সব ধর্ষণ সমান নয়

কাউকে তো দেখছি না ফেসবুক বিদীর্ণ করে লিখছে “উন্নাওয়ের ধর্ষক বিধায়কের ফাঁসি চাই” বা “আসিফার ধর্ষকদের মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হোক”? এখনো পাড়ায় পাড়ায় মোমবাতি মিছিলের কোন খবর পাইনি। কাল রাতে দিল্লীতে একখানা হয়েছে বটে কিন্তু তার আয়োজক আবার একটা রাজনৈতিক দল। সেখানে রাহুল গান্ধী ছিলেন। কোথায় গেল নির্ভয়াকান্ডে জাগরূক সেই “নাগরিক সমাজ”?

কথাটা অনেকদিন ধরেই লিখব লিখব করছি। কিন্তু এমনও কথা আছে যা লিখতে হাত সরে না। কেবলই মনে হয় “ভুল ভাবছি। এ সত্যি নয়।“ কিন্তু নিজেকে এ হেন প্রবোধ দিয়েই বা কতদিন চলে? স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ যখন লিখে গেছেন যুগান্তের কবিকেও মানহারা মানবীর দ্বারে দাঁড়াতেই হবে, তখন আমার — দু পয়সার সাংবাদিক আর ফেসবুকে রাগ, ক্ষোভ, ঘৃণা উগরে দেওয়া মূল্যহীন ব্লগার — সাধ্য কী যে একথা না লিখে থাকি? আর সত্যি বলতে যা লিখি তা তো কোথাও কোন মনের কোণে কোন প্রভাব ফেলে না। লিখি নিজের নিষ্ক্রিয়তার পাপস্খালন হচ্ছে — এই ভেবে। ঐ, এরিস্টটল যাকে catharsis বলতেন আর কি। তাই বুক ঠুকে কথাটা লিখেই ফেলি।
সব ধর্ষণ সমান নয়।
কথাটা খুব আপত্তিকর মনে হচ্ছে, না? হতে পারে। কিন্তু গত কয়েকবছরের ঘটনাবলী প্রমাণ করেছে যে সব ধর্ষণ সমান নয়।
২০১২ র ডিসেম্বরের কথা মনে করুন। দিল্লীর সেই মেয়েটি, যার আমরা বাহারী নাম রেখেছি নির্ভয়া (যেন সে নির্ভয়ে বুক ফুলিয়ে ধর্ষিত হতে গিয়েছিল, যেন তার ধর্ষণোত্তর মৃত্যু অত্যন্ত বীরোচিত ঘটনা, যেন একটা তাজা প্রাণের এই মর্মন্তুদ পরিণতি জাতির বিবেক জাগিয়ে তোলার জন্য এক মহান আত্মত্যাগ), সে যখন হাসপাতালে মৃত্যুর চেয়েও বেশি বেদনা নিয়ে শুয়ে ছিল, তখন সারা ভারত জুড়ে কত মোমবাতি মিছিল! ফেসবুকে সরকার কত অপদার্থ সেই নিয়ে লক্ষ লক্ষ পোস্ট! দেশটাকে বদলে ফেলা দরকার — এই মর্মে আমাদের যুবসমাজের কি চিল চিৎকার! বহু মানুষ তো মিছিল করে খোদ দিল্লীতে প্রতিবাদ জানাতে গেলেন ক্ষমতার অলিন্দে। সহসা কি আপাদমস্তক আলোড়ন এই পোড়া দেশটার শরীরে!
সেই একই পরিমাণ আলোড়ন কি হয়েছিল এই বাংলায় যখন কামদুনির মেয়েটা ধর্ষিতা হল? যখন মধ্যমগ্রামে এক ট্যাক্সি ড্রাইভারের মেয়ে ধর্ষণ এবং তারপরেও চলতে থাকা দীর্ঘ লাঞ্ছনার শেষে মারা গেল এবং মৃত্যুটা আত্মহত্যা না হত্যা তা নিয়ে ধোঁয়াশা দেখা দিল? সুজেট জর্ডানের ধর্ষক যেন এখন কোথায়?
যদি ঐ ঘটনাগুলো নিয়ে সংবাদমাধ্যম এবং বিরোধী দলগুলোর প্রতিক্রিয়া ঘেঁটে দেখেন তাহলে হয়ত বলবেন “কম কিছু তো হয়নি।” কিন্তু আমি সংবাদমাধ্যম আর বিরোধী দলগুলোর কথা বলছিই না। বলছি আমাদের মত ক্ষমতার বৃত্তের বাইরে থাকা মানুষদের কথা। আমরা কজন ধর্ষণ হলেই মুখ্যমন্ত্রীর সেটাকে “সাজানো ঘটনা” বা “সিপিএমের চক্রান্ত” বলা শুনে শিউরে উঠেছি, বমি বমি লাগায় বেসিনে থুতু ফেলেছি? কী বলছেন? অনেকেই? তাই নাকি? তার প্রতিফলন তো ভোটবাক্সে দেখলাম না। চৌত্রিশ বছর যারা অপশাসন করেছে তাদের তুলনায় পরিবর্তনের সরকার ভালই চলেছে যদি ধরেও নিই, তাহলে সরকারের পতন না হলেও এত সব ঘটনায় সমর্থন তো অন্তত কমে যাওয়া উচিৎ ছিল। হয়েছে তো উলটো। মুখ্যমন্ত্রীর পার্টির সমর্থন বেড়েই গেছে। ২০১৬ র ফলাফল নিয়ে অনেকের সাথে কথা বলে দেখেছি। সকলেই একমত যে ধর্ষণগুলো কোন ইস্যু নয় যতক্ষণ আমার বাড়ির সামনের কাঁচা নর্দমা পাকা হচ্ছে, আমার গাড়ির চাকা রাস্তার গাড্ডায় পড়ে সার্ভিসিঙের খরচ বাড়িয়ে না দিচ্ছে। অতএব বোঝাই যাচ্ছে যে নির্ভয়ার ধর্ষণ আর কামদুনির মেয়েটার ধর্ষণ এক নয়।
এইসব অপ্রিয় কথা হয়ত লিখতাম না। কিন্তু মুশকিল হল এই যে দেখলাম ধর্ষণের অবমূল্যায়ন চলতেই থাকল (মুখ্যমন্ত্রী সেই যে কত লাখ যেন মূল্য ধার্য করেছিলেন সেই মূল্যের কথা বলছি না কিন্তু) এবং প্রায় দেড় শতক পরে গোপালকৃষ্ণ গোখেলের সেই বিখ্যাত উক্তিকে আবার সত্য প্রমাণ করে এই রোগটা সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ল। সংরক্ষণ চেয়ে জাঠরা দক্ষযজ্ঞ করল, সেই বাবদ নাকি ধর্ষণও করল। সেটা নিয়ে একটু হৈ চৈ হতেই সরকারগুলো ঘোষণা করল কিছুই নাকি হয়নি। সব ধর্ষণ কাল্পনিক। তারপর নয়ডায় জাতীয় সড়কের ধারে এক মহিলার ধর্ষণও এক দিনের মধ্যেই পারিবারিক কলহ, আদৌ ধর্ষণ হয়নি — এসবে পর্যবসিত হল। কোনটা যে সত্য, কোনটা উত্তরসত্য কে বা জানে!
কিন্তু তারপর একটা ঘটনা ঘটল যা তীব্রতার কারণে অস্বীকার করার কোন উপায় রাখেনি। অবশ্য কেউ অস্বীকার করতে চায়ওনি। সেটা হল আপাদমস্তক দুর্নীতিগ্রস্ত, যৌনবিকৃতিসম্পন্ন, বহু নারীর ধর্ষক এক গুরুর গ্রেপ্তারের প্রতিবাদে শত শত ভক্তের দাঙ্গা করা। হরিয়ানার রাজ্য সরকার স্পষ্টতই হাত গুটিয়ে বসে রইল। বুঝে নেওয়া শক্ত নয় যে রাষ্ট্রযন্ত্রের এবং, মানুন আর না-ই মানুন, সাধারণ মানুষের এক বিরাট অংশের সমর্থন ঐ গুরমিত রাম রহিমের দিকে ছিল।
এর পরেও ধর্ষণ এবং সে সম্পর্কে আমাদের উদাসীনতার গল্পটা যেন একতা কাপুরের কে সিরিয়ালের মত — শেষই হয় না। কিন্তু রাম রহিমের সময় থেকেই দেখা যাচ্ছে আমরা আর শুধু উদাসীনতায় থেমে নেই। আমরা ক্রমশ যৌন অপরাধীদের সমর্থনে সোচ্চার।
কলকাতার নাম করা স্কুলে দুজন শিক্ষকের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠল ধর্ষণের। অবিলম্বে সরকারের মদতপুষ্ট লোকেরা গোপনে এবং প্রকাশ্যে বলতে শুরু করল এসব রাজ্যকে অশান্ত করার জন্যে বামপন্থী চক্রান্ত। একটা কাগজে তো প্রতিবাদী অভিভাবকদের ছবি ছেপে দাবী করা হল যে ওঁরা আসলে মাওবাদী। ফেসবুকে যে যা-ই লিখুক নিজেকে প্রগতিশীল প্রমাণ করতে, সেই সময় অন্তত পাঁচজন পরিচিত ব্যক্তিগত কথাবার্তায় আমাকে বোঝানোর চেষ্টা করেছিল জি ডি বিড়লা স্কুলের মেয়েটা মিথ্যে বলছে এবং গোটা ব্যাপারটা আসলে তৃণমূল বনাম বিজেপি ছাড়া কিছুই নয়। এমন তাদের যুক্তির বাহার যে একটা সময়ে আমিও ধন্দে পড়ে যাই। তখন আবার বুঝলাম যে সব ধর্ষণ সমান নয়। কোন দলের লোক যুক্ত, কোন দলের শাসনে ঘটেছে ব্যাপারটা সেসব দেখে আমরা, মানে শিক্ষিত, রুচিশীলরা ধর্ষণের দর ঠিক করি।
কিন্তু তখনো বুঝিনি দর ঠিক করার ওটাই একমাত্র মানদণ্ড নয়। সেটা বোঝার জন্যে অপেক্ষা করতে হল একটা আট বছরের মেয়ের ধর্ষণ এবং খুন পর্যন্ত, একটা ধর্ষিত মেয়ের বাবা পুলিশের হাতে খুন হওয়া পর্যন্ত।
স্পষ্ট মনে আছে যখন নির্ভয়ার ঘটনা প্রকাশ হল, দোষীরা গ্রেপ্তার হল তখন নাবালক ছেলেটিকেও প্রাপ্তবয়স্ক হিসাবে বিচার করা হোক, মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হোক — এই দাবীতে আমার কত বন্ধু, পরিজন সোচ্চার ছিলেন। আমি এর বিরোধিতা করেছিলাম বলে তারা আমাকেই ধর্ষক বলে ফেলে প্রায়। এখন কোথায় তারা? কাউকে তো দেখছি না ফেসবুক বিদীর্ণ করে লিখছে “উন্নাওয়ের ধর্ষক বিধায়কের ফাঁসি চাই” বা “আসিফার ধর্ষকদের মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হোক”? এখনো পাড়ায় পাড়ায় মোমবাতি মিছিলের কোন খবর পাইনি। কাল রাতে দিল্লীতে একখানা হয়েছে বটে কিন্তু তার আয়োজক আবার একটা রাজনৈতিক দল। সেখানে রাহুল গান্ধী ছিলেন। কোথায় গেল নির্ভয়াকান্ডে জাগরূক সেই “নাগরিক সমাজ”?
নব্বইয়ের দশকের শেষদিক থেকে ক্রমশ “স্বতঃস্ফূর্ত” কথাটা খুব জনপ্রিয় হয়েছে। প্রতিবাদ নাকি স্বতঃস্ফূর্ত হলে তবেই গ্রাহ্য হবে, নইলে নয়। অর্থাৎ আমি যদি বুদ্ধি খাটিয়ে, শ্রম দিয়ে, সময় দিয়ে আমার বক্তব্যের সমর্থনে আপনাকে রাস্তায় নামাতে পারি তাহলে সে প্রতিবাদ হল সাজানো ঘটনা। আপনার যদি একা একা স্কচ বা ইনস্ট্যান্ট কফিতে চুমুক দিতে দিতে মনে হয় “নাঃ! একটু মিছিলে হেঁটে আসি”, তবেই সেটা প্রতিবাদ হবে। যাদের স্কচ বা কফি খাওয়ার সাধ্য নেই তাদের প্রতিবাদ, অতএব, গ্রাহ্য নয়। তাদের হাতে থাকে পতাকা, অর্থাৎ তারা সংগঠিত। অর্থাৎ স্বতঃস্ফূর্ত নয়। ভাগ্যিস এইরকম স্বতঃস্ফূর্ততার ধারণা এমনকি অহিংসার পূজারী মহাত্মা গান্ধীরও ছিল না। থাকলে অসহযোগ, ভারত ছাড়ো ওসব করতেন না। সুভাষচন্দ্রও সাত মুলুক পাড়ি দিয়ে সেনাবাহিনী টাহিনী গড়ার ঝামেলায় যেতেন না। মার্টিন লুথার কিংও অপেক্ষা করতেন কবে সাদা চামড়ার লোকেরা এসে চোখের জল ফেলতে ফেলতে “ভাই রে” বলে কালো মানুষদের গলা জড়িয়ে ধরে নিজেদের আমোদের জায়গাগুলোয় নিয়ে যাবে। তা সে যাই হোক, কথা হচ্ছে নির্ভয়ার জন্যে যে “স্বতঃস্ফূর্ত আবেগের বিস্ফোরণ” দেখেছিলাম সে আবেগ কিন্তু উন্নাওয়ের মেয়েটির জন্যে দেখতে পাচ্ছি না। আসিফার জন্যে তো আরোই পাচ্ছি না। উলটে দেখছি এদের ধর্ষকদের জন্যে, হত্যাকারীদের জন্যে বেশ একটা সহানুভূতির আবহ।
আবার বলছি, রাষ্ট্রযন্ত্রের যে সক্রিয় সমর্থন ঐ ইতরগুলোর প্রতি তার চেয়েও আমি বেশি আতঙ্কিত আমাদের মত মানুষদের আচরণ নিয়ে। কোন সন্দেহ নেই গত কয়েকবছরে এদেশে খুনী এবং ধর্ষকদের রাষ্ট্র নজিরবিহীন সমর্থন দিয়েছে। কিন্তু আমার প্রশ্ন এই যে এরকম একটা রাষ্ট্রশক্তি তো তৈরি করেছি আমরা। সেজন্যে আমাদের কেউ কি অনুতপ্ত? আমাদের গণতন্ত্রের হাজারটা ত্রুটি আছে। কিন্তু কেউ কি বলতে পারবে অন্যদের মনোনয়ন জমা দিতে না দিয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় মুখ্যমন্ত্রী হয়েছিলেন? একজনও কি বলবে যোগী আদিত্যনাথ মুখ্যমন্ত্রী হয়েছে লোকের ভোট দেওয়া আটকে? কেউ বলবে ২০১৪ র লোকসভা নির্বাচন বিজেপি জিতেছিল কাউকে ভোট দিতে না দিয়ে?
তাহলে দাঁড়াল কী? ধর্ষকদের ক্ষমতায়ন করেছি আমরাই। দয়া করে বলবেন না “বুঝিনি এমন হবে।” ২০১১ থেকে ১৬ অব্দি অত ধর্ষণের ঘটনার পরেও আপনি বোঝেননি? যোগী আদিত্যনাথের অনেক দোষ আছে। কিন্তু সে কোনদিন নিজের চিন্তাধারা, উদ্দেশ্য গোপন করেছে এমন অপবাদ তার চরম শত্রুও দেবে না। সে কোন ধরণের মানুষ সম্পর্কে কী ভাবে, কী করতে চায় সেসব সে প্রকাশ্যেই বহুবার বলেছে। তার ভিডিও আছে, খবরেও প্রকাশিত হয়েছে। ওসব জেনেও উত্তরপ্রদেশে যে লোক তাকে মুখ্যমন্ত্রী বানিয়েছে আর অন্য কোথাও বসে যারা সমর্থন জানিয়েছে তারা উন্নাওয়ের ঐ মানহারা মানবীর দ্বারে কোন মুখে দাঁড়াবে?
আসিফার ঘটনা আরো বেশি অবাক করার মত। এবং তার প্রতিক্রিয়াও চমকপ্রদ। কোন সভ্য দেশে একটা আট বছরের মেয়েকে একমাত্র কোন বিকৃতমনা অপরাধীই অপহরণ করে বন্দী করে রেখে বারবার ধর্ষণ করতে এবং তারপর খুন করতে পারে। ‘Silence of the lambs’ এর বাফেলো বিলের মত কেউ। এ কাজে কোন সঙ্গী পাওয়ার তার কথা নয় এবং যখন সে ধরা পড়বে তখন বিনা বিলম্বে কঠোরতম শাস্তি তার হওয়ার কথা। কিন্তু আসিফার দুর্ভাগ্য সে জন্মেছিল একটা অসভ্য দেশে। যে দেশের মানুষ ধর্মান্ধ, বর্বর। দুধের শিশুকে মন্দিরে নিয়ে গিয়ে বিগ্রহের সামনে দল বেঁধে ধর্ষণ করে বারবার এবং সেটা হয় তাদের পূজার অঙ্গ। আর কী দারুণ ব্যাপার! যে রাজ্যের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ আসিফার ধর্মের, এমন এক ধর্ম যা নাকি, ধর্ষকদের ধর্মের লোকেদের কথানুযায়ী ভীষণ হিংস্র, সেই রাজ্যে পুলিশ অনেকদিন অব্দি অভিযোগই না নিয়ে গ্যাঁট হয়ে বসে থাকতে পারে! শেষ অব্দি যখন নেয়, তখন জানা যায় কর্তাদের আগেই অনেক টাকাপয়সা দেওয়া হয়েছিল চেপে যাওয়ার জন্য। শুধু তাও নয়, ধর্ষণপুজোর পেরসাদ তাঁরাও পেয়েছেন। এতসব আয়োজন কেন? না আসিফার পরিবার পরিজন ভাই বেরাদরদের ঐ এলাকা থেকে সরানোর জন্যে। আচ্ছা এই অব্দিও না হয় বোঝা গেল। দোষীদের যথাযোগ্য শাস্তির ব্যবস্থা করুক রাষ্ট্র। এর বেশি আর কী করণীয়? ক্ষতি তো যা হওয়ার হয়েই গেছে। কিন্তু বিপদের শেষ তো সেখানে নয়। লোকে যে মিছিল করতে বেরিয়েছে ধর্ষকদের সমর্থনে! উকিলরা আন্দোলন শুরু করেছেন পুলিশকে চার্জশিটই দাখিল করতে দেবেন না বলে! আসিফার পরিবারের পক্ষের উকিলকে হুমকি দেওয়া হচ্ছে “ভিটেমাটি চাটি করে দেব”!
তা এসবে আমাদের স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিক্রিয়াগুলি কী কী রকমের?

১) নীরবতা
২) নিশ্চয়ই পাকিস্তানের হাত আছে
৩) কাশ্মীরীদের বিশ্বাস করা যায় না। কে জানে আসলে কী ব্যাপার? মিডিয়া তো সবেতেই “ওদের” দিকে ঝোল টানে
৪) হয়েছে বেশ হয়েছে। বেঁচে থাকলে তো বড় হয়ে টেররিস্ট হত
৫) তুমি এত লাফাচ্ছ কেন? তোমার বোনকে তো কেউ রেপ করেনি

দু নম্বর থেকে পাঁচ নম্বর হচ্ছে তাদের প্রতিক্রিয়া যারা ইদানীং হিন্দু বলে গর্বিত। এক থেকে পাঁচ তাদেরও প্রতিক্রিয়া যারা অত গর্বিত টর্বিত নয়, তবে মোগাদিশুতে মুসলমান সন্ত্রাসবাদীরা বোম মারলে মুর্শিদাবাদের মুসলমান সম্পর্কে বলে “কৈ, নিন্দা করল না তো? ওদের ধর্মটাই এইরকম। কোরানে পরিষ্কার লেখা আছে।”
এখন যদি জিজ্ঞেস করি এই যে আপনারা আসিফার ধর্ষণকে নির্ভয়ার ধর্ষণের পাশে রাখছেনই না, নিন্দাও করছেন না — এ থেকে কী বুঝব? হিন্দু ধর্মটাই এরকম? ঐ ধর্ষণপুজোর কথা বেদে পরিষ্কার লেখা আছে? কারা যেন ইংরিজিটা লিখতে পারে বলে মুসলমানদের উঠতে বসতে জ্ঞান দেয় “Educated Muslims should reclaim their religion from fundamentalists?” তেনারা হিন্দুধর্মটাকে মৌলবাদীদের হাত থেকে পুনরুদ্ধার করার কাজটা কবে শুরু করছেন জানতে ভারী ইচ্ছা করছে।
ইতিমধ্যে বুকে হাত রেখে একটা সত্যি কথা বলে ফেলতে পারলে ভাল হয়। সেটা এই যে আমরা অনেকেই জেনেশুনে বিষ করেছি পান। কারণ বাইরে উন্নয়ন ইত্যাদি যা-ই বলে থাকি না কেন, মনে মনে জপছিলাম “মুসলমানগুলোকে একটু শিক্ষা দেওয়া দরকার,” “সোনার চাঁদ, সোনার টুকরোগুলোর বড্ড বাড় বেড়েছে” ইত্যাদি। এসব যখন ভেবেছি তখন যোগী আদিত্যনাথের বক্তৃতায় ধর্ষণের হুমকি আমাদের ভালই লেগেছে। এ বিষ বড় মিষ্টি। খাওয়ার সময়ে ভেবেছি আমার কী? আমি তো সংখ্যালঘুও নই, দলিতও নই। এখনো মিষ্টি মিষ্টি লাগছে তাই ধর্ষণগুলোকে সেইভাবেই মাপছি।
এমন বিষ আছে খাওয়ার সাথে সাথে কেউ মরে না, মরে ধীরে ধীরে, অনেক মাস, বছর ধরে। যেমন আর্সেনিক। ঘৃণাও আর্সেনিকের মতই। মনে রাখবেন, যে ধর্ষক একটা আট বছরের মেয়েকে ধর্ষণ করবে বলে মীরাট থেকে কাঠুয়া যেতে পারে, সে কিন্তু মুসলমান না পেলে ধর্ষণ করা বন্ধ রাখবে না। এ দেশের সব মুসলমান, দলিত, আদিবাসী হিটলারের জার্মানির ইহুদীদের মত হাওয়া হয়ে গেলেও তার চোখ লোভে চকচক করবেই। তা বিষ যখন গিলেছেন এবং আমাদের সক্কলকে গিলিয়েছেন তখন আর কী করা? দরজা, জানালা এঁটে শোবেন দয়া করে আর ছেলেমেয়েদের একা কোথাও ছাড়বেন না। মনে রাখবেন, ধর্ষণকে নানা লোক নানা উদ্দেশ্যে ব্যবহার করে কিন্তু ধর্ষণ করার ইচ্ছাটি একদম ধর্মনিরপেক্ষ। ওখানে কিন্তু জাতের ভিত্তিতে সংরক্ষণও নেই।
সব ধর্ষণ সমান নয় কিন্তু সব ধর্ষক সমান।

নিজের দিকে আঙুল তুলুন

আমাকে ছোট থেকে যাঁরা ঠেগুয়া খাইয়েছেন তাঁরা তো কখনো দাবী করেননি ছটপুজোয় ছুটি দিতে হবে। বাংলার মুখ্যমন্ত্রী কেন দিলেন সে প্রশ্ন তাঁকে করুন। এ রাজ্যের হিন্দিভাষীরা নিজেদের মত করে রামনবমী পালনও তো করে আসছেন বরাবর, অস্ত্রমিছিল করেননি তো। রাজনৈতিক দল কেন রাম আর হনুমানের পুজো করবে সে প্রশ্ন দিলীপ ঘোষ আর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে করুন, হিন্দিভাষীরা এর জবাব কেন দেবেন? এ তো আইসিসের অপরাধের জবাব এদেশের সাধারণ মুসলমানের কাছে চাওয়ার মত হয়ে গেল

যেহেতু প্রাসঙ্গিক সেহেতু একটু ব্যক্তিগত প্রসঙ্গের অবতারণা করা যাক।
আমার বাড়ির খুব কাছে অধুনালুপ্ত হিন্দমোটর কারখানা, তৎসহ শ্রমিকদের কোয়ার্টার। ঐ এলাকার বাইরেও কিছুটা জায়গা জুড়ে যাঁদের কোয়ার্টারে জায়গা হয়নি বা নিজের সামর্থ্য আছে তাঁদের বাসস্থান। আমার যখন সদ্য অক্ষর পরিচয় হয়েছে তখন কারখানাটা রমরমিয়ে চলছে। আমার বাবা সেইসময় সক্রিয় রাজনীতিবিদ, তার উপরে প্রশাসক। ফলে রোজ সকালে ঐ কারখানার শ্রমিকরা, যাঁরা ভারতবর্ষের বিভিন্ন রাজ্য থেকে এসেছেন এবং মূলত হিন্দিভাষী, বাবার কাছে বিভিন্ন দরকারে আসতেন। বাবা বাড়ি ফিরত অনেক রাত করে, ফলে খুব ভোর ভোর উঠতে পারত না। যতক্ষণ না উঠত, ওঁদের সাথে গল্পগুজব করতাম আমি। অন্য ভাষা আমার কাছে ভীষণ কৌতূহলোদ্দীপক ছিল আর ওঁদের দিক থেকে দেখলে, ছোটদের সাথে সময় কাটাতে কার না ভাল লাগে? তা এই রোজ সকালে হিন্দি বলার ফলে বাংলার সাথে সাথে হিন্দিটাও তখন আমি দিব্যি বলতে পারি।
যখন হাইস্কুলে পৌঁছেছি তখন ঐ কারখানারই এক শিখ শ্রমিক পরিবার আমাদের প্রায় আত্মীয় হয়ে গিয়েছিল। ওঁরা সপরিবারে আমাদের বাড়ি এসেছেন, ওঁদের ছেলেমেয়েদের বিয়েতে আমরা নেমন্তন্ন খেয়েছি। সেই ঘনিষ্ঠতা বেশিদিন টেকেনি, নইলে গুরুমুখীটাও কিছুটা শিখে নেওয়ার চেষ্টা করতাম।
বরাবর, এমনকি হিন্দমোটর কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ার পরেও, এলাকার হিন্দিভাষী মানুষদের সাথে আমাদের সম্পর্ক একই রকম থেকেছে। খুব ছোটবেলা থেকেই তাই ছটপুজোর ঠেগুয়ার স্বাদ কিরকম সেটা জানি। আমার বাবার যখন ক্যান্সার হয়, তখন যাঁরা নিয়মিত খবর নিতেন, যে কোনরকমভাবে আমাদের সাহায্য করার জন্য মুখিয়ে থাকতেন তাঁদের মধ্যে অনেকেও বন্ধ হয়ে যাওয়া কারখানার হিন্দিভাষী শ্রমিক। বাবা মারা যাওয়ার পর ভেবেছিলাম স্বাভাবিক কারণেই ওঁদের সাথে আমাদের সম্পর্ক শেষ হয়ে যাবে। আমাকে অবাক করে, আমাকে খুব ছোটবেলায় দেখেছেন এমন একজন তাঁর মেয়ের গ্র‍্যাজুয়েশনের পরে কী পড়া উচিৎ তার পরামর্শ করতে আমার কাছে এসেছিলেন বছর দুয়েক আগে। “তুমহারে পিতাজি তো রহে নহি। অব কাঁহা যায়েঁ, কিসসে পুছেঁ? সোচা তুমসে হি পুছ লেতে হ্যাঁয়” বললেন এসে। এই যে জীবিকার তাগিদে, জীবনরক্ষার তাগিদে পশ্চিমবঙ্গে আসা ভিন্ন ভাষাভাষী মানুষ এখানে থাকতে থাকতে এই রাজ্যের মানুষকে ভরসাস্থল মনে করেন — এর চেয়ে গর্বের আর কিছু নেই বলে আমার মনে হয়।
আমি নিজে একসময় হায়দরাবাদের একটা খবরের কাগজে কাজ করতাম। তখন সেই নিউজরুমে বাঙালিরা প্রায় সংখ্যাগরিষ্ঠ, তেলুগুদের চেয়ে সংখ্যায় বেশি তো বটেই। একদিন এক তেলুগু সহকর্মী হঠাৎ দাবী করে বসল আমাকে ফোনে ইংরিজিতে কথা বলতে হবে কারণ কানের কাছে অজানা ভাষায় কেউ কথা বললে তার কাজের অসুবিধা হচ্ছে। এই অন্যায় দাবী মেনে নেওয়ার ছেলে আমি নই। ফলে তার সাথে জোর ঝগড়া হল। সে বলল “তাহলে তেলুগু শেখো। এখানে এসে থাকবে, কাজ করবে আর এখানকার ভাষা শিখবে না?” আমি সপাটে জবাব দিয়েছিলাম “শিখতেই পারি। কিন্তু তুমি কলকাতায় এসো, আমরা তোমায় বাংলা শিখতে জোর করব না। আমরা করি না।” সে আর রা কাড়েনি।
বাঙালি হিসাবে অত গর্বিত আমার কখনো লাগেনি। আর সশস্ত্র রামনবমী মিছিল, তজ্জনিত হিংসা, আবুল কালাম আজাদের মূর্তি ভাঙা দেখে বাঙালি হিসাবে এত লজ্জিতও কখনো হইনি। সেই লজ্জা আরো বাড়িয়ে দিচ্ছে সেই বাঙালিরা যারা এখন আমাদের জাতিগত অধঃপতনের দোষ চাপাচ্ছে অবাঙালিদের ঘাড়ে। ভারত এখন বিবিধ আমরা ওরায় বিভক্ত। তার মধ্যে আবার একটা নতুন আমরা-ওরা যোগ করছে এই বাঙালিরা।
নিজের অযোগ্যতা, অপদার্থতার দায় অন্যের ঘাড়ে চাপানো ভীতু, ওপরচালাক এবং অলস লোকের লক্ষণ। এই বাঙালিরাও আমাদের সেরকম বলেই প্রমাণ করছে। হাস্যকর কিছু কথা বলা হচ্ছে। “এত বেশি সহিষ্ণু হওয়াই আমাদের অন্যায় হয়েছে”, “আমাদের কালচারটার এরা সব্বোনাশ করে দিল”, “রামকৃষ্ণ, রবীন্দ্রনাথ, বিদ্যাসাগরের বাংলা। সেই বাংলায় অবাঙালিগুলো এসে এই সাম্প্রদায়িক রাজনীতি ঢোকাল”, “ওরা যেখানে যেখানে থাকে সেখানেই কিন্তু হিন্দুত্ববাদের রমরমা” — এইসব কথা দেখছি বিজেপিবিরোধীরা তো বটেই, নিজেকে বামপন্থী বলে দাবী করা অনেকেও বেশ বুক ফুলিয়ে বলছেন, সোশাল মিডিয়ায় লিখছেনও। মোটের উপর ঐ তিনটেই বক্তব্য এঁদের। কথাগুলো কতটা অন্যায়, কেন অন্যায় সেটা এবার দেখা যাক।

“এত বেশি সহিষ্ণু হওয়াই আমাদের অন্যায় হয়েছে”
কিরকম হওয়া উচিৎ ছিল তাহলে? মুম্বাইয়ের শিবসেনার মত? বিহার বা উত্তরপ্রদেশের লোক দেখলেই ঠ্যাঙানো উচিৎ ছিল? নাকি সব্বাইকে বাংলা শিখতে হবে, নইলে এর লাইসেন্স দেব না, তার লাইসেন্স দেব না — এসব বলা উচিৎ ছিল? প্রথমত, মুম্বাইতে এটা করে কী ফল হয়েছে? মুম্বাই বলতেই বিশ্বসুদ্ধ লোক কী বোঝে? বলিউড। কোন ভাষায় ছবি হয় সেখানে? হিন্দি। চেনা পরিচিত বাঙালি যারা মহারাষ্ট্রে থাকেন তাঁদের কজন মারাঠি জানেন একবার জিজ্ঞেস করে দেখুন তো। বুঝতে পারবেন ঠ্যাঙাড়ে পদ্ধতি ব্যর্থ। তাছাড়া এই কথা যদি বলেন তাহলে হিন্দুত্ববাদীরা যখন পাকিস্তানের উদাহরণ দেখিয়ে গণতান্ত্রিক অধিকারগুলো কেড়ে নেওয়া সমর্থন করে তখন কিন্তু বলা চলবে না “দেশটাকে পাকিস্তান বানাতে চাও তাহলে?”

“আমাদের কালচারটার এরা সব্বোনাশ করে দিল”
এর চেয়ে বড় মিথ্যা আর নেই। কিসের কালচার? কালচার বলতে আজকের বাঙালি কী বোঝে? কালচারের বাংলা প্রতিশব্দ কী? সঠিক বানানে সেটা লিখতে পারবে চল্লিশের নীচে বয়স এমন কজন আছে? তামিল, তেলুগু ছবি ঝেড়ে বলিউডে ছবি হয় আবার সেই ছবি ঝেড়ে বাংলা ছবি হয়। প্রায় তিরিশ বছর ধরে এই চলছে। এর নাম কালচার? ইংরিজি মাধ্যম স্কুলে তো বাঙালি দেড়শো বছর ধরে পড়ছে কিন্তু আগে তো বাপ-মা গর্ব করে বলত না “জানেন দাদা, আমার ছেলের বাংলাটা ঠিক আসে না”? এই অবস্থায় পৌঁছে দিয়েছে বিহারী, মাড়োয়ারিরা? একই স্কুলে পড়া মাড়োয়ারি ছেলেমেয়ের বাবা-মাকে তো বলতে শুনি না গদগদ হয়ে “মেরে বেটে কো না হিন্দি ঠিক সে আতা নহি”? সন্ধ্যের পর তথাকথিত শিক্ষিত বাঙালি যে সিরিয়ালগুলো দ্যাখে সেগুলোর নাম কালচার? ওসবে তো হিন্দি ছবির গানও চলে। তার মানে যারা বানায় তারা নিজেরা লিখতে তো পারেই না, লাগসই বাংলা গান খুঁজে বের করার মুরোদও তাদের নেই। স্বাভাবিক। কারণ এদের সাক্ষাৎকার যা এদিকওদিক পাওয়া যায় তাতে দেখা যায় এরা বাংলা বলে গ্রীকদের মত। তা এরকমটা এদের শেখাল কে? হলদিরাম ভুজিয়াওয়ালা? গলায় পা দিয়ে? বাঙালি হিন্দু মেয়ের বিয়েতে মেহেন্দি চালু করল কে? কোন বিহারী এসে এ কে ৪৭ নিয়ে দাঁড়িয়েছিল? যে ছেলে সব শাস্ত্রীয় আচার মেনে বিয়ে করে, প্রেমের বিয়েতেও পণ নিতে ছাড়ে না, সে বৌভাতের দিন প্রথাগত ধুতি পাঞ্জাবি ছেড়ে শেরওয়ানি পরে কোন মাড়োয়ারির ভয়ে? ছেলেমেয়েকে ইংরিজি মাধ্যম স্কুলে ভর্তি করে এমনকি দ্বিতীয় ভাষার জায়গা থেকেও বাংলাকে সরিয়ে হিন্দি ঢোকান যে বাঙালি বাবা-মায়েরা তাদের কোন হিন্দিভাষী ব্ল্যাকমেল করেছে এটা করতে?
তাছাড়া কালচার মানে তো শুধু এসব নয়। ট্রেনে বাসে তরুণ বাঙালিদের ভাষা শুনে দেখেছেন? এমনিতে পাঁচ লাইন কথা বললে দু লাইন ইংরিজি আর আড়াই লাইন হিন্দি থাকে। খিস্তি দেওয়ার সময় কিন্তু এরা পরম বাঙালি। এবং জনসমক্ষে খিস্তিসহ কথা বলাটা বেশ গর্বের ব্যাপার এদের কাছে। বছর কুড়ি আগেও বড়দের সামনে শালা বলে ফেললে যে বাঙালি কানমলা খেয়েছে তারই ছেলেমেয়ে ট্রেনে বসে হেডফোনে বন্ধুকে মহানন্দে কাঁচা খিস্তি দিয়ে যায়, সে কামরাভর্তি যতই বাপ-পিতেমোর বয়সী লোক থাক, মহিলারা থাকুন বা বাচ্চাকাচ্চা থাক।
এই জাতির কালচার শেষ করে দিয়েছে অন্য রাজ্য থেকে আসা দশ বারো শতাংশ লোক? শুনলেই হাসি পায়।

“এ বাংলা রামকৃষ্ণ, রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, বিদ্যাসাগরের বাংলা। সেই বাংলায় অবাঙালিগুলো এই সাম্প্রদায়িক, পশ্চাৎপদ রাজনীতি ঢোকাল”
ঐ তিন চারটে নাম মুখস্থ বুলির মত আউড়ে যাওয়া বহুকাল হল বাঙালির বদভ্যেস। কাঁঠালি কলার চেয়েও বেশি ঘটে ব্যবহার করা হয় এই নামগুলো। অথচ এই লোকগুলো কেন বিশিষ্ট তা ছেলেমেয়েকে শেখানোর দায়িত্ব অনেকদিন বাবা-মায়েরা ছেড়ে দিয়েছেন। কি ভাগ্যিস দ্বিতীয় জন কিছু গান, কবিতা লিখে গেছেন। তাই স্ট্যাটাস বজায় রাখতে বাড়িতে রচনাবলী সাজিয়ে রাখা, ছেলেমেয়েকে আবৃত্তি স্কুলে পাঠিয়ে “ভগবান তুমি…” বলতে শেখানো, ঘুরেফিরে গুটিকয়েক গান আর নাচ শেখানো — এসব আছে। বাকিরা তো আক্ষরিক অর্থেই ছবি হয়ে গেছেন। প্রথমজনেরটা থাকে ঠাকুরঘরে। অতএব কী বলেছেন ওসব আর কে পড়তে যাবে? পড়লেও ভাবতে যাবে কেন? গুরুবচন। মুখস্থ করাই কর্তব্য, ভাবতে নেই।
রবীন্দ্রনাথের স্নেহভাজন অথচ সঙ্গীতে এবং কাব্যে একেবারে স্বতন্ত্র নজরুলের প্রতি আমরা পশ্চিমবঙ্গীয়রা সযত্নলালিত অবজ্ঞা ছুঁড়ে দিয়েছি। আজকাল আর নজরুলগীতি শেখা ঠিক কেতাদুরস্ত নয়। আমাদের ছোটবেলার রবীন্দ্র-নজরুল সন্ধ্যাগুলোও প্রায় অবলুপ্ত। অন্নদাশঙ্করেরই বোধহয় ভুল হয়েছিল। নজরুলকে আমরা বিলকুল ভাগ করে দিয়েছি। আশঙ্কা হয় সেটাও হয়ত তাঁর ধর্মীয় পরিচয়ের জন্যেই।
চতুর্থজনের অবস্থা তো আরো করুণ। এই ভদ্রলোকের নাম আজকাল আর খুব বেশি বাঙালি জানে কিনা আমার সন্দেহ হয়। ছোটদের তো জানার উপায়ও নেই। তারা তো জলি প্রাইমার, এলিমেন্টারি ম্যাথসে ডুবে আছে। তার মধ্যে কি আর বর্ণপরিচয়ের জায়গা আছে? আর বড়রা তো বিদ্যাসাগর সম্বন্ধে বরাবরই জানত দুটো শব্দ —- বিধবাবিবাহ আর বাল্য বিবাহ। আরেকজনকে তো বাঙালি ভুলেই গেছে। তিনি রামমোহন রায়। সেটা অবশ্য একদিকে ভাল। পপকর্ন খেতে খেতে পদ্মাবতী দেখার সময়ে ঐ ভদ্রলোককে মনে পড়লে পুরো আমেজটাই নষ্ট হবে।
মোদ্দা কথা হচ্ছে এই লোকগুলোকে শালগ্রাম শিলা বানিয়ে ফেলেছি আমরা অনেক আগেই। সুতরাং আমাদের বাংলাটা আর এদের বাংলা নেই। এর জন্যে বিহারী, মাড়োয়ারিদের গাল পাড়ার কোন যুক্তি নেই। তা বাদেও বাংলাকে এদের বাংলা বলা নিজেদের ইতিহাস সম্পর্কে অর্ধসত্য বলার প্রকৃষ্ট উদাহরণ।
রামকৃষ্ণের কথা আলাদা। তিনি শত হলেও ধর্মগুরু। তাছাড়া তাঁর এক নম্বর শিষ্য একটা আস্ত প্রতিষ্ঠান তৈরি করে গেছেন। তাই তিনি নিজের সময়ও পূজিত, এখনো পূজিত। কিন্তু রবীন্দ্রনাথকে গালাগাল দেওয়ার লোক তাঁর সময়েও নেহাত কম ছিল না। যেমন তাঁর যশে দ্বিজেন্দ্রলালের কম গা জ্বলেনি। আর নোবেল টোবেল পাওয়ার পরেও, বাণী বসুর ‘অষ্টম গর্ভ’ পড়লে বোঝা যায়, শিক্ষিত বাঙালিরা অনেকেই মনে করত উনি শুধু একজন বড়লোকের ছেলে যে শান্তিনিকেতনে সুন্দরী মেয়েদের নিয়ে ফুর্তি করে। এসব যারা মনে করত এ বাংলা তাদেরও। নিজেদের রবীন্দ্রনাথের উত্তরসূরি ভাবতে গেলে মনে রাখা উচিৎ আমরা ঐ লোকগুলোরও জাতভাই।
আর বিদ্যাসাগর? এ বাংলা কোনদিনই তাঁর ছিল না। তিনি যেমন আমাদের পূর্বপুরুষ তেমন যারা বিধবাদের বিয়ে দেওয়ার অপরাধে তাঁর শ্রাদ্ধানুষ্ঠান করেছিল, তাঁকে খিস্তি করে গান লিখেছিল, জুতো ছুঁড়েছিল, টাকার লোভে তাঁকে ঠকিয়েছিল তারাও এই আমাদেরই পূর্বপুরুষ। এবং তারা নেহাত এলেবেলে লোকও নয়, অনেকেই তখনকার সমাজের মাথা। এই বাংলা এমনই বিদ্যাসাগরের যে তিনি শেষ বয়সে এই জায়গাটা ছেড়ে দিয়ে দন্ডকারণ্যে সাঁওতালদের সঙ্গে গিয়ে বাস করতেন।
যে নবজাগরণ বা আলোকপ্রাপ্তি নিয়ে আমরা জাঁক করি সেই আলো যাঁরা নিয়ে এসেছিলেন তাঁদের মধ্যে ছিলেন এক ইউরোপীয় অধ্যাপকও। মনে রাখা ভাল যে সেই হেনরি লুই ভিভিয়ান ডিরোজিওকে আমাদেরই গণ্যমান্য পূর্বপুরুষরা বিদেশী এবং বিধর্মী বলে অপমানের একশেষ করেছিল। আমাদের সমাজের কুপ্রথাগুলোর দিকে আঙুল তোলার তাঁর অধিকার নেই বলেছিল। ঠিক যেমন আজকের দক্ষিণপন্থীরা বলছে লেনিন তো বিদেশী, এদেশে তার মূর্তি থাকবে কেন? আমাদের সেই পূর্বপুরুষেরা ডিরোজিওকে ভাতেও মেরে এমন অবস্থা করে যে তাঁর অকালমৃত্যু হয়।
আর সাম্প্রদায়িকতা হিন্দিভাষীরা এ রাজ্যে নিয়ে এসেছে, কেবল তাদের এলাকাগুলোতেই হিন্দুত্ববাদের প্রসার ঘটছে এমনটা যদি আপনার মনে হয় তাহলে বলতে হয় আপনি বুদবুদের মধ্যে বাস করছেন বহুকাল ধরেই। ভাল করে তাকিয়ে দেখলে চারপাশে অজস্র আত্মীয়স্বজন পাবেন যারা গাদা ডিগ্রিধারী হয়েও চরম অশিক্ষিতের মত বলে “অমুকের মুসলমানদের সাথে এত কিসের দহরম বুঝি না। বাঙালি ছেলে বাঙালিদের সাথে বন্ধুত্ব কর না।” বাংলা ভাষার জন্যে আজ অব্দি যারা প্রাণ দিয়েছে সীমান্তের দুই পারে, তাদের বেশিরভাগ ইসলাম ধর্মাবলম্বী অথচ আমাদের ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, উকিল, অধ্যাপক, সাংবাদিক ইত্যাদি পেশাধারী মূর্খরা বলে তারাই বাঙালি, মুসলমানরা মুসলমান। বিজেপির প্রোপাগান্ডা আর মমতার নিজেকে মুসলমানদের ত্রাতা হিসাবে তুলে ধরার অপচেষ্টা শুরু হওয়ার পর থেকে আশপাশের লেখাপড়া জানা মানুষদের ভেতরের ঘৃণা কিভাবে বেরিয়ে আসছে, কি অনায়াসে তারা ভিত্তিহীন গুজবকে ধ্রুব সত্য হিসাবে বিশ্বাস করছে এবং অন্যকে বিশ্বাস করাচ্ছে তা যদি আপনার চোখে না পড়ে থাকে, একমাত্র তাহলেই আপনি ভাববেন হিন্দুত্ববাদীরা শুধু হিন্দিভাষীদের এলাকায় শক্তিশালী হচ্ছে।
তবে এই সাম্প্রদায়িকতার ইতিহাসও আমাদের সুপ্রাচীন। উইলিয়াম শেক্সপিয়রের অনন্য প্রতিভা যেমন তাঁর ইহুদীবিদ্বেষকে অতিক্রম করতে পারেনি, আমাদের গদ্যের আদিপুরুষ বঙ্কিমচন্দ্রের প্রতিভাও তেমনি তাঁর মুসলমানবিদ্বেষকে অতিক্রম করতে পারেনি। মুসলমান শাসকরা এদেশে হানাদার এবং সমস্ত অধঃপতনের মূলে, তারা আসার আগে এদেশ স্বর্গরাজ্য ছিল — এই যে অতিসরলীকৃত ইতিহাস আর এস এস আমাদের গেলাচ্ছে, বঙ্কিম যে তার চেয়ে খুব আলাদা কিছু ভাবতেন তা ভাবা শক্ত। রাজসিংহ উপন্যাসের শেষে তবু একটা কৈফিয়ত গোছের লেখা আছে, যেখানে বঙ্কিম লিখেছেন সব হিন্দুই ভাল আর সব মুসলমানই খারাপ এমনটা বলা তাঁর উদ্দেশ্য নয়। আনন্দমঠ উপন্যাসের শেষে তাও নেই।
বিবেকানন্দ একবার বৈদান্তিক মস্তিষ্কের সঙ্গে ঐস্লামিক দেহের সমন্বয়ের কথা বলেছিলেন, কিন্তু তাঁর ইতিহাস পাঠেও “সবই ব্যাদে আছে” এবং সে যুগের পর থেকে ভারতে আর ভাল কিছু হয়নি — এই মনোভাবটা বড় জ্বলজ্বল করে। আর সত্যি বলতে কি, ঐ উক্তি থেকেও এটাই মনে হয় যে বিবেকানন্দ মুসলমানদের একটা বিশেষ ধর্মাবলম্বী মানুষ হিসাবে না দেখে একটা বিশেষ জাতিগোষ্ঠীর লোক হিসাবে দেখতেন। নইলে ঐস্লামিক দেহ কথাটার কোন মানে দাঁড়ায় কি? সব মুসলমানের দেহের গঠন কি একরকম? আমার মাছ ভাত খাওয়া বাঙালি মুসলমান মাস্টারমশাই সাড়ে পাঁচ ফুট উচ্চতার রোগাসোগা লোক। আবার আমাদের পেস বোলার মহম্মদ শামি। দীর্ঘদেহী, বলিষ্ঠ চেহারার উত্তরপ্রদেশ থেকে আসা মুসলমান। এদের মধ্যে কার দেহের সঙ্গে বৈদান্তিক মস্তিষ্কের সমন্বয় চাইছিলেন বিবেকানন্দ?
অত তত্ত্বকথারও দরকার নেই, বাস্তব উদাহরণ দেখি। স্বাধীনতার প্রাক্কালে দাঙ্গা করতে আমরা বাঙালিরা কারো চেয়ে পিছিয়ে থাকিনি। ১৯৪৬ এর ১৬ই আগস্টের দাঙ্গাও বাইরে থেকে কেউ এসে করে দিয়ে যায়নি।
অতএব শুরু হয়ে যাওয়া ঝড় এবং আসন্ন প্রলয় আটকাতে হলে স্বীকার করে নেওয়া ভাল যে বাঙালি সংস্কৃতিমান, বাঙালি শান্তিপ্রিয়, বাঙালি দাঙ্গাবাজি করে না — এই একমাত্রিক পরিচিতিটা আপন মনের মাধুরী মিশায়ে আমাদেরই তৈরি করা। আসলে বাঙালিদের মধ্যে অন্য কোন জাতের লোকেদের চেয়ে পরধর্মবিদ্বেষী, কুসংস্কারাচ্ছন্ন, দাঙ্গাবাজ লোক কম নেই। কোনদিন ছিলও না। বাঙালির বাংলাকে এক রাখতে রাখীবন্ধন করা রবীন্দ্রনাথ আছেন আবার হিন্দু, মুসলমান এক দেশের নাগরিক হতে পারে না — এই মনোভাবের শ্যামাপ্রসাদও আছেন। আমাদের “একই বৃন্তে দুটি কুসুম” লেখা, অসামান্য শ্যামাসঙ্গীত রচয়িতা নজরুল আছেন আবার প্রত্যক্ষ সংগ্রাম দিবস লেলিয়ে দেওয়া সুরাবর্দিও আছেন। আপনি এদের মধ্যে কার উত্তরসূরি সেটা প্রমাণ হয় আপনার কথায় এবং কাজে।
অতএব আঙুলটা এবার নিজের দিকে তোলা যাক। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের ভেতরের দৈত্যটার মুখোমুখি হওয়া যাক। এমনিতেও যে রাজ্যে আমরা বিপুলভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠ, সেখানে অন্য রাজ্যের অন্য ভাষাভাষী মানুষ এসে সবকিছু বদলে দিচ্ছেন — এটা যদি সত্যি বলে মানতে হয় তাহলে এটাও মানতে হয় যে আমরা সব নিরেট মাথার লোক। গোটা ভারতকে ভাগ করা হচ্ছে, বাঙালিকেও ভাগ করার চক্রান্ত শুরু হয়েছে। সেটা ভুলে আরো নতুন ভাগাভাগি তৈরি করবেন না দয়া করে। আদি অনন্তকাল ধরে মানুষ জীবিকার সন্ধানে এক দেশ থেকে আরেক দেশ, এক রাজ্য থেকে আরেক রাজ্যে যাচ্ছে। এই ধারার বিরুদ্ধে কথা বলা যেমন অনৈতিহাসিক তেমনই অমানবিক। পৃথিবীর কোন প্রগতিশীল মানবগোষ্ঠী এর জন্যে কারো সাথে শত্রুতা করে না। এবং করতে ইচ্ছে করলে মনে রাখবেন, সব ক্রিয়ারই প্রতিক্রিয়া থাকে এবং বহু বাঙালি পেশাগত কারণে সারা ভারতে ছড়িয়ে আছেন।
কী বললেন? হিন্দি সাম্রাজ্যবাদ? সে তো সঙ্ঘ পরিবার, ভারত সরকার আর পশ্চিমবঙ্গ সরকার করছে। তার জন্যে আপনার হিন্দিভাষী, রাম আর হনুমানের পূজারী প্রতিবেশী দায়ী হবেন কেন? আমাকে ছোট থেকে যাঁরা ঠেগুয়া খাইয়েছেন তাঁরা তো কখনো দাবী করেননি ছটপুজোয় ছুটি দিতে হবে। বাংলার মুখ্যমন্ত্রী কেন দিলেন সে প্রশ্ন তাঁকে করুন। এ রাজ্যের হিন্দিভাষীরা নিজেদের মত করে রামনবমী পালনও তো করে আসছেন বরাবর, অস্ত্রমিছিল করেননি তো। রাজনৈতিক দল কেন রাম আর হনুমানের পুজো করবে সে প্রশ্ন দিলীপ ঘোষ আর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে করুন, হিন্দিভাষীরা এর জবাব কেন দেবেন? এ তো আইসিসের অপরাধের জবাব এদেশের সাধারণ মুসলমানের কাছে চাওয়ার মত হয়ে গেল।
সত্যি কথা বলতে, হিন্দি সাম্রাজ্যবাদকে মালার মত গলায় পরে নিচ্ছি আমরা নিজে — বাংলার চর্চা ক্রমশ কমিয়ে দিয়ে এবং ভাষাটার প্রতি অবজ্ঞা প্রকাশ করে। কয়েক মাস আগে এক টেলিকম কোম্পানি তাদের ইংরিজি বিজ্ঞাপনের বাংলা তর্জমা খবরের কাগজে ছেপেছিল শুধু গুগল ট্রান্সলেটরের ভরসায়। ফলে সেটার হরফটাই যা বাংলা ছিল, ভাষাটা কী তা বোঝা ভগবানেরও অসাধ্য। এই সাহস ওরা তামিলনাড়ু, কর্ণাটক কি কেরালায় পায় না। এখানে যে পায় তার জন্যে দায়ী আমরাই, এ রাজ্যের হিন্দিভাষীরা নন। অন্য ভাষা শিখতে গেলে যে বাংলা ভুলতে হয় না সেটা নিজে বুঝলে এবং ছেলেমেয়েকে বোঝালে হিন্দি সাম্রাজ্যবাদ এমনিই ট্যাঁ ফোঁ করার জায়গা পাবে না।

কংগ্রেস-সিপিএম জোট নিয়ে সীতারামায়ণ

“মিত্রোঁ, আপনারা দেখুন, আমি দলিত বাবা-মার চা ওয়ালা ছেলে, আপনাদের আশীর্বাদে ক্ষমতায় এসেছি। আমাকে সরানোর জন্যে সবাই একজোট হয়েছে। এদের কোন নীতি নেই, কোন আদর্শ নেই, শুধু একটাই উদ্দেশ্য — মোদীকে হারানো। কারণ মোদী গরীব মানুষের জন্যে কাজ করে, কারণ মোদীর আমলে হিন্দুদের জাগরণ হয়েছে” ইত্যাদি

মার্কসবাদ মানে কী, সিপিএম নেতা সীতারাম ইয়েচুরি যা বলছেন সেটাই কিনা, প্রকাশ কারাত ঠিক না ভুল — এসব তত্ত্বকথা না হয় থাক। তত্ত্ব নিয়ে আলোচনা করার বৈদগ্ধ্য আমার নেই, যতদূর জানি বেশিরভাগ লোকেরই আমার মতই অবস্থা। অতএব ওসব ভুলে গিয়ে একটা কান্ডজ্ঞান সংক্রান্ত প্রশ্ন করি। কান্ডজ্ঞান ব্যাপারটা সংসদীয় রাজনীতিতে প্রায়শই গাণিতিক। অতএব প্রশ্নটাকে অঙ্কের প্রশ্নও বলা যায়। প্রশ্নটা এই — যে অঙ্কটা একবার ভুল বলে প্রমাণিত হয়েছে সেটাই আবার করতে যাওয়া বুদ্ধিমানের কাজ কিনা।

পশ্চিমবঙ্গে ২০১৬ বিধানসভা নির্বাচনে বামফ্রন্ট আর কংগ্রেসের জোট নিদারুণভাবে প্রত্যাখ্যাত হয়েছিল। আসন সংখ্যাটা যেসব সিপিএম কর্মীর মনে আছে তাঁরা নিশ্চয় মানেন একা লড়লে ৩৪ বছরের শাসন বা অপশাসন সত্ত্বেও এত খারাপ অবস্থা হত না। অর্থাৎ ইয়েচুরি, কারাত, বেঙ্গল লাইন, কেরালা লাইন যা-ই হোক না কেন হাতে কাস্তে হাতুড়ি উঠে আসা ভোটাররা মোটেই পছন্দ করেননি। সীতারামের একমাথা চুল বলেই তিনি আবার বেলতলায় যাবেন এটা কী ধরণের কান্ডজ্ঞান ভগবান কিম্বা মার্কস কেউই জানেন না বোধহয়।

আজকের টাইমস অফ ইন্ডিয়া পড়ে বুঝলাম ভদ্রলোকের আবার পার্টির উপর অভিমান হয়েছে। “আমায় প্রো-কংগ্রেস বললে আমিও প্রো-বিজেপি বলতে পারি” জাতীয় ছেলেমানুষি কথাবার্তা বলেছেন ধেড়ে সাধারণ সম্পাদক। সে বলুন গে। উনি বুঝবেন আর ওঁর পার্টি বুঝবে। কিন্তু উনি মার্কসবাদের মানে যা বলেছেন সেটা মেনে নিলেও যে কংগ্রেসের সাথে জোট সমর্থনযোগ্য হচ্ছে না! উনি বলেছেন যে বদলাতে পারে না সে কমিউনিস্ট নয়। মেনে নেওয়া গেল। তাহলে উনি নিজে কংগ্রেসের সাথে জোটের চূড়ান্ত ব্যর্থতা দেখার পরেও বদলাচ্ছেন না কেন?

ক্ষমতা থেকে বিজেপিকে তাড়ানো যে আশু কর্তব্য তা নিয়ে শুধু সিপিএম বা বামপন্থী কেন, বিরোধী রাজনৈতিক দল বা দলীয় রাজনীতির বাইরে থাকা নাগরিকদের কারোরই দ্বিধা আছে বলে মনে হয় না। সীতারাম নিজেও বলেছেন মতপার্থক্য শুধু কিভাবে সেটা নিয়ে। তাহলে কেন মনে হচ্ছে যে বিরোধী ঐক্যটা নির্বাচনী জোট করেই হতে হবে? ভোটের পরে পরিস্থিতি অনুযায়ী তো সিদ্ধান্ত নেওয়াই যায়। সঙ্ঘ পরিবারের বিরুদ্ধে লড়াই তো নির্বাচন দিয়েই শেষ হবে না।

তেলে আর জলে মিশ খাওয়াতে গেলে যে যাকে হারাতে চাইছি তারই সুবিধা হয় সেই শিক্ষাটা ২০১৬ সালের ফল থেকে নেওয়া কি এতই শক্ত? আমরা কেউ কি ভুলে গেছি বিধানসভা নির্বাচনের প্রচারপর্বে মমতা কী বলে গেলেন সমানে? কংগ্রেস সমর্থকদের বললেন “দেখুন, বরাবর বলেছি কংগ্রেস সিপিএমের বি টিম। দেখলেন তো? ওরা সাঁইবাড়ির শহীদদের কেমন ভুলে গেল দেখুন।” আর সিপিএম সমর্থকদের ছুঁয়ে গেল তাঁর টিটকিরি “বাহাত্তরের সন্ত্রাস ভুলে গেলেন কমরেড?” এর ফলে যেটা হল সেটা হচ্ছে গোটা নির্বাচনে মুখ্যমন্ত্রীকে পাঁচ বছর কী কাজ করলেন তার কোন হিসাবই দিতে হল না। বিরোধীরা নিজেদের বিরুদ্ধে অনৈতিকতার অভিযোগ সামাল দিতেই ব্যস্ত থাকলেন, সরকারকে প্রশ্নটা করবেন কখন?

আরও পড়ুন ঢেউ উঠছে…

এখন থেকেই বলে দেওয়া যায়, রামধনু জোট হলে নরেন্দ্র মোদীর কাজটাও একইরকম সহজ হয়ে যাবে। অর্থনীতির বেহাল অবস্থার জন্যে জবাবদিহি করতে হবে না, সুবিধা পাইয়ে দেওয়ার পুঁজিবাদের জন্যে কৈফিয়ত দিতে হবে না, কর্নিসেনাদের তোল্লাই দেওয়া, মুসলমান, দলিতদের উপর অত্যাচারের প্রশ্ন উঠবেই না। তিনি শুধু কেঁদেকেটে মিটিঙে মিটিঙে সেই ফাটা রেকর্ড বাজাবেন “মিত্রোঁ, আপনারা দেখুন, আমি দলিত বাবা-মার চা ওয়ালা ছেলে, আপনাদের আশীর্বাদে ক্ষমতায় এসেছি। আমাকে সরানোর জন্যে সবাই একজোট হয়েছে। এদের কোন নীতি নেই, কোন আদর্শ নেই, শুধু একটাই উদ্দেশ্য — মোদীকে হারানো। কারণ মোদী গরীব মানুষের জন্যে কাজ করে, কারণ মোদীর আমলে হিন্দুদের জাগরণ হয়েছে” ইত্যাদি। এর সাথে মোদীর ইশারায় সাঙ্গোপাঙ্গদের তৈরি কিছু বাইনারি তো থাকবেই, সেগুলো তো জোট হলেও হবে, না হলেও হবে। অর্থাৎ বিরোধীরা যথারীতি নিজেদের পিঠ বাঁচাতেই ব্যস্ত থাকবেন। বরং মোদীর পক্ষে তুলনায় শক্ত হবে যে রাজ্যে যে শক্তিশালী সেখানে তার মোকাবিলা করা। কারণ ২০১৪ র হাওয়া আর নেই। সব প্রশ্নপত্রের একই উত্তর দিয়ে তখন ড্যাংড্যাং করে পাশ করা গেছিল, এবারে অত সোজা হবে না। অতএব আমি যদি মোদী হতাম, আমি চাইতাম শুধু কংগ্রেস-বাম নয়, যত বিরোধী দল আছে সব্বাই মিলে একটা জোট হোক। তাহলে বলতে পারব সারদা, নারদা, ভাদরা, কাস্তে হাতুড়ি সবাই এক। এরা এক হয়ে দেশের মানুষকে লুটতে চায়। এটা অ্যান্টি-ন্যাশনালদের জোট। অর্ণব গোস্বামীকে লেলিয়ে দেব, সে জিওর্জিও আরমানির স্যুট আর জিমি চুর জুতো পরে বলবে “এটা দেশের গরীব মানুষের ক্ষমতায়নের বিরুদ্ধে ক্ষমতায় ফিরতে হাত নিশপিশ করা লুটিয়েন্স এলিট আর জেএনইউ এর অ্যান্টি-ন্যাশনাল বামেদের জোট। এতদিন ইউনিভার্সিটি ক্যাম্পাসে ছিল, এবার ভোটে হয়েছে।” আহা! ভারী মজা হবে।

অনেক বাজে বকলাম। একটা মজার স্মৃতি দিয়ে শেষ করি।

জ্যোতি বসুর প্রধানমন্ত্রী হওয়া নিয়ে যখন সিপিএম পার্টিতে বিতর্ক হয় তখন সীতারাম ইয়েচুরি ছিলেন সরকারে না যাওয়ার পক্ষে। সেবারে তাঁরাই জয়যুক্ত হয়েছিলেন। তারপর আজকালে একটা ছবি বেরিয়েছিল। ছবি মানে এখন যাকে মিম (meme) বলা হয়। ছবিতে কার্ল মার্কসের মূর্তির সামনে বসে সীতারাম বোঝাচ্ছেন “মার্কসবাদ মানে হল…”। আর মার্কসের মূর্তিটা বলছে “এটা আবার কে?”

ধর্মনিরপেক্ষতার ধাঁধা

শুধু দক্ষিণপন্থীরা নয়, মধ্যপন্থী, এমনকি অনেক বামপন্থীও বলে থাকেন “ভারত আবার ধর্মনিরপেক্ষ কোথায়? ধর্মনিরপেক্ষ মানে কোন ধর্মকেই সরকার পাত্তা দেবে না। এখানে কি সেটা হয়? এখানে তো সবেতেই ধর্ম”

আগামী বছর লালকৃষ্ণ আদবানির রথযাত্রার ৩০ বছর পূর্ণ হবে। এই তিরিশ বছরে দুটো শব্দবন্ধ আদবানি এবং তাঁর সাঙ্গোপাঙ্গদের কল্যাণে দারুণ জনপ্রিয় হয়েছে — মেকি ধর্মনিরপেক্ষতা (pseduo secularism) আর প্রকৃত ধর্মনিরপেক্ষতা (true secularism)। নরেন্দ্র মোদীর সরকারের হজযাত্রায় ভর্তুকি তুলে দেওয়ার সূত্রে ঐদুটো শব্দবন্ধ আবার বেশি বেশি করে শোনা যাচ্ছে। মোটের উপর বিজেপি এবং তার সমর্থকরা যা বলছেন তার সার এই যে ধর্মনিরপেক্ষ দেশে একটা বিশেষ ধর্মের লোক তীর্থ করতে যাবে বলে সরকার পয়সা খরচা করবে কেন? এগুলো হচ্ছে মেকি ধর্মনিরপেক্ষতা। এই যে নরেন্দ্রবাবু ভর্তুকি তুলে দিলেন — এইটেই হচ্ছে প্রকৃত ধর্মনিরপেক্ষতা। কথাটা শুনতে ভারী ভাল এবং কথাটা সত্যিও — যতক্ষণ না আপনি এটা জানছেন যে মানস সরোবরে তীর্থ করতে যাওয়ার জন্যে ভারত সরকার কত হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দেয়। এছাড়াও কোন রাজ্যের সরকার পাকিস্তানের নানকানা সাহিবে তীর্থ করতে যাওয়ার জন্যে ভর্তুকি দেয়, কোন রাজ্যের সরকার কুম্ভমেলার আয়োজন করে। এবং সেসব মিলিয়ে যা খরচা হয় তা হজযাত্রার ভর্তুকির চেয়ে অনেক অনেক বেশি। এই দেখুন

https://www.outlookindia.com/website/amp/rs-200-cr-haj-subsidy-gone-but-what-about-rs-2500-crore-set-aside-by-up-alone-fo/306961?__twitter_impression=true

পার্থক্যটা আরো কুশ্রী হয়ে দাঁড়ায় হজে যাতায়াতের খরচ হিসাব করলে। হিসাব করলে ফল যা বেরোয় তার মানে দাঁড়ায় এই যে ভর্তুকিটা তীর্থযাত্রীরা পায় না, পায় এয়ার ইন্ডিয়া — হজ করতে যেতে হলে যাদের বিমানে যাওয়া বাধ্যতামূলক। গোটা আষ্টেক অনুচ্ছেদ পড়ে দেখুন

https://thewire.in/214513/haj-subsidy-cancelled-air-india/

তা সত্ত্বেও হজের ভর্তুকি তুলে দেওয়ার সিদ্ধান্তের পর এখন অব্দি কোন ইসলাম ধর্মাবলম্বী বা কোন মুসলিম সংগঠনকে হাঁই হাঁই করে উঠতে দেখা গেল না যে “এটা আমাদের অধিকার, এটা দিতেই হবে।” বস্তুত সেই প্রথম এন ডি এ সরকারের আমল থেকে হজযাত্রীদের ভর্তুকি দেওয়া নিয়ে “প্রকৃত ধর্মনিরপেক্ষ” পার্টি এবং তাদের প্রতি সহানুভূতিশীল লোকেদের চিৎকার চেঁচামেচি শুনছি। এই বছরগুলোতে এ নিয়ে বন্ধুবান্ধব, পরিচিত, অপরিচিত যত ইসলাম ধর্মাবলম্বীর সাথে কথা হয়েছে, সকলেই বলেছে যে এই ভর্তুকি অপ্রয়োজনীয়। ইসলামেও নাকি তাদেরই হজযাত্রা করতে বলা হয়েছে যাদের সামর্থ্য আছে। সুতরাং সরকারী আনুকূল্যে তীর্থ করতে যাওয়ার কোন যুক্তি নেই।
অথচ দেখুন, হজের ভর্তুকির সঙ্গে সঙ্গে হিন্দু তীর্থযাত্রীদের ভর্তুকি তুলে দেওয়ার কথা যেইমাত্র বলা হয়েছে অমনি চিৎকার শুরু হয়ে গেছে “হিন্দু খতরে মে হ্যায়”। কথাটা যে বলবে সে-ই যে হিন্দুদের শত্রু এটা যেন স্বতঃসিদ্ধ। এই চিৎকারে সবচেয়ে জোরালো গলাগুলো হিন্দুত্ববাদী মোদীর সাঙ্গোপাঙ্গদের। এটাকে, অতএব, প্রকৃত ধর্মনিরপেক্ষতা বলা যাচ্ছে না।
কিন্তু মূল প্রশ্নটা এর চেয়ে অনেক বড় এবং সেই প্রশ্নটার উত্তর নিয়ে সর্বশক্তি দিয়ে লড়াই করার দরকার আছে। প্রশ্নটা এই যে ধর্মনিরপেক্ষতা মানে কী? শুধু দক্ষিণপন্থীরা নয়, মধ্যপন্থী, এমনকি অনেক বামপন্থীও বলে থাকেন “ভারত আবার ধর্মনিরপেক্ষ কোথায়? ধর্মনিরপেক্ষ মানে কোন ধর্মকেই সরকার পাত্তা দেবে না। এখানে কি সেটা হয়? এখানে তো সবেতেই ধর্ম।”
কথাটা উড়িয়ে দেওয়ার নয়। ধর্মনিরপেক্ষতার ধারণাটা এসেছে ইউরোপের secular ধারণা থেকে। এবং secular রাজনৈতিক ব্যবস্থার মানে এমন একটা ব্যবস্থা যাতে চার্চের কোন ভূমিকা থাকবে না। চার্চ, মানে ধর্মযাজকদের, রাষ্ট্রের ব্যাপারে কোন কথাই বলতে দেওয়া হবে না। ইউরোপে ব্যাপারটা এভাবেই ঘটেছিল কারণ মধ্যযুগে ঐ মহাদেশে চার্চ দণ্ডমুণ্ডের কর্তা হয়ে বসেছিল, রাজার সমান বা কোন কোন ক্ষেত্রে রাজার চেয়েও ক্ষমতাশালী হয়ে উঠে যারপরনাই অত্যাচার করত সাধারণ মানুষের উপর। নবজাগরণ চার্চের সেই ক্ষমতার বিরুদ্ধে একটা আন্দোলনও বটে। নবজাগরণ সমাজকে ধর্মকেন্দ্রীক (theocentric) থেকে করল মানবকেন্দ্রীক (anthropocentric)। সেখান থেকেই কালে কালে এল secular রাষ্ট্রব্যবস্থার ধারণা। তা চার্চনিরপেক্ষ শাসনব্যবস্থা যদি কায়েম করতে হয় তাহলে স্বভাবতই রাষ্ট্রকেও ধর্ম থেকে দূরে থাকতে হবে। সেটাই যথার্থ ধর্মনিরপেক্ষতা।
কিন্তু ধর্মনিরপেক্ষতার যে এই একটাই চেহারা হতে পারে, একথাটা কে বলে দিল? অন্তত ভারতবর্ষে শাসকের কাছ থেকে এবং সাধারণ মানুষের কাছ থেকে (যেহেতু গণতন্ত্রে শাসক আকাশ থেকে পড়েন না, সাধারণ মানুষের মধ্যে থেকেই উঠে আসেন) ওরকম ধর্মনিরপেক্ষতা আশা করা নির্বুদ্ধিতা। কেউ ওরকম হলে নিশ্চয়ই ভাল কথা, যেমন প্রথম প্রধানমন্ত্রী জহরলাল নেহরু নাস্তিক ছিলেন। কিন্তু বেশিরভাগ মানুষ আর বেশিরভাগ শাসক যে তেমন হবেন না সেটাই এদেশে স্বাভাবিক। কেন, সেটা ভারতের ইতিহাস যে একটুও বুঝেছে তাকে বুঝিয়ে বলতে হয় না। বিবেকানন্দ তো বলেইছিলেন, সব জাতির একটা করে মূলমন্ত্র থাকে, ফরাসীদের যেমন liberte, egalite, fraternite; ভারতীয়দের মূলমন্ত্র তেমনি ধর্ম। কোন দেশের মূলমন্ত্র ধর্ম হওয়া মোটেই ভাল কথা নয়, হলে কী ধরণের পশ্চাদপসরণ হতে পারে তার বহু নিদর্শন আমরা পাচ্ছি এখন, অন্য অনেক দেশের উদাহরণ থেকেও বোঝা যায়। তবুও এটাই যে ভারতের বাস্তবতা সেটা অস্বীকার করা মূর্খামি। আমাদের রাষ্ট্রপিতারা (founding fathers অর্থে। আমি গান্ধীভক্ত নই, তাই একা মহাত্মা গান্ধীই রাষ্ট্রপিতা এমনটা মনে করি না। তবে তিনিও একজন) ওরকম মূর্খ ছিলেন না। ধর্মকে বাদ দিয়ে এই দেশ চালানো যাবে না সেটা তাঁরা ভালই বুঝতেন কিন্তু ধর্মের উপর ভর দিয়ে তো আর একটা বিংশ শতকের সভ্য দেশ গড়ে উঠতে পারে না। তাছাড়া কোন ধর্মের উপর ভর দেওয়া হবে? এ তো আর পঞ্চদশ, ষোড়শ শতাব্দীর ইউরোপ নয় যে খ্রীষ্টান ধর্মটাকে সামলে দিলেই হল। এখানে অজস্র ধর্ম, একই ধর্মের মধ্যেও অজস্র মত (ইংরিজিতে যাকে sect বলে আর কি)। সেখানে কোন একটাকে প্রাধান্য দেওয়া মানেই বাকি সকলকে জোর করে সেই ধর্মের অধীন করে দেওয়া।
অতিচালাক কয়েকজন সঙ্ঘ পরিবারের নেতা বলতেন এবং এখনো বলেন “হিন্দুরা এদেশে সংখ্যাগরিষ্ঠ, অতএব তাদেরই প্রাধান্য দেওয়া উচিৎ। অন্যদের তো কেউ তাড়িয়ে দিতে বলছে না, তারাও থাকবে এদেশে।” আপনি যদি সংখ্যাগরিষ্ঠ সম্প্রদায়ের মানুষ হন তাহলে কথাটা আপনার দিব্য পছন্দ হবে। কিন্তু এভাবে যে একটা সুস্থ, স্বাভাবিক দেশ তৈরি হয় না তার জলজ্যান্ত প্রমাণ পাকিস্তান। সঙ্ঘ পরিবারের উপর্যুক্ত তত্ত্বটার মতই পাকিস্তানের সংখ্যালঘুদের অধিকার সম্পর্কে অনেক মিষ্টি মিষ্টি কথা মহম্মদ আলি জিন্নাও বলে গেছেন। তাতে আদপে কোন লাভ হয়নি ওদেশের হিন্দুদের। এদেশের “প্রকৃত ধর্মনিরপেক্ষ” লোকেরাই তো উঠতে বসতে শোনান ১৯৪৭ এর পর থেকে ভারতে কিভাবে সংখ্যালঘুরা বেড়েছে আর পাকিস্তানে কমেছে। মুজিবহত্যা পরবর্তী বাংলাদেশ নিয়েও একই কথা প্রযোজ্য। ভারতে যদি হিন্দুধর্মকে প্রাধান্য দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিতেন রাষ্ট্রপিতারা তাহলে ভারতও যে হিন্দু পাকিস্তান হত সেটা বুঝতে বৈদিক বুদ্ধির প্রয়োজন হয় কি? তাহলে বিকল্প কী ছিল? একটাই। সব ধর্মেরই পৃষ্ঠপোষকতা করা। বাম, দক্ষিণ সকলেরই বোঝা উচিৎ ইউরোপীয় ঢঙে রাষ্ট্র যদি সব ধর্ম থেকে সমদূরত্বের নীতি নিত তাহলে এখানে যা হত সেটা হল মাৎস্যন্যায়। যে সংখ্যালঘু তাকে নিজের ধর্মাচরণ করতে হত লুকিয়ে আর যে সংখ্যাগুরু সে আইনগতভাবে না হলেও, গায়ের জোরে নিজের ধর্ম চাপিয়ে দিত সংখ্যালঘুদের উপর। না মানলে মারধোর খেতে হত, মরতে হত। ঠিক যেভাবে সরকারী নিষ্ক্রিয়তার সুযোগে এখন পশ্চিমবঙ্গেও দিব্যি অস্ত্রশিক্ষা শিবির চালাচ্ছে আর এস এস।
কেউ কেউ বলবেন, আচ্ছা সে না হয় দেশের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের সময় হল। গান্ধী তো খুন হলেন ১৯৪৮ এ, প্যাটেল চলে গেলেন ১৯৫০ এ, আম্বেদকর ১৯৫৬ এ আর নেহরু ১৯৬৪ তে। কিন্তু পরবর্তী শাসকেরা কী করলেন? কী করলেন তারপরের প্রধানমন্ত্রীরা, মুখ্যমন্ত্রীরা? এবং অনিবার্যভাবেই দক্ষিণপন্থীরা সেই বোকা বোকা কথাটা আবার বলবেন “Secularism শব্দটা তো সংবিধানের প্রস্তাবনায় ছিল না। ইন্দিরা কেন ঢোকালেন?” প্রশ্নকর্তারা ভান করেন যেন ধর্মীয় স্বাধীনতার অধিকার তার আগে থেকেই ২৫-২৮ নম্বর অনুচ্ছেদে ছিল না, ইন্দিরা চক্রান্ত করে সেটাও ঢুকিয়েছিলেন। তাহলে secularism শব্দটায় আপত্তিটা কিসের? আপনারা তো নাকি “প্রকৃত ধর্মনিরপেক্ষ”। তাহলে তো ধর্মনিরপেক্ষ শব্দটা সংবিধানে ঢোকানোর জন্যে ইন্দিরার আপনাদের ধন্যবাদার্হ হওয়া কথা!
এই কথোপকথন মুখোমুখি বসে চালালে এরপরেই টিভি বিতর্কের মত প্রবল চিৎকার চেঁচামেচি লেগে যাবে, সীমান্তে কত সৈনিক মরছে সেসব নিয়ে আলোচনা শুরু হয়ে যাবে। সুতরাং এবার ইতিহাস, সংবিধানের মত যা কেউ পড়ার দরকার মনে করে না এমন বিষয় বাদ দিয়ে একেবারে গোদা ব্যাপারে চলে আসা যাক। ভারত যে আসলে ধর্মনিরপেক্ষ নয় তা প্রমাণ করতে যে বহুল প্রচলিত উদাহরণগুলো দেওয়া হয় তার তেমন একটা নিয়ে কথা বলা যাক। তাহলে সরকারগুলোর পক্ষে কতটা কী করা সম্ভব সেটাও পরিষ্কার হবে।
ভারত ধর্মনিরপেক্ষ হলে মুসলমানরা রাস্তায় বসে নমাজ পড়ে কেন? এসব বন্ধ হওয়া উচিৎ
ঠিক কথা। রাস্তা আটকে ধর্মাচরণ কোন কাজের কথা নয়। মুসলমানদের রাস্তায় নমাজ পড়া বন্ধ হওয়া উচিৎ, রাস্তা আটকে পুজো প্যান্ডেল বন্ধ হওয়া উচিৎ, তাজিয়া বন্ধ হওয়া উচিৎ, চারদিনের পুজোকে দশদিন অব্দি টেনে নিয়ে গিয়ে রাস্তাজুড়ে কানফাটানো ব্যান্ড পার্টি নিয়ে ভাসান বন্ধ হওয়া উচিৎ, রাষ্ট্রের পৃষ্ঠপোষকতায় কুম্ভমেলা থেকে শুরু করে দুর্গা ভাসানোর কার্নিভাল অব্দি সবকিছু বন্ধ হওয়া উচিৎ। স্কুলে সরস্বতীপুজো এবং নবীদিবস — দুটোই বন্ধ হওয়া উচিৎ। শুধু তাই নয়, রাস্তা জুড়ে, ট্রেনের কামরা জুড়ে গাঁজা খেতে খেতে জোয়ান লোকেদের তীর্থ করতে যাওয়া বন্ধ হওয়া উচিৎ।
আমাদের বাংলায় তারকেশ্বরের মাথায় শ্রাবণ মাসে জল ঢালতে যায় যারা তারা অন্য সব যাত্রীরই মাথা কিনে নেয়। আপনি বয়স্ক হোন, অসুস্থ হোন, সাথে কোলের শিশু থাকুক বা অন্তঃসত্ত্বা মহিলা থাকুক, ওঁরা আপনাকে দয়া করে বসার জায়গা না-ও দিতে পারেন। ওখানে নিজের হিন্দু পরিচয় দিয়ে কোন খাতির পাবেন না। উপরন্তু দুর্গন্ধ এবং অনবরত ঢাকঢোলের আওয়াজে লিলুয়া থেকে হাওড়া যেতে মনে হবে সশরীরে নরকযাত্রা করছেন। এবং আর যাই করুন, ভুলেও শ্রাবণ মাসের শনিবারে শের শাহের করা গ্র‍্যাণ্ড ট্রাঙ্ক রোড ধরে গাড়িতে চেপে কোথাও যেতে যাবেন না। বাবার ভক্তবৃন্দ গোটা রাস্তার দখল নিয়ে নেন। রাস্তার ঠিক মাঝখানে বসে বিশ্রামও নিতে পারেন ইচ্ছা হলে। আর শব্দদূষণ যা হয় সেটাও বন্ধ হওয়া উচিৎ, আজানের মাইকের মতই। কিছু দিল্লীবাসীর কাছে শুনছিলাম কাঁওয়ারিয়ারা যেসব এলাকা দিয়ে হরিদ্বার যায় সেখানকার লোকেদের অভিজ্ঞতাও নাকি কতকটা এরকমই। তা যেসব রাজ্যে “মেকি ধর্মনিরপেক্ষ” সরকার আছে তাদের কথা বাদই দিলাম। যেখানে “প্রকৃত ধর্মনিরপেক্ষ” সরকার সেখানে এগুলো বন্ধ করে দেখান দেখি।
পারবেন না। কারণ সবচেয়ে উদার হিন্দুটিও গর্জে উঠে বলবে “আমার ধর্মীয় স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করা হচ্ছে।” তা যে সংখ্যায় কম তাকে আইন দেখাব, ধর্মনিরপেক্ষতা দেখাব আর যে সংখ্যাগুরু তার ধর্মাচরণ যেমন ইচ্ছা চলবে সেটা আর যা-ই হোক, গণতন্ত্র নয়, ধর্মনিরপেক্ষতা তো নয়ই।
তাই ভারতের ধর্মনিরপেক্ষতা কখনোই ইউরোপের মডেল অনুসরণ করে চলতে পারে না। ভারতে সরকারকে ধর্মগুলোর মধ্যে সমতা বজায় রাখার কাজে সক্রিয় হতেই হবে। একদেশদর্শিতাই সাম্প্রদায়িক, সমদর্শিতাই ধর্মনিরপেক্ষতা এদেশে।
সেই কারণেই সরকারের প্রধানের নিজের ধর্মীয় পরিচয়ের প্রদর্শনী সাম্প্রদায়িক। কারণ ব্যক্তি হিসাবে তিনি যা-ই হোন, তিনি শুধু নিজের ধর্মের মানুষের প্রধান নন, সব ধর্মের মানুষের প্রধান। সেইজন্যেই মমতার ইফতারে গিয়ে মাথায় কাপড় দিয়ে নমাজ পড়া এবং মোদীর দশাশ্বমেধ ঘাটে সন্ধ্যারতি অন্যায়। মমতা জন্মসূত্রে হিন্দু হলেও ইচ্ছা হলে নিজের বাড়িতে দিনে পাঁচবার নমাজ পড়তেই পারেন, সেটা ব্যক্তি মমতার স্বাধীনতা। নরেন্দ্র মোদীও দুবেলা বাড়ির ঠাকুরকে পুজো করুন, কিচ্ছু এসে যায় না। কিন্তু প্রকাশ্যে একটা বিশেষ ধর্মাচরণ করে এই বার্তা দিতে পারেন না যে “আমি তোমাদেরই লোক”। সেটাই সাম্প্রদায়িকতা, ভর্তুকি দেওয়াটা নয়।

ফ্যাসিবাদের মানবজমিন

শাশ্বত ভারতীয় পরিবার এমন এক প্রতিষ্ঠান যেখানে একনায়কত্ব স্বীকৃত এবং প্রার্থিত। বাবা কি জেঠু কি দাদু — কেউ একজন যা সিদ্ধান্ত নেবেন সেটাই চূড়ান্ত। এই মডেলটা যৌথ পরিবারের বিলুপ্তির সঙ্গে সঙ্গে কিছুটা ক্ষয়প্রাপ্ত হলেও ডোডোপাখি হয়ে গেছে বলে যদি কেউ ভাবেন তাহলে তিনি নিজের চারপাশে ভাল করে তাকিয়ে দেখছেন না। শুধু পরিবার নয়, ক্রমশ ছোট হয়ে আসা অফিসগুলোর তস্য ছোট ডিপার্টমেন্টগুলোয় উঁকি মেরে দেখুন। যিনি মোটে তিনজনের বস তিনিও বাকি দুজনের শ্বাস প্রশ্বাসের উপর মালিকানা দাবী করেন

ভারতে ফ্যাসিবাদের জন্য জমি কেমন উর্বর এবং নরেন্দ্র মোদীর মত লোককে উপড়ে ফেলা কেন শক্ত সেটা বোঝা খুব সোজা। এর কারণটা হল এখানে ফ্যাসিবাদের অনেকগুলো মাথা। মোদী বা অমিত শাহ বা কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে খবর করার জন্য সম্পাদকের চাকরি যাওয়া, সাংবাদিকদের খুন বা ধর্ষণের হুমকি পাওয়া, সাধারণ মানুষ বা বিখ্যাত কেউ সরকারের কোনরকম সমালোচনা করলেই অনলাইন বা অফলাইনে গালাগাল, তাকে ভাতে মারার চেষ্টা — এসব গত কয়েকবছরে জলভাত হয়ে দাঁড়িয়েছে। পরিস্থিতি এমন যে এটা যে ঘটছে তাও আপনি বলতে পারবেন না। বললেই “পাকিস্তান চলে যাও” ইত্যাদি। আজও কানহাইয়া কুমারকে এক জায়গায় মেরেধরে নীরব করে দেওয়ার চেষ্টা হয়েছে।
কিন্তু সমস্যাটা যত ব্যাপক ভাবছেন তার চেয়েও অনেক বড় কারণ প্রাক-দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালীন জার্মানিতে একটাই দল এভাবে বিরোধীদের গলা টিপে ধরত কিন্তু ভারতে শুধু সঙ্ঘ পরিবার এমন করছে তা নয়, ফলে এসব যে অন্যায় এটুকুই অনেক মানুষকে বোঝানো শক্ত। এমনিতেই শাশ্বত ভারতীয় পরিবার এমন এক প্রতিষ্ঠান যেখানে একনায়কত্ব স্বীকৃত এবং প্রার্থিত। বাবা কি জেঠু কি দাদু — কেউ একজন যা সিদ্ধান্ত নেবেন সেটাই চূড়ান্ত। এই মডেলটা যৌথ পরিবারের বিলুপ্তির সঙ্গে সঙ্গে কিছুটা ক্ষয়প্রাপ্ত হলেও ডোডোপাখি হয়ে গেছে বলে যদি কেউ ভাবেন তাহলে তিনি নিজের চারপাশে ভাল করে তাকিয়ে দেখছেন না। শুধু পরিবার নয়, ক্রমশ ছোট হয়ে আসা অফিসগুলোর তস্য ছোট ডিপার্টমেন্টগুলোয় উঁকি মেরে দেখুন। যিনি মোটে তিনজনের বস তিনিও বাকি দুজনের শ্বাস প্রশ্বাসের উপর মালিকানা দাবী করেন। সুতরাং যার ক্ষমতা কম বা নেই তাকে কথা বলতে না দেওয়া আমাদের সংস্কৃতি আর সেই সংস্কৃতির সবচেয়ে নির্লজ্জ ব্যবহার করেন আমাদের রাজনৈতিক নেতা-নেত্রীরা। না, শুধু বিজেপি নয়।
কয়েকদিন আগেই তামিলনাডুর কার্টুনিস্ট জি বালাকে হাজতবাস করতে হল। তাঁর অপরাধ তিনি মুখ্যমন্ত্রী, পুলিশ কমিশনার আর ডিস্ট্রিক্ট কালেকটরকে নগ্ন দেখিয়েছেন তাঁর এক কার্টুনে। অতএব প্রশাসন ভীষণ সক্রিয় হয়ে ব্যবস্থা নিয়ে নিল ঝটপট।
মনে রাখবেন তামিলনাড়ু এমন রাজ্য যেখানে কিছুদিন আগে প্রবল প্রাকৃতিক দুর্যোগে প্রশাসনের টিকি পাওয়া যায়নি দীর্ঘদিন। জয়ললিতা মারা যাওয়ার পর থেকে কে কার পক্ষে, কে জয়ললিতার বড় ভক্ত তা নিয়ে ডামাডোলে বেশ কিছুদিন কোন মুখ্যমন্ত্রীই ছিল না। অথচ যেই কার্টুনিস্টকে গ্রেপ্তার করার কথা এল, প্রশাসন যন্ত্রের মত দ্রুত কাজ করল। দুর্নীতিগ্রস্ত ক্ষমতাশালীদের ল্যাংটো করে দেওয়াই যে কার্টুনিস্টের কাজ সেকথা আর শুনছে কে?
আরো ঘরের কাছে আসুন। ডেঙ্গু হয়েছে কি হয়নি তাই নিয়ে আমরা সাধারণ মানুষ আর সরকারের মধ্যে তর্কাতর্কি চলতে চলতে কতগুলো প্রাণ চলে গেল, প্রশাসন চলছিল গদাই লস্করী চালে এবং ডেঙ্গুর চেয়ে বড় শত্রু ঠাউরেছিল ডেঙ্গুর খবরকে। যেই না এক ডাক্তারবাবু ফেসবুকে পোস্ট করলেন ডেঙ্গু নিয়ে, অমনি দারুণ দ্রুততায় তিনি সাসপেন্ড হয়ে গেলেন। অম্বিকেশ, শিলাদিত্য ইত্যাদি পুরনো নামগুলো আর নাহয় না-ই বললাম।
আমি হাসপাতাল থেকে ফিরে ডেঙ্গু নিয়ে একটা পোস্ট দেওয়ার পরে এক শুভাকাঙ্ক্ষী অগ্রজ সাংবাদিক ফোন করে সতর্ক করেছিলেন “খুব সাবধান। তুমি যা লিখেছ তার চেয়েও নিরীহ কথা লিখে কিন্তু এরাজ্যে লোকে গ্রেপ্তার হয়েছে।” ডাক্তার দত্তচৌধুরীর হাল থেকে স্পষ্ট যে সতর্কবার্তাটি অত্যন্ত সঙ্গত।
তা এই দেশে আর আপনি লোককে বোঝাবেন কী করে যে বিজেপি সরকার যা করছে তা এমার্জেন্সিরই নামান্তর! পঁচাত্তর থেকে সাতাত্তর পর্যন্ত গণতন্ত্রকে গণধর্ষণ করার পরেও তো আজও অনেক শিক্ষিত লোক ইন্দিরাকে ভারতের সেরা প্রধানমন্ত্রী বলেন। স্বাভাবিকভাবেই মোদীবাবু তাঁকেও ছাড়িয়ে যাবেন। ওনার আমল নিয়ে হয়ত বইটই লেখা হবে। তবে মমতার সাথে যতই শত্রুতা করুন, একনায়কত্বের ইতিহাসে অন্তত কয়েকটা পাতা পাওয়ার থেকে আমাদের দিদিকে উনি বঞ্চিত করতে পারবেন না।

বেচারাথেরিয়াম ডাক্তার

এই তারতম্য সরকারকে এবং আমাদের মত রুগীদের, তাদের বাড়ির লোকেদের কী বার্তা দিচ্ছে? শুধু সরকারী হাসপাতালের যাঁরা ডাক্তারি করেন তাঁদের যোগ্যতা কম নাকি কম রোজগার করেন বলে গুরুত্ব কম? এই বার্তা গেলে কোন রুগী কোন ডাক্তারকেই শ্রদ্ধা করবে কি? নাকি সরকার কোন ডাক্তারকে গুরুত্ব দেবে?

একমাস হতে চলল বিছানায় পড়ে আছি — এক সপ্তাহ নার্সিংহোমে, তারপর থেকে বাড়িতে। সারা গায়ে অসহ্য ব্যথা, ধুম জ্বর — এসব নিয়ে নার্সিংহোমের দিনগুলো শোচনীয়ভাবে কেটেছে প্রথমদিকে। তারপর আস্তে আস্তে একটু সুস্থ হলাম। হয়ে দেখলাম আমার চেয়েও খারাপ অবস্থা ডাক্তারদের। মুখে বলছেন ডেঙ্গু কিন্তু লিখতে হচ্ছে “এন এস ১ বাহিত ভাইরাল জ্বর” কারণ স্নেহময়ী দিদির রাজ্যে শুধু যে সাংবাদিক কী লিখবেন সেটা দিদি এবং তাঁর ভাইদের চোখরাঙানিতে ঠিক হয় তা নয়, ডাক্তার প্রেসক্রিপশনে কী লিখবেন সেটাও নবান্নে ঠিক হয়। ডাক্তারের দুর্গতিটা ভাবুন — পুজোমন্ডপে অসুরও হতে হবে আবার প্রেসক্রিপশনও লিখতে হবে হুজুরের হুকুমমত, নইলেই টানাটানি। এক ডাক্তার তো বেচারাথেরিয়ামের মত মুখ করে বলেই দিলেন “মাঝেমাঝে মনে হয় প্র্যাকটিস করা ছেড়ে দিই।”
এসব দেখে মনে পড়ে গেল ডাক্তার গড়াইয়ের কথা। ডাক্তার এস পি গড়াই, যিনি বাঙ্গুর ইনস্টিটিউট অফ নিউরোলজির কর্তা ছিলেন এবং মিডিয়াবাহিনী নিয়ে মুখ্যমন্ত্রীর দেশোদ্ধারে আপত্তি জানিয়ে, অপারেশন ফেলে মহাকরণে জো হুজুরি করতে পারবেন না বলার জন্যে সেই ২০১১র মে মাসে সাসপেন্ড হয়েছিলেন। সেইসময় অনেকেরই খুব আহ্লাদ হয়েছিল কারণ “সি পি এম আমলের আবর্জনা সরানো হল।” কোন কোন ডাক্তারেরও যে এমন উল্লাস হয়নি তা বলা যাবে না। ডাক্তারবাবুরা সংগঠিতভাবে কোন প্রতিবাদ করেছিলেন কি? মনে করার খুব চেষ্টা করছি, মনে পড়ছে না।
আমার বাবার জন্যে কয়েকবার এবং একবার আমার নিজের জন্যেও মমতা ক্ষমতায় আসার আগে বাঙ্গুরের ঐ হাসপাতালে যেতে হয়েছিল। তখন দেখেছি পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা, নিয়মানুবর্তিতা ইত্যাদির দিক থেকে সরকারী হাসপাতাল বললেই যে ভয়াবহ ছবিটা চোখের সামনে ভেসে ওঠে, বাঙ্গুর ঠিক তেমনটা ছিল না। নিশ্চয়ই তার কৃতিত্ব ডাক্তার গড়াইয়ের মত লোকেদেরই। কিন্তু পরিবর্তন সেসবের ধার ধারেনি।
আরেকজন ডাক্তারের কথাও মনে পড়ল — ডাক্তার অরুণ সিং। শেঠ সুখলাল কারনানি মেমোরিয়াল হাসপাতালের এই ডাক্তারকে স্বচক্ষে দেখার সৌভাগ্য হয়েছিল। এনার সম্বন্ধে অনেক কথা শুনেছিলাম। ওরকম ব্যস্ত হাসপাতালে নিও ন্যাটালজির মত একটা সুপার স্পেশালাইজড বিভাগ বানিয়ে ফেলেছিলেন ভদ্রলোক। সেই বিভাগে যেতে হয়েছিল আমাকে। গিয়ে দেখি কি আশ্চর্য মেশিনের মত কাজ হয় সেখানে, হাজারটা অপ্রাপ্তির মধ্যেও! একজন নার্স ডাক্তার সিংকে উদ্ধৃত করে যেরকম স্বরে কথা বললেন আমার আর আমার স্ত্রীর সাথে, অতখানি শ্রদ্ধা নিয়ে কোন প্রতিষ্ঠানের প্রধান সম্পর্কে অন্য কর্মীদের কথা বলতে শেষ শুনেছিলাম যখন আমার স্কুলের মাস্টারমশাইরা আমাদের হেডস্যার সম্পর্কে কথা বলতেন। ডাক্তার সিংকে যেদিন সামনাসামনি দেখলাম, দেখে মনে হল কোন ধ্যানমগ্ন ঋষিকে দেখছি। এমন একটা লোক যাকে এককথায় পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করতে ইচ্ছা করে। আমার সামান্য দেখায় ভুল থাকতে পারে কিন্তু তথ্য বলছে এস এস কে এমের পেডিয়াট্রিকস এবং নিও ন্যাটালজি বিভাগকে দেশের অন্যতম সেরা করে তোলায় ডাক্তার সিং অনস্বীকার্য অবদান। সেই লোকটিকেও কি এক অভিযোগ প্রমাণ হওয়ার আগেই এমন এক হাসপাতালে বদলি করে দেওয়া হয়েছিল যেখানে তাঁর গবেষণার কোন দাম নেই। ডাক্তারবাবুরা কতটা প্রতিবাদ করেছিলেন? মনে করতে পারছি না।
হ্যাঁ, প্রতিবাদ একটা হয়েছিল, একেবারে রাস্তায় নেমে। যখন মুখ্যমন্ত্রী বেসরকারী হাসপাতালের জোরজুলুম, দু নম্বরীর একটা হিসাবকিতাব করলেন প্রকাশ্যে, তারপর যখন হাসপাতালগুলোয় পেশিশক্তির আস্ফালন চলল একের পর এক। তখন ডাক্তাররা রাস্তায় নেমেছিলেন বটে।
তাহলে আমরা সাধারণ মানুষ কী বুঝব? সরকারী হাসপাতালের ডাক্তারবাবুদের পাশে বেসরকারীর ডাক্তারবাবুরা নেই নাকি বেসরকারীর ডাক্তারবাবুদের পাশে সরকারীর ডাক্তারবাবুরা নেই? আমাদের অভিজ্ঞতা তো বলে ঘুরেফিরে একই ডাক্তারদের সরকারী, বেসরকারী দুরকম জায়গাতেই দেখা যায়। তাহলে প্রতিবাদের এহেন তারতম্য হয় কেন? তার চেয়েও বড় প্রশ্ন, এই তারতম্য সরকারকে এবং আমাদের মত রুগীদের, তাদের বাড়ির লোকেদের কী বার্তা দিচ্ছে? শুধু সরকারী হাসপাতালের যাঁরা ডাক্তারি করেন তাঁদের যোগ্যতা কম নাকি কম রোজগার করেন বলে গুরুত্ব কম? এই বার্তা গেলে কোন রুগী কোন ডাক্তারকেই শ্রদ্ধা করবে কি? নাকি সরকার কোন ডাক্তারকে গুরুত্ব দেবে? দিচ্ছে না যে সে তো বোঝাই যাচ্ছে। নইলে ডাক্তার রোগনির্ণয় করে কী লিখবেন তা মুখ্যমন্ত্রী ঠিক করেন কোন অধিকারে? তিনি পাশ করা উকিল, ডক্টরেট, কবি, চিত্রশিল্পী — এসব জানতাম। তিনি ডাক্তারও হয়ে উঠলেন নাকি? ইন্ডিয়ান মেডিকাল এসোসিয়েশন বলে কিছু এরাজ্যে আছে?

আমাদের কেউ নেই

এই মেরুকরণে বেশিরভাগ মুসলমান ভোট আর কিছু হিন্দু ভোট তাঁর দিকে পড়লেই তো কেল্লা ফতে। রামনবমীর মিছিলের পরে বোধহয় বুঝেছেন অঙ্ক মিলছে না, তাই এখন আবার নিজেকে বড় হিন্দু প্রমাণ করতে নেমে পড়েছেন। তাঁর পার্টি বজরংবলীর পুজো করছে। তিনি পুরীর মন্দিরে পুজো দিতে যাচ্ছেন, উল্টোরথেও জ্বলজ্বল করছেন। কিন্তু যা হবার তা তো হয়ে গেছে। এখন দুই ধর্মের নেতাদের গরম গরম বাণী দিচ্ছেন। এতদিন যে ইদ্রিশ আলিদের পুষলেন, সে পাপ ভাগীরথীতে ধোয়া যাবে কি?

মমতা ব্যানার্জি সত্যবাদী যুধিষ্ঠির — একথা ঘুমচোখে জিজ্ঞেস করলে বোধহয় পার্থ চ্যাটার্জিও বলবেন না। তবু রাজ্যপালের বিরুদ্ধে আমাদের মুখ্যমন্ত্রী যে অভিযোগ করেছেন সেটাকে অবিশ্বাস করার কারণ দেখছি না। তার কারণ দুটো। প্রথমত, কেশরীনাথ ত্রিপাঠী প্রাক্তন আর এস এস প্রচারক। আর এস এস দ্বারা শিক্ষিত একজন লোক ভারতীয় সংবিধানকে খুব সম্মান করে এবং নিজের সাংবিধানিক সীমা লঙ্ঘন না করার ব্যাপারে খুব সচেতন — এরকম দাবী করলে ভক্তরা যা-ই বলুন, প্রেতলোকে গোলওয়ালকর, হেড়গেওয়াররা খুব রেগে যাবেন। দ্বিতীয়ত, বিজেপি ব্লক সভাপতির মত কথা এই ভদ্রলোক বলেই থাকেন। কদিন আগে টাইমস অফ ইন্ডিয়ায় প্রকাশিত সাক্ষাৎকারেও বলেছেন।
কিন্তু সেটা প্রশ্ন নয়। প্রশ্ন হল ওভাবে কথা বলার সুযোগ ত্রিপাঠীমশাইকে কে করে দিল? উত্তর একটাই। মমতা ব্যানার্জি নিজে।
দেড়শো কোটির দেশে আজকাল মানুষ অপ্রতুল, কিন্তু গরুর কোন অভাব নেই। এক গরুর নিজের ভগবানের মহত্ত্বে এত ঠুনকো বিশ্বাস যে অন্যের ধর্মস্থানে তাঁকে না বসালে শরীরটা বেশ হিন্দু হিন্দু লাগে না। আরেকপাল গরুর আবার নিজের ধর্মের উপরে বিশ্বাস এত ঠুনকো যে সামান্য ফটোশপের ধাক্কাতেই তার অপমান হয় এবং ভাঙচুর, বাড়ি পোড়ানো, মারধর (গণপিটুনিরও দাবী ছিল) না করলে নিজেদের যথেষ্ট মুসলমান মনে হয় না।
কিন্তু কথা হচ্ছে মনে মনে তো অমন অনেকেই ভাবে। এই পরিমাণ হিংসা ছড়ানোর সাহস এদের হয় কখন? তখনই হয় যখন বিশ্বাস থাকে যে “আমার কিস্যু হবে না।” মমতা ব্যানার্জির সরকার সেই বিশ্বাস তৈরি করে দিয়েছেন। পশ্চিমবঙ্গে দীর্ঘকাল কোন সাম্প্রদায়িক সংঘর্ষ ছিল না। ২০১১ র পর থেকে, ২০১৬ র পরে বিশেষত, একের পর এক ঘটনা ঘটেই চলেছে। সৌভাগ্যক্রমে এর জেরে এখন পর্যন্ত কোন প্রাণহানি হয়নি, ধর্ষণের ঘটনা ঘটেনি। নইলে আরো বড় আকার নিত। এই ঘটনাগুলোর সবকটাতেই পুলিশ পৌঁছেছে হিন্দী সিনেমার পুলিশের মত দেরীতে। মালদা, চন্দননগর, ধূলাগড়, খড়গপুর, নদীয়া, অধুনা বাদুড়িয়া — এই সংঘর্ষগুলো কেন আগে থাকতে আটকানো গেল না সেটাও বড় প্রশ্ন। প্ররোচনা যে যাকেই দিয়ে থাক, সে প্ররোচনায় আগুন জ্বলার আগেই জল ঢালা গেল না কেন? সরকারের গোয়েন্দা বিভাগ তাহলে আছে কী করতে?
আসল কথা মমতা এক ভয়ঙ্কর খেলা শুরু করেছিলেন। এখন আর সামলাতে পারছেন না। বিজেপির হিন্দু মৌলবাদের মোকাবিলা করার বদলে মুসলমান মৌলবাদীদের তোল্লাই দিচ্ছিলেন। বস্তুত ক্ষমতায় আসার আগে থেকেই দিচ্ছিলেন। মুসলমানদের উন্নয়নের জন্যে হাতেকলমে কিছু করার বদলে নজর ছিল মাথায় কাপড় দিয়ে নমাজ পড়ার ভঙ্গিতে ছবি তোলার দিকে। হাস্যকরভাবে সরকারী হোর্ডিং এ লেখা হচ্ছে “নমস্কার এবং সালাম।” যেন বাঙালি মুসলমান কখনো “নমস্কার” শব্দটা উচ্চারণ করে না। এতে কোন গরীব মুসলমানের কোন উপকার হয়নি। যা হয়েছে তা হল ইসলামিক মৌলবাদীদের বিশ্বাস তৈরি যে “দিদি আমাদের কিচ্ছু বলবে না” আর অন্যদিকে হিন্দু মৌলবাদীদের কাজ সহজ করা। তারা দিব্যি হিন্দুদের মাথায় ঢুকিয়ে দিতে পারছে “দিদি ওদের লোক। হিন্দুবিরোধী।” একইসঙ্গে মমতার আমলে গ্রামে, মফঃস্বলে গত কয়েকবছরে আর এস এস কিভাবে বেড়েছে লক্ষ্য করলে বোঝা যায় সেটাও দিদির ইচ্ছা।
আদরের দিদি ভেবেছিলেন আর এস এস বাড়লে মুসলমানরা ভয় পাবে, তাঁকে রক্ষাকর্ত্রী হিসাবে দেখবে আর ঢেলে ভোট দেবে। অন্যদিকে মুসলমান মৌলবাদীদের ভয়ে হিন্দুরা যদি বিজেপির দিকে ঢলে পড়ে তো পড়ুক। এই মেরুকরণে বেশিরভাগ মুসলমান ভোট আর কিছু হিন্দু ভোট তাঁর দিকে পড়লেই তো কেল্লা ফতে। রামনবমীর মিছিলের পরে বোধহয় বুঝেছেন অঙ্ক মিলছে না, তাই এখন আবার নিজেকে বড় হিন্দু প্রমাণ করতে নেমে পড়েছেন। তাঁর পার্টি বজরংবলীর পুজো করছে। তিনি পুরীর মন্দিরে পুজো দিতে যাচ্ছেন, উল্টোরথেও জ্বলজ্বল করছেন। কিন্তু যা হবার তা তো হয়ে গেছে। এখন দুই ধর্মের নেতাদের গরম গরম বাণী দিচ্ছেন। এতদিন যে ইদ্রিশ আলিদের পুষলেন, সে পাপ ভাগীরথীতে ধোয়া যাবে কি?
এই অগ্নিগর্ভ পরিস্থিতিতে রাজ্যের প্রধান প্রশাসক কী বললেন? না তিনি রাজ্যপালের কথায় এতটাই অপমানিত যে পদত্যাগ করবেন ভেবেছিলেন। চমৎকার। বাড়িতে ডাকাত পড়েছে, দাদু সুযোগ পেয়ে চেঁচামেচি করছেন আর মা ছেলেমেয়েদের কী করে বাঁচাব সেটা না ভেবে বললেন “আমি অত্যন্ত অপমানিত। রান্নাঘরের জানলা দিয়ে বেরিয়ে যাব ভাবছিলাম। তারপর ভাবলাম আমি তো শ্বশুরমশাইয়ের মা নই, আমি ছেলেমেয়েদের মা। তাই গেলাম না। কিন্তু যেতে আমার দু মিনিট লাগবে।”
সঙ্কটমুহূর্তে পদত্যাগ যাঁর প্রথম প্রতিক্রিয়া, তিনি হচ্ছেন আমাদের মুখ্য প্রশাসক! আমাদের যে কে বাঁচাবে!
বিঃ দ্রঃ তৃণমূল, বিজেপি, জামাত ইত্যাদি ছাড়াও এ রাজ্যে আরেকটা রাজনৈতিক শক্তি নাকি আছে বলে খবর। তাদের নাম বামফ্রন্ট। তারা গরু নয়, কচ্ছপ। গতকাল কলকাতায় তারা একটা গনগনে মিছিল করেছে। কিসের বিরুদ্ধে? কলেজ স্কোয়ারে মিটিং, মিছিল নিষিদ্ধ করার প্রতিবাদে। নিষিদ্ধ করার ঘোষণাটা হয়েছিল প্রায় মাসখানেক আগে। অতএব ধৈর্য ধরতে হবে। আর মাসখানেক পরে ওঁরা সাম্প্রদায়িক রাজনীতির বিরুদ্ধে কিছু একটা করবেন আশা করা যায়।

অখন্ড বাংলা

যদি আলাদাই হবেন তবে মুক্তিযুদ্ধের সময় এপারের বাঙালি কেন অধীর হয়ে থাকত দেবদুলাল বন্দ্যোপাধ্যায়ের গলায় খবর শোনার জন্যে? কেন এপারের আমরা বড় হলাম শামসুরের নানির ‘বিষাদসিন্ধু’ পাঠ শুনতে শুনতে? যে কাজ লর্ড কার্জন করে উঠতে পারলেন না, কাঁটাতারও সেভাবে পেরে উঠল না, কেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সেকাজ করতে চাইছেন?

“মোরা এক সে দেশের খাই গো হাওয়া
এক সে দেশের জল”

“আল্লা মেঘ দে পানি দে
ছায়া দে রে তুই”

“বাংলার মাটি বাংলার জল
বাংলার বায়ু বাংলার ফল
পুণ্য হউক পুণ্য হউক
হে ভগবান”

উপরের পংক্তিগুলো বাংলা ভাষার সম্পদ। “জল” বললেও বাংলা, “পানি” বললেও। যে অন্যকিছু ভাবে সে হয় বাংলাকে, বাঙালিকে চেনে না অথবা বদমাইশ। অসদুদ্দেশ্য আছে, তাই বোকা সাজছে। গত কয়েকশো বছর ধরে যে বাঙালি “জল” বলে আর যে বাঙালি “পানি” বলে তারা পাশাপাশি বাস করছে। কখনো শোনা যায়নি একদল অন্য দলকে বলেছে “তোমায় আমি যা বলছি তা-ই বলতে হবে। নইলে তুমি বাঙালি নও।” বস্তুত কোন বাঙালি হিন্দু হলেই যে “জল” বলবে আর মুসলমান হলেই “পানি”, এই ধারণাগুলোও অতিসরলীকৃত। উপরের পংক্তিগুলোতেই দেখা যাচ্ছে ইসলাম ধর্মাবলম্বী নজরুল ব্রাক্ষ্ম রবীন্দ্রনাথের মতই “জল” লিখেছেন। ইচ্ছা হয়েছে বলে লিখেছেন, পানি লিখলেও মহাভারত অশুদ্ধ হত না। আব্বাসউদ্দিনের গলায় যখন ক্ষরাক্লিষ্ট গ্রাম্য মানুষের বৃষ্টির প্রার্থনা শুনি, “আল্লা” বলছেন বলে তা বিদেশী মনে হয় কি কখনো? বাংলার ভালোর জন্যে নিজের ভগবানের কাছে রবীন্দ্রনাথের উদাত্ত প্রার্থনা সুচিত্রা মিত্রের গলায় কি বিজাতীয় মনে হয় কোন মুসলমান শ্রোতার?
পশ্চিমবঙ্গ সরকার এখন এইরকম কিম্ভূত কিমাকার চিন্তাই করছেন। রামধনু শব্দটা শুনে যে বাঙালির বৃষ্টিদিনের অপরূপ দৃশ্য মনে না পড়ে দাশরথির কথা মনে পড়ে সে যে সুকুমারের দাশরথির চেয়েও বড় পাগল এটা আলাদা করে বুঝিয়ে দেওয়ার দরকার নেই বোধহয়। হেসে উড়িয়ে দেওয়া যেত, যদি এই বিষ পাঠ্যবইয়ে ঢোকানোর চেষ্টা না হত।
বাংলা ভাষার জন্য যারা প্রাণ দিয়েছিল তারা অনেকেই হয়ত মা-কে আম্মি বলে ডাকত, বাবাকে আব্বা বা আব্বু। আবার বাংলাদেশের মুক্তিযোদ্ধারা অনেকে মা-কে মা বলেই ডাকতেন। কী তফাত? শামসুর রহমান বাঙালি আর নির্মলেন্দু গুণ হিন্দু বাঙালি? সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় বাঙালি আর সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ মুসলমান বাঙালি? বাঙালি দুরকমের হয় — হিন্দু আর মুসলমান — শিশুদের একথা শিখিয়ে দেওয়া, এ তো নোংরামি! বাঙালি একরকমই — বাঙালি। কেউ ফুল বেলপাতা দিয়ে বিগ্রহের পূজা করেন, কেউ শুধু পশ্চিমদিকে মুখ করে জানু পেতে বসে নিজের ঈশ্বরের আরাধনা করেন। এ তো তাঁদের ব্যক্তিগত ব্যাপার। তা বলে তাঁরা আলাদা!
যদি আলাদাই হবেন তবে মুক্তিযুদ্ধের সময় এপারের বাঙালি কেন অধীর হয়ে থাকত দেবদুলাল বন্দ্যোপাধ্যায়ের গলায় খবর শোনার জন্যে? কেন এপারের আমরা বড় হলাম শামসুরের নানির ‘বিষাদসিন্ধু’ পাঠ শুনতে শুনতে? যে কাজ লর্ড কার্জন করে উঠতে পারলেন না, কাঁটাতারও সেভাবে পেরে উঠল না, কেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সেকাজ করতে চাইছেন?
সরকারের কীর্তিকলাপ বেশ কিছুদিন ধরেই ভরসার বদলে সন্দেহের উদ্রেক করছে। পশ্চিমবঙ্গের অনেক হতাশাজনক নেইয়ের পাশে দীর্ঘকাল একটা গর্ব করার মত নেই ছিল — সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা নেই। বাম আমলের সবকিছুর সঙ্গে সঙ্গে এটাকেও বাতিল করবেন নাকি? সাম্প্রদায়িক গোলমাল আটকানোয় সরকারের গড়িমসি কিছুদিন ধরেই প্রকট হয়ে উঠছে। পুলিশ যেন হিন্দি সিনেমার পুলিশ হয়ে উঠেছে, পৌঁছয় ঘটনা ঘটে যাওয়ার পরে। সেই প্রেক্ষাপটে রামধনুর রং বদল আরো বিপজ্জনক। এ যে একেবারে বুকের ভেতর দেওয়াল তোলার চেষ্টা, ছোট থেকেই আমরা-ওরা তৈরি করে দেওয়ার চেষ্টা।
বাঙালির এই বিপদে কোথায় কবি সুবোধ সরকার? তিনি তো মুখ্যমন্ত্রীর ঘনিষ্ঠ। তিনি প্রতিবাদ করবেন না? বলবেন না এটা অন্যায়, এটা বিপজ্জনক? নইলে কবি হিসাবে, সমাজের বিবেক হিসাবে কী করে মানব ভদ্রলোককে? কোথায় বা শিক্ষাবিদ সুনন্দ সান্যাল? তিনি তো শিক্ষার রাজনীতিকরণের বিরুদ্ধে, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ভবিষ্যৎ ঝরঝরে হয়ে যাওয়া নিয়ে বরাবর সোচ্চার ছিলেন। প্রাথমিকে ইংরিজি না পড়তে পেরে যাদের ভবিষ্যৎ নষ্ট হয়েছে উনি বলতেন, তাদের ছেলেমেয়েরা একে অপরকে ধর্মের ভিত্তিতে চিনতে শিখুক — এই কি উনি চান? কোথায় কবীর সুমন যিনি বলেন মমতাদেবীর নামে মন্দির হবে? এই কি দেবীসুলভ কাজ?

পুনশ্চ: যাদের সাথে রাজনৈতিক লড়াইয়ে জেতার জন্যে মাননীয়া এই বিভাজন উস্কে দিচ্ছেন সেই সঙ্ঘ পরিবার এ খেলায় বিশ্বকাপের দাবিদার; মুখ্যমন্ত্রী তো সবে সন্তোষ ট্রফি খেলতে নেমেছেন। এখন মোহন ভ্যাগাবন্ড আসছে, এরপরে এ রাজ্যে ভোগী আদিত্যনাথ, শুঁড়ির সাক্ষী মহারাজও আসবে। এসে বঙ্গ ক্যালিফেট ইত্যাদি আষাঢ়ে গপ্প বলবে। সেই ঢপগুলোকে বিশ্বাসযোগ্য করার দায়িত্ব এতদ্বারা মুখ্যমন্ত্রীই নিয়ে নিয়েছেন। পারেন মাইরি! টিপু সুলতান মসজিদের একজন ইমাম আছেন তাই-ই জানতাম না ভাল করে। এখন দেখছি মুখ্যমন্ত্রীর দেওয়া ভাতায় বেশি খেয়ে তেনার এমন বদহজম হয়েছে যে নিজেকে দন্ডমুন্ডের কর্তা ভেবে বসেছেন।