ভাগ করলে বাড়ে

“ও আয় রে ছুটে আয় পুজোর গন্ধ এসেছে / ঢ্যাং কুড়কুড় ঢ্যাং কুড়াকুড় বাদ্যি বেজেছে…” গানটা বেশ জনপ্রিয়। পুজোর মরসুমে বিশেষত ছোটদের নাচ-গানের অনুষ্ঠানে প্রায় সর্বত্র শোনা যায়। ১৯৭৭ সালের পুজোয় সলিল চৌধুরীর এই সৃষ্টি তাঁর কন্যা অন্তরার গলায় প্রথম শোনা গিয়েছিল। গানটার সঞ্চারী এরকম “কাঁদছ কেন আজ ময়নাপাড়ার মেয়ে? / নতুন জামা ফ্রক পাওনি বুঝি চেয়ে? / আমার কাছে যা আছে সব তোমায় দেব দিয়ে / আজ হাসিখুশি মিথ্যে হবে তোমাকে বাদ দিয়ে।”

আনন্দ যে ভাগ করলে বাড়ে, সে কথা আজকাল আর ছোটদের বোঝানোর সময় পাই না আমরা। সলিল চৌধুরীর প্রজন্মের মানুষ প্রাণপণে শেখাতেন। এই স্তবকটা সেদিক থেকে চমকপ্রদ কিছু নয়। কিন্তু বহুবার শোনা এই গানটা কদিন আগে নিজের মেয়ের গলায় শুনে যে কারণে কানটা বেশি খাড়া করতে হল, তা হল দুটো শব্দ — “ময়নাপাড়ার মেয়ে”।

ঐ দুটো শব্দে ঘুমন্ত স্মৃতি সজাগ হয়ে উঠল। আমাদের বাড়িতে নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি প্রথম টেপ রেকর্ডার (বা ক্যাসেট প্লেয়ার) আসার পর গোড়ার দিকে কেনা ক্যাসেটগুলোর একটার নাম ছিল ‘হিটস অফ সলিল চৌধুরী’। সেই ক্যাসেটের অধিকাংশ গান সকলের চেনা, সেই বারো-তেরো বছর বয়সে আমারও চেনা। কিন্তু সেই প্রথম শুনেছিলাম এক আশ্চর্য গান — সুচিত্রা মিত্রের গলায় ‘সেই মেয়ে’।

১৯৫০ এ প্রকাশিত সেই গানের শরীরে পরতে পরতে জড়িয়ে আছে বাংলার গ্রামের মানুষের দুর্দশা আর তেভাগা আন্দোলন। কলকাতায় এসে পড়া অগণিত অভুক্ত, অর্ধভুক্ত মানুষের মধ্যে একটি মেয়েকে দেখে গীতিকার লিখেছেন “হয়ত তাকে কৃষ্ণকলি বলে, কবিগুরু, তুমিই চিনেছিলে।” শীর্ণ বাহু তুলে ক্ষুধায় জ্বলতে দেখে শুরুতেই ভেবেছেন “কে জানে হায়, কোথায় বা ঘর কী নাম কালো মেয়ে?” তারপরই চিহ্নিত করেছেন “হয়ত বা সেই ময়নাপাড়ার মাঠের কালো মেয়ে।” একজন স্রষ্টা কিভাবে আরেক স্রষ্টার সৃষ্টি আত্তীকরণ করে অন্য উচ্চতায় পৌঁছে যান, বোধহয় এই গান তার এক উজ্জ্বল নিদর্শন।

চৌঠা আষাঢ় ১৩০৭ এ রচিত রবীন্দ্রনাথের “কৃষ্ণকলি আমি তারেই বলি” সুচিত্রা মিত্র বা শান্তিদেব ঘোষের গলায় কে না শুনেছে? সেই উৎকৃষ্ট প্রেমের (যদিও ক্ষণিকা কাব্যগ্রন্থের এই কবিতা গীতবিতানের প্রেম পর্যায় নয়, বিচিত্র পর্যায়ের অন্তর্ভুক্ত) গানের নায়িকা সলিল চৌধুরীর কলমে ফিরে এল অভুক্ত পল্লীবালা হিসাবে। তেভাগা আন্দোলনে উদ্দীপ্ত গীতিকার নিজের গানের শেষে কবিগুরুকে বললেন “আবার কোনদিন যদি তারে দেখো পথে / বোলো তারে বোলো তারই তরে / ময়নাপাড়া থেকে খবর আসে তারি তরে রে / সে যেন ফিরে যায় রে।”

জীবন মরণের সীমানা ছাড়ায়ে দুই স্রষ্টার এই সংলাপ কৈশোর থেকেই জানা ছিল। মধ্যবয়সের মুখে এসে খেয়াল করে শিহরিত হলাম যে সেই ময়নাপাড়ার মেয়ে সলিল চৌধুরীকে ১৯৭৭ এও ছেড়ে যায়নি। ১৯৫০ এ তিনি বছর আঠাশের যুবক, সাতাশ বছর পরে প্রায় বৃদ্ধ। তাঁর কল্পনায় রবীন্দ্রনাথের গানের যুবতী ততদিনে ছোট্ট মেয়ে হয়ে গেছে। তেভাগার তাপ এ গানে নেই, সময় বদলেছে বলে, হয়ত শিশুদের জন্য গান বলেও। কিন্তু গানটা যে সচ্ছল পরিবারের শিশুর জবানিতে রচিত, সে নিজে যা উপহার পেয়েছে তার সবই ময়নাপাড়ার মেয়েকে দিয়ে দেবে বলছে, নইলে হাসিখুশি মিথ্যে হয়ে যাবে।

কিন্তু রবীন্দ্রনাথ আর সলিল চৌধুরীর সংলাপ বোধহয় এই গানে কেবল ময়নাপাড়ার মেয়েতে শেষ নয়, কারণ সচ্ছল মেয়ের প্রত্যয়ে প্রতিধ্বনি পাচ্ছি ‘শিশু’ কাব্যগ্রন্থের ‘পূজার সাজ’ কবিতার। দরিদ্র কৃষক বাবার দুই ছেলে — বিধু আর মধু। বাবার কিনে আনা সামান্য ছিটের জামা বিধুর পছন্দ হয়েছে, মধু কিন্তু উচ্চাকাঙ্ক্ষী। সে ধনী রায়বাবুর কাছে গিয়ে কান্নাকাটি করে। রায়বাবু নিজের ছেলেকে ডেকে বলেন “ওরে গুপি, তোর জামা দে তুই মধুকে।” কবিতার মূল প্রতিপাদ্য অবশ্য আত্মসম্মান, তাই বিধু-মধুর মা মধুর ধার করা জামা দেখে দুঃখ পান, বিধুকে বলেন “দরিদ্র ছেলের দেহে দরিদ্র বাপের স্নেহে / ছিটের জামাটি করে আলো।” কিন্তু লক্ষণীয় যে, রায়বাবুও আনন্দ ভাগ করে নেওয়ার পক্ষপাতী।

স্রষ্টারা ভাগ করে নিতে জানেন।

লাঠালাঠি নয়, গলাগলি

বিজয়া দশমীর মিষ্টির স্বাদ মিলিয়ে যাওয়ার আগেই কথাগুলো বলে ফেলা যাক, কারণ আমাদের স্মৃতি অতি দুর্বল।

বেশ কয়েক দশক হল একটা ধারণা তৈরি হয়েছিল যে পশ্চিমবঙ্গের বাঙালি দারুণ ধর্মনিরপেক্ষ এক জাতি, তাই তাদের সবচেয়ে বড় উৎসব দুর্গাপুজোরও সামাজিক চরিত্রটাই বড় কথা, ধর্মীয় চরিত্রটা নয়। উৎসবটা মূলত সংখ্যাগুরু হিন্দুদের উৎসব হলেও সংখ্যালঘু মুসলমানরাও এতে সানন্দে অংশগ্রহণ করেন, করতে কোন বাধাও নেই। কিন্তু গত কয়েক দিনে প্রমাণ হয়ে গেছে যে বাঙালি হিন্দু, মুসলমানকে নজরুলই যথার্থ বুঝেছিলেন। সে কথায় পরে আসছি।

ব্যাপারটা কী? না বেলেঘাটা ৩৩ এর পল্লী এবারের পুজোয় সর্বধর্ম সমন্বয় নিয়ে ভেবেছেন। তাই তাঁদের পুজো মণ্ডপে আজানও বেজেছে। আর যেই না বেজেছে, অমনি বহু বাঙালির ধর্মনিরপেক্ষতার খোলস খসে পড়েছে। বজরং দলের বাঁদরদের নিয়ে বেশি চিন্তিত নই। সেই একটা প্রাচীন কবিতা আছে না “কুকুরের কাজ কুকুর করেছে” ইত্যাদি? তা মৌলবাদী সংগঠনের কাজ তারা করেছে। মণ্ডপে গিয়ে অশান্তি করার চেষ্টা করেছে, অকৃতকার্য হয়ে থানায় এফ আই আর করেছে। পুলিশ কোন আইনের কোন ধারায় এসব এফ আই আর গ্রহণ করে সে প্রশ্ন তোলা যেতেই পারে, কিন্তু তা দীর্ঘমেয়াদী চিন্তার বিষয় নয়। চিন্তার বিষয় সাধারণ হিন্দু ও মুসলমানদের উষ্মা প্রকাশ। এই সাধারণদের মধ্যে আবার প্রগতিশীল, এমনকি বামপন্থীরাও আছেন। আশঙ্কা, আতঙ্ক এখানেই।

এক নিকটাত্মীয় একটি হোয়াটস্যাপ মেসেজ ফরোয়ার্ড করলেন। পড়লে চট করে মনেই হবে না কাজটা হিন্দুত্ববাদী আই টি সেলের। অবশ্য ইদানীং তো বাংলার প্রথিতযশা সাহিত্যিকদের কেউ কেউ ও দলে ভিড়েছেন, হয়ত তাঁদের কাউকে দিয়েই লেখানো বার্তাটা। উদ্ধৃত করার লোভ সামলাতে পারছি না।

ওই দুর্গাপুজো থিম যে শিল্পীর মস্তিষ্কপ্রসূত তাঁর নাম রিন্টু দাস। তাঁর কথায়, “আমাদের থিমের বিষয় হচ্ছে যে আমরা সবাই এক, কেউ একা নই। সাম্প্রদায়িকতা ভুলে সবাই যাতে সম্প্রীতির পথে চলি সেই বার্তায় দেওয়া হয়েছে। মায়ের হাতে অস্ত্র নেই। সেটা যুদ্ধ ভুলে শান্তির বার্তা।”
এখন আমরা কি জানি এই আযানে আসলে কী বলা হয়। এ ব্যাপারে উদ্যোক্তাদের ও কোনও ধারণা আছে? আসুন আযানের বাংলা অনুবাদটা পড়া যাক।
* আল্লাহু আকবর – আল্লাহ সর্বশক্তিমান।
*আশহাদু-আল লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ – আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ্ ছাড়া অন্য কোন উপাস্য নেই।
*আশহাদু-আন্না মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ – আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, মুহাম্মদ (স) আল্লাহর প্রেরিত দূত।
*হাইয়া আলাস সালা – নামাজের জন্য এসো।
*হাইয়া আলাল ফালা – সাফল্যের জন্য এসো।
*আল্লাহু আকবর – আল্লাহ সর্বশক্তিমান।
*লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ – আল্লাহ্ ছাড়া অন্য কোন উপাস্য নেই।
*মহম্মদ রসুলুল্লাহ- মহম্মদ ই একমাত্র রসুল, মানে আল্লার দূত।
এবার ভাবুন, সামনে দুর্গা প্রতিমা। মাথার উপরে দেবাদিদেব মহেশ্বর। পাশে কার্তিক, গণেশ, লক্ষ্মী আর সরস্বতী। তাঁদের অকালবোধনে আবাহন করা হয়েছে। মাইকে বাজছে: আল্লাহ্ ছাড়া অন্য কোন উপাস্য নেই!
এই হল প্রোগ্রেসিভ, অসাম্প্রদায়িক বাঙালির জ্ঞানের গভীরতা!
(দেশপ্রেমিক বানানাদি অপরিবর্তিত)

আমি আরবি ভাষা জানি না, ইসলাম ধর্মাবলম্বীও নই। ফলে আজানে যা বলা হয় তার অর্থ সত্যিই এই কিনা জানি না। তবে কত আর অবিশ্বাস করব? তাই ধরেই নিলাম এখানে সঠিক অনুবাদই করা হয়েছে। তা আপত্তির হেতুটা বোঝার চেষ্টা করে দেখি।

আজানে বলা হচ্ছে আল্লাই সর্বশক্তিমান, আল্লা একমাত্র উপাস্য, মহম্মদ আল্লার একমাত্র দূত। হিন্দু দেবদেবীদের পূজাস্থলে এসব কি কথা! এ জিনিস কখনো ওখানে বাজানো যায়!

ব্যাপারটা সর্বধর্ম সমন্বয়ের থিমের সঙ্গে কেন অসঙ্গতিপূর্ণ ঠিক বুঝলাম না। সব ধর্মেই তো সেই ধর্মকেই সর্বোত্তম সত্য বলে দাবী করা হয়। বিশ্বাস হচ্ছে না? তাহলে উদাহরণ দিই। যদিও হিন্দুধর্মের কোরান শরীফ বা বাইবেলের মত নির্দিষ্ট ধর্মগ্রন্থ নেই (বস্তুত হিন্দুধর্ম আদৌ কোন একক ধর্ম কিনা তা নিয়ে পণ্ডিতদের মধ্যে বিলক্ষণ তর্ক আছে), তবু বাড়িতে বাড়িতে শ্রীমদ্ভগবদগীতা পাওয়া যায়। আমি আবার বামুন বাড়ির ছেলে হওয়াতে ছোট থেকে বাড়িতে রোগা, মোটা, বেঁটে, লম্বা — নানা চেহারার গীতা দেখছি। অনিচ্ছায় দু বছর এবং পরে স্বেচ্ছায় দু বছর সংস্কৃত পড়তে হয়েছিল। তা বাড়ির একটা গীতা খুলে দেখলাম সপ্তম অধ্যায়ের সপ্তম শ্লোকে শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে বলছেন

মত্তঃ পরতরং নান্যৎ কিঞ্চিদন্তি ধনঞ্জয়
ময়ি সর্ব্বমিদং প্রোতং সূত্রে মণিগণা ইব।।

অর্থ কী?

হে ধনঞ্জয়, আমার চেয়ে শ্রেষ্ঠ কেউ নেই। মালায় যেভাবে মণিগুলো সুতোয় গাঁথা থাকে, আমার মধ্যে সেইভাবে সর্বভূত এবং সমস্ত জগৎ গ্রথিত।
তার আগেই, চতুর্থ অধ্যায়ে, রয়েছে প্রায় সকলের পরিচিত পঁয়ত্রিশতম শ্লোকটা

শ্রেয়ান স্বধর্ম্মো বিগুণঃ পরধর্ম্মাৎ স্বনুষ্ঠিতাৎ
স্বধর্মে নিধনং শ্রেয়ঃ পরধর্ম্মো ভয়াবহঃ।।

অর্থাৎ নিজের ধর্মে যদি দোষ ত্রুটি থাকে এবং পরের ধর্মে না থাকে, তাহলেও পরধর্মের চেয়ে নিজ ধর্ম ভাল। নিজের ধর্মে থেকে মৃত্যুও ভাল, পরধর্ম পালন করা ভয়াবহ।

যদি বা দ্বিতীয় শ্লোকে ধর্ম বলতে কী বোঝানো হচ্ছে তা নিয়ে সূক্ষ্ম তর্কের অবকাশ আছে, প্রথম শ্লোকে শ্রীকৃষ্ণ যা বলছেন দ্ব্যর্থহীন ভাষাতেই বলছেন। আজান দেওয়ার সময়ে যেমন বলা হয় আল্লাই সর্বশ্রেষ্ঠ, শ্রীকৃষ্ণও বলছেন তিনিই সর্বশ্রেষ্ঠ। তা হোয়াটস্যাপবাবুদের যুক্তি অনুযায়ী শ্রীকৃষ্ণ এত বড় কথা বলে দেওয়ার পরে শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংস যে কলমা পড়েছিলেন, গবেষকসুলভ অনুসন্ধিৎসায় খ্রীষ্টধর্মও পালন করেছিলেন সেটা কি উচিৎ কাজ হয়েছিল? “প্রোগ্রেসিভ অসাম্প্রদায়িক বাঙালির” জ্ঞানের না হয় গভীরতা নেই, পরমহংসকেও কি পরম মূর্খ বলবেন তাহলে? ৩৩ এর পল্লী যে অপরাধে অপরাধী, একই অপরাধে রামকৃষ্ণও কি অপরাধী নন? এঁরা তো কেবল অস্থায়ী মণ্ডপে মাটির মূর্তির উপস্থিতিতে নমাজ বাজিয়েছেন, তিনি তো খোদ দক্ষিণেশ্বরের অধিষ্ঠাত্রী দেবীর পুরোহিত হয়ে অন্য ধর্মের দেবতার উপাসনা করেছেন।

মজার কথা (না, চিন্তার কথা) এই নিয়ে আপত্তি শুধু রামকৃষ্ণের চেয়েও বড় হিন্দুরাই করছেন না। মুসলমানরাও করছেন। তাঁদের কারো কারো ধারণা সর্বশক্তিমান আল্লা এতে হিন্দু দেবদেবীদের কাছে ছোট হয়ে গেলেন। আল্লাকে ছোট করা এত সহজ বলে যাঁরা মনে করেন, তাঁরা এক কথায় মৌলবাদী। নইলে অন্য ধর্মের লোক তাঁর ধর্মের প্রার্থনা লোককে জানালে আপত্তি হবে কেন? অন্য ধর্মের লোক কোরান পড়লে কি আপনি রেগে যান, না খুশি হন? খুশি হওয়ারই তো কথা। উল্টোদিকেও তাই। কোন মুসলমান ভালবেসে বেদ, উপনিষদ পড়েন জানলে রেগে যায় যে হিন্দু, সে যেমন মৌলবাদী, প্যান্ডেলে নমাজ শুনে যে মুসলমান রেগে যায় সেও মৌলবাদী ছাড়া কিছু নয়। এখন সঙ্ঘ পরিবারের যুগ, দেশে সংখ্যাগরিষ্ঠ হল হিন্দুরা, তাই বজরং দল হল্লা করতে সাহস পায়, এঁরা পান না। এই যা তফাৎ।

আরেকটা মতও প্রচার হচ্ছে। অনেক মুসলমান নাকি আহত এই জন্যে যে আজান ব্যাপারটা প্রার্থনা, গান নয়। অতএব এটাকে পুজো মণ্ডপে বাজানো মানে আজানের অসম্মান। কি অদ্ভুত যুক্তি! পুজোর জায়গাতেই তো আজানের ব্যবহার করা হচ্ছে। আজানের সাথে কোমর দুলিয়ে কোন সিনেমাবণিতা নাচছেন বলে তো খবর নেই। এতে আজানের অসম্মান হয়? এ যুক্তির সাথে তো হোয়াটস্যাপের যে বার্তার উল্লেখ করলাম তার কোন পার্থক্য নেই। আমারটা সেরা, তাকে অন্য কিছুর পাশে রাখলেই তার অসম্মান হয় — এই তো বলতে চাওয়া হচ্ছে আসলে।

তথাকথিত প্রগতিশীল যারা, তাদের বুদ্ধি বেশি। তাই তারা চালাকি করে বলছে “সর্বধর্ম সমন্বয়ের কোন প্রয়োজন নেই, সহাবস্থান হলেই যথেষ্ট।” শুনে মনে পড়ল আমার এক হিন্দুত্ববাদী প্রাক্তন বন্ধুর কথা। তার সাথে তর্ক হতে হতে একদিন বলেছিলাম “তুই কী চাস? মুসলমানদের মেরে ফেলা হোক বা ভারত থেকে তাড়িয়ে দেওয়া হোক?” তার উত্তর ছিল “তা কেন? থাকুক এক পাশে। লাঠালাঠিরও দরকার নেই, গলাগলিরও দরকার নেই।”

মুসলমান নাগরিককে বাড়ি ভাড়া দেয় না যারা, মুসলমান হলে আবাসনে ফ্ল্যাট কিনতে দেয় না যারা তাদেরও কিন্তু আসলে বক্তব্য এটাই। তুমি বাপু তোমার এলাকায় থাকো, আমি আমার এলাকায় থাকি। এক কথায়, সমন্বয়ের দরকার নেই, সহাবস্থানই যথেষ্ট। যে ইসলাম ধর্মাবলম্বী প্রগতিশীল সমন্বয় বাতিল করে সহাবস্থানের তত্ত্ব খাড়া করেন, তিনি আসলে মুসলমানদের কোণঠাসা করার ব্যাপারীদেরই সাহায্য করেন। আর যে বামপন্থীরা এই তত্ত্ব সমর্থন করেন, তাঁদের উপযুক্ত বিশেষণ আমি খুঁজছি। এখনো পাইনি।

তাছাড়া এই প্রগতিশীলরা কে হরিদাস পাল যে সমন্বয়কে বাতিল করবেন? এ দেশে কয়েক হাজার বছর ধরে ধর্মীয় সমন্বয় হয়েই চলেছে। কোন শাসক শুরু করেননি, অনেক শাসক আটকাতে চেয়েও পারেননি। সাধারণ মানুষ নিজের বুদ্ধি বিবেচনায় এই সমন্বয় করে চলেছেন। হিন্দুদের সত্যনারায়ণ কখন সত্য পীর হয়ে যান টের পাওয়া যায় না। ওলাউঠায় গ্রাম কে গ্রাম উজাড় হয়ে যেত এক সময়। তা থেকে তৈরি হয়েছে ওলাবিবি। ওলাবিবির থানে হিন্দু, মুসলমান উভয়েই যান। কত মাজারে যে সন্তানহীনা হিন্দু মহিলারা সন্তান প্রার্থনা করেন তার কোন সেন্সাস হয়নি আজ অব্দি। গত বছর বন্ধু মৃণালের শ্বশুরালয় পশ্চিম মেদিনীপুরের মোগলমারি গ্রামে গিয়েছিলাম। সে গ্রামের চালু মন্দির দূর থেকে দেখলে মসজিদ বলে ভুল হওয়া বিচিত্র নয়। ইসলামিক স্থাপত্যের অভিজ্ঞান যে গম্বুজ তা রয়েছে মন্দিরের মাথায়, দেয়ালে মসজিদের মত নকশা কাটা জাফরি। সুফি সাধকদের কথা তো বলতে শুরু করলে শেষ হবে না। দুজন কাওয়ালি গায়কের কথা বলি।

বন্ধু উজ্জ্বলের কল্যাণে বছর দুয়েক আগে শুনেছিলাম ফরিদ আয়াজ আর আবু মুহাম্মদের গান “ইয়াদ হ্যায় কুছ ভি হামারি”। সেখান গোকুল ছেড়ে চলে যাওয়া কানাইকে রাধিকা জিজ্ঞেস করছেন তাঁর কথা মনে আছে কিনা। কিভাবে কানাইয়ের খবর পেতে হন্যে হয়ে ঘুরেছেন তার উদাহরণ হিসাবে বলছেন “পইয়াঁ পড়ি মহাদেবকে যা কে”। শেষ দিকে রয়েছে “ম্যায় কৌন হুঁ ঔর কেয়া হুঁ ইয়ে রিজওয়ান (জন্নতের দারোগার নাম) সে পুছো / জন্নত মেরে অজদাদ (পূর্বপুরুষ) কি ঠুকরায়ি হুয়ি হ্যায় / ফিরতি থি কিঁউ মারি মারি।” অর্থাৎ কৃষ্ণের প্রেয়সীর পূর্বপুরুষদের জন্নতে ঢুকতে দেওয়া হয়নি তিনি কৃষ্ণপ্রেমে উন্মাদিনী হয়েছেন বলে। এই সমন্বয় যাঁরা চান না, যাঁরা বলেন এই সমন্বয় জগাখিচুড়ি, তাঁরা হিন্দু বা মুসলমান কারোর ভাল চান না।

অল ইন্ডিয়া রেডিওর তৈরি যে ‘মহিষাসুরমর্দিনী’ না শুনলে বাঙালির শারদোৎসব শুরু হয় না, সেই অনুষ্ঠানের যন্ত্রশিল্পীদের অনেকেই ছিলেন মুসলমান। সেটা কি সহাবস্থানের উদাহরণ নাকি সমন্বয়ের উদাহরণ? সহাবস্থানবাদীরা কি বলবেন ঐ শিল্পীদের বাদ দিয়ে করা উচিৎ ছিল অনুষ্ঠানটা বা ঐ শিল্পীদের নিজে থেকেই বলা উচিৎ ছিল আমরা বাজাব না? এরপর কি শুনব বড়ে গোলাম আলি খাঁ সাহেবের উচিৎ ছিল “হায় রাম” বোল বাদ দিয়ে “ইয়াদ পিয়া কি আয়ে” গাওয়ার আদেশ মেনে নিয়ে পাকিস্তানেই থেকে যাওয়া? নাকি শুনব নজরুলের অতগুলো শ্যামাসঙ্গীত লেখা ঠিক কাজ হয়নি? হিন্দুরাষ্ট্রবাদীদের বিরুদ্ধে লড়তে গিয়ে আমরা এভাবে সাভারকর-জিন্নার দ্বিজাতিতত্ত্বকেই মেনে নেব নাকি?

কেউ কেউ আপত্তি করছেন এই বলে যে দৈনন্দিন জীবনে যখন মুসলমানদের এক সূত্রে বেঁধে নেওয়ার প্রচেষ্টা ক্রমশ তলানিতে ঠেকছে, তখন এ সমস্ত “দ্যাখনাই” ব্যাপারের কোন দরকার নেই। প্রথমত, ৩৩ এর পল্লী ওরকম থিম না করলে কি রোজকার জীবনে মুসলমানদের প্রান্তিক করে দেওয়ার চেষ্টা কিছুমাত্র কম হত? আর ঐ মণ্ডপ হওয়াতেই বা দুই সম্প্রদায়ের ব্যবধান ঘোচানোর প্রচেষ্টায় আমাদের বাধা দিচ্ছে কে?

দ্বিতীয়ত, কিছুটা দ্যাখনাইয়েরও প্রয়োজন আছে বইকি। যুগটাই দৃশ্য শ্রাব্য উদ্দীপকের যুগ। নইলে মুসলমানদের রাষ্ট্রযন্ত্র ব্যবহার করে চুপিসাড়ে খুন করলেই তো হিন্দুত্ব ব্রিগেডের কাজ চলে যেত। প্রকাশ্য জায়গায় পিটিয়ে মারার দরকার কী? গণপিটুনির ভিডিও তৈরি করে ছড়িয়ে দেওয়ার প্রয়োজনীয়তাই বা কী? আসলে ওরা এমন করে শুধু সন্ত্রাস ছড়ানোর জন্যে নয়, এমনটাই যে স্বাভাবিক, এরকম যে করাই যায় তা মানুষের মনে ঢুকিয়ে দেওয়ার জন্যে। এদের সাথে লড়তে গেলে আমাদেরও বেশি বেশি করে দেখানো দরকার যে পুজো আর নমাজ পাশাপাশি চলাটাই স্বাভাবিক।

আমাদের একজন রবীন্দ্রনাথ ছিলেন। তিনিও বলতেন যে আমার ভাই তাকে ছাদে উঠে চেঁচিয়ে আহা, ভাই বুকে এসো, বলার দরকার নেই। বললেই বরং বোঝা যায় কোন গোলমাল আছে। কথাটা সাধারণ অবস্থায় ঠিক। কিন্তু সেই রবীন্দ্রনাথই তো বঙ্গভঙ্গ রদের আন্দোলনে পথে নেমে সকলের হাতে রাখী পরালেন। অবনীন্দ্রনাথ লিখেছেন গঙ্গাতীরে রাখীবন্ধন উৎসব করে জোড়াসাঁকোয় ফেরার পথে রবীন্দ্রনাথ সটান নাখোদা মসজিদে ঢুকে পড়লেন। ওঁরা তখন বাইরে দাঁড়িয়ে আশঙ্কা করছেন কোন অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটবে। অথচ কিছুক্ষণ পরেই সহাস্য রবীন্দ্রনাথ ইমামের হাত ধরে বেরিয়ে এলেন রাখী পরিয়ে। তাহলে দ্যাখনাই কাজ করলেন কে? রবীন্দ্রনাথ, না ইমাম? নাকি দুজনেই? তার চেয়েও বড় কথা, কাজটা অন্যায় হয়েছিল কি?

আর দ্যাখনাই বলছেন কাকে? কোন মুসলমান ব্যক্তি প্যান্ডেলে ঠাকুর দেখতে গেছেন এমন ছবি দেখেও দেখছি অনেকে অসন্তুষ্ট। এগুলো নাকি সংখ্যাগুরুর কাছে প্রিয় হওয়ার জন্যে দ্যাখনাই। মানে কি এই কথাটার? কোন ইসলাম ধর্মাবলম্বী মানুষ পুজোয় নতুন জামাকাপড় কেনেন, ছেলেমেয়েকে নিয়ে ঠাকুর দেখতে বেরোন হিন্দুদের কাছে প্রিয় হওয়ার জন্যে? পশ্চিমবঙ্গের বহু পুজো কমিটি চালান যে মুসলমান কর্মকর্তারা, তাঁরা আসলে হিন্দুদের প্রিয় হতে চান? এইভাবে ব্যক্তিমানুষকে, তার সাধ আহ্লাদকে ধর্মীয় পরিচিতির কারণে অপমান করা যায়? তাহলে আমি যখন আমার মুসলমান বন্ধুর বাড়ি ইফতারে যাই সেটা আসলে নিজেকে ধর্মনিরপেক্ষ প্রমাণ করতে যাই? হোস্টেলজীবনে আমরা যে মুসলমান সহপাঠীদের ঈদের ছুটিতে বাড়ি যাওয়ার সময়ে হুমকি দিতাম “খাবার দাবার না আনলে ঢুকতে দেব না হোস্টেলে”, সেটা তাহলে সংখ্যালঘুর উপরে সংখ্যাগুরুর শক্তির আস্ফালন ছিল?

আমাকে আমার মত থাকতে দাও, তুমি তোমার মত থাকো — এই অনুপম রায়ে আসলে ধর্মীয় ফ্যাসিবাদের হাত শক্ত হচ্ছে। অনেক প্রগতিশীল, বামপন্থী হিন্দু এবং মুসলমানের যেসব বক্তব্য এবার পুজোয় শুনলাম তাতে বুঝলাম এঁরাও হিন্দুত্ববাদীদের মত হিন্দু, মুসলমান পৃথগন্ন হয়ে থাকলেই খুশি। কদিন পর এমনও বলতে পারেন যে হিন্দু-মুসলমানে বিয়ে টিয়েও না হলেই ভাল হয়। সেই আমার বন্ধুর মত আর কি। লাঠালাঠি চাই না, গলাগলিও চাই না।

নজরুলের কথা বলেছিলাম গোড়াতেই। তিনি ঠিক যা বলেছিলেন সেটা দিয়ে শেষ করি

আমি কেবলমাত্র হিন্দু-মুসলমানকে এক জায়গায় ধরে এনে হ্যান্ডশেক করাবার চেষ্টা করেছি; গালাগালিকে গলাগলিতে পরিণত করার চেষ্টা করেছি। সে হাতে হাত মিলানো যদি হাতাহাতির চেয়ে অশোভনীয় হয়ে থাকে, তাহলে ওরা আপনি আলাদা হয়ে যাবে। আমার গাঁটছড়ার বাঁধন কাটতে তাদের কোন বেগ পেতে হবে না। কেন না, একজনের হাতে আছে লাঠি, আরেকজনের আস্তিনে আছে ছুরি।

আক্রমণে মৃণাল, রক্ষণে নীতা

সোশাল মিডিয়ায় কদিন হল ভাইরাল হয়েছে একটা ফুটবল দলের ছক। যে দলের সদস্য আমাদের বাংলা সাহিত্যের কিছু জনপ্রিয় চরিত্র। হয় তারা খেলছে বা দলের সঙ্গে অন্য নানা ভূমিকায় যুক্ত আছে। বিশ্বকাপ ফুটবলের ময়দান থেকে বহুদূরে থাকা আমরা এভাবেই দুধের সাধ ঘোলে মেটাই।
দলটার দিকে তাকিয়ে কল্পনার পাখা মেলে দিতে গিয়ে খেয়াল হল, ফিফা ক্রমতালিকায় ৯৭ নম্বরে থাকা ভারতের পুরুষদের জাতীয় দলের তুলনায় মেয়েদের দল কিন্তু অনেক এগিয়ে। এই মুহূর্তে আমাদের মেয়েরা ৬০ নম্বরে। উত্তর আমেরিকায় ২০২৬ থেকে পুরুষদের বিশ্বকাপ ৪৮ দলের হয়ে যাচ্ছে। মেয়েদের ক্ষেত্রে তেমন হলে (এই মুহূর্তে ২৪ দলের প্রতিযোগিতা) ভারতের বিশ্বকাপ খেলার সম্ভাবনা অনেক বেশি।
তখনই মনে হল, আমাদের সাহিত্যের জ্বলজ্বলে নারী চরিত্রদের নিয়েও একটা জবরদস্ত ফুটবল দল বানানো যেতেই পারে। তবে সে দল অতটা মজার হবে না, বরং লড়াকু হবে। আমাদের দেশের কজন মেয়েরই বা মজায় বাঁচার সুযোগ হয়।
এখানে স্বীকার্য যে আমার পড়ার পরিধি খুব ছোট। তার উপরে ওপার বাংলার সাহিত্য প্রায় কিছুই পড়া হয়নি। ফলে যাঁরা বেশি পড়েন তাঁরা নিশ্চয়ই আরো ভাল দল বানাতে পারবেন। আরো বলা প্রয়োজন যে খেলোয়াড় ঠিক করার সময়ে সাহিত্যের পাশাপাশি চলচ্চিত্রে যেভাবে এদের কারো কারো চরিত্রচিত্রণ হয়েছে তা ভুলতে পারিনি। সার্থক বাংলা ছবির অনেকগুলোই তো সাহিত্যাশ্রয়ী। ফলে আশা করি মহাপাতক হয়নি।
গোলে রাখলাম বাণী বসুর গান্ধর্বী উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র অপালাকে। প্রতিকূল অবস্থাতেও সবদিক সামলে সঙ্গীতের প্রতি নিবেদিত প্রাণ এই মহিলাকে দুর্গ সামলানোর দায়িত্ব দিয়ে নিশ্চিন্ত হওয়া যায়। ম্যানুয়েল নয়ারের মত মাল্টি টাস্কিং গোলরক্ষা এঁর পক্ষেই সম্ভব।
দুই সাইড ব্যাকের ভূমিকায় রবীন্দ্রনাথের কুমুদিনী আর আশাপূর্ণা দেবীর আইকনিক চরিত্র সুবর্ণলতা। সে যুগে দোর্দণ্ডপ্রতাপ স্বামীর সাথে দূরত্ব রেখে জীবন কাটানো ‘যোগাযোগ’ উপন্যাসের নায়িকা কুমুদিনী আর আশাপূর্ণা দেবীর ট্রিলজির সুবর্ণলতা রক্ষণে যেমন আঁটোসাটো, তেমনি কাফু আর রবার্তো কার্লোসের মত ওভারল্যাপে গিয়ে বিপক্ষকে তছনছ করে দিতেও পারে। মনে করে দেখুন স্বদেশী আন্দোলনের সমর্থনে সুবর্ণ কেমন বাড়ির উঠোনে বিলিতি জামাকাপড় পুড়িয়ে দিয়েছিল।
সেন্ট্রাল ডিফেন্সে আমাদের দরকার তুলনায় কম দুঃসাহসী কিন্তু দৃঢ়চেতা দুজনকে। তাই রইলেন আশাপূর্ণারই ‘অনাচার’ গল্পের সুভাষ কাকিমা, যিনি অসুস্থ, মৃতপ্রায় শ্বশুরমশাইকে মানসিক আঘাত থেকে বাঁচাতে স্বামীর মৃত্যুর খবর গোপন করে সধবার জীবন কাটিয়েছিলেন দীর্ঘকাল, সামাজিক গঞ্জনা বা শাস্ত্রের ভয়কে তোয়াক্কা করেননি। ইনিই আমাদের ফ্রাঙ্কো বারেসি।
এঁর পাশেই থাকবেন শক্তিপদ রাজগুরুর নীতা, পরিবারের জন্যে যার সর্বস্ব ত্যাগকে পর্দায় অমর করে রেখেছেন ঋত্বিক ঘটক। সেন্ট্রাল ডিফেন্সে এমন নিঃস্বার্থ সৈনিক আর পাব কোথায়?
মাঝমাঠে আমাদের জেনারেল হিসাবে থাকবেন নটী বিনোদিনী। ওখানে দরকার এমন একজনকে যিনি দলের স্বার্থে ডিফেন্সে নেমে আসবেন, আবার স্ট্রাইকারদের ডিফেন্স চেরা পাসও বাড়াবেন প্রয়োজনে। বাংলার সাধারণ রঙ্গালয় তৈরি করার জন্যে যিনি অভিনয় করা ছেড়ে দিয়েছিলেন প্রবল ব্যথা সহ্য করে, যিনি অমর হয়ে আছেন ব্রজেন দের নাটকে, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের উপন্যাসে, সেই নটীই এই কাজের উপযুক্ত। পেশায় যৌনকর্মী হওয়ায় আত্মত্যাগের প্রাপ্য প্রতিদান হিসাবে তাঁর নামে রঙ্গালয়ের নামকরণ সে যুগে করা হয়নি। তার প্রায়শ্চিত্ত হিসাবে এই দলের ক্যাপ্টেনস আর্ম ব্যান্ড তাঁর পুরোবাহুতেই থাক।
বিনোদিনীর দুপাশে মাঠ আলো করে থাকবে পথের পাঁচালীর দুর্গা আর শেষের কবিতার লাবণ্য।
ভীষণ দুরন্ত দুর্গা এনগোলো কান্তের মত সারামাঠ দৌড়ে ব্যস্তিব্যস্ত করে দেবে প্রতিপক্ষকে। আর অকল্পনীয় পাসে মাঠে ফুল ফোটাবে লাবণ্য। দিয়েগো মারাদোনার মতই যাকে ছকে বাঁধা যায় না, যে দীঘির জল, ঘড়ার জল নয়, সে-ই তো লাবণ্য।
ত্রিফলা আক্রমণে স্ত্রীর পত্রের মৃণাল, দহনের ঝিনুক, আর বঙ্কিমের দেবী চৌধুরানি।
প্রথম জনের সাথে আজীবন শ্বশুরবাড়ির মূল্যবোধের লড়াই চলেছে। শেষে সে পুরী থেকে চিঠি লিখে স্বামীকে জানিয়ে দিয়েছে যে সে শুধু মেজোবউ নয়, জগৎ এবং জগদীশ্বরের সঙ্গে তার যে অন্য সম্পর্কও আছে তা সে আবিষ্কার করেছে। সুতরাং সে আর সংসারের শিকলে বাঁধা পড়বে না। দ্বিতীয় জন গোটা দুনিয়ার বিরুদ্ধে একা দাঁড়িয়ে লড়েছে পুরুষের দুষ্কর্মের বিরুদ্ধে। আর তৃতীয় জন নিরীহ বধূ থেকে ডাকাত সর্দার হয়ে একদা প্রভুত্ব করা পুরুষদের পদানত করেছে। এই আক্রমণভাগ দেখে যে কোন ডিফেন্স কাঁপতে বাধ্য।
আমাদের শক্তিশালী রিজার্ভ বেঞ্চে থাকছে সামাজিক রীতিনীতির বিপরীতে দাঁড়ানোর সাহস রাখে এরকম চারজন — তারাশঙ্করের মহাশ্বেতা, চোখের বালির নায়িকা বিনোদিনী, কাপালিকের কাছে বেড়ে ওঠা বঙ্কিমের কপালকুণ্ডলা এবং শরৎচন্দ্রের রাজলক্ষ্মী।
লীলা মজুমদারের রসিক, প্রবল বুদ্ধিমতী পদিপিসী এই দলকে চালনা করবেন। টেকনিক্যাল পরামর্শ দিয়ে তাঁকে সাহায্য করবে হাঁটুর বয়সী কলাবতী — মতি নন্দীর চরিত্র। এখানে কোচ আর টিডির অশান্তির কোন সম্ভাবনা নেই। পিসী সম্ভবত ৪-৩-৩ ছকেই খেলাবেন কারণ যাদের হারাবার কিছু নেই, জয় করার জন্যে আছে গোটা জগৎ তাদের রক্ষণাত্মক হয়ে লাভ নেই।

গোলরক্ষক: অপালা। রক্ষণ: কুমুদিনী, সুভাষ কাকিমা, নীতা, সুবর্ণলতা। মাঝমাঠ: লাবণ্য, নটী বিনোদিনী, দুর্গা। আক্রমণ: মৃণাল, ঝিনুক, দেবী চৌধুরানী। অতিরিক্ত: মহাশ্বেতা (গোলরক্ষক), বিনোদিনী, কপালকুণ্ডলা, রাজলক্ষ্মী। কোচ: পদিপিসী। টেকনিক্যাল ডিরেক্টর: কলাবতী।