বল্লভপুরের রূপকথা: খাঁটি বাংলা ছবি

হাস্যরস উৎপাদনের জন্যও ওপরচালাক কথার খেল, এলিটিস্ট বিদ্রূপ অথবা অধুনা জনপ্রিয় খিস্তির উপর নির্ভর করতে হয়নি।

এক গল্প হাজারবার বললে সে আর এক গল্প থাকে না, পালটে পালটে যায়। মানুষের জীবনের মত। এক চরিত্রের মুখ দিয়ে এই কথাটি পরিচালক ছবির শুরুতেই বলে দিয়েছেন। তাই বাদল সরকারের নাটক দেখা না থাকলেও বল্লভপুরের রূপকথা দেখতে অসুবিধা হয় না। আমরা দুর্ভাগা প্রজন্ম। বাদল সরকারের নামটুকুই শুনেছি, কেউ কেউ তা-ও শুনিনি। আমরা কেবল সত্যজিৎ রায়কে চিনি। পরিচালক অনির্বাণ ভট্টাচার্য যথার্থই অনুমান করেছিলেন, হলে ঢুকে আমরা কেউ সঙ্গের দর্শককে জিজ্ঞেস করে ফেলতেই পারি “বাদল সরকারটা আবার কে?” তাই গোড়াতেই সেসব দেখিয়ে দিয়েছেন। প্রফেসর শঙ্কুর মত দেখতে লোকটি যে একজন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন নাট্যশিল্পী তা সিনেমা দেখতে গিয়ে জানা হয়ে গেল।

পরিচালকের বুকের পাটা দেখে অবাক হতে হয়। মেগাসিরিয়ালে অভ্যস্ত দর্শককে তিনি একে তো বাদল সরকার চেনাচ্ছেন, তার উপর আবার আখ্যান সম্বন্ধে সচেতন করছেন! মিশকালো অন্ধকারে নৌকো বাইতে বাইতে যে মাঝি আখ্যান সম্পর্কে ওই চিরসত্য উচ্চারণ করছে তার নাম রসিক। অরসিকের কাছে রস নিবেদন করার দুর্ভাগ্য যেন আমার না হয় – বিধাতার কাছে আর্জি জানিয়েছিলেন প্রাচীন কবি। অনির্বাণ সে ঝুঁকি নিয়েছেন। তাঁর এত আয়োজন বৃথা যেত যদি বিদেশি ছবি থেকে বাদল সরকারের হাত ঘুরে তাঁর কাছে আসা আখ্যানটিকে রসোত্তীর্ণ করতে না পারতেন। সে পরীক্ষায় তিনি সফল। তাঁর আখ্যান রসে টইটম্বুর। হলভর্তি দর্শক প্রায়ই হেসে গড়াগড়ি খেয়েছে। কিন্তু তার চেয়েও বড় কথা, এ ছবি একটিমাত্র রস পরিবেশন করেনি। এমনকি হাস্যরস উৎপাদনের জন্যও ওপরচালাক কথার খেল (pun), এলিটিস্ট বিদ্রূপ অথবা অধুনা জনপ্রিয় খিস্তির উপর নির্ভর করতে হয়নি।

ভারতের সর্বকালের সেরা ক্রিকেট অধিনায়কদের একজন, সৌরভ গাঙ্গুলি, একটা কথা খুব বলে থাকেন – একজন অধিনায়ক ততটাই ভাল, যতটা ভাল তাঁর দল। কথাটা চলচ্চিত্র পরিচালকের বেলাতেও বোধহয় খানিকটা খাটে। যে পরিচালকের হাতে বাদল সরকারের লেখা সংলাপ, সত্যম ভট্টাচার্য (ভূপতি), শ্যামল চক্রবর্তী (মনোহর), দেবরাজ ভট্টাচার্যের (সঞ্জীব) মত উৎকৃষ্ট অভিনেতা থাকেন, তাঁকে হাস্যরসের জন্য ইদানীংকালের বাংলা ছবিতে ব্যবহৃত উপরে উল্লিখিত মধ্যমেধার কৌশলগুলোর কাছে হাত পাততে হবেই বা কেন? তবে ক্রিকেট দলের অধিনায়কের একটা সুবিধা থাকে যা পরিচালকের নেই। দলের ব্যর্থতায় নেহাত প্যাঁচে পড়লে অধিনায়ক নির্বাচকদের ঘাড়েও কিছুটা দায় চাপিয়ে দিতে পারেন, পরিচালকের সে উপায় নেই। অনির্বাণ থিয়েটারের অভিনেতাদের নিয়ে সিনেমা বানিয়েছেন। ফেল করলে কারোর দিকে আঙুল তোলার উপায় থাকত না। কিন্তু তাঁর নির্বাচিত অভিনেতারা প্রত্যেকেই চ্যাম্পিয়ন খেলোয়াড়ের মত খেলেছেন।

অনিবার্যভাবে মনে পড়ে সদ্যপ্রয়াত তরুণ মজুমদারের কথা। উত্তমকুমার, সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের যুগে অনুপকুমারকে নায়কের চরিত্রে রেখে তিনি বানিয়ে ফেলেছিলেন বাংলা ছবির ইতিহাসে সর্বকালের সেরা হিট ছবিগুলোর অন্যতম – পলাতক (১৯৬৩)। স্রেফ শক্তিশালী চিত্রনাট্য আর অভিনয় দক্ষতা হিট ছবির রসায়ন হতে পারে তার অকাট্য প্রমাণ। অনির্বাণও তারকাবিহীন, এমনকি রুপোলি পর্দার অভিনেতাবিহীন ছবি করেছেন। তরুণের সময়ে তবু টলিউড সংকটাপন্ন ছিল না। এখন কিন্তু স্বাস্থ্যের অবস্থা আশঙ্কাজনক। এ ছবি যদি শেষপর্যন্ত বিপুল সংখ্যক দর্শকের আশীর্বাদধন্য হয়, তাহলে কী করলে ছবি হিট হয়, সে প্রশ্ন নতুন করে ভাবতে হবে সকলকেই। শীর্ষ মন্তাজেই ইঙ্গিত রয়েছে – গোয়েন্দা, ভূত, নস্ট্যালজিয়া সবই কপচানো হয়ে গেছে। কোনোটাই বিশেষ কাজ দেয়নি। তরুণ পারতেন রুচিসম্মত অথচ জনপ্রিয় ছবি তৈরি করতে। সে ছবি সত্যজিৎ, ঋত্বিক ঘটক বা মৃণাল সেনের উচ্চতার শিল্প হত না হয়ত। কিন্তু স্রেফ শহুরে ও অনাবাসী বাঙালি দর্শকের জন্য তৈরি চলচ্চিত্রোৎসবমুখী ভানও তাতে থাকত না। একইসঙ্গে গ্রাম ও শহরের দর্শকের মনোরঞ্জন করতে পারে, এমন বাংলা ছবি বিশ-তিরিশ বছর হল তৈরিই হয় না। অভিজ্ঞরা বলেন অমন ছবি নাকি সম্ভবই নয়, কারণ গ্রাম আর শহরের দর্শকের রুচির তফাত বিস্তর। অথচ বিশ্বায়নের যুগে গোটা দুনিয়াটাই গ্লোবাল ভিলেজ – এমনটাই তো জেনে আসছি। বাস্তবিক দার্জিলিং থেকে মেদিনীপুর – সর্বত্রই তো পৌঁছে গেছে ওটিটি। তবু? বল্লভপুরের রূপকথা আখ্যানে এবং উপস্থাপনে গ্রাম, শহরের সেতুবন্ধনের চেষ্টা করেছে। দেখা যাক তা সফল হয় কিনা।

অভিনয়ের কথা হচ্ছিল। ছবি দাঁড়িয়ে আছে ভূপতি, ছন্দা (সুরঙ্গনা বন্দ্যোপাধ্যায়), মনোহর আর সঞ্জীবের চরিত্রের উপর ভর দিয়ে। তাঁদের অভিনয় তো নিখুঁত বটেই, ছোটখাটো চরিত্রগুলোতেও এত নির্মেদ অভিনয় আজকাল বাংলা ছবিতে সুলভ নয়। ভূপতির তিন পাওনাদার সাহা (কৃপাবিন্দু চৌধুরী), শ্রীনাথ (সুরজিৎ সরকার) আর পবনের (সুমন্ত রায়) সংলাপ বলার ঢং, হাঁটাচলা, তাকানো – সবকিছুই হাসির উদ্রেক করেছে। অথচ যথেষ্ট অবকাশ থাকা সত্ত্বেও তাঁরা অতি-অভিনয় করেননি। ইংরেজিতে যাকে কমিক টাইমিং বলে তাতে অবশ্য সবার উপরে মনোহর চরিত্রে শ্যামল। গোটা ছবিতে তিনি ভাবলেশহীন মুখে আর সকলকে হাসিয়ে গেলেন।

সত্যম চারশো বছর আগেকার রোম্যান্টিক, কালিদাস আওড়ানো, জমকালো পোশাক পরা রাজপুত্রের চরিত্রে যতটা সাবলীল, ততটাই দেনার দায়ে গলা পর্যন্ত ডুবে থাকা রায়বাড়ির প্রথম গামছা পরে ঘুমনো রাজা হিসাবে। এমনকি শুধু ভূপতির চরিত্রেও তিনি প্রয়োজনমাফিক সপ্রতিভ এবং অপ্রতিভ। কাজটা মোটেই সহজ নয়। বিশেষ করে ব্যোমকেশ আর ফেলুদার চরিত্রের একইরকম অভিনয় দেখে অভ্যস্ত চোখে সত্যমকে দেখে বলতে ইচ্ছে করে “বড় বিস্ময় লাগে হেরি তোমারে”।

দেবরাজ ভূতের ভয়ে কাবু, মিসেস হালদারের বকুনিতে ক্যাবলা অথচ বন্ধুর প্রতি আনুগত্যে অবিচল চরিত্রে দারুণ বিশ্বাসযোগ্য। অমন অভিনয় করতে পারেন আবার চমৎকার গাইতেও পারেন – এমন শিল্পী কজন পাওয়া যায়?

ওপেন টি বায়োস্কোপ ছবির নেহাত বালিকা সুরঙ্গনা এ ছবিতে গত শতকের ছয়ের দশকের লাবণ্যময়ী বাঙালি মেয়ে ছন্দার চরিত্রে দারুণ মানিয়ে গেছেন। সে শুধু তাঁর সৌন্দর্য, শাড়ি পরার ধরন বা চুল বাঁধার কায়দার জন্যে নয়। যে চোখের ভাষা সেরা সময়ের রোম্যান্টিক বাংলা ছবির নায়িকাদের অব্যর্থ অস্ত্র ছিল, সেই ভাষায় সুরঙ্গনার চোখ বারবার কথা বলেছে। পাশে দাঁড়ানো পুরুষটিকে নিজের ভাললাগা জানানোর জন্য বেশি কিছু নয়, স্রেফ তার মত দেখতে পূর্বপুরুষের পোর্ট্রেটের সামনে দাঁড়িয়ে “সুপুরুষ” বলে আড়চোখে তাকিয়ে নেওয়ার নৈপুণ্য সুরঙ্গনা চমৎকার রপ্ত করেছেন। বাঙালির প্রেমের অভিজ্ঞান, অন্তত সিনেমার পর্দায়, একসময় ছিল তার সূক্ষ্মতা। নায়িকারা সরাসরি নায়কের দিকে তাকাতেন না বা আগ বাড়িয়ে চুমু খেতেন না বলে যে ন্যাকা ছিলেন তা নয়। পাঁচের দশকেই শাপমোচন ছবিতে অবিবাহিতা সুচিত্রা সেন সটান বাবার সামনে দাদাকে জানিয়ে দিচ্ছেন উত্তমকুমারের সঙ্গে দেখা করতে যান কারণ “তিনি আমার স্বামী”। আবার পথে হল দেরী ছবিতে তাঁর চেয়ে নায়কের দৃষ্টিই লজ্জায় বেশি থরোথরো। সত্যমকে ধমকে দেওয়ার দৃশ্যে সুরঙ্গনাকেও তেমনই দৃঢ়চেতা দেখিয়েছে।

আরও পড়ুন অহৈতুকী পার্টিজানপ্রীতি

বল্লভপুরের রূপকথা ছবিটির এই এক মজা। আপাতদৃষ্টিতে নতুন কিছুই নেই। যা আছে তা হল বাংলা ছবির, বাংলার সংস্কৃতির চিরনতুন কিছু উপাদান যা মানুষের সর্বদা ভাল লাগে। নায়ক, নায়কের অভিভাবকসুলভ বৃদ্ধ চাকর, প্রাণের বন্ধু, নায়িকার শৌখিন এবং আধক্ষ্যাপা বাবা, জাঁদরেল মা, বাবার সঙ্গে রেষারেষি থাকা এক বুড়ো ধনী – এর কোনোটাই কি বাংলা ছবির দর্শকের কাছে নতুন? পরিচালক অনির্বাণ বা অন্যরা প্রচার পর্বে কোথাও বলেননি, অথচ দেখা গেল ছবিটি পিরিয়ড পিসও বটে। মূল নাটকের মত গত শতকের ছয়ের দশকই দেখানো হয়েছে। সেই সময়কার পোশাক-আশাক, কথা বলার ধরন, গাড়ির মডেল সবই নিখুঁত। এমনকি ছবির সঙ্গীত পর্যন্ত বাংলা গানের হারিয়ে যাওয়া মেলডির সন্ধান দেয়। অনির্বাণ, দেবরাজ, শুভদীপের সৃষ্টি ‘সাজো সাজাও এমন করে’ সাহানা বাজপেয়ীর গলায় এমন মধু ঝরায় যে সুরটি ছবি শেষ হওয়ার বহুক্ষণ পরেও কোথা থেকে যেন কানে ভেসে আসে। যন্ত্রসঙ্গীতের ঝমঝম আওয়াজে পূর্ণ খোনা গলার আধুনিক বাংলা সিনেমার গান তো শুনি আর ভুলে যাই প্রায় সহজেই। ছবির আবহসঙ্গীত পর্যন্ত আজকের বলে মনে হয় না, ভয়ের ছবির পরিবেশ সৃষ্টিকারী চেনা শব্দসম্ভারই ফিরে ফিরে আসে। যদিও তাতে ভয়ের পরিবেশ কতটা তৈরি করা গেছে তাতে সন্দেহ আছে। এই এক সমালোচনার জায়গা।

তবে চলচ্চিত্র তো শেষপর্যন্ত চিত্র। মনে রাখার মত কিছু শট না থাকলে চলে না। সেখানে সোনা ফলিয়েছেন সিনেমাটোগ্রাফার সৌমিক হালদার। তাঁর তৈরি অন্ধকার ঘুরঘুট্টি বটে, কিন্তু তার মধ্যেও জঙ্গলের প্রত্যেকটি গাছ আলাদা করে দেখা যায়। দিনের বেলার শটগুলোতেও আউটডোর লোকেশনের সৌন্দর্য তাঁর ক্যামেরা চেটেপুটে নিয়েছে। তবে ভোলা যায় না বল্লভপুরের রাজবাড়িতে প্রথম পদক্ষেপের সময়ে সিনেমার পর্দা জুড়ে থাকা অন্ধকারের মধ্যে উদ্ভাসিত ছন্দার মুখের ক্লোজ আপ।

বল্লভপুরের রূপকথা শস্তা নয়, সহজ। চটকদার নয়, রংদার। নতুন নয়, চিরচেনা। পরিচালক অনির্বাণের সবচেয়ে বড় গুণ – তিনি একটি খাঁটি বাংলা ছবি বানিয়েছেন। এখানে বাঙালিকে বাঙালি বলে চেনা যায়। বাংলার মাটি, বাংলার জল, বাংলার বায়ু, বাংলার ফল হাইরাইজ, হাইওয়ে, স্কচ আর পরকীয়ায় হারিয়ে যায়নি। হৃদয় ঘেঁটে দেখা গেছে কোথায় পাতা শীতলপাটি। ছবির শুরুতে আখ্যান সম্পর্কে যে চিরসত্য মাঝি রসিক তার পীর ঠাকুর্দার উক্তি বলে উল্লেখ করেছে, সেই সত্যই আবার শেষে দোকানদার পবন তার সন্ন্যাসীপ্রতিম ঠাকুর্দার উক্তি বলে ঘোষণা করেছে। অতি সহজে, প্রায় অলক্ষ্যে পরিচালক বাংলার হিন্দু-মুসলমানের সাংস্কৃতিক সমন্বয় দেখিয়ে দিলেন। পুরনো কথাও বারবার বলতে হয়, বলতে বলতে নতুন হয়ে ওঠে। সেই নতুনত্বের খোঁজে বেরিয়েছেন অনির্বাণ। একেবারে শেষে দেখা গেছে তিনি নিজেকে নিয়েও রসিকতা করতে পারেন। এই ক্ষমতা যদি ধরে রাখতে পারেন তাহলে ভবিষ্যতে আরও ভাল কিছু আশা করা যায়।

নাগরিক ডট নেট ওয়েবসাইটে প্রকাশিত

সলিল চৌধুরী স্মরণে একটি মনোমুগ্ধকর সন্ধ্যা

গত তিরিশ বছরে বাঙালির সংস্কৃতি চর্চা ক্রমশ যে কোনো উপলক্ষে গোটা দশেক রবীন্দ্রসঙ্গীত ঘুরিয়ে ফিরিয়ে গাওয়া আর সত্যজিৎ রায়ের গোটা পাঁচেক ছবির চর্বিতচর্বণের কানাগলিতে ঢুকে পড়েছে। যে ‘কালচার’ নিয়ে বাঙালির গর্বের শেষ নেই, তাতে যে গর্ব করার মত আর কোনো পাত্র-পাত্রী আছেন বা সঙ্গীত, নাটক, সিনেমা ইত্যাদির আর কোনো ধারা আছে তা টের পাওয়া ক্রমশ কঠিন হয়ে দাঁড়াচ্ছে। এমন নয় যে রবীন্দ্রচর্চার নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়েছে বা সত্যজিতের ছবির চর্চা অভূতপূর্ব উচ্চতায় পৌঁছেছে। আসলে ক্রমিক আত্মবিস্মৃতির ধারাবাহিকতায় রবীন্দ্রনাথ আর সত্যজিতের উইকেট দুটোই এখনো টিকে আছে, বাকিরা জনমন থেকে ক্রমশ কতিপয় রসিকের বৈঠকখানায় অবসৃত হয়েছেন। ওরই মধ্যে সলিল চৌধুরীর অবস্থা কিছুটা ভাল। একসময় পাড়ার রবীন্দ্র-নজরুল সন্ধ্যায় গান গেয়ে, আবৃত্তি করে সংস্কৃতি চর্চায় হাতেখড়ি হত বঙ্গসন্তানদের। গত শতকের নয়ের দশক থেকে বুগি উগি সেই সন্ধ্যাগুলোকে স্থানচ্যুত করতে শুরু করে। এখন নানা বয়সের গানের রিয়্যালিটি শোয়ে বিখ্যাত হওয়ার উচ্চাকাঙ্ক্ষাই বাঙালি শিশু, কিশোরদের সংস্কৃতি চর্চার পথ নির্ধারণ করে। সেসব শোয়ে সলিলের গানের বেশ খানিকটা দাম আছে। তার একটা বড় কারণ তিনি একদা হিন্দি সিনেমা দাপিয়ে বেড়িয়েছেন, লতা মঙ্গেশকরের মত শিল্পী তাঁর সুরে, কথায় বাংলা গানও গেয়েছেন। নইলে ওই দামও আজ সলিল পেতেন কিনা সন্দেহ।

ওটুকুর উপর ভরসা করে কোনো সাংস্কৃতিক সংগঠন শহরাঞ্চলের প্রেক্ষাগৃহ ভাড়া করে সপ্তাহের মাঝখানে গোটা সন্ধে সঙ্গীতানুষ্ঠানের আয়োজন করতে পারে – এ কথা চট করে বিশ্বাস হতে চায় না। ফলে যখন জানা যায় উত্তরপাড়ার ‘মীড়’ এই কাণ্ডটি ঘটাতে চলেছে ২২ সেপ্টেম্বর (বৃহস্পতিবার) সন্ধ্যায়, তখনই চট করে গুগল করে নিতে হয় সেদিন সলিলের জন্মদিন বা মৃত্যুদিন কিনা। শুধু সঙ্গীতচর্চা নয়, যে কোনো চর্চাই যে আসলে ৩৬৫ দিনের কাজ সেকথা আজকাল মনে রাখা শক্ত। গুগল সার্চ যখন জানিয়ে দিল সলিলের মৃত্যুদিন চলে গেছে সপ্তাহ দুয়েক আগেই আর জন্মদিনের মাস দুয়েক দেরি আছে, তখন বোঝা গেল আবেগ কাজে লাগিয়ে নাম কেনা মীড়ের সদস্যদের উদ্দেশ্য নয়। তাঁরা শ্রোতাদের ‘অতল সলিলে’ নিয়ে যেতে চান নিতান্ত সলিল চৌধুরীর গানের টানেই।

গান নির্বাচনেও দেখা গেল পরিশ্রমের ছাপ। মীড়ের কচিকাঁচারা সমবেত সঙ্গীতে ‘শ্রাবণ অঝোর ঝরে’, ‘ঝিলিক ঝিলিক ঝিনুক খুঁজে পেলাম’ ইত্যাদি গানে অন্য স্বাদ এনে দিয়েছে। বাংলা ভাষার এই দুর্দিনেও এক ঝাঁক বাঙালি কিশোর-কিশোরী নিখুঁত উচ্চারণে ‘দুপুরের রৌদ্রের নিঃঝুম শান্তি শান্তি/নীল কপোতাক্ষীর কান্তি’ গাইছে – এই দৃশ্য, এই ধ্বনি মনোমুগ্ধকর। কিন্তু পরিচালক সৌরভ চক্রবর্তী চমকে দিয়েছেন তাঁর ছাত্রীদের গাইতে দেওয়া একক গানের পছন্দে। ১৯৫৬ সালে জাগতে রহো ছবিতে আশা ভোঁসলের গাওয়া ‘ঠান্ডি ঠান্ডি সাওন কি পুহার’ গানটি আজ কতজনেরই বা পরিচিত? আরও বড় চমক লহনা ভট্টাচার্যের কণ্ঠে সলিল রচিত ও সুরারোপিত ‘সেই মেয়ে’। রবীন্দ্রনাথের ময়নাপাড়ার মেয়ে কৃষ্ণকলিকে শিল্পী সলিলের চোখ দেখেছিল ছেচল্লিশের মন্বন্তরে শীর্ণ বাহু তুলে কলকাতায় যারা ফ্যান ভিক্ষা করত তাদের মধ্যে। সুচিত্রা মিত্রের কণ্ঠে গায়ে কাঁটা দেওয়ার মত সেই গান কৈশোর না পেরনো লহনাকে গাইতে দিয়ে অনুষ্ঠানের নির্দেশক বিরাট ঝুঁকি নিয়েছিলেন। কিন্তু লহনা যে অনায়াস দক্ষতায় অত লম্বা এবং দুরূহ গানটি গেয়েছেন তা ঝুঁকি সার্থক করেছে।

অনুষ্ঠানের দ্বিতীয় পর্বে তথাগত ভট্টাচার্য অন্য স্বাদ এনে দিয়েছেন ‘মোর মতন আর দেশপ্রেমিক নাই’, বাড়ি থেকে পালিয়ে ছবির ‘আমি অনেক ঘুরিয়া শ্যাষে আইলাম রে কইলকাত্তা’, গঙ্গা ছবির ‘ইচ্ছা করে পরাণডারে’ ইত্যাদি গানগুলি গেয়ে।

শেষ শিল্পী ছিলেন সৌরভ স্বয়ং। ‘পাগল হাওয়া’, ‘আমায় প্রশ্ন করে নীল ধ্রুবতারা’ শিল্পী হিসাবে তাঁর জাত চেনায়। তবে এই সন্ধের পবিত্রতম মুহূর্ত তিনি তৈরি করতে পেরেছেন ‘যদি কিছু আমারে শুধাও’ গানে। সলিলের মত অত বড় শিল্পীর শিল্পকর্মেও অমন বিশুদ্ধ গানের সংখ্যা হয়ত খুব বেশি নয়। ওই গান গেয়ে আক্ষরিক অর্থে শ্রোতাদের অতল সলিলে নিয়ে যেতে পেরেছেন সৌরভ।

আরও পড়ুন সকল অহঙ্কার হে আমার 

অনুষ্ঠানের মেজাজ যে তারে বাঁধা ছিল তাতে ঈষৎ বেসুরো ঠেকেছে ‘শপথ’ কবিতা অবলম্বনে নাচ এবং সমবেত কণ্ঠে ‘পথে এবার নামো সাথী’ গানটি। বিশেষত, গানটি যে সময়ে রচিত তার তুলনায় যুগ এতটাই বদলে গেছে, আমাদের পথে নামার অভ্যাস এতটাই কমে গেছে, নামার উদ্দেশ্যেরও এত তারতম্য ঘটেছে যে গানটি এখন নিজেই নিজের প্যারডি বলে মনে হয় অনেকসময়। দোষটা অবশ্য প্রতিবেদকের সিনিসিজমেরও হতে পারে। বরং অনেক বেশি কালজয়ী ‘রানার’। সৌরভের মত দরাজ গলার কোনো শিল্পীর কণ্ঠে ওই গান হয়ত মধুরতর স্মৃতি হয়ে উঠতে পারত।

সেদিন উত্তরপাড়া গণভবনে তিলধারণের জায়গা ছিল না লিখতে পারলে চমৎকার হত, কিন্তু ঘটনা হল বহু দর্শকের চেয়ে মনোযোগী দর্শক সঙ্গীতানুষ্ঠানের রসগ্রহণের পক্ষে বেশি সুবিধাজনক। সেদিক থেকেও ‘অতল সলিলে’ তৃপ্তিদায়ক। ইদানীং যে কোনো প্রেক্ষাগৃহে মোবাইল ফোনের আওয়াজ শিল্পী এবং অন্য দর্শকদের যতখানি বিরক্তি উদ্রেক করে, এদিন তার অর্ধেকও করেনি।

নাগরিক ডট নেট-এ প্রকাশিত

টলমলে ট্রিবিউটে ফেলুদার গোয়েন্দাগিরি গুবলেট

আমাদের যখন সবে গোঁফ দাড়ি গজাচ্ছে, তখন ট্রেনের কামরা বা পাবলিক টয়লেটের দেয়ালে সাঁটা কিছু বিজ্ঞাপন নজর কাড়ত। সেখানে লেখা থাকত একটা কথা, যার অর্থ বুঝতে না পেরে আমরা আকাশ-পাতাল ভাবতাম এবং বন্ধু মহলে বিস্তর আলোচনা করতাম। কথাটা হল, কৈশোরের কিছু “কুঅভ্যাস” ছাড়তে না পারলে নাকি বিবাহিত জীবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়। নিজেরা কিশোর বলেই ওখানে কোন অভ্যাসের কথা বলা হত তা জানতে আমরা যারপরনাই উদগ্রীব ছিলাম। কথাটা মনে পড়ল সদ্য ওটিটিতে মুক্তি পাওয়া ফেলুদার গোয়েন্দাগিরি দেখে। এই ওয়েব সিরিজের মূলধন হল ফেলুদা আর সত্যজিৎ সম্পর্কে বাঙালির স্মৃতিমেদুরতা। ও জিনিসটা মানুষ মাত্রেরই থাকে, কিন্তু ওটা এই মুহূর্তে আমাদের জাতীয় কুঅভ্যাসে পরিণত হয়েছে। তাই আমরা চিরকিশোর হয়ে পড়েছি। ফলে পুনরাবৃত্তিই আমাদের শিল্প হয়ে দাঁড়িয়েছে, অনুকরণই আমাদের আপ্লুত করছে। গালভরা নাম হয়েছে ‘ট্রিবিউট’। অনীক দত্ত সত্যজিৎ রায়ের জন্মশতবর্ষে তাঁকে ট্রিবিউট দিতে ছবি তৈরি করেছেন। সে ছবির বৈশিষ্ট্য (বিজ্ঞাপন জগতের ভাষায় – ইউনিক সেলিং পয়েন্ট) হল, নামভূমিকায় যিনি আছেন তাঁকে হুবহু সত্যজিতের মত দেখাচ্ছে (অথচ চরিত্রটির নাম সত্যজিৎ নয়), আর পথের পাঁচালীর দৃশ্যগুলোর দারুণ পুনর্নির্মাণ করা হয়েছে। এতেই আমাদের আবেগে গলা বুজে আসছে। আসল পথের পাঁচালী দেখার উপায় থাকতে অনুকরণ কেন দেখতে যাব, সে প্রশ্ন করলে লোকে তেড়ে আসছে।

ব্যাপারটা শৈল্পিক হোক বা না হোক, স্মৃতিমেদুরতা (বাঙালিরা যাকে বলে নস্ট্যালজিয়া) যে লালমোহন গাঙ্গুলির ভাষায় “সেলিং লাইক হট কচুরিজ”, তাতে সন্দেহ নেই। ফলে সৃজিত মুখার্জিও নস্ট্যালজিয়া বেচতেই নেমেছেন। সিরিজের প্রথম পর্বের শুরুটাই হুবহু অনুকরণ, থুড়ি ট্রিবিউট। সোনার কেল্লা ছবিতে ফেলুদাকে পর্দায় প্রথমবার দেখানোর সময়ে শীর্ষাসনরত পদযুগল দেখানো হয়েছিল, তোপসে দৌড়ে এসে খবর দিয়েছিল মক্কেল এসেছে। এখানে পদযুগল এসেছে কয়েক সেকেন্ড পরে, প্রথমবার দেখানো হয়েছে শীর্ষাসনরত ফেলুদার মুখের ক্লোজ আপ। মুশকিল হল, অনুকরণেরও সক্ষমতা অক্ষমতা আছে। মক্কেল আসার খবর ফেলুদাকে তখুনি জানানোর দরকার পড়ে। জটায়ুর আগমন তো কোনো অপ্রত্যাশিত ঘটনা নয় যে তৎক্ষণাৎ জানাতে হবে। কিন্তু নির্দেশক ওসব ভাবতে যাবেন কেন? দর্শককে নস্ট্যালজিয়ায় জবজবে করে ফেলতে পারাই আসল। বিশ্বাসে মিলায় বস্তু, তর্কে বহুদূর।

নস্ট্যালজিয়া নিশ্ছিদ্র করতে সিরিজটিকে পিরিয়ড পিসে পরিণত করা হয়েছে। একমাত্র পশ্চিমবঙ্গেই বোধহয় এমন সিনেমা বোদ্ধা দর্শক পাওয়া যায়, যাঁরা বিশ্বাস করেন ছবি সেপিয়া টোনে রাখলেই পিরিয়ড পিস হয়ে যায়। কারণ ফেলুদারা দার্জিলিংয়ে যে হোটেলে ওঠে, তার বাইরের দেয়াল আধুনিক কায়দার। আশির দশকের ফেলুদা সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়কে ট্রিবিউট দিতেই বোধহয় দার্জিলিংয়ের ঠান্ডাতেও এই সিরিজের ফেলুদা টোটা রায়চৌধুরীকে ফিনফিনে পাজামা আর পাঞ্জাবির উপরে স্রেফ একটা চাদর জড়িয়ে থাকতে হয়। কিন্তু বাইরে বেরোবার সময়ে তিনি দিব্যি টি-শার্ট পরে ফেলেন। মর্নিং ওয়াকেও চলে যান আধুনিক জামাকাপড় পরে। সেইসব সময়ে আশির দশক বজায় থাকে ফেলুদা আর তোপসের পেতে আঁচড়ানো চুলে। বিরূপাক্ষ মজুমদারের পুত্র সমীরণের সঙ্গে ফেলুদার বাকযুদ্ধ অবশ্য পুরোদস্তুর রেট্রো। ১৯৮৭ সালে মুক্তি পাওয়া প্রভাত রায়ের প্রতিকার ছবির কথা মনে পড়ে যায়। ভয় হয়, চোখা চোখা সংলাপ বলতে বলতে এখুনি চিরঞ্জিত আর ভিক্টর ব্যানার্জির মত টোটা আর সমীরণরূপী সুপ্রভাত দাস মারামারি শুরু করে দেবেন। ট্রিবিউট অবশ্য এখানেই শেষ নয়। এই সিরিজে ফেলুদার সংলাপ সম্ভবত এমএলএ ফাটাকেষ্ট চরিত্রের অভিনেতা মিঠুন চক্রবর্তীকে ট্রিবিউট। নইলে নিজের গায়ের জোর কতটা তা বোঝাতে ফেলুদা বলতে পারেন না “ঘোড়া যেমন চাঁট মেরে মানুষের মাথার খুলি উড়িয়ে দিতে পারে, ঠিক তেমনই বহু দেশে ঘোড়াকে কেটে তার মাংস রান্না করে খাওয়া হয়।” (তারপর ঘাড় বেঁকিয়ে “সুস্বাদু। জানেন?”)

দার্জিলিংয়ে ফেলুদার কার্যকলাপ অবশ্য সৌমিত্র বা চিরঞ্জিতের চেয়েও যাঁকে বেশি মনে পড়ায় তিনি অমিতাভ বচ্চন। কারণ এই ফেলুদা চিতাবাঘের চোখে চোখ রাখতে পারেন, মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে এসেই গুনগুন করে গান গাইতে পারেন। সে আবার ইংরেজি গান, যেহেতু তাতে ল্যাভেন্ডার শব্দটা আছে এবং যে ধাক্কা মেরেছিল তার শরীর থেকে ইয়ার্ডলি ল্যাভেন্ডার পারফিউমের গন্ধ পেয়ে ফেলুদা তাকে চিনতে পেরেছেন। এখানেই শেষ নয়, ফেলুদা আহত, ক্রেপ ব্যান্ডেজ বাঁধা হাতের উপর গোটা শরীরের ভার নিতে পারেন। তিনি আরও একটি জিনিস পারেন যা এমনকি আশির দশকের বচ্চনও পারতেন না। তা হল দু হাতে বন্দুক চালানো। সমীরণ মজুমদারের গাড়ির টায়ারে ফেলুদা গুলি করেন বাঁ হাতে, গাড়ি থেকে নেমে আবার বন্দুক তাক করেন ডান হাতে।

ভক্তরা নিশ্চয়ই বলবেন এসব পরিচালকের স্বাধীনতা। ফিল্মের সাহিত্যকে অক্ষরে অক্ষরে অনুসরণ করার দায় নেই। সত্যজিৎ নিজেও বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়, শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায় প্রমুখের গল্প নিয়ে ছবি করার সময়ে চিত্রনাট্যে অনেককিছু বদলে দিয়েছেন। কথাটা ঠিকই। এই স্বাধীনতার পূর্ণ সদ্ব্যবহার সৃজিতবাবু এই সিরিজে করেছেন। যেমন সত্যজিতের গল্পের টফ্রানিল বড়ি হয়ে গেছে ট্রফানিল। কিন্তু সমস্যা হল, ১৯৮৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে মাত্র ছদিনে লিখিত এই গল্পে (সূত্র: ফেলুদা সমগ্র ১, ষষ্ঠ মুদ্রণ, নভেম্বর ২০০৯; আনন্দ) সত্যজিৎ যে টফ্রানিলের কথা লিখেছেন, সামান্য গুগল সার্চই বলে দিচ্ছে ওই ওষুধটি (Tofranil) অ্যান্টি-ডিপ্রেস্যান্ট, যার প্রয়োজনীয়তা বিরূপাক্ষবাবু নিজে ব্যাখ্যা করেছেন। কিন্তু Trofanil বলে কোনো ওষুধের সন্ধান পাওয়া যাচ্ছে না। এ যুগের সিধুজ্যাঠা গুগল Tromanil Plus বলে একটি ট্যাবলেটের কথা বলছে বটে, কিন্তু সেটিও রিউম্যাটয়েড আর্থ্রাইটিস, অ্যাঙ্কিলোসিং স্পন্ডিলাইটিস এবং অস্টিওআর্থ্রাইটিসে ব্যবহার হয়। তাহলে কি পরিচালক সত্যজিতের উপর কলম চালিয়ে কোনো অদ্যাবধি অনাবিষ্কৃত ওষুধের সন্ধান দিলেন? পিরিয়ড পিসে কি তা করা চলে? প্রশ্ন রয়ে যাচ্ছে। সব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে অবশ্য হতাশ হতে হবে। যেমন বিরূপাক্ষবাবুর বেয়ারা লোকনাথকে খুন করা হয়েছিল গলা কেটে। মৃতদেহের তলপেটের কাছেও কী করে রক্ত লাগল – এ প্রশ্নেরও কোনো উত্তর নেই।

গল্পের যে পরিবর্তনটিকে সোশাল মিডিয়ায় কেউ কেউ বৈপ্লবিক আখ্যা দিচ্ছেন, সেটি চিত্রনাট্যকে কীভাবে সমৃদ্ধ করেছে তা-ও যেমন বোঝা গেল না। দার্জিলিং জমজমাট গল্পে বলিউডের নায়িকা সুচন্দ্রার উল্লেখমাত্র আছে। এই সিরিজে কিন্তু তাঁর উপস্থিতি বেশ কয়েকটি দৃশ্যে। শুধু তা-ই নয়, ফিল্মের নায়ক রাজেন রায়না ওরফে বিষ্ণুদাশ বালাপোরিয়ার সঙ্গে তাঁর উদ্দাম প্রেম আছে – একথা একেবারে শুরু থেকেই বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু শেষপর্যন্ত দর্শককে (এবং ফেলুদাকে) একটি চুম্বন দৃশ্য উপহার দেওয়া ছাড়া চরিত্রটির আর কোনও ভূমিকা নেই। নায়ক-নায়িকার সম্পর্ক বিরূপাক্ষ মজুমদার হত্যা রহস্যকে নতুন কী দিতে পারল তা বোধহয় জিজ্ঞেস করা উচিত হবে না। কিন্তু সুলভ পর্নোগ্রাফির যুগেও বাঙালি দর্শকের একটি লং শটের চুম্বন দৃশ্যকে বৈপ্লবিক মনে হচ্ছে দেখে বিস্মিত না হয়ে উপায় নেই।

একইরকম অবাক করে গল্পের সাধারণ ভদ্রলোক হরিনারায়ণ মুখোপাধ্যায়কে ‘অ্যাংগ্রি ওল্ড ম্যান’ গোছের চরিত্রে পরিণত করা। তিনি নাকি বিরূপাক্ষবাবুর উপর নজর রাখার জন্য লোক লাগিয়েছিলেন। কী উদ্দেশ্যে তার ব্যাখ্যা অবশ্য চিত্রনাট্যে নেই। উপরন্তু তিনি বলেন, “ব্লাড প্রেশার আর গেঁটে বাতের সমস্যা না থাকলে” তিনি হয়ত বিরূপাক্ষবাবুকে খুন করার চেষ্টা করতেন। এটাও কি আশির দশকের বচ্চনকে ট্রিবিউট? মানে পিরিয়ড পিস হিসাবে প্রতিষ্ঠা করার জন্য হঠাৎ একটিমাত্র দৃশ্যে একটিমাত্র দেয়ালে আখরি রাস্তা-র পোস্টার সাঁটা হয়েছে বলে জিজ্ঞেস করছি।

আরও পড়ুন ‘অলৌকিক মেগা সিরিয়াল দেখা সমাজের সত্যজিতের ছবি দেখার কোন কারণ নেই, তিনি উপলক্ষ মাত্র’

ট্রিবিউটাভ্যাস চরমে উঠেছে ব্যোমকেশ বক্সীকে নিয়ে। কদিন পরে কলকাতা মেট্রোর উত্তমকুমার স্টেশনের আশপাশে হাঁটতে গেলে নির্ঘাত কোনো ব্যোমকেশ বা ফেলুদার চরিত্রে অভিনয় করা শিল্পীর সঙ্গে ধাক্কা লেগে যাবে। দেখা যাচ্ছে তাতেও যথেষ্ট ট্রিবিউট হয়নি। তাই সৃজিতবাবুর সিরিজে পুলক ঘোষাল জটায়ুর নারীচরিত্রহীন উপন্যাসের চিত্রনাট্যে নায়িকা আমদানি করার যুক্তি হিসাবে খাড়া করছেন শরদিন্দুর সত্যান্বেষীর বিবাহিত জীবনকে। আবার রহস্যোদ্ঘাটনের দৃশ্যে স্বয়ং ফেলুদা বলছেন চিত্রচোর গল্পের সঙ্গে নাকি বিরূপাক্ষ হত্যার ঘটনার মিল আছে। মিলটি যে কী তা আমার খাটো বুদ্ধিতে ধরা পড়ল না। শরদিন্দুর গল্পের অপরাধী তার পুরনো চেহারাটা গায়েব করার জন্য ছবি চুরি করেছিল। এ গল্পের অপরাধী তো বুঝতেই পারেনি তার একখানা পুরনো চেহারার ছবি রয়েছে নয়নপুর ভিলায়। অবশ্য আমাদের মত দর্শকের বুদ্ধির দৌড় কতটুকু তা নির্দেশক ভালই জানেন। তাই ফ্ল্যাশব্যাক দৃশ্যগুলি বার তিনেক করে না দেখিয়ে ক্ষান্ত দেননি। বিরূপাক্ষবাবুর বুকে ছুরি মারার শটটি যে কতবার কতভাবে দেখিয়েছেন তা গুনতে গিয়ে ব্যর্থ হলাম।

নস্ট্যালজিয়া ছাড়া আর যে জিনিসটি এখন সেলিং লাইক হট কচুরিজ, সেটি হল গোয়েন্দা গল্প। এই দুয়ের চাপে এই সিরিজের একজন গুরুত্বপূর্ণ অভিনেতা চিড়েচ্যাপ্টা হয়ে গেছেন। তাঁর নাম অনির্বাণ চক্রবর্তী। সবে গত মাসে মুক্তি পেয়েছে আরেক গোয়েন্দার কীর্তিকলাপ নিয়ে ছবি দ্য একেন। সেই ছবিতে অনির্বাণ নিজেই গোয়েন্দা। এমন একজন গোয়েন্দা যিনি বিলক্ষণ ভাঁড়ামি করেন। বাংলা প্রবাদ বলতে ভুল করেন, হাস্যকর হিন্দি বলেন। দুটি ছবিরই প্রেক্ষাপট দার্জিলিং, লোকেশনেও মিল। অনেক ফ্রেমে মনে হয় একই ছবি দেখছি। কে জানে, হয়ত শুটিংও কাছাকাছি সময়ে হয়েছে। এই ডামাডোলে অনির্বাণ একেনবাবুই থেকে গেছেন, লালমোহনবাবু হয়ে উঠতে পারেননি। জটায়ু যে ভাঁড় নন তা অভিনেতা বা নির্দেশক কেউই বুঝে উঠতে পারেননি মনে হয়। বিশেষ করে অঘোরচাঁদ বাটলিওয়ালার চরিত্রে অভিনয় করার সময়ে অনির্বাণ যা করেছেন তা সিনেমা কেন, যাত্রার মঞ্চেও বিসদৃশ লাগে। অবশ্য বিরূপাক্ষ মজুমদারের চরিত্রে বরুণ চন্দ, মহাদেব ভার্মার চরিত্রে সুব্রত দত্ত ইন্সপেক্টর যতীশ সাহার চরিত্রে লোকনাথ দে আর সুচন্দ্রার চরিত্রে মুনমুন রায় ছাড়া এই সিরিজে প্রায় সকলেই বাড়াবাড়ি করেছেন।

ফেলুদার চরিত্রে টোটাকে দিব্যি মানিয়ে গিয়েছিল। কিন্তু চিড়িয়াখানায় চিতাবাঘকে প্রায় কামড়াতে যাওয়া ফেলুদাকে তো মানায় না বটেই, কোনো শিক্ষিত মানুষকেই মানায় না। সোনার কেল্লায় মুকুল ভবানন্দকে দুষ্টু লোক বলে চিনতে পেরেছিল তখন, যখন সে ময়ূরের দিকে গুলি চালায়। জীবজগতের প্রতি এই সংবেদনশীলতা গোটা রায় পরিবারের অভিজ্ঞান। লীলা মজুমদারের ‘কুঁকড়ো’ গল্পেও যার প্রমাণ রয়েছে। ফেলুদাকে হি-ম্যান বানাতে গিয়ে সেই সংবেদনশীলতার জায়গায় আলিপুর চিড়িয়াখানায় যারা বাঘের খাঁচায় ঢুকে তাকে মালা পরাতে গিয়েছিল, তাদের মানসিকতা এনে ফেলা হয়েছে। সন্দীপ রায়ের ফেলুদাও অনেকের প্রত্যাশা পূরণ করতে পারতেন না, কিন্তু নিদেনপক্ষে তাঁর ফেলুদা সলমন খান বা টাইগার শ্রফ মার্কা মোটা দাগের অ্যাকশন হিরো হয়ে ওঠার চেষ্টা করতেন না। সৃজিতের ফেলুদা যদি পেশিবহুল চেহারার, বাঘ সিংহের সাথে লড়াই করা পুরোদস্তুর একটি নতুন চরিত্র হয়ে উঠতেন, তাহলেও কথা ছিল। ভাবা যেত বিবিসির শার্লক সিরিজের মত নতুন কিছু হল। কিন্তু এক পা নস্ট্যালজিয়ার সেপিয়া নৌকায় রেখে অন্য পা হাস্যকর মাচোইজমে রাখা এই টলমলে ট্রিবিউট আপন মনে গাওয়ার মত শীর্ষ সঙ্গীতটি ছাড়া বাংলা চলচ্চিত্র জগৎকে কী দিল?

https://nagorik.net এ প্রকাশিত

সংবাদমাধ্যম গণতন্ত্রের স্তম্ভ নয়, গণতন্ত্রই সংবাদমাধ্যমের স্তম্ভ

গত ২১ মে, ২০২২ (শনিবার) কলকাতার ন্যাশনাল মাইম ইনস্টিটিউটে হাতিবাগান সঙ্ঘারাম নাট্যদলের দশ বছর পূর্তি উপলক্ষে আয়োজিত আলোচনা সভায় প্রদত্ত সংবাদমাধ্যম সম্পর্কে এই বক্তৃতা পরিবর্ধিত ও পরিমার্জিত রূপে প্রকাশ করা হল। আলোচনার বিষয় ছিল ‘আলো-অন্ধকারে আমাদের সময় – কী করণীয়, কী স্মরণীয়’।

উপস্থিত সকলকে নমস্কার, হাতিবাগান সঙ্ঘারামকে জন্মোৎসবের শুভেচ্ছা। আজকাল ভাল কাজ করতে চায় এমন কোনো সঙ্ঘের সন্ধান পেলে ভারি আরাম হয়। আপনারা আরও অনেকদিন আমাদের মনের আরাম, প্রাণের আরাম দিন, সঙ্গে সঙ্গে যন্ত্রণাও দিন – এই কামনা করি।

আমার কাছে যখন আজকের আলোচনায় অংশগ্রহণ করার প্রস্তাবটা এল, আলোচনার বিষয়টা শুনেই আমার যা মনে পড়ল সেটা বলি। করোনা অতিমারির শুরুর দিক পর্যন্ত আমি একটা খবরের কাগজে সম্পাদনার চাকরি করতাম। ওই চাকরিতে যেমন হয়, অফিস থেকে বেরোতাম মাঝরাত্তির নাগাদ; অফিসের গাড়ি আমাকে বাড়ি পৌঁছে দিয়ে আসত। আমরা রোজ বিবেকানন্দ যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গনের সামনে দিয়ে যেতাম। স্টেডিয়াম সমেত বাইপাসের অনেকটা জায়গায় অত রাতেও আলো চুঁইয়ে পড়ত। ক্লাস ইলেভেনে পড়ার সময়ে বিজন ভট্টাচার্যের নবান্ন নাটকটা প্রথম পড়ি। ওই নাটকের একটা দৃশ্য আমাদের পাঠ্য ছিল। সেই দৃশ্যে একটা বিয়েবাড়ির বর্ণনা আছে। লেখা হয়েছে, সেখানে আলো চুঁইয়ে পড়ছে। যে মাস্টারমশাই পড়িয়েছিলেন, তিনি খুব যত্ন করে আমাদের বুঝিয়েছিলেন যে কোনো জিনিস চুঁইয়ে পড়ে তখনই, যখন তা প্রয়োজনের অতিরিক্ত হয়ে যায়। তা ২০১৭ সালে যখন ভারতে অনূর্ধ্ব-১৭ ফুটবল বিশ্বকাপের আসর বসেছিল, তখন থেকেই ওই এলাকা চুঁইয়ে পড়া আলোয় ভেসে যাচ্ছে। এখন মহাবিশ্ব তো নিত্যতার সূত্র মেনে চলে, যাকে ইংরেজিতে বলে ল অফ কনজারভেশন। তার মানে পৃথিবীর যেখানেই আলো চুঁইয়ে পড়ে, বুঝতে হবে সেখানেই অন্য কোনো জায়গার আলো এনে ঢেলে দেওয়া হয়েছে। সেই জায়গাটাকে ঠেলে দেওয়া হয়েছে অন্ধকারে। আপনার চারপাশে তাকান, দেখবেন এরকম চুঁইয়ে পড়া আলোর জায়গা ২০-২৫ বছর ধরে ক্রমশ বেড়ে যাচ্ছে। আর আমরা এই আলোর বৃত্তেই থাকি বলে খেয়াল করি না, যে অন্ধকার এলাকাগুলোও বাড়ছে আলোর গতিতে।

সেই কারণেই আমাদের সময়ের আলো, অন্ধকার নিয়ে আলোচনার প্রয়োজন বোধ হচ্ছে। নইলে, শুধু আমাদের সময় কেন, যে কোনো সময়েই তো আলো আর অন্ধকার দুটোই থাকে। কিন্তু আমাদের সময়ে অন্ধকারের গভীরতা আর ব্যাপ্তি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে, যে অনেক প্রবীণ মানুষেরও অভূতপূর্ব বলে মনে হচ্ছে। এখানে সঞ্জয়দা (সঞ্জয় মুখোপাধ্যায়) আছেন। পশ্চিমবঙ্গ ১৯৬০, ৭০-এর দশকে যে অন্ধকারের মধ্যে দিয়ে গেছে তাকে ওঁর মত করে কজন জানে? সঞ্জয়দা সে নিয়ে লিখলে বা বললে সেই অন্ধকার একেবারে জ্যান্ত মনে হয়। আর নৃসিংহবাবু (নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ী) তো বললেনই, আলো আর অন্ধকার সৃষ্টির সমবয়সী। সুতরাং ইতিহাসে এমন কোনো যুগ ছিল না যা সম্পূর্ণ অন্ধকারমুক্ত। কিন্তু পরিমাণগত এবং গুণগত তফাত ঘটে। বিরাট তফাত। আমাদের সময়ের আলোচনায় যাওয়ার আগে এই কথাগুলো বলে নিতে হল, কারণ জীবনানন্দ দাশের ছিল একজন বনলতা সেন, আর আমরা হলাম অভ্যাসের দাস। আমাদের আছে হাজার হাজার বনলতা সেন। আপনি বর্তমানের কোনো অন্ধকারের দিকে আঙুল দেখালেই তাঁরা জম্বিদের মত দলে দলে তেড়ে আসবেন, বলবেন “এখন প্রতিবাদ করছেন? এতদিন কোথায় ছিলেন?”

মাঠে যেমন বাউন্ডারি না থাকলে খেলা যায় না, তেমনি আলোচনারও সীমা ঠিক করে না নিলে আলোচনা করা যায় না। আমি যেহেতু সাংবাদিকতা করি, তাই মূলত সাংবাদিকতার অন্ধকার নিয়েই আলোচনা করব, প্রসঙ্গক্রমে অন্য অন্ধকারের কথা এসে পড়বে।

আমি যদি আপনাদের জিজ্ঞেস করি, সাংবাদিক শব্দটা শুনলেই প্রথমে কার নাম মনে আসে? কোনো সন্দেহ নেই, অনেকেই বলবেন অর্ণব গোস্বামী। সকলেই যে লোকটাকে পছন্দ করেন বলে বলবেন তা নয়, যাঁরা অপছন্দ করেন তাঁদেরও প্রথমে ওই নামটাই মনে আসবে। লোকটি অন্ধকার এতটাই ছড়িয়ে দিতে পেরেছে। কেউ কেউ হয়ত একেবারে বিপরীত মেরুর রবীশ কুমারের নাম করবেন। এছাড়া সুমন দে, মৌপিয়া নন্দী, অঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায় ইত্যাদি নামও উঠে আসতে পারে। পুরনো লোকেরা বিবেকানন্দ মুখোপাধ্যায়, বরুণ সেনগুপ্ত, গৌরকিশোর ঘোষ, কুলদীপ নায়ার, সি আর ইরানি ইত্যাদি নাম বলবেন। কিন্তু আজকে আমি আপনাদের সামনে একেবারে অন্য কতকগুলো নাম বলব। আজকের ভারতবর্ষে আসল সাংবাদিকতা এঁরাই করছেন। সৈনিকরা নিজের জীবন বাজি রেখে লড়েন, এই সাংবাদিকরা নিজের সর্বস্ব বাজি রেখে খবর তুলে আনছেন।

প্রথম নামটা পবন জয়সোয়াল। উত্তরপ্রদেশের মির্জাপুরের এই সাংবাদিক ২০১৯ সালে জনসন্দেশ টাইমস বলে একটা স্থানীয় কাগজে খবর করেন, যে একটা স্কুলে মি ডে মিলে স্রেফ রুটি আর নুন দেওয়া হচ্ছে। সে খবর ক্রমশ সারা দেশে হইচই ফেলে দেয়, যোগী সরকারের মুখ পোড়ে। উত্তরপ্রদেশ পুলিস তাঁর বিরুদ্ধে অপরাধমূলক চক্রান্ত, কর্মরত সরকারি কর্মচারীর কাজে বাধা দেওয়া আর প্রতারণা – এই তিনটে অভিযোগে এফ আই আর দায়ের করে। যথারীতি শেষ অব্দি একটা অভিযোগও প্রমাণ করে উঠতে পারেনি। পবন ক্যান্সারে ভুগছিলেন, চিকিৎসা করার মত যথেষ্ট আর্থিক সঙ্গতি ছিল না। গত ১১ এপ্রিল তিনি উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী আদিত্যনাথ, বিরোধী নেতা অখিলেশ যাদব আর কংগ্রেস নেত্রী প্রিয়াঙ্কা গান্ধীকে ট্যাগ করে অর্থসাহায্য চেয়ে টুইট করেন। নিজের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট সংক্রান্ত তথ্যও দিয়ে দেন। ওঁরা কতটা সাহায্য করেছিলেন জানি না, কোনো কোনো সাধারণ মানুষ করেছিলেন। পবন গত ৫ মে মারা গেছেন।

দ্বিতীয় নাম যোগেন্দ্র সিং। তিনি কোনো স্থানীয় কাগজেও কাজ করতেন না, তাঁর ছিল ‘শাহজাহানপুর সমাচার’ নামে একটা ফেসবুক পেজ। ২০১৫ সালের ৩০ মে সেই পেজে তৎকালীন উত্তরপ্রদেশ সরকারের মন্ত্রী, সমাজবাদী পার্টির রামমূর্তি বর্মা এক অঙ্গনওয়াড়ি কর্মীকে ধর্ষণ করেছেন এবং জোর করে জমি দখল করেছেন – এই মর্মে খবর প্রকাশিত হয়। আপনাদের মধ্যে যারা সোশাল মিডিয়ায় খুব সক্রিয়, তাদের মনে পড়তে পারে একটা ভাইরাল ছবি – শরীরের বেশিরভাগটা পুড়ে ছাই হয়ে যাওয়া একটা মানুষ বুকে হেঁটে এগোবার চেষ্টা করছে। সেই মানুষটাই যোগেন্দ্র। কিছু মানবাধিকার সংগঠন ঘটনাটা নিয়ে চেঁচামেচি না করলে পুড়ে মরেও যোগেন্দ্রর ভাইরাল হওয়া হত না। মন্ত্রীমশাই আর কয়েকজন পুলিসকর্মীই যে যোগেন্দ্রকে জীবন্ত দাহ করেছেন সেটাও চাপা পড়ে যেত।

তৃতীয় নাম সিদ্দিক কাপ্পান। এই সাংবাদিক কয়েক বছর হয়ে গেল উত্তরপ্রদেশে হাজতবাস করছেন এমন এক প্রতিবেদনের জন্য, যা তিনি লিখতে পারতেন বলে উত্তরপ্রদেশ সরকারের ধারণা। এতদিন হয়ে গেল তাঁকে জামিন পর্যন্ত দেওয়া হয়নি। কাশ্মীরওয়ালা কাগজের সম্পাদক ফাহাদ শাহ আর ফ্রিলান্স সাংবাদিক সাজ্জাদ গুলের হাজতবাসও বেশ কয়েক মাস হয়ে গেল। তবে কাশ্মীরের কথায় যাব না, কারণ ওখানকার সাংবাদিকদের উপর নির্যাতনের যত বড় তালিকাই তৈরি করি না কেন, সেটা অসম্পূর্ণ তালিকা হবে। বরং মধ্যপ্রদেশের কথা বলি।

সিধি জেলার সাংবাদিক কণিষ্ক তিওয়ারি। তিনি গিয়েছিলেন নাট্যশিল্পী নীরজ কুন্দেরের গ্রেপ্তারের বিরুদ্ধে কোতোয়ালি থানার বাইরে যে প্রতিবাদ কর্মসূচি চলছিল তা কভার করতে। পুলিস তাঁকে এবং কয়েকজন প্রতিবাদী থিয়েটার কর্মীকে থানার ভিতর টেনে নিয়ে যায়, ১৮ ঘন্টা মত লকআপে আটকে রাখে। তাঁর অভিযোগ, মারধরও করা হয় এবং জামাকাপড় খুলে ফেলতে বাধ্য করা হয়। শেষের অভিযোগটা যে মিথ্যে নয় তা আপনারা অনেকেই নিশ্চয়ই জানেন, কারণ শুধু অন্তর্বাস পরিহিত বন্দীরা জড়সড় হয়ে এক পুলিস অফিসারের সামনে দাঁড়িয়ে আছেন, এ ছবিও ভাইরাল হয়েছিল।

একটা নামও পশ্চিমবঙ্গের নয় দেখে নিশ্চয়ই স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলছেন? ওয়ার্ল্ড প্রেস ফ্রিডম ইনডেক্সে ১৫০ নম্বরে নেমে যাওয়া এই দেশে আমাদের রাজ্যটাকে আমাদের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীর মত মরুদ্যান আখ্যা দেবেন ভাবছেন কি? তাহলে আরেকটা নাম বলি। বিপ্লব মন্ডল। ২০১৮ সালের ১০ এপ্রিল কলকাতা থেকে প্রকাশিত খবরের কাগজগুলো খুঁজে দেখুন। অধিকাংশ কাগজের প্রথম পাতায় পাবেন এঁর কথা। পঞ্চায়েত নির্বাচনের মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার প্রক্রিয়াকে আঁতুড়েই মুখে ধান পুরে মেরে ফেলার যে চেষ্টা চলছিল সেদিন, তার ছবি তুলে ফেলার অপরাধে রাজনৈতিক গুন্ডারা চিত্রসাংবাদিক বিপ্লবকে মারধোর করে, জামাকাপড় খুলে নেয়, সে ছবি মোবাইলে তোলা হয় এবং হুমকি দেওয়া হয় “ভাইরাল করে দেব কিন্তু।” সৈনিকদের মত ‘জীবন’ বাজি রেখে কাজ করছেন না বলে কেন ‘সর্বস্ব’ বাজি রেখে বললাম বোঝা গেল তো?

এটা কিন্তু এক দিকের অন্ধকার। শুধু এই দিকে অন্ধকার থাকলে উল্টো দিকে আলো দেখা যেত। কিন্তু উল্টো দিকটা কীরকম? বিপ্লবের কথা অধিকাংশ কাগজে বেরিয়েছিল বলেছি, সব কাগজে বলিনি কিন্তু। যে কাগজগুলোতে বেরোয়নি, তার মধ্যে একটা হল সেই কাগজ, যাদের হয়ে উনি সেদিন ছবি তুলতে গিয়েছিলেন। এটাই আজকের সাংবাদিকতার বাস্তবতা। আমি যখন সাংবাদিকতায় আসি ২০০৫ সালে, তখন একেই পড়তে পড়তে চাকরি পেয়ে গেছি বলে ধরাকে সরা জ্ঞান করতাম। তার উপর সিনিয়ররা একেকজনকে দেখিয়ে বলতেন “ওই যে অমুকদাকে দেখছিস? ও কর্পোরেশনে ঢুকলে মেয়র পর্যন্ত থরথর করে কাঁপে। কখন কী খবর করে দেবে, মেয়রের চেয়ার নিয়েই টানাটানি পড়ে যাবে।” “তমুক দিদিকে দ্যাখ। পুলিস কমিশনারও ওর সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে আমতা করে।” আমরা হাঁ করে তাকিয়ে থাকতাম আর ভাবতাম, ওঁদের মত হতে হবে।

ওই সাংবাদিকদের কি রাবণের মত দশটা মাথা ছিল, নাকি দুটো করে অতিরিক্ত হাত-পা জামাপ্যান্টের ভিতর লুকনো থাকত? তা তো নয়। তাহলে সরকার, সরকারি দল, পুলিস, প্রশাসন, বিরোধী দল – সকলকে চটানোর মত খবর করার সাহস পেতেন কী করে? পেতেন, কারণ জানতেন আমার কাগজ আমার পিছনে আছে। আমার নামে যদি মামলা হয়, কাগজের উকিল বুঝে নেবে। আমাকে যদি গ্রেপ্তার করা হয়, আমার সম্পাদক জামিনের ব্যবস্থা করবেন, পরদিন কাগজে বিরাট করে খবর বেরোবে যে সরকার সংবাদমাধ্যমের কণ্ঠরোধ করছে। আর রাজনৈতিক গুন্ডারা যদি পেটায়, মিডিয়ার গাড়ি যদি ভাঙচুর হয়, তাহলে শুধু তাঁর কাগজ বা চ্যানেল নয়, গোটা সংবাদমাধ্যম সরকারের বিরুদ্ধে উঠে পড়ে লাগবে। শুধু পশ্চিমবঙ্গের কথা বলছি না, সারা দেশেই এরকম হত। আর এখন? সরকারের বিরুদ্ধে বা কোনো ক্ষমতাশালী, পয়সাওয়ালা ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে খবর করতে গেলে প্রথমে আপনি আপনার ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ বলবে “চেপে যা বাপু। কী দরকার?” যদি এমন হয় যে আপনার বসটির মেরুদণ্ড এখনো সোজা, তাহলে খবরটা হয়ত হয়ে গেল, কিন্তু পরদিন আপনি আর আপনার বস – দুজনের চাকরি নিয়েই টানাটানি হবে। এভাবে অসংখ্য ভাল সাংবাদিকের চাকরি গেছে গত এক দশকে। সারা দেশেই গেছে। প্রতিদিন যে আরও কত সরকারবিরোধী খবর এবং টাকার কুমিরদের কুকীর্তির খবর বাতিল করে দেওয়া হচ্ছে বা লঘু করে ফেলা হচ্ছে ভারতবর্ষের নিউজরুমগুলোতে, তার হিসাব করার চেয়ে মাথার চুল গোনা সহজ।

কাদের অঙ্গুলিহেলনে হচ্ছে এরকম? কাগজ এবং চ্যানেলের মালিকদের। কেন তাঁরা এরকম হয়ে গেছেন গত এক দশকে? সবচেয়ে বড় কারণ – বিজ্ঞাপন।

সংবাদমাধ্যম বলতে কাদের বোঝায়? স্বাধীনতার পর থেকে ভারত যে আধা-সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতি নিয়ে চলছিল, তাতে যে দু-একটা শিল্পক্ষেত্রে সরকারি অংশগ্রহণ নগণ্য ছিল তার একটা হল মিডিয়া। গত সহস্রাব্দের প্রায় গোটাটাই মিডিয়া বলতে মোটের উপর প্রিন্ট মিডিয়াকেই বোঝাত, কারণ তার আগে অব্দি তো টিভির খবর মানে কেবল দূরদর্শনের বুলেটিন। কেবল টিভি তো ঘরে ঘরে থাকত না, কারণ সেটা বেশ ব্যয়সাপেক্ষ ছিল। তা তখনকার খবরের কাগজগুলো ১৯৯১ সালের অর্থনৈতিক উদারীকরণের পর থেকে আমাদের কী বুঝিয়েছে? না, ভর্তুকি খুব খারাপ জিনিস। কোনোকিছুতে ভর্তুকি দেওয়া সরকারের উচিত নয়। সবকিছু খোলা বাজারে ছেড়ে দেওয়া উচিত, সেখান থেকে যার যা কেনার সামর্থ আছে সে সেটা কিনবে, যার সামর্থ নেই সে কিনবে না। অথচ এই যে তিরিশ বছর হয়ে গেল উদারীকরণের, সমস্ত সময়টা জুড়ে খবরের কাগজগুলো কিন্তু নিউজপ্রিন্ট কেনার সময়ে সরকারের কাছ থেকে ভর্তুকি পেয়ে এসেছে। মানে আপনি সকালবেলা আপনার বাড়ির কাগজটায় ভর্তুকির বিরুদ্ধে একশো যুক্তি পড়ে পাড়ার চায়ের দোকানে গিয়ে জমিয়ে তর্ক করে এসেছেন, কাগজের মাধ্যমে জনমত তৈরি হয়েছে, সরকার সেই জনমত শিরোধার্য করে ধীরে ধীরে সবেতেই ভর্তুকি কমিয়ে গেছে। কমাতে কমাতে ২০২২ সালে এসে আপনার রান্নার গ্যাসের সিলিন্ডারের দাম হয়ে গেছে হাজার টাকা। এদিকে আপনার কাগজের মালিক কিন্তু সরকারকে একবারও বলেনি, যে আমার নিউজপ্রিন্ট কিনতে ভর্তুকি লাগবে না। শুধু তা-ই নয়, সমস্ত সংবাদমাধ্যম গাছেরও খেয়েছে, তলারও কুড়িয়েছে। মানে কাগজ কেনার সময়ে একবার ভর্তুকি পেল, আবার সেই কাগজে খবর ছেপে যখন বার করবে তখন সরকারি বিজ্ঞাপনও পেল। তাহলে ডাবল সাবসিডি হল? এখানেও শেষ নয়। এর উপর আবার বেসরকারি বিজ্ঞাপন ছেপেছে। এখন তো বিজ্ঞাপন এমন জায়গায় পৌঁছেছে, যে আপনি কাগজের প্রথম পাতা খুঁজে পাবেন না। যাঁরা খুব ভোরে ওঠেন তাঁরা শুরুর বিজ্ঞাপনের পাতাগুলো ওল্টাতে ওল্টাতে ঘুমিয়েও পড়তে পারেন।

টিভি চ্যানেলের ক্ষেত্রেও একই ব্যাপার। তারাও অনেক টাকার সরকারি বিজ্ঞাপন পায়, সঙ্গে বেসরকারি বিজ্ঞাপনও চলে। সেটা মেনে নেওয়া যেত, যদি এরা দর্শকদের থেকে টাকা না নিত। ডিটিএইচ যুগের আগে যেমন চ্যানেলগুলো আপনার থেকে টাকা নিতে পারত না। তাহলে আয় করবে কোথা থেকে? সুতরাং বিজ্ঞাপন দরকার ছিল। আমি কূপমণ্ডূক, কিন্তু যাঁরা বিভিন্ন দেশে গেছেন তাঁরা জানেন, সাবস্ক্রিপশন মডেলে টিভি চললে কিন্তু এত বিজ্ঞাপন থাকে না। আমাদের এখানে তো এখন অনুষ্ঠানের মাঝে বা খবরের মাঝে বিজ্ঞাপন হয় না, বিজ্ঞাপনের মাঝে একটুখানি খবর হয়। ক্রিকেট খেলা দেখতে বসলে দেখবেন কোনো কোনো ওভারের একটা-দুটো বল হয়ে যাওয়ার পর বিজ্ঞাপন বন্ধ হয়। আসলে চ্যানেল মালিক আর বড় কাগজের মালিকদের লোভের কোনো শেষ নেই। “এ জগতে হায় সে-ই বেশি চায় আছে যার ভুরি ভুরি।”

আরও পড়ুন সত্যান্বেষী পাঠক জাগুন, সরকারি বিজ্ঞাপন পেতে গেলে ইতিবাচক খবর লিখতে হবে

এই হল বড় কাগজ, বড় মিডিয়ার কাণ্ড। আর ছোট কাগজগুলোকে এই সরকারি বিজ্ঞাপনের জুজু দেখিয়েই যে যেখানে ক্ষমতাসীন সে সেখানে পকেটে পুরে রেখেছে। কারণ কাগজের ব্যবসায় একটা মৌলিক স্ববিরোধ আছে। আপনারা অনেকেই নিশ্চয়ই জানেন, যে কাগজটা আপনি পাঁচ টাকা দিয়ে কেনেন সেটা তৈরি করতে খরচ হয় ১০-১৫ টাকা। এটা অতিমারীর আগের হিসাব বললাম, এখন হয়ত আরও বেশি। তা এই খরচ পুষিয়ে তারপর লাভ করতে গেলে ছোট কাগজগুলোর পক্ষে সরকারি বিজ্ঞাপন বাদ দিয়ে চলা অসম্ভব। বড় কাগজ বলতে কী বোঝাচ্ছি? পাঁচ লক্ষের বেশি বিক্রি হয় যে কাগজগুলো। আর ছোট কাগজ মানে যারা মেরে কেটে এক-দু লক্ষ। পশ্চিমবঙ্গের মত রাজ্যে বড় কাগজ একটা কি দুটো। সেই কাগজগুলো এত বেসরকারি বিজ্ঞাপন পায়, যে ওই যে বললাম – প্রথম পাতা খুঁজতে গিয়ে ঘুমিয়ে পড়বেন। ছোট কাগজ কিন্তু ওসব বিজ্ঞাপন পায় না সাধারণত। কেন পায় না? কারণ সেগুলো কম লোকের হাতে যায়। যিনি বিজ্ঞাপনদাতা, তিনি তো যত বেশি সম্ভব লোকের কাছে পৌঁছতে চান। ফলে যে কাগজের বিক্রি বেশি সেই কাগজই বেশি বিজ্ঞাপন পায়। মানে তেলা মাথাতেই তেল পড়ে। সরকারি বিজ্ঞাপনের ক্ষেত্রে কিন্তু নিয়মটা আলাদা। আপনার কাগজের বিক্রি যা-ই হোক, যদি নামটা ডিএভিপি (মানে ডিরেক্টোরেট অফ অ্যাডভার্টাইজিং অ্যান্ড ভিজুয়াল পাবলিসিটি)-র খাতায় থাকে, তাহলেই সরকার আপনাকে বিজ্ঞাপন দেবে। সরকার এই নিয়মটাকেই ব্যবহার করে। অমুক প্রতিবেদনে আমার দুর্নীতি দেখিয়েছ? যাও, তোমাকে বিজ্ঞাপন দেব না। তমুক সিদ্ধান্তের নিন্দে করেছ? আজ থেকে তোমার বিজ্ঞাপন বন্ধ।

কতকগুলো টাকার অঙ্ক না বললে আপনাদের বিশ্বাস না-ও হতে পারে যে সরকারি বিজ্ঞাপন এত বড় ব্যাপার। তাই কয়েকটা অঙ্ক বলি। প্রায়ই দেখবেন কাগজের প্রথম পাতা জুড়ে বিজ্ঞাপন থাকে। ওরকম একটা বিজ্ঞাপনের দর বড় কাগজগুলোতে উনিশ বিশ। ২০২০ সালে আমি তেমন একটা কাগজেই কাজ করতাম। সেখানে ওই বিজ্ঞাপনের দাম ছিল এক কোটি টাকা। আধ পাতার বিজ্ঞাপন হলে পঞ্চাশ লাখ। এবার মনে করে দেখুন, গত লোকসভা নির্বাচনের সময়ে প্রত্যেক দফায় কতবার আপনার বাড়ির কাগজটার পাতা জুড়ে মোদীজিকে দেখেছেন, তারপর হিসাব করুন কত টাকার বিজ্ঞাপন একেকটা কাগজ বিজেপির থেকে পেয়েছে। এ তো গেল নির্বাচনের সময়ে দেশের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক দলের বিজ্ঞাপনের কথা। ওগুলো তাও কোট আনকোট সরকারি বিজ্ঞাপন নয়। গত এক দশকে সরকারের বিজ্ঞাপন দেওয়ার বহর কীভাবে বেড়েছে তার একটা ধারণা দিই। এগুলো সবই অতিমারীর আগের হিসাব। পরেরগুলো আসতে এখনো সময় লাগবে।

২০১৭ সালের ডিসেম্বরে একজন তথ্যের অধিকার আইন (মানে রাইট টু ইনফরমেশন অ্যাক্ট) অনুযায়ী কেন্দ্রীয় সরকারের তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রকের কাছে জানতে চেয়েছিলেন সরকার সংবাদমাধ্যমে কত টাকার বিজ্ঞাপন দিয়েছে। উত্তরে সরকার জানায় এপ্রিল ২০১৪ থেকে অক্টোবর ২০১৭ পর্যন্ত অঙ্কটা ছিল ৩,৭৫৫ কোটি টাকা। ইলেকট্রনিক সংবাদমাধ্যমের ভাগে ১,৬৫৬ কোটি আর ছাপা কাগজে বা পত্রিকায় ১,৬৯৮ কোটি। অরবিন্দ কেজরিওয়ালের দিল্লি সরকার, মানে আম আদমি পার্টির সরকার। তারা শুধু ২০১৫ সালেই ৫২৬ কোটি টাকার বিজ্ঞাপন দিয়েছিল।

তা এতগুলো টাকার বিজ্ঞাপনের মায়া ত্যাগ করে কোন সংবাদমাধ্যম সরকারের বিরুদ্ধে যায় এমন খবর করবে? পশ্চিমবঙ্গের কথা বেশি বলব না। কারণ এখান থেকে আবার বাড়ি ফিরতে হবে তো, বিপ্লব মন্ডল করে দিলে মুশকিল। গতবছর একসঙ্গে চারটে রাজ্য আর একটা কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল, মানে পুদুচেরিতে, ভোট হয়েছিল। তার মধ্যে ফেসবুকে বিজ্ঞাপন দেওয়ায় এক নম্বরে ছিল আমাদের রাজ্য। প্রায় পৌনে চার কোটি টাকা খরচ করেছিল এই রাজ্যের দলগুলো। প্রায় ১ কোটি ৬৯ লক্ষ টাকা খরচ করে শীর্ষে ছিল তৃণমূল কংগ্রেস। অন্যান্য সংবাদমাধ্যমের মত বা তার চেয়েও বেশি করে কীভাবে সোশাল মিডিয়া ভোটারদের প্রভাবিত করে তা নিয়ে একটা আলাদা আলোচনা করা যায়, তার মধ্যে যাচ্ছি না।

বিজ্ঞাপন দিয়ে মিডিয়াকে কিনে নেওয়ার কাজটা কিন্তু শুধু সরকার করে না, কর্পোরেটও করে। আর আমাদের দেশে তো ক্রমশ যাহা কর্পোরেট তাহাই সরকার হয়ে দাঁড়াচ্ছে। ফলে কোনো কাগজ যেমন সরকারের সমালোচনার মধ্যে যায় না, চ্যানেলগুলো যেমন দিনরাত প্রধানমন্ত্রী, মুখ্যমন্ত্রীদের গুণগান করতে ব্যস্ত থাকে, তেমনি শিল্পপতিদের কুকীর্তিও প্রকাশ করা যায় না। শুধু তা-ই নয়, কাগজের প্রথম পাতা থেকে শেষ পাতা পর্যন্ত কোথাও আপনি কারোর সমালোচনা করতে পারবেন না। ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে বলছি। এখন তো আইপিএলের দেখাদেখি অনেকগুলো খেলাতেই ওরকম আলো ঝলমলে লিগ হয়। আমার ডিপার্টমেন্টের এক জুনিয়রকে সেরকম একটা লিগ কভার করতে পাঠানো হয়েছিল। সে সেখান থেকে একটা কপি ফাইল করল, যে এখানে বাজনা তো প্রচুর, কিন্তু খাজনা নেই। মানে লোকে সেভাবে খেলা দেখতে আসছে না, গ্যালারি রোজই খালি থাকছে। এই কপি পাতায় বসে যাওয়ার পর ফেলে দিতে হয়েছিল। কারণ আমার কাছে উপরতলা থেকে ফোন এল, ওই লিগ কাগজকে কোটি পাঁচেক দিয়েছে। অতএব তাদের খামতি-টামতি লেখা যাবে না।

মানে বুঝতেই পারছেন, টাকা দিয়ে সংবাদমাধ্যমের মুখ বন্ধ করা যদি রাজনীতিতে একবার চালু হয়ে যায়, তাহলে সব ক্ষেত্রেই সেটা চলে। অগণতান্ত্রিকতা, অসহিষ্ণুতাও তাই এখন আমাদের জাতীয় জীবনের সর্বত্র। শুধু ক্ষমতাসীন দলের নেতা নেত্রী নয়, বিরাট কোহলি পর্যন্ত অপ্রিয় প্রশ্ন শুনলে রেগে যান। আজকাল খেলোয়াড়দের সাক্ষাৎকার নেওয়া মানে হচ্ছে, আগে থাকতে প্রশ্নগুলো দলের মিডিয়া ম্যানেজারের কাছে জমা দিতে হবে। তিনি যে প্রশ্নগুলো করতে অনুমতি দেবেন কেবল সেগুলোই জিজ্ঞেস করা যাবে। মানে ফিক্সড ইন্টারভিউ ব্যাপারটাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া হয়েছে।

এই যে দুর্নীতির প্রাতিষ্ঠানিক রূপ – এটাই আজকের সাংবাদিকতার অভিনব অন্ধকার। আগে কি এমন হত না, যে কোনো সাংবাদিক কোনো শিল্পপতির থেকে ঘুষ নিয়ে তাঁর সম্পর্কে বা তাঁর ব্যবসা সম্পর্কে ভাল ভাল কথা লিখলেন, বা লেখা উচিত এমন কোনো খবর লিখলেন না? বিলক্ষণ হত। রাজনৈতিক নেতারা, প্রশাসনের মাথারা, মন্ত্রীরা, অভিনেতারা – অনেকেই এ কাজ করাতেন। অনেকসময় ঘুষ দিয়েও করাতে হত না এগুলো, স্রেফ প্রভাব খাটিয়ে বা সাংবাদিকের সাথে খাতিরের জোরে করানো হত। কিন্তু সেগুলো চুপিচুপি করা, কোনো কোনো সাংবাদিক করতেন। কাজটার পেশাগত স্বীকৃতি ছিল না। এখন কিন্তু আর সাংবাদিক একা একা দুর্নীতি করতে পারেন না। এখন তাঁর কাগজ বা তাঁর চ্যানেল সরাসরি নির্দেশ নেয় ক্ষমতাশালীদের কাছ থেকে। দরাদরিও করে। ফলে কোনো সাংবাদিক সৎ সাংবাদিকতা করতে গেলে একলা হয়ে যাবেন। চুপচাপ ঘাড় নীচু করে কর্তৃপক্ষ যা বলছেন তাই করে যাওয়া ছাড়া কোনো উপায় নেই। অন্যথায় চাকরি চলে যাবে, বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে প্রাণও যেতে পারে।

আর সংবাদমাধ্যমগুলোর মধ্যে যে একতা ছিল, সেটাও নষ্ট হয়ে গেছে। আগে একজন সাংবাদিককে কেউ আক্রমণ করলে শুধু তাঁর সংস্থা নয়, সমস্ত সংস্থার সাংবাদিক পাশে দাঁড়াত। কারণ প্রতিযোগিতা ছিল খবর করা নিয়ে, ক্ষমতাশালীর প্রিয়পাত্র হওয়া নিয়ে নয়। এখন সাংবাদিক হয়ে গেছেন গৌণ, খবর করা নিয়ে প্রতিযোগিতাও স্তিমিত। কারণ প্রতিযোগিতাটা এখন সরকার আর বিরাট পুঁজিওলা লোকেদের কাছ থেকে টাকা নেওয়ার। সেই প্রতিযোগিতা তো মিডিয়া হাউসগুলোর মধ্যে, সাংবাদিক সেখানে বোড়ে মাত্র। সাংবাদিককে দরকারই নেই, দরকার ম্যানেজার। সেই কারণে অতিমারীর অজুহাতে গোটা দেশের অসংখ্য বড় কাগজ অনেকগুলো সংস্করণ বন্ধ করে দিয়েছে, কাগজ আর চ্যানেলগুলো প্রচুর সাংবাদিক ছাঁটাই করেছে। মালিকদের দরকার বাধ্য লোক। তারা অযোগ্য হলেও কোনো অসুবিধা নেই, বরং সুবিধা। কারণ সাধারণত অযোগ্য লোকের পোষ মানার তাগিদ বেশি হয়। এর মধ্যে যোগ্য লোক যাঁরা টিকে আছেন, তাঁদের নিজেদের যোগ্যতা জোর করে ভুলে টিকে থাকতে হচ্ছে। আপনি হয়ত সকালের কাগজে একগুচ্ছ ভুল দেখে বা টিভির খবরে ভুলভাল, হাস্যকর আলোচনা দেখে মন খারাপ করছেন। ভাবছেন ছি ছি! এই কাগজটা কোথায় ছিল, কোথায় নামল! ভুল করছেন, কোত্থাও নামেনি। আপনি সকালে যেটা হাতে পাচ্ছেন সেটা আসলে একটা রসিদ। কার রসিদ? যে বা যারা নিজের পছন্দের খবর ছাপাতে টাকা দিয়েছে তাদের রসিদ। মানে বিরাট বিরাট স্পনসর এসে পড়ার আগের যুগে পাড়ার দুর্গাপুজোর সুভেনির হত না? সেই জিনিস। আপনি মাস গেলে কাগজওলাকে টাকা দিলেন মানে আসলে কাগজে যারা বিজ্ঞাপন দেয় তাদের আপনি ভর্তুকি দিলেন। টিভির পর্দায় যা দেখছেন তা-ও ইলেকট্রনিক রসিদ। জর্জ অরওয়েল বলেছিলেন, খবর হচ্ছে সেটাই যেটা কেউ একজন চায় না প্রকাশিত হোক। বাকি সব হচ্ছে পাবলিক রিলেশন।

তা পাবলিক রিলেশন তো আর পাবলিকের স্বার্থে করা হয় না। পাবলিককে সম্মোহিত করে রাখার জন্য করা হয়। সেটাই করা হচ্ছে। আপনার দরকার চাকরি, আপনাকে আমি পড়াচ্ছি অমুক নেতার তমুকের সাথে বিবাহ বহির্ভূত সম্পর্কের রসালো কাহিনি। তাঁরা পয়লা বৈশাখে ছাদে নাচ করলেন, গরমের ছুটিতে কাশ্মীর বেড়াতে গেলেন। আপনি দেখছেন সবজি মাছ মাংস সবকিছুর আগুন দাম, ২০১৪ সালে যে দামে দুটো গ্যাস সিলিন্ডার পাওয়া যেত এখন সে দামে একটা পাওয়া যাচ্ছে। আমি আপনাকে দেখাচ্ছি কী? না তাজমহল কি আসলে তেজো মহালয় ছিল? কারণ ওটা করার জন্যই আমার কাগজ বা আমার চ্যানেল বিজ্ঞাপন, এবং পেড নিউজ, অর্থাৎ প্রাতিষ্ঠানিক ঘুষ, পাচ্ছে। সরকারের অকর্মণ্যতা নিয়ে খবর করতে গেলে সেগুলো বন্ধ হয়ে যাবে।

এর সঙ্গে আরও একটা বিপদ আছে। বিরাট বিপদ। কমলে কামিনী জানেন তো? ওই যে চণ্ডীমঙ্গলে ছিল? একজন মহিলা পদ্মফুলের উপর বসে আস্ত আস্ত হাতি গিলে ফেলছে? ওইভাবে পদ্মফুলের উপর বসে মুকেশ আম্বানি একের পর এক ভারতীয় সংবাদমাধ্যমকে গিলে ফেলছেন। এমন প্রায় কোনো সংবাদমাধ্যমের নাম আপনি ভেবে উঠতে পারবেন না, যেখানে তাঁর অন্তত কিছুটা অংশীদারিত্ব নেই। নিজেদের হাতে তৈরি সিএনএন-আইবিএন ছেড়ে চলে যেতে হয়েছিল রাজদীপ সরদেশাই আর তাঁর স্ত্রী সাগরিকা ঘোষকে। কারণ রাঘব বহলের থেকে ওটা কিনে নিয়েছিল রিলায়েন্স ইন্ডাস্ট্রিজ। ওই নেটওয়ার্ক এইট্টিন গ্রুপের যত চ্যানেল, যত ওয়েবসাইট সবই এখন মুকেশের সম্পত্তি। তাছাড়াও অজস্র সংবাদমাধ্যমে তিনি নানা মাত্রায় আছেন। এমনকি SEBI (মানে সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ বোর্ড অফ ইন্ডিয়া)-র রিপোর্ট থেকে জানা গেছে, সম্ভবত এনডিটিভিরও ৫২% শেয়ার এখন মুকেশের ঘনিষ্ঠ সহযোগী মহেন্দ্র নাহাতার। ভারতীয় মিডিয়া ইতিমধ্যেই অভিজাততন্ত্রে পরিণত হয়েছে, ক্রমশ আক্ষরিক অর্থে মনোপলির দিকে এগোচ্ছে। এইসব কারণে, লক্ষ করুন, আমি যে অসমসাহসী সাংবাদিকদের নাম করলাম প্রথম দিকে, তাঁরা কেউ আপনাদের জানা কোনো সংবাদমাধ্যমের কর্মী নন। কেউ স্থানীয় কাগজের কর্মচারী, কারোর একটা ইউটিউব চ্যানেল আছে, কেউ শুধু একটা ফেসবুক পেজ চালান। নির্ভীক সাংবাদিকতা আজকের ভারতে এই মানুষগুলোই করছেন।

কী করে পারছেন? এর উত্তরের মধ্যেই লুকিয়ে আছে আজকের আলোচনার বিষয়ের দ্বিতীয় অংশটার উত্তর। কী করণীয়?

এই মুহূর্তে ভারতে সত্যিকারের সাংবাদিকতা বলতে যা বোঝায়, কয়েকটা ব্যতিক্রম বাদ দিলে সেটা করার একমাত্র জায়গা হয়ে দাঁড়াচ্ছে বিকল্প সংবাদমাধ্যম (alternative media)। কয়েকটা নাম আমরা সবাই জানি – দ্য ওয়্যারনিউজক্লিকনিউজলন্ড্রিকুইন্ট ইত্যাদি। এরা অনেকেই স্থানীয় স্তরের যে লড়াকু সাংবাদিকরা এতদিন বিভিন্ন বড় সংবাদমাধ্যমে নামমাত্র পারিশ্রমিকে দারুণ কাজ করতেন, তাদের কিছুটা বেশি টাকা দিয়ে খবর কেনে। সরকারবিরোধী, কর্পোরেটবিরোধী খবর এরা করে উঠতে পারে কারণ এই ওয়েবসাইটগুলো চলে মূলত সাবস্ক্রাইবারদের টাকায়, বিজ্ঞাপনের টাকায় নয়। বাংলায় কিন্তু এই ব্যাপারটা এখনো সেভাবে চালু হয়নি। না হওয়ার জন্য আপনি, আমি সবাই খানিকটা দায়ী। হয়নি বলে পশ্চিমবঙ্গে যে নিউজ সাইটগুলো আছে, তার অনেকগুলোই কনটেন্টের দিক থেকে বিকল্প নয়।

আমি শুধু বিজ্ঞাপনের কথা বলেছি, পেড নিউজের মধ্যে ঢুকিনি। কারণ সেটা আবার নিজেই একটা আলাদা বিষয়। এ নিয়ে বিশিষ্ট সাংবাদিক পি সাইনাথের দারুণ কাজ আছে। এমনিতে আজকাল সংবাদমাধ্যমকে টাকা দিয়ে আপনি করাতে পারবেন না এমন কাজ নেই। ২০১৮ সালে কোবরাপোস্ট একটা স্টিং অপারেশন করেছিল। তাতে কোবরাপোস্টের প্রতিনিধিরা একটা হিন্দুত্ববাদী সংগঠনের প্রতিনিধি সেজে ভারতের অনেকগুলো বড় বড় মিডিয়া হাউসের কর্তাদের কাছে গিয়েছিলেন। প্রস্তাব ছিল, আমরা টাকা দেব, সাম্প্রদায়িক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত খবর করতে হবে এবং ২০১৯ লোকসভা নির্বাচনে ক্ষমতাসীন দলের সুবিধা হয় এমন খবর করতে হবে, নানারকম ইভেন্টের আয়োজন করতে হবে। দুটো মাত্র মিডিয়া হাউস রাজি হয়নি – পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান আর ত্রিপুরার দৈনিক সংবাদ।

এই অন্ধকারের মধ্যে আমরা দাঁড়িয়ে আছি। কেন নেমে এল এই অন্ধকার? ১৯৭৫ সালে ইন্দিরা গান্ধীর জরুরি অবস্থার চেয়েও ঘন এই অন্ধকার কেন আটকাতে পারল না সংবাদমাধ্যম? দক্ষিণপন্থী রাজনীতির উত্থান তো শুধু ভারতে হয়নি। পৃথিবীর দুটো প্রাচীন গণতন্ত্র – ব্রিটিশ যুক্তরাজ্য আর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র – দু জায়গাতেই ঘোর দক্ষিণপন্থীরা ক্ষমতায় এসেছে গত এক দশকে। সেখানে মিডিয়ার এ অবস্থা হয়নি তো।

ইন্টারনেটে ইংল্যান্ডের কাগজগুলো পড়ে দেখুন, রোজ তুলোধোনা করছে বরিস জনসনকে। সরকার তাদের কিচ্ছুটি করতে পারে না। মাসখানেক আগেই দেখলাম আইটিভির একজন সাংবাদিক মুখোমুখি বসে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর লাইভ সাক্ষাৎকার নিয়েছেন। ভদ্রমহিলার বয়স আমাদের নাভিকা কুমারের মতই হবে। কিন্তু তিনি এমন সব প্রশ্ন করছিলেন, যে জনসনবাবু পালাতে পথ পাচ্ছিলেন না। একবার আমতা আমতা করে বলার চেষ্টা করলেন, আমার পক্ষে যা যা করা সম্ভব আমি করছি। মহিলা সটান বলে দিলেন, না, করছেন না। তারপর তথ্যপ্রমাণও দিয়ে দিলেন। ২০১৭ সালের ডিসেম্বর মাসে নিউইয়র্ক টাইমস তাদের ‘ওপিনিয়ন’ নামে যে বিভাগটা আছে তাতে ‘ট্রাম্প’স লাইজ’ শিরোনামে পুরো পাতা জুড়ে একটা লেখা ছেপেছিল। কী ছিল সেই লেখায়? কিচ্ছু না। রাষ্ট্রপতি হওয়ার পর থেকে ডোনাল্ড ট্রাম্প যত মিথ্যে কথা বলেছেন তার তালিকা, সঙ্গে সত্যিটা কী – সেইটা। আমরা কি স্বপ্নেও ভাবতে পারি ভারতের কোনো কাগজে ‘মোদী’জ লাইজ’ বলে একটা পাতা বেরোবে? যে দু-একটা কাগজ এখনো ধারাবাহিকভাবে সরকারবিরোধী খবর করে – ধরুন ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস বা বেঙ্গালুরুর ডেকান হেরাল্ড, কি কলকাতার টেলিগ্রাফ – তারাও পেরে উঠবে না। আবার দেখা যায় এরাও নিজের রাজ্যের সরকারের ব্যাপারে অনেকসময় নরম। কারণ সকলেরই ক্ষমতার সীমা আছে। কদিন পরপরই দেখবেন খবর হয় – এনডিটিভির প্রণয় রায়, রাধিকা রায়ের পাসপোর্ট সিজ করা হয়েছে। বা দ্য ওয়্যারের অফিসে ইডির রেড, অথবা নিউজক্লিকের কর্ণধারকে টানা ছ ঘন্টা জেরা। তাছাড়া অবাধ্য সংবাদমাধ্যমের সম্পাদকদের নামে কথায় কথায় মানহানির মামলা, থানায় ডেকে পাঠিয়ে হয়রানি – এসব চলতেই থাকে। উপরন্তু যে মানিকজোড় ক্রমশ ভারতের সব শিল্পের দখল নিচ্ছেন, তাঁদের অন্য জোড়টি, গৌতম আদানি, তিনিও মৃদুমন্দ গতিতে মিডিয়া জগতে ঢুকে পড়ছেন। কুইন্টের মাইনরিটি স্টেক কিনেছেন সদ্য। সুতরাং বিকল্প সংবাদমাধ্যমও যে আমাদের সময়ের আলো হয়ে বেশিদিন টিকতে পারবে, এমন ভরসা করা যায় না।

তাহলে কী স্মরণীয়? কী করণীয়?

প্রথমেই আমাদের মধ্যে গেড়ে বসে থাকা একটা সম্পূর্ণ ভুল ধারণাকে সমূলে উৎপাটিত করতে হবে। আমরা ছোট থেকে শুনে এসেছি যে আইনসভা (মানে সংসদ, বিধানসভা, বিধান পরিষদ ইত্যাদি), প্রশাসন (মানে পুলিস, আমলা প্রমুখ), বিচারব্যবস্থার (মানে আদালত) পর সংবাদমাধ্যম হল গণতন্ত্রের চতুর্থ স্তম্ভ। খবরের কাগজ হল “people’s Parliament always in session” – এরকমও বলা হয়েছে। এখন বুঝে নেওয়ার সময় এসেছে, যে এগুলো একদম ভুল। আসলে সংবাদমাধ্যম গণতন্ত্রের অন্যতম স্তম্ভ নয়, গণতন্ত্রই সংবাদমাধ্যমের একমাত্র স্তম্ভ। গণতন্ত্র শক্তিশালী হলে সংবাদমাধ্যম শক্তিশালী হয়, গণতন্ত্র ধসে পড়লে সংবাদমাধ্যমও ধসে পড়ে।

ইংল্যান্ড, আমেরিকার সাংবাদিকরা রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রীর চোখে চোখ রেখে কথা বলতে পারছেন কারণ বাম, মধ্য, ডান যে-ই ক্ষমতায় আসুক; ওখানকার গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো এত শক্তিশালী, যে একটা স্তরের বেশি বেয়াদপি করা যায় না। আপনার দেশের রাজনীতি নীতিহীনতা, দুর্নীতি আর মানুষ-মারা আদর্শের স্বর্গরাজ্য হয়ে যাবে আর সংবাদমাধ্যম একা কুম্ভ হয়ে গণতন্ত্রের গড় রক্ষা করবে – এ হয় না। আপনার সমাজ সংখ্যালঘুর রক্ত চাইবে আর টিভি চ্যানেলগুলো রেডিও রোয়ান্ডা হয়ে উঠবে না – এ অসম্ভব।

আমেরিকার বিরোধী রাজনৈতিক শক্তিগুলোকে দেখুন আর ভারতের বিরোধী শক্তিগুলোকে দেখুন। আমেরিকার ডেমোক্র্যাট নেতারা রাহুল গান্ধীর মত ট্রাম্পের সাথে লড়াই করতে করতে আচমকা ইউরোপে ছুটি কাটাতে চলে যেতেন না। ওখানে আমাদের এখানকার মত ঘোষিত মার্কসবাদীদের সংখ্যা এবং শক্তি – দুটোই নগণ্য। কিন্তু ডেমোক্র্যাট দলের বামপন্থী বার্নি স্যান্ডার্স, আলেক্সান্দ্রা ওকাসিও কর্তেজরা যে লড়াই দিয়েছিলেন, এখনো দিচ্ছেন, তার ফলে ট্রাম্পপন্থী লোকেরা তো বটেই, এমনকি ডেমোক্র্যাটদের ভিতরের দক্ষিণপন্থীরাও কিছুটা পিছু হটতে বাধ্য হয়েছে। অসংখ্য দলে বিভক্ত ভারতের বামপন্থীদের তো তার চেয়ে অনেক বেশি জোরদার লড়াই দেওয়ার কথা। কিন্তু পারছেন কই? বুলডোজারের সামনে সিপিএমের বৃন্দা কারাতের সঙ্গে নকশাল নেতা রবি রাইও দাঁড়িয়ে পড়েছিলেন। যেখানে সম্ভব সেখানেই স্বৈরাচারী শাসকের বুলডোজারের সামনে যদি ওঁরা ওইরকম ঐক্যবদ্ধভাবে দাঁড়াতে পারেন, তাহলে কিছুটা লড়াই হতে পারে। কিন্তু এ দেশের কমিউনিস্টদের অনেকটা সময় এবং উদ্যম নষ্ট হয় কে কার চেয়ে বেশি কমিউনিস্ট তার চুলচেরা হিসাব করতে গিয়ে।

আর যে আঞ্চলিক দলগুলো আছে, তাদের মধ্যে লালুপ্রসাদের রাষ্ট্রীয় জনতা দল ছাড়া প্রায় সকলেই কখনো না কখনো বিজেপির সাথে ঘর করেছে, ক্ষমতায় থাকাকালীন চরম দুর্নীতির ইতিহাসও আছে। তাছাড়া তাদের নেতা-নেত্রীদের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার আগ্রহ যতখানি, আরএসএসের বিরুদ্ধে সম্মুখসমরে নামার আগ্রহ ততখানি নয়। বরং রামনবমী পালন, মন্দির বানানো, বিভিন্ন পুজোর আয়োজনে বিজেপির চেয়ে বেশি বিজেপি হওয়ার প্রতিযোগিতায় তারা বেশি স্বচ্ছন্দ। সংখ্যালঘুদের ত্রাতার অভিনয় করে ক্ষমতায় এসে দাঙ্গাবাজদের দলের টিকিটে উপনির্বাচনে দাঁড় করাতে তাদের কোথাও বাধে না। ফলে অবাধে মসজিদের কুয়ো থেকে শিবলিঙ্গ উদ্ধার চলছে। গণতান্ত্রিক, ধর্মনিরপেক্ষ ভারত আমাদের চোখের সামনে ইতিহাস হয়ে যাচ্ছে। সে ইতিহাস অবশ্য পড়বে না আমাদের ছেলেমেয়েরা। তারা পড়বে হলদিঘাটের যুদ্ধে রাণাপ্রতাপের সেনাবাহিনী আকবরের বাহিনীকে হারিয়ে দিয়েছিল। তারা ভগৎ সিং পড়বে না, পড়বে আরএসএসের প্রথম সঙ্ঘচালক কেশব বলিরাম হেড়গেওয়ারের বক্তৃতা।

এমতাবস্থায় সাংবাদিকতার অন্ধকার কাটানো অসম্ভব। সে অন্ধকার কাটবে তখনই, যখন ভারত আবার গণতান্ত্রিক, ধর্মনিরপেক্ষ হবে।

কী করে হবে সেটা? মোডাস অপারেন্ডি যদি আমার জানা থাকত, তাহলে আমি আজ এখানে এসে আপনাদের সামনে এতক্ষণ ধরে বক্তৃতা দিতাম না। কাজটা করতে নেমে পড়তাম। কিন্তু আমি জীবনে একদিনও সক্রিয় রাজনীতি করিনি, আর এই কাজটা রাজনীতির লোকেদেরই কাজ। তাঁদেরই করতে হবে। এখানে আমি রাজনীতি বলতে দলীয় রাজনীতির কথা বলছি, সরকার পরিবর্তনের কথা বলছি। কিন্তু আমার ধারণা, যে অন্ধকারে ভারতবর্ষ প্রবেশ করেছে তার থেকে মুক্তি স্রেফ সরকার পরিবর্তন হলেই হবে না। সেই কারণেই আমরা যারা দলীয় রাজনীতির বাইরের লোক, তাদেরও সেতুবন্ধনে কাঠবিড়ালির ভূমিকা নিতে হবে বলে আমার মনে হয়।

তার জন্যে প্রথমেই আমাদের নিজেদের রাজনৈতিক করে তুলতে হবে। রাজনৈতিক করে তোলা মানে কোনো রাজনৈতিক দলে যোগ দেওয়া নয়। সে কেউ প্রয়োজন বোধ করলে যোগ দিতেই পারেন। কিন্তু যেটা অবশ্যই করা দরকার সেটা হল কাজকর্মে, জীবনচর্যায় রাজনৈতিক হওয়া। এই ব্যাপারটায় অন্তত এই মুহূর্তে ভারতের ফ্যাসিবাদীরা বামপন্থী এবং মধ্যপন্থীদের চেয়ে অনেক এগিয়ে রয়েছে।

একটা উদাহরণ দিই, তাহলেই বোঝা যাবে কথাটা। এই কিছুদিন আগে সোশাল মিডিয়া তোলপাড় হয়ে গেল একজন রেডিও জকির একটা মন্তব্য নিয়ে। তা উনি যে চ্যানেলের বিতর্কসভায় গিয়ে কথাগুলো বলেছিলেন, সেই চ্যানেলটা আমি দেখি না। কারণ ওটা যে খবরের চ্যানেল নয়, ফ্যাসিবাদীদের প্রোপাগান্ডা চ্যানেল সেটা অনেকদিন আগেই পরিষ্কার হয়ে গেছে এবং তারাও এটা গোপন করার চেষ্টা করে না। কিন্তু একটা লেখার জন্য আমার ওই ক্লিপটা, যেখানে ওই ভদ্রমহিলা বিতর্কিত কথাগুলো বলেছেন, সেটা দেখার দরকার পড়েছিল। ওই কয়েক মিনিটের ক্লিপে আমার দুজনকে চোখে পড়ল যাঁরা ঘোষিত ফ্যাসিবিরোধী। একজন নামকরা অধ্যাপক, আরেকজন বিখ্যাত সাহিত্যিক। তা আমি যদি ফ্যাসিবাদীদের প্ল্যাটফর্মকে বয়কট করার মত সামান্য কাজটুকুও করতে না পারি, তাহলে আমি কিসের ফ্যাসিবিরোধী? ওঁরা তো তবু দলীয় রাজনীতির বাইরের লোক। তৃণমূল, কংগ্রেস, সিপিএম ইত্যাদি যেসব দল ঘোষিত আরএসএস বিরোধী – অবশ্য, তৃণমূল সম্পর্কে না জেনে ওই শব্দটা প্রয়োগ করা হয়ত আমার উচিত হচ্ছে না।। কারণ গত বছর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ইন্ডিয়া টুডে কনক্লেভে রাহুল কাঁওয়ালকে বলেছিলেন তাঁর বিজেপিকে নিয়ে সমস্যা, তিনি সঙ্ঘ পরিবারের বিরুদ্ধে লড়ছেন না। কারণ তারা ভোটে লড়ে না (এই ভিডিওতে ১৩ মিনিট ১১ সেকেন্ড থেকে)। যা-ই হোক, কথা হচ্ছে বিজেপিবিরোধী দলের প্রতিনিধিরাই বা ওই চ্যানেলে কী প্রত্যাশা নিয়ে যান? কেন বয়কট করতে পারেন না? আমাদের মত সাধারণ মানুষ তো ওঁদের দিকেই তাকিয়ে থাকে। ওঁরা কিন্তু বুঝতেই পারছেন না, যে এই বয়কটটা একটা দরকারি রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত। এই সিদ্ধান্তই যদি না নেওয়া যায়, তাহলে গণতন্ত্রকে কী করে বাঁচাব আর ফ্যাসিবাদকে কী করে হারাব? লক্ষ করে দেখবেন, কোনো বিজেপি নেতা তো বটেই, দলীয় রাজনীতির বাইরের কোনো দক্ষিণপন্থীও রবীশ কুমারের শোতে যায় না, ওয়্যার বা নিউজক্লিকে লেখে না।

আসলে গত তিরিশ বছরে আমাদের সকলেরই যে সত্তাটা সবচেয়ে শক্তিশালী হয়ে উঠেছে সেটা হল ক্রেতা সত্তা। ফলে আমাদের চিন্তাভাবনাও হয়ে গেছে ব্র্যান্ড নির্ভর। কোনটা রাজনীতি আর কোনটা স্রেফ দলাদলি সেটা ভুলে গেছি। আমাদের মধ্যে এক ধরনের অরাজনৈতিক পার্টিজানশিপ তৈরি হয়েছে, যা আসলে হয়ত ব্র্যান্ড নির্ভরতা। আমরা ভাবছি একটা মতাদর্শ মানে একটা ব্র্যান্ড। আর ব্র্যান্ডেড জিনিসের তো একটাই এক্সক্লুসিভ বিক্রেতা থাকে। ফ্যাসিবাদ ব্র্যান্ডের বিক্রেতা হল বিজেপি, মার্কসবাদ ব্র্যান্ডের বিক্রেতা সিপিএম – এরকম আর কি। আমাদের রাজ্যে তো ব্র্যান্ড বুদ্ধ, ব্র্যান্ড মমতা – এই শব্দবন্ধগুলো অনেকদিন ধরেই চালু। এগুলো আমাদের অবচেতনেও কাজ করে। তো ব্র্যান্ড চেনা হয়ে গেলে আমরা কী করছি? কে কোন দলের সমর্থক আর আমি কোন দলের সমর্থক – তা দিয়ে আমার প্রতিক্রিয়া ঠিক করছি এবং আমার ক্রিয়া বলে আর কিছু থাকছে না।

আপনার সাথে কোনো বিষয়ে আমার তর্ক হলে আমি আপনার যুক্তিগুলো মন দিয়ে শুনছি না, বোঝার চেষ্টা করছি না। যুক্তিগুলো খণ্ডন করে আপনাকে হারানোর চেষ্টা করছি না। আমি চট করে আপনার ফেসবুক প্রোফাইল দেখে জেনে নিচ্ছি কোন বিষয়ে আপনার কী প্রতিক্রিয়া ছিল, তা থেকে ঠিক করে নিচ্ছি আপনি কোন দলের লোক। তারপর আপনি আমার পছন্দের ব্র্যান্ডের লোক হলে আপনি অন্যায় বললেও একমত হয়ে যাচ্ছি, নাহলে ন্যায্য কথা বললেও ঝগড়া করছি। এয়ারটেল ভাল, না ভোডাফোন ভাল? এই নিয়ে যদি দুজন ঝগড়া করে, গালাগালির পর্যায়ে চলে যায়, আপনি দেখে হাসবেন তো? অথচ এটা কিন্তু সেই জিনিসই হচ্ছে। ফ্যাসিবাদ ঠিক এটাই চায়।

অর্থাৎ ফ্যাসিবাদ আর বাইরে নেই, আপনার ভেতরে আমার ভেতরেও ঢুকে পড়েছে। এটাকে বার করতে হলে যেখানে সম্ভব সেখানেই ফ্যাসিবাদীদের সংস্রব ত্যাগ করতে হবে। কোনো ছোঁয়াচে রোগ হলে আমরা সকলের থেকে সরে থাকি দুটো কারণে। এক, যাতে রোগটা আরও ছড়াতে না পারে। দুই, যাতে আমার নিজের সংক্রমণ বেড়ে না যায়। আমাদের মারাত্মক ছোঁয়াচে ঘৃণার রোগ হয়েছে। এই রোগ তাড়াতেও আমাদের আগে ফ্যাসিবাদীদের সঙ্গে সমস্তরকম সম্ভাব্য সম্পর্ক ত্যাগ করতে হবে বলে আমার মনে হয়। কাউকে হয়ত বন্ধু ত্যাগ করতে হবে, কাউকে কোনো আত্মীয়ের সাথে সম্পর্ক তুলে দিতে হবে। কিন্তু কাজটা করতেই হবে। আমরা যে যার মত গায়ে হাওয়া লাগিয়ে চলব আর এত বড় বিপদ থেকে দেশটা বেঁচে যাবে, আমরা আবার স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলব – এরকম ভাবনা অনৈতিহাসিক।

একবার আমারই কাছাকাছি বয়সের কয়েকজন পুরস্কারপ্রাপ্ত বাঙালি সাহিত্যিকের সাথে এসব নিয়ে আলোচনা করার সুযোগ হয়েছিল। তাঁরা হিন্দি আগ্রাসন আটকাতে হবে বলে দিনরাত ফেসবুকে পোস্ট করতেন। অথচ নিজেদের ছেলেমেয়েকে বাংলা বই পড়ান না। সেদিনের আড্ডায় বললেনও “বাংলার চেয়ে হিন্দি পড়লে যদি বেশি লাভ হয়, তাহলে সন্তানকে আমি হিন্দিই পড়াব। বাংলা কেন পড়াব?”

এরকম ভণ্ডামি করে কোনোদিন ফ্যাসিবাদীদের হারানো যায়নি। কেবল প্রতিক্রিয়া দিয়ে পৃথিবীর কোনো দেশে গণতন্ত্র রক্ষা হয়নি। ক্রিয়া দরকার। কীরকম ক্রিয়া? আমি ডাক দিলে তো এক হাজার লোক জড়ো হবে না, যে একটা মিছিল কি মিটিং করব? কিন্তু মিছিল, মিটিংয়ে যেতে তো পারব। অন্তত সেটুকু করি। যদি আমি লিখলে পাঁচজন লোক পড়ে, তাহলে একটু লিখি। যদি বললে আপনাদের মত কিছু লোক শোনে, তাহলে একটু বলি। যে কবিকে আমরা ঠাকুর বানিয়ে শিকেয় তুলে ভুলে গেছি এবং যাঁর জন্মদিনে আমরা কোনো কেলেঙ্কারি করতেই বাকি রাখি না, সেই কবি লিখেছিলেন

কে লইবে মোর কার্য, কহে সন্ধ্যারবি।
শুনিয়া জগৎ রহে নিরুত্তর ছবি।
মাটির প্রদীপ ছিল, সে কহিল, স্বামী,
আমার যেটুকু সাধ্য করিব তা আমি।”

এই মাটির প্রদীপের কাজটা আমরা করতে পারি। ভীষণ ক্লান্তিকর, হতাশায় ডুবিয়ে দেওয়ার মত কাজ কিন্তু। কারণ চারপাশের অন্ধকার এত গাঢ়, রাতটা এত দীর্ঘ যে মাঝে মাঝে মনে হবে একটা অন্ধকার অট্টালিকায় আপনি একা প্রদীপ হয়ে জ্বলছেন। এই হতাশা কাটিয়ে ওঠার জন্যে একটু আশার বাণী আমি শোনাতে পারি আগাথা ক্রিস্টির লেখা থেকে। দ্য পেল হর্স উপন্যাসের এক জায়গায় কয়েকটা চরিত্র ‘ইভিল’-এর ধরন ধারণ নিয়ে আলোচনা করছিল। সেখানে একটা চরিত্র বলে, যে হিটলারের মত লোকেরা ইভিল হলেও নিশ্চয়ই তাদের বিরাট ব্যক্তিত্ব ছিল। পরে যখন অপরাধী ধরা পড়ে, দেখা যায় লোকটা নেহাত ফালতু। তখন এক পুলিস অফিসার বলেন “Evil is not something superhuman, it’s something less than human. Your criminal is someone who wants to be important, but who never will be important, because he’ll always be less than a man.”

সাংবাদিক পরিচয়ে এতগুলো কথা বললাম। ফলে কেউ এই প্রশ্নটা তুলতেই পারেন, যে আমার তো নিরপেক্ষ হওয়ার কথা। আমি পক্ষ নিচ্ছি কেন? সাংবাদিকদের নিরপেক্ষ হওয়া উচিত, এই ধারণাটাকেও বাতিল করা দরকার। এ দেশে কথাটা খোলাখুলি বলা হয় না এখনো, সবরকম পক্ষপাতদুষ্ট কাজ নিরপেক্ষতার ভান বজায় রেখে করা হয়। কিন্তু সেই ১৯৪২ সালে আমেরিকায় হাচিন্স কমিশন বলে একটা কমিশন তৈরি করা হয়েছিল। তার কাজ ছিল আধুনিক গণতন্ত্রে সংবাদমাধ্যমের ভূমিকা নির্ধারণ করা। ১৯৪৭ সালে সেই কমিশন রিপোর্ট দেয়। সেই রিপোর্টে “factually accurate but substantially untrue” প্রতিবেদন লেখার ব্যাপারে সতর্ক করে দেওয়া হয়েছিল। কথাটা কেমন পরস্পরবিরোধী মনে হচ্ছে না? ঘটনা হিসাবে নিখুঁত হলে আবার অসত্য হবে কী করে?

২০২০ সালের অগাস্ট মাসে আমেরিকান প্রেস ইনস্টিটিউটের এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর টম রোজেনস্টিয়েল ট্রাম্পের আমলে উত্তর-সত্যের (post truth) মোকাবিলা কীভাবে করতে হবে সেটা বলতে গিয়ে এর ব্যাখ্যা দিয়েছেন। বলেছেন ধরুন, আমি নিও নাজিদের বলা একগাদা কথা রিপোর্ট করেছি, যেটা ঘটনা হিসাবে নিখুঁত। মানে তারা সত্যিই এই কথাগুলো বলেছে। কিন্তু যা বলেছে, সেগুলো ডাহা মিথ্যে। তার মানে আমি কী করলাম? আমি মিথ্যে কথাগুলোকে নিখুঁতভাবে রিপোর্ট করলাম। আমি যদি রিপোর্টে না বলি যে এগুলো সব মিথ্যে কথা, তাহলে তো সত্যের পক্ষে দাঁড়ানো হবে না। অথচ সত্য উদ্ঘাটন করাই তো সাংবাদিকের কাজ।

আমি মাস দুয়েক আগে অল্টনিউজের কর্ণধার প্রতীক সিনহার সাক্ষাৎকার নিলাম। উনি আরও এক ধাপ এগিয়ে বললেন, সমাজে ঘৃণার এমন চাষ হয়েছে যে স্রেফ কোনটা ভুয়ো খবর আর সত্যিটা কী, সেটা বলে দিয়ে কাজ মিটছে না। কারণ আমরা ফেক নিউজ থেকে হেট স্পীচের স্তরে পৌঁছে গেছি।

সুতরাং সাংবাদিককে এখন পক্ষ নিতেই হবে। প্রাইম টাইম নিউজে যারা ঘৃণা ছড়ায় তারা মিথ্যার পক্ষ নিয়েছে, আমি সত্যের পক্ষ নিলাম।

https://nagorik.net/ এ প্রকাশিত

তীব্র মেরুকরণ হওয়া সমাজে ফ্যাক্ট চেকিং যথেষ্ট নয়: প্রতীক

স্কুল স্তর থেকে অসত্যের বিরুদ্ধে লড়াই শুরু করতে অল্টনিউজ পশ্চিমবঙ্গে

সম্প্রতি অল্টনিউজের কর্ণধার প্রতীক সিনহা সোশাল মিডিয়ায় ঘোষণা করেছেন, তিনি কলকাতার বাসিন্দা হয়েছেন। অল্টনিউজ এবার পশ্চিমবঙ্গেও কাজ করবে। হঠাৎ এই সিদ্ধান্তের কারণ কী? এ কি কোনো স্বল্পমেয়াদি সিদ্ধান্ত, নাকি এর পিছনে আছে দীর্ঘমেয়াদি ভাবনা? নাগরিক ডট নেটের প্রতীককে জানালেন অল্টনিউজের প্রতীক।

নাগরিক: প্রথমেই পশ্চিমবঙ্গে আপনাকে এবং অল্টনিউজকে স্বাগত জানাই। সেইসঙ্গে একটা অনুযোগও করব। আমাদের কিন্তু অল্টনিউজকে গত বছরের বিধানসভা নির্বাচনের সময়ে বেশি দরকার ছিল। কারণ নির্বাচনের সময়ে ভুয়ো খবরের উপদ্রব বড্ড বেড়ে যায়। তাই আমার প্রথম প্রশ্ন, পশ্চিমবঙ্গে বা বাংলায় অল্টনিউজকে বিস্তৃত করার সিদ্ধান্তটা এই সময়ে কেন নেওয়া হল?

প্রতীক: আমার মনে হয় আমাদের পশ্চিমবঙ্গে আসার উদ্দেশ্য সম্পর্কে কিছুটা ভুল ধারণা থেকে এই অনুযোগটা তৈরি হয়েছে। দেখুন, ভুয়ো খবরের উপদ্রব দেশের সব ভাষাতেই সমান। অথচ আমরা একটা ক্রাউড ফান্ডেড ছোট স্টার্ট-আপ। সব রাজ্যে ছড়িয়ে পড়া আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়। তো আমাদের কলকাতায় আসার কারণ এটা নয় যে পশ্চিমবঙ্গ ভুয়ো খবরের সবচেয়ে বড় টার্গেটগুলোর অন্যতম। আমাদের উদ্দেশ্যটা একটু বিশদে বলি?

 নাগরিক: নিশ্চয়ই…

প্রতীক: অল্টনিউজ চালু হয়েছে পাঁচ বছর হল। যারা এটা চালু করেছিল তারা নানারকম কাজের লোক। আমি যেমন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের লোক। আগের পনেরো বছর আমি সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারই ছিলাম। ইঞ্জিনিয়ারিং ছেড়ে এই কাজটায় এসেছি সামাজিক প্রভাব আছে এমন কিছু করব ভেবে। আমরা যারা অল্টনিউজ শুরু করেছিলাম, সকলেই চাইতাম আমাদের নিজেদের যে পারদর্শিতাগুলো আছে, সেগুলোকে সমাজের কাজে লাগাব। আর আমরা দেখেছিলাম যে ভারতীয় সাংবাদিকতায় ক্রস ডিসিপ্লিন বিশেষজ্ঞ বলে কিছু নেই। মানে ধরুন, যিনি বিজ্ঞান নিয়ে সাংবাদিকতা করেন, তাঁর কিন্তু বিজ্ঞানের ডিগ্রি নেই। বা টেক জার্নালিস্টের প্রযুক্তির ডিগ্রি নেই। আমরা বুঝেছিলাম, আমাদের যার যা টেকনিকাল জ্ঞান, সেগুলো ব্যবহার করে সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে এমন একটা জিনিস করতে পারি যা সেই সময়ে অন্তত এ দেশে আর কেউ করছিল না। ২০১৭ সালে আমরাই প্রথম এ দেশে মিথ্যা তথ্য চিহ্নিত করার কাজটা শুরু করি। কিন্তু সেটুকুই আমাদের লক্ষ্য ছিল না। আমরা আশা করেছিলাম সামগ্রিকভাবে সমাজে ভুয়ো তথ্যের পরিমাণ কমিয়ে আনতে পারব।

কিন্তু লক্ষ্য করে দেখুন, সমস্ত বড় বড় ইস্যুতে ভুয়ো খবর, মিথ্যা তথ্যকে চিহ্নিত করতে এত পরিশ্রম করি আমরা… এখন আরও অনেক সংগঠন করে… তা সত্ত্বেও কিন্তু সমাজে কোনো বদল আসেনি। সমাজ এখনো পাঁচ বছর আগের মতই মিথ্যা তথ্য গিলে চলেছে। বরং প্রতিদিন এগুলো বাড়ছে বললেও ভুল হয় না। তার ফলে সমাজে কী তীব্র মেরুকরণ হয়েছে আমরা দেখতেই পাচ্ছি। গত এক-দেড় বছরে আবার ভুয়ো খবর, মিথ্যা তথ্যের সাথে যুক্ত হয়েছে হেট স্পীচ। এ থেকে প্রমাণ হয়, এতদিন ধরে অসত্য গিলতে গিলতে সমাজ এতটাই দ্বিধাবিভক্ত হয়ে গেছে যে হেট স্পীচ হজম করতে কোনো অসুবিধাই হচ্ছে না। ছ বছর আগেও যদি হরিদ্বার বা ছত্তিশগড়ের হেট স্পীচের মত ঘটনা ঘটত, অনেক বেশি মানুষ অবাক হতেন বা ক্ষোভ প্রকাশ করতেন।

ফলে আমরা বুঝতে পেরেছি, এই যে একের পর এক আর্টিকেল প্রকাশ করে যাচ্ছি, এটা যথেষ্ট নয়। আরও বেশি কিছু করা দরকার। উন্নততর প্রযুক্তি তো দরকার বটেই, তা নিয়ে আমরা ইতিমধ্যেই কাজ শুরু করেছি। কিন্তু আমাদের বিশ্বাস, মানুষকে এই ব্যাপারে শিক্ষিত করা বেশি জরুরি। আপনি ইউরোপের দিকে তাকান। বিশেষ করে ফিনল্যান্ড, ডেনমার্কের মত দেশে ইতিমধ্যেই ভুয়ো খবর চিহ্নিত করা স্কুলের পাঠক্রমে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে। মানে ওরা এ সম্বন্ধে মানুষকে ছোট থেকে শিক্ষিত, সচেতন করে তোলার চেষ্টা করছে; ব্যাপারটাকে স্রেফ সাংবাদিকতার ব্যাপার বলে ভাবছে না। আমরা ওই দিকে এগোতে চাইছি। পশ্চিমবঙ্গে আসার মূল উদ্দেশ্য এই দিকটা নিয়ে কাজ করা। পাশাপাশি সাংবাদিকসুলভ যে কাজ আমরা পাঁচ বছর ধরে করছি সেটা তো করে যাবই।

নাগরিক: তা এই কাজ শুরু করার জন্য পশ্চিমবঙ্গ উর্বর জমি বলে মনে হল কেন?

প্রতীক: এই কাজটা আমরা একটা ভৌগোলিক অঞ্চল বেছে নিয়ে শুরু করতে চেয়েছিলাম। আমরা দেখতে চাই যে একটা বড় অঞ্চলের মানুষকে ব্যাপকভাবে তথ্যসাক্ষর (information literate) বা মিডিয়াসাক্ষর (media literate) করে তোলা যায় কিনা। তা এটা করতে গেলে এমন একটা রাজ্য দরকার, যেখানকার সরকার আমাদের কাজটাকে সমর্থন না করলেও অন্তত আমাদের বিরোধিতা করবে না। সেদিক থেকে আমাদের তিনটে রাজ্যের কথা মাথায় ছিল — কেরালা, তামিলনাডু আর পশ্চিমবঙ্গ। এই কাজে রাজনৈতিক স্থিরতার গুরুত্বটা আশা করি বুঝতে পারছেন। মানুষকে এই ব্যাপারে শিক্ষিত করে তোলা তো দু-এক দিনের কাজ নয়, রাজনৈতিক বিরোধিতা সামলে দীর্ঘ সময় ধরে এটা করে যাওয়া মুশকিল। তো আমরা শেষমেশ এখানেই করব ঠিক করলাম, তার একটা বড় কারণ এই প্রোজেক্টটার মাথা আমি। আমি বাংলা ভাষাটা অন্তত বলতে পারি; তামিল, মালয়ালম পারি না। দ্বিতীয়ত, পূর্ব ভারতের রাজনৈতিক গুরুত্ব ক্রমশ বাড়ছে। যেমন পশ্চিমবঙ্গের, তেমনি আসামের, তেমনই বিহারের। ২০২৪ লোকসভা নির্বাচনে পশ্চিমবঙ্গ আর বিহারের যে বিয়াল্লিশটা করে আসন, সেগুলো খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে। কেরালায় হয়ত আমাদের কাজের জমি কিছুটা তৈরি ছিল। কারণ ওখানকার সিপিএম সরকার স্কুলের পাঠক্রমে তথ্যসাক্ষরতার কোর্স চালু করবে বলে ঘোষণা করেছে, শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ শুরু হয়ে গেছে। কিন্তু শেষ অব্দি ভাষা আর রাজনৈতিক গুরুত্ব — এই দুটো কারণেই আমরা পশ্চিমবঙ্গকে বেছে নিলাম বলা যায়।

নাগরিক: এ ব্যাপারে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের সাথে আলাপ আলোচনা হয়েছে কি?

প্রতীক: না, এক্ষুণি সরকারের সাথে আলোচনা করার কোনো পরিকল্পনা নেই। প্রথমে আমরা নিজেরা একটা কাঠামো দাঁড় করাতে চাই। কিছু এনজিও, প্রাইভেট স্কুল ইত্যাদির সঙ্গে কাজ করে আমরা আগে একটা পাঠক্রম তৈরি করতে চাইছি। সত্যি কথা বলতে, আমাদের এই কাজটা করতে করতেই শিখতে হবে কী করে কী করা যায়। কারণ আমার তো শিক্ষাজগতের কোনো অভিজ্ঞতা নেই। একেবারে শূন্য থেকে শুরু করছি। আমরা আপাতত এক বছরের পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছি। আমি নিজে এই কদিন আগেই কিছু ক্লাস ইলেভেন, টুয়েলভের ছেলেমেয়েকে একটা ট্রেনিং কোর্স করালাম।

নাগরিক: ব্যাপারটা কতটা কঠিন হতে পারে বলে মনে হচ্ছে?

প্রতীক: ব্যাপারটা অনেকটাই অন্যরকম। যেমন ধরুন, ছোটদের তথ্য সংগ্রহ করা আর বড়দের তথ্য সংগ্রহ করার ধরনটা কিন্তু আলাদা। ফলে আমাদের এমন একটা পাঠক্রম তৈরি করতে হবে যেটা ছোটদের ভাল লাগবে। বড়দের যদি আমি রাজনৈতিক ভুয়ো খবর নিয়ে বলি, তাঁরা আগ্রহী হবেন। কিন্তু ছোটরা উৎসাহ পাবে না। সুতরাং আমাদের ভাবতে হবে কী করে এমন একটা পাঠক্রম তৈরি করা যায় যা ছোটদের টানতে পারবে, তথ্য সম্পর্কে তাদের আরও বিশ্লেষণাত্মক দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করতে পারবে। যেসব দেশ এই কাজটা শুরু করে দিয়েছে তাদের কিছু কিছু পদ্ধতি আমরা নিশ্চয়ই অনুসরণ করতে পারি, কিন্তু বেশিরভাগটাই নিজেদের নতুন করে ভাবতে হবে। কারণ স্ক্যান্ডিনেভিয়ার দেশগুলোর সাথে আমাদের সামাজিক, সাংস্কৃতিক তফাত বিস্তর। ধরুন ফিনল্যান্ডের সাক্ষরতার হার ৯৫%-এর আশেপাশে। তাদের মত করে এখানকার মানুষকে শেখাতে গেলে তো চলবে না। ফলে আমাদের পথ আমাদেরই আবিষ্কার করতে হবে।

নাগরিক: একটু পরিষ্কার করে নিই, তাহলে আপনারা এখানে মানুষকে তথ্যসাক্ষর করার কাজটা করবেন, কিন্তু অল্টনিউজ হিন্দির মত অল্টনিউজ বাংলা পরিষেবা চালু হচ্ছে না?

প্রতীক: না না, তা নয়। অল্টনিউজ বাংলা চালু হচ্ছে। কারণ এখানে মানুষকে তথ্যসাক্ষর করতে হলে শেখানোর ভাষাটা বাংলা হতেই হবে। একেবারে শিশু শুধু নয়, বয়ঃসন্ধির ছেলেমেয়েদের কথা ভাবুন। আমি যদি তাদের শেখাতে যাই, ওদের মধ্যে যারা ইংরেজিতে স্বচ্ছন্দ নয় তাদের জন্যে বাংলা রিসোর্স লাগবে তো। অল্টনিউজ বাংলাকে দিয়ে সেই কাজটা হবে। মানে অল্টনিউজ বাংলা আমাদের এই বড় কাজটারই একটা অংশ হয়ে উঠবে বলতে পারেন।

নাগরিক: অদূর ভবিষ্যতে অন্য আঞ্চলিক ভাষাতেও এরকম উদ্যোগ নেওয়ার কোনো ভাবনা আছে কি?

প্রতীক: আপাতত নেই। বড়জোর গুজরাটি ভাষায় কাজ করতে পারি, কারণ আমি নিজে গুজরাটি ভাষাটা জানি, আমার অনেক সহকর্মীও গুজরাটি। আমাদের একটা ছোট গুজরাটি পরিষেবা আছেও, যেখানে সামান্য কিছু ভিডিও দেওয়া হয়। খুব বেশি হলে সেটাকে একটা পূর্ণাঙ্গ পরিষেবায় পরিণত করতে পারি। তার কারণ আমাদের মত ছোট স্টার্ট-আপের পক্ষে একেবারে নিশ এরিয়াতে কাজ করাই সম্ভব। যেমন এতদিন আমরা স্রেফ ভুয়ো খবর, মিথ্যা তথ্য নিয়ে কাজ করেছি, অন্য কিছুতে ঢুকিনি। এখন হেট স্পীচ নিয়ে কাজ শুরু করছি। সবে ‘আনহেট’ বলে একটা প্রোজেক্ট ঘোষণা করেছি। আর এই শিক্ষা নিয়ে কাজটা শুরু করছি। নিজেদের এর বেশি ছড়ানোর সামর্থ কোথায়? তাছাড়া দেখুন, আলাদা আলাদা ভাষায় পরিষেবা চালু করে যে অসত্যের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে খুব বেশি সুবিধা হবে তা নয়। এই যে এতদিন ইংরেজি ভাষায় আমরা কাজ করছি, এতে কজন ইংরেজি জানা লোককে প্রভাবিত করা গেছে? সমাজে মেরুকরণ এত মারাত্মক, যে বিরাট অংশের মানুষকে কিছুই বুঝিয়ে ওঠা যাচ্ছে না। অতএব আমাদের অন্য রাস্তা নিতে হচ্ছে। আমি জানি না সফল হবে কিনা, কিন্তু স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি এখন যেভাবে আমরা এই সমস্যার সাথে লড়ছি তাতে তেমন সুবিধা হচ্ছে না।

নাগরিক: আচ্ছা, আপনার অভিজ্ঞতা কী বলে? ভুয়ো খবর কি ইংরেজি ভাষায় বেশি তৈরি হয়, নাকি আঞ্চলিক ভাষাগুলোতে?

প্রতীক: সব ভাষাতেই সমানভাবে তৈরি হয় এবং অন্য ভাষায় অনুবাদ হয়ে যায়। মনে রাখবেন, মিথ্যা তথ্য কিন্তু ভুল তথ্য নয়। মানে ওগুলোর জন্ম ভুল করে হয় না, সংগঠিতভাবে তৈরি করা হয়। ফলে বাংলায় তৈরি ভুয়ো খবর মুহূর্তের মধ্যে তেলেঙ্গানায় বা গুজরাটে গিয়ে পৌঁছয়। কোন ভাষায় বেশি মিথ্যা তথ্য উৎপাদন হয় তার কোনো সঠিক পরিসংখ্যান পাওয়াও অসম্ভব, কারণ কে যে ভুয়ো খবর তৈরি করছে তা কিছুতেই খুঁজে বার করা যায় না। আই টি সেল কি একটা ঘরে বসা কয়েকটা লোক, নাকি সারা দেশে ছড়িয়ে থাকা কয়েকশো লোক? এর উত্তর কারোর কাছে নেই।

নাগরিক: বিশেষ করে উদারপন্থী বৃত্তের মধ্যে একটা কথা আজকাল খুব বলা হয়। মানুষ তা-ই বিশ্বাস করে যা সে বিশ্বাস করতে চায়। অল্টনিউজ করতে গিয়ে আপনার অভিজ্ঞতা থেকে কি কথাটা ঠিক বলে মনে হয়? যেমন ধরুন, আপনাদের অ্যাপে তো সন্দেহজনক তথ্য আপলোড করে সেটা ভুয়ো কিনা তা জেনে নেওয়ার একটা ব্যবস্থা আছে। সেটা কতজন ব্যবহার করেন?

প্রতীক: ওই ব্যবস্থা তো আছেই। তা বাদে আমাদের একটা হোয়াটস্যাপ নম্বরও আছে। সেখানেও একই কাজ করা যায়। বেশকিছু লোক এগুলো ব্যবহার করেও থাকেন। তবে সব মিলিয়ে সংখ্যাটা আর কত? এই মুহূর্তে ভারতে ৫০০ মিলিয়নের বেশি হোয়াটস্যাপ ব্যবহারকারী আছেন। তার মানে এতগুলো মানুষের কাছে ভুয়ো খবর পৌঁছানোর সম্ভাবনা আছে। অল্টনিউজ মাসে এক মিলিয়ন ইউজার পায়। তো বুঝতেই পারছেন, আমরা একটা ভগ্নাংশের কাছেও পৌঁছতে পারছি না। আমার মনে হয় না ফ্যাক্ট চেকিং সাংবাদিকতা কোনোদিনই এমন জায়গায় পৌঁছবে, যখন সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ ফ্যাক্ট চেক করবেন। সেই কারণেই আমরা এই রাজ্যে যা করতে এসেছি সেটা গুরুত্বপূর্ণ।

নাগরিক: সারা ভারতেই স্বাধীন সাংবাদিকতা যাঁরা করেন, তাঁদের অভিযোগ হল, ক্ষমতাশালীরা এই স্বাধীন সাংবাদিকদের কাজে প্যাঁচে পড়ার সম্ভাবনা আছে দেখলেই কেস ঠুকে দিয়ে কোণঠাসা করেন। আপনাদেরও তো এরকম অভিজ্ঞতা হয়। এই ঝামেলাটা কীভাবে সামলান?

প্রতীক: হ্যাঁ, আমার সহকর্মী এবং অল্টনিউজের কো-ফাউন্ডার মহম্মদ জুবেরের নামেই তো আলাদা আলাদা জায়গায় চারটে এফ আই আর হয়ে বসে আছে। সবকটাই হাস্যকর অভিযোগ। আমাদের বিরুদ্ধে দৈনিক জাগরণ কাগজের একটা মানহানির মামলাও চলছে। লিগাল নোটিস তো আসতেই থাকে। মানে যথেষ্ট হয়রানি চলে। তবে আমরা খুবই সতর্ক হয়ে কাজ করি। প্রত্যেককে বারবার বলা হয়, মাথা গরম থাকার সময়ে কিছু লিখবে না। কোনোকিছু নিয়ে উত্তেজিত থাকলে, রাগ পড়ে যাওয়ার পর লেখো। আমাদের রিপোর্টগুলোতে আমরা প্রসঙ্গ থেকে একেবারেই যেন সরে না যাওয়া হয় সেদিক কড়া নজর রাখি। নির্দিষ্ট করে বলি, আমরা লেখায় অত্যন্ত কম বিশেষণ ব্যবহার করি।

নাগরিক: ক্রাউড-ফান্ডেড ফ্যাক্ট চেকিংয়ের ব্যবসায়িক ভবিষ্যৎ কেমন বলে আপনার মনে হয়? মানে টাকা রোজগার করতে না পারলে তো কাজটা চালিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়।

প্রতীক: এই মুহূর্তে আমাদের কোনো অসুবিধা হচ্ছে না। এই অতিমারী, লকডাউন ইত্যাদিতেও আমাদের মাইনে কমাতে হয়নি। যথেষ্ট মানুষই টাকা দিয়ে পড়ছেন। তবে কমবেশি তো হয়েই থাকে। কয়েকটা ফ্যাক্টরের উপর ব্যাপারটা নির্ভর করে, যেমন অর্থনীতির অবস্থা কেমন? লোকের হাতে কতটা অতিরিক্ত অর্থ আছে? তাছাড়া আমাদের একটা বড় সুবিধা হল আমরা এমন একটা ভাষায় কাজ করি, যে ভাষা ব্যবহারকারীদের মাথাপিছু আয় শুধু আঞ্চলিক ভাষা পড়তে পারেন যাঁরা, সেইরকম মানুষের চেয়ে সাধারণত বেশি হয়। ফলে আমার ধারণা, কেবল আঞ্চলিক ভাষায় এরকম কোনো ওয়েবসাইট চালানো অনেক বেশি কষ্টসাধ্য হবে।

নাগরিক: নাগরিককে সময় দেওয়ার জন্য অনেক ধন্যবাদ।

প্রতীক: ধন্যবাদ আপনাদেরও।

https://nagorik.net থেকে প্রকাশিত। ছবি ইন্টারনেট থেকে

লজ্জার ভাগ

ভিখারি দূরে থাক, হকারদের প্রবেশও নিষেধ। কেউ ফাঁকতালে গ্রীষ্মের দুপুরে ঢুকে পড়লে রক্ষীর চাকরি নিয়ে টানাটানি পড়বে।

উসকোখুসকো, পরিচর্যার অভাবে লাল হয়ে যাওয়া দড়ির মত চুল, পরনে রং বোঝা যায় না এমন সালোয়ার কামিজ, কাঁধে একটা কাপড়ের পোঁটলা, সঙ্গে হাড় জিরজিরে ছেঁড়া ফ্রক পরা বছর দশেকের একটি মেয়ে। এভাবে আমাদের ফ্ল্যাটের দরজায় এসে দাঁড়িয়েছিলেন একজন বছর তিরিশের মহিলা। দিন পনেরো আগের কথা। কোনো ভণিতা নেই, দরজা খুলতেই বললেন “বাবু, দুটো কাপড় হবে? আমাদের পরার কাপড় নেই।” বাড়ির দরজায় এসে কেউ সরাসরি হাত পেতে দাঁড়ায়নি অনেককাল। তাই কিছুটা ধাক্কা লেগেছিল। নিজের ফ্ল্যাটের দিকে তাকিয়ে, বউ মেয়ের দিকে তাকিয়ে লজ্জাই হয়েছিল কিছুটা। গিন্নীর ব্যবস্থাপনায় বেশকিছু পুরনো জামাকাপড় প্রার্থীর হাতে তুলে দেওয়া গেল। বাচ্চা মেয়েটির চোখ দিয়ে খিদে এমন দৃষ্টিকটুভাবে চেয়ে ছিল, যে তার হাতে দুটো বিস্কুটও দেওয়া গেল। তাতেই বোঝা গেল, এমন নয় যে ওদের বাড়িতে অন্নের তবু সংস্থান আছে, কেবল বস্ত্র ভিক্ষা করতে হচ্ছে। মহিলা বলে বসলেন “বাবু, চাল হবে?” আসলে ইনি ভিক্ষাজীবী নন একেবারেই। বললেন অধুনা প্রায় জঙ্গলে পরিণত হিন্দমোটর কারখানার পরিত্যক্ত কোয়ার্টারগুলোর একটাতে থাকেন। কী কাজ করতেন বললেন না, কিন্তু বললেন কাজ ঘুচে গেছে অতিমারীর কোপে। কাপড় দিয়েছি গোটা কয়েক, মেয়ের হাতে বিস্কুট দিয়েছি না চাইতেই, কিঞ্চিৎ নগদও দিয়েছি। বোধহয় সে জন্যেই ভরসা করে চাল চেয়েছিলেন। কেন কে জানে, ফস করে মুখ দিয়ে বেরিয়ে গেল “হবে না।” একটিও কথা না বাড়িয়ে, পোঁটলার মুখ বেঁধে ফেলে দুজনে বিদায় নিলেন।

সিঁড়ি দিয়ে নেমে যাওয়ার পর মনে হল, ফিরে ডাকি। কিন্তু কোথায় যেন আটকে গেল। গিন্নী শুনে বললেন “হবে না বললে কেন? চাল তো ছিলই।” ভেবে দেখলাম, চাল আছে। অভাব তো নেই-ই, বরং উদ্বৃত্ত আছে। কিন্তু আমার দেবার মনটাই নেই। নিজের কাছে নানারকম যুক্তি খাড়া করে ফেললাম কিছুক্ষণের মধ্যেই। যেমন, কাপড় দিলাম, টাকা দিলাম, আবার চালও দেব? বাড়াবাড়ি করা ভাল নয়। যদি চিনে রাখে, নিয়মিত আসা যাওয়া শুরু করে? প্রগতিশীল যুক্তিও খবরের কাগজের ক্রোড়পত্রের মত লাগিয়ে দিলাম পিছনে — ভিক্ষা দেওয়া ভাল নয়। এর সমর্থনে দু-একজন মহাপুরুষের উক্তিও মনে করার চেষ্টা করলাম, মনে পড়ল না। শেষ পর্যন্ত দুটো কথা স্বীকার না করে উপায় রইল না। প্রথমত, যিনি এসেছিলেন তিনি সারা বছর ধরাচূড়ো পরে ট্রেনে বাসে ভিক্ষা করে নেশার টাকা তুলে বেড়ানোর লোক নন। লজ্জার মাথা খেয়ে মেয়ের হাত ধরে ভিক্ষা করতে বেরিয়েছেন। দ্বিতীয়ত, যদি বারবার ফিরেও আসেন, তাহলেও আমার যত আছে সবটা ভিক্ষা করে নিয়ে যাওয়ার শক্তি ওঁর নেই।

আসলে সংবেদনশীলতা বোধহয় একটা অভ্যাস। সে অভ্যাস আমার চলে গেছে, তাই কয়েক মিনিটের জন্যও আপন হতে বাহির হয়ে বাইরে দাঁড়াতে পারি না। ভয় হয়, দুর্বলতম মানুষটিও আমার সব কেড়ে নেবে। অথচ নেওয়ার মত কী-ই বা পড়ে আছে আমাদের? এক সময় কিন্তু ছিল। যখন এ তল্লাটে বাড়ি বাড়ি আসতেন তাঁরা, যাঁদের আমরা সবাই ভিখিরি বলতাম।

ভাগীরথীর পশ্চিম পাড়ের যে জায়গাগুলো হুগলী শিল্পাঞ্চলের মধ্যে ধরা হত, তারই একটায় আজন্ম বসবাস করছি। আমার জন্মের আগে বা আমার জ্ঞান হওয়ার আগেই এ অঞ্চলের বেশকিছু কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। সমরেশ বসুর গল্প, উপন্যাসে এই অঞ্চলের যে ব্যস্ত শ্রমিক মহল্লার ছবি পাওয়া যায়, সেসব বিরল হয়ে আসতে শুরু করেছে ক্রমশ। র‍্যালিস ইন্ডিয়াকে প্রথম থেকেই পোড়োবাড়ি বলে জেনেছি, রিলাক্সন কারখানায় ধর্মঘট, শ্রমিক-মালিকের টানাপোড়েন চলছে — এসব শুনতে শুনতে বড় হয়েছি। কিন্তু কৈশোরের শেষ পর্যন্ত হিন্দমোটর আর রিষড়ার অ্যালকালির সাইরেন ভুলতে দেয়নি যে আমরা শিল্পাঞ্চলে বাস করি। পাড়ার কাকু, জেঠু, দাদারা সাইরেন বাজার খানিক আগে-পরে সাইকেল নিয়ে কারখানার দিকে রওনা হতেন বা ফিরতেন। ওসব সকাল-বিকেলের ব্যাপার। দুপুরের নৈঃশব্দ্য, গৃহিণীদের দু দণ্ড বিশ্রামের শান্তি ভঙ্গ হত ভিখারিদের আগমনে।

যাঁরা আসতেন তাঁদের রোজ দেখতে দেখতে মুখ চেনা হয়ে যেত। এক লোলচর্ম বৃদ্ধা আসতেন। পিঠ বেঁকে মাটির সাথে প্রায় সমান্তরাল হয়ে গেছে, দু পা হেঁটেই হাঁপিয়ে পড়েন, টানা কথা বলতেও পারেন না। পয়সা দিলে ক্ষুণ্ণই হতেন। তাঁর দরকার ছিল চাল, ডাল অথবা আলু। তখন ফ্ল্যাটে থাকতাম না। নিজেদের বাড়ি ছিল, সে বাড়ির চাল ছিল টিনের, বৃষ্টি হলে জলও পড়ত। কিন্তু ওই বৃদ্ধাকে মা কখনো বলেননি, চাল হবে না। এ কেবল আমার বাড়ির গল্প নয়। এলাকায় দোতলা বাড়ি তখন গোনা যেত, আর টিভি থাকতে একটা-দুটো বাড়িতে। বৃদ্ধা সব বাড়ি থেকেই কিছু না কিছু পেতেন, ঠা ঠা দুপুরে জিরিয়ে নিতেন কোনো বারান্দায় বসে। হাফপ্যান্টের বয়সে কৌতূহলের সীমা থাকে না। একদিন জিজ্ঞেস করেছিলাম “দিদা, তুমি ভিক্ষা করো কেন? তোমার বাড়িতে কেউ নেই?” ছিল, সবই ছিল। স্বামী না থাকলেও ছেলে ছিল, বৌমা ছিল, নাতি-নাতনি ছিল। কিন্তু তারা দেখে না, দু মুঠো খেতেও দেয় না — এমনটাই বলেছিলেন তিনি। দিদার মৃত্যুসংবাদও যথাসময়ে পাওয়া গিয়েছিল। যতদূর মনে পড়ে, আমাদের পাড়ার লোকেরাই চাঁদা তুলে তাঁর সৎকারের ব্যবস্থা করেছিল।

এক কাকু ছিল, যে শত প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও ভিক্ষা করতে চাইত না। জন্মান্ধ, তার উপর টাকাপয়সার হিসাবও রাখতে পারত না ঠিক করে। তাই তার বাড়ি বাড়ি ধূপ বিক্রি করার ব্যবসা নামেই ব্যবসা। কোনো ক্রেতা তাকে সুযোগ পেয়ে ঠকিয়েছে কিনা জানি না, তবে যে ধূপ সে বিক্রি করতে আসত তার গন্ধ তেমন মনোমুগ্ধকর ছিল না। আদৌ কোনো গন্ধ ছিল কিনা সে-ও তর্কসাধ্য, অর্থাৎ পাইকারি বিক্রেতা তাকে বরাবরই ঠকিয়ে গেছে বলা যায়। সুতরাং কাকুর কোনোমতে গ্রাসাচ্ছাদন আসলে লোকের দয়ার উপরেই নির্ভরশীল ছিল। বয়স একটু বাড়তে মস্তিষ্ক বিকৃতির লক্ষণও দেখা দিয়েছিল, ফলে দুর্দশার শেষ ছিল না। তবু, কটু কথা শোনালেও, তাকে যৎসামান্য সাহায্য করার লোকের অভাব ছিল না আমাদের এই অকিঞ্চিৎকর মফস্বলে।

মাঝে মাঝে দেখা মুখও ছিল কয়েকজন। সেই সময়কার আর সব মফস্বল স্টেশনের মত, আমাদের কোন্নগর স্টেশনের প্ল্যাটফর্মেও ভিখারিদের দেখা পাওয়া যেত। তাছাড়া কালীপুজোর দিন সন্ধেবেলা আমারই বয়সী কিছু শুকনো মুখ ঘুরে বেড়াত। তারা শিশু হলেও আত্মসম্মান যথেষ্ট, তাই কখনো কারোর কাছে বাজি চায়নি। কিন্তু তাদের মুখের অন্ধকার দেখেও নিজের ভাগের আলো থেকে একটুও দেবে না কোন পাষাণ?

আশির দশক পেরিয়ে নব্বইয়ের দশকে এসে কিন্তু অন্য মানুষের দয়ায় বাঁচতে বাধ্য মানুষের সংখ্যা কমে গেল বহুগুণ। এলাকায় বন্ধ কারখানার সংখ্যা বাড়লেও চোখের সামনে দেখতে পেলাম, কিছু না কিছু করছে সকলেই। নিতান্ত ভিক্ষা করে খাওয়ার লোক আমাদের এলাকায় আর নেই দেখে অদ্ভুত স্বস্তিবোধ হত। আজ যৌবনের শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে আমার বৃত্তের সমবয়স্ক এবং বয়োজ্যেষ্ঠ লোকেদের সাথে কথা বলে দেখি, নিজ নিজ এলাকায় তাঁদের অভিজ্ঞতাও এরকমই। অন্যের অনুগ্রহের ভরসায় জীবনধারণ করার চেয়ে গ্লানিকর কিছু নেই। সে গ্লানি দেখাও গ্লানিকর। তা কাউকে অবসন্ন করে, কাউকে ক্ষিপ্ত করে। ওই গ্লানি থেকে আমরা মুক্তি পেয়েছি বলেই মনে হয়েছিল মাঝের কয়েক বছর।

এখন ভারতের যে প্রান্তের মানুষের সাথেই কথা বলছি, মন খারাপ করা গল্প বলছেন সবাই। আলোকচিত্রীদের ক্যামেরাতেও ধরা পড়ছে মানুষের অসীম দুর্দশার ছবি। পথ দিয়ে চলে যাওয়া দুধের গাড়ি থেকে গড়িয়ে পড়া দুধ রাস্তা থেকে চেটে খাচ্ছেন একজন — এমন ছবিও আমরা দেখে ফেলেছি গত বছর। তার আগেই অবশ্য আমার কল্পনাশক্তিকে অবশ করে দিয়ে হুগলী জেলার প্রত্যন্ত গ্রামের অধিবাসী এক বন্ধু জানিয়েছে, এক দুপুরে তারা সবে খেয়ে উঠে ঢেঁকুর তুলছে যখন, এক পথিক এসে সরাসরি জিজ্ঞেস করেছে “ভাত হবে?” বছর তিরিশেকের ছেলেটি নিজের জন্মস্থানে মানুষকে এভাবে অভুক্ত থাকতে কখনো দেখেনি। ভারতের রাজধানীতে জন্মানো, বেড়ে ওঠা সাংবাদিক বন্ধুও এই দেড় বছরে একাধিকবার বলেছেন, যারা খেটে খেত, তারাও হাত পাততে বাধ্য হচ্ছে।

জানি না, পাঠক, এসব অভিজ্ঞতা কতটা মিলছে আপনাদের অভিজ্ঞতার সাথে। আমাদের নবগ্রাম অনেক বদলে গেছে, আমরা সবাই বদলে গেছি। এখানে এখন অনবরত বাড়ি ভাঙছে, ফ্ল্যাট উঠছে। সেসব ফ্ল্যাটে আমরা সম্ভ্রান্ত লোকেরা থাকি। আমার ফ্ল্যাটের সদর দরজা খোলা পেয়েই নিশ্চয়ই দোতলায় উঠে আসতে পেরেছিল ওই তরুণী মা আর তার মেয়ে। হয়ত আর কোনোদিন পারবে না। বহু ফ্ল্যাটে সজাগ রক্ষী আছে এসব বাজে লোককে আটকানোর জন্য। ভিখারি দূরে থাক, হকারদের প্রবেশও নিষেধ। কেউ ফাঁকতালে গ্রীষ্মের দুপুরে ঢুকে পড়লে রক্ষীর চাকরি নিয়ে টানাটানি পড়বে। আপনি যদি তেমন কোনো ফ্ল্যাটের বাসিন্দা হন, তাহলে করজোড়ে ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি এইসব তিক্ত অভিজ্ঞতা, বমন উদ্রেককারী দৃশ্যের পসরা সাজাবার জন্য। এসব গালগল্প মনে হলে আমিই দায়ী।

আসলে অনুগ্রহ প্রার্থী মানুষ আমাকে বড় লজ্জায় ফেলেন। অতিমারীর সময় হঠাৎ লজ্জায় পড়তে হয়েছে তা নয়। এ লজ্জার শুরু এই সহস্রাব্দের গোড়ার দিকে। তার আগে নেহাত বালক ছিলাম, লজ্জা ঘৃণা ভয় — সবই কম ছিল। প্রথম লজ্জা পেলাম যখন সাহাগঞ্জের ডানলপ কারখানার শ্রমিকরা আমাদের বাড়িতে পুরুষ-মহিলাদের প্রসাধন সামগ্রী বিক্রি করতে এলেন। বাবার বয়সী লোক সামনে হাত জোড় করে দাঁড়ালে যে পায়ের নীচের মাটি দুলতে শুরু করে, সে অনুভূতি সেই প্রথম। আমরা যত বড় হয়েছি, বন্ধ কারখানার সংখ্যা যত বেড়েছে, তত বেড়েছে মরিয়া শ্রমিকদের যাতায়াত। এক পাড়ায় কতজন এক মাসে কতগুলো ডিওডোর‍্যান্ট কিনতে পারে? উত্তর জেনেও তাঁদের দলে দলে, বারবার আসতে হয়েছে আমাদের দুয়ারে। বিপন্ন মানুষের জন্যে, রোজগারের রাস্তা খোঁজা মানুষের জন্যে এই পৃথিবী কী ভীষণ ছোট! যাঁরা আসেন, তাঁদের কখনো না কখনো ফেরাতেই হয়। মেজাজ ভাল থাকলে নরম সুরে “সেদিন যেটা দিয়ে গেলেন, এখনো ফুরোয়নি যে, কাকু।” তিরিক্ষে হলে “এই তো আপনাদের ফ্যাক্টরিরই একজনের থেকে একটা জিনিস কিনলাম। কজনের থেকে কিনতে হবে রে বাবা?” মাসে মাসে এলে কয়েক জনের মুখ চেনা হয়ে যায়। তখন অনুগ্রহ প্রার্থনা আরও লজ্জায় ফেলে। কেউ কেউ নিজের অবস্থায় এতই লজ্জিত, যে সামান্য নখপালিশ কেনার জন্য হাঁটুর বয়সী গৃহবধূকে বলে ফেলেন “আপনাদের অশেষ দয়া। আপনারা আছেন বলেই আমার মেয়েটা খেতে পরতে পাচ্ছে মা।” আসলে তিনি জানেন এই বেচা কেনা চাহিদা-যোগানের অর্থনৈতিক নীতি অনুযায়ী হচ্ছে না, হচ্ছে অনুগ্রহের ভিত্তিতে।

গত দেড়-দুই দশক ধরে তবু এই ভানটুকু আমাদের আব্রু বজায় রেখেছিল। অতিমারী এসে সেটুকুও বুঝি কেড়ে নিল। ভিখারি হওয়া ছাড়া আর পথ রইল না অনেক মানুষের। নিজেকে এখন মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের দুঃশাসনীয় গল্পের নারীদের মত অসহায়, উলঙ্গ মনে হয়। দুঃখ ভাগ করলে কমে জানি, লজ্জা ভাগ করলে কমে কিনা জানি না। তাই খানিক আশায়, প্রিয় পাঠক, এই ঝুঁকি নিলাম।

https://aajkaal.in এ প্রকাশিত। ছবি ইন্টারনেট থেকে।

বর্ষার শব্দ

শিরীষ কাগজের চালাকি ভেদ করতে বর্ষার একটা গোটা মরসুমও লাগেনি। ভিতরে ঢুকতে পেয়ে তার সুরও গেল বদলে।

বর্ষার শব্দ আছে। বৃষ্টির শব্দ নয়, যে শব্দের কথা বলছি তা অন্য কোনো শব্দের সাথে মেলে না।

আমাদের বাড়িটা মজবুত এবং পাকা। কিন্তু বাবা-জ্যাঠাদের মধ্যে ঠাকুর্দার তৈরি বাড়ি ভাগাভাগি হওয়ার সময় বারান্দাটা আমাদের ভাগে পড়েনি। অথচ রোজ প্রচুর মানুষ আসেন বাবার কাছে নানা প্রয়োজনে, তাঁদের বসার জায়গা দেওয়া যায় না। তাই বারান্দার দরকার পড়ল। শিক্ষক বাবার মাইনে তখন হাজার দশেক। মাকে জিজ্ঞেস করলেন “লোন নিয়ে বারান্দাটা করে না ফেললে আগামী বর্ষায় খুব মুশকিলে পড়ব। কটা বছর ডাল, আলুসেদ্ধ খেয়ে থাকতে হবে কিন্তু। পারবে তো?” সে যুগের মধ্যবিত্ত গৃহিণীরা পারতেন না এমন কৃচ্ছ্রসাধন আজও আবিষ্কার হয়নি। সেই আমাদের বারান্দা হল, কিন্তু বাবা যা ঋণ পেলেন তাতে বারান্দার দেওয়াল প্লাস্টার হল না। মেঝে হল না, মাটি ফেলে সমান করে একটু কম দামের ইট পেতে দেওয়া হল তার উপর। নড়বড় করত, মায়ের শরীর বেশ ভারী বলে চলতে অসুবিধা হত প্রথম প্রথম। বাবা বলতেন “ও কিছু না, চলতে চলতে ওগুলো মাটিতে বসে যাবে। তখন আর অসুবিধা হবে না।” পাকা ছাদও হল না, কারণ ছাদ ঢালাইয়ের অনেক খরচ। কোথা থেকে বেশকিছু ফুটোওলা টিন জোগাড় হল, শিরীষ কাগজ দিয়ে ফুটো বোজানো হল, আমাদের পাকাবাড়ির বারান্দা পেল টিনের চাল। বর্ষা এসে পড়ল, সশব্দে। প্রথম দিন বৃষ্টি শুরু হওয়ার সময় অনেক রাত। আমরা তিনজনেই এমন বোকা, ভেবেছিলাম কেউ টিনের চালের উপর উঠে লাফাচ্ছে। ক্রমশ সে শব্দের সাথে ভাব হয়ে গেল।

শিরীষ কাগজের চালাকি ভেদ করতে বর্ষার একটা গোটা মরসুমও লাগেনি। ভিতরে ঢুকতে পেয়ে তার সুরও গেল বদলে। আস্ত চাল আর ফুটো চালে শব্দের তফাত অভ্যস্ত কান ছাড়া ধরা পড়ে না চট করে। ফুটো দিয়ে ইটের উপর পড়ার শব্দ আরেকরকম। জল পেয়ে ইটগুলোর চেহারা বদলে গেল, চটি ছাড়া বারান্দায় হাঁটা বারণ হল। সাপ, ব্যাঙ দুয়েরই শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান একমাত্র আমাদের বারান্দার ইটের মেঝেতেই দেখেছি। সাপগুলোর বাহারি চেহারা দেখে বহুবার ভেবেছি বিষাক্ত, কিন্তু প্রতিবারই দেখা গেছে ওগুলো হেলে। ইটের উপর জল পড়ার শব্দ একরকম, সেই জলে কাদায় হাঁটার শব্দ আরেকরকম। সব মিলিয়ে বর্ষার শব্দ।

সশব্দ বর্ষায় বিদ্যুৎ চালু থাকবে এমন প্রত্যাশা আমাদের ছিল না। বৃষ্টি থামলেই আসবে কিনা তা নিয়েই বরং বড়রা আলোচনা করতেন। বর্ষার শব্দের মধ্যে সন্ধেবেলায় লণ্ঠন বা ল্যাম্পের আলোয় পড়তে বসলে চেঁচিয়ে পড়ার দরকার হত। মনে মনে পড়লে বা লিখতে গেলে ধীরে ধীরে বুজে আসত চোখের পাতা — এমন সুরেলা, এমন ছান্দিক ছিল বর্ষার শব্দ। সাধারণত বাবা বাড়ি ফিরতেন রাত করে। বরাবরই মনে হত বাবা বাড়ির বাইরে থাকলে বর্ষার শব্দ একরকম, ফিরে এলে অন্যরকম।

তখন পাড়ায় টিভি বিরল। আমাদের পাশের বাড়িতেই ছিল একখানা। দৈবাৎ বৃষ্টি হওয়া সত্ত্বেও লোডশেডিং হত না। তখন টিভি থেকে ভেসে আসা সিনেমার গান আর সংলাপে বর্ষার শব্দের রূপ খুলে যেত। বৃষ্টি, লোডশেডিং, পড়াশোনা শেষ, বাবা ফিরছেন না, ফিরলে খেতে বসব। ততক্ষণ কী হবে? মা গান গাইবেন। বর্ষার শব্দে যোগ হল মায়ের খালি গলার গান, বাড়িতে হারমোনিয়ামের প্রয়োজন বোধ হয়নি তখনো। মোমবাতির আলোয় তোমার অসীমে প্রাণমন লয়ে মা কতদূর ধেয়ে যেতেন তা বোঝার বয়স হওয়ার আগে থেকেই এই রুটিন। বোধহয় তাই এখনো বর্ষার শব্দ পেলেই কানের মধ্যে রবীন্দ্রসঙ্গীত বাজতে থাকে। তার সবগুলোই প্রকৃতি পর্যায়ের গান নয়, বর্ষার গানও নয়। বোঝার বয়স কি আজও হয়েছে? কে জানে! বয়স আর বোঝার বয়স বোধহয় আলাদা। তাছাড়া সবটা কি কখনো বোঝা হবে? প্রথম যেদিন মাকে “সুখের মাঝে তোমায় দেখেছি” গাইতে শুনেছিলাম আর চোখে দেখেছিলাম জল, সেদিন সে জলের কারণ বুঝিনি, আজও তো বুঝি না।

খালি গলায় গাইতে বাবাও ভালবাসতেন, অপেশাদার যাত্রা/নাটকে নিয়মিত অভিনয় করতেন বলে কণ্ঠস্বরও ছিল চমৎকার। কখনো কবিতা লেখার চেষ্টা করেছিলেন বলে জানি না, কিন্তু বহু কবিতা মুখস্থ ছিল। সেসব আবৃত্তি করার ইচ্ছে কেন জানি না বৃষ্টি এলেই সবচেয়ে প্রবল হত। বোধহয় বাবার মধ্যে রোম্যান্টিকতার ঘাটতি ছিল। কারণ এক্ষুণি চোখ বুজলে বর্ষার শব্দের সাথে বাবার গলায় শোনা যেসব কবিতা আজ মিশে যাচ্ছে, সেগুলো একটাও প্রেমের কবিতা নয় — কাজি নজরুলের ‘আমার কৈফিয়ৎ’, ‘কামাল পাশা’, রবীন্দ্রনাথের ‘ছেলেটা’। আর আশ্চর্য সব গল্পের আবহসঙ্গীত হয়ে আছে বর্ষার শব্দ। ঠাকুর্দার একখানা রেকর্ড প্লেয়ার আমাদের ভাগে পড়েছিল। কিছু ধার করা আর কিছু কেনা লং প্লেয়িং রেকর্ড চালাতাম তাতে। একটা রেকর্ডে বাজত ‘একবার বিদায় দে মা ঘুরে আসি’। একটা ছুটির দিনে শুনতে শুনতে লোডশেডিং। বাবার মুখে সেই প্রথম শুনলাম ক্ষুদিরাম আর প্রফুল্ল চাকীর গল্প। কোনো এক বর্ষার দিনে শুনেছিলাম রুশ বিপ্লবের গল্প। আমি জানি বাবা কোনোদিন সের্গেই আইজেনস্টাইনের কোনো ছবি দেখেননি। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় নন্দনে প্রথমবার ব্যাটলশিপ পোটেমকিন দেখে মনে হয়েছিল এসব দৃশ্য বাবার চোখেই প্রথম দেখেছি। ফিদেল কাস্ত্রো, চে গেভারার গল্পও প্রথম শুনিয়েছিলেন কোন বৃষ্টিদিনে।

আমাদের জীবনে অনেকগুলো স্মরণীয় পরিবর্তন আসে ১৯৯০ সালে। সেই বসন্তে প্রথম মাকে ছেড়ে বেশ কয়েকদিন থাকতে হয়েছিল। বৈশাখ মাসের পাঁচ তারিখ হাসপাতালে মা আমার বোনকে জন্ম দিলেন। সে বছরই কোনো সরকারি সিদ্ধান্তে বাবার মাইনে বাড়ল অনেকখানি। একদিন আমাকে আর মাস ছয়েকের বোনকে বড় জেঠিমার কাছে রেখে বাবা-মা খানিকক্ষণের জন্য বেরিয়ে গেলেন। ফিরলেন একটা আশ্চর্য জিনিস নিয়ে। আপট্রনের পোর্টেবল টিভি। ততদিনে পাড়ায় প্রায় সব বাড়িতে টিভি এসে গেছে, কলকাতাবাসী আত্মীয়দের বাড়িতে এবং পাড়ার এক ধনী বন্ধুর বাড়িতে মনোরম রঙিন টিভিও দেখে ফেলেছি। সাদাকালো টিভি দেখে সামান্য মনখারাপ হয়েছিল, প্রকাশ করিনি। দোকান থেকে যিনি এসে টিভি চালানো, বন্ধ করা, চ্যানেল বদলানো, ছবির ঔজ্জ্বল্য বাড়ানো কমানো শেখাতে এসেছিলেন তিনি বললেন “কোম্পানি এই মডেলটা রঙিন টিভি হিসাবেই বানিয়েছিল। খরচে পোষাবে না বলে লাস্ট মোমেন্টে সাদাকালো করেছে।” এ কি কম সান্ত্বনা! পরদিন খেলার মাঠে ধনী বন্ধুটিকে সগর্বে জানিয়েছিলাম এই তথ্য। তখন ভুয়ো খবর আমাদের কল্পনাতেই ছিল না। এতকিছু বদলাল, বর্ষার শব্দ কিন্তু বদলায়নি। যতটুকু মাইনে বেড়েছিল তাতে দেওয়াল প্লাস্টার করা যায় না, বারান্দার মেঝে হয় না, পাকা ছাদ হয় না।

তা বলে কেউ গোমড়া মুখে থাকে না। আমার সাথে আমার বোনও বর্ষার শব্দ উপভোগ করতে শিখে গেল দ্রুত। বছর তিনেক পরে আমাদের বাড়িতে এল আরেকটা আশ্চর্যন্ত্র। ফিলিপসের টু ইন ওয়ান। একই যন্ত্রে ক্যাসেট চলে আবার এফ এম রেডিও চলে! দাদুর রেকর্ড প্লেয়ার বোনের জন্মের আগেই গত হয়েছেন। মাঝের কয়েকটা বছর বাড়িতে গান বজায় রেখেছিলেন বাবা-মা নিজেরাই। সামর্থ সীমিত, তাই বাবা বললেন যে মাসে টেপ রেকর্ডার কেনা হল, সে মাসে ক্যাসেট কেনা হবে না। মাসে মাসে একটা-দুটো করে ক্যাসেটে বাড়িতে এলেন সুমন চট্টোপাধ্যায়, নচিকেতা, সলিল চৌধুরী, এ আর রহমান এবং অবশ্যই থরে থরে রবীন্দ্রনাথ। তখন আর বৃষ্টি হলেই লোডশেডিং হয় না আমাদের পাড়ায়। এক বর্ষার সকালে বাবার ইচ্ছে হল আবৃত্তি রেকর্ড করে রাখবে। যে গলা যাত্রার মাঠে শেষ সারির দর্শকের কাছেও পৌঁছে যেত অনায়াসে, সেই গলা তখন আর নেই। সেরিবেলা ডিজেনারেশনের অসুখে বাবার হাত কাঁপত আজন্ম দেখেছি, ততদিনে গলাও কাঁপতে শুরু করেছে। সেদিনের বর্ষার শব্দে মিশল কাঁপা গলায় ‘বিষ্টি পড়ে টাপুর টুপুর’। সেখানেই শেষ নয়, রান্নাবান্নার মধ্যে থেকে টেনে এনে মাকে দিয়েও আবৃত্তি করানো হল মায়ের প্রিয় কবিতা ‘অভিসার’।

এখন চাকরি চলে যাওয়ার যুগ, মাইনে কমে যাওয়ার যুগ। তাই হয়ত বললে গল্পের মত শোনায়, কিন্তু সে সময় সত্যিই বাবার চাকরি যেতে পারে বা মাইনে কমে যেতে পারে আমরা জানতাম না। জানতাম মাইনে কেবল বাড়ে। কারোর বাবার মাইনে ঝটপট বাড়ে, আমাদের বাবার ধীরে ধীরে বাড়ে। ধীরে ধীরে বাড়তে বাড়তে আমার যখন গোঁফ দাড়ি বেরোতে শুরু করেছে, তখন বর্ষার শব্দ বদলে গেল। কারণ ব্যাঙ্কের চোখে বাবার ঋণ নেওয়ার ক্ষমতা বেড়েছে। অতএব বারান্দার পুরনো বাসিন্দা সাপ, ব্যাঙেদের কপাল পুড়ল। শান বাঁধানো মেঝে হল, দেওয়ালে প্লাস্টার হল। ফুটো টিনের চালের দিন ফুরোল। বারান্দা যে কেবল পাকা ছাদ পেল তা নয়, ছাদের উপর নতুন ঘরও হল। তারপর এল বর্ষা। আমরা চারজন আষাঢ়স্য প্রথম দিবসে প্রবল ব্যথায় আবিষ্কার করলাম, আমাদের বর্ষার শব্দ দূরে সরে গেছে। সেবার বর্ষাটা মনখারাপে কেটেছে। কী যেন অমূল্য ধন আমাদের ছিল, আর নেই।

বর্ষা কিন্তু নির্দয় নয়। টিনের চাল না পেলে চুপ করে যাব, এমন জেদ নেই তার। আমাদের বাড়ির সামনেই খোলা মাঠ, সেখানে বিকেলে ক্রিকেট, ফুটবল খেলেছি কিন্তু সকালে গরু চরিয়েছে নাটুকাকু। এরপর থেকে আমাদের বর্ষার শব্দ ভরে রেখেছে সেই গরুদের ডাক, কাদা মাঠে বলে শট নেওয়ার ভোঁতা শব্দ আর গোলের তীক্ষ্ণ উল্লাস। ছাদের রেনওয়াটার পাইপ থেকে জল পড়ার শব্দ থেকেও বঞ্চিত হইনি। কলকাতার অনতিদূরে আমাদের মফস্বলে গত সাড়ে তিন দশকে শব্দদূষণ যত বেড়েছে, বর্ষা তত বোবা হয়েছে। গাছপালা, পশুপাখিও নিঃশব্দে উল্লাস করা শিখে গেছে। পাছে শব্দ করলে মানুষের চোখে পড়ে ছাঁটাইয়ের খাতায় নাম উঠে যায়!

আমরা কিন্তু বহাল তবিয়তে আছি। শুধু বৃষ্টি এলে মনে হয় কোনও একটা তার ছিঁড়ে গেছে কবে। সুর হারায়ে গেল।

ছবি: ইন্টারনেট থেকে

নবীন প্রজন্মের পাকিস্তানিদের বাংলার প্রতি কোনও দ্বেষ নেই, বলছেন ভাইরাল হওয়া পাক সিরিয়ালের পরিচালক

আমার গানটা ভীষণ ভাল লেগেছিল আর ঘটনাচক্রে আমার সিরিয়ালের দুটো তিনটে মুহূর্তের সঙ্গে গানটার বক্তব্য আশ্চর্যভাবে মিলে যাচ্ছিল।

মহরীন জব্বার। ছবি ইনস্টাগ্রাম থেকে

বাংলা ভাষার সাথে পাকিস্তানের যথেষ্ট সাংস্কৃতিক আদান প্রদান হয়নি, আক্ষেপ মহরীন জব্বারের

কয়েকদিন ধরে সোশাল মিডিয়ার বাঙালিরা দুটো ক্লিপ নিয়ে আপ্লুত। সেখানে দেখা যাচ্ছে পাকিস্তানের এক টিভি সিরিয়ালের দৃশ্যে নায়িকা (য়ুমনা জ্যায়দি) রবীন্দ্রনাথের ‘আমার পরাণ যাহা চায়’ গানটা গাইছেন। ডিপ ফেকের যুগে কোনকিছুতেই চট করে বিশ্বাস করা যায় না, কিন্তু প্রথম ক্লিপ প্রকাশ্যে আসার কিছু পরেই সংশয় দূর হল। দেখা গেল দিল কেয়া করে নামের ওই সিরিয়ালের পরিচালক নিজেই ইনস্টাগ্রামে ওই গানের অন্য একটা অংশ পোস্ট করেছিলেন। পাকিস্তান এমন একটা দেশ, যে দেশের সরকার বাংলাভাষীদের উপর উর্দু চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছিল। তা থেকে এক বিরাট আন্দোলনের জন্ম হয়, যার পরিণতি মুক্তিযুদ্ধ এবং স্বাধীন বাংলাদেশের জন্ম। এ বছর বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী, সেই দেশের জাতীয় সঙ্গীতের রচয়িতা রবীন্দ্রনাথ। স্বভাবতই তাঁর লেখা গান আজকের পাকিস্তানের টিভি সিরিয়ালে গাওয়া হয়েছে দেখে দুই বাংলার মানুষ আপ্লুত। পশ্চিমবঙ্গের খবরের কাগজে, ওয়েবসাইটে রীতিমত খবর। যদিও এই সিরিয়াল জিও টিভিতে দেখানো হয়েছিল ২০১৯-এ, ভারতে এখন একটা ওটিটি প্ল্যাটফর্মে দেখা যাচ্ছে। সম্ভবত সে কারণেই এতদিন পরে সোশাল মিডিয়ার সূত্রে বাঙালির চোখে পড়া। এই গান পাকিস্তানের সিরিয়ালে কে ব্যবহার করলেন? কেনই বা ব্যবহার করলেন? তবে কি কোন বাঙালি আছেন এই প্রযোজনার নেপথ্যে? উদ্বেলিত বাঙালি হৃদয়ে অনেক প্রশ্ন। নাগরিক ডট নেটকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে তাঁর আস্তানা থেকে এইসব প্রশ্নের বিস্তারিত জবাব দিলেন ওই ধারাবাহিকের পরিচালক মহরীন জব্বার

মহরীনের প্রথম ছায়াছবি রামচন্দ পাকিস্তানি-তে তাঁর সঙ্গে কাজ করেছিলেন কলকাতার দেবজ্যোতি মিশ্র। নন্দিতা দাস সে ছবিতে অভিনয়ও করেন। ফলে বাংলা বা কলকাতা তাঁর সম্পূর্ণ অপরিচিত নয়।

আপনি একেবারে প্রথম ছবি থেকে বাঙালিদের সাথে কাজ করছেন। রবীন্দ্রনাথের গানের সাথে আপনার আলাপ কি সেই সূত্রে? নাকি অন্য কোনভাবে আপনার বাংলার সাথে যোগ ছিল এবং সে পথেই রবীন্দ্রনাথে পৌঁছেছেন?

আমি এই গানটা পেয়েছি আসলে আমার বন্ধু শর্বরী দেশপাণ্ডের কাছ থেকে, মানে সিরিয়ালে গানটা যে প্লেব্যাক করেছিল। ও একবার নিউ ইয়র্কে এসেছিল। তখন একটা আড্ডায় ওই গানটা গায়। শোনা মাত্রই গানটা আমাকে আকর্ষণ করে, যদিও আমি তখন কথাগুলোর মানে জানতাম না। কিন্তু ভাল লেগেছিল বলে আমি পরে ওকে গানটা অনুবাদ করে পাঠাতে বলি। অনুবাদ পড়ার পর গানটার প্রেমে পড়ে যাই। এতটাই, যে আমি বুঝতে পারি এই গানটা আমাকে দিল কেয়া করে-তে ব্যবহার করতেই হবে। কারণ য়ুমনা জ্যায়দির চরিত্রটার সাথে এই গানটা দারুণ মিশ খায়। তখন আমি শর্বরীকে গানটা রেকর্ড করে আমাকে পাঠাতে বলি।

আপনি কি বাংলায় বা অনুবাদে রবীন্দ্রনাথ পড়েছেন? ওই গানটার সংস্পর্শে আসার পরে ওঁর লেখা পড়া বা ওঁর গান শোনা কি অভ্যাসে দাঁড়িয়েছে বা মাঝে মাঝে শুনছেন?

না, আমি কখনো কোন ভাষাতেই রবীন্দ্রনাথ পড়িনি। ওই গানটার মধ্যে দিয়েই আমি তাঁকে আবিষ্কার করি এবং আশ্চর্য হয়ে যাই। স্রেফ প্রেমে পড়ে যাই। ওটা আমার কাছেও একটা শিক্ষণীয় অভিজ্ঞতা ছিল। আশা করি ভবিষ্যতে এই শিক্ষাটা এগিয়ে নিয়ে যেতে পারব।

আচ্ছা, একটা উর্দু সিরিয়ালে বাংলা রবীন্দ্রসঙ্গীত ব্যবহার করার কথা হঠাৎ কেন মনে হল?

ওটা একেবারেই আবেগমথিত প্রতিক্রিয়া। আমার গানটা ভীষণ ভাল লেগেছিল আর ঘটনাচক্রে আমার সিরিয়ালের দুটো তিনটে মুহূর্তের সঙ্গে গানটার বক্তব্য আশ্চর্যভাবে মিলে যাচ্ছিল। আমার চিত্রনাট্যে তো গানটা প্রথমে ছিল না। পরে যখন সিরিয়ালের পুরো গল্পটা পড়ছি (আসমা নবীলের লেখা), তখন আমার মনে হল যে অমুক অমুক জায়গায় এই গানটাই সবচেয়ে উপযুক্ত।

পাকিস্তানের যুবক যুবতীদের মধ্যে কি রবীন্দ্রসঙ্গীত গাওয়ার চল আছে? আপনার সিরিয়ালে যেমন দেখিয়েছেন তেমনভাবে নিজেদের মধ্যে আড্ডায় তারা কি এসব গান গায়?

সত্যি কথা বলতে, যদি কারোর কোন বাঙালির সাথে পারিবারিক সম্পর্ক থাকে বা সে বাংলাদেশে কোন সময় থেকে থাকে, কি পশ্চিমবঙ্গের সাথে যোগাযোগ থাকে, তাহলে আলাদা কথা। নচেৎ নয়। আমি নিশ্চিত পাকিস্তানে সেরকম মানুষ অনেকেই আছেন, তবে সেরকম আড্ডায় আমার নিজের কখনো থাকার সুযোগ হয়নি। সুতরাং সিরিয়ালে যা দেখিয়েছি সেটা একেবারেই অভিনব দৃশ্য।

মজার কথা, আপনি যে বছরে জন্মেছেন সে বছরেই পাকিস্তান থেকে আলাদা হয়ে বাংলাদেশ স্বাধীন রাষ্ট্র হিসাবে আত্মপ্রকাশ করে। পশ্চিম পাকিস্তান আর তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানের দ্বন্দ্ব  শুরু হয়েছিল উর্দু বনাম বাংলা নিয়ে, যে কারণে আমাদের পশ্চিমবঙ্গে এখনো অনেকের উর্দু ভাষার প্রতি রাগ আছে। আবার এই ক্লিপগুলো জনপ্রিয় হয়েছেও কতকটা সেই কারণেই। পশ্চিমবঙ্গের প্রায় সব সংবাদমাধ্যম এই নিয়ে খবর করেছে। মানুষ ভীষণ খুশি। অনেকের প্রশ্ন, পাকিস্তানে কি তাহলে বাংলার প্রতি আর কোন সাংস্কৃতিক বিরোধিতা নেই? মানে খুব নির্দিষ্টভাবে যদি জিজ্ঞেস করি, আপনার সিরিয়ালে রবীন্দ্রসঙ্গীত ব্যবহার করায় কেমন প্রতিক্রিয়া হয়েছিল? বাংলা গান ব্যবহার করেছেন বলে কোন সমস্যায় পড়তে হয়নি তো?

আসলে দুর্ভাগ্যজনকভাবে পাকিস্তানের তরুণ প্রজন্ম, আমি যখন তরুণ ছিলাম তখনকার কথা ধরেই বলছি, ১৯৭১-এর ঘটনাবলী নিয়ে খুব একটা আলাপ আলোচনা, পর্যবেক্ষণ — এসবের মধ্যে দিয়ে যায়নি। তার আবার একটা সুফল আছে। সেটা হল তাদের মধ্যে কোন বাংলা বিরোধিতা নেই। বাংলা ভাষাটা সম্পর্কে কোন গোঁড়ামিও নেই। তাদের মনের দরজা খোলা। তবে দুঃখের বিষয় বাংলা ভাষার সাথে পাকিস্তানের ততটা সাংস্কৃতিক আদান প্রদান হয়নি, যতটা হিন্দির সাথে হয়েছে। যেমন বলিউডের সিনেমা আমাদের ওখানে দারুণ জনপ্রিয়। কারণটা অনেকটাই ভাষাগত। পাকিস্তানের মানুষ হিন্দিটা চট করে বুঝতে পারে। সেই কারণেই আমার মনে হয় বাংলা নিয়ে অনেককিছু করা যেতে পারে। এ নিয়ে ভাবনা চিন্তা করা দরকার। আমি তো বাংলা ব্যবহার করে কোন অসুবিধায় পড়িনি। মনে হয় না ভবিষ্যতেও কোন সমস্যা হবে।

দিল কেয়া করে টিভিতে দেখানো হয়েছিল ২০১৯-এ। “আমার পরান যাহা চায়”-এর ক্লিপগুলো সোশাল মিডিয়ায় এসে পড়ার পর আরো বেশকিছু পাকিস্তানি সিরিয়ালের ক্লিপ পাওয়া যাচ্ছে, যেগুলোতে বাংলা গান (রবীন্দ্রসঙ্গীত নয় অবশ্য) ব্যবহার করা হয়েছে। আপনার কি জানা আছে কবে থেকে এই ধারা শুরু হয়েছে? কেনই বা পাকিস্তানি সিরিয়ালে বাংলা গানের ব্যবহার শুরু হল? পাকিস্তানে কি উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বাংলা বলা মানুষজন আছেন? নাকি এটা ওটিটির যুগ, সেকথা মাথায় রেখে পরবর্তীকালে বাংলাদেশ বা পশ্চিমবঙ্গের যে দর্শকরা দেখবেন, তাঁদের আকর্ষণ করার জন্যে করা হচ্ছে?

আমি অন্য পাকিস্তানি সিরিয়ালের ক্লিপগুলো দেখিনি, তবে যদি এরকম হয়ে থাকে, আমার মনে হয় ব্যাপারটা চমৎকার। আমি যখন এই গানটা ব্যবহার করেছিলাম তখন কোন বিশেষ উদ্দেশ্য নিয়ে করিনি। শর্বরী গানটা অপূর্ব গেয়েছিল। আর দেখলাম আমার সিরিয়ালের গল্পটার সাথে গানটা খাপ খাচ্ছে। ব্যাস, ওটাই কারণ। আমি খুব খুশি যে টিভিতে সিরিয়ালটা শেষ হয়ে যাওয়ার এত বছর পরে হলেও ব্যাপারটা আপনাদের নজরে পড়েছে এবং ভাল লাগছে।

শেষ প্রশ্ন। এই মুহূর্তে এই উপমহাদেশের শিল্পীদের পক্ষে আমাদের যৌথ সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার ভাগ করে নেওয়া কতটা কঠিন? সামাজিক বা রাজনৈতিক বাধা কতখানি? অদূর ভবিষ্যতে সেই বাধা সরে যাওয়ার আশা আছে বলে কি আপনি মনে করেন?

দেখুন, মুশকিল হল এই তিনটে দেশের (ভারত, পাকিস্তান, বাংলাদেশ) সরকারগুলোর মধ্যে কোনরকম মতপার্থক্য হলেই প্রথম আঘাতটা আসে শিল্পীদের উপর। অথচ তাঁদের একেবারে শেষে আক্রান্ত হওয়ার কথা। কিরকম মজার কথা ভাবুন, ব্যবসা বাণিজ্য চলতে থাকে অথচ তিনটে দেশেই শিল্পীদের এক কোণে ঠেলে দেওয়া হয়। এটা অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক। তবে এই পরিস্থিতিতেও এমন কেউ কেউ আছেন যাঁরা একসঙ্গে কাজ করার চেষ্টা করছেন। আপনি তো জানেনই, আমি ২০০৮ সালে রামচন্দ পাকিস্তানি করেছি ভারতীয় শিল্পীদের সঙ্গে। এক ঝুঠি লাভ স্টোরি করেছি জি ফাইভের জন্য। সম্ভবত ওদের জন্য আরো একটা কাজ আমি করব। আশা করি এই আদান প্রদান বন্ধ হবে না। কারণ আমার মনে হয় একমাত্র এই পথেই আমরা একে অপরকে জানতে পারি, চিনতে পারি। আমাদের একের অপরের সম্বন্ধে অনেক অজ্ঞতা আছে। আমাদের মধ্যে অনেক ভুল বোঝাবুঝিও আছে। অথচ আমাদের কত মিল! কতকিছু রয়েছে যা আমরা সকলেই ভালবাসি। দেশের মাটির প্রতি আমাদের ভালবাসা একরকম, আমাদের খাদ্যাভ্যাস, আমাদের পোশাক আশাক — সবেতেই তো অনেক মিল। তফাতগুলো সত্ত্বেও এতগুলো মিল আছে। কিন্তু সবচেয়ে বড় কথা তিনটে দেশের মানুষেরই মনুষ্যত্ব আছে। আমার মনে হয় না সেকথা যথেষ্ট জোর দিয়ে বলা হয়েছে, দেখানো হয়েছে। তাছাড়া আমার মনে হয়, দুর্ভাগ্যজনকভাবে উপমহাদেশের অন্য দুটো দেশে পাকিস্তানের সংস্কৃতি যথেষ্ট পরিমাণে পৌঁছয়নি। বিশেষ করে ভারতে। সেখানে তেমনভাবে পাকিস্তানের নাটক বা সিনেমা দেখা যায় না, পাকিস্তানের সঙ্গীত শোনা যায় না বা সেখানকার বই পড়া যায় না। বরং পাকিস্তানে ভারতের সাংস্কৃতিক কাজকর্ম অনেক সুলভ। তবে আমি আশাবাদী এবং মনে করি সবসময়ই ভবিষ্যৎ সম্পর্কে ইতিবাচক মনোভাব নেওয়া উচিৎ। তাই আমার ধারণা ভবিষ্যতে এই পরিস্থিতির উন্নতি হবে।

https://nagorik.net এ প্রকাশিত

‘অলৌকিক মেগা সিরিয়াল দেখা সমাজের সত্যজিতের ছবি দেখার কোন কারণ নেই, তিনি উপলক্ষ মাত্র’

আসলে আমাদের বিয়ের দিন যেমন ঠাকুর্দার ছবি বার করা হয়, কারণ আমাদের একটা বংশপরিচয় আছে, সত্যজিতের পথের পাঁচালী বা অপরাজিত সেই ধরনের ছবি হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বাঙালি আজকাল সেইসব ছবিই দেখে যেখানে সত্যজিৎ রায় ঈশপের মত নীতিবাক্য প্রচার করেন, নাগরিককে বললেন সঞ্জয় মুখোপাধ্যায়

এই মুহূর্তে পশ্চিমবঙ্গে শতবর্ষ পার হওয়া সত্যজিৎ রায়ের ছবি নিয়ে কথা বলার জন্য সঞ্জয় মুখোপাধ্যায়ের চেয়ে যোগ্যতর লোক পাওয়া দুষ্কর। তা বলে তাঁর সাথে কথা বলতে বসে সিনেমার গণ্ডিতে আটকে থাকলে ভুল হয়। তিনি আসলে বাঙালি সংস্কৃতির বিকাশ ও বিনাশের একজন একনিষ্ঠ পাঠক। তাই তাঁর সত্যজিৎ আলোচনা কেবল সেলুলয়েডে আটকে থাকে না। নাগরিক ডট নেটের পক্ষ থেকে কিছু প্রশ্ন পেশ করে আলোচনা উপভোগ করলেন প্রতীক।

সঞ্জয়দা, আজ আমরা যেখানে দাঁড়িয়ে আছি, সেখানে অন্ধ ধর্মবিশ্বাস আর বিজ্ঞান প্রায় সম্মুখসমরে। সেই প্রেক্ষিতে সত্যজিতের বিজ্ঞানমনস্কতাকে আপনি কীভাবে দেখেন? মানে দেবীমহাপুরুষ বা গণশত্রু ছবিতে দেখি ধর্মীয় কুসংস্কারের বিরুদ্ধে তাঁর স্পষ্ট অবস্থান। আবার তাঁর গল্পগুলোতে, এমনকি প্রফেসর শঙ্কুর মত কল্পবিজ্ঞানের গল্পেও, অনেক অলৌকিক ঘটনা রয়েছে। সেগুলোকে কিন্তু সবসময় অসম্ভব বা বুজরুকি হিসাবে দেখানো হয়নি।

এই প্রশ্নটার উত্তরে প্রথমেই বলব, সত্যজিৎ রায় নিজে রসিকতা করে বলতেন যে তিনি ঈশ্বরে বিশ্বাস করেন না, কিন্তু ভূতে বিশ্বাস করেন। যে ধরনের অলৌকিকতা বা ব্যাখ্যার অতীত কিছু ঘটনা তিনি দেখেছেন, সেগুলো সাধারণ সংস্কারের মত তাঁর মধ্যে কাজ করেছে। কিন্তু সামগ্রিকভাবে সত্যজিৎ রায় একজন যুক্তিবাদী। ব্যাপারটা অপরাজিত ছবিতে প্রথম দেখা যায়। অপু স্কুলে গিয়ে প্রথম দেশ শব্দটার মানে জানল। তারপর ইন্সপেক্টর তার প্রশংসা করে গেলেন, হেডমাস্টার তাকে লিভিংস্টোনের ভ্রমণ বৃত্তান্ত দিলেন, বাইরের বই পড়ার উৎসাহ দিলেন। এরপর সে বাড়িতে সাইফনের পরীক্ষা করছে, গ্রহণ যে রাহু কেতুর ব্যাপার নয়, চন্দ্র সূর্যের বিশেষ অবস্থানের ফলে হয় — সেটা মাকে বোঝাচ্ছে। অপু প্রথম ভাষার রহস্য (মেটাফর, মেটোনিমি ইত্যাদি) জানছে, ল্যাবরেটরি দেখছে। অর্থাৎ সত্যজিতের স্বাধীনোত্তর দেশে আদর্শ নাগরিক গড়ে তোলার যে অভিপ্রায়, তার মধ্যে সবসময়েই থাকছে ধর্মমুক্ত যুক্তিবাদের উন্মোচন, যার উৎস আমরা ইউরোপের রেনেসাঁয় পাই। আমাদের দেশে এই যুক্তিবাদের আগমন উনিশ শতকে। সত্যজিৎ এমন একটা পরিবারের সদস্য ছিলেন, যেখানে আমরা উনিশ শতক বলতে যা বোঝাই তার সমস্তটাই ছিল। কেবল উপেন্দ্রকিশোর, সুকুমার এবং সত্যজিৎ নয়, মনে রাখতে হবে কলকাতার বাইরে যে ক্রিকেট খেলা হত ময়মনসিংহে, তারও উদ্গাতা ছিলেন উপেন্দ্রকিশোরেরই এক ভাই সারদারঞ্জন রায়। ফলে ইউরোপিয় আধুনিকতার বৈশিষ্ট্যগুলো প্রথম যুগের সত্যজিতের মধ্যে খুবই সক্রিয়।

দেবী ছবিতে শুধু যে অন্ধ কুসংস্কার কোন অভিশাপের জন্ম দিতে পারে, কীভাবে এক ধরনের ফিমেল হিস্টিরিয়ার উৎপত্তি হতে পারে, সে বিষয়ে স্পষ্ট ইঙ্গিত করেছেন শুধু তা-ই নয়, ভারতীয় সম্পর্কের বিন্যাস দেখানোর ক্ষেত্রেও তিনি প্রায় বিপ্লবী। শ্বশুরমশাইয়ের পায়ে দয়াময়ী তেল মাখিয়ে দেওয়ার পরে, ফ্রয়েডিয় প্রতিস্থাপনের তত্ত্ব মেনেই সত্যজিৎ দেখান যে সেই রাত্তিরেই শ্বশুরের স্বপ্নে মা কালী দেখা দেন। আসলে পুত্রবধূর শরীর স্পর্শে যদি কোন সুখানুভূতি হয়, তা আমাদের সচেতন নীতিবোধকে আঘাত করে। তার প্রতিক্রিয়াতেই কালী দর্শন। আমরা অনেক ক্ষেত্রেই বুঝতে পারি না, যে গণশত্রুহীরক রাজার দেশে বা মহাপুরুষ ছবিতে, তিনি যে কেবল আচারগুলোর মধ্যেকার সংস্কারান্ধতাকে আক্রমণ করছেন, তা নয়। ধর্ম আরো বড় জিনিস। বিশেষত ভারতবর্ষে ধর্ম, অন্তত হিন্দুধর্ম, একটা সাংস্কৃতিক ব্যবস্থা। এটা কোন বাঁধাধরা ধর্ম নয় এবং সেই কারণেই সেখান থেকে বিপদের সম্ভাবনাও বেশি। সত্যজিৎ সারাজীবনই এসবের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছেন। তাঁর প্রগতি চিন্তায় কোন খাদ ছিল না।

আসলে আমার মনে হয় সমস্যার জায়গাটা হল আমাদের উনিশ শতকীয় প্রগতি চিন্তা। তাকে নবজাগরণ বা অন্য যে নামেই ডাকুন, তার মধ্যে এক ধরনের দ্বৈততা (ambiguity) ছিল। আমরা যেমনভাবে বাইরের জগতের প্রগতির কথা ভেবেছিলাম, তেমনভাবে অন্তর্জগতের প্রগতির কথা ভাবিনি। এটা ঠাকুর পরিবারের ক্ষেত্রেও সত্য, কেশবচন্দ্র সেনের পরিবারের ক্ষেত্রে সত্য, এমনকি বিদ্যাসাগরের পরিবারের ক্ষেত্রেও সত্য। আমাদের পরিবারের নারী সদস্যদের উন্নতি এবং পুরুষ সদস্যদের মানসিকতার মধ্যে বিরাট পার্থক্য থেকে গেছে। এই স্ববিরোধটা আমার মনে হয় উনিশ শতকের ঐতিহ্য যাঁরা বহন করেছেন, তাঁদের প্রত্যেকের মধ্যেই আছে। সত্যজিৎ রায়ও সেই সমস্যা থেকে মুক্ত নন।

আপনি বললেন সত্যজিতের মধ্যে উনিশ শতকের মনীষা ছিল। তা ইদানীং অনেকেই যে বলছেন সেই সময়ের সমস্ত অর্জন আমরা বাঙালিরা হারিয়ে ফেলছি, তাহলে ঐ মনীষার অংশ হিসাবে সত্যজিতের ছবিও কি অদূর ভবিষ্যতে বাঙালির কাছে অপ্রাসঙ্গিক হয়ে যেতে পারে বলে আপনার মনে হয়?

আপনি তো ভিমরুলের চাকে ঢিল মারলেন। দেখুন, বাঙালিরা অনেক বানানো সত্যের মধ্যে বাস করে। চলচ্চিত্র আমার ভাত কাপড়ের জোগান দেয় বলেই আমি জানি যে সত্যজিৎ রায়ের ছবি সত্যি সত্যি কতটা দেখা হয় আজকাল। সত্যজিৎ রায়ের ছবি বলতে আজকের বাঙালি মধ্যবিত্ত, মানে আমার আপনার আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধব কোন ছবিগুলো বোঝে? শেষ তিনটে ছবি — গণশত্রু, শাখা প্রশাখা, আগন্তুক; ফেলুদার ছবিগুলো — সোনার কেল্লা, জয়বাবা ফেলুনাথ এবং একটা ছোটদের জন্য ছবি — গুপী গাইন বাঘা বাইন। কিন্তু সত্যজিৎ রায়ের যে ঐতিহাসিক পর্ব, যখন তাঁর শিল্প শীর্ষবিন্দু স্পর্শ করেছে, অর্থাৎ ১৯৫৫ সালের পথের পাঁচালী থেকে ১৯৬৪ সালের চারুলতা পর্যন্ত, সেই ছবিগুলো কজন দ্যাখে? এমনকি তাঁর যে বিখ্যাত শহর ত্রয়ী — জনঅরণ্য, সীমাবদ্ধ, প্রতিদ্বন্দ্বী — যেখানে অপূর্ব কুমার রায়ের মধ্যে দিয়ে উত্তর-ঔপনিবেশিক পরিস্থিতিতে নাগরিকের যে পুনর্নির্মাণ সত্যজিৎ রায় করেছিলেন, সেই ধারণাকে তিনি নিজেই প্রশ্ন করেছেন, সেই ছবিগুলোই বা কতটা দেখা হয়?

অপরাজিত ছবির অপু গ্লোব হাতে কলকাতা শহরে পা দিয়েছিল এবং হ্যারিসন রোডের দিকে তাকিয়েছিল। আর প্রতিদ্বন্দ্বী ছবির সিদ্ধার্থ যখন গ্র্যান্ড হোটেলের সামনে থেকে বা লিন্ডসে স্ট্রিটের সামনে থেকে একটি অবলিক অ্যাঙ্গেল ক্যামেরায় একজন তরুণীর বক্ষদেশের প্রতি তার দৃষ্টি নিবদ্ধ করেছে। যদি ভাবা যায় বাঙালি যুবকের অপূর্ব থেকে সিদ্ধার্থে রূপান্তর হল। বা শ্যামলেন্দুতে রূপান্তর হল, যে চাকরিতে উন্নতির জন্য খুনের অভিপ্রায় বহন করতে পারে। সোমনাথের কথা ভাবুন। যুবক অপূর্ব গ্লোব হাতে বিশ্ববোধের শরিক হতে চেয়েছিল। সেই যুবকের স্বপ্ন এমনভাবে ভেঙে গেল, যে সে সোমনাথ হয়ে নৈশ অভিযানে মেয়েমানুষের সাপ্লায়ার হয়ে গেল। সত্যজিতের এই যে স্বপ্নের নির্মাণ এবং স্বপ্নভঙ্গ, এখানেই তিনি শিল্পী হিসাবে শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করেছেন। অথচ এইসব ছবি আজকাল বড় একটা কেউ দেখে না। চারুলতা, দেবী, কাঞ্চনজঙ্ঘা কেউ দ্যাখে? অভিযান ছবিটা কবে কে শেষ দেখেছে? অপরাজিত ছবিটা তো প্রায় দেখাই হয় না। পথের পাঁচালীই বা কতটা দেখা হয়? দেখা হয় সেইসব ছবি, যেখানে সত্যজিৎ রায় ঈশপের গল্পের মত নীতিবাক্য প্রচার করেন। তখন সত্যজিৎ রায়ের শরীরও খারাপ হয়ে গেছে। তাই এই ছবিগুলো নেহাতই সামাজিক অনুশাসনের দায়িত্ব নেয়।

সঞ্জয়দা, আপনার কি মনে হয় সত্যজিতের কাজ নিয়ে চর্চা করার বদলে, তাঁর দর্শন নিয়ে ভাবনা চিন্তা করার বদলে, তাঁর আবহসঙ্গীতকে রিংটোন বানিয়ে, ছবির ব্যর্থ রিটেলিং করে বা যেখানে সেখানে সেগুলো থেকে এক-আধটা সংলাপ গুঁজে দিয়ে আমরা রবীন্দ্রপুজোর মত সত্যজিৎ পুজো শুরু করে দিয়েছি?

আসলে আমাদের বিয়ের দিন যেমন ঠাকুর্দার ছবি বার করা হয়, কারণ আমাদের একটা বংশপরিচয় আছে, সত্যজিতের পথের পাঁচালী বা অপরাজিত সেই ধরনের ছবি হয়ে দাঁড়িয়েছে। কেউ দ্যাখে না, কিন্তু সবাই জানে ওগুলো ক্লাসিক। এমনও বলা চালু হয়েছে যে সত্যজিৎ রায় আজ আর প্রাসঙ্গিক নন। আজকাল টিভিতে এমন সব অলৌকিক মেগা সিরিয়াল চলে, যা দেখে ভূতেদেরও গা ছমছম করবে। তার গল্পগুলো সপ্তদশ শতকেও অবাস্তব ছিল। কিন্তু সেগুলো যে চলছে, তার মানে এগুলোর সামাজিক অনুমোদন আছে। তা এমন সমাজের তো সত্যজিৎ রায়ের ছবি দেখার কোন কারণ নেই। তিনি একটা উপলক্ষ মাত্র। তাঁর যে ছবিগুলো দেখা হয়, সেগুলো একটা বার্তা পাওয়ার জন্য। যেমন আগন্তুক বা হীরক রাজার দেশে। এগুলো জনপ্রিয় কেন? কারণ এগুলোতে এমন বার্তা রয়েছে, আমাদের মনের দুর্বলতা, ভীতি থেকে যেগুলোর প্রতি আমরা সমর্থন আশা করি। “দড়ি ধরে মারো টান/রাজা হবে খানখান” বলে যে বিদ্রোহ, তা আমাদের সহজে ইচ্ছাপূরণের সত্য বলে প্রতিষ্ঠিত হয়। মনমোহনবাবু বাইরে থেকে এসে আমাদের হঠাৎ ভাল করে দেন, আমরা ভাবি যে আমরা বাঙালিরা আবার হঠাৎ একদিন জগৎসভায় শ্রেষ্ঠ আসন লব। পরিশ্রম, মেধা এবং ধীশক্তির কোন প্রয়োজন নেই।

বাংলায় ইদানীং গোয়েন্দা গল্প নিয়ে বহু নির্দেশক ছবি, ওয়েব সিরিজ ইত্যাদি করছেন। অথচ সত্যজিৎ রায়ের সৃষ্ট সবচেয়ে জনপ্রিয় চরিত্র ফেলুদাকে নিয়ে তিনি নিজে দুটোর বেশি ছবি করেননি। শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়ের ব্যোমকেশকে নিয়েও তিনি ‘চিড়িয়াখানা’ করেছিলেন অনেকটা দায়ে পড়ে। অথচ তিনি তো রহস্য গল্প লিখতে ভালবাসতেন। ছবি করার ক্ষেত্রে এই অনিচ্ছা কেন সেদিকটায় যদি একটু আলোকপাত করেন।

আসলে কী জানেন, সত্যজিৎ রায়ের সময়ে, এমনকি সত্তরের দশকেও, বাঙালি স্থিরতার প্রতীক ছিল। ফেলুদা রহস্য অনুসন্ধান করত এবং রহস্যভেদ করত। ছোটদের জন্যে লেখা সত্যজিৎদের পরিবারে বংশ পরম্পরায় চলেছে। উপেন্দ্রকিশোর লিখেছেন একেবারে শিশুদের জন্য, সুকুমার রায় লিখেছেন অনতি কিশোরদের জন্য, আর সত্যজিৎ লিখেছেন যারা প্রায় স্কুলের শেষ ধাপে — তাদের জন্য। ফেলুদার গল্পগুলো মূলত কিশোরপাঠ্য, ফলে প্রায় স্ত্রী চরিত্র বর্জিত। কিন্তু আজ যে গল্পগুলো নিয়ে ছবি তৈরি হচ্ছে, সেগুলো এক ঈশ্বর পরিত্যক্ত সমাজের লক্ষণ।

এই সমাজের মানুষ সামাজিক সংলাপের জন্য অন্য কোন এজেন্সির দ্বারস্থ। রাষ্ট্রাতিরিক্ত কাউকে তার দরকার। রাষ্ট্র স্বাধীনতার এই সত্তর-আশি বছর পরে আর খুব একটা নির্ভরযোগ্য রক্ষাকবচ বলে মনে হচ্ছে না আমাদের। স্বাধীনতার প্রথম প্রতিশ্রুতি ফিকে হয়ে গেছে। আমাদের দৈনন্দিন জীবনযাপন থেকে আমরা ঈশ্বরকে নির্বাসন দিয়েছি। কবচ, তাবিজ, শেকড় হিসাবে বা আমাদের ভাষার ব্যবহারে যতটা ঈশ্বরকে কাজে লাগাই, তত কিন্তু বিশ্বাস হিসাবে কাজে লাগাই না। আজকের নিরীশ্বর মানুষ, জীবনানন্দ দাশের ভাষায় “মানুষ কাউকে চায় — তার সেই নিহত উজ্জ্বল / ঈশ্বরের পরিবর্তে অন্য কোনো সাধনার ফল”। রাষ্ট্র এবং ঈশ্বর যদি অশক্ত হন, তাহলে নিরাপত্তা পেতে আমাদের একটা মধ্যস্থ এজেন্সি দরকার। সেই এজেন্সিটা কে? সেটা হল রাষ্ট্রাতিরিক্ত চরিত্র — গোয়েন্দা। মনে রাখবেন, গোয়েন্দা কিন্তু পুলিস নয়। সে অপরাধ আটকানোর দায়িত্ব নিতে পারে না, কিন্তু অপরাধের সমাধান করে দেয়। বাকি কাজ পুলিস করে।

অর্থনৈতিক উদারীকরণের পরে হঠাৎ যে বিত্তস্ফীতি মধ্যবিত্তদের মধ্যে, তারপর খবরের কাগজ পড়লেই বোঝা যায়, আমাদের অপরাধেরও মাত্রা বদল ঘটে গেছে। এখন কলকাতা শহরে যে ধরনের অপরাধ হয়, এমনকি যৌন অপরাধ হয়, সেগুলো আগে হত না। এই সমাজ কার কাছে দায়বদ্ধ থাকতে চায়? সে সেলফ জাস্টিসের ভাবনায়, আত্মসমর্থনের জন্য, এমন একজনকে খুঁজে নেয়, যে তার হয়ে এই কাজটা করে দেবে। বাঙালি এমন এক সমাজ গড়ে তুলেছে, যেখানে অন্য কিছু ভাবার জায়গা নেই।

তবে দুঃখের বিষয়, স্রেফ ক্যামেরা দক্ষতা বা সম্পাদনা দক্ষতার দিক থেকেও সত্যজিৎ রায় অন্য পর্যায়ের শিল্পী ছিলেন। এখনকার এঁদের কোন দক্ষতাই নেই। আমি যখন রূপকলা কেন্দ্রের প্রধান ছিলাম, সেখানে সৌমেন্দু রায় পড়াতেন। তিনি আমাকে একবার বলেছিলেন “যা অবস্থা হয়ে দাঁড়িয়েছে সঞ্জয়, তাতে তুমি ক্যামেরা চালাচ্ছ, না সুব্রতদা (সুব্রত মিত্র) ক্যামেরা চালাচ্ছেন, বোঝা যাবে না। কারণ ডিজিটাল ক্যামেরা সেলফ কারেক্টিং মোডে চলে। যেমন এডিটিং সফটওয়্যার সবটাই নিজেই করে নেয়। ফলে এখনকার ছবিগুলোতে আপনি ঝলসানি পাচ্ছেন। ঝলসানি মানে কিন্তু সিনেমার উৎকর্ষ নয়। ভারতীয় সমাজ যেভাবে বিবর্তিত হচ্ছে, আপনি বাংলা ছবিতে তার কোন প্রমাণ দেখতে পান? এমনকি নন্দীগ্রাম, সিঙ্গুরের আন্দোলন নিয়ে যারা গর্ব করে, তারাও কি বাংলা ছবিতে নন্দীগ্রাম, সিঙ্গুরের কোন প্রভাব দেখাতে পেরেছে? পারেনি।

আচ্ছা, খুদে পাঠকদের পক্ষ থেকে একটা প্রশ্ন। সত্যজিৎ প্রফেসর শঙ্কুর গল্প নিয়ে ছবি করেননি কেন?

যে কোন ছবি বানানোর ব্যাপারেই সত্যজিৎ রায়ের একটা জোরালো বিশ্বাস ছিল। আমরা সবাই যদি সেই বিশ্বাসের শরিক হতে পারতাম, তাহলে বাংলার চলচ্চিত্র শিল্প আজকের গাড্ডায় গিয়ে পড়ত না। সত্যজিৎ মনে করতেন, কেউ যদি তাঁকে ছবি করতে টাকা দেন, তাঁর একটা ন্যূনতম রিটার্ন পাওয়া উচিৎ। ফলে তিনি প্রথম থেকেই খুব কম বাজেটে ছবি করার কথা ভাবতেন। তাঁর মার্কেট কারা? প্রধানত বাঙালি মধ্যবিত্ত। তাই এদের রুচি অনুযায়ীই তিনি ছবি বানাতেন এবং কম খরচে বানাতেন। ছোটরা সঙ্গতভাবেই জানতে চাইতে পারে তিনি শঙ্কুকে নিয়ে কেন ছবি করলেন না? আমি যোগ করব, সত্যজিৎ রায় নিজে তো ঘনাদার গল্পের খুব ভক্ত ছিলেন। তা নিয়েই বা কেন ছবি করলেন না? এই গোটা জগৎটাকেই উনি বাইরে রাখলেন কেন? উত্তরটা সোজা। আসলে ঘনাদা বা প্রফেসর শঙ্কুতে যে টেকনিকাল এফেক্ট দরকার, সেই এফেক্ট আনতে সত্যজিৎ রায়কে যে প্রবল পরিশ্রম এবং খরচ করতে হত, তা আজকের বাঙালি পরিচালক ভাবতে পারে না। সে তো বিভূতিভূষণের গল্প নিয়ে ছবি করতে আফ্রিকায় চলে যেতে পারে। সে হনুমান টুপি পরে নরওয়েতে বসে থাকে। সেই সময়ে এই পরিমাণ খরচ সত্যজিৎ রায়ের সাধ্যের বাইরে ছিল।

প্রযোজকদের ব্যাপারটাও মনে রাখতে হবে। আর ডি বনশল কিন্তু এমন ব্যবসা করতেন যার ব্যালান্স শীট হয়, অডিট রিপোর্ট হয়। আজকাল কিছু রহস্যজনক বিনিয়োগকারী হয়েছে বাংলা সিনেমায়। তাদের টাকা কোথা থেকে আসে, তারা কেন বিনিয়োগ করে, করতে না পারলে কোথায় চলে যায় — কেউ বলতে পারবে না। গত দশ-পনেরো বছরের বা পুরো একুশ শতকেরই এই ইতিহাসের হদিশ কোন সেন্ট্রাল বা স্টেট এজেন্সির কাছে নেই।

শেষ প্রশ্ন। লেখক হিসাবে সত্যজিৎ রায়কে আপনি কোনখানে রাখবেন? প্রশ্নটা করছি কারণ শিশু-কিশোর সাহিত্যে তাঁর জনপ্রিয়তা প্রশ্নাতীত হলেও অশোক মিত্রের মত মানুষ লিখেছেন “আমার গলা কেটে ফেললেও বলতে আদৌ সম্মত হব না যে সত্যজিৎ তেমন বাংলা গদ্য লিখতে জানতেন।”

নিরপেক্ষভাবে বলছি, অশোক মিত্র সমগ্র বাংলা সাহিত্যের কথা ভেবে লিখেছেন এবং এটা আংশিক সত্য। তিনি খুব ভুল বলেননি, তবে একটু নির্দয় হয়েছেন। কারণ তাঁর মাথায় হয়ত ছিল সাহিত্য রচনায় সত্যজিতের পারিবারিক ঐতিহ্য। তাঁর বংশের শিশুসাহিত্যিকরা যে মানের, ধরুন সুকুমার রায় বা লীলা মজুমদার, সত্যজিৎ রায় সেই মানের সাহিত্যিক ছিলেন না। যদিও তিনি দাবি করতেন সাহিত্য তাঁর রক্তে, সিনেমাটাই বরং আমদানি। আসলে সিনেমাই পেশা হওয়ার কারণে সত্যজিতের যে কোন গল্পেই দৃশ্য খুব গুরুত্ব পেত। দার্জিলিং জমজমাট, গ্যাংটকে গন্ডগোল বা বাদশাহী আংটি পড়লে দেখবেন দার্জিলিং, গ্যাংটক এবং লখনৌ ঘোরার জন্য কোন টুরিস্ট বোর্ডের গাইডবুক লাগবে না। একেবারে চিত্রনাট্যকারের ভঙ্গিতে, ক্যামেরা মুভমেন্ট যেভাবে হবে, সেভাবে সত্যজিৎ লিখতেন। কিন্তু শুধু চোখ তো সাহিত্য তৈরি করে না, অন্য অনুভূতিগুলোও করে। সত্যজিৎ সেগুলোর দিকে নজর দেওয়ার সময় পাননি। এটা সত্য। আবার তাঁর জনপ্রিয়তাও এই কারণেই। সত্যজিতের লেখা পড়লে ভাবতে হয় না।

সুকুমারের আবোল তাবোল কিন্তু মহত্তর সৃষ্টি, কারণ তার মধ্যে অনেক ভাবনার জায়গা আছে। আপনি প্রথম পড়ার সময় খুব মজা পাবেন, কিন্তু ক্রমশ বুঝতে পারবেন অনেক গভীরতর ভাবনা আছে লেখাগুলোর মধ্যে। সত্যজিৎ রায়ের লেখা শুধুই পড়ার আনন্দে পড়ার জন্য। যেন তরতর করে গাড়ি চলছে স্টেশনে না থেমে। এগুলো রেল যাত্রায় বা বড় প্লেন যাত্রায় নিখুঁত সঙ্গী হতে পারে। কিন্তু এমন নয় যে এগুলো মানুষের মনে স্থায়ী হতে পারে। সে চেষ্টা সত্যজিৎ করেনওনি। দৈবাৎ তাঁর ছবি তেমন না চললে তিনি বইগুলোর রয়্যালটি থেকে অনেক লাভ করতেন।

এই প্রসঙ্গে বলি, পরিচালক হিসাবে তাঁর পারিশ্রমিক কিন্তু খুব কম ছিল। আজকের পরিচালকরা শুনলে অবাক হয়ে যাবেন যে সেদিনকার হিসাবে তাঁদের আজকের পারিশ্রমিকের চার ভাগের এক ভাগও সত্যজিৎ কোনদিন নেননি। যখন তিনি আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন, তখনো।

https://nagorik.net/ এ প্রকাশিত। ছবি ইন্টারনেট থেকে।

যে রাম স্টিরিওটাইপ মানেন না

মকবুলবাবুর পরিষ্কার কথা, “জয় সিয়ারাম” বলছেন না “জয় শ্রীরাম” বলছেন তাতে কিছু এসে যায় না, রাম রামই থাকেন। কোন উদ্দেশ্যে বলছেন সেটাই আসল।

রামানন্দ সাগরের রামকে মনে আছে? সেই যে দাড়ি গোঁফ কামানো সুদর্শন অরুণ গোভিল? ইদানীং রাস্তাঘাটে অনেক গাড়ির পিছনে স্টিকার হিসাবে যে গেরুয়া রঙের ‘অ্যাংরি রাম’ দেখা যায় সেই চেহারাটা মনে করুন। তিনিও শ্মশ্রুগুম্ফহীন যুবক। কখনো অবাঙালি দোকানদারের কাছ থেকে অক্ষয় তৃতীয়ায় মিষ্টির প্যাকেটের সাথে রামসীতার ছবিওলা ক্যালেন্ডার পেয়েছেন? সেই রামও বলিউড, টলিউডের নিরানব্বই শতাংশ নায়কের মত ক্লীন শেভন। চোখ বুজে বলা যায়, অনিল কাপুর বা চিরঞ্জিত কোনদিন রামের চরিত্রে অভিনয় করার জন্য ডাক পেতেন না। বস্তুত ১৯৯৭ সালে মুক্তি পাওয়া ভি মধুসূদন রাওয়ের হিন্দি ‘লব কুশ’ ছবিতে রামের ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন কামানো মুখের জিতেন্দ্র। ছোটবেলায় পড়া ‘ছবিতে রামায়ণ’-এর রামেরও গোঁফ দাড়ি কিচ্ছু নেই। এ ভারতে কত শত রামায়ণ আর সেসবে কত শত রাম। হিসাব রাখা দুঃসাধ্য। তবু অন্য চেহারার রাম খুঁজে পাওয়া শক্ত। কিম্বা শক্ত মনে হয়, কারণ ঐ যে কবি বলেছেন, ঘর হতে শুধু দুই পা ফেলিয়া একটি ধানের শিষের উপরে একটি শিশিরবিন্দুই আমাদের দেখা হয়ে ওঠে না সারাজীবন।

ভোটের মুখে গুরুর গুঁতোয় রামের খোঁজে বেরিয়েছি। ঝোলায়, থুড়ি মাথায়, রয়েছে রামের স্টিরিওটাইপ। মোল্লার দৌড় মসজিদ পর্যন্ত, আমার দৌড় রামরাজাতলা পর্যন্ত। যে যত কম জানে, তার দুনিয়া তত ছোট, আর সে ভাবে সে তত বেশি জানে। হুগলী জেলার ছেলে, হাওড়া জেলার রামরাজাতলা চিনব না তা-ও কি হয়? পকেটে হাত ঢুকিয়ে শিস দিতে দিতে দিব্যি পৌঁছে গেলাম। কিন্তু স্টেশনে নেমে টোটোয় চেপে রামমন্দিরে গিয়ে মোবাইল ফোনে খচখচ করে গোটা কতক ছবি তুলে চলে এলে গুরুর কাছে চিঁড়ে ভিজবে না। তাই সবজান্তা ভাব ত্যাগ করে স্থানীয় বাসিন্দাদের জিজ্ঞেস করতেই হল এখানকার রামের ইতিহাস, ভূগোল কোথায় পাব? জানা গেল, জানতে হলে যেতে হবে অযোধ্যার কাছে। পিঠটান দেব ভাবছিলাম। মুখে মাস্ক থাকা সত্ত্বেও বাণী নিকেতন লাইব্রেরির সহৃদয় সমুদা কী করে যে মতলব বুঝে ফেললেন! সবই বোধহয় রামের ইচ্ছে। বললেন অযোধ্যা মানে অযোধ্যারাম চৌধুরী, যিনি এই পুজো চালু করেছিলেন। সমুদার কাছে কি টাইম মেশিন আছে? পলাশীর যুদ্ধের আশেপাশে যে মানুষ এই পুজো চালু করেছিলেন, তাঁর কাছে আমাকে পাঠাবেন কী করে? বললেন “চলে যান ভাইদার কাছে। উনি রামমন্দিরের একজন ট্রাস্টি। যা জানতে চান সব পেয়ে যাবেন ওঁর কাছে।” অযোধ্যারামের কাছে পৌঁছবার এ কী রকম রাস্তা তা তখন বুঝিনি, বুঝলাম রামরাজাতলার রামমন্দিরের অছি পরিষদের সদস্য তপন চৌধুরী ওরফে ভাইদার বাড়ির বৈঠকখানায় বসে। দেওয়ালে টাঙানো বংশলতিকা বলছে যাঁর কাছে এসেছি, তিনি অযোধ্যারাম চৌধুরীর বংশের অষ্টম পুরুষ। রামের খোঁজে এসেছি শুনে তপনবাবু বের করে দিলেন ‘অযোধ্যারামের রাম’ — তাঁরই লেখা রামরাজাতলার রামপুজোর ইতিবৃত্ত। পুস্তিকাটি হাতে নিয়েই ভেঙে গেল আমার মনে শিকড় বাকড় গজিয়ে যাওয়া রামের প্রথম স্টিরিওটাইপ। মলাটের ছবিতে দেখি রামের পুরুষ্টু গোঁফ!

সাহেবরা বলেছে “Man made god in his own image” । তপনবাবুদেরও বিশ্বাস সুদূর অতীতের কোন শিল্পী রাজকীয় ভঙ্গিমা আনার জন্য রামের মুখে গোঁফ এঁকে দিয়েছিলেন। সেই ট্র্যাডিশন সমানে চলেছে। আসলে অন্যত্র রামের যে মূর্তি দেখতে পাওয়া যায় তা বনবাসী রামের, কিন্তু অযোধ্যারাম চৌধুরী চেয়েছিলেন রাজবেশী রামের পুজো করতে। কারণ স্বপ্নে তিনি রাম সীতাকে যুগলে রাজবেশেই দেখেছিলেন। প্রত্যেক বছর রামনবমীতে শুরু হয়ে শ্রাবণ মাসের শেষ রবিবার পর্যন্ত চলা এই পুজোতে অবশ্য কেবল রামসীতার পুজো হয় না। অযোধ্যারাম বংশপরম্পরায় শিবভক্ত ছিলেন, তাই রামসীতার পাশেই থাকেন শিব। শিবের সামনে পবনপুত্র হনুমান। এছাড়াও ব্রহ্মা, জাম্বুবান, বিশ্বামিত্র, বশিষ্ঠ, লক্ষ্মণ, ভরত, শত্রুঘ্ন আর বিভীষণ। রামচন্দ্রের রাজসভার নর্তকীদের মূর্তি মিলিয়ে মোট ছাব্বিশটা মূর্তি এই বেদীতে থাকে। আমার মত অল্পবিদ্যা ভয়ঙ্করীদের মনে আরেকটা স্টিরিওটাইপ আছে। আমাদের ঘোরতর ধারণা বাঙালি হিন্দুরা মাতৃপূজাই করে বরাবর, রামের পুজো নেহাত উত্তর ভারতীয় হাঙ্গামা। এই পুজোর আড়াইশো বছরের ইতিহাস অবশ্য সেরকম সাক্ষ্য দেয় না। তবে হ্যাঁ, মাতৃপূজা বাদ দিয়ে রামরাজাতলায় রামের পুজো করবার জো নেই। অযোধ্যারাম যখন এই পুজো চালু করেন, তখন এতদঞ্চলে ধুমধাম করে বারোয়ারি সরস্বতীপুজো হত। রামের পুজো নিয়ে গ্রামবাসীদের মধ্যে বিবাদ হয়, সে বিবাদ মেটাতে অযোধ্যারাম অভিনব উপায় অবলম্বন করেন। বেদীতে রামচন্দ্রের মূর্তির উপরে স্থাপন করলেন দেবী সরস্বতীকে। প্রতি বছর রামের মূর্তি তৈরির কাঠামোর বাঁশ পুজো চালু হল সরস্বতীপুজোর দিন। সে বাঁশ স্থানীয় লোকেদের বাড়িতেই কাটতে হবে।

তপনবাবু বলছিলেন “আড়াইশো বছরে আর কখনো যে এই পুজো নিয়ে কোন বিবাদ হয়নি এমন নয়, কিন্তু রামের আশীর্বাদে সব মিটে যায় শেষ অব্দি। কিছু কিছু ব্যাপার যেমন আড়াইশো বছর ধরে আমরা একইরকম রেখেছি (যেমন প্রথম পুরোহিত হলধর ন্যায়রত্নের বংশেরই কাউকে দিয়ে পুজো করানো), তেমনি সময়ের সাথে সাথে প্রয়োজনীয় বদলও হয়েছে। পুজোর জায়গা তো বদলেছে অনেক আগেই। এখন যেখানে মন্দির, সেখানে তো অযোধ্যারাম শুরু করেননি। তারপর পূর্ণাঙ্গ মন্দিরও গড়তে হয়েছে সময়ের প্রয়োজনে। বছরে চার মাসে পুজো হয়, বাকি আট মাস ঠাকুরের আসনের জায়গাটুকু বাজারের মধ্যে বজায় রাখতে আমরা হিমশিম। তাই এই মন্দির।”

আমার এক মাস্টারমশাই বলতেন একশোটা শকুন মরলে একটা সাংবাদিক জন্মায়। তা মাস্টারমশাইয়ের কথার মান রাখতে জিজ্ঞেস করে ফেললাম “আচ্ছা, এই পুজোতে অন্য ধর্মের মানুষের অংশগ্রহণ কেমন?” তপনবাবু চওড়া হেসে বললেন “আসুন না এবার পুজোর সময়, নিজের চোখেই দেখতে পাবেন। এই পুজো, এই মেলা এখানকার এক নম্বর উৎসব তো। হিন্দু, মুসলমান সকলের উৎসব। সে কি আজ থেকে? ছোটবেলা থেকেই তো তাই দেখে আসছি।”

তপনবাবুদের বংশের ইতিহাসেও অবশ্য মুসলমান শাসকদের নাম জড়িয়ে আছে। অযোধ্যারাম চৌধুরী নবাব আলিবর্দি খাঁর উচ্চপদস্থ রাজকর্মচারী ছিলেন। হাওড়ার সাঁকরাইলে এসে বসতি স্থাপন করেছিলেন তাঁর পূর্বপুরুষ চন্দ্রশেখর সান্যাল। কিন্তু মোগল সম্রাটের দেওয়া ‘চতুর্ধারীন’ উপাধি থেকে এই বংশের পদবি হয়ে যায় চৌধুরী। সেই বংশের বাড়ির পুজো আজ বারোয়ারি পুজো। রামরাজাতলার রাম সর্বগ। তাঁর নামে মোবাইল ফোনের দোকান চলে, আবার উৎকৃষ্ট ছাগমাংসের দোকানও চলে।

স্টিরিওটাইপের দফা রফা হওয়ার আরো কিছু বাকি ছিল। সেটুকু সম্পূর্ণ হল এ তল্লাটের পুরনো বাসিন্দা অধ্যাপক মকবুল ইসলামের সাথে কথা বলে। তিনি জানালেন “বাংলার বৈষ্ণব সংস্কৃতিতে যখন রাধাকৃষ্ণের পুজো খুব বেশি প্রচার পায়নি, সেইসময় রামই আরাধ্য ছিলেন। সেই সময়কার রামের মন্দির এখানে আছে, মুর্শিদাবাদে আছে, আরো নানা জায়গায় আছে। ঠাকুর রামকৃষ্ণদেবের পরিবারও রামের ভক্ত ছিল, তাঁর বাবা রঘুপতির পুজো করতেন। প্রাক-চৈতন্য যুগের বৈষ্ণব ধর্ম ছিল রামকেন্দ্রিক। এই ধারা আসাম এবং মণিপুরেও খুব শক্তিশালী ছিল, যে কারণে একাধিক রামের মন্দির আছে।” রামরাজাতলার পুজোকে মকবুলবাবু ভারতের এই বিস্তীর্ণ এলাকার রাম সংস্কৃতির অঙ্গ বলেই মনে করেন।

“আমাদের এখানকার রাম ঠাকুরের ভাসান নবদ্বীপের রাসের সাথে তুলনীয়। এটা গোটা বাংলার উল্লেখযোগ্য সাংস্কৃতিক ঘটনাবলীর অন্যতম। এখানে রামের সাথেই ভাসান হয় পার্শ্ববর্তী পুজো ব্যাতাই চণ্ডী আর সৌম্য চণ্ডীর, যাঁরা শক্তির প্রতীক। সুতরাং রাম রয়েছেন বিষ্ণু তত্ত্ব আর শক্তি তত্ত্বের মধ্যমণি হয়ে। অতএব রাম ঠাকুর আপামর বাংলার মানুষের সঙ্গে জড়িয়ে আছেন।”

ডিজে বক্স থেকে বা রাজনৈতিক দলের লোকেদের মুখে “জয় শ্রীরাম” ধ্বনির আক্রমণাত্মক উচ্চারণ মকবুলবাবুর প্রত্যয়ে কোন ছাপ ফেলতে পারেনি। তিনি ওসব এক ফুঁ-তে উড়িয়ে দিয়ে বললেন “রাজনৈতিক স্বার্থে কথাটার একটা রাজনৈতিক অর্থ তৈরি করা হয়েছে, যার ফলে ঐ ধ্বনি শুনলে মানুষের রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া হয়। কিন্তু আমরা রাম ঠাকুরকে চিনি ছোটবেলা থেকে। তখন এসব রাজনৈতিক দলের এখানে কোন প্রভাবই ছিল না। আমরা তো তখন থেকেই রাম ঠাকুরকে ভালবাসি। সুতরাং এসব স্লোগানে আমাদের কিছু এসে যায় না।”

মকবুলবাবুর পরিষ্কার কথা, “জয় সিয়ারাম” বলছেন না “জয় শ্রীরাম” বলছেন তাতে কিছু এসে যায় না, রাম রামই থাকেন। কোন উদ্দেশ্যে বলছেন সেটাই আসল। “রামের মত একজন মহান, আদর্শ পুরুষের নামের রাজনীতিকরণের ফলে যা হয়েছে তা হল অনেকে রামকে প্রত্যাখ্যান করছেন। এটা কিন্তু ক্ষতিকর। কারণ রামকে প্রত্যাখ্যান করা মানে মূলত বিষ্ণুতত্ত্বকে প্রত্যাখ্যান করা। অর্থাৎ রাজনৈতিক ‘জয় শ্রীরাম’ রামের থেকে মানুষকে মুখ ফেরাতে বাধ্য করছে। এটা ভারতীয় সংস্কৃতির ক্ষতি। এটা করে কোন পার্টির জয়জয়কার হতে পারে হয়ত, কিন্তু রাধাকৃষ্ণ, রামসীতা যে আমাদের সকলের সংস্কৃতি — সেই বোধটাই হারিয়ে যেতে বসেছে।”

অবশ্য অযোধ্যারামের প্রতিষ্ঠিত রামরাজার প্রতি অন্য সম্প্রদায়ের মানুষের আকর্ষণ তাতে কমবার নয় বলেই মকবুলবাবুর ধারণা। দিন বদলেছে অনেক, আচ্ছে বা বুরে যা-ই বলুন, কিন্তু যে কোন সম্প্রদায়ের লোক রামরাজাতলার রামচরণ শেঠ রোড দিয়ে যাওয়ার সময় একবার রাম ঠাকুরকে দেখতে চাইবেই।

আপনিও ইচ্ছা করল দেখে আসতে পারেন, তবে রামের গোঁফ নেই কেন? মন্দিরে মোটে চারটে ঠাকুর কেন? প্রতীকের লেখার সাথে মিলছে না কেন? এসব প্রশ্ন করে গুরুতে পোস্ট করবেন না যেন। ২০১৯-এ তৈরি মার্বেলে মোড়া মন্দিরে যে বিগ্রহ দেখতে পাবেন সে বিগ্রহ রাজস্থান থেকে করিয়ে আনা। ফি বছর রামনবমী থেকে যে রামরাজার পুজো হয়, তাঁকে দেখতে হলে তখন যেতে হবে।

ঐ যে বললাম, এ রাম কোন স্টিরিওটাইপ মানেন না।

https://guruchandali.com/ এ প্রকাশিত

%d bloggers like this: