবীন্দ্রনৃত্য করে হাজার হাজার লাইক পাওয়ার আছে। কারোর বন্ধুর জন্মদিনে পিটার ক্যাট বা মেইনল্যান্ড চায়নায় হুল্লোড় করে কমরেড যেন বিপ্লবের মতই দীর্ঘজীবী হন, তা পোস্ট করা প্রয়োজন। কেউ টিভি চ্যানেলে তৃণমূলের মুখপাত্রের সঙ্গে তুমুল ঝগড়া করেই সমর্থকদের মোহিত রাখতে ব্যস্ত, সত্যিকারের সংঘর্ষে জড়াবেন না। কারণ তাহলে থিয়েটার করতে গিয়ে সরকারি হল পাবেন না, সিনেমা বানানোর পর নন্দনে শো পাবেন না। কেউ আবার জয়দেব বসুর জন্মদিন, মৃত্যুদিন এসে পড়লেই ‘রাজার সঙ্গে আঁতাত করেন যিনি/আমাদের সেই গুহকের প্রতি ঘেন্না’ ইত্যাদি পোস্ট করেন। কিন্তু তিনিও জানেন, তাঁর সরকারপক্ষের বন্ধুরাও জানেন, যে ওসব রান্নাবাটি খেলা। তাই কবিতা পাঠ, গল্প পাঠের আসরে ডাক এসে যায় যথাসময়ে। সে চিঠি সরকারবিরোধী সাহিত্যিক সগর্বে ফেসবুকে পোস্টও করেন। অনেকের আবার বিক্ষোভ বিদ্রোহ বিপ্লব সবই সাহিত্যজগতের দখল ঘিরে। বাম আমলে ওটার রাশ নিজেদের হাতে ছিল, এখন বেরিয়ে গেছে। যত আক্রোশ তাই নিয়ে। কোথায় কোন প্রাণ হাতে করে সিপিএম করা কর্মীর বাচ্চা মেয়েটা বোম খেয়ে মরে গেল – তাতে এঁদের কী? কয়েকটা ফেসবুক পোস্ট করে দেবেন, না হয় একখানা আবেগে থরোথরো কবিতাই লিখে দেবেন। তাতে সাপও মরবে, লাঠিও ভাঙবে না। অর্থাৎ বামপন্থী পরিচয়টাও বজায় থাকবে, আবার শিল্পী বা সাহিত্যিক হিসাবে ক্ষীর খাওয়াও বন্ধ হবে না।

এঁরাই বঙ্গ সিপিএম নেতৃত্বের কাছের লোক, ভালবাসার লোক। এঁরাই বিবেকবান ধর্মনিরপেক্ষ বুদ্ধিজীবী হিসাবে রিপাবলিক বাংলায় গিয়ে গিয়ে চ্যানেলটিকে ভদ্রলোক সদস্য সমর্থকদের মধ্যে বৈধতা পাইয়ে দিয়েছেন। ফলে সেই ভদ্রলোকরা দিনরাত প্রাক্তন এসএফআই অ্যাংকরের বিষ গিলে গিলে সিপিএমের মিছিলে যান, ফেসবুকে মীনাক্ষীর বক্তৃতা শেয়ার করেন আর ভোট দেন বিজেপিকে। তমন্নার মৃত্যুতে এই ভদ্রলোকদের কোনো তাপ উত্তাপ নেই, কারণ ‘এ তো ওদের নিজেদের মধ্যে ঝামেলা। ওরা তো এইসবই করে। ভোটের দিন মারামারিগুলোও তো ওরাই করে।’ বোঝাই যাচ্ছে, এই ‘ওরা’ কিন্তু তৃণমূল কংগ্রেস নয়। যতই সিপিএম ও অন্য বামেরা ফেসবুকে ডিমের কুসুমের ছবি দিয়ে ময়ূখ ঘোষকে নিয়ে হাসিঠাট্টা করুন, বাঙালি ভদ্রলোক ভোটারদের অনেকের মস্তিষ্ক কিন্তু ময়ূখের পায়েই জমা পড়েছে। তাই এই ভদ্রলোক ভদ্রমহিলাদের কাছে তমন্না কোনো বাচ্চা মেয়ে নয়, মুসলমান মেয়ে। এই শ্রেণির ভোটের জন্যেই আবার আজকের সিপিএমের যৎসামান্য সাধনা। নইলে তমন্নার মৃত্যু নিয়ে শুধু কালীগঞ্জ নয়, পশ্চিমবঙ্গের পাড়ায় পাড়ায় মিছিল হওয়া উচিত ছিল। রাস্তা অবরোধ, রেল অবরোধ হওয়া উচিত ছিল। কবে বামপন্থীরা এক পয়সা ট্রামভাড়া বৃদ্ধি নিয়ে আক্ষরিক অর্থে আগুনে আন্দোলন করেছিল, সে ইতিহাস জানতে হবে না। তাপসী মালিকের মৃত্যু নিয়ে মমতা ব্যানার্জি কী করেছিলেন মনে করুন, তাহলেই বোঝা যাবে কী বলছি। অমন করেছিলেন বলেই তাপসীকে কেউ ভোলেনি, কিন্তু তমন্নাকে আমরা আজই ভুলে যাব দিঘার রথযাত্রা দেখতে দেখতে। শুধু তাই নয়, অমন করেছিলেন বলেই পশ্চিমবঙ্গের ইতিহাসে সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত সরকার চালানো সত্ত্বেও, তৃণমূল স্তরের মানুষ তাঁর দলের তোলাবাজিসহ নানাবিধ অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে গেলেও, প্রশাসন বলে রাজ্যে কার্যত কিছু না থাকলেও, স্কুল থেকে হাসপাতাল পর্যন্ত নৈরাজ্যের চূড়ান্ত হলেও মমতার জনপ্রিয়তা কমছে না।

অন্যদিকে প্রত্যেকটা নির্বাচন, উপনির্বাচনের পরে সিপিএম কর্মীরা কী করেন? কংগ্রেসের সঙ্গে জোট থাকা উচিত কি উচিত নয়, অন্য বাম দলগুলোর সঙ্গে ঐক্য গড়ে তোলা উচিত কি উচিত নয় – এই নিয়ে ফেসবুকে নিজেদের মধ্যে তর্ক করেন। বড়জোর ‘এত কিছুর পরেও যদি লোকে এদের ভোট দেয়, তাহলে আর কিছু বলার নেই’ বলে বিলাপ করেন। গত লোকসভা নির্বাচন পর্যন্ত লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের নাম করে পশ্চিমবঙ্গের গরিব মানুষকে ভিখিরি বলাও চালু ছিল, সেবার রাজ্য সম্পাদকের কড়া মন্তব্যের পর ওটা বন্ধ হয়েছে। কালীগঞ্জের উপনির্বাচনে বিপুল ভোটে হারের পরেও একই ঘূর্ণিতে ঘটনা ঘুরপাক খাচ্ছে। তমন্নার মৃত্যু দেখার পর আরও বেশি করে এক দল সিপিএম সোশাল মিডিয়ায় ঝড় তুলছেন এই বলে, যে বামফ্রন্ট ব্যাপারটা আর রাখার দরকার নেই। যেন ওটা ভেঙে দিলেই লোকে হইহই করে ওঁদের ভোট দিয়ে দেবে আর ২০২৬ সালে অষ্টম বামফ্রন্ট, থুড়ি, প্রথম সিপিএম সরকার এসে যাবে। আসল সমস্যা হল, এখন বাংলায় সিপিএম বলতে পড়ে আছেন নিচের তলার কিছু লড়াকু কর্মী, যাঁদের নেতারা নানা অজুহাতে লড়তে দেন না। আর আছে সোশাল মিডিয়ার শম সিপিএম, যাদের কথা এতক্ষণ সবিস্তারে বললাম। বিশ্বাস হচ্ছে না? রাগ হচ্ছে? আচ্ছা দেখুন।

তমন্না খুন হল ২৩ জুন, আর ২৬ জুনের সংস্করণে সিপিএমের দলীয় মুখপত্র গণশক্তি খবর দিল ‘কালীগঞ্জে নিহত শিশুকন্যা তামান্না খাতুনের গ্রামে আগামী শনিবার যাবেন সিপিআই(এম)’র রাজ্য সম্পাদক মহম্মদ সেলিম, পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য মীনাক্ষী মুখার্জি সহ পার্টি নেতৃবৃন্দ। স্থানীয় মানুষজনকে নিয়ে সেখানে প্রতিবাদ সভায় অংশ নেবেন তাঁরা। বুধবার সিপিআই(এম)’র রাজ্য কমিটির বৈঠকের শেষে সাংবাদিক বৈঠক করে একথা জানিয়ে মহম্মদ সেলিম বলেছেন, খুনের অভিযোগে এফআইআর-এ নাম থাকা দুষ্কৃতীদের এখনও গ্রেফতার করা হয়নি। তৃণমূলের ঝাণ্ডা নিয়ে তারা এখনও ঘুরে বেড়াচ্ছে।’ অর্থাৎ কমরেডের শিশুকন্যাকে কারা খুন করেছে তা জানেন রাজ্য সম্পাদক। ফলে ধরে নেওয়া যায় রাজ্য কমিটির সকলেই জানেন। পুলিস যে নিষ্ক্রিয় তাও জানেন। তবু তাঁরা কমরেডের পরিবারের কাছে ছুটে না গিয়ে, পুলিসের কৈফিয়ত না চেয়ে রাজ্য কমিটির বৈঠক চালিয়ে যাচ্ছিলেন। সাংবাদিক নয়, স্রেফ নাগরিক কৌতূহল থেকেই জানতে ইচ্ছে করে – কী এমন গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা চলছিল রাজ্য কমিটিতে? ২৫ তারিখ রাজ্য কমিটির বৈঠক শেষ হয়ে যাওয়ার পরেও কালীগঞ্জ পৌঁছতে ২৮ তারিখ হবে কেন? কলকাতা থেকে কালীগঞ্জের দূরত্ব কি রেলপথে কোচির চেয়েও বেশি? নাকি ২৬, ২৭ জুড়ে পশ্চিমবঙ্গে বিপ্লব করে তৃণমূল সরকারকে উচ্ছেদ করে ফেলবে বঙ্গ সিপিএম? তারপর ২৮ তারিখ তমন্নার বাড়ি গিয়ে তার মা-বাবার হাত ধরে সেলিম বলবেন ‘কমরেডস, আপনাদের মেয়েকে তো ফিরিয়ে আনতে পারব না, কিন্তু যারা তাকে খুন করেছে তাদের শাস্তির পাকা ব্যবস্থা করে এসেছি’? সত্যি সত্যি এমন ঘটা দূরে থাক, টলিপাড়ার কোনো মার্কামারা সিপিএম পরিচালকের এই দৃশ্যটা লেখার পরিস্থিতিও কি তৈরি করতে পারা গেছে রাজ্য কমিটির মিটিংয়ে?

অবশ্য ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদের এই রমরমার যুগে কে কার কমরেড? শব্দটা এখন বাম বৃত্তে কোনো কারণে ঢুকে পড়া নারী পুরুষের মুখস্থ বুলি মাত্র। সত্যি সত্যি সিপিএমে কমরেড কথাটার কোনো দাম থাকলে রাজ্য কমিটির অফিসে বসে সাংবাদিক সম্মেলন করে কীভাবে একজন কমিউনিস্ট পার্টির নেতা বলতে পারেন, তিনি নিজের বাবার টাকায় বিলাসবহুল গাড়ি কিনেছেন বেশ করেছেন? বিজেপির নির্বাচনী প্রচারের ভিডিওতে মুখ দেখানো শিল্পীদের পার্টির কর্মসূচিতে নিয়ে আসার পরেও তিনি শাস্তিই বা এড়ান কী করে? কোন সম্মেলনে কে কাকে ভোটে হারিয়ে পদাধিকারী হলেন, কার সঙ্গে কার হাতাহাতি হল – সে খবরই বা সংবাদমাধ্যমে দিনের পর দিন এসে পড়ে কী করে? কীভাবে সামান্য যুব সংগঠনের সম্মেলনে কোনো পদ না পেয়ে কেউ সোশাল মিডিয়ায় পোস্ট করতে পারে, সে নেতা হল না বলে আগামীদিনে সংগঠনের কাছে কেউ মূত্রত্যাগ করতেও যাবে না?

লেখাটায় সাংবাদিকসুলভ নৈর্ব্যক্তিকতা থাকছে না, তাই না? থাকা উচিতও নয়। কারণ সাংবাদিকও মেয়ের বাবা। রাজ্যটার হাল দেখে স্পষ্ট বুঝতে পারছি, সর্বাঙ্গ পচে গেছে। এই রাজ্যে আমি থাকি, আমার মেয়ে থাকে। কেন নৈর্ব্যক্তিক হতে যাব? ‘সর্বাঙ্গ’ কথাটা পছন্দ হচ্ছে না? আচ্ছা সবিস্তারে বলি। সিপিএম তো শূন্য, আপনারা যাদের ভোট দিয়ে রাজ্যের বিরোধী দল বানিয়েছেন তাদের দিকেই তাকিয়ে দেখুন। শুভেন্দু অধিকারী, সুকান্ত মজুমদাররা সারাক্ষণ গরম লোহার মত বাক্যবাণ নিক্ষেপ করেন পশ্চিমবঙ্গ সরকারের দিকে, অথচ দু-চার লাইন আইসক্রিমের মত ঠান্ডা বিবৃতি দিয়েছেন তমন্নার ঘটনা নিয়ে। তৃণমূল বিধায়কের আনা টাকা ফিরিয়ে দেওয়ার জন্যে কিঞ্চিৎ প্রশংসা করেছেন তমন্নার মায়ের। তাঁকে কোনো অজ্ঞাত কারণে বেগম রোকেয়ার সঙ্গে তুলনা করেছেন। বোধহয় আরবি নামের জন্যে। আসলে তমন্না, সাবিনারা রোকেয়ার মত আরবি নামের বাঙালি বলেই তো এই নিয়মরক্ষা। যদি মেয়েটার নাম হত তৃণা বা মণি, তাহলেই ব্যাপারটাকে জাতীয় স্তরে নিয়ে ফেলতেন ওঁরা। প্রধানমন্ত্রী এক্সে পোস্ট করতেন, অমিত মালব্য ও সম্প্রদায় পশ্চিমবঙ্গে হিন্দুরা কত বিপন্ন – তার অজস্র বানানো প্রমাণ ছড়াতে শুরু করতেন।

কিন্তু ভেবে দেখুন তো, দোষগুলো কি শুধু তৃণমূল-সিপিএম-বিজেপির মধ্যে সীমাবদ্ধ? মেয়েটার নাম তমন্না বলে আর সুদূর নদিয়ার কালীগঞ্জের বাসিন্দা বলেই কি ‘কোনো রাজনৈতিক দলকে আমাদের আন্দোলনে ঢুকতে দেব না’ বলে চিৎকার করা নারীবাদী নেত্রীরা আজ চুপ নন? যে কোনো দলের কলকাতার নেতার মেয়ে এভাবে খুন হলেও কি চুপ থাকতেন তাঁরা? ‘ওকে সেই ছোট থেকে দেখেছি’ বলে টিভি ক্যামেরায় বাইট দেওয়া শুরু হত না? তৃণমূলের নেতা, কর্মীরা যে দুর্নীতি করেন তাকে কি গোটা বঙ্গসমাজই আসলে প্রশংসার দৃষ্টিতে দেখে না? বছর বিশেক আগেও পাড়ায় ঘুষখোর সরকারি অফিসার বা দু নম্বরি ব্যবসায়ী থাকলে, তার ধোপা নাপিত বন্ধ না করলেও, সকলে তাকে একটু এড়িয়ে চলত। সে বাড়িতে ঘটা করে লক্ষ্মীপুজো, সরস্বতীপুজো বা লোকনাথ বাবার জন্মতিথি পালন করে লোক খাওয়ালে বাড়ি ফিরে নিমন্ত্রিতরাই আলোচনা করত ‘পাপের টাকা তো, এসব করে পাপ ধোয়ার চেষ্টা করে আর কি।’ আজ কিন্তু কারোর আঙুল ফুলে কলাগাছ হলে কেউ খোঁজ করে না – এত টাকা পেল কোত্থেকে। বরং তাকেই সফল লোক বলে মেনে নেয় সকলে। কেউ প্রশ্ন তুললে তার সম্পর্কে বলাবলি করে ‘যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে হবে তো। নিজে পারেনি বলে হিংসে করছে।’ সিপিএমের মত আলস্য, দিশাহীনতা এবং কোনো ত্যাগস্বীকার না করেই দাবি আদায় করা যাবে – এরকম মনোভাবও তো আমাদের সকলেরই।

দেখে শুনে মনে হয়, তমন্না মরে গিয়ে বেঁচে গেল। ওর মত মেয়ের জন্যে আমাদের গ্রামে পড়ার স্কুল নেই, কলেজগুলোও ধুঁকছে। কলেজ পেরিয়ে আরও বড় কোথাও, ভাল কোথাও সে পৌঁছতে পারত – এমন ভাবনাও হাস্যকর। অল্প বয়সে বিয়ে হয়ে অপুষ্টিতে ভোগা বাচ্চার মা হওয়া ছাড়া আর কোন ভবিষ্যৎ রেখেছিলাম আমরা ওর জন্যে? সে ভবিষ্যৎও তো সুস্থ শরীরে বড় হলে। তার আগেই নির্জন মাঠে বা বনে বাদাড়ে নিয়ে গিয়ে যদি ওকে ফুর্তি করে শেষ করে দিত কোনো নরপশু? এমন তো হামেশাই হচ্ছে আমাদের চারপাশে। অপরাধীরা অনেকে আবার গায়ে হাওয়া লাগিয়ে ঘুরেও বেড়াচ্ছে। যদি ধরে নিই, এসব কিছুই হত না, বড় হয়ে একটা সুস্থ স্বাভাবিক জীবন পেত আমাদের তমন্না, তাতেও কি শান্তি থাকত? চারদিকে ব্যাঙের ছাতার মত এত ঘৃণার ফসল ফলেছে আমাদের এই বাংলায়, যে একটা মেয়ে অন্য ধর্মের ছেলেকে বিয়ে করেছে বলে সম্প্রতি তার শ্রাদ্ধ করেছে পরিবার। এই ঘৃণা কখন কাকে গিলে ফেলে কোনো ঠিক আছে? আমাদের কি আর কোনো অধিকার আছে সন্তানের জন্ম দেওয়ার? আমাদের ‘জীনে কি তমন্না’ তো ‘মারনে কা ইরাদা’ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

নাগরিক ডট নেট ওয়েবসাইটে প্রকাশিত