কাটমানির স্বপ্নভঙ্গ?

বয়ঃসন্ধির প্রেম একতরফা হলেও বিশুদ্ধ। অন্তত আমাদের বয়ঃসন্ধির প্রেম তেমনই ছিল। কারণ আমাদের স্মার্টফোন ছিল না, তাতে সুলভ পর্নোগ্রাফি ছিল না, সম্ভবত সে জন্যেই অ্যাসিড দিয়ে বাথরুম পরিষ্কার করা ছাড়া আর কিছু করা যায় আমরা ভেবে উঠতে পারতাম না। তা সেই বয়ঃসন্ধির প্রেম নিয়ে সবচেয়ে জীবন্ত, হৃদপিণ্ড ছিন্নভিন্ন করে দেওয়া গানটা লিখেছিলেন নচিকেতা। সে বয়সে তাঁর নীলাঞ্জনা আর আমাদের নীলাঞ্জনারা অভিন্ন ছিল।
শুধু প্রেম নয়, বয়ঃসন্ধির সবকিছুই মানুষের বহুকাল প্রিয় থাকে। হয়ত ওখানেই শৈশবের শেষ বলে। নচিকেতার জন্যেও তাই আমাদের প্রজন্মের অনেকের মনে একটা বিশেষ জায়গা আছে বা ছিল। শিল্পমূল্যে কবীর সুমন (সেযুগের সুমন চট্টোপাধ্যায়) অনেক এগিয়ে। কিন্তু নব্বইয়ের দশকে পশ্চিমবঙ্গের গ্রামে, মফঃস্বলে ছড়িয়ে থাকা মানুষের মনের কথা প্রায় তাঁদের ভাষায় গানের মাধ্যমে বলার ক্ষেত্রে নচিকেতার জুড়ি ছিল না। এবং সেটা বয়সের বাধা অতিক্রম করে। নচিকেতা আমাদের যেমন নীলাঞ্জনা দিয়েছিলেন, দাদু দিদাদের বৃদ্ধাশ্রম দিয়েছিলেন; শাপভ্রষ্ট বাবা, কাকাদের অনির্বাণ দিয়েছিলেন। অস্বীকার করবে কোন মূর্খ? আমরা সলিল চৌধুরীর যুগের লোক নই। আমাদের জন্যে কেউ ঘুমভাঙার গান লেখেনি। আলোর স্পর্শে দুঃখের কাল কেটে যাবে সেই স্বপ্ন আমরা দেখিনি, কারণ পরীক্ষায় ফার্স্ট হওয়া ছাড়া আর কোন স্বপ্ন দেখতে শেখানোই হয়নি। প্রতিবাদের ভাষা বলতে আমরা তাই “শুনব না গান, গান শুনব না” বুঝেছি। সেই ভাষা নচিকেতাই যুগিয়েছিলেন।
সেই জায়গাটা নচিকেতা ধরে রাখতে পারতেন অনায়াসেই। কিন্তু ঐ যে অনেকে বলে, আপনি হয় যৌবনেই বিদ্রোহীর মৃত্যু বরণ করতে পারেন নয় দীর্ঘজীবী প্রতিক্রিয়াশীল হয়ে উঠতে পারেন। কথাটা নচিকেতার ক্ষেত্রে এমন নিদারুণ সত্যি হয়ে উঠবে ভাবতে পারিনি।
বেশ মনে আছে, জনপ্রিয়তার তুঙ্গে থাকার সময়ে আমাদের কোন্নগর রবীন্দ্রভবনে একবার গাইতে এসেছেন, এক প্রবীণ সিপিএম নেতাকে অনুষ্ঠান শেষে তরুণ পার্টিকর্মী উচ্ছ্বসিত হয়ে বললেন “যা পপুলারিটি, ভোটে দাঁড় করায় দিলে ড্যাং ড্যাং কইর‍্যা জিত্যা যাইব।” সুভাষ চক্রবর্তীর সাথে নচিকেতার ঘনিষ্ঠতা ততদিনে সুবিদিত। জানি না ইঙ্গিতটা সেদিকেই ছিল কিনা, তবে সি পি আই (এম) শেষ পর্যন্ত নচিকেতার জনপ্রিয়তাকে নির্বাচনী লড়াইয়ে ব্যবহার করেনি। রাজ্যে যখন পরিবর্তনের হাওয়া বইতে শুরু করল তখন আরো অনেক ছোট বড় বিখ্যাত লোকের মতই নচিকেতাও পরিবর্তনপন্থী হয়ে উঠলেন। বামফ্রন্ট সমর্থক হিসাবে দুঃখ পেয়েছিলাম কিন্তু সঙ্গে এও মনে হয়েছিল যে হয়ত তিনি বামফ্রন্টের দলগুলির বিচ্যুতিতে ব্যথিত, বিরক্ত একজন বামপন্থী। ভুল জায়গায় নিস্তার খুঁজছেন। ভুল তো আমি, আপনি সকলেই করি। তাছাড়া ২০০৮-০৯ থেকে মমতার প্রতি বামফ্রন্টের বাইরের বামেদের প্রকাশ্য ও গোপন সমর্থন তো ছিলই। আর তাঁর বিভিন্ন গান শুনে নকশালপন্থীদের প্রতি নচিকেতার সমর্থন বুঝে নিতেও খুব অসুবিধা হত না। তাই সান্ত্বনা ছিল।
সে সান্ত্বনা অবশ্য দ্রুত অন্তর্হিত শুরু করল যখন দেখা গেল নচিকেতার মনকাড়া গান কমে আসছে, বেড়ে যাচ্ছে রেল দপ্তরের বিভিন্ন জলসায় তাঁর অনুষ্ঠান। রেলমন্ত্রী তখন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। পরিবর্তনের সরকার আসার পরে মন ছুঁয়ে যাওয়া গান কমা আর অনুষ্ঠান বাড়া আরো ত্বরান্বিত হল। যে শিল্পী একসময় আমাদের বলতেন “চল যাব তোকে নিয়ে, এই নরকের অনেক দূরে। এই মিথ্যে কথার মেকি শহরের সীমানা ছাড়িয়ে”, তাঁর সবচেয়ে বড় মঞ্চ হয়ে দাঁড়াল একুশে জুলাইয়ের মঞ্চ। একজন শিল্পী, তিনি বাম ডান যা-ই হোন, যখন নিজের শিল্পকে অপ্রধান করে ফেলেন, যখন তাঁর রাজনীতি তাঁর শিল্পের মধ্যে দিয়ে নয়, অন্য পথে প্রকাশ খোঁজে তখন তাঁকে সন্দেহ করতেই হয়। ভাঁড়ার খালি হয়ে গেছে বলে গানের ভান করে আখের গোছাচ্ছেন — এই সন্দেহ আর অমূলক থাকে না তখন। সেই সন্দেহই ক্রমশ প্রবল হয়েছে গত কয়েক বছরে। আর এখন, যখন পশ্চিমবঙ্গে আরেক পালাবদলের কালো মেঘ দেখা যাচ্ছে, তখন কাটমানি নিয়ে তাঁর গান সেই সন্দেহকে আরো বাড়িয়েই তুলল।
মানুষ ভুল করে, আবার মানুষই সেই ভুল সংশোধন করে। সে দিক থেকে মত পরিবর্তন করার অধিকার সব মানুষেরই আছে, একজন শিল্পীর তো আছে বটেই। সুতরাং নচিকেতা একবার মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে সমর্থন করেছেন বলেই যে সারাজীবন করে যেতে হবে একথা বলার নিশ্চয়ই মানে হয় না। শিল্পীকে চারপাশ সম্পর্কে সচেতন হতেই হবে এবং শেষ অব্দি নিজের বিবেকের বাণী শুনতেই হবে। কিন্তু মুশকিল হল যে সরকারঘনিষ্ঠ শিল্পীদের বিবেক একমাত্র উল্টোদিকে শক্তিশালী (সে যে উপায়েই শক্তিশালী হোক) বিরোধী দল থাকলে তবেই জাগ্রত হয়, তাদের বিবেককে যাত্রার বিবেকের চেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া যায় না।
আজ সকালের কাগজে দেখলাম নচিকেতা সাফাই দিয়েছেন, গানটা সারা দেশের দুর্নীতিগ্রস্ত নেতা নেত্রীদেরই বিরুদ্ধে। এবারেও একুশে জুলাইয়ের মঞ্চে তাঁকে দেখা যাবে কিনা জিজ্ঞেস করলে বলেছেন দিদি ডাকলে তিনি নরকেও চলে যাবেন। কারণ ব্যক্তিগত সম্পর্কই তাঁর কাছে আসল, পার্টি কোন ব্যাপার না। কথাটা কেমন সিগারেটের প্যাকেটের বিধিসম্মত সতর্কীকরণের মত শোনাল না? কাল সুভাষদার সাথে সম্পর্ক ভাল ছিল বলে উনি সিপিএমের ছিলেন, আজ দিদির জন্যে উনি তৃণমূলের, কাল অন্য কোন দাদার জন্যে বিজেপির হয়ে যেতেই পারেন — এমনটাই কি বলতে চাইলেন জীবনমুখী শিল্পী?

পুনশ্চ: সেদিন দেখি আমার নীলাঞ্জনা বাজার করছে। মাছ, মাংস, সবজি বিক্রেতাদের সাথে তার কথা বলার ধরণ দেখে অবাক হয়ে ভাবলাম “একে নিয়ে কবিতা লিখতাম!”

ব্যর্থ নমস্কার

প্রথমে ভেবেছিলাম এই বিষয়ে একটা লাইনও লিখব না। প্রবৃত্তি হচ্ছিল না। বাস্তবিক যা ঘটেছে এবং ঘটছে তা দেখে বমি পাচ্ছিল। কিন্তু শেষ অব্দি ভেবে দেখলাম ইতরামির স্বর্ণযুগে প্রবৃত্তির দোহাই দিয়ে চুপ করে থাকা অপরাধমূলক কাজ। যারা ভালবাসো, অন্তর হতে বিদ্বেষ বিষ নাশো ইত্যাদি ভাল ভাল কথা বলেছিলেন, দুর্দিনে দাঁড়িয়ে আমাদের কবীন্দ্র স্বয়ং তাঁদের ব্যর্থ নমস্কারে ফিরিয়ে দিয়েছেন। আমি কোন হরিদাস পাল? তাই সংক্ষেপে কয়েকটা কথা বমি করার মত করেই উগরে দিই।
ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের মূর্তি কেন ভাঙা হয়েছে তা নিয়ে কোন সন্দেহের অবকাশ নেই। অত বিশালকায় বাঙালি আর কে-ই বা আছেন? ওঁকে না ভাঙলে বাংলাকে কী করে ভাঙা যাবে? আমার নিজের অন্তত কারা ভেঙেছে তা নিয়েও কোন সন্দেহ নেই, যতক্ষণ না তদন্ত অন্যরকম প্রমাণ করছে। কিন্তু বলার কথা এই যে বাঙালির ভণ্ডামি যারা মূর্তি ভেঙেছে তাদেরই হাত শক্ত করছে।
যত লোক ফেসবুকে বিদ্যাসাগরকে ডিপি বানিয়েছে তার অর্ধেকও যদি ফেসবুকে বাংলায় পোস্ট করার অভ্যাস রাখত, হোয়াটস্যাপে বাংলায় চ্যাট করত তাহলে বাংলার রাজধানীতে বিদ্যাসাগরের মূর্তি ভাঙার সাহস কারো হত না। কলকাতা জুড়ে কয়েকশো ইংরিজি মাধ্যম স্কুল। সেই স্কুলে পাঠরত লক্ষ লক্ষ বাঙালি ছেলেমেয়ে যদি অন্তত দ্বিতীয় ভাষা হিসাবেও বাংলা পড়ত, তাহলে আমাদের বিদ্যাসাগরকে নিয়ে গদগদ হওয়ার একটা মানে থাকত। কিন্তু তারা পড়ে হিন্দি। বাবা-মায়েরা গর্ব করেন “জানেন দাদা, আমার ছেলের বাংলাটা ঠিক আসে না।“ এদিকে বিদ্যাসাগরের মূর্তি ভাঙা হয়েছে বলে লোকে কেঁদে ভাসাচ্ছে।
রাজ্যের বাংলা মাধ্যম স্কুলগুলো শিক্ষক শিক্ষিকার অভাবে ধুঁকছে, ছাত্রছাত্রীর অভাবে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। বেশিদিন আগের কথা নয়, স্বয়ং বিদ্যাসাগরের প্রতিষ্ঠা করা স্কুল বন্ধ হয়ে যেতে বসেছিল। আমাদের মধ্যে যাঁদের কথা কম, কাজ বেশি তাঁরা আপাতত বাঁচিয়েছেন। আমরা কেউ সেসব নিয়ে ভাবি? বিদ্যাসাগর অবিভক্ত বাংলায় ঘুরে ঘুরে স্কুল স্থাপন করেছিলেন। কেন? যাতে শিক্ষার আলো সবচেয়ে প্রত্যন্ত গ্রামে, সবচেয়ে গরীব মানুষটার ঘরেও পৌঁছায়। এবং সেটা সম্ভব একমাত্র জোরালো সরকারপোষিত শিক্ষাব্যবস্থা থাকলে তবেই। অথচ আমাদের এখানে সরকারী শিক্ষাব্যবস্থার মুমূর্ষু অবস্থা নিয়ে আমাদের কারোর মাথা ব্যথা আছে? বেসরকারী স্কুলগুলোর বেশি ফি এর জন্যে মুখ্যমন্ত্রী একদিন মালিকদের ডেকে ধমকালেই তো আমরা খুশি। বিদ্যাসাগরের শিক্ষা গোল্লায় যাক, যতক্ষণ হাতে কলমে মূর্তি না ভাঙা হচ্ছে ততক্ষণ সব ঠিক আছে। মাস দুয়েক আগে কলকাতা শহরের বুকে শিক্ষক পদপ্রার্থীরা রোদ বৃষ্টি মাথায় করে না খেয়ে রাস্তায় বসেছিলেন। একদিন দুদিন নয়, আঠাশ দিন। কজন গিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন আর কটা ফেসবুক পোস্ট দেখেছি পরিষ্কার মনে আছে। শিক্ষকের দুঃখে যার প্রাণ কাঁদে না সে কিরকম বিদ্যাসাগরপ্রেমী?
আরো মোটা দাগে বলব? বিদ্যাসাগরের প্রতিকৃতিরও কম অসম্মান কলকাতার বুকে মূর্তি ভাঙার আগে থেকেই হয়নি। লুকিয়ে চুরিয়ে হয়নি, আমার আপনার চোখের সামনেই হয়েছে। আমরা প্রতিবাদ করিনি, আমাদের অগ্রগামী শিল্পী, সাহিত্যিক, অধ্যাপকরাও করেননি। গোটা শহর ছেয়ে গেছে বিভিন্ন মনীষীদের উক্তি সম্বলিত হোর্ডিংয়ে, যার মধ্যে বিদ্যাসাগরও আছেন। সঙ্গের ছবিটি কিন্তু সেই মনীষীদের নয়, মাননীয়া মুখ্যমন্ত্রীর। আরেক ধরণের হোর্ডিংয়ে বাংলার মনীষীদের সঙ্গে এক সারিতে বসানো হয়েছে মুখ্যমন্ত্রীকে। সেই হোর্ডিংও আলো (বা অন্ধকার) করে রেখেছে শহরের আকাশ। কারো মনে হয়নি ব্যাপারটা অন্যায়, অশ্লীল? বাঙালি সংস্কৃতির উপর আঘাত? আমরা কি অপেক্ষা করছিলাম কবে বিদাসাগরের মুন্ডুটা আছড়ে মাটিতে ফেলা হবে তার জন্যে?
আর একটা কথা বলার আছে। বাংলার সংস্কৃতি আক্রান্ত সন্দেহ নেই। কিন্তু চট করে ব্যাপারটা যেরকম বাঙালি বনাম অবাঙালি করে ফেলা হয়েছে তা শুধু সঙ্কটটাকে গুলিয়ে দেওয়ার চেষ্টা। লড়াইটা আসলে ভাল বনাম মন্দের, বাঙালি বনাম অবাঙালির নয়। বাঙালিকে নিজভূমে পরবাসী হতে কেউ জোর করেনি।
অফিসে কাজ করতে করতে ক্ষিদে পেলে সুইগি অ্যাপের মাধ্যমে খাবার আনাই। গত এক দেড় মাসে দুবার দুজন ডেলিভারি বয় খাবার নিয়ে এসে আমাকে ফোন করে হিন্দিতে কথা বলেছে। একজনের পদবী হালদার, অন্যজনের সাহা। তবু নিশ্চিত হওয়ার জন্যে তাঁদের জিজ্ঞেস করেছিলাম “ভাই, আপনি বাঙালি তো?” সদর্থক উত্তর পেয়ে জানতে চেয়েছিলাম আমার পদবি বন্দ্যোপাধ্যায় দেখেও কেন হিন্দিতে কথা বললেন। দুজনেই জানালেন আজকাল বাঙালি খদ্দেররা নাকি বাংলায় কথা বললে বুঝতেই পারেন না। এ জিনিস বাঙালিকে বড়বাজারের গদির কোন মারোয়াড়ি শেখাননি, ভবানীপুরের পাঞ্জাবীরাও শেখাননি। ঠিক যেমন বাঙালি মেয়ের বিয়েতে সঙ্গীত করতে হবে এমনটা কোন অবাঙালি মাথায় বন্দুক ঠেকিয়ে দাবী করেননি, বাঙালি বর বৌভাতে শেরওয়ানি না পরলে ভোটার লিস্ট থেকে নাম কেটে দেওয়া হবে, এমনটাও কোন অবাঙালি রাজনীতিবিদ হুমকি দেননি। হিন্দিকে বাংলার মাথায় চাপিয়েছে বাঙালি নিজেই। যে কারণে শহুরে, লেখাপড়া জানা বাঙালির বিদ্যাসাগরের জন্যে এই হঠাৎ আবেগকে মড়াকান্নার বেশি কিছু বলা শক্ত।
বাঙালি সংস্কৃতির উপর আঘাত করা শুরু হয়েছে তখন থেকে যখন বাংলার অধিকাংশ ইসলাম ধর্মাবলম্বী মানুষের মাতৃভাষা বাংলা হওয়া সত্ত্বেও যেখানে সেখানে রাজনৈতিক হোর্ডিং লেখা শুরু হয়েছে উর্দুতে। প্রবল আঘাত করা হয়েছে তখন যখন হিন্দি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করা হয়েছে। বিরাট আঘাত নেমে এসেছে তখন যখন কলকাতার আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব প্রাঙ্গণে সত্যজিৎ রায়, ঋত্বিক ঘটক, মৃণাল সেন, তপন সিংহ, অজয় কর, নিদেনপক্ষে উত্তম কুমার বা সুচিত্রা সেনের বদলে চলচ্চিত্রের সঙ্গে সম্পর্কহীন নেত্রীর ঢাউস প্রতিকৃতি টাঙানো হয়েছে। পঞ্চধাতুর বা দুশো ফুটের বিদ্যাসাগর মূর্তি বানিয়ে এই ক্ষতি পূরণীয় নয়। এবং এ ক্ষতি অবাঙালিরা কেউ করেনি।
বিদ্যাসাগরকে রাধাকান্ত দেব, রসময় দত্তর মত বাঙালিদের বিরুদ্ধেই লড়তে হয়েছিল। তাই অনেকে যে বলছেন “বাঙালিকে সব বিভেদ ভুলে এক হতে হবে”, সেকথা একেবারে ভুল। বরং বাঙালিকে পক্ষ নিতে হবে। ঠিক করতে হবে সে বিদ্যাসাগরের পক্ষে না রাধাকান্তদের পক্ষে। কথায় এবং কাজে আমাদের রামমোহন, বিদ্যাসাগরের আত্মীয় ছিলেন মহারাষ্ট্রের আত্মারাম পান্ডুরঙ্গ, জ্যোতিরাও ফুলেরা। ঠিক তেমনি সেদিন যাঁরা বিদ্যাসাগরকে অকথা কুকথা বলেছেন, প্রাণ নাশের চেষ্টা করেছেন তাঁদের উত্তরসূরী আজকের মোদী, অমিত শাহরা। অতএব হিন্দি জাতীয়তাবাদের বিপক্ষে বাঙালি জাতীয়তাবাদের অতিসরলীকরণ দিয়ে এ লড়াই লড়া যাবে না। ওভাবে লড়লে বড়জোর কারো নির্বাচনী লড়াইয়ে সুবিধা হতে পারে, বাঙালি জাতীয়তাবাদের আড়ালে নিজেদের অপসংস্কৃতি লুকিয়ে ফেলার সুবিধা হতে পারে।
পুনশ্চ: অধুনা যে হাওয়া তাতে এই লেখাটাকে বামের রাম হয়ে যাওয়ার প্রমাণ হিসাবে চালানো হবে হয়ত। হলে আমি নিরুপায় কারণ আমি ছোট থেকে অঙ্কে কাঁচা। বাইনারি বুঝি না।

কিচ্ছু মিলছে না

স্কুলজীবনে পরীক্ষায় এক ধরণের প্রশ্ন আসত, “অমুকের সাথে তমুকের পাঁচটি সাদৃশ্য লেখো।” আমরা তখন পাশে রাখা ছয় ইঞ্চি স্কেলটা টেনে নিয়ে ঠিক খাতার মাঝ বরাবর উল্লম্ব ভাবে একটা দাগ টানতাম। তারপর তার ডাইনে বাঁয়ে দু পক্ষের বৈশিষ্ট্যগুলো লিখতাম। মজার কথা, যে দুটো প্রাণীর বা উদ্ভিদের বা বস্তুর সাদৃশ্য জানতে চাওয়া হত, তাদের বৈসাদৃশ্য জানতে চেয়েও প্রশ্ন আসত অনেক সময়। অর্থাৎ তাদের মিল থাকলেও তারা কিন্তু হুবহু এক নয়। কেন এমন হয় তা বুঝিয়ে দিয়েছিলেন আমাদের স্কুলের জীবন বিজ্ঞানের মাস্টারমশাই সুবীরবাবু। বলেছিলেন “জানবে সাদৃশ্য থাকলে তবেই বৈসাদৃশ্যের প্রশ্ন আসে। মানুষের সঙ্গে মানুষের কী কী সাদৃশ্য, কী কী বৈসাদৃশ্য সেটা জিজ্ঞেস করা যায়। পাগল ছাড়া কেউ জিজ্ঞেস করে না মানুষ আর ছাগলের কী কী সাদৃশ্য বা বৈসাদৃশ্য।”
এইসব কথা আমার বেশ কয়েক বছর ধরে খুব মনে হচ্ছে, আমাদের প্রধানমন্ত্রী আর মুখ্যমন্ত্রীকে দেখে। ওঁদের খুব লড়াই, আবার উনি সেদিন বললেন, নাকি মিষ্টি খাওয়াও চলে। শুনে ইনি কিন্তু বললেন না এসব মিথ্যে কথা। শুধু বললেন এরপর থেকে মাটির লাড্ডু না কিসব যেন পাঠাবেন, খেতে গিয়ে দাঁত ভেঙে যাবে। স্কুলে পড়তে আমিও বন্ধুদের উপর রেগে গেলে এরকমই বলতাম। ফলে খুবই নস্ট্যালজিক হয়ে পড়লাম। আমিও তো মানুষ, আমারও তো ইচ্ছে করে সেই সেকালের মত পরীক্ষার প্রশ্নের উত্তর দিতে। তাই ভাবলাম লিখেই ফেলি কিছু একটা। কী লিখি, কী লিখি? মুখ্যমন্ত্রী ও প্রধানমন্ত্রীর সাদৃশ্য ও বৈসাদৃশ্য লিখি। নরেন্দ্রভাই দামোদরদাস মোদী আর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তো শুধু দুজন মানুষ নন, তাঁরা হলেন, সাহেবরা যাকে বলে, কাল্ট ফিগার। অদূর ভবিষ্যতেই তাঁদের জীবন ও বাণী আমাদের সন্তানরা পাঠ্য বইতে পড়বে। চাকরি বাকরি চলে গেলে বাড়িতে বসে টিউশন করার সময় আমার এই লেখাটা নোট হিসাবে কাজে লেগে যাবে। তেমন জনপ্রিয় করতে পারলে ‘প্রতীকদার নোট’ হিসাবে অমুক প্রকাশনীর সহায়িকা বই হয়েও বেরোতে পারে। রয়্যালটি থেকে বিলক্ষণ দু পয়সা কামাতে পারব।
আগে বৈসাদৃশ্যগুলোই দেখা যাক।
উনি পুরুষ, ইনি নারী। উনি গুজরাতি, ইনি বাঙালি। উনি বিজেপি নেতা, ইনি তৃণমূল নেত্রী। অনেকক্ষণ মাথা চুলকেও আর কিছু বার করতে পারলাম না। এই জন্যে সুবীরবাবুর হাতে আমি চিরকাল কম নম্বর পেতাম। আচ্ছা, নাহয় সাদৃশ্যগুলো লেখার চেষ্টা করে দেখি।
ওনার সরকার অমুকটা পারেনি বললেই উনি দায়ী করেন “কংগ্রেস কে সাট সাল” কে, ইনি বলেন “বামফ্রন্ট ৩৪ বছরে যা সর্বনাশ করে দিয়েছে…”
তাতে থেমে গেলেন তো বেঁচে গেলেন, নাছোড়বান্দা হলে উনি বলেন “দেশদ্রোহী”, “পাকিস্তানি”, “আরবান নকশাল”। ইনি বলেন “সিপিএমের লোক”, “মাওবাদী” (নকশাল তকমার সঙ্গে আশ্চর্য মিল না?)। ইদানীং বিজেপিও বলছেন।
ওনার দলবল জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের উপর খড়গহস্ত। সেখানে চতুর্দিকে কন্ডোম ছড়িয়ে থাকে, ছেলেমেয়েরা সব মদ, গাঁজা, ড্রাগ ইত্যাদি খেয়ে পড়ে থাকে, আর ভারতকে খণ্ড খণ্ড করার চক্রান্ত চলে — এমনটাই ওঁরা বলেন।
এঁর দলের বিষনজরে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়। সেখানেও নাকি মাওবাদী গিজগিজ করছে। এবং যখন এক উপাচার্যের বিরুদ্ধে আন্দোলন হল, তখন এঁর দলের এক পাণ্ডা প্রশ্ন তুললেন “মদ, গাঁজা বন্ধ। তাই কি এত প্রতিবাদী গন্ধ?” তিনি আবার এখন ওঁর দলের পাণ্ডা।
তা এর সমাধান হিসাবে ওঁর মানবসম্পদ উন্নয়ন মন্ত্রী ক্যাম্পাসে ইয়া বড় জাতীয় পতাকা টাঙানোর ফতোয়া দিয়েছিলেন, উপাচার্য ক্যাম্পাসে মিলিটারি ট্যাঙ্ক রাখার নিদান দিয়েছিলেন। আর এঁর শিক্ষামন্ত্রী পরিষ্কার বলেছিলেন সরকারের পয়সায় খেতে পরতে হলে বিশ্ববিদ্যালয়কে সরকারের কথা শুনেই চলতে হবে। অতএব কিভাবে ভর্তি হবে আমি ঠিক করব, কী পড়ানো হবে আমি ঠিক করব, ইত্যাদি।
পরিতাপের বিষয় (কার পরিতাপ জানি না) দুটো বিশ্ববিদ্যালয়ই পড়াশোনা, গবেষণায় পারদর্শিতা দেখিয়েই চলেছে।
বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সঙ্গে অবশ্য দুজনেরই সম্পর্ক গভীর। উনি ‘সম্পূর্ণ’ রাষ্ট্রবিজ্ঞানে এম এ, ডিগ্রি দেখতে চাইলে সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয় বলেছে ওসব তথ্য দেখানো যাবে না, নিয়ম নেই। ইনি পাশ করা উকিল না কী যেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের নামটা ভুলে গেছি।
কর্মসংস্থানের সমস্যার কথা তুললে উনি বলেন “রোজগার নেই মানে? যে পকোড়া বেচে সে রোজগার করছে না?” আর ইনি বলেন তেলেভাজা শিল্পও তো শিল্প।
ওঁর উত্থানকে ওঁর ইংরিজি শিক্ষিত সুটেড বুটেড ধনীর দুলাল বুদ্ধিজীবীরা বলেন লুটিয়েন্স এলিটের আধিপত্যের বিরুদ্ধে দলিত গরীবের ছেলের উত্থান। এঁর উত্থানকে এঁর বামপন্থী ভদ্রলোক বুদ্ধিজীবীরা বলেন ধুতি পরিহিত ভদ্রলোকদের আধিপত্যের বিরুদ্ধে সাধারণ ঘরের মেয়ের উত্থান। ওঁর উত্থানের পর যে দলিতদের প্রাণ ওষ্ঠাগত সেটা চেপে যাওয়াই ভাল। আর এঁর উত্থানের পর যে সাধারণ ঘরের মেয়েরা ধর্ষিত হলেই “সাজানো ঘটনা” হয়ে যাচ্ছে, সেকথা বললেও পুলিশে ধরতে পারে।
পুলিশে ধরা বলতে মনে পড়ল, ওঁর নিন্দা করে, ওঁর পার্টির অন্য নেতাদের নিন্দা করে ফেসবুকে পোস্ট করায় কলেজ পড়ুয়া থেকে সাংবাদিক অব্দি অনেকেই দেশদ্রোহের দায়ে গ্রেপ্তার হয়েছেন। এঁর বা এঁর সরকারের নিন্দা করে লোকে অম্বিকেশ, অরুণাচল ইত্যাদি হয়েছে। মিটিঙে প্রশ্ন তুলে শিলাদিত্যও হয়েছে।
প্রশ্ন পছন্দ হয়নি বলে উনি করণ থাপারের অনুষ্ঠান থেকে এক গ্লাস জল খেয়ে উঠে গেছিলেন, ইনি দর্শকের প্রশ্ন পছন্দ হয়নি বলে তাকে সিপিএম, মাওবাদী ইত্যাদি বলে দেগে দিয়ে সাগরিকা ঘোষের অনুষ্ঠান থেকে প্রস্থান করেছিলেন।
দুজনেই কিন্তু লেখক। উনি এক্সাম ওয়ারিয়র লেখেন। এঁর লেখা বই এক্সাম ওয়ারিয়রদের পুরস্কার দেওয়া হয়।
ওঁর বীরেরা বলেন অমর্ত্য সেন অর্থনীতি বোঝেন না, ইরফান হাবিব ইতিহাস জানেন না। এঁর বীর বলেছেন শঙ্খ ঘোষ কোন কবি নন।
উনি বাবা গোরক্ষনাথ, গুরু নানক আর সন্ত কবীর — যাঁরা একে অপরের জীবৎকালে জীবিতই ছিলেন না — তাঁদের মধ্যে আধ্যাত্মিক বৈঠক করান। তক্ষশীলা বিশ্ববিদ্যালয়কে অধুনা পাকিস্তান থেকে বিহারে এনে স্থাপন করেন। ইনি? ১৯৪১ এ প্রয়াত রবীন্দ্রনাথকে দিয়ে গান্ধীজির ১৯৪৬ এর অনশন ভঙ্গ করান, পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় সতীদাহ প্রথা রদ করার আইন পাশ করান।
বোর হয়ে যাচ্ছেন, না? আচ্ছা থামা যাক তবে। দুজনেই আবার বজরংবলীর ভক্ত। তিনি গদা নিয়ে রাস্তায় নেমে পড়েছেন ইতিমধ্যেই। বেশি বাড়াবাড়ি করলে দুদল ভক্ত নিয়ে গদাপেটা করতে চলে আসবেন হয়ত।