ন্যায় অন্যায়

রাষ্ট্র বলছে আপনি এদেশের নাগরিক কিনা তাতে আমার বয়ে গেছে। আপনি বলুন আপনার ঠাকুর্দা, দাদু, দিদিমা, বাবা, মা এঁরা এদেশের নাগরিক ছিলেন কিনা। একে যুক্তি বলে?

ঐতিহাসিক সঙ্কটের সময়ে অনেক বড় মানুষেরই ন্যায় অন্যায় গুলিয়ে যায়, আমাদের মত সাধারণ লোকের তো গুলিয়ে যেতেই পারে। তাই ৩১শে আগস্ট আসামের জাতীয় নাগরিকপঞ্জীর চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশ পাওয়ার পর দেখছি উনিশ লক্ষ বাদ পড়েছে বলে যাঁরা দুঃখ বা উদ্বেগ প্রকাশ করছেন তাঁদের অনেকেরই বক্তব্য ব্যাপারটা দুঃখজনক, কিন্তু ন্যায় কি অন্যায় তা জানি না। খসড়া তালিকা প্রকাশ পাওয়ার পরে উদাসীন বা এন আর সি সমর্থক মানুষের সংখ্যা কিন্তু অনেক বেশি ছিল এই বাংলায়। সেদিক থেকে এখন অবস্থার উন্নতি হয়েছে বলতে হবে। কিন্তু তার একটা বড় কারণ, যা বিজেপির প্রতিক্রিয়া থেকেই পরিষ্কার, তালিকার বাইরে থাকা মানুষদের মধ্যে হিন্দুদের সংখ্যাগরিষ্ঠ হওয়া।

আসামের অনেক হিন্দু বাঙালির মত পশ্চিমবঙ্গের বহু হিন্দু বাঙালিও বিজেপির প্রোপাগাণ্ডায় ভুলে বিশ্বাস করেছিল আসাম রাজ্যটাকে বাংলাদেশ থেকে আগত মুসলমানরা একেবারে দখল করে নিয়েছে, পশ্চিমবঙ্গও “ওদের” দখলে চলে যাচ্ছে। ফল আশানুরূপ না হওয়ায়, উপরন্তু হিন্দুরাই বেশি বাদ পড়ে যাওয়ায় এরা স্তম্ভিত, উৎকণ্ঠিত। ফলে উনিশ লক্ষ দেশহীন মানুষের জন্য হঠাৎ সমবেদনা তৈরি হয়েছে এবং রংচঙে ব্যাকগ্রাউন্ডে লেখা “বাংলায় এন আর সি চাই” বলে যে ফেসবুক স্ট্যাটাসগুলো গত কয়েক বছর ধরে দেখা যাচ্ছিল, নিজেদের বিপদের আশঙ্কায় সেগুলো আর তত চোখে পড়ছে না। উলটে এই অধমের পোস্টে, যারা কাশ্মীরকে শিক্ষা দিতে চেয়েছিল, কাশ্মীরি মেয়েদের বিয়ে করতে পারবে বলে আহ্লাদে আটখানা হয়েছিল (চুয়াত্তর বছর ধরে তো নেহরু আটকে রেখেছিল), তারাও লাইক দিয়ে যাচ্ছে।

এদের নিয়ে ভাবি না। কিন্তু এরাই সব নয়। ব্যক্তিগতভাবে চিনি এমন অনেক হৃদয়বান মানুষকেও দেখছি বলছেন কোনটা ঠিক কোনটা ভুল জানি না। সেই জন্যই এই পোস্টের অবতারণা।

আসামে নাগরিকপঞ্জী নবায়ন করা বন্ধ করা উচিৎ এবং দেশের কোথাও এ জিনিস করা কেন উচিৎ নয় এসব বোঝাতে বহু মানুষ বহুদিন ধরে কাজ করছেন। ফেসবুকে NO NRC নামে একটা গ্রুপও আছে। সেসব দেখতে পারেন, দেখা প্রয়োজনও। কিন্তু সেসব ছাড়া নিজেই কতকগুলো কথা ভেবে দেখুন।

প্রথমত, পৃথিবীর সব রাষ্ট্র তার নাগরিকদের নাগরিকত্বের কিছু প্রমাণপত্র দেয়। ভারত রাষ্ট্রও দেয়। যেমন ভোটার কার্ড, প্যান কার্ড, ড্রাইভিং লাইসেন্স, পাসপোর্ট। এখন আবার সব কার্ডের বাড়া বলা হচ্ছে আধার কার্ডকে। এই প্রমাণপত্রগুলো কিসের প্রমাণ? আপনি যে ভারতের নাগরিক তার প্রমাণ। পৃথিবীর সব দেশই নাগরিকের থেকে তার সেই দেশের নাগরিক হওয়ার প্রমাণই দাবী করে। কিন্তু এন আর সি র কাছে এগুলো কোন প্রমাণই নয়। সেখানে রাষ্ট্র বলছে আপনি এদেশের নাগরিক কিনা তাতে আমার বয়ে গেছে। আপনি বলুন আপনার ঠাকুর্দা, দাদু, দিদিমা, বাবা, মা এঁরা এদেশের নাগরিক ছিলেন কিনা। একে যুক্তি বলে? কতটা পেছোব আমরা? ঠাকুর্দাতেই বা থামা কেন? ২৫শে মার্চ, ১৯৭১ এই বা থামার দরকার কী? ১৫ই আগস্ট, ১৯৪৭ এ আমার পরিবারের যাঁরা জীবিত ছিলেন তাঁরা এ দেশের নাগরিক ছিলেন কিনা জানতে চাইলেই বা ঠেকাচ্ছে কে? ধরুন আগামী দিনে রাষ্ট্র আরো পেছোতে চাইল। বলল ১৮৫৭ র সিপাহী বিদ্রোহ হল আমাদের প্রথম স্বাধীনতার যুদ্ধ। তার আগে আপনার পূর্বপুরুষ এ দেশে ছিলেন কিনা বলুন। না থাকলে আপনি নাগরিক নন। আজ লিগ্যাসি ডকুমেন্ট চাইলে না হয় বাড়ির দলিল, বাবার গ্র‍্যাজুয়েশন সার্টিফিকেট ইত্যাদি দেখাচ্ছেন। তখন পূর্বপুরুষের নামটা খুঁজে পাবেন তো?
জানি এর পালটা যুক্তি হিসাবে বলা হবে ভারতে এত দুর্নীতি যে সীমান্ত পেরিয়ে এসে ভোটার কার্ড ইত্যাদি করিয়ে ফেলা কোন ব্যাপারই নয়। অতএব ওগুলো কোন প্রমাণ নয়। ঠিক কথা। আচ্ছা দুর্নীতিটা কার? রাষ্ট্রেরই তো। ঘুষ নিয়ে সীমান্ত পার করিয়ে দেয় যে সীমান্ত রক্ষী সে রাষ্ট্রের যন্ত্র। রাষ্ট্রেরই অন্য কয়েকটা যন্ত্রের দুর্নীতি ছাড়া আপনি সত্যিকারের নাগরিক না হলে ভোটার, প্যান, পাসপোর্ট, আধার কিছুই বানিয়ে উঠতে পারবেন না। একথা ঠিক যে যে ঘুষ নেয় আর যে ঘুষ দেয় — দুজনেই দোষী। কিন্তু এন আর সি যদি যে ঘুষ দিয়ে নাগরিকত্ব কিনেছে তাকে চিহ্নিত করার এবং শাস্তি দেওয়ার ব্যবস্থা হয়, তাহলে যারা ঘুষ নিয়ে নাগরিকত্ব বিক্রি করেছে তাদের শাস্তি দেওয়ার ব্যবস্থাটা কোথায়? নেই যখন তখন স্পষ্ট যে এই ব্যবস্থা তৈরিই হয়েছে এক পক্ষকে শাস্তি দেওয়ার জন্যে, অর্থাৎ এ অন্যায় ব্যবস্থা।
দ্বিতীয়ত, পৃথিবীর সমস্ত আইনের মূল মন্ত্র হল “Innocent till proved guilty.” অর্থাৎ আপনার বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের হলে যতক্ষণ আপনি দোষী প্রমাণিত না হচ্ছেন ততক্ষণ আপনি নির্দোষ। এন আর সি কিন্তু উলটপুরাণ। রাষ্ট্র ধরেই নিচ্ছে তার কিছু নাগরিক আসলে নাগরিক নয়। তারপর সেই নাগরিককে বলছে “প্রমাণ করো তুমি নাগরিক।” কেন? রাষ্ট্র প্রমাণ করে দেখাক না যে অমুক আসলে অনুপ্রবেশকারী, নাগরিক নয়। “মারতে চাও তো ডাকাও নাকো জল্লাদ। গন্ধ শুঁকে মরতে হবে এ আবার কী আহ্লাদ?”

কিন্তু এ দুটো যুক্তির চেয়েও বড় কথা, এদেশে নাগরিকত্বের একাধিক প্রমাণপত্রের ব্যবস্থা থাকা সত্ত্বেও যদি আমরা জাতীয় নাগরিকপঞ্জী তৈরি করা মেনে নিই, তাহলে রাষ্ট্রকে নাগরিকত্বের সংজ্ঞা ইচ্ছে মত বদলে নেওয়ার অধিকার দিয়ে দেওয়া হয়। ইংরিজিতে যাকে “shifting posts” বলে। এর বিপদটা ভেবে দেখুন। আজ রাষ্ট্র একটা তারিখ বেঁধে দিয়ে বলছে তার আগে যাদের পরিবার এ দেশে ছিল না তারা নাগরিক নয়। কাল বলতেই পারে সকলের ডি এন এ পরীক্ষা করব। যাদের মধ্যে উত্তরে হিমালয় আর দক্ষিণে ভারত মহাসাগরের মাঝের এই ভূখণ্ডের বাইরের জিন পাওয়া যাবে, সে নাগরিক নয়। তাকে ডিটেনশন ক্যাম্পে পাঠানো হবে। তখন রাষ্ট্রের সুবিধা মত এক একটা জনগোষ্ঠী ধরে অনাগরিক ঘোষণা করে দেওয়ার ভারী সুবিধা হবে। এবং সেটা কখন কোন জনগোষ্ঠী, তা কিন্তু ক্ষমতাসীন দলের ইচ্ছাধীন হবে। ফলে কোন জনগোষ্ঠীই নিশ্চিন্ত থাকতে পারবেন না। ভাবছেন নেহাত ভয়ের বেসাতি করছি? মনে রাখবেন, আধার কার্ডের মাধ্যমে আমার আপনার বায়োমেট্রিক তথ্য কিন্তু ইতিমধ্যেই রাষ্ট্রের হাতে।

আসামের নাগরিকপঞ্জীর অবশ্যই একটা ইতিহাস আছে, যা দেশের অন্য কোন রাজ্যের সাথে মেলে না। অসমিয়া জাতি পরিচয়ের আক্রমণাত্মক রাজনীতিকে ধামাচাপা দিতে ১৯৮৫ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধী সেই ইতিহাসটার অপব্যবহার করে ১৯৫১ র নাগরিকপঞ্জী নবায়নের এই গাজরটি ঝুলিয়েছিলেন। আজকের কেন্দ্রীয় সরকারকে এই নিয়ে কিছু বললেই তাঁরা হাত উলটে বলেন “সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে তো হচ্ছে। আমরা তো কিছু করিনি।” যেন সবসময় সব মামলায় সরকার সুপ্রিম কোর্টের বাধ্য ছেলেটি। যেন আইনি বিতর্কের মাধ্যমে আদালতের মত বদলের চেষ্টা করা সরকারের কাজ নয়। অথচ এই সেদিন আধার মামলার সময়ে সরকারী কৌঁসুলি বিচারপতিদের ধমক খেতে খেতেও আধারের জন্যে প্রাণপণ লড়ে গেছেন।
আর বিরোধী দলগুলো? তারা কে জানে কোন প্রণোদনায় কতকগুলো অর্থহীন কথা বলে চলেছে। কংগ্রেসের বিশেষ কিছু বলার মুখ নেই, যেহেতু তাদের নেতাই প্যান্ডোরার এই বাক্সটি খুলে দিয়ে গিয়েছিলেন। তাই তারা কেবল পদ্ধতিগত ত্রুটির প্রশ্ন তুলে বাদ পড়া মানুষের জন্যে অশ্রুপাত করছে। কিন্তু অন্য দলগুলোর ভূমিকাও কম ন্যক্কারজনক নয়। তৃণমূল আজ বাঙালি বাদ না গেলেই খুশি তো কাল গোর্খারা বাদ না গেলেই খুশি। বৃহত্তম বামপন্থী দল আবার প্রকৃত ভারতীয় নাগরিক যেন বাদ না যায় সেদিকে নজর দিতে বলছেন। সরকার কেন খুলে বলছে না যাদের নাগরিকত্ব শেষ অব্দি প্রমাণ হবে না তাদের কী করা হবে — এই নিয়ে চেঁচামেচি করছেন। যেন তাঁরা জানেন না ইতিমধ্যেই আসামের ডিটেনশন ক্যাম্পগুলোতে যাঁরা আছেন তাঁরা কেন আছেন, নির্মীয়মাণ ডিটেনশন ক্যাম্পগুলো কেন বানানো হচ্ছে।

হে মোর দুর্ভাগা দেশ!

ভাবনা করা চলবে না

আপনার যদি গণতন্ত্র নিয়ে বিন্দুমাত্র মাথা ব্যথা থেকে থাকে এবং বিজেপির দেশপ্রেমের চশমা সরিয়ে আপনি যদি ফ্যাসিবাদ দেখতে পেয়ে থাকেন, তাহলে যতবড় বামবিরোধীই হোন না কেন, এই সত্য মেনে না নিয়ে আপনার উপায় নেই যে শুধু বামপন্থীরাই পড়ে আছেন

ফ্যাসিবাদের একটা মহৎ গুণ আছে — অতি উৎকৃষ্ট ছাঁকনির কাজ করে। কেন বলছি?
২০১৯ এর লোকসভা নির্বাচন নানা দিক থেকেই অনন্য ছিল। যেমন ধরুন, বামপন্থী পরিবারে জন্মে, বরাবর বামপন্থী রাজনীতির কাছাকাছি থেকে যা দেখতে পাইনি, এবারের লোকসভা নির্বাচনের আগে পরে তেমন এক ঘটনা দেখলাম। শক্তি কমে আসা বামপন্থীরা দু ভাগে ভাগ হয়ে গেলেন, নিজেদের মধ্যে কোন আদর্শগত মতানৈক্যে নয়, কোন অবাম দলকে সমর্থন করা উচিৎ, কাকে উচিৎ নয় তাই নিয়ে।
এক দল বললেন বিজেপি যেহেতু দেশের সামনে সবচেয়ে বড় বিপদ, তাই ওদের হারাতে সকলের সাথে জোট করতে হবে। তবে কিনা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আর বিজেপির তফাত উনিশ বিশ। তাই ওঁকে বাদ দিয়েই করতে হবে এই জোট। কংগ্রেস অতীতে যা-ই করে থাক, ওদের সাথে থাকতেই হবে এই পরিস্থিতিতে। ওরা আর যা-ই হোক বিজেপি তো নয়। অস্যার্থ, একলা লড়তে ঠিক সাহস পাচ্ছি না। তাছাড়া সারা দেশে লড়ার শক্তিও নেই। অতএব ওরা লড়ুক, বাফারের কাজ করুক। আমরা তো রইলামই।
আরেক দল বামপন্থী উপর্যুক্ত বামেদের প্রবল আক্রমণ করলেন। বললেন ওঁরা ক্ষমতা হারানোর আক্রোশে, ক্ষুদ্র স্বার্থে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে বাদ দিয়ে ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনকে দুর্বল করছেন। বরং মমতার হাতই শক্ত করা উচিৎ। বাঁচালে উনিই পারেন বাঁচাতে। উনিই ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে সবচেয়ে অগ্রণী সৈনিক। অস্যার্থ, আমাদের তো শক্তি নেই। উনি নেতৃত্ব দিন, আমরা লড়ে যাব।
নির্বাচনের ফল বেরোনোর পর দু পক্ষই যে ভুল ছিলেন তা পরিষ্কার হয়ে গেল। দেখা গেল প্রথম দল কংগ্রেসের লড়ার ক্ষমতায় আস্থা রাখলেও ভোটাররা রাখেননি। উলটে কংগ্রেস কী করবে আর কী করবে না তা নিয়ে মাথা ঘামাতে গিয়ে বিজেপি বা মমতার বিরোধী হিসাবে নিজেদের বিশ্বাসযোগ্যতা তলানিতে। যে ভোট নিজেদের ছিল সেগুলো ধরে রাখার কাজটাও ঠিক করে করা হয়নি।
দ্বিতীয় দলের ভোটের হিসাবে হারানোর মত কিছু ছিল না। সম্ভবত সেটাই তৃণমূলের প্রতি অকুণ্ঠ সমর্থনের সবচেয়ে বড় কারণ। ভোটের ফলে দেখা গেল তাঁরা যে নেত্রীর উপর ভরসা করেছিলেন তাঁর উপর ভোটারদের যথেষ্ট ভরসা নেই।
ভোটের আগে বহু বাম এবং মধ্যপন্থী বন্ধুদের সাথে অনলাইন ও অফলাইনে ঝগড়া করেছি এই বলে যে বিজেপিকে আটকাতে হবে এই যুক্তিতে কোনরকম রামধনু জোট করলে কোন লাভ হবে না, বরং বিজেপির কাজ আরো সহজ হবে। এমনিতেই গত কয়েক বছরে ঘরে ঘরে যত্ন করে জমিয়ে তোলা ধর্মান্ধতা, মুসলমানবিদ্বেষের পরিমণ্ডলে অন্য সব ইস্যু যে পেছনে চলে যেতে পারে সেই আশঙ্কা করতে খুব বেশি বুদ্ধির দরকার হয় না। তার উপর বালাকোট যে মানুষকে অন্য সবকিছু ভুলিয়ে দিয়েছে সে তো এতদিনে পরিষ্কার। কিন্তু রামধনু জোট কেন সারা দেশের কোথাও কাজ করল না তার অন্য কারণও তলিয়ে দেখা দরকার। সেটা করা খুব সহজ হয় বিজেপির জয়ের পর যারা এই নির্বাচনে বিজেপিবিরোধী ছিল তাদের কার্যকলাপ পর্যালোচনা করলে।
কংগ্রেসকে দিয়েই শুরু করা যাক। যে বামপন্থী দলগুলো কংগ্রেসকে ঢাল ভেবেছিলেন তাঁরা মধ্যপ্রদেশের কংগ্রেস সরকারের বিজেপিসুলভ কর্মসূচীকে পাত্তাই দেননি। গোশালা বানিয়ে দেব, রাম পথ বানিয়ে দেব — এসব বলে যারা বিধানসভা নির্বাচন জেতে, তাদের যদি ভোটাররা লোকসভায় ভোট না দেন তাতে অবাক হওয়ার কিছু আছে কি? যদি কেউ হিন্দুত্বের জন্যেই ভোট দেবে ঠিক করে, তাহলে আগমার্কা হিন্দুত্বকেই দেবে, নকল হিন্দুত্বকে কেন দেবে? বিধানসভায় নাহয় রাজ্য সরকারের কাজকর্মে রুষ্ট হয়ে কংগ্রেসকে ভোট দেওয়া গেল, লোকসভায় আর কেন? শুধু মধ্যপ্রদেশ? গুজরাটের নির্বাচনের সময়ে বিজেপি প্রশ্ন তুলল “রাহুল গান্ধী কি হিন্দু?” কংগ্রেস উত্তর দিল “উনি শুধু হিন্দু নন, রীতিমত পৈতেওলা হিন্দু।” বামফ্রন্ট (ওটা কি আছে এখনো? বহরমপুর কেন্দ্রে সিপিএম কংগ্রেস প্রার্থীকে সমর্থন করার পরেও?) নেতৃত্ব এই পার্টির হাত ধরে হিন্দুত্বের বিরুদ্ধে লড়বেন ভেবেছিলেন। এসব অবশ্য লোকসভা নির্বাচনের আগের কথা। তারপর থেকে কংগ্রেস কী কী করেছে?
ইউ এ পি এ আইন এবং এন আই এ আইনের সংশোধনী, যেগুলো ব্যক্তির নাগরিক অধিকারে শেষ পেরেক পুঁতেছে এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় রাজ্য সরকারের যে অধিকার তাতে কেন্দ্রীয় হস্তক্ষেপকে বৈধতা দিয়েছে, কংগ্রেস সেই সংশোধনগুলো নিয়ে বিতর্কে নানা গরম গরম কথা বলে শেষে রাজ্যসভায় পক্ষে ভোট দিয়েছে। জম্মু ও কাশ্মীর ইস্যুতে সোনিয়া আর রাহুল গান্ধী সরকারের বিপক্ষে দাঁড়ালেও রোজ কোন না কোন কংগ্রেস নেতা সরকারকে সমর্থন করছেন। এমনকি পি চিদম্বরম গ্রেপ্তার হওয়ার পর থেকে জয়রাম রমেশ, শশী থারুরের মত নেতা, যাঁরা সুললিত ইংরেজিতে গান্ধী, রবীন্দ্রনাথ, আইডিয়া অফ ইন্ডিয়া ইত্যাদি বলে গত কয়েক বছরে প্রচুর হাততালি কুড়িয়েছেন, তাঁরা বলতে শুরু করেছেন মোদীর অবিমিশ্র সমালোচনা করা নাকি ঠিক নয়। সীতারাম ইয়েচুরি, ডি রাজারা ভেবেছিলেন এদের হাত ধরে বিজেপির বিরুদ্ধে লড়বেন।
এবার তৃণমূল কংগ্রেসের কথায় আসা যাক। নকশাল, এস ইউ সি আই প্রভৃতি বামপন্থীরা এই দলটির সর্বোচ্চ নেত্রীকেই মুক্তিসূর্য ভেবেছিলেন, ২০১৬ থেকে পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির সঙ্গে হিন্দুত্বের প্রতিযোগিতায় নেমে পড়া সত্ত্বেও। তা তৃণমূল কী করেছে ভোটের পর থেকে?
এক কথায় বললে মহুয়া মৈত্র একটা মারকাটারি বক্তৃতা দিয়েছেন লোকসভায়। ব্যাস, আর কিচ্ছু না। ইউ এ পি এ আইনের সংশোধনী নিয়ে আলোচনায় বক্তৃতাটি দিয়ে ফেসবুক এবং ইউটিউবে কয়েক হাজার লাইক কুড়ানোর পর তৃণমূল সদলবলে ভোট দিয়েছে সরকারের পক্ষে। আর এন আই এ আইন নিয়ে ভোটাভুটিতে ওয়াক আউট করে পরোক্ষ সমর্থন দিয়েছে। এ তো গেল সংসদের ভেতরের কথা। বাইরে তৃণমূল থেকে বিজেপিতে যাওয়ার ঢল নেমেছে নির্বাচনের পর থেকে। তা আটকাতে অসমর্থ হয়ে শীর্ষ নেত্রীর বিজেপির থেকেও বেশি বিজেপি হওয়ার প্রয়াসও বেড়েছে। বিজেপি অযোধ্যায় রামমন্দির বানাবে, ইনি দীঘায় জগন্নাথ মন্দির বানাবেন বলছেন। একদিকে চা ওয়ালার সাফল্য দেখে চা ওয়ালীকে দাঁড় করানোর চেষ্টা করছেন, অন্যদিকে বরাবরের রণং দেহি মূর্তি বিসর্জন দিয়ে কেন্দ্রের সাথে সংঘাতে যাবেন না বলছেন।
তারপর আসা যাক অখিলেশ আর মায়াবতীর কথায়। দুজনে সব অতীত বৈরিতা ভুলে উত্তরপ্রদেশে একজোট হয়ে লড়েছিলেন। সেই জোটের উপরে আমরা বিজেপিবিরোধীরা সকলেই অনেক আশা (নাকি দুরাশা?) করেছিলাম। পরাস্ত হওয়ার পর থেকে সংসদে আনা সমস্ত অগণতান্ত্রিক বিলে অখিলেশের সমাজবাদী পার্টি আর মায়াবতীর বহুজন সমাজ পার্টি লক্ষ্মী হয়ে সরকারের পক্ষে ভোট দিয়েছে। সংবিধানকে এবং গণতন্ত্রকে বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ দেখিয়ে কাশ্মীরিদের প্রতি যা করা হল, আম্বেদকরের নামে শপথ নেওয়া মায়াবতীর পার্টি তাতেও বিনা বাক্য ব্যয়ে সমর্থন জানিয়েছে।
হিন্দুত্ববাদের সূতিকাগার, মোদী-শাহের ইন্দ্রপ্রস্থ যে গুজরাট, সেখানে তিন মহারথী এক হয়েছিলেন বিজেপিকে হারাবেন বলে। বামপন্থী, আম্বেদকরপন্থী জিগ্নেশ মেওয়ানি হাত মিলিয়েছিলেন চরম প্রতিক্রিয়াশীল উচ্চবর্ণের জন্যে সংরক্ষণ দাবী করা নেতা হার্দিক প্যাটেলের সাথে। এই বিপরীত মেরুর রাজনীতি কী করে মিলতে পারে তা নিয়ে যখন জিগ্নেশকে প্রশ্ন করা হয়েছিল নির্বাচনের আগে, তখন তিনি বলেছিলেন আগে তো বিজেপিকে হারাই, তারপর ওসব বুঝে নেব। বিজেপি বৃহত্তম বিপদ, আগে ওদের হারাতে হবে — এই যুক্তিতে তিনি আবার পশ্চিমবঙ্গের কমিউনিস্টদের পরামর্শ দিয়েছিলেন দিদির হাত শক্ত করতে। ফলাফলে দেখা গেল পরেরটা পরে হবে যুক্তি মানুষ বিশ্বাস করেননি। জিগ্নেশ আর হার্দিকের সঙ্গে জুড়েছিলেন কংগ্রেস নেতা অল্পেশ ঠাকোর। অল্পেশ এখন বিজেপিতে, হার্দিক নির্বাচন কমিশনের বদান্যতায় নির্বাচনে লড়তে না পারার পর থেকে চুপ, জিগ্নেশ একা পড়ে গেছেন।
আর কে বিজেপিবিরোধী ছিলেন? অরবিন্দ কেজরিওয়াল। অর্থাৎ আম আদমি পার্টি। ওঁদের কথা যত কম বলা যায় তত ভাল। দিল্লীতে যে ওঁরা একটা আসনও জিততে পারেননি সেটা বড় কথা নয়। বিজেপির কয়েক হাজার কোটি টাকার নির্বাচনী প্রচার, সাম্প্রদায়িক মেরুকরণ, সমস্ত সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের পার্টিজান কার্যকলাপের মধ্যে আপের মত একটা ছোট পার্টির না জিততে পারা দোষের নয়। কিন্তু বরাবরের লড়াকু কেজরিওয়াল কেমন যেন মিইয়ে গেছেন নির্বাচনের পর থেকে। কেন্দ্রীয় সরকারের বঞ্চনা নিয়ে তাঁর আর কোন বক্তব্য নেই। দিল্লীকে রাজ্যের মর্যাদা দেওয়া হোক এই দাবী তিনি কবে থেকে করে আসছেন। অথচ জম্মু ও কাশ্মীরকে ভেঙে তিন টুকরো করে কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল করে দেওয়া হল, তিনি সমর্থন করলেন।
দেবগৌড়ার দল নিজেদের বিধায়ক, সাংসদ বিক্রি হওয়া আটকাতে পারছেন না, ডি এম কে ও সরকারের বাধ্য সন্তান।
তাহলে বাকি রইল কারা? কাশ্মীরের ন্যাশনাল কনফারেন্স আর হায়দরাবাদের আসাদুদ্দিন ওয়েসিকে (যিনি লম্বা দাড়ি রাখেন আর ফেজ পরেন বলে আমরা মৌলবাদী বলে ধরেই নিয়েছি, যদিও গেরুয়া পরা সাংসদদের দেখে মৌলবাদী মনে হয় না) বাদ দিলে, বাকি রইলেন বামপন্থীরা। আপনার যদি গণতন্ত্র নিয়ে বিন্দুমাত্র মাথা ব্যথা থেকে থাকে এবং বিজেপির দেশপ্রেমের চশমা সরিয়ে আপনি যদি ফ্যাসিবাদ দেখতে পেয়ে থাকেন, তাহলে যতবড় বামবিরোধীই হোন না কেন, এই সত্য মেনে না নিয়ে আপনার উপায় নেই যে শুধু বামপন্থীরাই পড়ে আছেন। বস্তুত, এন আই এ আইনে রাজ্য সরকারকে ঠুঁটো জগন্নাথ আর এন আই এ কে সর্বশক্তিমান করে দেওয়ার বিপক্ষে লোকসভায় ভোট দিয়েছিলেন ঠিক ছজন — চার বাম সাংসদ আর ন্যাশনাল কনফারেন্স এবং ওয়েসি।
ফ্যাসিবাদ ছেঁকে দিয়েছে। এখন থেকে ভারতে তার যত বিরোধিতা হবে, যেটুকু বিরোধিতা হবে তার নেতৃত্ব বামপন্থীদেরই দিতে হবে। তাঁরা চান বা না চান, বিজেপিকে তাত্ত্বিকভাবে ফ্যাসিবাদী বলে মানুন বা না মানুন। কারণ বাফারগুলো আর নেই, আর থাকবে না। কেউ সি বি আই, ই ডি ওষুধে জব্দ, কেউ নিজের ক্ষমতাটুকু ধরে রাখতে পারলেই খুশি, কাউকে স্রেফ কিনে নেওয়া গেছে এবং যাবে। কিন্তু বামপন্থীদের দিকে সিবিআই, ই ডি লেলিয়ে দেওয়া যাচ্ছে না, কারণ তাঁদের দুর্নীতি নেই। পশ্চিমবঙ্গের কিছু সেজ নেতা ছাড়া কাউকে কিনে ফেলাও যাচ্ছে না।
এই পর্যন্ত পড়ে আপনি তেলে বেগুনে জ্বলে উঠবেন, কারণ চৌত্রিশ বছরের বাম শাসনে সিপিএমের দুর্নীতিগ্রস্ত এল সি এস, পঞ্চায়েত সদস্য, পঞ্চায়েত প্রধানের মুখ আপনার মনে পড়বে, পড়া সঙ্গত। কিন্তু মনে রাখবেন, ভারতে এ পর্যন্ত ক্ষমতার স্বাদ পেয়েছে যে দুটি বামপন্থী দল, তাদের আমলে সরকারী স্তরে দুর্নীতি ভারতের অন্য যে কোন রাজ্যের চেয়ে কম৷ আর কোন দলে আপনি বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য বা মানিক সরকার বা পিনারাই বিজয়নের মত জীবনযাত্রার মুখ্যমন্ত্রী দেখাতে পারবেন কি? ইন্দ্রজিৎ গুপ্তের মত সৎ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ভারতে কজন পাওয়া গেছে বাজার অর্থনীতির যুগে? সদ্যপ্রয়াত নকশাল নেতা এ কে রায় বা শঙ্কর গুহনিয়োগীর কথা নাহয় না-ই বললাম। না-ই আলোচনা করলাম যুক্তফ্রন্ট সরকারের শ্রমমন্ত্রী এস ইউ সি আই নেতা সুবোধ ব্যানার্জির কথা। তাঁরা তো প্রাগৈতিহাসিক লোক বলে গণ্য হন আজকাল।
এখন প্রশ্ন, বামপন্থীরা লড়বেন কী করে? কতটুকু শক্তি তাঁদের? আর এস এস (বিজেপি তো ফ্রন্ট মাত্র) নামক কর্পোরেটপুষ্ট বেহেমথের সামনে তাঁরা কতটুকু? যদি বামপন্থী বলতে ক্রমহ্রাসমান সিপিএম বোঝেন তাহলে সত্যিই তাঁরা পারবেন না। যদি সীমিত সাংগঠনিক শক্তির সি পি আই বোঝেন তাহলে তাঁরাও পারবেন না। যদি আলাদা করে সি পি আই (এম-এল) লিবারেশন বোঝেন তাহলে নিঃসংশয়ে বলা যায় তাঁরাও পারবেন না। কিছু কিছু অঞ্চলে শক্তিশালী এস ইউ সি আই বা আর এস পি, ফরোয়ার্ড ব্লক — এঁরা কেউই পারবেন না। কিন্তু এঁরা সকলে যদি একত্র হন, তাহলে শক্তিটা উড়িয়ে দেওয়ার মত হয় না। এঁরা এক হলেই কি জিতে যাবেন? বা জনসমর্থন পাবেন? এক এক করে উত্তর ভাবা যাক।
কে যেন বলেছেন “I do not fight fascists because I will win. I fight fascists because they are fascists.” এই মুহূর্তে এর চেয়ে বড় কথা নেই। সমস্ত বামপন্থী শুধু নয়, সমস্ত গণতন্ত্রপ্রিয় দেশপ্রেমিক মানুষেরই এই কথাটাই শিরোধার্য করা দরকার। বড় কথা হল সমস্ত বামপন্থী এক হতে পারবেন কিনা।
লোকসভা নির্বাচনের আগে ৩রা ফেব্রুয়ারি বামফ্রন্টের ডাকা ব্রিগেড সমাবেশে লিবারেশন নেতা দীপঙ্কর ভট্টাচার্যের উপস্থিতিকে বৃহত্তর বাম ঐক্যের পূর্বাভাস বলে যাঁরা আশা করেছিলেন, অচিরেই তাঁদের ভুল ভেঙে যায় কংগ্রেসের সঙ্গে আসন সমঝোতা নিয়ে সিপিএমের উদগ্রীব উন্মাদনায়। আজকের সঙ্কটেও, ভয় হয়, বাম ঐক্যের চেয়ে বৃহত্তম বামপন্থী দলটির নেতৃত্বের কাছে ক্ষয়িষ্ণু কংগ্রেসের সখ্য বেশি প্রার্থনীয় না হয়। আরো আশঙ্কা এই যে ঐক্যের প্রচেষ্টা হলে হয়ত লিবারেশন কর্মীরা বলবেন “অমুক বছর যে আমাদের অমুক কমরেডকে ওরা মেরেছিল?” প্রত্যুত্তরে সিপিএম কর্মীরাও অনুরূপ হিংসার ইতিহাস তুলে ধরবেন। এস ইউ সি আই বলবেন “সিপিএম সংশোধনবাদী”, আর সিপিএম বলবেন “ওরা আবেগসর্বস্ব অতি বাম। বিপ্লবের পক্ষে ক্ষতিকর।”
এই যদি চলতে থাকে, তাহলে ভারতে বামপন্থী বলে আর কেউ তো থাকবেই না, বর্তমান পরিস্থিতিতে বলা যায় ভারত ব্যাপারটাই আর থাকবে না।
এবার জনসমর্থনের প্রশ্ন। বামপন্থীরা সমর্থন পাবেন, কিন্তু পেতে গেলে ঠিক করতে হবে কাদের সমর্থন চাইছেন। সকলের সমর্থন কথাটার আজ আর কোন মানে নেই। ভারতে এখন ঔপনিবেশিক শাসন চলছে না। হিন্দু ফ্যাসিবাদ বাইরে থেকে আসা জিনিস নয়। তাই একে পরাস্ত করতে মহাত্মা গান্ধী যেরকম দল মত ধর্ম জাতি নির্বিশেষে সব ভারতবাসীকে এক করতে চেষ্টা করেছিলেন, সেরকম প্রচেষ্টার কোন মানে হয় না। স্পষ্টতই ভারতে যে সামাজিক ওলট পালট হয়নি অথচ হওয়া উচিৎ ছিল ইতিহাসের নিয়মে, এখন তারই সময়। অর্থাৎ এখন পক্ষ নেওয়ার সময়। বামপন্থীরা, যদি সত্যিই বামপন্থী হন, তাহলে আক্রান্ত ধর্মীয় সংখ্যালঘুর পক্ষ নেবেন। নিম্নবর্ণের মানুষের পক্ষ নেবেন। সারা পৃথিবীতে, আমাদের দেশে তো বটেই, জঙ্গল এবং বন্যপ্রাণকে গ্রাস করতে উদ্যত পুঁজিবাদ। পুরো গ্রহটারই ধ্বংস সাধনে উদ্যত, সরকারপুষ্ট বৃহৎ পুঁজি। ধ্বংস থেকে বাঁচতে হলে অরণ্যের অধিকার অরণ্যবাসীদের হাতে ফিরিয়ে দেওয়া অবশ্য কর্তব্য। তাই বামপন্থীদের আদিবাসীদের পক্ষেও অবশ্যই থাকতে হবে।
সব মিলিয়ে এঁরাই কিন্তু এদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ। তবে এঁদের পক্ষে দাঁড়াতে হলে বামপন্থীদের দীর্ঘকাল সমর্থন করতেন এমন অনেক মানুষের সমর্থন হারানোর ঝুঁকিও কিন্তু নিতে হবে। গোড়াতেই বলেছি ফ্যাসিবাদ অতি উৎকৃষ্ট ছাঁকনি। সেকথা শুধু রাজনৈতিক দলগুলোর ক্ষেত্রে সত্যি তা নয়। চারপাশে তাকালেই দেখা যাচ্ছে, জীবনে কখনো বামপন্থীদের ছাড়া অন্য কাউকে ভোট দেননি এমন বহু মানুষের সুপ্ত মুসলমানবিদ্বেষ কেমন বেরিয়ে এসেছে। পশ্চিমবঙ্গের বামপন্থীদের ভোট এক লহমায় ২৩% থেকে ৭% এ নেমে আসার পেছনে এঁরা বড় কারণ। অবশিষ্ট সাত শতাংশের অনেকেও যে “কাশ্মীরকে বেশ টাইট দেওয়া গেছে” ভাবছেন না এমনটা জোর দিয়ে বলা যাচ্ছে না। অদূর ভবিষ্যতে ফ্যাসিবাদীরা আরো সূক্ষ্ম ছাঁকনি প্রয়োগ করতে চলেছে। শিক্ষা ক্ষেত্রে এবং চাকরিতে বর্ণভিত্তিক সংরক্ষণ তুলে দেওয়া হবে। তাতে যে বহু বাম সমর্থক উচ্চবর্ণের মানুষই উল্লসিত হবেন তা পরিষ্কার। বর্ণবাদকে আলাদা করে বোঝার প্রয়োজন নেই, শ্রেণীর লড়াই ছাড়া আর কোন লড়াই নেই — এই ভ্রান্তির ফল তখন বামপন্থীদের ভুগতে হবে। অর্থাৎ আরো অনেক সাবেকি সমর্থক সরে যাবেন। বামপন্থীরা সে ঝুঁকি নেবেন তো? এখন অবশ্য তাঁদের আর হারানোর কিছুই নেই। আর কবি তো বলেছেনই “তোর আপনজনে ছাড়বে তোরে। তা বলে ভাবনা করা চলবে না।”

কাটমানির স্বপ্নভঙ্গ?

যে শিল্পী একসময় আমাদের বলতেন “চল যাব তোকে নিয়ে, এই নরকের অনেক দূরে। এই মিথ্যে কথার মেকি শহরের সীমানা ছাড়িয়ে”, তাঁর সবচেয়ে বড় মঞ্চ হয়ে দাঁড়াল একুশে জুলাইয়ের মঞ্চ

বয়ঃসন্ধির প্রেম একতরফা হলেও বিশুদ্ধ। অন্তত আমাদের বয়ঃসন্ধির প্রেম তেমনই ছিল। কারণ আমাদের স্মার্টফোন ছিল না, তাতে সুলভ পর্নোগ্রাফি ছিল না, সম্ভবত সে জন্যেই অ্যাসিড দিয়ে বাথরুম পরিষ্কার করা ছাড়া আর কিছু করা যায় আমরা ভেবে উঠতে পারতাম না। তা সেই বয়ঃসন্ধির প্রেম নিয়ে সবচেয়ে জীবন্ত, হৃদপিণ্ড ছিন্নভিন্ন করে দেওয়া গানটা লিখেছিলেন নচিকেতা। সে বয়সে তাঁর নীলাঞ্জনা আর আমাদের নীলাঞ্জনারা অভিন্ন ছিল।
শুধু প্রেম নয়, বয়ঃসন্ধির সবকিছুই মানুষের বহুকাল প্রিয় থাকে। হয়ত ওখানেই শৈশবের শেষ বলে। নচিকেতার জন্যেও তাই আমাদের প্রজন্মের অনেকের মনে একটা বিশেষ জায়গা আছে বা ছিল। শিল্পমূল্যে কবীর সুমন (সেযুগের সুমন চট্টোপাধ্যায়) অনেক এগিয়ে। কিন্তু নব্বইয়ের দশকে পশ্চিমবঙ্গের গ্রামে, মফঃস্বলে ছড়িয়ে থাকা মানুষের মনের কথা প্রায় তাঁদের ভাষায় গানের মাধ্যমে বলার ক্ষেত্রে নচিকেতার জুড়ি ছিল না। এবং সেটা বয়সের বাধা অতিক্রম করে। নচিকেতা আমাদের যেমন নীলাঞ্জনা দিয়েছিলেন, দাদু দিদাদের বৃদ্ধাশ্রম দিয়েছিলেন; শাপভ্রষ্ট বাবা, কাকাদের অনির্বাণ দিয়েছিলেন। অস্বীকার করবে কোন মূর্খ? আমরা সলিল চৌধুরীর যুগের লোক নই। আমাদের জন্যে কেউ ঘুমভাঙার গান লেখেনি। আলোর স্পর্শে দুঃখের কাল কেটে যাবে সেই স্বপ্ন আমরা দেখিনি, কারণ পরীক্ষায় ফার্স্ট হওয়া ছাড়া আর কোন স্বপ্ন দেখতে শেখানোই হয়নি। প্রতিবাদের ভাষা বলতে আমরা তাই “শুনব না গান, গান শুনব না” বুঝেছি। সেই ভাষা নচিকেতাই যুগিয়েছিলেন।
সেই জায়গাটা নচিকেতা ধরে রাখতে পারতেন অনায়াসেই। কিন্তু ঐ যে অনেকে বলে, আপনি হয় যৌবনেই বিদ্রোহীর মৃত্যু বরণ করতে পারেন নয় দীর্ঘজীবী প্রতিক্রিয়াশীল হয়ে উঠতে পারেন। কথাটা নচিকেতার ক্ষেত্রে এমন নিদারুণ সত্যি হয়ে উঠবে ভাবতে পারিনি।
বেশ মনে আছে, জনপ্রিয়তার তুঙ্গে থাকার সময়ে আমাদের কোন্নগর রবীন্দ্রভবনে একবার গাইতে এসেছেন, এক প্রবীণ সিপিএম নেতাকে অনুষ্ঠান শেষে তরুণ পার্টিকর্মী উচ্ছ্বসিত হয়ে বললেন “যা পপুলারিটি, ভোটে দাঁড় করায় দিলে ড্যাং ড্যাং কইর‍্যা জিত্যা যাইব।” সুভাষ চক্রবর্তীর সাথে নচিকেতার ঘনিষ্ঠতা ততদিনে সুবিদিত। জানি না ইঙ্গিতটা সেদিকেই ছিল কিনা, তবে সি পি আই (এম) শেষ পর্যন্ত নচিকেতার জনপ্রিয়তাকে নির্বাচনী লড়াইয়ে ব্যবহার করেনি। রাজ্যে যখন পরিবর্তনের হাওয়া বইতে শুরু করল তখন আরো অনেক ছোট বড় বিখ্যাত লোকের মতই নচিকেতাও পরিবর্তনপন্থী হয়ে উঠলেন। বামফ্রন্ট সমর্থক হিসাবে দুঃখ পেয়েছিলাম কিন্তু সঙ্গে এও মনে হয়েছিল যে হয়ত তিনি বামফ্রন্টের দলগুলির বিচ্যুতিতে ব্যথিত, বিরক্ত একজন বামপন্থী। ভুল জায়গায় নিস্তার খুঁজছেন। ভুল তো আমি, আপনি সকলেই করি। তাছাড়া ২০০৮-০৯ থেকে মমতার প্রতি বামফ্রন্টের বাইরের বামেদের প্রকাশ্য ও গোপন সমর্থন তো ছিলই। আর তাঁর বিভিন্ন গান শুনে নকশালপন্থীদের প্রতি নচিকেতার সমর্থন বুঝে নিতেও খুব অসুবিধা হত না। তাই সান্ত্বনা ছিল।
সে সান্ত্বনা অবশ্য দ্রুত অন্তর্হিত শুরু করল যখন দেখা গেল নচিকেতার মনকাড়া গান কমে আসছে, বেড়ে যাচ্ছে রেল দপ্তরের বিভিন্ন জলসায় তাঁর অনুষ্ঠান। রেলমন্ত্রী তখন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। পরিবর্তনের সরকার আসার পরে মন ছুঁয়ে যাওয়া গান কমা আর অনুষ্ঠান বাড়া আরো ত্বরান্বিত হল। যে শিল্পী একসময় আমাদের বলতেন “চল যাব তোকে নিয়ে, এই নরকের অনেক দূরে। এই মিথ্যে কথার মেকি শহরের সীমানা ছাড়িয়ে”, তাঁর সবচেয়ে বড় মঞ্চ হয়ে দাঁড়াল একুশে জুলাইয়ের মঞ্চ। একজন শিল্পী, তিনি বাম ডান যা-ই হোন, যখন নিজের শিল্পকে অপ্রধান করে ফেলেন, যখন তাঁর রাজনীতি তাঁর শিল্পের মধ্যে দিয়ে নয়, অন্য পথে প্রকাশ খোঁজে তখন তাঁকে সন্দেহ করতেই হয়। ভাঁড়ার খালি হয়ে গেছে বলে গানের ভান করে আখের গোছাচ্ছেন — এই সন্দেহ আর অমূলক থাকে না তখন। সেই সন্দেহই ক্রমশ প্রবল হয়েছে গত কয়েক বছরে। আর এখন, যখন পশ্চিমবঙ্গে আরেক পালাবদলের কালো মেঘ দেখা যাচ্ছে, তখন কাটমানি নিয়ে তাঁর গান সেই সন্দেহকে আরো বাড়িয়েই তুলল।
মানুষ ভুল করে, আবার মানুষই সেই ভুল সংশোধন করে। সে দিক থেকে মত পরিবর্তন করার অধিকার সব মানুষেরই আছে, একজন শিল্পীর তো আছে বটেই। সুতরাং নচিকেতা একবার মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে সমর্থন করেছেন বলেই যে সারাজীবন করে যেতে হবে একথা বলার নিশ্চয়ই মানে হয় না। শিল্পীকে চারপাশ সম্পর্কে সচেতন হতেই হবে এবং শেষ অব্দি নিজের বিবেকের বাণী শুনতেই হবে। কিন্তু মুশকিল হল যে সরকারঘনিষ্ঠ শিল্পীদের বিবেক একমাত্র উল্টোদিকে শক্তিশালী (সে যে উপায়েই শক্তিশালী হোক) বিরোধী দল থাকলে তবেই জাগ্রত হয়, তাদের বিবেককে যাত্রার বিবেকের চেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া যায় না।
আজ সকালের কাগজে দেখলাম নচিকেতা সাফাই দিয়েছেন, গানটা সারা দেশের দুর্নীতিগ্রস্ত নেতা নেত্রীদেরই বিরুদ্ধে। এবারেও একুশে জুলাইয়ের মঞ্চে তাঁকে দেখা যাবে কিনা জিজ্ঞেস করলে বলেছেন দিদি ডাকলে তিনি নরকেও চলে যাবেন। কারণ ব্যক্তিগত সম্পর্কই তাঁর কাছে আসল, পার্টি কোন ব্যাপার না। কথাটা কেমন সিগারেটের প্যাকেটের বিধিসম্মত সতর্কীকরণের মত শোনাল না? কাল সুভাষদার সাথে সম্পর্ক ভাল ছিল বলে উনি সিপিএমের ছিলেন, আজ দিদির জন্যে উনি তৃণমূলের, কাল অন্য কোন দাদার জন্যে বিজেপির হয়ে যেতেই পারেন — এমনটাই কি বলতে চাইলেন জীবনমুখী শিল্পী?

পুনশ্চ: সেদিন দেখি আমার নীলাঞ্জনা বাজার করছে। মাছ, মাংস, সবজি বিক্রেতাদের সাথে তার কথা বলার ধরণ দেখে অবাক হয়ে ভাবলাম “একে নিয়ে কবিতা লিখতাম!”

বাধাই হো

ডেভেলাপমেন্টের ভাষা এমোন আচ্ছা সে সিখাবো যে নকরির গঙ্গা মাইয়া এসে যাবেন ওয়েস্ট বেঙ্গালে

পাশ্চিমবাঙ্গালের জানাগাণকে আনেক আনেক বাধাই। উয়ো তেইস তারিখ সে ভাবছি বাধাই দেবো, কিন্তু একটু দেরী হোয়ে গেলো। আমাকে শামা কারিয়ে দেবেন। এখোন তো আপনাদের সোনার সোমোয়, দোনো হাথ মে লাড্ডু। এখোন আপনারা এইটুকু গালতি মাফ কারিয়ে দিতে পারবেন।
আপনাদের ভালোবাষায় আমাদের ভোটবাক্সা একদম ভরে গেছে। আমরা আপনাদের এই ভালোবাষার বদলা বিলকুল সুদসামেত চুকতা কারিয়ে দেব। আপনাদের ছেলেমেয়েরা আনেক দিন ধরে এন্টি ডেভেলাপমেন্ট ভাষা সিখে বিলকুল বাকোয়াস তৈরি হোচ্ছে। আভি ওদের সব্বাইকে আমরা ডেভেলাপমেন্টের ভাষা এমোন আচ্ছা সে সিখাবো যে নকরির গঙ্গা মাইয়া এসে যাবেন ওয়েস্ট বেঙ্গালে।
হাঁ, ইয়ে সাচ বাত আছে কি দেশ মে বেকারি বহুত বেড়ে গেছে। পিছলে পঁয়তাল্লিশ সাল মে ইতনি বেকারি ছিলো না। লেকিন ওটা নিয়ে আপনারা একদম ভাববেন না। সব জায়গায় কিছু এন্টি নেসনাল আদমি থাকে, বেঙ্গালে থোড়া জিয়াদা আছে। ওরাই ইয়ে সব নিয়ে কথা বলছে। আপনারা ওদেরকে এই ভোটে যা থাপ্পাড় দিয়েছেন তার রিওয়ার্ড তো পাবেনই। জালদি আমরা বেঙ্গাল থেকে এন্টি নেসনালদের আউট কারিয়ে দেব। সাব উয়িদেশ থেকে ঘুসপেটি হয়ে ঢুকে আছে আর ওদেরই জন্যে আপনাদের নকরি হচ্ছে না।
বাই দা ওয়ে, আপনারা সাউথ ইন্ডিয়ার এন্টি নেসনালদের কোথায় একদম ভুলবেন না। ওরা ডেভেলাপমেন্ট চায় না। ইসি লিয়ে ওদের নেসনাল লেঙ্গুয়েজ নিয়ে বহুত প্রবলেম আছে। ওরা একদম বেকওয়ার্ড স্টেটস আছে। আপনাদের বেঙ্গালের যে একটা এন্টি নেসনাল ইকনমিস্ট আছে কি সেন? ওনার তৈরি কি সব আনাপ শানাপ ইনডেক্সে ওরা উপর দিকে আছে, লেকিন ভেদিক ইকনমিক্সে ওরা একদম ফেল আছে। রামায়ণ, মাহাভারাত কিচ্ছু ওরা মানে না। রাভাণ, মাহিষাসুরের মত ভিলেনদের ওরা পুজা করে। ওদেরকে ফালো করবেন তো কিচ্ছু ডেভেলাপমেন্ট হোবে না।
পার আমাদের বেঙ্গালিদের উপর ভিশোয়াস আছে। বেঙ্গালিরা সুইসাইড কোরবে না, তাদের মোদ্দে আনেক ইনটেলিজেন্ট মাইন্ডস আছে। আমাদের গালতি ভি সোশাল মিডিয়ায় ওরা এমোন ডিফেন্ড করে দেয় যে আমরা ভাবি “আরে ইয়ে তো গালতি থা হি নহি।“
উপার সে ইতনে সাল বাদ আমরা আপনাদের পার্টিশানের বদলা নেয়ার চান্স দিচ্ছি। আপনারা ছেড়ে দিবেন? রাভিন্দ্রনাথ টেগোর বোলেন, বাঙ্কিমচান্দ্র চাট্টোপাধ্যায় বোলেন, সোকোলেই বেঙ্গালিদের সাওধান করেছেন টার্মাইটদের বিরুদ্ধে। গদ্দার কমনিস্ট আর মমতাজ বেগম আপনাদের কাছে উয়ো সব লুকিয়ে রেখেছিল। এখোন আমরা ইতিহাস নয়া তারিকে সে লিখব তো দেখতে পাবেন।
বেঙ্গালি হিস্ট্রিতে লেকিন আনেক গদ্দার ভি আছে। ওদের এলমিনেট কোরতে হোবে। রামমোহান রয় আছে, ভিদিয়াসাগর আছে। হিন্দুধার্মের এরা যা শাতি কোরেছেন সব আমাদের রিভার্স কোরতে হোবে। তারপর মাইকেল মাদসুদান আছে। ক্রিশ্চান মিশনারিদের টাকায় রামজির বহুত বেইজতি কোরেছে। উসকা ভি উইচার আমরা কোরব। আর কোন কোন বেঙ্গালি এন্টি হিন্দুস্তান কাম করেছে উয়ো দেখার কাম আমরা কানভার্টেড বুদ্ধিজীউয়ীদের দিয়েছি। ওনাদের আর্ডিনারি বুদ্ধি নহি, এক্সট্রা আর্ডিনারি বুদ্ধি। সেগুলোর ইউজ কোরে নিতে হোবে। বাদ মে ওদের জন্যে ভি ডিটেনশন কেম্প হোবে। আমরা কোন বেঙ্গালির সাথে আন্যায় হোতে দিবো না, আপনারা দেখে নিবেন।
মনে রাখবেন, যারা দুর্গা মায়ের পূজা কোরে, রাষ্ট্রভাষা বোলে, তাদের কোন ভয় নাই। ভয় পাবে সির্ফ ভারত মাতার শত্রুরা।
ফির একবার সব বেঙ্গালিকে বহুত বহুত বাধাই।

ব্যর্থ নমস্কার

বিদ্যাসাগরের প্রতিকৃতিরও কম অসম্মান কলকাতার বুকে মূর্তি ভাঙার আগে থেকেই হয়নি। লুকিয়ে চুরিয়ে হয়নি, আমার আপনার চোখের সামনেই হয়েছে

প্রথমে ভেবেছিলাম এই বিষয়ে একটা লাইনও লিখব না। প্রবৃত্তি হচ্ছিল না। বাস্তবিক যা ঘটেছে এবং ঘটছে তা দেখে বমি পাচ্ছিল। কিন্তু শেষ অব্দি ভেবে দেখলাম ইতরামির স্বর্ণযুগে প্রবৃত্তির দোহাই দিয়ে চুপ করে থাকা অপরাধমূলক কাজ। যারা ভালবাসো, অন্তর হতে বিদ্বেষ বিষ নাশো ইত্যাদি ভাল ভাল কথা বলেছিলেন, দুর্দিনে দাঁড়িয়ে আমাদের কবীন্দ্র স্বয়ং তাঁদের ব্যর্থ নমস্কারে ফিরিয়ে দিয়েছেন। আমি কোন হরিদাস পাল? তাই সংক্ষেপে কয়েকটা কথা বমি করার মত করেই উগরে দিই।
ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের মূর্তি কেন ভাঙা হয়েছে তা নিয়ে কোন সন্দেহের অবকাশ নেই। অত বিশালকায় বাঙালি আর কে-ই বা আছেন? ওঁকে না ভাঙলে বাংলাকে কী করে ভাঙা যাবে? আমার নিজের অন্তত কারা ভেঙেছে তা নিয়েও কোন সন্দেহ নেই, যতক্ষণ না তদন্ত অন্যরকম প্রমাণ করছে। কিন্তু বলার কথা এই যে বাঙালির ভণ্ডামি যারা মূর্তি ভেঙেছে তাদেরই হাত শক্ত করছে।
যত লোক ফেসবুকে বিদ্যাসাগরকে ডিপি বানিয়েছে তার অর্ধেকও যদি ফেসবুকে বাংলায় পোস্ট করার অভ্যাস রাখত, হোয়াটস্যাপে বাংলায় চ্যাট করত তাহলে বাংলার রাজধানীতে বিদ্যাসাগরের মূর্তি ভাঙার সাহস কারো হত না। কলকাতা জুড়ে কয়েকশো ইংরিজি মাধ্যম স্কুল। সেই স্কুলে পাঠরত লক্ষ লক্ষ বাঙালি ছেলেমেয়ে যদি অন্তত দ্বিতীয় ভাষা হিসাবেও বাংলা পড়ত, তাহলে আমাদের বিদ্যাসাগরকে নিয়ে গদগদ হওয়ার একটা মানে থাকত। কিন্তু তারা পড়ে হিন্দি। বাবা-মায়েরা গর্ব করেন “জানেন দাদা, আমার ছেলের বাংলাটা ঠিক আসে না।“ এদিকে বিদ্যাসাগরের মূর্তি ভাঙা হয়েছে বলে লোকে কেঁদে ভাসাচ্ছে।
রাজ্যের বাংলা মাধ্যম স্কুলগুলো শিক্ষক শিক্ষিকার অভাবে ধুঁকছে, ছাত্রছাত্রীর অভাবে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। বেশিদিন আগের কথা নয়, স্বয়ং বিদ্যাসাগরের প্রতিষ্ঠা করা স্কুল বন্ধ হয়ে যেতে বসেছিল। আমাদের মধ্যে যাঁদের কথা কম, কাজ বেশি তাঁরা আপাতত বাঁচিয়েছেন। আমরা কেউ সেসব নিয়ে ভাবি? বিদ্যাসাগর অবিভক্ত বাংলায় ঘুরে ঘুরে স্কুল স্থাপন করেছিলেন। কেন? যাতে শিক্ষার আলো সবচেয়ে প্রত্যন্ত গ্রামে, সবচেয়ে গরীব মানুষটার ঘরেও পৌঁছায়। এবং সেটা সম্ভব একমাত্র জোরালো সরকারপোষিত শিক্ষাব্যবস্থা থাকলে তবেই। অথচ আমাদের এখানে সরকারী শিক্ষাব্যবস্থার মুমূর্ষু অবস্থা নিয়ে আমাদের কারোর মাথা ব্যথা আছে? বেসরকারী স্কুলগুলোর বেশি ফি এর জন্যে মুখ্যমন্ত্রী একদিন মালিকদের ডেকে ধমকালেই তো আমরা খুশি। বিদ্যাসাগরের শিক্ষা গোল্লায় যাক, যতক্ষণ হাতে কলমে মূর্তি না ভাঙা হচ্ছে ততক্ষণ সব ঠিক আছে। মাস দুয়েক আগে কলকাতা শহরের বুকে শিক্ষক পদপ্রার্থীরা রোদ বৃষ্টি মাথায় করে না খেয়ে রাস্তায় বসেছিলেন। একদিন দুদিন নয়, আঠাশ দিন। কজন গিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন আর কটা ফেসবুক পোস্ট দেখেছি পরিষ্কার মনে আছে। শিক্ষকের দুঃখে যার প্রাণ কাঁদে না সে কিরকম বিদ্যাসাগরপ্রেমী?
আরো মোটা দাগে বলব? বিদ্যাসাগরের প্রতিকৃতিরও কম অসম্মান কলকাতার বুকে মূর্তি ভাঙার আগে থেকেই হয়নি। লুকিয়ে চুরিয়ে হয়নি, আমার আপনার চোখের সামনেই হয়েছে। আমরা প্রতিবাদ করিনি, আমাদের অগ্রগামী শিল্পী, সাহিত্যিক, অধ্যাপকরাও করেননি। গোটা শহর ছেয়ে গেছে বিভিন্ন মনীষীদের উক্তি সম্বলিত হোর্ডিংয়ে, যার মধ্যে বিদ্যাসাগরও আছেন। সঙ্গের ছবিটি কিন্তু সেই মনীষীদের নয়, মাননীয়া মুখ্যমন্ত্রীর। আরেক ধরণের হোর্ডিংয়ে বাংলার মনীষীদের সঙ্গে এক সারিতে বসানো হয়েছে মুখ্যমন্ত্রীকে। সেই হোর্ডিংও আলো (বা অন্ধকার) করে রেখেছে শহরের আকাশ। কারো মনে হয়নি ব্যাপারটা অন্যায়, অশ্লীল? বাঙালি সংস্কৃতির উপর আঘাত? আমরা কি অপেক্ষা করছিলাম কবে বিদাসাগরের মুন্ডুটা আছড়ে মাটিতে ফেলা হবে তার জন্যে?
আর একটা কথা বলার আছে। বাংলার সংস্কৃতি আক্রান্ত সন্দেহ নেই। কিন্তু চট করে ব্যাপারটা যেরকম বাঙালি বনাম অবাঙালি করে ফেলা হয়েছে তা শুধু সঙ্কটটাকে গুলিয়ে দেওয়ার চেষ্টা। লড়াইটা আসলে ভাল বনাম মন্দের, বাঙালি বনাম অবাঙালির নয়। বাঙালিকে নিজভূমে পরবাসী হতে কেউ জোর করেনি।
অফিসে কাজ করতে করতে ক্ষিদে পেলে সুইগি অ্যাপের মাধ্যমে খাবার আনাই। গত এক দেড় মাসে দুবার দুজন ডেলিভারি বয় খাবার নিয়ে এসে আমাকে ফোন করে হিন্দিতে কথা বলেছে। একজনের পদবী হালদার, অন্যজনের সাহা। তবু নিশ্চিত হওয়ার জন্যে তাঁদের জিজ্ঞেস করেছিলাম “ভাই, আপনি বাঙালি তো?” সদর্থক উত্তর পেয়ে জানতে চেয়েছিলাম আমার পদবি বন্দ্যোপাধ্যায় দেখেও কেন হিন্দিতে কথা বললেন। দুজনেই জানালেন আজকাল বাঙালি খদ্দেররা নাকি বাংলায় কথা বললে বুঝতেই পারেন না। এ জিনিস বাঙালিকে বড়বাজারের গদির কোন মারোয়াড়ি শেখাননি, ভবানীপুরের পাঞ্জাবীরাও শেখাননি। ঠিক যেমন বাঙালি মেয়ের বিয়েতে সঙ্গীত করতে হবে এমনটা কোন অবাঙালি মাথায় বন্দুক ঠেকিয়ে দাবী করেননি, বাঙালি বর বৌভাতে শেরওয়ানি না পরলে ভোটার লিস্ট থেকে নাম কেটে দেওয়া হবে, এমনটাও কোন অবাঙালি রাজনীতিবিদ হুমকি দেননি। হিন্দিকে বাংলার মাথায় চাপিয়েছে বাঙালি নিজেই। যে কারণে শহুরে, লেখাপড়া জানা বাঙালির বিদ্যাসাগরের জন্যে এই হঠাৎ আবেগকে মড়াকান্নার বেশি কিছু বলা শক্ত।
বাঙালি সংস্কৃতির উপর আঘাত করা শুরু হয়েছে তখন থেকে যখন বাংলার অধিকাংশ ইসলাম ধর্মাবলম্বী মানুষের মাতৃভাষা বাংলা হওয়া সত্ত্বেও যেখানে সেখানে রাজনৈতিক হোর্ডিং লেখা শুরু হয়েছে উর্দুতে। প্রবল আঘাত করা হয়েছে তখন যখন হিন্দি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করা হয়েছে। বিরাট আঘাত নেমে এসেছে তখন যখন কলকাতার আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব প্রাঙ্গণে সত্যজিৎ রায়, ঋত্বিক ঘটক, মৃণাল সেন, তপন সিংহ, অজয় কর, নিদেনপক্ষে উত্তম কুমার বা সুচিত্রা সেনের বদলে চলচ্চিত্রের সঙ্গে সম্পর্কহীন নেত্রীর ঢাউস প্রতিকৃতি টাঙানো হয়েছে। পঞ্চধাতুর বা দুশো ফুটের বিদ্যাসাগর মূর্তি বানিয়ে এই ক্ষতি পূরণীয় নয়। এবং এ ক্ষতি অবাঙালিরা কেউ করেনি।
বিদ্যাসাগরকে রাধাকান্ত দেব, রসময় দত্তর মত বাঙালিদের বিরুদ্ধেই লড়তে হয়েছিল। তাই অনেকে যে বলছেন “বাঙালিকে সব বিভেদ ভুলে এক হতে হবে”, সেকথা একেবারে ভুল। বরং বাঙালিকে পক্ষ নিতে হবে। ঠিক করতে হবে সে বিদ্যাসাগরের পক্ষে না রাধাকান্তদের পক্ষে। কথায় এবং কাজে আমাদের রামমোহন, বিদ্যাসাগরের আত্মীয় ছিলেন মহারাষ্ট্রের আত্মারাম পান্ডুরঙ্গ, জ্যোতিরাও ফুলেরা। ঠিক তেমনি সেদিন যাঁরা বিদ্যাসাগরকে অকথা কুকথা বলেছেন, প্রাণ নাশের চেষ্টা করেছেন তাঁদের উত্তরসূরী আজকের মোদী, অমিত শাহরা। অতএব হিন্দি জাতীয়তাবাদের বিপক্ষে বাঙালি জাতীয়তাবাদের অতিসরলীকরণ দিয়ে এ লড়াই লড়া যাবে না। ওভাবে লড়লে বড়জোর কারো নির্বাচনী লড়াইয়ে সুবিধা হতে পারে, বাঙালি জাতীয়তাবাদের আড়ালে নিজেদের অপসংস্কৃতি লুকিয়ে ফেলার সুবিধা হতে পারে।
পুনশ্চ: অধুনা যে হাওয়া তাতে এই লেখাটাকে বামের রাম হয়ে যাওয়ার প্রমাণ হিসাবে চালানো হবে হয়ত। হলে আমি নিরুপায় কারণ আমি ছোট থেকে অঙ্কে কাঁচা। বাইনারি বুঝি না।

এই কথাটি মনে রেখো

মাত্র দুজনের কথা বলব, যাঁরা মুসলমানও নন আবার হিন্দুবিরোধী বলেও চিহ্নিত নন। কতটা ধর্মাচরণ করতেন জানি না, তবে জন্মসূত্রে হিন্দুই

সোশাল মিডিয়ায় একটা পোস্ট খুব শেয়ার হচ্ছে। কিছু মৃত মানুষের ছবি। বলা হচ্ছে ভোট দেওয়ার সময় আমাদের মনে রাখবেন। সেই ছবিগুলোর মধ্যে যেমন আখলাক, পহলু, জুনেদ, আফরাজুলরা আছে তেমনি গৌরী লঙ্কেশ, নরেন্দ্র দাভোলকর, গোবিন্দ পানসারে, এম এম কালবুর্গিরাও আছেন। এঁরা হয় ইসলাম ধর্মাবলম্বী, নয় হিন্দুবিরোধী হিসাবে চিহ্নিত।
আমি এত জনের কথা বলব না, মাত্র দুজনের কথা বলব, যাঁরা মুসলমানও নন আবার হিন্দুবিরোধী বলেও চিহ্নিত নন। কতটা ধর্মাচরণ করতেন জানি না, তবে জন্মসূত্রে হিন্দুই।
প্রথম জনের নাম সুবোধ কুমার সিং। উত্তরপ্রদেশের দাদরির আখলাক আহমেদের হত্যার তদন্ত করে চার্জশিট দাখিলকারী এই পুলিশ অফিসার গত তেসরা ডিসেম্বর বুলন্দশহরে তথাকথিত গোরক্ষকদের হাত থেকে আরো কিছু মানুষকে বাঁচানোর চেষ্টা করতে গিয়ে বিফল হন এবং গণপিটুনিতে প্রাণ হারান।
দ্বিতীয় জন হেমন্ত করকরে। মহারাষ্ট্র পুলিশের সন্ত্রাসবাদদমন শাখার প্রধান ছিলেন এক সময়। মালেগাঁও বিস্ফোরণের তদন্তকারী অফিসার হিসাবে হিন্দু সন্ন্যাসিনী প্রজ্ঞা সিং ঠাকুরকে গ্রেপ্তার করেন। কান টানলে মাথা আসার মত তার ফলে আস্ত একটি সন্ত্রাসবাদী নেটওয়ার্কের সন্ধান পাওয়া গিয়েছিল। সেই নেটওয়ার্কে অনেকের সঙ্গে বাঙালি গেরুয়াধারী অসীমানন্দ আর সেনাবাহিনীর লোক লেফটেন্যান্ট কর্নেল পুরোহিতও ছিলেন (গত কয়েক দিনে আপনি হোয়াটস্যাপ বা ফেসবুকে যা-ই পড়ে থাকুন না কেন, ঘটনা হল সেই কেসে আজ অব্দি প্রজ্ঞা সিং ঠাকুর নির্দোষ বলে ঘোষিত হয়নি। সে শারীরিক অসুস্থতার কারণে আপাতত মুক্ত)। ইতিমধ্যে ২৬শে নভেম্বর ২০০৮ মুম্বাইতে ভারতবর্ষের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় সন্ত্রাসবাদী আক্রমণ হয়। হেমন্ত সেই আক্রমণের মোকাবিলা করতে গিয়ে নিহত হন।
শহীদের সংজ্ঞা কী? যিনি দেশের প্রতি নিজের কর্তব্য পালন করতে গিয়ে প্রাণ হারান তিনি কি শহীদ? যদি তাই হয় তাহলে সুবোধ এবং হেমন্ত দুজনেই শহীদ। পুলওয়ামায় নিজেদের অজ্ঞাতে ৩৫০ কিলোগ্রাম আর ডি এক্স বিস্ফোরণে যে জওয়ানরা প্রাণ হারালেন তাঁরা যদি শহীদ হন, সজ্ঞানে নিজের জীবন বাজি রেখে কর্তব্য করতে গিয়ে নিহত এই দুই পুলিশকর্মীও শহীদ।
গত পাঁচ বছরে সরকারের সমালোচক, উগ্র জাতীয়তাবাদের বিপক্ষে মুখ খোলা নাগরিকদের চুপ করিয়ে দেওয়ার জন্যে দেশের সর্বোচ্চ নেতা নরেন্দ্র মোদী থেকে শুরু করে গাঁয়ে মানে না আপনি মোড়ল নিউজ অ্যাঙ্কর পর্যন্ত সকলে চিৎকার করেছেন “সিয়াচেনে আমাদের জওয়ানরা লড়ছে, আর তোরা…”। অর্থাৎ জওয়ানদের, শহীদদের সম্মানার্থে মুখ বুজে সমস্ত সরকারী অপদার্থতা এবং অন্যায় মেনে নিতে হবে। তাই বলছি, এবার ভোট দিতে যাওয়ার সময় আর কিছু না হোক, অন্তত মনে রাখুন ক্ষমতাসীনরা সুবোধ আর হেমন্ত — এই দুই শহীদের প্রতি, জীবদ্দশায় এবং মৃত্যুর পরে, কিরকম শ্রদ্ধা প্রদর্শন করেছেন।
গত দোসরা মার্চ সুবোধের হত্যার ঘটনায় চার্জশিট দাখিল করেছে পুলিশ, বিজেপি শাসিত উত্তরপ্রদেশের পুলিশ। যে ৩৮ জনের নামে চার্জশিট দাখিল হয়েছে তাদের মধ্যে সঙ্ঘ পরিবার সগৌরবে বর্তমান। বজরং দল তো বটেই, বিজেপির যুব নেতারও নাম আছে। আর সবে গতকাল, জামিনে জেলের বাইরে থাকা মালেগাঁও বিস্ফোরণে অভিযুক্ত প্রজ্ঞা বলেছেন হেমন্ত তাঁর অভিশাপেই নিহত হয়েছেন।
হে মোর দুর্ভাগা দেশ, এই সেদিন আমরা অ্যান্টি ন্যাশনাল তকমা পেলাম জাতীয়তাবাদীদের থেকে। কারণ আমরা প্রশ্ন তুলছিলাম শহীদদের শহীদ হতে হল কেন। আর আজ নিজের কাজ করতে গিয়ে শহীদ হওয়া পুলিশ অফিসারকে অবলীলায় “রাবণ” বলতে পারল সাংসদ পদপ্রার্থী, বলতে পারল “আমার অভিশাপেই লোকটা মরেছে।” শুধু বলল নয়, বলে সমর্থনও পেয়ে গেল। তাকে কোন অ্যাঙ্কর দেশদ্রোহী বললেন না, দেশের সবচেয়ে বড় জাতীয়তাবাদী দল বলল “ওটা ওনার ব্যক্তিগত মতামত।” প্রধানমন্ত্রী পর্যন্ত বললেন না যে এ একজন শহীদকে অপমান করেছে।
সাধারণ মানুষের মধ্যেও মহিলা বিলক্ষণ সহানুভূতি কুড়িয়েছে টিভি ক্যামেরার সামনে কান্নাকাটি করে, হেমন্ত তার সাথে কত দুর্ব্যবহার করেছেন সেকথা বলে। কেউ কেউ বলছেন “পুলিশের লোকেদের কখনো বিশ্বাস করা যায় না। ওরা ভীষণ নৃশংস।” স্বয়ং প্রধানমন্ত্রীও এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন একজন মহিলাকে, একজন সাধ্বীকে পুলিশ অত্যাচার করেছিল, তখন কেউ কিছু বলেনি কেন? মজার কথা সোনি সোরির যৌনাঙ্গে পাথর ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছিল শুনে এই মহা সংবেদনশীল ব্যক্তিরা কখনো “আহা” বলেন না। অথচ সন্ত্রাসবাদে অভিযুক্ত মহিলাকে তদন্তকারী অফিসারের রসগোল্লা খাওয়ানো উচিৎ ছিল বলে মনে করছেন। একবার গুগল করলেই দেখতে পাবেন সারা ভারতবর্ষে তেমন সাক্ষ্যপ্রমাণ ছাড়াই সন্ত্রাসবাদী সন্দেহে প্রতিনিয়ত কত মুসলমান যুবককে গ্রেপ্তার করা হয় এবং তাদের দিয়ে অপরাধ স্বীকার করিয়ে নেওয়ার জন্যে কি অকথ্য অত্যাচার করা হয়। মজার কথা, তৎসত্ত্বেও অনেক ক্ষেত্রেই তাদের বিরুদ্ধে কোন প্রমাণ পাওয়া যায় না। কোন অপরাধ না করেও মাসের পর মাস, বছরের পর বছর কারান্তরালে কাটিয়ে ভাঙাচোরা মানুষগুলো বেকসুর খালাস পায়। সেখানে এই মহিলার বাইকখানা যে সরাসরি বিস্ফোরণে ব্যবহৃত হয়েছিল, সেকথা আজ অব্দি অপ্রমাণিত হয়নি। হেমন্তের প্রভাবমুক্ত এন আই এ দ্বারা নবলিখিত চার্জশিটেও বলা হয়েছে বাইকটা ওঁর হলেও উনি ব্যবহার করছিলেন না দু বছর যাবৎ।
অনেকে আবার দেখছি বোম ফাটিয়ে মানুষ মেরেছে বেশ করেছে, দেশ ভাগের সময়ে যে মুসলমানরা মানুষ মেরেছিল তার প্রতিশোধ নিচ্ছে। এটা ওদের মতাদর্শ। ওরা নিজেদের জায়গায় ঠিক। এইসব কথাবার্তা বলছেন। চমৎকার যুক্তি সন্দেহ নেই। এই যুক্তি অনুযায়ী আই এস, আল কায়দা, জৈশ ই মহম্মদ, হাফিজ সঈদের জামাত উদ দাওয়া — সকলেই নিজেদের জায়গায় ঠিক। দুনিয়া জুড়ে ইসলামিক রাষ্ট্র হওয়া উচিৎ, কাফেরদের হত্যা, ধর্ষণ ইত্যাদি করা উচিৎ — এগুলো তাদের মতাদর্শ।
মানতে রাজি তো? ভেবে দেখুন। মনে রাখুন। মানুষ যখন বধির হয়ে যায়, জীবিতদের কণ্ঠ শুনতে পায় না, তখন মৃতদের কণ্ঠের উপরেই নির্ভর করতে হয়। কারণ মৃত মানুষ মিথ্যে বলে না।

বিঃ দ্রঃ খারাপ কথা বলে দিয়ে পরে দুঃখপ্রকাশ করার কৌশলটা বহু ব্যবহারে জীর্ণ। যাঁরা ঠিক ঐ কথাটাই শুনতে চেয়েছিলেন তাঁরাও বোঝেন বক্তা আসলে মোটেই দুঃখিত নন। অতএব যাঁরা মনে করেন বলা উচিৎ হয়নি, তাঁদেরই বা দুঃখপ্রকাশকে পাত্তা দেওয়ার কী আছে?

সাংবিধানিক সঙ্কট না পালে বাঘ?

আইনী মীমাংসা তো নাহয় মহামান্য প্রধান বিচারপতি করে দেবেন, কিন্তু মুখ্যমন্ত্রীর ধর্না কতদিন চলবে? কার বিরুদ্ধে এই ধর্না? এসব প্রশ্নের উত্তর কে দেবে? গতকাল নগরপালের বাড়ির সামনে মোদীর বিরিদ্ধে সংবিধানের পিণ্ডি চটকানোর অভিযোগ করে যখন ধর্নায় বসেছেন, তখন ধরে নেওয়া যায় ধর্না কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে। তা সেই ধর্না দিল্লীর ৭, রেসকোর্স রোডে না হয়ে কলকাতার মেট্রো চ্যানেলে কেন?

১৯৯৩ সালের কোন একদিন কলকাতার তিলজলা এলাকায় ঢুকে পাঞ্জাব পুলিশ এক দম্পতিকে গুলি করে মারে এবং তাদের মৃতদেহ নিয়ে প্রস্থান করে। ঐ দম্পতির বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল তারা নাকি খালিস্তানি জঙ্গি। এই ঘটনা জানাজানি হওয়ার পর প্রচুর আলোড়ন হয়। অতঃপর আমৃত্যু মার্কসবাদী, প্রাক্তন সি পি আই (এম) নেতা এবং বামফ্রন্ট সরকারের একদা অর্থমন্ত্রী অশোক মিত্র সংবাদ প্রতিদিন কাগজে তাঁর কলামে এই ঘটনার তীব্র নিন্দা করেন। লেখাটার শিরোনাম ছিল ‘সবার উপরে পঞ্জাব পুলিশ সত্য?’ সেই লেখা থেকে ঈষৎ দীর্ঘ উদ্ধৃতি এখানে প্রাসঙ্গিক:

স্বাধীনতার পর প্রচুর ঢক্কানিনাদ সহকারে ১৯৪৯ সালে একটি সংবিধান রচনা করা হয়েছিলো, সেই সংবিধানের অনুশাসনে আমাদের রাষ্ট্রব্যবস্থা নাকি নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে। সংবিধানে সুস্পষ্ট নির্দেশ যে-কোনো রাজ্যে আইনশৃঙ্খলা রক্ষার সার্বিক দায়িত্ব ঐ-রাজ্যের সরকারের, কেন্দ্রীয় সরকারেরও না, অন্য-কোনো রাজ্যের সরকারের তো না-ই। রাজ্য সরকারের অনুমতি না নিয়ে এমনকী কোন কেন্দ্রীয় বাহিনীরও কোনো উপলক্ষ্যেই রাজ্যে অনুপ্রবেশের অধিকার নেই। মাত্র একটি অবস্থায় এই রীতির ব্যত্যয় হতে পারে: কেন্দ্রীয় সন্ত্রাসদমন ও অশান্ত অঞ্চল আইন যদি একটি রাজ্যের ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা হ’য়ে থাকে, তা’হলে। কিন্তু এই আইনের ধারাবলে এক রাজ্যের পুলিশ অন্য রাজ্যে ঢুকে যেতে পারে না, ঐ আইন কোনো রাজ্যের ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা হ’লে একমাত্র কেন্দ্রীয় পুলিশ বা প্রতিরক্ষা বাহিনীই রাজ্য সরকারের অনুমতি ছাড়াই কোনো রাজ্যে ঢুকে গিয়ে নিজেদের ইচ্ছানুযায়ী আইনশৃঙ্খলার টহলদারীর ব্যবস্থা করতে পারে।

গতকাল সন্ধ্যা থেকে কলকাতার নগরপালকে জিজ্ঞাসাবাদ করা নিয়ে যে অভূতপূর্ব পরিস্থিতির উদ্ভব হয়েছে তা নিয়ে যে কোন আলোচনায় উপর্যুক্ত কথাগুলো মনে রাখা দরকার, যদিও ১৯৯৩ এর ঘটনার সাথে রাজীব কুমারের বিরুদ্ধে যে অভিযোগ আছে তার অনেক তফাত।
আইন অনুযায়ী কোন আইন এমনভাবে প্রয়োগ করা যায় না বা এমন কোন আইন প্রণয়ন করাও যায় না যা সংবিধানের যা বিরুদ্ধে যায়। এখন কথা হচ্ছে সিবিআই কোন আইন অনুযায়ী সারদা কেলেঙ্কারির তদন্ত করছে? মহামান্য সুপ্রিম কোর্ট তাদের তদন্তের দায়িত্ব দিয়েছেন তাই তারা তদন্ত করছে — এই উত্তরটা অসম্পূর্ণ। কারণ সুপ্রিম কোর্টও আইনের ঊর্ধ্বে নন। স্বয়ং প্রধান বিচারপতিকেও রায় দিতে হয় দেশের আইন মেনেই, তিনি নতুন আইন প্রণয়ন করতে পারেন না। সুপ্রিম কোর্ট যে সিবিআই বা কেন্দ্রীয় তদন্ত ব্যুরোকে আব্দুল মান্নানের দায়ের করা মামলার তদন্তভার দিয়েছেন সেটাও আইনমাফিক। কী সে আইন যার বলে সিবিআই একটা অঙ্গরাজ্যের ঘটনার তদন্ত করতে পারে?
আইনটা হল The Delhi Special Police Establishment Act, 1946. গত ২৫শে নভেম্বর, ২০১৪ তারিখে এই আইনেরই একটি সংশোধনী বিল লোকসভায় পেশ হয়, যার ফলে সিবিআই অধিকর্তা বেছে নেওয়ার জন্যে তিন সদস্যের কমিশন গঠন হয়। সেই কমিশনের সদস্য প্রধানমন্ত্রী, লোকসভার বিরোধী দলনেতা এবং সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি বা তাঁর মনোনীত কোন বিচারপতি। মূল আইনের ছ নম্বর ধারায় কিন্তু বলা আছে কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল বা রেল বিভাগের এলাকায় এই কেন্দ্রীয় পুলিশকে তদন্ত করতে পারে কিন্তু কোন অঙ্গরাজ্যে তদন্ত করতে হলে রাজ্য সরকারের সম্মতি প্রয়োজন।
তাহলে সিবিআই সারা দেশে এত অভিযোগের তদন্ত করে কী করে? করতে পারে কারণ সংশ্লিষ্ট রাজ্য সরকার সম্মতি দেয়। সেই সম্মতির পোশাকি নাম general consent. পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রে এই general consent দিয়েছিল বামফ্রন্ট সরকার, ১৯৮৯ সালে। কে জানে কী আঁচ করে গত নভেম্বরে প্রথমে অন্ধ্রপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী চন্দ্রবাবু নাইডু, এবং তারপর আমাদের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় general consent প্রত্যাহার করে নেন৷ অর্থাৎ এর পর থেকে এ রাজ্যের কোন কেসের তদন্ত করতে হলে সিবিআইকে প্রত্যেক কেসের জন্যে আলাদা করে তদন্তের অনুমতি চাইতে হবে।
কিন্তু এই সম্মতি প্রত্যাহার করে নেওয়ার সময়ে সম্ভবত দিদির খেয়াল ছিল না যে ইতিমধ্যেই চালু হয়ে যাওয়া কেসে এর কোন প্রভাব পড়বে না।
এই আইনী জটিলতা নিয়ে আমরা আমাদের মাথার সব চুল ছেঁড়ার সময় অবশ্য পাব না। আজই সিবিআইয়ের আবেদনে সাড়া দিয়ে মহামান্য প্রধান বিচারপতি গোগোই বসেছিলেন। সলিসিটর জেনারেলকে (অর্থাৎ কেন্দ্রীয় সরকারের কৌঁসুলিকে) মৃদু ধমক দিয়ে বলেছেন, আপনাদের কাছে এমন কোন প্রমাণই নেই যা থেকে বোঝা যায় পশ্চিমবঙ্গ সরকার বা পুলিশ প্রমাণ লোপাট করার চেষ্টা করছে। একটা প্রমাণ দেখান যে সেই চেষ্টা করছে বা করার কথা ভাবছে। এদের এমন শিক্ষা দেব যে আফশোসের শেষ থাকবে না।
মহামান্য আদালত আবার কালই বসছেন। ফলত খুব শিগগির আমরা জেনে যাব কোন পক্ষ আইনভঙ্গ করেছে? রাজ্য সরকারের পুলিশকে না জানিয়ে অসাংবিধানিকভাবে, কোন ওয়ারেন্ট ছাড়াই সিবিআই কলকাতার নগরপালকে ধমকাতে গিয়েছিল? নাকি নগরপালই তদন্তে অসহযোগিতা করে নিয়ম ভাঙছিলেন, এবং সিবিআই সব আইনকানুন মেনেই তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করতে গিয়েছিল?
আইনী মীমাংসা তো নাহয় মহামান্য প্রধান বিচারপতি করে দেবেন, কিন্তু মুখ্যমন্ত্রীর ধর্না কতদিন চলবে? কার বিরুদ্ধে এই ধর্না? এসব প্রশ্নের উত্তর কে দেবে? গতকাল নগরপালের বাড়ির সামনে মোদীর বিরিদ্ধে সংবিধানের পিণ্ডি চটকানোর অভিযোগ করে যখন ধর্নায় বসেছেন, তখন ধরে নেওয়া যায় ধর্না কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে। তা সেই ধর্না দিল্লীর ৭, রেসকোর্স রোডে না হয়ে কলকাতার মেট্রো চ্যানেলে কেন?
যে ৩৫৬ র জুজু কেন্দ্রীয় সরকার দেখাচ্ছে বলে কাল মুখ্যমন্ত্রী অভিযোগ করছিলেন বা স্টুডিওতে বিজেপি নেতারা হুমকি দিচ্ছিলেন, তা যদি সত্যি হয় তাহলে নিঃসন্দেহে মমতা ঠিকই করেছেন। তাঁর সরকারকে যদি কাজ করতে না দেওয়া হয়, নিশ্চয়ই তাঁর অধিকার আছে পথে নেমে আসার। কিন্তু চব্বিশ ঘন্টা হতে চলল, রাজ্যপাল চুপ, কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রক চুপ। জুজুটা গেল কোথায়? তাহলে কি কাল সন্ধ্যের অতি তৎপরতা এবং ধর্না শেক্সপিয়রের ভাষায় “much ado about nothing”?
এতগুলো প্রশ্নের পরে আরো একটা প্রশ্ন আসে। সিবিআই তো বলছে তারা শুধু জিজ্ঞাসাবাদ করতে চায়। তাতে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের আপত্তি কেন? এ কি সেই ঠাকুরঘরে কে জিজ্ঞেস করায় “আমি কলা খাইনি” উত্তর আসার মত ব্যাপার?
বিঃ দ্রঃ সংবিধানের ৩৫৬ ধারার কথা উঠতে মনে পড়ল, তৃণমূল কংগ্রেস গঠন করার পর একটা নির্বাচনে বর্তমান মুখ্যমন্ত্রীর দলের প্রাপ্ত ভোট ছিল শতাংশের হিসাবে ৩.৫৬। তিনি তৎকালীন রাজ্য সরকারকে হুমকি দিয়ে বলেছিলেন ভোটের শতাংশটা খেয়াল রাখবেন। বাড়াবাড়ি করলে পশ্চিমবঙ্গের ঐ অবস্থাই হবে।
ধন্য আশা কুহকিনী।

সৃষ্টির মনের কথা

“ভালবাসা কী করে প্রমাণ করা যায় বল তো? ভালবেসেই তো? আজ যখন আদালতে আমাকে বলা হল ‘প্রমাণ করুন আপনি দেশকে ভালবাসেন’, আমি ভাবলাম কী করে করি? কেমন করে প্রমাণ করা যায় যে আমি আমার দেশকে ভালবাসি?”

দুঃসময়। বড় দুঃসময়ে বেঁচে আছি। সকালের কাগজ ১৯৯২ এর স্মৃতি উশকে দিয়ে লিখছে বিশ্ব হিন্দু পরিষদ আর রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘ হুমকি দিয়েছে রাত পোহালেই দু লক্ষ লোক ঢুকে পড়বে অযোধ্যায়। এদিকে পশ্চিমবঙ্গে ১৯৮৯ মনে করানো রথযাত্রার প্রস্তুতি। রাজ্য সরকার শীর্ষস্থানীয় আমলাকে পাঠিয়েছে বিজেপির সাথে যাত্রাপথ ইত্যাদি নিয়ে আলোচনা করতে। আহা! কি আনন্দ আকাশে বাতাসে।
ওদিকে আসামে ডিটেনশন ক্যাম্পে ভিড় বাড়ছে, বহু পরিবার ছিন্নভিন্ন, আত্মহত্যার পর আত্মহত্যা। সংসদে পাশ হওয়ার অপেক্ষায় নতুন নাগরিকত্ব আইন। যে আইন পাশ হলে অহিন্দু মানুষের ভারতের নাগরিক হওয়ার রাস্তা বন্ধ হয়ে যাবে। “দিবে আর নিবে, মিলাবে মিলিবে, যাবে না ফিরে” শুধু কবিতার পংক্তি হয়ে যাবে।
এসব ক্ষমতাসীনদের রাজনীতি। আর বিরোধীদের রাজনীতিটা কিরকম?
দিন দুয়েক আগে কংগ্রেস নেতা সি পি যোশী বললেন একমাত্র একজন কংগ্রেস প্রধানমন্ত্রীই পারেন রামমন্দির প্রতিষ্ঠা করতে। মনে করিয়ে দিলেন যে রাজীব গান্ধীই বাবরি মসজিদের তালা খুলিয়ে পুজো আচ্চার ব্যবস্থা করিয়েছিলেন। যোশী আরো বলেছেন হিন্দু ধর্মটা একমাত্র ব্রাক্ষ্মণরাই বোঝে। নরেন্দ্র মোদী, উমা ভারতী এরা আর কী জানবে? নীচু জাতের লোকেদের হিন্দু ধর্ম নিয়ে কথা বলার কোন অধিকারই নেই। যোশীজিকে যিনি ধমকে দিয়েছেন বলে খবরে প্রকাশ, সেই রাহুল গান্ধী কেবল মন্দির থেকে মন্দিরে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। তাঁর সম্পর্কে তাই হিন্দুত্বের ব্র‍্যান্ড অ্যাম্বাসাডর বিজেপি প্রশ্ন তুলেছিল তিনি কি হিন্দু? উত্তরে কংগ্রেস মুখপাত্র বলেছিলেন রাহুল যে শুধু হিন্দু তাই নয়, তিনি রীতিমত পৈতেওয়ালা হিন্দু।
বাংলার অগ্নিকন্যা তথা কর্ণধার বিজেপিকে আটকাতে দীর্ঘদিন অব্দি সাধারণ মুসলমানকে ভুলে ইমাম, মোয়াজ্জেমদের সমর্থনে ভর দিয়ে চলছিলেন। বছরখানেক হল সেসব চাপা দিতে আবার ব্রাক্ষ্মণ সম্মেলন, বজরংবলী পুজো, জনসভায় গায়ত্রী মন্ত্র উচ্চারণ, দুর্গা বিসর্জনের বিষণ্ণতাকে আমুদে কার্নিভালে পরিণত করায় মেতেছেন। তাতেও যথেষ্ট হচ্ছে না মনে করে শেষমেশ আয়করদাতাদের টাকা পুজো কমিটিগুলোকে বিলিয়েছেন। এন আর সি নিয়ে দিনকতক লোকলস্কর নিয়ে বিস্তর চেঁচামেচি করার পর এখন স্পিকটি নট। অবশ্য ওটা নিয়ে বেশি পরিশ্রম কেনই বা করতে যাবেন? তিনিই তো প্রথম সাংসদ যিনি সীমান্তবর্তী এলাকায় সিপিএম বাংলাদেশ থেকে লোক ঢোকাচ্ছে, এদের বার করে দেওয়া হোক — এই দাবী করে লোকসভার স্পিকারের দিকে কাগজ ছুঁড়েছিলেন।
আর বামপন্থীরা? সর্ববৃহৎ পার্টির নেতাদের একাংশ তো মনে করছেন বিজেপিকে হারাতে উপর্যুক্ত কংগ্রেসেরই হাত ধরা দরকার এক্ষুণি। নিজেদের লড়ার ক্ষমতার উপর এমন আস্থা আর কাদের আছে? এন আর সি, নাগরিকত্ব বিল নিয়ে বামেদের যে কী মতামত কে জানে! শীর্ষ নেতৃত্ব একবার বলেছিলেন দেখতে হবে নিরপরাধ লোকের যেন হয়রানি না হয়। মানে মানুষের নাগরিকত্ব নির্ধারণে তার বংশপরিচয়কে মানদণ্ড ধরায় বোধহয় তাঁদের আপত্তি নেই। যাহা লিগ্যাসি তাহাই লিগাল।
অর্থাৎ দেশের সর্বত্র তাঁদের ভারতীয়তা, তাঁদের দেশপ্রেমের প্রমাণ চাওয়া হচ্ছে মানুষের কাছে। এই প্রমাণ দীর্ঘকাল ঠারেঠোরে চাওয়া হত এদেশের মুসলমানদের কাছে। এখন ঘাড় ধরে চাওয়া হচ্ছে। আসামের অন্য ধর্মাবলম্বী মানুষেরাও সেই আওতায়। সংখ্যালঘুদের প্রতি মুহূর্তে বুঝিয়ে দেওয়া হচ্ছে তাঁরা অপ্রিয়, অপ্রয়োজনীয়, অপ্রাসঙ্গিক। তাঁদের খুন করলে শাস্তি হয় না চাকরি হয়, ধর্মস্থান ভেঙে দিলে অপরাধ হয় না মন্ত্রিত্ব হয়, গালাগালি দিলে বাহাদুরি হয়।
এমতাবস্থায় প্রায়শই “সৃষ্টির মনের কথা মনে হয় — দ্বেষ।” মনটা এমন কোন সৃষ্টি খুঁজতে থাকে যার মনের কথা ভালবাসা। খুঁজতে খুঁজতে পেয়ে গেলাম অনুভব সিনহার ছবি ‘মুল্ক’ (দেশ)। হিন্দু, মুসলমানের ইতিহাসের সঙ্গমস্থল বেনারসের পুরনো বাসিন্দা বৃদ্ধ আইনজীবী মুরাদ আলি মহম্মদকে কাঠগড়ায় উঠতে হল এবং প্রমাণ করতে বলা হল তিনি তাঁর মুল্ক অর্থাৎ দেশকে ভালবাসেন। তিনি নিয়মিত আয়কর দেন, পুলিশের খাতায় কখনো তাঁর নাম ওঠেনি, এমনকি গাড়ি চালানোর সময়ও কখনো ট্র‍্যাফিক আইন ভাঙেননি। কিন্তু ওসব যথেষ্ট নয় একথা প্রমাণের জন্যে যে তিনি দেশপ্রেমিক। সন্ত্রাসবাদী নন।
ধর্মীয় মৌলবাদ আমাদের উঠোন পেরিয়ে চলে আসছে আমাদের সবার শোবার ঘর অব্দি। তফাৎ শুধু এই যে সংখ্যালঘুর মৌলবাদকে ঢুকতে হচ্ছে লুকিয়ে চুরিয়ে, সংখ্যাগুরুর মৌলবাদ আসছে সামনের দরজা দিয়ে। আলি মহম্মদের ভোলেভালা ক্লাস টেন পাশ ভাই বিলালের ছেলে শাহিদ, যাকে ছোটবেলায় ধরে বেঁধে কোরান পড়িয়ে ওঠা যায়নি, সে কাশ্মীরের বন্যাত্রাণে অর্থসাহায্য করছে ভাবতে ভাবতে হয়ে গেল জেহাদি নেটওয়ার্কের সদস্য। আর বাড়ির উল্টোদিকের পান বিক্রেতা চৌবে, যে আলি সাহেবের প্রাণের বন্ধু, তার অকর্মণ্য ছেলে বুক ফুলিয়ে “দেশের কাজে” নেমে পড়ল বাইকের সামনে পতাকা লাগিয়ে। কী সেই কাজ? লোকলস্কর ডেকে এনে আলি সাহেবের গ্যারেজ ভেঙে দেওয়া, হিন্দু উৎসবের আগে লাউডস্পিকারের মুখটা মুসলমানদের বাড়ির দিকে ঘুরিয়ে দেওয়া যাতে তারা টের পায় “গোটা দেশ তাদের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ”, রাতে আলি সাহেবের বাড়িতে পাথর ছোঁড়ার আয়োজন, দেয়ালে এবং দরজায় লিখে দেওয়া “TERRORIST”, “GO TO PAK”।
এই ছবিতে অনুভব সিনহার সবচেয়ে বড় কাজ সম্ভবত আমাদের অনেকের মনে তৈরি হওয়া চড়া একরঙা ছবিগুলো মুছে দেওয়া। এ ছবির হিন্দুরা নানারকম, মুসলমানরাও তাই।
ধর্মপ্রাণ অথচ গোঁড়ামিহীন আলি মহম্মদ আছেন, কোরান ঠিকমত না পড়েও জেহাদী হওয়া ভাইপো শাহিদ আছে, অ্যান্টি টেররিজম স্কোয়াডের ভুয়ো এনকাউন্টারবাদী অফিসার দানিশ জাভেদও আছেন। তিনি মনে করেন সন্ত্রাসবাদীদের গ্রেপ্তার না করে শেষ করে দেওয়া উচিৎ কারণ তারা মুসলমানদের বদনামের কারণ।
হিন্দুদের মধ্যে চৌবে আছেন, যিনি স্ত্রীকে লুকিয়ে বন্ধু আলির বাড়িতে কোরমা, কালিয়া খেতেন অথচ শাহিদের অপরাধ প্রকাশ হতেই বিরাট হিন্দু হয়ে উঠলেন এবং নিঃসংশয়ে বুঝে নিলেন “আমার ছেলে ঠিকই বলে। ওরা ঐরকমই।“ কিন্তু আলি সাহেবের আরেক বন্ধু সোনকর আছেন, যিনি ১৯৯২ এর ৬ই ডিসেম্বরের অভিশপ্ত রাতে চৌবেকে সঙ্গে নিয়ে আলি সাহেবের পরিবারকে দাঙ্গাবাজদের হাত থেকে বাঁচাতে ছুটে এসেছিলেন। যিনি গোটা মহল্লার বিরুদ্ধে গিয়ে আলি সাহেবের পুরো পরিবারকে সন্ত্রাসবাদী প্রমাণ করার চেষ্টা চলার সময়ে পাশে থাকলেন। আলির প্রবাসী ছেলে এসে যখন বলল এ বাড়ি ছেড়ে তার সাথে ইংল্যান্ড চলে যাওয়াই ভাল, তখন সোনকরকে দেখিয়েই আলি সাহেব বললেন “আমরা চলে যাব? আমি নিজেকে কী জবাব দেব? যে আমি দেশদ্রোহী? পাড়ার লোককে সোনকর কী জবাব দেবে? ও বলবে ও দেশদ্রোহীদের পাশে দাঁড়িয়েছিল?”
সর্বোপরি আছেন আরতি মহম্মদ — আলি সাহেবের হিন্দু পুত্রবধূ। একজন বেপথু হয়েছে বলে পুরো পরিবারটাকে সন্ত্রাসবাদী প্রমাণ করার প্রচেষ্টাকে বিফল করার দায়িত্ব শেষ অবধি যার ঘাড়ে পড়ে। মুসলমানদের ঝামেলা মুসলমানরাই সামলাক, কোর্ট তো বলে দিয়েছে ওরা টেররিস্ট — বাবা-মায়ের এইসব আবোলতাবোল কথাবার্তা উড়িয়ে দিয়ে ঘাড় সোজা করে লড়ে যায় মেয়েটি। অথচ বেনারসে আসার আগে স্বামীর সাথে বিবাহবিচ্ছেদের মুখে দাঁড়িয়েছিল সে, কারণ আলি সাহেবের ছেলে আফতাব চাইছিল সন্তানের জন্মের আগেই যেন তার ধর্মটা ঠিক করে রাখা হয়। শুনানিতে যাওয়ার সময় কিন্তু সে মন্দিরের প্রসাদী ফুল মাথায় ছুঁইয়ে যায়।
আরো এক দল মানুষ আছেন আলি সাহেবের মুল্কে, যাদের কথা না বললেই নয়। কিছু লোক যারা মসজিদে নমাজ পড়তে এসে তাঁকে আমন্ত্রণ জানায় শাহিদ আর বিলালের শাহাদাত উদযাপন করতে আসার জন্যে এবং প্রবল ধমক খায়। আলি সাহেব তাদের জানিয়ে দেন শাহিদ যা করেছে তা শাহাদাত নয়, সন্ত্রাস। যারা তাঁর বাড়িতে পাথর ছুঁড়েছে তারাও যে সন্ত্রাসীই সেকথা তিনি বলে এসেছেন এফ আই আর নিতে অনিচ্ছুক দারোগাকে।
মসজিদে ফিসফিসিয়ে কথা বলা লোকগুলোর দলেই পড়েন সরকারপক্ষের উকিল সন্তোষ আনন্দ। সাক্ষ্যপ্রমাণ না-ই থাক, মুসলমানবিদ্বেষের কোন অভাব নেই তাঁর মধ্যে। তিনি জানেন এখন কেস জিততে হলে বিচারবিভাগকে নানাভাবে প্রভাবিত করতে হয়; হোয়াটস্যাপ, ফেসবুককে হাতিয়ার করতে হয়।
ছায়াছবি হিসাবে অনায়াসেই আরো ভাল হতে পারত ‘মুল্ক’। তাপসী পান্নু আরো জোরালো আরতি হতে পারতেন, আদালতে তাঁর অতি মূল্যবান closing argument চিত্রনাট্যের সাহায্য পেলে আরো কম বক্তৃতা হতে পারত। বিচারকের শেষ কথাগুলোও, যদিও অত্যন্ত জরুরী, অতটা বক্তৃতার মত না শোনালে নিঃসন্দেহে আরো ভাল হত। কিন্তু তার চেয়ে অনেক বড় কথা এই সময়ে এই ছবিটার প্রয়োজন ছিল। কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে আলি সাহেবরূপী ঋষি কাপুর যখন সন্তোষ আনন্দরূপী আশুতোষ রানাকে প্রশ্ন করেন “আমার দেশে আমাকে স্বাগত জানানোর অধিকার আপনাকে কে দিয়েছে?” তখন প্রশ্নটা তাঁর একার থাকে না, কোটি কোটি ভারতবাসীর হয়ে দাঁড়ায়। সেইসব ভারতবাসীর যাঁদের পান থেকে চুন খসলে পাকিস্তানি বলে সম্বোধন করা হয়, ভারত-পাকিস্তান ক্রিকেট ম্যাচের সময়ে যাদের দিকে আড়চোখে, বাঁকা হেসে তাকানো হয়।
তবে সবচেয়ে মনে রাখার মত মুহূর্ত তৈরি হয় আদালতে নয়, বাড়ির ছাদে। ভাই বিলালের উকিল থেকে কেসে অন্যতম অভিযুক্ত হয়ে যাওয়ার পর শব্দহীন বিনিদ্র রাতে পুত্রবধূকে আলি সাহেব বলেন “তবসসুম যখন বিয়ে হয়ে এ বাড়িতে এল, তখন আমার সাথে খুব ঝগড়া করত, বলত ‘তুমি আমায় ভালবাস না।’ আমি বলতাম ‘বাসি তো। খুব ভালবাসি।’ ভালবাসা কী করে প্রমাণ করা যায় বল তো? ভালবেসেই তো? আজ যখন আদালতে আমাকে বলা হল ‘প্রমাণ করুন আপনি দেশকে ভালবাসেন’, আমি ভাবলাম কী করে করি? কেমন করে প্রমাণ করা যায় যে আমি আমার দেশকে ভালবাসি?”
দেশকে ভালবাসার প্রশ্ন উঠতে তাঁর মনে পড়ল প্রিয়তমা স্ত্রীর কথা, মায়ের কথা নয়। “ভারত মাতা কি জয়” স্লোগানের পরাভবে পূর্ণিমার তাজমহলের মত উজ্জ্বল হয়ে উঠল মুরাদ আলি মহম্মদের দেশপ্রেম।

লেখাপড়া করে যে-ই

ইসলামপুর নিয়ে পক্ষ নিতেই হবে কারণ ইসলামপুর প্রথম ঘটনা নয়, বিচ্ছিন্ন ঘটনাও নয়

মোদ্দাকথা পড়াশোনা হোক সেটা সরকার চায় না। কেন্দ্রীয় সরকারও চায় না, রাজ্য সরকারও চায় না।
যাঁরা ছাত্রদের রাজনীতি করার অধিকারের বিরুদ্ধে তাঁদের মধ্যে দুরকম মত আছে। এক দল মনে করেন ছাত্রদের শুধু বইয়ে মুখ গুঁজে থাকা উচিৎ, আর কিছু করা তাদের স্বাস্থ্যের পক্ষে ক্ষতিকারক। আরেক দল মানুষের মতে রাজনীতি করতে পারে, কিন্তু সে রাজনীতির দাবীদাওয়া হওয়া উচিৎ একান্ত ছাত্রদের। ক্যাম্পাসের বাইরের কোন ঘটনার অভিঘাত সেখানে থাকা চলবে না। এই মতগুলোর ভাল মন্দের মধ্যে যাচ্ছি না। কিন্তু দুরকম মতের লোকেরাই নিশ্চয়ই স্বীকার করবেন যে এ রাজ্যের এবং এ দেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে কত কয়েক বছর ধরে যা চলছে তা সরাসরি ছাত্রছাত্রীদের লেখাপড়ায় প্রভাব ফ্যালে। সুতরাং সেগুলোকে ভুলে বই মুখে গুঁজে বসে থেকে তাদের বিশেষ লাভ নেই। কারণ পড়ার পরিবেশ এবং উদ্দেশ্যই নষ্ট করে দেওয়া হচ্ছে।
স্কুলে বাংলার শিক্ষক নেই। সে জায়গা পূরণ করা দীর্ঘদিনের দাবী। অথচ এসে হাজির হলেন উর্দু আর সংস্কৃতের শিক্ষকরা। ছাত্রদের মধ্যে অসন্তোষ, হতেই পারে কিছু বাইরের লোকও তাদের অসন্তোষে ঘৃতাহুতি করেছে। একটা এলাকার স্কুল কলেজের সাথে সেই এলাকার সমস্ত মানুষেরই স্বার্থ জড়িত আছে, বিশেষত সরকারপোষিত স্কুলগুলোর সাথে। উচ্চবিত্ত, মধ্যবিত্তরা এখন ছেলেমেয়েকে অমুক ইন্টারন্যাশনাল, তমুক পাবলিক স্কুলে পাঠাতে পারেন। গরীব, নিম্নবিত্ত ছেলেমেয়েদের জন্যে এখনো যে সরকারী স্কুলই ভরসা। ফলে বহিরাগত আপনি বলবেন কাকে? তাছাড়া কোন রাজনীতিবিদ এসে দিদিমণিকে জগ ছুঁড়ে মারলে যখন বহিরাগতর প্রশ্ন ওঠে না, তখন এ বেলাতেই বা সে প্রশ্ন কেন উঠবে?
ইসলামপুর নিয়ে পক্ষ নিতেই হবে কারণ ইসলামপুর প্রথম ঘটনা নয়, বিচ্ছিন্ন ঘটনাও নয়। দীর্ঘ তিন চার দশক ধরে পশ্চিমবঙ্গে যে চাকরিটা যোগ্যতা থাকলেই পাওয়া যায় বলে লোকে জানত সেটা হল স্কুল শিক্ষকের চাকরি। সেখানেও দুর্নীতি, স্বজনপোষণ ঢুকে পড়ায় বামফ্রন্ট সরকারের আমলে নেট বা স্লেট পরীক্ষার আদলে স্কুল সার্ভিস পরীক্ষা চালু হয়। বর্তমান সরকার আসার পরে সেই পরীক্ষা নিয়মিত হয় না, হলেও কে পাশ করল আর কে চাকরি পেল তা ভগবান আর সরকার ছাড়া কাক পক্ষীতেও টের পায় না। বেসরকারী ক্ষেত্রে কাজ করা লোকেরা বিশ্বায়নের যুগে কর্মক্ষেত্রে আন্দোলন করার অধিকার হারিয়েছে, সরকারী কর্মচারীদের সে অধিকার বজায় আছে বলে জানা ছিল। কিন্তু শিক্ষকদের অধিকারের এমনই চেহারা যে এক সহকর্মীর ভোট করাতে গিয়ে রহস্যমৃত্যুর তদন্ত চাইলেও হাজতবাস করতে হয়, মার খেতে হয়। স্কুল চত্বরেও বিভিন্ন শ্রী সামলাতে সামলাতে লেখাপড়ার বিশ্রী অবস্থা মেনে নিতে হচ্ছে মাস্টারমশাই-দিদিমণিদের।
এদিকে কলেজগুলো চলছে একগাদা আংশিক সময়ের অধ্যাপকদের দিয়ে। তরুণ মেধাবীরা প্রায় ঠিকে ঝিতে পর্যবসিত। তারা এবং প্রবীণরা সর্বদাই আতঙ্কে আছেন, কখন ছাত্র সংসদ বা অন্য কারো কোপদৃষ্টি পড়ে। মারধোর না খেয়ে সসম্মানে বাড়ি ফিরতেই পারলেই যথেষ্ট, পড়ানোয় আর মন দেবেন কখন?
উল্টোদিকে কলেজ ভর্তি হতে গেলে কয়েক হাজার বা লক্ষ টাকা তোলা দিতে হবে ছাত্র সংসদকে। অথচ ছাত্র সংসদ ভেঙে দেওয়া হয়েছে বহু কলেজে। আন্দোলনের দাবী ন্যায্য, অন্যায্য যা-ই হোক, যাদবপুর থেকে বিধানচন্দ্র কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত সর্বত্র সরকার এবং প্রধানদের সমাধান হল “পুলিশ ডাকো আর ঠ্যাঙাও।” এও মোটামুটি স্বতঃসিদ্ধ যে ছাত্রদের কোন দাবী থাকতে নেই। অতএব হোস্টেলে থাকার জায়গা আদায় করতে হলেও তাদের হয় মেডিকাল কলেজের মত অনশন করতে হবে, নয় প্রেসিডেন্সির মত কলেজের গেটে তালা ঝুলিয়ে বলতে হবে “হোস্টেল দাও তবে তালা খুলব।” সুবিধামত সরকার কোথাও বলবে “এটা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের আভ্যন্তরীণ ব্যাপার” আর কোথাও “সরকারের টাকায় চলবে, সরকারের কথা শুনবে না?” ওদিকে মালদার স্বীকৃতিবিহীন কলেজটার ছাত্রছাত্রীদের আন্দোলন এখনো চলছে, কলকাতার বুকে। ওদের জন্যে কেউ কোন সমাধান খুঁজছেন কিনা কে জানে?
আপনি যদি শিক্ষিত যুবক/যুবতী বা তাদের বাবা-মা হন, আপনি ভাবতেই পারেন “এ রাজ্যটা একেবারে গেছে। ওকে বাইরে পাঠিয়ে দেব।” কিন্তু তাতেও নিস্তার নেই। সমস্ত সরকারী বা বেসরকারী সমীক্ষায় দেশের যে বিশ্ববিদ্যালয় সবসময় প্রথম সারিতে (যদি প্রথম না হয়) থাকে, সেই জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ে সরকারী পার্টির ছাত্র সংগঠন মারদাঙ্গা করেও সংসদ দখল করতে পারেনি। সেই রাগে দেশের প্রতিরক্ষা মন্ত্রী বলে দিয়েছেন ঐ বিশ্ববিদ্যালয়ে “ভারতবিরোধী শক্তি” কাজ করছে। অর্থাৎ দেশের অন্যতম সেরা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছাত্রছাত্রী, গবেষকদের ভারত সরকার শত্রু হিসাবে দেগে দিল। তার কয়েকদিন আগেই দিল্লীর জাকির হুসেন কলেজেও সংসদ নির্বাচনের দিন তাণ্ডব চলেছে।
গত পাঁচ বছরে ভারত সরকারের নিশানায় জেএনইউ ছাড়াও এসেছে হায়দরাবাদ বিশ্ববিদ্যালয়, আলিগড় প্রভৃতি। ক্যান্টিনে এটা কেন, ওটা কেন নয়? অমুক জায়গায় তমুকের ছবি ঝুলছে কেন? আবোল তাবোল ছুতোয় পড়াশোনা নষ্ট করে দেওয়ার প্রবল প্রচেষ্টা চলছে, চলবে।
কোথায় কেমন লেখাপড়া হচ্ছে তা নিয়ে সরকার বিন্দুমাত্র চিন্তিত নয়। তারা বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে ঢাউস জাতীয় পতাকা টাঙাতে ব্যস্ত, সাঁজোয়া গাড়ি রাখতে চায়। অবশ্য শুধু চায় বললে এই সরকারের সক্রিয়তাকে নেহাতই অসম্মান করা হয়। খোদ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (UGC) সব বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যদের চিঠি দিয়ে জানিয়েছেন ২৯শে সেপ্টেম্বর তারিখটা সার্জিকাল স্ট্রাইক দিবস হিসাবে পালন করতে হবে। সেদিন এন সি সি প্যারেড করতে হবে, ছাত্রছাত্রীদের দিয়ে সেনাবাহিনীর প্রশংসাসূচক ডিজিটাল বা সত্যিকারের কার্ড বানাতে হবে, দিল্লীতে এবং সব রাজ্যের রাজধানীতে এই উপলক্ষে যে প্রদর্শনীর ব্যবস্থা হচ্ছে ছাত্রছাত্রীদের সেখানে যেতে উৎসাহ দিতে হবে ইত্যাদি। অর্থাৎ বিশ্ববিদ্যালয় ততটা পড়াশোনার জায়গা নয় যতটা দেশপ্রেমের প্রদর্শনীর জায়গা।
অবশ্য এর জন্যে মঞ্জুরি কমিশনের উপর রাগ না করাই ভাল। সে বেচারা নিজেই তো আর দুদিন পর থাকবে না। পরিকল্পনা কমিশন গিয়ে নীতি আয়োগ এসেছে, যার প্রয়োগ সম্বন্ধে রচনা লিখতে দিলে চেয়ারম্যান নিজেও মাথা চুলকোবেন। আগামী দিনে মঞ্জুরি কমিশন গিয়ে কোন এক জো হুজুরি কমিশন আসবে নিশ্চয়ই। অবশ্য ওসবের দরকারই বা কী? এখনো তৈরি না হওয়া বিশ্ববিদ্যালয়কে যখন সরকার স্বয়ং সেন্টার অফ এক্সেলেন্স তকমা দিয়ে দিচ্ছেন তখন আর ন্যাক, ইউজিসি এসব রেখে আয়করদাতার পয়সা নষ্ট করা কেন?
এসবেও অবশ্য অনেকেরই আপত্তি নেই। ভারতীয় বিজ্ঞান কংগ্রেসে পুষ্পক বিমানের মডেল নিয়ে তো আলোচনা হয়েই গেছে। ফলে বোঝাই যাচ্ছে আধুনিক বিদ্যাগুলো সব ফালতু। ওগুলো শেখার কোন দরকারই নেই। অতএব উঠে যাক না স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়গুলো। তবে খারাপ লাগে আমার সেইসব বোকা বন্ধুদের জন্যে, যারা গত এক দশক উন্নত দেশগুলোর বিভিন্ন গবেষণাগারে কাজ করে, এ দেশের চেয়ে অনেক উন্নত জীবনযাত্রায় থেকেও ভুলতে পারেনি যে তার লেখাপড়ার খরচ অনেকদিন পর্যন্ত ভাগ করে নিয়েছে এ দেশের রিকশাওয়ালা, পানওয়ালা, লোকের বাড়িতে বাসন মাজে যারা তারা। সেই বোকাগুলো দেশে ফিরে এসে দেশকে কিছু ফিরিয়ে দিতে চাইছে আর কিছুতেই বুঝে উঠতে পারছে না তাদের যোগ্যতা কেন দেশে ফিরে আসার জন্যে যথেষ্ট হচ্ছে না। ভাবি তাদের মনে করিয়ে দেব “লেখাপড়া করে যে-ই/অনাহারে মরে সে-ই।/জানার কোন শেষ নাই/জানার চেষ্টা বৃথা তাই।/বিদ্যালাভে লোকসান/নাই অর্থ নাই মান”।
সরকার কেন খাল কেটে উদয়ন পণ্ডিত আনতে যাবে?

প্রকল্প এখন প্রকাশ্যে

যেন একটা আলাদা আইন থাকলে গরুগুলোর চেয়ে রাকবরের প্রাণের মূল্য ঝাড়খন্ড পুলিশের কাছে বেশি হত

রাজস্থানে শুনেছি জল খুব সুলভ নয়। তবু পাছে পুলিশের গাড়ি নোংরা হয়, মৃতপ্রায় রাকবরকে ধুয়ে মুছে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার জন্যে গাড়িতে তোলা হয়েছিল। তবে বেদম পিটুনির পর ধুয়ে দিলেই রক্তপাত বন্ধ হয় না। তাই সম্ভবত তার পরেও গোটা রাস্তায় রাকবরের রক্ত চুঁইয়ে চুঁইয়ে পড়েছে। ঘটনাস্থল থেকে হাসপাতাল — এই দীর্ঘ ছ কিলোমিটার পথে নিশ্চয়ই তার রক্তের রেখা এখনো মিলিয়ে যায়নি। রাজস্থানে তো জল সুলভ নয়।
তা রাকবর খানের রক্তের রেখা মিলিয়ে যেতে না যেতেই উত্তরপ্রদেশের গাজিয়াবাদে সাহিল মার খেয়ে মরতে মরতে বেঁচে গেলেন। রাকবর আর সাহিলের মধ্যে চট করে কোন মিল চোখে পড়ে না। প্রথমজনের পেশা পশুপালন, দ্বিতীয়জন একটা চাকরি করেন। প্রথমজন গাঁয়ের লোক, দ্বিতীয়জন মধ্যপ্রদেশের রাজধানী ভোপালের বাসিন্দা। প্রথমজন বিবাহিত এবং ইতিমধ্যেই বাবা হয়েছিলেন, দ্বিতীয়জন গিয়েছিলেন পছন্দের মানুষের সাথে ঘর বাঁধতে। দুজনের মধ্যে বস্তুত একটাই মিল — দুজনেই মুসলমান। কতটা ধর্মপ্রাণ ওঁরা তাও আমরা জানি না, কিন্তু যাদের কাছে আসল হল ধর্মীয় পরিচিতি তারা আদার ব্যাপারী। জাহাজের খোঁজ তারা নিতে চায় না। গত কয়েকবছরে ঘটে চলা গণপ্রহারে মৃত্যুর মিছিলে চোখ রাখলে ধর্মান্ধ বদমাইশ ছাড়া সকলেই দেখতে পাবেন যে এই সংগঠিত খুনগুলোর লক্ষ্য ইসলাম ধর্মাবলম্বী মানুষেরা আর খুনগুলোর করছে ক্ষমতাসীন সঙ্ঘ পরিবার, যারা ভারতকে হিন্দুরাষ্ট্রে পরিণত করতে চায়।
একথা এতদিন পর্যন্ত আমার মত দেশদ্রোহী মাকু, সেকুরাই কেবল বলছিল। এখন আর তা নয়। গণপ্রহারের শিকার হওয়া অতিপরিচিত হিন্দু সন্ন্যাসী স্বামী অগ্নিবেশ গত সপ্তাহে টাইমস অফ ইন্ডিয়াকে একটা সাক্ষাৎকারে পরিষ্কার বলেছেন “It was a lynch mob, except it was not a faceless lynch mob but one that was sponsored and supported by the powers that be in the state and central governments. I am not the first one to be attacked, many more have been lynched to death. Akhlaq Khan was killed in Dadri, so was Pehlu Khan and Junaid, and not a single murderer has been apprehended.”
রাকবরের খুন যা নতুন করে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে তা হল হিন্দুত্ববাদী প্রশাসনের প্রকল্পই হল মুসলমান নাগরিকদের খুন করা। এরপর রেজিস্ট্রি করে হিন্দু প্রেমিকাকে বিয়ে করতে গিয়ে সাহিলের মার খাওয়া প্রমাণ করে মুসলমানদের মারা তাদের মারার জন্যেই। গোরক্ষা, লাভ জিহাদ ইত্যাদি হল নতুন নতুন অজুহাত। আগে তবু মন্ত্রী সান্ত্রীদের চোখের চামড়া বজায় রাখার দায় ছিল। এখন আর সেসব নেই। অভিযুক্তরা জামিনে ছাড়া পেলে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী ড্যাং ড্যাং করে মাল্যদান করতেও চলে যাচ্ছেন।
রাজধানী দিল্লীতে বসে অবশ্য এখনো একটু কুম্ভীরাশ্রু বিসর্জন করতে হচ্ছে। সংবিধানটা এখনো বদলানো হয়নি কিনা। তাই আমাদের বিশুদ্ধ হিন্দি বলা নিপাট ভালমানুষ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন “প্রয়োজনে সরকার গণপিটুনির বিরুদ্ধে আইন করতে প্রস্তুত।” যেন নতুন একখানা আইন করে দিলেই সমস্যা মিটে যাবে। যেন এখনকার আইনে মানুষকে পিটিয়ে মেরে ফেলা আইনসম্মত। যেন অপরাধীদের শাস্তি হচ্ছে না শুধু উপযুক্ত আইন নেই বলে। যেন একটা আলাদা আইন থাকলে গরুগুলোর চেয়ে রাকবরের প্রাণের মূল্য ঝাড়খন্ড পুলিশের কাছে বেশি হত। “ও মন্ত্রীমশাই, ষড়যন্ত্রীমশাই… যত চালাকি তোমার, জানতে নাইকো বাকি আর।”
ধর্মীয় পরিচয়ে নিরাপদ দূরত্বে থাকা যেসব লোকেরা এখনো বেড়ার উপর বসে পা দোলাচ্ছেন আর “নিরপেক্ষতা”, “ডায়লগ” — এইসব ন্যাকা শব্দ কপচাচ্ছেন তাঁরা স্বামী অগ্নিবেশের সাবধানবাণীটা একবার পড়ে নেবেন “What they call hardline Hindutva is the greatest threat to Hindu culture, or sanatan dharam… The hardline approach of causing harm to whoever disagrees is a kind of nascent fascism.”
অবশ্য সাবধান হবে কে? অনেক লেখাপড়া জানা লোকের মতে তো আবার ফ্যাসিবাদ খুব ভাল জিনিস, দেশের ওটাই দরকার, হিটলার দারুণ লোক ছিল ইত্যাদি।