হুলিগানের গুঁতোয় যা যা টের পাওয়া গেল

তখন বাঙালির রাজনীতির সর্বজনস্বীকৃত পদ্ধতি ছিল – জ্যোতি বসু, প্রমোদ দাশগুপ্তেরা ধুন্ধুমার আন্দোলন করবেন। নিজেদের শিল্পের মাধ্যমে রাজনৈতিক বার্তা দেবেন উৎপলবাবু বা মৃণাল সেনরা। এখন ডান, বাম নির্বিশেষে বাঙালির চাহিদা হয়েছে উলটো – শতরূপ, দিলীপদের স্টুডিওয় যেতে হবে। মিছিলে যেতে হবে অনির্বাণদের।

পশ্চিমবঙ্গের বই বাজারে সহায়িকা জিনিসটার বেশ বিক্রি আছে বোঝা যায়। কারণ প্রকাশকরা টিভিতে ওসব বইয়ের বিজ্ঞাপন দিতে টাকা খরচ করেন। ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসাডর হিসাবে নিয়ে আসেন মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিকে প্রথম দশে থাকা ছেলেমেয়েদের। এদিকে এ রাজ্যের শিল্পীদের রোজগার ক্রমশ কমছে বলে খবর পাই। বাংলা সিনেমা, বাংলা নাটক, বাংলা গান – কোনোকিছুই যে আর লাভজনক ব্যবসা থাকছে না, তা তো আমরা অনেকেই এখন জেনে গেছি। কিন্তু পকেটে টান পড়লেও এবার থেকে সঙ্গীতশিল্পীদের গানের সহায়িকা প্রকাশ করা উচিত। গানের অনুষ্ঠান শুরু হওয়ার আগে প্রত্যেক দর্শকের হাতে এক কপি করে সেই সহায়িকা ধরিয়ে দেওয়া উচিত। সেখানে কোন গানের কোন কথাটা আক্ষরিক অর্থে নয়, শ্লেষার্থে বলা; কোন লোকের নাম কেন নেওয়া হয়েছে, কার নাম কেন নেওয়া হয়নি, কোন ঘটনার উল্লেখ কেন এসেছে, শিল্পী অতীতে কোন ঘটনা নিয়ে গান বেঁধেছেন, কোনটা নিয়ে বাঁধেননি, না বাঁধলে কেন বাঁধেননি; কোন মিছিলে গেছেন আর কোন মিছিলে যাননি, না গেলে কেন যাননি – এসব পরিষ্কার করে লিখে দেওয়া উচিত। একজন শিল্পীর অনুষ্ঠান হলে এটুকু করলেই চলবে, কিন্তু গানের দল হলে দলের প্রত্যেক সদস্যের অতীতের কোন ঘটনায় কী মতামত ছিল তাও লিখে দিতে হবে। তবে এটুকু করাই যথেষ্ট নয়। অনুষ্ঠানের প্রচারের সময়ে এই সহায়িকার বিজ্ঞাপনও দিতে হবে। ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসাডর হিসাবে নিতে হবে রাজনৈতিক দলের নেতাদের। প্রত্যেকটা সহায়িকার বিজ্ঞাপনেই কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে উপস্থিত সব দলের নেতাকে রাখতে হবে। নইলে নিরপেক্ষতা বজায় থাকবে না। এইসব শর্ত মেনে গান না করলে বুঝতে হবে সংশ্লিষ্ট শিল্পী বা শিল্পীদের দল হয় চটিচাটা, নয় চাড্ডি, নইলে মাকু অথবা সেকু। কখনো কখনো তিনটের মধ্যে দুটো, বা একসঙ্গে তিনটেই।

এখানে দুটো আপত্তি উঠতে পারে।

১) গানের অনুষ্ঠান দেখতে গিয়ে বই কে পড়বে?

২) অনলাইনে কে কী বলল তাতে কী এসে যায়?

যে কোনো ফেসবুক-শিক্ষিত বাঙালিই ১ নম্বর প্রশ্নের উত্তরে জানিয়ে দেবেন যে ওটা অজুহাত, কোনো প্রশ্ন নয়। কেউ পড়বে কি পড়বে না সেটা ভাবার দায়িত্ব শিল্পীর নয়। শিল্পীকে আমাদের শর্তাবলী মানতে হবে। আমরা অত পড়বও না, সব গান মন দিয়ে শুনবও না। আমরা যারা টিকিট কেটে অনুষ্ঠান দেখতে যাইনি, তারা অনুষ্ঠানে পরিবেশিত গোটা আষ্টেক গানের মধ্যে গোটা একটা গানের ভিডিও-ও দেখব না অনলাইনে। দেখব সাড়ে তিন মিনিটের ভাইরাল হওয়া ক্লিপ, তারপর লিখব সাড়ে তিন হাজার শব্দের ফেসবুক-প্রবন্ধ। কারণ শিল্প যিনি বা যাঁরা সৃষ্টি করেন, যাবতীয় দায়িত্ব তাঁদেরই। শিল্পের রসাস্বাদন করতে কয়েক হাজার বছর ধরে মানুষ যে মানসিক পরিশ্রম করে এসেছে, সেসব করার দায়দায়িত্ব আমাদের নেই। উৎকর্ণ হয়ে গান শোনার দায়িত্ব নেই, গানের কথাগুলো নিয়ে ভাবার দায়িত্ব নেই, যে কথাগুলো বলা হচ্ছে সেগুলো কেন বলা হচ্ছে, যেভাবে বলা হচ্ছে সেভাবেই বা কেন বলা হচ্ছে? এসব নিয়ে ভাবা আমাদের কাজ নয়। আমরা শুধু দেখব আমাদের পছন্দের কথা বলা হচ্ছে কিনা। হলে প্রশংসায় ভরিয়ে দেব, ফেসবুকে লাইক দেব, শেয়ার করব। অপছন্দের কথা হলে বলব ‘ছ্যাঃ! এটা গান?’, ‘একে প্রতিবাদ বলে?’, ‘রকের ভাষা স্টেজে উঠে বলে দিলেই শিল্প হয়?’ শ্লেষ বোঝার ধৈর্য না রেখে গান বা কৌতুকের স্রেফ আক্ষরিক অর্থ দেখেই চিল চিৎকার জুড়ে দেব ‘ইশ! নারীবিদ্বেষী কথা বলে চলে গেল, আর লোকে এই নিয়ে উল্লাস করছে!’

২ নম্বর প্রশ্নটা যে ২০২৫ সালে দাঁড়িয়ে অবান্তর, তা নিয়ে বোধহয় বিতর্কের অবকাশ নেই। সোশাল মিডিয়া কেবল শিল্পচর্চার নয়, সাধারণ জীবনচর্যারই অবাঞ্ছিত কিন্তু অপরিহার্য অঙ্গ হয়ে গেছে। যে কোনো শিল্পের জনপ্রিয়তা, তা থেকে আয় – অনেকটাই নির্ধারিত হচ্ছে জিনিসটা কতখানি ভাইরাল হল তার উপরে। ফলে কোনো শিল্পমাধ্যমই আজ আর অনলাইন প্রতিক্রিয়াকে অগ্রাহ্য করতে পারে না। সিনেমা বা নাচগান, নাটকের ক্ষেত্রে আগে মুখে মুখে প্রচারের যে ব্যাপারটা ছিল, তা এখন প্রায় উঠে গেছে। যা ঘটে তা অনলাইনেই ঘটে। কোন ছবি দেখতে যাব, কাদের গান শুনতে যাব বা কোন নাটক দেখব – আমরা সকলেই ঠিক করি ফেসবুক রিভিউ পড়ে বা ইউটিউবে কেমন হিট হচ্ছে তাই দিয়ে। তাছাড়া অনলাইনে কে কী বলল তাতে যদি কিছু না-ই এসে যায়, তাহলে অনলাইনে ঘৃণাভাষণ বা মহিলাদের প্রতি লিঙ্গবিদ্বেষী মন্তব্য, ধর্ষণের হুমকি দেওয়া নিয়ে আমরা আপত্তি করি কেন?

বলা বাহুল্য, এতগুলো কথা উঠে আসছে গত কয়েক দিনে মিলনমেলা প্রাঙ্গণে একাধিক ব্যান্ডের এক অনুষ্ঠানে হুলিগানইজম ব্যান্ডের একখানা গানের কিয়দংশ নিয়ে তৈরি হওয়া উত্তেজনা সম্পর্কে।

সাড়ে তিন মিনিটের ওই ভিডিওর ভাইরাল হওয়া প্রমাণ করে, যাবতীয় ডানপন্থী ও বামপন্থী আপত্তি সত্ত্বেও বহু মানুষের ওই পরিবেশনা ভাল লেগেছে। লাগারই কথা, কারণ আজকের পশ্চিমবঙ্গে যেসব কথা সাধারণ মানুষ আলোচনা করেন ফিসফাসে, সেসব কথা হুলিগানইজম মঞ্চে দাঁড়িয়ে গলা তুলে বলে দিয়েছে। এই বাংলায় যাঁরা ঠিক করেন কোনটা গান, কোনটা প্রতিবাদ, কোনটা সিনেমা; যাঁদের সম্পর্কে নচিকেতা সেই বাম আমলে লিখেছিলেন “সংস্কৃতির গ্রাফ উঠছে না নামছে/ফিতে দিয়ে মাপছেন তাঁরা”, সেইসব লোক ও মহিলাদের চোখে ওটা গান না-ই হতে পারে, প্রতিবাদও না হতে পারে। কিন্তু যে মফস্বলের টোটোচালক এই আমলেও সিপিএম করেন আর নিয়মিত কুণাল ঘোষের দলের কর্মীদের কাছ থেকে হাতে ও ভাতে মরার হুমকি শোনেন, তিনি দেখছেন তাঁর কথা একটা গানের দল কলকাতা শহরের বুকে ঝলমলে মঞ্চে উঠে বলে দিয়েছে। যে সিপিএম করা বাসচালক নিজে বেশিদূর লেখাপড়া করতে পারেননি, ভেবেছিলেন ছেলেকে অনেকদূর পড়াবেন অথচ দেখছেন স্কুল-কলেজের বারোটা বেজে গেছে, এদিকে কেন্দ্রের শাসক দলের নেতা গরুর দুধে সোনার তত্ত্ব দিচ্ছেন, পাশের পাড়ায় বাচ্চাদের শেখানো হচ্ছে পাকিস্তান স্বাধীন হওয়ার সময়ে এগারো হাজার হিন্দু মারার গালগল্প – তিনি নিজের ছেলের ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তিত। তিনি দেখছেন, একটা জনপ্রিয় মুখ গরুর দুধে সোনার তত্ত্ব দেওয়া সাম্প্রদায়িক নেতাকে হাসির পাত্র করে দিচ্ছে। ভাবছেন যদি তাতে ছেলেপুলেদের উপর একটু প্রভাব পড়ে।

শতরূপ ঘোষের বাবুয়ানি নিয়ে দু-চার কথা বললে এঁদের কিচ্ছু এসে যায় না, বরং হয়ত ভালই লাগে। কারণ বামপন্থী দলের সংস্পর্শে এসে যদি তাঁরা একটা জিনিসও শিখে থাকেন তা এই, যে লোকে কপালের দোষে গরিব হয় না। দুনিয়ায় বড়লোক আছে বলেই গরিব আছে। সে বড়লোকের টাকা আইনি পথেই আয় করা হোক বা বেআইনি পথে।

কথাটা আলালের ঘরের দুলাল সিপিএমদেরও শেখার কথা ছিল, কিন্তু হুলিগানইজমের হুল্লোড়ে তাঁদের প্রতিক্রিয়া দেখে মনে হচ্ছে না পার্টির পক্ষ থেকে শেখানো হয়েছে। ফলে এক আশ্চর্য কাণ্ড ঘটছে গত কয়েক দিন ধরে। যে নেতাকে নিয়ে টিপ্পনী কাটা হয়েছে, তিনি ক্রুদ্ধ প্রতিক্রিয়া দেননি। অথচ সমর্থকদের ক্রোধ আর ফুরোচ্ছে না। নেতা বুদ্ধিমান, তিনি একবার, আমার বাবার টাকায় আমি গাড়ি কিনেছি বেশ করেছি – এই মর্মে আস্ফালন করেই সম্ভবত বুঝে গেছেন যে কমিউনিস্ট পার্টি করে ওকথা বলা চলে না। কিন্তু বিদেশে ছুটি কাটাতে যাওয়া, দামি গাড়ি চড়া ভক্তবৃন্দের এ যে অস্তিত্বের সংকট। যে ভোগে আপাদমস্তক ডুবে আছেন, তা কমিউনিস্টসুলভ নয় – এ বার্তা দিকে দিকে রটি গেলে বামপন্থী হওয়ার রেলাটি বজায় রাখা যে শক্ত হয়ে যাবে। মঞ্চের হুলিগানরা যেভাবে তাঁদের নেতাকে নিয়ে খিল্লি করল, তাতে সাহস পেয়ে যদি গরিব নিম্নবিত্ত বামপন্থীরা এঁদের নিয়ে খিল্লি করতে শুরু করে! এই আতঙ্কেই ‘ওটা কোনো গান নয়’, ‘ওটা প্রতিবাদ হয়নি’, ‘ওই আক্রমণে হুল নেই’ ইত্যাদি বাণী সাড়ে তিন দিনে সাড়ে তিন লক্ষ বার সোশাল মিডিয়ায় লেখা, সাড়ে তিন কোটি শেয়ার করা নয় তো? কিছুই যখন হয়নি, তখন রিমের পর রিম এ নিয়ে লেখার দরকার কী? যাদের জিনিসটা ভাল লেগেছে তাদের দিকে তেড়ে যাওয়ার দরকারই বা কী?

ব্যাপারটাকে খিস্তি খেউড় বলে উড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা যাঁরা করছেন, তাঁরা ভুলে যাচ্ছেন – এটা বাংলা। এখানে কবির লড়াই, তরজা, খেউড়ও খাঁটি দিশি সংস্কৃতি। হুলিগানইজমের অন্যতম প্রধান গায়ক অনির্বাণ ভট্টাচার্য নাহয় ‘গরিবের উত্তমকুমার’ (এই অভিধার প্রকট সাহেবিয়ানা এবং গরিবের সংস্কৃতিকে নিকৃষ্ট বলার প্রচ্ছন্ন বাবুয়ানিটি কি বামপন্থী?), শতবর্ষে পা দেওয়া আসল উত্তমকুমারের এন্টনী ফিরিঙ্গী (১৯৬৭) দেখলেই ব্যাপারটা জানা যায়। অবশ্য শহুরে মধ্যবিত্ত, উচ্চবিত্ত বামপন্থীদের অনেকে সত্যজিৎ-ঋত্বিক-মৃণালের বাইরে বাংলা ছবি দেখেননি। ফলে তাঁরা না-ও জানতে পারেন। কিন্তু আজকের পৃথিবীতে কীভাবে প্রতিবাদের ভাষা এবং ভাষ্য পালটে ফেলছেন শিল্পীরা; শিল্পমাধ্যম এবং সাংবাদিকতার সীমারেখা কীভাবে প্রায়শই মুছে যাচ্ছে – সেটুকু তো জানা উচিত। বামপন্থী নেতাদের থেকে সাধারণ জীবনযাপন আশা করা অনুচিত – এমনটা প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা হচ্ছে। এরপর কি শুনতে হবে তাঁদের কাছে আন্তর্জাতিক চেতনাও আশা করা উচিত নয়? নাকি সেটা বছর বছর ১ সেপ্টেম্বরের মিছিলেই সীমাবদ্ধ থাকবে বলে মেনে নিতে হবে?

চলতি বামাবেগের অরাজনৈতিকতা আরও স্পষ্ট হয়ে যায় হুলিগানইজমের পরিবেশনা নিয়ে ডানপন্থী আপত্তির দিকে তাকালে। বিজেপি নেতা দিলীপ ঘোষকে নিয়ে টিপ্পনী কাটা হয়েছে, তিনি প্রতিক্রিয়ায় বলেছেন – বাকস্বাধীনতা আছে বলেই যা খুশি বলা যায় না। অথচ তাঁর দলের আইনজীবী নেতা তরুণজ্যোতি তিওয়ারি হুলিগানইজম, এবং দুই তাদের প্রধান গায়কের অন্যতম, অনির্বাণের নামে পুলিসে যে লিখিত অভিযোগ জানিয়েছেন তা কিন্তু দিলীপের প্রতি কটূক্তি নিয়ে নয়, সনাতন ধর্ম সম্পর্কে অন্য একটা টিপ্পনীর জন্য। সোশাল মিডিয়ার ডানপন্থীদেরও ওই সাড়ে তিন মিনিট নিয়ে আপত্তির কারণ সনাতন সম্পর্কে রসিকতা – যা ভারতের দক্ষিণপন্থী রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু। ব্যক্তি নেতাকে নিয়ে তাঁরা ভাবিত নন। অথচ বামেরা উত্তেজিত শতরূপের গাড়ির মান বাঁচাতে। তাহলে কি নেতা আর পার্টি অভিন্ন এঁদের কাছে? যেমন হিন্দুত্ববাদীদের কাছে ২০২৪ নির্বাচনের আগে পর্যন্তও নরেন্দ্র মোদী আর বিজেপি অভিন্ন ছিলেন? শতরূপ কি এত বড় নেতা? যদি তা-ই হয়, তাহলে আবার ‘সাহস থাকলে মহম্মদ সেলিমকে আক্রমণ করতে পারত, সফট টার্গেট বেছেছে’ – এমন কথা উঠছে কেন? যে নেতার এত অনুরাগী, তিনি ‘সফট টার্গেট’ হন কী করে? আর যদি ‘সফট টার্গেট’-ই হন, তাহলে তাঁকে নিয়ে সামান্য একটা গানের দলের টিপ্পনীকে পার্টির প্রতি আক্রমণ বলে ভেবে ফেলা কেন? তৃণমূল সরকার যখন খামোকা মীনাক্ষী মুখার্জিকে হাজতবাস করাল, তখন এর অর্ধেক উৎসাহ নিয়ে সিপিএমের এই সদস্য সমর্থকরা তাঁকে ছাড়িয়ে আনতে গেলেও বোধহয় সরকারের হৃদকম্প হয়ে যেত, তাঁকে ছেড়ে দিতে বাধ্য হত। তা তো করা হয়নি। তাহলে ‘সফট টার্গেট’ আসলে কে? শতরূপ না মীনাক্ষী? বামেরা বলছেন হুলিগানদের অন্য দুই টার্গেটও ‘সফট’। হয়ত ঠিকই বলছেন, কারণ কুণাল আর দিলীপকে নিয়ে তাঁদের পার্টির সদস্য, সমর্থকরা কিন্তু এত হইচই করলেন না।

এইবার যে যুক্তিটা উঠে আসা অনিবার্য, সেটা শিল্প সম্বন্ধে নয়, শিল্পী সম্বন্ধে। শিল্পীর অধিকার সম্বন্ধে বললেও ভুল হয় না। নিশ্চয়ই বলা হবে, হুলিগানইজম বলে গুলিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করবেন না। আসল হল অনির্বাণ। তিনি সুবিধাবাদী, তিনিই চটিচাটা, তিনিই আর জি কর আন্দোলন নিয়ে চুপ ছিলেন, তিনিই শিক্ষা দুর্নীতি নিয়ে কথা বলেননি। এখন তিনি জ্ঞান দিলে শুনতে হবে?

এ থেকেও বামপন্থীদের সম্বন্ধে ভারি মজার কিছু কথা টের পাওয়া যাচ্ছে। দক্ষিণপন্থীদের আক্রমণের তির অনির্বাণের উপর স্থির থাকার কারণ সহজবোধ্য। ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে, সনাতন নিয়ে রসিকতা তিনিই করেছেন। শতরূপ ঘোষকে নিয়ে রসিকতা কিন্তু তাঁর মুখ দিয়ে বেরোয়নি। অন্য দুই ঘোষকে নিয়ে তিনি ফুট কাটলেও, শতরূপকে নিয়ে ছড়া কেটেছেন দেবরাজ ভট্টাচার্য। অথচ তিনি চটিচাটা – এমন অভিযোগ কেউ তুলছেন না। এ বোধহয় ব্যক্তির ঊর্ধ্বে দল – মার্কসবাদের এই প্রাথমিক পাঠ ভুলে মেরে দেওয়ার ফল। বস্তুত, ব্যাপারটাকে শতরূপ বনাম অনির্বাণ বানিয়ে ফেলা বামেদের বয়ান দেখে মনে হচ্ছে না তাঁরা কেউ জানেন যে গানগুলো ‘অনির্বাণের গান’ নয়, ব্যান্ডটার গান। এমনও হতে পারে, ওই গা জ্বালানো ছড়াগুলো অনির্বাণের লেখাই নয়। সেক্ষেত্রে ব্যান্ডের বাকিদের তৃণমূলী সংযোগের ফর্দ দেওয়াও কর্তব্য ছিল। অথচ হুলিগানদের উপর রেগে কাঁই হয়ে যাওয়া জনপিণ্ডের কতজন ওই ব্যান্ডের বাকি সদস্যদের নাম বলতে পারবেন তা নিয়েই সন্দেহ আছে। কেবল গৌরবে বহুবচন করা তো ঠিক নয়, তাই হুলিগানইজমের বাকি সাতজনের নাম এইবেলা স্মরণ করে নেওয়া যাক – শুভদীপ গুহ, কৃশানু ঘোষ, সোমেশ্বর ভট্টাচার্য, নীলাংশুক দত্ত, প্রীতম দাস, প্রীতম দেব সরকার, সুশ্রুত গোস্বামী।

সে যা-ই হোক, ওই দলের সবচেয়ে জনপ্রিয় মুখ যখন অনির্বাণ, তখন তাঁকেই আক্রমণ করার যুক্তি ভুল নয়। অনির্বাণের বিজেপির লোক হওয়ার প্রমাণ হাজির করতে না পারলেও, তৃণমূলের পক্ষের লোক হওয়ার প্রমাণ হাজির করেছেন সোশাল মিডিয়ার বীরপুঙ্গবরা। তিনি খোদ মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জির হাত থেকে সরকারি সম্মান গ্রহণ করেছেন। এ একেবারে বামাল সমেত ধরা পড়া যাকে বলে। মুশকিল হল, সরকার আর দলের ভেদরেখা মুছে যাচ্ছে বলে এ রাজ্যের বিরোধীরা সঙ্গতভাবেই চেঁচামেচি করে থাকেন। কিন্তু সরকারি সম্মানকে এক্ষেত্রে তৃণমূল দলের দেওয়া সম্মান বলে ধরে নিতে একটুও ইতস্তত করছেন না। যদি তাও হয়, তাহলে একই যুক্তিতে প্রয়াত সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়কেও তৃণমূলের লোক বলতে হয়। কারণ শেষ বয়সে তিনিও রাজ্য সরকারের দেওয়া বঙ্গবিভূষণ পুরস্কার (২০১৭) গ্রহণ করেছিলেন। সুখের বিষয়, তেমনটা কোনো সিপিএম সদস্য সমর্থক আজ পর্যন্ত বলেননি। আমৃত্যু সৌমিত্র প্রকাশ্যেই বামপন্থী ছিলেন, তাঁর সেই সম্মান আজ পর্যন্ত কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা বামপন্থীরা করেননি। ফলে গুটিটা গোড়াতেই কেঁচে যাচ্ছে।

অনেকের অবশ্য সূক্ষ্মতর বক্তব্য আছে। অনির্বাণ তৃণমূলী নন, কিন্তু সুবিধাবাদী। কারণ তিনি আর জি কর আন্দোলনে যোগ দেননি। পশ্চিমবাংলার এত বড় নিয়োগ কেলেঙ্কারির কথা তাঁদের ব্যান্ডের গানে নেই। কেন আর জি কর আন্দোলনে যোগ দেননি, তার ব্যাখ্যা অনির্বাণ ইতিমধ্যেই বহুবার দিয়েছেন। সে ব্যাখ্যা কেউ অবিশ্বাস করতেই পারেন, বিশ্বাস করলেও অপছন্দ করতে পারেন। কিন্তু সমস্যা অন্য। যে কোনো ব্যক্তিরই নিন্দা করা যেতে পারে কোনো বিষয়ে প্রতিবাদ না করার জন্যে। কিন্তু পরবর্তীকালে কোনো বিষয়ে তিনি কথা বললেই ‘তখন কথা বলেননি, অতএব এখনো চুপ করে থাকতে হবে’ – এই দাবি প্রথমত বনলতা সেনগিরি, দ্বিতীয়ত গা জোয়ারি। এতে মানুষের বাকস্বাধীনতা কেড়ে নেওয়ার ইচ্ছাই প্রকাশ পায়। শেষ বিচারে সেটা দক্ষিণপন্থাই।

এটাই বা কীরকম আবদার, যে একজন শিল্পীর শিল্পকে বিচার করতে হবে তিনি শিল্পের বাইরে কী করেছেন বা করেননি তা দিয়ে? আমি জানি অমুক ডাক্তার চমৎকার পেটের চিকিৎসা করেন। আমার পেটের অসুখ দীর্ঘদিন ধরে সারছে না, হাজারটা ডাক্তার দেখিয়ে হয়রান হয়ে গেছি, তবু তাঁর কাছে যাব না, যেহেতু তিনি বিবাহ বহির্ভূত প্রেম করেন? এরকম হাস্যকর যুক্তিতে আর কোন জিনিসটা করি আমরা? শিল্পীদের নিয়ে ভাবতে গেলেই আমাদের এরকম ভাবনার উদয় কেন হয় – তা নিয়ে বোধহয় রাজ্যের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর পিএইচডি করানোর ব্যবস্থা করা উচিত এবার।

পৃথিবীর যে কোনো দেশে, যে কোনো কালে শিল্পীদের প্রধান কাজ ক্ষমতাবানের ত্রুটি ধরা, শাসককে এবং সমাজকে নিয়ে বিদ্রুপ করা। প্রতিবাদ, প্রতিরোধ, আন্দোলনে অনুপ্রেরণা দেওয়া। আন্দোলনে নামলে ভাল, না নামলে মহাপাপ হয় না। আন্দোলন করা রাজনীতির লোকেদের কাজ। শিল্পীরা চাইলেই যে আন্দোলন করতে পারবেন তাও নয়। সবাই রবীন্দ্রনাথ হন না যে স্বয়ং স্বদেশি আন্দোলনে নেতৃত্ব দেবেন। লক্ষণীয়, সে আন্দোলন থেকে তিনি আবার বেরিয়েও এসেছিলেন। কারণ তাঁর মনে হয়েছিল, ওই আন্দোলনে সত্যের চেয়ে ভান বেশি। এই সিদ্ধান্তের কারণে তাঁকে তখনকার জাতীয়তাবাদীদের বিষনজরেও পড়তে হয়েছিল। তারপরেও হিজলি জেলে বন্দিহত্যা নিয়ে তিনি ‘প্রশ্ন’ কবিতাটা লিখেছেন। সে কবিতায় না আছে হিজলি জেলের নাম, না আছে ইংরেজ সরকারের উল্লেখ। এখন হলে নির্ঘাত তাঁকে শুনতে হত ‘ওসব চালাকি। দম থাকলে গভর্নর জেনারেলের নাম করে লিখত।’ ভাগ্যিস তখনকার বাঙালির সহায়িকা দরকার হত না!

কদিন আগেই উৎপল দত্তের জন্মদিন গেছে। তিনি ঘোষিত বামপন্থী, আমৃত্যু সিপিএম দলের ঘনিষ্ঠ, নাট্যজগতে তাঁর অবদান অনস্বীকার্য এবং মঞ্চে তাঁর সব কাজই রাজনৈতিক। কিন্তু গত কয়েক দিনের ঘটনাপ্রবাহ দেখে সন্দেহ হচ্ছে – তাঁর জন্মদিনকে ব্যবহার করে যাঁরা ফেসবুক পোস্টে লিখছিলেন উৎপলবাবুর মেরুদণ্ড ছিল, আজকের শিল্পীদের নেই, উৎপলবাবুকে আজ পেলে তাঁকেও মেরুদণ্ডহীন বলতেন। কারণ তিনি রোজগারের জন্যে জনপ্রিয় হিন্দি বাণিজ্যিক ছবিতে অভিনয় করেছেন। এমনকি প্রথম বামফ্রন্ট সরকারের অর্থমন্ত্রী অশোক মিত্র তো লিখেছেন, নাটক করার অপরাধে কংগ্রেস আমলে কারারুদ্ধ উৎপলকে ছাড়িয়ে নিয়েছিলেন বম্বের কোনো ছবির প্রযোজক, যাতে তাঁর শুটিং নষ্ট না হয়। এই লোকের কল্লোল বা দুঃস্বপ্নের নগরী যতই সরাসরি রাজনৈতিক হোক, আজকের কমরেডরা কি আর পাত্তা দিতেন? তখন বাঙালির রাজনীতির সর্বজনস্বীকৃত পদ্ধতি ছিল – জ্যোতি বসু, প্রমোদ দাশগুপ্তেরা ধুন্ধুমার আন্দোলন করবেন। নিজেদের শিল্পের মাধ্যমে রাজনৈতিক বার্তা দেবেন উৎপলবাবু বা মৃণাল সেনরা। এখন ডান, বাম নির্বিশেষে বাঙালির চাহিদা হয়েছে উলটো – শতরূপ, দিলীপদের স্টুডিওয় যেতে হবে। মিছিলে যেতে হবে অনির্বাণদের।

আরও পড়ুন অনির্বাণ কাজ পাচ্ছেন না: টালিগঞ্জের অর্ধসত্য বা হিমশৈলের চূড়া

এই উলটো বুঝলি প্রজার দেশে গানের দলের সমালোচনায় তাদের গান নিয়ে আলোচনা হবে না। হুলিগানইজমের এর আগে প্রবল ভাইরাল হওয়া ‘মেলার গান’-এর রাজনীতি আজ পর্যন্ত খেয়াল করার সময় সুযোগ পাননি বামপন্থীরাও। অনির্বাণের সমালোচনা করতে হলেও তাঁর কাজের সমালোচনা করা হয় না। হয় তিনি কাকে বিয়ে করেছেন আর কাকে করেননি তা দিয়ে সুবিধাবাদী প্রমাণের চেষ্টা, নয় কোন মিছিলে গেছেন আর কোন মিছিলে যাননি তা নিয়ে ক্রিকেটের ধারাভাষ্যকারদের মত গ্রাফিক বিশ্লেষণ। এসব আলোচনার সিদ্ধান্ত আগে থেকেই স্থির থাকে। নইলে ভুলে যাওয়ার কথা নয় যে অনির্বাণ নির্দেশিত মন্দার সাম্প্রতিককালের বাংলা বিনোদন জগতের সবচেয়ে রাজনৈতিক দুটো ওয়েব সিরিজের অন্যতম (অন্যটা প্রদীপ্ত ভট্টাচার্য নির্দেশিত বিরহী)। মন্দারে গোড়াতেই একটা রাজনৈতিক হত্যা দেখানো হয়, যিনি খুন হন তিনি একজন বামপন্থী শ্রমিক নেতা। তাঁর রাজনৈতিক পরিচয় নিয়ে বিন্দুমাত্র ধোঁয়াশা রাখা হয়নি। তাছাড়া বাংলা ছবির ইতিহাসে একটা অভূতপূর্ব ঘটনা গতবছর ঘটিয়েছেন অর্ণ মুখোপাধ্যায় আর অনির্বাণ। তাঁদের যুগ্ম নির্দেশনায় মুক্তি পেয়েছে অথৈমঞ্চসফল নাটক থেকে করা এই ছবিতে পশ্চিমবাংলার ভদ্রলোকদের মুখোশ ছিঁড়ে ফেলে দেখানো হয়েছে তাদের জাতপাতের বাছবিচার কত ভয়ঙ্কর।

তালিকা দীর্ঘতর করা যায়, তবে লেখা দীর্ঘতর করে লাভ নেই। কারণ একবিংশ শতাব্দীতে আমাদের মনোযোগের আয়ু মাত্র আড়াই মিনিট। কিন্তু এই ভাবনা পীড়াদায়ক যে সংস্কৃতি আর রাজনীতি নিয়ে চিরকাল কলার তোলা বাঙালির এখন ভোট চুরি, ভোটার তালিকার আসন্ন বিশেষ নিবিড় সংশোধনী, দেশের বিভিন্ন প্রান্তে বাঙালি বিতাড়ন নিয়ে দিনরাত উত্তেজিত থাকার কথা ছিল এবং সব দলের নেতাদের ব্যতিব্যস্ত করে রাখার কথা ছিল। অথচ বাঙালিদের একটা অংশ মেতে আছে থিয়েটার ও সিনেমার একজন জনপ্রিয় শিল্পীর যাবতীয় কাজ নস্যাৎ করে দিতে, যেহেতু তাঁর গানের দল তাদের আদুরে নেতার ত্রুটি তুলে ধরেছে। দেখছি, মেলার গানে যথার্থই লেখা হয়েছে ‘আমাদের জীবনতলায় মোটরগাড়ি ঘুরছে মরণকুয়ায়…’।

ইনস্ক্রিপ্ট ওয়েবসাইটে প্রকাশিত

ভোটচুরির অভিযোগ আমাদের এনে ফেলেছে এক সন্ধিক্ষণে

গণতন্ত্রকে অস্বীকার করা এবং গণতন্ত্র নষ্ট করার অভিযোগ উঠলে সগর্বে ‘বেশ করেছি’ বলার এই ঔদ্ধত্যই ফ্যাসিবাদ। এর সঙ্গে অন্য কোনও সরকারের অন্যায়ের, অপশাসনের তুলনা চলে না। এ-কথা যাঁরা আজ বুঝবেন না, ফ্যাসিবাদ জাঁকিয়ে বসতে পারলে ভারতের গণতন্ত্রের পাশাপাশি তাঁদেরও ঠাঁই হবে জাদুঘরে।

এক যুগ পরে এমন একটা ঘটনা ঘটল স্বাধীনতা দিবসের ঠিক দুদিন আগে, যা এতদিনের অনভ্যস্ত কানে অবিশ্বাস্য মনে হল— ভারতের শাসক দল আর বিরোধী দল একমত হয়েছে। কোন বিষয়ে? ভোটচুরি সম্বন্ধে। যে সে লোক নয়, দেশের গদ্দারদের দেখলেই গুলি করার পক্ষপাতী যিনি, সেই অনুরাগ ঠাকুর স্বয়ং সাংবাদিক সম্মেলন করে ঠিক তাই বললেন, যা লোকসভার বিরোধী দলনেতা তথা কংগ্রেসের সবচেয়ে বড় নেতা রাহুল গান্ধী তার হপ্তাখানেক আগে বলেছিলেন— ভোটার তালিকায় ব্যাপক কারচুপি করে ভোটচুরি করা হয়েছে। সত্যি কথা বলতে, অনুরাগ রাহুলের বক্তব্যকে আরও জোরদার করে দিয়েছেন।

রাহুল তো বলেছিলেন তাঁর দলের লোকেরা নির্বাচন কমিশনের দেওয়া কম্পিউটার স্ক্যানেরও অযোগ্য সাত ফুট উঁচু কাগজ ঘেঁটে ভোটচুরির প্রমাণ বের করেছেন মোটে একখানা লোকসভা কেন্দ্রের একখানা বিধানসভা অঞ্চলে। চাইলে কমিশন বলতেই পারত যে এত বড় দেশে একটা লোকসভা কেন্দ্রে ভুলচুক হয়ে থাকতেই পারে। এ দিয়ে প্রমাণ হয় না যে সারা দেশে এ জিনিস হয়েছে। কিন্তু অনুরাগ আরও গভীরে গবেষণা করেছেন। তিনি সারা দেশের নানা রাজ্যের আধ ডজন লোকসভা আসনের তথ্য তুলে ধরেছেন। সেগুলোতেও দেখা যাচ্ছে রাহুল-চিহ্নিত মাধবপুরা আসনের মতোই কাণ্ড ঘটেছে।

৭ আগস্ট ছিল বৃহস্পতিবার, অর্থাৎ হিন্দুমতে লক্ষ্মীবার। সেদিন রাহুলের সাংবাদিক সম্মেলন এবং তারপর থেকে যা যা হয়ে চলেছে, তাতে মা লক্ষ্মী হিন্দুত্ববাদীদের উপর অপ্রসন্ন বলেই বোধ হচ্ছে। ২০১৪ সালে বিজেপি কেন্দ্রে ক্ষমতায় আসার পর থেকেই কংগ্রেস, আম আদমি পার্টির মতো একাধিক বিরোধী দল ভোটে কারচুপির অভিযোগ করে যাচ্ছে। প্রায় সব অভিযোগের ক্ষেত্রেই আঙুল উঠেছে ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিনের দিকে। কমিশন পাত্তা দেয়নি, বিজেপি তো দেয়নি বটেই। নিজেরা জিতলে বলেছে ‘হেরো পার্টি অজুহাত খুঁজছে’, আর বিরোধীরা জিতলে বলেছে ‘এবার কেন ওরা ইভিএমের কথা বলছে না?’ অথচ ইভিএমের বিরুদ্ধে অভিযোগগুলো মোটেই ফেলে দেওয়ার মতো ছিল না, অভিযোগকারীরা যে শলাপরামর্শ করে অভিযোগ করেছে তা-ও নয়। কেবল বিরোধীরাই অভিযোগ করেছে এমনও নয়। সাংবাদিকরা খবর করেছেন ইভিএম বেপাত্তা, গণতান্ত্রিক অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠন অভিযোগ করেছে যে প্রদত্ত ভোট আর ইভিএমে গোনা ভোটের সংখ্যার তফাত হয়েছে প্রচুর আসনে— সবই মাছি তাড়ানোর মতো করে উড়িয়ে দিয়েছে নির্বাচন কমিশন। আদালতে আবেদন করেও লাভ হয়নি। বিজেপিবিরোধী ভোটাররাও বিশ্বাস করেছেন যে বিরোধীরা নিজেদের কাজটা ঠিকমতো করে না, তাই এসব বলে। যতটুকু যা কারচুপি হয় তা চিরকালই হত, যখন যে ক্ষমতায় থাকে সে-ই করে। ফলে হিন্দুত্ববাদীরা বেশ নিশ্চিন্তেই ছিল।

কিন্তু বিষ্যুদবার দুপুরে রাহুল একেবারে অন্যদিক থেকে আক্রমণ করলেন। বললেন, গোড়ায় গলদ। ভোটার তালিকা ঘেঁটে বের করা তথ্য চোখের সামনে তুলে ধরলেন, দিস্তা দিস্তা কাগজ হাতে দেখিয়ে দিলেন— অভূতপূর্ব কারচুপি হচ্ছে। আমাদের গণতন্ত্রের নানা ত্রুটি থাকলেও, সেরা বৈশিষ্ট্য হল— মুকেশ আম্বানির একটা ভোট, আমার বাড়ির কাজের দিদিরও একটাই ভোট। ওটাই ভারতের গণতন্ত্রের জোর, আমাদের গর্বের জায়গা। এই জায়গাটা সেই ১৯৫২ সালের প্রথম নির্বাচন থেকেই স্বাধীন ভারতে তৈরি করা হয়েছে। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার প্রথম দিন থেকে ধনী-গরিব, নারী-পুরুষ, হিন্দু-বৌদ্ধ-শিখ-জৈন-পারসিক-মুসলমান-খ্রিস্টান, উঁচু জাত-নিচু জাত— সবার ভোটাধিকার আছে, এই গর্ব করার অধিকার গোটা দুনিয়ায় একমাত্র আমাদের। এমনকি গ্রেট ব্রিটেন বা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেরও এই ইতিহাস নেই। আর ৭৮ বছরের অবহেলায় অর্থবল, বাহুবলের গুরুত্ব বাড়তে বাড়তে ভারতীয় গণতন্ত্র যেখানে পৌঁছেছে তাতে আজ আপামর ভারতবাসীর গণতান্ত্রিক সম্বল বলতে ওই ভোটটুকুই। সেটাই যে চুরি হয়ে যাচ্ছে তা রাহুল আক্ষরিক অর্থে কাগুজে প্রমাণ দিয়ে দেখিয়ে দিলেন। যতই ডিজিটাল ইন্ডিয়ার ঢাক বাজানো হোক, দেশের অধিকাংশ মানুষ এখনও মোবাইল ছাড়া আর কোনও ইলেকট্রনিক জিনিসের ব্যবহার জানেন না। তাঁদের কাছে কাগজে ছাপা জিনিসের মর্যাদা এখনও বেশি। এই কথাটা আমরা অনেকেই বুঝতে পারি না, গরিব মানুষের পার্টি বলে যারা নিজেদের দাবি করে তারাও অনেকে বোঝে না। রাহুল বা কংগ্রেস যে সেটা বুঝেছে, সেদিনের সাংবাদিক সম্মেলন তার প্রমাণ। পাওয়ার পয়েন্ট প্রেজেন্টেশনে দেশের বড় অংশের মানুষকে কিছুই বোঝানো যেত না, যদি রাহুল ইয়া মোটা মোটা বইয়ের মতো করে প্রমাণগুলো চোখের সামনে হাজির না করতেন। লক্ষ করার মতো ব্যাপার হল, সাংবাদিকরা কিন্তু ইভিএম কারচুপির প্রশ্নও তুলেছিলেন। রাহুল সেদিকে গেলেনই না, বললেন আসল গলদ নির্বাচন কমিশনের। ওই জায়গাটা ঠিক না থাকলে ব্যালটেই ভোট হোক আর ইভিএমে— ভোটচুরি হবেই।

আরও পড়ুন বিধবা, পিতৃহীন শিশু – সকলকে জবাব দিতে হবে সেকুলারদের

বিষ্যুদবারের ক্ষত মেরামত করার চেষ্টা করতে করতে এক সপ্তাহ কাটিয়ে ফেলল নির্বাচন কমিশন আর বিজেপি। কিন্তু দেখা যাচ্ছে এ-দেশের নির্বাচন হয়ে দাঁড়িয়েছে কেশব নাগের অঙ্ক বইয়ের চৌবাচ্চার মতো। রাহুল জল বেরোবার এত বড় গর্ত করে দিয়েছেন যে জল ঢোকার নল দিয়ে কমিশন আর বিজেপি যতই জল ঢোকাক, চৌবাচ্চা দ্রুত খালি হয়ে যাওয়ার দিকে এগোচ্ছে। প্রথমে কমিশন বলল হলফনামা জমা না দিলে রাহুলের অভিযোগ নিয়ে তদন্ত করব না। অবিলম্বে জানা গেল নিয়মানুযায়ী এতে হলফনামা জমা দেওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। তারপর নির্বাচন কমিশনের কর্ণাটকের সিইও একখানা হাস্যকর কাজ করে বসলেন। রাহুলকে নোটিস পাঠালেন, তিনি যেন অভিযোগ তথ্যপ্রমাণ-সহ জমা দেন। একে তো যার বিরুদ্ধে চুরির অভিযোগ সে-ই দাবি করছে তার কাছে চুরির প্রমাণ দিতে হবে, তার উপর তারই কাছ থেকে নেওয়া নথিকে প্রমাণ বলে মানতে সে রাজি নয়। জনপ্রিয় বাংলা ছবির ফুটো মস্তানের সংলাপই এখানে পরিস্থিতির সবচেয়ে যথার্থ বর্ণনা দিতে পারে— ‘এ কে রে সান্তিগোপাল! এ তো আজব কালেকসন!’

এদিকে রাহুল ভাঙা বেড়া দেখিয়ে দিতেই শেয়ালরা বেরিয়ে এল পালে পালে। মহম্মদ জুবেরের মতো সাংবাদিক থেকে শুরু করে বিভিন্ন রাজ্যের কংগ্রেস কর্মী, সাধারণ উৎসাহী মানুষ, এমনকি গোদি মিডিয়ার একটা অংশও (যেমন ইন্ডিয়া টুডে গ্রুপ) তদন্তে নেমে পড়ল এবং দেখা গেল, যেখানে ছাই উড়ছে সেখানেই অমূল্য রতন পাওয়া যাচ্ছে।

এমতাবস্থায় রেফারির হয়ে মাঠে নামতে হত বিজেপির চাণক্যকে, যদি তিনি সত্যিই চাণক্যের মতো কূটবুদ্ধিসম্পন্ন হয়ে থাকেন। কিন্তু তিনি স্পিকটি নট, মাঠে নামিয়ে দিলেন অনুরাগকে। তিনি ভাবলেন রাহুল আর প্রিয়াঙ্কা গান্ধীর জেতা রায়বেরিলি আর ওয়ায়নাড়, তৃণমূল কংগ্রেস নেতা অভিষেক ব্যানার্জির জেতা ডায়মন্ড হারবার আসনের ভোটার তালিকাতেও গোলমাল আছে দেখালেই সব কোলাহল থেমে যাবে। কিন্তু বাপু তা কী হয়? অতি বুদ্ধিমান বাঙালি ভদ্রলোক আর সারা দেশের অন্ধ ভক্তরা ছাড়া সকলেই বুঝতে পারছে, নির্বাচন কমিশনকে দিয়ে বিজেপি যে কাণ্ডটি ঘটিয়ে চলেছে বলে মনে হচ্ছে, তা চিরাচরিত ভোটের দিনের রিগিং নয়। পেশিশক্তির জোরে লোককে ভয় দেখিয়ে ভোট দিতে না দেওয়া, নিজের লোক ঢুকিয়ে পরের পর ভোট দেওয়ানো বা ভোটার তালিকা দেখে অনুপস্থিত ভোটারের জায়গায় নিজের লোককে ভোট দেওয়ানো দেশের সব দলই করেছে কোনও না কোনও সময়ে। কিন্তু নির্বাচন কমিশন নিজেই এমন ব্যবস্থা করে দিচ্ছে যাতে একটা নির্দিষ্ট দলের সমর্থকরা যতবার ইচ্ছে যেখানে ইচ্ছে ভোট দিতে পারে (এখনও আমরা জানি না ব্যাপারটা ঠান্ডা ঘরে বসে মেশিনের মাধ্যমেই সম্পন্ন হয়ে যাচ্ছে কিনা), ভোটার তালিকায় নাম যোগ-বিয়োগ করা হচ্ছে একটা দলকে হারা আসনও জিতিয়ে দেওয়ার উদ্দেশ্যে— এ জিনিস অভূতপূর্ব। এটা চলতে থাকলে দেশে আর ত্রুটিপূর্ণ গণতন্ত্রও আছে বলা যায় না। ভ্লাদিমির পুতিনের রাশিয়া হয়ে উঠতে আর দেরি নেই আমাদের।

এই সেদিনও রাহুলকে বিজেপির বিরুদ্ধে উপযুক্ত নেতা বলে মনে করত না তৃণমূল কংগ্রেস। সেই অজুহাতে ত্রিপুরা, মণিপুর, মেঘালয়, গোয়ার মতো রাজ্যে জিতবে না জেনেও লড়তে চলে গেছে। সেই তৃণমূলের দু-নম্বর নেতা অভিষেক ৭ তারিখের সাংবাদিক সম্মেলনের পর থেকেই রাহুলের প্রত্যেক কথায় সায় দিচ্ছেন। তাঁর দলের সাংসদরা দৃশ্যতই রাহুলের বাহিনীর সৈনিক হয়ে উঠেছেন। একইভাবে বিভিন্ন সময়ে কংগ্রেসকে সাবোতাজ করতে গোয়া, গুজরাতের মতো রাজ্যে নির্বাচনে লড়তে চলে যাওয়া আম আদমি পার্টির সাংসদরা দিল্লি বিধানসভা নির্বাচনে হেরে যাওয়ার পরে প্রায় উধাও হয়ে গিয়েছিলেন। তাঁরাও রাহুলের পাশে দাঁড়িয়ে পড়েছেন, ১১ তারিখের নির্বাচন সদন অভিযানেও যোগ দিয়েছিলেন। সমাজবাদী পার্টির অখিলেশ যাদবের ব্যারিকেড টপকে যাওয়ার স্পর্ধা আর রাষ্ট্রীয় জনতা দলের তেজস্বী যাদবের মারমুখী মেজাজের রাজনৈতিক স্বার্থ সহজবোধ্য। সামনে বিহারে বিধানসভা নির্বাচন, ২০২৭ সালে উত্তরপ্রদেশে। তেজস্বী আর অখিলেশ ওই দুই রাজ্যের প্রধান বিরোধী নেতা, ক্ষমতায় আসতে মরিয়া হওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু তৃণমূল তো ২০২৬ বিধানসভা নির্বাচনেও হইহই করে জিতবে বলছেন বোদ্ধারা। বিরোধীরাও আড়ালে তা স্বীকার করে। আর আপের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে নির্ঘাত স্বয়ং অরবিন্দ কেজরিওয়ালও আশাবাদী নন, তাই এত বড় কাণ্ড নিয়ে একটা সোশাল মিডিয়া পোস্ট পর্যন্ত করছেন না। তাহলে এই দুই দলের কংগ্রেসের সঙ্গে এমন শক্ত জোট বাঁধার কারণ কী?

কারণ গত এক সপ্তাহে যা ঘটছে তার সঙ্গে বিহারে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধনীর নামে যেভাবে মানুষের ভোটাধিকার হরণ চলছে (এরপর পশ্চিমবঙ্গে এবং তারপর গোটা দেশে চলবে), তা মিলিয়ে দেখলে যে কেউ বুঝতে পারে— এরপর থেকে সব ভোটে জিতবে বিজেপিই। এখন বিজেপি বাদে সবাই একজোট না হলে কোনও দলেরই আর অস্তিত্ব থাকবে না। ফলে অসুস্থ হয়ে পড়া তৃণমূল সাংসদ মিতালী বাগকে একদিক থেকে রাহুল, অন্যদিক থেকে সিপিএম সাংসদ জন ব্রিটাস ধরে আছেন— এই ভাইরাল ছবি আসলে মানুষের বিপদে জোট বাঁধার আদিম অভ্যাসের চিত্র। সবাই মিলে রাস্তার দখল নিয়ে, পাহাড়প্রমাণ আন্দোলনের ঢেউ তুলে যদি বিজেপির ইমারত ভাঙতে পারেন, তবেই আলাদা আলাদা দল করার মানে থাকবে। তখন কে ভালো কে মন্দ, কে কম রিগিং করে কে বেশি রিগিং করে, কে বুর্জোয়া কে কমিউনিস্ট, কোনটা ফ্যাসিবাদ কোনটা নয়া ফ্যাসিবাদ— এসব নিয়ে তর্কাতর্কি, মারামারি করার ফুরসত পাওয়া যাবে। না পারলে কী হবে? তার ট্রেলার বিজেপি দেখিয়ে দিয়েছে ১১ তারিখেই। প্রায় সমস্ত বিরোধী সাংসদ যখন পথে এবং দিল্লি পুলিশ তাঁদের আটক করেছে, তখন কোনও আলোচনা ছাড়াই একাধিক বিল পাশ করিয়ে নিয়েছে সংসদ থেকে, যার মধ্যে আছে নতুন আয়কর আইনও। এই আইন অনুযায়ী আয়কর বিভাগ যে কোনও করদাতার ইমেল, সোশাল মিডিয়া হ্যান্ডেল পর্যন্ত দেখতে পারে। বলা বাহুল্য, এ কেবল ব্যক্তিগত গোপনীয়তায় হস্তক্ষেপ নয়। আইনের এই ধারা ব্যবহার করে সরকারবিরোধী যে কোনও মানুষকে হয়রান করা সম্ভব, গ্রেপ্তার করাও সম্ভব। এই সরকারের আমলে একবার গ্রেপ্তার হলে আপনি দোষী না নির্দোষ তার বিচার কত কঠিন তা যদি না বুঝে থাকেন, শুধু দুটো নাম মনে করুন— স্ট্যান স্বামী আর উমর খালিদ।

বিরোধীশূন্য সংসদে বিল পাশ করানো সম্পর্কে সেদিন সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী কিরেন রিজিজু কী বলেছিলেন?

‘কংগ্রেস পার্টি আর বিরোধীরা অনেক সময় নষ্ট করেছে। এখন আমরা আর দেশের সময়, সংসদের সময় নষ্ট করতে দেব না। সরকার গুরুত্বপূর্ণ সব বিল পাশ করাতে চায়। আমরা আজ সেগুলো লোকসভা আর রাজ্যসভা— দুই জায়গাতেই পাশ করাব। দেশ একজন লোকের আর একটা পরিবারের বোকামির জন্যে এত ক্ষতি সহ্য করতে পারে না। অনেক বিরোধী সাংসদও এসে বলেছেন তাঁরা নিরুপায়। তাঁদের নেতারা জোর করে গোলমাল পাকাতে বলে। আমরা প্রতিদিন একটা ইস্যু নিয়ে দেশের সময় আর সংসদের সময় নষ্ট হতে দেব না। সুতরাং আমরা গুরুত্বপূর্ণ বিলগুলো পাশ করাব।’

এই একটা ইস্যু কোনটা? ভোটচুরি। অর্থাৎ যা দিয়ে সংসদ তৈরি হয়েছে, সেটাকেই ফালতু বলে উড়িয়ে দিচ্ছে সরকার। সংসদ ব্যাপারটার গুরুত্বই আসলে স্বীকার করছে না, প্রকারান্তরে বলা হচ্ছে— আমরা যা চাইব সেটাই আইনে পরিণত করব।

গণতন্ত্রকে অস্বীকার করা এবং গণতন্ত্র নষ্ট করার অভিযোগ উঠলে সগর্বে ‘বেশ করেছি’ বলার এই ঔদ্ধত্যই ফ্যাসিবাদ। এর সঙ্গে অন্য কোনও সরকারের অন্যায়ের, অপশাসনের তুলনা চলে না। এ-কথা যাঁরা আজ বুঝবেন না, ফ্যাসিবাদ জাঁকিয়ে বসতে পারলে ভারতের গণতন্ত্রের পাশাপাশি তাঁদেরও ঠাঁই হবে জাদুঘরে। তবে গণতন্ত্রের এখনও বাঁচার আশা আছে, কারণ এই অতি বুদ্ধিমান অবুঝরা সংখ্যায় কম এবং রাজনৈতিকভাবে অপ্রাসঙ্গিক। রাহুল, অখিলেশ, তেজস্বী, ব্রিটাসরা জানেন কোনটা নির্বাচনী বাধ্যবাধকতা আর কোনটা ঐতিহাসিক প্রয়োজন। তাছাড়া ও পক্ষে আছেন অনুরাগের মতো কালিদাসের বংশধররা।

চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম ওয়েবসাইটে প্রকাশিত

বাংলা বলে কোনো ভাষা নেই, বাঙালি বলে কোনো জাতি নেই?

আজ থেকে বছর তিরিশেক আগেই বাংলা ভাষা কোনটা, বাঙালি কারা – সে বোধ ভদ্রলোক শ্রেণি হারিয়েছে। ফলে আজ যে বাঙালি সাহিত্যিক, অধ্যাপকদের দেখা যাচ্ছে ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়াররা আক্রান্ত না হলে বাংলা ভাষার উপর আক্রমণ হচ্ছে তা বিশ্বাস না করতে, বা বাঙালি প্রবাসী শ্রমিকদের উপর আক্রমণকে বাঙালিদের উপর আক্রমণ বলে না ধরতে – তাতে অবাক হওয়ার কিছু নেই।

ঠিক এক দশক আগের কথা। সদ্য রাজকাহিনী বেরিয়েছে (অবন ঠাকুরের নয়, সৃজিত মুখার্জির)। ইংরিজি জানা বাঙালি ভদ্রলোক, ভদ্রমহিলারা আপ্লুত হয়ে একটা গান শেয়ার করতে লাগলেন সোশাল মিডিয়ায়। কী গান? ওই যে গানটা আমাদের জাতীয় স্তোত্র। কিন্তু এত আপ্লুত হওয়ার কারণ কী? কারণ রবীন্দ্রনাথের লেখা গানটা আসলে অনেক বড়, অত বড় জাতীয় স্তোত্র রাখা যায় না ব্যবহারিক অসুবিধার কারণেই। তাই আমাদের জাতীয় স্তোত্র হিসাবে ব্যবহৃত হয় শুরুর দিকের খানিকটা অংশ। ওই ছবিতে সৃজিতবাবু গোটা গানটাই ব্যবহার করেছিলেন। এই নিয়ে আপ্লুত হওয়া অন্যায় নয়। কিন্তু মুশকিল হল, দেখা গেল যাঁরা শেয়ার করছেন তাঁদের অনেকেই লিখছেন ‘লিসন টু দ্য বেঙ্গলি ভার্শন অফ আওয়ার ন্যাশনাল অ্যান্থেম। ইট’স বিউটিফুল’ – এই জাতীয় কথাবার্তা। সাধারণত সোশাল মিডিয়ায় কারোর কোনো ভুল ধরলে তিনি প্রবল খেপে গিয়ে যিনি ভুল ধরেছেন তাঁকে অপমান করেন। এক্ষেত্রে যেসব বাঙালি মান-অপমানের তোয়াক্কা না করে ওইসব পোস্টে মন্তব্য করেছিলেন বা নিজে পোস্ট করেছিলেন যে গানটা তো বাংলাতেই লিখেছিলেন রবিবাবু, তার আবার বাংলা ভার্শন কী – তাঁদের ‘আঁতেল’, ‘সবজান্তা’ ইত্যাদি বিশেষণ দেওয়া হচ্ছিল। তবে ভারতবর্ষে ইংরিজি জানা মূর্খদের আত্মবিশ্বাস বেশি। তাই সেই মূর্খরা কেউ কেউ আবার যিনি শুধরে দেওয়ার চেষ্টা করছেন তাঁকেই ভুল প্রমাণ করার চেষ্টা করছিল। ব্যাপার দেখে হাসা উচিত না কাঁদা উচিত তা বুঝতে না পারলেও, এটুকু বুঝে গিয়েছিলাম যে বাঙালি সংস্কৃতির ধারক ও বাহক যে ভদ্রলোক শ্রেণি, তাদের ভবিষ্যৎ ঝরঝরে হয়ে গেছে। আজ অমিত মালব্যকে যতই গালাগালি দিন, একথা নিশ্চিত হয়ে বলার উপায় নেই যে তাঁর ওই গণ্ডমূর্খ পোস্টের যুক্তিগুলো কোনো ইংরিজি শিক্ষিত বাঙালি ভদ্রলোকেরই জুগিয়ে দেওয়া নয়।

এই ভদ্রলোক-ভদ্রমহিলাদের অতি পছন্দের একখানা ধর্মীয় সংগঠন আছে, যাকে তাঁরা ধর্মনিরপেক্ষ সংগঠন বলে ভাবতে ভালবাসেন (মানে আমড়াকে আম বলে ভাবতে ভালবাসেন) – রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশন। রাজকাহিনীর গান নিয়ে ভদ্রলোক শ্রেণির রাজবোকামির দেড় দশক আগে ওই সংগঠন পরিচালিত একটা কলেজের পড়ুয়া ছিলাম। আমার সহপাঠী ছিল মঠের ভিতরেই গড়ে ওঠা, সন্ন্যাসীদের দ্বারা পরিচালিত বেদ বিদ্যালয়ে ছোট থেকে লেখাপড়া করে আসা কয়েকজন ছাত্র। তারা জনগণমন গাইত সংস্কৃত উচ্চারণে। আমরা কয়েকজন ছাত্র মিলে একদিন তাদের জিজ্ঞেস করলাম ‘ওরকম উচ্চারণে গাস কেন?’ তারা অত্যন্ত গর্বের সঙ্গে জানাল, ওটা ছোট থেকে শিখেছে। ওটাই শুদ্ধ সংস্কৃত উচ্চারণ। আমরা জিজ্ঞেস করলাম ‘বাংলা গানের উচ্চারণ সংস্কৃতের মত হবে কেন?’ তারা কিছুতেই মানতে রাজি হল না যে গানটা বাংলায় লেখা। নির্ঘাত তারা আজও জাতীয় স্তোত্র গাওয়ার প্রয়োজন হলে ‘শুদ্ধ সংস্কৃত’ উচ্চারণেই গায়। এরা কেউ কিন্তু প্রান্তিক পরিবারের সন্তান নয়, হিন্দিভাষীও নয়। গ্রাম, শহর – দুরকম জায়গার ছেলেই ছিল সেই দলে। সত্যি কথা বলতে, কেবল এরা নয়। আইসিএসই বা সিবিএসই স্কুলে পড়ে আসা বাঙালি সহপাঠীদেরও দেখেছি সংস্কৃত উচ্চারণে জনগণমন গাইতে। অর্থাৎ আজ থেকে বছর তিরিশেক আগেই বাংলা ভাষা কোনটা, বাঙালি কারা – সে বোধ ভদ্রলোক শ্রেণি হারিয়েছে। ফলে আজ যে বাঙালি সাহিত্যিক, অধ্যাপকদের দেখা যাচ্ছে ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়াররা আক্রান্ত না হলে বাংলা ভাষার উপর আক্রমণ হচ্ছে তা বিশ্বাস না করতে, বা বাঙালি প্রবাসী শ্রমিকদের উপর আক্রমণকে বাঙালিদের উপর আক্রমণ বলে না ধরতে – তাতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। এটাই অনিবার্য ছিল।

এখন কথা হচ্ছে, এমনটা হল কেন? বাংলা ভাষা, সংস্কৃতির লাগাম তো চিরকালই এই ভদ্রলোকদের হাতেই থেকেছে। দুই বাংলা ভাগ হওয়ার পরে তো আরওই। বাংলা সিনেমার যত বিখ্যাত অভিনেতা, অভিনেত্রীর নাম মনে করতে পারেন তাদের কজন হিন্দু নিম্নবর্গীয় বা মুসলমান? পাকিস্তান ভেঙে বাংলাদেশ হওয়ার পরে দু-চারজন মুসলমান অভিনেতা, অভিনেত্রী পশ্চিমবঙ্গে অভিনয় করেছেন বটে, কিন্তু মুসলমান চরিত্র কটা এপারের বাংলা সিনেমায়? মুসলমান সমাজের গল্পই বা কটা? পশ্চিমবঙ্গের বাংলা পত্রপত্রিকার সম্পাদক, সাহিত্যিকদের মধ্যে খুঁজতে গেলেও ঘুরে ফিরে সেই প্রাক-স্বাধীনতা যুগের মীর মোশাররফ হোসেন, কাজী নজরুল ইসলাম, জসীমউদ্দিন, সৈয়দ মুজতবা আলী, এস ওয়াজেদ আলী বা একটু পরের সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজের নাম আসবে। কিছু নিবিষ্ট পাঠক হয়ত আবুল বাশার বা আফসার আহমেদের নাম মনে করতে পারবেন। জনপ্রিয় গাইয়ে, বাজিয়েদের মধ্যেও সেই ইংরিজি শিক্ষিত বামুন, কায়েত, বদ্যিরাই বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ। শিক্ষক, অধ্যাপক, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, উকিল, সাংবাদিক, রাজনীতিবিদ – যেদিকে তাকাবেন সেদিকই তো ভদ্রলোকরা আলো করে আছেন। তাহলে এ অবস্থা হল কেন? স্পষ্টতই পূর্বসুরিরা পতাকা যাদের হাতে দিয়েছেন তাদের বহিবার শকতি দেননি। কিন্তু কেন দেননি, বা দিতে পারেননি?

বামফ্রন্ট সরকার প্রাথমিক স্কুল থেকে ইংরিজি তুলে দেওয়ার জন্যে ভদ্রলোকেরা বেসরকারি ইংরিজি মাধ্যম স্কুলে ছেলেমেয়েদের ভর্তি করতে বাধ্য হন আর তা থেকেই শিক্ষিত বাঙালির সঙ্গে বাংলা ভাষার বিযুক্তি শুরু, কারণ ইংরিজিটা তো শিখতেই হবে। নইলে কাজকর্ম পাওয়া যায় কী করে? ওটাই তো কাজের ভাষা।

এরকম একটা তত্ত্ব প্রায়শই খাড়া করা হয়। এই তত্ত্ব নজর করার মত। শিক্ষা মাতৃভাষাতেই হওয়া উচিত – একথা আমাদের রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, সত্যেন্দ্রনাথ বসু থেকে শুরু করে গোটা দুনিয়ার অনেক বড় বড় পণ্ডিত বলেছেন। আবার বিপক্ষেও যুক্তি আছে। সে বিতর্কে না গিয়ে একথা মেনে নেওয়া যাক যে, কোনো ভাষা কাজের ভাষা হয়ে না থাকলে গুরুত্ব হারায়। বামফ্রন্ট সরকার মাতৃভাষার উপর জোর দিলেও বাংলাকে গোটা রাজ্যের কাজের ভাষা করে তোলার পর্যাপ্ত উদ্যোগ নেয়নি। পাশাপাশি ভারতের মত বহুভাষিক দেশে ইংরিজির গুরুত্ব বিশ্বায়নের সঙ্গে সঙ্গে বেড়েছে এবং ভদ্রলোকরা বাংলা ভাষাকে ক্রমশ ত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছেন – একথা তর্কের খাতিরে নাহয় মেনে নেওয়া গেল। কিন্তু কথা হচ্ছে, বাঙালি ভদ্রলোকদের ছেলেমেয়েরা তো ইংরিজি মাধ্যম স্কুলে পড়ছে বিংশ শতাব্দীর গোড়া থেকেই। যাঁর বই ছেলেমেয়ের হাতে তুলে না দিলে আজও এমনকি অনাবাসী বাঙালিদেরও ‘বাংলার সংস্কৃতি শেখাচ্ছি না’ ভেবে অপরাধবোধ হয়, সেই লীলা মজুমদার নিজেই কনভেন্টের ছাত্রী ছিলেন। তা ইংরিজি মাধ্যম স্কুলে ভর্তি করলেই ছেলেমেয়েকে বাংলা বইপত্তর পড়ানো, বাংলা গান শোনানো, সিনেমা দেখানো, নাটক দেখানো তুলে দিতে হবে – এ নিয়ম কি বামফ্রন্ট সরকারের তৈরি? আগেকার বাঙালির অমন করার দরকার পড়েনি, হঠাৎ বামফ্রন্ট সরকার প্রাথমিক শিক্ষা থেকে ইংরিজি তুলে দিতেই দরকার পড়ল?

সত্যি কথা বলতে, সিপিএম ক্রমশ ভদ্রলোকদের পার্টি হয়ে যাওয়ায় বামফ্রন্টও মেহনতি মানুষের সরকার থেকে ভদ্রলোকদের সরকারেই পরিণত হয়েছিল নয়ের দশকের শেষার্ধে। তাই ভদ্রলোকদের ইংরিজি নিয়ে হাহুতাশের প্রভাবে এই সহস্রাব্দের গোড়ায় কিন্তু প্রাথমিকে ইংরিজি ফিরিয়েও এনেছিল। তারপর কি ভদ্রলোকেরা ছেলেমেয়েদের সরকারি প্রাথমিক স্কুলে ফিরিয়ে এনেছিলেন? মোটেই না। উলটে মাধ্যমিক স্তরেও বেসরকারি স্কুলে ভর্তি করার ঝোঁক বেড়ে গিয়েছিল। এখন নাহয় এসএসসি কেলেঙ্কারি ইত্যাদি যুক্তি দিয়ে বলা যায় সরকারি স্কুলগুলো পড়াশোনার অনুপযুক্ত হয়ে গেছে। বাম আমলে তো প্রতিবছর এসএসসি পরীক্ষা হত, রাজ্যের আনাচে কানাচে গজিয়ে ওঠা ইংরিজি মাধ্যমের স্কুলগুলোর মাস্টারদের চেয়ে অনেক কঠিন প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা দিয়ে মাস্টারমশাই, দিদিমণিরা সরকারি বাংলা মাধ্যম স্কুলগুলোতে যোগও দিতেন। ত্রুটি থাকলেও স্কুলের পরিকাঠামো নিয়ে, পড়াশোনা নিয়ে তখনকার সরকারের আগ্রহ যে বর্তমান সরকারের চেয়ে বেশি ছিল – তা আজকাল অনেক তৃণমূল কংগ্রেস সমর্থকও স্বীকার করেন। তাহলে?

এই প্রশ্নের উত্তর দিতে গেলে আসলে বাঙালি ভদ্রলোকের অভদ্রতা প্রকাশ হয়ে পড়বে। বহু ভদ্রলোকের কাছেই আপত্তিকর ছিল বাম আমলে মুটে, মজুর, রিকশাওয়ালা, বাড়ির কাজের লোক, মুচি, মেথরের ছেলেমেয়েদের তাদের ছেলেমেয়েদের সঙ্গে একই স্কুলে ঢুকে পড়া। আরও বেশি গায়ে লাগত যখন তারা কেউ নিজের ছেলেমেয়ের চেয়ে পরীক্ষায় বেশি নম্বর পেয়ে যেত। পরীক্ষার ফল বেরোবার পর আমাদের অনেককেই বকুনি খেতে হয়েছে ‘তোর লজ্জা করে না? অমুকের বাড়িতে কোনোদিন কেউ স্কুলের গণ্ডি পেরোয়নি, আর ও অঙ্কে ৮৫ পেয়ে গেল। তুই মাস্টারের ছেলে হয়ে ৫৫? ছিঃ!’ মাস্টারের ছেলে বড় হয়ে মাস্টার; ডাক্তারের ছেলেমেয়ে তো বটেই, ছেলের বউ আর জামাইও ডাক্তার; উকিলের ছেলেমেয়ে উকিল; মুদির ছেলে মুদি, তার মেয়ে অন্য ছোট ব্যবসায়ীর গৃহবধূ; রিকশাওয়ালার ছেলে সবজিওয়ালা – এই সামাজিক স্থিতাবস্থায়, গোবলয়ের লোক বলে বাঙালি ভদ্রলোক যাদের দিকে তাকিয়ে নাক সিঁটকোয়, তাদের মত নিজেরাও অভ্যস্ত ছিল। সেই স্থিতাবস্থা ঘেঁটে যাওয়ার সামান্য সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল বাম আমলে। ওটুকুই ভদ্রলোকদের পক্ষে শিশুর আত্মার উপর নরকের দুঃস্বপ্নের মত হয়ে দাঁড়িয়েছিল। এই দুঃস্বপ্ন থেকে মুক্তি পাওয়ার পথ তারা খুঁজে পায় অনেক টাকা মাইনের বেসরকারি স্কুলে। নয়ের দশক থেকে মনমোহনী অর্থনীতির জোরে বাঙালি ভদ্রলোকের জীবনে আমূল পরিবর্তন এসে যায়। তাদের হাতে এসে গেল খরচ করার মত অতিরিক্ত টাকা। ফলে ছোটলোকের ছেলেপুলের সঙ্গে এক স্কুলে পড়ানোর আর দরকার রইল না। পাঠিয়ে দাও ফেলো কড়ি মাখো তেল স্কুলে। এমনকি বামফ্রন্ট সরকারের বদান্যতায় উচ্চমধ্যবিত্ত হয়ে ওঠা সরকারি স্কুলের মাস্টারমশাই, দিদিমণিরাও নিজেদের ছেলেমেয়েকে ইংরিজি মাধ্যম স্কুলে পাঠানো শুরু করেন তখনই। সংখ্যাটা অবশ্যই এখন অনেক বেড়েছে, তার পিছনে বর্তমান সরকারের শিক্ষাজগৎ নিয়ে ছেলেখেলার অবদান কম নয়। কিন্তু আসল কথা হল, ‘ইংরিজি শিখতে হবে বলে ইংরিজি মাধ্যম স্কুলে পড়াচ্ছি’ – এটা স্রেফ অজুহাত। দুর্বল অজুহাত। সেটা বুঝতে পেরেই যুক্তি জোরদার হবে মনে করে নয়ের দশকে অনেক বাবা-মা বলতেন ‘ইংরিজি বলা শিখতে হবে। নইলে কম্পিটিশনে দাঁড়াতে পারবে না। তাই ইংলিশ মিডিয়ামে দিয়েছি।’ এও ভারি মজার কথা। স্কুলটা কি তাহলে ‘স্পোকেন ইংলিশ’ শেখার জায়গা? ওটা জানলেই চাকরিবাকরি পাওয়া যায়? চোস্ত ইংরিজি বলতে পারলেই অঙ্ক, বিজ্ঞান, ভূগোল, ইতিহাস – সব শেখা হয়ে যাবে? অধিকাংশ বাঙালি ভদ্রলোক কিন্তু তেমনই মনে করে আজও। কথা বললেই টের পাওয়া যায়। তবে আজকাল একটা নতুন ব্যাপার ঘটেছে। ইংরেজ আমলে বাঙালি ভদ্রলোকের জীবনের লক্ষ্য ছিল যতটা সম্ভব ইংরেজ হওয়া, স্বাধীনতার পর থেকে – অনাবাসী ভারতীয় হওয়া। আজকের বাঙালি ভদ্রলোকের জীবনে একটা নতুন লক্ষ্য যোগ হয়েছে – মাড়োয়ারি বা গুজরাটি হওয়া। তাই ছেলেপুলেকে ইংরিজি মাধ্যমে পড়িয়ে ইংরিজি বলা শিখিয়েই সে খুশি নয়, দ্বিতীয় ভাষা হিসাবে হিন্দিও গুঁজে দিচ্ছে। সুতরাং বাংলা মাঠের বাইরে। গল্পের বই পড়ার এবং পড়ানোর চল বাঙালি ভদ্রলোক বাড়ি থেকে উঠে গেছে বহুকাল, এখন আবার বাবা-মায়েরা খেয়াল রাখেন, ছেলেমেয়ে যেন বাংলা সিরিয়াল বা সিনেমা দেখে না ফেলে।

এমতাবস্থায় বাংলা ভাষা-সংস্কৃতি কী, কোনটা তার অঙ্গ আর কোনটা নয় – তা নিয়ে স্পষ্ট ধারণা থাকবে কোন চুলোয়? সংজ্ঞাগুলো ঠিক করে দিয়েছি আমরা ভদ্রলোকরা। আমাদের সংজ্ঞায়িত বাংলা ভাষা-সংস্কৃতিকে আমরাই বাংলার বাইরে বাংলা বলে পরিচিত হতে দিইনি, ওগুলোকে আমাদের সংস্কৃতির বৃত্তে জায়গাই দিইনি। কলকাতা ও সংলগ্ন এলাকার ভাষায় লেখা গান আমাদের ‘আধুনিক গান’। বাঙাল ভাষার গানকে তখনই বাংলা গান বলে মেনেছি যখন শচীন দেববর্মণের মত রাজপুত্র গেয়েছেন। গ্রামের মানুষের নিজের গানকে লোকগীতি বলে আলাদা বাক্সে রেখেছি। পনিটেল বাঁধা শহুরে ভদ্রলোকরা গিটার বাজিয়ে ব্যান্ড বানিয়ে গাইলে তবেই সে গানের জায়গা হয়েছে প্রেসিডেন্সি, লেডি ব্র্যাবোর্ন বা যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস মোচ্ছবে। আচ্ছা তাও নাহয় মেনে নেওয়া গেল। কিন্তু নিজেরা যাকে বাংলা ভাষা, বাঙালি সংস্কৃতি বলে দেগে দিয়েছি তাকে সমাজের নিচের তলায় ছড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টাও কি করেছি? ফিল্ম সোসাইটি বানিয়ে ঋত্বিক ঘটকের উদ্বাস্তুদের নিয়ে তৈরি ছবি দেখেছি আর প্রবন্ধ লিখেছি। পরবর্তীকালে বাংলাদেশ থেকে চলে আসা উদ্বাস্তু, যারা এখানে এসে পেটের দায়ে আমাদের বাড়িতে বাসন মাজে বা ঘর ঝাঁট দেয় – তাদের দেখানোর তো চেষ্টা করিনি। সত্যজিৎ রায় বিশ্ববন্দিত পরিচালক বলে জাঁক করেছি, কিন্তু পথের পাঁচালী-র হরিহর রায়ের পরিবারের মত হতদরিদ্র বাঙালিকে ওই ছবি দেখানোর কোনো প্রয়াস তো আমাদের ছিল না। কারণ আমরা নিশ্চিত ছিলাম – ওরা ওসব বুঝবে না। ওদের জন্যে বেদের মেয়ে জ্যোৎস্না-ই ঠিক আছে। ঘটনা হল, যার দুবেলা পেট ভরে ভাত জোটে না, তারও মনের খিদে থাকে এবং সে খোরাক খুঁজে নেয়। বাংলার গরিব মানুষ, নিম্নবর্গীয় মানুষও তাই করেছে। আমাদের তৈরি সংস্কৃতি যখন তাদের পোষায়নি তখন তারা হিন্দি সিনেমা, হিন্দি গানে মজেছে। অধুনা ইউটিউব শর্টস আর ইনস্টা রিলসে। আমাদের অ্যাকাডেমি, আমাদের নন্দন নিয়ে আমরাই বুঁদ ছিলাম। ও জিনিস আজ কেউ বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দিলেই বা ওদের কী? এদিকে আমরা, বিশ্বায়িত ভদ্রলোকরাও, হিন্দি ভাষা-সংস্কৃতির দিকে ঝুঁকেছি। ইংরিজি তো ছিলই। ফলে এখন হঠাৎ আবিষ্কার করছি – হিন্দি-হিন্দু-হিন্দুস্তান তত্ত্বের প্রবক্তারা বলে দিচ্ছে বাংলা বলে আসলে কোনো ভাষা নেই, আর সেটাকেই ঠিক বলছেন বাংলা ভাষায় বইপত্তর লিখে নাম করে ফেলা লেখকরা।

নবজাগরণই বলি আর সমাজ সংস্কার আন্দোলনই বলি, উনিশ শতকে সেই প্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়ে আলোর সন্ধান যে বাঙালি ভদ্রলোক পেয়েছিল তা অনস্বীকার্য। কিন্তু আলো বাড়াতে গেলে আলো ছড়াতে হয়। ভদ্রলোকরা কী করেছে? প্রদীপ নিজের ঘরেই রেখে দিয়েছে, হাতে নিয়ে যাদের ঘরে আলো নেই তাদের কাছে যায়নি, তারা আমাদের প্রদীপ থেকে নিজেদের প্রদীপ জ্বালিয়ে নিতে পারেনি। এখন আমাদের প্রদীপের আয়ু ফুরিয়ে এসেছে, তাই চারপাশ অন্ধকারে ডুবে যেতে বসেছে। আসলে আমাদের বাংলা ভাষা চর্চা, সংস্কৃতি চর্চা বা যে কোনো চর্চাই বহুকাল হল প্রদর্শনীতে পরিণত হয়েছে। ওর মধ্যে ঘাম ঝরানোর কোনো ব্যাপার নেই, তাই ও থেকে আমাদের কোনো অর্জনও নেই। কেন এমন হল? ভাবতে গেলে জ্যোতি ভট্টাচার্য ‘কালচার’ ও ‘সংস্কৃতি’ প্রবন্ধে যে গোলমালের কথা বলেছেন সেটাই মনে পড়ে যাচ্ছে। একবার পড়ে দেখা যাক

ইংরেজি ভাষা থেকে ‘কালচার’ শব্দটার আমরা বাংলা পরিভাষা করেছি ‘সংস্কৃতি’। ঠিক পরিভাষা কী হওয়া উচিত – ‘সংস্কৃতি’ না ‘কৃষ্টি’, তা নিয়ে বিসংবাদ হয়েছে এককালে। রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, ‘কৃষ্টি’ শব্দটা বাংলা ভাষায় কুশ্রী অপজনন। ‘তাসের দেশ’ নাটকে শব্দটা নিয়ে কৌতুকও করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ। তারপরে ‘কৃষ্টি’ শব্দটা ক্রমে লোপ পেয়েছে, ‘সংস্কৃতি’-ই ব্যবহারসিদ্ধ লোকগ্রাহ্য শব্দ হয়ে উঠেছে।

ইংরেজরা ‘কালচার’ শব্দটা নিয়েছিল লাটিন ভাষা থেকে। লাটিন ভাষায় শব্দটার প্রধান অর্থ ছিল কৃষিকর্ম, ‘এগ্রিকালচার’ শব্দের মধ্যে সেই প্রধান অর্থ বাহিত হচ্ছে। এই কারণেই বাংলায় কেউ কেউ ‘কৃষ্টি’ বলতে চেয়েছিলেন, কর্ষণের সঙ্গে তার সম্পর্ক। কৃষিকর্মে কর্ষিত ক্ষেত্রে বীজ বপন করে নতুন শস্য উৎপাদন করা হয়…চিকিৎসাবিজ্ঞানে রোগজীবাণুর প্রতিষেধক জীবাণু ‘কালচার’ করে তৈরি করা হয়; রক্তে রোগজীবাণু বা ক্ষতিকর কোনো পদার্থ থাকলে অণুবীক্ষণে তা দেখতে হলে অনেক সময় রক্তবিন্দুর ‘কালচার’ করে তাকে বর্ধিত করতে হয়। মোট কথা ‘কালচার’ শব্দটার মধ্যে কর্ষণ বা অনুশীলনের দ্বারা নতুন বস্তু অথবা নতুন গুণ সৃষ্টি ইঙ্গিত রয়েছে, এর ঝোঁক উৎপাদনমুখী। কোনো না কোনো রকম বৃদ্ধি এর ফল।

আমাদের ‘সংস্কৃতি’ শব্দটির শব্দার্থগত ঝোঁক কিন্তু এরকম নয়। এর প্রধান অর্থ রূঢ় অবস্থা থেকে মার্জিত অবস্থায় আনয়ন, স্থূল অবস্থা থেকে বাহুল্যবর্জিত করে সূক্ষ্ম অবস্থায় আনয়ন। নতুন বস্তু সৃষ্টি, নতুন গুণ উৎপাদন, বা সংখ্যাবৃদ্ধি এর অভীপ্সিত লক্ষ্য নয়, যা আছে তাকেই একটা পরিশীলিত সংযত সুসমঞ্জস সুকুমার রূপদান এর লক্ষ্য। ‘সংস্কৃতি’ শব্দটির এই প্রধান ঝোঁক আমাদের আজকের পরিস্থিতিতে খানিকটা বাধাস্বরূপ হয়ে উঠছে – এরকম আশঙ্কা করছি।

পঞ্চাশ বছরেরও বেশি আগে লেখা এই কথাগুলো আজ আবার ভাবাচ্ছে। কারণ সংস্কৃতি শব্দের প্রধান ঝোঁক এখন আর খানিকটা বাধা নয়, গভীর কুয়োর দেওয়াল হয়ে গেছে দেখা যাচ্ছে। সেই কুয়োর ব্যাং হয়ে গেছি আমরা ভদ্রলোকরা; বাইরে রয়ে গেছে বাঙালি মুসলমান, বাঙালি নিম্নবর্গীয় হিন্দু এবং সাধারণভাবে, গরিব বাঙালি। কৃষ্টি শব্দটায় রবীন্দ্রনাথ প্রবল আপত্তি করেছিলেন বটে, তবে ভদ্রলোকদের কূপমণ্ডূকতা ধরে ফেলতে তাঁরও ভুল হয়নি। বঙ্গভঙ্গ রদের আন্দোলনে প্রথমে নেতৃত্ব দিয়েও তাই সরে গিয়েছিলেন। কারণ ফাঁকিবাজিটা ধরে ফেলেছিলেন। পরেও তাঁর লেখাপত্রে ভদ্রলোকি চালাকির আবরণ উন্মোচন করেছেন বারবার। ‘হিন্দু-মুসলমান’ প্রবন্ধে যেমন লিখেছেন

অল্পবয়সে যখন প্রথম জমিদারি সেরেস্তা দেখতে গিয়েছিলুম তখন দেখলুম, আমাদের ব্রাহ্মণ ম্যানেজার যে তক্তপোষে গদিতে বসে দরবার করেন সেখানে এক ধারে জাজিম তোলা, সেই জায়গাটা মুসলমান প্রজাদের বসবার জন্যে; আর জাজিমের উপর বসে হিন্দু প্রজারা। এইটে দেখে আমার ধিক্কার জন্মেছিল। অথচ এই ম্যানেজার আধুনিক দেশাত্মবোধী দলের। ইংরেজরাজের দরবারে ভারতীয়ের অসম্মান নিয়ে কটুভাষাব্যবহার তিনি উপভোগ করে থাকেন, তবু স্বদেশীয়কে ভদ্রোচিত সম্মান দেবার বেলা এত কৃপণ। এই কৃপণতা সমাজে ও কর্মক্ষেত্রে অনেকদূর পর্যন্ত প্রবেশ করেছে; অবশেষে এমন হয়েছে যেখানে হিন্দু সেখানে মুসলমানের দ্বার সংকীর্ণ, যেখানে মুসলমান সেখানে হিন্দুর বাধা বিস্তর।

এই ম্যানেজারই বাঙালি ভদ্রলোকের সংস্কৃতি আর কৃষ্টির তফাতের প্রমাণ। এঁর দেশাত্মবোধ হল প্রদর্শনী। ওটার নির্দিষ্ট মঞ্চ আছে, সেখানে নিজের পরিশীলিত দেশাত্মবোধ প্রমাণ করতে ওটা কাজে লাগে। কিন্তু নিজের জীবনে মেনে চলার, মুসলমানও যে তাঁর সমান ভারতীয় তা স্বীকার করার এবং অনুশীলন করার দায় নেই। এমন চরিত্রই এখন হাজারে হাজারে আমাদের চারপাশে ঘুরে বেড়াচ্ছে। রবীন্দ্রনাথ এই প্রবন্ধ লিখেছিলেন স্বাধীনতার আগে। স্বাধীনোত্তর ভারতে আবার সারা দেশের উদারপন্থী এবং বাঙালি ভদ্রলোকদের নিজেকে সংস্কৃতিবান প্রমাণ করতে ধর্মনিরপেক্ষ হওয়া আবশ্যিক হয়ে দাঁড়িয়েছিল। এখন দেশের রাজনীতি বদলে যাওয়ায়, পরিবেশ বদলে যাওয়ায় ওটা আর আবশ্যিক নয়। তাই এই ম্যানেজারবাবুর মনের কথা তিলোত্তমা মজুমদার, পবিত্র সরকারদের মুখে উঠে এসেছে, যার মর্মার্থ হল – ভদ্রলোকরাই বাঙালি। মুসলমানরা বাঙালি নয়। ভদ্রলোকদের উপর আক্রমণ হলে তবেই বলা চলে বাংলা ভাষার উপর আক্রমণ হয়েছে, মুসলমানদের উপর আক্রমণ বাংলা ভাষার উপর আক্রমণ নয়।

এ হল বাঙালি ভদ্রলোকের অন্তত দুশো বছর ধরে আপন মনের মাধুরী মিশায়ে তৈরি সত্য। এর সঙ্গে বাস্তবের কোনো সম্পর্ক নেই। এই তিলোত্তমা, এই পবিত্র, এই সঙ্গীতা বন্দ্যোপাধ্যায়রাই একুশে ফেব্রুয়ারি এসে পড়লে গদগদ উত্তর-সম্পাদকীয় প্রবন্ধ লেখেন বাংলা ভাষা নিয়ে। কিন্তু এখন বোঝা যাচ্ছে, ওগুলো সব প্রদর্শনী। আজকাল যাকে বাংলায় বলে ‘পারফরম্যান্স’। মনের কথা হল – একুশের ভাষা শহিদরা কেউ বাঙালি নয়, তারা ভদ্রলোকদের বাংলা ভাষার জন্যে প্রাণ দিয়েছিল মাত্র। ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধেও এঁরা বিস্তর লেখালিখি, বলাবলি করে চলেছেন সেই ২০১৪ সাল থেকে। কিন্তু স্পষ্টতই ওসবও পারফরম্যান্স। নইলে বিশাল বিশাল গেটওয়ালা আবাসনে থাকা এবং শীতাতপনিয়ন্ত্রিত গাড়িতে চড়া লেখক, বুদ্ধিজীবীরা কী করে বলেন যে এই বাংলায় হঠাৎ চতুর্দিকে প্রচুর নতুন লোক দেখতে পাচ্ছেন, যাদের সঙ্গে বাঙালিদের কোনো সংস্কৃতিগত মিল নেই? কোনো পরিসংখ্যানই এই সত্য প্রতিষ্ঠা করে না। এ যে নাজিদের আতঙ্ক সৃষ্টির ধ্রুপদী কৌশল, তা না জানার মত কম লেখাপড়া এঁদের নয়। উপরন্তু, যদি তর্কের খাতিরে ধরেও নেওয়া যায় চারপাশটা বাংলাদেশি এবং রোহিঙ্গায় ভরে গেছে, তাহলেই বা তাদের সঙ্গে এই ভদ্রমহিলা, ভদ্রলোকদের সংস্কৃতিগত মিলের অভাব হয় কী করে? অনেক বেশি অমিল তো হওয়ার কথা কলকাতা ও শহরতলিতে দ্রুত বেড়ে চলা বহুতলগুলোর বাসিন্দা হয়ে আসা হিন্দিভাষীদের সঙ্গে, যাদের অনেকেই আমিষের গন্ধ পেলে নাক কোঁচকায়। তাদেরই রাজ্যে কাজ করতে যাওয়া পশ্চিমবঙ্গের হিন্দু ও মুসলমান প্রবাসী শ্রমিকদের বাংলাদেশি দেগে দিয়ে কোনো আইনকানুনের তোয়াক্কা না করে, বৈধ কাগজপত্রকে পাত্তা না দিয়ে মারধোর করা হচ্ছে, পে লোডার দিয়ে বাংলাদেশে ছুড়ে ফেলা হচ্ছে।

এই তথাকথিত বুদ্ধিজীবীরা অবশ্য রোগ নন, রোগাক্রান্তের নমুনা। এই রোগে আমাদের আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধব অনেকেই আক্রান্ত। আমাদের যে কোনো একজনকে দেখলেই বোঝা যায়, বাঙালি ভদ্রলোকের কূপমণ্ডূকতা এবং নীতিহীনতা ঐতিহাসিক হলেও, গত অর্ধ দশকে বিশেষ অবনমন হয়েছে। ১৯৪৭ সালে পশ্চিমবঙ্গের ভদ্রলোকদের সংখ্যাগরিষ্ঠের মানসিকতা এরকম থাকলে বাঙালরা উদ্বাস্তু হয়ে এদেশে এসে হয় অনাগরিক বেগার শ্রমিকে পরিণত হত, বা ভিক্ষা করতে করতে অনাহারে মারা যেত। সেক্ষেত্রে ১৯৭১ সালেও পশ্চিমবঙ্গের বাঙালিরা ভারত সরকারকে বাংলাদেশের পাশে দাঁড়াতে যুদ্ধে নামার প্ররোচনা দিত না (অশোক মিত্র লিখিত আপিলা-চাপিলা দ্রষ্টব্য), সাধারণ মানুষের মধ্যে মুক্তিযুদ্ধের প্রতি আবেগ তৈরি হত না, বাঙালরা আরও এক দফা উদ্বাস্তু হওয়ার ধাক্কা সামলে এদেশে থিতু হতে পারত না।

মজার কথা, এখন ভদ্রলোকদের যে অংশের বাংলাদেশি অনুপ্রবেশের চিন্তায় রাতে ঘুম হচ্ছে না, তাদের অনেকে দ্বিতীয়, তৃতীয় বা চতুর্থ প্রজন্মের বাঙাল। এরা বুঝতে পারছে না, বা রিপাবলিক টিভি দেখে দেখে এত অন্ধ হয়ে গেছে যে বুঝতে চাইছে না, যে ভাষাকে বাংলাদেশি ভাষা বলে আজ চালাচ্ছে বিজেপি, সেই ভাষা অনেকাংশে তাদের মা-দিদিমার ভাষা। ওই ভাষাকে অস্বীকার করলেও ওই পরিচিতি যাওয়ার নয়। আগামীদিনে এ কার্ড ও কার্ড সে কার্ড – কোনো কার্ড দিয়েই নিজের নাগরিকত্ব প্রমাণ করে ওঠা যাবে না। কারণ কোনটা নাগরিকত্বের প্রমাণ সেটা ঠিক করে রাষ্ট্র। আর ভারত রাষ্ট্রের এই মুহূর্তে প্রকল্প হল বাঙালিদের অনাগরিক প্রমাণ করা।

ভদ্রলোকের ছেলেমেয়েদের স্মৃতিশক্তি তাজা করে দেওয়ার জন্যে বলি, সেই বামফ্রন্ট আমল থেকে – যখন তৃণমূল কংগ্রেস নেত্রী মমতা ব্যানার্জি প্রথম অভিযোগ তোলেন যে বাংলাদেশ থেকে লোক ঢুকিয়ে ভোটে জেতে বামেরা – বঙ্গ বিজেপির বক্তব্য ছিল, বাংলাদেশ থেকে আসা হিন্দুদের শরণার্থী ধরে নিয়ে আশ্রয় দিতে হবে এবং মুসলমানদের অনুপ্রবেশকারী ধরে নিয়ে শাস্তি দিতে হবে, ফেরত পাঠাতে হবে। অধুনা সোশাল মিডিয়ার বাইরে অপ্রাসঙ্গিক হয়ে যাওয়া তথাগত রায় যখন বঙ্গ বিজেপির সভাপতি ছিলেন, তখন তিনি একাধিক টিভি বিতর্কে বসে একথা বলেছেন। নরেন্দ্র মোদী সরকার যে নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন (সিএএ) পাশ করে ২০১৯ সালে, তার মর্মবস্তুও এটাই। সে কারণেই এ রাজ্যের হিন্দুদের, বিশেষত ভদ্রলোকদের, ওই আইন খুব পছন্দ হয়েছিল। মতুয়াদের মত বাংলাদেশ থেকে অত্যাচারিত হয়ে চলে আসা নিম্নবর্গীয় জনগোষ্ঠীর মানুষও ওই আইন পাশ হওয়ায় উল্লসিত হয়েছিলেন। কিন্তু একটা প্রশ্নের উত্তর না বিজেপি দিতে চায়, না সম্প্রতি বিজেপি সমর্থক হয়ে ওঠা পশ্চিমবঙ্গবাসী তৃতীয়-চতুর্থ প্রজন্মের বাঙাল ভদ্রলোকরা। প্রশ্নটা হল, শরণার্থীদের আশ্রয় দেওয়া এবং নাগরিকত্ব দেওয়ার মত মানবিক প্রকল্পের ‘কাট-অফ ডেট’ থাকবে কেন? সিএএ অনুযায়ী নাগরিকত্ব পাওয়ার ‘কাট-অফ ডেট’ হল ৩১ ডিসেম্বর ২০১৪। এর মানে কী? ওই তারিখের পরে কি বাংলাদেশে হিন্দু নির্যাতন বন্ধ হয়ে গেছে? নাকি ওর পরে যে হিন্দুরা নির্যাতিত হচ্ছে তারা মায়ের ভোগে যাক – এটাই হিন্দু দরদি বিজেপি এবং ভারতের নাগরিকত্ব এতদিনে অধিকারে পরিণত হয়ে গেছে বলে মনে করা বাঙাল ভদ্রলোকদের মনের কথা? এ প্রশ্ন করলেই বিজেপি নেতা তরুণজ্যোতি তিওয়ারি থেকে শুরু করে বাঙাল ভাষা বলতে না পারা সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার বাঙাল, সকলেই এক সুরে ঝাঁঝিয়ে ওঠে ‘যে আসবে তাকেই থাকতে দিতে হবে? দেশটা ধর্মশালা নাকি?’

এখন কথা হচ্ছে, এই আজকের বাঙালদের পূর্বপুরুষরা যখন ভিটেমাটি চাটি হয়ে এপারে চলে এসেছিলেন অধুনা বাংলাদেশ থেকে, তখন কি দেশটা ধর্মশালা ছিল? তখনকার শাসকরা মনে করেছিলেন – ছিল। ভাগ্যিস করেছিলেন, তাই আজকের বাঙাল ভদ্রলোকরা কলার তুলে এই প্রশ্ন করতে পারছেন। ওঁরা অবশ্য বলবেন ‘তখনকার পরিস্থিতি আর এখনকার পরিস্থিতি কি এক নাকি? ১৯৪৭ সালে তো একটা দেশকে আনতাবড়ি কেটে ভাগ করা হয়েছিল। আমাদের পূর্বপুরুষদের এই ভাগটার উপরে ততখানিই অধিকার, যতখানি আগে থেকেই এ ভাগে থাকা লোকেদের।’ ১৯৭১ সালে কিন্তু দেশভাগ-টাগ হয়নি। তখনো বাংলাদেশ থেকে আসা উদ্বাস্তুদের এ দেশের নাগরিকত্ব দেওয়া হয়েছিল। সেকথা মনে রাখলেও মানতেই হবে, যুক্তিটা সঠিক। কিন্তু মুশকিল হল, একবার যদি বিভাজনে হাততালি দেওয়া শুরু করেন, তখন দেখবেন অনেক চেপে রাখা বিভাজন বেরিয়ে পড়ছে। বাঙালরা এপারে চলে আসায় মোটেই পশ্চিমবঙ্গীয়রা (চলতি কথায় যাদের এদেশি বা ঘটি বলা হয়) সকলে খুব আপ্লুত হয়নি। ‘বাংলাদেশ থেকে লোক ঢুকছে পিলপিল করে, রোহিঙ্গায় চারপাশ ভরে গেছে’ – এই প্রোপাগান্ডায় আপনি যত ধুয়ো দিচ্ছেন, তত সেদিনের উদ্বাস্তুদের প্রতি বিদ্বেষ চেপে রাখা পশ্চিমবঙ্গীয়দের স্মৃতি তাজা হয়ে উঠছে। পশ্চিমবঙ্গে গত কয়েক বছরে আরএসএস-বিজেপির শক্তি বাড়ার পাশাপাশি ইস্টবেঙ্গল আর মোহনবাগান সমর্থকদের মধ্যে অনলাইন পা টানাটানির ভাষা যেভাবে বদলেছে, তা খেয়াল করলেই ব্যাপারটা স্পষ্ট হয়। অতএব বাঙাল ভদ্রলোক-ভদ্রমহিলাদের বোঝা উচিত যে তারা হিন্দিভাষীদের ‘রোহিঙ্গা’, ‘বাংলাদেশি’ বলে চিৎকারে যোগ দিয়ে নিজেদের ডিটেনশন ক্যাম্পের রাস্তা বানাচ্ছে।

বাড়াবাড়ি মনে হল কথাটা? আসামে এনআরসি-র সময়েও দেখেছিলাম সেখানকার বাঙাল ভদ্রলোকরা অনেকে বলছে ‘যে আসবে তাকেই থাকতে দিতে হবে? দেশটা ধর্মশালা নাকি?’ ঠিক এই কথাটাই যে হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে বাঙালিদের সম্পর্কে জাতিবিদ্বেষী অসমিয়াদের বক্তব্য, সেকথা তাদের খেয়াল ছিল না। খেয়াল হল, যখন এনআরসি থেকে বাদ পড়ে যাওয়া ১৯ লক্ষ মানুষের মধ্যে সাড়ে ১২ লক্ষ হিন্দু বেরোল এবং তার মধ্যে তারাও পড়ে গেল। নেলি গণহত্যার ইতিহাসও ওই ভদ্রলোকরা ভুলে থাকতে চেয়েছিল, কারণ ওতে যারা মরেছিল তারা মুসলমান। এখন আসামের বিভিন্ন ডিটেনশন সেন্টারে কারা দিন কাটাচ্ছে সেটা পশ্চিমবঙ্গে চতুর্দিকে রোহিঙ্গা দেখতে পাওয়া বাঙাল ভদ্রলোকরা একটু দেখে নিতে পারেন। পশ্চিমবঙ্গে এনআরসি করার পরিকল্পনা এখনো সরকারের নেই, কিন্তু এসআইআরের পরিকল্পনা বিলক্ষণ আছে। সেটাও একটা তালিকা, তারও থাকবে ‘কাট-অফ ডেট’। এসব ভদ্রলোকরা ভালই জানেন, কিন্তু কুয়োর ব্যাং তো কুয়োর বাইরের জগতের কথা জানতে পারলেও মানতে চায় না। যেমন নির্বাচন কমিশনের বানানো আরেকটা তালিকা – ভোটার তালিকা – কেমন হয় আজকাল সেকথা রাহুল গান্ধী চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিলেও ভদ্রলোকরা চোখ বন্ধ করে থাকতে পারে।

১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গবিরোধী আন্দোলনের সময়কার ভদ্রলোকদের ফাঁকিবাজিকে রবীন্দ্রনাথ চিহ্নিত করেছিলেন, নিন্দাও করেছিলেন। তবু মানতে হবে, সেই ভদ্রলোকদের অন্য সময়ে না হলেও বিপদের সময়ে বাঙালি মুসলমানদের সঙ্গে জোট বাঁধার বুদ্ধি ছিল। এখনকার ভদ্রলোক শ্রেণির মস্তিষ্ক এত উর্বর যে বিপদের সময়ে আরও বেশি করে নিজেদের আলাদা করে নিচ্ছে। বিপন্ন বাঙালির পাশে দাঁড়ানোর বদলে ‘আমি স্নান বলি, ও গোসল বলে। অতএব ও বাঙালি না, আমি বাঙালি’ – এসব বোকা বোকা কথা বলে নিজের কুয়োটা আরও গভীর করে খুঁড়ছে। যে হিন্দি আধিপত্যবাদী হিন্দুরা কোনোদিনই বাঙালিকে আপন বলে মনে করেনি এবং করবে না, তারা নিজেদের মনোভাব স্পষ্ট ভাষায় বুঝিয়ে দিলেও ভদ্রলোক, ভদ্রমহিলারা বুক ফুলিয়ে প্রতিপন্ন করতে চাইছে – বাঙালি বলে কোনো জাতি নেই। আছে দুটো আলাদা জাতি – বাঙালি হিন্দু আর বাংলাদেশি। বাংলা বলেও কোনো ভাষা নেই। আছে দুটো আলাদা ভাষা – হিন্দুর বাংলা আর বাংলাদেশি বাংলা। এই ঐতিহাসিক মূর্খামি যে দৃশ্যের সম্ভাবনা বাড়িয়ে তুলছে তা এইরকম – ভদ্রলোকরা বাঙালি বলে মার খাচ্ছে হিন্দিভাষীদের হাতে, আর এখন যে বাঙালিদের মার খাওয়া চলছে, যাদের বাঙালি বলে স্বীকার করতেই রাজি নয় ভদ্রলোকরা, তারা দূর থেকে বলছে ‘ওমা! আপনি ভদ্রলোক? আমি ভেবেছিলাম বাঙালি।’

নাগরিক ডট নেট ওয়েবসাইটে প্রকাশিত

অনির্বাণ কাজ পাচ্ছেন না: টালিগঞ্জের অর্ধসত্য বা হিমশৈলের চূড়া

অর্ধসত্য যে মিথ্যার চেয়েও ভয়ঙ্কর সে তো সকলেই জানেন। কিন্তু ক্লিকটোপের যুগে অর্ধসত্য আবার সত্যের চেয়ে সুবিধাজনকও বটে। অর্ধসত্যে ক্লিক পাওয়া যায় বেশি, তাই সংবাদমাধ্যমের সুবিধা। অর্ধসত্য নিয়ে কয়েকদিন সোশাল মিডিয়ায় রাগ-টাগ দেখিয়ে বিবেক দংশন থেকে মুক্তি পাওয়া যায়, তাই যে সংবাদ গিলছে তার সুবিধা। আবার পুরো সত্যটা জেনে গেলে হয়ত ব্যক্তির এত বেশি রাগ হবে বা গ্লানি হবে যে সত্যিকারের কিছু একটা করতে ইচ্ছে হবে। সেটা ব্যক্তির পক্ষে বিপজ্জনক, ব্যক্তি সমষ্টি হয়ে উঠলে ক্ষমতার পক্ষেও। এরকমই একটা অর্ধসত্য নিয়ে কদিন ধরে বাংলার নিস্তরঙ্গ সংস্কৃতি জগৎ কিছুটা উত্তাল – অনির্বাণ ভট্টাচার্য কাজ পাচ্ছেন না। গোটা ব্যাপারটা যা, তাতে এই খবরটাকে অর্ধসত্য না বলে সোয়া সত্য বা এক দশমাংশ সত্য বললেও ভুল হয় না।

ব্যাপারটা কী আসলে? ব্যাপার হল, টলিউডের কিছু শিল্পীকে কলাকুশলীরা (আজকাল বাংলায় যাঁদের টেকনিশিয়ান বলা হয়) বয়কট করেছেন। কী করে জানা গেল বয়কট করা হয়েছে? কেউ ঘোষণা করেছে? না। কিন্তু ওই শিল্পীরা কোনো ফিল্মের বা ওয়েব সিরিজের নির্দেশক, চিত্রনাট্যকার, অভিনেতা, গীতিকার, গায়ক বা অন্য যে ভূমিকাতেই থাকুন না কেন – শুটিংয়ের জন্য ডাকলে কোনো কলাকুশলী যাচ্ছেন না। এই বয়কটের আওতায় পড়ে যাওয়া শিল্পীদেরই একজন অনির্বাণ। এমনকি তিনি তাঁদের গানের দল হুলিগানইজমের মিউজিক ভিডিও শুট করতে গিয়েও দেখেন কোনো কলাকুশলী আসেননি। কিন্তু মূলধারার সংবাদমাধ্যম যেভাবে শুধু অনির্বাণের নাম নিয়ে হইচই করেই ব্যাপারটা মিটিয়ে ফেলতে চাইছে, তাতে বোঝা যায় যে গভীরে যাওয়ার সাধ নেই। হয়ত সাধ্যও নেই, কারণ সেটা করতে গেলে সরাসরি এ রাজ্যের ক্ষমতাসীনদের চটাতে হবে।

ঘটনা হল, অনির্বাণের একার ভাত মারার চেষ্টা চলছে না টালিগঞ্জে। কোনো কোনো সংবাদমাধ্যমে তাঁর পাশাপাশি বাংলা ছবি ও সিরিজের দর্শকদের পরিচিত মুখ পরমব্রত চট্টোপাধ্যায়ের নামোল্লেখ করা হয়েছে। বিকল্প সংবাদমাধ্যমগুলো এঁদের পাশাপাশি নির্দেশক ইন্দ্রনীল রায়চৌধুরীর নামও করেছে, কোনো কোনো সংবাদমাধ্যমে টিভির এক সময়কার পরিচিত মুখ এবং বড় পর্দার বেশকিছু ছবির পরিচালক সুদেষ্ণা রায়ের উল্লেখও করা হয়েছে। এও সেই সোয়া সত্যেরই বেসাতি। এর সুবিধা হল, পাঠক/দর্শক ভাববেন বা তাঁদের ভাবানো যাবে যে এই দু-চারজনের সঙ্গে দণ্ডমুণ্ডের কর্তাদের কোনো ব্যক্তিগত ঠোকাঠুকি লেগেছে। একেকজনের অতীত কার্যকলাপ উল্লেখ করে ‘যা হচ্ছে ওদের নিজেদের মধ্যে হচ্ছে, আমাদের ভাবার দরকার নেই’ – এরকম একটা বয়ান খাড়া করে দেওয়া যাবে। ফলে কয়েকদিন হইচইয়ের পরে সবাই ব্যাপারটা ভুলে যাবে, সোশাল মিডিয়ার যুগে হইচই করার মত নতুন কিছু ঠিক এসে পড়বে (এক্ষেত্রে যেমন প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়ের মাতৃভাষা সম্পর্কে হীনমন্যতা এসে পড়েছে)। ফলে কেউ আর খুঁজে দেখতে যাবে না, আসলে কী হয়েছে।

এই কুচক্র থেকে বেরোতে প্রথমেই বলা যাক যে বয়কট হচ্ছেন মূলত ১৩ জন। কোন ১৩ জন? যে ১৩ জন কলকাতা হাইকোর্টে রিট পিটিশন দাখিল করেছেন এই মর্মে, যে ভারতের একজন নাগরিকের এদেশে কাজ করে উপার্জন করার যে সংবিধানস্বীকৃত মৌলিক অধিকার রয়েছে, তা লঙ্ঘন করা হচ্ছে তাঁদের বেলায়। কাজ করতে বাধা দেওয়া হচ্ছে। এই ১৩ জন কারা? সুদেষ্ণা রায়, সুব্রত সেন, কিংশুক দে, বিদুলা ভট্টাচার্য, আশিস সেন চৌধুরী, সুমিত দাম, পরমব্রত চট্টোপাধ্যায়, অভিষেক সাহা, অনির্বাণ ভট্টাচার্য, দেবাশীষ চক্রবর্তী, ইন্দ্রনীল রায়চৌধুরী, প্রসেনজিৎ মল্লিক, সৌরভ ভট্টাচার্য।

বাংলা সিনেমার যাঁরা রীতিমত খোঁজখবর রাখেন, তাঁদের কাছেও হয়ত বেশিরভাগ নাম অচেনা। কিন্তু তার মানে তো এই নয় যে এই তালিকার কারোর কাজ করার অধিকার অন্যদের চেয়ে কম। সুতরাং বোঝা দরকার, একটা বিরাট অন্যায় ঘটে চলেছে পশ্চিমবঙ্গের সিনেমা শিল্পে এবং সেই অন্যায় ঘটছে রাজ্য সরকারের মদতে। এটা আমার মতামত নয়। পিটিশনাররা এই দাবিটাই করেছেন। বস্তুত, রিট পিটিশন সরকারের বিরুদ্ধেই দাখিল করা যায়। কারণ নাগরিকের যে কোনো সাংবিধানিক অধিকার রক্ষার দায়িত্ব সরকারের। ফলে এই শিল্পীদের কাজ করতে না দেওয়ার পিছনে টলিউডের কুখ্যাত ফেডারেশন – যার কর্তা মন্ত্রী অরূপ বিশ্বাসের ভাই স্বরূপ বিশ্বাস – আছেন বলে অভিযোগ থাকলেও, পিটিশন কিন্তু করা হয়েছে সরকার পিটিশনারদের অধিকার রক্ষা করছে না, এই অভিযোগে। এতে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের প্রতিক্রিয়া কী?

গতবছর এই জুলাই মাসেই যখন টালিগঞ্জে ফেডারেশন বনাম পরিচালক টানাপোড়েন শুরু হয় শ্রী ভেঙ্কটেশ ফিল্মস প্রযোজিত এবং রাহুল মুখার্জি নির্দেশিত একটি ছবির শুটিং নিয়ে এবং তার জেরে কাজ বন্ধ হয়ে যায় পুরো সিনেমাপাড়ায়, তখন মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি স্বয়ং সব পক্ষকে ডেকেছিলেন। সেই সভায় প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন যে সরকার একখানা কমিটি গঠন করে দেবে এবং সেই কমিটি সব মিটিয়ে দেবে। সে কমিটিও গঠন হল না আর তা নিয়ে বিস্তর ইমেল পাঠানোর পরেও কোনো জবাব পাওয়া গেল না দেখে পরিচালকরা আদালতে এই পিটিশন দাখিল করলেন। মজার কথা, হাইকোর্টে বিচারপতি অমৃতা সিনহার এজলাসে এই মামলার শুনানিতে কিন্তু রাজ্য সরকারের কৌঁসুলি কেবলই প্রমাণ করার চেষ্টা করে গেছেন যে এই মামলার দুটি পক্ষ হল ফেডারেশন আর পরিচালকরা। এতে সরকারের কোনো ভূমিকা নেই, কিছু করার নেই। বিচারপতি অবশ্য সেকথায় আমল দেননি। ডিভিশন বেঞ্চে আবেদন জানিয়েও রাজ্য সরকার সুবিধা করতে পারেনি। মামলা আবার ফেরত এসেছে বিচারপতি সিনহার এজলাসেই। ইতিমধ্যে বিচারপতি সিনহার পশ্চিমবঙ্গ সরকারের তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রকের সচিবকে দেওয়া স্পষ্ট নির্দেশ সত্ত্বেও পিটিশনারদের কাজে বাধা পড়ায় তাঁরা আদালত অবমাননার মামলাও করেছেন। সে মামলার শুনানি হওয়ার কথা আগামীকাল। তাহলে ভাবুন, রাজ্য সরকার ফেডারেশনের স্বার্থরক্ষায় কতখানি মরিয়া আর পরিচালকদের নাগরিক অধিকার রক্ষায় কতখানি উদাসীন। অর্থাৎ ব্যাপারটা স্রেফ অনির্বাণ বা কয়েকজন শিল্পীকে কলাকুশলীদের বয়কট করার ব্যাপার নয়। এ রাজ্যে যে কোনো নাগরিক আইনি পথে নিজের কাজকর্ম করতে পারবেন কি পারবেন না – প্রশ্নটা সেইখানে।

সমস্যার গভীরতা বোঝার জন্যে আরও দুটো তথ্য খুব জরুরি। এই পিটিশন যখন দাখিল করা হয় তখন পিটিশনার ছিলেন ১৫ জন, এখন ১৩। গত এক বছরে আরও একটি মামলা দায়ের করেছেন বয়কট হয়ে যাওয়া শিল্পীরা। সেটা সরাসরি ফেডারেশনের দণ্ডমুণ্ডের কর্তা স্বরূপের বিরুদ্ধে মানহানির মামলা, কারণ তিনি সংবাদমাধ্যমকে বলেছিলেন যে বেশিরভাগ নির্দেশকের নামেই নাকি যৌন হয়রানির অভিযোগ জমা পড়েছে তাঁর কাছে। সেই মামলা করেছিলেন ২৩০-৩৫ জন। মামলার শুনানি এখনো শুরুই হয়নি, অথচ ৭০-৮০ জন মামলাকারী মামলা প্রত্যাহার করে ফেলেছেন।

কেন এমন হল? ঠিক যে কারণে প্রকাশ্য দিবালোকে ব্যস্ত রাস্তায় খুন হওয়ার পরেও পুলিস একজন সাক্ষী পায় না খুনিকে দোষী সাব্যস্ত করার জন্যে। ঠিক যে কারণে আর জি কর কাণ্ডের সময়ে সারা রাজ্যের মেডিকাল কলেজের জুনিয়র ডাক্তাররা হুমকি সংস্কৃতির কথা বলছিলেন; যে কারণে সাউথ ক্যালকাটা ল কলেজে ছাত্রীর ধর্ষণের পর জানা যাচ্ছে, ম্যাংগো কুমার আগেও বিস্তর কুকর্ম করেছে। কিন্তু কেউ তার টিকি স্পর্শ করতে পারেনি। উপরন্তু সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হতে শুরু করেছে যে রাজ্যের বহু কলেজই নানা জাতের ম্যাংগোর গন্ধে বারো মাস ম ম করে। এহেন ম্যাংগোরাই এ রাজ্যের সর্বময় কর্তা এখন। গত ২০ জুন উত্তরবঙ্গ সংবাদের পাতায় বর্ষীয়ান সাংবাদিক রূপায়ণ ভট্টাচার্যকে লিখতে হয়েছে

মমতা রাত জেগে টিভি সিরিয়াল দেখেনতাঁর মতো করে সাহিত্যচর্চা করেনসবার জানা। অথচ টালিগঞ্জ ইন্ডাস্ট্রিই সবচেয়ে বিপন্ন শিল্প। সাহিত্য আকাদেমিনাট্য আকাদেমিতেও হাত মিলিয়ে অনেক কাজ চলছেযা দিদিই জানেন না। যে কোনও সময় টালিগঞ্জ ইন্ডাস্ট্রিতে তালাচাবি লেগে যাবে মন্ত্রী অরূপ বিশ্বাসের ভাই স্বরূপের দাদাগিরিতে। এই স্বরূপ কাউন্সিলারও ননঅথচ মমতা-অরূপকে তুড়ি মেরে উড়িয়ে প্রসেনজিৎ-দেব-সৃজিত-কৌশিক-পরমব্রত-অনির্বাণদের কাজ বন্ধ করতে এক মিনিট লাগে তাঁর। এক বছর ধরে স্বরূপ তাঁর স্বরূপ বোঝাচ্ছেন মিটিং না ডেকে। মুখ্যমন্ত্রীর নির্দেশ না মেনে। মমতা রহস্যজনক চুপ। মাঝে তিনি নিজের ভাই বাবুনকে পর্যন্ত কিছুদিনের জন্য ত্যাজ্য করেছিলেন। এখানে এসব হয় না।

দেব-শতাব্দী-জুন থেকে শুরু করে সায়নী-লাভলি-সায়ন্তনীরা তৃণমূলের এমপিএমএলএ। অথচ মমতা স্থানীয় বিধায়কের কীর্তিমান ভাইকে টালিগঞ্জ সামলাতে দিলেন কেনসাহিত্যজগৎ কি তাহলে কলেজ স্ট্রিটের বিধায়কের ভাই সামলাবেনযাত্রাপাড়া চিৎপুরের বিধায়কের ভাইখেলার ময়দান চৌরঙ্গির বিধায়কের ভাইঅরূপকে দিদি অনেক জায়গায় জট খুলতে পাঠান। অধিকাংশ ক্ষেত্রে অরূপ সফলসবাইকে নিয়ে চলার গুণের জন্য। শুধু ভাইকেই সামলাতে চূড়ান্ত ফ্লপ। অভিনেতারা বলেনভাই এখন দাদাকেই পাত্তা দেয় না। মমতার প্রতি সহানুভূতি সম্পন্নদের সঙ্গে রাজ্য সরকারের ঝামেলা লাগিয়ে দিতে ওস্তাদ স্বরূপ কোম্পানি।

এরপরেও যদি আপনি কেন-র উত্তর না পান, তাহলে দেখে নিন স্বরূপের নেতৃত্বাধীন ফেডারেশনের গুণগান করে তৈরি বাংলা ছবির তথাকথিত ফার্স্ট বয় সৃজিত মুখার্জি, গতবছর জুলাইয়ে যাঁর ছবির কাজ বয়কট নিয়ে এই বিবাদের সূত্রপাত সেই রাহুল মুখার্জি এবং সঙ্গীত পরিচালক তথা পরিচালক ইন্দ্রদীপ দাশগুপ্তের ভিডিও।

এই ভিডিও পোস্ট করা হয়েছিল গত ১১ জুন, যুযুধান পরিচালকরা তাঁদের বক্তব্য জানিয়ে দুখানা ভিডিও ৩০ এপ্রিল ও ২৮ মে প্রকাশ করার পর। মজার কথা, মামলাকারী পরিচালকরা ভিডিওগুলো পোস্ট করেছেন একখানা স্বতন্ত্র ইউটিউব চ্যানেলে এবং নিজ নিজ সোশাল মিডিয়া হ্যান্ডেলগুলোতে। ফেডারেশনের গুণগান করা ত্রয়ীর ভিডিও কিন্তু পোস্ট হয়েছে ফেডারেশনেরই ফেসবুক পেজ থেকে। আরও মজার কথা, পর্দায় এক কোণে তিন পরিচালককে দেখা যাচ্ছে, বেশিরভাগ জায়গা জুড়ে আছে একটি বাণী

আমরা একসাথে
কাজ করার পক্ষে
মিথ্যা মামলার বিপক্ষে।
ফেডারেশনে ছিলাম
আছি থাকবো

এই ভিডিওতে কলাকুশলীরা যে ছবি বানানোর কাজে নির্দেশকদের সমান জরুরি, সেকথা বলা হয়েছে। গোটা টলিউড যে পরিবারের মত, তাও বলা হয়েছে। এমনকি ‘স্বরূপদা’ কত ভাল – সেকথাও বলেছেন সেই রাহুল, যিনি ফেডারেশনের অনুমতি না নিয়ে বাংলাদেশে গিয়ে একখানা ওয়েব সিরিজের শুটিং করে এসেছিলেন বলে তাঁর এখানকার ছবির শুটিং করতে দেওয়া হচ্ছিল না। তা থেকেই গোটা গোলমালের সূত্রপাত। তাঁর পাশে দাঁড়িয়েই ফেডারেশনের গা জোয়ারির প্রতিবাদ আরম্ভ করেছিলেন সুদেষ্ণা, ইন্দ্রনীল, সুব্রত, পরমব্রত, অনির্বাণ, বিদুলা প্রমুখ। সৃজিত প্রথম থেকেই ধারেকাছে ঘেঁষেননি; কৌশিক গাঙ্গুলি, শিবপ্রসাদ মুখার্জিরা মাঝপথে সরে পড়েছেন। রাহুল স্বয়ং ‘স্বরূপদা’-র ভক্ত হয়ে গেছেন। তা হোক, সকলের মেরুদণ্ড কখনো সমান শক্ত হয় না। কিন্তু উপরের ভিডিওতে লক্ষ করার মত বিষয় হল, রাহুল বলছেন, তিনি ‘স্কেপগোট’ হয়েছিলেন, ফেডারেশনের সঙ্গে তাঁর ‘সম্পর্কে ফাটল ধরেছিল’ এবং তারপর তিনি প্রায় ২২২ দিন বেকার ছিলেন। অর্থাৎ প্রকারান্তরে স্বীকার করে নেওয়া হল যে ফেডারেশন (বা স্বরূপদা) হল কুমীর। টালিগঞ্জের জলে থেকে তার সঙ্গে বিবাদ করলে কাজ পাওয়া যায় না। সৃজিত আর ইন্দ্রদীপ ফেডারেশনকে খুব প্রয়োজনীয় সংস্থা বলেছেন, কেন প্রয়োজনীয় তা বলেননি। টালিগঞ্জের কলাকুশলীদের জন্য কী কী ভাল কাজ ফেডারেশন করেছে বা করছে – তা বলার বিন্দুমাত্র চেষ্টা নেই। সৃজিত ভিডিওর শুরুতেই ছিলেন। তিনি তো যা বলছেন তা কেন বলছেন তা-ই ভেবে পাচ্ছেন না বলে মনে হয়। কথা আটকে যায়, তারপর অনেক কষ্টে খুঁজে বার করেন ‘অসুবিধা হচ্ছে’ শব্দবন্ধ। কী অসুবিধা, কেন অসুবিধা – সেসবের মধ্যে যাননি। ইনিয়ে বিনিয়ে তিনজনেই বলেছেন, যে অসুবিধাই হয়ে থাক তা আলাপ আলোচনা করে মিটিয়ে নেওয়াই উচিত। আদালতে যাওয়া অন্যায় হয়েছে।

টলিউড যদি সত্যিই একটা পরিবার হয়, তাহলে বলতেই হবে যে এ হল গার্হস্থ্য হিংসায় লিপ্ত পরিবারের ভাষা। দীর্ঘদিন নির্যাতিত বাড়ির বউ যেই থানায় গিয়ে ডায়রি করে দেয়, অমনি শ্বশুরবাড়ির লোক বলতে শুরু করে ‘বাড়ির ঝামেলা বাড়িতেই মেটানো উচিত ছিল। এসব নিয়ে কেউ থানা-পুলিস করে? ছি ছি! পরিবারের একটা মানসম্মান নেই?’ উপরন্তু, আলোচনায় যে ফেডারেশনই বসেনি, সেকথাও চেপে গেছেন পরিচালক ত্রয়ী। আর ‘মিথ্যা মামলা’ কথাটা কিন্তু কলকাতা হাইকোর্টের বিচারপতিরা এখন পর্যন্ত মানেননি।

এবার প্রশ্ন উঠবে, কী এমন নির্যাতন করা হয়েছিল যে পিটিশনার পরিচালকরা আদালতে গেলেন? এই প্রশ্নের উত্তর গত এক বছরে বিভিন্ন সময়ে প্রতিবাদী পরিচালকরা সাংবাদিক সম্মেলন করে দিয়েছেন, বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের ক্যামেরার সামনেও বলেছেন। পুনরাবৃত্তি করে লেখার কলেবর বাড়াব না এবং পাঠকের আলস্যকেও প্রশ্রয় দেব না। যাঁরা বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির বর্তমান ও ভবিষ্যৎ নিয়ে বিন্দুমাত্র ভাবিত, প্রসেনজিৎ বাংলা বলতে বুক ফুলিয়ে লজ্জিত হওয়ায় যাঁরা সত্যিই ক্রুদ্ধ, তাঁরা নিজ আগ্রহে জেনে নেবেন। যাঁরা কিছু না জেনেই বোদ্ধা, তাঁদের জন্যে এ লেখা নয়। তাঁরা তো মনেই করেন না বাংলা ছবি কোনো দেখার মত জিনিস। কেন দেখার মত হয় না, তা নিয়েও এতদিন তাঁরা কোনো প্রশ্ন তোলেননি। এখন অনির্বাণ, পরমব্রতর নাম জড়িয়ে যাওয়ায় সোশাল মিডিয়ায় ‘এনগেজমেন্ট ফার্মিং’ করতে সুবিধা হবে বলে হঠাৎ এ বিষয়ে আগ্রহী হয়েছেন। ওঁরা ‘ওয়ার্ল্ড সিনেমা’ নিয়ে থাকেন, সোশাল মিডিয়ার উত্তেজনা থিতিয়ে গেলে নির্ঘাত আবার ওতেই ফিরে যাবেন।

তবে যে পাঠকরা বোদ্ধা নন তাঁদের সাধারণ বুদ্ধি আছে। তাঁরা নিশ্চয়ই বোঝেন যে পশ্চিমবঙ্গের বাংলা সিনেমা একটি রুগ্ন শিল্প। এখানে ছবির বাজেট কম, তাই শুটিংয়ের সময় কম, তাই নির্দেশক ও অভিনেতাদের পারিশ্রমিক কম, ফলে কলাকুশলীদের পারিশ্রমিক আরও কম। এমতাবস্থায় ফেডারেশনের উদ্যোগের ফলে কলাকুশলীরা খুব ভাল আছেন – একথা বলা অর্থহীন। এরকম একটা ইন্ডাস্ট্রিতে সক্রিয় শিল্পীদের কাজ করতে না দিলে কাজ যে আরও কমে যায়, তা বুঝতেও বোদ্ধা হওয়ার দরকার নেই। কারখানায় কাজ না হলে শ্রমিক কী করে ভাল থাকতে পারেন? যে ট্রেড ইউনিয়ন কাজ কমিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করে, সে শ্রমিক দরদী, সে প্রয়োজনীয় – একথারই বা মানে কী? আসলে যা চলছে তা যে ট্রেড ইউনিয়নের নামে গুন্ডামি বা আমির খান অভিনীত গুলাম ছবির মত মাফিয়ারাজ, তা বুঝতে অনুসন্ধানমূলক সাংবাদিকতা লাগে না।

আরো পড়ুন বাংলা মাধ্যম স্কুলের পর বাংলা সিনেমা উঠে যাওয়ার পালা?

বলিউডের অনেক হিট ছবির মতই ওই ছবিটাও একখানা হলিউডি ছবির পুনর্নির্মাণ। অন দ্য ওয়াটার ফ্রন্ট নামের সেই ছবিতে নায়কের চরিত্রে ছিলেন মার্লন ব্রান্ডো, পরিচালক এলিয়া কাজান। মূল ছবি আর তার পুনর্নির্মাণ – দুটোতেই নায়ককে অনেককিছু খোয়াতে হয়, আক্ষরিক অর্থে মারও খেতে হয়। ওটা কিন্তু গল্প হলেও সত্যি। কাজান ছবিটা বানিয়েছিলেন পুলিৎজার পুরস্কারপ্রাপ্ত সাংবাদিক ম্যালকম জনসনের একগুচ্ছ প্রতিবেদনের উপর ভিত্তি করে। সেসব যদি বাদও দেন, ২০২০-২১ সালের কৃষক আন্দোলনের দিকে তাকালেও বুঝবেন যে আন্দোলনকারীদের ত্যাগ ছাড়া কোনো আন্দোলন হয় না। আজকাল ও জিনিসটারই অভাব, তাই কোনো প্রতিবাদই ফেসবুকের বাইরে বেশিদূর ছড়ায় না, অভীষ্ট লক্ষ্যেও পৌঁছয় না। কারণ আজকাল রাজনৈতিক দলের নেতা কর্মীরাও প্রতীকী প্রতিবাদের বেশি কিছু করতে চান না। এই ১৩ জন পিটিশনার কিন্তু নিজেদের রুজি রোজগার বাজি রেখে লড়তে নেমেছেন। আর জি কর আন্দোলনে কেন মুখ খোলেননি, কেন একটা কথাও বলেননি – এসব বলে অনির্বাণকে আক্রমণ করতে পারেন। তৃণমূল সরকার গঠিত কমিটিতে ছিলেন বলে পরমব্রত, সুদেষ্ণাকেও গাল দিতে পারেন। কিন্তু নিজের অফিসে একটা সামান্য দাবির জন্যে লড়ে দেখুন, টের পাবেন যে মোমবাতি হাতে কদিন রাতে মিছিলে যাওয়া আর ক্যামেরার সামনে বাইট দেওয়া অতি সহজ কাজ। খেয়াল করবেন, আর জি কর আন্দোলনের সময়ে টলিউডের যে তারকারা ও কাজটা গোড়ায় করেছিলেন এবং পরে চেপে গিয়েছিলেন, তাঁদের কিন্তু তৃণমূল নেতা পরিচালিত ফেডারেশন বয়কট করছে না। কারণ ওতে ক্ষমতার কাঁচকলা।

ভাবুন, ভাবা প্র্যাকটিস করুন। আর যদি মনে হয় বাংলা সিনেমার ভবিষ্যতের জন্যে, বাঙালি সংস্কৃতির জন্যে এই লড়াইয়ের এক কণাও দাম আছে – তাহলে তির্যক মন্তব্য বন্ধ রাখুন। যদি এই লড়াইয়ের গুরুত্ব আরও বেশি বলে মনে করেন, তাহলে পাশেও দাঁড়াতে পারেন। বাংলা সিনেমার পাশে দাঁড়ানোর চেয়ে অনেক জরুরি কাজ হবে সেটা। আইনি লড়াইয়ে কীভাবে পাশে দাঁড়াবেন? আগ্রহ থাকলে প্রশ্নটা নিজেই তুলুন, উত্তর পেয়ে যাবেন।

নাগরিক ডট নেট ওয়েবসাইটে প্রকাশিত

মরে বেঁচে গেল তমন্না

ওর মত মেয়ের জন্যে আমাদের গ্রামে পড়ার স্কুল নেই, কলেজগুলোও ধুঁকছে। কলেজ পেরিয়ে আরও বড় কোথাও, ভাল কোথাও সে পৌঁছতে পারত – এমন ভাবনাও হাস্যকর।

‘আজ ফির জীনে কি তমন্না হ্যায়/আজ ফির মরনে কা ইরাদা হ্যায়’ – ওয়াহিদা রহমানের মত অনাবিল আনন্দে এই মারাত্মক লাইন দুটো গাইতে গাইতে নাচতে নাচতে তমন্না খাতুন পুকুরে চান করতে যাচ্ছিল কিনা, সে খবর কোথাও পেলাম না। হতেও পারে। ন-দশ বছরের শিশুর পক্ষে চারপাশের তাণ্ডবের মধ্যেও কতটা সরল এবং আপনমনে থাকা সম্ভব – তা আমি ৩৩ বছরের অনভ্যাসে ভুলে গেছি, ফলে আন্দাজ করতে পারছি না। কিন্তু দেখাই যাচ্ছে, এই স্মার্টফোন যুগেও ৯-১০ বছরের শিশু এতটা চৌখস হয়নি যে আঁচ করতে পারবে – বাবা যে দলের লোক তার প্রতিপক্ষ দলের বিজয় মিছিলের ধারেকাছে গেলে বাঁচার অভিলাষ বা তমন্না ‘মরনে কা ইরাদা’, অর্থাৎ মরার ইচ্ছা, হয়ে দাঁড়ায়। পিতামহ ভীষ্মের ছিল ইচ্ছামৃত্যু। মহাভারতের যুগ চলে গেছে; এখন বাপ ঠাকুর্দার বয়সী লোকেদের ইচ্ছা হলেই শিশুদের মৃত্যু হয়। যখন তখন যেখানে সেখানে। গাজা থেকে শুরু করে কালীগঞ্জ।

কী বলছেন? ‘বামফ্রন্টের ৩৪ বছরে’ ইত্যাদি? জানতাম ওটাই বলবেন। তাই তো সোজা মহাভারত থেকে শুরু করলাম। সবাই জানে চক্রব্যূহের সাতজন বীর ছিলেন অভিমন্যুর বাপ-ঠাকুর্দার বয়সী, তুলনায় অভিমন্যু নেহাত বালক। সুতরাং এ পাপের শুরু যে আজ নয় তা বলাই বাহুল্য। কিন্তু কী করব? মহাকালের চক্রান্তই বলুন, অথবা বাবা-মায়ের তমন্না, আমাকে এই কালখণ্ডেই বাঁচতে হচ্ছে। ফলে আজকের শিশুমৃত্যুর ঘা-ই আমার কাছে সবচেয়ে দগদগে। মানুষ নিজের বাবা-মা-ছেলেমেয়ের মৃত্যুশোকই কয়েক দিনে কাটিয়ে ওঠে, আর আপনারা বলছেন, দেড় দশক আগে শেষ হয়ে যাওয়া বামফ্রন্ট আমলে যে শিশুরা খুন হয়েছে তাদের মৃত্যু নিয়ে কথা বললে, তবেই তমন্নার মৃত্যু নিয়ে রেগে ওঠা বৈধ? বনলতা সেনকে লজ্জা দেবেন না মাইরি!

কী বলছেন? বড় বড় কথা বলছি, নিজেও কদিন পরেই তমন্নাকে ভুলে যাব? আজ্ঞে এই কথাটি যথার্থ বলেছেন। মাথাটা পচে যাচ্ছে, পচে গেছে স্ক্রোল করতে করতে। তমন্নাকে নিয়ে কদিন পোস্ট করা আর লাইক দেওয়া হয়ে গেলেই ঠিক স্ক্রোল করে এগিয়ে যাব। নিজের বাবার মৃত্যুশোকের ভার শ্মশানে দাঁড়িয়ে চিতায় তোলার আগেই ফেসবুকে পোস্ট করে নামিয়ে ফেলতে পারছি, আর কোথাকার কোন গণ্ডগ্রামের মেয়ে তমন্না – তার শোকে কদিন মুহ্যমান থাকব? হত কলকাতার কাছাকাছি এলাকার ভদ্দরলোকের মেয়ে, যে লেখাপড়া শিখে নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে গেছিল, কোনো পার্টির সঙ্গে যার গোটা পরিবারের কোনো সম্পর্ক ছিল না – তাহলে অন্তত কয়েক মাস তমন্নার মৃত্যু নিয়ে উত্তেজিত হয়ে থাকতাম। আমাদের দলহীন নারীবাদীরা (নয়-দশে কি নারী হয়? এ বিষয়ে কোনো মত দেব না; শেষে ম্যানস্প্লেনিংয়ের অভিযোগ উঠবে) রাত দখলের ডাক দিতেন, মেয়ে বউয়ের হাত ধরে চলে যেতাম গটগটিয়ে। সেখানে দাঁড়িয়েই গাদা ছবি, ভিডিও তুলে পোস্ট করে দিতাম ফেসবুকে। দায়িত্ব মিটে যেত। সপ্তাহান্তে আন্দোলন করে সোমবার থেকে যথারীতি অফিস কাছারি। এই মেয়েটার বেলায় অত কাণ্ড কেন করতে যাব? ওর তো বাবা সিপিএম করে। আন্দোলন-টান্দোলন করতে হলে সিপিএমই করুক। পশ্চিমবঙ্গে রাজনৈতিক হত্যার ইতিহাস তো লম্বা। ক দল খ দলের ঘর জ্বালিয়ে দেবে, খ দল ক দলের বাড়িতে বোম মারবে, কখনো ক দলের লোক মরবে আর কখনো খ দলের লোক মরবে। এ তো চিরকালই দেখছি। এর মধ্যে আমি ঢুকতে যাব কেন?

সাতে পাঁচে না থাকা মধ্যবিত্তও কি নতুন নাকি? মোটেই না। স্বাধীনতা সংগ্রাম বলুন, নকশাল আন্দোলন বলুন আর সিদ্ধার্থশঙ্কর রায়ের শাসনের দিনগুলোই বলুন। কোনোদিনই সকলে সুখী গৃহকোণ ফেলে পথে নেমে যায়নি। রূপকথায় বিশ্বাস করবেন না। ‘আমার নাম তোমার নাম, দেশের নাম ভিয়েতনাম’ বলে মিছিল করতেও মোটেই সকলে যায়নি। কেউ কেউ গেছিল। মুশকিল হচ্ছে, অনুপাত হিসাব করলে আমাদের মত এ যুগের বাম, প্রগতিশীল প্রমুখকে লজ্জায় পড়তে হবে। অবশ্য সেকালে না গিয়ে উপায় ছিল না। তখন তো মার্ক জুকেরবার্গ, ইলন মাস্কের মত মহাপুরুষদের জম্ম হয়নি, তারা নিজেদের সুসজ্জিত বাগানের গেট খুলে দেয়নি পুঞ্জীভূত গোষ্ঠীবদ্ধ ঘৃণার ব্যক্তিগত প্রকাশের জন্যে। তাই তখন নিদেনপক্ষে বামপন্থী নেতা কর্মী সমর্থকরা কিছু হলেই রাস্তায় নামতেন। মিছিল, মিটিং, পথসভাকেই প্রতিবাদ বা আন্দোলন বলে জানতেন। এখন তাঁরাও শিখে গেছেন – আন্দোলন মানে হল সোশাল মিডিয়া পোস্ট। মিছিল, মিটিং হলেও সেখানে গিয়ে স্লোগান দেওয়ার চেয়ে ফেসবুক লাইভ করা বেশি জরুরি। ওখান থেকেই ৮৮৮ বার কোট করা কবিতা বা গানের লাইন ক্যাপশন হিসাবে দিয়ে মিছিলের ছবি ও ভিডিও পোস্ট করাই রাজনীতি।

ব্যাপারটা সবচেয়ে মন দিয়ে শিখেছেন সবচেয়ে বড় বামপন্থী দল সিপিএমের শহুরে মধ্যবিত্ত নেতা কর্মী সমর্থকরা। গ্রামের দিকে পার্টির গরিবগুরবো সদস্য সমর্থক আক্রান্ত হলে, তাদের ছেলেমেয়েরা তমন্নার মত বেঘোরে প্রাণ হারালে, গিয়ে হাজির হতে হবে ঠিকই। কিন্তু সে দায়িত্ব কেবল একজনের – মীনাক্ষী ছাই ফেলতে ভাঙা কুলো মুখার্জি। বাকিরা ভীষণ ব্যস্ত। কারোর টালিগঞ্জ পাড়ার বন্ধুবান্ধবদের সঙ্গে সোশালাইজ করার দরকার আছে। কারোর গিটার বাজিয়ে ‘বেল্লা চাও’ গেয়ে বা রবীন্দ্রনৃত্য করে হাজার হাজার লাইক পাওয়ার আছে। কারোর বন্ধুর জন্মদিনে পিটার ক্যাট বা মেইনল্যান্ড চায়নায় হুল্লোড় করে কমরেড যেন বিপ্লবের মতই দীর্ঘজীবী হন, তা পোস্ট করা প্রয়োজন। কেউ টিভি চ্যানেলে তৃণমূলের মুখপাত্রের সঙ্গে তুমুল ঝগড়া করেই সমর্থকদের মোহিত রাখতে ব্যস্ত, সত্যিকারের সংঘর্ষে জড়াবেন না। কারণ তাহলে থিয়েটার করতে গিয়ে সরকারি হল পাবেন না, সিনেমা বানানোর পর নন্দনে শো পাবেন না। কেউ আবার জয়দেব বসুর জন্মদিন, মৃত্যুদিন এসে পড়লেই ‘রাজার সঙ্গে আঁতাত করেন যিনি/আমাদের সেই গুহকের প্রতি ঘেন্না’ ইত্যাদি পোস্ট করেন। কিন্তু তিনিও জানেন, তাঁর সরকারপক্ষের বন্ধুরাও জানেন, যে ওসব রান্নাবাটি খেলা। তাই কবিতা পাঠ, গল্প পাঠের আসরে ডাক এসে যায় যথাসময়ে। সে চিঠি সরকারবিরোধী সাহিত্যিক সগর্বে ফেসবুকে পোস্টও করেন। অনেকের আবার বিক্ষোভ বিদ্রোহ বিপ্লব সবই সাহিত্যজগতের দখল ঘিরে। বাম আমলে ওটার রাশ নিজেদের হাতে ছিল, এখন বেরিয়ে গেছে। যত আক্রোশ তাই নিয়ে। কোথায় কোন প্রাণ হাতে করে সিপিএম করা কর্মীর বাচ্চা মেয়েটা বোম খেয়ে মরে গেল – তাতে এঁদের কী? কয়েকটা ফেসবুক পোস্ট করে দেবেন, না হয় একখানা আবেগে থরোথরো কবিতাই লিখে দেবেন। তাতে সাপও মরবে, লাঠিও ভাঙবে না। অর্থাৎ বামপন্থী পরিচয়টাও বজায় থাকবে, আবার শিল্পী বা সাহিত্যিক হিসাবে ক্ষীর খাওয়াও বন্ধ হবে না।

এঁরাই বঙ্গ সিপিএম নেতৃত্বের কাছের লোক, ভালবাসার লোক। এঁরাই বিবেকবান ধর্মনিরপেক্ষ বুদ্ধিজীবী হিসাবে রিপাবলিক বাংলায় গিয়ে গিয়ে চ্যানেলটিকে ভদ্রলোক সদস্য সমর্থকদের মধ্যে বৈধতা পাইয়ে দিয়েছেন। ফলে সেই ভদ্রলোকরা দিনরাত প্রাক্তন এসএফআই অ্যাংকরের বিষ গিলে গিলে সিপিএমের মিছিলে যান, ফেসবুকে মীনাক্ষীর বক্তৃতা শেয়ার করেন আর ভোট দেন বিজেপিকে। তমন্নার মৃত্যুতে এই ভদ্রলোকদের কোনো তাপ উত্তাপ নেই, কারণ ‘এ তো ওদের নিজেদের মধ্যে ঝামেলা। ওরা তো এইসবই করে। ভোটের দিন মারামারিগুলোও তো ওরাই করে।’ বোঝাই যাচ্ছে, এই ‘ওরা’ কিন্তু তৃণমূল কংগ্রেস নয়। যতই সিপিএম ও অন্য বামেরা ফেসবুকে ডিমের কুসুমের ছবি দিয়ে ময়ূখ ঘোষকে নিয়ে হাসিঠাট্টা করুন, বাঙালি ভদ্রলোক ভোটারদের অনেকের মস্তিষ্ক কিন্তু ময়ূখের পায়েই জমা পড়েছে। তাই এই ভদ্রলোক ভদ্রমহিলাদের কাছে তমন্না কোনো বাচ্চা মেয়ে নয়, মুসলমান মেয়ে। এই শ্রেণির ভোটের জন্যেই আবার আজকের সিপিএমের যৎসামান্য সাধনা। নইলে তমন্নার মৃত্যু নিয়ে শুধু কালীগঞ্জ নয়, পশ্চিমবঙ্গের পাড়ায় পাড়ায় মিছিল হওয়া উচিত ছিল। রাস্তা অবরোধ, রেল অবরোধ হওয়া উচিত ছিল। কবে বামপন্থীরা এক পয়সা ট্রামভাড়া বৃদ্ধি নিয়ে আক্ষরিক অর্থে আগুনে আন্দোলন করেছিল, সে ইতিহাস জানতে হবে না। তাপসী মালিকের মৃত্যু নিয়ে মমতা ব্যানার্জি কী করেছিলেন মনে করুন, তাহলেই বোঝা যাবে কী বলছি। অমন করেছিলেন বলেই তাপসীকে কেউ ভোলেনি, কিন্তু তমন্নাকে আমরা আজই ভুলে যাব দিঘার রথযাত্রা দেখতে দেখতে। শুধু তাই নয়, অমন করেছিলেন বলেই পশ্চিমবঙ্গের ইতিহাসে সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত সরকার চালানো সত্ত্বেও, তৃণমূল স্তরের মানুষ তাঁর দলের তোলাবাজিসহ নানাবিধ অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে গেলেও, প্রশাসন বলে রাজ্যে কার্যত কিছু না থাকলেও, স্কুল থেকে হাসপাতাল পর্যন্ত নৈরাজ্যের চূড়ান্ত হলেও মমতার জনপ্রিয়তা কমছে না।

অন্যদিকে প্রত্যেকটা নির্বাচন, উপনির্বাচনের পরে সিপিএম কর্মীরা কী করেন? কংগ্রেসের সঙ্গে জোট থাকা উচিত কি উচিত নয়, অন্য বাম দলগুলোর সঙ্গে ঐক্য গড়ে তোলা উচিত কি উচিত নয় – এই নিয়ে ফেসবুকে নিজেদের মধ্যে তর্ক করেন। বড়জোর ‘এত কিছুর পরেও যদি লোকে এদের ভোট দেয়, তাহলে আর কিছু বলার নেই’ বলে বিলাপ করেন। গত লোকসভা নির্বাচন পর্যন্ত লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের নাম করে পশ্চিমবঙ্গের গরিব মানুষকে ভিখিরি বলাও চালু ছিল, সেবার রাজ্য সম্পাদকের কড়া মন্তব্যের পর ওটা বন্ধ হয়েছে। কালীগঞ্জের উপনির্বাচনে বিপুল ভোটে হারের পরেও একই ঘূর্ণিতে ঘটনা ঘুরপাক খাচ্ছে। তমন্নার মৃত্যু দেখার পর আরও বেশি করে এক দল সিপিএম সোশাল মিডিয়ায় ঝড় তুলছেন এই বলে, যে বামফ্রন্ট ব্যাপারটা আর রাখার দরকার নেই। যেন ওটা ভেঙে দিলেই লোকে হইহই করে ওঁদের ভোট দিয়ে দেবে আর ২০২৬ সালে অষ্টম বামফ্রন্ট, থুড়ি, প্রথম সিপিএম সরকার এসে যাবে। আসল সমস্যা হল, এখন বাংলায় সিপিএম বলতে পড়ে আছেন নিচের তলার কিছু লড়াকু কর্মী, যাঁদের নেতারা নানা অজুহাতে লড়তে দেন না। আর আছে সোশাল মিডিয়ার শম সিপিএম, যাদের কথা এতক্ষণ সবিস্তারে বললাম। বিশ্বাস হচ্ছে না? রাগ হচ্ছে? আচ্ছা দেখুন।

তমন্না খুন হল ২৩ জুন, আর ২৬ জুনের সংস্করণে সিপিএমের দলীয় মুখপত্র গণশক্তি খবর দিল ‘কালীগঞ্জে নিহত শিশুকন্যা তামান্না খাতুনের গ্রামে আগামী শনিবার যাবেন সিপিআই(এম)’র রাজ্য সম্পাদক মহম্মদ সেলিম, পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য মীনাক্ষী মুখার্জি সহ পার্টি নেতৃবৃন্দ। স্থানীয় মানুষজনকে নিয়ে সেখানে প্রতিবাদ সভায় অংশ নেবেন তাঁরা। বুধবার সিপিআই(এম)’র রাজ্য কমিটির বৈঠকের শেষে সাংবাদিক বৈঠক করে একথা জানিয়ে মহম্মদ সেলিম বলেছেন, খুনের অভিযোগে এফআইআর-এ নাম থাকা দুষ্কৃতীদের এখনও গ্রেফতার করা হয়নি। তৃণমূলের ঝাণ্ডা নিয়ে তারা এখনও ঘুরে বেড়াচ্ছে।’ অর্থাৎ কমরেডের শিশুকন্যাকে কারা খুন করেছে তা জানেন রাজ্য সম্পাদক। ফলে ধরে নেওয়া যায় রাজ্য কমিটির সকলেই জানেন। পুলিস যে নিষ্ক্রিয় তাও জানেন। তবু তাঁরা কমরেডের পরিবারের কাছে ছুটে না গিয়ে, পুলিসের কৈফিয়ত না চেয়ে রাজ্য কমিটির বৈঠক চালিয়ে যাচ্ছিলেন। সাংবাদিক নয়, স্রেফ নাগরিক কৌতূহল থেকেই জানতে ইচ্ছে করে – কী এমন গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা চলছিল রাজ্য কমিটিতে? ২৫ তারিখ রাজ্য কমিটির বৈঠক শেষ হয়ে যাওয়ার পরেও কালীগঞ্জ পৌঁছতে ২৮ তারিখ হবে কেন? কলকাতা থেকে কালীগঞ্জের দূরত্ব কি রেলপথে কোচির চেয়েও বেশি? নাকি ২৬, ২৭ জুড়ে পশ্চিমবঙ্গে বিপ্লব করে তৃণমূল সরকারকে উচ্ছেদ করে ফেলবে বঙ্গ সিপিএম? তারপর ২৮ তারিখ তমন্নার বাড়ি গিয়ে তার মা-বাবার হাত ধরে সেলিম বলবেন ‘কমরেডস, আপনাদের মেয়েকে তো ফিরিয়ে আনতে পারব না, কিন্তু যারা তাকে খুন করেছে তাদের শাস্তির পাকা ব্যবস্থা করে এসেছি’? সত্যি সত্যি এমন ঘটা দূরে থাক, টলিপাড়ার কোনো মার্কামারা সিপিএম পরিচালকের এই দৃশ্যটা লেখার পরিস্থিতিও কি তৈরি করতে পারা গেছে রাজ্য কমিটির মিটিংয়ে?

অবশ্য ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদের এই রমরমার যুগে কে কার কমরেড? শব্দটা এখন বাম বৃত্তে কোনো কারণে ঢুকে পড়া নারী পুরুষের মুখস্থ বুলি মাত্র। সত্যি সত্যি সিপিএমে কমরেড কথাটার কোনো দাম থাকলে রাজ্য কমিটির অফিসে বসে সাংবাদিক সম্মেলন করে কীভাবে একজন কমিউনিস্ট পার্টির নেতা বলতে পারেন, তিনি নিজের বাবার টাকায় বিলাসবহুল গাড়ি কিনেছেন বেশ করেছেন? বিজেপির নির্বাচনী প্রচারের ভিডিওতে মুখ দেখানো শিল্পীদের পার্টির কর্মসূচিতে নিয়ে আসার পরেও তিনি শাস্তিই বা এড়ান কী করে? কোন সম্মেলনে কে কাকে ভোটে হারিয়ে পদাধিকারী হলেন, কার সঙ্গে কার হাতাহাতি হল – সে খবরই বা সংবাদমাধ্যমে দিনের পর দিন এসে পড়ে কী করে? কীভাবে সামান্য যুব সংগঠনের সম্মেলনে কোনো পদ না পেয়ে কেউ সোশাল মিডিয়ায় পোস্ট করতে পারে, সে নেতা হল না বলে আগামীদিনে সংগঠনের কাছে কেউ মূত্রত্যাগ করতেও যাবে না?

লেখাটায় সাংবাদিকসুলভ নৈর্ব্যক্তিকতা থাকছে না, তাই না? থাকা উচিতও নয়। কারণ সাংবাদিকও মেয়ের বাবা। রাজ্যটার হাল দেখে স্পষ্ট বুঝতে পারছি, সর্বাঙ্গ পচে গেছে। এই রাজ্যে আমি থাকি, আমার মেয়ে থাকে। কেন নৈর্ব্যক্তিক হতে যাব? ‘সর্বাঙ্গ’ কথাটা পছন্দ হচ্ছে না? আচ্ছা সবিস্তারে বলি। সিপিএম তো শূন্য, আপনারা যাদের ভোট দিয়ে রাজ্যের বিরোধী দল বানিয়েছেন তাদের দিকেই তাকিয়ে দেখুন। শুভেন্দু অধিকারী, সুকান্ত মজুমদাররা সারাক্ষণ গরম লোহার মত বাক্যবাণ নিক্ষেপ করেন পশ্চিমবঙ্গ সরকারের দিকে, অথচ দু-চার লাইন আইসক্রিমের মত ঠান্ডা বিবৃতি দিয়েছেন তমন্নার ঘটনা নিয়ে। তৃণমূল বিধায়কের আনা টাকা ফিরিয়ে দেওয়ার জন্যে কিঞ্চিৎ প্রশংসা করেছেন তমন্নার মায়ের। তাঁকে কোনো অজ্ঞাত কারণে বেগম রোকেয়ার সঙ্গে তুলনা করেছেন। বোধহয় আরবি নামের জন্যে। আসলে তমন্না, সাবিনারা রোকেয়ার মত আরবি নামের বাঙালি বলেই তো এই নিয়মরক্ষা। যদি মেয়েটার নাম হত তৃণা বা মণি, তাহলেই ব্যাপারটাকে জাতীয় স্তরে নিয়ে ফেলতেন ওঁরা। প্রধানমন্ত্রী এক্সে পোস্ট করতেন, অমিত মালব্য ও সম্প্রদায় পশ্চিমবঙ্গে হিন্দুরা কত বিপন্ন – তার অজস্র বানানো প্রমাণ ছড়াতে শুরু করতেন।

কিন্তু ভেবে দেখুন তো, দোষগুলো কি শুধু তৃণমূল-সিপিএম-বিজেপির মধ্যে সীমাবদ্ধ? মেয়েটার নাম তমন্না বলে আর সুদূর নদিয়ার কালীগঞ্জের বাসিন্দা বলেই কি ‘কোনো রাজনৈতিক দলকে আমাদের আন্দোলনে ঢুকতে দেব না’ বলে চিৎকার করা নারীবাদী নেত্রীরা আজ চুপ নন? যে কোনো দলের কলকাতার নেতার মেয়ে এভাবে খুন হলেও কি চুপ থাকতেন তাঁরা? ‘ওকে সেই ছোট থেকে দেখেছি’ বলে টিভি ক্যামেরায় বাইট দেওয়া শুরু হত না? তৃণমূলের নেতা, কর্মীরা যে দুর্নীতি করেন তাকে কি গোটা বঙ্গসমাজই আসলে প্রশংসার দৃষ্টিতে দেখে না? বছর বিশেক আগেও পাড়ায় ঘুষখোর সরকারি অফিসার বা দু নম্বরি ব্যবসায়ী থাকলে, তার ধোপা নাপিত বন্ধ না করলেও, সকলে তাকে একটু এড়িয়ে চলত। সে বাড়িতে ঘটা করে লক্ষ্মীপুজো, সরস্বতীপুজো বা লোকনাথ বাবার জন্মতিথি পালন করে লোক খাওয়ালে বাড়ি ফিরে নিমন্ত্রিতরাই আলোচনা করত ‘পাপের টাকা তো, এসব করে পাপ ধোয়ার চেষ্টা করে আর কি।’ আজ কিন্তু কারোর আঙুল ফুলে কলাগাছ হলে কেউ খোঁজ করে না – এত টাকা পেল কোত্থেকে। বরং তাকেই সফল লোক বলে মেনে নেয় সকলে। কেউ প্রশ্ন তুললে তার সম্পর্কে বলাবলি করে ‘যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে হবে তো। নিজে পারেনি বলে হিংসে করছে।’ সিপিএমের মত আলস্য, দিশাহীনতা এবং কোনো ত্যাগস্বীকার না করেই দাবি আদায় করা যাবে – এরকম মনোভাবও তো আমাদের সকলেরই।

দেখে শুনে মনে হয়, তমন্না মরে গিয়ে বেঁচে গেল। ওর মত মেয়ের জন্যে আমাদের গ্রামে পড়ার স্কুল নেই, কলেজগুলোও ধুঁকছে। কলেজ পেরিয়ে আরও বড় কোথাও, ভাল কোথাও সে পৌঁছতে পারত – এমন ভাবনাও হাস্যকর। অল্প বয়সে বিয়ে হয়ে অপুষ্টিতে ভোগা বাচ্চার মা হওয়া ছাড়া আর কোন ভবিষ্যৎ রেখেছিলাম আমরা ওর জন্যে? সে ভবিষ্যৎও তো সুস্থ শরীরে বড় হলে। তার আগেই নির্জন মাঠে বা বনে বাদাড়ে নিয়ে গিয়ে যদি ওকে ফুর্তি করে শেষ করে দিত কোনো নরপশু? এমন তো হামেশাই হচ্ছে আমাদের চারপাশে। অপরাধীরা অনেকে আবার গায়ে হাওয়া লাগিয়ে ঘুরেও বেড়াচ্ছে। যদি ধরে নিই, এসব কিছুই হত না, বড় হয়ে একটা সুস্থ স্বাভাবিক জীবন পেত আমাদের তমন্না, তাতেও কি শান্তি থাকত? চারদিকে ব্যাঙের ছাতার মত এত ঘৃণার ফসল ফলেছে আমাদের এই বাংলায়, যে একটা মেয়ে অন্য ধর্মের ছেলেকে বিয়ে করেছে বলে সম্প্রতি তার শ্রাদ্ধ করেছে পরিবার। এই ঘৃণা কখন কাকে গিলে ফেলে কোনো ঠিক আছে? আমাদের কি আর কোনো অধিকার আছে সন্তানের জন্ম দেওয়ার? আমাদের ‘জীনে কি তমন্না’ তো ‘মারনে কা ইরাদা’ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

নাগরিক ডট নেট ওয়েবসাইটে প্রকাশিত

বাংলা মাধ্যম স্কুলের পর বাংলা সিনেমা উঠে যাওয়ার পালা?

নয়ের দশক থেকে কলকাতার বড় বড় সংবাদমাধ্যম যে শহুরে দরকচা মারা ছবিগুলোকে বাংলা ছবির পুনরুত্থান বলে দাগিয়ে দিল, সেগুলো বস্তুত বিভিন্ন মেজ সেজ ফেস্টিভালে পুরস্কার জেতা ছাড়া বাংলা ছবির হোমেও লাগেনি যজ্ঞেও লাগেনি।

এখনো বছরে যে দু-চারটে দিন পশ্চিমবঙ্গের বাঙালির নিজস্ব সংস্কৃতির জন্য গর্ববোধ হয় এবং সেটাকে বাঁচানো প্রয়োজন বলে মনে হয়, আজ তার মধ্যে এক দিন। আজ বাংলা সিনেমার আন্তর্জাতিকভাবে সবচেয়ে উদযাপিত পরিচালক সত্যজিৎ রায়ের জন্মদিন। মুর্শিদাবাদোত্তর, পহলগামোত্তর বাঙালি ভদ্রলোক-ভদ্রমহিলার সহসা নিজের হিন্দু সত্তা আবিষ্কার এবং দিঘার উপকূলে তাঁদের আদরের রামমোহন-বিদ্যাসাগর-রবীন্দ্রনাথ-নজরুলের প্রগতিশীলতা জগন্নাথদেবের পায়ে সঁপে দেওয়ার পর বলতে হবে, কপাল জোরে এই দিনটা পাওয়া গেছে। কেবল আজকের দিনেই বাংলা সিনেমা সম্পর্কে কখানা কথা লিখলে কেউ কেউ হয়ত গুরুত্ব দিয়ে পড়বেন। আগামীকালই আর তা হবে না। কারণ বিষয় হিসাবে কাশ্মীর-মুসলমান-পাকিস্তানের সহজ সমীকরণ বা কার বাড়িতে দিঘার মন্দিরের প্রসাদ পৌঁছল আর কোথায় পৌঁছল না, তা বাংলা সিনেমার হাল হকিকতের চেয়ে অনেক বেশি মুখরোচক।

সাংবাদিকতার সাবেকি নিয়ম মেনে সাম্প্রতিকতম ঘটনাটার উল্লেখ করেই আলোচনা শুরু করা যাক। গত বুধবার (৩০ এপ্রিল) বাংলা ছবির ছজন পরিচালক – অনির্বাণ ভট্টাচার্য, ইন্দ্রনীল রায়চৌধুরী, কিংশুক দে, পরমব্রত চট্টোপাধ্যায়, বিদুলা ভট্টাচার্য, সুদেষ্ণা রায় – একখানা মিনিট পনেরোর ভিডিও বার্তা প্রকাশ করেছেন। সে বার্তা টালিগঞ্জের কলাকুশলীদের প্রতি। ভিডিওতে বলা হয়েছে যে টালিগঞ্জ পাড়ার ফেডারেশন – যার সভাপতি পশ্চিমবঙ্গ সরকারের মন্ত্রী অরূপ বিশ্বাসের ভাই স্বরূপ বিশ্বাস – এবং এই পরিচালকরা, এখন বিবদমান। যাঁরা বাংলা কাগজগুলোর বিনোদনের পাতায় নিয়মিত চোখ বোলান, তাঁদের কাছে এটা খবর নয়। কিন্তু পরিচালকরা বলছেন – কলাকুশলীদের ফেডারেশনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে যে পরিচালকরা কলাকুশলীদের বিপক্ষে। এই ভিডিও নির্মাণের উদ্দেশ্য – সেই ‘ভুল’ ধারণা দূর করা।

ভিডিওটা না দেখে থাকলেও, এই পর্যন্ত পড়েই বুঝতে অসুবিধা হওয়ার কথা নয় যে গণ্ডগোল এতদূর গড়িয়েছে, এ রাজ্যের সমস্ত বিবাদেরই নিষ্পত্তি করে দেওয়ার ক্ষমতা ধরেন যিনি, তাঁর উপরেও ভরসা রাখতে পারেনি কোনো পক্ষই। টালিগঞ্জ মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জির বাসস্থান থেকে বেশি দূরে নয়। তার উপর ফেডারেশন সভাপতি তাঁরই মন্ত্রিসভার সদস্যের ভাই। তা সত্ত্বেও তাঁরা দিদির হস্তক্ষেপে পরিচালকদের সঙ্গে বিবাদ মিটিয়ে নেননি। নিলে পরিচালকরা এই অভিযোগ করতেন না। আবার পরিচালকরাও মুখ্যমন্ত্রীর ছত্রছায়ায় গেলেই নিজেদের অভাব অভিযোগ দূর হবে – এ বিশ্বাস রাখতে পারেননি। ফলে ভিডিও করে ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির ভিতরের বিবাদ প্রকাশ্যে এনে ফেলেছেন। পুরো ভিডিও দেখলে মালুম হয় – বাধ্য হয়েছেন।

কেন হল এরকম?

সংবাদমাধ্যমে আগে প্রকাশিত হয়েছে, এই ভিডিওতেও পরিচালকরা জানিয়েছেন যে তাঁরা মুখ্যমন্ত্রীর কাছে যাননি তা নয়। মুখ্যমন্ত্রী তাঁদের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন যে তিনি একটি কমিটি তৈরি করে দেবেন, যে কমিটি সব পক্ষের কথাবার্তা শুনে বিবাদ মেটানোর ব্যবস্থা করবে। কিন্তু সেই কমিটি গঠন করতে গেলে যে সরকারি বিজ্ঞপ্তি জারি করতে হয়, সেটাই পরবর্তী তিন মাসে হয়নি। পরিচালকরা তারপরেও এক মাস অপেক্ষা করেন। সরকার নট নড়নচড়ন। পরিচালকদের একাধিক ইমেলেরও জবাব দেওয়া হয়নি। অতঃপর তাঁরা সাংবাদিক সম্মেলন করে ফেডারেশনের কীর্তিকলাপ সম্পর্কে সর্বসমক্ষে অভিযোগ করেন। এই তাঁদের মহাপাপ। পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন প্রান্তে বিভিন্ন পেশার মানুষ জানেন, কর্মস্থলে যা অত্যাচার অবিচার হয় সেসব নিয়ে প্রকাশ্যে কথা না বলাই দস্তুর। সমাধান চাইলে যাঁরা অত্যাচার অবিচার করলেন তাঁদের কাছেই হাতজোড় করে দাঁড়ানো নিয়ম। তাঁরা সদয় না হলে খুব বড় অপরাধেও পুলিস এফআইআর নিতে চায় না। সেখানে এই পরিচালকরা একেবারে সাংবাদিক সম্মেলন করে বসলেন! ঘাড়ে কটা মাথা! ভিডিওতে পরিচালকদের অভিযোগ – এরপর থেকেই শুরু হয় সেই সাংবাদিক সম্মেলনে উপস্থিত পরিচালকদের কাজ করতে না দেওয়ার ব্যবস্থা। ওঁদের শুটিংয়ে কলাকুশলীদের কাজ করতে বারণ করা হয়। তার ফলেই নাকি তাঁরা (এই ছজন সমেত মোট ১৫ জন পরিচালক) আদালতের দ্বারস্থ হয়েছেন।

যে বাংলায় পুলিসে যাওয়াই সাধারণ মানুষের পক্ষে স্থানে স্থানে মহাপাতক, সেখানে একেবারে কলকাতা হাইকোর্টে ফেডারেশনের সর্বময় কর্তার বিরুদ্ধে মানহানির মামলা করে বসেছেন এঁরা। সে মামলার ইতিমধ্যেই দুটি শুনানি হয়েছে, সে খবর সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিতও হয়েছে। বিচারপতি অমৃতা সিনহা যে নির্দেশগুলো দিয়েছেন তাতে পরিচালকদের হাত শক্ত হয়েছে। তিনি স্পষ্ট বলেছেন, পরিচালকদের কাজে ফেডারেশন কোনো হস্তক্ষেপ করতে পারবে না। এমনকি যে ইউনিক কার্ড ফেডারেশনের তুরুপের তাস, যা না থাকলে সিনেমাপাড়ায় কাউকে কাজ করতে দেয় না তারা, সেই কার্ডকেও মূল্যহীন বলেছেন বিচারক। কিন্তু হলে হবে কী? আদালত নির্দেশ দিলেই মানব – এত সুবোধ বালকদের রাজ্য পশ্চিমবঙ্গ নয়। ওই নির্দেশের পরেও সুদেষ্ণা রায়ের ছবির শুটিং শুরু করতে গিয়ে ঠিক তাই ঘটেছে, যা রাহুল মুখার্জির ছবির শুটিং নিয়ে গতবছর জুলাই মাসে ঘটায় টলিপাড়ার সমস্ত কাজ বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। অর্থাৎ শুটিং সূচি ঘোষণা হওয়ার পরেও একজন কুশীলবও কাজ করতে আসেননি।

সেই থেকে অচলাবস্থা চলছে টালিগঞ্জে। মুখ্যমন্ত্রী হয় মেটাননি, অথবা ধরে নিতে হবে, তাঁর নির্দেশকেও অগ্রাহ্য করার মত শক্তি টলিপাড়ার দণ্ডমুণ্ডের কর্তা স্বরূপবাবুর আছে। আদালতের নির্দেশের পরেও সুদেষ্ণার ছবির কাজ বাতিল হয়ে যাওয়ায় আদালত অবমাননা হয়েছে কিনা, হয়ে থাকলে স্বরূপবাবু বা অন্য কেউ শাস্তির পাত্র কিনা, নাকি গোটা ঘটনায় তাঁর কোনো ভূমিকাই নেই – তার বিচার আদালতে হবে। কিন্তু সাড়ে ১৫ মিনিটের ভিডিওতে পরিচালকরা অভিযোগ করেছেন যে ফেডারেশনের ভয়েই কুশীলবরা নির্দিষ্ট কিছু পরিচালকের ছবিতে কাজ করতে আসছেন না। একথা সত্যি না মিথ্যা তা বলা মুশকিল, তবে হাইকোর্ট যে এই অভিযোগকে সত্যি বলেই গণ্য করেছে তার ইঙ্গিত বিচারপতির নির্দেশে রয়েছে। স্বরূপবাবু অবশ্য প্রকাশ্যে খুবই ভদ্রলোক। যতবার সংবাদমাধ্যম তাঁর কাছে এই গণ্ডগোল নিয়ে কিছু জানতে চায়, তিনি হয় বলেন আদালতে বিচারাধীন বিষয়ে কোনো মন্তব্য করবেন না, নতুবা বলেন এসব তাঁর ফেডারেশনের বিরুদ্ধে চক্রান্ত। যেমনটা বুধবারের ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পরে বলেছেন

পশ্চিমবঙ্গে এখন বিরাট বিরাট ঘটনা ঘটছে। শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মীদের নিয়োগ দুর্নীতির ফলে এক লপ্তে ২৬,০০০ মানুষের চাকরি গেছে। এদিকে মুর্শিদাবাদের দাঙ্গা এবং পহলগামের সন্ত্রাসবাদী হামলার পর সাম্প্রদায়িকতার সমস্যাও বাংলার বাসিন্দাদের এ রাজ্যে এবং ভিনরাজ্যে নানাভাবে বিপদে ফেলছে। সরকারি টাকায় মন্দির তৈরি এবং তার উদ্বোধন উপলক্ষে ঘুরপথে আমিষ খাওয়াদাওয়া বন্ধ করার চেষ্টার মত অভূতপূর্ব ঘটনাও ঘটে গেছে। এতকিছুর মধ্যে বাংলা সিনেমার জগতে কী হচ্ছে না হচ্ছে তা নিয়ে দীর্ঘ লেখা ফেঁদে বসার কী দরকার? প্রশ্নটা সঙ্গত এবং উত্তরটা জরুরি।

যা যা ঘটছে সবই রাজনৈতিক এবং সিনেমাপাড়ায় যা ঘটছে তাও মোটেই অরাজনৈতিক নয়। একেবারে গোদা অর্থে রাজনৈতিক তো বটেই, কারণ পরিচালকদের অভিযোগের তির শাসক দলের নেতা স্বরূপবাবুর দিকে। কিন্তু কেবল দলীয় রাজনীতির কথা ভাবলে চলবে না। জুলাই মাস থেকে এ পর্যন্ত ঘটনা পরম্পরা লক্ষ করলে বোঝা যায় যে টালিগঞ্জের এই ‘বিদ্রোহী’ পরিচালকরা যে অভিযোগ করছেন, তার সঙ্গে আর জি কর কাণ্ডের পর রাজ্যের বিভিন্ন মেডিকাল কলেজের ডাক্তাররা যে অভিযোগ করেছিলেন তার কোনো মৌলিক তফাত নেই। দুই ক্ষেত্রেই মূল অভিযোগ হল – হুমকি সংস্কৃতি চলছে। চোখ রাঙিয়ে, ভয় দেখিয়ে এক পক্ষ তাদের যা ইচ্ছে তাই করিয়ে নিতে চাইছে। প্রতিবাদ করলে কাজ করতে দেওয়া হচ্ছে না। ঠিক যেভাবে সেকালে গ্রামদেশে মোড়লের বিরুদ্ধাচরণ করলে ধোপা নাপিত বন্ধ করিয়ে দেওয়া হত।

আমি, আপনি কোন ছার; রুপোলি পর্দার লোকেরা, তারকারা, এরকম ভয়ের পরিবেশে কাজ করতে হচ্ছে বলে অভিযোগ করছেন। ব্যাপারটা এই রাজ্যের শুভাকাঙ্ক্ষী সকলকে ভাবিয়ে তোলার মত। শাসক দলের অনুগতরা টালিগঞ্জ পাড়ায় কলাকুশলী হিসাবে কাজ পায়, ছবিতে কাজ করতে যত লোক লাগা উচিত চাপ দিয়ে তার চেয়ে বেশি লোককে কাজ পাইয়ে দেওয়া হয় – এসব অভিযোগ যে তৃণমূল সরকারের আমলেই প্রথম উঠছে এমন নয়। কিন্তু কথা হল, স্বাস্থ্যবান মানুষের খানিকটা রক্ত মশা খেলে বিশেষ ক্ষতি হয় না। কিন্তু যে রক্তাল্পতায় ভুগছে তাকেও যদি রোজ একপাল মশা ছেঁকে ধরে, তাহলে অল্পদিনেই মৃত্যু অবশ্যম্ভাবী। ইন্ডাস্ট্রি হিসাবে বাংলা ছবি এখন সেই স্তরে পৌঁছে গেছে, অথচ ফেডারেশনের প্রতাপ কমছে না। ফলে কাজ আরও কমে যাচ্ছে। ২০২৪ সালে মাত্র ৩৬ খানা ছবি তৈরি হয়েছে, যা নাকি গত ১৫ বছরে সর্বনিম্ন। ফেডারেশনের উদ্ভট সব নিয়মের ঠ্যালায় (পড়ুন দাবির ঠ্যালায়, কারণ আইনত কোনো নিয়ম বানানোর অধিকার ফেডারেশনের নেই) বাংলা ছবির প্রযোজকের সংখ্যা কমছে, বাইরের কোনো ফিল্ম ইউনিটও আর পারতপক্ষে কলকাতায় শুটিং করতে আসছে না। বাংলা ছবির অভিনেতারা কাজের অভাবে কেউ মুম্বাই পাড়ি দিচ্ছেন, কেউ ইউটিউব চ্যানেল খুলে টক শো চালাচ্ছেন, কেউ অন্য ব্যবসাপত্র খোলার কথা ভাবছেন। বেশকিছু উল্লেখযোগ্য ছবির পরিচালক ইন্দ্রাশিস আচার্য, কেবল সিনেমা করে জীবিকা নির্বাহ করা শক্ত হয়ে দাঁড়াচ্ছে – একথা স্পষ্টাস্পষ্টি বলে গতবছর কর্পোরেট চাকরিতে যোগ দিয়েছেন। কিন্তু অভিনেতা, পরিচালকদের হাতে না হয় এসব বিকল্প রয়েছে। যাঁরা মেক আপ করেন, আলোর কাজ করেন, জুনিয়র আর্টিস্ট হিসাবে কাজ করেন অথবা স্রেফ সেটে ফাইফরমাশ খাটেন – তাঁদের তো আর নেই। এমন চললে তাঁরা যাবেন কোথায়? ফেডারেশন নিজেদের যাদের লোক বলে দাবি করছে, তাঁদেরই তো আক্ষরিক অর্থে পথে বসতে হবে। সান্ত্বনা হিসাবে তখন বড়জোর বলা যাবে ‘মনখারাপ করবেন না। আপনাদের আগে ডাক্তার আর শিক্ষকরাও পথে বসেছেন।’

গুন্ডামিই আইন হয়ে দাঁড়াবে, তার সঙ্গে আপোস করে স্রেফ নিজেরটুকু নিয়ে ভেবে তথাকথিত ‘ফার্স্ট বয়’-রা ছবি বানাবেন, বিশেষ ক্ষমতাশালী নায়কের ছবি নিয়ে বিপুল সোশাল মিডিয়া প্রচার চলবে – মাঝরাতে অমুক জায়গায় শো হাউসফুল, তমুক ছবি ব্লকবাস্টার। আর যাঁরা ইন্ডাস্ট্রির দমবন্ধ করা বর্তমান ও ভয়াবহ ভবিষ্যৎ ভেবে প্রতিবাদ করবেন তাঁদের একঘরে করা হবে। ফলে ইন্ডাস্ট্রিতে ক্রমশ কাজ কমবে। এভাবে ধুঁকতে ধুঁকতে একটা ভাষার ছবি কতদিন বেঁচে থাকতে পারে? এমনিতেই দুনিয়া জুড়ে সিনেমাশিল্পের এক ধরনের সংকট চলছে। হলিউড বা বলিউডও তার বাইরে নয়। তার উপর টলিউডের মত ছোট বাজারসম্পন্ন, আগে থেকেই দুর্বল হয়ে থাকা ইন্ডাস্ট্রিতে যদি সিনেমার বাইরের লোকেদের গা জোয়ারিই শেষ কথা হয়ে দাঁড়ায়, তাহলে বাংলা ছবি বাঁচবে কী করে?

বাঙালিদের মধ্যে এমন সিনেমাবোদ্ধার অভাব নেই, যাঁরা নাকটা আকাশের দিকে তুলে বলবেন ‘বাংলা ছবি না বাঁচলেই বা কী? যা সব ছবি বানায়…’। একথার উত্তর দেওয়ার আগে কতকগুলো তেতো কথা বলা দরকার।

প্রথমত, ফেডারেশন বনাম পরিচালকদের দ্বন্দ্ব টলিউডের যে কঙ্কালসার চেহারা তুলে ধরেছে তা দিয়ে শৈল্পিক দিক থেকে ভাল ছবি হওয়া অসম্ভব বললেই চলে। প্রয়াত অশোক মিত্রের কথা ধার করে বলতে হয়, অভাবের সংসারে ‘তেইশ বছরের আপাত-উঠতি শরীরেও, স্তন আর স্তন থাকে না, দুদিনেই তা হেলে প’ড়ে মাই হয়ে যায়।’ আজকাল বাংলা পূর্ণদৈর্ঘ্যের ছায়াছবির শুটিং হয় ১৪-১৫ দিনে। এতেই মাস্টারপিস বানাতে গেলে নির্দেশক, চিত্রগ্রাহক, সঙ্গীত পরিচালক, অভিনেতা – সকলকেই জিনিয়াস হতে হবে। একসঙ্গে এত জিনিয়াস কোনো দেশে কোনোকালেই সুলভ ছিল না।

আরও পড়ুন সিনেমার হাত ধরে ভারতীয়দের বিশ্বজয় চলছে বহুকাল ধরে 

দ্বিতীয়ত, যে তিন বাঙালি পরিচালককে জিনিয়াস গণ্য করে আজকাল আমরা বুক ফোলাই, তাঁদের কর্মজীবনে মোটেই সমস্ত ছবি হল ভরে দেখতে যায়নি বাঙালি দর্শক। গেলে ঋত্বিক ঘটক হতাশায় ক্রমশ বেশি বেশি করে মদে ডুবে যেতেন না, অকালে মারাও যেতেন না হয়ত। তাঁর মৃত্যুর পরেও কলকাতা এমন কিছু উদ্বেল হয়নি। সত্যজিৎই বাণিজ্যিক সাফল্যের মুখ দেখেছেন অনেকটা। তাও তাঁর সবচেয়ে শৈল্পিক কাজগুলোর চেয়ে বেশি জনপ্রিয় হয়েছে গুগাবাবা, হীরক রাজার দেশে আর ফেলুদার ছবিগুলো। মৃণাল সেনের ছবি তো খুব জনপ্রিয় হওয়ার কথাও নয়। তাঁর বক্তব্য আলাদা, শৈলীও আলাদা। বাংলা ছবিকে বাঁচিয়ে রেখেছিল আসলে সিনেমাবোদ্ধাদের হেলাশ্রদ্ধার পাত্র হয়ে থাকা ছবিগুলো। সেসব ছবি বানাতেন তপন সিংহ, অজয় কর, দীনেন গুপ্ত, অরবিন্দ মুখোপাধ্যায়, তরুণ মজুমদার, প্রভাত রায়, অঞ্জন চৌধুরী প্রমুখ। নিখাদ প্রেমের ছবি বা মজার ছবি, আটপৌরে সাংসারিক জটিলতার ছবি, সাধারণ মানুষের রোজকার সমস্যার ছবি – এসব দেখতে দর্শক হল ভরাত বলে শিল্পী ও কলাকুশলীদের সংসার চলত, প্রযোজকদের ঘরে টাকা আসত। তাই তাঁরা হিট হবে না ধরে নিয়েই সত্যজিৎ বা মৃণালের মত শিল্পীদের ছবিতে টাকা ঢালতে পারতেন। নয়ের দশক থেকে কলকাতার বড় বড় সংবাদমাধ্যম যে শহুরে দরকচা মারা ছবিগুলোকে বাংলা ছবির পুনরুত্থান বলে দাগিয়ে দিল, সেগুলো বস্তুত বিভিন্ন মেজ সেজ ফেস্টিভালে পুরস্কার জেতা ছাড়া বাংলা ছবির হোমেও লাগেনি যজ্ঞেও লাগেনি। এক পর্দার সিনেমা হলগুলো উঠে যাওয়ার আগে থেকেই ওইসব ছবি গ্রাম আর শহরের দর্শকের মধ্যে কাঁটাতার বসিয়ে দিয়েছে। মাল্টিপ্লেক্স এসে সর্বনাশ সম্পূর্ণ করেছে। বিপুল সংখ্যক দর্শক বাংলা ছবির হাতছাড়া হয়ে গেছেন অত টাকার টিকিট কাটার ক্ষমতা নেই বলে আর গ্রামেগঞ্জে সিনেমা হল প্রায় নেই বলে। যাঁরা আছেন, তাঁদের পক্ষে হাতে ইয়াব্বড় পপকর্নের বালতি নিয়ে বাংলা ছবি কেন, কোনো ছবির পাশেই দাঁড়ানো কঠিন। মনোযোগ স্বভাবতই ৪০০ টাকার পপকর্ন নষ্ট না হওয়ার দিকেই রাখতে হবে।

এবার বলা যাক, বাংলা ছবি না বাঁচলে কী হবে। শুধু শিল্পী আর কলাকুশলীদের রুজি রোজগার বন্ধ হবে তা নয়। পৃথিবীর বিশিষ্ট সংস্কৃতিবান জাতিগুলোর অন্যতম হিসাবে বাঙালির যে পরিচিতি, তা অনেকটাই মুছে যাবে। আজ গোটা ভারতকে এক ধর্ম, এক ভাষা, এক সংস্কৃতির দেশ করে তোলার যে আপ্রাণ লড়াই চালাচ্ছে সংঘ পরিবার, তাতে সেটা হবে তাদের গুরুত্বপূর্ণ জিত। আপনি আজ সত্যজিতের অস্কার আর ঋত্বিকের মৃত্যুর এতবছর পরে তাঁকে নিয়ে মার্টিন স্করসেসির মুগ্ধতার কথা শতমুখে বলে সম্মান পান বাংলা সিনেমা বলে একটা কিছুর অস্তিত্ব আছে বলে। না থাকলে যাকেই বলতে যাবেন, সে বলবে ‘হ্যাঁ হ্যাঁ, তোমাদের একসময় নাকি সবই ছিল। এখন কী আছে বলো?’ বাংলা মাধ্যম স্কুলগুলোকে উঠে যাওয়ার দ্বারপ্রান্তে এনে দাঁড় করিয়েছে পশ্চিমবঙ্গ সরকার। এর সঙ্গে বাংলা সিনেমাশিল্পটা তুলে দিতে পারলে সোনায় সোহাগা। পাড়ায় পাড়ায় রবীন্দ্র জয়ন্তী কমে এসেছে অনেকদিন হল, আজ থেকে ৫০ বছর পরে সত্যজিতের জন্মদিন পালন করার লোকও পাওয়া যাবে না।

ব্যাপারটা কিন্তু গভীরভাবে রাজনৈতিক। আপনি মাছি তাড়ানোর ভঙ্গিতে বলতেই পারেন ‘পরমব্রত চাটুজ্জে তো সরকারের দেউচা-পাঁচামির কমিটিতে ঢুকেছিল। এখন বুঝুক ঠ্যালা’, অথবা ‘অনির্বাণ ভটচায্যি তো আর জি করের বেলায় চুপ ছিল। এখন কেন?’, কিম্বা ‘সুদেষ্ণা রায় তো সরকারের কীসব কমিশনের মেম্বার। এদের পাত্তা না দেওয়াই উচিত।’ কিন্তু আপনি যত উদাসীন থাকবেন, আপনার ভাষা-সংস্কৃতির বারোটা বাজানোর জন্যে যে বড় রাজনীতিটা চলছে তার পথ তত পরিষ্কার হবে।

নাগরিক ডট নেট ওয়েবসাইটে প্রকাশিত

এসএসসি: স্থান কাল পাত্র গুলিয়ে যাওয়া সাংবাদিকের স্বীকারোক্তি

কখন সিপিএমের নেতৃত্বে ক্ষমতায় ফিরল বামফ্রন্ট, কখন বিকাশ ভট্টাচার্য মুখ্যমন্ত্রী হয়ে গেলেন, ২৬,০০০-এর বেশি শিক্ষক, শিক্ষাকর্মীর চাকরি খেয়ে নিলেন – কিছুই খেয়াল করলাম না! এর চেয়ে লজ্জার কথা আর কী হতে পারে?

কয়েকদিন হল বেশ লজ্জায় পড়ে গেছি। ২০০৫ সাল থেকে সাংবাদিকতায় আছি। শিশু যেমন হাঁটতে শেখার সময়ে বারবার হোঁচট খায়, পড়ে যায়, তেমন আমিও সাংবাদিকতার শুরুর দিনগুলোতে বিস্তর ভুল করেছি। তখন সিনিয়রদের ধমক খেয়েছি, খেতে খেতে কাজে ভুল কমেছে। সব সাংবাদিকেরই বেড়ে ওঠার এটাই প্রক্রিয়া। তিনি খেলা, গান-নাটক-সিনেমা-সাহিত্য, রাজনীতি, অর্থনীতি – যে শাখার সাংবাদিকই হোন। কিন্তু বিশ বছর কাজ করার পরেও এরকম বিচ্ছিরি ভুল করে ফেলেছি জানতে পারলে আমাকে যাঁরা সাংবাদিকতা শিখিয়েছিলেন তাঁরা আজও কান মুলে দেবেন। খেয়ালই করিনি কবে অষ্টম বামফ্রন্ট সরকার এসে গেছে রাজ্যে।

২০১১ সালে মমতা ব্যানার্জির নেতৃত্বে ক্ষমতায় আসা তৃণমূল কংগ্রেস সরকার কখন পড়ে গেল, কখন সিপিএমের নেতৃত্বে ক্ষমতায় ফিরল বামফ্রন্ট, কখন বিকাশ ভট্টাচার্য মুখ্যমন্ত্রী হয়ে গেলেন, ২৬,০০০-এর বেশি শিক্ষক, শিক্ষাকর্মীর চাকরি খেয়ে নিলেন – কিছুই খেয়াল করলাম না! এর চেয়ে লজ্জার কথা আর কী হতে পারে? একদা এক সম্পাদকের অধীনে কাজ করতাম, তাঁর একটা অদ্ভুত ধারণা ছিল। কোনো সাংবাদিক কাজে ভুল করেছে মানেই নাকি সে কাজ করতে করতে ঘুমোচ্ছিল। ভুলটা যা-ই হোক, যেমনই হোক, ভুলের কারণ যে এই একটাই – সে ব্যাপারে তিনি আশ্চর্য রকমের নিশ্চিত ছিলেন। আমরা যারা তাঁর অধীনস্থ তারা এতে যারপরনাই রেগে যেতাম, কারণ সাংবাদিকদের নানাবিধ চাপের মধ্যে কাজ করতে হয়। রিপোর্টারদের একরকম চাপ থাকে, সাব-এডিটরদের অন্যরকম। একেকটা চাপের কারণে একেকরকম ভুল হওয়া সম্ভব। কিন্তু সকলকেই এত গতির মধ্যে সারাক্ষণ কাজ করতে হয় যে ঘুমোবার বা ঝিমোবার কোনো অবকাশ নেই। ফলে বস ওই অভিযোগ করলে যে কোনো সাংবাদিকের প্রবল ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠাই স্বাভাবিক। অথচ এই যে ভুলটা আমার হল সারাক্ষণ খবরের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকা সত্ত্বেও – এর ব্যাখ্যা সেই খড়্গহস্ত সম্পাদকের অনড় মতটা ছাড়া আর কী দিয়েই বা করা যায়?

২০১৬ সালের এসএসসি পরীক্ষার ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে ছিল তৃণমূল পরিচালিত সরকার দ্বারা নিযুক্ত স্বায়ত্তশাসিত সংস্থা স্কুল সার্ভিস কমিশন। তার আধিকারিকদের নিযুক্ত করেছিল তৃণমূল সরকার। সেবারের এসএসসি পরীক্ষার ফল বেরোবার সময়ে শিক্ষামন্ত্রী ছিলেন তৃণমূল নেতা পার্থ চট্টোপাধ্যায়। পরীক্ষার ফল নির্ধারণে এবং চাকরিতে নিযুক্তির ক্ষেত্রে দুর্নীতি হয়েছে বলে মামলা করেন সেবারে পরীক্ষা দিয়ে চাকরি না পাওয়া প্রার্থীরা। তাঁদের কৌঁসুলি সিপিএম নেতা এবং একদা কলকাতা কর্পোরেশনের মেয়র বিকাশবাবু। তদন্তে পার্থবাবুর বিস্তর স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তির হদিশ মেলে এবং তিনি সমেত যতজন গ্রেফতার হন, সকলেই হয় সরাসরি তৃণমূল কংগ্রেস দলের নেতা, মন্ত্রী, কর্মী; নয়ত কোনো না কোনোভাবে ওই দলের সঙ্গে যুক্ত অথবা তৃণমূল সরকারের আমলে শিক্ষাক্ষেত্রের কোনো প্রশাসনিক পদে ছিলেন।

এই পর্যন্ত জানতাম। কিন্তু ২০১৬ সালের এসএসসি পরীক্ষার নিয়োগ দুর্নীতি সংক্রান্ত মামলায় সুপ্রিম কোর্টের রায় বেরোতেই সব গুলিয়ে গেল। ভিনগ্রহের জীবদের এই গ্রহে আগমন নিয়ে তৈরি হলিউডি ছবিতে যেমন দেখায়, আমার বোধহয় তেমন কোনো অভিজ্ঞতা হয়েছিল যার স্মৃতি মুছে গেছে। ফলে মাঝের সময়টার হিসাব মেলাতে পারছি না। এমনও হতে পারে যে বর্তমান শিক্ষামন্ত্রী, নট ও নাট্যকার ব্রাত্য বসু রচিত উইঙ্কল টুইঙ্কল নাটকের কেন্দ্রীয় চরিত্রটার মত কিছু একটা হয়েছিল আমার। কারণ কখন যে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বিরোধী দলনেত্রী হয়ে গেছেন তা টেরই পাইনি। গতকাল বাড়ির সামনে দিয়ে একটা মিছিল যাচ্ছে আওয়াজ পেলাম। ভাবলাম চাকরিহারাদের দাবি নিয়ে, বা সামগ্রিকভাবে পশ্চিমবঙ্গের স্কুলশিক্ষার দুরবস্থা নিয়ে, বামেদের মিছিল-টিছিল হবে (রামনবমী পেরিয়ে গেছে বলে বিজেপির মিছিল আশা করিনি)। ও মা! বারান্দায় গিয়ে দেখি তৃণমূল ছাত্র পরিষদের মিছিল যাচ্ছে – ধিক্কার মিছিল। ছাব্বিশ হাজার শিক্ষকের চাকরি যাওয়ায় সিপিএম ও বিজেপিকে ধিক্কার। এমনিতেই নিজেকে কেমন ‘টাইম ট্র্যাভেলার’ মনে হচ্ছিল, আরও ঘেঁটে গেলাম কারণ দেখলাম মিছিল যেখান দিয়ে যাচ্ছে, ঠিক সেখানেই একটা দেওয়ালে বিরোধী দলনেত্রী আর তাঁর ভাইপো অভিষেক ব্যানার্জির ছবিওলা একখানা লম্বালম্বি পোস্টার। তাতে সিপিএম যে পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনে শূন্য পাওয়ার হ্যাটট্রিক করে ফেলেছে সেকথা স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়েছে। স্পষ্ট দেখলাম – বছরগুলো হল ২০১৯, ২০২৪, ২০২১।

তৃণমূল
ছবি লেখকের

বিপদটা বুঝুন একবার! ৩ এপ্রিলের পর থেকে সব গুলিয়ে যাচ্ছে দেখে সবে নিজেকে বোঝাতে শুরু করেছিলাম যে কোনোভাবে টাইম মেশিনে চড়ে বসেছি। পিছিয়ে বাম আমলে চলে গেছি। তাই দেখছি নিয়োগ কেলেঙ্কারির জন্যে আগুনে বিরোধী নেত্রী সিপিএমের মুণ্ডপাত করছেন আর তাঁর দলের ছাত্র সংগঠন সরকারকে ধিক্কার জানাতে মিছিল বার করেছে। বেশ করেছে। এত বড় কেলেঙ্কারি যে সরকারের আমলে হয়, যে সরকার যোগ্য শিক্ষক, শিক্ষাকর্মীদের চাকরি যাওয়ার উপক্রম হলেও হাইকোর্ট থেকে সুপ্রিম কোর্টে অযোগ্য ব্যক্তিদের তালিকা দেয় না, সেই সরকারকে ধিক্কার জানানোই তো উচিত। কিন্তু তাহলে পোস্টারে ওই বছরগুলো জ্বলজ্বল করছে কী করে! তবে কি টাইম মেশিন আমাকে ভবিষ্যতে নিয়ে গিয়ে ফেলল? এমনিতেই এখনো আর জি কর কাণ্ডের পর রাজ্যের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তথা স্বাস্থ্যমন্ত্রীর নিজেরই সরকারের বিরুদ্ধে (নাকি ধর্ষকের বিরুদ্ধে?) প্রতিবাদ মিছিলের ধাক্কা এখনো কাটিয়ে উঠতে পারিনি, তার উপর এই? এ যে শিশুর আত্মার উপর নরকের দুঃস্বপ্ন!

যত দিন যাচ্ছে, মাথাটা পরিষ্কার হওয়ার বদলে আরও ঘেঁটে যাচ্ছে। তিন তারিখ এসএসসি মামলায় সুপ্রিম কোর্টের রায় বেরোবার পরে আমরা সকলেই বলছিলাম – যোগ্য ব্যক্তিদের চাকরি যাওয়া অন্যায়। ক্রমশ দেখছি সুরটা বদলে যাচ্ছে। নেতাজি ইন্ডোরের সভা থেকে মুখ্যমন্ত্রীই (নাকি বিরোধী নেত্রী?) বোধহয় অন্য সুর বেঁধে দিলেন। এখন অনেককে বলতে শুনছি – সকলের চাকরি যাওয়াই অন্যায়, অমানবিক। মানে যারা ঘুষ দিয়ে চাকরি পেয়েছে, তাদেরও চাকরি যাওয়া উচিত নয়। মুখ্যমন্ত্রী সেদিন মঞ্চ থেকেই বলেছেন যে আগে তিনি যোগ্যদের ব্যবস্থা করবেন, তারপর যারা অযোগ্য তাদের ব্যাপারটাও দেখবেন। এখন দেখছি চারপাশে অনেকেরই সেরকম মনোভাব। বরং যাঁরা মামলাকারী, অর্থাৎ যাঁরা ২০১৬ সালের এসএসসি পরীক্ষায় বসেছিলেন এবং দুর্নীতির কারণে আদৌ চাকরি পাননি, তাঁদের কথা কাউকে আর বিশেষ বলতে শুনছি না। তাঁদের উকিল বিকাশবাবুকেই যেহেতু এত শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মীর চাকরি হারানোর জন্যে দায়ী করেছেন মমতা, সেহেতু সেই মামলাকারীরাই প্রায় খলনায়ক হয়ে গেছেন অনেকের চোখে। বিশেষত আদালতের রায়ে যাঁরা চাকরি হারিয়েছেন তাঁদের চোখে। পার্থবাবু নির্ঘাত এখন প্রেসিডেন্সি সংশোধনাগারে বসে হাসছেন। এই মামলায় একে একে জামিন পেয়ে বেরিয়ে আসা শুরু হয়ে গিয়েছিল সুপ্রিম কোর্টের রায়ের আগেই, এই সংক্রান্ত আরেক মামলার রায়ে রাজ্য মন্ত্রিসভার অতিরিক্ত পদ তৈরি করার সিদ্ধান্ত নিয়ে সিবিআইয়ের তদন্তও বন্ধ করে দিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট। ফলে পার্থবাবু নিশ্চয়ই অদূর ভবিষ্যতে বসন্তের হাওয়ায় শ্বাস নেবেন বলে আশা করছেন।

পশ্চিমবঙ্গ জটিল জায়গা। আমার মত ঘেঁটে যাওয়া লোকের পক্ষে তো আরও জটিল। চুরি হয়েছে তা প্রমাণিত, কিছু চোর ধরাও পড়েছে। আরও চোর ভিড়ের মধ্যে মিশে আছে বলে আদালত রায় দিয়েছে। অথচ এ রাজ্যে সবাই মিলে বলছে না ‘যারা চোরকে দরজা খুলে দিয়েছে তারা দোষী।’ বরং যারা দরজা খুলে দিয়েছে বলে সন্দেহ, তাদের সঙ্গেই গলা মিলিয়ে অনেকে বলছে ‘যাদের জিনিস চুরি হয়েছে তারা মামলা করল কেন? ও ব্যাটারাই দোষী। ওদের উকিলটাই যত নষ্টের গোড়া।’ আইনের চোখে, বিচারসভায় উকিল যে মক্কেলের চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ, তিনি ভাল লোক না মন্দ লোক তা তিনি কোন মামলায় কাদের হয়ে লড়ছেন তা দিয়ে প্রমাণিত হয় – এ কথাটাও নতুন জানছি। এই যুক্তি সমাজ মেনে নিলে সবচেয়ে বড় বিপদ কিন্তু কোনো কারণে রাষ্ট্রের বা সংখ্যাগুরুর বিরাগভাজন হন যাঁরা, তাঁদের। এমনিতেই ভারতে মাওবাদীদের উকিলকে মাওবাদী বলে দাগিয়ে দেওয়া, সন্ত্রাসবাদী হানার অভিযোগে গ্রেফতার হওয়া মুসলমানদের আইনজীবীকে জেহাদি বলা – এসব চালু আছে। মক্কেল আর তার আইনজীবীকে এক ধরলে গোটা বিচারব্যবস্থারই যে আর কোনো মানে থাকে না তা দেখছি পশ্চিমবঙ্গের প্রগতিশীল, বামপন্থী মানুষরাও অনেকে ভুলে গেছেন। এই যুক্তিতে খুনির উকিলকেও খুনি, ডাকাতের উকিলকেও ডাকাত বলে ধরতে হয়। পশ্চিমবঙ্গ অবশ্য আরও জটিল জায়গা। এখানে যারা দোষী সাব্যস্ত হয়েছে তাদের উকিলদের কেউ দোষী বলছে না (নামও করছে না), অভিযোগকারীদের উকিলকে দোষী বলছে।

আরও পড়ুন সততা ও বাংলার সংবাদমাধ্যম: কোনো প্রশ্ন নয়

আপনারা কী করে মাথা ঠিক রাখছেন জানি না, আমার ঘেঁটে যাওয়া কিন্তু এখানেই শেষ নয়। বিরোধী দলনেত্রী, থুড়ি মুখ্যমন্ত্রী, চাকরি যাওয়া শিক্ষক, শিক্ষাকর্মীদের এমনি এমনি হরলিক্স খাওয়ার মত এমনি এমনি স্কুলে গিয়ে কাজ করতে বলেছিলেন। বলেছিলেন তা নাকি কেউ আটকাতে পারে না। অথচ তার কদিন পরেই ডি আই অফিসে প্রতিবাদ জানাতে গিয়ে পশ্চিমবঙ্গ পুলিসের হাতে বেধড়ক মার খেয়ে গেলেন চাকরিহারা মানুষগুলো। কেবল পুলিসের চিরপরিচিত লাঠি নয়, লাথির ব্যবহারও বাদ থাকেনি। শিক্ষক, শিক্ষাকর্মীরা জেলার স্কুল ইন্সপেক্টরের অফিসে গেলে মার জুটবে আর স্কুলে গেলে গোল্লা? কোন মহাপাপে এই শাস্তি? শিক্ষামন্ত্রী জানিয়েছেন – পাপটা হল আলোচনার টেবিলে এসে বসার পাশাপাশি আন্দোলন করতে ডি আই অফিসে চলে যাওয়া। আর জি কর আন্দোলনের সময়ে সরকারি দলের প্রতিনিধিদের মুখে শোনা গিয়েছিল রাজনীতি করা অন্যায়, এখন শোনা যাচ্ছে আন্দোলন করা অন্যায়। এটা ২০২৫ সালের গণতান্ত্রিক পশ্চিমবঙ্গ তো? নাকি অতীত বা ভবিষ্যতের কোনো একনায়কতান্ত্রিক ব্যবস্থায় ঢুকে পড়েছি? কেবল গুলিয়ে যাচ্ছে।

নাঃ! আর বেশি বলব না। বিজ্ঞজনে বলেছেন ‘বোবার শত্রু নেই’। সেই তুলনায় এমনিতেই অনেক বেশি কথা বলে ফেলেছি। থেমে যাওয়ার আগে সাম্প্রতিকতম ঘেঁটে যাওয়ার কারণটা বলে নিই। ১১ এপ্রিল শিক্ষামন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করে বেরিয়ে চাকরিহারারা সংবাদমাধ্যমের সামনে বেশ আশ্বস্ত গলায় বলেছেন, শিক্ষামন্ত্রীর উপস্থিতিতে নাকি এসএসসি জানিয়েছে যে যোগ্য আর অযোগ্যের আলাদা তালিকা তৈরি করা ইতিমধ্যেই শুরু হয়ে গেছে। ২১ এপ্রিল নাগাদ প্রকাশও করা হতে পারে।

এখন কথা হল, ব্যাপারটা যদি এতই জলভাত হয়, তাহলে এতদিন এসএসসি এই তালিকা তৈরি করেনি কেন আদালত বারবার বলা সত্ত্বেও? এখনই বা কিসের ভিত্তিতে বলা হচ্ছে তালিকা তৈরি করে দেওয়া হবে? এর উত্তরে চাকরিহারাদের মুখপাত্ররা জানিয়েছেন যে, ওএমআর শিটের ‘মিরর ইমেজ’ এসএসসির কাছে না থাকলেও তাঁরা সিবিআইয়ের আদালতে দাখিল করা মিরর ইমেজকেই ‘সার্টিফাই’ করতে রাজি। সেই ২২ লক্ষ ‘মিরর ইমেজ’ থেকেই জানা যাবে কে যোগ্য আর কে অযোগ্য।

কিমাশ্চর্যম তৎপরম! সিবিআইয়ের দেওয়া ওই প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও তো সুপ্রিম কোর্ট গোটা প্যানেল বাতিল করার রায় দিয়েছে। কেন দিয়েছে? কারণ রায়ের ৩৮ নম্বর অনুচ্ছেদে উল্লেখ করা হয়েছে যে ‘টেইন্টেড ক্যান্ডিডেট’-দের আইনজীবী বলেছেন – ওএমআর শিটের স্ক্যানড কপি বা ‘মিরর ইমেজ’-কে প্রমাণ হিসাবে ধরে তাঁদের শাস্তি দেওয়া উচিত নয়। কারণ ওগুলো তাঁরা যে শিটে পরীক্ষা দিয়েছিলেন সেই শিট নয়। আদালত তাঁদের আপত্তি উড়িয়েও দেয়নি। কেন দেয়নি তার ব্যাখ্যা পরের কয়েকটা অনুচ্ছেদে রয়েছে। নিচে দেখুন:

‘টেইন্টেড ক্যান্ডিডেট’-দের কথা সত্যি না মিথ্যে, তা পরীক্ষা করার কোনো উপায় ছিল না, আজও নেই। কারণ ওএমআর শিটগুলো তো নষ্ট করে ফেলা হয়েছে, যা এসএসসি আদালতে স্বীকার করেছে। তাহলে এখন যদি ওই মিরর ইমেজগুলোকে যোগ্যতার প্রমাণ হিসাবে দাখিল করা হয়, তা কি সকলে মেনে নেবেন? অবশ্য হিন্দিতে বলা হয় – মিঞা বিবি রাজি হলে কাজির কিছু করার থাকে না। তাই এখানেই থেমে যাই। নইলে কে আবার বলবে – আমারও কোনো দুরভিসন্ধি আছে, আমিও চাই না চাকরিহারারা চাকরি ফিরে পান।

পশ্চিমবঙ্গ বড় শক্ত ঠাঁই।

নাগরিক ডট নেট ওয়েবসাইটে প্রকাশিত

যাদবপুর: রিপাবলিক বা অন্য চ্যানেলে যা চলছে তা সাংবাদিকতা নয়

ভাবতে অবাক লাগে, জরুরি অবস্থার সময়ে পশ্চিমবাংলার একাধিক সম্পাদককে জেল খাটতে হয়েছিল সরকারের সামনে মাথা নোয়াননি বলে।

১৯৯০-এর দশকে তখন সারা ভারতের মাঠ মাতাচ্ছেন কৃশানু দে। ধীমান দত্ত সম্পাদিত খেলা পত্রিকায় এক সাক্ষাৎকারে তাঁকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, ভারতীয় ফুটবল আন্তর্জাতিক স্তরে অপ্রাসঙ্গিক হয়ে গেল কেন? কৃশানুর উত্তরটা মোটামুটি এরকম ছিল – সাহিত্য রবীন্দ্রনাথ থেকে সমরেশ বসুতে নেমেছে, ফুটবল চুনী গোস্বামী থেকে কৃশানু দে-তে নামবে না? ফুটবল বিশেষজ্ঞরা বলতে পারেন, এটা কোনো উত্তরই হল না। কৃশানুর খেলার ভক্তরা বলতে পারেন, কৃশানু অযথা বিনয় করছিলেন। তিনি মোটেই খুব নিচু মানের খেলোয়াড় ছিলেন না। সাহিত্যপ্রেমীরা বলতে পারেন, এ অতি বাজে তুলনা। সমরেশ বসু মোটেই এত ওঁচা লেখক নন যে রবীন্দ্রনাথ থেকে নামতে নামতে বাংলা সাহিত্য তাঁর স্তরে এসেছে বলা যাবে। কিন্তু যদি নামগুলো বাদ দিয়ে কৃশানুর বক্তব্যের নির্যাসটুকু নিই, তাহলে দেখা যাবে তিনি বলেছিলেন সব ক্ষেত্রেই বাঙালির অবনমন হচ্ছে। কথাটায় কিন্তু বিন্দুমাত্র ভুল নেই। সেই অবনমনের গতি গত ৩০-৩৫ বছরে আরও বেড়ে গেছে। কৃশানুর মানের বাঙালি ফুটবলার আজ আছে কি? সমরেশ বসুর মানের সাহিত্যিকও বাংলায় আর নেই। তবে বাঙালির সাংবাদিকতা যে উচ্চতা থেকে ধপাস করে পড়েছে, তার তুলনা মেলা ভার। মতি নন্দী থেকে মৌপিয়া নন্দী, গৌরকিশোর ঘোষ থেকে ময়ূখ ঘোষ। যেন এভারেস্ট থেকে সোজা বঙ্গোপসাগরে আছড়ে পড়া।

২০২৪ লোকসভা নির্বাচনের প্রাক্কালে এবং ফলাফল প্রকাশের পরেও সারা দেশে অন্যতম আলোচ্য বিষয় হয়ে উঠেছিল দেশের মূলধারার সংবাদমাধ্যমের, বিশেষত খবরের চ্যানেলগুলোর ভূমিকা। হোয়াটস্যাপ থেকে পাওয়া ভুয়ো খবর সম্প্রচার করা; মন্দির বনাম মসজিদ বয়ান প্রচার করে মুসলমানবিদ্বেষ ছড়ানো; সান্ধ্য প্যানেলে গাঁয়ে মানে না আপনি মোড়ল হিন্দু ও মুসলমান ধর্মীয় নেতাদের ডেকে এনে লড়িয়ে দেওয়া; বিরোধী দলের মুখপাত্র থেকে শুরু করে ছাত্রনেতা, মানবাধিকার কর্মী এবং সরকারের ত্রুটি তুলে ধরা সাংবাদিকদের ধমকানো; যে কোনো আন্দোলনকারীকে দেশদ্রোহী বা মাওবাদী বা খালিস্তানি বলে দেগে দেওয়া, পাকিস্তানের চর বা বিদেশের টাকায় চলেন বলে ঘোষণা করে দেওয়া – এইসব কুকর্ম ধারাবাহিকভাবে চালিয়ে শুধু যে দেশের গোদি মিডিয়া ক্ষমতাসীন বিজেপির প্রচারযন্ত্র হিসাবে কাজ করেছে তা নয়, দেশের সামাজিক পরিবেশ একেবারে বিষিয়ে দিয়েছে। তার ফল আমরা এখনো পেয়ে চলেছি (ভারত ক্রিকেটে ট্রফি জিতলে মধ্যপ্রদেশে সংখ্যালঘু এলাকায় হিংসা ছড়ানো হচ্ছে, উত্তরপ্রদেশে হোলির জন্যে মসজিদ ঢেকে দেওয়া হচ্ছে ত্রিপল দিয়ে), আরও বহুবছর পাব।

পশ্চিমবঙ্গে ২০১৯ লোকসভা এবং ২০২১ বিধানসভা নির্বাচনের সাপেক্ষে বিজেপির ফল অপ্রত্যাশিতভাবে খারাপ হওয়ায় বাংলার সংবাদমাধ্যমের দিকে তখন ততখানি নজর পড়েনি অনেকের। বস্তুত রিপাবলিক টিভি তখন পর্যন্ত মালিক অর্ণব গোস্বামীর পরিবেশনার গাঁক গাঁক শৈলীটুকুই চালু করতে পেরেছিল, ঘৃণার পথে রোজ নতুন মাইলফলক পেরিয়ে যাওয়া তখনো জমিয়ে শুরু করেনি। বলা যেতে পারে প্রদীপ, থুড়ি আগুন, জ্বালাবার আগে কেরোসিন তেল জোগাড় করার পর্ব চলছিল। অন্যদিকে একদা বিজেপির সমর্থনে রাজ্যসভার সাংসদ হওয়া সুভাষ চন্দ্রের জি নেটওয়ার্কের চ্যানেল ২৪ ঘন্টাও তখন আপাত নিরপেক্ষতা বজায় রাখার ব্যাপারে মনোযোগী ছিল। তাছাড়া নির্বাচনের ঠিক আগে সুভাষ চন্দ্রের সঙ্গে বিজেপির মন কষাকষির সংবাদও ভেসে এসেছিল। এবিপি আনন্দও আনন্দবাজার পত্রিকার মতই ধর্মেও থাকত, জিরাফেও থাকত। বাংলা চ্যানেলগুলোর দাঁত নখ বেরোতে শুরু করল ২০২৩ সাল থেকে, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্রের র‍্যাগিংয়ের কারণে মৃত্যুর খবরকে কেন্দ্র করে। তখনই প্রথম দেখা গেল, ওই ঘটনাকে হাতিয়ার করে বাংলার জনপ্রিয় খবরের চ্যানেলগুলোর মুখ হয়ে ওঠা অ্যাংকররা একেবারে অর্ণব, সুধীর চৌধুরী, রুবিকা লিয়াকতদের মত মার্কামারা গোদি মিডিয়ার অ্যাংকরদের ভাষায় ঘৃণা ছড়াতে পারেন।

২০১৬ সালে জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ে কাশ্মীরের স্বাধীনতা চেয়ে স্লোগান দেওয়া হয়েছে – এই ভুয়ো ভিডিও ছড়িয়েছিল কিছু তথাকথিত জাতীয় চ্যানেল (ফরেন্সিক পরীক্ষায় তা প্রমাণিত হয়)। তার ভিত্তিতে দিল্লি পুলিস ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রনেতাদের গ্রেফতার করে এবং গোটা বিশ্ববিদ্যালয়টাকেই জেহাদি সন্ত্রাসবাদীদের আখড়া বলে দেশের সামনে তুলে ধরার প্রক্রিয়া চালু করে গোদি মিডিয়া। সেইসময় টাইমস নাও চ্যানেলে কর্মরত অর্ণব কীভাবে লাইভ শোতে ডেকে উমর খালিদকে অসভ্যের মত ধমকেছিলেন, সেকথা অনেকেরই মনে আছে। ২০২৩ সালে দেখা গেল, মৌপিয়া অর্ণবের ছাত্রী না হলেও একলব্য তো বটেই। তিনিও যাদবপুরের এক ছাত্রনেতাকে ২৪ ঘন্টা চ্যানেলের শোতে ডেকে ধমকালেন এবং পাড়ার মস্তানদের কায়দায় বললেন ‘কে তুমি?’ যেন তিনি নিজে কোনো সম্রাজ্ঞী। রিপাবলিক বাংলার ময়ূখ অবশ্য তখনো তৃণমূল সরকারের বিরোধিতার কারণে এ রাজ্যের বাম কর্মী, সমর্থকদের নয়নের মণি। ওই চ্যানেলের দক্ষিণপন্থী প্রচারকে তখনো অনেকেই ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখছিলেন।

তারপর ঘটল আর জি করের ঘটনা। ততদিনে মৌপিয়া ২৪ ঘন্টা থেকে চলে গেছেন কলকাতা টিভিতে, যে কলকাতা টিভি কেন্দ্রীয় এজেন্সির কুনজরে (অর্থাৎ বিজেপির কুনজরে) পড়েছিল ২০২৩ সালেই। ঘন্টার পর ঘন্টা তাদের দফতরে তল্লাশি চালিয়েছিলেন অফিসাররা। আর জি করের ঘটনায় রাজ্য সরকারের ঢাল হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে মৌপিয়ার চ্যানেল এবং সোশাল মিডিয়া হ্যান্ডেল। তখনই দেখা যায়, তিনি আন্দোলন ব্যাপারটারই তীব্র বিরোধী। গোদি মিডিয়া চ্যানেলগুলোর মতই, সাক্ষ্যপ্রমাণ থাকুক আর না-ই থাকুক, আন্দোলনকারী ডাক্তারদের দুরভিসন্ধি সম্পর্কে নিত্যনতুন অভিযোগ চলতে থাকে। রিপাবলিক বাংলার তখনো দু নৌকায় পা, কারণ একদিকে তৃণমূল সরকারের বিরোধিতা করা কর্তব্য। অন্যদিকে বিজেপি যেই বুঝেছে আর জি কর আন্দোলন থেকে তাদের কোনো লাভ হবে না, হিন্দু-মুসলমান বাইনারির কোনো অবকাশ নেই, অমনি শুভেন্দু অধিকারী আর তৃণমূল নেতাদের সুর মিলে গেছে। ডাক্তাররা কত অসৎ, কেমন মদ গাঁজা খায়, তাদের উপর জনরোষ এসে পড়বে – এসব কথা এসে পড়েছে। এবিপি আনন্দ আবার সেই মামলায় প্রথম থেকে আন্দোলনের পাশে। কারণটা সহজবোধ্য। সরকারবাবুদের কাগজগুলোর মতই তাঁদের খবরের চ্যানেলের গুণগ্রাহীরাও বেশিরভাগ মধ্যবিত্ত, উচ্চবিত্ত। পশ্চিমবঙ্গের ডাক্তাররাও বেশিরভাগই আসেন সেই শ্রেণি থেকে। অতএব ডাক্তাররা দিন কে রাত, রাত কে দিন বললেও সর্বতোভাবে তাঁদের পাশেই থাকতে হত ঘন্টাখানেকের সুমন দে-কে।

আরও পড়ুন নির্বাচনের ফলে হেরে গেছে দেশের অসাধু মিডিয়া

এইসব ছোটখাটো পার্থক্য ঘুচে গেল যাদবপুরে ব্রাত্য বসুর গমন নিয়ে সাম্প্রতিক গোলমালে। যাদবপুরকে মৌপিয়া, ময়ূখ বা সুমন – কারোর চ্যানেলেরই পছন্দ করার কোনো কারণ নেই। রাজ্যে তৃণমূল ক্ষমতায় এসেছে দেড় দশক হতে চলল, কেন্দ্রে বিজেপি জাঁকিয়ে বসেছে এক দশকের বেশি। রাজ্যের বিধানসভায় এরা ছাড়া আর কোনো দল নেই প্রায়। অথচ যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে এখনো উভয়ের কেউই দাঁত ফোটাতে পারেনি। শিক্ষকদের মধ্যে যদি বা সংগঠন আছে, ছাত্রদের মধ্যে তৃণমূল ছাত্র পরিষদ আর অখিল ভারতীয় বিদ্যার্থী পরিষদের উপস্থিতি এখনো সাড়া জাগানোর মত নয়। বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য নিয়োগের ক্ষমতা কার, তা নিয়ে যতই দড়ি টানাটানি করুন মুখ্যমন্ত্রী আর রাজ্যপাল – তাতে যাদবপুরের ছেলেমেয়েদের কিছু এসে যায়নি। এসে যে যায়নি তার প্রমাণ শিক্ষামন্ত্রীর গাড়ি এমনিতে প্রতিদ্বন্দ্বী বিভিন্ন বাম ছাত্র সংগঠনের একত্রে ঘিরে ধরা, গাড়ির সামনে শুয়ে পড়া। সকলেরই দাবি প্রায় এক – ক্যাম্পাসে নির্বাচন করো, গণতন্ত্র ফেরাও। সে দাবির পাশে কেনই বা রিপাবলিক, কলকাতা টিভি, এবিপি আনন্দ দাঁড়াবে? নির্বাচন হলে বেশিরভাগ আসনে জিতবে তো সেই কোনো না কোনো বামপন্থী ছাত্র সংগঠন। তিন চ্যানেলের একটার মালিকও যে বামপন্থীদের পছন্দ করেন না – একথা কে না জানে?

কিন্তু ব্যাপারটা স্রেফ যাদবপুরকে বদনাম দেওয়ায় থেমে থাকলে কথা ছিল। সে তো র‍্যাগিংয়ে ছাত্র মৃত্যুর সময় থেকেই ক্যাম্পাসে পড়ে থাকা মদের বোতল আর ব্যবহৃত কন্ডোম গুনে চলেছে বাংলার সংবাদমাধ্যম। কিন্তু এবারের অভিনবত্ব লাগামছাড়া সাম্প্রদায়িক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রচারে। বিন্দুমাত্র সাক্ষ্যপ্রমাণের তোয়াক্কা না করে যা খুশি অভিযোগ তুলে ঘৃণা ছড়ানোর কাজ করে চলেছে রিপাবলিক বাংলা। যাদবপুর আজমল কাসবের মত উগ্রপন্থী তৈরির কারখানা – এমনও বলা হচ্ছে গলা তুলে। কেন বলছেন ভাই? উত্তরে কিন্তু চিৎকার ছাড়া কিছু পাওয়া যাবে না। এখানে যাদবপুর আসলে উপলক্ষ, আসল লক্ষ্য আতঙ্ক ছড়ানো। কিসের আতঙ্ক? ইসলামিয় সন্ত্রাসবাদের আতঙ্ক। যে ইসলামিয় সন্ত্রাসবাদের কোনো হানা এখন পর্যন্ত পশ্চিমবঙ্গে ঘটেনি, ভারতেও ঘটেনি বহুকাল। এমনকি ২০১৯ সালের পুলওয়ামার ঘটনার তদন্ত নিয়ে প্রবল জাতীয়তাবাদী এবং হিন্দু হৃদয়সম্রাট নরেন্দ্র মোদীর সরকারেরও কোনো তাপ উত্তাপ নেই। সেই কাণ্ডের দোষীরা আজ পর্যন্ত গ্রেফতার হল না। জম্মু ও কাশ্মীর পুলিসের এক শিখ অফিসারকে গ্রেফতার করা হয়েছিল। সেই দাভিন্দর সিং পর্যন্ত ২০২০ সালে জামিন পেয়ে গেছেন, কারণ পুলিস ৯০ দিনের মধ্যে চার্জশিট জমা দিতে পারেনি। এমন উগ্রপন্থার আতঙ্ক আজ ছড়ানো কী উদ্দেশ্যে? হিন্দুদের মধ্যে মুসলমানদের প্রতি ভয় জাগাতে, বাংলার সমাজে ধর্মীয় বিভাজন ঘটাতে। মৌপিয়া মাওবাদীর ভয় দেখানো পর্যন্ত এগিয়েছেন, ময়ূখ আরও এককাঠি সরেস। আসলে দুজনের প্রতি নির্দেশাবলিও বোধহয় কিছুটা ভিন্ন। দুজনেরই অন্তরালের উপরওয়ালার উদ্দেশ্য যাদবপুরের বারোটা বাজানো (কলকাতা পুলিস বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে পুলিস ফাঁড়ি করতে চায় বলে খবরে প্রকাশ। এতে কোনো পাঠকের জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের ক্যাম্পাসে সেনাবাহিনীর ট্যাংক রাখতে চাওয়ার কথা মনে পড়লে নিবন্ধকার দায়ী নন), তবে ময়ূখের উপরওয়ালার তার সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গের মুসলমানদের আরও আরও প্রান্তিক করে দেওয়ার লক্ষ্যও আছে নির্ঘাত। নেহাত সমাপতন নয় যে প্রায় একই সময়ে বিজেপি নেতা শুভেন্দু অধিকারী বলছেন তাঁরা ক্ষমতায় এলে তৃণমূলের মুসলমান বিধায়কদের চ্যাংদোলা করে বিধানসভার বাইরে ছুড়ে ফেলা হবে।

এখানে একটা কথা বলা জরুরি। রিপাবলিক বাংলা কিন্তু আজ হঠাৎ মুসলমানবিদ্বেষ ছড়ানোর কাজ শুরু করেনি, প্রথম থেকেই এ কাজ করে আসছে। বাংলাদেশের জুলাই বিপ্লবের পর থেকে লাগাতার বাংলাদেশি হিন্দুদের প্রতি দরদ দেখানোর ভান করে তীব্র বিদ্বেষমূলক, গালগল্পপ্রবণ শো চালিয়ে গেছে ময়ূখ ও তার চ্যানেল। মূল রিপাবলিক চ্যানেলটির বেত্তান্ত যাঁরা জানেন তাঁদের অবশ্য আগেই বোঝা উচিত ছিল যে এরা সাংবাদিকতা করতে আসেনি, আরএসএস-বিজেপির এজেন্ডা অনুযায়ী সমাজে বিভাজন তৈরি করাই এদের আসল কাজ। জেগে ঘুমোলে অবশ্য কিছুই জানা যায় না, বোঝা যায় না। পশ্চিমবঙ্গে ঘোষিত ফ্যাসিবাদবিরোধী, হিন্দুত্ববাদবিরোধী যে রাজনৈতিক দলগুলো আছে – তৃণমূল কংগ্রেস, কংগ্রেস এবং বাম দলগুলো – তারা এতদিন জেগেই ঘুমোচ্ছিল বোধহয়। তাই ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ইন্ডিয়া জোট যখন সিদ্ধান্ত নিল যে হিন্দি, ইংরিজি চ্যানেল মিলিয়ে ১৪ জন অ্যাংকরের অনুষ্ঠান তারা বয়কট করবে, তখন এই সবকটা দল ওই জোটে থাকা সত্ত্বেও পশ্চিমবঙ্গে এমন কিছু করা হবে কিনা তা নিয়ে প্রায় কোনো আলোচনাই হয়নি। তাহলে প্রশ্ন হল, ‘আজি এ প্রভাতে রবির কর/কেমনে পশিল প্রাণের ’পর’? প্রশ্নটা বিশেষত বামপন্থীদের জন্যে। তৃণমূলের মুখপাত্রদের রিপাবলিক বাংলার সাম্প্রদায়িকতা নিয়ে আপত্তি থাকার কথা নয়। ময়ূখ বা রিপাবলিক বাংলার অন্য কোনো সাংবাদিক মুসলমানদের সম্পর্কে চাট্টি উস্কানিমূলক কথা বললে তা নিয়ে চ্যানেলে বসে চেঁচামেচি করে তাঁদের বরং সংখ্যালঘুদের রক্ষাকর্তা হওয়ার ভান করতে সুবিধা হবে। আর কংগ্রেসের তো কে নেতা, কে নয় তাই বোঝা শক্ত। অবস্থা এমনই যে রাহুল গান্ধীকে গুজরাটে গিয়ে বলতে হয় – কংগ্রেসে বিজেপির লোক আছে, তাদের তিনি বার করে দেবেন। ফলে কে কোথায় যাবেন না যাবেন সে ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেবে কে?

কিন্তু বামপন্থীরা, অন্তত তাঁদের ঘোষণা অনুযায়ী, বিজেপির সঙ্গে প্রতিযোগিতামূলক সাম্প্রদায়িকতা করতে নামেননি। আবার কংগ্রেসের মত নেতৃত্বহীনতার সমস্যাও থাকার কথা নয়, কারণ তাঁদের তো ‘রেজিমেন্টেড’ দল। তাহলে? ময়ূখ সরাসরি এ রাজ্যের বামপন্থীদের আক্রমণ করল বলে ঘুম ভাঙল, নাকি রাজ্য সম্পাদক মহম্মদ সেলিমের ধর্মীয় পরিচয় নিয়ে নোংরামি করার পরে ঘুম ভাঙল? যে কারণেই ভেঙে থাক, কবি বলেছেন, প্রভাত কেবল রাত্রির অবসানে নয়। যখনই চিত্ত জাগে তখনই প্রভাত হয়। কিন্তু প্রভাত কি আদৌ হয়েছে? এতকিছুর পরেও তো রিপাবলিক বাংলা চ্যানেলের শোতে বাম প্রতিনিধিরা হাজির হচ্ছেন। যাদবপুর কাণ্ডে রিপাবলিক বাংলার কার্যকলাপে আরও পরিষ্কার হয়ে গেছে যে তারা সাংবাদিকতা করে না। ক্যাম্পাসে ঢুকে তাদের প্রতিবেদকদের উদ্দাম অসভ্যতার (ভিডিও প্রমাণ বর্তমান) ফলে ছাত্রছাত্রীরা তাদের বিরুদ্ধে এফআইআর করেছে যাদবপুর থানায়। ছাত্রছাত্রীদের কাছে ‘দালাল’ আখ্যা পাওয়া প্রতিবেদকরা ক্যামেরার সামনে লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে সগর্বে দাবি করেছেন তাঁরা দালালই। দেশের মানুষের দালাল। অপছন্দের সাংবাদিকদের কোনো রাজনৈতিক সংগঠনের সদস্যরা দালাল আখ্যা দিচ্ছেন – এটা নতুন কিছু নয়। কিন্তু সত্যিকারের সংবাদমাধ্যম সে আখ্যাকে পাত্তা দেয় না, ‘আমরা অমুক আমরা তমুক’ বলে বড়াইও করে না। কারণ সাংবাদিকতার প্রাথমিক পাঠের মধ্যে যেটা পড়ে, সেটা হল – সাংবাদিক নিজে সংবাদ নয়। দেখা যাচ্ছে সেই প্রাথমিক পাঠটাই রিপাবলিক বাংলা মানে না। এরপরেও এদের সংবাদমাধ্যম হিসাবে গণ্য করার কোনো মানে নেই।

পশ্চিমবঙ্গের ফ্যাসিবিরোধী রাজনৈতিক দল, অরাজনৈতিক সংগঠন এবং ব্যক্তিরা প্রায় সবাই ‘গোয়েবেলস’ আর ‘রেডিও রোয়ান্ডা’ কথা দুটো ব্যবহার করে থাকেন। প্রথমটা অ্যাডলফ হিটলারের ঘনিষ্ঠ, নাজি প্রোপাগান্ডার দায়িত্বে থাকা কুখ্যাত ব্যক্তিটির নাম। দ্বিতীয়টা গত শতকের নয়ের দশকে আফ্রিকার রোয়ান্ডার গৃহযুদ্ধে হুটু হত্যার মিথ্যা খবর প্রচার করে, লোক খেপিয়ে টুটসিদের গণহত্যার পথ প্রস্তুত করা রেডিও স্টেশনের নাম। আমাদের ফ্যাসিবিরোধীরা সঠিকভাবেই বলে থাকেন যে এদেশের গোদি মিডিয়া গোয়েবেলসের কায়দায় মিথ্যা প্রচার করে এবং রেডিও রোয়ান্ডার কায়দায় পরজাতিবিদ্বেষ ছড়িয়ে গণহত্যার দিকে ঠেলে দিচ্ছে দেশের মুসলমানদের। কিন্তু মুশকিল হল, সে কাজে তাঁরা যে মদত দিয়ে ফেলছেন – এটা মানতে রাজি নন। আগে না হলেও, সম্প্রতি বাম দলগুলোর অনেক কর্মী, সমর্থক বলতে শুরু করেছেন যে রিপাবলিক বাংলায় পার্টি প্রতিনিধিদের আর না যাওয়াই উচিত। তাতে প্রতিযুক্তি দেওয়া হয় ‘ওই প্ল্যাটফর্মটা ব্যবহার করা দরকার। ছেড়ে দেওয়া উচিত না’। এই প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করনেওয়ালারা বোধহয় সেইসময় রোয়ান্ডায় থাকলে রেডিও রোয়ান্ডাতেও যেতেন – প্ল্যাটফর্মটা ব্যবহার করতে।

করে কী লাভ হচ্ছে? কোনো পরিমাপযোগ্য লাভ কোনো বাম দলের নেতা বা মুখপাত্র দেখাতে পারবেন না। কী ক্ষতি হচ্ছে তা বরং পরিষ্কার। বহু বাম সমর্থকের বাড়িতে গেলে দেখতে পাওয়া যায়, দিনরাত রিপাবলিক বাংলা এবং রিপাবলিক টিভি চলে। কেন চলে? কারণ বাম নেতারা ওই চ্যানেলগুলোতে যান বলে সমর্থকরা মনে করেন ওরা নিশ্চয়ই ঠিক জিনিস দেখায়, ঠিক কথা বলে। অর্থাৎ তাঁদের মনোজগতে রিপাবলিক নেটওয়ার্ক বৈধতা পেয়ে গেছে। এতে রিপাবলিকের সুবিধা হল, সারাদিন চেতনে ও অবচেতনে তাদের ঘৃণাভাষণ ও ভুয়ো খবর বাম সমর্থক পরিবারগুলোকে গেলাতে পারছে। ফলে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে সন্ত্রাসবাদী তৈরি হয় বললেও তারা বিশ্বাস করবে, শিগগির পশ্চিমবঙ্গে মুসলমানরা সংখ্যায় হিন্দুদের ছাড়িয়ে যাবে আর হিন্দুদের ফের দেশভাগের সময়কার মত জান মাল নিয়ে উদ্বাস্তু হতে হবে বললেও তারা বিশ্বাস করবে। সিপিএমের মিছিল, মিটিংয়ে লোক হয় অথচ ভোট কেন পড়ে না – এই প্রশ্নের এও এক উত্তর। বাম নেতারা অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসে মনে করেন, তাঁরা রিপাবলিকের প্ল্যাটফর্মকে ব্যবহার করছেন। আসলে রিপাবলিক তাঁদের ব্যবহার করছে। তার প্রমাণ নির্বাচনের পর নির্বাচনে বামেদের ভোট রামে চলে যাওয়া।

এই সহজ কথাটা স্বীকার করতে বাম নেতাদের ভীষণ অসুবিধা। তাঁদের জঙ্গি অনলাইন সমর্থকরাও এসব বললে বলেন – এটা মিডিয়ার যুগ। মিডিয়াকে ব্যবহার করতেই হবে। এখানে বলার কথা দুটো। প্রথমত, উট আর উটপাখি যেমন এক নয়, বক আর বকফুল যেমন এক নয়, রিপাবলিকও তেমন মিডিয়া নয়। দ্বিতীয়ত, মিডিয়া সম্পর্কে নিজেদের অগ্রজদের সাবধানবাণীই আজকের বাম নেতা কর্মীরা বিস্মৃত হয়েছেন। একাধিক লোকের স্মৃতিচারণে পাওয়া যায় যে জ্যোতি বসু আর প্রমোদ দাশগুপ্ত দুজনেই কমরেডদের বলতেন ‘আনন্দবাজার আমাদের কোনো কাজের প্রশংসা করলেই সাবধান হবেন। আরেকবার ভেবে দেখবেন কাজটা ঠিক হচ্ছে কিনা।’ তাও তো ওঁদের সময়ে কোনো সংবাদমাধ্যম রিপাবলিকের স্তরে নামেনি। তবু একথা তাঁরা কেন বলতেন? কারণটা খুব স্পষ্ট। মিডিয়া হাউস মানেই হল বৃহৎ পুঁজি। তার স্বার্থ সবসময় বামপন্থী দলগুলোর স্বার্থের পরিপন্থী, তারা যে শ্রেণির প্রতিনিধিত্ব করতে চায় – তার পরিপন্থী। সুতরাং তাদের প্ল্যাটফর্মে তারা বামপন্থীদের ততটুকুই প্রচার দেবে যতটুকুতে তাদের স্বার্থ বিঘ্নিত না হয়। অতএব তাদের নিন্দাই প্রত্যাশিত, প্রশংসা সন্দেহজনক।

একথা বললে সিপিএমের এখনকার লোকেরা বলেন ‘এখন যুগ বদলে গেছে। ওসব ওঁদের যুগে চলত, এখন চলে না।’ কথা হচ্ছে, যুগ তো সর্বদাই বদলায়। কিন্তু জ্যোতিবাবুদের সময় থেকে আজ পর্যন্ত মিডিয়ার কী ধরনের বদল হয়েছে? বৃহৎ পুঁজির বদলে এখনকার মিডিয়া কি ছোট পুঁজির হাতে চলে গেছে? ফলে তাদের স্বার্থের সঙ্গে বামপন্থীদের স্বার্থের সংঘাত আগের চেয়ে কমে গেছে? মোটেই তা নয়। বরং এখন মূলধারার মিডিয়া আরও বড় পুঁজির অধীন হয়েছে। দেশের অধিকাংশ মিডিয়া হাউস নামে, বেনামে হয় মুকেশ আম্বানি নয় গৌতম আদানির হাতে চলে গেছে। অর্ণব যখন রিপাবলিক টিভি চালু করেন, তখন তাঁকে পুঁজি জুগিয়েছিলেন আবার এক বিজেপি সাংসদ অস্ত্র ব্যবসায়ী – এ তথ্যও সবার জানা। সেই নেটওয়ার্কের চ্যানেলে না গেলে চলবে না বা গেলে বামপন্থীদের লাভ হবে – এহেন চিন্তার ব্যাখ্যা কী?

সন্তোষজনক ব্যাখ্যা যে নেই তা ১ মার্চের পর থেকে এ রাজ্যের বাম নেতা কর্মীরা বিলক্ষণ বুঝতে পারছেন। তাই ময়ূখের উপর অভিমান করতে শুরু করেছেন। কলেজজীবনে ময়ূখ ভারতের ছাত্র ফেডারেশন করতেন বলে শোনা যায়। সাংবাদিকতার পেশায় যাওয়ার পরেও সেই গন্ধ তাঁর গায়ে বেশ কিছুদিন লেগেছিল। সেই সময়কার সোশাল মিডিয়া পোস্ট দেখেই বিশেষত সিপিএম সমর্থকরা তাঁর প্রেমে পড়েছিলেন। এখন সেইসব পোস্ট শেয়ার করে বাক্যবাণ নিক্ষেপ করা হচ্ছে – তাহলে কি তখন ময়ূখ নিজেই দেশদ্রোহী ছিল, ইত্যাদি। সিপিএম নেতা সৃজন ভট্টাচার্যের একখানা ভিডিও দেখলাম। সেটা ১৩ মার্চ যাদবপুর ক্যাম্পাসে রিপাবলিকের বীরপুঙ্গবদের চরম অসভ্যতার আগে শুট করা। সেখানে সৃজন ময়ূখের বক্তব্যের সমস্ত গোলমাল সুন্দর তুলে ধরলেন, কিন্তু তারপর বললেন ‘ও ছোটবেলায় এরকম ছিল না’। মুশকিল হল, ছোটবেলায় তো হিটলারও নাজি ছিল না। তাতে কী এসে যায়? সমস্যাটা তো আসলে ব্যক্তি ময়ূখ বা ব্যক্তি মৌপিয়া নন। কোন সাংবাদিক কীভাবে কাজ করবেন, কোন বিষয়ে কোন পক্ষ নেবেন তা ঠিক হয় তাঁর কোম্পানির (পড়ুন মালিকের) স্বার্থ অনুযায়ী। এটুকু বোঝার মত রাজনৈতিক পরিপক্কতা কি বঙ্গ সিপিএমের নেতাদের নেই?

আরেকটা জিনিস হয়ত সৃজনের মত তরুণ নেতাদের পক্ষে বোঝা সম্ভব নয়, কারণ তাঁরা সে আমলে ছোট ছিলেন। কিন্তু প্রবীণ সেলিম বা সুজন চক্রবর্তীদের না জানার কথা নয়। তা হল বামফ্রন্ট আমলে কলেজে রাম, শ্যাম, যদু, মধু সবাই এসএফআই ছিল। অফিসে যেমন সবাই কো-অর্ডিনেশন কমিটি, স্কুলে এবিটিএ আর কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে ওয়েবকুটা। ওতে কিছু প্রমাণ হয় না। অমন সর্বাঙ্গীণ আনুগত্য তৈরি করার বিপদই হল – সরকার বদলালেই লোকগুলো বদলে যায়। যেভাবে পাড়ায় পাড়ায় অটো স্ট্যান্ডের লাল পতাকাগুলো ঘাসফুলে বদলে গিয়েছিল ২০১১ সালে। মানুষের আসল রং বোঝা যায় দিন বদলালে। ময়ূখের রং এখন দেখা যাচ্ছে।

একটা সংবাদমাধ্যমে যতজন সাংবাদিক কাজ করেন তাঁরা সকলে নীতি নির্ধারক নন। অন্য যে কোনো পেশার মত সেখানেও অধিকাংশই স্রেফ হুকুম তামিল করেন। ফলে সংবাদমাধ্যমের কুকর্মের জন্য সাংবাদিককে সবসময় দায়ী করা যায় না। কিন্তু ময়ূখ, মৌপিয়া, সুমনরা যে স্তরে পৌঁছে গেছেন তাতে আর তাঁদের পদাতিক সৈনিক বলে ছাড় দেওয়া যায় না। ওই স্তরের সাংবাদিকরা সরাসরি নির্দেশ নেন মালিকের থেকে, অনেকসময় কোম্পানিতে তাঁদের শেয়ারও থাকে। মালিকরা জেনে বুঝেই এমন লোককে ওই জায়গায় তোলেন যে বিনা বাক্যব্যয়ে এমন কাজ করতে পারবে যা বিন্দুমাত্র বিবেক থাকলে পারা যায় না। ফলে ময়ূখ-মেদুরতা এবং প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করার ভাবনা ছেড়ে পশ্চিমবঙ্গের ধর্মীয় মেরুকরণে নেমে পড়া মিডিয়াকে বয়কট করার সময় এসে গেছে। বিভিন্ন দলের নেতারা ওসব চ্যানেলে গিয়ে বৈধতা না দিলেই সমর্থকদের চোখেও ওদের বিশ্বাসযোগ্যতা কমবে। তার প্রতিফলন ভোটবাক্সে পড়বে কিনা জানি না, ক্রমশ বারুদের স্তূপ হয়ে ওঠা সমাজে অবশ্যই পড়বে। রবীশ কুমার এমনি এমনি বলেন না – টিভিতে খবর দেখা বন্ধ করুন।

পুনশ্চ: রিপাবলিক টিভি আর কলকাতার টিভির দুই তারকার চেয়ে ভদ্র আচরণ করেন। তাহলেও এবিপি আনন্দের সুমনের কথাবার্তা কোন দিকে গড়ায় সেদিকে সতর্ক দৃষ্টি রাখা দরকার আমাদের সকলের। মনে রাখা ভাল, তিনি পুঁচকে দল ইন্ডিয়ান সেকুলার ফ্রন্টের আব্বাস সিদ্দিকীকে বলতে পারেন ‘আব্বাস, আপনি বিজেপির ভোট কাটুয়া।’ কিন্তু অমিত শাহের সাক্ষাৎকার নেওয়ার সময়ে জিজ্ঞেস করে উঠতে পারেন না – তৃণমূল থেকে বিজেপিতে আর বিজেপি থেকে তৃণমূলে অবাধ যাতায়াত চলে কী করে? উপরন্তু, বাংলাদেশের বিদ্রোহকে হাতিয়ার করে সাম্প্রদায়িক হাওয়া তোলার চেষ্টা সুমনের শো থেকেও কম হয়নি। আর সাম্প্রতিক যাদবপুর কাণ্ডে তিনি আপ্রাণ চেষ্টা করছিলেন প্রমাণ করতে যে ইন্দ্রানুজ রায়ের উপর দিয়ে মন্ত্রীর গাড়ি চলে যাওয়ার ছবিটা ভুয়ো। প্রমাণ হিসাবে কী যুক্তি দিচ্ছিলেন? না ছবিটা গণশক্তি ছাড়া কোথাও বেরোয়নি। এই যুক্তিতে দুনিয়ার সব সংবাদমাধ্যমের সব এক্সক্লুসিভই ভুয়ো। কারণ সেই খবর অন্য কোথাও বেরোয় না।

ভাবতে অবাক লাগে, জরুরি অবস্থার সময়ে পশ্চিমবাংলার একাধিক সম্পাদককে জেল খাটতে হয়েছিল সরকারের সামনে মাথা নোয়াননি বলে। সেই গৌরকিশোর ঘোষ, বরুণ সেনগুপ্তরা জীবিত নেই। কিন্তু তাঁদের শিষ্যরা অনেকে আছেন। সেই শিষ্যদের আজও অনেক সাংবাদিক আদর্শ বলে মনে করেন, বহু পাঠক/দর্শক তাঁদের মতামতকে গুরুত্ব দেন। সেই অনির্বাণ চট্টোপাধ্যায়, জয়ন্ত ঘোষাল, অশোক দাশগুপ্তরা এখনো হয় কাগজে নয় সোশাল মিডিয়ায় যথেষ্ট সক্রিয়। এই ‘গ্র্যান্ড ওল্ড ম্যান’-রা কেউ কি সোচ্চারে বলেছেন, বাংলার টিভি চ্যানেলগুলো যা করছে তা সাংবাদিকতা নয়? কারোর জানা থাকলে খবর দেবেন।

নাগরিক ডট নেট ওয়েবসাইটে প্রকাশিত

বাঙালির অরাজনৈতিক নিরপেক্ষতার নিচে চাপা পড়ছে ছাত্রছাত্রীরা

গণতন্ত্র-ফন্ত্র কে চায়? বিশেষ করে শিক্ষাঙ্গনে গণতন্ত্র তো বাবা-মায়েরা মোটেই চান না। ছেলেমেয়ে কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে যাবে লেখাপড়া করতে। ওটা রাজনীতি করার জায়গা নাকি?

ক্রিকেটের ধারাভাষ্যকাররা প্রায়ই বলেন – ক্রিকেট হল মিলিমিটারের খেলা। মানে কয়েক মিলিমিটার এদিক-ওদিক হলে নট আউটটা আউট হয়ে যেতে পারে, ছয়টা চার হয়ে যেতে পারে, ফলে জয়টা পরাজয়ে বদলে যেতে পারে। ব্রাত্য বসু আর তাঁর গাড়ির চালক বোধহয় ক্রিকেট দেখেন না। পশ্চিমবঙ্গের লেখাপড়া, নাটক, সিনেমা – এত কিছু সামলে কি আর সময় পাওয়া যায়? নইলে ইন্দ্রানুজ রায়ের গায়ে উঠে পড়ার কয়েক মিলিমিটার আগেই গাড়ির ব্রেক কষে ফেলতেন। তাহলেই কোনো সমস্যা থাকত না। কোনো চ্যানেল তাদের সাংবাদিককে পাঠিয়ে দিত ক্যাম্পাসে পড়ে থাকা মদের বোতল আর কন্ডোম গুনতে, কোনো চ্যানেল অতীতে ছড়িয়ে লাট করা কোনো প্রাক্তন উপাচার্যকে ডেকে এনে বোঝাত যাদবপুরে কোনো ‘ডিসিপ্লিন’ নেই এবং ‘ডিসিপ্লিন’ প্রতিষ্ঠা করতে গেলে কী করতে হবে। কোনো তথাকথিত স্বাধীন সাংবাদিক নিশ্চিন্তে তাঁর ইউটিউব চ্যানেলে বলে দিতে পারতেন ব্যাপারটা স্রেফ শিক্ষাক্ষেত্রে নৈরাজ্য তৈরি করার জন্যে সিপিএমের চক্রান্ত, কে কে বামপন্থী ছাত্র সংগঠনগুলোকে পৃথিবীর কোথা থেকে কত টাকা চাঁদা দিয়েছে তার এক্সেল শীট বানিয়ে ‘বিগ এক্সপোজে’ বলে প্রকাশ করতে পারতেন। আর জি কর আন্দোলনে যেসব বামপন্থীরা কর্পোরেট হাসপাতালের চক্রান্ত, স্বাস্থ্যসাথী প্রকল্প বানচাল করার ষড়যন্ত্র, বিজেপিকে ক্ষমতায় আনার পরিকল্পনা দেখতে পাচ্ছিলেন তাঁরাও নিশ্চিন্তে শিক্ষার বেসরকারিকরণের চক্রান্ত, কন্যাশ্রী প্রকল্প বানচাল করার ষড়যন্ত্র, ২০২৬ সালে বিজেপিকে ক্ষমতায় আনার পরিকল্পনা নিয়ে সোশাল মিডিয়ায় লম্ফঝম্প করতে পারতেন। নিজেদের ছাত্রজীবনে মুখে চোখে বিপ্লবের স্বপ্ন মেখে যথেষ্ট অশান্ত ছাত্র আন্দোলন করে, এখন পুলিসের সত্যবাদিতায় এবং শিক্ষামন্ত্রীর সম্ভ্রম রক্ষায় দারুণ বিশ্বাসী হয়ে যাওয়া অনাবাসী ফেসবুক ইনফ্লুয়েন্সার সদগুরুরাও দীর্ঘ পোস্ট লিখতে পারতেন – যাদবপুরের চ্যাংড়ারা ছাত্র সংসদের নির্বাচন ইত্যাদি দাবি করে ক্যাম্পাসে যে ফ্যাসিবাদ প্রবেশের রাস্তা খুলে দিচ্ছে – এই মর্মে। এমনকি সাংস্কৃতিক কর্মী ব্রাত্যবাবুর নাটক, সিনেমার বন্ধুরাও টিভি ক্যামেরাকে বড় মুখ করে বলতে পারতেন ‘কোনো রাজনীতির মধ্যে না গিয়ে বলছি – একজন শিক্ষিত, রুচিবান মানুষ, যিনি আবার মাস্টারমশাইও, তাঁর উপরে এই আক্রমণ নিন্দাযোগ্য।’ এই জাতীয় কিছু। সব বানচাল করে দিল ওই মিলিমিটার।

একটা জলজ্যান্ত ছেলের উপর দিয়ে গাড়ি চালিয়ে দেওয়া হয়েছে। সেই দৃশ্য ভাইরাল হয়ে গেছে, অস্বীকার করা যাবে না। ফলে অরূপ বিশ্বাস বা দেবাংশু ভট্টাচার্যের মত সরাসরি তৃণমূল কংগ্রেস করেন না যাঁরা, তাঁদের এখন ঢোঁক গিলে মানবিকতা দেখাতেই হচ্ছে। নইলে ভবিষ্যতে নিরপেক্ষতা (সংবাদমাধ্যমের), ফ্যাসিবাদবিরোধিতা (বামপন্থী ও উদারপন্থীদের) ইত্যাদি ভাল ভাল জিনিস করি বলে দাবি করা যাবে না। না, মানে করতে কে আর আটকাত? কিন্তু নিজেদেরই একটু বিবেকে লাগত বোধহয়। তাই ওঁদের এই মহানুভবতা। বোধহয় অনেকের মহানুভবতার কারণ এটাও যে ইন্দ্রানুজ রাজ্যের কোনো বিরোধী রাজনৈতিক দলের ছাত্র সংগঠনের সদস্য নয়। সেটা হলে সংবাদমাধ্যম তো বটেই, বিকল্প বামেরাও অনেকে শিক্ষামন্ত্রীকে ঘিরে ধরা, তাঁর গাড়ির কাচ ভাঙা ইত্যাদির নিন্দা করতেন এবং একে ওই বিরোধী রাজনৈতিক দলটার ক্ষমতা দখলের ঘৃণ্য চেষ্টা বলে সাংবাদিক সম্মেলন করতেন। যেমনটা আর জি কর আন্দোলনের শেষ পর্বে আমরা দেখেছি।

দেখুন, সত্যি কথা সোজা করে বলাই ভাল। গণতন্ত্র-ফন্ত্র কে চায়? বিশেষ করে শিক্ষাঙ্গনে গণতন্ত্র তো বাবা-মায়েরা মোটেই চান না। ছেলেমেয়ে কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে যাবে লেখাপড়া করতে। ওটা রাজনীতি করার জায়গা নাকি? বাবা-মায়েরা বিলক্ষণ জানেন যে যাদবপুরে লেখাপড়া হয় না। ওখানে কেবল ছেলেরা গাঁজা খায়, মেয়েরা ছেলেদের সঙ্গে বসে হাফপ্যান্ট পরে সিগারেট খায়। কিন্তু সেসবও মেনে নেওয়া যেত যুগের ধর্ম হিসাবে। এসবের থেকেও বড় অপরাধ যেটা করে যাদবপুরের ছেলেমেয়েরা, সেটা হল রাজনীতি করে। তাও আবার মূলত বামপন্থী রাজনীতি। এই রাজনীতির ছোঁয়াচ বাঁচাতে অর্থনৈতিকভাবে সক্ষম বাবা-মায়েরা পাঁচতারা হোটেলের মত যেসব বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় হয়েছে ছেলেমেয়েদের সেখানে পাঠাতেই বেশি স্বচ্ছন্দ বোধ করেন। যাদবপুর, প্রেসিডেন্সির মত দু-একটা জায়গা বাদে পশ্চিমবঙ্গের কোনো কলেজে যে ২০১৭ সাল থেকে ছাত্র সংসদের নির্বাচন হয় না তাতে বাবা-মায়েরা তো বটেই, অনেক ছাত্রছাত্রীও খুশি। ভোট দেব পঞ্চায়েত, পৌরসভা, বিধানসভা, লোকসভার জন্যে। পড়াশোনার জায়গায় আবার ভোট কিসের? এইসব করতে গিয়েই তো বাম আমলে পশ্চিমবঙ্গে লেখাপড়া হত না, তাই না? এদিকে ২০১১ সাল থেকে কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্রমশ ছাত্র রাজনীতি তুলে দিয়ে কীরকম দুর্দান্ত পড়াশোনা হচ্ছে তা সমস্ত ছাত্রছাত্রী এবং অভিভাবক জানেন। আরও নিদারুণভাবে জানেন মাস্টারমশাই, দিদিমণিরা। বছরের পর বছর নির্বাচন না হওয়া মানে যে একনায়কতন্ত্র – সেকথা তাঁরা দেশের রাজনীতি সম্পর্কে মানতে রাজি। পশ্চিমবঙ্গের ভোটে হিংসা, রিগিং ইত্যাদি নিয়েও অসন্তুষ্ট হন। কিন্তু কলেজ ক্যাম্পাসে তাঁরা রাজনীতি চান না, ভোট-ফোট চান না। কেন? জিজ্ঞেস করলেই উত্তর পাওয়া যাবে ‘ওতে লেখাপড়ার ক্ষতি হয়। অশান্তি হয়।’ প্রথম যুক্তিটা সত্যি হলে যাদবপুর বছরের পর বছর ইউজিসি, ন্যাক, বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মূল্যায়নে কী করে দেশের সেরা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে থাকে, সে প্রশ্নের উত্তর কিন্তু কারোর কাছে নেই। দ্বিতীয় যুক্তিটা ঠিক হলে অন্য শান্তিপূর্ণ কলেজগুলোতে ছাত্রসংখ্যা কমছে কেন, যাদের নাম খাতায় আছে তারাও ক্লাস করতে আসে না কেন, এসব প্রশ্নও কেউ নিজেকে করে না। ছাত্র রাজনীতির প্রায় পঞ্চত্বপ্রাপ্তি হওয়া পশ্চিমবঙ্গে যাদবপুরের মত জায়গাতেও খাতা না দেখেই নম্বর দিয়ে দেওয়া হচ্ছে, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে ১২০ জনের খাতা হারিয়ে যাচ্ছে কেন?

দীর্ঘ চেষ্টায় গোটা রাজ্যের মাথায় ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে যে ছাত্রছাত্রীরা রাজনীতি করলে লেখাপড়া হয় না আর শ্রমিকরা রাজনীতি করলে শিল্প হয় না। ২০১১ সালের পর থেকে সরকারি প্রচেষ্টায় দুটোই প্রায় তুলে দেওয়া হয়েছে সফলভাবে। অথচ না লেখাপড়া হচ্ছে, না শিল্প হচ্ছে। এসব বললে উত্তর আসবে, অত সালে অমুক কলেজে ছাত্র ইউনিয়নের নির্বাচনে হিংসায় অমুকের প্রাণ গিয়েছিল, তমুকের চোখ নষ্ট হয়েছিল। তমুক কলেজে এসএফআই বাম আমলে তোলাবাজি করেছিল, তৃণমূল নতুন কিছু করছে না। ঠিক কথা। একথাও ঠিক যে বহু কারখানায় বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠনের নেতারা (শ্রমিক ইউনিয়ন কেবল সিপিএম বা অন্য বামপন্থী দলের নেই; কংগ্রেস, তৃণমূল, এমনকি আরএসএসেরও আছে। এটা আবার এ যুগের সবজান্তারা জানেন না) মালিকপক্ষের সঙ্গে তলে তলে আপোস করে শ্রমিকদের বারোটা বাজিয়েছেন। কিন্তু তার জন্যে ইউনিয়ন, রাজনীতি, গণতন্ত্র সব তুলে দেওয়া উচিত – এই প্রত্যয় তৈরি হলে মাথায় ব্যথা হওয়া মাত্রই ব্যথার ওষুধ না খেয়ে বা দীর্ঘকালীন মাথাব্যথার কারণ সন্ধানে ডাক্তারের কাছে না গিয়ে পত্রপাঠ মাথাটা কেটে ফেলা উচিত। তাতে অচিরেই পশ্চিমবঙ্গ স্কন্ধকাটাদের রাজ্যে পরিণত হবে। ইতিমধ্যেই দু-কান কাটাদের রাজ্যে পরিণত হয়েছে। তাই চার্জশিটে যার নাম লেখা আছে সে বুক ফুলিয়ে সভায় বলতে পারে – ওটা কার নাম, নির্দিষ্ট করে বলুক। টিভি স্টুডিওর সান্ধ্য আলোচনায় গভীর জল্পনা কল্পনা চলে – নামটা কার।

এমন রাজ্যে সরকার যে নিতান্ত কোণঠাসা না হলে কোনো আন্দোলনকে গ্রাহ্য করবে না, কোনো দাবিকেই পাত্তা দেবে না তাতে আশ্চর্যের কিছু নেই। আর জি কর আন্দোলন যখন তুঙ্গে, তখন জুনিয়র ডাক্তাররা মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকে কলেজগুলোতে ছাত্র সংসদের নির্বাচন করানোর দাবি করেছিলেন। সরকারপক্ষ থেকে অমনি প্রচার করা শুরু হয় ‘এই দেখুন, এরা আসলে ক্ষমতা চায়’। সেই প্রচার অনেকের পছন্দও হয়ে যায়। মানে গণতান্ত্রিক দেশে নির্বাচন চাওয়া মহা অপরাধ। তর্কের খাতিরে যদি ধরে নেওয়া যায় তারা ক্ষমতা চায় বলেই নির্বাচন চেয়েছিল, সেটাই বা অপরাধ হবে কেন? নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতা হস্তান্তর তো গণতন্ত্রের লক্ষণ। গায়ের জোরে ক্ষমতা দখল করতে তো চায়নি। অথচ বহু বিপ্লবীও সেইসময় সরকারি দলের এই অন্যায় প্রচারের প্রতিবাদ করেননি। ব্রাত্যবাবুর গাড়ির বেপরোয়া মেজাজ তখনই তৈরি হয়েছে। এমনিতেই আমাদের দেশে গণতন্ত্র সংকুচিত হতে হতে এমন জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছে যে শাসক দলগুলোর যে কোনো অন্যায় নিয়ে প্রশ্ন তুললেই তারা বলে দেয়, কাজটা করার পরেও তারাই জিতেছে। অতএব মানুষের তাদের উপর আস্থা আছে। সুতরাং ওটা অন্যায় নয়। তার উপর লেখাপড়া জানা নাগরিকরা যদি নিজেরাই নানা ভাষায় বলতে শুরু করেন যে কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদ, স্কুলের ম্যানেজিং কমিটি বা টিচার্স কাউন্সিল, সমবায় সংস্থা ইত্যাদি ছোট ছোট পরিসরেও নির্বাচন চাওয়াই অপরাধ – তাহলে তো সোনায় সোহাগা।

অর্থাৎ ছাত্রের উপর দিয়ে শিক্ষামন্ত্রীর গাড়ি চালিয়ে দেওয়ার ঔদ্ধত্য শাসককে আমরাই উপহার দিয়েছি বললে বিশেষ ভুল হয় না। বিরোধী দলগুলো অবশ্যই দায়হীন নয়। বিধানসভার বিরোধী দল বিজেপির স্বর যে যাদবপুর বা ছাত্র রাজনীতির প্রসঙ্গ উঠলে তৃণমূলের সঙ্গে মিশে যায় তা অতীতেও দেখা গেছে, গতকাল থেকেও দেখা যাচ্ছে। এটা কাকতালীয় নয়। জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের মত যেসব প্রতিষ্ঠানের ছাত্রছাত্রীরা আজও মূলত বামপন্থী সেইসব প্রতিষ্ঠানকে তৃণমূল কংগ্রেসের মত বিজেপিও শত্রুই মনে করে এবং সেগুলোর সাড়ে বারোটা বাজাতে চেষ্টার ত্রুটি রাখে না। মতপার্থক্য যা নিয়ে হয় সেটা হল যারা বাবুল সুপ্রিয়র মাথায় চাঁটি মেরেছে বা ব্রাত্যবাবুকে আঘাত করেছে তাদের কী বলা হবে তাই নিয়ে। নকশাল, নাকি আর্বান নকশাল, নাকি দেশদ্রোহী, নাকি পাকিস্তানি ইত্যাদি প্রভৃতি। অমন মতপার্থক্য তৃণমূলের নিজের ভিতরেও তো হয়। কাল থেকে যেমন কোনো তৃণমূল নেতা বলছেন এটা সিপিএমের বদমাইশি, কেউ বলছে অতিবামদের গুন্ডামি ইত্যাদি প্রভৃতি। বিধানসভা, লোকসভায় বারবার শূন্য পেলেও যাদের হাতে নাকি এই রাজ্যের প্রগতিশীলতার ঐতিহ্য রক্ষা করার দায়িত্ব, সেই সিপিএম বা বামফ্রন্টের দলগুলোর আবার অন্য সমস্যা। বিভিন্ন ক্যাম্পাসে তাদের ছাত্রনেতারা যতটা লড়াকু, বিশেষত অন্য বামেদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে, ক্যাম্পাসের বাইরে পার্টির ততটা লড়াই দেখা যায় না। তার উপর ইদানীং আবার সিপিএম নেতারা ডিপার্টমেন্টাল স্টোর সিস্টেম চালু করেছেন। ব্রিগেডের ডাক দেয় যুব সংগঠন বা খেতমজুরদের সংগঠন। যাদবপুরে ছাত্রের উপর দিয়ে মন্ত্রীর গাড়ি চলে গেছে বলে ছাত্র ধর্মঘটের ডাক দিয়েছে ছাত্র সংগঠন। স্কুলশিক্ষার অব্যবস্থা নিয়ে আন্দোলন করতে হলে সে আন্দোলন হয় শিক্ষক সংগঠনের ব্যানারে। পার্টির নাম, পার্টির পতাকা দেখা যায় কেবল সম্মেলনে আর সাংবাদিক সম্মেলনে। পার্টির ‘নতুন মুখ’, ‘তরুণ মুখ’ বলে খ্যাত নেতৃবৃন্দকে কলকাতায় বিভিন্ন ছায়াছবির প্রিমিয়ারে আর টিভি স্টুডিওতে রোজ দেখা যায়। কিন্তু মীনাক্ষী মুখার্জি বাদ দিলে কাউকে প্রত্যন্ত এলাকার আন্দোলনে নিয়মিত দেখা যায় না। ক্ষমতাসীন তৃণমূলে এত জটিলতা নেই। একটাই বুলডোজার, সব জায়গায় চালানো হয়।

পশ্চিমবঙ্গে এর বাইরেও তৃণমূলবিরোধী দল আছে। কয়েকটা কোণে কংগ্রেস আছে, যাদের কথা বলাই বাহুল্য। তাছাড়া কিছু বাম দল আছে। ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে যখন বামফ্রন্ট শূন্য হয়ে গেল, তখন এক ওয়েব ম্যাগাজিনে লিখেছিলাম, তাঁদের অনেককালের অভিযোগ, সিপিএম বামপন্থার বদনাম করছে। একটিবার সুযোগ পেলেই তাঁরা দেখিয়ে দিতে পারেন আসল বামপন্থা কী, কিন্তু সিপিএম তাঁদের জায়গা ছাড়ে না। এবার সিপিএম শূন্য হয়ে গেল, সামনে ফ্যাসিবাদের বিপদ। এইবার তাঁরা সিপিএমের জায়গাটা নিন, দেখিয়ে দিন। কিন্তু ২০২৬ আসতে চলল, তাঁরা জায়গা ভরাট করতে পারলেন না। এখনো বলছেন যা ঘটছে সবই সিপিএমের দায়িত্ব। সে দায়িত্ব পালনে সিপিএম যে ব্যর্থ তা নিয়ে সন্দেহের অবকাশ নেই। কিন্তু ওটুকু বলে ওঁরা সন্তুষ্ট নন। আবার সিপিএমের উপর অভিমান করাও চাই। ‘বিজেপিকে ফ্যাসিবাদী না বলে নয়া ফ্যাসিবাদী বললি কেন? এরম কল্লে খেলব না।’ আবার সিপিএমও বলে ‘তোরা মমতাকে লেসার ইভিল বলেছিলিস না? এখন কেন?’ মানে রবীন্দ্রনাথের কাছে কথাঞ্জলি পুটে ক্ষমা চেয়ে নিয়ে ব্যাপারটাকে এরকমভাবে বলা যায় যে ‘বাম ভাবে আমি দেব/বিকল্প ভাবে আমি/নিউট্রাল ভাবে আমি দেব/হাসে ফ্যাসিনামী।’

আরও পড়ুন আন্দোলন, ন্যায়বিচার, পুজো: একটি অরোম্যান্টিক বয়ান

পশ্চিমে গুজরাট থেকে শুরু হয়ে বিজেপির বিজয়রথ পূর্বে ওড়িশা পর্যন্ত এসে পড়েছে। পশ্চিমবঙ্গে ঢুকতে পারেনি বলে আমরা অনেকেই আহ্লাদিত। সেই ২০২১ সাল থেকেই ফ্যাসিবাদকে হারিয়ে দিয়ে বেশ একটা বিপ্লবী অনুভূতি হচ্ছে। এদিকে সেবার নির্বাচন পর্ব মিটতেই তৃণমূল থেকে বিজেপিতে চলে যাওয়া নেতারা গুটিগুটি ফিরে এসেছেন, ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে লড়াকু নেত্রী মমতা ব্যানার্জি ফিরিয়েও নিয়েছেন। আসানসোল দাঙ্গায় উস্কানি দেওয়া বাবুলবাবু তো তৃণমূলে এসে মন্ত্রীও হয়ে গেছেন। মুকুল রায় বিজেপিতে আছেন, না তৃণমূলে – সে আবার এক রহস্য। রাজ্যের রাজনৈতিক বিতর্কও উন্নয়ন থেকে ধর্মে সরে গেছে। অযোধ্যার রামমন্দিরের পালটা দীঘায় জগন্নাথের মন্দির হয়েছে সরকারি টাকায়। দুর্গাপুজোয় সরকারি সাহায্য তো ছিলই, কাশীর অনুকরণে কলকাতায় গঙ্গার ঘাটে সন্ধ্যারতিও চালু হয়ে গেছে। কোথাও নির্বাচন হলে অশান্তি শুধু নয়, দেখা যাচ্ছে নির্বাচন চাইলেও অশান্তি হয়। দেশের সবচেয়ে বড় সিনেমা শিল্প বলিউডকে দখল করে ফেলেছে বিজেপি, একের পর এক হিন্দুত্ব প্রোপাগান্ডা ছবি চলছে। অথচ তৃণমূল সাংসদ, বিধায়কে ভর্তি টলিউডে কিন্তু তার পালটা প্রোপাগান্ডা ছবি হচ্ছে না। বরং প্রবল মুসলমানবিদ্বেষী বয়ানে ছবি হয়েছে, তাতে যাদবপুরের তৎকালীন তৃণমূল সাংসদ অভিনয় করেছেন। গোয়েন্দা ব্যোমকেশকে ত্রিশূলধারী শিব সাজানো ছবি হয়েছে ঘাটালের তৃণমূল সাংসদের প্রযোজনায়, শ্রেষ্ঠাংশেও তিনি। উপরন্তু ইতিমধ্যেই রুগ্ন শিল্প হয়ে যাওয়া আঞ্চলিক ভাষার এই ইন্ডাস্ট্রির অবস্থা আরও কাহিল হচ্ছে তৃণমূল নেতাদের প্রতাপে। টেকনিশিয়ানদের গিল্ড আর নির্দেশকদের দ্বন্দ্বে গতবছর জুলাই মাসে একবার বেশ কয়েকদিন শুটিং বন্ধ ছিল। তারপর অক্টোবর মাসে ২৩৩ জন পরিচালক তৃণমূলের টলিপাড়ার নেতা স্বরূপ বিশ্বাসের বিরুদ্ধে মানহানির মামলা করেন। সম্ভবত তারই প্রতিক্রিয়ায় টেকনিশিয়ানদের গিল্ড কয়েকজন পরিচালকের ছবির কাজে বাগড়া দেয়। ফলে গতমাসে পরিচালকরা কর্মবিরতি পালন শুরু করেছিলেন, তবে তাঁদের একতার অভাবে ব্যাপারটা দাঁড়ায়নি। সমস্যা কিন্তু রয়েই গেছে।

এ রাজ্যে অনেকে তো মানেন ভারতে ফ্যাসিবাদ এসে গেছে এবং ফ্যাসিবাদী বলেই আরএসএসের বিরুদ্ধে লড়াইটা আসলে সাংস্কৃতিক লড়াই। তাঁদের অনেকেই আবার বলেন তৃণমূল ফ্যাসিবাদী নয়, কারণ খুব খারাপ শক্তি হলেও তাদের কোনো আদর্শ নেই। আদর্শ না থেকেই যদি ফ্যাসিবাদ যে যে লক্ষ্য পৌঁছতে চায় সেই সেই লক্ষ্যে পৌঁছে যায় কোনো দল, তাহলেও কি সে ফ্যাসিবাদী হয় না?

কে জানে বাপু! বাঙালি তাত্ত্বিক জাতি। স্বৈরাচারী না ফ্যাসিবাদী; ফ্যাসিবাদী না নয়া ফ্যাসিবাদী? এসব তাত্ত্বিক লড়াই আমরা সারাদিন করে যেতে পারি। করছিও তাই। কাজের কাজ তো কিছু করছি না। অবশ্য করতে যাবই বা কেন? আমাদের তো অরাজনৈতিক, নিরপেক্ষ থাকতে হবে। কলকাতা থেকে প্রকাশিত বাঙালির গর্বের প্রগতিশীল খবরের কাগজ দ্য টেলিগ্রাফ-এর মত, যারা আজ যাদবপুরের খবরের শিরোনামে লিখেছে ‘Bratya, student hurt in JU clash’। ভাবুন! যার হাতে কাচ ঢুকেছে সে-ও ‘hurt’, যে গাড়ির তলায় পড়েছে, মারা যেতে পারত, সে-ও ‘hurt’। তুলনাহীন নিরপেক্ষতা।

নাগরিক ডট নেট ওয়েবসাইটে প্রকাশিত

মমতা যা করেছেন তাতে তিনি জিতলেও হিন্দুত্ববাদ হারবে না পশ্চিমবঙ্গে

সারা ভারতে হিন্দুত্ববাদী নেতারা মুসলমানদের যে কুৎসিত ভাষায় আক্রমণ করেন তাঁদের ভাষণে, তারই অন্য পিঠে আছে মমতার ‘যে গরু দুধ দেয় তার লাথি খাওয়া উচিত’ মন্তব্য। ইসলাম ধর্মাবলম্বী মানুষকে মনুষ্যেতর প্রাণির সঙ্গে তুলনা করাই ওই মন্তব্যের একমাত্র খারাপ দিক নয়। ওতে বিজেপির এই প্রোপাগান্ডাতেও সিলমোহর দেওয়া হয়েছে যে মুসলমানরা মমতার দলকে ভোট দেয় বলে তারা যা ইচ্ছে তাই করতে পারে এই রাজ্যে।

ললিপপ বনাম আমলকী। যে ভূখণ্ডে রাজনীতি করেছেন এবং বক্তৃতা দিয়েছেন সুরেন্দ্রনাথ ব্যানার্জি, চিত্তরঞ্জন দাশ, সুভাষচন্দ্র বসু, ফজলুল হক, শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জি, যোগেন মন্ডল, জ্যোতি বসু, হীরেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়, মওলানা ভাসানী, তাজউদ্দীন, মুজিবুর রহমানরা – সেই ভূখণ্ডের রাজনৈতিক বিতর্ক হয়ে দাঁড়িয়েছে ললিপপ বনাম আমলকীর বিতর্ক।

নিজেদের দূরদৃষ্টিহীন বিদেশনীতির চক্করে পড়ে যাওয়া ভারত সরকার শেষপর্যন্ত শীর্ষস্থানীয় কূটনীতিবিদদের মাধ্যমে বাংলাদেশের তদারকি সরকারের সঙ্গে আলোচনার পরিবেশ তৈরি করতে সফল হয়েছে। সেই বৈঠকে উত্তেজনার পারদ নেমেছে। ভারত সরকারের পক্ষ থেকে সংখ্যালঘুদের উপর নির্যাতনের প্রতিকার করতে যেমন বলা হয়েছে, বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকেও জানানো হয়েছে কী কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে এবং হবে। অথচ পশ্চিমবঙ্গে উত্তেজনা কমার নাম নেই। তাতে ধুয়ো দিচ্ছেন স্বয়ং মুখ্যমন্ত্রী, যাঁর এ বিষয়ে গরম গরম কথা বলার কোনো প্রয়োজন ছিল না, সাংবিধানিক এক্তিয়ারও নেই। পশ্চিমবঙ্গ বিজেপির নেতা, কর্মীরা লোকসভা নির্বাচনে এবং সদ্যসমাপ্ত উপনির্বাচনে পর্যুদস্ত হওয়ার পর ভেসে যেতে যেতে খড়কুটোর খোঁজ করছিলেন, চট্টগ্রামের অশান্তি তাঁদের পাড়ে তুলে দিয়েছে। ফলে তাঁরা যে দায়িত্বজ্ঞানহীন মন্তব্য করে, ওপারের হিন্দুদের প্রতি প্রবল প্রীতি প্রদর্শন করে এপারের হিন্দু ভোট একত্রিত করতে চাইবেন তা প্রত্যাশিত। তবলার বাঁয়ার মত যুদ্ধবাজ এবং টিআরপিবাজ মিডিয়ার সাংবাদিকরাও যে যা মুখে আসে তাই বলবেন তাও জানা কথা। কিন্তু মমতা ব্যানার্জির কী প্রয়োজন ছিল বাংলাদেশি সেনার কিছু অবসরপ্রাপ্ত আধিকারিক আর বাংলাদেশ ন্যাশনালিস্ট পার্টির (বিএনপি) একজন নেতা, যাঁরা বাংলাদেশ সরকারের কেউ নন, তাঁদের মন্তব্যের জবাবে খোদ বিধানসভায় দাঁড়িয়ে বলার ‘এত বড় হিম্মত, আপনাদের কেন, কারো নেই যে বাংলা, বিহার, উড়িষ্যা সব নিয়ে নেবেন আর আমরা বসে বসে ললিপপ খাব’?

এর জবাবে আবার বিএনপির ওই নেতা, রুহুল কবীর রিজভি, বলেছেন ‘আপনারা যদি চট্টগ্রামের দিকে তাকান, তাহলে আমরা কি আমলকী মুখে চুষব?’

মানে দুই দেশের সরকার – যাদের হাতে বিদেশনীতি এবং প্রতিরক্ষা – তারা কেউ কারোর এলাকা দখল করার হুমকি দেয়নি। পশ্চিমবঙ্গের কিছু বিজেপি নেতা আর বিজেপি প্রোপাগান্ডার প্রচারক (নামে সাংবাদিক) বাংলাদেশের বিরুদ্ধে আক্রমণাত্মক মন্তব্য করলেন। তার জবাবে বাংলাদেশের কিছু লোক, যাঁদের কোনো ক্ষমতাই নেই, তাঁরা পালটা গা গরম করা মন্তব্য করলেন। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী সেই মন্তব্যের ততোধিক অর্থহীন জবাব দেওয়ার জন্য বেছে নিলেন রাজ্যের আইনসভাকে। কেন? বাংলাদেশের অবসরপ্রাপ্ত সেনা অফিসারদের আর বিএনপি নেতার মেজাজ কেন বিগড়ে গেল, সে ভাবনা ওঁদের দেশের মানুষের উপর ছেড়ে দিয়ে আমরা বরং আমাদের মুখ্যমন্ত্রীর উত্তেজনার কারণ অনুসন্ধান করি।

বাংলাদেশের ঘটনাবলীতে প্রথম থেকেই মনে হচ্ছে মমতা যেন কত কট্টরপন্থী প্রতিক্রিয়া দিতে পারেন তার প্রতিযোগিতায় নেমেছেন বিজেপির সঙ্গে। ললিপপের বদলে আমলকীর হাস্যকর মন্তব্য করার সময়ে রিজভি এমন একটা কথা বলেছেন যা প্রণিধানযোগ্য। বলেছেন মমতাকে ওঁরা ধর্মনিরপেক্ষ, অসাম্প্রদায়িক বলে ভাবতেন। কিন্তু বাংলাদেশে সম্মিলিত জাতিপুঞ্জের শান্তিরক্ষী বাহিনী পাঠানোর কথা বলে মমতা নাকি প্রমাণ করে দিয়েছেন যে তিনিও আসলে কট্টরপন্থী হিন্দু। মমতার ওই প্রস্তাবে সত্যিই তা প্রমাণ হয় কিনা তা তর্কসাপেক্ষ, কিন্তু একথা অস্বীকার করার উপায় নেই যে ওই মন্তব্য বিজেপির চেয়েও চরমপন্থী। নরেন্দ্র মোদীর সরকার সেই জওহরলাল নেহরুর আমল থেকে চলে আসা সর্বসম্মত বিদেশনীতি ত্যাগ করে বহু ক্ষেত্রে আমূল পরিবর্তন ঘটিয়েছে। যেমন প্যালেস্তাইনের প্রতি মিত্রতার নীতি ত্যাগ করে ইজরায়েলের বন্ধু হয়ে উঠেছে। কিন্তু একটা ব্যাপারে এখনো চিরকালীন নীতি বজায় রাখা হয়েছে, তা হল অন্য দেশের সঙ্গে ভারত সরকারের গোলমালকে দ্বিপাক্ষিক বিষয় হিসাবে দেখা। এমনকি কাশ্মীর সমস্যাকেও অতীতের কংগ্রেস এবং যুক্তফ্রন্ট সরকারগুলোর মতই মোদী সরকার ভারত-পাকিস্তানের দ্বিপাক্ষিক সমস্যা হিসাবেই দেখে। কোনো তৃতীয় পক্ষের হস্তক্ষেপ চায় না। অথচ মমতা সটান একটা সার্বভৌম প্রতিবেশী রাষ্ট্র, যেখানকার সংখ্যালঘুরা আক্রান্ত হলে ভারতের স্বার্থও বিঘ্নিত হতে পারে, তাদের আভ্যন্তরীণ গোলমালে সম্মিলিত জাতিপুঞ্জের শান্তিবাহিনী পাঠানোর দাবি করে বসলেন!

মমতা প্রবীণ রাজনীতিবিদ, মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার আগে একাধিকবার কেন্দ্রীয় মন্ত্রীও ছিলেন। ফলে তাঁর এত চরমপন্থী অবস্থানের রাজনৈতিক প্রভাব সম্পর্কে তিনি সচেতন নন এমন ভাবার কারণ নেই। যা হওয়ার তাই হয়েছে, পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রীর এহেন আচরণে বাংলাদেশে প্রতিক্রিয়া হয়েছে। শান্তিবাহিনীর কথা বলায় খোদ বাংলাদেশ সরকার অসন্তোষ প্রকাশ করেছে। মহম্মদ ইউনুসের প্রেস সচিব শফিকুল আলম বলেছেন ‘আমরা অবাক হয়েছি ওঁর মন্তব্যে। এক জন মুখ্যমন্ত্রীর তো কথার ওজন থাকবে? তা ছাড়া এখানে যাঁরা পড়তে বা কোনও কাজে এসেছেন, সেই ভারতীয়রা নিরাপত্তার অভাব বোধ করছেন, এমন কোনও খবর আমাদের কাছে নেই।’ এরপরেও মমতা সুর নরম করেননি। ললিপপ-আমলকীর যুদ্ধে এসে পৌঁছেছেন। এর একটাই অর্থ হয়। কোনো বিষয়ে আন্দোলন করে রাজ্য সরকারকে ফ্যাসাদে ফেলতে অক্ষম বঙ্গ বিজেপি বাংলাদেশে হিন্দুদের উপর নির্যাতনকে যেভাবে আঁকড়ে ধরেছে, তাতে মমতা হিন্দু ভোট হারানোর আশঙ্কা করছেন। আশঙ্কা সত্যি হলে ক্ষমতা হাতছাড়া হতে পারে। তাই আর বছর দেড়েক পরের বিধানসভা নির্বাচনের কথা মাথায় রেখে তিনি যে বিজেপির চেয়েও বড় হিন্দু তা প্রমাণ করতে উঠে পড়ে লেগেছেন। তাতে প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষতি হল কি না হল তা ভেবে দেখার সময় নেই।

বিজেপিকে আটকানোর তাড়নায় এবং বামপন্থীদের দুর্বলতায় পশ্চিমবঙ্গের ধর্মীয় সংখ্যালঘু ভোটারদের কাছে একমাত্র পছন্দ হয়ে দাঁড়িয়েছে তৃণমূল কংগ্রেস। তার সুযোগ নিয়ে মমতা বাংলার মুসলমানদের প্রতি যথেচ্ছ অন্যায় করে চলেছেন। মমতার শাসনে এ রাজ্যের মুসলমানদের বলার মত আর্থসামাজিক উন্নয়নের কোনো দৃষ্টান্ত নেই। অথচ সারা ভারতে হিন্দুত্ববাদী নেতারা মুসলমানদের যে কুৎসিত ভাষায় আক্রমণ করেন তাঁদের ভাষণে, তারই অন্য পিঠে আছে মমতার ‘যে গরু দুধ দেয় তার লাথি খাওয়া উচিত’ মন্তব্য। ইসলাম ধর্মাবলম্বী মানুষকে মনুষ্যেতর প্রাণির সঙ্গে তুলনা করাই ওই মন্তব্যের একমাত্র খারাপ দিক নয়। ওতে বিজেপির এই প্রোপাগান্ডাতেও সিলমোহর দেওয়া হয়েছে যে মুসলমানরা মমতার দলকে ভোট দেয় বলে তারা যা ইচ্ছে তাই করতে পারে এই রাজ্যে। রেড রোডে ঈদের নমাজে গিয়ে নির্বাচনী কথাবার্তা বলেও তিনি রাজ্যের মুসলমানদের বিপদ বাড়িয়েছেন। রাজ্যের হিন্দুদের মধ্যে যতজন ইমাম, মোয়াজ্জেমদের সরকারি ভাতা দেওয়া সংখ্যালঘু তোষণ বলে মনে করেন, তার অর্ধেকও বোধহয় পুরোহিত ভাতার কথা মনে রাখেননি। দুর্গাপুজো করতে সরকারের টাকা দেওয়াও যে হিন্দু তোষণ, তা তিন শতাংশে নেমে আসা বামপন্থী ভোটারও মানতেই চান না। মমতা এসব ভালই বোঝেন। তাই সম্ভবত তিনি ঠিক করেছেন, ২০১১ সাল থেকে চালিয়ে আসা নরম হিন্দুত্ববাদ আর যথেষ্ট নয়। এবার একেবারে কট্টর হিন্দুত্ববাদী হয়ে উঠতে হবে।

অযোধ্যায় যেখানে বাবরি মসজিদ ছিল ঠিক সেখানেই সুবিশাল রামমন্দির বানিয়ে দেখিয়ে দিয়েছেন মোদী। ২০২৪ লোকসভা নির্বাচনের আগেই কাজ শেষ না হওয়া সত্ত্বেও সেই মন্দির উদ্বোধন করেছেন। তাতে নির্বাচনী লাভ হয়েছে কি হয়নি তা অন্য আলোচনার বিষয়। কিন্তু ২০২৬ বিধানসভার অনেক আগেই মমতাও দীঘায় জগন্নাথধাম বানিয়ে, বাংলা খবরের চ্যানেলের ভাষায়, ‘পালটা দিলেন’। বাংলাদেশে যে ইস্কন এই মুহূর্তে আক্রান্ত বলে অভিযোগ, সেই সংগঠনের সাধুদের পাশে নিয়েই মমতা বুধবার ঘোষণা করলেন যে আগামী অক্ষয় তৃতীয়ায় ওই মন্দিরের উদ্বোধন হবে।

কে জানে মোদীর মত মমতাও প্রাণপ্রতিষ্ঠা ইত্যাদি দায়িত্ব নিজেই পালন করবেন কিনা। তাঁর প্রগতিশীল সমর্থকরা যতই তাঁর উপর সাবল্টার্নত্ব আরোপ করুন, মুখ্যমন্ত্রী যে সাক্ষাৎ ব্রাহ্মণসন্তান তাতে তো ভুল নেই। সুতরাং করতেই পারেন। প্রধানমন্ত্রী ও জিনিস করায় আমরা বিস্তর চেঁচামেচি করেছিলাম রাষ্ট্রের সঙ্গে ধর্মের দূরত্ব ঘুচিয়ে দিয়ে ধর্মনিরপেক্ষ সংবিধানের শ্রাদ্ধ করা হল অভিযোগ তুলে। কিন্তু সরকারি টাকায় জগন্নাথের মন্দির বানালেও যে একই কাজ হয় সেকথা আমরা বলিনি, বলবও না। কারণ আমরা বাঙালি প্রগতিশীলরা জানি, মমতার সিদ্ধান্তে তৈরি মন্দির হল ধর্মনিরপেক্ষ মন্দির। আর তিনি যদি নিজে হাতে প্রাণপ্রতিষ্ঠা করেন তাহলে তা দেখে বিজেপির ভোটাররাও তৃণমূলকে ভোট দিয়ে দেবেন। সুতরাং সেটা হবে হিন্দুত্ববাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে ধর্মনিরপেক্ষতার জয়।

শুভেন্দু সম্ভবত সেই আশঙ্কাতেই চেঁচামেচি আরম্ভ করেছেন। তিনি হঠাৎ রাষ্ট্র আর ধর্মের পৃথকীকরণ সম্পর্কে ভারি সচেতন হয়ে বলে উঠেছেন ‘সরকারি টাকায় কোনো মন্দির, মসজিদ, গির্জা, গুরদোয়ারা করা যায় না…আমরা রামমন্দির বানিয়েছি হিন্দুদের টাকায়, সরকারের টাকায় নয়’। আরও বলেছেন, মমতা যা বানিয়েছেন ওটা নাকি মন্দিরই নয়। তিনি কাদের যেন মেদিনীপুরে নিয়ে এসে ধর্মসম্মেলন করে প্রমাণ করে দেবেন যে ওটা মন্দির নয়, ফলে মমতার ভণ্ডামি ফাঁস হয়ে যাবে। আরেক নেতা তরুণজ্যোতি তিওয়ারি আবার টিভি স্টুডিওতে বসে হুগলী আর মালদা জেলার দুটো মসজিদকে আসলে মন্দির বলে দাবি করে সেখানে পুজো দেওয়া যাবে কিনা সে প্রশ্ন খুঁচিয়ে তুলেছেন।

মোদ্দাকথা, ক্রমশ পরিষ্কার হয়ে যাচ্ছে যে ২০২১ সালের মত ২০২৬ সালের নির্বাচনও তৃণমূল সরকার পাঁচ বছরে কতটা কী কাজ করল না করল, তা নিয়ে হবে না। সরকারি দল এবং সরকারের দুষ্কর্ম বা দুর্নীতি নিয়েও নয়। কারণ কেবল সরকার নয়, রাজ্যের প্রধান বিরোধী দলও তা চায় না। আর জি কর কাণ্ড নিয়ে আন্দোলনে তারা কোনো ভূমিকা নিতে পারেনি বলে ও ব্যাপারটা সকলে ভুলে গেলেই তারা খুশি হত। ঠিক সেটাই হয়েছে। আন্দোলনকারীরা মিইয়ে গেছেন তো বটেই; মৃতার জন্যে ন্যায়বিচার চাই, কিন্তু ডাক্তাররা ধান্দাবাজ ও দুর্নীতিগ্রস্ত – এই যুক্তিতে যাঁরা আর জি কর আন্দোলনের প্রাণপণ বিরোধিতা করেছিলেন, তাঁরাও আর খবর রাখছেন না যে সরকারি কর্মচারী সন্দীপ ঘোষের বিরুদ্ধে চার্জশিট দিতে গেলে রাজ্য সরকারের যে অনুমতি প্রয়োজন সেটা সরকার দিচ্ছে না। তা নিয়ে তাঁরা সরকারের কৈফিয়ত তলব করছেন না, টুঁ শব্দটিও করছেন না। বরং অনেকে বলছেন, সন্দীপ ছাড়া কি আর কোনো দুর্নীতিগ্রস্ত ডাক্তার নেই রাজ্যে? একা ওকেই কেন শাস্তি পেতে হবে? সত্যিই তো। বেচারা সন্দীপ! যা নিয়ে টানা আড়াই মাস আন্দোলন চলল, মাস চারেক যেতেই যখন সে ব্যাপারটা এরকম দাঁড়িয়েছে, তখন আগামী দেড় বছরে সরকার যা-ই করুক না কেন, সেগুলো ভুলতেও সময় লাগবে না।

তাহলে কোন প্রশ্নে ভোট হবে? বাংলাদেশ নিয়ে হাওয়া গরম করে রাজ্য বিজেপি এইটুকু নিশ্চিত করতে পেরেছে যে মমতাকেও হিন্দু ভোটের জন্যে ঝাঁপাতে হবে। অর্থাৎ সংখ্যালঘুদের ভোটার হিসাবে অপ্রাসঙ্গিক করে দেওয়ার যে কাজ সঙ্ঘ পরিবার সারা ভারতে করতে চায় এবং অনেকটা করেও ফেলেছে, তৃণমূল সরকারের ১৫ বছরের মাথায় সে কাজ মোটামুটি সম্পূর্ণ হয়েছে পশ্চিমবঙ্গে। ২০২১ সালে বিজেপিকে আটকাতে হবে – এই প্রশ্নে ভোট হয়েছিল। তাই বহু ধর্মনিরপেক্ষ মানুষ তৃণমূলের কাজকর্মে বিরক্ত হওয়া সত্ত্বেও মমতাকেই ভোট দিয়েছিলেন। এবার মমতাও কে বড় হিন্দু – সেই প্রশ্নের দিকেই নির্বাচনকে নিয়ে যাচ্ছেন। হিন্দুদের মধ্যে যাঁরা নিজেদের ধর্মনিরপেক্ষ বলে এতদিন দাবি করতেন, তাঁদের অনেকের গত একমাসে যে চেহারা বেরিয়ে পড়েছে তাতে বিজেপিকে আটকাতে তাঁরা সকলে আর আগ্রহী কিনা তাতে সন্দেহ আছে। হিন্দুত্ববাদের এর চেয়ে বড় সাফল্য আর কী হতে পারত? এরপর মমতা হারলে হিন্দুত্ববাদ জিতবে তো বটেই, মমতা জিতলেও হিন্দুত্ববাদ হারবে না।

অবশ্য মমতা হারবেন কেন? শুভেন্দু যতই লাফালাফি করুন, মোহন ভাগবত কি আর শুভেন্দুর মত কোনো মন্দিরকে ‘কালচারাল সেন্টার’ বলে হেলাফেলা করতে রাজি হবেন? বাংলাদেশ সম্পর্কে মমতা যা যা বলেছেন, সেগুলো কি মোদী বা অমিত শাহেরও মন কি বাত নয়? নেহাত প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর মত পদে থাকলে ওসব কথা বলা যায় না তাই। অন্য কেউ বলে দিলে মন্দ কী? যা নিয়ে কথা বললে মোদী, শাহদের পছন্দ না-ও হতে পারে তা নিয়ে তো মমতা বা তাঁর দল কিছু বলছে না। সংসদের শীতকালীন অধিবেশন শুরু হওয়ার পর থেকে তো মনে হচ্ছে মহুয়া মৈত্র কংগ্রেস সাংসদ বা নির্দল। কারণ গৌতম আদানি নিয়ে আলোচনা চেয়ে রাহুল গান্ধীরা যে হল্লা করছেন তাতে মমতার দল যোগ দিতে চাইছে না। একা মহুয়াই সোশাল মিডিয়ায় আদানি নিয়ে গলা ফাটিয়ে যাচ্ছিলেন। তৃণমূল বলেছে ওটা নাকি সাধারণ মানুষের ইস্যু নয়, যদিও আদানি গ্রুপে শুধু স্টেট ব্যাংক আর এলআইসির মাধ্যমে মধ্যবিত্তের টাকা আটকে আছে তা নয়। বিদ্যুৎ বিতরণের ব্যবসা থেকে শুরু করে ভোজ্য তেলের ব্যবসা পর্যন্ত সবেতে আদানি গ্রুপ থাকায় তাদের হাতে লুণ্ঠিত হচ্ছেন গরিব মানুষও। আবার এই যে চতুর্দিকে মসজিদের নিচে, মাজারের নিচে মন্দির ছিল দাবি করে মামলা ঠুকছে হিন্দুত্ববাদীরা – তা নিয়েও ধর্মনিরপেক্ষ চূড়ামণি মমতা একটি শব্দ উচ্চারণ করেননি। কংগ্রেস হরিয়ানা, মহারাষ্ট্রে হারের সম্মুখীন হতেই ইন্ডিয়া জোটের নেতৃত্ব মমতার হাতেই তুলে দেওয়া উচিত – এই মর্মে বয়ান দিতে শুরু করেছেন তৃণমূলের মুখপাত্ররা; সমর্থন করছেন অখিলেশ যাদব, শরদ পাওয়ার, লালুপ্রসাদ প্রমুখ। অথচ এইসব জাতীয় স্তরের ব্যাপার বা অখিলেশের রাজ্যের সম্ভলের সাম্প্রদায়িক হিংসা নিয়ে এক লাইন প্রতিক্রিয়া দেননি নেত্রী।

একমাত্র রাজ্যসভার চেয়ারম্যান হিসাবে জগদীপ ধনখড়ের বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাবে কংগ্রেসের সঙ্গে একমত হয়েছে তৃণমূল। কিন্তু লোকসভা নির্বাচনের আগে শেষ অধিবেশনে অন্য দলের মত মমতার দলের সাংসদদেরও ধনখড় সাসপেন্ড না করলে কি সেটুকুও করা হত? সন্দেহ করতেই হচ্ছে, কারণ পশ্চিমবঙ্গের রাজ্যপাল পদে ধনখড়ের উত্তরসূরি সি ভি আনন্দ বোসের সঙ্গে প্রায় সব বিষয়ে ‘কাম অন ফাইট, কাম অন ফাইট’ করার পরে, এমনকি তাঁর বিরুদ্ধে রাজভবনের এক মহিলা কর্মীকে যৌন হয়রানি করার মত গুরুতর অভিযোগ ওঠার প্রেক্ষিতে বৈঠক করতে পর্যন্ত রাজ্যপালের কাছে যাবেন না বলার পরে হঠাৎ গত সোমবার কোন দেবতা সে, কার পরিহাসে, দুজনের ভাব হয়ে গেছে। ধনখড়ের বেলাতেও একটুখানি আড়ি আর সারাজীবন ভাব হয়েছিল। রাজ্যপাল পদে যাঁকে ঘোর অপছন্দ ছিল, উপরাষ্ট্রপতি পদে তাঁর বিরুদ্ধে বিরোধীদের প্রার্থী মার্গারেট আলভাকে সমর্থন করেনি তৃণমূল।

এভাবে একে অন্যকে বিপদে না ফেলে এবং নিঃশব্দে বিরোধ মিটিয়ে ফেলে যদি দিন চলে যায়, তাহলে আর মমতাকে হারানোর জন্যে বিজেপির উতলা হবার দরকার কী? তবে এখানে একটা বিধিসম্মত সতর্কীকরণ দিয়ে রাখা দরকার – পাশেই ওড়িশায় এমনই সাতে পাঁচে না থাকা, দীর্ঘদিনের নিরঙ্কুশ বিজয়ী নবীন পট্টনায়ককে এবছর বিজেপির কাছে মসনদ খোয়াতে হয়েছে।

আরো পড়ুন ভীরুদের হাতে ভারতের গণতন্ত্র রক্ষার ভার, তাই বিরোধী জোট নড়বড়ে

লেখাটা এখানেই শেষ করা যেত। কিন্তু ভারতের অন্য রাজ্যের সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গের তফাত আছে। অন্যত্র শাসক, বিরোধী – দুই পক্ষের সমালোচনা করলে মিটে যায়। কিন্তু এ রাজ্যে সেখানেই থেমে গেলে চলে না। প্রকৃত বিরোধীর অভাব এবং তেমন একটা শক্তির জন্যে মানুষের হাহাকার এমন জায়গায় পৌঁছেছে যে গায়ক, নায়ক, কবি – সকলের থেকেই তাঁরা বিরোধিতা দাবি করেন এবং দাবি পূরণ না হলে গাল দেন। ইদানীং লক্ষ করছি, আমাদের মত চুনোপুঁটি সাংবাদিকের লেখা পড়েও অনেকে মন্তব্য করছেন ‘অল্টারনেটিভটা কী’ বা ‘করণীয় কী’? অনেকে আরও এক ধাপ এগিয়ে বলে দিচ্ছেন যে বিকল্প না বলতে পারলে কিছু লেখাই উচিত নয়। যেন প্রশ্ন তোলা নয়, সব প্রশ্নের উত্তর দেওয়াই সংবাদমাধ্যমের কাজ। আবার কেউ কেউ ঘোষণা করে দিচ্ছেন, বিকল্প বলছে না মানে ও আসলে অমুক পক্ষে বা তমুক পক্ষে। সংবাদমাধ্যম সম্পর্কে এই ভুল ধারণা তৈরি হওয়ার জন্যে অবশ্য সাংবাদিকরাই দায়ী। আসলে যে নিরপেক্ষতা বলে কিছু হয় না, বিশেষত আজকের পৃথিবীতে সাংবাদিকের নৈর্ব্যক্তিকতার ধারণাও বদলে ফেলা দরকার, তা নিয়ে বিস্তর লেখালিখি আছে। আগ্রহীরা উদাহরণ হিসাবে এই লেখাটা পড়ে দেখতে পারেন। তা সত্ত্বেও একথা ঠিকই যে সাংবাদিকরা তাঁদের উদ্দেশ্যকে সন্দেহ করার একাধিক কারণ রোজ জুগিয়ে চলেছেন।

ঠিক তেমনই পশ্চিমবঙ্গের মানুষের রাজনীতির বাইরের লোকের মধ্যে বিরোধী খোঁজা এবং না পেলে ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠার জন্যেও বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোই দায়ী। বিজেপি আর তৃণমূল যে মুদ্রার এ পিঠ ও পিঠ সেকথা কেউ না-ও মানতে পারেন, কিন্তু বিজেপি যে বিধানসভার ভিতরে বা বাইরে সাধারণ মানুষের দাবিদাওয়া নিয়ে আন্দোলন করে না তা সাদা চোখেই দেখা যায়। কংগ্রেস তো বামফ্রন্ট আমলেই প্রান্তিক শক্তি হয়ে গিয়েছিল, রইল বাকি বামপন্থীরা।

রাজ্যের বৃহত্তম বামপন্থী দল বিরোধিতা করবে কী; ইদানীং বুঝেই উঠতে পারে না তারা কোনো পার্টি, নাকি এনজিও, নাকি কোম্পানি। তাই কখনো কিছুটা জনপ্রিয় হয়ে ওঠা যুবনেত্রী মীনাক্ষী মুখার্জিকে পাহাড় থেকে সাগর হাঁটিয়ে ভাবে ভোট পাওয়া যাবে, কখনো মনে করে অতিমারীতে বা অন্য সময়ে অসুস্থ মানুষের শুশ্রূষা করে বা অক্সিজেন সিলিন্ডার পৌঁছে দিয়ে ভোট পাওয়া যাবে, কখনো পতাকা বাদ দিয়ে কোনো আন্দোলনে ঢুকে পড়ে জনসমর্থন ফেরত আসবে মনে করে, কখনো আবার পেশাদার লোক দিয়ে কিছু হিসাবনিকাশ করালেই সব ঠিক হয়ে যাবে মনে করে। নির্বাচনের ফল বেরোলে কোনোটাই কাজে লাগল না দেখে সদস্য, সমর্থকরা অভিমান করেন আর সোশাল মিডিয়ায় — নেতৃত্বের বারণ অমান্য করে – সরকারি প্রকল্পে উপকৃত গরিব মানুষকে গালাগালি দেন। এই ‘বাহির-পানে চোখ মেলেছি, আমার হৃদয়-পানে চাই নি’ অবস্থা কাটিয়ে উঠতে না পারলে তৃণমূল, বিজেপিকে পরাস্ত করার জায়গায় পৌঁছনো শক্ত। নবীন ইন্ডিয়ান সেকুলার ফ্রন্ট না পুরনো নকশাল, নাকি প্রাচীন কংগ্রেস – কাদের সঙ্গে জোট করলে ভোট ফেরত আসবে তা ভাবতেই দিন যাবে।

সিপিএম বা বামফ্রন্টের বাইরেও কিছু বামপন্থী আছেন পশ্চিমবঙ্গে। কিন্তু তাঁরা সিপিএমের শূন্যস্থান পূরণ করার কোনো সম্ভাবনা তৈরি করতে পারেননি সিপিএম হীনবল হয়ে যাওয়ার পরেও।

সুতরাং হতাশাজনক হলেও, সত্যি কথাটা হল, ফ্যাসিবাদ বা হিন্দুত্ববাদকে পরাজিত করেছি বলে যে উল্লাস পশ্চিমবঙ্গবাসী ২০২১ এবং ২০২৪ সালের নির্বাচনের ফল বেরোবার পর করেছিলেন তা যে অকারণ ছিল সেকথা স্বীকার করার সময় এসে গেছে। এখন ‘আমাদের ডান পাশে ধ্বস/আমাদের বাঁয়ে গিরিখাত…।’

নাগরিক ডট নেট ওয়েবসাইটে প্রকাশিত