দ্যাট লিডার, দিস ম্যান: মহাশূন্যের দুটি বিন্দু

‘দিস ম্যান’ (অবশ্যই উওম্যানও) যারপরনাই পরিশ্রম করল স্বেচ্ছাসেবকের ভূমিকায় আর ‘দ্যাট লিডার’ পারমুটেশন-কম্বিনেশনের অঙ্ক কষে গেলেন।

২০০৪ লোকসভা নির্বাচনের প্রচার পর্বের রিপোর্টিং করতে জাপানের কমিউনিস্ট পার্টির মুখপত্র আকাহাতা তাদের দক্ষিণ এশিয়ার প্রতিবেদক জুনিচি কোদামাকে পাঠিয়েছিল পশ্চিমবঙ্গে। আমার তখন সেই বয়স যে বয়সে মনে হয় কাল বাদে পরশুই বিপ্লবটা করে ফেলব। ভারতের ছাত্র ফেডারেশনের সদস্য হওয়ার সুবাদে এবং এক বন্ধুর সক্রিয়তায় জুনিচির সহকারী হওয়ার সৌভাগ্য হল। পার্টি মুখপত্রের সাংবাদিক হলেও, পার্টির বিরোধীদের বক্তব্য জানায় তার সমান উৎসাহ। সম্ভবত ধনী দেশের কমিউনিস্ট পার্টির মুখপত্র বলেই আকাহাতা খরচ করার ব্যাপারেও অকৃপণ। তাই জুনিচি ভাড়া করা গাড়িতে চেপে যে কোন এলাকায় চলে যেত। বিভিন্ন দলের শীর্ষ নেতা থেকে শুরু করে হাতে টানা রিকশার চালক পর্যন্ত সকলের সাথে কথা বলাই তার সাংবাদিকতার অভিজ্ঞান। আমার কাজ মূলত জুনিচির আপাত দুর্বোধ্য ইংরেজি আর স্থানীয় লোকের বাংলা, হিন্দির সংযোগ স্থাপন এবং গাড়ির চালককে পথনির্দেশ দিয়ে জুনিচি আর তার স্ত্রী, ছায়াসঙ্গিনী রিয়েকোকে অচেনা জায়গাগুলোতে নিয়ে যাওয়া। দিন সাতেকের সেই অভিজ্ঞতা থেকে শিখলাম যে বিপ্লবটা পরশু হচ্ছে না, অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত রাখা হয়েছে।

ঐ সাতদিনের একদিন সকালে আমরা গিয়েছিলাম বারাসত চাঁপাডালি মোড়ের কাছে সিপিএমের পার্টি অফিসে। সে অফিসের শীতাতপনিয়ন্ত্রিত একটি ঘরে জুনিচির জন্য অপেক্ষায় ছিলেন তখনকার এক দোর্দণ্ডপ্রতাপ নেতা। ভদ্রলোকের ধোপদুরস্ত সাদা পাঞ্জাবি পাজামা আর মুখের কর্পোরেট হাসিটি মনোমুগ্ধকর। টেবিলের উপর দেখলাম তিনটি মোবাইল ফোন। অমন অত্যাধুনিক হ্যান্ডসেট বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার ক্লাসের ধনীর দুলাল-দুলালিদের হাতেও দেখিনি। বেরিয়ে আসার পর দেখলাম জাপানি কমরেডরাও বেশ অবাক। জুনিচি নিজে তখনো নোকিয়ার সেই ছুঁড়ে মানুষ মারা যায় এমন একখানা হ্যান্ডসেট ব্যবহার করে, তার স্ত্রীর নিজস্ব মোবাইল নেই।

সেখান থেকে আমরা গেলাম ছোট জাগুলিয়া। কমরেড দোর্দণ্ডপ্রতাপ বলে দিয়েছিলেন কার খোঁজ করতে হবে। খুঁজতে খুঁজতে আমরা পৌঁছলাম একটা ছোট্ট পার্টি অফিসে। বারাসতে যদি প্রাসাদে ঢুকে থাকি, এ তাহলে কুঁড়েঘর। দোর্দণ্ডপ্রতাপ যত রাজকীয়, ইনি তত সাদাসিধে। একমাথা পাকা চুল, চোখে ঘোলাটে চশমা, মুখভর্তি পাকা দাড়ি, পরনে সাধারণ লুঙ্গি, গায়ে ফুটো হয়ে যাওয়া গেঞ্জি। কানেও কম শোনেন। কিন্তু যেই মাত্র শুনলেন সুদূর জাপানের কমিউনিস্ট পার্টির দুই কমরেড এসেছেন, মনে হল বয়স দশ বছর কমে গেল ভদ্রলোকের। বলা বাহুল্য এ অফিসে এসি ঘর নেই। একতলায় গোটা দুয়েক ঘর, দোতলায় একখানা। ইনি আমাদের বেঞ্চে বসালেন। দোর্দণ্ডবাবু ঠান্ডা পানীয় খাইয়েছিলেন, ইনি হাঁক পেড়ে রাস্তার দোকান থেকে আনালেন লাল চা। জুনিচি গিয়েছিল নির্বাচন সম্বন্ধে খোঁজখবর করতে, কিন্তু এই ব্যক্তিটি সম্বন্ধে তার অসীম আগ্রহ তৈরি হল। তার হয়ে আমাকেই জিজ্ঞেস করতে হল কবে থেকে পার্টি করছেন (পঞ্চাশের দশক থেকে), এখন পার্টিতে কোন পদে আছেন (লোকাল কমিটির সদস্য), কী করেন (পার্টিই করেন, সারাজীবন তা-ই করেছেন), কোথায় থাকেন (ঐ অফিসেই থাকেন)। ছোট জাগুলিয়ায় গরীব মানুষ কতজন, ধনী কারা, কোথায় কেমন ভোট হয় — এসব প্রশ্নের জবাবও বৃদ্ধ যেভাবে দিলেন, তাতে বোঝা যায় এলাকাটা তাঁর হাতের তালুর মত চেনা।

কমিউনিস্ট পার্টির এরকম দু-একজন সদস্যকে স্বচক্ষে দেখার সৌভাগ্য আমার ছেলেবেলাতেই হয়েছে, আরো অনেকের গল্প শুনেছি। কিন্তু জুনিচি আর রিয়েকোর এমন অভিজ্ঞতা ছিল না। তারা আপ্লুত। আর সবচেয়ে মোক্ষম কথাটি জুনিচি বলল গাড়িতে উঠে। “হোয়াট ডিফারেন্স! দ্যাট লিডার, দিস ম্যান!” সত্যিই জগতের বিশ্লেষণে কার্ল মার্কস অভ্রান্ত। কমিউনিস্ট পার্টির ভিতরেও এমন শ্রেণি বিভাজন!

সতেরো বছর আগের সেই দিনটা বারবার মনে পড়ছে দোসরা মে-র পর থেকে। বামফ্রন্ট তথা সিপিএমের ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার এক দশক পূর্ণ হল। সেটা বড় কথা নয়। নির্বাচনে কোন দল হারে, কোন দল জেতে। একটানা ৩৪ বছর একই পার্টির নেতৃত্ব একই ফ্রন্টের সরকার ছিল, সেটাই বরং বিরল। কিন্তু একটা রাজ্যে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার দশ বছরের মধ্যে একটা দল লোকসভায় শূন্য, বিধানসভায় শূন্য — এরকম ঘটতে দেখা যায় না চট করে। উদাহরণস্বরূপ কংগ্রেসকেই দেখা যাক। তারা পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতায় নেই ১৯৭৭ সাল থেকে। কিন্তু দীর্ঘদিন প্রধান বিরোধী দল ছিল। নব্বইয়ের দশকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় দল ভেঙে বেরিয়ে যাওয়ার পর দ্রুত ক্ষমতা কমতে থাকলেও ২০১১-র পালাবদলেও কংগ্রেসের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। তারা এতদিন পরে বিধানসভায় শূন্য হয়েছে, লোকসভায় এখনো এ রাজ্য থেকে তাদের দুইজন প্রতিনিধি। পাশাপাশি বামফ্রন্টের বড় শরিক এই অল্প সময়েই ব্রিগেড ময়দান ছাড়া সর্বত্র শূন্য। এমতাবস্থায় যে কোন দলে রাজ্য স্তরের নেতাদের জবাবদিহি করতে হয়, জায়গা ছাড়তে হয়। গত কুড়ি বছরে কতবার প্রদেশ কংগ্রেসের সভাপতি বদলেছে গুনে দেখতে হবে। কিন্তু সিপিএমে ওসব হবার নয়। তারা মার্কসবাদী, লেনিনের আদর্শে চলে, তাদের আছে রেজিমেন্টেশন। সবই নাকি যৌথ দায়িত্বের ব্যাপার। রেজিমেন্টেশন ভাল না মন্দ তা নিয়ে বিস্তর বিতর্ক আছে। সেটুকু বাদ দিলে বাকিটা কিন্তু দিব্য শুনতে লাগে। বিশেষত কর্পোরেট দুনিয়ায় যেন তেন প্রকারেণ অন্যের ঘাড়ে দোষ চাপিয়ে দেওয়ার যে ধারা আছে, তার তুলনায় এ তো স্বর্গ। কিন্তু সিপিএমের ক্ষেত্রে যৌথ দায়িত্ব কথাটার অর্থ দাঁড়িয়েছে যৌথভাবে দায়িত্ব এড়ানো। ২০১৮-র পঞ্চায়েত নির্বাচনের মনোনয়ন পর্বে যখন রাস্তায় দাঁড়ানো উন্নয়ন খড়গ হাতে বাম কর্মীদের তাড়া করল, খুন করল, মহিলাদের কাপড় খুলে নিল — তখন রাজ্যের কোথাও নেতাদের যৌথ দায়িত্ব নিয়ে ধরনায় বসতে দেখা যায়নি, কোথাও কোন অবরোধ হয়নি। যে মুখ্যমন্ত্রীর বিরুদ্ধে তাঁদের এত অভিযোগ, তিনি নিশ্চিন্তে হরিশ চ‍্যাটার্জি স্ট্রিটের বাড়ি থেকে বিদ্যাসাগর সেতু পেরিয়ে রোজ নবান্নে গেছেন, এসেছেন। কোন লাল ঝান্ডা তাঁর পথ আটকায়নি।

অর্থাৎ “দিস ম্যান” মার খেয়েছে আর “দ্যাট লিডার” আলিমুদ্দিন স্ট্রিটে সাংবাদিক সম্মেলন ডেকে বিবৃতি দিয়েছেন। কেউ কেউ ফেসবুক বিদীর্ণ করে স্ট্যাটাস দিয়েছেন। কবে কোন জেলার কোন প্রত্যন্ত এলাকায় কোন পার্টি অফিস ভাঙা হয়েছে তা সারা রাজ্যের বাম কর্মী সমর্থকরা ফেসবুকের মাধ্যমে জানতে পেরেছেন। কিন্তু তার বিরুদ্ধে নেতারা কী ব্যবস্থা নিয়েছেন, কজন পার্টিকর্মীর সাথে গিয়ে দেখা করেছেন, কটা থানা ঘেরাও করেছেন — সেসব প্রচারিত হয়নি। ফলত বিরাট সংখ্যক নীচুতলার কর্মী সমর্থকের বিজেপির দিকে সরে যাওয়া, ২০১৯ লোকসভা নির্বাচনে ৩৭% থেকে ৭% হয়ে যাওয়া। তৃণমূল ও সম্প্রদায় স্বভাবতই বললেন বাম রাম হয়েছে। এতদূরও রটে গেল যে জেলার বাম নেতারা সচেতনভাবে ভোট ট্রান্সফার করিয়েছেন বিজেপির বাক্সে। সচেতন, অবচেতনের বিতর্কে না গিয়েও অনস্বীকার্য যে বামেদের ভোট সে সময় বিজেপির খাতায় জমা পড়েছে। অর্থাৎ একেবারে রাস্তায় দাঁড়িয়ে কাজ করা কর্মীরা মারও খেলেন, বদনামের ভাগীও হলেন।

অতঃপর নেতারা কী ব্যবস্থা নিলেন? কংগ্রেসের সঙ্গে জোট করতে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। ২০১৬ নির্বাচনের সময় থেকেই সূর্যবাবু, বিমানবাবুদের সঙ্গে অধীরবাবু, মান্নানবাবুদের যা ভাব তা দেখে অমর আকবর অ্যান্টনি বা ইয়াদোঁ কি বারাত ছবির শৈশবে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া ভাইয়েদের কথা মনে পড়ে। ভাগ্যিস মার্কসবাদে ভূত জিনিসটা নেই। থাকলে শহিদদের ভূতেরা যে কী করত ভাবলে গা শিরশির করে। তবে অন্ধের মত অতীত আঁকড়ে রাজনীতি হয় না। তাই পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতির কথা ভেবে বাম কর্মী সমর্থকরা হয়ত ব্যাপারটা মেনে নিয়েছিলেন (ভোটের অঙ্ক দেখলে কংগ্রেস কর্মী সমর্থকরা মন থেকে মেনেছিলেন কিনা নিশ্চিত হওয়া শক্ত), কিন্তু ২০১৯ লোকসভা নির্বাচনে শেষ মুহূর্তে সে জোটও হল না। তার দু বছরের মাথায় বিধানসভা নির্বাচন। মে মাসের নির্বাচনের জন্যে বামেদের নতুন উদ্যম দেখা গেল ফেব্রুয়ারিতে, যখন জোয়ানরা নবান্ন অভিযান করলেন। প্রচণ্ড মার খেলেন, মইদুল ইসলাম মিদ্যা প্রাণ হারালেন। কিন্তু ততদিনে রাজ্যে বিজেপি বিরোধী শক্তি হিসাবে নিজেদের জায়গা পাকা করে ফেলেছে। এস এফ আই নেতা সৃজন ভট্টাচার্য নাগরিক ডট নেটকে নবান্ন অভিযানের আগের দিন বলেছিলেন, বাইনারি ভাঙতেই নবান্নে যাচ্ছি। অর্থাৎ তদ্দিনে তৃণমূল-বিজেপি বাইনারি প্রতিষ্ঠিত।

এই বাইনারি তৈরি হল কেন? কোন সন্দেহ নেই তৃণমূল তেমনটাই চেয়েছিল। কারণ প্রতিযোগিতামূলক হিন্দুত্ব চালানো বা মুখরোচক কুৎসার দৌড়ে জেতা কর্মসংস্থানের প্রশ্ন, দুর্নীতির প্রশ্নের সুরাহা করার চেয়ে সহজ। কিন্তু সঙ্গত দাবি নিয়েও কেবল বিবৃতি দিলে আর মামলা ঠুকলে কি আর বিরোধী রাজনীতি হয়? সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে স্রেফ মামলা ঠুকে ঠুকেই তৃণমূলকে নাজেহাল করে দেবেন — এমন একটা দাবি সিপিএমের আইনজীবী নেতা বিকাশ ভট্টাচার্য লোকসভা নির্বাচনের প্রচারে করতেন (“মারব কম, দৌড় করাব বেশি”)। আদতে প্রসব হল অশ্বডিম্ব। যাদবপুর কেন্দ্রে আনকোরা অভিনেত্রীর কাছে হারলেন। রাজ্যের কোথায় তাঁর মামলার ভয়ে শাসক দল বাম কর্মী সমর্থকদের মারা বন্ধ করে দিয়েছে তা তিনিই জানেন। তবে কেবল বিকাশবাবুকে দোষ দেওয়া অন্যায়। বামেদের বরাবরের বদনাম তাঁরা কথায় কথায় আন্দোলন করেন; মিছিল, ধর্মঘট কিছুই বাদ যায় না। ক্ষমতায় থাকাকালীনও এ স্বভাব যায়নি। এই করেই পশ্চিমবঙ্গের শিল্প টিল্প সব তাঁরা তাড়িয়েছেন বলে এখনো অভিযোগ করা হয়। ২০১১-র পরের বঙ্গ সিপিএম সম্বন্ধে কিন্তু এমন অভিযোগ করার উপায় নেই। কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব বনধ ডাকলে আলাদা কথা, নিজেরা ওসবের মধ্যে যাননি। রাজ্যের মন্ত্রীদের হাসিমুখে টাকা নেওয়ার ছবি প্রকাশ্যে আসার পরেও আন্দোলনের ঠ্যালায় জনজীবন বিপর্যস্ত করেননি। আদালত যেদিন রায় দিলেন এস এস সি পরীক্ষায় দুর্নীতি হয়েছে; সেদিনও সূর্যবাবু, সেলিমবাবু, সুজনবাবু বা বিমানবাবু সরকারের গদি নাড়িয়ে দেওয়ার মত কোন কাজ করেননি। সেদিন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বিরোধী আসনে থাকলে কী ঘটত তা বামপন্থীরাও বিলক্ষণ বোঝেন। অশোক মিত্র নাকি একবার বলেছিলেন “আমি ভদ্রলোক নই, কমিউনিস্ট।” সিপিএমের বর্তমান নেতৃত্ব কিন্তু নিপাট ভদ্রলোক। তাঁদের ভদ্রতার সুযোগেই মমতাকে মমতাজ বেগম আখ্যা দিয়ে, অনবরত অকথা কুকথা বলে, রামনবমী বনাম বজরংবলীর বাইনারি ব্যবহার করে বিজেপি রাজ্যে প্রধান বিরোধী দল হয়ে গেল।

অন্য দিকে বিজেপি শক্তিশালী হওয়ার পর থেকেই বাম নেতৃত্বের বক্তব্য, তৃণমূল আর বিজেপি সমান বিপজ্জনক। এখনো বলি, কথাটা উড়িয়ে দেওয়ার মত নয়। যাঁরা অন্যরকম বলেন তাঁদের একটা বড় যুক্তি হল তৃণমূল খুব খারাপ এবং দুর্নীতিগ্রস্ত দল হতে পারে, কিন্তু বিজেপি এমন একটা দল যারা গণতান্ত্রিক কাঠামোটার পক্ষেই বিপজ্জনক। আমার প্রশ্ন, মেরে ধরে বিরোধীদের মনোনয়নই জমা দিতে না দিলে আর কোন গণতান্ত্রিক কাঠামো অবশিষ্ট থাকে? উত্তরে অবধারিতভাবে বলা হবে পশ্চিমবঙ্গে রাজনৈতিক হিংসা তৃণমূল শুরু করেনি, ইত্যাদি। এসব বলার সময় তৃণমূলপন্থী এবং উদারপন্থীরা মনে রাখেন না বা ইচ্ছা করেই ভুলে যান যে ১৯৭৮ সালে পঞ্চায়েত নির্বাচন চালু হওয়ার পর থেকে ২০১৮-র মত এত বেশি আসনে কখনো বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় এক পক্ষ জেতেনি। এই রইল প্রমাণ [১]। কিন্তু কথা হল, দুটো দল যদি সমান বিপজ্জনক হয়, তাহলে বড় দলটিকে সর্বশক্তি দিয়ে হারালেই তো ছোট দলকে হারানো সহজ হওয়ার কথা। উল্টোটা কী করে সম্ভব? তৃণমূলকে হারাতে পারলেও বিজেপির বিপদ তো থেকেই যেত। এই সোজা কথাটা বাম নেতারা বুঝলেন না। ফলে বিজেপি বিরোধী হিসাবে একেবারেই বিশ্বাসযোগ্য হয়ে উঠতে পারলেন না। শ্যাম পেলেন না, কুলও হারালেন।

মোদ্দা কথা এক পয়সা ট্রাম ভাড়া বৃদ্ধির প্রতিবাদে কলকাতা অচল করে দেওয়ার জন্য খ্যাত (আচ্ছা, কুখ্যাতই হল) বামপন্থীরা কোনরকম দীর্ঘমেয়াদি আন্দোলন গড়ে তোলার মধ্যে গেলেন না। ধর্মতলায় টেট পরীক্ষার অবিচারের প্রতিবাদে অনশনরত ছেলেমেয়েদের আন্দোলনে বিমানবাবু অতিথি শিল্পীর মত গিয়ে বসলেন। সুজনবাবু রাজভবনের গেটে অপেক্ষারত টিভি সাংবাদিকদের নিয়মিত বাইট দিলেন। সেলিমবাবু হিন্দি বাংলা মিশিয়ে সকৌতুক সাংবাদিক সম্মেলন আর ফেসবুক লাইভ করে গেলেন। মানুষের আশীর্বাদ কুড়োবার দায়িত্ব পড়ল নীচের তলার কর্মীদের উপর — কমিউনিটি ক্যান্টিন আর রেড ভলান্টিয়ার্সের মাধ্যমে। ‘দিস ম্যান’ (অবশ্যই উওম্যানও) যারপরনাই পরিশ্রম করল স্বেচ্ছাসেবকের ভূমিকায় আর ‘দ্যাট লিডার’ পারমুটেশন-কম্বিনেশনের অঙ্ক কষে গেলেন। কংগ্রেসের সাথে জোট করা যথেষ্ট হবে না, অতএব নতুন জোটসঙ্গী চাই। আমি কোথায় পাব তারে, আমার মনের মানুষ যে রে? খুঁজতে খুঁজতে পাওয়া গেল ফুরফুরা শরীফে। ভদ্রলোক ভোটাররা চটবেন জেনেও নেতারা যে উদ্যমে আব্বাস সিদ্দিকিকে আলিঙ্গন করেছিলেন, সিদ্ধান্তের কারণ ব্যাখ্যা করে শমীক লাহিড়ী যেরকম সন্দর্ভ রচনা করেছিলেন পার্টি মুখপত্রে — তাতে ভাবা গিয়েছিল সিপিএম সত্যিই কৌম পরিচয়ের রাজনীতিকে এড়িয়ে যাওয়ার যে ঐতিহাসিক ভুল, তা সংশোধন করতে চায়। কিন্তু পরীক্ষায় শূন্য পাওয়ার পর যেভাবে ইন্ডিয়ান সেকুলার ফ্রন্টের সাথে জোটকে দায়ী করা হচ্ছে, তাতে স্পষ্ট তাঁরা কর্মী সমর্থকদের যা-ই বলে থাকুন, আই এস এফের সাথে জোট করা শর্টকাটে জিতে যাওয়ার কৌশলের বেশি কিছু ছিল না।

অশোক ভট্টাচার্য আর শিলিগুড়ি নাকি সমার্থক। সেই শিলিগুড়িতে তাঁর এক বিশ্বস্ত অনুচর বিজেপিতে চলে যাওয়াতেই ভটচায্যিমশাই একেবারে তৃতীয় হয়ে গেলেন! তাহলে প্রশ্ন ওঠা উচিৎ তাঁর এতদিনের দাপট কি তাঁর ছিল, না অনুচরের? তিনি কি টের পাননি যে জনবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছেন? যে কিসের ভিত্তিতে একটা ধর্মীয় ফ্যাসিবাদী দলে চলে যাওয়ার মানসিকতাসম্পন্ন শঙ্কর ঘোষ তাঁর ডান হাত হয়ে উঠেছিলেন? কমিউনিস্ট পার্টির নেতা হিসাবে এ প্রশ্নের জবাবও দিতে হবে। অথচ প্রবীন ভটচায্যিমশাই অত গভীরে না গিয়ে নিজের পরাজয়কে স্রেফ বাকি রাজ্যের প্রবণতার অংশ বলেই ক্ষান্ত হলেন।

দক্ষিণবঙ্গের ভটচায্যিমশাই আরো এক কাঠি সরেস। তিনি যে কেবল আই এস এফের সাথে জোটে দোষ দেখেছেন তা নয়, কংগ্রেসকে অবহেলা, অবজ্ঞা, অপমান — আরো কী কী সব করা হয়েছে বলে তিনি বেজায় আহত। বলেছেন সে অপমানের জবাব নাকি কংগ্রেসের সদস্য সমর্থকরা দিয়ে দিয়েছেন। যে দল নিজের লড়া ৯১টা আসনেই পেয়েছে ২০১৯ লোকসভার চেয়ে ২.০৬% কম ভোট, তাদের সদস্য সমর্থকরা কি আকাশের চাঁদ এনে দেবে ভেবে ভটচাযমশাই তন্ময় হয়ে ছিলেন? চক্ষুশূল আই এস এফ কিন্তু ২৮টা আসনে ২০১৯ সালে প্রাপ্ত বাম ভোটের চেয়ে ৬.৬০% বেশি ভোট পেয়েছে। এমনকি বাম, কংগ্রেস যোগ করলে যা হয় তার চেয়েও বেশি ভোট পেয়েছে। অতএব তারাই ডুবিয়ে দিল, এ তত্ত্ব দাঁড়াচ্ছে না। তাদের নেওয়া হল বলে অনেক বাম ভোটার বিমুখ হলেন — এই যদি বক্তব্য হয়, তাহলে সে আশঙ্কা আগে কেন প্রকাশ্যে বলেননি? ফল বেরোবার পরে শৃঙ্খলাকে আর গুরুত্ব দিচ্ছেন না, কারণ গোটা সিস্টেমটাই উলঙ্গ হয়ে গেছে। আগেই শৃঙ্খলাভঙ্গ করে উলঙ্গ হওয়া বাঁচানোর চেষ্টা করতে পারতেন তো। তাহলে কি আশা করছিলেন আর যা-ই হোক নিজের আসনটি জিতে যাবেন? এবং জিতে গেলে আর বিদ্রোহী হওয়ার দরকার বোধ করতেন না? অবশ্য এই ভটচায্যির সবচেয়ে চমকপ্রদ মন্তব্য জোট নিয়ে নয়, বাটি নিয়ে। কমিউনিস্টদের রাস্তায় দাঁড়িয়ে রাজনীতি করাকে তিনি যে ভাষায় কটাক্ষ করেছেন, স্বয়ং তথাগত রায়কেও তা করতে দেখিনি কখনো। নেতাদের বাটি হাতে রাস্তায় দাঁড়িয়ে পড়ার পরামর্শ শুনে মনে পড়ল, ছোটবেলা থেকে যে কমিউনিস্টদের দেখেছি, তাঁরা এ রাজ্যের বন্যা থেকে শুরু করে কিউবার বিরুদ্ধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক অবরোধে মানুষের পাশে দাঁড়াতে আক্ষরিক অর্থেই ভিক্ষার বাটি নিয়ে লোকের বাড়ি বাড়ি যেতেন, স্টেশনে এবং বাসস্টপে দাঁড়াতেন। নির্বাচনের খরচও এখনো বাড়ি বাড়ি ঘুরে জোগাড় করেন ভটচাযমশায়ের কমরেডরা। এ ভিক্ষা যদি ভটচায্যিমশায়ের কাছে লজ্জার বিষয় হয়, তাহলে তাঁর শ্রেণিচরিত্র নিয়ে প্রশ্ন তোলা উচিৎ। “আমি মার্কসবাদী, আজীবন তা-ই থাকব” বলেছেন বলেই সন্দেহের ঊর্ধ্বে রাখা চলে না।

মিলে মিশে লড়া এমনই সর্বরোগহর বটিকা হিসাবে সিপিএম মহলে নন্দিত যে সুন্দরবনের লড়াকু নেতা কান্তি গাঙ্গুলি পর্যন্ত ভবিষ্যতে তৃণমূলের সাথে হাত মেলানোর দিকে ইঙ্গিত করেছেন। এদিকে ভোটের ফল বেরোবার পর থেকে যত্রতত্র বাম কর্মী সমর্থকরা তৃণমূলের হাতে মার খাচ্ছেন, ঘরছাড়া হচ্ছেন। এমনকি কোভিডের দ্বিতীয় ঢেউয়ে প্রাণের মায়া অগ্রাহ্য করে যে রেড ভলান্টিয়াররা কাজ করছেন, তাঁরাও খুনের হুমকি, ধর্ষণের হুমকি পাচ্ছেন। বেশ মনে আছে, নির্বাচনের কিছুদিন আগে ফেসবুকে মহম্মদ সেলিমের বিজেপির প্রতি নরম মনোভাবের সমালোচনা করে লিখেছিলাম, বিজেপি ক্ষমতায় এলে নীচের তলার কর্মীরা মার খাবেন, সেলিমবাবুরা পাশে দাঁড়াবেন না। এর প্রতিক্রিয়ায় বহু সিপিএম কর্মী আমার দিকে ধেয়ে এসেছিলেন। অনেকে বলেছিলেন তাঁদের পার্টিতে কোন উপরতলা-নীচতলা নেই। কথাটা সত্যি হলে সত্যিই ভাল লাগত। কিন্তু গত এক সপ্তাহে দেখা যাচ্ছে ‘দিস ম্যান’ মার খাচ্ছে, ‘দ্যাট লিডার’ কী যে করছে কেউ জানে না। ক্ষুব্ধ পার্টিকর্মীরা সোশাল মিডিয়ায় বিষোদ্গার করছেন। বর্ধমান, বাঁকুড়া, মেদিনীপুর বা ডুয়ার্সের প্রত্যন্ত এলাকার কথা বাদ দিন। কর্মীদের অভিযোগ খোদ দমদমে পার্টি অফিস বেদখল হয়ে যাচ্ছে, তবু নেতৃত্ব সংঘাতে যেতে চাইছেন না। নিরপেক্ষরা নিশ্চয়ই বলবেন নির্বাচনের পরে পশ্চিমবঙ্গে এসব ঘটনা চিরকাল ঘটে। কিন্তু যে দলের কর্মীরা আক্রান্ত হচ্ছেন, তাঁরা যে এরকম মুহূর্তে দলাই লামাকে নেতা হিসাবে চাইবেন না তা বলাই বাহুল্য। তাঁরা চাইবেন নেতারা এসবের প্রতিবাদে রাস্তায় নামুন। তাঁরা আশা করবেন নেতারা বোঝেন যে একটাও আসন না পাওয়ার পর শাসক দলের অত্যাচার নিয়ে সাংবাদিক সম্মেলন করতে চাইলে আলিমুদ্দিন স্ট্রিটে সাংবাদিক পাওয়াও মুশকিল হবে। ফলে সংবাদমাধ্যম দেখে সাধারণ মানুষ ভাববেন কেবল বিজেপির লোকেরাই নির্যাতিত হচ্ছে।

এতদিন পরে নন্দীগ্রামে একটা মিছিলের ব্যবস্থা হয়েছে। সীমিত শক্তির অজুহাতে বামেদের শীর্ষ নেতৃত্ব কতদিন হাত গুটিয়ে বসে থাকবেন আর কতজন নিরুপায় কর্মী সমর্থককে বিজেপির কাছে আশ্রয় নিতে হবে — তার উপর নির্ভর করছে ভবিষ্যতে বামেদের ভোট শতাংশও শূন্যের দিকে হাঁটবে কিনা। পরাজিত, আক্রান্ত মানুষ কিন্তু দেখতেই পাচ্ছেন বিজেপির সর্বভারতীয় সভাপতি জে পি নাড্ডা দিল্লি থেকে জেলায় চলে আসতে পারেন দলের আক্রান্ত লোককে দেখতে। সূর্যকান্ত মিশ্ররা কলকাতা থেকে গিয়ে উঠতে পারেন না।

তথ্যসূত্র

[১] দ্য হিন্দু পত্রিকা

https://nagorik.net/ এ প্রকাশিত

Author: Pratik

সাংবাদিক, লেখক। কাজ করেছেন দ্য টাইমস অফ ইন্ডিয়া, ডেকান ক্রনিকল, দ্য টেলিগ্রাফ, দ্য স্টেটসম্যান এবং অধুনালুপ্ত দ্য বেঙ্গল পোস্টে। বর্তমানে বিভিন্ন ওয়েবসাইট ও কাগজে লেখালিখি করেন। প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা ছয়।

Leave a Reply

Discover more from amarlikhon

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading