নাম তার ছিল: ১১

পূর্বকথা: পেশায় রোড কন্ট্রাক্টর সমীর পঞ্চায়েত সমিতিতে রবীনের কাছে পাত্তা না পেয়ে বাড়িতে এসে হাজির হয়, হাতে শুভময়ের কবিবন্ধুর বই। ক্রমশ যাতায়াত বাড়ে, কোন দিন কী সুবিধা চেয়ে বসবে ভেবে অস্বস্তি হয় রবীনের। সমীরের গাড়ি চেপে কলকাতায় ঠাকুর দেখতে যাওয়ার প্রস্তাবে জোনাকি উল্লসিত হয়, রবীনের বারণ শোনে না। অতঃপর

শ্রীপুর-মদনপুর পঞ্চায়েত সমিতির লাগোয়া ঋষিনগর পঞ্চায়েত সমিতি। সেখানে বেশ কয়েক কিলোমিটার রাস্তা তৈরি হবে। পুজোর পরেই টেন্ডার ডাকা হবে জানত রবীন। পুজোর আগে জেলা পার্টি অফিসে ওখানকার সভাপতি কমরেড রাখী সরকারের সাথে দেখা হয়েছিল, উনিই বলেছিলেন।

সমীরদের বাড়িতে বড় করে লক্ষ্মীপুজো হত। টিফিন কেরিয়ারে সেই প্রসাদ নিয়ে বাইক চালিয়ে সন্ধেবেলা এসেছিল সে। রবীন তখন বাড়িতেই। জোনাকি চা করল, খেতে খেতে সমীর বলল “রবীনদা, শুনলাম ঋষিনগরে একটা বড় রাস্তার কাজ আছে?”

গণশক্তিতে সেদিন সরোজ মুখার্জির লেখাটা সকাল থেকে পড়ে ওঠার সময় পায়নি রবীন। সবে শুরু করেছে, বকবক করার একদম ইচ্ছে ছিল না। শুধু বলে “হুঁ।”

“ওখানকার সভাপতি তো একজন মহিলা, না?”

“হুঁ। রাখীদি।”

“ও, আপনার থেকে সিনিয়র? আমি ভেবেছিলাম একটু জুনিয়রই হবে।”

রবীন কোন জবাব দেয় না। মন তখন পুরোপুরি লেখাটায়।

সমীরই বলে “আপনার সাথে তো খুব ভাল আলাপ।”

“হুঁ।”

“ভাবছিলাম ওখানকার টেন্ডারটা তুলব।”

“তোলো।”

“আপনি একটু বলে রাখবেন নাকি?”

এবার কাগজ থেকে চোখ তুলতেই হয়। সে দৃষ্টি দেখে হাত পা ঠান্ডা হয়ে আসে সমীরের।

“কাকে কী বলতে বলছ?”

“ন….না। ও….ই আর কি। রাখীদিকে।”

“কী বলব?”

কী বলতে হবে সেটা রবীন জানে না তা যে একেবারেই নয়, সেটুকু বোঝার বুদ্ধি সমীরের ছিল। উঠে চলে যাবে কিনা ভাবছে, এমন সময় জোনাকি ঘরে ঢুকেই হড়বড় করে অনেক আবোল তাবোল বলতে থাকে। সমীর বুঝতে পারে সেদিকেই মন দেওয়া ভাল, রবীনও গণশক্তির পাতায় ফিরে যায়।

তবে আর একটা শব্দও পড়ে উঠতে পারে না। মাথাটা এত গরম হয়ে গিয়েছিল যে কিছুতেই ঠান্ডা করে লেখাটায় মন দেওয়া যাচ্ছিল না।

পরদিন ছিল শনিবার। স্কুল থেকে ফিরে, খেয়ে দেয়ে আর বিশ্রাম না নিয়ে রবীন হীরুদার বাড়ি রওনা দিয়েছিল।

পৌঁছে দ্যাখে ঘর ভর্তি লোক। অধিকাংশই চেনা, পার্টির লোক। কিন্তু তাদের সামনে যা বলতে এসেছে তা বলা উচিৎ হত না। অতএব চুপ করে অপেক্ষা করতে হয়। ঘরে ঢুকতেই হীরুদা খেয়াল করেছেন, হাত নেড়ে বসতেও বলেছেন। মুখ দেখেই বুঝেছেন গুরুতর কিছু ঘটেছে। তাই উনিও সকলের মাঝখানে উচ্চবাচ্য করছেন না। একবার শুধু জিজ্ঞেস করলেন “রবীন চা খাবে নাকি? খেলে… আচ্ছা থাক।” আসলে বলতে শুরু করেই মনে পড়েছে রবীনের চা খেতে ইদানীং খুবই অসুবিধা হয়, হাতটা আজকাল একটু বেশিই কাঁপে। তাই চুপ করে গেলেন।

ঘন্টা দুয়েক লাগল সবার সাথে কথা শেষ করতে। ঘর খালি হলে রবীনকে চৌকিতে পাশে এসে বসতে বললেন। তারপর তলা থেকে অ্যালুমিনিয়ামের বড় বাটিটা বের করে তাকের টিন থেকে মুড়ি, আর কৌটো থেকে চানাচুর ঢাললেন। পাশের ছোট বাটি থেকে গোটা তিনেক লঙ্কা নিয়ে এসে বসলেন। রবীনের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বললেন “নাও। একটু শুকিয়ে গেছে, তাও খারাপ ঝাল নয়।”

রবীন এক গাল মুড়ি মুখে ফেলে, লঙ্কায় একটা কামড় দিয়ে বলল “হীরুদা, আর পারছি না। এবার আমায় ছেড়ে দিন।”

“পারছ না? কী পারছ না?”

“সভাপতির দায়িত্ব আর সামলাতে পারছি না। আপনি অনুমতি দিলে আমি রিজাইন করব।”

“সে কি! তুমি জেল খাটা ছেলে, কী এমন চাপ পড়ল যে রিজাইন করতে চাইছ? অক্রূরকে তো তোমার এখন সামলাতে পারা উচিৎ। ওর বিষদাঁত তো অনেকদিন ভেঙে ফেলেছ!”

“না, সমস্যা ওনাকে নিয়ে নয়।”

“তবে?”

“সমস্যা নিজেকে নিয়ে। আমি প্রলোভনগুলো এড়াতে পারছি না।”

রবীনকে অবাক করে হীরুদা মুচকি হাসেন। তারপর জানলা দিয়ে মুখ বাড়িয়ে হাঁক দেন “নন্দওওও।”

নীচের রাস্তা থেকে উত্তর আসে “এই যে, কাকু।”

“দুটো চা। একটা আমার, আরেকটা দুধ চিনি দিয়ে।”

“পাঠাচ্ছি।”

হীরুদা বিড়ি ধরিয়ে জিজ্ঞেস করেন “তা কী দিয়ে তোমায় কেনা গেল শেষ অব্দি?”

রবীন শশব্যস্ত হয়ে বলে “না না, সেরকম কিছু হয়নি। আমি ঘুষ টুষ নিইনি। প্রস্তাব দিতে সাহসই পাবে না কেউ।”

“এই যে বললে ‘প্রলোভন জয় করতে পারছি না’? কিসের প্রলোভন দিয়েছে?”

রবীন মাটিতে মিশে যেতে যেতে বলে “আমাকে নয়, আমার বউকে।”

“অ। তোমায় কাবু করতে পারবে না বুঝে তোমার বউকে ধরেছে। কে? কোন কন্ট্রাক্টর?”

রবীন মাথা নাড়ে। এবার হীরুদা একটু গম্ভীর হয়ে যান।

“কী দিয়েছে? শাড়ি জামাকাপড়?”

“সেটা হলে তো জোর করে ফেরত দিয়ে দিতাম, মিটে যেত। এ চালাক লোক। পুজোর মধ্যে একদিন গাড়ি করে কলকাতার ঠাকুর দেখাতে নিয়ে গিয়েছিল। আমাকেও পীড়াপীড়ি করেছিল। আমি কাটিয়ে দিয়েছি।”

“তা তোমার বউ রাজি হয়ে গেল?”

“অনেক বুঝিয়েছিলাম। বুঝল না।”

“বোঝো! তোমার শালা তো শুভময়। মানে সি পি আই রাজ্য কমিটির সদস্য শুভময়। তাই না?”

“হুম।”

“তার বোনের এরকম বুদ্ধি শুদ্ধি! আশ্চর্য!”

রবীনের চুপ করে থাকা ছাড়া কোন উপায় ছিল না। নিভে যাওয়া বিড়িটা আবার ধরিয়ে হীরুদা বলেন “যাক গে। লোকটা তার বিনিময়ে কী দাবী করেছে? পুজো তো সেই কবে হয়েছে, হঠাৎ আজ তোমার পদত্যাগ করার ইচ্ছে হল কেন?”

“তখুনি তখুনি তো কিছু দাবী করেনি… সেই জন্যেই আর কিছু বলিনি। কিন্তু গতকাল আলগাভাবে বলার চেষ্টা করছিল আমি যেন রাখীদিকে বলি ওর টেন্ডারটা দেখতে। ঋষিনগরে মেন রোডটা তৈরি হচ্ছে না?”

“তা তুমি কী বললে?”

“কিছুই বলিনি। কটমটিয়ে তাকাতেই ভয়ে চুপ মেরে গেছে।”

“কী নাম এর?”

“সমীর। সমীর রাউত। থান রোডের যে কাজটা আমাদের পঞ্চায়েত সমিতিতে হল সেটাও ওরাই করেছিল। কিন্তু তখন আমার সাথে আলাপ ছিল না। টেন্ডার কী করে জমা দিতে হয় জানতে একদিন হঠাৎ আমার অফিসে ঢুকে পড়েছিল, আমি ভাগিয়ে দিয়েছিলাম। তারপর হঠাৎ একদিন দেখি আমার বাড়ি গিয়ে হাজির। জোনাকির দাদার এক বন্ধুর রেফারেন্স নিয়ে এসেছিল। ফলে ঠিক তাড়িয়ে দেওয়াও সম্ভব হয়নি।”

“এবং সেই থেকে নিয়মিত যাতায়াত শুরু করেছে তো?”

“হ্যাঁ। ছেলের সাথেও ভাব জমিয়েছে, জোনাকিকেও ‘বৌদি বৌদি’ করে পকেটে পুরে ফেলেছে। কী বিপদে যে পড়েছি, হীরুদা।”

“তোমার ছেলের তো বছর ছয়েক বয়স। তার কথা নয় বুঝলাম, কিন্তু তোমার স্ত্রী…”

“আমার রিজাইন করা ছাড়া কোন উপায় নেই, দাদা। আমার চারপাশে স্বার্থান্বেষীদের ভিড় জমতে শুরু করেছে। এই বেলা ক্ষমতা ছেড়ে না দিলে পরিস্থিতি আমাকে দুর্নীতিগ্রস্ত হতে বাধ্য করবে।”

চা এসে পড়ে। হীরুদা খেতে খেতে পায়চারি করেন। রবীনকে অপেক্ষা করতে হয় একটু ঠান্ডা হওয়ার জন্যে। নইলে চলকে পড়ে একটা বিশ্রী কাণ্ড হবে। ও বুঝতে পারে হীরুদা বেশ চিন্তায় পড়েছেন।

হাঁটাহাঁটি করতে করতেই চা শেষ করেন। তারপর বসে পড়ে বলেন “আপাতত তুমি চালিয়ে যাও, বুঝলে? কোন উপায় নেই। এই সময়ে হঠাৎ সভাপতি বদল করলে বিরোধীরা প্রশ্ন তুলবে ‘কেন? কী হয়েছিল?’ তখন আমরা কী জবাব দেব? তাছাড়া তোমার জায়গায় বসাব কাকে, বলো তো? সহ সভাপতিটিকে বসালে কি কেলেঙ্কারিটা হবে তুমি তো বোঝোই।”

রবীন প্রবল প্রতিবাদ করে। “কিন্তু এদের আমি আটকাব কী করে, হীরুদা? বউকে বাড়ি থেকে বার করে দেব? তা তো পারব না।”

“ছি ছি, তা করবে কেন? বউকে বোঝাও। প্রয়োজনে ঝগড়া করো। দুর্বল হলে চলবে না, কমরেড। লড়াইয়ের এই তো শুরু।”

রবীন ভেবে পায় না কী করে, কতদিন আটকাতে পারবে সমীরকে, সমীরের মত আরো যারা ভবিষ্যতে আসবে তাদের।

“তুমি গান টান শোনো, রবীন?” এই প্রশ্নটা হঠাৎ কেন, রবীন বুঝতে পারে না।

“শুনি। বাবা সবুজগ্রামের বাড়িটা করার পরে অনেক কষ্টে একটা রেকর্ড প্লেয়ার কিনেছিলেন, এখনো দিব্যি চলছে। পিন বদলানো ছাড়া কোন খরচ নেই।”

“বাঃ! আমার তো গান শোনা বলতে এইটে।” হীরুদা টেবিলের উপর থেকে হাতলওয়ালা রেডিওটা তুলে দেখান। “যা-ই হোক, গান যখন শোনো তখন রবীন্দ্রনাথ শোনো নিশ্চয়। ঐ গানটা মন দিয়ে শুনবে। ‘তোর আপনজনে ছাড়বে তোরে, তা বলে ভাবনা করা চলবে না।’”

রবীন বোঝে, কিন্তু কিভাবে চলা উচিৎ সেটা বোঝে না।

“অত ভাবনার কিছু নেই,” হীরুদা কাঁধে হাত রেখে বলেন। “তুমি যেমনভাবে ছেলেটিকে স্টোনওয়াল করছ, তেমনই করে যাও। সুবিধা আদায় করতে না পারলেই দেখবে ছোঁড়া নিজেই সরে পড়বে। আগামী পঞ্চায়েত ভোটে আর তোমায় প্রার্থী করব না। কথা দিচ্ছি।”

কথাটা কিছুটা স্বস্তি দেয় রবীনকে। ভোটের তখন আর কয়েক মাস বাকি।

হীরুদার কথামত সে জোনাকিকে আবার বোঝানোর চেষ্টা করেছিল যে সমীরের মত কারো সঙ্গে রবীনের বা তার পরিবারের কোন রকম ঘনিষ্ঠতাই থাকা উচিৎ নয়। কিন্তু বলতে গেলেই এমন রণং দেহি মূর্তি হয়ে দাঁড়াত স্ত্রীর যে বলাই বন্ধ করে দিতে হয়। জোনাকির সেই এক কথা। “তোমার মনটাই ব্যাঁকা। মানুষকে সোজা ভাবে দেখতে জানো না। আমি মানুষকে মানুষ হিসাবে দেখি, পেশা দিয়ে বিচার করি না।” অগত্যা রবীন করত কি, সমীর এলেই কোন না কোন ছুতোয় বাড়ি থেকে বেরিয়ে যেত। তাতে জোনাকির উপর কোন প্রভাব না পড়লেও রবীন এই ভেবে স্বস্তি পেত যে সমীর কোন অন্যায় অনুরোধ করার সুযোগ পাচ্ছে না।

সেবারের বসন্তটা রবীন আমৃত্যু ভোলেনি।

তখন দক্ষিণে হাওয়া ছেড়েছে। সন্ধেয় কোন কাজ না থাকলে পঞ্চায়েত সমিতি থেকে ফিরে হাত মুখ ধুয়ে বিপ্লবকে কাঁধে চড়িয়ে হরিমতীর ঝিলের পাড়ে চলে যেত। বাবলুর চায়ের দোকানে বসে বিকেলের চা খেত, বিপ্লব খেত সন্দেশ বিস্কুট বা বাপুজি কেক। ওখানে বসে এলাকার পার্টি না করা লোকেদের সাথে গল্পগুজব হত। যার যত অভাব অভিযোগ সব ওখানে জানা যেত। পার্টির ছেলেপুলে দু একজনও থাকত না তা নয়। বাবলুই ছিল পার্টির সবচেয়ে বড় সমালোচক। ও জ্যোতি বসুর উপর চটে থাকত প্রায় সব সময়েই। জ্যোতিবাবু যা করেন, সবই ওর চোখে ভুল। সবেরই বিকল্প ব্যবস্থা ওর জানা। মাঝে মাঝে রবীন হাসতে হাসতে বলত “নাঃ! জ্যোতিবাবুরে দিয়া আর চলব না রে, বাবলু। আগামী বারে আমরা জিতলে তরেই মুখ্যমন্ত্রী করুম।” অন্য ক্রেতারা হেসে খুন হত।

তেমনই একটা দিনের কথা। সেদিন সকাল থেকেই শরীরটা ভাল লাগছিল না। জোনাকি বারণ করেছিল পঞ্চায়েত সমিতি যেতে। কিন্তু সেদিন অনেকগুলো জরুরী মিটিং, না গিয়ে উপায় ছিল না। সারাদিন কেমন বুক পেট ভার লাগল। ক্যান্টিনের যে খাবার রোজ দুপুরে তৃপ্তি করে খেত রবীন, সেটাও সেদিন সামান্য খেয়ে আর ভাল লাগল না। অফিস থেকে বেরোনোর সময়ে মনে হল গা গুলোচ্ছে, বমি হবে। হনহনিয়ে বাথরুমে যেতে যেতেই মাথাটা ঘুরে গেল, তারপর সব অন্ধকার।

যখন জ্ঞান ফিরল, রবীন দ্যাখে ও সভাপতির টেবিলে শুয়ে আছে, ওকে ঘিরে অফিসের সবাই। পঞ্চায়েত সমিতিরই সদস্য ডাক্তার প্রাণতোষ হাজরা ভুরু কুঁচকে তাকিয়ে আছেন। “সব দেখতে পাচ্ছেন পরিষ্কার? আমাদের সবাইকে চেনা যাচ্ছে?” রবীন মাথা নেড়ে হ্যাঁ বলতে পেরেছিল। কথা বলার শক্তি পাচ্ছিল না। তখনো যেন চারপাশটা অল্প অল্প দুলছে। “দেখি পালসটা। সঙ্গে তো স্টেথোটা পর্যন্ত নেই,” বলতে বলতে উনি রবীনের কব্জিটা ধরেন। ঘড়ি দেখে বলেন “এখন অনেকটা ভাল। বাড়ি গিয়ে অবশ্যই একটা কাউকে দেখিয়ে নেবেন। ইসিজি মাস্ট। এখুনি উঠবেন না, আরেকটু শুয়ে থাকুন।”

মিনিট কয়েক পরে উঠে বসলেও, মাটিতে পা রাখতেই মাথাটা ঝনঝন করে ওঠে। ডাক্তার হাজরা বলেন “ওনাকে একলা ছাড়া যাবে না। ট্রেনে করে একা একা যাওয়ার অবস্থা নেই। আমি যাচ্ছি সঙ্গে। আর কে যাবে?” আরো জনা দুয়েক রাজি হয়ে যায়। এস ডি ও সাহেব নিজের গাড়িটা দিতে চেয়েছিলেন পৌঁছে দেওয়ার জন্য, রবীন রাজি হয়নি। হাঁটতে খুবই কষ্ট হচ্ছিল। তিনজনে মিলে প্রায় চ্যাংদোলা করে রিকশায় মদনপুর স্টেশন, তারপর ট্রেন, তারপর সবুজগ্রাম স্টেশন থেকে আবার রিকশায় চাপিয়ে রবীনকে বাড়ি নিয়ে এসেছিল।

সেদিন পাড়ার হরিসভায় কীর্তন হচ্ছিল। দুপুর থেকেই জোনাকি ছেলেকে নিয়ে সেখানে। বাড়ির উল্টোদিকের ক্লাবের ছেলেরা মাঠে বসে আড্ডা মারতে মারতে হঠাৎ দ্যাখে রবীনকে রিকশায় কোন মতে শুইয়ে দুজন নিয়ে আসছে, পেছনে আরেকটা রিকশা। রবীনের চোখ বন্ধ দেখে মনে হয়েছিল বুঝি অজ্ঞান। আসলে চোখ খুলে রাখলে মাথায় অসহ্য ব্যথা হচ্ছিল, তার উপর রিকশার ঝাঁকুনি। বাড়ি তালাবন্ধ দেখে ক্লাবের ছেলেরাই দৌড়ে গিয়ে রবীনকে নিয়ে এসে ক্লাবঘরে শোয়ায়। সারা পাড়ার লোক জড়ো হয়। পাশের বাড়ির ভদ্রমহিলা জানতেন জোনাকি আর বিপ্লব হরিসভায়। একটা ছেলে দৌড়ে ডেকে নিয়ে এসেছিল ওদের।

ডাক্তার হাজরা স্থানীয় কার্ডিওলজিস্ট এসে ইসিজি করা পর্যন্ত ছিলেন। ইসিজিতে কোন অস্বাভাবিকতা ছিল না। কিন্তু সাহায্য ছাড়া হেঁটে বাথরুম পর্যন্ত যাওয়ার ক্ষমতাও ছিল না রবীনের। পরের হপ্তা দুয়েক এই অবস্থা চলেছিল। সেই পনেরো দিনে শুভময় আর রচনা এসে দেখে গেছে, সেই বিয়ের আগে থেকে বলা সত্ত্বেও রবীন বড় ডাক্তার দেখায়নি বলে বকাঝকা করেছে। পারিবারিক ডাক্তার আর ডাক্তার হাজরার সাথে আলোচনাও করেছে কী করা উচিৎ। দুই ডাক্তারের মতেই হার্টের সমস্যা নেই যখন, তখন অসুখটা নিউরোলজিকাল। সম্ভবত রবীনের হাত কাঁপার সঙ্গে জড়িত। শুভময়ের সাথে ছাত্র রাজনীতি করতেন, পরে সিপিএমে যোগ দেন ডাক্তার জীবন চৌধুরী। তখন ভারতের সবচেয়ে নাম করা নিউরোলজিস্ট। তাঁকে দেখানোর ব্যবস্থা করে দিয়েছিল শুভময়।

পরের ছ মাস মাসে দুবার সবুজগ্রাম থেকে কলকাতা যেতে হত ওঁকে দেখাতে। রবীনের তখন যা অবস্থা, ট্রেনে বাসে যাওয়া খুব কষ্টকর। কষ্ট করে হলেও সেভাবেই সে যেতে চেয়েছিল। কিন্তু জোনাকি কিছুতেই গাড়ি ছাড়া ওকে নিয়ে যাবে না, আর সে গাড়ি সমীরের। রবীন প্রবল আপত্তি করলেও বলরাম, দিদি শ্যামা আর শুভময় জোনাকির পক্ষ নিয়ে প্রবল ধমকাধমকি করে। অশক্ত শরীরে রবীনকে মেনে নিতেই হয়।

*এই উপন্যাসের সমস্ত ঘটনা ও চরিত্র কাল্পনিক। কোন সত্যি ঘটনা বা জীবিত/মৃত ব্যক্তির সাথে মিল পাওয়া গেলে তা সম্পূর্ণ অনিচ্ছাকৃত। কিছু বাস্তব চরিত্রের নাম এসেছে কেবল সময়কাল বোঝাতে

ভাল লাগলে টাকা পাঠাতে পারেন:

Google Pay / Paytm / BHIM বা অন্য মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে journopratik@oksbi কে

অথবা

নেট ব্যাঙ্কিং বা অন্য উপায়ে নিম্নলিখিত অ্যাকাউন্টে

Pratik Bandyopadhyay
A/c No. 10490957306
State Bank of India
Konnagar branch
IFSC: SBIN0002078

নাম তার ছিল: ১০

পূর্বকথা: প্রশাসন চালাতে গিয়ে পদে পদে প্রলোভন জয় করতে হয়েছে রবীনকে। সকলে পারে না। যারা পারেনি, তাদের কথা ভেবে মন খারাপ হয় রবীনের। আর মনে পড়ে তার একমাত্র ছেলে বিপ্লব কত ছোট বয়সে বুঝতে পেরেছিল, সৎ থাকা মানে কেবল প্রলোভন জয় করা নয়। কমিউনিস্ট হওয়া মানেও কেবল নিজে দুর্নীতিমুক্ত থাকা নয়

“আমার লোভ নেই — এই অহঙ্কারটা করলেই গণ্ডগোল, মাস্টারমশাই,” বলেছিলেন পাগল মহারাজ। “লোভ সকলেরই থাকে। সেই লোভের সাথে লড়াই করতে হয়, লোভ জয় করতে হয়। যেই আপনি ভাববেন আপনার লোভ নেই, অমনি আলগা দেবেন আর সেই সুযোগে লোভ জিতে যাবে। কিন্তু আপনাকে তো সে লড়াইয়ে হারতে দেখিনি এখন অব্দি! তাহলে কার লোভ দেখে এত উত্তেজিত হয়ে পড়েছেন?”

রবীন কথাটা অন্যদিকে ঘুরিয়ে দিয়েছিল, উত্তরটা দেয়নি। কারণ সত্যি কথাটা বলতে পারা যেত না, পারা যায় না। ততদিনে স্বামী মৃণ্ময়ানন্দর সাথে বেশ জমাট সখ্য হয়েছে। তবু বলা যায় না। যতই হোক, উনি তো আর নবারুণের মত ছোটবেলার বন্ধু নন। তার সাথেই যেখানে এই গোপন ব্যথাগুলো ভাগ করে নেওয়ার দিন নেই, সেখানে কয়েক বছরের বন্ধুত্বে পাগল মহারাজকে কী করে বলা যায়? যার লোভ রবীনকে অস্থির করে তুলেছিল সে যে জোনাকি। তাকে যে রবীন ভালবাসে। তার দোষ ত্রুটি কখনো বাইরের লোককে বলা যায়? মহারাজ রবীনের যত বড় বন্ধুই হোন না কেন, নবার মত পরিবারের অংশ তো হয়ে যাননি। কোনদিন হবেন না।

নবার সাথে বিচ্ছেদ অনেকটা একা করে দিয়েছে রবীনকে। বিচ্ছেদের কারণ কিছুটা জোনাকিও বটে, কিন্তু সেজন্যে ওকে দায়ী করে না রবীন। প্রশ্নটা ছিল নৈতিক এবং সেখানে ও আপোষ করেনি। যা হয়েছে ভালই হয়েছে। সেদিন না হোক, পরে কখনো নবার এই চেহারা ধরা পড়তই। যত দেরি হত, হয়ত তত বেশি কষ্ট হত বন্ধুর স্খলন দেখে। বন্ধুবিচ্ছেদের জন্য তাই কষ্ট হয়েছে, কিন্তু আফশোস হয়নি রবীনের। বরং বেশ গর্বই হয়েছে নীতির পরীক্ষায় পাশ করতে পেরে, ব্যক্তিগত আবেগের ঊর্ধ্বে উঠে প্রাণের বন্ধুকে ত্যাগ করেও যা অন্যায় তার বিরুদ্ধে খাড়া থাকতে পেরে। জোনাকির সক্রিয় সমর্থন সেই ঘটনায় সাহায্যই করেছিল। নইলে হয়ত পারা যেত না।

বন্ধুকে শত কষ্ট সত্ত্বেও ত্যাগ করা যায়, স্ত্রীকে যায় কি? জোনাকির লোভ নীতিতে অনড় থাকতে দিচ্ছে না বুঝেও তো তাকে ত্যাগ করতে পারেনি রবীন। মুখ বুজে আত্মনির্যাতন করে, ফাঁক পেতেই ছুটে গিয়েছিল পাগল মহারাজের কাছে। মনের জ্বালা মেটাতে। কারো নাম না করেই একটানা অনেকক্ষণ অভিযোগ করেছিল। কথা দিয়ে কথা না রাখা আর লোভের কাছে আত্মসমর্পণ — রবীনের এই দুটো অভিযোগ ছিল জোনাকির বিরুদ্ধে এবং কমরেডদের বিরুদ্ধে। কাকে আর বলা যায় সেসব কথা? কিন্তু না বললেও তো হাঁপ ধরে। তাই ৮৫-৮৬ সালে নবার সাথে বিচ্ছেদ হওয়ার পর থেকে হালকা হতে হলে পাগল মহারাজের কাছেই চলে যেত রবীন। মহারাজ বার দুয়েক দেখেছেন জোনাকিকে, সি পি এম কর্মীদের তো চতুর্দিকেই দেখতে পেতেন। ফলে নিশ্চয়ই বুঝতেন রবীনের ক্ষোভ কার বিরুদ্ধে। তবু রবীন নিজে কখনো মুখ ফুটে কারো নাম করে কথাগুলো বলেনি। জোনাকির চেয়ে পার্টি তার কম প্রিয় ছিল না তো। মহারাজও বিচক্ষণ। নিজের মতামত দেওয়ার সময়েও ভান করতেন যেন বোঝেননি কার ব্যাপারে কথাবার্তা হচ্ছে।

যদিও প্রথম সাক্ষাতেই মৃণ্ময়ানন্দের মনে হয়েছিল রবীনের সাথে জমবে ভাল, আটাত্তরের বন্যাত্রাণের কাজ শেষ হওয়ার পর থেকে আর ওদের দেখা হয়নি। পঞ্চায়েত সমিতির সভাপতি তখন ভীষণ ব্যস্ত। একাশির মে মাসে বিপ্লবের জন্ম ব্যস্ততা আরো বাড়িয়ে দিয়েছে। তার কয়েক মাস পরে হঠাৎ একদিন পাগল মহারাজ পঞ্চায়েত সমিতির অফিসে এসে হাজির।

“মাস্টারমশাই, চিনতে পারছেন তো?”

“আরে! বসুন, বসুন। চিনব না কেন? বন্যায় আপনি আর আপনার ছেলেরা ঐরকম খাটলেন। এর মধ্যেই ভুলে যাব?”

“আজকে কিন্তু নিজের কাজে এসেছি।”

“তা তো আসবেনই। আমরা তো পাবলিক সার্ভেন্ট। আপনাদের কাজই তো আমাদের কাজ। বলুন কী করতে পারি আপনার জন্যে?”

“খুব শক্ত কিছু না। একবারটি আমার ওখানে পায়ের ধুলো দিতে হবে আর কি,” কাঁধের ঝোলা থেকে একটা বাদামী খাম বার করে রবীনের হাতে দিয়ে মহারাজ বলেন।

ভেতরে একটা চিঠি। ছাব্বিশে জানুয়ারী পাগল মহারাজের স্কুলের প্রথম পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হওয়ার নিমন্ত্রণপত্র।

“বাঃ! আপনার স্কুলটা তাহলে একটু একটু করে বড় হচ্ছে?”

“হ্যাঁ, আসলে বেশ কয়েকটা পয়সাওয়ালা লোককে টুপি পরাতে পেরেছি আর কি,” হাতের ছোট্ট কৌটো থেকে একটু মৌরি ঢেলে মুখে দিয়ে পরম তৃপ্তির সঙ্গে মহারাজ বলে ওঠেন।

রবীন চমকে যায়। ধর্ম তো মানুষকে টুপিই পরায়, কিন্তু সে কথা একজন সন্ন্যাসী নিজ মুখে অবলীলাক্রমে বলতে পারে? ওর মুখ দেখে মনের ভাবটা বুঝতে অসুবিধা হয় না মহারাজের। মুচকি হেসে বলেন “আরে মশাই, আপনার কাছে আমার লুকোনোর দরকার নেই। আলবাত টুপি পরিয়েছি। ভাল কাজের জন্য মিথ্যে বললে দোষ হয় না। এ আমাদের ঠাকুরের কথা।”

রবীনের অস্বস্তি কাটে না, তবু সে হাসার চেষ্টা করে বলে “কী বলে টুপি পরালেন?”

“খুব সোজা। বললাম একটা আশ্রম করেছি, ঠাকুরের একটা মন্দির করছি, সঙ্গে দুঃস্থ ছেলেদের জন্যে একটা স্কুল। মুক্ত হস্তে দান করুন।”

“মন্দির? আমি কিন্তু মন্দির উদ্বোধন করতে যাব না।”

“সে আমি জানি। এই কটা বছর আমি আপনার খবর রেখেছি। জানি আপনি খাঁটি লোক। মন্দির হলে তবে তো উদ্বোধন করার প্রশ্ন।” মহারাজ বিচ্ছু ছেলের মত চোখ মারেন।

“মানে?”

“মানে মন্দিরের কথা না বললে লোকে হাত খোলে না, বুঝলেন না? যদি শুধু বলতাম গরীব ছেলেদের জন্যে স্কুল করছি, অমনি পাঁচ টাকা, দশ টাকা বেরোত। আসলে কাদের টুপি পরাচ্ছি বলুন তো? পাপীদের। ধনী ব্যবসায়ী, ঘুষখোর সরকারী অফিসার, চালের আড়তদার — এরাই তো বেশি দানধ্যান করতে পারে। সাদা পথে রোজগার করা সত্যিকারের ভক্ত দানধ্যান করার জন্যে পাঁচ দশ টাকার বেশি পাবে কোথায় বলুন? তা এই যে সব বড় বড় পাপী, এরা সারাক্ষণ অপরাধবোধে ভোগে, বুঝলেন তো? ধর্মস্থানে টাকা দিচ্ছি জানলে এদের মনে হয় বুঝি পাপ স্খালন হল। মানে আমার মত সাধু সন্ন্যাসীদের পাপের প্রায়শ্চিত্ত করার বকলমা দেয় আর কি। সেই নাটকটা দেখেছেন তো?”

“কোনটা? নটী বিনোদিনী?”

“ঠিক। ঠাকুর গিরীশকে বলেন না, ‘দে, বকলমা দে’? এও সেই ব্যাপার।”

“শুধু দেখেছি নয়, আমাদের ক্লাবের যাত্রায় গিরীশের চরিত্রে অভিনয়ও করেছি।”

মহারাজ একগাল হেসে বলেন “তাহলে ঠিকই বুঝেছি। আপনার উপরে ঠাকুরের আশীর্বাদ আছে।”

রবীন হো হো করে হেসে ওঠে। “নাস্তিক, মার্কসবাদী লোকের উপরে রামকৃষ্ণের আশীর্বাদ! এই জন্যেই আপনাকে মঠ থেকে বার করে দিয়েছিল, মহারাজ।”

মহারাজও হাসতে হাসতে বলেন “আপনি বিশ্বাস না-ই করতে পারেন। কিন্তু ঠাকুরের ইচ্ছা হলে তিনি অবিশ্বাসীকেও আশীর্বাদ করতে পারেন। আপনি ঠেকাতে পারবেন না।”

“আচ্ছা আচ্ছা, সে নয় হল। কিন্তু মন্দির বানাব বলে লোকের থেকে টাকা নিলেন, তারপর না বানালে তো ঠ্যাঙাবে আপনাকে।”

“আমি অত কাঁচা লোক নই, মাস্টারমশাই। ঐদিন সকালে ভিতপুজোর ব্যবস্থা করে রেখেছি। ভক্তসমাগম হবে, তারা এসে দেখবে মন্দির হচ্ছে। টাকাগুলো দিয়ে আমার ছেলেগুলোকে উৎসাহ দেওয়ার কাজটা এদিকে হয়ে গেল।”

“আপনার সব যুক্তিই ঠিক, মহারাজ। কিন্তু যদি আপনি মন্দির শেষ অব্দি না-ই করেন, কয়েক বছর পরে যদি লোকে আপনার বিরুদ্ধে জোচ্চুরির অভিযোগ তোলে, তখন তো আমার বিরুদ্ধে জোচ্চোরের পাশে থাকার অভিযোগ উঠবে।”

“ছি ছি,” একহাত জিভ কেটে মহারাজ বলেন “মন্দির একেবারে করবই না বললাম কখন? আমি ঠাকুরের চ্যালা, তাঁর মন্দির করব সংকল্প করে যদি না করি কত বড় পাপ হবে বলুন দেখি? মন্দির হবে। ধীরে ধীরে। আগে আমার স্কুলের উন্নতি, পরে মন্দির। ঠাকুর মন্দিরে থাকেন না, থাকেন মানুষের মধ্যে। তাদের ভাল আগে করলে পাপ হয় না।”

“হুম। জীবে প্রেম… কী যেন?”

“‘বহুরূপে সম্মুখে তোমার

ছাড়ি কোথা খুঁজিছ ঈশ্বর

জীবে প্রেম করে যেইজন

সেইজন সেবিছে ঈশ্বর।’

আপনি বিবেকানন্দ পড়েন নাকি, মাস্টারমশাই!”

“না না। আমার স্ত্রীর মুখে শোনা। ও তো মিশনের দীক্ষিতা।”

“তবেই দেখুন। ঠাকুর সারাক্ষণ আপনাকে ছুঁয়ে আছেন।”

“এই রে, আপনাকে বলাই ভুল হল দেখছি।”

দুজনেই হেসে গড়াগড়ি। সেই শুরু নিয়মিত দেখা সাক্ষাৎ, কথাবার্তা।

শুধু সেবার নয়, তারপর থেকে যতদিন পাগল মহারাজ বেঁচেছিলেন, বড়িহাটা রামকৃষ্ণ হাইস্কুলের পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে রবীনকে যেতেই হত। যখন স্কুলটা রীতিমত নাম করা হয়ে উঠেছে আর রবীন সব প্রশাসনিক পদ ছেড়ে দিয়েছে, পার্টির জোনাল কমিটিতেও নেই, পার্টির প্রাথমিক সদস্যপদটুকু ছাড়া আর কিছুই নেই তার, তখনো মহারাজ ছাড়তেন না। “আমার স্কুল। আমি যাকে খাঁটি লোক মনে করি সে প্রধান অতিথি যদি না-ও হয়, কয়েকটা পুরস্কার আমার ছেলেদের হাতে তাকে দিতেই হবে। আপনার ইচ্ছে না হলেও বন্ধু হিসাবে এই অত্যাচার আপনাকে সহ্য করতেই হবে।”

সেই বন্ধুত্বের অধিকারেই ১৯৮৭র সেই বিকেলে মহারাজের কাছে ছুটে গিয়েছিল ক্ষতবিক্ষত রবীন। ঘটনাটা বেড়াতে যাওয়া নিয়ে।

সমীর বলে ছেলেটি কন্ট্রাক্টর। আজাদপুরের কাছে এক জায়গায় রাস্তা বানানোর বরাত নেবে বলে সোজা রবীনের কাছে চলে এসেছিল একদিন। রবীন বলেছিল “কদ্দিন ব্যবসা করছ, বাবা? বরাত কিভাবে দেওয়া হয় জানো না? টেন্ডার জমা দাও গে। সভাপতির সাথে দেখা করার তো কিছু নেই। কেটে পড়ো।” ছেলেটি কথা না বাড়িয়ে চলে গিয়েছিল। পরে যখন বরাত দেওয়া হয়ে গেল, রবীন খেয়াল করেছিল যে ঐ ছেলেটির কোম্পানিই বরাত পেয়েছে।

এরপর একদিন সন্ধেবেলা পঞ্চায়েত সমিতি থেকে ফিরে রবীন দ্যাখে সমীর একতলার ভেতরের ঘরের খাটে বসে বিপ্লবের সাথে খেলাধুলো করছে। বিপ্লবের কোন চেনা অচেনা ছিল না জন্মের পর থেকেই। ফলে সমীরের সাথে তার দিব্যি ভাব জমেছে। রবীন যখন ভুরু কুঁচকে ভাবছে বদমাশটাকে ছেলের সামনে কতটা ভদ্রভাবে বিদেয় করা যায়, তখনই জোনাকি এসে বলে “জানো, ওকে অনিন্দ্যদা পাঠিয়েছে। তুমি আসবে বলেই বসিয়ে রেখেছি। ও বসতে চাইছিল না। তোমাকে চেনে বলল, তাই বললাম দেখা করেই যাও।”

অনিন্দ্যসুন্দর সেনগুপ্ত বিখ্যাত কবি এবং জোনাকির দাদা শুভময়ের ঘনিষ্ঠ বন্ধু। রবীনদের বিয়েতে এসেছিলেন, পরেও সস্ত্রীক সবুজগ্রামের বাড়িতে এসে সারাদিন কাটিয়ে গেছেন। অমায়িক লোক। উনি যে অত বিখ্যাত মানুষ তা বোঝাই যায় না। কলকাতার বুদ্ধিজীবীকে মাটিতে বসে অত চেটেপুটে খেতে রবীন কখনো দ্যাখেনি। সেই লোককে এই যন্তরটি কী করে চিনল ভেবেই পেল না রবীন। নির্ঘাত মিথ্যে কথা।

ছেলেটি চোর চোর মুখ করে তাকিয়ে ছিল। রবীন কাঁধে হাত রেখে শুধোল “তুমি অনিন্দ্যদাকে কীভাবে চেনো?”

“ওনার বোন-ভগ্নীপতি আমাদের বাড়িতে ভাড়া এসেছেন বছর খানেক হল। ওনাদের মেয়েটা তো সারাক্ষণ আমাদের ঘরেই থাকে। আমার সাথে বাচ্চাদের খুব ভাব।”

“বুঝলাম। কিন্তু বাচ্চার মামার সাথে আলাপটা কী করে হল, ভাই?”

“ঐ… ওনাদের ঘরে উনি সেদিন এসেছিলেন… আমি ছিলাম,” সমীর ঢোঁক গিলে বলেছিল। “কী করি টরি সেসব জিজ্ঞেস করছিলেন। তো কথায় কথায় বউদির কথা, আপনার কথা বললেন…”

কথা শেষ করার আগেই জোনাকি বলে “ওর হাত দিয়ে অনিন্দ্যদা ওঁর নতুন বইটা পাঠিয়েছেন। এই দ্যাখো।”

বইটা হাতে নিয়ে রবীনের মেজাজটা একটু ঠান্ডা হল। সবুজ মলাটের উপর সাদায় লেখা বইয়ের নাম ‘তোমার জন্যে পংক্তিভোজন’, আর কবির নাম। ভিতরে লাল কালিতে লাইন দুয়েক লিখেও দিয়েছেন ভদ্রলোক

আদরের জোনাকি আর তার আগুনে বর রবীনকে। সশরীরে হাজির হতে না পারার অপরাধ মার্জনা কোরো। পরে কবজি ডুবিয়ে প্রায়শ্চিত্ত করব।

              — অনিন্দ্যদা

যাক, ছেলেটা তাহলে ছুতো করে কোন দু নম্বরি প্রস্তাব টস্তাব নিয়ে আসেনি। রবীন নিশ্চিন্ত হয়ে বইটা নিয়ে ভিতরে চলে যায়। জোনাকিকে গিয়ে বলে “তোমার বাপের বাড়ির দিক থেকে এসছে। ছেলেটাকে একটা অমলেট টমলেট খাইয়েছ তো? নইলে আবার কুটুমবাড়িতে আমার বদনাম হবে।”

“অমলেট কী বলছ? কত মিষ্টি নিয়ে এসেছে দ্যাখো,” জোনাকি বাক্সের ঢাকনা খুলে দেখায়। “এত মিষ্টি তো আমরা সাতদিন ধরে খেয়েও শেষ করতে পারব না। ওখান থেকেই ওকে দিলাম কয়েকটা। অমলেটও দিয়েছি।”

রবীনের সন্দেহটা আবার ফিরে আসে। জোনাকি বুঝতে পারে না মিষ্টি দেখে রবীনের মত খাইয়ে লোকের কী কারণে মুখ গোমড়া হতে পারে। সে বাইরের ঘরে গিয়ে সমীরের সাথে গল্পগুজব করে, রবীন গামছা পরে কুয়োতলায় গায়ে জল ঢালতে যায়। ফিরে আসতেই সমীর বলে “আমি এবার উঠি, রবীনদা।”

“আচ্ছা, এসো। অনিন্দ্যদা কি এখন মাঝে মধ্যে আসছেন তোমাদের ওখানে?”

“না, এই তো প্রথম দেখলাম।”

“আচ্ছা। আবার এলে বোলো রবীনদা, বৌদি যেতে বলেছে।”

“ওকেও আবার আসতে বলো”, জোনাকি খেয়াল করায়।

“হ্যাঁ হ্যাঁ, সে তো নিশ্চয়ই। এসো সময় করে।”

সমীরের সময়ের দেখা যায় বিশেষ অভাব নেই। কদিন পরে পরেই তার দেখা মেলে। মাঝে মাঝে রাতে বাড়ি ফিরে রবীন শোনে সন্ধ্যায় সে এসেছিল। ব্যাপারটা রবীনের খুব একটা ভাল না লাগলেও দেখা যায় বিপ্লব তার বেশ ন্যাওটা হয়ে গেছে। জোনাকিও খাঁ খাঁ বাড়িতে একটা কথা বলার লোক পেয়ে আনন্দিত। কাজ সম্পর্কিত কোন কথা বলেনি বলে রবীন এই যাতায়াতে আপত্তি করে না, কিন্তু মনটা খচখচ করে। কোন স্বার্থ ছাড়াই তার বাড়িতে একজন কন্ট্রাক্টর এতবার আসছে — এটা কেমন হিসাবে মেলে না।

এসব ৮৬ সালের কথা। পরবর্তী এক বছরে সমীর বৌদির বিশেষ প্রিয়পাত্র হয়ে ওঠে, বিপ্লবও সমীরকাকুর ফ্যান। আজাদপুরের সেই রাস্তা বানানো শেষ হয়ে সমীর তার পাওনা গণ্ডাও বুঝে নিয়েছে এর মধ্যেই। কোথাও প্রাপ্যের বেশি কিছু দাবী করেনি, এতবার রবীনের বাড়ি এসেও ঐ প্রোজেক্ট নিয়ে কোন কথাবার্তাই বলেনি। তাই সভাপতির মনটা একটু নরম হয়। বিকেল ছাড়াও ছুটির দিনে সমীর সকালে আসতে শুরু করে। বলরামের সঙ্গে সে-ও ঐ আড্ডার একজন নিয়মিত সদস্য হয়ে যায়। যথারীতি পার্টির অন্য ছেলেপুলে বা রবীনের রাজনীতির বাইরের বন্ধুরাও থাকত সেখানে, দফায় দফায় চা আর রান্না চাপানো বাদ দিলে, জোনাকিও। এবং বিপ্লব।

ওর তখন সকালে স্কুল, ফিরতে ফিরতে রবীনের বেরিয়ে যাওয়ার সময় হয়ে যায়। পঞ্চায়েত সমিতি সেরে, পার্টির কাজ সেরে সে বাড়ি ফেরে অনেক রাতে। কোন কোনদিন বাবার সাথে খাবে বলে জোর করে জেগে থাকলেও বেশিরভাগ দিনই জোনাকির বকুনিতে খেয়ে দেয়ে শুয়ে পড়তে হয়। রবিবার সকালগুলোতে তাই সারাক্ষণ বাবার সঙ্গে লেপ্টে থাকত বিপ্লব। বিকেল হলেই আবার বেরিয়ে যাবে যে।

তেমনই এক রবিবারের আড্ডায় অয়ন প্রস্তাব দেয় পুজোয় গাড়ি করে কলকাতায় ঠাকুর দেখতে যাওয়া হোক। পরের সপ্তাহেই পুজো।

অয়ন কুড়াইল জুটমিলের দোর্দণ্ডপ্রতাপ সিটু নেতা বিজন চৌধুরীর একমাত্র ছেলে। লোকে বলত মাথায় ছিট আছে। কারণ বাপের কারখানা শাসনের উত্তরাধিকার বুঝে নেওয়ায় তার মোটে আগ্রহ ছিল না, ছিল কবিতা লেখায় আর লোককে ডেকে ডেকে শোনানোয়। রবীন বিজনকে কোনদিন পছন্দ করেনি এবং তার ছেলেকেও প্রথম দিকে পাত্তা দেয়নি। তারপর লোকে যেভাবে ওকে দেখলেই কবিতার ভয়ে দূর থেকে কেটে পড়ে আর আড়ালে পাগল ছাগল বলে, তাতে মায়া হল। তার ফলে নিয়মিত প্রচুর বাজে কবিতা শুনতে হয়, তবু রবীন ওকে একটু প্রশ্রয় দেয়। ছেলেটা বাপের মত নয় একেবারেই, বরং অত্যন্ত সরল, সাদা মনের মানুষ — একথা সে বুঝেছে।

সেই অয়নই একদিন ধুয়ো তোলে “বাবাকে বলব একটা গাড়ি যোগাড় করে দিতে। অষ্টমীর রাতে চলুন, রবীনদা।”

রবীন প্রথমেই জল ঢেলে দেওয়ার জন্যে বলে “না রে। আমার হবে না। অষ্টমীর দিন হীরুদার বাড়ি যেতে হবে।”

সমীর জোনাকিকে বলে “বৌদি, আপনি রাজি হয়ে যান, তাহলেই রবীনদা রাজি হবে।”

রবীনকে চমকে দিয়ে জোনাকির উত্তর “আমি তো রাজিই। আমি সব সময় রাজি। কিন্তু তোমাদের দাদার সময় হয় কোথায় ঘোরা বেড়ানোর? এখানেই দুটো ঠাকুর দেখতে যেতে চায় না। এই করে ছেলেটারও পাড়ার বাইরে কোন ঠাকুর দেখা হয় না।”

“না না, যাবে যাবে। এবারে যাবেখন,” বলরাম ফুট কাটে। “হীরুদার বাড়ি পরে যেও, রবীনদা। বছরে একটা দিন তো বিপ্লব, বৌদি — ওদের নিয়ে একটু রিল্যাক্স করবে নাকি?”

“এটা কিন্তু ঠিক,” সমীর জোর দেয়। “ওদের তো আপনি একদমই সময় দিতে পারেন না। আর আপনারও তো বিশ্রাম দরকার।”

“ওর বিশ্রাম টিশ্রাম লাগে না,” বেশ তেতো করেই জোনাকি বলে। “সারাক্ষণ রাজনীতির কচকচি না হলে ওর ভালই লাগে না। আমারই বরং বিশ্রাম দরকার।”

“আচ্ছা, তাহলে অন্তত বৌদির কথা ভেবেই চলুন? গাড়ি আমি নিয়ে আসব, অয়ন। তুমি, আমি, রবীনদা, বৌদি আর বিপ্লব।” সমীরের ব্লু প্রিন্ট তৈরি। “বলদা, তুমিও চলো।”

“না রে। আমার পাড়ার পুজোয় তো অষ্টমীর দিন দুঃস্থদের বস্ত্র বিতরণ। আমাকে প্রধান অতিথি করেছে।” বলরাম, ততদিনে ক্ষেত্রগ্রাম গ্রাম পঞ্চায়েতের প্রধান, বলে।

উপস্থিত সকলে মিলে চাপাচাপি করে রবীনের মৌখিক সম্মতি আদায় করেই ছাড়ে। শুধু বিপ্লব, কে জানে কী বুঝে, বারবার বলছিল “আমি ঠাকুর দেখতে ভালবাসি না।”

বাড়ি খালি হওয়ার পর রবীন জোনাকিকে অনেক বোঝানোর চেষ্টা করেছিল যে একজন কন্ট্রাক্টরের সঙ্গে পঞ্চায়েত সমিতির সভাপতি সপরিবারে কলকাতা বেড়াতে যেতে পারে না। জোনাকি এটাকে অকারণ ছুঁৎমার্গ ছাড়া আর কিছুই ভেবে উঠতে পারেনি।

“সমীর এতদিন আসছে। কোনদিন তোমার থেকে কোন অন্যায় সাহায্য চেয়েছে? কখনো বলেছে ‘রবীনদা আমার হয়ে ওকে বলে দিন, এটায় সই করে দিন, সেটায় সই করে দিন?’ তোমার তাতেও সন্দেহ যায় না?”

“এখনো কোন সুবিধা নেয়নি বলেই যে ভবিষ্যতেও নিতে চাইবে না তার কোন গ্যারান্টি নেই। এখনো চায়নি বলেই বাড়িতে ঢুকতে দিই। সেটা কথা নয়। কথা হচ্ছে ওর পেশার লোকের আমার পদের লোককে দরকার পড়েই। ওর গাড়িতে চড়ে আমরা বেড়াতে গেলে লোকে ভাবতেই পারে আমি অসৎ।”

“লোকের কথার দাম দেড় পয়সা। তুমি নিজের বিবেকের কাছে পরিষ্কার থাকলেই হল।”

“আমাকে যারা নেতা বানিয়েছে তারাই আমার বিবেক, জোনাকি। গরীব মানুষের পার্টি করি বলতে বলতে আমি কন্ট্রাক্টরের গাড়িতে চড়তে পারি না।”

এরপর তুমুল ঝগড়া লেগে যায়। বিয়ের সাত বছর হয়ে গেছে ততদিনে। ফলে জোনাকির যে সুখী জীবনযাত্রার উপরে যথেষ্টই লোভ আছে, সেকথা জানতে রবীনের বাকি ছিল না। কিন্তু সে যা চায় তা পাওয়ার জন্যে যে রবীনের নীতি আদর্শকেও বলি দিতে পারে — এতটা ধারণা ছিল না। বেশ খানিকক্ষণ চেঁচামেচি করার পর রবীনের মনে হয় মিথ্যে এত শক্তি খরচ করা। এত বয়সে কি কারো জীবনদর্শন বদলানো যায়?

বিকেলে হরিমতীর ঝিলের ধারে বসে বিড়ি খেতে খেতে রবীনের মন বলে “জোনাকির যখন এত ইচ্ছা, ও আর ছেলে ঘুরে আসুক। আমি না গেলেই তো হল।”

“তাতেও কি বদনাম আটকাবে?” মস্তিষ্ক জিজ্ঞেস করে।

“তা আটকাবে না, কিন্তু এছাড়া উপায় কী? বউকে তো আর মেরে ধরে আটকাতে পারব না,” মন উত্তর দেয়।

মানতেই হয়।

অষ্টমীর দিন দুপুরে খাওয়াদাওয়ার পরেই বেরোনো। অশান্তি এড়াতে আগে থেকে জোনাকিকে কিছু বলেনি রবীন। খেতে খেতেই বলে, সে যাচ্ছে না। প্রতিক্রিয়াটা অপ্রত্যাশিত। বিপ্লব বলে “আমিও যাব না। আমার ঠাকুর দেখতে ভাল লাগে না।”

জোনাকি তেলে বেগুনে জ্বলে উঠে বলে “তুমি কিছুতেই আমার কোন সাধ আহ্লাদ পূরণ হতে দেবে না, না? আবার ছেলেটাকেও শিখিয়ে রেখেছ।”

রবীন বুঝিয়ে বলে, সে চায় জোনাকি আর বিপ্লব ঘুরে আসুক অয়ন আর সমীরের সাথে। জোনাকি আরো রেগে চিৎকার করে “তুমি খুব ভাল করেই জানো আমি তোমাকে বাদ দিয়ে যাব না। যাওয়াটা বানচাল করার জন্যেই এই ফন্দি এঁটেছ।” কীভাবে নিজের সমস্ত শখ আহ্লাদ বিসর্জন দিয়ে সে রবীনের হেঁশেল ঠেলছে সেই প্রসঙ্গ এরপর সারা পাড়া শুনতে পায় ভরদুপুরে। রবীন চুপ করে শোনে আর ভাবে ভিতরে কত ক্ষোভ জমা হয়ে থাকলে পাঁচ বছরের ছেলের সামনেই এভাবে তাকে অভিযুক্ত করতে পারে জোনাকি। সত্যিই তো। কত বড় পরিবারের মেয়ে কী সংসারে এসে পড়েছে! অনায়াসে কোন ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার কি সরকারী অফিসারের বউ হতে পারত মেয়েটা। কোন অভাব থাকত না। রবীনেরই ভুল। তাড়াহুড়ো করে সে-ই তো নষ্ট করেছে ওর জীবনটা। জোনাকি একটু শান্ত হলে রবীন বলে “রাগ করে বলিনি। আমার তোমাদের গাড়ি করে কলকাতার ঠাকুর দেখানোর সামর্থ্য কোনদিন হবে বলে মনে হয় না। ঘুরে এসো। পুজোর দিনে মন খারাপ করে ঘরে বসে থেকো না। একবার ছেলেটার দিকে তাকিয়ে দ্যাখো, বেচারার মুখটা ছোট হয়ে গেছে।”

জোনাকি বিপ্লবকে বুকে টেনে নিয়ে মন ভাল করে, সাজগোজ শুরু করে। রবীন হীরুদার বাড়ি যাওয়ার নাম করে সাইকেল নিয়ে বেরিয়ে পড়ে। গিয়ে পৌঁছায় গলামনের পাড়ে পাগল মহারাজের আশ্রমে। মানুষ একা হলে একা মানুষ খোঁজে।

*এই উপন্যাসের সমস্ত ঘটনা ও চরিত্র কাল্পনিক। কোন সত্যি ঘটনা বা জীবিত/মৃত ব্যক্তির সাথে মিল পাওয়া গেলে তা সম্পূর্ণ অনিচ্ছাকৃত। কিছু বাস্তব চরিত্রের নাম এসেছে কেবল সময়কাল বোঝাতে

ভাল লাগলে টাকা পাঠাতে পারেন:

Google Pay / Paytm / BHIM বা অন্য মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে journopratik@oksbi কে

অথবা

নেট ব্যাঙ্কিং বা অন্য উপায়ে নিম্নলিখিত অ্যাকাউন্টে

Pratik Bandyopadhyay
A/c No. 10490957306
State Bank of India
Konnagar branch
IFSC: SBIN0002078

ভূত বলে কিছু নেই

ভূত বলে কিছু নেই।

লোকের কাছে বুক ফুলিয়ে কথাটা বলে আসছি বহু বছর ধরে, কিন্তু মনে ভয় ছিলই। একলা বাড়িতে ঝড়বৃষ্টির সময় হঠাৎ লোডশেডিং হয়ে গেলে বুকটা যে দুরুদুরু করত না তা নয়। ধরুন স্টেশন থেকে সরু, আধো অন্ধকার গলি দিয়ে শীতের সন্ধ্যেবেলা হেঁটে আসছি, চারিদিকে জনমনিষ্যি নেই। এমন সময় কোন বাড়িতে কথা নেই বার্তা নেই একটা বাচ্চা চিল চিৎকার জুড়ে দিল। অমনি হাতের জিনিসপত্র যে দু একবার রাস্তায় ছড়িয়ে পড়েনি তাও নয়। সত্যি কথা বলতে কি, একবার তো ভোর রাত্তিরে পায়খানায় বসে বাথরুমের খোলা জানলা দিয়ে কালো মত কি একটা ঢুকছে দেখে এমন চেঁচিয়ে উঠেছিলাম যে সারা বাড়ির লোকের ঘুম ছুটে গিয়েছিল। তবু কিন্তু আমায় দিয়ে কেউ বলাতে পারেনি যে ভূত আছে। কারণ যেটা জানলা দিয়ে ঢুকছিল সেটা আমার চিৎকারে ভয় পেয়ে ধুপ করে বাথরুমের বাইরে সেপটিক ট্যাঙ্কের উপর পড়ে, এবং পড়েই যে আওয়াজটা করে তাতে প্রমাণ হয়ে যায় যে ওটা হল পাড়ার কুখ্যাত কালো বেড়ালটা।

এরকম বেইজ্জতির পরে সকলের চাপাচাপিতে আমি এই পর্যন্ত স্বীকার করেছিলাম যে আমার ভূতের ভয় আছে। কিন্তু ভূত নেই। অবশ্য মনে মনে ঠিক করেই নিয়েছিলাম সত্যি যদি কখনো ভূতের পাল্লায় পড়ি তা হলে “ভূত আমার পুত, পেত্নী আমার ঝি” ইত্যাদি বলেই দেব। যুক্তি, মান সম্মান পরে, আগে হচ্ছে প্রাণ বাঁচানো। ভূতের যদি মানুষের ঘাড় মটকাতে ইচ্ছে হয়েই থাকে তাহলে আমি যুক্তিবাদী বলে তো আর ছেড়ে দেবে না। বাঁচলে পরে যুক্তি বদলে নেয়া যাবেখন। সেটাই তো বৈজ্ঞানিক, তাই না? ভূত থাকার কোন প্রমাণ নেই এখন অব্দি, তাই বিজ্ঞান বলে ভূত নেই। প্রমাণ পাওয়া গেলে তখন মেনে নিতে অসুবিধা কি যে ভূত আছে? “বিপুলা এ পৃথিবীর কতটুকু জানি?”

কিন্তু আমার সব সন্দেহ দূর হয়ে গেছে। আমি একেবারে নিঃসংশয়ে জেনেছি যে ভূত নেই। ঘটনাটা শুনলে আপনারাও একমত হবেন।

আষাঢ় মাসে আমার বাবা মারা গেলেন। জীবনে প্রথমবার আমার মনে হল, ভূত জিনিসটা থাকলে বেশ হত। কেন জানেন? কারণ কতকগুলো আফশোস রয়ে গেছিল। কিছু ব্যাপারে বাবার কাছে দোষ স্বীকার করব ভেবেছিলাম, সে সুযোগ আর পাওয়া যায়নি। তাছাড়া বাবাকে একটা ডাহা মিথ্যে বলেছিলাম, সেজন্যেও ক্ষমা চাইতে ইচ্ছে করছিল খুব। কি আশ্চর্য! বেঁচে থাকতে সাহস হয়নি কথাগুলো বলার, শ্মশান থেকে যেই বাড়ি ফিরলাম, মনে হল এইবার বাবাকে একবার সামনে পাই, সব দোষ স্বীকার করে ক্ষমা চাইব। ঠিক পারব।

একথা বাড়িতে কাউকে বললে বিচ্ছিরি নাটক হত। আত্মীয়স্বজনেরা সব ছুটে আসত, কোন পিসিমা কি জেঠিমা ঠিক বুদ্ধি দিত শ্রাদ্ধশান্তি অব্দি এগারো দিন আমার সাথে কাউকে একটা শুতে হবে। নয়ত আমার নিজের ঘরে শোয়া চলবে না, এক তলায় মায়ের পাশে শুতে হবে। ওসব অভ্যেস আমার গত কুড়ি বছর ধরে নেই। এত বছরের অভ্যেস বদলালে ঘুমই হবে না। তাছাড়া বাবা দেখা দিতে চাইলেও পারবে না। কোন কোন আত্মীয় আবার একটু বেশিই ভাল চায়। তারা বলতে পারে আমাকে ডাক্তার দেখানো দরকার। বাবা মারা যাওয়ার পরে কাঁদিনি বলে এমনিই তাদের আমার জন্যে চিন্তায় ঘুম হচ্ছিল না।

অতএব মনে কী আছে সেটা কাউকে বললাম না। যাদের মন্ত্রতন্ত্রে বিশ্বাস আছে তারা আমার জায়গায় থাকলে কোন ওঝাটোঝাকে ধরত। আমার আবার ওসব একদম বুজরুকি মনে হয়। ভূতের ইচ্ছে হলে সে আসবে, নইলে আসবে না। আমার মতই দুটো করে হাত পা, চোখ মুখ, আর হয়ত নাকের উপর একখানা চশমা যে লোকের, সে নাকি এত শক্তি ধরে যে মৃত মানুষের আত্মাকে ডেকে আনতে পারে — এ আমার বিশ্বাস হয় না। তাই আমার অফিসে এক মহিলা ছিল যে প্ল্যানচেট নিয়ে চর্চা করে, কাগজে গা ছমছমে অভিজ্ঞতা লিখেটিখে বেশ নামও করেছে, তার কাছে পর্যন্ত কোন পরামর্শ চাইলাম না।

শুধু একটাই কাজ করলাম। শেষ কয়েক বছর বাবা শুত দোতলায় আমার ঠিক পাশের ঘরে। রোজ রাতে নিজের বিছানা করার আগে ঐ ঘরে বাবার বিছানাটাও আগের মতই করা শুরু করলাম। ঠিক যেভাবে বাবা নিজে করত।

একটা বালিশে শুতে পারত না। একটার উপর আরেকটা চাপাত। দক্ষিণের জানলার দিকে মাথা দিত, পা থাকত উত্তরের দরজার দিকে। সেভাবেই বালিশগুলো পাততাম। বারো মাস খালি গায়ে শোয়া অভ্যেস ছিল। একখানা ফতুয়া বিছানায় বালিশের পাশে যেমন অগোছালো করে রেখে বাবা শুত, ঠিক তেমনি করে রেখে দিতাম। মশারিটা টাঙিয়ে ভেতরে ঢুকে মশা আছে কিনা দেখে নিতাম। থাকলে মেরে দিয়ে বেরোতাম। তারপর আলোটা নিভিয়ে দিতাম। আলো নেভানো হলে বাবা আমায় বলত “একটা জলের বোতল দিস তো।“ আমি তাই একখানা জলভর্তি বোতল মশারির ভেতর রেখে দিতাম। উত্তরের বারান্দায় যাওয়ার রাস্তাটা থাকত খোলা, দক্ষিণে বাথরুমে যাওয়ার দরজাটা থাকত ভেজানো। তাই করতে থাকলাম। বাবাকে রাতে বারবার উঠতে হত, তাই বাথরুমের আলোটা জ্বালাই থাকত। তাও করলাম।

কিন্তু এসব করেও লাভ কিছু হল না। এগারো দিনে শ্রাদ্ধ আর তেরো দিনে মৎস্যমুখী দিব্যি কেটে গেল। প্রতি রাতেই আমি নিজের ঘরে শুয়ে অপেক্ষা করতাম। একবার যদি বাবার গলা খাঁকারি শোনা যায়, কি বাথরুমের দরজাটা খোলার শব্দ পাওয়া যায়। কিন্তু রোজই একটু পরেই ঘুম এসে যেত। এক ঘুমে রাত কাবার। সকালে ঘুম থেকেই উঠেই বাবার ঘরে গিয়ে দেখতাম বালিশগুলো ব্যবহার হয়েছে কিনা, ফতুয়াটা আলনায় ফিরে গেছে কিনা, বোতলে জল একটুও কমেছে কিনা। নাঃ! কিচ্ছু হল না একদিনও।

লোকে তো বলে শাস্ত্রে নাকি আছে শ্রাদ্ধশান্তি হওয়া অব্দি মৃতের আত্মা বাড়ির চারপাশেই ঘুরে বেড়ায়। সেই কদিনেই যখন কিছু হল না, কাজকর্ম সব মিটে যাওয়ার পরে কি আর কোন আশা আছে? হতাশ হয়ে পড়েছিলাম। কিন্তু ভাবতে ভাবতে মনে হল, ওসব অং বং চং মন্ত্রে আবার কিছু হয় নাকি? যত্তসব কুসংস্কার। তাছাড়া আমার বাবা ছিল নাস্তিক লোক। সেই লোকের উপরে ওসব মন্ত্র আরোই কাজ করবে না। বরং এই কদিন বাড়িতে বারবার লোকজন আসছিল। হৈ চৈ তে হয়ত বাবার আসতে ইচ্ছেই করেনি। এবার সব ঠান্ডা হয়ে গেল, এখন হয়ত আসতে পারে।

মৎস্যমুখীর পরদিন থেকে আবার কাজে যোগ দিলাম। আমার প্রেসের চাকরি। বাড়ি ফিরি রাত আড়াইটে তিনটেয়। অত রাতে এসে নিজের বিছানা করতেই আলস্য লাগে, সেখানে দুটো বিছানা করা দুষ্কর। তাই দুপুরে অফিস যাওয়ার আগেই বাবার বিছানাটা করে দিতে লাগলাম। মা, বোন বা কাজের লোক উপরে এসে ওরকম দেখলে সেটা আবার চাউর হয়ে যাবে, সব প্ল্যান যাবে ভেস্তে। তাই বিছানা করে ঘরের দরজায় তালা দিয়ে দিতাম। প্রথম দিন দেখতে পেয়ে মা জিজ্ঞেস করল “হ্যাঁ রে, তুই ও ঘরের দরজায় তালা দিয়েছিস কেন?” মুখে যতটা সম্ভব বিষণ্ণতা এনে বললাম “বাবার জিনিসপত্রগুলো দেখলে স্থির থাকতে পারি না, মা। ও ঘরটা বন্ধই থাক।“ মায়ের তো সাদা মনে কাদা নেই। বিনা বাক্য ব্যয়ে মেনে নিল।

এই ব্যবস্থায় বাবার দুটো সমস্যা হওয়ার কথা। এক, বাথরুমে যেতে পারবে না। কারণ আমি অফিস যাওয়ার আগে যদি আলোটা জ্বেলে রেখে যাই তাহলে কেউ উপরে এলে সে ভুল হয়েছে ভেবে ঠিক নিভিয়ে দেবে। আর উত্তরের দিকের দরজাটা খোলা রাখলে ঘরে ঢুকে পড়ে সব দেখতে পেয়ে যাবে। এটুকু বাবাকে মানিয়ে নিতেই হবে। অবশ্য আমি অফিস থেকে এসেই জামাকাপড় না ছেড়ে দৌড়ে গিয়ে বাথরুমের আলোটা জ্বেলে ওদিককার দরজাটা খুলে দিই। মুখ বাড়িয়ে বলি “বাবা, আলো জ্বেলে দিয়েছি। এবার বাথরুম ঘুরে এস।“

কিন্তু এত কান্ড করেও কোন লাভ হল না। মাসতিনেক কেটে গেল। বাবার দিক থেকে কোন সাড়াশব্দ নেই। শ্রাদ্ধের পর থেকে কিন্তু আমার আর ঘুম আসে না। অফিসে কাজ করতে করতে ঢুলে পড়ি, বসের ধমক খাই।

আমার অপরাধবোধ বেড়েই চলে। অসুস্থ হয়ে পড়ার আগের কয়েক মাস প্রচন্ড গরমে বাবা ঐ ঘরটায় শুত আর আমি এ ঘরে এ সি চালিয়ে শুতাম। বলেছিলাম আমার সাথে শুতে, কিন্তু বাবা রাজি হয়নি। বলেছিল “আমার এ সি তে একটু পরেই নাক টাক বন্ধ হয়ে যায় রে। ঘুম হয় না। তুই শো। অফিস থেকে খেটেখুটে আসিস। আমার অসুবিধা হচ্ছে না।” আমি রোজ রাতে ভাবি, একটিবার যদি বাবা দেখা দেয়, শেষবারের মত একবার বাবার পাশে শুয়ে নেব। স্কুলে পড়ার সময় অনেক দুষ্টুমি করে এসে রাতে বাবার সাথে শুয়ে বলতাম অমুকটা করে ফেলেছি। বলে ভয়ে চুপ করে থাকতাম। বাবা কয়েক সেকেন্ড পরে মাথায় হাত বুলিয়ে বলত “নিজে থেকে বলেছ ভাল করেছ। তার মানে তুমি বুঝেছ কাজটা অন্যায় হয়েছে। আর কখনো কোর না।“ সে কাজ সত্যিই আর কখনো করতাম না আমি।

ভাবি আর একটিবার বাবার পাশে শুতে পেলে অমনি করে বলব “বাবা, আমি তোমায় হাসপাতালে মিথ্যে বলেছিলাম। আমি তখনই জানতাম তোমার আয়ু আর এক মাস। ডাক্তার সেদিন তাইজন্যেই বাড়ি নিয়ে আসতে বলেছিলেন। সেকথা তোমায় বলি কী করে? তাই বলেছিলাম ‘তোমার শরীর এখন অনেক ভাল। কেমো দিতে লাগবে না।“

কিছুতেই কিছু হচ্ছে না দেখে আমি বাবার বিছানাতেই শুতে শুরু করলাম। তাতে যদি বাবার সুবিধা হয় আসতে। মাসছয়েক হয়ে গেল, কিছুই ঘটেনি। তবে আজকাল আর জামা গায়ে শুতে পারি না, তাই জামাটা খুলে মাথার কাছে রাখি। জলের বোতল তো বিছানাতেই থাকে, তেষ্টা পেলে তাই অসুবিধা হয় না। বারবার বাথরুম যেতে হয় বটে, তাতেও অসুবিধা নেই। ওদিকের দরজাটা তো ভেজানোই থাকে, বাথরুমের আলোটাও জ্বালা থাকে।

মা, বোন কেউ কিছু টের পায়নি। ওরা জানে বাবার ঘর বন্ধই থাকে। শুধু যখন মাঝে মাঝে মাকে “শিখা” আর বোনকে “বুড়ি” বলে ডেকে ফেলি, ওরা চমকে ওঠে। বোন তো একদিন বললও “দাদা, এইভাবে যখন তখন ভয় দেখাবি না তো। আমার নাহয় অল্প বয়স। মার কোনদিন হার্ট ফেল করে যাবে। আর তুই এত ভাল গলা নকল করতে শিখলি কোথায়?” আমি মোটেও গলা নকল করতে পারি না। কে জানে ওদের কেন আমার ডাক শুনে মনে হয় বাবা ডাকল? তবে ব্যাপারটা আমার ভালই লাগে৷

আরো ভাল লাগে যখন দেখি আমার অসভ্য বসটি এমনভাবে আদেশ করে যেন অনুরোধ করছে। ঘনিষ্ঠ সহকর্মী ঋত্বিকের মতে “সেই যে সেদিন বসকে সবার সামনে প্রচন্ড ধমকালে? তারপর থেকে আর তোমায় ঘাঁটাতে চায় না।“ ছেলেটা মহা গুলবাজ। বসকে ধমকেছি আমি! সূর্য পশ্চিমে উঠলেও সম্ভব না। কদিন অন্যমনস্ক ছিলাম, সেটার সুযোগ নিয়ে যা ইচ্ছে একটা গল্প বানিয়ে আমাকে তুষ্ট করার চেষ্টা আর কি। ওর প্রমোশন আমার হাতে যে।

বাবা মারা গেছে এক বছর হতে চলল। এতদিনেও যখন কিছু হল না, ভূতের উপর বিশ্বাস রাখার কি আর কোন যুক্তি আছে, বলুন?

প্রকাশ: ফেসবুক