সব ধর্ষণ সমান নয়

কাউকে তো দেখছি না ফেসবুক বিদীর্ণ করে লিখছে “উন্নাওয়ের ধর্ষক বিধায়কের ফাঁসি চাই” বা “আসিফার ধর্ষকদের মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হোক”? এখনো পাড়ায় পাড়ায় মোমবাতি মিছিলের কোন খবর পাইনি। কাল রাতে দিল্লীতে একখানা হয়েছে বটে কিন্তু তার আয়োজক আবার একটা রাজনৈতিক দল। সেখানে রাহুল গান্ধী ছিলেন। কোথায় গেল নির্ভয়াকান্ডে জাগরূক সেই “নাগরিক সমাজ”?

কথাটা অনেকদিন ধরেই লিখব লিখব করছি। কিন্তু এমনও কথা আছে যা লিখতে হাত সরে না। কেবলই মনে হয় “ভুল ভাবছি। এ সত্যি নয়।“ কিন্তু নিজেকে এ হেন প্রবোধ দিয়েই বা কতদিন চলে? স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ যখন লিখে গেছেন যুগান্তের কবিকেও মানহারা মানবীর দ্বারে দাঁড়াতেই হবে, তখন আমার — দু পয়সার সাংবাদিক আর ফেসবুকে রাগ, ক্ষোভ, ঘৃণা উগরে দেওয়া মূল্যহীন ব্লগার — সাধ্য কী যে একথা না লিখে থাকি? আর সত্যি বলতে যা লিখি তা তো কোথাও কোন মনের কোণে কোন প্রভাব ফেলে না। লিখি নিজের নিষ্ক্রিয়তার পাপস্খালন হচ্ছে — এই ভেবে। ঐ, এরিস্টটল যাকে catharsis বলতেন আর কি। তাই বুক ঠুকে কথাটা লিখেই ফেলি।
সব ধর্ষণ সমান নয়।
কথাটা খুব আপত্তিকর মনে হচ্ছে, না? হতে পারে। কিন্তু গত কয়েকবছরের ঘটনাবলী প্রমাণ করেছে যে সব ধর্ষণ সমান নয়।
২০১২ র ডিসেম্বরের কথা মনে করুন। দিল্লীর সেই মেয়েটি, যার আমরা বাহারী নাম রেখেছি নির্ভয়া (যেন সে নির্ভয়ে বুক ফুলিয়ে ধর্ষিত হতে গিয়েছিল, যেন তার ধর্ষণোত্তর মৃত্যু অত্যন্ত বীরোচিত ঘটনা, যেন একটা তাজা প্রাণের এই মর্মন্তুদ পরিণতি জাতির বিবেক জাগিয়ে তোলার জন্য এক মহান আত্মত্যাগ), সে যখন হাসপাতালে মৃত্যুর চেয়েও বেশি বেদনা নিয়ে শুয়ে ছিল, তখন সারা ভারত জুড়ে কত মোমবাতি মিছিল! ফেসবুকে সরকার কত অপদার্থ সেই নিয়ে লক্ষ লক্ষ পোস্ট! দেশটাকে বদলে ফেলা দরকার — এই মর্মে আমাদের যুবসমাজের কি চিল চিৎকার! বহু মানুষ তো মিছিল করে খোদ দিল্লীতে প্রতিবাদ জানাতে গেলেন ক্ষমতার অলিন্দে। সহসা কি আপাদমস্তক আলোড়ন এই পোড়া দেশটার শরীরে!
সেই একই পরিমাণ আলোড়ন কি হয়েছিল এই বাংলায় যখন কামদুনির মেয়েটা ধর্ষিতা হল? যখন মধ্যমগ্রামে এক ট্যাক্সি ড্রাইভারের মেয়ে ধর্ষণ এবং তারপরেও চলতে থাকা দীর্ঘ লাঞ্ছনার শেষে মারা গেল এবং মৃত্যুটা আত্মহত্যা না হত্যা তা নিয়ে ধোঁয়াশা দেখা দিল? সুজেট জর্ডানের ধর্ষক যেন এখন কোথায়?
যদি ঐ ঘটনাগুলো নিয়ে সংবাদমাধ্যম এবং বিরোধী দলগুলোর প্রতিক্রিয়া ঘেঁটে দেখেন তাহলে হয়ত বলবেন “কম কিছু তো হয়নি।” কিন্তু আমি সংবাদমাধ্যম আর বিরোধী দলগুলোর কথা বলছিই না। বলছি আমাদের মত ক্ষমতার বৃত্তের বাইরে থাকা মানুষদের কথা। আমরা কজন ধর্ষণ হলেই মুখ্যমন্ত্রীর সেটাকে “সাজানো ঘটনা” বা “সিপিএমের চক্রান্ত” বলা শুনে শিউরে উঠেছি, বমি বমি লাগায় বেসিনে থুতু ফেলেছি? কী বলছেন? অনেকেই? তাই নাকি? তার প্রতিফলন তো ভোটবাক্সে দেখলাম না। চৌত্রিশ বছর যারা অপশাসন করেছে তাদের তুলনায় পরিবর্তনের সরকার ভালই চলেছে যদি ধরেও নিই, তাহলে সরকারের পতন না হলেও এত সব ঘটনায় সমর্থন তো অন্তত কমে যাওয়া উচিৎ ছিল। হয়েছে তো উলটো। মুখ্যমন্ত্রীর পার্টির সমর্থন বেড়েই গেছে। ২০১৬ র ফলাফল নিয়ে অনেকের সাথে কথা বলে দেখেছি। সকলেই একমত যে ধর্ষণগুলো কোন ইস্যু নয় যতক্ষণ আমার বাড়ির সামনের কাঁচা নর্দমা পাকা হচ্ছে, আমার গাড়ির চাকা রাস্তার গাড্ডায় পড়ে সার্ভিসিঙের খরচ বাড়িয়ে না দিচ্ছে। অতএব বোঝাই যাচ্ছে যে নির্ভয়ার ধর্ষণ আর কামদুনির মেয়েটার ধর্ষণ এক নয়।
এইসব অপ্রিয় কথা হয়ত লিখতাম না। কিন্তু মুশকিল হল এই যে দেখলাম ধর্ষণের অবমূল্যায়ন চলতেই থাকল (মুখ্যমন্ত্রী সেই যে কত লাখ যেন মূল্য ধার্য করেছিলেন সেই মূল্যের কথা বলছি না কিন্তু) এবং প্রায় দেড় শতক পরে গোপালকৃষ্ণ গোখেলের সেই বিখ্যাত উক্তিকে আবার সত্য প্রমাণ করে এই রোগটা সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ল। সংরক্ষণ চেয়ে জাঠরা দক্ষযজ্ঞ করল, সেই বাবদ নাকি ধর্ষণও করল। সেটা নিয়ে একটু হৈ চৈ হতেই সরকারগুলো ঘোষণা করল কিছুই নাকি হয়নি। সব ধর্ষণ কাল্পনিক। তারপর নয়ডায় জাতীয় সড়কের ধারে এক মহিলার ধর্ষণও এক দিনের মধ্যেই পারিবারিক কলহ, আদৌ ধর্ষণ হয়নি — এসবে পর্যবসিত হল। কোনটা যে সত্য, কোনটা উত্তরসত্য কে বা জানে!
কিন্তু তারপর একটা ঘটনা ঘটল যা তীব্রতার কারণে অস্বীকার করার কোন উপায় রাখেনি। অবশ্য কেউ অস্বীকার করতে চায়ওনি। সেটা হল আপাদমস্তক দুর্নীতিগ্রস্ত, যৌনবিকৃতিসম্পন্ন, বহু নারীর ধর্ষক এক গুরুর গ্রেপ্তারের প্রতিবাদে শত শত ভক্তের দাঙ্গা করা। হরিয়ানার রাজ্য সরকার স্পষ্টতই হাত গুটিয়ে বসে রইল। বুঝে নেওয়া শক্ত নয় যে রাষ্ট্রযন্ত্রের এবং, মানুন আর না-ই মানুন, সাধারণ মানুষের এক বিরাট অংশের সমর্থন ঐ গুরমিত রাম রহিমের দিকে ছিল।
এর পরেও ধর্ষণ এবং সে সম্পর্কে আমাদের উদাসীনতার গল্পটা যেন একতা কাপুরের কে সিরিয়ালের মত — শেষই হয় না। কিন্তু রাম রহিমের সময় থেকেই দেখা যাচ্ছে আমরা আর শুধু উদাসীনতায় থেমে নেই। আমরা ক্রমশ যৌন অপরাধীদের সমর্থনে সোচ্চার।
কলকাতার নাম করা স্কুলে দুজন শিক্ষকের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠল ধর্ষণের। অবিলম্বে সরকারের মদতপুষ্ট লোকেরা গোপনে এবং প্রকাশ্যে বলতে শুরু করল এসব রাজ্যকে অশান্ত করার জন্যে বামপন্থী চক্রান্ত। একটা কাগজে তো প্রতিবাদী অভিভাবকদের ছবি ছেপে দাবী করা হল যে ওঁরা আসলে মাওবাদী। ফেসবুকে যে যা-ই লিখুক নিজেকে প্রগতিশীল প্রমাণ করতে, সেই সময় অন্তত পাঁচজন পরিচিত ব্যক্তিগত কথাবার্তায় আমাকে বোঝানোর চেষ্টা করেছিল জি ডি বিড়লা স্কুলের মেয়েটা মিথ্যে বলছে এবং গোটা ব্যাপারটা আসলে তৃণমূল বনাম বিজেপি ছাড়া কিছুই নয়। এমন তাদের যুক্তির বাহার যে একটা সময়ে আমিও ধন্দে পড়ে যাই। তখন আবার বুঝলাম যে সব ধর্ষণ সমান নয়। কোন দলের লোক যুক্ত, কোন দলের শাসনে ঘটেছে ব্যাপারটা সেসব দেখে আমরা, মানে শিক্ষিত, রুচিশীলরা ধর্ষণের দর ঠিক করি।
কিন্তু তখনো বুঝিনি দর ঠিক করার ওটাই একমাত্র মানদণ্ড নয়। সেটা বোঝার জন্যে অপেক্ষা করতে হল একটা আট বছরের মেয়ের ধর্ষণ এবং খুন পর্যন্ত, একটা ধর্ষিত মেয়ের বাবা পুলিশের হাতে খুন হওয়া পর্যন্ত।
স্পষ্ট মনে আছে যখন নির্ভয়ার ঘটনা প্রকাশ হল, দোষীরা গ্রেপ্তার হল তখন নাবালক ছেলেটিকেও প্রাপ্তবয়স্ক হিসাবে বিচার করা হোক, মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হোক — এই দাবীতে আমার কত বন্ধু, পরিজন সোচ্চার ছিলেন। আমি এর বিরোধিতা করেছিলাম বলে তারা আমাকেই ধর্ষক বলে ফেলে প্রায়। এখন কোথায় তারা? কাউকে তো দেখছি না ফেসবুক বিদীর্ণ করে লিখছে “উন্নাওয়ের ধর্ষক বিধায়কের ফাঁসি চাই” বা “আসিফার ধর্ষকদের মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হোক”? এখনো পাড়ায় পাড়ায় মোমবাতি মিছিলের কোন খবর পাইনি। কাল রাতে দিল্লীতে একখানা হয়েছে বটে কিন্তু তার আয়োজক আবার একটা রাজনৈতিক দল। সেখানে রাহুল গান্ধী ছিলেন। কোথায় গেল নির্ভয়াকান্ডে জাগরূক সেই “নাগরিক সমাজ”?
নব্বইয়ের দশকের শেষদিক থেকে ক্রমশ “স্বতঃস্ফূর্ত” কথাটা খুব জনপ্রিয় হয়েছে। প্রতিবাদ নাকি স্বতঃস্ফূর্ত হলে তবেই গ্রাহ্য হবে, নইলে নয়। অর্থাৎ আমি যদি বুদ্ধি খাটিয়ে, শ্রম দিয়ে, সময় দিয়ে আমার বক্তব্যের সমর্থনে আপনাকে রাস্তায় নামাতে পারি তাহলে সে প্রতিবাদ হল সাজানো ঘটনা। আপনার যদি একা একা স্কচ বা ইনস্ট্যান্ট কফিতে চুমুক দিতে দিতে মনে হয় “নাঃ! একটু মিছিলে হেঁটে আসি”, তবেই সেটা প্রতিবাদ হবে। যাদের স্কচ বা কফি খাওয়ার সাধ্য নেই তাদের প্রতিবাদ, অতএব, গ্রাহ্য নয়। তাদের হাতে থাকে পতাকা, অর্থাৎ তারা সংগঠিত। অর্থাৎ স্বতঃস্ফূর্ত নয়। ভাগ্যিস এইরকম স্বতঃস্ফূর্ততার ধারণা এমনকি অহিংসার পূজারী মহাত্মা গান্ধীরও ছিল না। থাকলে অসহযোগ, ভারত ছাড়ো ওসব করতেন না। সুভাষচন্দ্রও সাত মুলুক পাড়ি দিয়ে সেনাবাহিনী টাহিনী গড়ার ঝামেলায় যেতেন না। মার্টিন লুথার কিংও অপেক্ষা করতেন কবে সাদা চামড়ার লোকেরা এসে চোখের জল ফেলতে ফেলতে “ভাই রে” বলে কালো মানুষদের গলা জড়িয়ে ধরে নিজেদের আমোদের জায়গাগুলোয় নিয়ে যাবে। তা সে যাই হোক, কথা হচ্ছে নির্ভয়ার জন্যে যে “স্বতঃস্ফূর্ত আবেগের বিস্ফোরণ” দেখেছিলাম সে আবেগ কিন্তু উন্নাওয়ের মেয়েটির জন্যে দেখতে পাচ্ছি না। আসিফার জন্যে তো আরোই পাচ্ছি না। উলটে দেখছি এদের ধর্ষকদের জন্যে, হত্যাকারীদের জন্যে বেশ একটা সহানুভূতির আবহ।
আবার বলছি, রাষ্ট্রযন্ত্রের যে সক্রিয় সমর্থন ঐ ইতরগুলোর প্রতি তার চেয়েও আমি বেশি আতঙ্কিত আমাদের মত মানুষদের আচরণ নিয়ে। কোন সন্দেহ নেই গত কয়েকবছরে এদেশে খুনী এবং ধর্ষকদের রাষ্ট্র নজিরবিহীন সমর্থন দিয়েছে। কিন্তু আমার প্রশ্ন এই যে এরকম একটা রাষ্ট্রশক্তি তো তৈরি করেছি আমরা। সেজন্যে আমাদের কেউ কি অনুতপ্ত? আমাদের গণতন্ত্রের হাজারটা ত্রুটি আছে। কিন্তু কেউ কি বলতে পারবে অন্যদের মনোনয়ন জমা দিতে না দিয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় মুখ্যমন্ত্রী হয়েছিলেন? একজনও কি বলবে যোগী আদিত্যনাথ মুখ্যমন্ত্রী হয়েছে লোকের ভোট দেওয়া আটকে? কেউ বলবে ২০১৪ র লোকসভা নির্বাচন বিজেপি জিতেছিল কাউকে ভোট দিতে না দিয়ে?
তাহলে দাঁড়াল কী? ধর্ষকদের ক্ষমতায়ন করেছি আমরাই। দয়া করে বলবেন না “বুঝিনি এমন হবে।” ২০১১ থেকে ১৬ অব্দি অত ধর্ষণের ঘটনার পরেও আপনি বোঝেননি? যোগী আদিত্যনাথের অনেক দোষ আছে। কিন্তু সে কোনদিন নিজের চিন্তাধারা, উদ্দেশ্য গোপন করেছে এমন অপবাদ তার চরম শত্রুও দেবে না। সে কোন ধরণের মানুষ সম্পর্কে কী ভাবে, কী করতে চায় সেসব সে প্রকাশ্যেই বহুবার বলেছে। তার ভিডিও আছে, খবরেও প্রকাশিত হয়েছে। ওসব জেনেও উত্তরপ্রদেশে যে লোক তাকে মুখ্যমন্ত্রী বানিয়েছে আর অন্য কোথাও বসে যারা সমর্থন জানিয়েছে তারা উন্নাওয়ের ঐ মানহারা মানবীর দ্বারে কোন মুখে দাঁড়াবে?
আসিফার ঘটনা আরো বেশি অবাক করার মত। এবং তার প্রতিক্রিয়াও চমকপ্রদ। কোন সভ্য দেশে একটা আট বছরের মেয়েকে একমাত্র কোন বিকৃতমনা অপরাধীই অপহরণ করে বন্দী করে রেখে বারবার ধর্ষণ করতে এবং তারপর খুন করতে পারে। ‘Silence of the lambs’ এর বাফেলো বিলের মত কেউ। এ কাজে কোন সঙ্গী পাওয়ার তার কথা নয় এবং যখন সে ধরা পড়বে তখন বিনা বিলম্বে কঠোরতম শাস্তি তার হওয়ার কথা। কিন্তু আসিফার দুর্ভাগ্য সে জন্মেছিল একটা অসভ্য দেশে। যে দেশের মানুষ ধর্মান্ধ, বর্বর। দুধের শিশুকে মন্দিরে নিয়ে গিয়ে বিগ্রহের সামনে দল বেঁধে ধর্ষণ করে বারবার এবং সেটা হয় তাদের পূজার অঙ্গ। আর কী দারুণ ব্যাপার! যে রাজ্যের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ আসিফার ধর্মের, এমন এক ধর্ম যা নাকি, ধর্ষকদের ধর্মের লোকেদের কথানুযায়ী ভীষণ হিংস্র, সেই রাজ্যে পুলিশ অনেকদিন অব্দি অভিযোগই না নিয়ে গ্যাঁট হয়ে বসে থাকতে পারে! শেষ অব্দি যখন নেয়, তখন জানা যায় কর্তাদের আগেই অনেক টাকাপয়সা দেওয়া হয়েছিল চেপে যাওয়ার জন্য। শুধু তাও নয়, ধর্ষণপুজোর পেরসাদ তাঁরাও পেয়েছেন। এতসব আয়োজন কেন? না আসিফার পরিবার পরিজন ভাই বেরাদরদের ঐ এলাকা থেকে সরানোর জন্যে। আচ্ছা এই অব্দিও না হয় বোঝা গেল। দোষীদের যথাযোগ্য শাস্তির ব্যবস্থা করুক রাষ্ট্র। এর বেশি আর কী করণীয়? ক্ষতি তো যা হওয়ার হয়েই গেছে। কিন্তু বিপদের শেষ তো সেখানে নয়। লোকে যে মিছিল করতে বেরিয়েছে ধর্ষকদের সমর্থনে! উকিলরা আন্দোলন শুরু করেছেন পুলিশকে চার্জশিটই দাখিল করতে দেবেন না বলে! আসিফার পরিবারের পক্ষের উকিলকে হুমকি দেওয়া হচ্ছে “ভিটেমাটি চাটি করে দেব”!
তা এসবে আমাদের স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিক্রিয়াগুলি কী কী রকমের?

১) নীরবতা
২) নিশ্চয়ই পাকিস্তানের হাত আছে
৩) কাশ্মীরীদের বিশ্বাস করা যায় না। কে জানে আসলে কী ব্যাপার? মিডিয়া তো সবেতেই “ওদের” দিকে ঝোল টানে
৪) হয়েছে বেশ হয়েছে। বেঁচে থাকলে তো বড় হয়ে টেররিস্ট হত
৫) তুমি এত লাফাচ্ছ কেন? তোমার বোনকে তো কেউ রেপ করেনি

দু নম্বর থেকে পাঁচ নম্বর হচ্ছে তাদের প্রতিক্রিয়া যারা ইদানীং হিন্দু বলে গর্বিত। এক থেকে পাঁচ তাদেরও প্রতিক্রিয়া যারা অত গর্বিত টর্বিত নয়, তবে মোগাদিশুতে মুসলমান সন্ত্রাসবাদীরা বোম মারলে মুর্শিদাবাদের মুসলমান সম্পর্কে বলে “কৈ, নিন্দা করল না তো? ওদের ধর্মটাই এইরকম। কোরানে পরিষ্কার লেখা আছে।”
এখন যদি জিজ্ঞেস করি এই যে আপনারা আসিফার ধর্ষণকে নির্ভয়ার ধর্ষণের পাশে রাখছেনই না, নিন্দাও করছেন না — এ থেকে কী বুঝব? হিন্দু ধর্মটাই এরকম? ঐ ধর্ষণপুজোর কথা বেদে পরিষ্কার লেখা আছে? কারা যেন ইংরিজিটা লিখতে পারে বলে মুসলমানদের উঠতে বসতে জ্ঞান দেয় “Educated Muslims should reclaim their religion from fundamentalists?” তেনারা হিন্দুধর্মটাকে মৌলবাদীদের হাত থেকে পুনরুদ্ধার করার কাজটা কবে শুরু করছেন জানতে ভারী ইচ্ছা করছে।
ইতিমধ্যে বুকে হাত রেখে একটা সত্যি কথা বলে ফেলতে পারলে ভাল হয়। সেটা এই যে আমরা অনেকেই জেনেশুনে বিষ করেছি পান। কারণ বাইরে উন্নয়ন ইত্যাদি যা-ই বলে থাকি না কেন, মনে মনে জপছিলাম “মুসলমানগুলোকে একটু শিক্ষা দেওয়া দরকার,” “সোনার চাঁদ, সোনার টুকরোগুলোর বড্ড বাড় বেড়েছে” ইত্যাদি। এসব যখন ভেবেছি তখন যোগী আদিত্যনাথের বক্তৃতায় ধর্ষণের হুমকি আমাদের ভালই লেগেছে। এ বিষ বড় মিষ্টি। খাওয়ার সময়ে ভেবেছি আমার কী? আমি তো সংখ্যালঘুও নই, দলিতও নই। এখনো মিষ্টি মিষ্টি লাগছে তাই ধর্ষণগুলোকে সেইভাবেই মাপছি।
এমন বিষ আছে খাওয়ার সাথে সাথে কেউ মরে না, মরে ধীরে ধীরে, অনেক মাস, বছর ধরে। যেমন আর্সেনিক। ঘৃণাও আর্সেনিকের মতই। মনে রাখবেন, যে ধর্ষক একটা আট বছরের মেয়েকে ধর্ষণ করবে বলে মীরাট থেকে কাঠুয়া যেতে পারে, সে কিন্তু মুসলমান না পেলে ধর্ষণ করা বন্ধ রাখবে না। এ দেশের সব মুসলমান, দলিত, আদিবাসী হিটলারের জার্মানির ইহুদীদের মত হাওয়া হয়ে গেলেও তার চোখ লোভে চকচক করবেই। তা বিষ যখন গিলেছেন এবং আমাদের সক্কলকে গিলিয়েছেন তখন আর কী করা? দরজা, জানালা এঁটে শোবেন দয়া করে আর ছেলেমেয়েদের একা কোথাও ছাড়বেন না। মনে রাখবেন, ধর্ষণকে নানা লোক নানা উদ্দেশ্যে ব্যবহার করে কিন্তু ধর্ষণ করার ইচ্ছাটি একদম ধর্মনিরপেক্ষ। ওখানে কিন্তু জাতের ভিত্তিতে সংরক্ষণও নেই।
সব ধর্ষণ সমান নয় কিন্তু সব ধর্ষক সমান।

স্খলনের শাস্তি

যৌনতা হল ছেনি, হাতুড়ির মত। ভাস্করের হাতে পড়লে মিকেলাঞ্জেলোর ডেভিড আর মন্দ লোকের হাতে পড়লে ধর্ষক, এমনকি শিশুধর্ষক গোলিয়াথ

broken-toy

বয়ঃসন্ধিতে বা প্রথম যৌবনে খবরের কাগজের যেসব ছবি আমরা লুকিয়ে লুকিয়ে দেখতাম তার চেয়েও রগরগে ছবি এবং লেখা এখনকার যে কোন জিনিসের বিজ্ঞাপনে।
যেসব ছবি স্কুল, কলেজ পালিয়ে কোন এলাকার এককোণে পড়ে থাকা ছারপোকাময়, দুর্গন্ধ সিনেমা হলে চলত সেসব এখন শীতাতপনিয়ন্ত্রিত হলে পপকর্ন খেতে খেতে সামাজিক সম্মান না খুইয়েই দেখা যায়। সাধারণ বলিউডি ছবির আইটেম সং, যা বাবা, মা, কাকা, পিসী, মাসি, মামা সবার সঙ্গে বসেই দেখা যায় আজকাল সেগুলোতে কিভাবে নারীকে শুধু ভোগ্যবস্তু হিসাবে দেখানো হয় তা নিয়েও অনেক লেখালিখি হয়েছে।
বেশ মনে আছে, আমরা যখন স্কুলের শেষ ধাপে তখন কোন সহপাঠী ব্লু ফিল্ম দেখেছে বললে বাকিরা এমন করে তার দিকে তাকাত যেন সে মঙ্গলগ্রহ থেকে এইমাত্র পৃথিবীতে ল্যান্ড করল। এই রেলাটা নেওয়ার অভিলাষে কেউ কেউ না দেখে থাকলেও বলত দেখেছে। অথচ শূন্য দশকের শুরু থেকেই দেখছি ক্লাস ফাইভ-সিক্স থেকেই ছেলেমেয়েদের হাতে মোবাইল, অতএব ইন্টারনেট, অতএব দেদার পর্ন।
বিদেশী পর্নোছবির এক নায়িকা আমাদের দেশে এসে রিয়েলিটি শো আর সফট পর্নে অভিনয় করে প্রায় ফেমিনিস্ট আইকন হয়ে গেলেন। অথচ নিজের দেশে, যেখানে পর্ন নিয়ে ঢাকঢাক গুড়গুড় নেই, পর্নোছবির অভিনেত্রীকে কেউ খারাপ মেয়ে বলেও ভাবে না, সেখানেও ওঁকে কেউ বিদ্রোহী, বিপ্লবী ভাবত এরকমটা শুনিনি।
সেদিন দেখলাম ‘দুপুর ঠাকুরপো’ বলে একটা বাংলা ওয়েব সিরিজ হয়েছে যার ট্রেলার অনেকেই ফেসবুকে শেয়ার করছে। বিষয়বস্তু কী? না নির্জন বউদির সাথে পাড়াতুতো ঠাকুরপোদের পরকীয়া। ট্রেলারটা দেখলেই বোঝা যায় পরকীয়া মানে এখানে কোন সূক্ষ্ম সম্পর্ক, নষ্টনীড়সুলভ প্রেম, অভিমান ইত্যাদি বোঝানো হচ্ছে না। যা বোঝানো হচ্ছে তা হল হ্যাংলা যৌনতা।
যৌন ক্ষিদে বাড়িয়ে তোলার এতরকম উপায় এবং যৌনবিকৃতির এহেন মূলধারায় অন্তর্ভুক্তির পাশাপাশি আমাদের দেশে কামনা সুস্থভাবে চরিতার্থ করার সোজা পথ এখনো সোজা নয়। আর সবাইকে নাহয় বাদই দিলাম, এখনো যে কত বিবাহিত দম্পতিকে বাড়িতে লোক এলে আলাদা শুতে হয় (নাহলে “সবাই কী ভাববে”), সপরিবারে সিনেমা দেখতে গেলে পাশাপাশি বসা চলে না (পাশাপাশি বসায় যে যৌনতার য ও নেই সেটা অনেককেই বোঝানো বেশ শক্ত) তার তালিকা তৈরি করলে ভোটার তালিকার চেয়ে ছোট হবে না।
যৌনতা হল ছেনি, হাতুড়ির মত। ভাস্করের হাতে পড়লে মিকেলাঞ্জেলোর ডেভিড আর মন্দ লোকের হাতে পড়লে ধর্ষক, এমনকি শিশুধর্ষক গোলিয়াথ। এই মহামূল্যবান জিনিসটাকে বিক্রয়যোগ্য, শস্তা পণ্য করে দেওয়ার বিরুদ্ধে প্রতিবাদকে প্রায়শই পিতৃতান্ত্রিকতা, সাংস্কৃতিক মৌলবাদ — এসব বলে ধমকে চুপ করিয়ে দেওয়া হয়। এর ফলে এদেশের পুরুষতান্ত্রিক সমাজে বিকৃত পুরুষদেরই হয়েছে সুবিধা। রাস্তাঘাটে কোন মহিলাকে দেখে কামনায় হিলহিল করা দিব্য ফ্যাশনেবল হয়ে গেছে। আগে বদ লোকেরা কোন মহিলার দিকে তাকাতে গেলেও ভাবত কেউ দেখতে পেলে কী ভাববে। এখন আর ও নিয়ে লজ্জা পাওয়ার বিশেষ কিছু থাকছে না।
অর্থাৎ বিকৃতিকে উস্কে দেওয়ার মত উপাদান চতুর্দিকে ঢালাও বিক্রি হচ্ছে। বিক্রির পক্ষে নানান যুক্তিও তৈরি হয়ে গেছে। মুশকিল হল সেসব কিনে নেওয়ার পরে কার বিকৃতি কতদূর যাবে তার সীমা বেঁধে দেওয়ার কোন উপায় নেই। মেয়েদের তো ছাড়ছেই না, যে শিশু মেয়ে হয়ে ওঠেনি আদৌ, তাকেও ছাড়ছে না।
এই ঘটনাক্রম আমরা নিজেদের চারপাশে দেখি, এবং অস্বীকার করি। এই যে কারণ নির্দেশ করার চেষ্টা করছি, এর জন্যে নির্ঘাৎ কয়েকজন তেড়ে এসে বলবেন অজুহাত দিচ্ছি। ধর্ষকদের ওকালতি করছি বললেও অবাক হব না। তাঁদেরকে আমার একটা কথাই বলার আছে। জঞ্জাল, আবর্জনা, জমা জল — এগুলো কি ডেঙ্গুর কারণ না অজুহাত? যদি আপনি মশার জন্মের রাস্তা বন্ধ করতে আগ্রহী না হন তাহলে মশাঘটিত রোগগুলো বারবার হবেই। যে বলবে ওগুলোর জন্যই ডেঙ্গু হচ্ছে তাকে যদি মশার হয়ে ওকালতি করছে বলেন তাহলে ক্ষতি আপনারই। মশা কেন কামড়াল তা নিয়ে রাগারাগি করে লাভ হবে কী?
হ্যাঁ, শিক্ষকের হাতে ছাত্রী ধর্ষিতা হলে আমাদের বেশি অসহায় লাগবে নিশ্চয়ই কিন্তু শিক্ষকরা তো আকাশ থেকে পড়েন না। আমাদের বাবা-মায়েরা যে শিক্ষকদের চোখ বুজে ভরসা করতেন তাঁরা তাঁদের সময়ের উৎপাদন, এখনকার শিক্ষকরা বর্তমান সময়ের। তাছাড়া আর সবকিছুর মত শিক্ষাও যে একটা পণ্য, শিক্ষকরা বিক্রেতা আর আমরা ক্রেতা — সে তো কবেই মেনে নিয়েছেন। তা দোকানে গিয়ে কি আপনি আশা করেন দোকানদার ভালবেসে ভাল জিনিস দেবে আপনাকে? করেন না। তাহলে শিক্ষককে বা স্কুলকেই বা একজন দোকানদারের চেয়ে বেশি বিশ্বাস করতে যাবেন কেন? পাকা ক্রেতার মত ছেলেমেয়েকে ভর্তি করার আগেই দেখে নিন যে স্কুলে ভর্তি করছেন সেখানে ছেলেমেয়ে কতটা নিরাপদ, কী কী ব্যবস্থা আছে।
আরেকটা কথাও না বলে পারছি না। জি ডি বিড়লা স্কুলের মেয়েটার ধর্ষকদের দেখে রাগে আমার গা যতটা ঘিনঘিন করছে ততটাই ঘেন্না করে যখন দেখি পাড়ার পুজোয় ধুনুচি নৃত্য প্রতিযোগিতার জায়গা নিয়েছে বুগিউগি আর সেখানে চার, পাঁচ, ছয় বছরের মেয়েরা হিন্দি আইটেম সং এ ছবির আইটেম গার্লের মতই সাজপোশাক পরে, তেমনই ভুরু নাচিয়ে, কোমর দুলিয়ে নাচছে, পুরস্কার পাচ্ছে। হাততালি দিচ্ছে তার বাবা, পাড়াতুতো কাকু, জেঠুরা। টিভির লিটল চ্যাম্পমার্কা অনুষ্ঠানে নিজের মেয়েকে প্রতিযোগী করে পাঠিয়ে এইসব নাচ নাচিয়ে গর্বিত হন যে বাবা-মায়েরা তাঁদের দেখেও আমার বমি করতে ইচ্ছা করে। জি ডি বিড়লার ঐ দুই শিক্ষককে খুব বর্বর কোন শাস্তি দেওয়া হোক, সঙ্গে এইসব বাবা-মায়েদেরও।

গুরুর ধর্ষণ মাপ

ঊনবিংশ শতাব্দীতে লেখা হুতোম প্যাঁচার নকশায় দেখছি খোদ বাংলায় হিন্দু বাড়িতে মেয়ের বিয়ে হলে পরিবারের গুরু ফুলশয্যায় বসে থাকতেন। তিনি “প্রসাদ করে দিলে” তবে স্বামী-স্ত্রী মিলিত হতে পারত। হুতোম সকৌতুকে লিখেছেন কিভাবে এক পাশ্চাত্যশিক্ষায় শিক্ষিত স্বামী খাটের তলায় লুকিয়ে থেকে যথাসময় বেরিয়ে এসে এক গুরুর মাথা ফাটিয়ে দেন, অতঃপর প্রাণভয়ে গুরুরা এই প্রসাদ করার অভ্যেস ত্যাগ করেন

মনে রাখবেন, ২০১২ সালের ১৬ই ডিসেম্বর যখন এক ধর্ষিতা আর তার সঙ্গী দিল্লীর ঠান্ডায় উলঙ্গ, রক্তাক্ত, মৃতপ্রায় অবস্থায় রাস্তায় পড়েছিল তখন তাদের সাহায্য করতে একটি মানুষও এগিয়ে আসেনি অথচ তা নিয়ে মোমবাতি মিছিল করতে লোকের অভাব হয়নি। আর ২০১৭ সালের ২৫শে আগস্ট একজন ধর্ষকের শাস্তির প্রতিবাদে লক্ষ লক্ষ মানুষ রাস্তায়। নিরস্ত্র, নিরীহ অবস্থায় নয়, রীতিমত খুনে মেজাজে। টেলিভিশনের পর্দায় দেখা গেছে বহু মহিলা এই ধর্ষকটির জন্যে কান্নাকাটি করছেন। মগজধোলাই কোন পর্যায়ে গেলে এটা সম্ভব একবার ভেবে দেখুন। মানলাম যে এই ভিড় সংগঠিত করা হয়েছে গোলমাল পাকানোর জন্য। কিন্তু একজন ধর্ষককে সমর্থন করার জন্যে এত লোককে সংগঠিত করা যে সম্ভব হচ্ছে (যে মূল্যেই হোক) তা মগজধোলাই ছাড়া একেবারেই অসম্ভব। সেই মগজধোলাইটা কী এবং কত প্রাচীন সেটা নিয়ে আলোচনা হওয়া উচিৎ।
ঘটনা হল যে প্রাচীন ভারতীয় সভ্যতার গর্ব আমরা করে থাকি, এটা তার এক বিরাট উত্তরাধিকার। দেবদাসী এদেশের অতি প্রাচীন প্রথা তবে সেটা মন্দিরে সীমাবদ্ধ। কিন্তু শিষ্যদের বাড়ির মেয়েরা গুরুর ভোগ্য — এ বিশ্বাসটার ইতিহাসও কিন্তু আমাদের দেশে বেশ লম্বা। ঊনবিংশ শতাব্দীতে লেখা হুতোম প্যাঁচার নকশায় দেখছি খোদ বাংলায় হিন্দু বাড়িতে মেয়ের বিয়ে হলে পরিবারের গুরু ফুলশয্যায় বসে থাকতেন। তিনি “প্রসাদ করে দিলে” তবে স্বামী-স্ত্রী মিলিত হতে পারত। হুতোম সকৌতুকে লিখেছেন কিভাবে এক পাশ্চাত্যশিক্ষায় শিক্ষিত স্বামী খাটের তলায় লুকিয়ে থেকে যথাসময় বেরিয়ে এসে এক গুরুর মাথা ফাটিয়ে দেন, অতঃপর প্রাণভয়ে গুরুরা এই প্রসাদ করার অভ্যেস ত্যাগ করেন। অতএব ঐ যে দেড় লক্ষ লোক মনে করেছে তাদের গুরু নির্দোষ, ঐ যে সাক্ষী মহারাজ বলে শাসকদলের এক গেরুয়া মাফিয়া ধর্ষণ প্রমাণিত হওয়ার পরেও গুরমিত নামক বরাহনন্দনটিকে পুণ্যাত্মা বলেছে, এরা কিন্তু সত্যিই মনে করে গুরুর অধিকার আছে শিষ্যাদের একটুআধটু ভোগটোগ করার। আমাদের এই ধর্মশাসিত দেশে ব্যাপারটা এখানেই সীমাবদ্ধ নয়। গুরুবাদী দেশ তো। “মহাজনো যেন গতঃ স পন্থা।” ফলে এদেশের অধিকাংশ পুরুষই মনে করে ধর্ষণ তার জন্মগত অধিকার। যাদের পেটে বিদ্যে আছে, ঘটে বুদ্ধি আছে — তারা এই মনোভাব গোপন করতে জানে, বাকিরা জানে না। ঠিক এই কারণেই আইন marital rape বলে কোনকিছুর অস্তিত্ব স্বীকার করে না, ধর্ষণের আইন অনুযায়ী অপ্রাপ্তবয়স্ক নারীর সাথে যৌন সংসর্গ ধর্ষণ বলে গণ্য হলেও অপকম্মটি মেয়েটির স্বামী করলে ধর্ষণ বলে ধরে না। এই আমাদের প্রাচীন ভারতীয় ঐতিহ্য, যা সমস্ত নারীকেই মা বলে ভাবতে শেখায় আর পুরুষকে শেখায় যে কোন নারীকেই সে ইচ্ছে হলেই মা বানিয়ে দিতে পারে, দোষ নেই। ভাগ্যিস সায়েবরা এসে আমাদের পাশ্চাত্যের আদবকায়দা শিখিয়ে নষ্ট করে দিয়েছিল, নইলে রামমোহন, বিদ্যাসাগরের লাশ পড়ে যেত তবু এদেশের মেয়েরা সতী হয়েই চলত, বালবিধবারা পাড়া প্রতিবেশীর সন্তানের মা হয়েই চলত। দেশের শিল্পোন্নত রাজ্যগুলো আবার এই পিছিয়ে পড়া বাংলার মত রামমোহন, বিদ্যাসাগর পায়নি কিনা তাই উনিশশো আশির দশকেও রূপ কানোয়ারকে সতী বানিয়েছে। শাহ বানোর নামটা মনে রাখা সোজা, এই মহিলার নামটা মনে পড়ে না সহজে।
নেহরু, আম্বেদকরদেরও বলিহারি। যে দেশ যা নয় তাকে তাই করে তোলার চেষ্টা! কতবড় সাহস! দেশের লোক গুরু ছাড়া বাঁচতে পারে না আর ওনারা বানাতে গেলেন সেকুলার দেশ। যত্তসব বিদেশী শিক্ষায় শিক্ষিত মোগল আর সোনার চাঁদের দল। এতদিনে দেশটা ধর্মের পথে ফিরছে, গুরুদের হাতে ফিরছে