Politics or culture, films or books. Everything fascinates me
Author: Pratik
সাংবাদিক, লেখক। কাজ করেছেন দ্য টাইমস অফ ইন্ডিয়া, ডেকান ক্রনিকল, দ্য টেলিগ্রাফ, দ্য স্টেটসম্যান এবং অধুনালুপ্ত দ্য বেঙ্গল পোস্টে। বর্তমানে বিভিন্ন ওয়েবসাইট ও কাগজে লেখালিখি করেন। প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা ছয়।
নাগরিক সমাজের কর্ণধাররা এঁদের নিজের সমাজের মানুষ বলে ধরেন বলে মনে হয় না। লাল পতাকাধারীরা এঁদের হাতে পতাকা ছেড়ে দিতে পারেন কিনা, এঁদের মিছিলে টেনে আনতে পারেন কিনা – তার উপর নির্ভর করছে পশ্চিমবঙ্গের ভবিষ্যৎ।
মঙ্গলবার বিকেলে কলকাতায় একটি রাজনৈতিক মিছিল ছিল। অদলীয় রাজনীতির আড়ালও সে মিছিলে ছিল না। যাঁরা সংগঠিতভাবে এসেছিলেন তাঁরা লাল পতাকা হাতেই এসেছিলেন। কারোর পতাকায় লালের উপর সাদায় কাস্তে হাতুড়ি আঁকা, কারোর আবার লালের উপর হলুদ রংয়ের বাঘ। সাদার উপর লাল তারা আঁকা পতাকাও ছিল এই মিছিলে। মিছিলটি ঘোষিতভাবেই বামফ্রন্টের মিছিল, অর্থাৎ এ রাজ্যে ১৯৭৭-২০১১ যেসব দল জোট বেঁধে ক্ষমতায় ছিল তাদের এবং তাদের বিভিন্ন গণসংগঠনের ডাকেই এই মিছিল। কয়েক হাজার লোকের এই মিছিলে কোনো জুনিয়র বা সিনিয়র ডাক্তার ছিলেন কিনা জানি না, থাকলেও ডাক্তার পরিচয়ে ছিলেন না। পতাকা নিয়ে হাঁটা অসংখ্য মানুষের একেকজন হয়ে ছিলেন। মিছিল চিরকাল অনেকের, একের নয়।
তা বলে বামফ্রন্টের মিছিল ডাক্তারদের ভুলে গিয়ে, আর জি কর হাসপাতালে ধর্ষিত ও নিহত মেয়েটিকে ভুলে গিয়ে কেবল মুখ্যমন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি করে মসনদে বসতে চাওয়ার মিছিল হয়ে দাঁড়ায়নি। পরিশীলিত শহুরে মধ্যবিত্তদের গলাগুলি স্লোগান তুলেছে
সময় যত দীর্ঘ হবে আওয়াজ তত তীক্ষ্ণ হবে। বিচার যত থমকে রবে আওয়াজ তত তীক্ষ্ণ হবে।
আবার রংচটা জামা প্যান্ট, শস্তা ছাপা শাড়ি পরা পালিশবিহীন মানুষ স্লোগান দিয়েছেন
নেংটি ছেড়ে ধেড়ে ধরো আর জি করের মাথা ধরো।
এই মিছিল শহুরের, এই মিছিল গেঁয়োর। এই মিছিল টি-শার্ট আর পনিটেলের, এই মিছিল ফেজ টুপি আর দাড়ির। এই মিছিল ক্রপ টপের, এই মিছিল হিজাবের। এই মিছিল স্নিকার্সের, এই মিছিল হাওয়াই চটির। আপনার প্রিয় টিভি চ্যানেল বা ইউটিউব চ্যানেল হয়ত দেখাবে না, তাই সবচেয়ে বেশি করে বলা প্রয়োজন – এই মিছিলে শুধু বহু মানুষ হাঁটেননি, যাঁরা হাঁটেননি তাঁরা পথের দুধার থেকে মিছিলকে আপন করে নিয়েছেন। তবে গোড়া থেকে শুরু করাই ভাল।
***
রাজাবাজার ট্রাম ডিপো থেকে তখনো মিছিল শুরু হয়নি, জমায়েত ক্রমে স্ফীত হচ্ছে। দেখি এক কাঁচাপাকা চুলের শীর্ণকায় ভদ্রলোক একটি সদ্য গোঁফদাড়ি ওঠা বাবুসোনা প্রজাতির ছেলেকে আঙুল তুলে দেখাচ্ছেন এক বৃদ্ধার দিকে ‘দেখছ? অন্তত ৮০ বছর বয়স হবে ওনার।’ কানে খাপছাড়া কয়েকটি শব্দ যেতে সেই বৃদ্ধা এবং তাঁর সঙ্গিনীরা ঘুরে তাকালেন। ভদ্রলোক বললেন ‘খারাপ কথা বলছি না দিদিভাই। আপনার উদাহরণ দিচ্ছি। শেখাচ্ছি।’ ওঁরা হেসে এগিয়ে যেতেই ছেলেটিকে বললেন ‘উনি এত বয়সে মিছিলে আসতে পেরেছেন, তোমার অসুবিধাটা কী?’ অপ্রস্তুত ধোপদুরস্ত ছেলেটি সহসা কথা খুঁজে পেল না। উনি বললেন ‘অন্যের জন্যেও কিছু করতে হয় তো।’
অনতিদূরেই আরও ভাল দৃষ্টান্ত ছিল। ওঁর চোখে পড়েনি, আমার চোখে পড়ল কিছুক্ষণের মধ্যেই।
ভদ্রলোকের বয়স খুব বেশি হবে না। কিন্তু কোনো গভীর অসুখ তাঁকে প্রায় চলচ্ছক্তিহীন করে ফেলেছে। হাত দুটো বেঁকে গেছে, পা দুটোও। কয়েক ইঞ্চি এগোতেও তাঁর কয়েক মিনিট সময় লাগে। দেখে ভেবেছিলাম ইনি আন্দোলনের প্রতি সংহতি জানাতে এসেছেন, নিশ্চয়ই মিছিলে যাবেন না। কিন্তু সন্ধের মুখে শ্যামবাজারে নেতাজি মূর্তির পাদদেশে পুলিস যখন মিছিলের গতি রোধ করল, বিস্মিত হয়ে দেখলাম ওই ভদ্রলোক আমার পাশে এসে গেছেন আবার।
ওই পথ হাঁটতে হাঁটতে ততক্ষণে তরুণ-তরুণী, মাঝবয়সীদের দল যেমন চোখে পড়েছে, তেমনি দেখেছি এমন বন্ধুদের যারা দুজনে স্রেফ একে অপরের হাত ধরে চলে এসেছে। তাদের মুখ বলছে, শরীরী ভাষা বলছে – আগে কখনো কোনো রাজনৈতিক সমাবেশে যোগ দেওয়ার অভিজ্ঞতা নেই। তাই স্লোগানে গলা মেলাতে প্রথম প্রথম তারা রাঙা হয়ে উঠছিল, পরে লজ্জা ভেঙে গেল। মিছিল চিরকাল লজ্জা ভাঙে, ব্যক্তিকে সমষ্টির একজন হতে শেখায়। সমষ্টিতে মিশে নিজেকে নতুন করে আবিষ্কার করে ব্যক্তি। এ জিনিস যে মিছিলে ঘটে না, সে কি সত্যি মিছিল?
হাঁটতে হাঁটতে ভাবছিলাম – মানুষ কেন মিছিলে যায়? নিজের বিবেকের কাছে পরিষ্কার থাকার জন্যে? এই মিছিলে মানুষ কেন গিয়েছিল? এখন গোটা পশ্চিমবঙ্গে রোজ যে নানা সংগঠনের ডাকে মিছিল বেরোচ্ছে, মানুষ কেন যাচ্ছে সেসবে? ‘চরম অন্যায় দেখে আমি প্রতিবাদ করেছিলাম আমার মত করে’ – ভবিষ্যতের এই তৃপ্তিটুকুর জন্যে? হয়ত তাই। তাতেই বা দোষ কী? কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে আজকের বহুনিন্দিত লাল পতাকার মিছিলে কেন এসেছেন এত মানুষ? কোনো পতাকাহীন মিছিলে গেলেও তো পাপস্খালনের অনুভূতি পাওয়া যায়। এ রহস্য উদ্ঘাটন আমার পক্ষে অসম্ভব। কিন্তু জানি না, কোনো পতাকা বা কোনো দলের প্রতি টান না থাকলে অতি বৃদ্ধ বাবাকে ছোট্ট ছেলের মত হাত ধরে মিছিলে নিয়ে আসতে পারে কিনা তাঁর ছেলে। ছেলেটি আমারই বয়সী। বেশভূষা দেখে এবং মুখের ভাষায় মনে হল, দূর গ্রাম থেকে এসেছেন ওঁরা। দুজনেরই ঘাড়ে লাল পতাকা। হয়ত জোয়ান বয়সে বাবাই মিছিলে হাঁটা শিখিয়েছিলেন ওই ছেলেকে, আজ দ্বিতীয় শৈশবে পৌঁছে সেই ছেলে তাঁকে হাত ধরে নিয়ে এসেছে। এভাবেই তো মিছিল এগোয়। মিছিল, বিশেষত লাল পতাকার মিছিল, আসলে তো রিলে। অদলীয় মিছিলেও কি এমন হয়? জানি না।
***
সপ্তাহের গোড়ার দিকে এক কর্মব্যস্ত দিনে কলকাতার প্রাণকেন্দ্রে ট্র্যাফিক স্তব্ধ করে দেওয়া কোনো মিছিল সম্পর্কে এত ভাল ভাল কথা লেখা প্রায় অসম্ভব ছিল আর জি করের ওই ডাক্তার মেয়েটির ধর্ষণ ও হত্যার আগে পর্যন্ত। যথাসময়ে নিজ নিজ কাজে যাওয়ার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ কিছু যে থাকতে পারে, তা টের পাওয়ার জন্যে আমাদের একটি সম্ভাবনাময় প্রাণ খোয়াতে হল। আজ যখন বিপুল জমায়েতের কারণে রাজাবাজার ট্রাম ডিপোয় পৌঁছবার আগেই বাস দাঁড়িয়ে পড়ল আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রোডের উপর, তখন ভেবেছিলাম বাসযাত্রীরা কর্মনাশা মিছিলকে দু-চারটে গালমন্দ করবেন। অবাক কাণ্ড! তেমন কিছু হল না। বাস খালি করতে করতে তাঁরা বলাবলি করলেন ‘একটা দিন একটু হেঁটে চলে যাব।’ স্কুলফেরত একটি ছেলে ক্লান্তি প্রকাশ করে মাকে বলছিল ‘আমি কিন্তু আর হাঁটতে পারব না।’ মা বললেন ‘ঠিক পারবি।’ মিছিল শুরু হওয়ার পর থেকে কেবলই তাকাচ্ছিলাম বিডন স্ট্রিটের মত শহরের যেসব গুরুত্বপূর্ণ রাস্তা এপিসি রোডে এসে মিশেছে, সেখানে আটকে থাকা বাসযাত্রী, বাইক আরোহী, চারচাকার আরোহীদের মুখের দিকে। যদি বিরক্তি থেকেও থাকে, কোনো মুখে তার বহিঃপ্রকাশ চোখে পড়ল না। এখনকার দস্তুর অনুযায়ী অনেকে বরং নিজের মোবাইলে ধরে রাখছিলেন মিছিলের ছবি। যা বিরক্তির কারণ তা কি কেউ সোশাল মিডিয়ায় শেয়ার করার জন্যে মোবাইলে ধরে রাখে? বোধহয় না।
পতাকাওলা, পতাকাহীন মিলিয়ে নয় নয় করে কম মিছিলে যাইনি গত ৩০-৩২ বছরে। কিন্তু মঙ্গলবারের মিছিল যত শ্যামবাজারের দিকে এগোল, তত যেসব দৃশ্য দেখলাম তা ইতিপূর্বে দেখিনি। রাস্তার ধারের বহুতলের বারান্দা জুড়ে সপরিবারে দাঁড়িয়ে ‘উই ওয়ান্ট জাস্টিস’ বলে চিৎকার করছেন মানুষ। বাচ্চাদের নিয়ে স্কুলফেরত মায়েরা দাঁড়িয়ে পড়েছেন মিছিল দেখে আর মিছিল থেকে কেউ গিয়ে একখানা লাল পতাকা ধরিয়ে দিয়েছে এক পড়ুয়ার হাতে। সে একখানা উঁচু জায়গায় উঠে সজোরে নাড়ছে সেই পতাকা, স্লোগান দেওয়া হচ্ছে সবাই মিলে।
রাস্তার ধারের দোকানের নীল কলারের কর্মচারীরা ফুটপাথ থেকে পথে নেমে এসে স্লোগান দিচ্ছেন। সবচেয়ে অবাক করলেন মহিলারা – নিম্ন মধ্যবিত্ত, গরিব পরিবারের মহিলারা। যে যেভাবে পেরেছেন বেরিয়ে এসেছেন পথে। মলিন নাইটির উপর গামছা জড়িয়ে, বাচ্চা কোলে নিয়েও। এপিসি রোডের অন্য পারে দাঁড়িয়ে তাঁরা স্লোগান দিচ্ছিলেন মিছিলের লোকেদের চেয়েও বেশি উৎসাহে। রাস্তার দুপাশে এত মানুষ এত প্রাণ যোগ করলেন মিছিলে, মনে হচ্ছিল যাঁরা হাঁটছেন তাঁদের গার্ড অফ অনার দিচ্ছেন ওঁরা। সবচেয়ে আশ্চর্য, অনেক জায়গায় মহিলারা লাল পতাকার এই মিছিলকে এমন অকুণ্ঠ সমর্থন জানাচ্ছিলেন তৃণমূল কংগ্রেসের পতাকায় সজ্জিত এলাকায় দাঁড়িয়ে। খান্না মোড়ের সামান্য আগে একটি জরাজীর্ণ বাড়ি। তার দোতলার বারান্দায় ঠাসাঠাসি করে দাঁড়িয়েছিলেন জনা দশেক মহিলা। এত তাঁদের গলার জোর এবং ঘুণধরা কাঠের রেলিংয়ের উপর ঝুঁকে পড়ে স্লোগান দেওয়ার উৎসাহ, যে ভয় হচ্ছিল, বাড়িটি তখনই ভেঙে পড়বে। আশ্চর্যের কথা, ওই বারান্দা থেকে কিন্তু ঝুলছিল একটি তিনকোণা ক্রুদ্ধ হনুমানের পতাকা।
স্পষ্টত, এ রাজ্যের গরিব মানুষও ক্রুদ্ধ। মহিলারা ক্রুদ্ধ। হতে পারে, এখন তাঁরা কার হাতে কোন পতাকা আছে তা দেখছেন না। তাঁরা কেবল জানেন, কোন পতাকা তাঁদের অপছন্দ। লক্ষণীয় বিষয় হল, এই শ্রেণির মানুষ বামেদের থেকে ক্রমশ দূরে গেছেন বলেই ২০১১ সাল থেকে কমতে কমতে রাজ্যের ও দেশের আইনসভায় এ রাজ্যের বামেরা আজ শূন্য। অন্যদিকে এই শ্রেণির মানুষের, বিশেষত মহিলাদের, আশীর্বাদই মমতা ব্যানার্জির সরকারের পাহাড়প্রমাণ দুর্নীতি সত্ত্বেও একের পর এক বিরাট নির্বাচনী জয়ের বড় কারণ। আর তা থেকেই সীমাহীন ঔদ্ধত্যের জন্ম, যে ঔদ্ধত্য গোটা রাজ্যের সরকারি হাসপাতালগুলিকে সন্দীপ ঘোষদের রাজত্ব করে রেখেছে। নইলে আজ হবু ডাক্তার মেয়েটিকে মরতে হত না।
লালবাজারে ডাক্তারদের অবরোধের কাছে শেষমেশ কলকাতার নগরপাল বিনীত গোয়েলের মাথা নোয়ানো আর ইস্টার্ন মেট্রোপলিটান বাইপাস বরাবর অরাজনৈতিক মানববন্ধনে হয়ত চাপা পড়ে যাবে বামফ্রন্টের আপাদমস্তক রাজনৈতিক মিছিলের খবর। কিন্তু মিছিলের বাইরের মানুষের প্রতিক্রিয়া দেখে মনে হল না, তাঁদের রাজনীতি সম্পর্কে বা লাল পতাকা সম্পর্কে অন্তত এই মুহূর্তে কোনো ছুঁতমার্গ আছে। কে এই আন্দোলন থেকে ফায়দা তুলবে না তুলবে তা নিয়ে ওঁরা ভাবিত নন তথাকথিত নাগরিক সমাজের নেতৃবৃন্দের মত। অবশ্য নাগরিক সমাজের কর্ণধাররা এঁদের নিজের সমাজের মানুষ বলে ধরেন বলে মনে হয় না। লাল পতাকাধারীরা এঁদের হাতে পতাকা ছেড়ে দিতে পারেন কিনা, এঁদের মিছিলে টেনে আনতে পারেন কিনা – তার উপর নির্ভর করছে পশ্চিমবঙ্গের ভবিষ্যৎ। সে ভবিষ্যৎ কিন্তু রাজ্যের রাজধানীতে একদিনের মিছিল দিয়ে গড়া যাবে না।
২০১১ সালে পশ্চিমবঙ্গে মমতা ব্যানার্জির সরকার আসার পরে আর ২০১৪ সালে দিল্লিতে নরেন্দ্র মোদীর সরকার আসার পরে ভারতীয় রাজনীতিতে, সমাজে এবং সংবাদমাধ্যমে একটা নতুন কায়দা চালু হয়েছে। প্রশ্ন যা করার বিরোধীদের করা হয়, সরকারকে নয়। অথচ গণতন্ত্র মানে ঠিক উলটো। অন্তত ১৯৪৭ সাল থেকে ভারতে গণতন্ত্র মানে ছিল – প্রশ্ন সরকারকে করা হবে, আন্দোলন হবে সরকারের নীতির বিরুদ্ধে বা কাজের বিরুদ্ধে। সেটা উলটে গেছে। এখন সরকার অপকর্ম করলে সরকার আর সরকারি দলের সুরে সুর মিলিয়ে সংবাদমাধ্যম, এমনকি সাধারণ মানুষও ফিরিস্তি দেন – বিরোধীরা সরকারে থাকার সময়ে কী কী অপকর্ম করেছিল। বিজেপি এবং গোদি মিডিয়ার এই কাজটা করার জন্যে আছে দুটো হাতিয়ার – ‘নেহরু’ আর ‘কংগ্রেস কে ৬০ সাল’। তৃণমূল আর তাদের সোচ্চার ও নিরুচ্চার সমর্থকদের জন্যে আছে ‘বামফ্রন্টের ৩৪ বছর’। আপনি বলতেই পারেন, ‘বাপু, ওই কারণেই তো ওদের সরিয়ে তোমাদের ক্ষমতায় এনেছি। তোমাদের এতদিন হয়ে গেল সরকারে, তাও ওরা কবে কী করেছিল কেন শুনব?’ ওই ফাটা রেকর্ড কিন্তু বেজেই চলবে।
এবারের লোকসভা ভোটে দেশের মানুষ বিজেপির ফাটা রেকর্ড বাজানো অনেকটা বন্ধ করে দিয়েছেন। তার কৃতিত্ব খানিকটা অবশ্যই বিকল্প সংবাদমাধ্যম এবং সাংবাদিকদের। কিন্তু বেশিটাই দেশের বিরোধী দলগুলোর। কোনো সাংবাদিক বা বিকল্প সংবাদমাধ্যম, তাদের যত লক্ষ ফলোয়ারই থাকুক না কেন, যদি ভাবে রাজনৈতিক দলগুলোর কর্মীদের তুলনায় তারা বেশি পরিশ্রম করে বা সাধারণ মানুষ তাদের উপর বেশি নির্ভর করেন, তাহলে সেই সাংবাদিক বা ওয়েবসাইট মাটির সঙ্গে সম্পর্কহীন। রাজনীতির র-ও তারা বোঝে না। তবে তাদের অবদান অন্যূন নয়। ঘটনা হল, বিরোধীদের আন্দোলন করার মত একটা সুস্থ স্বাভাবিক গণতান্ত্রিক ব্যাপারকে ভারতে দশবছর ধরে অস্বাভাবিক, দেশবিরোধী বলে তুলে ধরা হত। ওটাই যে স্বাভাবিক, ওভাবেই যে সরকার বদলায় এবং ওভাবেই যে নরেন্দ্র মোদীও ক্ষমতায় এসেছিলেন, সেকথা মানুষকে ভুলিয়ে দেওয়া হয়েছিল। গত এক-দেড় বছরে মানুষের সেই মনোভাব অনেকটাই কেটেছে। আরএসএস-বিজেপি ও তাদের বশংবদ মিডিয়া, বিরোধীরা আন্দোলন করলেই তাকে নানাভাবে বদনাম করে আর পার পাচ্ছে না। মানুষের মানসিকতার এই পরিবর্তনের কৃতিত্ব অনেকটাই বিকল্প ওয়েবসাইট, স্বাধীন সাংবাদিক, ইউটিউবারদের।
কিন্তু পশ্চিমবঙ্গ এখনো বাকি দেশের চেয়ে পিছিয়ে আছে। এখানে একে বিজেপি ক্ষমতায় নেই, তার উপর এখানেও দিদি মিডিয়া সেই ২০১১ সাল থেকেই আছে। সরকারি বিজ্ঞাপন বন্ধ করে, বন্ধ করার হুমকি দিয়ে বা বিজ্ঞাপন দেওয়ার লোভ দেখিয়ে মমতা ব্যানার্জির সরকার পশ্চিমবঙ্গে দিদি মিডিয়া তৈরি করেছে সচেতনভাবে। উপরি সমস্যা হিসাবে আছেন বাম এবং/অথবা প্রগতিশীল মানুষদের একাংশ। তাঁরা ‘বিজেপি এসে যাবে’, এই যুক্তিতে তৃণমূল সরকারের যাবতীয় অপকর্ম চাপা দেন। বিরোধীরা (বামেদের কথা বলছি, এ রাজ্যে বিজেপি বিরোধীসুলভ কোন কাজটা করে?) গত ১৩ বছরে পর্যাপ্ত পরিমাণে বা তীব্রতায় আন্দোলন করেননি এটা যেমন সত্যি, তেমন এটাও সত্যি যে কোনো বিষয়ে তাঁরা প্রতিবাদ করলেই, মমতা বা তৃণমূল কংগ্রেসের অন্য কোনো নেতা কিছু বলারও আগে খবরের কাগজে বা সোশাল মিডিয়ায় লেখা শুরু হয়ে যায় ‘ওরা আবার কথা বলছে কী? ওরা তো অত সালে অমুকটা করেছিল।’ সংবাদপত্রের উত্তর সম্পাদকীয় লেখক, বিকল্প ওয়েবসাইটগুলোর লেখক এবং জনপ্রিয় ফেসবুকারদের মধ্যে বেশকিছু মানুষ সর্বদা তালিকা নিয়ে তৈরি থাকেন – কবে, কোথায়, কখন তৃণমূল দল বা সরকারের করা কোন অন্যায়টা বামফ্রন্ট সরকারের আমলে সিপিএম বা জোট শরিক অন্য কোনো দল করেছিল। যুক্তি হিসাবে এটা অবশ্যই বনলতা সেনগিরি (whataboutery), যা আজকাল সারা পৃথিবীতে বাম, মধ্য, ডান – সব পক্ষের লোকেরাই করে থাকেন। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সর্বাধিক বিক্রীত বাংলা দৈনিক আনন্দবাজার পত্রিকা ও অন্যান্য মিডিয়ার কয়েক দশকের যত্নে গড়ে তোলা এই নাগরিক বিশ্বাস, যে রাজনীতি অত্যন্ত নোংরা একটা ব্যাপার এবং শুধুমাত্র বদ লোকেরাই রাজনৈতিক দলের সদস্য হয়।
ফলে সরকারের বিরুদ্ধে কোনোরকম আন্দোলনে যুক্ত হতে গেলেই রাজ্যের প্রতিষ্ঠিত বাম দলগুলোকে আন্দোলনকারীরাই বাধা দেন। শিক্ষক নিয়োগে দুর্নীতির বিরুদ্ধে আন্দোলনে এ জিনিস ঘটেছে, সরকারি কর্মচারীদের মহার্ঘ ভাতা বৃদ্ধির দাবিতে আন্দোলনও বামপন্থীদের বাইরে রাখতে গিয়ে দুভাগ হয়ে গিয়েছিল – বামফ্রন্টের সদস্য দলগুলোর সংগঠনের যৌথ মঞ্চ, বাকিদের সংগ্রামী যৌথ মঞ্চ। তারপর কোন মঞ্চ দিল্লিতে বিক্ষোভ দেখাতে গিয়ে হিন্দু মহাসভার আতিথ্য গ্রহণ করল তা নিয়ে ভুল খবরও রটেছিল তৃণমূলের উদ্যোগে। যেহেতু সিপিএমের শিক্ষক সংগঠন নিখিল বঙ্গ শিক্ষক সমিতির নাম ওই পেশার বাইরের মানুষের কাছে বেশি পরিচিত এবং আন্দোলনের বাইরে থাকা অনেক শিক্ষকও খবর রাখতেন না আন্দোলনের কতগুলো ভাগ হয়েছে, সেহেতু অনেকে সাক্ষ্যপ্রমাণ না দেখেই ধরে নিয়েছিলেন কাজটা সিপিএমের সংগঠনের নেতৃত্বে থাকা অংশেরই। তৃণমূল নেতা কুণাল ঘোষও সুযোগ বুঝে সোশাল মিডিয়ায় রাম-বাম-কং আঁতাত প্রমাণিত হল বলে ধুয়ো তুলেছিলেন। অথচ ঘটনা ছিল উলটো।
সবচেয়ে বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে যে বিরোধীরা, তাদের এইভাবে যে কোনো আন্দোলন থেকে দূরে রাখার এই কৌশল কংগ্রেস সম্পর্কে সেই ২০১৪ সাল থেকে সারা দেশে প্রয়োগ করে যাচ্ছিল বিজেপি। তাদের দ্বারা শাসিত কোনো রাজ্যে ধর্ষণ নিয়ে অসন্তোষ তৈরি হলেই বিজেপি নেতারা এবং গোদি মিডিয়া মনে করিয়ে দিত – নির্ভয়া কাণ্ড হয়েছে কংগ্রেস আমলে। অতএব কংগ্রেসের ও নিয়ে কোনো কথা বলার অধিকার নেই। নরেন্দ্র মোদী সরকারের কোনো অগণতান্ত্রিক কাজ নিয়ে প্রতিবাদ করলেই ইন্দিরা গান্ধীর জরুরি অবস্থা মনে করিয়ে দেওয়া হত। ধর্মনিরপেক্ষতা নিয়ে কথা বললেই শাহ বানো মামলার নাম করা হত। দেশের সাধারণ মানুষও এই একপেশে ধারণায় বিশ্বাস করছিলেন, যে কংগ্রেসের ৬০ বছরের শাসনে দেশে একটাও ভাল কাজ হয়নি। উপরন্তু বিজেপি এমন কিছুই করছে না, যা কংগ্রেস আগে করেনি। পশ্চিমবঙ্গের মতই কোথাও কোনো আন্দোলন দানা বাঁধলেই সংগঠকরা আগেভাগে বলে দিতেন ‘আমাদের এখানে কোনো রাজনৈতিক দল নেই। আমরা আন্দোলনের রাজনীতিকরণ চাই না।’ ফলে কংগ্রেসও হয়ে পড়েছিল রক্ষণাত্মক। যখন সারা দেশে এনআরসি-সিএএবিরোধী আন্দোলন চলছে, তখন এআইসিসি অফিসে বসে সাংবাদিক সম্মেলন করা ছাড়া ওই আন্দোলনে কোনো ভূমিকা নিতে ভয় পেয়েছে। সংগঠনকে কাজে লাগায়নি। কখনো দিল্লিতে অনুষ্ঠিত কোনো আন্দোলনে কংগ্রেসের কেউ গিয়ে হাজির হলেই সমবেত গোদি মিডিয়া এবং বিজেপি সেই আন্দোলনকে ‘রাজনৈতিক সুবিধাবাদ’ বলে দেগে দিয়েছে। এমনকি আন্দোলনকারীরাও আপত্তি করেছেন। ২০১৫ সালে যন্তর মন্তরে প্রাক্তন সেনাকর্মীদের আন্দোলনে রাহুল হাজির হওয়ায় তাঁকে আন্দোলনকারীরাই চলে যেতে বলেন।
২০২০-২১ সালের কৃষক আন্দোলনের সময়ে পাঞ্জাবে কংগ্রেস সরকার থাকা সত্ত্বেও দিল্লির আন্দোলনে কংগ্রেসের কোনো ভূমিকা ছিল না বললেই চলে। পাঞ্জাবের মুখ্যমন্ত্রী ক্যাপ্টেন অমরিন্দর সিং (পরে কংগ্রেস ছেড়ে নিজের দল খোলেন, এখন আবার বিজেপিতে যোগ দিয়েছেন) আন্দোলনকে মৌখিক সমর্থন জানিয়েছিলেন কেবল। কংগ্রেসের এই নিজের মধ্যে গুটিয়ে থাকা বিজেপিকে ভয়ানক হয়ে উঠতে সাহায্য করেছে। কংগ্রেস শেষমেশ এই সংকোচ কাটিয়ে ওঠে রাহুলের ভারত জোড়ো যাত্রার মধ্যে দিয়ে।
পশ্চিমবঙ্গে সিপিএম তথা বাম দলগুলোর সংকোচ আজও কাটেনি। তার অন্যতম কারণ, তাঁরা কংগ্রেসের মত কোনো নতুন বয়ান খাড়া করতে পারেননি। যে শিল্পায়ন হয়নি তার জন্য এবং ব্যর্থ মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের জন্য অশ্রুপাত করা ছাড়া তাঁদের বক্তব্য বলতে তৃণমূলের দোষগুলো দেখিয়ে দেওয়া। সিপিএম সদস্য, সমর্থকরা এখনো ‘গর্বের ৩৪’ নিয়ে বিভোর। এখনো নিজেরাই মেনে নিতে পারেননি যে ৩৪ বছরের সবটাই গর্বের হলে সংখ্যাটা উনচল্লিশে পৌঁছত, চৌত্রিশে থেমে যেত না। ফলে এখনো তাঁদের আমল নিয়ে বনলতা সেনগিরি করে সিপিএম নেতাকর্মীদের স্তব্ধ করে দেওয়া যায়। কোনো আন্দোলনের নেতৃত্ব হাতে তুলে নেওয়ার সাহস তাঁরা করে উঠতে পারেন না, পতাকাহীন মিছিলের ডাক দেন। বড়জোর ছাত্র সংগঠন বা যুব সংগঠনের নামে মিছিল, জমায়েত ইত্যাদি করা হয়। এই সংকোচের ফলে পশ্চিমবঙ্গে এক অদ্ভুত রাজনীতি রমরমিয়ে চলছে।
তৃণমূল সরকারের আমলে সরকারি হাসপাতালের ভিতরে সরকারি ডাক্তার ধর্ষিত হয়ে খুন হলেন। ইতিমধ্যেই পরিষ্কার যে প্রথম থেকে ঘটনাটা চেপে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে হাসপাতাল ও পুলিসের তরফ থেকে। স্বাস্থ্য আর স্বরাষ্ট্র – দুটো দফতরই স্বয়ং মুখ্যমন্ত্রীর হাতে। খুনের ঘটনা ৯ অগাস্ট সকালে প্রকাশ্যে আসার পর থেকেই হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ও পুলিসের কাজে, অর্থাৎ সরকারি কাজে, এত অসঙ্গতি যে কলকাতা হাইকোর্টে তো বটেই, সুপ্রিম কোর্টে পর্যন্ত ‘হ্যাঁ স্যার, ভুল হয়ে গেছে স্যার’-এর বাইরে যেতে পারেননি রাজ্য সরকারের কৌঁসুলি।
#SupremeCourt#BengalHorror case was being argued between the parties and @KapilSibal who's defending lawyer WB Govt was laughing and submitted in his submission which was not permissible in the eye of law and court. I've never seen a more shameless man than him, he's a disgrace pic.twitter.com/FxF7JE6OqK
তবু এখনো তৃণমূল তো বটেই, পশ্চিমবঙ্গের নাগরিক সমাজের একটা অংশও এই আলোচনায় বানতলা, ধানতলা টেনে আনছেন। রাত দখল আন্দোলনের অন্যতম নেত্রী বলে পরিচিত শতাব্দী দাশ গত বুধবারের আনন্দবাজার পত্রিকায় ‘অ-দলীয়, প্রবল রাজনৈতিক’ শীর্ষক প্রবন্ধে লিখেছেন ‘সাধারণ মানুষই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, তাঁদের কাঁধে চেপে কাউকে রাজনৈতিক আখের গোছাতে দেবেন না তাঁরা। বর্তমান শাসনহীনতার বিরুদ্ধে সংগঠিত মিছিল থেকেই হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে, মনুবাদী পিতৃতান্ত্রিক বিজেপিকে এই আন্দোলনের সুবিধা তুলতে দেওয়া হবে না। মনে করিয়ে দেওয়া হয়েছে সিপিএম যুগের বানতলা আর তৃণমূলের কামদুনি, একই সঙ্গে।’ পড়ে গুলিয়ে গেল – আন্দোলনের দাবিটা কী? অনেকের হাতে পোস্টার ছিল এবং মুখে স্লোগান ছিল ‘We want justice’, অর্থাৎ ‘আমরা ন্যায়বিচার চাই’। কার জন্য ন্যায়বিচার? আর জি করে মৃত মেয়েটার জন্যে ন্যায়বিচার, নাকি কামদুনির ধর্ষিতার জন্য ন্যায়বিচার, নাকি বানতলার ধর্ষিতার জন্য ন্যায়বিচার, নাকি এদের সকলের জন্য ন্যায়বিচার? মুশকিল হল, বানতলা আর কামদুনি – দুটো মামলারই নিষ্পত্তি হয়ে গেছে আগেই। ন্যায়বিচার হয়েছে কিনা তা ভিন্ন প্রশ্ন, কিন্তু আর জি করের ঘটনার পরে ওইসব ঘটনার জন্যে আন্দোলন করার তো মানে নেই। বিশেষত বানতলার ন্যায়বিচার তৃণমূল সরকারের কাছে তো চাওয়া যেতে পারে না। চাইলে বামফ্রন্ট সরকারের কাছে চাইতে হয়। যে সরকারের এখন আর অস্তিত্বই নেই, তার বিরুদ্ধে আন্দোলন মোদীর ভারত আর দিদির পশ্চিমবঙ্গেই শুধু সম্ভব। অবশ্য শতাব্দী বা সমমনস্করা বলতেই পারেন, ওই বাক্যগুলোর অর্থ তা নয়। অর্থ হল – এসব অনাচার সিপিএমও আগে করেছে, তৃণমূলও করেছে। অতএব তাদের এই আন্দোলনে প্রবেশ নিষেধ। পশ্চিমবঙ্গের নাগরিক সমাজের অরাজনৈতিক নেতারা এরকমই বলেন সাধারণত। কিন্তু একথা বললে আন্দোলনের লক্ষ্য আরও অস্পষ্ট হবে।
রাজনৈতিক দলগুলোর প্রবেশ না হয় আটকানো গেল, তাদের সহযোগিতা অগ্রাহ্য করা গেল কি? কামদুনির তৃণমূল সরকার রাত দখলের আন্দোলনের বিরোধিতা করেনি। বরং তাদের দখলে থাকা অটো, টোটো ইউনিয়ন বেশি রাতেও যানবাহন সচল রেখে সাহায্য করেছে। বানতলার সিপিএমের শ্রমিক সংগঠন সিটুর দখলে থাকা অ্যাপ ক্যাব চালকদের ইউনিয়নও সহযোগিতা করেছে। তার উপর আন্দোলনকারীরা নিজেরাই মনুবাদী পিতৃতান্ত্রিক বিজেপি সরকারের অধীনে থাকা মেট্রো রেলকে ইমেল করে অনুরোধ জানিয়েছিলেন মেট্রো চালু রাখতে। মেট্রো রেল সে দাবি পূরণ করেছে। এসব না হলে ১৪ তারিখ রাতে কলকাতায় অমন জমায়েত হত কি? হয়েছে ভাল কথা। কিন্তু মেয়েদের রাত দখল কি সফল হয়েছে? প্রশ্নটা তুলতে হচ্ছে, কারণ কদিন পরেই রাজ্য সরকার মহিলাদের রাতে সুরক্ষিত রাখতে যেসব ব্যবস্থা ঘোষণা করেছে, তার অন্যতম হল – মহিলাদের নাইট ডিউটি কম দেওয়া, সম্ভব হলে না দেওয়া। অর্থাৎ রাতের যেটুকু দখল মেয়েদের হাতে এখন আছে, সরকার নিজের অক্ষমতা ঢাকতে সেটুকুও কেড়ে নিতে চায়। তাহলে ‘শাসনহীনতার বিরুদ্ধে সংগঠিত মিছিল’ থেকে দেওয়া হুঁশিয়ারিটা যথেষ্ট জোরদার ছিল কিনা – এই প্রশ্নটা ওঠা উচিত নয় কি?
ঘটনা হল, তথাকথিত নাগরিক আন্দোলনের হুঁশিয়ারি এর চেয়ে বেশি জোরদার হয় না। সেকথা সরকারও জানে। সেই কারণেই কোনো রাজনৈতিক দলের সভা, সমাবেশ, মিছিল হলে যত পুলিস মজুত করা হয় তা এই ধরনের আন্দোলনের জন্য করা হয় না। ২০ অগাস্ট মোহনবাগান-ইস্টবেঙ্গল ম্যাচ বাতিলের পর সমর্থকরা যে প্রতিবাদী জমায়েতের ডাক দিয়েছিলেন, সেটাও অ-দলীয় কিন্তু রাজনৈতিক জমায়েত। অথচ তার প্রতি সরকারের অবিশ্বাস অনেক বেশি ছিল। তাই জমায়েতের ঘোষিত জায়গা (যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গন) পর্যন্ত কাউকে যেতেই দেওয়া হয়নি। উপরন্তু কেবল পুলিস নয়, ইস্টার্ন মেট্রোপলিটান বাইপাসে র্যাফ পর্যন্ত নামানো হয়। লাঠিও চালানো হয়।
যা-ই হোক, ১৪ অগাস্টের কর্মসূচি অন্তত একটা ব্যাপারে সফল। সরকার ভেবেছিল ওইদিন ওই প্রতিবাদ হতে দিলে পরদিন থেকে প্রতিবাদ থিতিয়ে যাবে। কিন্তু তা ঘটেনি। ফলে এখন দেখা যাচ্ছে সরকার বলছে, সাধারণ মানুষের আন্দোলনে বিরোধীরা ঢুকে পড়ে সরকারের বিরুদ্ধে চক্রান্ত করছে। মৃতার জন্যে ন্যায়বিচার আদায় করা নয়, এর উদ্দেশ্য সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করা। যেহেতু বিজেপি নেতা শুভেন্দু অধিকারী, পরে বামেরাও, মমতার পদত্যাগের দাবি তুলেছেন, সেহেতু একথা আরও বেশি করে বলা হচ্ছে। এতে তৃণমূল আপত্তি করতেই পারে, শঙ্কিতও হতে পারে। কিন্তু তৃণমূলের স্বার্থ যাঁদের স্বার্থ নয়, তাঁরা আপত্তি করবেন কেন? অথচ করছেন। এখানেই পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতির জটিলতা, দ্বিধা।
একনায়কতন্ত্রের সঙ্গে মিল বাড়ছে পশ্চিমবঙ্গের
লক্ষণীয় যে ২০১১ সালের পর থেকে পশ্চিমবঙ্গে একাধিক ভয়ানক ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে এবং পার্ক স্ট্রিট থেকে হাঁসখালি – প্রায় কোথাও মুখ্যমন্ত্রী ধর্ষিতাকে নিয়ে কুমন্তব্য করে ব্যাপারটাকে লঘু করে দিতে ছাড়েননি। তবু বিরোধীরা তাঁর পদত্যাগ দাবি করেনি। তুলনায় এবারে মুখ্যমন্ত্রী অনেক সংযত। প্রথমদিনই বলে দিয়েছিলেন যে মৃতার বাবা-মা চাইলে সিবিআই তদন্তে তাঁর আপত্তি নেই। তাহলে এবার বিরোধীরা পদত্যাগ চাইছেন কেন? কারণটা সহজবোধ্য। মুখ্যমন্ত্রীর কাজের চেয়ে তো আর কথার গুরুত্ব বেশি নয়। এবারের ঘটনায় যুক্ত দুটো দফতরই মুখ্যমন্ত্রীর নিজের হাতে এবং তারা নিজেদের কাজে বিস্তর গাফিলতি করেছে তা ঘটনার দিন থেকেই বোঝা যাচ্ছিল। পরবর্তীকালে হাইকোর্ট এবং সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিরাও সেই মতই ব্যক্ত করেছেন। এ রাজ্যে এমনিতে তৃণমূলের রাজনৈতিক বিরোধীরা ছাড়া প্রায় সকলেই যে কোনো দুর্নীতি, আইনশৃঙ্খলার অবনতির ঘটনায় বলেন – দোষীরা তৃণমূলের লোক হলেও মুখ্যমন্ত্রীর দোষ নেই। সাধারণ ভোটাররাও সাধারণত তাই মনে করেন। হাজারো কেলেঙ্কারি সত্ত্বেও একের পর এক নির্বাচনে তৃণমূলের জয়ের বড় কারণ মমতার এই ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা। রাজ্যের সবচেয়ে গরিব মানুষ, যিনি হয়ত স্থানীয় তৃণমূল নেতাদের দৌরাত্ম্যে অতিষ্ঠ, তাঁরও বিশ্বাস ‘দিদির পার্টির ছেলেগুলো বদমাইশ। দিদি কী করবে?’ কিন্তু আর জি করের ঘটনায় এরকম বলার কোনো উপায় নেই।
শিক্ষা দুর্নীতিতে সব দোষই শিক্ষামন্ত্রী পার্থ চ্যাটার্জি এবং আমলাদের উপর চাপিয়ে দেওয়া গিয়েছিল। গরু পাচার, কয়লা পাচার ইত্যাদি মামলায় তো অভিযুক্ত বা গ্রেফতার হওয়া ব্যক্তিদের সঙ্গে মুখ্যমন্ত্রীর সংযোগ আবিষ্কার করার প্রশ্নই নেই। অনুব্রত মণ্ডল তৃণমূল নেতা বলেই যে মমতা তাঁর থেকে টাকা পান – এমন কথা ইডিও বলেনি। সারদা কেলেঙ্কারিতে দু-একবার মুখ্যমন্ত্রীর নাম এলেও তা গুজবের বেশি এগোয়নি। নারদ কেলেঙ্কারির অভিযুক্তদের সম্পর্কেও মমতা বলতে পেরেছিলেন ‘আগে জানলে ভোটে দাঁড় করাতাম না’। কিন্তু তাঁরই অধীন দুটো দফতর একযোগে খুনের ঘটনায় অবহেলা করল, তিনি কিছুই জানলেন না। উপরন্তু আর জি করের কুখ্যাত অধ্যক্ষ সন্দীপ ঘোষের প্রতি সমবেদনা জ্ঞাপন করলেন সর্বসমক্ষে, তারপর পদত্যাগের কয়েক ঘন্টার মধ্যে তাঁকে অন্য হাসপাতালের অধ্যক্ষ করে দিল তাঁরই দফতর। আদালতের ধমক খেয়ে বাধ্যতামূলক ছুটিতে পাঠানো হল। এত কিছু মুখ্যমন্ত্রীর অগোচরে হয়েছে – একথা চরম মমতাভক্তও কি বিশ্বাস করবে? ২২ তারিখই সুপ্রিম কোর্টে আর জি কর মামলার দ্বিতীয় শুনানিতে সিবিআই অভিযোগ করেছে – অপরাধের অকুস্থলের অবস্থার পরিবর্তন করা হয়েছে মামলা তাদের হাতে যাওয়ার আগেই। প্রধান বিচারপতি ডি ওয়াই চন্দ্রচূড় দেখিয়ে দিয়েছেন যে রাজ্য সরকারের জমা দেওয়া টাইমলাইনে অপরাধীকে শাস্তি দিতে তাদের একনিষ্ঠতা নয়, অনীহাই প্রমাণ হয়।
🚨 CJI CHANDRACHUD : "Why the FIR was filed 3.15 hours after the body was handed over?"
KAPIL SIBAL : "Because Victim’s Father filed the FIR at 11:45 pm"
CJI CHANDRACHUD : It was the hospital's duty to file the FIR, particularly in the absence of the victim's parents
আইনকানুনের কোনো তোয়াক্কা করা হয়নি। আইনজীবী কপিল সিব্বাল এহেন আচরণের ব্যাখ্যা দিতে খাবি খেয়েছেন। তাই বিচারপতি পরবর্তী শুনানিতে কলকাতা পুলিসের একজন দায়িত্বশীল অফিসারকে উপস্থিত থাকতে বলেছেন, যাঁর কাছে এই অসঙ্গতির সন্তোষজনক উত্তর আছে।
এমতাবস্থায় বিরোধীরা স্বাস্থ্যমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি করলে মহাভারত অশুদ্ধ হবে কেন? যাঁরা বনলতা সেনগিরি অন্যায় মনে করেন না তাঁদের জ্ঞাতার্থে বলা যাক, মমতা নিজে বিরোধী নেত্রী থাকার সময়ে একাধিকবার মুখ্যমন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি করেছেন।
উপরের ছবির তারিখগুলো দেখলেই বোঝা যাচ্ছে, ২০০৬ সালে বামফ্রন্ট ২৯৪ আসনের মধ্যে ২৩৫ আসন জিতে আসার পরেও ওই দাবি করেছেন। অর্থাৎ তখন কিন্তু বামফ্রন্টের জনপ্রিয়তা নিয়ে অন্তত সংসদীয় পথে প্রশ্ন তোলার কোনো অবকাশ ছিল না। তবু। সত্যি কথা বলতে, অন্যায় কিছু করেননি। গণতন্ত্রে বিরোধী দলের কাজই হল সরকারের পান থেকে চুন খসলে ক্ষেপে ওঠা। কাজটা মমতা চমৎকার পারতেন। বাম দলগুলো আজ পারে না, জাতীয় স্তরে কংগ্রেসও এই সেদিন পর্যন্ত পারত না। মমতার অবশ্য একটা সুবিধা ছিল। ২০১১ সালের আগের সংবাদমাধ্যম এবং নাগরিক সমাজ মমতাকে ‘আন্দোলনের সুবিধা তুলতে দেওয়া হবে না’ বলত না। সরকারের সমালোচনা করে মমতা রাজ্যের বদনাম করছেন – এই জাতীয় কথা সিপিএম নেতাদের মুখে শোনা গেলেও, নাগরিক সমাজের লোকেরা কখনো বলতেন না। ইতিহাস তো সকলেরই থাকে। মমতারও আছে। তিনি তৃণমূল দল খোলার আগে দীর্ঘকাল কংগ্রেসে ছিলেন। কংগ্রেস আমলে পশ্চিমবঙ্গে যেসব অত্যাচার, অনাচার হয়েছে সেগুলোর দায়ও তাঁর ঘাড়ে চাপা উচিত তাহলে। কারণ তিনি কোনোদিন বলেননি যে তিনি সেসবের জন্যে লজ্জিত। উপরন্তু তিনি পশ্চিমবঙ্গের ইতিহাসের সবচেয়ে কুখ্যাত মুখ্যমন্ত্রী সিদ্ধার্থশঙ্কর রায়ের স্নেহভাজনও ছিলেন। এতৎসত্ত্বেও মমতাকে কংগ্রেসের কুকীর্তি মনে করিয়ে দিয়ে চুপ থাকতে বলত না কেউ। কারণ সেটা অপ্রাসঙ্গিক। কে আগে ক্ষমতায় থাকার সময়ে কী করেছিল, তার জন্যে তার পরবর্তী সরকারের বিরুদ্ধে কথা বলার অধিকার নেই, আন্দোলন করার অধিকার নেই – একথা যারা বলে তারা আসলে স্থিতাবস্থার সমর্থক। কোনো দল বা জোট সরকারে থাকাকালীন কুকর্ম করলে তার শাস্তি হিসাবে ভোটাররা তাদের ক্ষমতাচ্যুত করে অন্য কাউকে ক্ষমতায় আনেন। তাদের শাসন অপছন্দ হলে আবার তাদেরও তাড়ান – এভাবেই গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা চলে। ভোটারদের বিশ্বাস অর্জন করতে বিরোধী দলগুলোকে অনবরত লড়াই করে যেতে হয়, সরকার পক্ষের ভুলের ফায়দা তোলার চেষ্টা করতে হয়। এই কাঠামোর বাইরেও একজন বা কয়েকজন নাগরিক অথবা কোনো সংগঠন নির্দিষ্ট দাবি বা দাবিসমূহ নিয়ে আন্দোলন করতেই পারে। কিন্তু কোনো আন্দোলনে অমুককে ঢুকতে দেব না, তমুককে থাকতে দেব না বলাও যে অগণতান্ত্রিক এবং এক ধরনের বামনাই – তা মনুবাদের বিরুদ্ধে আন্দোলন করা ব্যক্তিরাও উপলব্ধি করছেন না।
আন্দোলনে একমাত্র তাকেই ঢুকতে দেব না বলা সঙ্গত, যার বিরুদ্ধে আন্দোলন। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গ জুড়ে এই মুহূর্তে নাগরিক সমাজের বিভিন্ন অংশ যে তথাকথিত অরাজনৈতিক আন্দোলনগুলো করছেন, সেগুলো যে কার বিরুদ্ধে তা প্রায়শই বোঝা যাচ্ছে না। অনেক সময় আন্দোলনকারীরা নিজেরাই জোরের সঙ্গে বলছেন – কারোর বিরুদ্ধে নয়। ২২ তারিখ রাত দখল আন্দোলনের আহ্বায়ক বলে পরিচিত রিমঝিম সিনহা ২৫ অগাস্ট (রবিবার) রাতে ফের টর্চ জ্বেলে, বেগুনি পতাকা নিয়ে এক আন্দোলনের ডাক দিয়েছিলেন। সেই ডাক দেওয়ার ভিডিওতেও এই আন্দোলন কার বিরুদ্ধে তা বলা হয়নি, যদিও বলা হয়েছে ‘আজ ২২ অগাস্ট, প্রায় ১২ দিন কেটে গেল, সুবিচার আসেনি। আর জি করের ঘটনার সঙ্গে জড়িত সকলকে গ্রেফতার করাও হয়নি।’ আন্দোলনের এক বিখ্যাত মুখ, অভিনেত্রী সোহিনী সেনগুপ্ত ২৩ অগাস্ট (শুক্রবার) তারিখের আনন্দবাজার পত্রিকায় লিখেছেন ‘একজনকে থামালে হাজার হাজার গলা আরও জোরে চিৎকার করবে’। এই শিরোনাম দেখে ভাবলাম যে থামাচ্ছে তার বিরুদ্ধে শেষমেশ বোধহয় দুকথা লিখেছেন। কিন্তু পড়তে গিয়ে হতাশ হলাম। উনি বরং লিখেছেন ‘আমাদের প্রত্যেকের নিজস্ব রাজনৈতিক বোধ রয়েছে। সেটা দিয়ে, আর নিজেদের সুবুদ্ধি দিয়ে আমরা ‘অ্যাপলিটিক্যাল’ শব্দটি ব্যবহার করছি। এটার মানে কিন্তু এই নয় যে, আমাদের কোনও পক্ষ নিতে হবে। আমাদের কেন কোনও পক্ষ নিতে হবে? আমাদের নিজের কণ্ঠস্বরই আমাদের পক্ষ।’
ন্যায়বিচার চাই বলছি, কিন্তু কার কাছে চাই বলছি না – এর কারণ কী? দুটো কারণ সম্ভব। ১) কার কাছে ন্যায়বিচার চাইছি নিজেও জানি না, ২) জানি, কিন্তু বলতে চাইছি না। কারণ বললেই বোঝা যাবে যে সে ন্যায়বিচার দিচ্ছে না। এই সত্য তাকে বিপদে ফেলবে। কিন্তু আমি কোনো কারণে তাকে বিপদে ফেলতে চাই না।
সমাজের উচ্চকোটির যথেষ্ট লেখাপড়া জানা নারী (এবং পুরুষরা) যেহেতু এই নাগরিক আন্দোলনের মুখ, সেহেতু প্রথম সম্ভাবনাটা বাতিল করে দেওয়াই শ্রেয়। সোহিনী তাঁর লেখার উপর্যুক্ত অংশের পরেই একটা বাচ্চা মেয়ের উল্লেখ করে লিখেছেন সে-ও হাতে মোমবাতি নিয়ে চিৎকার করতে করতে ন্যায়বিচার দাবি করেছে। তারপর মন্তব্য করেছেন ‘সে রাজনীতির কী বোঝে?’ প্রশ্ন হল, সে ন্যায়বিচারেরই বা কী বোঝে? তাকে বড়রা কিছু একটা বুঝিয়েই তো নিয়ে এসেছিলেন প্রতিবাদে? তা আর জি কর কাণ্ড যেভাবে গড়িয়েছে গত কয়েক দিনে, তাতে ওই বাচ্চা মেয়ের বড়রা নিশ্চয়ই বুঝে গেছেন যে যথাসময়ে এফআইআর না করে, মৃতার বাবা-মাকে বিভ্রান্ত করে, এমনকি তড়িঘড়ি মৃতদেহ হাসপাতাল থেকে বার করে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে ন্যায়বিচারের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে এ রাজ্যের সরকারই। কথাটা অনেকে বুঝে গেছেন বলেই শতাব্দী, রিমঝিম, সোহিনীরা ঢোঁক গিললেও ১৪ তারিখ রাতেই এবং তারপর থেকে কোনো কোনো নাগরিক মিছিলেও সরাসরি সরকারবিরোধী স্লোগান শোনা গেছে। তাহলে এবার দ্বিতীয় সম্ভাবনার আলোচনায় আসা যাক।
কী কারণে তৃণমূল সরকারকে বিপদে ফেলতে চাই না? এটাই বাংলার রাজনীতির সেই দ্বিধা, যার কথা এই লেখার প্রথম পর্বে উল্লেখ করেছিলাম। এই রাজ্যে বহু মানুষ আছেন যাঁরা আন্তরিকভাবে বিজেপি-আরএসএসের বিরোধী, আবার এও বোঝেন যে তৃণমূল সরকার বিস্তর অন্যায় করে চলেছে। কিন্তু মনে করেন সিপিএম/বামফ্রন্টকে আর ভোট দেওয়া চলে না (এরকম মনে হওয়ার জন্যে বাম নেতৃত্বের দিশাহীনতা, সাংগঠনিক ব্যর্থতা এবং বিজেপিবিরোধিতায় সিদ্ধান্তহীনতা যথেষ্ট পরিমাণে দায়ী)। অতএব বিজেপিকে আটকাতে তৃণমূলকেই ক্ষমতায় রাখতে হবে।
এই মনোভাবকে প্রশ্ন করার সময় এসে গেছে। নিঃসন্দেহে বিজেপি-আরএসএস যে কোনো রাজ্যের পক্ষেই ধ্বংসাত্মক শক্তি। কিন্তু তৃণমূল যে ধ্বংসাত্মক নয় – একথা কি আর বলা চলে? স্রেফ উল্টোদিকে আরও খারাপ একটা শক্তি আছে – এই যুক্তিতে পার্শ্ববর্তী বাংলাদেশেও শেখ হাসিনার দলের দমনপীড়ন, এমনকি নির্বাচনকে প্রহসনে পরিণত করা মেনে নিয়েও তাঁকেই বহুকাল ধরে সমর্থন করছিলেন প্রগতিশীলরা। কিন্তু মানুষের সহ্যের সীমা থাকে। চৈনিক চক্রান্তই বলুন আর মার্কিন চক্রান্তই বলুন – একটা দল কোনো ভূখণ্ডে বারবার ভোটই হতে দেবে না, সেই ভূখণ্ডের মানুষ তা কতবার কোন কোন যুক্তিতে মেনে নেবেন? পুলিস, অন্যান্য সশস্ত্র বাহিনী এবং শাসক দলের গুন্ডাদের গুলিতে প্রাণ গেলেও মানুষ অন্যদিকে মৌলবাদীরা আছে বলে মুখ বুজে থাকবে – এ জিনিস তো চিরকাল চলে না। স্বীকার্য যে পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভা, লোকসভায় ভোটদানে যে হিংসা, কারচুপি হয় তা এ আমলে নতুন নয়। মমতা ভোটকে হাসিনার মত প্রহসনে পরিণত করেছেন বলা যাবে না। কিন্তু ক্রমশ সেদিকেই এগোচ্ছেন বললে নেহাত ভুল বলা হবে কি?
পরপর দুটো পঞ্চায়েত নির্বাচন কিন্তু প্রহসনেই পরিণত হয়েছে। ২০১৮ সালে পশ্চিমবঙ্গের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি সংখ্যক আসনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছিলেন শাসক দলের প্রার্থীরা। ভোটের দিন রক্তারক্তি দেখতে অভ্যস্ত এই রাজ্যের মানুষও মনোনয়ন পত্র জমা দেওয়ার সময়েই অত মারামারি, মহিলাদের শাড়ি খুলে নেওয়া ইত্যাদি দেখতে অভ্যস্ত ছিলেন না। ২০২৩ পঞ্চায়েত নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয়নি এমন আসনের সংখ্যা নেমে আসে ৯.৫ শতাংশে। কিন্তু তা যত না শাসকের বদান্যতায়, তার চেয়ে বেশি বিরোধীদের লড়াকু মনোভাবের কারণে। মনোনয়ন জমা দেওয়ায় অত্যন্ত কম সময় দিয়ে, জমা দিতে আসা প্রার্থীদের নিরাপত্তা দিতে না পেরে ভোটের আগেই শিরোনামে চলে আসেন রাজ্য নির্বাচন কমিশনার রাজীব সিনহা। তবে আসল খেলা হল ভোট গণনার সময়ে। হিংসা তো হলই, জয়ী প্রার্থীকে আমলারা সার্টিফিকেট দেননি এমন অভিযোগ উঠল। মাঠে ঘাটে ব্যালট ও ব্যালট বাক্স পড়ে থাকতে দেখা গেল, প্রচুর মামলা হল এবং আদালতের নির্দেশে বহু আমলার চাকরি নিয়ে টানাটানি পড়ল।
সিবিআই আর ইডি যে অসংখ্য দুর্নীতির মামলায় তৃণমূলের বিভিন্ন নেতা, মন্ত্রীকে গ্রেফতার ও জিজ্ঞাসাবাদ করেছে সেগুলো থমকে গেছে। ঠিক যেভাবে সারদা ও নারদ মামলার কোনো নিষ্পত্তি হয়নি। তার মানে এই নয় যে তৃণমূল দুর্নীতিমুক্ত। একথা তৃণমূলকে ফ্যাসাদে ফেলতে না চাওয়া মানুষও জানেন। আজ এখানে বাড়ি ভেঙে পড়ছে, কাল ওখানে বাজি তৈরির কারখানায় বিস্ফোরণ হওয়ার পর দেখা যাচ্ছে সেখানে বোমা তৈরি হত, পরশু তৃণমূলের কাউন্সিলররাই প্রকাশ্যে মারামারি করছেন, তার পরদিন কোনো সমাজবিরোধী গ্রেফতার হওয়ায় প্রবীণ বিধায়ক আর সাংসদ (মদন মিত্র, সৌগত রায়) ফোনে খুনের হুমকি পাওয়ার অভিযোগ করছেন – এসব তো এ রাজ্যে চলছিলই। আর জি কর কাণ্ডে দেখা গেল সরকারি হেফাজতে সরকারি কর্মচারীর জান, মালের সুরক্ষাও নেই। সেটা শুধু ধর্ষণ, খুনে প্রমাণিত হয়নি; ১৪ অগাস্ট রাতে হাসপাতালে যে তাণ্ডব চলেছে তাতেও প্রমাণিত হয়েছে। সেদিন ডিউটিতে থাকা নার্সরা জানিয়েছেন, পুলিস তাঁদের নিরাপত্তা দিতে তো ব্যর্থ বটেই, নিজেদের নিরাপত্তার জন্যও তাঁদের কাছেই হাত পেতেছিল। বিজেপি এসে যেতে পারে – স্রেফ এই যুক্তিতে এই চরম নৈরাজ্য দেখেও কি তৃণমূলকে যেনতেনপ্রকারেণ সুরক্ষা দেওয়া চলে? রাজ্যের সব মানুষেরই ভাবার সময় এসেছে।
ভোট তো এখনো অনেক দূরে। ইতিমধ্যে তৃণমূল শুধরেও তো যেতে পারে, যদি টের পায় মানুষ তাদের কর্মকাণ্ডে খুশি নন। কিন্তু প্রাণপণে তাদের অন্যায় ঢাকা দেওয়ার চেষ্টা করলে তো দমনপীড়ন বেড়েই চলবে। ঠিক যা এই মুহূর্তে ঘটছে। ফুটবল মাঠে সমর্থকরা কিছু টিফো দেখাবেন – এই আশঙ্কায় একটা নিরীহ ফুটবল ম্যাচ বাতিল করে দিয়ে আরও বড় প্রতিবাদের রাস্তা খুলে দেওয়া হল। তারপর সেই প্রতিবাদও আটকাতে নিরস্ত্র ফুটবলপ্রেমীদের উপরে লাঠি চালানো হল। এখন স্কুলগুলোকে পর্যন্ত সরকার আদেশ দিচ্ছে – সরকারি অনুষ্ঠান ছাড়া কোনোকিছুতে ছাত্রছাত্রীদের নিয়ে যাওয়া চলবে না।
গণতন্ত্রের চেয়ে একনায়কতন্ত্রের সঙ্গেই যে এই আচরণের মিল বেশি, তা নাগরিক সমাজ স্বীকার না করলে নিজেদের কোনো দলীয় পরিচয় নেই বলে কোন মুখে?
দলহীন প্রতিবাদ সংঘ পরিবারের পক্ষে সুবিধাজনক
সব কথার পরেও রাজনৈতিক দলগুলো সম্পর্কে একটা অরাজনৈতিক আপত্তি উঠবেই। তা হল, দলগুলো নিজেদের রাজনৈতিক স্বার্থ ছাড়া কিছু দেখে না। অতএব প্রতিবাদকে তাদের হাতে চলে যেতে দেওয়া যায় না। এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত হওয়া উচিত কোন রাজনৈতিক দলের স্বার্থ কী তার বিচার করে। যেমন বিজেপি, কংগ্রেস, সিপিএম – সকলেরই রাজনৈতিক স্বার্থ ক্ষমতায় আসা। বিরোধীদের ক্ষমতায় আসতে চাওয়া যে পাপ নয়, একথাটা ২০১১ সালের পর থেকে পশ্চিমবঙ্গের এবং ২০১৪ সালের পর থেকে গোটা দেশের মানুষকে বলে বোঝাতে হয়। সে না হয় হল। কিন্তু এরপরেও বিচার করা দরকার, ক্ষমতায় এলে কে কী করতে পারে? সিপিএম আর কংগ্রেস (একলা বা জোটে) কী করতে পারে তা বোধহয় তারা নিজেরাও ভেবে দেখেনি। সেই কারণেই তাদের ভোট দেওয়ার কথা কেউ ভাবতে পারে না। কিন্তু বিজেপি ক্ষমতায় এলে কী করবে তা নিয়ে বুদ্ধি বিসর্জন না দেওয়া মানুষের সন্দেহের কোনো অবকাশ নেই। নরেন্দ্র মোদী সরকারের কার্যকলাপ দেখে যদি যথেষ্ট শিক্ষা না হয়ে থাকে, তাহলে বিজেপিশাসিত গুজরাট, মণিপুর, ত্রিপুরা, উত্তরপ্রদেশ, হরিয়ানা, মহারাষ্ট্র, আসাম – যে রাজ্য ইচ্ছা হয় দেখে নিন। তাহলেই বিজেপির হাতে প্রতিবাদ চলে যাওয়ার বিপদের সঙ্গে অন্যদের হাতে চলে যাওয়ার ফলের তফাত স্পষ্ট হবে। কিন্তু এসব রাজনৈতিক বিচারে আবার নাগরিক সমাজের লোকেরা যেতে চান না। রাজনৈতিক স্বার্থ তাঁদের কাছে প্রায় অপশব্দ। অনেক মানুষের কাছেই তাই হয়ে দাঁড়ানোর পিছনে রাজনৈতিক দলগুলোর যে কোনো দায় নেই তা নয়। কিন্তু যাঁরা দলগুলোর ঊর্ধ্বে উঠে ন্যায়ের জন্য, রাজ্যের ভালর জন্য দাঁড়িয়েছেন বলে দাবি করেন, তাঁদের কি কোনো স্বার্থ নেই? সেটাও একটু পরখ করে নেওয়া ভাল।
২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনের জন্যে ‘নো ভোট টু বিজেপি’ বলে এক প্রচারাভিযানে নেমেছিল বাংলার নাগরিক সমাজ। বাম কর্মী, সমর্থকরা রুষ্ট হয়েছিলেন। তাঁরা মনে করেছিলেন, এটা ঘুরিয়ে নাক দেখানোর মত করে তৃণমূলকে ভোট দিতে বলা। এই প্রচারাভিযানে যুক্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে তৃণমূলের থেকে টাকাপয়সা নেওয়ার ভিত্তিহীন অভিযোগও তুলেছিলেন। তবে পরে বালিগঞ্জ বিধানসভা কেন্দ্রের উপনির্বাচনে এবং ২০২৪ সালে দক্ষিণ কলকাতা লোকসভা কেন্দ্রে ওই প্রচারাভিযানের অন্যতম মুখ সায়রা শাহ হালিমকে সিপিএম প্রার্থী করে। কিন্তু ঘটনা হল, ওই প্রচারাভিযানের উদ্যোগীদের একজন – সামিরুল ইসলাম – পরে তৃণমূলের হয়ে রাজ্যসভায় চলে গেছেন।
‘নো ভোট টু বিজেপি’-কে জনপ্রিয় করতে জরুরি ভূমিকা নিয়েছিল একখানা মিউজিক ভিডিও। সেখানে দেখা গিয়েছিল বাংলা থিয়েটার ও সিনেমা জগতের একগুচ্ছ তারকাকে। সেখানে যেমন সব্যসাচী চক্রবর্তী, চন্দন সেন, রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায়ের মত মার্কামারা সিপিএম ছিলেন; তেমন ছিলেন দলহীন পরমব্রত চট্টোপাধ্যায়। তিনি সেইসময় বিজেপির বিরুদ্ধে কাগজে লেখালিখিও করেছিলেন। ২০২১ নির্বাচনের কিছুদিন পরেই দেখা গেল, তিনি দেউচা পাঁচামিতে কয়লাখনি হওয়া নিয়ে স্থানীয় মানুষের সঙ্গে সরকারের সমন্বয় সাধনের জন্য তৈরি এক রাজ্য সরকারি কমিটির প্রধান নিযুক্ত হয়েছেন। তিনি কয়লার কী জানেন, খনির কী জানেন, আদিবাসীদেরই বা কী জানেন – তা কি নিজেও জানেন? ২০২৩ সালে এসে এক সাক্ষাৎকারে পরমব্রত জানান যে তিনি ওই কমিটি থেকে পদত্যাগ করেছেন, ‘সেপ্টেম্বর বা অক্টোবরে।’ কারণ তাঁকে যে কাজ দেওয়া হয়েছিল সে কাজ নাকি শেষ হয়ে গেছে। কী কাজ, সে কাজ করতে গিয়ে কী পাওয়া গেল – এই ধরনের কমিটি সম্পর্কে এসব প্রশ্ন ভারতবর্ষে কোনোদিনই কেউ তোলে না। কিন্তু ব্যক্তিগতভাবে অন্তত দুজনকে চিনি, যাঁরা ‘নো ভোট টু বিজেপি’-র লোকেদের তৃণমূল সরকারের থেকে এরকম সুবিধা গ্রহণ করা দেখে বিতৃষ্ণায় ২০২৪ নির্বাচনের আগে আর এই ধরনের কোনো উদ্যোগে জড়িত হতে চাননি। নিশ্চিতভাবে এমন মানুষ আরও আছেন। সম্ভবত সে কারণেই এবারে আর ওই ক্যাম্পেনকে অন্তত ওই নামে দেখা যায়নি। কথা হল, দলের ঊর্ধ্বে দণ্ডায়মানরা যদি এমনভাবে ব্যক্তিস্বার্থ চরিতার্থ করেন, তাহলে দলগুলোর দোষ কী? তারা তো তবু কোনো একটা সমষ্টির স্বার্থ চরিতার্থ করতে চায়।
দলগুলোর সততা নেই, বিশেষত কাজে আর কথায় মিল নেই, তাই তাদের বিশ্বাস করা যায় না – এই বয়ান বাংলার নাগরিক সমাজে খুব জনপ্রিয়। কথাটা যে পুরোপুরি মিথ্যে তাও নয়। দলগুলোও সেকথা জানে। গত কয়েক বছরে বামেদের দলের পতাকা বাদ দিয়ে মিছিল, মিটিংয়ের ডাক দেওয়ার অভ্যাস হয়ত তারই স্বীকৃতি। সিপিএমের লোকেদের সংগঠিত মিছিল, রাজ্য সম্পাদক মহম্মদ সেলিম স্বয়ং হাঁটছেন, অথচ বলা হচ্ছে নাগরিক মিছিল – এমন অসংখ্য দৃষ্টান্ত আছে। এমন ব্যানারবিহীন দলীয় অভিযানের সাম্প্রতিকতম উদ্যোগ অবশ্য দক্ষিণপন্থীদের – মঙ্গলবারের নবান্ন অভিযান, যার ডাক দিয়েছিল ‘বাংলার ছাত্রসমাজ’। সে এমন ছাত্রসমাজ যে তাতে সহজেই যুক্ত হয়ে যান ব্যারাকপুরের অর্জুন সিং, সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করে নেন লম্বা সাদা দাড়িওলা এক সাধু। কিন্তু অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে রাজনৈতিক দলগুলোকে অস্বীকার করে বিশ্ব ছাড়ায়ে উঠতে চান যে বিদ্রোহীরা, তাঁদের সততার উদাহরণগুলোও যে নিদারুণ।
যেমন ধরুন দামিনী বেণী বসু। কয়েক মাস আগেই তাঁর একটা লেখা নিয়ে হইচই পড়ে গিয়েছিল। টিনের তলোয়ার নাটকে ধর্ষণে অভিযুক্ত অভিনেতা সুদীপ্ত চট্টোপাধ্যায়কে অভিনয়ের সুযোগ দেওয়ার প্রতিবাদ করে নির্দেশক সুমন মুখোপাধ্যায়কে সোশাল মিডিয়ায় খোলা চিঠি লিখেছিলেন দামিনী। তা নিয়ে একটা ওয়েবসাইটে খবর হয়, পরে সে খবর সরিয়ে দেওয়া হয়। দামিনী দাবি করেন যে সুমনের অঙ্গুলিহেলনেই ওই লেখা সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। এর প্রতিবাদে অন্য এক সাইটে লেখেন। সে লেখায় অন্য অনেক কথার সঙ্গে দামিনী লেখেন, বাংলা থিয়েটারে ‘রেপ-কালচার’ চালু আছে। সুমন দামিনীর সেই লেখার লিখিত উত্তরও দেন। বলা বাহুল্য, দামিনী মিথ্যা অভিযোগ করেছিলেন এমন প্রমাণ যখন নেই, তখন বেশ করেছিলেন। কিন্তু মুশকিল হয়েছে ওই কথায় আর কাজে মিল নিয়ে। গত সপ্তাহে কলকাতার এক বিলাসবহুল হোটেলে বিতরণ করা হয়েছে দেবী অ্যাওয়ার্ডস ২০২৪। অতীতে এই পুরস্কার যাঁরা প্রত্যাখ্যান করেছেন তাঁদের মধ্যে আছেন তামিলনাড়ুর দলিত কবি সুকীর্তা রানি। গতবছর ফেব্রুয়ারি মাসে এই পুরস্কার প্রত্যাখ্যান করার কারণ হিসাবে তিনি ফেসবুকে লেখেন ‘আমি সবে গতকাল জানতে পেরেছি যে এই অনুষ্ঠানের প্রধান স্পনসর হল আদানি গ্রুপ। আমি এমন কোনো সংগঠনের হাত থেকে বা এমন কোনো অনুষ্ঠানে পুরস্কার নিয়ে খুশি হব না, যা আদানির আর্থিক সাহায্যপ্রাপ্ত। কারণ সেটা আমি যে রাজনীতির কথা বলি বা যে আদর্শে বিশ্বাস করি তার পরিপন্থী। তাই আমি এই পুরস্কার গ্রহণ করব না।’
লিঙ্গ রাজনীতি, আদর্শ ইত্যাদি সম্পর্কে দামিনীকে অত্যন্ত সচেতন একজন শিল্পী হিসাবেই আমরা চিনেছি। এবছর ওই পুরস্কারপ্রাপ্ত ১৩ জন মহিলার মধ্যে একজন সেই দামিনী। তাঁর হাতে পুরস্কার তুলে দিয়েছেন কে? বিজেপি নেত্রী স্মৃতি ইরানি। বিজেপি ভারতের একমাত্র রাজনৈতিক দল যাদের নেতারা ধর্ষকের সমর্থনে মিছিল করে; যাদের সরকার ধর্ষণে শাস্তিপ্রাপ্তদের কেবল ক্ষমা করে দেয় না, মালা পরিয়ে, মিষ্টি খাইয়ে বরণ করে নেয়; রাতের অন্ধকারে পুলিস পাঠিয়ে ধর্ষিতার পরিবারকে আটকে রেখে দেহ ছিনিয়ে নিয়ে পুড়িয়ে দেয়। সেই দলের নেত্রীর হাত থেকে হাসিমুখে পুরস্কার নিয়েই দামিনী ক্ষান্ত দেননি। আর জি কর কাণ্ড নিয়েও দুকথা বলে দিয়েছেন সুললিত ইংরিজিতে। হরিবংশ রাই বচ্চন রচিত ‘অগ্নিপথ’ কবিতার লাইন আউড়ে যৌন অপরাধের বিরুদ্ধে লড়ার শপথ-টপথ নিয়েছেন, সেই শপথে গলা মেলানোর জন্য মাইকটা স্মৃতির দিকে এগিয়েও দিয়েছেন।
পুরস্কৃতদের মধ্যে ছিলেন টালিগঞ্জের অভিনেত্রী শুভশ্রী গাঙ্গুলিও। তিনিও পুরস্কার গ্রহণ করে বলেন ‘আমি সম্মানিত এবং কৃতজ্ঞ। কিন্তু সেই কথাতেই ফিরে আসতে হচ্ছে। খুশি নই। আমরা সবাই ভেঙে পড়েছি। আজকে এই পুরস্কার পেয়ে আমি নিশ্চয়ই খুশি, কিন্তু আনন্দ করতে পারছি না।’ শুভশ্রীকে এই পুরস্কার নেওয়ার কয়েকদিন পরে আর জি কর কাণ্ডে ন্যায়বিচার চেয়ে সিনেমা পাড়ার শিল্পীদের মিছিলেও হাঁটতে দেখা গেছে।
একই অঙ্গে এত রূপ দেখে সন্দেহ হয় – এঁদের প্রতিবাদ, আন্দোলনের পিছনেও আসলে নিজের যশলোভ। ওটা নিশ্চিত করতেই কখনো ক্ষমতাসীন তৃণমূলের দোষ নিয়ে চুপ করে থাকা, কখনো বিজেপি নেত্রীর হাত থেকে পুরস্কার নিয়ে যৌন অপরাধের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের ডাক দেওয়া। রাজনৈতিক নেতাদের সম্পর্কে খুব চালু কথা – তাঁরা জনতাকে ভুলিয়ে নিজেদের স্বার্থসিদ্ধি করেন। ১৪ তারিখ রাতে যে মহিলারা রাত দখলের ডাক পেয়ে পথে বেরিয়েছিলেন বা এখন শিল্পীদের মিছিল দেখে উদ্বুদ্ধ হচ্ছেন, তাঁদেরও কি তথাকথিত নাগরিক সমাজের এই নেতৃস্থানীয়রা ভোলাচ্ছেন না? নেতাদের নিদেনপক্ষে ভোট চাইতে আসতে হয়, তাই খানিকটা দায়বদ্ধতা থাকে। নাগরিক সমাজের নেতাদের তো সে চিন্তাও নেই। একটা রাজ্যসভার আসন অথবা সরকারি কমিটির সদস্যপদ, নিদেন কাগজে লেখা বা নাম বেরনো, খবরের চ্যানেলের প্যানেলে গিয়ে বসার ব্যবস্থা করতে পারলেই কাজ হাসিল। তার চেয়ে মহত্তর কোনো ন্যায়বিচার কি সত্যিই তাঁরা চান?
একবিংশ শতকে পৃথিবীর বহু দেশেই অবশ্য এরকম দলবিহীন নাগরিক সমাজের আন্দোলন দেখা যাচ্ছে। অনেকে এই প্রবণতা নিয়ে খুব উৎসাহিত। তাঁরা বলেন এটাই নতুন যুগের রাজনীতি। যুগে যুগে রাজনীতি যে বদলায় সেকথা তো ঠিকই। তবে এখন পর্যন্ত এ ধরনের রাজনীতি কিন্তু কোথাও প্রগতিশীলদের জয়যুক্ত করেনি। ‘অক্যুপাই ওয়াল স্ট্রিট’ কিছু অর্জন করতে পারেনি। তাহরীর স্কোয়ার থেকে শুরু হওয়া আরব বসন্তও কোনো নতুন ভোর নিয়ে আসেনি। বাংলাদেশে কদিন আগে হওয়া বিদ্রোহের পরিণামও যে প্রগতিশীল হবে তা এখনই বলা যাচ্ছে না। সেদেশের বামপন্থী, প্রগতিশীল শক্তির বেশকিছু অপছন্দের ঘটনাও ঘটছে মুহাম্মদ ইউনুসের সরকারের আমলে। উপরন্তু আমাদের দেশে দলবিহীন, পতাকাবিহীন ‘ইন্ডিয়া আগেনস্ট করাপশন’ এবং নির্ভয়া কাণ্ডের পরবর্তী আন্দোলনের পরিণাম হয়েছে ভয়াবহ। হিন্দুত্ববাদীদের ক্ষমতায় আনতে বড় ভূমিকা পালন করেছিল ওই দুটো আন্দোলন। কারণ বোধহয় এই, যে যেখানে কোনো পতাকা নেই সেখানে সংঘ পরিবারের লোকেরা সামাজিক সংগঠন করার দীর্ঘ অভিজ্ঞতা ব্যবহার করে খুব সহজেই সেঁধিয়ে যেতে পারে। সুতরাং রাজনৈতিক দলগুলোকে বাইরে রেখে নাগরিক সমাজের স্বয়ংক্রিয় আন্দোলনকে জয় বলে ভেবে নেওয়া বিপজ্জনক। এতে বেয়াদপ শাসককে শিক্ষা দেওয়া হচ্ছে কিনা তা যেমন ভাবার, তেমনই বিজেপিকে আটকানো হচ্ছে মনে করে বিজেপির রাস্তাই পরিষ্কার করা হচ্ছে কিনা তাও ভেবে দেখা দরকার।
২০১৪ সালে মোদী সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকে এই প্রথম কোনো অ-বিজেপি রাজ্য সরকারের বিরুদ্ধে এত বড় গণআন্দোলন হচ্ছে। কেন পশ্চিমবঙ্গেই এমন হল? যে প্রতিবাদীরা একাধারে ফ্যাসিবিরোধী এবং তৃণমূলের কোনো দোষ দেখতে পান না, তাঁরা কি ভেবে দেখবেন?
আমরা ছোট থেকেই শিখে এসেছি – রাজনীতি খুব খারাপ জিনিস। পশ্চিমবঙ্গের যাবতীয় দুরবস্থার মূলে হল রাজনীতি। আমাদের বড়রা আনন্দবাজার পত্রিকা পড়ে দিনরাত এই আলোচনাই করতেন
স্বাধীনতা দিবসে খুব ভোরবেলা ঘুম ভেঙে গেল। মাইকে দেশাত্মবোধক গান ভেসে এসে নয়, একটা স্বপ্ন দেখে।
দেখলাম সেলুলার জেলের সামনে দাঁড়িয়ে নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর আর বাঘাযতীন কীসব আলোচনা করছেন। পাশেই একটা লম্বা বাঁশে ভারতের পতাকা ফুল-টুল দিয়ে বাঁধা রয়েছে, ওঁরা কেউ তুলবেন বোধহয়। মাইকে ঝাঁ ঝাঁ করে ‘কদম কদম বঢ়ায়ে যা’ বাজছে আর আজাদ হিন্দ ফৌজ সাবধান পজিশনে দাঁড়িয়ে আছে। আমি একখানা রেকর্ডার বাগিয়ে ধরে এগিয়ে গেছি, তিনজনের বক্তব্য রেকর্ড করব বলে। কিন্তু তার আগেই নেতাজি হাত নেড়ে কাকে একটা ডাকলেন। দেখি – ক্ষুদিরাম বসু। তিন বয়োজ্যেষ্ঠ মিলে তাঁকেই এগিয়ে দিলেন পতাকা তুলতে। দেখে আমার বুকের ছাতি তো ৫৬ ইঞ্চি হবার জোগাড়। নেতাদের কোট চাইতে ভুলেই গেছি। ক্ষুদিরাম পতাকা তুললেন, একগাদা গাঁদা ফুল ঝরে পড়ল আর গোটা আজাদ হিন্দ ফৌজ ‘জয় হিন্দ’ বলে স্যালুট করল। আমিও উৎসাহের চোটে ‘জয় হিন্দ’ বলে সেলাম ঠুকে ফেলেছি। অমনি কানের কাছে কে যেন বলে উঠল ‘এ কী! এখানে স্লোগান দিচ্ছেন! ছিঃ! এটা একটা জাতীয় অনুষ্ঠান। দয়া করে এটাকে পলিটিসাইজ করবেন না।’ তাকিয়ে দেখি হাফপ্যান্ট পরা সুমন দে। আমি বলতে যাচ্ছিলাম, স্বাধীনতা সংগ্রাম ব্যাপারটাই তো রাজনৈতিক। তাহলে স্বাধীনতা দিবস অরাজনৈতিক হয় কী করে? সেখানে স্লোগান দেওয়া যাবে না-ই বা কেন? কিন্তু তার আগেই রবীন্দ্রনাথ সুমনবাবুর পিঠে মারলেন এক রদ্দা। অঙ্ক না পারলে আমাদের স্কুলের জহরবাবু যেরকম মারতেন, একেবারে সেইরকম। সুমনবাবু করুণ মুখে পিঠে হাত বুলোতে বুলোতে বললেন ‘কেস দেবেন না, প্লিজ’। অমনি আমার ঘুমটা ভেঙে গেল।
এরকম জগাখিচুড়ি স্বপ্ন কেন দেখলাম ভাবতে ভাবতে মনে হল, আমি যে প্রজন্মের লোক তাতে স্বাধীনতা দিবসে এই স্বপ্ন দেখাই স্বাভাবিক। কারণ আমরা ছোট থেকেই শিখে এসেছি – রাজনীতি খুব খারাপ জিনিস। পশ্চিমবঙ্গের যাবতীয় দুরবস্থার মূলে হল রাজনীতি। আমাদের বড়রা আনন্দবাজার পত্রিকা পড়ে দিনরাত যা আলোচনা করতেন তার মোটামুটি নির্যাস হল –
১) পশ্চিমবঙ্গে কোনো কাজ হয় না, কারণ বনধ হয়। ২) পশ্চিমবঙ্গে শিল্প হয় না, কারণ শ্রমিকরা রাজনীতি করে। ৩) পশ্চিমবঙ্গের স্কুলে লেখাপড়া হয় না, কারণ মাস্টাররা রাজনীতি করে। ৪) পশ্চিমবঙ্গের কলেজে ছাত্রছাত্রীরা পড়াশোনা করে না, কারণ রাজনীতি করে।
ফলে ২০১১ সালে যখন বামফ্রন্ট সরকার বিদায় নিল, তখন আমাদের প্রজন্মের অনেকেই স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছিল। আমাদের বড়দের কারো কারো মুখ দেখে মনে হয়েছিল, বাকি জীবনটা বাম শাসনে কাটাতে হবে না বলে দারুণ শান্তি পেয়েছেন। তখন চারপাশে সবাই বলত যে এবার থেকে পশ্চিমবঙ্গে শিল্প হবে, স্কুলে লেখাপড়া হবে, কলেজে ছাত্রছাত্রীরা মন দিয়ে পড়াশোনা করবে, হাসপাতালে চিকিৎসা হবে, ‘চলবে না, চলবে না’ আর চলবে না। এবার থেকে সব চলবে। কারণ রাজনীতি আর চলবে না। রাজনীতি না চললে যে খুব খারাপ হবে, সেকথা তখন বামপন্থী কয়েকজন ক্ষীণ কণ্ঠে বলেছিলেন। কিন্তু সদ্য যে হেরে গেছে তার কথায় কে কান দেয়? তার উপর একটানা ৩৪ বছর শাসন করে যারা হারে, তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগের লম্বা তালিকা থাকে। সেসব থেকে মুখ তুলতে কে চায়? তখন প্রায় সকলেই নিঃসন্দেহ, যে রাজ্যটা একেবারে শেষ হয়ে গেছে। তার জন্যে দায়ী বাম শাসন, কিন্তু কারণ রাজনীতি।
হা হুতাশ ছিল শুধু একজনের জন্য – বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য। কারণ তিনি বামপন্থী সরকারের মুখ্যমন্ত্রী হলেও বুঝেছিলেন যে সবকিছুতে রাজনীতি করা ঠিক নয়। যেমন উন্নয়ন নিয়ে রাজনীতি করা ভীষণ অন্যায়। তাই তিনি রাজনীতির ঊর্ধ্বে উঠে রাজ্যের ছেলেমেয়েদের ভালর জন্যে বাংলায় শিল্প আনতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তাঁর পার্টিই তাঁকে পিছন থেকে ছুরি মারল। তাই তিনি হেরে গেলেন। নেহাত তিনি অসম্ভব ভদ্রলোক, তাই মুখ ফুটে বলেননি ‘ব্রুটাস, তুমিও?’ তাঁর হয়ে আনন্দবাজার আর অন্যান্য সংবাদমাধ্যমগুলোই বলে দিয়েছিল। বিধানচন্দ্র রায় যদি বাংলার রূপকার হন, বুদ্ধদেব তাহলে বাংলার অরাজনীতির জন্মদাতা। তিনি মনে করতেন উন্নয়ন অরাজনৈতিক, তাই পার্টির কৃষক সংগঠনকে না জানিয়ে সিঙ্গুরের জমির প্রতিশ্রুতি দিয়ে দেন রতন টাটাকে। তিনি মনে করতেন শিল্প অরাজনৈতিক, তাই সটান বলে দেন – তাঁর দুর্ভাগ্য যে তিনি এমন একটা পার্টি করেন যারা বনধ ডাকে। বোধহয় তিনি মনে করতেন রাজনীতিও অরাজনৈতিক হলেই ভাল হয়। সেই কারণেই অন্য বামপন্থী দলের কর্মীদের পিছনে পুলিস লাগানো, ইউএপিএ আইনে গ্রেফতার করা ইত্যাদি তাঁর আমলে বেড়ে গিয়েছিল। এসবে অবশ্য আমাদের, মানে ভদ্রলোকদের, কোনো আপত্তি ছিল না। কারণ ওই যে – রাজনীতি খুব খারাপ জিনিস। তখন বিস্তর লেখালিখি হয়েছিল, এখনো বলাবলি হয় – মানুষটা তো ভাল, কিন্তু পার্টিটাই যে খারাপ। মানে কোনোভাবে যদি তৃণমূল কংগ্রেসের সরকারের মুখ্যমন্ত্রী হতে পারতেন বুদ্ধবাবু, তাহলে ভদ্রলোক-ভদ্রমহিলারা সবচেয়ে খুশি হতেন।
এসব ব্যাপার মমতা ব্যানার্জি ভালই বুঝতেন। তাঁকে তো আর এমনি এমনি বড় নেত্রী বলা হয় না। তিনি বুদ্ধবাবুর মত বই-টই লেখা শুরু করলেন। তা দিয়ে ভদ্রলোকদের খুব একটা সন্তুষ্ট করতে পারেননি, কিন্তু একে একে সব জায়গা থেকে রাজনীতি তুলে দিয়ে যারপরনাই প্রিয় হয়েছেন। পশ্চিমবঙ্গে ২০১১ সালের পর থেকে আর কোনো সফল বনধ হয় না। কারণ যে নেত্রী নিজে বিরোধী থাকার সময়ে নিজেই ঘনঘন বনধ ডাকতেন, তিনি মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পরে আর বনধ ডাকেন না। কোনো বিরোধী দল বনধ ডাকলে সরকারি কর্মচারীদের আগের রাতে অফিসে থেকে যেতে হয়, নইলে যে করেই হোক অফিসে পৌঁছতে হয়। ‘ব্রেক অফ সার্ভিস’ ইত্যাদি হুমকি থাকে। বামফ্রন্ট আমলে হাতে মাথা কাটা কো-অর্ডিনেশন কমিটির বিপ্লবী নেতারা কোথায় গেলেন? বিপন্ন সরকারি কর্মচারীরা অনেকসময় বুঝে পান না। বাস ইউনিয়ন, ট্যাক্সি ইউনিয়ন, অটো ইউনিয়ন, টোটো ইউনিয়ন – সবই যেহেতু বাম আমলের মতই শাসক দলের দখলে সেহেতু বনধ ব্যর্থই হয়। কিন্তু কাজ হয় কি? শনি, রবিবারকে কোনো ছুটির দিনের সঙ্গে একদিন বেশি ছুটি দিয়ে যোগ করে দেওয়া, পুজোর অনুদানের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে পুজোর ছুটি বৃদ্ধি – এসব তো হয়েই চলেছে। অবশ্য অরাজনৈতিক কারণে কাজ বন্ধ থাকলে পশ্চিমবঙ্গে কেউ আপত্তি করে না। যত দোষ, রাজনীতি ঘোষ।
পশ্চিমবঙ্গের শ্রমিকরাও আর রাজনীতি করেন না। বাম আমলের প্রবল প্রতাপান্বিত সিটু নিষ্প্রভ। শাসক দলের শ্রমিক সংগঠন শ্রমিকদের অধিকারের জন্যে কী করে কেউ জানে না। কিন্তু বাংলায় শিল্প এসেছে কি? বাংলায় শিল্পপতিরা বছর বছর আসতেন বর্ণাঢ্য শিল্প সম্মেলনে। বাংলায় সৌরভ গাঙ্গুলির মত নতুন শিল্পপতির জন্মও দেখা গেছে তৃণমূল শাসনে। কিন্তু শিল্প কোথায়? শিল্পপতির দেখা পেলেও শিল্পের দেখা না পেয়ে বোধহয় স্বয়ং মুখ্যমন্ত্রীও হতাশ হয়ে পড়েছেন। তাই এবছর আর বিশ্ব বঙ্গ বাণিজ্য সম্মেলন হচ্ছে না।
পশ্চিমবঙ্গের স্কুল নিয়ে বলতে শুরু করলে তো এ লেখা আর শেষ হবে না। বাম আমলের নিখিলবঙ্গ শিক্ষক সমিতির চেয়ে ঢের বেশি দাপট নিয়ে স্কুলে স্কুলে রয়েছে শুধুমাত্র তৃণমূলের শিক্ষক সংগঠন শিক্ষা সেল। বহু স্কুলে প্রধান শিক্ষক নেই, বছরের পর বছর কাজ চলছে ‘টিচার ইন চার্জ’ দিয়ে। বলা বাহুল্য তাঁরা কারা। তাঁদের অনেকের সঙ্গেই শিক্ষকদের গোলমাল গড়াচ্ছে আদালত পর্যন্ত। রাজনীতি নেই, সংগঠন নেই। তাই একা একাই লড়তে হচ্ছে শিক্ষকদের। অবশ্য সে তো সামান্য ব্যাপার। তার চেয়ে অনেক বড় কথা হল, কোনো স্কুলে ছাত্রছাত্রী আছে অথচ মাস্টার নেই। কোথাও আবার মাস্টার আছে অথচ ছাত্রছাত্রী নেই। কেন নেই? সে কেলেঙ্কারি কে না জানে! কিন্তু তা নিয়ে আজ অবধি বিরোধীরা কোনো বড় রাজনৈতিক আন্দোলন করতে পারলেন না। চাকরিপ্রার্থীরা অবশ্য রাজনীতি দূরে রাখার চেষ্টা করে গেছেন আপ্রাণ। মাঝরাত্তিরে পুলিস মহিলা আন্দোলনকারীদের পর্যন্ত টেনে হিঁচড়ে রাস্তা থেকে তুলে নিয়ে গেলেও তাঁরা বলেছেন ‘আমরা কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত নই’। কারণ ওই যে – রাজনীতি খুব খারাপ জিনিস। সে না হয় হল, কিন্তু স্কুলে লেখাপড়া হচ্ছে কি? স্কুলগুলো তো বন্ধ হতে বসেছে। রমরমা বেড়েছে বেসরকারি শীতাতপনিয়ন্ত্রিত স্কুলের। তাতে অবশ্য ভদ্রলোকদের অসুবিধা নেই। ছেলেমেয়েকে ওসব স্কুলে পড়ানোর রেস্ত তাঁদের আছে। তাছাড়া ওইসব স্কুলের একটা বড় গুণ হল – রাজনীতি নেই।
আমাদের বাবা-মায়েদের স্বপ্ন পূরণ করে মমতা কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়েও রাজনীতি বন্ধ করে দিয়েছেন। যাদবপুর বা প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয়ের মত দু-একটা ব্যতিক্রম বাদ দিলে সর্বত্র জাঁকিয়ে বসেছে একমেবাদ্বিতীয়ম তৃণমূল ছাত্র পরিষদ। মাঝে আবার কলেজে ভর্তি হতে গেলে তাদের মোটা টাকা উৎকোচ দিতে হচ্ছিল। নিজে বকাঝকা করেও তা বন্ধ করতে না পেরে কলেজে ভর্তির ব্যবস্থা অনলাইন করে ফেলেছে মমতা সরকার। ছাত্র ইউনিয়নের নির্বাচন বন্ধ সেই ২০১৭ সাল থেকে। আগে নাকি ছাত্রছাত্রীরা রাজনীতি করত বলে কলেজে লেখাপড়া হত না। এখন ছেলেমেয়েরা আর কলেজমুখো হতেই চাইছে না। নামকরা কলেজেও আসন খালি পড়ে থাকছে। কারণ ছাত্রছাত্রীরা জানে, জাতীয় শিক্ষানীতি আর রাজ্য শিক্ষানীতি (এবং দুর্নীতি) মিলিয়ে যা অবস্থা তাতে কলেজে পড়ে ভাত জোটানোর ব্যবস্থা হবে কিনা তার ঠিক নেই। এ রাজ্যে তো স্কুল, কলেজে শিক্ষক নিয়োগও প্রায় বন্ধ। এমএ/এমএসসি, এমনকি পিএইচডি করা ছেলেমেয়েরা সরকারি চাকরিপ্রাপ্ত শিক্ষাকর্মীদের চেয়েও কম বেতনে পড়াতে বাধ্য হচ্ছে আংশিক সময়ের অধ্যাপক হিসাবে অথবা দেদার অনুমোদন দিয়ে রাখা বেসরকারি নড়বড়ে কলেজে। অর্থাৎ কলেজ থেকে রাজনীতি তাড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে শিক্ষাকেও তাড়ানো হয়েছে।
মানে রাজ্যের সবকিছু অরাজনৈতিক হয়ে একটাও উপকার হয়েছে বলা যাবে না। তবু কিন্তু বাঙালির অরাজনীতি প্রেম অম্লান। সংসদে দাঁড়িয়ে যখন নরেন্দ্র মোদী বা অমিত শাহ যে কোনো বিষয়ে ফাঁপরে পড়লেই বলেন ‘বিরোধীরা রাজনীতি করছে’, আমাদের হাসি পায় না, রাগও হয় না। তৃণমূল কংগ্রেস নেতারা ওরকম বললেও আমাদের এখনো মনে হয় – ঠিকই বলছে। যে কোনো আন্দোলনকে বদনাম করার, নাগরিকদের চোখে হেয় করার একই উপায় বিজেপি ও তৃণমূল অবলম্বন করে – ‘দাবি ন্যায্য। কিন্তু বিরোধীরা এ নিয়ে রাজনীতি করছেন।’ যেন রাজনীতি করা এদেশে নিষিদ্ধ। একমাত্র ক্ষমতাসীন পক্ষই যে রাজনীতি অপছন্দ করে তা আমরা খেয়ালই করি না। ক্ষমতাসীনদের সুরে সুর মিলিয়ে আমরা রাজনীতি চাই না, অথচ গণতন্ত্র চাই। মানে স্নান করব, কিন্তু চুল ভেজাব না। অরাজনীতির সাধনা যে আমাদের প্রকৃতপক্ষে হিংস্র একদলীয় শাসনের দিকে নিয়ে গেছে, তা আমরা বুঝেও বুঝতে চাই না। জাতীয় স্তরে কী চলছে সে তো সবাই জানে। অন্য রাজ্যের বহু মানুষ এই অরাজনীতির ফাঁকি ধরে ফেলেছেন। তাই বিজেপিকে ছেঁটে দিয়েছেন ২০২৪ লোকসভা নির্বাচনে। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের অবস্থা কী?
এখানে দ্বিমেরু ভোট হওয়ায় বিজেপির আসন অনেক কমে গেলেও, ভোট কিন্তু বিশেষ কমছে না। উপরন্তু শুধু যে পঞ্চায়েত নির্বাচন ব্যাপারটা পরপর দুবার প্রহসনে পরিণত হল তা নয়, আর সব কলেজের মত মেডিকাল কলেজগুলোতেও প্রায় মাফিয়া হয়ে উঠেছে শাসক দলের ছাত্র সংগঠন। তৃণমূল কংগ্রেস সংলগ্ন ডাক্তার-অধ্যাপকদের একাংশের প্রশ্রয়ে আর জি কর মেডিকাল কলেজ ও হাসপাতাল যে নরককুণ্ড হয়ে উঠেছে তা এখন নিজ মুখে স্বীকার করছেন তৃণমূলেরই নেতা শান্তনু সেন। অবশ্য ওই হাসপাতালের স্নাতকোত্তর স্তরের ছাত্রীর নৃশংস ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ড না ঘটলে এবং নিজের মেয়ে ওই কলেজেরই ছাত্রী না হলে শান্তনু মুখ খুলতেন কিনা সন্দেহ।
আর জি করে অন্য ইউনিয়ন করতে গেলে ছাত্রছাত্রীদের কী হাল করা হয় তা কিন্তু আগেও এই ওয়েবসাইটেই প্রকাশিত হয়েছে। এবারের হত্যাকাণ্ডের মত আরও কত কাণ্ড অন্য মেডিকাল কলেজগুলোতে হওয়ার অপেক্ষায় আছে আমরা জানি না। অথচ আমরা সকলেই বুঝি, এমন আরও ঘটনা অনিবার্য। তবু শাসককে প্রশ্ন করার থেকে বাঙালি ভদ্রজনের কাছে এখনো বেশি গুরুত্বপূর্ণ অরাজনৈতিক থাকা। তাই এবারের স্বাধীনতা দিবস শুরু হল মধ্যরাতে মহিলাদের ডাকা যে আন্দোলন দিয়ে, সেই আন্দোলনের হোতারা বারবার ঘোষণা করে গেলেন – এটা অরাজনৈতিক আন্দোলন। বিখ্যাত অভিনেত্রী সোহিনী সেনগুপ্ত টিভি স্টুডিওতে বসে ধর্ষণ আটকাতে গেলে সমাজের, শিক্ষাব্যবস্থার কী কী সংস্কার করা দরকার সেসব বলার পাশাপাশি জোর দিয়ে বললেন – সরকারি রোষানলে তাঁকে কখনো পড়তে হয়নি। তাই সরকারের বিরুদ্ধে তাঁর কোনো রাগ নেই। এই আন্দোলন মহিলাদের নিরাপত্তা বিষয়ক। তাই কেউ যদি কোনো রাজনৈতিক পতাকা নিয়ে আসে, তাহলে তাকে ‘rudely’ বারণ করা হবে। অরাজনৈতিক সঞ্চালক সুমন দে বা স্টুডিওতে উপস্থিত রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিরাও তাঁকে প্রশ্ন করলেন না, এ রাজ্যের মহিলাদের নিরাপত্তা দেওয়ার দায়িত্ব কার? ভগবানের? তাহলে সরকারের দায়িত্ব কী? সোহিনীকে সরকারি রোষানলে পড়তে হয়নি বলেই যদি সরকারের বিরুদ্ধে তাঁর কোনো বক্তব্য না থাকে, তাহলে আর পাঁচজনের সঙ্গে আন্দোলনে নামার প্রয়োজন কী? আন্দোলনের কেন্দ্রে কি তাঁর স্বার্থ, নাকি যে মেয়েটি নৃশংসভাবে খুন হয়েছে তার স্বার্থ? বিখ্যাতরা এইরকম গা বাঁচানো অবস্থান নিয়ে দিব্যি চলতে পারেন, কারণ সরকারকে যদি বা সংবাদমাধ্যম ক্কচিৎ কদাচিৎ প্রশ্নের মুখে ফেলে, বিখ্যাতদের ফেলে না। তাই পরমব্রত চট্টোপাধ্যায়ও মাঝরাতে অ্যাকাডেমি অফ ফাইন আর্টসের সামনে দাঁড়িয়ে অবলীলাক্রমে বলে যেতে পারেন – কলকাতা দেশের অন্যান্য শহরের থেকে মহিলাদের নিরাপত্তায় এখনো অনেক এগিয়ে। তাই তো এরকম ঘটনা বেশি আঘাত দেয়। তাই তো তাঁরা পথে নেমেছেন। এটা এ দল বনাম ও দলের বিষয় নয় ইত্যাদি।
যে ঘটনার প্রতিবাদে মহিলারা রাস্তায় নেমেছিলেন বুধবার রাতে, সেটা ঘটেছে সরকারি হাসপাতালে। সরকার চালাচ্ছে একটা দল, সেই দলেরই অধীনে রয়েছে পুলিস। সেই পুলিসের বিরুদ্ধেই তথ্যপ্রমাণ লোপাটের অভিযোগ উঠেছে। সরকারি দলের নেতা এক ডাক্তারই মেডিকাল কলেজটা চালান, তিনিই কটু মন্তব্য করেছিলেন মৃতার বিরুদ্ধে। সেই মন্তব্যের প্রতিবাদেই রাতের দখল নেওয়ার ডাক। তাঁরই বিরুদ্ধে উঠেছে মারাত্মক সব অভিযোগ। সুতরাং পরমব্রত ঠিকই বলেছেন। এটা এ দল বনাম ও দলের বিষয় তো নয়ই। এটা একটাই দল বনাম মৃতার পরিবারকে ন্যায়বিচার পাইয়ে দেওয়ার বিষয়। অথচ তিনি ওই দলটার নামে কিছু বলবেন না। কারণ ওই যে – রাজনীতি খুব খারাপ জিনিস।
আনন্দের কথা, অরাজনীতির ধ্বজাধারীদের ডাকে যে হাজার হাজার অখ্যাত মহিলা (এবং পুরুষ) বুধবার রাতে পথে নেমে এসেছিলেন পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন জায়গায় এবং দেশের বিভিন্ন শহরে, তাঁরা এসব ন্যাকামি বোঝেন না। তাঁরা দ্ব্যর্থহীন ভাষায় আর জি কর হাসপাতালের মৃতা ছাত্রীর জন্যে ন্যায়বিচার চেয়ে স্লোগান তুলেছেন। অনেকে টিভি ক্যামেরার সামনে সরাসরি বলেছেন, যাকে গ্রেফতার করা হয়েছে সে সাক্ষীগোপাল। আসল অপরাধীদের ধরতে হবে এবং শাস্তি দিতে হবে। সরকারের কাছ থেকে সরাসরি জবাবদিহি চেয়েছেন তাঁরা। এসব দৃশ্য কালীঘাটের বাড়িতে বসে টিভিতে দেখে মমতা হয়ত অবাক হয়েছেন। অভিমানও করে থাকতে পারেন। তাঁর সরকার এই ‘বেনজির অরাজনৈতিক আন্দোলনের’ (এবিপি আনন্দের ভাষায়) সঙ্গে যে সহযোগিতা করেছে, তার এই প্রতিদান হয়ত তিনি আশা করেননি।
আন্দোলনের হোতারা এতে খুশি হলেন না রেগে গেলেন, তা-ই বা কে জানে! তাঁরা তো ব্যাপারটা অরাজনৈতিক রাখতেই চেয়েছিলেন। তাঁদের তো লক্ষ্য ছিল রাতের দখল নেওয়া, সরকারের বিরোধিতা করা তো নয়। অরাজনৈতিক বলে যে কিছু হয় না তা হয়ত তাঁরা ভুলে গিয়েছিলেন। ফলে রাশ আর হাতে থাকেনি, রাস্তায় নেমে আসা মানুষ সরকারের বিরুদ্ধে পুঞ্জীভূত ক্ষোভ উগরে দিয়েছে। আসলে দুনিয়ায় অরাজনৈতিক বলে যে কিছু হয় না, এটা যেমন ভোলা চলে না, তেমনি একথা ভুললেও চলে না যে জনতা সকলকে চমকে দিতে পারে। বুধবার রাতেও দিয়েছে। নইলে যে কাগজ একদা লিখত ‘যে দেশে ব্রিগেড নাই সেখানে কি গণতন্ত্র নাই?’, তারই টিভি চ্যানেলকে বুধবার লিখতে হত না ‘বিবেকের ডাকে বাংলা জুড়ে ব্রিগেড’। অবশ্য এর মানে হয়ত এটাও হতে পারে, যে ব্রিগেডেও আপত্তি নেই। যদি সেটা অরাজনৈতিক ব্রিগেড হয়।
মুশকিল হল, অরাজনৈতিক আন্দোলন একবিংশ শতাব্দীতে সারা বিশ্বে বেশ কেতাদুরস্ত হয়ে দাঁড়ালেও কোনো পরিবর্তন ঘটাতে পারেনি, যতক্ষণ না প্রবলভাবে রাজনৈতিক হয়ে উঠেছে। বাংলাদেশে সম্প্রতি যা ঘটেছে তা থেকেও একথাই প্রমাণ হয়। তবে পরিবর্তন ঘটাক আর না-ই ঘটাক, পশ্চিমবঙ্গের ভদ্রমহিলারা যে পথে নেমে আন্দোলন করার প্রয়োজন স্বীকার করেছেন – এটা নিঃসন্দেহে ভাল লক্ষণ। রাত তো দখল হল। আশা করি এরপর থেকে কলকাতার রাস্তায় দিনে মিছিল, জমায়েত বা অবরোধ দেখলে তাঁরা আর বিরক্ত হবেন না। ব্রিগেডে বা একুশে জুলাইয়ের মিটিংয়ে গ্রাম, মফস্বল থেকে আসা মানুষকে দেখে নাক সিঁটকে বলবেন না ‘চিড়িয়াখানা, ভিক্টোরিয়া বেড়াতে এসেছে।’ যার গায়ে লাঠি এসে পড়ে, তার জন্যে রাস্তাই যে একমাত্র রাস্তা – এটুকু মেট্রো, নিজের গাড়ি বা অ্যাপ ক্যাবে চেপে রাত দখল করতে আসা মহিলারা বুঝলেই অরাজনীতির বিরুদ্ধে স্বাধীনতা সংগ্রাম বেশ খানিকটা এগোবে। আর না বুঝলে?
বুধবার রাতেই কে বা কারা আর জি কর হাসপাতালে ঢুকে পড়ে তাণ্ডব চালিয়েছে, এমার্জেন্সি ডিপার্টমেন্টে ভাংচুর করেছে। আন্দোলনরত একমাত্র রাজনৈতিক শক্তি ভারতের গণতান্ত্রিক যুব ফেডারেশন ওই চত্বরে যেখানে অবস্থান বিক্ষোভ করছিল সেই জায়গাটা ভেঙে দেওয়া হয়েছে। তৃণমূল কংগ্রেসের দু নম্বর নেতা অভিষেক ব্যানার্জি জানিয়ে দিয়েছেন, ডাক্তারদের আন্দোলন ন্যায্য। তাঁদের নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। এসব যারা করেছে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
মানে নির্ঘাত স্বাধীনতা দিবস থেকেই ধর্ষণ, খুনের ঘটনার চেয়ে বড় করে তোলা হবে সরকারি হাসপাতালে হামলার ঘটনাকে। অন্যদিকে শনিবার থেকে মমতার দলই পথে নামবে মৃতাকে ন্যায়বিচার পাইয়ে দেওয়ার দাবিতে। অর্থাৎ যাঁর অধীন হাসপাতাল প্রশাসন ঘটনা ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করল, প্রমাণ লোপাট করতে হাসপাতালে ভাঙাভাঙি শুরু করে দিয়েছিল, সেই প্রশাসনের মাথাকে যিনি অন্য হাসপাতালে পুনর্বাসন দিয়েছিলেন – সেই স্বাস্থ্যমন্ত্রী ও পুলিসমন্ত্রীই এবার আন্দোলনকারী সাজবেন। বুধবার রাতের আন্দোলনের হোতাদের যুক্তি মানলে এতে কোনো অসঙ্গতি নেই। কারণ ব্যাপারটার মধ্যে রাজনীতি টেনে আনা অনুচিত। ব্যাপারটা নারী অধিকার সংক্রান্ত। মুখ্যমন্ত্রী নিজে নারী। অতএব।
অরাজনীতির হাত থেকে স্বাধীন হতে না পারলে মানুষকে বোকা বানানোর এই চেষ্টা পশ্চিমবঙ্গে চলতেই থাকবে। আশা করা যাক, বুধবার রাতের পর বাঙালি ভদ্রমহিলারা আর বোকা বনবেন না।
ভিনেশ ফোগত যে প্যারিস থেকে খালি হাতে ফিরছেন, তা একরকম ভালই হল। কারণ তাঁর যে পদকটা প্রাপ্য, সেটা দেওয়ার সাধ্য আন্তর্জাতিক অলিম্পিক কমিটির (আইওসি) নেই। সে পদক আজ থেকে ৬৪ বছর আগে মহম্মদ আলি বিসর্জন দিয়েছেন ওহায়ো নদীর জলে। ঈশপের গল্পের মত কোনো দেবী উঠে এসে তো আর সে পদক ভিনেশের গলায় পরিয়ে দেবেন না। তার জায়গায় অন্য কোন পদক মানাবে?
খবরে প্রকাশ, শেষপর্যন্ত প্যারিস অলিম্পিকে কুস্তিতে ভারতকে পদক এনে দিলেন যিনি, সেই অমন শেরাওয়াতও ব্রোঞ্জ পদকের জন্য লড়াইয়ের আগের রাতে দু-এক কেজি নয়, সাড়ে চার কেজি বেশি ওজনে পৌঁছে গিয়েছিলেন। তারপর সেই ওজন কমাতে অমন আর তাঁর দুই কোচ – জগমন্দর সিং আর বীরেন্দর দাহিয়া – সারারাত কী করলেন? প্রথমে দুজনে অমনের সঙ্গে দেড় ঘন্টা কুস্তি লড়লেন ম্যাটে। তারপর এক ঘন্টার হট বাথ। তারপর রাত সাড়ে বারোটা থেকে এক ঘন্টা অমন ট্রিডমিলে একটুও না থেমে দৌড়ে গেলেন। অতঃপর আধ ঘন্টার বিরাম, যাতে ঘাম ঝরে এবং সেই সূত্রে ওজন খানিকটা কমে। তারপর পাঁচ মিনিট করে পাঁচবার সাওনায় বসা। তারপরেও অমনের ওজন ৫৭ কেজির চেয়ে ৯০০ গ্রাম বেশি ছিল। তারপর তাঁকে আচ্ছা করে দলাই মলাই করা হয় এবং দুই কোচ অমনকে হালকা জগিং করতে বলেন। এরপর পাঁচবার ১৫ মিনিট করে দৌড়। শেষে ভোর সাড়ে চারটের সময়ে দেখা যায় অমনের ওজন ৫৬.৯ কেজি হয়ে গেছে। তবে নিশ্চিন্দি।
এখন কথা হল, এক ভারতীয় কুস্তিগিরের ওজন যদি ঘন্টা দশেকের মধ্যে ৪.৬ কেজিরও বেশি কমিয়ে ফেলা যায়, তাহলে অন্য একজনের ওজন কিলো তিনেক কমানো গেল না কেন? ভারতীয় দলের চিফ মেডিকাল অফিসার দিনশ পারদিওয়ালা বলেছেন সম্ভাব্য সবকিছু করার পরেও ১০০ গ্রাম ওজন বেশি থেকেই গেছে।
Dr. Dinshaw Pardiwala explains what went into Vinesh Phogat's weight cut efforts:
Weight cuts cause weakness and energy depletion, which are counterproductive to participation. So wrestlers will resort to some energy restoration with limited water and high-energy foods, usually… pic.twitter.com/N9OvrkoeFG
হিন্দুস্তান টাইমসের এক প্রতিবেদন বলছে, গোলমালটা পেকেছে হিসাবের ভুলে। শুনতে অদ্ভুত লাগলেও একদিনে তিনটে কুস্তি ম্যাচ খেলার পরেও ওজন বেড়ে যাওয়া অস্বাভাবিক নয়। একথা কুস্তিগিররা জানেন, তাঁদের পরিচর্যার দায়িত্বে থাকা কোচ, ফিজিও, ডাক্তার, নিউট্রিশনিস্ট – সকলেই জানেন। কিন্তু ভিনেশের নিউট্রিশনিস্টের নাকি হিসাব ছিল, ওজন দেড় কেজি বাড়বে। অথচ জাপানের অপরাজেয় কুস্তিগির ইউয়ি সুসাকি সমেত তিনজনকে হারানোর পরে দেখা যায় ভিনেশের ওজন ২.৭ কেজি বেড়ে গেছে। সারারাত পরিশ্রম করেও শেষরক্ষা হয়নি। ভিনেশের চুল কেটে দিয়েও চেষ্টা করা হয়েছিল।
আমরা জানি, পৃথিবীতে বড় বড় ব্যাপারে দুরকমের ভুল হয় – ইচ্ছাকৃত ও অনিচ্ছাকৃত। দিয়েগো মারাদোনা যেমন ১৯৯৪ ফুটবল বিশ্বকাপ চলাকালীন এফিড্রিন নামক একটি নিষিদ্ধ ড্রাগ সেবন করে ডোপ পরীক্ষায় ধরা পড়ে বলেছিলেন, তাঁর ডাক্তার তাঁকে কী ওষুধ খাইয়ে দিয়েছেন তিনি জানেন না। অর্থাৎ তিনি জানতেন না যে ওই ওষুধে কোনো নিষিদ্ধ ড্রাগ আছে। মারাদোনার দাবির সত্যতা প্রমাণিত হয়নি, কারণ তাঁর সেই ব্যক্তিগত ডাক্তারটিকে আর্জেন্টিনা শিবিরের ত্রিসীমানায় পাওয়া যায়নি। অবশ্য ডোপ করে ধরা পড়ার পরে অনেক অ্যাথলিটই ঠিক মারাদোনার যুক্তিই দিয়ে থাকেন। মারিয়া শারাপোভাও তাঁর আত্মজীবনীতে তেমনটাই লিখেছেন। সুতরাং মনে করার কারণ আছে যে ওটা ইচ্ছাকৃত ভুল। ভিনেশের বেলায় অবশ্য কোনো অসদুপায় অবলম্বন করার চেষ্টা ছিল না। কুস্তি এবং বক্সিং এমন দুটো খেলা, যেখানে ওজনের ভিত্তিতে খেলোয়াড়দের ভাগ করা হয় এবং প্রায় সব খেলোয়াড়ই নিজের চেয়ে কিছুটা কম ওজনের বিভাগে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। বাড়তি ওজনটুকু নিয়ামক সংস্থার ওজন যন্ত্রে ওঠার (যার পোশাকি নাম ওয়ে-ইন) আগে কমিয়ে ফেলেন নানা উপায়ে। ঠিক যেমন অমন কমিয়েছিলেন ব্রোঞ্জ পদকের জন্য ম্যাচের আগের রাতে। ভিনেশের অতখানি ওজন না কমালেও চলত। যেটুকু দরকার তাও যে করা গেল না, তার জন্য দায়ী কি ইচ্ছাকৃত ভুল, না অনিচ্ছাকৃত ভুল?
মজার কথা, অমনের কোচেরা বলেছেন যে ভিনেশের ঘটনায় তাঁরা তৎপর হয়ে গিয়েছিলেন। যদিও ওই দুজন ভিনেশের ব্যক্তিগত কোচ নন (তাঁর কোচ বিদেশি, নাম ওলার অ্যাকোস), তবু এই কথা থেকে কি ধরে নেওয়া যায় যে ভারতীয় দল ভিনেশের ফাইনাল গুবলেট হওয়ার আগে পর্যন্ত গদাই লস্করি চালে চলছিল? ষড়যন্ত্রের তত্ত্বে না গিয়েও বলা যায়, এরকম মনে করা ভুল নয়। কারণ নিউট্রিশনিস্টের ভুল যদি ঐতিহাসিক অনিচ্ছাকৃত ভুলও হয়, ভিনেশের হয়ে কোর্ট অফ আরবিট্রেশন ফর স্পোর্টে (ক্যাস) আবেদন জানাতে যে গড়িমসি করা হয়েছিল তা তো প্রকাশ করেই দিয়েছেন ভিনেশের আইনজীবী রাহুল মেহরা।
1. During Olympic Games, every host city (in this case Paris) has to have a panel of pro bono lawyers which is set up during the period of the Games to fight cases on behalf of athletes;
বস্তুত, ক্যাস ভিনেশের আবেদন গ্রহণ করে যে বিবৃতি দিয়েছিল তাতেও বলা হয়েছে, আবেদনকারী কোনো অন্তর্বর্তী স্থগিতাদেশের আবেদন করেননি। করলে কিন্তু ভিনেশের বিভাগের ফাইনাল স্থগিত রাখার নির্দেশও দিতে পারত ক্যাস (রায় দান পিছোতে পিছোতে এখন ১৩ অগাস্ট তারিখ ধার্য হয়েছে)। কিন্তু সেসব হবে কী করে? ভারতীয় অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশন (আইওএ) তো তখনো নিজেদের আইনজীবীই নিয়োগ করে উঠতে পারেনি। অলিম্পিক আয়োজকদের দ্বারা নিযুক্ত প্যারিস বারের ফরাসি আইনজীবীরাই উদ্যোগ নিয়ে ভিনেশের হয়ে আবেদন করেছেন। তাঁরা যতটুকু করেছেন, ততটুকুই হয়েছে। এই দীর্ঘসূত্রিতা দুর্বোধ্য, কারণ ভিনেশ যে ফাইনালে লড়তে পারবেন না সে খবর গত বুধবার আইওসি সরকারিভাবে ঘোষণা করার আগেই ভারতের সবচেয়ে ক্ষমতাবান মানুষ – প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী – ভিনেশের লড়াইকে সেলাম-টেলাম জানিয়ে দিয়েছিলেন। যদিও মঙ্গলবার যখন অসাধ্য সাধন করে ভিনেশ পদক নিশ্চিত করলেন তখন প্রধানমন্ত্রী কোনো সোশাল মিডিয়া পোস্ট করেননি।
Vinesh, you are a champion among champions! You are India's pride and an inspiration for each and every Indian.
Today's setback hurts. I wish words could express the sense of despair that I am experiencing.
At the same time, I know that you epitomise resilience. It has always…
মোদ্দাকথা যতক্ষণে ভিনেশের হয়ে ক্যাসে আবেদন জানানো হয়েছে, ততক্ষণে স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী ঘটনা সম্পর্কে অবগত। তবু হরীশ সালভের মত বড় উকিলকে নিযুক্ত করতে দেরি হয়েছে। অর্থাৎ সাধারণ ভারতীয় ক্রীড়াপ্রেমী ভিনেশের ঘটনায় যতটা মর্মাহত হয়েছেন, ভারতীয় কুস্তি বা অলিম্পিক সংস্থা কিম্বা দেশের হোমরা চোমরারা মোটেই ততটা হননি। বিজেপি আই টি সেলের পক্ষ থেকে ভিনেশকে কটাক্ষ করে নানারকম পোস্টও চালু হয়ে গিয়েছিল। সম্ভবত সংসদে বিরোধীদের হইচই, ওয়াক আউট এবং সোশাল মিডিয়ায় বেশিরভাগ মানুষের সহানুভূতি ভিনেশের দিকে থাকা – এই ত্র্যহস্পর্শে হরিয়ানার বিধানসভা নির্বাচনের আগে জনমত আরও সরকারবিরোধী হয়ে যাওয়ার ভয়ে হোমরা চোমরারা গা ঝাড়া দিয়ে ওঠেন।
এই কারণেই বলা, মহম্মদ আলির ফেলে দেওয়া পদকের ন্যায্য দাবিদার আমাদের ভিনেশ। আলি (তখন ক্যাসিয়াস ক্লে) দুনিয়ার সেরা বক্সার হয়েও সাদা চামড়ার লোকেদের রেস্তোরাঁয় বন্ধুদের নিয়ে খাবার খেতে পারেননি, গলাধাক্কা খেয়েছিলেন। কারণ তিনি কালো মানুষ হয়ে জন্মেছিলেন। আর প্রায় কেরিয়ার শেষ করে দেওয়া আঘাত কাটিয়ে, অসম্ভব শারীরিক বেদনা সহ্য করে ভিনেশের কুস্তির ম্যাটে ফিরে আসা জয়যুক্ত হল না, কারণ তাঁর দেশে মেয়ে হয়ে জন্মালে কেবল ভাল খেলোয়াড় হওয়া যথেষ্ট নয়। কোনো সন্দেহ নেই, ভিনেশ যদি আমাদের দেশের লক্ষ্মী ছেলে ক্রিকেটারদের মত লক্ষ্মী মেয়ে হতেন, নিয়মিত শাসক দল বিজেপির বিভিন্ন রাজনৈতিক এজেন্ডার পক্ষ নিয়ে সোশাল মিডিয়ায় পোস্ট করতেন, তাহলে তাঁর হয়ে সাত তাড়াতাড়ি ক্যাসে ছুটে যেত ভারতীয় অলিম্পিক সংস্থা। বিশিষ্ট ক্রীড়াপ্রেমী নীতা আম্বানিও নির্ঘাত কিছু একটা করতেন, সেটা ন্যায্যই হোক আর অন্যায্যই হোক। কিন্তু ভিনেশ যে ম্যাটের বাইরেও কুস্তি বজায় রেখেছেন।
বিজেপি সাংসদ ব্রিজভূষণ শরণ সিংয়ের বিরুদ্ধে ধর্ষণ, অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়ে কুস্তিগিরদের হয়রানি ইত্যাদি অভিযোগ নিয়ে রাস্তায় নেমে আন্দোলন করেছেন বলে মোদীজি অন্তর্ঘাত ঘটিয়ে ভিনেশের সোনা জেতার পথ রুদ্ধ করেছেন – এমন বলছি না। কারণ বলার মত যথেষ্ট প্রমাণ আমাদের হাতে নেই। কিন্তু নিজের শরীরের ওজন ৫৬ কেজির আশেপাশে হওয়া সত্ত্বেও ভিনেশকে ৫০ কেজি ফ্রিস্টাইলে লড়ার সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছিল, কারণ চোট সারানোর চিন্তা ছেড়ে, কুস্তি ছেড়ে তাঁকে রাস্তায় বসে থাকতে হয়েছে দিনের পর দিন। দিল্লি পুলিস টানতে টানতে নিয়ে গেছে রাস্তা দিয়ে। সেসবের পর শেষমেশ লিগামেন্টের চোটের জন্য অস্ত্রোপচার হয়েছে ২০২৩ সালের ডিসেম্বর মাসে।
অস্ত্রোপচারের পর প্রথম যেদিন ম্যাটে পা রাখেন, সেদিন কয়েক পা হেঁটেই যন্ত্রণায় লুটিয়ে পড়েছিলেন। এদিকে ততদিনে ৫৩ কেজি ফ্রিস্টাইল কুস্তিতে উঠে এসেছেন অন্তিম পাঙ্ঘেল। ফলে আবার অলিম্পিকের যোগ্যতা অর্জন করতে হলে নিজের ওজনের চেয়ে আরও কম ওজনের বিভাগে যাওয়া ছাড়া উপায় ছিল না ভিনেশের। এতখানি ওজন কমানো এবং প্রতিযোগিতা চলাকালীন কম রাখা মোটেই সহজ নয়। এবছর এপ্রিল মাসে কিরগিজস্তানের রাজধানী বিশকেকে যোগ্যতার্জন প্রতিযোগিতার আগের রাতেও ওজন কমানোর জন্য অমানুষিক পরিশ্রম করতে হয়েছিল ভিনেশকে। কোচ অ্যাকোসের বন্ধুর বাড়ির সাওনায় ৯৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস উষ্ণতায় বসে থাকতে হয়েছিল ১৫+১৫ = ৩০ মিনিট। তখন আবার কোচ শুকনো ডাল পাতা দিয়ে তাঁকে মারছিলেন, যাতে ঘাম বেরোয়, ওজন কমে। অত লড়াই করতে হয়েছিল ৭০০ গ্রাম ওজন কমানোর জন্যে। এই লড়াইয়ে বারবার জেতা শক্ত। ২০১৬ অলিম্পিক পর্যন্ত কুস্তির প্রথম রাউন্ড থেকে ফাইনাল পর্যন্ত লড়াই একই দিনে হত। সে নিয়ম চালু থাকলে হয়ত ভিনেশের ম্যাটের বাইরের লড়াইটা এত বড় হয়ে দাঁড়াত না।
থাক, না-ই বা জিতলেন অলিম্পিক পদক। সকলেই যদি জিতে যায়, তাহলে যারা কিছুই জেতে না তারা লড়ে যাওয়ার অনুপ্রেরণা পাবে কাকে দেখে? ভিনেশ তো ঠিকই বুঝেছেন। গোটা জীবনটাই তো কুস্তির ম্যাট। প্রতিপক্ষও অসংখ্য এবং নানারকম।
মানুষ যে আজও জাতের ভিত্তিতে অন্যায়ের সম্মুখীন হন, তা বাঙালিরা অনেকে বিশ্বাসই করেন না।
চিরাগ পাসোয়ান বেজায় চটেছেন। কে তিনি? তিনি এখন কেবল রামবিলাস পাসোয়ানের ছেলে নন। রীতিমত কেন্দ্রীয় মন্ত্রী এবং এনডিএ সরকারের অন্যতম শরিক। কার উপর চটেছেন? দেশের সর্বোচ্চ আদালতের একটা রায়ের উপর। গত সপ্তাহে সুপ্রিম কোর্টের সাত বিচারপতির সাংবিধানিক বেঞ্চ রায় দিয়েছে – তফসিলি জাতি, উপজাতির মানুষের জন্য সরকারি চাকরি এবং শিক্ষায় যে সংরক্ষণের ব্যবস্থা আছে তার মধ্যে আলাদা করে বেশি পিছিয়ে থাকা শ্রেণিগুলোর জন্যে রাজ্য সরকারগুলো সংরক্ষণের ব্যবস্থা করতে পারবে।
এই রায়ে কেন চিরাগ চটে গেলেন? তিনি দলের নেতৃত্ব পেয়েছেন উত্তরাধিকার সূত্রে, কিন্তু তাঁর বাবার রাজনীতিতে উত্থান বিহারে পিছিয়ে পড়া জাতের মানুষের অধিকারের রাজনীতি করে। তাই সংবিধানে সংরক্ষণের ব্যবস্থা কেন রাখা হয়েছে তা নিয়ে চিরাগের ধারণা খুব পরিষ্কার। যে কথা এদেশের উচ্চবর্গীয় মানুষ বোঝেন না অথবা না বোঝার ভান করেন, তা হল, দেশের গরিব মানুষকে ধনী বা মধ্যবিত্ত করে তোলার জন্য সংবিধানপ্রণেতারা সংরক্ষণের ব্যবস্থা করেননি। ওই ব্যবস্থা করা হয়েছিল কয়েক হাজার বছর ধরে বর্ণাশ্রমমাফিক যাদের নিচু জাত বলে দেগে দিয়ে যাবতীয় অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে, তাদের হাতে অধিকার তুলে দিতে। স্বাধীনতার ৭৭ বছর হতে চলল, সংরক্ষণের সুফল পেয়ে কিছু মানুষ আর্থসামাজিক দিক থেকে অনেকটা অগ্রসর হয়ে থাকলেও ভারতীয় সমাজ কিন্তু এখনো বর্ণাশ্রম মেনেই চলে। বিহারে অফিসের ব্রাহ্মণ চাপরাশি দলিত কালেক্টরকে আজও এক গ্লাস জল দেয় না। কালেক্টর বিচক্ষণ ব্যক্তি হলে জল চেয়ে ঝামেলা বাড়ান না। তাই চিরাগ ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন – সাতজন বিচারপতি নিজ নিজ রায়ে এত কথা বললেন আর ‘অস্পৃশ্যতা’ শব্দটাই উচ্চারণ করলেন না!
চাপরাশি-কালেক্টরের ব্যাপারটা বিশ্বাস না-ও হতে পারে, কারণ এইভাবে অস্পৃশ্যতার অনুশীলন পশ্চিমবঙ্গে সাধারণত দেখা যায় না। বাঙালি ভদ্রলোকদের অস্পৃশ্যতা অনুশীলন বাড়িতে মুসলমান অতিথি এলে তাঁর ব্যবহৃত কাপ প্লেট আলাদা করে সরিয়ে রেখে মেজে নেওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ। অতিথি দেখতে পান না বলে প্রগতিশীলতা আর জাত – দুটোই বজায় থাকে। তাই মানুষ যে আজও জাতের ভিত্তিতে অন্যায়ের সম্মুখীন হন, তা বাঙালিরা অনেকে বিশ্বাসই করেন না। অতএব নামধাম সমেত ঘটনা তুলে ধরা আবশ্যক।
জুলাই ২০১৫। উত্তরপ্রদেশের রেহুয়া লালগঞ্জের এক দলিত পরিবারের রাজু সরোজ আর ব্রিজেশ সরোজ নামে দুই ভাই আইআইটির প্রবেশিকা পরীক্ষায় পাস করেছিলেন বলে গ্রামের উচ্চবর্ণের লোকেরা তাঁদের বাড়িতে ঢিল পাটকেল ছুড়েছিল। তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী অখিলেশ যাদব রাজু আর সরোজকে সংবর্ধনা দেওয়ার পরে গ্রামের লোকের ব্যবহারে পরিবর্তন আসে। কিন্তু এক সর্বভারতীয় দৈনিকের প্রতিবেদককে তাঁরা জানিয়েছিলেন, ছোটবেলা থেকেই পড়াশোনায় নিরুৎসাহ করত গ্রামের লোকেরা। বলা হত, দলিতদের দ্বারা লেখাপড়া হয় না। আইআইটির প্রবেশিকা পরীক্ষার কয়েক সপ্তাহ আগে গ্রামের লোকেরা তাঁদের বাড়ির জলের লাইন পর্যন্ত কেটে দিয়েছিল। ২০২০ সালে হাথরসে উচ্চবর্গীয় ছেলেরা একটা দলিত মেয়েকে ধর্ষণ করে খুন করে দিয়েছিল। আজও কারোর শাস্তি তো হয়নি বটেই, মেয়েটার পরিবারই গৃহবন্দি হয়ে আছে। সেকথা এই কাগজেই ২০২৪ লোকসভা নির্বাচন পর্বে প্রকাশিত হয়েছে। এছাড়া অমুক জায়গায় দলিত বর ঘোড়ার পিঠে চেপে বিয়ে করতে যাচ্ছিল বলে তাকে উচ্চবর্গীয়রা পিটিয়েছে (যেমন ফেব্রুয়ারি ২০২৪), তমুক জায়গায় একজন দলিতের মুখে এক উচ্চবর্ণ কুলাঙ্গার পেচ্ছাপ করে দিয়েছে (যেমন জুন ২০২৪) – এসব সংবাদ তো কদিন অন্তরই আসতে থাকে।
মহামান্য বিচারপতিরা হয়ত এসব জানতে পারেন না। তাই তাঁদের বিচার্য মামলার বিষয় না হওয়া সত্ত্বেও কয়েকজন বিচারপতি স্বপ্নের মত সব কথা লিখেছেন রায়ে। যেমন ওই বেঞ্চের একমাত্র দলিত বিচারপতি বি আর গাওয়াই লিখেছেন ‘ক্রিমি লেয়ার’-এর কথা। অর্থাৎ তফসিলি জাতি, উপজাতিভুক্ত মানুষের মধ্যে যেসব পরিবার আর্থিকভাবে সচ্ছল হয়ে গেছে কয়েক প্রজন্ম ধরে সংরক্ষণের সুবিধা পেয়ে, তাদের সংরক্ষণের সুবিধা থেকে বাদ দেওয়া উচিত। বিচারপতি পঙ্কজ মিথাল আবার লিখেছেন, সংরক্ষণের সুবিধা কোনো পরিবারকে এক প্রজন্মের বেশি দেওয়া উচিত নয়।
এই দুই বিচারপতির কথার পিছনে যে ভাবনা কাজ করছে, তা হল সংরক্ষণ আর্থিক উত্তরণের এক উপায় মাত্র। সামাজিক বৈষম্যের প্রতিষেধক নয়। মোদী সরকারের মন্ত্রী চিরাগ তাই বলেছেন, জাতভিত্তিক বৈষম্য আপনি আর্থিকভাবে কত উপরে উঠেছেন বা কত বড় পদে আছেন তার উপর নির্ভর করে না। চূড়ান্ত সফল হলেও এই বৈষম্যের মুখোমুখি হতে হয়। তিনি যে ১০০% ঠিক কথা বলেছেন তা কয়েকদিন আগেই প্রমাণ করে দিয়েছেন মন্ত্রিসভায় চিরাগের সহকর্মী অনুরাগ ঠাকুর। তিনি বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধীর বর্ণভিত্তিক জনগণনার দাবিকে নস্যাৎ করার যুক্তি হিসাবে বলেছেন – যার নিজের জাতের ঠিক নেই সে আবার জাতভিত্তিক জনগণনার দাবি করে। বস্তুত ভারতের উঁচু জাতের লোকেরা নিচু জাতের লোকেদের সঙ্গে পেরে না উঠলে এই ভাষাতেই কথা বলে থাকে। নরেন্দ্র মোদীর নেতৃত্বে অমৃতকাল চলছে বলে সংসদের ভিতরেও এভাবে বলা গেল। এই দেশে ‘ক্রিমি লেয়ার’ কী? দেবা ন জানন্তি। বিচারপতি মিথাল তো আবার শ্রীমদ্ভগবদগীতা উদ্ধৃত করে বলেছেন প্রাচীন ভারতে বর্ণভিত্তিক অসাম্য ছিলই না। তাহলে মনুস্মৃতি বোধহয় কোনো ইংরেজের লেখা।
তবে এসবের জন্য বিচারপতিদের ‘দক্ষিণপন্থী’, ‘কাউ বেল্টের লোক’ – এসব আখ্যা দিলে কিন্তু অন্যায় হবে। বাংলাদেশের চলতি হাসিনা সরকার-বিরোধী আন্দোলন নিয়ে প্রগতিশীল, বামপন্থী ভদ্রলোক শ্রেণির অনেক বাঙালি সোশাল মিডিয়ায় যা পোস্ট করেছেন তা থেকে স্পষ্ট বোঝা যায় – তাঁরা বাংলাদেশের সংরক্ষণ নীতি আর ভারতের সংরক্ষণ নীতির তফাত বোঝেননি এবং তাঁদের মনোভাব উক্ত বিচারপতিদের থেকে কিছুমাত্র আলাদা নয়। শুধু কি কয়েকজন ব্যক্তিরই এহেন মতামত? পশ্চিমবঙ্গে ৩৪ বছর বামপন্থী সরকারে নেতৃত্বকারী মার্কসবাদী দলটার মুখপত্রের সম্পাদকীয় এই রায় সম্পর্কে বলেছে ‘এটা ঠিক দারিদ্র্য দূরীকরণ, সমাজের সব অংশের কাছে উন্নয়নের সুফল সমানভাবে পৌঁছে দেবার ক্ষেত্রে সংরক্ষণ ব্যবস্থা অন্তর্বর্তীকালীন পদক্ষেপ হতে পারে কিন্তু স্থায়ী ব্যবস্থা নয়। তাই এই ব্যবস্থা অনন্তকাল চলতে পারে না। তেমনি সময়ের সাথে সাথে বিভিন্ন জাতি গোষ্ঠীর মধ্যে আর্থ-সামাজিক পরিবর্তন হয়। আজ যারা পশ্চাদপদ কাল তারা পশ্চাদপদ নাও থাকতে পারে। তেমনি শুধু জাতির পরিচয়ে কোনও অংশ প্রজন্মের পর প্রজন্ম সুবিধা ভোগ করে যেতে পারে না।’ অনিল বিশ্বাস এই পার্টিরই রাজ্য সম্পাদক তথা সর্বময় নেতা ছিলেন দীর্ঘকাল। বামফ্রন্ট সরকারের গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রী ছিলেন কান্তি বিশ্বাস। তারপরেও সংরক্ষণ সম্পর্কে এরকম ভ্রান্ত, বামনাই ভাবনা যখন এ রাজ্যের এককালীন শাসক দলের রয়ে গেছে, তখন পশ্চিমবঙ্গে জাতভিত্তিক বৈষম্য যে দিব্যি খেয়ে পরে বেঁচে আছে তা আর বলে দিতে হয় না।
অবশ্য এতে আশ্চর্যের কিছু নেই। যোগেন মণ্ডলকে তো বাংলার রাজনীতিতে কেউ স্মরণ করে না, চুনী কোটালকে স্মরণ করা হয় কেবল সিপিএমকে গাল দেওয়ার দরকার হলে। আর বিশ্ববিদ্যালয়ের দিদিমণি মেরুনা মুর্মুকে সোশাল মিডিয়ায় আজও উচ্চবর্ণ কন্যাসমা ছাত্রী গাল দেয় ‘কোটায় চাকরি পেয়েছেন’ বলে। এসবের বোধহয় একটাই সমাধান। বিহারের মত জাতভিত্তিক জনগণনা এ রাজ্যেও হয়ে যাক। দেখা যাক, সোনার চাঁদ আর সোনার টুকরো বলে যাদের কটাক্ষ করা হয় তারাই সব চাকরি-বাকরি নিয়ে বসে আছে আর বেচারা বামুন কায়েতরা সবার পিছে সবার নিচে পড়ে আছে কিনা।
এ বই পড়লে আর কখনো কোনো ভাষার কোনো আখ্যানের শেষে ‘And they lived happily ever after’ বাক্যটি বা ওর সমার্থক কোনো বাক্য পড়ে পাঠক বিশ্বাস করতে পারবেন কিনা সন্দেহ।
সরকার থেকে একটা বড় যজ্ঞের আসর বসানো হয়েছে। ত্রিকালসিদ্ধ নাগা জ্যোতিষ আর একটা কানা গেরুয়া কৌপীনধারী যজ্ঞে ঘি ঢালছে। কেজি কেজি ঘি। মণ মণ বেলকাঠ। গম্ভীর মন্ত্রপাঠ। ধোঁয়ায় ভরে যাচ্ছে চারদিক। অনুভূতি যথাযথ করার জন্যে যজ্ঞ হচ্ছে। ভয়, বিরক্তি, খুশি, রাগ, দুঃখ, লজ্জা, আশ্চর্য/অবাক সব যেন ব্যাকরণমাফিক হয়। তারপর সমস্ত কিছু আগের মতো যথাযথ হয়ে গেলে এই গল্পগুলো মিথ হয়ে যাবে। মুখফেরতা আখ্যান। আর, আখ্যানের শেষে জেগে থাকবে, ‘And they lived happily ever after.’
এই অনুচ্ছেদটি যে বইয়ের শেষ অনুচ্ছেদ, সেই বইটির নাম আয়না উধাও, লেখক প্রবুদ্ধ ঘোষ। এটি উপন্যাস নয়, ছোটগল্পের বই। তবু এই বই পড়লে মনে হয়, লেখক আসলে একটিই আখ্যান নানাভাবে পাঠকের সামনে তুলে ধরছেন। তার কারণ শুধু এটুকু নয় যে এক গল্পের চরিত্রকে অন্য গল্পেও পাওয়া যাচ্ছে। কেবল এটুকুও নয়, যে এক গল্পের পটভূমি ‘হরষেবিষাদ’ শহরের নাম সরকার পালটে ‘হরষবিলাসী’ করে দিচ্ছে অন্য এক গল্পে। এসবের চেয়ে বড় কথা হল, লেখক গোটা বইটি জুড়েই আমাদের জানা ঘটনাবলীকে, বিস্মৃত ঘটনাবলীকে অজানা করে তুলছেন গল্প বলার গুণে। আবার অজানাকে জানার গণ্ডির মধ্যে এনে ফেলছেন। এ কাজ করতে গিয়ে সাধারণত অপ্রিয় সত্যে প্রলেপ দেওয়া হয়, প্রবুদ্ধ করেছেন ঠিক উল্টো। তিনি কখনো পাঠকের স্মৃতির পুরুষাঙ্গে হাতুড়ি মেরেছেন, কখনো পাঠকের স্তনের বোঁটা ছিঁড়ে নিয়েছেন। এ বই পড়লে আর কখনো কোনো ভাষার কোনো আখ্যানের শেষে ‘And they lived happily ever after’ বাক্যটি বা ওর সমার্থক কোনো বাক্য পড়ে পাঠক বিশ্বাস করতে পারবেন কিনা সন্দেহ। বইয়ের প্রচ্ছদ থেকে পৃষ্ঠপ্রচ্ছদ পর্যন্ত পাঠককে সুখী, মেদুর গল্পের সন্ধান দেওয়ার বদলে লেখক কেবলই অস্বস্তিকর অভিজ্ঞতার মধ্যে ঠেলে দিয়েছেন। কখনো কখনো তিনি পাঠকের প্রতি এতই নির্দয় যে গল্পের পিছনের আসল ঘটনাটি সরাসরি উদ্ধৃত করেছেন সংবাদমাধ্যম থেকে। যেমন ‘জাদু-বাস্তারবাদ ও পুতনার আখ্যান’ গল্পের বন্ধনীর মধ্যে রাখা এই অংশটি
(পাঠক নিশ্চয় ভাবছেন, “এ-সব হয় নাকি সভ্য দেশে?” বা। “কেআরপি-র নামে কুৎসা রটানো” ভেবে অশ্লীলতার মামলা ঠুকতে তৈরি হচ্ছেন? প্লিজ রেগে যাবেন না। এগুলো হয়েছে। এরকমই হয়। সিএনএন-১৮ মিডিয়ার সাংবাদিক তনুশ্রী পাণ্ডে বাস্তারের আদিবাসী মহিলাদের সাক্ষাৎকার নিয়েছিলেন। ২০১৫ থেকে ২০১৬ সালের মধ্যে বাস্তারের মহিলাদের অভিজ্ঞতা রেকর্ড করেছিলেন। প্রকাশিত হবার পরে কিছু হইচই হয়েছিল। “I was four months pregnant when I was raped. They (the security forces) did not care I was pregnant,” said a feeble voice, her face blurred by the channel. Another said, she had just delivered (eight hours before) and lactating. “They were not convinced and a cop squeezed my breasts to see if there was milk.” Another woman said “they groped me, sexually assaulted and beat me.”) সাংবাদিক তনুশ্রীর এই রেকর্ডিং এবং লেখার আগে ও পরে এমন অনেকবার হয়েছে। হরবখত হতেই থাকে। যেহেতু গল্পের মধ্যে কিছুটা বিশ্বাসযোগ্যতা রাখতে হয়, তাই তথ্যসূত্র দেওয়া। অবিশ্যি আমাদের গণতন্ত্রে এ-সব অবিশ্বাস্য বা অলীক সংলাপ। যাই হোক, সত্যি লেখা লেখকের কাজ নয়, গল্প লেখা কাজ। আসুন, আবার গল্পে ফিরি।)
লেখক পাঠককে বারবার চমকে দেওয়ার ব্যাপারে কতখানি সচেতন তা বই পড়া শেষ করে গল্পগুলির নামের দিকে তাকালেই টের পাওয়া যাচ্ছে – ১) ‘লোকটা এই পাড়াতেই কোথাও থাকে’, ২) ‘আশু কেন গোয়েন্দা হতে পারছে না’, ৩) ‘আলোমানুষ ও আগুনের লোককথা’, ৪) ‘একঘণ্টার ভাবনায় প্রতিমা যেভাবে বাঁচতে চাইছিল’, ৫) ‘উধাও-আয়না আর আকাশপ্রদীপের লোককথা’, ৬) ‘একটা ভীষণ সুখী সময় আর কয়েকটা থেমে যাওয়া ট্রামের গল্প’, ৭) ‘ক্যাপ্টেন আজ নিশ্চিন্তে ঘুমোবে’, ৮) ‘জাদু-বাস্তারবাদ ও পুতনার আখ্যান’, ৯) ‘একজন ও এবং ওদের আখ্যান’, ১০) ‘আনন্দ ময়দান ছেড়ে পালায়নি’, ১১) ‘সরকার সব ঠিক ক’রে দেবে’।
প্রথম দুটি নামে অনিশ্চয়তা স্পষ্ট, এবং গল্পদুটিও, পাঠক যত এগোবেন, তত তাঁকে এমন এক জগতের সন্ধান দেবে যেখানে লোকটা এবং আশু কিছুতেই থিতু হতে পারছে না। পাঠকও সেই অনিশ্চয়তার, অস্বস্তির ফাঁসে ছটফট করবেন, পালাতে পারবেন না। আলো আর আগুন পাশাপাশি দেখে যে আশঙ্কা মনে উঁকি দেয়, তৃতীয় গল্পে সেই আশঙ্কাই ক্রমশ বিরাট আকার ধারণ করেছে। বিরাট করে তুলতে লোককথার প্রকরণের সার্থক ব্যবহার করেছেন লেখক। চতুর্থ গল্পের নামে বলেই দেওয়া হয়েছে যে এ মাত্র একটি ঘন্টার ভাবনা। কিন্তু এক ঘন্টার মধ্যে একজন মানুষের আস্ত জীবনভাবনা যখন সেঁধিয়ে যায় তখন তো চিঁড়েচ্যাপ্টা হয়ে যেতে হয়। তারপর ভাবুন, আয়নাবিহীন বাড়ির কথা ভাবলেই অস্বস্তি হয় না? অসম্ভব মনে হয় না? প্রায় প্রত্যেক গল্পেই কলমের খোঁচায় বাস্তবের নাড়ি ভুঁড়ি বার করে এনেছেন লেখক, পঞ্চম গল্পে তা তুঙ্গে উঠেছে। ষষ্ঠ গল্পের নামে পাঠকের যে প্রত্যাশা তৈরি হয়, গল্প চলে ঠিক উল্টো পথে। ফলে পাঠককে ফের চমকে উঠতে হয়। ক্রমশ পরিষ্কার হয় যে গল্পের নামে ‘সুখী’ শব্দটি নয়, ‘ভীষণ’ শব্দটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। সপ্তম গল্পেও শিরোনামের প্রত্যাশার ঠিক উল্টো মেরুতে পাঠককে নিয়ে যান লেখক। অষ্টম গল্পটি, এই আলোচকের মতে, এই বইয়ের সবচেয়ে সচকিত করার মত এবং সেরা গল্প। নামটি একইসঙ্গে মার্কেজ এবং মহাভারত মনে পড়িয়ে দেয়। গল্প সে উচ্চতায় না পৌঁছলে পরিতাপের বিষয় হত। কিন্তু লেখক নিপুণভাবে বিস্তৃত ক্যানভাসে অত্যাচারের আখ্যান লিখতে পেরেছেন। সে আখ্যান সত্যিই বাস্তবের ঊর্ধ্বে এবং পুতনার মত দৈত্যাকৃতি। নবম গল্পটির নাম প্রথম দুটি গল্পের মত কেবল অনিশ্চয়তা নয়, অকিঞ্চিৎকরতারও আভাস দেয়। আমরা সকলেই নিজের কাছে গুরুত্বপূর্ণ, আমাদের পরিবার পরিজন ততোধিক গুরুত্বপূর্ণ। সুতরাং অতিমারীর সময়ে অকিঞ্চিৎকর মানুষের যে আখ্যান রচনা করেছেন লেখক, তা পাঠককে নড়বড়ে করে দেবে। দশম গল্পে আনন্দের ময়দান ছেড়ে না পালানোর পরিণতিও পাঠককে সুখী করবে না। আর শেষ গল্পের নাম? এই লেখার প্রথম অনুচ্ছেদ আবার পড়ুন। সরকার কীভাবে সব ঠিক করে দেয় তার আঁচ পাবেন।
এখন কথা হল, গাঁটের কড়ি খরচ করে এমন ঘেঁটি ধরে নেড়ে দেওয়া বই পড়বেন কেন? প্রথমত, লেখক মনে করেছেন ভোরের বেলার তারার কাছে তাঁর কিছু কথা আছে। তাই তিনি লিখেছেন, পড়া না পড়া পাঠকের ব্যাপার। এটি প্রথম গল্পের বই হলেও প্রবুদ্ধ স্পষ্টতই পাঠকের মন জোগানোর কথা ভেবে লেখেননি। সে কারণেই গল্পগুলি ব্যতিক্রমী। যদি কোনো পাঠক নিজের পাঠাভ্যাসের বাইরে যেতে না চান, অজ্ঞাত অনুভূতির সন্ধান যদি তাঁর সাহিত্য পড়ার কারণ না হয়, তাহলে এ বই না পড়াই ভাল। যে পাঠক ঝুঁকি নিতে ভালবাসেন – এ বই তাঁর জন্য। এখানে প্রেম আছে, কিন্তু পরিচিত চেহারায় নেই। যৌনতা আছে, হিংসা আছে প্রবলভাবে, গায়ের লোম খাড়া করে দেওয়ার মত রোমাঞ্চ আছে। কিন্তু রহস্য রোমাঞ্চ সিরিজের মত করে নয়। বরং গোয়েন্দাপ্রেমী পাঠককে গোটা বাংলা গোয়েন্দা সাহিত্য সম্পর্কেই ভাবিয়ে তোলার মত গল্প ‘আশু কেন গোয়েন্দা হতে পারছে না’। যে পাঠক বিশ্বাস করেন সাহিত্য মানে তাতে দুটি জিনিস থাকতেই হবে – ভাষাশিল্প আর কল্পনাশক্তি, এ বই তাঁরও মনের খোরাক হবে। আলোচককে বিশ্বাস করা নিষ্প্রয়োজন। নিজেই পড়ে দেখুন ‘একঘণ্টার ভাবনায় প্রতিমা যেভাবে বাঁচতে চাইছিল’ গল্পের প্রথম অনুচ্ছেদের এই অংশ
বাপির কাটা মাথা ভেসে ওঠে। ‘সিলি হাওয়া ছুঁ গয়ি, সিলা বদন ছিল্ গয়া’ গানটা ভেসে আসছে। বাবুদা রেডিয়ো শোনে এখনও। ক্ষয়া ক্ষয়া রেডিয়োর গায়ে আশি দশক থেকে ধুলো জমেছে। সুরেলা আওয়াজও তাই ধুলোমাখা ধূসর হয়ে আসে। ভাঙা ভাঙা। এ-সব সারাবে না কেউ আর। ‘বেচে দাও বাবুদা, ভালো ফোন কেনো একটা’ – এই অনুরোধের আসরে পাত্তা না দিয়েই বাবুদা চা পাতা ফোটায়। বাবুদার দোকানে উঠে যাওয়া গেঞ্জিকলের সুতো লেগে থাকে। ভেঙে যাওয়া ভেপার ল্যাম্পের ফিকে আলো ছড়িয়ে থাকে। বাবুদার দোকানে এখনও তৃণমূল বা বিজেপির পতাকা লাগানোর ধক দেখায়নি কেউ। অথচ পাঁচটা দশের চা খেতে খেতে শ্যামল, বলাই, অমররা বাবুদার দোকানের পতাকা পালটে দেওয়ার আলোচনা করছে অনেক বছর ধরেই। প্রত্যেক পাড়াতেই একটা-দু’টো এমন দোকান থেকে যায়। রেডিয়োর নব ঘোরে, পছন্দের স্টেশন। সন্ধের মুখে সিলি হাওয়া ছুঁয়ে যায়। শরীরে আনচান করে ফ্রিকোয়েন্সি মিলে গেলে। প্রতিমা বাপির মাথাটা দুলতে দেখে। সারা শরীরে কোথাও কোনো আঘাতের দাগ নেই। ক্ষত নেই। শ্মশানে যখন বাপির বডিটা বাঁশের চ্যাঁচাড়িতে শোয়ানো হল, টুপ ক’রে মাথাটা আলাদা হয়ে গেল।
বিশ শতকে একটা সময়ে অনেক গল্পকার বলতেন, পৃথিবীতে বলার মত গল্প শেষ হয়ে গেছে। সুতরাং প্লটের আর গুরুত্ব নেই, এখন গল্পকারের কাজ হল কতরকমভাবে গল্প বলা যায় তা দেখানো। দেখতে দেখতে এই তত্ত্বের বয়সও কম হল না। কিন্তু আজকাল যাঁরা এই তত্ত্বে বিশ্বাস করে গল্প লেখেন, প্রায়শই দেখা যায় তাঁরা গল্প লেখার অছিলায় প্রবন্ধ লিখছেন। তাঁরা মনে করেন, যা বলছেন তা এতটাই গুরুত্বপূর্ণ যে প্লট তৈরি করার দরকার নেই। প্রবুদ্ধ যথেষ্ট গম্ভীর বিষয় নিয়ে গল্প লিখেছেন, ভাষার উপর তাঁর যথেষ্ট দখল। তবুও তিনি অভিনব গল্প বলেছেন, প্লট নির্মাণে যত্ন নিয়েছেন। কোনো গল্পে একটি শহরের সমস্ত আয়না উধাও হয়ে যাচ্ছে, কোনো গল্পে একজন গোয়েন্দা হতে চেষ্টা করছে। কিন্তু তদন্ত শেষ করার আগেই তাকে নিরস্ত করছে একের পর এক মক্কেল। কেন? তা জানতে গেলে গল্পটি পড়তে হবে। প্রবুদ্ধ একটি গল্পে অনায়াসে ঘটনাকে কল্পনার জোরে বীভৎস রসে সিক্ত করে লোককথার সঙ্গে মিলিয়ে দিচ্ছেন, তো আরেকটি গল্পে একেবারে কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে অর্জুন ও শ্রীকৃষ্ণের কথোপকথন থেকে নিঃসৃত হচ্ছে তাঁর আখ্যান।
এর জন্য প্রবুদ্ধর প্রশংসা প্রাপ্য। কিন্তু তাঁর কলমের জোর যেখান থেকে আসছে, হয়ত সেখানেই তাঁর দুর্বলতাও। প্রবুদ্ধর গল্পের রাজনীতির কথা বলছি। প্রবুদ্ধ ঠিক করে নিয়েছেন তিনি কাদের গল্প বলবেন, কাদের পক্ষে দাঁড়াবেন। এই স্থিরতা না থাকলে তাঁর গল্প এত তীক্ষ্ণ হত না। কিন্তু এর ফলে কোনো কোনো গল্পে বহু চরিত্র ভিড় করছে, কিন্তু কোনো চরিত্রই জ্যান্ত হয়ে উঠছে না। তাদের উপর ঘটে যাওয়া নির্যাতন যত স্পষ্ট, মানুষগুলিকে কি তত স্পষ্ট দেখাচ্ছে? লেখক ভেবে দেখতে পারেন।
দ্বিতীয়ত, বেশকিছু ক্ষেত্রে রাজনৈতিক বক্তব্য প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে গল্প অতিকথনের শিকার বলে মনে হয়। এই সমস্যা সবচেয়ে প্রকট ‘আশু কেন গোয়েন্দা হতে পারছে না’ গল্পে। চমৎকার প্লট, চমৎকার বক্তব্য এবং তার যথোপযুক্ত ভাষা এই গল্পের। কিন্তু মনে হয় লেখক কিছুতেই নিশ্চিত হতে পারছিলেন না যে তাঁর বক্তব্য পাঠক বুঝে উঠতে পারবেন কিনা। তাই একের পর এক ঘটনা যোগ করে গেছেন, যা গল্পটির দৈর্ঘ্য বৃদ্ধি করা ছাড়া কিছু করতে পারেনি। কিংবা ধরা যাক, ‘একজন ও এবং ওদের আখ্যান’ গল্পের এই কটি লাইন
‘ও’-র কোনো নাম নেই। থেকেই বা কী হবে? আধার আছে, নম্বর। খিদে আছে। ওদের দিকে তাচ্ছিল্যের বিস্কুট, ব্লিচিং আর রুটি ছুঁড়ে দেওয়া আছে। আমাদের পবিত্রস্তোত্র বা পুরাণকথনের থেকে বহুদূরে ও।
গল্পটি আসলে আগেই শেষ হয়ে গিয়েছিল। শেষাংশে গল্পের ব্যাখ্যা দেওয়া এই অংশের প্রয়োজন ছিল না। মনোযোগী পাঠক নির্ঘাত বুঝতে পারবেন ‘ও’ কেন একটি নামহীন চরিত্র। পাঠককে অস্বীকার করে গল্প লেখার যে সাহস এ বইতে অধিকাংশ ক্ষেত্রে প্রবুদ্ধ দেখিয়েছেন, এখানে এসে সেই সাহস তিনি ত্যাগ করেছেন। এত প্রতিভাবান লেখকের এই দোলাচল কিঞ্চিৎ হতাশ করে। তবে ভরসার কথা, প্রবুদ্ধ অত্যন্ত তরুণ লেখক এবং এই তাঁর প্রথম গল্পের বই। ফলে সামলে নেওয়ার সময় এবং সুযোগ তাঁর আছে। আর যে জিনিসটি রসভঙ্গ করেছে দু-একটি গল্পে, সেটি হল স্লোগান অর্থে ‘নাড়া’ শব্দটি। বুঝতে অসুবিধা হয় না, লেখক যে অঞ্চলের গল্পে শব্দটি ব্যবহার করেছেন সে অঞ্চলের কথ্য হিন্দির কথা মাথায় রেখে ওই শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। কিন্তু সেক্ষেত্রে ‘নারা’ লেখাই সমীচীন। কারণ হিন্দিতে ‘নাড়া’ বলা হয় পায়জামার দড়িকে বা গুরুর শিষ্যত্ব গ্রহণ করে হাতে যে জিনিসটি বাঁধা হয় তাকে।
তবে এই বই লেখক প্রবুদ্ধ সম্পর্কে প্রত্যাশার পারদ চড়িয়ে দিল। অদ্বয় চৌধুরীর প্রচ্ছদও প্রশংসার দাবি রাখে। কারণ তা ছিমছাম অথচ ব্যতিক্রমী।
‘বাংলায় শিল্প নেই, শিক্ষা নেই, চাকরি নেই, আইনশৃঙ্খলা নেই’-এর মত ‘ভাল সিনেমা নেই’ কথাটাও বহু আলোচিত। মানিকবাবুর মেঘ দেখার পর সন্দেহ হতে বাধ্য – সত্যিই কি আমাদের ভাল সিনেমা নেই, নাকি ভাল সিনেমার দর্শক নেই?
‘আমার ইচ্ছে করে শূন্যে উঠে মেঘের ওপর দিয়ে হাঁটি’ – বাংলা ছবির গানে এই লাইন লেখা হয়েছিল ৫০ বছরেরও কম সময় আগে। সেই ছবি দর্শক হল ভরিয়ে দেখেছিল, গৌরীপ্রসন্ন মজুমদার রচিত এই গান এবং তার গায়ক মান্না দে-কে মাথায় করে রেখেছিল। বাংলা সিনেমার সেই জমজমাট আসর মাটি হয়ে গেছে। কোন শশীকান্ত কবে কীভাবে মাটি করল তা নিয়ে ইদানীং কিছু কথাবার্তা হয়, নিঃসন্দেহে আরও হওয়া দরকার। তবে শিল্পসুষমার স্বাদ নেওয়ার অধিকার সব দেশে, সব কালেই দর্শককে অর্জন করতে হয়। সে অধিকার না থাকলে শিল্পের সমস্ত আয়োজন ‘অরসিকেষু রস নিবেদনম্’ হয়ে দাঁড়ায়। ‘বাংলায় শিল্প নেই, শিক্ষা নেই, চাকরি নেই, আইনশৃঙ্খলা নেই’-এর মত ‘ভাল সিনেমা নেই’ কথাটাও বহু আলোচিত। মানিকবাবুর মেঘ দেখার পর সন্দেহ হতে বাধ্য – সত্যিই কি আমাদের ভাল সিনেমা নেই, নাকি ভাল সিনেমার দর্শক নেই? গত এক যুগেই পশ্চিমবঙ্গে অন্তত গোটা আষ্টেক বেশি ছবি হয়েছে যেগুলো রহস্য রোমাঞ্চ, সম্পর্কের টানাপোড়েন বা প্রেম-ঢিসুম ঢিসুম-মধুরেণ সমাপয়েৎ ফর্মুলার বাইরে গিয়ে রসোত্তীর্ণ শিল্প হতে চেষ্টা করেছে। ভূতের ভবিষ্যৎ (২০১২), বল্লভপুরের রূপকথা (২০২২)-র মত দু-একটা ব্যতিক্রম বাদ দিলে সেই প্রয়াসগুলো কিন্তু দর্শকের দাক্ষিণ্য পায়নি। বাকিটা ব্যক্তিগত (২০১৩) বা আসা যাওয়ার মাঝে (২০১৪) তত দর্শক পায়নি, যত দর্শক পেয়েছে যেমন তেমনভাবে নির্মিত ব্যোমকেশের ছবিগুলো। পুনরাবৃত্তিমূলক ফেলুদা বা কাকাবাবুর গল্প নিয়ে নির্মিত ছবিগুলোর অর্ধেক দর্শকও মায়ার জঞ্জাল (২০২০) ঝিল্লি (২০২১), ভটভটি (২০২২), নীহারিকা (২০২৩) ভূতপরী (২০২৪) বা অথৈ (২০২৪) দেখেননি। সম্ভবত সেই কারণেই ২০২১ সাল থেকে পৃথিবীর বিভিন্ন ফিল্মোৎসবে পুরস্কৃত মানিকবাবুর মেঘকে পশ্চিমবঙ্গে সাধারণ দর্শকের জন্য মুক্তি পেতে অপেক্ষা করতে হল ২০২৪ সাল পর্যন্ত। অনির্বাণ ভট্টাচার্যের মত বিখ্যাত শিল্পী এ ছবির নিবেদক না হলে এবং ছবির একখানা গান না গাইলে হয়ত এরপরেও ছবিটা নিয়ে বিশেষ আলোচনা হত না।
মেঘের কথা হচ্ছিল। বাংলা সিনেমার মেঘের উপর দিয়ে হাঁটার ইচ্ছাশক্তি খর্ব হতে হতে কী করে গেটেড কমিউনিটির কোনো একটা টাওয়ারের বিলাসবহুল ফ্ল্যাটের ঘরে নেমে এল – তার ইতিহাস হয়ত কোনোদিন লেখা হবে। এই ছবির পরিচালক অভিনন্দন ব্যানার্জি কিন্তু আমাদের সেই আর্থসামাজিক সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছেন। কথাসর্বস্ব বাংলা ছবির যুগে তিনি এমন এক ছবি বানিয়েছেন যেখানে ক্যামেরার প্রত্যেকটা ফ্রেম কথা বলে, চরিত্রগুলো কথা বলে যতটুকু দরকার ততটুকুই। তেমনই এক মুখর ফ্রেমে পরিচালক ধরেছেন এক রিয়েল এস্টেট কোম্পানির হোর্ডিং। সেই বিজ্ঞাপন সম্ভাব্য ক্রেতাকে লোভ দেখাচ্ছে – আসুন, মেঘেদের সঙ্গে বাস করুন। অথচ তখন ক্রয়ক্ষমতাহীন মানিকবাবু – এ ছবির প্রধান চরিত্র – একখানা ছাদওয়ালা বাড়ি খুঁজছেন তাঁর গাছগুলোর জন্যে। বন্ধুর কাছে মুখঝামটা শুনছেন – নিজের মাথা গোঁজার ঠাঁই হয় না, বৃক্ষরোপণের শখ!
ক্রমশ গরম বেড়ে চলা, বৃষ্টিবিরল কলকাতা শহরের এক নিঃসঙ্গ বাসিন্দার এই সাদাকালো বাস্তবতা পর্দায় তুলে আনা, একইসঙ্গে রোম্যান্টিক থাকার সাহসের জন্য পরিচালককে অভিনন্দন না জানিয়ে উপায় নেই। না, মানিকবাবু মানে এখানে সত্যজিৎ রায় নন। এ ছবি সত্যজিতের জীবনের কোনো সফল বা বিফল মুহূর্ত নিয়ে নয়, তাঁর কোনো কাজের অনুপ্রেরণাও এখানে চোখে পড়ে না। বরং অতি সামান্য চাকরি করার পাশাপাশি ছোটদের আবৃত্তির টিউশনি করা এই মানিকবাবু শেখান সুকুমার রায়ের ‘মেঘ মুলুকে ঝাপসা রাতে,/রামধনুকের আবছায়াতে,/তাল বেতালে খেয়াল সুরে,/তান ধরেছি কণ্ঠ পুরে।/হেথায় নিষেধ নাইরে দাদা,/নাইরে বাঁধন নাইরে বাধা।/হেথায় রঙিন আকাশতলে/স্বপন দোলা হাওয়ায় দোলে,/সুরের নেশায় ঝরনা ছোটে,/আকাশ কুসুম আপনি ফোটে, রঙিয়ে আকাশ, রঙিয়ে মন/চমক জাগে ক্ষণে ক্ষণ!’ দূষিত বাতাসে ঢেকে যাওয়া কংক্রিটের জঙ্গল একবিংশ শতকের কলকাতা শহরে সুকুমারের এই রোম্যান্স যিনি ছুঁতে পারেন তিনি ছাড়া আর কে-ই বা মরা গাছেও রোজ জল দেবে, বাবার মৃত্যুর দিনেও রুটি কিনে আনবে রাস্তার কুকুরের জন্যে, অদেখা প্রেমিকার সঙ্গে ভাগ করে খাবে ডালভাত আর ঢ্যাঁড়শ ভাজা? হ্যাঁ, এটা প্রেমের ছবি। আর সব ব্যাপারে অত্যন্ত সাধারণ মানিকবাবু, দালালকে কোনো লেখাপড়া ছাড়াই টাকা দিয়ে সর্বস্বান্ত হওয়ার মত বোকা মানিকবাবু, একজন দুরারোগ্য রোম্যান্টিক। আজকের কলকাতার পক্ষে বেমানান রোম্যান্টিক, যেমন বেমানান ছিলেন সে যুগের ইউরোপে সেরভান্তেসের ‘রোম্যান্টিক’ নায়ক দন কিহোতে। এ ছবির সমাপ্তি যেভাবে ঘটিয়েছেন অভিনন্দন, তা একেবারেই সুকুমারীয় – যে সুকুমারকে শিশুসাহিত্যের আড়ালখানা ভেদ করে আমরা দেখতে পাই না।
ছবির যে কথা বলতে সংলাপ লাগে না তা যেমন আমরা ক্রমশ ভুলে যাচ্ছি, তেমনি সংলাপ না থাকলেও শব্দ যে কথা বলতে পারে তাও ভুলে যাচ্ছি। কারণ শব্দগুলোকে আলাদা করার মত নৈঃশব্দ্য ক্রমশই বিরল হচ্ছে আমাদের চারপাশে। প্রথমবার ফিল্মে কাজ করা অনুপ সিংয়ের নয়নাভিরাম ক্যামেরার সঙ্গে মুপ্পালা কিরণ কুমার, টেনি আর শুভজিৎ মুখার্জি যে শব্দ-নৈঃশব্দ্য-আবহসঙ্গীতের নকশা বুনেছেন, তা অতি পরিচিত দৃশ্য থেকে চমকে ওঠার মত ছবি উদ্ধার করে এনেছে বারবার। নইলে রাস্তার আলোর মাধ্যমে কথোপকথন সম্ভব হত না। কেবল কণ্ঠস্বর দিয়ে একটা চরিত্র হয়ে উঠতেও পারতেন না মানিকবাবুর বাড়িওয়ালি। একেবারে শয্যাশায়ী বাবাও সন্তানের জীবনে কতখানি গুরুত্বপূর্ণ, তাঁর প্রস্থানে কী বিরাট শূন্যতা তৈরি হয় তাও কেবল শব্দ আর সঙ্গীতের গুণে দেখিয়ে দেওয়া গেছে কোনো সংলাপ ছাড়াই। বোঝা গেল না? স্বাভাবিক। কারণ এই ছবি অনির্বচনীয় দৃশ্যে ভরপুর, অনির্বচনীয় কল্পনায় ঋদ্ধ। না দেখলে বোঝা যাবে না, বেশি বোঝানোর চেষ্টা করাও বাচালতা।
এই বাচালতা জিনিসটা এ ছবির একেবারেই নেই। একা মানুষের শোক বা তার অবদমিত কাম – কোনোটা বোঝাতেই অভিনন্দনকে বচন ব্যবহার করতে হয় না। জীবনানন্দ দাশের ভাষায় ‘বাজারের পোকাকাটা জিনিসের কেনাকাটা’ করা মানুষ মানিকবাবুর চরিত্রে চন্দন সেন এই অনির্বচনীয়তা সারা শরীরে ধারণ করায় দারুণ সফল। ছবির প্রথমার্ধের বিমর্ষ চন্দন আর দ্বিতীয়ার্ধের খুশিয়াল চন্দন কীভাবে একই ব্যক্তি থেকেও দুজন আলাদা মানুষ হয়ে যান – দেখে আশ্চর্য হয়ে যেতে হয়। মুখে যে প্রেমিক হাসি তিনি ফুটিয়েছেন, তা কেবল মনোমুগ্ধকর নয়, রোমাঞ্চকরও। যোগ্য সঙ্গত করেছেন দেবেশ রায়চৌধুরী, নিমাই ঘোষ, অরুণ গুহঠাকুরতা এবং ব্রাত্য বসু।
চন্দন যে মসৃণভাবে সিনেমার পর্দার মাঝবয়সী রোম্যান্টিক নায়ক হয়ে উঠতে পারেন, তা কি দশকের পর দশক তাঁর অভিনয়ের গুণগ্রাহী দর্শকরাও কেউ কল্পনা করেছিলেন? অভিনন্দন কিন্তু করেছেন। কল্পনাশক্তিতে, এবং সেই কারণে চিত্রনাট্যে, তিনি একশোয় একশো। অভিনন্দন কলকাতার রাজপথ, গলিপথ, ফুটপাথ, দেওয়ালগুলোকে তো বটেই; ধাপার মাঠ আর ময়দানকেও এ ছবির চরিত্র করে তুলেছেন চিত্রনাট্যের গুণে। তবে সেখানেই তাঁর নৈপুণ্য শেষ নয়। আজকের বাংলা ছবির দর্শক হিসাবে দুরুদুরু বুকে না বলে উপায় নেই যে এই পরিচালকের হাতে একখানা জাদুদণ্ড আছে বলে মনে হয়। তার ছোঁয়ায় সেকেলে বাক্স টিভির ফ্রেমের ভিতর টবে ফুল ধরে; চিত্রনাট্যের তালে তাল দেয় দেয়ালের টিকটিকি, মাকড়সা; আঁকা ছবি হয়েও রোম্যান্সে পর্দা মুড়ে দেন উত্তমকুমার আর সুচিত্রা সেন। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্য নিয়ে তাঁদের জ্যান্ত করে তুলতে হয় না। এমন জাদু বাংলা ছবিতে আমাদের বয়সের দর্শকরা অন্তত দেখেনি। প্রবীণরা বলতে পারবেন আদৌ কোনোদিন দেখা গেছে কিনা। তবে একটাই অনুযোগ – এত যত্নে নির্মিত ছবির শেষে নাম দেখানোর সময়ে দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের ‘দ্বীজেন্দ্রলাল’ হয়ে যাওয়া অনভিপ্রেত।
দুরুদুরু বুকে কেন বললাম? প্রথমত, প্রথম ছবিটাই এমন বানান যে তরুণ পরিচালক তাঁর ভবিষ্যৎ নিয়ে যুগপৎ আশা আর আশঙ্কা হয়। আমাদের মা-মাসিরা এসব ক্ষেত্রে পরিচালকের কড়ে আঙুল দাঁতে কেটে মাথায় তিনবার থুতু দিতেন। দ্বিতীয়ত, দর্শক যদি এই ছবিকে মা-মাসিদের মত করে আশীর্বাদ না করেন তাহলে অভিনন্দনকেও হয়ত পরের ছবিটা ফর্মুলায় ফেলেই বানাতে হবে। অন্য কোনো পরিচালকও হয়ত এমন কিছু করার সাহস করবেন না, কারণ এই ছবির প্রযোজক হয়ে যে ঝুঁকি বৌদ্ধায়ন মুখার্জি আর মোনালিসা মুখার্জি নিয়েছেন, সে ঝুঁকি আর কোনো প্রযোজক নেবেন না। বাংলা ছবির কোনো ভবিষ্যৎ থাকবে না, আমরা কেবল সত্যজিৎ-ঋত্বিক-মৃণালের জাবর কেটে যাব।
অনেকে বলছেন, মানিকবাবুর মেঘ আন্তর্জাতিক মানের ছবি। সেসব বোদ্ধারা জানেন। কিন্তু নিঃসন্দেহে বলা যায়, বাংলা ছবির সাধারণ দর্শকের জন্য এ ছবি এক অনন্য অভিজ্ঞতা। এই উচ্চতার রোম্যান্টিক ছবি আমরা বহুকাল দেখিনি। বারবার রোম্যান্টিক ছবি বলছি, প্রেমের ছবি বলছি। তাহলে ছবির নায়িকাকে নিয়ে কিছু বলছি না কেন? তাঁর কথা উহ্যই থাক, কারণ তিনি অনির্বচনীয়। নিজে চোখে দেখে আসুন।
লোকনীতি-সিএসডিএসের এক সমীক্ষার বিশ্লেষণ করতে গিয়ে যোগেন্দ্র যাদব ও তাঁর দুই সঙ্গী শ্রেয়স সরদেশাই, রাহুল শাস্ত্রী লিখেছেন যে গোদি মিডিয়া দিনরাত সরকারি প্রোপাগান্ডা না চালালে ২০২৪ নির্বাচন ২০০৪ সালের মতই হারতেন মোদী। সেই মিডিয়া কাল হঠাৎ পালটি খেলেই কি ক্ষমা করবেন ক্ষুব্ধ মানুষ?
শিং নেই তবু নাম তার সিংহ, ডিম নয় তবু অশ্বডিম্ব। তাহলে একটা নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের ও মতের প্রচার করা সংস্থাকে সংবাদমাধ্যম বলা যাবে না কেন? আলবাত যাবে। গণশক্তি অবশ্যই সংবাদমাধ্যম, জাগো বাংলা একই ধরনের আরেকটা সংবাদমাধ্যম। কিন্তু দুটোর কোনোটাই গোপন করে না যে তারা যথাক্রমে সিপিএম এবং তৃণমূল কংগ্রেসের মুখপত্র। ইদানীং গণশক্তির মালিকানায় কিছু পরিবর্তন আনা হয়েছে, ফলে কাগজটা আর সরাসরি পার্টির সম্পত্তি নয়। কিন্তু এখনও কাগজের সম্পাদক নির্ধারণ করে সিপিএমের রাজ্য কমিটি। সুতরাং এই ধরনের সংবাদমাধ্যমগুলোর পরিচয় নিয়ে কোনো সমস্যা নেই। সমস্যা অন্য আরেক ধরন নিয়ে। ভারতে গত এক দশকে এক ধরনের সংবাদমাধ্যম দেখা গেছে, যারা নিরপেক্ষ থাকার নাম করে চরিত্রহীন হয়ে গেছে। তাদের পরিচিতি আলাদা করতে রবীশ কুমার একখানা চমৎকার শব্দবন্ধ তৈরি করেছেন— গোদি মিডিয়া। অর্থাৎ মোদীর কোলে বসে থাকা মিডিয়া। সমস্যা তাদের নিয়ে। তাদের আর সংবাদমাধ্যম বলা চলে কিনা, তাদের সর্বশক্তিমান অ্যাঙ্করদের সাংবাদিক বলা চলে কিনা তা নিয়ে অনেকদিন ধরেই প্রশ্ন উঠছিল। ২০২৪ লোকসভা নির্বাচনে পরিষ্কার হয়ে গেল, এদের একটা বড় অংশ সীমানা পেরিয়ে এতদূর চলে গেছে যে আর ফিরে আসা অসম্ভব।
ইন্ডিয়া টুডে চ্যানেলের রাহুল কাঁওয়ালের কথাই ধরুন। ৪ জুন ভোটগণনা সবে আরম্ভ হয়েছে, পোস্টাল ব্যালট গোনা চলছে। তখনই রাহুল এক্সিট পোলের ফলের ভিত্তিতে বিরোধীদের বিরুদ্ধে এবং যাঁরা ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন সম্পর্কে প্রশ্ন তোলেন, তাঁদের বিরুদ্ধে বিষোদ্গার করতে শুরু করলেন। বললেন এই ধরনের লোকেরা ‘ডিলিউশনাল’। এরা কিছুতেই মানুষের রায় মেনে নেয় না, দশ বছর ধরে কিছুতেই মানতে রাজি নয় যে মোদী মানুষের মন জয় করেছেন। সকাল সকাল তাঁর অত চেঁচামেচির কারণ কী ছিল? তাঁর আশঙ্কা ছিল, ভোটের ফল বেরোবার পরেও সেই ধারা চলতেই থাকবে। কেন ছিল তা বোঝা শক্ত নয়। তিনি নিজের চ্যানেলের এবং অন্য সব চ্যানেলের বুথফেরত সমীক্ষাকেই ভোটের প্রকৃত ফল ধরে নিয়ে বসেছিলেন। কেন ধরলেন? একজন সাংবাদিকের তো বোঝার কথা এবং দর্শকদের বোঝানোর কথা, যে যে কোনো সমীক্ষাতেই ভুল থাকা সম্ভব। তার চেয়েও বড় কথা, মানুষ ভোট দিয়েছেন। তার গণনার ফলই নির্বাচনের ফল। বুথফেরত সমীক্ষাকে আসল ফল বলে ধরে নেওয়া ভোটারদের অপমান করাও বটে। রাহুল কম দিন সাংবাদিকতায় নেই। তাহলে এতগুলো ভুল করলেন কেন? আসলে সব সাংবাদিকই তো কোনো না কোনো দলের সমর্থক, কোনো না কোনো দলকে ভোট দেন। সেটা অন্যায়ও নয়। রাহুল অবশ্যই বিজেপি সমর্থক, তাই তিনি চাইছিলেন বিজেপি জিতুক। বুথফেরত সমীক্ষা সেটাই দেখিয়েছে বলে তাঁর বিশ্বাস হয়েছে। উত্তর-সত্যের যুগে তো বলাই হয়, সে তাই বিশ্বাস করে যা সে বিশ্বাস করতে চায়। কথা হল, সাংবাদিক হলে কিন্তু ব্যক্তিগত পছন্দটা প্রকাশ করা চলে না কাজ করার সময়ে। মতামত দেওয়ার জায়গা অবশ্যই আছে সাংবাদিকতায়। কিন্তু নির্বাচনের ফল নিয়ে উল্লাস করা বা দুঃখে শুয়ে পড়া তার মধ্যে পড়ে না। তার উপর নির্বাচন কমিশন এবারে যেভাবে ভোট পরিচালনা করেছে তাতে আপত্তি করার যথেষ্ট কারণ আছে। যে নির্বাচন কমিশন বহু দেরিতে ভোটদানের হার ঘোষণা করে বিরোধীদের চেঁচামেচির ফলে, তাতে দেখা যায় ভোটদান শতাংশের হিসাবে ভোট দেওয়ার দিনের চেয়ে ব্যাখ্যাহীনভাবে বেড়ে গেছে, তারপরেও ঠিক কত ভোট পড়েছে তা প্রকাশ করা হয় না— সেই কমিশনকে নিয়ে, তার পরিচালিত প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তো উঠবেই। বিজেপির রাজনৈতিক অ্যাজেন্ডা নিজের অ্যাজেন্ডা না হয়ে উঠলে কোনো সাংবাদিক এগুলো নিয়ে কেউ প্রশ্ন তুললে তাকে ‘ডিলিউশনাল’ বলতে পারেন না। বললে তিনি সাংবাদিক নন।
আবার ধরুন রজত শর্মা। ইন্ডিয়া টিভির সর্বেসর্বা এই সাংবাদিক গোদি মিডিয়ার অন্যতম বিখ্যাত মুখ। কথিত আছে যে মোদীর আমলে তাঁর সম্পত্তি নেতাদের থেকেও দ্রুত বেড়েছে। সেই রজত বিজেপির ফলাফলে এতই হতাশ যে একদিন লাইভ অনুষ্ঠানে কংগ্রেস মুখপাত্র রাগিণী নায়েককে রেগেমেগে খিস্তি দিয়ে বসলেন। কোনো সাংবাদিকের এত রাগ হয় না যে লাইভ অনুষ্ঠানে নেহাত স্বগতোক্তি হিসাবেও খিস্তি দিয়ে বসবেন। কিন্তু রজতের হল। স্পষ্টত সাংবাদিকতা আর তাঁর পেশা নেই। বিজেপির জয়-পরাজয়, বিজেপির আসন বাড়া-কমা রজতের সর্বস্ব হয়ে দাঁড়িয়েছে। এদের আর যা-ই হোক, সাংবাদিক বলা যায় না। এদের সংস্থাগুলোকেও সংবাদমাধ্যম বলা শক্ত।
ইন্ডিয়া টুডে গ্রুপের অরুণ পুরির মেয়ে কল্লি পুরি নির্বাচনের কিছুদিন আগেই ইন্ডিয়া টুডে কনক্লেভে বলেছিলেন ‘গণতন্ত্রে বিরোধী দলের ভূমিকা পালন করা মিডিয়ার কাজ নয়… গোদি মিডিয়া বা মোদী মিডিয়া বলে কোনো সংবাদমাধ্যমকে চিহ্নিত করা নেহাতই অন্যায়। দেশের বিরোধী পক্ষ যদি ছিন্নবিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়ে থাকে, তার জন্য মিডিয়াকে দায়ী করা যায় না। আমরা উল্টোদিকটাকে একইরকমভাবে দেখাব কী করে, যদি সেই পক্ষের অস্তিত্বই না থাকে? আমরা এই বক্সিং ম্যাচের দর্শক। খেলোয়াড় নই।’ দেশে বিজেপি ছাড়া এতগুলো দল থাকা সত্ত্বেও যখন কেউ বলে বিরোধী পক্ষের অস্তিত্বই নেই তখন সে যে আক্ষরিক ও প্রতীকী, দুই অর্থেই অন্ধ তা বলে দেওয়ার দরকার পড়ে না। এরকম অন্ধ মালিকের সংস্থাকে সংবাদমাধ্যম বলার কী যুক্তি থাকতে পারে?
উদাহরণের তালিকা লম্বা করার মানে হয় না। যে কোনো পাঠক আরও গোটা দশেক অ্যাঙ্কর আর চ্যানেলের নাম নিজেই বলে দিতে পারবেন, যারা সরাসরি ঘোষণা করে দিলেই পারত যে তারা বিজেপির প্রচারক। তাহলেই আর নিন্দা করার কোনো জায়গা থাকত না। কিন্তু ঘোষণা করে না, কারণ স্টক মার্কেটের দালালি ছাড়া আর কোনো দালালিই ঘোষণা করে করার জিনিস নয়। রিপাবলিক টিভি-র অর্ণব গোস্বামী অবশ্য ফল ঘোষণার দিন বারবার এনডিএর আসন বাড়লে উল্লাস করে বলছিলেন ‘আমরা…’। তবে উনি তো সর্বার্থে ব্যতিক্রম। সাধারণভাবে একটু রেখেঢেকে দালালি করতে হয়, নইলে অর্ধেক দর্শক/পাঠক হারাতে হয়। যেমন আনন্দবাজার পত্রিকা-র মালিক যত বড় পুঁজিবাদীই হোন না কেন, তিনি অবশ্যই চান তাঁর কাগজগুলো মার্কসবাদীরাও পড়ুক, তাঁর চ্যানেলগুলো মার্কসবাদীরাও দেখুক। ব্যবসায়ীর তো প্রধান লক্ষ্য মুনাফা করা, আর সব ধরনের দর্শক/পাঠক ধরতে না পারলে কমবে চ্যানেলের টিআরপি এবং কাগজের বিক্রি। তারই ভিত্তিতে আসে বিজ্ঞাপন, সেটাও কমে যাবে। বিজ্ঞাপন কমে গেলেই মুনাফাও কমে যাবে। তবে ভারতে বিজ্ঞাপনের একটা বড় অংশ হল সরকারি বিজ্ঞাপন। সেই বিজ্ঞাপনের জোরেই যে যেখানে ক্ষমতাসীন, সে সেখানকার সংবাদমাধ্যমকে নিয়ন্ত্রণ করে। বিজেপি এই খেলায় সবচেয়ে দড়। তাই তারা গোটা ভারত জুড়ে তৈরি করেছে গোদি মিডিয়া। উপরন্তু মুকেশ আম্বানি, গৌতম আদানি প্রায় সব সাবেকি মিডিয়া হাউসের আংশিক বা পূর্ণ দখল নিয়ে ফেলেছেন। ফলে সব ধরনের পাঠক/দর্শক ধরার তাগিদ গোদি মিডিয়ার নেই। তারা সোল্লাসে এক পক্ষের বয়ান প্রচার করে যাচ্ছে। কাল্লি পুরির বক্তৃতা বস্তুত সেকথা স্বীকার করা এবং সেটাকেই ন্যায়সঙ্গত বলে দেখানোর প্রয়াস।
আরও একটা কারণে নিরপেক্ষতার ভান করতে হয় ‘লেগ্যাসি মিডিয়া’-কে। ভারতে স্বাধীনতার পর থেকে ত্রুটিপূর্ণ হলেও সংসদীয় গণতন্ত্র বজায় আছে। নির্বাচনের পর নিয়মিত সরকার বদল হয়ে এসেছে শান্তিপূর্ণ উপায়েই। এমন একটা দেশে কোনো সংবাদমাধ্যম যদি নিজেকে সম্পূর্ণভাবে ক্ষমতাসীন দলের দূত হিসাবে প্রচার করে, তাহলে সরকার বদলে গেলে বিপদে পড়ার সম্ভাবনা আছে। পার্টি-মুখপত্রগুলোকে এমন বিপদে প্রায়শই পড়তে হয়। ত্রিপুরায় যেমন বিজেপি সরকার আসার পরে সিপিএমের মুখপত্র দেশের কথা বন্ধ করিয়ে দেওয়া হয়েছিল কিছুদিনের জন্য। পশ্চিমবঙ্গেও তৃণমূল সরকার গণশক্তিকে সরকারি বিজ্ঞাপন দেয় না। এমন ঝামেলায় কোন মূলধারার সংবাদমাধ্যম পড়তে চাইবে? তাই ধর্মেও আছি, জিরাফেও আছি পদ্ধতিতে চলে প্রায় সব সংবাদমাধ্যমই।
কিন্তু ২০১৪ সাল থেকে মিডিয়া হাউসগুলোর মালিক, সম্পাদকরা সেই কাণ্ডজ্ঞানটুকুও হারিয়েছেন। তাঁরা মোদীর যে অপরাজেয় ভাবমূর্তি তৈরি করেছেন তা নিজেরাই বিশ্বাস করতে শুরু করেছিলেন। ফলে সরকার বদলে গেলে কী হবে সে চিন্তা আর নেই। আবার এই কাণ্ডজ্ঞানহীনতাই তাঁদের মোদীর রাজনীতির ভাগীদার করে ফেলেছে। এখন মোদী হারলে তাঁদের সমূহ বিপদ। অতএব সর্বান্তকরণে মোদীকে জেতানোর চেষ্টা করতেই হয়। এবারের নির্বাচনের ফল সেই কারণেই কেবল বিজেপি বা আরএসএস নয়, গোদি মিডিয়ার জন্যেও ধাক্কা। মোদীর জনপ্রিয়তা যে নিম্নমুখী তা নির্বাচনের ফলই প্রমাণ করেছে। তার ফল গোদি মিডিয়ার উপর পড়া অনিবার্য, পড়তে শুরুও করেছে কয়েক বছর হল। সে কারণেই বিজেপিবিরোধীরা যেমন টিভির খবর দেখা ছেড়ে ধ্রুব রাঠি, রবীশ কুমার, পুণ্যপ্রসূন বাজপেয়ী, রাজীব রঞ্জনদের ইউটিউব চ্যানেল দেখতে শুরু করেছেন; তেমন বিজেপি সমর্থকদের মধ্যেও বিভিন্ন ইউটিউব চ্যানেল দেখার প্রবণতা বাড়ছে। উভয়পক্ষেই এই প্রবণতা আরও বাড়বে এবারের ন্যক্কারজনক বুথফেরত সমীক্ষার পরে।
সংবাদমাধ্যমের আরও কিছু পরিবর্তনের লক্ষণ ইতিমধ্যেই দেখা গেছে। দেশের রাজনীতি কোন দিকে যায় তার উপর নির্ভর করবে এই লক্ষণগুলো অদূর ভবিষ্যতে আরও বড় হয়ে উঠবে কিনা। যেমন দিল্লির প্রেস ক্লাব অফ ইন্ডিয়া দেশের একাধিক সাংবাদিকদের সংগঠনের সঙ্গে মিলে সপ্তদশ লোকসভায় পাশ হওয়া নতুন টেলিকম আইন সম্পর্কে আপত্তি করার সাহস পেয়ে গেছে। এই আইনগুলো যে বাকস্বাধীনতার পরিপন্থী, বিশেষ করে বিকল্প সংবাদমাধ্যমের কণ্ঠরোধ করার উদ্দেশ্যে তৈরি, তা কিন্তু জানাই ছিল। অথচ এর আগে এমন সাহস এতগুলো সংগঠনের হয়নি। কাশ্মিরের বিভিন্ন সাংবাদিক বা নিউজক্লিক সম্পাদক প্রবীর পুরকায়স্থ গ্রেফতার হওয়ার সময়েও খুব বেশি সাংবাদিককে মুখ খুলতে দেখা যায়নি।
আজকাল গোদি মিডিয়ার কোনো কোনো অ্যাঙ্করও বেসুরো গাওয়ার সাহস পাচ্ছেন। ইন্ডিয়া টুডের রাজদীপ সরদেশাই বিজেপির চিৎকারসর্বস্ব মুখপাত্র সঞ্জু বর্মাকে সটান বলে দিচ্ছেন— এবার একটু গলা নামিয়ে কথা বলা শিখতে হবে। আপনাদের এখন আর ব্রুট মেজরিটি নেই। এবিপি নিউজের অ্যাঙ্করও বিজেপি নেতাকে লাইভ অনুষ্ঠানে ধমকে দিচ্ছেন। অষ্টাদশ লোকসভার প্রথম অধিবেশন শুরু হচ্ছে ২৪ জুন। নতুন প্রাণ পাওয়া বিরোধীরা যদি সরকারকে সংসদে কোণঠাসা করতে পারে, তাহলে মূলধারার সংবাদমাধ্যম নিজেদের সুর আরও বদলাতে বাধ্য হবে। মোদী সরকার যত দুর্বল হবে, তত ফাঁপরে পড়বে গোদি মিডিয়া। কারণ নিজেদের ভোল পাল্টে ফেলা শক্ত হবে। মানুষ বোকা নয়, মানুষ সবকিছু ভুলেও যায় না। একথা হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছেন মোদী। লোকনীতি-সিএসডিএসের এক সমীক্ষার বিশ্লেষণ করতে গিয়ে যোগেন্দ্র যাদব ও তাঁর দুই সঙ্গী শ্রেয়স সরদেশাই, রাহুল শাস্ত্রী লিখেছেন যে গোদি মিডিয়া দিনরাত সরকারি প্রোপাগান্ডা না চালালে ২০২৪ নির্বাচন ২০০৪ সালের মতই হারতেন মোদী। সেই মিডিয়া কাল হঠাৎ পালটি খেলেই কি ক্ষমা করবেন ক্ষুব্ধ মানুষ?
পুনশ্চ: ইন্ডিয়া জোটের নেতারা দাবি করছেন মোদী ৩.০ আসলে নড়বড়ে সরকার, যে কোনোদিন পড়ে যাবে। যদি তেমন হয় অথবা একেবারে ২০২৯ সালেই সরকার বদল হয়, তখন কিন্তু বিকল্প সংবাদমাধ্যমকেও পরীক্ষা দিতে হবে। কারণ শঠতা, কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের সঙ্গে গোপন আঁতাত, পেশাগত সুবিধাবাদ ও অযোগ্যতার দোষ যে বিকল্প সংবাদমাধ্যমে একেবারেই নেই— এমন বললে মিথ্যে বলা হবে। ফ্যাসিবাদবিরোধিতা আপাতত প্রাথমিক কর্তব্য। সেই সুযোগে অন্য অনেক ক্ষমতাবানের বিরুদ্ধে প্রশ্ন তোলার দায়িত্বও বিকল্প সংবাদমাধ্যম এখন এড়িয়ে যেতে পারছে। তখন কিন্তু আর তা করা চলবে না।
ডেমোক্রেসিতে গভমেন্টই সকলের মাইবাপ। কিন্তু কজনের বাপই গভমেন্ট হয়? যাদের হয় তারা এতকাল হাতে মাথা কেটে এসেছে, আর এখন একজন একটু সব ছবিতে থাকতে চেয়েছে বলে আপনারা তাকে ট্রোল করছেন! এমনি এমনি তো আর সাহেবরা বলেনি যে ভারত পরশ্রীকাতর লোকেদের দেশ। কোথায় বলেছে সেকথা জিজ্ঞেস করবেন না। একবার যখন লিখেছি সাহেবরা বলেছে, তখন অবশ্যই বলেছে। না বলে থাকলেও আপনাদের কীর্তিকলাপ দেখে শিগগির বলবে। সোশাল মিডিয়া হয়ে এই হয়েছে ঝামেলা। সকলেরই হাতে একখানা ফোন আছে, ফলে কারোর কোনো ণত্ব ষত্ব জ্ঞান নেই। যার যা সম্মান তাকে যে সেটা দিতে হয়, সেই বোধ নেই। যিনি এত বড় বোর্ডটাকে কাঁধে করে টেনে নিয়ে যাচ্ছেন, তিনি একটু বিশ্বকাপে হাত দিয়েছেন বলে সকলে যা খুশি তাই পোস্ট করে চলেছে। অবশ্য এ দেশের লোকের ধর্মই তো এই। যে দেশে প্রধানমন্ত্রীকেই লোকে সম্মান দেয় না, মিম বানায়; সে দেশে ক্রিকেট বোর্ডের প্রেসিডেন্টকে আর কে সম্মান দেবে?
অ্যাঁ, কী বলছেন? জয় শাহ প্রেসিডেন্ট নন, সেক্রেটারি? প্রেসিডেন্ট কে তাহলে? রজার বিনি? আরে ওসব বিনি পয়সার লোককে অত পাত্তা দেওয়ার কী আছে? তাছাড়া তেনাকে তো দেখাও যায় না চট করে, কথা-টথাও শোনা যায় না। ক্রিকেট কি যক্ষপুরী নাকি, যে রজারকে রক্তকরবীর রাজা বলে মেনে নিতে হবে? ওসব ছাড়ুন। মানিব্যাগ যার কাছে, সে-ই হল আসল রাজা। আজ দেশের ক্রিকেট চালাচ্ছেন, এশিয়ার ক্রিকেট চালাচ্ছেন, অন্যদের ঘাড় ধরে দুনিয়ার ক্রিকেটও নিজের মর্জি মত চালিয়ে নিচ্ছেন। কাল হয়ত বসেই পড়বেন আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিলের চেয়ারম্যানের চেয়ারে। যে দেশে কানার নাম হয় পদ্মলোচন, সে দেশে বিশ্বকাপে জয় পাওয়া এবং বিশ্বক্রিকেটের শাহ হতে চলা লোককে এত লোক গাল দিচ্ছে দেখলে মানুষটার প্রতি মায়া হয়। মানুষটার কতখানি মায়া দয়া সে খবর আপনারা রাখেন? এই যে হারিকেন বেরিলে আপনাদের প্রিয় ক্রিকেটাররা ওয়েস্ট ইন্ডিজে আটকে পড়েছিলেন, চার্টার্ড ফ্লাইট পাঠিয়ে তাঁদের উড়িয়ে আনল কে? ওই শর্মা, থুড়ি শাহই তো। শুধু কি তাই? ক্রিকেটাররা কে কোথায় কার সঙ্গে কানাকানি করলেন, কার সঙ্গে চুপিচুপি দেখা করলেন, ডিনার খেতে গেলেন, খেয়ে হোটেলে নিজের ঘরে গেলেন নাকি তার ঘরে গেলেন – এসব জরুরি ইনফর্মেশন আপনাদের ফোনে পৌঁছে দেন যে ধুরন্ধর জার্নালিস্টরা, তাঁদের পর্যন্ত উড়িয়ে এনেছেন বিসিসিআই সেক্রেটারি জয়। এমন লোকের নামে জয়ধ্বনি না দিয়ে তাকে নিয়ে চালাক চালাক জোক ক্র্যাক করা! এসব ধম্মে সইবে? নেহাত লোকটা বায়োলজিকাল, তাই অভিশাপ-টাপ দিতে পারে না। তা বলে লোকটাকে নাহক ছোট করবে দেশসুদ্ধ ক্রিকেটপ্রেমী মিলে?
বলা হচ্ছে যশপ্রীত বুমরার হাত থেকে নাকি কোনো এক দুর্বল মুহূর্তে জয় কাপটা ছিনিয়ে নিয়েছিলেন রোহিত শর্মার সঙ্গে ছবি তুলবেন বলে।
Jay Shah is constantly seen snatching the trophy from players just to be seen in the camera frame holding it.
This nepotism product wont even qualify for the BCCI's peon post if he weren't Amit Shah's son, look at the audacity of this langur
কী এমন মহাভারত অশুদ্ধ হয়েছে তাতে? বছর বছর আইপিএলের ম্যাচ বাড়িয়ে খেলোয়াড়দের আরও ধনী করার ব্যবস্থা করছেন, ফি বছর আইসিসি টুর্নামেন্টের বন্দোবস্ত করেছেন (২০১৯ – ৫০ ওভারের বিশ্বকাপ, ২০২১ – বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপ ফাইনাল আর ২০ ওভারের বিশ্বকাপ, ২০২২ – আবার ২০ ওভারের বিশ্বকাপ, ২০২৩ – বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপ ফাইনাল আর ৫০ ওভারের বিশ্বকাপ, ২০২৪ – আরও একবার ২০ ওভারের বিশ্বকাপ, ২০২৫ – চ্যাম্পিয়নস ট্রফি আর বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপ ফাইনাল) যাতে ক্রিকেটাররা বড় ট্রফি জেতার অনেক সুযোগ পান, বৃষ্টির সম্ভাবনা থাকলে অন্য সেমিফাইনালে রিজার্ভ ডে রেখে ভারতের ম্যাচে না রাখার ব্যবস্থা করেছেন, গতবছর দেশের মাঠে বিশ্বকাপের আয়োজন করে অন্য দেশের সমর্থকদের আসার রাস্তা এমনভাবে বন্ধ করেছিলেন যে খেলোয়াড়রা গ্যালারিতে কেবল নীল সমুদ্রই দেখতে পেতেন। মানে রোহিত, বুমরারা দারুণ খেলেন তাই। যদি না-ও খেলতেন, তাহলেও তাঁদেরই হাতে ট্রফি তুলে দেওয়ার জন্যে যতটা করা সম্ভব, সবটাই শাহ করেছেন। এশিয়া কাপ থেকে শুরু করে বিশ্বকাপ – সর্বত্রই করে থাকেন। এত কিছু করার পরেও যারা প্রশ্ন তোলে – এই লোকটার কী যোগ্যতা আছে কাপ হাতে নেওয়ার, তারা দেশদ্রোহী ছাড়া কী?
তাছাড়া আপনারা খেয়ালই করেন না যে আপনাদের জন্যেও মানুষটা কত করে। সাত সমুদ্দুর তেরো নদীর পারে বিশ্বকাপ হল, তবু কেমন সন্ধেবেলা অফিস থেকে ফিরে মাঝরাত অব্দি খেলা দেখে আবার পরদিন সকাল সকাল অফিস চলে গেলেন। ওদিকে যেখানে খেলা হল সেখানকার লোকেরা সাতসকালে বা ভরদুপুরে কাজকম্ম ফেলে মাঠে যেতে পারল না বলে অনেক খেলায় গ্যালারি বিজেপির ভোটের মিটিংয়ের মাঠের মত খালি গেল। শাহের বোর্ড না থাকলে আপনারই চেতনার রঙে পান্না সবুজ হতে পারে, চুনি রাঙা হয়ে উঠতে পারে আর আপনার প্রাইম টাইমে ভারতের ক্রিকেট ম্যাচ হতে পারে একেবারে অন্য গোলার্ধে – এ কি স্বপ্নেও ভাবতে পারতেন? তা এত কাণ্ড যে টাকার গরমে সম্ভব হল, সে টাকার মালিককে আপনারা ফ্রেমের বাইরে রাখতে চান? নিজেদের ইচ্ছা মত টুর্নামেন্ট সাজিয়ে নেয়া নিয়ে সায়েবরা লেখালিখি করলে গোঁফে তা দিয়ে আপনারা বলেন – ‘এসব সাদা চামড়ারা অনেক করেছে। এখন আমাদের সময়, আমরা করব।’ আর এদেশের দু-একজন সাংবাদিক ভুল করে লিখে ফেললে দুর্বাসা মুনির মতন রেগে বলেন ‘অ্যান্টি-ন্যাশনাল।’ সত্যযুগ হলে বেচারিরা ভস্মই হয়ে যেত। তা এখন শাহের জন্যেও চাড্ডি হাততালি দিলেন না হয়।
কী দরাজ মন দেখুন তো লোকটার! আইসিসি চ্যাম্পিয়ন টিমকে দিয়েছে এদেশের কারেন্সিতে ২০ কোটি টাকা মত, আর উনি দিচ্ছেন ১২৫ কোটি। পঞ্চাশ গ্রামের টুর্নামেন্টে কোনোদিন দেখেছেন, কমিটি দিল ৫০১ টাকা আর আপনার ক্লাব দিল ৩০০১ টাকা? আহা! অমন হলে দুনিয়াটাই অন্যরকম হত মশাই। একবার ভাবুন। দুনিয়ার ফিফথ লার্জেস্ট ইকোনমির দেশ আমাদের, তাও এত লোক গরিব যে জয়ের জেঠুমণির সরকার ৮০ কোটি লোককে ফ্রিতে রেশন দেয়ার ব্যবস্থা করেছে। সেই দেশের ক্রিকেট দলকে ২০ ওভারের বিশ্বকাপ জেতার জন্যে ১২৫ কোটি টাকা দিলেন জয়। কিছু লোক আবার কেমন নিন্দুক দেখুন – বলে বেড়াচ্ছে যে এটা তেলা মাথায় তেল দেয়া। একেকজনের ভাগে কোটি পাঁচেক করে পড়বে, ওর চেয়ে বেশি ওরা এনডর্সমেন্ট থেকেই পায়। এদিকে মেয়েদের আর ছেলেদের দলের ম্যাচ ফি সমান করে দিয়ে মেয়েদের ম্যাচের আয়োজনই করা হয় না। তা ওদের জন্যে কিছু ভাবলে হত। কোভিডে রঞ্জি ট্রফি বন্ধ থাকার সময়ে দিন আনি দিন খাই অবস্থা হয়েছিল অনেক ঘরোয়া ক্রিকেটারের। তাদের জন্যেও কিছু করে না জয়ের বোর্ড। আরে বাপু, মানুষটার মনটা নরম বলে কি দানসত্র খুলে বসতে হবে নাকি? যারা টাকা করার ব্যবস্থা করে তাদেরই দেয়ার বন্দোবস্ত করা হয়েছে। যে সে মাথায় তেল দিলে চলবে? তেলের যা দাম বেড়েছে।
তা ক্রিকেটাররা কি কিছু মাইন্ড করেছেন? দেখে মনে তো হল না। তাঁরা জানেন যে জয় হলেন গোপাল পাঁঠার মত। তিনি আছেন বলে আমি আছি, আপনি আছেন, রোহিত আছেন, বিরাট আছেন, বুমরা আছেন, হার্দিক আছেন। তাই লক্ষ্মী ছেলের মত তাঁরা বিভিন্ন ব্যাপারে জয়ের জেঠুমণির সরকারের পক্ষ নিয়ে পোস্ট করে দেন। আবার লক্ষ্মী ছেলের মত পোস্ট করেন না, যখন দেশের মহিলা অলিম্পিয়ানদের রাতের অন্ধকারে টেনে হিঁচড়ে রাস্তা থেকে তুলে নিয়ে যায় জয়ের বাবার পুলিস।
দেশের লোক কি কিছু মাইন্ড করেছে? মোটেও না। নিদেনপক্ষে মুম্বাইয়ের লোকেরা তো একেবারেই মাইন্ড করেনি। ১৯৮৩ সালের কথা বাদ দিন, ২০০৭ বা ২০১১ সালেও মেরিন ড্রাইভে এত লোক দেখা যায়নি উইক ডে-তে ভর সন্ধেবেলা। এই অনন্ত আনন্দধারার মধ্যে স্রেফ মুখখানা অপছন্দ বলে ছুতোয় নাতায় মিষ্টি লোকটার পিছনে লেগে অ্যাম্বিয়েন্সটা বিগড়ে দেবেন না মাইরি। কটা দিন অন্তত নিট, নেট, ব্রিজ ভাঙা, এয়ারপোর্টের ছাদ ধসে পড়ে অক্কা পাওয়া, দেশের রাজধানীতে জলের অভাবে মিনিস্টারের অনশন, অগ্নিবীর, ঠেঙিয়ে মুসলমান হত্যা – এসব পলিটিকাল কচকচি ভুলে থাকতে দিন। আচ্ছে দিন না আসুক, আচ্ছে উইন তো এসেছে। গলা ছেড়ে গেয়ে উঠুন ‘জয় জয় জয় জয় হে’।
নয়ের দশকে যখন ভারত-পাক সম্পর্ক আজকের মত এত খারাপ হয়নি, তখন পাকিস্তানিরা ভারতীয়দের সঙ্গে রসিকতা করত – শচীন তেন্ডুলকর আর মাধুরী দীক্ষিতকে দিয়ে দাও। আমরা কাশ্মীরের দাবি ছেড়ে দেব।
গতবছর জুবিলি নামের এক ওয়েব সিরিজে গত শতকের পাঁচের দশকের মুম্বাই ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি নিয়ে সত্যাশ্রয়ী গল্প ফাঁদা হয়েছিল। সেই প্লট অনুযায়ী, পূর্বতন সোভিয়েত ইউনিয়ন ভারতে কমিউনিস্ট প্রোপাগান্ডা ছড়ানোর জন্যে বম্বের সিনেমা জগতের একটা অংশকে অর্থের জোগান দিত। জওহরলাল নেহরুর নেতৃত্বাধীন ভারত সরকারও তাতে মদত দিত। সেই প্রকল্পে সায় না দেওয়ায় অন্য এক অংশের ছবির গান অল ইন্ডিয়া রেডিওতে বাজানো বন্ধ করে দেওয়া হয়। তারই মোকাবিলায় সেই অংশ মার্কিনি সহায়তায় রেডিও সিলোন থেকে হিন্দি ছবির গান বাজানোর ব্যবস্থা করা হয়। এই কাহিনির কতটা সত্যি কতটা মিথ্যা তা নিয়ে আলোচনা করার মানে হয় না, কারণ নির্মাতারা প্রথমেই হাত ধুয়ে ফেলেছিলেন পর্দায় ‘সব চরিত্র কাল্পনিক’ জাতীয় বিবৃতি দিয়ে। কিন্তু শাস্ত্রে জল থেকে দুধ আলাদা করে খাওয়ার ক্ষমতাসম্পন্ন যে রাজহাঁসের কথা আছে, আমরা যদি তেমন করে এই গপ্পোটাকে দেখি, তাহলে বুঝতে পারব – সদ্যস্বাধীন ভারতের হিন্দি ছবির আন্তর্জাতিক আবেদন ছিল। সেই আবেদন আজও অনেকের বুকে জ্বালা ধরায়। ‘সফট পাওয়ার’ কথাটা ইদানীং খুব ব্যবহৃত হয় আন্তর্জাতিক সম্পর্কের আলোচনায়। স্বাধীন ভারতের সফট পাওয়ার কিন্তু প্রথম থেকেই সবচেয়ে বেশি বলিউডি ছবিতেই (বলিউড নামটা অবশ্য অনেক পরে এসেছে)।
উজ্জ্বল গৌরবর্ণ এবং ভারতীয়দের মধ্যে বিরল রঙের চোখের মণির অধিকারী রাজ কাপুরের ছবি যে পূর্বতন সোভিয়েত ইউনিয়নে প্রবল জনপ্রিয় ছিল তা সর্বজনবিদিত। আওয়ারা (১৯৫১) দিনের পর দিন মস্কোর সিনেমা হলে হাউজফুল হত এবং রাজকে দেখতে প্রায় মারামারি লেগে যেত – এরকম একাধিক জবানবন্দি পাওয়া যায়। শ্রী ৪২০ (১৯৫৫) ছবিতে মুকেশের কণ্ঠে রাজের ঠোঁটে ‘মেরা জুতা হ্যায় জাপানি/ইয়ে পাতলুন ইংলিশস্তানী/সর পে লাল টোপি রুশি/ফির ভি দিল হ্যায় হিন্দুস্তানী’ যতখানি নেহরুর ভারতের জোট নিরপেক্ষ আন্তর্জাতিকতাবাদের ঘোষণা, ততটাই আন্তর্জাতিক দর্শকদের কাছে পৌঁছবার চেষ্টা। কমিউনিস্ট রাশিয়ায় রাজের বিপুল ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তার কারণেই নেহরুর মৃত্যুর ছবছর পরেও মেরা নাম জোকার (১৯৭০) ছবির জন্য একগুচ্ছ রুশ অভিনেতা, অভিনেত্রীকে রাজ ব্যবহার করতে পেরেছিলেন। সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রথম রাষ্ট্রপ্রধান লেনিন শিল্পমাধ্যম হিসাবে সিনেমার অমিত শক্তি বিলক্ষণ বুঝতেন। সেই কারণেই সদ্যোজাত কমিউনিস্ট রাষ্ট্র টানাটানির সংসারেও সের্গেই আইজেনস্টাইনের ছবির পৃষ্ঠপোষকতা করেছে। অনেকটা বামমনস্ক নেহরুও সিনেমার শক্তি বুঝতেন। সেই সময়কার বম্বের তিন প্রধান তারকা – রাজ, দিলীপকুমার আর দেব আনন্দ – নেহরুর প্রিয়পাত্র ছিলেন।
আজকাল পশ্চিমবঙ্গে নতুন করে বাংলা জাতীয়তাবাদের হুঙ্কার শোনা যাচ্ছে। সেই জাতীয়তাবাদীরা যুগপৎ আফসোস এবং অভিযোগ করেন যে নেহরু তথা কংগ্রেসের পৃষ্ঠপোষকতার কারণেই হিন্দি ছবি গোড়া থেকেই আন্তর্জাতিক বাজার পেয়েছে, বাংলা ছবি পায়নি। কথাটার মধ্যে কিছু সত্যতা থাকলেও থাকতে পারে, তবে ভুললে চলবে না যে বাংলা ছবি কিন্তু নিজগুণে আন্তর্জাতিক বাজার না হোক, বিস্তর আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেয়েছে একসময়। সত্যজিৎ রায় আর মৃণাল সেনের ছবি বিদেশের বিভিন্ন ফিল্মোৎসবে সমাদৃত ও পুরস্কৃত হয়েছে। উত্তমকুমার হিন্দি ছবি করতে গিয়ে মোটেই সফল হননি, কিন্তু নায়ক (১৯৬৬) ছবিতে অভিনয়ের জন্য আন্তর্জাতিক প্রশংসা পেয়েছেন। জীবদ্দশায় প্রাপ্য সম্মান না পাওয়া ঋত্বিক ঘটকের ছবি যত দিন যাচ্ছে তত বেশি করে আলোচিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে। বিখ্যাত ফিল্ম পত্রিকা সাইট অ্যান্ড সাউন্ড এখনো ঋত্বিকের ছবি নিয়ে আলোচনা প্রকাশ করে। অর্থাৎ বিশ্বজয় করার নানা পথ আছে এবং সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা না পেলেই সব পথ বন্ধ হয়ে যায় না। বিশেষ করে সিনেমার ক্ষেত্রে, যার নিজস্ব ভাষা আছে। সেই ভাষা দিয়ে পৃথিবীর যে কোনো দেশের দর্শককেই মোহিত করা সম্ভব, সিনেমার সংলাপের ভাষা সে বুঝুক আর না-ই বুঝুক।
যেমন বারাক ওবামা হিন্দি জানেন না, কিন্তু শাহরুখ খানের দিলওয়ালে দুলহনিয়া লে জায়েঙ্গে ছবি এত জনপ্রিয় হয়েছিল যে তার সংলাপ মার্কিন রাষ্ট্রপতি থাকার সময়ে তাঁর কানেও পৌঁছে গেছিল। তিনি (বা তাঁর বক্তৃতালেখকরা) জানতেন যে ভারত সফরে এসে শাহরুখের সংলাপ বললে বড় অংশের ভারতীয়কে মুগ্ধ করে দেওয়া যাবে। নিঃসন্দেহে বলিউড ছবির দৌড় অতদূর হওয়ার পিছনে একটা কারণ অনাবাসী ভারতীয়দের মধ্যে হিন্দিভাষীদের আধিক্য। নয়ের দশক থেকে দেখা গেছে অনেক ক্ষেত্রে বলিউড তাঁদের কথা মাথায় রেখেই ছবি করেছে। শাহরুখেরই একাধিক ছবি আছে যার প্রধান পাত্রপাত্রীরা অনাবাসী ভারতীয়। শাহরুখের ঘনিষ্ঠ বন্ধু করণ জোহর প্রায় আলাদা জঁরই বানিয়ে ফেলেছিলেন অনাবাসী ভারতীয়দের দিকে মুখ করে থাকা ছবির। তা বলে একথা ভাবলে ভুল হবে যে বম্বের ছবি কেবল বিদেশবাসী ভারতীয়রাই দেখে। আমার এক সুইটজারল্যান্ডবাসী বন্ধু গতবছর অ্যাটলি নির্দেশিত শাহরুখের জওয়ান দেখতে গিয়ে ও দেশের আফগান, শ্রীলঙ্কান বাসিন্দাদেরও দেখা পেয়েছিল। তারা তবু এই উপমহাদেশের লোক। ইউরোপ, আমেরিকায় বসবাসকারী ভারতীয়রা অনেকেই হলে হিন্দি ছবি দেখতে গিয়ে শ্বেতাঙ্গদেরও দেখা পায়।
সিনেমা সীমান্ত তো বটেই, রাজনৈতিক বৈরিতার বেড়াও যে টপকাতে পারে তার প্রমাণ পাকিস্তানে হিন্দি ছবির জনপ্রিয়তা। নয়ের দশকে যখন ভারত-পাক সম্পর্ক আজকের মত এত খারাপ হয়নি, তখন পাকিস্তানিরা ভারতীয়দের সঙ্গে রসিকতা করত – শচীন তেন্ডুলকর আর মাধুরী দীক্ষিতকে দিয়ে দাও। আমরা কাশ্মীরের দাবি ছেড়ে দেব। এক দশক আগেও তো পাকিস্তানের ফওয়াদ খান, মাহিরা খানরা বলিউডি ছবিতে অভিনয় করে গেছেন। মাহিরা এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, তাঁর মা যখন জানতে পারেন মাহিরা একটা ছবিতে (রঈস, ২০১৭) শাহরুখের নায়িকা হচ্ছেন তখন তিনি এমন আচরণ করেছিলেন যেন কৃতার্থ হয়ে গেছেন। মাহিরা রসিকতা করে বলেছিলেন – মা এমন করল, মনে হল, আমি যে পাকিস্তানের একজন নামকরা নায়িকা সেটা যেন কিছুই না।
তবে হিন্দি ছবি কতরকম মানুষকে জয় করতে পারে সে সম্পর্কে চমকপ্রদ অভিজ্ঞতা হয়েছিল আমার এক অগ্রজ সাংবাদিকের। বেজিং অলিম্পিক কভার করতে গিয়ে যে অল্পবয়সী চীনা স্বেচ্ছাসেবকদের সঙ্গে তাঁরা আলাপ হয়, তারা চোস্ত ইংরিজি বলতে পারত না। আবার এই সাংবাদিক মোটেই চীনা ভাষা জানেন না। কিন্তু ওই ছেলেমেয়েরা তাঁর সঙ্গে শাহরুখের ছবি নিয়ে গল্প করত। তিনি কিছুদিনের মধ্যেই বুঝতে পারেন, ওরা ওঁর চেয়ে বেশি ছবি দেখেছে শাহরুখের। অথচ চীনে বসে ভারতীয় ছবি দেখা নাকি খুব সহজ কাজ ছিল না সেইসময়, কারণ ইন্টারনেটের উপর সরকারের বিস্তর নজরদারি ছিল। ভার্চুয়াল প্রাইভেট নেটওয়ার্ক ইত্যাদি লাগত। সেসব বাধা পেরিয়েই তারা শাহরুখের ভক্ত হয়েছে। নিজের দেশের যে কোনো ক্ষেত্রে জয়ের কথা শুনতে এবং পড়তে কার না ভাল লাগে? তবে আনন্দ করার সময়ে পা মাটিতে রাখা ভাল। যে জয়ে আমার কোনো কৃতিত্বই নেই তা নিয়ে কলার তোলা আমাদের মজ্জাগত। যেমন এবারের কান ফিল্মোৎসবে নির্দেশক পায়েল কাপাডিয়ার ছবি, কলকাতার মেয়ে অনসূয়া সেনগুপ্তের অভিনয় পুরস্কৃত হওয়ার পরে এগুলোকে ‘ভারতের জয়’ বলে তুলে ধরা হয়েছে। পায়েল যে প্রতিষ্ঠানের ছাত্রী, সেই ফিল্ম অ্যান্ড টেলিভিশন ইনস্টিটিউটের প্রাক্তন কর্তা গজেন্দ্র চৌহান পর্যন্ত ছাত্রীর জন্যে তিনি গর্বিত বলে সোশাল মিডিয়ায় দাবি করেছেন। অথচ পায়েল যখন ছাত্রী ছিলেন, তখন তাঁকে মোটেই আদর করা হয়নি। প্রতিবাদী চরিত্রের ফল হিসাবে এখনো তাঁর বিরুদ্ধে মামলা চলছে। বলিউডের বিশিষ্ট সিনেমাশিল্পী অনুরাগ কাশ্যপ অপ্রিয় সত্য বলার জন্য বিখ্যাত। তিনি বলেই দিয়েছেন, কানে যে ভারতীয়রা পুরস্কৃত হয়েছে তাদের জন্য ভারতের গর্বিত হওয়ার কিছু নেই। পুরো কৃতিত্বই তাদের নিজেদের। কারণ ভারত তাদের জন্য কিচ্ছু করেনি। পায়েলের ছবির প্রযোজনা করেছেন অনেকে মিলে, সকলে ভারতীয় নন। এমনকি ছবিটা ভারতে দেখানোর ব্যবস্থা পর্যন্ত করা যায়নি এখনো।