সাইক্লোনে ডিজাস্টার পর্ন: সব দোষ প্রতিবেদকের নয়

প্রতিবেদকরা পুতুল, এঁরাই বাজিকর। এঁরা যা দেখাতে চাইবেন, যেভাবে দেখাতে চাইবেন — প্রতিবেদকরা সেভাবেই খবর করবেন।

কয়েক বছর আগে আমার তদানীন্তন অফিসের খুব কাছেই একটা অতি পুরনো বাড়ি ভেঙে পড়েছিল। যতদূর মনে পড়ে, একজন মারাও গিয়েছিল। স্বভাবতই সেই ঘটনার খবর করতে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের সাংবাদিকরা সেখানে উপস্থিত হন। কিন্তু শুধু তাঁরা নন, দেখেছিলাম বেশকিছু সাধারণ মানুষ সেখানে হাজির হয়েছেন স্রেফ ফোনের ক্যামেরায় ধ্বংসস্তুপের ছবি তুলতে। কেউ কেউ আবার অকুস্থলে দাঁড়িয়ে সেলফি তুলছিলেন। ব্যাপারটা খুব অনন্যসাধারণ নয়। সাম্প্রতিককালে এরকম পরিস্থিতিতে এমন দৃশ্য অনেকেরই চোখে পড়েছে। আজকাল সবকিছুই বিনোদন হয়ে উঠেছে। এমনকি ধ্বংসের দৃশ্য দেখেও বিনোদন হয়। আবার শুধু দেখেই সন্তুষ্টি হয় না, অন্যকে দেখাতেও ইচ্ছা করে। সুতরাং বলাই বাহুল্য বন্যার ছবি, ধসের ছবি, ভূমিকম্পের ছবির চাহিদা আছে। ফলে টিভি চ্যানেলগুলো যে গতকাল সাইক্লোন ইয়াসের ধ্বংসলীলার ছবি তুলতে রিপোর্টারদের বিপজ্জনক এলাকাগুলোতে পাঠিয়েছিল, তাতে আশ্চর্যের কিছু নেই। সাংবাদিকতার পেশাগত নৈতিকতার প্রশ্নে পরে আসা যাবে, আগে মেনে নেওয়া দরকার যে চ্যানেলগুলো বাজারের চাহিদা মেনে কাজ করে, আর বাজারে ধ্বংসের দাম আছে। সেই কারণে ইংরেজিতে অনেকে আজকাল একে বলেন ডিজাস্টার পর্ন।

এখন কথা হল, ব্যাপারটা কি সত্যিই এরকম অবিমিশ্র অন্যায়? সংবাদমাধ্যমের কি যা ঘটেছে তা দেখানো কর্তব্য নয়? ধ্বংস হলে ধ্বংস দেখাবে না, মৃত্যু ঘটলে মৃত্যু দেখাবে না? কোভিডের দ্বিতীয় ঢেউয়ে ল্যাজে গোবরে কেন্দ্রীয় সরকার যে দাবি করছে সংবাদমাধ্যমের ইতিবাচক ছবি দেখানো উচিৎ; কেবল মৃত্যু, বেদনা, অব্যবস্থা, লাঞ্ছনা দেখানো উচিৎ নয় — সেটাই তাহলে ঠিক?

একেবারেই তা নয়। সত্য দেখানো নিশ্চয়ই সংবাদমাধ্যমের কাজ। ক্ষমতাকে প্রশ্ন করা, তার ত্রুটি বিচ্যুতি ফাঁস করে দেওয়াও সংবাদমাধ্যমের কাজ। বরং কোথায় কী ভাল কাজ করল ক্ষমতাসীন মানুষ, সেটা না দেখালেও চলে। কারণ গণতন্ত্রে সেটাই তাদের করার কথা। অধিকার রক্ষিত হয়েছে, কর্তব্য করা হয়েছে — এগুলো খবর নয়, কারণ ওটাই নিয়ম। অধিকার লঙ্ঘিত হয়েছে, কর্তব্যে অবহেলার ঘটনা ঘটেছে — এগুলোই খবর, কারণ নিয়ম ভাঙা হয়েছে। এক কথায়, যা স্বাভাবিক নয় তা-ই খবর। সাংবাদিকতার ছাত্রছাত্রীদের তাই গোড়াতেই শেখানো হয়, কুকুর মানুষকে কামড়ালে সেটা খবর নয়। মানুষ কুকুরকে কামড়ালে সেটাই খবর। সুতরাং সাইক্লোন হয়নি, সেটা খবর নয়। সাইক্লোন হয়েছে, সেটাই খবর। আর যা খবর, তা টিভি চ্যানেলগুলো দেখাতে বাধ্য। যেমন বাজারে চাহিদা আছে বলে দেখানো উচিৎ, তেমনই পেশাগত নৈতিকতার দিক থেকেও দেখানো উচিৎ।

আসলে ধ্বংস দেখালেই ডিজাস্টার পর্ন হয় না; হয় ধ্বংসকে বলপূর্বক উত্তেজক, আকর্ষণীয় করে তোলার চেষ্টা করলে। ২৬ মে, ২০২১ সারাদিন টিভিতে সাইক্লোন ইয়াসের কভারেজ যেভাবে চলেছে তাতে ব্যাপারটাকে যৎপরোনাস্তি উত্তেজক করে তোলার চেষ্টা পরিষ্কার। কোন চ্যানেলে সাঁতরে যাওয়া মানুষের মুখে বুম ধরে প্রশ্ন করছেন একই জায়গায় হাঁটু জলে দাঁড়িয়ে থাকা প্রতিবেদক, কোথাও প্রতিবেদক নিজেই গলা জলে। ব্যাপারটাকে উত্তেজক করে তোলা এতটাই জরুরি যে একটা চ্যানেল ২০১৬ সালের উরুগুয়ের টর্নেডোর দৃশ্যও ইয়াসের ছবি বলে দেখিয়েছে। [১]

ফলত বিরাট অংশের দর্শক প্রশ্ন তুলেছেন, এ কী রকম কভারেজ? অনেক দর্শকেরই মনে হয়েছে চ্যানেলগুলো অকারণে এই ভয়ঙ্কর ঝড়ের মধ্যে ঠেলে দিয়ে প্রতিবেদকদের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলছে। এই বক্তব্য আবার অনেক সাংবাদিকের গায়ে লেগে গেছে। প্রথিতযশা সাংবাদিকরা কেউ কেউ সোশাল মিডিয়ায় জবাব দিয়েছেন, এসব ঝুঁকির অ্যাসাইনমেন্ট নেওয়ার মধ্যেই সাংবাদিক জীবনের সার্থকতা। অনেকে সিনিয়রদের সাবধানবাণী উড়িয়ে দিয়ে এমন অ্যাসাইনমেন্ট নিয়ে থাকেন। কথাটা সম্পূর্ণ মিথ্যে নয়। এক ধরনের বেপরোয়া মনোভাব না থাকলে ভাল ভাল খবর করা যায় না, ভাল প্রতিবেদক হওয়া যায় না। অন্য অনেক পেশার বদলে এই পেশা বেছে নেওয়ার কারণ অনেকের কাছেই এইসব “থ্রিল”। বরখা দত্তের মত গোলাগুলির মাঝখানে দাঁড়িয়ে যুদ্ধের খবর করার ইচ্ছা অনেক সাংবাদিকেরই থাকে। তাদের কেউ কেউ যে “ঝড়কে আমি করব মিতে, ডরব না তার ভ্রূকুটিতে” গাইতে গাইতে পশ্চিমবঙ্গের উপকূল এলাকায় চলে যাননি সে কথা জোর দিয়ে বলা যাবে না। কিন্তু একটা বুনিয়াদি প্রশ্ন আছে।

প্রশ্নটা হল এই থ্রিল কী উৎপাদন করছে? মানে সংবাদ যদি স্রেফ পণ্য হয়, তাহলে থ্রিলড সাংবাদিক কী পণ্য তুলে দিচ্ছেন ক্রেতার (অর্থাৎ দর্শকের) হাতে? সংবাদ যদি পণ্য না হয়, জনকল্যাণের পক্ষে প্রয়োজনীয় বস্তু হয়, তাহলেই বা কী কল্যাণ হচ্ছে থ্রিলড সাংবাদিকের দ্বারা? যে সাংবাদিক নিজের জীবন বিপন্ন করে গঙ্গাসাগরে বা দীঘা কি শঙ্করপুরে সাইক্লোন ইয়াসের মধ্যে দাঁড়িয়ে আছেন, তিনি কী খবর সরবরাহ করছেন? ঐ সময়ে ওখানে দাঁড়িয়ে থেকে কি তিনি এমন কিছু জানাতে পারছেন, যা আবহাওয়াবিদদের দেওয়া তথ্য থেকে স্টুডিওয় বসে জানা সম্ভব নয়? তিনি কি এমন কোন দুর্গত মানুষের খবর বাকি দুনিয়াকে (তদ্দ্বারা সরকারকেও) জানাতে পারছেন যার খবর এমনিতে কেউ জানতেও পারত না? যদি করার মত প্রশ্ন হয় “আপনার এখন কেমন লাগছে?” বা “আপনি সাঁতার কাটছেন?”, তাহলে সেই থ্রিলের প্রয়োজন কী? এতে কোন জনকল্যাণ সাধিত হচ্ছে? পণ্য হিসাবেই বা কী এমন নতুন জিনিস দর্শককে দেওয়া হচ্ছে? সাংবাদিকতা কি এত তুচ্ছ ব্যাপার যে একজন সাংবাদিক থ্রিলড হচ্ছেন বলেই এসব দেখাতে হবে টিভির পর্দায়? ইংরেজিতে embedded journalism বলে একটা কথা চালু আছে। তার নিদর্শন আমাদের দেশে বড় একটা দেখা যায় না। বিবিসি, সিএনএন বা আল জাজিরা খুললে দেখা যায় সিরিয়া, আফগানিস্তান, ইয়েমেন, প্যালেস্তাইনের মত জায়গায় সাংবাদিকরা ঘুরে ঘুরে বহু অচেনা জায়গায় পৌঁছে যান। অজানা ঘটনা তুলে আনেন। বহু মনে রাখার মত খবর হয়, সেসব খবর করতে গিয়ে তাঁদের বহু বিপদের মধ্যেও পড়তে হয়। কেউ কেউ বিদেশ বিভুঁইয়ে বন্দী হয়ে থাকেন বছরের পর বছর, কেউ বা খুন হয়ে যান, কেউ গোলাগুলির মাঝে পড়ে গিয়ে নেহাত দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান। নিশ্চয়ই থ্রিলের আকর্ষণ না থাকলে কেউ অমন করতে যায় না। কিন্তু তাঁদের করা খবরগুলোর মধ্যে মৌলিক গবেষণা থাকে, পরিশ্রম থাকে, ফলে উদ্ঘাটন থাকে। অমন সাংবাদিকতা সময়সাপেক্ষ। ঝড়ের দিন ক্যামেরা নিয়ে গিয়ে ছবি তুলে, পিস টু ক্যামেরা দিয়ে চলে আসার কাজ নয়। আমাদের এখানকার কজন সাংবাদিক আগামী একমাস ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় পড়ে থেকে কোথায় কীভাবে জনজীবন স্বাভাবিক হল বা হল না, সরকারি সাহায্য প্রতিশ্রুতিমাফিক পৌঁছল বা পৌঁছল না — সে খবর করবেন? যদি না করেন, তাহলে বিপর্যয়ের দিনের প্রয়াসকে ডিজাস্টার পর্ন বললে দোষ কোথায়?

এবার ভাবা যাক, এই যে আমাদের চ্যানেলগুলোর প্রতিবেদকরা কেউ অতটা সময় দেন না, কোন নতুন কথা তুলে আনতে পারেন না — এর কারণ কী? সকলেই অযোগ্য, অদক্ষ? বিদেশি চ্যানেলগুলোর প্রতিবেদকরা সকলে দেবতা, গন্ধর্ব আর আমাদের সব প্রতিবেদক শর্টকাট খোঁজা ফাঁকিবাজ? তা তো হতে পারে না। তাহলে তফাত কোথায়?

তফাত চ্যানেলগুলো খবর বলতে যা বোঝে আর প্রতিবেদকদের যেভাবে দ্যাখে তাতে। রোজ এবিপি আনন্দ বা ২৪ ঘন্টা দ্যাখেন এমন মানুষও পাঁচজন প্রতিবেদকের নাম বলতে গেলে হোঁচট খাবেন, কিন্তু গড়গড় করে বলে দেবেন অ্যাঙ্করদের নাম। এবিপি আনন্দ আর সুমন দে অধিকাংশ মানুষের কাছেই সমার্থক, ২৪ ঘন্টা বললেই মনে পড়বে প্রয়াত অঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায় বা মৌপিয়া নন্দীর নাম। রিপাবলিক টিভি বললেই একমেবাদ্বিতীয়ম অর্ণব গোস্বামী। অর্থাৎ প্রতিবেদকরা পুতুল, এঁরাই বাজিকর। এঁরা যা দেখাতে চাইবেন, যেভাবে দেখাতে চাইবেন — প্রতিবেদকরা সেভাবেই খবর করবেন। সঙ্গে অমুক, সঙ্গে তমুক শো চলে সব চ্যানেলেই। ভারতীয় খবরের চ্যানেলগুলোতে স্পেশাল শো মানেই সেটা অ্যাঙ্করের শো। প্রতিবেদকের শো বলে কিছু নেই। অথচ বিদেশি চ্যানেলগুলোতে কিন্তু বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে থাকা প্রতিবেদকদের কারও কারও নিজস্ব শো থাকে। এই প্রতিবেদকরা যে কোন বিপজ্জনক অ্যাসাইনমেন্টে যেমন জীবন বিপন্ন করে খবর করেন, তেমনি পাদপ্রদীপের আলোর ভাগও পান। আবার অ্যাঙ্কররাও বেরিয়ে পড়েন অনেক সময়। আমাদের দেশের চ্যানেলগুলোতে কিন্তু ৩৬৫ দিন স্টুডিও আলো করে থাকেন সুমন, মৌপিয়া, অর্ণব, নবিকা কুমাররা। হ্যাঁ, তাঁরাও বেরোন বটে। রিও কি রাশিয়া যেতে অথবা আউট্রাম ঘাটে বিতর্কসভা সঞ্চালনা করতে। সাইক্লোন ইয়াস নিয়ে রিপোর্ট করতে নৈব নৈব চ। আমরি অগ্নিকাণ্ডের অকুস্থলে সুমনবাবুর পৌঁছে যাওয়া বা ইয়াসের প্রতিবেদনে সুচন্দ্রিমা দেবীর উপস্থিতি ব্যতিক্রম, যা নিয়মকেই সুচিহ্নিত করে। নির্বাচনের ফল প্রকাশ বা বড় কিছু ঘটলে এঁদের সকাল থেকে রাত পর্যন্ত টিভির পর্দায় দেখা যায়, পরিশ্রম করার অসীম ক্ষমতা দেখে দর্শকদের ঘাড় শ্রদ্ধায় নুয়ে পড়ে। ট্রাম্প বনাম বাইডেন দ্বৈরথের ফল প্রকাশের দিনগুলোতে সিএনএন-এর অ্যাঙ্কররা কিন্তু এসে বসতেন, কিছু সময় পরে আবার অন্যদের জায়গা ছেড়ে দিয়ে চলে যেতেন।

এসবের জবাবে অবশ্যই যে যুক্তি উঠে আসবে, তা হল “ওদের অনেক টাকা, অনেক লোকজন।” ঠিক কথা। তাহলে এ-ও মেনে নেওয়া দরকার যে এখানকার টিভি চ্যানেলগুলোতে দরকারের চেয়ে কাজের লোক কম এবং তাঁরাও প্রয়োজনের চেয়ে কম পারিশ্রমিক পান। অতএব থ্রিল পরের কথা, সাইক্লোন ইয়াসকে ধাওয়া করে (রিপাবলিক টিভির ভাষায়) যে চ্যানেল, তার প্রতিবেদকের প্রাথমিক চিন্তা চাকরি বাঁচানোই। তার সাধ্য কি সত্যিকারের খবরের খোঁজ করে? মহাজন যে পথে হাঁটেন সেটাই পথ, অ্যাঙ্করের পথেই প্রতিবেদককে হাঁটতে হবে। যে দেশের টিভি অ্যাঙ্কর প্রধানমন্ত্রীর সাক্ষাৎকার নিতে গিয়ে নালে ঝোলে অম্বলে হয়, সে দেশের প্রতিবেদকের ঝড়ের দিনে ডিজাস্টার পর্ন তৈরি না করে উপায় নেই। দর্শকও দেখবেন, কারণ ওখানে দাঁড়িয়ে সেলফি নিতে পারার দুধের স্বাদ এভাবে ঘোলে মিটবে।

সূত্র:

১। https://bangla.boomlive.in/fact-check/fake-news-cyclone-yaas-2016-video-of-tornado-in-dolores-uruguay-falsely-shared-as-yass-effect-in-odisha-abp-ananda-factcheck-13283

https://nagorik.net এ প্রকাশিত

রাজদীপের দ্বীপান্তর: নিরপেক্ষতার পুরস্কার?

মনে করা হত নিরপেক্ষ থাকলে তবেই সত্য উদ্ঘাটন করা যায়; পক্ষপাতিত্ব করলে মিথ্যা প্রশ্রয় পায়। উত্তরসত্য (post truth) আর ভুয়ো খবরের যুগে এই সহজ সমীকরণ যে বাতিল হয়ে গেছে।

“সংবাদপত্রের স্বাধীনতা আর সাংবাদিকের স্বাধীনতা সমার্থক নয়। কোন দেশেই নয়। সংবাদপত্রের স্বাধীনতা কিংবা যাকে বলা হয় মুদ্রাযন্ত্রের স্বাধীনতা তার জন্য লড়াইটা এযাবৎ প্রধানত চলেছে রাষ্ট্রশক্তির বিরুদ্ধে, স্বৈরতান্ত্রিক শাসন-নিয়ন্ত্রণের বিরুদ্ধে। এ লড়ায়ের মোটামুটি মানে, স্বাধীনভাবে মতামত এবং সমকালীন ঘটনাবলীর বিবরণ প্রকাশের অধিকার দাবি করেছে খবরের কাগজ। সে অধিকার মোটের উপর স্বীকৃত হয়েছে অনেক দেশে। কিন্তু খবরের কাগজের স্বাধীনতা মানে, সাংবাদিকের, এমন কী সম্পাদকেরও স্বাধীন মত প্রকাশের অধিকার নয়, এই সোজা কথাটা পরিষ্কারভাবে না বোঝার ফলে অনেক ক্ষোভ এবং অভিযোগ জমে উঠেছে। ক্ষোভ সাংবাদিকের মনে, অভিযোগ সাংবাদিকের বিরুদ্ধে।”

‘সাংবাদিকতা ও কিংবদন্তী’ প্রবন্ধে কথাগুলো লিখেছিলেন অধুনালুপ্ত ‘হিন্দুস্থান স্ট্যান্ডার্ড’ কাগজের একদা অ্যাসিস্ট্যান্ট এডিটর সরোজ আচার্য। হকি খেলায় যেমন সবুজ কার্ড দেখিয়ে খানিকক্ষণের জন্য কোন কোন খেলোয়াড়কে মাঠের বাইরে পাঠিয়ে দেওয়া হয়, তেমনভাবে ইন্ডিয়া টুডে কর্তৃপক্ষ অভিজ্ঞ সাংবাদিক রাজদীপ সরদেশাইকে দু সপ্তাহের জন্য চ্যানেল থেকে নির্বাসন দিয়েছেন, উপরন্তু তাঁর মাইনে কেটে নিয়েছেন। এই ঘটনা নিয়ে ভাবতে গিয়ে সরোজ আচার্যের এই প্রবন্ধের কথা মনে পড়ল। সরোজবাবুর জীবদ্দশায় এ দেশে নিউজ চ্যানেল বলে কোন বস্তু ছিল না, কিন্তু এখানে সংবাদপত্রের জায়গায় অনায়াসে সংবাদমাধ্যম শব্দটা বসিয়ে নেওয়া যায়। তাতে অর্থের হেরফের হবে না, আমাদের কাজও হয়ে যাবে। জানি না রাজদীপবাবু বাংলা পড়তে পারেন কিনা, পারলেও সরোজবাবুর লেখা চোখে পড়ার সম্ভাবনা কম। কারণ ইনি পশ্চিমবঙ্গেই অধুনা বিস্মৃত একজন লেখক-সাংবাদিক। বাংলার দিকপাল সাংবাদিকরাই কজন এঁর নাম জানেন সন্দেহ আছে। কিন্তু ভারতীয় সাংবাদিকতার বর্তমান অবস্থা যাঁদের হতাশ করেছে এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে যাঁরা চিন্তিত, তাঁদের জন্য এই প্রবন্ধ চিন্তার খোরাক হতে পারে।

রাজদীপবাবুর ট্র্যাজেডি হল, তিনি অর্ণব গোস্বামী ও সম্প্রদায়ের মত দেশপ্রেমের দোহাই দিয়ে সরাসরি সরকারি দলের মুখপাত্র হয়ে উঠতে পারেননি। আবার রানা আয়ুব বা সিদ্ধার্থ বরদারাজনের মত বিজেপিকে প্রকাশ্যে দেশের শত্রু আখ্যা দিয়ে প্রতিষ্ঠানবিরোধী সাংবাদিকতা করার সাহস দেখাতে পারেননি। ফলে অর্ণববাবু যেখানে টাইমস গ্রুপের মত বিরাট কর্পোরেট সংস্থার চাকরি ছেড়ে দিয়ে নিজের মালিকানায় চ্যানেল খোলার রেস্ত পেয়ে গেছেন; সিদ্ধার্থবাবু যেখানে ওয়েব মাধ্যমে চলে গিয়ে মূলত পাঠকের অনুদানের উপর ভিত্তি করে সরকারি আক্রমণের মুখে দাঁড়িয়েও নিজে সাংবাদিকতা বলতে যা বোঝেন তা চালিয়ে যাচ্ছেন; সেখানে রাজদীপবাবুকে নিজের হাতে তৈরি চ্যানেল সস্ত্রীক ছেড়ে আসতে হয়েছে কয়েক বছর আগে। ২০০২-এর গুজরাট দাঙ্গা যেভাবে রিপোর্ট করেছিলেন, তার জন্য বিজেপির কর্মী-সমর্থকরা তাঁকে নিত্য গাল পাড়ে, বাগে পেয়ে আমেরিকার রাস্তায় কয়েক ঘা বসিয়েও দিয়েছিল। অথচ এখন রাহুল কাঁওয়াল, গৌরব সাওয়ান্তের মত ব্যাজহীন বিজেপি মুখপাত্রের সাথে বসে সাংবাদিকতার ভান করতে হয়। আর সেজন্যে এমনকি বিজেপি বিরোধী সাধারণ মানুষও রাজদীপবাবুর উপর রুষ্ট। প্রবীণ সাংবাদিকের লাঞ্ছনার দ্ব্যর্থহীন ভাষায় নিন্দা করার বদলে অনেকেই বলছেন, যে জন আছে মাঝখানে, তার ঠাঁই নাই কোনখানে — একথা রাজদীপবাবুকে বুঝতে হবে।

পুঁজিবাদী আনন্দবাজার গ্রুপের কাগজের সাংবাদিক অথচ মার্কসবাদী সরোজবাবু তাঁর প্রবন্ধে সারা পৃথিবীর একাধিক প্রবাদপ্রতিম সংবাদপত্র ও সম্পাদকের উদাহরণ দিয়ে দেখিয়েছেন “ব্যক্তিগতভাবে সাংবাদিকের বিরুদ্ধে ভীরুতা, কপটাচরণ, দাস-মনোভাব ইত্যাদির অভিযোগ আনবার কোনো অর্থই হয় না। অন্য সব প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের যেমন তাদের কাজ সম্পর্কে কতকগুলি নির্দেশ মেনে চলতে হয় সাংবাদিকদেরও তেমনি। অন্য সব প্রতিষ্ঠানেও কাজের নীতি নির্ধারণ এবং দায়ভাগটা সাধারণ কর্মীর ইচ্ছা অনুযায়ী হয় না, হওয়া সম্ভব নয়। প্রতিষ্ঠানের কর্তৃত্ব গণতান্ত্রিক উপায়ে সমানভাবে ভাগ করে দেবার পদ্ধতি সোভিয়েট ইউনিয়নেও আবিষ্কৃত হয়নি। ‘কর্তার ইচ্ছায় কর্ম’ যেমন কলকারখানায়, তেমনই খবরের কাগজেও…”

এই কথাটা উপলব্ধি করতে পারলে রাজদীপবাবুর ত্রিশঙ্কু অবস্থা নিয়ে রাগ করা অযৌক্তিক হয়ে পড়ে। কিন্তু সেক্ষেত্রে সঙ্গতভাবেই এই প্রশ্ন আসে, যে একই যুক্তিতে রাহুল, গৌরব, হিন্দি চ্যানেলগুলোর আরো উগ্রভাষী রুবিকা লিয়াকত, রোহিত সারদানাদের বা বিভিন্ন কাগজের সম্পাদকদের ছাড় দেওয়া হবে না কেন? তাঁদেরও তো মালিকের মর্জি মেনে চলতে হয়। যদি রবীশ কুমার এনডিটিভি-তে চাকরি না করে রিপাবলিক টিভিতে চাকরি করতেন, তাহলে কি তাঁর পক্ষে এখনকার মত সাংবাদিকতা করা সম্ভব হত?

এতক্ষণ সরোজ আচার্যের প্রবন্ধের প্রাসঙ্গিকতা আলোচনা করেছি। এই প্রশ্নগুলোর উত্তর পেতে গেলে অপ্রাসঙ্গিকতার দিকগুলো বুঝতে হবে। এর জন্য প্রবন্ধকার দায়ী নন, দায়ী সময়।

প্রথমত, সরোজবাবু যে সময়ের লোক, সেই সময়ের সংবাদমাধ্যমের মালিকরা যেরকম পুঁজির প্রতিভূ ছিলেন, তার সাথে আজকের পুঁজির চরিত্রগত ফারাক অনেক। সেই সময় আমাদের দেশের কাগজের মালিকরা, সে আনন্দবাজার পত্রিকার মালিক সরকারবাবুরাই হোন আর হিন্দুস্তান টাইমসের মালিক বিড়লা কিংবা ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের গোয়েঙ্কা, ব্যবসায়িক স্বার্থে কাগজ চালিয়েও মনে করতেন কাগজের দায়িত্ব সাধারণ মানুষের কথা বলা, রাষ্ট্রশক্তির গলদ প্রকাশ করা। স্বাধীনতা আন্দোলনের উত্তরাধিকার এই চিন্তাভাবনার পিছনে অবশ্যই বড় কারণ ছিল। ১৯৯১ পরবর্তী নিও-লিবারাল পুঁজি কিন্তু লাভের কড়ি ছাড়া কিছু নিয়েই ভাবতে রাজি নয়। ফলে এখন তার স্বার্থ আর রাষ্ট্রশক্তির স্বার্থ অভিন্ন, কারণ কল্যাণমূলক রাষ্ট্রের ধারণা পরিত্যক্ত। রাষ্ট্রের উপর অতি ধনীদের নিয়ন্ত্রণ গত তিরিশ বছরে বাড়তে বাড়তে এখন চূড়ান্ত। অতএব আগে সংবাদমাধ্যমের মালিকরা অনেক বিষয়ে সম্পাদককে স্বাধীনতা দিতেন, এখন আর দেন না। সচেতন সাংবাদিক অস্বীকার করতে পারবেন না, যে এখন স্রেফ প্রতিষ্ঠানের নির্দেশ মেনে চলা মানে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সাংবাদিকতা বলতে যা বোঝায়, ঠিক তার উল্টোটা করা। এ অবস্থা সরোজ আচার্যের প্রবন্ধের কালে ছিল না। উদাহরণস্বরূপ, ঘুষখোর সাংবাদিক চিরকাল ছিল। পি সাইনাথের পেইড নিউজ নিয়ে কাজ এবং কোবরাপোস্টের স্টিং অপারেশন দেখিয়ে দিয়েছে, এখন ঘুষ নেয় খোদ সংবাদমাধ্যম। অতএব এ যুগে সম্পাদক প্রতিষ্ঠানের নিয়ম মেনে চলাকেই যদি চূড়ান্ত মনে করেন, তাহলে স্বীকার করে নেওয়া ভাল যে তিনি সাংবাদিকতা করছেন না, মালিকের ব্যবসার প্রচারাভিযান চালাচ্ছেন।

দ্বিতীয়ত, বিংশ শতাব্দীতে স্বাধীন সাংবাদিকতা, ইংরেজিতে যাকে বলে ফ্রিলান্স জার্নালিজম, তার পরিসর ছিল নিতান্ত সংকীর্ণ। সঠিক অর্থে স্বাধীনতাও তাতে ছিল না। কারণ খবর প্রকাশের জন্য কোন না কোন সংবাদমাধ্যমের দ্বারস্থ হতেই হত। অতএব বিবেক দংশন মেনে নেওয়া ছাড়া উপায় কী? এখন ইন্টারনেট, সোশাল মিডিয়ার যুগ। নয় নয় করে কম সাংবাদিক ইউটিউব, ফেসবুক, টুইটার, ইন্সটাগ্রামের মাধ্যমে সাংবাদিকতা করছেন না। রোজগারের নিরিখে কর্পোরেট সংবাদমাধ্যমের চাকরির তুলনায় এখনো সেসব নগণ্য, কিন্তু কর্পোরেট যথার্থই বুঝেছে যা বলে দেওয়া হচ্ছে, হুবহু তাই লিখতে বা দেখাতে সাংবাদিকের দরকার হয় না। তাই ছাঁটাইয়ের হিড়িক পড়েছে। এমতাবস্থায় প্রতিষ্ঠানের নিয়ম মেনে সাংবাদিকতা করা না হয় না-ই গেল, নিজের চাকরিটা বাঁচানো যাবে কি? যাবে না। এখানে আমরা অবশ্যই সম্পাদক স্তরের সাংবাদিকদের কথা বলছি, কারণ যে সাংবাদিকরা কর্পোরেট মইয়ের নীচের দিকে আছেন, তাঁদের সামনে বিকল্প নেই। কোন পেশাতেই তাঁদের স্তরের লোকেরা নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়ার দায়িত্বে থাকেন না। কিন্তু উপরতলার লোকেরা স্রেফ চাকরি বাঁচানোর জন্য দিনকে রাত, রাতকে দিন করেন — এমন ছেঁদো যুক্তি আর হয় না। এ হেন সম্পাদকদের শরীরী ভাষাও প্রমাণ করে, তাঁরা যা করছেন সোৎসাহে করছেন। কথাটা যেমন টিভি সাংবাদিকদের ক্ষেত্রে সত্যি, তেমন কাগজের সম্পাদকদের ক্ষেত্রেও সত্যি। কাগজের সম্পাদকদের পাঠক দেখতে পান না, এই যা।

রাজদীপ সরদেশাই ঠিক এখানেই মার খেয়ে গেলেন। এনডিটিভি বা সিএনএন-আইবিএন আমলে যিনি ছিলেন পরিপাটি সাংবাদিক, ইন্ডিয়া টুডের বিভিন্ন শো-তে প্রায়শই তাঁকে অপটু জোকার বলে মনে হয়, কারণ রাহুল বা গৌরবের স্বতঃস্ফূর্ততা তাঁর মধ্যে থাকে না। স্টুডিওর অতিথিরাও লাইভ অনুষ্ঠানে তাঁকে বিজেপি বিরোধী বলে ঠেস দেন, আর তিনি প্রাণপণে প্রমাণ করার চেষ্টা করেন তিনি নিরপেক্ষ। ভুল হোক আর ঠিক হোক, মানতেই হবে, সাংবাদিকতায় সারা পৃথিবীতেই দীর্ঘদিনের প্রতিষ্ঠিত ধারণা ছিল, সাংবাদিকের একমাত্র দায়বদ্ধতা নিরপেক্ষতার প্রতি। কারণ মনে করা হত নিরপেক্ষ থাকলে তবেই সত্য উদ্ঘাটন করা যায়; পক্ষপাতিত্ব করলে মিথ্যা প্রশ্রয় পায়। উত্তরসত্য (post truth) আর ভুয়ো খবরের যুগে এই সহজ সমীকরণ যে বাতিল হয়ে গেছে, অনেককেই তা এখনো বোঝানো যায় না। রাজদীপবাবু তেমন লোকেদেরই একজন। এঁরা এখনো বোঝেননি, সাংবাদিকের একমাত্র দায়বদ্ধতা সত্যের কাছে, যা এখন অধিকাংশ সময়ে রাষ্ট্রের বিপক্ষে যাবে। কারণ মিথ্যা এখন তার অন্যতম হাতিয়ার। ফলে মতামতহীন সাংবাদিকতার এখন জলে কুমির, ডাঙায় বাঘ।

লক্ষ করলে দেখা যাবে, রাজদীপ মতামতহীন হয়েই ডুবলেন। ২৬শে জানুয়ারি দিল্লির রাজপথে যে কৃষকের মৃত্যু হয়, তাঁর সম্বন্ধে নিজের চ্যানেলের ক্যামেরার সামনে উনি পুলিসের বক্তব্য (ট্র্যাক্টর উল্টে মৃত্যু) আর আন্দোলনকারী কৃষকদের বক্তব্য (পুলিশের গুলি ট্র্যাক্টর উল্টে যাওয়ার কারণ) — দুটোই বলেন। আসলে সাংবাদিকের ঠিক তাই করার কথা। কিন্তু তিনি বুঝতে পারেননি, তাঁর চ্যানেলের মালিক তা চাইছেন না। তিনি চাইছেন কেবল পুলিসের বক্তব্যটাই প্রচারিত হোক। দেরিতে উপলব্ধি করে রাজদীপ কৃষকদের বক্তব্য জানিয়ে যে টুইট করেছিলেন তা মুছে দেন এবং কারণ হিসাবে পুলিসের বক্তব্য লেখেন। তাতে চিঁড়ে ভেজেনি। কেবল মালিক শাস্তি দিয়েছেন তা নয়, দুটো রাজ্য সরকার রাজদীপের বিরুদ্ধে (সঙ্গে আরো পাঁচজনের বিরুদ্ধে) রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগে এফ আই আর করেছে। এর চেয়ে তিনি কেবল পুলিসের বক্তব্যই বলতে পারতেন।

নির্বাসন এবং মাইনে কাটা যাওয়ার পর, ২৯শে জানুয়ারি হিন্দুস্তান টাইমসে নিজের কলামে রাজদীপ ২৪ বছর বয়সী নবরীত সিং-এর মৃত্যুর জন্য ফের ট্র্যাক্টর উল্টে যাওয়াকেই দায়ী করেছেন। এই শুভ বুদ্ধির উদয়ে তাঁর বিরুদ্ধে দেশদ্রোহিতার অভিযোগ প্রত্যাহার করা হয় কিনা সেটাই এখন দেখার। ভবিষ্যতে তিনি সরোজ আচার্যের নিম্নলিখিত কথাগুলো মনে রেখে এগোলে হয়ত উভয়সঙ্কট এড়াতে পারতেন। অন্তত যে বাংলা জানা দর্শকরা রাজদীপের নিরপেক্ষতা নিয়ে রুষ্ট, তাঁরা পড়ুন। সমস্যাটা বুঝতে পারবেন। এই কথাগুলো আজও একইরকম সত্যি:

“খবরের কাগজ [পড়ুন সংবাদমাধ্যম] জনসাধারণের সেবক হোক বা না হোক, গোড়ার কথা হল খবরের কাগজ আর পাঁচ রকম জিনিসের মতই ‘প্রপার্টি’ অর্থাৎ সেই প্রপার্টির স্বত্ত্বাধিকার যতক্ষণ সব বিষয়ে শেষ কথা বলতে অধিকারী ততক্ষণ সংবাদপত্রের [সংবাদমাধ্যমের] স্বাধীনতা, জন স্বার্থরক্ষা ইত্যাদি বিষয় প্রপার্টির স্বার্থদ্বারা নিয়ন্ত্রিত।”

https://nagorik.net/ এ প্রকাশিত। ছবি ইন্টারনেট থেকে।

প্রসঙ্গ কৃষক-আন্দোলন: প্রশ্নগুলো সহজ, উত্তর কে জানায়?

অধুনা ক্ষমতার বিরুদ্ধে কলম ধরলে কারাবাস হয় পরে, আগে সাংবাদিকের চাকরি যায়।

দেশে একটা কৃষক-আন্দোলন চলছে। দেশে মানে ‘সন্ত্রাসবাদীদের জায়গা’ কাশ্মিরে নয়, ‘বিচ্ছিন্নতাবাদী’ উত্তর-পূর্বাঞ্চলে নয়, এমনকি ‘দুর্বোধ্য’ ভাষায় কথা বলা তামিলনাডু, অন্ধ্র, তেলেঙ্গানা বা কেরলেও নয়। আন্দোলনটা চলছে খোদ রাজধানী দিল্লিকে ঘিরে। রাজনৈতিক মতপার্থক্য ভুলে গিয়ে অনেকগুলো কৃষক সংগঠনের সদস্যরা দিল্লির এই হাঁড়-কাঁপানো শীতে পথে বসে আছেন সপরিবার। তাঁরা ভারত বন্‌ধ ডাকলেন, বিজেপি ছাড়া প্রায় সব রাজনৈতিক দল সমর্থন করল। এই আন্দোলনের দাবিগুলো কী কী? খুব লম্বা কোনও দাবি সনদ নেই। অতিমারির মওকায় বিনা আলোচনায় অর্ডিন্যান্স জারি করে, পরে সংসদে বুলডোজার চালিয়ে (রাজ্যসভায় ভোটাভুটি হতে না দিয়ে) পাশ করিয়ে নেওয়া কৃষি আইনগুলো বাতিল করতে হবে, আর প্রস্তাবিত বিদ্যুৎ আইন (সংশোধনী) বিল বাতিল করতে হবে— দাবি এটুকুই। দাবিগুলো কি ন্যায্য, না অন্যায্য? সরকার যে বলছে এই আইনগুলোতে কৃষকদের ভালই হবে— সে কি নেহাত বানানো কথা? মনে এসব প্রশ্ন জাগলে আপনি কোথায় যাবেন? খবরের কাগজ পড়বেন অথবা টিভি দেখবেন তো? কিন্তু সেখানে এসবের উত্তর পাওয়ার সম্ভাবনা কম।

প্রথমত, সর্বভারতীয় খবরের চ্যানেল আপনাকে অনেক বেশি করে দেখাবে চিনকে ভারত ‘কেমন দিল’ (যদিও চিনই প্রতিনিয়ত ভারতকে ‘দিয়ে চলেছে’ সীমান্তবর্তী এলাকায়। বদলে ভারত বিবৃতি ছাড়া বিশেষ কিছুই দিতে পারেনি এখনও পর্যন্ত); পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রীর একদা-ঘনিষ্ঠ নেতা শুভেন্দু অধিকারী তৃণমূল ছেড়ে বিজেপিতে যোগ দেবেন কিনা, দিলে কবে দেবেন, আর কে-কে অপেক্ষমান যাত্রীর তালিকায় আছেন, ইত্যাদি। সর্বভারতীয় কাগজগুলোতে এসব খবরের পাশাপাশি ঢালাও লেখা থাকবে নরেন্দ্র মোদি ‘মন কি বাত’-এ কী বললেন। পশ্চিমবঙ্গের সংবাদমাধ্যমও তথৈবচ। টিভি খুলে বিজেপি আর তৃণমূলের প্রত্যেকটি গ্রামীণ ঝগড়ার পুঙ্খানুপুঙ্খও আপনি জেনে যাবেন, খবরের কাগজের প্রথম পাতায় থাকবেই রাজ্য সরকারি কর্মচারীদের বহুবিলম্বিত ডিএ প্রাপ্তির ঘোষণা (যেন মহানুভব সরকারের দয়ার শরীর, তাই ওটা দিচ্ছেন)। বিধানসভা নির্বাচন এগিয়ে এলে যে ধরনের ঘোষণা দেশের সব সরকারই করে থাকে, সেগুলোও পাবে যথাযোগ্য মর্যাদা। কৃষক-আন্দোলনের ভাগ্যে শিকে ছিঁড়বে কেবল কোনও সংবাদসংস্থার প্রতিভাবান আলোকচিত্রী আন্দোলনকারীদের দৃষ্টিনন্দন ছবি তুলতে পারলে তবেই। সঙ্গে থাকবে দুই কি তিন কলমে ছড়ানো একটুকরো খবর (যা আন্দোলনের শুরুর কয়েকদিন ছবিহীন এক কলম বা দু কলমেই সীমাবদ্ধ ছিল)। ‘এরপর অমুক পাতায়’…

দ্বিতীয়ত, এটুকু খবরেও আপনাকে তথ্য দেওয়া হবে যৎসামান্য। ‘সরকারের ভাবনাচিন্তা সম্পর্কে ওয়াকিবহাল সূত্র থেকে জানা যাচ্ছে’, ‘কৃষকরা বলছেন’-জাতীয় ধরি-মাছ-না-ছুঁই-পানি শব্দবন্ধে আপনাকে কেবল জানিয়ে দেওয়া হবে ব্যাপারটা খুব পুঁদিচ্চেরি (টেনিদার ভাষায়) এবং সত্বর মিটে যাওয়ার সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না। কিন্তু কৃষকদের দাবিদাওয়া সম্বন্ধে আপনি তেমন কিছু জানতে পারবেন না, তার ভালমন্দ নিয়ে কোনও গভীর আলোচনা পাবেন না, আন্দোলনকারীদের সম্বন্ধে বা আন্দোলনের প্রধান নেতাদের মতামত কিংবা রাজনীতি নিয়ে প্রায় কিছুই জানতে পারবেন না।

তবুও তো আপনি জেনে যাচ্ছেন। কী করে জানতে পারছেন? ভেবে দেখুন, আপনি জানছেন মূলত সোশাল মিডিয়া থেকে। বিভিন্ন খবর ও মতামতের সাইটের লিঙ্ক শেয়ার হচ্ছে সোশাল মিডিয়ায়। কোনও-কোনও সাংবাদিক অকুস্থল থেকে সরাসরি টুইট করছেন। আপনি সেখান থেকেই জানতে পারছেন। কিন্তু ওভাবে জানার সমস্যা হল, যাঁরা এই আন্দোলনের পক্ষে, তাঁদের কাছে কৃষকদের বার্তা পৌঁছাচ্ছে, আর যাঁরা বিপক্ষে তাঁরা নির্বিবাদে ‘খালিস্তানি জুজু’ দেখে যাচ্ছেন। তথাকথিত স্বাধীন সংবাদমাধ্যমগুলো যে নিরপেক্ষতার কথা বলে অনবরত, ‘বোথ সাইডস অফ দ্য স্টোরি’ নামক যে জিনিসটার পোশাকি আলোচনা চলে, সেটাকে এইভাবে তারাই ধ্বংস করে দিচ্ছে।

কিন্তু এমন হচ্ছে কেন? এককথায় বিজেপি মিডিয়াকে নিয়ন্ত্রণ করছে বললে এর উত্তর হয় না। কারণ কৃষক বা শ্রমিক আন্দোলনকে অগ্রাহ্য করা, তার পিছনে দুরভিসন্ধি আবিষ্কার করা ভারতের (প্রায় সব দেশেরই) সংবাদমাধ্যমের পুরনো অসুখ। তফাত এইটুকু যে, অতীতে কৃষক-শ্রমিক বিরোধী সরকারও আলোচনার প্রয়োজন স্বীকার করত, মোদি-সরকার বাধ্য হয়ে আলোচনায় বসেছে। ভেবেছিল, এর আগের আন্দোলনগুলোকে যেমন শহুরে নকশাল বা পাকিস্তানিদের আন্দোলন বলে দেগে দিয়ে দাঙ্গা আর দমননীতি দিয়ে চুপ করিয়ে দেওয়া গিয়েছিল— এ ক্ষেত্রেও তেমনটাই করা যাবে। তাহলে আর একটু তলিয়ে দেখা যাক, কেন এ হেন অবহেলা।

মূলধারার সংবাদমাধ্যম বলতে বোঝায় খবরের কাগজ আর টিভি চ্যানেলগুলোকে। আমাদের দেশে বিরাট পুঁজি না থাকলে দৈনিক সংবাদপত্র বা টিভি চ্যানেল চালানো বরাবরই দুষ্কর। ফলে কাগজ আর চ্যানেলের মালিকরা সকলেই বড়-বড় শিল্পপতি। টাইমস গ্রুপের জৈনদের মতো অনেকের সংবাদ-ব্যবসাটাই মূল ব্যবসা। আবার ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস কাগজের মালিক গোয়েঙ্কারা বা হিন্দুস্তান টাইমসের বিড়লারা অন্য নানা ব্যবসাতে আছেন, আবার সংবাদের ব্যবসাতেও আছেন। সংবাদের ক্রেতা কারা? মূলত ভদ্রলোকেরা, চাষাভুষোরা নন। নব্বইয়ের দশকের অর্থনৈতিক উদারীকরণের ফলে নিশ্চয়ই মধ্যবিত্তের সংখ্যা বেড়েছে। কিন্তু তাতে সংবাদমাধ্যমের ক্রেতার চাহিদা বদলে যায়নি। যে পাঠক কাল কোনওমতে সংসার চালাতেন, তিনিও আজ হাতে কিছু বেশি টাকা পেয়ে বহু বছরের বড়লোকের মতোই শেয়ার বাজারের খবর চান, ব্যাঙ্কক বা ফুকেত বেড়াতে যান। কাল যে শ্রমিক কারখানায় ধর্মঘট করে দাবি আদায় করতে চাইতেন, আজ তাঁর আইটি এঞ্জিনিয়ার সন্তান ধর্মঘট করার অধিকার জরুরি বলে মনে করে না, ধর্মঘট কর্মনাশা বলেই মনে করে। তার সকালবেলার কাগজ তাকে তার পছন্দের কথাই পড়াতে চায়, তার প্রিয় চ্যানেল সে যা শুনতে চায় বা দেখতে চায় তা-ই দেখায়। নীল বিদ্রোহের যুগের হরিশ মুখার্জির কথা ভেবে লাভ নেই। বিংশ শতাব্দীর প্রথম ভাগের ভারতীয় প্রেসের কথা ভেবেও লাভ নেই। তখন পুঁজিপতি কাগজ মালিকদেরও লক্ষ ছিল স্বাধীনতা আন্দোলনকে শক্তিশালী করা। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর পুঁজি যে পুঁজির নিয়মেই চলবে, তাতে আর আশ্চর্য কী? শ্রমিক-কৃষকের আন্দোলনকে কেনই বা সে গুরুত্ব দিতে যাবে?

এ পর্যন্ত পড়ে অনেকেরই মন বিদ্রোহ করবে। আজকের ডিসটোপিয়া কি একেবারেই নতুন নয়? হ্যাঁ, নতুনত্ব নিশ্চয়ই আছে।

কৃষক-আন্দোলনের খবরকে প্রাপ্য গুরুত্ব না-দেওয়া এক জিনিস, আর আন্দোলনকে সরাসরি অতীতের এক বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত করে দেওয়া আরেক জিনিস। এটা নতুন, তবে এ-ও মনে রাখা ভাল যে, গত দশ বছরে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রনেতাদের বিচ্ছিন্নতাবাদী হিসেবে দেগে দিয়েছে এই মিডিয়াই, ইসলাম ধর্মাবলম্বীদের নাগরিকত্ব আইনের বিরুদ্ধে আন্দোলনকেও পাকিস্তানের চক্রান্ত বলে দেগে দিয়েছে এই মিডিয়াই। সেদিক থেকে এবারের আচরণটাও নতুন নয়।

আসলে লাভের কড়ি মূল কথা হলেও, দশ-পনেরো বছর আগে পর্যন্তও সংবাদমাধ্যমের মালিকরা মনে করতেন, কিছুটা সামাজিক দায়িত্ব তাঁদের আছে। এর পিছনে স্বাধীনতা আন্দোলনের স্মৃতি হয়তো একটা কারণ। অথবা হয়তো ভারতীয় মধ্যবিত্তের দুর্বলতর মানুষের প্রতি যে সহমর্মিতা ছিল, সেকথা মাথায় রেখে সংবাদমাধ্যম সবরকম লড়াই আন্দোলনকেই খবর হিসেবে দেখতে বাধ্য হত। এখন আর সে দায় নেই, কারণ মধ্যবিত্ত বদলে গেছে— ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে চলতি কৃষক-আন্দোলনের অন্যতম নেতা হান্নান মোল্লা সখেদে যা বলেছেন। হেতু যা-ই হোক, সংবাদমাধ্যমের মালিকরা আগে মনে করতেন সংবাদসংগ্রহ বিশেষজ্ঞের কাজ এবং সংবাদ পরিবেশন মানে আসলে, মোটের উপর, ক্ষমতার দোষত্রুটি প্রকাশ করা। সেই কারণেই দোর্দণ্ডপ্রতাপ ইন্দিরা গান্ধি জরুরি অবস্থা জারি করেও সংবাদমাধ্যমকে পোষা তোতাপাখি বানাতে পারেননি। বরুণ সেনগুপ্ত, গৌরকিশোর ঘোষ, কুলদীপ নায়ারের মতো সম্পাদকরা কারাবাস করে ফেরত এসে আবার কলম ধরতে পেরেছেন। অধুনা ক্ষমতার বিরুদ্ধে কলম ধরলে কারাবাস হয় পরে, আগে সাংবাদিকের চাকরি যায়। আজকের মালিক সংবাদসংগ্রহ চান না, চান মুনাফা বৃদ্ধির জন্য বিত্তবান ক্ষমতাশালীর অনুগ্রহ। যেমন দিল্লিতে, তেমনই রাজ্যে-রাজ্যে। এ কাজে বিশেষজ্ঞ লাগে না, লাগে যা-বলেন-তাই-লিখি বাহিনী। তাই চতুর্দিকে সাংবাদিক ছাঁটাই হচ্ছে, কাগজ বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে, চ্যানেল তুলে দেওয়া হচ্ছে এমন একটা সময়ে, যখন স্বাধীনতার পরে ভারতের অর্থনৈতিক অবস্থা সবচেয়ে খারাপ, সামাজিক বিভাজন তুঙ্গে, বিচারব্যবস্থার নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন উঠে গিয়েছে, মৌলিক সাংবিধানিক অধিকারগুলো নেহাত কথার কথা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। অর্থাৎ যখন আরও বেশিসংখ্যক এবং বেশি সমালোচক সাংবাদিক দরকার ছিল, সেই সময় সংবাদসংগ্রহের কাজটাই তুলে দেওয়া হচ্ছে। অজুহাত হিসেবে কয়েক মাস আগে ছিল কোভিড-১৯, এখন অর্থনৈতিক মন্দা। সিংঘুতে সংবাদসংগ্রহ করতে যাবে কে, লোক কোথায়? লোক যেন না থাকে সে ব্যবস্থাই তো করা হয়েছে সযত্নে।

ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের মালিক রামনাথ গোয়েঙ্কাকে একবার এক রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী বলেছিলেন “আপনার অমুক রিপোর্টার খুব ভাল কাজ করছে।” রামনাথ তৎক্ষণাৎ সেই রিপোর্টারকে বরখাস্ত করেন। এখন যুগ বদলেছে। কোথায় কে কোন কাগজের সম্পাদক হবেন, অমুক চ্যানেলের তমুক জেলার সংবাদদাতা কে হবেন, তা-ও ঠিক করছেন মন্ত্রীরা। রবীশ কুমারের মতো কয়েকজন কথা শুনছেন না, ফলে দেখাই যাচ্ছে “ফিরিছে রাজার প্রহরী সদাই কাহার পিছু পিছু”। সুতরাং কোনটা খবর কোনটা নয়, কোনটা কত বড় খবর সেটাও যে মন্ত্রীসান্ত্রীরাই ঠিক করে দিচ্ছেন তা বোঝা কি খুব শক্ত?

আমরা যারা কাগজের পাঠক আর টিভির দর্শক, তারা না-বুঝলেও আন্দোলনকারী কৃষকরা বিলক্ষণ বোঝেন। তাই বেশকিছু চ্যানেলের সাংবাদিককে প্রোপাগান্ডা সংগ্রহে গিয়ে ব্যর্থ মনোরথ হয়ে ফিরতে হয়েছে।

তথ্যসূত্র

https://theprint.in/theprint-essential/what-is-electricity-amendment-bill-2020-and-why-farmers-are-opposing-it/555186/
https://indianexpress.com/article/india/hannan-mollah-idea-exchange-farmer-protests-farm-laws-7094428/
https://www.firstpost.com/india/bad-journalism-makes-a-lot-more-noise-raj-kamal-jhas-speech-at-ramnath-goenka-awards-3088184.html

https://4numberplatform.com এ প্রকাশিত

সাংবাদিক ছাঁটাই: আনন্দ সংবাদ নয়, বিপদ-সংকেত

বুঝে উঠতে পারেননি চুক্তিভিত্তিক চাকরিতে ঠিকা শ্রমিকের চেয়ে বেশি অধিকার দাবি করা যায় না।

দুরাত্মার যেমন ছলের অভাব হয় না, ছাঁটাইয়ের কারণেরও অভাব হয় না। সে কারণ কখনো অতিমারী, যা কোভিড-১৯ এর প্রভাবে এখন চলছে; আবার কখনও আর্থিক মন্দা, যেমনটা ২০০৮-০৯ এ হয়েছিল। কখনও শুধুই “লোক বেশি ছিল”। অনেক সময় আবার কারণ দর্শানোর দরকারই পড়ে না, কারণ খবরটা বিশেষ কারো চোখেই পড়ে না। যেমন এই মুহূর্তে বি এস এন এলের মত রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থায় স্থায়ী, অস্থায়ী কর্মীদের স্রেফ খেদিয়ে দেওয়া হচ্ছে, অথচ তা নিয়ে কর্মী এবং কর্মী ইউনিয়ন ছাড়া বিশেষ কারো মাথাব্যথা নেই। কারণ সংবাদমাধ্যমগুলো ইদানীং মানুষের কাজ হারানোকে আর খবর বলে মনে করে না। পথ অবরোধ, হাতাহাতি বা তারও বেশি কিছু ঘটলে দু একদিন খবরের চ্যানেলে নিউজফ্ল্যাশ হিসাবে এসে পড়ে, বিয়েবাড়িতে ঢুকে পড়া বুভুক্ষু ভিখারির মত খবরের কাগজের ভিতরের পাতায় এক কোণে জায়গা হয়। সেটুকু জায়গাও অবশ্য ঘটনাটা রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থায় হলে তবেই পাওয়া যায়। বেসরকারি সংস্থায় ছাঁটাই হওয়া পূর্ব দিকে সূর্য ওঠা আর পশ্চিমে অস্ত যাওয়ার মতই স্বাভাবিক ঘটনা।

আপনি যদি নাম করা কোম্পানির ভাল মাইনের কর্মচারী হন, তাহলে নিশ্চিত থাকতে পারেন আপনার কাজ হারানোটা খবর নয়। আপনাকে যখন সুললিত ভাষায় জানানো হবে কোম্পানির আর আপনাকে প্রয়োজন নেই, তখন চুপচাপ বাড়ি চলে আসা ছাড়া আপনার আর কিচ্ছু করার নেই। আপনার বা আপনাদের কথা কোথাও এক লাইন লেখা হবে না। আপনাদের কেউ যদি ফ্যান থেকে ঝুলে পড়েন, একমাত্র তাহলেই টিভি চ্যানেলগুলো দৌড়ে আসতে পারে বা কাগজওয়ালারা আগ্রহী হয়ে উঠতে পারে। কোভিডের প্রতাপে কাজ হারিয়ে এই মুহূর্তে আপনারা কেউ যদি নিজের এবং পরিবারের তেমন সর্বনাশ করবেন বলে ভেবে থাকেন, তাহলে তাঁদের যন্ত্রণার উপশমের জন্য একটা খবর আছে। আপনারা যে তিমিরে, সাংবাদিকরাও সেই তিমিরে। সেই মার্চ মাসের শেষ থেকে এই আগস্ট মাসের তৃতীয় সপ্তাহ পর্যন্ত সারা দেশে কয়েক হাজার সাংবাদিক কর্মহীন হয়ে পড়েছেন। আপনি যতগুলো কাগজের নাম জানেন, যতগুলো খবরের চ্যানেলের হদিশ আপনার জানা আছে, তার প্রায় সবকটাই কিছু সাংবাদিককে ছাঁটাই করেছে, বাকিদের মাইনে কেটেছে নানা মাত্রায়। তাঁরা মুখ বুজে সহ্য করছেন, আপনিই বা করবেন না কেন?

অনেকদিন অনেক সংখ্যাতাত্ত্বিক চালাকি চলল। এখন রিজার্ভ ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়া নিজেই বলছে অর্থনীতির অবস্থা মোটেও ভাল নয়, জি ডি পি ঋণাত্মকও হয়ে যেতে পারে। প্রবাসী শ্রমিকদের আমরা মাইলের পর মাইল হাঁটতে হাঁটতে মরে যেতে দেখে ফেলেছি। সমস্ত ক্ষেত্রেই বহু মানুষ কর্মহীন হয়েছেন। এমতাবস্থায় হাজার পাঁচেক সাংবাদিকের চাকরি যাওয়া নিয়ে আলাদা করে বলবার কী আছে। সংখ্যার বিচারে হয়ত নেই, কিন্তু সাংবাদিকদের যদি প্রেস্টিটিউট আর শকুন — এই দুই স্টিরিওটাইপের বাইরে গিয়ে মানুষ বলে ভাবতে রাজি থাকেন, তাহলে সাংবাদিকদের কাজ হারানো আপনার কাজ হারানোর মতই বেদনাদায়ক। কিন্তু তার চেয়েও বড় কথা, এত সাংবাদিকের চাকরি যাওয়া এই দেশের গণ>তন্ত্রের পক্ষে মারাত্মক দুঃসংবাদ। আর গণতন্ত্র বিপদে পড়া মানে শুধু আমার আপনার নয়, আমাদের সন্তানদেরও ভবিষ্যৎ অন্ধকার।

আপনি বলবেন, কেন? সাংবাদিকদের চাকরি গেলে গণতন্ত্র বিপন্ন হবে কেন? আসলে হবে নয়, গণতন্ত্র ইতিমধ্যেই বিপন্ন। সেই কারণেই সাংবাদিকরা অপ্রয়োজনীয় হয়ে পড়েছেন, তাঁদের একটা বড় অংশকে বিদায় দেওয়া হচ্ছে। অনস্বীকার্য যে কিছু ব্যতিক্রম বাদ দিলে বেশিরভাগ সংবাদমাধ্যমই এখন “কলের গান, কুকুর মাথা”, তাদের কিনেছে বিজ্ঞাপনদাতা। আর সবচেয়ে বড় বিজ্ঞাপনদাতা হল সরকার (কেন্দ্র এবং রাজ্য)। বিজ্ঞাপনদাতাদের চটানো চলে না, অথচ সাংবাদিকদের সংবাদ সংগ্রহ করতে দিলেই চটবার মত খবর এসে হাজির হবে। মালিকপক্ষ তা চান না। তাঁরা ব্যবসা করতে নেমেছেন, জনসেবা করতে নয়। আপনি যদি সংবাদমাধ্যমগুলোর বিজ্ঞাপনী স্লোগানে মোহিত হয়ে থাকেন, সে আপনার দোষ। আসলে কাগজ তা-ই লেখে যা তাকে লিখতে বলা হয়। সে কাজ করতে তো আর সাংবাদিক লাগে না। তাই সাংবাদিকরা এখন উদ্বৃত্ত। এর প্রভাব আপনার উপর কীভাবে পড়বে বুঝলেন তো? আপনার সুখ দুঃখ বিপদ আপদের খবর ক্রমশই বিরলতর হবে কাগজের পাতায় আর টিভির পর্দায়। পাড়াসুদ্ধ লোকের চাকরি চলে গেলেও, জিনিসপত্রের দাম আকাশছোঁয়া হয়ে গেলেও, করোনায় আক্রান্ত রোগীর সংখ্যায় এবং মৃত্যুতে ভারত জগৎসভায় শ্রেষ্ঠ আসন নিলেও, কাগজ খুললে বা টিভি দেখলে মনে হবে অন্য দেশের খবর দেখছেন। কারণ সংবাদমাধ্যমগুলোকে তেমনটাই করতে বলা হয়েছে। কে বলেছে তা অনুমান করার জন্য স্বর্ণপদক চেয়ে বসবেন না যেন।

করোনার জন্য প্রায় সব পেশাতেই কর্মহানি হয়েছে প্রবল। বিভিন্ন ক্ষেত্রের প্রতিবেদন ও বিশ্লেষণ নিয়ে এ বিষয়ে দুটি সংখ্যা ভাবা হয়েছে। পরের সংখ্যায় থাকছে হকারদের নিয়ে বিশ্বেন্দু নন্দের, গৃহসহায়িকাদের নিয়ে মৌসুমী বিলকিসের প্রতিবেদন ও অর্থনীতির একটি মডেল নিয়ে অনির্বাণ মুখোপাধ্যায়ের বিশ্লেষণ।

এত তেতো কথা পড়ে যে কেউ বলতেই পারেন, এ সমস্ত প্রোপাগান্ডা। সত্যিই তো অতিমারীর ফলে বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক বিপর্যয় ঘটেছে, বেশিরভাগ ব্যবসা বাণিজ্যই ধুঁকছে। কাগজ বা চ্যানেলের মালিকরা কি পকেটের পয়সা দিয়ে ব্যবসা চালাবেন? তাঁদেরও নিশ্চয়ই ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, সে ক্ষতি পূরণ করতে কর্মী সঙ্কোচন ছাড়া পথ ছিল না।

আচ্ছা, তাহলে অতিমারী নিয়েই কথা হোক। ভারতে করোনার পদার্পণ যেদিনই ঘটে থাক, চার ঘন্টার নোটিশে দেশ জুড়ে লকডাউন চালু হওয়ার আগে পর্যন্ত অর্থনীতির চাকা তো পুরো দমে ঘুরছিল। প্রধানমন্ত্রী ঘোষিত লকডাউন শুরু হয় ২৫শে মার্চ মধ্যরাতে, তার আগে ২২শে মার্চ ছিল জনতা কারফিউ। পশ্চিমবঙ্গে লকডাউন শুরু হয়েছিল ২৩শে মার্চই; মহারাষ্ট্র, তামিলনাড়ুর মত কয়েকটা রাজ্যও দেশব্যাপী লকডাউনের কয়েকদিন আগে থেকেই লকডাউন ঘোষণা করে। অর্থাৎ অর্থনীতির চাকা ঘুরতে ঘুরতে একেবারে বন্ধ হয়ে যায় মার্চের শেষ সপ্তাহে। আচ্ছা আর্থিক বর্ষ শেষ হয় কত তারিখে? ৩১শে মার্চ। তাহলে কোভিড-১৯ এর প্রভাব ২০১৯-২০ আর্থিক বর্ষে কদিন পড়েছে ভারতের সংবাদমাধ্যমের উপর? বড় জোর দশ দিন। এই দশ দিন এমনই কাঁপিয়ে দিল মহীরূহদের যে বাকি আর্থিক বর্ষের লাভ কমতে কমতে বিপুল ক্ষতিতে চলে গেল! তাই এপ্রিল-মে থেকেই মাইনে কাটা এবং ছাঁটাই শুরু করতে হল বড় বড় সংবাদমাধ্যমগুলোতে? এ যদি সত্য হয়, তাহলে পি সি সরকারের এখনই প্রকাশ্যে নাক খত দিয়ে বলা উচিৎ তাঁর বংশের কেউ আর কোনওদিন ম্যাজিক দেখাবে না।

বলা যেতেই পারে যে এটা অতিসরলীকরণ হল। বিগত আর্থিক বর্ষের ক্ষতি নয়, এই বিপুল ছাঁটাই এবং মাইনে কাটার কারণ হল বর্তমান আর্থিক বর্ষের বিপুল ক্ষতির সম্ভাবনা। স্রেফ সম্ভাবনার কথা ভেবে মানুষের চাকরি খাওয়া কতটা যুক্তিযুক্ত সে প্রশ্ন তুলব না। কারণ কর্পোরেট দুনিয়া মানবিক যুক্তিতে চলে না, চলে লাভ ক্ষতির যুক্তিতে। সেখানে মানুষকে নিয়ে আলোচনা বামপন্থী সেন্টিমেন্টালিজম মাত্র। অন্য একটা প্রশ্ন আছে। কর্মীদের মাইনে দেওয়ার খরচ কমালে কতটা খরচ কমে? একটা উদাহরণই যথেষ্ট।

২০১৭ সালের জানুয়ারি মাসে এক অতিকায় সর্বভারতীয় সংবাদপত্র তাদের উত্তর সম্পাদকীয় স্তম্ভে দাবি করেছিল কাগজ চালানো দুষ্কর হয়ে পড়েছে। যা যা কারণ বলা হয়েছিল, তার মধ্যে একটা ছিল কর্মচারীদের মাইনে দিতে বিপুল খরচ। তার দুদিন পরেই দিল্লি ইউনিয়ন অফ জার্নালিস্টস নামে সাংবাদিকদের এক সংগঠন পাবলিক রেকর্ড উদ্ধৃত করে বলেছিল, ঐ সংবাদপত্রের মোট আয়ের মাত্র ১১% খরচ হয় মাইনে দিতে। পরিসংখ্যানটা অবশ্য ২০১০-১১ আর্থিক বর্ষের। ধরা যাক সিংহহৃদয় মালিকপক্ষ এতদিনে সে খরচ দ্বিগুণ করে ফেলেছেন। তা এই বিপুল ক্ষতির মরসুমে কর্মী ছাঁটাই করে ঐ ২২% খরচের কতটা কমানো গেল? বাকি ৭৮% থেকে কিছু সাশ্রয় হল কি? এসব প্রশ্ন তুললেই সংবাদপত্রের স্বাধীনতা, ব্যবসার গোপনীয়তা, কোম্পানি আইনের রক্ষাকবচ ইত্যাদি প্রসঙ্গ এসে যাবে। কোভিডের ক্ষতিপূরণে শ্রম আইন এলেবেলে হয়ে গেছে, আট ঘন্টা কাজের অধিকারের মত ন্যূনতম অধিকারও সরকার ইচ্ছামত স্থগিত রাখছেন। কেউ কিন্তু কোম্পানি আইন দেশমাতৃকার স্বার্থে বলি দিতে রাজি নয়। তাই বলছি, কোভিড নেহাত অজুহাত। এই বিপুল ক্ষতি নিয়ে তিন দিন ব্যাপী অশ্রু বিসর্জন সভা প্রতি বছরের মত এ বছরেও কোন কোম্পানি মরিশাসে কেউ বা মারাকেশে করবেন, নিদেন মুম্বাইয়ের সেভেন স্টার হোটেলে। এদিকে কাজ হারানো সাংবাদিকরা গৃহঋণের ই এম আই দিতে না পেরে ব্যাঙ্কের রিকভারি এজেন্টদের থেকে পালিয়ে বেড়াবেন।

কেউ কেউ হয়ত অগত্যা ধনী রাজনৈতিক দলের টোপ গিলে প্রকাশ্যে বা কৌশলে প্রোপাগান্ডার কাজে লাগবেন। কিন্তু সে সুযোগই বা কজন পাবেন? পশ্চিমবঙ্গে তো এক লহমায় সংবাদমাধ্যমের অনেকের কাজ হারানো অনতি অতীতেই ঘটেছে, যখন সুদীপ্ত সেনের পুঁজিতে পুষ্ট খবরের কাগজ এবং টিভি চ্যানেলগুলো উঠে গেল। অনেকেই আর কাজ পাননি। বাধ্য হয়ে মুদির দোকান, স্টেশনারি দোকান খুলে বসেছেন, কোনও মতে দিন গুজরান হয় — এমন মানুষও আছেন।

যাঁরা কোন পয়সাওয়ালা রাজনৈতিক দলের দাক্ষিণ্য পাবেন, তাঁরা যদি আপনার পছন্দের দলটির প্রোপাগান্ডা না করেন তাহলে বিলক্ষণ তেড়ে গাল দেবেন। কিন্তু, প্রিয় পাঠক, সাংবাদিকদের এই দুর্দশার কাহিনীতে আপনার ভাববার মত যে উপাদান আছে তা দয়া করে অগ্রাহ্য করবেন না। আজকাল সরকারী চাকরি অনেক কমে গেছে, বেশিরভাগ মানুষই কোন না কোন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মী। অতএব কর্পোরেটের কর্মচারী সাংবাদিকদের সাথে বিশেষ অবস্থাভেদ নেই।

সাংবাদিকদের এমন অবস্থা হল কেন? যাঁরা অমিতশক্তিধর, সরকার গড়তে পারেন আবার ফেলেও দিতে পারেন বলে জনশ্রুতি, তাঁদের কাতারে কাতারে চাকরি যাচ্ছে আর কেউ টুঁ শব্দটি করছে না — এমন হল কেন? হল, কারণ নয়ের দশকে বিশ্বায়নের যুগে দিকপাল সাংবাদিকরা মালিকদের প্ররোচনায় রিমের পর রিম লিখে দেশসুদ্ধ লোককে বোঝালেন যে কর্মী ইউনিয়নের মত খারাপ জিনিস দুটি নেই। ওটি সর্বতোভাবে কর্মনাশা, শিল্পবিরোধী। এর ফলে সরকারি মদতে, মালিকদের ইচ্ছায় সব শিল্পেই ইউনিয়নগুলো দুর্বল হয়ে পড়ল, কোথাও নামমাত্রে পরিণত হল। সংবাদমাধ্যমে ইউনিয়ন কার্যত উঠে গেল। তারপর এল চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ। দিকপালরা ভাবলেন তাঁরা ঐতিহাসিক কাজ করলেন। ঠিকই ভাবলেন। তবে ভেবেছিলেন পানিপথের যুদ্ধ জয় করলেন, আজকের সাংবাদিকরা বুঝছেন (বুঝছেন কি? কে জানে!) আসলে ওটা ছিল পলাশীর পরাজয়। হাতে যন্ত্রপাতির বদলে কলম (এ যুগে ল্যাপটপ) থাকে বলে সাংবাদিকরা ভেবেছিলেন তাঁরা শ্রমিক নন। তাই বুঝে উঠতে পারেননি চুক্তিভিত্তিক চাকরিতে ঠিকা শ্রমিকের চেয়ে বেশি অধিকার দাবি করা যায় না। আর জোট বেঁধে দাবি পেশ করার অধিকার না থাকলে কোন অধিকারই থাকে না, মালিকের খেয়ালে চলতে হয়।

খেয়াল মানে খিদে, লাভের খিদে। বাঘের ক্ষুধামান্দ্য হতে পারে, কর্পোরেটের খিদে কখনও কমে না। এই একবিংশ শতকে লাভের নতুন সংজ্ঞা তৈরি হয়েছে। কর্পোরেট বয়ানে লাভের মানে হল গত বছরের চেয়ে বেশি লাভ। সেই নতুন টার্গেটে না পৌঁছাতে না পারলেই কোম্পানির ক্ষতি হয়, আর তখনই কর্মী ঘচাং ফু। সাংবাদিকও তেমনই এক কর্মী, তার বেশি কিছু নয়। সেই কারণেই আগেকার সম্পাদকরা রাজনৈতিক গুন্ডার হাতে প্রতিবেদক নিগৃহীত হলে বুক দিয়ে আগলাতেন এবং প্রশাসনের বাপান্ত করতেন। এখন খবর পর্যন্ত ছাপেন না অনেক সময়, এফ আই আর ও করতে দেন না। উলটে শাসক দলকে কুপিত করার অপরাধে ঐ প্রতিবেদককে বরখাস্তও করতে পারেন।

তাই আজ সহকর্মী কাজ হারিয়ে গলায় দড়ি দিলেও সাংবাদিকদের এক লাইন লেখার উপায় নেই, ফেসবুকে লিখতেও বুক কাঁপে। নির্জনে শোক পালন ছাড়া গতি নেই।

প্রিয় পাঠক, আপনি যে পেশাতেই থাকুন, কর্মস্থলে আপনার অবস্থা কি এর চেয়ে উন্নত? ভেবে দেখুন তো?

https://www.guruchandali.com/ এ প্রকাশিত

%d bloggers like this: