ভাবনা করা চলবে না

আপনার যদি গণতন্ত্র নিয়ে বিন্দুমাত্র মাথা ব্যথা থেকে থাকে এবং বিজেপির দেশপ্রেমের চশমা সরিয়ে আপনি যদি ফ্যাসিবাদ দেখতে পেয়ে থাকেন, তাহলে যতবড় বামবিরোধীই হোন না কেন, এই সত্য মেনে না নিয়ে আপনার উপায় নেই যে শুধু বামপন্থীরাই পড়ে আছেন

ফ্যাসিবাদের একটা মহৎ গুণ আছে — অতি উৎকৃষ্ট ছাঁকনির কাজ করে। কেন বলছি?
২০১৯ এর লোকসভা নির্বাচন নানা দিক থেকেই অনন্য ছিল। যেমন ধরুন, বামপন্থী পরিবারে জন্মে, বরাবর বামপন্থী রাজনীতির কাছাকাছি থেকে যা দেখতে পাইনি, এবারের লোকসভা নির্বাচনের আগে পরে তেমন এক ঘটনা দেখলাম। শক্তি কমে আসা বামপন্থীরা দু ভাগে ভাগ হয়ে গেলেন, নিজেদের মধ্যে কোন আদর্শগত মতানৈক্যে নয়, কোন অবাম দলকে সমর্থন করা উচিৎ, কাকে উচিৎ নয় তাই নিয়ে।
এক দল বললেন বিজেপি যেহেতু দেশের সামনে সবচেয়ে বড় বিপদ, তাই ওদের হারাতে সকলের সাথে জোট করতে হবে। তবে কিনা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আর বিজেপির তফাত উনিশ বিশ। তাই ওঁকে বাদ দিয়েই করতে হবে এই জোট। কংগ্রেস অতীতে যা-ই করে থাক, ওদের সাথে থাকতেই হবে এই পরিস্থিতিতে। ওরা আর যা-ই হোক বিজেপি তো নয়। অস্যার্থ, একলা লড়তে ঠিক সাহস পাচ্ছি না। তাছাড়া সারা দেশে লড়ার শক্তিও নেই। অতএব ওরা লড়ুক, বাফারের কাজ করুক। আমরা তো রইলামই।
আরেক দল বামপন্থী উপর্যুক্ত বামেদের প্রবল আক্রমণ করলেন। বললেন ওঁরা ক্ষমতা হারানোর আক্রোশে, ক্ষুদ্র স্বার্থে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে বাদ দিয়ে ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনকে দুর্বল করছেন। বরং মমতার হাতই শক্ত করা উচিৎ। বাঁচালে উনিই পারেন বাঁচাতে। উনিই ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে সবচেয়ে অগ্রণী সৈনিক। অস্যার্থ, আমাদের তো শক্তি নেই। উনি নেতৃত্ব দিন, আমরা লড়ে যাব।
নির্বাচনের ফল বেরোনোর পর দু পক্ষই যে ভুল ছিলেন তা পরিষ্কার হয়ে গেল। দেখা গেল প্রথম দল কংগ্রেসের লড়ার ক্ষমতায় আস্থা রাখলেও ভোটাররা রাখেননি। উলটে কংগ্রেস কী করবে আর কী করবে না তা নিয়ে মাথা ঘামাতে গিয়ে বিজেপি বা মমতার বিরোধী হিসাবে নিজেদের বিশ্বাসযোগ্যতা তলানিতে। যে ভোট নিজেদের ছিল সেগুলো ধরে রাখার কাজটাও ঠিক করে করা হয়নি।
দ্বিতীয় দলের ভোটের হিসাবে হারানোর মত কিছু ছিল না। সম্ভবত সেটাই তৃণমূলের প্রতি অকুণ্ঠ সমর্থনের সবচেয়ে বড় কারণ। ভোটের ফলে দেখা গেল তাঁরা যে নেত্রীর উপর ভরসা করেছিলেন তাঁর উপর ভোটারদের যথেষ্ট ভরসা নেই।
ভোটের আগে বহু বাম এবং মধ্যপন্থী বন্ধুদের সাথে অনলাইন ও অফলাইনে ঝগড়া করেছি এই বলে যে বিজেপিকে আটকাতে হবে এই যুক্তিতে কোনরকম রামধনু জোট করলে কোন লাভ হবে না, বরং বিজেপির কাজ আরো সহজ হবে। এমনিতেই গত কয়েক বছরে ঘরে ঘরে যত্ন করে জমিয়ে তোলা ধর্মান্ধতা, মুসলমানবিদ্বেষের পরিমণ্ডলে অন্য সব ইস্যু যে পেছনে চলে যেতে পারে সেই আশঙ্কা করতে খুব বেশি বুদ্ধির দরকার হয় না। তার উপর বালাকোট যে মানুষকে অন্য সবকিছু ভুলিয়ে দিয়েছে সে তো এতদিনে পরিষ্কার। কিন্তু রামধনু জোট কেন সারা দেশের কোথাও কাজ করল না তার অন্য কারণও তলিয়ে দেখা দরকার। সেটা করা খুব সহজ হয় বিজেপির জয়ের পর যারা এই নির্বাচনে বিজেপিবিরোধী ছিল তাদের কার্যকলাপ পর্যালোচনা করলে।
কংগ্রেসকে দিয়েই শুরু করা যাক। যে বামপন্থী দলগুলো কংগ্রেসকে ঢাল ভেবেছিলেন তাঁরা মধ্যপ্রদেশের কংগ্রেস সরকারের বিজেপিসুলভ কর্মসূচীকে পাত্তাই দেননি। গোশালা বানিয়ে দেব, রাম পথ বানিয়ে দেব — এসব বলে যারা বিধানসভা নির্বাচন জেতে, তাদের যদি ভোটাররা লোকসভায় ভোট না দেন তাতে অবাক হওয়ার কিছু আছে কি? যদি কেউ হিন্দুত্বের জন্যেই ভোট দেবে ঠিক করে, তাহলে আগমার্কা হিন্দুত্বকেই দেবে, নকল হিন্দুত্বকে কেন দেবে? বিধানসভায় নাহয় রাজ্য সরকারের কাজকর্মে রুষ্ট হয়ে কংগ্রেসকে ভোট দেওয়া গেল, লোকসভায় আর কেন? শুধু মধ্যপ্রদেশ? গুজরাটের নির্বাচনের সময়ে বিজেপি প্রশ্ন তুলল “রাহুল গান্ধী কি হিন্দু?” কংগ্রেস উত্তর দিল “উনি শুধু হিন্দু নন, রীতিমত পৈতেওলা হিন্দু।” বামফ্রন্ট (ওটা কি আছে এখনো? বহরমপুর কেন্দ্রে সিপিএম কংগ্রেস প্রার্থীকে সমর্থন করার পরেও?) নেতৃত্ব এই পার্টির হাত ধরে হিন্দুত্বের বিরুদ্ধে লড়বেন ভেবেছিলেন। এসব অবশ্য লোকসভা নির্বাচনের আগের কথা। তারপর থেকে কংগ্রেস কী কী করেছে?
ইউ এ পি এ আইন এবং এন আই এ আইনের সংশোধনী, যেগুলো ব্যক্তির নাগরিক অধিকারে শেষ পেরেক পুঁতেছে এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় রাজ্য সরকারের যে অধিকার তাতে কেন্দ্রীয় হস্তক্ষেপকে বৈধতা দিয়েছে, কংগ্রেস সেই সংশোধনগুলো নিয়ে বিতর্কে নানা গরম গরম কথা বলে শেষে রাজ্যসভায় পক্ষে ভোট দিয়েছে। জম্মু ও কাশ্মীর ইস্যুতে সোনিয়া আর রাহুল গান্ধী সরকারের বিপক্ষে দাঁড়ালেও রোজ কোন না কোন কংগ্রেস নেতা সরকারকে সমর্থন করছেন। এমনকি পি চিদম্বরম গ্রেপ্তার হওয়ার পর থেকে জয়রাম রমেশ, শশী থারুরের মত নেতা, যাঁরা সুললিত ইংরেজিতে গান্ধী, রবীন্দ্রনাথ, আইডিয়া অফ ইন্ডিয়া ইত্যাদি বলে গত কয়েক বছরে প্রচুর হাততালি কুড়িয়েছেন, তাঁরা বলতে শুরু করেছেন মোদীর অবিমিশ্র সমালোচনা করা নাকি ঠিক নয়। সীতারাম ইয়েচুরি, ডি রাজারা ভেবেছিলেন এদের হাত ধরে বিজেপির বিরুদ্ধে লড়বেন।
এবার তৃণমূল কংগ্রেসের কথায় আসা যাক। নকশাল, এস ইউ সি আই প্রভৃতি বামপন্থীরা এই দলটির সর্বোচ্চ নেত্রীকেই মুক্তিসূর্য ভেবেছিলেন, ২০১৬ থেকে পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির সঙ্গে হিন্দুত্বের প্রতিযোগিতায় নেমে পড়া সত্ত্বেও। তা তৃণমূল কী করেছে ভোটের পর থেকে?
এক কথায় বললে মহুয়া মৈত্র একটা মারকাটারি বক্তৃতা দিয়েছেন লোকসভায়। ব্যাস, আর কিচ্ছু না। ইউ এ পি এ আইনের সংশোধনী নিয়ে আলোচনায় বক্তৃতাটি দিয়ে ফেসবুক এবং ইউটিউবে কয়েক হাজার লাইক কুড়ানোর পর তৃণমূল সদলবলে ভোট দিয়েছে সরকারের পক্ষে। আর এন আই এ আইন নিয়ে ভোটাভুটিতে ওয়াক আউট করে পরোক্ষ সমর্থন দিয়েছে। এ তো গেল সংসদের ভেতরের কথা। বাইরে তৃণমূল থেকে বিজেপিতে যাওয়ার ঢল নেমেছে নির্বাচনের পর থেকে। তা আটকাতে অসমর্থ হয়ে শীর্ষ নেত্রীর বিজেপির থেকেও বেশি বিজেপি হওয়ার প্রয়াসও বেড়েছে। বিজেপি অযোধ্যায় রামমন্দির বানাবে, ইনি দীঘায় জগন্নাথ মন্দির বানাবেন বলছেন। একদিকে চা ওয়ালার সাফল্য দেখে চা ওয়ালীকে দাঁড় করানোর চেষ্টা করছেন, অন্যদিকে বরাবরের রণং দেহি মূর্তি বিসর্জন দিয়ে কেন্দ্রের সাথে সংঘাতে যাবেন না বলছেন।
তারপর আসা যাক অখিলেশ আর মায়াবতীর কথায়। দুজনে সব অতীত বৈরিতা ভুলে উত্তরপ্রদেশে একজোট হয়ে লড়েছিলেন। সেই জোটের উপরে আমরা বিজেপিবিরোধীরা সকলেই অনেক আশা (নাকি দুরাশা?) করেছিলাম। পরাস্ত হওয়ার পর থেকে সংসদে আনা সমস্ত অগণতান্ত্রিক বিলে অখিলেশের সমাজবাদী পার্টি আর মায়াবতীর বহুজন সমাজ পার্টি লক্ষ্মী হয়ে সরকারের পক্ষে ভোট দিয়েছে। সংবিধানকে এবং গণতন্ত্রকে বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ দেখিয়ে কাশ্মীরিদের প্রতি যা করা হল, আম্বেদকরের নামে শপথ নেওয়া মায়াবতীর পার্টি তাতেও বিনা বাক্য ব্যয়ে সমর্থন জানিয়েছে।
হিন্দুত্ববাদের সূতিকাগার, মোদী-শাহের ইন্দ্রপ্রস্থ যে গুজরাট, সেখানে তিন মহারথী এক হয়েছিলেন বিজেপিকে হারাবেন বলে। বামপন্থী, আম্বেদকরপন্থী জিগ্নেশ মেওয়ানি হাত মিলিয়েছিলেন চরম প্রতিক্রিয়াশীল উচ্চবর্ণের জন্যে সংরক্ষণ দাবী করা নেতা হার্দিক প্যাটেলের সাথে। এই বিপরীত মেরুর রাজনীতি কী করে মিলতে পারে তা নিয়ে যখন জিগ্নেশকে প্রশ্ন করা হয়েছিল নির্বাচনের আগে, তখন তিনি বলেছিলেন আগে তো বিজেপিকে হারাই, তারপর ওসব বুঝে নেব। বিজেপি বৃহত্তম বিপদ, আগে ওদের হারাতে হবে — এই যুক্তিতে তিনি আবার পশ্চিমবঙ্গের কমিউনিস্টদের পরামর্শ দিয়েছিলেন দিদির হাত শক্ত করতে। ফলাফলে দেখা গেল পরেরটা পরে হবে যুক্তি মানুষ বিশ্বাস করেননি। জিগ্নেশ আর হার্দিকের সঙ্গে জুড়েছিলেন কংগ্রেস নেতা অল্পেশ ঠাকোর। অল্পেশ এখন বিজেপিতে, হার্দিক নির্বাচন কমিশনের বদান্যতায় নির্বাচনে লড়তে না পারার পর থেকে চুপ, জিগ্নেশ একা পড়ে গেছেন।
আর কে বিজেপিবিরোধী ছিলেন? অরবিন্দ কেজরিওয়াল। অর্থাৎ আম আদমি পার্টি। ওঁদের কথা যত কম বলা যায় তত ভাল। দিল্লীতে যে ওঁরা একটা আসনও জিততে পারেননি সেটা বড় কথা নয়। বিজেপির কয়েক হাজার কোটি টাকার নির্বাচনী প্রচার, সাম্প্রদায়িক মেরুকরণ, সমস্ত সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের পার্টিজান কার্যকলাপের মধ্যে আপের মত একটা ছোট পার্টির না জিততে পারা দোষের নয়। কিন্তু বরাবরের লড়াকু কেজরিওয়াল কেমন যেন মিইয়ে গেছেন নির্বাচনের পর থেকে। কেন্দ্রীয় সরকারের বঞ্চনা নিয়ে তাঁর আর কোন বক্তব্য নেই। দিল্লীকে রাজ্যের মর্যাদা দেওয়া হোক এই দাবী তিনি কবে থেকে করে আসছেন। অথচ জম্মু ও কাশ্মীরকে ভেঙে তিন টুকরো করে কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল করে দেওয়া হল, তিনি সমর্থন করলেন।
দেবগৌড়ার দল নিজেদের বিধায়ক, সাংসদ বিক্রি হওয়া আটকাতে পারছেন না, ডি এম কে ও সরকারের বাধ্য সন্তান।
তাহলে বাকি রইল কারা? কাশ্মীরের ন্যাশনাল কনফারেন্স আর হায়দরাবাদের আসাদুদ্দিন ওয়েসিকে (যিনি লম্বা দাড়ি রাখেন আর ফেজ পরেন বলে আমরা মৌলবাদী বলে ধরেই নিয়েছি, যদিও গেরুয়া পরা সাংসদদের দেখে মৌলবাদী মনে হয় না) বাদ দিলে, বাকি রইলেন বামপন্থীরা। আপনার যদি গণতন্ত্র নিয়ে বিন্দুমাত্র মাথা ব্যথা থেকে থাকে এবং বিজেপির দেশপ্রেমের চশমা সরিয়ে আপনি যদি ফ্যাসিবাদ দেখতে পেয়ে থাকেন, তাহলে যতবড় বামবিরোধীই হোন না কেন, এই সত্য মেনে না নিয়ে আপনার উপায় নেই যে শুধু বামপন্থীরাই পড়ে আছেন। বস্তুত, এন আই এ আইনে রাজ্য সরকারকে ঠুঁটো জগন্নাথ আর এন আই এ কে সর্বশক্তিমান করে দেওয়ার বিপক্ষে লোকসভায় ভোট দিয়েছিলেন ঠিক ছজন — চার বাম সাংসদ আর ন্যাশনাল কনফারেন্স এবং ওয়েসি।
ফ্যাসিবাদ ছেঁকে দিয়েছে। এখন থেকে ভারতে তার যত বিরোধিতা হবে, যেটুকু বিরোধিতা হবে তার নেতৃত্ব বামপন্থীদেরই দিতে হবে। তাঁরা চান বা না চান, বিজেপিকে তাত্ত্বিকভাবে ফ্যাসিবাদী বলে মানুন বা না মানুন। কারণ বাফারগুলো আর নেই, আর থাকবে না। কেউ সি বি আই, ই ডি ওষুধে জব্দ, কেউ নিজের ক্ষমতাটুকু ধরে রাখতে পারলেই খুশি, কাউকে স্রেফ কিনে নেওয়া গেছে এবং যাবে। কিন্তু বামপন্থীদের দিকে সিবিআই, ই ডি লেলিয়ে দেওয়া যাচ্ছে না, কারণ তাঁদের দুর্নীতি নেই। পশ্চিমবঙ্গের কিছু সেজ নেতা ছাড়া কাউকে কিনে ফেলাও যাচ্ছে না।
এই পর্যন্ত পড়ে আপনি তেলে বেগুনে জ্বলে উঠবেন, কারণ চৌত্রিশ বছরের বাম শাসনে সিপিএমের দুর্নীতিগ্রস্ত এল সি এস, পঞ্চায়েত সদস্য, পঞ্চায়েত প্রধানের মুখ আপনার মনে পড়বে, পড়া সঙ্গত। কিন্তু মনে রাখবেন, ভারতে এ পর্যন্ত ক্ষমতার স্বাদ পেয়েছে যে দুটি বামপন্থী দল, তাদের আমলে সরকারী স্তরে দুর্নীতি ভারতের অন্য যে কোন রাজ্যের চেয়ে কম৷ আর কোন দলে আপনি বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য বা মানিক সরকার বা পিনারাই বিজয়নের মত জীবনযাত্রার মুখ্যমন্ত্রী দেখাতে পারবেন কি? ইন্দ্রজিৎ গুপ্তের মত সৎ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ভারতে কজন পাওয়া গেছে বাজার অর্থনীতির যুগে? সদ্যপ্রয়াত নকশাল নেতা এ কে রায় বা শঙ্কর গুহনিয়োগীর কথা নাহয় না-ই বললাম। না-ই আলোচনা করলাম যুক্তফ্রন্ট সরকারের শ্রমমন্ত্রী এস ইউ সি আই নেতা সুবোধ ব্যানার্জির কথা। তাঁরা তো প্রাগৈতিহাসিক লোক বলে গণ্য হন আজকাল।
এখন প্রশ্ন, বামপন্থীরা লড়বেন কী করে? কতটুকু শক্তি তাঁদের? আর এস এস (বিজেপি তো ফ্রন্ট মাত্র) নামক কর্পোরেটপুষ্ট বেহেমথের সামনে তাঁরা কতটুকু? যদি বামপন্থী বলতে ক্রমহ্রাসমান সিপিএম বোঝেন তাহলে সত্যিই তাঁরা পারবেন না। যদি সীমিত সাংগঠনিক শক্তির সি পি আই বোঝেন তাহলে তাঁরাও পারবেন না। যদি আলাদা করে সি পি আই (এম-এল) লিবারেশন বোঝেন তাহলে নিঃসংশয়ে বলা যায় তাঁরাও পারবেন না। কিছু কিছু অঞ্চলে শক্তিশালী এস ইউ সি আই বা আর এস পি, ফরোয়ার্ড ব্লক — এঁরা কেউই পারবেন না। কিন্তু এঁরা সকলে যদি একত্র হন, তাহলে শক্তিটা উড়িয়ে দেওয়ার মত হয় না। এঁরা এক হলেই কি জিতে যাবেন? বা জনসমর্থন পাবেন? এক এক করে উত্তর ভাবা যাক।
কে যেন বলেছেন “I do not fight fascists because I will win. I fight fascists because they are fascists.” এই মুহূর্তে এর চেয়ে বড় কথা নেই। সমস্ত বামপন্থী শুধু নয়, সমস্ত গণতন্ত্রপ্রিয় দেশপ্রেমিক মানুষেরই এই কথাটাই শিরোধার্য করা দরকার। বড় কথা হল সমস্ত বামপন্থী এক হতে পারবেন কিনা।
লোকসভা নির্বাচনের আগে ৩রা ফেব্রুয়ারি বামফ্রন্টের ডাকা ব্রিগেড সমাবেশে লিবারেশন নেতা দীপঙ্কর ভট্টাচার্যের উপস্থিতিকে বৃহত্তর বাম ঐক্যের পূর্বাভাস বলে যাঁরা আশা করেছিলেন, অচিরেই তাঁদের ভুল ভেঙে যায় কংগ্রেসের সঙ্গে আসন সমঝোতা নিয়ে সিপিএমের উদগ্রীব উন্মাদনায়। আজকের সঙ্কটেও, ভয় হয়, বাম ঐক্যের চেয়ে বৃহত্তম বামপন্থী দলটির নেতৃত্বের কাছে ক্ষয়িষ্ণু কংগ্রেসের সখ্য বেশি প্রার্থনীয় না হয়। আরো আশঙ্কা এই যে ঐক্যের প্রচেষ্টা হলে হয়ত লিবারেশন কর্মীরা বলবেন “অমুক বছর যে আমাদের অমুক কমরেডকে ওরা মেরেছিল?” প্রত্যুত্তরে সিপিএম কর্মীরাও অনুরূপ হিংসার ইতিহাস তুলে ধরবেন। এস ইউ সি আই বলবেন “সিপিএম সংশোধনবাদী”, আর সিপিএম বলবেন “ওরা আবেগসর্বস্ব অতি বাম। বিপ্লবের পক্ষে ক্ষতিকর।”
এই যদি চলতে থাকে, তাহলে ভারতে বামপন্থী বলে আর কেউ তো থাকবেই না, বর্তমান পরিস্থিতিতে বলা যায় ভারত ব্যাপারটাই আর থাকবে না।
এবার জনসমর্থনের প্রশ্ন। বামপন্থীরা সমর্থন পাবেন, কিন্তু পেতে গেলে ঠিক করতে হবে কাদের সমর্থন চাইছেন। সকলের সমর্থন কথাটার আজ আর কোন মানে নেই। ভারতে এখন ঔপনিবেশিক শাসন চলছে না। হিন্দু ফ্যাসিবাদ বাইরে থেকে আসা জিনিস নয়। তাই একে পরাস্ত করতে মহাত্মা গান্ধী যেরকম দল মত ধর্ম জাতি নির্বিশেষে সব ভারতবাসীকে এক করতে চেষ্টা করেছিলেন, সেরকম প্রচেষ্টার কোন মানে হয় না। স্পষ্টতই ভারতে যে সামাজিক ওলট পালট হয়নি অথচ হওয়া উচিৎ ছিল ইতিহাসের নিয়মে, এখন তারই সময়। অর্থাৎ এখন পক্ষ নেওয়ার সময়। বামপন্থীরা, যদি সত্যিই বামপন্থী হন, তাহলে আক্রান্ত ধর্মীয় সংখ্যালঘুর পক্ষ নেবেন। নিম্নবর্ণের মানুষের পক্ষ নেবেন। সারা পৃথিবীতে, আমাদের দেশে তো বটেই, জঙ্গল এবং বন্যপ্রাণকে গ্রাস করতে উদ্যত পুঁজিবাদ। পুরো গ্রহটারই ধ্বংস সাধনে উদ্যত, সরকারপুষ্ট বৃহৎ পুঁজি। ধ্বংস থেকে বাঁচতে হলে অরণ্যের অধিকার অরণ্যবাসীদের হাতে ফিরিয়ে দেওয়া অবশ্য কর্তব্য। তাই বামপন্থীদের আদিবাসীদের পক্ষেও অবশ্যই থাকতে হবে।
সব মিলিয়ে এঁরাই কিন্তু এদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ। তবে এঁদের পক্ষে দাঁড়াতে হলে বামপন্থীদের দীর্ঘকাল সমর্থন করতেন এমন অনেক মানুষের সমর্থন হারানোর ঝুঁকিও কিন্তু নিতে হবে। গোড়াতেই বলেছি ফ্যাসিবাদ অতি উৎকৃষ্ট ছাঁকনি। সেকথা শুধু রাজনৈতিক দলগুলোর ক্ষেত্রে সত্যি তা নয়। চারপাশে তাকালেই দেখা যাচ্ছে, জীবনে কখনো বামপন্থীদের ছাড়া অন্য কাউকে ভোট দেননি এমন বহু মানুষের সুপ্ত মুসলমানবিদ্বেষ কেমন বেরিয়ে এসেছে। পশ্চিমবঙ্গের বামপন্থীদের ভোট এক লহমায় ২৩% থেকে ৭% এ নেমে আসার পেছনে এঁরা বড় কারণ। অবশিষ্ট সাত শতাংশের অনেকেও যে “কাশ্মীরকে বেশ টাইট দেওয়া গেছে” ভাবছেন না এমনটা জোর দিয়ে বলা যাচ্ছে না। অদূর ভবিষ্যতে ফ্যাসিবাদীরা আরো সূক্ষ্ম ছাঁকনি প্রয়োগ করতে চলেছে। শিক্ষা ক্ষেত্রে এবং চাকরিতে বর্ণভিত্তিক সংরক্ষণ তুলে দেওয়া হবে। তাতে যে বহু বাম সমর্থক উচ্চবর্ণের মানুষই উল্লসিত হবেন তা পরিষ্কার। বর্ণবাদকে আলাদা করে বোঝার প্রয়োজন নেই, শ্রেণীর লড়াই ছাড়া আর কোন লড়াই নেই — এই ভ্রান্তির ফল তখন বামপন্থীদের ভুগতে হবে। অর্থাৎ আরো অনেক সাবেকি সমর্থক সরে যাবেন। বামপন্থীরা সে ঝুঁকি নেবেন তো? এখন অবশ্য তাঁদের আর হারানোর কিছুই নেই। আর কবি তো বলেছেনই “তোর আপনজনে ছাড়বে তোরে। তা বলে ভাবনা করা চলবে না।”

কাটমানির স্বপ্নভঙ্গ?

যে শিল্পী একসময় আমাদের বলতেন “চল যাব তোকে নিয়ে, এই নরকের অনেক দূরে। এই মিথ্যে কথার মেকি শহরের সীমানা ছাড়িয়ে”, তাঁর সবচেয়ে বড় মঞ্চ হয়ে দাঁড়াল একুশে জুলাইয়ের মঞ্চ

বয়ঃসন্ধির প্রেম একতরফা হলেও বিশুদ্ধ। অন্তত আমাদের বয়ঃসন্ধির প্রেম তেমনই ছিল। কারণ আমাদের স্মার্টফোন ছিল না, তাতে সুলভ পর্নোগ্রাফি ছিল না, সম্ভবত সে জন্যেই অ্যাসিড দিয়ে বাথরুম পরিষ্কার করা ছাড়া আর কিছু করা যায় আমরা ভেবে উঠতে পারতাম না। তা সেই বয়ঃসন্ধির প্রেম নিয়ে সবচেয়ে জীবন্ত, হৃদপিণ্ড ছিন্নভিন্ন করে দেওয়া গানটা লিখেছিলেন নচিকেতা। সে বয়সে তাঁর নীলাঞ্জনা আর আমাদের নীলাঞ্জনারা অভিন্ন ছিল।
শুধু প্রেম নয়, বয়ঃসন্ধির সবকিছুই মানুষের বহুকাল প্রিয় থাকে। হয়ত ওখানেই শৈশবের শেষ বলে। নচিকেতার জন্যেও তাই আমাদের প্রজন্মের অনেকের মনে একটা বিশেষ জায়গা আছে বা ছিল। শিল্পমূল্যে কবীর সুমন (সেযুগের সুমন চট্টোপাধ্যায়) অনেক এগিয়ে। কিন্তু নব্বইয়ের দশকে পশ্চিমবঙ্গের গ্রামে, মফঃস্বলে ছড়িয়ে থাকা মানুষের মনের কথা প্রায় তাঁদের ভাষায় গানের মাধ্যমে বলার ক্ষেত্রে নচিকেতার জুড়ি ছিল না। এবং সেটা বয়সের বাধা অতিক্রম করে। নচিকেতা আমাদের যেমন নীলাঞ্জনা দিয়েছিলেন, দাদু দিদাদের বৃদ্ধাশ্রম দিয়েছিলেন; শাপভ্রষ্ট বাবা, কাকাদের অনির্বাণ দিয়েছিলেন। অস্বীকার করবে কোন মূর্খ? আমরা সলিল চৌধুরীর যুগের লোক নই। আমাদের জন্যে কেউ ঘুমভাঙার গান লেখেনি। আলোর স্পর্শে দুঃখের কাল কেটে যাবে সেই স্বপ্ন আমরা দেখিনি, কারণ পরীক্ষায় ফার্স্ট হওয়া ছাড়া আর কোন স্বপ্ন দেখতে শেখানোই হয়নি। প্রতিবাদের ভাষা বলতে আমরা তাই “শুনব না গান, গান শুনব না” বুঝেছি। সেই ভাষা নচিকেতাই যুগিয়েছিলেন।
সেই জায়গাটা নচিকেতা ধরে রাখতে পারতেন অনায়াসেই। কিন্তু ঐ যে অনেকে বলে, আপনি হয় যৌবনেই বিদ্রোহীর মৃত্যু বরণ করতে পারেন নয় দীর্ঘজীবী প্রতিক্রিয়াশীল হয়ে উঠতে পারেন। কথাটা নচিকেতার ক্ষেত্রে এমন নিদারুণ সত্যি হয়ে উঠবে ভাবতে পারিনি।
বেশ মনে আছে, জনপ্রিয়তার তুঙ্গে থাকার সময়ে আমাদের কোন্নগর রবীন্দ্রভবনে একবার গাইতে এসেছেন, এক প্রবীণ সিপিএম নেতাকে অনুষ্ঠান শেষে তরুণ পার্টিকর্মী উচ্ছ্বসিত হয়ে বললেন “যা পপুলারিটি, ভোটে দাঁড় করায় দিলে ড্যাং ড্যাং কইর‍্যা জিত্যা যাইব।” সুভাষ চক্রবর্তীর সাথে নচিকেতার ঘনিষ্ঠতা ততদিনে সুবিদিত। জানি না ইঙ্গিতটা সেদিকেই ছিল কিনা, তবে সি পি আই (এম) শেষ পর্যন্ত নচিকেতার জনপ্রিয়তাকে নির্বাচনী লড়াইয়ে ব্যবহার করেনি। রাজ্যে যখন পরিবর্তনের হাওয়া বইতে শুরু করল তখন আরো অনেক ছোট বড় বিখ্যাত লোকের মতই নচিকেতাও পরিবর্তনপন্থী হয়ে উঠলেন। বামফ্রন্ট সমর্থক হিসাবে দুঃখ পেয়েছিলাম কিন্তু সঙ্গে এও মনে হয়েছিল যে হয়ত তিনি বামফ্রন্টের দলগুলির বিচ্যুতিতে ব্যথিত, বিরক্ত একজন বামপন্থী। ভুল জায়গায় নিস্তার খুঁজছেন। ভুল তো আমি, আপনি সকলেই করি। তাছাড়া ২০০৮-০৯ থেকে মমতার প্রতি বামফ্রন্টের বাইরের বামেদের প্রকাশ্য ও গোপন সমর্থন তো ছিলই। আর তাঁর বিভিন্ন গান শুনে নকশালপন্থীদের প্রতি নচিকেতার সমর্থন বুঝে নিতেও খুব অসুবিধা হত না। তাই সান্ত্বনা ছিল।
সে সান্ত্বনা অবশ্য দ্রুত অন্তর্হিত শুরু করল যখন দেখা গেল নচিকেতার মনকাড়া গান কমে আসছে, বেড়ে যাচ্ছে রেল দপ্তরের বিভিন্ন জলসায় তাঁর অনুষ্ঠান। রেলমন্ত্রী তখন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। পরিবর্তনের সরকার আসার পরে মন ছুঁয়ে যাওয়া গান কমা আর অনুষ্ঠান বাড়া আরো ত্বরান্বিত হল। যে শিল্পী একসময় আমাদের বলতেন “চল যাব তোকে নিয়ে, এই নরকের অনেক দূরে। এই মিথ্যে কথার মেকি শহরের সীমানা ছাড়িয়ে”, তাঁর সবচেয়ে বড় মঞ্চ হয়ে দাঁড়াল একুশে জুলাইয়ের মঞ্চ। একজন শিল্পী, তিনি বাম ডান যা-ই হোন, যখন নিজের শিল্পকে অপ্রধান করে ফেলেন, যখন তাঁর রাজনীতি তাঁর শিল্পের মধ্যে দিয়ে নয়, অন্য পথে প্রকাশ খোঁজে তখন তাঁকে সন্দেহ করতেই হয়। ভাঁড়ার খালি হয়ে গেছে বলে গানের ভান করে আখের গোছাচ্ছেন — এই সন্দেহ আর অমূলক থাকে না তখন। সেই সন্দেহই ক্রমশ প্রবল হয়েছে গত কয়েক বছরে। আর এখন, যখন পশ্চিমবঙ্গে আরেক পালাবদলের কালো মেঘ দেখা যাচ্ছে, তখন কাটমানি নিয়ে তাঁর গান সেই সন্দেহকে আরো বাড়িয়েই তুলল।
মানুষ ভুল করে, আবার মানুষই সেই ভুল সংশোধন করে। সে দিক থেকে মত পরিবর্তন করার অধিকার সব মানুষেরই আছে, একজন শিল্পীর তো আছে বটেই। সুতরাং নচিকেতা একবার মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে সমর্থন করেছেন বলেই যে সারাজীবন করে যেতে হবে একথা বলার নিশ্চয়ই মানে হয় না। শিল্পীকে চারপাশ সম্পর্কে সচেতন হতেই হবে এবং শেষ অব্দি নিজের বিবেকের বাণী শুনতেই হবে। কিন্তু মুশকিল হল যে সরকারঘনিষ্ঠ শিল্পীদের বিবেক একমাত্র উল্টোদিকে শক্তিশালী (সে যে উপায়েই শক্তিশালী হোক) বিরোধী দল থাকলে তবেই জাগ্রত হয়, তাদের বিবেককে যাত্রার বিবেকের চেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া যায় না।
আজ সকালের কাগজে দেখলাম নচিকেতা সাফাই দিয়েছেন, গানটা সারা দেশের দুর্নীতিগ্রস্ত নেতা নেত্রীদেরই বিরুদ্ধে। এবারেও একুশে জুলাইয়ের মঞ্চে তাঁকে দেখা যাবে কিনা জিজ্ঞেস করলে বলেছেন দিদি ডাকলে তিনি নরকেও চলে যাবেন। কারণ ব্যক্তিগত সম্পর্কই তাঁর কাছে আসল, পার্টি কোন ব্যাপার না। কথাটা কেমন সিগারেটের প্যাকেটের বিধিসম্মত সতর্কীকরণের মত শোনাল না? কাল সুভাষদার সাথে সম্পর্ক ভাল ছিল বলে উনি সিপিএমের ছিলেন, আজ দিদির জন্যে উনি তৃণমূলের, কাল অন্য কোন দাদার জন্যে বিজেপির হয়ে যেতেই পারেন — এমনটাই কি বলতে চাইলেন জীবনমুখী শিল্পী?

পুনশ্চ: সেদিন দেখি আমার নীলাঞ্জনা বাজার করছে। মাছ, মাংস, সবজি বিক্রেতাদের সাথে তার কথা বলার ধরণ দেখে অবাক হয়ে ভাবলাম “একে নিয়ে কবিতা লিখতাম!”

ব্যর্থ নমস্কার

বিদ্যাসাগরের প্রতিকৃতিরও কম অসম্মান কলকাতার বুকে মূর্তি ভাঙার আগে থেকেই হয়নি। লুকিয়ে চুরিয়ে হয়নি, আমার আপনার চোখের সামনেই হয়েছে

প্রথমে ভেবেছিলাম এই বিষয়ে একটা লাইনও লিখব না। প্রবৃত্তি হচ্ছিল না। বাস্তবিক যা ঘটেছে এবং ঘটছে তা দেখে বমি পাচ্ছিল। কিন্তু শেষ অব্দি ভেবে দেখলাম ইতরামির স্বর্ণযুগে প্রবৃত্তির দোহাই দিয়ে চুপ করে থাকা অপরাধমূলক কাজ। যারা ভালবাসো, অন্তর হতে বিদ্বেষ বিষ নাশো ইত্যাদি ভাল ভাল কথা বলেছিলেন, দুর্দিনে দাঁড়িয়ে আমাদের কবীন্দ্র স্বয়ং তাঁদের ব্যর্থ নমস্কারে ফিরিয়ে দিয়েছেন। আমি কোন হরিদাস পাল? তাই সংক্ষেপে কয়েকটা কথা বমি করার মত করেই উগরে দিই।
ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের মূর্তি কেন ভাঙা হয়েছে তা নিয়ে কোন সন্দেহের অবকাশ নেই। অত বিশালকায় বাঙালি আর কে-ই বা আছেন? ওঁকে না ভাঙলে বাংলাকে কী করে ভাঙা যাবে? আমার নিজের অন্তত কারা ভেঙেছে তা নিয়েও কোন সন্দেহ নেই, যতক্ষণ না তদন্ত অন্যরকম প্রমাণ করছে। কিন্তু বলার কথা এই যে বাঙালির ভণ্ডামি যারা মূর্তি ভেঙেছে তাদেরই হাত শক্ত করছে।
যত লোক ফেসবুকে বিদ্যাসাগরকে ডিপি বানিয়েছে তার অর্ধেকও যদি ফেসবুকে বাংলায় পোস্ট করার অভ্যাস রাখত, হোয়াটস্যাপে বাংলায় চ্যাট করত তাহলে বাংলার রাজধানীতে বিদ্যাসাগরের মূর্তি ভাঙার সাহস কারো হত না। কলকাতা জুড়ে কয়েকশো ইংরিজি মাধ্যম স্কুল। সেই স্কুলে পাঠরত লক্ষ লক্ষ বাঙালি ছেলেমেয়ে যদি অন্তত দ্বিতীয় ভাষা হিসাবেও বাংলা পড়ত, তাহলে আমাদের বিদ্যাসাগরকে নিয়ে গদগদ হওয়ার একটা মানে থাকত। কিন্তু তারা পড়ে হিন্দি। বাবা-মায়েরা গর্ব করেন “জানেন দাদা, আমার ছেলের বাংলাটা ঠিক আসে না।“ এদিকে বিদ্যাসাগরের মূর্তি ভাঙা হয়েছে বলে লোকে কেঁদে ভাসাচ্ছে।
রাজ্যের বাংলা মাধ্যম স্কুলগুলো শিক্ষক শিক্ষিকার অভাবে ধুঁকছে, ছাত্রছাত্রীর অভাবে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। বেশিদিন আগের কথা নয়, স্বয়ং বিদ্যাসাগরের প্রতিষ্ঠা করা স্কুল বন্ধ হয়ে যেতে বসেছিল। আমাদের মধ্যে যাঁদের কথা কম, কাজ বেশি তাঁরা আপাতত বাঁচিয়েছেন। আমরা কেউ সেসব নিয়ে ভাবি? বিদ্যাসাগর অবিভক্ত বাংলায় ঘুরে ঘুরে স্কুল স্থাপন করেছিলেন। কেন? যাতে শিক্ষার আলো সবচেয়ে প্রত্যন্ত গ্রামে, সবচেয়ে গরীব মানুষটার ঘরেও পৌঁছায়। এবং সেটা সম্ভব একমাত্র জোরালো সরকারপোষিত শিক্ষাব্যবস্থা থাকলে তবেই। অথচ আমাদের এখানে সরকারী শিক্ষাব্যবস্থার মুমূর্ষু অবস্থা নিয়ে আমাদের কারোর মাথা ব্যথা আছে? বেসরকারী স্কুলগুলোর বেশি ফি এর জন্যে মুখ্যমন্ত্রী একদিন মালিকদের ডেকে ধমকালেই তো আমরা খুশি। বিদ্যাসাগরের শিক্ষা গোল্লায় যাক, যতক্ষণ হাতে কলমে মূর্তি না ভাঙা হচ্ছে ততক্ষণ সব ঠিক আছে। মাস দুয়েক আগে কলকাতা শহরের বুকে শিক্ষক পদপ্রার্থীরা রোদ বৃষ্টি মাথায় করে না খেয়ে রাস্তায় বসেছিলেন। একদিন দুদিন নয়, আঠাশ দিন। কজন গিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন আর কটা ফেসবুক পোস্ট দেখেছি পরিষ্কার মনে আছে। শিক্ষকের দুঃখে যার প্রাণ কাঁদে না সে কিরকম বিদ্যাসাগরপ্রেমী?
আরো মোটা দাগে বলব? বিদ্যাসাগরের প্রতিকৃতিরও কম অসম্মান কলকাতার বুকে মূর্তি ভাঙার আগে থেকেই হয়নি। লুকিয়ে চুরিয়ে হয়নি, আমার আপনার চোখের সামনেই হয়েছে। আমরা প্রতিবাদ করিনি, আমাদের অগ্রগামী শিল্পী, সাহিত্যিক, অধ্যাপকরাও করেননি। গোটা শহর ছেয়ে গেছে বিভিন্ন মনীষীদের উক্তি সম্বলিত হোর্ডিংয়ে, যার মধ্যে বিদ্যাসাগরও আছেন। সঙ্গের ছবিটি কিন্তু সেই মনীষীদের নয়, মাননীয়া মুখ্যমন্ত্রীর। আরেক ধরণের হোর্ডিংয়ে বাংলার মনীষীদের সঙ্গে এক সারিতে বসানো হয়েছে মুখ্যমন্ত্রীকে। সেই হোর্ডিংও আলো (বা অন্ধকার) করে রেখেছে শহরের আকাশ। কারো মনে হয়নি ব্যাপারটা অন্যায়, অশ্লীল? বাঙালি সংস্কৃতির উপর আঘাত? আমরা কি অপেক্ষা করছিলাম কবে বিদাসাগরের মুন্ডুটা আছড়ে মাটিতে ফেলা হবে তার জন্যে?
আর একটা কথা বলার আছে। বাংলার সংস্কৃতি আক্রান্ত সন্দেহ নেই। কিন্তু চট করে ব্যাপারটা যেরকম বাঙালি বনাম অবাঙালি করে ফেলা হয়েছে তা শুধু সঙ্কটটাকে গুলিয়ে দেওয়ার চেষ্টা। লড়াইটা আসলে ভাল বনাম মন্দের, বাঙালি বনাম অবাঙালির নয়। বাঙালিকে নিজভূমে পরবাসী হতে কেউ জোর করেনি।
অফিসে কাজ করতে করতে ক্ষিদে পেলে সুইগি অ্যাপের মাধ্যমে খাবার আনাই। গত এক দেড় মাসে দুবার দুজন ডেলিভারি বয় খাবার নিয়ে এসে আমাকে ফোন করে হিন্দিতে কথা বলেছে। একজনের পদবী হালদার, অন্যজনের সাহা। তবু নিশ্চিত হওয়ার জন্যে তাঁদের জিজ্ঞেস করেছিলাম “ভাই, আপনি বাঙালি তো?” সদর্থক উত্তর পেয়ে জানতে চেয়েছিলাম আমার পদবি বন্দ্যোপাধ্যায় দেখেও কেন হিন্দিতে কথা বললেন। দুজনেই জানালেন আজকাল বাঙালি খদ্দেররা নাকি বাংলায় কথা বললে বুঝতেই পারেন না। এ জিনিস বাঙালিকে বড়বাজারের গদির কোন মারোয়াড়ি শেখাননি, ভবানীপুরের পাঞ্জাবীরাও শেখাননি। ঠিক যেমন বাঙালি মেয়ের বিয়েতে সঙ্গীত করতে হবে এমনটা কোন অবাঙালি মাথায় বন্দুক ঠেকিয়ে দাবী করেননি, বাঙালি বর বৌভাতে শেরওয়ানি না পরলে ভোটার লিস্ট থেকে নাম কেটে দেওয়া হবে, এমনটাও কোন অবাঙালি রাজনীতিবিদ হুমকি দেননি। হিন্দিকে বাংলার মাথায় চাপিয়েছে বাঙালি নিজেই। যে কারণে শহুরে, লেখাপড়া জানা বাঙালির বিদ্যাসাগরের জন্যে এই হঠাৎ আবেগকে মড়াকান্নার বেশি কিছু বলা শক্ত।
বাঙালি সংস্কৃতির উপর আঘাত করা শুরু হয়েছে তখন থেকে যখন বাংলার অধিকাংশ ইসলাম ধর্মাবলম্বী মানুষের মাতৃভাষা বাংলা হওয়া সত্ত্বেও যেখানে সেখানে রাজনৈতিক হোর্ডিং লেখা শুরু হয়েছে উর্দুতে। প্রবল আঘাত করা হয়েছে তখন যখন হিন্দি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করা হয়েছে। বিরাট আঘাত নেমে এসেছে তখন যখন কলকাতার আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব প্রাঙ্গণে সত্যজিৎ রায়, ঋত্বিক ঘটক, মৃণাল সেন, তপন সিংহ, অজয় কর, নিদেনপক্ষে উত্তম কুমার বা সুচিত্রা সেনের বদলে চলচ্চিত্রের সঙ্গে সম্পর্কহীন নেত্রীর ঢাউস প্রতিকৃতি টাঙানো হয়েছে। পঞ্চধাতুর বা দুশো ফুটের বিদ্যাসাগর মূর্তি বানিয়ে এই ক্ষতি পূরণীয় নয়। এবং এ ক্ষতি অবাঙালিরা কেউ করেনি।
বিদ্যাসাগরকে রাধাকান্ত দেব, রসময় দত্তর মত বাঙালিদের বিরুদ্ধেই লড়তে হয়েছিল। তাই অনেকে যে বলছেন “বাঙালিকে সব বিভেদ ভুলে এক হতে হবে”, সেকথা একেবারে ভুল। বরং বাঙালিকে পক্ষ নিতে হবে। ঠিক করতে হবে সে বিদ্যাসাগরের পক্ষে না রাধাকান্তদের পক্ষে। কথায় এবং কাজে আমাদের রামমোহন, বিদ্যাসাগরের আত্মীয় ছিলেন মহারাষ্ট্রের আত্মারাম পান্ডুরঙ্গ, জ্যোতিরাও ফুলেরা। ঠিক তেমনি সেদিন যাঁরা বিদ্যাসাগরকে অকথা কুকথা বলেছেন, প্রাণ নাশের চেষ্টা করেছেন তাঁদের উত্তরসূরী আজকের মোদী, অমিত শাহরা। অতএব হিন্দি জাতীয়তাবাদের বিপক্ষে বাঙালি জাতীয়তাবাদের অতিসরলীকরণ দিয়ে এ লড়াই লড়া যাবে না। ওভাবে লড়লে বড়জোর কারো নির্বাচনী লড়াইয়ে সুবিধা হতে পারে, বাঙালি জাতীয়তাবাদের আড়ালে নিজেদের অপসংস্কৃতি লুকিয়ে ফেলার সুবিধা হতে পারে।
পুনশ্চ: অধুনা যে হাওয়া তাতে এই লেখাটাকে বামের রাম হয়ে যাওয়ার প্রমাণ হিসাবে চালানো হবে হয়ত। হলে আমি নিরুপায় কারণ আমি ছোট থেকে অঙ্কে কাঁচা। বাইনারি বুঝি না।

কিচ্ছু মিলছে না

নরেন্দ্রভাই দামোদরদাস মোদী আর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তো শুধু দুজন মানুষ নন, তাঁরা হলেন, সাহেবরা যাকে বলে, কাল্ট ফিগার। অদূর ভবিষ্যতেই তাঁদের জীবন ও বাণী আমাদের সন্তানরা পাঠ্য বইতে পড়বে

স্কুলজীবনে পরীক্ষায় এক ধরণের প্রশ্ন আসত, “অমুকের সাথে তমুকের পাঁচটি সাদৃশ্য লেখো।” আমরা তখন পাশে রাখা ছয় ইঞ্চি স্কেলটা টেনে নিয়ে ঠিক খাতার মাঝ বরাবর উল্লম্ব ভাবে একটা দাগ টানতাম। তারপর তার ডাইনে বাঁয়ে দু পক্ষের বৈশিষ্ট্যগুলো লিখতাম। মজার কথা, যে দুটো প্রাণীর বা উদ্ভিদের বা বস্তুর সাদৃশ্য জানতে চাওয়া হত, তাদের বৈসাদৃশ্য জানতে চেয়েও প্রশ্ন আসত অনেক সময়। অর্থাৎ তাদের মিল থাকলেও তারা কিন্তু হুবহু এক নয়। কেন এমন হয় তা বুঝিয়ে দিয়েছিলেন আমাদের স্কুলের জীবন বিজ্ঞানের মাস্টারমশাই সুবীরবাবু। বলেছিলেন “জানবে সাদৃশ্য থাকলে তবেই বৈসাদৃশ্যের প্রশ্ন আসে। মানুষের সঙ্গে মানুষের কী কী সাদৃশ্য, কী কী বৈসাদৃশ্য সেটা জিজ্ঞেস করা যায়। পাগল ছাড়া কেউ জিজ্ঞেস করে না মানুষ আর ছাগলের কী কী সাদৃশ্য বা বৈসাদৃশ্য।”
এইসব কথা আমার বেশ কয়েক বছর ধরে খুব মনে হচ্ছে, আমাদের প্রধানমন্ত্রী আর মুখ্যমন্ত্রীকে দেখে। ওঁদের খুব লড়াই, আবার উনি সেদিন বললেন, নাকি মিষ্টি খাওয়াও চলে। শুনে ইনি কিন্তু বললেন না এসব মিথ্যে কথা। শুধু বললেন এরপর থেকে মাটির লাড্ডু না কিসব যেন পাঠাবেন, খেতে গিয়ে দাঁত ভেঙে যাবে। স্কুলে পড়তে আমিও বন্ধুদের উপর রেগে গেলে এরকমই বলতাম। ফলে খুবই নস্ট্যালজিক হয়ে পড়লাম। আমিও তো মানুষ, আমারও তো ইচ্ছে করে সেই সেকালের মত পরীক্ষার প্রশ্নের উত্তর দিতে। তাই ভাবলাম লিখেই ফেলি কিছু একটা। কী লিখি, কী লিখি? মুখ্যমন্ত্রী ও প্রধানমন্ত্রীর সাদৃশ্য ও বৈসাদৃশ্য লিখি। নরেন্দ্রভাই দামোদরদাস মোদী আর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তো শুধু দুজন মানুষ নন, তাঁরা হলেন, সাহেবরা যাকে বলে, কাল্ট ফিগার। অদূর ভবিষ্যতেই তাঁদের জীবন ও বাণী আমাদের সন্তানরা পাঠ্য বইতে পড়বে। চাকরি বাকরি চলে গেলে বাড়িতে বসে টিউশন করার সময় আমার এই লেখাটা নোট হিসাবে কাজে লেগে যাবে। তেমন জনপ্রিয় করতে পারলে ‘প্রতীকদার নোট’ হিসাবে অমুক প্রকাশনীর সহায়িকা বই হয়েও বেরোতে পারে। রয়্যালটি থেকে বিলক্ষণ দু পয়সা কামাতে পারব।
আগে বৈসাদৃশ্যগুলোই দেখা যাক।
উনি পুরুষ, ইনি নারী। উনি গুজরাতি, ইনি বাঙালি। উনি বিজেপি নেতা, ইনি তৃণমূল নেত্রী। অনেকক্ষণ মাথা চুলকেও আর কিছু বার করতে পারলাম না। এই জন্যে সুবীরবাবুর হাতে আমি চিরকাল কম নম্বর পেতাম। আচ্ছা, নাহয় সাদৃশ্যগুলো লেখার চেষ্টা করে দেখি।
ওনার সরকার অমুকটা পারেনি বললেই উনি দায়ী করেন “কংগ্রেস কে সাট সাল” কে, ইনি বলেন “বামফ্রন্ট ৩৪ বছরে যা সর্বনাশ করে দিয়েছে…”
তাতে থেমে গেলেন তো বেঁচে গেলেন, নাছোড়বান্দা হলে উনি বলেন “দেশদ্রোহী”, “পাকিস্তানি”, “আরবান নকশাল”। ইনি বলেন “সিপিএমের লোক”, “মাওবাদী” (নকশাল তকমার সঙ্গে আশ্চর্য মিল না?)। ইদানীং বিজেপিও বলছেন।
ওনার দলবল জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের উপর খড়গহস্ত। সেখানে চতুর্দিকে কন্ডোম ছড়িয়ে থাকে, ছেলেমেয়েরা সব মদ, গাঁজা, ড্রাগ ইত্যাদি খেয়ে পড়ে থাকে, আর ভারতকে খণ্ড খণ্ড করার চক্রান্ত চলে — এমনটাই ওঁরা বলেন।
এঁর দলের বিষনজরে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়। সেখানেও নাকি মাওবাদী গিজগিজ করছে। এবং যখন এক উপাচার্যের বিরুদ্ধে আন্দোলন হল, তখন এঁর দলের এক পাণ্ডা প্রশ্ন তুললেন “মদ, গাঁজা বন্ধ। তাই কি এত প্রতিবাদী গন্ধ?” তিনি আবার এখন ওঁর দলের পাণ্ডা।
তা এর সমাধান হিসাবে ওঁর মানবসম্পদ উন্নয়ন মন্ত্রী ক্যাম্পাসে ইয়া বড় জাতীয় পতাকা টাঙানোর ফতোয়া দিয়েছিলেন, উপাচার্য ক্যাম্পাসে মিলিটারি ট্যাঙ্ক রাখার নিদান দিয়েছিলেন। আর এঁর শিক্ষামন্ত্রী পরিষ্কার বলেছিলেন সরকারের পয়সায় খেতে পরতে হলে বিশ্ববিদ্যালয়কে সরকারের কথা শুনেই চলতে হবে। অতএব কিভাবে ভর্তি হবে আমি ঠিক করব, কী পড়ানো হবে আমি ঠিক করব, ইত্যাদি।
পরিতাপের বিষয় (কার পরিতাপ জানি না) দুটো বিশ্ববিদ্যালয়ই পড়াশোনা, গবেষণায় পারদর্শিতা দেখিয়েই চলেছে।
বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সঙ্গে অবশ্য দুজনেরই সম্পর্ক গভীর। উনি ‘সম্পূর্ণ’ রাষ্ট্রবিজ্ঞানে এম এ, ডিগ্রি দেখতে চাইলে সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয় বলেছে ওসব তথ্য দেখানো যাবে না, নিয়ম নেই। ইনি পাশ করা উকিল না কী যেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের নামটা ভুলে গেছি।
কর্মসংস্থানের সমস্যার কথা তুললে উনি বলেন “রোজগার নেই মানে? যে পকোড়া বেচে সে রোজগার করছে না?” আর ইনি বলেন তেলেভাজা শিল্পও তো শিল্প।
ওঁর উত্থানকে ওঁর ইংরিজি শিক্ষিত সুটেড বুটেড ধনীর দুলাল বুদ্ধিজীবীরা বলেন লুটিয়েন্স এলিটের আধিপত্যের বিরুদ্ধে দলিত গরীবের ছেলের উত্থান। এঁর উত্থানকে এঁর বামপন্থী ভদ্রলোক বুদ্ধিজীবীরা বলেন ধুতি পরিহিত ভদ্রলোকদের আধিপত্যের বিরুদ্ধে সাধারণ ঘরের মেয়ের উত্থান। ওঁর উত্থানের পর যে দলিতদের প্রাণ ওষ্ঠাগত সেটা চেপে যাওয়াই ভাল। আর এঁর উত্থানের পর যে সাধারণ ঘরের মেয়েরা ধর্ষিত হলেই “সাজানো ঘটনা” হয়ে যাচ্ছে, সেকথা বললেও পুলিশে ধরতে পারে।
পুলিশে ধরা বলতে মনে পড়ল, ওঁর নিন্দা করে, ওঁর পার্টির অন্য নেতাদের নিন্দা করে ফেসবুকে পোস্ট করায় কলেজ পড়ুয়া থেকে সাংবাদিক অব্দি অনেকেই দেশদ্রোহের দায়ে গ্রেপ্তার হয়েছেন। এঁর বা এঁর সরকারের নিন্দা করে লোকে অম্বিকেশ, অরুণাচল ইত্যাদি হয়েছে। মিটিঙে প্রশ্ন তুলে শিলাদিত্যও হয়েছে।
প্রশ্ন পছন্দ হয়নি বলে উনি করণ থাপারের অনুষ্ঠান থেকে এক গ্লাস জল খেয়ে উঠে গেছিলেন, ইনি দর্শকের প্রশ্ন পছন্দ হয়নি বলে তাকে সিপিএম, মাওবাদী ইত্যাদি বলে দেগে দিয়ে সাগরিকা ঘোষের অনুষ্ঠান থেকে প্রস্থান করেছিলেন।
দুজনেই কিন্তু লেখক। উনি এক্সাম ওয়ারিয়র লেখেন। এঁর লেখা বই এক্সাম ওয়ারিয়রদের পুরস্কার দেওয়া হয়।
ওঁর বীরেরা বলেন অমর্ত্য সেন অর্থনীতি বোঝেন না, ইরফান হাবিব ইতিহাস জানেন না। এঁর বীর বলেছেন শঙ্খ ঘোষ কোনো কবি নন।
উনি বাবা গোরক্ষনাথ, গুরু নানক আর সন্ত কবীর — যাঁরা একে অপরের জীবৎকালে জীবিতই ছিলেন না — তাঁদের মধ্যে আধ্যাত্মিক বৈঠক করান। তক্ষশীলা বিশ্ববিদ্যালয়কে অধুনা পাকিস্তান থেকে বিহারে এনে স্থাপন করেন। ইনি? ১৯৪১ এ প্রয়াত রবীন্দ্রনাথকে দিয়ে গান্ধীজির ১৯৪৬ এর অনশন ভঙ্গ করান, পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় সতীদাহ প্রথা রদ করার আইন পাশ করান।
বোর হয়ে যাচ্ছেন, না? আচ্ছা থামা যাক তবে। দুজনেই আবার বজরংবলীর ভক্ত। তিনি গদা নিয়ে রাস্তায় নেমে পড়েছেন ইতিমধ্যেই। বেশি বাড়াবাড়ি করলে দুদল ভক্ত নিয়ে গদাপেটা করতে চলে আসবেন হয়ত।

সাংবিধানিক সঙ্কট না পালে বাঘ?

আইনী মীমাংসা তো নাহয় মহামান্য প্রধান বিচারপতি করে দেবেন, কিন্তু মুখ্যমন্ত্রীর ধর্না কতদিন চলবে? কার বিরুদ্ধে এই ধর্না? এসব প্রশ্নের উত্তর কে দেবে? গতকাল নগরপালের বাড়ির সামনে মোদীর বিরিদ্ধে সংবিধানের পিণ্ডি চটকানোর অভিযোগ করে যখন ধর্নায় বসেছেন, তখন ধরে নেওয়া যায় ধর্না কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে। তা সেই ধর্না দিল্লীর ৭, রেসকোর্স রোডে না হয়ে কলকাতার মেট্রো চ্যানেলে কেন?

১৯৯৩ সালের কোন একদিন কলকাতার তিলজলা এলাকায় ঢুকে পাঞ্জাব পুলিশ এক দম্পতিকে গুলি করে মারে এবং তাদের মৃতদেহ নিয়ে প্রস্থান করে। ঐ দম্পতির বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল তারা নাকি খালিস্তানি জঙ্গি। এই ঘটনা জানাজানি হওয়ার পর প্রচুর আলোড়ন হয়। অতঃপর আমৃত্যু মার্কসবাদী, প্রাক্তন সি পি আই (এম) নেতা এবং বামফ্রন্ট সরকারের একদা অর্থমন্ত্রী অশোক মিত্র সংবাদ প্রতিদিন কাগজে তাঁর কলামে এই ঘটনার তীব্র নিন্দা করেন। লেখাটার শিরোনাম ছিল ‘সবার উপরে পঞ্জাব পুলিশ সত্য?’ সেই লেখা থেকে ঈষৎ দীর্ঘ উদ্ধৃতি এখানে প্রাসঙ্গিক:

স্বাধীনতার পর প্রচুর ঢক্কানিনাদ সহকারে ১৯৪৯ সালে একটি সংবিধান রচনা করা হয়েছিলো, সেই সংবিধানের অনুশাসনে আমাদের রাষ্ট্রব্যবস্থা নাকি নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে। সংবিধানে সুস্পষ্ট নির্দেশ যে-কোনো রাজ্যে আইনশৃঙ্খলা রক্ষার সার্বিক দায়িত্ব ঐ-রাজ্যের সরকারের, কেন্দ্রীয় সরকারেরও না, অন্য-কোনো রাজ্যের সরকারের তো না-ই। রাজ্য সরকারের অনুমতি না নিয়ে এমনকী কোন কেন্দ্রীয় বাহিনীরও কোনো উপলক্ষ্যেই রাজ্যে অনুপ্রবেশের অধিকার নেই। মাত্র একটি অবস্থায় এই রীতির ব্যত্যয় হতে পারে: কেন্দ্রীয় সন্ত্রাসদমন ও অশান্ত অঞ্চল আইন যদি একটি রাজ্যের ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা হ’য়ে থাকে, তা’হলে। কিন্তু এই আইনের ধারাবলে এক রাজ্যের পুলিশ অন্য রাজ্যে ঢুকে যেতে পারে না, ঐ আইন কোনো রাজ্যের ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা হ’লে একমাত্র কেন্দ্রীয় পুলিশ বা প্রতিরক্ষা বাহিনীই রাজ্য সরকারের অনুমতি ছাড়াই কোনো রাজ্যে ঢুকে গিয়ে নিজেদের ইচ্ছানুযায়ী আইনশৃঙ্খলার টহলদারীর ব্যবস্থা করতে পারে।

গতকাল সন্ধ্যা থেকে কলকাতার নগরপালকে জিজ্ঞাসাবাদ করা নিয়ে যে অভূতপূর্ব পরিস্থিতির উদ্ভব হয়েছে তা নিয়ে যে কোন আলোচনায় উপর্যুক্ত কথাগুলো মনে রাখা দরকার, যদিও ১৯৯৩ এর ঘটনার সাথে রাজীব কুমারের বিরুদ্ধে যে অভিযোগ আছে তার অনেক তফাত।
আইন অনুযায়ী কোন আইন এমনভাবে প্রয়োগ করা যায় না বা এমন কোন আইন প্রণয়ন করাও যায় না যা সংবিধানের যা বিরুদ্ধে যায়। এখন কথা হচ্ছে সিবিআই কোন আইন অনুযায়ী সারদা কেলেঙ্কারির তদন্ত করছে? মহামান্য সুপ্রিম কোর্ট তাদের তদন্তের দায়িত্ব দিয়েছেন তাই তারা তদন্ত করছে — এই উত্তরটা অসম্পূর্ণ। কারণ সুপ্রিম কোর্টও আইনের ঊর্ধ্বে নন। স্বয়ং প্রধান বিচারপতিকেও রায় দিতে হয় দেশের আইন মেনেই, তিনি নতুন আইন প্রণয়ন করতে পারেন না। সুপ্রিম কোর্ট যে সিবিআই বা কেন্দ্রীয় তদন্ত ব্যুরোকে আব্দুল মান্নানের দায়ের করা মামলার তদন্তভার দিয়েছেন সেটাও আইনমাফিক। কী সে আইন যার বলে সিবিআই একটা অঙ্গরাজ্যের ঘটনার তদন্ত করতে পারে?
আইনটা হল The Delhi Special Police Establishment Act, 1946. গত ২৫শে নভেম্বর, ২০১৪ তারিখে এই আইনেরই একটি সংশোধনী বিল লোকসভায় পেশ হয়, যার ফলে সিবিআই অধিকর্তা বেছে নেওয়ার জন্যে তিন সদস্যের কমিশন গঠন হয়। সেই কমিশনের সদস্য প্রধানমন্ত্রী, লোকসভার বিরোধী দলনেতা এবং সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি বা তাঁর মনোনীত কোন বিচারপতি। মূল আইনের ছ নম্বর ধারায় কিন্তু বলা আছে কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল বা রেল বিভাগের এলাকায় এই কেন্দ্রীয় পুলিশকে তদন্ত করতে পারে কিন্তু কোন অঙ্গরাজ্যে তদন্ত করতে হলে রাজ্য সরকারের সম্মতি প্রয়োজন।
তাহলে সিবিআই সারা দেশে এত অভিযোগের তদন্ত করে কী করে? করতে পারে কারণ সংশ্লিষ্ট রাজ্য সরকার সম্মতি দেয়। সেই সম্মতির পোশাকি নাম general consent. পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রে এই general consent দিয়েছিল বামফ্রন্ট সরকার, ১৯৮৯ সালে। কে জানে কী আঁচ করে গত নভেম্বরে প্রথমে অন্ধ্রপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী চন্দ্রবাবু নাইডু, এবং তারপর আমাদের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় general consent প্রত্যাহার করে নেন৷ অর্থাৎ এর পর থেকে এ রাজ্যের কোন কেসের তদন্ত করতে হলে সিবিআইকে প্রত্যেক কেসের জন্যে আলাদা করে তদন্তের অনুমতি চাইতে হবে।
কিন্তু এই সম্মতি প্রত্যাহার করে নেওয়ার সময়ে সম্ভবত দিদির খেয়াল ছিল না যে ইতিমধ্যেই চালু হয়ে যাওয়া কেসে এর কোন প্রভাব পড়বে না।
এই আইনী জটিলতা নিয়ে আমরা আমাদের মাথার সব চুল ছেঁড়ার সময় অবশ্য পাব না। আজই সিবিআইয়ের আবেদনে সাড়া দিয়ে মহামান্য প্রধান বিচারপতি গোগোই বসেছিলেন। সলিসিটর জেনারেলকে (অর্থাৎ কেন্দ্রীয় সরকারের কৌঁসুলিকে) মৃদু ধমক দিয়ে বলেছেন, আপনাদের কাছে এমন কোন প্রমাণই নেই যা থেকে বোঝা যায় পশ্চিমবঙ্গ সরকার বা পুলিশ প্রমাণ লোপাট করার চেষ্টা করছে। একটা প্রমাণ দেখান যে সেই চেষ্টা করছে বা করার কথা ভাবছে। এদের এমন শিক্ষা দেব যে আফশোসের শেষ থাকবে না।
মহামান্য আদালত আবার কালই বসছেন। ফলত খুব শিগগির আমরা জেনে যাব কোন পক্ষ আইনভঙ্গ করেছে? রাজ্য সরকারের পুলিশকে না জানিয়ে অসাংবিধানিকভাবে, কোন ওয়ারেন্ট ছাড়াই সিবিআই কলকাতার নগরপালকে ধমকাতে গিয়েছিল? নাকি নগরপালই তদন্তে অসহযোগিতা করে নিয়ম ভাঙছিলেন, এবং সিবিআই সব আইনকানুন মেনেই তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করতে গিয়েছিল?
আইনী মীমাংসা তো নাহয় মহামান্য প্রধান বিচারপতি করে দেবেন, কিন্তু মুখ্যমন্ত্রীর ধর্না কতদিন চলবে? কার বিরুদ্ধে এই ধর্না? এসব প্রশ্নের উত্তর কে দেবে? গতকাল নগরপালের বাড়ির সামনে মোদীর বিরিদ্ধে সংবিধানের পিণ্ডি চটকানোর অভিযোগ করে যখন ধর্নায় বসেছেন, তখন ধরে নেওয়া যায় ধর্না কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে। তা সেই ধর্না দিল্লীর ৭, রেসকোর্স রোডে না হয়ে কলকাতার মেট্রো চ্যানেলে কেন?
যে ৩৫৬ র জুজু কেন্দ্রীয় সরকার দেখাচ্ছে বলে কাল মুখ্যমন্ত্রী অভিযোগ করছিলেন বা স্টুডিওতে বিজেপি নেতারা হুমকি দিচ্ছিলেন, তা যদি সত্যি হয় তাহলে নিঃসন্দেহে মমতা ঠিকই করেছেন। তাঁর সরকারকে যদি কাজ করতে না দেওয়া হয়, নিশ্চয়ই তাঁর অধিকার আছে পথে নেমে আসার। কিন্তু চব্বিশ ঘন্টা হতে চলল, রাজ্যপাল চুপ, কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রক চুপ। জুজুটা গেল কোথায়? তাহলে কি কাল সন্ধ্যের অতি তৎপরতা এবং ধর্না শেক্সপিয়রের ভাষায় “much ado about nothing”?
এতগুলো প্রশ্নের পরে আরো একটা প্রশ্ন আসে। সিবিআই তো বলছে তারা শুধু জিজ্ঞাসাবাদ করতে চায়। তাতে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের আপত্তি কেন? এ কি সেই ঠাকুরঘরে কে জিজ্ঞেস করায় “আমি কলা খাইনি” উত্তর আসার মত ব্যাপার?
বিঃ দ্রঃ সংবিধানের ৩৫৬ ধারার কথা উঠতে মনে পড়ল, তৃণমূল কংগ্রেস গঠন করার পর একটা নির্বাচনে বর্তমান মুখ্যমন্ত্রীর দলের প্রাপ্ত ভোট ছিল শতাংশের হিসাবে ৩.৫৬। তিনি তৎকালীন রাজ্য সরকারকে হুমকি দিয়ে বলেছিলেন ভোটের শতাংশটা খেয়াল রাখবেন। বাড়াবাড়ি করলে পশ্চিমবঙ্গের ঐ অবস্থাই হবে।
ধন্য আশা কুহকিনী।

বেঁচে থাক ডিম ভাত

আজকের পৃথিবীতে রাজনৈতিক সমাবেশ সবচেয়ে বড় জায়গা যেখানে আপনাকে আপনার ক্রয় ক্ষমতা অনুযায়ী মাপা হয় না

ডিম্ভাত নিয়ে চলা বিদ্রুপ এবং তার প্রতিবাদের পরিপ্রেক্ষিতে কতকগুলো কথা বলা দরকার যেগুলো মমতার ব্রিগেড সমাবেশ, বামেদের ব্রিগেড সমাবেশ ছাড়িয়েও প্রাসঙ্গিক।
১) যাঁরা কোনোদিন কোনো রংয়ের রাজনৈতিক মিছিলে বা সমাবেশে যাননি এবং যাওয়াটা “down market” বলে মনে করেন তাঁদের জ্ঞাতার্থে বলি, বহু মানুষের সাথে হাঁটলে অথবা দিগন্তবিস্তৃত মাঠে লক্ষ লক্ষ মানুষের সাথে বসে থাকলে আর কিছু না হোক একটা জিনিস হয় সেটা হল ইগো নিয়ন্ত্রণে আসে। ছশো কোটি মানুষের দুনিয়ায় আপনি কত ক্ষুদ্র, কত অকিঞ্চিৎকর সেটা পরিষ্কার বোঝা যায়। শুধু এই কারণেই নিয়মিত মিছিলে, মিটিঙে যাওয়া যেতে পারে। ল্যাজ মোটা হওয়া আটকানোর এর থেকে ভাল প্রতিষেধক নেই।
২) ব্রিগেডের সমাবেশে আসা লোকেদের উদ্দেশ্য বা কোন লোভ দেখিয়ে তাদের নিয়ে আসা হয়েছে তা নিয়ে ব্যঙ্গবিদ্রূপ নতুন কিছু নয়, বরাবর হয়ে আসছে। আমাদের বাল্যকালে, সিপিএম তথা বামফ্রন্ট যখন মধ্যগগনে, তখন একটি সংবাদপত্রের উত্তর সম্পাদকীয় স্তম্ভে দীর্ঘ লেখা বেরিয়েছিল, যাতে প্রশ্ন করা হয়েছিল “যে দেশে ব্রিগেড নেই সে দেশে কি গণতন্ত্র নেই?” পৃথিবীর সব দেশের গণতন্ত্র এক ছাঁচে ঢালা হোক, একই অর্থনীতি সব দেশে চলুক এই নিও লিবারেল বদমাইশি যাদের তত্ত্ব, বলা বাহুল্য তারাই এসব লিখেছিল। বিশ্বায়নের দুই দশকে আমরা, এ দেশের মধ্যবিত্তরা, এই বুলিগুলো মুখস্থ করে ফেলেছি। বহুজাতিক ব্র‍্যান্ডের জুতো আর জিনস পরতে পেরে আহ্লাদিত আমরাই এখন সগর্বে সকলকে বোঝাই গণতন্ত্র মানে হল পাঁচ বছর অন্তর ভোটটি দিয়ে বাকি সময়টা ঘুমিয়ে থাকা। বিরোধিতা মানেই “disruption” অতএব মিটিং, মিছিল, বনধ সবকিছুই কর্মনাশা। যাদের কর্ম নাশ হচ্ছে রোজ তারা ঘুমিয়ে থাকুক, আমাকে আমার কর্ম করতে দিক। এই চিন্তাভাবনা থেকেই ডিম্ভাত ব্যঙ্গ। এবং এই নিষ্ক্রিয়তার চাষবাসেরই ফল মমতা এবং মোদীর একনায়কত্ব, যেখানে প্রতিবাদ করলেন মানেই আপনি যথাক্রমে উন্নয়নবিরোধী এবং অ্যান্টি ন্যাশনাল। নিও লিবারেল অর্থনীতি, রাজনীতি এখন অস্তাচলে। জায়গা নিচ্ছে ট্রাম্প, ব্রেক্সিট, বলসোনারোর দল। অতএব ফ্রান্সে ব্রিগেড নেই, গণতন্ত্র আছে এবং সেখানে ইয়েলো ভেস্ট আন্দোলন চলছে। স্ট্যাচু অফ লিবার্টির দেশ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, সেখানেও ব্রিগেড নেই। কিন্তু একনায়ক হতে চাওয়া রাষ্ট্রপতির বিরুদ্ধে প্রায় রোজ আপনারা যাকে “disruption” বলেন তা চলেছে। এমন অবস্থা যে মাঝেমধ্যেই সরকার ঝাঁপ ফেলে দিচ্ছে। আপনি যদি এসব না জানেন বা জেনেও আন্দোলন, সমাবেশ দেখে নাক সিঁটকোন তার মানে একটাই — আপনি backdated বা আপনাদের ভাষায় uncool. অর্থাৎ down market.
৩) লড়াই, আন্দোলন, ইউনিয়ন — এসবকে অপ্রয়োজনীয়, “যাদের কোনো কাজ নেই তারা এসব করে” বলে গালাগাল দিতে হলে ভেবেচিন্তে দেবেন। জেট এয়ারওয়েজের কর্মীদের মত চাকরি থেকে রাতারাতি ছাঁটাই হয়ে গেলে আবার প্রকাশ কারাতের কাছে ছুটবেন না যেন। আরো একটা কথা ভেবে দেখবেন। যদি তর্কের খাতিরে ধরে নেওয়া যায় যে সত্যিই কোনো ব্রিগেড সমাবেশে আসা কয়েক লাখ লোকের কোন কাজ নেই, তাহলে সেটা জাতীয় সমস্যা। সেই সমস্যার সমাধানে আপনি কী করছেন? এই সমস্যার সমাধান দাবিও করেছেন কি কখনো? যদি না করে থাকেন তাহলে এই কর্মহীন লোকগুলোকে বিদ্রূপ করার বা নিন্দা করার অধিকার আপনার জন্মায় কী করে?
৪) “এদের তো কিনে নেওয়া খুব সোজা। এদের তো ডিম ভাত (মতান্তরে, স্থানান্তরে বা দিনান্তরে এক প্যাকেট বিরিয়ানি) খাইয়ে দিলেই চলে আসে”। এটা যদি মানুষের শস্তা হওয়ার প্রমাণ হয় তাহলে তো আপনি তো আরো শস্তা। এদের দূর দূরান্ত থেকে আনতে হলে অন্তত যে আনছে তাকে গাঁটের পয়সা খরচ করে বিরিয়ানি খাওয়াতে হয়। আপনি তো আলো ঝলমলে দোকান দেখলেই সপ্তাহান্তে সপরিবারে মলে চলে যান, যা দরকার নেই তা-ও নিজের পয়সা খরচ করে কেনেন, পাঁচ টাকার পপকর্ন দেড়শো টাকায় কেনেন। অর্থাৎ আপনাকে টুপি পরিয়ে আপনার চেয়ে অনেক বড়লোকেরা আরো বড়লোক হয়, এবং আপনার রুচি পছন্দকে কিনে ফ্যালে একটা সমাবেশ আয়োজনের চেয়ে অনেক কম খরচেই।
৫) উপর্যুক্ত কথাগুলো সবই “দেশটার কিস্যু হবে না” ধরণের, প্রকৃতপক্ষে দক্ষিণপন্থী, মধ্যবিত্ত, উচ্চবিত্তদের প্রতি। এ ছাড়াও দুরকমের বামপন্থী আছেন। একদল তাঁদের অপছন্দের পার্টিকে গাল পাড়তে পারার আনন্দে ভুলেই গেছেন যে এই একই গালাগাল বরাবর তাঁদের পছন্দের পার্টিকে দেওয়া হয়েছে, কদিন পরেই আবার দেওয়া হবে। আরেক দল ঠান্ডা ঘরে বসে মার্কস, লেনিন, মাও মুখস্থ করা ছাড়া বিশেষ কিছুই করছেন না কিন্তু ব্রিগেড ফিগেডকে পাত্তা দেন না। কারণ তাঁরা তো কবেই বলেছেন যে কোনো মানুষই নিজের ইচ্ছায় ভোট দেন না এবং সকলকেই জোর করে ব্রিগেডে নিয়ে আসা হয়। এঁরা একদা ভাল করে বন্দুক চালাতে না শিখেই সশস্ত্র বিপ্লব করতে গিয়েছিলেন। সহযোদ্ধারা মৃত্যুবরণ করলেন, কেউ কেউ সারাজীবনের মত পঙ্গু হয়ে গেলেন, এঁরা কে জানে কী করে আস্ত থেকে গেলেন। এখন হয় খবরের কাগজের স্তম্ভের আড়াল থেকে, নয় ফেসবুক ওয়ালের আড়াল থেকে শ্রেণিশত্রুর বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেন। এঁদের বোধ করি বেশি পাত্তা দেওয়ার দরকার নেই, কারণ প্রথমোক্তরা কেউ বিমান বসুর মত আশি বছর বয়সে পুলিশের লাঠি খেতে যাবেন না। দ্বিতীয়োক্তরা কবিতা কৃষ্ণনের মত মাঠে ময়দানে রোজ ধর্ষণ, খুনের হুমকি অগ্রাহ্য করে রাজনীতি করবেন না। তবে মুখিয়ে আছি মোদীর মিটিংয়ের দিন এঁরা জোর করে আনা, ডিম ভাত খেতে আসা জনতা সম্বন্ধে কটা কথা বলেন তা দেখার জন্যে।
শেষে একটা কথা বলি। আজকের পৃথিবীতে রাজনৈতিক সমাবেশ (যে কোনো দলের) সবচেয়ে বড় জায়গা যেখানে আপনাকে আপনার ক্রয় ক্ষমতা অনুযায়ী মাপা হয় না।
আমার পকেটে হয়ত দুটো ডেবিট কার্ড, একটা ক্রেডিট কার্ড। সবকটা মিলিয়ে হয়ত আমার কাছে পাঁচশো ক্রেডিট পয়েন্ট আছে। ধরা যাক আমার স্ত্রীর পার্সেও দুটো ডেবিট কার্ড, আছে নশো ক্রেডিট পয়েন্ট। আমার বন্ধু প্রাথমিক স্কুলের শিক্ষক, তার মোটে একটা স্যালারি অ্যাকাউন্টের কার্ড। তার সাথে তার বান্ধবী আছেন, যিনি হন্যে হয়ে চাকরি খুঁজছেন, সেভিংস অ্যাকাউন্টে হাজার পাঁচেক টাকা আছে। আমাদের সাথে আমাদের পরিচারিকা আছেন, যাঁকে মাসে তিন হাজার টাকা মাইনে দিই। তাঁর কোনো ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টই নেই। আমরা যদি কোনো সিনেমা হলে যাই বা মলে ঢুকি, পাঁচ জনের আত্মবিশ্বাস হবে পাঁচ রকমের। কারণ আমাদের ক্ষমতা ওই চত্বরে সমান নয়। কোনো কোনো জায়গায় পরিচারিকাকে হয়ত আমাদের সাথে বসতেই দেওয়া হবে না। কে জানে, হয়ত আমরাই চাইব উনি অন্য টেবিলে বসুন বা বাইরে অপেক্ষা করুন। কিন্তু আমরা যদি কোনো মিছিলে যাই বা ব্রিগেডে যাই, পাঁচজনেই সমান। আমাদের পরিচারিকার মত আমাদেরও ঘাসের উপর চটি পেতেই বসতে হবে। সুতরাং মিছিল বেঁচে থাক, মিটিং বেঁচে থাক, সেখানে যাওয়া মানুষের ক্ষিদে পেলে খাওয়ানোর ব্যবস্থা বেঁচে থাক।
বরং “কেউ যদি বেশি খাও খাওয়ার হিসেব নাও, কেন না অনেক লোক ভাল করে খায় না।”

সৃষ্টির মনের কথা

“ভালবাসা কী করে প্রমাণ করা যায় বল তো? ভালবেসেই তো? আজ যখন আদালতে আমাকে বলা হল ‘প্রমাণ করুন আপনি দেশকে ভালবাসেন’, আমি ভাবলাম কী করে করি? কেমন করে প্রমাণ করা যায় যে আমি আমার দেশকে ভালবাসি?”

দুঃসময়। বড় দুঃসময়ে বেঁচে আছি। সকালের কাগজ ১৯৯২ এর স্মৃতি উশকে দিয়ে লিখছে বিশ্ব হিন্দু পরিষদ আর রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘ হুমকি দিয়েছে রাত পোহালেই দু লক্ষ লোক ঢুকে পড়বে অযোধ্যায়। এদিকে পশ্চিমবঙ্গে ১৯৮৯ মনে করানো রথযাত্রার প্রস্তুতি। রাজ্য সরকার শীর্ষস্থানীয় আমলাকে পাঠিয়েছে বিজেপির সাথে যাত্রাপথ ইত্যাদি নিয়ে আলোচনা করতে। আহা! কি আনন্দ আকাশে বাতাসে।
ওদিকে আসামে ডিটেনশন ক্যাম্পে ভিড় বাড়ছে, বহু পরিবার ছিন্নভিন্ন, আত্মহত্যার পর আত্মহত্যা। সংসদে পাশ হওয়ার অপেক্ষায় নতুন নাগরিকত্ব আইন। যে আইন পাশ হলে অহিন্দু মানুষের ভারতের নাগরিক হওয়ার রাস্তা বন্ধ হয়ে যাবে। “দিবে আর নিবে, মিলাবে মিলিবে, যাবে না ফিরে” শুধু কবিতার পংক্তি হয়ে যাবে।
এসব ক্ষমতাসীনদের রাজনীতি। আর বিরোধীদের রাজনীতিটা কিরকম?
দিন দুয়েক আগে কংগ্রেস নেতা সি পি যোশী বললেন একমাত্র একজন কংগ্রেস প্রধানমন্ত্রীই পারেন রামমন্দির প্রতিষ্ঠা করতে। মনে করিয়ে দিলেন যে রাজীব গান্ধীই বাবরি মসজিদের তালা খুলিয়ে পুজো আচ্চার ব্যবস্থা করিয়েছিলেন। যোশী আরো বলেছেন হিন্দু ধর্মটা একমাত্র ব্রাক্ষ্মণরাই বোঝে। নরেন্দ্র মোদী, উমা ভারতী এরা আর কী জানবে? নীচু জাতের লোকেদের হিন্দু ধর্ম নিয়ে কথা বলার কোন অধিকারই নেই। যোশীজিকে যিনি ধমকে দিয়েছেন বলে খবরে প্রকাশ, সেই রাহুল গান্ধী কেবল মন্দির থেকে মন্দিরে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। তাঁর সম্পর্কে তাই হিন্দুত্বের ব্র‍্যান্ড অ্যাম্বাসাডর বিজেপি প্রশ্ন তুলেছিল তিনি কি হিন্দু? উত্তরে কংগ্রেস মুখপাত্র বলেছিলেন রাহুল যে শুধু হিন্দু তাই নয়, তিনি রীতিমত পৈতেওয়ালা হিন্দু।
বাংলার অগ্নিকন্যা তথা কর্ণধার বিজেপিকে আটকাতে দীর্ঘদিন অব্দি সাধারণ মুসলমানকে ভুলে ইমাম, মোয়াজ্জেমদের সমর্থনে ভর দিয়ে চলছিলেন। বছরখানেক হল সেসব চাপা দিতে আবার ব্রাক্ষ্মণ সম্মেলন, বজরংবলী পুজো, জনসভায় গায়ত্রী মন্ত্র উচ্চারণ, দুর্গা বিসর্জনের বিষণ্ণতাকে আমুদে কার্নিভালে পরিণত করায় মেতেছেন। তাতেও যথেষ্ট হচ্ছে না মনে করে শেষমেশ আয়করদাতাদের টাকা পুজো কমিটিগুলোকে বিলিয়েছেন। এন আর সি নিয়ে দিনকতক লোকলস্কর নিয়ে বিস্তর চেঁচামেচি করার পর এখন স্পিকটি নট। অবশ্য ওটা নিয়ে বেশি পরিশ্রম কেনই বা করতে যাবেন? তিনিই তো প্রথম সাংসদ যিনি সীমান্তবর্তী এলাকায় সিপিএম বাংলাদেশ থেকে লোক ঢোকাচ্ছে, এদের বার করে দেওয়া হোক — এই দাবী করে লোকসভার স্পিকারের দিকে কাগজ ছুঁড়েছিলেন।
আর বামপন্থীরা? সর্ববৃহৎ পার্টির নেতাদের একাংশ তো মনে করছেন বিজেপিকে হারাতে উপর্যুক্ত কংগ্রেসেরই হাত ধরা দরকার এক্ষুণি। নিজেদের লড়ার ক্ষমতার উপর এমন আস্থা আর কাদের আছে? এন আর সি, নাগরিকত্ব বিল নিয়ে বামেদের যে কী মতামত কে জানে! শীর্ষ নেতৃত্ব একবার বলেছিলেন দেখতে হবে নিরপরাধ লোকের যেন হয়রানি না হয়। মানে মানুষের নাগরিকত্ব নির্ধারণে তার বংশপরিচয়কে মানদণ্ড ধরায় বোধহয় তাঁদের আপত্তি নেই। যাহা লিগ্যাসি তাহাই লিগাল।
অর্থাৎ দেশের সর্বত্র তাঁদের ভারতীয়তা, তাঁদের দেশপ্রেমের প্রমাণ চাওয়া হচ্ছে মানুষের কাছে। এই প্রমাণ দীর্ঘকাল ঠারেঠোরে চাওয়া হত এদেশের মুসলমানদের কাছে। এখন ঘাড় ধরে চাওয়া হচ্ছে। আসামের অন্য ধর্মাবলম্বী মানুষেরাও সেই আওতায়। সংখ্যালঘুদের প্রতি মুহূর্তে বুঝিয়ে দেওয়া হচ্ছে তাঁরা অপ্রিয়, অপ্রয়োজনীয়, অপ্রাসঙ্গিক। তাঁদের খুন করলে শাস্তি হয় না চাকরি হয়, ধর্মস্থান ভেঙে দিলে অপরাধ হয় না মন্ত্রিত্ব হয়, গালাগালি দিলে বাহাদুরি হয়।
এমতাবস্থায় প্রায়শই “সৃষ্টির মনের কথা মনে হয় — দ্বেষ।” মনটা এমন কোন সৃষ্টি খুঁজতে থাকে যার মনের কথা ভালবাসা। খুঁজতে খুঁজতে পেয়ে গেলাম অনুভব সিনহার ছবি ‘মুল্ক’ (দেশ)। হিন্দু, মুসলমানের ইতিহাসের সঙ্গমস্থল বেনারসের পুরনো বাসিন্দা বৃদ্ধ আইনজীবী মুরাদ আলি মহম্মদকে কাঠগড়ায় উঠতে হল এবং প্রমাণ করতে বলা হল তিনি তাঁর মুল্ক অর্থাৎ দেশকে ভালবাসেন। তিনি নিয়মিত আয়কর দেন, পুলিশের খাতায় কখনো তাঁর নাম ওঠেনি, এমনকি গাড়ি চালানোর সময়ও কখনো ট্র‍্যাফিক আইন ভাঙেননি। কিন্তু ওসব যথেষ্ট নয় একথা প্রমাণের জন্যে যে তিনি দেশপ্রেমিক। সন্ত্রাসবাদী নন।
ধর্মীয় মৌলবাদ আমাদের উঠোন পেরিয়ে চলে আসছে আমাদের সবার শোবার ঘর অব্দি। তফাৎ শুধু এই যে সংখ্যালঘুর মৌলবাদকে ঢুকতে হচ্ছে লুকিয়ে চুরিয়ে, সংখ্যাগুরুর মৌলবাদ আসছে সামনের দরজা দিয়ে। আলি মহম্মদের ভোলেভালা ক্লাস টেন পাশ ভাই বিলালের ছেলে শাহিদ, যাকে ছোটবেলায় ধরে বেঁধে কোরান পড়িয়ে ওঠা যায়নি, সে কাশ্মীরের বন্যাত্রাণে অর্থসাহায্য করছে ভাবতে ভাবতে হয়ে গেল জেহাদি নেটওয়ার্কের সদস্য। আর বাড়ির উল্টোদিকের পান বিক্রেতা চৌবে, যে আলি সাহেবের প্রাণের বন্ধু, তার অকর্মণ্য ছেলে বুক ফুলিয়ে “দেশের কাজে” নেমে পড়ল বাইকের সামনে পতাকা লাগিয়ে। কী সেই কাজ? লোকলস্কর ডেকে এনে আলি সাহেবের গ্যারেজ ভেঙে দেওয়া, হিন্দু উৎসবের আগে লাউডস্পিকারের মুখটা মুসলমানদের বাড়ির দিকে ঘুরিয়ে দেওয়া যাতে তারা টের পায় “গোটা দেশ তাদের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ”, রাতে আলি সাহেবের বাড়িতে পাথর ছোঁড়ার আয়োজন, দেয়ালে এবং দরজায় লিখে দেওয়া “TERRORIST”, “GO TO PAK”।
এই ছবিতে অনুভব সিনহার সবচেয়ে বড় কাজ সম্ভবত আমাদের অনেকের মনে তৈরি হওয়া চড়া একরঙা ছবিগুলো মুছে দেওয়া। এ ছবির হিন্দুরা নানারকম, মুসলমানরাও তাই।
ধর্মপ্রাণ অথচ গোঁড়ামিহীন আলি মহম্মদ আছেন, কোরান ঠিকমত না পড়েও জেহাদী হওয়া ভাইপো শাহিদ আছে, অ্যান্টি টেররিজম স্কোয়াডের ভুয়ো এনকাউন্টারবাদী অফিসার দানিশ জাভেদও আছেন। তিনি মনে করেন সন্ত্রাসবাদীদের গ্রেপ্তার না করে শেষ করে দেওয়া উচিৎ কারণ তারা মুসলমানদের বদনামের কারণ।
হিন্দুদের মধ্যে চৌবে আছেন, যিনি স্ত্রীকে লুকিয়ে বন্ধু আলির বাড়িতে কোরমা, কালিয়া খেতেন অথচ শাহিদের অপরাধ প্রকাশ হতেই বিরাট হিন্দু হয়ে উঠলেন এবং নিঃসংশয়ে বুঝে নিলেন “আমার ছেলে ঠিকই বলে। ওরা ঐরকমই।“ কিন্তু আলি সাহেবের আরেক বন্ধু সোনকর আছেন, যিনি ১৯৯২ এর ৬ই ডিসেম্বরের অভিশপ্ত রাতে চৌবেকে সঙ্গে নিয়ে আলি সাহেবের পরিবারকে দাঙ্গাবাজদের হাত থেকে বাঁচাতে ছুটে এসেছিলেন। যিনি গোটা মহল্লার বিরুদ্ধে গিয়ে আলি সাহেবের পুরো পরিবারকে সন্ত্রাসবাদী প্রমাণ করার চেষ্টা চলার সময়ে পাশে থাকলেন। আলির প্রবাসী ছেলে এসে যখন বলল এ বাড়ি ছেড়ে তার সাথে ইংল্যান্ড চলে যাওয়াই ভাল, তখন সোনকরকে দেখিয়েই আলি সাহেব বললেন “আমরা চলে যাব? আমি নিজেকে কী জবাব দেব? যে আমি দেশদ্রোহী? পাড়ার লোককে সোনকর কী জবাব দেবে? ও বলবে ও দেশদ্রোহীদের পাশে দাঁড়িয়েছিল?”
সর্বোপরি আছেন আরতি মহম্মদ — আলি সাহেবের হিন্দু পুত্রবধূ। একজন বেপথু হয়েছে বলে পুরো পরিবারটাকে সন্ত্রাসবাদী প্রমাণ করার প্রচেষ্টাকে বিফল করার দায়িত্ব শেষ অবধি যার ঘাড়ে পড়ে। মুসলমানদের ঝামেলা মুসলমানরাই সামলাক, কোর্ট তো বলে দিয়েছে ওরা টেররিস্ট — বাবা-মায়ের এইসব আবোলতাবোল কথাবার্তা উড়িয়ে দিয়ে ঘাড় সোজা করে লড়ে যায় মেয়েটি। অথচ বেনারসে আসার আগে স্বামীর সাথে বিবাহবিচ্ছেদের মুখে দাঁড়িয়েছিল সে, কারণ আলি সাহেবের ছেলে আফতাব চাইছিল সন্তানের জন্মের আগেই যেন তার ধর্মটা ঠিক করে রাখা হয়। শুনানিতে যাওয়ার সময় কিন্তু সে মন্দিরের প্রসাদী ফুল মাথায় ছুঁইয়ে যায়।
আরো এক দল মানুষ আছেন আলি সাহেবের মুল্কে, যাদের কথা না বললেই নয়। কিছু লোক যারা মসজিদে নমাজ পড়তে এসে তাঁকে আমন্ত্রণ জানায় শাহিদ আর বিলালের শাহাদাত উদযাপন করতে আসার জন্যে এবং প্রবল ধমক খায়। আলি সাহেব তাদের জানিয়ে দেন শাহিদ যা করেছে তা শাহাদাত নয়, সন্ত্রাস। যারা তাঁর বাড়িতে পাথর ছুঁড়েছে তারাও যে সন্ত্রাসীই সেকথা তিনি বলে এসেছেন এফ আই আর নিতে অনিচ্ছুক দারোগাকে।
মসজিদে ফিসফিসিয়ে কথা বলা লোকগুলোর দলেই পড়েন সরকারপক্ষের উকিল সন্তোষ আনন্দ। সাক্ষ্যপ্রমাণ না-ই থাক, মুসলমানবিদ্বেষের কোন অভাব নেই তাঁর মধ্যে। তিনি জানেন এখন কেস জিততে হলে বিচারবিভাগকে নানাভাবে প্রভাবিত করতে হয়; হোয়াটস্যাপ, ফেসবুককে হাতিয়ার করতে হয়।
ছায়াছবি হিসাবে অনায়াসেই আরো ভাল হতে পারত ‘মুল্ক’। তাপসী পান্নু আরো জোরালো আরতি হতে পারতেন, আদালতে তাঁর অতি মূল্যবান closing argument চিত্রনাট্যের সাহায্য পেলে আরো কম বক্তৃতা হতে পারত। বিচারকের শেষ কথাগুলোও, যদিও অত্যন্ত জরুরী, অতটা বক্তৃতার মত না শোনালে নিঃসন্দেহে আরো ভাল হত। কিন্তু তার চেয়ে অনেক বড় কথা এই সময়ে এই ছবিটার প্রয়োজন ছিল। কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে আলি সাহেবরূপী ঋষি কাপুর যখন সন্তোষ আনন্দরূপী আশুতোষ রানাকে প্রশ্ন করেন “আমার দেশে আমাকে স্বাগত জানানোর অধিকার আপনাকে কে দিয়েছে?” তখন প্রশ্নটা তাঁর একার থাকে না, কোটি কোটি ভারতবাসীর হয়ে দাঁড়ায়। সেইসব ভারতবাসীর যাঁদের পান থেকে চুন খসলে পাকিস্তানি বলে সম্বোধন করা হয়, ভারত-পাকিস্তান ক্রিকেট ম্যাচের সময়ে যাদের দিকে আড়চোখে, বাঁকা হেসে তাকানো হয়।
তবে সবচেয়ে মনে রাখার মত মুহূর্ত তৈরি হয় আদালতে নয়, বাড়ির ছাদে। ভাই বিলালের উকিল থেকে কেসে অন্যতম অভিযুক্ত হয়ে যাওয়ার পর শব্দহীন বিনিদ্র রাতে পুত্রবধূকে আলি সাহেব বলেন “তবসসুম যখন বিয়ে হয়ে এ বাড়িতে এল, তখন আমার সাথে খুব ঝগড়া করত, বলত ‘তুমি আমায় ভালবাস না।’ আমি বলতাম ‘বাসি তো। খুব ভালবাসি।’ ভালবাসা কী করে প্রমাণ করা যায় বল তো? ভালবেসেই তো? আজ যখন আদালতে আমাকে বলা হল ‘প্রমাণ করুন আপনি দেশকে ভালবাসেন’, আমি ভাবলাম কী করে করি? কেমন করে প্রমাণ করা যায় যে আমি আমার দেশকে ভালবাসি?”
দেশকে ভালবাসার প্রশ্ন উঠতে তাঁর মনে পড়ল প্রিয়তমা স্ত্রীর কথা, মায়ের কথা নয়। “ভারত মাতা কি জয়” স্লোগানের পরাভবে পূর্ণিমার তাজমহলের মত উজ্জ্বল হয়ে উঠল মুরাদ আলি মহম্মদের দেশপ্রেম।

অনধিকার প্রবেশ

যেন কলেজ বা ইউনিভার্সিটি হল বারোয়ারী দুর্গাপুজো। পাড়ার কাউন্সিলর সবচেয়ে বেশি টাকা চাঁদা দেয় বলে সে চাইলে মুম্বাইয়ের মিস টিনাকে দিয়ে নবমীর দিন নাচের ব্যবস্থা করতেই হবে। যতই পাড়ার লোকে মনে করুক এটা অশ্লীল

যাদবপুরে প্রবেশিকা পরীক্ষা হওয়া উচিৎ না অনুচিত এই নিয়ে মতপার্থক্য আছে বিভিন্ন মহলে এবং থাকারই কথা। সরকারপোষিত একটা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সংজ্ঞানুযায়ী আমার, আপনার মত করদাতাদের যৌথ সম্পত্তি। ফলে তার কার্যকলাপ নিয়ে নিশ্চয়ই আমাদের সকলের মতামত থাকবে। এটা আমাদের অধিকার। কর্পোরেটচালিত বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ের জাঁকজমক দেখে যতই মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকুন, তাদের পরীক্ষা পদ্ধতি, ভর্তির প্রক্রিয়া, পাঠক্রম নিয়ে চেঁচামেচি করার অধিকার আমার আপনার নেই, এটা মনে রাখবেন।
যাদবপুরের প্রতি আমাদের সে অধিকার আছে বলেই যাদবপুরকে তথা সরকারপোষিত সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে বুক দিয়ে আগলানো আমাদের কর্তব্য। এবং আমাদের সকলের অধিকার রক্ষা করার জন্যেই সরকারের কথায় যাদবপুর উঠবে বসবে, এমনটা হতে দেওয়া উচিৎ না।
সরকার মানেই নাগরিক নয়। সরকারের মতামত গণতন্ত্রের সবচেয়ে উন্নত অবস্থাতেও সব নাগরিকের মতামতের প্রমাণ নয়, বড়জোর সংখ্যাগরিষ্ঠ নাগরিকের মতামতের প্রমাণ। সমস্ত ইস্যুতে তাও নয়। এমতাবস্থায় ঘরে বাইরে, কাগজে, চ্যানেলে, ফেসবুকে, হোয়াটস্যাপে বিতর্ক চলতে থাকুক কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় কোন পথে চলবে সে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার শুধুমাত্র তার শিক্ষক শিক্ষিকা এবং ছাত্রছাত্রীদের হাতেই থাকতে হবে।
কিছুদিন আগে শিক্ষামন্ত্রী রাজ্য সরকার পোষিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো সম্পর্কে বলেছিলেন “সরকার টাকা দিচ্ছে আর সরকারের কথা মানবে না?” যেন কলেজ বা ইউনিভার্সিটি হল বারোয়ারী দুর্গাপুজো। পাড়ার কাউন্সিলর সবচেয়ে বেশি টাকা চাঁদা দেয় বলে সে চাইলে মুম্বাইয়ের মিস টিনাকে দিয়ে নবমীর দিন নাচের ব্যবস্থা করতেই হবে। যতই পাড়ার লোকে মনে করুক এটা অশ্লীল।
এভাবে তো লেখাপড়া হয় না।
উপরন্তু আজকের সরকার একরকম সিলেবাস ঠিক করবে, কাল অন্য সরকার এসে বলবে “এসব বাজে জিনিস পড়ানো হচ্ছে। কাল থেকে অন্য জিনিস পড়ানো হবে।“ আজকের সরকার বলছে “প্রবেশিকা পরীক্ষা তুলে দিতে হবে।“ কালকের সরকার বলবে “প্রবেশিকা পরীক্ষা ছাড়া বিশ্ববিদ্যালয় চলে নাকি?” সরকার বদলের সাথে সাথে যদি লেখাপড়ার ধারা বদলায় তাহলে সে বিশ্ববিদ্যালয়ের পি এইচ ডি থিসিসগুলো যে টোকা নয় সে কথা কে-ই বা বিশ্বাস করবে?
অনেক বড় বড় মাথা দেখতে পাচ্ছি প্রবেশিকা পরীক্ষা কেন ভাল নয় তার পক্ষে অনেক যুক্তি দিচ্ছেন। আমার নিজেরও দু একটা যুক্তি আছে কিন্তু সে বিতর্কে যাবই না। যেতাম যদি বুঝতাম রাজ্য সরকারের এই সিদ্ধান্তের পেছনে আছে যাদবপুরের শ্রীবৃদ্ধি। কিন্তু সরকারের যে ভাবের ঘরে দিনে ডাকাতি। যে সরকারের আমলে সারা রাজ্যে কলেজের আসন কেনাবেচা হয়, সেই সরকারের যাদবপুরের উন্নতির চিন্তায় রাতে ঘুম হচ্ছে না একথা নিঃস্বার্থ কেউ কেন বিশ্বাস করবে? যাদবপুরের অনেক ছাত্রছাত্রী দেখছি প্রশ্ন তুলছেন যে সেন্ট জেভিয়ার্স বা রামকৃষ্ণ মিশন বিদ্যামন্দিরও তো প্রবেশিকা পরীক্ষা নেয়, তাদেরকে সরকার জোর করছে না কেন? শুধু যাদবপুরের উন্নতিই কি সরকারের লক্ষ্য?
খুবই সঙ্গত প্রশ্ন। উত্তর একাধিক, তবে খুব সোজা। সেন্ট জেভিয়ার্সের ইউনিয়ন অরাজনৈতিক, সেখানে টি এম সি পির ঢোকার জায়গা নেই। আর বিদ্যামন্দিরের ছাত্র সংসদ বাতাসের মত। সবাই জানে আছে কিন্তু চোখে দেখতে পাওয়া যায় না। অতএব সেখানেও টি এম সি পি কে ঢোকানো যাবে না। বিদ্যামন্দিরের উপরি সুবিধা এই যে তাদের চোখ রাঙালে, মুখ্যমন্ত্রী জানেন, বিজেপি “হিন্দু খতরে মে হ্যায়” বলে তেড়ে আসবে।
যাদবপুরের প্রতি এই অহৈতুকী কৃপার অনেক কারণের একটা, স্পষ্টতই, তাদের তোলাবাজির এলাকায় অন্তর্ভুক্ত করতে পারার ব্যর্থতা। আরো একটা মজার জিনিস লক্ষ্য করুন। এমন দুটো ঘটনা যুগপৎ ঘটছে — কলেজ ভর্তি নিয়ে প্রকাশ্য দুর্নীতি আর যাদবপুরে অচলাবস্থা — যার প্রভাব রিকশাচালকের পরিবার থেকে উচ্চপদস্থ সরকারী আমলার পরিবার পর্যন্ত বিস্তৃত, অথচ সাম্প্রতিক ভোটগুলোর ফলাফল অনুযায়ী রাজ্যের প্রধান বিরোধী দল বিজেপি স্পিকটি নট। আসলে ক্ষমতাসীন দলের মত তারাও চায় এ রাজ্যের লেখাপড়া গোল্লায় যাক৷ বিশেষ করে যাদবপুর গোল্লায় গেলে তো নাগপুরে মিষ্টান্ন বিতরণ হবে। মুক্ত চিন্তা এবং বামপন্থী চিন্তার আখড়াগুলো সঙ্ঘ পরিবারের কাছে পরের ছেলে পরমানন্দ। যত গোল্লায় যায় তত আনন্দ। যাদবপুরের ছাত্রছাত্রী এবং শিক্ষককুলের মধ্যে বিভিন্ন তীব্রতার লাল রঙের পোঁচ মমতাদেবী এবং মোদীবাবুর মধ্যে সমান বিবমিষার উদ্রেক করে। ২০০৮-০৯ থেকে শুরু করে বামফ্রন্টকে পছন্দ নয় বলে যে বামপন্থীরা মমতাকেই প্রকৃত বামপন্থী বলে নন্দিত করেছেন, এখনো করেন, তাঁরা এবার ভুলটা বুঝলে ভাল হয়।
এই অসহনীয় অবস্থাতেও, যে কোন আন্দোলন শুরু হলেই যা হয়, আন্দোলনের ধরণ নিয়ে সমালোচনা করতে কেউ ছাড়ছে না। লেখাপড়ার বারোটা বাজিয়ে দেওয়ার চক্রান্ত করছে সরকার, তবু যাদবপুরের সুবোধ বালক বালিকাদের উচিৎ ছিল ধর্নায় না বসে, অনশন না করে বই মুখে বসে থাকা — এই কথা অনেকেই বলছেন এবং লিখছেন। যেন ছেলেমেয়েরা রুখে না দাঁড়ালে তাঁরাই ব্যাপারটা নিয়ে সরকারের সাথে কথা বলে বিহিত করতেন। যে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠাই হয়েছিল ইংরেজ সরকারের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে বিকল্প শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্যে, সেখানকার ছেলেমেয়েরা প্রতিবাদ করছে কেন তাই নিয়ে প্রাজ্ঞদের অপার বিস্ময় এবং বিপুল ক্রোধ।
আমার পরিচিত যাদবপুরের তুলনামূলক সাহিত্যের এক প্রাক্তন ছাত্র দুঃখ করে বলল তুলনামূলক সাহিত্যের একজন নাকি অনশন করতে গিয়ে অসুস্থ হয়ে পড়েছে। তাতে নাকি অনেকে বলছে ঐ বিভাগটাই ফালতু। ওটা তুলে দেওয়াই উচিৎ কারণ ওটা পড়ে কেউ চাকরি পায় না। ছেলেটি ভেবেছিল আমার সহানুভূতি পাবে কিন্তু আমি তাকে বললাম শুধু তুলনামূলক নয়, সবরকম সাহিত্য পড়ানোই বন্ধ করে দেওয়া উচিৎ। তাতে আমার মত সাংবাদিকদের মস্ত সুবিধা। আমরা রোজ যে ছাইভস্ম লিখি সেগুলোকে ছাইভস্ম বলে চেনার মত আর কেউ থাকবে না। শুধু সাহিত্যও নয়, ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগও তুলে দেওয়া উচিৎ। কারণ এদেশে বহু ইঞ্জিনিয়ার বেকার বসে আছে। যত ইঞ্জিনিয়ার আছে তত চাকরি নেই। ফলে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়েও চাকরি পাওয়া যাচ্ছে না।
আমার কথা শুনে ছেলেটির মুখের যা চেহারা হল তাতে আমার এত অপরাধবোধ হল যে ভাবলাম ওকে সন্দেশ বিস্কুট খাওয়াই। খাওয়াতে খাওয়াতে বললাম যে কাল একটা না তৈরি হওয়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে দেশের সরকার আই আই টি, আই আই এস সি র সমান মর্যাদা দিয়েছে। যাদবপুরের কী হবে?
বেচারা ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছে দেখে আমাদের স্কুলের জহরবাবুর জ্যামিতি ক্লাস নেওয়ার ঢঙে বললাম “আসলে একটা সাদা কাগজের উপর কয়েকটা বিন্দু একে অপরের থেকে অনেক দূরে দূরে বসে আছে। কিন্তু এগুলোকে জুড়লে দেখবি আসলে এগুলো একটা চতুর্ভুজের চারটে শীর্ষবিন্দু। একটা হল শিক্ষা ব্যবসায় জাঁকিয়ে বসতে চাওয়া কর্পোরেট, একটা সেই কর্পোরেটের দাসানুদাস ফ্যাসিবাদী সরকার, আরেকটা উচ্চশিক্ষা পুরোপুরি বেসরকারী হাতে চলে গেলেই সর্বোচ্চ যোগ্যতা না থাকলেও পড়িয়ে বা বই লিখে দু পয়সা কামিয়ে নেবে বলে ওঁত পেতে থাকা বুদ্ধিজীবী এবং চতুর্থটা হল এক শ্রেণীর ভদ্রলোক, যারা বরাবর চেয়েছে শুধু তাদের ছেলেমেয়েরাই লেখাপড়া শিখুক। চাষাভুষোর পড়াশোনা শিখে কী হবে?”

ভো ভো ভদ্রসন্তান

কী হয় পঞ্চায়েত দিয়ে? যে ভদ্রসন্তান পেটে বোম মারলেও ত্রিস্তর পঞ্চায়েতের তিনটে স্তর কী কী বলতে পারবে না, সেও জানে পঞ্চায়েতের কোন কাজ নেই। বামফ্রন্ট সরকার এইটে বানিয়েছিল কেবল টাকা মারার জন্যে। কী দরকার এমন ভোটের? তুলে দিলেই হয়। এই যে ক্যানিং লোকালে ভদ্রসন্তানদের বাড়ি রান্না করতে আসা, বাসন মাজতে আসা ছোটলোকগুলো তিন চারদিন কামাই দেয় পঞ্চায়েতে ভোট দেবে বলে —- এর দরকারটা কী রে ভাই? এইসব ছোটলোক গণতন্ত্রের বোঝেটা কী? পঞ্চায়েত ব্যবস্থা তো করার মধ্যে করেছে এই যে এদের হাতে ক্ষমতা দিয়েছে। ছোটলোকেরা অনেকে গ্রামের ভদ্রসন্তানদের টপকে প্রধান টধান হয়েছে। তা এ কি আর ভাল ব্যবস্থা রে বাপু?

শেষপর্যন্ত এক মাস্টারমশাইকে মরতে হল ভদ্রসন্তানদের “এসব আগেও হয়েছে” র এলায়িত ঔদাসীন্য থেকে জাগানোর জন্যে। হতভাগ্য প্রিসাইডিং অফিসার রাজকুমার রায় মরিয়া প্রমাণ করিলেন ভদ্রসন্তানগণের চেতনা মরে নাই। তাঁহারা আজিও নির্বাচনী হিংসার জন্যে সরকারকে দায়ী করিয়া গালাগাল করিতে সক্ষম।
মনোনয়ন জমা দেওয়ার সময়কার হিংসাটা নেহাত বিসদৃশ লাগায় একটু “উঃ আঃ” করতেই হচ্ছিল। তবু “এরা আসলে সিপিএমের মত সংগঠিত না তো, তাই একটু বেশি উগ্র” এসব বলে চালানো হচ্ছিল। মনোনয়ন জমা দেওয়া মিটে যেতেই ভদ্রসন্তানদের ভারী নিশ্চিন্দিভাব এসেছিল। কাগজে বেরিয়েছিল বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় এত বেশি আসন শাসক দল কখনো জেতেনি তাই খানিকটা নিন্দেমন্দ না করে উপায় ছিল না। শিক্ষিত লোক হিসাবে সমাজে একটা পরিচিতি আছে তো। এরপর তো নির্বাচন আর নির্বাচনে তো মারামারি, বোমাবাজি, খুন হয়েছে অনেক। অতএব ওতে সরকারের দোষ হয় না। নিন্দে করার দায়িত্বও নেই ভদ্রজনের।
তার চেয়ে বড় কথা যে মরল সে তো হয় এ পার্টির লোক, নয় ও পার্টির লোক। তারা তো আর কারো মা, বাপ, ভাই, বোন, ছেলেপুলে নয়। পার্টি তো করে অশিক্ষিতরা, যাদের শিক্ষিতদের মত স্বার্থপর হয়ে বাঁচার সুযোগ নেই। অতএব তারা মরলে ভদ্রসন্তানের কী-ই বা এসে যায়? ও তাপসী মালিকই বলুন আর দেবু দাস, ঊষা দাসই বলুন, ভদ্রসন্তান হলে কি আর রাজনীতির মধ্যে যেত? চেতন ভগতের কথামত নিজের কেরিয়ার নিয়ে মাথা ঘামিয়ে জমাটি একখান চাকরি জুটিয়ে সক্কলের ধরাছোঁয়ার বাইরে চলে যেত। অতএব পরিবর্তনের সরকার ভাল সরকার। যতই লোক মারুক আর গণতন্ত্রের মা-মাসি করুক, ভি আই পি রোডটা কংক্রিটে আর রেলিঙে মুড়ে দিয়েছে, এত আলো লাগিয়েছে যে ছেলেমেয়েরা চুমু খাওয়ার আড়াল পাচ্ছে না, স্কুলমাস্টারগুলো কোন কাজ করত না, তাদের ঘাড়ে কন্যাশ্রী থেকে দিদিশ্রী সব চাপিয়ে দিয়ে খুব টাইট দিয়েছে। আর কী চাই? একেই তো বলে উন্নয়ন। কেন হিংসার প্রতিবাদ করতে যাবে ভদ্রসন্তান? এত উন্নয়নের বদলে নাহয় এক ভাই এক কবিকে দিলই দুটো গাল। কবিকে কে বলেছিল পার্টির লোকের মত কবিতা লিখতে? তিনি যদি ভদ্রসন্তানোচিত কাজ কোনগুলো সেটা ভুলে মেরে দেন, সেটা বুড়ো বয়সের ভীমরতি। তার জন্যে সরকারকে কেন গাল দেবে? সর্বেসর্বা মুখ্যমন্ত্রীকেই বা কেন দোষ দেবে?
তবু নয় ভেবে দেখা যেত যদি ভোটটা লোকসভা কি বিধানসভার হত। কিসের ভোট? না পঞ্চায়েতের। কী হয় পঞ্চায়েত দিয়ে? যে ভদ্রসন্তান পেটে বোম মারলেও ত্রিস্তর পঞ্চায়েতের তিনটে স্তর কী কী বলতে পারবে না, সেও জানে পঞ্চায়েতের কোন কাজ নেই। বামফ্রন্ট সরকার এইটে বানিয়েছিল কেবল টাকা মারার জন্যে। কী দরকার এমন ভোটের? তুলে দিলেই হয়। এই যে ক্যানিং লোকালে ভদ্রসন্তানদের বাড়ি রান্না করতে আসা, বাসন মাজতে আসা ছোটলোকগুলো তিন চারদিন কামাই দেয় পঞ্চায়েতে ভোট দেবে বলে —- এর দরকারটা কী রে ভাই? এইসব ছোটলোক গণতন্ত্রের বোঝেটা কী? পঞ্চায়েত ব্যবস্থা তো করার মধ্যে করেছে এই যে এদের হাতে ক্ষমতা দিয়েছে। ছোটলোকেরা অনেকে গ্রামের ভদ্রসন্তানদের টপকে প্রধান টধান হয়েছে। তা এ কি আর ভাল ব্যবস্থা রে বাপু? যেমন করেছিল পেছন পাকা কমিউনিস্টের দল, এখন ফল ভুগছে।
এ নিয়ে শহর, মফঃস্বল, গ্রাম সব জায়গার ভদ্রসন্তানেরাই একমত ছিলেন দুদিন আগে অব্দি। গোলমাল পাকালেন তাদেরই একজন। প্রিসাইডিং অফিসার হয়েছেন ভাল কথা, “আগেও হয়েছে” মন্ত্র জপে বুথে গিয়ে চোখকান বুঁজে থাকলেই চুকে যেত। কিন্তু এই চরম নীতিহীনতার যুগেও থাকে কিছু কিছু নীতিবাগীশ বোকার হদ্দ। এরা ভাবে ছাত্রদের সামনে অনুকরণীয় চরিত্র হয়ে ওঠাটা শিক্ষকের কাজের মধ্যে পড়ে। এই ভদ্রলোক সম্ভবত ঐ দলে। এই ধরণের লোকের সমস্যা হচ্ছে মেরুদণ্ড বলে জিনিসটা এখনো নিষ্ক্রিয় অঙ্গে পরিণত হয়নি আমাদের মত। ফলে সাহসটা অসম্ভব বেশি। লাঠিসোটা, টাঙ্গি, বন্দুক — যা-ই দেখাও না কেন, এদের ভয় পাওয়ানো মুশকিল। তা শক্ত মেরুদণ্ড তো অধুনা একটি রোগবিশেষ। সে রোগে শেষ অব্দি যা হয় তাই হয়েছে আর কি। তবে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াটি চমকপ্রদ। দৃশ্যত মার খেলেন এস ডি ও, তবে আসলে চড়চাপড়গুলো কার উদ্দেশে তা নিয়ে সন্দেহের অবকাশ নেই। এবং প্রত্যেকটি চড় তিনি অর্জন করেছেন।
মাস্টারমশাইয়ের মৃত্যু অনেক ছাত্রকে জাগিয়ে তুলেছে দেখে ভাল লাগছে। এই দারুণ দুঃসময়ে আমরা এতই দ্বিধাবিভক্ত যে ডাক্তার মার খেলে শুধু ডাক্তাররা প্রতিবাদ করেন, রাজনৈতিক কর্মী মার খেলে শুধু তার দলের লোকেরাই প্রতিবাদ করে, শিক্ষক মার খেলে শুধু শিক্ষক সমিতি প্রতিবাদ করে, ছাত্ররা মার খেলেও সেটা শুধু তাদের সমস্যা, সাংবাদিক মার খেলে… যাকগে। কথা হচ্ছে এই ব্যাপারটা শাসকও বুঝে ফেলেছে। ফলে প্রতিবাদীদের গায়ে একটা লেবেল সেঁটে দেয়। জানে ঐটে করে দিলেই তারা আর কারো থেকে কোন সহানুভূতি, সমর্থন পাবে না। এবারে যেমন মাননীয়া মুখ্যমন্ত্রীর সরকার লেবেল দিয়েছে “ওরা তো ভোটকর্মী নয়, শিক্ষকও নয়। ওরা এবিটিএ।” কেন্দ্রের বিজেপি সরকার যেমন বলে আর কি “ওরা তো ছাত্র নয়, ওরা বামপন্থী ছাত্র”, “ওরা তো কৃষক নয়, ওরা সিপিএমের কৃষক” বা এদের সব্বাইকে একেবারে থার্ড ব্র‍্যাকেটে পুরে “ওরা এন্টি ন্যাশনাল।” অস্যার্থ কেবল এটা নয় যে ঐ লেবেলের লোকেদের প্রতিবাদের অধিকার নেই। লেবেলটা আসলে চোখ মটকে বাকিদের বলা “এদের সাথে যোগ দিও না।” আমরা ভদ্রসন্তানেরাও এমন সুবোধ বালক যে সরকারী মতটা বুলির মত আউড়ে শুধু নিজে চেপে যাই তা নয়, অন্যকেও বোঝাই।
ভদ্রসন্তানদেরই আবার মত প্রকাশের স্বাধীনতা সবচেয়ে বেশি কিনা, তাই তেনারা যা মনে করেন সেই মতটাই প্রধান হয়ে ওঠে। ফলে জঘন্যতম কান্ডগুলো করেও সরকারগুলো দিব্য “আগেও হয়েছে” বলে চালিয়ে যাচ্ছে।
— নির্বাচনের জন্যে খুন? আগেও হয়েছে।
— ধর্ষণ? আগেও হয়েছে।
— ঘোড়া কেনাবেচা? আগেও হয়েছে।
— বিশ্ববিদ্যালয়ে ঢুকে পুলিশের অত্যাচার? আগেও হয়েছে।
মোদীর আছে “কংগ্রেস কে সত্তর সাল” আর দিদির “বামফ্রন্টের চৌত্রিশ বছর”। যদ্দিন উনি আরো সত্তর বছর আর ইনি আরো চৌত্রিশ বছর শাসন না করছেন তদ্দিন চুপটি করে থাকতে হবে। ভদ্রসন্তানরা অবিশ্যি চুপ করে থাকতে ভারী ভালবাসেন। জেগে উঠে একেকজন যা সব সমাধান দিচ্ছেন তাতে মনে হয় এর চেয়ে ঘুমোলেই বুঝি ভাল ছিল। সেদিন ভোট দেব বলে লাইনে দাঁড়িয়ে আছি (সকাল সকাল গেছিলাম বলে দিতে পেরেছি, ভাইসব। আমায় মেডেল দিও), কর্তব্যরত পুলিশকর্মীর সাথে আমার পেছনের ভদ্রসন্তান দেশ, জাতি, পরিস্থিতি নিয়ে মনোজ্ঞ আলোচনা শুরু করলেন এবং দুজনে মিলে সিদ্ধান্ত করলেন “ভোট অনলাইন করে দেয়া উচিৎ।” আদ্ধেক লোক কী দিয়ে ভাত খাবে তার ঠিক নেই, উনি অনলাইনে ভোট করাচ্ছেন। এবং এতদ্দ্বারা শাসক দলের বদমাইশিকে বেমালুম অস্বীকার করছেন। আসলে সেই যে আগন্তুক ছবিতে ছিল — কূপমণ্ডূক। আজকাল ভদ্রসন্তানেরা স্মার্টফোনমণ্ডূক। নিজের প্রতি ছাড়া আর কারো প্রতি কোন দায়দায়িত্ব নেই। রাজকুমার রায়ের মৃত্যুটা বড় চমকে দিয়েছে, বড় কাছের লোক মনে হচ্ছে। তাই দুদিন একটু রাগারাগি করবেন আর কি। তারপর আবার মুখে লিউকোপ্লাস্ট লাগাবেন। তার উপরে লেখা থাকবে “আগেও হয়েছে”, এবং যেদিন সরকার দয়া করে ভোট দেয়ার সুযোগ দেবে সেদিন সুড়সুড় করে গিয়ে আবার ওদেরই ভোট দেবেন।
অবশ্য সব ভদ্রসন্তানই এমনধারা তা বললে অন্যায় হবে। অনেকে খুব প্রতিবাদী। তেনারা জেগে উঠেই ঠিক করে ফেলেছেন এদের আর ভোট নয়। কারণটি ভারী মজার। “এসব খুনোখুনি মারামারি করছে মুসলমানরা। বিজেপি এলেই এরা সিধে হয়ে যাবে। অতএব বাংলায় বিজেপিকেই চাই।” এদের জিজ্ঞেস করুন “হ্যাঁ দাদা, অনুব্রত মন্ডল কি মুসলমান? জ্যোতিপ্রিয় মল্লিক কি পাঁচ ওয়াক্ত নমাজ পড়েন?” এনারা বুদ্ধিমানের মত জবাব দেবেন “আরে এরা তো আর মারামারিটা করছে না। যারা করছে তাদের নামগুলো দেখুন না। বেশিরভাগ মুসলমান। আরাবুলকে ভুলে যাচ্ছেন?” তখন যদি ধরিয়ে দেন যে যারা মার খেয়ে মরছে তাদের মধ্যেও অনেক মুসলমান, অমনি আপনি এন্টি ন্যাশনাল হয়ে যাবেন। আসল কথা সেই যে ব্রিগেডের মাঠে ২০১৪ সালে মোদীজি এসে বলেছিলেন “এখানে মমতা দিদি আছেন খুব ভাল কথা। দিল্লীতে আমায় বসান, আপনাদের দুই হাতে লাড্ডু হয়ে যাবে।” তা সেই লাড্ডু এখন গোগ্রাসে গিলছি আমরা। দু হাতের লাড্ডুতে মন ভরছে না, কোঁচড়েও চাই। তাই আবার নবান্নেও বিজেপিকে দরকার।
খান ভদ্রসন্তানগণ, পেট পুরে খান। পেটপুরে খান আর প্রাণভরে মলত্যাগ করুন। আপনারা তো আর ছোটলোক নন যে মাঠেঘাটে যেতে হবে। মোদীর স্বচ্ছ ভারত আর দিদির নির্মল বাংলার তো আপনারাই ব্র‍্যান্ড এম্বাসেডর।

বিঃ দ্রঃ তৃণমূল কংগ্রেসের কে এক অর্বাচীন এম এল এ কাল দাবী করেছেন তিনি নাকি এমন সন্ত্রাস বাম আমলেও দ্যাখেননি। ওসব গুজবে কান দেবেন না। লাড্ডু খেয়ে যান।

এসব কী?

একদমই ভাল লাগছে না যখন দেখছি সিপিএম কর্মীরা মমতার বিরুদ্ধে লড়াই চলছে বলে বিজেপির সাথে লড়াই নেই ধরে নিচ্ছেন

পশ্চিমবাংলায় পঞ্চায়েত নির্বাচনের মনোনয়ন জমা দেওয়া নিয়ে যা হচ্ছে তাতে দেখছি অনেক বামবিরোধীও এখন স্বীকার করছেন এমনটা তাঁরা কখনো দ্যাখেননি। অনেকে এও বলছেন যে এমন পরিবর্তন তাঁরা চাননি। ব্যক্তিগতভাবে এসব দেখে আমি যেমন ক্রুদ্ধ, কষ্ট পাচ্ছি তেমনি একটা মৃদু ভাল লাগার জায়গা এইটা যে দেখতে পাচ্ছি বাম দলগুলোর মধ্যে, সিপিএমের মধ্যে এখনো বহু মানুষ আছেন যাঁরা প্রাণের মায়া, মান সম্মানের মায়া ত্যাগ করে প্রতিরোধ করছেন। রঙ বদলে ফ্যালেননি বা আমার মত ফেসবুকিশ বামপন্থী হয়ে যাননি।
সংবাদমাধ্যম বা সোশাল মিডিয়ায় যা দেখছি তাতে এটা দেখেও অবাক হচ্ছি বলা যায় যে মার বেশি খাচ্ছেন বামেরাই, বিজেপি নয়। পার্টি অফিস বা ঘরবাড়ি ভাঙচুরও বামেদেরই বেশি হচ্ছে, যারা নাকি প্রধান বিরোধী নয়। বাম রাজনীতির দিক থেকে দেখলে এই মার খাওয়া, লড়ে যাওয়া প্রশংসনীয় নিঃসন্দেহে। ভোট হলে তেমন কিছু বেশি আসন পাব না জেনেও মনোনয়ন জমা দেওয়ার জন্যে এরকম দাঁতে দাঁত চেপে লড়ে যেতে পারে কটা পার্টি?
এসব ভাল লাগছে। কিন্তু একদমই ভাল লাগছে না যখন দেখছি সিপিএম কর্মীরা মমতার বিরুদ্ধে লড়াই চলছে বলে বিজেপির সাথে লড়াই নেই বলে ধরে নিচ্ছেন। সত্যি কথা বলতে নেতৃত্বের দিক থেকে এমন সামান্যতম ইঙ্গিতও দেওয়া হয়নি। কোন কোন এলাকায় দেখতে পাচ্ছি বা শুনতে পাচ্ছি গ্রাম পঞ্চায়েত স্তরে “বাম-বিজেপি সমর্থিত”, এমনকি “বাম-তৃণমূল সমর্থিত” কাঁঠালের আমসত্ত্বের আবির্ভাব হয়েছে। সেরকমটা একেবারে স্থানীয় স্তরে, একজন বা কয়েকজনের স্বার্থের খাতিরে অতীতেও হয়েছে শুনেছি। এখন যখন পার্টি দুর্বল, ২০১১ র পর থেকে কেষ্টেতর প্রাণীদের অত্যাচারে অনেক জায়গায় প্রায় উধাও তখন কেন্দ্রীয় নেতৃত্বকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে কারো কারো এরকম কান্ড ঘটিয়ে ফেলা অন্যায় হলেও অবাক করার মত নয়। আদর্শগত দেউলিয়াপনা যে আছে সে তো আর আমরা নতুন জানছি না, তা বলে সকলেই ওরকম তা ভাবারও কারণ নেই। সেইজন্যেই ওরকম জোট করাটাই সামগ্রিকভাবে পার্টির অঘোষিত নীতি বলে মনে করার কারণ আছে, এমনটা নিখাদ তৃণমূলী ছাড়া কেউ বলবেন মনে হয় না। ফলত আমার আপত্তির জায়গা অন্য।
এখন গ্রাম, শহর সর্বত্রই হোয়াটস্যাপ আর ফেসবুকের দাপট। রাগ হচ্ছে, শঙ্কিত হচ্ছি তখন যখন দেখছি বিজেপি আই টি সেলের তৈরি ভুয়ো খবর সম্বলিত বার্তা সিপিএম সদস্য, সমর্থকরা দিব্যি ফরোয়ার্ড করে দিচ্ছেন। ফেসবুকেও দেখছি অনেক সিপিএম সদস্য সরাসরি শেয়ার বাটন টিপে বিজেপি এবং তার বন্ধু যে দাঙ্গাবাজ সংগঠনগুলো, তাদের পোস্ট শেয়ার করছেন। সেসব পোস্টের মধ্যে সরাসরি মুসলমানবিদ্বেষী, বানানো তথ্যসম্বলিত যে পোস্টগুলো আমরা অনেকেই চিনি, সেগুলোও রয়েছে। মমতা কত খারাপ তা প্রমাণ করার জন্যে এসবও যাঁরা শেয়ার করছেন তাঁদের ধিক্কার জানাবার ভাষা নেই। মমতা কত খারাপ তা অনেকেই বুঝতে পারছে। আপনারা বিজেপির ভাষা ধার করে না বোঝালে লোকে বুঝবে না?
যেসব মানুষ বুক চিতিয়ে এখনো নিজেদের সিপিএম সমর্থক বলেন তাঁদের এহেন কার্যকলাপ দেখে হাসব না কাঁদব বুঝতে পারছি না। এমনও সন্দেহ হচ্ছে যে তাঁদের সমর্থন বস্তুত একটাই চিহ্নে বরাবর ভোট দিয়ে আসার অভ্যাস, দলটার নীতি বা আদর্শের প্রতি (আদর্শ শব্দটায় আপত্তি থাকলে কথিত আদর্শ বলা যাক) সমর্থন নয়।
তবু সেটা সমর্থকদের ব্যাপার। একজন সমর্থকের সব কিছু তো আর একটা দল নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। দল অন্তত তার সদস্যদের শাসন করুক। সি পি আই (এম) এর কোন সোশাল মিডিয়া সেল আছে কিনা আমার জানা নেই। যদি নাও থাকে, এসব যে পার্টি সদস্যরা করছেন তাঁরা বুঝে করছেন, না না বুঝে করছেন সে দিকে নেতৃত্বের নজর দেওয়া উচিৎ নয় কি? নইলে তো ধরে নিতে হবে “মৌনং সম্মতি লক্ষণম।” বিজেপির বিরুদ্ধে লড়াইটাই যে বড় লড়াই সে কথা তো আপনাদের পার্টি কংগ্রেসও স্বীকার করল। তাহলে এসব কী?