প্রকল্প এখন প্রকাশ্যে

রাজস্থানে শুনেছি জল খুব সুলভ নয়। তবু পাছে পুলিশের গাড়ি নোংরা হয়, মৃতপ্রায় রাকবরকে ধুয়ে মুছে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার জন্যে গাড়িতে তোলা হয়েছিল। তবে বেদম পিটুনির পর ধুয়ে দিলেই রক্তপাত বন্ধ হয় না। তাই সম্ভবত তার পরেও গোটা রাস্তায় রাকবরের রক্ত চুঁইয়ে চুঁইয়ে পড়েছে। ঘটনাস্থল থেকে হাসপাতাল — এই দীর্ঘ ছ কিলোমিটার পথে নিশ্চয়ই তার রক্তের রেখা এখনো মিলিয়ে যায়নি। রাজস্থানে তো জল সুলভ নয়।
তা রাকবর খানের রক্তের রেখা মিলিয়ে যেতে না যেতেই উত্তরপ্রদেশের গাজিয়াবাদে সাহিল মার খেয়ে মরতে মরতে বেঁচে গেলেন। রাকবর আর সাহিলের মধ্যে চট করে কোন মিল চোখে পড়ে না। প্রথমজনের পেশা পশুপালন, দ্বিতীয়জন একটা চাকরি করেন। প্রথমজন গাঁয়ের লোক, দ্বিতীয়জন মধ্যপ্রদেশের রাজধানী ভোপালের বাসিন্দা। প্রথমজন বিবাহিত এবং ইতিমধ্যেই বাবা হয়েছিলেন, দ্বিতীয়জন গিয়েছিলেন পছন্দের মানুষের সাথে ঘর বাঁধতে। দুজনের মধ্যে বস্তুত একটাই মিল — দুজনেই মুসলমান। কতটা ধর্মপ্রাণ ওঁরা তাও আমরা জানি না, কিন্তু যাদের কাছে আসল হল ধর্মীয় পরিচিতি তারা আদার ব্যাপারী। জাহাজের খোঁজ তারা নিতে চায় না। গত কয়েকবছরে ঘটে চলা গণপ্রহারে মৃত্যুর মিছিলে চোখ রাখলে ধর্মান্ধ বদমাইশ ছাড়া সকলেই দেখতে পাবেন যে এই সংগঠিত খুনগুলোর লক্ষ্য ইসলাম ধর্মাবলম্বী মানুষেরা আর খুনগুলোর করছে ক্ষমতাসীন সঙ্ঘ পরিবার, যারা ভারতকে হিন্দুরাষ্ট্রে পরিণত করতে চায়।
একথা এতদিন পর্যন্ত আমার মত দেশদ্রোহী মাকু, সেকুরাই কেবল বলছিল। এখন আর তা নয়। গণপ্রহারের শিকার হওয়া অতিপরিচিত হিন্দু সন্ন্যাসী স্বামী অগ্নিবেশ গত সপ্তাহে টাইমস অফ ইন্ডিয়াকে একটা সাক্ষাৎকারে পরিষ্কার বলেছেন “It was a lynch mob, except it was not a faceless lynch mob but one that was sponsored and supported by the powers that be in the state and central governments. I am not the first one to be attacked, many more have been lynched to death. Akhlaq Khan was killed in Dadri, so was Pehlu Khan and Junaid, and not a single murderer has been apprehended.”
রাকবরের খুন যা নতুন করে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে তা হল হিন্দুত্ববাদী প্রশাসনের প্রকল্পই হল মুসলমান নাগরিকদের খুন করা। এরপর রেজিস্ট্রি করে হিন্দু প্রেমিকাকে বিয়ে করতে গিয়ে সাহিলের মার খাওয়া প্রমাণ করে মুসলমানদের মারা তাদের মারার জন্যেই। গোরক্ষা, লাভ জিহাদ ইত্যাদি হল নতুন নতুন অজুহাত। আগে তবু মন্ত্রী সান্ত্রীদের চোখের চামড়া বজায় রাখার দায় ছিল। এখন আর সেসব নেই। অভিযুক্তরা জামিনে ছাড়া পেলে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী ড্যাং ড্যাং করে মাল্যদান করতেও চলে যাচ্ছেন।
রাজধানী দিল্লীতে বসে অবশ্য এখনো একটু কুম্ভীরাশ্রু বিসর্জন করতে হচ্ছে। সংবিধানটা এখনো বদলানো হয়নি কিনা। তাই আমাদের বিশুদ্ধ হিন্দি বলা নিপাট ভালমানুষ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন “প্রয়োজনে সরকার গণপিটুনির বিরুদ্ধে আইন করতে প্রস্তুত।” যেন নতুন একখানা আইন করে দিলেই সমস্যা মিটে যাবে। যেন এখনকার আইনে মানুষকে পিটিয়ে মেরে ফেলা আইনসম্মত। যেন অপরাধীদের শাস্তি হচ্ছে না শুধু উপযুক্ত আইন নেই বলে। যেন একটা আলাদা আইন থাকলে গরুগুলোর চেয়ে রাকবরের প্রাণের মূল্য ঝাড়খন্ড পুলিশের কাছে বেশি হত। “ও মন্ত্রীমশাই, ষড়যন্ত্রীমশাই… যত চালাকি তোমার, জানতে নাইকো বাকি আর।”
ধর্মীয় পরিচয়ে নিরাপদ দূরত্বে থাকা যেসব লোকেরা এখনো বেড়ার উপর বসে পা দোলাচ্ছেন আর “নিরপেক্ষতা”, “ডায়লগ” — এইসব ন্যাকা শব্দ কপচাচ্ছেন তাঁরা স্বামী অগ্নিবেশের সাবধানবাণীটা একবার পড়ে নেবেন “What they call hardline Hindutva is the greatest threat to Hindu culture, or sanatan dharam… The hardline approach of causing harm to whoever disagrees is a kind of nascent fascism.”
অবশ্য সাবধান হবে কে? অনেক লেখাপড়া জানা লোকের মতে তো আবার ফ্যাসিবাদ খুব ভাল জিনিস, দেশের ওটাই দরকার, হিটলার দারুণ লোক ছিল ইত্যাদি।

Advertisements

রক্তপিপাসু বাঙালি

afrazul

আখলাক আহমেদ খুন হওয়ার কয়েকদিন পরে আমি একটা খেলার প্রতিবেদন লিখতে একটা বিজেপিশাসিত রাজ্যে গেছি। সেই রাজ্যের সবচেয়ে শিল্পোন্নত শহরের অভিজাত এলাকায় তৈরি স্টেডিয়ামের অস্থায়ী প্রেস বক্সে গিয়ে রোজ বসি। ওখানকার পয়সাওয়ালা, ক্ষমতাবান লোকেরা আশেপাশেই এসে বসেন, খানিকক্ষণ ক্রিকেটমাঠের উত্তাপ নিয়ে যান, নিজেদের মধ্যে আবহাওয়া, হজমের গণ্ডগোল, ক্রিকেটটা আশির দশকে কেমন ছিল আর এখন কেমন হয়েছে, শহরের কোথায় এখন জমির দাম সবচেয়ে বেশি আর কোথায় সবচেয়ে কম — এইসব নিয়ে গভীর আলোচনা করেন। সেই আলোচনায় একদিন দেখলাম সকলেই একমত হয়ে বলছেন যে একটা মুসলমান মরেছে তাতে দেশসুদ্ধু লোক মিলে যে লাফালাফিটা করছে সেটা অত্যন্ত অন্যায়। উত্তরপ্রদেশ সরকার আবার ক্ষতিপূরণ দিচ্ছে! হিন্দু মরলে দিত?
কিছুটা তফাতে বসে আমার গা চিড়বিড় করছে, নিজেকে শান্ত রাখছি এই বুঝিয়ে যে এই ধর্মান্ধগুলোর সাথে তখন তর্কে জড়ালে আমার কাজের বারোটা বাজবে। আরো যে ভাবনাটা শান্ত থাকতে সাহায্য করেছিল সেটা এই যে ওটা একে গোবলয়ের রাজ্য তায় বিজেপিশাসিত। আমাদের পশ্চিমবঙ্গের শিক্ষিত লোকেরা এইভাবে ভাবে না। অন্য ব্যাপারে যতই মতের অমিল থাক, এই ধরণের হত্যার পক্ষ নিয়ে কেউ গলা ফাটায় না, যে খুন হল সরকার তার পরিবারের পাশে দাঁড়ালেও কেউ নোংরা মন্তব্য করে না। আফরাজুলের হত্যার পরের দিনগুলো আমার এই আত্মশ্লাঘাকে ইডেন থেকে ছয় মেরে বাংলার বাইরে পাঠিয়ে দিয়েছে।
রামনবমীতে সশস্ত্র মিছিল দেখে আন্দাজ করেছিলাম, এবারে নিশ্চিত হয়ে গেলাম যে বাঙালিদের মধ্যে গোমাতার সন্তানের সংখ্যা নেহাত কম নয়। আফরাজুল সম্পর্কে লাভ জিহাদের গপ্পটা বাজারে পড়তে না পড়তে বাঙালি চৈত্র সেলের শাড়ির মত ঝাঁপিয়ে তুলে নিল এবং সেটাকে মানুষ খুনের যুক্তি হিসাবে রোজকার কথাবার্তায় এবং অবশ্যই সোশাল মিডিয়ায় চালিয়ে দিল। আফরাজুলের বিরুদ্ধে লাভ জিহাদের অভিযোগ যে আদৌ প্রমাণ হল না সেকথা ছেড়েই দিলাম। কিন্তু যে দেশে ধর্ষণ করে ড্যাংড্যাং করে মন্ত্রী হওয়া যায় সে দেশে বিবাহ বহির্ভূত সম্পর্কের শাস্তি হচ্ছে মৃত্যুদন্ড, তাও আবার দন্ড দিতে আইন আদালত লাগবে না; রাম, শ্যাম, যদু, শম্ভু যে কেউ দন্ড দিতে পারে — একে যুক্তি বলে স্বীকার করে আকাশ বাতাস বিদীর্ণ করল কারা? রামমোহন, বিদ্যাসাগর, রবীন্দ্রনাথ, শরৎচন্দ্র, নজরুল, বেগম রোকেয়ার দেশের লোকেরা। আবার আফরাজুল মুসলমান অর্থাৎ বাঙালি নয় — এই কথাও দেখলাম লোকে বেশ রেলা নিয়ে বলে বেড়াচ্ছে। অবশ্য মাইকেল মধুসূদন আর কাজী নজরুল বাঙালি নন যারা বলতে পারে তাদের কাছে আফরাজুলের আর কী দাম? অপেক্ষায় ছিলাম কবে কোন ঘটনা নিয়ে বনলতা সেনগিরি শুরু হবে। বিরাট হিন্দু বাঙালি সেই সুযোগটা পেল হেমন্ত রায়ের মৃত্যুতে। কে হত্যা করেছে, কেন হত্যা করেছে কিছু জানতে পারার আগেই তারা যত ধর্মনিরপেক্ষ লোক সবার মা-মাসি উদ্ধার করে বলতে শুরু করল “এই হত্যার প্রতিবাদ হবে না কেন? একে ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে না কেন?”
আচ্ছা প্রতিবাদটা কার বিরুদ্ধে হবে? দুনিয়ার যেখানে যত খুন হচ্ছে নানা কারণে, সবকটারই প্রতিবাদ করতে হবে? সবকটাই নিন্দনীয় বললে মোটের উপর আপত্তি করার কিছু থাকে না কিন্তু সবকটারই নিন্দা করতেই হবে, নয়ত কোনটারই নিন্দা করা চলবে না, একথা যারা বলে তারা যে আসলে এক বিশেষ ধরণের খুনীর সমর্থক — একথা পরিষ্কার করে বলার সময় এসেছে। কী ধরণের খুনী তা নিয়ে যদি আপনার সন্দেহ থেকে থাকে তাহলে একবার কালকের খবরে চোখ রাখুন। রাজস্থানে শম্ভুলালের সমর্থনে আদালত আক্রমণ করে যেটা করা হয়েছে সেটাকে সন্ত্রাসবাদ ছাড়া অন্য কোন নাম দেওয়া যায় না। মাথার তেরঙ্গাটাকে টেনে নামিয়ে তার জায়গায় গেরুয়া পতাকা তোলা হয়েছে। আইসিসের আছে কালো পতাকা, এদের আছে গেরুয়া পতাকা। যে ভারত সরকার বিশ্ববিদ্যালয়ে ২০০ ফুট উঁচু জাতীয় পতাকা লাগাতে চায়, পর্নো ছায়াছবির আগেও জাতীয় সঙ্গীত চালাতে চায় সেই সরকার কিন্তু এ নিয়ে চুপচাপ। অর্ণব গোস্বামী কী বললেন এ নিয়ে? কেউ শুনেছেন?
ও হ্যাঁ, ক্ষতিপূরণের কথা হচ্ছিল। ওটা তো রাজস্থান সরকারেরই দেওয়া উচিৎ ছিল। তাদের রাজ্যে আইনশৃঙ্খলার এমন অবস্থা যে লোকে জানে একটা মুসলমানকে খুন করলে কিচ্ছু এসে যাবে না — এর জন্যেই তো প্রাণ গেল একটা নিরস্ত্র লোকের। এর দায় কোন না কোন সরকারকে তো নিতেই হবে। অতঃপর খুনী গ্রেপ্তার হল কিনা সেটা বড় কথা নয় কারণ অপরাধটা যেভাবে করা হয়েছে তাতে গ্রেপ্তার করার কাজটুকুই তো সরকারের ভাগে পড়ে ছিল। সেটুকু করার জন্যে তো আর বিরাট হিন্দুরা দাবী করতে পারেন না যে সকলে উঠে দাঁড়িয়ে হাততালি দেবে।
রাজস্থান সরকার অবশ্য আফরাজুলের খুনী, তার প্রতি সহানুভূতিশীল লোকেদের দায় নেবেন না সেটাই স্বাভাবিক কারণ মুখ্যমন্ত্রী বসুন্ধরা রাজে জননেত্রী নন, সাংবিধানিক দায়িত্ব পালনে আগ্রহী প্রশাসক নন। উনি উন্মত্ত জনতার নেত্রী। প্রমাণ চাই? গত ১৩ই ডিসেম্বর দ্য টাইমস অফ ইন্ডিয়ায় প্রকাশিত তাঁর সাক্ষাৎকারটা পড়ে নিন। নেত্রীর সোজাসাপ্টা কথা “একটা কাস্টের লোকের ভাবাবেগে যখন আঘাত লেগেছে তখন পদ্মাবতী মুক্তি পাওয়ার দরকারটা কী?” আরো অনেক মণিমুক্তো পাবেন ঐ সাক্ষাৎকারে যা বুঝিয়ে দেয় ক্ষ্যাপা জনতা যা চায় তাই-ই হবে রাজস্থানে। মুখ্যমন্ত্রী নিজেও সেই জনতারই একজন।
যাক সে কথা। এই বীভৎসতা দেখে কিন্তু এক শ্রেণীর বাঙালি যারপরনাই উল্লসিত। বসিরহাটের গন্ডগোলেই যারা ৩৫৬ ইত্যাদির দাবী করে ফেলেছিল তাদের রাজস্থানে আইনের শাসন ভেঙে পড়েছে এমনটা বলতে কিন্তু শোনা যাবে না। বাঙালির মোদীপ্রীতি উত্তরোত্তর বেড়েই চলেছে। নিত্যযাত্রী হওয়ার সুবাদে আজকাল প্রায়ই দেখি বাংলার বাসিন্দা বিহারী, মারোয়াড়িরা মোদীকে গাল পাড়ছেন। অথচ বাঙালিদের কি অচলা ভক্তি!
সক্রেটিসের ছাত্র আর এরিস্টটলের মাস্টারমশাই প্লেটো মনে করতেন গণতন্ত্র একটা ফালতু ব্যাপার কারণ এটা খুব ভাল চললে হয়ে দাঁড়ায় অভিজাততন্ত্র (plutocracy) আর খুব খারাপ চললে ক্ষ্যাপা জনতাতন্ত্র (mobocracy)। তা ভারতীয় গণতন্ত্র এখন একাধারে plutocracy এবং mobocracy। একদিকে দেশের সরকার থেকে ফুটবল পর্যন্ত সবকিছু চালাচ্ছে হাতেগোনা কয়েকজন পয়সাওয়ালা লোক, যাদের আরো বড়লোক করার জন্যে আগামীদিনে আমার, আপনার সাদা পথে অর্জিত টাকাও কেড়ে নেওয়ার আইন তৈরি হচ্ছে; অন্যদিকে আপনি কার পুজো করবেন, কী খাবেন, কী পরবেন, কী দেখবেন, কাকে বিয়ে করবেন, কার সাথে শোবেন সেটা ঠিক করে দেবে পাগলা কুকুরের চেয়েও বেশি বিপজ্জনক জনতা আর সরকার সেই জনতারই পক্ষ নিয়ে কখনো আপনার লাঞ্ছনা দেখে চুপটি করে থাকবে, আর কখনো আইনের অপব্যবহার করে বা নতুন আইন বানিয়ে আপনার অত্যাচার বাড়িয়ে তুলবে। যদি সংখ্যালঘু হন তো আপনি বাঁচবেন না মরবেন সেটাও ঠিক করবে ঐ জনতাই। সরকার বলবে “জনতাকে ক্ষেপানো কেন বাপু? জনতা যেমনটি চায় তেমনটি করে থাকতে পারলে থাক, নইলে পাকিস্তান চলে যাও।”
তা বাঙালি ঐ plutocracy র দিকটায় প্রবেশাধিকার পাচ্ছে না কারণ বাঙালির অভিজাত নেই গুজরাতি আর মারোয়াড়িদের মত, তাই mobocracy র দিকটায় সমানে সমানে লড়ে যাচ্ছে। ফাইট, মণি ফাইট।

রূপবতী

শাহ বানোর নাম জানে না এমন কোন লিখতে পড়তে জানা ভারতীয় বোধহয় আর অবশিষ্ট নেই। যারা জানত না তারাও কয়েকমাস আগে তিন তালাক এবং অভিন্ন দেওয়ানী বিধি নিয়ে বিজেপির কিং কং সুলভ বুক চাপড়ানোর সূত্রে জেনে গেছে শাহ বানো কে। ঐ ভদ্রমহিলার নামটা ভারতীয় দক্ষিণপন্থী রাজনীতিবিদ, বুদ্ধিজীবী এবং সাধারণ মুসলমানবিদ্বেষীরা চট করে ভুলবে না কারণ মুসলমানরা যে এখনো “আধুনিক হয়নি”, তারা যে “এখনো মধ্যযুগে পড়ে আছে” সেটার এমন হাতেগরম প্রমাণ পাওয়া যায় না তো চট করে। কিন্তু বলুন “রূপ কানোয়ার”, অনেকেই বলবে “সেটা আবার কে?” যারা ফেসবুকে জহরলাল নেহরু আর বিজয়লক্ষ্মী পন্ডিতের ছবি শেয়ার করে জহরলালকে দুশ্চরিত্র প্রমাণ করে তারা তো বটেই। রূপ কানোয়ার একটা বছর আঠেরোর মেয়ে। ১৯৮৭ সালের ৪ঠা সেপ্টেম্বর তার চব্বিশ বছর বয়সী স্বামীর চিতায় সে সতী হয়।

হ্যাঁ, ঠিকই পড়ছেন। সতী হয়, অর্থাৎ স্বামীর সঙ্গে সহমরণে যায়। এই সেই প্রথা যা রদ করার জন্যে রামমোহন রায় (“এমনকিছু ভাল লোক ছিলেন না। হিন্দুধর্মের অনেক ক্ষতি করেছেন” — আনুমানিক ১৯৯৯ সালে জনপ্রিয় এবং তথাকথিত আধুনিক এক হিন্দু ধর্মীয় সংগঠনের সন্ন্যাসীর মন্তব্য) আজ থেকে প্রায় দুশো বছর আগে এখান থেকে লন্ডন পর্যন্ত দৌড়াদৌড়ি করেছিলেন এবং তার ফলে ১৮২৯ এ লর্ড বেন্টিঙ্কের আমলে আমাদের ঔপনিবেশিক শাসকেরা এই জঘন্য প্রথাকে বেআইনি ঘোষণা করে। কিন্তু বুঝতেই পারছেন, ১৯৮৭ তেও কেউ সতী হচ্ছে মানে ১৫৮ বছরেও হিন্দুরা সকলে আধুনিক হয়ে উঠতে পারেনি। দেশের আইন যা বলে বলুক, ধর্মীয় ভাবাবেগের উপরে কোনকিছুর স্থান তাদের কাছে নেই। ঐ সময়কার প্রতিবেদন বলছে, কয়েকশো লোকের সামনে রূপ কানোয়ার সতী হয়। সে স্বেচ্ছায় সতী হয়নি (হলে সেটাও আত্মহত্যা বলে আইনত অপরাধ), তাকে জোর করা হয়েছিল বলে অভিযোগ থাকায় পুলিশি তদন্ত ইত্যাদি হয়। যথারীতি কিছু প্রমাণ করা যায়নি। কয়েকশো লোককে কে চটাতে যাবে? শেষমেশ সতী হতে প্ররোচনা দেওয়ার অভিযোগে কয়েকজনের বিরুদ্ধে আইনি কার্যকলাপ চালু হয়। কিন্তু তারাও ২০০৪ সালে প্রমাণের অভাবে বেকসুর খালাস পায়। পদ্মাবতী ছবিটা কেন মুক্তি পাওয়া উচিৎ নয়, তার পক্ষে একটাই যুক্তি দেওয়া হচ্ছে — “Rajput pride”। সেটা কী জিনিস বুঝতে হলে রূপ কানোয়ারের ঘটনাটা খুব প্রাসঙ্গিক। ঐ যে এক গাঁ লোক মিলে একটা মেয়েকে মৃত স্বামীর সঙ্গে জ্যান্ত পোড়ানো (বা পুড়তে দেওয়া), তার মৃত্যুর পর তাকে ভগবান বানিয়ে ফেলা, যেখানে পোড়ানো হয়েছে সেই জায়গাটাকে তীর্থক্ষেত্র করে তোলা — ওটাই রাজপুতদের গর্বের জিনিস।
গা ঘিনঘিন করছে? কেন ভাই? এরা তো মুসলমান নয়, হোক না মধ্যযুগীয়। রাজপুতরা নাকি বরাবর বীরের জাত। এমন বীর যে তাদের মেয়েদের শেখানো হত শত্রু আক্রমণ করলে নিজের যৌন শুদ্ধতা বাঁচাতে আগুনে ঝাঁপ দেবে, তবু যেন শত্রুর হাতে পড়ো না। এর আবার গালভরা নাম আছে — জহরব্রত। আলাউদ্দিন খিলজি যখন রাজপুতানা আক্রমণ করেন তখন নাকি রানী পদ্মাবতী (আমাদের অবনীন্দ্রনাথের রাজকাহিনীর পদ্মিনী) এই জহরব্রতই পালন করেন।
এটা ইতিহাস না নেহাত গপ্প সে বিতর্কে যাবই না। নাহয় ইতিহাসই হল। কিন্তু এই ২০১৭ সালে দাঁড়িয়ে একজন মহিলার যৌন শুদ্ধতা তার জীবনের চেয়েও মূল্যবান, অতএব যিনি নিজের মানরক্ষায় প্রাণত্যাগ করেছেন তিনি দেবী — এই চিন্তাভাবনা যাদের, তাদের তো আধুনিক মানুষ বলা চলতে পারে না। তাহলে স্বীকার করতে হয় যে হিন্দুদেরও অনেকেই এখনো মধ্যযুগে পড়ে আছে।
একদল বিজ্ঞ লোক বলবে “১৯৮৭র একটা ঘটনা দিয়ে ২০১৭র রাজপুতদের বদনাম করছে। যত্তসব।” সেইসব বিজ্ঞদের জ্ঞাতার্থে বলি ২০১১র জনগণনা অনুযায়ী রাজস্থানে প্রতি হাজার জন পুরুষপিছু মাত্র ৯২৮ জন মেয়ে। জাতীয় অনুপাতের চেয়েও রাজপুত বীরপুঙ্গবদের রাজস্থান অনেক পিছিয়ে। শূন্য থেকে ছয় বছরের শিশুদের মধ্যে হিসাব করলে সংখ্যাটা আরো ভয়াবহ — ৮৮৮। বোঝাই যাচ্ছে রাজপুতরা তাদের মেয়েদের নিয়ে কি দারুণ গর্বিত। আমাদের মেয়েরা শত্রুর এঁটো হয় না — এইটাই ওঁদের একমাত্র গর্বের জায়গা আর কি। স্বভাবতই পদ্মাবতী সিনেমার পর্দায় নাচলে গাইলে ওঁদের গর্বে আঘাত লাগবে বইকি। সিনেমা যে বাস্তব নয় সেসব বুঝিয়ে লাভ কী? যেদেশে গুরমীত রাম রহিম সিং এর সুপারহিরো ফিল্ম হিট হয় সেদেশে ও যুক্তি শুনবে কে?
এসব বলার মানে এই নয় যে রাজপুত মানেই নরাধম। সত্যি বলতে কি, শুধু রাজপুত নয়, এদেশের সর্বত্রই উচ্চবর্ণের লোকেরা নানারকম অমানুষিক আচার হাজার বছর ধরে চালিয়ে এসেছে। এই বাংলায় যেমন কুলীন ব্রাক্ষ্মণরা বিয়ে করাটাকেই একটা পেশায় পরিণত করে ফেলেছিল। বাঁড়ুজ্জে বংশে যখন জন্মেছি তখন খুঁজলে নিশ্চয় আমার কোন পূর্বপুরুষকেও পাওয়া যাবে যে এরকম বিকৃত ব্যবসায় লিপ্ত ছিল। তা বলে আমি, একবিংশ শতকের মানুষ, আমি কি সেসবকে সমর্থন করব? কুলীন বামুনদের নিয়ে কেউ ছবি করলে কি বাংলার চাটুজ্জে, বাঁড়ুজ্জে, মুখুজ্জে মিলে সিনেমা হল ভাঙচুর করতে নামবে না পরিচালকের মাথা কাটতে চাইবে?
কল্পনা করতেও কষ্ট হচ্ছে, তাই না? এর কারণ কিন্তু এই নয় যে বাঙালি ব্রাক্ষ্মণরা সব দেবতুল্য, রাজস্থানের কর্ণি সেনার রাজপুতদের মত নয়। কারণটা ইতিহাস। বিশদে বলার জায়গা এবং সময় যেহেতু নেই তাই সংক্ষেপে একথা বললে অত্যুক্তি হবে না যে কারণটা রামমোহন আর বিদ্যাসাগর। শশী থারুর বলে এক নিপুণ বক্তা এবং ধুরন্ধর ভদ্রলোক বলেছেন রাজপুত ঐতিহ্য ভারতীয় ঐতিহ্যের অপরিহার্য অঙ্গ। অতএব তাদের ঐতিহ্যের অপমান না হয় সেদিকে সকলের নজর দেওয়া উচিৎ। রামমোহন আর বিদ্যাসাগর এইসব ঐতিহ্যের স্বরূপ থারুরের চেয়ে অনেক ভাল জানতেন। তাই ওসবের তোয়াক্কা না করে বিধর্মী, বিজাতীয় শাসকের কাছে সতীদাহ, বহুবিবাহের ঐতিহ্যের বারোটা পাঁচ বাজিয়ে দেওয়ার জন্যে তদবির করতে একদম দ্বিধা করেননি। সেসময়কার বামুন, কায়েতরা আজকের কর্ণি সেনার মতই আচরণ করেছিল। পার্থক্যের মধ্যে ইংরেজ সরকার বসুন্ধরা রাজে সিন্ধিয়ার মত “ইশ! ওরা কি দুষ্টু!” বলে হাত গুটিয়ে বসে থাকেনি। অসভ্য ঐতিহ্যগুলোকে বেআইনি করে ছেড়েছিল।
আরেকটা সুবিধা তখন ছিল। সেসময় অতিচালাক, স্বার্থান্বেষী, ঘুষখোর বুদ্ধিজীবী আর সাংবাদিক ছিল না যারা সরকারের মদতপ্রাপ্ত সন্ত্রাসবাদীগুলোকে ন্যাকামি করে “fringe element” বলবে। এরা আছে বলেই আইনের শাসনের উপরে কোন গোষ্ঠীর ভাবাবেগের এই অবাধ দৌরাত্ম্য নির্ঝঞ্ঝাটে সম্ভব হচ্ছে। শাসক দলের নেতা লাইভ টিভিতে বসে আইএসের ঢঙে খুনের হুমকি দিচ্ছে, নায়িকার অঙ্গহানির হুমকি দিয়ে ড্যাংড্যাং করে ঘুরে বেড়াচ্ছে লোকে, সরকার কিছুই করতে পারছে না। বিজেপির মুখ্যমন্ত্রীদের এই এক মজা। তাঁরা সবাই ভীষণ পরিশ্রমী, উপযুক্ত এবং জনপ্রিয় কিন্তু সঙ্কটের সময়ে তাঁরা কেউই কিছু করে উঠতে পারেন না। যেমন ২০০২ এ মোদী পারেননি আরকি। সব মিলিয়ে দীপিকা পাড়ুকোনের নাক আস্ত থাকলেও দেশ হিসাবে ভারতের নাক কাটা গেছে। নিজেদের সভ্য বলে দাবী করার অধিকার আমরা ক্রমশ হারাচ্ছি।
দুঃখের বিষয় এই যে এমন একটা ছবি নিয়ে এই কান্ড হচ্ছে যেখানে আধুনিক ভারতে একেবারেই অনুকরণীয় নয় এমন এক চরিত্রকে গৌরবান্বিত করা হয়েছে। সঞ্জয় লীলা বনশালী তো সমাজসচেতন বাস্তবধর্মী ছবি বানানোর বান্দা নন। তিনি কেবল মনোরম দৃশ্যপট তৈরি করেন। দেবদাসের নিদারুণ ট্রাজেডিও তাঁর হাতে পড়ে রাঙা টুকটুক করে। এমন পরিচালকের এই দুর্গতির কোন মানে হয়! তাছাড়া এরপরেও তো তিনি একবারও বলছেন না এস দুর্গা আর ন্যুড ছবির সঙ্গে যে অন্যায় হয়েছে তাও কম আঘাত নয়। এতদিন কল্পজগতে বাস করেছেন বেশ করেছেন। এখন যখন নাচগানওলা ফর্মুলা ছবি বানাতে গিয়েও গোষ্ঠীর এবং রাষ্ট্রের গুন্ডামি সহ্য করতে হচ্ছে তখন অন্তত বেপরোয়া হয়ে উঠুন না। দেখান না একটা অন্য কল্পজগত। বানান না রূপ কানোয়ারকে নিয়ে একটা ছবি, যেখানে স্বামীর চিতা থেকে লাফিয়ে নেমে পড়ে অমিতাভ বচ্চনের মত একাই শ্বশুর, দেওর আর তাদের গুন্ডাবাহিনীকে নিকেশ করবেন দীপিকা। তারপর নীচু জাত বা মুসলমান বলে যে প্রেমিকের সাথে বিয়ে দেননি বাবা-মা, সেই রণবীরকে বাইকের পেছনে চাপিয়ে চলে যাবেন অনেক দূরে, “Rajput pride” কে কাঁচকলা দেখিয়ে।
পুনশ্চ: আমার ধারণা এই লেখাটায় বেশকিছু লোক মন্তব্য করবে যে এর মধ্যে হিন্দু, মুসলমানকে টেনে আনা নোংরা রাজনীতি বা মূর্খামি। রাজপুত ভাবাবেগে আঘাত লাগায় রাজস্থানের মুসলমানরাও আহত। এর প্রমাণ হিসাবে বলা হবে যে আজমের শরীফও পদ্মাবতীর মুক্তির বিরোধিতা করেছে। উত্তরে বলি, আজমের শরীফের ঘাড়ে কটা মাথা যে বিরোধিতা না করে? যে রাজপুতদের মুখ্যমন্ত্রীই ছুঁতে পারেন না তাদের বিরোধিতা করবে সংখ্যালঘুরা?