যোগাযোগ

ক্ষমতার ঝুঁটি ধরে নেড়ে দেওয়া খবর

সুমন দে, ময়ূখ ঘোষ, মৌপিয়া নন্দীদের যদি দুঃখে কিছু একটা হয়ে যায় তার দায়িত্ব কি জ্ঞানেশবাবু নেবেন?

খুব বড় সাংবাদিকও জীবনে একটা বা দুটো এমন খবর করে উঠতে পারেন যা গোটা দেশকে নাড়িয়ে দেয় এবং সাংবাদিকের মৃত্যুর পরেও আলোচিত হবে। বলা বাহুল্য, গত বুধবার (২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬) তেমন একখানা খবর করে দিয়েছেন দি ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস কাগজের মুম্বই সংস্করণের আবাসিক সম্পাদক ঋতিকা চোপড়া। তাঁর খবরের প্রভাবে এবার গোটা দেশের বড় অংশের মানুষ সেকথা বিশ্বাস করছেন, যেকথা লোকসভার বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধী গতবছর থেকে বলে চলেছেন— ভোট চুরি হচ্ছে, জনাদেশ ভোটে প্রতিফলিত হতে দেওয়া হচ্ছে না এবং এ কাজ করছে খোদ নির্বাচন কমিশন। এত দিন বিজেপি তো বটেই, অন্য বিরোধী দলগুলোও তাঁকে আমল দেয়নি। উদ্ধব ঠাকরের শিবসেনা আমল দিতে শুরু করে মহারাষ্ট্র বিধানসভা নির্বাচনে তাদের অপ্রত্যাশিত খারাপ ফলের পর থেকে। বিহারের অপ্রত্যাশিত ফলের পরে রাষ্ট্রীয় জনতা দলের তেজস্বী যাদব আর লিবারেশনের সাধারণ সম্পাদক দীপঙ্কর ভট্টাচার্য নির্বাচন প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলেও কেন কে জানে চুপ করে গিয়েছিলেন! মমতা ব্যানার্জি ও তাঁর দল পশ্চিমবঙ্গের ক্ষমতা হারানোর আগে পর্যন্ত প্রায় বিজেপির সুরেই রাহুলকে তাচ্ছিল্য করত, হারার পর মমতা টের পেলেন যে যথেচ্ছ কারচুপি হয়। তখন এই ফল মানেন না বলে হুঙ্কার দিয়েও চুপ করে গিয়েছিলেন। ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের খবরের পর এঁরা সবাই ফের সোচ্চার। বিজেপির জোটসঙ্গী চিরাগ পাসোয়ানও মুখ খুলেছেন, চন্দ্রবাবু নাইডুর পার্টি, নীতীশ কুমারের দল, এমনকী কর্ণাটকের জেডিএস-ও জবাবদিহি চাইছে। বিজেপি মুখপাত্ররা চ্যানেলে চ্যানেলে নির্বাচন কমিশনের হয়ে জবাবদিহি করতে গিয়ে (কেন এটা তাঁদের দায়িত্ব তা তাঁরাই জানেন) খাবি খাচ্ছেন। রজত শর্মার মত সরকারি পুরস্কারপ্রাপ্ত গোদি সাংবাদিকও জ্ঞানেশ কুমারকে গাল দিচ্ছেন, মন দিচ্ছেন নরেন্দ্র মোদী-অমিত শাহের দিকে যাতে আঙুল না ওঠে তা নিশ্চিত করায়। মূলত কংগ্রেস এবং বামপন্থী দলগুলোর কর্মীরা একেবারে পথে নেমে পড়েছেন, সঙ্গে যোগেন্দ্র যাদবের মত দলহীন মানুষও। শুক্রবার (২৫ সেপ্টেম্বর) দীপঙ্কর, নেহা বোরা, যোগেন্দ্রদের দিল্লি পুলিশ আটকও করেছিল। পাটনায় আন্দোলনকারীদের উপর জলকামান চালিয়েছে। তারপরেও শনিবার দিল্লিতে বিরাট জমায়েত হয়েছে এবং বোধহয় এই প্রথমবার, রাস্তা থেকে আওয়াজ উঠেছে— ইভিএম বাতিল করো, গণতন্ত্র বাঁচাও। হঠাৎ জনপ্রিয় ককরোচ জনতা পার্টির নেতারা যতই জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগকে এক নম্বর দাবি বলুন, অভিজিৎ দিপকে যতই বিরোধীদের ভোট বয়কট করার পরামর্শ দিন, পথে ঘাটে কিন্তু সরাসরি মোদী সরকারের বিরুদ্ধে ক্ষোভের উদ্গীরণ হচ্ছে। সেই ২০১৪ সাল থেকে যাবতীয় সংকটে বুক (মাপটা জানি না) চিতিয়ে নেতৃত্ব দেন যিনি, সেই অমিত শাহ এদিকে স্পিকটি নট, ৫৬ ইঞ্চি ছাতির মোদী কীর্তনে ব্যস্ত।

ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস মূলধারার সংবাদমাধ্যম। তারা এমন একটা খবর করেছে বলেই যে দেশের মূলধারার সংবাদমাধ্যমের প্রবণতা রাতারাতি বদলে গেছে তা কিন্তু নয়। পরিস্থিতি সামলাতে গিয়ে গোদি মিডিয়া এমন ল্যাজে গোবরে, যে “সূত্র বলেছে কমিশনের যাবতীয় সিদ্ধান্ত সর্বসম্মতিক্রমে নেওয়া হয়েছিল”, “সূত্র বলেছে ফর্ম নং ৬ সংক্রান্ত ব্যাপারস্যাপার নির্বাচন কমিশনাররা সকলেই জানতেন”— এই জাতীয় হাস্যকর কথাবার্তা বলে যাচ্ছে। সাংবাদিকতায় নামোল্লেখ না করে সূত্র বলেছে বলা হয় সেসব ক্ষেত্রে, যেখানে সূত্রের দেওয়া তথ্য সূত্রের পক্ষে বিপজ্জনক হতে পারে। অর্থাৎ সূত্র চাইছে না তার নাম প্রকাশিত হোক। কিন্তু এইসব তথ্য যদি নির্বাচন কমিশনাররা বুক ফুলিয়ে না বলতে পারেন, তাহলেই বুঝতে হবে কথাগুলো মিথ্যে। এটুকু বোঝার বুদ্ধি শতকরা একশো জন পাঠক/দর্শকেরই আছে, রাজনৈতিক পছন্দের উপর নির্ভর করে কথাটা কে প্রকাশ্যে স্বীকার করবে আর কে করবে না। ফলে এমন খবর করে একটা সংবাদমাধ্যম নিজেকে ক্ষমতার ভৃত্য প্রতিপন্ন ছাড়া কিছুই করে উঠতে পারে না। এদের আরও হাস্যকর করে দিয়েছে নির্বাচন কমিশন নিজে। বুধবার তড়িঘড়ি প্রকাশ করা প্রেস নোটে এক্সপ্রেসের খবরে প্রকাশিত সব তথ্যই স্বীকার করে নিয়ে বলা হল— তবে সব সিদ্ধান্ত সর্বসম্মত। অর্থাৎ গোদি মিডিয়া আগ বাড়িয়ে যা বলেছিল, কমিশন স্বনামেই সেকথা বলল। গোদি মিডিয়া কুলতিলক অর্ণব গোস্বামী দেখলাম, অভ্যাসবশত রাহুল গান্ধীকে পাপ্পু প্রমাণ করতে গিয়ে রাষ্ট্রীয় জনতা দলের মুখপাত্র কাঞ্চনা যাদবের কাছে এত হ্যাটা হলেন যে মুখ চোখ শুকিয়ে গেল। ইন্ডিয়া টুডে টিভিতে বুধবার রাতেই রাজদীপ সরদেশাইয়ের শো-তে দেখলাম রাজনৈতিক বিশ্লেষক নামধারী যে বিজেপি এজেন্টরা থাকেন, তাঁদের একজন, রজত শেঠি, ঢোঁক গিলে নির্বাচন কমিশনের সবকিছু পরিষ্কার করে বলা উচিত বলছেন।

শনিবারের বারবেলায় তিন নির্বাচন কমিশনার সভা করে যে প্রেস বিজ্ঞপ্তি জারি করেছেন তাতে গোদি মিডিয়া শুধু নয়, রজতের মত বিজেপির এই অঘোষিত মুখপাত্রদের কী হবে ভেবে চিন্তা হচ্ছে। কারণ এই প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে ঋতিকার প্রতিবেদনে যা যা অভিযোগ তোলা হয়েছে সবই মেনে নিয়ে এসআইআর প্রক্রিয়ায় একগুচ্ছ বদল আনার কথা বলা হয়েছে। কী কী বদল তা জানার জন্যে নিশ্চয়ই আপনি এই কলাম পড়েন না, তাই সেগুলো আর উল্লেখ করছি না। কিন্তু মোদ্দাকথা হল, এই বদলগুলো যদি সত্যি সত্যি করা হয় তাহলে এতগুলো রাজ্যে যে বিশেষ নিবিড় সংশোধনী (এসআইআর) হয়ে গেল তার আর কোনো মানেই থাকবে না। যে ভোটাররা বাদ পড়ে গেছেন তালিকা থেকে, তাঁরা সকলেই ফেরত আসবেন। তাহলে এই প্রক্রিয়া কত জরুরি তা নিয়ে এত মাস ধরে যে বক্তৃতাগুলো শত শত রজতরা দিয়ে গেলেন, সেগুলোর কী হবে?

আমাদের ঘরের ছেলেমেয়েদের কথা ভাবলে আরও চিন্তা হচ্ছে। কলকাতার গরমে বারো মাস স্যুট বুট পরে থাকা অ্যাংকররা এত যে ভুয়ো ভোটারের খোঁজ পেলেন, তাঁদের প্রতিবেদকরা বাংলাদেশে পালিয়ে যাওয়া বাড়ির কাজের লোকেদের তালাবন্ধ দরজা দেখালেন— সেইসব লোক যদি ভোটার তালিকায় ফেরত চলে আসেন, কী হবে তখন? সুমন দে, ময়ূখ ঘোষ, মৌপিয়া নন্দীদের যদি দুঃখে কিছু একটা হয়ে যায় তার দায়িত্ব কি জ্ঞানেশবাবু নেবেন? শনিবারের প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে জরুরি ভিত্তিতে বাদ যাওয়া ভোটারদের ফেরানোর প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। তার মানে ঘুরিয়ে মেনে নেওয়া হল যে কয়েক কোটি ভোটারকে অকারণে বাদ দেওয়া হয়েছে। সেক্ষেত্রে বিহার, বাংলা, তামিলনাড়ুর মত রাজ্যে হয়ে যাওয়া নির্বাচনগুলোর কী বৈধতা রইল? ফলগুলোরই বা কী বিশ্বাসযোগ্যতা রইল? এই প্রশ্নটা মনে জাগলেই চোখের সামনে ভেসে উঠছে বিশ্বনাথ চক্রবর্তীর মত রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মুখ। ৪ জুনের পর হাত-পা নেড়ে তাঁরা বাংলার ফলাফলের যেসব ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন, সেগুলোর যে নয়া পয়সা দাম রইল না, সেকথা না বোঝার মত বোকা এঁরা নন। আশা করি এঁদের বাড়িতে আয়না নেই।

গত কয়েকদিনের ঘটনায় অনেকে ভারতের গোল্লায় যাওয়া সাংবাদিকতার পুনরুত্থানের আশা দেখছেন, আমি দেখছি না। এত বছরের প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষতির প্রতিকার মাত্র একটা খবর দিয়ে হয় না। ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসও গত কয়েক বছরে বেশ কিছু ক্ষেত্রে মোদী সরকারের তাঁবেদারি করেছে। এক্ষেত্রেও, যা সংবাদমাধ্যমের কাজ, ঠিক সেটুকুই করা হয়েছে। পরিস্থিতির বিচারে তা একটু বেশি প্রশংসার যোগ্য, কিন্তু প্রাক-২০১৪ ভারতে এর জন্যে প্রতিবেদককে ‘হিরো’ বানানো হত না। তাঁর কাগজকেও সাংবাদিকতার আলোকবর্তিকা বলে তুলে ধরত না কেউ। উপরন্তু, এদেশের সৎ সাংবাদিকতার ধ্বজা বহুদিন হল ছোট সংবাদমাধ্যম, স্বাধীন সাংবাদিকরা তুলে নিয়েছেন। তা করতে গিয়ে জেল খেটেছেন, প্রাণও দিয়েছেন। আজ এক্সপ্রেসের খবরটাকে ‘টার্নিং পয়েন্ট’ বলে নাচানাচি করলে ওই সাংবাদিকদের লড়াইকে অস্বীকার করা হয়। মনে রাখা ভাল, ঋতিকার প্রতিবেদন প্রকাশের দিনই পাঠক-পৃষ্ঠপোষকদের টাকায় চলা মিডিয়া রিপোর্টার্স কালেকটিভ একখানা প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে, যা ভারতের গণতন্ত্রের উপরে কত বড় সার্জিকাল স্ট্রাইক এই এসআইআর, তা বোঝার জন্যে দারুণ গুরুত্বপূর্ণ। খবরটা হল, দিল্লির এসআইআরে নির্বাচন কমিশন ভিআইপি-দের নাম যাতে বাদ না যায় তার জন্যে আলাদা ব্যবস্থা রেখেছে। অর্থাৎ সংবিধানে দেশের সব নাগরিককে যে আইনের চোখে সমান বলা হয়েছে, সরাসরি সেই নীতিরই বিরোধী এই ব্যবস্থা। ভারতীয় গণতন্ত্রের সবচেয়ে বড় গুণ হল— আপনার বাড়ির কাজের মাসির ভোট, আপনার ভোট আর মুকেশ আম্বানির ভোটের দাম সমান। প্রথম নির্বাচন কমিশনার সুকুমার সেনের আমল থেকে আজ পর্যন্ত, অন্তত ভোটার তালিকা তৈরি করার ক্ষেত্রে এর অন্যথা হয়নি। রিপোর্টার্স কালেকটিভের প্রতিবেদন জানাচ্ছে যে, জ্ঞানেশবাবু সেই ব্যবস্থাটারই মূলে কুঠারাঘাত করেছেন। অতএব উদ্বাহু হয়ে ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসকে বা ঋতিকাকে ভারতীয় সাংবাদিকতার উদ্ধারকর্তা অভিধা দেওয়ার কারণ দেখছি না।

আরও পড়ুন নির্বাচনে এবারও খেলা হবে, তবে রান্নাবাটি

আরও একটা কথা না বললেই নয়। দীর্ঘদিন বিভিন্ন কাগজের নিউজরুমের সদস্য ছিলাম বলেই সেদিন প্রতিবেদনটা পড়ে সংশ্লিষ্ট সাংবাদিক সম্পর্কে খোঁজখবর নিতে গিয়ে একটু অবাক হয়েছিলাম। কারণ ইনি মুম্বইয়ে কর্মরত, আর নির্বাচন কমিশন দেশের রাজধানী দিল্লিতে। এমন একখানা খবর মুম্বইতে বসে কোনো সাংবাদিক করে ফেললে প্রতিদ্বন্দ্বীরা তো বটেই, তাঁর নিজের কাগজের দিল্লি ব্যুরোর সহকর্মীদেরও খুশি হওয়ার কথা নয়। বরং দস্তুর হল, দিল্লির প্রতিবেদকদের বস মৃদু ধমক দেবেন “ওখান থেকে স্টোরিটা করল, তোমরা পারলে না?” উপরন্তু এত বড় খবর সাধারণত কোনো একজন সাংবাদিকের কৃতিত্বে কাগজ করতে পারে না। কারণ এর অনেকগুলো দিক আছে, নানা জায়গা থেকে অনেককিছু নিশ্চিত করতে হয়, বেশকিছু কাগজপত্র একেবারে হাতে না এলে এরকম খবর ছেপে দেওয়ার ঝুঁকি নেওয়া যায় না। এত কিছু করতে একাধিক সাংবাদিককে কাজ করতে হয়। তদন্তমূলক সাংবাদিকতা মানেই ‘সবে মিলি করি কাজ’। সেখানে একজনই এত বড় কাজ করে ফেললেন! ভাবতে ভাবতেই সাংবাদিক বন্ধুদের সূত্রে একটা নাম জানতে পারলাম— দামিনী নাথ। ইনি ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের সিনিয়র সাংবাদিক, জাতীয় ব্যুরোর দায়িত্বপূর্ণ পদে আছেন। শুনলাম, তিনিই প্রথম বেশ কিছুদিন আগে এক প্রতিবেদনে লেখেন যে তিন নির্বাচন কমিশনারের মধ্যে মতপার্থক্য দেখা দিয়েছে। তাঁদের মধ্যে দুজন ক্যাবিনেট সেক্রেটারিকে চিঠি লিখেছেন, যা হওয়ার কথা নয়। কারণ নির্বাচন কমিশন স্বশাসিত সংস্থা, কেন্দ্রীয় সরকারের অধীন নয়। সেই প্রতিবেদনের সূত্র ধরেই কেঁচো খুঁড়তে কেউটে বেরিয়ে পড়ার মত নাকি এই খবরটা বেরিয়ে পড়ে। সুতরাং যিনি কেঁচো খুঁড়েছেন, তাঁরও কৃতিত্ব পাওয়া উচিত ছিল। কিন্তু কাগজে কেবল ঋতিকার নাম বেরনোয় তাঁর ছবি তাঁর নাম সোশাল মিডিয়ার পাতায় পাতায়। আমার অভিজ্ঞতা অনুযায়ী, ব্যাপারটা বড় জোর অর্ধেক বিশ্বাস করেছিলাম। কারণ আর সব পেশার মত সাংবাদিকতাতেও রেষারেষি, লবিবাজি ইত্যাদি থাকে। ফলে যারা ঋতিকাকে দেখতে পারে না এবং দামিনীকে পছন্দ করে, তারাও এসব রটাতে পারে। এমনটা নিউজরুমের ভিতরে বারবার ঘটতে দেখেছি। কিন্তু শনিবার দুপুরে দেখলাম ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের সোশাল মিডিয়া হ্যান্ডেল থেকে দামিনীর সঙ্গে দীর্ঘ কথোপকথনের ভিডিও প্রকাশ করা হয়েছে, যেখানে তিনি সাত বছর ধরে নির্বাচন কমিশন কভার করার অভিজ্ঞতা থেকে ঋতিকার প্রতিবেদনের নাড়িনক্ষত্রের সন্ধান দিচ্ছেন।

সংবাদমাধ্যম এরকমই। অতএব সাংবাদিকদের মধ্যে নায়ক খোঁজার চেষ্টা না করাই ভালো। বরং রবি নায়ারের নামটা জেনে রাখুন। ইনি গুজরাটের সাংবাদিক। গৌতম আদানির ব্যবসায়িক কার্যকলাপ নিয়ে প্রতিবেদন লিখেছিলেন বলে আদানি এন্টারপ্রাইজেস তাঁর বিরুদ্ধে মানহানির ফৌজদারি মামলা ঠোকে ২০২১ সালে। সেই মামলায় তাঁকে গত ১৭ সেপ্টেম্বর গ্রেফতার করা হয় এক জামিন অযোগ্য গ্রেফতারি পরোয়ানায়। গুজরাট হাইকোর্টে, তারপর সুপ্রিম কোর্টে, আবেদন করেও জামিন পাওয়া যাচ্ছিল না। শেষমেশ বৃহস্পতিবার (২৪ সেপ্টেম্বর) জামিন পেয়েছেন। ধর্ষণের সাজাপ্রাপ্ত গুরমীত রাম রহিম কতবার বাইরে আসেন খেয়াল করেছেন তো?

শেষ পাতে

মনে পড়ল, আমার অন্যতম প্রিয় কলামনিস্ট খুশবন্ত সিং হিন্দুস্তান টাইমস কাগজে তাঁর কলাম শেষ করতেন একখানা চুটকি দিয়ে। গম্ভীর বিষয় নিয়ে একগাদা কথা লেখার পরে এভাবে শেষ করা খুবই যুক্তিযুক্ত বলে আমার মনে হয়। তাই এবার থেকে এই কলামও মজার কোনো ঘটনা দিয়ে শেষ করব। আজ বলি ‘সূত্র’ নিয়ে একটা মজার ব্যাপার।

এক সাংবাদিক একটা আন্তর্জাতিক ক্রিকেট ম্যাচের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে প্রতিবেদন লিখেছিলেন। অত্যন্ত পরিশ্রমী প্রতিবেদন— পুলিশ কমিশনার থেকে শুরু করে কনস্টেবল পর্যন্ত সকলের উদ্ধৃতি ছিল। এমনকী শেষে ছিল “পুলিশ কুকুরটির ঘনিষ্ঠ এক সূত্র জানিয়েছে…”

a2onuswor.com ওয়েবসাইটে প্রকাশিত

সংবাদ, রিল, বিজ্ঞাপন: ঘেঁটে ঘ

বাজারের মাছ, মাংস বিক্রেতা এবং ছোট দোকানদাররা অনেকে ১৫ অক্টোবরের অপেক্ষা না করে এখন থেকেই নগদ ছাড়া জিনিসপত্র বেচা বন্ধ করে দিয়েছেন। অথচ এটা বাংলার কোনো সংবাদমাধ্যমের বিতর্কের বিষয় নয়।

‘গণতন্ত্রে রাজার জন্মদিন’। এই হল শনিবারের (১৯ সেপ্টেম্বর) গণশক্তির সম্পাদকীয় কলামের শিরোনাম। ঠিক তার আগের দিন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর আবির্ভাব দিবস উপলক্ষে দেশজুড়ে সরকারি পয়সায় যে মোচ্ছবটি করা হয়েছে তার এর চেয়ে সঠিক বর্ণনা দেওয়া সম্ভব নয়। অথচ সিপিএমের এই দলীয় মুখপত্র ছাড়া আর কোনো সংবাদমাধ্যম বুক ঠুকে এই কথাটা বলতে পেরেছে বলে দেখলাম না। বরং বড় বড় মিডিয়ার ওয়েবসাইটে শুক্রবার সারাদিন দেখা গেছে দেশের কোথায় কত লক্ষ প্রদীপ জ্বালিয়ে মানুষ মোদীজিকে আশীর্বাদ করেছেন। আনন্দবাজার ডট কমের এক ভিডিওতে দেখছিলাম, খোদ কলকাতায় ঘটা করে যজ্ঞ হচ্ছে। প্রবীণ কংগ্রেসি, থুড়ি তৃণমূলী, থুড়ি বিজেপি নেতা তথা রাজ্যের মন্ত্রী তাপস রায় স্বয়ং যজ্ঞের আগুনে চামচে করে ঘি ঢালছেন। গেরুয়া কেকেরও নাকি আয়োজন হয়েছিল। জন্মদিনের কেক পর্যন্ত গেরুয়া হতে হবে— এই বিধান কোন শাস্ত্রে দেওয়া আছে জানি না। অবশ্য কতকিছুই তো জানি না। পরিবারের জ্যেষ্ঠ ছোটদের জন্মদিনে আশীর্বাদ করেন জানতাম, এখন জানলাম পরিবারের জ্যেষ্ঠকেই আশীর্বাদ করতে হয় সবাই মিলে। অবশ্য এই মোচ্ছবের ফলে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী কতটা আশীর্বাদ কুড়োলেন আর কতটা অভিশাপ— তা নিয়ে সন্দেহ আছে। পরিচিত বিজেপি সমর্থকদের মধ্যেও উচ্ছ্বাসের প্রকাশ দেখলাম না। করোনা অতিমারীর সময়ে যাঁর এক কথায় পাড়াসুদ্ধ লোক থালা বাজিয়েছিল, তাঁর জন্মদিনে সরকারি উদ্যোগ সত্ত্বেও কেউ বাড়িতে প্রদীপ জ্বেলেছে চোখে পড়ল না। যেসব সরকারি কর্মচারীর রুটিরুজি নিয়ে টানাটানি পড়তে পারে প্রদীপ না জ্বালালে, তাদেরই দেখলাম প্রদীপ জ্বালিয়ে ছবি-টবি তুলে জিও ট্যাগ করে সোশাল মিডিয়ায় পোস্ট করতে। যদিও সোশাল মিডিয়ায় পোস্ট করাও নির্দেশের অন্তর্ভুক্ত ছিল কিনা জানি না। সেদিন সন্ধেবেলা বরং গেরুয়া পতাকা লাগানো একখানা টোটোতে উঠে টোটোচালকের মুখে এক রাশ অভিযোগ শুনলাম বিজেপি শাসন এবং এভাবে জন্মদিন পালন নিয়ে। শেষে তো তিনি প্রশ্ন তুলে বসলেন “এত কোটি টাকা খরচ করে যে জন্মদিন করা হচ্ছে, একটা গরিব মানুষের একটা মিষ্টি দেয়া হয়েছে? বড়দের হাতেও দিতে হবে না। দেশে এত মানুষ খেতে পায় না, তাদের বাড়ির বাচ্চাদের হাতে একটা করে এক টাকা দামের লজেন্স দিলেও বুঝতাম।” অথচ সংবাদমাধ্যমে এসব চেহারা উঠে আসছে না। তাদের চোখে তো সকলই শোভন, সকলই নবীন, সকলই বিমল। কিন্তু গোলমাল পাকিয়েছে হাতে হাতে ইন্টারনেট। বিবিসি নিজেদের সোশাল মিডিয়া হ্যান্ডেল থেকে পোস্ট করেছিল— মোদীকে তাঁর জন্মদিনে আপনি কী উপহার দিতে চান? উত্তরে বিস্তর গালিগালাজ আসতে শুরু করে। তখন বিবিসি পোস্টে লেখে— দয়া করে কুরুচিপূর্ণ ভাষা প্রয়োগ করবেন না। তাতেও চিঁড়ে ভেজেনি, অগত্যা বিবিসি ওই পোস্টের কমেন্টস সেকশন বন্ধ করে দেয়। অর্থাৎ জন্মদিন পালন ঠিক পরিকল্পনামাফিক এগোয়নি। অথচ চেষ্টার ত্রুটি ছিল না। মালদা টাইমসের ক্যামেরায় ধরা পড়েছে যে, ভূতনির চরে বানভাসি মানুষের হাতে ত্রাণ তুলে দেওয়ার আগে তাঁদের দিয়ে বার্থডে বয়ের নামে জয়ধ্বনি করানো হয়েছে।

মালদা টাইমস নামটা শুনে আবার ভারতবিখ্যাত টাইমস গ্রুপের কোনো সংবাদমাধ্যম বলে ভেবে বসবেন না। দুয়ের মধ্যে কোনো সম্বন্ধ নেই, থাকলে অমন একখানা খবর কখনো তারা প্রচার করত না। আজকের ভারতে তথা বাংলায়, ততক্ষণই ক্ষমতাসীনের পক্ষে অপ্রীতিকর খবর প্রচার করা চলে, যতক্ষণ সংবাদমাধ্যমটি ক্ষুদ্র বা অতি ক্ষুদ্র। অবশ্য কোন খবর অপ্রীতিকর তা ঠিকও হয় ক্ষমতাসীনের মর্জি অনুযায়ী। ভূতনির কাণ্ড যেহেতু লুকিয়ে চুরিয়ে করা হয়নি, সেহেতু মনে করা অন্যায় নয় যে ও কাজ লুকোনো সরকারের উদ্দেশ্যও ছিল না। বরং পশ্চিমবঙ্গের মন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পালের মত বুক ফুলিয়ে সকলকে দেখিয়ে কাজ করাই হয়ত শুভেন্দু অধিকারীর সরকারের পন্থা। যদিও তাঁর কাজ খুব জনপ্রিয় হচ্ছে বলে মনে হয় না, যদি না তিনি জনপ্রিয় হওয়া বলতে মিম ও রিলের বিষয়বস্তু হয়ে যাওয়া বোঝেন। ইনস্টাগ্রাম বা ফেসবুকের রিলে যে মানুষদের দেখা যাচ্ছে, তাঁদের বেশভূষা যদি শ্রেণির পরিচায়ক হয় তাহলে বলতে হবে যে পশ্চিমবঙ্গের মধ্যবিত্ত বা গরিব, কেউই খুশি নন মন্ত্রীর কর্মকাণ্ডে। কিন্তু আজ এই তালিকা, কাল ওই তালিকা থেকে বাদ পড়ে যাওয়ার ভারতে, যেখানে নাগরিক সরকারকে বেছে নেন না, সরকার নাগরিককে বেছে নেন, সেখানে মন্ত্রীসান্ত্রীদের উপর রুষ্ট হলে তাঁদের নিয়ে হাসাহাসি করা ছাড়া কী-ই বা করতে পারে সাধারণ মানুষ? তাই চতুর্দিক ভরে গেছে অগ্নিমিত্রাকে নিয়ে তৈরি মিম আর রিলে। একটায় যেমন দেখলাম— প্রথম শটে কয়েকটি ছেলে রাস্তা দিয়ে হেঁটে আসছে। পরের শটে মেগাফোন নিয়ে তিনি বলছেন “রাস্তা দিয়ে হাঁটবেন না”। তৃতীয় শটে ছেলেগুলি রাস্তা ছেড়ে ব্রিজের রেলিংয়ের উপর দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে। বাগেশ্বর বাবার বিরুদ্ধে কথা বললে গ্রেফতার করার নির্দেশ দিয়েছিলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। এখন পর্যন্ত তাঁর মন্ত্রিসভার সদস্যদের নিয়ে রিল বা মিম বানানো/শেয়ার করার জন্য গ্রেফতারির আদেশ নেই ভাগ্যিস! নইলে পশ্চিমবঙ্গের হাজতগুলোতে জায়গা কম পড়ে যেতে পারে।

আজকাল অবশ্য কোনটা রিল, কোনটা খবর আর কোনটা বিজ্ঞাপন তা বোঝা দায়। যেমন গত কয়েক দিনে সাধারণ মানুষের মধ্যে যে সরকারি ঘোষণা নিয়ে সর্বাধিক চাঞ্চল্য দেখা দিয়েছে তা হল ইউপিআই পেমেন্টের উপরে মাশুল বসা। সরকার বারবারই বলছে, এ নিয়ে ক্রেতা/উপভোক্তাদের চিন্তা করার কিছু নেই। তাঁদের পকেট থেকে একটি টাকাও খসবে না, ও টাকা দেবেন ব্যবসায়ীরা। তাও লেনদেন দু হাজার টাকার বেশি হলে তবেই। কিন্তু রাস্তাঘাটে কান পাতলে দেখা যাচ্ছে, সাধারণ মানুষ ব্যাপারটা নিয়ে খুশি নন। কিছুতেই আশ্বস্ত হচ্ছেন না। বাজারের মাছ, মাংস বিক্রেতা এবং ছোট দোকানদাররা অনেকে ১৫ অক্টোবরের অপেক্ষা না করে এখন থেকেই নগদ ছাড়া জিনিসপত্র বেচা বন্ধ করে দিয়েছেন। অথচ এটা বাংলার কোনো সংবাদমাধ্যমের বিতর্কের বিষয় নয়। জাতীয় স্তরের গোদি মিডিয়া তবু এ নিয়ে আলোচনা করেছে, ইন্ডিয়া টুডে টিভির লাইভ অনুষ্ঠানে পেমেন্টস পার্টনার কোম্পানি ভারতপে-র প্রতিষ্ঠাতা ও প্রাক্তন ম্যানেজিং ডিরেক্টর অশনীর গ্রোভার সরকারকে তুলোধোনা করেছেন। সাত তাড়াতাড়ি ভারতপে-র বর্তমান সিইও নলিন নেগি বলে দিয়েছেন যে তাঁরা নতুন নিয়মের পক্ষে। ভারতপে-র মুখপত্র আরও এক ধাপ এগিয়ে বলেছেন— ওসব অশনীরের ব্যক্তিগত মতামত, ওর সঙ্গে ভারতপে-র কোনো সম্পর্ক নেই। অর্থাৎ সমাজের উপর থেকে নিচ পর্যন্ত মানুষ ইউপিআই পেমেন্টের উপর খরচ চাপা নিয়ে অসন্তুষ্ট। এই অসন্তোষ বাংলার সংবাদমাধ্যম সযত্নে এড়িয়ে গেলেও সরকার পাতা জোড়া বিজ্ঞাপন দিয়েছেন শনিবারের কাগজে। সরকার মানে রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা ন্যাশনাল পেমেন্টস কর্পোরেশন অফ ইন্ডিয়া, সঙ্গী হয়েছে ভারতের ডিজিটাল পেমেন্ট বাস্তুতন্ত্রে উপস্থিত নন-ব্যাংকিং কোম্পানিগুলোর সংগঠন পেমেন্টস কাউন্সিল অফ ইন্ডিয়া। তাতে আপ্রাণ চেষ্টা করা হয়েছে প্রমাণ করার, যে ইউপিআই পেমেন্টের জন্য ব্যবসায়ীদের মাশুল দিতে হলে তা নাগরিকদের জন্য ভালো। এ কাজ নাকি করা হচ্ছে আরও বেশি মানুষ যাতে ইউপিআই ব্যবহার করেন তারই জন্য। হিসাবও দেওয়া হয়েছে— এই ১২০ কোটি মোবাইল ব্যবহারকারীর মধ্যে মাত্র ৫৬.৫ কোটি ইউপিআই ব্যবহার করেন। অর্থাৎ ভাবুন, সংবাদমাধ্যম এই সরকারি সিদ্ধান্তের খবর দিয়েছে, তাতে মানুষের প্রতিক্রিয়া তুলে ধরেনি, অথচ সরকারের বয়ানটা বিজ্ঞাপন হিসাবে তুলে ধরে লক্ষ লক্ষ টাকা কামিয়ে নিল। কোন কোন কাগজ ছেপেছে এই বিজ্ঞাপন? আমার চোখে একটা কাগজই পড়েছে— সিপিএমের মুখপত্র গণশক্তি। জানি না এবিপি গ্রুপের ভাগ্যে শিকে ছেঁড়েনি কেন। এখনো ‘গেরুয়া গুন্ডামি’-র প্রভাব কাটেনি কি? গণশক্তির একই সংস্করণের ছ নম্বর পাতায় খবর হিসাবে এ ব্যাপারে সরকারের দাবি কী তা লেখা হয়েছে, সঙ্গে বিশ্লেষকরা যে একে অর্থনীতির মৌলিক নিয়মের পরিপন্থী বলছেন, তা-ও লেখা হয়েছে।

আরও দেখুন গিলি গিলি গে: মোদী ম্যাজিক বলতে যা বোঝায়

যা দিনকাল, তাতে মমতা ব্যানার্জির তৃণমূল কংগ্রেসের হাত থেকে প্রতীক কেড়ে নেওয়া এবং কংগ্রেস প্রার্থীকে পুরনো মামলায় গ্রেফতার করে নন্দীগ্রামের উপনির্বাচনকে বিরোধীশূন্য করে দেওয়ার প্রয়াসকে যে বাংলার প্রায় সব সংবাদমাধ্যমই সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়েছে, তাতেই আমাদের আপ্লুত হওয়া উচিত। কে এতে উল্লাস করল আর কে সাংবিধানিক অন্যায় বলে চিহ্নিত করল তা নিয়ে না ভাবাই ভালো। পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতি বহুকাল ধরেই আবর্তিত হচ্ছে এক লাইনের একটা নীতির উপর ভিত্তি করে— আমার যে বিরোধী তার প্রতি অন্যায় করা হলে সেটা অন্যায় নয়। আমার প্রতি করা হলে তবেই অন্যায়। এই নীতি নিয়ে কংগ্রেস চলেছে, মমতা ব্যানার্জি চলেছেন সেই আটের দশক থেকে, সিপিএম চলেছে এবং চলছে, বিজেপি তো চলেই। কোনো রাজ্যের বা দেশের সংবাদমাধ্যম তার রাজনৈতিক ধারার একেবারে বিপরীতে চলে না। কারণ সংবাদমাধ্যম একই বাস্তুতন্ত্রের অংশ।

a2onuswor.com ওয়েবসাইটে প্রকাশিত

সংবাদ ও সংবাদমাধ্যমে যা দেখি নতুন লাগে

“ধর্ম যার যার উৎসব সবার” বলার মধ্যে ভদ্রলোকি ভণ্ডামি আছে নিশ্চিত। কারণ ঈদকে হিন্দু বাঙালি একই যুক্তিতে উৎসব হিসাবে পালন করে না। তা বলে একটা উৎসবকে যে যা খুশি নামে ডাকতে পারবে না, যেমনভাবে খুশি পালন করতে পারবে না— এরকম রাষ্ট্রীয় নির্দেশ নেহাত গা-জোয়ারি।

একদা এক বিখ্যাত সাংবাদিকের অধীনে কাজ করতাম, ধরা যাক তাঁর নাম লোকুবাবু। লোকুবাবুর একটা অদ্ভুত অভ্যাস ছিল। তিনি হঠাৎ হঠাৎ রাগের মাথায় একেকটা শব্দ নিষিদ্ধ করে দিতেন। মানে ধরুন, তাঁর মনে হল comeback শব্দটা বড্ড বেশি ব্যবহার করা হচ্ছে সেই কাগজের শিরোনামে। অমনি একদিন অফিসের ছাদ ফাটিয়ে ঘোষণা করতেন “Comeback is banned.” এমন করতে করতে হয়ত কোনোদিন দেখা যেত win কথাটা নিষিদ্ধ, মানে লেখা বারণ। খবরের কাগজের খেলার পাতায় সে কী বিপত্তি!

পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর ‘শারদোৎসব’ শব্দটা নিষিদ্ধ করে দেওয়া দেখে তাই স্মৃতিমেদুর হয়ে পড়লাম। স্মৃতিমেদুরতা খুব বিপজ্জনক জিনিস। স্মৃতিমেদুরতার চশমা পরে দেখলে অ্যাডলফ হিটলারকেও উত্তমকুমার অভিনীত ভালো ছেলেদের মত মনে হয় অনেকসময়। উপরন্তু স্বৈরাচার বা ফ্যাসিবাদের সঙ্গে সময়ের দূরত্ব তৈরি হলে তাকে আর তত ভয়ঙ্কর লাগে না, বরং “কেমন কড়া লোক ছিল” বলে প্রশংসা করতেও মন চায় অনেকের। অতএব চারপাশটা স্মৃতিমেদুরতার চশমা খুলেই দেখা ভালো। সেভাবে দেখলে লোকুবাবুর এই খুঁতখুঁতেমি আর মজাদার লাগে না, স্বৈরাচার বলে স্পষ্ট চেনা যায়। কারণ একটা ভাষা তৈরি হয় বহু প্রজন্ম ধরে কয়েক কোটি মানুষের যৌথ প্রয়াসে। সেই ভাষার বহুল ব্যবহৃত একটা শব্দকে কোনো ব্যক্তি, তিনি যত ক্ষমতাবানই হোন না কেন, হঠাৎ এক ঘোষণায় নিষিদ্ধ করে দিতে পারেন না। ক্ষমতার চোখরাঙানিতে ভয় পেয়ে যদি বা মানুষ লেখা বন্ধ রাখে, মুখে মুখে শব্দটা চালু থাকবেই। ঠেকায় কার সাধ্যি? এ আসলে কেবল একটা ভাষার উপর সন্ত্রাস নয়, সেই ভাষাভাষী মানুষের সংস্কৃতির উপর আক্রমণ। লোকুবাবুর সমর্থনে তবু বলা যেতে পারে— কাগজের পাতার শিরোনামে একই শব্দের বারবার ব্যবহার আটকানো তাঁর কর্তব্য। কিন্তু যখন কোনো নির্দিষ্ট শব্দকে নিষিদ্ধ করার কাজটা করেন রাজ্যের প্রশাসনিক প্রধান, আর যে শব্দটা নিষিদ্ধ করেছেন সেটা এমন এক উৎসবের নাম যেটা আবেগের দিক থেকে তো বটেই, অর্থনৈতিকভাবেও পশ্চিমবঙ্গের বাঙালির সবচেয়ে বড় উৎসব; তখন এ কাজের পক্ষে যে কোনো যুক্তিই কুযুক্তি। দুর্গাপুজোকে শারদোৎসব বলে, তারপর “ধর্ম যার যার উৎসব সবার” বলার মধ্যে ভদ্রলোকি ভণ্ডামি আছে নিশ্চিত। কারণ ঈদকে হিন্দু বাঙালি একই যুক্তিতে উৎসব হিসাবে পালন করে না। তা বলে একটা উৎসবকে যে যা খুশি নামে ডাকতে পারবে না, যেমনভাবে খুশি পালন করতে পারবে না— এরকম রাষ্ট্রীয় নির্দেশ নেহাত গা-জোয়ারি।

ভাগ্যিস দুর্গাপুজো অর্থনৈতিকভাবে পশ্চিমবঙ্গে অতি গুরুত্বপূর্ণ, নইলে সংবাদমাধ্যমে মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্য নিয়ে হইচই কতটা হত কে জানে! শনিবার (১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬) সকালের গণশক্তি-র এক প্রতিবেদন বলছে, কুমোরটুলিতে গতবার সাড়ে ছয় হাজার প্রতিমার বরাত এসেছিল, এবারে বায়না হয়েছে সাড়ে পাঁচ হাজার। যদি খবরটা ঠিক হয়, তাহলে এখানেই তো এক হাজার পুজো কমে যাওয়ার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। রাজ্যের অন্যান্য জায়গার অবস্থা তাহলে সহজেই অনুমেয়। মানে পুজো কেমন হতে হবে তা নিয়ে একাধিক রাজনৈতিক ও ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব (যত দোষ সবই বাগেশ্বর বাবাকে দিলে তো চলবে না) যেসব মন্তব্য করেছেন, তার হাতেনাতে ফল হয়েছে। এর ধাক্কা যে অর্থনীতির উপর পড়বে তা বলাই বাহুল্য। হয়ত সেই কারণেই পশ্চিমবঙ্গের প্রায় সব সংবাদমাধ্যম মৃদু বা সোচ্চার প্রতিবাদ সহ বড় করে তুলে ধরেছে মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্য (আনন্দবাজার পত্রিকা আবার রবীন্দ্রনাথের লেখা থেকে উদ্ধৃতি সমেত)। নইলে খোদ কলকাতার বুকে যে একটা আস্ত পাড়াকে তিন মাসের বেশি সময় ধরে জলহীন করে রাখা হয়েছে স্রেফ বাসিন্দাদের ধর্মবিশ্বাসের কারণে, এত বড় খবরটা রাজ্যের কোন মূলধারার সংবাদমাধ্যম কতবার তুলে ধরেছে গত একমাসে? বরং সর্বভারতীয় বিকল্প সংবাদমাধ্যম সে কাজ করছে বেশি।

আরও পড়ুন নির্বাচনের ফলে হেরে গেছে দেশের অসাধু মিডিয়া

অবশ্য মুখ্যমন্ত্রী ভালোমন্দ যা-ই বলুন, তাকে লঘু করবে কে? রাবণের মত দশটা মাথা কার আছে? উপরন্তু লোকুবাবুরাই এখন সংবাদমাধ্যমের উপর থেকে নিচ পর্যন্ত বিরাজ করছেন। লোকুবাবু বিখ্যাত হয়েছিলেন বিখ্যাত খেলোয়াড়, প্রাক্তন খেলোয়াড়, আইপিএলের যুগে পেজ থ্রি সেলেবদের লম্বা লম্বা সাক্ষাৎকার নিয়ে। ফলে তাঁর অধীন সমস্ত পাতা জুড়েই ‘কী ঘটিয়াছে’-র থেকে বড় করে তুলেছিলেন ‘কে কী বলিয়াছে’-কে। সেইসময় তবু এ জিনিসের নিন্দেবান্দা করার লোক ছিল মিডিয়ায়। কিন্তু তাঁরা তখনই প্রান্তিক, এখন ভ্যানিশ। লোকুবাবুদের নাম যশ দেখে পরবর্তী প্রজন্মের ছকুবাবুরা শিখেছেন যে ওকেই সাংবাদিকতা বলে। তার উপর অমৃতকালের ভারতে মন্ত্রীসান্ত্রীরা কী বললেন সেটাকেই খবর করে না তুলে অধিকাংশ সংবাদমাধ্যমের উপায় নেই। স্রেফ অনুলিখন করো, নইলে সরকারি বিজ্ঞাপন বন্ধ। কী করলেন সেটাও ছাপা বা দেখানো যাবে, যদি কাজটা হয় ফিতে কাটা বা ট্রেনের সামনে পতাকা নাড়া, কিংবা হিমালয়ের গুহায় বসে ধ্যান করা। যা একেবারেই প্রকাশ করা চলে না ইদানীং, তা হল মন্ত্রীসান্ত্রীরা কী করলেন না। সেসব জায়গা ভরাতে কাগজে ছাপতে হলেও, ভিতরের পাতায় ছোট করে। আর টিভির সান্ধ্য কাজিয়ায় ওসবকে বিষয় করে তোলার প্রশ্নই নেই। সুতরাং বিশ্ববিদ্যালয় বিল বা নাগা সন্ন্যাসীদের নিয়ে মুখ্যমন্ত্রীর যাদবপুর অভিযান নিশ্চয়ই যথাযোগ্য সম্মান পাবে কাগজে এবং টিভি চ্যানেলে। কিন্তু রাজ্যের প্রায় প্রত্যেক পৌরসভা আর পঞ্চায়েত এলাকাতেই যে নানা কারণে জঞ্জাল সাফাই হচ্ছে না দীর্ঘদিন ধরে— সে খবর নিজ নিজ জেলার পাতায় চুপিসারে গেলেই যথেষ্ট। আবার নাগা সন্ন্যাসীদের যে ছবি সবাই দেখে ফেলেছে, সোশাল মিডিয়ায় ভাইরাল, সে ছবি কাগজে প্রায় দেখাই গেল না। জানি না এর পিছনে শ্লীলতা-অশ্লীলতার যুক্তি আছে কিনা। যদি থাকে তাহলে আবার কিঞ্চিৎ স্মৃতিমেদুরতা তৈরি হবে। কারণ যেসব কাগজ সর্বত্যাগী সাধুদের নগ্নতা দেখাতে লজ্জায় নতমুখ, কৈশোরে তাদেরই পাতায় অসংখ্য বিখ্যাত, আধাবিখ্যাত মডেল ও অভিনেত্রীর প্রায়-নগ্নতা দেখে আমাদের দাড়িগোঁফ গজানোর গতি বেড়ে গিয়েছিল। কথাটা বিশেষত ইংরিজি ভাষার কাগজগুলোর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। তখন সোশাল মিডিয়ার যুগ হলে ভাইরাল হওয়ার সমস্ত রেকর্ড ভেঙে ফেলত সেইসব কাগজের সেইসব পাতা।

অবশ্য সোশাল মিডিয়া থাকায় কিছু উপকারও হয়েছে। যেমন কাগজ খুললে বা টিভির খবর দেখলে কেবল জানা যাচ্ছে, দিল্লিতে ব্রিকস সামিটে নরেন্দ্র মোদী গোলের পর গোল দিচ্ছেন। সোশাল মিডিয়া না থাকলে জানাই যেত না যে ওদিকে দিল্লি শহরের ট্র্যাফিকের ইট খসে পড়েছে। দিল্লিবাসীরা সোশাল মিডিয়ায় অভিযোগ করছেন— রাস্তায় বেরোলে এত ডাইভার্শন, যে ঘুরে যেতে যেতে কেউ শেষে নিউ ইয়র্কও পৌঁছে যেতে পারে। যদিও বিশ্বগুরু হওয়ার গুরুত্ব যারা বোঝে না, সেইসব মূঢ়রাই এরকম অভিযোগ করে থাকে। রাস্তায় গর্ত, ট্র্যাফিক জ্যাম, সরকারি ইমারতের ছাদ ফুটো হয়ে জল পড়া বা পুর পরিষেবার গাফিলতিতে সরকারকে প্রশ্ন করা সংবাদমাধ্যমের কাজ ছিল সেই জুরাসিক যুগে। এখন তো ভারত আনন্দ আশ্রম। মিডিয়ার কাজ গেয়ে যাওয়া “পৃথিবী বদলে গেছে/যা দেখি নতুন লাগে।” প্রশ্ন করার ব্যাপারটা ছেড়ে দেওয়া হয়েছে দিমাগী নকশাল বিকল্প সংবাদমাধ্যমের হাতে।

a2onuswor.com ওয়েবসাইটে প্রকাশিত

এক মুখ দিয়ে রাম বলব, অন্য মুখ দিয়ে শ্যাম

আসলে কর্পোরেট মিডিয়া সম্পর্কে একটা অপ্রিয় সত্য হল, কোন সাংবাদিক লোকের চোখে ‘হিরো’ হবেন আর কে রাজাগোপালের মত বিস্মৃত হবেন, তা-ও ঠিক করে মালিক।

যদি ধরে নিই ৭০ বছর বাঁচব, তাহলে জীবনের বেশিরভাগটাই পেরিয়ে এসেছি। এর মধ্যে প্রথম বছর ছয়েক বাদ দিলে, যে জিনিসটা ছাড়া এই সেদিন পর্যন্তও চলত না, সেটা হল খবরের কাগজ। ও জিনিসটার প্রতি আকর্ষণ এত প্রবল ছিল এবং পড়তে এত সময় ব্যয় করতাম যে মাধ্যমিক পরীক্ষার আগে বাবা বাড়ি থেকে বেরোবার সময়ে মাকে বলে যেতেন— আমাকে যেন কাগজের ধারে কাছে যেতে না দেওয়া হয়। আমি কী করতাম? বাবা-মায়েরও আগে ঘুম থেকে উঠে পড়ে, বারান্দায় এসে পড়ে থাকা কাগজটা তুলে নিয়ে অন্তত সবকটা শিরোনাম আর খেলার পাতাটা পড়ে ফেলতাম। তারপর যেখানে যেভাবে পড়ে ছিল, সেখানে ঠিক সেইভাবে ফেলে রেখে দাঁত মাজতে যেতাম। ফলে মাঝে মাঝে অবিশ্বাস্য লাগে যে, খবরের কাগজ দিয়ে যাওয়ার জন্যে যে ব্যাগটা আমাদের বহুতলের বারান্দা থেকে ঝুলিয়ে রাখার কথা, সেটা ঝোলাতে আজকাল প্রায়ই ভুলে যাই। যেদিন ভুলি না সেদিনও কাগজ আসার সঙ্গে সঙ্গেই যে পড়ে ফেলতে ইচ্ছে করে তা নয়। আদ্যোপান্ত পড়া ছেড়েই দিয়েছি; পড়ি মূলত শিরোনামগুলো আর উত্তর-সম্পাদকীয় পাতার কোনো লেখা কৌতূহলোদ্দীপক মনে হলে। মাঝে মাঝে এমনও হয়— কাগজ তোলা হল, কিন্তু সারাদিনে পড়েই উঠতে পারলাম না। পড়ে রইল একপাশে দুয়োরানির মত। বহুতলের বাকি পরিবারগুলোর কাছেও যে খবরের কাগজের আর কদর নেই তা বুঝতে পারি, যখন দেখি একমাত্র আমার ফ্ল্যাট থেকেই কাগজের ব্যাগ ঝোলে সকালে। সিঁড়িতে দিনের পর দিন জমতে থাকে আরও উপরতলার ফ্ল্যাটমালিকদের তুলে নিয়ে না যাওয়া কাগজ। অথচ প্রতিবেশীদের সঙ্গে কথাবার্তা বলতে গিয়ে বোঝা যায়— প্রায় সব ঘটনাই সকলের জানা। অনেকের ক্ষেত্রে তার কারণ টিভির খবর দেখার অভ্যাস, আমার ক্ষেত্রে তার চেয়েও বড় কারণ মোবাইল ফোন।

ছোটবেলার সংবাদপত্র-প্রীতি শুধু নয়, পরবর্তীকালে দেড় দশক খবরের কাগজের সাংবাদিক হিসাবে কাটানোর ফলেও এই পরিস্থিতি মনকে ভারাক্রান্ত করে তোলে। দেখতে পাই, আমার পরের প্রজন্মের কাছে খবরের কাগজ ইতিমধ্যেই একেবারে মূল্যহীন হয়ে গেছে। পৃথিবীতে পরিবর্তনই যে একমাত্র অপরিবর্তনীয় সত্য, সেকথা জানি। প্রযুক্তির বদল জীবনযাত্রায় বদল আনবে— এ-ও অনিবার্য। কিন্তু কোভিড অতিমারীর পর থেকে খবরের কাগজের জনপ্রিয়তায় (বা প্রয়োজনীয়তায়) এই যে ধস, তার পিছনে কাগজগুলোর নিজেদের দায়ও কম নয়।

ডিজিটাল সংবাদমাধ্যমের যুগে সকালের কাগজের বাসি হয়ে যাওয়া আটকানোর কোনো উপায় নেই। খবরের কাগজগুলোরও সোশাল মিডিয়া হ্যান্ডেল আছে, সেখান থেকে নিয়মিত আপডেট দেওয়া হয়। যেমন আছে টিভি চ্যানেলগুলোর। সুতরাং তাজা থাকতে গেলে, পাঠকের কাছে প্রয়োজনীয় হয়ে উঠতে গেলে, কাগজগুলোর ক্রমশ বিশ্লেষণাত্মক হয়ে ওঠা দরকার ছিল। কিন্তু এখনো তারা আগের দিন সকালবেলায় কী ঘটেছে তা-ই লিখে চলেছে মোটের উপর, কেমনভাবে ঘটেছে তাতে জোর নেই। যেহেতু কী ঘটেছে তা জানানোর দায়মুক্ত হওয়া যায় এ যুগে, সেহেতু তাড়াহুড়ো না করে অনেক বেশি তদন্তমূলক সাংবাদিকতা করার সুযোগও এখন খবরের কাগজের হাতে। আরও স্থানীয় হওয়ারও সুযোগ তৈরি হয়েছে। কিন্তু দু-একটা কাগজ বাদ দিলে সকলেই থোড় বড়ি খাড়া আর খাড়া বড়ি থোড় পরিবেশন করতে ব্যস্ত। এর দায় অবশ্যই অনেকটা মালিকপক্ষের। কাগজের ভোল বদল করতে গেলে যে বিশেষ পারদর্শিতা ও অভিজ্ঞতা দরকার, তা পেতে গাঁটের কড়ি খরচ করতে হয়। করোনা অতিমারীর সময়ে “লোকে কাগজ পড়ছে না” এই অজুহাতে তাঁরা বিশেষত মাঝারি ও উপরের স্তরের সাংবাদিকদের ব্যাপক ছাঁটাই করে মাইনের খরচ বাঁচিয়ে নিজেদের লাভের গুড়ের হাঁড়ি ভর্তি রেখেছেন। ফলে ওসব বদল-টদল করবে কারা?

কিন্তু এখানেই শেষ নয়। টিভি চ্যানেলগুলোর মত কাগজগুলোও যে একপেশে, সরকারের পদলেহনকারী হয়ে গেছে— সেকথা পাঠকদের কাছে গোপন নেই। একদা বলা হত, পাঠককে আকর্ষণ করতে গেলে সরকারবিরোধী লেখালিখিই করতে হবে। সত্যিই পশ্চিমবঙ্গে বছরের পর বছর সর্বাধিক বিক্রীত দুটো কাগজের নাম ছিল আনন্দবাজার পত্রিকা আর বর্তমান, যারা বামফ্রন্ট সরকারের তীব্র বিরোধী ছিল। বামেদের প্রতি নরম আজকাল তুমুল বিক্রি হত বিশেষ কোনো খেলা থাকলে। এদের চেয়ে বয়সে নবীন সংবাদ প্রতিদিন-ও সরকারবিরোধী বলে পরিচিত ছিল। আরও তরুণ দৈনিক স্টেটসম্যান তো সিঙ্গুর-নন্দীগ্রাম পর্বে বিক্রি বাড়িয়ে ফেলেছিল সরকারবিরোধিতার কারণেই। কলকাতার প্রাচীন ইংরিজি কাগজ দ্য স্টেটসম্যান আর ১৯৮০-র দশকে স্থাপিত আনন্দবাজার গ্রুপের ইংরিজি কাগজ দ্য টেলিগ্রাফ-ও সরকারবিরোধী হিসাবে প্রসিদ্ধ ছিল। ২০১১ সালে কলকাতায় আর ২০১৪ সালে দিল্লিতে সরকার বদলানোর পরে ক্রমশ এমন হয়েছে যে, আজ বিজেপিশাসিত পশ্চিমবঙ্গে আনন্দবাজার প্রথম পাতায় ‘গেরুয়া গুন্ডামি’ শিরোনাম দিলে বাম, ডান, মধ্যপন্থী— সব পক্ষ আপ্লুত হচ্ছে। স্রেফ শিরোনাম এবং যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে যা ঘটেছে, আগেরদিনই হাতের মোবাইলে যা দেখে ফেলেছে সবাই— সেটুকু হুবহু বিবৃত করার জন্যেই। তার বেশি কিছু নয়। অর্থাৎ যা ঘটেছে, কাগজে ঠিক তা লেখা হবে না, যেমনটি ঘটেছে তেমনটি লেখা হবে না— এটাই আমাদের প্রত্যাশা হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমরা জেনে গেছি, কেবল সেই বয়ানই লেখা হবে বা টিভিতে দেখানো হবে, যা সরকার চায়। অন্য বয়ানের জন্যে আমাদের তাকিয়ে থাকতে হবে বিকল্প সংবাদমাধ্যমের দিকে। মূলধারার সংবাদমাধ্যম যদ্দৃষ্টং তদ লিখিতং করলেই আমরা উল্লসিত হয়ে বলে উঠছি “অহো! কী দুঃসহ স্পর্ধা!”

আমরা যে ইতিহাস-বিস্মৃত তার প্রচুর প্রমাণ রোজই পাওয়া যায়, এ-ও তেমনই একটা প্রমাণ। সেদিনের প্রথম পাতার জন্যে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর হুমকি, অতঃপর আনন্দবাজারের সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে মামলা এবং আনন্দবাজার অফিসের গায়ে গেরুয়া রং লেপে দেওয়া— এসব আমরা আর কাগজটার প্রথম পাতায় দেখিনি কিন্তু। দেখেছি অন্য সংবাদমাধ্যমে বা সোশাল মিডিয়ায়। যে কাগজের গায়ে হাত পড়ল তারা নিজেদের উপর আক্রমণের খবরই ক্রমশ ঠেলে দিল ভিতরের পাতায়, আকারে ছোট হতে হতে এখন মিলিয়ে গেছে। গেরুয়া ছিল, আবার সাদা করে দিয়েছি— এ নিয়ে রাবীন্দ্রিক বাহাদুরিটা পর্যন্ত কাগজের পাতায় হল না। হল সোশাল মিডিয়ায়। অর্থাৎ যে কাগজের সাংবাদিকরা আক্রান্ত, সেই কাগজই সেই খবর ছাপার উপযুক্ত জায়গা দিচ্ছে না। একে সাধারণ পাঠক কাগজের মহানুভবতা বলে ভাবতে পারেন, মনে করতে পারেন নিজেদের ঊর্ধ্বে কাগজ অন্য খবরকে রেখেছে। নিউজরুমে কাজ করার অভিজ্ঞতায়, একে মিটমাট করে নেওয়ার চেষ্টা ছাড়া অন্য কিছু বলে ভাবা আমার পক্ষে শক্ত। বিশেষত যখন সবেমাত্র জুন মাসে জানতে পেরেছি যে, এবিপি গ্রুপেরই ইংরিজি কাগজ দ্য টেলিগ্রাফ-এর প্রাক্তন সম্পাদক আর রাজাগোপালের নাম ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধনী থেকে বাদ দেওয়া হয়েছিল এবং তার ফলে তাঁর পাসপোর্ট দিনের পর দিন পুনর্নবীকরণ করা হয়নি; তাঁকে হয়রান করা হয়েছে বহুদিন ধরে। তাতে আজকের বিদ্রোহী মিডিয়া এবিপি গ্রুপ কিন্তু পাশে দাঁড়ায়নি। শেষমেশ রাজাগোপাল লিখিত বার্তা পরঞ্জয় গুহঠাকুরতার মত বিকল্প মাধ্যমের সাংবাদিক সোশাল মিডিয়ায় পোস্ট করে দেন, তা ভাইরাল হয় এবং তারপর বিভিন্ন বিকল্প সংবাদমাধ্যমে তা নিয়ে খবর প্রকাশিত হয়। তারপর কেরালার মুখ্যমন্ত্রী প্রতিকার চেয়ে চিঠি লেখেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রীকে, তবে রাজাগোপাল পাসপোর্ট পান। এই গোটা পর্বে টেলিগ্রাফ বা আনন্দবাজার অথবা তাদের নিউজ চ্যানেল এবিপি আনন্দ কিন্তু এক লাইন আলোচনা করেনি এ নিয়ে।

আরও পড়ুন ব্যাকফুটে গোদি মিডিয়া

এই যদি স্পর্ধা হয়, তাহলে ভণ্ডামি কোনটা? জরুরি অবস্থার সময়ে বরুণ সেনগুপ্ত, গৌরকিশোর ঘোষ, সি আর ইরানিরা যা দেখিয়েছিলেন তাকেই বা কী বলা উচিত? বস্তুত, সাংবাদিকের নামে মামলা হওয়া কোনো অভিনব ব্যাপার নয়। তৃণমূল সরকারের আমলেও হয়েছে, এবিপি গ্রুপের সাংবাদিকদের নামেও হয়েছে। তা নিয়ে সোশাল মিডিয়ায় কেউ হইচই করেনি এই যা। আসলে কর্পোরেট মিডিয়া সম্পর্কে একটা অপ্রিয় সত্য হল, কোন সাংবাদিক লোকের চোখে ‘হিরো’ হবেন আর কে রাজাগোপালের মত বিস্মৃত হবেন, তা-ও ঠিক করে মালিক। মনে রাখা ভালো, রাজাগোপাল হলেন সেই সম্পাদক যাঁর আমলে টেলিগ্রাফের প্রথম পাতা উদ্ভাবনীমূলক শিরোনাম এবং চেহারার কারণে যেসব জায়গায় কাগজ পৌঁছয় না সেখানেও প্রসিদ্ধ হয়ে উঠেছিল। সোশাল মিডিয়ার মাধ্যমে সেসব পাতা নিয়মিত ভাইরাল হত এবং বিজেপিবিরোধী মহলে লড়াকু কাগজ হিসাবে পরিচিত হয়েছিল টেলিগ্রাফ। আনন্দবাজার পত্রিকা বা এবিপি আনন্দ কিন্তু ওরকম বিদ্রোহী চেহারা নেয়নি কখনো। বরং এবিপি আনন্দ পশ্চিমবঙ্গে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধনী চলাকালীন বিজেপি-প্রচারিত “পশ্চিমবঙ্গ রোহিঙ্গা আর বাংলাদেশিতে ভরে গেছে” এবং “তারা এসআইআরের ভয়ে বাংলাদেশে পালাচ্ছে” বয়ানের প্রচারে অগ্রণী ভূমিকা নিয়েছিল। এসব আসলে কর্পোরেট কৌশল। এক মুখ দিয়ে রাম বলব, আরেক মুখ দিয়ে শ্যাম। সংবাদ মূলত ব্যবসা, আর সব পক্ষের লোককেই ক্রেতা হিসাবে বজায় রাখা দরকার। এর মধ্যে বিদ্রোহও তো নেই-ই, স্পর্ধাও নেই। সত্যি কথা বলতে, ভারতের মিডিয়ার অর্থনীতি যে চেহারা নিয়েছে তাতে বড় সংবাদমাধ্যমগুলোর স্পর্ধা দেখানোর বিশেষ অবকাশও নেই। বিশ্বাস না হয়, প্রণয় রায়কে জিজ্ঞেস করুন। স্পর্ধা দেখাচ্ছিলেন বলেই বিভিন্ন সরকারি দফতর মিথ্যা অভিযোগ (আদালতে ইতিমধ্যে প্রমাণিত) করে বছরের পর বছর হয়রান করে তাঁর এবং স্ত্রী রাধিকা রায়ের তৈরি বিজেপিবিরোধী বড় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভি-কে কেড়ে নিল।

অতএব বড় সংবাদমাধ্যমে স্পর্ধা খুঁজতে না যাওয়াই ভালো। স্পর্ধা কি কম পড়িয়াছে? বাংলায় হয়ত পড়িয়াছে, কিন্তু বাংলার বাইরে তাকিয়ে দেখুন। জেন জি আন্দোলনের সত্য মার খেয়ে, জীবনের ঝুঁকি নিয়ে আপনার হাতের মোবাইলে পৌঁছে দিল যেসব ছোট ছোট ইউটিউব চ্যানেল বা ইনস্টাগ্রামার, তাঁরা সাংবাদিক নন? ক্ষমতাকে প্রশ্ন করাই যদি সংবাদমাধ্যমের কাজ হয়, তাহলে সেই কাজটা এখন সবচেয়ে ভালো করছেন ওঁরাই। করতে গিয়ে কত বড় ঝুঁকি নিচ্ছেন তার হাতে গরম প্রমাণ ৪ পিএম নিউজ নেটওয়ার্ক নামের ডিজিটাল মিডিয়ার দুই সাংবাদিক শাহীন খান আর নাফিসা খান। তাঁরা দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী রেখা গুপ্তাকে প্রশ্ন করতে গিয়ে সাকেত থানায় পুলিশের হাতে বেদম মার খেয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। শুধু তাই নয়, তাঁরা মুসলমান বলে বেশি মারা হয়েছে— এমন অভিযোগও উঠেছে দিল্লি পুলিশের বিরুদ্ধে। এর প্রতিবাদে দিল্লির বহু সাংবাদিক মিলে থানা ঘেরাও করে ফেলেন ৪ সেপ্টেম্বর। প্রেস ক্লাব, বিভিন্ন সাংবাদিক সংগঠন, কংগ্রেস, আম আদমি পার্টি ইত্যাদি মহল থেকে প্রতিবাদ এবং নিন্দার পরেও এই কলাম লেখার সময় পর্যন্ত পুলিশ এফআইআর নেয়নি।

এবার ভেবে দেখুন, স্পর্ধা কথাটাকে খুব শস্তা করে দেওয়া কি উচিত? যা বিরল, তারই তো দাম বেশি।

a2onuswor.com ওয়েবসাইটে প্রকাশিত

দিমাগী নকশাল: সমস্যা নকশাল নিয়ে, নাকি মগজ নিয়ে?

শুনেছি মার্কিন দেশে অ্যালবার্ট আইনস্টাইনের মগজ নানা ভাগে ভাগ করে রীতিমত সংরক্ষণ করে রাখা হয়েছে, কারণ এক জীবনে অত বিরাট বিরাট কাজ করে যাওয়া লোক মানুষের ইতিহাসে বিরল। কিন্তু সে তো তাঁর আশ্চর্য মেধার প্রকাশ দেখে তাঁর মৃত্যুর পর করা হয়েছে। জ্যান্ত লোকের মগজ দেখতে পান নাকি আমাদের প্রধানমন্ত্রী! তাঁর কাছে কি সুকুমার রায় বর্ণিত ফুটোস্কোপ রয়েছে?

আনন্দময় বর্মণকে বোধহয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এবং তাঁর মন্ত্রিসভার সদস্যরা চেনেন না। চিনে নিতে চাইলে কাজটা কঠিন নয়, কারণ উনি ভারতীয় জনতা পার্টির টিকিটেই নির্বাচিত বিধায়ক।

স্বাধীনতা দিবসের ভাষণে ‘দিমাগী নকশাল’ বলতে প্রধানমন্ত্রী ঠিক কী বুঝিয়েছেন তার ব্যাখ্যা দিতে হয়েছে মন্ত্রিসভার সদস্য কিরেণ রিজিজুকে। নকশাল আন্দোলন কী এবং নকশাল কারা— সে ব্যাপারে যাঁদের সামান্য ধারণা আছে তাঁদের রিজিজুর ব্যাখ্যা শুনে হাসি পাওয়া স্বাভাবিক। তিনি যেসব বৈশিষ্ট্য নির্ধারণ করেছেন তার সঙ্গে নকশাল হওয়ার কোনও আবশ্যিক সম্পর্ক নেই। তার উপর আলাদা করে ‘দিমাগী’ বলতে কী বোঝানো হয়েছে তার ব্যাখ্যাও নেই।

অথচ ভারতের নকশাল আন্দোলন যেখান থেকে শুরু হয়েছিল, সেই নকশালবাড়ি জায়গাটা যে বিধানসভার অধীনে (মাটিগাড়া-নকশালবাড়ি), তা এখন বিজেপিরই দখলে। সেখানকারই বিধায়ক আনন্দময়বাবু। প্রধানমন্ত্রী বা কিরেণবাবু যদি একবারটি তাঁর সঙ্গে কথা বলতেন, তাহলেই হয়ত এমন ঘেঁটে ঘ অবস্থা হত না যাতে প্রধানমন্ত্রীর বক্তৃতার ‘মেড ইজি’ দিতে হয় আরেকজন মন্ত্রীকে; তাতেও এমন সব অদ্ভুত কথা বেরোয় যে সোশাল মিডিয়ায় হাসাহাসি চলে।

অবশ্য এসব গ্রহের কারসাজিও হতে পারে। কারণ ২০১৪ থেকে এই সেদিন পর্যন্ত মোদীজি ও তাঁর দল কাউকে ‘আর্বান নকশাল’, ‘টুকড়ে টুকড়ে গ্যাং’, ‘অ্যান্টি-ন্যাশনাল’, ‘আন্দোলনজীবী’, ‘খালিস্তানি’ ইত্যাদি তকমা দিলে দেশসুদ্ধ লোক তা শিরোধার্য করে সেইসব লোককে দেশের শত্রু হিসাবে মেনে নিত। যারা চিহ্নিত হল তাদের পত্রপাঠ গ্রেফতারি, তাদের নামে এফআইআর দায়ের, বাড়িতে বা অফিসে তল্লাশি চলত। তাদের বন্ধুবান্ধবরাও কিঞ্চিৎ ভীত হয়ে পড়তেন, পাছে সঙ্গদোষে তাঁদেরও একই হাল হয়। কিন্তু কে জানে কোন গ্রহের ষড়যন্ত্রে সেসব চলতে থাকলেও ভয় আউট, ঠাট্টা ইন হয়ে গেছে। দেশের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত আন্দোলনকারী, মানবাধিকার কর্মী, তথ্যের অধিকার আইন নিয়ে মামলা মোকদ্দমা করা লোকজনের (যাদের মধ্যে আবার তরুণ আইনজীবীরাও আছেন) উপর ক্ষিপ্ত হয়ে তাদের আরশোলার সঙ্গে তুলনা করলেন। ও মা! কিছুদিনের মধ্যেই ককরোচ জনতা পার্টি তৈরি হয়ে গেল! তারপর তাদের সঙ্গে গুচ্ছের বামপন্থী ও আম্বেদকরপন্থী ছেলেমেয়ে জুটে গেল। দিল্লির যন্তর মন্তর থেকে শুরু হয়ে তারা গোটা উত্তর ভারতে ওড়াউড়ি শুরু করে দিল; বিভিন্ন রাজ্যের পুলিশ ‘হিট’ দিতে দিতে নাজেহাল, কিছুতেই কিছু হয় না। অমিত শাহের চাণক্যসুলভ বুদ্ধি পর্যন্ত ফেল। আরশোলা মারতে গিয়ে এমন হল যে তিনি নিজেই সংসদে ঢোকা ছেড়ে দিতে বাধ্য হলেন। প্রধানমন্ত্রী বাংকারে আশ্রয় নিয়েছিলেন কিনা কে জানে! যা-ই হোক, আরশোলাদের ইনস্টাগ্রামে ক্ষমা করে দিয়ে তিনি লালকেল্লা থেকে দেশের মানুষকে ‘দিমাগী নকশাল’ সম্পর্কে সাবধান করলেন। এবারে দেখা গেল মোটেই কেউ ঘাবড়াচ্ছে না। সোশাল মিডিয়ায় দিমাগী নকশাল পার্টিও তৈরি হয়ে গেছে। কেউ আর ভয় তো পাচ্ছেই না, এমনকী ব্যাপারটা এমন ‘কুল’ হয়ে দাঁড়িয়েছে যে নকশাল (মাওবাদী) সংগঠনগুলোর বিরুদ্ধে অপারেশন গ্রীন হান্ট চালু করে অমিত শাহকে অপারেশন কাগারের পথ দেখিয়েছিলেন যে পি চিদম্বরম, তিনিও নিজেকে দিমাগী নকশাল বলে দাবি করে বসেছেন। বল মা তারা দাঁড়াই কোথা!

প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন, নকশালরা শেষ হয়ে গেছে। কিন্তু দিমাগী নকশালরা এখনও আছে। তাদের থেকেই সাবধান হতে হবে। একথা শুনে আমার মত ছাপোষা নাগরিকদের কিছুটা আশ্বস্ত লাগে। নকশালরা নিজেরাও গুনে বলতে পারবে না তাদের কতরকমের প্রকারভেদ আছে, তার মধ্যে কারা অবশিষ্ট আছে আর কারা অপারেশন কাগারের ফলে অবলুপ্ত। কিন্তু মোদীজি যখন বলছেন আর কেউ নেই, তখন নিশ্চিত নেই।

আরও পড়ুন ওয়ারেন হেস্টিংস যা শেখালেন

সেই ২০১৬ সালে নোটবন্দির পর থেকে শুনে আসছি, নকশালরা শেষ হয়ে গেছে। কথাটা এতবার বলা হয়েছে যে এবার গুনে দেখতে হবে এ পর্যন্ত কতবার নকশালরা শেষ হয়েছে। যা-ই হোক, আরও একবার শেষ হলে ক্ষতি কী? শাস্ত্রে বলেছে অধিকন্তু ন দোষায়। তাই স্বাধীনতা দিবসের বক্তৃতা শুনে আশায় বুক বেঁধেছিলাম। কিন্তু দিমাগী নকশাল আবার কোথা থেকে এল রে বাপু! দিমাগ মানে তো মগজ। তাহলে দিমাগী নকশাল মানে হল মগুজে নকশাল। এটা কি কাগুজে বাঘের মত ব্যাপার? তা বাপু বাঘশুমারির সময়ে আলাদা করে কাগুজে বাঘও গোনা হয় বলে তো শুনিনি। কাগুজে বাঘ আসল বাঘের সমান বিপজ্জনক, এমনও শুনিনি। তাহলে নকশালরা আর না থাকলে মগুজে নকশালদের নিয়ে এত চিন্তা কীসের? তাছাড়া কোন মানুষটারই বা মগজ নেই? যারা প্রধানমন্ত্রীর দলের লোক তারা কি বিনা মগজেই এত বড় দেশ চালাচ্ছে?

তাহলে সমস্যা কি কিছু মানুষের মগজে যা আছে তা নিয়ে? তবে তো ভারি মুশকিল। শুনেছি মার্কিন দেশে অ্যালবার্ট আইনস্টাইনের মগজ নানা ভাগে ভাগ করে রীতিমত সংরক্ষণ করে রাখা হয়েছে, কারণ এক জীবনে অত বিরাট বিরাট কাজ করে যাওয়া লোক মানুষের ইতিহাসে বিরল। কিন্তু সে তো তাঁর আশ্চর্য মেধার প্রকাশ দেখে তাঁর মৃত্যুর পর করা হয়েছে। জ্যান্ত লোকের মগজ দেখতে পান নাকি আমাদের প্রধানমন্ত্রী! তাঁর কাছে কি সুকুমার রায় বর্ণিত ফুটোস্কোপ রয়েছে? অবশ্য মোদীজি পারেন না এমন জিনিস নেই। সেই কোন ছেলেবেলায় কুমিরের মুখ থেকে খেলার বল উদ্ধার করে এনেছিলেন। এই তো সেদিন সশরীরে উপস্থিত না হয়েও কয়েক ঘন্টার জন্যে রুশ-ইউক্রেন যুদ্ধ থামিয়ে দিয়েছিলেন। তাঁর পক্ষে জ্যান্ত মানুষের মগজে কী আছে তা জানা আর এমন কী ব্যাপার?

কিন্তু যদি জানেনই যে যা আছে তা দেশের পক্ষে ক্ষতিকর, তাহলে এতদিন কোনো ব্যবস্থা নেননি কেন? তিনিই তো আমাদের দণ্ডমুণ্ডের কর্তা। পেট্রল পাম্প থেকে ভ্যাকসিন সার্টিফিকেট (সুনীল শেঠির ঠাকুরঘরেও)— তিনি সর্বত্রগামী। কেবল দেশের শত্রুদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার বেলাতেই সব দায়িত্ব আমাদের ঘাড়ে এসে পড়বে নাকি? করোনা ভাইরাস আটকানোর মত মগুজে নকশালদের আটকানোর জন্যেও এবার থালা বাজানোর হোমটাস্ক দেবেন আমাদের, নাকি মোমবাতি জ্বালানোর? নাকি কোথাও লাইন-টাইন দিতে হবে আবার? গত বারো বছরে এই একটা শিল্পেই তো নিয়মিত কর্মসংস্থান হয়েছে। টাকা তুলতে লাইন, অমুকের সঙ্গে তমুকের লিংক করাতে লাইন, এসআইআরে নাম তুলতে লাইন, ট্রাইব্যুনালে লাইনে দাঁড়ানোর পর এবার কি মগুজে নকশাল নই প্রমাণ করতে লাইনে দাঁড় করানো হবে আবালবৃদ্ধবণিতাকে?

নাকি সমস্যা মগজ থাকলেই? তাই যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় বা জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের মত মগজের চর্চা করার জায়গাগুলোতে রাত বিরেতে হামলা হবে? সে সরকার মাইবাপ, যদি তাই চান তো তাই হবে। ঠেকাবে কে? কিন্তু যাদবপুর বা জেএনইউ-কে মেরে ধরে গলগোটিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের স্তরে নামিয়ে আনলেই কি মগজের সমস্যা মিটবে? মগজ যে সকলেরই আছে, আর সেটা থাকে মুণ্ডুতে। তা মুণ্ডু গেলে খাবটা কী? অবশ্য গ্যাসের দাম, জিনিসপত্রের দাম যেভাবে বাড়ছে তাতে খাওয়ার খরচ অনেক। হিতৈষী সরকার হয়ত খরচ বাঁচিয়ে দিতে চাইছেন। এটাই মাস্টারস্ট্রোক।

a2onuswor.com ওয়েবসাইটে প্রকাশিত

বাকস্বাধীনতা এখন রীতিমতো কমেডি

পাটনার আন্দোলনে এক যুবক উপস্থিত পুলিশকর্মীকে জিজ্ঞেস করছেন “কাঁদানে গ্যাস, জলকামানের ব্যবস্থা করেছেন?” উত্তরে তিনি না বলায় বলছেন “এ কে ৪৭?” তাতেও না বলায়, যেন ভারি হতাশ হয়ে বলছেন “কিছুরই ব্যবস্থা করেননি?”

দেশ স্বাধীন হতে না হতেই কমিউনিস্টরা স্লোগান তুললেন “ইয়ে আজাদি ঝুঠা হ্যায়”;অর্থাৎ এই স্বাধীনতা মিথ্যা। তাঁদের বক্তব্য— এ কেবল রাজনৈতিক স্বাধীনতা, দেশের গরিব নিপীড়িত মানুষ অর্থনৈতিকভাবে স্বাধীন না হলে সেটা স্বাধীনতাই নয়। কেবল স্লোগান তুললে তো রাজনীতি হয় না,যে কোনো পার্টিকেই তার বার্তা উদ্দিষ্ট মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার একাধিক পথ বের করতে হয়। আজকের রিলের যুগে যেমন, সে যুগেও তেমন গানের মাধ্যমে বার্তা দিলে অনেক সহজে অনেক বেশি মানুষের কাছে পৌঁছত। বিশেষ করে গান একেবারে লেখাপড়া না জানা মানুষের কাছেও বার্তা পৌঁছে দিতে পারে,যা অনেকসময় বক্তৃতা বা প্যামফ্লেট পারে না। তাই অবিভক্ত কমিউনিস্ট পার্টির সাংস্কৃতিক শাখা,ভারতীয় গণনাট্য সঙ্ঘের সদস্যরা ১৯৪৮ সালে গান বাঁধলেন—মাউন্টব্যাটেন মঙ্গলকাব্য। বাংলার প্রাচীন মঙ্গলকাব্যের প্রকরণ মেনে তাতে ভারতের স্বাধীনতাকে তুলে ধরা হল স্রেফ ক্ষমতা হস্তান্তর হিসাবে। “মাউন্টব্যাটন সাহেব ও/তোমার সাধের ব্যাটন/কার হাতে থুইয়া গেলায়ো।” সেই গানে মাউন্টব্যাটেনের স্থলাভিষিক্ত গভর্নর জেনারেল চক্রবর্তী রাজাগোপালাচারী নয়, প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু এবং বল্লভভাই প্যাটেল, মৌলানা আবুল কালাম আজাদের মত মন্ত্রিসভার অন্য সদস্যদের নিয়েও একেবারে নাম করে প্রচণ্ড ব্যঙ্গ করা হয়। সে গান নিষিদ্ধ করেনি ভারত সরকার বা পশ্চিমবঙ্গ সরকার। সেই গান যাতে ছড়াতে না পারে তার ব্যবস্থা করেছিল বলেও জানা যায় না। কমিউনিস্ট পার্টি ওই ১৯৪৮ সালেই নিষিদ্ধ হয়েছিল, কিন্তু সেটা ওই গানের জন্যে নয়।

বছর চল্লিশেক এগিয়ে আসা যাক। ১৯৮৯ লোকসভা নির্বাচনের আগে বিদায়ী প্রধানমন্ত্রী সম্পর্কে বিরোধীরা স্লোগান তোলেন “গলি গলি মে শোর হ্যায়/রাজীব গান্ধী চোর হ্যায়।” কারণ তার কিছুদিন আগেই অভিযোগ উঠেছে— ভারতীয় সেনাবাহিনীর জন্য সুইডেনের অস্ত্র নির্মাণ কোম্পানি বোফর্সের কাছ থেকে অস্ত্র কেনায় প্রায় ১,৪০০ কোটি টাকার দুর্নীতি হয়েছে এবং স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী ঘুষ খেয়েছেন। গোটা নির্বাচন পর্ব এই স্লোগান চলে,আমরা দেখতাম দেয়াল জুড়ে এই স্লোগান লেখা হচ্ছে পাড়ায় পাড়ায়। রাজীব তথা কংগ্রেস আগাগোড়া এই অভিযোগ অস্বীকার করে, কিন্তু নির্বাচনে কংগ্রেস জনসমর্থন হারায়। একদা রাজীবের মন্ত্রিসভার সদস্য বিশ্বনাথ প্রতাপ সিং প্রধানমন্ত্রী হন। কিন্তু একবারের জন্যও রাজীব নিজে বা কংগ্রেস বলেনি যে প্রধানমন্ত্রী চেয়ারটা সাংবিধানিক, তাঁকে চোর বলা মারাত্মক পাপ। অথবা যারা তাঁকে চোর বলছে তারা দেশদ্রোহী, বা তাদের পাকিস্তানে চলে যাওয়া উচিত। ফলে আজ আরও প্রায় ৪০ বছর পরে যখন প্রধানমন্ত্রীকে ঠাট্টার পাত্র বানিয়ে ফেলার জন্যে ছাত্রছাত্রীদের গ্রেফতার করা হচ্ছে; ১৫ বছরের মেয়ের বাড়িতে ঢুকে পড়ে তাকে এবং তার মাকে এমন ভয় দেখানো হচ্ছে যে তাঁরা বাড়ি ছেড়ে দিতে বাধ্য হচ্ছেন; যারা প্রধানমন্ত্রীকে হাসি ঠাট্টা, কার্টুনের বিষয়বস্তু বানিয়ে ফেলেছেন তাঁদের বিরুদ্ধে এফআইআর হচ্ছে এবং উন্মত্ত জনতা তাঁদের বাড়ি পৌঁছে যাচ্ছে, তখন সত্যিই প্রশ্ন করতে ইচ্ছে হয় “ইয়ে আজাদী সচ হ্যায় ইয়া ঝুঠা হ্যায়?”এই স্বাধীনতা সত্য না মিথ্যা?

যে দেশে প্রকাশ্যে কিছু বলতে গেলে বা লিখতে গেলে শতবার ভাবতে হয়— বাড়িতে পুলিশ অথবা গুন্ডাবাহিনী আসবে কিনা, সে দেশে বাকস্বাধীনতা যে ঘোর বিপদে তা নিয়ে সন্দেহের অবকাশ নেই। তবু যে আমাদের ৮০তম স্বাধীনতা দিবসে দাঁড়িয়ে নিজেদের শেষ বিচারে স্বাধীন দেশের নাগরিক বলেই মনে হচ্ছে, তার কৃতিত্ব কিন্তু সরকার বা আদালতের নয়। কৃতিত্ব দেশের নাগরিকদের। যাবতীয় হুমকি,পুলিশের পেরেক বসানো লাঠি, এ কে ৪৭, জলকামান,কাঁদানে গ্যাস,বুলডোজার সহ্য ও অগ্রাহ্য করে এদেশের সবুজ, অবুঝ,কাঁচা নাগরিকরা দেখিয়ে দিয়েছেন— বাঁধন যত শক্ত হবে তত বাঁধন টুটিয়ে দেওয়ার সাহস তাঁদের আছে। নিজেদের মর্ত্যে আগত ভগবান মনে করা যে নেতাদের চিরাচরিত প্রতিবাদের ভাষা দিয়ে মাটিতে নামিয়ে আনা যাচ্ছিল না, তাঁদের দম ফাটানো হাসি দিয়ে ফুৎকারে উড়িয়ে দিয়েছেন নাগরিকরা। প্রধানমন্ত্রী নিজের ৫৬ ইঞ্চির ছাতি নিয়ে গর্ব করেছিলেন, এখন সেই ৫৬ ইঞ্চিকেই ব্যুমেরাং করে তাঁর দিকে ছুড়ে দিয়েছে তরুণ প্রজন্ম। কী করে বাঁচবেন তার আঘাত থেকে? ভাবতে গিয়ে রাতে না ঘুম হচ্ছে প্রধানমন্ত্রীর, না তাঁর কোটি কোটি টাকা মাইনের জনসংযোগের দায়িত্বে থাকা মানুষজনের। এক্স আর মেটাকে বলে সব অপছন্দের ভিডিও মোছানোর ব্যবস্থা করছে সরকার। নরেন্দ্র মোদী সরকারের এক মন্ত্রী নীতিন গড়করি তো সোজা আদালতে চলে গেছেন তাঁর সম্পর্কে পোস্ট মোছানোর জন্যে। কিন্তু কত মোছা হবে? যা ছড়িয়ে গেছে তা তো ছড়িয়েই গেছে,মানুষের মন থেকে মুছে দেওয়ার তো কোনো উপায় নেই। তার উপর সোশাল মিডিয়া এমন এক গ্যাঁড়াকল যে যত পোস্ট মোছা হয়, তত নতুন পোস্ট এসে পড়ে। এই যৌবন জলতরঙ্গ রুধিবে কে? ক্ষমতাশালীর ভাবমূর্তি ধূলিসাৎ,প্রেস্টিজে গ্যামাক্সিন।

এখন দেশের প্রধান বিরোধী দল কংগ্রেসও সংসদ চত্বরেই প্রধানমন্ত্রীকে বাঁদর বলছে,তাঁর যাকে তাকে জড়িয়ে ধরার অভ্যাস নিয়ে ঠাট্টা করছেন লোকসভার বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধী।

এমন নয় যে কংগ্রেস যতদিন সরকারে ছিল ততদিন ভারত বাকস্বাধীনতার স্বর্গ ছিল আর বিজেপি ক্ষমতায় আসতেই নরক হয়ে গেছে। রাহুলের ঠাকুমা ইন্দিরার আমলেই ভারতে জরুরি অবস্থা ঘোষিত হয়। তখন খবরের কাগজের অফিসে সরকারি অফিসার এসে বসে থাকতেন কোথায় কী ছাপা হচ্ছে না হচ্ছে দেখতে। বাবু দেখে মাথা দোলাবেন, তবে ছাপা হবে। তার প্রতিবাদে সেইসময় কোনো কাগজ সম্পাদকীয় স্তম্ভ খালি রেখেছিল, কেউ বা কাটা চিহ্ন ছেপে দিয়েছিল। অবাধ্য সাংবাদিকদের ব্যাপক গ্রেফতারি তো ছিলই,অবাধ্য হওয়ায় কিশোরকুমারের গান বাজানো বন্ধ করে দিয়েছিল অল ইন্ডিয়া রেডিও। এমনকী ইন্দিরার সঙ্গে নায়িকার চরিত্রের মিল আছে— এই অলিখিত অভিযোগে নিষিদ্ধ করে দেওয়া হয়েছিল সুচিত্রা সেন ও সঞ্জীবকুমার অভিনীত, গুলজারের ছবি আন্ধী। খোদ পশ্চিমবঙ্গে প্রয়াত সুব্রত মুখোপাধ্যায়ের উদ্যোগে রবীন্দ্রনাথের ‘চিত্ত যেথা ভয়শূন্য’ নিষিদ্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। মৃত্যুর আগে পর্যন্তও তা নিয়ে তাঁর কোনো আক্ষেপ ছিল না।

বাকস্বাধীনতায় সরকারি হস্তক্ষেপের আরও অজস্র দৃষ্টান্ত আছে স্বাধীন ভারতে। রাজীবের প্রধানমন্ত্রিত্বেই সলমন রুশদির স্যাটানিক ভার্সেস নিষিদ্ধ করে দেওয়া হয়েছিল মুসলমান মৌলবাদীদের চাপে। পশ্চিমবঙ্গে বামফ্রন্ট আমলে তসলিমা নাসরিনের দ্বিখণ্ডিত নিষিদ্ধ করার ইতিহাস আছে,মৌলবাদীদের সামান্য গণ্ডগোলের ভয়ে তসলিমাকে কলকাতা থেকে বিদেয় করে দেওয়ার ইতিহাসও আছে। একবার তো কলকাতা ফিল্মোৎসবে আসা একখানা ছবিতে (টরাস) লেনিনকে যেভাবে দেখানো হয়েছে তা রাজ্য সরকারের পছন্দ হয়নি বলে চলতে দেওয়া হয়নি— এমন অভিযোগও উঠেছিল। ফলে শিল্প,সাহিত্যের বাকস্বাধীনতা রক্ষায় ভারতের কোনো রাজনৈতিক শক্তির ভূমিকাই ধারাবাহিকভাবে ভালো নয়। কিন্তু গত এক যুগে মোদী সরকারের আমলে বা ডবল ইঞ্জিন সরকারগুলোর শাসনে যা হয়েছে তার মধ্যে বিলক্ষণ নতুনত্ব আছে।

এর আগে বিভিন্ন মতকে বিভিন্ন সময়ে দমন করার চেষ্টা হয়েছে; কিন্তু সিনেমা, সাহিত্য, নাটক, শিল্পকলা, এমনকী ইতিহাস রচনাতেও একটাই বয়ান সর্বত্র সবার উপরে চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা হয়নি। উপরন্তু, ইন্দিরার ঘোষিত জরুরি অবস্থার বছর দুয়েক (১৯৭৫-৭৭) বাদ দিলে, যাবতীয় সংবাদমাধ্যমের গলা টিপে ধরে তাকে দিয়ে সরকারি বয়ান বলিয়ে নেওয়ার চেষ্টা হিমাচল থেকে কন্যাকুমারী পর্যন্ত বিরল। মোদী সরকারের আমলে কিন্তু সব মিডিয়ার এক রা,জরুরি অবস্থার ঘোষণা ছাড়াই। যে কারণে গোদি মিডিয়া কথাটার উদ্ভব হয়েছে। ভারত জুড়ে এত সাংবাদিকের গ্রেফতার ও হত্যার খতিয়ানও কোনো রাজ্যে পাওয়া যাবে না। স্বভাবতই আন্তর্জাতিক প্রেস ফ্রিডম ইনডেক্সে আমাদের দেশের অবস্থা দেখে বাস কন্ডাক্টরদের মত বলতে হয় “পেছন দিকে এগিয়ে যান।”

আরও পড়ুন কুণাল, যাঁর কৌতুক আজ কামড়ায়

তবে মানুষ এত অদ্ভুত জীব, ভারত এমন আশ্চর্য দেশ যে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেললেও কোথাও কোনো বিদ্রোহ মাথাচাড়া দেবে না— এমনটা বেশিদিন হয় না। যেমন রাজনীতিতে হয় না, তেমনি বাকস্বাধীনতার ক্ষেত্রেও হয় না। এখন যে ঠাট্টার স্রোতে স্বয়ং মোদী টালমাটাল এবং রাহুল যাকে রাজনীতির ভাষা করে তুলছেন,সেটা কিন্তু শুরু করেছিলেন ঋজু বিদূষকরা। সাম্প্রতিক জেন জি আন্দোলনের এক ভাইরাল ভিডিওতে দেখা গেছে,পাটনার আন্দোলনে এক যুবক উপস্থিত পুলিশকর্মীকে জিজ্ঞেস করছেন “কাঁদানে গ্যাস, জলকামানের ব্যবস্থা করেছেন?” উত্তরে তিনি না বলায় বলছেন “এ কে ৪৭?” তাতেও না বলায়, যেন ভারি হতাশ হয়ে বলছেন “কিছুরই ব্যবস্থা করেননি?” ক্ষমতাকে এইভাবে খেলো করে দেওয়ার পথ কিন্তু দেখিয়েছেন ঋজু বিদূষকরা। কুণাল কামরার ২০১৯ সালের এক ভিডিওতে দেখা যায়,তিনি বলছেন— প্রত্যেকবার রামনবমীতে নেতারা তলোয়ার হাতে এসে বলেন, মন্দির ইয়হি বনায়েঙ্গে। তলোয়ার দেখেই মুড খারাপ হয়ে যায়। এত ট্যাক্স দিই, তাও এই ব্যাকডেটেড ওয়েপন! রকেট লঞ্চার-টঞ্চার আনুন, যাতে পাবলিকেরও আস্থা থাকে যে নেতা ঠিকঠাক এগোচ্ছেন। প্রায় এই ভাষাই উঠে এসেছে পাটনার ওই যুবকের মুখে।

এই হাস্যরস যে বিরোধী রাজনীতিবিদদের সমান বিপজ্জনক তা বুঝতে পেরে এই বিদূষকদের উপর বহুদিন ধরেই খড়্গহস্ত ডবল ইঞ্জিন সরকারগুলো। কুণাল, মুনাওয়ার ফারুকি সমেত অনেকের বিরুদ্ধে বারবার মামলা মোকদ্দমা হয়েছে; উন্মত্ত জনতার আক্রমণ হয়েছে; তাঁদের শো করার অপরাধে হল ভেঙে দেওয়া হয়েছে। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মুনাওয়ারকে তো কারাবাস পর্যন্ত করতে হয়েছে। এমনকী এসব নিয়েও ঠাট্টা করেছেন বরুণ গ্রোভার,যাঁকে কুণালরা ওঁদের গুরু বলে মানেন। বরুণ তাঁর ‘নাথিং মেকস সেন্স’ শীর্ষক শোয়ের শুরুতেই বলেন— এমন হতে পারে যে কিছুদিন পরে আপনাদের পুলিশ স্টেশন থেকে ডাক এল। ভয় পাবেন না,শুধু তিনটে প্রশ্নের উত্তর মনে রাখবেন। প্রথমত, শো কোথায় দেখেছেন? বলবেন,অ্যান্টিলায়। দ্বিতীয়ত,কমেডিয়ান কে ছিল?বলবেন,সময় রায়না। তৃতীয়ত,জোক কাকে নিয়ে ছিল?বলবেন,রাহুল গান্ধী।

তাহলে ভারতে এখন বাকস্বাধীনতার অবস্থা কি ভালো, না খারাপ? উত্তরটাও বরুণের কথাতেই দেওয়া যাক।

“ভারতে এখন কমেডি করা খুব শক্ত কাজ, কারণ কমেডির সরাসরি প্রতিযোগিতা বাস্তবের সঙ্গে।”

সত্যি কথা। নইলে সরকার বদলের পর অ্যাকাডেমি অফ ফাইন আর্টসের টিকিট কাউন্টারের রং গেরুয়া করে দিল কর্তৃপক্ষ, আজ এক দল শিল্পী গিয়ে সাদা করে দিলেন, আবার কাল আরেক দল শিল্পী এসে গেরুয়া রং করলেন লাল রং নিয়ে আপত্তি জানিয়ে— এ কি সম্ভব?

a2onuswor.com ওয়েবসাইটে প্রকাশিত

তসলিমার জয়ধ্বনি: রাজনীতি ভুলে সংস্কৃতি চর্চা স্থগিত রাখলে হয় না?

ভয় পেলে চুপ করে থাকা যায়। ক্ষমতার পক্ষ নিয়ে, সংখ্যাগুরুর পক্ষ নিয়ে ইনিয়েবিনিয়ে বা সোচ্চারে বলাবলি, লেখালিখি করার দরকার হয় না। তাদের মঞ্চে যাওয়ারও দরকার হয় না। সে কাজ যাঁরা করছেন এবং করাকে যাঁরা সমর্থন করছেন, তাঁরা ওটা না করলে মোটেই খাওয়া-পরা বন্ধ হবে না। খুব বেশি হলে যা হবে তা হল, পুজোর ছুটিতে প্যারিস বা মায়ামি বেড়াতে যাওয়ার সঙ্গতি থাকবে না, মন্দারমণি দিয়ে কাজ সারতে হবে।

কারও কাছে কিছু দাবি করা চলবে না। নেতাদের কাছ থেকে তাদের কাজের কৈফিয়ত দাবি করা চলবে না। ফুটবলারদের কাছ থেকে অন্য ফুটবলারদের অপমানে প্রতিবাদ দাবি করা চলবে না। দেশের যুবসমাজের উন্মাদনা এবং পকেটের পয়সায় যারা কোটিপতি, সেই খেলোয়াড় বা অভিনেতাদের কাছ থেকে ওই যুবসমাজের উপর দমনপীড়ন নেমে এলে তার বিরোধিতা দাবি করা চলবে না। সংবাদমাধ্যমের কাছে সত্যনিষ্ঠা দাবি করা চলবে না। এমনকী সাহিত্যিকরা বিবেকবান হবেন, যিনি ধর্মীয় মৌলবাদের ও সংখ্যাগুরুবাদের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার কারণে দেশছাড়া, তিনি অন্য দেশের মৌলবাদ ও সংখ্যাগুরুবাদের সঙ্গে আপস করবেন না— এ দাবিও করা চলবে না। এমনটাই আমাদের সময়ের দাবি।

কারণ? সকলেরই নাকি রুটিরুজির প্রশ্ন আছে, অস্তিত্বের প্রশ্ন আছে। যেন ইতিহাসের একমাত্র এই কালখণ্ডেই সত্যি কথা বলতে হলে, প্রতিবাদ করতে হলে মানুষকে নিজের রোজগার, নিজের অস্তিত্বের ঝুঁকি নিতে হচ্ছে। যেন অতীতে সর্বদেশে সর্বকালে প্রতিবাদ করা ভারি আরামের কাজ ছিল। দমনপীড়নে বিশ্বাসী সরকার বা মৌলবাদীরা প্রতিবাদীদের চাকরি দিত, চাকুরে হলে মাইনে বাড়িয়ে দিত, বোনাস দিত, মাঝেমধ্যে পুরস্কারও দিত। একে-৪৭ হাতে নিয়ে ভিন্ন মতের মানুষের বাড়ির বাইরে নিজেরাই পাহারা দিত, বলত “আমি আপনার বিরোধী হতে পারি, কিন্তু আপনার কথা বলার অধিকার আমি নিজের জীবন দিয়েও রক্ষা করব।”

মজা হল, রুটিরুজির যুক্তি যাঁরা দিচ্ছেন তাঁরা কেউ ‘দিন আনি দিন খাই’ শ্রেণির মানুষ নন। সরকারি দমন বা সংখ্যাগুরুবাদী গুন্ডাদের হাতে মারধর, হয়রানির ভয় সকলের আছে (এই লেখকেরও আছে)। নাট্যকর্মী থেকে শুরু করে ১৫ বছরের বাচ্চা মেয়েকে পর্যন্ত যেভাবে সদলবলে আক্রমণ করা হচ্ছে, তাতে ভয় পেলে কাউকে দোষ দেওয়াও যায় না। কিন্তু ভয় পেলে চুপ করে থাকা যায়। ক্ষমতার পক্ষ নিয়ে, সংখ্যাগুরুর পক্ষ নিয়ে ইনিয়েবিনিয়ে বা সোচ্চারে বলাবলি, লেখালিখি করার দরকার হয় না। তাদের মঞ্চে যাওয়ারও দরকার হয় না। সে কাজ যাঁরা করছেন এবং করাকে যাঁরা সমর্থন করছেন, তাঁরা ওটা না করলে মোটেই খাওয়া-পরা বন্ধ হবে না। খুব বেশি হলে যা হবে তা হল, পুজোর ছুটিতে প্যারিস বা মায়ামি বেড়াতে যাওয়ার সঙ্গতি থাকবে না, মন্দারমণি দিয়ে কাজ সারতে হবে। পশ্চিমবঙ্গের বাঙালি লেখকদের রবীন্দ্র পুরস্কার, বঙ্কিম পুরস্কার, বাংলা আকাদেমি পুরস্কার, সাহিত্য আকাদেমি পুরস্কারের দরজা বন্ধ হয়ে যাবে। তেতো সত্য হল— ভোগবাদ আর ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদে আমরা এমন গলা পর্যন্ত ডুবে গেছি যে ওসব ছাড়াও যে বাঁচা যায় তা আমাদের পাড়ার ছাপোষা গোঁসাই থেকে শুরু করে নামকরা কবি গোঁসাই পর্যন্ত কেউ কল্পনাও করতে পারে না। কিন্তু সকলের বাড়িতেই আয়না আছে। যিনি যত বিখ্যাত, তাঁর আয়না তত বড়। তার সামনে দাঁড়ালে নিজের এই চেহারা দেখে আমাদের সকলেরই লজ্জা করে। সেই লজ্জা ঢাকতে পাতার পোশাক হল “রুটিরুজি”। এ রাজ্যের বাংলা ভাষার লেখকরা ভালো করেই জানেন (এখন সোশাল মিডিয়ার দৌলতে অনেক পাঠকও জেনে ফেলেছেন) যে বাংলায় সাহিত্য রচনা করে রুটিরুজির ব্যবস্থা হয় না। লেখকদের প্রায় সকলেরই অন্য পেশা আছে, যাঁদের নেই তাঁরা অন্য পেশার খোঁজে আছেন। শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের পসার বিখ্যাত, তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় বইয়ের রয়্যালটি দিয়ে গাড়ি কিনেছিলেন শোনা যায়। গজেন্দ্রকুমার মিত্র আরেকজনের সঙ্গে মিলে আস্ত প্রকাশনা সংস্থা খুলে ফেলেছিলেন। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, বুদ্ধদেব গুহ, শংকরও বহুবিক্রীত ছিলেন। কিন্তু সেসব দিন চলে গেছে। আজকের সবচেয়ে জনপ্রিয় লেখকের বইও পাঁচশো বা হাজার কপি বিক্রি হয় বলে তাঁদের প্রকাশকদের দাবি করতে দেখা যায় না। সেই কারণে কি পুরস্কারই কি রুটিরুজি হয়ে দাঁড়িয়েছে? যাঁদের ব্যাপারটা তাই, তাঁরা মনের সুখে তসলিমা থেকে সন্তোষী মা— যাকে খুশি বন্দনা করুন, আপত্তি নেই। যাঁদের তেমন স্বার্থ নেই, তাঁরাও নিজ নিজ প্রিয় সাহিত্যিকের পাশে দাঁড়ানোর জন্যে যদি এমন করতে চান তো করুন। কিন্তু একে বাকস্বাধীনতার পক্ষে দাঁড়ানো বলে তত্ত্বায়ন করা চলছে। তাই কিছু কথা না বলে থাকা যাচ্ছে না।

বাংলার কালচার্ড বাবু-বিবি আজও যাঁকে নিয়ে “আহা! সত্যিকারের ভদ্রলোক ছিলেন” বলে হাহুতাশ করে, সেই বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য নিজের দলের তথা ভারতবর্ষের বামপন্থী আন্দোলনের যে দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি করেছিলেন মুখ্যমন্ত্রী থাকার সময়ে, তা সিপিএমের কর্মী-সমর্থকরা কেউ কেউ আজকাল জনান্তিকে স্বীকার করেন। পার্টি স্বীকার করে না, হয়তো কোনওদিন করবেও না। তাতে অবশ্য ইতিহাস বদলাবে না। বুদ্ধদেব সরকারের যেসব ভুলভাল সিদ্ধান্ত নরেন্দ্র মোদি, শুভেন্দু অধিকারীদের অক্সিজেন জুগিয়েছে তার অন্যতম হল কলকাতা থেকে তসলিমা নাসরিনকে বিদায় নিতে বাধ্য করা। হাতে ২৩৫ জন বিধায়ক আর তিরিশের বেশি সাংসদ থাকা সত্ত্বেও, দিন দুয়েকের কলকাতাকেন্দ্রিক অশান্তিতে যদি কোনও সরকারের মনে হয়ে থাকে যে একজন সাহিত্যিককে নিরাপত্তা দিতে তারা অপারগ এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সামলে উঠতে পারবে না, তাহলে সেই সরকার অযোগ্য। জ্যোতি বসুর আমলে ভারতজুড়ে শিখ গণহত্যার সময়ে এ রাজ্যে কেউ ট্যাঁ ফোঁ করতে পারেনি, বাবরি মসজিদ ভাঙা-পরবর্তী দাঙ্গাও পশ্চিমবঙ্গে লাগামছাড়া হতে পারেনি। সেখানে বুদ্ধবাবুরা একজন সাহিত্যিকের বিরুদ্ধে কিছু সংগঠিত অশান্তিতে ঘাবড়ে গেলেন এবং তাঁকে রাজ্যছাড়া করলেন। ফলে হিন্দুত্ববাদীরা দ্বিবিধ সুবিধা পেয়ে গেল। প্রথমত, পশ্চিমবঙ্গের গোটা মুসলমান সমাজ ভীষণ অসহিষ্ণু— এ-কথা প্রচার করার পরিসর তৈরি হয়ে গেল। দ্বিতীয়ত, বামপন্থীরা সংখ্যালঘু তোষণ করে, মুসলমান মৌলবাদীদের প্রশ্রয় দেয়— এ-কথা বলার জন্যেও চিরকালীন দৃষ্টান্ত হাতে এসে গেল। তসলিমা যে স্বমহিমায় তার আগে বহুবছর কলকাতায় ছিলেন, সেই সত্য সম্পূর্ণ অর্থহীন হয়ে গেল। আজ দেখা যাচ্ছে অনেকের সে-কথা মনেই নেই। না থাকা দোষেরও নয়। এক বালতি দুধে এক ফোঁটা চোনা ফেলে দেওয়ার পর কাটা দুধ আগে ভালো ছিল বলে বিক্রি করতে গেলে কেউ কিনবে না। যে সময়ে দিল্লি, মুম্বইতে শিবসেনার হুমকিতে ভারত-পাকিস্তান টেস্ট ম্যাচ হতে পারত না সেইসময় এই কলকাতাতেই যে ম্যাচ হয়েছে, বা এই বামফ্রন্ট সরকারই যে কাশীতে শুটিং করতে না পারা চলচ্চিত্র পরিচালক দীপা মেহতাকে কলকাতায় শুটিং করলে নিরাপত্তার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল— সেই সত্য তসলিমার বিতাড়নে নতুন অর্থ পরিগ্রহ করে। হিন্দুত্ববাদীদের পক্ষে বলা সহজ হয়ে যায় যে ওগুলো ধর্মনিরপেক্ষতার লক্ষণ নয়। কমিউনিস্টরা আসলে হিন্দুবিরোধী, তাই ওগুলো করেছিল। বাকস্বাধীনতার পক্ষে বলে করেনি।

এই পর্যন্ত মানতে অসুবিধা আজকের সাহিত্যিক, শিল্পী, বাকস্বাধীনতাপ্রেমী নাগরিকদের প্রায় কারও নেই দেখা যাচ্ছে। কিন্তু এসব বুঝেও কী করে যে তসলিমার এতদিন পরে কলকাতায় আগমনকে বাকস্বাধীনতার জয় বলে অভিনন্দিত করা যাচ্ছে তা বোঝা দায়। তাঁকে ফিরিয়ে এনেছে কারা এবং কী উদ্দেশ্যে, তা নিয়ে সংশয়ের অবকাশ কী করে থাকছে? যে-ই আনুক, যে উদ্দেশ্যেই আনুক— এটা আপাতদৃষ্টিতে ভারি উদার যুক্তি মনে হলেও, আসলে হাস্যকর। যাদের অধীনে থাকা সাহিত্য আকাদেমি এমএম কলবুর্গির মতো লেখকের হত্যার কোনও নিন্দা করেনি, যারা অপছন্দের কথা লেখার জন্যে (সিদ্দিক কাপ্পানের ক্ষেত্রে, স্রেফ লিখতে পারে ভেবেই) সারা দেশে বহু সাংবাদিককে গ্রেপ্তার করে কঠোরতম আইনে মামলা ঠুকে দিনের পর দিন কারাবন্দি করে রাখে, যারা তাদের অপছন্দের কথা সোশাল মিডিয়ায় পোস্ট করার জন্যে নিত্য লেখক, শিল্পীদের বিরুদ্ধে এফআইআর দায়ের করছে, এমনকি দলবদ্ধভাবে বাড়ি গিয়ে ভয়ও দেখাচ্ছে, তারাই আজ পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতায়। সেই দল তসলিমাকে কলকাতায় ফিরিয়ে নিয়ে এসেছে বাকস্বাধীনতায় বিশ্বাস করে বলে, রাজনৈতিক অ্যাজেন্ডার স্বার্থে নয়— এ-কথায় কেন বিশ্বাস করতে হবে? বা উদ্দেশ্য সেটা হলেও ব্যাপারটা ভালো— এ-কথারই বা মানে কী? তাহলে আগামীকাল তালিবানরা যদি অরুন্ধতী রায়কে কাবুলে ডেকে সংবর্ধনা দেয়, আমরা তালিবানদের প্রশংসা করব? বলব, উদ্দেশ্য যা-ই হোক, ব্যাপারটা ভালো?

তা-ই করব হয়তো, কারণ আমাদের সাহিত্যিক, শিল্পীরা তো সেরকমই। তাঁরা একেবারে আজকের জয় গোস্বামীর মতই, ক্ষমতাসীনের বিরুদ্ধে মুখ খোলেন সে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর। অন্তত ২০১১ সালের পর থেকে তাই। ২০১৫ সালে যখন সারা ভারতের শিল্পী, সাহিত্যিকরা কেন্দ্রীয় সরকারের কাছ থেকে পাওয়া পুরস্কার ফিরিয়ে দিচ্ছিলেন তথাকথিত গোরক্ষকদের হাতে গণপিটুনিতে হত্যা; কলবুর্গি, নরেন্দ্র দাভোলকরের মতো মানুষের হত্যা এবং তা নিয়ে সাহিত্য আকাদেমির মতো সংস্থাগুলোর নীরবতার প্রতিবাদে, তখন এই বাংলা থেকে কেবল মন্দাক্রান্তা সেন পুরস্কার ফিরিয়ে দিয়েছিলেন। আর জ্ঞানপীঠ পুরস্কার নিতে গিয়ে নিজের প্রতিবাদ জ্ঞাপন করেছিলেন প্রয়াত শঙ্খ ঘোষ। আজ তসলিমার নামে জয়ধ্বনি করা, আনন্দবাজারের প্রথম পাতায় তাঁর গুণগান করা জয় গোস্বামীই বা কোথায় ছিলেন আর বাকিরাই বা কটা মিটিং, মিছিল করেছিলেন? আচ্ছা, জাতীয় স্তরের ব্যাপারস্যাপার থাক। তসলিমাকে ফেরানোর দাবিতেই বা কটা মিটিং, মিছিল হয়েছিল তৃণমূল কংগ্রেস সরকারের আমলে? জয়-সহ কত গুণীজনই তো মমতা ব্যানার্জির ঘনিষ্ঠ ছিলেন, তখন উদ্যোগ নেননি কেন? আজ জয় বলছেন, আরও অনেকেই বলছেন, তাঁরা নাকি চুপ করে থাকতে বাধ্য হয়েছিলেন হুমকি সংস্কৃতির কারণে। তাহলে সোজা মেনে নিলেই তো হয়— আমরা ভীতু, তাই মুখ খুলতে পারব না। আবার তত্ত্বায়নের দরকার কী? কালের নিয়মে যখন বিজেপি সরকার চলে যাবে, তখন আবার বাকস্বাধীনতার ধ্বজাধারী শিল্পী, সাহিত্যিক, সাহিত্যপ্রেমীরা বলবেন না তো “আমাদের দিয়ে জোর করে তসলিমা বন্দনা করানো হয়েছিল?”

তসলিমা কলকাতায় আসার পর থেকে অভ্যর্থনা আর শেষ হচ্ছে না। সম্ভবত রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নোবেল পুরস্কার নিয়ে দেশে ফেরার পরে বা স্বামী বিবেকানন্দ শিকাগো বক্তৃতা দিয়ে ফেরার পরেও এই শহরে এরকম লাগাতার অভ্যর্থনার ব্যবস্থা হয়নি। জয়কে দুয়ো দিয়ে যারা মঞ্চ থেকে নামিয়ে দিয়েছে তারা যদি ভেবে থাকে বিরাট কাজ করেছে, তাহলে তারা নেহাতই বোকা। পরদিন পড়তে হয় নইলে পিছিয়ে পড়তে হয় যে কাগজ, তার প্রথম পাতার তসলিমামুখী কলামটা কিন্তু জয়ই লিখেছেন। একদা যে শহরে ছিলেন সে শহরে ফিরে এসেছেন বলে নামকরা পত্রিকার প্রচ্ছদকাহিনি হয়েছে কোনও কবির কবিতা— এমনটাই বা আমাদের অকাব্যিক যুগে কতবার কোন শহরে ঘটেছে? তসলিমার বেলায় কলকাতায় ঘটল। কলকাতার সংবাদমাধ্যমগুলোর অন্যতম খবর হয়ে গেছেন তসলিমা। তিনি স্রেফ কলকাতায় পা রাখতেই ধন্য হল ধন্য হল আমাদের বাঙালি জীবন। সমস্তটাই বাংলার মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত ভালোবাসা, সংবাদমাধ্যমের স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিক্রিয়া— এই যদি বিশ্বাস করতে হয়, তাহলে মা দুর্গা সত্যি, মহিষাসুর সত্যি, ক্যাপ্টেন স্পার্ক সত্যি।

আরও পড়ুন মঈন সম্পর্কে কুৎসিত বিদ্রূপে সন্দেহ জাগে, তসলিমা কি হিন্দুত্বের ট্রোজান ঘোড়া? 

এবার কেউ চোখ রাঙিয়েই বলতেই পারেন “তবে রে, এসব সত্যি না হলে সত্যিটা কী?” সবিনয়ে বলব, আজ্ঞে সত্যিটা হল তসলিমা এই বাংলায় একে একটি বিক্রয়যোগ্য ব্র্যান্ড, তার উপর ডবল ইঞ্জিন সরকার পশ্চিমবঙ্গকে যে ছাঁচে ঢালতে চায় তার পক্ষেও নিখুঁত। কারণ তিনি কেবল মুসলমান মৌলবাদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী চরিত্র নন। একবার টুইটারে ইংল্যান্ডের মুসলমান ক্রিকেটার মঈন আলি লম্বা দাড়ি রাখেন বলে তিনিও সন্ত্রাসবাদী হতে পারেন বলে রসিকতা করেছিলেন খাঁটি হিন্দুত্ববাদী কায়দায়। ইংল্যান্ডের খ্রিস্টান ক্রিকেটাররা দল বেঁধে প্রতিবাদ করায় বুঝতে পারেন বাড়াবাড়ি হয়ে গেছে। তখন টুইটটি মুছে দিয়ে দাবি করেন ওটা নাকি সারকাজম ছিল। বলা বাহুল্য, সে-কথা সত্যি হলে টুইট মুছে দেওয়ার দরকার ছিল না। যা-ই হোক, লম্বা দাড়ি মানেই মৌলবাদী, হিজাব বা বোরখা পরে মানেই মৌলবাদের শিকার— এগুলো আমার মতো পশ্চিমবঙ্গীয় ভদ্রলোকের খুব পছন্দের স্টিরিওটাইপ। অতএব তসলিমাকে দিয়ে সেইসব বয়ান বাঙালি সমাজে চারিয়ে দেওয়া সহজ হতে পারে, যেগুলো বাকি ভারত আস্তাকুঁড়ে ফেলে দিচ্ছে ক্রমশ। সাম্প্রতিক ‘জেন জি’ আন্দোলন তার প্রমাণ।

সুতরাং তসলিমার আগমন, জয়ের গমন— সবই রাজনৈতিক। আমরা যে খুবই কালচারাল জাতি তা দুনিয়াসুদ্ধ লোক জানে। নইলে বিপুল উৎসাহে ঠিক অন্য সংস্কৃতি দ্বারা আক্রান্ত হওয়ার যুগেই রামমোহন, বিদ্যাসাগর, রবীন্দ্রনাথের মতো আইকনদের ক্যানসেল কালচারে ফেলে দিই? তাই করতে করতে এখন এমন হাল হয়েছে যে নেতাজি সুভাষচন্দ্র পড়েছেন জুতোর তলায়, আর তসলিমা চড়েছেন মাথায়। রাজনীতির ঊর্ধ্বে উঠে সাংস্কৃতিক হওয়ার চেষ্টা অন্তত এবারটা না করলেই নয়?

চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম ওয়েবসাইটে প্রকাশিত

সঠিক সময়ে ইনিংসের সমাপ্তি ঘোষণা করলেন সোবার্স

যতই অমর বলি, পাঁচ বছর পরে সোবার্সকে ক’জন ক্রিকেটপ্রেমীর মনে থাকবে সন্দেহ আছে। শচীন, কোহলি, রুটদের ৩০-৪০ হাজার রানের পাশে সোবার্সের আর কী দাম? অলরাউন্ডার হিসেবে কপিলদেব, ইয়ান বোথাম, রিচার্ড হেডলি, ইমরান খান তো ছিলেনই; এখন জাদেজাও ৪০০০ রান আর সাড়ে তিনশো উইকেট নিয়ে ফেলেছেন। কপিলদের সময়ে কিন্তু সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত ছিল— অলরাউন্ডার হিসাবে সবার ওপরে স্যর গ্যারি। বাকি সবাই তাঁর নীচে। কারণ তখন ক্রিকেটার, দর্শক, সাংবাদিক বা ধারাভাষ্যকার— কেউ-ই খেলাটাকে এক্সেল শিট মনে করতেন না।

খেলাধুলোর ইতিহাস বলে আগামিদিনে কিছু থাকবে কি না জানি না, কারণ এখন ইতিহাসকে ‘নস্ট্যালজিয়া’ বলে দেগে দিয়ে বর্তমানের সবকিছুকেই সর্বকালের সেরা বলার যুগ। এ-যুগের সঙ্গে মানিয়ে নিতে আমার মতো চল্লিশোর্ধ্বদের বেশ অসুবিধে হয়। আমার বাড়াবাড়ি রকমের দুষ্টু বন্ধুদের পাড়ার জ্যাঠামশাই থেকে স্কুলের মাস্টারমশাই প্রকাশ্যে ‘হনুমান’ বলে অপমান করতেন। এখন সেই বন্ধুরা ভাবে ‘একবার যদি দিনগুলো ফিরে পাই, স্যরদের দেখে নেব।’ আমি অঙ্ক ভুল করে কানমলা খেয়ে ধমক শুনতাম ‘ছাগল’। এখন দেখছি, কাউকে ছাগল বলে না মানলে তাকে অপমান করা হয়। আমরা জানতাম A for apple, B for bat যেমন, তেমনই G for goat। এখন দেখি ছোটবেলায় শেখা ইংরেজি ব্যাকরণের নিয়ম লঙ্ঘন করে লিখতে হয় GOAT. কিন্তু সেকথার ছাগল ছাড়াও একটা গূঢ়তর, বৃহত্তর অর্থ আছে— সর্বকালের সেরা (Greatest of All Time)। তাই সকল ভক্তকুল নিজেদের পছন্দের খেলোয়াড়কেই ছাগল বলে প্রমাণ করতে ব্যস্ত।

অবশ্য ব্যাপারটা ভক্তকুলের মাথায় ঢুকিয়ে দিতে বহুজাতিক ব্যবসায়িক সংস্থা আর গণমাধ্যমের ভূমিকা অতুলনীয়। যে ফুটবলারকে দিয়ে বিজ্ঞাপন করালে সবচেয়ে বেশি জিনিস বিক্রি হয়, তাঁকে ছাগলের সঙ্গে বসিয়ে ফটোশুট, মাঠের মধ্যে তাঁর ছায়া হিসাবে একখানা ছাগলের ছায়া দেখিয়ে ছবি তৈরি— সুচারু ব্যবস্থা। ক্রিকেটের ক্ষেত্রে ব্যাপারটা আরও নিদারুণ। গোটের ছড়াছড়ি। সব ধরনের ক্রিকেট মিলিয়ে নাকি বিরাট কোহলি গোট, একদিনের ক্রিকেটে নাকি রোহিত শর্মা গোট, রবিচন্দ্রন অশ্বিন অবসর নেওয়ার সময়ে শুনলাম তিনিও গোট, ইদানীং শোনা যায় অলরাউন্ডার হিসাবে রবীন্দ্র জাদেজা গোট, এমনকী, মাঝেসাঝে খেলে এক-আধটা ম্যাচ জিতিয়ে দিলে কয়েক ঘণ্টার জন্যে হার্দিক পান্ডিয়াও গোট হয়ে যান। এর ওপর আছেন ‘ইউনিভার্স বস’ ক্রিস গেল এবং ‘গড’ শচীন তেন্ডুলকর। মানে ক্রিকেট মাঠে দিন-দিন মানুষই সংখ্যালঘু হয়ে যাচ্ছে। এমন দিনে কি তারে বলা যায় যে, গ্যারি সোবার্স বলে একজন রক্তমাংসের মানুষ ছিলেন, যিনি যখন আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে অবসর নেন তখন টেস্ট ক্রিকেটে এক ইনিংসে সর্বোচ্চ রানের রেকর্ড (৩৬৫) তাঁর দখলে, ওয়েস্ট ইন্ডিজের হয়ে মোট সর্বোচ্চ রানও তাঁর?

শুধু তাই নয়, ৯৩ খানা টেস্ট খেলে প্রায় ৫৮ গড় ধরে রাখার রেকর্ড আজও খুব বেশি ক্রিকেটারের নেই। এই ২০২৬ সালেও গড়ের দিক থেকে তিনি টেস্টের ইতিহাসে ১১ নম্বরে। কিন্তু ওপরের দশজনের চারজন ৩০ খানা টেস্টও খেলেননি। এদিকে অবসরের সময়ে সোবার্স ছিলেন ওয়েস্ট ইন্ডিজের হয়ে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ উইকেট শিকারী (লান্স গিবসের পরেই)। কী বল করতেন? আঙুলের কারিকুরিতে স্পিন, কবজির মোচড়ে স্পিন, সুইং, সিম— এককথায় যতরকম বোলিং সম্ভব। এখানেই শেষ নয়। স্লিপে আর ফরোয়ার্ড শর্ট লেগে তাঁর মতো ফিল্ডারও ক্রিকেটের ইতিহাসে খুব বেশি আসেনি।

পরিসংখ্যানের খাতিরে বলা যেতে পারে, তিনি টেস্টে ১০৯ খানা ক্যাচ নিয়েছিলেন, তার চেয়ে বেশি ক্যাচ সেইসময় একমাত্র কলিন কাউড্রে আর ওয়াল্টার হ্যামন্ডের ছিল। কিন্তু ওই পরিসংখ্যান আসল কথা নয়। অমন ফিল্ডার যে বিরল, সেকথা বলেছেন কারা? যাঁরা সোবার্সের খেলা দেখেছেন, তাঁরা, যাঁরা ওঁর সঙ্গে বা বিরুদ্ধে খেলেছেন, তাঁরাও। তিনি ওয়েস্ট ইন্ডিজের হয়ে খেলা ছেড়েছেন ১৯৭৪ সালে। স্বভাবতই তাঁর খেলার খুব বেশি ভিডিও সংরক্ষিত নেই। কিন্তু আমরা ভুলে যাই, ভিডিও আবিষ্কারের আগে, দিনরাত যাবতীয় খেলার সরাসরি সম্প্রচারের আগেও পৃথিবীর অস্তিত্ব ছিল। তখনও মানুষ প্রেম করত, সন্তানের জন্ম দিত, তাকে বুক দিয়ে লালন করত, ছবি আঁকত, কবিতা লিখত, গান গাইত এবং খেলাধুলো করত। কারণ এসব করতে ভাল লাগত। যারা দেখত, তারাও ভাল লাগত বলেই দেখত। আর যা দেখতে ভাল লাগে, তা মানুষ শতমুখে বলে এবং লিখে অন্যকে জানায়। তাই ব্র্যাডম্যান, সোবার্স, পেলে, রড লেভার, দিয়েগো মারাদোনাদের মহত্ত্বের লিখিত ইতিহাস আছে। তাঁদের কেউ গোট বলত না, কারণ কে সবার সেরা— তা নিয়ে কারও মাথাব্যথা ছিল না।

খেলার প্রাথমিক উদ্দেশ্য আনন্দ পাওয়া— যে খেলে তার পক্ষেও, যে দেখে তার পক্ষেও। তারপর আসে স্কোরবোর্ড, হার-জিতের হিসেব। তারও পরে আসত খেলাকে ঘিরে ব্যবসা। সেটা মন্দ নয়, কারণ খেলা যদি খেলোয়াড়দের পারিশ্রমিক দিতে পারে, তাহলে তাঁরা আরও মন দিয়ে খেলতে পারবেন। কিন্তু সোবার্স যে যুগের ক্রিকেটার, তখন ক্রিকেট নিয়ে ব্যবসা হত, ব্যবসার জন্যে ক্রিকেট হত না। ব্র্যাডম্যান, সোবার্সদের ব্র্যান্ড হয়ে ওঠার তাগিদ ছিল না। তাঁদের ব্র্যান্ড করে তোলার জন্যে পাকা মাথার লোকেরা দিবারাত্র লেগেও থাকত না। ফলে দর্শক, সাংবাদিক, সমালোচক— সকলের কাছেই মুহূর্তের মূল্য ছিল, সৌন্দর্যের দাম ছিল। অতি সফল অলরাউন্ডার সোবার্সের জন্য সবাই পাগল হত, কিন্তু জর্জ হেডলি বা রয় ফ্রেডরিক্সকেও কেউ ভুলত না। যে-দল হেরে গেল, সে-দলের ক্রিকেটারদের জন্যও জয়ী দলের সমর্থকদের ভালবাসা থাকত।

সে-যুগের লোক বলেই সোবার্স ওরকম ঝুঁকি নিতে পারতেন, যা নিয়েছিলেন ওয়েস্ট ইন্ডিজ অধিনায়ক হিসাবে ১৯৬৮ সালে পোর্ট অফ স্পেনে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে চতুর্থ টেস্টে। তিনি এমন এক সময়ে দ্বিতীয় ইনিংসের সমাপ্তি ঘোষণা করেন, যখন ইংল্যান্ডকে ঘণ্টাদুয়েক ব্যাট করতে হবে আর জিততে গেলে দরকার মাত্র ২১৫ রান। সোবার্সের ধারণা ছিল, ইংল্যান্ড ওইটুকু সময়ও টিকতে পারবে না, ওয়েস্ট ইন্ডিজ জিতে যাবে। কিন্তু কাউড্রের ইংল্যান্ড অনায়াসে সাত উইকেটে জেতে। কেন ওই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন? ‘দ্য গার্ডিয়ান ’ কাগজে সোবার্সকে নিয়ে লিখতে গিয়ে ভিক মার্কস জানিয়েছেন, সোবার্সের উত্তর ছিল, ‘সিরিজটা বড্ড বোরিং ছিল। প্রথম তিনটে টেস্ট ড্র হয়েছিল। ইংল্যান্ড ঘণ্টায় ১২-১৩ ওভার করে বল করছিল। আমি ভীষণ হতাশ হয়েছিলাম। আমি ক্রিকেট বলতে যা বুঝি, ওটা তা নয়।’ ব্রেন্ডন ম্যাককালাম আর বেন স্টোকসের টেস্ট ক্রিকেট নিয়ে পরীক্ষানিরীক্ষা যেভাবে দর্শকদের আশীর্বাদ পেলেও ক্রিকেটমহলে সমালোচিত হয়েছে, তাতে বোঝা যায়— পৃথিবী বদলে গেছে। এখানে জেতাটাই বড় কথা, কারণ জয়ই বিক্রয়যোগ্য। পরাজয় নয়। জয়ীই ব্র্যান্ড হয়। তাই সারাক্ষণ তর্ক লাগিয়ে রাখতে হবে— মেসি গোট, না রোনাল্ডো? বিরাট গোট, না জো রুট? কখনও বিশ্বকাপ না জেতা জোহান ক্রুয়েফ বা অতি সামান্য টেস্ট খেলতে সুযোগ পাওয়া ব্যারি রিচার্ডসকে সর্বকালের সেরাদের আলোচনায় আনা যাবে না। তাছাড়া কোনওমতেই যা করা যাবে না, তা হল অতীতের কেউ বর্তমানের কারও চেয়ে মহান খেলোয়াড় ছিলেন, তা বলা। কারণ ওটা বিপণনবিরোধী ব্যাপার। কোনও কোম্পানি কি তার এখনকার ঠান্ডা পানীয়ের বিজ্ঞাপনে বলতে পারে ‘এই যেটা বের করেছি এটা ভাল, তবে আগেরটা আরও ভাল ছিল?’ খেলাকে এবং সফল খেলোয়াড়কে বিক্রি করাই আজকের খেলার উদ্দেশ্য। তাঁদের ব্যবহার করে যত বেশি সম্ভব বিজ্ঞাপন দেখানোই উদ্দেশ্য। তাই আইপিএলে আছে ‘টাইম আউট’, ফুটবল বিশ্বকাপে ‘হাইড্রেশন ব্রেক।’ কুড়ি-বাইশ ডিগ্রি তাপমাত্রায় সন্ধে-রাতের খেলায় মিনিট কুড়ি অন্তরই নাকি খেলোয়াড়দের বিরতির দরকার হচ্ছে।

ব্যাপারটা সব খেলাতেই হচ্ছে, দুদ্দাড় করে সব রেকর্ড ভেঙে যাচ্ছে। কাল যে রেকর্ডকে মনে হত ধরাছোঁয়ার বাইরে, আজ সে রেকর্ড ধুলোয় লুটোচ্ছে। শচীনের একদিনের ক্রিকেটে শতরানের রেকর্ড বিরাট ভেঙে দিয়েছেন। সে-রেকর্ড হয়তো আর ভাঙবে না, কারণ খেলাটাই থাকবে না। কিন্তু কুড়ি ওভারের ক্রিকেটে রেকর্ড ভাঙাগড়ার খেলা চলছেই। আইপিএলে বৈভব সূর্যবংশী এক মরশুমেই সবথেকে বেশি ছয়, অভিষেক হওয়া খেলোয়াড় হিসেবে সবথেকে বেশি রান, সবচেয়ে কম বয়সে ৭০০-র বেশি রান আর এক মরশুমে সবচেয়ে বেশি পুরস্কার জেতার রেকর্ড ভেঙে দিয়েছেন। আর্লিং হাল্যান্ড যেভাবে এগোচ্ছেন, তাতে অনেকে মনে করছেন মেসির গোল করার যাবতীয় রেকর্ডও তিনি ভেঙে দিতে পারেন। খেলা যেহেতু আর প্রাথমিকভাবে আনন্দ পাওয়ার, সৌন্দর্যের রসাস্বাদন করার জিনিস নেই, তাই খেলোয়াড়দের মহত্ত্বের মাপকাঠি হয়ে গেছে পরিসংখ্যান। যাঁর পরিসংখ্যান দুর্দান্ত নয় বা পাওয়া যায় না, তাঁরা সর্বকালের সেরাদের আলোচনায় ঢুকতে পারেন না। তাই ক্রিকেটে গোটের আলোচনায় কখনও অ্যাডাম গিলক্রিস্ট বা অ্যালান নট আসেন না। ফুটবলের গোটের আলোচনায় লেভ ইয়াশিন বা গর্ডন ব্যাংকস, ববি মুর, ফ্রাঞ্জ বেকেনবাওয়ার বা ফ্র্যাংকো বারেসির নাম আসে না।

আরও পড়ুন বেদি আর ববিকে ভোলা বিবেকের কাছে অপরাধ

সুতরাং, যতই অমর বলি, পাঁচ বছর পরে সোবার্সকে ক’জন ক্রিকেটপ্রেমীর মনে থাকবে সন্দেহ আছে। শচীন, কোহলি, রুটদের ৩০-৪০ হাজার রানের পাশে সোবার্সের আর কী দাম? অলরাউন্ডার হিসেবে কপিলদেব, ইয়ান বোথাম, রিচার্ড হেডলি, ইমরান খান তো ছিলেনই; এখন জাদেজাও ৪০০০ রান আর সাড়ে তিনশো উইকেট নিয়ে ফেলেছেন। কপিলদের সময়ে কিন্তু সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত ছিল— অলরাউন্ডার হিসাবে সবার ওপরে স্যর গ্যারি। বাকি সবাই তাঁর নীচে। কারণ তখন ক্রিকেটার, দর্শক, সাংবাদিক বা ধারাভাষ্যকার— কেউ-ই খেলাটাকে এক্সেল শিট মনে করতেন না। আসলে বিপণনের লোকেদের এক্সেল শিটই দরকার। সব খেলাই এখন বিলিয়ন ডলারের ব্যবসা, তাই সব খেলাতেই ব্র্যান্ড নির্মাণ আর এক্সেল শিট তৈরি চলছে সচেতনভাবে। খেলার সৌন্দর্যকে (এবং মহান অনিশ্চয়তাকে) মারো গুলি। টেনিস নিয়ে এই কথা ক’দিন আগে বলেছেন স্বয়ং রজার ফেডেরার। এক পডকাস্টে তিনি বলেছেন, সমস্ত প্রতিযোগিতায় কোর্ট অল্পবিস্তর একইরকম করে দেওয়া হচ্ছে, বলও। যাতে শেষমেশ ফাইনালে পৌঁছন কার্লোস আলকারাজ আর ইয়ানিক সিনার। ঘাসের কোর্ট, হার্ড কোর্ট, ক্লে কোর্টে টেনিস খেলার আলাদা চ্যালেঞ্জ ক্রমশ মুছে যাচ্ছে। ব্যাপারটা বদলানো দরকার।

তাই বলতে হবে, সোবার্স এবারে সঠিক সময়ে ইনিংসের সমাপ্তি ঘোষণা করেছেন। আগামী ২৮ তারিখ নব্বইয়ে পা দেওয়ার কথা ছিল, নির্ঘাত অনেকেই সেদিন তাঁর শতায়ু কামনা করতেন। কিন্তু শততম জন্মদিনে কি আর কেউ স্মৃতিচারণ করত, বিশ্ব একাদশের হয়ে অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে ১৯৭১-’৭২ মরশুমে ডেনিস লিলিকে তছনছ করে দেওয়া ২৫৪ রানের কথা? ও জিনিসের মূল্য দিতে গেলে তো বুঝতে হবে, লিলি কেমন ছিলেন? আজকের প্রজন্ম তো পরিসংখ্যান দেখে বলবে— টেস্ট ক্রিকেটে সর্বোচ্চ উইকেট শিকারীদের তালিকায় লিলি অনেক নীচে। তাঁকে পেটানো আর এমন কী ব্যাপার? লিলির গতি বা সোবার্সের স্ট্রোকের শৌর্য ও সৌন্দর্য আলোচ্যই নয়।

‘ম্যায় ওয়াপস আউঙ্গা’ একটা না-হওয়া বাংলা ছবি

নির্বৈর পূর্বপুরুষের প্রেম সন্ধান করতে করতে পাপেরও হদিশ পেয়েছে। আমারও সেই দশা। খুলে বলি।

প্রিয় ইমতিয়াজ,

আপনার নতুন ছবি দেখতে যাওয়ার মূল কারণ ছিল প্রেম। প্রেমের গল্প পড়তে ভালো লাগে, প্রেমের সিনেমা দেখতে ভালো লাগে এবং রোম্যান্টিক সিনেমা বানানোয় আপনার দক্ষতা প্রশ্নাতীত। জব উই মেট তো আমার প্রজন্মের অনেকের কাছে একান্ত ব্যক্তিগত ছবি। সেই কারণে বলিউডের যুদ্ধের বাজারে আপনি প্রেমের ছবি বানিয়েছেন জেনেই দেখার ইচ্ছে হয়েছিল। যাদের রুচিকে ভরসা করি, তারা অনেকে দেখে এসে প্রশংসা করায় দেখার ইচ্ছে আরও বেড়েছিল। একটু-আধটু লিখি এবং লিখলে কেউ কেউ মন দিয়ে পড়ে, তাই ছবিটা দেখে লিখব বলেও ভেবে রেখেছিলাম। কিন্তু ম্যায় ওয়াপস আউঙ্গা দেখতে গিয়ে সব গোলমাল হয়ে গেল। মানে ভেবেছিলাম, যেভাবে আর পাঁচটা ছবি নিয়ে লিখে এসেছি এতদিন, সেভাবেই চুলচেরা বিচার করব। প্রবাদপ্রতিম নাসিরুদ্দীন শাহের অভিনয়, এ আর রহমানের সেই রোজা (১৯৯২) ছবির মত অপাপবিদ্ধ সঙ্গীত, তরুণ ও নয়নাভিরাম নায়ক-নায়িকা (বেদাঙ্গ রায়না ও শর্বরী ওয়াঘ) আর দিলজিৎ দোসাঞ্জের ‘দিল’ জিতে নেওয়া অভিনয়, প্লেব্যাক শিল্পীদের প্রতি (বিশেষত দীপালি সহায়ের প্রতি) আমার মুগ্ধতা, আপনার গল্প বলার চিরাচরিত মুনশিয়ানা ইত্যাদি নিয়ে লিখব। কিন্তু সেটা আর সম্ভব নয়, কারণ এ ছবি অত্যন্ত ব্যক্তিগত হয়ে দাঁড়িয়েছে। সুতরাং ব্যক্তিগত কথাগুলোই বলা যাক। বাংলা ভাষার সুবিধা হল, এ চিঠি আপনার কাছে পৌঁছবে না। অতএব আপনাকে বলার অছিলায়, যাদের কাছে পৌঁছবে তাদের সঙ্গে কিছু ব্যক্তিগত অভিমত ভাগ করে নেওয়া, তাদের ভাবনাকে উস্কে দেওয়াই আসল উদ্দেশ্য। কিন্তু প্রেম ঢেলে দেওয়ার জন্যে যেমন একজন পাত্র লাগে, তেমন মনের কথা খুলে বলতেও একজন পাত্র লাগে। তাই আপনাকে খাড়া করা।

ছবির ক্রেডিট রোল হওয়া শুরু হতেই ১৯৯০-৯১ সালের কথা মনে পড়ে গেল, বুঝলেন? তখন আমার বয়স ৮-৯ বছর। একদিন গভীর রাতে বাবা টিভি চালিয়েছেন সিনেমা দেখবেন বলে। আমিও সিনেমার আকর্ষণে জেগে রয়েছি (সদ্য দ্বিতীয়বার মা হওয়ায় আমার মা আমাকে বকে ঘুম পাড়ানোর অবস্থায় নেই, বাবা বরাবর প্রশ্রয়দাতা)। ছবিটা বাংলা, কিন্তু সিনেমার শুরুতে নাম দেখানোর সময়ে নারীকণ্ঠে ঝাঁ ঝাঁ করে এমন একখানা গান বেজে উঠল, যে ধরনটা আমার একেবারে অপরিচিত। তার কথাগুলো

আমের তলায় ঝামুর ঝুমুর
কলাতলায় বিয়া
আইলেন গো সুন্দরী জামাই
মুটুক মাথায় দিয়া।

সঙ্গে উলুর শব্দ ছিল, বাবাও বললেন— এটা বিয়ের গান, সাবেকি বাঙালি বিয়ের গান। ছবিটা পুরো দেখেছিলাম, কিন্তু বিশেষ বুঝতে পারিনি তখন। কিন্তু অবাক হয়েছিলাম, দুটো কারণে— ১) বাবা ছবিটা দেখতে দেখতে কাঁদলেন, ২) ছবিটায় কোনো বিয়ের দৃশ্য নেই। তাহলে শুরুতে বিয়ের গান কেন?

এই প্রশ্নের উত্তর পেতে আমাকে অপেক্ষা করতে হয়েছিল বারো বছর, আমাদের বাংলা মতে এক যুগ। আমি তখন কলেজের ছাত্র। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের আবশ্যিক বাংলার পাঠ্যবইতে ঋত্বিক কুমার ঘটকের একখানা প্রবন্ধ ছিল, যার শিরোনাম ‘আমার ছবি’। উনিই ছোটবেলায় প্রথম দেখা সেই ছবির পরিচালক। ওই লেখায় তিনি ব্যাখ্যা করেছেন যে শুরুতেই বিয়ের গান রেখেছিলেন, কারণ তাঁর অন্তরের অভিলাষ— আলাদা হয়ে যাওয়া দুই বাংলার মিলন হোক। বিয়ে মানেই তো মিলন। এই ছবিটা— কোমল গান্ধার (১৯৬১)— নির্ঘাত আপনার দেখা। নইলে আপনার ছবিতে বিভক্ত পাঞ্জাব প্রেমিক-প্রেমিকার (ঈশার আর আফসানা) না-হওয়া বিয়ের প্রতীক হয়ে দাঁড়ায় কেমন করে? যে মিলন হল না, তা নিয়েই তো আপনার আখ্যান। ঋত্বিক যে বাসনা বিমূর্ত রেখেছিলেন, তা-ই যেন আপনার ছবিতে মূর্ত হয়ে উঠেছে।

কাঁচা বয়সের বুক টনটন করা প্রেম, টিন্ডার/বাম্বল যুগের বাঁধন এড়াতে চাওয়া প্রেম, বুকের গভীরে সারাজীবন প্রদীপের মত জ্বালিয়ে রাখা প্রেম— সবই আপনি দেখিয়েছেন একেবারে জ্যান্ত করে। সে প্রত্যাশা আপনার কাছে ছিলই। কিন্তু আপনি যে ঘৃণা পেরিয়েও প্রেমের বেঁচে থাকার ক্ষমতা আছে বলে দেখাবেন, তা-ও আবার দেশভাগের সময়কার বীভৎস সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার অনুপুঙ্খ উল্লেখ সমেত— এতটা কল্পনা করিনি। আসলে পূর্বপুরুষের প্রেমের সন্ধানে বেরিয়ে পড়া নির্বৈর সিং গ্রেওয়ালের যুগে দাঁড়িয়ে, ঘৃণার পর্ব পেরিয়েও যে প্রেম টিকে থাকে— এই বিশ্বাস রাখা আমাদের পক্ষে ক্রমশ কঠিন হয়ে দাঁড়াচ্ছে। কে যেন বলেছিলেন, হলোকস্ট দেখার পরে আর কবিতা লেখা যায় না? গরুর জন্যে মানুষ হত্যা দেখার পরে, গাজা দেখার পরেও কি আর প্রেমে বিশ্বাস রাখা যায়? আপনি রেখেছেন, তাই ম্যায় ওয়াপস আউঙ্গা যে এক সিংহহৃদয় ছবি তা স্বীকার করতে কোনো দ্বিধা নেই। তবে সব ভালোলাগা পেরিয়েও বাঙালি হিসাবে আপনার ছবি আমার মধ্যে গভীর হতাশার জন্ম দিয়েছে। নির্বৈর পূর্বপুরুষের প্রেম সন্ধান করতে করতে পাপেরও হদিশ পেয়েছে। আমারও সেই দশা। খুলে বলি।

আপনি যে পাঞ্জাবি উদ্বাস্তু আর বাঙালি উদ্বাস্তুদের যন্ত্রণাকে একই নজরে দেখেন তার পর্যাপ্ত প্রমাণ এই ছবিতে রেখেছেন। একটা নিদারুণ গানে চার লাইন বাংলা রেখেছেন, স্টক শটে বাঙালি উদ্বাস্তুদের দেখিয়েছেন তো বটেই, এমনকি ট্রেনে সরগোধা ত্যাগ করে গ্রেওয়াল পরিবারের সীমান্তের এপারে চলে আসার সময়কার সাদাকালো শটগুলো দেখলে নিমাই ঘোষের ছিন্নমূল (১৯৫০) মনে পড়তে বাধ্য। আর এখানেই আমার হতাশা। দেশভাগের যে অলীক, হাস্যকর অথচ বীভৎস বাস্তবতা আপনি পর্দায় তুলে এনেছেন তা কোনো বাংলা ছবিতে আজ পর্যন্ত দেখা যায়নি। আবার দেশভাগ কীভাবে পাঞ্জাবি হিন্দু, শিখ ও মুসলমানের প্রেম, সখ্য, পারিবারিক আত্মীয়তা ভেঙে খানখান করে দিয়েছিল, তাও কোনো বাংলা ছবির পরিচালক আজ পর্যন্ত দেখিয়ে উঠতে পারলেন না। ঋত্বিক আর নিমাই ছাড়া আর কোনো পরিচালক তো দেশভাগকে বিষয় হিসাবে পাত্তাই দিলেন না। বরিশালের মানুষ ঋত্বিক আস্ত ট্রিলজি বানিয়েছেন, কিন্তু সেগুলোও দেশভাগোত্তর ট্রমা নিয়ে। দেশভাগ ব্যাপারটা কেমন ছিল, তার আগেকার পূর্ববঙ্গের জীবন কেমন ছিল— সেসব তাঁর ছবিতেও পাই না। আমাদের সিনেমার আরেক দিকপাল, মৃণাল সেন, ফরিদপুরের মানুষ। তাঁর ফিল্মোগ্রাফিতেও দেশভাগ অনুপস্থিত। সত্যজিৎ রায়কে তবু এই যুক্তিতে কিছুটা ছাড় দেওয়া যায় যে তাঁর পূর্ববঙ্গের সঙ্গে যোগ ঠাকুর্দা উপেন্দ্রকিশোরের আমলেই প্রায় শেষ হয়ে গিয়েছিল। সত্যজিতের জন্ম ও বেড়ে ওঠা কলকাতায়। পূর্ববঙ্গের জীবন বা উদ্বাস্তু জীবন তাঁর উপলব্ধির বাইরে। আর বাংলা জনপ্রিয় সিনেমা? কোনো বিদেশি সেই সিনেমার ইতিহাস ঘাঁটলে জানতেই পারবে না যে দেশভাগ, বাংলা ভাগ বলে এত বড় একটা ব্যাপার কোনোদিন ঘটেছিল। আশ্চর্য! এই কারণেই ম্যায় ওয়াপস আউঙ্গা দেখতে দেখতে আমার পূর্বপুরুষদের উপরে রাগ হচ্ছিল, এই ছবিটা বাংলায় হয়নি বলে।

আরও পড়ুন হোমবাউন্ড: ফিরব বললে ফেরা যায় নাকি?

অথচ না হওয়ার কোনো কারণ ছিল না। আপনার ছবিতে প্রাক-দেশভাগ পর্ব যে প্রোগ্রেসিভ রাইটার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভা থেকে শুরু হয়, সেই সংগঠনে বাঙালিদের অংশগ্রহণও উল্লেখযোগ্য ছিল। মুনশি প্রেমচন্দ আজ থেকে বিশ-তিরিশ বছর আগে পর্যন্তও বাঙালি পাঠকের অত্যন্ত প্রিয় ছিলেন। উপরন্তু, যেসব বাঙাল পরিবারকে এক কাপড়ে চলে আসতে হয়েছিল পূর্ববঙ্গ ছেড়ে আপনার ছবির গ্রেওয়াল পরিবারের মত সিলুয়েট হয়ে, তাদের অনেকেরই যে মুজফফরের মত প্রতিবেশী ছিল তা কিন্তু পারিবারিক গল্পকথায় পাওয়া যায়। মুজফফররা ছিল বলেই আমাদের পূর্বপুরুষরা অনেকে প্রাণ হাতে করে হলেও এপারে চলে আসতে পেরেছিলেন। অথচ সেই প্রতিবেশীদের আমাদের সিনেমায় কোনোদিন দেখা গেল না। কেন গেল না? উত্তরটা অস্বস্তিকর। সম্ভবত ও জিনিস সত্যনিষ্ঠভাবে দেখাতে গেলে নির্বৈরের দাদুর প্রেমের মত আমাদের দাদুদের প্রেম নয়, পাপই উঠে আসত। ধরা পড়ে যেত এই সত্য যে, বাঙালি ভদ্রলোকেরা, যারা আমাদের সাহিত্য, নাটক, শিল্প, সঙ্গীত, ফটোগ্রাফি এবং সিনেমার চিরকালীন কর্ণধার, তাদের বাড়ির ছেলেমেয়েরা মুসলমানদের বিয়ে করা দূরে থাক, তাদের সঙ্গে প্রেম করার কথাও স্বপ্নে ভাবত না। মুসলমান প্রতিবেশীদের সঙ্গে সম্পর্কও যতটা প্রয়োজনের, ততটা প্রাণের ছিল না। ফলে আমাদের সিনেমায় কোনো আফসানা থাকা সম্ভব নয়।

অশোক মিত্র, বীণা দাস, অতীন বন্দ্যোপাধ্যায়দের আত্মজীবনীমূলক লেখায় আমাদের পূর্বপুরুষদের সেইসব পাপের সাক্ষ্য রয়েছে। অশোক লিখেছেন, কীভাবে তাঁর দোর্দণ্ডপ্রতাপ মামারা স্রেফ জমির আল দিয়ে হেঁটে আসার সময়ে বাবুদের দেখে আল থেকে নেমে না যাওয়ায় পেরেক বসানো কাঠ দিয়ে গরিব মুসলমান প্রজাকে পিটিয়েছিলেন। বীণা লিখেছেন, কীভাবে এক মুসলমান যুবতী তাঁকে শুনিয়ে দিয়েছিলেন যে হিন্দু বাড়িতে কুকুর বেড়াল পাতের কাছে গেলে সে ভাত খাওয়া চলে, কিন্তু মুসলমানের ছোঁয়া লাগলে চলে না। এই শতাব্দীর শুরুতে অতীন আজকাল কাগজের এক রবিবাসরীয় নিবন্ধে লিখেছিলেন, ছোটবেলায় দেখেছেন মুসলমান বন্ধুর ঠাকুমা গল্প করতে আসতেন তাঁর ঠাকুমার সঙ্গে। দুই পরিবারে সম্পর্কও ছিল জমাট। কিন্তু বন্ধুর ঠাকুমার জন্যে আলাদা একখানা পিঁড়ি ঠিক করা ছিল। স্বভাবতই আমাদের লক্ষ্মী ছেলে দাদুরা তাঁদের ভরা যৌবনে কোনো আফসানার প্রেমে পড়তেন না। এই যদি না হবে, তাহলে প্রফুল্ল রায়ের কেয়াপাতার নৌকো ছাড়া আমাদের সাহিত্যেই বা অবিভক্ত বাংলায় দুই সম্প্রদায়ের প্রেমের গল্প বিরল কেন? সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় ছাড়া আর কোনো জনপ্রিয় লেখকের লেখায় ওপার বাংলায় ছেড়ে আসা মুসলমান বাল্যবন্ধুর জন্যে দু ফোঁটা চোখের জল পাই না কেন? বাঙালদের পারিবারিক গল্পকথাতেই বা যত আফসোস ছেড়ে আসা জমিজমা পুকুর বা তুলসীমঞ্চের জন্য, তার সিকি ভাগ কোনো প্রতিবেশী বন্ধু বা প্রেমিকার সঙ্গে বিচ্ছেদ হয়ে যাওয়ার জন্যে নয় কেন?

ইমতিয়াজ, আপনি হয়তো জানেন না, কিছুদিন আগে পশ্চিমবঙ্গ ভারতে থেকে যাওয়ার কৃতিত্ব কার, তা নিয়ে গোল বেধেছিল আমাদের রাজ্যে। তখন বিখ্যাত ঐতিহাসিক পার্থ চট্টোপাধ্যায় সর্বাধিক বিক্রীত বাংলা দৈনিকে প্রকাশিত সুদীর্ঘ লেখায় দেখিয়ে দেন যে এতে আলাদা করে কারও কৃতিত্ব নেই। আসলে দুই বাংলার সংখ্যাগরিষ্ঠ বিধায়ক, হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে, বাংলা ভাগ করার পক্ষেই ভোট দিয়েছিলেন। অর্থাৎ বাংলা ভাগ আমাদের পূর্বপুরুষরা চেয়েছিলেন। এমন বললে নেহাতই সত্যের অপলাপ হবে যে আমাদের ছাপোষা পূর্বপুরুষরা চাননি, সিদ্ধান্তটা নেতারা চাপিয়ে দিয়েছিলেন। যদি তা-ই হত, তাহলে আজ পশ্চিমবঙ্গ দিবস আমাদের কাছে উদযাপনের বিষয় হত না, বরং কে কাণ্ডটার জন্যে দায়ী তা লুকিয়ে ফেলার চেষ্টা করতে হত নেতাদের। আসল কথাটা হল, উদ্বাস্তুদের যন্ত্রণা যেমন সত্যি, তাঁদের জাতভাইরাই যে বাংলা ভাগ চেয়েছিলেন তা-ও সত্যি। উপরন্তু, আমাদের পশ্চিমবঙ্গীয় সাংস্কৃতিক বয়ানে ব্যাপারটা একতরফা। এপার থেকেও যে ওপারে উদ্বাস্তু হয়ে চলে যেতে হয়েছিল মানুষকে, তাদের যন্ত্রণাও যে কম নয়, তা আমাদের সিনেমায় নেই। ওপারের প্রাক-স্বাধীনতা যুগের হিন্দু-মুসলমানের সম্পর্ক তো নেই-ই। এমনকি সাহিত্যেও, ও জিনিসটা আমরা ওপারের আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের লেখায় যত স্পষ্ট করে পাই, এপারের লেখকদের লেখায় পাই না। বাংলার কোনো সাদত হাসান মান্টো নেই ইমতিয়াজ। আপনাদের পাঞ্জাবিদের আছে। তাই আমাদের টোবা টেক সিংদের কথা কেউ লিখে রাখেনি। দেশভাগের পর্বে পাঞ্জাবের মেয়েদের মর্মন্তুদ কাহিনি যেভাবে আপনি আর আপনার সহলেখক নয়নিকা মাহতানি লিপিবদ্ধ করেছেন, বাংলা সিনেমা তা করেনি। আমাদের পূর্বপুরুষরা সেই ন্যাকা নৈতিকতার পাপ করেছেন, যাকে আপনার নির্বৈর বিদূষক হয়ে ব্যঙ্গ করে “র‍্যাডক্লিফ বললেন, গান্ধী বলেছেন খারাপ জিনিস দেখতে নেই। তাই আমি দেখব না।”

এই পাপের ফল কী? ফল এই যে, পূর্ববাংলার মুজফফরদের কথাও আমাদের জনপ্রিয় সংস্কৃতিতে অনুপস্থিত। সুতরাং আজ খুব সহজেই পশ্চিমবঙ্গে এই বয়ান খাড়া করা যাচ্ছে যে দেশভাগের সব দায় একটা সম্প্রদায়ের, অন্য সম্প্রদায় শুধুই তার শিকার। এ-ও সহজেই বিশ্বাস করানো যাচ্ছে যে হিন্দু, মুসলমান চিরকালই একে অপরের শত্রু ছিল; কখনো তাদের মধ্যে মৈত্রী ছিল না। আপনার ছবিতে র‍্যাডক্লিফ লাইন বিরতির ঠিক আগে একটা উঠোনকে দুভাগ করে দিয়ে রক্তের রঙে ফুটে উঠছে পর্দায়, আর আজকের বাংলা ছবিতে র‍্যাডক্লিফ লাইন পর্দায় ফুটে উঠছে সাম্প্রদায়িক আইটেম নাম্বারে দুই বাংলা জুড়ে যাওয়ার কাল্পনিক ভয় দেখাতে। সে ভয় ঋত্বিককে নিয়ে ফেসবুকে গদগদ হওয়া বাঙালির পছন্দ হচ্ছে, তারা হলও ভরাচ্ছে। তাই আমাদের কোনো ইমতিয়াজ নেই, আমাদের কোনো ইমতিয়াজ অদূর ভবিষ্যতে হবেও না। বরং সম্ভব হলে আমরা পশ্চিমবঙ্গের মধ্যেও একের পর এক র‍্যাডক্লিফ লাইন টেনে দেব, যতক্ষণ না বাঙালি বলে জাতিটাই অবলুপ্ত হয়ে যায় হিন্দু আর মুসলমানে ভাগ হতে হতে।

আপনাকে নমস্কার জানিয়ে স্বীকার করে নিই, আপনারা পাঞ্জাবিরা ট্রমার মুখোমুখি দাঁড়ানোর সাহস রাখেন। তাই আপনাদের পার্টিশন মিউজিয়াম আছে। তাতে শুধু ঘৃণায় ইন্ধন জোগানোর কাজ হয় না, একে অপরের ঘায়ে হাত বুলিয়ে উপশমের কাজও হয়। তাই হয়তো শিখ মহিলাদের, মুসলমান দাঙ্গাবাজদের হাত থেকে বাঁচতে সপরিবার আত্মহত্যার পাশাপাশি ভারত থেকে পাকিস্তানগামী মুসলমান উদ্বাস্তুদের ট্রেনে শিখ দাঙ্গাবাজদের হত্যালীলার মাঝে মুসলমান সেজে থাকা এক শিখের দৃশ্য উঠে আসতে পেরেছে আপনার ক্যামেরায়। ট্রমা অতিক্রম করে আমৃত্যু প্রেম করার মুরোদ আপনাদের আছে ইমতিয়াজ। আমাদের নেই। একথা বারবার প্রমাণিত হচ্ছে। কয়েক মাস আগেই আরেক পাঞ্জাবি, বরুণ গ্রোভার, তাঁর ঋজু বিদূষণায় শিখদের দেশভাগের ট্রমা এবং তা থেকে জন্ম নেওয়া মুসলমানবিদ্বেষ নিয়ে রসিকতা করেছেন। তারপর বলেছেন, তাঁর পরিবার অধুনা পাকিস্তানে তাঁদের ভিটে ছেড়ে আসার সময়ে একখানা প্রদীপ জ্বেলে রেখে এসেছিল, এই আশায় যে শিগগির ওবাড়িতে ফিরে যাওয়া হবে। সীমান্তের এপারে এসে যেখানে আশ্রয় নেওয়া হল, সেখানেও একখানা প্রদীপ জ্বলছিল। মানে এবাড়ি যে পরিবার ছেড়ে গেছে, তাদেরও আশা ছিল তারা ফিরে আসবে। রূঢ় বাস্তব হল, “ম্যায় ওয়াপস আউঙ্গা” বলে গিয়ে কেউ আর সে যুগে ফিরে আসতে পারেনি। কিন্তু বরুণদের নতুন বাড়িতে সেই প্রদীপ রোজ জ্বালানো হত এই আশায় যে, পুরনো বাড়িতে যে পরিবার গেছে তারাও ওঁদের জ্বালিয়ে আসা প্রদীপ জ্বেলে রাখছে। এভাবেই “মানুষের মৃত্যু হলে তবুও মানব থাকে যায়”।

কথাটা বরিশাল থেকে আসা বাঙালি কবির লেখা হলেও, দেখা যাচ্ছে এপারের বাঙালি শিল্পী, সাহিত্যিকদের ওতে বিশ্বাস কম। আপনাদের মত পাঞ্জাবি শিল্পীদেরই বেশি বিশ্বাস। তাই বাঙালি হিসাবে আপনার ও আপনার পূর্বপুরুষদের প্রতি অশেষ কৃতজ্ঞতা রইল, আমার পূর্বপুরুষদের জন্য রইল অভিসম্পাত।

ইতি

এক অপাংক্তেয় বাঙালি।

সঙ্ঘারামের রক্তকরবী: রাবীন্দ্রিক অথচ সমসাময়িক

বাংলার শিল্পীদের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের সংলাপ জারি আছে, একই সময়ে দু-দুটো নাট্যদল রক্তকরবী মঞ্চস্থ করছে, আর আপনি দেখতে না গিয়েই সবটা জেনে ফেলবেন?

এই মুহূর্তে আফ্রিকার বেশ কিছু দেশে ইবোলা মহামারী চলছে। কঙ্গোয় সেই মহামারীর কেন্দ্রবিন্দু হল প্রবল দারিদ্র্যে ধ্বস্ত শহর মংবোয়ালু। কী আছে সেই শহরে? আছে সোনার খনি, গোটা এলাকার অর্থনীতি সেই খনির উপর নির্ভরশীল। আর সেই খনিতে কাজ করেন প্রচুর প্রবাসী শ্রমিক। অর্থাৎ মাটির নিচে সোনা, অথচ মাটির উপরের মানুষগুলো, সেই সোনা যারা খুঁড়ে বের করে সেই মানুষগুলো, হদ্দ গরিব। প্রয়াত পল ফার্মারের মত চিকিৎসক তথা নৃতত্ত্ববিদ লিখেছেন যে আফ্রিকার কঙ্গো, সিয়েরা লিওনের মত দেশের মানুষকে যুগের পর যুগ সোনা বা হীরের লোভে যেভাবে শোষণ করা হয়েছে, ওখানে বারবার মহামারী দেখা দেওয়ার তা অন্যতম কারণ। সুতরাং ২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে যদি কারও সন্দেহ হয়, রক্তকরবী নাটকের যক্ষপুরী সম্পূর্ণ কাল্পনিক, তাহলে তাকে মংবোয়ালুর খোঁজ দেওয়াই যথেষ্ট। সেখানে গেলেই দেখা পাওয়া যাবে এই নাটকের ফাগুলাল, চন্দ্রা, কিশোর, বিশু পাগল, গোকুলদের। নন্দিনী আর রঞ্জনের দেখা পাওয়া যাবে কি? সম্ভবত না, কারণ সোনা আর হীরের ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে ইলন মাস্ক, জেফ বেজোসের মত সর্দারদের হারাতে নন্দিনী আর রঞ্জনের সন্ধানই মানুষের সন্ধান। এই সন্ধান আছে বলেই রক্তকরবী ‘সত্যমূলক’ হলেও নাটক, ইতিহাস নয়। তবে কেবল মংবোয়ালু তো যক্ষপুরী নয়, রক্তকরবী নাটক প্রকাশের শতবর্ষ পরে আজ গোটা দুনিয়াটাই যক্ষপুরী। সেই সত্য তুলে ধরতে ক্যান্টিন আর্ট স্পেসের পর, হাতিবাগান সঙ্ঘারামের সত্যনিষ্ঠ প্রযোজনাও দেখার সুযোগ হল সম্প্রতি।

রক্তকরবী নাটকের উপস্থাপনায় মঞ্চসজ্জা বরাবরই খুব আলোচিত বিষয়। প্রদীপ কুমার পাত্র আর মদন মিস্ত্রি এখানে যে যক্ষপুরী বানিয়ে তুলেছেন তা ধ্রুপদী রবীন্দ্রনাটকের মেজাজ বজায় রেখেই আজকের দুনিয়াকে স্পষ্ট করে তুলেছে। মঞ্চের দুই প্রান্তে রাস্তার আলোর স্তম্ভে ক্লোজ সার্কিট টিভির শ্যেনদৃষ্টি এবং রাজার বন্ধ দরজার ঠিক উপরেও তার উপস্থিতি জর্জ অরওয়েলের 1984 উপন্যাসকে মনে পড়িয়ে দেয়। আমরা সবাই যে এক ডিসটোপিয়ায় বসবাস করছি, আজকের পৃথিবীর ব্যবসায়ীরা এবং রাষ্ট্র যে নজরদারি চালায় নাগরিকদের উপর, সেই আধুনিক সত্য অনায়াসে রাবীন্দ্রিক হয়ে ওঠে যখন বিশু (তথাগত চৌধুরী) ওই ক্যামেরার দিকেই আঙুল তুলে ফাগুলালকে (কল্লোল দে) বলে “তোদের আদর পড়ে যেখানে সর্দারের দৃষ্টি পড়ে সেখানেই, সোনাব্যাঙ যতই মকমক শব্দে কোলাব্যাঙের অভ্যর্থনা করে, সেটা কানে গিয়ে পৌঁছয় বোড়াসাপের।” পরিচালকের কল্পনার সঙ্গে মঞ্চ পরিকল্পনা ও নির্মাণের এই সুর মেলানো অপূর্ব। পাশাপাশি এই মঞ্চ পুঁজিবাদের ধারাবাহিকতাকেও ধারণ করেছে। বড় বড় দাঁতওয়ালা চাকা দেখে মনে পড়ে যায় চার্লি চ্যাপলিনের মডার্ন টাইমস ছবির সেই দৈত্যাকৃতি চাকাগুলোকে। রাজার রহস্যময়তার অনেকটাও মঞ্চসজ্জার কৃতিত্ব। যে অর্ধস্বচ্ছ দরজার ওপার থেকে রাজা (অনুরণ সেনগুপ্ত) কথা বলে, তাতে পড়া রাজার ছায়া তার ভয়ঙ্করতা এবং অসহায়তাকে দর্শকের সামনে অতিকায় করে তোলে।

দীপ্তেশ মুখার্জি আর অভিরূপ দে-র অবদানে এই নাটকে শব্দ ও সঙ্গীত যে আবহ নির্মাণ করেছে তা-ও স্বতন্ত্র উল্লেখের দাবি রাখে। শুরুতেই তালবাদ্য সহযোগে এবং মধুরিমা গোস্বামীর অঙ্গবিন্যাসে সোনা খনন দর্শকের মনোযোগ আকর্ষণ করে নেয়।

অভিনয়ের আলোচনায় আসতে দেরি করলাম, কারণ রবীন্দ্রনাথ যে ভাষায় এই নাটক রচনা করেছেন, তার বিমূর্ততাকে মূর্ত করে তোলায় মঞ্চ, শব্দ, সঙ্গীতের ভূমিকা অতি গুরুত্বপূর্ণ। ওখানে প্রয়াস ব্যর্থ হলে মনোযোগী রবীন্দ্রপাঠক দর্শক ছাড়া আর কাউকে স্রেফ অভিনয় দিয়ে ছুঁয়ে ফেলা এই নাটকে বেশ কঠিন। অভিনয়ের আলোচনা শুরু করা যাক নন্দিনীকে দিয়েই।

নন্দিনী আসলে কে? যক্ষপুরীর কড়া নিয়মে এই মস্ত বেনিয়মটি হাজির হল কোথা থেকে? রবীন্দ্রনাথের নিজের ব্যাখ্যায় “জেলেদের জালে দৈবাৎ মাঝে-মাঝে অখাদ্যজাতের জলচর জীব আটকা পড়ে। তাদের দ্বারা পেটভরা বা ট্যাঁকভরার কাজ তো হয়ই না, মাঝের থেকে তারা জাল ছিঁড়ে দিয়ে যায়। এই নাট্যের ঘটনাজালের মধ্যে নন্দিনী নামক একটি কন্যা তেমনিভাবে এসে পড়েছে।” নাটকের শেষদিকে আমরা যক্ষপুরীর মত হিংস্র খনি এলাকায় নন্দিনীর গ্রামের কথা শুনতে পাই, সে গ্রামের মানুষের কথাও পাই। সে খেতের কথা বলে, ফসলের কথা বলে, ফুল তার অঙ্গে, রং তার মনে। এই চরিত্রে ঈস্পীতা ঘোষ যতবার মঞ্চে আসেন, মঞ্চ জুড়ে থাকা অন্ধকার ও অবসাদে আলোর সঞ্চার হয়। এর কৃতিত্ব শ্রমিকদের গাঢ় নীল পোশাক, মঞ্চের দখল নিয়ে রাখা কালো রঙের বিপরীতে ঈস্পীতার সবুজ শাড়ি, হলুদ ব্লাউজ আর লাল ফুলের যতখানি (রূপসজ্জা: সঞ্জয় পাল), ততখানিই তাঁর অভিনয়ের। তিনি লঘু পায়ে চলে ফিরে বেড়ান, সে চলা নাচ নয় অথচ ছন্দময়। ঘোর লাগিয়ে দেওয়ার মত রূপ না থাকলে নন্দিনীর চরিত্রে বিশ্বাসযোগ্য হয়ে ওঠা শক্ত, কিন্তু সে রূপ সম্পূর্ণ হয় অভিনয় ক্ষমতা দিয়ে। বস্তুত, ঘন্টা দুয়েকের বিরতিহীন নাটকের মধ্যেই দুজন নন্দিনীকে দেখা যায়। এক নন্দিনী আনন্দকে, বিদ্রোহকে এমনভাবে ছড়িয়ে দিতে পারে পুরুষের মধ্যে যে গোকুল (অর্ক চক্রবর্তী) বা চন্দ্রা (মধুরিমা) তাকে বিপদ বলে মনে করে। আরেক নন্দিনীকে দেখা যায় একেবারে শেষদিকে, যে দিশেহারা। আনন্দের বদলে শঙ্কাই তার অভিজ্ঞান। এই দুই নন্দিনীর চরিত্রেই ঈস্পীতা চমৎকার। তবে গান গাওয়ার সময়ে তাঁকে কিছুটা দুর্বল লাগে।

বিশু পাগল রক্তকরবী নাটকের কতখানি, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। এক নারীর হাতে আকাশের চাঁদ এনে দিতে সে যক্ষপুরীতে এসেছিল। তারপর তাকে চরবৃত্তি করতে লাগিয়ে দিয়েছিল সর্দাররা। কিন্তু সে কাজ বিশুর দ্বারা হয়নি। তাই তার অবস্থা আর পাঁচজন শ্রমিকের চেয়েও খারাপ। অথচ সে যাদের বিরুদ্ধে চরবৃত্তি করতে এসেছিল তারাই তাকে ভালোবাসে। সর্দারদের লোক থেকে শ্রমিকদের লোক হয়ে যাওয়ায় বিশুর স্ত্রীও তাকে ত্যাগ করেছে। এতখানি নিঃস্বতা সত্ত্বেও যক্ষপুরীতে বিশু একমাত্র লোক, যার গান নন্দিনীকেও মুগ্ধ করে। এই তিক্ততাহীন বিশুর চরিত্রকে তথাগত (যিনি এই নাটকের নির্দেশকও) প্রায় দার্শনিক উচ্চতা দান করেছেন। তাঁর দরাজ গানের গলা বিষণ্ণ সংলাপ উচ্চারণের সময়েও এক ধরনের নিরাসক্তির আভাস দেয়। যেন এমন একজন মানুষ, যে চোখের জলের জোয়ারেও ভোলে না যে ডাঙা আছে। তথাগতর বিশু একইসঙ্গে প্রেমিক ও সন্ন্যাসী।

মাত্র কয়েকদিন আগেই ক্যান্টিন আর্ট স্পেসের রক্তকরবী প্রযোজনায় আজকের বাংলা নাট্যমঞ্চের আরেক প্রতিভাবান অভিনেতা বুদ্ধদেব দাসের অভিনয় দেখার সুযোগ হয়েছে। দুজন ভালো অভিনেতা একই চরিত্রের কেমন দুরকম ব্যাখ্যা করেন তা এত অল্প সময়ের ব্যবধানে দেখার বিরল সুযোগ এই মুহূর্তে এই বাংলার দর্শকের হাতের মুঠোয়। বুদ্ধদেবের বিশুর সর্বাঙ্গে লেগে থাকে বিষাদ, তথাগতর মুখে লেগেই থাকে অনির্বচনীয় হাসি। যেন তিনি জানেন, জীবনের রণ রক্ত সফলতা সত্য, তবু শেষ সত্য নয়। রাজা একবার জিজ্ঞেস করে, নন্দিনীর সঙ্গে ও কে? “রঞ্জনের জুড়ি নাকি?” তার উত্তরে বিশু বলে “না রাজা, আমি রঞ্জনের ও-পিঠ, যে পিঠে আলো পড়ে না— আমি অমাবস্যা।” এই সংলাপ যখন বুদ্ধদেব বলেন, তখন ঝরে পড়ে রঞ্জন হতে না পারার হতাশা। আর তথাগত যখন বলেন, তখন মনে হয়— তিনি রঞ্জন নন এবং রঞ্জন হতে চান না। তিনি নিজের অবস্থানে খুশি। বড় বিস্ময় লাগে এই দুই অভিনেতাকে দেখে। আমাদের তো আজ বিশেষ কিছুই নেই। তবু একজন তথাগত আর একজন বুদ্ধদেব আছেন!

রাজার চরিত্রে অনুরণও চমকপ্রদ। এই চরিত্রের অভিনেতার হাতে যে কণ্ঠস্বর ছাড়া বিশেষ কোনো আয়ুধ নেই তা তো সবাই জানেন, কিন্তু এখানে অনুরণকে একটা বাড়তি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছেন নির্দেশক— গলার পাশাপাশি ছায়া দিয়েও অভিনয় করতে হয়েছে। অর্থাৎ এখানে রাজাকে একেবারে দেখা যায় না তা নয়, সারাক্ষণই রাজার ছায়া দেখা যায়। সুরজ বিশ্বাস ও ধনপতি মণ্ডলের আলোকসম্পাতে এ এক অদ্ভুত কাণ্ড। অনুরণ যে দক্ষতায় নিজের ছায়ার উচ্চতা বাড়িয়ে কমিয়ে এবং কণ্ঠস্বরের নিপুণ ব্যবহারে রাজার বিরাট ভাবমূর্তি তৈরি করেন, তা ভেঙে পড়ে শেষ পর্বে তাঁর অন্তরাল থেকে বেরিয়ে আসায়। তখন অনুরণের সত্যিকারের দৈহিক উচ্চতা যে বৈপরীত্য তৈরি করে তার সঙ্গে মানানসই তাঁর বিধ্বস্ত, প্রতারিত অথচ হার না মানা মানুষের অভিনয়।

আরও পড়ুন রক্তকরবী: প্রযোজনা আন্তর্জাতিক, কিন্তু বাংলা কি?

ফাগুলালের চরিত্রে কল্লোল আর তার স্ত্রী চন্দ্রার চরিত্রে মধুরিমা সাক্ষাৎ শ্রমিক ও তার গিন্নী। ঠিক যেমন জীবন থেকে উঠে আসা অধ্যাপক মনে হয় অনন্য শঙ্কর দেবভূতিকে। অন্যান্য ছোট কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে দীপজ্যোতি মণ্ডল (কিশোর), অর্ক, জয়ন্ত মিত্র (সর্দার), অভিজিৎ নাগ (গোঁসাই) যথাযথ। অভিরূপের গিটার এবং নীলার্ঘ্য দত্তর ব্যাঞ্জো এই নাটকে কতখানি গুরুত্বপূর্ণ তা বুঝিয়ে বলতে গেলে কবীর সুমন দিয়ে কীভাবে রবীন্দ্রনাথকে ছুঁয়ে ফেলেছেন নির্দেশক, সেকথাটা বলে দিতে হবে। কিন্তু সে রহস্য উদ্ঘাটন করব কেন? বাঙালির এই দুঃসময়েও বাংলার শিল্পীদের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের সংলাপ জারি আছে, একই সময়ে দু-দুটো নাট্যদল রক্তকরবী মঞ্চস্থ করছে, আর আপনি দেখতে না গিয়েই সবটা জেনে ফেলবেন? এমন অন্যায়ে প্রশ্রয় দেব না।

ক্যান্টিন আর্ট স্পেসের প্রযোজনার উপসংহার নিয়ে আমার আপত্তির কথা লিখেছিলাম। হাতিবাগান সঙ্ঘারামের নাটকের উপসংহার অতখানি পার্টিজান নয়, ‘পৌষ তোদের ডাক দিয়েছে’-র সঙ্গে শ্রুতিমধুর মিশ্রণ ঘটানো হয়েছে ‘হেই সামালো ধান হো’-র। কিন্তু শ্রুতিমধুর হলেও এই সৃজনান্তর নাটকের বার্তাকে একটা অস্বস্তিকর জায়গায় নিয়ে গেছে বলে মনে হয়। নাটকটাকে আগাগোড়া সমকালীন করে তোলা হয়েছে, কিন্তু শেষে তেভাগা আন্দোলনের সময়কার এই গানের আবাহন থেকে কি এই সিদ্ধান্ত করব যে যক্ষপুরী থেকে পরিত্রাণের পথ হিসাবে কৃষিপ্রধান সভ্যতাকেই দেখলেন তথাগত ও তাঁর দল? সে সমাধান রবীন্দ্রনাথের সময়ে বাস্তবোচিত হলেও, আজকের দিনে কিন্তু একেবারেই কল্পকথা। রবীন্দ্রনাথ যখন এই নাটক লেখেন তখন তাঁর বন্ধু মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী গ্রামভিত্তিক রাষ্ট্রের ধারণা দিচ্ছিলেন। সেই ধারণা স্বাধীন ভারতে পরিত্যক্ত হয়, গান্ধীরই শিষ্য জওহরলাল নেহরুর পৌরোহিত্যে আমাদের অর্থনীতির ভিত হয়ে দাঁড়ায় ভারি শিল্প ও বাঁধ। সেখান থেকে বহু যুগ পার করে আমরা এখন বিশ্বব্যাপী গিগ অর্থনীতি এবং প্রযুক্তিভিত্তিক সামন্ততন্ত্রের (techno-feudalism) কবলে। এ যুগের সোনার খনির শ্রমিকদের নিস্তারের পথ কৃষিকাজে নেই। বিশ্বজুড়ে জমির সংকট, জমি থাকলেও জলের সংকট। সেই সংকট আরও বাড়াচ্ছে বেজোস, মাস্ক, স্যাম অল্টম্যানদের ইয়া বড় সব ডেটা সেন্টার। এখন ধানের নামে হাত মুষ্টিবদ্ধ করে কোনো লাভ হবে কি?

এ প্রশ্নের উত্তর খোঁজার দায় কেবল নাট্যকর্মীদের উপর চাপিয়ে দিলে অবশ্য অন্যায় হবে। তাঁরা শিল্পী, তাঁদের মূল কাজ সত্য তুলে ধরা এবং স্বপ্ন দেখানো। সে কাজ এই নাটকে শতকরা একশো ভাগ সততায় করা হয়েছে। তবে শিল্পীদের কাজেও তো আমরা ভবিষ্যতের ইশারা খুঁজি; বিশেষ করে সেইসব শিল্পীদের কাজে, যাঁরা শতবর্ষ আগের শিল্পকে নিজের সময়ের মাটিতে দাঁড় করানোর স্পর্ধা দেখান।