সব সত্যি

রুকুদার সাথে আমার সেদিন দেখা হল রুবী হাসপাতালের মোড়ে। আপনারা দেখলে চিনবেন না। সে কপাল ছাপানো চুল নেই, মুখে সে মিষ্টি ভাবটি নেই, অভিমানে কেঁদে ভাসানো চোখ দুটিও দিন হোক রাত হোক ব্র‍্যান্ডেড রোদচশমায় ঢাকা থাকে।
কাশীর উমানাথ ঘোষালের একমাত্র পুত্র এখন বছর পঞ্চাশের প্রতিষ্ঠিত ভদ্রলোক। কসবার ফ্ল্যাটটা বেচে দিয়ে সদ্য নিউটাউনের নতুন ফ্ল্যাটে উঠে গেছেন। বয়স যা-ই হোক, তিনি এখনো হাল ফ্যাশনের তরুণ। মাথাটা ক্লীন শেভন, মুখে ফ্রেঞ্চ কাট, গায়ে টি শার্ট আর পরনে ফেডেড জিনস, কব্জিতে ইয়াব্বড় রোলেক্স। জিম করে শরীরটা একদম শন কোনারির মত রেখেছেন। মার্সিডিজ চালিয়ে যেতে যেতে কী করে যে বাস স্ট্যান্ডে আমায় খেয়াল করলেন সে এক আশ্চর্য ব্যাপার। বললেন “উঠে আয়, তোকে ড্রপ করে দেব।”
গাড়িতে উঠেই দেখি পেছনের সিটে হাতের স্মার্টফোনে নিবিষ্ট বছর আষ্টেকের একটি ছেলে। “ও সম্পর্কে আমার নাতি হয়। আমার কাজিনের গ্র‍্যান্ডসন আর কি। বাট উই আর গ্রেট ফ্রেন্ডস। হোয়াট ডুয়ু সে, স্পাইডি?”
“য়া ডুড। ইউ আর আয়রন ম্যান, আয়াম স্পাইডারম্যান। উই আর অ্যাভেঞ্জার্স,” ছেলেটি গম্ভীর মুখে বলল।
“তারপর? কেমন চলছে?” রুকুদা আমার পিঠে চাপড় মেরে বললেন।
“চলার দরকার নেই। থেমে গেলেই ভাল হয়। উল্টোদিকে চলে লাভ কী?” বেজার মুখে বললাম।
“হোয়াই?” প্রশ্নটা শুনেই বুঝলাম উনি বেশ ভালই আছেন। “এনি প্রবলেম?”
“প্রবলেম কি আর একটা? পেঁয়াজের কিলো একশো টাকা, রান্নার গ্যাস সাত-আটশো, রোজ শুনছি এখানে দশ হাজার লোকের চাকরি গেছে, সেখানে পাঁচ হাজার লোকের চাকরি গেছে, লোকে ন-দশ মাস মাইনে না পেয়ে গলায় দড়ি দিচ্ছে, ওদিকে চিকিৎসার যা খরচ… মনে হয় স্বেচ্ছামৃত্যুটা চালু হলে খারাপ হয় না। আর লেখাপড়ার খরচ এত বেড়ে গেছে… ছেলেমেয়েকে মানুষ করব কী করে জানি না…”
“ট্রু। তেলের দাম পঞ্চাশ পয়সা করে বাড়িয়ে বাড়িয়ে এমন জায়গায় এনেছে… ড্রাইভিং আ কার হ্যাজ বিকাম আ লাক্সারি। ডিসগাস্টিং। অ্যান্ড নোবডি প্রোটেস্টস!”
এবার মনে হল রুকুদা আমার দুঃখ কিছুটা হলেও বুঝেছেন। একটু শান্তি পেলাম। এমন সময় উনি বললেন “বাট অ্যাট লিস্ট একটা ভাল জিনিস তো হল।”
“কী বলুন তো?”
“দ্য টেম্পল অফ কোর্স!” এমনভাবে কথাটা বললেন যেন বুঝতে পারিনি বলে আমার সীতার মত পাতাল প্রবেশ করা উচিৎ। “সেই কবে থেকে এই ঝামেলাটা চলছে বল তো? আয়াম সো হ্যাপি দ্যাট ইটস ওভার। আর কি ব্যালান্সড ভার্ডিক্ট বল তো?”
“কিসের ব্যালান্স?”
“আরে কাউকেই তো বঞ্চিত করা হল না। আমরা মন্দির পেলাম, ওদেরও ল্যান্ড দেয়া হল। বানিয়ে নাও মস্ক।”
“কিন্তু রুকুদা, ওখানে তো একটা মসজিদ ছিল। সেটা ভেঙে…”
“আরে যা ছিল, ছিল। সে তো আর ফেরানো যাবে না। ওর নীচে তো মন্দিরও ছিল। আর্কিওলজিস্টরা বলেছে তো।”
“জাজমেন্টে তো তা লেখা নেই। লেখা আছে একটা কাঠামো পাওয়া গেছে। সেটা রামেরই মন্দির কিনা বলা যাচ্ছে না।”
“আরে মন্দির যে ছিল সেটা তো ওয়েল নোন ফ্যাক্ট। সবাই জানে। লর্ড রাম ওয়জ বর্ন দেয়ার।”
“মানে আপনি বলছেন রাম, লক্ষ্মণ, সীতা, হনুমান এরা সব সত্যি সত্যি ছিল? লঙ্কাকাণ্ড, সীতাকে উদ্ধার করার জন্যে যুদ্ধ — এসব সত্যি?”
“মিথ্যে কী করে বলি, প্রতীকবাবু? মুনি ঋষিরা তো এসব লিখে গেছেন।”
“সব সত্যি,” হঠাৎ পেছনে বসা ছেলেটি কেমন রোবটের মত বলে উঠল। আমার পিলে চমকে গিয়েছিল। “রাম সত্যি, রাবণ সত্যি, হনুমান সত্যি, আয়রন ম্যান সত্যি, স্পাইডারম্যান সত্যি, সুপারম্যান সত্যি, ব্যাটম্যান সত্যি। মার্ভেল ইউনিভার্স সত্যি, ডি সি কমিকস সত্যি।”
কথাগুলো বলেই সে আবার মোবাইলে ডুবে গেল। তার গম্ভীর মুখ দেখে আমি প্রতিবাদ করতে সাহস পেলাম না। মুখটা রুকুদার কানের কাছে নিয়ে গিয়ে বললাম “এ কোন ক্লাসে পড়ে? এসব ছাই পাঁশ শিখল কোথায়?”
রুকুদার আমাদের কথাবার্তা গোপন রাখার দেখলাম কোন ইচ্ছাই নেই। বেশ জোরেই বললেন “ছাই পাঁশের কী আছে? এদের জেনারেশন অনেক ওপেন। আমাদের মত নাকি? আমাদের তো কিছু ব্যাডলি রিটন ক্রাইম ফিকশন ছাড়া পড়ার কিছু ছিল না। লুক অ্যাট দেম। দে হ্যাভ দ্য ওয়ার্ল্ড ইনসাইড দ্যাট স্মল মেশিন। ওদের কোন ডগমা নেই।”
“বুঝলাম, কিন্তু এসব কী বলছে! ব্যাটম্যান, সুপারম্যান সত্যি?”
“দ্যাখ, আমরা যখন ছোট ছিলাম আমরাও তো জানতাম পুরাণ হচ্ছে গল্প। ইট টুক আস সেভেন্টি এইট্টি ইয়ারস টু সী থ্রু দ্যাট লেফটিস্ট প্রপাগ্যান্ডা। ওনলি নাও উই নো দ্যাট রাম ডিড এক্সিস্ট। তা কে বলতে পারে, ও যতদিনে বড় হবে হয়ত ততদিনে জানা যাবে মেনি আ টাইম উই ওয়্যার রিয়ালি অন দ্য ভার্জ অফ এক্সটিঙ্কশন অ্যান্ড দি অ্যাভেঞ্জার্স সেভড আস। এগুলো সব টপ সিক্রেট তো। গভমেন্ট লেভেলে ওরা নিশ্চয়ই জানে, আমাদের জানানো হয় না। ফেয়ার এনাফ। কী দরকার আননেসেসারি প্যানিক তৈরি করে?”
“এরকম হয় নাকি?”
“এরকমই তো হয়। আরে তুই কাশ্মীরের কেসটাই দ্যাখ না। এই যদি ওখানে ফিফথ অগাস্ট থেকে সব বন্ধ না করে দিত, এতদিনে স্টোন পেলটিং, এটা সেটা করে হান্ড্রেডস উড হ্যাভ ডায়েড। জাস্ট ইনফরমেশন ছড়াতে দেয়নি গভমেন্ট, দ্যাখ কত পীসফুল আছে।”
“পীসফুল! কদিন ধরে রোজই তো খবরে দেখছি এখানে ব্লাস্ট, ওখানে টেররিস্ট অ্যাটাক…”
“ও কিছু না। ঐটুকু তো হবেই। কিন্তু যা হওয়ার কথা ছিল তার কিছুই হয়নি। দ্য গভমেন্ট হ্যান্ডলড কাশ্মীর এক্সট্রিমলি ওয়েল। এটা কিন্তু মানতেই হবে।”
আর কিছু বলা উচিৎ হবে কিনা ভাবছি, রুকুদা বলল “কী ভাবছিস অত? কথাগুলো পছন্দ হচ্ছে না, না? আসলে কী জানিস তো? তোদের না বেসিকে গন্ডগোল হয়ে গেছে। তোদের পুরো হিস্ট্রিটাই ভুল শেখানো হয়েছে। নট ইয়োর ফল্ট দো, আমিও ভুল শিখেছিলাম। আমার বাবা তো বোকাসোকা লোক ছিল, ব্যবসায় সেরকম শাইন করতে পারেনি, বেনারসের বাড়িটা ছাড়া কিছুই রেখে যেতে পারেনি। আমার তো স্ট্রাগল করেই লাইফটা কেটে গেল। সেরকম স্কুলিং আর পেলাম কোথায়? সেই সময় মগনলালের অফারটা নিয়ে নিলে আজকে আমি স্টেটসে থাকতাম।”
ভেবেছিলাম বাকি পথটা মুখ খুলব না, কিন্তু আর চুপ করে থাকতে পারলাম না।
“রুকুদা, এটা আপনি কী বললেন? মগনলাল তো একজন অপরাধী। ও ওরকম একটা ওয়ার্ক অফ আর্ট বিদেশে চালান করে দিত। তাছাড়া আপনার বাবা তো বলেছিলেনই ওনাকে ওটা পেতে গেলে চুরি করতে হত আপনার দাদুর দেরাজ থেকে…”
“ধুর! যত্তসব মিডল ক্লাস মর‍্যালিটি। নিজের বাড়ির জিনিস বাবার কাবার্ড থেকে বার করবে। ওকে চুরি বলে? এইসবের জন্যেই বাঙালির কিস্যু হল না। এই মাইন্ডসেট নিয়ে বিজনেস হয় না।”
আমার তখন গাড়িটাকে মনে হচ্ছে ডিটেনশন ক্যাম্প, বাইরের হাওয়া খাওয়ার জন্যে প্রাণ হাঁপিয়ে উঠেছে, নামতে পারলে বাঁচি। রুকুদা কিন্তু আপন মনে বলে চলেছে।
“যা বলছিলাম, বুঝলি? আমাদের আসলে হিস্ট্রিটাই ভুল শেখানো হয়েছে। ধর আমাদের ফ্রিডম ফাইটার কারা? সাভারকর, দীনদয়াল উপাধ্যায়, সর্দার প্যাটেল — এরাই তো। আমাদের এদের কথা শেখানোই হয়নি। আমরা কেবল নেহরু, গান্ধী শিখেছি। দে ওয়্যার বেসিকালি ব্রিটিশ এজেন্টস। সাভারকর সেলুলার জেলে, গান্ধী এদিকে গায়ে হাওয়া লাগিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে৷ জাস্ট থিঙ্ক অ্যাবাউট ইট।”
“গায়ে হাওয়া লাগিয়ে মানে! গান্ধী, নেহরু দুজনেই তো অনেকদিন জেল খেটেছেন…”
“আরে এরা সব মাইনরিটির স্বার্থ খুব দেখত তো, তাই জন্যে এত মাথায় তোলা হয়েছে। তুই বল তো, হোয়াট ইজ দ্য সো কলড মাইনরিটিজ কন্ট্রিবিউশন টু আওয়ার ফ্রিডম স্ট্রাগল?”
আমি না হেসে পারলাম না।
“এ তো পনেরো নম্বরের প্রশ্ন হয়ে গেল রুকুদা। সেই সিপাহী বিদ্রোহের সময় বাহাদুর শাহ জাফরকে দিয়ে শুরু করতে হবে, মৌলানা আবুল কালাম আজাদে এসে শেষ হবে।”
“নাঃ! তোর মাথাটা দেখছি ওরা পুরো খেয়ে নিয়েছে। তোকে আমাদের স্পাইডির স্কুলে ভর্তি করে দিতে পারলে ভাল হত রে।”
বলে রুকুদা বিশ্রীভাবে হাসতে লাগল। আমি জানলা দিয়ে দেখার চেষ্টা করছি আমাদের বাস স্টপটা এল কিনা, পেছন থেকে আদরের স্পাইডি বললেন “আমাদের স্কুলে হি ওন্ট ফিট, মিস্টার স্টার্ক। ও কি গায়ত্রী মান্ত্রা বলতে পারে?”
“স্কুলে আবার গায়ত্রী মন্ত্র শেখায় নাকি?” আমার তো চক্ষু চড়কগাছ।
“অফকোর্স,” ছেলে ভারী তাচ্ছিল্য করে বলল “অ্যান্ড উই ডোন্ট ইট নন ভেজ ইন স্কুল। ইউ নিড টু হ্যাভ ডিসিপ্লিন টু বি প্রপারলি এজুকেটেড।”
আমি রামানন্দ সাগরের সীতার মত কেঁদে ভাসিয়ে “হে ধরিত্রী, দ্বিধা হও” বলতে যাচ্ছি, তার আগেই রুকুদা বলল “আমি জানি তুই খুব আপসেট হচ্ছিস। বাট বিলিভ মি, প্রপার স্কুলিং খুব ইম্পর্ট্যান্ট। ইসলাম, ক্রিশ্চিয়ানিটির সাথে মাখামাখি করে আমাদের যে কালচারাল পলিউশন হয়েছে সেটা দূর করতে হবে তো। তারপর লাস্ট থার্টি ফর্টি ইয়ারসে বেঙ্গল তো বাংলাদেশীতে ভরে গেছে। দ্যাট অলসো নিডস টু বি অ্যাড্রেসড।”
“বাংলাদেশী!”
“হ্যাঁ। দেখিস না চারদিকে? তবে ওটা নিয়ে অবশ্য আর চিন্তা নেই। এন আর সি হলেই তো সব ধরা পড়ে যাবে।”
“রুকুদা, আমি কিন্তু বাঙাল। দেশভাগের সময় আমার পূর্বপুরুষরা ওপার থেকেই এসেছিল তাড়া খেয়ে।”
“আরে সে তো জানি। তোর ভয় নেই। যারা তাড়া করেছিল, এন আর সি হলে তারাই এবার তাড়া খাবে। ওয়েট অ্যান্ড সি। অনেকদিন ওরা এই দেশটা রুল করল। এবার দে হ্যাভ বিন পুট ইন প্লেস। আর ওসব চলবে না।”
“কিন্তু আসামের এন আর সি তে যে উনিশ লাখ বাদ পড়েছে তার বারো-তেরো লাখই যে হিন্দু?”
“এগুলো সব কংগ্রেসী মিডিয়ার প্রোপাগান্ডা, বুঝলি না? অ্যান্ড আসাম ইজ আসাম। দিস ইজ বেঙ্গল। এখানে চালাকি চলে না। আমরা রবীন্দ্রনাথের লোক, বিবেকানন্দর লোক।”
আমার স্টপটা দেখলাম রুকুদার মনে আছে। গাড়িটা দাঁড় করাতেই দরজা খুলে প্রায় লাফ দিয়ে নামলাম। দরজাটা বন্ধ করার আগে মাথায় দুষ্টুমি বুদ্ধি চাপল।
“রুকুদা, আপনাদের বেনারসের বাড়িটা আছে এখনো?”
“না রে, সোল্ড ইট লং টাইম ব্যাক। অত বড় বাড়ি রাখা আজকের দিনে হাতি পোষা।”
“দলিলটা আছে তো?”
“বাড়ি বেচে দিলাম, দলিল কী হবে?”
“না, এন আর সি হলে আপনার লিগ্যাসি প্রমাণ হয়ে যেত ওটা থাকলে। দেড়শো বছরের পুরনো বাড়ি তো। আপনাদের কলকাতার বাড়ি তো ষাটের দশকে তৈরি, তাই না? আর সে বাড়িও তো বেচে দিয়েছেন। আপনি যে বিশুদ্ধ ঘটি আর বড় বংশের ছেলে সে আমি জানি। কিন্তু আমি বললে কি আর এন আর সি অথরিটি শুনবে? কে জানে!”
বলেই গাড়ির দরজাটা দড়াম করে বন্ধ করলাম। কয়েক পা হেঁটে গিয়েও স্টার্ট দেওয়ার শব্দ না পেয়ে ঘুরে তাকিয়ে দেখি রুকুদা একদৃষ্টে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। সেই মগনলালের ঘরে শরবতের গেলাসটাকে লালমোহনবাবু যেরকম সন্দিগ্ধ দৃষ্টিতে দেখছিলেন প্রথমে, অনেকটা সেই রকম।

*লেখাটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক। রুকু চরিত্রের অভিনেতা জিৎ বসুর সঙ্গে এই লেখার রুকুর কোন সম্পর্ক নেই

ন্যায় অন্যায়

ঐতিহাসিক সঙ্কটের সময়ে অনেক বড় মানুষেরই ন্যায় অন্যায় গুলিয়ে যায়, আমাদের মত সাধারণ লোকের তো গুলিয়ে যেতেই পারে। তাই ৩১শে আগস্ট আসামের জাতীয় নাগরিকপঞ্জীর চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশ পাওয়ার পর দেখছি উনিশ লক্ষ বাদ পড়েছে বলে যাঁরা দুঃখ বা উদ্বেগ প্রকাশ করছেন তাঁদের অনেকেরই বক্তব্য ব্যাপারটা দুঃখজনক, কিন্তু ন্যায় কি অন্যায় তা জানি না। খসড়া তালিকা প্রকাশ পাওয়ার পরে উদাসীন বা এন আর সি সমর্থক মানুষের সংখ্যা কিন্তু অনেক বেশি ছিল এই বাংলায়। সেদিক থেকে এখন অবস্থার উন্নতি হয়েছে বলতে হবে। কিন্তু তার একটা বড় কারণ, যা বিজেপির প্রতিক্রিয়া থেকেই পরিষ্কার, তালিকার বাইরে থাকা মানুষদের মধ্যে হিন্দুদের সংখ্যাগরিষ্ঠ হওয়া।

আসামের অনেক হিন্দু বাঙালির মত পশ্চিমবঙ্গের বহু হিন্দু বাঙালিও বিজেপির প্রোপাগাণ্ডায় ভুলে বিশ্বাস করেছিল আসাম রাজ্যটাকে বাংলাদেশ থেকে আগত মুসলমানরা একেবারে দখল করে নিয়েছে, পশ্চিমবঙ্গও “ওদের” দখলে চলে যাচ্ছে। ফল আশানুরূপ না হওয়ায়, উপরন্তু হিন্দুরাই বেশি বাদ পড়ে যাওয়ায় এরা স্তম্ভিত, উৎকণ্ঠিত। ফলে উনিশ লক্ষ দেশহীন মানুষের জন্য হঠাৎ সমবেদনা তৈরি হয়েছে এবং রংচঙে ব্যাকগ্রাউন্ডে লেখা “বাংলায় এন আর সি চাই” বলে যে ফেসবুক স্ট্যাটাসগুলো গত কয়েক বছর ধরে দেখা যাচ্ছিল, নিজেদের বিপদের আশঙ্কায় সেগুলো আর তত চোখে পড়ছে না। উলটে এই অধমের পোস্টে, যারা কাশ্মীরকে শিক্ষা দিতে চেয়েছিল, কাশ্মীরি মেয়েদের বিয়ে করতে পারবে বলে আহ্লাদে আটখানা হয়েছিল (চুয়াত্তর বছর ধরে তো নেহরু আটকে রেখেছিল), তারাও লাইক দিয়ে যাচ্ছে।

এদের নিয়ে ভাবি না। কিন্তু এরাই সব নয়। ব্যক্তিগতভাবে চিনি এমন অনেক হৃদয়বান মানুষকেও দেখছি বলছেন কোনটা ঠিক কোনটা ভুল জানি না। সেই জন্যই এই পোস্টের অবতারণা।

আসামে নাগরিকপঞ্জী নবায়ন করা বন্ধ করা উচিৎ এবং দেশের কোথাও এ জিনিস করা কেন উচিৎ নয় এসব বোঝাতে বহু মানুষ বহুদিন ধরে কাজ করছেন। ফেসবুকে NO NRC নামে একটা গ্রুপও আছে। সেসব দেখতে পারেন, দেখা প্রয়োজনও। কিন্তু সেসব ছাড়া নিজেই কতকগুলো কথা ভেবে দেখুন।

প্রথমত, পৃথিবীর সব রাষ্ট্র তার নাগরিকদের নাগরিকত্বের কিছু প্রমাণপত্র দেয়। ভারত রাষ্ট্রও দেয়। যেমন ভোটার কার্ড, প্যান কার্ড, ড্রাইভিং লাইসেন্স, পাসপোর্ট। এখন আবার সব কার্ডের বাড়া বলা হচ্ছে আধার কার্ডকে। এই প্রমাণপত্রগুলো কিসের প্রমাণ? আপনি যে ভারতের নাগরিক তার প্রমাণ। পৃথিবীর সব দেশই নাগরিকের থেকে তার সেই দেশের নাগরিক হওয়ার প্রমাণই দাবী করে। কিন্তু এন আর সি র কাছে এগুলো কোন প্রমাণই নয়। সেখানে রাষ্ট্র বলছে আপনি এদেশের নাগরিক কিনা তাতে আমার বয়ে গেছে। আপনি বলুন আপনার ঠাকুর্দা, দাদু, দিদিমা, বাবা, মা এঁরা এদেশের নাগরিক ছিলেন কিনা। একে যুক্তি বলে? কতটা পেছোব আমরা? ঠাকুর্দাতেই বা থামা কেন? ২৫শে মার্চ, ১৯৭১ এই বা থামার দরকার কী? ১৫ই আগস্ট, ১৯৪৭ এ আমার পরিবারের যাঁরা জীবিত ছিলেন তাঁরা এ দেশের নাগরিক ছিলেন কিনা জানতে চাইলেই বা ঠেকাচ্ছে কে? ধরুন আগামী দিনে রাষ্ট্র আরো পেছোতে চাইল। বলল ১৮৫৭ র সিপাহী বিদ্রোহ হল আমাদের প্রথম স্বাধীনতার যুদ্ধ। তার আগে আপনার পূর্বপুরুষ এ দেশে ছিলেন কিনা বলুন। না থাকলে আপনি নাগরিক নন। আজ লিগ্যাসি ডকুমেন্ট চাইলে না হয় বাড়ির দলিল, বাবার গ্র‍্যাজুয়েশন সার্টিফিকেট ইত্যাদি দেখাচ্ছেন। তখন পূর্বপুরুষের নামটা খুঁজে পাবেন তো?
জানি এর পালটা যুক্তি হিসাবে বলা হবে ভারতে এত দুর্নীতি যে সীমান্ত পেরিয়ে এসে ভোটার কার্ড ইত্যাদি করিয়ে ফেলা কোন ব্যাপারই নয়। অতএব ওগুলো কোন প্রমাণ নয়। ঠিক কথা। আচ্ছা দুর্নীতিটা কার? রাষ্ট্রেরই তো। ঘুষ নিয়ে সীমান্ত পার করিয়ে দেয় যে সীমান্ত রক্ষী সে রাষ্ট্রের যন্ত্র। রাষ্ট্রেরই অন্য কয়েকটা যন্ত্রের দুর্নীতি ছাড়া আপনি সত্যিকারের নাগরিক না হলে ভোটার, প্যান, পাসপোর্ট, আধার কিছুই বানিয়ে উঠতে পারবেন না। একথা ঠিক যে যে ঘুষ নেয় আর যে ঘুষ দেয় — দুজনেই দোষী। কিন্তু এন আর সি যদি যে ঘুষ দিয়ে নাগরিকত্ব কিনেছে তাকে চিহ্নিত করার এবং শাস্তি দেওয়ার ব্যবস্থা হয়, তাহলে যারা ঘুষ নিয়ে নাগরিকত্ব বিক্রি করেছে তাদের শাস্তি দেওয়ার ব্যবস্থাটা কোথায়? নেই যখন তখন স্পষ্ট যে এই ব্যবস্থা তৈরিই হয়েছে এক পক্ষকে শাস্তি দেওয়ার জন্যে, অর্থাৎ এ অন্যায় ব্যবস্থা।
দ্বিতীয়ত, পৃথিবীর সমস্ত আইনের মূল মন্ত্র হল “Innocent till proved guilty.” অর্থাৎ আপনার বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের হলে যতক্ষণ আপনি দোষী প্রমাণিত না হচ্ছেন ততক্ষণ আপনি নির্দোষ। এন আর সি কিন্তু উলটপুরাণ। রাষ্ট্র ধরেই নিচ্ছে তার কিছু নাগরিক আসলে নাগরিক নয়। তারপর সেই নাগরিককে বলছে “প্রমাণ করো তুমি নাগরিক।” কেন? রাষ্ট্র প্রমাণ করে দেখাক না যে অমুক আসলে অনুপ্রবেশকারী, নাগরিক নয়। “মারতে চাও তো ডাকাও নাকো জল্লাদ। গন্ধ শুঁকে মরতে হবে এ আবার কী আহ্লাদ?”

কিন্তু এ দুটো যুক্তির চেয়েও বড় কথা, এদেশে নাগরিকত্বের একাধিক প্রমাণপত্রের ব্যবস্থা থাকা সত্ত্বেও যদি আমরা জাতীয় নাগরিকপঞ্জী তৈরি করা মেনে নিই, তাহলে রাষ্ট্রকে নাগরিকত্বের সংজ্ঞা ইচ্ছে মত বদলে নেওয়ার অধিকার দিয়ে দেওয়া হয়। ইংরিজিতে যাকে “shifting posts” বলে। এর বিপদটা ভেবে দেখুন। আজ রাষ্ট্র একটা তারিখ বেঁধে দিয়ে বলছে তার আগে যাদের পরিবার এ দেশে ছিল না তারা নাগরিক নয়। কাল বলতেই পারে সকলের ডি এন এ পরীক্ষা করব। যাদের মধ্যে উত্তরে হিমালয় আর দক্ষিণে ভারত মহাসাগরের মাঝের এই ভূখণ্ডের বাইরের জিন পাওয়া যাবে, সে নাগরিক নয়। তাকে ডিটেনশন ক্যাম্পে পাঠানো হবে। তখন রাষ্ট্রের সুবিধা মত এক একটা জনগোষ্ঠী ধরে অনাগরিক ঘোষণা করে দেওয়ার ভারী সুবিধা হবে। এবং সেটা কখন কোন জনগোষ্ঠী, তা কিন্তু ক্ষমতাসীন দলের ইচ্ছাধীন হবে। ফলে কোন জনগোষ্ঠীই নিশ্চিন্ত থাকতে পারবেন না। ভাবছেন নেহাত ভয়ের বেসাতি করছি? মনে রাখবেন, আধার কার্ডের মাধ্যমে আমার আপনার বায়োমেট্রিক তথ্য কিন্তু ইতিমধ্যেই রাষ্ট্রের হাতে।

আসামের নাগরিকপঞ্জীর অবশ্যই একটা ইতিহাস আছে, যা দেশের অন্য কোন রাজ্যের সাথে মেলে না। অসমিয়া জাতি পরিচয়ের আক্রমণাত্মক রাজনীতিকে ধামাচাপা দিতে ১৯৮৫ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধী সেই ইতিহাসটার অপব্যবহার করে ১৯৫১ র নাগরিকপঞ্জী নবায়নের এই গাজরটি ঝুলিয়েছিলেন। আজকের কেন্দ্রীয় সরকারকে এই নিয়ে কিছু বললেই তাঁরা হাত উলটে বলেন “সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে তো হচ্ছে। আমরা তো কিছু করিনি।” যেন সবসময় সব মামলায় সরকার সুপ্রিম কোর্টের বাধ্য ছেলেটি। যেন আইনি বিতর্কের মাধ্যমে আদালতের মত বদলের চেষ্টা করা সরকারের কাজ নয়। অথচ এই সেদিন আধার মামলার সময়ে সরকারী কৌঁসুলি বিচারপতিদের ধমক খেতে খেতেও আধারের জন্যে প্রাণপণ লড়ে গেছেন।
আর বিরোধী দলগুলো? তারা কে জানে কোন প্রণোদনায় কতকগুলো অর্থহীন কথা বলে চলেছে। কংগ্রেসের বিশেষ কিছু বলার মুখ নেই, যেহেতু তাদের নেতাই প্যান্ডোরার এই বাক্সটি খুলে দিয়ে গিয়েছিলেন। তাই তারা কেবল পদ্ধতিগত ত্রুটির প্রশ্ন তুলে বাদ পড়া মানুষের জন্যে অশ্রুপাত করছে। কিন্তু অন্য দলগুলোর ভূমিকাও কম ন্যক্কারজনক নয়। তৃণমূল আজ বাঙালি বাদ না গেলেই খুশি তো কাল গোর্খারা বাদ না গেলেই খুশি। বৃহত্তম বামপন্থী দল আবার প্রকৃত ভারতীয় নাগরিক যেন বাদ না যায় সেদিকে নজর দিতে বলছেন। সরকার কেন খুলে বলছে না যাদের নাগরিকত্ব শেষ অব্দি প্রমাণ হবে না তাদের কী করা হবে — এই নিয়ে চেঁচামেচি করছেন। যেন তাঁরা জানেন না ইতিমধ্যেই আসামের ডিটেনশন ক্যাম্পগুলোতে যাঁরা আছেন তাঁরা কেন আছেন, নির্মীয়মাণ ডিটেনশন ক্যাম্পগুলো কেন বানানো হচ্ছে।

হে মোর দুর্ভাগা দেশ!