সীতারামায়ণ

মার্কসবাদ মানে কী, সীতারাম ইয়েচুরি যা বলছেন সেটাই কিনা, প্রকাশ কারাত ঠিক না ভুল — এসব তত্ত্বকথা না হয় থাক। তত্ত্ব নিয়ে আলোচনা করার বৈদগ্ধ্য আমার নেই, যতদূর জানি বেশিরভাগ লোকেরই আমার মতই অবস্থা। অতএব ওসব ভুলে গিয়ে একটা কান্ডজ্ঞান সংক্রান্ত প্রশ্ন করি। কান্ডজ্ঞান ব্যাপারটা সংসদীয় রাজনীতিতে প্রায়শই গাণিতিক। অতএব প্রশ্নটাকে অঙ্কের প্রশ্নও বলা যায়। প্রশ্নটা এই — যে অঙ্কটা একবার ভুল বলে প্রমাণিত হয়েছে সেটাই আবার করতে যাওয়া বুদ্ধিমানের কাজ কিনা।

পশ্চিমবঙ্গে ২০১৬ বিধানসভা নির্বাচনে বামফ্রন্ট আর কংগ্রেসের জোট নিদারুণভাবে প্রত্যাখ্যাত হয়েছিল। আসন সংখ্যাটা যেসব সিপিএম কর্মীর মনে আছে তাঁরা নিশ্চয় মানেন একা লড়লে ৩৪ বছরের শাসন বা অপশাসন সত্ত্বেও এত খারাপ অবস্থা হত না। অর্থাৎ ইয়েচুরি, কারাত, বেঙ্গল লাইন, কেরালা লাইন যা-ই হোক না কেন হাতে কাস্তে হাতুড়ি উঠে আসা ভোটাররা মোটেই পছন্দ করেননি। সীতারামের একমাথা চুল বলেই তিনি আবার বেলতলায় যাবেন এটা কী ধরণের কান্ডজ্ঞান ভগবান কিম্বা মার্কস কেউই জানেন না বোধহয়।

আজকের টাইমস অফ ইন্ডিয়া পড়ে বুঝলাম ভদ্রলোকের আবার পার্টির উপর অভিমান হয়েছে। “আমায় প্রো কংগ্রেস বললে আমিও প্রো বিজেপি বলতে পারি” জাতীয় ছেলেমানুষি কথাবার্তা বলেছেন ধেড়ে সাধারণ সম্পাদক। সে বলুন গে। উনি বুঝবেন আর ওঁর পার্টি বুঝবে। কিন্তু উনি মার্কসবাদের মানে যা বলেছেন সেটা মেনে নিলেও যে কংগ্রেসের সাথে জোট সমর্থনযোগ্য হচ্ছে না! উনি বলেছেন যে বদলাতে পারে না সে কমিউনিস্ট নয়। মেনে নেওয়া গেল। তাহলে উনি নিজে কংগ্রেসের সাথে জোটের চূড়ান্ত ব্যর্থতা দেখার পরেও বদলাচ্ছেন না কেন?

ক্ষমতা থেকে বিজেপিকে তাড়ানো যে আশু কর্তব্য তা নিয়ে শুধু সিপিএম বা বামপন্থী কেন, বিরোধী রাজনৈতিক দল বা দলীয় রাজনীতির বাইরে থাকা নাগরিকদের কারোরই দ্বিধা আছে বলে মনে হয় না। সীতারাম নিজেও বলেছেন মতপার্থক্য শুধু কিভাবে সেটা নিয়ে। তাহলে কেন মনে হচ্ছে যে বিরোধী ঐক্যটা নির্বাচনী জোট করেই হতে হবে? ভোটের পরে পরিস্থিতি অনুযায়ী তো সিদ্ধান্ত নেওয়াই যায়। সঙ্ঘ পরিবারের বিরুদ্ধে লড়াই তো নির্বাচন দিয়েই শেষ হবে না।

তেলে আর জলে মিশ খাওয়াতে গেলে যে যাকে হারাতে চাইছি তারই সুবিধা হয় সেই শিক্ষাটা ২০১৬ র ফল থেকে নেওয়া কি এতই শক্ত? আমরা কেউ কি ভুলে গেছি বিধানসভা নির্বাচনের প্রচারপর্বে মমতা কী বলে গেলেন সমানে? কংগ্রেস সমর্থকদের বললেন “দেখুন, বরাবর বলেছি কংগ্রেস সিপিএমের বি টিম। দেখলেন তো? ওরা সাঁইবাড়ির শহীদদের কেমন ভুলে গেল দেখুন।” আর বাম সমর্থকদের ছুঁয়ে গেল তাঁর টিটকিরি “বাহাত্তরের সন্ত্রাস ভুলে গেলেন কমরেড?” এর ফলে যেটা হল সেটা হচ্ছে গোটা নির্বাচনে মুখ্যমন্ত্রীকে পাঁচ বছর কী কাজ করলেন তার কোন হিসাবই দিতে হল না। বিরোধীরা নিজেদের বিরুদ্ধে অনৈতিকতার অভিযোগ সামাল দিতেই ব্যস্ত থাকলেন, সরকারকে প্রশ্নটা করবেন কখন?

এখন থেকেই বলে দেওয়া যায়, রামধনু জোট হলে নরেন্দ্র মোদীর কাজটাও একইরকম সহজ হয়ে যাবে। অর্থনীতির বেহাল অবস্থার জন্যে জবাবদিহি করতে হবে না, সুবিধা পাইয়ে দেওয়ার পুঁজিবাদের জন্যে কৈফিয়ত দিতে হবে না, কর্নিসেনাদের তোল্লাই দেওয়া, মুসলমান, দলিতদের উপর অত্যাচারের প্রশ্ন উঠবেই না। তিনি শুধু কেঁদেকেটে মিটিঙে মিটিঙে সেই ফাটা রেকর্ড বাজাবেন “মিত্রোঁ, আপনারা দেখুন, আমি দলিত বাবা-মার চা ওয়ালা ছেলে, আপনাদের আশীর্বাদে ক্ষমতায় এসেছি। আমাকে সরানোর জন্যে সবাই একজোট হয়েছে। এদের কোন নীতি নেই, কোন আদর্শ নেই, শুধু একটাই উদ্দেশ্য — মোদীকে হারানো। কারণ মোদী গরীব মানুষের জন্যে কাজ করে, কারণ মোদীর আমলে হিন্দুদের জাগরণ হয়েছে” ইত্যাদি। এর সাথে মোদীর ইশারায় সাঙ্গোপাঙ্গদের তৈরি কিছু বাইনারি তো থাকবেই, সেগুলো তো জোট হলেও হবে, না হলেও হবে। অর্থাৎ বিরোধীরা যথারীতি নিজেদের পিঠ বাঁচাতেই ব্যস্ত থাকবেন। বরং মোদীর পক্ষে তুলনায় শক্ত হবে যে রাজ্যে যে শক্তিশালী সেখানে তার মোকাবিলা করা। কারণ ২০১৪ র হাওয়া আর নেই। সব প্রশ্নপত্রের একই উত্তর দিয়ে তখন ড্যাংড্যাং করে পাশ করা গেছিল, এবারে অত সোজা হবে না। অতএব আমি যদি মোদী হতাম, আমি চাইতাম শুধু কংগ্রেস-বাম নয়, যত বিরোধী দল আছে সব্বাই মিলে একটা জোট হোক। তাহলে বলতে পারব সারদা, নারদা, ভাদরা, কাস্তে, হাতুড়ি সবাই এক। এরা এক হয়ে দেশের মানুষকে লুটতে চায়। এটা এন্টি ন্যাশনালদের জোট। অর্ণব গোস্বামীকে লেলিয়ে দেব, সে জিওর্জিও আরমানির স্যুট আর জিমি চুর জুতো পরে বলবে “এটা দেশের গরীব মানুষের ক্ষমতায়নের বিরুদ্ধে ক্ষমতায় ফিরতে হাত নিশপিশ করা লুটিয়েন্স এলিট আর জেএনইউ এর এন্টি ন্যাশনাল বামেদের জোট। এতদিন ইউনিভার্সিটি ক্যাম্পাসে ছিল, এবার ভোটে হয়েছে।” আহা! ভারী মজা হবে।

অনেক বাজে বকলাম। একটা মজার স্মৃতি দিয়ে শেষ করি।

জ্যোতি বসুর প্রধানমন্ত্রী হওয়া নিয়ে যখন তাঁর পার্টিতে বিতর্ক হয় তখন সীতারাম ইয়েচুরি ছিলেন সরকারে না যাওয়ার পক্ষে। সেবারে তাঁরাই জয়যুক্ত হয়েছিলেন। তারপর আজকালে একটা ছবি বেরিয়েছিল। ছবি মানে এখন যাকে মিম (meme) বলা হয়। ছবিতে কার্ল মার্কসের মূর্তির সামনে বসে সীতারাম বোঝাচ্ছেন “মার্কসবাদ মানে হল…”। আর মার্কসের মূর্তিটা বলছে “এটা আবার কে?”

রক্তপিপাসু বাঙালি

afrazul

আখলাক আহমেদ খুন হওয়ার কয়েকদিন পরে আমি একটা খেলার প্রতিবেদন লিখতে একটা বিজেপিশাসিত রাজ্যে গেছি। সেই রাজ্যের সবচেয়ে শিল্পোন্নত শহরের অভিজাত এলাকায় তৈরি স্টেডিয়ামের অস্থায়ী প্রেস বক্সে গিয়ে রোজ বসি। ওখানকার পয়সাওয়ালা, ক্ষমতাবান লোকেরা আশেপাশেই এসে বসেন, খানিকক্ষণ ক্রিকেটমাঠের উত্তাপ নিয়ে যান, নিজেদের মধ্যে আবহাওয়া, হজমের গণ্ডগোল, ক্রিকেটটা আশির দশকে কেমন ছিল আর এখন কেমন হয়েছে, শহরের কোথায় এখন জমির দাম সবচেয়ে বেশি আর কোথায় সবচেয়ে কম — এইসব নিয়ে গভীর আলোচনা করেন। সেই আলোচনায় একদিন দেখলাম সকলেই একমত হয়ে বলছেন যে একটা মুসলমান মরেছে তাতে দেশসুদ্ধু লোক মিলে যে লাফালাফিটা করছে সেটা অত্যন্ত অন্যায়। উত্তরপ্রদেশ সরকার আবার ক্ষতিপূরণ দিচ্ছে! হিন্দু মরলে দিত?
কিছুটা তফাতে বসে আমার গা চিড়বিড় করছে, নিজেকে শান্ত রাখছি এই বুঝিয়ে যে এই ধর্মান্ধগুলোর সাথে তখন তর্কে জড়ালে আমার কাজের বারোটা বাজবে। আরো যে ভাবনাটা শান্ত থাকতে সাহায্য করেছিল সেটা এই যে ওটা একে গোবলয়ের রাজ্য তায় বিজেপিশাসিত। আমাদের পশ্চিমবঙ্গের শিক্ষিত লোকেরা এইভাবে ভাবে না। অন্য ব্যাপারে যতই মতের অমিল থাক, এই ধরণের হত্যার পক্ষ নিয়ে কেউ গলা ফাটায় না, যে খুন হল সরকার তার পরিবারের পাশে দাঁড়ালেও কেউ নোংরা মন্তব্য করে না। আফরাজুলের হত্যার পরের দিনগুলো আমার এই আত্মশ্লাঘাকে ইডেন থেকে ছয় মেরে বাংলার বাইরে পাঠিয়ে দিয়েছে।
রামনবমীতে সশস্ত্র মিছিল দেখে আন্দাজ করেছিলাম, এবারে নিশ্চিত হয়ে গেলাম যে বাঙালিদের মধ্যে গোমাতার সন্তানের সংখ্যা নেহাত কম নয়। আফরাজুল সম্পর্কে লাভ জিহাদের গপ্পটা বাজারে পড়তে না পড়তে বাঙালি চৈত্র সেলের শাড়ির মত ঝাঁপিয়ে তুলে নিল এবং সেটাকে মানুষ খুনের যুক্তি হিসাবে রোজকার কথাবার্তায় এবং অবশ্যই সোশাল মিডিয়ায় চালিয়ে দিল। আফরাজুলের বিরুদ্ধে লাভ জিহাদের অভিযোগ যে আদৌ প্রমাণ হল না সেকথা ছেড়েই দিলাম। কিন্তু যে দেশে ধর্ষণ করে ড্যাংড্যাং করে মন্ত্রী হওয়া যায় সে দেশে বিবাহ বহির্ভূত সম্পর্কের শাস্তি হচ্ছে মৃত্যুদন্ড, তাও আবার দন্ড দিতে আইন আদালত লাগবে না; রাম, শ্যাম, যদু, শম্ভু যে কেউ দন্ড দিতে পারে — একে যুক্তি বলে স্বীকার করে আকাশ বাতাস বিদীর্ণ করল কারা? রামমোহন, বিদ্যাসাগর, রবীন্দ্রনাথ, শরৎচন্দ্র, নজরুল, বেগম রোকেয়ার দেশের লোকেরা। আবার আফরাজুল মুসলমান অর্থাৎ বাঙালি নয় — এই কথাও দেখলাম লোকে বেশ রেলা নিয়ে বলে বেড়াচ্ছে। অবশ্য মাইকেল মধুসূদন আর কাজী নজরুল বাঙালি নন যারা বলতে পারে তাদের কাছে আফরাজুলের আর কী দাম? অপেক্ষায় ছিলাম কবে কোন ঘটনা নিয়ে বনলতা সেনগিরি শুরু হবে। বিরাট হিন্দু বাঙালি সেই সুযোগটা পেল হেমন্ত রায়ের মৃত্যুতে। কে হত্যা করেছে, কেন হত্যা করেছে কিছু জানতে পারার আগেই তারা যত ধর্মনিরপেক্ষ লোক সবার মা-মাসি উদ্ধার করে বলতে শুরু করল “এই হত্যার প্রতিবাদ হবে না কেন? একে ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে না কেন?”
আচ্ছা প্রতিবাদটা কার বিরুদ্ধে হবে? দুনিয়ার যেখানে যত খুন হচ্ছে নানা কারণে, সবকটারই প্রতিবাদ করতে হবে? সবকটাই নিন্দনীয় বললে মোটের উপর আপত্তি করার কিছু থাকে না কিন্তু সবকটারই নিন্দা করতেই হবে, নয়ত কোনটারই নিন্দা করা চলবে না, একথা যারা বলে তারা যে আসলে এক বিশেষ ধরণের খুনীর সমর্থক — একথা পরিষ্কার করে বলার সময় এসেছে। কী ধরণের খুনী তা নিয়ে যদি আপনার সন্দেহ থেকে থাকে তাহলে একবার কালকের খবরে চোখ রাখুন। রাজস্থানে শম্ভুলালের সমর্থনে আদালত আক্রমণ করে যেটা করা হয়েছে সেটাকে সন্ত্রাসবাদ ছাড়া অন্য কোন নাম দেওয়া যায় না। মাথার তেরঙ্গাটাকে টেনে নামিয়ে তার জায়গায় গেরুয়া পতাকা তোলা হয়েছে। আইসিসের আছে কালো পতাকা, এদের আছে গেরুয়া পতাকা। যে ভারত সরকার বিশ্ববিদ্যালয়ে ২০০ ফুট উঁচু জাতীয় পতাকা লাগাতে চায়, পর্নো ছায়াছবির আগেও জাতীয় সঙ্গীত চালাতে চায় সেই সরকার কিন্তু এ নিয়ে চুপচাপ। অর্ণব গোস্বামী কী বললেন এ নিয়ে? কেউ শুনেছেন?
ও হ্যাঁ, ক্ষতিপূরণের কথা হচ্ছিল। ওটা তো রাজস্থান সরকারেরই দেওয়া উচিৎ ছিল। তাদের রাজ্যে আইনশৃঙ্খলার এমন অবস্থা যে লোকে জানে একটা মুসলমানকে খুন করলে কিচ্ছু এসে যাবে না — এর জন্যেই তো প্রাণ গেল একটা নিরস্ত্র লোকের। এর দায় কোন না কোন সরকারকে তো নিতেই হবে। অতঃপর খুনী গ্রেপ্তার হল কিনা সেটা বড় কথা নয় কারণ অপরাধটা যেভাবে করা হয়েছে তাতে গ্রেপ্তার করার কাজটুকুই তো সরকারের ভাগে পড়ে ছিল। সেটুকু করার জন্যে তো আর বিরাট হিন্দুরা দাবী করতে পারেন না যে সকলে উঠে দাঁড়িয়ে হাততালি দেবে।
রাজস্থান সরকার অবশ্য আফরাজুলের খুনী, তার প্রতি সহানুভূতিশীল লোকেদের দায় নেবেন না সেটাই স্বাভাবিক কারণ মুখ্যমন্ত্রী বসুন্ধরা রাজে জননেত্রী নন, সাংবিধানিক দায়িত্ব পালনে আগ্রহী প্রশাসক নন। উনি উন্মত্ত জনতার নেত্রী। প্রমাণ চাই? গত ১৩ই ডিসেম্বর দ্য টাইমস অফ ইন্ডিয়ায় প্রকাশিত তাঁর সাক্ষাৎকারটা পড়ে নিন। নেত্রীর সোজাসাপ্টা কথা “একটা কাস্টের লোকের ভাবাবেগে যখন আঘাত লেগেছে তখন পদ্মাবতী মুক্তি পাওয়ার দরকারটা কী?” আরো অনেক মণিমুক্তো পাবেন ঐ সাক্ষাৎকারে যা বুঝিয়ে দেয় ক্ষ্যাপা জনতা যা চায় তাই-ই হবে রাজস্থানে। মুখ্যমন্ত্রী নিজেও সেই জনতারই একজন।
যাক সে কথা। এই বীভৎসতা দেখে কিন্তু এক শ্রেণীর বাঙালি যারপরনাই উল্লসিত। বসিরহাটের গন্ডগোলেই যারা ৩৫৬ ইত্যাদির দাবী করে ফেলেছিল তাদের রাজস্থানে আইনের শাসন ভেঙে পড়েছে এমনটা বলতে কিন্তু শোনা যাবে না। বাঙালির মোদীপ্রীতি উত্তরোত্তর বেড়েই চলেছে। নিত্যযাত্রী হওয়ার সুবাদে আজকাল প্রায়ই দেখি বাংলার বাসিন্দা বিহারী, মারোয়াড়িরা মোদীকে গাল পাড়ছেন। অথচ বাঙালিদের কি অচলা ভক্তি!
সক্রেটিসের ছাত্র আর এরিস্টটলের মাস্টারমশাই প্লেটো মনে করতেন গণতন্ত্র একটা ফালতু ব্যাপার কারণ এটা খুব ভাল চললে হয়ে দাঁড়ায় অভিজাততন্ত্র (plutocracy) আর খুব খারাপ চললে ক্ষ্যাপা জনতাতন্ত্র (mobocracy)। তা ভারতীয় গণতন্ত্র এখন একাধারে plutocracy এবং mobocracy। একদিকে দেশের সরকার থেকে ফুটবল পর্যন্ত সবকিছু চালাচ্ছে হাতেগোনা কয়েকজন পয়সাওয়ালা লোক, যাদের আরো বড়লোক করার জন্যে আগামীদিনে আমার, আপনার সাদা পথে অর্জিত টাকাও কেড়ে নেওয়ার আইন তৈরি হচ্ছে; অন্যদিকে আপনি কার পুজো করবেন, কী খাবেন, কী পরবেন, কী দেখবেন, কাকে বিয়ে করবেন, কার সাথে শোবেন সেটা ঠিক করে দেবে পাগলা কুকুরের চেয়েও বেশি বিপজ্জনক জনতা আর সরকার সেই জনতারই পক্ষ নিয়ে কখনো আপনার লাঞ্ছনা দেখে চুপটি করে থাকবে, আর কখনো আইনের অপব্যবহার করে বা নতুন আইন বানিয়ে আপনার অত্যাচার বাড়িয়ে তুলবে। যদি সংখ্যালঘু হন তো আপনি বাঁচবেন না মরবেন সেটাও ঠিক করবে ঐ জনতাই। সরকার বলবে “জনতাকে ক্ষেপানো কেন বাপু? জনতা যেমনটি চায় তেমনটি করে থাকতে পারলে থাক, নইলে পাকিস্তান চলে যাও।”
তা বাঙালি ঐ plutocracy র দিকটায় প্রবেশাধিকার পাচ্ছে না কারণ বাঙালির অভিজাত নেই গুজরাতি আর মারোয়াড়িদের মত, তাই mobocracy র দিকটায় সমানে সমানে লড়ে যাচ্ছে। ফাইট, মণি ফাইট।

সাম্প্রদায়িক, অসাম্প্রদায়িক

৬ই ডিসেম্বর ১৯৯২ এবং তারপরের কয়েকদিন এখনো ছবির মত মনে আছে। খুব চেনা কোন কোন মানুষের ভেতরের পশুকে সেই প্রথম দেখতে পেয়েছিলাম। আমার বয়স তখন দশ। বড় হওয়ার গতিটা ঐ বয়সে বাড়তে শুরু করে। বলা যায় ৯২-৯৩ সালের ঐ দিনগুলো সেই গতিটাকে কিছুটা বাড়িয়ে দিয়েছিল।
এর প্রায় ছবছর পরে, ২৬শে জুলাই, ১৯৯৮ আমি রামকৃষ্ণ মিশন বিদ্যামন্দিরে ভর্তি হই। আবাসিক কলেজ হওয়াতে বাড়ি ছেড়ে নিজ দায়িত্বে থাকার সেই শুরু। তার আগে ধর্মের আমার জীবনে কোন দৈনন্দিন ভূমিকা ছিল না। বাবা নাস্তিক, মা আস্তিক হলেও নিয়মিত পূজার্চনার পাট ছিল না বাড়িতে। রামকৃষ্ণ মিশনের ধর্মীয় পরিবেশ যে আমার বিশেষ ভাল লাগত না তা বলাই বাহুল্য। কিন্তু দেদার আড্ডা দেওয়ার সুযোগ সে অস্বস্তি ভুলিয়ে দিত। কিছুটা সেইজন্যেই উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করার পরে কলেজের তিনবছরও দিব্যি ওখানে কাটিয়ে দিয়েছি।
ঘটনাচক্রে বিদ্যামন্দিরে আমার পাঁচ বছর বিজেপি নেতৃত্বাধীন প্রথম এনডিএ সরকারের পাঁচ বছরের মধ্যেই পড়ে। সব ব্যাপারেই ধর্মের আলোচনার কেন্দ্রে চলে আসা তখন শুরু হয়ে গেছে। বন্ধুবান্ধবদের মধ্যেও ধর্ম নিয়ে, ধর্মের ঝান্ডাধরা রাজনীতি নিয়ে প্রচণ্ড তর্কবিতর্ক হত। অবশ্য তখন মতান্তর মানেই মনান্তর ছিল না। যা-ই হোক আমার এক সহপাঠী ছিল যে মুসলমানদের দুচক্ষে দেখতে পারত না। সে বাংলাদেশ থেকে তাড়া খেয়ে পালিয়ে আসা হিন্দু। তাকে আমি এবং আরো কয়েকজন কিছুতেই বুঝিয়ে উঠতে পারতাম না যে তার মত অভিজ্ঞতা অনেক মুসলমানেরও বিভিন্ন সময়ে হয়েছে। তার মানে যেমন সব হিন্দু খুনে নয়, তেমনি সব মুসলমানও তার পরিবারের উপর অত্যাচার করা লোকেদের মত নয়। সে কিছুতেই মানত না। সে ঘুরেফিরেই বলত “ওরা ঐরকমই”। ২০০৩ এ কলেজ ছাড়ার পর থেকে আর তার সাথে যোগাযোগ নেই।
২০১০ সালের এক সকাল। নাইট ডিউটি করে এসে আমার তখন মাঝরাত। হঠাৎ মোবাইল বেজে উঠল। আমার পেশায় এরকম হলে প্রথমেই লোকে ভাবে বসের ফোন। চাকরিটা গেছে হয়ত। আমি সেকথা ভেবেই ধড়মড়িয়ে উঠে ফোনটা ধরেছি। দেখি অজানা একটা নম্বর। বসের ফোন নয় যখন তখন কেটে দেব ভেবেছিলাম। তারপর মনে হল মিটিয়ে দেওয়াই ভাল, নইলে আবার করতে পারে। কথা বলতে গিয়ে দেখি এ আমার সেই বন্ধু।
আমার বন্ধু প্রতিবাদ করতে গিয়ে গালাগালি খেয়েছে ছাত্রছাত্রীদের সামনে। আমাদেরই কোন সহপাঠীর থেকে। সে তখন এক প্রত্যন্ত অঞ্চলে মুসলমান প্রধান এলাকার গ্রামের স্কুলের শিক্ষক। চাকরিটা নিয়েছিল কলেজের চাকরি পাওয়া পর্যন্ত নমো নমো করে করবে বলে। কিন্তু ছাত্রছাত্রীরা ওকে এমনভাবে ভালবাসায় বেঁধেছে যে ও পড়েছে দোটানায়। আমাকে ফোন করার কারণ ঐ স্কুলের পরিচালন সমিতির দুর্নীতি। স্কুলের উন্নয়নের জন্য আসা সরকারী টাকা অন্য খাতে খরচা করা হচ্ছে। প্রধানশিক্ষক ভাল মানুষ, পণ্ডিত। কিন্তু ঐ গ্রামেরই বাসিন্দা। ফলে জলে থেকে কুমীরের সাথে বিবাদ করতে ভয় পান। সেই সুযোগে স্কুলের উন্নতি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। শুনেছে আমি সাংবাদিক। তাই ফোন করেছে। যদি কাগজে এই দুর্নীতির খবর ছাপা যায়, দোষীদের শাস্তি হয়।
আমি তাকে বোঝালাম যে বহু গ্রামের স্কুলেই এই জিনিস ঘটে। ফলে বেশ বড় অংকের আর্থিক দুর্নীতি না হলে কাগজ ছাপতে রাজি হবে না। যদি হয়ও, শাস্তি দেওয়া তো কাগজের হাতে নয়। প্রশাসনিক নড়াচড়া না হলে দোষীদের রোষ এসে পড়বে ওরই উপরে। তাতে ওর ভীষণ বিপদ ঘটতে পারে। তাতে সে আমায় বলল “ঠিকই বলেছিস। কো এড স্কুল তো। কখন কি বদনাম দিয়ে দেবে! কিন্তু দুঃখটা কী জানিস তো? এই স্কুলের ছেলেমেয়েরা কি গরীব তুই ভাবতে পারবি না। এত গরীব আমি তুই চোখে দেখিনি। তাদের জন্য স্কুল। কত কষ্ট করে একটু লেখাপড়া করে এরা। অধিকাংশ মুসলমান আর কিছু আদিবাসী। এদের জন্য সরকারের স্কিম আছে। সেই টাকা ছোটলোকগুলো মেরে নিচ্ছে! আমার আর কি? নেট পাশ করে গেছি, বেশি পেছনে লাগলে চলে যাব। কিন্তু এই ছেলেমেয়েগুলোর কী হবে বল তো, প্রতীক?” আমি পরামর্শ দিলাম গোপনে ডি আই প্রমুখের সাথে যোগাযোগ করতে। বন্ধু বারবার বলে গেল ছেলেমেয়েগুলো কত কষ্ট করে, ঐ গ্রামের লোককে কি প্রচণ্ড পরিশ্রম করে বেঁচে থাকতে হয়। গ্রামের সরল সোজা মানুষের উপর মাতব্বররা কিভাবে ছড়ি ঘোরায় সেকথাও বলল। কিন্তু একবারও বলল না “মুসলমান তো। ওরা ঐরকমই।”
বন্ধুটি ধর্মান্ধ — এই ধারণা নিয়েই কলেজ ছেড়েছিলাম। সেদিন ভুল প্রমাণিত হলাম। সেই আনন্দে আমার সেই সকালে আর ঘুম এলো না