দিমাগী নকশাল: সমস্যা নকশাল নিয়ে, নাকি মগজ নিয়ে?

শুনেছি মার্কিন দেশে অ্যালবার্ট আইনস্টাইনের মগজ নানা ভাগে ভাগ করে রীতিমত সংরক্ষণ করে রাখা হয়েছে, কারণ এক জীবনে অত বিরাট বিরাট কাজ করে যাওয়া লোক মানুষের ইতিহাসে বিরল। কিন্তু সে তো তাঁর আশ্চর্য মেধার প্রকাশ দেখে তাঁর মৃত্যুর পর করা হয়েছে। জ্যান্ত লোকের মগজ দেখতে পান নাকি আমাদের প্রধানমন্ত্রী! তাঁর কাছে কি সুকুমার রায় বর্ণিত ফুটোস্কোপ রয়েছে?

আনন্দময় বর্মণকে বোধহয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এবং তাঁর মন্ত্রিসভার সদস্যরা চেনেন না। চিনে নিতে চাইলে কাজটা কঠিন নয়, কারণ উনি ভারতীয় জনতা পার্টির টিকিটেই নির্বাচিত বিধায়ক।

স্বাধীনতা দিবসের ভাষণে ‘দিমাগী নকশাল’ বলতে প্রধানমন্ত্রী ঠিক কী বুঝিয়েছেন তার ব্যাখ্যা দিতে হয়েছে মন্ত্রিসভার সদস্য কিরেণ রিজিজুকে। নকশাল আন্দোলন কী এবং নকশাল কারা— সে ব্যাপারে যাঁদের সামান্য ধারণা আছে তাঁদের রিজিজুর ব্যাখ্যা শুনে হাসি পাওয়া স্বাভাবিক। তিনি যেসব বৈশিষ্ট্য নির্ধারণ করেছেন তার সঙ্গে নকশাল হওয়ার কোনও আবশ্যিক সম্পর্ক নেই। তার উপর আলাদা করে ‘দিমাগী’ বলতে কী বোঝানো হয়েছে তার ব্যাখ্যাও নেই।

অথচ ভারতের নকশাল আন্দোলন যেখান থেকে শুরু হয়েছিল, সেই নকশালবাড়ি জায়গাটা যে বিধানসভার অধীনে (মাটিগাড়া-নকশালবাড়ি), তা এখন বিজেপিরই দখলে। সেখানকারই বিধায়ক আনন্দময়বাবু। প্রধানমন্ত্রী বা কিরেণবাবু যদি একবারটি তাঁর সঙ্গে কথা বলতেন, তাহলেই হয়ত এমন ঘেঁটে ঘ অবস্থা হত না যাতে প্রধানমন্ত্রীর বক্তৃতার ‘মেড ইজি’ দিতে হয় আরেকজন মন্ত্রীকে; তাতেও এমন সব অদ্ভুত কথা বেরোয় যে সোশাল মিডিয়ায় হাসাহাসি চলে।

অবশ্য এসব গ্রহের কারসাজিও হতে পারে। কারণ ২০১৪ থেকে এই সেদিন পর্যন্ত মোদীজি ও তাঁর দল কাউকে ‘আর্বান নকশাল’, ‘টুকড়ে টুকড়ে গ্যাং’, ‘অ্যান্টি-ন্যাশনাল’, ‘আন্দোলনজীবী’, ‘খালিস্তানি’ ইত্যাদি তকমা দিলে দেশসুদ্ধ লোক তা শিরোধার্য করে সেইসব লোককে দেশের শত্রু হিসাবে মেনে নিত। যারা চিহ্নিত হল তাদের পত্রপাঠ গ্রেফতারি, তাদের নামে এফআইআর দায়ের, বাড়িতে বা অফিসে তল্লাশি চলত। তাদের বন্ধুবান্ধবরাও কিঞ্চিৎ ভীত হয়ে পড়তেন, পাছে সঙ্গদোষে তাঁদেরও একই হাল হয়। কিন্তু কে জানে কোন গ্রহের ষড়যন্ত্রে সেসব চলতে থাকলেও ভয় আউট, ঠাট্টা ইন হয়ে গেছে। দেশের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত আন্দোলনকারী, মানবাধিকার কর্মী, তথ্যের অধিকার আইন নিয়ে মামলা মোকদ্দমা করা লোকজনের (যাদের মধ্যে আবার তরুণ আইনজীবীরাও আছেন) উপর ক্ষিপ্ত হয়ে তাদের আরশোলার সঙ্গে তুলনা করলেন। ও মা! কিছুদিনের মধ্যেই ককরোচ জনতা পার্টি তৈরি হয়ে গেল! তারপর তাদের সঙ্গে গুচ্ছের বামপন্থী ও আম্বেদকরপন্থী ছেলেমেয়ে জুটে গেল। দিল্লির যন্তর মন্তর থেকে শুরু হয়ে তারা গোটা উত্তর ভারতে ওড়াউড়ি শুরু করে দিল; বিভিন্ন রাজ্যের পুলিশ ‘হিট’ দিতে দিতে নাজেহাল, কিছুতেই কিছু হয় না। অমিত শাহের চাণক্যসুলভ বুদ্ধি পর্যন্ত ফেল। আরশোলা মারতে গিয়ে এমন হল যে তিনি নিজেই সংসদে ঢোকা ছেড়ে দিতে বাধ্য হলেন। প্রধানমন্ত্রী বাংকারে আশ্রয় নিয়েছিলেন কিনা কে জানে! যা-ই হোক, আরশোলাদের ইনস্টাগ্রামে ক্ষমা করে দিয়ে তিনি লালকেল্লা থেকে দেশের মানুষকে ‘দিমাগী নকশাল’ সম্পর্কে সাবধান করলেন। এবারে দেখা গেল মোটেই কেউ ঘাবড়াচ্ছে না। সোশাল মিডিয়ায় দিমাগী নকশাল পার্টিও তৈরি হয়ে গেছে। কেউ আর ভয় তো পাচ্ছেই না, এমনকী ব্যাপারটা এমন ‘কুল’ হয়ে দাঁড়িয়েছে যে নকশাল (মাওবাদী) সংগঠনগুলোর বিরুদ্ধে অপারেশন গ্রীন হান্ট চালু করে অমিত শাহকে অপারেশন কাগারের পথ দেখিয়েছিলেন যে পি চিদম্বরম, তিনিও নিজেকে দিমাগী নকশাল বলে দাবি করে বসেছেন। বল মা তারা দাঁড়াই কোথা!

প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন, নকশালরা শেষ হয়ে গেছে। কিন্তু দিমাগী নকশালরা এখনও আছে। তাদের থেকেই সাবধান হতে হবে। একথা শুনে আমার মত ছাপোষা নাগরিকদের কিছুটা আশ্বস্ত লাগে। নকশালরা নিজেরাও গুনে বলতে পারবে না তাদের কতরকমের প্রকারভেদ আছে, তার মধ্যে কারা অবশিষ্ট আছে আর কারা অপারেশন কাগারের ফলে অবলুপ্ত। কিন্তু মোদীজি যখন বলছেন আর কেউ নেই, তখন নিশ্চিত নেই।

আরও পড়ুন ওয়ারেন হেস্টিংস যা শেখালেন

সেই ২০১৬ সালে নোটবন্দির পর থেকে শুনে আসছি, নকশালরা শেষ হয়ে গেছে। কথাটা এতবার বলা হয়েছে যে এবার গুনে দেখতে হবে এ পর্যন্ত কতবার নকশালরা শেষ হয়েছে। যা-ই হোক, আরও একবার শেষ হলে ক্ষতি কী? শাস্ত্রে বলেছে অধিকন্তু ন দোষায়। তাই স্বাধীনতা দিবসের বক্তৃতা শুনে আশায় বুক বেঁধেছিলাম। কিন্তু দিমাগী নকশাল আবার কোথা থেকে এল রে বাপু! দিমাগ মানে তো মগজ। তাহলে দিমাগী নকশাল মানে হল মগুজে নকশাল। এটা কি কাগুজে বাঘের মত ব্যাপার? তা বাপু বাঘশুমারির সময়ে আলাদা করে কাগুজে বাঘও গোনা হয় বলে তো শুনিনি। কাগুজে বাঘ আসল বাঘের সমান বিপজ্জনক, এমনও শুনিনি। তাহলে নকশালরা আর না থাকলে মগুজে নকশালদের নিয়ে এত চিন্তা কীসের? তাছাড়া কোন মানুষটারই বা মগজ নেই? যারা প্রধানমন্ত্রীর দলের লোক তারা কি বিনা মগজেই এত বড় দেশ চালাচ্ছে?

তাহলে সমস্যা কি কিছু মানুষের মগজে যা আছে তা নিয়ে? তবে তো ভারি মুশকিল। শুনেছি মার্কিন দেশে অ্যালবার্ট আইনস্টাইনের মগজ নানা ভাগে ভাগ করে রীতিমত সংরক্ষণ করে রাখা হয়েছে, কারণ এক জীবনে অত বিরাট বিরাট কাজ করে যাওয়া লোক মানুষের ইতিহাসে বিরল। কিন্তু সে তো তাঁর আশ্চর্য মেধার প্রকাশ দেখে তাঁর মৃত্যুর পর করা হয়েছে। জ্যান্ত লোকের মগজ দেখতে পান নাকি আমাদের প্রধানমন্ত্রী! তাঁর কাছে কি সুকুমার রায় বর্ণিত ফুটোস্কোপ রয়েছে? অবশ্য মোদীজি পারেন না এমন জিনিস নেই। সেই কোন ছেলেবেলায় কুমিরের মুখ থেকে খেলার বল উদ্ধার করে এনেছিলেন। এই তো সেদিন সশরীরে উপস্থিত না হয়েও কয়েক ঘন্টার জন্যে রুশ-ইউক্রেন যুদ্ধ থামিয়ে দিয়েছিলেন। তাঁর পক্ষে জ্যান্ত মানুষের মগজে কী আছে তা জানা আর এমন কী ব্যাপার?

কিন্তু যদি জানেনই যে যা আছে তা দেশের পক্ষে ক্ষতিকর, তাহলে এতদিন কোনো ব্যবস্থা নেননি কেন? তিনিই তো আমাদের দণ্ডমুণ্ডের কর্তা। পেট্রল পাম্প থেকে ভ্যাকসিন সার্টিফিকেট (সুনীল শেঠির ঠাকুরঘরেও)— তিনি সর্বত্রগামী। কেবল দেশের শত্রুদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার বেলাতেই সব দায়িত্ব আমাদের ঘাড়ে এসে পড়বে নাকি? করোনা ভাইরাস আটকানোর মত মগুজে নকশালদের আটকানোর জন্যেও এবার থালা বাজানোর হোমটাস্ক দেবেন আমাদের, নাকি মোমবাতি জ্বালানোর? নাকি কোথাও লাইন-টাইন দিতে হবে আবার? গত বারো বছরে এই একটা শিল্পেই তো নিয়মিত কর্মসংস্থান হয়েছে। টাকা তুলতে লাইন, অমুকের সঙ্গে তমুকের লিংক করাতে লাইন, এসআইআরে নাম তুলতে লাইন, ট্রাইব্যুনালে লাইনে দাঁড়ানোর পর এবার কি মগুজে নকশাল নই প্রমাণ করতে লাইনে দাঁড় করানো হবে আবালবৃদ্ধবণিতাকে?

নাকি সমস্যা মগজ থাকলেই? তাই যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় বা জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের মত মগজের চর্চা করার জায়গাগুলোতে রাত বিরেতে হামলা হবে? সে সরকার মাইবাপ, যদি তাই চান তো তাই হবে। ঠেকাবে কে? কিন্তু যাদবপুর বা জেএনইউ-কে মেরে ধরে গলগোটিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের স্তরে নামিয়ে আনলেই কি মগজের সমস্যা মিটবে? মগজ যে সকলেরই আছে, আর সেটা থাকে মুণ্ডুতে। তা মুণ্ডু গেলে খাবটা কী? অবশ্য গ্যাসের দাম, জিনিসপত্রের দাম যেভাবে বাড়ছে তাতে খাওয়ার খরচ অনেক। হিতৈষী সরকার হয়ত খরচ বাঁচিয়ে দিতে চাইছেন। এটাই মাস্টারস্ট্রোক।

a2onuswor.com ওয়েবসাইটে প্রকাশিত

বাকস্বাধীনতা এখন রীতিমতো কমেডি

পাটনার আন্দোলনে এক যুবক উপস্থিত পুলিশকর্মীকে জিজ্ঞেস করছেন “কাঁদানে গ্যাস, জলকামানের ব্যবস্থা করেছেন?” উত্তরে তিনি না বলায় বলছেন “এ কে ৪৭?” তাতেও না বলায়, যেন ভারি হতাশ হয়ে বলছেন “কিছুরই ব্যবস্থা করেননি?”

দেশ স্বাধীন হতে না হতেই কমিউনিস্টরা স্লোগান তুললেন “ইয়ে আজাদি ঝুঠা হ্যায়”;অর্থাৎ এই স্বাধীনতা মিথ্যা। তাঁদের বক্তব্য— এ কেবল রাজনৈতিক স্বাধীনতা, দেশের গরিব নিপীড়িত মানুষ অর্থনৈতিকভাবে স্বাধীন না হলে সেটা স্বাধীনতাই নয়। কেবল স্লোগান তুললে তো রাজনীতি হয় না,যে কোনো পার্টিকেই তার বার্তা উদ্দিষ্ট মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার একাধিক পথ বের করতে হয়। আজকের রিলের যুগে যেমন, সে যুগেও তেমন গানের মাধ্যমে বার্তা দিলে অনেক সহজে অনেক বেশি মানুষের কাছে পৌঁছত। বিশেষ করে গান একেবারে লেখাপড়া না জানা মানুষের কাছেও বার্তা পৌঁছে দিতে পারে,যা অনেকসময় বক্তৃতা বা প্যামফ্লেট পারে না। তাই অবিভক্ত কমিউনিস্ট পার্টির সাংস্কৃতিক শাখা,ভারতীয় গণনাট্য সঙ্ঘের সদস্যরা ১৯৪৮ সালে গান বাঁধলেন—মাউন্টব্যাটেন মঙ্গলকাব্য। বাংলার প্রাচীন মঙ্গলকাব্যের প্রকরণ মেনে তাতে ভারতের স্বাধীনতাকে তুলে ধরা হল স্রেফ ক্ষমতা হস্তান্তর হিসাবে। “মাউন্টব্যাটন সাহেব ও/তোমার সাধের ব্যাটন/কার হাতে থুইয়া গেলায়ো।” সেই গানে মাউন্টব্যাটেনের স্থলাভিষিক্ত গভর্নর জেনারেল চক্রবর্তী রাজাগোপালাচারী নয়, প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু এবং বল্লভভাই প্যাটেল, মৌলানা আবুল কালাম আজাদের মত মন্ত্রিসভার অন্য সদস্যদের নিয়েও একেবারে নাম করে প্রচণ্ড ব্যঙ্গ করা হয়। সে গান নিষিদ্ধ করেনি ভারত সরকার বা পশ্চিমবঙ্গ সরকার। সেই গান যাতে ছড়াতে না পারে তার ব্যবস্থা করেছিল বলেও জানা যায় না। কমিউনিস্ট পার্টি ওই ১৯৪৮ সালেই নিষিদ্ধ হয়েছিল, কিন্তু সেটা ওই গানের জন্যে নয়।

বছর চল্লিশেক এগিয়ে আসা যাক। ১৯৮৯ লোকসভা নির্বাচনের আগে বিদায়ী প্রধানমন্ত্রী সম্পর্কে বিরোধীরা স্লোগান তোলেন “গলি গলি মে শোর হ্যায়/রাজীব গান্ধী চোর হ্যায়।” কারণ তার কিছুদিন আগেই অভিযোগ উঠেছে— ভারতীয় সেনাবাহিনীর জন্য সুইডেনের অস্ত্র নির্মাণ কোম্পানি বোফর্সের কাছ থেকে অস্ত্র কেনায় প্রায় ১,৪০০ কোটি টাকার দুর্নীতি হয়েছে এবং স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী ঘুষ খেয়েছেন। গোটা নির্বাচন পর্ব এই স্লোগান চলে,আমরা দেখতাম দেয়াল জুড়ে এই স্লোগান লেখা হচ্ছে পাড়ায় পাড়ায়। রাজীব তথা কংগ্রেস আগাগোড়া এই অভিযোগ অস্বীকার করে, কিন্তু নির্বাচনে কংগ্রেস জনসমর্থন হারায়। একদা রাজীবের মন্ত্রিসভার সদস্য বিশ্বনাথ প্রতাপ সিং প্রধানমন্ত্রী হন। কিন্তু একবারের জন্যও রাজীব নিজে বা কংগ্রেস বলেনি যে প্রধানমন্ত্রী চেয়ারটা সাংবিধানিক, তাঁকে চোর বলা মারাত্মক পাপ। অথবা যারা তাঁকে চোর বলছে তারা দেশদ্রোহী, বা তাদের পাকিস্তানে চলে যাওয়া উচিত। ফলে আজ আরও প্রায় ৪০ বছর পরে যখন প্রধানমন্ত্রীকে ঠাট্টার পাত্র বানিয়ে ফেলার জন্যে ছাত্রছাত্রীদের গ্রেফতার করা হচ্ছে; ১৫ বছরের মেয়ের বাড়িতে ঢুকে পড়ে তাকে এবং তার মাকে এমন ভয় দেখানো হচ্ছে যে তাঁরা বাড়ি ছেড়ে দিতে বাধ্য হচ্ছেন; যারা প্রধানমন্ত্রীকে হাসি ঠাট্টা, কার্টুনের বিষয়বস্তু বানিয়ে ফেলেছেন তাঁদের বিরুদ্ধে এফআইআর হচ্ছে এবং উন্মত্ত জনতা তাঁদের বাড়ি পৌঁছে যাচ্ছে, তখন সত্যিই প্রশ্ন করতে ইচ্ছে হয় “ইয়ে আজাদী সচ হ্যায় ইয়া ঝুঠা হ্যায়?”এই স্বাধীনতা সত্য না মিথ্যা?

যে দেশে প্রকাশ্যে কিছু বলতে গেলে বা লিখতে গেলে শতবার ভাবতে হয়— বাড়িতে পুলিশ অথবা গুন্ডাবাহিনী আসবে কিনা, সে দেশে বাকস্বাধীনতা যে ঘোর বিপদে তা নিয়ে সন্দেহের অবকাশ নেই। তবু যে আমাদের ৮০তম স্বাধীনতা দিবসে দাঁড়িয়ে নিজেদের শেষ বিচারে স্বাধীন দেশের নাগরিক বলেই মনে হচ্ছে, তার কৃতিত্ব কিন্তু সরকার বা আদালতের নয়। কৃতিত্ব দেশের নাগরিকদের। যাবতীয় হুমকি,পুলিশের পেরেক বসানো লাঠি, এ কে ৪৭, জলকামান,কাঁদানে গ্যাস,বুলডোজার সহ্য ও অগ্রাহ্য করে এদেশের সবুজ, অবুঝ,কাঁচা নাগরিকরা দেখিয়ে দিয়েছেন— বাঁধন যত শক্ত হবে তত বাঁধন টুটিয়ে দেওয়ার সাহস তাঁদের আছে। নিজেদের মর্ত্যে আগত ভগবান মনে করা যে নেতাদের চিরাচরিত প্রতিবাদের ভাষা দিয়ে মাটিতে নামিয়ে আনা যাচ্ছিল না, তাঁদের দম ফাটানো হাসি দিয়ে ফুৎকারে উড়িয়ে দিয়েছেন নাগরিকরা। প্রধানমন্ত্রী নিজের ৫৬ ইঞ্চির ছাতি নিয়ে গর্ব করেছিলেন, এখন সেই ৫৬ ইঞ্চিকেই ব্যুমেরাং করে তাঁর দিকে ছুড়ে দিয়েছে তরুণ প্রজন্ম। কী করে বাঁচবেন তার আঘাত থেকে? ভাবতে গিয়ে রাতে না ঘুম হচ্ছে প্রধানমন্ত্রীর, না তাঁর কোটি কোটি টাকা মাইনের জনসংযোগের দায়িত্বে থাকা মানুষজনের। এক্স আর মেটাকে বলে সব অপছন্দের ভিডিও মোছানোর ব্যবস্থা করছে সরকার। নরেন্দ্র মোদী সরকারের এক মন্ত্রী নীতিন গড়করি তো সোজা আদালতে চলে গেছেন তাঁর সম্পর্কে পোস্ট মোছানোর জন্যে। কিন্তু কত মোছা হবে? যা ছড়িয়ে গেছে তা তো ছড়িয়েই গেছে,মানুষের মন থেকে মুছে দেওয়ার তো কোনো উপায় নেই। তার উপর সোশাল মিডিয়া এমন এক গ্যাঁড়াকল যে যত পোস্ট মোছা হয়, তত নতুন পোস্ট এসে পড়ে। এই যৌবন জলতরঙ্গ রুধিবে কে? ক্ষমতাশালীর ভাবমূর্তি ধূলিসাৎ,প্রেস্টিজে গ্যামাক্সিন।

এখন দেশের প্রধান বিরোধী দল কংগ্রেসও সংসদ চত্বরেই প্রধানমন্ত্রীকে বাঁদর বলছে,তাঁর যাকে তাকে জড়িয়ে ধরার অভ্যাস নিয়ে ঠাট্টা করছেন লোকসভার বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধী।

এমন নয় যে কংগ্রেস যতদিন সরকারে ছিল ততদিন ভারত বাকস্বাধীনতার স্বর্গ ছিল আর বিজেপি ক্ষমতায় আসতেই নরক হয়ে গেছে। রাহুলের ঠাকুমা ইন্দিরার আমলেই ভারতে জরুরি অবস্থা ঘোষিত হয়। তখন খবরের কাগজের অফিসে সরকারি অফিসার এসে বসে থাকতেন কোথায় কী ছাপা হচ্ছে না হচ্ছে দেখতে। বাবু দেখে মাথা দোলাবেন, তবে ছাপা হবে। তার প্রতিবাদে সেইসময় কোনো কাগজ সম্পাদকীয় স্তম্ভ খালি রেখেছিল, কেউ বা কাটা চিহ্ন ছেপে দিয়েছিল। অবাধ্য সাংবাদিকদের ব্যাপক গ্রেফতারি তো ছিলই,অবাধ্য হওয়ায় কিশোরকুমারের গান বাজানো বন্ধ করে দিয়েছিল অল ইন্ডিয়া রেডিও। এমনকী ইন্দিরার সঙ্গে নায়িকার চরিত্রের মিল আছে— এই অলিখিত অভিযোগে নিষিদ্ধ করে দেওয়া হয়েছিল সুচিত্রা সেন ও সঞ্জীবকুমার অভিনীত, গুলজারের ছবি আন্ধী। খোদ পশ্চিমবঙ্গে প্রয়াত সুব্রত মুখোপাধ্যায়ের উদ্যোগে রবীন্দ্রনাথের ‘চিত্ত যেথা ভয়শূন্য’ নিষিদ্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। মৃত্যুর আগে পর্যন্তও তা নিয়ে তাঁর কোনো আক্ষেপ ছিল না।

বাকস্বাধীনতায় সরকারি হস্তক্ষেপের আরও অজস্র দৃষ্টান্ত আছে স্বাধীন ভারতে। রাজীবের প্রধানমন্ত্রিত্বেই সলমন রুশদির স্যাটানিক ভার্সেস নিষিদ্ধ করে দেওয়া হয়েছিল মুসলমান মৌলবাদীদের চাপে। পশ্চিমবঙ্গে বামফ্রন্ট আমলে তসলিমা নাসরিনের দ্বিখণ্ডিত নিষিদ্ধ করার ইতিহাস আছে,মৌলবাদীদের সামান্য গণ্ডগোলের ভয়ে তসলিমাকে কলকাতা থেকে বিদেয় করে দেওয়ার ইতিহাসও আছে। একবার তো কলকাতা ফিল্মোৎসবে আসা একখানা ছবিতে (টরাস) লেনিনকে যেভাবে দেখানো হয়েছে তা রাজ্য সরকারের পছন্দ হয়নি বলে চলতে দেওয়া হয়নি— এমন অভিযোগও উঠেছিল। ফলে শিল্প,সাহিত্যের বাকস্বাধীনতা রক্ষায় ভারতের কোনো রাজনৈতিক শক্তির ভূমিকাই ধারাবাহিকভাবে ভালো নয়। কিন্তু গত এক যুগে মোদী সরকারের আমলে বা ডবল ইঞ্জিন সরকারগুলোর শাসনে যা হয়েছে তার মধ্যে বিলক্ষণ নতুনত্ব আছে।

এর আগে বিভিন্ন মতকে বিভিন্ন সময়ে দমন করার চেষ্টা হয়েছে; কিন্তু সিনেমা, সাহিত্য, নাটক, শিল্পকলা, এমনকী ইতিহাস রচনাতেও একটাই বয়ান সর্বত্র সবার উপরে চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা হয়নি। উপরন্তু, ইন্দিরার ঘোষিত জরুরি অবস্থার বছর দুয়েক (১৯৭৫-৭৭) বাদ দিলে, যাবতীয় সংবাদমাধ্যমের গলা টিপে ধরে তাকে দিয়ে সরকারি বয়ান বলিয়ে নেওয়ার চেষ্টা হিমাচল থেকে কন্যাকুমারী পর্যন্ত বিরল। মোদী সরকারের আমলে কিন্তু সব মিডিয়ার এক রা,জরুরি অবস্থার ঘোষণা ছাড়াই। যে কারণে গোদি মিডিয়া কথাটার উদ্ভব হয়েছে। ভারত জুড়ে এত সাংবাদিকের গ্রেফতার ও হত্যার খতিয়ানও কোনো রাজ্যে পাওয়া যাবে না। স্বভাবতই আন্তর্জাতিক প্রেস ফ্রিডম ইনডেক্সে আমাদের দেশের অবস্থা দেখে বাস কন্ডাক্টরদের মত বলতে হয় “পেছন দিকে এগিয়ে যান।”

আরও পড়ুন কুণাল, যাঁর কৌতুক আজ কামড়ায়

তবে মানুষ এত অদ্ভুত জীব, ভারত এমন আশ্চর্য দেশ যে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেললেও কোথাও কোনো বিদ্রোহ মাথাচাড়া দেবে না— এমনটা বেশিদিন হয় না। যেমন রাজনীতিতে হয় না, তেমনি বাকস্বাধীনতার ক্ষেত্রেও হয় না। এখন যে ঠাট্টার স্রোতে স্বয়ং মোদী টালমাটাল এবং রাহুল যাকে রাজনীতির ভাষা করে তুলছেন,সেটা কিন্তু শুরু করেছিলেন ঋজু বিদূষকরা। সাম্প্রতিক জেন জি আন্দোলনের এক ভাইরাল ভিডিওতে দেখা গেছে,পাটনার আন্দোলনে এক যুবক উপস্থিত পুলিশকর্মীকে জিজ্ঞেস করছেন “কাঁদানে গ্যাস, জলকামানের ব্যবস্থা করেছেন?” উত্তরে তিনি না বলায় বলছেন “এ কে ৪৭?” তাতেও না বলায়, যেন ভারি হতাশ হয়ে বলছেন “কিছুরই ব্যবস্থা করেননি?” ক্ষমতাকে এইভাবে খেলো করে দেওয়ার পথ কিন্তু দেখিয়েছেন ঋজু বিদূষকরা। কুণাল কামরার ২০১৯ সালের এক ভিডিওতে দেখা যায়,তিনি বলছেন— প্রত্যেকবার রামনবমীতে নেতারা তলোয়ার হাতে এসে বলেন, মন্দির ইয়হি বনায়েঙ্গে। তলোয়ার দেখেই মুড খারাপ হয়ে যায়। এত ট্যাক্স দিই, তাও এই ব্যাকডেটেড ওয়েপন! রকেট লঞ্চার-টঞ্চার আনুন, যাতে পাবলিকেরও আস্থা থাকে যে নেতা ঠিকঠাক এগোচ্ছেন। প্রায় এই ভাষাই উঠে এসেছে পাটনার ওই যুবকের মুখে।

এই হাস্যরস যে বিরোধী রাজনীতিবিদদের সমান বিপজ্জনক তা বুঝতে পেরে এই বিদূষকদের উপর বহুদিন ধরেই খড়্গহস্ত ডবল ইঞ্জিন সরকারগুলো। কুণাল, মুনাওয়ার ফারুকি সমেত অনেকের বিরুদ্ধে বারবার মামলা মোকদ্দমা হয়েছে; উন্মত্ত জনতার আক্রমণ হয়েছে; তাঁদের শো করার অপরাধে হল ভেঙে দেওয়া হয়েছে। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মুনাওয়ারকে তো কারাবাস পর্যন্ত করতে হয়েছে। এমনকী এসব নিয়েও ঠাট্টা করেছেন বরুণ গ্রোভার,যাঁকে কুণালরা ওঁদের গুরু বলে মানেন। বরুণ তাঁর ‘নাথিং মেকস সেন্স’ শীর্ষক শোয়ের শুরুতেই বলেন— এমন হতে পারে যে কিছুদিন পরে আপনাদের পুলিশ স্টেশন থেকে ডাক এল। ভয় পাবেন না,শুধু তিনটে প্রশ্নের উত্তর মনে রাখবেন। প্রথমত, শো কোথায় দেখেছেন? বলবেন,অ্যান্টিলায়। দ্বিতীয়ত,কমেডিয়ান কে ছিল?বলবেন,সময় রায়না। তৃতীয়ত,জোক কাকে নিয়ে ছিল?বলবেন,রাহুল গান্ধী।

তাহলে ভারতে এখন বাকস্বাধীনতার অবস্থা কি ভালো, না খারাপ? উত্তরটাও বরুণের কথাতেই দেওয়া যাক।

“ভারতে এখন কমেডি করা খুব শক্ত কাজ, কারণ কমেডির সরাসরি প্রতিযোগিতা বাস্তবের সঙ্গে।”

সত্যি কথা। নইলে সরকার বদলের পর অ্যাকাডেমি অফ ফাইন আর্টসের টিকিট কাউন্টারের রং গেরুয়া করে দিল কর্তৃপক্ষ, আজ এক দল শিল্পী গিয়ে সাদা করে দিলেন, আবার কাল আরেক দল শিল্পী এসে গেরুয়া রং করলেন লাল রং নিয়ে আপত্তি জানিয়ে— এ কি সম্ভব?

a2onuswor.com ওয়েবসাইটে প্রকাশিত

তসলিমার জয়ধ্বনি: রাজনীতি ভুলে সংস্কৃতি চর্চা স্থগিত রাখলে হয় না?

ভয় পেলে চুপ করে থাকা যায়। ক্ষমতার পক্ষ নিয়ে, সংখ্যাগুরুর পক্ষ নিয়ে ইনিয়েবিনিয়ে বা সোচ্চারে বলাবলি, লেখালিখি করার দরকার হয় না। তাদের মঞ্চে যাওয়ারও দরকার হয় না। সে কাজ যাঁরা করছেন এবং করাকে যাঁরা সমর্থন করছেন, তাঁরা ওটা না করলে মোটেই খাওয়া-পরা বন্ধ হবে না। খুব বেশি হলে যা হবে তা হল, পুজোর ছুটিতে প্যারিস বা মায়ামি বেড়াতে যাওয়ার সঙ্গতি থাকবে না, মন্দারমণি দিয়ে কাজ সারতে হবে।

কারও কাছে কিছু দাবি করা চলবে না। নেতাদের কাছ থেকে তাদের কাজের কৈফিয়ত দাবি করা চলবে না। ফুটবলারদের কাছ থেকে অন্য ফুটবলারদের অপমানে প্রতিবাদ দাবি করা চলবে না। দেশের যুবসমাজের উন্মাদনা এবং পকেটের পয়সায় যারা কোটিপতি, সেই খেলোয়াড় বা অভিনেতাদের কাছ থেকে ওই যুবসমাজের উপর দমনপীড়ন নেমে এলে তার বিরোধিতা দাবি করা চলবে না। সংবাদমাধ্যমের কাছে সত্যনিষ্ঠা দাবি করা চলবে না। এমনকী সাহিত্যিকরা বিবেকবান হবেন, যিনি ধর্মীয় মৌলবাদের ও সংখ্যাগুরুবাদের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার কারণে দেশছাড়া, তিনি অন্য দেশের মৌলবাদ ও সংখ্যাগুরুবাদের সঙ্গে আপস করবেন না— এ দাবিও করা চলবে না। এমনটাই আমাদের সময়ের দাবি।

কারণ? সকলেরই নাকি রুটিরুজির প্রশ্ন আছে, অস্তিত্বের প্রশ্ন আছে। যেন ইতিহাসের একমাত্র এই কালখণ্ডেই সত্যি কথা বলতে হলে, প্রতিবাদ করতে হলে মানুষকে নিজের রোজগার, নিজের অস্তিত্বের ঝুঁকি নিতে হচ্ছে। যেন অতীতে সর্বদেশে সর্বকালে প্রতিবাদ করা ভারি আরামের কাজ ছিল। দমনপীড়নে বিশ্বাসী সরকার বা মৌলবাদীরা প্রতিবাদীদের চাকরি দিত, চাকুরে হলে মাইনে বাড়িয়ে দিত, বোনাস দিত, মাঝেমধ্যে পুরস্কারও দিত। একে-৪৭ হাতে নিয়ে ভিন্ন মতের মানুষের বাড়ির বাইরে নিজেরাই পাহারা দিত, বলত “আমি আপনার বিরোধী হতে পারি, কিন্তু আপনার কথা বলার অধিকার আমি নিজের জীবন দিয়েও রক্ষা করব।”

মজা হল, রুটিরুজির যুক্তি যাঁরা দিচ্ছেন তাঁরা কেউ ‘দিন আনি দিন খাই’ শ্রেণির মানুষ নন। সরকারি দমন বা সংখ্যাগুরুবাদী গুন্ডাদের হাতে মারধর, হয়রানির ভয় সকলের আছে (এই লেখকেরও আছে)। নাট্যকর্মী থেকে শুরু করে ১৫ বছরের বাচ্চা মেয়েকে পর্যন্ত যেভাবে সদলবলে আক্রমণ করা হচ্ছে, তাতে ভয় পেলে কাউকে দোষ দেওয়াও যায় না। কিন্তু ভয় পেলে চুপ করে থাকা যায়। ক্ষমতার পক্ষ নিয়ে, সংখ্যাগুরুর পক্ষ নিয়ে ইনিয়েবিনিয়ে বা সোচ্চারে বলাবলি, লেখালিখি করার দরকার হয় না। তাদের মঞ্চে যাওয়ারও দরকার হয় না। সে কাজ যাঁরা করছেন এবং করাকে যাঁরা সমর্থন করছেন, তাঁরা ওটা না করলে মোটেই খাওয়া-পরা বন্ধ হবে না। খুব বেশি হলে যা হবে তা হল, পুজোর ছুটিতে প্যারিস বা মায়ামি বেড়াতে যাওয়ার সঙ্গতি থাকবে না, মন্দারমণি দিয়ে কাজ সারতে হবে। পশ্চিমবঙ্গের বাঙালি লেখকদের রবীন্দ্র পুরস্কার, বঙ্কিম পুরস্কার, বাংলা আকাদেমি পুরস্কার, সাহিত্য আকাদেমি পুরস্কারের দরজা বন্ধ হয়ে যাবে। তেতো সত্য হল— ভোগবাদ আর ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদে আমরা এমন গলা পর্যন্ত ডুবে গেছি যে ওসব ছাড়াও যে বাঁচা যায় তা আমাদের পাড়ার ছাপোষা গোঁসাই থেকে শুরু করে নামকরা কবি গোঁসাই পর্যন্ত কেউ কল্পনাও করতে পারে না। কিন্তু সকলের বাড়িতেই আয়না আছে। যিনি যত বিখ্যাত, তাঁর আয়না তত বড়। তার সামনে দাঁড়ালে নিজের এই চেহারা দেখে আমাদের সকলেরই লজ্জা করে। সেই লজ্জা ঢাকতে পাতার পোশাক হল “রুটিরুজি”। এ রাজ্যের বাংলা ভাষার লেখকরা ভালো করেই জানেন (এখন সোশাল মিডিয়ার দৌলতে অনেক পাঠকও জেনে ফেলেছেন) যে বাংলায় সাহিত্য রচনা করে রুটিরুজির ব্যবস্থা হয় না। লেখকদের প্রায় সকলেরই অন্য পেশা আছে, যাঁদের নেই তাঁরা অন্য পেশার খোঁজে আছেন। শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের পসার বিখ্যাত, তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় বইয়ের রয়্যালটি দিয়ে গাড়ি কিনেছিলেন শোনা যায়। গজেন্দ্রকুমার মিত্র আরেকজনের সঙ্গে মিলে আস্ত প্রকাশনা সংস্থা খুলে ফেলেছিলেন। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, বুদ্ধদেব গুহ, শংকরও বহুবিক্রীত ছিলেন। কিন্তু সেসব দিন চলে গেছে। আজকের সবচেয়ে জনপ্রিয় লেখকের বইও পাঁচশো বা হাজার কপি বিক্রি হয় বলে তাঁদের প্রকাশকদের দাবি করতে দেখা যায় না। সেই কারণে কি পুরস্কারই কি রুটিরুজি হয়ে দাঁড়িয়েছে? যাঁদের ব্যাপারটা তাই, তাঁরা মনের সুখে তসলিমা থেকে সন্তোষী মা— যাকে খুশি বন্দনা করুন, আপত্তি নেই। যাঁদের তেমন স্বার্থ নেই, তাঁরাও নিজ নিজ প্রিয় সাহিত্যিকের পাশে দাঁড়ানোর জন্যে যদি এমন করতে চান তো করুন। কিন্তু একে বাকস্বাধীনতার পক্ষে দাঁড়ানো বলে তত্ত্বায়ন করা চলছে। তাই কিছু কথা না বলে থাকা যাচ্ছে না।

বাংলার কালচার্ড বাবু-বিবি আজও যাঁকে নিয়ে “আহা! সত্যিকারের ভদ্রলোক ছিলেন” বলে হাহুতাশ করে, সেই বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য নিজের দলের তথা ভারতবর্ষের বামপন্থী আন্দোলনের যে দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি করেছিলেন মুখ্যমন্ত্রী থাকার সময়ে, তা সিপিএমের কর্মী-সমর্থকরা কেউ কেউ আজকাল জনান্তিকে স্বীকার করেন। পার্টি স্বীকার করে না, হয়তো কোনওদিন করবেও না। তাতে অবশ্য ইতিহাস বদলাবে না। বুদ্ধদেব সরকারের যেসব ভুলভাল সিদ্ধান্ত নরেন্দ্র মোদি, শুভেন্দু অধিকারীদের অক্সিজেন জুগিয়েছে তার অন্যতম হল কলকাতা থেকে তসলিমা নাসরিনকে বিদায় নিতে বাধ্য করা। হাতে ২৩৫ জন বিধায়ক আর তিরিশের বেশি সাংসদ থাকা সত্ত্বেও, দিন দুয়েকের কলকাতাকেন্দ্রিক অশান্তিতে যদি কোনও সরকারের মনে হয়ে থাকে যে একজন সাহিত্যিককে নিরাপত্তা দিতে তারা অপারগ এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সামলে উঠতে পারবে না, তাহলে সেই সরকার অযোগ্য। জ্যোতি বসুর আমলে ভারতজুড়ে শিখ গণহত্যার সময়ে এ রাজ্যে কেউ ট্যাঁ ফোঁ করতে পারেনি, বাবরি মসজিদ ভাঙা-পরবর্তী দাঙ্গাও পশ্চিমবঙ্গে লাগামছাড়া হতে পারেনি। সেখানে বুদ্ধবাবুরা একজন সাহিত্যিকের বিরুদ্ধে কিছু সংগঠিত অশান্তিতে ঘাবড়ে গেলেন এবং তাঁকে রাজ্যছাড়া করলেন। ফলে হিন্দুত্ববাদীরা দ্বিবিধ সুবিধা পেয়ে গেল। প্রথমত, পশ্চিমবঙ্গের গোটা মুসলমান সমাজ ভীষণ অসহিষ্ণু— এ-কথা প্রচার করার পরিসর তৈরি হয়ে গেল। দ্বিতীয়ত, বামপন্থীরা সংখ্যালঘু তোষণ করে, মুসলমান মৌলবাদীদের প্রশ্রয় দেয়— এ-কথা বলার জন্যেও চিরকালীন দৃষ্টান্ত হাতে এসে গেল। তসলিমা যে স্বমহিমায় তার আগে বহুবছর কলকাতায় ছিলেন, সেই সত্য সম্পূর্ণ অর্থহীন হয়ে গেল। আজ দেখা যাচ্ছে অনেকের সে-কথা মনেই নেই। না থাকা দোষেরও নয়। এক বালতি দুধে এক ফোঁটা চোনা ফেলে দেওয়ার পর কাটা দুধ আগে ভালো ছিল বলে বিক্রি করতে গেলে কেউ কিনবে না। যে সময়ে দিল্লি, মুম্বইতে শিবসেনার হুমকিতে ভারত-পাকিস্তান টেস্ট ম্যাচ হতে পারত না সেইসময় এই কলকাতাতেই যে ম্যাচ হয়েছে, বা এই বামফ্রন্ট সরকারই যে কাশীতে শুটিং করতে না পারা চলচ্চিত্র পরিচালক দীপা মেহতাকে কলকাতায় শুটিং করলে নিরাপত্তার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল— সেই সত্য তসলিমার বিতাড়নে নতুন অর্থ পরিগ্রহ করে। হিন্দুত্ববাদীদের পক্ষে বলা সহজ হয়ে যায় যে ওগুলো ধর্মনিরপেক্ষতার লক্ষণ নয়। কমিউনিস্টরা আসলে হিন্দুবিরোধী, তাই ওগুলো করেছিল। বাকস্বাধীনতার পক্ষে বলে করেনি।

এই পর্যন্ত মানতে অসুবিধা আজকের সাহিত্যিক, শিল্পী, বাকস্বাধীনতাপ্রেমী নাগরিকদের প্রায় কারও নেই দেখা যাচ্ছে। কিন্তু এসব বুঝেও কী করে যে তসলিমার এতদিন পরে কলকাতায় আগমনকে বাকস্বাধীনতার জয় বলে অভিনন্দিত করা যাচ্ছে তা বোঝা দায়। তাঁকে ফিরিয়ে এনেছে কারা এবং কী উদ্দেশ্যে, তা নিয়ে সংশয়ের অবকাশ কী করে থাকছে? যে-ই আনুক, যে উদ্দেশ্যেই আনুক— এটা আপাতদৃষ্টিতে ভারি উদার যুক্তি মনে হলেও, আসলে হাস্যকর। যাদের অধীনে থাকা সাহিত্য আকাদেমি এমএম কলবুর্গির মতো লেখকের হত্যার কোনও নিন্দা করেনি, যারা অপছন্দের কথা লেখার জন্যে (সিদ্দিক কাপ্পানের ক্ষেত্রে, স্রেফ লিখতে পারে ভেবেই) সারা দেশে বহু সাংবাদিককে গ্রেপ্তার করে কঠোরতম আইনে মামলা ঠুকে দিনের পর দিন কারাবন্দি করে রাখে, যারা তাদের অপছন্দের কথা সোশাল মিডিয়ায় পোস্ট করার জন্যে নিত্য লেখক, শিল্পীদের বিরুদ্ধে এফআইআর দায়ের করছে, এমনকি দলবদ্ধভাবে বাড়ি গিয়ে ভয়ও দেখাচ্ছে, তারাই আজ পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতায়। সেই দল তসলিমাকে কলকাতায় ফিরিয়ে নিয়ে এসেছে বাকস্বাধীনতায় বিশ্বাস করে বলে, রাজনৈতিক অ্যাজেন্ডার স্বার্থে নয়— এ-কথায় কেন বিশ্বাস করতে হবে? বা উদ্দেশ্য সেটা হলেও ব্যাপারটা ভালো— এ-কথারই বা মানে কী? তাহলে আগামীকাল তালিবানরা যদি অরুন্ধতী রায়কে কাবুলে ডেকে সংবর্ধনা দেয়, আমরা তালিবানদের প্রশংসা করব? বলব, উদ্দেশ্য যা-ই হোক, ব্যাপারটা ভালো?

তা-ই করব হয়তো, কারণ আমাদের সাহিত্যিক, শিল্পীরা তো সেরকমই। তাঁরা একেবারে আজকের জয় গোস্বামীর মতই, ক্ষমতাসীনের বিরুদ্ধে মুখ খোলেন সে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর। অন্তত ২০১১ সালের পর থেকে তাই। ২০১৫ সালে যখন সারা ভারতের শিল্পী, সাহিত্যিকরা কেন্দ্রীয় সরকারের কাছ থেকে পাওয়া পুরস্কার ফিরিয়ে দিচ্ছিলেন তথাকথিত গোরক্ষকদের হাতে গণপিটুনিতে হত্যা; কলবুর্গি, নরেন্দ্র দাভোলকরের মতো মানুষের হত্যা এবং তা নিয়ে সাহিত্য আকাদেমির মতো সংস্থাগুলোর নীরবতার প্রতিবাদে, তখন এই বাংলা থেকে কেবল মন্দাক্রান্তা সেন পুরস্কার ফিরিয়ে দিয়েছিলেন। আর জ্ঞানপীঠ পুরস্কার নিতে গিয়ে নিজের প্রতিবাদ জ্ঞাপন করেছিলেন প্রয়াত শঙ্খ ঘোষ। আজ তসলিমার নামে জয়ধ্বনি করা, আনন্দবাজারের প্রথম পাতায় তাঁর গুণগান করা জয় গোস্বামীই বা কোথায় ছিলেন আর বাকিরাই বা কটা মিটিং, মিছিল করেছিলেন? আচ্ছা, জাতীয় স্তরের ব্যাপারস্যাপার থাক। তসলিমাকে ফেরানোর দাবিতেই বা কটা মিটিং, মিছিল হয়েছিল তৃণমূল কংগ্রেস সরকারের আমলে? জয়-সহ কত গুণীজনই তো মমতা ব্যানার্জির ঘনিষ্ঠ ছিলেন, তখন উদ্যোগ নেননি কেন? আজ জয় বলছেন, আরও অনেকেই বলছেন, তাঁরা নাকি চুপ করে থাকতে বাধ্য হয়েছিলেন হুমকি সংস্কৃতির কারণে। তাহলে সোজা মেনে নিলেই তো হয়— আমরা ভীতু, তাই মুখ খুলতে পারব না। আবার তত্ত্বায়নের দরকার কী? কালের নিয়মে যখন বিজেপি সরকার চলে যাবে, তখন আবার বাকস্বাধীনতার ধ্বজাধারী শিল্পী, সাহিত্যিক, সাহিত্যপ্রেমীরা বলবেন না তো “আমাদের দিয়ে জোর করে তসলিমা বন্দনা করানো হয়েছিল?”

তসলিমা কলকাতায় আসার পর থেকে অভ্যর্থনা আর শেষ হচ্ছে না। সম্ভবত রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নোবেল পুরস্কার নিয়ে দেশে ফেরার পরে বা স্বামী বিবেকানন্দ শিকাগো বক্তৃতা দিয়ে ফেরার পরেও এই শহরে এরকম লাগাতার অভ্যর্থনার ব্যবস্থা হয়নি। জয়কে দুয়ো দিয়ে যারা মঞ্চ থেকে নামিয়ে দিয়েছে তারা যদি ভেবে থাকে বিরাট কাজ করেছে, তাহলে তারা নেহাতই বোকা। পরদিন পড়তে হয় নইলে পিছিয়ে পড়তে হয় যে কাগজ, তার প্রথম পাতার তসলিমামুখী কলামটা কিন্তু জয়ই লিখেছেন। একদা যে শহরে ছিলেন সে শহরে ফিরে এসেছেন বলে নামকরা পত্রিকার প্রচ্ছদকাহিনি হয়েছে কোনও কবির কবিতা— এমনটাই বা আমাদের অকাব্যিক যুগে কতবার কোন শহরে ঘটেছে? তসলিমার বেলায় কলকাতায় ঘটল। কলকাতার সংবাদমাধ্যমগুলোর অন্যতম খবর হয়ে গেছেন তসলিমা। তিনি স্রেফ কলকাতায় পা রাখতেই ধন্য হল ধন্য হল আমাদের বাঙালি জীবন। সমস্তটাই বাংলার মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত ভালোবাসা, সংবাদমাধ্যমের স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিক্রিয়া— এই যদি বিশ্বাস করতে হয়, তাহলে মা দুর্গা সত্যি, মহিষাসুর সত্যি, ক্যাপ্টেন স্পার্ক সত্যি।

আরও পড়ুন মঈন সম্পর্কে কুৎসিত বিদ্রূপে সন্দেহ জাগে, তসলিমা কি হিন্দুত্বের ট্রোজান ঘোড়া? 

এবার কেউ চোখ রাঙিয়েই বলতেই পারেন “তবে রে, এসব সত্যি না হলে সত্যিটা কী?” সবিনয়ে বলব, আজ্ঞে সত্যিটা হল তসলিমা এই বাংলায় একে একটি বিক্রয়যোগ্য ব্র্যান্ড, তার উপর ডবল ইঞ্জিন সরকার পশ্চিমবঙ্গকে যে ছাঁচে ঢালতে চায় তার পক্ষেও নিখুঁত। কারণ তিনি কেবল মুসলমান মৌলবাদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী চরিত্র নন। একবার টুইটারে ইংল্যান্ডের মুসলমান ক্রিকেটার মঈন আলি লম্বা দাড়ি রাখেন বলে তিনিও সন্ত্রাসবাদী হতে পারেন বলে রসিকতা করেছিলেন খাঁটি হিন্দুত্ববাদী কায়দায়। ইংল্যান্ডের খ্রিস্টান ক্রিকেটাররা দল বেঁধে প্রতিবাদ করায় বুঝতে পারেন বাড়াবাড়ি হয়ে গেছে। তখন টুইটটি মুছে দিয়ে দাবি করেন ওটা নাকি সারকাজম ছিল। বলা বাহুল্য, সে-কথা সত্যি হলে টুইট মুছে দেওয়ার দরকার ছিল না। যা-ই হোক, লম্বা দাড়ি মানেই মৌলবাদী, হিজাব বা বোরখা পরে মানেই মৌলবাদের শিকার— এগুলো আমার মতো পশ্চিমবঙ্গীয় ভদ্রলোকের খুব পছন্দের স্টিরিওটাইপ। অতএব তসলিমাকে দিয়ে সেইসব বয়ান বাঙালি সমাজে চারিয়ে দেওয়া সহজ হতে পারে, যেগুলো বাকি ভারত আস্তাকুঁড়ে ফেলে দিচ্ছে ক্রমশ। সাম্প্রতিক ‘জেন জি’ আন্দোলন তার প্রমাণ।

সুতরাং তসলিমার আগমন, জয়ের গমন— সবই রাজনৈতিক। আমরা যে খুবই কালচারাল জাতি তা দুনিয়াসুদ্ধ লোক জানে। নইলে বিপুল উৎসাহে ঠিক অন্য সংস্কৃতি দ্বারা আক্রান্ত হওয়ার যুগেই রামমোহন, বিদ্যাসাগর, রবীন্দ্রনাথের মতো আইকনদের ক্যানসেল কালচারে ফেলে দিই? তাই করতে করতে এখন এমন হাল হয়েছে যে নেতাজি সুভাষচন্দ্র পড়েছেন জুতোর তলায়, আর তসলিমা চড়েছেন মাথায়। রাজনীতির ঊর্ধ্বে উঠে সাংস্কৃতিক হওয়ার চেষ্টা অন্তত এবারটা না করলেই নয়?

চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম ওয়েবসাইটে প্রকাশিত

সঠিক সময়ে ইনিংসের সমাপ্তি ঘোষণা করলেন সোবার্স

যতই অমর বলি, পাঁচ বছর পরে সোবার্সকে ক’জন ক্রিকেটপ্রেমীর মনে থাকবে সন্দেহ আছে। শচীন, কোহলি, রুটদের ৩০-৪০ হাজার রানের পাশে সোবার্সের আর কী দাম? অলরাউন্ডার হিসেবে কপিলদেব, ইয়ান বোথাম, রিচার্ড হেডলি, ইমরান খান তো ছিলেনই; এখন জাদেজাও ৪০০০ রান আর সাড়ে তিনশো উইকেট নিয়ে ফেলেছেন। কপিলদের সময়ে কিন্তু সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত ছিল— অলরাউন্ডার হিসাবে সবার ওপরে স্যর গ্যারি। বাকি সবাই তাঁর নীচে। কারণ তখন ক্রিকেটার, দর্শক, সাংবাদিক বা ধারাভাষ্যকার— কেউ-ই খেলাটাকে এক্সেল শিট মনে করতেন না।

খেলাধুলোর ইতিহাস বলে আগামিদিনে কিছু থাকবে কি না জানি না, কারণ এখন ইতিহাসকে ‘নস্ট্যালজিয়া’ বলে দেগে দিয়ে বর্তমানের সবকিছুকেই সর্বকালের সেরা বলার যুগ। এ-যুগের সঙ্গে মানিয়ে নিতে আমার মতো চল্লিশোর্ধ্বদের বেশ অসুবিধে হয়। আমার বাড়াবাড়ি রকমের দুষ্টু বন্ধুদের পাড়ার জ্যাঠামশাই থেকে স্কুলের মাস্টারমশাই প্রকাশ্যে ‘হনুমান’ বলে অপমান করতেন। এখন সেই বন্ধুরা ভাবে ‘একবার যদি দিনগুলো ফিরে পাই, স্যরদের দেখে নেব।’ আমি অঙ্ক ভুল করে কানমলা খেয়ে ধমক শুনতাম ‘ছাগল’। এখন দেখছি, কাউকে ছাগল বলে না মানলে তাকে অপমান করা হয়। আমরা জানতাম A for apple, B for bat যেমন, তেমনই G for goat। এখন দেখি ছোটবেলায় শেখা ইংরেজি ব্যাকরণের নিয়ম লঙ্ঘন করে লিখতে হয় GOAT. কিন্তু সেকথার ছাগল ছাড়াও একটা গূঢ়তর, বৃহত্তর অর্থ আছে— সর্বকালের সেরা (Greatest of All Time)। তাই সকল ভক্তকুল নিজেদের পছন্দের খেলোয়াড়কেই ছাগল বলে প্রমাণ করতে ব্যস্ত।

অবশ্য ব্যাপারটা ভক্তকুলের মাথায় ঢুকিয়ে দিতে বহুজাতিক ব্যবসায়িক সংস্থা আর গণমাধ্যমের ভূমিকা অতুলনীয়। যে ফুটবলারকে দিয়ে বিজ্ঞাপন করালে সবচেয়ে বেশি জিনিস বিক্রি হয়, তাঁকে ছাগলের সঙ্গে বসিয়ে ফটোশুট, মাঠের মধ্যে তাঁর ছায়া হিসাবে একখানা ছাগলের ছায়া দেখিয়ে ছবি তৈরি— সুচারু ব্যবস্থা। ক্রিকেটের ক্ষেত্রে ব্যাপারটা আরও নিদারুণ। গোটের ছড়াছড়ি। সব ধরনের ক্রিকেট মিলিয়ে নাকি বিরাট কোহলি গোট, একদিনের ক্রিকেটে নাকি রোহিত শর্মা গোট, রবিচন্দ্রন অশ্বিন অবসর নেওয়ার সময়ে শুনলাম তিনিও গোট, ইদানীং শোনা যায় অলরাউন্ডার হিসাবে রবীন্দ্র জাদেজা গোট, এমনকী, মাঝেসাঝে খেলে এক-আধটা ম্যাচ জিতিয়ে দিলে কয়েক ঘণ্টার জন্যে হার্দিক পান্ডিয়াও গোট হয়ে যান। এর ওপর আছেন ‘ইউনিভার্স বস’ ক্রিস গেল এবং ‘গড’ শচীন তেন্ডুলকর। মানে ক্রিকেট মাঠে দিন-দিন মানুষই সংখ্যালঘু হয়ে যাচ্ছে। এমন দিনে কি তারে বলা যায় যে, গ্যারি সোবার্স বলে একজন রক্তমাংসের মানুষ ছিলেন, যিনি যখন আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে অবসর নেন তখন টেস্ট ক্রিকেটে এক ইনিংসে সর্বোচ্চ রানের রেকর্ড (৩৬৫) তাঁর দখলে, ওয়েস্ট ইন্ডিজের হয়ে মোট সর্বোচ্চ রানও তাঁর?

শুধু তাই নয়, ৯৩ খানা টেস্ট খেলে প্রায় ৫৮ গড় ধরে রাখার রেকর্ড আজও খুব বেশি ক্রিকেটারের নেই। এই ২০২৬ সালেও গড়ের দিক থেকে তিনি টেস্টের ইতিহাসে ১১ নম্বরে। কিন্তু ওপরের দশজনের চারজন ৩০ খানা টেস্টও খেলেননি। এদিকে অবসরের সময়ে সোবার্স ছিলেন ওয়েস্ট ইন্ডিজের হয়ে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ উইকেট শিকারী (লান্স গিবসের পরেই)। কী বল করতেন? আঙুলের কারিকুরিতে স্পিন, কবজির মোচড়ে স্পিন, সুইং, সিম— এককথায় যতরকম বোলিং সম্ভব। এখানেই শেষ নয়। স্লিপে আর ফরোয়ার্ড শর্ট লেগে তাঁর মতো ফিল্ডারও ক্রিকেটের ইতিহাসে খুব বেশি আসেনি।

পরিসংখ্যানের খাতিরে বলা যেতে পারে, তিনি টেস্টে ১০৯ খানা ক্যাচ নিয়েছিলেন, তার চেয়ে বেশি ক্যাচ সেইসময় একমাত্র কলিন কাউড্রে আর ওয়াল্টার হ্যামন্ডের ছিল। কিন্তু ওই পরিসংখ্যান আসল কথা নয়। অমন ফিল্ডার যে বিরল, সেকথা বলেছেন কারা? যাঁরা সোবার্সের খেলা দেখেছেন, তাঁরা, যাঁরা ওঁর সঙ্গে বা বিরুদ্ধে খেলেছেন, তাঁরাও। তিনি ওয়েস্ট ইন্ডিজের হয়ে খেলা ছেড়েছেন ১৯৭৪ সালে। স্বভাবতই তাঁর খেলার খুব বেশি ভিডিও সংরক্ষিত নেই। কিন্তু আমরা ভুলে যাই, ভিডিও আবিষ্কারের আগে, দিনরাত যাবতীয় খেলার সরাসরি সম্প্রচারের আগেও পৃথিবীর অস্তিত্ব ছিল। তখনও মানুষ প্রেম করত, সন্তানের জন্ম দিত, তাকে বুক দিয়ে লালন করত, ছবি আঁকত, কবিতা লিখত, গান গাইত এবং খেলাধুলো করত। কারণ এসব করতে ভাল লাগত। যারা দেখত, তারাও ভাল লাগত বলেই দেখত। আর যা দেখতে ভাল লাগে, তা মানুষ শতমুখে বলে এবং লিখে অন্যকে জানায়। তাই ব্র্যাডম্যান, সোবার্স, পেলে, রড লেভার, দিয়েগো মারাদোনাদের মহত্ত্বের লিখিত ইতিহাস আছে। তাঁদের কেউ গোট বলত না, কারণ কে সবার সেরা— তা নিয়ে কারও মাথাব্যথা ছিল না।

খেলার প্রাথমিক উদ্দেশ্য আনন্দ পাওয়া— যে খেলে তার পক্ষেও, যে দেখে তার পক্ষেও। তারপর আসে স্কোরবোর্ড, হার-জিতের হিসেব। তারও পরে আসত খেলাকে ঘিরে ব্যবসা। সেটা মন্দ নয়, কারণ খেলা যদি খেলোয়াড়দের পারিশ্রমিক দিতে পারে, তাহলে তাঁরা আরও মন দিয়ে খেলতে পারবেন। কিন্তু সোবার্স যে যুগের ক্রিকেটার, তখন ক্রিকেট নিয়ে ব্যবসা হত, ব্যবসার জন্যে ক্রিকেট হত না। ব্র্যাডম্যান, সোবার্সদের ব্র্যান্ড হয়ে ওঠার তাগিদ ছিল না। তাঁদের ব্র্যান্ড করে তোলার জন্যে পাকা মাথার লোকেরা দিবারাত্র লেগেও থাকত না। ফলে দর্শক, সাংবাদিক, সমালোচক— সকলের কাছেই মুহূর্তের মূল্য ছিল, সৌন্দর্যের দাম ছিল। অতি সফল অলরাউন্ডার সোবার্সের জন্য সবাই পাগল হত, কিন্তু জর্জ হেডলি বা রয় ফ্রেডরিক্সকেও কেউ ভুলত না। যে-দল হেরে গেল, সে-দলের ক্রিকেটারদের জন্যও জয়ী দলের সমর্থকদের ভালবাসা থাকত।

সে-যুগের লোক বলেই সোবার্স ওরকম ঝুঁকি নিতে পারতেন, যা নিয়েছিলেন ওয়েস্ট ইন্ডিজ অধিনায়ক হিসাবে ১৯৬৮ সালে পোর্ট অফ স্পেনে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে চতুর্থ টেস্টে। তিনি এমন এক সময়ে দ্বিতীয় ইনিংসের সমাপ্তি ঘোষণা করেন, যখন ইংল্যান্ডকে ঘণ্টাদুয়েক ব্যাট করতে হবে আর জিততে গেলে দরকার মাত্র ২১৫ রান। সোবার্সের ধারণা ছিল, ইংল্যান্ড ওইটুকু সময়ও টিকতে পারবে না, ওয়েস্ট ইন্ডিজ জিতে যাবে। কিন্তু কাউড্রের ইংল্যান্ড অনায়াসে সাত উইকেটে জেতে। কেন ওই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন? ‘দ্য গার্ডিয়ান ’ কাগজে সোবার্সকে নিয়ে লিখতে গিয়ে ভিক মার্কস জানিয়েছেন, সোবার্সের উত্তর ছিল, ‘সিরিজটা বড্ড বোরিং ছিল। প্রথম তিনটে টেস্ট ড্র হয়েছিল। ইংল্যান্ড ঘণ্টায় ১২-১৩ ওভার করে বল করছিল। আমি ভীষণ হতাশ হয়েছিলাম। আমি ক্রিকেট বলতে যা বুঝি, ওটা তা নয়।’ ব্রেন্ডন ম্যাককালাম আর বেন স্টোকসের টেস্ট ক্রিকেট নিয়ে পরীক্ষানিরীক্ষা যেভাবে দর্শকদের আশীর্বাদ পেলেও ক্রিকেটমহলে সমালোচিত হয়েছে, তাতে বোঝা যায়— পৃথিবী বদলে গেছে। এখানে জেতাটাই বড় কথা, কারণ জয়ই বিক্রয়যোগ্য। পরাজয় নয়। জয়ীই ব্র্যান্ড হয়। তাই সারাক্ষণ তর্ক লাগিয়ে রাখতে হবে— মেসি গোট, না রোনাল্ডো? বিরাট গোট, না জো রুট? কখনও বিশ্বকাপ না জেতা জোহান ক্রুয়েফ বা অতি সামান্য টেস্ট খেলতে সুযোগ পাওয়া ব্যারি রিচার্ডসকে সর্বকালের সেরাদের আলোচনায় আনা যাবে না। তাছাড়া কোনওমতেই যা করা যাবে না, তা হল অতীতের কেউ বর্তমানের কারও চেয়ে মহান খেলোয়াড় ছিলেন, তা বলা। কারণ ওটা বিপণনবিরোধী ব্যাপার। কোনও কোম্পানি কি তার এখনকার ঠান্ডা পানীয়ের বিজ্ঞাপনে বলতে পারে ‘এই যেটা বের করেছি এটা ভাল, তবে আগেরটা আরও ভাল ছিল?’ খেলাকে এবং সফল খেলোয়াড়কে বিক্রি করাই আজকের খেলার উদ্দেশ্য। তাঁদের ব্যবহার করে যত বেশি সম্ভব বিজ্ঞাপন দেখানোই উদ্দেশ্য। তাই আইপিএলে আছে ‘টাইম আউট’, ফুটবল বিশ্বকাপে ‘হাইড্রেশন ব্রেক।’ কুড়ি-বাইশ ডিগ্রি তাপমাত্রায় সন্ধে-রাতের খেলায় মিনিট কুড়ি অন্তরই নাকি খেলোয়াড়দের বিরতির দরকার হচ্ছে।

ব্যাপারটা সব খেলাতেই হচ্ছে, দুদ্দাড় করে সব রেকর্ড ভেঙে যাচ্ছে। কাল যে রেকর্ডকে মনে হত ধরাছোঁয়ার বাইরে, আজ সে রেকর্ড ধুলোয় লুটোচ্ছে। শচীনের একদিনের ক্রিকেটে শতরানের রেকর্ড বিরাট ভেঙে দিয়েছেন। সে-রেকর্ড হয়তো আর ভাঙবে না, কারণ খেলাটাই থাকবে না। কিন্তু কুড়ি ওভারের ক্রিকেটে রেকর্ড ভাঙাগড়ার খেলা চলছেই। আইপিএলে বৈভব সূর্যবংশী এক মরশুমেই সবথেকে বেশি ছয়, অভিষেক হওয়া খেলোয়াড় হিসেবে সবথেকে বেশি রান, সবচেয়ে কম বয়সে ৭০০-র বেশি রান আর এক মরশুমে সবচেয়ে বেশি পুরস্কার জেতার রেকর্ড ভেঙে দিয়েছেন। আর্লিং হাল্যান্ড যেভাবে এগোচ্ছেন, তাতে অনেকে মনে করছেন মেসির গোল করার যাবতীয় রেকর্ডও তিনি ভেঙে দিতে পারেন। খেলা যেহেতু আর প্রাথমিকভাবে আনন্দ পাওয়ার, সৌন্দর্যের রসাস্বাদন করার জিনিস নেই, তাই খেলোয়াড়দের মহত্ত্বের মাপকাঠি হয়ে গেছে পরিসংখ্যান। যাঁর পরিসংখ্যান দুর্দান্ত নয় বা পাওয়া যায় না, তাঁরা সর্বকালের সেরাদের আলোচনায় ঢুকতে পারেন না। তাই ক্রিকেটে গোটের আলোচনায় কখনও অ্যাডাম গিলক্রিস্ট বা অ্যালান নট আসেন না। ফুটবলের গোটের আলোচনায় লেভ ইয়াশিন বা গর্ডন ব্যাংকস, ববি মুর, ফ্রাঞ্জ বেকেনবাওয়ার বা ফ্র্যাংকো বারেসির নাম আসে না।

আরও পড়ুন বেদি আর ববিকে ভোলা বিবেকের কাছে অপরাধ

সুতরাং, যতই অমর বলি, পাঁচ বছর পরে সোবার্সকে ক’জন ক্রিকেটপ্রেমীর মনে থাকবে সন্দেহ আছে। শচীন, কোহলি, রুটদের ৩০-৪০ হাজার রানের পাশে সোবার্সের আর কী দাম? অলরাউন্ডার হিসেবে কপিলদেব, ইয়ান বোথাম, রিচার্ড হেডলি, ইমরান খান তো ছিলেনই; এখন জাদেজাও ৪০০০ রান আর সাড়ে তিনশো উইকেট নিয়ে ফেলেছেন। কপিলদের সময়ে কিন্তু সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত ছিল— অলরাউন্ডার হিসাবে সবার ওপরে স্যর গ্যারি। বাকি সবাই তাঁর নীচে। কারণ তখন ক্রিকেটার, দর্শক, সাংবাদিক বা ধারাভাষ্যকার— কেউ-ই খেলাটাকে এক্সেল শিট মনে করতেন না। আসলে বিপণনের লোকেদের এক্সেল শিটই দরকার। সব খেলাই এখন বিলিয়ন ডলারের ব্যবসা, তাই সব খেলাতেই ব্র্যান্ড নির্মাণ আর এক্সেল শিট তৈরি চলছে সচেতনভাবে। খেলার সৌন্দর্যকে (এবং মহান অনিশ্চয়তাকে) মারো গুলি। টেনিস নিয়ে এই কথা ক’দিন আগে বলেছেন স্বয়ং রজার ফেডেরার। এক পডকাস্টে তিনি বলেছেন, সমস্ত প্রতিযোগিতায় কোর্ট অল্পবিস্তর একইরকম করে দেওয়া হচ্ছে, বলও। যাতে শেষমেশ ফাইনালে পৌঁছন কার্লোস আলকারাজ আর ইয়ানিক সিনার। ঘাসের কোর্ট, হার্ড কোর্ট, ক্লে কোর্টে টেনিস খেলার আলাদা চ্যালেঞ্জ ক্রমশ মুছে যাচ্ছে। ব্যাপারটা বদলানো দরকার।

তাই বলতে হবে, সোবার্স এবারে সঠিক সময়ে ইনিংসের সমাপ্তি ঘোষণা করেছেন। আগামী ২৮ তারিখ নব্বইয়ে পা দেওয়ার কথা ছিল, নির্ঘাত অনেকেই সেদিন তাঁর শতায়ু কামনা করতেন। কিন্তু শততম জন্মদিনে কি আর কেউ স্মৃতিচারণ করত, বিশ্ব একাদশের হয়ে অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে ১৯৭১-’৭২ মরশুমে ডেনিস লিলিকে তছনছ করে দেওয়া ২৫৪ রানের কথা? ও জিনিসের মূল্য দিতে গেলে তো বুঝতে হবে, লিলি কেমন ছিলেন? আজকের প্রজন্ম তো পরিসংখ্যান দেখে বলবে— টেস্ট ক্রিকেটে সর্বোচ্চ উইকেট শিকারীদের তালিকায় লিলি অনেক নীচে। তাঁকে পেটানো আর এমন কী ব্যাপার? লিলির গতি বা সোবার্সের স্ট্রোকের শৌর্য ও সৌন্দর্য আলোচ্যই নয়।

‘ম্যায় ওয়াপস আউঙ্গা’ একটা না-হওয়া বাংলা ছবি

নির্বৈর পূর্বপুরুষের প্রেম সন্ধান করতে করতে পাপেরও হদিশ পেয়েছে। আমারও সেই দশা। খুলে বলি।

প্রিয় ইমতিয়াজ,

আপনার নতুন ছবি দেখতে যাওয়ার মূল কারণ ছিল প্রেম। প্রেমের গল্প পড়তে ভালো লাগে, প্রেমের সিনেমা দেখতে ভালো লাগে এবং রোম্যান্টিক সিনেমা বানানোয় আপনার দক্ষতা প্রশ্নাতীত। জব উই মেট তো আমার প্রজন্মের অনেকের কাছে একান্ত ব্যক্তিগত ছবি। সেই কারণে বলিউডের যুদ্ধের বাজারে আপনি প্রেমের ছবি বানিয়েছেন জেনেই দেখার ইচ্ছে হয়েছিল। যাদের রুচিকে ভরসা করি, তারা অনেকে দেখে এসে প্রশংসা করায় দেখার ইচ্ছে আরও বেড়েছিল। একটু-আধটু লিখি এবং লিখলে কেউ কেউ মন দিয়ে পড়ে, তাই ছবিটা দেখে লিখব বলেও ভেবে রেখেছিলাম। কিন্তু ম্যায় ওয়াপস আউঙ্গা দেখতে গিয়ে সব গোলমাল হয়ে গেল। মানে ভেবেছিলাম, যেভাবে আর পাঁচটা ছবি নিয়ে লিখে এসেছি এতদিন, সেভাবেই চুলচেরা বিচার করব। প্রবাদপ্রতিম নাসিরুদ্দীন শাহের অভিনয়, এ আর রহমানের সেই রোজা (১৯৯২) ছবির মত অপাপবিদ্ধ সঙ্গীত, তরুণ ও নয়নাভিরাম নায়ক-নায়িকা (বেদাঙ্গ রায়না ও শর্বরী ওয়াঘ) আর দিলজিৎ দোসাঞ্জের ‘দিল’ জিতে নেওয়া অভিনয়, প্লেব্যাক শিল্পীদের প্রতি (বিশেষত দীপালি সহায়ের প্রতি) আমার মুগ্ধতা, আপনার গল্প বলার চিরাচরিত মুনশিয়ানা ইত্যাদি নিয়ে লিখব। কিন্তু সেটা আর সম্ভব নয়, কারণ এ ছবি অত্যন্ত ব্যক্তিগত হয়ে দাঁড়িয়েছে। সুতরাং ব্যক্তিগত কথাগুলোই বলা যাক। বাংলা ভাষার সুবিধা হল, এ চিঠি আপনার কাছে পৌঁছবে না। অতএব আপনাকে বলার অছিলায়, যাদের কাছে পৌঁছবে তাদের সঙ্গে কিছু ব্যক্তিগত অভিমত ভাগ করে নেওয়া, তাদের ভাবনাকে উস্কে দেওয়াই আসল উদ্দেশ্য। কিন্তু প্রেম ঢেলে দেওয়ার জন্যে যেমন একজন পাত্র লাগে, তেমন মনের কথা খুলে বলতেও একজন পাত্র লাগে। তাই আপনাকে খাড়া করা।

ছবির ক্রেডিট রোল হওয়া শুরু হতেই ১৯৯০-৯১ সালের কথা মনে পড়ে গেল, বুঝলেন? তখন আমার বয়স ৮-৯ বছর। একদিন গভীর রাতে বাবা টিভি চালিয়েছেন সিনেমা দেখবেন বলে। আমিও সিনেমার আকর্ষণে জেগে রয়েছি (সদ্য দ্বিতীয়বার মা হওয়ায় আমার মা আমাকে বকে ঘুম পাড়ানোর অবস্থায় নেই, বাবা বরাবর প্রশ্রয়দাতা)। ছবিটা বাংলা, কিন্তু সিনেমার শুরুতে নাম দেখানোর সময়ে নারীকণ্ঠে ঝাঁ ঝাঁ করে এমন একখানা গান বেজে উঠল, যে ধরনটা আমার একেবারে অপরিচিত। তার কথাগুলো

আমের তলায় ঝামুর ঝুমুর
কলাতলায় বিয়া
আইলেন গো সুন্দরী জামাই
মুটুক মাথায় দিয়া।

সঙ্গে উলুর শব্দ ছিল, বাবাও বললেন— এটা বিয়ের গান, সাবেকি বাঙালি বিয়ের গান। ছবিটা পুরো দেখেছিলাম, কিন্তু বিশেষ বুঝতে পারিনি তখন। কিন্তু অবাক হয়েছিলাম, দুটো কারণে— ১) বাবা ছবিটা দেখতে দেখতে কাঁদলেন, ২) ছবিটায় কোনো বিয়ের দৃশ্য নেই। তাহলে শুরুতে বিয়ের গান কেন?

এই প্রশ্নের উত্তর পেতে আমাকে অপেক্ষা করতে হয়েছিল বারো বছর, আমাদের বাংলা মতে এক যুগ। আমি তখন কলেজের ছাত্র। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের আবশ্যিক বাংলার পাঠ্যবইতে ঋত্বিক কুমার ঘটকের একখানা প্রবন্ধ ছিল, যার শিরোনাম ‘আমার ছবি’। উনিই ছোটবেলায় প্রথম দেখা সেই ছবির পরিচালক। ওই লেখায় তিনি ব্যাখ্যা করেছেন যে শুরুতেই বিয়ের গান রেখেছিলেন, কারণ তাঁর অন্তরের অভিলাষ— আলাদা হয়ে যাওয়া দুই বাংলার মিলন হোক। বিয়ে মানেই তো মিলন। এই ছবিটা— কোমল গান্ধার (১৯৬১)— নির্ঘাত আপনার দেখা। নইলে আপনার ছবিতে বিভক্ত পাঞ্জাব প্রেমিক-প্রেমিকার (ঈশার আর আফসানা) না-হওয়া বিয়ের প্রতীক হয়ে দাঁড়ায় কেমন করে? যে মিলন হল না, তা নিয়েই তো আপনার আখ্যান। ঋত্বিক যে বাসনা বিমূর্ত রেখেছিলেন, তা-ই যেন আপনার ছবিতে মূর্ত হয়ে উঠেছে।

কাঁচা বয়সের বুক টনটন করা প্রেম, টিন্ডার/বাম্বল যুগের বাঁধন এড়াতে চাওয়া প্রেম, বুকের গভীরে সারাজীবন প্রদীপের মত জ্বালিয়ে রাখা প্রেম— সবই আপনি দেখিয়েছেন একেবারে জ্যান্ত করে। সে প্রত্যাশা আপনার কাছে ছিলই। কিন্তু আপনি যে ঘৃণা পেরিয়েও প্রেমের বেঁচে থাকার ক্ষমতা আছে বলে দেখাবেন, তা-ও আবার দেশভাগের সময়কার বীভৎস সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার অনুপুঙ্খ উল্লেখ সমেত— এতটা কল্পনা করিনি। আসলে পূর্বপুরুষের প্রেমের সন্ধানে বেরিয়ে পড়া নির্বৈর সিং গ্রেওয়ালের যুগে দাঁড়িয়ে, ঘৃণার পর্ব পেরিয়েও যে প্রেম টিকে থাকে— এই বিশ্বাস রাখা আমাদের পক্ষে ক্রমশ কঠিন হয়ে দাঁড়াচ্ছে। কে যেন বলেছিলেন, হলোকস্ট দেখার পরে আর কবিতা লেখা যায় না? গরুর জন্যে মানুষ হত্যা দেখার পরে, গাজা দেখার পরেও কি আর প্রেমে বিশ্বাস রাখা যায়? আপনি রেখেছেন, তাই ম্যায় ওয়াপস আউঙ্গা যে এক সিংহহৃদয় ছবি তা স্বীকার করতে কোনো দ্বিধা নেই। তবে সব ভালোলাগা পেরিয়েও বাঙালি হিসাবে আপনার ছবি আমার মধ্যে গভীর হতাশার জন্ম দিয়েছে। নির্বৈর পূর্বপুরুষের প্রেম সন্ধান করতে করতে পাপেরও হদিশ পেয়েছে। আমারও সেই দশা। খুলে বলি।

আপনি যে পাঞ্জাবি উদ্বাস্তু আর বাঙালি উদ্বাস্তুদের যন্ত্রণাকে একই নজরে দেখেন তার পর্যাপ্ত প্রমাণ এই ছবিতে রেখেছেন। একটা নিদারুণ গানে চার লাইন বাংলা রেখেছেন, স্টক শটে বাঙালি উদ্বাস্তুদের দেখিয়েছেন তো বটেই, এমনকি ট্রেনে সরগোধা ত্যাগ করে গ্রেওয়াল পরিবারের সীমান্তের এপারে চলে আসার সময়কার সাদাকালো শটগুলো দেখলে নিমাই ঘোষের ছিন্নমূল (১৯৫০) মনে পড়তে বাধ্য। আর এখানেই আমার হতাশা। দেশভাগের যে অলীক, হাস্যকর অথচ বীভৎস বাস্তবতা আপনি পর্দায় তুলে এনেছেন তা কোনো বাংলা ছবিতে আজ পর্যন্ত দেখা যায়নি। আবার দেশভাগ কীভাবে পাঞ্জাবি হিন্দু, শিখ ও মুসলমানের প্রেম, সখ্য, পারিবারিক আত্মীয়তা ভেঙে খানখান করে দিয়েছিল, তাও কোনো বাংলা ছবির পরিচালক আজ পর্যন্ত দেখিয়ে উঠতে পারলেন না। ঋত্বিক আর নিমাই ছাড়া আর কোনো পরিচালক তো দেশভাগকে বিষয় হিসাবে পাত্তাই দিলেন না। বরিশালের মানুষ ঋত্বিক আস্ত ট্রিলজি বানিয়েছেন, কিন্তু সেগুলোও দেশভাগোত্তর ট্রমা নিয়ে। দেশভাগ ব্যাপারটা কেমন ছিল, তার আগেকার পূর্ববঙ্গের জীবন কেমন ছিল— সেসব তাঁর ছবিতেও পাই না। আমাদের সিনেমার আরেক দিকপাল, মৃণাল সেন, ফরিদপুরের মানুষ। তাঁর ফিল্মোগ্রাফিতেও দেশভাগ অনুপস্থিত। সত্যজিৎ রায়কে তবু এই যুক্তিতে কিছুটা ছাড় দেওয়া যায় যে তাঁর পূর্ববঙ্গের সঙ্গে যোগ ঠাকুর্দা উপেন্দ্রকিশোরের আমলেই প্রায় শেষ হয়ে গিয়েছিল। সত্যজিতের জন্ম ও বেড়ে ওঠা কলকাতায়। পূর্ববঙ্গের জীবন বা উদ্বাস্তু জীবন তাঁর উপলব্ধির বাইরে। আর বাংলা জনপ্রিয় সিনেমা? কোনো বিদেশি সেই সিনেমার ইতিহাস ঘাঁটলে জানতেই পারবে না যে দেশভাগ, বাংলা ভাগ বলে এত বড় একটা ব্যাপার কোনোদিন ঘটেছিল। আশ্চর্য! এই কারণেই ম্যায় ওয়াপস আউঙ্গা দেখতে দেখতে আমার পূর্বপুরুষদের উপরে রাগ হচ্ছিল, এই ছবিটা বাংলায় হয়নি বলে।

আরও পড়ুন হোমবাউন্ড: ফিরব বললে ফেরা যায় নাকি?

অথচ না হওয়ার কোনো কারণ ছিল না। আপনার ছবিতে প্রাক-দেশভাগ পর্ব যে প্রোগ্রেসিভ রাইটার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভা থেকে শুরু হয়, সেই সংগঠনে বাঙালিদের অংশগ্রহণও উল্লেখযোগ্য ছিল। মুনশি প্রেমচন্দ আজ থেকে বিশ-তিরিশ বছর আগে পর্যন্তও বাঙালি পাঠকের অত্যন্ত প্রিয় ছিলেন। উপরন্তু, যেসব বাঙাল পরিবারকে এক কাপড়ে চলে আসতে হয়েছিল পূর্ববঙ্গ ছেড়ে আপনার ছবির গ্রেওয়াল পরিবারের মত সিলুয়েট হয়ে, তাদের অনেকেরই যে মুজফফরের মত প্রতিবেশী ছিল তা কিন্তু পারিবারিক গল্পকথায় পাওয়া যায়। মুজফফররা ছিল বলেই আমাদের পূর্বপুরুষরা অনেকে প্রাণ হাতে করে হলেও এপারে চলে আসতে পেরেছিলেন। অথচ সেই প্রতিবেশীদের আমাদের সিনেমায় কোনোদিন দেখা গেল না। কেন গেল না? উত্তরটা অস্বস্তিকর। সম্ভবত ও জিনিস সত্যনিষ্ঠভাবে দেখাতে গেলে নির্বৈরের দাদুর প্রেমের মত আমাদের দাদুদের প্রেম নয়, পাপই উঠে আসত। ধরা পড়ে যেত এই সত্য যে, বাঙালি ভদ্রলোকেরা, যারা আমাদের সাহিত্য, নাটক, শিল্প, সঙ্গীত, ফটোগ্রাফি এবং সিনেমার চিরকালীন কর্ণধার, তাদের বাড়ির ছেলেমেয়েরা মুসলমানদের বিয়ে করা দূরে থাক, তাদের সঙ্গে প্রেম করার কথাও স্বপ্নে ভাবত না। মুসলমান প্রতিবেশীদের সঙ্গে সম্পর্কও যতটা প্রয়োজনের, ততটা প্রাণের ছিল না। ফলে আমাদের সিনেমায় কোনো আফসানা থাকা সম্ভব নয়।

অশোক মিত্র, বীণা দাস, অতীন বন্দ্যোপাধ্যায়দের আত্মজীবনীমূলক লেখায় আমাদের পূর্বপুরুষদের সেইসব পাপের সাক্ষ্য রয়েছে। অশোক লিখেছেন, কীভাবে তাঁর দোর্দণ্ডপ্রতাপ মামারা স্রেফ জমির আল দিয়ে হেঁটে আসার সময়ে বাবুদের দেখে আল থেকে নেমে না যাওয়ায় পেরেক বসানো কাঠ দিয়ে গরিব মুসলমান প্রজাকে পিটিয়েছিলেন। বীণা লিখেছেন, কীভাবে এক মুসলমান যুবতী তাঁকে শুনিয়ে দিয়েছিলেন যে হিন্দু বাড়িতে কুকুর বেড়াল পাতের কাছে গেলে সে ভাত খাওয়া চলে, কিন্তু মুসলমানের ছোঁয়া লাগলে চলে না। এই শতাব্দীর শুরুতে অতীন আজকাল কাগজের এক রবিবাসরীয় নিবন্ধে লিখেছিলেন, ছোটবেলায় দেখেছেন মুসলমান বন্ধুর ঠাকুমা গল্প করতে আসতেন তাঁর ঠাকুমার সঙ্গে। দুই পরিবারে সম্পর্কও ছিল জমাট। কিন্তু বন্ধুর ঠাকুমার জন্যে আলাদা একখানা পিঁড়ি ঠিক করা ছিল। স্বভাবতই আমাদের লক্ষ্মী ছেলে দাদুরা তাঁদের ভরা যৌবনে কোনো আফসানার প্রেমে পড়তেন না। এই যদি না হবে, তাহলে প্রফুল্ল রায়ের কেয়াপাতার নৌকো ছাড়া আমাদের সাহিত্যেই বা অবিভক্ত বাংলায় দুই সম্প্রদায়ের প্রেমের গল্প বিরল কেন? সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় ছাড়া আর কোনো জনপ্রিয় লেখকের লেখায় ওপার বাংলায় ছেড়ে আসা মুসলমান বাল্যবন্ধুর জন্যে দু ফোঁটা চোখের জল পাই না কেন? বাঙালদের পারিবারিক গল্পকথাতেই বা যত আফসোস ছেড়ে আসা জমিজমা পুকুর বা তুলসীমঞ্চের জন্য, তার সিকি ভাগ কোনো প্রতিবেশী বন্ধু বা প্রেমিকার সঙ্গে বিচ্ছেদ হয়ে যাওয়ার জন্যে নয় কেন?

ইমতিয়াজ, আপনি হয়তো জানেন না, কিছুদিন আগে পশ্চিমবঙ্গ ভারতে থেকে যাওয়ার কৃতিত্ব কার, তা নিয়ে গোল বেধেছিল আমাদের রাজ্যে। তখন বিখ্যাত ঐতিহাসিক পার্থ চট্টোপাধ্যায় সর্বাধিক বিক্রীত বাংলা দৈনিকে প্রকাশিত সুদীর্ঘ লেখায় দেখিয়ে দেন যে এতে আলাদা করে কারও কৃতিত্ব নেই। আসলে দুই বাংলার সংখ্যাগরিষ্ঠ বিধায়ক, হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে, বাংলা ভাগ করার পক্ষেই ভোট দিয়েছিলেন। অর্থাৎ বাংলা ভাগ আমাদের পূর্বপুরুষরা চেয়েছিলেন। এমন বললে নেহাতই সত্যের অপলাপ হবে যে আমাদের ছাপোষা পূর্বপুরুষরা চাননি, সিদ্ধান্তটা নেতারা চাপিয়ে দিয়েছিলেন। যদি তা-ই হত, তাহলে আজ পশ্চিমবঙ্গ দিবস আমাদের কাছে উদযাপনের বিষয় হত না, বরং কে কাণ্ডটার জন্যে দায়ী তা লুকিয়ে ফেলার চেষ্টা করতে হত নেতাদের। আসল কথাটা হল, উদ্বাস্তুদের যন্ত্রণা যেমন সত্যি, তাঁদের জাতভাইরাই যে বাংলা ভাগ চেয়েছিলেন তা-ও সত্যি। উপরন্তু, আমাদের পশ্চিমবঙ্গীয় সাংস্কৃতিক বয়ানে ব্যাপারটা একতরফা। এপার থেকেও যে ওপারে উদ্বাস্তু হয়ে চলে যেতে হয়েছিল মানুষকে, তাদের যন্ত্রণাও যে কম নয়, তা আমাদের সিনেমায় নেই। ওপারের প্রাক-স্বাধীনতা যুগের হিন্দু-মুসলমানের সম্পর্ক তো নেই-ই। এমনকি সাহিত্যেও, ও জিনিসটা আমরা ওপারের আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের লেখায় যত স্পষ্ট করে পাই, এপারের লেখকদের লেখায় পাই না। বাংলার কোনো সাদত হাসান মান্টো নেই ইমতিয়াজ। আপনাদের পাঞ্জাবিদের আছে। তাই আমাদের টোবা টেক সিংদের কথা কেউ লিখে রাখেনি। দেশভাগের পর্বে পাঞ্জাবের মেয়েদের মর্মন্তুদ কাহিনি যেভাবে আপনি আর আপনার সহলেখক নয়নিকা মাহতানি লিপিবদ্ধ করেছেন, বাংলা সিনেমা তা করেনি। আমাদের পূর্বপুরুষরা সেই ন্যাকা নৈতিকতার পাপ করেছেন, যাকে আপনার নির্বৈর বিদূষক হয়ে ব্যঙ্গ করে “র‍্যাডক্লিফ বললেন, গান্ধী বলেছেন খারাপ জিনিস দেখতে নেই। তাই আমি দেখব না।”

এই পাপের ফল কী? ফল এই যে, পূর্ববাংলার মুজফফরদের কথাও আমাদের জনপ্রিয় সংস্কৃতিতে অনুপস্থিত। সুতরাং আজ খুব সহজেই পশ্চিমবঙ্গে এই বয়ান খাড়া করা যাচ্ছে যে দেশভাগের সব দায় একটা সম্প্রদায়ের, অন্য সম্প্রদায় শুধুই তার শিকার। এ-ও সহজেই বিশ্বাস করানো যাচ্ছে যে হিন্দু, মুসলমান চিরকালই একে অপরের শত্রু ছিল; কখনো তাদের মধ্যে মৈত্রী ছিল না। আপনার ছবিতে র‍্যাডক্লিফ লাইন বিরতির ঠিক আগে একটা উঠোনকে দুভাগ করে দিয়ে রক্তের রঙে ফুটে উঠছে পর্দায়, আর আজকের বাংলা ছবিতে র‍্যাডক্লিফ লাইন পর্দায় ফুটে উঠছে সাম্প্রদায়িক আইটেম নাম্বারে দুই বাংলা জুড়ে যাওয়ার কাল্পনিক ভয় দেখাতে। সে ভয় ঋত্বিককে নিয়ে ফেসবুকে গদগদ হওয়া বাঙালির পছন্দ হচ্ছে, তারা হলও ভরাচ্ছে। তাই আমাদের কোনো ইমতিয়াজ নেই, আমাদের কোনো ইমতিয়াজ অদূর ভবিষ্যতে হবেও না। বরং সম্ভব হলে আমরা পশ্চিমবঙ্গের মধ্যেও একের পর এক র‍্যাডক্লিফ লাইন টেনে দেব, যতক্ষণ না বাঙালি বলে জাতিটাই অবলুপ্ত হয়ে যায় হিন্দু আর মুসলমানে ভাগ হতে হতে।

আপনাকে নমস্কার জানিয়ে স্বীকার করে নিই, আপনারা পাঞ্জাবিরা ট্রমার মুখোমুখি দাঁড়ানোর সাহস রাখেন। তাই আপনাদের পার্টিশন মিউজিয়াম আছে। তাতে শুধু ঘৃণায় ইন্ধন জোগানোর কাজ হয় না, একে অপরের ঘায়ে হাত বুলিয়ে উপশমের কাজও হয়। তাই হয়তো শিখ মহিলাদের, মুসলমান দাঙ্গাবাজদের হাত থেকে বাঁচতে সপরিবার আত্মহত্যার পাশাপাশি ভারত থেকে পাকিস্তানগামী মুসলমান উদ্বাস্তুদের ট্রেনে শিখ দাঙ্গাবাজদের হত্যালীলার মাঝে মুসলমান সেজে থাকা এক শিখের দৃশ্য উঠে আসতে পেরেছে আপনার ক্যামেরায়। ট্রমা অতিক্রম করে আমৃত্যু প্রেম করার মুরোদ আপনাদের আছে ইমতিয়াজ। আমাদের নেই। একথা বারবার প্রমাণিত হচ্ছে। কয়েক মাস আগেই আরেক পাঞ্জাবি, বরুণ গ্রোভার, তাঁর ঋজু বিদূষণায় শিখদের দেশভাগের ট্রমা এবং তা থেকে জন্ম নেওয়া মুসলমানবিদ্বেষ নিয়ে রসিকতা করেছেন। তারপর বলেছেন, তাঁর পরিবার অধুনা পাকিস্তানে তাঁদের ভিটে ছেড়ে আসার সময়ে একখানা প্রদীপ জ্বেলে রেখে এসেছিল, এই আশায় যে শিগগির ওবাড়িতে ফিরে যাওয়া হবে। সীমান্তের এপারে এসে যেখানে আশ্রয় নেওয়া হল, সেখানেও একখানা প্রদীপ জ্বলছিল। মানে এবাড়ি যে পরিবার ছেড়ে গেছে, তাদেরও আশা ছিল তারা ফিরে আসবে। রূঢ় বাস্তব হল, “ম্যায় ওয়াপস আউঙ্গা” বলে গিয়ে কেউ আর সে যুগে ফিরে আসতে পারেনি। কিন্তু বরুণদের নতুন বাড়িতে সেই প্রদীপ রোজ জ্বালানো হত এই আশায় যে, পুরনো বাড়িতে যে পরিবার গেছে তারাও ওঁদের জ্বালিয়ে আসা প্রদীপ জ্বেলে রাখছে। এভাবেই “মানুষের মৃত্যু হলে তবুও মানব থাকে যায়”।

কথাটা বরিশাল থেকে আসা বাঙালি কবির লেখা হলেও, দেখা যাচ্ছে এপারের বাঙালি শিল্পী, সাহিত্যিকদের ওতে বিশ্বাস কম। আপনাদের মত পাঞ্জাবি শিল্পীদেরই বেশি বিশ্বাস। তাই বাঙালি হিসাবে আপনার ও আপনার পূর্বপুরুষদের প্রতি অশেষ কৃতজ্ঞতা রইল, আমার পূর্বপুরুষদের জন্য রইল অভিসম্পাত।

ইতি

এক অপাংক্তেয় বাঙালি।

সঙ্ঘারামের রক্তকরবী: রাবীন্দ্রিক অথচ সমসাময়িক

বাংলার শিল্পীদের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের সংলাপ জারি আছে, একই সময়ে দু-দুটো নাট্যদল রক্তকরবী মঞ্চস্থ করছে, আর আপনি দেখতে না গিয়েই সবটা জেনে ফেলবেন?

এই মুহূর্তে আফ্রিকার বেশ কিছু দেশে ইবোলা মহামারী চলছে। কঙ্গোয় সেই মহামারীর কেন্দ্রবিন্দু হল প্রবল দারিদ্র্যে ধ্বস্ত শহর মংবোয়ালু। কী আছে সেই শহরে? আছে সোনার খনি, গোটা এলাকার অর্থনীতি সেই খনির উপর নির্ভরশীল। আর সেই খনিতে কাজ করেন প্রচুর প্রবাসী শ্রমিক। অর্থাৎ মাটির নিচে সোনা, অথচ মাটির উপরের মানুষগুলো, সেই সোনা যারা খুঁড়ে বের করে সেই মানুষগুলো, হদ্দ গরিব। প্রয়াত পল ফার্মারের মত চিকিৎসক তথা নৃতত্ত্ববিদ লিখেছেন যে আফ্রিকার কঙ্গো, সিয়েরা লিওনের মত দেশের মানুষকে যুগের পর যুগ সোনা বা হীরের লোভে যেভাবে শোষণ করা হয়েছে, ওখানে বারবার মহামারী দেখা দেওয়ার তা অন্যতম কারণ। সুতরাং ২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে যদি কারও সন্দেহ হয়, রক্তকরবী নাটকের যক্ষপুরী সম্পূর্ণ কাল্পনিক, তাহলে তাকে মংবোয়ালুর খোঁজ দেওয়াই যথেষ্ট। সেখানে গেলেই দেখা পাওয়া যাবে এই নাটকের ফাগুলাল, চন্দ্রা, কিশোর, বিশু পাগল, গোকুলদের। নন্দিনী আর রঞ্জনের দেখা পাওয়া যাবে কি? সম্ভবত না, কারণ সোনা আর হীরের ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে ইলন মাস্ক, জেফ বেজোসের মত সর্দারদের হারাতে নন্দিনী আর রঞ্জনের সন্ধানই মানুষের সন্ধান। এই সন্ধান আছে বলেই রক্তকরবী ‘সত্যমূলক’ হলেও নাটক, ইতিহাস নয়। তবে কেবল মংবোয়ালু তো যক্ষপুরী নয়, রক্তকরবী নাটক প্রকাশের শতবর্ষ পরে আজ গোটা দুনিয়াটাই যক্ষপুরী। সেই সত্য তুলে ধরতে ক্যান্টিন আর্ট স্পেসের পর, হাতিবাগান সঙ্ঘারামের সত্যনিষ্ঠ প্রযোজনাও দেখার সুযোগ হল সম্প্রতি।

রক্তকরবী নাটকের উপস্থাপনায় মঞ্চসজ্জা বরাবরই খুব আলোচিত বিষয়। প্রদীপ কুমার পাত্র আর মদন মিস্ত্রি এখানে যে যক্ষপুরী বানিয়ে তুলেছেন তা ধ্রুপদী রবীন্দ্রনাটকের মেজাজ বজায় রেখেই আজকের দুনিয়াকে স্পষ্ট করে তুলেছে। মঞ্চের দুই প্রান্তে রাস্তার আলোর স্তম্ভে ক্লোজ সার্কিট টিভির শ্যেনদৃষ্টি এবং রাজার বন্ধ দরজার ঠিক উপরেও তার উপস্থিতি জর্জ অরওয়েলের 1984 উপন্যাসকে মনে পড়িয়ে দেয়। আমরা সবাই যে এক ডিসটোপিয়ায় বসবাস করছি, আজকের পৃথিবীর ব্যবসায়ীরা এবং রাষ্ট্র যে নজরদারি চালায় নাগরিকদের উপর, সেই আধুনিক সত্য অনায়াসে রাবীন্দ্রিক হয়ে ওঠে যখন বিশু (তথাগত চৌধুরী) ওই ক্যামেরার দিকেই আঙুল তুলে ফাগুলালকে (কল্লোল দে) বলে “তোদের আদর পড়ে যেখানে সর্দারের দৃষ্টি পড়ে সেখানেই, সোনাব্যাঙ যতই মকমক শব্দে কোলাব্যাঙের অভ্যর্থনা করে, সেটা কানে গিয়ে পৌঁছয় বোড়াসাপের।” পরিচালকের কল্পনার সঙ্গে মঞ্চ পরিকল্পনা ও নির্মাণের এই সুর মেলানো অপূর্ব। পাশাপাশি এই মঞ্চ পুঁজিবাদের ধারাবাহিকতাকেও ধারণ করেছে। বড় বড় দাঁতওয়ালা চাকা দেখে মনে পড়ে যায় চার্লি চ্যাপলিনের মডার্ন টাইমস ছবির সেই দৈত্যাকৃতি চাকাগুলোকে। রাজার রহস্যময়তার অনেকটাও মঞ্চসজ্জার কৃতিত্ব। যে অর্ধস্বচ্ছ দরজার ওপার থেকে রাজা (অনুরণ সেনগুপ্ত) কথা বলে, তাতে পড়া রাজার ছায়া তার ভয়ঙ্করতা এবং অসহায়তাকে দর্শকের সামনে অতিকায় করে তোলে।

দীপ্তেশ মুখার্জি আর অভিরূপ দে-র অবদানে এই নাটকে শব্দ ও সঙ্গীত যে আবহ নির্মাণ করেছে তা-ও স্বতন্ত্র উল্লেখের দাবি রাখে। শুরুতেই তালবাদ্য সহযোগে এবং মধুরিমা গোস্বামীর অঙ্গবিন্যাসে সোনা খনন দর্শকের মনোযোগ আকর্ষণ করে নেয়।

অভিনয়ের আলোচনায় আসতে দেরি করলাম, কারণ রবীন্দ্রনাথ যে ভাষায় এই নাটক রচনা করেছেন, তার বিমূর্ততাকে মূর্ত করে তোলায় মঞ্চ, শব্দ, সঙ্গীতের ভূমিকা অতি গুরুত্বপূর্ণ। ওখানে প্রয়াস ব্যর্থ হলে মনোযোগী রবীন্দ্রপাঠক দর্শক ছাড়া আর কাউকে স্রেফ অভিনয় দিয়ে ছুঁয়ে ফেলা এই নাটকে বেশ কঠিন। অভিনয়ের আলোচনা শুরু করা যাক নন্দিনীকে দিয়েই।

নন্দিনী আসলে কে? যক্ষপুরীর কড়া নিয়মে এই মস্ত বেনিয়মটি হাজির হল কোথা থেকে? রবীন্দ্রনাথের নিজের ব্যাখ্যায় “জেলেদের জালে দৈবাৎ মাঝে-মাঝে অখাদ্যজাতের জলচর জীব আটকা পড়ে। তাদের দ্বারা পেটভরা বা ট্যাঁকভরার কাজ তো হয়ই না, মাঝের থেকে তারা জাল ছিঁড়ে দিয়ে যায়। এই নাট্যের ঘটনাজালের মধ্যে নন্দিনী নামক একটি কন্যা তেমনিভাবে এসে পড়েছে।” নাটকের শেষদিকে আমরা যক্ষপুরীর মত হিংস্র খনি এলাকায় নন্দিনীর গ্রামের কথা শুনতে পাই, সে গ্রামের মানুষের কথাও পাই। সে খেতের কথা বলে, ফসলের কথা বলে, ফুল তার অঙ্গে, রং তার মনে। এই চরিত্রে ঈস্পীতা ঘোষ যতবার মঞ্চে আসেন, মঞ্চ জুড়ে থাকা অন্ধকার ও অবসাদে আলোর সঞ্চার হয়। এর কৃতিত্ব শ্রমিকদের গাঢ় নীল পোশাক, মঞ্চের দখল নিয়ে রাখা কালো রঙের বিপরীতে ঈস্পীতার সবুজ শাড়ি, হলুদ ব্লাউজ আর লাল ফুলের যতখানি (রূপসজ্জা: সঞ্জয় পাল), ততখানিই তাঁর অভিনয়ের। তিনি লঘু পায়ে চলে ফিরে বেড়ান, সে চলা নাচ নয় অথচ ছন্দময়। ঘোর লাগিয়ে দেওয়ার মত রূপ না থাকলে নন্দিনীর চরিত্রে বিশ্বাসযোগ্য হয়ে ওঠা শক্ত, কিন্তু সে রূপ সম্পূর্ণ হয় অভিনয় ক্ষমতা দিয়ে। বস্তুত, ঘন্টা দুয়েকের বিরতিহীন নাটকের মধ্যেই দুজন নন্দিনীকে দেখা যায়। এক নন্দিনী আনন্দকে, বিদ্রোহকে এমনভাবে ছড়িয়ে দিতে পারে পুরুষের মধ্যে যে গোকুল (অর্ক চক্রবর্তী) বা চন্দ্রা (মধুরিমা) তাকে বিপদ বলে মনে করে। আরেক নন্দিনীকে দেখা যায় একেবারে শেষদিকে, যে দিশেহারা। আনন্দের বদলে শঙ্কাই তার অভিজ্ঞান। এই দুই নন্দিনীর চরিত্রেই ঈস্পীতা চমৎকার। তবে গান গাওয়ার সময়ে তাঁকে কিছুটা দুর্বল লাগে।

বিশু পাগল রক্তকরবী নাটকের কতখানি, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। এক নারীর হাতে আকাশের চাঁদ এনে দিতে সে যক্ষপুরীতে এসেছিল। তারপর তাকে চরবৃত্তি করতে লাগিয়ে দিয়েছিল সর্দাররা। কিন্তু সে কাজ বিশুর দ্বারা হয়নি। তাই তার অবস্থা আর পাঁচজন শ্রমিকের চেয়েও খারাপ। অথচ সে যাদের বিরুদ্ধে চরবৃত্তি করতে এসেছিল তারাই তাকে ভালোবাসে। সর্দারদের লোক থেকে শ্রমিকদের লোক হয়ে যাওয়ায় বিশুর স্ত্রীও তাকে ত্যাগ করেছে। এতখানি নিঃস্বতা সত্ত্বেও যক্ষপুরীতে বিশু একমাত্র লোক, যার গান নন্দিনীকেও মুগ্ধ করে। এই তিক্ততাহীন বিশুর চরিত্রকে তথাগত (যিনি এই নাটকের নির্দেশকও) প্রায় দার্শনিক উচ্চতা দান করেছেন। তাঁর দরাজ গানের গলা বিষণ্ণ সংলাপ উচ্চারণের সময়েও এক ধরনের নিরাসক্তির আভাস দেয়। যেন এমন একজন মানুষ, যে চোখের জলের জোয়ারেও ভোলে না যে ডাঙা আছে। তথাগতর বিশু একইসঙ্গে প্রেমিক ও সন্ন্যাসী।

মাত্র কয়েকদিন আগেই ক্যান্টিন আর্ট স্পেসের রক্তকরবী প্রযোজনায় আজকের বাংলা নাট্যমঞ্চের আরেক প্রতিভাবান অভিনেতা বুদ্ধদেব দাসের অভিনয় দেখার সুযোগ হয়েছে। দুজন ভালো অভিনেতা একই চরিত্রের কেমন দুরকম ব্যাখ্যা করেন তা এত অল্প সময়ের ব্যবধানে দেখার বিরল সুযোগ এই মুহূর্তে এই বাংলার দর্শকের হাতের মুঠোয়। বুদ্ধদেবের বিশুর সর্বাঙ্গে লেগে থাকে বিষাদ, তথাগতর মুখে লেগেই থাকে অনির্বচনীয় হাসি। যেন তিনি জানেন, জীবনের রণ রক্ত সফলতা সত্য, তবু শেষ সত্য নয়। রাজা একবার জিজ্ঞেস করে, নন্দিনীর সঙ্গে ও কে? “রঞ্জনের জুড়ি নাকি?” তার উত্তরে বিশু বলে “না রাজা, আমি রঞ্জনের ও-পিঠ, যে পিঠে আলো পড়ে না— আমি অমাবস্যা।” এই সংলাপ যখন বুদ্ধদেব বলেন, তখন ঝরে পড়ে রঞ্জন হতে না পারার হতাশা। আর তথাগত যখন বলেন, তখন মনে হয়— তিনি রঞ্জন নন এবং রঞ্জন হতে চান না। তিনি নিজের অবস্থানে খুশি। বড় বিস্ময় লাগে এই দুই অভিনেতাকে দেখে। আমাদের তো আজ বিশেষ কিছুই নেই। তবু একজন তথাগত আর একজন বুদ্ধদেব আছেন!

রাজার চরিত্রে অনুরণও চমকপ্রদ। এই চরিত্রের অভিনেতার হাতে যে কণ্ঠস্বর ছাড়া বিশেষ কোনো আয়ুধ নেই তা তো সবাই জানেন, কিন্তু এখানে অনুরণকে একটা বাড়তি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছেন নির্দেশক— গলার পাশাপাশি ছায়া দিয়েও অভিনয় করতে হয়েছে। অর্থাৎ এখানে রাজাকে একেবারে দেখা যায় না তা নয়, সারাক্ষণই রাজার ছায়া দেখা যায়। সুরজ বিশ্বাস ও ধনপতি মণ্ডলের আলোকসম্পাতে এ এক অদ্ভুত কাণ্ড। অনুরণ যে দক্ষতায় নিজের ছায়ার উচ্চতা বাড়িয়ে কমিয়ে এবং কণ্ঠস্বরের নিপুণ ব্যবহারে রাজার বিরাট ভাবমূর্তি তৈরি করেন, তা ভেঙে পড়ে শেষ পর্বে তাঁর অন্তরাল থেকে বেরিয়ে আসায়। তখন অনুরণের সত্যিকারের দৈহিক উচ্চতা যে বৈপরীত্য তৈরি করে তার সঙ্গে মানানসই তাঁর বিধ্বস্ত, প্রতারিত অথচ হার না মানা মানুষের অভিনয়।

আরও পড়ুন রক্তকরবী: প্রযোজনা আন্তর্জাতিক, কিন্তু বাংলা কি?

ফাগুলালের চরিত্রে কল্লোল আর তার স্ত্রী চন্দ্রার চরিত্রে মধুরিমা সাক্ষাৎ শ্রমিক ও তার গিন্নী। ঠিক যেমন জীবন থেকে উঠে আসা অধ্যাপক মনে হয় অনন্য শঙ্কর দেবভূতিকে। অন্যান্য ছোট কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে দীপজ্যোতি মণ্ডল (কিশোর), অর্ক, জয়ন্ত মিত্র (সর্দার), অভিজিৎ নাগ (গোঁসাই) যথাযথ। অভিরূপের গিটার এবং নীলার্ঘ্য দত্তর ব্যাঞ্জো এই নাটকে কতখানি গুরুত্বপূর্ণ তা বুঝিয়ে বলতে গেলে কবীর সুমন দিয়ে কীভাবে রবীন্দ্রনাথকে ছুঁয়ে ফেলেছেন নির্দেশক, সেকথাটা বলে দিতে হবে। কিন্তু সে রহস্য উদ্ঘাটন করব কেন? বাঙালির এই দুঃসময়েও বাংলার শিল্পীদের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের সংলাপ জারি আছে, একই সময়ে দু-দুটো নাট্যদল রক্তকরবী মঞ্চস্থ করছে, আর আপনি দেখতে না গিয়েই সবটা জেনে ফেলবেন? এমন অন্যায়ে প্রশ্রয় দেব না।

ক্যান্টিন আর্ট স্পেসের প্রযোজনার উপসংহার নিয়ে আমার আপত্তির কথা লিখেছিলাম। হাতিবাগান সঙ্ঘারামের নাটকের উপসংহার অতখানি পার্টিজান নয়, ‘পৌষ তোদের ডাক দিয়েছে’-র সঙ্গে শ্রুতিমধুর মিশ্রণ ঘটানো হয়েছে ‘হেই সামালো ধান হো’-র। কিন্তু শ্রুতিমধুর হলেও এই সৃজনান্তর নাটকের বার্তাকে একটা অস্বস্তিকর জায়গায় নিয়ে গেছে বলে মনে হয়। নাটকটাকে আগাগোড়া সমকালীন করে তোলা হয়েছে, কিন্তু শেষে তেভাগা আন্দোলনের সময়কার এই গানের আবাহন থেকে কি এই সিদ্ধান্ত করব যে যক্ষপুরী থেকে পরিত্রাণের পথ হিসাবে কৃষিপ্রধান সভ্যতাকেই দেখলেন তথাগত ও তাঁর দল? সে সমাধান রবীন্দ্রনাথের সময়ে বাস্তবোচিত হলেও, আজকের দিনে কিন্তু একেবারেই কল্পকথা। রবীন্দ্রনাথ যখন এই নাটক লেখেন তখন তাঁর বন্ধু মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী গ্রামভিত্তিক রাষ্ট্রের ধারণা দিচ্ছিলেন। সেই ধারণা স্বাধীন ভারতে পরিত্যক্ত হয়, গান্ধীরই শিষ্য জওহরলাল নেহরুর পৌরোহিত্যে আমাদের অর্থনীতির ভিত হয়ে দাঁড়ায় ভারি শিল্প ও বাঁধ। সেখান থেকে বহু যুগ পার করে আমরা এখন বিশ্বব্যাপী গিগ অর্থনীতি এবং প্রযুক্তিভিত্তিক সামন্ততন্ত্রের (techno-feudalism) কবলে। এ যুগের সোনার খনির শ্রমিকদের নিস্তারের পথ কৃষিকাজে নেই। বিশ্বজুড়ে জমির সংকট, জমি থাকলেও জলের সংকট। সেই সংকট আরও বাড়াচ্ছে বেজোস, মাস্ক, স্যাম অল্টম্যানদের ইয়া বড় সব ডেটা সেন্টার। এখন ধানের নামে হাত মুষ্টিবদ্ধ করে কোনো লাভ হবে কি?

এ প্রশ্নের উত্তর খোঁজার দায় কেবল নাট্যকর্মীদের উপর চাপিয়ে দিলে অবশ্য অন্যায় হবে। তাঁরা শিল্পী, তাঁদের মূল কাজ সত্য তুলে ধরা এবং স্বপ্ন দেখানো। সে কাজ এই নাটকে শতকরা একশো ভাগ সততায় করা হয়েছে। তবে শিল্পীদের কাজেও তো আমরা ভবিষ্যতের ইশারা খুঁজি; বিশেষ করে সেইসব শিল্পীদের কাজে, যাঁরা শতবর্ষ আগের শিল্পকে নিজের সময়ের মাটিতে দাঁড় করানোর স্পর্ধা দেখান।

হকারদের নিয়ে বেকার গোলমাল!

আমরা যারা লেখাপড়া শিখেছি খানিকটা, মাথার উপরে পাকা ছাদ আছে এবং ঘরে এসি, গ্যারেজে গাড়ি আছে— তারা চাই আইন একেবারে অক্ষরে অক্ষরে পালিত হোক। রেলের জমিতে কেবল রেলের জিনিস থাকবে। দোকান কেন থাকবে? ঘরবাড়ি কেন থাকবে? অটো, টোটো কেন দাঁড়াবে?

যদি উচ্ছেদই উদ্দেশ্য হয়, তাহলে এসব ভাবার প্রয়োজন নেই। সরকারি সম্পত্তি মানে যে আসলে নাগরিকের সম্পত্তি— সেকথা কজন নাগরিকই বা জানে, বোঝে এবং বিশ্বাস করে? সমাজের উপর থেকে নিচ পর্যন্ত সকলকে জানানোর ব্যবস্থা তো কোনোদিন করাই হয়নি। আর এখন তো কে নাগরিক তা ঠিক করছে রাষ্ট্র। ফলে যদি কাল রেলের জমিতে ব্যবসা করা বা বসবাস করা মানুষকে অনাগরিক বলে প্রতিষ্ঠা করে দেওয়া হয়, তাহলেই মুশকিল আসান।

পশ্চিমবঙ্গে নতুন সরকারের শপথ গ্রহণের একমাস পূর্ণ হয়েছে। রাজ্যটা যে বদলে গেছে তা অস্বীকার করার উপায় নেই। ৯ মে-র আগে পর্যন্ত রাজ্যের সাধারণ মানুষ বলুন, বিরোধী রাজনৈতিক দলের লোকেরা বলুন আর সংবাদমাধ্যমই বলুন— সকলেই বলত যে পশ্চিমবঙ্গের বিরাট সমস্যা হল বেকার সমস্যা। গত একমাসে বেকার সমস্যার সমাধান হয়ে গেছে, প্রধান হয়ে গেছে হকার সমস্যা। হকাররা কার সমস্যা? এখন পর্যন্ত তাঁরা রেলের সমস্যা। কেন? না তাঁরা গোটা রাজ্যজুড়ে রেলের জমি দখল করে রেখেছেন। সম্ভবত সেই কারণেই লোকাল ট্রেন ঠিক সময়ে চলছে না, দূরপাল্লার ট্রেন ৩-৪ ঘন্টা লেট। রেলের জমি দখলমুক্ত হলেই স্টেশনগুলো হয়ে যাবে হলিউডি সিনেমার স্টেশনগুলোর মত। শিয়ালদা বা হাওড়া স্টেশন দখলমুক্ত করা হয়েছে, বাকিগুলোকেও করতে পারলেই আমাদের আর পাঁচ টাকার ভাঁড়ের চা বাদাম বিস্কুট দিয়ে খেতে হবে না। আমরা উন্নত দেশের লোকেদের মত এই অসহ্য গরমে আড়াইশো-তিনশো টাকার আইসড টি বা কোল্ড কফি খাব, সঙ্গে থাকবে কনফেকশনারির সম্ভার। যে নিত্যযাত্রীদের স্টেশনে পৌঁছলেই খিদেয় পেট চুঁই চুঁই করে, তাঁদেরও আর ডিম-পাঁউরুটি, ঘুগনি, মুড়ি-তরকারি— এ সমস্ত ছাইপাঁশ খেয়ে থাকতে হবে না। গত নভেম্বরেই রেল বোর্ড খাবারদাবার সম্পর্কে নিয়ম বদলে স্টেশন চত্বরে কেএফসি, ম্যাকডোনাল্ড’স, পিৎজা হাট, হলদিরামদের দোকান খোলার অনুমতি দিয়েছে। কিন্তু দোকান খুলবে কোথায়? হকাররা বসে আছেন যে। হকারদের পাশেই দোকান খুললেও চলবে না। কজন আর ভাঁড়ের চা থাকতে লাটে, ফ্র্যাপে, ক্যাপুচিনো খেতে যাবে? এই সমস্যার সমাধান করতেই হত। অতএব পশ্চিমবঙ্গের নতুন সরকার রেলের জায়গা খালি করতে নেমেছে।

যতই আসুক বিঘ্ন বিপদ, হাওয়া হোক প্রতিকূল, সরকার হকার ও বস্তি উচ্ছেদ করেই ছাড়বে। কাজটা দক্ষভাবে করতে রাজ্যের মুখ্যসচিবকে চেয়ারম্যান করে, রেলমন্ত্রক আর রাজ্য সরকারের গুরুত্বপূর্ণ সচিব এবং রাজ্য পুলিশের ডিজি আর কলকাতার পুলিশ কমিশনারকে নিয়ে গঠন করা হয়েছে টাস্ক ফোর্স। টাস্কটি এমন যে ফোর্স ব্যবহার করতেই হবে। প্রথমে কেবল হকার উচ্ছেদ, বস্তি উচ্ছেদ চলছিল। এখন দেখা যাচ্ছে উত্তরপাড়া বা কোন্নগরের মত জায়গায় হকার উচ্ছেদের সমান বা তার চেয়েও বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে টোটো স্ট্যান্ড, অটো স্ট্যান্ড স্টেশন চত্বর থেকে সরিয়ে দেওয়ার কাজকে। আপনি বয়স্ক হতে পারেন, অসুস্থ হতে পারেন, প্রতিবন্ধী হতে পারেন। আইন আপনাকে মানতেই হবে, অর্থাৎ ৫০/৬০/১০০ মিটার দূর থেকে হেঁটে স্টেশনে আসতে হবে। আইন সকলের জন্য এক। কথাটা আমাদের সংবিধানে লেখা আছে। তাই আমরা যারা লেখাপড়া শিখেছি খানিকটা, মাথার উপরে পাকা ছাদ আছে এবং ঘরে এসি, গ্যারেজে গাড়ি আছে— তারা চাই আইন একেবারে অক্ষরে অক্ষরে পালিত হোক। রেলের জমিতে কেবল রেলের জিনিস থাকবে। দোকান কেন থাকবে? ঘরবাড়ি কেন থাকবে? অটো, টোটো কেন দাঁড়াবে?

ঠিক কথা। আমার জমিতে যেমন কেবল আমার সম্পত্তিই থাকতে পারে। সেখানে অন্য কাউকে কিছু করতে গেলে আমার অনুমতি নিতে হবে, আমার থেকে জমি কিনতে হবে বা লিজ নিতে হবে। নিদেনপক্ষে আমাকে ভাড়া দিতে হবে। রেলের বেলাতেই বা অন্য নিয়ম হবে কেন? তুমি গরিব বলে নিয়মকানুন মানবে না? যাদবপুর হোক আর ব্যারাকপুর। তোমাকে উঠে যেতেই হবে, না উঠলে বুলডোজার দিয়ে তুলে দেওয়া হবে। আইনে বুলডোজারের কথা কোথায় লেখা আছে সেটা অবশ্য জানা একটু শক্ত। আইনে বরং আদালতের দ্বারস্থ হওয়ার কথা আছে, দেশের সব আইনেই থাকে। কিন্তু আদালতের স্থগিতাদেশেও যে আইনের কিছু এসে যায় না সেটা যাদবপুরের ক্ষেত্রে দেখা গেল। যাক সে কথা। দুনিয়া জুড়েই তো দেখা যাচ্ছে একটা আইনই স্বতঃসিদ্ধ— জোর যার মুলুক তার। নাহয় আমাদের এখানেও তাই হল। তাছাড়া অতীতে কি কখনো হকার উচ্ছেদ হয়নি? ২০২৪ সালে লোকসভা নির্বাচনে বিপুল জয় পাওয়ার পরে পরেই তৃণমূল কংগ্রেসের সরকারও করেছিল, তার বহু আগে বামফ্রন্ট সরকার কলকাতা শহরে ‘অপারেশন সানশাইন’ করেছিল। রেল করলেই দোষ?

হক কথা। আইন মেনে চলা উচিত, তার বাইরে কারও পা দেওয়া উচিত নয়। স্ট্রিট ভেন্ডার্স (প্রোটেকশন অফ লাইভলিহুড অ্যান্ড রেগুলেশন অফ স্ট্রিট ভেন্ডিং) অ্যাক্ট, ২০১৪ নামে একখানা আইন আছে। সেই আইনে বলে আছে, ততক্ষণ রাস্তার বিক্রেতাদের উচ্ছেদ করা যাবে না যতক্ষণ না টাউন ভেন্ডিং কমিটি সমস্ত বিক্রেতাদের বিষয়ে সমীক্ষা চালাচ্ছে এবং তারা যে বিক্রেতা, সেই সার্টিফিকেট দিচ্ছে। তারপর কোনো প্রয়োজনে ওইসব দোকান সরানোর দরকার থাকলে বিক্রেতাদের কমপক্ষে ৩০ দিনের নোটিশ দিতে হবে। আরও বলা আছে, উচ্ছেদ শেষ অস্ত্র। বরং বিক্রেতাদের প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনা করে তাঁদের অন্যত্র ব্যবসা করার সুযোগ দিতে হবে এবং এমন জায়গা চিহ্নিত করে দিতে হবে যেখানে তাঁরা ব্যবসা চালাতে পারেন। এই আইন অবশ্য চালু হয়েছিল ১ মে ২০১৪, মানে নরেন্দ্র মোদীর সরকার তৈরি হওয়ার হপ্তা দুয়েক আগে। এমন হতেই পারে যে আইনটি ওঁদের পছন্দ নয়। ওঁরা মনে করছেন এসব আদিখ্যেতা। তাহলেও তো আইনটি আগে বদল করতে হবে সংসদে পাশ করিয়ে। রাষ্ট্রপতিকে দিয়ে স্বাক্ষর করাতে হবে। অবশ্য উন্নয়নে দেরি করা ঠিক নয়। সোনার বাংলা যত তাড়াতাড়ি বানানো যায় তত ভালো। সেক্ষেত্রে অত আইনকানুনের তোয়াক্কা করলে চলবে না।

আরও পড়ুন এসএসসি: স্থান কাল পাত্র গুলিয়ে যাওয়া সাংবাদিকের স্বীকারোক্তি

বোধহয় এই সূত্র মেনেই দিকে দিকে উচ্ছেদ চলছে। তবে ওই রেলের জমি সম্পর্কে দু-একখানা কথা আছে। রেল তো বি আর চোপড়ার বানানো দূরদর্শনের মহাভারতের কালচক্র নয় যে আদি অনন্তকাল ধরে ছিল। ১৮৫৩ সালের আগে ভারতে রেল বলে কিছু ছিল না। পশ্চিমবঙ্গের রেলপথ এবং যেসব স্টেশনে উচ্ছেদ হয়েছে এখন পর্যন্ত, তাদের বয়স আরও কম। তা এই স্টেশনগুলো বানানোর জন্য রেল জমি পেল কোথায়? রেলের আগে এসব জমির মালিক ছিল কারা? ভারতের বহু সরকারি স্কুল, কলেজ, হাসপাতালের মত রেলের ইতিহাস ঘাঁটলেও দেখা যাবে যে এইসব জমি এক বা একাধিক ব্যক্তির সম্পত্তি ছিল। কোথাও বা কোনো গোষ্ঠীর সম্পত্তি ছিল। তাঁদের থেকে যৎসামান্য দামে, কখনো বা বিনামূল্যে রেল এইসব জমি পেয়েছিল। মানুষ সানন্দে দিয়েছিলেন, কারণ রেল হলে অনেক মানুষের সুবিধা হবে, তাঁদের নিজেদেরও হবে। সরকারি সম্পত্তি কথাটার ইংরিজি যে public property, সে তো আর এমনি এমনি নয়। এই পাবলিকের মধ্যে কিন্তু স্টেশন চত্বরের দোকানদার, টোটোচালক, অটোচালক— সবাই পড়েন। ফলে রেলের মালিক তথা রেলের জমির মালিক তাঁরাও। অন্তত যতক্ষণ না ভারতীয় রেল সরকারি সম্পত্তি থেকে এক বা একাধিক কর্পোরেটের সম্পত্তি হয়ে যাচ্ছে। সুতরাং বক্তব্য যদি এই হয় যে, রেলকে ভাড়া দিচ্ছ না বা লিজ নাওনি বলে তোমাকে রেলের এলাকায় ব্যবসা করতে দেওয়া হবে না, তাহলে সমাধান খুব সহজ। এই হকার, বস্তিবাসী, টোটোচালক, অটোচালকদের সঙ্গে কাগজে কলমে চুক্তি করা। তাতে রেলেরও আয় হয়, এঁদেরও চোখের জল ফেলতে হয় না।

অবশ্য যদি উচ্ছেদই উদ্দেশ্য হয়, তাহলে এসব ভাবার প্রয়োজন নেই। সরকারি সম্পত্তি মানে যে আসলে নাগরিকের সম্পত্তি— সেকথা কজন নাগরিকই বা জানে, বোঝে এবং বিশ্বাস করে? সমাজের উপর থেকে নিচ পর্যন্ত সকলকে জানানোর ব্যবস্থা তো কোনোদিন করাই হয়নি। আর এখন তো কে নাগরিক তা ঠিক করছে রাষ্ট্র। ফলে যদি কাল রেলের জমিতে ব্যবসা করা বা বসবাস করা মানুষকে অনাগরিক বলে প্রতিষ্ঠা করে দেওয়া হয়, তাহলেই মুশকিল আসান। যে নাগরিক নয় তার আবার অধিকার কী? বুলডোজার চালানোর চেয়ে এটা করা সহজ কাজ। বুলডোজার চালিয়ে দোকানপাট, ঘরদোর ভেঙে দিতে গিয়ে খামোকা বহু জায়গায় রক্তারক্তি হচ্ছে। সরকারবিরোধী নেতাদের হাজতে পুরতে হচ্ছে। তাতে তাদের প্রতি সাধারণ মানুষের সমর্থন নতুন করে তৈরি হচ্ছে। এসব বাজে ঝামেলার কোনো মানে হয়?

অ2অনুস্বর ডট কম ওয়েবসাইটে প্রকাশিত

রক্তকরবী: প্রযোজনা আন্তর্জাতিক, কিন্তু বাংলা কি?

এমনই তাঁর অভিনয়ের জাদু যে মনে হয়, রবীন্দ্রনাথ যেন বিশু পাগলের চরিত্র লিখেছিলেন বুদ্ধদেব দাস অভিনয় করবেন বলেই।

ভারতীয় নাট্যজগতের প্রবাদপ্রতিম নট ও নাট্যকার গিরীশ কারনাড প্রায় দেড় দশক আগে একবার বাঙালির প্রবল বিরাগভাজন হয়েছিলেন। কারণ তিনি বলেছিলেন— রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর মহান কবি, কিন্তু দ্বিতীয় সারির এবং মাঝারি মানের নাট্যকার। তাঁর নাটকের গরিব চরিত্রগুলো ‘কার্ডবোর্ড ক্যারেক্টার্স’। নাট্যকার হিসাবে তিনি বাদল সরকার, মোহন রাকেশ এবং বিজয় তেন্ডুলকরকে রবীন্দ্রনাথের থেকে বেশি নম্বর দিয়েছিলেন। হিন্দুদের ৩৩ কোটি ঠাকুর, বাঙালির তখন ছিল ৩৩ কোটি ১। ফলে কারনাডের এই মতামতে প্রবল রুষ্ট হয়েছিলেন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় থেকে শুরু করে শ্রমিক নেতা গুরুদাস দাশগুপ্ত পর্যন্ত সকলেই। গিরীশের সমালোচনার কোনো চর্চিত উত্তর দেওয়া হয়েছিল— এমন দৃষ্টান্ত এই লেখা লিখতে বসে খুঁজে পাচ্ছি না। গিরীশের সমালোচনার উত্তরে বাংলার কোনো নাট্যদল রবীন্দ্রনাথের কোনো নাটক মঞ্চস্থ করে শৈল্পিক প্রতিবাদ করেছিল কিনা, তাও জানতে পারছি না। স্মৃতি থেকে যতটুকু উদ্ধার করতে পারছি, তাতে শেয়ালের কুমির ছানা দেখানোর মত করে বহুরূপীর রক্তকরবী প্রযোজনার কথাই তুলে ধরা হয়েছিল বিভিন্ন মহল থেকে। তবে এই মুহূর্তে বাংলার মঞ্চে অন্তত দুটো দল রক্তকরবী অভিনয় করছে— হাতিবাগান সঙ্ঘারাম ও ক্যান্টিন আর্ট স্পেস। দ্বিতীয় দলটার অভিনয় সম্প্রতি দেখার সুযোগ হল। তারা রবীন্দ্রনাথের এই বহু আলোচিত নাটককে যেভাবে সমসাময়িক করে তুলেছে, তাতে কারনাড জীবিত থাকলে হয়ত নিজের মন্তব্য পুনর্বিবেচনা করতে বাধ্য হতেন। রবীন্দ্রনাথের নাটক যে এমন এক বিমূর্ততাকে ছুঁয়ে আছে, যা দিয়ে একশো বছর পরের মূর্ততাকেও ধরে ফেলা যায়— তা এই প্রযোজনায় দিনের আলোর মত পরিষ্কার। একথা সত্যি যে সোনার খনির শ্রমিকরা বলে না ‘বনের মধ্যে পাখি ছুটি পেলে উড়তে পায়, খাঁচার মধ্যে তাকে ছুটি দিলে মাথা ঠুকে মরে।’ এই দার্শনিকতা যদি তাদের মনে কাজ করেও, তা এইভাবে প্রকাশ করার মত ভাষাজ্ঞান তাদের থাকে না। কিন্তু কথাটা এতদূর সত্য যে তা ১৯২৫ সালে যতখানি সত্য ছিল, ২০২৬ সালেও সমান সত্য। হয়ত আজ আরও বেশি সত্য। কারণ এখন আর কেবল খনি শ্রমিক নয়, কর্পোরেট মজুরদের জীবনেও সত্য। শঙ্খ ঘোষ লিখেছিলেন— সত্য বলা ছাড়া কবিতার কোনো কাজ নেই। সেকথা তো যে কোনো শিল্পমাধ্যমের জন্যেই সত্যি।

রবীন্দ্রনাথের নাটকে আজকের সত্যানুসন্ধানে ক্যান্টিন আর্ট স্পেস যা যা করেছে তার মধ্যে সবচেয়ে অভিনব হল মঞ্চসজ্জা। দর্শকাসনকে চারদিক থেকে ঘিরে তৈরি হয়েছে মঞ্চ, যা স্বাভাবিকভাবেই দর্শকাসনের চেয়ে উঁচুতে। ফলে নাটকের শুরুতেই যখন ফাগুলাল (ঋদ্ধিবেশ ভট্টাচার্য) বলে, আপনারা খনি এলাকায় এসে পড়েছেন, তখন তা কথার কথা থাকে না। খনির মধ্যে বসে থাকার অনুভূতি হয়। নাট্যকার রচিত মূল সংলাপ ব্যবহার করেই অন্য ঘটনাবলী, শব্দ, দৃশ্য আমদানি করে প্রযোজনার কাছাকাছি সময় দেখানো সাম্প্রতিককালে বাংলায় উইলিয়াম শেক্সপিয়রের নাটকের প্রযোজনায় জলভাত। স্বপ্নসন্ধানীর হ্যামলেট-এ যেমন চলে আসে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাওয়ার প্রসঙ্গ, ম্যাকবেথ-এ এসে পড়ে গাজা। কিন্তু রবীন্দ্রনাথের সৃষ্টিকে এভাবে একেবারে আজকের মাটিতে নামিয়ে আনার প্রচেষ্টা সুলভ নয়। এই প্রচেষ্টার আরও বেশি প্রশংসা প্রাপ্য এইজন্যে যে ব্যাপারটা স্রেফ জয়রাজ ভট্টাচার্যের করা সিনোগ্রাফি আর অভিনেতাদের পোশাক-আশাকে থেমে থাকেনি। ফাগুলাল এখানে হিন্দিভাষী শ্রমিক, সে আর তার বউ চন্দ্রা (দেবপ্রিয়া অধিকারী) দেহাতি ভাষাতেও বাক্যালাপ করে। সর্দার (বিপ্লব বন্দ্যোপাধ্যায়) এখানে গলফ খেলে অবসর যাপন করা কর্পোরেট এক্সিকিউটিভ, অধ্যাপক (অনসূয়া রাকা) সংবেদনশীল হলেও মধ্যবিত্ত অভ্যাসের বাইরে যেতে না পারা মহিলা বুদ্ধিজীবী। এইসব উচ্চশ্রেণির মানুষের মুখের ভাষায় মিশে থাকে যথেচ্ছ ইংরিজি। তবে নাটকের মূল বয়ানের বিনির্মাণের সেরা দৃষ্টান্ত শ্রমিকদের নম্বরে চিহ্নিত ইউনিফর্ম, যেখানে বিশু পাগলের নম্বর হল 69NG (রবীন্দ্রনাথের কলমে যা ৬৯ঙ), অর্থাৎ কিনা NOT GOOD। নন্দিনীর মত প্রতিষ্ঠানবিরোধী, প্রচলিত ব্যবস্থার গোড়া ধরে টান দেওয়া চরিত্রের মুখে ইংরিজি সংলাপ— বিশেষত একেবারে শেষদিকে ‘brutal capitalism’— অবশ্য বাহুল্য মনে হয়।

যেমন বাহুল্য মনে হয় কমিউনিস্ট ইন্টারন্যাশনাল গেয়ে নাটকের সমাপ্তি। রবীন্দ্রনাথ কোনো ভান করেননি। রক্তকরবীর ভূমিকায় ‘নাট্যপরিচয়’-এ পরিষ্কার লিখে দিয়েছেন ‘এই নাটক সত্যমূলক’। সুতরাং তাঁর আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু যে ধনতন্ত্র আর দেখাচ্ছেন শ্রমিকদের জীবন, তা নিয়ে কোনো সংশয়ের অবকাশ কোনোদিনই ছিল না। নাটকের শেষে যে ভাঙনের জয়গান, তা যে শ্রমিক অভ্যুত্থানই— তাও চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেওয়ার প্রয়োজন পড়ে না। তারপরেও কমিউনিস্ট ইন্টারন্যাশনালের মত পার্টিজান উপাদান ব্যবহার করলে বাম রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত বা তার প্রতি অনুরক্ত দর্শকরা আলাদা তৃপ্তি পেতে পারেন, কিন্তু আজকের দিনে এই নাটককে বৃহত্তর দর্শকসমাজের কাছে পৌঁছে দেওয়া জরুরি। সে কাজে ব্যাঘাত ঘটা অসম্ভব নয়। অবশ্য এই নাটকের দর্শক হিসাবে কাদের চান বা কাদের চান না, সে সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীনতা যাঁরা এই নাটক করছেন তাঁদেরই।

একথা বলা এই জন্যে যে এই প্রযোজনার মধ্যে বৃত্ত বড় করে ফেলার সম্ভাবনা আছে। কারণ এখানে যত্ন করে দৃশ্য নির্মাণ করা হয়েছে এবং অভিনেতারা প্রায় সবাই নিজেদের ক্ষমতার পূর্ণ সদ্ব্যবহার করেছেন। ফলে কোথা দিয়ে দু ঘন্টা কেটে যায় টের পাওয়া যায় না। এই নাটকে প্রাণ আছে।

রক্তকরবী পড়া আছে বা দেখা আছে এমন সকলেই জানেন যে এই নাটকের প্রাণ হল নন্দিনী, বিশু, আর নেপথ্য থেকে রাজা। এই প্রযোজনায় বিশুর চরিত্রে বুদ্ধদেব দাস একজন জিনস পরা আধুনিক যুবক, যিনি খালি গলায় যেমন ‘চোখের জলের লাগল জোয়ার’ গেয়ে ওঠেন, তেমন গিটার বাজিয়ে ‘জামাইকা ফেয়ারওয়েল’ গেয়ে যক্ষপুরীতে আসার আগের জীবনের বেদনাবিধুর স্মৃতিচারণও করেন। তাঁর গুপ্তচর হয়ে যক্ষপুরীর শ্রমিকদের মধ্যে প্রবেশ করার স্বীকারোক্তিতে নমকহারাম (১৯৭৩) ছবির রাজেশ খান্নাকে মনে পড়ে। এতৎসত্ত্বেও এমনই তাঁর অভিনয়ের জাদু যে মনে হয়, রবীন্দ্রনাথ যেন বিশু পাগলের চরিত্র লিখেছিলেন বুদ্ধদেব অভিনয় করবেন বলেই। বুদ্ধদেবের অভিনয় প্রতিভা বাংলা নাটকের দর্শকদের মধ্যে বেশ কিছুদিন হল সমাদৃত। কিন্তু বিশুর চরিত্রে এই অভিনয়ে এত পরত যে অভিনেতা থেকে চরিত্রকে আলাদা করাই শক্ত হয়ে যায়। যে অহংবোধ এবং বেদনা মিশিয়ে তিনি বলেন ‘তোর সেই কিছু-না-দেওয়া আমি ললাটে পরে চলে যাব। অল্প-কিছু দেওয়ার দামে আমার গান বিক্রি করব না’, আর যে রাজনৈতিক প্রজ্ঞায় বলেন ‘চুপ করাটাকে যে শুনতে পায়, তাতে আপদ আরো বাড়ে’, তাতে আশ্চর্য বিশ্বাস ফুটে ওঠে। মনে হয় না, বুদ্ধদেব অন্যের লেখা সংলাপ বলছেন। অভিনেতা কীভাবে নিজের শরীরকে ব্যবহার করলেন, শ্বাসকষ্টের অভিনয় কতটা নিখুঁত হল— এসব তথ্য নেহাত অপ্রাসঙ্গিক মনে হয়। কারণ ওগুলো যে অভিনয় সেকথা ততক্ষণে ভুলে গেছি। আশ মেটে না বুদ্ধদেবের গলায় গিটারের ঝংকার সমেত ‘তোমায় গান শোনাব’ দু-এক লাইন শুনে, বরং খালি গলায় আরও খানিকটা শোনা গেলে হয়ত প্রাণের আরাম হত।

সেই তুলনায় নন্দিনীর চরিত্রে শ্রাবন্তী ভট্টাচার্য প্রথম দিকে কিছুতেই যেন সপ্তমে পৌঁছতে পারেন না। নন্দিনীর মাদকতা অন্য চরিত্রগুলোর সংলাপ থেকেই বুঝে নিতে হয়। বরং নাটকের পরের দিকে যখন নন্দিনী ক্রমশ রণরঙ্গিনী হয়ে ওঠে, তখন শ্রাবন্তীর দেহভঙ্গিমা অনেক বেশি সাবলীল লাগে। রঞ্জনের মৃত্যুতে তাঁর শোকের বিদ্রোহের উন্মাদনায় পরিণত হওয়া বেশি স্পর্শ করে।

দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্যি, খুব বেশি দর্শক এখনো তথাগত চৌধুরীকে চেনেন না। ব্যাপারটা যে দুর্ভাগ্যজনক তা নিয়ে এই নাটক দেখলে আর সন্দেহ থাকবে না। রাজা চরিত্রে তাঁর অভিনয়ের প্রায় একমাত্র সম্বল কণ্ঠস্বর। রবীন্দ্রনাথ তেমনই ধার্য করেছেন। ফলে বহুরূপীর সেই বিখ্যাত প্রযোজনায় এই কঠিন কাজটা করতেন শম্ভু মিত্র স্বয়ং। তথাগত সম্বলকে আয়ুধে পরিণত করেছেন। ক্ষমতার দম্ভ, ক্ষমতার হাতে নিজেই বন্দি হয়ে যাওয়ার এবং তা থেকে বেরিয়ে আসতে না পারার অসহায়তা, নন্দিনীর প্রতি অদম্য আকর্ষণ এবং তার ক্ষুদ্র সহজতার কাছে নিজের বিশালতার পরাজয় তথাগতর কণ্ঠে নদীর জোয়ার ভাঁটার মত খেলতে থাকে। রক্তকরবীর রাজাই সম্ভবত সবচেয়ে রাবীন্দ্রিক। মানবতাবাদী রবীন্দ্রনাথ যক্ষপুরীর একনায়ককে আঁকলেন, অথচ তাকেও ভালোবাসার স্পর্শ থেকে বঞ্চিত করতে পারলেন না। সোনার খনির অন্ধকার থেকে নন্দিনীর আলো দিয়ে তাকেও বের করে নিয়ে এলেন। সে নিজের ধ্বজা নিজেই ভেঙে নিজের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করতে চলল। শোষকের প্রতি এত মমতা কোনো বিদ্রোহ দেখায় না, দেখায়নি। হয়ত কারনাড এই চরিত্রচিত্রণকেই মাঝারিয়ানা বলতেন। কিন্তু রাজার চরিত্রটা এমন যে নন্দিনীর মত আমাদেরও তার প্রতি মায়া পড়ে যায়। পড়বে না, যদি রাজা চরিত্রের অভিনেতা তাঁর চরিত্রের স্ববিরোধী বৈশিষ্ট্যগুলোর কোনো একটায় বেশি জোর দিয়ে ফেলেন। এই টাল সামলাতে পারাই সম্ভবত ওই চরিত্রের অভিনেতার কাজটা কঠিন করে তোলে। সে কাজ চমৎকার করেছেন তথাগত। তিনি তাঁর বদ্ধ ঘরের বিশালতা ছেড়ে যখন দর্শকের চোখের সামনে বেরিয়ে আসেন, তখন ছোট হয়ে যান না। প্রিয় হয়ে ওঠেন।

আরও পড়ুন মহাভারত ২: আজকের মহাকাব্য

ফাগুলালের চরিত্রে ঋদ্ধিবেশের অভিনয় অত্যন্ত স্বতঃস্ফূর্ত, কিন্তু চন্দ্রার চরিত্রে দেবপ্রিয়া অধিকারী চমকপ্রদ। তাঁর হাত নাড়া, মুখ ঝামটা দেওয়া, দেহাতি উচ্চারণ একেবারে পশ্চিমবঙ্গের শ্রমিক মহল্লার হিন্দিভাষী গিন্নীদের মত। বাংলা সংলাপ না থাকলে বিশ্বাস করা শক্ত হত যে চন্দ্রা চরিত্রের অভিনেত্রী বাঙালি। এই প্রযোজনায় রবীন্দ্রনাথের বয়ানের বিনির্মাণে অন্যতম বড় ঝুঁকি নেওয়া হয়েছে অধ্যাপকের চরিত্রকে নারী করে দিয়ে। ব্যাপারটা যে উতরে গেছে তার কৃতিত্ব অনসূয়ার। তিনি অধ্যাপক চরিত্রের পৌরুষ দূর করে তাতে দিব্যি নারীত্ব আরোপ করতে পেরেছেন। নন্দিনীর প্রতি এক ধরনের সমকামী আকর্ষণের আভাস নন্দিনীর চৌম্বক শক্তি বোঝাতেও সহায়ক হয়েছে। শোষণ হচ্ছে মেনে নিয়ে ক্ষমতাকে না চটানোর মধ্যবিত্ত অভ্যাসও অনসূয়া সাবলীলভাবে তুলে ধরেছেন। আর যিনি স্বল্প উপস্থিতিতেও প্রভাব ফেলেন, তিনি হলেন সর্দার চরিত্রে বিপ্লব বন্দ্যোপাধ্যায়। কর্পোরেট শয়তান হয়ে উঠতে তাঁকে উচ্চকিত অভিনয় করতে হয়নি, হাঁটাচলায় মাপা আভিজাত্যের পালিশ দিয়েই কাজ সেরে ফেলেছেন। তাঁর ক্রূরতা তাঁর শীতলতায়।

সবকিছুর পরে একটা ব্যাপারেই মন খুঁতখুঁত করে। এই প্রযোজনার আন্তর্জাতিক মানে ওঠার সাধ্য আছে, সংলাপে একাধিক ভাষার ব্যবহার এবং দর্শকদের হাতে দেওয়া কাগজখানায় কেবল ইংরিজির ব্যবহার থেকে মনে হয়— সাধও আছে। কিন্তু সেদিকে মন দিতে গিয়ে বাংলা কম পড়ে গেল কি? রবীন্দ্রনাথের কিন্তু আন্তর্জাতিক হওয়ার জন্যে কম বাঙালি হওয়ার দরকার পড়েনি। নাজি অধিকৃত ওয়ারশ ঘেটোতে নিশ্চিত মৃত্যুর সামনে দাঁড়িয়ে থাকা শিশুদের ডাকঘর নাটক করার কথা তো আমরা জানি।

নাগরিক ডট নেট ওয়েবসাইটে প্রকাশিত

গণতন্ত্রের কঙ্কাল দেখিয়ে দিলেন জিতু মুন্ডা

যে ‘গণতন্ত্রের উৎসব’ সম্পর্কে আমাদের প্রত্যাশা নামতে এইখানে এসে ঠেকেছে— এ থেকেই প্রমাণ হয় যে ভারতীয় গণতন্ত্রের চামড়া, মাংস, মজ্জা সব খুবলে খাওয়া হয়ে গেছে। পড়ে আছে কঙ্কাল।

নির্বাচনের ভরা মরশুমে একথা বললে নিশ্চয়ই মহাপাপ হবে যে গণতন্ত্র মানে কেবল ভোট দেওয়া, ভোট নেওয়া আর সরকার গঠন নয়। কিন্তু আমরা অনেকেই অনেক পাপ জানতে বা অজান্তে রোজ করে চলেছি। সুতরাং এ পাপও করেই ফেলা যাক। পশ্চিমবঙ্গে এবারে যেভাবে ভোট হচ্ছে, তার সঙ্গে নাজি জার্মানির নির্বাচনের মিল খুঁজতে খুব বেশি কষ্ট করতে হবে না, অমিল বোধহয় একটাই— এখনো কোনো বুথে ভোটারের পাশে দাঁড়িয়ে সশস্ত্র বাহিনীর লোককে কাকে ভোট দেওয়া হচ্ছে নজর রেখেছে বলে খবর নেই। আশা করা যাক, দ্বিতীয় দফার শেষেও অন্তত এইটুকু সান্ত্বনা থাকবে যে তেমনটা হয়নি। এই যে ‘গণতন্ত্রের উৎসব’ সম্পর্কে আমাদের প্রত্যাশা নামতে এইখানে এসে ঠেকেছে— এ থেকেই প্রমাণ হয় যে ভারতীয় গণতন্ত্রের চামড়া, মাংস, মজ্জা সব খুবলে খাওয়া হয়ে গেছে। পড়ে আছে কঙ্কাল।

ব্যাপারটা একেবারে সাদা চোখে দেখতে পাওয়ার ব্যবস্থা করে দেওয়ার জন্যে ধন্যবাদ প্রাপ্য আমাদের প্রতিবেশী রাজ্য ওড়িশার কেওনঝার জেলার বাসিন্দা জিতু মুন্ডার। ‘আমরা পৃথিবীর বৃহত্তম গণতন্ত্র, আমরা পৃথিবীর চতুর্থ বৃহত্তম অর্থনীতি’ বলে গোরিলা গোষ্ঠীর দলনেতার মত বুক বাজানো আমাদের অভ্যাসে দাঁড়িয়ে গেছে। কিন্তু জিতুকে মাত্র হাজার বিশেক টাকা ব্যাংক থেকে তোলার জন্যে যা করতে হয়েছে, তাতে প্রমাণ হয় যে পৃথিবীর যে কোনো গোরিলা সমাজ আজকের ভারতের চেয়ে সভ্য। গোরিলা সমাজে প্রয়াত বোনের কষ্টার্জিত ফলমূল অধিকার করতে বোনের কঙ্কাল মাটি খুঁড়ে তুলে এনে অপেক্ষাকৃত বেশি ক্ষমতাশালী গোরিলার সামনে যে রাখতে হত না— একথা ডায়ান ফসির মত কোনো বিশেষজ্ঞকে জিজ্ঞেস না করেই হলফ করে বলা যায়। জিতুর বোন গবাদি পশু বিক্রি করে ওই কটা টাকা পেয়েছিলেন, তারপর তাঁর মৃত্যু হয়। হতদরিদ্র জিতুকে বারবার ব্যাংকে গিয়ে শুনতে হয়েছে— মৃত্যুর প্রমাণ চাই, অর্থাৎ কাগজ চাই। জিতুর পক্ষে ‘কাগজ দেখাব না’ বলার বিলাসিতা করা সম্ভব নয়, এদিকে তাঁর কাগজও অমিল। জিতুর মত আদিবাসী, প্রান্তিক মানুষের কাছে অনেক কাগজই থাকে না। আগামীদিনে ওড়িশায় এসআইআর হলে হয়ত জিতুকে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার বাইরে ছুড়ে ফেলা হবে, যেভাবে পশ্চিমবঙ্গের ৬৬ লাখ মানুষকে ফেলা হয়েছে (অধিকাংশের কাগজ থাকা সত্ত্বেও)। এমনই রক্তমাংসহীন হিংস্র একটা ব্যবস্থা আমাদের দেশে গণতন্ত্রের নামে চলছে।

অনেকেই বলবেন, ব্যাংকের সঙ্গে গণতন্ত্রের সম্পর্ক কী? কারণ শুরুতেই বললাম, গণতন্ত্র মানে কেবল ভোট— একথা বিশ্বাস করা আমাদের বদভ্যাসে দাঁড়িয়ে গেছে। নিজের টাকা বা প্রয়াত নিকটাত্মীয়ের ব্যাংকে গচ্ছিত টাকা তোলা যে একজন মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার— তা আমাদের মনেই হয় না। যে কোনোদিন যে কোনো ব্যাংকে গেলেই কোনো না কোনো মানুষকে দেখা যায় মৃত আত্মীয়ের টাকাপয়সার ব্যাপারে এসেছেন। ব্যাংক থেকে কিছু কাগজপত্রের তালিকা দিয়ে দেওয়া হয় ভাবলেশহীন মুখে। তার মধ্যে অবশ্যই থাকে KYC, যা জীবিত অবস্থায় ওই গ্রাহক নির্ঘাত ৯৯ বার জমা দিয়েছেন। ডিজিটাল ইন্ডিয়াতেও কেন ব্যাংকের একজন গ্রাহককে বারবার KYC জমা দিতে হবে— এ প্রশ্ন করা হলে নিম্নতম ব্যাংককর্মী থেকে জেনারেল ম্যানেজার পর্যন্ত সকলেই হাত উলটে উত্তর দেন— নিয়ম। এমন নির্বোধ নিয়ম আছে কেন, বাতিল হচ্ছে না কেন— এসব প্রশ্ন আমরা করি না। নিয়ম যে দৈবনির্দেশিত নয়, মানুষের তৈরি, তাতে গোলমাল থাকতে পারে এবং তা পরিবর্তনযোগ্য— সেকথা আমরা ভুলে গেছি। যেমন আমরা মাঝেমধ্যে কাগজে পড়ি বা হাতের মোবাইলে দেখতে পাই, অমুক জায়গায় তমুক লোক আধার কার্ডের বায়োমেট্রিক্স মেলেনি বলে সরকারি প্রকল্পের টাকা পাচ্ছেন না। তারপর আমরা স্ক্রোল করে অন্যকিছুতে চলে যাই। ২০১৮ সালে আমাদের আরেক প্রতিবেশী রাজ্য ঝাড়খণ্ডের পাকুড় জেলার লুখি মুর্মু অনাহারে মারা গিয়েছিলেন ২৩ জানুয়ারি, কারণ অক্টোবর মাস থেকে বায়োমেট্রিক্স মিলছিল না বলে রেশন তুলতে পারেননি। ওই রেশন ছিল তাঁর বেঁচে থাকার চাবিকাঠি। এসব দেখে আমরা আধার কার্ড সম্পর্কে কোনো প্রশ্ন তুলি না। অথচ সুপ্রিম কোর্ট ২০১৬ সালেই রায় দিয়েছে যে সরকারি প্রকল্পে আধার কার্ড ব্যবহার করা যেতে পারে, কিন্তু বাধ্যতামূলক করা যাবে না।

এগুলো আমাদের গণতান্ত্রিক আলোচনার বিষয় নয়। কারণ আমাদের বায়োমেট্রিক্স মেলা না মেলা নিয়ে ভাবতে হয় কেবল মোবাইলের নতুন সিম কার্ড দরকার হলে। দোকানের মালিক বা কর্মচারীদের নিজেদের দায় সিম বিক্রি করা, তাই তারা বেজায় ভদ্রতা করে। আধার না মিললে ‘ভোটার কার্ড আর প্যান কার্ড দিয়ে হয়ে যাবে স্যার’। জিতুর বা লুখির কাছে হয়ত জরুরি কাগজ নেই, বিকল্প কাগজও নেই। কিন্তু তাঁদের জন্যে কেউ অন্য রাস্তার খোঁজ করবে না। কারণ তাঁদের ক্রয়ক্ষমতা নেই, তাই কানাকড়ি দাম নেই। না দোকানে, না ব্যাংকে, না নির্বাচন কমিশনের কাছে। কারণ আমাদের ব্যবস্থায় মানুষের দাম (পড়ুন বৈধতা, শুনতে গণতান্ত্রিক হবে) মানুষ দিয়ে নয়, কাগজ দিয়ে। কোন কাগজ? সেটা আবার ব্যাংক বা রাষ্ট্র ইচ্ছামত বদলে ফেলতে পারে রোজ। পশ্চিমবঙ্গের এসআইআরে ঠিক তাই হয়েছে, এখনো হয়ে চলেছে। ভোটার তালিকায় উঠে যাওয়া নামও এখন ট্রাইব্যুনালের আদেশে বাদ হয়ে যাচ্ছে।

এদিকে এসআইআরে বাদ যাওয়া বিচারাধীন ভোটারদের মধ্যে যাঁদের বিচার হয়েছে, তাঁদের প্রায় ৯৯% বৈধ ভোটার বলে গণ্য হয়েছেন। মানে তাঁদের অবৈধ ঘোষণা করার কোনো কারণই ছিল না। অর্থাৎ গণতন্ত্রের লাগাম আর জনগণের হাতে নেই। এখনো কেউ কেউ ভোট দিতে পারছেন, এই যা। মানে ওই কঙ্কালটাই এখনো অবশিষ্ট আছে। তারও উপকারিতা আছে, দেখালে একটু-আধটু অধিকার পাওয়া যায়। জিতু যেমন ব্যাংকের দরজার সামনে বোনের কঙ্কালটাকে শুইয়ে দেওয়ায় হঠাৎ ব্যাংক সদয় হয়ে গেছে, তাদের KYC-র প্রয়োজনও রাতারাতি মিটে গেছে। জিতুর হাতে বোনের গচ্ছিত টাকা তো তুলে দেওয়া হয়েছেই, সঙ্গে সাহায্য বাবদ আরও টাকা দেওয়া হয়েছে। আহা! দয়ার শরীর বাবুদের!

আরও পড়ুন ভোটচুরির অভিযোগ আমাদের এনে ফেলেছে এক সন্ধিক্ষণে

আমরা অনেকে অবশ্য এটুকু গণতন্ত্রেই খুশি। আমাদের আধ কোটি সহনাগরিক বিনা দোষে ভোট দিতে পারলেন না, তাতে কী হয়েছে? রিগিং হলেও তো কত লোক ভোট দিতে পারে না। আমি ভোট দিতে পারছি মানেই গণতন্ত্র সজীব। আমাদের ফ্ল্যাটের বাইরে পর্যন্ত পা রাখতে হচ্ছে না, হাউজিংয়েই বুথ হয়েছে। এমন গণতন্ত্র কোথাও খুঁজে পাবে নাকো তুমি। রাজ্যটা কাশ্মীর এবং সব নিয়মকানুনের বাইরে চলে যাওয়া মণিপুরের চেয়েও বেশি সশস্ত্র বাহিনীতে ভরে গেল দেখে আমরা আরও নিশ্চিত হচ্ছি যে দেশে গণতন্ত্র বেঁচে আছে। ফরসা টুকটুকে, সুবেশী, হিন্দিভাষী পুলিশ অফিসার আঙুল উঁচিয়ে গ্রামে ঢুকে লোককে শাসাচ্ছেন দেখে আমাদের দারুণ লাগছে। কারণ আমরা হিন্দি সিনেমায় নায়ককে ওরকমভাবে খলনায়ক ও তার দলবলকে শাসাতে দেখেছি। মিডিয়া আবার বলছে, লোকটা ‘এনকাউন্টার স্পেশালিস্ট’। সোনায় সোহাগা। যে অফিসাররা এনকাউন্টার করে তাদের মত বাহাদুর যে আর হয় না, সে তো আমরা সেই অব তক ছপ্পন থেকেই জানি। মিডিয়া লোকটার নাম দিয়েছে সিঙ্ঘম। ওই ছবিটা আরও সাম্প্রতিক, ফলে আমাদের আরও ভালো মনে আছে। অতএব আমরা আহ্লাদে আটখানা। যে লোক আইন আদালতের তোয়াক্কা না করে সোজা ঠুকে দেয়, তার হাতেই যে আমাদের গণতন্ত্র সবচেয়ে নিরাপদ— এতে আর সন্দেহ কী? বিশেষত যার পরিবার পরিজনকে শাসাচ্ছে, সে নিজেই যখন অনেকের মতে অপরাধী। উত্তরপ্রদেশের মত, জাহাঙ্গীরের বাড়ির উপরেই বুলডোজার চালিয়ে দিলে আমরা আরও নিশ্চিত হতে পারতাম যে আমাদের গণতন্ত্রের এই রক্ষীটি জবরদস্ত। ডান, বাম নির্বিশেষে আমাদের এই যে ভাবনা— এটাই প্রমাণ করে যে গণতন্ত্রের কঙ্কালকে জ্যান্ত জিনিস বলে ভুল করছি। জিতু একেবারে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিলেন।

কঙ্কালপুজোর শুভেচ্ছা।

নাগরিক ডট নেট ওয়েবসাইটে প্রকাশিত

এসআইআর মওকায় অনুপ্রবেশ নিয়ে কিছু কথা

যার ওই তথাকথিত যোগ্যতা নেই, টাকা বা পরিচিতিও নেই, তারও কিন্তু উন্নততর জীবনের অভিলাষ আছে। সেই জীবনকে ধাওয়া করার মানবিক অধিকারও আছে। কথাটা যেমন ভারত থেকে যে আমেরিকায় যেতে চায় তার বেলায় সত্যি, তেমন যে বাংলাদেশ থেকে ভারতে আসতে চায়, তার বেলাতেও সত্যি। এই লোকগুলো তাহলে কী করে? বেআইনি পথে বাংলাদেশ থেকে ভারতে ঢোকে, বা ভারত থেকে আমেরিকায় যায়। রাষ্ট্রের ভাষায় বললে— অনুপ্রবেশ করে।

সম্প্রতি নাগরিক ডট নেটের পডকাস্টে এসে সিপিএম নেতা সৃজন ভট্টাচার্য বলেছেন ‘অনুপ্রবেশ শুধু ধর্মীয় কারণে ঘটে না।’ সবিস্তারে বলেছেন— সারা পৃথিবীতেই মানুষ নিজের দেশ থেকে উন্নততর অর্থনীতির দেশে যাওয়ার চেষ্টা করে, ফলে এটা সারা পৃথিবীর সমস্যা। এই কথাগুলো রিল হিসাবে ছড়িয়ে পড়তেই এক শ্রেণির মানুষ রেগে কাঁই হয়েছেন। সেই মওকায় আরও চাট্টি কথা বলে নেওয়ার ধান্দায় এই লেখার অবতারণা।

সৃজন যা বলেছেন তাকে তথ্য হিসাবে অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই। ওই ভিডিওর নিচে ছাপার অযোগ্য ভাষায় যাঁরা মন্তব্য করে যাচ্ছেন, তাঁরা নিজেরাই অনেকে অন্য দেশে বসে আছেন বিভিন্ন পেশার সঙ্গে যুক্ত হয়ে। অমৃতকালের ভারত বা তার আগের ভারত পেশাগতভাবে বা জীবনযাত্রার অন্য মাপকাঠিতে তাঁদের খুব পছন্দের জায়গা হলে নিশ্চয়ই বিদেশে গিয়ে বসবাস করতেন না। সোশাল মিডিয়ায় বামপন্থী বা উদারপন্থী চিন্তাভাবনাকে আক্রমণ করা যাঁদের দৈনন্দিন কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছে গত এক যুগে (পারিশ্রমিকে বা বিনা পারিশ্রমিকে), তাঁদের বড় অংশ তথ্যপ্রযুক্তি ক্ষেত্রের ইঞ্জিনিয়ার এবং ওই পেশার বহু মানুষের গত দুই-আড়াই দশক ধরেই জীবনের লক্ষ্য— কোম্পানির কাজে প্রথম বিশ্বের দেশগুলোতে যাওয়া, তারপর সেই কাজটাকেই স্থায়ী করে নিয়ে, অথবা অন্য কোনো কোম্পানির চাকরি নিয়ে, সেদেশেই থিতু হওয়া। অনেকে তো এক দেশ থেকে আরেক দেশে ভেসেও বেড়ান। দেশে ফেরার কোনো আশু পরিকল্পনা নেই, সুদূর ভবিষ্যতেও নেই। অথচ মানুষ উন্নত অর্থনীতির দেশে চলে যেতে চায় শুনলেই এঁরা তেলে বেগুনে জ্বলে ওঠেন। অবশ্য ওঁরা বলবেন ‘সেটা অভিবাসন, অনুপ্রবেশ নয়।’ সে প্রসঙ্গে আসব, ফাঁকি দেব না।

বলতে দ্বিধা নেই, বছর দশ-পনেরো আগেও, যারা পড়াশোনা করতে বা স্বল্পমেয়াদি কাজের সূত্রে আমাদের দেশ থেকে বিদেশে গিয়ে সেখানকার স্থায়ী বাসিন্দা হয়ে যায়, তাদের খুব ভালো চোখে দেখতাম না। প্রথম বিশ্বের দেশগুলোকে ২০০ বছর ধরে অন্য কোনো দেশ শোষণ করেনি, বরং ভারতের মত দেশগুলোকে শুষেই ওরা ধনী হয়েছে। সুতরাং এদেশের চেয়ে ওসব দেশের জীবনযাত্রা, কাজের সুযোগ ইত্যাদি উন্নত হওয়ারই কথা। সেসবের জন্যে এদেশের গরিব, মধ্যবিত্ত মানুষের ভর্তুকির টাকায় লেখাপড়া শেখা (সরকারি ভর্তুকির জন্যেই এদেশে লেখাপড়ার খরচ কম ছিল বছর পনেরো আগে পর্যন্তও। সরকারের টাকা মানে সাধারণ মানুষের করের টাকা, আর কর মানে কেবল আয়কর নয়) যেসব ছেলেমেয়ে বিদেশেই থেকে যেত, তাদের সম্বন্ধে ‘পলাতক’ শব্দটাই আমি ব্যবহার করতাম। এখন আর করি না, কারণ একাধিক কারণে আমার মত বদলেছে।

প্রথমত, স্বাধীনতার ৮০ বছর হতে চলল, এখনো আমরা দেশটাকে এমন করে তুলতে পারিনি, যেখানে সাদামাটা মানুষও জীবনের ন্যূনতম প্রয়োজনগুলো সুস্থভাবে সোজা পথে মিটিয়ে শান্তিতে বসবাস করতে পারে। উচ্চাকাঙ্ক্ষী হলে তো কথাই নেই। ফলে ইতিহাসের নিয়ম মেনে মানুষ উন্নততর জীবনযাত্রার দিকে দৌড়বেই। এমনকি আদিম মানুষও তাই করত, নইলে মানুষ নামক প্রাণীটি কখনো আফ্রিকা মহাদেশ ছেড়ে বেরোত না (যাঁরা জীববিজ্ঞান ও ইতিহাস মানেন না, তাঁরা এই লেখা পড়া এখানেই বন্ধ করে দিন)।

দ্বিতীয়ত, ভারতের বেশকিছু সম্প্রদায়ের জন্যে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে দেশের অবস্থা শেষ দেড় দশকে এমন করে ফেলা হয়েছে যে সেই সম্প্রদায়ের যে কোনো মানুষই সুযোগ থাকলে দেশ ছেড়ে চলে যেতে চাইবে। তাদের উপরেও রাগ করা চলে না।

তৃতীয়ত, দেশ আর রাষ্ট্র এক জিনিস নয়। আমরা দুটোকে সমার্থক শব্দ বলে ভাবি, কিন্তু আসলে তা নয়। রাষ্ট্র প্রশাসনিক ব্যাপার, দেশ মূলত মনোভূমি। ফলে ভারত রাষ্ট্রের ভূগোল আছে, সরকার আছে। ভারত দেশটার ভূগোল নেই, ইতিহাস আছে। সরকার নেই, সংস্কৃতি আছে। কেউ বুকে করে সেই সংস্কৃতি পৃথিবীর যে কোনো প্রান্তে নিয়ে গিয়ে বাস করতে পারে। সেই কারণেই গ্রীন কার্ড পেয়ে যাওয়া লোকও আমেরিকায় ভারতীয় ক্রিকেট দলের ম্যাচ হলে নীল জার্সি পরে গলা ফাটাতে পারে। মার্কিন রাষ্ট্রের নাগরিকের দায়িত্ব পালন করেও পারে। তার উপর ভারত এমন মজার দেশ যে ভারতীয় সংস্কৃতি মানে আসলে সাড়ে বত্রিশ ভাজা ‘একটি বিরাট হিয়া’। হিয়া মানে মন। সুতরাং ভারতীয় হিয়া যে পৃথিবীর যেখানে নিয়ে যেতে পেরেছে, সেখানেই ভারত আছে বললে ভুল হয় না। যার মনটা ভারতীয়, সে-ই ভারতীয়। তার ধর্ম যা-ই হোক, মুখের ভাষা যা-ই হোক, পেশা যা-ই হোক, বড়লোকই হোক আর গরিবই হোক। ভারতে থাকুক আর না-ই থাকুক। একথা মাথায় ঢোকার পরে আর অনাবাসী ভারতীয়দের উপর রাগ করি না। কিন্তু এইসব প্রিয় কথা বলতে গেলেই কিছু অপ্রিয় কথা এসে পড়ে, যেগুলো বর্তমান আলোচনায় প্রাসঙ্গিক।

উন্নততর জীবনের সন্ধানে যাওয়া আসলে সব মানুষের জন্মগত অধিকার, অথচ দুনিয়ার কোনো রাষ্ট্র সেকথা স্বীকার করে না। তাই এক দেশ থেকে আরেক দেশে ভাগ্যান্বেষণে যেতে হলে নিজের এবং যে রাষ্ট্রে যেতে চান, দুপক্ষেরই সম্মতি আদায় করতে হয়। মানে পাসপোর্ট, ভিসা, ওয়ার্ক পারমিট, পরে নাগরিকত্ব ইত্যাদি। ওগুলো পেতে কী লাগে? আপনি বলবেন যোগ্যতা, আসলে লাগে টাকা এবং/অথবা পরিচিতি। ভেবে দেখুন, নিজেই বুঝতে পারবেন। GRE, CIEFL, TOEFL না কীসব আছে আপনাদের? সেগুলো পাশ না করে কি কেউ বিদেশ যাচ্ছে না, নাকি গিয়ে বাসিন্দা হয়ে যাচ্ছে না? আপনি যাকে যোগ্যতা বলছেন, সেটা কীসের যোগ্যতা? আপনাকে অন্য দেশে ঢোকার অনুমতি আদায় করে দেবে সেদেশের কেউ (আপনি যেখানে পড়তে বা পড়াতে যাচ্ছেন সেই শিক্ষা প্রতিষ্ঠান অথবা আপনি যে কোম্পানির চাকুরে) – এই ব্যবস্থা করার যোগ্যতা।

এখন কথা হল, যার ওই তথাকথিত যোগ্যতা নেই, টাকা বা পরিচিতিও নেই, তারও কিন্তু উন্নততর জীবনের অভিলাষ আছে। সেই জীবনকে ধাওয়া করার মানবিক অধিকারও আছে। কথাটা যেমন ভারত থেকে যে আমেরিকায় যেতে চায় তার বেলায় সত্যি, তেমন যে বাংলাদেশ থেকে ভারতে আসতে চায়, তার বেলাতেও সত্যি। এই লোকগুলো তাহলে কী করে? বেআইনি পথে বাংলাদেশ থেকে ভারতে ঢোকে, বা ভারত থেকে আমেরিকায় যায়। রাষ্ট্রের ভাষায় বললে— অনুপ্রবেশ করে। এ তো গেল আরও ভালো জীবনের আকাঙ্ক্ষায় দেশ বদলানোর কথা। এছাড়া স্রেফ প্রাণে বাঁচতেও মানুষ এক রাষ্ট্র থেকে আরেক রাষ্ট্রে যায়। তাদের উদ্বাস্তু বলাই দস্তুর, কিন্তু যখনই কোনো রাষ্ট্রের মনে হয় ‘ব্যাটারা বড্ড বেশি সংখ্যায় আসছে’, তখনই লাঠিসোটা গুলি বন্দুক বের করে তাদের তাড়াতে লেগে পড়ে। তখন আর উদ্বাস্তু বলে না, বলে অনুপ্রবেশকারী।

কোনটা অনুপ্রবেশ আর কোনটা নয়, সেটা ঠিক করে রাষ্ট্র। আর সংজ্ঞাটা সে যেদিন ইচ্ছে যখন ইচ্ছে বদলে ফেলতে পারে। উদ্বাস্তুদের কথা বাদ দিন। আপনি হয়ত রাতে ঘুমোলেন নাগরিক হিসাবে, সকালে উঠে দেখলেন অনুপ্রবেশকারী হয়ে গেছেন। এই কথাটা কমাস আগে বললেও অনাবাসী বন্ধুরা নির্ঘাত হেসে উড়িয়ে দিতেন, এখন আর পারবেন না। ডোনাল্ড ট্রাম্পের মুখটা একবার মনে করে দেখুন। কদিন আগেই হাড়ে ঠকঠকানি ধরিয়ে দিয়েছিলেন না? স্বীকার না করলেও, অনেকের হাড় এখনো ঠকঠক করেই চলেছে। তা সত্ত্বেও কিন্তু ‘পশ্চিমবঙ্গে বড্ড বেশি বাংলাদেশি আর রোহিঙ্গা ঢুকে পড়েছে’ বলে রাতে ঘুম না হওয়া বাঙালি বাবা-মায়েরা ছেলেমেয়েকে কী করে বিদেশে পাঠানো যায় তার খোঁজখবর জারি রেখেছেন। ‘আমার ছেলে স্টেটসে থাকে’ বলে বিয়েবাড়িতে দূর সম্পর্কের আত্মীয় এবং নতুন পরিচিতের কাছে রেলা নেওয়াও জারি আছে। কয়েক মাস আগে এক বিয়েবাড়িতে তেমন এক আত্মীয়ের সঙ্গে আমার কথা হচ্ছিল। তাঁর ছেলেও ‘স্টেটসে থাকে’, তার উপর বউমা আমেরিকান। স্বভাবতই ভদ্রমহিলা মাটির দু ইঞ্চি উপর দিয়ে হাঁটেন। বউমা আমিষ খান না, কারণ তিনি ‘অ্যানিমাল ক্রুয়েলটি’-র বিরুদ্ধে। সমাজবিজ্ঞান নিয়ে লেখাপড়া করে এখন কী একটা এনজিও-তে ‘আন্ডার-প্রিভিলেজড’ মানুষের জন্য কাজ করেন। গর্বিত শাশুড়ি এসব শোনাচ্ছিলেন আমাদের। বাঙালিসুলভ বোকামিতে জিজ্ঞেস করে ফেলেছিলাম ‘আপনার ছেলে-বউমা কি তাহলে ডেমোক্র্যাট?’ উত্তর এল ‘সেরকম কিছু না, যার যেটা ভালো সেটা বলে। আমার বউমা যেমন বলে, ট্রাম্প ইজ দ্য বেস্ট প্রেসিডেন্ট।’ এই কথোপকথনের আগেই H1B ভিসা নিয়ে ট্রাম্পের বিষোদ্গার শুরু হয়ে গেছে। আমার মনে তার চেয়েও দগদগে ঘা তৈরি করেছে ভারতীয়দের হাতে-পায়ে শেকল বেঁধে বিমানে তুলে আমেরিকা থেকে বের করে দেওয়ার দৃশ্য।

সেসব উল্লেখ করে জিজ্ঞেস করলাম— এসব কাণ্ড করে ট্রাম্প কী করে মার্কিন বউমার চোখে সেরা রাষ্ট্রপতি হন? বাঙাল (নিজেই বললেন) শাশুড়ি উত্তর দিলেন ‘না, ওরা তো বেআইনিভাবে আমেরিকায় গেছিল। ওরা তো অনুপ্রবেশকারী। ওরা আমেরিকায় গেছে স্রেফ টাকা রোজগার করতে। ওদের তো বের করে দিতেই হবে’। উত্তরে বলেই ফেললাম, আপনার ছেলেও তো টাকা করতেই গেছে। ভদ্রমহিলার উত্তর ‘আমার ছেলে তো পাসপোর্ট, ভিসা করিয়ে গেছে।’ অর্থাৎ ঘুরে ফিরে ব্যাপারটা দাঁড়াল ওই— রাষ্ট্রের দেওয়া কাগজ যাকে অভিবাসী বলে সে-ই অভিবাসী, অন্যরা অনুপ্রবেশকারী। এই কাগজ জোগাড় করা কিন্তু যোগ্যতার ব্যাপার নয়, নেহাতই রাষ্ট্রের দয়া। এ দয়া যদি ১৯৪৭ সালের পরে ভারত রাষ্ট্র না দেখাত, তাহলে আজ যে বাঙালরা এবিপি আনন্দ ইত্যাদি চ্যানেলে দেখানো হাজার হাজার লোকের বাংলাদেশে পালানোর ভুয়ো ভিডিও দেখে উল্লসিত, এসআইআরে বাদ পড়া লোকেরা ঢিট হয়েছে ভেবে নাচছেন, তাঁদের বাপ-মায়েরা কিন্তু অনুপ্রবেশকারী হয়ে যেতেন।

তবে একটা কথা মানতেই হবে। ট্রাম্প, তাঁর উপরাষ্ট্রপতি জে ডি ভান্স, যতই অভিবাসীদের বাড়ির মেয়ে বিয়ে করে ভণ্ডামি করুন, নরেন্দ্র মোদীর বিজেপির কিন্তু অন্য দেশ থেকে আসা লোকেদের ব্যাপারে চিন্তাভাবনা অনেক পরিষ্কার। তথাগত রায় যখন রাজ্য সভাপতি ছিলেন, সেই জুরাসিক যুগ থেকে বঙ্গ বিজেপি বলে আসছে— বাংলাদেশ থেকে আসা মুসলমানরা অনুপ্রবেশকারী, হিন্দুরা শরণার্থী। কেন্দ্রে একক শক্তিতে ক্ষমতায় আসার পরে তারা নাগরিকত্ব আইনের যে সংশোধন করেছে, তাতেও এই ভাবনাকেই স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। এতক্ষণ ধরে যা যা বলেছি, সবকিছুর বিপরীতে পুরনো ও নতুন বাঙালরা সেই আইনকে তুলে ধরতে পারেন। কিন্তু ডেভিল (ডিমের নয়, বিজেপির প্রতি বিশ্বস্ত হতে চাইলে আমিষ-চিন্তা মাথা থেকে তাড়ান) যে ডিটেলে। এসআইআর থেকে বাদ দেওয়ার সময়ে কই হিন্দুদের রেখে দেওয়া হল না তো! এখন যে নিত্য হিন্দু বীর অমিত শাহ এসআইআর থেকে বাদ পড়া মানুষকে দেশছাড়া করার হুমকি দিচ্ছেন, তাতেও তো বলছেন না যে হিন্দুদের রেখে দেওয়া হবে? অনুপ্রবেশকারী আর শরণার্থী বলে দুটো গোষ্ঠীর কথা তো বলছেন না? একটা শব্দই তো ব্যবহার করছেন— ‘ঘুসপ্যায়েট’।

আরো পড়ুন রামদাসী, লালদাসের ধর্ম এবং রামমন্দির

আসামের ডিটেনশন ক্যাম্পেও কিন্তু কেবল মুসলমানদের ঢোকানো হয়নি। উলটে একাধিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ওই রাজ্যের ডিটেনশন ক্যাম্পে আটক বেশিরভাগ মানুষ হিন্দু বাঙালি।

সংঘ পরিবারের সোশাল মিডিয়া যোদ্ধারা যে নেহাত পুতুলখেলায় লিপ্ত নন, সংঘের মনের কথাই যে তাঁদের মুখ দিয়ে বেরোয়— একথা যদি জানা থাকে, তাহলে বুঝতে অসুবিধা হওয়ার কথা নয় যে এক্ষেত্রেও অমিত শাহরা অত্যন্ত সৎ। কারণ ওঁদের আই টি সেলের লোকেরা ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বাসিন্দা হিন্দুদের জন্যে কেঁদে ভাসালেও তাদের এদেশে আশ্রয় নেওয়ার প্রসঙ্গ উঠলেই বলে ‘দেশটা কি ধর্মশালা নাকি?’ অর্থাৎ এঁদের হিন্দু বাঙালির প্রতি প্রীতি আসলে, গোদা বাংলায় যাকে বলে, মায়ের চেয়ে মাসির দরদ বেশি। মানে আহা উহু করব, কিন্তু দায়িত্ব নেব না। তাহলে আহা উহু করাই বা কেন, ভেবে দেখেছেন কি? কারণটা খুব সহজ। যাতে ওদেশের সংখ্যালঘুর প্রতি অত্যাচারকে এদেশের সংখ্যালঘুর অত্যাচারের পক্ষে যুক্তি হিসাবে তুলে ধরা যায়। মানে শুঁড়ির সাক্ষী যেমন মাতাল, সংঘ পরিবারের সাক্ষী জামাত। মুশকিল হল, বাংলাদেশের মানুষ জামাতকে হারিয়ে ভূত করে দিলেন; পশ্চিমবঙ্গের মানুষের হিন্দুত্বের নেশা কিন্তু কাটছে না। আই টি সেল নিরুপায় হয়ে আঁকড়ে ধরেছে পশ্চিমবঙ্গের সীমান্তবর্তী আসনগুলোতে জামাতের জয়কে, তাই দিয়ে হোয়াটস্যাপ গ্রুপগুলোর মাধ্যমে ‘পশ্চিমবঙ্গ বিপন্ন, বাংলাদেশ হয়ে যাবে’ বলে ভয় দেখানো হচ্ছে। বাঙালি সে প্রোপাগান্ডা এখনো গিলছে। কারণ মুসলমানদের প্রতি অকারণ ভয় থেকে তৈরি হওয়া ঘৃণা এতদিনে ঘাড়ে এমন চেপে বসেছে যে সৃজন যখন বলছেন ‘রাষ্ট্র কোনোদিনই খুব ভালো জিনিস নয়’, তখন এঁরা মনে করছেন— পশ্চিমবঙ্গকে বাংলাদেশ বানানোর চক্রান্ত করছে। ফলে যে হিন্দুর নিজের নাম এসআইআরে বাদ পড়েনি, তিনি আর যাঁর নাম বাদ পড়েছে তাঁকে নিয়েও চিন্তিত নন। রাষ্ট্রের প্রতি এমন অচলা ভক্তি তৈরি হয়েছে যে ভেবে নিচ্ছেন— এমনি এমনি তো আর বাদ দেয়নি, ওরা হিন্দু হলেও নির্ঘাত বাংলাদেশ থেকে এসেছে।

এখন বুঝবেন না, যখন বুঝবেন তখন অনেক দেরি হয়ে যাবে জেনেও একবার বলে রাখা যাক— রাষ্ট্র, বিশেষ করে আধুনিক জাতিরাষ্ট্র, নেহাতই সেদিনের ছেলে। বয়স আড়াইশো-তিনশো বছরের বেশি নয় এবং জিনিসটা মানুষের তৈরি। যদি ভগবান বলে কেউ থেকেও থাকেন, তিনি রাষ্ট্রগুলোর সীমানা এঁকে দিয়ে পৃথিবীর রাজনৈতিক ম্যাপটা তৈরি করেননি। স্রেফ গত একশো বছরেই কতগুলো রাষ্ট্র তৈরি হয়েছে আর ভেঙে গেছে গুগল করে দেখে নিলেই চলবে, সৃজনকে বা এই নিবন্ধকারকে বিশ্বাস করার দরকার নেই।

সুতরাং মানুষের তৈরি রাষ্ট্র, নাগরিকদের সিদ্ধান্তে তৈরি রাষ্ট্র যখন নিজের মর্জি মত নির্ধারণ করে— এ নাগরিক আর ও নাগরিক নয়, তখন প্রতিবাদ করাই বুদ্ধিমানের কাজ। কারণ এ জিনিস একবার শুরু হলে থামবার নয়। কাল মর্জি বদলালে রাষ্ট্র নাগরিক হওয়ার মাপকাঠি বদলে দেবে। আজকের মাপকাঠিতে আপনি নাগরিক, সেদিনের মাপকাঠিতে বাদ পড়ে যেতে পারেন। কী করবেন তখন? আপনারাই তো বলেন— মুসলমানদের ভারতে থাকার দরকার নেই, তাদের যাওয়ার জন্যে নাকি ৫৭ খানা দেশ আছে। আপনাদের এই একটাই দেশ।

নাগরিক ডট নেট ওয়েবসাইটে প্রকাশিত