পাঠশালা বন্ধ?

অন্তত একজন মাস্টারমশাইকে চিনি যিনি খুব ছোটবেলায় পিতৃহীন হন, বাবা খুব সামান্য কাজ করতেন। তাঁর মৃত্যুর পর মা লোকের বাড়িতে বাসন মাজা, কাপড় কাচার কাজ করে ছেলেকে বড় করেন। আমার বছর কুড়ির ছাত্রজীবনে অন্তত পাঁচ জন সহপাঠীকে পেয়েছি যারা প্রথম প্রজন্মের পড়ুয়া, কিন্তু মেধা এবং পরিশ্রম করার ক্ষমতায় অন্য সকলের চেয়ে দু তিন গুণ এগিয়ে। নিজেদের ক্ষমতার সদ্ব্যবহার করে তারা সাফল্যের শীর্ষে পৌঁছেছে। প্রাথমিক স্তরে একটা স্কুলে দু দফায় দু তিন বছর পড়েছিলাম, যেখানে প্রত্যেক ক্লাসে প্রায় নব্বই শতাংশ পড়ুয়াই প্রথম প্রজন্মের। আমার বাবা যে স্কুলের শিক্ষক ছিলেন সেই স্কুলেরও অনেক ছাত্রছাত্রী স্কুল শেষ করতে পারত না। লেখাপড়ার চেয়ে, পরীক্ষা পাশ করার চেয়ে গ্রাসাচ্ছাদনের তাগিদ তাদের এবং তাদের পরিবারের অনেক বেশি। বাবার মুখে শুনতাম, এখন গঞ্জ এলাকার স্কুলশিক্ষিকা স্ত্রীর কাছেও শুনি, অনেক ছাত্রীর মেধা থাকা সত্ত্বেও বিয়ে হয়ে যায় মাধ্যমিক বা উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা দেওয়ার আগেই। বেশি লেখাপড়া শিখলে পাত্র পাওয়া মুশকিল হবে, বরপণের অঙ্কটা তখন নাগালের বাইরে চলে যাবে। অনেক ছাত্রী স্কুলে এসে থেকে কেবল জানতে চায় কখন মিড ডে মিল পাওয়া যাবে, কারণ বাড়ি থেকে ভরপেট ভাত খেয়ে আসার সৌভাগ্য তাদের হয় না।

এই আমাদের দেশ। এ দেশের শিক্ষানীতি নিয়ে আমরা কথা বলছি।

এটা মার্ক জুকরবার্গের দেশ নয়। আমরা ক্রমশ ভুলে যাচ্ছি যে সুন্দর পিচাই, সত্য নাডেলারা এখানে ব্যতিক্রম, নিয়ম নয়। আর তাদের গুগল, মাইক্রোসফটের সি ই ও হয়ে বসায় এ দেশের একটি মানুষেরও এক কণা লাভ হয়নি। ওগুলো কোন ঐতিহাসিক ঘটনা নয়, কারণ ওতে ওঁদের দুজনের ব্যাঙ্ক ব্যালান্স ফুলে ফেঁপে ওঠা ছাড়া পৃথিবীর আর কারো কোন লাভ বা ক্ষতি হয়নি। প্রথম অনুচ্ছেদে যাদের কথা লিখেছি, তারাই এ দেশের মানুষ এবং সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ। আমার পরিচিত মাস্টারমশাই যে শেষ পর্যন্ত মাস্টারমশাই হতে পেরেছেন, আমার ঐ সহপাঠীরা কেউ কেউ বিদেশের নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা করে, অধ্যাপনা করে তাক লাগিয়ে দিতে পেরেছে, তার কারণ অনেক দূর পর্যন্ত তাদের পড়াশোনার খরচের সিংহভাগ বহন করেছিল সরকার। তখনো বিপুল মাইনের বেসরকারী স্কুলে দিগ্বিদিক ভরে যায়নি (বিশেষত যারা অভিভাবকদের বলতে পারে দরকার হলে বাড়ির জিনিসপত্র বিক্রি করে মাইনে দিন, নয়ত স্টুডেন্টকে নিয়ে যান), টাকা থাকলেই ডাক্তারি বা ইঞ্জিনিয়ারিং এ ভর্তি হওয়ার ঢালাও সুযোগ ছিল না। কিন্তু মেধা থাকলে পড়া আটকাত না। কারণ পড়তে পুঁজির দরকার হত না, সরকারই ছিল মধ্যবিত্ত এবং গরীব বাবা-মায়ের পুঁজি। “লম্পট”, “দুশ্চরিত্র”, “দুর্বল” প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু আর তাঁর বিরোধীদের আসনে থাকা “গোঁড়া”, “সেকেলে”, “শিল্পবিরোধী”, “দেশদ্রোহী” বামপন্থীরা এমন ব্যবস্থা করেছিলেন যাতে নিম্নবিত্ত, মধ্যবিত্ত জানত দারিদ্র্যের অন্ধকার থেকে বেরিয়ে আসার সবচেয়ে বড় সুযোগ লেখাপড়া করা। এমন নয় যে তখন পাশ করলেই টপাটপ চাকরি জুটে যেত, দেশে বেকারত্ব ছিলই না। কিন্তু মেধা আছে, পুঁজি নেই বলে লেখাপড়া শেষ হবে না — এমনটা ক্রমশ বিরল হয়ে উঠছিল।

সে ধারা গতিপথ বদলাতে শুরু করেছিল আজকের উচ্চবিত্তদের পরম পূজ্য মনমোহন সিং আর নরসিমা রাওয়ের আমল থেকে। আমাদের ছাত্রজীবনের শেষদিকেই দেখেছি অনেকে উষ্মা প্রকাশ করছে “ব্যাঙ্গালোর ট্যাঙ্গালোরে কত অপশন। একটু টাকা খরচ করলেই ডাক্তারি, ইঞ্জিনিয়ারিং পড়া যায়। এখানে লেফটিস্টগুলো না ইন্ডাস্ট্রি রেখেছে, না কলেজ খুলতে দিচ্ছে।” কোয়ান্টিটি-কোয়ালিটির ব্যস্তানুপাতিক সম্পর্কের কথা তখন কেউ শুনতে চায়নি। বামফ্রন্ট সরকারও, শেষ অবধি, ঢালাও কলেজ খোলার অনুমতি দিলেন। ক্যাপিটেশন ফি কথাটা আমাদের অভিধানে জাঁকিয়ে বসল। সেই সঙ্গে পাড়ায় পাড়ায় ইংরেজি মাধ্যম স্কুলের রমরমা হল। তাদের সোম, বুধ, শুক্র একরকম ইউনিফর্ম; মঙ্গল, বৃহস্পতি অন্যরকম। সেখানে না পড়লে মনুষ্য জন্ম বৃথা বলে জানা গেল। ভদ্রসন্তানদের ইংরেজি শিখতে না দেওয়ার বামপন্থী চক্রান্তের বিরুদ্ধে সে এক যুগান্তকারী আন্দোলন। কোন মাধ্যমে পড়াশোনা হচ্ছে সেটাই হয়ে দাঁড়াল মুখ্য। কী পড়ানো হচ্ছে, কত ভাল পড়ানো হচ্ছে, কারা পড়াচ্ছেন — সেসব ছেঁদো ব্যাপার হয়ে গেল। সরকারী স্কুলগুলো হয়ে পড়ল প্রান্তিক। কারণ ভদ্রসন্তানরা আর ওমুখো হলেন না, ফলে মাস্টারমশাই দিদিমণিদের পড়ানোর উৎসাহ তলানিতে পোঁছাল। ঝাঁ চকচকে ইংরেজি মাধ্যম স্কুল নেই যে গ্রামাঞ্চলে তার কথা আলাদা। শহর বা মফস্বলে যারা লোকের বাড়িতে কাজ করে বা রিকশা চালায় বা ভাগচাষী, তাদের ছেলেমেয়েদের আবার কিসের মেধা? কী হবে তাদের লেখাপড়া শিখে? পথে দেখা হতে আমাদের এলাকার নামকরা ছেলেদের স্কুলের প্রধান শিক্ষক একদিন হতাশ গলায় বললেন “আগে আমাদের স্কুলে পড়ত ডাক্তার, মাস্টার, ইঞ্জিনিয়ার, অফিসারদের ছেলেরা। এখন কারা পড়ে জানিসই তো। এদের নিয়ে আর কী লেখাপড়া হবে?”

সেই কারণেই সরকারী স্কুল সরকারের নিজেরও দুয়োরানি হয়ে গেল। মুখ্যমন্ত্রী বেসরকারী স্কুলের ফি নিয়ে গণ্ডগোল মেটাতে নিজে আসরে নামেন, কিন্তু সরকারী স্কুলে শিক্ষক নিয়োগের পরীক্ষা বন্ধ হয়ে যায়, নামমাত্র মাইনেয় কাজ করে যান প্যারা টিচাররা। অনশন করতে গিয়ে পথের পাশে মারা যান, কাগজের ভিতরের পাতায় খবর হয় আর মহামান্য আদালত নির্দেশ দেন এমন জায়গায় আন্দোলন করতে হবে যেখানে কারোর অসুবিধা হবে না।

এইসব ভাবনাতেই শিলমোহর দিল নতুন জাতীয় শিক্ষানীতি। ফ্যালো কড়ি, মাখো তেল। যাদের বাবা-মায়ের সঙ্গতি আছে সেই ভদ্রসন্তানরা দামী স্কুল কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে যাবেন। যত যাবেন তত গরীব, সংখ্যালঘু, নিম্নবর্গীয়, জাতি উপজাতির মানুষই কেবল পড়ে থাকবেন সরকারী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে। আর তাঁদের লেখাপড়া করা যে তেমন জরুরী নয় সে সিদ্ধান্ত সমাজ এবং সরকার তো নিয়েই রেখেছে। তাছাড়া সরকারী প্রতিষ্ঠানের আর কী দাম থাকবে? সরকারী পক্ষপাত তো রিলায়েন্স ইউনিভার্সিটির মত বেসরকারী প্রতিষ্ঠানের প্রতিই। তাছাড়া নতুন শিক্ষানীতি বলেই দিয়েছে “চরে খাও।” রামকৃষ্ণ মিশন বা সেন্ট জেভিয়ার্সের মত হাতে গোনা কিছু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ছাড়া কে আর চরে খেতে পারবে? মাইনে বাড়বে। মধ্যবিত্ত ঋণ নেবে, নিম্নবিত্ত পড়া ছেড়ে দেবে। এ হেন বেসরকারীকরণে ভদ্রলোকদের খুশি হওয়ার মত আরেকটা ব্যাপার ঘটবে। যাদের তাঁরা “সোনার চাঁদ, সোনার টুকরো” বলেন, তাদের লেখাপড়া করা কমে যাবে। এমনিতেই বহু জায়গায় সংরক্ষিত আসনগুলো পূরণ হয় না (তথাপি জেনারেল ক্যাটেগরি ‘বঞ্চিত’), এরপর যেমন-খুশি-ফি-বাড়াও ব্যবস্থায় আরো কম ছাত্রছাত্রী ভর্তি হবে। কারণ ভদ্রলোকদের মস্তিষ্কের গভীরে প্রবিষ্ট প্রোপাগান্ডা যা-ই বলুক, ভারতের গরীব মানুষদের মধ্যে বামুন, কায়েতদের চেয়ে তফসিলি জাতি উপজাতিভুক্ত মানুষের সংখ্যা অনেক বেশি।

আপনি ফোনে, ট্যাবে, ল্যাপটপে বা ডেস্কটপে এতদূর পড়ে ভাবছেন বাজে সময় নষ্ট হল। ফালতু লোকেদের জন্য এত অশ্রুপাত কিসের? আমার জন্য, আমার ছেলেমেয়ের জন্য তো নতুন শিক্ষানীতি অনেক দ্বার খুলে দিল। সত্যি কি তাই? নতুন ব্যবস্থায় আপনারাও ফালতু লোকেদের দলে পড়ে যাবেন না তো? মনে রাখবেন, এখন থেকে কিন্তু ডিগ্রির দাম আর আগের মত থাকবে না। ফার্স্ট ইয়ারে পড়া ছেড়ে দিলে সার্টিফিকেট, সেকেন্ড ইয়ারে ছাড়লে ডিপ্লোমা, শেষ অব্দি পড়লে ডিগ্রি। অধ্যবসায়ের বিশেষ দাম থাকল কি? চাকরির বাজারে এমন ডিগ্রির দাম থাকবে তো? ফিজিক্সের সাথে ইতিহাস পড়া যাবে শুনতে রোমহর্ষক। কিন্তু অঙ্ক আর কেমিস্ট্রি না পড়ে ইতিহাস পড়লে ফিজিক্স শেখা যাবে তো? অন্তত চাকরি বাকরি পাওয়ার মত শেখা সম্ভব হবে তো? যে সরকার এই শিক্ষানীতি বানিয়েছেন তাঁরা আবার মেকলের শিক্ষাব্যবস্থার বড় সমালোচক, কারণ ওটা ছিল ইংরেজ সরকারের কেরানি তৈরি করার ব্যবস্থা। তার বদলে এঁরা এনেছেন বহুজাতিকের বাধ্য কর্মী তৈরির ব্যবস্থা, তাই স্কুলস্তর থেকেই স্থানীয় ব্যবসায় ইন্টার্নশিপের ব্যবস্থা। কিন্তু সেটাও সুচারুভাবে সম্পন্ন হবে তো? তাছাড়া শিক্ষক শিক্ষিকাদের মেধাও তো এবার থেকে বাজারের পণ্য হয়ে গেল, তারও দরাদরি হবে। ইতিমধ্যেই উচ্চশিক্ষায় পার্ট টাইমার দিয়ে কাজ চালানো দস্তুর হয়ে গেছে। এমতাবস্থায় উচ্চশিক্ষিত ছেলেমেয়ে তার যোগ্যতার উপযুক্ত দাম পাবে তো?

পাঠ্যক্রম কী হবে সে আলোচনায় কালক্ষেপ করা উচিৎ হবে না। যে যে রাজ্যে বিজেপি ক্ষমতায় এসে গেছে সেখানকার খবর রাখলেই সহজে আন্দাজ করা যায় নজরুল, সুকান্ত বাদ যাবেন। রবীন্দ্রনাথ টিকে গেলেও যেতে পারেন, তবে ‘ভারততীর্থ’, ‘হে মোর দুর্ভাগা দেশ’ ইত্যাদি কবিতাগুলো ছেলেমেয়েদের ত্রিসীমানায় ঘেঁষতে দেওয়া হবে না। বাংলার ইতিহাস ব্যাপারটা বাদ দেওয়াই ভাল হবে, কারণ সেই পাল যুগ থেকে শুরু করে পলাশীর যুদ্ধ অব্দি কেবল বিধর্মীদের রমরমা তো। আর উনবিংশ শতকের সমাজ সংস্কার আন্দোলন ব্যাপারটা একদম পড়ানো যাবে না। ঐ সময়েই তো বাঙালিরা সব অহিন্দু ম্লেচ্ছ হয়ে গেল। রামমোহন বলে একটা লোক গভর্নর জেনারেলকে চিঠি লিখল (ডিসেম্বর ১৮২৩), এ দেশের যুবকদের সংস্কৃত পড়ানোয় অত মন না দিলেও চলবে। ইংরেজি পড়ান, আধুনিক দর্শন পড়ান। মানে লোকটা কেবল পবিত্র সতীদাহ প্রথা তুলে দিয়েই ক্ষান্ত হয়নি। ও আপদ বিদেয় হতে না হতেই আবার ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর বলে আরেকজন হাজির। সে আরো বড় বিপদ। কেবল বিধবাদের বিয়ে দিয়েছে, মেয়েদের লেখাপড়া শিখিয়েছে তা নয়; পণ্ডিতদের সাথে, ব্যালান্টাইন সাহেবের সাথে ঝগড়া করে বেদ, বেদান্ত, সংস্কৃতকে পাশে সরিয়ে দিয়ে ইংরেজি আর পাশ্চাত্য জ্ঞান বিজ্ঞান শিক্ষার পাকা ব্যবস্থা করেছে। ওসব পড়েই তো দেশটা উচ্ছন্নে গেছে। যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামো, গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র — এসব বুদ্ধি তো ঐ পশ্চিমের জানলা গলেই ঢুকে পড়েছে।

অবশ্য বাংলা ভাষাটাই তো থাকবে না, বাংলার ইতিহাসের কথা আসছে কোথা থেকে? ইংরেজি মাধ্যমে তো পড়াতে দেবেন না বলছেন সরকার। তা আপনারা যারা ছেলেমেয়েকে ইংরেজি মাধ্যমে পড়াতে চেয়েছিলেন, তারা কি আর বাংলা মাধ্যমে পড়াবেন এখন? তা তো হয় না। সরকার জানেন সে কথা। তাই বলবেন হিন্দি মাধ্যমে পড়াতে। বোকা তামিলদের তাতে আপত্তি থাকতে পারে, আপনাদের তো নেই। এমনিতেই তো ছেলেমেয়ের সেকেন্ড ল্যাঙ্গুয়েজ হিন্দি করে রেখেছেন অনেকে।

নয়া শিক্ষানীতি কি জয়, হিন্দি মিডিয়াম কি জয়।

ব্যর্থ নমস্কার

প্রথমে ভেবেছিলাম এই বিষয়ে একটা লাইনও লিখব না। প্রবৃত্তি হচ্ছিল না। বাস্তবিক যা ঘটেছে এবং ঘটছে তা দেখে বমি পাচ্ছিল। কিন্তু শেষ অব্দি ভেবে দেখলাম ইতরামির স্বর্ণযুগে প্রবৃত্তির দোহাই দিয়ে চুপ করে থাকা অপরাধমূলক কাজ। যারা ভালবাসো, অন্তর হতে বিদ্বেষ বিষ নাশো ইত্যাদি ভাল ভাল কথা বলেছিলেন, দুর্দিনে দাঁড়িয়ে আমাদের কবীন্দ্র স্বয়ং তাঁদের ব্যর্থ নমস্কারে ফিরিয়ে দিয়েছেন। আমি কোন হরিদাস পাল? তাই সংক্ষেপে কয়েকটা কথা বমি করার মত করেই উগরে দিই।
ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের মূর্তি কেন ভাঙা হয়েছে তা নিয়ে কোন সন্দেহের অবকাশ নেই। অত বিশালকায় বাঙালি আর কে-ই বা আছেন? ওঁকে না ভাঙলে বাংলাকে কী করে ভাঙা যাবে? আমার নিজের অন্তত কারা ভেঙেছে তা নিয়েও কোন সন্দেহ নেই, যতক্ষণ না তদন্ত অন্যরকম প্রমাণ করছে। কিন্তু বলার কথা এই যে বাঙালির ভণ্ডামি যারা মূর্তি ভেঙেছে তাদেরই হাত শক্ত করছে।
যত লোক ফেসবুকে বিদ্যাসাগরকে ডিপি বানিয়েছে তার অর্ধেকও যদি ফেসবুকে বাংলায় পোস্ট করার অভ্যাস রাখত, হোয়াটস্যাপে বাংলায় চ্যাট করত তাহলে বাংলার রাজধানীতে বিদ্যাসাগরের মূর্তি ভাঙার সাহস কারো হত না। কলকাতা জুড়ে কয়েকশো ইংরিজি মাধ্যম স্কুল। সেই স্কুলে পাঠরত লক্ষ লক্ষ বাঙালি ছেলেমেয়ে যদি অন্তত দ্বিতীয় ভাষা হিসাবেও বাংলা পড়ত, তাহলে আমাদের বিদ্যাসাগরকে নিয়ে গদগদ হওয়ার একটা মানে থাকত। কিন্তু তারা পড়ে হিন্দি। বাবা-মায়েরা গর্ব করেন “জানেন দাদা, আমার ছেলের বাংলাটা ঠিক আসে না।“ এদিকে বিদ্যাসাগরের মূর্তি ভাঙা হয়েছে বলে লোকে কেঁদে ভাসাচ্ছে।
রাজ্যের বাংলা মাধ্যম স্কুলগুলো শিক্ষক শিক্ষিকার অভাবে ধুঁকছে, ছাত্রছাত্রীর অভাবে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। বেশিদিন আগের কথা নয়, স্বয়ং বিদ্যাসাগরের প্রতিষ্ঠা করা স্কুল বন্ধ হয়ে যেতে বসেছিল। আমাদের মধ্যে যাঁদের কথা কম, কাজ বেশি তাঁরা আপাতত বাঁচিয়েছেন। আমরা কেউ সেসব নিয়ে ভাবি? বিদ্যাসাগর অবিভক্ত বাংলায় ঘুরে ঘুরে স্কুল স্থাপন করেছিলেন। কেন? যাতে শিক্ষার আলো সবচেয়ে প্রত্যন্ত গ্রামে, সবচেয়ে গরীব মানুষটার ঘরেও পৌঁছায়। এবং সেটা সম্ভব একমাত্র জোরালো সরকারপোষিত শিক্ষাব্যবস্থা থাকলে তবেই। অথচ আমাদের এখানে সরকারী শিক্ষাব্যবস্থার মুমূর্ষু অবস্থা নিয়ে আমাদের কারোর মাথা ব্যথা আছে? বেসরকারী স্কুলগুলোর বেশি ফি এর জন্যে মুখ্যমন্ত্রী একদিন মালিকদের ডেকে ধমকালেই তো আমরা খুশি। বিদ্যাসাগরের শিক্ষা গোল্লায় যাক, যতক্ষণ হাতে কলমে মূর্তি না ভাঙা হচ্ছে ততক্ষণ সব ঠিক আছে। মাস দুয়েক আগে কলকাতা শহরের বুকে শিক্ষক পদপ্রার্থীরা রোদ বৃষ্টি মাথায় করে না খেয়ে রাস্তায় বসেছিলেন। একদিন দুদিন নয়, আঠাশ দিন। কজন গিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন আর কটা ফেসবুক পোস্ট দেখেছি পরিষ্কার মনে আছে। শিক্ষকের দুঃখে যার প্রাণ কাঁদে না সে কিরকম বিদ্যাসাগরপ্রেমী?
আরো মোটা দাগে বলব? বিদ্যাসাগরের প্রতিকৃতিরও কম অসম্মান কলকাতার বুকে মূর্তি ভাঙার আগে থেকেই হয়নি। লুকিয়ে চুরিয়ে হয়নি, আমার আপনার চোখের সামনেই হয়েছে। আমরা প্রতিবাদ করিনি, আমাদের অগ্রগামী শিল্পী, সাহিত্যিক, অধ্যাপকরাও করেননি। গোটা শহর ছেয়ে গেছে বিভিন্ন মনীষীদের উক্তি সম্বলিত হোর্ডিংয়ে, যার মধ্যে বিদ্যাসাগরও আছেন। সঙ্গের ছবিটি কিন্তু সেই মনীষীদের নয়, মাননীয়া মুখ্যমন্ত্রীর। আরেক ধরণের হোর্ডিংয়ে বাংলার মনীষীদের সঙ্গে এক সারিতে বসানো হয়েছে মুখ্যমন্ত্রীকে। সেই হোর্ডিংও আলো (বা অন্ধকার) করে রেখেছে শহরের আকাশ। কারো মনে হয়নি ব্যাপারটা অন্যায়, অশ্লীল? বাঙালি সংস্কৃতির উপর আঘাত? আমরা কি অপেক্ষা করছিলাম কবে বিদাসাগরের মুন্ডুটা আছড়ে মাটিতে ফেলা হবে তার জন্যে?
আর একটা কথা বলার আছে। বাংলার সংস্কৃতি আক্রান্ত সন্দেহ নেই। কিন্তু চট করে ব্যাপারটা যেরকম বাঙালি বনাম অবাঙালি করে ফেলা হয়েছে তা শুধু সঙ্কটটাকে গুলিয়ে দেওয়ার চেষ্টা। লড়াইটা আসলে ভাল বনাম মন্দের, বাঙালি বনাম অবাঙালির নয়। বাঙালিকে নিজভূমে পরবাসী হতে কেউ জোর করেনি।
অফিসে কাজ করতে করতে ক্ষিদে পেলে সুইগি অ্যাপের মাধ্যমে খাবার আনাই। গত এক দেড় মাসে দুবার দুজন ডেলিভারি বয় খাবার নিয়ে এসে আমাকে ফোন করে হিন্দিতে কথা বলেছে। একজনের পদবী হালদার, অন্যজনের সাহা। তবু নিশ্চিত হওয়ার জন্যে তাঁদের জিজ্ঞেস করেছিলাম “ভাই, আপনি বাঙালি তো?” সদর্থক উত্তর পেয়ে জানতে চেয়েছিলাম আমার পদবি বন্দ্যোপাধ্যায় দেখেও কেন হিন্দিতে কথা বললেন। দুজনেই জানালেন আজকাল বাঙালি খদ্দেররা নাকি বাংলায় কথা বললে বুঝতেই পারেন না। এ জিনিস বাঙালিকে বড়বাজারের গদির কোন মারোয়াড়ি শেখাননি, ভবানীপুরের পাঞ্জাবীরাও শেখাননি। ঠিক যেমন বাঙালি মেয়ের বিয়েতে সঙ্গীত করতে হবে এমনটা কোন অবাঙালি মাথায় বন্দুক ঠেকিয়ে দাবী করেননি, বাঙালি বর বৌভাতে শেরওয়ানি না পরলে ভোটার লিস্ট থেকে নাম কেটে দেওয়া হবে, এমনটাও কোন অবাঙালি রাজনীতিবিদ হুমকি দেননি। হিন্দিকে বাংলার মাথায় চাপিয়েছে বাঙালি নিজেই। যে কারণে শহুরে, লেখাপড়া জানা বাঙালির বিদ্যাসাগরের জন্যে এই হঠাৎ আবেগকে মড়াকান্নার বেশি কিছু বলা শক্ত।
বাঙালি সংস্কৃতির উপর আঘাত করা শুরু হয়েছে তখন থেকে যখন বাংলার অধিকাংশ ইসলাম ধর্মাবলম্বী মানুষের মাতৃভাষা বাংলা হওয়া সত্ত্বেও যেখানে সেখানে রাজনৈতিক হোর্ডিং লেখা শুরু হয়েছে উর্দুতে। প্রবল আঘাত করা হয়েছে তখন যখন হিন্দি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করা হয়েছে। বিরাট আঘাত নেমে এসেছে তখন যখন কলকাতার আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব প্রাঙ্গণে সত্যজিৎ রায়, ঋত্বিক ঘটক, মৃণাল সেন, তপন সিংহ, অজয় কর, নিদেনপক্ষে উত্তম কুমার বা সুচিত্রা সেনের বদলে চলচ্চিত্রের সঙ্গে সম্পর্কহীন নেত্রীর ঢাউস প্রতিকৃতি টাঙানো হয়েছে। পঞ্চধাতুর বা দুশো ফুটের বিদ্যাসাগর মূর্তি বানিয়ে এই ক্ষতি পূরণীয় নয়। এবং এ ক্ষতি অবাঙালিরা কেউ করেনি।
বিদ্যাসাগরকে রাধাকান্ত দেব, রসময় দত্তর মত বাঙালিদের বিরুদ্ধেই লড়তে হয়েছিল। তাই অনেকে যে বলছেন “বাঙালিকে সব বিভেদ ভুলে এক হতে হবে”, সেকথা একেবারে ভুল। বরং বাঙালিকে পক্ষ নিতে হবে। ঠিক করতে হবে সে বিদ্যাসাগরের পক্ষে না রাধাকান্তদের পক্ষে। কথায় এবং কাজে আমাদের রামমোহন, বিদ্যাসাগরের আত্মীয় ছিলেন মহারাষ্ট্রের আত্মারাম পান্ডুরঙ্গ, জ্যোতিরাও ফুলেরা। ঠিক তেমনি সেদিন যাঁরা বিদ্যাসাগরকে অকথা কুকথা বলেছেন, প্রাণ নাশের চেষ্টা করেছেন তাঁদের উত্তরসূরী আজকের মোদী, অমিত শাহরা। অতএব হিন্দি জাতীয়তাবাদের বিপক্ষে বাঙালি জাতীয়তাবাদের অতিসরলীকরণ দিয়ে এ লড়াই লড়া যাবে না। ওভাবে লড়লে বড়জোর কারো নির্বাচনী লড়াইয়ে সুবিধা হতে পারে, বাঙালি জাতীয়তাবাদের আড়ালে নিজেদের অপসংস্কৃতি লুকিয়ে ফেলার সুবিধা হতে পারে।
পুনশ্চ: অধুনা যে হাওয়া তাতে এই লেখাটাকে বামের রাম হয়ে যাওয়ার প্রমাণ হিসাবে চালানো হবে হয়ত। হলে আমি নিরুপায় কারণ আমি ছোট থেকে অঙ্কে কাঁচা। বাইনারি বুঝি না।

নিজের দিকে আঙুল তুলুন

যেহেতু প্রাসঙ্গিক সেহেতু একটু ব্যক্তিগত প্রসঙ্গের অবতারণা করা যাক।
আমার বাড়ির খুব কাছে অধুনালুপ্ত হিন্দমোটর কারখানা, তৎসহ শ্রমিকদের কোয়ার্টার। ঐ এলাকার বাইরেও কিছুটা জায়গা জুড়ে যাঁদের কোয়ার্টারে জায়গা হয়নি বা নিজের সামর্থ্য আছে তাঁদের বাসস্থান। আমার যখন সদ্য অক্ষর পরিচয় হয়েছে তখন কারখানাটা রমরমিয়ে চলছে। আমার বাবা সেইসময় সক্রিয় রাজনীতিবিদ, তার উপরে প্রশাসক। ফলে রোজ সকালে ঐ কারখানার শ্রমিকরা, যাঁরা ভারতবর্ষের বিভিন্ন রাজ্য থেকে এসেছেন এবং মূলত হিন্দিভাষী, বাবার কাছে বিভিন্ন দরকারে আসতেন। বাবা বাড়ি ফিরত অনেক রাত করে, ফলে খুব ভোর ভোর উঠতে পারত না। যতক্ষণ না উঠত, ওঁদের সাথে গল্পগুজব করতাম আমি। অন্য ভাষা আমার কাছে ভীষণ কৌতূহলোদ্দীপক ছিল আর ওঁদের দিক থেকে দেখলে, ছোটদের সাথে সময় কাটাতে কার না ভাল লাগে? তা এই রোজ সকালে হিন্দি বলার ফলে বাংলার সাথে সাথে হিন্দিটাও তখন আমি দিব্যি বলতে পারি।
যখন হাইস্কুলে পৌঁছেছি তখন ঐ কারখানারই এক শিখ শ্রমিক পরিবার আমাদের প্রায় আত্মীয় হয়ে গিয়েছিল। ওঁরা সপরিবারে আমাদের বাড়ি এসেছেন, ওঁদের ছেলেমেয়েদের বিয়েতে আমরা নেমন্তন্ন খেয়েছি। সেই ঘনিষ্ঠতা বেশিদিন টেকেনি, নইলে গুরুমুখীটাও কিছুটা শিখে নেওয়ার চেষ্টা করতাম।
বরাবর, এমনকি হিন্দমোটর কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ার পরেও, এলাকার হিন্দিভাষী মানুষদের সাথে আমাদের সম্পর্ক একই রকম থেকেছে। খুব ছোটবেলা থেকেই তাই ছটপুজোর ঠেগুয়ার স্বাদ কিরকম সেটা জানি। আমার বাবার যখন ক্যান্সার হয়, তখন যাঁরা নিয়মিত খবর নিতেন, যে কোনরকমভাবে আমাদের সাহায্য করার জন্য মুখিয়ে থাকতেন তাঁদের মধ্যে অনেকেও বন্ধ হয়ে যাওয়া কারখানার হিন্দিভাষী শ্রমিক। বাবা মারা যাওয়ার পর ভেবেছিলাম স্বাভাবিক কারণেই ওঁদের সাথে আমাদের সম্পর্ক শেষ হয়ে যাবে। আমাকে অবাক করে, আমাকে খুব ছোটবেলায় দেখেছেন এমন একজন তাঁর মেয়ের গ্র‍্যাজুয়েশনের পরে কী পড়া উচিৎ তার পরামর্শ করতে আমার কাছে এসেছিলেন বছর দুয়েক আগে। “তুমহারে পিতাজি তো রহে নহি। অব কাঁহা যায়েঁ, কিসসে পুছেঁ? সোচা তুমসে হি পুছ লেতে হ্যাঁয়” বললেন এসে। এই যে জীবিকার তাগিদে, জীবনরক্ষার তাগিদে পশ্চিমবঙ্গে আসা ভিন্ন ভাষাভাষী মানুষ এখানে থাকতে থাকতে এই রাজ্যের মানুষকে ভরসাস্থল মনে করেন — এর চেয়ে গর্বের আর কিছু নেই বলে আমার মনে হয়।
আমি নিজে একসময় হায়দরাবাদের একটা খবরের কাগজে কাজ করতাম। তখন সেই নিউজরুমে বাঙালিরা প্রায় সংখ্যাগরিষ্ঠ, তেলুগুদের চেয়ে সংখ্যায় বেশি তো বটেই। একদিন এক তেলুগু সহকর্মী হঠাৎ দাবী করে বসল আমাকে ফোনে ইংরিজিতে কথা বলতে হবে কারণ কানের কাছে অজানা ভাষায় কেউ কথা বললে তার কাজের অসুবিধা হচ্ছে। এই অন্যায় দাবী মেনে নেওয়ার ছেলে আমি নই। ফলে তার সাথে জোর ঝগড়া হল। সে বলল “তাহলে তেলুগু শেখো। এখানে এসে থাকবে, কাজ করবে আর এখানকার ভাষা শিখবে না?” আমি সপাটে জবাব দিয়েছিলাম “শিখতেই পারি। কিন্তু তুমি কলকাতায় এসো, আমরা তোমায় বাংলা শিখতে জোর করব না। আমরা করি না।” সে আর রা কাড়েনি।
বাঙালি হিসাবে অত গর্বিত আমার কখনো লাগেনি। আর সশস্ত্র রামনবমী মিছিল, তজ্জনিত হিংসা, আবুল কালাম আজাদের মূর্তি ভাঙা দেখে বাঙালি হিসাবে এত লজ্জিতও কখনো হইনি। সেই লজ্জা আরো বাড়িয়ে দিচ্ছে সেই বাঙালিরা যারা এখন আমাদের জাতিগত অধঃপতনের দোষ চাপাচ্ছে অবাঙালিদের ঘাড়ে। ভারত এখন বিবিধ আমরা ওরায় বিভক্ত। তার মধ্যে আবার একটা নতুন আমরা-ওরা যোগ করছে এই বাঙালিরা।
নিজের অযোগ্যতা, অপদার্থতার দায় অন্যের ঘাড়ে চাপানো ভীতু, ওপরচালাক এবং অলস লোকের লক্ষণ। এই বাঙালিরাও আমাদের সেরকম বলেই প্রমাণ করছে। হাস্যকর কিছু কথা বলা হচ্ছে। “এত বেশি সহিষ্ণু হওয়াই আমাদের অন্যায় হয়েছে”, “আমাদের কালচারটার এরা সব্বোনাশ করে দিল”, “রামকৃষ্ণ, রবীন্দ্রনাথ, বিদ্যাসাগরের বাংলা। সেই বাংলায় অবাঙালিগুলো এসে এই সাম্প্রদায়িক রাজনীতি ঢোকাল”, “ওরা যেখানে যেখানে থাকে সেখানেই কিন্তু হিন্দুত্ববাদের রমরমা” — এইসব কথা দেখছি বিজেপিবিরোধীরা তো বটেই, নিজেকে বামপন্থী বলে দাবী করা অনেকেও বেশ বুক ফুলিয়ে বলছেন, সোশাল মিডিয়ায় লিখছেনও। মোটের উপর ঐ তিনটেই বক্তব্য এঁদের। কথাগুলো কতটা অন্যায়, কেন অন্যায় সেটা এবার দেখা যাক।

“এত বেশি সহিষ্ণু হওয়াই আমাদের অন্যায় হয়েছে”
কিরকম হওয়া উচিৎ ছিল তাহলে? মুম্বাইয়ের শিবসেনার মত? বিহার বা উত্তরপ্রদেশের লোক দেখলেই ঠ্যাঙানো উচিৎ ছিল? নাকি সব্বাইকে বাংলা শিখতে হবে, নইলে এর লাইসেন্স দেব না, তার লাইসেন্স দেব না — এসব বলা উচিৎ ছিল? প্রথমত, মুম্বাইতে এটা করে কী ফল হয়েছে? মুম্বাই বলতেই বিশ্বসুদ্ধ লোক কী বোঝে? বলিউড। কোন ভাষায় ছবি হয় সেখানে? হিন্দি। চেনা পরিচিত বাঙালি যারা মহারাষ্ট্রে থাকেন তাঁদের কজন মারাঠি জানেন একবার জিজ্ঞেস করে দেখুন তো। বুঝতে পারবেন ঠ্যাঙাড়ে পদ্ধতি ব্যর্থ। তাছাড়া এই কথা যদি বলেন তাহলে হিন্দুত্ববাদীরা যখন পাকিস্তানের উদাহরণ দেখিয়ে গণতান্ত্রিক অধিকারগুলো কেড়ে নেওয়া সমর্থন করে তখন কিন্তু বলা চলবে না “দেশটাকে পাকিস্তান বানাতে চাও তাহলে?”

“আমাদের কালচারটার এরা সব্বোনাশ করে দিল”
এর চেয়ে বড় মিথ্যা আর নেই। কিসের কালচার? কালচার বলতে আজকের বাঙালি কী বোঝে? কালচারের বাংলা প্রতিশব্দ কী? সঠিক বানানে সেটা লিখতে পারবে চল্লিশের নীচে বয়স এমন কজন আছে? তামিল, তেলুগু ছবি ঝেড়ে বলিউডে ছবি হয় আবার সেই ছবি ঝেড়ে বাংলা ছবি হয়। প্রায় তিরিশ বছর ধরে এই চলছে। এর নাম কালচার? ইংরিজি মাধ্যম স্কুলে তো বাঙালি দেড়শো বছর ধরে পড়ছে কিন্তু আগে তো বাপ-মা গর্ব করে বলত না “জানেন দাদা, আমার ছেলের বাংলাটা ঠিক আসে না”? এই অবস্থায় পৌঁছে দিয়েছে বিহারী, মাড়োয়ারিরা? একই স্কুলে পড়া মাড়োয়ারি ছেলেমেয়ের বাবা-মাকে তো বলতে শুনি না গদগদ হয়ে “মেরে বেটে কো না হিন্দি ঠিক সে আতা নহি”? সন্ধ্যের পর তথাকথিত শিক্ষিত বাঙালি যে সিরিয়ালগুলো দ্যাখে সেগুলোর নাম কালচার? ওসবে তো হিন্দি ছবির গানও চলে। তার মানে যারা বানায় তারা নিজেরা লিখতে তো পারেই না, লাগসই বাংলা গান খুঁজে বের করার মুরোদও তাদের নেই। স্বাভাবিক। কারণ এদের সাক্ষাৎকার যা এদিকওদিক পাওয়া যায় তাতে দেখা যায় এরা বাংলা বলে গ্রীকদের মত। তা এরকমটা এদের শেখাল কে? হলদিরাম ভুজিয়াওয়ালা? গলায় পা দিয়ে? বাঙালি হিন্দু মেয়ের বিয়েতে মেহেন্দি চালু করল কে? কোন বিহারী এসে এ কে ৪৭ নিয়ে দাঁড়িয়েছিল? যে ছেলে সব শাস্ত্রীয় আচার মেনে বিয়ে করে, প্রেমের বিয়েতেও পণ নিতে ছাড়ে না, সে বৌভাতের দিন প্রথাগত ধুতি পাঞ্জাবি ছেড়ে শেরওয়ানি পরে কোন মাড়োয়ারির ভয়ে? ছেলেমেয়েকে ইংরিজি মাধ্যম স্কুলে ভর্তি করে এমনকি দ্বিতীয় ভাষার জায়গা থেকেও বাংলাকে সরিয়ে হিন্দি ঢোকান যে বাঙালি বাবা-মায়েরা তাদের কোন হিন্দিভাষী ব্ল্যাকমেল করেছে এটা করতে?
তাছাড়া কালচার মানে তো শুধু এসব নয়। ট্রেনে বাসে তরুণ বাঙালিদের ভাষা শুনে দেখেছেন? এমনিতে পাঁচ লাইন কথা বললে দু লাইন ইংরিজি আর আড়াই লাইন হিন্দি থাকে। খিস্তি দেওয়ার সময় কিন্তু এরা পরম বাঙালি। এবং জনসমক্ষে খিস্তিসহ কথা বলাটা বেশ গর্বের ব্যাপার এদের কাছে। বছর কুড়ি আগেও বড়দের সামনে শালা বলে ফেললে যে বাঙালি কানমলা খেয়েছে তারই ছেলেমেয়ে ট্রেনে বসে হেডফোনে বন্ধুকে মহানন্দে কাঁচা খিস্তি দিয়ে যায়, সে কামরাভর্তি যতই বাপ-পিতেমোর বয়সী লোক থাক, মহিলারা থাকুন বা বাচ্চাকাচ্চা থাক।
এই জাতির কালচার শেষ করে দিয়েছে অন্য রাজ্য থেকে আসা দশ বারো শতাংশ লোক? শুনলেই হাসি পায়।

“এ বাংলা রামকৃষ্ণ, রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, বিদ্যাসাগরের বাংলা। সেই বাংলায় অবাঙালিগুলো এই সাম্প্রদায়িক, পশ্চাৎপদ রাজনীতি ঢোকাল”
ঐ তিন চারটে নাম মুখস্থ বুলির মত আউড়ে যাওয়া বহুকাল হল বাঙালির বদভ্যেস। কাঁঠালি কলার চেয়েও বেশি ঘটে ব্যবহার করা হয় এই নামগুলো। অথচ এই লোকগুলো কেন বিশিষ্ট তা ছেলেমেয়েকে শেখানোর দায়িত্ব অনেকদিন বাবা-মায়েরা ছেড়ে দিয়েছেন। কি ভাগ্যিস দ্বিতীয় জন কিছু গান, কবিতা লিখে গেছেন। তাই স্ট্যাটাস বজায় রাখতে বাড়িতে রচনাবলী সাজিয়ে রাখা, ছেলেমেয়েকে আবৃত্তি স্কুলে পাঠিয়ে “ভগবান তুমি…” বলতে শেখানো, ঘুরেফিরে গুটিকয়েক গান আর নাচ শেখানো — এসব আছে। বাকিরা তো আক্ষরিক অর্থেই ছবি হয়ে গেছেন। প্রথমজনেরটা থাকে ঠাকুরঘরে। অতএব কী বলেছেন ওসব আর কে পড়তে যাবে? পড়লেও ভাবতে যাবে কেন? গুরুবচন। মুখস্থ করাই কর্তব্য, ভাবতে নেই।
রবীন্দ্রনাথের স্নেহভাজন অথচ সঙ্গীতে এবং কাব্যে একেবারে স্বতন্ত্র নজরুলের প্রতি আমরা পশ্চিমবঙ্গীয়রা সযত্নলালিত অবজ্ঞা ছুঁড়ে দিয়েছি। আজকাল আর নজরুলগীতি শেখা ঠিক কেতাদুরস্ত নয়। আমাদের ছোটবেলার রবীন্দ্র-নজরুল সন্ধ্যাগুলোও প্রায় অবলুপ্ত। অন্নদাশঙ্করেরই বোধহয় ভুল হয়েছিল। নজরুলকে আমরা বিলকুল ভাগ করে দিয়েছি। আশঙ্কা হয় সেটাও হয়ত তাঁর ধর্মীয় পরিচয়ের জন্যেই।
চতুর্থজনের অবস্থা তো আরো করুণ। এই ভদ্রলোকের নাম আজকাল আর খুব বেশি বাঙালি জানে কিনা আমার সন্দেহ হয়। ছোটদের তো জানার উপায়ও নেই। তারা তো জলি প্রাইমার, এলিমেন্টারি ম্যাথসে ডুবে আছে। তার মধ্যে কি আর বর্ণপরিচয়ের জায়গা আছে? আর বড়রা তো বিদ্যাসাগর সম্বন্ধে বরাবরই জানত দুটো শব্দ —- বিধবাবিবাহ আর বাল্য বিবাহ। আরেকজনকে তো বাঙালি ভুলেই গেছে। তিনি রামমোহন রায়। সেটা অবশ্য একদিকে ভাল। পপকর্ন খেতে খেতে পদ্মাবতী দেখার সময়ে ঐ ভদ্রলোককে মনে পড়লে পুরো আমেজটাই নষ্ট হবে।
মোদ্দা কথা হচ্ছে এই লোকগুলোকে শালগ্রাম শিলা বানিয়ে ফেলেছি আমরা অনেক আগেই। সুতরাং আমাদের বাংলাটা আর এদের বাংলা নেই। এর জন্যে বিহারী, মাড়োয়ারিদের গাল পাড়ার কোন যুক্তি নেই। তা বাদেও বাংলাকে এদের বাংলা বলা নিজেদের ইতিহাস সম্পর্কে অর্ধসত্য বলার প্রকৃষ্ট উদাহরণ।
রামকৃষ্ণের কথা আলাদা। তিনি শত হলেও ধর্মগুরু। তাছাড়া তাঁর এক নম্বর শিষ্য একটা আস্ত প্রতিষ্ঠান তৈরি করে গেছেন। তাই তিনি নিজের সময়ও পূজিত, এখনো পূজিত। কিন্তু রবীন্দ্রনাথকে গালাগাল দেওয়ার লোক তাঁর সময়েও নেহাত কম ছিল না। যেমন তাঁর যশে দ্বিজেন্দ্রলালের কম গা জ্বলেনি। আর নোবেল টোবেল পাওয়ার পরেও, বাণী বসুর ‘অষ্টম গর্ভ’ পড়লে বোঝা যায়, শিক্ষিত বাঙালিরা অনেকেই মনে করত উনি শুধু একজন বড়লোকের ছেলে যে শান্তিনিকেতনে সুন্দরী মেয়েদের নিয়ে ফুর্তি করে। এসব যারা মনে করত এ বাংলা তাদেরও। নিজেদের রবীন্দ্রনাথের উত্তরসূরি ভাবতে গেলে মনে রাখা উচিৎ আমরা ঐ লোকগুলোরও জাতভাই।
আর বিদ্যাসাগর? এ বাংলা কোনদিনই তাঁর ছিল না। তিনি যেমন আমাদের পূর্বপুরুষ তেমন যারা বিধবাদের বিয়ে দেওয়ার অপরাধে তাঁর শ্রাদ্ধানুষ্ঠান করেছিল, তাঁকে খিস্তি করে গান লিখেছিল, জুতো ছুঁড়েছিল, টাকার লোভে তাঁকে ঠকিয়েছিল তারাও এই আমাদেরই পূর্বপুরুষ। এবং তারা নেহাত এলেবেলে লোকও নয়, অনেকেই তখনকার সমাজের মাথা। এই বাংলা এমনই বিদ্যাসাগরের যে তিনি শেষ বয়সে এই জায়গাটা ছেড়ে দিয়ে দন্ডকারণ্যে সাঁওতালদের সঙ্গে গিয়ে বাস করতেন।
যে নবজাগরণ বা আলোকপ্রাপ্তি নিয়ে আমরা জাঁক করি সেই আলো যাঁরা নিয়ে এসেছিলেন তাঁদের মধ্যে ছিলেন এক ইউরোপীয় অধ্যাপকও। মনে রাখা ভাল যে সেই হেনরি লুই ভিভিয়ান ডিরোজিওকে আমাদেরই গণ্যমান্য পূর্বপুরুষরা বিদেশী এবং বিধর্মী বলে অপমানের একশেষ করেছিল। আমাদের সমাজের কুপ্রথাগুলোর দিকে আঙুল তোলার তাঁর অধিকার নেই বলেছিল। ঠিক যেমন আজকের দক্ষিণপন্থীরা বলছে লেনিন তো বিদেশী, এদেশে তার মূর্তি থাকবে কেন? আমাদের সেই পূর্বপুরুষেরা ডিরোজিওকে ভাতেও মেরে এমন অবস্থা করে যে তাঁর অকালমৃত্যু হয়।
আর সাম্প্রদায়িকতা হিন্দিভাষীরা এ রাজ্যে নিয়ে এসেছে, কেবল তাদের এলাকাগুলোতেই হিন্দুত্ববাদের প্রসার ঘটছে এমনটা যদি আপনার মনে হয় তাহলে বলতে হয় আপনি বুদবুদের মধ্যে বাস করছেন বহুকাল ধরেই। ভাল করে তাকিয়ে দেখলে চারপাশে অজস্র আত্মীয়স্বজন পাবেন যারা গাদা ডিগ্রিধারী হয়েও চরম অশিক্ষিতের মত বলে “অমুকের মুসলমানদের সাথে এত কিসের দহরম বুঝি না। বাঙালি ছেলে বাঙালিদের সাথে বন্ধুত্ব কর না।” বাংলা ভাষার জন্যে আজ অব্দি যারা প্রাণ দিয়েছে সীমান্তের দুই পারে, তাদের বেশিরভাগ ইসলাম ধর্মাবলম্বী অথচ আমাদের ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, উকিল, অধ্যাপক, সাংবাদিক ইত্যাদি পেশাধারী মূর্খরা বলে তারাই বাঙালি, মুসলমানরা মুসলমান। বিজেপির প্রোপাগান্ডা আর মমতার নিজেকে মুসলমানদের ত্রাতা হিসাবে তুলে ধরার অপচেষ্টা শুরু হওয়ার পর থেকে আশপাশের লেখাপড়া জানা মানুষদের ভেতরের ঘৃণা কিভাবে বেরিয়ে আসছে, কি অনায়াসে তারা ভিত্তিহীন গুজবকে ধ্রুব সত্য হিসাবে বিশ্বাস করছে এবং অন্যকে বিশ্বাস করাচ্ছে তা যদি আপনার চোখে না পড়ে থাকে, একমাত্র তাহলেই আপনি ভাববেন হিন্দুত্ববাদীরা শুধু হিন্দিভাষীদের এলাকায় শক্তিশালী হচ্ছে।
তবে এই সাম্প্রদায়িকতার ইতিহাসও আমাদের সুপ্রাচীন। উইলিয়াম শেক্সপিয়রের অনন্য প্রতিভা যেমন তাঁর ইহুদীবিদ্বেষকে অতিক্রম করতে পারেনি, আমাদের গদ্যের আদিপুরুষ বঙ্কিমচন্দ্রের প্রতিভাও তেমনি তাঁর মুসলমানবিদ্বেষকে অতিক্রম করতে পারেনি। মুসলমান শাসকরা এদেশে হানাদার এবং সমস্ত অধঃপতনের মূলে, তারা আসার আগে এদেশ স্বর্গরাজ্য ছিল — এই যে অতিসরলীকৃত ইতিহাস আর এস এস আমাদের গেলাচ্ছে, বঙ্কিম যে তার চেয়ে খুব আলাদা কিছু ভাবতেন তা ভাবা শক্ত। রাজসিংহ উপন্যাসের শেষে তবু একটা কৈফিয়ত গোছের লেখা আছে, যেখানে বঙ্কিম লিখেছেন সব হিন্দুই ভাল আর সব মুসলমানই খারাপ এমনটা বলা তাঁর উদ্দেশ্য নয়। আনন্দমঠ উপন্যাসের শেষে তাও নেই।
বিবেকানন্দ একবার বৈদান্তিক মস্তিষ্কের সঙ্গে ঐস্লামিক দেহের সমন্বয়ের কথা বলেছিলেন, কিন্তু তাঁর ইতিহাস পাঠেও “সবই ব্যাদে আছে” এবং সে যুগের পর থেকে ভারতে আর ভাল কিছু হয়নি — এই মনোভাবটা বড় জ্বলজ্বল করে। আর সত্যি বলতে কি, ঐ উক্তি থেকেও এটাই মনে হয় যে বিবেকানন্দ মুসলমানদের একটা বিশেষ ধর্মাবলম্বী মানুষ হিসাবে না দেখে একটা বিশেষ জাতিগোষ্ঠীর লোক হিসাবে দেখতেন। নইলে ঐস্লামিক দেহ কথাটার কোন মানে দাঁড়ায় কি? সব মুসলমানের দেহের গঠন কি একরকম? আমার মাছ ভাত খাওয়া বাঙালি মুসলমান মাস্টারমশাই সাড়ে পাঁচ ফুট উচ্চতার রোগাসোগা লোক। আবার আমাদের পেস বোলার মহম্মদ শামি। দীর্ঘদেহী, বলিষ্ঠ চেহারার উত্তরপ্রদেশ থেকে আসা মুসলমান। এদের মধ্যে কার দেহের সঙ্গে বৈদান্তিক মস্তিষ্কের সমন্বয় চাইছিলেন বিবেকানন্দ?
অত তত্ত্বকথারও দরকার নেই, বাস্তব উদাহরণ দেখি। স্বাধীনতার প্রাক্কালে দাঙ্গা করতে আমরা বাঙালিরা কারো চেয়ে পিছিয়ে থাকিনি। ১৯৪৬ এর ১৬ই আগস্টের দাঙ্গাও বাইরে থেকে কেউ এসে করে দিয়ে যায়নি।
অতএব শুরু হয়ে যাওয়া ঝড় এবং আসন্ন প্রলয় আটকাতে হলে স্বীকার করে নেওয়া ভাল যে বাঙালি সংস্কৃতিমান, বাঙালি শান্তিপ্রিয়, বাঙালি দাঙ্গাবাজি করে না — এই একমাত্রিক পরিচিতিটা আপন মনের মাধুরী মিশায়ে আমাদেরই তৈরি করা। আসলে বাঙালিদের মধ্যে অন্য কোন জাতের লোকেদের চেয়ে পরধর্মবিদ্বেষী, কুসংস্কারাচ্ছন্ন, দাঙ্গাবাজ লোক কম নেই। কোনদিন ছিলও না। বাঙালির বাংলাকে এক রাখতে রাখীবন্ধন করা রবীন্দ্রনাথ আছেন আবার হিন্দু, মুসলমান এক দেশের নাগরিক হতে পারে না — এই মনোভাবের শ্যামাপ্রসাদও আছেন। আমাদের “একই বৃন্তে দুটি কুসুম” লেখা, অসামান্য শ্যামাসঙ্গীত রচয়িতা নজরুল আছেন আবার প্রত্যক্ষ সংগ্রাম দিবস লেলিয়ে দেওয়া সুরাবর্দিও আছেন। আপনি এদের মধ্যে কার উত্তরসূরি সেটা প্রমাণ হয় আপনার কথায় এবং কাজে।
অতএব আঙুলটা এবার নিজের দিকে তোলা যাক। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের ভেতরের দৈত্যটার মুখোমুখি হওয়া যাক। এমনিতেও যে রাজ্যে আমরা বিপুলভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠ, সেখানে অন্য রাজ্যের অন্য ভাষাভাষী মানুষ এসে সবকিছু বদলে দিচ্ছেন — এটা যদি সত্যি বলে মানতে হয় তাহলে এটাও মানতে হয় যে আমরা সব নিরেট মাথার লোক। গোটা ভারতকে ভাগ করা হচ্ছে, বাঙালিকেও ভাগ করার চক্রান্ত শুরু হয়েছে। সেটা ভুলে আরো নতুন ভাগাভাগি তৈরি করবেন না দয়া করে। আদি অনন্তকাল ধরে মানুষ জীবিকার সন্ধানে এক দেশ থেকে আরেক দেশ, এক রাজ্য থেকে আরেক রাজ্যে যাচ্ছে। এই ধারার বিরুদ্ধে কথা বলা যেমন অনৈতিহাসিক তেমনই অমানবিক। পৃথিবীর কোন প্রগতিশীল মানবগোষ্ঠী এর জন্যে কারো সাথে শত্রুতা করে না। এবং করতে ইচ্ছে করলে মনে রাখবেন, সব ক্রিয়ারই প্রতিক্রিয়া থাকে এবং বহু বাঙালি পেশাগত কারণে সারা ভারতে ছড়িয়ে আছেন।
কী বললেন? হিন্দি সাম্রাজ্যবাদ? সে তো সঙ্ঘ পরিবার, ভারত সরকার আর পশ্চিমবঙ্গ সরকার করছে। তার জন্যে আপনার হিন্দিভাষী, রাম আর হনুমানের পূজারী প্রতিবেশী দায়ী হবেন কেন? আমাকে ছোট থেকে যাঁরা ঠেগুয়া খাইয়েছেন তাঁরা তো কখনো দাবী করেননি ছটপুজোয় ছুটি দিতে হবে। বাংলার মুখ্যমন্ত্রী কেন দিলেন সে প্রশ্ন তাঁকে করুন। এ রাজ্যের হিন্দিভাষীরা নিজেদের মত করে রামনবমী পালনও তো করে আসছেন বরাবর, অস্ত্রমিছিল করেননি তো। রাজনৈতিক দল কেন রাম আর হনুমানের পুজো করবে সে প্রশ্ন দিলীপ ঘোষ আর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে করুন, হিন্দিভাষীরা এর জবাব কেন দেবেন? এ তো আইসিসের অপরাধের জবাব এদেশের সাধারণ মুসলমানের কাছে চাওয়ার মত হয়ে গেল।
সত্যি কথা বলতে, হিন্দি সাম্রাজ্যবাদকে মালার মত গলায় পরে নিচ্ছি আমরা নিজে — বাংলার চর্চা ক্রমশ কমিয়ে দিয়ে এবং ভাষাটার প্রতি অবজ্ঞা প্রকাশ করে। কয়েক মাস আগে এক টেলিকম কোম্পানি তাদের ইংরিজি বিজ্ঞাপনের বাংলা তর্জমা খবরের কাগজে ছেপেছিল শুধু গুগল ট্রান্সলেটরের ভরসায়। ফলে সেটার হরফটাই যা বাংলা ছিল, ভাষাটা কী তা বোঝা ভগবানেরও অসাধ্য। এই সাহস ওরা তামিলনাড়ু, কর্ণাটক কি কেরালায় পায় না। এখানে যে পায় তার জন্যে দায়ী আমরাই, এ রাজ্যের হিন্দিভাষীরা নন। অন্য ভাষা শিখতে গেলে যে বাংলা ভুলতে হয় না সেটা নিজে বুঝলে এবং ছেলেমেয়েকে বোঝালে হিন্দি সাম্রাজ্যবাদ এমনিই ট্যাঁ ফোঁ করার জায়গা পাবে না।