নাম তার ছিল: ৩৪

পূর্বকথা: বহুদিন পরে জেলা সম্পাদকের তলব পেয়ে পার্টির জেলা অফিসে যেতে হল রবীনকে। সম্পাদকমশাই অভিযোগ করলেন, সে উপদল করছে। ফাল্গুনী আর শিবুর বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ আছে জানিয়ে হুমকি দিলেন, ওদের সংস্রব ত্যাগ না করলে পার্টি সদস্যপদ কেড়ে নেওয়া হতে পারে।

আজ রবীনের চাকরি জীবনের শেষ দিন। সকাল থেকে পাগল মহারাজের কথা মনে পড়ছে খুব।

আড্ডা মারতে গিয়ে এক দিন ওঁকে জিজ্ঞেস করেছিল “আচ্ছা, কত বছর বাঁচা ভাল বলে মনে হয় আপনার?”

“বয়স দিয়ে হিসাব করলে হবে না মাস্টারমশাই।”

“তবে? কর্মঠ থাকতে থাকতে মারা যাওয়াই ভাল বলছেন?”

“ঐ যে, আপনার প্রিয় ঠাকুর যা লিখেছেন? ঐটেই ঠিক।”

“উনি তো এত লিখেছেন যে হাজার খানেক গীতা হয়ে যাবে। আপনি কোনটার কথা বলছেন?”

“চাহি না রহিতে বসে, ফুরাইলে বেলা। তখনি চলিয়া যাব, শেষ হলে খেলা।”

“হুঁ। কিন্তু তেমন কি আর সবার হয়, মহারাজ? ভীষ্মের ছিল ইচ্ছামৃত্যু। তেমন সুবিধে থাকলে তো হয়েই যেত।”

“না, সে আর আমাদের কেমন করে হবে? তবে কি জানেন, কারোর বাঁচার ইচ্ছে চলে গেলে তাকে আর হাজার চেষ্টা করেও রাখা যায় না।”

কথাটা ভারী আশ্চর্য লেগেছিল রবীনের। সত্যিই তো! বাঁচতে গেলে তো সবচেয়ে প্রথমে বাঁচতে চাইতে হবে। এ কথাটা এভাবে মনে আসেনি কখনো। সে যখন অবাক হয়ে নিজের বাঁচার ইচ্ছে মাপছে, তখন মহারাজ যোগ করেছিলেন “কর্মী লোকেদের কাজ ফুরিয়ে গেলে বাঁচার ইচ্ছে চলে যায়। তখন তারা চলে যাবার জন্যে তৈরি হয়ে থাকে।”

পাগল মহারাজের অনেক কথাই রবীনকে অনেক সময় ভাবিয়েছে। ভাবনার খোরাক পাওয়া যায় বলেই তো তাঁর কাছে বারবার ছুটে যাওয়া। কিন্তু সেদিনের কথাগুলোর মত আর কোন কিছু কখনো ভাবায়নি। সেবার ওঁর কাছ থেকে ঘুরে আসার পরের কয়েকটা দিন খুব ব্যস্ততায় কেটেছিল। হঠাৎ একদিন সকালে ফাল্গুনী এসে খবর দিল পাগল মহারাজ অসুস্থ। ওর শ্বশুরবাড়ি মহারাজের আশ্রমের পাড়াতেই। সেখান থেকেই খবর পেয়েছে।

রবীন স্কুল থেকে ফিরেই ছুটল। সেই প্রথম মহারাজকে শুয়ে থাকতে দেখা।

“আমার তেমন কিছু হয়নি, মাস্টারমশাই। এরা সব ভয় পেয়েছে, তাই আমাকে জোর করে শুইয়ে রেখেছে।”

“হয়নি বললেই হল? আমি অপু মহারাজের সাথে কথা বলে এ ঘরে এলাম। আপনার রীতিমত একটা স্ট্রোক হয়ে গেছে। এখন কদিন কথার অবাধ্য হওয়া চলবে না।”

“না, অবাধ্য আমি হব কেন? অপুর মত যোগ্য লোক আশ্রমের দায়িত্বে আছে, আমার তো শুয়ে থাকতে অসুবিধে নেই। তবে বেশিদিন শুয়ে থাকতে হবে না।”

“সে তো বটেই। আপনার মত কাজের লোক বেশিদিন শুয়ে থাকলে চলবে? আপনি নিয়ম মেনে চলুন, ঝটপট সুস্থ হয়ে যাবেন।”

“কাজ আমার ফুরিয়েছে। এবার বিদায় নেব।”

কথাটা শুনে যে ধাক্কাটা লেগেছিল সেটা এত বছর পরেও রবীনের মনে একেবারে টাটকা। সে চমকে উঠে বলেছিল “এসব কী বলছেন?”

“ঠিকই বলছি। আমার স্কুলটা দাঁড়িয়ে গেছে, কাকে ভার দিয়ে যাব সেই নিয়ে চিন্তা ছিল। অপুকে পেয়ে সে চিন্তাও দূর হয়েছে। আর তো আমার কিছু পাওয়ার নেই, মাস্টারমশাই। কিছু দেয়ারও নেই। যতটুকু আমার ছিল, সব দিয়ে দিয়েছি। আর থাকলে যে লোকের হেলা শ্রদ্ধার পাত্র হব। তার চেয়ে চলে যাওয়াই ভাল নয়?”

“অন্যদের কথা জানি না মহারাজ। আমি তো সাধারণ মানুষ, বড় স্বার্থপর। শুধু নিজের দরকারটাই ভাবি। আমার যে আপনাকে এখনো দরকার? এই যে জীবনযুদ্ধে ক্লান্ত হয়ে পড়লে আপনার কাছে আসি, দুটো কথা বলি, থোড় বড়ি খাড়া আর খাড়া বড়ি থোড়ের বাইরে আলাপ আলোচনা হয়… আপনি না থাকলে কার কাছে যাব বলুন তো?”

কথাটা শুনে মহারাজ ভারী স্নিগ্ধ হেসে হাতটা মেলে দিয়েছিলেন। রবীন দুহাত দিয়ে সেটাকে জড়িয়ে ধরতে বলেছিলেন “সঙ্গী পেয়ে যাবেন, মাস্টারমশাই। আর কেউ না থাক, কিচ্ছু না থাক, আপনার ছাত্রছাত্রীরা আছে না? ওরাই বাঁচার রসদ জুগিয়ে দেবে।”

ভারী অশান্ত মন নিয়ে সেদিন ফিরে এসেছিল রবীন। শিগগির আবার দেখতে যাবে ভেবেছিল। সে সুযোগ আর পাওয়া যায়নি। মৃত্যুসংবাদ পেয়ে আর ও মুখো হয়নি। মহারাজ শেষ কথাটা অবশ্য ভুল বলেননি। উনি মারা গেছেন বছর পাঁচেক হল। স্কুল আর ছাত্রছাত্রীগুলো আছে বলেই একেবারে নিঃসঙ্গ হয়ে পড়তে হয়নি। পার্টির সাথে যোগ তো কমে গেছে অনেকটাই, জোনাকির সাথে কতটুকু যোগ আছে সে কথা ভাবতেও রবীন ভরসা পায় না। আছে যে, সেই বিশ্বাসটুকুই বেঁচে থাক না হয়। আর ছেলেটা? সে যে কত দূরে তা মাপাও অসম্ভব। ইদানীং অবশ্য আগের তুলনায় ফোনে কথাবার্তা বলে বেশি। ওদিককার এক আধটা খবর নিজে থেকেই দেয়, এদিককার খবরও জিজ্ঞেস করে না তা নয়। রবীন তাতেই সন্তুষ্ট থাকার চেষ্টা করে। ছেলেমেয়ে বয়ঃসন্ধিতে পৌঁছলেই বাবার সাথে সেই ছোটবেলার সখ্য থাকে না, এমনটাই তো দেখে গেল সারা জীবন। তবু তো বিপ্লবের ক্ষেত্রে কলেজে ভর্তি হওয়া পর্যন্তও তেমনটা হয়নি।

সেদিন বৃহস্পতিবার। রবীনের দিনের শেষ ক্লাসটা থাকে সিক্স বি সেকশনে। কিন্তু হেডমাস্টার অনিল বলেই দিয়েছিল, সেদিন টিফিনের পর আর ক্লাস হবে না। রবীনের ফেয়ারওয়েল, তারপর ছুটি। অনিল কলকাতার ছেলে, মফস্বলের স্কুলের হেডমাস্টার হয়ে এসেছে। তবু নাক উঁচু ভাবটা নেই। প্রথম দিনই রবীনকে বলেছিল “সিনিয়র টিচাররা আমাকে নাম ধরেই ডাকতে পারেন। আর ‘আপনি আপনি’ করবেন না, প্লিজ। আমি আপনাদের চেয়ে বেশ কিছুটা ছোট।” রবীনের অবশ্য হেডমাস্টারকে তুমি বলা না-পসন্দ। তাই নাম ধরেও “আপনি” বলে এসেছে। ফেয়ারওয়েলের আয়োজনে আপত্তি করে বলেছিল “এসব আবার কেন করছেন, অনিল? আর কি আমার ইস্কুলে আসা বারণ?”

“ছি ছি! এ কী বলছেন, মাস্টারমশাই? এই স্কুল সব সময় আপনার। যখন ইচ্ছে আসবেন। কিন্তু এত বছর এই স্কুলটাকে যা দিলেন, স্কুলের তো কর্তব্য তার জন্যে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা। সামান্য একটু আয়োজন। এতে আপত্তি করবেন না।”

সামান্য বললেও, রবীন দেখল ব্যাপার নেহাত সামান্য নয়। দোতলায় জীবনের শেষ ক্লাসটা নিয়ে বারান্দায় বেরিয়ে দেখতে পেল, ইউ আকৃতির স্কুলের বড় উঠোনটায় দু তিনটে টেবিল জুড়ে রাখা আছে, বসবার চেয়ার দেওয়া হয়েছে। সামনে সতরঞ্চি পাতা ছেলেমেয়েরা বসবে বলে। এর আগে যতজন বিদায় নিয়েছেন, এই ব্যবস্থাই ছিল বটে, তবু যেন নতুন লাগছে। কারণ অনুষ্ঠান সূচী তো রবীন নিজেই ঠিক করত। কোন ছাত্র স্যার বা দিদিমণি সম্পর্কে দু কথা বলবে, কে শুরুতে একটা গান গাইবে — এসব খুঁটিনাটি তো সে নিজেই দেখত বরাবর। মানপত্রটাও বাংলার দিদিমণি শ্রাবন্তী লিখে বাঁধাতে পাঠানোর আগে একবার দেখিয়ে নিত। এবার সবটাই অজানা। একতলায় নেমে টিচার্স রুমে গিয়ে অবশ্য বোঝা গেল এবারের আয়োজন সত্যিই একটু ব্যতিক্রমী। থুড়থুড়ে বুড়ি হয়ে পড়া রজনীদি, যিনি না থাকলে জোনাকির সাথে বিয়েটা হত না, তিনি এসেছেন। সেই কাঁকুড়গাছি থেকে! আবার নবাও হাজির। সপ্তাহের মাঝখানেই! অনিল ওকেও ডেকে এনেছে? হেডমাস্টার অনিল অতিথিদের নিয়ে গিয়ে যথাস্থানে বসাল। রবীনের দু পাশে। নবা যে স্কুলের গভর্নিং বডির সদস্য সেটা তখন খেয়াল হল।

সামনে ছেলেমেয়েগুলোকে ওরই মুখের দিকে চেয়ে বসে থাকতে দেখে প্রথমবার রবীনের চোখ দুটো একটু ছলছলিয়ে উঠল। সকলের বসার জায়গা হয়নি। অনেকেই দাঁড়িয়ে আছে ধার ঘেঁষে, দেয়ালে হেলান দিয়ে। দোতলার বারান্দাতেও অনেকে। কী বিষাদময় কচি মুখগুলো! এতগুলো অপাপবিদ্ধ তরুণ মন তাকে ভালবাসে ভেবে বুকটা কেঁপে উঠল রবীনের। নিজের কানে কানে বলল “এদের ভালবাসার যোগ্য কি আমি?”

ওরা সব মাইক ঠিক করছে, হারমোনিয়াম, ফুলদানি ইত্যাদি নিয়ে আসছে। চারদিক দেখতে দেখতে খেয়াল হল, সতরঞ্চি যেখানে শেষ সেখানে দাঁড়িয়ে আছে সুবিমল। ছেলেটা মাধ্যমিকের পর উচ্চমাধ্যমিকেও এক দাঁড়ি পেয়েছে। রবীনের ইচ্ছে ও প্রফেসর হোক। হতভাগাটা কলেজ কামাই করে এসেছে। ওর উপর চোখ পড়তেই এক গাল হাসল, রবীনও হাসল। কিন্তু এতদূর থেকেও রবীন পরিষ্কার দেখতে পেল বোকাটার চোখে জল। ঠিক তখুনি নবা মুখটা কানের কাছে নিয়ে এসে বলল “ঐ কোণের মেয়েটা কে রে? ঐ যে স্কুল পাহারা দেয় রিকশাওয়ালা, ওর গিন্নী?”

প্রথমটায় রবীনের অচেনা মনে হল। হবে না-ই বা কেন? এই সেদিনের ফ্রক পরা, বিনুনি দোলানো মেয়েটা যদি শাড়ি ব্লাউজ পরে একটা বছর খানেকের বাচ্চা কোলে নিয়ে বসে থাকে তাহলে চট করে কি চেনা যায়? রবীন যখন ভুরু কুঁচকে তাকাচ্ছে, তখন ওর হাসিটা দেখে শেষ অব্দি চিনতে পারা গেল। শিউলি। প্রচুর ধমক খেয়ে শেষে ট্রান্সলেশনটা ঠিক হলে এইরকম হাসত। রবীন উঠে দাঁড়িয়ে হাত নেড়ে ডাকে। ও বাচ্চা কোলে এগিয়ে আসে।

“কী রে? একেবারে গিন্নী হয়ে গেছিস যে। ছেলেটা কবে হল?”

“এই তো। এক বচ্ছর হবে, স্যার।”

“তোর যেন কোথায় শ্বশুরবাড়ি?”

“বড়িহাটায়।”

“ও হ্যাঁ। তা তোকে কে বলল আমার আজকে ফেয়ারওয়েল?”

“ও মা! আমাদের পাড়ার কত ছেলেমেয়ে পড়ে এই ইস্কুলে।”

“তা বটে।” রবীন কোলের ছেলেটার দিকে হাত বাড়াতেই সে নিঃসঙ্কোচে চলে আসে। “বা রে, ভারী লক্ষ্মী ছেলে তো তোর? চেনা অচেনা নেই!”

“শিশুরা ভাল মানুষ খারাপ মানুষ বোঝে স্যার।”

“হ্যাঁ হ্যাঁ। খুব বোঝে। ছেলের মা হয়েও তোর বুদ্ধিটা পাকেনি রে পাগলি।”

রবীন পকেট হাতড়ে একটা একশো টাকার নোট পায়। সেটা শিউলির হাতে দিয়ে বলে “এটা রাখ। দাদুভাইকে রসগোল্লা খাওয়াস। নাকি তোরা চকলেট খাওয়াস আজকাল? সে যা-ই হোক।”

“এ মা! না স্যার।”

“না আবার কী? বলছি নে। আর যে কদিন বাপের বাড়িতে আছিস, একদিন আমার বাড়ি আয় ওকে নিয়ে। তোর জেঠিমা খুব খুশি হবে। জামাইকে তো ওভাবে আসতে বলা যায় না। ওটা নয় পরে হবে।”

“যাব স্যার।”

শিউলি টেবিলের তলা দিয়েই মাথা গলিয়ে পায়ের ধুলো নেয়।

“আহা, মাথা ঠুকে যাবে রে। যা যা বোস গিয়ে।”

“স্যার, আমরা তৈরি। শুরু করি এবার?” অ্যাসিস্টেন্ট হেডমাস্টার অমৃতেন্দু জিজ্ঞেস করল।

“ও হো। হ্যাঁ হ্যাঁ, শুরু করো। ছেলেমেয়েগুলো টিফিনটাও খেতে পারেনি আজকে। শিগগির শেষ করতে হবে,” বলতে বলতে রবীন বসে পড়ে।

সব বিদায়ের অনুষ্ঠানই এক রকম। শেষ দিনে সবাই অনুপ্রেরণা, সবচেয়ে ফাঁকিবাজ মাস্টারটাও জ্ঞানতাপস, আর সবথেকে মারকুটে মাস্টারও করুণাধারা। এই কথাটা বলে রবীন টিচার্স রুমে হাসির ফোয়ারা তুলেছে বহুবার। একের পর এক নিজের স্তুতি শুনতে শুনতে সেটা মনে পড়ে হাসি পাচ্ছিল। শেষে যখন মানপত্রটা পাঠ করতে করতে শ্রাবন্তীর গলা বুজে এল, তখন রবীন হেসেই ফেলল। থমথমে পরিবেশে ঐ হাসিতে সবাই থতমত খেয়ে গেল। মানপত্রটা হাতে তুলে দেওয়ার পর হেডমাস্টার ঘোষণা করলেন “এবার আমাদের সকলের প্রিয়, শ্রদ্ধেয় রবীন ঘোষালকে তাঁর প্রিয় ছাত্রছাত্রীদের উদ্দেশে কিছু বলতে অনুরোধ করছি।”

রবীন হাসিমুখে বলতে উঠল।

“সবার মুখ এমন ভার কেন? এটা তো স্মরণসভা নয়। আমি এখনো অন্তত দশ বছর বাঁচব। শুভেন্দু স্যার আমাদের জুনিয়র মোস্ট। ওনার বিয়েতে বরযাত্রী না গিয়ে আমি মোটেই মরছি না।”

হাসির রোল উঠল। সকলের সাথে খুব খানিকটা হেসে নিয়ে রবীন আবার শুরু করল।

“না, সত্যিই। একটা অবসর নিয়ে এত মুহ্যমান হয়ে পড়ার কিছু নেই। আমার বরং বেশ ভাল লাগছে, ভদ্রমণ্ডলী। আমি এই অনুষ্ঠানের আয়োজকদের কাছে কৃতজ্ঞ যে ওঁদের উদ্যোগে বহু বছর পরে রজনীদির সাথে দেখা হল। আমার বাল্যবন্ধু নবারুণ খুব ব্যস্ত মানুষ। সে-ও এসেছে। আর সবচেয়ে বড় কথা, এই উঠোনে সবাই মিলে জড়ো হওয়াতে আমার প্রিয় ছেলেমেয়েগুলোকে শেষ দিনে একসাথে দেখতে পাচ্ছি। আজ তো টিফিনের আগে আমার মোটে দুটো ক্লাস ছিল, ফলে মনটা একটু খারাপই হচ্ছিল টিফিনের পরে যাদের ক্লাস নিই তাদের সাথে দেখা হল না বলে। সে দুঃখও মিটে গেল।

সত্যি কথা বলতে, আমি হেডস্যারকে বারণই করেছিলাম এমন কিছু করতে। উনিই জোর করলেন। তা এখন মনে হচ্ছে ভালই করেছেন। কয়েকটা কথা বলা যে আমার দরকার সেটা নিজেরই খেয়াল ছিল না। এখন সামনে এই মুখগুলো দেখে খেয়াল হল।

স্কুলের কয়েকজন প্রাক্তনীকেও দেখতে পাচ্ছি। আরো অনেকে হয়ত রয়েছে, আমি মনে করতে পারছি না। তোরা দুঃখ পাস না, মনা। বুড়ো হয়েছি, চোখের জ্যোতি কমে আসছে, স্মৃতির জোরও কমে গেছে। তবে চোখের জ্যোতি কমে গেলে হয় কি, মন দিয়ে অনেক কিছু দেখে ফেলা যায়। ঐ যে কবি বলেছেন না “চোখের আলোয় দেখেছিলেম চোখের বাহিরে, অন্তরে আজ দেখব যখন আলোক নাহি রে?” তা অন্তরে ইদানীং যা দেখতে পাই, তাতে দেখছি ছাত্রছাত্রীদের কাছে আমার ক্ষমা চাওয়া দরকার। কী জন্যে? কারণটা এখনকার ছেলেমেয়েরা জানে না, সদ্যপ্রাক্তন যারা তারাও বুঝবে না, কিন্তু আমার পুরনো সহকর্মীরা আর প্রথম দিককার ছাত্রছাত্রীরা জানে, রবীন স্যার এক সময় কিরকম মারকুটে ছিল। রবীন স্যার আসছে শুনলে ছেলেমেয়েরা থরথর করে কাঁপত। অনিলের আগে যে হেডমাস্টারমশাই ছিলেন, তিনি অ্যানুয়াল স্পোর্টসে বা সরস্বতীপুজোয় ছেলেমেয়েরা খুব বাড়াবাড়ি করলে আমায় বলতেন ‘একটু ঠান্ডা করে দিন তো’। আমিও মহানন্দে ছড়ি নিয়ে নেমে পড়তাম। কাজটা ভাল করিনি। যাদের মেরেছি তাদের সকলের কাছে হাত জোড় করে ক্ষমা চাইছি।

এখন তো বুঝতে পারি, চাকরিজীবনের প্রথম দশ পনেরো বছর আমি ছেলেমেয়েদের অভিভাবক হয়ে উঠতে পারিনি। তার পেছনে রাজনৈতিক কারণ ছিল ঠিকই। পালিয়ে পালিয়ে বেড়াতে হয়েছে, মাঝে মাঝে স্কুলে এসেছি, তখন কী আর পড়ানোয় মন বসে? কিন্তু যে কারণই থাক, অন্যায় আমারই। পড়া না পারলেই মারতে শুরু করেছি। কেন পড়েনি, পড়লে কেন মনে নেই, বুঝেছে কি বোঝেনি — সেসব ভাবার চেষ্টাই করিনি। পরে যখন বাবা হলাম, পালানোর দিনও শেষ হল, তখন মারতে গেলেই আমার ছেলের মুখটা চোখের সামনে ভেসে উঠত। তারপর দেখলাম, কোন ছেলে পড়া করে আসেনি, কারণ তাকে আগের দিন সন্ধেবেলা কোন বিয়েবাড়ির টেবিল পরিষ্কার করার কাজে যেতে হয়েছিল। কোন মেয়ের মা অনেকদিন বিছানায়, ছোট ছোট ভাই বোন আছে। সে বেচারি পড়া করবে না সংসার সামলাবে? কারো হয়ত বয়স পনেরো, বুদ্ধি সাত আট বছরের মত। দুবেলা পেট ভরে খেতেই পায়নি কখনো, বুদ্ধি পাকবে কী করে? এদের মারধোর করলে মানুষ হবে না, উল্টে ওরা যে মানুষ সেই বিশ্বাসটাই চলে যাবে।

কত যে গলদ আমাদের ব্যবস্থায়! যে ছেলেটা প্রত্যেকবার স্পোর্টসে হাই জাম্প, লং জাম্পে ফার্স্ট হয় তাকে আরো বড় লাফ দেয়ার শিক্ষা দেয়া আমাদের নাগালের বাইরে। কিন্তু সে অঙ্ক না পারলে আমরা বলে দিই ‘তোর দ্বারা কিস্যু হবে না।’ অথচ যে অঙ্কে ভাল কিন্তু স্পোর্টসে হিটও পেরোতে পারে না, তাকে কিন্তু বলি না ‘তোর দ্বারা হবে না।’

এসবের সমাধান ছড়িতে তো নেই বটেই, স্কুল চত্বরেও সবটা নেই। সমাধানের যে চেষ্টা দুনিয়া জুড়ে মানুষ করছে, আমি নিজের সামান্য সামর্থ্য নিয়ে সেই চেষ্টায় সামিল হতে চেয়েছিলাম। সেখানেও সফল হতে পারিনি। হয়ত সৎভাবে, সর্বশক্তি দিয়ে চেষ্টা করিনি। সে জন্যেও ক্ষমা চাইছি।

সহকর্মীরা আমার অনেক ফাঁক পূরণ করে দিয়েছেন, আমার শারীরিক প্রতিবন্ধকতার জন্যে কখনো আমায় ছোট করেননি, সে জন্যে অনেক ধন্যবাদ। রজনীদির মত কয়েকজন বরাবর পাশে না থাকলে আমার পক্ষে জীবনটা দুর্বিষহ হয়ে উঠতে পারত।

সর্বোপরি এই স্কুলের ছেলেমেয়েরা, যারা আমার সব দোষ ত্রুটি, অসুবিধা ভুলে আমাকে ভালবেসেছে, বিশেষ করে গত পাঁচ সাত বছর যারা আমার সমস্ত সময়টা ভরিয়ে রেখেছে, তাদের আর কী দিতে পারি আমি? তারাই আমায় এত দিয়েছে যে কুবেরের ধন তার কাছে তুচ্ছ। আমার এক পুরনো বন্ধুর কথা বলে শেষ করি। তিনি একটা রবীন্দ্রসঙ্গীতের দুটো লাইন মনে করিয়ে দিয়ে বলেছিলেন বেলা ফুরিয়ে গেলে আর বসে থাকতে চাই না। আমি তাই বলি, আমার বেলা ফুরিয়েছে। এবার আমায় হাসিমুখে বিদায় দিন। তবে স্কুলটাকে সবাই মিলে আগলে রাখতে হবে কিন্তু। এ স্কুল থেকে হয়ত গণ্ডায় গণ্ডায় ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার বেরোয় না। কিন্তু এই স্কুলে বহু প্রথম প্রজন্মের ছাত্রছাত্রী পড়তে আসে। তার মানে এই স্কুল শিক্ষার আলো আরো আরো দূরে ছড়িয়ে দেয় প্রতি বছর। একটা স্কুলের এর চেয়ে বড় কাজ আর কী আছে? নমস্কার। ভাল থাকবেন সবাই।”

ভাল লাগলে টাকা দিতে পারেন Google Pay / Paytm / BHIM বা অন্য UPI অ্যাপের মাধ্যমে journopratik@okhdfcbank কে

অথবা

নেট ব্যাঙ্কিং বা অন্য উপায়ে নিম্নলিখিত অ্যাকাউন্টে

Pratik Bandyopadhyay
A/c No. 14041140002343
HDFC Bank
Branch: South Calcutta Girls’ College
IFS Code: HDFC0001404
MICR Code: 700240048

নাম তার ছিল: ৩৩

পূর্বকথা: লোকসভা নির্বাচনে বামফ্রন্টের হার হয়েছে বলে বিপ্লবের বাঙালি সহকর্মীরা উল্লসিত। তাদের উৎসবে কমিউনিস্টদের আসন্ন মৃত্যুর আনন্দে পান করা হয়। প্রতিবাদ করে বিপ্লব আর মালিনী। এতদিন চেপে রাখা বামপন্থী পরিচয় প্রকাশ পেয়ে যাওয়ার পর বিল্পব ঘোষণা করে সে বামপন্থী। আজীবন বামপন্থীই থাকবে।

অপারেশন বর্গা। ভূমি সংস্কার। পঞ্চায়েত। তারপর? সবচেয়ে গরীব, ভূমিহীন চাষীর হাতে জমি তুলে দেওয়া? যৌথ খামার? সে আর হল কোথায়?

জেলা সম্পাদক ডাক পাঠিয়েছেন। ট্রেনে যেতে যেতে জানলা দিয়ে যতদূর চোখ যায় ছড়িয়ে থাকা ক্ষেতজমি দেখতে দেখতে সে কথাই ভাবছিল রবীন। ইদানীং মাঝে মাঝে বেশ দুর্বল লাগে। তাই ট্রেনে করে যাওয়া হলেও একা যেতে ভরসা হল না আজ। শিবুকে বলতে হল “আমার সাথে একটু যাবি? যদি তোর অসুবিধা না থাকে?”

কারখানা বন্ধ হওয়ার পর থেকে শিবুর কাজ বলতে তো পার্টি করাটাই। রবীনের ঘনিষ্ঠ হওয়ার ফলে গত বছর সম্মেলনে বেচারা লোকাল কমিটিতেও জায়গা পায়নি। রবীন যেন এল সি এমও না থাকে তা নিশ্চিত করতে বলরাম আর শ্যামল কংসবণিক অক্লান্ত পরিশ্রম করেছিল। আর ওদের আটকাতে পাগলের মত লড়ে গিয়েছিল ফাল্গুনী আর শিবু। রবীন বলেছিল ওসব না করতে। বয়স তো কম হল না। এল সি এম থাকা না থাকা দিয়ে কী আসে যায়? পার্টির কাজ করতে কোন তকমা লাগে না। রবীন লোকাল কমিটিতে থেকেই বা এমন কী করতে পারবে? কলকাঠি তো নাড়বে সেই বলরাম, আর তাল দেবে শ্যামল। অমন লোকাল কমিটিতে থাকা না থাকা সমান। কিন্তু ফাল্গুনী আর শিবু নাছোড়বান্দা। ওরা দৌড়াদৌড়ি করে এল সি এস শ্যামলের প্যানেলের পালটা প্যানেল ঠিক তৈরি করে ফেলল। দুজনে মিলে দিন রাত রবীনকে বোঝানোর পরে ও খানিকটা ক্লান্ত হয়েই রাজি হয়ে গিয়েছিল প্যানেলে থাকতে। কারণ আশা করেছিল শেষ অব্দি প্যানেল করাই যাবে না। কোন কমরেড বল, শ্যামলের চক্ষুশূল হতে রাজি হবে? ওকে অবাক করে সত্যি সত্যি এগারো জনের প্যানেল বানিয়ে ফেলল ছেলে দুটো মিলে। সম্মেলনের আগের দিন সকালে প্যানেলটা দেখিয়ে শিবু রবীনকে রীতিমত বিজ্ঞের মত বলেছিল “রবীনদা, আপনি জানেন না কমরেডরা একনো আপনাকে কত সন্মান করে। সবকটা ব্রাঞ্চে গিয়ে আমরা কমরেডদের সাথে কতা বলেচি। আপনি লোকাল কমিটিতে থাকবেন না কেউ মানতে পারচে না। ফাল্গুনীকে, আমাকে পচন্দ করে না যারা তারাও বলচে ‘রবীনদাকে অসম্মান করা হবে এটা আমরা মানতে পারি না।’”

“মুখে তো অনেকেই অনেক কথা বলে। শেষে পরশু দিন দেখবি তোদের প্যানেলের লোকের নাম ওদের প্যানেলেও আছে,” রবীন হাসতে হাসতে বলেছিল।

“তা হোক। আমরা লোকাল কমিটিতে থাকি বা না থাকি, তোমাকে রাখবই,” ফাল্গুনী একেবারে গোঁয়ার গোবিন্দের মত বলেছিল। রবীনের মনে হয়েছিল এ যেন সবুজগ্রামের জনপ্রিয় ফিজিক্স টিচার, দাড়ি পাকতে শুরু করা ফাল্গুনী গুপ্ত নয়, সেই হাফপ্যান্ট পরা সদ্য গোঁফের রেখা ওঠা ফাল্গুনী, যে বাবার সাইকেল হাফ প্যাডেল করে রবীনের স্কুলে গিয়ে হাঁপাতে হাঁপাতে খবর দিয়েছিল পাড়ায় পুলিশ ঢুকেছে, রবীনকে পালাতে হবে।

সম্মেলনের দিন দেখা গেল রবীন ঠিক, ফাল্গুনী আর শিবুও ঠিক। দুজন কমরেডের নাম দুই প্যানেলেই আছে। ডায়াস থেকে তুমুল চেষ্টা করা হল ভোটাভুটি যেন না হয়, কিন্তু ফাল্গুনী আর শিবুর সঙ্গে আরো বেশ কয়েকজন কমরেড লড়ে গেল। ভোট হল। একজন বাদে বল, শ্যামলের পুরো প্যানেল জিতে গেল। আর জিতল রবীন। গো হারান হেরে সম্মেলন শেষে যখন বেরোনো হল, ক্ষ্যাপা দুটোর হাবভাব দেখে মনে হচ্ছিল ওরা বিশ্বকাপ ফুটবল জিতে উঠল। আর বল যখন পাশ দিয়ে হেঁটে বেরিয়ে গেল, মুখখানা দেখে রবীনের হাসিই পেল। যেন খুব কাছের কেউ মারা গেছে।

তারপর থেকে সকালে গণশক্তি বিলি করা আর বউয়ের দোকানে নাম কা ওয়াস্তে মুখ দেখানো ছাড়া শিবুর আর বিশেষ কাজ থাকে না। রবীন ওদিকটায় গেলেই শিবুর গিন্নী অভিযোগ করে “ওকে একটু বলবেন তো দাদা, দোকানে যেন একটু সময় দেয়। আমি একা আর কত করব? একা একাই তো এত বছরের চেষ্টায় ব্যবসাটা বাড়ি থেকে দোকানে আনতে পারলাম। আমাকে একটুও সাহায্য করবে না? এই দোকানটাই তো আমাদের ভাত যোগায়।”

রবীন মাথা নেড়ে বলে “অ্যাই শিবু, বউডারে একটু হেল্প কর। ঠিকই তো কইতাছে। ব্যবসার কি খাটুনি কম?”

“তবে? বলুন দেখি? আগে তো বলত পার্টির কাজে সময় পায় না। এখন তো শুধু সকালে কাগজটা দিতে যায়। তবু একটু দোকানে বসবে না? এই বিকেলবেলাটা ঘন্টা খানেক বসে। তাও কোন দায়িত্ব নেবে না। খদ্দের এলে মাপও নিচ্ছি আমি, ক্যাশও সামলাচ্ছি আমি। আর পারি না বাপু।”

এসব কথার সময়ে শিবু সাত চড়ে রা কাড়ে না। রবীন বলে “শিবু, তুই কিন্তু বউয়ের কথা শোন। দুনিয়ার সব বুদ্ধিমান পুরুষ তাই করে। আর এই ব্যাপারে আমি ওর পক্ষই নিমু। হাঁটতে হাঁটতে তগো দোকানে আইলে যে সন্ধ্যাবেলা এক কাপ চা পাই, হেইডা বন্ধ করনের রিস্ক আমি নিতে পারুম না।”

রবীন আর শিবু হাসে, ওর বউ জিভ কেটে বলে “এ রাম! দাদা, তা কখনো হয়? আপনি এলে আমরা নিজেদের পাতের ভাতও আপনাকে দিয়ে দিতে পারি।”

রবীন হাসতে হাসতে বলে “জানি গো, জানি। আমার ভাই বোন, আত্মীয়, বন্ধু যা কও, সবই তো তোমরা। এই সবুজগ্রামে আমার জন্যে তোমরা আছ বইল্যাই তো কাউরে কেয়ার করি না। কিচ্ছু থাকে না, বুঝলা? পদও থাকে না, গায়ের জোরও থাকে না। মানুষের ভালবাসাডাই থাকে।”

সেই ভালবাসার জোরেই শিবুকে সঙ্গী হতে বলা।

“শিবু, রথীন রায়ের হঠাৎ আমায় কেন মনে পড়ল বল দেখি?” রবীন উল্টো দিকে বসা মানুষটাকে জিজ্ঞেস করে।

“আপনাকে ফোনে কী বলল?”

“খুলে তো বলল না কিছু। ফোনটা তো করেছিল ঐ রামকৃষ্ণ বলে ছেলেটা। ওনার ডান হাত। আমাকে শুধু বলল, রথীনদা আপনাকে একবার দেখা করতে বলেছে। যত তাড়াতাড়ি পারেন। তা আমি বললাম ‘ঠিক আছে, আমি রোববার আসছি।’”

“আমার মনে হয় পার্টিটাকে ঢেলে সাজানোর কোন প্ল্যান। এবারের ভোটের ফলটা তো নেতাদের চিন্তায় ফেলেচে ঠিকই। ফেলাই উচিৎ।”

“বলছিস? কি জানি! আমার ঠিক ভরসা হচ্ছে না রে। পার্টিটাকে ঠিক করা নিয়ে কত কথাবার্তা, কত পার্টি চিঠি, কত কী হল… সেই শৈলেন দাশগুপ্তর সময় থেকে। ফল তো কিছু দেখলাম না। আর এগুলো পার্টির যখন পায়ের তলায় মাটি আছে তখন করা অনেক সহজ। এখন তো মাটি সরতে শুরু করেছে। এখন কি আর ওসবের মধ্যে যাবে নেতারা?”

“কিন্তু দু হাজার এগারো যদি জিততে হয়, রবীনদা, অদল বদল কিন্তু কত্তে হবে। আপনি অনেক আগেই বুঝতে পেরেচিলেন, আমরা বুঝিনি। লোকসভা ভোটের রেজাল্ট বেরোবার পর থেকে কিন্তু সবাই বুঝতে পারচে। মানুষ কিন্তু রেগে আচে। আগে ভয়ে হোক বা যে কারণে হোক, মুখ খুলত না। এখন কিন্তু রাস্তাঘাটে বলাবলি করচে।”

“বলাবলি আগেও করত। আমাদের শোনার কান ছিল না। এখন পিঠে বাড়ি পড়েছে তাই কানগুলো খাড়া হয়েছে, বুঝলি? পার্টিকে অনেক আগেই সাবধান করা হয়েছিল। ভাল ভাল লোক সাবধান করেছে। তখন কেউ কথা কানে তোলেনি। অশোক মিত্রর মত লোককে আমরা রাখতে পারলাম না। উনি তাও অন্যরকম লোক। পার্টি ছেড়ে দিয়েও পার্টিবিরোধী কাজে জড়াননি…”

“পরে তো পার্টি ওনাকে রাজ্যসভাতেও পাটাল।”

“হ্যাঁ। তারপর সঈফুদ্দিন চৌধুরী। সে কি আর খারাপ লোক? লেখাপড়া জানা লোক। সে লোকটাকেও রাখতে পারলাম না। তিনি আলাদা পার্টি খুলে বসলেন। ওদিকে ত্রিপুরার নীরেন চক্কোত্তি। এখন কি আর সময় আছে?”

“ভোটের তো এখনো বচর দেড়েক দেরী। এর মদ্যে চেষ্টা কল্লে ঠিক সব গুচিয়ে নেয়া যাবে।”

“ভোটের সময়ের কথা বলছি না রে, বলছি মানুষের বিশ্বাস পুনরুদ্ধার করার কি আর সময় আছে? ভোট তো আসবে যাবে। পরপর এতগুলো ভোট আমরা জিতেছি, চিরকালই কি জিতব? তা তো হয় না। এক সময় তো হারতেই হবে। সেটা বড় কথা না।”

“কিন্তু সংসদীয় ব্যবস্তায় যতক্ষণ আচি, ভোটের কথা একেবারে ভাবব না বললে কি চলে, রবীনদা?”

“ঐখানেই তো গণ্ডগোল রে, শিবু। ঐ ভাবতে ভাবতেই আমাদের ভারসাম্য নষ্ট হয়ে গেল। ভোটে জেতার চিন্তা এত বড় হয়ে গেল, যে আসল দিকগুলোয় আর নজর দেয়া হল না। এখন আর হবেও না, তুই দেখে নে। এখন শর্ট কাটে কী করে ভোট ফেরত পাওয়া যায় তার ব্যবস্থা হবে।”

“কিন্তু… আপনাকে তলবটা তা’লে কী জন্যে?”

“নির্ঘাত কোন নালিশ আছে। মানে আমার নামে কেউ নালিশ করেছে। শাস্তি দেয়ার আগে হুঁশিয়ারি দেবে বোধহয়।”

“শাস্তি!” শিবু একেবারে হাঁ হয়ে যায়। “অপরাদটা কী?”

“শাস্তি দিতে কি অপরাধের দরকার হয় সব সময়?”

শিবু কথাটার মানে বুঝতে পারে না।

জেলা অফিসে অনেকদিন পরে আসা হল রবীনের। হীরুদার মৃত্যুর পরে বার দুয়েক এসেছে। একবার সুব্রতদা, যিনি হীরুদার পরে জেলা সম্পাদক হলেন, তাঁর সাথে এলাকার একটা সমস্যা নিয়ে কথা বলতে এসেছিল। তারই এক বছরের মধ্যে আরেকবার। সুব্রত মণ্ডল একদিন দুম করে স্ট্রোক হয়ে মারা গেলেন। তাঁর স্মরণসভায় এসেছিল। তখনো রবীন জোনাল কমিটির সদস্য। সেও প্রায় এক দশক আগেকার কথা। জোনাল কমিটি থেকে বাদ পড়ে গেছে নতুন সহস্রাব্দের গোড়ার দিকেই। আর কোনদিন জেলা পার্টির কারোর তাকে দরকার হবে রবীন ভাবেনি।

দোতলায় সম্পাদকের ঘরের সামনে ভিড়। দুটো বেঞ্চে লাইন দিয়ে লোক বসে আছে। প্রশস্ত টাকওয়ালা, অবশিষ্ট চুলগুলো আর সব দাড়ি পেকে যাওয়া একজন রবীনকে দেখেই উঠে দাঁড়িয়ে বলল “আসেন, মাস্টারমশাই। বসেন।” এত বয়স্ক একটা লোক তাকে আপনি আজ্ঞে করছে দেখে রবীন একটু অবাকই হল। শিবু তো খুক করে হেসেই ফেলল। লোকটা সেটা খেয়াল না করে বলল “আপনি আমাকে চিনতে পারেননি তো?”

রবীন মাথা নেড়ে না বলল।

“চেনার কথাও না। সেই কবেকার কথা। আমার আজাদপুরে বাড়ি। আপনি পঞ্চায়েত সমিতির সভাপতি থাকার সময় আমাদের ওখানে একটা লাইব্রেরি করলেন মনে আছে?”

“খুব মনে আছে।”

“আমি তখন ওখানে এস এফ আই করতাম। লাইব্রেরি উদ্বোধন করতে শিক্ষামন্ত্রী, গ্রন্থাগার মন্ত্রী – এঁরা সব এলেন, আপনিও ছিলেন। আমি একটা কবিতা…”

“ও হ্যাঁ হ্যাঁ,” রবীন বুড়োটাকে জড়িয়ে ধরে। “রাস্তা কারো একার নয়। বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। নিশ্চয় মনে আছে, খুব মনে আছে। কিন্তু তোমার নামটা যে মনে নেই গো।”

“আপনি তো অনেকটাই মনে রেখেছেন, স্যার। এতটা আমি আশা করিনি। আমার নাম ফরিদুর।”

“হ্যাঁ হ্যাঁ। এইবার মনে পড়েছে। তুমি শুধু এস এফ আই করতে? তুমি তো আজাদপুর কলেজে এস এফ আইয়ের প্রথম জি এস, তাই না? তোমাকে ভোটের দিন সি পি মেরে হাসপাতালে পাঠিয়ে দিয়েছিল।”

“আপনার তো অনেক কিছু মনে আছে স্যার!” লোকটা অবাক।

“আরে এসব যেদিন ভুলে যাব সেদিন আর পার্টি অফিসে পা দেয়ার অধিকার থাকবে না, বুঝলে? সেই হেমাঙ্গ বিশ্বাস দলবল নিয়ে একটা গান গাইতেন না? ‘আমরা তো ভুলি নাই শহীদ, কখনো ভুলব না, তোমার কইলজার খুনে রাঙাইল কে, আন্ধার জেলখানা।’ পার্টির জন্যে যারা মার খায়, প্রাণ দেয় তাদের ভুলে গেলে আর পার্টির থাকল কী? কিন্তু বাবা, তুমি এত বুড়িয়ে গেলে কী করে?”

“আর বলবেন না। দুবার জন্ডিস, একবার টাইফয়েড। একবার তো ম্যালিগন্যান্ট ম্যালেরিয়ায় মরতে মরতে বেঁচে গেলাম। চুল সব আগেই উঠে গেছিল। মনের দুঃখে দাড়িই রাখতে শুরু করলাম। সেও সব পেকে গেছে চল্লিশের মধ্যে।”

উপস্থিত সবাই হেসে ওঠে। সবচেয়ে জোরালো হাসিটা রবীনের। সম্পাদকমশাইয়ের ঘর থেকে রামকৃষ্ণ পর্দা তুলে মুখ বাড়িয়ে বলে “একটু আস্তে। দাদার অসুবিধা হচ্ছে।” অপ্রস্তুত কমরেডরা চুপ করে যায়। রবীন ফরিদুরের কাঁধে হাত দিয়ে বলে “আমরা তো লাইনে অনেক পেছনে। চলো নীচে গিয়ে একটু চা খাই আর আজাদপুর কেমন আছে শুনি তোমার থেকে। যেতে খুব ইচ্ছে করে। কিন্তু আজকাল আর অতটা সাইক্লিং করতে পারি না, বুঝলে? বয়স হয়েছে তো। এ বছর রিটায়ারমেন্ট।”

চা, বিড়ি খেয়ে এসে বেঞ্চে বসতে না বসতেই রবীনের ডাক এসে গেল। রবীন বলল “ফরিদুর, তুমি সেরে এসো আগে। আমার আগে থেকে বসে আছ তো?” কিন্তু রামকৃষ্ণ জোর দিয়ে বলল “না, রথীনদা আপনাকেই আগে ডাকছে।” অগত্যা।

রবীন আর শিবু ঘরে ঢুকতেই রথীন রায় বললেন “এটা কে?”

“কমরেড শিবু মণ্ডল,” রবীন শিবুর কাঁধে হাত রেখে বলল। “আমাদের এলাকার সবচেয়ে পার্টি অন্তপ্রাণ কমরেডদের মধ্যে একজন।”

“অ। তুমি বাইরে বসো।”

বলার ধরনটা একেবারেই ভাল লাগল না রবীনের। শিবু চুপচাপ বেরিয়ে গেল। রবীনের মনে হল ওরই ভুল। রথীন রায় কেমন লোক জেনেও শিবুকে আজকে নিয়ে আসা উচিৎ হয়নি। ওর ভুলেই বেচারাকে অপমানিত হতে হল।

“বসুন, কমরেড,” কাঠখোট্টা রথীন বলল। “আপনি ঐ লেজুড়টাকে নিয়ে এসেছেন কেন?”

রবীনের মাথাটা দুম করে গরম হয়ে গেল।

“আমি চল্লিশ বছরের উপর পার্টি করছি। আজ অব্দি কোন লেজুড় হয়নি আমার, অনেক কমরেড হয়েছে। কাজের কথায় এলে ভাল হয়। অনেকটা পথ যেতে হবে আমাদের।”

রথীন যে এরকম জবাব আশা করেনি সেটা মুখ দেখে ভালই বোঝা গেল। মুখ থেকে পাইপটা নামিয়ে রেখে বলল “হ্যাঁ, আমার হাতেও বেশি সময় নেই। আপনার বিরুদ্ধে অভিযোগ এসেছে। অন্য কেউ হলে পার্টির যা নিয়মকানুন সেই অনুযায়ী কাজকর্ম শুরু করার নির্দেশ দিতাম। কিন্তু আপনি প্রবীণ লোক, চল্লিশ বছর ধরে পার্টি করছেন নিজেই বললেন, তাই মনে হল আপনাকে মুখে বললে যদি কাজ হয়। তাই ডেকে পাঠিয়েছি।”

“অভিযোগটা কী?”

“আপনার বিরুদ্ধে উপদল করার অভিযোগ আছে। এবং যাদের নিয়ে করছেন তাদের বিরুদ্ধে আরো গুরুতর অভিযোগ আছে।”

“তারা কারা?”

“বাবা! আপনি কিছুই জানেন না বলতে চান?”

“আমি আসলে পুরনো দিনের লোক তো। আজকাল অনেক নতুন নতুন কথা চালু হয়েছে, পুরনো কথার নতুন মানে হয়েছে। সেসব আমি সত্যিই বুঝি না। ফলে আপনার কথা বুঝতে আমার একটু অসুবিধাই হচ্ছে।”

“তার মানে আপনি বলছেন আপনি উপদলীয় কাজকর্ম করছেন না?”

“উপদল বলতে আপনি কী বোঝাচ্ছেন আমি জানি না। আমি উপদল বলতে বুঝি দলের মধ্যে কয়েকজন যদি নিজেদের স্বার্থকে পার্টির স্বার্থের উপরে স্থান দেয় এবং পার্টির ক্ষতির কথা মাথায় না রেখে এই গোষ্ঠীর জন্যে ছোট বড় সুবিধা আদায় করার চেষ্টা করে, ক্ষমতা দখল করার চেষ্টা করে, তাদেরকে। আমি এরকম কিছু করেছি বলে তো মনে পড়ে না।”

“তাহলে গত বছর লোকাল কমিটির সম্মেলনে আপনার নেতৃত্বে সরকারী প্যানেলের পাল্টা প্যানেল উঠল কী করে?”

“আমার নেতৃত্বে? আপনি ঘটনাটা ঠিক করে জানেন না, কমরেড। ঐ প্যানেলে প্রস্তাবিত এল সি এস হিসাবে কমরেড ফাল্গুনী গুপ্তর নাম ছিল, আমার নয়।”

“জানি, জানি। ঐ ফাল্গুনী তো আপনারই চ্যালা।”

“আপনি আমার চেয়ে বয়সে একটু ছোট হলেও পার্টির জেলা সম্পাদক। সেই জন্যে আপনার প্রশ্নগুলোর জবাব দিচ্ছি। লেজুড়, চ্যালা — এইসব শব্দ যদি কমরেডদের সম্বন্ধে ব্যবহার করেন তাহলে আর জবাব দেব না। আপনি যা ইচ্ছা ব্যবস্থা নিতে পারেন,” বলতে বলতে রবীন উঠে দাঁড়ায়।

“আপনার ঐ প্রিয় কমরেডদের সম্পর্কে অভিযোগগুলো শুনবেন না?”

“আপনি বললে শুনতেই পারি, কিন্তু তাঁদের হয়ে অভিযোগের জবাব দেয়া আমার কাজ নয়।”

“আপনার জবাব পার্টি শুনবেও না। অভিযোগগুলো শুনে যান, তাদের বলে দেবেন জবাব যেন তৈরি রাখে। শিগগির তাদের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু হবে।”

রবীন হ্যাঁ, না কিছুই বলে না, তবে দাঁড়িয়ে থাকে। রথীন রায় টেবিলের উপর থেকে একটা কাগজ হাতে নিয়ে বলেন “আপনার ঐ ফাল্গুনী কি যেন, তার বিরুদ্ধে একটি বিবাহ বহির্ভূত সম্পর্কের অভিযোগ আছে। এক বিধবা মহিলার সাথে। আর এই যাকে নিয়ে এসেছেন ট্যাঁকে করে, তার বিরুদ্ধে পার্টি মুখপত্র বিক্রির টাকা মেরে দেয়ার অভিযোগ। এদের পাশ থেকে সরে আসুন, কমরেড। নইলে কিন্তু আপনার সদস্যপদও বিপদে পড়তে পারে।”

“আপনি মাই বাপ, পার্টি আপনার,” রবীন চওড়া হেসে বলে। “আপনি কাকে পার্টিতে রাখবেন, কাকে বার করে দেবেন সে আপনার ব্যাপার। আমি যখন পার্টি করতে এসেছিলাম তখন ঐ সদস্যপদ পেতে গেলে অনেক রকম পরীক্ষা দিতে হত, কমরেড। সেগুলো পাশ করতে করতেই মানুষ পার্টির লোক হয়ে যেত। ফলে আগে পার্টির লোক হয়েছি, পরে সদস্যপদ পেয়েছি। আজ সদস্যপদ চলে গেলেও পার্টির লোকই থাকব। যদ্দিন বাঁচি। চলি।”

জেলা সম্পাদকের ঘর থেকে বেরিয়ে রবীন কিছু বলেনি, শিবুও কিছু জিজ্ঞেস করেনি। স্টেশনে এসে শিবু যখন বিড়ি ধরিয়ে দিচ্ছে, তখন রবীন বলল “আমাকে এবার ত্যাগ কর, বুঝলি? আমার দিন শেষ। বাঁচতে চাস তো বলরামকে ধর। দু বেলা ওর বাড়ি যা, মিষ্টি কথা টথা বল। অপমান হজম করে বাজার টাজার যদি করে দিতে পারিস তাহলে আরো ভাল। বাঁচতে তো হবে, ভাই। আমার আর তোদের বাঁচানোর শক্তিটুকুও নেই রে।”

শুনে শিবু হো হো করে হাসতে থাকে। সে কি হাসি! আর থামেই না। লোকজন তাকাতে শুরু করে। রবীন বলে “কি রে? এত হাসির কী হল? সিরিয়াসলি বলছি।”

“রবীনদা, আপনি পারেন বটে,” হাসি সামলাতে সামলাতে শিবু বলে। “আচ্ছা ধরুন আমি আপনাকে ত্যাগ কল্লাম। আপনি পারবেন আমায় ত্যাগ কত্তে? যদি শোনেন শিবু হাসপাতালে, ঠিক তো গিয়ে হাজির হবেন। যদি শোনেন শিবুর বাড়ি হাঁড়ি চড়চে না, ছুতো করে কারো হাত দিয়ে বাড়ির এটা সেটা তো ঠিক পাঠাবেন। এত বচ্চর যারা আপনাকে ত্যাগ করেচে, সকলের সাথেই তো এই জিনিস করে এসেচেন আপনি। যে আপনার সাথে কতা বলা পয্যন্ত ছেড়ে দিয়েচে তারও চাকরির জন্যে একে তাকে বলেচেন, বাপ-মা মরলে শ্মশান গেচেন।”

রবীন বলে “আরে বোকা, সে তো করতেই হবে। আমায় পছন্দ করুক আর না-ই করুক, পার্টির লোকের পাশে দাঁড়াতে হবে না? নইলে আর কমরেড কিসের?”

“তা’লে আর আমায় এসব বলবেন না।”

“এমনি এমনি বলছি না রে। বড় ক্ষতির সম্ভাবনা দেখেই বলছি। পার্টির আর আমার মধ্যে যদি বাছতে হয়, পার্টিটাকেই তো বাছা উচিৎ।”

ভাল লাগলে টাকা দিতে পারেন Google Pay / Paytm / BHIM বা অন্য UPI অ্যাপের মাধ্যমে journopratik@okhdfcbank কে

অথবা

নেট ব্যাঙ্কিং বা অন্য উপায়ে নিম্নলিখিত অ্যাকাউন্টে

Pratik Bandyopadhyay
A/c No. 14041140002343
HDFC Bank
Branch: South Calcutta Girls’ College
IFS Code: HDFC0001404
MICR Code: 700240048

নাম তার ছিল: ৩২

পূর্বকথা: লোকসভা নির্বাচনের ফল নবারুণকে হতবাক ও অবসন্ন করে। এই সময় রবীনের তাকে দরকার মনে করে তার বাড়িতে পৌঁছায় সে। শোনে হঠাৎ এসে আবার হঠাৎ চলে গেছে বিপ্লব। বাবার উপর রাগ করে।

অফিসের ওরা উল্লসিত। বিপ্লবের বাঙালি সহকর্মীরা। প্রসূন বলছিল দু হাজার এগারোতে বামফ্রন্ট হারলে সব্বাইকে প্যারাডাইসে ডিনার খাওয়াবে। সি পি এম ওদের গ্রামের জমি কেড়ে নিয়েছিল। সেই থেকে হারেনি, এতদিনে হারল। জমিয়ে সেলিব্রেট করতে হবে। এবার ফল প্রকাশের দিনটা শনিবার পড়ে যাওয়ায় অফিস থেকে বেরিয়ে কোন বারে গিয়ে সেলিব্রেট করা হয়নি। তাই ওরা ঠিক করেছে নেক্সট উইকেন্ডে রোহিত বলে ছেলেটার ফ্ল্যাটে খাওয়া দাওয়া হৈ হুল্লোড় করা হবে। পশ্চিমবাংলার ছেলে না হলেও শাহনওয়াজকে ডাকা হয়েছে। আসর জমাতে ওর মত কেউ পারে না।

“তু আ রাহা হ্যায় কল?” শুক্রবার এক ফাঁকে সিগারেট খেতে বেরিয়ে একলা পেয়ে শাহনওয়াজ বিপ্লবকে জিজ্ঞেস করল।

“ইয়া। হোয়াই নট?”

“নহি, মুঝে লগা থা তু অ্যাভয়েড করেগা।”

“কিঁউ?”

“ইয়োর ড্যাড ইজ আ সি পি এম ম্যান, না?”

বিপ্লব চমকে উঠল। এখানে এসে তো সচেতনভাবেই এই কথাটা কাউকে বলেনি! তাহলে নওয়াজ জানল কী করে?

“হাউ ডু ইউ নো?”

ইউ টোল্ড মি।”

“আই! হোয়েন?”

“কেয়া বাত কর রহা? তুঝে ইয়াদ তক নহি? তেরে ফ্ল্যাট মে পি রহে থে। তভি তো বোলা তু।”

বিপ্লব কিছুতেই ভেবে পায় না কোন দিনের কথা বলছে নওয়াজ। বিপ্লবের ফ্ল্যাটে ও একাধিকবার গেছে, দু একবার পান ভোজন হয়েছে। কিন্তু কবে আবার এত নেশা হল যে এই গোপন কথাটা ওকে বলে ফেলল! আবার মনেও রইল না!

“এনিওয়ে, আই হ্যাভন্ট টোল্ড এনিবডি। ডোন্ট ওয়ারি।”

নওয়াজ নিজের সিগারেট শেষ করে অফিসে ঢুকে যায়, বিপ্লবেরটা তখনো কিছুটা বাকি। টানতে টানতে ও ভাবে নওয়াজকে জিজ্ঞেস করতে হবে সেদিন নেশার ঘোরে আর কী কী বলে ফেলেছিল। বাবার রাজনৈতিক পরিচয়টা সযত্নে লুকিয়ে রেখেছিল এতদিন। তবু তো জয়ের রাস্তায় ছিল বাবার দল। আজ যখন হেরেছে, তখনই পরিচয়টা ফাঁস হয়ে যাওয়ার সময় হল? নিজের উপর প্রচণ্ড রাগ হয়। এই জন্যে নেশা করতে হলে একা করাই ভাল। অচিন্ত্যদার কথা আলাদা। তার সাথে অন্যরকম সম্পর্ক ছিল, নেশা করে মুখ ফসকে কিছু বলে ফেললেও সে কথা ফাঁস হয়ে যাওয়ার ভয় ছিল না। কিন্তু নওয়াজ ছেলেটা ভাল হলেও সহকর্মীর বেশি কিছু নয়। কি কুক্ষণে যে ওকে কয়েকবার মদ্যপানের সঙ্গী করে ফেলেছিল! অবশ্য ও বলছে আর কাউকে বলেনি। বোধহয় সত্যিই বলেনি। নইলে টিটকিরি মারার এমন সুযোগ কি সকলে ছেড়ে দিত? অফিসে রাজনৈতিক আলোচনা খুব জোর গলায় হয় না বটে, কিন্তু ফল বেরোবার দিন সকাল থেকে নিশ্চয়ই প্রসূন অ্যান্ড কোম্পানি এস এম এস করে করে পাগল করে দিত। যে এস এম এস জোকগুলো এখন ফরোয়ার্ড করে নীচু গলায় বলছে “লেটেস্টটা দ্যাখ। ব্যাপক”, সেগুলোই সারাদিন ধরে পাঠাতে থাকত। আর ইচ্ছে করে একই জোক চার পাঁচ জন মিলে পাঠিয়ে ব্যতিব্যস্ত করে তুলত, যদি একবারও টের পেত বামফ্রন্টের হারে বিপ্লবের দুঃখ পাওয়ার বিন্দুমাত্র সম্ভাবনা আছে।

সিগারেটটা পায়ের নীচে পিষে দিয়ে ধোঁয়ার শেষ রিংটা ছেড়ে বিপ্লব ভাবে, এত চিন্তা করার অবশ্য কোন দরকার নেই। ওরা জানতে পারলেই বা কী? এই হার ওর তো গায়ে লাগেনি। ওরা যেসব জোকগুলো পাঠাচ্ছে সেগুলো পড়ে ও তো দিব্যি উপভোগ করছে। সেই যে, কী যেন? “চলুন, বেড়িয়ে আসি। কলকাতা থেকে বেশি দূরে নয়। প্রকৃতির কোলে সি পি এমের জেতা লোকসভা সিট দেখতে।” পড়ে তো দিব্যি হা হা করে হেসেছে বিপ্লব। ওরা যদি জানতে পেরেও যায় তার বাবা সি পি এম, পেছনে লাগলে সটান বলে দেবে “বাবা সি পি এম তো কী? আমি অ্যান্টি সি পি এম।”

পরদিন সকালে ঘুম থেকে ওঠার পরে অবশ্য এত অলস লাগছিল, বিপ্লব ভাবল পার্টিটায় না গেলেই হয়। শুধু কী অজুহাত দেবে সেটা ঠিক করে রাখতে হবে। প্রসূন, রোহিত, তিতাস, অমরেশ, মালিনী — সবাই ঢপ দিয়ে অফিসে ডুব দিতে ওস্তাদ। ওদেরকে ঠকানো বেশ শক্ত কাজ। অবশ্য আলস্য কাটিয়ে চলে গেলেই আর অত ভাবনা চিন্তার দরকার পড়ে না। কিন্তু যেতে, কেন কে জানে, ইচ্ছাই করছে না। রোহিত বড়লোকের ছেলে, রুচিও বেশ উঁচু দরের। যদিও পার্টির খরচ খরচা ভাগ করে নেওয়া হয়েছে সবাই মিলে, তবু ওর ফ্ল্যাটে পার্টি মানে নিজের সংগ্রহ থেকে অত্যন্ত বেশি দামী কোন একটা মদ নিশ্চয়ই খাওয়াবে ও। অন্যের বাড়িতে পার্টি থাকলেও সঙ্গে করে ওরকম একটা বোতল ও বরাবরই নিয়ে যায়। না গেলে ওটা মিস হবে। তবু। কোথায় যে আটকাচ্ছে তা বিপ্লব ভেবে পাচ্ছে না।

প্রসূন সেই ১৬ই মে থেকে যেরকম তুরীয় মেজাজে আছে, তাতে ও সারা সন্ধ্যে দাপাবে আজকে। ছেলেটা এমনিতে মন্দ নয়, কিন্তু সি পি এম নিয়ে কথা বলতে শুরু করলেই জ্ঞানগম্যি সব হারিয়ে ফেলে। খুব একটা যুক্তির ধার ধারে না কখনোই। সি পি এমের কথা উঠলে তো আর কথাই নেই। অনর্গল খিস্তি দেয়। জ্যোতি বসু, বুদ্ধদেব, অনিল বিশ্বাস, বিমান বোস সকলের যৌন জীবন সম্পর্কে নানারকম রসাল মন্তব্য করে। এমনিতে না হয় মানিয়ে নেওয়া যায়। আজ ছুটির দিনে সন্ধে, রাত জুড়ে ওসব শুনতে হবে ভেবে বিরক্ত লাগছে।

রোহিতটাও তো কম যায় না। নিজের বাড়িটা কোন বিধানসভা এলাকায় সেটা বলতে পারে না, এদিকে জোর গলায় বলে “কমিউনিস্টদের গুলি করে মারা উচিৎ। ওদের জন্যেই পশ্চিমবঙ্গের কিচ্ছু হল না। গোটা দেশটারই কিছু হবে না যদ্দিন কমিউনিসটগুলোকে শেষ না করা হচ্ছে।” গোড়ার দিকে বিপ্লব কয়েকবার ওকে বোঝানোর চেষ্টা করেছিল যে কমিউনিস্ট মানেই সি পি এম নয়। কিন্তু ওর তাতে কিছু এসে যায় না। ও জোর গলায় বলে “ভাই শোন, আয়াম নট ইন্টরেস্টেড ইন পলিটিক্স। আই হেট পলিটিশিয়ানস। স্পেশালি কমিউনিস্টস। দে হ্যাভ রুইনড এভরি কান্ট্রি দে রুলড। মাই হিরো ইজ হিটলার। দেশের উন্নতি কিভাবে করতে হয় লোকটা দেখিয়ে গেছে। আমি ভোট দিতে যাই না। যেদিন কোন পার্টি সাহস করে বলবে ‘আমরা হিটলারের রাস্তায় চলব’, সেদিন গিয়ে ভোট দিয়ে আসব।”

দুপুর গড়িয়ে বিকেল হতে হতে বিপ্লব ঠিক করে ফেলল যাবে না, ফোনটা অফ করে রাখবে। বাড়িতেও থাকা উচিৎ হবে না। আটটা নাগাদ রোহিতের ফ্ল্যাটে পৌঁছবার কথা সকলের। তারপর ফোন করে না পেলে প্রসূন হয়ত দলবল নিয়ে এসে তুলে নিয়ে যেতে পারে। বেশি দূর তো নয় ওর ফ্ল্যাট থেকে। সন্ধের মুখে কেটে পড়তে হবে কোথাও।

সব ভেস্তে গেল দিবানিদ্রায়। বিকেলবেলাই বেরিয়ে পড়া উচিৎ ছিল। চুপচাপ খাটে পড়ে থাকায় চোখ লেগে গেল। ঘুম যখন ভাঙল তখন অন্ধকার হয়ে গেছে। বাড়িওয়ালার বিচ্ছু ছেলেটাও আজকে জ্বালাতে আসেনি। আশ্চর্য! ধড়মড়িয়ে উঠে বিপ্লব দ্যাখে সোয়া সাতটা বাজে। তাড়াতাড়ি চোখে মুখে জল দিয়ে উঠে প্যান্টটা গলিয়ে বেরোতে যাবে, এমন সময় কলিং বেল বাজল। যা আশঙ্কা ছিল প্রায় তাই ঘটল। দরজা খুলতেই সামনে মূর্তিমান শাহনওয়াজ।

“ওয়াহ। রেডি হো গয়া তু? চল নিকলতে হ্যাঁয়।”

বিপ্লব ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে কিছু বলে উঠতে পারে না প্রথমটা। তারপর জিজ্ঞেস করে “তু ইয়াহাঁ?”

“হাঁ। আপনা কার লেকে আয়া ম্যায়। সোচা তুঝে উঠা লুঁ।”

এরপর কিভাবে এড়ানো সম্ভব কিছু ভেবে উঠতে না পেরে বিপ্লব গুটিগুটি পায়ে নওয়াজের সাথে ওর গাড়িতে গিয়ে ওঠে।

আসরটা দিব্যি জমে গেল। নওয়াজ সচরাচর যা করে থাকে, তা করেই জমিয়ে দিল। চটজলদি ড্রিঙ্ক তৈরি করে, এর পেছনে লেগে, ওর সাথে একটু খুনসুটি করে একেবারে মাতিয়ে দিল ঘন্টা খানেকের মধ্যেই। বিপ্লব খুশি হল কারণ নওয়াজের দাপটে যে জন্যে পার্টি সেসব নিয়ে কোন কথাই উঠছিল না। রোহিতের সাউন্ড সিস্টেমটা গাঁক গাঁক করে চলছিল প্রায় শুরু থেকেই। ফলে কথা বিশেষ বলাও যাচ্ছিল না। বিপ্লব বাকিদের মত নাচ না জেনেও নাচতে পারে না কোনদিনই, আর অত আওয়াজের মধ্যে লোকের কানের কাছে মুখ নিয়ে গিয়ে কথা বলাও কষ্টসাধ্য। ও তাই নিশ্চিন্তে এক কোণে সোফায় বসে বিয়ার খাচ্ছিল। আর যে নাচানাচির মধ্যে বিশেষ গেল না, সে হচ্ছে মালিনী। ও কিন্তু দিব্যি নাচতে পারে। বহু অফিস পার্টিতে ওকে ঘন্টার পর ঘন্টা টানা ডান্স ফ্লোরে থাকতে দেখেছে বিপ্লব। আজকে সেরকম উৎসাহ নেই দেখে একটু অদ্ভুত লাগছিল। কিন্তু কেন, কী বৃত্তান্ত — অত কিছু জিজ্ঞেস করার দরকারই বা কী?

সন্ধ্যেটা দিব্যি কেটে গেল। দশটা নাগাদ তিতাস বলল “গাইজ, আয়্যাম স্টার্ভিং।” প্রসূন জানিয়ে দিল পাশের ঘরে ডাইনিং টেবিলে সব সাজানোই আছে। তিতাস জিজ্ঞেস করল “এনিবডি ওয়ন্টস টু জয়েন মি?” মালিনী তক্ষুণি উঠে পড়ল। বিপ্লবকে জিজ্ঞেস করল “তুই খাবি এখন?” বিপ্লব বলল “না রে। আরেকটু পরে।”

এগারোটা নাগাদ যখন সবাই খেতে শুরু করেছে, তখনই প্রথম বিপ্লব বুঝতে পারল প্রসূনের বেশ নেশা হয়ে গেছে। নওয়াজের সাথে ঠাট্টা করে প্রেমের অভিনয় করতে করতে হঠাৎ সিরিয়াস হয়ে গিয়ে এমনভাবে গলা জড়িয়ে ঠোঁটে চুমু খেতে গেল যে নওয়াজ ওর গালে আদরের চড়টা একটু জোরে কষিয়ে বলল “আবে ম্যায় করিনা হুঁ ইয়া তু গে হ্যায়?” তখন ঠাট্টা ইয়ার্কির উপর দিয়ে গেল ব্যাপারটা। ঝামেলা শুরু হল রোহিত খাওয়াদাওয়ার পরে শ্যাম্পেনের বোতল বের করে আনতেই।

অনেকেই প্রসূনকে বারণ করেছিল তক্ষুণি খেতে, কারণ স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল সন্ধ্যে থেকে বিয়ার আর হুইস্কি খেয়েই ছেলে টালমাটাল। কিন্তু ও হচ্ছে দলনেতা। কারোর বারণ শুনলে তো। যখন গ্লাসে গ্লাসে শ্যাম্পেন ঢালা হচ্ছে তখন রোহিত নওয়াজকে ধরল গানের জন্যে। অনেক গুণের মধ্যে কিশোরভক্ত নওয়াজের এটাও একটা গুণ। বেশ ভাল গায়। চোখ বন্ধ করে শুনলে সহসা কিশোর কুমার গাইছে বলেই মনে হয়। ও ধরল “আ চলকে তুঝে ম্যায় লেকে চলুঁ এক অ্যায়সে গগন কে তলে।” কিছুটা চলার পরে অনেকেই গলা মেলাল, কেউ কেউ তাল দিতে থাকল। শুধু বিপ্লব বিষণ্ণ হয়ে পড়ল। আসলে গানটার সাথে একটা বিশেষ স্মৃতি জড়িয়ে ছিল।

বিপ্লব যখন খুব ছোট তখন বাড়িতে গান শোনার উপায় বলতে ছিল থাপ্পড় মেরে মেরে স্টেশন ঠিক করতে হওয়া ঢাউস রেডিওটা, আর ঠাকুর্দার রেকর্ড প্লেয়ারটা। তখনো পে কমিশনের দৌলতে বাবার মাইনে ভদ্রজনোচিত হয়নি। এর ওর থেকে রেকর্ড চেয়ে এনে বাবা চালাত, আর প্রতি পুজোয় মামার বাড়ি থেকে ফেরার পথে শ্যামবাজার পাঁচ মাথার মোড়ের দোকান থেকে একটা করে লং প্লেয়িং রেকর্ড কিনে আনত মা। ঠাকুর্দার নিজের কেনা গুটি কয়েক এল পি রেকর্ড ছিল অবশ্য। তারই একটায় ছিল গানটা। বিপ্লবকে অনেক ডাকাডাকি করেও যখন ঘুম থেকে তোলা যেত না ভোরবেলা স্কুলে যাওয়ার জন্যে, তখন বাবা এই গানটা চালিয়ে দিত সজোরে। গান কানে গিয়ে অনিচ্ছা সত্ত্বেও চোখ অল্প খুলতেই বাবা কোলে তুলে নিয়ে সোজা চলে যেত বাথরুমে। না জেগে উপায় থাকত না।

গান শেষ হতেই সকলে হাততালি দিয়ে, সিটি বাজিয়ে গায়ককে বাহবা দিল। বিপ্লব বসে রইল নিঝুম হয়ে। প্রসূনকে উশকে দিল সেটাই।

“অ্যাই শালা, তালি দে বি সি। কোন জগতে আছিস?” বিপ্লবকে খুব জোরে ঝাঁকিয়ে বলল সে।

বিপ্লব মৃদু হেসে হাতের গ্লাসটা নওয়াজের দিকে তুলে বলল “ও হ্যাঁ। ওয়েল সাং, ডিয়ার।”

প্রসূনের তাতে মন উঠল না। বলল “না বস। ওটুকুতে হবে না। লেটস ড্রিঙ্ক টু দ্য হেলথ অফ শাহনওয়াজ।” সকলে নিজের নিজের গ্লাস ঠেকিয়ে চিয়ার্স বলে চুমুক দিল। প্রসূন এক ঢোকে গ্লাসে যতটা শ্যাম্পেন ছিল শেষ করে দিল, তারপর আরেকটু ঢেলে বলল “অ্যাই এবার একটা টোস্ট দিদির জন্যে। মমতা দিদি। অ্যান্ড টু দ্য ডেথ অফ কমিউনিস্টস।”

বিপ্লব ইতস্তত করছিল, এমন সময় মালিনী বলল “নো। আয়্যাম নট রেইজিং এ টোস্ট টু দ্যাট উওম্যান। অ্যান্ড ডেফিনিটলি নট টু দ্য ডেথ অফ কমিউনিস্টস। আর ইউ ইনসেন?”

“কেন? ইনসেনের কী আছে? শালা সবকটাকে উলটো করে গাছে ঝুলিয়ে প্যাঁদানো উচিৎ,” প্রসূন চিৎকার করে বলল। “ওরা কম লোককে মেরেছে?”

“অ্যাবসোলিউটলি, বাডি। আই সাপোর্ট ইউ,” রোহিত বলল। “শালা ঐ জ্যোতি বসু আর বুদ্ধদেব ভটচায। সিঙ্গল হ্যান্ডেডলি শেষ করে দিল রাজ্যটাকে। বাংলা থেকে সি পি এমকে তাড়াও। এটাই দিদির এক নম্বর কাজ হওয়া উচিৎ।”

“শাট আপ, রোহিত। ইডিয়টের মত কথা বলিস না। ওয়েস্ট বেঙ্গলের অনেক কিছু খারাপ আছে আমি মানছি। বাট ডোন্ট গেট পার্সনাল। বুদ্ধবাবুর মত লোক হয় না,” মালিনীকে রুখে উঠতে দেখে বিপ্লব অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে।

“কেন, ভাই? তোর এত গায়ে লাগছে কেন?” অমরেশ তেড়ে আসে। “তুই কি সি পি এম?”

“আমি সি পি এম না হলেও, আমার বাবা, মা দুজনেই সি পি এম।”

বিপ্লব আর শাহনওয়াজ বাদে বাকিরা “দুয়ো দুয়ো” বলে হৈ হৈ করে ওঠে। প্রসূন সোল্লাসে বলে “ওরে, ছুপা রুস্তম রে। শালা এতদিন ঘাপটি মেরে ছিল! কি ঘোল খাইয়েছে মাইরি! একদম বুঝতে পারিনি। এ বাবা! অমরেশ, শালা তোর মামা না কে যেন টি এম সি করে না? আর তুই সি পি এমের মেয়েকে লাইন মারিস! ছ্যা ছ্যা ছ্যা!”

অমরেশের যে মালিনীকে পছন্দ সেটা সবাই জানত, সম্ভবত মালিনীও। কিন্তু কথাটা এভাবে বলায় অমরেশের মুখ লাল হয়ে ওঠে। গম্ভীর মুখে বলে “প্রসূন, তোর বেশি নেশা হয়ে গেছে। আর খাস না। আর মুখও খুলিস না।”

প্রসূন লাথি দেখায়। রোহিত, যার একটুও নেশা হয়নি, সে বলে ওঠে “অ্যাই প্রসূন, লেটস নট গেট পার্সনাল, ওকে? তবে মালিনী, তুইও কিন্তু অদ্ভুত। তোর বাবা মা সি পি এম করে ঠিক আছে। বাট ইউ আর বিহেভিং লাইক বুদ্ধ এট সেটরা আর ইয়োর ফ্যামিলি। গিম্মি আ ব্রেক, ইয়া। অল হি সেইড ওয়জ ‘লেটস রেইজ আ টোস্ট।’ এত সিরিয়াস হওয়ার কী আছে?”

“‘এত সিরিয়াস হওয়ার কী আছে’ মানে? হাউ ক্যান আই রেইজ আ টোস্ট টু দ্য ডেথ অফ মাই পেরেন্টস?” মালিনী উঠে দাঁড়িয়ে পড়ে। “আয়্যাম লীভিং।”

নওয়াজ আর তিতাস ওকে জড়িয়ে ধরে আটকায়। কিন্তু মালিনী কিছুতেই থাকবে না। রোহিত আর প্রসূন তখন সমানে বলে যাচ্ছে মালিনী ননসেন্সের মত আচরণ করছে। বিপ্লব বুঝতে পারে ওর যেটুকু নেশা হয়েছিল, সেটুকুও ছুটে যাচ্ছে। সব চেঁচামেচির উপরে গলা তুলে ও বলে “মালিনী, তুই চুপ করে বোস।” ওকে এভাবে কথা বলতে সহকর্মীরা কেউ কখনো শোনেনি। এক লহমায় সব গোলমাল থেমে যায়। তারপর বিপ্লব বলে “প্রসূন, তুই এক্ষুণি ক্ষমা চা। নইলে আমিও বেরিয়ে যাব।”

“হোয়াট! শালা তুইও সি পি এম নাকি?”

“আমি সি পি এম হই বা না হই। তোর কোন অধিকার নেই ঐভাবে কথা বলার।”

“অধিকার নেই! কিসের অধিকার? আমাকে অধিকার দেখাচ্ছিস? শালা সি পি এমের কী অধিকার ছিল আমাদের জমি গায়ের জোরে ছিনিয়ে নেয়ার?”

“একশো বার ছিল। হাজার বার ছিল। তোর চোদ্দ পুরুষ জমিতে অন্য লোককে খাটিয়ে, বসে বসে খেয়ে, গরীব মানুষের রক্ত চুষে অত সম্পত্তি বানিয়েছিল। বামফ্রন্ট সরকার বেশ করেছে ঐ জমি কেড়ে নিয়েছে।”

“অ্যাই বিপ্লব, এবার কিন্তু তুই বাড়াবাড়ি করছিস। একটা ইল্লিগাল ব্যাপারকে তুই সাপোর্ট করছিস,” রোহিত আঙুল তুলে বলে।

“শোন রোহিত, তোকে কোনদিন কিছু বলি না। আজকে বলছি শুনে রাখ। তোর মত পলিটিকালি অশিক্ষিত আমি দুটো দেখিনি। তুই কোন কেন্দ্রের ভোটার সেটা আগে মুখস্থ কর, তারপর রাজনীতি নিয়ে মুখ খুলবি আমার সামনে।”

“হা! আই ডিডন্ট নো ইউ আর আ টিপিকাল কমি। হোয়েন দে ডোন্ট হ্যাভ আনসারজ, দে জাস্ট শাউট পিপল ডাউন। সি পি এম বেআইনিভাবে জমি কেড়ে নিয়েছিল এটা সবাই জানে।”

“শাট আপ, ইউ ইডিয়ট।” নিজের গলার জোরে বিপ্লব নিজেই চমকে যায় প্রথমে। তারপর নিজেকে শান্ত করতে করতে বলে “তুই যে জমি কেড়ে নেওয়া নিয়ে দিন রাত বকবক করিস, সেটা ছিল অপারেশন বর্গা। আজ অব্দি এ দেশের অন্য কোন সরকারের সাহস হয়নি জোতদার, জমিদারদের কোমর ভেঙে দিয়ে এভাবে ভূমি সংস্কার করার। বেআইনি বলছিলি না? সংবিধানে ডাইরেক্টিভ প্রিন্সিপলস অফ স্টেট পলিসি বলে একটা জিনিস আছে। সেখানে সরকারকে ভূমি সংস্কার করতে বলা আছে। তাছাড়া পঞ্চান্ন সালের ল্যান্ড রিফর্মস অ্যাক্ট ছিল। সেই আইনটা প্রয়োগ করার সাধ্য ছিল না কারোর। জ্যোতি বসু আর বিনয় চৌধুরী করে দেখিয়ে দিয়েছে। উনআশি আর আশি সালে নিজেরা দুটো আইন বানিয়ে তোর চোদ্দ পুরুষের রক্ত চোষার ব্যবসা বন্ধ করে দিয়ে গেছে।”

“ওঃ! চাষাদের উপর কী দরদ রে! ঐ জন্যে সিঙ্গুরে জমি কেড়ে নিয়েছে, নন্দীগ্রামে জমি কেড়ে নিয়েছে,” অমরেশ বলে।

“অন্যায় করেছে। প্রবল অন্যায় করেছে। সেই জন্যেই আজ হেরে গেছে।”

“নন্দীগ্রাম তাও ঠিক আছে। সিঙ্গুরে কিচ্ছু অন্যায় হয়নি। ওখানে বদমাইশি করে ঐ মহিলা কারখানাটা হতে দিল না। এদিকে বলবে সি পি এম বাংলায় শিল্প হতে দিল না,” মালিনী এতক্ষণ পরে গলা ফিরে পায়।

“ধুর! শালা ইম্পোটেন্ট গভমেন্ট। ক্ষমতা থাকলে পিটিয়ে তুলে দিত দিদিকে। দে ওনলি হ্যাভ এক্সকিউজেজ। ঠাঁই ঠাঁই ঠাঁই ফায়ারিং করে দিত একবার, সব শুয়োরের বাচ্চা ন্যাশনাল হাইওয়ে ছেড়ে পালিয়ে যেত। আমি সাপোর্ট করতাম সি পি এমকে। আমি,” রোহিত বলে।

“সেটাই প্রমাণ করে যে কাজটা অন্যায় হত। তোর মত মাইন্ডলেস ডেভিল যেটাকে সাপোর্ট করে সেটাই সবচেয়ে অন্যায় কাজ।”

“অ্যাই, এই সি পি এম দুটোকে ঘাড় ধরে বার করে দে তো,” প্রসূন আবার চেঁচিয়ে ওঠে। “শালা আস্তিন কা সাপ। বার করে দে দুটোকে।”

নওয়াজ এতক্ষণ একটাও কথা বলেনি৷ এবার সে খিঁচিয়ে ওঠে “আরে ইয়ার, হোয়াটস রং উইথ ইউ? হোয়াই আর ইউ পিপল ফাইটিং ওভার অ্যান ইলেকশন রেজাল্ট ইন আ স্টেট ইউ হ্যাভ লেফট? কেয়া রখখা হ্যায় ইস মে? ফালতু ঝগড়কে শাম খরাব হো রহা। অবে প্রাসুন, কিঁউ ইয়ে বদতমিজি কর রাহা তু? ঔর রোহিত, তু কিস টাইপ কা হোস্ট হ্যায়? তেরে মেহমান কো ইয়ে নিকাল দে রহা ঔর তু চুপচাপ সুন রহা?”

“নো নো, আই ডোন্ট ওয়ন্ট এনিবডি টু গো। বাট সিরিয়াসলি, ম্যান। ইউ গাইজ আর আমেজিং। এভরিওয়ান নিউ হোয়াট দিস পার্টি ইজ ফর, রাইট? ইটস বিকজ আওয়ার দিদি হ্যাজ কিকড কমি অ্যাস। মালিনীর প্রবলেম থাকলে ও না এলেই পারত। আই ডিডন্ট নো শি হ্যাজ সি পি এম কানেকশনস। ডিড এনিবডি এলস নো?” রোহিত শ্রাগ করে বলে।

অমরেশ, তিতাস, নওয়াজ মাথা নাড়ে। প্রসূন বলে “না গুরু। একদম জানতাম না। কিন্তু শালা বিপ্লবটা কি জিনিস মাইরি! এতদিন সি পি এমকে কি গালাগাল দিত, আজকে বিরাট সি পি এম হয়ে গেল!”

বিপ্লবের মাথাটা ততক্ষণে ঠান্ডা হয়ে এসেছে।

“ভুল, প্রসূন। সবাই ভুল করেছে। মালিনী ভুল করেছে বাবা মায়ের পার্টির হেরে যাওয়া সেলিব্রেট করতে এসে। তুই ভেবেছিস সি পি এমকে গালাগাল করি মানে আমি কমিউনিস্টবিরোধী। আর সবচেয়ে বড় ভুল কে করেছে জানিস তো?”

নেশা চরমে ওঠা প্রসূন হেসে গড়িয়ে পড়তে পড়তে বলে “জানি, জানি। আই নো। ইটস শাহনওয়াজ খান। ব্যাটা বুঝতেই পারেনি হুইচ সাইড হি ইজ অন।”

“না। সবচেয়ে বড় ভুলটা করেছি আমি। কারণ আমি ভেবেছি নিজের রাজনীতিটা লুকিয়ে ফেলা যায়। লুকিয়ে ফেলা উচিৎ।”

“তার মানে? তুই সি পি এম করিস?” মালিনীর চোখ কপালে উঠে যায়। “আমার বাবা করে। যতদিন বাঁচবে ততদিনই করবে। আর আমি? যতদিন বাঁচব ততদিন বামপন্থী থাকব।”

ভাল লাগলে টাকা দিতে পারেন Google Pay / Paytm / BHIM বা অন্য UPI অ্যাপের মাধ্যমে journopratik@okhdfcbank কে

অথবা

নেট ব্যাঙ্কিং বা অন্য উপায়ে নিম্নলিখিত অ্যাকাউন্টে

Pratik Bandyopadhyay
A/c No. 14041140002343
HDFC Bank
Branch: South Calcutta Girls’ College
IFS Code: HDFC0001404
MICR Code: 700240048