সীতারামায়ণ

“মিত্রোঁ, আপনারা দেখুন, আমি দলিত বাবা-মার চা ওয়ালা ছেলে, আপনাদের আশীর্বাদে ক্ষমতায় এসেছি। আমাকে সরানোর জন্যে সবাই একজোট হয়েছে। এদের কোন নীতি নেই, কোন আদর্শ নেই, শুধু একটাই উদ্দেশ্য — মোদীকে হারানো। কারণ মোদী গরীব মানুষের জন্যে কাজ করে, কারণ মোদীর আমলে হিন্দুদের জাগরণ হয়েছে” ইত্যাদি

মার্কসবাদ মানে কী, সীতারাম ইয়েচুরি যা বলছেন সেটাই কিনা, প্রকাশ কারাত ঠিক না ভুল — এসব তত্ত্বকথা না হয় থাক। তত্ত্ব নিয়ে আলোচনা করার বৈদগ্ধ্য আমার নেই, যতদূর জানি বেশিরভাগ লোকেরই আমার মতই অবস্থা। অতএব ওসব ভুলে গিয়ে একটা কান্ডজ্ঞান সংক্রান্ত প্রশ্ন করি। কান্ডজ্ঞান ব্যাপারটা সংসদীয় রাজনীতিতে প্রায়শই গাণিতিক। অতএব প্রশ্নটাকে অঙ্কের প্রশ্নও বলা যায়। প্রশ্নটা এই — যে অঙ্কটা একবার ভুল বলে প্রমাণিত হয়েছে সেটাই আবার করতে যাওয়া বুদ্ধিমানের কাজ কিনা।

পশ্চিমবঙ্গে ২০১৬ বিধানসভা নির্বাচনে বামফ্রন্ট আর কংগ্রেসের জোট নিদারুণভাবে প্রত্যাখ্যাত হয়েছিল। আসন সংখ্যাটা যেসব সিপিএম কর্মীর মনে আছে তাঁরা নিশ্চয় মানেন একা লড়লে ৩৪ বছরের শাসন বা অপশাসন সত্ত্বেও এত খারাপ অবস্থা হত না। অর্থাৎ ইয়েচুরি, কারাত, বেঙ্গল লাইন, কেরালা লাইন যা-ই হোক না কেন হাতে কাস্তে হাতুড়ি উঠে আসা ভোটাররা মোটেই পছন্দ করেননি। সীতারামের একমাথা চুল বলেই তিনি আবার বেলতলায় যাবেন এটা কী ধরণের কান্ডজ্ঞান ভগবান কিম্বা মার্কস কেউই জানেন না বোধহয়।

আজকের টাইমস অফ ইন্ডিয়া পড়ে বুঝলাম ভদ্রলোকের আবার পার্টির উপর অভিমান হয়েছে। “আমায় প্রো কংগ্রেস বললে আমিও প্রো বিজেপি বলতে পারি” জাতীয় ছেলেমানুষি কথাবার্তা বলেছেন ধেড়ে সাধারণ সম্পাদক। সে বলুন গে। উনি বুঝবেন আর ওঁর পার্টি বুঝবে। কিন্তু উনি মার্কসবাদের মানে যা বলেছেন সেটা মেনে নিলেও যে কংগ্রেসের সাথে জোট সমর্থনযোগ্য হচ্ছে না! উনি বলেছেন যে বদলাতে পারে না সে কমিউনিস্ট নয়। মেনে নেওয়া গেল। তাহলে উনি নিজে কংগ্রেসের সাথে জোটের চূড়ান্ত ব্যর্থতা দেখার পরেও বদলাচ্ছেন না কেন?

ক্ষমতা থেকে বিজেপিকে তাড়ানো যে আশু কর্তব্য তা নিয়ে শুধু সিপিএম বা বামপন্থী কেন, বিরোধী রাজনৈতিক দল বা দলীয় রাজনীতির বাইরে থাকা নাগরিকদের কারোরই দ্বিধা আছে বলে মনে হয় না। সীতারাম নিজেও বলেছেন মতপার্থক্য শুধু কিভাবে সেটা নিয়ে। তাহলে কেন মনে হচ্ছে যে বিরোধী ঐক্যটা নির্বাচনী জোট করেই হতে হবে? ভোটের পরে পরিস্থিতি অনুযায়ী তো সিদ্ধান্ত নেওয়াই যায়। সঙ্ঘ পরিবারের বিরুদ্ধে লড়াই তো নির্বাচন দিয়েই শেষ হবে না।

তেলে আর জলে মিশ খাওয়াতে গেলে যে যাকে হারাতে চাইছি তারই সুবিধা হয় সেই শিক্ষাটা ২০১৬ র ফল থেকে নেওয়া কি এতই শক্ত? আমরা কেউ কি ভুলে গেছি বিধানসভা নির্বাচনের প্রচারপর্বে মমতা কী বলে গেলেন সমানে? কংগ্রেস সমর্থকদের বললেন “দেখুন, বরাবর বলেছি কংগ্রেস সিপিএমের বি টিম। দেখলেন তো? ওরা সাঁইবাড়ির শহীদদের কেমন ভুলে গেল দেখুন।” আর বাম সমর্থকদের ছুঁয়ে গেল তাঁর টিটকিরি “বাহাত্তরের সন্ত্রাস ভুলে গেলেন কমরেড?” এর ফলে যেটা হল সেটা হচ্ছে গোটা নির্বাচনে মুখ্যমন্ত্রীকে পাঁচ বছর কী কাজ করলেন তার কোন হিসাবই দিতে হল না। বিরোধীরা নিজেদের বিরুদ্ধে অনৈতিকতার অভিযোগ সামাল দিতেই ব্যস্ত থাকলেন, সরকারকে প্রশ্নটা করবেন কখন?

এখন থেকেই বলে দেওয়া যায়, রামধনু জোট হলে নরেন্দ্র মোদীর কাজটাও একইরকম সহজ হয়ে যাবে। অর্থনীতির বেহাল অবস্থার জন্যে জবাবদিহি করতে হবে না, সুবিধা পাইয়ে দেওয়ার পুঁজিবাদের জন্যে কৈফিয়ত দিতে হবে না, কর্নিসেনাদের তোল্লাই দেওয়া, মুসলমান, দলিতদের উপর অত্যাচারের প্রশ্ন উঠবেই না। তিনি শুধু কেঁদেকেটে মিটিঙে মিটিঙে সেই ফাটা রেকর্ড বাজাবেন “মিত্রোঁ, আপনারা দেখুন, আমি দলিত বাবা-মার চা ওয়ালা ছেলে, আপনাদের আশীর্বাদে ক্ষমতায় এসেছি। আমাকে সরানোর জন্যে সবাই একজোট হয়েছে। এদের কোন নীতি নেই, কোন আদর্শ নেই, শুধু একটাই উদ্দেশ্য — মোদীকে হারানো। কারণ মোদী গরীব মানুষের জন্যে কাজ করে, কারণ মোদীর আমলে হিন্দুদের জাগরণ হয়েছে” ইত্যাদি। এর সাথে মোদীর ইশারায় সাঙ্গোপাঙ্গদের তৈরি কিছু বাইনারি তো থাকবেই, সেগুলো তো জোট হলেও হবে, না হলেও হবে। অর্থাৎ বিরোধীরা যথারীতি নিজেদের পিঠ বাঁচাতেই ব্যস্ত থাকবেন। বরং মোদীর পক্ষে তুলনায় শক্ত হবে যে রাজ্যে যে শক্তিশালী সেখানে তার মোকাবিলা করা। কারণ ২০১৪ র হাওয়া আর নেই। সব প্রশ্নপত্রের একই উত্তর দিয়ে তখন ড্যাংড্যাং করে পাশ করা গেছিল, এবারে অত সোজা হবে না। অতএব আমি যদি মোদী হতাম, আমি চাইতাম শুধু কংগ্রেস-বাম নয়, যত বিরোধী দল আছে সব্বাই মিলে একটা জোট হোক। তাহলে বলতে পারব সারদা, নারদা, ভাদরা, কাস্তে, হাতুড়ি সবাই এক। এরা এক হয়ে দেশের মানুষকে লুটতে চায়। এটা এন্টি ন্যাশনালদের জোট। অর্ণব গোস্বামীকে লেলিয়ে দেব, সে জিওর্জিও আরমানির স্যুট আর জিমি চুর জুতো পরে বলবে “এটা দেশের গরীব মানুষের ক্ষমতায়নের বিরুদ্ধে ক্ষমতায় ফিরতে হাত নিশপিশ করা লুটিয়েন্স এলিট আর জেএনইউ এর এন্টি ন্যাশনাল বামেদের জোট। এতদিন ইউনিভার্সিটি ক্যাম্পাসে ছিল, এবার ভোটে হয়েছে।” আহা! ভারী মজা হবে।

অনেক বাজে বকলাম। একটা মজার স্মৃতি দিয়ে শেষ করি।

জ্যোতি বসুর প্রধানমন্ত্রী হওয়া নিয়ে যখন তাঁর পার্টিতে বিতর্ক হয় তখন সীতারাম ইয়েচুরি ছিলেন সরকারে না যাওয়ার পক্ষে। সেবারে তাঁরাই জয়যুক্ত হয়েছিলেন। তারপর আজকালে একটা ছবি বেরিয়েছিল। ছবি মানে এখন যাকে মিম (meme) বলা হয়। ছবিতে কার্ল মার্কসের মূর্তির সামনে বসে সীতারাম বোঝাচ্ছেন “মার্কসবাদ মানে হল…”। আর মার্কসের মূর্তিটা বলছে “এটা আবার কে?”

ধর্মনিরপেক্ষতার ধাঁধা

শুধু দক্ষিণপন্থীরা নয়, মধ্যপন্থী, এমনকি অনেক বামপন্থীও বলে থাকেন “ভারত আবার ধর্মনিরপেক্ষ কোথায়? ধর্মনিরপেক্ষ মানে কোন ধর্মকেই সরকার পাত্তা দেবে না। এখানে কি সেটা হয়? এখানে তো সবেতেই ধর্ম”

আগামী বছর লালকৃষ্ণ আদবানির রথযাত্রার ৩০ বছর পূর্ণ হবে। এই তিরিশ বছরে দুটো শব্দবন্ধ আদবানি এবং তাঁর সাঙ্গোপাঙ্গদের কল্যাণে দারুণ জনপ্রিয় হয়েছে — মেকি ধর্মনিরপেক্ষতা (pseduo secularism) আর প্রকৃত ধর্মনিরপেক্ষতা (true secularism)। নরেন্দ্র মোদীর সরকারের হজযাত্রায় ভর্তুকি তুলে দেওয়ার সূত্রে ঐদুটো শব্দবন্ধ আবার বেশি বেশি করে শোনা যাচ্ছে। মোটের উপর বিজেপি এবং তার সমর্থকরা যা বলছেন তার সার এই যে ধর্মনিরপেক্ষ দেশে একটা বিশেষ ধর্মের লোক তীর্থ করতে যাবে বলে সরকার পয়সা খরচা করবে কেন? এগুলো হচ্ছে মেকি ধর্মনিরপেক্ষতা। এই যে নরেন্দ্রবাবু ভর্তুকি তুলে দিলেন — এইটেই হচ্ছে প্রকৃত ধর্মনিরপেক্ষতা। কথাটা শুনতে ভারী ভাল এবং কথাটা সত্যিও — যতক্ষণ না আপনি এটা জানছেন যে মানস সরোবরে তীর্থ করতে যাওয়ার জন্যে ভারত সরকার কত হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দেয়। এছাড়াও কোন রাজ্যের সরকার পাকিস্তানের নানকানা সাহিবে তীর্থ করতে যাওয়ার জন্যে ভর্তুকি দেয়, কোন রাজ্যের সরকার কুম্ভমেলার আয়োজন করে। এবং সেসব মিলিয়ে যা খরচা হয় তা হজযাত্রার ভর্তুকির চেয়ে অনেক অনেক বেশি। এই দেখুন

https://www.outlookindia.com/website/amp/rs-200-cr-haj-subsidy-gone-but-what-about-rs-2500-crore-set-aside-by-up-alone-fo/306961?__twitter_impression=true

পার্থক্যটা আরো কুশ্রী হয়ে দাঁড়ায় হজে যাতায়াতের খরচ হিসাব করলে। হিসাব করলে ফল যা বেরোয় তার মানে দাঁড়ায় এই যে ভর্তুকিটা তীর্থযাত্রীরা পায় না, পায় এয়ার ইন্ডিয়া — হজ করতে যেতে হলে যাদের বিমানে যাওয়া বাধ্যতামূলক। গোটা আষ্টেক অনুচ্ছেদ পড়ে দেখুন

https://thewire.in/214513/haj-subsidy-cancelled-air-india/

তা সত্ত্বেও হজের ভর্তুকি তুলে দেওয়ার সিদ্ধান্তের পর এখন অব্দি কোন ইসলাম ধর্মাবলম্বী বা কোন মুসলিম সংগঠনকে হাঁই হাঁই করে উঠতে দেখা গেল না যে “এটা আমাদের অধিকার, এটা দিতেই হবে।” বস্তুত সেই প্রথম এন ডি এ সরকারের আমল থেকে হজযাত্রীদের ভর্তুকি দেওয়া নিয়ে “প্রকৃত ধর্মনিরপেক্ষ” পার্টি এবং তাদের প্রতি সহানুভূতিশীল লোকেদের চিৎকার চেঁচামেচি শুনছি। এই বছরগুলোতে এ নিয়ে বন্ধুবান্ধব, পরিচিত, অপরিচিত যত ইসলাম ধর্মাবলম্বীর সাথে কথা হয়েছে, সকলেই বলেছে যে এই ভর্তুকি অপ্রয়োজনীয়। ইসলামেও নাকি তাদেরই হজযাত্রা করতে বলা হয়েছে যাদের সামর্থ্য আছে। সুতরাং সরকারী আনুকূল্যে তীর্থ করতে যাওয়ার কোন যুক্তি নেই।
অথচ দেখুন, হজের ভর্তুকির সঙ্গে সঙ্গে হিন্দু তীর্থযাত্রীদের ভর্তুকি তুলে দেওয়ার কথা যেইমাত্র বলা হয়েছে অমনি চিৎকার শুরু হয়ে গেছে “হিন্দু খতরে মে হ্যায়”। কথাটা যে বলবে সে-ই যে হিন্দুদের শত্রু এটা যেন স্বতঃসিদ্ধ। এই চিৎকারে সবচেয়ে জোরালো গলাগুলো হিন্দুত্ববাদী মোদীর সাঙ্গোপাঙ্গদের। এটাকে, অতএব, প্রকৃত ধর্মনিরপেক্ষতা বলা যাচ্ছে না।
কিন্তু মূল প্রশ্নটা এর চেয়ে অনেক বড় এবং সেই প্রশ্নটার উত্তর নিয়ে সর্বশক্তি দিয়ে লড়াই করার দরকার আছে। প্রশ্নটা এই যে ধর্মনিরপেক্ষতা মানে কী? শুধু দক্ষিণপন্থীরা নয়, মধ্যপন্থী, এমনকি অনেক বামপন্থীও বলে থাকেন “ভারত আবার ধর্মনিরপেক্ষ কোথায়? ধর্মনিরপেক্ষ মানে কোন ধর্মকেই সরকার পাত্তা দেবে না। এখানে কি সেটা হয়? এখানে তো সবেতেই ধর্ম।”
কথাটা উড়িয়ে দেওয়ার নয়। ধর্মনিরপেক্ষতার ধারণাটা এসেছে ইউরোপের secular ধারণা থেকে। এবং secular রাজনৈতিক ব্যবস্থার মানে এমন একটা ব্যবস্থা যাতে চার্চের কোন ভূমিকা থাকবে না। চার্চ, মানে ধর্মযাজকদের, রাষ্ট্রের ব্যাপারে কোন কথাই বলতে দেওয়া হবে না। ইউরোপে ব্যাপারটা এভাবেই ঘটেছিল কারণ মধ্যযুগে ঐ মহাদেশে চার্চ দণ্ডমুণ্ডের কর্তা হয়ে বসেছিল, রাজার সমান বা কোন কোন ক্ষেত্রে রাজার চেয়েও ক্ষমতাশালী হয়ে উঠে যারপরনাই অত্যাচার করত সাধারণ মানুষের উপর। নবজাগরণ চার্চের সেই ক্ষমতার বিরুদ্ধে একটা আন্দোলনও বটে। নবজাগরণ সমাজকে ধর্মকেন্দ্রীক (theocentric) থেকে করল মানবকেন্দ্রীক (anthropocentric)। সেখান থেকেই কালে কালে এল secular রাষ্ট্রব্যবস্থার ধারণা। তা চার্চনিরপেক্ষ শাসনব্যবস্থা যদি কায়েম করতে হয় তাহলে স্বভাবতই রাষ্ট্রকেও ধর্ম থেকে দূরে থাকতে হবে। সেটাই যথার্থ ধর্মনিরপেক্ষতা।
কিন্তু ধর্মনিরপেক্ষতার যে এই একটাই চেহারা হতে পারে, একথাটা কে বলে দিল? অন্তত ভারতবর্ষে শাসকের কাছ থেকে এবং সাধারণ মানুষের কাছ থেকে (যেহেতু গণতন্ত্রে শাসক আকাশ থেকে পড়েন না, সাধারণ মানুষের মধ্যে থেকেই উঠে আসেন) ওরকম ধর্মনিরপেক্ষতা আশা করা নির্বুদ্ধিতা। কেউ ওরকম হলে নিশ্চয়ই ভাল কথা, যেমন প্রথম প্রধানমন্ত্রী জহরলাল নেহরু নাস্তিক ছিলেন। কিন্তু বেশিরভাগ মানুষ আর বেশিরভাগ শাসক যে তেমন হবেন না সেটাই এদেশে স্বাভাবিক। কেন, সেটা ভারতের ইতিহাস যে একটুও বুঝেছে তাকে বুঝিয়ে বলতে হয় না। বিবেকানন্দ তো বলেইছিলেন, সব জাতির একটা করে মূলমন্ত্র থাকে, ফরাসীদের যেমন liberte, egalite, fraternite; ভারতীয়দের মূলমন্ত্র তেমনি ধর্ম। কোন দেশের মূলমন্ত্র ধর্ম হওয়া মোটেই ভাল কথা নয়, হলে কী ধরণের পশ্চাদপসরণ হতে পারে তার বহু নিদর্শন আমরা পাচ্ছি এখন, অন্য অনেক দেশের উদাহরণ থেকেও বোঝা যায়। তবুও এটাই যে ভারতের বাস্তবতা সেটা অস্বীকার করা মূর্খামি। আমাদের রাষ্ট্রপিতারা (founding fathers অর্থে। আমি গান্ধীভক্ত নই, তাই একা মহাত্মা গান্ধীই রাষ্ট্রপিতা এমনটা মনে করি না। তবে তিনিও একজন) ওরকম মূর্খ ছিলেন না। ধর্মকে বাদ দিয়ে এই দেশ চালানো যাবে না সেটা তাঁরা ভালই বুঝতেন কিন্তু ধর্মের উপর ভর দিয়ে তো আর একটা বিংশ শতকের সভ্য দেশ গড়ে উঠতে পারে না। তাছাড়া কোন ধর্মের উপর ভর দেওয়া হবে? এ তো আর পঞ্চদশ, ষোড়শ শতাব্দীর ইউরোপ নয় যে খ্রীষ্টান ধর্মটাকে সামলে দিলেই হল। এখানে অজস্র ধর্ম, একই ধর্মের মধ্যেও অজস্র মত (ইংরিজিতে যাকে sect বলে আর কি)। সেখানে কোন একটাকে প্রাধান্য দেওয়া মানেই বাকি সকলকে জোর করে সেই ধর্মের অধীন করে দেওয়া।
অতিচালাক কয়েকজন সঙ্ঘ পরিবারের নেতা বলতেন এবং এখনো বলেন “হিন্দুরা এদেশে সংখ্যাগরিষ্ঠ, অতএব তাদেরই প্রাধান্য দেওয়া উচিৎ। অন্যদের তো কেউ তাড়িয়ে দিতে বলছে না, তারাও থাকবে এদেশে।” আপনি যদি সংখ্যাগরিষ্ঠ সম্প্রদায়ের মানুষ হন তাহলে কথাটা আপনার দিব্য পছন্দ হবে। কিন্তু এভাবে যে একটা সুস্থ, স্বাভাবিক দেশ তৈরি হয় না তার জলজ্যান্ত প্রমাণ পাকিস্তান। সঙ্ঘ পরিবারের উপর্যুক্ত তত্ত্বটার মতই পাকিস্তানের সংখ্যালঘুদের অধিকার সম্পর্কে অনেক মিষ্টি মিষ্টি কথা মহম্মদ আলি জিন্নাও বলে গেছেন। তাতে আদপে কোন লাভ হয়নি ওদেশের হিন্দুদের। এদেশের “প্রকৃত ধর্মনিরপেক্ষ” লোকেরাই তো উঠতে বসতে শোনান ১৯৪৭ এর পর থেকে ভারতে কিভাবে সংখ্যালঘুরা বেড়েছে আর পাকিস্তানে কমেছে। মুজিবহত্যা পরবর্তী বাংলাদেশ নিয়েও একই কথা প্রযোজ্য। ভারতে যদি হিন্দুধর্মকে প্রাধান্য দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিতেন রাষ্ট্রপিতারা তাহলে ভারতও যে হিন্দু পাকিস্তান হত সেটা বুঝতে বৈদিক বুদ্ধির প্রয়োজন হয় কি? তাহলে বিকল্প কী ছিল? একটাই। সব ধর্মেরই পৃষ্ঠপোষকতা করা। বাম, দক্ষিণ সকলেরই বোঝা উচিৎ ইউরোপীয় ঢঙে রাষ্ট্র যদি সব ধর্ম থেকে সমদূরত্বের নীতি নিত তাহলে এখানে যা হত সেটা হল মাৎস্যন্যায়। যে সংখ্যালঘু তাকে নিজের ধর্মাচরণ করতে হত লুকিয়ে আর যে সংখ্যাগুরু সে আইনগতভাবে না হলেও, গায়ের জোরে নিজের ধর্ম চাপিয়ে দিত সংখ্যালঘুদের উপর। না মানলে মারধোর খেতে হত, মরতে হত। ঠিক যেভাবে সরকারী নিষ্ক্রিয়তার সুযোগে এখন পশ্চিমবঙ্গেও দিব্যি অস্ত্রশিক্ষা শিবির চালাচ্ছে আর এস এস।
কেউ কেউ বলবেন, আচ্ছা সে না হয় দেশের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের সময় হল। গান্ধী তো খুন হলেন ১৯৪৮ এ, প্যাটেল চলে গেলেন ১৯৫০ এ, আম্বেদকর ১৯৫৬ এ আর নেহরু ১৯৬৪ তে। কিন্তু পরবর্তী শাসকেরা কী করলেন? কী করলেন তারপরের প্রধানমন্ত্রীরা, মুখ্যমন্ত্রীরা? এবং অনিবার্যভাবেই দক্ষিণপন্থীরা সেই বোকা বোকা কথাটা আবার বলবেন “Secularism শব্দটা তো সংবিধানের প্রস্তাবনায় ছিল না। ইন্দিরা কেন ঢোকালেন?” প্রশ্নকর্তারা ভান করেন যেন ধর্মীয় স্বাধীনতার অধিকার তার আগে থেকেই ২৫-২৮ নম্বর অনুচ্ছেদে ছিল না, ইন্দিরা চক্রান্ত করে সেটাও ঢুকিয়েছিলেন। তাহলে secularism শব্দটায় আপত্তিটা কিসের? আপনারা তো নাকি “প্রকৃত ধর্মনিরপেক্ষ”। তাহলে তো ধর্মনিরপেক্ষ শব্দটা সংবিধানে ঢোকানোর জন্যে ইন্দিরার আপনাদের ধন্যবাদার্হ হওয়া কথা!
এই কথোপকথন মুখোমুখি বসে চালালে এরপরেই টিভি বিতর্কের মত প্রবল চিৎকার চেঁচামেচি লেগে যাবে, সীমান্তে কত সৈনিক মরছে সেসব নিয়ে আলোচনা শুরু হয়ে যাবে। সুতরাং এবার ইতিহাস, সংবিধানের মত যা কেউ পড়ার দরকার মনে করে না এমন বিষয় বাদ দিয়ে একেবারে গোদা ব্যাপারে চলে আসা যাক। ভারত যে আসলে ধর্মনিরপেক্ষ নয় তা প্রমাণ করতে যে বহুল প্রচলিত উদাহরণগুলো দেওয়া হয় তার তেমন একটা নিয়ে কথা বলা যাক। তাহলে সরকারগুলোর পক্ষে কতটা কী করা সম্ভব সেটাও পরিষ্কার হবে।
ভারত ধর্মনিরপেক্ষ হলে মুসলমানরা রাস্তায় বসে নমাজ পড়ে কেন? এসব বন্ধ হওয়া উচিৎ
ঠিক কথা। রাস্তা আটকে ধর্মাচরণ কোন কাজের কথা নয়। মুসলমানদের রাস্তায় নমাজ পড়া বন্ধ হওয়া উচিৎ, রাস্তা আটকে পুজো প্যান্ডেল বন্ধ হওয়া উচিৎ, তাজিয়া বন্ধ হওয়া উচিৎ, চারদিনের পুজোকে দশদিন অব্দি টেনে নিয়ে গিয়ে রাস্তাজুড়ে কানফাটানো ব্যান্ড পার্টি নিয়ে ভাসান বন্ধ হওয়া উচিৎ, রাষ্ট্রের পৃষ্ঠপোষকতায় কুম্ভমেলা থেকে শুরু করে দুর্গা ভাসানোর কার্নিভাল অব্দি সবকিছু বন্ধ হওয়া উচিৎ। স্কুলে সরস্বতীপুজো এবং নবীদিবস — দুটোই বন্ধ হওয়া উচিৎ। শুধু তাই নয়, রাস্তা জুড়ে, ট্রেনের কামরা জুড়ে গাঁজা খেতে খেতে জোয়ান লোকেদের তীর্থ করতে যাওয়া বন্ধ হওয়া উচিৎ।
আমাদের বাংলায় তারকেশ্বরের মাথায় শ্রাবণ মাসে জল ঢালতে যায় যারা তারা অন্য সব যাত্রীরই মাথা কিনে নেয়। আপনি বয়স্ক হোন, অসুস্থ হোন, সাথে কোলের শিশু থাকুক বা অন্তঃসত্ত্বা মহিলা থাকুক, ওঁরা আপনাকে দয়া করে বসার জায়গা না-ও দিতে পারেন। ওখানে নিজের হিন্দু পরিচয় দিয়ে কোন খাতির পাবেন না। উপরন্তু দুর্গন্ধ এবং অনবরত ঢাকঢোলের আওয়াজে লিলুয়া থেকে হাওড়া যেতে মনে হবে সশরীরে নরকযাত্রা করছেন। এবং আর যাই করুন, ভুলেও শ্রাবণ মাসের শনিবারে শের শাহের করা গ্র‍্যাণ্ড ট্রাঙ্ক রোড ধরে গাড়িতে চেপে কোথাও যেতে যাবেন না। বাবার ভক্তবৃন্দ গোটা রাস্তার দখল নিয়ে নেন। রাস্তার ঠিক মাঝখানে বসে বিশ্রামও নিতে পারেন ইচ্ছা হলে। আর শব্দদূষণ যা হয় সেটাও বন্ধ হওয়া উচিৎ, আজানের মাইকের মতই। কিছু দিল্লীবাসীর কাছে শুনছিলাম কাঁওয়ারিয়ারা যেসব এলাকা দিয়ে হরিদ্বার যায় সেখানকার লোকেদের অভিজ্ঞতাও নাকি কতকটা এরকমই। তা যেসব রাজ্যে “মেকি ধর্মনিরপেক্ষ” সরকার আছে তাদের কথা বাদই দিলাম। যেখানে “প্রকৃত ধর্মনিরপেক্ষ” সরকার সেখানে এগুলো বন্ধ করে দেখান দেখি।
পারবেন না। কারণ সবচেয়ে উদার হিন্দুটিও গর্জে উঠে বলবে “আমার ধর্মীয় স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করা হচ্ছে।” তা যে সংখ্যায় কম তাকে আইন দেখাব, ধর্মনিরপেক্ষতা দেখাব আর যে সংখ্যাগুরু তার ধর্মাচরণ যেমন ইচ্ছা চলবে সেটা আর যা-ই হোক, গণতন্ত্র নয়, ধর্মনিরপেক্ষতা তো নয়ই।
তাই ভারতের ধর্মনিরপেক্ষতা কখনোই ইউরোপের মডেল অনুসরণ করে চলতে পারে না। ভারতে সরকারকে ধর্মগুলোর মধ্যে সমতা বজায় রাখার কাজে সক্রিয় হতেই হবে। একদেশদর্শিতাই সাম্প্রদায়িক, সমদর্শিতাই ধর্মনিরপেক্ষতা এদেশে।
সেই কারণেই সরকারের প্রধানের নিজের ধর্মীয় পরিচয়ের প্রদর্শনী সাম্প্রদায়িক। কারণ ব্যক্তি হিসাবে তিনি যা-ই হোন, তিনি শুধু নিজের ধর্মের মানুষের প্রধান নন, সব ধর্মের মানুষের প্রধান। সেইজন্যেই মমতার ইফতারে গিয়ে মাথায় কাপড় দিয়ে নমাজ পড়া এবং মোদীর দশাশ্বমেধ ঘাটে সন্ধ্যারতি অন্যায়। মমতা জন্মসূত্রে হিন্দু হলেও ইচ্ছা হলে নিজের বাড়িতে দিনে পাঁচবার নমাজ পড়তেই পারেন, সেটা ব্যক্তি মমতার স্বাধীনতা। নরেন্দ্র মোদীও দুবেলা বাড়ির ঠাকুরকে পুজো করুন, কিচ্ছু এসে যায় না। কিন্তু প্রকাশ্যে একটা বিশেষ ধর্মাচরণ করে এই বার্তা দিতে পারেন না যে “আমি তোমাদেরই লোক”। সেটাই সাম্প্রদায়িকতা, ভর্তুকি দেওয়াটা নয়।

বড় দেশের দিন

আপনার যদি মনে হয় আমার ছেলে/মেয়ে ক্রিসমাস ক্যারল শিখে কেরেস্তান হয়ে যাবে, হলে সমূহ সর্বনাশ, তাহলে ঐসব স্কুলে পড়াবেন না। কে মাথার দিব্যি দিয়েছে পড়াতে?

বিশ্ববিদ্যালয়ের দুবছর আর প্রাথমিক শিক্ষার বছরচারেক বাদ দিলে আমার গোটা ছাত্রজীবন কেটেছে গেরুয়াধারী সন্ন্যাসীদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে।

আমাদের স্কুল প্রতিষ্ঠা করেছিলেন রামকৃষ্ণ মিশন থেকে বেরিয়ে এসে নিজের প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা একজন সন্ন্যাসী। সেই স্কুলে আমি যখন ক্লাস ফাইভে পড়ি, তখন ছাত্রদের জন্য একটা আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়েছিল যার বিষয় ছিল ‘ধর্ম কি কুসংস্কার?’ বিতর্ক প্রতিযোগিতার মত এতেও পুরস্কার দেওয়া হয়েছিল এবং প্রথম হয়েছিল ক্লাস সিক্সের একটি ছেলে, যার মূল বক্তব্য ছিল “হ্যাঁ, আচারসর্বস্ব ধর্ম অবশ্যই কুসংস্কার।”

আমাদের স্কুলে দুর্গাপুজো হত, একেবারে বিশুদ্ধ সিদ্ধান্ত মতে।

এই স্কুল থেকে মাধ্যমিক পাশ করার পরে ভর্তি হলাম রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশনের সদর দপ্তরের নাকের ডগায় থাকা কলেজে। সম্পূর্ণ আবাসিক কলেজ, যেখানে সকাল সন্ধ্যে হোস্টেলের ঠাকুরঘরে প্রার্থনায় বসতে হয়। যদিও ঠাকুরের আসনে তিনজন মানুষের ছবি আছে, তবু ব্যাপারটাকে ধর্মনিরপেক্ষ বলে কোনভাবেই চালানো যায় না। কারণ প্রার্থনায় রামকৃষ্ণ, সারদা, বিবেকানন্দ ছাড়াও হিন্দু দেবদেবীর বন্দনা করা হয়। কিন্তু সেই প্রার্থনায় যাওয়া নিয়ে কোনদিন আমার সহপাঠী জাহির আর আমিনুলের মুখ ভার দেখিনি। স্পষ্টতই ওদের বাবা-মায়েদেরও এ নিয়ে কোন আপত্তি ছিল না। জাহির আমার ঘনিষ্ঠ বন্ধুদের একজন হওয়ায় এ নিয়ে জিজ্ঞেসও করেছিলাম। ও বলেছিল “আমার বাবা তো ঠাকুর দেবতা মানে না। তাছাড়া এটা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ডিসিপ্লিন, জেনেশুনেই তো এসেছি। আর আমি প্রার্থনায় বসে আমার ভগবানের কাছেও প্রার্থনা করতে পারি। কেউ তো আটকাচ্ছে না।” পরেও আমার সহপাঠী ইফতে খারুল, আসিফ, ইমরান, ইকবাল — এদের কাউকেই এ নিয়ে একটা শব্দও খরচ করতে দেখিনি, প্রার্থনায় যেতে ওদের কোনরকম আপত্তি আছে এমন মনে করবারও কোন কারণ ঘটেনি।

এত কথা বলবার কারণ বড়দিন পালন নিয়ে যে বদমাইশিটা শুরু হয়েছে সেইটা। বহু লেখাপড়া জানা হিন্দু, যাদের ধর্মপালন বছরে একবার বাড়িতে লক্ষ্মী, সরস্বতী বা কালীপুজো করায় সীমাবদ্ধ, পেটে বোম মারলেও এক লাইন শুদ্ধ সংস্কৃত বেরোবে না, তারাও গত কয়েকবছর ধরেই নিজেদের হিন্দু পরিচিতি সম্পর্কে দেখছি প্রয়োজনের অতিরিক্ত সচেতন হয়ে উঠেছে। “আমি গর্বিত যে আমি হিন্দু” বলাটা বেশ একটা ফ্যাশন হয়ে দাঁড়িয়েছে বছরসাতেক হল। ভাবখানা এমন যেন ওকে কেউ বলেছে “এ মা, তুই হিন্দু? ছ্যা ছ্যা ছ্যা! দূর হ! এবার থেকে তুই আমার বাড়ি এলে আলাদা থালা বাসনে খেতে দেব।” অথবা হিন্দু বলে ওকে ট্রেন থেকে মেরে নামিয়ে দেওয়া হচ্ছে অথবা নতুন জায়গায় গিয়ে বাড়িভাড়া পাচ্ছে না। মজার কথা, এরকম গর্বিত হিন্দুরা আবার লক্ষ লক্ষ টাকা খরচ করে ছেলেমেয়েকে খ্রীষ্টান মিশনারিদের স্কুলে ভর্তি করে। তাতে ক্ষতি নেই। বহুবছর ধরে ঐ স্কুল, কলেজগুলো এদেশে উচ্চমানের শিক্ষা দিয়ে আসছে, রামকৃষ্ণ মিশনের মতই। কিন্তু সমস্যা এই যে হিন্দু বাবা-মায়েদের এখন এক অদ্ভুত ধারণা হয়েছে “ওরা কায়দা করে নিজেদের ধর্ম প্রচার করছে।”

কি আশ্চর্য! এরা নাকি লেখাপড়া শিখেছে! আমার সন্তানকে আমি জেনেশুনে খ্রীষ্টান সন্ন্যাসী বা সন্ন্যাসিনীদের পরিচালিত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তি করলাম, তা তাঁরা তো সেভাবেই শিক্ষা দেবেন যেভাবে দেওয়া ভাল বলে তাঁরা মনে করেন। ওঁরা তো ওঁদের স্কুল কলেজের নিয়মকানুন গোপনও করেন না কখনো। ডন বসকো, অ্যাসেম্বলি অফ গড চার্চ, লোরেটো বা সেন্ট জেভিয়ার্স তো আর হগওয়ার্টস নয় যে ভেতরে কী হচ্ছে বাইরের মাগল বাবা-মায়েরা জানতে পারে না। আপনার যদি মনে হয় আপনার ছেলে/মেয়ে ক্রিসমাস ক্যারল শিখে কেরেস্তান হয়ে যাবে, হলে সমূহ সর্বনাশ, তাহলে ঐসব স্কুলে পড়াবেন না। কে মাথার দিব্যি দিয়েছে পড়াতে? আজ অব্দি তো শুনলাম না লিলুয়ার কোন বাবা-মা পুলিশে ডায়রি করেছেন যে তাঁদের বাড়ির ছেলেকে ফাদাররা জোর করে তুলে নিয়ে গিয়ে ডন বসকোয় ভর্তি করেছে। বরং অনেক কাঠখড় পুড়িয়েও সেখানে ভর্তি করতে পারলেন না বলে বিলাপ করতে শুনি বহু বাবা-মাকে।

তাহলে আর এস এস প্রোপাগান্ডায় এই নির্বোধের মত আত্মসমর্পণ করে কী প্রমাণ করছেন আপনি? নিজের হিন্দু পরিচিতি না উজবুক পরিচিতি?

স্কুল কলেজের ছেলেমেয়েদের ধরে ধরে খ্রীষ্টান বানানোর প্রকল্প যদি মিশনারী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর থাকত তাহলে কলকাতার সচ্ছল বাঙালিদের মধ্যে অ্যাদ্দিনে খ্রীষ্টানরা সংখ্যাগরিষ্ঠ হয়ে যেত বোধহয়। নিজের ধর্ম নিজের বুকের মধ্যে রাখুন, মাথায় উঠতে দেবেন না। সবাই জমিয়ে কেক খান, বড়দিনে আনন্দ করুন। না করলে ক্ষতি আপনার। আমি নাস্তিক কিন্তু লক্ষ্মীপুজোর খিচুড়ি, ঈদের সেমাই, ছটের ঠেগুয়া বা ক্রিসমাসের কেক — কোনটাই ছাড়ি না। কেন ছাড়ব? এই যে নানা স্বাদ এটাই তো আমার দেশের মজা, এই মজা উপভোগ করার জন্যে মানুষ হওয়াই যথেষ্ট, বিশ্বাসী হওয়ার দরকার পড়ে না। আপনি যদি এর একটা খান, অন্যগুলো না খান সেটা আপনার ক্ষতি। সে তো লোকে প্যালারাম বাঁড়ুজ্জের মত আলু পটল আর সিঙিমাছের ঝোল খেয়েও বেঁচে থাকে। অমন বাঁচায় আনন্দ কই?

রক্তপিপাসু বাঙালি

আফরাজুল মুসলমান অর্থাৎ বাঙালি নয় — এই কথাও দেখলাম লোকে বেশ রেলা নিয়ে বলে বেড়াচ্ছে। অবশ্য মাইকেল মধুসূদন আর কাজী নজরুল বাঙালি নন যারা বলতে পারে তাদের কাছে আফরাজুলের আর কী দাম?

afrazul

আখলাক আহমেদ খুন হওয়ার কয়েকদিন পরে আমি একটা খেলার প্রতিবেদন লিখতে একটা বিজেপিশাসিত রাজ্যে গেছি। সেই রাজ্যের সবচেয়ে শিল্পোন্নত শহরের অভিজাত এলাকায় তৈরি স্টেডিয়ামের অস্থায়ী প্রেস বক্সে গিয়ে রোজ বসি। ওখানকার পয়সাওয়ালা, ক্ষমতাবান লোকেরা আশেপাশেই এসে বসেন, খানিকক্ষণ ক্রিকেটমাঠের উত্তাপ নিয়ে যান, নিজেদের মধ্যে আবহাওয়া, হজমের গণ্ডগোল, ক্রিকেটটা আশির দশকে কেমন ছিল আর এখন কেমন হয়েছে, শহরের কোথায় এখন জমির দাম সবচেয়ে বেশি আর কোথায় সবচেয়ে কম — এইসব নিয়ে গভীর আলোচনা করেন। সেই আলোচনায় একদিন দেখলাম সকলেই একমত হয়ে বলছেন যে একটা মুসলমান মরেছে তাতে দেশসুদ্ধু লোক মিলে যে লাফালাফিটা করছে সেটা অত্যন্ত অন্যায়। উত্তরপ্রদেশ সরকার আবার ক্ষতিপূরণ দিচ্ছে! হিন্দু মরলে দিত?
কিছুটা তফাতে বসে আমার গা চিড়বিড় করছে, নিজেকে শান্ত রাখছি এই বুঝিয়ে যে এই ধর্মান্ধগুলোর সাথে তখন তর্কে জড়ালে আমার কাজের বারোটা বাজবে। আরো যে ভাবনাটা শান্ত থাকতে সাহায্য করেছিল সেটা এই যে ওটা একে গোবলয়ের রাজ্য তায় বিজেপিশাসিত। আমাদের পশ্চিমবঙ্গের শিক্ষিত লোকেরা এইভাবে ভাবে না। অন্য ব্যাপারে যতই মতের অমিল থাক, এই ধরণের হত্যার পক্ষ নিয়ে কেউ গলা ফাটায় না, যে খুন হল সরকার তার পরিবারের পাশে দাঁড়ালেও কেউ নোংরা মন্তব্য করে না। আফরাজুলের হত্যার পরের দিনগুলো আমার এই আত্মশ্লাঘাকে ইডেন থেকে ছয় মেরে বাংলার বাইরে পাঠিয়ে দিয়েছে।
রামনবমীতে সশস্ত্র মিছিল দেখে আন্দাজ করেছিলাম, এবারে নিশ্চিত হয়ে গেলাম যে বাঙালিদের মধ্যে গোমাতার সন্তানের সংখ্যা নেহাত কম নয়। আফরাজুল সম্পর্কে লাভ জিহাদের গপ্পটা বাজারে পড়তে না পড়তে বাঙালি চৈত্র সেলের শাড়ির মত ঝাঁপিয়ে তুলে নিল এবং সেটাকে মানুষ খুনের যুক্তি হিসাবে রোজকার কথাবার্তায় এবং অবশ্যই সোশাল মিডিয়ায় চালিয়ে দিল। আফরাজুলের বিরুদ্ধে লাভ জিহাদের অভিযোগ যে আদৌ প্রমাণ হল না সেকথা ছেড়েই দিলাম। কিন্তু যে দেশে ধর্ষণ করে ড্যাংড্যাং করে মন্ত্রী হওয়া যায় সে দেশে বিবাহ বহির্ভূত সম্পর্কের শাস্তি হচ্ছে মৃত্যুদন্ড, তাও আবার দন্ড দিতে আইন আদালত লাগবে না; রাম, শ্যাম, যদু, শম্ভু যে কেউ দন্ড দিতে পারে — একে যুক্তি বলে স্বীকার করে আকাশ বাতাস বিদীর্ণ করল কারা? রামমোহন, বিদ্যাসাগর, রবীন্দ্রনাথ, শরৎচন্দ্র, নজরুল, বেগম রোকেয়ার দেশের লোকেরা। আবার আফরাজুল মুসলমান অর্থাৎ বাঙালি নয় — এই কথাও দেখলাম লোকে বেশ রেলা নিয়ে বলে বেড়াচ্ছে। অবশ্য মাইকেল মধুসূদন আর কাজী নজরুল বাঙালি নন যারা বলতে পারে তাদের কাছে আফরাজুলের আর কী দাম? অপেক্ষায় ছিলাম কবে কোন ঘটনা নিয়ে বনলতা সেনগিরি শুরু হবে। বিরাট হিন্দু বাঙালি সেই সুযোগটা পেল হেমন্ত রায়ের মৃত্যুতে। কে হত্যা করেছে, কেন হত্যা করেছে কিছু জানতে পারার আগেই তারা যত ধর্মনিরপেক্ষ লোক সবার মা-মাসি উদ্ধার করে বলতে শুরু করল “এই হত্যার প্রতিবাদ হবে না কেন? একে ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে না কেন?”
আচ্ছা প্রতিবাদটা কার বিরুদ্ধে হবে? দুনিয়ার যেখানে যত খুন হচ্ছে নানা কারণে, সবকটারই প্রতিবাদ করতে হবে? সবকটাই নিন্দনীয় বললে মোটের উপর আপত্তি করার কিছু থাকে না কিন্তু সবকটারই নিন্দা করতেই হবে, নয়ত কোনটারই নিন্দা করা চলবে না, একথা যারা বলে তারা যে আসলে এক বিশেষ ধরণের খুনীর সমর্থক — একথা পরিষ্কার করে বলার সময় এসেছে। কী ধরণের খুনী তা নিয়ে যদি আপনার সন্দেহ থেকে থাকে তাহলে একবার কালকের খবরে চোখ রাখুন। রাজস্থানে শম্ভুলালের সমর্থনে আদালত আক্রমণ করে যেটা করা হয়েছে সেটাকে সন্ত্রাসবাদ ছাড়া অন্য কোন নাম দেওয়া যায় না। মাথার তেরঙ্গাটাকে টেনে নামিয়ে তার জায়গায় গেরুয়া পতাকা তোলা হয়েছে। আইসিসের আছে কালো পতাকা, এদের আছে গেরুয়া পতাকা। যে ভারত সরকার বিশ্ববিদ্যালয়ে ২০০ ফুট উঁচু জাতীয় পতাকা লাগাতে চায়, পর্নো ছায়াছবির আগেও জাতীয় সঙ্গীত চালাতে চায় সেই সরকার কিন্তু এ নিয়ে চুপচাপ। অর্ণব গোস্বামী কী বললেন এ নিয়ে? কেউ শুনেছেন?
ও হ্যাঁ, ক্ষতিপূরণের কথা হচ্ছিল। ওটা তো রাজস্থান সরকারেরই দেওয়া উচিৎ ছিল। তাদের রাজ্যে আইনশৃঙ্খলার এমন অবস্থা যে লোকে জানে একটা মুসলমানকে খুন করলে কিচ্ছু এসে যাবে না — এর জন্যেই তো প্রাণ গেল একটা নিরস্ত্র লোকের। এর দায় কোন না কোন সরকারকে তো নিতেই হবে। অতঃপর খুনী গ্রেপ্তার হল কিনা সেটা বড় কথা নয় কারণ অপরাধটা যেভাবে করা হয়েছে তাতে গ্রেপ্তার করার কাজটুকুই তো সরকারের ভাগে পড়ে ছিল। সেটুকু করার জন্যে তো আর বিরাট হিন্দুরা দাবী করতে পারেন না যে সকলে উঠে দাঁড়িয়ে হাততালি দেবে।
রাজস্থান সরকার অবশ্য আফরাজুলের খুনী, তার প্রতি সহানুভূতিশীল লোকেদের দায় নেবেন না সেটাই স্বাভাবিক কারণ মুখ্যমন্ত্রী বসুন্ধরা রাজে জননেত্রী নন, সাংবিধানিক দায়িত্ব পালনে আগ্রহী প্রশাসক নন। উনি উন্মত্ত জনতার নেত্রী। প্রমাণ চাই? গত ১৩ই ডিসেম্বর দ্য টাইমস অফ ইন্ডিয়ায় প্রকাশিত তাঁর সাক্ষাৎকারটা পড়ে নিন। নেত্রীর সোজাসাপ্টা কথা “একটা কাস্টের লোকের ভাবাবেগে যখন আঘাত লেগেছে তখন পদ্মাবতী মুক্তি পাওয়ার দরকারটা কী?” আরো অনেক মণিমুক্তো পাবেন ঐ সাক্ষাৎকারে যা বুঝিয়ে দেয় ক্ষ্যাপা জনতা যা চায় তাই-ই হবে রাজস্থানে। মুখ্যমন্ত্রী নিজেও সেই জনতারই একজন।
যাক সে কথা। এই বীভৎসতা দেখে কিন্তু এক শ্রেণীর বাঙালি যারপরনাই উল্লসিত। বসিরহাটের গন্ডগোলেই যারা ৩৫৬ ইত্যাদির দাবী করে ফেলেছিল তাদের রাজস্থানে আইনের শাসন ভেঙে পড়েছে এমনটা বলতে কিন্তু শোনা যাবে না। বাঙালির মোদীপ্রীতি উত্তরোত্তর বেড়েই চলেছে। নিত্যযাত্রী হওয়ার সুবাদে আজকাল প্রায়ই দেখি বাংলার বাসিন্দা বিহারী, মারোয়াড়িরা মোদীকে গাল পাড়ছেন। অথচ বাঙালিদের কি অচলা ভক্তি!
সক্রেটিসের ছাত্র আর এরিস্টটলের মাস্টারমশাই প্লেটো মনে করতেন গণতন্ত্র একটা ফালতু ব্যাপার কারণ এটা খুব ভাল চললে হয়ে দাঁড়ায় অভিজাততন্ত্র (plutocracy) আর খুব খারাপ চললে ক্ষ্যাপা জনতাতন্ত্র (mobocracy)। তা ভারতীয় গণতন্ত্র এখন একাধারে plutocracy এবং mobocracy। একদিকে দেশের সরকার থেকে ফুটবল পর্যন্ত সবকিছু চালাচ্ছে হাতেগোনা কয়েকজন পয়সাওয়ালা লোক, যাদের আরো বড়লোক করার জন্যে আগামীদিনে আমার, আপনার সাদা পথে অর্জিত টাকাও কেড়ে নেওয়ার আইন তৈরি হচ্ছে; অন্যদিকে আপনি কার পুজো করবেন, কী খাবেন, কী পরবেন, কী দেখবেন, কাকে বিয়ে করবেন, কার সাথে শোবেন সেটা ঠিক করে দেবে পাগলা কুকুরের চেয়েও বেশি বিপজ্জনক জনতা আর সরকার সেই জনতারই পক্ষ নিয়ে কখনো আপনার লাঞ্ছনা দেখে চুপটি করে থাকবে, আর কখনো আইনের অপব্যবহার করে বা নতুন আইন বানিয়ে আপনার অত্যাচার বাড়িয়ে তুলবে। যদি সংখ্যালঘু হন তো আপনি বাঁচবেন না মরবেন সেটাও ঠিক করবে ঐ জনতাই। সরকার বলবে “জনতাকে ক্ষেপানো কেন বাপু? জনতা যেমনটি চায় তেমনটি করে থাকতে পারলে থাক, নইলে পাকিস্তান চলে যাও।”
তা বাঙালি ঐ plutocracy র দিকটায় প্রবেশাধিকার পাচ্ছে না কারণ বাঙালির অভিজাত নেই গুজরাতি আর মারোয়াড়িদের মত, তাই mobocracy র দিকটায় সমানে সমানে লড়ে যাচ্ছে। ফাইট, মণি ফাইট।

ভেসে যাব?

আমাদের বাস্তব অভিজ্ঞতা বলে গত এক দশকে দশমীতে ঠাকুর বিসর্জন দেয় এরকম পুজোর সংখ্যা প্রায় শূন্যে নেমে এসেছে এবং একাদশীতে বিসর্জন দেওয়া হয় এমন ঠাকুরের সংখ্যাও ক্রমশ কমছে। সুতরাং আজকের দিনে একটা বিশেষ দিনে প্রশাসনিক সুবিধার জন্যে ভাসান বন্ধ রাখতে বললে ধর্মীয় অধিকারের প্রশ্ন উঠে যাওয়া বেশ বিস্ময়কর

দুটো কাগজের রিপোর্ট পড়লাম, আরো নানা জিনিস যা সবাই পড়ছে তাও পড়লাম। কিছু পরস্পরবিরোধী তথ্য পাওয়া যাচ্ছে কিন্তু যা নিয়ে সংশয় থাকছে না সেটা হল পশ্চিমবঙ্গের ইতিহাসে এর আগে কোন মুখ্যমন্ত্রী কবে দুর্গাপুজোর ভাসান হবে আর কবে হবে না তা ঘোষণা করেননি, কাজটা পুলিশকর্তা বা অন্য মন্ত্রীদের করতে দিয়েছিলেন। কেন? নিশ্চয়ই তাঁদের অন্য কাজ ছিল, ফলে উৎসবের খই ভাজা তাঁদের পক্ষে সম্ভব হয়নি। বর্তমান মুখ্যমন্ত্রীর উৎসব নিয়ে উৎসাহ বরাবরই বেশি, এক্ষেত্রেও তারই বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে।
ওঁত পেতে থাকা হায়েনার দল এমন সুযোগ ছাড়তে পারে না, ছাড়েওনি। “হিন্দু খতরে মে হ্যায়” কথাটা বাঙালি হিন্দুর কানে ভাসিয়ে দিয়েছে এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রিধারী, পরিবারে কজন বিদেশবাসী আছে তা নিয়ে গর্ব করা বাঙালিও এই ঢপের চপ গপ গপ করে খেয়েছে, খাচ্ছে। একবারও ভেবে দেখছে না। ভাবলে বুঝতে পারত যে রাজ্যের বড় বড় পুজোগুলোর আয়োজক শাসকদলের নেতারা, যে রাজ্যের সরকার পারলে ইতুপুজোতেও ছুটি দিয়ে দেয়, শহরের ব্যস্ততম রাস্তায় ভাসান নিয়ে মোচ্ছব করেন মুখ্যমন্ত্রী নিজে — সে রাজ্যে হিন্দুর কোন খতরা নেই। সংখ্যালঘু তোষণ থাকলেও নেই, না থাকলেও নেই। কিন্তু মুখ্যমন্ত্রীর অত্যুৎসাহে যেটা হল সেটা হচ্ছে হিন্দুত্ববাদীরা এমন একটা কারণে মুসলমানবিদ্বেষ ছড়ানোর সুযোগ পেয়ে গেল যেটার সঙ্গে বাংলার মুসলমানদের কোন সম্পর্কই নেই। তাঁরা কেউ কখনো দাবী করেননি মহরমের তাজিয়ার জন্যে ভাসান বন্ধ রাখতে হবে। বলবেনই বা কেন? হিন্দু খতরায় থাকা বাংলায় এবছরও তো অসংখ্য পুজো কমিটির দায়িত্বে তাঁরাই আছেন। নিজেদের পুজোর ঠাকুরগুলো ভাসানোর ব্যবস্থাও তো তাজিয়া বার করার পাশাপাশি তাঁদেরই করতে হবে।
ক্ষতি যা হওয়ার ইতিমধ্যেই হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী হাইকোর্টের আদেশ মেনে নিয়ে পুজো এবং মহরম যাতে শান্তিপূর্ণভাবে মেটে তার ব্যবস্থায় এইবেলা মন দিলে ভাল করতেন, কিন্তু উনি তো উনিই। আরো পাঁচটা গরম মন্তব্য করে সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত ব্যাপারটাকে টেনে নিয়ে না গেলে, উত্তেজনা আরো না ছড়ালে ঠিক তৃপ্ত হতে পারছেন না বোধহয়।
যদি আনন্দবাজার পত্রিকায় প্রকাশিত তথ্য ঠিক হয় অর্থাৎ ১৯৮৩ আর ৮৭ সালে সত্যিই মহরমের জন্যে একাদশীর দিন ভাসান বন্ধ থেকে থাকে তাহলে প্রশ্ন ওঠে গত দুবছর ধরে যারা এই ব্যবস্থার বিরুদ্ধে আদালতে যাচ্ছে, তারা কি ঐ দুবছর পুজো করেনি? তাহলে সেইসময়ে আদালতে যায়নি কেন? বা সেইসময়ে যারা পুজো করেছিল তাদের তখন কেন মনে হয়নি যে ধর্মীয় অধিকারে হস্তক্ষেপ হচ্ছে, হিন্দু খতরে মে হ্যায়? হঠাৎ ২০১৭ সালে এসে কেন মনে হল যে একদিন পরে ভাসান করতে বলা মানে ধর্মাচরণের অধিকারে হস্তক্ষেপ? আমাদের বাস্তব অভিজ্ঞতা বলে গত এক দশকে দশমীতে ঠাকুর বিসর্জন দেয় এরকম পুজোর সংখ্যা প্রায় শূন্যে নেমে এসেছে এবং একাদশীতে বিসর্জন দেওয়া হয় এমন ঠাকুরের সংখ্যাও ক্রমশ কমছে। সুতরাং আজকের দিনে একটা বিশেষ দিনে প্রশাসনিক সুবিধার জন্যে ভাসান বন্ধ রাখতে বললে ধর্মীয় অধিকারের প্রশ্ন উঠে যাওয়া বেশ বিস্ময়কর।
এবার একটা জোরালো আপত্তি উঠবে জানি। “এই তাহলে সেকুলারিজম? আমরা সংখ্যাগরিষ্ঠ, আমাদের সবসময় সংখ্যালঘুদের জন্যে স্যাক্রিফাইস করতে হবে কেন? ওদের ধর্মাচরণ মৌলিক অধিকারের মধ্যে পড়ে, আমাদের মৌলিক অধিকার নেই?” হক কথা। এবার তাহলে মৌলিক অধিকার নিয়ে আলোচনা হোক।
ভারতীয় সংবিধানের ২৫(১) ধারায় সব নাগরিককে ধর্মাচরণের স্বাধীনতা মৌলিক অধিকার দেওয়া হয়েছে, আইনশৃঙ্খলা, নৈতিকতা এবং স্বাস্থ্য বজায় রেখে। পশ্চিমবঙ্গ সরকার কাউকে দুর্গাপুজো করতে বাধা দেননি, বিসর্জনেও বাধা দেননি। দিলেও কিন্তু সেটা অসাংবিধানিক না-ও হতে পারত। যেমন দমকল বিভাগ যদি বলত কোন পুজোমন্ডপ বিপজ্জনক, দুর্ঘটনাপ্রবণ। তাহলে তাদের পুজো করার অনুমতি সরকার না-ই দিতে পারত। অর্থাৎ আপনি ধর্মাচরণ করবেন বলে অন্য লোককে বিপদে ফেলতে পারেন না। ওটা আপনার মৌলিক অধিকার নয়। যাদের অনুমতি দেওয়া হল না তারাও আদালতে যেতেই পারে। আদালত কি তাদের আর্জি শুনবে? কে জানে!
বিপদের কথা আসছে কেন? আসছে কারণ বিসর্জনের সময়ে পথে বা ঘাটে ঝগড়াঝাঁটি, এমনকি হাতাহাতি মোটেই বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এর সঙ্গে যদি মহরমের তাজিয়া যোগ হয়, বিশেষ করে ২০১৭র ভারতে তথা বাংলায় সেটা সামলানো যে যথেষ্ট শক্ত তা কি বুঝতে খুব অসুবিধা হয়? এটা আইনশৃঙ্খলারক্ষার প্রশ্ন। সেটা যার দায়িত্ব, সেই রাজ্য সরকার যদি বলে “আমি পারব না”, তাহলে আমি তাকে অযোগ্য বলে তেড়ে গালাগাল দেবই। কিন্তু “কিচ্ছু হবে না” বলে উড়িয়ে দেব কি? জানি না। ক্ষমতাহীন নাগরিক হিসাবে শুধু আশা করি বিচারকরা যাতে খারাপ কিছু না ঘটে তার ব্যবস্থা করবেন, ব্যাপারটা রাজ্য সরকারের হাতে ছেড়ে রাখবেন না, বিশেষ করে যে সরকার তাঁদের প্রবল তিরস্কারের পাত্র।
তবে বিচারকদের রায় শোনার পর থেকে একটা প্রশ্ন বড্ড জ্বালাচ্ছে, সেইটা সবশেষে বলি। সংবিধানেরই ১৯(১)(ডি) চলাচলের স্বাধীনতার অধিকার দেওয়া হয়েছে। মানে ভারতের যে কোন নাগরিক দেশের মধ্যে যে কোন জায়গা থেকে যে কোন জায়গায় চলাচল করতে পারে। তা কলকাতায় একটা খুব গুরুত্বপূর্ণ রাস্তা আছে যার নাম মহাত্মা গান্ধী রোড। সেই রাস্তায় বেশ কিছুদিন হল দিনের বেলায় দেখেছি প্রাইভেট গাড়ি চলতে দেওয়া হয় না। এখন কয়েকজন গাড়ির মালিক মিলে যদি আদালতের কাছে গিয়ে বলেন যে সরকার এতদ্দ্বারা আমাদের চলাচলের মৌলিক অধিকার হরণ করেছে, আদালত কি সেই আর্জি শুনবে? তারপর মামলায় যদি সাব্যস্ত হয় সত্যিই চালকদের মৌলিক অধিকার লঙ্ঘিত হয়েছে, তাহলে কি আদালতের নির্দেশে মহাত্মা গান্ধী রোডে প্রাইভেট গাড়িও চলবে? এইভাবে যে যে সিদ্ধান্ত নেওয়া সরকারের কাজ তার সবই কি বিচারপতিরা নেবেন? সেভাবে দেশ চলবে তো?

আনিতে গৌরী

আকাশটার দিকে তাকিয়ে দেখেছেন? রঙ বদলে গেছে। যেখানে একটুআধটু ফাঁকা জমিতে সুযোগ আছে সেখানেই কাশফুল ফুটেছে। আমাদের বাংলায় এই সময়টা আগমনী গাওয়ার। “যাও যাও গিরী, আনিতে গৌরী/উমা বড় দুখে রয়েছে।” আজ সন্ধ্যায় বেঙ্গালুরুতে এক গৌরীর বিসর্জন সম্পন্ন হল। এখন আমরা ক্রুদ্ধ, আতঙ্কিত — আরো অনেককিছু হতে পারি কিন্তু বিস্মিত হওয়ার কোন যুক্তিসঙ্গত কারণ নেই।
এটাই হওয়ার ছিল। গৌরী লঙ্কেশের বদলে অন্য কেউও খুন হতে পারতেন। এমন যে কেউ যিনি হিন্দুত্বের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে আছেন ঘাড় শক্ত করে। শুধু হিন্দুত্বও নয়, ক্ষমতার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে আছেন যাঁরা। কয়েকদিন আগেই নাকি একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে মমতার ছবিতে হিটলারি গোঁফ লাগানোর জন্যে। রাষ্ট্রশক্তির ক্ষমতার যখন সীমা থাকে তখন সে আইনকে ব্যবহার করে বিরোধী স্বরকে নীরব করে দিতে, আর যখন ক্ষমতা সীমা ছাড়িয়ে যায় তখন আর ওসবের দরকার হয় না, সরাসরি গুন্ডা নামিয়ে নিকেশ করে দেওয়া যায়। ভারতীয় রাজনীতিবিদদের অনেকের মধ্যেই একনায়কসুলভ প্রবৃত্তির প্রকাশ প্রকট হলেও এই মুহূর্তে যেহেতু লাগামছাড়া ক্ষমতা হিন্দুত্ববাদীদের হাতে, তাই তারা নির্ভয়ে এরকম খুনোখুনি করবেই। এমনিতেই যারা ধর্মান্ধ তাদের সঙ্গে যুক্তি খাটে না, গণতান্ত্রিক অধিকারও তাদের দেওয়া উচিৎ না। হিন্দুত্ব যে বস্তুত আইসিস বা আল কায়দা বা বাংলাদেশের জমিয়তের মত একটি ভয়ঙ্কর কাল্ট সেটা এদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ কবে বুঝবেন জানি না। যতদিনে বুঝবেন ততদিনে না দেরী হয়ে যায়। সাংবাদিকরা, প্রতিবাদীরা বিভিন্ন দেশে, বিভিন্ন কারণে খুন হয়ে চলেন কিন্তু এদেশে খুনগুলোর মধ্যে ব্যবধান বড্ড কমে এসেছে এবং কারা খুন হচ্ছেন সে ব্যাপারেও বেশ ধারাবাহিকতা দেখা দিয়েছে। এর কোন শান্তিপূর্ণ সমাধান তো দেখছি না। এই ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে ঘোষিত যোদ্ধা যারা তাদেরই এক দলের আবার সরকার কর্নাটকে। তাদের যুদ্ধ করার যা ছিরি, তাতে আমি ফ্যাসিবাদী হলে উচ্ছ্বসিত হতাম।
প্রকাশ কারাত, পিনারাই বিজয়ন! আপনারা কংগ্রেসের অযোগ্যতায় খুশি তো?
Gauri-Lankesh

গুরুর ধর্ষণ মাপ

ঊনবিংশ শতাব্দীতে লেখা হুতোম প্যাঁচার নকশায় দেখছি খোদ বাংলায় হিন্দু বাড়িতে মেয়ের বিয়ে হলে পরিবারের গুরু ফুলশয্যায় বসে থাকতেন। তিনি “প্রসাদ করে দিলে” তবে স্বামী-স্ত্রী মিলিত হতে পারত। হুতোম সকৌতুকে লিখেছেন কিভাবে এক পাশ্চাত্যশিক্ষায় শিক্ষিত স্বামী খাটের তলায় লুকিয়ে থেকে যথাসময় বেরিয়ে এসে এক গুরুর মাথা ফাটিয়ে দেন, অতঃপর প্রাণভয়ে গুরুরা এই প্রসাদ করার অভ্যেস ত্যাগ করেন

মনে রাখবেন, ২০১২ সালের ১৬ই ডিসেম্বর যখন এক ধর্ষিতা আর তার সঙ্গী দিল্লীর ঠান্ডায় উলঙ্গ, রক্তাক্ত, মৃতপ্রায় অবস্থায় রাস্তায় পড়েছিল তখন তাদের সাহায্য করতে একটি মানুষও এগিয়ে আসেনি অথচ তা নিয়ে মোমবাতি মিছিল করতে লোকের অভাব হয়নি। আর ২০১৭ সালের ২৫শে আগস্ট একজন ধর্ষকের শাস্তির প্রতিবাদে লক্ষ লক্ষ মানুষ রাস্তায়। নিরস্ত্র, নিরীহ অবস্থায় নয়, রীতিমত খুনে মেজাজে। টেলিভিশনের পর্দায় দেখা গেছে বহু মহিলা এই ধর্ষকটির জন্যে কান্নাকাটি করছেন। মগজধোলাই কোন পর্যায়ে গেলে এটা সম্ভব একবার ভেবে দেখুন। মানলাম যে এই ভিড় সংগঠিত করা হয়েছে গোলমাল পাকানোর জন্য। কিন্তু একজন ধর্ষককে সমর্থন করার জন্যে এত লোককে সংগঠিত করা যে সম্ভব হচ্ছে (যে মূল্যেই হোক) তা মগজধোলাই ছাড়া একেবারেই অসম্ভব। সেই মগজধোলাইটা কী এবং কত প্রাচীন সেটা নিয়ে আলোচনা হওয়া উচিৎ।
ঘটনা হল যে প্রাচীন ভারতীয় সভ্যতার গর্ব আমরা করে থাকি, এটা তার এক বিরাট উত্তরাধিকার। দেবদাসী এদেশের অতি প্রাচীন প্রথা তবে সেটা মন্দিরে সীমাবদ্ধ। কিন্তু শিষ্যদের বাড়ির মেয়েরা গুরুর ভোগ্য — এ বিশ্বাসটার ইতিহাসও কিন্তু আমাদের দেশে বেশ লম্বা। ঊনবিংশ শতাব্দীতে লেখা হুতোম প্যাঁচার নকশায় দেখছি খোদ বাংলায় হিন্দু বাড়িতে মেয়ের বিয়ে হলে পরিবারের গুরু ফুলশয্যায় বসে থাকতেন। তিনি “প্রসাদ করে দিলে” তবে স্বামী-স্ত্রী মিলিত হতে পারত। হুতোম সকৌতুকে লিখেছেন কিভাবে এক পাশ্চাত্যশিক্ষায় শিক্ষিত স্বামী খাটের তলায় লুকিয়ে থেকে যথাসময় বেরিয়ে এসে এক গুরুর মাথা ফাটিয়ে দেন, অতঃপর প্রাণভয়ে গুরুরা এই প্রসাদ করার অভ্যেস ত্যাগ করেন। অতএব ঐ যে দেড় লক্ষ লোক মনে করেছে তাদের গুরু নির্দোষ, ঐ যে সাক্ষী মহারাজ বলে শাসকদলের এক গেরুয়া মাফিয়া ধর্ষণ প্রমাণিত হওয়ার পরেও গুরমিত নামক বরাহনন্দনটিকে পুণ্যাত্মা বলেছে, এরা কিন্তু সত্যিই মনে করে গুরুর অধিকার আছে শিষ্যাদের একটুআধটু ভোগটোগ করার। আমাদের এই ধর্মশাসিত দেশে ব্যাপারটা এখানেই সীমাবদ্ধ নয়। গুরুবাদী দেশ তো। “মহাজনো যেন গতঃ স পন্থা।” ফলে এদেশের অধিকাংশ পুরুষই মনে করে ধর্ষণ তার জন্মগত অধিকার। যাদের পেটে বিদ্যে আছে, ঘটে বুদ্ধি আছে — তারা এই মনোভাব গোপন করতে জানে, বাকিরা জানে না। ঠিক এই কারণেই আইন marital rape বলে কোনকিছুর অস্তিত্ব স্বীকার করে না, ধর্ষণের আইন অনুযায়ী অপ্রাপ্তবয়স্ক নারীর সাথে যৌন সংসর্গ ধর্ষণ বলে গণ্য হলেও অপকম্মটি মেয়েটির স্বামী করলে ধর্ষণ বলে ধরে না। এই আমাদের প্রাচীন ভারতীয় ঐতিহ্য, যা সমস্ত নারীকেই মা বলে ভাবতে শেখায় আর পুরুষকে শেখায় যে কোন নারীকেই সে ইচ্ছে হলেই মা বানিয়ে দিতে পারে, দোষ নেই। ভাগ্যিস সায়েবরা এসে আমাদের পাশ্চাত্যের আদবকায়দা শিখিয়ে নষ্ট করে দিয়েছিল, নইলে রামমোহন, বিদ্যাসাগরের লাশ পড়ে যেত তবু এদেশের মেয়েরা সতী হয়েই চলত, বালবিধবারা পাড়া প্রতিবেশীর সন্তানের মা হয়েই চলত। দেশের শিল্পোন্নত রাজ্যগুলো আবার এই পিছিয়ে পড়া বাংলার মত রামমোহন, বিদ্যাসাগর পায়নি কিনা তাই উনিশশো আশির দশকেও রূপ কানোয়ারকে সতী বানিয়েছে। শাহ বানোর নামটা মনে রাখা সোজা, এই মহিলার নামটা মনে পড়ে না সহজে।
নেহরু, আম্বেদকরদেরও বলিহারি। যে দেশ যা নয় তাকে তাই করে তোলার চেষ্টা! কতবড় সাহস! দেশের লোক গুরু ছাড়া বাঁচতে পারে না আর ওনারা বানাতে গেলেন সেকুলার দেশ। যত্তসব বিদেশী শিক্ষায় শিক্ষিত মোগল আর সোনার চাঁদের দল। এতদিনে দেশটা ধর্মের পথে ফিরছে, গুরুদের হাতে ফিরছে

ধোঁকা ধোঁকা ধোঁকা

এখন অব্দি যা খবর তাতে সুপ্রিম কোর্ট একটি ছ মাসের জন্য ঐতিহাসিক রায় দিয়েছেন। ছ মাসের জন্য কারণ মুসলমান মহিলাদের অধিকার রক্ষায় বিদ্যাসাগরের মত লড়ছেন যে ভদ্রলোক, তাঁর সরকার নাকি মুসলমানদের বিবাহবিচ্ছেদ নিয়ে কোন নতুন আইন টাইন করতে চান না। সেটা না করলে পরিস্থিতি ছ মাস পরে আবার পুনঃ তাৎক্ষণিক তালাক ভব হয়ে যাবে।
“আমরা” অবশ্য ইতিমধ্যেই প্রধানমন্ত্রীকে অভিনন্দন ইত্যাদি জানিয়ে দিয়েছি এই রায়টার জন্যে। কারণ তাতে “আমাদের” এইটা ভাবতে সুবিধা হয় যে “আমাদের” নেতা “ওদের” মহিলাদের উদ্ধার করলেন। মামলাটা যে করেছিলেন মুসলমান মহিলারাই, এতদিন নিজেদের অধিকারের জন্য লড়লেন তাঁরাই সেটা ভুলে যেতে সুবিধা হয়। রায়টাও যে দিলেন বিচারপতিরা, মোদীবাবু নয় — সেটাও চেপে যাওয়াই ভাল কারণ আদালতের রায় বললে নেশাটা ঠিক জমে না। বিচারকদের তো আর দেখেশুনে, পছন্দ করে কপালে ভোটটি দিইনি। ফলে ওনাদের “আমাদের” লোক বলে ভাবতে এখনো একটু অসুবিধা হয়। তাছাড়া জহরকোট আর শ্বেতশুভ্র দাড়িতে যে মহারাণা প্রতাপসুলভ আবেদনটা আছে সেটা ঢলঢলে কালো কোটে কোথায়? অতএব যাঁর অবদান এই রায়ে গোটাকতক বক্তৃতা আর টুইট বৈ কিছু নয়, তাঁকেই কৃতিত্ব দিতে হবে।
দাঁড়ান, দাঁড়ান। অত অজ্ঞ ভাববেন না। এখুনি বলবেন তো “রাজীব গান্ধী যখন সুপ্রিম কোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে গিয়ে মুসলমান মহিলাদের অধিকারকে আইনি স্বীকৃতি দিলেন না তখন কোথায় ছিলেন?” তখন আমি অ আ ক খ শিখছিলাম। তবে রাজীব গান্ধী যে অন্যায় করেছিলেন সে বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই। কিন্তু নিজেকে রাজীব গান্ধীর চেয়ে উৎকৃষ্ট প্রমাণ করতে শুধু আদালতে তাৎক্ষণিক তিনতালাকের (হ্যাঁ, তাৎক্ষণিক, মানে instant triple talaq কেই অসাংবিধানিক বলেছেন সুপ্রিম কোর্ট। তিনতালাককে নয়) বিরুদ্ধে সরকারী উকিলকে দিয়ে সওয়াল করালে তো যথেষ্ট হবে না, দাদা। একটা নতুন আইন করে দেখান।
এইবার অভিন্ন দেওয়ানি আইনের কথা বলবেন তো? সেটা হলেই এটা হয়ে যায়, তাই না? আচ্ছা তাই হোক। মোদীজি আমাদের বলুন শুনি কী কী থাকবে সেই আইনে? নাহয় টুইট করেই বলুন। কী বললেন? ওটা এখনো তৈরি হয়নি? বুঝুন। দেশসুদ্ধ লোকের গোঁফে তেল মাখিয়ে দিলেন এদিকে কাঁঠাল গাছটা কোথায় সেটাই বলতে পারছেন না? তার মানে যদ্দিন অভিন্ন দেওয়ানী আইন না করতে পারছেন তদ্দিন তাৎক্ষণিক তিনতালাকের কোন প্রতিকার করতে পারবেন না? ও হরি! তাহলে আর কী উদ্ধার করলেন মুসলমান মহিলাদের? না মানে এটা ঠিকই যে হিন্দুই হোক আর মুসলমানই হোক, মহিলাদের উদ্ধার করতে না পারলে ঠিক নায়ক হওয়া যায় না। আর এদেশের বাস্তবটা হল সত্যিকারের ক্ষমতার জায়গায় বেশিরভাগ ক্ষেত্রে পুরুষরাই বসে আছে, অতএব তারা অধিকার না দিলে মেয়েরা অধিকার পাবেও না। সুতরাং মোদীবাবুর দিকেই তো তাকিয়ে থাকতে হবে মুসলমান মহিলাদের অধিকার আদায়ের জন্যে। তিনিও যদি মুসলমান বোনেদের দুঃখে এরকম উদাসীন হন তাহলে চলে?

পুনশ্চ: এই স্ট্যাটাস যাঁরা পড়লেন তাঁদের মধ্যে যদি মোদীজির ঘনিষ্ঠ কেউ থাকেন, দয়া করে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে বলবেন মুসলমান বোনেদের উদ্ধারকার্য শেষ করতে বেশি দেরী না করতে কারণ হিন্দু বোনেরা অনেকে বড় কষ্টে আছেন। বিবাহবিচ্ছেদ তো ছেড়ে দিন, কাকে বিবাহ করবেন সেটা ঠিক করার অধিকারটুকু পাচ্ছেন না, বাপদাদার হাতে বেঘোরে খুন হচ্ছেন। অনেকে আবার সাহস করে বিয়েটা করে ফেলেও স্বামীর সাথে শান্তিতে থাকতে পারছেন না, স্বামীর নামে লাভ জিহাদ না কিসব অভিযোগ শুনছেন বাপের বাড়িতে ঘরবন্দী হয়ে। এঁরাই বা মোদীজি ছাড়া কার ভরসায় থাকবেন?

আমাদের কেউ নেই

এই মেরুকরণে বেশিরভাগ মুসলমান ভোট আর কিছু হিন্দু ভোট তাঁর দিকে পড়লেই তো কেল্লা ফতে। রামনবমীর মিছিলের পরে বোধহয় বুঝেছেন অঙ্ক মিলছে না, তাই এখন আবার নিজেকে বড় হিন্দু প্রমাণ করতে নেমে পড়েছেন। তাঁর পার্টি বজরংবলীর পুজো করছে। তিনি পুরীর মন্দিরে পুজো দিতে যাচ্ছেন, উল্টোরথেও জ্বলজ্বল করছেন। কিন্তু যা হবার তা তো হয়ে গেছে। এখন দুই ধর্মের নেতাদের গরম গরম বাণী দিচ্ছেন। এতদিন যে ইদ্রিশ আলিদের পুষলেন, সে পাপ ভাগীরথীতে ধোয়া যাবে কি?

মমতা ব্যানার্জি সত্যবাদী যুধিষ্ঠির — একথা ঘুমচোখে জিজ্ঞেস করলে বোধহয় পার্থ চ্যাটার্জিও বলবেন না। তবু রাজ্যপালের বিরুদ্ধে আমাদের মুখ্যমন্ত্রী যে অভিযোগ করেছেন সেটাকে অবিশ্বাস করার কারণ দেখছি না। তার কারণ দুটো। প্রথমত, কেশরীনাথ ত্রিপাঠী প্রাক্তন আর এস এস প্রচারক। আর এস এস দ্বারা শিক্ষিত একজন লোক ভারতীয় সংবিধানকে খুব সম্মান করে এবং নিজের সাংবিধানিক সীমা লঙ্ঘন না করার ব্যাপারে খুব সচেতন — এরকম দাবী করলে ভক্তরা যা-ই বলুন, প্রেতলোকে গোলওয়ালকর, হেড়গেওয়াররা খুব রেগে যাবেন। দ্বিতীয়ত, বিজেপি ব্লক সভাপতির মত কথা এই ভদ্রলোক বলেই থাকেন। কদিন আগে টাইমস অফ ইন্ডিয়ায় প্রকাশিত সাক্ষাৎকারেও বলেছেন।
কিন্তু সেটা প্রশ্ন নয়। প্রশ্ন হল ওভাবে কথা বলার সুযোগ ত্রিপাঠীমশাইকে কে করে দিল? উত্তর একটাই। মমতা ব্যানার্জি নিজে।
দেড়শো কোটির দেশে আজকাল মানুষ অপ্রতুল, কিন্তু গরুর কোন অভাব নেই। এক গরুর নিজের ভগবানের মহত্ত্বে এত ঠুনকো বিশ্বাস যে অন্যের ধর্মস্থানে তাঁকে না বসালে শরীরটা বেশ হিন্দু হিন্দু লাগে না। আরেকপাল গরুর আবার নিজের ধর্মের উপরে বিশ্বাস এত ঠুনকো যে সামান্য ফটোশপের ধাক্কাতেই তার অপমান হয় এবং ভাঙচুর, বাড়ি পোড়ানো, মারধর (গণপিটুনিরও দাবী ছিল) না করলে নিজেদের যথেষ্ট মুসলমান মনে হয় না।
কিন্তু কথা হচ্ছে মনে মনে তো অমন অনেকেই ভাবে। এই পরিমাণ হিংসা ছড়ানোর সাহস এদের হয় কখন? তখনই হয় যখন বিশ্বাস থাকে যে “আমার কিস্যু হবে না।” মমতা ব্যানার্জির সরকার সেই বিশ্বাস তৈরি করে দিয়েছেন। পশ্চিমবঙ্গে দীর্ঘকাল কোন সাম্প্রদায়িক সংঘর্ষ ছিল না। ২০১১ র পর থেকে, ২০১৬ র পরে বিশেষত, একের পর এক ঘটনা ঘটেই চলেছে। সৌভাগ্যক্রমে এর জেরে এখন পর্যন্ত কোন প্রাণহানি হয়নি, ধর্ষণের ঘটনা ঘটেনি। নইলে আরো বড় আকার নিত। এই ঘটনাগুলোর সবকটাতেই পুলিশ পৌঁছেছে হিন্দী সিনেমার পুলিশের মত দেরীতে। মালদা, চন্দননগর, ধূলাগড়, খড়গপুর, নদীয়া, অধুনা বাদুড়িয়া — এই সংঘর্ষগুলো কেন আগে থাকতে আটকানো গেল না সেটাও বড় প্রশ্ন। প্ররোচনা যে যাকেই দিয়ে থাক, সে প্ররোচনায় আগুন জ্বলার আগেই জল ঢালা গেল না কেন? সরকারের গোয়েন্দা বিভাগ তাহলে আছে কী করতে?
আসল কথা মমতা এক ভয়ঙ্কর খেলা শুরু করেছিলেন। এখন আর সামলাতে পারছেন না। বিজেপির হিন্দু মৌলবাদের মোকাবিলা করার বদলে মুসলমান মৌলবাদীদের তোল্লাই দিচ্ছিলেন। বস্তুত ক্ষমতায় আসার আগে থেকেই দিচ্ছিলেন। মুসলমানদের উন্নয়নের জন্যে হাতেকলমে কিছু করার বদলে নজর ছিল মাথায় কাপড় দিয়ে নমাজ পড়ার ভঙ্গিতে ছবি তোলার দিকে। হাস্যকরভাবে সরকারী হোর্ডিং এ লেখা হচ্ছে “নমস্কার এবং সালাম।” যেন বাঙালি মুসলমান কখনো “নমস্কার” শব্দটা উচ্চারণ করে না। এতে কোন গরীব মুসলমানের কোন উপকার হয়নি। যা হয়েছে তা হল ইসলামিক মৌলবাদীদের বিশ্বাস তৈরি যে “দিদি আমাদের কিচ্ছু বলবে না” আর অন্যদিকে হিন্দু মৌলবাদীদের কাজ সহজ করা। তারা দিব্যি হিন্দুদের মাথায় ঢুকিয়ে দিতে পারছে “দিদি ওদের লোক। হিন্দুবিরোধী।” একইসঙ্গে মমতার আমলে গ্রামে, মফঃস্বলে গত কয়েকবছরে আর এস এস কিভাবে বেড়েছে লক্ষ্য করলে বোঝা যায় সেটাও দিদির ইচ্ছা।
আদরের দিদি ভেবেছিলেন আর এস এস বাড়লে মুসলমানরা ভয় পাবে, তাঁকে রক্ষাকর্ত্রী হিসাবে দেখবে আর ঢেলে ভোট দেবে। অন্যদিকে মুসলমান মৌলবাদীদের ভয়ে হিন্দুরা যদি বিজেপির দিকে ঢলে পড়ে তো পড়ুক। এই মেরুকরণে বেশিরভাগ মুসলমান ভোট আর কিছু হিন্দু ভোট তাঁর দিকে পড়লেই তো কেল্লা ফতে। রামনবমীর মিছিলের পরে বোধহয় বুঝেছেন অঙ্ক মিলছে না, তাই এখন আবার নিজেকে বড় হিন্দু প্রমাণ করতে নেমে পড়েছেন। তাঁর পার্টি বজরংবলীর পুজো করছে। তিনি পুরীর মন্দিরে পুজো দিতে যাচ্ছেন, উল্টোরথেও জ্বলজ্বল করছেন। কিন্তু যা হবার তা তো হয়ে গেছে। এখন দুই ধর্মের নেতাদের গরম গরম বাণী দিচ্ছেন। এতদিন যে ইদ্রিশ আলিদের পুষলেন, সে পাপ ভাগীরথীতে ধোয়া যাবে কি?
এই অগ্নিগর্ভ পরিস্থিতিতে রাজ্যের প্রধান প্রশাসক কী বললেন? না তিনি রাজ্যপালের কথায় এতটাই অপমানিত যে পদত্যাগ করবেন ভেবেছিলেন। চমৎকার। বাড়িতে ডাকাত পড়েছে, দাদু সুযোগ পেয়ে চেঁচামেচি করছেন আর মা ছেলেমেয়েদের কী করে বাঁচাব সেটা না ভেবে বললেন “আমি অত্যন্ত অপমানিত। রান্নাঘরের জানলা দিয়ে বেরিয়ে যাব ভাবছিলাম। তারপর ভাবলাম আমি তো শ্বশুরমশাইয়ের মা নই, আমি ছেলেমেয়েদের মা। তাই গেলাম না। কিন্তু যেতে আমার দু মিনিট লাগবে।”
সঙ্কটমুহূর্তে পদত্যাগ যাঁর প্রথম প্রতিক্রিয়া, তিনি হচ্ছেন আমাদের মুখ্য প্রশাসক! আমাদের যে কে বাঁচাবে!
বিঃ দ্রঃ তৃণমূল, বিজেপি, জামাত ইত্যাদি ছাড়াও এ রাজ্যে আরেকটা রাজনৈতিক শক্তি নাকি আছে বলে খবর। তাদের নাম বামফ্রন্ট। তারা গরু নয়, কচ্ছপ। গতকাল কলকাতায় তারা একটা গনগনে মিছিল করেছে। কিসের বিরুদ্ধে? কলেজ স্কোয়ারে মিটিং, মিছিল নিষিদ্ধ করার প্রতিবাদে। নিষিদ্ধ করার ঘোষণাটা হয়েছিল প্রায় মাসখানেক আগে। অতএব ধৈর্য ধরতে হবে। আর মাসখানেক পরে ওঁরা সাম্প্রদায়িক রাজনীতির বিরুদ্ধে কিছু একটা করবেন আশা করা যায়।

বুদ্ধিজীবীর নিরপেক্ষতা : নিরপেক্ষতার ভন্ডামি

ভাবলে আরো অবাক লাগে যে হিটলারের বিরুদ্ধে শুধু ইহুদী বিজ্ঞানীরাই গিয়েছিলেন, খাঁটি জার্মান বিজ্ঞানীরা যাননি। ইতিহাস অবশ্য অন্যরকম বলছে। তবে সেক্ষেত্রেও ধরতে হবে ঐ জার্মানরা প্রশংসনীয় কিছু করেননি। আমি অবশ্য এত ভাবছি না। আমি মনে করছি কবি ইতিহাস পড়েন না। বড় কবি তো, শুধু কবিতাই পড়েন। অজস্র মধ্যমেধার বাঙালির মত সামান্য ‘বিশ্বাসঘাতক’ পড়াও তাঁর কাছে সময় নষ্ট।

রামকৃষ্ণ পরমহংস বলেছিলেন “যতদিন বাঁচি ততদিন শিখি”। আজ সকালে শিখলাম বাঙালি বুদ্ধিজীবীদের এখন এত বুদ্ধি যে আইওয়া পৌঁছলে তবে ইসলামিক স্টেট সম্পর্কে জানতে পারেন। এই শিক্ষাটি আমার হল আনন্দবাজার পত্রিকার উত্তর সম্পাদকীয় স্তম্ভে নামকরা সাহিত্যিক বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখাটা পড়ে। ওঁর কবিতা কিছু কিছু পড়েছি। বেশ লাগে। বলতে কি, শ্রীজাতর চেয়ে বেশি ভাল লাগে। তার উপর আজকের লেখার শিরোনামটার সাথে একমত না হওয়ার কোন প্রশ্নই নেই: “সময় এসেছে ধর্ম না দেখে বিপন্নের পাশে দাঁড়ানোর”। অতএব লেখাটা গোগ্রাসে গিলতে গেলাম। আশা করেছিলাম লেখাটা ভাল হবে। এতটা শিক্ষামূলক হবে ধারণা করতে পারিনি।
কবি লিখছেন “গুজরাত দাঙ্গার পর দু’মাসের মাইনে দিয়েছিলাম। হেঁটেছিলাম বেশ অনেকগুলো মিছিলে। (তখনও জুকেরবার্গ ফুটেজ-বিপ্লবী হওয়ার সুযোগ করে দেননি)। তা সেই মিছিলের কয়েকটায় মহম্মদ সেলিম নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। কই সেলিম সাহেবকে কেউ মুসলিম সাম্প্রদায়িক বলেনি তো! আইনস্টাইন যখন রুজভেল্টকে চিঠি লিখেছিলেন ইহুদিদের বাঁচাবার জন্য, কেউ কি তাঁকে ইহুদি-সাম্প্রদায়িক বলেছিলেন? মার্টিন লুথার কিং যে শ্বেতাঙ্গদের অত্যাচারের মোকাবিলা করার জন্য কৃষ্ণাঙ্গদের একে অপরের প্রতি “এক্সট্রিম ইন লাভ” হয়ে উঠতে বলতেন, তার জন্য কি কেউ বলেন যে উনি কৃষ্ণাঙ্গ সাম্প্রদায়িক?”
ইঙ্গিতটা বোঝা গেল? তিনটে উদাহরণ। একটাই মিল। মহম্মদ সেলিম জন্মসূত্রে মুসলমান, মিছিলটা ছিল ব্যাপক মুসলমান হত্যার বিরুদ্ধে। আইনস্টাইন জন্মসূত্রে ইহুদি, আবেদনটাও ছিল ইহুদিদের বাঁচানোর (যদিও এখানে কবি কোন চিঠির কথা বলছেন বুঝলাম না। কারোর জানা থাকলে জানাবেন। জানতে চাই। ম্যানহাটন প্রোজেক্ট নিয়ে চিঠিটা ঠিক ইহুদিদের বাঁচানোর জন্যে লেখা হয়েছিল বলে তো মনে হয় না)। মার্টিন লুথার কিং নিজে কৃষ্ণাঙ্গ, কৃষ্ণাঙ্গদের এক হতে বলেছিলেন।
অর্থাৎ কবি ইঙ্গিত করছেন এঁদের কার্যকলাপ যে বিপন্ন মানুষের পাশে দাঁড়ানো বলে প্রশংসনীয় তা নয়, এঁরা নিজ নিজ কৌমের পাশে দাঁড়িয়েছেন বলে প্রশংসনীয়। ভেবে অবাক লাগছে যে ২০০২ এ সিপিএম নেতা মহম্মদ সেলিম একটা মিছিলে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন যেখানে জন্মসূত্রে হিন্দু কোন সিপিএম নেতা যাননি। মানে বিনায়কবাবু তো তেমন কারো নাম করেননি দেখছি। কেউ গিয়ে থাকলে অবশ্য সেটা প্রশংসনীয় নয়। তাঁদের এখন বিবেকের দংশন হওয়া উচিৎ। যেমনটা বিনায়কবাবুর নিজের হচ্ছে। নিজের কৌমের পাশে না দাঁড়িয়ে অন্য কৌমের পাশে কেউ দাঁড়াতে যায়?
ভাবলে আরো অবাক লাগে যে হিটলারের বিরুদ্ধে শুধু ইহুদী বিজ্ঞানীরাই গিয়েছিলেন, খাঁটি জার্মান বিজ্ঞানীরা যাননি। ইতিহাস অবশ্য অন্যরকম বলছে। তবে সেক্ষেত্রেও ধরতে হবে ঐ জার্মানরা প্রশংসনীয় কিছু করেননি। আমি অবশ্য এত ভাবছি না। আমি মনে করছি কবি ইতিহাস পড়েন না। বড় কবি তো, শুধু কবিতাই পড়েন। অজস্র মধ্যমেধার বাঙালির মত সামান্য ‘বিশ্বাসঘাতক’ পড়াও তাঁর কাছে সময় নষ্ট।
ভাল হত কবি যদি এই “নিজের কৌমের পাশে দাঁড়ান” কথাটাই সোচ্চারে গোটা লেখাটা জুড়ে বলতেন। তত্ত্বটা মানতে না পারলেও অন্তত বুঝতাম লোকটার সাহস আছে। কিন্তু না, সে সৎসাহস তিনি দেখাতে পারেননি। এরপরেই শুরু করেছেন, যাকে আজকাল ইংরিজিতে অনেকে বলেন whataboutery।
“কে বলবে এগুলোর বিরুদ্ধে? আমি নিজেই কি বলেছি? বলিনি বলেই মাথা নিচু হয়ে গেল যখন মল্লারপুরের একটি ছেলে বইমেলায় আমাকে বলল, ‘দাদরির পর আপনি খবরের কাগজে লিখেছিলেন, কিন্তু কই আমাদের ইন্দ্রজিৎকে যখন পিটিয়ে মেরে দিল, তখন কিছু লিখলেন না তো?’
কে ইন্দ্রজিৎ? আখলাখের মতো তাকেও পিটিয়ে মারা হয়েছে? জানি না তো! কোথায় ধূলাগড়? উস্তি-ক্যানিং-কালিয়াচক-সমুদ্রগড়-দেগঙ্গা কোথায়? এই পৃথিবীতে? সেখানে যাদের বাড়ি পোড়ানো হয়েছে তারা কারা? মানুষই তো?”
এই অংশটা পড়ে ইন্দ্রজিৎ কে সেটা আমারও মনে পড়েনি। তাই ইন্টারনেট ঘাঁটাঘাঁটি করতে হল। করে যা বেরোল তা হচ্ছে বীরভূম জেলার একটি ঘটনা। ‘দ্য হিন্দু’ র প্রতিবেদনে পেলাম ইন্দ্রজিৎ দত্ত বলে এক দোকানদারকে মহরম উপলক্ষে অনেক টাকা চাঁদা দিতে বলা হয়েছিল বলে অভিযোগ। দিতে আপত্তি করায় তাকে মারধোর করা হয় এবং সেই আঘাতের ফলেই কদিন পরে হাসপাতালে তার মৃত্যু হয়। অত্যন্ত দুঃখজনক এবং প্রশাসনের অপদার্থতাজনিত মৃত্যু। কিন্তু আখলাক হত্যার সাথে তুলনাটা মেনে নেওয়া শক্ত। চাঁদার জুলুম আমাদের কারো অপরিচিত নয়, তার জেরে মৃত্যু বিরল হলেও। কিন্তু সেই মৃত্যুর সঙ্গে তুলনা করছেন একটি সংগঠিত হত্যার যার কারণ একজন মানুষের খাদ্যাভ্যাস! তার উপর তন্নতন্ন করে খুঁজেও এমন কোন খবর পেলাম না যে শাসকদলের কেউ ইন্দ্রজিতের হত্যাকারীর পক্ষে একটি কথা বলেছে। আখলাকের বেলায় কিন্তু এক অভিযুক্তের ম্যালেরিয়ায় মৃত্যু হওয়ার পর তাকে জাতীয় পতাকায় মোড়া হয়েছিল এবং এক কেন্দ্রীয় মন্ত্রী গিয়ে শেষ শ্রদ্ধা জানিয়ে এসেছিলেন। একজন কবি তুলনা করছেন এই দুটো ঘটনার? কবিরা আত্মভোলা হন শুনেছি, কাণ্ডজ্ঞানশূন্যও হন নাকি? আরো হাসির কথা এই যে বিনায়কবাবু এই হত্যাকে ভারতে আইসিসের জিহাদের এক নিদর্শন বলে ধরেছেন। চাঁদা দেয়নি বলে পিটিয়ে মারা যদি আন্তর্জাতিক জিহাদ হয়, তাহলে বলতে হবে পাড়ার তোলাবাজের সাথে এল বাগদাদির পার্থক্য কেবল পরিমাপগত।
গত দুবছরে পশ্চিমবঙ্গে বিভিন্ন জায়গায় সাম্প্রদায়িক অশান্তি লেগেছে। মানুষের ঘরবাড়ি পুড়েছে। প্রশাসনের গড়িমসি বারবার প্রকট হয়েছে। সেজন্যে সাধারণ মানুষ, বুদ্ধিজীবী, বিরোধী দল সকলেই সরকারের অপদার্থতার দিকে আঙুল তুলেছেন, সে বিনায়কবাবু যতই বলুন হিন্দুদের জন্য কেউ বলে না। তবু পশ্চিমবঙ্গ সরকারের বিরুদ্ধে যদি এই কারণে তিনি বিষোদগার করতেন একটুও অন্যায় হত না। কিন্তু আশ্চর্যের কথা তাঁর আক্রমণের লক্ষ্য মোটেও সরকার নয়। লেখার শেষ প্যারায় গিয়ে কবি বলছেন “বাড়িতে লক্ষ্মীপুজো-সরস্বতীপুজো-বারের উপোস, নাতির পইতে, দাদুর শ্রাদ্ধ, সব কিছু করার পরে ফেসবুকে নিজেকে ‘নাস্তিক’ দাবি করার এলিটিস্ট ভণ্ডামি এক জন মুসলমান কল্পনাও করতে পারেন না। পারেন না বলেই, কোথাও কোনও মুসলমান অত্যাচারিত হলে তিনি বুক চিতিয়ে তার পাশে দাঁড়ান। দাঁড়ান এক জন মানুষের পাশে আর এক জন মানুষের যে-ভাবে দাঁড়ানো উচিত, সে-ভাবেই। প্রাজ্ঞ হিন্দুরা কবে এক জন অত্যাচারিত হিন্দুকেও মানুষ ভাবতে পারবেন? কবে বলতে পারবেন, সতেরো জন হিন্দু সন্ন্যাসীকে পেট্রোল ঢেলে পুড়িয়ে মারা অন্যায় হয়েছিল? কবে আমি দেগঙ্গা কিংবা ক্যানিং-এর রাস্তায় দাঁড়িয়ে, চিৎকার করে বলতে পারব, ‘প্লিজ পানিশ মি অলসো। আই হ্যাভ ডিসাইডেড টু কল মাইসেলফ, আ হিন্দু।'”
বুঝুন। হিন্দুদের প্রতি যত অত্যাচার, অনাচার, অবিচার হচ্ছে সবের জন্যে দায়ী হলেন সেইসব হিন্দুরা যাঁরা নিজেদের নাস্তিক বলে দাবী করেন। ধূলাগড়, দেগঙ্গা ইত্যাদির জন্যেও দায়ী হলেন নাস্তিকরা। কবিপ্রতিভা এখানে কি মারাত্মক বাইনারি নির্মাণ করল আসলে দেখুন, শিখুন।
বলা হল মুসলমানদের মধ্যে নাস্তিক-ফাস্তিক কেউ হয় না এবং মুসলমান সবসময় মুসলমানের পাশে দাঁড়ায়। অতএব আপনি যদি হিন্দু হন তাহলে ওসব নাস্তিক হওয়াটওয়া ত্যাগ করুন, হিন্দুর পাশে দাঁড়ান। লেখায় অনেক আগেই বলা হয়েছে যে ভারতে আইসিস ঠিক কত হাজার কোটি টাকা যে ঢোকাচ্ছে সেটা “সতর্ক করতে চাইলেও যাঁরা সতর্ক হন না, যাঁরা বিশ্বাস করেন অন্ধ হলেই প্রলয় বন্ধ থাকবে, সেই পণ্ডিতদের” জানা নেই (কবির যখন জানা আছে তখন তিনি কেন লিখলেন না সে-ও এক রহস্য)। অর্থাৎ ধর্মযুদ্ধ শিগগির শুরু হবে, আপনি যদি নাস্তিক হন বা সংখ্যালঘুর প্রতি সংবেদনশীল হন, তার মানে আপনি হিন্দু হয়ে হিন্দুর সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করছেন।
হিন্দু এদেশে কিরকম নিপীড়িত, কেমন কুকুর বেড়ালের মত তাদের রাখা হয়েছে সেকথা প্রমাণ করতে কবি বাংলাদেশী হিন্দু, কাশ্মীরি পন্ডিত সকলকেই টেনে এনেছেন। যখন আর কুলোয়নি তখন সেই আশির দশকের বিজন সেতু অব্দি পৌঁছে গেছেন। কিন্তু এত চোখের জলেও বাঁকা হাসিটা লুকনো গেল না। “কাশ্মীরের যে পণ্ডিতগুলো দিল্লির রাস্তায় কাতরাচ্ছে গত পঁচিশ বছর, তাদের যন্ত্রণাতেও কারও বুকটা টনটন করে উঠলে সে তৎক্ষণাৎ বিজেপি বলে চিহ্নিত হয় কেন?” কে যে ওঁকে বিজেপি বলে চিহ্নিত করল উনিই জানেন। গোটা লেখায় যা যা বিজেপির বক্তব্য ঠিক তাই তাই বললেন, তারপর জানিয়ে দিলেন ওঁকে কিন্তু বিজেপি বলা চলবে না।
শিক্ষিত বিজেপি সমর্থকদের এই অভ্যেসটা অননুকরণীয়। সিপিএমের এই দুর্দিনেও কোন সমর্থককে আপনি বলতে শুনবেন না সে কোন পার্টির সমর্থক নয়। কংগ্রেস সমর্থকও তাই। এ রাজ্যে প্রবল প্রতাপান্বিত তৃণমূল সমর্থকরা তো সোচ্চার দিদিভক্ত। কিন্তু বিজেপিভক্ত নরেন্দ্র মোদীর ছবি বুকে আটকেও বলে “আমি কোন পার্টির সাপোর্টার নই।” ওদেরই সবার সমঝে চলা উচিৎ। ওরা কোথায় রেলা নেবে, তা নয়। আসলে সারাক্ষণ যারা ভয় বিক্রি করে তারাও ভীত হয়ে থাকে। বিনায়কবাবুর মত আপনার যদি সিরিয়া, তুরস্কের মুসলমানের আজানের সুর ভাল লাগে অথচ এদেশের কোটি কোটি মুসলমানের এক শতাংশেরও কম যুবকের আইসিসে যাওয়া দেখে মনে হয় ঘরে ঘরে জিহাদের প্রস্তুতি চলছে, তাহলে আর আপনি রেলায় থাকবেন কী করে?
এই রাজ্যে এখনো এক বোকা কবি আছেন যিনি বলেন সত্য বলা ছাড়া কবিতার আর কোন কাজ নেই। চতুর কবি বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায় অবশ্য তথ্যের বা বাস্তবের ধার না ধেরে দিব্যি ভয় ছড়ানোর কাজটা করেছেন। সত্য নয়, এখন যে উত্তরসত্যের যুগ।

%d bloggers like this: