শিক্ষক দিবসের প্রশ্ন: শিক্ষকদের বাঁচাবে কে?

কাকিমার এখন লক্ষ্মীর ভান্ডার থেকে মাসে এক হাজার টাকা পাওয়ার কথা। কিন্তু ছেলের উপর যে আশা ছিল, সে আশা পূরণ হল না।

কালের গতি রোধ করা যমেরও অসাধ্য। তাই আজ পশ্চিমবঙ্গেও শিক্ষক দিবস। নইলে যেখানে শিক্ষিকারা বিষ খেতে বাধ্য হন, সেখানে শিক্ষক দিবস বলে কিছু থাকতে পারে না। অণিমা নাথ, ছবি দাস, শিখা দাস, পুতুল মন্ডল, জোশুয়া টুডু, মন্দিরা সর্দারদের বিষ খাওয়া আসলে একটা ষড়যন্ত্র, অশান্তি সৃষ্টি করাই আসল উদ্দেশ্য ছিল — এমন অভিযোগ অবশ্য উঠেছে। [১] ওঠাই স্বাভাবিক। কৃষকরা আত্মহত্যা করলে যেমন ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দল এবং তাদের অনুরাগীরা বলে থাকে “ক্ষতিপূরণের লোভে করেছে।” কবি এমনি এমনি লেখেননি, সকল দেশের সেরা সে যে আমার জন্মভূমি। এ দেশে না জন্মালে আত্মহত্যা যে মরণোত্তর কিছু পাওয়ার লোভে করা সম্ভব এ তথ্য আপনি জানতে পারতেন? তেমনি প্রাথমিক স্কুলের কয়েকজন নগণ্য শিক্ষিকা যে একটা বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ সরকারকে অস্থির করে দেওয়ার ষড়যন্ত্রে মানববোমার মত কাজ করতে পারেন — এ-ও অন্য কোথাও থাকলে জানা কঠিন হত। তাও আবার বিস্ফোরকবিহীন মানববোমা। মানে চারপাশে আর কেউ মরবে না, কারোর কোনো ক্ষতি হবে না। কেবল শিক্ষিকা নিজে মরবেন, আর তাতেই সরকার কেঁপে উঠবে। শিক্ষক-শিক্ষিকার প্রতি আমাদের এত শ্রদ্ধা অবশিষ্ট আছে?

নেই। থাকলে ২০১৫ সালের মাদ্রাসা শিক্ষকদের অনশন আন্দোলনের কথা, ২০১৯ সালের প্যারাটিচারদের অনশনের কথা এবং স্কুল সার্ভিস কমিশনের মাধ্যমে চাকরির প্রত্যাশায় থাকা হবু শিক্ষকদের অনশনের কথা মনে থাকত। কয়েকশো শিক্ষক বা হবু শিক্ষক ওই আন্দোলনগুলোতে অনশন করেছেন, খবরের কাগজের তিনের পাতায়, বা পাঁচের পাতায়, কি সাতের পাতায় খবর বেরিয়েছে। আমরা পাতা উল্টাতে গিয়ে হয়ত খেয়ালও করিনি। ছন্দা সাহার মৃত্যু (২০১৫) [২], রেবতী রাউতের মৃত্যু এবং তাপস বরের ব্রেন স্ট্রোক নিয়ে বিতর্ক (২০১৯) [৩] তৈরি হলে কখনো সখনো একটু হৈ চৈ হয়েছে। তারপর যে কে সেই। গত দশ বছরে এ রাজ্যে যে কোন আন্দোলনের প্রতি সরকারি উদাসীনতা এবং সামাজিক উদাসীনতার কারণে (শুধু সরকার কেন? আন্দোলনের ‘আ’ শুনলেই কারণ জানার বিন্দুমাত্র চেষ্টা না করে আমরাও কি অভিসম্পাত দিই না?) সব ধরনের আন্দোলনকারী ভেবে নিতে বাধ্য হয়েছেন, জীবনের ঝুঁকি না নিলে সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করা যাবে না। তাই কেবল শিক্ষক, হবু শিক্ষকরা নয়, ডাক্তাররাও এই পর্বে অনশনের রাস্তা বেছে নিয়েছেন। বিষ খাওয়ার চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে এক দিনে পৌঁছানো হয়নি।

এ রাজ্যে শিক্ষক-শিক্ষিকারা কেমন আছেন খোঁজ নিতে গেলে প্রথমেই বিরাট অর্থনৈতিক বিভেদ চোখে পড়ে। স্কুলশিক্ষার সঙ্গে যুক্ত স্থায়ী চাকরি করা শিক্ষক-শিক্ষিকাদের অবস্থা যথেষ্ট সচ্ছল, অভিযোগের অবকাশ বলতে মহার্ঘ ভাতা নিয়ে রাজ্য সরকারের নিয়ে টালবাহানা। কিন্তু সেই অভিযোগ সমস্ত রাজ্য সরকারি কর্মচারীরই রয়েছে, কেবল তাঁদের নয়। চুক্তির ভিত্তিতে কাজ করা প্যারাটিচারদের অবস্থা এর বিপরীত। তাঁরা মাস গেলে তেরো হাজার টাকার আশেপাশে মাইনে পান। প্রভিডেন্ট ফান্ড, প্রফেশনাল ট্যাক্স ইত্যাদি কেটে এগারো হাজার টাকার মত হাতে আসে, যোগ্যতা যা-ই হোক, অভিজ্ঞতা যত বছরেরই হোক। নিয়োগের শর্ত অনুযায়ী তাঁদের দায়িত্ব ছিল ক্লাসের পিছিয়ে পড়া ছাত্রছাত্রীদের যত্ন নেওয়া, স্কুলছুট ছাত্রছাত্রীদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে স্কুলে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করা। অথচ স্কুল সার্ভিস কমিশনের মাধ্যমে নিয়োগ যেহেতু বন্ধ, তাই স্কুলগুলোতে শূন্য পদের অভাব নেই, ফলত কাজের চাপ যথেষ্ট। অতএব স্কুল কর্তৃপক্ষ অনন্যোপায়। প্যারাটিচাররা পুরো সময়ের শিক্ষক-শিক্ষিকাদের সমান ক্লাস নিচ্ছেন, সমানে সমানে পরীক্ষার খাতাও দেখছেন। এমনকি, গোড়ায় কথা ছিল সপ্তাহে তিনদিন তাঁরা কাজ করবেন। তা অবস্থা বিশেষে ছদিনই হয়ে দাঁড়িয়েছে। অর্থাৎ কাজ বেশি, মাইনে কম — প্যারাটিচারদের জন্য এটাই নিয়ম।

কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রেও একইরকম বিভাজন তৈরি হয়েছে। পুরো সময়ের অধ্যাপনা শুরু করেই যেখানে হাজার পঞ্চাশেক টাকা মাইনে পাওয়া যাচ্ছে, বছরের পর বছর আংশিক সময়ের অধ্যাপক (যাঁদের এখন বলা হয় State Aided College Teacher — SACT) হয়ে থাকা নেট/স্লেট পাশ করা পিএইচডি অধ্যাপক, অধ্যাপিকারাও অভিজ্ঞতা অনুযায়ী পঁচিশ থেকে পঁয়ত্রিশ হাজার টাকায় আটকে আছেন। কলেজের মর্জি মাফিক কোথাও কোথাও আরও কম। কলেজ সার্ভিস কমিশনের নিয়োগও অনিয়মিত। ফলে কলেজ চালানোর ক্ষেত্রে কিন্তু বড় ভূমিকা পালন করেন SACT-রা। অথচ ওঁদের পদগুলো, পরিভাষায়, নোশনাল। মানে কোনো SACT কোনো কারণে বিদায় নিলে তাঁর জায়গায় নতুন লোক পাওয়া যাবে না।

পশ্চিমবঙ্গে শিল্প নেই বহু বছর, কর্মসংস্থানের অভাব বর্তমান সরকারের আমলেই তৈরি হয়েছে এমন বললে নিতান্ত অন্যায় হবে। কলেজ সার্ভিস কমিশনের নিয়োগ নিয়ে বামফ্রন্ট আমলেও বিস্তর ডামাডোল ছিল। কিন্তু দীর্ঘ অভাবের তালিকার পাশে যা ছিল, তা হল লেখাপড়া শিখতে পারলে এবং এসএসসি পরীক্ষায় পাশ করলে শিক্ষকতার চাকরির নিশ্চয়তা। বাম আমলেই একসময় স্কুলের চাকরির নিয়োগে স্থানীয় স্তরে দুর্নীতির প্রচুর অভিযোগ উঠত। টাকা নিয়েই হোক অথবা নেতার সাথে পরিচিতি বা আত্মীয়তার সুবাদে যোগ্য প্রার্থীর বদলে অযোগ্য শিক্ষক, শিক্ষিকা নিয়োগ করা হচ্ছে — এমনটা কান পাতলেই শোনা যেত। স্কুল সার্ভিস কমিশন চালু হওয়ার পর ছবিটা বদলে গিয়েছিল। কতটা বদলেছিল? আমার পাড়ায় চপ ভাজেন এক কাকিমা; কাকুর ছোট দোকান ছিল। তাঁদের বড় ছেলে এম এ পড়ছিল। বছর কয়েক আগে একবার চপ কিনতে গিয়েছি, কাকিমা বড় মুখ করে বললেন “এরপর এসএসসিটা পাস করলে মাস্টারি পাবে। আমাদের সংসারটা দাঁড়িয়ে যাবে।” সেই এসএসসি আর তার দেওয়া হয়নি, কারণ পরীক্ষাটাই হয়নি। কাকিমার এখন লক্ষ্মীর ভান্ডার থেকে মাসে এক হাজার টাকা পাওয়ার কথা। কিন্তু ছেলের উপর যে আশা ছিল, সে আশা পূরণ হল না। ছেলে এখন কাকিমাকে ব্যবসায় সাহায্য করে। এইভাবেই কি ভবিষ্যতের শিক্ষক, শিক্ষিকা পাব আমরা?

এমন মনে করার কারণ নেই, যে পুরো সময়ের শিক্ষক-শিক্ষিকারা খুব ভাল আছেন। মাস গেলে মাইনেটা পেলেই মাস্টাররা খুশি, আর কিছু নিয়ে তারা ভাবে না। এমনিতেই একগাদা ছুটি পায়, অতিমারির ফলে তো আরও মজা হয়েছে। শিক্ষক, শিক্ষিকাদের সম্বন্ধে এমন ভাবনা সাম্প্রতিককালে বেশ জনপ্রিয় হয়েছে। ফাঁকিবাজ পৃথিবীর সব পেশায়, সব কালে, সব দেশে থাকে। কিন্তু নিজের ধারণা নিয়ে বসে না থেকে শিক্ষক, শিক্ষিকাদের সাথে কথা বললে বোঝা যায় তাঁরা সুখে নেই।

মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিক বাতিল হয়ে যাওয়ার পর এক শিক্ষকের সাথে কথা হচ্ছিল। তিনি বললেন, পরীক্ষা বাতিল হয়ে যাওয়া খুবই দুঃখের। কিন্তু লেখাপড়াটা ঠিক করে হয়েছিল কি? অধিকাংশ স্কুলে শিক্ষক অপ্রতুল, এদিকে পড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে হাজারটা কাজ চেপেছে তাঁদের ঘাড়ে। সরকারের কল্যাণমূলক প্রকল্পের কাজকর্ম অনেকটাই তাঁদের করতে হয়। করতে গিয়ে পড়ানোর সময় কাটছাঁট হয়। আরও বললেন, পশ্চিমবঙ্গে গত দশ বছরে যে হারে জনসংখ্যা বেড়েছে, সে হারে মাধ্যমিক পরীক্ষার্থী বাড়েনি। কাগজে, টিভিতে ছাত্রীর সংখ্যা বাড়া নিয়ে উল্লাস হয়, কিন্তু ছাত্রের সংখ্যা যে কমে যাচ্ছে সে কথা কেউ বলে না। এই ছাত্ররা যাচ্ছে কোথায়? তাঁর মতে লেখাপড়া ছেড়ে দিয়ে জীবিকার সন্ধানে চলে যাচ্ছে। তাঁর আশঙ্কা, এই প্রবণতা অতিমারীর প্রকোপে আরও বেড়ে গেল। একেই দারিদ্র্য বেড়ে যাওয়া এবং বছর দুয়েক স্কুল বন্ধ থাকার কারণে অনেক ছাত্রীর বিয়ে হয়ে যাচ্ছে বলে বিভিন্ন সমীক্ষায় উঠে আসছে। ওই শিক্ষকের আশঙ্কা, এরপর যখন স্কুল খুলবে তখন দেখা যাবে স্কুলছুট ছাত্রের সংখ্যাও পাল্লা দিয়ে বেড়ে গেছে।

উনি যা বলেননি, তা হল সরকারি বাংলা মাধ্যম স্কুলে ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা গত দশ-পনেরো বছর ধরেই কমছে। গ্রামাঞ্চলের কথা জানি না, শহর ও শহরতলি এলাকায় তার একটা বড় কারণ বেসরকারি ইংরেজি মাধ্যম স্কুলের প্রতি মধ্যবিত্ত, উচ্চবিত্ত বাবা-মায়েদের পক্ষপাত। এর প্রভাবে কোথাও কোথাও ছাত্রসংখ্যা এমনভাবে কমছে, যে স্বয়ং বিদ্যাসাগর প্রতিষ্ঠিত স্কুলও উঠে যেতে বসেছিল বছর দুয়েক আগে। ইংরেজি মাধ্যম করে দিয়ে বাঁচানো হয়েছে। [৪] বাংলা মাধ্যম অনেক স্কুলকেই ইংরেজি মাধ্যম করে বাঁচানোর চেষ্টা রাজ্য সরকার করছেন। বাঁচছে কিনা বুঝতে আরও কয়েক বছর লাগবে, কিন্তু ওই রুগ্ন স্কুলগুলোর মাস্টারমশাই, দিদিমণিদের নিশ্চিন্ত থাকার দিন গিয়েছে। কারণ ১৯৯১-এর পর থেকে শিক্ষার বেসরকারিকরণের সঙ্গে সঙ্গেই এ কথা প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে যে শিক্ষা (স্বাস্থ্যের মতই) আরও একটা ব্যবসা। আর রুগ্ন ব্যবসা যে রাখতে নেই তা কেন্দ্র বা রাজ্য, কোনো সরকারই অস্বীকার করে না। ফলে আজকের পাকা চাকরি মানেই আর কালকের পাকা চাকরি নয়।

মুশকিল হল, পঞ্চাশ হাজার, ষাট হাজার, এমনকি এক-দেড় লাখ টাকা খরচ করে যেসব ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে বাবা-মায়েরা ছেলেমেয়েদের ভর্তি করছেন, সেখানকার শিক্ষক-শিক্ষিকারা অনেকেই ভদ্রজনোচিত মাইনে পান না। স্কুল মালিক কোটিপতি হচ্ছেন, অথচ মাস্টাররা যে তিমিরে সেই তিমিরেই। ব্যাঙের ছাতার মত গজিয়ে ওঠা বেসরকারি কলেজগুলোতে যাঁরা পড়ান, তাঁদের অবস্থাও তথৈবচ। সরকারি সাহায্যপ্রাপ্ত কলেজের আংশিক সময়ের শিক্ষকদের কথা উপরে বলেছি। একই যোগ্যতার অনেকে মাসে পনেরো-কুড়ি হাজার টাকা বেতনে বেসরকারি কলেজগুলোতে পড়িয়ে থাকেন। কেউ কেউ আবার ক্লাস পিছু টাকা পান। কত পাবেন, কেমনভাবে পাবেন তা অনেক ক্ষেত্রেই কলেজ কর্তৃপক্ষের মেজাজ মর্জির উপর নির্ভর করে। বেসরকারি স্কুল এবং হাসপাতালের খরচ আকাশছোঁয়া হয়ে যাওয়ার সমস্যা নিয়ে মাঝেমধ্যেই সংবাদমাধ্যমে হইচই হয়। মুখ্যমন্ত্রী বরাভয় নিয়ে আবির্ভূত হন, কাউকে ধমকে, কাউকে বাবা বাছা করে বুঝিয়ে অভিভাবকদের উপর চাপ কমাতে বলেন। কিন্তু মাস্টারদের মাইনে কোনো আলোচনার বিষয় হয় না। অবশ্য সরকারের বেতনভুক যে মাস্টাররা, তাঁদের আর্থিক দাবিদাওয়াই যখন কুকুরের ঘেউ ঘেউয়ের সঙ্গে তুলনীয় হয়ে দাঁড়ায়, তখন বেসরকারি স্কুল, কলেজের শিক্ষকরা কার কাছে কী আশা করবেন?

২০১৮ সালে জগদ্বিখ্যাত টাইম পত্রিকা আমেরিকার পাবলিক স্কুলগুলোর মাস্টারদের পারিশ্রমিক নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল। ওঁদের অবস্থা এত সঙ্গীন, যে একজন বলেছেন তিনি দিন গুজরান করার জন্য একসাথে তিনটে কাজ করেন, উপরন্তু ব্লাড প্লাজমা দান করেন।[৫] পৃথিবীর সবচেয়ে খারাপ দৃষ্টান্তটা দেখিয়ে নিজেদের তার চেয়ে উন্নত প্রমাণ করায় আমরা ভারতীয়রা ওস্তাদ। অতএব সে প্রতিবেদন তুলে ধরে পশ্চিমবঙ্গের শিক্ষক-শিক্ষিকাদের ভাগ্যনিয়ন্তারা বলতেই পারেন, “আমরা অনেক ভাল রেখেছি।” সত্যিই তো। মাস্টারদের নিয়ে সরকারের তো বিশেষ মাথা ঘামানোর দরকার নেই। কী পড়ানো হবে, কেন পড়ানো হবে — সেসব কর্পোরেট জগত ইতিমধ্যেই ঠিক করতে শুরু করেছে, আগামী দিনে আরও করবে। যে শিক্ষা কর্পোরেটের কাজে লাগে না, তা যে শিক্ষাই নয় — সে ব্যাপারে ঐকমত্য শিগগির তৈরি হয়ে যাবে। কদিন পর আপনি নিজেই বলবেন, আপনার সন্তানের ছবি আঁকা, খেলাধুলো করা, গান গাওয়া, সাহিত্য পড়া বা ভাল করে অঙ্ক শেখাও তত জরুরি নয়, যত জরুরি কোডিং শেখা। আর সেটা করতে কড়া বা স্নেহময় মাস্টারমশাই, দিদিমণি লাগে না। লাগে একটা অ্যাপ। যাদের অ্যাপ নেই তারা শিখবে না। মিটে গেল।

শিক্ষক দিবসে দাঁড়িয়ে ভয় হচ্ছে, শেরনি ছবিতে যেমন ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে মানুষের কুকর্মের ফলে একসময় বাঘ দেখতে মিউজিয়ামে যেতে হবে, শিক্ষক-শিক্ষিকাদেরও না সেই অবস্থা হয়।

তথ্যসূত্র:

১) হিন্দুস্তান টাইমস
২) ওল্ড ইন্ডিয়া টুমোরো
৩) সংবাদ প্রতিদিন
৪) আনন্দবাজার পত্রিকা
৫) টাইম ডট কম

https://nagorik.net এ প্রকাশিত

মেধামেধ যজ্ঞ

মানুষের পেট যেহেতু ভিসুভিয়াস নয়, সেহেতু পঁচিশ দিন কেটে যাওয়ায় জঠরাগ্নিও বোধহয় নিভে গেছে

আজ কলকাতায় মহোৎসব ছিল। এ বছরের আই পি এল এর প্রথম খেলা। রাজভবনের উল্টোদিকে বাস থেকে নেমে যখন বাঁয়ে ঘুরে হাঁটছি, তখন উলটোদিক থেকে জনস্রোত ধেয়ে আসছে। নানারকম মুখ। রংচঙে, ঝকঝকে, হাত ধরাধরি করে প্রেমিক প্রেমিকা, বাবার হাত ধরে ছেলে, নাইট রাইডার্সের জার্সি পরিহিত বন্ধুদল। সকলেরই মুখ দেখে বোঝা যায় ফুরফুরে মেজাজ, ভর্তি পেট। কারো কারো হাতে ঠান্ডা পানীয়ের বোতল। এঁদের সকলের কাছে মহোৎসবের আহ্বান এসেছে। কিছু কাঞ্চনমূল্যের বিনিময়ে। স্বর্গের বাগানের টিকিট কেটেছেন এঁরা কড়কড়ে নোট খরচ করে। কেনই বা মেজাজ ফুরফুরে থাকবে না?

এঁদের পেরিয়ে ধর্মতলার বাস ডিপোর মধ্যে দিয়ে হাঁটছি, নাকে আসছে ফুটপাথে রাঁধা বিরিয়ানি, ডিমের কারি, মাছের ঝোল, শস্তার চাউমিন, মোগলাই পরোটা, এগ রোল, পেয়ারা, শসার গন্ধ। ধর্মতলার এই আনন্দযজ্ঞে দিনমজুর থেকে শুরু করে আমার মত এ সি ট্যাক্সি চাপতে সক্ষম মানুষ পর্যন্ত সবার নিমন্ত্রণ।

আর এইসব রূপ রস গন্ধের অনতিদূরেই বসে আছেন, বা মাথা ঘুরছে, গা বমি ভাব আসছে বলে শুয়ে আছেন — আমার মেয়ের হবু মাস্টারমশাই, দিদিমণিরা। একদিন দুদিন নয়, পঁচিশ দিন ধরে কিছু না খেয়ে। এমনও হতে পারে যে আগামী দিনে হয়ত এটাই নিয়ম হয়ে যাবে। এক বৃদ্ধকে দেখলাম একটি অসুস্থ মেয়ের পাশে বসে আছেন। সম্ভবত মেয়েটির বাবা। বলা যায় না, হয়ত আমার মেয়েকেও এরকম অনশনে বসতে হবে লেখাপড়া শিখে আর আমি তখন ঐ বৃদ্ধের জায়গায় গিয়ে বসব।

এই লড়াকু ছেলেমেয়েগুলোর প্রতি আমার অক্ষম, নীরব সমর্থন জানাতে কয়েক মিনিটের জন্যে গিয়ে দাঁড়িয়েছিলাম পথপার্শ্বে, যেখানে এরা ত্রিপলের নীচে রাস্তায় বসে দিনের পর দিন, রাতের পর রাত কাটাচ্ছে। বিশ্বাস করুন, জায়গাটায় কোন গ্ল্যামার নেই, কোন বিপ্লব বিপ্লব গন্ধ নেই। কয়েকশো পরীক্ষায় পাশ তরুণ তরুণীর দীর্ঘশ্বাস ছাড়া বিশেষ কোন শব্দও নেই। সোশাল মিডিয়ায় অনেকেই ঠারেঠোরে যা বলতে চাইছেন বা সরকারপক্ষ হয়ত যে আশঙ্কায় এই আন্দোলনকে অগ্রাহ্য করছেন, তেমন কোন রাজনৈতিক আগুনও জায়গাটায় জ্বলছে না। মানুষের পেট যেহেতু ভিসুভিয়াস নয়, সেহেতু পঁচিশ দিন কেটে যাওয়ায় জঠরাগ্নিও বোধহয় নিভে গেছে।

আমার বাবা শিক্ষক ছিলেন, মামারা, জ্যাঠারাও এই পেশায় ছিলেন, স্ত্রীও শিক্ষিকা। নিজের পায়ে দাঁড়াতে পেরেছি যাঁদের জন্যে, তাঁদের মধ্যে বেশিরভাগই শিক্ষক। শুনেছি একসময় শিক্ষকদের সংসার চালানো দুর্বিষহ ছিল, লোকে মেয়ের বিয়ে দিতে চাইত না শিক্ষক পাত্রের সাথে। কিন্তু তখনো শিক্ষকদের এমন অসম্মান করেনি বোধহয় কোন সরকার। বিধানচন্দ্রের সরকার আন্দোলনরত শিক্ষকদের উপর গুলি চালিয়েছিল, সেকথা বাদ দিলে।

বেশ মনে আছে, বামফ্রন্ট আমলে একসময় স্কুলে শিক্ষক নিয়োগে দুর্নীতির অভিযোগ উঠত প্রায়ই। ম্যানেজিং কমিটির ভূমিকা নিয়ে প্রার্থীদের অসন্তোষ থাকত। যোগ্য প্রার্থী ভাল ইন্টারভিউ দিয়ে বেরিয়েও চাকরি পেতেন না। আমারই এক পরিচিত বহুদূর থেকে এক জায়গায় ইন্টারভিউ দিতে গিয়ে স্টেশন থেকে স্কুলে যাওয়ার রিকশায় উঠেই চালকের মুখ থেকে শুনেছিলেন “আপনার চাকরি হবে না। সেক্রেটারির লোক আছে। তাকেই নেবে।”
সম্ভবত কতকটা সেই কারণেই কলেজের জন্যে যেমন নেট বা স্লেট পরীক্ষা, সেই আদলে এস এস সি পরীক্ষা চালু করা হয়েছিল। তার সুফল আমাদের প্রজন্মের বহু শিক্ষিত ছেলেমেয়ে পেয়েছেন। আমাদের বাবা-মায়েরা জানতেন, পশ্চিমবঙ্গে আর কোন চাকরি না হোক, এস এস সি টা পাশ করতে পারলে স্কুলের চাকরি হবেই। কিন্তু তা বললে তো চলবে না। আগের সরকারের কোন ভাল কাজকেও যে পরের সরকার রেয়াত করবে, এমন দাবী এ দেশে আর করা চলে না। পরিবর্তন আর উন্নয়নের জোয়ারে পুরাতন যাক ভেসে যাক। অতএব যে পরীক্ষা প্রতি বছর হওয়ার কথা, সে পরীক্ষা প্রায় প্রতি বিশ্বকাপে হচ্ছে। সে পরীক্ষার ফলাফলে আবার এত বেশি মেধাবী ছেলেমেয়ের নাম উঠে আসছে যে মেধা তালিকা প্রকাশ করাই যাচ্ছে না। তবু এই শ দুয়েক ছেলেমেয়ে চৈত্রের গরমে রাস্তায় বসে আছে সরকারের শুভবুদ্ধি উদয়ের আশায়। অহো, কি দুঃসহ স্পর্ধা!

কয়েকদিন আগেই ‘শিন্ডলার্স লিস্ট’ ছবিটা দেখছিলাম। নাজি অধিকৃত পোল্যান্ডের ক্রাকাউতে বন্দী শিবিরে দরকারী আর অদরকারী লোকেদের তালিকা বানানো হচ্ছে। একজন করে বন্দী এসে দাঁড়াচ্ছে আর নাজি কেরানি তার পেশা জিজ্ঞেস করছে। দরকারী বুঝলে পরিচয়পত্রে একরকম ছাপ, অদরকারী বুঝলে অন্যরকম। একজন বললেন “আমি ইতিহাস আর সাহিত্য পড়াই।” পত্রপাঠ অপ্রয়োজনীয় হওয়ার ছাপ পড়ে গেল। অসহায় শিক্ষক বিস্ফারিত নেত্রে বললেন “I teach history and literature. Since when it’s not essential?”

দেখে শিউরে উঠলাম। সাহিত্য, ইতিহাস — এসব পড়া যে দরকারী নয় তা তো আমরা ছোট থেকে শুনে আসছি। আর এই শেষ যৌবনে এসে দেখতে পাচ্ছি ওগুলো যাঁরা পড়ান তাঁরাও অদরকারী বলে চিহ্নিত হয়ে যাচ্ছেন। এই তো সেদিন এক প্রথিতযশা সাংবাদিক (অধুনা বিচারাধীন বন্দী হিসাবে শ্রীঘরে থাকায় যশে কিঞ্চিৎ টান পড়েছে অবশ্য) সদর্পে ফেসবুকে লিখে দিলেন তুলনামূলক সাহিত্যের মত ফালতু বিষয় তুলে দেওয়া উচিৎ। এসব পড়ে কোন লাভ নেই। লিখলেন শুধু নয়, কয়েকশো লাইকও পেলেন। আর এস এস সি পাশ করা ছেলেমেয়েদের আন্দোলন শুরু হতেই সোশাল মিডিয়ায় অদ্ভুতুড়ে তত্ত্ব জন্মাচ্ছে — যারা বিজ্ঞান পড়ে তারা নাকি বেশিরভাগই ইঞ্জিনিয়ার হয়ে রাজ্যের বাইরে চলে যায়। পড়ে থাকে মেধাহীন বাংলা, ইংরিজি, ইতিহাসের ছেলেমেয়েরা। তাদের এস এস সি ছাড়া গতি নেই, তাই তারাই নাকি যোগ্যতা না থাকলেও চাকরি দাবী করে রাস্তা জুড়ে বসে আছে।

যারা এসব বলছে তারা বোধহয় জানে না গোটা দেশে কত হাজার ইঞ্জিনিয়ার বেকার, কত ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে আসন পূরণ হচ্ছে না কারণ লোকে বুঝে গেছে ওখানেও চাকরি নেই। নির্ঘাত তারা এও জানে না যে ঐ “not essential” এর তালিকায় বিজ্ঞানের শিক্ষক, গবেষকরাও ঢুকে পড়েছেন।

গত মাসের ঘটনা। দেশের গুরুত্বপূর্ণ সরকারপোষিত বিজ্ঞান গবেষণা সংস্থা টাটা ইনস্টিটিউট অফ ফান্ডামেন্টাল রিসার্চ গবেষকদের বিজ্ঞপ্তি দিয়ে বলেছে, শোন বাপু, এখন টাকাকড়ি নেই। অর্ধেক মাইনে দিচ্ছি, তাই নিয়ে চুপচাপ থাকো। পরে দেবখন বাকিটা। এদিকে খবরের কাগজ খুলে দেখুন। সরকারী বিজ্ঞাপনের কমতি নেই। যত অভাব মাস্টারমশাই, দিদিমণি, গবেষকদের মাইনে দেওয়ার বেলায়। এ রাজ্যেও যেমন শিক্ষকদের ডি এ, ইনক্রিমেন্ট দেওয়ার বেলায় শোনা যায় কোষাগার ফাঁকা। অথচ কার্নিভালের টাকা কম পড়ে না, থানা থেকে ডেকে ডেকে দুর্গাপুজোর টাকা দেওয়ার সময়েও টানাটানি হয় না।

আসলে ঐ যে “not essential”, ঐটেই হচ্ছে আসল কথা। যারা শেখায় তাদের যত অপ্রাসঙ্গিক করে দেওয়া যাবে তত মানুষের শেখার আগ্রহ কমে যাবে, মগজ ধোলাই না করলেও সবাই বুঝে যাবে “বিদ্যা লাভে লোকসান, নাই অর্থ নাই মান।” তবে না হীরকের রাজা ভগবান হবে?

আর ভগবান হতে সাহায্য করি আমরা, যারা ফেসবুক ভরে আছি। আমরা ভাবছি এসব ধরনা, অনশন তো করছে বাংলা মাধ্যমের ছাত্রছাত্রীরা, যারা বাংলা মাধ্যমের স্কুলে চাকরি করতে চায়। এতে আমাদের কী? আমার ছেলেমেয়েকে তো ইংরিজি মাধ্যম স্কুলে পড়াব, সে বড় হয়ে চাকরি করলে ওরকম স্কুলেই করবে। তো আমার ভারী বয়ে গেছে। কিন্তু এত নিশ্চিন্ত না থেকে একটু খোঁজ নিয়ে দেখুন দেখি, আপনি কয়েক লাখ টাকা খরচ করে যে স্কুলে সন্তানকে ভর্তি করেছেন সেই স্কুলের শিক্ষক শিক্ষিকারা কত টাকা মাইনে পান? এ ছুতো সে ছুতোয় যে বিপুল পরিমাণ টাকা স্কুল কর্তৃপক্ষ আপনার থেকে নিচ্ছেন প্রতিনিয়ত, তার কত শতাংশ শিক্ষক, অশিক্ষক কর্মীদের বেতনে খরচ হচ্ছে? চিত্রটা কিন্তু ভাল নয়।

আসলে শিক্ষা এখন ব্যবসায় পরিণত। কিসের ব্যবসা? কাঁচামাল সরবরাহের ব্যবসা। কাদের কাঁচামাল। কর্পোরেটের। আপনার ছেলেমেয়ে অঙ্ক করে মজা পাচ্ছে কিনা, তার মধ্যে ভবিষ্যতের গণিতবিদ তৈরি হচ্ছে কিনা তা দেখার দায়িত্ব স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় কেউ নিচ্ছে না। কারো সন্তান স্টিফেন হকিংয়ের মত মহাবিশ্বের রহস্য উদঘাটনে জীবন ব্যয় করুক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান তা চাইছে না। কারণ ওরকম ছাত্রছাত্রীকে মানবসম্পদ হিসাবে কোন কোম্পানি কিনবে না। আর যে শিক্ষা লাভের কড়ি উৎপাদনে কাজে লাগে না, তা “not essential.” একই কারণে সাহিত্য তথা তুলনামূলক সাহিত্যও ফালতু। কোন শিক্ষক বা শিক্ষিকার প্রণোদনায় (অনুপ্রেরণায় নয় কিছুতেই) যদি এক ঘর ছাত্রছাত্রী শিহরিত হয়ে আবিষ্কার করে জীবনানন্দের কোন পংক্তি আজকের প্যালেস্তাইনের কোন কবির প্রায় অনুবাদ বলে মনে হচ্ছে, তাতে আম্বানি বা জ্যাক মায়ের কী লাভ? উল্টে বিপদ। কারণ “এরা যত বেশি শেখে, তত বেশি জানে, তত কম মানে।”

অতএব, এক দিকে ব্যাঙের ছাতার মত প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় গজিয়ে ওঠে, যেখানকার দেয় বেতন মহার্ঘ। অন্যদিকে জহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের বেতন সাধারণ পড়ুয়ার নাগালের বাইরে নিয়ে যাওয়া হয়। আর এ রাজ্যে কম বেশি যা-ই নম্বর পাও, কলেজে ভর্তি হতে হাজার হাজার টাকা উৎকোচ দিতে হয়। যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও চাকরি না পেয়ে খোলা আকাশের নীচে শুয়ে থাকতে হয়, অথচ শিক্ষকের অভাবে স্কুল চলে না, ছাত্রসংখ্যা কমে যায়, স্কুল উঠে যায়।
দেখে শুনে আমি আপনি কী করব? বাবা-মা হিসাবে যেটুকু করতে পারি। অর্থাৎ সামর্থ্য আছে বলে বেসরকারী স্কুলে সরিয়ে নেব, বহুজাতিকের জন্যে মানবসম্পদ তৈরি করব। আর যে বাবা-মায়ের সামর্থ্য নেই, তাঁদের ছেলেমেয়ের আর লেখাপড়া শেখা হবে না, সে মানবসম্পদ হয়ে উঠতে পারবে না। আমরা “essential”, ওরা “not essential”। বিশ্বাস করুন, এখানে মেধার উপস্থিতি বা অনুপস্থিতির কোন ভূমিকা নেই।

লেখাপড়া করে যে-ই

ইসলামপুর নিয়ে পক্ষ নিতেই হবে কারণ ইসলামপুর প্রথম ঘটনা নয়, বিচ্ছিন্ন ঘটনাও নয়

মোদ্দাকথা পড়াশোনা হোক সেটা সরকার চায় না। কেন্দ্রীয় সরকারও চায় না, রাজ্য সরকারও চায় না।
যাঁরা ছাত্রদের রাজনীতি করার অধিকারের বিরুদ্ধে তাঁদের মধ্যে দুরকম মত আছে। এক দল মনে করেন ছাত্রদের শুধু বইয়ে মুখ গুঁজে থাকা উচিৎ, আর কিছু করা তাদের স্বাস্থ্যের পক্ষে ক্ষতিকারক। আরেক দল মানুষের মতে রাজনীতি করতে পারে, কিন্তু সে রাজনীতির দাবীদাওয়া হওয়া উচিৎ একান্ত ছাত্রদের। ক্যাম্পাসের বাইরের কোন ঘটনার অভিঘাত সেখানে থাকা চলবে না। এই মতগুলোর ভাল মন্দের মধ্যে যাচ্ছি না। কিন্তু দুরকম মতের লোকেরাই নিশ্চয়ই স্বীকার করবেন যে এ রাজ্যের এবং এ দেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে কত কয়েক বছর ধরে যা চলছে তা সরাসরি ছাত্রছাত্রীদের লেখাপড়ায় প্রভাব ফ্যালে। সুতরাং সেগুলোকে ভুলে বই মুখে গুঁজে বসে থেকে তাদের বিশেষ লাভ নেই। কারণ পড়ার পরিবেশ এবং উদ্দেশ্যই নষ্ট করে দেওয়া হচ্ছে।
স্কুলে বাংলার শিক্ষক নেই। সে জায়গা পূরণ করা দীর্ঘদিনের দাবী। অথচ এসে হাজির হলেন উর্দু আর সংস্কৃতের শিক্ষকরা। ছাত্রদের মধ্যে অসন্তোষ, হতেই পারে কিছু বাইরের লোকও তাদের অসন্তোষে ঘৃতাহুতি করেছে। একটা এলাকার স্কুল কলেজের সাথে সেই এলাকার সমস্ত মানুষেরই স্বার্থ জড়িত আছে, বিশেষত সরকারপোষিত স্কুলগুলোর সাথে। উচ্চবিত্ত, মধ্যবিত্তরা এখন ছেলেমেয়েকে অমুক ইন্টারন্যাশনাল, তমুক পাবলিক স্কুলে পাঠাতে পারেন। গরীব, নিম্নবিত্ত ছেলেমেয়েদের জন্যে এখনো যে সরকারী স্কুলই ভরসা। ফলে বহিরাগত আপনি বলবেন কাকে? তাছাড়া কোন রাজনীতিবিদ এসে দিদিমণিকে জগ ছুঁড়ে মারলে যখন বহিরাগতর প্রশ্ন ওঠে না, তখন এ বেলাতেই বা সে প্রশ্ন কেন উঠবে?
ইসলামপুর নিয়ে পক্ষ নিতেই হবে কারণ ইসলামপুর প্রথম ঘটনা নয়, বিচ্ছিন্ন ঘটনাও নয়। দীর্ঘ তিন চার দশক ধরে পশ্চিমবঙ্গে যে চাকরিটা যোগ্যতা থাকলেই পাওয়া যায় বলে লোকে জানত সেটা হল স্কুল শিক্ষকের চাকরি। সেখানেও দুর্নীতি, স্বজনপোষণ ঢুকে পড়ায় বামফ্রন্ট সরকারের আমলে নেট বা স্লেট পরীক্ষার আদলে স্কুল সার্ভিস পরীক্ষা চালু হয়। বর্তমান সরকার আসার পরে সেই পরীক্ষা নিয়মিত হয় না, হলেও কে পাশ করল আর কে চাকরি পেল তা ভগবান আর সরকার ছাড়া কাক পক্ষীতেও টের পায় না। বেসরকারী ক্ষেত্রে কাজ করা লোকেরা বিশ্বায়নের যুগে কর্মক্ষেত্রে আন্দোলন করার অধিকার হারিয়েছে, সরকারী কর্মচারীদের সে অধিকার বজায় আছে বলে জানা ছিল। কিন্তু শিক্ষকদের অধিকারের এমনই চেহারা যে এক সহকর্মীর ভোট করাতে গিয়ে রহস্যমৃত্যুর তদন্ত চাইলেও হাজতবাস করতে হয়, মার খেতে হয়। স্কুল চত্বরেও বিভিন্ন শ্রী সামলাতে সামলাতে লেখাপড়ার বিশ্রী অবস্থা মেনে নিতে হচ্ছে মাস্টারমশাই-দিদিমণিদের।
এদিকে কলেজগুলো চলছে একগাদা আংশিক সময়ের অধ্যাপকদের দিয়ে। তরুণ মেধাবীরা প্রায় ঠিকে ঝিতে পর্যবসিত। তারা এবং প্রবীণরা সর্বদাই আতঙ্কে আছেন, কখন ছাত্র সংসদ বা অন্য কারো কোপদৃষ্টি পড়ে। মারধোর না খেয়ে সসম্মানে বাড়ি ফিরতেই পারলেই যথেষ্ট, পড়ানোয় আর মন দেবেন কখন?
উল্টোদিকে কলেজ ভর্তি হতে গেলে কয়েক হাজার বা লক্ষ টাকা তোলা দিতে হবে ছাত্র সংসদকে। অথচ ছাত্র সংসদ ভেঙে দেওয়া হয়েছে বহু কলেজে। আন্দোলনের দাবী ন্যায্য, অন্যায্য যা-ই হোক, যাদবপুর থেকে বিধানচন্দ্র কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত সর্বত্র সরকার এবং প্রধানদের সমাধান হল “পুলিশ ডাকো আর ঠ্যাঙাও।” এও মোটামুটি স্বতঃসিদ্ধ যে ছাত্রদের কোন দাবী থাকতে নেই। অতএব হোস্টেলে থাকার জায়গা আদায় করতে হলেও তাদের হয় মেডিকাল কলেজের মত অনশন করতে হবে, নয় প্রেসিডেন্সির মত কলেজের গেটে তালা ঝুলিয়ে বলতে হবে “হোস্টেল দাও তবে তালা খুলব।” সুবিধামত সরকার কোথাও বলবে “এটা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের আভ্যন্তরীণ ব্যাপার” আর কোথাও “সরকারের টাকায় চলবে, সরকারের কথা শুনবে না?” ওদিকে মালদার স্বীকৃতিবিহীন কলেজটার ছাত্রছাত্রীদের আন্দোলন এখনো চলছে, কলকাতার বুকে। ওদের জন্যে কেউ কোন সমাধান খুঁজছেন কিনা কে জানে?
আপনি যদি শিক্ষিত যুবক/যুবতী বা তাদের বাবা-মা হন, আপনি ভাবতেই পারেন “এ রাজ্যটা একেবারে গেছে। ওকে বাইরে পাঠিয়ে দেব।” কিন্তু তাতেও নিস্তার নেই। সমস্ত সরকারী বা বেসরকারী সমীক্ষায় দেশের যে বিশ্ববিদ্যালয় সবসময় প্রথম সারিতে (যদি প্রথম না হয়) থাকে, সেই জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ে সরকারী পার্টির ছাত্র সংগঠন মারদাঙ্গা করেও সংসদ দখল করতে পারেনি। সেই রাগে দেশের প্রতিরক্ষা মন্ত্রী বলে দিয়েছেন ঐ বিশ্ববিদ্যালয়ে “ভারতবিরোধী শক্তি” কাজ করছে। অর্থাৎ দেশের অন্যতম সেরা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছাত্রছাত্রী, গবেষকদের ভারত সরকার শত্রু হিসাবে দেগে দিল। তার কয়েকদিন আগেই দিল্লীর জাকির হুসেন কলেজেও সংসদ নির্বাচনের দিন তাণ্ডব চলেছে।
গত পাঁচ বছরে ভারত সরকারের নিশানায় জেএনইউ ছাড়াও এসেছে হায়দরাবাদ বিশ্ববিদ্যালয়, আলিগড় প্রভৃতি। ক্যান্টিনে এটা কেন, ওটা কেন নয়? অমুক জায়গায় তমুকের ছবি ঝুলছে কেন? আবোল তাবোল ছুতোয় পড়াশোনা নষ্ট করে দেওয়ার প্রবল প্রচেষ্টা চলছে, চলবে।
কোথায় কেমন লেখাপড়া হচ্ছে তা নিয়ে সরকার বিন্দুমাত্র চিন্তিত নয়। তারা বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে ঢাউস জাতীয় পতাকা টাঙাতে ব্যস্ত, সাঁজোয়া গাড়ি রাখতে চায়। অবশ্য শুধু চায় বললে এই সরকারের সক্রিয়তাকে নেহাতই অসম্মান করা হয়। খোদ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (UGC) সব বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যদের চিঠি দিয়ে জানিয়েছেন ২৯শে সেপ্টেম্বর তারিখটা সার্জিকাল স্ট্রাইক দিবস হিসাবে পালন করতে হবে। সেদিন এন সি সি প্যারেড করতে হবে, ছাত্রছাত্রীদের দিয়ে সেনাবাহিনীর প্রশংসাসূচক ডিজিটাল বা সত্যিকারের কার্ড বানাতে হবে, দিল্লীতে এবং সব রাজ্যের রাজধানীতে এই উপলক্ষে যে প্রদর্শনীর ব্যবস্থা হচ্ছে ছাত্রছাত্রীদের সেখানে যেতে উৎসাহ দিতে হবে ইত্যাদি। অর্থাৎ বিশ্ববিদ্যালয় ততটা পড়াশোনার জায়গা নয় যতটা দেশপ্রেমের প্রদর্শনীর জায়গা।
অবশ্য এর জন্যে মঞ্জুরি কমিশনের উপর রাগ না করাই ভাল। সে বেচারা নিজেই তো আর দুদিন পর থাকবে না। পরিকল্পনা কমিশন গিয়ে নীতি আয়োগ এসেছে, যার প্রয়োগ সম্বন্ধে রচনা লিখতে দিলে চেয়ারম্যান নিজেও মাথা চুলকোবেন। আগামী দিনে মঞ্জুরি কমিশন গিয়ে কোন এক জো হুজুরি কমিশন আসবে নিশ্চয়ই। অবশ্য ওসবের দরকারই বা কী? এখনো তৈরি না হওয়া বিশ্ববিদ্যালয়কে যখন সরকার স্বয়ং সেন্টার অফ এক্সেলেন্স তকমা দিয়ে দিচ্ছেন তখন আর ন্যাক, ইউজিসি এসব রেখে আয়করদাতার পয়সা নষ্ট করা কেন?
এসবেও অবশ্য অনেকেরই আপত্তি নেই। ভারতীয় বিজ্ঞান কংগ্রেসে পুষ্পক বিমানের মডেল নিয়ে তো আলোচনা হয়েই গেছে। ফলে বোঝাই যাচ্ছে আধুনিক বিদ্যাগুলো সব ফালতু। ওগুলো শেখার কোন দরকারই নেই। অতএব উঠে যাক না স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়গুলো। তবে খারাপ লাগে আমার সেইসব বোকা বন্ধুদের জন্যে, যারা গত এক দশক উন্নত দেশগুলোর বিভিন্ন গবেষণাগারে কাজ করে, এ দেশের চেয়ে অনেক উন্নত জীবনযাত্রায় থেকেও ভুলতে পারেনি যে তার লেখাপড়ার খরচ অনেকদিন পর্যন্ত ভাগ করে নিয়েছে এ দেশের রিকশাওয়ালা, পানওয়ালা, লোকের বাড়িতে বাসন মাজে যারা তারা। সেই বোকাগুলো দেশে ফিরে এসে দেশকে কিছু ফিরিয়ে দিতে চাইছে আর কিছুতেই বুঝে উঠতে পারছে না তাদের যোগ্যতা কেন দেশে ফিরে আসার জন্যে যথেষ্ট হচ্ছে না। ভাবি তাদের মনে করিয়ে দেব “লেখাপড়া করে যে-ই/অনাহারে মরে সে-ই।/জানার কোন শেষ নাই/জানার চেষ্টা বৃথা তাই।/বিদ্যালাভে লোকসান/নাই অর্থ নাই মান”।
সরকার কেন খাল কেটে উদয়ন পণ্ডিত আনতে যাবে?