দুটো বই নিয়ে দুটো কথা

যুগ বলছে নিজের ঢাক নিজেই পেটাও, নইলে কেউ শুনবে না। কিন্তু চক্ষুলজ্জা বলে একটা জিনিস আছে তো। তাই নিজের ঢাকের সাথে বন্ধুর ঢাকও পিটিয়ে নেওয়া গেল। মৃণাল শতপথী আর আমার বই নিয়ে দুজনের আলোচনা। তুলিরেখা ভিডিওটা তুলে সম্পাদনাও করে না দিলে অবশ্য সম্ভব হত না। আগ্রহীরা দেখবেন এবং মন্তব্য করবেন আশা রইল।

যে কথা ভিডিওতে নেই: কলকাতা বইমেলায় মৃণালের বই পাওয়া যাচ্ছে স্টল নং ৩৪৬ এ, আমারটা ৩২৭ এ।

ভ্রম সংশোধন: ভিডিওতে এক জায়গায় জলবায়ু পরিবর্তনে বিপন্ন মেগা কালচারগুলোর কথা বলেছি। মেগা কালচার মানে যে ভাষায় দশ লক্ষের বেশি লোক কথা বলে তেমন ভাষার সংস্কৃতির কথা বলেছি। ভুলটা আমারই। যে বিজ্ঞানী বন্ধু ব্যাপারটা আমাকে বলেছিল সে সংখ্যাটা মিলিয়নে বলেছিল। আমি লক্ষে পরিবর্তন করতে গিয়ে গুবলেট করেছি। সংখ্যাটা আসলে অনেক বেশি

সায়েবসুবোদের ছবি

কাল হঠাৎ ঝোঁকের মাথায় একটা বাংলা ছবি দেখতে চলে গেলাম সপরিবারে। বেশ ভাল লাগল ছবিটা। যতটা আশা করেছিলাম তার চেয়ে বেশিই ভাল লাগল। কিন্তু এক বালতি দুধে একফোঁটা চোনা। ছবির কলাকুশলীদের নামের তালিকা পুরোটাই রোমানে লেখা। বেশ কয়েকবছর হল বাংলার ছবিতে এটা বাংলার পাশাপাশি রোমানেও লেখার চল হয়েছে। অনেক ছবিতেই দেখেছি বাংলা লেখাটা পর্দার এককোণে অবহেলায়। এখানে দেখলাম বাংলা একদম বাদ।
বাংলা বর্ণমালার প্রতি ছবি করিয়েদের এই অনীহার কারণ কয়েকজনকে জিজ্ঞেস করেছি। চটজলদি উত্তর আসে “আসলে ফেস্টিভ্যালে পাঠাতে হয় তো।” যেন বাংলা ছবির ফেস্টিভ্যাল অভিযান ঋতুপর্ণ পরবর্তী যুগেই শুরু হয়েছে। এমনকি সত্যজিৎ, মৃণালের ছবিও কখনো ফেস্টিভ্যাল দর্শন করেনি, পুরস্কৃতও হয়নি। একথা বললে আবার উত্তর আসে “বাংলা করার অনেক খরচ তো।” এতেও প্রশ্ন ওঠে সত্যজিৎ, মৃণালের কি মাটির নীচে রূপোর কলসীতে গুপ্তধন পোঁতা ছিল? আচ্ছা ফেস্টিভ্যালের দর্শক, বিচারকদের জন্যে বিদেশী ভাষায় সাবটাইটেল করাতে কোন খরচ হয় না? তাছাড়া ফেস্টিভ্যাল মাথায় রেখে যাঁরা ছবি বানান আজকাল, তাঁরা কত কাঁড়ি কাঁড়ি পুরস্কার আনছেন, বাংলা ছবি সারা বিশ্বে কেমন অগ্রগণ্য হয়ে উঠেছে তা তো দেখতেই পাচ্ছি। আরো একটা প্রশ্ন করি। বাংলাদেশের ছবিগুলো ফেস্টিভ্যালে যায় না? যাকগে।
পশ্চিমবঙ্গের চলচ্চিত্র শিল্পের যে ভাঁড়ে মা ভবানী সেটা অনেকদিন হল কোন গোপন তথ্য নয়। কলাকুশলীরা নিজেরাই তো সংবাদমাধ্যমকে বলে বেড়ান যে ছবি করার খরচ তুলতেই বেশ কষ্ট হয়। সেক্ষেত্রে এই রোমানে টাইটেল কার্ড করে ইংরিজি না জানা দর্শককে অচ্ছুত করে রাখার অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস, যাকে ইংরিজিতে elitism বলাই সঙ্গত, সেটা বাংলা ছবির নিয়ামকরা পান কোথায়? নাকি ব্যাপারটা আসলে এই যে বাংলা ছবির উচ্চশিক্ষিত শহুরে নির্মাতারা নিজেদের নামের সঠিক বাংলা বানানটাও জানেন না, জানার প্রয়োজনও বোধ করেন না? সে না হয় না-ই জানলেন। এ নিয়ে বেশি বললে আবার ব্যাপারটা শেষ অব্দি ব্যক্তিস্বাধীনতার প্রশ্ন হয়ে দাঁড়াবে। কিন্তু কথা হচ্ছে বাংলা ভাষাটা যখন এতই তুচ্ছতাচ্ছিল্যের বস্তু তখন এই সায়েবসুবোরা নিজেদের সায়েবসুবো দর্শকদের জন্যে ইংরিজি ছবিই বানান না কেন? তাহলে তো ফেস্টিভ্যালের বিচারকদের আরো সুবিধা হয় আর ইংরিজিতে যাকে wider audience বলে, আপনাদের প্রশ্নাতীত প্রতিভা সেটাও পেতে পারে আর আর্থিক ক্ষতির মাত্রাও কমে যেতে পারে।