‘১৯৯১ থেকে জনকল্যাণমূলক রাষ্ট্রের পথ ত্যাগ করার ফল গ্লোবাল হাঙ্গার ইনডেক্সে ১০১তম স্থান’

কেবল বলা হয়, সবকিছু খুলে দাও। সারা পৃথিবীতে আজ যতগুলো সফল অর্থনীতি আছে, কোনোটাই সবকিছু খুলে দিয়ে সফল হয়নি।

এয়ার ইন্ডিয়া বিক্রি হয়ে যাওয়া দারুণ অখুশি হওয়ার মত কোনো ঘটনা নয়, বলছেন অর্থনীতিবিদ

পশ্চিমবঙ্গের মানুষ, অধুনা দিল্লির বাসিন্দা নিত্য নন্দ অর্থনীতির সঙ্গে দীর্ঘকাল যুক্ত রয়েছেন। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, শিল্পায়ন, উন্নয়ন এবং পরিবেশগত ইস্যুগুলোতেই তাঁর আগ্রহ বেশি। ভারত সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রক ও সরকারি সংস্থার পরামর্শদাতা হিসাবে বহু বছর ধরে তিনি অর্থনৈতিক নীতি প্রণয়নের কাজ করেছেন। তাছাড়া UNCTAD (United Nations Conference on Trade and Development), UNESCAP (United Nations Economic and Social Commission for Asia and the Pacific), UNDP (United Nations Development Programme)-র মত সংস্থা এবং ইউরোপিয়ান কমিশনের কনসালট্যান্টের ভূমিকাও পালন করেছেন। এই মুহূর্তে তিনি কাউন্সিল ফর সোশাল ডেভেলপমেন্টের ডিরেক্টর। অতি সম্প্রতি লন্ডন ও নিউইয়র্ক থেকে প্রকাশিত হয়েছে তাঁর বই India’s Industrial Policy and Performance: Growth, competition and competitiveness। নাগরিক ডট নেটের সাথে আলাপচারিতায় নিত্যবাবু ভারতের অর্থনীতির অভিমুখ, জনকল্যাণমূলক রাষ্ট্রের পশ্চাদপসরণ থেকে শুরু করে এয়ার ইন্ডিয়ার বেসরকারিকরণ ও বিশ্ব অর্থনীতি নিয়ে অনেক ধোঁয়াশা সরিয়ে দিলেন।

গত কয়েক বছরের অভিজ্ঞতা থেকে ভারতের মত দেশে জনকল্যাণমূলক রাষ্ট্রের ধারণাকে কতটা উপযোগী বলে মনে করেন? অরবিন্দ কেজরিওয়াল যে বিপুল ভর্তুকি দিয়ে প্রায় জলের দরে বিদ্যুৎ জোগান, বা মমতা ব্যানার্জি যেভাবে নানা প্রকল্পের মাধ্যমে বিভিন্ন জরুরি পরিষেবা বিনামূল্যে নাগরিকদের দিয়ে থাকেন — তাকে কীভাবে দেখেন?

দেখুন, সকলের জন্য ন্যূনতম খাদ্যের জোগান নিশ্চিত করা যে কোনো রাষ্ট্রের কর্তব্য। সেটাও আমরা করে উঠতে পারছি না। গ্লোবাল হাঙ্গার ইনডেক্সে ১১৬টা দেশের মধ্যে ১০১ নম্বরে পৌঁছে গেছি। নেপাল, পাকিস্তানের চেয়েও পিছনে। এই অবস্থায় রাষ্ট্রের জনকল্যাণমূলক কাজকর্মের উপযোগিতা আলাদা করে বুঝিয়ে বলার আর দরকার পড়ে না। তবে একটা কথা বলতেই হবে, এই দুর্দশা কিন্তু স্রেফ গত এক-দেড় বছরের নয়। আমরা এই সময়টায় কী দেখলাম? কয়েক লক্ষ মানুষ লকডাউন আরম্ভ হতেই পায়ে হেঁটে বাড়ি ফিরতে শুরু করলেন। তা এঁরা সব মহানগরগুলোতে কেন এসেছিলেন? কাজ করে একটা ভাল জীবন পাবেন আশা করে তো? কিন্তু ভেবে দেখুন, কতটা ভঙ্গুর তাঁদের অবস্থা, যে এক মাস কাজ না থাকলেই না খেয়ে থাকতে হবে, সেই আশঙ্কায় তাঁরা ফিরে যেতে শুরু করলেন। এই অবস্থা তো আর তক্ষুণি হয়নি। তার মানে আমরা যতই গলা ফাটাই যে ১৯৯১ সালের পরে আমাদের জিডিপি বেড়েছে, মাথাপিছু আয় বেড়েছে, আসলে কিন্তু বিরাট অংশের মানুষ চরম দুর্দশার মধ্যে রয়ে গেছে। গ্লোবাল হাঙ্গার ইনডেক্সে আমরা ৯৪ থেকে ১০১ হয়েছি। আগের সংখ্যাটাও কি গর্বের? আসলে গত তিরিশ বছর ধরেই আমরা ক্রমশ জনকল্যাণমূলক রাষ্ট্রের ধারণা থেকে সরে এসেছি। এগুলো তারই ফল।

আপনার দ্বিতীয় প্রশ্নটার কোনো সহজ উত্তর নেই। আমি নীতিগতভাবে এইসব পদক্ষেপের বিরোধী নই, কারণ গরীব নাগরিকদের সাহায্য করা দরকার। কিন্তু নির্দিষ্ট কিছু সমালোচনার জায়গা আছে। যেমন ধরুন কেজরিওয়াল যতখানি বিদ্যুৎ ভর্তুকি দিয়ে প্রায় বিনামূল্যে দিচ্ছেন, ততটা বোধহয় কোনো গরীব মানুষের দরকার হয় না। আমি মনে করি না কাউকে বাড়িতে এয়ার কন্ডিশনার চালানোর জন্য বিনামূল্যে বিদ্যুৎ দেওয়া উচিত। সেটা পরিবেশরক্ষার দৃষ্টিভঙ্গিতেও খারাপ, অর্থনীতির দিক থেকেও খারাপ। দিল্লিতে কেজরিওয়াল নিঃসন্দেহে স্বাস্থ্যব্যবস্থা, শিক্ষাব্যবস্থাকে অনেকটা গুরুত্ব দিয়েছেন। কিন্তু কোভিড অতিমারীতে আমরা দেখলাম এখানকার স্বাস্থ্যব্যবস্থা কিন্তু তাতেও প্রয়োজন মেটানোর পক্ষে একেবারেই যথেষ্ট নয়। আমার মনে হয় বিদ্যুতে যে পরিমাণ ভর্তুকি দিল্লি সরকার দিচ্ছে, তাতে কাটছাঁট করে স্বাস্থ্যব্যবস্থায় সেই টাকা কাজে লাগালে তা অনেক বেশি জনকল্যাণমুখী হবে।

একটা কথা বলা দরকার। যে দেশটাকে আমরা গণতন্ত্রের স্বর্গ বা মক্কা বলে থাকি, সেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে কিন্তু আর কিছু থাকুক না থাকুক, গরীব বলেই আপনার ছেলেমেয়ে শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হবে — এমনটা হয় না। ওখানকার সরকারি স্কুলগুলো যথেষ্ট ভাল। নিঃসন্দেহে কিছু বেসরকারি স্কুল আছে যেখানে লেখাপড়ার বাইরেও অনেককিছু শেখানো হয়। ঘোড়ায় চড়া, এটিকেট ইত্যাদি। সেখানে অনেক টাকাপয়সা থাকলে তবেই পড়াশোনা করা যায়। কিন্তু ওগুলো না শিখলেও তেমন ক্ষতি নেই। কিন্তু একজন গরীব ছাত্র বা ছাত্রী যে শিক্ষাটা না পেলেই নয়, তা থেকে কিন্তু বঞ্চিত হবে না। এ কথা কিন্তু আমাদের দেশ সম্বন্ধে নিঃসংশয়ে বলা যায় না। আমি নিজে পশ্চিমবঙ্গে পড়াশোনা করেছি বলে জানি, অনেককিছু ইতিমধ্যে বদলে গিয়ে থাকলেও আজও পশ্চিমবঙ্গের সরকারি স্কুলগুলো নেহাত ফ্যালনা নয়। কিন্তু উত্তর ভারতের বিভিন্ন রাজ্যের সরকারি স্কুলগুলোর অবস্থা মোটেই ভাল নয়। একেবারেই পড়াশোনা হয় না। মানে শেষমেশ ব্যাপারটা এই, যে গরীবের ছেলেমেয়ে শিক্ষার সুযোগ থেকে পুরোপুরি বঞ্চিত। ন্যূনতম খাদ্য নিশ্চিত করার মত সবচেয়ে গরীবের ছেলেমেয়েরও ন্যূনতম শিক্ষা নিশ্চিত করাও কিন্তু যে কোনো রাষ্ট্রের কর্তব্য।

আচ্ছা, বিশ্বায়নের যুগে ভারতের মত উদার অর্থনীতি নিয়ে চলেছে যেসব বড় বড় রাষ্ট্র, তারা এখন কোন পথে হাঁটছে? বিশ্ব জুড়ে পুঁজিবাদের যে সঙ্কটের কথা আমরা ইদানীং বামপন্থীদের মুখে শুনি, সেটা কতটা ঠিক বা ভুল?

আমাদের দেশে চীন কীভাবে চলেছে, দক্ষিণ কোরিয়া কীভাবে চলেছে, ব্রাজিল বা জার্মানি কীভাবে চলেছে সে সম্পর্কে যা বলা হয় আর আসলে দেশগুলোর অর্থনীতি যেভাবে চলেছে, তার মধ্যে কিন্তু অনেক তফাত আছে। বাম, দক্ষিণ — দু পক্ষই কোথাও না কোথাও পুরো সত্যিটা বলে না। এটাই বাস্তব।

আজ যদি আপনি বলেন চীন উদার অর্থনীতি অবলম্বন করে বিরাট এগিয়ে গেছে সেটা যেমন সম্পূর্ণ মিথ্যে, তেমনি যদি বলেন ওরা সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতি নিয়ে এগিয়েছে, তা-ও মিথ্যে। চীন আসলে দুরকম অর্থনীতির একরকম মেলবন্ধনের চেষ্টা করেছে। চীনের অর্থনীতিতে রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ কিন্তু বেশ জোরালো। পরিকাঠামো ক্ষেত্রে যেমন প্রবল নিয়ন্ত্রণ আছে। ব্যাঙ্কিং ক্ষেত্রেও চূড়ান্ত নিয়ন্ত্রণ আছে। বিশ্বব্যাপী এখন যে চীনা কোম্পানিগুলো বিনিয়োগ করছে, সেগুলো বেশিরভাগই কিন্তু সরকারি কোম্পানি। এভাবেই চীনের অর্থনীতি এমন জায়গায় পৌঁছেছে, যে ফরচুন ৫০০ তালিকায় আমাদের দেশের যতগুলো কোম্পানি থাকে, তার চেয়ে ওদের কোম্পানির সংখ্যা অনেক বেশি।

আবার ছোট দেশ সিঙ্গাপুরের দিকে যদি তাকান। ওদের পাশ্চাত্যের অর্থনীতিবিদরা উদারনৈতিক দেশ বলে থাকেন। আসলে ওদের দেশে আমদানি শুল্ক বেশ কম। এইদিক থেকে ওরা উদার। কিন্তু অন্য যে কোনো ক্ষেত্রে প্রবল সরকারি নিয়ন্ত্রণ আছে। এমনকি কোনো আবাসনে কোন জনগোষ্ঠীর কতজন লোক থাকবে সেটাও সরকার নিয়ন্ত্রণ করে।

দক্ষিণ কোরিয়ায় গেলেও দেখতে পাবেন সরকার কিছু ক্ষেত্রে উদার হলেও অনেক ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখেছে। আসলে সব দেশই নিজের মত করে কোথাও না কোথাও সরকারি নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, জার্মানির মত দেশও এর ব্যতিক্রম নয়। এই সত্যিটা আমাদের দেশের লোকের সামনে বলা হয় না সাধারণত। কেবল বলা হয়, সবকিছু খুলে দাও। সারা পৃথিবীতে আজ যতগুলো সফল অর্থনীতি আছে, কোনোটাই সবকিছু খুলে দিয়ে সফল হয়নি।

আপনার কথা থেকেই এসে পড়ে বেসরকারিকরণের প্রসঙ্গ। সদ্য এয়ার ইন্ডিয়া কিনে নিল টাটা। অনেকে বলছেন জওহরলাল নেহরু পুঁজিপতিদের বিরোধী ছিলেন। তাই এয়ার ইন্ডিয়া টাটাদের হাত থেকে ছিনিয়ে নিয়েছিলেন, নরেন্দ্র মোদি ফিরিয়ে দিলেন। ভারতীয় অর্থনীতির একটা বড় ভুল এতদিনে সংশোধন করা হল। এই ব্যাখ্যা কতটা ঠিক? কারণ টাটাদের প্রকাশ করা হিসাব অনুযায়ী যখন ভারত সরকার এয়ার ইন্ডিয়া অধিগ্রহণ করেন, তখন তো কোম্পানি ঘাটতিতেই চলছিল, তাই না?

আসলে ১৯৫০-এর দশকে কী হয়েছিল, কেন হয়েছিল — সেগুলো না জেনেই যদি আজ কেন হচ্ছে তা নিয়ে মন্তব্য করি, তাহলে খুব বড় ভুল হয়ে যাবে। সেইসময় আমাদের দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, কোম্পানিগুলোর আর্থিক সঙ্গতির কথা মাথায় রাখা দরকার। এটা ঠিক যে টাটারাই এয়ার ইন্ডিয়ার ব্যবসাটা শুরু করেছিলেন। কিন্তু এয়ার ইন্ডিয়া যেভাবে বাড়ছিল, তাঁরা কি সেই অনুযায়ী বাড়াতে পারতেন বা বাড়াতেন? সেটা আমরা কেউ জানি না। ১৯৬০-এর দশকে কিন্তু এয়ার ইন্ডিয়া এশিয়ার অন্যতম বড় এয়ারলাইন্স কোম্পানি হিসাবে প্রতিষ্ঠিত হয়ে গিয়েছিল। বলা ভাল, এয়ার ইন্ডিয়াকে আমরা, অর্থাৎ আমাদের সরকার, ঠিকমত চালাতে পারল না। বা চালাতে চাইল না। কারণ প্রথমত, মোটামুটি ১৯৮০-র দশক থেকে, আরও বেশি করে ১৯৯১ সাল থেকে, আমরা চাই না কোনোকিছুর মালিকানা সরকারের হাতে থাকুক। এটা এমন একটা আদর্শগত ব্যাপার, যার ভালমন্দ আমরা ভেবে দেখি না। সেই অবস্থান থেকেই এত বছর ধরে এয়ার ইন্ডিয়াকে কী করে পুনরুজ্জীবিত করা যায়, ঠিক করে চালানো যায় — সে চিন্তাকে যথেষ্ট গুরুত্ব দিইনি।

দ্বিতীয়ত, মাথায় যদি সাপে কামড়ায় আপনি কোথায় বাঁধন দেবেন? আজ মূল প্রশ্ন হল রাষ্ট্র কি জনকল্যাণের জন্য, নাকি পুঁজিপতিদের ব্যক্তিগত স্বার্থে সমস্ত রাষ্ট্রীয় সংস্থান তাদের হাতে তুলে দেওয়ার জন্য? আমি কিন্তু বলছি না, যে নেহরুর সময়ে সবকিছু একেবারে উল্টো ছিল, তিনি পুঁজিপতিদের মোটেই রেয়াত করেননি। তখন সরকারিভাবে যেসব সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল তার সবই যে পুঁজিপতিদের বিরুদ্ধে তা কিন্তু নয়। অনেক ক্ষেত্রেই পুঁজিপতিদের সাহায্য করার জন্যই কাজগুলো করা হয়েছিল। কারণ তখন পুঁজিপতিদের হাতে তেমন টাকা ছিল না। আমাদের পরিকাঠামোগত শিল্প এবং ভারী শিল্প তৈরি করতে বড় বড় বিনিয়োগের প্রয়োজন ছিল। তেমন বিনিয়োগ করতে পারার মত কটা কোম্পানি ছিল তখন এ দেশে, আর আজ কটা কোম্পানি আছে? দুটো বাস্তবতা একেবারে আলাদা। নেহরু একেবারে সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে চাইছিলেন আর এখন শতকরা একশো ভাগ ধনতান্ত্রিক ব্যবস্থা চলছে — এমন কথা আমি বলব না। কিন্তু সরকার কিছুই করবে না — আজকের এই যে মতাদর্শ। একে প্রশ্ন করা দরকার।

প্রায় দশ বছর বা তারও বেশি সময় ধরে এয়ার ইন্ডিয়া যেভাবে লসে রান করছিল, তাতে অদূর ভবিষ্যতে তার কোনো পুনরুজ্জীবনের আশা দেখছিলাম না। সেদিক থেকে এয়ার ইন্ডিয়া সরকারের হাত থেকে চলে যাওয়ায় যে আমরা খুব বেশি কিছু হারালাম তা মনে করার কারণ নেই। কিন্তু এটাও ঠিক যে টাটার কাছে এয়ার ইন্ডিয়া বিক্রি করে দেওয়ার সময়ে কোম্পানির বিপুল পরিমাণ দেনার বোঝা কিন্তু সরকারই ঘাড়ে নিয়ে নিয়েছে। সরকারের ঘাড় মানেই তো সাধারণ মানুষের ঘাড়। সুতরাং এয়ার ইন্ডিয়া বিক্রি করে মানুষের লাভ হল, তাও বলা যাবে না।

আবার ভেবে দেখুন, এয়ার ইন্ডিয়া চালিয়ে কি একেবারে সাধারণ, গরীব ভারতবাসীর কোনো লাভ হয়? তা কিন্তু নয়। এয়ার ইন্ডিয়ায় যারা কাজ করে তারা সবাই যথেষ্ট ভাল বেতন পায়, বিমানচালক বা বিমানসেবিকার কাজ খুবই গ্ল্যামারাস পেশা হিসাবে সমাজে স্বীকৃত। আমাদের মত দেশে ওই পেশায় অত বেতন না দিলেও কিন্তু চলে। তাছাড়া আমরা যারা এয়ার ইন্ডিয়ার পরিষেবা ব্যবহার করি, তারাও কিন্তু কেউ গরীব লোক নই। সুতরাং গরীব মানুষের এতে কোনো ক্ষতিবৃদ্ধি নেই। তবে সব মিলিয়ে একটা সরকারি এয়ারলাইন্স বেসরকারি হয়ে গেল বলে খুব অখুশি হওয়ার কিছু আছে বলে আমি মনে করছি না।

সিঙ্গাপুর এয়ারলাইন্স, যার মেজরিটি শেয়ার হোল্ডার হল সিঙ্গাপুর সরকারের অধীন টেমাসেক হোল্ডিংস, তারা যথেষ্ট লাভজনক একটি সংস্থা। এমিরেটস, কাতার, এয়ার চায়না, স্ক্যান্ডিনেভিয়ান এয়ারলাইন্সের মত আরও বেশকিছুসরকারি বিমান সংস্থা আছে, যাদের কোভিড-১৯ অতিমারির আগে অব্দি ধারাবাহিক বৃদ্ধি হচ্ছিল এবং লাভে চলছিল। এয়ার ইন্ডিয়া তেমনটা পারল না কেন?

ঠিক কথাই যে পৃথিবীর সবচেয়ে ভাল এয়ারলাইন্স বলে যেগুলো গণ্য হয়, তার অনেকগুলোই পুরোপুরি সরকারি মালিকানায় চলে। আপনি যে নামগুলো করলেন তার মধ্যে আমি আরব দেশের এয়ারলাইন্সগুলোকে একটু আলাদাভাবে দেখি, কারণ ওরা যেহেতু তৈল উৎপাদক দেশ সেহেতু একটা বাড়তি সুবিধা পেয়ে থাকে। ওরা একেবারে বেস থেকে কম দামে তেল কিনে এয়ারলাইন্সগুলোকে একটু অন্যভাবে চালায়। ফলে ওদের সাথে অন্য এয়ারলাইন্সগুলোর তুলনা করা মুশকিল। কিন্তু সিঙ্গাপুরের ক্ষেত্রে তো আর সে যুক্তি খাটে না। থাই এয়ারওয়েজও আলাদা কোনো সুবিধা পায় না। নিউজিল্যান্ড ছোট দেশ ঠিকই, তবু তার সরকারি মালিকানার এয়ারলাইন্স দিব্যি চলছে। এরকম অনেক উদাহরণ তো আছেই। আর্জেন্টিনার কথাও আলাদা করে বলা দরকার। ওদের সরকারি এয়ারলাইন্সের একসময় বেসরকারিকরণ করা হয়েছিল। কিন্তু বেসরকারিকরণ সত্যি হল কিনা সেটা পরিষ্কার হল না। কারণ কোম্পানিটা কিনল কে? না ইউরোপের এক কোম্পানি। তারপর তারা চালাতে পারল না। যখন দেখা গেল এয়ারলাইন্সটা উঠে যাওয়ার জোগাড়, তখন জাতীয় সম্মানের প্রশ্ন এসে গেল। তাছাড়া কোম্পানি উঠে গেলে বহু কর্মচারী, যারা আর্জেন্টাইন নাগরিক, তাদের চাকরি চলে যাবে। সরকার মনে করল এটা হতে দেওয়া যায় না। তাই অনেক বেশি দামে তারাই আবার এয়ারলাইন্সটা কিনে নিল। আমাদের এখানেও যে সেরকম ঘটবে না সে গ্যারান্টি কেউ দিতে পারবে না।

সরকারের ব্যবসা করা কাজ নয়, ওটা ব্যবসায়ীদের উপরেই ছেড়ে দেওয়া উচিত। এই যে কথাটা আমরা মনমোহন সিং অর্থমন্ত্রী থাকার সময় থেকে শুনে আসছি, সেটা কতটা ঠিক বলে মনে করেন? সরকার ব্যবসা না করলে অর্থনীতিতে তার প্রভাব কি সর্বদা ভাল? ভারতীয় কর্পোরেটরা তো অনেকেই রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্ক থেকে ঋণ নিয়ে অপচয় করেছে, যার ফলে বিপুল পরিমাণ নন-পারফর্মিং অ্যাসেটের দায় এখন ব্যাঙ্কগুলোর ঘাড়ে চেপেছে।

মনমোহন সিং কথাটা প্রথম যখন বলেছিলেন, তখন বলেছিলেন সরকারের ব্যবসা না করে শিক্ষা, স্বাস্থ্যের মত সামাজিক ক্ষেত্রগুলোকে শক্তিশালী করার দিকে মন দেবে। কিন্তু আমরা দেখতেই পাচ্ছি, হয়েছে কিন্তু তার উল্টো। শুধু যে বিভিন্ন রাষ্ট্রায়ত্ত ক্ষেত্রের বেসরকারিকরণ হল তা নয়; শিক্ষা, স্বাস্থ্যকেও তুলে দেওয়া হল বেসরকারি হাতে। তার ফলাফল আমরা স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি। সুতরাং সরকার ব্যবসা করবে কি করবে না, তার চেয়েও বড় প্রশ্ন হল ব্যবসা কেন করা হয় আর ব্যবসার সুফল কারা পায়? বেসরকারি হাতে ব্যবসা ছেড়ে দিতে চান ভাল কথা। কিন্তু তার ফল সাধারণ মানুষের জন্য ভাল হবে কিনা সেটা হল আসল কথা। প্রচুর বেসরকারি হাসপাতাল আর শিক্ষা প্রতিষ্ঠান তো বানানো হয়েছে গত তিরিশ বছরে। তার সুফল কি আমরা পেয়েছি? মনে হয় না, খুব বেশি লোক বলবে পেয়েছি। ঘটছে কী? গরীব পরিবারের ছেলেমেয়েরা শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। শুধু তা-ই নয়, বিদ্যুৎ বা রেলের মত পরিকাঠামোগত শিল্পকে শুধু ব্যবসা হিসাবে দেখা কিন্তু অত্যন্ত অন্যায়। ধরুন রেলওয়ের সাথে যে কীভাবে কত লোক জড়িয়ে আছে তা বলে শেষ করা যাবে না। শুধু যাত্রী আর রেল কোম্পানি নয়, রেলওয়ের নানারকম জিনিসের সাপ্লায়ার, ট্রেন আর প্ল্যাটফর্মের হকার — সকলেই রেলের সাথে যুক্ত। অতএব রেলওয়ে ব্যবসা হিসাবে কতটা লাভ করছে বা করছে না — এই হিসাব দিয়ে যদি রেলওয়ের মূল্যায়ন করা হয়, তা খুবই দুর্ভাগ্যজনক। তার ফল হবে মারাত্মক।

একটা ছোট উদাহরণ দিই। ধরুন একজন ব্যবসায়ী দুর্গাপুর থেকে কলকাতায় যাতায়াত করে একটা ছোট ব্যবসা করত। সে শস্তায় কিছু জিনিস বিক্রি করে করেকম্মে খাচ্ছিল। এখন রেলকে লাভজনক করতে গিয়ে আপনি যদি খুব বেশি ব্যয়সাধ্য করে তোলেন, তাহলে এই ধরনের ছোট ব্যবসায়ীর উৎপাদন খরচ কিন্তু বেড়ে যাবে। এরা আবার অনেকে বড় ব্যবসায়ীর সাপ্লাই লাইন হিসাবে কাজ করে। ফলে সেই ব্যবসার উৎপাদন খরচও বাড়বে। এইভাবে সবরকম ব্যবসায়ীর উপরেই চাপ বাড়বে। এক দিকে এসব করবেন আর অন্য দিকে আপনি অভিযোগ করবেন, চীনা জিনিসের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় পেরে উঠছেন না, তারা আপনার বাজার দখল করে নিচ্ছে। আপনি তেলের দাম লিটার পিছু ১০০ টাকার বেশি করবেন, বিদ্যুতের খরচ চীনের দ্বিগুণ করবেন, পরিবহণ খরচ চীনের দ্বিগুণ করবেন। তারপর বলবেন, আমার ব্যবসায়ীরা কোনো কাজের নয়। এ তো কোনো কাজের কথা নয়।

অর্থাৎ সরকার এমন অনেক ব্যবসার সাথে যুক্ত, যেগুলো এক দিকে যেমন মানুষকে, বিশেষ করে গরীব মানুষকে নানারকম পরিষেবা দেয়, তেমনি অন্য দিকে আমাদের উৎপাদন ব্যবস্থাটাকে সচল রাখে। কম খরচে নানারকম উৎপাদনে এই ক্ষেত্রগুলোর উল্লেখযোগ্য অবদান আছে। একথা অগ্রাহ্য করে আপনি যদি লাভ কত হল, তা বিচার করেন তা হলে সে বিচার সম্পূর্ণ ভুল।

এই যে বহু বছর ধরে করদাতাদের টাকায় গড়ে ওঠা কোম্পানিগুলো সরকার এমন শর্তে বেসরকারি হাতে তুলে দিচ্ছেন, যা তাদের পক্ষে বেশ সুবিধাজনক। এই সরকারিগুলো সংস্থাগুলোর অবস্থার কিছুটা উন্নতি করে নিয়ে তারপর বিক্রির চেষ্টা করলে কি ভাল হত?

দেখুন, আজ সরকার যদি কোনো সরকারি সংস্থাকে বেসরকারি করার নীতিগত সিদ্ধান্ত নেয়, তাহলে কাজটা করে ফেলার অনেকরকম উপায় আছে। আপনি করদাতাদের স্বার্থের কথা বললেন। সত্যিই তো। আপনি দুর্গাপুরে যান, রাঁচিতে যান, ভোপালে যান বা অন্য কোথাও গিয়ে দেখুন, বিভিন্ন সরকারি প্রকল্পগুলো করার সময়ে কৃষক এবং অন্যান্য সাধারণ মানুষের থেকে জমি নেওয়া হয়েছিল। প্রকল্পের জন্য যত জমি দরকার তার চেয়ে অনেক বেশি জমি নেওয়া হয়েছিল। গরীব মানুষ নামমাত্র দামে বা বিনামূল্যে সরকারকে জমি দিয়েছিল। আমাদের গ্রামের দিকে অনেক জায়গায় সরকারি হাসপাতাল করার জন্য মানুষ স্বেচ্ছায় প্রায় বিনা পয়সায় জমি দিয়ে দিয়েছে। কেন? না তাদের প্রত্যাশা ছিল যে এই জমিতে হাসপাতাল হলে সেটা দেশের কাজে লাগবে, দেশের মানুষ শস্তায় বা বিনামূল্যে চিকিৎসা পাবে। এটাও তো এক ধরনের বিনিয়োগ। আজ যদি সেই কারখানা, সেই হাসপাতাল বেসরকারিকরণ করে দেওয়া হয় তাহলে সেই মানুষগুলোর বিনিয়োগের মূল্য কীভাবে দেওয়া হবে? এগুলো নৈতিক প্রশ্ন।

দ্বিতীয়ত, আমি যদি বিক্রিই করি, তাহলে একই ধারায় কেন ভাবব? মানে যেমন ধরুন, এয়ার ইন্ডিয়া একটা দেনায় ডুবে থাকা কোম্পানি। কেউ কিনতেই চাইছিল না। তা বলে টাটা যে খুব ক্ষতিস্বীকার করে কিনেছে তা কিন্তু নয়। এই কেনাবেচায় ওদের একটাই বড় দায়ভার নিতে হল, সেটা হল এয়ার ইন্ডিয়ার বিপুল কর্মীবাহিনী। এয়ার ইন্ডিয়াতে একসময় যত কর্মী নিয়োগ করা হয়েছে, হয়ত তত কর্মীর প্রয়োজন ছিল না। তাছাড়া এয়ার ইন্ডিয়া তার কর্মচারীদের যেসব সুযোগ সুবিধা দিয়ে এসেছে — বিনামূল্যে ভ্রমণ ইত্যাদি — সেগুলো কোথাও দেওয়া হয় না। আমার মতে সরকারের এই সুবিধাগুলো দেওয়া উচিত নয়। পর্যাপ্ত বেতন দেওয়া সত্ত্বেও এইসব সুযোগ সুবিধা দেওয়ার কোনো মানে হয় না। এটা এয়ার ইন্ডিয়ার ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়ার একমাত্র কারণ না হলেও অন্যতম কারণ। সরকার কেন এইসব ক্ষেত্রে কাটছাঁট করে কোম্পানিটার পুনরুজ্জীবনের চেষ্টা করেনি সেটাও ভাবা দরকার।

https://nagorik.net/ এ প্রকাশিত

বামেদের মধ্যবিত্ত-কেন্দ্রিকতার সংকট কিংবা দ্বিমেরু-বঙ্গের এক নিশ্চিন্ত নাগরিকের প্রলাপ

বিজেপির রামনবমীর বিপরীতে তৃণমূলের হনুমানপুজো, অযোধ্যার রামমন্দিরের বিপরীতে দীঘার জগন্নাথ মন্দির… এগুলোই বাংলার রাজনীতির অভিজ্ঞান হয়ে উঠতে পারে।

পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনের ফল প্রকাশের অন্তিম লগ্নে ভারতীয় জনতা পার্টির রাজ্য সহ-সভাপতি জয়প্রকাশ মজুমদারের সাংবাদিক সম্মেলন দেখছিলাম। ২০০১-এর বিধানসভা নির্বাচনে বিরাট আশা জাগিয়ে বিধ্বস্ত হওয়ার পর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের চেহারাটা অনেকেরই মনে আছে। জয়ের জন্য প্রাণপণ লড়াই করার পর পরাজিত হলে কোনও নেতা বা নেত্রীর প্রতিক্রিয়া ওরকমই হওয়ার কথা। অথচ, জয়প্রকাশবাবু দেখলাম বেশ স্থিতধী। তিন থেকে ৭৭-এ পৌঁছনোতেই তিনি সাফল্য (নাকি সান্ত্বনা?) খুঁজে পেয়েছেন। ২০১৯ লোকসভা নির্বাচনে শতাধিক বিধানসভা আসনে এগিয়ে থাকার কথা সুবিধামত ভুলেই গেলেন বোধহয়। কিংবা হয়তো ওটা কর্মীদের মনোবল ভাঙতে না-দেওয়ার কৌশল। তবে যে-কথা বলতে গিয়ে তাঁর মাস্ক-পরা মুখও মনে হল উদ্ভাসিত, কণ্ঠস্বরে স্পষ্ট তৃপ্তি— তা হল তৃতীয় শক্তির অবলুপ্তি। বাম, কংগ্রেস, আইএসএফ যে রাজ্যের রাজনীতিতে কোনও সাড়াই ফেলতে পারেনি এবং আগামী দিনে এই রাজ্যের রাজনীতি যে বিজেপি আর তৃণমূলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে— এই ঘোষণায় রীতিমত জয়ের প্রকাশ দেখলাম। বোঝা গেল, রাজ্য জয়ের স্বপ্ন সফল না-হলেও পশ্চিমবঙ্গকে দ্বিমেরু রাজনীতির দিকে নিয়ে যাওয়াও বিজেপির পক্ষে যথেষ্ট সন্তোষজনক ফলাফল।

২০১৪-র পর থেকে পশ্চিমবঙ্গের আয়তনের কোনও রাজ্যে বিজেপি-কে এরকম বিশ্রী হারের মুখ দেখতে হয়নি। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষের সংখ্যা, দেশভাগের ইতিহাস ইত্যাদি নানা কারণে পশ্চিমবঙ্গে ধর্মীয় মেরুকরণের খেলা শুরু হয়েছিল। আরও নানাবিধ মেরুকরণের আশঙ্কাও প্রকট হয়ে উঠেছিল। উপরন্তু, বিজেপি এই রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচনে জিতে গেলে ২০২৪-এ তাদের লোকসভায় জেতার পথ পরিষ্কার হয়ে যাবে, এরকমও অনেকে ভাবতে শুরু করেছিলেন। তা ছাড়াও বিজেপি-শাসিত রাজ্যগুলোর যা সার্বিক অবস্থা, সেসব দেখে পশ্চিমবঙ্গবাসীর শঙ্কিত হওয়ার যথেষ্ট কারণ ছিল। সর্বোপরি অন্য রাজ্যের মানুষও উদগ্রীব ছিলেন দেখার জন্য যে, বাঙালি সংস্কৃতি হিন্দুত্বের কাছে হার মানে কি না। সেটা ঘটলে সঙ্ঘ পরিবারের হিন্দুরাষ্ট্রের বৌদ্ধিক জয় হত। ফলে, তৃণমূল কংগ্রেসের জয় অনেকের কাছেই উল্লাসের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। রাজ্যের বাইরের মানুষের এই উল্লাস শতকরা একশো ভাগ সঙ্গত, কারণ যে কোনও মূল্যে বিজেপির পরাজয়ই তাঁদের প্রয়োজন ছিল। এই রাজ্যে বিজেপি ক্ষমতাসীন হলে দেশব্যাপী তার সুদূরপ্রসারী প্রভাব পড়তই। যেমন, এই মুহূর্তে করোনা সামলানোয় গাফিলতি এবং অনিচ্ছা প্রকাশ হয়ে যাওয়ায় কেন্দ্রীয় সরকার প্রবল চাপে পড়েছে বলেই দিল্লিতে আন্দোলনরত কৃষকদের করোনার দোহাই দিয়ে তুলে দিতে পারছে না— যা গত বছর শাহিনবাগের সিএএ-বিরোধী আন্দোলনের বেলায় করতে পেরেছিল। পশ্চিমবঙ্গে জিতে গেলে মোদি-অমিত শাহ জুটি কৃষকদের ওপর বলপ্রয়োগ করতেও পিছপা হতেন বলে মনে হয় না। কিন্তু সেসব সংক্রান্ত স্বস্তি ও উল্লাস পেরিয়েও, এই রাজ্যের মানুষের ভবিষ্যতের স্বার্থে কিছু কথা ভেবে দেখা প্রয়োজন বই কী!

প্রায় ৩৮ শতাংশ ভোট পেয়েছে বিজেপি। এর সবটাই সরকারবিরোধী ভোট তো বটেই, কিন্তু কী কারণে এই ভোটাররা সরকারের বিরোধী? যদি জনপ্রিয় যুক্তি অনুযায়ী ধরে নিই এদের বিজেপিকে ভোট দেওয়ার একটাই কারণ— মুসলমান বিদ্বেষ, তা হলে বিশেষ উদ্বেগের কারণ রয়েছে। গত পাঁচ বছরে বিজেপির ক্রমবর্ধমান শক্তিতে আসানসোল, ধূলাগড়, বসিরহাট, তেলেনিপাড়ার মতো নানা জায়গায় সাম্প্রদায়িক অশান্তি হতে দেখা গিয়েছে। এর কোনওটাই তৃণমূলের সংগঠন আটকাতে পারেনি। বহু জায়গাতেই মানুষের অভিযোগ, প্রশাসনিক প্রতিক্রিয়াও পর্যাপ্ত ছিল না। পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার পর নড়েচড়ে বসেছে। ২০১৬-তে ১০.১৬ শতাংশ ভোট পাওয়া সাকুল্যে তিন বিধায়কের বিজেপিই যখন এত অশান্তি পাকাতে পেরেছে, তখন প্রায় চার গুণ বেশি ভোট পাওয়া ৭৭ জন বিধায়কের বিজেপি লক্ষ্মী ছেলেটি হয়ে থাকবে কি? মনে রাখতে হবে, এখন তাদের ১৮ জন সাংসদও আছেন, কেন্দ্রে তাদের সরকার। পান থেকে চুন খসলে তা নিয়ে একটা বড়সড় কাণ্ড ঘটিয়ে ফেলার রসদ তাদের আছে। গত কয়েক বছরে বাংলার সমাজে যে গভীর সাম্প্রদায়িক ক্ষত তৈরি হয়েছে তা যে বিজেপির পরাজয়ের সঙ্গে সঙ্গে বাতাসে মিলিয়ে যাবে, এমন মনে করার কোনও কারণ নেই। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিপুল সমর্থন নিয়ে প্রত্যাবর্তনে প্রমাণিত হল যে, ইমাম ভাতা দিলে অন্যায় হয় না, পুরোহিত ভাতা দেওয়াও ভালো। যেহেতু বিজেপির প্রচার ছিল পশ্চিমবঙ্গে দুর্গাপুজো করতে দেওয়া হয় না, সেই প্রচারকে মিথ্যা প্রমাণ করতে সরকারের ক্লাবগুলোকে পুজোর খরচ দেওয়াও অন্যায় নয়। অতএব আগামী পাঁচ বছর বিজেপির প্ররোচনা দেওয়ার মতো ইস্যুর অভাব হবে না, আর তৃণমূল সরকার সে সব প্ররোচনার রাজনৈতিক মোকাবিলা না-করে দড়ির উপর ব্যালান্সের খেলা খেলে যাবেন— এমন সম্ভাবনা তাই প্রবল।

যা গত দশ বছরে হয়নি, আগামী পাঁচ বছরে হবে— এমন আশা করা যুক্তিযুক্ত নয়। তাই ২০১১ থেকে সারা বাংলায় ছড়িয়ে পড়া আরএসএস-এর সংগঠনের বিরুদ্ধে শাসক দল সত্যিকারের কোনও রাজনৈতিক প্রতিরোধ গড়ে তুলবে— এমন ভাবা, অতএব, বাতুলতা হবে। অবশ্য সরকারি দল প্রতিরোধ করতে যাবেই বা কেন? মুখ্যমন্ত্রী তো এই সেদিন ইন্ডিয়া টুডে-র সাংবাদিক রাহুল কাঁওয়ালকে বলেছেন, আরএসএস-কে নিয়ে তাঁর কোনও সমস্যা নেই, কারণ তারা ভোটে লড়ে না তাঁর সমস্যা বিজেপিকে নিয়ে। বিজেপিকে হারানো হয়ে গেছে, অতএব আরএসএস এবং তৃণমূলের শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান চলতেই পারে বোধহয়। আগামী পাঁচ বছর, বা জয়প্রকাশবাবুর কথা ঠিক হলে, অতিদূর ভবিষ্যৎ পর্যন্ত বিজেপির রামনবমীর বিপরীতে তৃণমূলের হনুমানপুজো, অযোধ্যার রামমন্দিরের বিপরীতে দীঘার জগন্নাথ মন্দির… এগুলোই বাংলার রাজনীতির অভিজ্ঞান হয়ে উঠতে পারে।

দুর্নীতির অভিযোগ, সে আম্ফানের ত্রাণেই হোক কিংবা এসএসসি পরীক্ষার মাধ্যমে চাকরি দেওয়ার ক্ষেত্রেই হোক, বাংলার নির্বাচনে সে সব যে কোনও ইস্যু নয় তা এবারের নির্বাচনে পরিষ্কার হয়ে গেছে। ফলত কর্মসংস্থানও ইস্যু নয়, হয়তো আগামীদিনেও হবে না। শিল্প হবে কি হবে না, শিক্ষিত বেকাররা চাকরি পাবে কি পাবে না— প্রচারে অনবরত সে সব কথা বলে এবং ইশতেহারে লিখে বিরাট গোল্লা পেয়েছে বাম দলগুলো এবং কংগ্রেস, আইএসএফ একটার বেশি আসনে জিততে পারেনি। সাংবাদিক সম্মেলনে তাদের সম্বন্ধে প্রশ্ন আসতে মুখ্যমন্ত্রী একটাও শব্দ খরচ করতে চাইলেন না, করার কথাও নয়। তারা যে ইস্যুগুলো তুলে ধরেছিল, সেগুলো তাঁর মাথায় থাকলেই নাগরিকদের পক্ষে যথেষ্ট। কিন্তু মুখ্যমন্ত্রীর দিক থেকে ভাবলে মানতেই হয়, তাঁর সে সব মনে রাখার কোনও প্রয়োজন নেই। যারা মনে রেখেছিল, তাদের সব মিলিয়ে সাড়ে আট শতাংশ মানুষ ভোট দিয়েছেন। অত কম মানুষের চাওয়া-পাওয়া নিয়ে একজন মুখ্যমন্ত্রীর মাথা ঘামানোর অর্থ হয় না। আর বিজেপি যে ওসব নিয়ে ভাবতে রাজি নয় তা কেন্দ্রীয় সরকার এবং তাদের দখলে থাকা অন্য রাজ্য সরকারগুলোর কার্যকলাপ দেখলেই বোঝা যায়। সুতরাং পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতি এখন থেকে ইস্যুকেন্দ্রিক না-হয়ে চিহ্নকেন্দ্রিক হয়ে উঠলে অবাক হওয়ার কিছু নেই। অর্থাৎ মুখ্যমন্ত্রী কালীঘাট মন্দিরে গেলেন কি না, মহরমের দিন প্রতিমা বিসর্জনের অনুমতি দেওয়া হল কি না— এই সব।

সাধারণ নাগরিকের স্বস্তি এইখানে, যে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের চালু করা একগুচ্ছ জনমুখী প্রকল্প, যার সুবিধা গরিব প্রান্তিক মানুষ পেয়ে থাকেন, সেগুলো অন্তত চালু রইল। বিজেপি যেখানে যেখানে ক্ষমতায় আছে, সেখানে এরকম প্রকল্পের কোনও স্থান নেই। আয়ুষ্মান ভারত[3] বা ফসল বিমা যোজনার[4] মতো দু-একটা কেন্দ্রীয় সরকারি প্রকল্প যা-ও বা আছে, সেগুলো সবই প্রকৃতপক্ষে ধোঁকার টাটি বলে অভিযোগ।

স্পষ্টত, আর একটা আশা নিয়ে মানুষ তৃণমূলকে বিপুল ভোটে জয়যুক্ত করেছেন, তা হল, বাংলায় এনআরসি হবে না। আইনত এনআরসি করা বা না-করা কেন্দ্রীয় সরকারের সিদ্ধান্ত। তবে মানুষ নিশ্চয়ই আশা করেন দিদি এই রাজ্যে এই প্রক্রিয়া প্রাণপণে আটকাবেন। গত বছর যখন বিভিন্ন ধারার বামপন্থীরা, নানা বয়সের মহিলারা সিএএ-এনআরসি-এনপিআর আটকাতে আন্দোলন করছিলেন তখন দেখা গিয়েছিল মুখ্যমন্ত্রী নিজে এই নিয়ে মিছিল-মিটিং করলেও অন্যদের আন্দোলনের প্রতি রাজ্য প্রশাসন বিশেষ সদয় নয়। আশা করা যায়, এখন আর সে সমস্যা হবে না। প্রধান বিরোধী দল বিজেপি তো আর এ নিয়ে আন্দোলন করতে যাবে না, শক্তিহীন বামফ্রন্টই বা কী এমন আন্দোলন করবে? হাতে রইলেন বিকল্প বামেরা, যাঁরা এরপর ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে আন্দোলন আরও তীব্র করবেন বলে শোনা যাচ্ছে। তাঁরা তো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিবেক। তৃণমূলের এই বিপুল জয়ে তাঁদের ‘নো ভোট টু বিজেপি’ আন্দোলনের যথেষ্ট অবদান— এই দাবিতে রবিবাসরীয় আকাশ-বাতাস তাঁরা মুখর করে তুলেছিলেন। সুতরাং তাঁরা আন্দোলন করলে মমতা নিশ্চয়ই আপত্তি করবেন না। আশা করা যায়, দিদি আগামী পাঁচ বছর ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে এঁদের সংগ্রামকে মমতাময়ী পক্ষিমাতার মতো দুই ডানা দিয়ে আগলাবেন। ২০১৮ সালে যেমন চেয়েছিলেন পঞ্চায়েতে শুধু তাঁর দলই থাকুক, এখন তেমন দাবি আশা করা যায় করবেন না যে, ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধেও শুধু তাঁর দলই লড়ুক।

শূন্যে পৌঁছে যাওয়া কংগ্রেসের এ-রাজ্যে ভবিষ্যৎ কী, বলা দুষ্কর। একা কুম্ভ অধীর চৌধুরীর গড় মাটিতে মিশে গেছে, প্রবীণ জনপ্রিয় নেতা আব্দুল মান্নান ধরাশায়ী। বৃদ্ধতান্ত্রিক সিপিএমেও একগুচ্ছ নতুন মুখ দেখা গেছে, কিন্তু কংগ্রেসে? সিপিএমের কচিকাঁচারা যদি ‘একলা চলো রে’ নীতিতে ফিরে যেতে চান তা হলে কংগ্রেসের কী হবে, দেবা ন জানন্তি।

অবশ্য ফলপ্রকাশের পর আটচল্লিশ ঘন্টা কেটে গিয়ে থাকলেও রাজ্য সিপিএমের শীর্ষ নেতাদের কেউ দায়িত্ব স্বীকার করে পদত্যাগ করেছেন, এমন খবর নেই। একটি তথাকথিত বিপ্লবী পার্টির শান্ত হ্রদের মতো অন্দরমহলে একমাত্র ঢেউ বলতে টিভির পর্দায় পরাজিত সিপিআইএম প্রার্থী তন্ময় ভট্টাচার্যের নেতৃত্বের বিরুদ্ধে অকস্মাৎ বিষোদ্গার। কমিউনিস্ট পার্টির কর্মীর বাইরে এ-ভাবে কথা বলা শৃঙ্খলাভঙ্গ কি না, সে বিতর্কে না-গিয়েও বলা যায়, তাঁর সমালোচনায় গঠনমূলক কিছু ছিল না। এই ফলের জন্য “পলিটব্যুরোর দু-একজন নেতা” ছাড়া তিনি দুটো কারণ দেখিয়েছেন। সর্বক্ষণের কর্মীদের যথেষ্ট ভাতা না-পাওয়া আর আইএসএফ-এর সঙ্গে জোট করা। দ্বিতীয়টার ব্যাখ্যা দেননি, আর প্রথমটা ঠিক থাকলে কীভাবে শূন্যের বদলে খাতায় পাঁচটা বা দশটা আসন জমা পড়ত, তা বুঝতে চেষ্টা করার চেয়ে বাইফোকাল চশমা হারানো মানুষের পক্ষে সূচে সুতো পরানো সহজ। উপরন্তু তন্ময়বাবু যে ভাষায় বামপন্থীদের রাস্তার রাজনীতিতে বিশ্বাস রাখাকে কটাক্ষ করেছেন, তাতে তাঁর মার্কস্‌বাদে আস্থাকে সন্দেহ করার যথেষ্ট কারণ আছে। আইএসএফ-এর সঙ্গে জোট করা নিয়ে আপত্তি আর কংগ্রেসের সঙ্গে জোট করা নিয়ে প্রবল আবেগ দেখে মনে হয়নি, আন্দোলনের মাধ্যমে মানুষের সঙ্গে নিবিড় যোগাযোগ স্থাপন করার মতো কোনও পথ তিনি নিজের দলকে দেখাতে চান। বোধহয় তাঁর মনে হয়েছে স্রেফ আইএসএফ-কে জোটের বাইরে রাখলেই মানুষ তাঁদের ঢেলে ভোট দিতেন। মীনাক্ষী, ঐশী, দীপ্সিতা, সৃজন, প্রতীকুরদেরও তা-ই ধারণা কি না, কে জানে! যদি তা-ই হয়, তা হলে অদূর ভবিষ্যতে বামেদের বাংলায় ঘুরে দাঁড়ানোর সম্ভাবনা শূন্য।

আসলে সিপিএমের রাজনীতিতে শ্রেণির প্রশ্ন বহুদিন ধরেই অবহেলিত। তা না-হলে ওঁরা আগেই বুঝতে পারতেন যে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পক্ষে নির্ণায়ক ভোট দেন গরিব মানুষ, যাঁরা তাঁর বিভিন্ন সরকারি প্রকল্পে উপকৃত। আমাদের দেশে যে কোনও নির্বাচনেই নির্ণায়ক ভোট আসলে গরিব মানুষের, কারণ তাঁরাই সংখ্যাগরিষ্ঠ। গত কয়েক বছরে সিপিআইএম-এর সোশাল মিডিয়া নির্ভরতা, এবং কারা সোশাল মিডিয়ায় ওই পার্টির জয়পতাকা ওড়ান তা দেখলে পরিষ্কার বোঝা যায় সিপিআইএম-এর মূল ভোটার হয়ে দাঁড়িয়েছেন মধ্যবিত্ত এবং উচ্চবিত্ত মানুষ। এঁদের অনেকেই আসলে অভ্যাসে সিপিআইএম। পরিবার সিপিআইএম সমর্থক বলে এঁরা সিপিআইএম সমর্থক, অথবা অল্প বয়সে কোনও বাম গণসংগঠনের সদস্য ছিলেন, সেই আবেগ রয়ে গেছে। গরিব মানুষ কোনও পার্টির দ্বারা, সরকারের দ্বারা উপকৃত হলে তা তাঁর ভোটকে প্রভাবিত করে। কিন্তু উপর্যুক্ত শ্রেণির মানুষের সেভাবে উপকৃত হওয়ার ব্যাপার নেই, তাঁরা চলতি হাওয়ার পন্থী। এ বারের ভোটে হাওয়া ছিল বামেরা জিতবে না, অতএব ভোট দিয়ে লাভ নেই। উপরন্তু দাড়ি-টুপি পরা মুসলমান ধর্মগুরুর সঙ্গে জোট বাঁধাও এঁদের পছন্দ হয়নি। তাই লোকসভা নির্বাচনে পাওয়া সাত শতাংশের মধ্যে থেকেও এই দুই বা তিন শতাংশ বেরিয়ে গিয়ে বিজেপি-বিরোধিতার কারণে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে ভোট দিয়েছেন, এখন সোশাল মিডিয়া ভরিয়ে তুলছেন স্বীকারোক্তিতে। এরই মধ্যে হঠাৎ দ্বিমেরু রাজনীতির বিপদগুলো খেয়াল হওয়ায় কেউ কেউ লম্বা পোস্ট লিখে তৃণমূল কংগ্রেসকে খেয়াল করাচ্ছেন, তাঁদের ভোট দেওয়া হয়েছে স্রেফ বিজেপিকে আটকাতে। পার্টিটাকে পছন্দ হয়েছে বা সরকারের কাজ পছন্দ হয়েছে বলে নয়।

শ্রেণি সচেতনতার অভাবে, সমাজবিজ্ঞানের অ-আ-ক-খ জ্ঞানের অভাবে এই শ্রেণির চিন্তাভাবনাই কিন্তু বর্তমান বাম নেতা এবং প্রার্থীদের বিপুলভাবে প্রভাবিত করে। তাই মমতার জনকল্যাণমূলক প্রকল্পগুলোকে সিপিআইএম কর্মীরা প্রায়ই হেয় করেন। “মানুষ আপনার দান/ ভিক্ষা চায় না, মানুষের রোজগারের ব্যবস্থা করুন”— এই চরম নব্য উদারনীতিবাদী কথাটা মিটিং-এ বা সোশাল মিডিয়ায় সিপিআইএম-এর লোকেদের প্রায়শই বলতে দেখা যায়। ওঁরা জানেন না অথবা উপলব্ধি করেন না যে, সরকারের টাকা আসলে করদাতাদের টাকা এবং সে কর একজন ধনী ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে একজন রিকশাচালক পর্যন্ত সকলেই দেন। সুতরাং নাগরিকের জন্য চালু করা কোনও সরকারি প্রকল্প আদতে দান নয়। কন্যাশ্রীর সাইকেল যেমন দান নয়, স্বাস্থ্যসাথী কার্ডের প্রিমিয়ামও দান নয়। শুধু তা-ই নয়, পুঁজিবাদী ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতার মধ্যে পিছিয়ে পড়া মানুষের জন্য এগুলো করা কল্যাণকামী রাষ্ট্রের বহু পুরনো কৌশল। বামফ্রন্ট সরকারও এমন প্রকল্প চালাত। কথাগুলো কিন্তু বিস্তর প্রশংসা কুড়োয় মধ্যবিত্ত, উচ্চবিত্ত সমর্থকদের থেকে। ফলে, ওঁরা ভাবেন, একেবারে ঠিক কথাই বলা হয়েছে এবং বাস্তবে গরিব মানুষের থেকে আরও দূরে সরে যান।

এই মধ্যবিত্ত-কেন্দ্রিকতা না-কাটলে সিপিআইএম-এর আর কোনও ভবিষ্যৎ নেই।

অতএব দ্বিমেরু পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে রুজিরোজগারের প্রশ্ন জিইয়ে রাখার দায়িত্ব এখন পড়ল বিকল্প বামেদের কাঁধে। তাঁদের অনেককালের অভিযোগ, সিপিআইএম বামপন্থার বদনাম করছে। একটিবার সুযোগ পেলেই তাঁরা দেখিয়ে দিতে পারেন আসল বামপন্থা কী, কিন্তু সিপিআইএম তাঁদের জায়গা ছাড়ে না। সিপিআইএম ক্ষমতা থেকে চলে যাওয়ার পরের দশ বছরেও সে সুযোগ ওঁরা পাননি। অনেকটা ওই ‘আনফিট’ বর্ষীয়ান ক্রিকেটার যেমন অতীতের পারফরম্যান্সের জোরে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে খেলেই যান, আর বেচারা তরুণ প্রতিভাবানদের রিজার্ভ বেঞ্চে বসেই জীবন কাটাতে হয়। নির্বাচকদের অসীম কৃপা, এবার তাঁরা দলের সেই বোঝাগুলিকে বিদেয় করার বন্দোবস্ত পাকা করে দিলেন। আশা করা যাক, তরুণরা সেঞ্চুরি, ডবল সেঞ্চুরির ফুলঝুরি ছোটাতে পারবেন শিগগিরই।

https://4numberplatform.com/ এ প্রকাশিত

এই মৃত্যু উপত্যকাই আমার দেশ

এখন কোথায় গেল কোলবালিশ আর কোথায় গেল প্রাচীন ভারতের বিজ্ঞান, যা সবদিক থেকে পাশ্চাত্যের চেয়ে উন্নত? কোনটাই পারল না তো বাঁচাতে?

কাব্যি করবেন না। এই মৃত্যু উপত্যকাই আমার দেশ, এই জল্লাদের উল্লাসমঞ্চের প্রত্যেকটা বাঁশ আমাদের নিজের হাতে পোঁতা। এখন চোখ বড় বড় করে বিস্ময় প্রকাশ করলে চলবে না। যখন বেসরকারিকরণকে সর্বসন্তাপহর বটিকা বলেছিলেন, যখন সিগারেটে সুখটান দিয়ে বলেছিলেন “ফেলো কড়ি মাখো তেল”, তখন ভেবেছিলেন হাসপাতালে শয্যা খালি থাকলে তবে আপনার মেডিক্লেম কাজে লাগবে? মনে ছিল না অক্সিজেন কম পড়লে আপনি কোটিপতি হলেও লাভ হবে না?

ডাক্তার কাফিল খান নিজের পকেটের পয়সা দিয়ে অক্সিজেন আনিয়ে শিশুদের প্রাণ বাঁচাতে গিয়েছিলেন। সেই অপরাধে উত্তরপ্রদেশ সরকার তাঁকে হাজতবাস করাল দীর্ঘদিন। আজ সেই রাজ্যে শ্মশানে জায়গা নেই বলে ফুটপাথে পোড়ানো হচ্ছে মৃতদেহ।

A report by @lokeshRlive from Ghaziabad tearing into govt’s suppression of Covid casualties in UP.

pic.twitter.com/Elt9Rl9baZ

— Piyush Rai (@Benarasiyaa) April 18, 2021

অথচ সরকার বলছে এপ্রিল মাসে কোভিডে মৃতের সংখ্যা মাত্র দুই!

Story of Ghaziabad. pic.twitter.com/Q6JXjLHIJK

— Aditya Raj Kaul (@AdityaRajKaul) April 18, 2021

কে নির্বাচিত করেছিল এমন সরকারকে? ক্রেনিয়াস গ্রহের অ্যাং আর তার জাতভাইরা? এখন সে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ নিজেও কোভিডাক্রান্ত। কিন্তু গত বছর যখন প্রধানমন্ত্রীর বিধানে ভাইরাস তাড়াতে থালা বাজিয়েছিলেন, সে দৃশ্য যারা হাঁ করে টিভিতে দেখেছে, নিজেও সোৎসাহে থালা বাজিয়েছে — তারা তো এই দেশেরই মানুষ। পথে ঘাটে ঝগড়া করেছে, হোয়াটস্যাপ ফরোয়ার্ডকে বেদবাক্য বলে ধরে নিয়ে আওয়াজের চোটে করোনা ভাইরাস মরে যাবে, এই তত্ত্ব প্রচার করেছে যে বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রিধারীরা — তারা সবাই এ দেশের মানুষ। এর বিপরীতে করোনা অতিমারী আসলে এক পাহাড়প্রমাণ ফাঁকি, লড়াই আন্দোলন দমন করার জন্য সরকারের তৈরি এক ধাপ্পা, করোনা সাধারণ সর্দিকাশি, ফ্লু-এর চেয়ে বেশি কিছু নয় — প্রবল আত্মবিশ্বাসে এসব বলে গেছে যারা, তারাও কেউ ভিনগ্রহের বাসিন্দা নয়।

ইন্ডিয়ান মেডিকাল অ্যাসোসিয়েশন জানাচ্ছে এখন অব্দি চলতি অতিমারীতে অন্তত ৭৩৯ জন এম বি বি এস ডাক্তার মারা গেছেন, এই দ্বিতীয় ঢেউতেই তিনজন। আই এম এ না বললেও আমরা নিজেদের অভিজ্ঞতায় জানি — ডাক্তার, নার্সরা বারো ঘন্টা, ষোল ঘন্টা ডিউটি করছেন সেই গত বছরের মার্চ থেকে। খাওয়ার সময় নেই, বাথরুমে যাওয়ার সময় নেই, ঋতুমতী মহিলারা ন্যাপকিন বদলানোর সময় পর্যন্ত পাচ্ছেন না। তাঁদের ধন্যবাদ জানানোর জন্যই নাকি মহামতি নরেন্দ্র মোদী থালা বাসন বাজাতে বলেছিলেন দেশের সকলকে। এ দেশের অনুগত মানুষ তাঁর নির্দেশ অক্ষরে অক্ষরে পালন করেছিল। অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারামণ ঘটা করে ১.৭ লক্ষ কোটি টাকার কোভিড-১৯ ত্রাণ প্যাকেজ ঘোষণা করেছিলেন। তাতে সাফাই কর্মচারী, ওয়ার্ড বয়, নার্স, আশা কর্মী, প্যারামেডিক, টেকনিশিয়ান, ডাক্তার, বিশেষজ্ঞ প্রমুখের জন্য ৫০ লক্ষ টাকার বিমা প্রকল্প ছিল। ২৬শে মার্চ, ২০২০ তারিখে মন্ত্রী বলেছিলেন এতে নাকি প্রায় ২২ লক্ষ স্বাস্থ্যকর্মী উপকৃত হবেন। এ বছরের ২৪শে মার্চ কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্য মন্ত্রক সার্কুলার জারি করে সেই বিমা প্রকল্প বন্ধ করে দিয়েছে। [১]

‘দ্য নিউ ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’ জানাচ্ছে এই এক বছরে মাত্র ২৮৭ জন এই বিমার টাকা দাবি করেছেন। এই ধূর্ত, নির্দয় সরকারকে গদিতে বসিয়েছে কি পাকিস্তানের মানুষ? রাজ্যে রাজ্যে (পশ্চিমবঙ্গে তো বটেই) এদেরই ক্ষমতায় আনতে উদগ্রীব কি বাংলাদেশের মানুষ?

পশ্চিমবঙ্গে তো আবার আজকাল বাংলাদেশ বাদ দিয়ে কোন আলোচনা চলে না। ওটা যে আলাদা দেশ তা গুলিয়ে যায় অনেকসময়। ও দেশের ধর্ষিতাকে এ রাজ্যের নির্বাচনে ইস্যু করার চেষ্টা হয়। ও দেশের লোকে পশ্চিমবঙ্গ ভরে গেছে বলে যারা ভীষণ চিন্তিত, তাদের স্বভাবতই এ দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার অব্যবস্থা নিয়ে ভাবার সময় নেই। মুশকিল হল আমরা এ দেশে ভ্যাক্সিন পাঠাচ্ছি, সে দেশে ভ্যাক্সিন পাঠাচ্ছি বলে প্রধানমন্ত্রী আস্ফালন করছেন, এদিকে ওষুধের জন্য বাংলাদেশের কোম্পানিগুলোর কাছে হাত পাততে হচ্ছে। ঝাড়খণ্ডের মুখ্যমন্ত্রী হেমন্ত সোরেন এই অবস্থায় এসে দাঁড়িয়েছেন। মোদী সরকারের কাছে বাংলাদেশ থেকে এই ওষুধ আমদানি করার অনুমতিও চেয়েছেন।

माननीय मुख्यमंत्री श्री हेमंत सोरेन जी ने रेमडेसिविर की कमी को पूरा करने के लिए बांग्लादेश की दवा कंपनियों से संपर्क साधा। केन्द्र सरकार से भी आयात की अनुमति मांगी।@HemantSorenJMM @JmmJharkhand @narendramodi @DVSadanandGowda @AmitShah @PMOIndia pic.twitter.com/ejhh40M05O

— JMM_पश्चिमी सिंहभूम (@WestsinghbhmJMM) April 18, 2021

অনুমতি পাবেন কিনা কে জানে? মোদীর অনুমতি দেওয়ার সময় হবে কি? উনি তো গোড়াতেই বলেছিলেন উনি প্রধানমন্ত্রী নন, প্রধান সেবক। ফলে ওঁর অনেক কাজ। মহারাষ্ট্রের মুখ্যমন্ত্রী উদ্ধব ঠাকরে নাকি অতিমারীর জরুরি পরিস্থিতিতে প্রধানমন্ত্রীর অফিসে ফোন করে শুনেছেন তিনি পশ্চিমবঙ্গে ভোটের প্রচারে ব্যস্ত, ফিরলে উত্তর পাবেন। ইতিমধ্যে কত মানুষ আর হাসপাতাল থেকে বাড়ি ফিরবেন না, সে খবরে প্রধানমন্ত্রীর দরকার নেই। এমন নয় যে তিনি এই প্রথম অযোগ্যতার বা নৃশংসতার পরিচয় দিচ্ছেন। গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী থাকার সময়ই তিনি নিজের জাত চিনিয়েছেন। সেসব জেনেশুনে বিষ পান তো আমরাই করেছি। এখন বিষের জ্বালায় এই মৃত্যু উপত্যকা আমার দেশ না বললে চলবে কেন?

পৃথিবীর সব দেশে কোভিডের প্রকোপে লকডাউন হয়েছে, কিন্তু লক্ষ লক্ষ মানুষকে কয়েক শো মাইল পায়ে হেঁটে বাড়ির উদ্দেশে যাত্রা করতে হয়নি, পথে ক্ষিদে তেষ্টায় মরতে হয়নি। এ দেশে হয়েছে। যখন তারা মরেছে, তখন আমরাই তো অসন্তোষ প্রকাশ করেছি, লকডাউন সত্ত্বেও এরা হাঁটছে কেন? অবৈজ্ঞানিক হলেও পোকামাকড় জ্ঞানে মানুষগুলোকে পথে বসিয়ে গায়ে স্প্রে করে স্যানিটাইজ করা হয়েছে। ওতেই নাকি কোভিড ছড়ানো বন্ধ হবে। তাতেই বা আমাদের কজনের আপত্তি হয়েছে? বিদেশ থেকে আসা বড়লোকেরা বেমালুম পরিচিতি বা টাকার জোরে কোয়ারান্টিনের বালাই না রেখে দেশের ভিতর সেঁধিয়ে গেছে আর আমরা আশঙ্কা প্রকাশ করেছি বাড়ির কাজের লোক, ক্যাটারিং-এর কাজ করা লোক, রিকশাওয়ালা, পথের ভিখারি আর প্রবাসী শ্রমিকরাই ভাইরাস ছড়াচ্ছে। লেখাপড়া শিখে অবিজ্ঞানের চাষ করেছে যারা, অমুক পাঁপড় খেলে করোনা হয় না, তমুক আসন করলে করোনা হয় না, মাথায় গোমূত্র ছেটালে করোনা হয় না — এসব বিশ্বাস করেছে যারা, তারা কোন দেশের লোক?

কত না কালক্ষেপ করেছি গোটা পৃথিবীর দখল নেওয়ার জন্য ভাইরাসটা চীন গবেষণাগারে বানিয়ে সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে দিয়েছে কিনা সেই আলোচনায়। অথচ চীন যে কয়েক মাসের মধ্যে একগাদা নতুন হাসপাতাল বানিয়ে ফেলেছিল সেদিকে নজর দিইনি। না দেশ, না রাজ্য — কোন সরকারকে প্রশ্ন করিনি আমাদের একটাও নতুন হাসপাতাল হল না কেন? মুখ্যমন্ত্রী রাস্তায় নেমে গোল কেটেছেন কাকে কোথায় দাঁড়াতে হবে, আমরা হাততালি দিয়ে বলিনি “ওঃ, কি দারুণ লিডার! সামনে দাঁড়িয়ে লড়ছেন।” করোনাকে বালিশ করে শুয়ে পড়তে বলেছেন, আমরা বলেছি “বিজ্ঞানীরাও তো তা-ই বলছেন। এ ভাইরাস তো অনেকদিন থাকবে।” এখন কোথায় গেল কোলবালিশ আর কোথায় গেল প্রাচীন ভারতের বিজ্ঞান, যা সবদিক থেকে পাশ্চাত্যের চেয়ে উন্নত? কোনটাই পারল না তো বাঁচাতে? এতদিন পরে গণেশের প্লাস্টিক সার্জারির প্রাচীন কৌশলে বিশ্বাসী প্রধানমন্ত্রীর সরকার বলছে একশোটা হাসপাতালে নতুন অক্সিজেন প্ল্যান্ট বানানো হবে পিএম কেয়ারস ফান্ডের টাকায়।[২]

দেড়শো কোটি মানুষের দেশের মোটে একশোটা হাসপাতালে অক্সিজেনের ব্যবস্থা করার টাকার খোঁজ এত দিনে পাওয়া গেল। এদিকে দুর্গাপুজোর টাকা জোগানো রাজ্য সরকার এখনো কোভিডের প্রথম ঢেউয়ের চিকিৎসা বাবদ শ্রীরামপুর শ্রমজীবী হাসপাতালের প্রাপ্য আট কোটি টাকা দেয়নি।[৩]

আহা, নিজ রাজনৈতিক এজেন্ডার স্বার্থে আমরা কত কূট তর্কই না করেছি! কেউ পশ্চিমবঙ্গের অবস্থা খারাপ বললে বলেছি “গুজরাটের অবস্থা কি ভাল? মধ্যপ্রদেশের অবস্থা কি ভাল?” যেন ঐ রাজ্যগুলোর চেয়ে কম লোক মরলেই এ রাজ্যের সরকারকে মেডেল দিতে হবে, এ রাজ্যের মানুষের জীবনের দাম নির্ভর করে ঐ রাজ্যগুলোর মানুষের জীবনের উপর। সারা দেশে কয়েকটা হাতে গোনা সংবাদমাধ্যম সাহস করে খবর করেছে যে কেন্দ্রীয় সরকার এবং অনেকগুলো রাজ্য সরকার রোগীর সংখ্যা, মৃতের সংখ্যা লুকোচ্ছে। তাদের বিরুদ্ধে অকর্মণ্য সরকারগুলো দারুণ তৎপরতায় গর্জে উঠেছে, মামলা মোকদ্দমার হুমকি দেওয়া হয়েছে। কোন পার্টির সরকার তা দেখে আমরা ঠিক করেছি খবরগুলো বিশ্বাস করব কিনা। যদি কেউ কখনো বলে ফেলে কেরালা করোনা ভাল সামলাচ্ছে, অমনি আমরা তক্কে তক্কে থেকেছি কেরালায় কেস বাড়ে কিনা, মৃত্যু বাড়ে কিনা। বাড়লেই সে কি উল্লাস! “বাঃ বাঃ! কেরালায় লোক মরেছে। হল তো? কেরালা মডেল?” এই শকুনবৃত্তি যে দেশের মানুষ করে, সে দেশই তো মৃত্যু উপত্যকা। এখন আমার দেশ না বলে এড়িয়ে গেলে হবে?

যখন সরকার বলেছিল করোনা তেমন চিন্তার ব্যাপার নয়, তখন আয়োজিত তবলিগী জামাতের মর্কজকে দেশের করোনা ছড়ানোর জন্য দায়ী করে কত না চেঁচিয়েছি। হিন্দু এলাকায় মুসলমান ফলওয়ালা, সব্জিওয়ালাকে ঢুকতে দিইনি কারণ নিশ্চিত খবর ছিল, কোভিড-১৯ ওদের বাধ্য ছেলে। ওদের শরীরে থেকে অসুস্থ করছে না, কিন্তু ওদের কথায় হিন্দুদের দেহে ঢুকে পড়ছে। এখন লক্ষ লক্ষ লোক কুম্ভমেলায় গা ঘেঁষাঘেঁষি করলেও চিন্তা নেই, কারোর করোনা হবে না। এ কথা বলছে কোন দেশের মন্ত্রীসান্ত্রীরা?[৪]

তাদের মন্ত্রী বানিয়েছে কারা? টিমবাকটুর লোকেরা?

নেতা মন্ত্রীরা নাহয় সাধারণ মানুষের জীবনের তোয়াক্কা করেন না, ভোটের জন্য লালায়িত — তাই সমাবেশ করেই চলেছেন। সে সমাবেশ বন্ধ করার দাবি তুলছে না যে সাহিত্যিক, শিল্পী, সাংবাদিক, বুদ্ধিজীবী — তারা কিসের জন্য লালায়িত? কোন দেশের লোক তারা?

এই মৃত্যু উপত্যকাই আমার দেশ, কারণ কেবল মানুষ মরছে না। কয়েক কোটি জীবন্ত মানুষের বিবেক মরে গেছে, মরে যাচ্ছে প্রতিদিন। করোনায় এখনো দ্বিতীয় স্থানে থাকলেও, যে অতিমারীতে মৃত্যু হয় বিবেকের, তাতে ভারত ইতিমধ্যেই পৃথিবীতে প্রথম স্থানে।

সূত্র:

[১] New Indian Express
[২] LiveMint
[৩] আনন্দবাজার পত্রিকা 
[৪] Firstpost

https://nagorik.net এ প্রকাশিত

উল্টো রাজা উল্টো বুঝলি প্রজার দেশে

আমাদের সংবিধান যে নিতান্ত ফেলে দেওয়ার মত একটা জিনিস সে সিদ্ধান্ত এ দেশে হয়েই গেছে

যে যা-ই বলুক, চোখ কান খোলা রাখলে বেশ টের পাওয়া যাচ্ছে পশ্চিমবঙ্গ মোটেই কোরোনা সামলাতে যা করা উচিৎ তা করছে না। বেশি কড়া কথা বলা হয়ে যাচ্ছে মনে হলে একটু নরম করে বলা যেতেই পারে করতে পারছে না। তা বলে কেন্দ্রীয় সরকার সংবিধান, যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামো ইত্যাদির তোয়াক্কা না করে জেলায় কী হচ্ছে সে সম্বন্ধে ভাষণ দেবে আর খবরদারি করতে কেন্দ্রীয় দল পাঠাবে — তাও সমর্থনযোগ্য নয়।

লক্ষণীয়, গত দুদিনে কেন্দ্রীয় সরকার কতকগুলো জায়গা সম্বন্ধে আলাদা করে বলেছে সেখানে উদ্বেগজনক অবস্থা। প্রত্যেকটা জায়গাই অ-বিজেপি শাসিত রাজ্যে — কলকাতা, মুম্বাই, জয়পুর, ইন্দোর। কলকাতার (এবং হাওড়ার) অবস্থা আমরা আশেপাশের লোকেরা জানি, তাই বাদ দিন। কিন্তু বাকিগুলো ভাবুন।

শুরু থেকেই দেশে সবচেয়ে বেশি টেস্ট করছে কেরালা আর মহারাষ্ট্র। স্বভাবতই ও দুটো রাজ্যে কোরোনা আক্রান্ত রোগীও বেশি পাওয়া যাচ্ছে৷ মুম্বাই মহারাষ্ট্রের রাজধানী। জয়পুর রাজস্থানে। যে রাজ্যের ভিলওয়ারাকে কদিন আগে মডেল বলেছে কেন্দ্রীয় সরকার নিজেই। সেখানে কোরোনা রোগীর সংখ্যাও কিছু অস্বাভাবিক গতিতে বৃদ্ধি পাচ্ছে না। ইন্দোর মধ্যপ্রদেশে। সে এমন এক রাজ্য যেখানে এখন অব্দি আস্ত ক্যাবিনেট নেই, স্বাস্থ্যমন্ত্রী নেই। কংগ্রেস সরকারকে সরিয়ে সবে বিজেপি সরকার শপথ নিয়েছে, তখনই লকডাউন শুরু হল। সেখানে মাঝে কয়েকদিন প্রচুর কোরোনা রোগী পাওয়া যাচ্ছিল, হঠাৎই কমতে শুরু করেছে। ভোজবাজির মত।

এর পাশাপাশি যদি বিজেপিশাসিত রাজ্যগুলোর দিকে চোখ রাখা যায়, দেখা যাবে উত্তরপ্রদেশে ঠিক কী হচ্ছে আমরা জানি না। তবলিগি জামাতের জমায়েত নিয়ে দিনরাত এত দুশ্চিন্তা আমাদের, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রক নিয়মিত আপডেট দিচ্ছে ওখান থেকে কতজনের কোরোনা হয়েছে, অথচ লকডাউন শুরু হওয়ার পর রামনবমীর দিন অযোধ্যার অনুষ্ঠান থেকে কতজনের কোরোনা হয়েছে তার কোন পরিসংখ্যান আমরা পাচ্ছি না। উত্তরপ্রদেশে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ীই কিন্তু সহস্রাধিক আক্রান্ত। তা নিয়ে কেন্দ্রীয় সরকার চিন্তিত নন। উত্তর-পূর্বাঞ্চলের রাজ্যগুলো সর্বদা দেশী বিদেশী পর্যটকে ভরে থাকে, অথচ ওদিকে একেকটা রাজ্যে দুজন, পাঁচ জন, দশ জন করে আক্রান্ত। অর্থাৎ ঐ রাজ্যগুলো বাকিদের জন্য অনুকরণীয়। তাহলে কেন্দ্রীয় সরকার বাকিদের ওদের থেকে শিখতে বলছেন না কেন, তাও পরিষ্কার নয়। ফলত কিছু রাজ্যের জন্য এই দুশ্চিন্তাকে লর্ড ডালহৌসির করদ রাজ্যগুলোর প্রজাদের জন্য দুশ্চিন্তার বেশি কিছু ভাবা শক্ত হয়ে দাঁড়াচ্ছে।

আসলে রাজ্য সরকার মানে যে কেন্দ্রীয় সরকারের অধীনস্থ অফিস নয়, তা বর্তমান সরকার মোটেই মানতে চান না।সংবিধানকে মারো গুলি। কেনই বা মারবেন না? আমাদের সংবিধান যে নিতান্ত ফেলে দেওয়ার মত একটা জিনিস সে সিদ্ধান্ত এ দেশে হয়েই গেছে। পাড়ার “আমি কিন্তু বিজেপি নই” দাদা বা দিদির সাথে কথা বললেই বুঝতে পারবেন।

অবশ্য প্রধানমন্ত্রীকে মুখ্যমন্ত্রীর প্রভু ভাবার অভ্যেসটা যারাই শক্তিশালী কেন্দ্রীয় সরকার চালিয়েছে তাদেরই বিলক্ষণ ছিল। রাজ্যপালকে দিয়ে দিনরাত বিরোধী দলের রাজ্য সরকারের পিছনে লাগা, সরকার ভেঙে দেওয়া, কাজে বাধা সৃষ্টি — সবই শুরু হয়েছে সেই বাজপেয়ীর দুর্গা ইন্দিরার আমলে। বরাবর কেন্দ্রের দাদাগিরি নিয়ে সবচেয়ে সোচ্চার ছিলেন বামপন্থীরা। তাঁরা রাজ্যগুলোকে আরো ক্ষমতা দিতে এমনকি সংবিধান সংশোধন চাইতেন, ৩৫৬ ধারার বিলোপ চাইতেন। এ সবের জন্য বাঙালির দৈনিক বেদ যারপরনাই গালাগাল দিয়েছে বামেদের। বলেছে এরা কাজ করতে চায় না বলে কেন্দ্রীয় সরকারের দিকে আঙুল তোলে।

একবার তো এক কেন্দ্রীয় মন্ত্রী হুমকিই দিয়েছিলেন যে তাঁর দল লোকসভায় ৩.৫৬% ভোট পেয়েছে, তাই তিনি প্রধানমন্ত্রীকে দিয়ে পশ্চিমবঙ্গে ৩৫৬ জারি করিয়ে দেবেন। নামটা গুগল করলে পেয়ে যাবেন। শেষ বামফ্রন্ট সরকারের আমলে তিনিই আবার বলেছিলেন পি এম টু ডি এম কাজ হওয়া উচিৎ, রাজ্য সরকারকে মানব না।

এরকম অনেক দৃষ্টান্ত আছে। কিন্তু কোন দুষ্কর্মই আগে অন্য লোক করেছে বলে বৈধ হয়ে যায় না। ফলত কেন্দ্রীয় সরকারের এই “চালুনি বলে ছুঁচ, তোর পিছে কেন ছ্যাঁদা” মার্কা তৎপরতাকে কোন যুক্তিতেই মহৎ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে ভাবা সম্ভব হচ্ছে না। “এই সময়ে রাজনীতি করবেন না” কথাটাও নেহাত খিল্লি হয়ে দাঁড়াচ্ছে। বরাবর দেখা যায় রাজনীতিকে ভাইরাসের মত পরিহার করতে বলে তারাই যারা ক্ষমতাশালী, কারণ রাজনীতি বন্ধ করতে পারলে ক্ষমতা নিরঙ্কুশ হয়। এক্ষেত্রেও ব্যাপারটা তাই। কেন্দ্র, রাজ্য উভয় সরকারের ব্যবহারই তা প্রমাণ করে। রাজ্যের ব্যবহার নিয়ে না হয় আরেকদিন কথা হবে। পিঠটাও তো বাঁচাতে হবে।

তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ

যার মেডিক্লেম করার ক্ষমতা আছে, সে ভাল চিকিৎসা পাবে। যার নেই তার জন্য তো পূতিগন্ধময় সরকারী হাসপাতাল রইল

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে কখনো ঘটেনি এমন অন্তত দুটো ঘটনা কোভিড-১৯ ঘটিয়ে ফেলেছে ইতিমধ্যেই। প্রথমত, অলিম্পিক এক বছর পিছিয়ে দিয়েছে। দ্বিতীয়ত, লন্ডনের অল ইংল্যান্ড ক্লাবের বার্ষিক টেনিস প্রতিযোগিতা, যা সবাই উইম্বলডন নামে চেনে, সেটাও এ বছরের মত বাতিল হয়ে গেছে। প্রাণহানির হিসাবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের চেয়ে এখনো অনেক পিছিয়ে থাকলেও ব্যাপ্তিতে নতুন কোরোনাভাইরাস দুটো বিশ্বযুদ্ধকেই ছাড়িয়ে গেছে। ওসেনিয়াও বাদ পড়েনি। ঠিক কত মানুষের জীবিকা কোরোনার বলি হবে তা এখনো অনিশ্চিত, তবে গরীব মানুষের ক্ষতি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালীন পৃথিবীর জনসংখ্যা এবং আজ পর্যন্ত মুদ্রাস্ফীতির সাপেক্ষে হিসাব করলে অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়ত এখনই আশি বছর আগেকার ক্ষতিকে অতিক্রম করেছে।

আমাদের দাদু-দিদিমাদের প্রজন্ম দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের তাপ অনুভব করেছিলেন। বোমাতঙ্কে এক সময় কলকাতা ছেড়ে দূর গ্রামে মফস্বলে পালিয়ে যাওয়ার হিড়িক পড়েছিল। শেষ পর্যন্ত ভারত ভূখণ্ডে যুদ্ধ এসে না পৌঁছালেও পরাধীন দেশের শস্য উইনস্টন চার্চিলের বদান্যতায় ব্রিটিশ সৈন্যদের পেট ভরাতে চলে গিয়েছিল। কলকাতার রাস্তায় মানুষ ভাত নয়, ফ্যান চেয়ে বেড়িয়েছে, ভদ্র ঘরের মেয়ে বউদের ভাতের জন্য বেশ্যাবৃত্তি করতে হয়েছে (যৌনকর্মী শব্দটা তখনকার কোন লেখায় পাইনি, সম্ভবত যাদের কথা বলছি তারাও খুশি হত না এই শব্দ ব্যবহার করলে)। সেই সময় গ্রাম থেকে আসা অভুক্তদের মধ্যে সলিল চৌধুরীর চোখ রবীন্দ্রনাথের কৃষ্ণকলিকে দেখতে পেয়েছে। “দুটি শীর্ণ বাহু তুলে / ও সে ক্ষুধায় জ্বলে / অন্ন মেগে মেগে ফেরে প্রাসাদ পানে চেয়ে। / কে জানে হায় কোথায় বা ঘর / কী নাম কালো মেয়ে! হয়ত বা সেই ময়নাপাড়ার মাঠের কালো মেয়ে।”

সেই যুদ্ধের পর অনেক কিছু বদলেছিল। উপনিবেশ বজায় রাখা ধনী দেশগুলোর আর পড়তায় পোষাচ্ছিল না। তাই বিংশ শতাব্দী হয়ে গিয়েছিল মুক্তির দশক — সাম্রাজ্যবাদের হাত থেকে মুক্তির।

সাম্রাজ্য না হয় ছাড়া গেল, তা বলে কি রাশ ছেড়ে দেওয়া যায় পুরোপুরি? হরণ করতে না পারলে কি প্রাচুর্য বজায় রাখা যায়? তাছাড়া যাদের উপনিবেশ ছিল না তাদের বুঝি সাম্রাজ্যের সাধ হয় না, প্রাচুর্যের দরকার হয় না? সে প্রাচুর্য বজায় রাখতে মহাযুদ্ধের পরের প্রায় পঞ্চাশ বছর বেশ বেগ পেতে হয়েছিল পুরনো, নতুন দাদাদের। কারণ নতুন যে কায়দাটা, মানে কেনা আর বেচাই যে মনুষ্য জীবনের লক্ষ্য ও মোক্ষ, তা অর্ধেক পৃথিবীকে বোঝানোই যাচ্ছিল না। কেবল ঘোষিত সমাজতান্ত্রিক দেশগুলোর কথা বলছি না। সদ্য স্বাধীন দেশগুলোর অনেকেই তো তখন অর্থনীতিতে বাম দিক ঘেঁষে হাঁটছিল। ভারতের মত বিরাট দেশও। “যত খাই তত চাই বাপি চানাচুর” তত্ত্ব অর্ধেক বিশ্বে ছড়িয়ে দেওয়া যায়নি, মানুষকে ক্রেতাদাস বানিয়ে বিক্রেতারাজ কায়েম করা যায়নি। সেটা করা গেল গত শতকের শেষ দশকে এসে। ভোগবাদ শেষ অবধি বিশ্বায়িত হতে পারল আর বেলাগাম ভোগে আমরা পেলাম এই দুর্ভোগ — তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ। এ যুদ্ধে এক পক্ষে প্রকৃতি, অন্য পক্ষে নিরস্ত্র সরকার। আর সাধারণ মানুষ? উলুখাগড়া।

এতদ্বারা কোরোনা কী থেকে হয় তা আবিষ্কার করে ফেলেছি বলে দাবী করছি না, যুদ্ধের প্রেক্ষাপট বলছি মাত্র। যুদ্ধই যে চলছে তা নিয়ে তো সন্দেহের অবকাশ নেই। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাই বলেছে “global pandemic” অর্থাৎ বিশ্বব্যাপী অতিমারী। রোগটা কিভাবে হচ্ছে, কী কী উপায়ে ছড়াচ্ছে তাও শতকরা একশো ভাগ নিশ্চিত নয় প্রাদুর্ভাবের এতদিন পরেও, ভ্যাক্সিন আবিষ্কার কবে হবে তাও এখনো অনিশ্চিত। তাই বলছি এ যুদ্ধে এক পক্ষে প্রকৃতি।

অন্য পক্ষে নিরস্ত্র সরকার কেন বলছি? কারণ রোগের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে অস্ত্র হল শক্তিশালী স্বাস্থ্য ব্যবস্থা, ওষুধপত্র, যন্ত্রপাতি। সৈনিক হলেন স্বাস্থ্যকর্মীরা। কিন্তু মহাশক্তিধর দেশগুলোর অধিকাংশের আছে কেবল পরমাণু বোমা, মিসাইল, যুদ্ধজাহাজ, বিশাল স্থলবাহিনী, বিমানবাহিনী আর নৌবাহিনী। মশা মারতে কামান দাগলে কোন লাভ হয়? ম্যালেরিয়ার সময় যদি কামান দাগেন তাহলে রোগী মরবে, মশা নয়। কি চমৎকার ব্যাপার হত বলুন তো, যদি কোভিড-১৯ পাকিস্তান হত? এক্ষুণি মেঘে মেঘে গোটা কতক স্টেলদ বম্বার হানা দিলেই এই দিনের পর দিন ঘরবন্দী থাকার হাত থেকে মুক্তি পাওয়া যেত। সারা পৃথিবীতে এখন যত পারমাণবিক অস্ত্র মজুত আছে তা একসঙ্গে বিস্ফোরিত হলেও কোরোনার ক থাকবে না। কারণ মানুষ দূরের কথা, গ্রহটাই থাকবে না হয়ত। মাথা না থাকলে আর কিসের মাথা ব্যথা? আমাদের সরকারগুলোর অস্ত্র যা আছে তা আসলে এইরকম। তাই নিরস্ত্র।

কিন্তু কেন নিরস্ত্র? কারণ সরকারগুলো এ যুদ্ধের জন্য প্রস্তুতি নেয়নি। কেন নেয়নি? কারণ প্রয়োজন বোধ করেনি। কেন করেনি? কারণ ওটা সরকারের কাজ নয়। সরকারের কাজ তবে কোনটা? যুদ্ধ করা। তার প্রস্তুতি নিতেই সরকার ব্যস্ত ছিল। ভারতের সাথে তার প্রতিবেশীদের শেষ পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ হয়েছিল ১৯৭১ এ। বাংলাদেশ, বার্মা, নেপালের মত অতি ক্ষুদ্র প্রতিবেশীর সাথে সুদূর ভবিষ্যতেও যুদ্ধের কোন সম্ভাবনা নেই। উঠতে বসতে যার সাথে অশান্তি, সেই পাকিস্তান খেতে পায় না তো যুদ্ধ করবে কী? পারবে না জানে বলেই প্রক্সি ওয়ার চালায়। সেই প্রক্সি ওয়ারে অত্যাধুনিক যুদ্ধজাহাজ কোন কাজে লাগে না, অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমানেরও সচরাচর প্রয়োজন পড়ে না। বাকি রইল চীন। ভারত তার পণ্যের বিরাট বাজার। যুদ্ধ লাগলে তার নিজেরই ব্যবসার ক্ষতি। এরকম প্রতিবেশে দাঁড়িয়েও ভারতের প্রতিরক্ষা বাজেট বেড়েছে লাফিয়ে লাফিয়ে, আর স্বাস্থ্য খাতে খরচ কমেছে। ২০২০-২১ এর বাজেটে প্রতিরক্ষায় বরাদ্দ হয়েছে ৩.৩৭ লক্ষ কোটি টাকা। স্বাস্থ্যের জন্য ৬৯,২৩৪ কোটি টাকা। তবু দেখবেন বিজ্ঞ ব্যক্তিরা লিখে এবং বলে হা হুতাশ করেন “আহা, অমুক প্লেনটা কেনা হল না! তমুক কামান মান্ধাতার আমলের হয়ে রয়েছে। অমুকে এগিয়ে গেল, তমুকে টেক্কা দিয়ে দিল।” শুধু বিজ্ঞ ব্যক্তিরাই বা কেন? আমরাও তো করি। কাউকে শুনেছেন বলতে “আহা, কতদিন একটা নতুন সরকারী হাসপাতাল হয়নি! অমুক ওষুধটার দাম যে কেন সরকার কমাতে পারে না! তমুক যন্ত্রটা কলকাতার সব হাসপাতালে কেন নেই?” কেউ এসব বলে না, কারণ সবাই জানে চিকিৎসার ব্যবস্থা করার দায়িত্ব সরকারের নয়। যুদ্ধ করার দায়িত্ব সরকারের।

চিকিৎসা করার দায়িত্ব তবে কার? আমরা সবাই জানি। ঝাঁ চকচকে বেসরকারী হাসপাতালের। ওষুধ বানানো এবং বেচার দায়িত্ব বিভিন্ন ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানির। ফেলো কড়ি মাখো তেল ব্যবস্থা। যেমনটা “উন্নত” দেশে হয় আর কি। ওটাই তো সর্বোত্তম ব্যবস্থা, তাই না? আমরা তো তেমনটাই শিখেছি সেই নব্বইয়ের দশক থেকে। অন্য যে বিকল্প ছিল, মানে সরকার নিয়ন্ত্রিত স্বাস্থ্য ব্যবস্থা — সেটা যে সেকেলে, সেটা যে ফালতু সে ব্যাপারে তো আমরা নিশ্চিত। সরকারী হাসপাতালগুলোর দিকে তাকালেই তো বোঝা যায় ফেলো কড়ি মাখো তেল ব্যবস্থাই হল সঠিক ব্যবস্থা। হাসপাতাল হবে পাঁচ তারা হোটেলের মত। সেখানকার কর্মচারীরা হবে সুবেশী হোটেল ম্যানেজমেন্ট পড়া রিসেপশনিস্টদের মত। আর ডাক্তারবাবু অনেক টাকা পারিশ্রমিক নেবেন। তবে না চিকিৎসা? যদি বলেন কড়ির ব্যবস্থা করবে কে? কেন, ইনসিওরেন্স কোম্পানি? বছর বছর কয়েক হাজার টাকা প্রিমিয়াম দিয়ে গোটা পরিবারের মেডিক্লেম করিয়েছি তো। যার মেডিক্লেম করার ক্ষমতা আছে, সে ভাল চিকিৎসা পাবে। যার নেই তার জন্য তো পূতিগন্ধময় সরকারী হাসপাতাল রইল। উন্নত ব্যবস্থা মানেই তো এই বেছে নেওয়ার স্বাধীনতা, তাই না?
এতদিন চলছিল বেশ। শুধু আমাদের দেশে নয়, যে দেশগুলো আমাদের বিকল্প ভুলিয়ে এসব ধরিয়েছে সেখানেও দিব্যি চলছিল ব্যবস্থাটা। যার পকেটে মেডিক্লেম আছে সে খুশি, ডাক্তার খুশি, হাসপাতাল মালিকরা খুশি, ওষুধ কোম্পানি খুশি। আমাদের দেশে তবু যত নষ্টের গোড়া, সমাজবাদের প্রতি দুর্বলতা থাকা জওহরলাল নেহরুর উদ্যোগে তৈরি সরকারী স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ধ্বংসাবশেষ অনেক গরীব মানুষের যেমন তেমন দেখভাল চালাচ্ছিল। অনেক উন্নত দেশে, যেমন আমাদের স্বপ্নের দেশ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে, রেস্ত না থাকলে অসুস্থ হওয়া মানা। মধ্যে বারাক ওবামা উল্টো গাইলেন, সে কথা বড় একটা পছন্দ হল না কারোর। কী করে হবে? সরকারী মানে ফালতু এবং চিকিৎসার ব্যবস্থা করা সরকারের কাজ নয় — এসব আমরা তো মোটে তিরিশ বছর হল শিখেছি, আমেরিকানরা সেই কবে থেকে শুনে আসছে। আর সকলকে শিখিয়েছেও। আজ হঠাৎ নতুন কথা শুনলে মনে হবে না ব্যাটা বুদ্ধির ঢেঁকি? ওবামার কথা শুনে যত লোক মুখ বেঁকিয়েছিল, তার চেয়ে বেশি লোক বার্নি স্যান্ডার্সের কথা মন দিয়ে শুনছিল। তবু বার্নির গায়ে কেন কমুনিস্ট গন্ধ? এই প্রশ্নে দ্বিধায় ছিল। মানে সব দেশের পয়সাওয়ালা লোকই তো আমার আপনার মতই। যার পকেটে পয়সা নেই তাকে নিয়ে ভাবতে আমাদের বয়েই গেছে।

হেনকালে গগনেতে উঠিলেন কোরোনা।

ফল কী? ফেলো কড়ি মাখো তেলের দেশ যুক্তরাষ্ট্র এক কথায় ল্যাজে গোবরে। ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রথমে পাত্তাই দেননি, বলেছিলেন ঐ দু চারটে হয়েছে আর কি, তাও চীনের চক্রান্তে। শিগগির শূন্যে নেমে আসবে। তারপর যখন রোগী বাড়তে থাকল তখনো বলছিলেন লকডাউন আবার কী? ওভাবে দেশ চলে? তারপর এখন, যখন চার লক্ষের বেশি আক্রান্ত নিয়ে তাঁর দেশ জগৎসভায় শ্রেষ্ঠ আসন দখল করে ফেলেছে, প্রায় তেরো হাজার মানুষ মৃত, তখন তিনি চীন আর হু কে দোষ দিচ্ছেন। ওদিকে ভেন্টিলেটর কোন রাজ্যে কতগুলো যাবে তা নিয়ে নিলাম চলছে। মানে বুঝলেন তো? আপনার স্বপ্নের দেশে, উন্নত ব্যবস্থায় মানুষের জীবন নিলামে কেনা বেচা হচ্ছে। এত অস্ত্র বানায় অত বড় দেশটা, সারা পৃথিবীতে বিক্রি করে, এত উন্নত মোবাইল কম্পিউটার ট্যাব নানাবিধ সফটওয়্যার আবিষ্কার করে, কে এফ সি, কোকা-কোলা, স্টারবাকস — উদ্ভাবনের স্বর্গরাজ্য একেবারে। অথচ যথেষ্ট ভেন্টিলেটর বানিয়ে উঠতে পারেনি। ভেন্টিলেটর তো অনেক বড় কথা, সামান্য অ্যান্টি-ম্যালেরিয়া ড্রাগের জন্য পর্যন্ত ভারতকে ধমকাতে হচ্ছে। এই আপনাদের উন্নত দেশ, উন্নত ব্যবস্থা। কড়ি ফেললেও তেল দিতে পারছে না।

হাইড্রক্সিক্লোরোকুইন নামে এই যে ওষুধ, যার জন্য ট্রাম্প মোদীকে দিলেন এক ধমক আর মোদী সুড়সুড় করে রপ্তানির উপর নিষেধাজ্ঞা তুলে নিলেন, তেমন ওষুধ উৎপাদনের উপযুক্ত জায়গা হল ভারতের সরকারী ফার্মাসিউটিক্যাল সংস্থাগুলো। ভারতে ওষুধ তৈরির ৭০% কাঁচামাল আমদানি হয় চীন থেকে। ২০১৫ তে ভারত সরকার নিযুক্ত কাটোচ কমিটি বলেছিল সরকারী সংস্থাগুলোকে ব্যবহার করে এই জায়গাটাতে ভারত অনায়াসেই স্বনির্ভর হয়ে উঠতে পারে। কিন্তু ভারত সরকার, মানে মোদীর সরকার, কী করলেন? না ঐ সংস্থাগুলোকে পুরোপুরি বা আংশিকভাবে বেচে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন। এই কোম্পানিগুলোর মধ্যে আছে কলকাতার বেঙ্গল কেমিক্যালও। যদিও কলকাতা হাইকোর্ট বেঙ্গল কেমিক্যাল বিক্রির সিদ্ধান্ত খারিজ করে দিয়েছেন। তাহলে ভাবুন, যে সরকারী সংস্থা আমাদের জীবনদায়ী ওষুধ তৈরি করতে পারে তাকে বেচে দিতে সরকার উৎসাহী কেন? কারণ ঐ যে, ওষুধ যোগানো সরকারের কাজ নয়।

বিরক্ত হচ্ছেন? এক কথা বারবার পড়ে রেগে যাচ্ছেন? জিজ্ঞেস করছেন কে ঠিক করল ওষুধ যোগানো সরকারের কাজ নয়, চিকিৎসা দেওয়া সরকারের কাজ নয়? আপনিই ঠিক করেছেন। যদি এতে খুব দাগা লাগে তাহলে বলা যায় আপনাকে দিয়ে ঠিক করানো হয়েছে। কে ঠিক করিয়েছে? সরকার নিজেই। একবার মনে করে দেখুন নব্বইয়ের দশক। মনমোহনী অর্থনীতি মনে আছে? তখন থেকেই তো কাগজে, টিভিতে, পত্রিকায় সর্বত্র জেনেছেন রাষ্ট্রের দিন শেষ। কেউ চীন বললে, কিউবা বললে, ভিয়েতনাম বললে বলেছেন “আরে ওসব রিজেক্টেড সিস্টেম। ওসব উঠে গেল দেখলেন না?” কারণ তার আগের কয়েক বছরে প্রণয় রায়ের ‘দ্য ওয়ার্ল্ড দিস উইক’ এ বার্লিনের দেওয়াল ভাঙতে দেখেছেন, দ্যুমায় আগুন জ্বলতে দেখেছেন। আপনি ঠিক দেখেছেন এবং ভুল বুঝেছেন। আপনি সমাজতান্ত্রিক দেশগুলোর পতন দেখেছেন আর বাজার অর্থনীতির খুড়োর কল দেখেছেন। আপনি জানতে পারেননি যে রাষ্ট্রীয় স্বাস্থ্য ব্যবস্থা কেবল ঘোষিত সমাজতান্ত্রিক দেশগুলোতে ছিল না। আপনাকে স্ক্যান্ডিনেভিয়ার দেশগুলোর কথা বলা হয়নি, আপনাকে ব্রিটেনের এন এইচ এসের কথা বলা হয়নি, আপনাকে এখনো সিঙ্গাপুরের কথাও বড় একটা বলা হয়নি।

কেবল এভাবেই যে আপনাকে বোঝানো হয়েছে যা কেনা যায় তা-ই ভাল আর সরকারী মানেই ফালতু তা-ও নয়। সরকার নিজে আপনাকে সরকারী ব্যবস্থা থেকে দূরে ঠেলেছে। আমার জন্ম আশির দশকের গোড়ায়, আমার বোনের জন্ম ১৯৯০ তে। তখনো ভারত বাজার অর্থনীতির দেশ হয়নি, মেডিক্লেম কারোর অভিধানে ছিল না। আমার বাবা স্কুল শিক্ষক। আমার জন্মের সময়ে না হলেও, বোনের জন্মকালে মন্দ মাইনে পেতেন না। আমরা দুজনেই জন্মেছি সরকারী হাসপাতালে। তখনো সেগুলোর চেহারা আজকের আমরি, অ্যাপোলো বা ফর্টিসের মত ছিল না। কিন্তু সামর্থ্য থাকলে ওখানে যাব না এমন মনে হত না, হলে বাবা আমার মাকে নিয়ে যেতেন না। অথচ ২০১১ সালে আমার মেয়ের জন্ম হল বেসরকারী নার্সিংহোমে। কারণ আমি আমার স্ত্রীর স্বাস্থ্যের ভার সরকারের উপর ছাড়তে ভরসা পেলাম না। ভরসার জায়গাটা সরকার নিজেই নষ্ট করে দিয়েছে তার আগের কুড়ি বছরে। সব দলের সরকারই। সরকার নিজেই ছিদ্র করেছে লৌহ বাসরে, আর সেই ছিদ্র দিয়ে ঢুকিয়েছে বেসরকারীকরণের কালনাগিনীকে। কারণ সরকার চায় না মানুষের চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে।

কেন চায় না? সরকার চিকিৎসার ব্যবস্থা করবে না, শিক্ষার ব্যবস্থা করবে না, তাহলে করবে কী? দুটো কাজ করবে। এক, পরিকাঠামোর ব্যবস্থা করবে। মানে রাস্তাঘাট, বিমানবন্দর ইত্যাদি। দুই, যুদ্ধ করবে। নব্বইয়ের দশকে নতুন চিন্তা ছিল এটাই। কেন চিন্তাবিদরা সরকারকে এই কাজ দুটোয় বেঁধে দিলেন?

ভেবে দেখুন, সরকার নিজে রাস্তাঘাট বানাতে পারে না। কোন ব্যবসায়ীকে বরাত দিতে হবে। স্কুল, কলেজ, হাসপাতাল, বিমানবন্দর — সবেতেই তাই। তাহলে বেশ কিছু বড়লোকের আরো বড়লোক হওয়ার ব্যবস্থা হল। যত বড়, যত গুরুত্বপূর্ণ পরিকাঠামো, তত বেশি মুনাফা, তত বড়লোক হওয়ার ব্যবস্থা। তাছাড়া কেবল স্বাস্থ্য বেসরকারী হলে ভাল তা তো নয়, সবই বেসরকারী হলে ভাল বলা হয়েছে। তাই পরিবহন বেসরকারী, শিক্ষা বেসরকারী, যা যা মানুষের জীবনে দরকারী তার সবই বেসরকারী। অর্থাৎ আসল কথা হল ব্যবসা। মানুষের জন্য অর্থনীতি নয়, ব্যবসার জন্য অর্থনীতি। আর যেহেতু অর্থনীতিই অন্য সব নীতিকে চালায় তাই তখন থেকে রাজনীতিও ব্যবসার জন্য, স্বাস্থ্য নীতিও ব্যবসার জন্য। আর সবচেয়ে অর্থকরী ব্যবসা হল অস্ত্র ব্যবসা। তাই যুদ্ধ করার অধিকারটা সরকারকে দেওয়া হল। যুদ্ধ হোক আর না-ই হোক, সরকারকে অস্ত্র কিনতেই হবে। না কিনলে ধনকুবেররা আরো ধনী হবে কী করে?

সুতরাং আপনার পকেটে কড়ি থাকায় যে ব্যবস্থাকে আপনি ভেবেছিলেন ফেলো কড়ি মাখো তেল, সেটার আসল নাম হল এলোমেলো করে দে মা লুটে পুটে খাই। মনে রাখবেন যে ধনীরা এই ব্যবস্থা চালায় সাক্ষীগোপাল সরকারগুলোকে দিয়ে, তাদের খাঁই অপরিসীম। আপনি যে ধার করে গাড়ি কিনে বা বিদেশ ঘুরে এসে ভাবেন “দেশের উন্নতি হয়েছে। আমার বাবা-মা তো এমন পারত না,” তাও ওদেরই বদান্যতায়। আপনি খরচ না করলে ওদের মুনাফা হয় না বলে। মুনাফাই মোক্ষ। আপনি যে কোম্পানির চাকুরে সে কোম্পানির মুনাফা গত বছরের চেয়ে এ বছর না বাড়লে আপনার চাকরিটি নট হয়ে যাবে, আপনি ফাঁকিবাজ না পরিশ্রমী তা অপ্রাসঙ্গিক। হাড়ে হাড়ে টের পাবেন বেসরকারী সংস্থা মানে মোটেই মেধাতন্ত্র (meritocracy) নয়, মুনাফাতন্ত্র (profitocracy)।

এখন কথা হচ্ছে এই মুনাফাতন্ত্রকে যদি ভাল বলেন, তাহলে স্বাস্থ্য ব্যবস্থার হাল আমাদের দেশের বর্তমান অবস্থার মত হওয়াই ভাল। সরকার যদি শক্তিশালী স্বাস্থ্য ব্যবস্থা তৈরি করে, তাহলে বেসরকারী হাসপাতালে যাবে কে? তাদের মুনাফা হবে কোথা থেকে? ভেন্টিলেটর নিলাম হওয়াও কিন্তু ভাল। ক্রয় বিক্রয়ের স্বাধীনতা। ফেলো কড়ি মাখো তেল। বুঝলেন কিনা?

মুনাফাতন্ত্র কিন্তু প্রকৃতির ধার ধারে না। বিশ্ব উষ্ণায়নকে বলে বামপন্থী কন্সপিরেসি থিওরি। কারণ উষ্ণায়ন হচ্ছে বলে মেনে নিলেই ফসিলজাত জ্বালানির ব্যবহার কমাতে হবে। তেল কোম্পানির লোকসান হবে না? পকেটে পয়সা থাকলেই আজকাল এ সি লাগিয়ে ফেলা যায়। সত্যি সত্যি ক্লোরোফ্লুওকার্বনের ব্যবহার কমাতে গেলে কী হবে এয়ার কন্ডিশনারের ব্যবসার? প্লাস্টিক দুনিয়ার ক্ষতি করছে মানলে বিশ্বজোড়া প্লাস্টিক ব্যবসার বারোটা বাজবে। বাহুল্যকে প্রয়োজনে পরিণত করা গেছে কত দিনের চেষ্টায়, এখন উল্টো পথে হাঁটলে কী হবে মুনাফার গতি? অতএব যেমন চলছে চলুক। চালাতে গিয়ে হিমবাহগুলো তো বটেই, চিরতুষার (permafrost), মানে পৃথিবীর যেসব জায়গার বরফ সেই তুষার যুগ থেকে আজ পর্যন্ত গলেনি, তাও গলে যাচ্ছে। কত মহামারী অতিমারীর জীবাণু যে সেই বরফে জমেছিল কে-ই বা বলতে পারে? কাকলাস মেরুভালুকের ছবি মুনাফাবাদীদের মন গলাতে পারেনি, এখন দুনিয়াসুদ্ধ লোক থাকো ঘরে বন্দী। সব ব্যবসার সাড়ে সর্বনাশ, মুনাফাতন্ত্র ছাপিয়ে মন্দাতন্ত্র এসে পড়ল।

তাহলে বিশ্বযুদ্ধটা দাঁড়াল মুনাফাতান্ত্রিক রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে প্রকৃতির। ওয়ার্ল্ডোমিটার বলে যে সাইটটা গত কয়েক দিনে জনপ্রিয় হয়েছে, সেখানে গিয়ে কোরোনা আক্রান্ত দেশের নামগুলো ভাল করে দেখুন। যেসব দেশের সরকারের স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় মনোযোগ আছে, মানে মুনাফাতন্ত্র জোরালো নয়, সেসব দেশে রোগটার দাপট কম। ভিয়েতনাম খুঁজে দেখুন, কিউবা খুঁজে দেখুন। “রিজেক্টেড সিস্টেম” গুলোর অবস্থা একবার দেখলেনই না হয়। জার্মানি আবার রিজেক্টেড সিস্টেমেও চলে না, তবু সে সামলে নিয়েছে। কারণ স্বাস্থ্য ব্যবস্থা ভাল। সামলে নিচ্ছে ফ্রান্সও। স্পেনের সরকার আবার কী করেছে দেখেছেন তো? বেসরকারী হাসপাতালগুলো অধিগ্রহণ করেছে। ভাবুন তো, আপনি ই এম বাইপাসের ধারে একটা ঝাঁ চকচকে হাসপাতালের বেডে শুয়ে আছেন, অথচ মেডিক্লেমে সবটা কভার হবে কিনা ভেবে রক্তচাপ বাড়ছে না!

এবার চীনা ফ্রন্টে একটা আক্রমণ হবে বুঝতে পারছি৷ প্রশ্ন উঠবে সবই যদি মুনাফাতন্ত্রের দোষ, তবে চীনে এমন কেলেঙ্কারির ব্যাখ্যা কী? উত্তরটা নেহাত সোজা। যতই চতুর্দিকে মাওয়ের ছবি থাক আর লাল পতাকায় ছেয়ে থাক পথ ঘাট, বর্তমান চীনের সঙ্গে সমাজতন্ত্রের সম্পর্ক নেহরুর সমাজবাদের সাথে নরসিমা রাওয়ের কংগ্রেসের চেয়েও ক্ষীণ। কাস্তে হাতুড়ি চীনের শালগ্রাম শিলা মাত্র। সারা পৃথিবীতে ব্যবসা করতে চীনের আগ্রহ ট্রাম্পের দেশের চেয়ে কিছু কম নয়। ট্রাম্প যদি বলেন “মেরে পাস গেটস হ্যায়, জোবস হ্যায়, ব্রনসন হ্যায়। তুমহারে পাস কেয়া হ্যায়, কেয়া হ্যায় তুমহারে পাস?” জিনপিং সগর্বে বলবেন “মেরে পাস মা হ্যায়। জ্যাক মা।” চীনের মুনাফাতন্ত্র হয়ত আরো নির্মম কারণ সেখানে সরকারকে প্রকাশ্যে গাল দেওয়ার উপায় নেই। তাই এমন মহামারী হতে পারল। কিন্তু লক্ষ্য করে দেখুন, চীন তবুও বেশ তাড়াতাড়ি সামলে নিল। তার পেছনেও সেই সরকারী স্বাস্থ্য ব্যবস্থার অবদান।

এই বিশ্বযুদ্ধে আমাদের প্রধানমন্ত্রী যেভাবে লড়ছেন, নিরস্ত্র অনন্যোপায় সেনাপ্রধানরা সেভাবেই লড়েন। একশো তিরিশ কোটি লোকের দেশে যথেষ্ট ডাক্তার নেই, নার্স নেই, হাসপাতাল নেই। তাহলে আপনি কী করবেন? প্রার্থনা করবেন। উনি বারবার ঠিক সেটাই করতে বলছেন আমাদের। ঈশ্বর যদি কোরোনাটা সামলে দিতে পারেন, তাহলে পাকিস্তানকে উনি একাই দেখে নেবেন। অতএব আপনারা তেড়ে প্রার্থনা করুন। মসজিদ ছাড়া সব জায়গায় প্রার্থনা করতে পারেন।

তোমার পথের থেকে অনেক দূরে

বুঝে নেওয়া জরুরী যে বিবেকানন্দ যতই এক খণ্ড জমিতে কয়েকজন গুরুভাইকে নিয়ে কষ্টেসৃষ্টে রামকৃষ্ণ মিশন প্রতিষ্ঠা করে থাকুন, আজকের মিশন একটি অতিকায় এন জি ও

কিছুদিন আগেই সর্বভারতীয় সংবাদমাধ্যমে আমি যে কলেজে পড়েছি তার নাম জ্বলজ্বল করছিল। কারণ বেনারস হিন্দু ইউনিভার্সিটিতে যেখানে একজন মুসলমান অধ্যাপককে সংস্কৃত বিভাগে যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও পড়াতে দেওয়া হল না, সেখানে আমাদের কলেজের সংস্কৃত বিভাগে একজন মুসলমান অধ্যাপক পড়াচ্ছেন। খবরটা বেরোতে আমার বহু সহপাঠী, বহু সিনিয়র, জুনিয়র তা নিয়ে গর্ব করে সোশাল মিডিয়ায় পোস্ট করেছে। কোন কোন মাস্টারমশাইও করেছেন। আমি করিনি। যাঁরা করেছেন তাঁরা ভুল করেছেন মনে করি না। আজকের আবহে দাঁড়িয়ে তাঁরা সঙ্গত কারণেই মনে করেছেন আমাদের কলেজ সঠিক অবস্থানে আছে। তাই গর্বিত হয়েছেন।

কিন্তু আমি, হয়ত নিজের মুদ্রাদোষে, মনে করেছিলাম কোন ধর্মের লোক কোন বিষয় পড়াচ্ছে এটা খবর হয়ে দাঁড়ানোই দুর্ভাগ্যজনক। রামকৃষ্ণ মিশন বিদ্যামন্দির থেকে বি এ পাশ করে যখন সাংবাদিকতায় এম এ পড়তে ঢুকেছিলাম, একেবারে প্রথম দিকের ক্লাসেই আমরা শিখেছিলাম কুকুর মানুষকে কামড়ালে তা খবর নয়। মানুষ কুকুরকে কামড়ালে খবর। সেই শিক্ষা আজও ভুলতে পারিনি বলে আমার মনে হয়েছিল মুসলমান শিক্ষকের সংস্কৃত পড়ানো খবর হয়ে দাঁড়িয়েছে — এ ভারতীয় হিসাবে আমার লজ্জা, বিদ্যামন্দিরের ছাত্র হিসাবে আমার যতই গর্ব হোক। উপরন্তু প্রতিষ্ঠান হিসাবে, যৌবনের উপবন হিসাবে আমার কলেজের প্রতি আমার যত টানই থাক না কেন, কলেজটাকে পরিচালনা করে যে প্রতিষ্ঠান, সেই রামকৃষ্ণ মিশনকে আমি কোনদিন বিশ্বাস করিনি।

বেলুড় বিদ্যামন্দিরের ছাত্র হওয়ার আগেই আমার জানা ছিল ভগিনী নিবেদিতাকে রামকৃষ্ণ মিশনের সংস্রব ত্যাগ করতে বলা হয়েছিল তিনি স্বাধীনতা সংগ্রামীদের সাহায্য করতেন বলে। যুক্তি ছিল মিশন রাজনীতি নিরপেক্ষ থাকতে চায়। তা ভাল কি মন্দ সে নাহয় তর্কসাধ্য। বিশেষত ধর্মীয় সংগঠন রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘের রাজনীতিতে জড়ানোর বিষময় ফল যখন আমরা একশো বছর ধরে দেখছি। কিন্তু এন ডি এ ১ এর আমলে রামকৃষ্ণ মিশন বিদ্যামন্দিরের ছাত্র থাকার সুবাদে দেখেছি, কিভাবে হাওড়া থেকে বেলুড় মঠ অব্দি ট্রেন চালু হওয়ার বন্দোবস্ত হয়ে গেল মসৃণভাবে। পরে যখন সে ট্রেন চালু হল তখন আমি কোন্নগর-হাওড়া নিত্যযাত্রী। দেখতাম রামকৃষ্ণের জন্মতিথির মত দু একটা দিন বাদে সেই ট্রেনে যাতায়াত করতেন মূলত দুজন — ট্রেনের চালক আর গার্ড। অথচ শিয়ালদা-ডানকুনি পথে ট্রেন বাড়ে না বহুকাল, যদিও মানুষ বাদুড়ঝোলা হয়ে যাতায়াত করেন রোজ। সারা দেশে খুঁজলে অমন কয়েকশো রুট পাওয়া যেত।

আরো দেখেছি হিন্দুত্ব রাজনীতির প্রতি মহারাজদের প্রসন্নতা। ধর্মীয় ঐতিহ্যের বাধ্যতামূলক ক্লাসে অধ্যক্ষের সাথে একবার আমার আর কয়েকজন সহপাঠীর ধুন্ধুমার বেধে গেল। তিনি বাংলাদেশের হিন্দুদের উপর অত্যাচারের দোহাই দিয়ে প্রোপাগান্ডা চালাচ্ছিলেন। ঠিক সেই কথাগুলোই বলছিলেন যেগুলো আর এস এস তথা বিজেপি সেই সময় অল্প স্বল্প বলত, আজকাল সোচ্চারে, আরো আক্রমণাত্মক ভাষায় বলে।

লক্ষ্য করে দেখবেন, বাংলার সংস্কার আন্দোলনের নেতৃস্থানীয়রা আজকের বিজেপি-আর এস এসের অতি অপছন্দের লোক৷ বিশেষত বিদ্যাসাগর আর রামমোহন। সোশাল মিডিয়ায় তাঁদের গালাগালি দেওয়া হয়, অশ্লীল মিম বানানো হয়। কোন বাঙালির চোখে যে ঐ দুজন মানুষ খলনায়ক হতে পারেন বিদ্যামন্দিরে না পড়লে আমার জানাই হত না। এক মহারাজ একবার বলেছিলেন ঐ দুজন হিন্দুধর্মের ক্ষতি করেছেন খ্রীষ্টান সরকারের সাহায্য নিয়ে। সতীদাহ প্রথার সপক্ষে আর বিধবা বিবাহের বিপক্ষে এমন ঋজু বক্তৃতা বিজেপির ট্রোলদের মুখে ইদানীং শোনা যায়। বাজপেয়ী বা আদবানি দূরের কথা, নরেন্দ্র মোদীরও আজ অবধি সাহস হয়নি এমনটা প্রকাশ্যে বলার। স্বামী সুবীরানন্দদের মত সাধুদের সমর্থনে যদি প্রধানমন্ত্রী হতে পারে তখন আদিত্যনাথ হয়ত এসব বলবে।

তা এসব অভিজ্ঞতার কারণে রামকৃষ্ণ মিশনের প্রধানমন্ত্রীর জন্যে গেরুয়া কার্পেট বিছিয়ে দেওয়ায় আমি একটুও অবাক হইনি। আর মিশনে ফোন করে ধিক্কার দেওয়ার কর্মসূচীতেও সামিল হইনি। বুঝে নেওয়া জরুরী যে বিবেকানন্দ যতই এক খণ্ড জমিতে কয়েকজন গুরুভাইকে নিয়ে কষ্টেসৃষ্টে রামকৃষ্ণ মিশন প্রতিষ্ঠা করে থাকুন, আজকের মিশন একটি অতিকায় এন জি ও, যার দেশী ও বৈদেশিক স্বার্থ রামকৃষ্ণের দরিদ্রতম ভক্তের সাথে না-ও মিলতে পারে, হিন্দুত্ববাদী শাসকের সাথে মিলবেই। কেউ যদি ভাবে রামকৃষ্ণ “যত মত তত পথ” বলেছিলেন বলে, সত্যান্বেষীর আগ্রহে সবরকম সাধনপদ্ধতি অবলম্বন করেছিলেন বলে আজকের মহারাজরা হিন্দুত্ববাদের বিরুদ্ধে সদর্পে দাঁড়াবেন, তাহলে সে দিবাস্বপ্ন দেখছে।

বিবেকানন্দ বলেছিলেন ভারতে ইসলামিক শরীরে বৈদান্তিক আত্মার সমন্বয় করতে — এসব জ্ঞানগর্ভ কথা কাঁপা কাঁপা গলায় বলে কোন লাভ নেই। কাজের কথা হল বাংলায় যত বাড়িতে রামমোহন, বিদ্যাসাগর বা রবীন্দ্রনাথের ছবি আছে তার চেয়ে অনেক বেশি বাড়িতে রামকৃষ্ণ, বিবেকানন্দ, সারদার ছবি আছে। তার অধিকাংশই আবার রামকৃষ্ণ মিশনের কোন বিপণি থেকে কেনা। এই কথাটা নরেন্দ্র মোদী জানেন। তিনি জানেন রামকৃষ্ণ মিশন এমন এক বিক্রেতা যাদের প্ল্যাটফর্ম থেকে হিন্দুত্ব কোম্পানির পণ্য বেচলে বাংলায় সবচেয়ে বেশি ক্রেতা পাওয়া যাবে। এমনকি যারা সচরাচর কোম্পানিটাকে ভাল চোখে দেখে না, তারাও এবার এই কোম্পানির মাল কিনে ফেলতে পারে। আর যে মালটা বাজারে একদম চলছে না, বরং বেচতে গিয়ে লোকের গালাগাল শুনতে হচ্ছে, সেই সি এ এ-এন আর সি-এন পি আরও এই প্ল্যাটফর্ম থেকে বিক্রি করলে বিক্রি হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি।

এখন ব্যথিত প্রাণেরা বলবেন রামকৃষ্ণ মিশন তাদের প্ল্যাটফর্ম মোদীকে ব্যবহার করতে দিল কেন? এ প্রশ্নের কোন অর্থ নেই। ছুরি দিয়ে মানুষ খুন করা যায়। আপনি কি প্রশ্ন করেন অ্যামাজন তাদের প্ল্যাটফর্মে ছুরি বিক্রি করতে দেয় কেন?
আসল কথা গোটা দেশের মত বাংলাও একটা সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। এক হাতে কার্ল মার্কস, অন্য হাতে মা কালী; একদিকে রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে গদগদ হওয়া আর অন্যদিকে বাংলা পরীক্ষায় রচনায় বিবেকানন্দের পুনরুত্থানবাদ (সহজ কথায় “সবই ব্যাদে আছে”) কোট করে বাঙালিদের এতকাল চলেছে। আর চলবে না। আপনাকে পক্ষ নিতে হবে। এতদিন অনেকেরই বিশ্বাস ছিল রামকৃষ্ণ মিশন যে হিন্দুধর্মের কথা বলে তা আর এস এসের হিন্দুত্ব নয়। এই ধারণার মূলে রামকৃষ্ণ স্বয়ং। আজ তাঁর ইচ্ছানুসারে প্রতিষ্ঠিত মিশন বুঝিয়ে দিল তারা দুটোকে বিশেষ আলাদা বলে মনে করে না। এবার আপনাকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে আপনি রামকৃষ্ণকে নিজের মত করে বুঝে নেবেন, নাকি তাঁর সঙ্ঘের সাধুরা যেভাবে তাঁকে দেখাচ্ছেন সেটাই শিরোধার্য করবেন।

এবার তর্ক উঠবে, রামকৃষ্ণ মিশন আবার কখন হিন্দুত্বকে (সি এ এ-এন আর সি-এন পি আর) মান্যতা দিল? বরংস্বামী সুবীরানন্দ তো বলেছেন “আমরা রাজনীতির ঊর্ধ্বে”। বলেছেন বটে, কিন্তু ওটা সিগারেটের প্যাকেটে বিধিসম্মত সতর্কীকরণের মত। আমরা যারা রামকৃষ্ণ মিশনের স্কুল কলেজে পড়াশোনা করেছি তারা বিলক্ষণ জানি কতটা মেধাবী হলে তবে ঐ সংগঠনের উচ্চপদে ওঠা যায়। পশ্চিমবঙ্গের যে কোন বিশ্ববিদ্যালয়ের ফ্যাকাল্টির সমসংখ্যক বা তার বেশি পি এইচ ডি, আই আই টি পাশ ইঞ্জিনিয়ার, বিলেত ফেরত ডাক্তার, গবেষক ইত্যাদি পাওয়া যাবে রামকৃষ্ণ মিশনের উচ্চকোটিতে। সেইসব লোকেরা বোঝেননি মোদীর বেলুড় মঠে এসে থাকতে চাওয়া, বিবেকানন্দের জন্মদিবসের অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করতে চাওয়ার উদ্দেশ্য কী — এ যিনি বিশ্বাস করবেন তাঁকে একথা বিশ্বাস করানোও শক্ত নয় যে দু হাজার টাকার নোটে মাইক্রোচিপ আছে।

এখন প্রশ্ন উঠতে পারে প্রধানমন্ত্রীকে না বলা কি সম্ভব? মিশন কী বলে নিরস্ত করতে পারত মোদীকে? অনেক ভাবলাম এবং ভেবে দেখলাম, উত্তরটা কিন্তু খুব সোজা। মহারাজরা বলতেই পারতেন, আমরা সন্ন্যাসী, আপনি এসে থাকলে গাদা নিরাপত্তাকর্মী আসবেন, সংবাদমাধ্যম হুমড়ি খেয়ে পড়বে। এসবে আশ্রমের শান্তিভঙ্গ হবে, আমাদের সাধন ভজনের অসুবিধা হবে। অবশ্য একথা রামকৃষ্ণ মিশন বলতে পারত কিনা তার চেয়েও বড় কথা প্রশ্রয় পাওয়ার প্রত্যয় না থাকলে নরেন্দ্র মোদী এমন আব্দার করতেন না। তিনি ভারত সেবাশ্রম সঙ্ঘে গিয়ে থাকার আব্দার তো করেননি আজ অব্দি? অতএব মেনে নেওয়া যাক যে সুবীরানন্দরা সন্ত লাল সিং নন, যিনি হিন্দু হয়ে হিন্দুত্ববাদের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিলেন এবং অযোধ্যার রামমন্দির আন্দোলনের বিরোধিতা করার অপরাধে প্রাণ হারিয়েছিলেন। আনন্দ পট্টবর্ধনের ‘রাম কে নাম’ তথ্যচিত্রে অবশ্য তিনি অমর হয়ে আছেন।

মোদ্দা কথা হল, রামকৃষ্ণ মিশনের জন্য অশ্রুপাত করা বৃথা। যদি আপনি বিপদটা বুঝে থাকেন, যদি আপনি দেশটাকে বাঁচাতে চান, তাহলে রামের সেতু বন্ধনে কাঠবিড়ালী যেটুকু করেছিল সেটুকুই উদ্যোগ নিয়ে করুন। মিছিলে আসুন, মিটিঙে আসুন। যতটা পারেন।

পুনশ্চ: আমার মত যারা বিদ্যামন্দির, নরেন্দ্রপুর বা মিশনের অন্য প্রতিষ্ঠানের প্রাক্তনী, তাদের বলি, আমার কাছে কিন্তু কলেজ মানে মাস্টারমশাইরা আর ছাত্ররা। এসব বিষয়ে যে তাঁদের মতামত নেওয়া হয় না তা আমরা প্রত্যেকেই জানি। ফলে আমার তাঁদের বিরুদ্ধে কোন বক্তব্য নেই। তাছাড়া অ্যামাজন ক্ষতিকারক জিনিসপত্র বিক্রি করায় বলে কি আমি তার কর্মচারীদের দোষী ঠাওরাই? তবে যেহেতু আইনত কলেজ বলতে কর্তৃপক্ষকে মানতেই হয় এবং সেই কর্তৃপক্ষ হলেন মিশনের সন্ন্যাসীরা, সেহেতু কেবল ওখানে পড়তাম, এই আবেগে আর কখনো ঐ চত্বরে পা দেব না। প্রিয় মাস্টারমশাইদের সাথে বাইরে দেখা করব, বন্ধুদের সাথেও তাই। বর্তমান ছাত্রদের সাথে সম্পর্ক হলে তাদের জন্যেও একই ব্যবস্থা।

ফুটন্ত সকালের পুরনো স্বপ্ন

আমার জন্ম হয়েছিল সরকারী হাসপাতালে, আমার বউকে আমি সেই পূতিগন্ধময় হাসপাতালের ধারে কাছে নিয়ে যাইনি

নতুন নয়, আজ পুরনো কথার দিন।

ইতিমধ্যেই দিকে দিকে বার্তা রটে গেছে যে মানুষ বিভিন্ন দেশে রাস্তায় নেমে পড়েছেন। লেবানন আর চিলির ছবি উল্কার বেগে ছড়াচ্ছে সারা পৃথিবীর মানুষের কাছে। চিলির আতঙ্কিত রাষ্ট্রপ্রধান সেবাস্তিয়ান পিনেরা পুরো ক্যাবিনেটকেই বরখাস্ত করেছেন। কিছুদিন আগে বিশাল আন্দোলন হয়েছে হংকঙে। সে আন্দোলন সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে মহাশক্তিধর চীনও। অনেকেই ভয় পাচ্ছিলেন (আমিও পাচ্ছিলাম) চীন না আবার একটা তিয়েন আন মেন স্কোয়ার ঘটিয়ে দেয়। এখন পর্যন্ত তেমনটা ঘটেনি। অর্থাৎ লক্ষ লক্ষ মানুষ রাস্তায় নেমে পড়লে এই একবিংশ শতাব্দীর পরমাণু শক্তিধর, নেট নজরদার রাষ্ট্রও কিন্তু আতান্তরে পড়ে। “শাসনে যতই ঘেরো, আছে বল দুর্বলেরও”।

কথাগুলো পুরনো, নাকি চিরনতুন? এদিকে আজ নয়া উদারবাদী (neo-liberal) অর্থনীতিতে ব্যতিব্যস্ত, দুর্দশাগ্রস্ত আর্জেন্টিনার মানুষ রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে বাম-মধ্যপন্থী প্রার্থী আলবার্তো ফার্নান্ডেজকে জিতিয়ে দিলেন। তাঁর পাশে উপরাষ্ট্রপতি হতে লড়ছিলেন ভূতপূর্ব বামপন্থী রাষ্ট্রপতি ক্রিস্টিনা কির্শনার। এইমাত্র দেখলাম বিবিসির দক্ষিণ আমেরিকার প্রতিবেদক কেটি ওয়াটসন তাঁর বিশ্লেষণে লিখেছেন আলবার্তোর জয়ে ক্রিস্টিনার রাজনীতির অবদান এতটাই যে অনেক ভোটার ভোট দিতে যাওয়ার সময়ে বলেছিলেন তাঁরা ক্রিস্টিনাকে ভোট দেবেন। যেন তিনিই রাষ্ট্রপতি পদপ্রার্থী, আলবার্তো নন।

পৃথিবীর মানচিত্রে সবচেয়ে ওজনদার দেশ, আর্জেন্টিনা থেকে আরো উত্তরে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। সেখানে ডেমোক্র্যাট নেতা বার্নি স্যান্ডার্স ক্রমশ সুর চড়াচ্ছেন অর্থনৈতিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে। তিনি অতি ধনীদের উপর আলাদা কর চালু করার কথা বলছেন। শিক্ষা এবং স্বাস্থ্য সকলের অধিকার হওয়া উচিৎ বলছেন। কখনো বা টুইট করছেন পৃথিবীতে বিলিয়নেয়ার থাকাই উচিৎ নয়। আমাদের কানে এসব শুনতে লাগে নন্দ ঘোষ নেহরুর মত, বা যারা নাকি দেশটার (বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গের) সর্বনাশ করেছে, সেই কমিউনিস্টদের মত। মার্কিন দেশে কিন্তু এসব কথা ব্লাসফেমির সামিল ছিল এই সেদিন অব্দিও। অথচ এই মুহূর্তে বার্নির জনপ্রিয়তার গ্রাফ ঊর্ধ্বমুখী। তাঁর সমর্থকদের মধ্যে অনেকেই আবার শ্রমজীবী মানুষ। বার্নি প্রকাশ্যে ধর্মঘটের অধিকারের পক্ষে বলছেন, ধর্মঘটী শ্রমিকদের সমর্থন করছেন। কী কাণ্ড বলুন তো!

লক্ষ্য করুন মধ্যপ্রাচ্যের লেবাননই হোক আর লাতিন আমেরিকার চিলি বা আর্জেন্টিনা কিংবা উত্তর আমেরিকার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র অথবা আমাদের প্রতিবেশী চীন। মানুষ রাস্তায় নামছেন কিন্তু আরো বেশি অধিকারের দাবীতে। হংকঙের আন্দোলন সেখানকার স্বায়ত্তশাসনকে খর্ব করার প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে, অর্থাৎ সেখানে রাজনৈতিক অধিকারের প্রশ্নটাই প্রধান। অন্য সবকটা দেশের ক্ষেত্রেই ক্ষোভ আসলে সাধারণ চাকুরিজীবী এবং শ্রমজীবী গরীব এবং মধ্যবিত্ত মানুষের রোজগার কেড়ে নেয় যে অর্থনীতি, কর্পোরেটদেরই দন্ডমুন্ডের কর্তা করে তোলে যে অর্থনীতি, যার ভুরি ভুরি আছে তাকে আরো পাইয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করে আর শিক্ষা স্বাস্থ্যকে বেসরকারীকরণ করে সাধারণের ধরা ছোঁয়ার বাইরে নিয়ে যায় যে অর্থনীতি — তার বিরুদ্ধে।

ভারতের অবস্থা কি অন্যরকম? সেই নব্বইয়ের দশকের গোড়ায় যখন সারা বিশ্ব শিখল সমাজতন্ত্র মৃত, রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত অর্থনীতি উন্নয়নের পরিপন্থী, ট্রেড ইউনিয়ন শিল্পের ক্ষতি করে, বেসরকারীকরণই মুক্তির পথ — তখন থেকেই তো এ দেশের সরকারগুলো আই এম এফ, বিশ্বব্যাঙ্ক ইত্যাদির বাধ্য ছাত্র হয়ে ঢালাও বেসরকারীকরণ করেছে। জওহরলাল নেহরুর নিজের পার্টিই কাণ্ডটি করায় এখনকার মত তাঁকে অকথ্য গালাগাল তখন করা হয়নি সত্য, কিন্তু নেহরুর “সমাজবাদী অর্থনীতির অচলায়তন” থেকে নরসিমা, মনমোহন ভারতকে মুক্ত করেছেন একথা তো তখন থেকেই কাগজে, টিভিতে বলাবলি শুরু হয়েছে। শ্রম আইনকে ক্রমশ দুর্বল করে বেসরকারী ক্ষেত্রের কর্মীদের চাকরির নিরাপত্তা কেড়ে নেওয়া শুরু হয়েছে তখন থেকেই, বর্তমান সরকারের আমলে মজা টের পাওয়ানো হচ্ছে সরকারী কর্মচারীদেরও। গ্রামীণ অর্থনীতি তখন থেকেই দুয়োরানী, তাই কৃষকদের মৃত্যু মিছিলও তো শুরু হয়েছে মনমোহিনী অর্থনীতির আমলেই। বিভিন্ন প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য আক্রমণের মাধ্যমে ট্রেড ইউনিয়ন ব্যাপারটাকে অপ্রাসঙ্গিক করে দেওয়া হয়েছে, তুলে দেওয়া হয়েছে বহু শিল্পক্ষেত্রে। আমি আপনি, মানে ভদ্রলোকেরা, খুশি হয়েছি। কারণ আমাদের বলা হয়েছিল এতে শেষ পর্যন্ত দেশের উন্নতি হবে। মনমোহন সিং নোটবন্দীর বিতর্কে জন মেনার্ড কেনসকে উদ্ধৃত করে বললেন বটে “In the long run we are all dead,” কিন্তু এই লং রানের কথা সেসময় তাঁরাও শুনিয়েছিলেন। সে যা-ই হোক, আসল কথা হল দেশের উন্নতি হয়েছে কিনা।

প্রশ্নটার উত্তর পেতে গেলে জানা দরকার দেশ মানে কে? বঙ্কিম লিখেছিলেন হাসিম শেখ আর রামা কৈবর্তর কথা। জানি না তাদের লাভ হয়েছে কিনা, তবে আমার আপনার তো লাভ হয়েছে বটেই। আমার বাবার সাদা-কালো টিভির বেশি কেনার সামর্থ্য হয়নি, আমি রঙিন টিভি দিয়ে শুরু করে এখন স্মার্ট টিভিতে পৌঁছে গেছি। বাবার জীবন কেটেছে ট্রেনে বাসে ঘামে ভিজে, আমি যখন তখন ওলা উবের। সত্যি বলতে কি গাড়ি কেনার জন্যে ধার দিতে চেয়ে ব্যাঙ্কের লোকেরা আমার পায়ে ধরতে বাকি রাখে। উন্নতি হয়নি?

আমার জন্যে চকলেট কিনতে ঢুকে দাম শুনে মুখ চুন করে দোকান থেকে বেরিয়ে আসতে দেখেছি বাবাকে, আর আমার মেয়ে এখন ডিপার্টমেন্টাল স্টোরে ঢুকে বাছাই করে কোন কোন চকলেট সে কিনবে না। উন্নতি নয়, বলুন? বাবার জীবন কেটে গেছে পাড়ার দর্জির তৈরি জামাকাপড় পরে, আজ আমি ব্র‍্যান্ডেড শার্ট ছাড়া পরি না, বিদেশী ব্র‍্যান্ডের ঘড়ি থাকে হাতে। উন্নতি নয়?

বাড়িতে একখানা ল্যান্ড ফোন নেওয়া খুব দরকার হয়ে পড়েছিল বলে রেকারিং ডিপোজিট করতে হয়েছিল বাবা-মাকে, আজ আমি আর আমার বউ হাতের মোবাইলে সামান্য টাকায় সারা পৃথিবীর কথা বলা ছাড়াও বিশ্বায়িত বিনোদন ভোগ করছি। তবুও বলবেন উন্নতি হয়নি?

এদেশে মুক্ত বাজার অর্থনীতি চালু হওয়ার সময়ে আমার কিছু ক্রয় ক্ষমতা ছিল, তাই সেই অর্থনীতি আমাকে আরো আয় করার সুযোগ দিয়েছে, যাতে আমি আরো ব্যয় করে যে আমার চেয়ে অনেক বেশি ধনী তাকে আরো ধনী করতে পারি। আমার যে সহপাঠীর বাবার ছোট মুদির দোকান, তার যে জয়েন্টে পেছন দিকে র‍্যাঙ্ক করে বেসরকারী ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে পড়ার টাকা না থাকায় লেখাপড়া শেষ হয়ে গেল সেকথা থাক। আমি তো কয়েক লক্ষ টাকা ফিজ দিয়ে ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করে আজ এ দেশে কাল সে দেশে কাজ করে বেড়াচ্ছি। সেটা উন্নতি নয়?

আমার জন্ম হয়েছিল সরকারী হাসপাতালে, আমার বউকে আমি সেই পূতিগন্ধময় হাসপাতালের ধারে কাছে নিয়ে যাইনি। আমার সন্তান জন্মেছে ঝাঁ চকচকে নার্সিংহোমে। মনমোহন সিং না থাকলে কে দিত আমাকে এই সুযোগ? আমার চটকলের শ্রমিক বন্ধুর স্ত্রী যে সরকারী হাসপাতালে সন্তান প্রসব করতে গিয়ে সংক্রমণের ফলে মাত্র বাইশ বছর বয়সে মারা গেল সে কথা থাক। একদিন তো সকলকেই মরতে হবে।

সুতরাং দেশ মানে আমার কাছে যেহেতু আগে আমি, আমার পরিবার, তাই উন্নতি যে হয়েছে তাতে সন্দেহ নেই। যার লাভ হয়নি সে করুক চিলি, লেবানন বা ফ্রান্সের ইয়েলো ভেস্টস আন্দোলনের মত কিছু। বা আর্জেন্টিনার লোকেদের মত ভোট দিক বামপন্থীদের, ভিড় জমাক তাদের মিটিঙে যারা বার্নির মত বলে চিকিৎসার জন্যে গাদা গাদা ইনশিওরেন্স প্রিমিয়াম দিতে হওয়া অন্যায়, যে পড়তে চায় তার পড়ার খরচ সরকারের দেওয়া উচিৎ। আমি কেন এসবের মধ্যে থাকব? আমার তো প্রিমিয়াম দেওয়ার ক্ষমতা আছে, ছেলেমেয়েকে পয়সা খরচ করে যেখানে ইচ্ছে পড়ানোর ক্ষমতাও আছে আমার।

অবশ্য এত উন্নতির সঙ্গে কিছু উদ্বেগও আমি পেয়েছি, যা আমার বাবার ছিল না।

নিজের যৌবনে আমার চাকুরিজীবী বাবা মাইনে পেলে মায়ের সাথে মাস খরচের হিসাব করতে বসে দেখতেন এটা করলে সেটা হবে না, অমুক শখটা পরের মাসের জন্যে তুলে রাখতে হবে। কিন্তু জানতেন পরের মাসেও চাকরিটা থাকবে, স্ত্রী পুত্র কন্যা নিয়ে দুটো খাওয়া পরার অভাব হবে না। আমার সে নিশ্চয়তা নেই। শুধু নিজের কাজটুকু মন দিয়ে করেই নিশ্চিন্ত থাকার আমার উপায় নেই। কোম্পানি যদি তার লাভের লক্ষ্যমাত্রা ছুঁতে না পারে তার মানে হবে কোম্পানির ক্ষতি হয়েছে। সেই ক্ষতি পূরণ করতে কর্মী সঙ্কোচন হবে, বস বলবেন “সবাই তো ব্যবসা করতে এসেছে। কেউ তো মাদার টেরেসা নয়”। অতএব গত মাসের এমপ্লয়ি অফ দ্য মান্থ আমি বছর চল্লিশেক বয়সে হয়ে যাব বেকার, সামার ভ্যাকেশনে ফুকেটের বীচে যে বউকে দীপিকা পাড়ুকোন মনে হচ্ছিল অচিরে দেখব তার চোখের কোলে কালি পড়ে সে নিরুপা রায় হয়ে গেল। মেয়েকে ভেবেছিলাম বিদেশে পড়তে পাঠাব, এখন স্কুলের মাইনে দেওয়াই কঠিন হয়ে দাঁড়াবে।

অবশ্য বউ আমার যথেষ্ট যোগ্যতাসম্পন্ন। তার সরকারী চাকরি আছে আমার বাবার মতই। তাই ভেবেছিলাম অবসর জীবনে অন্তত তার পেনশনে আমাদের দুজনের চলে যাবে। কিন্তু এখন দেখছি সরকার তার পেনশন না-ও দিতে পারে, জিনিসপত্রের দাম বাড়ছে অথচ গিন্নীর মাইনে কাল কমিয়ে দিলেও কিছু বলার নেই। ওদিকে ব্যাঙ্কে যা টাকা জমিয়েছিলাম, ব্যাঙ্ক ফেল পড়লে শুনছি তার সবটা পাব না। অন্যত্র যা জমিয়েছি তার পাওনা গণ্ডাও নাকি শেয়ার বাজারের মর্জি মাফিক।

এসব মনে পড়লে বোধ হয় কি মিছিলে নামা উচিৎ? নাকি কেবলই মনে হয় ঐ ব্যাটা সোনার চাঁদ, সোনার টুকরো — ওর জন্যেই আমি সরকারী চাকরি পাইনি, পেলে একবার…? ঐ যে সব মুসলমান বাংলাদেশ থেকে হুড়মুড়িয়ে আসছে, ওদেরকে বার করে দিতে পারলেই…? মনে হয় কি অমুকে কেন তমুকের মাংস খায় এটাই মূল সমস্যা? নাকি আমরা যারা আতঙ্কে ভুগছি আপনি তাদের দলে? ডিটেনশন ক্যাম্পের আতঙ্ক, গণপিটুনির আতঙ্ক। আমরা সকলেই যে ঘুমোচ্ছি, সকলেই যে বিশ্বাস করছি “সব চাঙ্গা সি”, তা তো নয়। তাহলে কেন আমরা রাস্তায় নেই?

নেই তার বড় কারণ যাঁরা মিছিল ডাকবেন, মিটিং করে রাস্তায় নামাবেন আমাদের তাঁরাই নিজেদের জায়গায় নেই। বার্নি স্যান্ডার্স সারাজীবন লড়ে গেলেন। যখন কেউ তাঁর কথা শুনত না তখনো লড়েছেন, আজও লড়ছেন। আজ অনেকে তাঁর কথা শুনছে। ক্রিস্টিনা কির্শনারের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ ছিল, তিনি পদচ্যুত হয়েছিলেন। তবুও লড়াইয়ের ময়দান ছেড়ে যাননি, মানুষ আজ তাঁর লড়াইকে জয়যুক্ত করলেন। বিবিসি লিখেছে “A comeback for the old politics”। এ দেশে পুরনো সমাজবাদী, কল্যাণকামী রাজনীতিকে ফিরিয়ে আনার এই তো সময়। মানুষ, জল, জঙ্গল বাঁচাতে সেই রাজনীতিরই তো প্রয়োজন। কিন্তু দু একটি অঞ্চলে ছাড়া কোথায় সেই রাজনীতির লোকেরা? তাঁদের ঐক্যবদ্ধ হওয়ার প্রচেষ্টা কোথায়? তাঁদের কেউ কেউ যে চূড়ান্ত আক্রমণাত্মক, ধ্বংসোন্মুখ নয়া উদারবাদী মোদী সরকারের থেকে মনমোহিনী পথেই নিস্তার খুঁজছেন!

পৃথিবী জুড়ে নয়া উদারবাদী অর্থনীতির (রাজনীতিরও, কারণ প্রয়াত অশোক মিত্র যথার্থই বলতেন “রাজনীতিই অর্থনীতি”) শিয়রে শমন। ট্রাম্প, মোদী জানেন যে এই সঙ্কট থেকে উত্তরণের পথ তাঁরা জানেন না। তাই উনি বলেন ইমিগ্র‍্যান্টদের কথা, ইনি বলেন এন আর সি করব, নাগরিকত্ব আইন করব, মুসলমানরাই যত নষ্টের গোড়া ইত্যাদি।

এই দুঃসময়ে, এই সম্ভাবনার সুসময়ে, কোথায় তাঁরা যাঁরা রাত্রির বৃন্ত থেকে ফুটন্ত সকাল ছিঁড়ে আনার স্বপ্ন দেখাতে পারেন?

কিচ্ছু মিলছে না

নরেন্দ্রভাই দামোদরদাস মোদী আর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তো শুধু দুজন মানুষ নন, তাঁরা হলেন, সাহেবরা যাকে বলে, কাল্ট ফিগার। অদূর ভবিষ্যতেই তাঁদের জীবন ও বাণী আমাদের সন্তানরা পাঠ্য বইতে পড়বে

স্কুলজীবনে পরীক্ষায় এক ধরণের প্রশ্ন আসত, “অমুকের সাথে তমুকের পাঁচটি সাদৃশ্য লেখো।” আমরা তখন পাশে রাখা ছয় ইঞ্চি স্কেলটা টেনে নিয়ে ঠিক খাতার মাঝ বরাবর উল্লম্ব ভাবে একটা দাগ টানতাম। তারপর তার ডাইনে বাঁয়ে দু পক্ষের বৈশিষ্ট্যগুলো লিখতাম। মজার কথা, যে দুটো প্রাণীর বা উদ্ভিদের বা বস্তুর সাদৃশ্য জানতে চাওয়া হত, তাদের বৈসাদৃশ্য জানতে চেয়েও প্রশ্ন আসত অনেক সময়। অর্থাৎ তাদের মিল থাকলেও তারা কিন্তু হুবহু এক নয়। কেন এমন হয় তা বুঝিয়ে দিয়েছিলেন আমাদের স্কুলের জীবন বিজ্ঞানের মাস্টারমশাই সুবীরবাবু। বলেছিলেন “জানবে সাদৃশ্য থাকলে তবেই বৈসাদৃশ্যের প্রশ্ন আসে। মানুষের সঙ্গে মানুষের কী কী সাদৃশ্য, কী কী বৈসাদৃশ্য সেটা জিজ্ঞেস করা যায়। পাগল ছাড়া কেউ জিজ্ঞেস করে না মানুষ আর ছাগলের কী কী সাদৃশ্য বা বৈসাদৃশ্য।”
এইসব কথা আমার বেশ কয়েক বছর ধরে খুব মনে হচ্ছে, আমাদের প্রধানমন্ত্রী আর মুখ্যমন্ত্রীকে দেখে। ওঁদের খুব লড়াই, আবার উনি সেদিন বললেন, নাকি মিষ্টি খাওয়াও চলে। শুনে ইনি কিন্তু বললেন না এসব মিথ্যে কথা। শুধু বললেন এরপর থেকে মাটির লাড্ডু না কিসব যেন পাঠাবেন, খেতে গিয়ে দাঁত ভেঙে যাবে। স্কুলে পড়তে আমিও বন্ধুদের উপর রেগে গেলে এরকমই বলতাম। ফলে খুবই নস্ট্যালজিক হয়ে পড়লাম। আমিও তো মানুষ, আমারও তো ইচ্ছে করে সেই সেকালের মত পরীক্ষার প্রশ্নের উত্তর দিতে। তাই ভাবলাম লিখেই ফেলি কিছু একটা। কী লিখি, কী লিখি? মুখ্যমন্ত্রী ও প্রধানমন্ত্রীর সাদৃশ্য ও বৈসাদৃশ্য লিখি। নরেন্দ্রভাই দামোদরদাস মোদী আর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তো শুধু দুজন মানুষ নন, তাঁরা হলেন, সাহেবরা যাকে বলে, কাল্ট ফিগার। অদূর ভবিষ্যতেই তাঁদের জীবন ও বাণী আমাদের সন্তানরা পাঠ্য বইতে পড়বে। চাকরি বাকরি চলে গেলে বাড়িতে বসে টিউশন করার সময় আমার এই লেখাটা নোট হিসাবে কাজে লেগে যাবে। তেমন জনপ্রিয় করতে পারলে ‘প্রতীকদার নোট’ হিসাবে অমুক প্রকাশনীর সহায়িকা বই হয়েও বেরোতে পারে। রয়্যালটি থেকে বিলক্ষণ দু পয়সা কামাতে পারব।
আগে বৈসাদৃশ্যগুলোই দেখা যাক।
উনি পুরুষ, ইনি নারী। উনি গুজরাতি, ইনি বাঙালি। উনি বিজেপি নেতা, ইনি তৃণমূল নেত্রী। অনেকক্ষণ মাথা চুলকেও আর কিছু বার করতে পারলাম না। এই জন্যে সুবীরবাবুর হাতে আমি চিরকাল কম নম্বর পেতাম। আচ্ছা, নাহয় সাদৃশ্যগুলো লেখার চেষ্টা করে দেখি।
ওনার সরকার অমুকটা পারেনি বললেই উনি দায়ী করেন “কংগ্রেস কে সাট সাল” কে, ইনি বলেন “বামফ্রন্ট ৩৪ বছরে যা সর্বনাশ করে দিয়েছে…”
তাতে থেমে গেলেন তো বেঁচে গেলেন, নাছোড়বান্দা হলে উনি বলেন “দেশদ্রোহী”, “পাকিস্তানি”, “আরবান নকশাল”। ইনি বলেন “সিপিএমের লোক”, “মাওবাদী” (নকশাল তকমার সঙ্গে আশ্চর্য মিল না?)। ইদানীং বিজেপিও বলছেন।
ওনার দলবল জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের উপর খড়গহস্ত। সেখানে চতুর্দিকে কন্ডোম ছড়িয়ে থাকে, ছেলেমেয়েরা সব মদ, গাঁজা, ড্রাগ ইত্যাদি খেয়ে পড়ে থাকে, আর ভারতকে খণ্ড খণ্ড করার চক্রান্ত চলে — এমনটাই ওঁরা বলেন।
এঁর দলের বিষনজরে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়। সেখানেও নাকি মাওবাদী গিজগিজ করছে। এবং যখন এক উপাচার্যের বিরুদ্ধে আন্দোলন হল, তখন এঁর দলের এক পাণ্ডা প্রশ্ন তুললেন “মদ, গাঁজা বন্ধ। তাই কি এত প্রতিবাদী গন্ধ?” তিনি আবার এখন ওঁর দলের পাণ্ডা।
তা এর সমাধান হিসাবে ওঁর মানবসম্পদ উন্নয়ন মন্ত্রী ক্যাম্পাসে ইয়া বড় জাতীয় পতাকা টাঙানোর ফতোয়া দিয়েছিলেন, উপাচার্য ক্যাম্পাসে মিলিটারি ট্যাঙ্ক রাখার নিদান দিয়েছিলেন। আর এঁর শিক্ষামন্ত্রী পরিষ্কার বলেছিলেন সরকারের পয়সায় খেতে পরতে হলে বিশ্ববিদ্যালয়কে সরকারের কথা শুনেই চলতে হবে। অতএব কিভাবে ভর্তি হবে আমি ঠিক করব, কী পড়ানো হবে আমি ঠিক করব, ইত্যাদি।
পরিতাপের বিষয় (কার পরিতাপ জানি না) দুটো বিশ্ববিদ্যালয়ই পড়াশোনা, গবেষণায় পারদর্শিতা দেখিয়েই চলেছে।
বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সঙ্গে অবশ্য দুজনেরই সম্পর্ক গভীর। উনি ‘সম্পূর্ণ’ রাষ্ট্রবিজ্ঞানে এম এ, ডিগ্রি দেখতে চাইলে সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয় বলেছে ওসব তথ্য দেখানো যাবে না, নিয়ম নেই। ইনি পাশ করা উকিল না কী যেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের নামটা ভুলে গেছি।
কর্মসংস্থানের সমস্যার কথা তুললে উনি বলেন “রোজগার নেই মানে? যে পকোড়া বেচে সে রোজগার করছে না?” আর ইনি বলেন তেলেভাজা শিল্পও তো শিল্প।
ওঁর উত্থানকে ওঁর ইংরিজি শিক্ষিত সুটেড বুটেড ধনীর দুলাল বুদ্ধিজীবীরা বলেন লুটিয়েন্স এলিটের আধিপত্যের বিরুদ্ধে দলিত গরীবের ছেলের উত্থান। এঁর উত্থানকে এঁর বামপন্থী ভদ্রলোক বুদ্ধিজীবীরা বলেন ধুতি পরিহিত ভদ্রলোকদের আধিপত্যের বিরুদ্ধে সাধারণ ঘরের মেয়ের উত্থান। ওঁর উত্থানের পর যে দলিতদের প্রাণ ওষ্ঠাগত সেটা চেপে যাওয়াই ভাল। আর এঁর উত্থানের পর যে সাধারণ ঘরের মেয়েরা ধর্ষিত হলেই “সাজানো ঘটনা” হয়ে যাচ্ছে, সেকথা বললেও পুলিশে ধরতে পারে।
পুলিশে ধরা বলতে মনে পড়ল, ওঁর নিন্দা করে, ওঁর পার্টির অন্য নেতাদের নিন্দা করে ফেসবুকে পোস্ট করায় কলেজ পড়ুয়া থেকে সাংবাদিক অব্দি অনেকেই দেশদ্রোহের দায়ে গ্রেপ্তার হয়েছেন। এঁর বা এঁর সরকারের নিন্দা করে লোকে অম্বিকেশ, অরুণাচল ইত্যাদি হয়েছে। মিটিঙে প্রশ্ন তুলে শিলাদিত্যও হয়েছে।
প্রশ্ন পছন্দ হয়নি বলে উনি করণ থাপারের অনুষ্ঠান থেকে এক গ্লাস জল খেয়ে উঠে গেছিলেন, ইনি দর্শকের প্রশ্ন পছন্দ হয়নি বলে তাকে সিপিএম, মাওবাদী ইত্যাদি বলে দেগে দিয়ে সাগরিকা ঘোষের অনুষ্ঠান থেকে প্রস্থান করেছিলেন।
দুজনেই কিন্তু লেখক। উনি এক্সাম ওয়ারিয়র লেখেন। এঁর লেখা বই এক্সাম ওয়ারিয়রদের পুরস্কার দেওয়া হয়।
ওঁর বীরেরা বলেন অমর্ত্য সেন অর্থনীতি বোঝেন না, ইরফান হাবিব ইতিহাস জানেন না। এঁর বীর বলেছেন শঙ্খ ঘোষ কোনো কবি নন।
উনি বাবা গোরক্ষনাথ, গুরু নানক আর সন্ত কবীর — যাঁরা একে অপরের জীবৎকালে জীবিতই ছিলেন না — তাঁদের মধ্যে আধ্যাত্মিক বৈঠক করান। তক্ষশীলা বিশ্ববিদ্যালয়কে অধুনা পাকিস্তান থেকে বিহারে এনে স্থাপন করেন। ইনি? ১৯৪১ এ প্রয়াত রবীন্দ্রনাথকে দিয়ে গান্ধীজির ১৯৪৬ এর অনশন ভঙ্গ করান, পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় সতীদাহ প্রথা রদ করার আইন পাশ করান।
বোর হয়ে যাচ্ছেন, না? আচ্ছা থামা যাক তবে। দুজনেই আবার বজরংবলীর ভক্ত। তিনি গদা নিয়ে রাস্তায় নেমে পড়েছেন ইতিমধ্যেই। বেশি বাড়াবাড়ি করলে দুদল ভক্ত নিয়ে গদাপেটা করতে চলে আসবেন হয়ত।

Where is the hosh?

আমাদের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা ঐ মানুষগুলোকে এরকম জালনিবদ্ধ রোহিতের মত মরতে হয় কেন?

আমাদের এলাকায় পাড়ার লোকেরা মিলে অপেশাদার যাত্রা করেন বহুকাল থেকে। ছোটবেলায় চোখ বড় বড় করে দেখতাম মঞ্চের উপর যুদ্ধ হত, রাজা মন্ত্রী সৈনিক মরত, তারপর যেই আলো নিভে যেত অমনি তড়াক করে উঠে মঞ্চ থেকে চলে যেত। আমার বাবাও অভিনয় করতেন বলে যাত্রা শেষ হওয়ার পরে গ্রীনরুমে আমার অবাধ যাতায়াত ছিল। মৃত অভিনেতারা অন্ধকারের মধ্যে উঠে চলে যেতেন বলে শিশু বয়সে আমার কিন্তু সন্দেহ রয়েই যেত, লোকটা সত্যি বেঁচে আছে কিনা। গ্রীনরুমে গিয়ে পাড়াতুতো কাকু, জেঠু বা দাদুকে মেক আপ তুলতে দেখে চক্ষুকর্ণের বিবাদ ভঞ্জন করা অব্দি আমার বুক দুরদুর করত। একটু বড় হওয়ার পর সেকথা মনে করে নিজের কাছেই বিস্তর লজ্জা পেয়েছি। তবে এখন বুঝতে পারি লজ্জা পাওয়ার কোন কারণ ছিল না। ধেড়ে ধেড়ে লোকেরা যখন সত্যিকারের যুদ্ধ, সত্যিকারের সৈনিকদের জীবনকে যাত্রার মতই নেহাত খেলা মনে করে, তখন বছর পাঁচেকের ছেলের যাত্রাকে সত্যি ভাবা কী আর এমন দোষের?
কাল পুলওয়ামায় বিয়াল্লিশ জনের মৃত্যুর পর থেকে অনলাইন এবং অফলাইনে লোকের যা প্রতিক্রিয়া দেখছি তাতে মনে হচ্ছে যুদ্ধ নেহাত যাত্রা বৈ তো নয়। তাও ভাল, উরির পরে পাকিস্তানে পরমাণু বোমা ফেলার প্রস্তাব দিচ্ছিল অনেকে, এবারে শুধু আরেকখানা সার্জিক্যাল স্ট্রাইকের আবদার করেই ক্ষান্ত আছে। চারিদিকে বেশ একটা যুদ্ধ যুদ্ধ ভাব। বিজেপি মুখপাত্র রাম মাধব দেখলাম টিভিতে বলছেন পাকিস্তানকে এমন জবাব দেব, ওরা ভুলতে পারবে না ইত্যাদি। ডি ডি ইন্ডিয়াতে আবার দেখলাম এক পলিতকেশ ভদ্রলোক বলছেন পাকিস্তান এটা করেছে নির্বাচনে বিরোধীদের সুবিধা পাইয়ে দেওয়ার জন্যে। অর্থাৎ সম্ভবত, এখন থেকে ঘটনার তদন্ত এবং যাদের গাফিলতির ফলে এতগুলো মানুষের নিরুপায় মৃত্যু হল তাদের শাস্তিবিধানের চেয়ে সরকার যে ব্যাপারটায় গুরুত্ব দেবে সেটা হল যারা সরকারকে প্রশ্ন করবে তাদের দেশদ্রোহী বলে দেগে দেওয়া (কে জানে হয়ত জেলে দেওয়া বা গণপিটুনি দেওয়াও)। মাধববাবু যেমন বুম ধরা সাংবাদিকটিকে ধমকে বলেই দিলেন “আপনার কমিউনিটির যারা পাকিস্তানকে সাপোর্ট করে তাদের বিচ্ছিন্ন করার সময় এসে গেছে।“
কিছু করার নেই, মেনে নিতে হবে। দেশে এখন দেশপ্রেমিক সরকার। আই এস আই চিহ্নিত। পাকিস্তানের নয়, প্রশান্ত মহলানবীশের।
২০১৪ লোকসভা নির্বাচনের কয়েক মাস যখন বাকি তখন এক দীর্ঘ ট্রেনযাত্রায় এক মিত্রকে বলছিলাম কেন আমি মোদী ক্ষমতায় আসুন চাই না। সে প্রায় সবটাই মেনে নিয়েও বলল “মোদী ক্ষমতায় এলে আর কিছু না হোক, পাকিস্তানকে একটু ঠুকে দেওয়া যাবে।“ যে দেশটাকে মোদীজির ঠুকে দেওয়ার কথা ছিল, হঠাৎ সে দেশের প্রধানমন্ত্রীর নাতনির বিয়েতে গিয়ে কোলাকুলি করেছেন। ওটা নাকি স্টেটসম্যানসুলভ কাজ। তারপর হল পাঠানকোটে হামলা। অতঃপর পাকিস্তানের আই এস আইকে আদর করে ডেকে এনে (বিরিয়ানি খাওয়ানো হয়েছিল কিনা উজ্জ্বল নিকম জানতে পারেন) ভারতের সেনা ছাউনি পরিদর্শন করতে দেওয়া হল। ওটা বোধহয় নিউ ইয়র্ক টাইমসসুলভ ছিল। তারপর হল সার্জিক্যাল স্ট্রাইক। এবং তা নিয়ে সিনেমা। এছাড়াও হয়েছে। অবসরপ্রাপ্ত সৈনিকরা ওয়ান র‍্যাঙ্ক ওয়ান পেনশন পাননি বলে দিল্লীর যন্তর মন্তরে অনশন করছিলেন, তাঁদের কলার ধরে স্থানচ্যুত করা হয়েছে। বি এস এফ, সি আর পি এফ জওয়ানরা ঠিকমত খেতে পান না, অফিসাররা অন্যায় ব্যবহার করেন — এই অভিযোগ করে সোশাল মিডিয়ায় ভিডিও আপলোড করেছিলেন। প্রতিকার পাননি, গলাধাক্কা পেয়েছেন। আর সন্ত্রাসবাদী কার্যকলাপ কিরকম কমে গেছে সে তো দেখাই যাচ্ছে পাঁচ বছর ধরে। সার্জিক্যাল স্ট্রাইকের ফলে নাকি সব তছনছ হয়ে গেছে শোনা যাচ্ছিল। এখন দেখা যাচ্ছে সে গুড়েও বালি। নোটবন্দির ফলে সন্ত্রাসবাদী কার্যকলাপ উঠে যাবে কথা ছিল, তাও হল না। এরপরেও এখনো দেখছি অনেকের অনেক আশা মোদীবাবুর উপরে। কোন কোন বাঙালির দেশপ্রেমের ভার বাংলা ভাষা বইতে পারছে না। তাই হিন্দিতে স্ট্যাটাস দিচ্ছেন “মোদীজি সব কুছ রোক দো, বাস পাকিস্তান কো ঠোক দো।”
পাকিস্তান একটি সেনা আর মৌলবাদী দ্বারা নিয়ন্ত্রিত রাষ্ট্র, যার ভারতে অশান্তি সৃষ্টি করা ছাড়া প্রায় কোন কাজ নেই। তাদের সাহায্যপ্রাপ্ত সন্ত্রাসবাদীদের কার্যকলাপে এতজন সি আর পি এফ জওয়ানের প্রাণ গেল। ফলে রাগ, দুঃখ সবই বৈধ। কিন্তু এই যে প্রতিশোধ ইত্যাদি শব্দগুলো বুড়িমার চকলেট বোমের মত ব্যবহার করছি আমরা — এই প্রতিশোধ নিতে যাবেটা কে? আমি, আপনি তো নয়ই, রাম মাধব আর ভিকি কৌশল পর্যন্ত যাবেন না। যাবেন স্বাস্থ্যবান নিম্নবিত্ত বা মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তানরা, যাঁরা এই দেড়শো কোটির দেশের বিপুল কর্মসংস্থানের সমস্যার অন্যতম শিকার। তা এই প্রশ্ন কবে তুলবেন যে আমাদের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা ঐ মানুষগুলোকে এরকম জালনিবদ্ধ রোহিতের মত মরতে হয় কেন? কাশ্মীরের মত বিপদসংকুল এলাকায় আটাত্তরটা গাড়ির বিরাট কনভয় আড়াই হাজার জওয়ানকে নিয়ে একত্রে চলাচল করে কোন দুঃখে? বিশেষত যেখানে গোয়েন্দা বিভাগ আগেই আক্রমণের সম্ভাবনা জানিয়েছিল? পাকিস্তানের সেনা, সরকার, সন্ত্রাসবাদী — কেউই তো আপনার হাতে নেই। যে সরকারটা আপনার হাতে তাকে এই প্রশ্নগুলো করবেন না?
অবশ্য এমনটা বললে অন্যায় হবে যে এই সরকারের আমলেই প্রথম এত কিছু ঘটল। কক্ষনো না। মহান লিবারাল নেতা অটলবিহারী বাজপেয়ীর আমলে সন্ত্রাসবাদীরা ভারতের মাটি থেকে বিমান হাইজ্যাক করে আফগানিস্তানে চলে যায়নি? সে কি নরেন্দ্র মোদীর দোষ? কার্গিলে অনুপ্রবেশকারীরা ঢুকে পড়েনি? সে কি মোদীর দোষে? মৃত সৈনিকদের কফিন নিয়ে কেলেঙ্কারি হয়নি? তার জন্যেও কি মোদী দায়ী? খোদ সংসদ ভবনে আক্রমণ হয়েছে। সেটাও কি বেচারা মোদীর ঘাড়ে চাপাব এখন?
আসলে আগমার্কা দেশপ্রেমিকদের আছে টনটনে মান আর বিপুল জোশ। কিন্তু রামকৃষ্ণ আবার বলেছিলেন “যার মান আর হুঁশ আছে সে-ই মানুষ।” মান আর জোশ তো অর্ধমানবেরও থাকে। সেটা একবার স্বয়ং বিবেকানন্দ টের পেয়েছিলেন।

বিঃ দ্রঃ দয়া করে “ছিঃ! সৈনিকের মৃত্যু নিয়ে রাজনীতি করছেন?” জাতীয় মন্তব্য করবেন না। পৃথিবীর কোথাও সশস্ত্রবাহিনীর মানুষ অরাজনৈতিক কারণে নিহত হন না। মানুষকে মানুষের বিরুদ্ধে লড়ানো একটি ঘোরতর রাজনৈতিক ক্রিয়া।

আমার সন্ততি

ভেবে দেখলাম যে অক্ষয় ধন আমার সন্তানকে দিয়ে যেতে পারি তা হল সমাজ, সংসারের সঙ্গে, সারা পৃথিবীর মানুষের সঙ্গে তার সম্পর্কের বোধ

ধ্বংস করে দাও আমাকে যদি চাও
আমার সন্ততি স্বপ্নে থাক।

— শঙ্খ ঘোষ (বাবরের প্রার্থনা)

যেদিন বাবা হয়েছি সেদিন থেকে ভেবে চলেছি, মানুষ পৃথিবী থেকে চলে যাওয়ার সময় সন্তানকে যা যা দিয়ে যেতে পারে তার মধ্যে কোনটা সবচেয়ে মূল্যবান?
অনেকে টাকাপয়সা, ধনসম্পদ দিয়ে যান। টাকার দাম মুদ্রাস্ফীতির কারণে দিন দিন কমে, সম্পত্তির মূল্যও নানা কারণে বাড়ে কমে। কথায় বলে কুবেরের ধনও ফুরিয়ে যায়। ফলে সন্তানকে যত ধনসম্পত্তিই দিয়ে যান না কেন, তার মূল্য অবিকৃত থাকবে না।
সফল, কৃতি মানুষেরা তাঁদের সন্তানদের খ্যাতি দিয়ে যান। কিন্তু সেই খ্যাতি বজায় রাখতে হলে সন্তানকেও বিখ্যাত বাবা কি মায়ের মত প্রতিভাবান এবং সফল হতে হয়, যা প্রায়শই হয় না। উপরন্তু বাবা-মায়ের খ্যাতির অপব্যবহার করে সন্তান তাঁদের দুর্নামের কারণ হচ্ছে — এমন দৃষ্টান্তই চোখে পড়ে বেশি। উপেন্দ্রকিশোরের পরে সুকুমার, সুকুমারের পর সত্যজিৎ নেহাতই ব্যতিক্রম। সে জন্যেই মনে থাকে। ঈশ্বরচন্দ্রের পরে নারায়ণচন্দ্রই বরং বেশি দেখা যায়।
আমরা সাধারণ মানুষ। এ যুগে সন্তানের ভোগ করার মত যথেষ্ট সম্পত্তি রেখে যাওয়ার সুযোগ আমাদের অনেকেরই হবে না। মৃত্যুর পরেও সন্তান “অমুকের ছেলে” বা “তমুকের মেয়ে” হিসাবে সমাজে অতিরিক্ত সম্মান, সুযোগসুবিধা বা খ্যাতি ভোগ করবে তেমন সম্ভাবনাও নেই। তবে কি এমন কিছুই নেই যা আমাদের মৃত্যুর পরেও সন্তানদের সম্পদ না হোক, অন্তত ছাতা হিসাবে কাজ করতে পারে? আমার সন্তানের সঙ্গে আমার সম্পর্কের সীমা তবে আমার শরীর? সেই শরীর অবলুপ্ত হওয়ার পর আমার সাথে সম্পর্কের কোন মূল্যবান অর্জন তার কাছে থাকবে না? তাহলে কেন দেশ কাল নির্বিশেষে বাবা-মায়েরা নিজের জীবনের চেয়েও সন্তানের মঙ্গলকে ঊর্ধ্বে স্থান দেন? আমাদের অষ্টাদশ শতকের কবির কেন মনে হল ঈশ্বরীর দেখা পেলে বাংলার নিরক্ষর পাটনী প্রার্থনা করবে “আমার সন্তান যেন থাকে দুধে ভাতে”? প্রায় তিনশো বছর পরের কবির কেন মনে হল ভাগ্যান্বেষী উজবেক যোদ্ধা বাবর, যার সাথে সেই বাঙালি পাটনীর কোন দিক থেকে কোন মিল নেই, তিনিও নিজের ঈশ্বরের কাছে বলতেন, আমার জীবনের বিনিময়ে হলেও আমার সন্তানের জীবন দাও? কবির কল্পনা তো আকাশ থেকে পড়েনি, এমনই আকুতি বিভিন্ন ভাষায় কত বাবা-মাকে তো আজও উচ্চারণ করতে দেখি আমরা। সেই বাবা মায়েরা তাহলে জীবন ফুরোলেই ফুরিয়ে যাবেন সন্তানের কাছেও?
কেউ কেউ বলবেন বাবা-মা শিক্ষা দেন, জীবনে নিজের পায়ে দাঁড় করান। সেটাই তো সারাজীবন সঙ্গে থাকে। সেকথা ঠিক, কিন্তু সে অবদান বাবা-মায়ের অনন্য অবদান নয়। মানুষ আত্মীয়স্বজন বন্ধুবান্ধবের থেকেও শিক্ষা পায়, সর্বোপরি শিক্ষক শিক্ষিকাদের থেকে পায়। এবং যে শিক্ষা সে পায় তার বেশিরভাগটাই স্বোপার্জিত। বাবা-মা বড় জোর সুযোগ তৈরি করে দেন।
ভেবে দেখলাম যে অক্ষয় ধন আমার সন্তানকে দিয়ে যেতে পারি তা হল সমাজ, সংসারের সঙ্গে, সারা পৃথিবীর মানুষের সঙ্গে তার সম্পর্কের বোধ। সুসময়ে, এবং দারুণ দুঃসময়ে, সেই বোধ তাকে অনেকটাই নিয়ন্ত্রণ করে।
সত্যি কথা বলতে কি, আমাদের প্রত্যেককে আমাদের বাবা-মায়েরাও জেনে বা না জেনে ঐ বোধই দিয়ে গেছেন, দিয়ে যাচ্ছেন। ইতিহাসের কোন মুহূর্তে ঠিক কোন জায়গাটায় আমি দাঁড়িয়ে আছি এবং তার সাপেক্ষে বর্তমানে আর ভবিষ্যতে আমার কোথায় দাঁড়ানো উচিৎ সেই বোধ সচেতন বাবা-মায়েরা আমাদের দিয়ে যান জেনে বুঝে। আর যে বাবা-মায়েরা তত সচেতন নন আসলে তাঁরাও স্থান নির্দেশ করে দিয়ে যান তাঁদের কথাবার্তায়, জীবনচর্যায়।
কথাটা নতুন করে উপলব্ধি করলাম টিভিতে তথাকথিত গোরক্ষকদের হাতে নিহত পুলিশকর্মী সুবোধ কুমার সিং এর ছেলে অভিষেকের কথা শুনতে শুনতে।
সুবোধ কুমার খুন হওয়ার পর যত সময় যাচ্ছে তত পরিষ্কার হচ্ছে যে খুন হওয়ার দিনের ঘটনাবলী সুপরিকল্পিত, হঠাৎ উত্তেজিত জনতা তাঁকে হত্যা করেনি। তিনি সাম্প্রতিক অতীতে গোহত্যার “অপরাধে” প্রথম যে খুনটা হয়েছিল দাদরিতে, সেই খুনের তদন্তকারী অফিসার ছিলেন। সেই খুনের অপরাধীদের হাজতবাস করার পেছনে তাঁর যথেষ্ট অবদান ছিল। বদলি হয়ে বুলন্দশহরে এসে পড়ার পরেও আদিত্যনাথের উত্তরপ্রদেশে আপোষ না করে তিনি হিন্দুত্ববাদীদের যথেষ্ট বিরাগভাজন হয়েছেন। তাঁর স্ত্রী বলেছেন সুবোধ কুমারকে প্রায়শই খুনের হুমকি দেওয়া হত। খবরে প্রকাশ বিজেপি নেতারা বুলন্দশহর থেকে তাঁর বদলি দাবী করেছিলেন অতি সম্প্রতি। বিপদের মধ্যে দিয়ে হাঁটছেন জেনেও সুবোধ কুমার ঘটনার দিন পুলিশ ইন্সপেক্টর হিসাবে যা কর্তব্য ঠিক তাই করছিলেন। কোন সাহস তাঁকে প্রণোদিত করেছিল তা বলার জন্যে তিনি নেই, তা দেশ হিসাবে আমাদের ব্যর্থতা। কিন্তু বাবা হিসাবে তাঁর সাফল্য এই অন্ধকারে আমাদের ক্ষীণ আলো দেখাচ্ছে।
সকালের কাগজে মুন্ডিতমস্তক যে ছেলেদুটির ছবি কয়েকশো কিলোমিটার দূরে বসা আমাকে ক্ষিপ্ত করে তুলছিল, সেই বাবা হারা কিশোর যখন টিভির পর্দায় বলে “শুধু মুখ্যমন্ত্রীকে নয়, সারা ভারতের লোকের কাছে আমার আবেদন, হিন্দু মুসলমান নিয়ে দাঙ্গা, সাম্প্রদায়িক হিংসা দয়া করে বন্ধ করুন,” তখন বোঝা যায় সুবোধকুমার ছেলেটির সঙ্গেই আছেন।
আরো পরিষ্কার হয় যখন অভিষেক বলেন “আমার বাবা একটা কথাই বলতেন ‘আর কিছু হতে পার না পার, সুনাগরিক হও। সব ধর্ম, সব জাতির লোকই এক। তুমি কারো চেয়ে বড় নও, কারো চেয়ে ছোটও নও।”
বাবা খুন হওয়ার কয়েকদিনের মধ্যে এই ভাষায় এই কথাগুলো বলতে পারা মুখস্থ বিদ্যায় সম্ভব নয়। প্রধানমন্ত্রী যে বিদ্যার বলে মধ্যে মধ্যে মহাত্মা গান্ধীর বন্দনা করেন সে বিদ্যার কর্ম নয় এসব। অনুভূতিদেশ থেকে আলো না পেলে শুধু ক্রিয়া, বিশেষণের জোরে এসব কথা বেরোয় না। অভিষেক যখন আমাদের সবাইকে সাবধান করেন এই বলে যে আমরা আত্মহননের পথে এগোচ্ছি; পাকিস্তান, চীনের দরকার নেই, আমরাই একে অপরের অনেক বড় শত্রু হয়ে উঠছি; তখন বোঝা যায় অভিষেকের প্রয়াত বাবা, এবং অবশ্যই মা, এই যুগসন্ধিক্ষণে তার যে স্থান নির্দেশ করেছেন সে সেই স্থানের যোগ্য হয়ে উঠছে। এইখানে মৃত সুবোধ কুমারের জিত, হত্যাকারীদের হার। হত্যাকারীদের সরকার তাঁর নামে রাস্তার নামকরণ করুক আর না-ই করুক, সুবোধ কুমার সন্তানের মধ্যে বেঁচে রইলেন। আমাদেরও বাঁচার রাস্তার সন্ধান দিলেন।
এত কথা বলার পরে একটা প্রশ্ন উঠতে বাধ্য। সন্তান কি সবসময় বাবা-মায়ের দেখানো অবস্থান মেনে নেয়? নেয় না। প্রকৃতপক্ষে সর্বদা মেনে নেওয়া উচিৎও নয়। কারণ অনেক বাবা-মা এমন অবস্থানও ঠিক করেন যা সমাজের পক্ষে, সন্তানের চারপাশের মানুষের পক্ষে ক্ষতিকর, পশ্চাৎমুখী। সেইসব বাবা-মায়েদের অবাধ্য সন্তানেরাই যুগে যুগে সমাজকে বদলে দেন, এগিয়ে নিয়ে যান। সেই জন্যেই আমাদেরও বারবার ভাবতে হবে সন্তানকে ঠিক কোথায় দাঁড়াতে বলছি। কার পক্ষে, কার বিপক্ষে? তাকে যে অবস্থান নিতে শেখাচ্ছি তা শুধু তার জন্যে ভাল, না আর পাঁচজনের জন্যেও ভাল — সেকথাও ভাবতে হবে। এমনি এমনি তো আর ঠাকুমা, দিদিমারা বলতেন না “প্রসব করলেই হয় না মাতা।”

%d bloggers like this: