প্রতিবাদ সংবাদে বাদ?

গত ২৭শে নভেম্বর পাঞ্জাব, হরিয়ানার কৃষকরা তিনটে কৃষি বিল বাতিলের দাবীতে এবং প্রস্তাবিত বিদ্যুৎ বিলের বিরুদ্ধে দিল্লী অভিযান শুরু করেন। ইতিমধ্যে উত্তরাখণ্ড, উত্তরপ্রদেশের মত রাজ্যগুলোর কৃষকরাও পথে নেমে পড়েছেন। মহারাষ্ট্রের কৃষকরা নামবেন বলে ঘোষণা করেছেন। কাউকে কেয়ার না করা মোদী সরকার বুঝেছে ঠ্যালার নাম বাবাজি। এ রীতিমত কৃষক বিদ্রোহ। তাই গায়ের জোর ভুলে অমিত শাহ ও সম্প্রদায় হঠাৎ আলোচনার জোরে বিশ্বাসী হয়ে উঠেছে। চিড়ে কিন্তু ভিজছে না। একগুঁয়ে চাষাদের এক কথা — সংসদ ডাকো, আইন বাতিল করো। সারা দেশের বাম, মধ্য, দক্ষিণ — যে কোন পন্থার মানুষের কাছেই এই মুহূর্তে এর চেয়ে বড় কোন ঘটনা নেই, কোন ইস্যু নেই, থাকার কথাও নয়।

অথচ বাংলা মূলধারার সংবাদমাধ্যমগুলোর দিকে তাকালে কিন্তু সেটা বোঝার উপায় নেই। গতকালই পি সাইনাথ এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন এই কৃষক বিদ্রোহ এক দিনে তৈরি হয়নি। গত কয়েক বছরে রাজস্থান, মহারাষ্ট্র, মধ্যপ্রদেশের কিষাণ লং মার্চের ধারাবাহিকতায় এই আন্দোলন এসেছে। সেই আন্দোলনগুলো যেমন বাংলার সর্বাধিক টি আর পি প্রাপ্ত দুটো খবরের চ্যানেলে প্রাধান্য পায়নি, এই আন্দোলনও পাচ্ছে না।

২৬শে নভেম্বর কেন্দ্রীয় ট্রেড ইউনিয়নগুলোর ডাকে দেশব্যাপী সাধারণ ধর্মঘট ছিল। সেই ধর্মঘটকেও সমর্থন জানিয়েছিল কৃষক সংগঠনগুলো। সেদিন বহু জায়গায় ট্রেন চলেনি, বাস চলেনি, দোকানপাট বন্ধ ছিল। অথচ সেদিন দুপুরেও কূপমন্ডুক বাংলা চ্যানেলের প্রধান খবর ছিল মাঝেরহাট ব্রিজ খোলার দাবিতে বিজেপির দাপাদাপি। যে ব্রিজ আজ বিকেলে উদ্বোধন হওয়ার কথা আগেই ঘোষণা হয়ে গিয়েছিল।

বাংলা খবরের কাগজগুলোতেও গত কয়েক দিন ধরে কৃষক বিদ্রোহ নয়, বেশি জায়গা অধিকার করে থাকছে শুভেন্দু অধিকারীর ধাষ্টামো বা মাননীয় মুখ্যমন্ত্রীর ভোটমুখী প্রকল্প ঘোষণা। গত দু-তিন দিনে তবু কৃষক বিদ্রোহের খবর বা ছবি বাড়ির কাগজটার প্রথম পাতায় ভাল করে দেখতে পাচ্ছি, তার আগে এ কোণে এক কলম বা ও কোণে দু কলমেই সন্তুষ্ট থাকতে হচ্ছিল। সে অবশ্য চব্বিশ ঘন্টার আনন্দময় চ্যানেলগুলোর তুলনায় মন্দের ভাল। কারণ ওগুলোতে খবর বলতে সারাদিন যা পাওয়া যায়, তা হল — অমুক জায়গায় তৃণমূলের লেখা দেওয়াল মুছে দিল বিজেপি। তমুক জায়গায় বিজেপির পার্টি অফিসে তৃণমূলের ভাঙচুর। বিজেপি নেতার মাচার লাউ কেটে নেওয়ার অভিযোগ তৃণমূল পঞ্চায়েত সদস্যের বিরুদ্ধে। তৃণমূলের পঞ্চায়েত প্রধানের বিরুদ্ধে চরিত্রহীনতার অভিযোগ করলেন বিজেপি সদস্য — এইরকম আর কি।

অর্থাৎ যে খবরগুলো আজ থেকে পাঁচ বছর আগেও নেহাত দেখানোর বা ছাপার মত কিছু না থাকলে জায়গা ভরাতে ব্রিফ হিসাবে ব্যবহার করা হত — সেগুলোই বাঙালিকে দিনরাত পড়ানো এবং দেখানো হচ্ছে। ব্যাপারটা মোটেই হাস্যকর নয়। আসলে দিল্লী ভিত্তিক হিন্দ্রেজি সংবাদমাধ্যম যেমন দেশের আসল সমস্যাগুলোকে আড়াল করতে পাকিস্তানকে কেমন দিলাম, লাভ জিহাদ, সিভিল সার্ভিস জিহাদ ইত্যাদি আবর্জনা পরিবেশন করে, বাংলার সংবাদমাধ্যমও কৃষক বিদ্রোহ, শ্রমিকদের আন্দোলনকে আড়াল করতে আবর্জনা পরিবেশন করছে। হিন্দ্রেজি সংবাদমাধ্যমগুলোর খবর থেকে মস্তিষ্কে বিষক্রিয়া হয়, বাংলার আবর্জনা কেবল দুর্গন্ধ ছড়ায় — তফাত এটুকুই।

কিন্তু কেন এমন করা হচ্ছে? কৃষক আন্দোলনকে প্রাপ্য গুরুত্ব দিলে কী ক্ষতি? পশ্চিমবঙ্গের শ্রমিকরা কি টিভি দ্যাখেন না, নাকি কৃষি আইন, শ্রম কোডের প্রভাব এ রাজ্যের শ্রমিক, কৃষকদের উপর পড়বে না?

আসলে প্রকাশ্যে স্বীকার না করলেও, যারা জানার তারা জানে, হিন্দ্রেজি সংবাদমাধ্যমের অধিকাংশ যেমন একচোখা, এ রাজ্যের অধিকাংশ সংবাদমাধ্যমও তাই। তাদের অনেকেই ফ্যাসিবিরোধী, কিন্তু কোনটাকে ফ্যাসিবাদ বলা হবে, তার কতটা বিরোধিতা করা হবে, আদৌ করা হবে কিনা — সেসব তারা ঠিক করে না। অনুপ্রেরণা ছাড়া এ রাজ্যে ফ্যাসিবাদের বিরোধিতা করাও মানা।

অতএব শিক্ষক-শিক্ষিকার চাকরি খুঁজছে যারা, তাদের আন্দোলনের কথা জানতে হলে আপনাকে ফেসবুকই খুলতে হবে। টিভির স্থানীয় সংবাদ লাউমাচা পুঁইমাচা নিয়েই চলবে। কৃষক বিদ্রোহের খবর জানতে চাইলেও হাতে গোনা হিন্দ্রেজি সংবাদমাধ্যম অথবা খবরের সাইটের শরণাপন্ন হতে হবে। টিভি আর কাগজ জুড়ে দলবদলের হট্টগোলই চলবে।

ছবিটা অবশ্য কাল থেকে বদলে যাবে বলে আশা করছি। কারণ আজ দিদি ঘোষণা করেছেন তিনি কৃষকদের পাশে আছেন, ঐ আইনগুলো খুব খারাপ, অবিলম্বে বাতিল করা উচিৎ এবং এই দাবিতে তাঁর দল কোমর বেঁধে আন্দোলনে নামছে। আশা করি এবার আর বাংলা সংবাদমাধ্যমের অনুপ্রেরণার অভাব হবে না।

উল্টো রাজা উল্টো বুঝলি প্রজার দেশে

যে যা-ই বলুক, চোখ কান খোলা রাখলে বেশ টের পাওয়া যাচ্ছে পশ্চিমবঙ্গ মোটেই কোরোনা সামলাতে যা করা উচিৎ তা করছে না। বেশি কড়া কথা বলা হয়ে যাচ্ছে মনে হলে একটু নরম করে বলা যেতেই পারে করতে পারছে না। তা বলে কেন্দ্রীয় সরকার সংবিধান, যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামো ইত্যাদির তোয়াক্কা না করে জেলায় কী হচ্ছে সে সম্বন্ধে ভাষণ দেবে আর খবরদারি করতে কেন্দ্রীয় দল পাঠাবে — তাও সমর্থনযোগ্য নয়।

লক্ষণীয়, গত দুদিনে কেন্দ্রীয় সরকার কতকগুলো জায়গা সম্বন্ধে আলাদা করে বলেছে সেখানে উদ্বেগজনক অবস্থা। প্রত্যেকটা জায়গাই অ-বিজেপি শাসিত রাজ্যে — কলকাতা, মুম্বাই, জয়পুর, ইন্দোর। কলকাতার (এবং হাওড়ার) অবস্থা আমরা আশেপাশের লোকেরা জানি, তাই বাদ দিন। কিন্তু বাকিগুলো ভাবুন।

শুরু থেকেই দেশে সবচেয়ে বেশি টেস্ট করছে কেরালা আর মহারাষ্ট্র। স্বভাবতই ও দুটো রাজ্যে কোরোনা আক্রান্ত রোগীও বেশি পাওয়া যাচ্ছে৷ মুম্বাই মহারাষ্ট্রের রাজধানী। জয়পুর রাজস্থানে। যে রাজ্যের ভিলওয়ারাকে কদিন আগে মডেল বলেছে কেন্দ্রীয় সরকার নিজেই। সেখানে কোরোনা রোগীর সংখ্যাও কিছু অস্বাভাবিক গতিতে বৃদ্ধি পাচ্ছে না। ইন্দোর মধ্যপ্রদেশে। সে এমন এক রাজ্য যেখানে এখন অব্দি আস্ত ক্যাবিনেট নেই, স্বাস্থ্যমন্ত্রী নেই। কংগ্রেস সরকারকে সরিয়ে সবে বিজেপি সরকার শপথ নিয়েছে, তখনই লকডাউন শুরু হল। সেখানে মাঝে কয়েকদিন প্রচুর কোরোনা রোগী পাওয়া যাচ্ছিল, হঠাৎই কমতে শুরু করেছে। ভোজবাজির মত।

এর পাশাপাশি যদি বিজেপিশাসিত রাজ্যগুলোর দিকে চোখ রাখা যায়, দেখা যাবে উত্তরপ্রদেশে ঠিক কী হচ্ছে আমরা জানি না। তবলিগি জামাতের জমায়েত নিয়ে দিনরাত এত দুশ্চিন্তা আমাদের, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রক নিয়মিত আপডেট দিচ্ছে ওখান থেকে কতজনের কোরোনা হয়েছে, অথচ লকডাউন শুরু হওয়ার পর রামনবমীর দিন অযোধ্যার অনুষ্ঠান থেকে কতজনের কোরোনা হয়েছে তার কোন পরিসংখ্যান আমরা পাচ্ছি না। উত্তরপ্রদেশে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ীই কিন্তু সহস্রাধিক আক্রান্ত। তা নিয়ে কেন্দ্রীয় সরকার চিন্তিত নন। উত্তর-পূর্বাঞ্চলের রাজ্যগুলো সর্বদা দেশী বিদেশী পর্যটকে ভরে থাকে, অথচ ওদিকে একেকটা রাজ্যে দুজন, পাঁচ জন, দশ জন করে আক্রান্ত। অর্থাৎ ঐ রাজ্যগুলো বাকিদের জন্য অনুকরণীয়। তাহলে কেন্দ্রীয় সরকার বাকিদের ওদের থেকে শিখতে বলছেন না কেন, তাও পরিষ্কার নয়। ফলত কিছু রাজ্যের জন্য এই দুশ্চিন্তাকে লর্ড ডালহৌসির করদ রাজ্যগুলোর প্রজাদের জন্য দুশ্চিন্তার বেশি কিছু ভাবা শক্ত হয়ে দাঁড়াচ্ছে।

আসলে রাজ্য সরকার মানে যে কেন্দ্রীয় সরকারের অধীনস্থ অফিস নয়, তা বর্তমান সরকার মোটেই মানতে চান না।সংবিধানকে মারো গুলি। কেনই বা মারবেন না? আমাদের সংবিধান যে নিতান্ত ফেলে দেওয়ার মত একটা জিনিস সে সিদ্ধান্ত এ দেশে হয়েই গেছে। পাড়ার “আমি কিন্তু বিজেপি নই” দাদা বা দিদির সাথে কথা বললেই বুঝতে পারবেন।

অবশ্য প্রধানমন্ত্রীকে মুখ্যমন্ত্রীর প্রভু ভাবার অভ্যেসটা যারাই শক্তিশালী কেন্দ্রীয় সরকার চালিয়েছে তাদেরই বিলক্ষণ ছিল। রাজ্যপালকে দিয়ে দিনরাত বিরোধী দলের রাজ্য সরকারের পিছনে লাগা, সরকার ভেঙে দেওয়া, কাজে বাধা সৃষ্টি — সবই শুরু হয়েছে সেই বাজপেয়ীর দুর্গা ইন্দিরার আমলে। বরাবর কেন্দ্রের দাদাগিরি নিয়ে সবচেয়ে সোচ্চার ছিলেন বামপন্থীরা। তাঁরা রাজ্যগুলোকে আরো ক্ষমতা দিতে এমনকি সংবিধান সংশোধন চাইতেন, ৩৫৬ ধারার বিলোপ চাইতেন। এ সবের জন্য বাঙালির দৈনিক বেদ যারপরনাই গালাগাল দিয়েছে বামেদের। বলেছে এরা কাজ করতে চায় না বলে কেন্দ্রীয় সরকারের দিকে আঙুল তোলে।

একবার তো এক কেন্দ্রীয় মন্ত্রী হুমকিই দিয়েছিলেন যে তাঁর দল লোকসভায় ৩.৫৬% ভোট পেয়েছে, তাই তিনি প্রধানমন্ত্রীকে দিয়ে পশ্চিমবঙ্গে ৩৫৬ জারি করিয়ে দেবেন। নামটা গুগল করলে পেয়ে যাবেন। শেষ বামফ্রন্ট সরকারের আমলে তিনিই আবার বলেছিলেন পি এম টু ডি এম কাজ হওয়া উচিৎ, রাজ্য সরকারকে মানব না।

এরকম অনেক দৃষ্টান্ত আছে। কিন্তু কোন দুষ্কর্মই আগে অন্য লোক করেছে বলে বৈধ হয়ে যায় না। ফলত কেন্দ্রীয় সরকারের এই “চালুনি বলে ছুঁচ, তোর পিছে কেন ছ্যাঁদা” মার্কা তৎপরতাকে কোন যুক্তিতেই মহৎ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে ভাবা সম্ভব হচ্ছে না। “এই সময়ে রাজনীতি করবেন না” কথাটাও নেহাত খিল্লি হয়ে দাঁড়াচ্ছে। বরাবর দেখা যায় রাজনীতিকে ভাইরাসের মত পরিহার করতে বলে তারাই যারা ক্ষমতাশালী, কারণ রাজনীতি বন্ধ করতে পারলে ক্ষমতা নিরঙ্কুশ হয়। এক্ষেত্রেও ব্যাপারটা তাই। কেন্দ্র, রাজ্য উভয় সরকারের ব্যবহারই তা প্রমাণ করে। রাজ্যের ব্যবহার নিয়ে না হয় আরেকদিন কথা হবে। পিঠটাও তো বাঁচাতে হবে।

সাত তাড়াতাড়ি

ঠিক সাতটা অনুচ্ছেদ। কারণ এই ঘটনা এর চেয়ে বেশি গুরুত্ব পাওয়ার যোগ্য নয়।

১) শরীর, নারী শরীর তো বটেই, অবশ্যই বিদ্রোহের হাতিয়ার হতে পারে। মণিপুরের মায়েরা এক সময় রাষ্ট্রীয় ধর্ষণের প্রতিবাদে উলঙ্গ হয়ে রাস্তায় দাঁড়িয়েছিলেন। হাতের ব্যানারে লেখা ছিল “INDIAN ARMY RAPE US.” এরকম বিস্ফোরক রাজনৈতিক বক্তব্য নিজের শরীরকে ব্যবহার করে প্রকাশ করা যায়। আবার সাধারণভাবে ধর্ষণ, যৌন হয়রানির প্রতিবাদ করতে মহিলারা slut walk ও করে থাকেন। সুতরাং শুধু বুকে বা পিঠে কেন, হাতে পায়ে মাথায় পশ্চাদ্দেশে — যেখানে ইচ্ছা হয় আপনি কিছু লিখে ছবি তুলতেই পারেন। কিন্তু সেটা যদি বিদ্রোহ বলে গ্রাহ্য হতে হয় তাহলে লেখাটার সারবত্তা থাকতে হবে। রবীন্দ্রসঙ্গীতে খিস্তি বসিয়ে দিলেই বিদ্রোহ হয় না। মণিপুরের মায়েদের মত বা যাঁরা slut walk করেন তাঁদের মত বিদ্রোহী হতে গেলে কিন্তু রাষ্ট্র, সমাজ, পরিবার —- সকলের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে হয়। তাতে নানাবিধ ক্ষতির ঝুঁকি থাকে। সেজেগুজে একটি জনপ্রিয় উৎসবে যোগ দেওয়ায় কোন ঝুঁকি নেই। ভাইরাল হতে চাওয়া বিদ্রোহ নয়।

২) রবীন্দ্রনাথের গান, কবিতা নিয়ে ব্যঙ্গবিদ্রূপ বা প্যারডি এমন কিছু অভূতপূর্ব ব্যাপার নয় যা রোদ্দুর রায়ের ক্ষণজন্মা প্রতিভার দৌলতে এই সোনার বাংলায় ঘটতে পারল। রবীন্দ্রনাথের জীবদ্দশাতেই ওসব হয়েছে, স্বয়ং দ্বিজেন্দ্রলাল রায় করেছেন। বিশিষ্ট সমালোচক জ্যোতি ভটাচার্য দেখিয়েছেন কাজী নজরুল ইসলামও তাঁর একটা কবিতায় ‘ভারততীর্থ’ কবিতার কিছু পংক্তি নিয়ে ব্যঙ্গ করেছেন। কিন্তু তাঁরা আনতাবড়ি খিস্তি যোগ করে কাজ সারেননি। “উনি ব্যঙ্গ করেছেন অতএব আমি করলে দোষ নেই” — এটা অশিক্ষিতের যুক্তি। কী করেছেন তা দিয়ে আপনার বিচার হবে, স্রেফ করেছেন বলেই বাহবা দাবী করতে পারেন না কেউ। সে আপনি মেঘ বা রৌদ্র যা-ই হন।

৩) অনেক বুদ্ধিমান লোক ‘শেষের কবিতা’ র বিভিন্ন অংশ উদ্ধৃত করে রবীন্দ্রনাথকে দিয়েই এই অসভ্যতার ওকালতি করাতে চাইছেন। প্রচুর লাইকও পাচ্ছেন, কারণ উপন্যাস পড়ার সময় আজকাল কারোর নেই। যাঁরা আগ্রহী তাঁরা উপন্যাসটা পড়লে দেখবেন যে অংশগুলো উদ্ধৃত হচ্ছে সেগুলো অমিত রায় এবং সে যে ছদ্মনামে রবিবাবুর বিরোধিতা করত, সেই নিবারণ চক্রবর্তীর বক্তব্য, রবীন্দ্রনাথের বক্তব্য নয়। আর অমিত চরিত্রটি কী এবং কেন সেটা উপন্যাসের শেষ পাতা অব্দি পৌঁছাতে পারলে বেশ বোঝা যায়। কথাটা যদি গোলমেলে মনে হয় তাহলে গুগল করে দেখে নিন negative capability মানে কী।

৪) সমসাময়িক বাংলা সাহিত্যে এক শ্রেণীর লেখক আছেন যাঁরা মনে করেন চাট্টি খিস্তি লিখলেই নবারুণ ভট্টাচার্যের পদাঙ্ক অনুসরণ করা হয়। তাঁদের মধ্যে ব্যাপারটার প্রবল সমর্থন দেখতে পাচ্ছি। অবাক হচ্ছি না। যাঁরা কিংবদন্তির রাজহংসের জল বাদ দিয়ে দুধ খাওয়ার মত করে নবারুণের সাহিত্য থেকে তুলে নিয়েছেন কেবল খিস্তিটুকু, তাঁরা এই ধাষ্টামো সমর্থন করবেন না তো করবে কারা?

৫) ভারতের ফ্যাসিবাদীদের একটি প্রিয় খেলা আছে। ইংরেজিতে তার নাম whataboutery, আমি বাংলায় বলি বনলতা সেনগিরি। অর্থাৎ “এতদিন কোথায় ছিলেন?” এই কাণ্ডে দেখছি ফ্যাসিবিরোধীরা প্রবল বনলতা সেনগিরি করছেন। “দিল্লীতে জোর করে রবীন্দ্রনাথের লেখা জাতীয় সঙ্গীত গাইয়ে খুন করে ফেলা হল। সেটা অশ্লীল মনে হয়নি?” “বিজেপি রবীন্দ্রনাথের কবিতা বিকৃত করে পোস্টার বানিয়েছে। সেটা অশ্লীল মনে হয়নি?” এ কি অদ্ভুত গা জোয়ারি রে বাবা! যারা রবীন্দ্রভারতীর কাণ্ডটার নিন্দা করছি তারা অনেকেই তো সোচ্চার বিজেপিবিরোধী, দিল্লীর দাঙ্গা নিয়েও সোচ্চার থেকেছি। এই অসভ্যতা বিজেপি করেনি বলেই নিন্দা করা যাবে না? বা বিজেপিও নিন্দা করছে বলেই আমাদের প্রশংসা করা কর্তব্য? এ তো বিজেপির মতই অনর্থক বাইনারি তৈরি করা। তাও আবার বাংলার সংস্কৃতির পায়ুমৈথুন করে — ঠিক যেটা বিজেপি করতে চায়।

৬) বাড়াবাড়ি করা আমাদের জাতীয় স্বভাবে পরিণত হয়েছে। যেমন ক্রিয়ায় তেমনি প্রতিক্রিয়ায়। কিছু ছেলেমেয়ে অসভ্যতা করেছে, তাদের নিন্দা শুনতেই হবে, বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ পারলে কিছু শাস্তিও দিতে পারেন। এদের বিরুদ্ধে পুলিশে অভিযোগ করার দরকার কী? এরা কি চুরি ডাকাতি করেছে না খুন জখম করেছে? আর উপাচার্যই বা কিসের নৈতিক দায়িত্ব নিয়ে পদত্যাগ করতে চাইছিলেন?

৭) গত দশ-বারো বছরে রাস্তাঘাটে খিস্তি দিয়ে কথা বলা যে দ্রুততায় ফ্যাশনে পরিণত হয়েছে, একই দ্রুততায় ভারতীয় পুরুষদের ধর্ষণ করার ইচ্ছাও বেড়েছে। কিছু মেয়ের পিঠ দেখা যেতেই সেই ইচ্ছা বেরিয়ে আসছে। কি সাংঘাতিক ব্যাপার! মেয়েদের পিঠ দেখা গেছে! আবার সে পিঠে কিসব লেখা! এ উত্তেজনা সামলানো যায়? যাদের মেয়েদের হাতের তালু দেখলেও গা শিরশির করে, তারা যে পিঠ দেখে মত্ত হাতীর মত আচরণ করবে তাতে আর আশ্চর্য কী?