বাবুসোনা সংস্কৃতি

আশির দশকে বাবা-মায়ের সাথে এক আত্মীয়ের বাড়িতে যেতাম। আমি তখনো প্রাথমিকে, সে কলকাতার এক বিখ্যাত স্কুলের উঁচু ক্লাসে প্রথম সারির ছাত্র। তার ঝুড়ি ঝুড়ি নম্বরের গর্বে তার বাবা-মা তো বটেই, প্রতিফলিত গৌরবে আমাদের অন্য আত্মীয়স্বজনদেরও মাটিতে পা পড়ে না। তাদের বাড়ি গেলে কিন্তু বোঝা যেত তার বাবা-মা গৌরবে বহুবচন চান না মোটেই। যত নিকটাত্মীয়ই আসুক, সে পড়ার টেবিল ছেড়ে নড়ত না। তেরো চোদ্দ বছরের ছেলেটিকে আমার মনে হত পঞ্চাশোর্ধের মত রাশভারী। এমন নয় যে এই রুটিন কেবল পরীক্ষার আশেপাশে। বারো মাস সে এভাবেই চলত। স্বভাবতই আমার মত শৈশব পার না হওয়া আত্মীয়দের কাছে বড়রা ঐ ছেলেটিকে অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত হিসাবে হাজির করতেন। বড়রা বারবার শোনাতেন “ওর মত হওয়ার চেষ্টা করো। দেখেছ কেমন লেখাপড়ায় মন? বাড়িতে যে-ই আসুক, ঝড় উঠুক, বন্যা হয়ে যাক, ও কিন্তু পড়া ছেড়ে ওঠে না।”

বড় পরীক্ষাগুলোতে ভাল নম্বর এবং শিক্ষান্তে মোটা মাইনের চাকরি পাওয়া যদি মানুষ হওয়ার মাপকাঠি হয় তাহলে বলা দরকার যে ছেলেটি মানুষ হয়েছে। আমি নিশ্চিত এই পথে হেঁটে এরকম মানুষ হওয়া মানুষ আমরা সকলেই কাঁড়ি কাঁড়ি দেখেছি গত তিরিশ চল্লিশ বছরে, এখনো দেখছি। প্রশ্ন হল সফল মানুষ আর ভাল মানুষ কি একই? ভাল মানুষ মানেই বা কী? যে মন দিয়ে রোজগার করে সংসার চালায় তার বাকি সমাজের প্রতি কোন দায়বদ্ধতা না থাকলে, চূড়ান্ত দায়িত্বজ্ঞানহীন হলেও কি তাকে ভাল মানুষ বলা যায়?

এই প্রশ্নগুলো কদিন আগে করলেও হাঁ হাঁ করে উঠতেন অনেক ভদ্রজন, বাকিরা পাত্তা দিতেন না। কিন্তু রোগ বড় বালাই, বিশেষত অতিমারী। গত দুদিন ধরে যেভাবে সকলে একটি অক্সফোর্ডের ছাত্র এবং তার বাবা-মাকে দায়িত্বজ্ঞানহীনতায় অভিযুক্ত করছেন তা দেখে অপ্রিয় প্রশ্নগুলো তোলার ঝুঁকিটা নিয়েই ফেললাম।

নিজের কাছে সৎ থাকতে হলে মানতেই হবে এই প্রশ্নগুলো গত সাড়ে তিন দশক আমরা একেবারেই নিজেদের করিনি, অন্যদেরও করিনি। এগুলো অবান্তর হয়ে গেছে। ছোট থেকেই শিখে গেছি যে আমি মানুষ হয়েছি কিনা তার প্রমাণ হল আমি কোন পেশায় আছি এবং কত রোজগার করি। অতএব আমার ক্লাসের যে ফার্স্ট বয় পরে তত ভাল রেজাল্ট করতে না পেরে এখন সামান্য ব্যাঙ্ককর্মী, তার চেয়ে বেশি মানুষ হয়েছে থার্ড বয়। কারণ সে ইঞ্জিনিয়ার হয়ে এখন ক্যালিফোর্নিয়ায় থাকে। এমন নয় যে কেবল অন্যরাই এভাবে ভাবে। ফার্স্ট বয় নিজেও ভাবে “আমার দ্বারা কিস্যু হল না। ও শালা স্কুলে কোনদিন আমাকে ছুঁতে পারত না, কপাল জোরে কোথায় উঠে গেল!”

আমাদের প্রজন্ম এভাবেই ভাবতে শিখেছে এবং আমরা বাবা-মা হয়েও আমাদের নার্সারি স্কুলে যেতে শুরু করা ছেলেমেয়েদের এভাবেই ভাবতে শেখাচ্ছি। লক্ষ্য করুন, এই চিন্তার সমস্তটা জুড়েই আমি, কোথাও আমরা নেই। বন্ধুর সাফল্যে আনন্দ পাওয়া নেই, বন্ধুর ব্যর্থতায় কষ্ট পাওয়া নেই। দু তিন প্রজন্ম ধরে এ হেন স্বার্থপরতার কৃষিকাজ চালালে যেমন ফসল ফলে আমাদের বিলেত ফেরত বাবুসোনা ভাইটি তাই — তার বেশি কিচ্ছু নয়। আর তার বাবা-মা যে অপরাধ করেছেন তা শুরু হয়েছে তার ছোটবেলায়। সেই একই অপরাধ আমাদের অনেকের বাবা-মাই করেছেন। এমন করে গায়ে লাগেনি বলে সমাজ সেটাকে অপরাধ বলে চিহ্নিতই করেনি এতদিন। ভদ্রলোকের ছেলেমেয়ে কেবল শিখেছে পরীক্ষায় ভাল রেজাল্ট করতে পারলেই তার কাজ শেষ। দুনিয়ার কারোর প্রতি তার কোন কর্তব্য নেই। ঐ যে আমার আত্মীয় সম্পর্কে বড়রা বলতেন “বাড়িতে যে-ই আসুক, ঝড় উঠুক, বন্যা হয়ে যাক” ইত্যাদি। অর্থাৎ ঝড়ে তোমার প্রতিবেশীর ঘরের চাল উড়ে গিয়ে সে নিরাশ্রয় হয়ে যাক, তুমি বাবা-মায়ের বানিয়ে দেওয়া পড়ার ঘরে মোটা মাইনের চাকুরে হওয়ার প্রস্তুতি চালিয়ে যাও। বন্যায় তোমার আত্মীয়ের ঘর ভেসে যাক, তোমার দু ফোঁটা চোখের জল ফেলারও দরকার নেই, তুমি কেশব নাগের অঙ্কগুলো শেষ করো। ভাগ্যিস কেশবচন্দ্র নাগের অঙ্ক বইই কিনে দেওয়া হত আমাদের, তাঁর কষ্ট করে লেখাপড়া করার ইতিহাস পড়ানো হত না। অবশ্য হলেই বা কী হত? আমরা মুখস্থ করতাম আর পরীক্ষার খাতায় উগরে দিয়ে ভুলে যেতাম। যেমনটা ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর সম্পর্কে করেছি।

তা এইভাবে যে বাবুসোনাদের তৈরি করা হচ্ছে, কী করে আমরা আশা করছি যে তারা নিজের সুখ স্বাচ্ছন্দ্য আনন্দ ফুর্তির বাইরে কিছু ভাববে? গায়ে যখন জ্বর নেই, গলায় ব্যথা নেই, কাশি হচ্ছে না, তখন বাবুসোনা কেন মায়ের অফিসে কলার তুলে ঘুরতে যাবে না? কেন গিয়ে লাইন দেবে হাসপাতালে? তাও আবার সরকারী হাসপাতালে? ওসব হাসপাতাল তো তার বাড়ির কাজের মাসির জন্যে। আর মা-ই বা কেন ছেলেকে আদর করে অফিসে, মলে, ক্লাবে ঘোরাবেন না? কজনের ছেলে অক্সফোর্ডে পড়তে যায়? চুলোয় যাক জনস্বাস্থ্য, চুলোয় যাক সাবধানতা।

খুব খারাপ লাগছে তো কথাগুলো? বাড়াবাড়ি মনে হচ্ছে তো? তাহলে বলি। আমি যে স্কুলের ছাত্র, সেই স্কুলের আন্তঃক্লাস ফুটবল প্রতিযোগিতা হয় প্রয়াত মাস্টারমশাই পাঁচুগোপালবাবুর নামে। তাঁকে আমরা পাইনি। আমাদের ইংরিজির মাস্টারমশাই সোমনাথবাবু একবার হাসতে হাসতে বলেছিলেন “পাঁচুবাবু যখন মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করছিলেন, তখন হাসপাতালে রাত জেগেছিল আমাদের খারাপ ছাত্ররা, ভাল ছাত্ররা নয়।”

আমাদের সময় থেকেই এমন হয়। কারণ বাবা-মা শেখান পড়াশোনা করা এত বিশাল একটা কাজ যে ওটা করে আর কিচ্ছু করা যায় না। কারো জন্যে হাসপাতালে রাত জাগা যায় না, বাড়িতে কেউ এলে গল্পগুজব করা যায় না, এমনকি পাঠ্যের বাইরে ভাল বই টই পড়াও যায় না। যখন ক্লাস ইলেভেনে পড়ি, বাংলা ক্লাসে আমাদের মাস্টারমশাই সুশান্ত বসু এক ভাল ছাত্র কোন এক বিখ্যাত সাহিত্যিকের নাম শোনেনি শুনে হতাশ হয়ে বলে ফেলেছিলেন “এত বয়স হয়ে গেল ওঁর কোন লেখা পড়োনি? জীবনটা কাটাবে কী করে!” কী কুক্ষণেই বলেছিলেন! হোস্টেলে ফিরে অন্য এক ভাল ছাত্র নাতিদীর্ঘ বক্তৃতা দিয়েছিল, যার মূল উপজীব্য “সাহিত্য-ফাহিত্য পড়ে নষ্ট করার মত সময় নেই। এখন সামনে হায়ার সেকেন্ডারি, তারপর জয়েন্ট। এস্ট্যাবলিশড হয়ে নিই, তারপর বই ফই পড়া যাবে।”

আমার সেই সহপাঠীরও দোষ নেই। বাবুসোনা সংস্কৃতির ঐ আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ তত্ত্ব। ডাক্তারি আর ইঞ্জিনিয়ারিং ছাড়া দুনিয়ায় আর কোন কিছু পড়ার কোন দরকার নেই, যারা পড়ে তারা ফালতু। আমার এক মেধাবী বন্ধু উচ্চমাধ্যমিকে বিজ্ঞান পড়ে সাড়া জাগানো ফল করেছিল। জয়েন্ট এন্ট্রান্সের ফল বেরোবার পর তার বাড়ি গিয়ে আমার মনে হয়েছিল কেউ মারা গেছেন। কারণ ইঞ্জিনিয়ারিঙে তার হাজার তিনেক র‍্যাঙ্ক হয়েছে, বাবা বলেছেন “ওর লাইফ শেষ”। এই কারণে পিটার উইর পরিচালিত ‘ডেড পোয়েটস সোসাইটি’ ছবিটা দেখলেই মনে হয় এটা এই বাংলারই গল্প।

অবশ্য আমাদের বাবুসোনা সংস্কৃতি এমন জোরদার যে জন কিটিং (যে চরিত্রে রবিন উইলিয়ামস অভিনয় করেছিলেন) এর তুলনায় অনেক নিরামিষ কথাবার্তা বলেই আমাদের সুশান্তবাবু ছাত্রদের বিরাগভাজন হয়েছিলেন।
অথচ বাঙালি ছেলেরা এমন বাবুসোনা চিরকাল ছিল না কিন্তু। হলে ক্ষুদিরামকে পাওয়া যেত না, বিনয় বাদল দীনেশ হত না, নকশালবাড়ি আন্দোলন বলেও কিছু ঘটত না। সেকথা থাক, বাবুসোনাদের বিদ্রোহী বিপ্লবী হওয়ার দরকার নেই (ক্ষুদিরাম তো কবেই আমাদের ঠাট্টার পাত্র হয়ে গেছেন), একটু মানুষের মত মানুষ হলেই যথেষ্ট হয়। কিন্তু কী করে হবে? মানুষ যেমন সমাজ তৈরি করে, সমাজও তো মানুষ তৈরি করে। আমাদের সমাজ তো ক্রমশ উন্নততর বাবুসোনার কারখানা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। আজকাল দেখি পাড়ার বাচ্চারা মাঠে খেলার সময় মায়েরা বসে থাকেন পাশে। পড়ে গেলে দৌড়ে আসেন, খেলতে খেলতে ছোটদের মধ্যে ঝগড়া লাগলে প্রায়শই তা মায়েদের ঝগড়ায় পরিণত হয়। অর্থাৎ শিশু ছোট থেকেই শিখছে সে কখনো ভুল করে না, সে যা চায় সেটাই তার অধিকার।

বছর দুয়েক আগে আমাদের এক প্রতিবেশী মারা গেলেন। আমাদের পাড়া থেকে শ্মশান অনেক দূরে হওয়ায় কেউ মারা গেলে ম্যাটাডোরে করে নিয়ে যাওয়া হয় সাধারণত। শ্মশানযাত্রীতে ভরে যায় সে ম্যাটাডোর, অল্পবয়সীরা থাকে বেশি সংখ্যায় — এমনটাই কৈশোর থেকে দেখে আসছি। সেবার দেখলাম ম্যাটাডোরের উপর বেশ ছড়িয়ে ছিটিয়ে দাঁড়ানো যাচ্ছে। আরো যা বিস্ময়কর, একটি বছর কুড়ির ছেলেকে বাদ দিলে শ্মশানযাত্রীদের মধ্যে পঁয়ত্রিশোর্ধ আমিই সর্বকনিষ্ঠ। বাবুসোনারা বোধহয় টিউশনে ব্যস্ত ছিল। আমাদের মফস্বলেই এই অবস্থা, কলকাতার খবর জানি না।

এবার প্রবল আপত্তি উঠবে। যদি শ্মশানে, হাসপাতালেই ঘুরে বেড়ায় পড়ুয়ারা, তাহলে লেখাপড়া করবে কখন? এমন আপত্তি আমাদের বাবা-মায়েরা আর আমরাই করে থাকি। তার আগের লোকেরা করতেন না। বলা হয় আগে নাকি “কম্পিটিশনের যুগ” ছিল না, তাই অন্য সবে মন দেওয়া সম্ভব ছিল। অথচ আমরা এ ধরাকে ধন্য করে দেওয়ার অনেক আগেই দেশে দুর্ভিক্ষ হয়েছে, দেশ ভাগ হয়েছে। ভদ্রসন্তানদের পর্যন্ত দু মুঠো ভাতের জন্য করতে হয়নি এমন কাজ নেই। তার চেয়ে বেশি কম্পিটিশনে আমাদের পড়তে হয়েছে কি?

লেখাটা যদি এতদূর অব্দি পড়ে ফেলে থাকেন তাহলে হয়ত খেয়াল করেছেন আমি কেবল ছেলেদের কথাই বলে যাচ্ছি, ভদ্রলোকের মেয়েদের কথা বলছি না। তার মানে এই নয় যে ভদ্রজন মেয়েদের দারুণ সামাজিক জীব তৈরি করছেন। এ যুগের আলালদের ঘরে কেবল দুলাল তৈরি হয় না, বিলক্ষণ দুলালীও হয়। সেই সোনামণিরা বাবুসোনাদের চেয়ে যে মোটেই আলাদা নয় তাও দেখা যাচ্ছে কয়েকজন বিলেত ফেরতের খবরে। বিলেত না যাওয়া মেমদের কোরোনার কারণে স্কুল কলেজ না থাকার সুযোগে দলবদ্ধ ফুর্তি দেখেও টের পাওয়া যাচ্ছে। তবু একে বাবুসোনা সংস্কৃতিই বলছি কারণ এই ধারাটি বাঙালি তৈরি করেছিল পুত্রসন্তানদের কথা ভেবেই। তার প্রমাণ এক দেড় দশক আগেও বিজ্ঞান শাখায় বাঙালি মেয়ের অভাব।

বাবা-মায়েরা বলতেন ডাক্তার বা ইঞ্জিনিয়ার না হলে জীবন বৃথা। তারপর বেশ নিঃসঙ্কোচে বলতেন “মেয়ে হলে অত চিন্তা করতাম না। কিছু না হলে বিয়ে দিয়ে দেব, মিটে যাবে।” তাই সমাজবিচ্ছিন্ন মানুষ বানানোর তাগিদ মেয়েদের বেলায় কম দেখা যেত। ফলত আমার বন্ধুদের মধ্যে যারা ইঞ্জিনিয়ারিঙের ছাত্র তারা দুঃখ করত “তোদের আর্টসের ক্লাসগুলোতে কত মেয়ে থাকে, আমরা তিরিশটা ছেলে আর দুটো মেয়ে। প্রেম করতেও কম্পিটিশন।” কথাটা মজা করে বলা হলেও একটা বড় সত্য বেরিয়ে আসে, তা হল ছেলেরা যা হলে মানুষ হয়েছে বলে বাবা-মায়েরা মনে করতেন মেয়েদের তা না হলেও চলত। মেয়ে মাস্টারি করলেও মানুষ, ছেলে মাস্টার হলে “ফেলিওর”।

বাবুসোনা সংস্কৃতি কী দিয়েছে বাঙালিকে? সমাজ সংসার ভুলে লেখাপড়া করে কজন বাঙালি প্রযুক্তিতে আলাদা করে বলার মত অবদান রেখেছে গত তিরিশ বছরে? গত চল্লিশ বছরে কজন বাঙালি ডাক্তারকে সারা ভারত এক ডাকে চিনেছে? নাহয় অত বড় না-ই হল, স্থানীয় মানুষ নাম শুনলেই শ্রদ্ধায় মাথা নত করে এমন ডাক্তারই বা কজন হয়েছে সারা পশ্চিমবঙ্গে? উত্তরে লবডঙ্কার বেশি কিছু পাওয়া শক্ত। সর্বভারতীয় ক্ষেত্রে সাড়া জাগানো কটা কবিতা লেখা হয়েছে বাংলায় বা কটা ফিল্ম তৈরি হয়েছে এই সময়ে সে প্রশ্ন করার কোন মানেই হয় না কারণ ওসব লাইন যে মেধাবীদের জন্যে নয় তা তো বাবুসোনা সংস্কৃতি বলেই দিয়েছে। একই সঙ্গে ভুলিয়ে দিয়েছে যে সংস্কৃতি মানে কেবল নাচ, গান, ছবি আঁকা, নাটক করা, সাহিত্য রচনা নয়। বিজ্ঞানচর্চা, রাজনীতি — এসবও সংস্কৃতির অঙ্গ।

আসলে বিজ্ঞানচর্চা হবে কী করে? বাবুসোনা সংস্কৃতিতে বিজ্ঞান পড়ার উদ্দেশ্য তো বিজ্ঞান শেখা নয়, মোটা মাইনের চাকরি পাওয়া। আমার আরেক মাস্টারমশাই শাশ্বত ভট্টাচার্য যেমন একবার ক্লাসে বলেছিলেন “তোমরা বিজ্ঞান পড়ো এই কারণে নয় যে তোমরা বিজ্ঞান শিখতে চাও বা তোমরা বিজ্ঞানমনস্ক। তোমরা বিজ্ঞান পড়ো কারণ ওটা পড়লে বেশি ভাল চাকরি পাওয়া যায় বলে প্রচার আছে। যদি প্রচার থাকত কুসংস্কারে অনার্স পড়লে বেশি ভাল চাকরি পাওয়া যায়, তাহলে তোমরা কুসংস্কারেই অনার্স পড়তে।” কথাটা যে নেহাত অন্যায় বলেননি তা সেদিনের যে বাবুসোনারা সফ্টওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার হয়ে এখন সোশাল মিডিয়ায় দক্ষিণপন্থী ভুয়ো খবরের সপক্ষে গলা ফাটায় তাদের দেখলেই পরিষ্কার হয়।
আর রাজনীতি? ওরে বাবা! লেখাপড়া করে হাসপাতালে অসুস্থ লোককে দেখতেই যাওয়া যায় না, আবার রাজনীতি করা যাবে কী করে? করা যে যায় তার কিন্তু অনেক প্রমাণ আছে।

উচ্চমাধ্যমিকে প্রথম হওয়া দীপঙ্কর ভট্টাচার্য (বাবুসোনাদের বাবা-মায়েদের প্রিয় নরেন্দ্রপুর রামকৃষ্ণ মিশনের ছাত্র) সি পি আই এম এল লিবারেশনের সর্বক্ষণের কর্মী হয়েছেন, সর্বভারতীয় সম্পাদক হয়েছেন। সি পি আই এমের সর্বভারতীয় সম্পাদক সীতারাম ইয়েচুরিও সি বি এস ই র সর্বভারতীয় পরীক্ষায় প্রথম হয়েছিলেন। অবশ্য বাবুসোনাদের বাবা-মায়ের বিচারে দুজনেই “ফেলিওর”। টাকা, গাড়ি, প্রাসাদোপম বাড়ি — কিছুই করে উঠতে পারেননি। তবে সে বিচারে মানুষ হওয়া লোকেদের মধ্যেও কিন্তু ছাত্রনেতা পাওয়া যায়। সুপ্রিম কোর্টে আইন ব্যবসা করে প্রভুত সম্পত্তির অধিকারী এবং পরবর্তীকালে দেশের অর্থমন্ত্রী হওয়া প্রয়াত অরুণ জেটলি ছাত্র রাজনীতি করতেন।

সুতরাং বাবুসোনা আর সোনামণিরা স্বার্থপর, দায়িত্বজ্ঞানহীন বলে ওদের উপর রাগ করবেন না। আমাদের ছানা পোনাগুলোও তো অমনিই হবে। দিল্লীতে নাকি লোকে আইন কানুনের তোয়াক্কা না করে যা ইচ্ছা করার যুক্তি হিসাবে বলে “জানতা হ্যায় মেরা বাপ কৌন হ্যায়?” আমরা বাঙালিরা তো প্রগতিশীল, তাই হয়ত আমাদের ছেলেটি কোরোনাকে “জানিস আমার মা কে” বলে নিশ্চিন্ত হয়েছিল।

অনধিকার চর্চা

২০১৭ সালের নভেম্বরে আমার ডেঙ্গু হয়েছিল। সেবার চারিদিকে ডেঙ্গু, ম্যালেরিয়ার প্রকোপ। বেশকিছু মানুষ মারা যান। আমি নার্সিংহোমের যে ওয়ার্ডে ভর্তি হয়েছিলাম সেই ওয়ার্ডেই আরো দু তিনজন মশাবাহিত রোগে ভুগছিলেন। একজনকে আমার চোখের সামনেই আই সি ইউ তে নিয়ে যাওয়া হল, পরে শুনলাম মারা গেছেন। কিন্তু পরিষ্কার মনে আছে, আমার রোগ নির্ণয় করে ডাক্তারবাবু ডেঙ্গু লেখেননি, লিখেছিলেন অজানা জ্বর। ডাক্তার আমার এক ডাক্তার আত্মীয়ের বন্ধু হওয়াতে তাঁকে একান্তে জিজ্ঞেস করা গিয়েছিল মুখে ডেঙ্গু বললেও লিখলেন না কেন। উত্তর দেওয়ার সময়ে ডাক্তারবাবুর কাঁচুমাচু মুখটা আজও মনে পড়ে। ডেঙ্গু লিখলেই সরকারের পক্ষ থেকে নানা প্রশ্নের সম্মুখীন হওয়ার সম্ভাবনা। অগত্যা।
অর্থাৎ কী রোগ হয়েছে সেটা এম বি বি এস, এম ডি ইত্যাদি করা ডাক্তার বোঝেন না, বোঝে সরকার। একে একনায়কতন্ত্র না বললে কাকে বলে জানি না। যে কোন একনায়কতন্ত্র শেষ পর্যন্ত কী করে? নৈরাজ্যের জন্ম দেয়। সোজা বাংলায় “বজ্র আঁটুনি ফস্কা গেরো।” এখন সেই গেরোতেই আমরা পড়েছি। পশ্চিমবঙ্গের সরকারী স্বাস্থ্য ব্যবস্থা সেই বাম আমল থেকেই রুগ্ন, মৃতপ্রায়। এই আমলে যোগ হয়েছে নতুন উপসর্গ — অবহেলার অভিযোগে ডাক্তার পেটানো।
আসলে এমন সুন্দর ব্যবস্থা তৈরি করেছি আমরা যে আমাদেরই ভোটে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের কোন প্রশ্ন করা চলে না। করলেই কেউ বলেন “মাওবাদী”, কেউ বলেন “দেশদ্রোহী”। অথচ ডাক্তারদের যথেচ্ছ প্রশ্ন করা চলে, কিচ্ছু না জেনে বিজ্ঞের মত তাঁদের সিদ্ধান্তকে অপ্রয়োজনীয় বলে দেগে দেওয়া চলে। এ বিষয়ে হিন্দু, মুসলমান, ধনী, মধ্যবিত্ত, নিম্নবিত্ত কেউ কম যায় না। যার হাতে স্মার্টফোন আছে, সে-ই ডাক্তারবাবুর প্রেসক্রিপশন অনুযায়ী ওষুধ কেনার আগে একবার গুগল করে নিচ্ছে, তারপর নিজের বিবেচনা অনুসারে অমুক ওষুধটা খাচ্ছে আর তমুকটা খাচ্ছে না। মানে ডাক্তার পরিশ্রম করে জয়েন্ট এন্ট্রান্স পাশ করলেন, তারপর পাঁচ সাত বছর পড়াশোনা করে এম বি বি এস হলেন, আরো দু তিন বছর পড়ে এম ডি বা এম এস কিছু একটা হলেন, কেউ কেউ এরপর আরো পড়াশোনা করে, ট্যাঁকের পয়সা খরচা করে আরো নানা ডিগ্রি পেয়ে যে চিকিৎসা করলেন সেটা যে ফালতু তা বুঝতে একটা গুগল সার্চই যথেষ্ট। যার স্মার্টফোন নেই তার আছে পাড়ার ওষুধের দোকান অথবা সর্বজ্ঞ আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধব। কোন অসুখে অ্যান্টিবায়োটিক খেতেই হবে, কোন অন্তঃসত্ত্বার অস্ত্রোপচার করার কোন দরকার নেই এগুলো আজকাল হাসিম শেখ, রামা কৈবর্তও জানে। এবং তারা এও জানে যে তাদের হিসাব অনুযায়ী “চিকিৎসায় গাফিলতি” হলেই হাসপাতালে দলবল নিয়ে চড়াও হয়ে ভাংচুর, মারপিট করাই যায়। কেউ কিচ্ছু বলবে না। বরং আলাপ পরিচয় থাকলে স্থানীয় কাউন্সিলর, এম এল এ বা এম পি স্বয়ং দক্ষযজ্ঞে নেতৃত্ব দেবেন।
তাছাড়া যেহেতু “অ্যালোপ্যাথিতে আসলে শরীরের ক্ষতি করে”, তাই সঙ্গে হোমিওপ্যাথি, আয়ুর্বেদ, ইউনানি, বাবা রামদেব, আর্ট অফ লিভিং, গোমূত্র — এসব তো আছেই। খোদ কেন্দ্রীয় সরকার একখানা আয়ুশ মন্ত্রক খুলে বসেছেন। অতএব একথা জানতে কারো বাকি নেই যে লেখাপড়া করে এম বি বি এস ইত্যাদি হওয়া ডাক্তারগুলো নেহাত ফালতু। জুনিয়রগুলো তো তস্য ফালতু। অতএব দলবল নিয়ে যাও আর যত ইচ্ছে ঠ্যাঙাও।
অবশ্য এতে আশ্চর্য হওয়ার তেমন কিছু নেই। অমর্ত্য সেন যেখানে অর্থনীতি জানেন না সেখানে ডাক্তাররা চিকিৎসা করতে জানে এ কি বিশ্বাসযোগ্য? বললেই মানতে হবে নাকি? এরপর তো বলবে মানুষ বাঁদর থেকে এসেছে, পৃথিবী বাসযোগ্য হতে কয়েক লক্ষ বছর সময় লেগেছে।
সরকারও বুঝেছে জনগণ কী চায়। জনগণ অধিকার চায়। নানারকম সব অধিকার, যার মধ্যে স্বাস্থ্যের অধিকারটাও আছে। তারা চায় নিজের সাধ্যের মধ্যেই উপযুক্ত চিকিৎসা। কিন্তু বাপু সবাইকে সব অধিকার দিয়ে দিলে বেচার জন্যে থাকবেটা কী? চিকিৎসার মত এমন একটা জিনিস যদি সরকারী হাসপাতালে গেলেই কম পয়সায় দিব্যি পাওয়া যায় তাহলে কত লোকের পোলাও মারা যাবে বলুন দেখি? যার পয়সা আছে সে যাক না ঝাঁ চকচকে বেসরকারী হাসপাতালে। যার সামর্থ্য নেই সে সরকারী হাসপাতালে আসুক, যেখানে সারাক্ষণ নেই রাজ্যের নৈরাজ্য চলে। বেড নেই, ওষুধ নেই, পরীক্ষা নিরীক্ষা করার যন্ত্রপাতি নেই, প্রয়োজন অনুসারে ডাক্তারও নেই। একজন ডাক্তার টানা চব্বিশ ঘন্টা, ছত্রিশ ঘন্টা ডিউটি করেন। এখানেই লোকে আসুক। পরিষেবা পাবে না, হাতের কাছে ডাক্তার, নার্সগুলোকে তো পাবে। পেটাক, মেরে ফেলুক, যা ইচ্ছে করুক। আরে বাবা অন্তত মারপিট করার অধিকারটা তো দিতে হবে, নইলে সরকার চলবে কী করে? স্বাস্থ্যের অধিকারের চেয়ে এই অধিকার দিলে অনেক শস্তা হয় সরকারের। পুজো, কার্নিভাল, এ উৎসব সে উৎসবের বাজেটে টান পড়ে না।
কী মনে হচ্ছে? খামোকা বেসরকারী স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে গাল দেওয়া হচ্ছে? আচ্ছা মনে করে দেখুন তো, ২০১৭ সালের ২৩শে ফেব্রুয়ারী কলকাতার টাউন হলে একটা মিটিং হয়েছিল না? সেখানে মুখ্যমন্ত্রী বেসরকারী হাসপাতালের মালিকদের ডেকে খুব ধমকে দিয়েছিলেন। খামোকা পেশেন্টদের থেকে বেশি টাকা নেওয়া হচ্ছে, স্বাস্থ্য নিয়ে বিজনেস করবেন না, মানুষকে ঠকাবেন না, সরকার কড়া ব্যবস্থা নেবে ইত্যাদি। আচ্ছা কার বিরুদ্ধে কটা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে আজ অব্দি? তার চেয়েও বড় কথা মুখ্যমন্ত্রী সারা রাজ্যের সরকারী হাসপাতালের সুপারদের নিয়ে টাউন হলে কবে বসেছেন? কবে জানতে চেয়েছেন কী কী সমস্যা আছে, কিভাবে মেটানো যায়? অর্থাৎ এমনি করেই যায় যদি দিন যাক না। মাঝেমধ্যে মধ্যবিত্ত, উচ্চবিত্ত যেখানে যায় সেখানকার ব্যাপারে একটু হম্বিতম্বি করলাম — এই যথেষ্ট।
সরকারী হাসপাতালেও কি আর কিছু করব না? করব। জবরদস্ত গেট লাগাব, আলো লাগাব, নীল সাদা রঙ করব, সেগুলো মাঝেরহাট ব্রিজের মত সুরক্ষিত হবে। এর বেশি করা যাবে না। বেসরকারী স্বাস্থ্য ব্যবস্থার খদ্দেররা সরকারী হাসপাতালের দিকে চলে না যায় সেটা তো নিশ্চিত করতে হবে। হ্যাঁ, উন্মত্ত জনতা কখনো কখনো ওখানেও গিয়ে পেটাবে বটে। সে মারও তো ডাক্তার, স্বাস্থ্যকর্মীরাই খাবে। সরকার আর মালিকপক্ষ মান্না দের মত গান গাইতেই পারে “তাতে তোমার কী? আর আমার কী?”
অতএব প্রিয় ডাক্তারকুল, আপনারা মানিয়ে নিন। এ দেশে ডাক্তারি করতে গেলে হয় কাফিল খান নয় পরিবহ মুখোপাধ্যায় হতেই হবে।
যাঁরা ডাক্তার নন তাঁরা খুব রাগ করছেন, তাই না? ভাবছেন “ডাক্তাররা যে কত বদমাইশি করে সেকথা তো একবারও বলল না? নার্সিংহোম আর ডায়াগনস্টিক সেন্টারের ব্যবসা ফেঁদে লাল হয়ে যাচ্ছে কত ডাক্তার তা তো বলল না? এই যে সব চিকিৎসা বন্ধ করে দিয়ে বসে আছে, এটা কি উচিৎ কাজ? কোন অধিকার নেই অসুস্থ মানুষের সাথে এরকম করার।”
ঠিক কথা। কোন কোন ডাক্তার অত্যন্ত অসৎ। নানারকম চক্র তৈরি করে দু নম্বরী পয়সা করেন, সরকারী টাকাও মেরে দেন। ইঞ্জিনিয়াররাও করেন। ব্যবসায়ীরা করেন, রাজনীতিবিদরা করেন, সাংবাদিকদের কথা আর নিজ মুখে কী বলব? আজকাল এমনকি মাস্টাররাও করেন এসব। কিন্তু বাংলা অভিধানে প্রসঙ্গ বলে একটা শব্দ আছে। ইংরিজিতে যাকে বলে context। এন আর এসের ঘটনার প্রসঙ্গে অসাধু ডাক্তারদের কথা আসে না। অবশ্য আজকাল আর প্রসঙ্গ টসঙ্গ কে মানে? ভারতের বেহাল অর্থনীতি নিয়ে প্রশ্ন তুললে তো উত্তর আসে “পাকিস্তান কো ঘর মে ঘুসকে মারা।”
রইল ডাক্তারদের অধিকারের কথা। শান্তিপূর্ণভাবে প্রতিবাদ করার অধিকার তাঁদের অবশ্যই আছে। গোটা দেশে এই মুহূর্তে একটা অধিকারই স্বীকৃত — উন্মত্ত জনতার যা ইচ্ছে করার অধিকার। সকলকেই মনে করিয়ে দেওয়া দরকার যে ওটাই একমাত্র অধিকার নয়। বস্তুত ওটা আদৌ কোন অধিকার নয়, ওটা বরং অন্যের অধিকার হরণ।
আর আমাদের অসুবিধা? দুঃখজনক। কিন্তু হাসপাতালে লুম্পেনতন্ত্র চালু হতে দিয়ে ডাক্তার আর রোগীকে যুযুধান দুই পক্ষে স্থাপন করেছেন যিনি, এই বিবাদ মেটানোর দায়িত্ব তো তাঁর উপরেই বর্তায়। তিনি তো মূর্তি আর পাঁচতারা হোটেল উদ্বোধনে ব্যস্ত।

বিশ্বসাথে যোগে

“বিশ্বসাথে যোগে যেথায় বিহারো
সেইখানে যোগ তোমার সাথে আমারও।”

গানটা ছোট থেকেই শুনছি। কতবার কত রবীন্দ্রজয়ন্তীতে সুরে, বেসুরে; কত লং প্লেয়িং রেকর্ডে, ক্যাসেটে, সিডিতে যে শুনেছি তার হিসাব নেই। বেশিরভাগ রবীন্দ্রসঙ্গীত যেরকম অন্যমনস্কভাবে শোনে সবাই, সেভাবেও শুনেছি আবার মন দিয়েও শুনে দেখেছি। কোন যোগ স্থাপন করতে পারিনি গানটার সাথে। এভাবেই স্কুল, কলেজ পেরিয়ে গেছি। বাবা-মায়ের ঠ্যালা খেয়ে রবীন্দ্রজয়ন্তীতে অংশগ্রহণ করেছি একটা বয়স পর্যন্ত, তারপর যে বয়সে বাবা-মা আর জোর করতে পারে না সেই বয়স থেকে যতটা পেরেছি পাশ কাটিয়ে গেছি অনুষ্ঠানটাকে।

তারপর বিশ্ববিদ্যালয়ে ঢুকলাম। একদিন আশুতোষ বিল্ডিং এর ঠিক সামনে অর্ধচন্দ্রাকার জায়গাটায় বসে পা দুলিয়ে অমূল্য আড্ডা দিচ্ছি, আমার সহপাঠী বন্ধু এবং তৎকালীন কমরেড (পরে সহকর্মী) সুদীপ্ত এসে জোর করে টেনে নিয়ে গেল। কোথায় যেতে হবে না হবে কিচ্ছু বলল না। যদ্দূর মনে পড়ে ইউনিভার্সিটির গেট দিয়ে বেরিয়েই রেলায় ট্যাক্সি ডেকে আমাকে নিয়ে উঠে পড়ল। কোথায় যাওয়ার তাড়া, কিসের তাড়া কিছুই বুঝলাম না। যেতে যেতে শোনা গেল সেটা।
আমরা দুজনে তখনো বিশ্বজুড়ে যৌথ খামারের স্বপ্নটপ্ন দেখি। তা জাপান থেকে এক কমরেড এসেছেন আমাদের এখানকার নির্বাচন কভার করতে। তাঁকে সাহায্য করতে হবে। ভারতের ছাত্র ফেডারেশনের রাজ্য কমিটি নাকি সাংবাদিকতা বিভাগের কোন ছাত্রকে চেয়েছে সেই কাজে। আর আমার যোগ্যতা সম্পর্কে অকারণ উচ্চ ধারণা পোষণ করা বন্ধুটি অমনি আমার নাম বলে দিয়েছে। বলে দিয়েই ক্ষান্ত হয়নি অবশ্য। আমাকে পাকড়াও করে পাড়ি দিয়েছে রাজ্য কমিটির অফিসে। শুনেই আমি ট্যাক্সির দরজা খুলে ঝাঁপ দিতে যাচ্ছিলাম আর কি। জাপানীর জ জানি না, সুদীপ্ত আমায় এরকম ফাঁসাচ্ছে! শেষমেশ যে বান্ধবীটির প্রতি অনুরক্ত ছিলাম তার কথা ভেবে টেবে ঝাঁপটা দিলাম না।

জাপানীটি দেখা গেল অতীব ভদ্রলোক এবং সে জাপানী জানা লোক খুঁজছে না, খুঁজছে ইংরিজি এবং বাংলা জানা লোক। তা তার সাথে নির্বাচন কভার করা তো হল। বোধহয় নেহাত খারাপ সাহায্য করিনি। তাই সে পরেও আরেকবার কলকাতায় এসে আমাকেই খুঁজে বার করে কাজকম্ম করেছিল।

এর পরের বছর। ছাত্রজীবন একেবারে শেষ প্রান্তে। ছাত্র ফেডারেশনের সাথে সম্পর্ক ঘুচিয়ে দিয়েছি, এম এ পাশ করে চাকরিবাকরি পাব কিনা তা নিয়ে কিছুটা দুশ্চিন্তায় আছি। এমন সময় খবর হল উগো শাভেজ কলকাতায় আসবেন। শাভেজ মানে ভেনেজুয়েলার সেই নেতা যিনি প্রায় একটা গোটা মহাদেশকে বিশ্বায়নের চাকার তলা থেকে সরিয়ে এনে অন্যরকমভাবে বাঁচার সাহস দিয়েছেন। শাভেজ মানে যিনি ভোটে জিতে এসে সমাজতান্ত্রিক কর্মকান্ড চালানোর ক্ষমতা ধরেন। শাভেজ মানে যিনি প্রায় কাস্ত্রোর মতই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নাকের ডগায় দাঁড়িয়ে বহুজাতিকদের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করতে পারেন। সেই শাভেজ আসছেন কলকাতায়। যখন নেলসন ম্যান্ডেলা এসেছিলেন, বাবা নিয়ে গিয়েছিলেন হাত ধরে। এবারে শোনামাত্র ভাবছি কী করে যাওয়া যায় রবীন্দ্র সরোবর স্টেডিয়ামে সেই দিনটায়। ছাত্র ফেডারেশনের সাথে আড়ি করেছি, যৌথ খামারের স্বপ্নের সাথে তো আড়ি করিনি। এত কাছে আসছেন শাভেজ, অন্তত কয়েকশো ফুট দূর থেকে তাঁকে দেখব না!

কোন ব্যবস্থা মাথায় আসার আগেই জাপানী কমরেড জুনিচির ফোন। “আমি কমরেড শাভেজের কলকাতা সফর কভার করতে আসছি। তোমার অন্য কোন কাজ না থাকলে আমাকে একটু সাহায্য করবে?” অন্য কাজ! সব কাজ ফেলে ঐ কাজ করব আমি।

জুনিচির সঙ্গী হওয়ার সুবাদে মঞ্চের একেবারে কাছাকাছি বসার সুযোগ পেয়ে গেলাম। খুব কাছ দিয়ে হেঁটে এসে মঞ্চে উঠলেন শাভেজ। তারপর উদাত্ত গলায় নিজের মাতৃভাষায় বক্তৃতা। স্টেডিয়ামে উপস্থিত বেশিরভাগ লোকের মতই আমিও স্প্যানিশ জানি না। জুনিচিও জানে না। আমার কাজ ছিল ঐ সভার সকলের বক্তৃতার ইংরিজি অনুবাদ লিখে দেওয়া। শাভেজের বক্তৃতা শুনছি আর প্যাডে লিখছি। আসলে তো তাঁর কথা শুনে লিখছি না, লিখছি স্প্যানিশ দূতাবাস আমারই বয়সী যে ছেলেটিকে শাভেজের বক্তৃতা বাংলা করে বলে দেওয়ার জন্যে নিযুক্ত করেছিল তার কথা শুনে। দু এক মিনিটের মধ্যেই স্পষ্ট হয়ে গেল যে ভাগ্যবানটি স্প্যানিশ যেমনই জানুক, বাংলা মোটেই জানে না। হোঁচট খেতে খেতেও প্রায় মেরে এনেছিল ব্যাপারটা কিন্তু একেবারে গুবলেট হয়ে গেল শাভেজ বক্তৃতার উপসংহারে রবীন্দ্রনাথের একটা কবিতা বলতে শুরু করতেই। লাইনদুয়েক বাংলা করতেই গোটা স্টেডিয়াম বুঝে গেল এটা কোন কবিতা। কিন্তু সেই হতভাগা বোধহয় জম্মে কবিতাটা পড়েনি। তাই সে ভ্যাবাচ্যাকা। আরো লাইনতিনেক চলার পর এমনকি শাভেজও বুঝলেন ঠিক বাংলা হচ্ছে না। ভুরু কুঁচকে থেমে গেলেন। অগত্যা মঞ্চে উপবিষ্ট পশ্চিমবাংলার তখনকার মুখ্যমন্ত্রী (তিনিও নাকি বর্তমান মুখ্যমন্ত্রীর মত কবিতা টবিতা লিখতেন) উঠে এসে সেই বঙ্গ মায়ের স্প্যানিশ সন্তানটিকে সরিয়ে দিয়ে গড়গড় করে বলে দিলেন “চিত্ত যেথা ভয়শূন্য / উচ্চ যেথা শির…” ইত্যাদি। শাভেজ দেখলাম যারপরনাই খুশি হলেন। দুজনের আলিঙ্গন, স্টেডিয়ামসুদ্ধ লোকের স্লোগান দিয়ে মিটিং শেষ হল।

কথা ছিল বক্তৃতাগুলো আমি পরদিন দুপুরের মধ্যে ইমেল করব জুনিচিকে। তারপর বিকেলে ওর হোটেলে যাব আর কোন সাহায্য লাগলে সেটা করতে। পরদিন হোটেলে পৌঁছতেই ওর প্রথম প্রশ্ন “তুমি এত ভাল কবিতা লিখতে পার?রবীন্দ্রনাথের কবিতাটার কি সুন্দর ইংরিজি করেছ!” লজ্জায় আমার মাথা কাটা যায় আর কি। ওকে বোঝালাম যে ইংরিজিটা মহাকবি নিজেই করে গেছেন। তাতে ও আরো মুগ্ধ। রবীন্দ্রনাথ নোবেলজয়ী কবি। জাপানেও গেছেন সেকথা ওর জানা। কিন্তু তিনি যে এত ভাল ইংরিজি জানতেন তা ও শোনেনি কখনো। কয়েক সেকেন্ড স্তব্ধ হয়ে রইল।

তারপরেই আমাকে ফেলল মহাবিপদে।

“আচ্ছা এই কবিতাটার জাপানী অনুবাদ পাওয়া যাবে?”

বোঝ! আমি ওকে বললাম যে রবীন্দ্রনাথ জাপানী ভাষা জানতেন বলে আমার জানা নেই। ওদের দেশের কোন কবি যদি করে থাকেন অনুবাদ তো থাকতে পারে কিন্তু সে তো ও-ই ভাল জানবে। জুনিচি নাছোড়বান্দা। এত ভাল লেগেছে কবিতাটা, বলে “যে করে হোক আমায় একটা জাপানী অনুবাদ যোগাড় করে দাও।” দিন দুয়েক সময় চেয়ে নিয়ে কেটে পড়লাম।

অকূলপাথারে পড়লে যা করা আমাদের জাতীয় অভ্যেস সেটাই করলাম। বাবার পরামর্শ চাইলাম। বাবাই বাতলে দিলেন। আমার এক মামা বিশ্বভারতীর অধ্যাপক ছিলেন। সেই মামীকে ধরলাম। নিপ্পন ভবনের অধিকর্তার ইমেল আইডি যোগাড় হল। তাঁকেই জুনিচির ব্যাপারে জানিয়ে লিখলাম অন্তত বঞ্চিত করে যেন বাঁচিয়ে দেন। ভেবেছিলাম উত্তর টুত্তর পাব না। অবাক কান্ড! চব্বিশ ঘন্টার মধ্যেই উত্তর এল “আপনার অনুরোধ পেয়েছি। মিস্টার জুনিচি কোদামাকে আমরা কবিতাটা পাঠাচ্ছি।”

জুনিচির সেদিনই দিল্লীতে নিজের আস্তানায় ফিরে যাওয়ার কথা। আমি জানালাম কী বার্তা এসেছে রবীন্দ্রনাথের নিজের বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। বেচারা একটু ব্যাজার মুখেই ফেরত গেল। বোধহয় ভেবেছিল মারাদোনার মত ডজ করে দিলাম। আমি আবার নিপ্পন ভবনের অধিকর্তা মারাদোনা কিনা তাই ভাবছিলাম। কে আমি অজ্ঞাতকুলশীল কলকাতার উপকণ্ঠের এক ছাত্র? আমার অনুরোধে কেনই বা এসব করতে যাবেন তিনি? কিন্তু রবীন্দ্রনাথের বুঝি ক্ষমতা অসীম। পরদিন বিকেলে দিল্লী থেকে ফোন করল জুনিচি। সে ইমেলে কবিতাটা পেয়েছে। এবং পড়ে আপ্লুত। “এমন আশ্চর্য কবিতা আমি আগে পড়িনি। তোমাকে অনেক ধন্যবাদ।”

রবীন্দ্রনাথকে বললাম, একমাত্র তুমিই পারো। কোথায় সুদূর লাতিন আমেরিকার দেশ ভেনেজুয়েলা! সেখানকার বিপ্লবী নেতার বুকে তুফান তোলে তোমার কবিতা আর সেই কবিতা নিজের ভাষায় পড়তে চায় এশিয়ার এক প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপের সাংবাদিক! আব্দারটা করে তোমার দেশের, তোমার ভাষার এক অকিঞ্চিৎকর তরুণের কাছে আর সে আব্দারটা মেটাতে সমর্থ হয় কারণ একটা বিশ্বভারতী রেখে গেছ তুমি!
সেইদিন গানটা কানের ভিতর দিয়ে মরমে পৌঁছল। ফিরে রবীন্দ্রনাথকেই বললাম “নয়কো বনে, নয় বিজনে, / নয়কো আমার আপন মনে — / সবার যেথায় আপন তুমি, হে প্রিয়, সেথায় আপন আমারও।।”