লেখাপড়া করে যে-ই

ইসলামপুর নিয়ে পক্ষ নিতেই হবে কারণ ইসলামপুর প্রথম ঘটনা নয়, বিচ্ছিন্ন ঘটনাও নয়

মোদ্দাকথা পড়াশোনা হোক সেটা সরকার চায় না। কেন্দ্রীয় সরকারও চায় না, রাজ্য সরকারও চায় না।
যাঁরা ছাত্রদের রাজনীতি করার অধিকারের বিরুদ্ধে তাঁদের মধ্যে দুরকম মত আছে। এক দল মনে করেন ছাত্রদের শুধু বইয়ে মুখ গুঁজে থাকা উচিৎ, আর কিছু করা তাদের স্বাস্থ্যের পক্ষে ক্ষতিকারক। আরেক দল মানুষের মতে রাজনীতি করতে পারে, কিন্তু সে রাজনীতির দাবীদাওয়া হওয়া উচিৎ একান্ত ছাত্রদের। ক্যাম্পাসের বাইরের কোন ঘটনার অভিঘাত সেখানে থাকা চলবে না। এই মতগুলোর ভাল মন্দের মধ্যে যাচ্ছি না। কিন্তু দুরকম মতের লোকেরাই নিশ্চয়ই স্বীকার করবেন যে এ রাজ্যের এবং এ দেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে কত কয়েক বছর ধরে যা চলছে তা সরাসরি ছাত্রছাত্রীদের লেখাপড়ায় প্রভাব ফ্যালে। সুতরাং সেগুলোকে ভুলে বই মুখে গুঁজে বসে থেকে তাদের বিশেষ লাভ নেই। কারণ পড়ার পরিবেশ এবং উদ্দেশ্যই নষ্ট করে দেওয়া হচ্ছে।
স্কুলে বাংলার শিক্ষক নেই। সে জায়গা পূরণ করা দীর্ঘদিনের দাবী। অথচ এসে হাজির হলেন উর্দু আর সংস্কৃতের শিক্ষকরা। ছাত্রদের মধ্যে অসন্তোষ, হতেই পারে কিছু বাইরের লোকও তাদের অসন্তোষে ঘৃতাহুতি করেছে। একটা এলাকার স্কুল কলেজের সাথে সেই এলাকার সমস্ত মানুষেরই স্বার্থ জড়িত আছে, বিশেষত সরকারপোষিত স্কুলগুলোর সাথে। উচ্চবিত্ত, মধ্যবিত্তরা এখন ছেলেমেয়েকে অমুক ইন্টারন্যাশনাল, তমুক পাবলিক স্কুলে পাঠাতে পারেন। গরীব, নিম্নবিত্ত ছেলেমেয়েদের জন্যে এখনো যে সরকারী স্কুলই ভরসা। ফলে বহিরাগত আপনি বলবেন কাকে? তাছাড়া কোন রাজনীতিবিদ এসে দিদিমণিকে জগ ছুঁড়ে মারলে যখন বহিরাগতর প্রশ্ন ওঠে না, তখন এ বেলাতেই বা সে প্রশ্ন কেন উঠবে?
ইসলামপুর নিয়ে পক্ষ নিতেই হবে কারণ ইসলামপুর প্রথম ঘটনা নয়, বিচ্ছিন্ন ঘটনাও নয়। দীর্ঘ তিন চার দশক ধরে পশ্চিমবঙ্গে যে চাকরিটা যোগ্যতা থাকলেই পাওয়া যায় বলে লোকে জানত সেটা হল স্কুল শিক্ষকের চাকরি। সেখানেও দুর্নীতি, স্বজনপোষণ ঢুকে পড়ায় বামফ্রন্ট সরকারের আমলে নেট বা স্লেট পরীক্ষার আদলে স্কুল সার্ভিস পরীক্ষা চালু হয়। বর্তমান সরকার আসার পরে সেই পরীক্ষা নিয়মিত হয় না, হলেও কে পাশ করল আর কে চাকরি পেল তা ভগবান আর সরকার ছাড়া কাক পক্ষীতেও টের পায় না। বেসরকারী ক্ষেত্রে কাজ করা লোকেরা বিশ্বায়নের যুগে কর্মক্ষেত্রে আন্দোলন করার অধিকার হারিয়েছে, সরকারী কর্মচারীদের সে অধিকার বজায় আছে বলে জানা ছিল। কিন্তু শিক্ষকদের অধিকারের এমনই চেহারা যে এক সহকর্মীর ভোট করাতে গিয়ে রহস্যমৃত্যুর তদন্ত চাইলেও হাজতবাস করতে হয়, মার খেতে হয়। স্কুল চত্বরেও বিভিন্ন শ্রী সামলাতে সামলাতে লেখাপড়ার বিশ্রী অবস্থা মেনে নিতে হচ্ছে মাস্টারমশাই-দিদিমণিদের।
এদিকে কলেজগুলো চলছে একগাদা আংশিক সময়ের অধ্যাপকদের দিয়ে। তরুণ মেধাবীরা প্রায় ঠিকে ঝিতে পর্যবসিত। তারা এবং প্রবীণরা সর্বদাই আতঙ্কে আছেন, কখন ছাত্র সংসদ বা অন্য কারো কোপদৃষ্টি পড়ে। মারধোর না খেয়ে সসম্মানে বাড়ি ফিরতেই পারলেই যথেষ্ট, পড়ানোয় আর মন দেবেন কখন?
উল্টোদিকে কলেজ ভর্তি হতে গেলে কয়েক হাজার বা লক্ষ টাকা তোলা দিতে হবে ছাত্র সংসদকে। অথচ ছাত্র সংসদ ভেঙে দেওয়া হয়েছে বহু কলেজে। আন্দোলনের দাবী ন্যায্য, অন্যায্য যা-ই হোক, যাদবপুর থেকে বিধানচন্দ্র কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত সর্বত্র সরকার এবং প্রধানদের সমাধান হল “পুলিশ ডাকো আর ঠ্যাঙাও।” এও মোটামুটি স্বতঃসিদ্ধ যে ছাত্রদের কোন দাবী থাকতে নেই। অতএব হোস্টেলে থাকার জায়গা আদায় করতে হলেও তাদের হয় মেডিকাল কলেজের মত অনশন করতে হবে, নয় প্রেসিডেন্সির মত কলেজের গেটে তালা ঝুলিয়ে বলতে হবে “হোস্টেল দাও তবে তালা খুলব।” সুবিধামত সরকার কোথাও বলবে “এটা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের আভ্যন্তরীণ ব্যাপার” আর কোথাও “সরকারের টাকায় চলবে, সরকারের কথা শুনবে না?” ওদিকে মালদার স্বীকৃতিবিহীন কলেজটার ছাত্রছাত্রীদের আন্দোলন এখনো চলছে, কলকাতার বুকে। ওদের জন্যে কেউ কোন সমাধান খুঁজছেন কিনা কে জানে?
আপনি যদি শিক্ষিত যুবক/যুবতী বা তাদের বাবা-মা হন, আপনি ভাবতেই পারেন “এ রাজ্যটা একেবারে গেছে। ওকে বাইরে পাঠিয়ে দেব।” কিন্তু তাতেও নিস্তার নেই। সমস্ত সরকারী বা বেসরকারী সমীক্ষায় দেশের যে বিশ্ববিদ্যালয় সবসময় প্রথম সারিতে (যদি প্রথম না হয়) থাকে, সেই জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ে সরকারী পার্টির ছাত্র সংগঠন মারদাঙ্গা করেও সংসদ দখল করতে পারেনি। সেই রাগে দেশের প্রতিরক্ষা মন্ত্রী বলে দিয়েছেন ঐ বিশ্ববিদ্যালয়ে “ভারতবিরোধী শক্তি” কাজ করছে। অর্থাৎ দেশের অন্যতম সেরা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছাত্রছাত্রী, গবেষকদের ভারত সরকার শত্রু হিসাবে দেগে দিল। তার কয়েকদিন আগেই দিল্লীর জাকির হুসেন কলেজেও সংসদ নির্বাচনের দিন তাণ্ডব চলেছে।
গত পাঁচ বছরে ভারত সরকারের নিশানায় জেএনইউ ছাড়াও এসেছে হায়দরাবাদ বিশ্ববিদ্যালয়, আলিগড় প্রভৃতি। ক্যান্টিনে এটা কেন, ওটা কেন নয়? অমুক জায়গায় তমুকের ছবি ঝুলছে কেন? আবোল তাবোল ছুতোয় পড়াশোনা নষ্ট করে দেওয়ার প্রবল প্রচেষ্টা চলছে, চলবে।
কোথায় কেমন লেখাপড়া হচ্ছে তা নিয়ে সরকার বিন্দুমাত্র চিন্তিত নয়। তারা বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে ঢাউস জাতীয় পতাকা টাঙাতে ব্যস্ত, সাঁজোয়া গাড়ি রাখতে চায়। অবশ্য শুধু চায় বললে এই সরকারের সক্রিয়তাকে নেহাতই অসম্মান করা হয়। খোদ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (UGC) সব বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যদের চিঠি দিয়ে জানিয়েছেন ২৯শে সেপ্টেম্বর তারিখটা সার্জিকাল স্ট্রাইক দিবস হিসাবে পালন করতে হবে। সেদিন এন সি সি প্যারেড করতে হবে, ছাত্রছাত্রীদের দিয়ে সেনাবাহিনীর প্রশংসাসূচক ডিজিটাল বা সত্যিকারের কার্ড বানাতে হবে, দিল্লীতে এবং সব রাজ্যের রাজধানীতে এই উপলক্ষে যে প্রদর্শনীর ব্যবস্থা হচ্ছে ছাত্রছাত্রীদের সেখানে যেতে উৎসাহ দিতে হবে ইত্যাদি। অর্থাৎ বিশ্ববিদ্যালয় ততটা পড়াশোনার জায়গা নয় যতটা দেশপ্রেমের প্রদর্শনীর জায়গা।
অবশ্য এর জন্যে মঞ্জুরি কমিশনের উপর রাগ না করাই ভাল। সে বেচারা নিজেই তো আর দুদিন পর থাকবে না। পরিকল্পনা কমিশন গিয়ে নীতি আয়োগ এসেছে, যার প্রয়োগ সম্বন্ধে রচনা লিখতে দিলে চেয়ারম্যান নিজেও মাথা চুলকোবেন। আগামী দিনে মঞ্জুরি কমিশন গিয়ে কোন এক জো হুজুরি কমিশন আসবে নিশ্চয়ই। অবশ্য ওসবের দরকারই বা কী? এখনো তৈরি না হওয়া বিশ্ববিদ্যালয়কে যখন সরকার স্বয়ং সেন্টার অফ এক্সেলেন্স তকমা দিয়ে দিচ্ছেন তখন আর ন্যাক, ইউজিসি এসব রেখে আয়করদাতার পয়সা নষ্ট করা কেন?
এসবেও অবশ্য অনেকেরই আপত্তি নেই। ভারতীয় বিজ্ঞান কংগ্রেসে পুষ্পক বিমানের মডেল নিয়ে তো আলোচনা হয়েই গেছে। ফলে বোঝাই যাচ্ছে আধুনিক বিদ্যাগুলো সব ফালতু। ওগুলো শেখার কোন দরকারই নেই। অতএব উঠে যাক না স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়গুলো। তবে খারাপ লাগে আমার সেইসব বোকা বন্ধুদের জন্যে, যারা গত এক দশক উন্নত দেশগুলোর বিভিন্ন গবেষণাগারে কাজ করে, এ দেশের চেয়ে অনেক উন্নত জীবনযাত্রায় থেকেও ভুলতে পারেনি যে তার লেখাপড়ার খরচ অনেকদিন পর্যন্ত ভাগ করে নিয়েছে এ দেশের রিকশাওয়ালা, পানওয়ালা, লোকের বাড়িতে বাসন মাজে যারা তারা। সেই বোকাগুলো দেশে ফিরে এসে দেশকে কিছু ফিরিয়ে দিতে চাইছে আর কিছুতেই বুঝে উঠতে পারছে না তাদের যোগ্যতা কেন দেশে ফিরে আসার জন্যে যথেষ্ট হচ্ছে না। ভাবি তাদের মনে করিয়ে দেব “লেখাপড়া করে যে-ই/অনাহারে মরে সে-ই।/জানার কোন শেষ নাই/জানার চেষ্টা বৃথা তাই।/বিদ্যালাভে লোকসান/নাই অর্থ নাই মান”।
সরকার কেন খাল কেটে উদয়ন পণ্ডিত আনতে যাবে?

বিজ্ঞান, অপবিজ্ঞান ও কাঁচকলা

প্রাকৃতিক বিজ্ঞানের লোকেরা আজকে জে এন ইউ, দিল্লী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদের মার খেতে দেখে যেন ভাববেন না আপনাদের উপরে কোন আক্রমণ আসবে না। যে উদাহরণটা দিলাম ওটা যে কোনদিন সত্যি হয়ে যেতে পারে। ইতিমধ্যেই বিজ্ঞান কংগ্রেসে প্রাচীন ভারতের বিমান প্রযুক্তি নিয়ে আলোচনা হয়ে গেছে। অমর্ত্য সেনকে যারা মূর্খ বলে তারা যে অশোক সেনকে বেশিদিন পন্ডিত বলে মানবে এমন মনে করা যুক্তিসঙ্গত নয়

১৯৮০র দশকে যখন প্রাথমিক শিক্ষার গন্ডিও পেরোইনি তখন থেকেই আত্মীয়স্বজন পাড়া প্রতিবেশীদের কথাবার্তায় বুঝতে পারতাম যে উচ্চশিক্ষায় বিজ্ঞান নিয়ে পড়াশোনা না করে উপায় নেই। অর্থাৎ চাকরিবাকরি পাওয়া যাবে না। একটু বড় হতেই শুনলাম শুধু বিজ্ঞান পড়াও যথেষ্ট নয়, ডাক্তার অথবা ইঞ্জিনিয়ার হতেই হবে। নাহলে লেখাপড়া করার মানেই হয় না। ঘটনাচক্রে আমার বাবা শিক্ষক, একজন বাদে অন্য জ্যাঠারা শিক্ষক/অধ্যাপক, মামা মাসিরাও ঐ পেশায়, এমনকি মায়ের মামা মাসি, মেসোরাও অনেকে তাই। কিন্তু যা বুঝতাম সেটা হল ওঁদের সময়ে মাস্টার হওয়া ভাল ছিল কিন্তু আমার প্রজন্মের ভদ্রঘরের ছেলেকে (মেয়ে হলে অন্যরকম চলতে পারে, কারণ “সেই তো বিয়ে দিতে হবে”) ডাক্তার বা ইঞ্জিনিয়ারই হতে হবে।
কতকটা নিকটাত্মীয়দের বেশিরভাগ শিক্ষকতায় থাকার ফলে, অনেকটাই বাবা-মায়ের ব্যতিক্রমী চিন্তাভাবনার সুবাদে আর খানিকটা বরাবর অতি সাধারণ ছাত্র হওয়ার ফলে আমার উপরে বিজ্ঞান পড়ার বা ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার হওয়ার চাপ কখনো এসে পড়েনি। নিজের ইচ্ছামতই স্কুল ছাড়ার পরে কলা বিভাগের ছাত্র হতে পেরেছিলাম। তারপর ইংরিজি সাহিত্যের অযোগ্য ছাত্রও হতে পেরেছিলাম। কিন্তু অনেক যোগ্যতর সহপাঠীকে দেখেছি যারা এই স্বাধীনতাটা পায়নি। গান বাজনায় প্রবল আগ্রহ, নিচু ক্লাস থেকেই রাজনৈতিকভাবে খুব সচেতন, বইপাগল অনেক সহপাঠীকে দেখেই মনে হত, এখনো হয়, যে তারা সাহিত্য বা সমাজবিজ্ঞানে ভাল অবদান রাখতে পারত। যারা পারেনি তাদের অপরাধ তারা পরীক্ষায় চমৎকার নম্বর পেত। ভাল নম্বর পাওয়া ছেলেদের ইংরিজিতে যাকে humanities বলে তা নিয়ে পড়াশোনা করা একেবারে বারণ ছিল। ফলে তারা এদেশের লক্ষ লক্ষ ডাক্তারের একজন হয়েছে বা কোন বহুজাতিকের হয়ে সফটওয়্যার কোড লিখে দিন কাটাচ্ছে। যারা কোনভাবে উচ্চ মাধ্যমিকে বিজ্ঞান নিয়ে পড়তে গিয়ে ধ্যাড়াতে পেরেছিল তারা তবু উপকৃত হয়েছে, সাহিত্যের বা সমাজবিজ্ঞানের গবেষণায়, শিক্ষকতায় সরে এসে নিজের বিষয়কে এবং নিজেকে সমৃদ্ধ করেছে। যারা অন্ততপক্ষে জয়েন্ট এন্ট্রান্স পরীক্ষায় ব্যর্থ হতে পেরেছিল তারাও প্রাকৃতিক বিজ্ঞানের গবেষণায় বা মাস্টারিতে প্রাণ ঢেলে দিয়ে সুখী হয়েছে।
এ থেকে যা প্রমাণ হয় তা হল প্রায় চল্লিশ বছর আগে থেকেই আমাদের দেশের শিক্ষিত মধ্যবিত্ত, উচ্চবিত্তদের মধ্যে চালু ধারণা হল সমাজবিজ্ঞান এবং সাহিত্য ফালতু বিষয়, বিজ্ঞান পড়তে গিয়ে ব্যর্থ হলে বা মেধায় না কুলোলে তবেই ওগুলো পড়া যেতে পারে। ওগুলো এমনকি দ্বিতীয় পছন্দও নয় অনেকের কাছেই। শুধু মাড়োয়ারি নয়, অনেক বাঙালি পরিবারেও দেখেছি উচ্চ মাধ্যমিকে খারাপ নম্বর পেলে বি কমে ঢুকে পড়তে বলা হত। এর একটা কারণ এই যে কোন এক অজ্ঞাত কারণে একটা ধারণা তৈরি হয়েছিল কলাবিভাগে পড়লে অর্থকরী চাকরি পাওয়া যায় না। ততদিনে কিন্তু বামফ্রন্ট সরকার স্কুল, কলেজের শিক্ষকদের ভদ্রস্থ মাইনে দিতে শুরু করেছে।
এই মানসিকতার পরিবর্তন তখনো হয়নি যখন অর্থনৈতিক উদারীকরণের প্রায় এক দশক পরে শিল্পে স্বয়ংক্রিয় যন্ত্রের প্রভাবে চাকরিবাকরি কমতে শুরু করল। এই যে সকলকে ঠেলেঠুলে বিজ্ঞান প্রযুক্তি পড়ানো এই প্রবণতাকে কিছুটা সদর্থক বলা যেত যদি এর কারণটা শুধুই পেশাগত না হয়ে মূলত বিজ্ঞানমনস্কতা হত। কিন্তু ঘটনা একেবারেই সেরকম ছিল না। আমাদের এক অধ্যাপক আবশ্যিক বাংলার ক্লাসে একবার বলেছিলেন “তোমরা এতজন যে বিজ্ঞানে অনার্স পড় তার কারণ এই নয় যে তোমরা সবাই বিজ্ঞানকে খুব জরুরী জিনিস মনে কর। তোমরা পড় কারণ একটা প্রচার আছে যে বিজ্ঞান পড়লে ভাল চাকরি পাওয়া যায়। যদি কুসংস্কারে অনার্স পড়লে ভাল চাকরি পাওয়া যেত তাহলে তোমরা কুসংস্কারেই অনার্স পড়তে।” কথাটা বলে তিনি অনেক ছাত্রের বিরাগভাজন হয়েছিলেন, কিন্তু কথাটা সত্যি। সেসময়ে যারা লেখাপড়া করেছে তারা নিজের মনে জানে যে কথাটা সত্যি।
এতে কার ক্ষতি হয়েছে? বরাবর ভাবতাম যাদের জোর করে অপছন্দের বিষয় পড়ানো হয়েছে বুঝি শুধু তাদেরই ক্ষতি হয়েছে। কিন্তু এখন দেখছি একটা বিরাট সামাজিক ক্ষতি হয়ে গেছে। বেশ কয়েকটা প্রজন্ম তৈরি হয়েছে যাদের ইতিহাসজ্ঞান বলে প্রায় কিচ্ছু নেই কারণ স্কুলে ইতিহাস পড়ার সময়ে এদের বলা হয়েছিল ওটা জরুরী বিষয় নয়, “মুখস্থ করে নম্বর পেয়ে গেলেই যথেষ্ট। মন দিয়ে অঙ্ক, বিজ্ঞান পড়”। ফলে আজকে আপনি এদের বলুন ভগৎ সিংকে ১৪ই ফেব্রুয়ারি ফাঁসি দেওয়া হয়েছিল, এরা পত্রপাঠ বিশ্বাস করে ফেলবে। এদের বলুন জওহরলাল নেহরু দেশের জন্য কিছুই করেননি, এরা বিশ্বাস করে ফেলবে। কারণ স্কুলের ইতিহাস বইতে স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাস যা পড়া হয়েছিল তার বিন্দুবিসর্গও এদের মনে নেই। মনে রাখার দরকার নেই ভেবে পড়লে মনে থাকার কথাও নয়। এদের বলুন নেহরুর বদলে সর্দার প্যাটেল প্রধানমন্ত্রী হলে দেশের চেহারা অন্যরকম হত। বিনা প্রশ্নে বিশ্বাস করে নেবে কারণ সন্দেহ হতে গেলে যে প্রাথমিক পড়াশোনা থাকতে হয় সেটাই নেই। থাকলে গুগল করেই জানতে পারত যে সর্দার নেহরুর চেয়ে ১৪ বছরের বড় এবং ১৯৪৭এ দেশ স্বাধীন হয় আর সর্দার মারা যান ১৯৫০এ। প্রধানমন্ত্রী হলেই বা তিনি দেশটা গড়ার সময় পেতেন কখন?
কিন্তু ক্ষতির শেষ শুধু ইতিহাসচেতনাহীনতায় নয়। আরো বড় ক্ষতি এই যে ভারতীয়দের বিরাট অংশ মনে করে সমাজবিজ্ঞানের বিষয়গুলোর কোন কার্যকারিতা নেই, এগুলো অধ্যয়ন করতে কোন মেধা লাগে না, যে কেউ এগুলো নিয়ে কাজ করতে পারে। এই চিন্তার কারণেই সোশাল মিডিয়ায় এবং তার বাইরেও দেখবেন বলা হয় যাদবপুর, জেএনইউ, এফ টি আই আই তে যারা পড়ে তারা হল “ফ্রি লোডার”, তাদের কোন কাজ নেই, শুধু নেশা করে। চট করে কোন আই আই টি সম্পর্কে এরকম বলতে শুনবেন না। অথচ আই আই টির ছেলেমেয়েরাও সরকারী ভর্তুকি পায়, তাদের কেউ কেউও নেশা করে। কেউ বলছে “অমর্ত্য সেন অর্থনীতির কী বোঝেন? ওনার থেকে বড়বাজারে যে ব্যবসা চালায় সে ভাল বোঝে।” আবার কেউ হয়ত বলছে “ফলি নরিম্যান চিফ জাস্টিস ছিলেন বলেই কিসে সিডিশন হয় জানেন তা প্রমাণ হয় না। উকিলরা সব বদমাইশ।”
অথচ কখনো শুনবেন না কেউ বলছে “এ পি জে আব্দুল কালাম বিজ্ঞানের কী বুঝত?” শুনবেন না কারণ গড়পড়তা লোকের ধারণা প্রাকৃতিক বিজ্ঞান বা প্রযুক্তি নিয়ে যারা কাজ করে তারা মেধাবী এবং তাদের কাজ দেশের কাজে লাগে। সমাজবিজ্ঞানের আওতায় কী পড়ে, সেগুলো যে আমাদের প্রত্যেকের জীবনে নির্ধারক ভূমিকা নেয়, বস্তুত একজন প্রযুক্তিবিদ বা পদার্থবিদের কাজের চেয়ে একজন অর্থনীতিবিদ বা রাষ্ট্রবিজ্ঞানীর কাজের প্রভাবই যে একজন সাধারণ নাগরিকের জীবনে বেশি প্রত্যক্ষ সেকথা বোঝার শক্তি লেখাপড়া জানা ভারতবাসীর অধিকাংশেরই আজ নেই। অথচ যদি সমাজবিজ্ঞানের গুরুত্ব কম হত তাহলে উমর খালিদকে বাস্তার নিয়ে সেমিনারে বক্তৃতা দিতে আটকানো হত না, আই আই এস সি র পদার্থবিদ্যার কোন গবেষককে আটকানো হত স্ট্রিং থিওরি নিয়ে কোন বক্তৃতা দেওয়া থেকে। বলা হত “এসব বলা যাবে না। এগুলো বেদবিরোধী।”
প্রাকৃতিক বিজ্ঞানের লোকেরা আজকে জে এন ইউ, দিল্লী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদের মার খেতে দেখে যেন ভাববেন না আপনাদের উপরে কোন আক্রমণ আসবে না। যে উদাহরণটা দিলাম ওটা যে কোনদিন সত্যি হয়ে যেতে পারে। ইতিমধ্যেই বিজ্ঞান কংগ্রেসে প্রাচীন ভারতের বিমান প্রযুক্তি নিয়ে আলোচনা হয়ে গেছে। অমর্ত্য সেনকে যারা মূর্খ বলে তারা যে অশোক সেনকে বেশিদিন পন্ডিত বলে মানবে এমন মনে করা যুক্তিসঙ্গত নয়।
যে ক্ষতি ইতিমধ্যেই হয়েছে তার ফল এখন কতদিন ভোগ করতে হবে কে জানে? নতুন বাবা-মায়েরা যদি সন্তানকে প্রাকৃতিক বিজ্ঞানের পাশাপাশি সমাজবিজ্ঞান, সাহিত্যের গুরুত্ব সম্পর্কে সচেতন করেন তাহলে সুদূর ভবিষ্যৎটা ভাল হয়।
দায়িত্বটা অবশ্য শেষ অব্দি শিক্ষাব্যবস্থাকেই নিতে হবে। প্রেসিডেন্সির দুশো বছর পূর্তি অনুষ্ঠানে অধ্যাপক সুকান্ত চৌধুরী বলেছিলেন উচ্চশিক্ষায় কলাবিভাগের ছাত্রছাত্রীদেরও অঙ্ক শেখানো উচিৎ। পন্ডিত মানুষ, হয়ত ঠিকই বলেছেন, তবে দেশের এই দুঃসময়টা কেটে গেলে বোধহয় আগে দরকার স্কুলস্তর থেকে যত্ন করে ইতিহাস পড়ানোর সাথে সাথে একেবারে প্রাথমিক স্তরের রাষ্ট্রবিজ্ঞান আর অর্থনীতি পড়ানো।

প্রতিবাদের অধিকার

আপনি সমর্থন করেন না এমন একটা বিষয় নিয়ে আন্দোলন হলেই আপনি বলবেন “আমার টাকায় এসব করা চলবে না। যে পাতে খাচ্ছ, সে পাতেই হাগছ” ইত্যাদি। তাহলে তো মশাই যে পাড়ার লোক সরকারী দলের প্রার্থীকে জেতায় না সে পাড়ায় রাস্তা না বানানোটাই সঠিক রাজনীতি। আপনি মমতার রাজ্যে থেকে বি জে পি, সি পি এম, কংগ্রেস এদের ভোট দেবেন আর দিদির ভাইয়েরা আপনার জন্য ক্যাটরিনার গালের মত রাস্তা বানিয়ে দেবে! আপনিও তো যে পাতে খাচ্ছেন সে পাতেই হাগছেন

JNUSU President Kanhaiya Kumar at JNU

হোক কলরব আন্দোলনের সময় দেখেছি, এখন আবার দেখছি যে আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে একটা যুক্তি দেওয়া হয় — আয়করদাতাদের টাকায় যেহেতু তারা ভর্তুকিপ্রাপ্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়ছে অতএব তাদের প্রতিবাদ-টতিবাদ করার অধিকার নেই। এগুলো করা মানে আয়করদাতার টাকা নষ্ট করা। এই যুক্তি যুগপৎ বোকার যুক্তি এবং গা-জোয়ারি যুক্তি।
কেন এটা বোকার যুক্তি সেটা আগে বলি।

ভারতবর্ষে কয়েক কোটি আয়করদাতা। তারা সকলে প্রায় কোন বিষয়েই একমত নয়। হওয়ার দরকারও নেই। তাহলে কি করে ধরে নেওয়া হয় যে সব আয়করদাতাই মনে করে ছাত্রছাত্রীদের কোন বিষয়ে প্রতিবাদ করা উচিৎ নয় বা আদৌ রাজনীতি করা উচিৎ নয়? যিনি এরকম ভাবেন তিনি ভাবুন কিন্তু আমার আয় বা ভাবনার মালিকানা আমি আপনাকে দিইনি। উপরন্তু যারা আন্দোলন করছে তাদের বাবা-মায়েরাও অনেকে আয়করদাতা। দেশগঠনে তাঁদের আয় কিছু কম পরিমাণে ব্যবহার হয় না। যাদবপুরের যেসব মাস্টারমশাই, দিদিমণি ছাত্রদের সমর্থন করেছিলেন এবং জে এন ইউ এর যাঁরা আন্দোলনের পাশে দাঁড়িয়েছেন তাঁরাও শুধু আয়করদাতার টাকায় মাইনে পান তা নয়, নিজেরাও আয়কর দেন। প্রাক্তন ছাত্রছাত্রী, যাঁরা এদেশে থাকেন, তাঁরাও আয়করদাতা। স্পষ্টত, যে কোন ছাত্র আন্দোলনই বহু আয়করদাতার স্নেহধন্য।

এবার আপনি বলবেন, তাহলে যেসব আয়করদাতা আন্দোলনকারীরা তাদের টাকা নষ্ট করছে মনে করে তাদের মতামত কি মূল্যহীন? একেবারেই না। এখানেই আসছে গা-জোয়ারির প্রশ্নটা। আপনি সমর্থন করেন না এমন একটা বিষয় নিয়ে আন্দোলন হলেই আপনি বলবেন “আমার টাকায় এসব করা চলবে না। যে পাতে খাচ্ছ, সে পাতেই হাগছ” ইত্যাদি। তাহলে তো মশাই যে পাড়ার লোক সরকারী দলের প্রার্থীকে জেতায় না সে পাড়ায় রাস্তা না বানানোটাই সঠিক রাজনীতি। আপনি মমতার রাজ্যে থেকে বি জে পি, সি পি এম, কংগ্রেস এদের ভোট দেবেন আর দিদির ভাইয়েরা আপনার জন্য ক্যাটরিনার গালের মত রাস্তা বানিয়ে দেবে! আপনিও তো যে পাতে খাচ্ছেন সে পাতেই হাগছেন। আমি বামপন্থী। তা বলে আমি একথা বলতে পারি না যে আমি আয়কর দিই বলে বিশ্ববিদ্যালয়ে শুধু এস এফ আই আর এ আই এস এফ কে রাজনীতি করতে দিতে হবে। ছাত্র পরিষদ, টি এম সি পি, এ বি ভি পি সকলেরই অধিকার আছে। আমি এদের অপছন্দ করি বলেই এরা আন্দোলন করলে বলতে পারি না “আমার টাকায় এসব করা চলবে না। যে পাতে খাচ্ছ, সে পাতেই হাগছ”।

যদি বলি তাহলে আমি গুন্ডা। স্বাধীন দেশের নাগরিক-ফাগরিক কিস্যু নই। যে অন্যের স্বাধীনতা মানে না তার নিজের স্বাধীনতাও বাঁচে না।

পুনশ্চ — বিদেশবাসী প্রাক্তনীদের কথা এখানে বললাম না। কারণ তাঁদের মধ্যে যাঁরা ম্যাডিসন স্কোয়ার গার্ডেনে যান তাঁরা অত্যন্ত দেশভক্ত। নিশ্চয় এসব দেশদ্রোহী আন্দোলন কোন যুক্তিতেই সমর্থন করেন না। আর যাঁরা ঐসব অনুষ্ঠানে যান না তাঁরা তো একেবারে দেশদ্রোহী। তাঁরা কি ভাবেন সেই নিয়ে আলোচনা করলে যদি পুলিশে ধরে!

%d bloggers like this: