ন্যায় অন্যায়

ঐতিহাসিক সঙ্কটের সময়ে অনেক বড় মানুষেরই ন্যায় অন্যায় গুলিয়ে যায়, আমাদের মত সাধারণ লোকের তো গুলিয়ে যেতেই পারে। তাই ৩১শে আগস্ট আসামের জাতীয় নাগরিকপঞ্জীর চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশ পাওয়ার পর দেখছি উনিশ লক্ষ বাদ পড়েছে বলে যাঁরা দুঃখ বা উদ্বেগ প্রকাশ করছেন তাঁদের অনেকেরই বক্তব্য ব্যাপারটা দুঃখজনক, কিন্তু ন্যায় কি অন্যায় তা জানি না। খসড়া তালিকা প্রকাশ পাওয়ার পরে উদাসীন বা এন আর সি সমর্থক মানুষের সংখ্যা কিন্তু অনেক বেশি ছিল এই বাংলায়। সেদিক থেকে এখন অবস্থার উন্নতি হয়েছে বলতে হবে। কিন্তু তার একটা বড় কারণ, যা বিজেপির প্রতিক্রিয়া থেকেই পরিষ্কার, তালিকার বাইরে থাকা মানুষদের মধ্যে হিন্দুদের সংখ্যাগরিষ্ঠ হওয়া।

আসামের অনেক হিন্দু বাঙালির মত পশ্চিমবঙ্গের বহু হিন্দু বাঙালিও বিজেপির প্রোপাগাণ্ডায় ভুলে বিশ্বাস করেছিল আসাম রাজ্যটাকে বাংলাদেশ থেকে আগত মুসলমানরা একেবারে দখল করে নিয়েছে, পশ্চিমবঙ্গও “ওদের” দখলে চলে যাচ্ছে। ফল আশানুরূপ না হওয়ায়, উপরন্তু হিন্দুরাই বেশি বাদ পড়ে যাওয়ায় এরা স্তম্ভিত, উৎকণ্ঠিত। ফলে উনিশ লক্ষ দেশহীন মানুষের জন্য হঠাৎ সমবেদনা তৈরি হয়েছে এবং রংচঙে ব্যাকগ্রাউন্ডে লেখা “বাংলায় এন আর সি চাই” বলে যে ফেসবুক স্ট্যাটাসগুলো গত কয়েক বছর ধরে দেখা যাচ্ছিল, নিজেদের বিপদের আশঙ্কায় সেগুলো আর তত চোখে পড়ছে না। উলটে এই অধমের পোস্টে, যারা কাশ্মীরকে শিক্ষা দিতে চেয়েছিল, কাশ্মীরি মেয়েদের বিয়ে করতে পারবে বলে আহ্লাদে আটখানা হয়েছিল (চুয়াত্তর বছর ধরে তো নেহরু আটকে রেখেছিল), তারাও লাইক দিয়ে যাচ্ছে।

এদের নিয়ে ভাবি না। কিন্তু এরাই সব নয়। ব্যক্তিগতভাবে চিনি এমন অনেক হৃদয়বান মানুষকেও দেখছি বলছেন কোনটা ঠিক কোনটা ভুল জানি না। সেই জন্যই এই পোস্টের অবতারণা।

আসামে নাগরিকপঞ্জী নবায়ন করা বন্ধ করা উচিৎ এবং দেশের কোথাও এ জিনিস করা কেন উচিৎ নয় এসব বোঝাতে বহু মানুষ বহুদিন ধরে কাজ করছেন। ফেসবুকে NO NRC নামে একটা গ্রুপও আছে। সেসব দেখতে পারেন, দেখা প্রয়োজনও। কিন্তু সেসব ছাড়া নিজেই কতকগুলো কথা ভেবে দেখুন।

প্রথমত, পৃথিবীর সব রাষ্ট্র তার নাগরিকদের নাগরিকত্বের কিছু প্রমাণপত্র দেয়। ভারত রাষ্ট্রও দেয়। যেমন ভোটার কার্ড, প্যান কার্ড, ড্রাইভিং লাইসেন্স, পাসপোর্ট। এখন আবার সব কার্ডের বাড়া বলা হচ্ছে আধার কার্ডকে। এই প্রমাণপত্রগুলো কিসের প্রমাণ? আপনি যে ভারতের নাগরিক তার প্রমাণ। পৃথিবীর সব দেশই নাগরিকের থেকে তার সেই দেশের নাগরিক হওয়ার প্রমাণই দাবী করে। কিন্তু এন আর সি র কাছে এগুলো কোন প্রমাণই নয়। সেখানে রাষ্ট্র বলছে আপনি এদেশের নাগরিক কিনা তাতে আমার বয়ে গেছে। আপনি বলুন আপনার ঠাকুর্দা, দাদু, দিদিমা, বাবা, মা এঁরা এদেশের নাগরিক ছিলেন কিনা। একে যুক্তি বলে? কতটা পেছোব আমরা? ঠাকুর্দাতেই বা থামা কেন? ২৫শে মার্চ, ১৯৭১ এই বা থামার দরকার কী? ১৫ই আগস্ট, ১৯৪৭ এ আমার পরিবারের যাঁরা জীবিত ছিলেন তাঁরা এ দেশের নাগরিক ছিলেন কিনা জানতে চাইলেই বা ঠেকাচ্ছে কে? ধরুন আগামী দিনে রাষ্ট্র আরো পেছোতে চাইল। বলল ১৮৫৭ র সিপাহী বিদ্রোহ হল আমাদের প্রথম স্বাধীনতার যুদ্ধ। তার আগে আপনার পূর্বপুরুষ এ দেশে ছিলেন কিনা বলুন। না থাকলে আপনি নাগরিক নন। আজ লিগ্যাসি ডকুমেন্ট চাইলে না হয় বাড়ির দলিল, বাবার গ্র‍্যাজুয়েশন সার্টিফিকেট ইত্যাদি দেখাচ্ছেন। তখন পূর্বপুরুষের নামটা খুঁজে পাবেন তো?
জানি এর পালটা যুক্তি হিসাবে বলা হবে ভারতে এত দুর্নীতি যে সীমান্ত পেরিয়ে এসে ভোটার কার্ড ইত্যাদি করিয়ে ফেলা কোন ব্যাপারই নয়। অতএব ওগুলো কোন প্রমাণ নয়। ঠিক কথা। আচ্ছা দুর্নীতিটা কার? রাষ্ট্রেরই তো। ঘুষ নিয়ে সীমান্ত পার করিয়ে দেয় যে সীমান্ত রক্ষী সে রাষ্ট্রের যন্ত্র। রাষ্ট্রেরই অন্য কয়েকটা যন্ত্রের দুর্নীতি ছাড়া আপনি সত্যিকারের নাগরিক না হলে ভোটার, প্যান, পাসপোর্ট, আধার কিছুই বানিয়ে উঠতে পারবেন না। একথা ঠিক যে যে ঘুষ নেয় আর যে ঘুষ দেয় — দুজনেই দোষী। কিন্তু এন আর সি যদি যে ঘুষ দিয়ে নাগরিকত্ব কিনেছে তাকে চিহ্নিত করার এবং শাস্তি দেওয়ার ব্যবস্থা হয়, তাহলে যারা ঘুষ নিয়ে নাগরিকত্ব বিক্রি করেছে তাদের শাস্তি দেওয়ার ব্যবস্থাটা কোথায়? নেই যখন তখন স্পষ্ট যে এই ব্যবস্থা তৈরিই হয়েছে এক পক্ষকে শাস্তি দেওয়ার জন্যে, অর্থাৎ এ অন্যায় ব্যবস্থা।
দ্বিতীয়ত, পৃথিবীর সমস্ত আইনের মূল মন্ত্র হল “Innocent till proved guilty.” অর্থাৎ আপনার বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের হলে যতক্ষণ আপনি দোষী প্রমাণিত না হচ্ছেন ততক্ষণ আপনি নির্দোষ। এন আর সি কিন্তু উলটপুরাণ। রাষ্ট্র ধরেই নিচ্ছে তার কিছু নাগরিক আসলে নাগরিক নয়। তারপর সেই নাগরিককে বলছে “প্রমাণ করো তুমি নাগরিক।” কেন? রাষ্ট্র প্রমাণ করে দেখাক না যে অমুক আসলে অনুপ্রবেশকারী, নাগরিক নয়। “মারতে চাও তো ডাকাও নাকো জল্লাদ। গন্ধ শুঁকে মরতে হবে এ আবার কী আহ্লাদ?”

কিন্তু এ দুটো যুক্তির চেয়েও বড় কথা, এদেশে নাগরিকত্বের একাধিক প্রমাণপত্রের ব্যবস্থা থাকা সত্ত্বেও যদি আমরা জাতীয় নাগরিকপঞ্জী তৈরি করা মেনে নিই, তাহলে রাষ্ট্রকে নাগরিকত্বের সংজ্ঞা ইচ্ছে মত বদলে নেওয়ার অধিকার দিয়ে দেওয়া হয়। ইংরিজিতে যাকে “shifting posts” বলে। এর বিপদটা ভেবে দেখুন। আজ রাষ্ট্র একটা তারিখ বেঁধে দিয়ে বলছে তার আগে যাদের পরিবার এ দেশে ছিল না তারা নাগরিক নয়। কাল বলতেই পারে সকলের ডি এন এ পরীক্ষা করব। যাদের মধ্যে উত্তরে হিমালয় আর দক্ষিণে ভারত মহাসাগরের মাঝের এই ভূখণ্ডের বাইরের জিন পাওয়া যাবে, সে নাগরিক নয়। তাকে ডিটেনশন ক্যাম্পে পাঠানো হবে। তখন রাষ্ট্রের সুবিধা মত এক একটা জনগোষ্ঠী ধরে অনাগরিক ঘোষণা করে দেওয়ার ভারী সুবিধা হবে। এবং সেটা কখন কোন জনগোষ্ঠী, তা কিন্তু ক্ষমতাসীন দলের ইচ্ছাধীন হবে। ফলে কোন জনগোষ্ঠীই নিশ্চিন্ত থাকতে পারবেন না। ভাবছেন নেহাত ভয়ের বেসাতি করছি? মনে রাখবেন, আধার কার্ডের মাধ্যমে আমার আপনার বায়োমেট্রিক তথ্য কিন্তু ইতিমধ্যেই রাষ্ট্রের হাতে।

আসামের নাগরিকপঞ্জীর অবশ্যই একটা ইতিহাস আছে, যা দেশের অন্য কোন রাজ্যের সাথে মেলে না। অসমিয়া জাতি পরিচয়ের আক্রমণাত্মক রাজনীতিকে ধামাচাপা দিতে ১৯৮৫ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধী সেই ইতিহাসটার অপব্যবহার করে ১৯৫১ র নাগরিকপঞ্জী নবায়নের এই গাজরটি ঝুলিয়েছিলেন। আজকের কেন্দ্রীয় সরকারকে এই নিয়ে কিছু বললেই তাঁরা হাত উলটে বলেন “সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে তো হচ্ছে। আমরা তো কিছু করিনি।” যেন সবসময় সব মামলায় সরকার সুপ্রিম কোর্টের বাধ্য ছেলেটি। যেন আইনি বিতর্কের মাধ্যমে আদালতের মত বদলের চেষ্টা করা সরকারের কাজ নয়। অথচ এই সেদিন আধার মামলার সময়ে সরকারী কৌঁসুলি বিচারপতিদের ধমক খেতে খেতেও আধারের জন্যে প্রাণপণ লড়ে গেছেন।
আর বিরোধী দলগুলো? তারা কে জানে কোন প্রণোদনায় কতকগুলো অর্থহীন কথা বলে চলেছে। কংগ্রেসের বিশেষ কিছু বলার মুখ নেই, যেহেতু তাদের নেতাই প্যান্ডোরার এই বাক্সটি খুলে দিয়ে গিয়েছিলেন। তাই তারা কেবল পদ্ধতিগত ত্রুটির প্রশ্ন তুলে বাদ পড়া মানুষের জন্যে অশ্রুপাত করছে। কিন্তু অন্য দলগুলোর ভূমিকাও কম ন্যক্কারজনক নয়। তৃণমূল আজ বাঙালি বাদ না গেলেই খুশি তো কাল গোর্খারা বাদ না গেলেই খুশি। বৃহত্তম বামপন্থী দল আবার প্রকৃত ভারতীয় নাগরিক যেন বাদ না যায় সেদিকে নজর দিতে বলছেন। সরকার কেন খুলে বলছে না যাদের নাগরিকত্ব শেষ অব্দি প্রমাণ হবে না তাদের কী করা হবে — এই নিয়ে চেঁচামেচি করছেন। যেন তাঁরা জানেন না ইতিমধ্যেই আসামের ডিটেনশন ক্যাম্পগুলোতে যাঁরা আছেন তাঁরা কেন আছেন, নির্মীয়মাণ ডিটেনশন ক্যাম্পগুলো কেন বানানো হচ্ছে।

হে মোর দুর্ভাগা দেশ!

Advertisements

যারা ইতিহাস বিস্মৃত হয়

আমি হিন্দু। কিন্তু আমি আজহারের ব্যাটিং দারুণ ভালবাসতাম। ও ফিক্সিং করেছে শুনে ভীষণ দুঃখ পেয়েছিলাম। মহম্মদ রফি আমার খুব ভাল লাগে, অনেকসময় কিশোরের চেয়েও বেশি। বিরিয়ানি আমার সবচেয়ে প্রিয় খাদ্য। আমার অনেক মুসলমান বন্ধু আছে। অতএব প্রমাণিত হল যে আমি সাম্প্রদায়িক নই। সুতরাং আমি একথা বলতেই পারি যে আমাদের দেশে স্বাধীনতার পর থেকে সব রাজনৈতিক দলই সংখ্যালঘু তোষণ করে এসেছে। সবেতেই ওদের বেশি সুবিধা পাইয়ে দেওয়া হয়েছে, ওদের দোষগুলো সব ঢেকে রাখা হয়। এখনো ওরা যা ইচ্ছে মারদাঙ্গা করে, তাতে দোষ হয় না। মিডিয়া পর্যন্ত ওদের দোষ চেপে দেয়।

উপর্যুক্ত কথাগুলো যদি আপনার মনের কথা হয় তাহলে বলতে বাধ্য হচ্ছি, আপনি মোটেই অসাম্প্রদায়িক নন। বরং আপনি যুক্তি বা তথ্যের ধার না ধারা একজন মানুষ যিনি আবেগ দিয়ে সবকিছু বিচার করেন। আর্থসামাজিক মানদন্ডগুলোর প্রায় সবকটাতে মুসলমান সম্প্রদায় দেশের সবথেকে পিছিয়ে থাকা সম্প্রদায়। সরকারী চাকরিতেও। আমি বলছি না। ভারতের একমাত্র প্রকৃত ধর্মনিরপেক্ষ পার্টির মন্ত্রী সংসদে বলেছেন। এই দেখুন https://www.google.co.in/…/muslim-working-proportion…/lite/…

এই যখন ঘটনা তখন সংখ্যালঘু তোষণটা হল কখন আর তার সুবিধাটা পেল কে?
এই যে বলছেন ওরা মারদাঙ্গা করলে কোন দোষ হয় না সেই নিয়েও বলা যাক তাহলে। ২০০১ এর জনগণনা অনুযায়ী আমাদের জনসংখ্যার ১৩% মুসলমান অথচ ঐসময়ে বিভিন্ন জেলে বন্দী ছিল যারা তাদের ২২% মুসলমান। নিজেই পড়ে দেখুন http://m.timesofindia.com/…/Muslim…/articleshow/45253329.cms

যদি সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার কথা আলাদা করে বলেন তাহলে বলি ভারতবর্ষে ঐ অপরাধে কঠোর শাস্তি কারোরই হয় না। উল্টে সংখ্যাগুরু সম্প্রদায়ের লোক হলে নায়ক হয়ে যাওয়া যায়, মন্ত্রীও হওয়া যায়। বলুন তো বাল ঠাকরে শিয়া না সুন্নি? বাবু বজরংগি কি মুসলমান? মায়া কোদনানি? জগদীশ টাইটলার? সজ্জন কুমার? লালকৃষ্ণ আদবানি? উমা ভারতী?

এবার আসুন মিডিয়ার কথায়। প্রথমত মিডিয়া কোন একটি সংস্থা নয়। প্রত্যেক মিডিয়া হাউসের নিজস্ব মতামত, কার্যপদ্ধতি, স্বার্থ আছে। সকলেই সেই অনুযায়ী খবর পরিবেশন করে। সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা বলতে সেটাকেই বোঝায়। ফলে খবরের সত্যতা যাচাই না করে যা ইচ্ছে লিখে, দেখিয়ে বাজার গরম করে এমন কাগজ এবং চ্যানেল যেমন আছে তেমনি দায়িত্বশীল গণমাধ্যমও আছে। ভারতীয় সাংবাদিকতার যে অবনমন হয়েছে তা নিয়ে আজ কোন ঢাকঢাক গুড়গুড় নেই। তবু এখনো প্রায় সব কাগজ বা টিভি চ্যানেলই সাম্প্রদায়িক সংঘর্ষের ক্ষেত্রে কয়েকটা নিয়ম মেনে চলে। যেমন কোন সম্প্রদায়ের লোক কোন সম্প্রদায়ের উপর আক্রমণ করেছে তা উল্লেখ না করা, কাদের বেশি ক্ষয়ক্ষতি, কাদের কম এসব আলোচনা না করা, সর্বোপরি ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি না হওয়া পর্যন্ত অর্থাৎ পরিস্থিতি যতক্ষণ না প্রশাসনের হাতের বাইরে চলে যাচ্ছে ততক্ষণ তেমনভাবে রিপোর্টই না করা। কারণ দেখা গেছে তাতে উত্তেজনা নতুন নতুন এলাকায় ছড়ায় এবং দাঙ্গাবাজদের কাজ সহজ হয়। আজকাল অবশ্য অনেকেই মনে করছেন সোশাল মিডিয়ার এই যুগে এই পদ্ধতি অচল। এতে বরং যা নয় তাই গুজব ছড়ানোর ফাঁকা ময়দান তৈরি হয়। এ নিয়ে বিতর্কের অবকাশ আছে। কিন্তু মনে রাখবেন মিডিয়া দেখাচ্ছে না মানে কিন্তু শুধু সংখ্যালঘু নয়, সংখ্যাগুরুদের কুকর্মগুলোও চাপা পড়ে থাকছে। আপনি হোয়াটস্যাপে যে ভিডিওটা দেখে লাফাচ্ছেন সেটাই একমাত্র সত্য নয়।
এত কথা বলছি মানে যে আমি আপনাকে দাঙ্গাবাজ বলছি তা নয়। এমন হতেই পারে যে আপনি যা বলছেন সরল বিশ্বাস থেকেই বলছেন। মানে আপনি সত্যিই বিশ্বাস করেন যে কথাগুলো সাম্প্রদায়িক নয়। আমি আপনার সেই বিশ্বাসটাকেই প্রশ্ন করছি। ভেবে দেখুন তো আপনি সেই জার্মানদের মত হয়ে যাচ্ছেন না তো যারা নাজিদের এই প্রোপাগান্ডায় বিশ্বাস করেছিল যে ইহুদীরাই জার্মানির সমস্ত দুর্দশার কারণ? তারপর কী হয়েছিল সেটা ইতিহাস। রক্তাক্ত, লজ্জাকর ইতিহাস। সে ইতিহাস ভুলে যাচ্ছেন না তো? জার্মান ভাষায় একটা প্রবাদ আছে “যারা ইতিহাস বিস্মৃত হয়, তারা অভিশপ্ত। ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি তারা করবেই।”

মৌলবাদী বনাম মৌলবাদী

বাংলাদেশের হিন্দুদের উপরে অত্যাচার হলে বোধহয় সবচেয়ে উল্লসিত হয় ভারতের হিন্দু মৌলবাদীরা। কারণ তখন ওটা দেখিয়ে তারা বলতে পারে “কিছু বাঞ্চোদ তবুও বলবে ভারতে অসহিষ্ণুতা বাড়ছে” (ভাষাটা দেখে কেউ নাক সিঁটকোবেন না দয়া করে। এই ভাষাতেই ওরা লেখে এগুলো)। কদিন আগে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় একটা ফেসবুক পোস্টের প্রতিক্রিয়ায় মন্দির, বিগ্রহ ভাঙা হয়েছে। হিন্দুবাড়িতে লুঠতরাজ, খুন, জখম ইত্যাদি করা হয়েছে। সেই ঘটনা নিয়েও উপরে যেমন বললাম তেমন পোস্ট দেখতে পাচ্ছি। যে মানসিকতা নিয়ে এই জাতীয় পোস্ট করা হয় তারমধ্যে অনেকগুলো মনুষ্যেতর যুক্তি কাজ করে। যেমন:

১) হিন্দুরা করলেই দোষ হয়ে যায়। এখন যে ওরা (মুসলমানরা) করছে!

২) আমরা তো এখনো কিছুই করিনি (দাদরি ফাদরি ভুলে যান)। দেখাব মজা, দাঁড়াও না (অর্থাৎ গোটা দেশটাকে গুজরাট বানিয়ে দেবো। যদিও বলার সময় বলব গুজরাট নিয়ে মোদীকে মিথ্যে অভিযুক্ত করা হয়। আদালত নির্দোষ ঘোষণা করেছে, ইত্যাদি)।

৩) আমাদের দেশের পাকিস্তানী এজেন্টগুলো (মানে কিছু রাজনৈতিক দল, ধর্মনিরপেক্ষ সাধারণ মানুষ, বুদ্ধিজীবী এবং কিছু সাংবাদিক যারা এখনো সংঘচালিত নয়) বাংলাদেশ, পাকিস্তানে সংখ্যালঘুদের উপরে অত্যাচার নিয়ে তো কিছু বলে না। যত দরদ খালি মুসলমানদের জন্য, না? কই বাংলাদেশের কেউ তো হিন্দুদের জন্য চোখের জল ফেলছে না, এদের এত মড়াকান্না কিসের জন্য?

এক এক করে উত্তর দেওয়া যাক।

১) দোষ হিন্দুরা করলেও হয়, মুসলমানরা করলেও হয়। পৃথিবীর কোথাও এমন আইন আছে শুনেছেন যে খুনীকে মাপ করে দেওয়া হয় এই যুক্তিতে যে আরো অনেকে খুন করেছে? এই যুক্তি একমাত্র সে-ই দেখায় যার উদ্দেশ্যই খুন করা।

২) এই যে তুলনামূলক আলোচনা করে বলছেন আমরা সহিষঞু, এতেই আপনারা নিজেরাই প্রমাণ করছেন সহিষঞু নন। তর্জনী উঁচিয়ে বলছেন “খবরদার অসহিষঞু বলবি না। কিছুই তো করিনি এখনো।” এ সেই সুকুমার রায়ের কবিতা হয়ে গেল “আমি আছি, গিন্নী আছেন, আছেন আমার নয় ছেলে। সবাই মিলে কামড়ে দেব মিথ্যে এমন ভয় পেলে।” কবিতাটা পড়ে যেমন সবাই হাসে, আপনাদের কথাবার্তাও হেসে উড়িয়ে দেওয়া যেত আপনাদের হাতে ক্ষমতা না থাকলে। বস্তুত নেহরু এবং প্যাটেল আপনাদের হেসেই উড়িয়ে দিতে চেয়েছিলেন এবং সেটাই ভুল হয়েছিল।

৩) এবার সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগে আসা যাক। প্রথমত, “পাকিস্তানী এজেন্ট” কথাটা ভীষণ বোকাবোকা। চীনা এজেন্ট বললে তাও ভেবে দেখা যেত। পাকিস্তান ভারতের রাজনৈতিক দল, প্রতিষ্ঠিত সাংবাদিক — এদের হাতখরচই দিয়ে উঠতে পারবে না।
দ্বিতীয়ত, ভারতের অগ্রগণ্য সংবাদমাধ্যমে বাংলাদেশ, পাকিস্তানের সংখ্যালঘুদের নিয়ে বিলক্ষণ লেখালিখি, আলাপ আলোচনা হয়। আপনারা যথারীতি সেটা চেপে যান। রাজনৈতিক দলগুলোও সময়ে সময়ে ওদেশের পরিস্থিতি নিয়ে প্রকাশ্যেই কথা বলে। নিঃসন্দেহে এদেশের পরিস্থিতি নিয়ে যতটা বলে ততটা বলে না। কেন বলবে? দলগুলো এদেশের। সংবিধান তাদের এদেশের মানুষের ভালমন্দের দায়িত্ব দিয়েছে। তারা এদেশের মানুষের দুর্দশা নিয়ে হইহল্লা না করে সারাক্ষণ বাংলাদেশ, পাকিস্তান নিয়ে ব্যস্ত থাকবে? মৌলবাদী মস্তিষ্ক ছাড়া এরকম চিন্তার উর্বর ক্ষেত্র পাওয়া মুশকিল।
তৃতীয়ত, বাংলাদেশে, পাকিস্তানে সংখ্যালঘুদের উপর অত্যাচারের খবর আপনি জানছেন
কি করে? জানাচ্ছে তো সেদেশের সংবাদমাধ্যম। সেগুলো চালায় কারা? সংখ্যাগরিষ্ঠ সাংবাদিক কারা? সেদেশের মুসলমানরা। হিন্দুদের আক্রমণের প্রতিবাদ করতে গিয়ে, বাকস্বাধীনতার উপর আক্রমণের বিরুদ্ধে প্রতিরোধে সামনের সারিতেই আছেন মুসলমান বুদ্ধিজীবীরা। কতজনের প্রাণ গিয়েছে, কতজন দেশছাড়া হয়েছে জানেন না? নাকি না জানার ভান করছেন?
চতুর্থত, সাধারণ মানুষের কথা যদি বলেন, ব্রাক্ষণবাড়িয়ার ঘটনার পরেও দেখলাম ফেসবুকে সবচেয়ে সরব আমার বাংলাদেশি মুসলমান বন্ধুরাই। আমি তো ঘটনাটার কথা প্রথম জানলাম তেমন এক বন্ধুর দেয়াল থেকেই। বন্ধুর কোন দেশ হয় না, ধর্ম হয় না। কিন্তু এক্ষেত্রে বন্ধুদের এই দুটো পরিচয় উল্লেখ না করে উপায় থাকল না, এজন্য আমি ক্ষমাপ্রার্থী। শাহবাগে দিনের পর দিন যারা মৌলবাদীদের শাস্তির দাবিতে হত্যে দিয়ে পড়েছিল তাদের অধিকাংশও মুসলমান। আমার অন্তত একজন বন্ধু তার মধ্যে ছিল, একথা বলতে আমি গর্ববোধ করি।
এদেশে আমরা তো পারিনি এমন কোন আন্দোলন গড়ে তুলতে যা দাবি করে ১৯৮৪র দেশজোড়া শিখ গণহত্যার নাটের গুরুদের শাস্তি, ২০০২ এর গুজরাটে মুসলমান গণহত্যার খলনায়কদের শাস্তি। বরং ভারতে তো উল্টোটাই হয়ে চলেছে। গণহত্যার পুরস্কারস্বরূপ মন্ত্রিত্ব পাওয়া যাচ্ছে — যেমন কংগ্রেস আমলে, তেমনি বিজেপি আমলে। গুজরাটের ঘটনায় তবু যে কজনের শাস্তি হয়েছিল তারাও মে ২০১৪র পরে গারদের বাইরে এসে ড্যাং ড্যাং করে ঘুরে বেড়াচ্ছে। গণপিটুনিতে অভিযুক্ত রোগভোগে মারা গেলে তার মৃতদেহ জাতীয় পতাকাশোভিত হচ্ছে। কেন্দ্রীয় মন্ত্রী সশরীরে উপস্থিত হয়ে শ্রদ্ধাজ্ঞাপন করছেন। কারোর দিকে আঙুল তোলা আমাদের সাজে না।