প্রতিবাদ সংবাদে বাদ?

গত ২৭শে নভেম্বর পাঞ্জাব, হরিয়ানার কৃষকরা তিনটে কৃষি বিল বাতিলের দাবীতে এবং প্রস্তাবিত বিদ্যুৎ বিলের বিরুদ্ধে দিল্লী অভিযান শুরু করেন। ইতিমধ্যে উত্তরাখণ্ড, উত্তরপ্রদেশের মত রাজ্যগুলোর কৃষকরাও পথে নেমে পড়েছেন। মহারাষ্ট্রের কৃষকরা নামবেন বলে ঘোষণা করেছেন। কাউকে কেয়ার না করা মোদী সরকার বুঝেছে ঠ্যালার নাম বাবাজি। এ রীতিমত কৃষক বিদ্রোহ। তাই গায়ের জোর ভুলে অমিত শাহ ও সম্প্রদায় হঠাৎ আলোচনার জোরে বিশ্বাসী হয়ে উঠেছে। চিড়ে কিন্তু ভিজছে না। একগুঁয়ে চাষাদের এক কথা — সংসদ ডাকো, আইন বাতিল করো। সারা দেশের বাম, মধ্য, দক্ষিণ — যে কোন পন্থার মানুষের কাছেই এই মুহূর্তে এর চেয়ে বড় কোন ঘটনা নেই, কোন ইস্যু নেই, থাকার কথাও নয়।

অথচ বাংলা মূলধারার সংবাদমাধ্যমগুলোর দিকে তাকালে কিন্তু সেটা বোঝার উপায় নেই। গতকালই পি সাইনাথ এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন এই কৃষক বিদ্রোহ এক দিনে তৈরি হয়নি। গত কয়েক বছরে রাজস্থান, মহারাষ্ট্র, মধ্যপ্রদেশের কিষাণ লং মার্চের ধারাবাহিকতায় এই আন্দোলন এসেছে। সেই আন্দোলনগুলো যেমন বাংলার সর্বাধিক টি আর পি প্রাপ্ত দুটো খবরের চ্যানেলে প্রাধান্য পায়নি, এই আন্দোলনও পাচ্ছে না।

২৬শে নভেম্বর কেন্দ্রীয় ট্রেড ইউনিয়নগুলোর ডাকে দেশব্যাপী সাধারণ ধর্মঘট ছিল। সেই ধর্মঘটকেও সমর্থন জানিয়েছিল কৃষক সংগঠনগুলো। সেদিন বহু জায়গায় ট্রেন চলেনি, বাস চলেনি, দোকানপাট বন্ধ ছিল। অথচ সেদিন দুপুরেও কূপমন্ডুক বাংলা চ্যানেলের প্রধান খবর ছিল মাঝেরহাট ব্রিজ খোলার দাবিতে বিজেপির দাপাদাপি। যে ব্রিজ আজ বিকেলে উদ্বোধন হওয়ার কথা আগেই ঘোষণা হয়ে গিয়েছিল।

বাংলা খবরের কাগজগুলোতেও গত কয়েক দিন ধরে কৃষক বিদ্রোহ নয়, বেশি জায়গা অধিকার করে থাকছে শুভেন্দু অধিকারীর ধাষ্টামো বা মাননীয় মুখ্যমন্ত্রীর ভোটমুখী প্রকল্প ঘোষণা। গত দু-তিন দিনে তবু কৃষক বিদ্রোহের খবর বা ছবি বাড়ির কাগজটার প্রথম পাতায় ভাল করে দেখতে পাচ্ছি, তার আগে এ কোণে এক কলম বা ও কোণে দু কলমেই সন্তুষ্ট থাকতে হচ্ছিল। সে অবশ্য চব্বিশ ঘন্টার আনন্দময় চ্যানেলগুলোর তুলনায় মন্দের ভাল। কারণ ওগুলোতে খবর বলতে সারাদিন যা পাওয়া যায়, তা হল — অমুক জায়গায় তৃণমূলের লেখা দেওয়াল মুছে দিল বিজেপি। তমুক জায়গায় বিজেপির পার্টি অফিসে তৃণমূলের ভাঙচুর। বিজেপি নেতার মাচার লাউ কেটে নেওয়ার অভিযোগ তৃণমূল পঞ্চায়েত সদস্যের বিরুদ্ধে। তৃণমূলের পঞ্চায়েত প্রধানের বিরুদ্ধে চরিত্রহীনতার অভিযোগ করলেন বিজেপি সদস্য — এইরকম আর কি।

অর্থাৎ যে খবরগুলো আজ থেকে পাঁচ বছর আগেও নেহাত দেখানোর বা ছাপার মত কিছু না থাকলে জায়গা ভরাতে ব্রিফ হিসাবে ব্যবহার করা হত — সেগুলোই বাঙালিকে দিনরাত পড়ানো এবং দেখানো হচ্ছে। ব্যাপারটা মোটেই হাস্যকর নয়। আসলে দিল্লী ভিত্তিক হিন্দ্রেজি সংবাদমাধ্যম যেমন দেশের আসল সমস্যাগুলোকে আড়াল করতে পাকিস্তানকে কেমন দিলাম, লাভ জিহাদ, সিভিল সার্ভিস জিহাদ ইত্যাদি আবর্জনা পরিবেশন করে, বাংলার সংবাদমাধ্যমও কৃষক বিদ্রোহ, শ্রমিকদের আন্দোলনকে আড়াল করতে আবর্জনা পরিবেশন করছে। হিন্দ্রেজি সংবাদমাধ্যমগুলোর খবর থেকে মস্তিষ্কে বিষক্রিয়া হয়, বাংলার আবর্জনা কেবল দুর্গন্ধ ছড়ায় — তফাত এটুকুই।

কিন্তু কেন এমন করা হচ্ছে? কৃষক আন্দোলনকে প্রাপ্য গুরুত্ব দিলে কী ক্ষতি? পশ্চিমবঙ্গের শ্রমিকরা কি টিভি দ্যাখেন না, নাকি কৃষি আইন, শ্রম কোডের প্রভাব এ রাজ্যের শ্রমিক, কৃষকদের উপর পড়বে না?

আসলে প্রকাশ্যে স্বীকার না করলেও, যারা জানার তারা জানে, হিন্দ্রেজি সংবাদমাধ্যমের অধিকাংশ যেমন একচোখা, এ রাজ্যের অধিকাংশ সংবাদমাধ্যমও তাই। তাদের অনেকেই ফ্যাসিবিরোধী, কিন্তু কোনটাকে ফ্যাসিবাদ বলা হবে, তার কতটা বিরোধিতা করা হবে, আদৌ করা হবে কিনা — সেসব তারা ঠিক করে না। অনুপ্রেরণা ছাড়া এ রাজ্যে ফ্যাসিবাদের বিরোধিতা করাও মানা।

অতএব শিক্ষক-শিক্ষিকার চাকরি খুঁজছে যারা, তাদের আন্দোলনের কথা জানতে হলে আপনাকে ফেসবুকই খুলতে হবে। টিভির স্থানীয় সংবাদ লাউমাচা পুঁইমাচা নিয়েই চলবে। কৃষক বিদ্রোহের খবর জানতে চাইলেও হাতে গোনা হিন্দ্রেজি সংবাদমাধ্যম অথবা খবরের সাইটের শরণাপন্ন হতে হবে। টিভি আর কাগজ জুড়ে দলবদলের হট্টগোলই চলবে।

ছবিটা অবশ্য কাল থেকে বদলে যাবে বলে আশা করছি। কারণ আজ দিদি ঘোষণা করেছেন তিনি কৃষকদের পাশে আছেন, ঐ আইনগুলো খুব খারাপ, অবিলম্বে বাতিল করা উচিৎ এবং এই দাবিতে তাঁর দল কোমর বেঁধে আন্দোলনে নামছে। আশা করি এবার আর বাংলা সংবাদমাধ্যমের অনুপ্রেরণার অভাব হবে না।

উল্টো রাজা উল্টো বুঝলি প্রজার দেশে

যে যা-ই বলুক, চোখ কান খোলা রাখলে বেশ টের পাওয়া যাচ্ছে পশ্চিমবঙ্গ মোটেই কোরোনা সামলাতে যা করা উচিৎ তা করছে না। বেশি কড়া কথা বলা হয়ে যাচ্ছে মনে হলে একটু নরম করে বলা যেতেই পারে করতে পারছে না। তা বলে কেন্দ্রীয় সরকার সংবিধান, যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামো ইত্যাদির তোয়াক্কা না করে জেলায় কী হচ্ছে সে সম্বন্ধে ভাষণ দেবে আর খবরদারি করতে কেন্দ্রীয় দল পাঠাবে — তাও সমর্থনযোগ্য নয়।

লক্ষণীয়, গত দুদিনে কেন্দ্রীয় সরকার কতকগুলো জায়গা সম্বন্ধে আলাদা করে বলেছে সেখানে উদ্বেগজনক অবস্থা। প্রত্যেকটা জায়গাই অ-বিজেপি শাসিত রাজ্যে — কলকাতা, মুম্বাই, জয়পুর, ইন্দোর। কলকাতার (এবং হাওড়ার) অবস্থা আমরা আশেপাশের লোকেরা জানি, তাই বাদ দিন। কিন্তু বাকিগুলো ভাবুন।

শুরু থেকেই দেশে সবচেয়ে বেশি টেস্ট করছে কেরালা আর মহারাষ্ট্র। স্বভাবতই ও দুটো রাজ্যে কোরোনা আক্রান্ত রোগীও বেশি পাওয়া যাচ্ছে৷ মুম্বাই মহারাষ্ট্রের রাজধানী। জয়পুর রাজস্থানে। যে রাজ্যের ভিলওয়ারাকে কদিন আগে মডেল বলেছে কেন্দ্রীয় সরকার নিজেই। সেখানে কোরোনা রোগীর সংখ্যাও কিছু অস্বাভাবিক গতিতে বৃদ্ধি পাচ্ছে না। ইন্দোর মধ্যপ্রদেশে। সে এমন এক রাজ্য যেখানে এখন অব্দি আস্ত ক্যাবিনেট নেই, স্বাস্থ্যমন্ত্রী নেই। কংগ্রেস সরকারকে সরিয়ে সবে বিজেপি সরকার শপথ নিয়েছে, তখনই লকডাউন শুরু হল। সেখানে মাঝে কয়েকদিন প্রচুর কোরোনা রোগী পাওয়া যাচ্ছিল, হঠাৎই কমতে শুরু করেছে। ভোজবাজির মত।

এর পাশাপাশি যদি বিজেপিশাসিত রাজ্যগুলোর দিকে চোখ রাখা যায়, দেখা যাবে উত্তরপ্রদেশে ঠিক কী হচ্ছে আমরা জানি না। তবলিগি জামাতের জমায়েত নিয়ে দিনরাত এত দুশ্চিন্তা আমাদের, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রক নিয়মিত আপডেট দিচ্ছে ওখান থেকে কতজনের কোরোনা হয়েছে, অথচ লকডাউন শুরু হওয়ার পর রামনবমীর দিন অযোধ্যার অনুষ্ঠান থেকে কতজনের কোরোনা হয়েছে তার কোন পরিসংখ্যান আমরা পাচ্ছি না। উত্তরপ্রদেশে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ীই কিন্তু সহস্রাধিক আক্রান্ত। তা নিয়ে কেন্দ্রীয় সরকার চিন্তিত নন। উত্তর-পূর্বাঞ্চলের রাজ্যগুলো সর্বদা দেশী বিদেশী পর্যটকে ভরে থাকে, অথচ ওদিকে একেকটা রাজ্যে দুজন, পাঁচ জন, দশ জন করে আক্রান্ত। অর্থাৎ ঐ রাজ্যগুলো বাকিদের জন্য অনুকরণীয়। তাহলে কেন্দ্রীয় সরকার বাকিদের ওদের থেকে শিখতে বলছেন না কেন, তাও পরিষ্কার নয়। ফলত কিছু রাজ্যের জন্য এই দুশ্চিন্তাকে লর্ড ডালহৌসির করদ রাজ্যগুলোর প্রজাদের জন্য দুশ্চিন্তার বেশি কিছু ভাবা শক্ত হয়ে দাঁড়াচ্ছে।

আসলে রাজ্য সরকার মানে যে কেন্দ্রীয় সরকারের অধীনস্থ অফিস নয়, তা বর্তমান সরকার মোটেই মানতে চান না।সংবিধানকে মারো গুলি। কেনই বা মারবেন না? আমাদের সংবিধান যে নিতান্ত ফেলে দেওয়ার মত একটা জিনিস সে সিদ্ধান্ত এ দেশে হয়েই গেছে। পাড়ার “আমি কিন্তু বিজেপি নই” দাদা বা দিদির সাথে কথা বললেই বুঝতে পারবেন।

অবশ্য প্রধানমন্ত্রীকে মুখ্যমন্ত্রীর প্রভু ভাবার অভ্যেসটা যারাই শক্তিশালী কেন্দ্রীয় সরকার চালিয়েছে তাদেরই বিলক্ষণ ছিল। রাজ্যপালকে দিয়ে দিনরাত বিরোধী দলের রাজ্য সরকারের পিছনে লাগা, সরকার ভেঙে দেওয়া, কাজে বাধা সৃষ্টি — সবই শুরু হয়েছে সেই বাজপেয়ীর দুর্গা ইন্দিরার আমলে। বরাবর কেন্দ্রের দাদাগিরি নিয়ে সবচেয়ে সোচ্চার ছিলেন বামপন্থীরা। তাঁরা রাজ্যগুলোকে আরো ক্ষমতা দিতে এমনকি সংবিধান সংশোধন চাইতেন, ৩৫৬ ধারার বিলোপ চাইতেন। এ সবের জন্য বাঙালির দৈনিক বেদ যারপরনাই গালাগাল দিয়েছে বামেদের। বলেছে এরা কাজ করতে চায় না বলে কেন্দ্রীয় সরকারের দিকে আঙুল তোলে।

একবার তো এক কেন্দ্রীয় মন্ত্রী হুমকিই দিয়েছিলেন যে তাঁর দল লোকসভায় ৩.৫৬% ভোট পেয়েছে, তাই তিনি প্রধানমন্ত্রীকে দিয়ে পশ্চিমবঙ্গে ৩৫৬ জারি করিয়ে দেবেন। নামটা গুগল করলে পেয়ে যাবেন। শেষ বামফ্রন্ট সরকারের আমলে তিনিই আবার বলেছিলেন পি এম টু ডি এম কাজ হওয়া উচিৎ, রাজ্য সরকারকে মানব না।

এরকম অনেক দৃষ্টান্ত আছে। কিন্তু কোন দুষ্কর্মই আগে অন্য লোক করেছে বলে বৈধ হয়ে যায় না। ফলত কেন্দ্রীয় সরকারের এই “চালুনি বলে ছুঁচ, তোর পিছে কেন ছ্যাঁদা” মার্কা তৎপরতাকে কোন যুক্তিতেই মহৎ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে ভাবা সম্ভব হচ্ছে না। “এই সময়ে রাজনীতি করবেন না” কথাটাও নেহাত খিল্লি হয়ে দাঁড়াচ্ছে। বরাবর দেখা যায় রাজনীতিকে ভাইরাসের মত পরিহার করতে বলে তারাই যারা ক্ষমতাশালী, কারণ রাজনীতি বন্ধ করতে পারলে ক্ষমতা নিরঙ্কুশ হয়। এক্ষেত্রেও ব্যাপারটা তাই। কেন্দ্র, রাজ্য উভয় সরকারের ব্যবহারই তা প্রমাণ করে। রাজ্যের ব্যবহার নিয়ে না হয় আরেকদিন কথা হবে। পিঠটাও তো বাঁচাতে হবে।

সাত শতাংশের অধিকারে

যতই ক্ষমতাচ্যুত হোক, ক্ষমতাহীন হোক, বামপন্থীরা রাস্তায় নামলে ঢেউ উঠবে। আজও এর কোন ব্যতিক্রম পৃথিবীর কোথাও নেই। পার্টির নাম, সংগঠনের নাম যা-ই হোক। আর ন্যায্য দাবীতে রাস্তায় নামলে অকর্মণ্য শাসক মারবে, ধরবে, মাথা ফাটাবে — এরও কোন ব্যতিক্রম হয় না। ফলে গতকালের নবান্ন অভিযানে রাজপথে যেসব দৃশ্যের জন্ম হয়েছে সেগুলো অনভিপ্রেত হলেও অপ্রত্যাশিত নয়। বুক চিতিয়ে পুলিশের সঙ্গে লড়ে গেলেন যে নূতন, সবুজ, কাঁচারা তাঁদেরও সাধুবাদ প্রাপ্য। ফেসবুক বিপ্লবের যুগে রাস্তাই যে একমাত্র রাস্তা সেকথা শিরোধার্য করে এইভাবে রক্তাক্ত হতে যাঁদের বাধে না তাঁদের কুর্নিশ না করে উপায় নেই। সমস্যা অন্যত্র।
কাল সিপিএমের ছাত্র সংগঠন এস এফ আই আর যুব সংগঠন ডি ওয়াই এফ আই যে দাবীগুলোর ভিত্তিতে নবান্ন অভিযান করছিলেন — স্বল্প খরচে শিক্ষার দাবী এবং কাজের দাবী — সেগুলো যে ন্যায্য তা নিয়ে কোন সুস্থ মস্তিষ্কের মানুষের মনে কোন সন্দেহ থাকার কথা নয়, যদি না তিনি রাজ্যে ক্ষমতাসীন দলের অন্ধ সমর্থক হন বা মুখ্যমন্ত্রীকে দৈবী শক্তির অধিকারী, মানবিক ভুলচুকের অতীত বলে মনে করেন। কিন্তু রাজনীতি, বিশেষত বিরোধী রাজনীতি, শুধু দাবী সনদ পেশের ধারাবাহিকতার নাম নয়। উপরন্তু ছাত্র সংগঠনের বা যুব সংগঠনের কেবল তাদের গোষ্ঠীগত স্বার্থের কথাই বলা উচিৎ, বৃহত্তর রাজনীতি তাদের কর্মকাণ্ডের অন্তর্ভুক্ত হওয়া উচিৎ নয় — এমনটা আর যে-ই ভাবুক, বামপন্থীরা নিশ্চয়ই ভাবেন না। সেদিক থেকে দেখলে প্রায় একইরকমের দাবী নিয়ে গত কয়েক বছরে কখনো সিপিএম দলের নবান্ন অভিযান, কখনো কৃষক সভার নবান্ন অভিযান, কখনো ছাত্র, যুব সংগঠনের নবান্ন অভিযান দেশের যে বর্তমান রাজনৈতিক, আর্থসামাজিক সঙ্কট তার সাপেক্ষে কী অবস্থান নিচ্ছে? অভিযানগুলো বারবার নবান্নেই বা যাচ্ছে কেন?
শিক্ষা, স্বাস্থ্যকে পণ্য করে তোলার যে প্রক্রিয়া ১৯৯১ তে শুরু হয়েছিল, ২০১৪ থেকে বিজেপি শাসনে তা আরো প্রকাশ্য, আরো নির্লজ্জ। আম্বানিদের যে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এখনো চালুই হয়নি তাকে সেন্টার অফ এক্সেলেন্স তকমা দিয়েছে কেন্দ্রীয় সরকার। অথচ টাটা ইন্সটিটিউট অফ ফান্ডামেন্টাল রিসার্চের মত সরকারপোষিত প্রতিষ্ঠানের গবেষকদের পুরো মাইনে দেওয়ার ক্ষমতা নাকি সরকারের নেই, ইসরোর গবেষকদের মাইনে কমিয়ে দেওয়া হচ্ছে। অর্থাৎ এ রাজ্যে কলেজে তোলাবাজি, হবু শিক্ষক, প্যারা টিচারদের পুলিশ দিয়ে পেটানো ইত্যাদি কোন বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। দেশের কোথাও শিক্ষাজগতের লোকেরা ভাল নেই। না ছাত্রছাত্রীরা, না গবেষক শিক্ষক শিক্ষিকারা। শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের মৌলিক অধিকার বিপন্ন। তাহলে এসব নিয়ে সিপিএম বা তার গণসংঠনগুলোর সংসদ অভিযান হচ্ছে না কেন?
কাজের অধিকার সারা দেশে কিভাবে বিপন্ন তা তো আলাদা করে বলার অপেক্ষা রাখে না। গত কয়েক মাসে কয়েক হাজার মানুষের চাকরি গেছে, আরো বহু মানুষ আশঙ্কিত। যাদের চাকরি আছে তাঁরাও অনেকে মাইনে পাচ্ছেন না বি এস এন এল কর্মীদের মত। তা নিয়ে বামপন্থী ট্রেড ইউনিয়নগুলো (সিটু তো বটেই) আন্দোলনও করছে। অথচ দল হিসাবে এসব নিয়ে সিপিএমের রাস্তায় নেমে আন্দোলন সংসদ বা সাউথ ব্লকের দিকে যাচ্ছে না কেন? এস এফ আই বা ডি ওয়াই এফ আই এর অভিযানই বা দিল্লীমুখো নয় কেন? অন্য রাজ্যে সাংগঠনিক শক্তির অভাব আছে বলে দিল্লী আক্রমণ করছি না, একথা যদি কেউ বলেন, সেটাকে অজুহাত বলেই ধরতে হবে কারণ মহারাষ্ট্র, রাজস্থান বা হরিয়ানার মত যেসব রাজ্যে সিপিএমের সাংগঠনিক শক্তি পশ্চিমবঙ্গের চেয়ে অনেক কম, সেখানকার কৃষকদের পর্যন্ত সংগঠিত করে দিল্লী, মুম্বইয়ের বুকে সিপিএমের কৃষক সভার উদ্যোগে কিষাণ লং মার্চ সারা দেশ অল্প দিন আগেই দেখেছে। তাহলে?
তার চেয়েও বড় কথা “বুনিয়াদি লড়াইটা হল ভাতের লড়াই। বামপন্থীদের সেই লড়াই জারী রাখতে হবে” — এই জাতীয় যুক্তিতে সমকালের জ্বলন্ত সমস্যাগুলোকে এড়িয়ে যাওয়া কি কোন শুভবুদ্ধিসম্পন্ন রাজনৈতিক দলের উচিৎ? সারা দেশে এই মুহূর্তে সবচেয়ে বড় বিপদ হল হিন্দুত্ববাদী একনায়কতন্ত্রের বিপদ। যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা এবং গণতন্ত্র লুপ্ত হওয়ার বিপদ। সেই বিপদ কোন দিক থেকে এসেছে (এখনো আসছে ভাবার ভুল করবেন না) তা আমরা সবাই জানি। তার বিরুদ্ধে রাস্তার লড়াইকে কি সিপিএম কোন অদূর ভবিষ্যতের জন্যে স্থগিত রেখেছে? রাখতে পারে? রাজ্যের তৃণমূল সরকার তো ২০১১ থেকেই এখনকার মত চলছে। তা নিয়ে বারবার নবান্ন অভিযানে পার্টি সদস্য বা গণসংগঠনের সদস্যদের রক্ত ঝরছে অথচ মানুষের সমর্থন বাড়ার বদলে কমেই চলেছে। এর কারণ কী? আসলে কি মানুষের ইস্যু বুঝতেই ভুল হচ্ছে? নিজেদের পছন্দের ইস্যুকেই মানুষের ইস্যু বলে চালিয়ে দেওয়া হচ্ছে? নেতৃত্ব এগুলো ভাববেন না?
পশ্চিমবঙ্গের গরীব, বড়লোক, মধ্যবিত্ত সকলেই এই মুহূর্তে কোন ইস্যুটা নিয়ে উদ্বিগ্ন? বা নিদেন পক্ষে আগ্রহী? নিঃসন্দেহে এন আর সি। বিজেপি রোজ বলছে, বড় মেজ সেজ ছোট সব নেতা নেত্রী বলছেন বাংলায় এন আর সি হবেই। শুধু বাংলাই বা কেন? আসামে ডিটেনশন সেন্টার তৈরি হয়ে গেছে, অন্যত্রও হচ্ছে। তা নিয়ে সিপিএম নেতৃত্ব এখনো কিন্তু, যদি, তবে করছেন। কখনো শোনা যাচ্ছে আসামের বাইরে এন আর সি হলে ওঁরা বিরোধী, অর্থাৎ আসামে যা হয়েছে বেশ হয়েছে। কখনো বলছেন দেখতে হবে যেন সত্যিকারের নাগরিকরা বাদ না পড়ে যান। এসবের মানে কী? যে পার্টি অসহায় মানুষ, গরীব মানুষ, ছিন্নমূল মানুষের পাশে নির্দ্বিধায় দাঁড়ায় না, মানুষকে ছিন্নমূল করার প্রক্রিয়ার বিপক্ষে পিঠ সোজা করে দাঁড়ায় না — সে আবার কিরকম কমিউনিস্ট পার্টি?
ওদিকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কিন্তু এ নিয়ে রাস্তায় নেমে পড়েছেন। শেষ অব্দি সারদা, নারদের চোখ রাঙানি পেরিয়ে কদ্দূর কী করবেন সেটা পরের কথা, কিন্তু ছিন্নমূল হতে চলা মানুষ কিন্তু দেখছেন তিনি বলেছেন “দু কোটি লোককে বার করে দেবে? দুটো লোকের গায়ে হাত দিয়ে দেখাক।” এরকম কথা সিপিএম তথা বাম নেতাদের মুখে শোনা যাচ্ছে না কেন? তাঁরা কি ভাবছেন বাঙালদের পক্ষ নিলে এদেশীয় ভোটাররা ক্ষেপে যাবেন? উদ্বাস্তুদের জন্যে আন্দোলন কিন্তু স্বাধীনোত্তর ভারতে তথা বাংলায় বামপন্থীদের শক্ত জমিতে দাঁড় করিয়েছিল।
আচ্ছা, রাজ্য সরকারকেও কি সঠিক ইস্যুতে আক্রমণ করা হচ্ছে? মুখ্যমন্ত্রীর সাধের মেট্রো রেল প্রকল্প এমনই কল্পরাজ্যের জিনিস যে তাকে বাস্তবের মাটিতে নামাতে গিয়ে বহু লোকের ভিটেমাটি চাটি হওয়ার যোগাড় হয়েছে। তা নিয়েই বা বামেদের আন্দোলন কই? যে শহরে এই সরকারের আমলেই নির্মীয়মাণ ফ্লাইওভার ভেঙে পড়ে মানুষের মৃত্যু হয়েছে, প্রকল্প শেষ করা সম্ভব নয় বলে ঘোষিত হয়েছে, সেই শহরে আবার এরকম সর্বনাশা প্রকল্প এগোল কী করে তা নিয়ে বামেরা সরকারকে প্রশ্নবাণে, আন্দোলনে জর্জরিত করলেন কই? নেতৃত্ব কি মনে করেন এগুলোতে কারোর কিছু এসে যায় না? নাকি ওখানেও হিসাব? বাড়ি ভেঙে পড়া লোকেদের চেয়ে মেট্রো হলে যারা চড়বে তাদের ভোটসংখ্যা বেশি হওয়ার হিসাব?
যদি তা-ই হয়, তাহলে এই যাঁরা লাল ঝান্ডার জন্যে এখনো প্রাণ বাজি রাখছেন তাঁরা কোন হিসাবে আছেন জানতে ইচ্ছা করে। তাঁদের ত্যাগ, তাঁদের রক্ত অপচয় হচ্ছে না তো? সাম্প্রতিককালে অনেকের মুখে কাছের শত্রু তৃণমূল, তারপর বিজেপির মোকাবিলা করা হবে ইত্যাদি শোনা যাচ্ছে। মনে পড়ল, ছেলেবেলা থেকে দেখি গণশক্তির সম্পাদকীয় স্তম্ভের উপরে কোন মার্কসবাদী ক্লাসিক সন্দর্ভ থেকে কয়েক লাইন উদ্ধৃত থাকে। যখন স্কুলে পড়ি তখন একটা উদ্ধৃতি প্রায়ই দেখতাম। স্মৃতি থেকে যতটুকু উদ্ধার করতে পারছি তাতে কথাটা ছিল খানিকটা এরকম: কমিউনিস্টদের লক্ষ্য, অন্য সব সর্বহারা পার্টির মতই, শ্রমিক শ্রেণীর আশু দাবীগুলি আদায় করা। কিন্তু তার মধ্যেও তারা বৃহত্তর লড়াইয়ের কথা ভোলে না এবং আসন্ন বিপ্লবের জন্যে প্রস্তুতি নেয়।
আশা করি বাম নেতাদের স্মৃতিশক্তি আমার চেয়ে অনেক ভাল, তাঁরা আমার মত ক্লাসিকগুলো না পড়া লোক নন এবং ক্লাসিকগুলোর সময়োপযোগী ব্যাখ্যা করার শক্তিও তাঁদের অনেক বেশি।
কোন সিপিএম/বাম কর্মী বলতেই পারেন “তুমি কে হে, এত কথা বলছ? কোনদিন আমাদের কোন মিছিলে এক ঘা লাঠিও তো খাওনি। তোমার কী অধিকার এসব লেখার?” বললে তিনি ঠিকই বলবেন। তবে উত্তরে আমারও একটু বলার আছে।
আমি এই কথাগুলো লিখলাম সাত শতাংশের অধিকারে। অর্থাৎ আমি সেই সাত শতাংশের মধ্যে পড়ি যারা এখনো আপনাদের ভোট দেয়। অতএব আমার মতামতকে গুরুত্ব দিতে আপনারা বাধ্য। সংসদীয় গণতন্ত্রে কতিপয় লোকের এটুকু বাঁদরামি আপনাদের মেনে নিতেই হবে।