প্রিয় ইমতিয়াজ,
আপনার নতুন ছবি দেখতে যাওয়ার মূল কারণ ছিল প্রেম। প্রেমের গল্প পড়তে ভালো লাগে, প্রেমের সিনেমা দেখতে ভালো লাগে এবং রোম্যান্টিক সিনেমা বানানোয় আপনার দক্ষতা প্রশ্নাতীত। জব উই মেট তো আমার প্রজন্মের অনেকের কাছে একান্ত ব্যক্তিগত ছবি। সেই কারণে বলিউডের যুদ্ধের বাজারে আপনি প্রেমের ছবি বানিয়েছেন জেনেই দেখার ইচ্ছে হয়েছিল। যাদের রুচিকে ভরসা করি, তারা অনেকে দেখে এসে প্রশংসা করায় দেখার ইচ্ছে আরও বেড়েছিল। একটু-আধটু লিখি এবং লিখলে কেউ কেউ মন দিয়ে পড়ে, তাই ছবিটা দেখে লিখব বলেও ভেবে রেখেছিলাম। কিন্তু ম্যায় ওয়াপস আউঙ্গা দেখতে গিয়ে সব গোলমাল হয়ে গেল। মানে ভেবেছিলাম, যেভাবে আর পাঁচটা ছবি নিয়ে লিখে এসেছি এতদিন, সেভাবেই চুলচেরা বিচার করব। প্রবাদপ্রতিম নাসিরুদ্দীন শাহের অভিনয়, এ আর রহমানের সেই রোজা (১৯৯২) ছবির মত অপাপবিদ্ধ সঙ্গীত, তরুণ ও নয়নাভিরাম নায়ক-নায়িকা (বেদাঙ্গ রায়না ও শর্বরী ওয়াঘ) আর দিলজিৎ দোসাঞ্জের ‘দিল’ জিতে নেওয়া অভিনয়, প্লেব্যাক শিল্পীদের প্রতি (বিশেষত দীপালি সহায়ের প্রতি) আমার মুগ্ধতা, আপনার গল্প বলার চিরাচরিত মুনশিয়ানা ইত্যাদি নিয়ে লিখব। কিন্তু সেটা আর সম্ভব নয়, কারণ এ ছবি অত্যন্ত ব্যক্তিগত হয়ে দাঁড়িয়েছে। সুতরাং ব্যক্তিগত কথাগুলোই বলা যাক। বাংলা ভাষার সুবিধা হল, এ চিঠি আপনার কাছে পৌঁছবে না। অতএব আপনাকে বলার অছিলায়, যাদের কাছে পৌঁছবে তাদের সঙ্গে কিছু ব্যক্তিগত অভিমত ভাগ করে নেওয়া, তাদের ভাবনাকে উস্কে দেওয়াই আসল উদ্দেশ্য। কিন্তু প্রেম ঢেলে দেওয়ার জন্যে যেমন একজন পাত্র লাগে, তেমন মনের কথা খুলে বলতেও একজন পাত্র লাগে। তাই আপনাকে খাড়া করা।
ছবির ক্রেডিট রোল হওয়া শুরু হতেই ১৯৯০-৯১ সালের কথা মনে পড়ে গেল, বুঝলেন? তখন আমার বয়স ৮-৯ বছর। একদিন গভীর রাতে বাবা টিভি চালিয়েছেন সিনেমা দেখবেন বলে। আমিও সিনেমার আকর্ষণে জেগে রয়েছি (সদ্য দ্বিতীয়বার মা হওয়ায় আমার মা আমাকে বকে ঘুম পাড়ানোর অবস্থায় নেই, বাবা বরাবর প্রশ্রয়দাতা)। ছবিটা বাংলা, কিন্তু সিনেমার শুরুতে নাম দেখানোর সময়ে নারীকণ্ঠে ঝাঁ ঝাঁ করে এমন একখানা গান বেজে উঠল, যে ধরনটা আমার একেবারে অপরিচিত। তার কথাগুলো
আমের তলায় ঝামুর ঝুমুর
কলাতলায় বিয়া
আইলেন গো সুন্দরী জামাই
মুটুক মাথায় দিয়া।
সঙ্গে উলুর শব্দ ছিল, বাবাও বললেন— এটা বিয়ের গান, সাবেকি বাঙালি বিয়ের গান। ছবিটা পুরো দেখেছিলাম, কিন্তু বিশেষ বুঝতে পারিনি তখন। কিন্তু অবাক হয়েছিলাম, দুটো কারণে— ১) বাবা ছবিটা দেখতে দেখতে কাঁদলেন, ২) ছবিটায় কোনো বিয়ের দৃশ্য নেই। তাহলে শুরুতে বিয়ের গান কেন?
এই প্রশ্নের উত্তর পেতে আমাকে অপেক্ষা করতে হয়েছিল বারো বছর, আমাদের বাংলা মতে এক যুগ। আমি তখন কলেজের ছাত্র। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের আবশ্যিক বাংলার পাঠ্যবইতে ঋত্বিক কুমার ঘটকের একখানা প্রবন্ধ ছিল, যার শিরোনাম ‘আমার ছবি’। উনিই ছোটবেলায় প্রথম দেখা সেই ছবির পরিচালক। ওই লেখায় তিনি ব্যাখ্যা করেছেন যে শুরুতেই বিয়ের গান রেখেছিলেন, কারণ তাঁর অন্তরের অভিলাষ— আলাদা হয়ে যাওয়া দুই বাংলার মিলন হোক। বিয়ে মানেই তো মিলন। এই ছবিটা— কোমল গান্ধার (১৯৬১)— নির্ঘাত আপনার দেখা। নইলে আপনার ছবিতে বিভক্ত পাঞ্জাব প্রেমিক-প্রেমিকার (ঈশার আর আফসানা) না-হওয়া বিয়ের প্রতীক হয়ে দাঁড়ায় কেমন করে? যে মিলন হল না, তা নিয়েই তো আপনার আখ্যান। ঋত্বিক যে বাসনা বিমূর্ত রেখেছিলেন, তা-ই যেন আপনার ছবিতে মূর্ত হয়ে উঠেছে।
কাঁচা বয়সের বুক টনটন করা প্রেম, টিন্ডার/বাম্বল যুগের বাঁধন এড়াতে চাওয়া প্রেম, বুকের গভীরে সারাজীবন প্রদীপের মত জ্বালিয়ে রাখা প্রেম— সবই আপনি দেখিয়েছেন একেবারে জ্যান্ত করে। সে প্রত্যাশা আপনার কাছে ছিলই। কিন্তু আপনি যে ঘৃণা পেরিয়েও প্রেমের বেঁচে থাকার ক্ষমতা আছে বলে দেখাবেন, তা-ও আবার দেশভাগের সময়কার বীভৎস সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার অনুপুঙ্খ উল্লেখ সমেত— এতটা কল্পনা করিনি। আসলে পূর্বপুরুষের প্রেমের সন্ধানে বেরিয়ে পড়া নির্বৈর সিং গ্রেওয়ালের যুগে দাঁড়িয়ে, ঘৃণার পর্ব পেরিয়েও যে প্রেম টিকে থাকে— এই বিশ্বাস রাখা আমাদের পক্ষে ক্রমশ কঠিন হয়ে দাঁড়াচ্ছে। কে যেন বলেছিলেন, হলোকস্ট দেখার পরে আর কবিতা লেখা যায় না? গরুর জন্যে মানুষ হত্যা দেখার পরে, গাজা দেখার পরেও কি আর প্রেমে বিশ্বাস রাখা যায়? আপনি রেখেছেন, তাই ম্যায় ওয়াপস আউঙ্গা যে এক সিংহহৃদয় ছবি তা স্বীকার করতে কোনো দ্বিধা নেই। তবে সব ভালোলাগা পেরিয়েও বাঙালি হিসাবে আপনার ছবি আমার মধ্যে গভীর হতাশার জন্ম দিয়েছে। নির্বৈর পূর্বপুরুষের প্রেম সন্ধান করতে করতে পাপেরও হদিশ পেয়েছে। আমারও সেই দশা। খুলে বলি।
আপনি যে পাঞ্জাবি উদ্বাস্তু আর বাঙালি উদ্বাস্তুদের যন্ত্রণাকে একই নজরে দেখেন তার পর্যাপ্ত প্রমাণ এই ছবিতে রেখেছেন। একটা নিদারুণ গানে চার লাইন বাংলা রেখেছেন, স্টক শটে বাঙালি উদ্বাস্তুদের দেখিয়েছেন তো বটেই, এমনকি ট্রেনে সরগোধা ত্যাগ করে গ্রেওয়াল পরিবারের সীমান্তের এপারে চলে আসার সময়কার সাদাকালো শটগুলো দেখলে নিমাই ঘোষের ছিন্নমূল (১৯৫০) মনে পড়তে বাধ্য। আর এখানেই আমার হতাশা। দেশভাগের যে অলীক, হাস্যকর অথচ বীভৎস বাস্তবতা আপনি পর্দায় তুলে এনেছেন তা কোনো বাংলা ছবিতে আজ পর্যন্ত দেখা যায়নি। আবার দেশভাগ কীভাবে পাঞ্জাবি হিন্দু, শিখ ও মুসলমানের প্রেম, সখ্য, পারিবারিক আত্মীয়তা ভেঙে খানখান করে দিয়েছিল, তাও কোনো বাংলা ছবির পরিচালক আজ পর্যন্ত দেখিয়ে উঠতে পারলেন না। ঋত্বিক আর নিমাই ছাড়া আর কোনো পরিচালক তো দেশভাগকে বিষয় হিসাবে পাত্তাই দিলেন না। বরিশালের মানুষ ঋত্বিক আস্ত ট্রিলজি বানিয়েছেন, কিন্তু সেগুলোও দেশভাগোত্তর ট্রমা নিয়ে। দেশভাগ ব্যাপারটা কেমন ছিল, তার আগেকার পূর্ববঙ্গের জীবন কেমন ছিল— সেসব তাঁর ছবিতেও পাই না। আমাদের সিনেমার আরেক দিকপাল, মৃণাল সেন, ফরিদপুরের মানুষ। তাঁর ফিল্মোগ্রাফিতেও দেশভাগ অনুপস্থিত। সত্যজিৎ রায়কে তবু এই যুক্তিতে কিছুটা ছাড় দেওয়া যায় যে তাঁর পূর্ববঙ্গের সঙ্গে যোগ ঠাকুর্দা উপেন্দ্রকিশোরের আমলেই প্রায় শেষ হয়ে গিয়েছিল। সত্যজিতের জন্ম ও বেড়ে ওঠা কলকাতায়। পূর্ববঙ্গের জীবন বা উদ্বাস্তু জীবন তাঁর উপলব্ধির বাইরে। আর বাংলা জনপ্রিয় সিনেমা? কোনো বিদেশি সেই সিনেমার ইতিহাস ঘাঁটলে জানতেই পারবে না যে দেশভাগ, বাংলা ভাগ বলে এত বড় একটা ব্যাপার কোনোদিন ঘটেছিল। আশ্চর্য! এই কারণেই ম্যায় ওয়াপস আউঙ্গা দেখতে দেখতে আমার পূর্বপুরুষদের উপরে রাগ হচ্ছিল, এই ছবিটা বাংলায় হয়নি বলে।
আরও পড়ুন হোমবাউন্ড: ফিরব বললে ফেরা যায় নাকি?
অথচ না হওয়ার কোনো কারণ ছিল না। আপনার ছবিতে প্রাক-দেশভাগ পর্ব যে প্রোগ্রেসিভ রাইটার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভা থেকে শুরু হয়, সেই সংগঠনে বাঙালিদের অংশগ্রহণও উল্লেখযোগ্য ছিল। মুনশি প্রেমচন্দ আজ থেকে বিশ-তিরিশ বছর আগে পর্যন্তও বাঙালি পাঠকের অত্যন্ত প্রিয় ছিলেন। উপরন্তু, যেসব বাঙাল পরিবারকে এক কাপড়ে চলে আসতে হয়েছিল পূর্ববঙ্গ ছেড়ে আপনার ছবির গ্রেওয়াল পরিবারের মত সিলুয়েট হয়ে, তাদের অনেকেরই যে মুজফফরের মত প্রতিবেশী ছিল তা কিন্তু পারিবারিক গল্পকথায় পাওয়া যায়। মুজফফররা ছিল বলেই আমাদের পূর্বপুরুষরা অনেকে প্রাণ হাতে করে হলেও এপারে চলে আসতে পেরেছিলেন। অথচ সেই প্রতিবেশীদের আমাদের সিনেমায় কোনোদিন দেখা গেল না। কেন গেল না? উত্তরটা অস্বস্তিকর। সম্ভবত ও জিনিস সত্যনিষ্ঠভাবে দেখাতে গেলে নির্বৈরের দাদুর প্রেমের মত আমাদের দাদুদের প্রেম নয়, পাপই উঠে আসত। ধরা পড়ে যেত এই সত্য যে, বাঙালি ভদ্রলোকেরা, যারা আমাদের সাহিত্য, নাটক, শিল্প, সঙ্গীত, ফটোগ্রাফি এবং সিনেমার চিরকালীন কর্ণধার, তাদের বাড়ির ছেলেমেয়েরা মুসলমানদের বিয়ে করা দূরে থাক, তাদের সঙ্গে প্রেম করার কথাও স্বপ্নে ভাবত না। মুসলমান প্রতিবেশীদের সঙ্গে সম্পর্কও যতটা প্রয়োজনের, ততটা প্রাণের ছিল না। ফলে আমাদের সিনেমায় কোনো আফসানা থাকা সম্ভব নয়।
অশোক মিত্র, বীণা দাস, অতীন বন্দ্যোপাধ্যায়দের আত্মজীবনীমূলক লেখায় আমাদের পূর্বপুরুষদের সেইসব পাপের সাক্ষ্য রয়েছে। অশোক লিখেছেন, কীভাবে তাঁর দোর্দণ্ডপ্রতাপ মামারা স্রেফ জমির আল দিয়ে হেঁটে আসার সময়ে বাবুদের দেখে আল থেকে নেমে না যাওয়ায় পেরেক বসানো কাঠ দিয়ে গরিব মুসলমান প্রজাকে পিটিয়েছিলেন। বীণা লিখেছেন, কীভাবে এক মুসলমান যুবতী তাঁকে শুনিয়ে দিয়েছিলেন যে হিন্দু বাড়িতে কুকুর বেড়াল পাতের কাছে গেলে সে ভাত খাওয়া চলে, কিন্তু মুসলমানের ছোঁয়া লাগলে চলে না। এই শতাব্দীর শুরুতে অতীন আজকাল কাগজের এক রবিবাসরীয় নিবন্ধে লিখেছিলেন, ছোটবেলায় দেখেছেন মুসলমান বন্ধুর ঠাকুমা গল্প করতে আসতেন তাঁর ঠাকুমার সঙ্গে। দুই পরিবারে সম্পর্কও ছিল জমাট। কিন্তু বন্ধুর ঠাকুমার জন্যে আলাদা একখানা পিঁড়ি ঠিক করা ছিল। স্বভাবতই আমাদের লক্ষ্মী ছেলে দাদুরা তাঁদের ভরা যৌবনে কোনো আফসানার প্রেমে পড়তেন না। এই যদি না হবে, তাহলে প্রফুল্ল রায়ের কেয়াপাতার নৌকো ছাড়া আমাদের সাহিত্যেই বা অবিভক্ত বাংলায় দুই সম্প্রদায়ের প্রেমের গল্প বিরল কেন? সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় ছাড়া আর কোনো জনপ্রিয় লেখকের লেখায় ওপার বাংলায় ছেড়ে আসা মুসলমান বাল্যবন্ধুর জন্যে দু ফোঁটা চোখের জল পাই না কেন? বাঙালদের পারিবারিক গল্পকথাতেই বা যত আফসোস ছেড়ে আসা জমিজমা পুকুর বা তুলসীমঞ্চের জন্য, তার সিকি ভাগ কোনো প্রতিবেশী বন্ধু বা প্রেমিকার সঙ্গে বিচ্ছেদ হয়ে যাওয়ার জন্যে নয় কেন?
ইমতিয়াজ, আপনি হয়তো জানেন না, কিছুদিন আগে পশ্চিমবঙ্গ ভারতে থেকে যাওয়ার কৃতিত্ব কার, তা নিয়ে গোল বেধেছিল আমাদের রাজ্যে। তখন বিখ্যাত ঐতিহাসিক পার্থ চট্টোপাধ্যায় সর্বাধিক বিক্রীত বাংলা দৈনিকে প্রকাশিত সুদীর্ঘ লেখায় দেখিয়ে দেন যে এতে আলাদা করে কারও কৃতিত্ব নেই। আসলে দুই বাংলার সংখ্যাগরিষ্ঠ বিধায়ক, হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে, বাংলা ভাগ করার পক্ষেই ভোট দিয়েছিলেন। অর্থাৎ বাংলা ভাগ আমাদের পূর্বপুরুষরা চেয়েছিলেন। এমন বললে নেহাতই সত্যের অপলাপ হবে যে আমাদের ছাপোষা পূর্বপুরুষরা চাননি, সিদ্ধান্তটা নেতারা চাপিয়ে দিয়েছিলেন। যদি তা-ই হত, তাহলে আজ পশ্চিমবঙ্গ দিবস আমাদের কাছে উদযাপনের বিষয় হত না, বরং কে কাণ্ডটার জন্যে দায়ী তা লুকিয়ে ফেলার চেষ্টা করতে হত নেতাদের। আসল কথাটা হল, উদ্বাস্তুদের যন্ত্রণা যেমন সত্যি, তাঁদের জাতভাইরাই যে বাংলা ভাগ চেয়েছিলেন তা-ও সত্যি। উপরন্তু, আমাদের পশ্চিমবঙ্গীয় সাংস্কৃতিক বয়ানে ব্যাপারটা একতরফা। এপার থেকেও যে ওপারে উদ্বাস্তু হয়ে চলে যেতে হয়েছিল মানুষকে, তাদের যন্ত্রণাও যে কম নয়, তা আমাদের সিনেমায় নেই। ওপারের প্রাক-স্বাধীনতা যুগের হিন্দু-মুসলমানের সম্পর্ক তো নেই-ই। এমনকি সাহিত্যেও, ও জিনিসটা আমরা ওপারের আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের লেখায় যত স্পষ্ট করে পাই, এপারের লেখকদের লেখায় পাই না। বাংলার কোনো সাদত হাসান মান্টো নেই ইমতিয়াজ। আপনাদের পাঞ্জাবিদের আছে। তাই আমাদের টোবা টেক সিংদের কথা কেউ লিখে রাখেনি। দেশভাগের পর্বে পাঞ্জাবের মেয়েদের মর্মন্তুদ কাহিনি যেভাবে আপনি আর আপনার সহলেখক নয়নিকা মাহতানি লিপিবদ্ধ করেছেন, বাংলা সিনেমা তা করেনি। আমাদের পূর্বপুরুষরা সেই ন্যাকা নৈতিকতার পাপ করেছেন, যাকে আপনার নির্বৈর বিদূষক হয়ে ব্যঙ্গ করে “র্যাডক্লিফ বললেন, গান্ধী বলেছেন খারাপ জিনিস দেখতে নেই। তাই আমি দেখব না।”
এই পাপের ফল কী? ফল এই যে, পূর্ববাংলার মুজফফরদের কথাও আমাদের জনপ্রিয় সংস্কৃতিতে অনুপস্থিত। সুতরাং আজ খুব সহজেই পশ্চিমবঙ্গে এই বয়ান খাড়া করা যাচ্ছে যে দেশভাগের সব দায় একটা সম্প্রদায়ের, অন্য সম্প্রদায় শুধুই তার শিকার। এ-ও সহজেই বিশ্বাস করানো যাচ্ছে যে হিন্দু, মুসলমান চিরকালই একে অপরের শত্রু ছিল; কখনো তাদের মধ্যে মৈত্রী ছিল না। আপনার ছবিতে র্যাডক্লিফ লাইন বিরতির ঠিক আগে একটা উঠোনকে দুভাগ করে দিয়ে রক্তের রঙে ফুটে উঠছে পর্দায়, আর আজকের বাংলা ছবিতে র্যাডক্লিফ লাইন পর্দায় ফুটে উঠছে সাম্প্রদায়িক আইটেম নাম্বারে দুই বাংলা জুড়ে যাওয়ার কাল্পনিক ভয় দেখাতে। সে ভয় ঋত্বিককে নিয়ে ফেসবুকে গদগদ হওয়া বাঙালির পছন্দ হচ্ছে, তারা হলও ভরাচ্ছে। তাই আমাদের কোনো ইমতিয়াজ নেই, আমাদের কোনো ইমতিয়াজ অদূর ভবিষ্যতে হবেও না। বরং সম্ভব হলে আমরা পশ্চিমবঙ্গের মধ্যেও একের পর এক র্যাডক্লিফ লাইন টেনে দেব, যতক্ষণ না বাঙালি বলে জাতিটাই অবলুপ্ত হয়ে যায় হিন্দু আর মুসলমানে ভাগ হতে হতে।
আপনাকে নমস্কার জানিয়ে স্বীকার করে নিই, আপনারা পাঞ্জাবিরা ট্রমার মুখোমুখি দাঁড়ানোর সাহস রাখেন। তাই আপনাদের পার্টিশন মিউজিয়াম আছে। তাতে শুধু ঘৃণায় ইন্ধন জোগানোর কাজ হয় না, একে অপরের ঘায়ে হাত বুলিয়ে উপশমের কাজও হয়। তাই হয়তো শিখ মহিলাদের, মুসলমান দাঙ্গাবাজদের হাত থেকে বাঁচতে সপরিবার আত্মহত্যার পাশাপাশি ভারত থেকে পাকিস্তানগামী মুসলমান উদ্বাস্তুদের ট্রেনে শিখ দাঙ্গাবাজদের হত্যালীলার মাঝে মুসলমান সেজে থাকা এক শিখের দৃশ্য উঠে আসতে পেরেছে আপনার ক্যামেরায়। ট্রমা অতিক্রম করে আমৃত্যু প্রেম করার মুরোদ আপনাদের আছে ইমতিয়াজ। আমাদের নেই। একথা বারবার প্রমাণিত হচ্ছে। কয়েক মাস আগেই আরেক পাঞ্জাবি, বরুণ গ্রোভার, তাঁর ঋজু বিদূষণায় শিখদের দেশভাগের ট্রমা এবং তা থেকে জন্ম নেওয়া মুসলমানবিদ্বেষ নিয়ে রসিকতা করেছেন। তারপর বলেছেন, তাঁর পরিবার অধুনা পাকিস্তানে তাঁদের ভিটে ছেড়ে আসার সময়ে একখানা প্রদীপ জ্বেলে রেখে এসেছিল, এই আশায় যে শিগগির ওবাড়িতে ফিরে যাওয়া হবে। সীমান্তের এপারে এসে যেখানে আশ্রয় নেওয়া হল, সেখানেও একখানা প্রদীপ জ্বলছিল। মানে এবাড়ি যে পরিবার ছেড়ে গেছে, তাদেরও আশা ছিল তারা ফিরে আসবে। রূঢ় বাস্তব হল, “ম্যায় ওয়াপস আউঙ্গা” বলে গিয়ে কেউ আর সে যুগে ফিরে আসতে পারেনি। কিন্তু বরুণদের নতুন বাড়িতে সেই প্রদীপ রোজ জ্বালানো হত এই আশায় যে, পুরনো বাড়িতে যে পরিবার গেছে তারাও ওঁদের জ্বালিয়ে আসা প্রদীপ জ্বেলে রাখছে। এভাবেই “মানুষের মৃত্যু হলে তবুও মানব থাকে যায়”।
কথাটা বরিশাল থেকে আসা বাঙালি কবির লেখা হলেও, দেখা যাচ্ছে এপারের বাঙালি শিল্পী, সাহিত্যিকদের ওতে বিশ্বাস কম। আপনাদের মত পাঞ্জাবি শিল্পীদেরই বেশি বিশ্বাস। তাই বাঙালি হিসাবে আপনার ও আপনার পূর্বপুরুষদের প্রতি অশেষ কৃতজ্ঞতা রইল, আমার পূর্বপুরুষদের জন্য রইল অভিসম্পাত।
ইতি
এক অপাংক্তেয় বাঙালি।
