আমাদের কেউ নেই

মমতা ব্যানার্জি সত্যবাদী যুধিষ্ঠির — একথা ঘুমচোখে জিজ্ঞেস করলে বোধহয় পার্থ চ্যাটার্জিও বলবেন না। তবু রাজ্যপালের বিরুদ্ধে আমাদের মুখ্যমন্ত্রী যে অভিযোগ করেছেন সেটাকে অবিশ্বাস করার কারণ দেখছি না। তার কারণ দুটো। প্রথমত, কেশরীনাথ ত্রিপাঠী প্রাক্তন আর এস এস প্রচারক। আর এস এস দ্বারা শিক্ষিত একজন লোক ভারতীয় সংবিধানকে খুব সম্মান করে এবং নিজের সাংবিধানিক সীমা লঙ্ঘন না করার ব্যাপারে খুব সচেতন — এরকম দাবী করলে ভক্তরা যা-ই বলুন, প্রেতলোকে গোলওয়ালকর, হেড়গেওয়াররা খুব রেগে যাবেন। দ্বিতীয়ত, বিজেপি ব্লক সভাপতির মত কথা এই ভদ্রলোক বলেই থাকেন। কদিন আগে টাইমস অফ ইন্ডিয়ায় প্রকাশিত সাক্ষাৎকারেও বলেছেন।
কিন্তু সেটা প্রশ্ন নয়। প্রশ্ন হল ওভাবে কথা বলার সুযোগ ত্রিপাঠীমশাইকে কে করে দিল? উত্তর একটাই। মমতা ব্যানার্জি নিজে।
দেড়শো কোটির দেশে আজকাল মানুষ অপ্রতুল, কিন্তু গরুর কোন অভাব নেই। এক গরুর নিজের ভগবানের মহত্ত্বে এত ঠুনকো বিশ্বাস যে অন্যের ধর্মস্থানে তাঁকে না বসালে শরীরটা বেশ হিন্দু হিন্দু লাগে না। আরেকপাল গরুর আবার নিজের ধর্মের উপরে বিশ্বাস এত ঠুনকো যে সামান্য ফটোশপের ধাক্কাতেই তার অপমান হয় এবং ভাঙচুর, বাড়ি পোড়ানো, মারধর (গণপিটুনিরও দাবী ছিল) না করলে নিজেদের যথেষ্ট মুসলমান মনে হয় না।
কিন্তু কথা হচ্ছে মনে মনে তো অমন অনেকেই ভাবে। এই পরিমাণ হিংসা ছড়ানোর সাহস এদের হয় কখন? তখনই হয় যখন বিশ্বাস থাকে যে “আমার কিস্যু হবে না।” মমতা ব্যানার্জির সরকার সেই বিশ্বাস তৈরি করে দিয়েছেন। পশ্চিমবঙ্গে দীর্ঘকাল কোন সাম্প্রদায়িক সংঘর্ষ ছিল না। ২০১১ র পর থেকে, ২০১৬ র পরে বিশেষত, একের পর এক ঘটনা ঘটেই চলেছে। সৌভাগ্যক্রমে এর জেরে এখন পর্যন্ত কোন প্রাণহানি হয়নি, ধর্ষণের ঘটনা ঘটেনি। নইলে আরো বড় আকার নিত। এই ঘটনাগুলোর সবকটাতেই পুলিশ পৌঁছেছে হিন্দী সিনেমার পুলিশের মত দেরীতে। মালদা, চন্দননগর, ধূলাগড়, খড়গপুর, নদীয়া, অধুনা বাদুড়িয়া — এই সংঘর্ষগুলো কেন আগে থাকতে আটকানো গেল না সেটাও বড় প্রশ্ন। প্ররোচনা যে যাকেই দিয়ে থাক, সে প্ররোচনায় আগুন জ্বলার আগেই জল ঢালা গেল না কেন? সরকারের গোয়েন্দা বিভাগ তাহলে আছে কী করতে?
আসল কথা মমতা এক ভয়ঙ্কর খেলা শুরু করেছিলেন। এখন আর সামলাতে পারছেন না। বিজেপির হিন্দু মৌলবাদের মোকাবিলা করার বদলে মুসলমান মৌলবাদীদের তোল্লাই দিচ্ছিলেন। বস্তুত ক্ষমতায় আসার আগে থেকেই দিচ্ছিলেন। মুসলমানদের উন্নয়নের জন্যে হাতেকলমে কিছু করার বদলে নজর ছিল মাথায় কাপড় দিয়ে নমাজ পড়ার ভঙ্গিতে ছবি তোলার দিকে। হাস্যকরভাবে সরকারী হোর্ডিং এ লেখা হচ্ছে “নমস্কার এবং সালাম।” যেন বাঙালি মুসলমান কখনো “নমস্কার” শব্দটা উচ্চারণ করে না। এতে কোন গরীব মুসলমানের কোন উপকার হয়নি। যা হয়েছে তা হল ইসলামিক মৌলবাদীদের বিশ্বাস তৈরি যে “দিদি আমাদের কিচ্ছু বলবে না” আর অন্যদিকে হিন্দু মৌলবাদীদের কাজ সহজ করা। তারা দিব্যি হিন্দুদের মাথায় ঢুকিয়ে দিতে পারছে “দিদি ওদের লোক। হিন্দুবিরোধী।” একইসঙ্গে মমতার আমলে গ্রামে, মফঃস্বলে গত কয়েকবছরে আর এস এস কিভাবে বেড়েছে লক্ষ্য করলে বোঝা যায় সেটাও দিদির ইচ্ছা।
আদরের দিদি ভেবেছিলেন আর এস এস বাড়লে মুসলমানরা ভয় পাবে, তাঁকে রক্ষাকর্ত্রী হিসাবে দেখবে আর ঢেলে ভোট দেবে। অন্যদিকে মুসলমান মৌলবাদীদের ভয়ে হিন্দুরা যদি বিজেপির দিকে ঢলে পড়ে তো পড়ুক। এই মেরুকরণে বেশিরভাগ মুসলমান ভোট আর কিছু হিন্দু ভোট তাঁর দিকে পড়লেই তো কেল্লা ফতে। রামনবমীর মিছিলের পরে বোধহয় বুঝেছেন অঙ্ক মিলছে না, তাই এখন আবার নিজেকে বড় হিন্দু প্রমাণ করতে নেমে পড়েছেন। তাঁর পার্টি বজরংবলীর পুজো করছে। তিনি পুরীর মন্দিরে পুজো দিতে যাচ্ছেন, উল্টোরথেও জ্বলজ্বল করছেন। কিন্তু যা হবার তা তো হয়ে গেছে। এখন দুই ধর্মের নেতাদের গরম গরম বাণী দিচ্ছেন। এতদিন যে ইদ্রিশ আলিদের পুষলেন, সে পাপ ভাগীরথীতে ধোয়া যাবে কি?
এই অগ্নিগর্ভ পরিস্থিতিতে রাজ্যের প্রধান প্রশাসক কী বললেন? না তিনি রাজ্যপালের কথায় এতটাই অপমানিত যে পদত্যাগ করবেন ভেবেছিলেন। চমৎকার। বাড়িতে ডাকাত পড়েছে, দাদু সুযোগ পেয়ে চেঁচামেচি করছেন আর মা ছেলেমেয়েদের কী করে বাঁচাব সেটা না ভেবে বললেন “আমি অত্যন্ত অপমানিত। রান্নাঘরের জানলা দিয়ে বেরিয়ে যাব ভাবছিলাম। তারপর ভাবলাম আমি তো শ্বশুরমশাইয়ের মা নই, আমি ছেলেমেয়েদের মা। তাই গেলাম না। কিন্তু যেতে আমার দু মিনিট লাগবে।”
সঙ্কটমুহূর্তে পদত্যাগ যাঁর প্রথম প্রতিক্রিয়া, তিনি হচ্ছেন আমাদের মুখ্য প্রশাসক! আমাদের যে কে বাঁচাবে!
বিঃ দ্রঃ তৃণমূল, বিজেপি, জামাত ইত্যাদি ছাড়াও এ রাজ্যে আরেকটা রাজনৈতিক শক্তি নাকি আছে বলে খবর। তাদের নাম বামফ্রন্ট। তারা গরু নয়, কচ্ছপ। গতকাল কলকাতায় তারা একটা গনগনে মিছিল করেছে। কিসের বিরুদ্ধে? কলেজ স্কোয়ারে মিটিং, মিছিল নিষিদ্ধ করার প্রতিবাদে। নিষিদ্ধ করার ঘোষণাটা হয়েছিল প্রায় মাসখানেক আগে। অতএব ধৈর্য ধরতে হবে। আর মাসখানেক পরে ওঁরা সাম্প্রদায়িক রাজনীতির বিরুদ্ধে কিছু একটা করবেন আশা করা যায়।

Advertisements

বুদ্ধিজীবীর নিরপেক্ষতা : নিরপেক্ষতার ভন্ডামি

রামকৃষ্ণ পরমহংস বলেছিলেন “যতদিন বাঁচি ততদিন শিখি”। আজ সকালে শিখলাম বাঙালি বুদ্ধিজীবীদের এখন এত বুদ্ধি যে আইওয়া পৌঁছলে তবে ইসলামিক স্টেট সম্পর্কে জানতে পারেন। এই শিক্ষাটি আমার হল আনন্দবাজার পত্রিকার উত্তর সম্পাদকীয় স্তম্ভে নামকরা সাহিত্যিক বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখাটা পড়ে। ওঁর কবিতা কিছু কিছু পড়েছি। বেশ লাগে। বলতে কি, শ্রীজাতর চেয়ে বেশি ভাল লাগে। তার উপর আজকের লেখার শিরোনামটার সাথে একমত না হওয়ার কোন প্রশ্নই নেই: “সময় এসেছে ধর্ম না দেখে বিপন্নের পাশে দাঁড়ানোর”। অতএব লেখাটা গোগ্রাসে গিলতে গেলাম। আশা করেছিলাম লেখাটা ভাল হবে। এতটা শিক্ষামূলক হবে ধারণা করতে পারিনি।
কবি লিখছেন “গুজরাত দাঙ্গার পর দু’মাসের মাইনে দিয়েছিলাম। হেঁটেছিলাম বেশ অনেকগুলো মিছিলে। (তখনও জুকেরবার্গ ফুটেজ-বিপ্লবী হওয়ার সুযোগ করে দেননি)। তা সেই মিছিলের কয়েকটায় মহম্মদ সেলিম নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। কই সেলিম সাহেবকে কেউ মুসলিম সাম্প্রদায়িক বলেনি তো! আইনস্টাইন যখন রুজভেল্টকে চিঠি লিখেছিলেন ইহুদিদের বাঁচাবার জন্য, কেউ কি তাঁকে ইহুদি-সাম্প্রদায়িক বলেছিলেন? মার্টিন লুথার কিং যে শ্বেতাঙ্গদের অত্যাচারের মোকাবিলা করার জন্য কৃষ্ণাঙ্গদের একে অপরের প্রতি “এক্সট্রিম ইন লাভ” হয়ে উঠতে বলতেন, তার জন্য কি কেউ বলেন যে উনি কৃষ্ণাঙ্গ সাম্প্রদায়িক?”
ইঙ্গিতটা বোঝা গেল? তিনটে উদাহরণ। একটাই মিল। মহম্মদ সেলিম জন্মসূত্রে মুসলমান, মিছিলটা ছিল ব্যাপক মুসলমান হত্যার বিরুদ্ধে। আইনস্টাইন জন্মসূত্রে ইহুদি, আবেদনটাও ছিল ইহুদিদের বাঁচানোর (যদিও এখানে কবি কোন চিঠির কথা বলছেন বুঝলাম না। কারোর জানা থাকলে জানাবেন। জানতে চাই। ম্যানহাটন প্রোজেক্ট নিয়ে চিঠিটা ঠিক ইহুদিদের বাঁচানোর জন্যে লেখা হয়েছিল বলে তো মনে হয় না)। মার্টিন লুথার কিং নিজে কৃষ্ণাঙ্গ, কৃষ্ণাঙ্গদের এক হতে বলেছিলেন।
অর্থাৎ কবি ইঙ্গিত করছেন এঁদের কার্যকলাপ যে বিপন্ন মানুষের পাশে দাঁড়ানো বলে প্রশংসনীয় তা নয়, এঁরা নিজ নিজ কৌমের পাশে দাঁড়িয়েছেন বলে প্রশংসনীয়। ভেবে অবাক লাগছে যে ২০০২ এ সিপিএম নেতা মহম্মদ সেলিম একটা মিছিলে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন যেখানে জন্মসূত্রে হিন্দু কোন সিপিএম নেতা যাননি। মানে বিনায়কবাবু তো তেমন কারো নাম করেননি দেখছি। কেউ গিয়ে থাকলে অবশ্য সেটা প্রশংসনীয় নয়। তাঁদের এখন বিবেকের দংশন হওয়া উচিৎ। যেমনটা বিনায়কবাবুর নিজের হচ্ছে। নিজের কৌমের পাশে না দাঁড়িয়ে অন্য কৌমের পাশে কেউ দাঁড়াতে যায়?
ভাবলে আরো অবাক লাগে যে হিটলারের বিরুদ্ধে শুধু ইহুদী বিজ্ঞানীরাই গিয়েছিলেন, খাঁটি জার্মান বিজ্ঞানীরা যাননি। ইতিহাস অবশ্য অন্যরকম বলছে। তবে সেক্ষেত্রেও ধরতে হবে ঐ জার্মানরা প্রশংসনীয় কিছু করেননি। আমি অবশ্য এত ভাবছি না। আমি মনে করছি কবি ইতিহাস পড়েন না। বড় কবি তো, শুধু কবিতাই পড়েন। অজস্র মধ্যমেধার বাঙালির মত সামান্য ‘বিশ্বাসঘাতক’ পড়াও তাঁর কাছে সময় নষ্ট।
ভাল হত কবি যদি এই “নিজের কৌমের পাশে দাঁড়ান” কথাটাই সোচ্চারে গোটা লেখাটা জুড়ে বলতেন। তত্ত্বটা মানতে না পারলেও অন্তত বুঝতাম লোকটার সাহস আছে। কিন্তু না, সে সৎসাহস তিনি দেখাতে পারেননি। এরপরেই শুরু করেছেন, যাকে আজকাল ইংরিজিতে অনেকে বলেন whataboutery।
“কে বলবে এগুলোর বিরুদ্ধে? আমি নিজেই কি বলেছি? বলিনি বলেই মাথা নিচু হয়ে গেল যখন মল্লারপুরের একটি ছেলে বইমেলায় আমাকে বলল, ‘দাদরির পর আপনি খবরের কাগজে লিখেছিলেন, কিন্তু কই আমাদের ইন্দ্রজিৎকে যখন পিটিয়ে মেরে দিল, তখন কিছু লিখলেন না তো?’
কে ইন্দ্রজিৎ? আখলাখের মতো তাকেও পিটিয়ে মারা হয়েছে? জানি না তো! কোথায় ধূলাগড়? উস্তি-ক্যানিং-কালিয়াচক-সমুদ্রগড়-দেগঙ্গা কোথায়? এই পৃথিবীতে? সেখানে যাদের বাড়ি পোড়ানো হয়েছে তারা কারা? মানুষই তো?”
এই অংশটা পড়ে ইন্দ্রজিৎ কে সেটা আমারও মনে পড়েনি। তাই ইন্টারনেট ঘাঁটাঘাঁটি করতে হল। করে যা বেরোল তা হচ্ছে বীরভূম জেলার একটি ঘটনা। ‘দ্য হিন্দু’ র প্রতিবেদনে পেলাম ইন্দ্রজিৎ দত্ত বলে এক দোকানদারকে মহরম উপলক্ষে অনেক টাকা চাঁদা দিতে বলা হয়েছিল বলে অভিযোগ। দিতে আপত্তি করায় তাকে মারধোর করা হয় এবং সেই আঘাতের ফলেই কদিন পরে হাসপাতালে তার মৃত্যু হয়। অত্যন্ত দুঃখজনক এবং প্রশাসনের অপদার্থতাজনিত মৃত্যু। কিন্তু আখলাক হত্যার সাথে তুলনাটা মেনে নেওয়া শক্ত। চাঁদার জুলুম আমাদের কারো অপরিচিত নয়, তার জেরে মৃত্যু বিরল হলেও। কিন্তু সেই মৃত্যুর সঙ্গে তুলনা করছেন একটি সংগঠিত হত্যার যার কারণ একজন মানুষের খাদ্যাভ্যাস! তার উপর তন্নতন্ন করে খুঁজেও এমন কোন খবর পেলাম না যে শাসকদলের কেউ ইন্দ্রজিতের হত্যাকারীর পক্ষে একটি কথা বলেছে। আখলাকের বেলায় কিন্তু এক অভিযুক্তের ম্যালেরিয়ায় মৃত্যু হওয়ার পর তাকে জাতীয় পতাকায় মোড়া হয়েছিল এবং এক কেন্দ্রীয় মন্ত্রী গিয়ে শেষ শ্রদ্ধা জানিয়ে এসেছিলেন। একজন কবি তুলনা করছেন এই দুটো ঘটনার? কবিরা আত্মভোলা হন শুনেছি, কাণ্ডজ্ঞানশূন্যও হন নাকি? আরো হাসির কথা এই যে বিনায়কবাবু এই হত্যাকে ভারতে আইসিসের জিহাদের এক নিদর্শন বলে ধরেছেন। চাঁদা দেয়নি বলে পিটিয়ে মারা যদি আন্তর্জাতিক জিহাদ হয়, তাহলে বলতে হবে পাড়ার তোলাবাজের সাথে এল বাগদাদির পার্থক্য কেবল পরিমাপগত।
গত দুবছরে পশ্চিমবঙ্গে বিভিন্ন জায়গায় সাম্প্রদায়িক অশান্তি লেগেছে। মানুষের ঘরবাড়ি পুড়েছে। প্রশাসনের গড়িমসি বারবার প্রকট হয়েছে। সেজন্যে সাধারণ মানুষ, বুদ্ধিজীবী, বিরোধী দল সকলেই সরকারের অপদার্থতার দিকে আঙুল তুলেছেন, সে বিনায়কবাবু যতই বলুন হিন্দুদের জন্য কেউ বলে না। তবু পশ্চিমবঙ্গ সরকারের বিরুদ্ধে যদি এই কারণে তিনি বিষোদগার করতেন একটুও অন্যায় হত না। কিন্তু আশ্চর্যের কথা তাঁর আক্রমণের লক্ষ্য মোটেও সরকার নয়। লেখার শেষ প্যারায় গিয়ে কবি বলছেন “বাড়িতে লক্ষ্মীপুজো-সরস্বতীপুজো-বারের উপোস, নাতির পইতে, দাদুর শ্রাদ্ধ, সব কিছু করার পরে ফেসবুকে নিজেকে ‘নাস্তিক’ দাবি করার এলিটিস্ট ভণ্ডামি এক জন মুসলমান কল্পনাও করতে পারেন না। পারেন না বলেই, কোথাও কোনও মুসলমান অত্যাচারিত হলে তিনি বুক চিতিয়ে তার পাশে দাঁড়ান। দাঁড়ান এক জন মানুষের পাশে আর এক জন মানুষের যে-ভাবে দাঁড়ানো উচিত, সে-ভাবেই। প্রাজ্ঞ হিন্দুরা কবে এক জন অত্যাচারিত হিন্দুকেও মানুষ ভাবতে পারবেন? কবে বলতে পারবেন, সতেরো জন হিন্দু সন্ন্যাসীকে পেট্রোল ঢেলে পুড়িয়ে মারা অন্যায় হয়েছিল? কবে আমি দেগঙ্গা কিংবা ক্যানিং-এর রাস্তায় দাঁড়িয়ে, চিৎকার করে বলতে পারব, ‘প্লিজ পানিশ মি অলসো। আই হ্যাভ ডিসাইডেড টু কল মাইসেলফ, আ হিন্দু।'”
বুঝুন। হিন্দুদের প্রতি যত অত্যাচার, অনাচার, অবিচার হচ্ছে সবের জন্যে দায়ী হলেন সেইসব হিন্দুরা যাঁরা নিজেদের নাস্তিক বলে দাবী করেন। ধূলাগড়, দেগঙ্গা ইত্যাদির জন্যেও দায়ী হলেন নাস্তিকরা। কবিপ্রতিভা এখানে কি মারাত্মক বাইনারি নির্মাণ করল আসলে দেখুন, শিখুন।
বলা হল মুসলমানদের মধ্যে নাস্তিক-ফাস্তিক কেউ হয় না এবং মুসলমান সবসময় মুসলমানের পাশে দাঁড়ায়। অতএব আপনি যদি হিন্দু হন তাহলে ওসব নাস্তিক হওয়াটওয়া ত্যাগ করুন, হিন্দুর পাশে দাঁড়ান। লেখায় অনেক আগেই বলা হয়েছে যে ভারতে আইসিস ঠিক কত হাজার কোটি টাকা যে ঢোকাচ্ছে সেটা “সতর্ক করতে চাইলেও যাঁরা সতর্ক হন না, যাঁরা বিশ্বাস করেন অন্ধ হলেই প্রলয় বন্ধ থাকবে, সেই পণ্ডিতদের” জানা নেই (কবির যখন জানা আছে তখন তিনি কেন লিখলেন না সে-ও এক রহস্য)। অর্থাৎ ধর্মযুদ্ধ শিগগির শুরু হবে, আপনি যদি নাস্তিক হন বা সংখ্যালঘুর প্রতি সংবেদনশীল হন, তার মানে আপনি হিন্দু হয়ে হিন্দুর সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করছেন।
হিন্দু এদেশে কিরকম নিপীড়িত, কেমন কুকুর বেড়ালের মত তাদের রাখা হয়েছে সেকথা প্রমাণ করতে কবি বাংলাদেশী হিন্দু, কাশ্মীরি পন্ডিত সকলকেই টেনে এনেছেন। যখন আর কুলোয়নি তখন সেই আশির দশকের বিজন সেতু অব্দি পৌঁছে গেছেন। কিন্তু এত চোখের জলেও বাঁকা হাসিটা লুকনো গেল না। “কাশ্মীরের যে পণ্ডিতগুলো দিল্লির রাস্তায় কাতরাচ্ছে গত পঁচিশ বছর, তাদের যন্ত্রণাতেও কারও বুকটা টনটন করে উঠলে সে তৎক্ষণাৎ বিজেপি বলে চিহ্নিত হয় কেন?” কে যে ওঁকে বিজেপি বলে চিহ্নিত করল উনিই জানেন। গোটা লেখায় যা যা বিজেপির বক্তব্য ঠিক তাই তাই বললেন, তারপর জানিয়ে দিলেন ওঁকে কিন্তু বিজেপি বলা চলবে না।
শিক্ষিত বিজেপি সমর্থকদের এই অভ্যেসটা অননুকরণীয়। সিপিএমের এই দুর্দিনেও কোন সমর্থককে আপনি বলতে শুনবেন না সে কোন পার্টির সমর্থক নয়। কংগ্রেস সমর্থকও তাই। এ রাজ্যে প্রবল প্রতাপান্বিত তৃণমূল সমর্থকরা তো সোচ্চার দিদিভক্ত। কিন্তু বিজেপিভক্ত নরেন্দ্র মোদীর ছবি বুকে আটকেও বলে “আমি কোন পার্টির সাপোর্টার নই।” ওদেরই সবার সমঝে চলা উচিৎ। ওরা কোথায় রেলা নেবে, তা নয়। আসলে সারাক্ষণ যারা ভয় বিক্রি করে তারাও ভীত হয়ে থাকে। বিনায়কবাবুর মত আপনার যদি সিরিয়া, তুরস্কের মুসলমানের আজানের সুর ভাল লাগে অথচ এদেশের কোটি কোটি মুসলমানের এক শতাংশেরও কম যুবকের আইসিসে যাওয়া দেখে মনে হয় ঘরে ঘরে জিহাদের প্রস্তুতি চলছে, তাহলে আর আপনি রেলায় থাকবেন কী করে?
এই রাজ্যে এখনো এক বোকা কবি আছেন যিনি বলেন সত্য বলা ছাড়া কবিতার আর কোন কাজ নেই। চতুর কবি বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায় অবশ্য তথ্যের বা বাস্তবের ধার না ধেরে দিব্যি ভয় ছড়ানোর কাজটা করেছেন। সত্য নয়, এখন যে উত্তরসত্যের যুগ।

‘ওদের’ প্রতিবাদ

সারা পৃথিবীর উগ্র দক্ষিণপন্থীদের তো বটেই, সংখ্যাগরিষ্ঠ সম্প্রদায়ের সাধারণ মানুষদের মধ্যে অনেকেও মুসলমানদের বিরুদ্ধে একটা অভিযোগ করেই থাকেন “ওরা নিজেদের ধর্মের মৌলবাদীদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করে না।” যখন ধর্মনিরপেক্ষতা নিয়ে তর্কবিতর্কে আর সব যুক্তি ব্যর্থ হয়ে যায়, তখন এই যুক্তিটাকে খড়কুটোর মত আঁকড়ে ধরে ভেসে ওঠার চেষ্টা করে অনেকে। সামগ্রিকভাবে এই অভিযোগটার সত্যতা বা অসত্যতা নিয়ে আলোচনায় যাচ্ছি না। আপাতত একটা ঘটনায় নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখছি।
কলকাতার টিপু সুলতান মসজিদের শাহি ইমাম বরকতিবাবু একের পর এক ফতোয়া জারি করে ইদানীং বেশ নাম করেছিল। ধর্মের চেয়ে রাজনীতিতেই যে বাবুর আগ্রহ বেশি তা বুঝতে কারো বাকি ছিল না। এবং লোকটি নিজেকে এতই মাতব্বর ভাবতে শুরু করেছিল যে সরকারী নির্দেশ অগ্রাহ্য করে গাড়িতে লাল বাতি নিয়েই ঘুরে বেড়াচ্ছিল। লোকটার বিরুদ্ধে আমার হিন্দু বন্ধুবান্ধবদের মতই মুসলমান বন্ধুদের মধ্যেও বেশ কিছুদিন ধরে অসন্তোষ লক্ষ্য করছি — শুধু ভার্চুয়াল দুনিয়ায় নয়, তার বাইরেও। আমাকে রোজই টিপু সুলতান মসজিদের সামনে দিয়েই অফিস যেতে হয়। ফলে প্রায় একবছর আগে থেকে আমার চোখে পড়েছে বিভিন্ন বিষয়ে ঐ এলাকার প্রধানত মুসলমান ব্যবসায়ীদের ঝোলানো পোস্টার, যেগুলো বরকতিবাবুর ঠিক উলটো কথা বলেছে। শেষমেশ গত সপ্তাহে দেখলাম একটা পোস্টারে বলা হয়েছে রাজনীতিকে মসজিদের বাইরে রাখা হোক। তারপরেই জানা গেল কয়েকদিন আগে মসজিদে ঢোকার মুখে বরকতিবাবুকে কিছু মুসলমান যুবক কয়েক ঘা দিয়েছেন। তারপর জানা গেল তার ইমাম পদটি গেছে।
মজার কথা আমাদের দক্ষিণপন্থীরা এখন বলতে শুরু করেছেন এটার কৃতিত্ব হিন্দুদের। মুসলমানরা এই রাজ্যটা দখল করে নিচ্ছিল। হিন্দুরা প্রবল প্রতিরোধ করেছে। তাতেই ঘাবড়ে গিয়ে নাকি মমতা এটা করালেন।
অর্থাৎ ডানদিকের বাবুরা মনে করেন মুসলমানদের মসজিদ, তাদের ইমাম — এসব তারা পরিচালনা করে না, তাদের নিজস্ব কোন মতামত নেই। বেশ কথা। তাহলে এরপর থেকে মুসলমানরা কেন প্রতিবাদ করে না এই কথাটা আর কখনো বলবেন না। মুসলমানরা যখন এতই ঠুঁটো জগন্নাথ তখন তারা আর প্রতিবাদ করবে কী করে? আপনারাই বলরাম হয়ে ওদের কাজগুলো করে দিন।
আরো অনুরোধ করি, হিন্দু প্রতিরোধের যখন এত শক্তি যে অন্য ধর্মের ইমাম বদলে দিতে পারে তখন নিজের ধর্মে নিশ্চয়ই আরো বড় বড় পরিবর্তন ঘটাতে পারে? তাহলে খাপ পঞ্চায়েতের বিরুদ্ধে একটা হিন্দু প্রতিরোধ হোক না। সবর্ণ বিবাহের বিরুদ্ধে একটা হিন্দু প্রতিরোধ হোক। হিন্দুদের বাধ্য করুন পাত্র/পাত্রী চাই এর বিজ্ঞাপনে “caste no bar” লিখতে। রাজ্যে নাহয় আপনাদের ভাষায় মমতাজের সরকার, উত্তরপ্রদেশ, হরিয়ানা, গুজরাট, মহারাষ্ট্র, মধ্যপ্রদেশ, রাজস্থান — এসব রাজ্যে গোরক্ষকবাহিনীর মত একটা বাহিনী হোক না যারা দলিতদের কুয়োয় যারা কেরোসিন তেল ঢেলে দেয় তাদের বেদম পেটাবে। হিন্দু প্রতিরোধের শক্তিতেই তো এন্টি-রোমিও স্কোয়াড হয়েছে? তা ঐ শক্তি দিয়ে একটা এন্টি-হাঙ্গার স্কোয়াড করুন না। হিন্দু প্রতিরোধের এত শক্তি আর দেশের ৭৮% হিন্দুর একজনও যাতে খালি পেটে না ঘুমোয় তার ব্যবস্থা করতে পারবেন না? ২২% মুসলমানের কথা নাহয় না-ই ভাবলেন। তাদের তো এতবছর ধরে আমরা দেশদ্রোহীরা খাইয়েদাইয়ে মোটা করেছি। আপনাদের রাজত্বে নাহয় তারা না-ই খেল।