ন্যায় অন্যায়

ঐতিহাসিক সঙ্কটের সময়ে অনেক বড় মানুষেরই ন্যায় অন্যায় গুলিয়ে যায়, আমাদের মত সাধারণ লোকের তো গুলিয়ে যেতেই পারে। তাই ৩১শে আগস্ট আসামের জাতীয় নাগরিকপঞ্জীর চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশ পাওয়ার পর দেখছি উনিশ লক্ষ বাদ পড়েছে বলে যাঁরা দুঃখ বা উদ্বেগ প্রকাশ করছেন তাঁদের অনেকেরই বক্তব্য ব্যাপারটা দুঃখজনক, কিন্তু ন্যায় কি অন্যায় তা জানি না। খসড়া তালিকা প্রকাশ পাওয়ার পরে উদাসীন বা এন আর সি সমর্থক মানুষের সংখ্যা কিন্তু অনেক বেশি ছিল এই বাংলায়। সেদিক থেকে এখন অবস্থার উন্নতি হয়েছে বলতে হবে। কিন্তু তার একটা বড় কারণ, যা বিজেপির প্রতিক্রিয়া থেকেই পরিষ্কার, তালিকার বাইরে থাকা মানুষদের মধ্যে হিন্দুদের সংখ্যাগরিষ্ঠ হওয়া।

আসামের অনেক হিন্দু বাঙালির মত পশ্চিমবঙ্গের বহু হিন্দু বাঙালিও বিজেপির প্রোপাগাণ্ডায় ভুলে বিশ্বাস করেছিল আসাম রাজ্যটাকে বাংলাদেশ থেকে আগত মুসলমানরা একেবারে দখল করে নিয়েছে, পশ্চিমবঙ্গও “ওদের” দখলে চলে যাচ্ছে। ফল আশানুরূপ না হওয়ায়, উপরন্তু হিন্দুরাই বেশি বাদ পড়ে যাওয়ায় এরা স্তম্ভিত, উৎকণ্ঠিত। ফলে উনিশ লক্ষ দেশহীন মানুষের জন্য হঠাৎ সমবেদনা তৈরি হয়েছে এবং রংচঙে ব্যাকগ্রাউন্ডে লেখা “বাংলায় এন আর সি চাই” বলে যে ফেসবুক স্ট্যাটাসগুলো গত কয়েক বছর ধরে দেখা যাচ্ছিল, নিজেদের বিপদের আশঙ্কায় সেগুলো আর তত চোখে পড়ছে না। উলটে এই অধমের পোস্টে, যারা কাশ্মীরকে শিক্ষা দিতে চেয়েছিল, কাশ্মীরি মেয়েদের বিয়ে করতে পারবে বলে আহ্লাদে আটখানা হয়েছিল (চুয়াত্তর বছর ধরে তো নেহরু আটকে রেখেছিল), তারাও লাইক দিয়ে যাচ্ছে।

এদের নিয়ে ভাবি না। কিন্তু এরাই সব নয়। ব্যক্তিগতভাবে চিনি এমন অনেক হৃদয়বান মানুষকেও দেখছি বলছেন কোনটা ঠিক কোনটা ভুল জানি না। সেই জন্যই এই পোস্টের অবতারণা।

আসামে নাগরিকপঞ্জী নবায়ন করা বন্ধ করা উচিৎ এবং দেশের কোথাও এ জিনিস করা কেন উচিৎ নয় এসব বোঝাতে বহু মানুষ বহুদিন ধরে কাজ করছেন। ফেসবুকে NO NRC নামে একটা গ্রুপও আছে। সেসব দেখতে পারেন, দেখা প্রয়োজনও। কিন্তু সেসব ছাড়া নিজেই কতকগুলো কথা ভেবে দেখুন।

প্রথমত, পৃথিবীর সব রাষ্ট্র তার নাগরিকদের নাগরিকত্বের কিছু প্রমাণপত্র দেয়। ভারত রাষ্ট্রও দেয়। যেমন ভোটার কার্ড, প্যান কার্ড, ড্রাইভিং লাইসেন্স, পাসপোর্ট। এখন আবার সব কার্ডের বাড়া বলা হচ্ছে আধার কার্ডকে। এই প্রমাণপত্রগুলো কিসের প্রমাণ? আপনি যে ভারতের নাগরিক তার প্রমাণ। পৃথিবীর সব দেশই নাগরিকের থেকে তার সেই দেশের নাগরিক হওয়ার প্রমাণই দাবী করে। কিন্তু এন আর সি র কাছে এগুলো কোন প্রমাণই নয়। সেখানে রাষ্ট্র বলছে আপনি এদেশের নাগরিক কিনা তাতে আমার বয়ে গেছে। আপনি বলুন আপনার ঠাকুর্দা, দাদু, দিদিমা, বাবা, মা এঁরা এদেশের নাগরিক ছিলেন কিনা। একে যুক্তি বলে? কতটা পেছোব আমরা? ঠাকুর্দাতেই বা থামা কেন? ২৫শে মার্চ, ১৯৭১ এই বা থামার দরকার কী? ১৫ই আগস্ট, ১৯৪৭ এ আমার পরিবারের যাঁরা জীবিত ছিলেন তাঁরা এ দেশের নাগরিক ছিলেন কিনা জানতে চাইলেই বা ঠেকাচ্ছে কে? ধরুন আগামী দিনে রাষ্ট্র আরো পেছোতে চাইল। বলল ১৮৫৭ র সিপাহী বিদ্রোহ হল আমাদের প্রথম স্বাধীনতার যুদ্ধ। তার আগে আপনার পূর্বপুরুষ এ দেশে ছিলেন কিনা বলুন। না থাকলে আপনি নাগরিক নন। আজ লিগ্যাসি ডকুমেন্ট চাইলে না হয় বাড়ির দলিল, বাবার গ্র‍্যাজুয়েশন সার্টিফিকেট ইত্যাদি দেখাচ্ছেন। তখন পূর্বপুরুষের নামটা খুঁজে পাবেন তো?
জানি এর পালটা যুক্তি হিসাবে বলা হবে ভারতে এত দুর্নীতি যে সীমান্ত পেরিয়ে এসে ভোটার কার্ড ইত্যাদি করিয়ে ফেলা কোন ব্যাপারই নয়। অতএব ওগুলো কোন প্রমাণ নয়। ঠিক কথা। আচ্ছা দুর্নীতিটা কার? রাষ্ট্রেরই তো। ঘুষ নিয়ে সীমান্ত পার করিয়ে দেয় যে সীমান্ত রক্ষী সে রাষ্ট্রের যন্ত্র। রাষ্ট্রেরই অন্য কয়েকটা যন্ত্রের দুর্নীতি ছাড়া আপনি সত্যিকারের নাগরিক না হলে ভোটার, প্যান, পাসপোর্ট, আধার কিছুই বানিয়ে উঠতে পারবেন না। একথা ঠিক যে যে ঘুষ নেয় আর যে ঘুষ দেয় — দুজনেই দোষী। কিন্তু এন আর সি যদি যে ঘুষ দিয়ে নাগরিকত্ব কিনেছে তাকে চিহ্নিত করার এবং শাস্তি দেওয়ার ব্যবস্থা হয়, তাহলে যারা ঘুষ নিয়ে নাগরিকত্ব বিক্রি করেছে তাদের শাস্তি দেওয়ার ব্যবস্থাটা কোথায়? নেই যখন তখন স্পষ্ট যে এই ব্যবস্থা তৈরিই হয়েছে এক পক্ষকে শাস্তি দেওয়ার জন্যে, অর্থাৎ এ অন্যায় ব্যবস্থা।
দ্বিতীয়ত, পৃথিবীর সমস্ত আইনের মূল মন্ত্র হল “Innocent till proved guilty.” অর্থাৎ আপনার বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের হলে যতক্ষণ আপনি দোষী প্রমাণিত না হচ্ছেন ততক্ষণ আপনি নির্দোষ। এন আর সি কিন্তু উলটপুরাণ। রাষ্ট্র ধরেই নিচ্ছে তার কিছু নাগরিক আসলে নাগরিক নয়। তারপর সেই নাগরিককে বলছে “প্রমাণ করো তুমি নাগরিক।” কেন? রাষ্ট্র প্রমাণ করে দেখাক না যে অমুক আসলে অনুপ্রবেশকারী, নাগরিক নয়। “মারতে চাও তো ডাকাও নাকো জল্লাদ। গন্ধ শুঁকে মরতে হবে এ আবার কী আহ্লাদ?”

কিন্তু এ দুটো যুক্তির চেয়েও বড় কথা, এদেশে নাগরিকত্বের একাধিক প্রমাণপত্রের ব্যবস্থা থাকা সত্ত্বেও যদি আমরা জাতীয় নাগরিকপঞ্জী তৈরি করা মেনে নিই, তাহলে রাষ্ট্রকে নাগরিকত্বের সংজ্ঞা ইচ্ছে মত বদলে নেওয়ার অধিকার দিয়ে দেওয়া হয়। ইংরিজিতে যাকে “shifting posts” বলে। এর বিপদটা ভেবে দেখুন। আজ রাষ্ট্র একটা তারিখ বেঁধে দিয়ে বলছে তার আগে যাদের পরিবার এ দেশে ছিল না তারা নাগরিক নয়। কাল বলতেই পারে সকলের ডি এন এ পরীক্ষা করব। যাদের মধ্যে উত্তরে হিমালয় আর দক্ষিণে ভারত মহাসাগরের মাঝের এই ভূখণ্ডের বাইরের জিন পাওয়া যাবে, সে নাগরিক নয়। তাকে ডিটেনশন ক্যাম্পে পাঠানো হবে। তখন রাষ্ট্রের সুবিধা মত এক একটা জনগোষ্ঠী ধরে অনাগরিক ঘোষণা করে দেওয়ার ভারী সুবিধা হবে। এবং সেটা কখন কোন জনগোষ্ঠী, তা কিন্তু ক্ষমতাসীন দলের ইচ্ছাধীন হবে। ফলে কোন জনগোষ্ঠীই নিশ্চিন্ত থাকতে পারবেন না। ভাবছেন নেহাত ভয়ের বেসাতি করছি? মনে রাখবেন, আধার কার্ডের মাধ্যমে আমার আপনার বায়োমেট্রিক তথ্য কিন্তু ইতিমধ্যেই রাষ্ট্রের হাতে।

আসামের নাগরিকপঞ্জীর অবশ্যই একটা ইতিহাস আছে, যা দেশের অন্য কোন রাজ্যের সাথে মেলে না। অসমিয়া জাতি পরিচয়ের আক্রমণাত্মক রাজনীতিকে ধামাচাপা দিতে ১৯৮৫ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধী সেই ইতিহাসটার অপব্যবহার করে ১৯৫১ র নাগরিকপঞ্জী নবায়নের এই গাজরটি ঝুলিয়েছিলেন। আজকের কেন্দ্রীয় সরকারকে এই নিয়ে কিছু বললেই তাঁরা হাত উলটে বলেন “সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে তো হচ্ছে। আমরা তো কিছু করিনি।” যেন সবসময় সব মামলায় সরকার সুপ্রিম কোর্টের বাধ্য ছেলেটি। যেন আইনি বিতর্কের মাধ্যমে আদালতের মত বদলের চেষ্টা করা সরকারের কাজ নয়। অথচ এই সেদিন আধার মামলার সময়ে সরকারী কৌঁসুলি বিচারপতিদের ধমক খেতে খেতেও আধারের জন্যে প্রাণপণ লড়ে গেছেন।
আর বিরোধী দলগুলো? তারা কে জানে কোন প্রণোদনায় কতকগুলো অর্থহীন কথা বলে চলেছে। কংগ্রেসের বিশেষ কিছু বলার মুখ নেই, যেহেতু তাদের নেতাই প্যান্ডোরার এই বাক্সটি খুলে দিয়ে গিয়েছিলেন। তাই তারা কেবল পদ্ধতিগত ত্রুটির প্রশ্ন তুলে বাদ পড়া মানুষের জন্যে অশ্রুপাত করছে। কিন্তু অন্য দলগুলোর ভূমিকাও কম ন্যক্কারজনক নয়। তৃণমূল আজ বাঙালি বাদ না গেলেই খুশি তো কাল গোর্খারা বাদ না গেলেই খুশি। বৃহত্তম বামপন্থী দল আবার প্রকৃত ভারতীয় নাগরিক যেন বাদ না যায় সেদিকে নজর দিতে বলছেন। সরকার কেন খুলে বলছে না যাদের নাগরিকত্ব শেষ অব্দি প্রমাণ হবে না তাদের কী করা হবে — এই নিয়ে চেঁচামেচি করছেন। যেন তাঁরা জানেন না ইতিমধ্যেই আসামের ডিটেনশন ক্যাম্পগুলোতে যাঁরা আছেন তাঁরা কেন আছেন, নির্মীয়মাণ ডিটেনশন ক্যাম্পগুলো কেন বানানো হচ্ছে।

হে মোর দুর্ভাগা দেশ!

Advertisements

শিক্ষণীয়

আজকাল লিখতে ইচ্ছে করে না খুব একটা। আর কতদিন যা লিখতে ইচ্ছে করে তা লেখা যাবে তাও অনিশ্চিত। তাই দুটো কথা লিখে দিই। না লিখে আর থাকা গেল না বলেই লিখছি, নইলে কাউকে “বোর” করার ইচ্ছা নেই।

একজন সাংবিধানিক প্রধান (বেচারা সংবিধান) আপত্তি করেছেন ওয়েস্ট বেঙ্গলের লোকেরা কেন ইস্টবেঙ্গলকে সমর্থন করে তাই নিয়ে। তার জবাবে সকলে বলাবলি (এবং লেখালিখি) করছেন যে এটা ভুলভাল কথা বলে খবরে থাকার চেষ্টা, উনি ফুটবল তো জানেনই না, ইতিহাসও জানেন না ইত্যাদি।
এগুলো সবই ঠিক কথা। কিন্তু কথায় বলে প্রাজ্ঞ লোকের প্রজ্ঞার চেয়ে মূর্খের মূর্খামি দেখে অনেক বেশি শেখা যায়। এখানেও কিন্তু শেখার উপাদান আছে। কী সেটা?
হিন্দুত্ববাদীদের (“রাজ্যপাল, রাষ্ট্রপতির কোন দল হয় না” কথাটা এখন “সদা সত্য কথা বলিবে” রকমের বাতিল প্রবাদ) চিরকালই বাংলাদেশের হিন্দুদের দুঃখে বুক ফাটে। তাদের দীর্ঘদিনের ঘোষিত দাবী হল বাংলাদেশ থেকে যে হিন্দুরা ভারতে চলে আসে তাদের শরণার্থী হিসাবে এ দেশে আশ্রয় দিতে হবে। আর যে মুসলমানরা আসে তাদের অনুপ্রবেশকারী গণ্য করে ফেরত পাঠাতে হবে। ২০১৪ সালে সরকারে আসার পর একে কাজে পরিণত করতে তারা বিশেষ উদ্যোগও নিয়েছে। আসামে এন আর সি চলছে পুরো দমে (তাতে আসলে কী ঘটছে তা নিয়ে এখানে আলোচনা করছি না), অন্যদিকে নতুন নাগরিকত্ব আইন হচ্ছে। সেই আইনে বলা হচ্ছে যে কোন দেশ থেকে জাতিগত হিংসার শিকার হয়ে চলে আসা হিন্দুরা (বৌদ্ধ, জৈন, শিখ সকলকেই সাপটে হিন্দু ধরে নেওয়া হয়েছে অবশ্য) এ দেশে নাগরিকত্বের অধিকার পাবে। অর্থাৎ বাংলাদেশ বা পূর্বতন পূর্ববঙ্গের হিন্দুদের প্রতি হিন্দুত্ববাদীরা সহানুভূতিশীল। অনেকটা সেই কারণেও পশ্চিমবঙ্গের বাঙালদের মধ্যে বিজেপির সমর্থন ক্রমবর্ধমান। যাঁরা নিজেরা বাঙাল তাঁরা জানেন যে আত্মীয়স্বজন অনেকেই ভাবছেন “হোক বাংলায় এন আর সি। ওরা আমাদের বাপ ঠাকুর্দাদের খেদিয়ে দিয়েছিল, বিজেপি এসে ওদেরও একটু দিক।”
তা ইস্টবেঙ্গল সমর্থক তো মূলত বাঙালরাই। দেশভাগ বা বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের বহু আগে তৈরি ক্লাব হলেও ইস্টবেঙ্গলের হার জিতের সঙ্গে যে উদ্বাস্তু হয়ে এ পারে চলে আসা বাঙালদের হাসি চোখের জল মিশে থাকে তা বাঙালি মাত্রেই জানে। সাংবিধানিক প্রধানবাবুও বিলক্ষণ জানেন। যদি উনি মোহনবাগান সমর্থক হন, তাহলে তো আরো বেশি করে জানেন। সেক্ষেত্রে ইস্টবেঙ্গল সমর্থকদের জন্যে তো ওঁর বিশেষ ভালবাসা থাকার কথা ছিল। উল্টোটা হল কেন?
ব্যাপারটা কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের বাঙালদের জন্যে শিক্ষণীয়। শিক্ষা নেওয়া সবসময় ভাল। পিঠে লাঠির বাড়ি পড়ার আগে নেওয়া গেলে আরো ভাল।

একজন লোক জোম্যাটোর মাধ্যমে খাবার কিনতে চেয়েছিল। শেষ অব্দি অর্ডার বাতিল করে কারণ খাবার দিতে যার আসার কথা ছিল সে মুসলমান। আর আমাদের ইনি বিরাট হিন্দু, মোছলমানের ছোঁয়া খান না। তা জোম্যাটো বিরাট হিন্দুটিকে বলেছে খাবারের কোন ধর্ম নেই, খাবার নিজেই একটা ধর্ম। উপরন্তু জ্যোমাটোর বাবু আবার বলেছেন আমরা এসব অন্যায় আব্দার রাখব না, তাতে যা হয় হবে। বলতেই গেল গেল রব উঠেছে, হাজার হাজার বছরের ধর্ম একটা ফুড ডেলিভারি অ্যাপের মালিকের খোঁচায় নাকি রসাতলে যাচ্ছে। অতএব ধর্ম অন্তপ্রাণ হিন্দুরা সবাই মিলে অ্যাপটি আনইনস্টল করতে লেগেছে।
এ সম্বন্ধে কিছু শুকনো কথা বলার আছে। প্রথমত, জোম্যাটো বেশ করেছে। শুধু তাই নয়, যে লোকটি অর্ডার বাতিল করেছে তার কাজটা বস্তুত অস্পৃশ্যতা। দেশে অস্পৃশ্যতাবিরোধী আইন আছে। সেই আইন অনুযায়ী লোকটিকে অভিযুক্ত করা যায় কিনা সেটা আইনজ্ঞরা বলতে পারবেন, তবে নীতিগতভাবে এটা অস্পৃশ্যতাই।
দ্বিতীয়ত, আমাদের অফিসের পাশেই একটা নাম করা রেস্তোরাঁ থাকায় বিভিন্ন ডেলিভারি অ্যাপের হয়ে কর্মরত ছেলেদের সাথে আমাদের অল্প স্বল্প আলাপ আছে। যে কোন পেশার লোকের যে ন্যূনতম নিরাপত্তা প্রাপ্য তা তাদের নেই। ছেলেগুলো মোটামুটি লেখাপড়া জানা এবং বাইক চালায় দেখে ভুল করবেন না। এরা আক্ষরিক অর্থেই দিন আনে দিন খায়। ফলত ক্ষিদে পেলে পিঠের বাক্স খুলে অন্যের অর্ডার দেওয়া খাবারও খায়। ওদের জায়গায় আমি থাকলে আমিও খেতাম। বেশ করতাম।
সারা পৃথিবীতে মানুষের শ্রমকে বড় লোকেরা শস্তায় কিনে নিয়ে আরো বড়লোক হচ্ছে। তাই একুশ শতকের অর্থনীতিতে সবচেয়ে লাভজনক ব্যবসা হল দালালি। নানারকমের দালালি, যেখানে বিনিয়োগ তেমন কিছু নয় কারণ আসল পুঁজিটা হল শ্রম, যা খুব শস্তায় পাওয়া যাচ্ছে। শুধু ভারতের জোম্যাটোর ডেলিভারি বয়রা নয়, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অ্যামাজনের কর্মীরাও একদম ভাল নেই। সেই কারণেই কদিন আগে প্রাইম সেলের দিনগুলোয় তারা ধর্মঘটের ডাক দিয়েছিল।
এসবের প্রতিবাদ করতে চান? খুব ভাল কথা। এইভাবে শ্রমিকদের শোষণ করার জন্যে অ্যামাজনকে গালাগাল দিন, জোম্যাটোকেও গালাগাল দিন। তা বলে সংখ্যাগুরু বাঁদরামির বিরুদ্ধে দাঁড়ানোকে পাবলিসিটি স্টান্ট বলে উড়িয়ে দেবেন না। যদি এটা স্টান্ট হয় তাহলে এমন ঝুঁকিপূর্ণ স্টান্ট যা দেখানোর ঝুঁকি আজকের ভারতে বিশেষ কেউ নেবে না। আমাদের কোটিপতি ক্রিকেটারদের দেখছেন না? বিমুদ্রাকরণকে বৈপ্লবিক পদক্ষেপ বলে দিতে পারেন ২৪ ঘন্টার মধ্যে, অথচ নানা অজুহাতে যখন বেছে বেছে একটাই সম্প্রদায়ের মানুষকে খুন করা হয় তখন এঁরা অন্তত পাবলিসিটির জন্যেও একটা কথা বলেন কি? রূপোলি পর্দার তারকারাও তথৈবচ। সর্বকালের সবচেয়ে বড় তারকাকে এক সাংবাদিক প্রশ্ন করেছিলেন গণপিটুনি নিয়ে। তো তিনি বলেছিলেন তিনি নাকি বিষয়টা ঠিক জানেন না। অর্থাৎ এই স্টান্টটা দেখাতে অমিতাভ বচ্চনও ভয় পান।
উনপঞ্চাশজন নানা পেশার বিশিষ্ট মানুষ অবশ্য দেখিয়েছিলেন স্টান্টটা। ফল কী? পাটনা হাইকোর্টে তাঁদের বিরুদ্ধে দেশদ্রোহিতার অভিযোগ আনা হয়েছে। বোঝা গেল কতটা বিপজ্জনক এই স্টান্ট? সেই স্টান্ট যদি নিজেদের পুরো ব্যবসার ঝুঁকি নিয়ে জোম্যাটো কর্তৃপক্ষ দেখিয়ে থাকেন তাহলে আপনার অবশ্যই হাততালি দেওয়া উচিৎ। অবশ্য আপনি যদি প্রকাশ্যে লিবারাল আর মনে মনে হিন্দুত্ববাদী হন তাহলে আলাদা কথা।

সায়েবসুবোদের ছবি

কাল হঠাৎ ঝোঁকের মাথায় একটা বাংলা ছবি দেখতে চলে গেলাম সপরিবারে। বেশ ভাল লাগল ছবিটা। যতটা আশা করেছিলাম তার চেয়ে বেশিই ভাল লাগল। কিন্তু এক বালতি দুধে একফোঁটা চোনা। ছবির কলাকুশলীদের নামের তালিকা পুরোটাই রোমানে লেখা। বেশ কয়েকবছর হল বাংলার ছবিতে এটা বাংলার পাশাপাশি রোমানেও লেখার চল হয়েছে। অনেক ছবিতেই দেখেছি বাংলা লেখাটা পর্দার এককোণে অবহেলায়। এখানে দেখলাম বাংলা একদম বাদ।
বাংলা বর্ণমালার প্রতি ছবি করিয়েদের এই অনীহার কারণ কয়েকজনকে জিজ্ঞেস করেছি। চটজলদি উত্তর আসে “আসলে ফেস্টিভ্যালে পাঠাতে হয় তো।” যেন বাংলা ছবির ফেস্টিভ্যাল অভিযান ঋতুপর্ণ পরবর্তী যুগেই শুরু হয়েছে। এমনকি সত্যজিৎ, মৃণালের ছবিও কখনো ফেস্টিভ্যাল দর্শন করেনি, পুরস্কৃতও হয়নি। একথা বললে আবার উত্তর আসে “বাংলা করার অনেক খরচ তো।” এতেও প্রশ্ন ওঠে সত্যজিৎ, মৃণালের কি মাটির নীচে রূপোর কলসীতে গুপ্তধন পোঁতা ছিল? আচ্ছা ফেস্টিভ্যালের দর্শক, বিচারকদের জন্যে বিদেশী ভাষায় সাবটাইটেল করাতে কোন খরচ হয় না? তাছাড়া ফেস্টিভ্যাল মাথায় রেখে যাঁরা ছবি বানান আজকাল, তাঁরা কত কাঁড়ি কাঁড়ি পুরস্কার আনছেন, বাংলা ছবি সারা বিশ্বে কেমন অগ্রগণ্য হয়ে উঠেছে তা তো দেখতেই পাচ্ছি। আরো একটা প্রশ্ন করি। বাংলাদেশের ছবিগুলো ফেস্টিভ্যালে যায় না? যাকগে।
পশ্চিমবঙ্গের চলচ্চিত্র শিল্পের যে ভাঁড়ে মা ভবানী সেটা অনেকদিন হল কোন গোপন তথ্য নয়। কলাকুশলীরা নিজেরাই তো সংবাদমাধ্যমকে বলে বেড়ান যে ছবি করার খরচ তুলতেই বেশ কষ্ট হয়। সেক্ষেত্রে এই রোমানে টাইটেল কার্ড করে ইংরিজি না জানা দর্শককে অচ্ছুত করে রাখার অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস, যাকে ইংরিজিতে elitism বলাই সঙ্গত, সেটা বাংলা ছবির নিয়ামকরা পান কোথায়? নাকি ব্যাপারটা আসলে এই যে বাংলা ছবির উচ্চশিক্ষিত শহুরে নির্মাতারা নিজেদের নামের সঠিক বাংলা বানানটাও জানেন না, জানার প্রয়োজনও বোধ করেন না? সে না হয় না-ই জানলেন। এ নিয়ে বেশি বললে আবার ব্যাপারটা শেষ অব্দি ব্যক্তিস্বাধীনতার প্রশ্ন হয়ে দাঁড়াবে। কিন্তু কথা হচ্ছে বাংলা ভাষাটা যখন এতই তুচ্ছতাচ্ছিল্যের বস্তু তখন এই সায়েবসুবোরা নিজেদের সায়েবসুবো দর্শকদের জন্যে ইংরিজি ছবিই বানান না কেন? তাহলে তো ফেস্টিভ্যালের বিচারকদের আরো সুবিধা হয় আর ইংরিজিতে যাকে wider audience বলে, আপনাদের প্রশ্নাতীত প্রতিভা সেটাও পেতে পারে আর আর্থিক ক্ষতির মাত্রাও কমে যেতে পারে।