‘ম্যায় ওয়াপস আউঙ্গা’ একটা না-হওয়া বাংলা ছবি

নির্বৈর পূর্বপুরুষের প্রেম সন্ধান করতে করতে পাপেরও হদিশ পেয়েছে। আমারও সেই দশা। খুলে বলি।

প্রিয় ইমতিয়াজ,

আপনার নতুন ছবি দেখতে যাওয়ার মূল কারণ ছিল প্রেম। প্রেমের গল্প পড়তে ভালো লাগে, প্রেমের সিনেমা দেখতে ভালো লাগে এবং রোম্যান্টিক সিনেমা বানানোয় আপনার দক্ষতা প্রশ্নাতীত। জব উই মেট তো আমার প্রজন্মের অনেকের কাছে একান্ত ব্যক্তিগত ছবি। সেই কারণে বলিউডের যুদ্ধের বাজারে আপনি প্রেমের ছবি বানিয়েছেন জেনেই দেখার ইচ্ছে হয়েছিল। যাদের রুচিকে ভরসা করি, তারা অনেকে দেখে এসে প্রশংসা করায় দেখার ইচ্ছে আরও বেড়েছিল। একটু-আধটু লিখি এবং লিখলে কেউ কেউ মন দিয়ে পড়ে, তাই ছবিটা দেখে লিখব বলেও ভেবে রেখেছিলাম। কিন্তু ম্যায় ওয়াপস আউঙ্গা দেখতে গিয়ে সব গোলমাল হয়ে গেল। মানে ভেবেছিলাম, যেভাবে আর পাঁচটা ছবি নিয়ে লিখে এসেছি এতদিন, সেভাবেই চুলচেরা বিচার করব। প্রবাদপ্রতিম নাসিরুদ্দীন শাহের অভিনয়, এ আর রহমানের সেই রোজা (১৯৯২) ছবির মত অপাপবিদ্ধ সঙ্গীত, তরুণ ও নয়নাভিরাম নায়ক-নায়িকা (বেদাঙ্গ রায়না ও শর্বরী ওয়াঘ) আর দিলজিৎ দোসাঞ্জের ‘দিল’ জিতে নেওয়া অভিনয়, প্লেব্যাক শিল্পীদের প্রতি (বিশেষত দীপালি সহায়ের প্রতি) আমার মুগ্ধতা, আপনার গল্প বলার চিরাচরিত মুনশিয়ানা ইত্যাদি নিয়ে লিখব। কিন্তু সেটা আর সম্ভব নয়, কারণ এ ছবি অত্যন্ত ব্যক্তিগত হয়ে দাঁড়িয়েছে। সুতরাং ব্যক্তিগত কথাগুলোই বলা যাক। বাংলা ভাষার সুবিধা হল, এ চিঠি আপনার কাছে পৌঁছবে না। অতএব আপনাকে বলার অছিলায়, যাদের কাছে পৌঁছবে তাদের সঙ্গে কিছু ব্যক্তিগত অভিমত ভাগ করে নেওয়া, তাদের ভাবনাকে উস্কে দেওয়াই আসল উদ্দেশ্য। কিন্তু প্রেম ঢেলে দেওয়ার জন্যে যেমন একজন পাত্র লাগে, তেমন মনের কথা খুলে বলতেও একজন পাত্র লাগে। তাই আপনাকে খাড়া করা।

ছবির ক্রেডিট রোল হওয়া শুরু হতেই ১৯৯০-৯১ সালের কথা মনে পড়ে গেল, বুঝলেন? তখন আমার বয়স ৮-৯ বছর। একদিন গভীর রাতে বাবা টিভি চালিয়েছেন সিনেমা দেখবেন বলে। আমিও সিনেমার আকর্ষণে জেগে রয়েছি (সদ্য দ্বিতীয়বার মা হওয়ায় আমার মা আমাকে বকে ঘুম পাড়ানোর অবস্থায় নেই, বাবা বরাবর প্রশ্রয়দাতা)। ছবিটা বাংলা, কিন্তু সিনেমার শুরুতে নাম দেখানোর সময়ে নারীকণ্ঠে ঝাঁ ঝাঁ করে এমন একখানা গান বেজে উঠল, যে ধরনটা আমার একেবারে অপরিচিত। তার কথাগুলো

আমের তলায় ঝামুর ঝুমুর
কলাতলায় বিয়া
আইলেন গো সুন্দরী জামাই
মুটুক মাথায় দিয়া।

সঙ্গে উলুর শব্দ ছিল, বাবাও বললেন— এটা বিয়ের গান, সাবেকি বাঙালি বিয়ের গান। ছবিটা পুরো দেখেছিলাম, কিন্তু বিশেষ বুঝতে পারিনি তখন। কিন্তু অবাক হয়েছিলাম, দুটো কারণে— ১) বাবা ছবিটা দেখতে দেখতে কাঁদলেন, ২) ছবিটায় কোনো বিয়ের দৃশ্য নেই। তাহলে শুরুতে বিয়ের গান কেন?

এই প্রশ্নের উত্তর পেতে আমাকে অপেক্ষা করতে হয়েছিল বারো বছর, আমাদের বাংলা মতে এক যুগ। আমি তখন কলেজের ছাত্র। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের আবশ্যিক বাংলার পাঠ্যবইতে ঋত্বিক কুমার ঘটকের একখানা প্রবন্ধ ছিল, যার শিরোনাম ‘আমার ছবি’। উনিই ছোটবেলায় প্রথম দেখা সেই ছবির পরিচালক। ওই লেখায় তিনি ব্যাখ্যা করেছেন যে শুরুতেই বিয়ের গান রেখেছিলেন, কারণ তাঁর অন্তরের অভিলাষ— আলাদা হয়ে যাওয়া দুই বাংলার মিলন হোক। বিয়ে মানেই তো মিলন। এই ছবিটা— কোমল গান্ধার (১৯৬১)— নির্ঘাত আপনার দেখা। নইলে আপনার ছবিতে বিভক্ত পাঞ্জাব প্রেমিক-প্রেমিকার (ঈশার আর আফসানা) না-হওয়া বিয়ের প্রতীক হয়ে দাঁড়ায় কেমন করে? যে মিলন হল না, তা নিয়েই তো আপনার আখ্যান। ঋত্বিক যে বাসনা বিমূর্ত রেখেছিলেন, তা-ই যেন আপনার ছবিতে মূর্ত হয়ে উঠেছে।

কাঁচা বয়সের বুক টনটন করা প্রেম, টিন্ডার/বাম্বল যুগের বাঁধন এড়াতে চাওয়া প্রেম, বুকের গভীরে সারাজীবন প্রদীপের মত জ্বালিয়ে রাখা প্রেম— সবই আপনি দেখিয়েছেন একেবারে জ্যান্ত করে। সে প্রত্যাশা আপনার কাছে ছিলই। কিন্তু আপনি যে ঘৃণা পেরিয়েও প্রেমের বেঁচে থাকার ক্ষমতা আছে বলে দেখাবেন, তা-ও আবার দেশভাগের সময়কার বীভৎস সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার অনুপুঙ্খ উল্লেখ সমেত— এতটা কল্পনা করিনি। আসলে পূর্বপুরুষের প্রেমের সন্ধানে বেরিয়ে পড়া নির্বৈর সিং গ্রেওয়ালের যুগে দাঁড়িয়ে, ঘৃণার পর্ব পেরিয়েও যে প্রেম টিকে থাকে— এই বিশ্বাস রাখা আমাদের পক্ষে ক্রমশ কঠিন হয়ে দাঁড়াচ্ছে। কে যেন বলেছিলেন, হলোকস্ট দেখার পরে আর কবিতা লেখা যায় না? গরুর জন্যে মানুষ হত্যা দেখার পরে, গাজা দেখার পরেও কি আর প্রেমে বিশ্বাস রাখা যায়? আপনি রেখেছেন, তাই ম্যায় ওয়াপস আউঙ্গা যে এক সিংহহৃদয় ছবি তা স্বীকার করতে কোনো দ্বিধা নেই। তবে সব ভালোলাগা পেরিয়েও বাঙালি হিসাবে আপনার ছবি আমার মধ্যে গভীর হতাশার জন্ম দিয়েছে। নির্বৈর পূর্বপুরুষের প্রেম সন্ধান করতে করতে পাপেরও হদিশ পেয়েছে। আমারও সেই দশা। খুলে বলি।

আপনি যে পাঞ্জাবি উদ্বাস্তু আর বাঙালি উদ্বাস্তুদের যন্ত্রণাকে একই নজরে দেখেন তার পর্যাপ্ত প্রমাণ এই ছবিতে রেখেছেন। একটা নিদারুণ গানে চার লাইন বাংলা রেখেছেন, স্টক শটে বাঙালি উদ্বাস্তুদের দেখিয়েছেন তো বটেই, এমনকি ট্রেনে সরগোধা ত্যাগ করে গ্রেওয়াল পরিবারের সীমান্তের এপারে চলে আসার সময়কার সাদাকালো শটগুলো দেখলে নিমাই ঘোষের ছিন্নমূল (১৯৫০) মনে পড়তে বাধ্য। আর এখানেই আমার হতাশা। দেশভাগের যে অলীক, হাস্যকর অথচ বীভৎস বাস্তবতা আপনি পর্দায় তুলে এনেছেন তা কোনো বাংলা ছবিতে আজ পর্যন্ত দেখা যায়নি। আবার দেশভাগ কীভাবে পাঞ্জাবি হিন্দু, শিখ ও মুসলমানের প্রেম, সখ্য, পারিবারিক আত্মীয়তা ভেঙে খানখান করে দিয়েছিল, তাও কোনো বাংলা ছবির পরিচালক আজ পর্যন্ত দেখিয়ে উঠতে পারলেন না। ঋত্বিক আর নিমাই ছাড়া আর কোনো পরিচালক তো দেশভাগকে বিষয় হিসাবে পাত্তাই দিলেন না। বরিশালের মানুষ ঋত্বিক আস্ত ট্রিলজি বানিয়েছেন, কিন্তু সেগুলোও দেশভাগোত্তর ট্রমা নিয়ে। দেশভাগ ব্যাপারটা কেমন ছিল, তার আগেকার পূর্ববঙ্গের জীবন কেমন ছিল— সেসব তাঁর ছবিতেও পাই না। আমাদের সিনেমার আরেক দিকপাল, মৃণাল সেন, ফরিদপুরের মানুষ। তাঁর ফিল্মোগ্রাফিতেও দেশভাগ অনুপস্থিত। সত্যজিৎ রায়কে তবু এই যুক্তিতে কিছুটা ছাড় দেওয়া যায় যে তাঁর পূর্ববঙ্গের সঙ্গে যোগ ঠাকুর্দা উপেন্দ্রকিশোরের আমলেই প্রায় শেষ হয়ে গিয়েছিল। সত্যজিতের জন্ম ও বেড়ে ওঠা কলকাতায়। পূর্ববঙ্গের জীবন বা উদ্বাস্তু জীবন তাঁর উপলব্ধির বাইরে। আর বাংলা জনপ্রিয় সিনেমা? কোনো বিদেশি সেই সিনেমার ইতিহাস ঘাঁটলে জানতেই পারবে না যে দেশভাগ, বাংলা ভাগ বলে এত বড় একটা ব্যাপার কোনোদিন ঘটেছিল। আশ্চর্য! এই কারণেই ম্যায় ওয়াপস আউঙ্গা দেখতে দেখতে আমার পূর্বপুরুষদের উপরে রাগ হচ্ছিল, এই ছবিটা বাংলায় হয়নি বলে।

আরও পড়ুন হোমবাউন্ড: ফিরব বললে ফেরা যায় নাকি?

অথচ না হওয়ার কোনো কারণ ছিল না। আপনার ছবিতে প্রাক-দেশভাগ পর্ব যে প্রোগ্রেসিভ রাইটার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভা থেকে শুরু হয়, সেই সংগঠনে বাঙালিদের অংশগ্রহণও উল্লেখযোগ্য ছিল। মুনশি প্রেমচন্দ আজ থেকে বিশ-তিরিশ বছর আগে পর্যন্তও বাঙালি পাঠকের অত্যন্ত প্রিয় ছিলেন। উপরন্তু, যেসব বাঙাল পরিবারকে এক কাপড়ে চলে আসতে হয়েছিল পূর্ববঙ্গ ছেড়ে আপনার ছবির গ্রেওয়াল পরিবারের মত সিলুয়েট হয়ে, তাদের অনেকেরই যে মুজফফরের মত প্রতিবেশী ছিল তা কিন্তু পারিবারিক গল্পকথায় পাওয়া যায়। মুজফফররা ছিল বলেই আমাদের পূর্বপুরুষরা অনেকে প্রাণ হাতে করে হলেও এপারে চলে আসতে পেরেছিলেন। অথচ সেই প্রতিবেশীদের আমাদের সিনেমায় কোনোদিন দেখা গেল না। কেন গেল না? উত্তরটা অস্বস্তিকর। সম্ভবত ও জিনিস সত্যনিষ্ঠভাবে দেখাতে গেলে নির্বৈরের দাদুর প্রেমের মত আমাদের দাদুদের প্রেম নয়, পাপই উঠে আসত। ধরা পড়ে যেত এই সত্য যে, বাঙালি ভদ্রলোকেরা, যারা আমাদের সাহিত্য, নাটক, শিল্প, সঙ্গীত, ফটোগ্রাফি এবং সিনেমার চিরকালীন কর্ণধার, তাদের বাড়ির ছেলেমেয়েরা মুসলমানদের বিয়ে করা দূরে থাক, তাদের সঙ্গে প্রেম করার কথাও স্বপ্নে ভাবত না। মুসলমান প্রতিবেশীদের সঙ্গে সম্পর্কও যতটা প্রয়োজনের, ততটা প্রাণের ছিল না। ফলে আমাদের সিনেমায় কোনো আফসানা থাকা সম্ভব নয়।

অশোক মিত্র, বীণা দাস, অতীন বন্দ্যোপাধ্যায়দের আত্মজীবনীমূলক লেখায় আমাদের পূর্বপুরুষদের সেইসব পাপের সাক্ষ্য রয়েছে। অশোক লিখেছেন, কীভাবে তাঁর দোর্দণ্ডপ্রতাপ মামারা স্রেফ জমির আল দিয়ে হেঁটে আসার সময়ে বাবুদের দেখে আল থেকে নেমে না যাওয়ায় পেরেক বসানো কাঠ দিয়ে গরিব মুসলমান প্রজাকে পিটিয়েছিলেন। বীণা লিখেছেন, কীভাবে এক মুসলমান যুবতী তাঁকে শুনিয়ে দিয়েছিলেন যে হিন্দু বাড়িতে কুকুর বেড়াল পাতের কাছে গেলে সে ভাত খাওয়া চলে, কিন্তু মুসলমানের ছোঁয়া লাগলে চলে না। এই শতাব্দীর শুরুতে অতীন আজকাল কাগজের এক রবিবাসরীয় নিবন্ধে লিখেছিলেন, ছোটবেলায় দেখেছেন মুসলমান বন্ধুর ঠাকুমা গল্প করতে আসতেন তাঁর ঠাকুমার সঙ্গে। দুই পরিবারে সম্পর্কও ছিল জমাট। কিন্তু বন্ধুর ঠাকুমার জন্যে আলাদা একখানা পিঁড়ি ঠিক করা ছিল। স্বভাবতই আমাদের লক্ষ্মী ছেলে দাদুরা তাঁদের ভরা যৌবনে কোনো আফসানার প্রেমে পড়তেন না। এই যদি না হবে, তাহলে প্রফুল্ল রায়ের কেয়াপাতার নৌকো ছাড়া আমাদের সাহিত্যেই বা অবিভক্ত বাংলায় দুই সম্প্রদায়ের প্রেমের গল্প বিরল কেন? সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় ছাড়া আর কোনো জনপ্রিয় লেখকের লেখায় ওপার বাংলায় ছেড়ে আসা মুসলমান বাল্যবন্ধুর জন্যে দু ফোঁটা চোখের জল পাই না কেন? বাঙালদের পারিবারিক গল্পকথাতেই বা যত আফসোস ছেড়ে আসা জমিজমা পুকুর বা তুলসীমঞ্চের জন্য, তার সিকি ভাগ কোনো প্রতিবেশী বন্ধু বা প্রেমিকার সঙ্গে বিচ্ছেদ হয়ে যাওয়ার জন্যে নয় কেন?

ইমতিয়াজ, আপনি হয়তো জানেন না, কিছুদিন আগে পশ্চিমবঙ্গ ভারতে থেকে যাওয়ার কৃতিত্ব কার, তা নিয়ে গোল বেধেছিল আমাদের রাজ্যে। তখন বিখ্যাত ঐতিহাসিক পার্থ চট্টোপাধ্যায় সর্বাধিক বিক্রীত বাংলা দৈনিকে প্রকাশিত সুদীর্ঘ লেখায় দেখিয়ে দেন যে এতে আলাদা করে কারও কৃতিত্ব নেই। আসলে দুই বাংলার সংখ্যাগরিষ্ঠ বিধায়ক, হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে, বাংলা ভাগ করার পক্ষেই ভোট দিয়েছিলেন। অর্থাৎ বাংলা ভাগ আমাদের পূর্বপুরুষরা চেয়েছিলেন। এমন বললে নেহাতই সত্যের অপলাপ হবে যে আমাদের ছাপোষা পূর্বপুরুষরা চাননি, সিদ্ধান্তটা নেতারা চাপিয়ে দিয়েছিলেন। যদি তা-ই হত, তাহলে আজ পশ্চিমবঙ্গ দিবস আমাদের কাছে উদযাপনের বিষয় হত না, বরং কে কাণ্ডটার জন্যে দায়ী তা লুকিয়ে ফেলার চেষ্টা করতে হত নেতাদের। আসল কথাটা হল, উদ্বাস্তুদের যন্ত্রণা যেমন সত্যি, তাঁদের জাতভাইরাই যে বাংলা ভাগ চেয়েছিলেন তা-ও সত্যি। উপরন্তু, আমাদের পশ্চিমবঙ্গীয় সাংস্কৃতিক বয়ানে ব্যাপারটা একতরফা। এপার থেকেও যে ওপারে উদ্বাস্তু হয়ে চলে যেতে হয়েছিল মানুষকে, তাদের যন্ত্রণাও যে কম নয়, তা আমাদের সিনেমায় নেই। ওপারের প্রাক-স্বাধীনতা যুগের হিন্দু-মুসলমানের সম্পর্ক তো নেই-ই। এমনকি সাহিত্যেও, ও জিনিসটা আমরা ওপারের আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের লেখায় যত স্পষ্ট করে পাই, এপারের লেখকদের লেখায় পাই না। বাংলার কোনো সাদত হাসান মান্টো নেই ইমতিয়াজ। আপনাদের পাঞ্জাবিদের আছে। তাই আমাদের টোবা টেক সিংদের কথা কেউ লিখে রাখেনি। দেশভাগের পর্বে পাঞ্জাবের মেয়েদের মর্মন্তুদ কাহিনি যেভাবে আপনি আর আপনার সহলেখক নয়নিকা মাহতানি লিপিবদ্ধ করেছেন, বাংলা সিনেমা তা করেনি। আমাদের পূর্বপুরুষরা সেই ন্যাকা নৈতিকতার পাপ করেছেন, যাকে আপনার নির্বৈর বিদূষক হয়ে ব্যঙ্গ করে “র‍্যাডক্লিফ বললেন, গান্ধী বলেছেন খারাপ জিনিস দেখতে নেই। তাই আমি দেখব না।”

এই পাপের ফল কী? ফল এই যে, পূর্ববাংলার মুজফফরদের কথাও আমাদের জনপ্রিয় সংস্কৃতিতে অনুপস্থিত। সুতরাং আজ খুব সহজেই পশ্চিমবঙ্গে এই বয়ান খাড়া করা যাচ্ছে যে দেশভাগের সব দায় একটা সম্প্রদায়ের, অন্য সম্প্রদায় শুধুই তার শিকার। এ-ও সহজেই বিশ্বাস করানো যাচ্ছে যে হিন্দু, মুসলমান চিরকালই একে অপরের শত্রু ছিল; কখনো তাদের মধ্যে মৈত্রী ছিল না। আপনার ছবিতে র‍্যাডক্লিফ লাইন বিরতির ঠিক আগে একটা উঠোনকে দুভাগ করে দিয়ে রক্তের রঙে ফুটে উঠছে পর্দায়, আর আজকের বাংলা ছবিতে র‍্যাডক্লিফ লাইন পর্দায় ফুটে উঠছে সাম্প্রদায়িক আইটেম নাম্বারে দুই বাংলা জুড়ে যাওয়ার কাল্পনিক ভয় দেখাতে। সে ভয় ঋত্বিককে নিয়ে ফেসবুকে গদগদ হওয়া বাঙালির পছন্দ হচ্ছে, তারা হলও ভরাচ্ছে। তাই আমাদের কোনো ইমতিয়াজ নেই, আমাদের কোনো ইমতিয়াজ অদূর ভবিষ্যতে হবেও না। বরং সম্ভব হলে আমরা পশ্চিমবঙ্গের মধ্যেও একের পর এক র‍্যাডক্লিফ লাইন টেনে দেব, যতক্ষণ না বাঙালি বলে জাতিটাই অবলুপ্ত হয়ে যায় হিন্দু আর মুসলমানে ভাগ হতে হতে।

আপনাকে নমস্কার জানিয়ে স্বীকার করে নিই, আপনারা পাঞ্জাবিরা ট্রমার মুখোমুখি দাঁড়ানোর সাহস রাখেন। তাই আপনাদের পার্টিশন মিউজিয়াম আছে। তাতে শুধু ঘৃণায় ইন্ধন জোগানোর কাজ হয় না, একে অপরের ঘায়ে হাত বুলিয়ে উপশমের কাজও হয়। তাই হয়তো শিখ মহিলাদের, মুসলমান দাঙ্গাবাজদের হাত থেকে বাঁচতে সপরিবার আত্মহত্যার পাশাপাশি ভারত থেকে পাকিস্তানগামী মুসলমান উদ্বাস্তুদের ট্রেনে শিখ দাঙ্গাবাজদের হত্যালীলার মাঝে মুসলমান সেজে থাকা এক শিখের দৃশ্য উঠে আসতে পেরেছে আপনার ক্যামেরায়। ট্রমা অতিক্রম করে আমৃত্যু প্রেম করার মুরোদ আপনাদের আছে ইমতিয়াজ। আমাদের নেই। একথা বারবার প্রমাণিত হচ্ছে। কয়েক মাস আগেই আরেক পাঞ্জাবি, বরুণ গ্রোভার, তাঁর ঋজু বিদূষণায় শিখদের দেশভাগের ট্রমা এবং তা থেকে জন্ম নেওয়া মুসলমানবিদ্বেষ নিয়ে রসিকতা করেছেন। তারপর বলেছেন, তাঁর পরিবার অধুনা পাকিস্তানে তাঁদের ভিটে ছেড়ে আসার সময়ে একখানা প্রদীপ জ্বেলে রেখে এসেছিল, এই আশায় যে শিগগির ওবাড়িতে ফিরে যাওয়া হবে। সীমান্তের এপারে এসে যেখানে আশ্রয় নেওয়া হল, সেখানেও একখানা প্রদীপ জ্বলছিল। মানে এবাড়ি যে পরিবার ছেড়ে গেছে, তাদেরও আশা ছিল তারা ফিরে আসবে। রূঢ় বাস্তব হল, “ম্যায় ওয়াপস আউঙ্গা” বলে গিয়ে কেউ আর সে যুগে ফিরে আসতে পারেনি। কিন্তু বরুণদের নতুন বাড়িতে সেই প্রদীপ রোজ জ্বালানো হত এই আশায় যে, পুরনো বাড়িতে যে পরিবার গেছে তারাও ওঁদের জ্বালিয়ে আসা প্রদীপ জ্বেলে রাখছে। এভাবেই “মানুষের মৃত্যু হলে তবুও মানব থাকে যায়”।

কথাটা বরিশাল থেকে আসা বাঙালি কবির লেখা হলেও, দেখা যাচ্ছে এপারের বাঙালি শিল্পী, সাহিত্যিকদের ওতে বিশ্বাস কম। আপনাদের মত পাঞ্জাবি শিল্পীদেরই বেশি বিশ্বাস। তাই বাঙালি হিসাবে আপনার ও আপনার পূর্বপুরুষদের প্রতি অশেষ কৃতজ্ঞতা রইল, আমার পূর্বপুরুষদের জন্য রইল অভিসম্পাত।

ইতি

এক অপাংক্তেয় বাঙালি।

সঙ্ঘারামের রক্তকরবী: রাবীন্দ্রিক অথচ সমসাময়িক

বাংলার শিল্পীদের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের সংলাপ জারি আছে, একই সময়ে দু-দুটো নাট্যদল রক্তকরবী মঞ্চস্থ করছে, আর আপনি দেখতে না গিয়েই সবটা জেনে ফেলবেন?

এই মুহূর্তে আফ্রিকার বেশ কিছু দেশে ইবোলা মহামারী চলছে। কঙ্গোয় সেই মহামারীর কেন্দ্রবিন্দু হল প্রবল দারিদ্র্যে ধ্বস্ত শহর মংবোয়ালু। কী আছে সেই শহরে? আছে সোনার খনি, গোটা এলাকার অর্থনীতি সেই খনির উপর নির্ভরশীল। আর সেই খনিতে কাজ করেন প্রচুর প্রবাসী শ্রমিক। অর্থাৎ মাটির নিচে সোনা, অথচ মাটির উপরের মানুষগুলো, সেই সোনা যারা খুঁড়ে বের করে সেই মানুষগুলো, হদ্দ গরিব। প্রয়াত পল ফার্মারের মত চিকিৎসক তথা নৃতত্ত্ববিদ লিখেছেন যে আফ্রিকার কঙ্গো, সিয়েরা লিওনের মত দেশের মানুষকে যুগের পর যুগ সোনা বা হীরের লোভে যেভাবে শোষণ করা হয়েছে, ওখানে বারবার মহামারী দেখা দেওয়ার তা অন্যতম কারণ। সুতরাং ২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে যদি কারও সন্দেহ হয়, রক্তকরবী নাটকের যক্ষপুরী সম্পূর্ণ কাল্পনিক, তাহলে তাকে মংবোয়ালুর খোঁজ দেওয়াই যথেষ্ট। সেখানে গেলেই দেখা পাওয়া যাবে এই নাটকের ফাগুলাল, চন্দ্রা, কিশোর, বিশু পাগল, গোকুলদের। নন্দিনী আর রঞ্জনের দেখা পাওয়া যাবে কি? সম্ভবত না, কারণ সোনা আর হীরের ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে ইলন মাস্ক, জেফ বেজোসের মত সর্দারদের হারাতে নন্দিনী আর রঞ্জনের সন্ধানই মানুষের সন্ধান। এই সন্ধান আছে বলেই রক্তকরবী ‘সত্যমূলক’ হলেও নাটক, ইতিহাস নয়। তবে কেবল মংবোয়ালু তো যক্ষপুরী নয়, রক্তকরবী নাটক প্রকাশের শতবর্ষ পরে আজ গোটা দুনিয়াটাই যক্ষপুরী। সেই সত্য তুলে ধরতে ক্যান্টিন আর্ট স্পেসের পর, হাতিবাগান সঙ্ঘারামের সত্যনিষ্ঠ প্রযোজনাও দেখার সুযোগ হল সম্প্রতি।

রক্তকরবী নাটকের উপস্থাপনায় মঞ্চসজ্জা বরাবরই খুব আলোচিত বিষয়। প্রদীপ কুমার পাত্র আর মদন মিস্ত্রি এখানে যে যক্ষপুরী বানিয়ে তুলেছেন তা ধ্রুপদী রবীন্দ্রনাটকের মেজাজ বজায় রেখেই আজকের দুনিয়াকে স্পষ্ট করে তুলেছে। মঞ্চের দুই প্রান্তে রাস্তার আলোর স্তম্ভে ক্লোজ সার্কিট টিভির শ্যেনদৃষ্টি এবং রাজার বন্ধ দরজার ঠিক উপরেও তার উপস্থিতি জর্জ অরওয়েলের 1984 উপন্যাসকে মনে পড়িয়ে দেয়। আমরা সবাই যে এক ডিসটোপিয়ায় বসবাস করছি, আজকের পৃথিবীর ব্যবসায়ীরা এবং রাষ্ট্র যে নজরদারি চালায় নাগরিকদের উপর, সেই আধুনিক সত্য অনায়াসে রাবীন্দ্রিক হয়ে ওঠে যখন বিশু (তথাগত চৌধুরী) ওই ক্যামেরার দিকেই আঙুল তুলে ফাগুলালকে (কল্লোল দে) বলে “তোদের আদর পড়ে যেখানে সর্দারের দৃষ্টি পড়ে সেখানেই, সোনাব্যাঙ যতই মকমক শব্দে কোলাব্যাঙের অভ্যর্থনা করে, সেটা কানে গিয়ে পৌঁছয় বোড়াসাপের।” পরিচালকের কল্পনার সঙ্গে মঞ্চ পরিকল্পনা ও নির্মাণের এই সুর মেলানো অপূর্ব। পাশাপাশি এই মঞ্চ পুঁজিবাদের ধারাবাহিকতাকেও ধারণ করেছে। বড় বড় দাঁতওয়ালা চাকা দেখে মনে পড়ে যায় চার্লি চ্যাপলিনের মডার্ন টাইমস ছবির সেই দৈত্যাকৃতি চাকাগুলোকে। রাজার রহস্যময়তার অনেকটাও মঞ্চসজ্জার কৃতিত্ব। যে অর্ধস্বচ্ছ দরজার ওপার থেকে রাজা (অনুরণ সেনগুপ্ত) কথা বলে, তাতে পড়া রাজার ছায়া তার ভয়ঙ্করতা এবং অসহায়তাকে দর্শকের সামনে অতিকায় করে তোলে।

দীপ্তেশ মুখার্জি আর অভিরূপ দে-র অবদানে এই নাটকে শব্দ ও সঙ্গীত যে আবহ নির্মাণ করেছে তা-ও স্বতন্ত্র উল্লেখের দাবি রাখে। শুরুতেই তালবাদ্য সহযোগে এবং মধুরিমা গোস্বামীর অঙ্গবিন্যাসে সোনা খনন দর্শকের মনোযোগ আকর্ষণ করে নেয়।

অভিনয়ের আলোচনায় আসতে দেরি করলাম, কারণ রবীন্দ্রনাথ যে ভাষায় এই নাটক রচনা করেছেন, তার বিমূর্ততাকে মূর্ত করে তোলায় মঞ্চ, শব্দ, সঙ্গীতের ভূমিকা অতি গুরুত্বপূর্ণ। ওখানে প্রয়াস ব্যর্থ হলে মনোযোগী রবীন্দ্রপাঠক দর্শক ছাড়া আর কাউকে স্রেফ অভিনয় দিয়ে ছুঁয়ে ফেলা এই নাটকে বেশ কঠিন। অভিনয়ের আলোচনা শুরু করা যাক নন্দিনীকে দিয়েই।

নন্দিনী আসলে কে? যক্ষপুরীর কড়া নিয়মে এই মস্ত বেনিয়মটি হাজির হল কোথা থেকে? রবীন্দ্রনাথের নিজের ব্যাখ্যায় “জেলেদের জালে দৈবাৎ মাঝে-মাঝে অখাদ্যজাতের জলচর জীব আটকা পড়ে। তাদের দ্বারা পেটভরা বা ট্যাঁকভরার কাজ তো হয়ই না, মাঝের থেকে তারা জাল ছিঁড়ে দিয়ে যায়। এই নাট্যের ঘটনাজালের মধ্যে নন্দিনী নামক একটি কন্যা তেমনিভাবে এসে পড়েছে।” নাটকের শেষদিকে আমরা যক্ষপুরীর মত হিংস্র খনি এলাকায় নন্দিনীর গ্রামের কথা শুনতে পাই, সে গ্রামের মানুষের কথাও পাই। সে খেতের কথা বলে, ফসলের কথা বলে, ফুল তার অঙ্গে, রং তার মনে। এই চরিত্রে ঈস্পীতা ঘোষ যতবার মঞ্চে আসেন, মঞ্চ জুড়ে থাকা অন্ধকার ও অবসাদে আলোর সঞ্চার হয়। এর কৃতিত্ব শ্রমিকদের গাঢ় নীল পোশাক, মঞ্চের দখল নিয়ে রাখা কালো রঙের বিপরীতে ঈস্পীতার সবুজ শাড়ি, হলুদ ব্লাউজ আর লাল ফুলের যতখানি (রূপসজ্জা: সঞ্জয় পাল), ততখানিই তাঁর অভিনয়ের। তিনি লঘু পায়ে চলে ফিরে বেড়ান, সে চলা নাচ নয় অথচ ছন্দময়। ঘোর লাগিয়ে দেওয়ার মত রূপ না থাকলে নন্দিনীর চরিত্রে বিশ্বাসযোগ্য হয়ে ওঠা শক্ত, কিন্তু সে রূপ সম্পূর্ণ হয় অভিনয় ক্ষমতা দিয়ে। বস্তুত, ঘন্টা দুয়েকের বিরতিহীন নাটকের মধ্যেই দুজন নন্দিনীকে দেখা যায়। এক নন্দিনী আনন্দকে, বিদ্রোহকে এমনভাবে ছড়িয়ে দিতে পারে পুরুষের মধ্যে যে গোকুল (অর্ক চক্রবর্তী) বা চন্দ্রা (মধুরিমা) তাকে বিপদ বলে মনে করে। আরেক নন্দিনীকে দেখা যায় একেবারে শেষদিকে, যে দিশেহারা। আনন্দের বদলে শঙ্কাই তার অভিজ্ঞান। এই দুই নন্দিনীর চরিত্রেই ঈস্পীতা চমৎকার। তবে গান গাওয়ার সময়ে তাঁকে কিছুটা দুর্বল লাগে।

বিশু পাগল রক্তকরবী নাটকের কতখানি, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। এক নারীর হাতে আকাশের চাঁদ এনে দিতে সে যক্ষপুরীতে এসেছিল। তারপর তাকে চরবৃত্তি করতে লাগিয়ে দিয়েছিল সর্দাররা। কিন্তু সে কাজ বিশুর দ্বারা হয়নি। তাই তার অবস্থা আর পাঁচজন শ্রমিকের চেয়েও খারাপ। অথচ সে যাদের বিরুদ্ধে চরবৃত্তি করতে এসেছিল তারাই তাকে ভালোবাসে। সর্দারদের লোক থেকে শ্রমিকদের লোক হয়ে যাওয়ায় বিশুর স্ত্রীও তাকে ত্যাগ করেছে। এতখানি নিঃস্বতা সত্ত্বেও যক্ষপুরীতে বিশু একমাত্র লোক, যার গান নন্দিনীকেও মুগ্ধ করে। এই তিক্ততাহীন বিশুর চরিত্রকে তথাগত (যিনি এই নাটকের নির্দেশকও) প্রায় দার্শনিক উচ্চতা দান করেছেন। তাঁর দরাজ গানের গলা বিষণ্ণ সংলাপ উচ্চারণের সময়েও এক ধরনের নিরাসক্তির আভাস দেয়। যেন এমন একজন মানুষ, যে চোখের জলের জোয়ারেও ভোলে না যে ডাঙা আছে। তথাগতর বিশু একইসঙ্গে প্রেমিক ও সন্ন্যাসী।

মাত্র কয়েকদিন আগেই ক্যান্টিন আর্ট স্পেসের রক্তকরবী প্রযোজনায় আজকের বাংলা নাট্যমঞ্চের আরেক প্রতিভাবান অভিনেতা বুদ্ধদেব দাসের অভিনয় দেখার সুযোগ হয়েছে। দুজন ভালো অভিনেতা একই চরিত্রের কেমন দুরকম ব্যাখ্যা করেন তা এত অল্প সময়ের ব্যবধানে দেখার বিরল সুযোগ এই মুহূর্তে এই বাংলার দর্শকের হাতের মুঠোয়। বুদ্ধদেবের বিশুর সর্বাঙ্গে লেগে থাকে বিষাদ, তথাগতর মুখে লেগেই থাকে অনির্বচনীয় হাসি। যেন তিনি জানেন, জীবনের রণ রক্ত সফলতা সত্য, তবু শেষ সত্য নয়। রাজা একবার জিজ্ঞেস করে, নন্দিনীর সঙ্গে ও কে? “রঞ্জনের জুড়ি নাকি?” তার উত্তরে বিশু বলে “না রাজা, আমি রঞ্জনের ও-পিঠ, যে পিঠে আলো পড়ে না— আমি অমাবস্যা।” এই সংলাপ যখন বুদ্ধদেব বলেন, তখন ঝরে পড়ে রঞ্জন হতে না পারার হতাশা। আর তথাগত যখন বলেন, তখন মনে হয়— তিনি রঞ্জন নন এবং রঞ্জন হতে চান না। তিনি নিজের অবস্থানে খুশি। বড় বিস্ময় লাগে এই দুই অভিনেতাকে দেখে। আমাদের তো আজ বিশেষ কিছুই নেই। তবু একজন তথাগত আর একজন বুদ্ধদেব আছেন!

রাজার চরিত্রে অনুরণও চমকপ্রদ। এই চরিত্রের অভিনেতার হাতে যে কণ্ঠস্বর ছাড়া বিশেষ কোনো আয়ুধ নেই তা তো সবাই জানেন, কিন্তু এখানে অনুরণকে একটা বাড়তি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছেন নির্দেশক— গলার পাশাপাশি ছায়া দিয়েও অভিনয় করতে হয়েছে। অর্থাৎ এখানে রাজাকে একেবারে দেখা যায় না তা নয়, সারাক্ষণই রাজার ছায়া দেখা যায়। সুরজ বিশ্বাস ও ধনপতি মণ্ডলের আলোকসম্পাতে এ এক অদ্ভুত কাণ্ড। অনুরণ যে দক্ষতায় নিজের ছায়ার উচ্চতা বাড়িয়ে কমিয়ে এবং কণ্ঠস্বরের নিপুণ ব্যবহারে রাজার বিরাট ভাবমূর্তি তৈরি করেন, তা ভেঙে পড়ে শেষ পর্বে তাঁর অন্তরাল থেকে বেরিয়ে আসায়। তখন অনুরণের সত্যিকারের দৈহিক উচ্চতা যে বৈপরীত্য তৈরি করে তার সঙ্গে মানানসই তাঁর বিধ্বস্ত, প্রতারিত অথচ হার না মানা মানুষের অভিনয়।

আরও পড়ুন রক্তকরবী: প্রযোজনা আন্তর্জাতিক, কিন্তু বাংলা কি?

ফাগুলালের চরিত্রে কল্লোল আর তার স্ত্রী চন্দ্রার চরিত্রে মধুরিমা সাক্ষাৎ শ্রমিক ও তার গিন্নী। ঠিক যেমন জীবন থেকে উঠে আসা অধ্যাপক মনে হয় অনন্য শঙ্কর দেবভূতিকে। অন্যান্য ছোট কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে দীপজ্যোতি মণ্ডল (কিশোর), অর্ক, জয়ন্ত মিত্র (সর্দার), অভিজিৎ নাগ (গোঁসাই) যথাযথ। অভিরূপের গিটার এবং নীলার্ঘ্য দত্তর ব্যাঞ্জো এই নাটকে কতখানি গুরুত্বপূর্ণ তা বুঝিয়ে বলতে গেলে কবীর সুমন দিয়ে কীভাবে রবীন্দ্রনাথকে ছুঁয়ে ফেলেছেন নির্দেশক, সেকথাটা বলে দিতে হবে। কিন্তু সে রহস্য উদ্ঘাটন করব কেন? বাঙালির এই দুঃসময়েও বাংলার শিল্পীদের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের সংলাপ জারি আছে, একই সময়ে দু-দুটো নাট্যদল রক্তকরবী মঞ্চস্থ করছে, আর আপনি দেখতে না গিয়েই সবটা জেনে ফেলবেন? এমন অন্যায়ে প্রশ্রয় দেব না।

ক্যান্টিন আর্ট স্পেসের প্রযোজনার উপসংহার নিয়ে আমার আপত্তির কথা লিখেছিলাম। হাতিবাগান সঙ্ঘারামের নাটকের উপসংহার অতখানি পার্টিজান নয়, ‘পৌষ তোদের ডাক দিয়েছে’-র সঙ্গে শ্রুতিমধুর মিশ্রণ ঘটানো হয়েছে ‘হেই সামালো ধান হো’-র। কিন্তু শ্রুতিমধুর হলেও এই সৃজনান্তর নাটকের বার্তাকে একটা অস্বস্তিকর জায়গায় নিয়ে গেছে বলে মনে হয়। নাটকটাকে আগাগোড়া সমকালীন করে তোলা হয়েছে, কিন্তু শেষে তেভাগা আন্দোলনের সময়কার এই গানের আবাহন থেকে কি এই সিদ্ধান্ত করব যে যক্ষপুরী থেকে পরিত্রাণের পথ হিসাবে কৃষিপ্রধান সভ্যতাকেই দেখলেন তথাগত ও তাঁর দল? সে সমাধান রবীন্দ্রনাথের সময়ে বাস্তবোচিত হলেও, আজকের দিনে কিন্তু একেবারেই কল্পকথা। রবীন্দ্রনাথ যখন এই নাটক লেখেন তখন তাঁর বন্ধু মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী গ্রামভিত্তিক রাষ্ট্রের ধারণা দিচ্ছিলেন। সেই ধারণা স্বাধীন ভারতে পরিত্যক্ত হয়, গান্ধীরই শিষ্য জওহরলাল নেহরুর পৌরোহিত্যে আমাদের অর্থনীতির ভিত হয়ে দাঁড়ায় ভারি শিল্প ও বাঁধ। সেখান থেকে বহু যুগ পার করে আমরা এখন বিশ্বব্যাপী গিগ অর্থনীতি এবং প্রযুক্তিভিত্তিক সামন্ততন্ত্রের (techno-feudalism) কবলে। এ যুগের সোনার খনির শ্রমিকদের নিস্তারের পথ কৃষিকাজে নেই। বিশ্বজুড়ে জমির সংকট, জমি থাকলেও জলের সংকট। সেই সংকট আরও বাড়াচ্ছে বেজোস, মাস্ক, স্যাম অল্টম্যানদের ইয়া বড় সব ডেটা সেন্টার। এখন ধানের নামে হাত মুষ্টিবদ্ধ করে কোনো লাভ হবে কি?

এ প্রশ্নের উত্তর খোঁজার দায় কেবল নাট্যকর্মীদের উপর চাপিয়ে দিলে অবশ্য অন্যায় হবে। তাঁরা শিল্পী, তাঁদের মূল কাজ সত্য তুলে ধরা এবং স্বপ্ন দেখানো। সে কাজ এই নাটকে শতকরা একশো ভাগ সততায় করা হয়েছে। তবে শিল্পীদের কাজেও তো আমরা ভবিষ্যতের ইশারা খুঁজি; বিশেষ করে সেইসব শিল্পীদের কাজে, যাঁরা শতবর্ষ আগের শিল্পকে নিজের সময়ের মাটিতে দাঁড় করানোর স্পর্ধা দেখান।

রক্তকরবী: প্রযোজনা আন্তর্জাতিক, কিন্তু বাংলা কি?

এমনই তাঁর অভিনয়ের জাদু যে মনে হয়, রবীন্দ্রনাথ যেন বিশু পাগলের চরিত্র লিখেছিলেন বুদ্ধদেব দাস অভিনয় করবেন বলেই।

ভারতীয় নাট্যজগতের প্রবাদপ্রতিম নট ও নাট্যকার গিরীশ কারনাড প্রায় দেড় দশক আগে একবার বাঙালির প্রবল বিরাগভাজন হয়েছিলেন। কারণ তিনি বলেছিলেন— রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর মহান কবি, কিন্তু দ্বিতীয় সারির এবং মাঝারি মানের নাট্যকার। তাঁর নাটকের গরিব চরিত্রগুলো ‘কার্ডবোর্ড ক্যারেক্টার্স’। নাট্যকার হিসাবে তিনি বাদল সরকার, মোহন রাকেশ এবং বিজয় তেন্ডুলকরকে রবীন্দ্রনাথের থেকে বেশি নম্বর দিয়েছিলেন। হিন্দুদের ৩৩ কোটি ঠাকুর, বাঙালির তখন ছিল ৩৩ কোটি ১। ফলে কারনাডের এই মতামতে প্রবল রুষ্ট হয়েছিলেন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় থেকে শুরু করে শ্রমিক নেতা গুরুদাস দাশগুপ্ত পর্যন্ত সকলেই। গিরীশের সমালোচনার কোনো চর্চিত উত্তর দেওয়া হয়েছিল— এমন দৃষ্টান্ত এই লেখা লিখতে বসে খুঁজে পাচ্ছি না। গিরীশের সমালোচনার উত্তরে বাংলার কোনো নাট্যদল রবীন্দ্রনাথের কোনো নাটক মঞ্চস্থ করে শৈল্পিক প্রতিবাদ করেছিল কিনা, তাও জানতে পারছি না। স্মৃতি থেকে যতটুকু উদ্ধার করতে পারছি, তাতে শেয়ালের কুমির ছানা দেখানোর মত করে বহুরূপীর রক্তকরবী প্রযোজনার কথাই তুলে ধরা হয়েছিল বিভিন্ন মহল থেকে। তবে এই মুহূর্তে বাংলার মঞ্চে অন্তত দুটো দল রক্তকরবী অভিনয় করছে— হাতিবাগান সঙ্ঘারাম ও ক্যান্টিন আর্ট স্পেস। দ্বিতীয় দলটার অভিনয় সম্প্রতি দেখার সুযোগ হল। তারা রবীন্দ্রনাথের এই বহু আলোচিত নাটককে যেভাবে সমসাময়িক করে তুলেছে, তাতে কারনাড জীবিত থাকলে হয়ত নিজের মন্তব্য পুনর্বিবেচনা করতে বাধ্য হতেন। রবীন্দ্রনাথের নাটক যে এমন এক বিমূর্ততাকে ছুঁয়ে আছে, যা দিয়ে একশো বছর পরের মূর্ততাকেও ধরে ফেলা যায়— তা এই প্রযোজনায় দিনের আলোর মত পরিষ্কার। একথা সত্যি যে সোনার খনির শ্রমিকরা বলে না ‘বনের মধ্যে পাখি ছুটি পেলে উড়তে পায়, খাঁচার মধ্যে তাকে ছুটি দিলে মাথা ঠুকে মরে।’ এই দার্শনিকতা যদি তাদের মনে কাজ করেও, তা এইভাবে প্রকাশ করার মত ভাষাজ্ঞান তাদের থাকে না। কিন্তু কথাটা এতদূর সত্য যে তা ১৯২৫ সালে যতখানি সত্য ছিল, ২০২৬ সালেও সমান সত্য। হয়ত আজ আরও বেশি সত্য। কারণ এখন আর কেবল খনি শ্রমিক নয়, কর্পোরেট মজুরদের জীবনেও সত্য। শঙ্খ ঘোষ লিখেছিলেন— সত্য বলা ছাড়া কবিতার কোনো কাজ নেই। সেকথা তো যে কোনো শিল্পমাধ্যমের জন্যেই সত্যি।

রবীন্দ্রনাথের নাটকে আজকের সত্যানুসন্ধানে ক্যান্টিন আর্ট স্পেস যা যা করেছে তার মধ্যে সবচেয়ে অভিনব হল মঞ্চসজ্জা। দর্শকাসনকে চারদিক থেকে ঘিরে তৈরি হয়েছে মঞ্চ, যা স্বাভাবিকভাবেই দর্শকাসনের চেয়ে উঁচুতে। ফলে নাটকের শুরুতেই যখন ফাগুলাল (ঋদ্ধিবেশ ভট্টাচার্য) বলে, আপনারা খনি এলাকায় এসে পড়েছেন, তখন তা কথার কথা থাকে না। খনির মধ্যে বসে থাকার অনুভূতি হয়। নাট্যকার রচিত মূল সংলাপ ব্যবহার করেই অন্য ঘটনাবলী, শব্দ, দৃশ্য আমদানি করে প্রযোজনার কাছাকাছি সময় দেখানো সাম্প্রতিককালে বাংলায় উইলিয়াম শেক্সপিয়রের নাটকের প্রযোজনায় জলভাত। স্বপ্নসন্ধানীর হ্যামলেট-এ যেমন চলে আসে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাওয়ার প্রসঙ্গ, ম্যাকবেথ-এ এসে পড়ে গাজা। কিন্তু রবীন্দ্রনাথের সৃষ্টিকে এভাবে একেবারে আজকের মাটিতে নামিয়ে আনার প্রচেষ্টা সুলভ নয়। এই প্রচেষ্টার আরও বেশি প্রশংসা প্রাপ্য এইজন্যে যে ব্যাপারটা স্রেফ জয়রাজ ভট্টাচার্যের করা সিনোগ্রাফি আর অভিনেতাদের পোশাক-আশাকে থেমে থাকেনি। ফাগুলাল এখানে হিন্দিভাষী শ্রমিক, সে আর তার বউ চন্দ্রা (দেবপ্রিয়া অধিকারী) দেহাতি ভাষাতেও বাক্যালাপ করে। সর্দার (বিপ্লব বন্দ্যোপাধ্যায়) এখানে গলফ খেলে অবসর যাপন করা কর্পোরেট এক্সিকিউটিভ, অধ্যাপক (অনসূয়া রাকা) সংবেদনশীল হলেও মধ্যবিত্ত অভ্যাসের বাইরে যেতে না পারা মহিলা বুদ্ধিজীবী। এইসব উচ্চশ্রেণির মানুষের মুখের ভাষায় মিশে থাকে যথেচ্ছ ইংরিজি। তবে নাটকের মূল বয়ানের বিনির্মাণের সেরা দৃষ্টান্ত শ্রমিকদের নম্বরে চিহ্নিত ইউনিফর্ম, যেখানে বিশু পাগলের নম্বর হল 69NG (রবীন্দ্রনাথের কলমে যা ৬৯ঙ), অর্থাৎ কিনা NOT GOOD। নন্দিনীর মত প্রতিষ্ঠানবিরোধী, প্রচলিত ব্যবস্থার গোড়া ধরে টান দেওয়া চরিত্রের মুখে ইংরিজি সংলাপ— বিশেষত একেবারে শেষদিকে ‘brutal capitalism’— অবশ্য বাহুল্য মনে হয়।

যেমন বাহুল্য মনে হয় কমিউনিস্ট ইন্টারন্যাশনাল গেয়ে নাটকের সমাপ্তি। রবীন্দ্রনাথ কোনো ভান করেননি। রক্তকরবীর ভূমিকায় ‘নাট্যপরিচয়’-এ পরিষ্কার লিখে দিয়েছেন ‘এই নাটক সত্যমূলক’। সুতরাং তাঁর আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু যে ধনতন্ত্র আর দেখাচ্ছেন শ্রমিকদের জীবন, তা নিয়ে কোনো সংশয়ের অবকাশ কোনোদিনই ছিল না। নাটকের শেষে যে ভাঙনের জয়গান, তা যে শ্রমিক অভ্যুত্থানই— তাও চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেওয়ার প্রয়োজন পড়ে না। তারপরেও কমিউনিস্ট ইন্টারন্যাশনালের মত পার্টিজান উপাদান ব্যবহার করলে বাম রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত বা তার প্রতি অনুরক্ত দর্শকরা আলাদা তৃপ্তি পেতে পারেন, কিন্তু আজকের দিনে এই নাটককে বৃহত্তর দর্শকসমাজের কাছে পৌঁছে দেওয়া জরুরি। সে কাজে ব্যাঘাত ঘটা অসম্ভব নয়। অবশ্য এই নাটকের দর্শক হিসাবে কাদের চান বা কাদের চান না, সে সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীনতা যাঁরা এই নাটক করছেন তাঁদেরই।

একথা বলা এই জন্যে যে এই প্রযোজনার মধ্যে বৃত্ত বড় করে ফেলার সম্ভাবনা আছে। কারণ এখানে যত্ন করে দৃশ্য নির্মাণ করা হয়েছে এবং অভিনেতারা প্রায় সবাই নিজেদের ক্ষমতার পূর্ণ সদ্ব্যবহার করেছেন। ফলে কোথা দিয়ে দু ঘন্টা কেটে যায় টের পাওয়া যায় না। এই নাটকে প্রাণ আছে।

রক্তকরবী পড়া আছে বা দেখা আছে এমন সকলেই জানেন যে এই নাটকের প্রাণ হল নন্দিনী, বিশু, আর নেপথ্য থেকে রাজা। এই প্রযোজনায় বিশুর চরিত্রে বুদ্ধদেব দাস একজন জিনস পরা আধুনিক যুবক, যিনি খালি গলায় যেমন ‘চোখের জলের লাগল জোয়ার’ গেয়ে ওঠেন, তেমন গিটার বাজিয়ে ‘জামাইকা ফেয়ারওয়েল’ গেয়ে যক্ষপুরীতে আসার আগের জীবনের বেদনাবিধুর স্মৃতিচারণও করেন। তাঁর গুপ্তচর হয়ে যক্ষপুরীর শ্রমিকদের মধ্যে প্রবেশ করার স্বীকারোক্তিতে নমকহারাম (১৯৭৩) ছবির রাজেশ খান্নাকে মনে পড়ে। এতৎসত্ত্বেও এমনই তাঁর অভিনয়ের জাদু যে মনে হয়, রবীন্দ্রনাথ যেন বিশু পাগলের চরিত্র লিখেছিলেন বুদ্ধদেব অভিনয় করবেন বলেই। বুদ্ধদেবের অভিনয় প্রতিভা বাংলা নাটকের দর্শকদের মধ্যে বেশ কিছুদিন হল সমাদৃত। কিন্তু বিশুর চরিত্রে এই অভিনয়ে এত পরত যে অভিনেতা থেকে চরিত্রকে আলাদা করাই শক্ত হয়ে যায়। যে অহংবোধ এবং বেদনা মিশিয়ে তিনি বলেন ‘তোর সেই কিছু-না-দেওয়া আমি ললাটে পরে চলে যাব। অল্প-কিছু দেওয়ার দামে আমার গান বিক্রি করব না’, আর যে রাজনৈতিক প্রজ্ঞায় বলেন ‘চুপ করাটাকে যে শুনতে পায়, তাতে আপদ আরো বাড়ে’, তাতে আশ্চর্য বিশ্বাস ফুটে ওঠে। মনে হয় না, বুদ্ধদেব অন্যের লেখা সংলাপ বলছেন। অভিনেতা কীভাবে নিজের শরীরকে ব্যবহার করলেন, শ্বাসকষ্টের অভিনয় কতটা নিখুঁত হল— এসব তথ্য নেহাত অপ্রাসঙ্গিক মনে হয়। কারণ ওগুলো যে অভিনয় সেকথা ততক্ষণে ভুলে গেছি। আশ মেটে না বুদ্ধদেবের গলায় গিটারের ঝংকার সমেত ‘তোমায় গান শোনাব’ দু-এক লাইন শুনে, বরং খালি গলায় আরও খানিকটা শোনা গেলে হয়ত প্রাণের আরাম হত।

সেই তুলনায় নন্দিনীর চরিত্রে শ্রাবন্তী ভট্টাচার্য প্রথম দিকে কিছুতেই যেন সপ্তমে পৌঁছতে পারেন না। নন্দিনীর মাদকতা অন্য চরিত্রগুলোর সংলাপ থেকেই বুঝে নিতে হয়। বরং নাটকের পরের দিকে যখন নন্দিনী ক্রমশ রণরঙ্গিনী হয়ে ওঠে, তখন শ্রাবন্তীর দেহভঙ্গিমা অনেক বেশি সাবলীল লাগে। রঞ্জনের মৃত্যুতে তাঁর শোকের বিদ্রোহের উন্মাদনায় পরিণত হওয়া বেশি স্পর্শ করে।

দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্যি, খুব বেশি দর্শক এখনো তথাগত চৌধুরীকে চেনেন না। ব্যাপারটা যে দুর্ভাগ্যজনক তা নিয়ে এই নাটক দেখলে আর সন্দেহ থাকবে না। রাজা চরিত্রে তাঁর অভিনয়ের প্রায় একমাত্র সম্বল কণ্ঠস্বর। রবীন্দ্রনাথ তেমনই ধার্য করেছেন। ফলে বহুরূপীর সেই বিখ্যাত প্রযোজনায় এই কঠিন কাজটা করতেন শম্ভু মিত্র স্বয়ং। তথাগত সম্বলকে আয়ুধে পরিণত করেছেন। ক্ষমতার দম্ভ, ক্ষমতার হাতে নিজেই বন্দি হয়ে যাওয়ার এবং তা থেকে বেরিয়ে আসতে না পারার অসহায়তা, নন্দিনীর প্রতি অদম্য আকর্ষণ এবং তার ক্ষুদ্র সহজতার কাছে নিজের বিশালতার পরাজয় তথাগতর কণ্ঠে নদীর জোয়ার ভাঁটার মত খেলতে থাকে। রক্তকরবীর রাজাই সম্ভবত সবচেয়ে রাবীন্দ্রিক। মানবতাবাদী রবীন্দ্রনাথ যক্ষপুরীর একনায়ককে আঁকলেন, অথচ তাকেও ভালোবাসার স্পর্শ থেকে বঞ্চিত করতে পারলেন না। সোনার খনির অন্ধকার থেকে নন্দিনীর আলো দিয়ে তাকেও বের করে নিয়ে এলেন। সে নিজের ধ্বজা নিজেই ভেঙে নিজের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করতে চলল। শোষকের প্রতি এত মমতা কোনো বিদ্রোহ দেখায় না, দেখায়নি। হয়ত কারনাড এই চরিত্রচিত্রণকেই মাঝারিয়ানা বলতেন। কিন্তু রাজার চরিত্রটা এমন যে নন্দিনীর মত আমাদেরও তার প্রতি মায়া পড়ে যায়। পড়বে না, যদি রাজা চরিত্রের অভিনেতা তাঁর চরিত্রের স্ববিরোধী বৈশিষ্ট্যগুলোর কোনো একটায় বেশি জোর দিয়ে ফেলেন। এই টাল সামলাতে পারাই সম্ভবত ওই চরিত্রের অভিনেতার কাজটা কঠিন করে তোলে। সে কাজ চমৎকার করেছেন তথাগত। তিনি তাঁর বদ্ধ ঘরের বিশালতা ছেড়ে যখন দর্শকের চোখের সামনে বেরিয়ে আসেন, তখন ছোট হয়ে যান না। প্রিয় হয়ে ওঠেন।

আরও পড়ুন মহাভারত ২: আজকের মহাকাব্য

ফাগুলালের চরিত্রে ঋদ্ধিবেশের অভিনয় অত্যন্ত স্বতঃস্ফূর্ত, কিন্তু চন্দ্রার চরিত্রে দেবপ্রিয়া অধিকারী চমকপ্রদ। তাঁর হাত নাড়া, মুখ ঝামটা দেওয়া, দেহাতি উচ্চারণ একেবারে পশ্চিমবঙ্গের শ্রমিক মহল্লার হিন্দিভাষী গিন্নীদের মত। বাংলা সংলাপ না থাকলে বিশ্বাস করা শক্ত হত যে চন্দ্রা চরিত্রের অভিনেত্রী বাঙালি। এই প্রযোজনায় রবীন্দ্রনাথের বয়ানের বিনির্মাণে অন্যতম বড় ঝুঁকি নেওয়া হয়েছে অধ্যাপকের চরিত্রকে নারী করে দিয়ে। ব্যাপারটা যে উতরে গেছে তার কৃতিত্ব অনসূয়ার। তিনি অধ্যাপক চরিত্রের পৌরুষ দূর করে তাতে দিব্যি নারীত্ব আরোপ করতে পেরেছেন। নন্দিনীর প্রতি এক ধরনের সমকামী আকর্ষণের আভাস নন্দিনীর চৌম্বক শক্তি বোঝাতেও সহায়ক হয়েছে। শোষণ হচ্ছে মেনে নিয়ে ক্ষমতাকে না চটানোর মধ্যবিত্ত অভ্যাসও অনসূয়া সাবলীলভাবে তুলে ধরেছেন। আর যিনি স্বল্প উপস্থিতিতেও প্রভাব ফেলেন, তিনি হলেন সর্দার চরিত্রে বিপ্লব বন্দ্যোপাধ্যায়। কর্পোরেট শয়তান হয়ে উঠতে তাঁকে উচ্চকিত অভিনয় করতে হয়নি, হাঁটাচলায় মাপা আভিজাত্যের পালিশ দিয়েই কাজ সেরে ফেলেছেন। তাঁর ক্রূরতা তাঁর শীতলতায়।

সবকিছুর পরে একটা ব্যাপারেই মন খুঁতখুঁত করে। এই প্রযোজনার আন্তর্জাতিক মানে ওঠার সাধ্য আছে, সংলাপে একাধিক ভাষার ব্যবহার এবং দর্শকদের হাতে দেওয়া কাগজখানায় কেবল ইংরিজির ব্যবহার থেকে মনে হয়— সাধও আছে। কিন্তু সেদিকে মন দিতে গিয়ে বাংলা কম পড়ে গেল কি? রবীন্দ্রনাথের কিন্তু আন্তর্জাতিক হওয়ার জন্যে কম বাঙালি হওয়ার দরকার পড়েনি। নাজি অধিকৃত ওয়ারশ ঘেটোতে নিশ্চিত মৃত্যুর সামনে দাঁড়িয়ে থাকা শিশুদের ডাকঘর নাটক করার কথা তো আমরা জানি।

নাগরিক ডট নেট ওয়েবসাইটে প্রকাশিত

দর্শকের সামনে নিজেকে খুঁড়ে ফেলার স্পর্ধায় প্রোজ্জ্বল অর্ণ, তথাগত

নাটকের বিভিন্ন মুহূর্তে যে বাবা, মা, প্রথম প্রেম, প্রাণের বন্ধু, বন্ধুর বউ, কলেজের বান্ধবী, প্রেরণাদাত্রী প্রেমিকা, হতাশ স্ত্রী, আলোর মত শিশুসন্তান এবং অন্ধকার অপরাধীরা ফুটে ওঠে অর্ণর অবয়বে— তাদের সঙ্গে আমাদের আত্মার আত্মীয়দের কোনো তফাত নেই।

বাঙালি ভালো নেই, বাংলা থিয়েটারও ভালো নেই। স্বভাবতই থিয়েটার শিল্পীরাও ভালো নেই। অন্তত কয়েকজন চেষ্টা করছেন এই ভালো না থাকা দর্শকের সামনে তুলে ধরতে। সেই প্রয়াসে এই মুহূর্তে অন্তত দুটো একক নাটক হচ্ছে আমাদের আশপাশের মঞ্চে। হাওড়ার দল নটধার অর্ণ মুখোপাধ্যায় নিজের সৃজনে করছেন আবহমানদিল্লির ধৃ আর্ট অ্যান্ড ওয়েলফেয়ার ফাউন্ডেশনের শান্তনু মল্লিকের নির্দেশনায়, হাতিবাগান সঙ্ঘারামের সহযোগিতায়, তথাগত চৌধুরী করছেন দ্য মাস্কারেড এমন নয় যে বাংলা থিয়েটারে একক অভিনয় বিরল। এই কালখণ্ডেই প্রয়াত শাঁওলী মিত্রের প্রবাদে পরিণত নাথবতী অনাথবৎ নতুন করে করছেন অর্পিতা ঘোষ। আমাদের দেখার সৌভাগ্য হয়নি, কিন্তু গত শতকের আট-নয়ের দশকে শাঁওলীর ওই নাটক এবং কথা অমৃতসমান অনেককেই আচ্ছন্ন করে রেখেছিল। পরে অডিও ক্যাসেটে আমাদের কাছেও সেই নৈপুণ্যের ছিটেফোঁটা এসে পৌঁছেছিল, একইভাবে এসেছিল বিপ্লব চট্টোপাধ্যায়ের শকুনির পাশা। কিন্তু সেসব মহাভারতাশ্রয়ী কাহিনির সাহায্যে সত্যান্বেষণ। এই মুহূর্তে অর্ণ আর তথাগত যা করছেন তার মৌলিকত্ব এই যে, তাঁরা পুরাণ বা রূপকের আশ্রয় ছেড়ে নগ্ন বর্তমানে দাঁড়িয়ে নিজেরই ভিতরটা খুঁড়ে দর্শককে দেখাচ্ছেন। অর্ণর নাটকের কেন্দ্রে তবু একজন চরিত্র আছে, যার নাম অর্ণ নয়। তথাগত যে চরিত্রে অভিনয় করছেন সে চরিত্রের কোনো নামও নেই। সে স্রেফ একজন অভিনেতা। দর্শক আর অভিনেতার মধ্যে যে ন্যূনতম আড়াল, তাও সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। বাংলা থিয়েটারের প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য অনেককিছুই এখন মন খারাপ করিয়ে দেওয়ার মত, ভবিষ্যৎ সম্পর্কে হতাশ করার মত। তার মধ্যেও অন্তত দুটো নাটকে এইরকম চেষ্টা হচ্ছে— এ নেহাত সামান্য কথা নয়।

আবহমান নাটকটা দাঁড়িয়ে আছে অর্ণর গল্প বলতে পারার ক্ষমতার উপরে। গল্পটা খুব সামান্য একজন মানুষের অসামান্য যন্ত্রণার। বাঙালি সমাজে ঘাপটি মেরে থাকা ভণ্ডামি, বিশেষত বর্ণবাদ সম্পর্কে ভণ্ডামির উপর, এর আগেও আলো ফেলেছেন অর্ণ। উইলিয়ম শেক্সপিয়রের ওথেলো নাটকের সৃজনান্তর অথৈ এক দশকের কাছাকাছি সময় অত্যন্ত মঞ্চসফল ছিল, যদিও সিনেমায় দর্শকানুকূল্য পায়নি। আবহমানেও একজন নিম্নবিত্ত এবং নিম্নবর্গীয় মানুষের কাহিনিই রয়েছে, যার আশৈশব যন্ত্রণার কারণগুলোর মধ্যে মিশে আছে বর্ণাশ্রমে তার অবস্থান। তবে এই নাটকের সেটাই বিষয় নয়। বিষয় তাহলে কী? এক অর্থে দর্শকই এই নাটকের বিষয়। কারণ সুচারু আত্মহননের ঠিক আগের মুহূর্তে এক ব্যর্থ সাহিত্যিক, ব্যর্থ ব্যক্তির বয়ানে যে জীবনের ছবি উঠে আসে— তা গত তিন-সাড়ে তিন দশকের পশ্চিমবঙ্গের একজন গড়পড়তা যুবকেরই জীবন। আমাদের প্রেম-অপ্রেম, সাফল্য-ব্যর্থতা, শক্তি-দুর্বলতা, সততা-শঠতা, উদ্যম-আলস্য, নারীর উপরে পৌরুষ চাপিয়ে দেওয়ার প্রবণতা আমাদেরই চোখের সামনে তুলে ধরেন অর্ণ। নাটকের বিভিন্ন মুহূর্তে যে বাবা, মা, প্রথম প্রেম, প্রাণের বন্ধু, বন্ধুর বউ, কলেজের বান্ধবী, প্রেরণাদাত্রী প্রেমিকা, হতাশ স্ত্রী, আলোর মত শিশুসন্তান এবং অন্ধকার অপরাধীরা ফুটে ওঠে অর্ণর অবয়বে— তাদের সঙ্গে আমাদের আত্মার আত্মীয়দের কোনো তফাত নেই। ফলে যখন মঞ্চের উপরে চলতে থাকা ঘড়িতে সময় ফুরিয়ে আসা টের পাওয়া যায়, বেজে ওঠে শেষ ঘন্টা আর মঞ্চের ধারে চলে এসে অর্ণ দর্শকদের আঙুল তুলে অভিযুক্ত করেন এই বলে যে, চলে যাওয়ার ইচ্ছে ছিল না, কিন্তু তোমাদেরই তৈরি করা সমাজে আমার বেঁচে থাকার আর উপায় নেই, তখন পালাবার পথ পাওয়া যায় না। সৌমিত দেবের কবিতার পংক্তি আর প্রয়াত জয়দেব ঘোষের ‘মুহূর্তে অমৃত মানুষ মুহূর্তে বিষ’ হাড়ে কাঁপন ধরিয়ে দেওয়ার মত বিশ্বাসযোগ্য লাগে।

মানসিক ও শারীরিকভাবে একেবারে কোণঠাসা হয়ে যাওয়া একজন মানুষকে জ্যান্ত করে তুলতে, একটা লাঠি আর একখানা অস্বস্তিকর বসার জায়গা— দৃশ্যত অর্ণর প্রপ বলতে এটুকুই। কিন্তু তিনি আসল প্রপ করে তোলেন নিজের শরীরকে। কেন্দ্রীয় চরিত্রের আলাদা ব্যক্তিত্ব তৈরি করেন তার অস্থির বাচনভঙ্গি, অনবরত গা চুলকানো, খুঁড়িয়ে চলা দিয়ে। অতীতের মানুষটা যে অন্যরকম ছিল তা বেরিয়ে আসে এসবের মসৃণ অন্তর্ধানে। মঞ্চে অন্য চরিত্রগুলোকে দেখি না, কিন্তু তাদের চোখ দিয়ে কেন্দ্রীয় চরিত্রটাকে দেখি। কখনো অর্ণ গোটা মঞ্চের অধীশ্বর হয়ে ওঠেন, কখনো মঞ্চের শূন্যতা আরও বড় দেখায় তাঁর পড়ে পড়ে লাথি খাওয়ায়, হাহাকারে। জীবনের কাছে হেরে যাওয়া মানুষটা যখন বিরতির পর উদ্ধত ঔদাসীন্যে দর্শকদের সরাসরি বলে— অনেকের হয়ত একঘেয়ে লাগছে। ভালো না লাগলে চলে যেতে পারেন; তখন গুলিয়ে যায়— কথাটা চরিত্র বলছে, নাকি অভিনেতা বলছেন। বাংলা নাটকের এই নড়বড়ে যুগে, জনপ্রিয় হওয়ার জন্যে শস্তা চমকের যুগে স্বয়ং অর্ণই কি জেরজি গ্রোটোওস্কির মত দরজা বন্ধ করে সেই থিয়েটার করতে চাইছেন, যা যার দরকার সে এসে দেখে নেবে?

আরও পড়ুন অপর আর বিজ্ঞানের চিরকালীন ট্র্যাজেডির মঞ্চায়ন ফ্র্যাঙ্কেনস্টাইন

তথাগতর দ্য মাস্কারেড আবার আক্ষরিক অর্থে দরজা বন্ধ করে অভিনয়। এখানে মঞ্চ মানে একখানা ঘর, হলঘর বলার মত বড়ও নয়। সেখানে প্রসেনিয়াম বলেও কিছু নেই। দর্শক ঢুকে পড়েন নাটকের সাজঘরে, কোণের দরজা দিয়ে এসে হাজির হন অভিনেতা। কয়েক ঘন্টা পরেই তিনি মঞ্চে উঠবেন। দর্শকের কাছে তাঁর কিছুই লুকোবার নেই, লুকোবার উপায়ও নেই। অভিনয়ের আগে একটু স্বাস্থ্যকর খাবার দূরের কথা, সাজঘরেই চা বানিয়ে খাওয়ার উপায়টুকুও যে নেই— তা দর্শকের কাছে পরিষ্কার হয়ে যায় শুরুতেই। এখানে প্রপের অভাব নেই, বরং প্রাচুর্য আছে। এমন অনেককিছুই আছে যা দর্শক দেখে ফেললে নাটকের প্রার্থিত রহস্য আর থাকে না। কিন্তু সেটাই উদ্দেশ্য। তথাগত বেসিনে হাত ধোন দর্শকের সামনে, মুখে রং মাখেন দর্শকের সামনে, এমনকি শুধু অন্তর্বাসটুকু রেখে পোশাক পরিবর্তনও করেন দর্শকের সামনেই। অন্তরাল আছে, সেখান থেকে ভেসে আসে শব্দ। সেই শব্দের সঙ্গে আদানপ্রদানও করেন তথাগত, কিন্তু অন্তরালে যান না। মুখোশের পিছনে না গিয়ে, অভিনেতার মুখোশের পিছনের মানুষটাকেই উলঙ্গ চেহারায় দর্শকের সামনে দাঁড় করানোর চেষ্টা করেন।

এই নাটকে আয়নার মুখোমুখি বসে দর্শকের চোখের সামনেই তথাগত দাঁতের ফাঁকের ময়লা খুঁটে পরিষ্কার করেন। এত কাছ থেকে দেখা যায় বলেই শিহরিত হয়ে দেখতে হয়— কী অনায়াসে শুধুমাত্র মুখের পেশির ব্যবহারে গোবেচারা থিয়েটার অভিনেতা থেকে রামলীলার হনুমান, সেখান থেকে ‘জয় শ্রীরাম’ স্লোগান দেওয়া হিংস্র শাখামৃগ, ঋত্বিক ঘটক রচিত গল্পের দেহাতি শ্রমিক ও শ্রমিক নেতা এবং ফাউস্ট ও মেফিস্টোফিলিস হয়ে যান তথাগত। দেখতে দেখতে আফসোস হয়, সিনেমায় নেমে নাম না করলে গুণী অভিনেতাদের আমরা চিনতে পারি না, আদৌ জানতে পারি না। অভিনেতার নিজের আফসোস হয় না? নাম, যশ, অর্থ, প্রতিপত্তির কথা না ভেবে যিনি অভিনয় করে যেতে পারেন সারাজীবন, তিনিই নাকি সৎ শিল্পী। বাকিরা জনপ্রিয়তার কাছে নিজেকে বিকিয়ে দেওয়া ‘মাল’— এমন একটা বয়ান খুব জনপ্রিয় হয়েছে আজকাল। সেই বয়ানকে মাটিতে আছড়ে ভেঙে ফেলে এই নাটক। মই বেয়ে অনেক উপরে উঠে গিয়ে তথাগত সোচ্চারে জানিয়ে দেন, বস্তিবাসীর চরিত্রে অভিনয় করতে করতে তিনি টের পেয়েছিলেন— শাহরুখ খানের মন্নতের মত অট্টালিকা তাঁরও চাই। কিন্তু প্রবল প্রতিভা থাকলেও সবাই শাহরুখ হতে পারে না। তা জেনেই অভিনেতাকে লড়ে যেতে হয়, সারাক্ষণ লড়ে যেতে হয় মেফিস্টোফিলিসের সঙ্গে। এই দ্বন্দ্বটাই আর সব দ্বন্দ্বের চেয়ে অভিনেতাকে পোড়ায় বেশি।

মুশকিল হল, অভিনেতা ধূপের মত। না পোড়ালে গন্ধ কিছুই নাহি ঢালে। অর্ণ আর তথাগত— দুজনেই দারুণ সব গন্ধ ঢেলে দিয়েছেন। কখনো বারুদগন্ধ, কখনো পারিজাতগন্ধ। অর্ণ যত একের পর এক চরিত্রের কাহিনির আয়নায় কেন্দ্রীয় চরিত্রকে দাঁড় করান, তত উদ্ভাসিত হতে থাকে তাঁর ভিতরের অভিনেতা। তথাগত নিজের মুখে নতুন করে যত রং চড়ান, যত পোশাক বদলে নতুন চরিত্রকে ধারণ করেন নিজের শরীরে, তত মুখোশের নিচ থেকে বেরিয়ে আসে অভিনেতার মুখ। অর্ণ যেহেতু তাঁর কাজের জন্যে বেছে নিয়েছেন প্রসেনিয়াম, তাই দর্শক হিসাবে তবু তাঁর থেকে কিছুটা নিরাপদ দূরত্বে থাকা সম্ভব হয়। ন্যাশনাল মাইম ইনস্টিটিউটের ঘরে তথাগতর দহন এত কাছে চলে আসে যে এক ধরনের নিরাপত্তাহীনতাও কাজ করে কোনো কোনো মুহূর্তে— এই বুঝি নিজের গায়েই আগুন লেগে গেল।

দু-এক কথা অবশ্যই বলা যায় নাটক দুটোর অপূর্ণতা সম্পর্কে। যেমন অর্ণর নাটকে উৎকণ্ঠার একটা পরত যোগ করে মঞ্চে ঝুলতে থাকা ইলেকট্রনিক ঘড়িখানা, যার উদ্দেশ্য জানিয়ে দেওয়া— চরিত্রটার বেঁচে থাকার সময় ফুরিয়ে আসছে। সাধারণ ঘড়ি না হয়ে যদি ওতে কাউন্টডাউনের ব্যবস্থা থাকত, তাহলে হয়ত আরও ভালো হত। আর একক নাটকও যেহেতু যৌথতার উৎপাদন, সেহেতু প্রযোজনায় সহায়তা করেছেন যাঁরা এবং মাঝে কয়েকবার মঞ্চে আসেন যাঁরা— তাঁদের নাম কোনোভাবে দর্শকদের জানানোর ব্যবস্থা থাকলে ভালো হত। শান্তনু-তথাগতর নাটকের সমাপ্তি যেন হঠাৎই এসে পড়ে। অভিনেতার নিজেকে আবিষ্কারের লড়াইয়ের অবসান (closure) হল বলে মনে হয় না। অবশ্য এটা এই আলোচকের মত অনভিনেতার ভ্রান্তিও হতে পারে। হয়ত শান্তনু বা তথাগতর মতে, অভিনেতার নিজেকে আবিষ্কারের লড়াই কখনো শেষ হয় না। থিয়েটার তো বায়বীয় কিছু নয়, অভিনেতারও প্রেক্ষাগৃহের বাইরে অস্তিত্ব আছে। সেখানে যখন দিনরাত অশান্তি চলছে, তখন নাটক আর তার অভিনেতা কোন বিন্দুতে পৌঁছে প্রশান্ত হবে?

নাগরিক ডট নেট ওয়েবসাইটে প্রকাশিত

আমার গান: আশ্চর্য ভাবনার মঞ্চায়ন

আটপৌরে জীবনের মধ্যে থেকে বিশ্বসাথে যোগে বিহার করার সাধনাই একসময় বাঙালি মধ্যবিত্তের অভিজ্ঞান ছিল। সেই জীবনযাপনকে মঞ্চায়িত করতে গিয়ে নির্দেশক সুমন সেনগুপ্ত যেভাবে একবিংশ শতাব্দীর হোমো স্যাপিয়েন্সের বিশ্ববীক্ষা এবং জ্ঞানচর্চা নিয়ে প্রশ্ন তুলে দিয়েছেন, সেটাই এই নাটককে বিশিষ্ট করে তোলে।

জন্মান্ধ মেয়েকে জ্যোৎস্নার ধারণা দিতে চেয়েছেন আমাদের ভাষার কবি জয় গোস্বামী। আর জন্মান্ধ ছেলেকে এই মহাবিশ্বের আলো, গান, তারামণ্ডলের রহস্য সন্ধানে প্রবৃত্ত করতে চেয়েছেন পদার্থবিদ্যার শিক্ষক অতীন। কেবল অন্ধ নয়, কোমরের নিচ থেকে পঙ্গু হয়ে যাওয়া একমাত্র ছেলে পলাশকে ঘিরে অতীন আর তাঁর স্ত্রী আরতির যে জীবনসংগ্রাম, ইন্দ্রিয়গত প্রতিবন্ধকতা কাটিয়ে ওঠার জন্য পলাশের যে সংগ্রাম – তা নিয়েই আমার গান নাটক বুনেছে চেতলা কৃষ্টি সংসদ। এই নাটকের নাম আমার আলো বা আমার মুক্তি হলে হয়ত আরও যথাযথ হত, কারণ গান এই নাটকে ধরতাই, নাটকের প্রাণ নয়। অন্তত এই আলোচকের তাই মনে হয়েছে। কিন্তু আসল কথা সেটা নয়। অতীন-আরতি-পলাশের মত সাধারণ পরিবার বাংলার শহরে বা মফস্বলে কোনোদিনই বিরল নয়। আটপৌরে জীবনের মধ্যে থেকে বিশ্বসাথে যোগে বিহার করার সাধনাই একসময় বাঙালি মধ্যবিত্তের অভিজ্ঞান ছিল। সেই জীবনযাপনকে মঞ্চায়িত করতে গিয়ে নির্দেশক সুমন সেনগুপ্ত যেভাবে একবিংশ শতাব্দীর হোমো স্যাপিয়েন্সের বিশ্ববীক্ষা এবং জ্ঞানচর্চা নিয়ে প্রশ্ন তুলে দিয়েছেন, সেটাই এই নাটককে বিশিষ্ট করে তোলে। একবার দেখে মনে হয় – আরও কী যেন ছিল, খেয়াল করলাম না! আরেকবার দেখলে হয়।

পলাশ এমন একজন যুবক যার কৌতূহলের শেষ নেই এবং যে উন্মাদের মত জানতে চায় – আলো কী? যেহেতু সে চক্ষুষ্মান নয়, তাই তার আলোকে জানার একমাত্র উপায় জ্ঞানার্জন। বাবা আর ব্রেইল – এই তার সহায়। আর সহায় বাবার একদা ছাত্র বাবুদা, যে প্রবল তার্কিক, লোকের চোখে পাগল। কখনো সে প্রহেলিকা; আবার কখনো জলবৎ তরলং করে বুঝিয়ে দেয় মহাকর্ষ থেকে শুরু করে অণু, পরমাণুর রহস্য। মানুষকে যেভাবে সর্বদাই ঘিরে থাকে আলো আর অন্ধকার, তেমন করেই পলাশকে ঘিরে থাকে তার বাল্যবন্ধু মুনমুন। মোটের উপর এই কজনকে নিয়েই পলাশের মনোজগৎ। আর যারা আছে, তারা সকলেই বাইরের লোক। অবশ্য আরেকজন ব্যক্তি আছে যাকে দৃষ্টিহীন পলাশই কেবল দেখতে পায়, কিন্তু তার কথা বলে দিলে এই নাটকের রহস্য উদ্ঘাটন করে দেওয়ার অপরাধ ঘটে যাবে।

পলাশের চোখ দিয়ে, অর্থাৎ মন দিয়ে, জগৎটাকে দেখানোর জন্যে মঞ্চসজ্জায় (সুরজিৎ দে) এবং পোশাক-আশাকে (পিয়ালী সামন্ত, রুশতি চৌধুরী) সাদা, কালো আর ধূসরের বাইরে কোনো রং ব্যবহার করা হয়নি। ব্যতিক্রম শুধু পলাশের কল্পনায় তৈরি দিগন্ত, মানুষ বা পাখির মূর্তি। এই কল্পনাশক্তি মুগ্ধ করে। আগাগোড়া হুইলচেয়ারে বসা পলাশের চরিত্র বহুমাত্রিক। সে যেমন জ্ঞানপিপাসু, তেমনি অবুঝ। যত সরল, তত দুর্বোধ্য। সে অনাবিল আনন্দ পেতে পারে, আবার হতাশার চোটে হিংস্রও হয়ে উঠতে পারে। অভিনেতা সায়ন্তন মৈত্র এই পরস্পরবিরোধিতা তুলে ধরতে অনেকটাই সফল, তবে কিছু কিছু মুহূর্তে মনে হয়েছে তিনি অভিব্যক্তির বৈচিত্র্যের অভাবে ভুগছেন। তাঁর হাহাকার আর চরম আনন্দের অভিব্যক্তি প্রায় এক হয়ে গেছে।

ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র পলাশের বাবা এবং পথপ্রদর্শক অতীন। এই চরিত্রের অভিনেতা ময়ূখ দত্তের (নির্দেশনা সহকারীও বটে) বৈজ্ঞানিক আলোচনায় মশগুল হয়ে জটিল তত্ত্ব সহজ করে বুঝিয়ে দেওয়ার সাবলীলতা যতখানি মনোমুগ্ধকর, প্রতিবন্ধী সন্তানের বাবা হিসাবে অসহায়তা ততখানি স্পষ্ট হয় না। মঞ্জিমা চট্টোপাধ্যায় অভিনীত আরতি চরিত্রের পরিসর বড্ড সীমিত মনে হয়। তিনি তো স্বামীর মত ছেলের সঙ্গে জ্ঞানবিজ্ঞানের অভিযানে বেরোতে পারেন না, ফলে তাঁর সঙ্গে রসায়ন নিশ্চয়ই ভিন্নতর; মা হিসাবে তাঁর যন্ত্রণারও কিছু নিজস্বতা থাকার কথা। তা নাটকে তেমনভাবে আলাদা করে দেখা যায় না। পিয়ালী অভিনীত মুনমুনের চরিত্রও যতটা সকলের ভালোবাসা ও আক্রমণের লক্ষ্য, ততটা সোচ্চার নয়। সেদিক থেকে এই নাটকের নারী চরিত্রগুলোকে তুলনায় দুর্বল বললে ভুল হবে না। মঞ্চে সামান্য সময় কাটানো ইন্দ্রাণীও (সৃজনী দে) যেমন একেবারেই প্রান্তিক চরিত্র। জানার ইচ্ছা, জানার জন্যে ক্লেশ স্বীকার করার রোমাঞ্চ উপলব্ধি করা অতীনের বিপরীতে উপরচালাক সাংবাদিকের চরিত্রে সুস্নাত ভট্টাচার্য্যের অভিনয় খুবই বিশ্বাসযোগ্য। খুব বেশি সময় মঞ্চে না থাকলেও যিনি অত্যন্ত প্রভাবশালী অভিনয় করেন তিনি হলেন পলাশের দেখা ব্যক্তির চরিত্রে অরিত্র দে। নাটকের তুঙ্গ মুহূর্তে পলাশের সঙ্গে তাঁর মানসিক দ্বন্দ্বযুদ্ধ রীতিমত রোমাঞ্চকর।

যে অভিনেতার কথা শেষে বলতে হবে, তিনি হলেন বাবুদার চরিত্রে অভিনয় করা অর্ক চক্রবর্তী। চরিত্রটা বেশ বিপজ্জনক। একাধারে যাত্রার বিবেক, ‘কমিক রিলিফ’, বিজ্ঞানের একনিষ্ঠ চিরছাত্র, অতীন-আরতি-পলাশের পরিবারের প্রায় অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। কিন্তু যা সবচেয়ে বিপজ্জনক – সে দর্শককে বারংবার অস্বস্তিতে ফেলে স্বাভাবিকত্ব আর পাগলামির ধারণাকে ওলটপালট করে দিয়ে। অর্কর চরিত্র নাট্যকারের পূর্ণ সহায়তা পেয়েছে। সবচেয়ে হাস্যরস উদ্রেককারী সংলাপগুলো তার, আবার সবচেয়ে ভাবিয়ে তোলার মত সংলাপগুলোও তার। এই মহাবিশ্বকে পলাশের কাছে ভাঙতে ভাঙতে ফার্মিয়ন আর বোসন কণায় এনে ফেলার দায়িত্বও পালন করে বাবুদাই। নাটকটাকে যদি ঘুড়ি হিসাবে ভাবা হয়, তাহলে তার লাটাই অনেকাংশে অর্কর হাতেই থাকে এবং তিনি অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে ঘুড়ির উড়ান নিয়ন্ত্রণ করেন। তাঁর পাগলামি মাত্রা ছাড়ায় না বা লোক হাসানোর চেষ্টা বলে মনে হয় না। আবার অন্য চরিত্রগুলোকে হাস্যাস্পদ করে তুলে নিজে হাসলেও, বিজ্ঞানালোচনার সময়ে গাম্ভীর্যের ঘাটতি হয় না।

আরও পড়ুন অবহেলিত বিজ্ঞান আর কৈশোরকে ভালবেসে এল পক্ষীরাজের ডিম

শুরুতেই বলেছিলাম – গান এই নাটকের ধরতাই। রবীন্দ্রনাথের গান দিয়ে নাটকের ভাবনাকে সংহত করতে চেয়েছেন নির্দেশক। যে গানগুলো ব্যবহৃত হয়েছে সেগুলো যে নাটকের বিষয়বস্তু এবং পরিস্থিতির সঙ্গে জুতসই তা নিয়ে সন্দেহ নেই। সেঁজুতি গুপ্ত, অরিত্র এবং মঞ্জিমার গাওয়াও চমৎকার। কিন্তু গানের ব্যবহার কিঞ্চিৎ কম হলেই ভালো হত মনে হয়। বিশেষত যে গানের দু কলি পলাশ গাইছে মঞ্চের উপর, আলো নিভে যাওয়ার পর সেই গানেরই আরও খানিকটা অংশ অন্য কণ্ঠে বাজছে – এ জিনিস নেহাতই বাহুল্য। বাহুল্যের সমস্যা মঞ্চসজ্জাতেও রয়েছে। পলাশের বিজ্ঞানমগ্নতা বোঝাতে বেশকিছু জিনিস টাঙিয়ে মঞ্চটাকে ছোট করে আনা হয়েছে। তাতে ক্ষতি নেই, কিন্তু দর্শকের দেখতে পাওয়ার মত করে একখানা বাক্সের গায়ে ‘And God Said’ এবং জটিল অঙ্ক লিখে রাখার কি খুব প্রয়োজন ছিল? অত নিচু জায়গায় কোনোকিছুর গায়ে বড় বড় করে লিখে নিশ্চয়ই অতীন অন্ধ ছেলেকে অঙ্ক শেখান না? আজকের বাড়িতে ল্যান্ডলাইনের ভূমিকা যতটুকু দেখানো হয়েছে তাতে ওটাও না থাকলে ক্ষতিবৃদ্ধি হত না।

এ নাটক যেমন ভাললাগার, তেমনই যন্ত্রণার। অতীন এক জায়গায় বলছেনও ‘ব্যথাকে উপভোগ করতে শেখো’। স্বভাবতই এই নাটকে ফিরে ফিরে এসেছেন জীবনানন্দ দাশ। চিরায়ত জ্ঞানের সঙ্গে এ যুগের কেজো জ্ঞানের দ্বন্দ্ব যথার্থ ধরা পড়েছে ব্যক্তির সংলাপে ‘আমাদের এই শতকের/বিজ্ঞান তো সংকলিত জিনিসের ভিড় শুধু— বেড়ে যায় শুধু’ উচ্চারণে। কিন্তু এমন নাটকের সংলাপে মাঝেমাঝে এত পেলবতা কেন? পলাশ নামের ছেলেটাকে বাবা, মা, বন্ধু মিলে বারবার ‘পলাশ ফুল’ বলে ডাকা কেন? আবহসঙ্গীতে ফিরে ফিরে আরামদায়ক ‘মেঘ বলেছে যাব যাব’ সুর বাজানোই বা কেন? রাবীন্দ্রিকতা আসলে বেশ বিপজ্জনক ব্যাপার। মাত্রা ছাড়ালেই অশ্লীল লাগতে শুরু করে।

তবে যতই দোষ ধরা যাক, এই নাটক যে বিষয়কে তুলে ধরেছে তার যে দৃশ্যায়ন সম্ভব – না দেখলে বিশ্বাস করা শক্ত, এবং নাটকের শুরুতে দর্শকের মনে যে উৎকণ্ঠা সৃষ্টি করা হয়েছে, শেষে তার নিরসনের মুহূর্তটা বিশুদ্ধ ম্যাজিক। সেই ম্যাজিকের বড় কৃতিত্ব অবশ্যই আলোর দায়িত্বে থাকা কল্যাণ ঘোষের। তিনি মঞ্চে আলো ফেলার পাশাপাশি দর্শকের দেখতে পাওয়ার মত অন্ধকারও সৃষ্টি করেছেন। নইলে রেশ থেকে যাওয়ার মত ম্যাজিক সৃষ্টি হত না ক্লাইম্যাক্সে।

নাগরিক ডট নেট ওয়েবসাইটে প্রকাশিত

হোমবাউন্ড: ফিরব বললে ফেরা যায় নাকি?

হিন্দু উচ্চবর্গীয়দের পারিবারিক আড্ডা থেকে হোয়াটস্যাপ গ্রুপ হয়ে এখন সরকারি নীতি নির্ধারণেও এরাই দেশের যত নষ্টের গোড়া হিসাবে স্বীকৃত। শোয়েবদের যাওয়ার জন্যে তো গোটা পঞ্চাশেক দেশ আছে। তবু যে তারা কেন এদেশে পড়ে থাকে তা উচ্চবর্গীয় শিক্ষিত মানুষ বুঝেই উঠতে পারেন না। আর সরকার তো চন্দনদের জন্যেই সবকিছু করে, ওদের আর চিন্তা কী?

আলো আঁধারিতে ঢাকা একফালি জায়গা, তার এদিক থেকে ওদিকে হেঁটে যাচ্ছে ছোট ছোট পিঁপড়ে। প্রথম চোটে তাই মনে হয় বটে, তবে কয়েক সেকেন্ড কাটতে না কাটতেই বোঝা যায় – জায়গাটা আসলে গাড়িঘোড়াহীন ফ্লাইওভার। যারা হেঁটে যাচ্ছে তারা নিরুপায়, শ্রান্ত মানুষ। প্রতীক শাহের ক্যামেরায় লকডাউনে ঘরে ফিরতে চাওয়া প্রবাসী শ্রমিকদের এভাবেই দেখিয়েছেন হোমবাউন্ড ছবির পরিচালক নীরজ ঘেওয়ান। মাল্টিপ্লেক্সের ঠান্ডা ঘরে বসে মনে হয়, যেন ধরে ফেলেছেন আমরা আসলে কীভাবে দেখি ওই মানুষগুলোকে, রাষ্ট্র কীভাবে দেখে। ধরে ফেলেছেন বলেই ছবি শুরুর আগের, স্পষ্টতই সেন্সরের চাপে লিখিত, দীর্ঘ ‘ডিসক্লেমার’ দ্বিগুণ হাস্যকর মনে হয় ছবি শেষ হওয়ার পর। তার চেয়ে অনেক বেশি বিশ্বাসযোগ্য মনে হয় ডিসক্লেমারের পরেই পর্দায় ভেসে ওঠা সম্পূর্ণ বিপরীতার্থক শব্দবন্ধ, যার অর্থ – সত্য ঘটনা অবলম্বনে।

নীরজ, বরুণ গ্রোভার এবং শ্রীধর দুবে লিখিত এই ছবির সংলাপে করুণ মুহূর্তে নানা সূক্ষ্ম ও স্থূল রসিকতা থাকলেও, হোমবাউন্ড যে হাস্যরস উৎপাদন করে তার গায়ে ভিড়ে ঠাসাঠাসি প্যাসেঞ্জার ট্রেনের যাত্রীদের মত করে লেগে থাকে চোখের জল। ইদানীং এদেশে ঘর ছেড়ে কাজের খোঁজে অন্যত্র যাওয়া মানুষ সর্বত্র খলনায়ক। এই ছবির দুই প্রধান চরিত্র মহম্মদ শোয়েব (ঈশান খট্টর) আর চন্দন কুমার বাল্মীকি (বিশাল জেঠওয়া) আবার সেই শ্রেণিতে পড়ে, যারা সবচেয়ে বেশি ঘৃণার – অর্থাৎ সাদা কলারের কর্মী নয়, একেবারে গায়ে গতরে খেটে খাওয়া মানুষ। অবশ্য শ্রমজীবী না হলেও হয়ত বিশেষ তফাত হত না, কারণ নামেই প্রমাণ – প্রথম জন মুসলমান, দ্বিতীয় জন দলিত। হিন্দু উচ্চবর্গীয়দের পারিবারিক আড্ডা থেকে হোয়াটস্যাপ গ্রুপ হয়ে এখন সরকারি নীতি নির্ধারণেও এরাই দেশের যত নষ্টের গোড়া হিসাবে স্বীকৃত। শোয়েবদের যাওয়ার জন্যে তো গোটা পঞ্চাশেক দেশ আছে। তবু যে তারা কেন এদেশে পড়ে থাকে তা উচ্চবর্গীয় শিক্ষিত মানুষ বুঝেই উঠতে পারেন না। আর সরকার তো চন্দনদের জন্যেই সবকিছু করে, ওদের আর চিন্তা কী? যেমনটা এক সরকারি অফিসার তাকে বলেছে। এই ছবির লেখক দল – বরুণ, বশারত পীর, সুমিত রায় এবং নীরজ স্বয়ং – স্লোগানধর্মিতার দিকে না গিয়েও বুঝিয়ে দিতে পেরেছেন শোয়েবরা কেন সুযোগ পেলেও দুবাই যেতে চায় না। চন্দনদের বিড়ম্বনাও দেখিয়ে দিয়েছেন। আসল পদবি লিখলে লোকে নিচু নজরে দেখে আর না লিখলে নিজের চোখে ছোট হয়ে যেতে হয়। সরকারি চাকরির পরীক্ষার ফর্মে পদবি লিখব কি লিখব না, ‘সংরক্ষিত’ লেখা বাক্সে টিক দেব কি দেব না – নিজের সঙ্গে এই লড়াইটা লড়তে লড়তেই বয়স বেড়ে যায়।

ন্যাকা লাগছে ব্যাপারগুলো? লাগারই কথা। মানুষের চোখে পিঁপড়ের জীবনসংগ্রাম তো ন্যাকাই লাগে। ‘গেটেড কমিউনিটি’-র মধ্যে কাটানো নিশ্চিন্ত জীবন আর সাহারা মরুভূমি সংলগ্ন আফ্রিকার সমান দারিদ্র্যে ক্রমশ বিভাজিত হতে থাকা এই দেশে হোমবাউন্ডের পাত্রপাত্রীদের জীবন মাল্টিপ্লেক্সের দর্শকদের চোখে অলীক, অবাস্তব মনে হওয়াই স্বাভাবিক। এ তো সেই রাজ কাপুরের আমল নয় যে সিনেমার পর্দায় চালচুলোহীন শ্রী ৪২০-এর সঙ্গে প্রেম হয়ে যাবে বস্তির বাচ্চাদের লিখতে পড়তে শেখানো সুন্দরী নার্গিসের, আর তা দেখে মোহিত হবে আসমুদ্রহিমাচল হিন্দি সিনেমার দর্শক। নতুন ভারতের মহানগরে শ্রী ৪২০ হয়ে থাকাই যাবে না, আধার কার্ড দেখাতে হবে। শোয়েবের মত মুসলমান হলে সামান্য চাপরাশির চাকরি পাকা করতে কেবল নিজের আধার কার্ড নয়, বাবা-মায়ের আধার কার্ডও দেখাতে হবে। আজকের হিন্দি সিনেমায় বস্তিবাসী কি ফুটপাথবাসী তো দূরের কথা, শোয়েব আর চন্দনের মত গাঁয়ের লোকদেরও দেখা যায় না চট করে। সেই নয়ের দশক থেকে, প্রাসাদোপম বাড়ির মালিক ব্যবসায়ী আর অনাবাসী ভারতীয়রাই তো নায়ক, নায়িকা। ইদানীং আবার প্রাচীন ও অপ্রাচীন যোদ্ধা এবং ধর্মযোদ্ধারা নায়ক, নায়িকা হচ্ছেন। নীরজ উলটো পথের পথিক। এক দশক আগে নিজের প্রথম ছবি মসান-এ তিনি দেখিয়েছিলেন বারাণসীর ডোম পরিবারের ছেলের সঙ্গে উচ্চবর্ণের মেয়ের প্রেমের স্বপ্ন এবং স্বপ্নভঙ্গ। প্রশ্ন তুলেছিলেন – এই দুঃখ কিছুতেই শেষ হয় না কেন? সেই প্রশ্নেরই যেন এবার উত্তর খুঁজেছেন দুই গ্রামের ছেলের কাহিনিতে।

দুঃখ শেষ হয় না, কারণ চন্দনের মায়ের রান্না যতই ভালো হোক, সে মিড ডে মিল রাঁধলে বাবা-মায়েরা স্কুলে পাঠাবেন না ছেলেমেয়েদের। চন্দনের দিদি স্কুলের বাচ্চাদের হেগো পোঁদ ধুইয়ে দেবে – ওই পর্যন্ত ঠিক আছে। ব্যতিক্রমী হেডমাস্টার যতই আইনের ভয় দেখান, তাতে কাজ হবে না। বাবাসাহেব আম্বেদকর দলিতদের বাড়ির বিয়েতে গৌতম বুদ্ধের পাশে যতই পূজিত হোন, সংবিধান বা আইন মানা হবে কিনা, কোথায় কতটুকু মানা হবে, তা ঠিক করবেন উচ্চবর্গীয়রাই। দুঃখ শেষ হয় না, কারণ শোয়েবের মা যতই সুস্বাদু হালুয়া রাঁধুন আর শোয়েবের বিপণন ক্ষমতা যতই অসাধারণ হোক, শেষ কথা হল সে ভারত-পাকিস্তান ম্যাচে কাকে সমর্থন করে এবং সে নিজে যা-ই মনে করুক, সবাই নিশ্চিত যে পাকিস্তান হারলে সে দুঃখ পায়। দুঃখ শেষ হয় না, কারণ পথে অসুস্থ হয়ে পড়া প্রবাসী শ্রমিককে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার জন্যে পুলিশ প্রশাসনের টিকি পাওয়া যায় না। কিন্তু মারা যাওয়ার পর মর্গে নিয়ে যেতে পত্রপাঠ সবাই হাজির। চারতলা পায়ের তলায় রাখবে তিনতলাকে, তিনতলা পায়ের তলায় রাখবে দোতলাকে, দোতলা পায়ের তলায় রাখবে একতলাকে – হাজার হাজার বছরের এই সুবিন্যস্ত শোষণব্যবস্থাকে কোনোরকম তত্ত্ব না কপচিয়ে সিনেমায় তুলে এনেছেন নীরজ। দুই প্রাণের বন্ধুর একজন চাকরির পরীক্ষায় পাশ করল, অন্যজন করল না। অমনি কিন্তু সম্পর্ক চিড় খেল, একে অপরের ধর্মীয় পরিচয় এবং জাতি পরিচয় উল্লেখ করে দাঁত নখ বের করে ফেলল। আবার হতদরিদ্র চন্দনের পরিবার সর্বস্ব পণ করে লেখাপড়ার ব্যবস্থা করে যায় চন্দনের জন্যে, তার দিদির জন্যে নয়। দলিত মেয়ে সুধা ভারতী যতই প্রেমে পড়ুক, সে অন্তত গ্র্যাজুয়েট নয় এমন ছেলেকে – পুলিশের কনস্টেবলকে – বিয়ে করতে রাজি নয়। কারণ বাবার সরকারি চাকরির কল্যাণে সুধার জাত না বদলাক, শ্রেণি বদলে গেছে। এই হল নীরজের ভারত, আমাদের ভারত।

আরও পড়ুন তালিবান শাসন: ঘর হতে শুধু দুই পা ফেলিয়া

অভিনেতার কাজই হল তিনি যে লোক নন সেই লোক হয়ে ওঠা। তবু হয়ত চারপাশের পরিস্থিতির কারণেই ঈশানকে মিতভাষী, অপমান বুকে চেপে রাখা গরিব মুসলমান যুবকের চরিত্রে এত বিশ্বাসযোগ্য অভিনয় করতে দেখে একটু বেশিই ভালো লাগে। নীরবে অপমানিত হওয়ার দৃশ্যগুলোতে ঈশান সবচেয়ে বাঙ্ময়। ছবির শেষ প্রান্তে চরম অসহায়তার মুহূর্তে তিনি সবচেয়ে শক্তিশালী অভিনয় করেন। তবে চমকে দেন চন্দনের চরিত্রে বিশাল। তাঁর চেহারার সবচেয়ে চোখে পড়ার মত জিনিস হল অস্বাভাবিক কটা চোখ। ওই চোখদুটোকে তিনি মরদানি ২ ছবিতে ব্যবহার করেছিলেন নারীবিদ্বেষী সাইকোপ্যাথের হিংস্রতা ফুটিয়ে তুলতে। এখানে প্রায় ম্যাজিকের মত ব্যবহার করেছেন দলিতের গ্লানিকে মুখরতা দিতে। পছন্দের নারীর সামনে প্রেমিকের চিরকালীন ক্যাবলামি করতে করতে, ভেঙে পড়া বন্ধুকে কাঁদার জন্যে কাঁধ এগিয়ে দিতে দিতে ছবি যত এগিয়েছে, বিশাল বিশালতর হয়েছেন।

নীরজের ছবির নায়িকার গ্ল্যামার থাকে না, সুধারও নেই। সেই চরিত্রে জাহ্নবী কাপুর যথাযথ। তবে বিশালের সঙ্গে ঈশানের রসায়ন যত নিখুঁত, জাহ্নবী আর বিশালের রসায়ন ততটা জমেনি। পর্দায় বেশিক্ষণ না থাকলেও মনে থেকে যায় চন্দনের মায়ের চরিত্রে শালিনী বৎস্যা আর ঈশানের বসের চরিত্রে শ্রীধরের অভিনয়। বরুণ অতীতে বহু ছবিতে একবার শুনলে কানে লেগে থাকার মত গান লিখেছেন। যাঁরা তাঁর কবিতার কথা জানেন, তাঁকে ঋজু বিদূষক হিসাবেও চেনেন, তাঁরা আরও ভালো করে জানেন তাঁর ভাষার উপর প্রশ্নাতীত দখলের কথা। সব মিলিয়ে যে প্রত্যাশা তৈরি হয়, অমিত ত্রিবেদী সুরারোপিত, জাভেদ আলি আর পাপোনের গাওয়া এই ছবির ‘ইয়ার মেরে’ সেই প্রত্যাশা পূরণ করে না।

ছবি শেষ হওয়ার পরেও চোখে লেগে থাকার মত দৃশ্যের অবশ্য শেষ নেই। তেমনই একটা দৃশ্য দিয়ে এই লেখা শুরু করেছিলাম। পরের দিকে শিশি ভর্তি আচারের, বন্ধুদের সঙ্গে কাড়াকাড়ি করে খাওয়ার জিনিস থেকে বেঁচে থাকার শেষ সম্বল হয়ে পড়ার দৃশ্যও অবিস্মরণীয়। কে জানে সে জন্যেই সচেতনভাবে নীরজ ওই করুণ দৃশ্যে ফ্রেমের মাঝখানে ‘সব ইয়াদ রখখা জায়গা’ কবিতার রচয়িতা আমির আজিজকে রেখেছেন কিনা! এই আলোচককে অবশ্য ছবি দেখার সপ্তাহখানেক পরেও তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে দুখানা ফাটা পা আর এক জোড়া নতুন চটি। এইসব কারণে নীতিন বৈদের সম্পাদনার কথাও আলাদা করে বলতেই হবে।

ছবি শেষ হওয়ার পরেও চোখে লেগে থাকার মত দৃশ্যের অবশ্য শেষ নেই। তেমনই একটা দৃশ্য দিয়ে এই লেখা শুরু করেছিলাম। পরের দিকে শিশি ভর্তি আচারের, বন্ধুদের সঙ্গে কাড়াকাড়ি করে খাওয়ার জিনিস থেকে বেঁচে থাকার শেষ সম্বল হয়ে পড়ার দৃশ্যও অবিস্মরণীয়। কে জানে সে জন্যেই সচেতনভাবে নীরজ ওই করুণ দৃশ্যে ফ্রেমের মাঝখানে ‘সব ইয়াদ রখখা জায়গা’ কবিতার রচয়িতা আমির আজিজকে রেখেছেন কিনা! এই আলোচককে অবশ্য ছবি দেখার সপ্তাহখানেক পরেও তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে দুখানা ফাটা পা আর এক জোড়া নতুন চটি। এইসব কারণে নীতিন বৈদের সম্পাদনার কথাও আলাদা করে বলতেই হবে।

নীরজ একজন আশ্চর্য পরিচালক। তিনি গোটা ছবিতে মানুষের শঠতা, অত্যাচার, অনাচার, অবিচার, দুঃখকষ্ট দেখান। তারপরেও এক চিলতে আশায় ছবি শেষ করেন। মসান ছবিতে শ্মশানের বামুনের মেয়ে দেবী পাঠক (রিচা চাড্ডা) আর ডোমের ছেলে দীপক চৌধুরীর (ভিকি কৌশল) সমান্তরালভাবে চলতে থাকা জীবন একসাথে বয়ে গিয়েছিল সঙ্গমের দিকে। এখানেও শেষমেশ দুরকমভাবে ঘরে ফিরেছে দুই বন্ধু। নীরজ শেষপর্যন্ত এমন এক দেশের স্বপ্ন জিইয়ে রেখেছেন, যেখানে হিন্দু বন্ধুর গৃহপ্রবেশে দরজা ফুল দিয়ে সাজায় মুসলমান বন্ধু। এ দৃশ্যই এদেশে স্বাভাবিক ছিল, ক্রমশ অস্বাভাবিক হয়ে দাঁড়াচ্ছে। অভিযোগ উঠেছে – মুসলমান রোগী দেখেন বলে হিন্দু ডাক্তারের চেম্বার বন্ধ করিয়ে দেওয়া হয়েছে খোদ পশ্চিমবঙ্গে। তাই বুক দুরুদুরু করে। পরিচালককে প্রশ্ন করতে সাধ হয় ‘ফিরব বললে ফেরা যায় নাকি/হারিয়েছ দেশ কাল জানো না কি?’

অবশ্য হয়ত নীরজই ঠিক, আমরা যারা আশঙ্কিত, তারাই ভুল। সংখ্যাগুরুবাদীদের গত কয়েক বছরের আপ্রাণ চেষ্টার পরেও, প্রধানমন্ত্রী নিজে প্রচার চালানোর পরেও, হিন্দি সিনেমার দর্শকরা ঘৃণা ছড়ানো সিনেমাকে বাতিল করে দিলেন তো। তাছাড়া ধর্মা প্রোডাকশনসের মত বলিউডের বিরাট প্রযোজনা সংস্থা এ ছবির দায়িত্ব নিল তো। যতই মার্টিন স্করসেসি এক্সিকিউটিভ প্রোডিউসার হোন, অত বড় ব্যানারের ছায়া না থাকলে যে এ ছবি দর্শকের মুখ দেখত না, তা সাম্প্রতিক কিছু উদাহরণ খেয়াল করলেই বোঝা যায়। অতএব হয়ত এখনো আশা করা অযৌক্তিক নয় যে, ক্রিকেট খেলতে খেলতে মুসলমান বন্ধুকে কেউ তার ধর্ম তুলে ‘নিজেদের এলাকায় গিয়ে খেল গে যা’ বললে হিন্দু বন্ধুর মারপিট করতে যাওয়ার দিন এদেশে ফুরোবে না। এ যুগের কোনো কবিকে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের মত ছোটবেলার বন্ধু আনোয়ারকে স্মরণ করে লিখতে হবে না ‘বন্ধু হারালে দুনিয়াটা খাঁ খাঁ করে/ভেঙে যায় গ্রাম, নদীও শুকনো ধূ ধূ/খেলার বয়েস পেরোলেও একা ঘরে/বার বার দেখি বন্ধুরই মুখ শুধু।’

নাগরিক ডট নেট ওয়েবসাইটে প্রকাশিত

এ বাঁচা কেমন বাঁচা? হাসাতে হাসাতে প্রশ্ন তুলে দিল ভূত তেরিকি

গত কয়েক বছরে ‘হরর কমেডি’-র মধ্যে দিয়ে লিঙ্গ রাজনীতি উলটে দেওয়ার দৃষ্টান্ত হিসাবে অমর কৌশিক নির্দেশিত হিন্দি ছবি স্ত্রী (২০১৮) এবং স্ত্রী ২ (২০২৪) নিয়ে বিস্তর আলোচনা হয়েছে। বাংলায় তেমন প্রয়াস এই সিরিজের আগে হয়নি বললেই চলে।

অনেকদিন আগে এক সাদা দাড়িওলা নাট্যকার বলেছিলেন ‘লোককে যদি সত্যিটা বলতে চাও, তাহলে তাদের হাসাও। নইলে লোকে তোমাকে মেরে ফেলবে।’ না, তাঁর নাম রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নয়। নাট্যকার বলেছি বলে যদি বাদল সরকার ভাবেন, সেটাও ভুল। দুনিয়ার সব ভাল ভাল কথা বাঙালিরাই বলেছে এমন তো নয়। কথাটা বলেছিলেন আইরিশ নাট্যকার জর্জ বার্নার্ড শ। পরিচালক কৌশিক হাফিজী আর সৃজনশীল পরিচালক অনির্বাণ ভট্টাচার্য, যে কোনো কারণেই হোক, কথাটা হাড়ে হাড়ে উপলব্ধি করেছেন। তাই হইচইয়ের জন্য তাঁরা যে নতুন ওয়েব সিরিজ বানিয়েছেন, সেই ভূত তেরিকি, ভয় দেখাতে দেখাতেও হাসায়। হাসতে হাসতেও ভয় পেতে হয়, কারণ যা দেখানো হচ্ছে তা যে নেহাত বানানো নয়, সেটা ভুলে থাকতে চাইলেও দিব্যি টের পাওয়া যায়।

নির্মাতারা অবশ্য সত্যকথনের উদ্দেশ্য গোপন করার বিশেষ চেষ্টা করেননি। মৃণাল সেনের আকালের সন্ধানে ছবিতে কলকাতা থেকে এক দল যুবক-যুবতী গ্রামে গিয়েছিল দুর্ভিক্ষ নিয়ে কাহিনিচিত্র তৈরি করতে। এখানে ভূতের বাড়িতে যাওয়ার উদ্দেশ্য সরাসরি তথ্যচিত্র বানানো। শুরুতেই প্রযোজক মিস্টার ডি’সুজা বলে দিয়েছেন ‘বাঙালি ভূত নিয়ে সিনেমা অনেক হয়েছে। কিন্তু, ডকুমেন্টারি একটাও হয়নি।’ তা এই তথ্যচিত্র থেকে যেসব তথ্য বেরিয়ে এসেছে, সেগুলো বাংলা সংবাদমাধ্যমের ভাষায় ‘বিস্ফোরক’। ছবির প্রযোজক শুটিং শুরু হওয়ার আগেই মরে ভূত হয়ে যান! তাঁর জীবিত হিসাবরক্ষক ছবির বাজেট এক কোপে অর্ধেক করে দেন! ভূতুড়ে বাড়িতে চারজন পেতনির সঙ্গে বাস করে একজন মানুষ! সেই পেতনিরা আবার মানুষের সঙ্গে ‘ইন্টু মিন্টু’ করে!

কেলেঙ্কারির এখানেই শেষ নয়। একেক পেতনির একেকরকম পদ্ধতি পছন্দ। রাজিয়ার (দীপান্বিতা সরকার) একটি লোককেই পছন্দ – জয়ন্ত চক্রবর্তী (দেবরাজ ভট্টাচার্য)। কিন্তু রাজিয়া সঙ্গমে লিপ্ত হতে একেকবার একেকজন জীবিত মহিলার শরীরে ঢুকে পড়ে। তাতেও শখ মেটে না। আরও বৈচিত্র্যের সন্ধানে সে কী করে তা না বলাই ভাল। বললে ‘স্পয়লার’ দেওয়াও হয়ে যাবে, বাঙালির যৌনতা নিয়ে ছুঁতমার্গকে এক লপ্তে বড্ড বেশি আঘাত করাও হয়ে যাবে। সেই আঘাতে কোনো পাঠক তথ্যচিত্রের প্রযোজকের মত পটল তুললে এই প্রবন্ধের লেখক বিপদে পড়ে যাবেন। তিনি তথ্যচিত্রের পরিচালক, ‘ফা** ইন্ডিপেন্ডেন্ট ফিল্মমেকার’ সঞ্জয় লীলা ব্যানার্জির (দুর্বার শর্মা) চেয়ে কোনো অংশে কম অসহায় নন।

রাজিয়া তবু ১৭৫৯ সালে মারা যাওয়া পাঠান বাবা ও বাঙালি মায়ের গোলমেলে পরিবারের সন্তান। বিশুদ্ধ বাঙালি ঘরের বিধবা লবঙ্গ (রাত্রি চ্যাটার্জী) আবার নিশির ডাক ডেকে একেক রাতে একেকজন পুরুষ ধরে আনে! কখনো কখনো এক ডাকে একাধিক পুরুষও হাজির হয়! সবচেয়ে আধুনিক পেতনি সুকুমারী (ঐশ্বর্য সেন) অবশ্য সঞ্চয়িতা, শেষের কবিতা নিয়েই মগ্ন ছিল। কিন্তু তারও জীবদ্দশায় প্রেম করার, চুমু খাওয়ার, ‘মাজা দুলিয়ে দুলিয়ে’ নাচার সাধ পূরণ হয়নি। ফলে…দেখে নেবেন।

কী ভাবছেন? ‘ইরোটিক থ্রিলার’? না মশাই। মোটে একটা ‘অ্যাডাল্ট = বাজে/খারাপ’ দৃশ্য আছে। সেখানেও মহিলাটির দিকে ‘মেল গেজ’ দিতে গেলে ভিরমি খেতে হবে।

এই তিন পেতনির অভিভাবক যে, সেই বিষ্ণুপ্রিয়া বা ভানুদিদি (আভেরী সিংহ রায়) অবশ্য সেদিক থেকে সাত্ত্বিক মহিলা। তার সময় কাটে সদ্যমৃত মানুষকে ভীতিপ্রদ ভূত হয়ে ওঠার শিক্ষা দিয়ে। তবে চার পেতনির কেউ কিন্তু অতি পরিচিত ‘মেয়েরাই মেয়েদের শত্রু’ তত্ত্ব প্রমাণ করে একে অন্যের পিছনে নিন্দেমন্দ করে না। বরং নিজেদের মধ্যে প্রাচীন বাংলায় গালাগালি দিয়ে চুলোচুলি করলেও পিছনে একে অপরের প্রশংসাই করে। লবঙ্গ পিসি যে শরবতে বিষ মিশিয়ে মানুষ মারে – সঞ্জয় লীলার দলকে এইটুকু সাবধানবাণী দেওয়া ছাড়া অন্যের পিছনে তার সম্পর্কে খারাপ কিছু বলার কোনো দৃষ্টান্ত নেই। বরং রাজিয়া আর সুকুমারী এক বাক্যে স্বীকার করে যে ভানুদিদি তাদের নেত্রী; রাজিয়া আর বিষ্ণুপ্রিয়া বলে সুকুমারী তাদের মধ্যে সবচেয়ে সুন্দরী। বেঁচে থাকলে ‘বাংলা বইয়ের হিরোইন’ হতে পারত।

সব মিলিয়ে ব্যাপারটা সাংঘাতিক না? বাঙালি পত্নী, থুড়ি পেতনি, এতখানি স্বনির্ভর হয়ে গেলে ব্যাপারটা যে খুবই ভয়ের হয়ে দাঁড়ায় তাতে সন্দেহ নেই। সেইজন্যেই তো ভীত সহকারী দেবদাসকে সঞ্জয় লীলা বলতে বাধ্য হয় – বউকে সব কথা বলতে নেই। সব পুরুষ সব কথা বউকে বলতে শুরু করলে পৃথিবীতে একটি পুরুষও আর বেঁচে থাকবে না। লক্ষণীয়, কথাটা শুনেই ভীত দেবদাস (সুব্রত সরকার) তাকায় পাশে বসা সহকারী পরিচালক মেয়েটির (উজ্জয়িনী চ্যাটার্জি) দিকে। মায়ের নাম নিজের নামে যোগ করা সঞ্জয় লীলার সঙ্গে মেয়েটির ‘ইন্টু মিন্টু’ আছে, এমন ইঙ্গিত বারবার দেওয়া হয়েছে। এদিকে সঞ্জয় লীলা বিবাহিত না অবিবাহিত – তা কিন্তু জানতে পারা যায় না। কী ভাবছেন? ‘ফেমিনিস্ট টেক্সট’? আরে না না, অত গুরুতর কিছু নয়। তবে হ্যাঁ, এখানে কিন্তু ডাকাত ভূতকেও মেছো পেতনি বউয়ের ভয়ে সিঁটিয়ে থাকতে হয়। গত কয়েক বছরে ‘হরর কমেডি’-র মধ্যে দিয়ে লিঙ্গ রাজনীতি উলটে দেওয়ার দৃষ্টান্ত হিসাবে অমর কৌশিক নির্দেশিত হিন্দি ছবি স্ত্রী (২০১৮) এবং স্ত্রী ২ (২০২৪) নিয়ে বিস্তর আলোচনা হয়েছে। বাংলায় তেমন প্রয়াস এই সিরিজের আগে হয়নি বললেই চলে। কিন্তু ভূত তেরিকি কেবল ওতে আটকে থাকেনি। মজাটা সেখানেই।

নিশ্চয়ই ভাবছেন, হাসানোর ব্যাপারটা বোঝা গেল। ভয়ের ব্যাপারটাও নাহয় বোঝা গেল। কিন্তু এসবের মধ্যে সত্যি কোথায়? আজ্ঞে তা বুঝতে গেলে তো নিজে দেখতে হবে। আড়াই মিনিটের বেশি যে আমাদের ধৈর্য থাকে না সেকথা আজকাল কে না জানে! তার উপর বাংলা ভাষায় তৈরি কোনোকিছুর জন্যে আমাদের ধৈর্য আরও কম। তাই এই সিরিজের নির্মাতারা দর্শকদের জন্যে কিছু সহায়িকার ব্যবস্থা করে দিয়েছেন পর্দায়। সেগুলো খেয়াল করলে মজা পাবেন, সমৃদ্ধও হবেন। যেমন সমৃদ্ধ হবেন সদ্যোজাতকেও জয়ন্তর স্ত্রীর (মৈত্রী ব্যানার্জি) ইংরিজি বলতে শেখানোর তাড়া দেখে।

কণিষ্ককে নিয়ে অনাবশ্যক লম্বা মজা বা জয়ন্তর নিশির ডাক শোনার অভিনয়ের দৃশ্যের মত কিছু বাহুল্য বাদ দিলে এই অভিনব সিরিজের সবচেয়ে বড় জোর এর চমৎকার চিত্রনাট্য এবং বুদ্ধিদীপ্ত সংলাপ। স্রেফ চতুর কথার খেলা (pun) আর বহু ব্যবহৃত খিস্তি দিয়ে হাততালি পাওয়ার মত সংলাপ লেখার যে ধারা সাম্প্রতিককালে বাংলা সিনেমা আর ওয়েব সিরিজে দেখা যায়, ভূত তেরিকি একেবারেই সেই রাস্তায় হাঁটেনি। এখানে খিস্তি মানে সরাসরি কানে আঙুল দেওয়ার মত খিস্তি এবং অভিনব খিস্তি, যেমনটা বেরিয়েছে তথ্যচিত্রের জন্যে সাক্ষাৎকার দেওয়ার সময়ে ভূতের বাড়ির একমাত্র মানুষ বাসিন্দা তাপসের (শুভঙ্কর ঘটক) মুখ থেকে।

কিন্তু হাস্যরস, অদ্ভুতরস, আদিরস পেরিয়ে আরও এগিয়ে গেছে এই ওয়েব সিরিজ। দ্বিতীয় পর্বেই গল্পে এসেছে নতুন মোড় এবং সিরিজ যেখানে শেষ হয়েছে তা অপ্রত্যাশিত। এই পরিবর্তন সম্ভব হত না সকলের উঁচু মানের অভিনয় ছাড়া। যে পেতনিদের উপর গোটা সিরিজ দাঁড়িয়ে আছে, তাঁরা চোখ ফেরাতে দেন না। সাধারণত কলকাতার বাংলা ভাষা ছাড়া অন্য কোনো বাংলায় কথা বলতে হলেই আজকের অভিনেতারা অনিচ্ছাকৃত হাস্যরস সৃষ্টি করে বসেন। কিন্তু এখানে বাঙাল টানে চমৎকার চালিয়ে গেছেন দীপান্বিতা; আভেরী নাকি সুর বজায় রেখে খাস পশ্চিমবঙ্গীয় ভাষায় কথা বলেছেন আগাগোড়া। ১৯৭০-এর দশকের আধুনিকার চরিত্রে ঐশ্বর্যও দারুণ সফল। তিনজনের হাঁটাচলা, ছলাকলায় যে বিভিন্নতা থাকার কথা ছিল তাও তাঁরা সযত্নে রক্ষা করেছেন। তার উপর আছে ভয় দেখানো – কোথাও চাউনির সামান্য পরিবর্তনে, কোথাও বসার বা দাঁড়ানোর ভঙ্গি বদলে। সেসবেও তিনজনেই সফল। ঐশ্বর্যকে এর উপর প্রেমের অভিনয়ও করতে হয়েছে।

আরও পড়ুন মানিকবাবুর মেঘ: অনন্য রোম্যান্টিক ছবি

দুর্বার এর আগে অনির্বাণের সৃজনশীল পরিচালনায় দুটো ওয়েব সিরিজে একেবারে দুই মেরুর চরিত্রে অভিনয় করেছেন – ব্যোমকেশ ও পিঁজরাপোল-এ তলোয়ারের মত তীক্ষ্ণ ভুজঙ্গ ডাক্তার, আর তালমার রোমিও জুলিয়েট-এ গোবেচারা তপন। এখানে তিনি একইসঙ্গে বেচারা, ভীতু, আবার দলনেতা। ভয় পাচ্ছেন ঠিকই, কিন্তু সেটা লুকিয়েও রাখতে হবে। নইলে শুটিংয়ের কর্তৃত্ব হাত থেকে বেরিয়ে যাবে। একখানা টুপি আর চশমায় ভর দিয়ে ভীরু, সংস্কৃতিবান অথচ অসহায় বাঙালির মূর্ত প্রতীক হয়ে উঠেছেন এই তরুণ অভিনেতা। পেতনিরা কী করতে বললে মানবে আর কিসে রেগে যাবে, তা নিয়ে তাঁর সর্বক্ষণের আতঙ্ক; সহকারীদের কাজকর্মে, প্রযোজকের কীর্তিকলাপে হতাশা; পার্টির দৃশ্যে সহকর্মীর এবং নিজের প্রাণ বাঁচানোর মরিয়া চেষ্টা যেমন হাসির উদ্রেক করে, তেমনই টের পাওয়ায় – ঠিক কোন গাড্ডায় পড়ে আছি আমরা।

বাবা-মা-বউয়ের চোখে ফালতু, অথচ পেতনির সঙ্গে মাঠে ঘাটে খাটে খাটে খেলে বেড়ানো বেচারা ভদ্রলোকের চরিত্রে দেবরাজ এতটাই জ্যান্ত, থুড়ি জয়ন্ত, হয়ে উঠেছেন যে তাঁকে দেখলেই মনে পড়ে নবারুণ ভট্টাচার্যের লাইন ‘বাঙালি শুধুই খচ্চর নয়, তদুপরি অসহায়’। ভদ্রলোকের যাবতীয় ভালমানুষি ও ভণ্ডামি ভারি নিপুণভাবে তুলে ধরেছেন দেবরাজ।

কমলেশ নামক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে আছেন শৌনক কুন্ডু। অল্প সময়ের মধ্যেই তাঁকে দ্বিধা, বিষাদ, পূর্বরাগ, প্রেম, বিস্মৃতি – অনেককিছু ফুটিয়ে তুলতে হয়েছে। তাঁরই ঠোঁটে আছে এই সিরিজের সূক্ষ্ম অথচ সবচেয়ে মোক্ষম খোঁচা দেওয়া সংলাপ ‘কী হয়েছে মানুষের? এত রাগ, এত হিংসে…’। দ্বিতীয় পর্বের কমলেশ আর শেষ পর্বের কমলেশ প্রায় দুটো আলাদা চরিত্র। দুটোতেই দিব্য উতরে গেছেন শৌনক। গোটা সিরিজে সাকুল্যে আড়াই-তিন লাইন সংলাপ বলতে হওয়া উজ্জয়িনী বা শুটিং দলের অন্যদের অভিনয়েও এক চুল খামতি নেই।

ভূতুড়ে পরিবেশ তৈরি করতে অসামান্য ভূমিকা নিয়েছে অনিমেষ ঘড়ুইয়ের ক্যামেরা আর উজান চ্যাটার্জির আবহসঙ্গীত। অনিমেষের নৈপুণ্য তুঙ্গে উঠেছে একেবারে শেষ পর্বে রবীন্দ্রসঙ্গীতের গায়ে কাঁটা দেওয়া ব্যবহারে। এক স্মরণীয় শটে তিনি মিলিয়ে দিয়েছেন ভূতের বাড়ির আলো আঁধারি আর গানের ‘সেইখানেতে সাদায় কালোয়   মিলে গেছে আঁধার আলোয় –’ । ভূতের ছবির আবহসঙ্গীত প্রায়শই অকারণে কান ঝালাপালা করে। কিন্তু উজান মজা আর গা শিরশিরে ভাব মিলিয়েছেন শব্দের পরিমিত ব্যবহারে।

তবে এত উপাদেয় রান্নায় নুন কিন্তু গানগুলো। আগেও দেখা গেছে, অনির্বাণের কলম আর দেবরাজের সুর ও কণ্ঠ মিললে গুনগুন করার মত এক বা একাধিক গান তৈরি হয়ে যায়। এই সিরিজেও ব্যতিক্রম ঘটেনি। মধুপূর্ণা গাঙ্গুলির গাওয়া শীর্ষসঙ্গীত তো বটেই, দেবরাজ আর ঝিনুক বসুর গাওয়া ‘একটা প্রেম করি’-ও শ্রুতিমাধুর্যে তেমন গান হয়ে উঠেছে। গানের কথায় আশ্চর্য কাণ্ড অবশ্য ঘটেছে ঐশ্বর্য রায়ের গাওয়া ভূতেদের পার্টির গানে।

ভয় দেখাও, ঘাড় মটকাও, খেয়ে নাও সমস্যা
পূর্ণিমা খেয়ে নাও, ঢেঁকুর তোলো অমাবস্যা।

রাজনীতি খেয়ে নাও, ঢেঁকুর তোলো মানবিকতা।

এসব লাইন সহজে ভোলার নয়, যেমন ভোলা যাবে না সমাধানবাবুকে। র‍্যাপার ভূতো (বুদ্ধদেব দাস; কণ্ঠে অনির্বাণ) আর রজনীগন্ধার স্টিক লাগিয়ে হারমোনিয়াম নিয়ে ‘কেউ বেঁচে নেই’ গাইতে বসা গায়ককে (উজান) আবার হজম করা শক্ত বলে ভোলা কঠিন।

এই সিরিজের দুর্বলতা বলতে প্রথম দেড়খানা পর্বের বিপুল মজা সত্ত্বেও গল্প দানা না বাঁধা। তাছাড়া ভানুদিদি কী করে মারা গেলেন সে ব্যাখ্যাও কোথাও নেই। ব্যাপারটা বিসদৃশ লাগত না, যদি একমাত্র তাঁর বেলাতেই এমনটা না ঘটত। আর সবচেয়ে বড় শক্তি কী? প্রচণ্ড হুল্লোড় সত্ত্বেও গিলতে আসা বিষাদ। কারণ এই সিরিজে সারাক্ষণ মনে হয়, অশরীরীরা শরীরী হয়ে উঠতে চাইছে আর শরীরীরা মরলে বাঁচে।

নাগরিক ডট নেট ওয়েবসাইটে প্রকাশিত

মহাভারত ২: আজকের মহাকাব্য

অভিমন্যুকে আমরা ক্ষণজন্মা প্রতিভাবান যোদ্ধা হিসাবে ভাবতেই অভ্যস্ত, যার যুদ্ধবিদ্যায় পারদর্শিতা অথচ বয়সের কারণে চক্রব্যূহ সম্পর্কে অসম্পূর্ণ জ্ঞান তার মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এই নাটকের অভিমন্যুর ট্র্যাজেডি কিন্তু তাকে আজকের পৃথিবীর যুবকের অনেক কাছাকাছি এনে দিয়েছে।

‘তোমরা কার পক্ষে?’

‘হস্তিনাপুরের পক্ষে।’

দুর্যোধন খুশি হন না, সশস্ত্র বাহিনী প্রজাদের পিছনে এসে দাঁড়ায়।

‘তোমরা কার পক্ষে?’

‘কৌরবদের পক্ষে।’

দুর্যোধন তাতেও খুশি হন না, প্রজাদের ঘাড়ের উপর নিঃশ্বাস ফেলে আরও বেশি সৈনিক।

‘তোমরা কার পক্ষে?’

‘দুর্যোধনের পক্ষে।’

এবার দুর্যোধনের মুখে হাসি ফোটে।

নটধা নাট্যদলের প্রযোজনা মহাভারত ২-এর এই দৃশ্যে দুর্যোধন আসলে কে? শাসক দলই দেশ আর দলের শীর্ষে থাকা ব্যক্তিই দল – এই সূত্রটা কেমন চেনা চেনা লাগছে না? ওই দৃশ্য দেখতে দেখতে মনে পড়ে যায় – India is Indira and Indira is India। এবছর জরুরি অবস্থার ৫০ বছর পূর্ণ হল। কিন্তু সে তো আজকের গতিময় দুনিয়ায় আদ্যিকালের কথা। তখন আমার জন্ম হয়নি, এই নাটকের অভিনেতাদের অধিকাংশেরও জন্ম হয়নি। তাহলে ২০২৫ সালের এক সন্ধ্যাতেও এই নাটক এত জ্যান্ত মনে হয় কেন? কারণ আজও, যা মহাভারতে নেই তা ভারতে নেই। উলটো দিক থেকে দেখলে, মহাভারতে যা যা আছে তার সবই ভারতে আছে। আজও আছে। ফলে শিব মুখোপাধ্যায়ের কলমে, অর্ণ মুখোপাধ্যায়ের নির্দেশনায় মহাভারতের উদ্যোগ পর্বের এই সৃজনান্তর কখনো প্রাচীন মনে হয় না, সেকেলে তো নয়ই।

মহাভারত মহাকাব্য, কারণ প্রত্যেক পাঠেই সেখান থেকে বেরিয়ে আসে কোনো না কোনো নতুন বয়ান। মহাভারত ২ নাটকে মহাকাব্যের পরিচিত চরিত্রগুলো থেকেও নাট্যকার বের করে এনেছেন আশ্চর্য নতুন সব পরত। যেমন শ্রীকৃষ্ণের সঙ্গে দ্রৌপদীর সখ্য বহু আলোচিত, কিন্তু এখানে সেই সম্পর্কের অন্য এক মাত্রারও আভাস দেওয়া হয়েছে। দ্রৌপদীর প্রতি যৌন বুভুক্ষায় পাণ্ডবরা যে কৃষ্ণকেও সন্দেহ করে এবং তাদের নিজেদের মধ্যেকার সম্পর্কে ছায়া ফেলে দ্রৌপদীর প্রতি কামনা – তাও জীবন্ত হয়ে উঠেছে মঞ্চে। পাণ্ডবদের কাছে দ্রৌপদীর প্রত্যাশা, নিজের অপমানের আগুনে জ্বলতে জ্বলতে তাদের যুদ্ধের দিকে চালনা করার তীব্র অভিলাষে সোহিনী সরকারকে দেখে মনে পড়ে অডিও ক্যাসেটে শোনা নাথবতী অনাথবৎ নাটকের শাঁওলী মিত্রকে। কিন্তু এখানে, বিশেষত দ্বিতীয়ার্ধে, যোগ হয়েছে অপমানের প্রতিশোধ নেওয়ার খিদের সঙ্গে মা হিসাবে সন্তানকে যুদ্ধের দিকে ঠেলে দেওয়ার জন্যে গ্লানিবোধ। এই দ্বিধায় ভিতরে ভিতরে তছনছ হতে থাকা, অথচ প্রবল ব্যক্তিত্বশালী পাঞ্চালীকে জীবন্ত করে তুলেছেন সোহিনী।

আবার ছবিতে মহাভারত, রাজশেখর বসুর মহাভারত বা দূরদর্শনের মহাভারতেও যে খল মামা শকুনিকে দেখা যায়, এই নাটকের শকুনি তার থেকে ভিন্ন এক চরিত্র। এমনকি বহুবছর আগে একক নাটক শকুনির পাশা-য় বিপ্লব চট্টোপাধ্যায় শকুনির খল হয়ে ওঠার কাহিনির মধ্যে দিয়ে তার যে অসহায়তা তুলে ধরেছিলেন, এই শকুনির অসহায়তা তার চেয়েও বেশি। ভাগ্নে দুর্যোধন ক্ষমতার মদে মত্ত হয়ে এই শকুনিকে বিশ্বাস করে না। শকুনিও আতঙ্কিত হয়ে পড়ে তার চেহারা দেখে, কর্ণকে বোঝায় – দুর্যোধন এমন এক একাকিত্বে পৌঁছেছে যেখানে মামা বা নিকট বন্ধুও তার ব্যবহার্য বস্তু মাত্র। এই ভীত, নিরাপত্তাহীনতায় ভোগা শকুনির চরিত্রে আশ্চর্য অভিনয় করেছেন ঋতম। যুগপৎ শারীরিক ও মানসিক আঘাতে পঙ্গু একটা মানুষকে দেখিয়েছেন তিনি।

বিরাট রাজকন্যা উত্তরার যে অর্জুনের প্রতি অনুরাগ ছিল – এর ইঙ্গিতটুকু আছে মহাভারতে। বলা আছে বিরাটরাজ অর্জুনকেই জামাই করতে চেয়েছিলেন, কিন্তু অর্জুন বলেন যেহেতু উত্তরা তাঁর শিষ্যা, তাই তিনি তাকে বিয়ে করতে পারেন না। বিয়ে হোক অভিমন্যুর সঙ্গে। এই নাটকে সেই ইঙ্গিতকে অবয়ব দেওয়া হয়েছে। প্রত্যাখ্যাত প্রেমিকা থেকে পুত্রবধূ হয়ে যাওয়ার নিরুচ্চার বেদনা বেশ ফুটিয়ে তুলেছেন উপাবেলা, যদিও অর্জুনের চরিত্রে শুভম আগাগোড়াই আড়ষ্ট। উপরন্তু অভিমন্যুর চরিত্রাভিনেতা জ্যোতির্ময় আর শুভমকে প্রায় সমবয়সী মনে হয়েছে, উপাবেলার সঙ্গে জ্যোতির্ময়ের রসায়নও তেমন ঘনীভূত হয়নি।

তবে এই নাটকের অভিমন্যুর চরিত্র সবচেয়ে চমকপ্রদ। অভিমন্যুকে আমরা ক্ষণজন্মা প্রতিভাবান যোদ্ধা হিসাবে ভাবতেই অভ্যস্ত, যার যুদ্ধবিদ্যায় পারদর্শিতা অথচ বয়সের কারণে চক্রব্যূহ সম্পর্কে অসম্পূর্ণ জ্ঞান তার মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এই নাটকের অভিমন্যুর ট্র্যাজেডি কিন্তু তাকে আজকের পৃথিবীর যুবকের অনেক কাছাকাছি এনে দিয়েছে। তার সমরানুরাগে কোনো গৌরব নেই, বরং যুদ্ধ লাগলে নিজেরই আত্মীয়দের হত্যা করতে হবে ভেবে সে বিহ্বল। অনেকটা গীতার গোড়ার দিকের অর্জুনের মত। অথচ এমনভাবে তাকে বড় করা হয়েছে যে যুদ্ধ ছাড়া জীবনের কোনো সার্থকতা আছে বলেও তার জানা নেই। এই দ্বন্দ্বে সে আত্মহত্যা পর্যন্ত করতে যায়। ভারতীয় সমাজে আত্মহননের চেষ্টাকে সচরাচর কাপুরুষতা বলেই ধরা হয়। অভিমন্যুকে সেই পথে টেনে নিয়ে গিয়ে নাট্যকার চরিত্রটার গা থেকে সমস্ত নায়কোচিত অলঙ্কার খুলে নিয়ে তাকে রক্তমাংসের মানুষে পরিণত করেছেন। তাই এই অভিমন্যুকে দেখে, উত্তরার সঙ্গে তার প্রেমের দৃশ্য দেখে মনে পড়ে ইংরেজ কবি উইলফ্রেড ওয়েনের কবিতায় বর্ণিত সেই তরুণদের, যাদের যুদ্ধযাত্রার বর্ণনায় কবি লেখেন এইসব পংক্তি

So secretly, like wrongs hushed-up, they went.
They were not ours:
We never heard to which front these were sent.

Nor there if they yet mock what women meant
Who gave them flowers.

Shall they return to beatings of great bells
In wild trainloads?
A few, a few, too few for drums and yells,
May creep back, silent, to still village wells
Up half-known roads.

তরুণদের মধ্যে যুদ্ধোন্মাদনা জাগিয়ে তুলে, তাদের প্রাণহানিকে বীরত্ব নাম দিয়ে সেই আগুনে হাত সেঁকার সেই ট্র্যাডিশন সমানে চলেছে। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ যেহেতু আসলে গৃহযুদ্ধ, সেহেতু এই নাটকের অভিমন্যুকে দেখে আরও মনে পড়ে তরুণ গল্পকার প্রবুদ্ধ ঘোষের ‘আনন্দ ময়দান ছেড়ে পালায়নি’ গল্পের আনন্দকে। তাকে ক্ষমতাসন্ধানী এক পণ্ডিতজি শিখিয়েছিলেন যে এতদিন আসল ইতিহাস জানতেই দেয়নি কেউ। ‘কীভাবে জবরদস্তি মেরেছে, মন্দির-মঠ ভেঙে গুঁড়িয়ে দিয়েছে। ওদের জন্যই দেশভাগ আর খুন। রামনাথ স্বামীর বইতে লেখা আছে তুর্কিরা বাংলা দখল করতে আসার অনেক আগে থেকে সুফি-টুফিরা বাংলায় এক-ধারসে ধর্ম পালটে দিচ্ছিল। গান গেয়ে সম্মোহন করত। তারপর গরু খাইয়ে দিত, সুন্নত করিয়ে দিত বাচ্চাদের তুলে এনে। আনন্দর কান-মাথা ঝাঁ ঝাঁ করে রাগে। বল্লাল সেন, লক্ষ্মণ সেন প্রজাদের বাঁচাতে কিছু বর্ণের ভাগ তৈরি ক’রে দিয়েছিল। সে তো নিজেদের ধর্ম বাঁচাতেই।’ সেই গল্পের শেষে ‘আনন্দর বুকে চাপাতির কোপ পরিচ্ছন্নভাবে নেমে আসবে। যন্ত্রণায়, রক্তের ফোঁটায় চোখ খুলতে পারবে না। আগুনের হলকা আরও বাড়বে কারণ মিছিল থেকে ছুটে যাওয়া লোক মহল্লার ঘরে আগুন দিচ্ছে। বোম আর গুলির আওয়াজে আনন্দর কান বুজে আসবে। ঠোঁট নড়বে। স্যার, ওরা আমাদের মিছিলে ইট মেরেছে। নোংরা নোংরা খিস্তি।’ কেন মরছে আনন্দ? কারণ ‘রিষড়ায় রামনবমীর মিছিলে সংঘর্ষ। দোকানে আগুন। পাথরবৃষ্টি। আহত প্রায় পনেরোজন। আশঙ্কাজনক অবস্থায় হাসপাতালে ভরতি নুরুল আলম নামে এক ব্যক্তি। সংঘর্ষে মৃত এক যুবক। যুবকের পরিচয়…’

এবং দুর্যোধন। রাজশেখর লিখেছেন ‘দুর্যোধন মহাভারতের প্রতিনায়ক এবং পূর্ণ পাপী।’ এই নাটকের দুর্যোধন পূর্ণ পাপী ঠিকই, কিন্তু সে একাধারে এই নাটকের প্রতিনায়ক এবং নায়ক। এই চরিত্রে অর্ণ পুরাণের প্রতিনায়কের মধ্যে থেকে তুলে এনেছেন একজন সুচতুর একনায়ককে, যে সন্ত্রাস কায়েম করে জনমত নিয়ে আসতে পারে নিজের দিকে, তারপর চরম শঠতায় স্বয়ং কৃষ্ণকেও কিংকর্তব্যবিমূঢ় করে দিয়ে নিজমুখে বলে যে সে যুদ্ধ চায় না। তারপর আতঙ্কিত জনতার মুখ দিয়ে বলিয়ে নেয় ‘বিনাযুদ্ধে নাহি দিব সূচ্যগ্র মেদিনী’। আত্মম্ভরিতার উত্তুঙ্গ শিখর অর্ণ দেখিয়ে দিয়েছেন তাঁর অভিনয়ে। তিনি কখনো সচেতনে, কখনো অবচেতনেই নিজেকে বলেন সুযোধন। অভিনয়ে অন্যমনস্কতা তুলে ধরার আশ্চর্য ক্ষমতা দেখিয়েছেন অর্ণ। খোঁড়া মামা শকুনি, বাবা অন্ধ ধৃতরাষ্ট্রকেও তিনি শারীরিক পীড়ন করতে ছাড়েন না। অর্ণর অভিনয় তুঙ্গে ওঠে ধৃতরাষ্ট্রের (কৌশিক চট্টোপাধ্যায়) সঙ্গে একান্ত মুহূর্তগুলোতে এবং কৃষ্ণের (অর্পণ ঘোষাল) সঙ্গে নাচের দ্বন্দ্বযুদ্ধে। নাটকের একেবারে শেষদিকে, যুদ্ধে যাওয়ার আগে মা গান্ধারীর (সাধনা মুখোপাধ্যায়) কাছে বিদায় নেওয়ার দৃশ্যে একেবারে অন্য এক দুর্যোধন বেরিয়ে আসে। মঞ্চের উপর গর্ভস্থ শিশুর মত কুঁকড়ে শুয়ে পড়েন অর্ণ, তারপর মাকে বলে যান – দুর্যোধনের মনে কেবল অন্ধকার, কারণ বাবা জন্মান্ধ আর মা স্বেচ্ছান্ধ। তাই তাকে আলো দেখানোর কেউ ছিল না। নাটকের সবচেয়ে বড় খল চরিত্রের যাবতীয় পাপ সত্ত্বেও ওই দৃশ্যে কঠিন হয়ে পড়ে দুর্যোধনের জন্যে চোখ ভিজে আসা আটকানো।

স্নেহান্ধ ধৃতরাষ্ট্রের ক্ষমতা ও অক্ষমতা মাত্র কয়েকটা সুযোগে জীবন্ত করে তোলেন কৌশিক। অর্ণর সঙ্গে তাঁর মুহূর্তগুলো বহুদিন মনে থাকার মত। একান্ত অনুচরকে যখন তিনি বলেন যে তাঁকে খাদের সামনে দাঁড় করালেও তিনি তাকেই বিশ্বাস করবেন, কারণ অন্ধ লোকের বিশ্বাস করা ছাড়া কোনো উপায় নেই – তখন তৈরি হয় এমন মুহূর্ত, যখন পরম সত্যকে ছুঁয়ে ফেলতে পারেন একজন অভিনেতা। ফলে সন্দেহ হয় – ধৃতরাষ্ট্র আসলে কে? দৃষ্টিহীন রাজা, বখে যাওয়া ছেলের স্নেহান্ধ বাবা, নাকি কোনো দেশের একনায়কের প্রোপাগান্ডায় নিজের দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে ফেলা নাগরিক? ধৃতরাষ্ট্র কি এমন এক বিকল্পহীন রাজনৈতিক অবস্থার শিকার, যেখানে লম্পট ছেলে দুঃশাসনকেও তাঁর সময়ে সময়ে দুর্যোধনের চেয়ে ভাল বলে মনে হয়?

দুঃশাসনের চরিত্রে যে লাম্পট্য ছাড়াও অনেককিছু আছে, তা সামান্য সুযোগেই দেখিয়ে দিয়েছেন সৌরভ। ধৃতরাষ্ট্রের সঙ্গে তাঁর একার কয়েকটা মাত্র মুহূর্ত দুঃশাসন চরিত্রের একমাত্রিকতা ঘুচিয়ে দিয়েছে।

আরও পড়ুন জনপ্রিয় বাংলা ছবির সযত্ন সন্ধানে তালমার রোমিও জুলিয়েট

কৃষ্ণের চরিত্রে অর্পণ মুরলীধর হিসাবে পাণ্ডব এবং দ্রৌপদীর সঙ্গে সাবলীল। কিন্তু কূটনীতিবিদ হিসাবে কর্ণ (অনুজয় চট্টোপাধ্যায়), শকুনি বা ধৃতরাষ্ট্রের সঙ্গে দৃশ্যগুলোতে তাঁকে যতখানি ভারি দেখানো উচিত ছিল, তা দেখায় না। অন্যদিকে এই সময়ের অন্যতম উল্লেখযোগ্য অভিনেতা অনুজয়ের বিশেষ কিছু করার নেই এই নাটকে।

তবে মানানসই আবহসঙ্গীত এবং এত নিপুণ অভিনয় সত্ত্বেও শেষপর্যন্ত এই প্রযোজনার সেরার শিরোপা বোধহয় নাট্যকারকেই দিতে হবে। তাঁর নির্মিত চরিত্রগুলো বেদব্যাসের মহাকাব্যের মতই বহুবর্ণ, উপরন্তু সমসাময়িক। স্ত্রী ভানুমতীর (স্বাগতা) সঙ্গে একমাত্র একান্ত দৃশ্যে দুর্যোধনের মুখে শোনা যায়, সকলের ভয়ের পাত্র হওয়ার মধ্যে এক ধরনের মাদকতা আছে। একনায়কদের মনস্তত্ত্বের গভীর থেকে তুলে আনা এই সংলাপ শাশ্বত সত্যের দিকে ইঙ্গিত করে।

নাগরিক ডট নেট ওয়েবসাইটে প্রকাশিত

অনির্বাণ কাজ পাচ্ছেন না: টালিগঞ্জের অর্ধসত্য বা হিমশৈলের চূড়া

অর্ধসত্য যে মিথ্যার চেয়েও ভয়ঙ্কর সে তো সকলেই জানেন। কিন্তু ক্লিকটোপের যুগে অর্ধসত্য আবার সত্যের চেয়ে সুবিধাজনকও বটে। অর্ধসত্যে ক্লিক পাওয়া যায় বেশি, তাই সংবাদমাধ্যমের সুবিধা। অর্ধসত্য নিয়ে কয়েকদিন সোশাল মিডিয়ায় রাগ-টাগ দেখিয়ে বিবেক দংশন থেকে মুক্তি পাওয়া যায়, তাই যে সংবাদ গিলছে তার সুবিধা। আবার পুরো সত্যটা জেনে গেলে হয়ত ব্যক্তির এত বেশি রাগ হবে বা গ্লানি হবে যে সত্যিকারের কিছু একটা করতে ইচ্ছে হবে। সেটা ব্যক্তির পক্ষে বিপজ্জনক, ব্যক্তি সমষ্টি হয়ে উঠলে ক্ষমতার পক্ষেও। এরকমই একটা অর্ধসত্য নিয়ে কদিন ধরে বাংলার নিস্তরঙ্গ সংস্কৃতি জগৎ কিছুটা উত্তাল – অনির্বাণ ভট্টাচার্য কাজ পাচ্ছেন না। গোটা ব্যাপারটা যা, তাতে এই খবরটাকে অর্ধসত্য না বলে সোয়া সত্য বা এক দশমাংশ সত্য বললেও ভুল হয় না।

ব্যাপারটা কী আসলে? ব্যাপার হল, টলিউডের কিছু শিল্পীকে কলাকুশলীরা (আজকাল বাংলায় যাঁদের টেকনিশিয়ান বলা হয়) বয়কট করেছেন। কী করে জানা গেল বয়কট করা হয়েছে? কেউ ঘোষণা করেছে? না। কিন্তু ওই শিল্পীরা কোনো ফিল্মের বা ওয়েব সিরিজের নির্দেশক, চিত্রনাট্যকার, অভিনেতা, গীতিকার, গায়ক বা অন্য যে ভূমিকাতেই থাকুন না কেন – শুটিংয়ের জন্য ডাকলে কোনো কলাকুশলী যাচ্ছেন না। এই বয়কটের আওতায় পড়ে যাওয়া শিল্পীদেরই একজন অনির্বাণ। এমনকি তিনি তাঁদের গানের দল হুলিগানইজমের মিউজিক ভিডিও শুট করতে গিয়েও দেখেন কোনো কলাকুশলী আসেননি। কিন্তু মূলধারার সংবাদমাধ্যম যেভাবে শুধু অনির্বাণের নাম নিয়ে হইচই করেই ব্যাপারটা মিটিয়ে ফেলতে চাইছে, তাতে বোঝা যায় যে গভীরে যাওয়ার সাধ নেই। হয়ত সাধ্যও নেই, কারণ সেটা করতে গেলে সরাসরি এ রাজ্যের ক্ষমতাসীনদের চটাতে হবে।

ঘটনা হল, অনির্বাণের একার ভাত মারার চেষ্টা চলছে না টালিগঞ্জে। কোনো কোনো সংবাদমাধ্যমে তাঁর পাশাপাশি বাংলা ছবি ও সিরিজের দর্শকদের পরিচিত মুখ পরমব্রত চট্টোপাধ্যায়ের নামোল্লেখ করা হয়েছে। বিকল্প সংবাদমাধ্যমগুলো এঁদের পাশাপাশি নির্দেশক ইন্দ্রনীল রায়চৌধুরীর নামও করেছে, কোনো কোনো সংবাদমাধ্যমে টিভির এক সময়কার পরিচিত মুখ এবং বড় পর্দার বেশকিছু ছবির পরিচালক সুদেষ্ণা রায়ের উল্লেখও করা হয়েছে। এও সেই সোয়া সত্যেরই বেসাতি। এর সুবিধা হল, পাঠক/দর্শক ভাববেন বা তাঁদের ভাবানো যাবে যে এই দু-চারজনের সঙ্গে দণ্ডমুণ্ডের কর্তাদের কোনো ব্যক্তিগত ঠোকাঠুকি লেগেছে। একেকজনের অতীত কার্যকলাপ উল্লেখ করে ‘যা হচ্ছে ওদের নিজেদের মধ্যে হচ্ছে, আমাদের ভাবার দরকার নেই’ – এরকম একটা বয়ান খাড়া করে দেওয়া যাবে। ফলে কয়েকদিন হইচইয়ের পরে সবাই ব্যাপারটা ভুলে যাবে, সোশাল মিডিয়ার যুগে হইচই করার মত নতুন কিছু ঠিক এসে পড়বে (এক্ষেত্রে যেমন প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়ের মাতৃভাষা সম্পর্কে হীনমন্যতা এসে পড়েছে)। ফলে কেউ আর খুঁজে দেখতে যাবে না, আসলে কী হয়েছে।

এই কুচক্র থেকে বেরোতে প্রথমেই বলা যাক যে বয়কট হচ্ছেন মূলত ১৩ জন। কোন ১৩ জন? যে ১৩ জন কলকাতা হাইকোর্টে রিট পিটিশন দাখিল করেছেন এই মর্মে, যে ভারতের একজন নাগরিকের এদেশে কাজ করে উপার্জন করার যে সংবিধানস্বীকৃত মৌলিক অধিকার রয়েছে, তা লঙ্ঘন করা হচ্ছে তাঁদের বেলায়। কাজ করতে বাধা দেওয়া হচ্ছে। এই ১৩ জন কারা? সুদেষ্ণা রায়, সুব্রত সেন, কিংশুক দে, বিদুলা ভট্টাচার্য, আশিস সেন চৌধুরী, সুমিত দাম, পরমব্রত চট্টোপাধ্যায়, অভিষেক সাহা, অনির্বাণ ভট্টাচার্য, দেবাশীষ চক্রবর্তী, ইন্দ্রনীল রায়চৌধুরী, প্রসেনজিৎ মল্লিক, সৌরভ ভট্টাচার্য।

বাংলা সিনেমার যাঁরা রীতিমত খোঁজখবর রাখেন, তাঁদের কাছেও হয়ত বেশিরভাগ নাম অচেনা। কিন্তু তার মানে তো এই নয় যে এই তালিকার কারোর কাজ করার অধিকার অন্যদের চেয়ে কম। সুতরাং বোঝা দরকার, একটা বিরাট অন্যায় ঘটে চলেছে পশ্চিমবঙ্গের সিনেমা শিল্পে এবং সেই অন্যায় ঘটছে রাজ্য সরকারের মদতে। এটা আমার মতামত নয়। পিটিশনাররা এই দাবিটাই করেছেন। বস্তুত, রিট পিটিশন সরকারের বিরুদ্ধেই দাখিল করা যায়। কারণ নাগরিকের যে কোনো সাংবিধানিক অধিকার রক্ষার দায়িত্ব সরকারের। ফলে এই শিল্পীদের কাজ করতে না দেওয়ার পিছনে টলিউডের কুখ্যাত ফেডারেশন – যার কর্তা মন্ত্রী অরূপ বিশ্বাসের ভাই স্বরূপ বিশ্বাস – আছেন বলে অভিযোগ থাকলেও, পিটিশন কিন্তু করা হয়েছে সরকার পিটিশনারদের অধিকার রক্ষা করছে না, এই অভিযোগে। এতে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের প্রতিক্রিয়া কী?

গতবছর এই জুলাই মাসেই যখন টালিগঞ্জে ফেডারেশন বনাম পরিচালক টানাপোড়েন শুরু হয় শ্রী ভেঙ্কটেশ ফিল্মস প্রযোজিত এবং রাহুল মুখার্জি নির্দেশিত একটি ছবির শুটিং নিয়ে এবং তার জেরে কাজ বন্ধ হয়ে যায় পুরো সিনেমাপাড়ায়, তখন মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি স্বয়ং সব পক্ষকে ডেকেছিলেন। সেই সভায় প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন যে সরকার একখানা কমিটি গঠন করে দেবে এবং সেই কমিটি সব মিটিয়ে দেবে। সে কমিটিও গঠন হল না আর তা নিয়ে বিস্তর ইমেল পাঠানোর পরেও কোনো জবাব পাওয়া গেল না দেখে পরিচালকরা আদালতে এই পিটিশন দাখিল করলেন। মজার কথা, হাইকোর্টে বিচারপতি অমৃতা সিনহার এজলাসে এই মামলার শুনানিতে কিন্তু রাজ্য সরকারের কৌঁসুলি কেবলই প্রমাণ করার চেষ্টা করে গেছেন যে এই মামলার দুটি পক্ষ হল ফেডারেশন আর পরিচালকরা। এতে সরকারের কোনো ভূমিকা নেই, কিছু করার নেই। বিচারপতি অবশ্য সেকথায় আমল দেননি। ডিভিশন বেঞ্চে আবেদন জানিয়েও রাজ্য সরকার সুবিধা করতে পারেনি। মামলা আবার ফেরত এসেছে বিচারপতি সিনহার এজলাসেই। ইতিমধ্যে বিচারপতি সিনহার পশ্চিমবঙ্গ সরকারের তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রকের সচিবকে দেওয়া স্পষ্ট নির্দেশ সত্ত্বেও পিটিশনারদের কাজে বাধা পড়ায় তাঁরা আদালত অবমাননার মামলাও করেছেন। সে মামলার শুনানি হওয়ার কথা আগামীকাল। তাহলে ভাবুন, রাজ্য সরকার ফেডারেশনের স্বার্থরক্ষায় কতখানি মরিয়া আর পরিচালকদের নাগরিক অধিকার রক্ষায় কতখানি উদাসীন। অর্থাৎ ব্যাপারটা স্রেফ অনির্বাণ বা কয়েকজন শিল্পীকে কলাকুশলীদের বয়কট করার ব্যাপার নয়। এ রাজ্যে যে কোনো নাগরিক আইনি পথে নিজের কাজকর্ম করতে পারবেন কি পারবেন না – প্রশ্নটা সেইখানে।

সমস্যার গভীরতা বোঝার জন্যে আরও দুটো তথ্য খুব জরুরি। এই পিটিশন যখন দাখিল করা হয় তখন পিটিশনার ছিলেন ১৫ জন, এখন ১৩। গত এক বছরে আরও একটি মামলা দায়ের করেছেন বয়কট হয়ে যাওয়া শিল্পীরা। সেটা সরাসরি ফেডারেশনের দণ্ডমুণ্ডের কর্তা স্বরূপের বিরুদ্ধে মানহানির মামলা, কারণ তিনি সংবাদমাধ্যমকে বলেছিলেন যে বেশিরভাগ নির্দেশকের নামেই নাকি যৌন হয়রানির অভিযোগ জমা পড়েছে তাঁর কাছে। সেই মামলা করেছিলেন ২৩০-৩৫ জন। মামলার শুনানি এখনো শুরুই হয়নি, অথচ ৭০-৮০ জন মামলাকারী মামলা প্রত্যাহার করে ফেলেছেন।

কেন এমন হল? ঠিক যে কারণে প্রকাশ্য দিবালোকে ব্যস্ত রাস্তায় খুন হওয়ার পরেও পুলিস একজন সাক্ষী পায় না খুনিকে দোষী সাব্যস্ত করার জন্যে। ঠিক যে কারণে আর জি কর কাণ্ডের সময়ে সারা রাজ্যের মেডিকাল কলেজের জুনিয়র ডাক্তাররা হুমকি সংস্কৃতির কথা বলছিলেন; যে কারণে সাউথ ক্যালকাটা ল কলেজে ছাত্রীর ধর্ষণের পর জানা যাচ্ছে, ম্যাংগো কুমার আগেও বিস্তর কুকর্ম করেছে। কিন্তু কেউ তার টিকি স্পর্শ করতে পারেনি। উপরন্তু সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হতে শুরু করেছে যে রাজ্যের বহু কলেজই নানা জাতের ম্যাংগোর গন্ধে বারো মাস ম ম করে। এহেন ম্যাংগোরাই এ রাজ্যের সর্বময় কর্তা এখন। গত ২০ জুন উত্তরবঙ্গ সংবাদের পাতায় বর্ষীয়ান সাংবাদিক রূপায়ণ ভট্টাচার্যকে লিখতে হয়েছে

মমতা রাত জেগে টিভি সিরিয়াল দেখেনতাঁর মতো করে সাহিত্যচর্চা করেনসবার জানা। অথচ টালিগঞ্জ ইন্ডাস্ট্রিই সবচেয়ে বিপন্ন শিল্প। সাহিত্য আকাদেমিনাট্য আকাদেমিতেও হাত মিলিয়ে অনেক কাজ চলছেযা দিদিই জানেন না। যে কোনও সময় টালিগঞ্জ ইন্ডাস্ট্রিতে তালাচাবি লেগে যাবে মন্ত্রী অরূপ বিশ্বাসের ভাই স্বরূপের দাদাগিরিতে। এই স্বরূপ কাউন্সিলারও ননঅথচ মমতা-অরূপকে তুড়ি মেরে উড়িয়ে প্রসেনজিৎ-দেব-সৃজিত-কৌশিক-পরমব্রত-অনির্বাণদের কাজ বন্ধ করতে এক মিনিট লাগে তাঁর। এক বছর ধরে স্বরূপ তাঁর স্বরূপ বোঝাচ্ছেন মিটিং না ডেকে। মুখ্যমন্ত্রীর নির্দেশ না মেনে। মমতা রহস্যজনক চুপ। মাঝে তিনি নিজের ভাই বাবুনকে পর্যন্ত কিছুদিনের জন্য ত্যাজ্য করেছিলেন। এখানে এসব হয় না।

দেব-শতাব্দী-জুন থেকে শুরু করে সায়নী-লাভলি-সায়ন্তনীরা তৃণমূলের এমপিএমএলএ। অথচ মমতা স্থানীয় বিধায়কের কীর্তিমান ভাইকে টালিগঞ্জ সামলাতে দিলেন কেনসাহিত্যজগৎ কি তাহলে কলেজ স্ট্রিটের বিধায়কের ভাই সামলাবেনযাত্রাপাড়া চিৎপুরের বিধায়কের ভাইখেলার ময়দান চৌরঙ্গির বিধায়কের ভাইঅরূপকে দিদি অনেক জায়গায় জট খুলতে পাঠান। অধিকাংশ ক্ষেত্রে অরূপ সফলসবাইকে নিয়ে চলার গুণের জন্য। শুধু ভাইকেই সামলাতে চূড়ান্ত ফ্লপ। অভিনেতারা বলেনভাই এখন দাদাকেই পাত্তা দেয় না। মমতার প্রতি সহানুভূতি সম্পন্নদের সঙ্গে রাজ্য সরকারের ঝামেলা লাগিয়ে দিতে ওস্তাদ স্বরূপ কোম্পানি।

এরপরেও যদি আপনি কেন-র উত্তর না পান, তাহলে দেখে নিন স্বরূপের নেতৃত্বাধীন ফেডারেশনের গুণগান করে তৈরি বাংলা ছবির তথাকথিত ফার্স্ট বয় সৃজিত মুখার্জি, গতবছর জুলাইয়ে যাঁর ছবির কাজ বয়কট নিয়ে এই বিবাদের সূত্রপাত সেই রাহুল মুখার্জি এবং সঙ্গীত পরিচালক তথা পরিচালক ইন্দ্রদীপ দাশগুপ্তের ভিডিও।

এই ভিডিও পোস্ট করা হয়েছিল গত ১১ জুন, যুযুধান পরিচালকরা তাঁদের বক্তব্য জানিয়ে দুখানা ভিডিও ৩০ এপ্রিল ও ২৮ মে প্রকাশ করার পর। মজার কথা, মামলাকারী পরিচালকরা ভিডিওগুলো পোস্ট করেছেন একখানা স্বতন্ত্র ইউটিউব চ্যানেলে এবং নিজ নিজ সোশাল মিডিয়া হ্যান্ডেলগুলোতে। ফেডারেশনের গুণগান করা ত্রয়ীর ভিডিও কিন্তু পোস্ট হয়েছে ফেডারেশনেরই ফেসবুক পেজ থেকে। আরও মজার কথা, পর্দায় এক কোণে তিন পরিচালককে দেখা যাচ্ছে, বেশিরভাগ জায়গা জুড়ে আছে একটি বাণী

আমরা একসাথে
কাজ করার পক্ষে
মিথ্যা মামলার বিপক্ষে।
ফেডারেশনে ছিলাম
আছি থাকবো

এই ভিডিওতে কলাকুশলীরা যে ছবি বানানোর কাজে নির্দেশকদের সমান জরুরি, সেকথা বলা হয়েছে। গোটা টলিউড যে পরিবারের মত, তাও বলা হয়েছে। এমনকি ‘স্বরূপদা’ কত ভাল – সেকথাও বলেছেন সেই রাহুল, যিনি ফেডারেশনের অনুমতি না নিয়ে বাংলাদেশে গিয়ে একখানা ওয়েব সিরিজের শুটিং করে এসেছিলেন বলে তাঁর এখানকার ছবির শুটিং করতে দেওয়া হচ্ছিল না। তা থেকেই গোটা গোলমালের সূত্রপাত। তাঁর পাশে দাঁড়িয়েই ফেডারেশনের গা জোয়ারির প্রতিবাদ আরম্ভ করেছিলেন সুদেষ্ণা, ইন্দ্রনীল, সুব্রত, পরমব্রত, অনির্বাণ, বিদুলা প্রমুখ। সৃজিত প্রথম থেকেই ধারেকাছে ঘেঁষেননি; কৌশিক গাঙ্গুলি, শিবপ্রসাদ মুখার্জিরা মাঝপথে সরে পড়েছেন। রাহুল স্বয়ং ‘স্বরূপদা’-র ভক্ত হয়ে গেছেন। তা হোক, সকলের মেরুদণ্ড কখনো সমান শক্ত হয় না। কিন্তু উপরের ভিডিওতে লক্ষ করার মত বিষয় হল, রাহুল বলছেন, তিনি ‘স্কেপগোট’ হয়েছিলেন, ফেডারেশনের সঙ্গে তাঁর ‘সম্পর্কে ফাটল ধরেছিল’ এবং তারপর তিনি প্রায় ২২২ দিন বেকার ছিলেন। অর্থাৎ প্রকারান্তরে স্বীকার করে নেওয়া হল যে ফেডারেশন (বা স্বরূপদা) হল কুমীর। টালিগঞ্জের জলে থেকে তার সঙ্গে বিবাদ করলে কাজ পাওয়া যায় না। সৃজিত আর ইন্দ্রদীপ ফেডারেশনকে খুব প্রয়োজনীয় সংস্থা বলেছেন, কেন প্রয়োজনীয় তা বলেননি। টালিগঞ্জের কলাকুশলীদের জন্য কী কী ভাল কাজ ফেডারেশন করেছে বা করছে – তা বলার বিন্দুমাত্র চেষ্টা নেই। সৃজিত ভিডিওর শুরুতেই ছিলেন। তিনি তো যা বলছেন তা কেন বলছেন তা-ই ভেবে পাচ্ছেন না বলে মনে হয়। কথা আটকে যায়, তারপর অনেক কষ্টে খুঁজে বার করেন ‘অসুবিধা হচ্ছে’ শব্দবন্ধ। কী অসুবিধা, কেন অসুবিধা – সেসবের মধ্যে যাননি। ইনিয়ে বিনিয়ে তিনজনেই বলেছেন, যে অসুবিধাই হয়ে থাক তা আলাপ আলোচনা করে মিটিয়ে নেওয়াই উচিত। আদালতে যাওয়া অন্যায় হয়েছে।

টলিউড যদি সত্যিই একটা পরিবার হয়, তাহলে বলতেই হবে যে এ হল গার্হস্থ্য হিংসায় লিপ্ত পরিবারের ভাষা। দীর্ঘদিন নির্যাতিত বাড়ির বউ যেই থানায় গিয়ে ডায়রি করে দেয়, অমনি শ্বশুরবাড়ির লোক বলতে শুরু করে ‘বাড়ির ঝামেলা বাড়িতেই মেটানো উচিত ছিল। এসব নিয়ে কেউ থানা-পুলিস করে? ছি ছি! পরিবারের একটা মানসম্মান নেই?’ উপরন্তু, আলোচনায় যে ফেডারেশনই বসেনি, সেকথাও চেপে গেছেন পরিচালক ত্রয়ী। আর ‘মিথ্যা মামলা’ কথাটা কিন্তু কলকাতা হাইকোর্টের বিচারপতিরা এখন পর্যন্ত মানেননি।

এবার প্রশ্ন উঠবে, কী এমন নির্যাতন করা হয়েছিল যে পিটিশনার পরিচালকরা আদালতে গেলেন? এই প্রশ্নের উত্তর গত এক বছরে বিভিন্ন সময়ে প্রতিবাদী পরিচালকরা সাংবাদিক সম্মেলন করে দিয়েছেন, বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের ক্যামেরার সামনেও বলেছেন। পুনরাবৃত্তি করে লেখার কলেবর বাড়াব না এবং পাঠকের আলস্যকেও প্রশ্রয় দেব না। যাঁরা বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির বর্তমান ও ভবিষ্যৎ নিয়ে বিন্দুমাত্র ভাবিত, প্রসেনজিৎ বাংলা বলতে বুক ফুলিয়ে লজ্জিত হওয়ায় যাঁরা সত্যিই ক্রুদ্ধ, তাঁরা নিজ আগ্রহে জেনে নেবেন। যাঁরা কিছু না জেনেই বোদ্ধা, তাঁদের জন্যে এ লেখা নয়। তাঁরা তো মনেই করেন না বাংলা ছবি কোনো দেখার মত জিনিস। কেন দেখার মত হয় না, তা নিয়েও এতদিন তাঁরা কোনো প্রশ্ন তোলেননি। এখন অনির্বাণ, পরমব্রতর নাম জড়িয়ে যাওয়ায় সোশাল মিডিয়ায় ‘এনগেজমেন্ট ফার্মিং’ করতে সুবিধা হবে বলে হঠাৎ এ বিষয়ে আগ্রহী হয়েছেন। ওঁরা ‘ওয়ার্ল্ড সিনেমা’ নিয়ে থাকেন, সোশাল মিডিয়ার উত্তেজনা থিতিয়ে গেলে নির্ঘাত আবার ওতেই ফিরে যাবেন।

তবে যে পাঠকরা বোদ্ধা নন তাঁদের সাধারণ বুদ্ধি আছে। তাঁরা নিশ্চয়ই বোঝেন যে পশ্চিমবঙ্গের বাংলা সিনেমা একটি রুগ্ন শিল্প। এখানে ছবির বাজেট কম, তাই শুটিংয়ের সময় কম, তাই নির্দেশক ও অভিনেতাদের পারিশ্রমিক কম, ফলে কলাকুশলীদের পারিশ্রমিক আরও কম। এমতাবস্থায় ফেডারেশনের উদ্যোগের ফলে কলাকুশলীরা খুব ভাল আছেন – একথা বলা অর্থহীন। এরকম একটা ইন্ডাস্ট্রিতে সক্রিয় শিল্পীদের কাজ করতে না দিলে কাজ যে আরও কমে যায়, তা বুঝতেও বোদ্ধা হওয়ার দরকার নেই। কারখানায় কাজ না হলে শ্রমিক কী করে ভাল থাকতে পারেন? যে ট্রেড ইউনিয়ন কাজ কমিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করে, সে শ্রমিক দরদী, সে প্রয়োজনীয় – একথারই বা মানে কী? আসলে যা চলছে তা যে ট্রেড ইউনিয়নের নামে গুন্ডামি বা আমির খান অভিনীত গুলাম ছবির মত মাফিয়ারাজ, তা বুঝতে অনুসন্ধানমূলক সাংবাদিকতা লাগে না।

আরো পড়ুন বাংলা মাধ্যম স্কুলের পর বাংলা সিনেমা উঠে যাওয়ার পালা?

বলিউডের অনেক হিট ছবির মতই ওই ছবিটাও একখানা হলিউডি ছবির পুনর্নির্মাণ। অন দ্য ওয়াটার ফ্রন্ট নামের সেই ছবিতে নায়কের চরিত্রে ছিলেন মার্লন ব্রান্ডো, পরিচালক এলিয়া কাজান। মূল ছবি আর তার পুনর্নির্মাণ – দুটোতেই নায়ককে অনেককিছু খোয়াতে হয়, আক্ষরিক অর্থে মারও খেতে হয়। ওটা কিন্তু গল্প হলেও সত্যি। কাজান ছবিটা বানিয়েছিলেন পুলিৎজার পুরস্কারপ্রাপ্ত সাংবাদিক ম্যালকম জনসনের একগুচ্ছ প্রতিবেদনের উপর ভিত্তি করে। সেসব যদি বাদও দেন, ২০২০-২১ সালের কৃষক আন্দোলনের দিকে তাকালেও বুঝবেন যে আন্দোলনকারীদের ত্যাগ ছাড়া কোনো আন্দোলন হয় না। আজকাল ও জিনিসটারই অভাব, তাই কোনো প্রতিবাদই ফেসবুকের বাইরে বেশিদূর ছড়ায় না, অভীষ্ট লক্ষ্যেও পৌঁছয় না। কারণ আজকাল রাজনৈতিক দলের নেতা কর্মীরাও প্রতীকী প্রতিবাদের বেশি কিছু করতে চান না। এই ১৩ জন পিটিশনার কিন্তু নিজেদের রুজি রোজগার বাজি রেখে লড়তে নেমেছেন। আর জি কর আন্দোলনে কেন মুখ খোলেননি, কেন একটা কথাও বলেননি – এসব বলে অনির্বাণকে আক্রমণ করতে পারেন। তৃণমূল সরকার গঠিত কমিটিতে ছিলেন বলে পরমব্রত, সুদেষ্ণাকেও গাল দিতে পারেন। কিন্তু নিজের অফিসে একটা সামান্য দাবির জন্যে লড়ে দেখুন, টের পাবেন যে মোমবাতি হাতে কদিন রাতে মিছিলে যাওয়া আর ক্যামেরার সামনে বাইট দেওয়া অতি সহজ কাজ। খেয়াল করবেন, আর জি কর আন্দোলনের সময়ে টলিউডের যে তারকারা ও কাজটা গোড়ায় করেছিলেন এবং পরে চেপে গিয়েছিলেন, তাঁদের কিন্তু তৃণমূল নেতা পরিচালিত ফেডারেশন বয়কট করছে না। কারণ ওতে ক্ষমতার কাঁচকলা।

ভাবুন, ভাবা প্র্যাকটিস করুন। আর যদি মনে হয় বাংলা সিনেমার ভবিষ্যতের জন্যে, বাঙালি সংস্কৃতির জন্যে এই লড়াইয়ের এক কণাও দাম আছে – তাহলে তির্যক মন্তব্য বন্ধ রাখুন। যদি এই লড়াইয়ের গুরুত্ব আরও বেশি বলে মনে করেন, তাহলে পাশেও দাঁড়াতে পারেন। বাংলা সিনেমার পাশে দাঁড়ানোর চেয়ে অনেক জরুরি কাজ হবে সেটা। আইনি লড়াইয়ে কীভাবে পাশে দাঁড়াবেন? আগ্রহ থাকলে প্রশ্নটা নিজেই তুলুন, উত্তর পেয়ে যাবেন।

নাগরিক ডট নেট ওয়েবসাইটে প্রকাশিত

অবহেলিত বিজ্ঞান আর কৈশোরকে ভালবেসে এল পক্ষীরাজের ডিম

আধুনিক বাঙালি বিজ্ঞানী হতে চায় না, কেউ কেউ হয়ে যায়। তাই আমাদের গল্পে, উপন্যাসে, সিনেমায় বিষয় হিসাবে বিজ্ঞান বা বিজ্ঞানী বিরল।

আকাশের লক্ষ লক্ষ তারার মধ্যে একটা হল সূর্য। সেই সূর্যের আটটা গ্রহ, তার একটা হল পৃথিবী। সেই পৃথিবীর একটা ছোট্ট জায়গা হল আকাশগঞ্জ। সেখানকার একটা স্কুলের একটা পরীক্ষায় যদি আমি ফেল করি, তাহলে কি আমি বিজ্ঞানী হতে পারব না? সৌকর্য ঘোষালের পক্ষীরাজের ডিম ছবির কেন্দ্রীয় চরিত্র শ্রীমান ঘোতন ওরফে সার্থক (মহাব্রত বসু) তারায় ভরা আকাশের দিকে তাকিয়ে আপন মনে এই প্রশ্ন তোলে মাধ্যমিকের টেস্টে, বিজ্ঞান পড়তে গেলে যা না জানলে একেবারেই চলে না, সেই অঙ্কে শূন্য পাওয়ার পরে।

নিজের অস্তিত্বকে এভাবে প্রশ্ন করতে একমাত্র মানুষই পারে – একথা একাধিকবার নানাভাবে লিখেছেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। আর এই মহাবিশ্বের সাপেক্ষে মানুষের ক্ষুদ্রতার কথা লিখেছেন বিশ্বখ্যাত মার্কিন জ্যোতির্বিজ্ঞানী কার্ল সেগান। তাঁর একখানা বিখ্যাত বইয়ের নাম পেল ব্লু ডট: এ ভিশন অফ দ্য হিউম্যান ফিউচার ইন স্পেস। সেই বইয়ের এক জায়গায় তিনি যা লিখেছেন তার বাংলা তরজমা করলে এরকম দাঁড়ায় ‘ওই বিন্দুটাকে আবার দেখুন। ওটাই এই জায়গাটা। আমাদের বাড়ি। ওটাই আমরা। ওর মধ্যেই আপনি যাদের ভালবাসেন, যাদের চেনেন, যাদের কথা কোনোদিন শুনেছেন, যত মানুষ কোনোদিন ছিল, জীবন কাটিয়েছিল, তারা সকলে আছে…পৃথিবীটা এক বিরাট ব্রহ্মাণ্ডের মধ্যে একটা ছোট্ট মঞ্চ।’ সেগানের জন্মের সাত বছর আগে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখেছিলেন ‘আকাশভরা সূর্য-তারা, বিশ্বভরা প্রাণ,/তাহারি মাঝখানে আমি পেয়েছি মোর স্থান…’। এই লাইনগুলো রবীন্দ্রনাথের কলম থেকে আসা খুবই স্বাভাবিক। কারণ তাঁর বিশেষ বন্ধু ছিলেন জগদীশচন্দ্র বসু আর স্নেহভাজন ছিলেন আরেক বিশ্ববিশ্রুত বাঙালি বিজ্ঞানী সত্যেন্দ্রনাথ বসু। ছোটদের বিজ্ঞানের প্রাথমিক পাঠ দিতে বিশ্বপরিচয় বইখানা লিখে সত্যেন্দ্রনাথকেই উৎসর্গ করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ। কিন্তু কী আশ্চর্য! বাঙালির ‘কালচার’ চর্চায় কোনোদিন বিজ্ঞানীদের জায়গা হল না! আমাদের সাংস্কৃতিক মহীরুহ কারা জিজ্ঞেস করলে কোনো বাঙালিকে আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়, জগদীশচন্দ্র, সত্যেন্দ্রনাথ বা মেঘনাদ সাহার নাম করতে শোনা যায় না। বোধহয় তাই, বাঙালি বাবা-মায়েরা বহুকাল ধরে ছেলেমেয়েদের ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার করতে চাইলেও বিজ্ঞানী হয়ে উঠতে উৎসাহ দেন না। আধুনিক বাঙালি বিজ্ঞানী হতে চায় না, কেউ কেউ হয়ে যায়। তাই আমাদের গল্পে, উপন্যাসে, সিনেমায় বিষয় হিসাবে বিজ্ঞান বা বিজ্ঞানী বিরল; যদি না সেটা কল্পবিজ্ঞান হয়। সৌকর্য কিন্তু এমন এক ছবি তৈরি করেছেন যার কেন্দ্রে আছে বিজ্ঞান, বিজ্ঞানে আগ্রহ, বিজ্ঞান গবেষণা, এক কিশোরের বিজ্ঞানী হওয়ার স্বপ্ন।

বিশ্বপরিচয়ে সত্যেন্দ্রনাথের উদ্দেশে রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন ‘মানুষ একমাত্র জীব যে আপনার সহজ বোধকেই সন্দেহ করেছে, প্রতিবাদ করেছে, হার মানাতে পারলেই খুশি হয়েছে। মানুষ সহজশক্তির সীমানা ছাড়াবার সাধনায় দূরকে করেছে নিকট, অদৃশ্যকে করেছে প্রত্যক্ষ, দুর্বোধকে দিয়েছে ভাষা। প্রকাশলোকের অন্তরে আছে যে অপ্রকাশলোক, মানুষ সেই গহনে প্রবেশ করে বিশ্বব্যাপারের মূলরহস্য কেবলই অবারিত করছে। যে সাধনায় এটা সম্ভব হয়েছে তার সুযোগ ও শক্তি পৃথিবীর অধিকাংশ মানুষেরই নেই। অথচ যারা এই সাধনার শক্তি ও দান থেকে একেবারেই বঞ্চিত হল তারা আধুনিক যুগের প্রত্যন্তদেশে একঘরে হয়ে রইল।’ যেন ঘোতনের কথাই লিখেছেন!

শুধু যে ঘোতন বিজ্ঞানী হওয়ার স্বপ্ন দেখে তা নয়, তার অঙ্কের মাস্টারমশাই বটব্যালও (অনির্বাণ ভট্টাচার্য) মনেপ্রাণে বিজ্ঞানী, তাঁর বাবাও ছিলেন বিজ্ঞানী। বিজ্ঞান গবেষণা করতে বিদেশ যাওয়ার অভিলাষ পূরণ হয়নি, তবু বটব্যাল স্যার বিজ্ঞান-পাগল। আকাশগঞ্জ হাইস্কুলের ছাত্রদের ঘর্ষণ ব্যাপারটা হাতেনাতে বোঝাতে বারান্দায় মোবিল ঢেলে দেন, তার উপর পিছলে পড়েন একের পর এক মাস্টারমশাই। শেষমেশ হেডস্যারও। ফলে বটব্যাল স্যারকে চাকরিটি খোয়াতে হয়। স্যারের ঘরে বড় বড় দুটো ছবিতে আছেন জগদীশচন্দ্র; আর অ্যালবার্ট আইনস্টাইন, যিনি আলো যে সবসময় সরলরেখায় চলে না তা প্রমাণ করতে বড় ভূমিকা নিয়েছিলেন। এখানেই শেষ নয়, যেভাবে সৌমিক হালদারের মায়াবী ক্যামেরায় ক্লোজ আপে ধরা পড়ে সামান্য ফড়িংও, তাতে মনে পড়ে আরেক বাঙালি বিজ্ঞানী গোপালচন্দ্র ভট্টাচার্যকে। ছোটদের বোধগম্য করে কীটপতঙ্গদের নিয়েও বাংলায় বই লেখার যত্ন ছিল যাঁর। ছোটদের ভাল লাগার জন্যে একটা ছবিতে যা যা দরকার, সেসব মশলা দিয়েও এমন বিজ্ঞানকেন্দ্রিক ছবি তৈরি করার জন্যে নির্দেশক সৌকর্যের প্রশংসা প্রাপ্য। সন্দীপ রায়ের বিস্মরণযোগ্য প্রফেসর শঙ্কুকে (ধৃতিমান চট্টোপাধ্যায়) বাদ দিলে বাংলা ছবির পর্দায় শেষ মনে রেখে দেওয়ার মত বিজ্ঞানী চরিত্র পাতালঘর (২০০৩) ছবির অঘোর সেন (সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়) আর ভূতনাথ (জয় সেনগুপ্ত)। কিন্তু সেই ছবিতে বিজ্ঞানের সঙ্গে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ছিল ভূত ও রূপকথা, যেমনটা শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের যে কোনো কাহিনিতে থাকে। এখানে কিন্তু পক্ষীরাজের রূপকথাকে বিজ্ঞানমনস্কতার দিকে ঠেলে দেয় চিত্রনাট্য।

সৌকর্যের ২০১৮ সালের ছবি রেনবো জেলি যাঁরা দেখেছেন (স্বতঃপ্রণোদিত অবাঞ্ছিত পরামর্শ দিচ্ছি – না দেখে থাকলে দেখে নিন), তাঁদের অতি পরিচিত ঘোতন আর তার বন্ধু পপিন্স (অনুমেঘা ব্যানার্জি)। এই ছবিতে তারা আর শিশু নেই, কিশোর-কিশোরী। তার সঙ্গে তাল রেখে সম্পর্কের রসায়নেও বয়ঃসন্ধিসুলভ পরিবর্তন এসেছে, যা ছবিতে অন্য এক রস যোগ করেছে। রেনবো জেলির পরে সৌকর্যের গতবছর মুক্তি পাওয়া ভূতপরী (২০২৪) ছবিতে মজা, ভূত, রূপকথার সঙ্গে মিশেছিল অনিবার্য বিষাদ। এই ছবিতে তার চেয়ে মৃদু অথচ গভীর বিষাদ আছে। সে কারণেই ছবি শেষ হওয়ার পরেও বেশ খানিকক্ষণ রেশ থেকে যায়। দুই খুদে অভিনেতাই চমৎকার কাজ করেছে। ‘মার্জিনাল আই কিউ’ থাকলেই যে মানুষের কৌতূহলের অভাব হয় না, আগ্রহের অভাব হয় না, অনুভূতির অভাব হয় না, তা মহাব্রতর অভিনয়ে দারুণভাবে ফুটে উঠেছে। রেনবো জেলির পর এই ছবি দেখলে মনে হয় মহাব্রতর সহজাত অভিনয় ক্ষমতা আছে। পপিন্সের সঙ্গে একান্ত দৃশ্যগুলোতে তার শরীরী ভাষায়, গলার স্বরে যে আকুতি ফুটে ওঠে তা এখনো বয়ঃসন্ধির স্মৃতি আছে যাঁদের, তাঁরা তারিয়ে তারিয়ে উপভোগ করতে পারবেন। অনুমেঘার সংলাপ বলার ধরনে রেনবো জেলিতে খানিকটা কবিতা আবৃত্তির ঢং ছিল, যার ক্ষতিপূরণ হয়ে গিয়েছিল শৈশবের মিষ্টতায়। এই ছবিতে তার অভিনয়ে প্রয়োজনীয় পরিণতি দেখা গেছে। জগদীশচন্দ্রের বন্ধুর লেখা লাগসই গানটা গাওয়ার সময়ে বোঝা গেছে, অনুমেঘার গানের গলাটাও বেশ।

মজাদার সংলাপ আর সুরেলা গান এই ছবির জোরের জায়গা। বিশেষত সৌকর্যের কথায় এবং নবারুণ বোসের সুরে ‘অঙ্কে জিরো, কিসের হিরো, খ্যাপা স্যারের বিশেষ গেরো’ গানখানা যেমন ছবির গল্প আর মেজাজের সঙ্গে দারুণ খাপ খায়, তেমনি একবার শুনলে চট করে ভুলতে পারাও শক্ত। অবশ্য ওই গানে একটা চালু বাঙালি ভ্রান্তি ঢুকে পড়েছে। ম্যাজিকের সঙ্গে কিন্তু ম্যাজিক রিয়ালিজমের কোনো সম্পর্ক নেই। ‘ম্যাজিক রিয়ালিজম’ ব্যাপারটা আসলে কী তা গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজের নোবেল প্রাপ্তি বক্তৃতা পড়লে পরিষ্কার বোঝা যায়।

গানখানা চমৎকার গেয়েছেন অনির্বাণ ভট্টাচার্য, কিন্তু হতাশ করেছে তাঁর অভিনয়। অনির্বাণকে নিজের বয়সের থেকে অনেক বেশি বয়সী একখানা চরিত্র দেওয়া হয়েছিল। তা বিশ্বাসযোগ্য করে তুলতে তিনি একটা বিশেষ কণ্ঠস্বর, কতকগুলো মুদ্রাদোষের সাহায্য নিয়েছেন। তাতে হাস্যরসের উৎপাদন হয়েছে বটে, কিন্তু উৎপাদনের চেষ্টা বড় বেশি করে ধরা পড়েছে। বরং যেসব দৃশ্যে তিনি বাবার স্মৃতিতে, প্রয়াত বন্ধুর স্মৃতিতে বিষণ্ণ – সেখানে অভিনেতা অনির্বাণকে চেনা গেছে। অতি অভিনয়ে দুষ্ট আরেক বিশিষ্ট অভিনেতা, পঞ্চায়েত প্রধানের চরিত্রে, দেবেশ রায়চৌধুরীও। প্যাংলার চরিত্রে শ্যামল চক্রবর্তী আর বিল্টুর চরিত্রে অনুজয় চট্টোপাধ্যায়ের মত দুজন চমৎকার অভিনেতার বিশেষ কিছু করার ছিল না।

আরো পড়ুন ছবিটা

এইখানেই এসে পড়ে চিত্রনাট্যের দুর্বলতার প্রশ্ন। এই দুজন যেমন অনেকখানি অব্যবহৃত রয়ে গেছেন, তেমনি বটব্যাল স্যারের বিজ্ঞান-পাগলামিও আরও স্পষ্ট হওয়া দরকার ছিল বলে মনে হয়। বটব্যাল স্যারের অল্পবয়সের যে চেহারা দেখানো হয়েছে তার সঙ্গে বেশি বয়সের চেহারা আর হাবভাবের তফাতও চোখে লাগার মত। হয়ত দুজন আলাদা অভিনেতাকে ব্যবহার করলে ব্যাপারটা তত বিসদৃশ লাগত না। এছাড়া যে জিনিসটা এই ছবিতে বেখাপ্পা লাগে তা হল পঞ্চায়েত প্রধানের পিছনের দেওয়ালের ছবিগুলো। এমন কোনো রাজনৈতিক নেতা কি এদেশে আছেন যিনি পাশাপাশি টাঙিয়ে রাখেন লেনিন, জোসেফ স্তালিন, জওহরলাল নেহরু আর নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর ছবি?

তবে এসব ত্রুটিকে ছাপিয়ে গেছে এই ছবির আদর্শগত দিক। আকাশগঞ্জে কোনো উঁচু নিচু ভেদ নেই। বিজ্ঞানীর বাড়ির চাকর প্যাংলা অঙ্কে যথেষ্ট দড়। সে-ই ঘোতনের পরীক্ষা নিয়ে নিতে পারে। গ্রামের স্কুলে পাশ করতে গলদঘর্ম ঘোতনের গোটা দুনিয়ায় সবচেয়ে বড় বন্ধু হল কলকাতার স্কুলে ক্লাসে ফার্স্ট হওয়া পপিন্স। বটব্যাল স্যার তো বটেই, হেডস্যার গুণধর বাগচী (সুব্রত সেনগুপ্ত) পর্যন্ত পরীক্ষায় সর্বোচ্চ নম্বর পাওয়াই জীবন সার্থক হওয়ার একমাত্র নিদর্শন বলে মনে করেন না। দুর্নীতিগ্রস্ত, আত্মরতিপ্রবণ পঞ্চায়েত প্রধানের মাথায় বন্দুক ধরার সুযোগ পেয়ে তাঁরা কী দাবি করেন? স্কুলে লাইব্রেরি আর ল্যাবরেটরি বানিয়ে দিতে হবে। সবচেয়ে বড় কথা, অনুভূতিপ্রবণ মন না থাকলে ডিগ্রি, বুদ্ধি, পরীক্ষার নম্বর যে বৃথা – এই কথাটা এই ছবির কোষে কোষে।

এসব দেখলে মনে পড়ে, আকাশগঞ্জ আমাদের আশপাশেই ছিল। আমাদেরই অবহেলায় হারিয়ে গেছে। সৌকর্য কল্পনাশক্তির জোরে তাকে ভারি সহজ, সুন্দর করে আবার আমাদের চোখের সামনে তুলে ধরেছেন। আমাদের ছেলেমেয়েদের সেই আকাশগঞ্জ দেখানোর সুযোগ না ছাড়াই ভাল। অন্তত তাদের স্বপ্নে আকাশগঞ্জ ঢুকে পড়ুক। তারপর কে বলতে পারে? ভোরের স্বপ্ন, মিথ্যে না-ও তো হতে পারে।

নাগরিক ডট নেট ওয়েবসাইটে প্রকাশিত