কুণাল, যাঁর কৌতুক আজ কামড়ায়

‘পরেরবার যদি রাজনৈতিক কৌতুক করি, তাহলে এত ব্যাকফুটে থাকার দরকার নেই। সোজা মোদী, অমিত শাহ, আম্বানি, আদানি – যা প্রাণে চায় বলে দেওয়াই ভাল। কারণ যা-ই করো, গালি তো খেতেই হবে। সুতরাং অল আউট খেলাই ভাল। অত ভাবার দরকার নেই যে লোকে অমুক জোকের যুক্তিটা নিয়ে বলবে…ইন্টারনেটে দুই ধরনের লোক আছে। এক ধরনের লোক শাসক দলের ভক্ত, আরেক ধরনের লোক শাসক দলকে রীতিমত ঘৃণা করে। অতএব…আমাকে অনেকেই বলেছে, এত ফেন্স সিটিং করছ কেন? সুতরাং ঠিক করে নিয়েছি…সেরা কমেডি হয় ক্ষমতার বিরুদ্ধে কথা বললে, তাই না? পাঞ্চ ডাউন করার চেয়ে পাঞ্চ আপ করা ভাল, আর সেটা যদি করতেই হয় তাহলে পাঞ্চটা জোরে মারাই ভাল। সুতরাং এখন যদি আমি রাজনৈতিক কৌতুক করি, তাহলে সেটা অনেক বেশি তীক্ষ্ণ হবে।’

গাম্ভীর্য নির্বোধের মুখোশ। কথাটা অনেককাল আগে বলেছিলেন এক মাস্টারমশাই। মোটেই বিশ্বাস করিনি, কারণ ততদিনে একাধিক জায়গা থেকে জেনেছি যে রাজশেখর বসু অত সরস সব গল্প লিখলেও, খুব গম্ভীর মানুষ ছিলেন। তারাপদ রায়ের সঙ্গে আলাপ ছিল এরকম একজনের মুখ থেকেও একইরকম কথা শুনেছিলাম। কিন্তু মাস্টারমশাই যে নেহাত ভুল বলেননি তার প্রমাণ গত কয়েক দিনে পাওয়া গেছে। ঋজু বিদূষক কুণাল কামরার কমেডি শো যে হলে হয়েছিল, মুম্বইয়ের সেই দ্য হ্যাবিট্যাট -এর মালিক আর কর্মচারীদের জিজ্ঞেস করলে তাঁরা নির্ঘাত বলবেন – হাড়ে হাড়ে টের পাওয়া গেছে। তবে নির্বোধ মানেই কিন্তু নিরীহ নয়। সুকুমার রায়ের রামগরুড়ের ছানাদের হাসতে মানা; একনাথ শিন্ডে, দেবেন্দ্র ফড়নবীশের দলবল আরও এককাঠি সরেস। তারা নিজেরা না হেসেই খুশি নয়, অন্যদেরও হাসতে মানা করে ভাংচুর করে।

অবশ্য এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। হাসাহাসি করলে ফ্যাসিবাদী হওয়া যায় না। তাছাড়া শিবসেনার জন্মই হয়েছিল ঠ্যাঙাড়ে বাহিনি হিসাবে, মুম্বই ও সংলগ্ন শিল্পাঞ্চলে অত্যন্ত শক্তিশালী বামপন্থী ট্রেড ইউনিয়নগুলোকে ভাঙার জন্যে (দুর্জনে বলে কংগ্রেসের উদ্যোগে)। কুণাল কামরার কমেডি শো নিয়ে শিবসেনার গুন্ডামি দেখে অনেকে খেয়াল করিয়ে দিচ্ছেন, শিবসেনার আদিপুরুষ বালাসাহেব ঠাকরে নিজে কার্টুনিস্ট ছিলেন, ইন্দিরা গান্ধীর ব্যঙ্গচিত্রও এঁকেছেন ইত্যাদি। কিন্তু ওসব কথা বলে লাভ নেই। বাল ঠাকরে শিবসেনার নেতা হিসাবে মোটেই কোনো গণতান্ত্রিক ব্যক্তি ছিলেন না। শিবসেনা কীভাবে মুম্বই চালাত সেকথা সে যুগের মুম্বই তথা মহারাষ্ট্রের বাসিন্দারা প্রত্যেকেই জানেন। নয়ের দশকের মুম্বই দাঙ্গায় শিবসেনার ভূমিকাও কোনো গোপন তথ্য নয়। আজ যে সারা ভারতে সুনির্দিষ্ট পরধর্মবিদ্বেষী এবং/অথবা পরজাতিবিদ্বেষী গুন্ডামি চালু করেছে সংঘ পরিবার, তার সূচনা অনেক আগেই বালাসাহেব করে দিয়েছিলেন মহারাষ্ট্রে। মুসলমান তো বটেই, সেইসময় শিবসেনার আক্রমণের বড় লক্ষ্য ছিলেন দক্ষিণ ভারতীয় শ্রমজীবী মানুষজন। ফলে কুণালের শো নিয়ে গুন্ডামি করে এক অর্থে একনাথরা প্রমাণ করে দিলেন যে তাঁরাই বাল ঠাকরের যথার্থ উত্তরাধিকারী, উদ্ধব ঠাকরেরা নন। চলচ্চিত্র পরিচালক হনসল মেহতা ২৪ মার্চ তাঁর এক্স হ্যান্ডেলে এক পোস্টে মনে করিয়ে দিয়েছেন যে আজ থেকে ২৫ বছর আগে তাঁর একখানা ছবির একটামাত্র সংলাপের জন্যে শিবসৈনিকরা তাঁর অফিসে ঢুকে তাণ্ডব চালিয়েছিল। তাঁকে মারধোর করা হয়, মুখে কালি লেপে দেওয়া হয়, তারপর জনা বিশেক রাজনৈতিক নেতা এবং হাজার দশেক লোকের সামনে এক বৃদ্ধার পা ধরে ক্ষমা চাওয়ানো হয়। মুম্বই পুলিস দ্য হ্যাবিট্যাট ভাংচুরে দর্শকের ভূমিকা পালন করেছে, সেদিনও তাই করেছিল। শিবসেনা কেমনভাবে চলত তা বোঝার জন্যে একথাও মনে করা দরকার যে বালাসাহেব ঠাকরের মৃত্যুর পর গোটা মহারাষ্ট্রে প্রায় বনধ করে দেওয়ার সমালোচনা করে সোশাল মিডিয়ায় পোস্ট করার জন্যে শিবসৈনিকরা পালঘরের দুই নিরীহ মেয়ের পিছনে লেগেছিল। তাদের পুলিস গ্রেফতার করে এবং একজনের আত্মীয়ের দোকান ভাংচুর করে শিবসৈনিকরা।

তবুও এবারের ঘটনা আর বাল ঠাকরের আমলের বিবিধ গুন্ডামিতে বিলক্ষণ তফাত আছে। তখন শিবসেনা ছিল রাষ্ট্রকেও তোয়াক্কা না করা অথবা রাষ্ট্রশক্তিকে নিজের ইচ্ছা মত চলতে বাধ্য করা শক্তি। আজ একনাথের শিবসেনা রাষ্ট্রের অংশ। স্রেফ তাঁর চ্যালাদের গুন্ডামিতে ব্যাপারটা থেমে থাকেনি, খোদ বৃহন্মুম্বই মিউনিসিপাল কর্পোরেশনের আধিকারিকরা গিয়ে দ্য হ্যাবিট্যাট ভেঙে এসেছেন। উপরন্তু মহারাষ্ট্রের মুখ্যমন্ত্রী ফড়নবীশ বলেছেন, কুণালকে ক্ষমা চাইতে হবে। তিনি যা খুশি তাই বলতে পারেন না। বাকস্বাধীনতার সীমা আছে ইত্যাদি। বালাসাহেব আইনের পথে যেতেন না, নিজের পথ নিজে কেটে নিতেন। কুণালের বিরুদ্ধে কিন্তু একাধিক এফআইআর ফাইল করা হয়েছে। যারা দ্য হ্যাবিট্যাট ভেঙে দিয়ে এসেছে, তারাই থানায় গিয়ে এফআইআর করেছে কুণালের নামে। অথচ তাদের বিরুদ্ধে কোনো মামলা মোকদ্দমা হওয়ার খবর নেই এখন পর্যন্ত। এখানেই সাধারণ গুন্ডামি আর ফ্যাসিবাদী হিংসার তফাত। এর বিরুদ্ধে শিরদাঁড়া সোজা করে দাঁড়াতে গেলে দুটো জিনিস অবশ্য প্রয়োজনীয় – সাহস আর কৌশল। কুণালের দুটোই আছে। কীরকম? দেখা যাক।

নায়কোচিত সাহস

দ্য হ্যাবিট্যাটের শোয়ের পর থেকে যা যা ঘটেছে তাতে কুণাল নায়ক হয়ে গেছেন – এতে অনেক আরএসএসবিরোধীকেও অসন্তুষ্ট হতে দেখছি। তাঁদের মধ্যে কারোর নায়ক ব্যাপারটাতেই আপত্তি, কারোর আবার আপত্তি কুণাল শোয়ের শেষে ভারতের সংবিধান তুলে ধরে নিজের অধিকারের কথা জানান দিয়েছিলেন বলে। আজ দেশের যা অবস্থা, সুপ্রিম কোর্টের আদেশেরও তোয়াক্কা না করে যেভাবে সংঘবিরোধীদের বাড়িঘর দোকানপাট বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়া চলছে, অপছন্দের লোক হলেই যা ইচ্ছা অভিযোগ দায়ের করে কারাবন্দি করে রাখা চলছে – তাতে কুণালের মত প্রকাশ্যে নাম করে ক্ষমতাসীন লোকেদের নিয়ে যিনি খিল্লি করবেন তিনি তো বহু মানুষের চোখে নায়ক হয়ে যাবেনই। আটকাবেন কী করে? আটকাতে হবেই বা কেন? পৃথিবীর কোন দেশে কোন বিদ্রোহ, কোন বিপ্লব আবার নায়ক ছাড়া হয়েছে? আমাদের স্বাধীনতা আন্দোলনেও তো অনেক নায়ক। সকলে আবার একই মত, একই পথেরও নন। ক্ষুদিরাম বসু নায়ক, মাস্টারদা সূর্য সেন নায়ক, ভগৎ সিং নায়ক, নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু নায়ক; আবার জওহরলাল নেহরু, মৌলানা আবুল কালাম আজাদ, মহাত্মা গান্ধীও নায়ক। শিল্পী সাহিত্যিকদের মধ্যে কাজী নজরুল ইসলাম নায়ক, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় নায়ক, আবার পীতাম্বর দাসও নায়ক। তাঁর নাম আজ প্রায় কারোর মনে নেই, কিন্তু তাঁর রচনা করা ‘একবার বিদায় দে মা ঘুরে আসি’ গানটা রয়ে গেছে। একটা সময় পর্যন্ত অল্লামা ইকবালও আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামের নায়ক ছিলেন। উর্দু, হিন্দি ভাষা নিয়ে অ্যালার্জি না থাকলে ‘সারে জহাঁ সে অচ্ছা’ গানটা আজও যে কোনো দেশপ্রেমিক মানুষের প্রিয় হবে, দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের ‘ধনধান্য পুষ্প ভরা’-র মতই। এঁরাও সকলে এক মতের লোক নন। যিনি আমার লড়াইটাই লড়ছেন কিন্তু একই মতের লোক নন, তাঁর সাহসকে সেলাম জানাতে না পারলে আমারই ক্ষুদ্রতা প্রকাশ পায়। তাঁর নয়।

রইল সংবিধানের কথা। পৃথিবীর কোনো সংবিধান নিখুঁত নয়, ভারতের সংবিধানও নয়। আবার যে কোনো দেশের সংবিধান খুললেই দেখা যায় অনেক ভাল ভাল কথা লেখা আছে যার প্রয়োগ নেই। কথাটা ভারতের সংবিধানের ক্ষেত্রেও সত্যি। সংবিধান প্রণেতাদের অন্যতম, বাবাসাহেব ভীমরাও আম্বেদকর, নিজেই সংবিধান সভার শেষ অধিবেশনে বলেছিলেন যে সংবিধানে সমতাবিধান করা হল, কিন্তু ভারতের সমাজ রইল অসাম্যে পরিপূর্ণ। এভাবে কতদিন ভারতে গণতন্ত্র টিকবে তা নিয়ে তিনি পরেও বারবার সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। কিন্তু ভারতের বহু মানুষ যে এই সংবিধানের দ্বারা নানা মাত্রায় উপকৃত হয়েছে তা অস্বীকার করার উপায় নেই। ঠিক যেমন অনস্বীকার্য যে অনেক মানুষের উপর নিপীড়ন চালানো হয়েছে এবং হচ্ছে এই সংবিধানকে হাতিয়ার করেই। তা বলে যে কোটি কোটি ভারতীয় সংবিধানের উপর আস্থা রাখেন, ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে আজকের লড়াইয়ে সংবিধানকে নিজের অস্ত্র মনে করছেন তাঁদের বিরুদ্ধ পক্ষ বলে মনে করা বা তাঁদের দিকেই বাক্যবাণ ছোড়া এককথায় নির্বুদ্ধিতা। ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে নানা জন নানাভাবে লড়বে, যার যতটুকু ক্ষমতা সে ততটুকুই দিয়েই লড়বে। কেউ লোক হাসিয়ে লড়বে, কেউ গান গেয়ে লড়বে, কেউ লিখে লড়বে, কেউ রাস্তায় মিছিল, মিটিং করে লড়বে, কেউ আইনি লড়াই করবে। এখন ‘এই সংবিধান মানি না’ বলার সময় নয়, কারণ এখন যুদ্ধটা সংবিধানের বিরুদ্ধে নয়। এটুকু বুঝতে খুব অসুবিধা হওয়ার কথা নয়, যদি আপনার সোশাল মিডিয়ার বাইরে একটা সত্যিকারের লড়াই থাকে।

উপযুক্ত কৌশল

কুণালকে মুম্বই থেকে ফোনে হুমকি দিচ্ছে কিছু লোক আর কুণাল তাদের বলছেন ‘আ যা তামিলনাড়ু’ – এমন একটা অডিও ক্লিপ ভাইরাল হয়েছে। অনেক খবরের চ্যানেলেও শোনানো হয়েছে। এটা ভুয়ো বলে এখন পর্যন্ত জানা যায়নি আর ঘটনা হল, মুম্বইয়ের বাসিন্দা কুণাল কয়েক বছর হল তামিলনাড়ুতে থাকতে শুরু করেছেন। ফলে তিনি যে হলে শো করেছিলেন সেখানে ভাংচুর চালাতে পারলেও একনাথের ভক্তরা কুণালকে শারীরিকভাবে আক্রমণ করতে পারেনি। পারলে কী করত তা অনুমান করাও অসম্ভব। স্রেফ হনসলের হাল করে ছেড়ে দিত – একথা আজকের ভারতে নিশ্চিত করে বলা যায় না। মনে রাখতে হবে, বিনা বিচারে উমর খালিদকে বছরের পর বছর আটক করে রাখার আগে তাঁর দিকে গুলি চালানো হয়েছিল। কুণাল মুসলমান নন বলে তেমন সম্ভাবনা নেই – এরকম যাঁরা ভাবেন তাঁরা হয়ত ২০২০ সালে জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের মেয়েদের হোস্টেলে হামলার কথা ভুলে গেছেন। কুণাল অবশ্যই ভোলেননি। উপরন্তু অন্য এক বিদূষক মুনাওয়ার ফারুকীর শো যখন ২০২১ সালে ইন্দোরে বলপূর্বক বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল এবং যে কৌতুক তিনি করেননি তার জন্যে কারারুদ্ধ করা হয়েছিল, তখন যে বিদূষকরা মুনাওয়ারের হয়ে লড়াই লড়েছিলেন, কুণাল তাঁদের একজন। ফলে বুঝতে অসুবিধা হয় না যে কুণাল সচেতনভাবেই এমন এক রাজ্যে চলে গেছেন যে রাজ্যের সরকার সংঘ পরিবারের সঙ্গে আদর্শগত লড়াইয়ে লিপ্ত, অত্যন্ত আক্রমণাত্মক। শুধু তাই নয়, অদূর ভবিষ্যতে এম কে স্ট্যালিনের নেতৃত্বাধীন ডিএমকে ক্ষমতাচ্যুত হলেও বিজেপির তামিলনাড়ুতে ক্ষমতায় আসার কোনো সম্ভাবনা নেই (পশ্চিমবঙ্গে কিন্তু আছে)। তামিলনাড়ুতে সংঘ পরিবারের বিরুদ্ধে সামাজিক-সাংস্কৃতিক প্রতিরোধ এত তীব্র যে সম্প্রতি কেন্দ্রের তিন ভাষা নীতি নিয়ে বিতর্কের আবহে সেখানকার বিজেপি নেত্রী রঞ্জনা নাচিয়ার পার্টি থেকে পদত্যাগ করেছেন

মুম্বইতে দাঁড়িয়ে নাম করে নরেন্দ্র মোদী, অমিত শাহ, ফড়নবীশ, মুকেশ আম্বানি, তাঁর ছেলে, আনন্দ মাহিন্দ্রা, এবং নাম না করে একনাথকে নিয়ে মস্করা করার সাহসের পিছনে যে কুণাল যে রাজ্যে থাকেন তার নিরাপত্তা কাজ করেছে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু ব্যাপারটার মধ্যে কৌশল আছে বলে কুণালের সাহসকে এক বিন্দুও ছোট করা যায় না। কারণ সাম্প্রতিক অতীতে বিজেপিশাসিত রাজ্যে অভিযোগ দায়ের করে অন্য রাজ্যের লোককে গ্রেফতার করার দৃষ্টান্ত বিরল নয়। আসাম পুলিস ২০২০ সাল থেকে তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী সর্বানন্দ সোনোয়ালের নির্দেশে গর্গ চ্যাটার্জিকে গ্রেফতার করতে চাইছিল। কলকাতা পুলিস নাকি সহযোগিতা করছিল না। শেষমেশ ২০২২ সালে গৌহাটি হাইকোর্ট কলকাতার পুলিস কমিশনারকে গর্গবাবুকে গ্রেফতার করার নির্দেশ দেয়, কলকাতা পুলিসকে সে নির্দেশ মানতেই হয়। গুজরাটের বিধায়ক জিগ্নেশ মেওয়ানিকেও আসাম পুলিস গ্রেফতার করে নিয়ে গিয়েছিল। অবশ্যই গুজরাট সরকার বিজেপির হওয়ায় সুবিধা হয়েছিল। কংগ্রেস নেতা পবন খেরাকে তো স্রেফ প্রধানমন্ত্রীকে ‘নরেন্দ্র গৌতমদাস মোদী’ বলার জন্যে দিল্লি বিমানবন্দরে বিমান থেকে নামিয়ে গ্রেফতার করেছিল আসাম পুলিস। তবে সুপ্রিম কোর্টের হস্তক্ষেপে তিনি কয়েক ঘন্টার মধ্যেই জামিন পেয়ে যান।

একথা ঠিক যে কুণালের এখন যেরকম নাম হয়েছে তাতে তাঁকে গ্রেফতার করা হলে প্রশান্ত ভূষণ বা ইন্দিরা জয়সিংয়ের মত দেশের সবচেয়ে নামকরা আইনজীবীরা হয়ত তাঁর হয়ে লড়বেন। তবে মনে রাখতে হবে, কুণাল কিন্তু গর্গ, জিগ্নেশ বা পবনের মত সক্রিয় রাজনীতির লোক নন। তাঁর কাছে গ্রেফতার হওয়া অতখানি জলভাত ব্যাপার না হওয়ারই কথা। আরও বড় কথা হল, কুণাল সুপ্রিম কোর্টকে আগে থেকেই চটিয়ে রেখেছেন। ২০২১ সালে তিনি সুপ্রিম কোর্ট যে দ্রুততায় অর্ণব গোস্বামীর জামিন মঞ্জুর করেছিল, তাকে ব্যঙ্গ করে একগুচ্ছ টুইট করেন। তার জন্যে তাঁর নামে সুপ্রিম কোর্টে মামলা করে কিছু লোক, বিচারপতিরাও আদালত অবমাননার নোটিস পাঠান। কুণাল তার যে জবাব দিয়েছিলেন তাও একই সঙ্গে সাহস ও রসবোধের নিদর্শন। মোদ্দা কথা, তিনি বিচারপতিদের সামনেও মাথা নোয়াননি। শুধু কি তাই? নিজের এক শোয়ে সুপ্রিম কোর্টকে ‘ব্রাহ্মণ-বানিয়া অ্যাফেয়ার’ পর্যন্ত বলে বসে আছেন। এমন লোকের উপর কি আর বিচারপতিরা সদয় হবেন?

কুণালের পরিবর্তন

কুণাল ঋজু বিদূষক হিসাবে কাজ করছেন বছর দশেক হতে চলল। কিন্তু তিনি কি বরাবর এতটা রাজনৈতিক, এত প্রতিবাদী, এতখানি সাহসী ছিলেন? উত্তর হল – না। ২০১৬-১৭ সালে কুণালের যে ভিডিও প্রথম ভাইরাল হয় এবং তাঁর নাম ছড়িয়ে পড়ে, তার নাম ছিল প্যাট্রিয়টিজম অ্যান্ড দ্য গভমেন্ট

এখানে তিনি যেসব কৌতুক করছেন সেগুলোও রাজনৈতিক। তিনি সেইসময় যা যা নিয়ে সর্বত্র আলোচনা হত, যেমন নোটবন্দি, জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয় – সব নিয়েই কথা বলছেন। কিন্তু তাতে আরও নানারকম কৌতুক মিশে আছে। তিনি সমাজের নানা ধরনের লোককে নিয়ে মজা করছেন, সোশাল মিডিয়া ট্রেন্ডগুলো নিয়ে কথা বলছেন, নেটফ্লিক্স নিয়ে মজা করছেন। তখন তাঁর মতে সরকার ছিল ভোডাফোনের মত ‘সার্ভিস প্রোভাইডার’, আর নাগরিক উপভোক্তা। এরপর ২০১৭ সালে তাঁর যে শোয়ের ভিডিও ইউটিউবে আপলোড হয়, সেখানে কুণাল মূলত ট্যাক্সিচালকদের নিয়ে মজা করেন। বিশেষত উবের ড্রাইভারদের নিয়ে। বলেন যে উবের একটা ভাল অ্যাপ কিন্তু ভারতে সেটা কাজ করে না, কারণ এখানকার ড্রাইভাররা ওই অ্যাপের নিয়ম অনুযায়ী চলতে চান না। ২০১৮ সালে দেশ কে বুডঢে ভিডিও। এটাও রাজনৈতিক এবং বিজেপিবিরোধী। কিন্তু ব্যঙ্গের চাঁদমারি বৃদ্ধ দক্ষিণপন্থীরা।

তারপরের ভিডিও আবার অনেকটা অরাজনৈতিক। সেখানে কুণাল মূলত মুম্বই আর ইন্দোর – এই দুই শহরের নানা গোলমালকে ব্যবহার করে হাস্যরস উৎপাদন করেন। এসবের পাশাপাশি চলছিল তাঁর পডকাস্ট শাট আপ ইয়া কুণাল, যেখানে তিনি উমর খালিদ আর কানহাইয়া কুমারের সাক্ষাৎকার নেন। আবার বিজেপি নেতাদেরও সাক্ষাৎকার নেন। কিন্তু এই ২০১৮ সালে কুণালের মধ্যে একটা পরিবর্তন লক্ষ করা যায়। অ্যাবিশ ম্যাথিউ নামে একজন ঋজু বিদূষক আছেন যিনি কুণালের মত অতটা জনপ্রিয় নন। তাঁর ইউটিউব চ্যানেলে তিনি জার্নি অফ আ জোক নামে একখানা পডকাস্ট করেন। সেই পডকাস্টের এক পর্বে কুণাল আসেন সেবছর। সেখানে অ্যাবিশ কুণালের থেকে জানছিলেন প্যাট্রিয়টিজম অ্যান্ড দ্য গভমেন্ট শোয়ের কৌতুকগুলো কীভাবে তৈরি করা হয়েছিল। পর্বের শেষদিকে অ্যাবিশ জিজ্ঞেস করেন, ওই ভিডিওর যে প্রতিক্রিয়া হয়েছে তা থেকে কুণাল কী শিখলেন? উত্তরে কুণাল বলেন ‘পরেরবার যদি রাজনৈতিক কৌতুক করি, তাহলে এত ব্যাকফুটে থাকার দরকার নেই। সোজা মোদী, অমিত শাহ, আম্বানি, আদানি – যা প্রাণে চায় বলে দেওয়াই ভাল। কারণ যা-ই করো, গালি তো খেতেই হবে। সুতরাং অল আউট খেলাই ভাল। অত ভাবার দরকার নেই যে লোকে অমুক জোকের যুক্তিটা নিয়ে বলবে…ইন্টারনেটে দুই ধরনের লোক আছে। এক ধরনের লোক শাসক দলের ভক্ত, আরেক ধরনের লোক শাসক দলকে রীতিমত ঘৃণা করে। অতএব…আমাকে অনেকেই বলেছে, এত ফেন্স সিটিং করছ কেন? সুতরাং ঠিক করে নিয়েছি…সেরা কমেডি হয় ক্ষমতার বিরুদ্ধে কথা বললে, তাই না? পাঞ্চ ডাউন করার চেয়ে পাঞ্চ আপ করা ভাল, আর সেটা যদি করতেই হয় তাহলে পাঞ্চটা জোরে মারাই ভাল। সুতরাং এখন যদি আমি রাজনৈতিক কৌতুক করি, তাহলে সেটা অনেক বেশি তীক্ষ্ণ হবে।’

আজকের কুণালের দিকে সেদিনের কুণালের যাত্রা শুরু তখন থেকে। ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনের আগে তাঁর যে ভিডিও আপলোড হয় সেখানে কুণাল এসে দাঁড়ান একখানা কালো টি শার্ট পরে, যার উপর বড় বড় অক্ষরে লেখা WAH MODIJI WAH। মঞ্চে এসেই তিনি দর্শকদের জিজ্ঞেস করেন ‘আমার আর আম্বানিজির মধ্যে মোদীজি কী করছেন? আমি সোজা আম্বানিকে কেন ভোট দিতে পারি না?’ হাসাহাসির মধ্যে দিয়ে কুণাল একবিংশ শতকের বিশ্ব রাজনীতির এক নিদারুণ সত্য উদ্ঘাটন করে ফেলেন – আজকের রাজনীতিকে চালায় আসলে বড় বড় কর্পোরেশনগুলো। তখনো কিন্তু মোদীর সঙ্গে আম্বানি, গৌতম আদানির সম্পর্ক নিয়ে রাহুল গান্ধী সরব হননি। ডোনাল্ড ট্রাম্পের হয়ে ইলন মাস্কের লম্ফঝম্প কোনোদিন দেখতে হবে – একথাও কেউ কল্পনা করেনি। অথচ কুণাল বলেন ‘আমার মনে হয় কর্পোরেশনগুলোরই ভোটে লড়া উচিত। রতন টাটা বনাম মুকেশ আম্বানি। লড়ো ২০১৯।’ এই কৌতুককে এগিয়ে নিতে নিতেও কুণাল আমাদের এক বুনিয়াদি বিতর্কের দিকে নিয়ে যান। সেটা হল – উন্নয়ন বা বিকাশ মানে কী?

নয়া উদারনীতিবাদ আমাদের এমন মাথা খেয়েছে, এটা যে বিতর্কের বিষয় তা এদেশের মার্কসবাদের নামে শপথ নেওয়া অনেক পার্টিও এই সহস্রাব্দে ভুলেই গেছে। লক্ষ করুন, যে কুণাল আগে সরকারকে ভোডাফোনের মত একটা কোম্পানি বলেই আখ্যা দিতেন, তিনি বছর তিনেক পরেই কর্পোরেশনগুলোর মুখোশ খুলছেন হাসাতে হাসাতে। পরের পাঁচ বছরে কুণাল কী কী করলেন? একদা উবের ড্রাইভারদের আচরণ নিয়ে কৌতুক করা মানুষটি গিগ শ্রমিকদের নিয়ে তৈরি গানের ভিডিও শেয়ার করলেন নিজের ইউটিউব চ্যানেলে। দেশের গোদি মিডিয়ার মুকুটহীন সম্রাট এবং জাতীয়তাবাদের ধ্বজাধারী সাংবাদিক অর্ণবের যে নিজের স্টুডিওর স্বাচ্ছন্দ্যের বাইরে এলে গলা দিয়ে আওয়াজ বেরোয় না তা ফাঁস করে দিলেন বিস্তর ঝামেলার ঝুঁকি নিয়েও। উমর, শার্জিল ইমামের মত রাজনৈতিক বন্দিদের মুক্তির দাবিতে সভায় বক্তৃতা দিলেন। হাস্যকৌতুকের ভিডিওগুলোতেও কৃষক আন্দোলনের প্রতি সহমর্মিতা দেখালেন, পডকাস্টে পি সাইনাথের মত লোককে ডেকে আনলেন। ২০২৪ লোকসভা নির্বাচনের সময়ে পুরোদস্তুর সাংবাদিকসুলভ অধ্যবসায়ে পর্বের পর পর্বে সরকারের রিপোর্ট কার্ড বার করলেন। অতঃপর এই সাম্প্রতিকতম ভিডিও, যা মহারাষ্ট্রের বিধানসভা নির্বাচনে বিরোধীদের ভরাডুবির পর সারা দেশে ঝুলে পড়া অনেক কাঁধকে মাথা তোলার সাহস দিল।

এই ভিডিওতে কুণাল যাদের আক্রমণ করেছেন তারা বুদ্ধিমানের মত, অতি ক্ষুদ্র এক ব্যক্তি, যার নামও নেওয়া হয়নি, তাকে অপমান করা হয়েছে অভিযোগ করে হল্লা করছে। সেই হল্লায় বিরোধী পক্ষের অনেকেও ভুলছেন। তাঁরা খেয়াল করছেন না, ভারতের কোনো রাজনৈতিক নেতা এখনো যা বলেননি কুণাল প্রথমবার সেটাই বলে দিয়েছেন এই ভিডিওতে। দেশের কমিউনিস্টরা পর্যন্ত যখন ফ্যাসিবাদী শাসন চলছে না নয়া ফ্যাসিবাদী – তা নিয়ে তাত্ত্বিক তর্কে মেতে আছেন, তখন এই বিদূষক শাহরুখ খান অভিনীত বাদশা ছবির টাইটেল সংটার প্যারডি বানিয়ে মোদীকে ‘তানাশাহ’ (একনায়ক) বলে দিয়েছেন। ওঁদের লেগেছে তো আসলে ওইখানে। আজকের দিনে গণতান্ত্রিক ভড়ংটা বজায় রাখতে সব একনায়কই চায়। রচপ তায়িপ এর্দোগান, ভ্লাদিমির পুতিনও সর্বক্ষণ প্রমাণ করার চেষ্টা করেন যে তাঁদের দেশে গণতন্ত্র চলছে। মোদীও ব্যতিক্রম নন। সেখানে একজন লোক হাসানোর লোক যদি সরাসরি একনায়ক শব্দটা উচ্চারণ করে ফেলে, তা হজম করা শক্ত। হাসিকে ভয় পায় না এমন কোনো একনায়ক হয় না। কারণ মানুষের উপর তাদের নিয়ন্ত্রণ বজায় থাকে ভয়ের কারণে, আর হাসি একনায়ককে খিল্লির পাত্র করে ফেলে। তাতে ভয় কেটে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। কোনো বিরোধী নেতার মুখ থেকে এই শব্দ বেরোলে খুব বেশি লোক পাত্তা না-ও দিতে পারে। কারণ একে তো অনেকে রাজনৈতিক বক্তৃতা শোনে না, তার উপর বিরোধীরা তো ক্ষমতাসীনের নামে দু-চারটে খারাপ কথা বলবেই। কিন্তু যে লোক হাসায় তার কথা স্রেফ রাগ করার জন্যেও অনেকে শোনে। ফলে কুণালের এই ভিডিও এক মূর্তিমান বিপদ। বিজেপি আই টি সেল ইতিমধ্যেই নেমে পড়েছে কুণালের পিছনে ডীপ স্টেটের ভূমিকা আছে, মার্কসবাদীদের টাকায় কুণাল চলেন – এইসব বলে পরিস্থিতি সামলাতে। মহারাষ্ট্র পুলিস কুণালের মুম্বইয়ের বাড়িতে গিয়ে, তিনি কাদের থেকে টাকাপয়সা পেয়েছেন তা নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করার জন্য তাঁর বাবা-মায়ের কাছে শমনও দিয়ে এসেছে। মজা হল, যত এসব করা হচ্ছে তত কুণালের কৌতুকগুলোর শক্তি বেড়ে যাচ্ছে। কারণ কুণাল বহুদিন আগে থেকে নিজেই হাসি হাসি মুখে বলে থাকেন ‘কমিউনিস্ট পার্টি অফ ইন্ডিয়া নে বহত প্যায়সে দিয়ে হ্যাঁয় মেরে কো’।

একটা কথা না বলে এ আলোচনা শেষ করতে পারছি না।

ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে নিজেদের অগ্রণী সৈনিক ভাবার এক অকারণ অভ্যাস বাঙালিদের আছে। সংঘ পরিবারের গোটা ভারতের উপর হিন্দি চাপিয়ে দেওয়ার আবহে এখন আরও বেশি করে পশ্চিমবঙ্গে বেশকিছু বাংলাবাদীর উদ্ভব হয়েছে। তাঁদের অনেকে অনাবাসী ভারতীয় হয়ে বাঙালি জাতীয়তাবাদের স্বপ্ন বিক্রি করেন সোশাল মিডিয়ায়, অবিভক্ত বাংলা আলাদা রাষ্ট্র হলে কী হত না হত তা নিয়ে বাষ্পাকুল হয়ে পড়েন। অনেকে আবার পশ্চিমবঙ্গে থেকেই নিজের ছেলেমেয়েকে ইংরিজি মাধ্যম স্কুলে দ্বিতীয় ভাষা হিসাবে হিন্দি পড়িয়ে বাংলার সংস্কৃতি বাঁচাতে ব্যাকুল। কুণালের মত হিন্দিভাষীদের কাজের প্রশংসা করলেই তাঁরা ভীষণ রেগে যান। কিন্তু কী করা যাবে? বাংলায় একজনও যে আজ পর্যন্ত হিন্দিভাষী রবীশ কুমার বা কুণালের মত ঋজু হয়ে দাঁড়াতে পারলেন না ফ্যাসিবাদের সামনে। না কোনো সাংবাদিক, না কোনো ঋজু বিদূষক, না কোনো গায়ক, না কোনো কবি। সারা ভারতে জনপ্রিয় হওয়ার কথা বলছি না। তার জন্যে অবশ্যই কুণালরা হিন্দি, ইংরিজি ব্যবহার করার সুবিধা পান। কিন্তু বাংলা ভাষায় বাঙালিদের আলোড়িত করার মত আমির আজিজ সুলভ গনগনে একখানা কবিতা কোন কবি লিখেছেন মোদী সরকারের দশ বছরে? স্লোগান হয়ে ওঠা কবিতার আবশ্যিক গুণ নয়। কিন্তু বরুণ গ্রোভার রচিত ‘হম কাগজ নহি দিখায়েঙ্গে’ যেভাবে সারা দেশে স্লোগান হয়ে উঠেছিল, তেমন একখানা কবিতাই বা কে লিখেছেন বাংলায়? বাংলা ভাষার কোন সাংবাদিক (এমনকি বিকল্প মাধ্যমেরও) রবীশের মত লাগাতার লিখে যাচ্ছেন/বলে যাচ্ছেন কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে?

আরও পড়ুন হাসছি মোরা হাসছি দেখো: বীর দাসের বীরত্বে দুই ভারতের পর্দা ফাঁস

কেন্দ্রের সরকারের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর কথা বলছি, রাজ্য সরকারের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে বলছি না। কাজটা তো খুব কঠিন হওয়ার কথা নয়, কারণ কুণালের তামিলনাড়ুর মত পশ্চিমবঙ্গও তো বিজেপিবিরোধী দলের (অন্তত তাদের বয়ান অনুযায়ী) শাসনে থাকা রাজ্য। কুণালের পিছনে যদি স্ট্যালিনের বরাভয় থেকে থাকে, এখান থেকে তাঁর মত কেউ উঠে দাঁড়ালে তাঁর পিছনেও নিশ্চয়ই মমতা ব্যানার্জির বরাভয় থাকবে। তাহলে ভয় কিসের?

আসলে বোধহয় স্বীকার করে নেওয়া ভাল, আমাদের সে মুরোদ নেই। আমরা মুখেন (এবং ফেসবুকেন) মারিতং জগৎ। আমাদের রাজ্য সরকারও তাই। নইলে যে ডিলিমিটেশন হলে আমাদের সাড়ে সর্বনাশ, তার বিরুদ্ধে অবিজেপি মুখ্যমন্ত্রীদের বৈঠক ডাকলেন স্ট্যালিন, তাতে গেলেনই না আমাদের রাজ্য সরকারের কোনো প্রতিনিধি!

অতএব আমাদের হয়ে লড়বেও অন্যরাই। আমরা কেবল পায়ের উপর পা তুলে তাদের দোষ ধরে যাব, কেন তারা যথেষ্ট বিপ্লবী নয় তা লিখে সোশাল মিডিয়া ভরাব। যেমন এখন কুণাল সম্পর্কে ভরাচ্ছি।

নাগরিক ডট নেট ওয়েবসাইটে প্রকাশিত

সাংবাদিক? ওদের আবার কী দরকার?

গ্রোক বাবাজি মোটেই কোনো সত্যান্বেষী নয়। সে আজ যে উত্তরগুলো দিচ্ছে তাতে নতুন তথ্য তো নেই-ই, উপরন্তু তার তথ্যের ভিত্তি হল এত বছর ধরে চাকরির ঝুঁকি নিয়ে, জীবনের ঝুঁকি নিয়ে যেসব সাংবাদিক খবর বার করে এনেছেন তাঁদের কাজকর্ম। কিন্তু এসব মনে রাখার দরকার নেই। সাংবাদিক ফালতু, গ্রোককে মাথায় তুলে নাচো।

ভয়েস অফ আমেরিকা নামটা সংবাদ জগতের সঙ্গে যুক্ত না থাকা বাঙালির অপরিচিত মনে হতে পারে। তবে যাঁরা কবীর সুমনের ভক্ত, কদিন আগেই তাঁর জন্মদিন উপলক্ষে খুশিয়াল হয়ে উঠেছিলেন, তাঁরা নিশ্চয়ই জানেন এই মার্কিনি আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের কথা। কারণ বাংলা গানে পুরোপুরি আত্মনিয়োগ করার আগে একসময় সুমন ভয়েস অফ আমেরিকায় সাংবাদিকের চাকরি করতেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ে মার্কিন সরকারের আনুকূল্যে তৈরি এই সংবাদমাধ্যম ইংরিজি সমেত মোট ৪৯ খানা ভাষায় সারা বিশ্বে পরিষেবা দিয়ে থাকে। সম্ভবত শিগগির বলতে হবে – দিত। কারণ গত রবিবার (১৬ মার্চ) ডোনাল্ড ট্রাম্পের সরকার ভয়েস অফ আমেরিকা এবং অন্যান্য সরকারপোষিত সংবাদমাধ্যমগুলোতে গণ ছাঁটাই আরম্ভ করেছে। আজকাল সারা পৃথিবীর কর্পোরেট চাকরিতে ইদানীং যা দস্তুর, সেই অনুযায়ী রাতারাতি ইমেল করে কর্মরত সাংবাদিক ও অন্যান্য কর্মীদের জানানো হয়েছে – কেটে পড়ো।

ট্রাম্প (অনেকে বলছে বকলমে ইলন মাস্ক) ক্ষমতায় আসার পর থেকে একের পর এক ‘এক্সিকিউটিভ অর্ডার’ দিয়ে মার্কিন সরকারের নানা দফতরের হাজার হাজার কর্মচারীর চাকরি ইতিমধ্যেই খেয়েছেন। সরকারের আস্ত বিভাগ তুলে দেওয়া হচ্ছে। নেহাত ওদেশের জজসাহেবদের সাক্ষাৎকার দেওয়ার উৎসাহ কম, সাংবিধানিক অধিকার রক্ষা করার উৎসাহ বেশি। তাই অনেকের এখনো সেসব চাকরি ফিরে পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। প্রায় রোজ কোনো না কোনো আদালতের বিচারক ট্রাম্পের কোনো ছাঁটাইয়ের আদেশকে অসাংবিধানিক বলে বাতিল করে দিচ্ছেন। এই দড়ি টানাটানিতে শেষমেশ কে জিতবে এখনো বলা যাচ্ছে না, তবে ভাবগতিক দেখে মনে হচ্ছে, সম্ভব হলে ট্রাম্প-মাস্ক সরকারটাই তুলে দিতে চান খরচ কমানোর নাম করে। সে কাজের অঙ্গ হিসাবেই যে ভয়েস অফ আমেরিকার উপর খড়্গহস্ত হয়েছেন তা বোঝা যাচ্ছে। কেবল ভয়েস অফ আমেরিকা তো নয়, রেডিও ফ্রি ইউরোপ, রেডিও ফ্রি এশিয়া, ফারসি ভাষার রেডিও ফারদা, আরবি ভাষার আলহুরা – এই সমস্ত সরকারপোষিত মিডিয়ার কর্মীদেরই টা টা বাই বাই করা হচ্ছে।

ব্যাপারটাকে স্রেফ অন্য দফতরের কর্মচারীদের ছাঁটাইয়ের সঙ্গে এক করে দেখলে সবটা দেখা হবে না। কারণ মার্কিন গণতন্ত্রের হাজার দোষ থাকলেও, অস্বীকার করার উপায় নেই যে আলাদা আলাদা গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাধীনতা ভারতীয় গণতন্ত্রের চেয়ে অনেক বেশি। এখানে আধা-সরকারি সংবাদমাধ্যম কী লিখতে/বলতে পারে বা পারে না তা কোনোদিনই সম্পূর্ণ সরকারের নিয়ন্ত্রণের বাইরে ছিল না। বলা বাহুল্য, ইদানীং সে নিয়ন্ত্রণ গলার ফাঁসে পরিণত হয়েছে। কিন্তু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ভয়েস অফ আমেরিকার মত প্রতিষ্ঠান সরকারি অর্থে পুষ্ট হলেও তাকে পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা অতীতের রাষ্ট্রপতিদের ছিল না। ট্রাম্প প্রশাসন মোটেই গোপন করছে না যে ওই ব্যাপারটা মোটেই তাদের পছন্দ নয়। ধনকুবের ট্রাম্প-মাস্ক সরকার শুধু বলতে বাকি রেখেছে যে নুন খাবে আর গুণ গাবে না, তা হবে না। ছাঁটাইয়ের খবর প্রকাশ করে সোল্লাসে হোয়াইট হাউস থেকে বলা হয়েছে – এর ফলে মার্কিন করদাতাদের আর দেশের প্রোপাগান্ডার পিছনে টাকা খরচ করতে হবে না। একথা ঠিক যে পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলের জন্যে তৈরি এই সংবাদমাধ্যমগুলো তৈরি করার উদ্দেশ্য ছিল এমন সব দেশে মার্কিনি দৃষ্টিভঙ্গি প্রচার করা, যেখানে মার্কিন সরকারের সঙ্গে সদ্ভাব নেই এমন সরকার রয়েছে। যেমন ঠান্ডা যুদ্ধকালীন পূর্ব ইউরোপ, চীন, ৯/১১ পরবর্তী মুসলমান-প্রধান দেশগুলো। যে কারণে ভয়েস অফ আমেরিকার মৃত্যুঘন্টা বেজেছে জেনে ট্রাম্পের ঘোষিত শত্রু চীনের সরকার নিয়ন্ত্রিত সংবাদমাধ্যম উল্লাস প্রকাশ করেছে। কিন্তু তেমন প্রোপাগান্ডায় ট্রাম্প সরকারের উৎসাহ নেই – একথা কি বিশ্বাসযোগ্য? মোটেই না। কারণ ট্রাম্প হলেন প্রোপাগান্ডার রাজা। তাঁর উত্থানের পিছনে ভারতের গোদি মিডিয়ার মত আমেরিকার সহিংস, দক্ষিণপন্থী মিডিয়ার যথেষ্ট বড় ভূমিকা আছে। সুতরাং তিনি কেন প্রোপাগান্ডায় করদাতার টাকা খরচ হচ্ছে ভেবে মায়া করতে যাবেন? আসল কথা ট্রাম্প এর আগের চার বছরের শাসনকালেই দেখে নিয়েছেন যে ভয়েস অফ আমেরিকাকে তিনি ফক্স নিউজ বানাতে পারবেন না। তারা তাঁর কথায় ওঠবোস করবে না। অতএব ওটা তাঁর কাছে বাজে খরচ। যে সাংবাদিক চাটুকার নয়, তাকে নিয়ে ট্রাম্প কী করবেন?

আরও পড়ুন এবার মোদীর পথের চেয়েও কঠিন গোদি মিডিয়ার পথ

লক্ষণীয়, মাস্ক টুইটার (অধুনা এক্স) কিনে নেওয়ার পর ২০২২ সালের নভেম্বর মাসে টুইট করেছিলেন যে এখন থেকে টুইটারে ‘সিটিজেন জার্নালিজম’-কে প্রাধান্য দেওয়া হবে এবং ‘মিডিয়া এলিট’ তা আটকানোর আপ্রাণ চেষ্টা করবে। তদ্দিনে তিনি টুইটারে সত্যাসত্য বিচার করা, ঘৃণা ভাষণ আটকানোর যেসব বিভাগ ছিল সেগুলোকে লাটে তুলে দিয়েছেন। অর্থাৎ বুঝতে অসুবিধা হয় না যে তিনি বোঝাতে চাইছিলেন, এবার থেকে যার যা প্রাণে চায় তাই তথ্য বলে চালিয়ে দিতে পারবে। কে না জানে সোশাল মিডিয়ার ক্ষমতা আজকের দিনে কতখানি? অনেক মানুষই যে খবরের জন্যে সংবাদমাধ্যমের চেয়ে সোশাল মিডিয়ার উপর বেশি নির্ভর করেন, সোশাল মিডিয়া থেকে যা জানা গেছে তার সত্যাসত্য যাচাই করার কথা ভুলেও ভাবেন না – এ তো কোনো গোপন কথা নয়। এমনকি সমস্ত সংবাদমাধ্যমকেও সোশাল মিডিয়া ব্যবহার করতে হয়, খবরের জন্যে সেদিকে নজরও রাখতে হয়। যারা আরও এককাঠি সরেস, তারা তো সাধারণ মানুষের মতই সোশাল মিডিয়ার তথ্য যাচাই না করেই খবর হিসাবে চালিয়ে দেয়। তা এহেন সোশাল মিডিয়ার মালিকরা যার প্রাণের বন্ধু, তার আর প্রোপাগান্ডা চালানোর জন্যে পেশাদার সাংবাদিকের দরকার হবে কেন? এবারে ট্রাম্পের শপথ গ্রহণের আগেই তো মেটার (অর্থাৎ ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, হোয়াটস্যাপের) মালিক মার্ক জুকেরবার্গ ভিডিও বার্তা প্রকাশ করে জানিয়ে দিয়েছিলেন যে এখন থেকে ফেসবুকও যাকে যা খুশি বলার ব্যাপারে অনেক বেশি স্বাধীনতা দেবে। মাস্ক তো টুইটারের মালিকানা হাতে পেয়েই আজীবন নিষিদ্ধ হয়ে যাওয়া ট্রাম্পকে ফেরত এনেছিলেন। তারপর ট্রাম্পের হয়ে রীতিমত প্রচার করেন। কী আশায় করেন তা এখন আমেরিকানরা হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছেন। উপরন্তু ট্রাম্পের নিজের কোম্পানিও একখানা সোশাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম খুলে ফেলেছে। কানার নাম পদ্মলোচন রাখার মত তার নাম রাখা হয়েছে ট্রুথ। এমতাবস্থায় সাংবাদিকরা মার্কিন সরকারের কাছে কেবল উদ্বৃত্ত নয়, রীতিমত বালাই। গেলে বাঁচা যায়।

বস্তুত, সর্বত্রই সাংবাদিকরা তাই। প্রণয় রায় আর রাধিকার রায় নাকি কীসব আর্থিক গোলমাল করেছেন – এই অভিযোগে তাঁদের নামে কত মামলা মোকদ্দমা হল নরেন্দ্র মোদী ক্ষমতায় আসার পর থেকে। কতবার তাঁদের পাসপোর্ট কেড়ে নেওয়া হল, এনডিটিভির দফতরে কত কেন্দ্রীয় এজেন্সির কত হানা হল। শেষমেশ প্রায় দেউলে অবস্থায় ওঁদের হাত থেকে এনডিটিভি কিনে ফেললেন পৃথিবীর সবচেয়ে ধনী ব্যক্তিদের একজন – গৌতম আদানি। ও মা! এবছর জানুয়ারি মাসে সিবিআই আদালতে জানিয়ে দিল, রায় দম্পতির বিরুদ্ধে অভিযোগগুলোর কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি! অতএব ‘যাও সবে নিজ নিজ কাজে’। সাত বছর ধরে চলা তদন্তের ফলটা তাহলে কী? সরকারবিরোধী সাংবাদিকতার জন্যে প্রসিদ্ধ এনডিটিভির সরকারের মুখপাত্রে পরিণত হওয়া; রায় দম্পতির হাত থেকে লাগাম বেরিয়ে যাওয়ায় রবীশ কুমার, অনিন্দ্য চক্রবর্তীর মত সাংবাদিকদের প্রথমে কর্মহীন হওয়া; পরে নিজের ব্লগ বা ইউটিউব চ্যানেল খুলে সীমিত পরিসরে সাংবাদিকতা করতে বাধ্য হওয়া। দেশজুড়ে কত সাংবাদিক যে জেল খেটেছেন এবং খাটছেন সেকথা লিখতে বসলে তো আলাদা ওয়েবসাইট তৈরি হয়ে যাবে। কোনো সাংবাদিক আরও বাড়াবাড়ি করলে অবশ্য জেল নয়, গৌরী লঙ্কেশ বা মুকেশ চন্দ্রকর করে দেওয়ার ব্যবস্থা হয়েছে।

ভাবছেন কেবল দুষ্টু লোক, দুষ্টু সরকারই সাংবাদিকদের সরিয়ে ফেলছে? মোটেই তা নয়। দুষ্টু লোকেদের বিরোধীরাও আহ্লাদে আটখানা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে। মাস্কের গ্রোককে মোদীজি বা বিজেপি সম্পর্কে প্রশ্ন করলেই সে টপাটপ এমন সব উত্তর দিচ্ছে যে সব কুকীর্তি বেরিয়ে আসছে। মোদীবিরোধীদের ধারণা, এই অস্ত্রেই ফ্যাসিবাদী বধ হবে। তাঁরা ভুলেই গেছেন যে গ্রোক বাবাজি মোটেই কোনো সত্যান্বেষী নয়। সে আজ যে উত্তরগুলো দিচ্ছে তাতে নতুন তথ্য তো নেই-ই, উপরন্তু তার তথ্যের ভিত্তি হল এত বছর ধরে চাকরির ঝুঁকি নিয়ে, জীবনের ঝুঁকি নিয়ে যেসব সাংবাদিক খবর বার করে এনেছেন তাঁদের কাজকর্ম। কিন্তু এসব মনে রাখার দরকার নেই। সাংবাদিক ফালতু, গ্রোককে মাথায় তুলে নাচো।

অতএব যারা এখনো সাংবাদিক হওয়ার স্বপ্ন দেখছে তাদের বলি – আর যেখানে যাও না রে ভাই সপ্তসাগর পার/জার্নালিজম ক্লাসের কাছে যেও না খবরদার।

রোববার ডট ইন ওয়েবসাইটে প্রকাশিত

সাংবাদিকদের অকালমৃত্যু যা যা শেখায়

আমার দ্বিতীয় চাকরিতে যিনি আমার বস ছিলেন, তিনি এক বিরল প্রজাতির ভদ্রলোক। একটুর জন্যে সতীশ হতে হতে বেঁচে গিয়েছিলেন।

লোকসভা নির্বাচনের বাজারে একটা মৃত্যু প্রায় সকলের নজর এড়িয়ে গেছে, কারণ বাংলা সংবাদমাধ্যমে তা নিয়ে এক লাইনও লেখা হয়নি। মূলধারার সংবাদমাধ্যমে অবশ্য সেই মৃত্যু নিয়ে লেখালিখি হওয়ার সম্ভাবনাও ছিল না। নিজের অপরাধ সকলেই ধামাচাপা দেয়। মূলধারার বাইরে আছি বলেই আমার লেখার সুযোগ ছিল। কিন্তু নির্বাচন সংক্রান্ত লেখালিখিতে মেতে গিয়ে আমিও সেই বর্ষীয়ান সাংবাদিকের মৃত্যুকে অগ্রাহ্য করার দোষে দুষ্ট হয়েছি। এই লেখা বস্তুত পাপস্খালনের চেষ্টা।

ভদ্রলোকের নাম সতীশ নন্দগাঁওকর। তিনি সর্বভারতীয় এবং স্বনামধন্য খবরের কাগজ হিন্দুস্তান টাইমস-এর মুম্বাই সংস্করণের মুম্বাই-থানে ব্যুরোর প্রধান ছিলেন। যাঁরা খবরের কাগজের কার্যপদ্ধতি সম্পর্কে ওয়াকিবহাল, তাঁরা জানেন যে পদটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই ধরনের পদগুলোতে সাধারণত থাকেন অত্যন্ত অভিজ্ঞ রিপোর্টাররা। তাঁদের অধীনে কাজ করেন অন্যরা। এই ব্যুরো প্রধানদের কাজের সময় বলে কিছু থাকে না, থাকা সম্ভব নয়। হয়ত অফিস থেকে বাড়ি চলে গেলেন রাত নটায়, কিন্তু দুটোর সময়ে ফোন আসতে পারে যে অমুক জায়গায় তমুক ঘটনা ঘটেছে। তখন নিজে না গেলেও, তাঁরই দায়িত্ব অন্য কোনো রিপোর্টারকে জানিয়ে খবরটা যেন পরদিন কাগজে বেরোয় তা নিশ্চিত করা। অফিসে নাইট ডিউটিতে থাকেন যে রিপোর্টার, তিনিও কোনো সিদ্ধান্ত নিতে অপারগ হলে যত রাতই হোক ব্যুরো প্রধানকে ঘুম থেকে তোলেন। এটাই দস্তুর। আবার কোনো খবর হাতছাড়া হয়ে গেলে, বা ভুল খবর বেরিয়ে গেলে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে জবাবদিহির দায়িত্বও প্রথমে ব্যুরো প্রধানের। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে অত বড় কাগজের ব্যুরো প্রধানরা নিজেরাও নামকরা সাংবাদিক হন। ফলে কাগজের উপর রাজনৈতিক/অরাজনৈতিক যেসব চাপ আসে বাইরে থেকে, তার অনেকটাও তাঁদেরই সামলাতে হয়। তার উপর রিপোর্টাররা অনেক ক্ষেত্রে অপাঠ্য, দুর্বোধ্য কপি লেখেন। সেই কপিকে বোধ্য করে তুলে তবে সম্পাদনার ডেস্কে পাঠানোও ব্যুরো প্রধানের দায়িত্ব।

এইরকম প্রচণ্ড চাপের একটা কাজ করতেন সতীশ। সঙ্গে আরও বেশকিছু অতিরিক্ত কাজ তাঁকে করতে হত। তিনি গত ২৮ ফেব্রুয়ারি মুম্বাইয়ে অফিসের কাছেই এক ওষুধের দোকানে ব্যথার ওষুধ কিনতে গিয়ে হৃদরোগে আক্রান্ত হন। নিকটবর্তী হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে চিকিৎসকরা বলেন সতীশ মারা গেছেন। এমন মৃত্যু নেহাত বিরল নয়। আমার আপনার অনেক পরিচিতই এরকম হঠাৎ হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান আজকাল। তাহলে সতীশকে নিয়ে লিখছি কেন? কারণ তাঁর মৃত্যুর পর কিছু অভূতপূর্ব ঘটনা ঘটেছে।

গত ১৩ মার্চ মুম্বাই প্রেস ক্লাবে সতীশের স্মরণসভায় তাঁর স্ত্রী অঞ্জলি অম্বেকর বলেন, ‘সাংবাদিক না হলে সতীশ একটা সুন্দর জীবন কাটাতে পারত।’ কথাটা নেহাত একজন অকালমৃতের স্ত্রীর বিলাপ বলে উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। কারণ তিনি হিন্দুস্তান টাইমসের মুম্বাই সংস্করণের রেসিডেন্ট এডিটর মীনা বাঘেলের বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন এডিটর্স গিল্ড অফ ইন্ডিয়া, প্রেস কাউন্সিল এবং মুম্বাই প্রেস ক্লাবে। তাঁর অভিযোগ, মীনা অনবরত অন্য সাংবাদিকদের সামনে সতীশকে অপমান করতেন, যা তাঁর মত সংবেদনশীল মানুষকে প্রবল আঘাত করত। মারা যাওয়ার খানিকক্ষণ আগে, শীতাতপনিয়ন্ত্রিত ঘরে বসে কুলকুল করে ঘামতে ঘামতে সতীশ বলেছিলেন যে তিনি পরদিনই পদত্যাগ করবেন। কারণ সেদিনও খানিক আগেই মীনা একই আচরণ করেছিলেন এবং এই আচরণ দীর্ঘদিন ধরে চলছিল। অঞ্জলির অভিযোগের ভিত্তিতে মুম্বাই প্রেস ক্লাব প্রাথমিক তদন্ত চালিয়ে রিপোর্ট তৈরি করেছে। তাতে বলা হয়েছে, যদিও সতীশের মৃত্যু আর মীনার ব্যবহারের মধ্যে কোনো সরাসরি সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করা যায়নি, তবু একথা সত্যি যে মীনা তাঁকে প্রচণ্ড মানসিক চাপে রাখতেন এবং নিয়মিত অপমান করতেন। এসব ‘কার্ডিয়াক এপিসোড’-এর কারণ হয়ে থাকতেই পারে।

এডিটর্স গিল্ডও এক বিবৃতিতে হিন্দুস্তান টাইমস কর্তৃপক্ষকে এই মৃত্যুর যথাযথ ও স্বচ্ছ তদন্ত করতে অনুরোধ করেছে। এর বেশি কিছু করার ক্ষমতা প্রেস ক্লাব বা গিল্ডের আইনত নেই, কারণ এগুলো সাংবাদিকদের সংগঠন মাত্র। ট্রেড ইউনিয়ন পর্যন্ত নয়। সত্যি কথা বলতে, ভারতের কর্পোরেট সংবাদমাধ্যমে বছর তিরিশেক হল সাংবাদিকদের ট্রেড ইউনিয়ন করা বন্ধ হয়ে গেছে। নয়ের দশকে উদারীকরণের সময়ে সংবাদমাধ্যমগুলো কর্মচারীদের চাকরিগুলোকে চুক্তিভিত্তিক করে ফেলার চেষ্টা শুরু করে। সংবাদমাধ্যমে যাঁরা শ্রমজীবী, অর্থাৎ ছাপার মেশিন চালানোর কাজ করেন বা অফিসগুলোতে পিওনের কাজ ইত্যাদি করতেন, তাঁদের মধ্যে এর বিরুদ্ধে কিছুটা প্রতিরোধ তৈরি হয়েছিল। তাই তাঁদের চুক্তিভিত্তিক কর্মচারী করে ফেলা সহজ হয়নি, অনেকে পুরনো ওয়েজ বোর্ডের অধীনেই রয়ে গিয়েছিলেন। তাঁদের যখন তখন তাড়ানো যায় না; যেমন ইচ্ছে ইনক্রিমেন্ট না দেওয়া বা মাইনে কমিয়ে দেওয়াও যায় না। অর্থাৎ নানা ঝামেলা পোয়াতে হয় মালিককে। অত টাকা দিতে পারব না, ব্যবসার অবস্থা ভাল না – এসব ওজর নিয়ে কোটিপতি কাগজগুলোর মালিকরা বিভিন্ন সময়ে আদালতে পর্যন্ত গেছেন ওই ধরনের কর্মচারীদের বিরুদ্ধে। কর্মচারীরাও গেছেন। অধিকাংশ ক্ষেত্রে কর্মচারীদেরই জয় হয়েছে।

কিন্তু যাঁরা নিজেদের বুদ্ধিজীবী মনে করেন, সেই সাংবাদিকরা, পাকা চাকরি থেকে চুক্তিভিত্তিক চাকরিতে চলে যেতে বিশেষ আপত্তি করেননি। কারণ তাঁদের সামনে মহার্ঘ প্যাকেজের গাজর ঝোলানো হয়েছিল। ফলে সাংবাদিকদের মধ্যে থেকে ইউনিয়ন তুলে দিতে মালিকদের বিশেষ কসরত করতে হয়নি। কিন্তু কেবল শ্রমজীবীদের মধ্যে ইউনিয়ন থাকতে থাকতে ক্রমশ দুর্বল হয়ে পড়ে; মালিকরা যে দুর্বল করে দিতে সক্রিয় ছিল তা বলাই বাহুল্য। যত পুরনো কর্মী অবসর নিয়েছেন, তত চুক্তিভিত্তিক কর্মী বেড়েছে, ইউনিয়ন ততই সাইন বোর্ডে পরিণত হয়েছে। সেই ৩০-৩৫ বছর আগে শুরু হওয়া প্রক্রিয়ার ফল এই, যে আজ সতীশরা কারণে-অকারণে গালমন্দ সহ্য করে কাজ করতে বাধ্য হন। পরিণামে জীবনটা পর্যন্ত চলে যায় অনেক সময়।

শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত হিন্দুস্তান টাইমস সতীশের বস মীনার বিরুদ্ধে কোনো তদন্ত করছে না। করলেও সতীশের মৃত্যুতে তাঁকে দায়ী করার মত কোনো প্রমাণ যে পাওয়া যাবে না তা বলাই বাহুল্য। আত্মহত্যায় প্ররোচনার অভিযোগই আদালতে প্রমাণ করা যথেষ্ট দুরূহ, আর এ তো ডাক্তারি পরিভাষায় স্বাভাবিক মৃত্যু। কিন্তু গত কয়েক বছরে সাংবাদিকদের মধ্যে ৫০-৬০ বছর বয়সে মৃত্যু কীভাবে বেড়েছে তার যদি কোনো সমীক্ষা করা যায়, তাহলে যে চোখ কপালে তোলার মত একটা সংখ্যা পাওয়া যাবে তা নিয়ে আমার কোনো সন্দেহ নেই। কেন সন্দেহ নেই?

কারণ যে পরিস্থিতিতে পড়ে সতীশের হৃদপিণ্ড কাজ বন্ধ করে দিয়েছে, তেমন পরিস্থিতিতে খবরের কাগজের দেড় দশকের কর্মজীবনে আমি নিজেও পড়েছি, অগ্রজ সহকর্মীদেরও পড়তে দেখেছি। হয়ত বয়স কম ছিল বলে আমার শরীর লড়ে গেছে। কিন্তু অগ্রজদের চল্লিশ না পেরোতেই নানারকম ছোট বড় রোগে আক্রান্ত হতে দেখেছি। সাংবাদিকদের মধ্যে ডায়বেটিস, হাইপার টেনশন, হৃদরোগ আজকাল জলভাত। আমার শেষ চাকরির এক অনুজ হঠাৎ একদিন রাতে সিলিং ফ্যান থেকে ঝুলে পড়েছিল। অন্য বিভাগের কর্মী হওয়ায় তার সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা ছিল না আমার। কিন্তু তার মৃত্যুর পরে তারই বিভাগের সাংবাদিকদের থেকে জেনেছিলাম, ওই ঝুলে পড়া মোটেই আকস্মিক নয়। তার কাজের সময় উদ্ভট হওয়ায় বৈবাহিক জীবনে অশান্তি চলছিল বেশ কিছুদিন ধরে। সে তার সুরাহা করার জন্যে বসের কাছে সামান্য পেশাদারি সাহায্য চেয়েছিল – কাজের সময়টা যদি অন্তত কিছুদিনের জন্য বদল করা যায়। তাকে প্রতিশ্রুতি দিয়েও সে বদল করা হয়নি। স্ত্রীর সঙ্গে অশান্তিও মেটেনি। ছেলেটি খুব বলিয়ে কইয়ে ছিল না। যাওয়ার সময়ে সুইসাইড নোট লেখার নাটকীয়তাটুকুও করেনি। এই মৃত্যুর দায়িত্ব কে নেবে? কেউ না। বেচারির তো অভিযোগ করারও কেউ ছিল না।

আমার দ্বিতীয় চাকরিতে যিনি আমার বস ছিলেন, তিনি এক বিরল প্রজাতির ভদ্রলোক। একটুর জন্যে সতীশ হতে হতে বেঁচে গিয়েছিলেন। আমি ওই কাগজের খেলার পাতায় যোগ দিয়েই শুনি, ক্রীড়া সম্পাদকের কয়েকদিন আগেই গুরুতর স্ট্রোক হয়েছে। তাই তিনি হাসপাতালে ভর্তি। মাস দেড়েক পরে যখন কাজে যোগ দিলেন, দেখলাম নিপাট ভালমানুষ এবং অফিসে অসম্ভব জনপ্রিয়। শুধু কাগজের সম্পাদক ভদ্রমহিলা, যিনি অত্যন্ত দক্ষ সহ-সম্পাদককেও ভরা নিউজরুমে হাঁটুর বয়সী ছেলেমেয়েদের সামনে অপদস্থ করতে ছাড়েন না, তিনিই আমাদের ক্রীড়া সম্পাদকের উপর খড়্গহস্ত। কোনো নির্দিষ্ট কারণ ছাড়াই। তাঁর সব কাজেই উনি ভুল ধরেন। মজার কথা, কাজ বলতে যা বোঝায় তা ওই ভদ্রমহিলাকে একদিনও করতে দেখিনি। আমি যে আট মাস ওই কাগজে ছিলাম, তার মধ্যে একদিনও সম্পাদক এক লাইন লেখেননি কাগজে। সম্পাদকীয় পর্যন্ত লিখতেন না। সারাদিন বসে বসে এর তার উপর চেঁচানো আর কয়েকটা পাতায় চোখ বোলানো ছাড়া তাঁর কাজ বলতে ছিল ম্যাড়মেড়ে ইংরিজিতে একে তাকে অপ্রয়োজনীয় ইমেল পাঠানো। কোনোদিন প্রথম পাতায় একটা শিরোনাম পর্যন্ত দিতে দেখিনি। অথচ তিনিই ওই কাগজের দণ্ডমুণ্ডের কর্তা। সদ্য মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে আসা আমার বসকে দেখতাম – সম্পাদকের চিৎকার শুরু হলেই হাত কাঁপছে। এর অনিবার্য ফল যা, একদিন ঠিক তাই ঘটল। সকালবেলা খবর পেলাম, আমাদের ক্রীড়া সম্পাদকের আবার হার্ট অ্যাটাক হয়েছে। তিনি ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিটে ভর্তি। আমি আর আমার এক সহকর্মী হাসপাতালে দেখতে গিয়ে ক্রীড়া সম্পাদকের স্ত্রীর মুখে যা শুনেছিলাম, তার সঙ্গে সতীশের স্ত্রীর বয়ানের শিউরে ওঠার মত মিল। সুখের কথা, তিনি কিছুদিন পরেই অবসর নেন। হয়ত সে কারণেই এখনো সুস্থ শরীরে জীবিত।

আরও পড়ুন টুইটার, বাইজু’স আঁধারে ছাঁটাই সম্পর্কে কয়েকটি কথা

এসব কথা লিখছি কেন? সব কর্পোরেট চাকুরেরই তো অল্পবিস্তর একইরকম অভিজ্ঞতা হয়। তাই তো আজকাল কাউকে জিজ্ঞেস করলে শোনা যায় না যে সে নিজের চাকরিতে সুখী। তাহলে সাংবাদিকরাই বা ব্যতিক্রম হবেন কেন? তাঁদের নিয়ে আলাদা করে লেখার কী আছে? সঙ্গত প্রশ্ন। আসলে ভারতের মূলধারার সাংবাদিকতা যে অতল খাদের মধ্যে পড়েছে গত এক দশকে, তাকে বুঝতে গেলে সাংবাদিকরা কোন অবস্থার মধ্যে কাজ করেন তা জানা দরকার। নইলে অন্ধের হস্তিদর্শন হয়।

শিক্ষকতার ব্যাপারে অনেকে বলে থাকেন, প্রচণ্ড মারধর করে সেইসব শিক্ষকরাই, যারা ভাল করে পড়াতে পারে না। সাংবাদিকতার ব্যাপারেও বললে ভুল হবে না যে অধস্তনদের উপর নিত্য চোটপাট চালানো, গালিগালাজ, অপমান করা অযোগ্য সাংবাদিকের লক্ষণ। ওই আচরণের পিছনে নিজের যোগ্যতার অভাবজনিত নিরাপত্তাহীনতার বড় ভূমিকা থাকে। বেশি যোগ্যতাসম্পন্ন কেউ তাকে অতিক্রম করে যাবে – এই উৎকণ্ঠা থেকে অধস্তনদের আত্মবিশ্বাস নষ্ট করে দেওয়ার প্রচেষ্টা থাকে। এর অজস্র উদাহরণ আছে। কিন্তু নাম করলে আইনি ঝামেলায় পড়তে হবে। কে না জানে, রাজনৈতিক নেতাদের পরেই সবচেয়ে লম্বা হাত বড় মিডিয়ার বড় সাংবাদিকদের? তাঁরা ক্ষমতাকে প্রশ্ন করতে না পারুন, কোটিপতি মালিকের মদতে এবং রাজনৈতিক ক্ষমতাবানদের সঙ্গে দহরমের সুবাদে ক্ষমতাহীনকে মাটিতে মিশিয়ে দিতে সিদ্ধহস্ত। দুঃখের বিষয়, নয়ের দশক থেকে মিডিয়ার দখল সম্পাদকদের হাত থেকে সরাসরি মালিকদের হাতে চলে যাওয়ায় এই ধরনের অযোগ্য অথচ বশংবদ সাংবাদিকদেরই তাঁরা উঁচু পদগুলোতে বসিয়েছেন। কারণ যোগ্য সাংবাদিক মালিককেও প্রশ্ন করবেন, মালিকের ব্যবসায়িক উদ্দেশ্য পালন করতে অস্বীকার করতেও পারেন। এরই ফলশ্রুতিতে সতীশের মত দশা হচ্ছে বহু সাংবাদিকের। তার চেয়েও বেশি সাংবাদিকের চাকরি যাচ্ছে করোনা অতিমারী বা কোম্পানির আর্থিক ক্ষতির অজুহাতে। ফলে মিডিয়া ভরে যাচ্ছে অশিক্ষিত, অর্ধশিক্ষিত সাংবাদিকে। তারাই হয়ে উঠছে সংবাদমাধ্যমগুলোর নীতি নির্ধারক। রবীশ কুমাররা সরে যাচ্ছেন ইউটিউবে, টিভি চ্যানেলে জাঁকিয়ে বসছেন অর্ণব গোস্বামীরা। নাম করা চ্যানেলে হোয়াটস্যাপে ফরোয়ার্ড হওয়া ভুয়ো খবর ঘটা করে প্রচারিত হচ্ছে। কোথাও সাম্প্রদায়িকতার বিষ ছড়াচ্ছেন অঞ্জনা ওম কাশ্যপ, কোথাও বিতর্ক আয়োজনের ভান করে এক পক্ষকে মৌপিয়া নন্দী ধমকাচ্ছেন ‘কে তুমি?’

এসবে তিতিবিরক্ত মানুষ ইদানীং ঝুঁকছেন বিকল্প সংবাদমাধ্যমের দিকে। তবে ভাবলে ভুল হবে যে এসব বালাই সেখানে একেবারেই নেই। তেমনটা হওয়া সম্ভবও নয়। কারণ বিকল্প সংবাদমাধ্যম আকাশ থেকে পড়েনি। যাঁরা এই মঞ্চগুলো গড়ে তুলেছেন বা তুলছেন, তাঁদের হাতেখড়ি হয়েছিল মূলধারাতেই। সকলেই যে আদর্শের কারণে অন্য পথে এসেছেন এমন নয়। অনেকে সেখানে যোগ্যতা প্রমাণ করতে না পেরেও বিকল্প পথে এসেছেন। তাঁরা হতে চান মূলধারার মহীরুহদের মতই। আসলে তাঁরাই এদের আদর্শ। অধস্তনদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার না করলে, যিনি টাকা জোগাচ্ছেন তাঁর পায়ে তৈলমর্দন না করলে, ক্ষমতাবানদের দাদা দিদি বানাতে না পারলে বড় সাংবাদিক হওয়া যায় না – এ ধারণা বিকল্প মাধ্যমের অনেকের মধ্যেও বদ্ধমূল। এই মনোভাবের ফল কাজে পড়তে বাধ্য। মূলধারার সংবাদমাধ্যমের কাজে পড়েছে, বিকল্প মাধ্যমেও অবশ্যই পড়বে। সত্যি কথা বলতে, এ দেশের বিকল্প সংবাদমাধ্যম এখনো বিকল্প ব্যবসায়িক মডেল হিসাবে সম্পূর্ণ বিকশিত হয়নি। অর্থাৎ মূলধারায় কাজ করে যতখানি রোজগার করা যায়, বিকল্পে এখনো যায় না। যশও এখনো মূলধারায় বেশি। বিকল্পে একই পরিমাণ যশলাভে পরিশ্রম অনেক বেশি। কোনোদিন ওগুলো মূলধারার সমান হয়ে গেলে বিকল্প মাধ্যমের সাংবাদিকদের আদর্শবাদের যথার্থ পরীক্ষা হবে। আমরা অনেকেই তো আসলে সুযোগের অভাবে চরিত্রবান।

ডুলুং পত্রিকার আষাঢ়-শ্রাবণ ১৪৩১ সংখ্যায় প্রকাশিত

এবার মোদীর পথের চেয়েও কঠিন গোদি মিডিয়ার পথ

লোকনীতি-সিএসডিএসের এক সমীক্ষার বিশ্লেষণ করতে গিয়ে যোগেন্দ্র যাদব ও তাঁর দুই সঙ্গী শ্রেয়স সরদেশাই, রাহুল শাস্ত্রী লিখেছেন যে গোদি মিডিয়া দিনরাত সরকারি প্রোপাগান্ডা না চালালে ২০২৪ নির্বাচন ২০০৪ সালের মতই হারতেন মোদী। সেই মিডিয়া কাল হঠাৎ পালটি খেলেই কি ক্ষমা করবেন ক্ষুব্ধ মানুষ?

শিং নেই তবু নাম তার সিংহ, ডিম নয় তবু অশ্বডিম্ব। তাহলে একটা নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের ও মতের প্রচার করা সংস্থাকে সংবাদমাধ্যম বলা যাবে না কেন? আলবাত যাবে। গণশক্তি অবশ্যই সংবাদমাধ্যম, জাগো বাংলা একই ধরনের আরেকটা সংবাদমাধ্যম। কিন্তু দুটোর কোনোটাই গোপন করে না যে তারা যথাক্রমে সিপিএম এবং তৃণমূল কংগ্রেসের মুখপত্র। ইদানীং গণশক্তির মালিকানায় কিছু পরিবর্তন আনা হয়েছে, ফলে কাগজটা আর সরাসরি পার্টির সম্পত্তি নয়। কিন্তু এখনও কাগজের সম্পাদক নির্ধারণ করে সিপিএমের রাজ্য কমিটি। সুতরাং এই ধরনের সংবাদমাধ্যমগুলোর পরিচয় নিয়ে কোনো সমস্যা নেই। সমস্যা অন্য আরেক ধরন নিয়ে। ভারতে গত এক দশকে এক ধরনের সংবাদমাধ্যম দেখা গেছে, যারা নিরপেক্ষ থাকার নাম করে চরিত্রহীন হয়ে গেছে। তাদের পরিচিতি আলাদা করতে রবীশ কুমার একখানা চমৎকার শব্দবন্ধ তৈরি করেছেন— গোদি মিডিয়া। অর্থাৎ মোদীর কোলে বসে থাকা মিডিয়া। সমস্যা তাদের নিয়ে। তাদের আর সংবাদমাধ্যম বলা চলে কিনা, তাদের সর্বশক্তিমান অ্যাঙ্করদের সাংবাদিক বলা চলে কিনা তা নিয়ে অনেকদিন ধরেই প্রশ্ন উঠছিল। ২০২৪ লোকসভা নির্বাচনে পরিষ্কার হয়ে গেল, এদের একটা বড় অংশ সীমানা পেরিয়ে এতদূর চলে গেছে যে আর ফিরে আসা অসম্ভব।

ইন্ডিয়া টুডে চ্যানেলের রাহুল কাঁওয়ালের কথাই ধরুন। ৪ জুন ভোটগণনা সবে আরম্ভ হয়েছে, পোস্টাল ব্যালট গোনা চলছে। তখনই রাহুল এক্সিট পোলের ফলের ভিত্তিতে বিরোধীদের বিরুদ্ধে এবং যাঁরা ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন সম্পর্কে প্রশ্ন তোলেন, তাঁদের বিরুদ্ধে বিষোদ্গার করতে শুরু করলেন। বললেন এই ধরনের লোকেরা ‘ডিলিউশনাল’। এরা কিছুতেই মানুষের রায় মেনে নেয় না, দশ বছর ধরে কিছুতেই মানতে রাজি নয় যে মোদী মানুষের মন জয় করেছেন। সকাল সকাল তাঁর অত চেঁচামেচির কারণ কী ছিল? তাঁর আশঙ্কা ছিল, ভোটের ফল বেরোবার পরেও সেই ধারা চলতেই থাকবে। কেন ছিল তা বোঝা শক্ত নয়। তিনি নিজের চ্যানেলের এবং অন্য সব চ্যানেলের বুথফেরত সমীক্ষাকেই ভোটের প্রকৃত ফল ধরে নিয়ে বসেছিলেন। কেন ধরলেন? একজন সাংবাদিকের তো বোঝার কথা এবং দর্শকদের বোঝানোর কথা, যে যে কোনো সমীক্ষাতেই ভুল থাকা সম্ভব। তার চেয়েও বড় কথা, মানুষ ভোট দিয়েছেন। তার গণনার ফলই নির্বাচনের ফল। বুথফেরত সমীক্ষাকে আসল ফল বলে ধরে নেওয়া ভোটারদের অপমান করাও বটে। রাহুল কম দিন সাংবাদিকতায় নেই। তাহলে এতগুলো ভুল করলেন কেন? আসলে সব সাংবাদিকই তো কোনো না কোনো দলের সমর্থক, কোনো না কোনো দলকে ভোট দেন। সেটা অন্যায়ও নয়। রাহুল অবশ্যই বিজেপি সমর্থক, তাই তিনি চাইছিলেন বিজেপি জিতুক। বুথফেরত সমীক্ষা সেটাই দেখিয়েছে বলে তাঁর বিশ্বাস হয়েছে। উত্তর-সত্যের যুগে তো বলাই হয়, সে তাই বিশ্বাস করে যা সে বিশ্বাস করতে চায়। কথা হল, সাংবাদিক হলে কিন্তু ব্যক্তিগত পছন্দটা প্রকাশ করা চলে না কাজ করার সময়ে। মতামত দেওয়ার জায়গা অবশ্যই আছে সাংবাদিকতায়। কিন্তু নির্বাচনের ফল নিয়ে উল্লাস করা বা দুঃখে শুয়ে পড়া তার মধ্যে পড়ে না। তার উপর নির্বাচন কমিশন এবারে যেভাবে ভোট পরিচালনা করেছে তাতে আপত্তি করার যথেষ্ট কারণ আছে। যে নির্বাচন কমিশন বহু দেরিতে ভোটদানের হার ঘোষণা করে বিরোধীদের চেঁচামেচির ফলে, তাতে দেখা যায় ভোটদান শতাংশের হিসাবে ভোট দেওয়ার দিনের চেয়ে ব্যাখ্যাহীনভাবে বেড়ে গেছে, তারপরেও ঠিক কত ভোট পড়েছে তা প্রকাশ করা হয় না— সেই কমিশনকে নিয়ে, তার পরিচালিত প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তো উঠবেই। বিজেপির রাজনৈতিক অ্যাজেন্ডা নিজের অ্যাজেন্ডা না হয়ে উঠলে কোনো সাংবাদিক এগুলো নিয়ে কেউ প্রশ্ন তুললে তাকে ‘ডিলিউশনাল’ বলতে পারেন না। বললে তিনি সাংবাদিক নন।

আবার ধরুন রজত শর্মা। ইন্ডিয়া টিভির সর্বেসর্বা এই সাংবাদিক গোদি মিডিয়ার অন্যতম বিখ্যাত মুখ। কথিত আছে যে মোদীর আমলে তাঁর সম্পত্তি নেতাদের থেকেও দ্রুত বেড়েছে। সেই রজত বিজেপির ফলাফলে এতই হতাশ যে একদিন লাইভ অনুষ্ঠানে কংগ্রেস মুখপাত্র রাগিণী নায়েককে রেগেমেগে খিস্তি দিয়ে বসলেন। কোনো সাংবাদিকের এত রাগ হয় না যে লাইভ অনুষ্ঠানে নেহাত স্বগতোক্তি হিসাবেও খিস্তি দিয়ে বসবেন। কিন্তু রজতের হল। স্পষ্টত সাংবাদিকতা আর তাঁর পেশা নেই। বিজেপির জয়-পরাজয়, বিজেপির আসন বাড়া-কমা রজতের সর্বস্ব হয়ে দাঁড়িয়েছে। এদের আর যা-ই হোক, সাংবাদিক বলা যায় না। এদের সংস্থাগুলোকেও সংবাদমাধ্যম বলা শক্ত।

ইন্ডিয়া টুডে গ্রুপের অরুণ পুরির মেয়ে কল্লি পুরি নির্বাচনের কিছুদিন আগেই ইন্ডিয়া টুডে কনক্লেভে বলেছিলেন ‘গণতন্ত্রে বিরোধী দলের ভূমিকা পালন করা মিডিয়ার কাজ নয়… গোদি মিডিয়া বা মোদী মিডিয়া বলে কোনো সংবাদমাধ্যমকে চিহ্নিত করা নেহাতই অন্যায়। দেশের বিরোধী পক্ষ যদি ছিন্নবিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়ে থাকে, তার জন্য মিডিয়াকে দায়ী করা যায় না। আমরা উল্টোদিকটাকে একইরকমভাবে দেখাব কী করে, যদি সেই পক্ষের অস্তিত্বই না থাকে? আমরা এই বক্সিং ম্যাচের দর্শক। খেলোয়াড় নই।’ দেশে বিজেপি ছাড়া এতগুলো দল থাকা সত্ত্বেও যখন কেউ বলে বিরোধী পক্ষের অস্তিত্বই নেই তখন সে যে আক্ষরিক ও প্রতীকী, দুই অর্থেই অন্ধ তা বলে দেওয়ার দরকার পড়ে না। এরকম অন্ধ মালিকের সংস্থাকে সংবাদমাধ্যম বলার কী যুক্তি থাকতে পারে?

উদাহরণের তালিকা লম্বা করার মানে হয় না। যে কোনো পাঠক আরও গোটা দশেক অ্যাঙ্কর আর চ্যানেলের নাম নিজেই বলে দিতে পারবেন, যারা সরাসরি ঘোষণা করে দিলেই পারত যে তারা বিজেপির প্রচারক। তাহলেই আর নিন্দা করার কোনো জায়গা থাকত না। কিন্তু ঘোষণা করে না, কারণ স্টক মার্কেটের দালালি ছাড়া আর কোনো দালালিই ঘোষণা করে করার জিনিস নয়। রিপাবলিক টিভি-র অর্ণব গোস্বামী অবশ্য ফল ঘোষণার দিন বারবার এনডিএর আসন বাড়লে উল্লাস করে বলছিলেন ‘আমরা…’। তবে উনি তো সর্বার্থে ব্যতিক্রম। সাধারণভাবে একটু রেখেঢেকে দালালি করতে হয়, নইলে অর্ধেক দর্শক/পাঠক হারাতে হয়। যেমন আনন্দবাজার পত্রিকা-র মালিক যত বড় পুঁজিবাদীই হোন না কেন, তিনি অবশ্যই চান তাঁর কাগজগুলো মার্কসবাদীরাও পড়ুক, তাঁর চ্যানেলগুলো মার্কসবাদীরাও দেখুক। ব্যবসায়ীর তো প্রধান লক্ষ্য মুনাফা করা, আর সব ধরনের দর্শক/পাঠক ধরতে না পারলে কমবে চ্যানেলের টিআরপি এবং কাগজের বিক্রি। তারই ভিত্তিতে আসে বিজ্ঞাপন, সেটাও কমে যাবে। বিজ্ঞাপন কমে গেলেই মুনাফাও কমে যাবে। তবে ভারতে বিজ্ঞাপনের একটা বড় অংশ হল সরকারি বিজ্ঞাপন। সেই বিজ্ঞাপনের জোরেই যে যেখানে ক্ষমতাসীন, সে সেখানকার সংবাদমাধ্যমকে নিয়ন্ত্রণ করে। বিজেপি এই খেলায় সবচেয়ে দড়। তাই তারা গোটা ভারত জুড়ে তৈরি করেছে গোদি মিডিয়া। উপরন্তু মুকেশ আম্বানি, গৌতম আদানি প্রায় সব সাবেকি মিডিয়া হাউসের আংশিক বা পূর্ণ দখল নিয়ে ফেলেছেন। ফলে সব ধরনের পাঠক/দর্শক ধরার তাগিদ গোদি মিডিয়ার নেই। তারা সোল্লাসে এক পক্ষের বয়ান প্রচার করে যাচ্ছে। কাল্লি পুরির বক্তৃতা বস্তুত সেকথা স্বীকার করা এবং সেটাকেই ন্যায়সঙ্গত বলে দেখানোর প্রয়াস।

আরও একটা কারণে নিরপেক্ষতার ভান করতে হয় ‘লেগ্যাসি মিডিয়া’-কে। ভারতে স্বাধীনতার পর থেকে ত্রুটিপূর্ণ হলেও সংসদীয় গণতন্ত্র বজায় আছে। নির্বাচনের পর নিয়মিত সরকার বদল হয়ে এসেছে শান্তিপূর্ণ উপায়েই। এমন একটা দেশে কোনো সংবাদমাধ্যম যদি নিজেকে সম্পূর্ণভাবে ক্ষমতাসীন দলের দূত হিসাবে প্রচার করে, তাহলে সরকার বদলে গেলে বিপদে পড়ার সম্ভাবনা আছে। পার্টি-মুখপত্রগুলোকে এমন বিপদে প্রায়শই পড়তে হয়। ত্রিপুরায় যেমন বিজেপি সরকার আসার পরে সিপিএমের মুখপত্র দেশের কথা বন্ধ করিয়ে দেওয়া হয়েছিল কিছুদিনের জন্য। পশ্চিমবঙ্গেও তৃণমূল সরকার গণশক্তিকে সরকারি বিজ্ঞাপন দেয় না। এমন ঝামেলায় কোন মূলধারার সংবাদমাধ্যম পড়তে চাইবে? তাই ধর্মেও আছি, জিরাফেও আছি পদ্ধতিতে চলে প্রায় সব সংবাদমাধ্যমই।

কিন্তু ২০১৪ সাল থেকে মিডিয়া হাউসগুলোর মালিক, সম্পাদকরা সেই কাণ্ডজ্ঞানটুকুও হারিয়েছেন। তাঁরা মোদীর যে অপরাজেয় ভাবমূর্তি তৈরি করেছেন তা নিজেরাই বিশ্বাস করতে শুরু করেছিলেন। ফলে সরকার বদলে গেলে কী হবে সে চিন্তা আর নেই। আবার এই কাণ্ডজ্ঞানহীনতাই তাঁদের মোদীর রাজনীতির ভাগীদার করে ফেলেছে। এখন মোদী হারলে তাঁদের সমূহ বিপদ। অতএব সর্বান্তকরণে মোদীকে জেতানোর চেষ্টা করতেই হয়। এবারের নির্বাচনের ফল সেই কারণেই কেবল বিজেপি বা আরএসএস নয়, গোদি মিডিয়ার জন্যেও ধাক্কা। মোদীর জনপ্রিয়তা যে নিম্নমুখী তা নির্বাচনের ফলই প্রমাণ করেছে। তার ফল গোদি মিডিয়ার উপর পড়া অনিবার্য, পড়তে শুরুও করেছে কয়েক বছর হল। সে কারণেই বিজেপিবিরোধীরা যেমন টিভির খবর দেখা ছেড়ে ধ্রুব রাঠি, রবীশ কুমার, পুণ্যপ্রসূন বাজপেয়ী, রাজীব রঞ্জনদের ইউটিউব চ্যানেল দেখতে শুরু করেছেন; তেমন বিজেপি সমর্থকদের মধ্যেও বিভিন্ন ইউটিউব চ্যানেল দেখার প্রবণতা বাড়ছে। উভয়পক্ষেই এই প্রবণতা আরও বাড়বে এবারের ন্যক্কারজনক বুথফেরত সমীক্ষার পরে।

আরও পড়ুন সরকারের কিছু দেশদ্রোহী দরকার, তাই নিউজক্লিক আক্রমণ

সংবাদমাধ্যমের আরও কিছু পরিবর্তনের লক্ষণ ইতিমধ্যেই দেখা গেছে। দেশের রাজনীতি কোন দিকে যায় তার উপর নির্ভর করবে এই লক্ষণগুলো অদূর ভবিষ্যতে আরও বড় হয়ে উঠবে কিনা। যেমন দিল্লির প্রেস ক্লাব অফ ইন্ডিয়া দেশের একাধিক সাংবাদিকদের সংগঠনের সঙ্গে মিলে সপ্তদশ লোকসভায় পাশ হওয়া নতুন টেলিকম আইন সম্পর্কে আপত্তি করার সাহস পেয়ে গেছে। এই আইনগুলো যে বাকস্বাধীনতার পরিপন্থী, বিশেষ করে বিকল্প সংবাদমাধ্যমের কণ্ঠরোধ করার উদ্দেশ্যে তৈরি, তা কিন্তু জানাই ছিল। অথচ এর আগে এমন সাহস এতগুলো সংগঠনের হয়নি। কাশ্মিরের বিভিন্ন সাংবাদিক বা নিউজক্লিক সম্পাদক প্রবীর পুরকায়স্থ গ্রেফতার হওয়ার সময়েও খুব বেশি সাংবাদিককে মুখ খুলতে দেখা যায়নি।

আজকাল গোদি মিডিয়ার কোনো কোনো অ্যাঙ্করও বেসুরো গাওয়ার সাহস পাচ্ছেন। ইন্ডিয়া টুডের রাজদীপ সরদেশাই বিজেপির চিৎকারসর্বস্ব মুখপাত্র সঞ্জু বর্মাকে সটান বলে দিচ্ছেন— এবার একটু গলা নামিয়ে কথা বলা শিখতে হবে। আপনাদের এখন আর ব্রুট মেজরিটি নেই। এবিপি নিউজের অ্যাঙ্করও বিজেপি নেতাকে লাইভ অনুষ্ঠানে ধমকে দিচ্ছেন। অষ্টাদশ লোকসভার প্রথম অধিবেশন শুরু হচ্ছে ২৪ জুন। নতুন প্রাণ পাওয়া বিরোধীরা যদি সরকারকে সংসদে কোণঠাসা করতে পারে, তাহলে মূলধারার সংবাদমাধ্যম নিজেদের সুর আরও বদলাতে বাধ্য হবে। মোদী সরকার যত দুর্বল হবে, তত ফাঁপরে পড়বে গোদি মিডিয়া। কারণ নিজেদের ভোল পাল্টে ফেলা শক্ত হবে। মানুষ বোকা নয়, মানুষ সবকিছু ভুলেও যায় না। একথা হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছেন মোদী। লোকনীতি-সিএসডিএসের এক সমীক্ষার বিশ্লেষণ করতে গিয়ে যোগেন্দ্র যাদব ও তাঁর দুই সঙ্গী শ্রেয়স সরদেশাই, রাহুল শাস্ত্রী লিখেছেন যে গোদি মিডিয়া দিনরাত সরকারি প্রোপাগান্ডা না চালালে ২০২৪ নির্বাচন ২০০৪ সালের মতই হারতেন মোদী। সেই মিডিয়া কাল হঠাৎ পালটি খেলেই কি ক্ষমা করবেন ক্ষুব্ধ মানুষ?

পুনশ্চ: ইন্ডিয়া জোটের নেতারা দাবি করছেন মোদী ৩.০ আসলে নড়বড়ে সরকার, যে কোনোদিন পড়ে যাবে। যদি তেমন হয় অথবা একেবারে ২০২৯ সালেই সরকার বদল হয়, তখন কিন্তু বিকল্প সংবাদমাধ্যমকেও পরীক্ষা দিতে হবে। কারণ শঠতা, কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের সঙ্গে গোপন আঁতাত, পেশাগত সুবিধাবাদ ও অযোগ্যতার দোষ যে বিকল্প সংবাদমাধ্যমে একেবারেই নেই— এমন বললে মিথ্যে বলা হবে। ফ্যাসিবাদবিরোধিতা আপাতত প্রাথমিক কর্তব্য। সেই সুযোগে অন্য অনেক ক্ষমতাবানের বিরুদ্ধে প্রশ্ন তোলার দায়িত্বও বিকল্প সংবাদমাধ্যম এখন এড়িয়ে যেতে পারছে। তখন কিন্তু আর তা করা চলবে না।

চার নম্বর প্ল্যাটফর্মে প্রকাশিত

হিন্দিভাষী ইউটিউবার যা করলেন, বাঙালিরা যা করলেন না

হিন্দি বলয়ের রাজ্যগুলোর গ্রামে-মফস্সলে ছড়িয়ে আছেন আরও অনেকে, যাঁদের ফলোয়ার রবীশ, ধ্রুব, আকাশ, কুণাল, সমদীশদের চেয়ে অনেক কম। তাঁদের কারও একটা ইউটিউব চ্যানেল আছে, কারও স্রেফ একটা ফেসবুক পেজ। কিন্তু গ্রামের যে সামান্য লেখাপড়া জানা বা নিরক্ষর মানুষের কাছে ইংরেজি ভাষায় কাজ করা প্রগতিশীলরা পৌঁছতে পারেন না, তাঁদের মধ্যে বিষ ঢোকা আটকাতে বা বিষ ঝাড়তে অতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা এই অখ্যাত মানুষগুলোর।

বেঙ্গালুরু নিবাসী আমার এক বন্ধুপত্নীর অভিজ্ঞতা বলি। সে একটি বাচ্চাদের স্কুলের দিদিমণি। বছর ছয়েকের এক ছাত্রীকে তার একটু বেশি মিষ্টি লাগে, মেয়েটিরও দিদিমণিকে বেশ পছন্দ। একই রুটের বাসে তাদের বাড়ি ফেরা। ফলে দু’জনের মধ্যে স্কুলের বাইরেও কথাবার্তা হয়। সেই মেয়েটি হঠাৎ একদিন দিদিমণিকে অনুরোধ করে বসল– ‘আমার একটা ইউটিউব চ্যানেল আছে। আপনি প্লিজ সাবস্ক্রাইব করুন।’ হতচকিত দিদিমণি পরে করবেন বলে এড়িয়ে গিয়েছিলেন, কিন্তু পরদিন আবার মেয়েটি ধরল, তার পরদিন আবার। কতবার না বলা যায়? একটা ছোট মেয়েকে প্রত্যাখ্যান করতে খারাপও লাগে। কিন্তু শেষমেশ বিরক্তি জিতে গেল। দিদিমণি বলতে বাধ্য হলেন– ‘আমাকে এই অনুরোধ কোরো না।’

এমন অভিজ্ঞতা আজকাল পশ্চিমবঙ্গেও অনেকের হয়। ইউটিউব ঘাঁটলেও দেখা যায়, সারা পৃথিবীর দুধের শিশু থেকে লোলচর্ম বৃদ্ধ পর্যন্ত সকলেরই নিজস্ব ইউটিউব চ্যানেল আছে। যার চ্যানেলে যা আপলোড করা হয়, তা যতই অপ্রয়োজনীয় হোক, দেখার লোকও আছে। ব্যাপারটা স্রেফ অপ্রয়োজনীয়তায় আটকে থাকলে সমস্যা ছিল না। কিন্তু ইউটিউব এমন এক মাধ্যম হয়ে দাঁড়িয়েছে, যা দিয়ে ফেসবুক বা টুইটারের মতোই ঘৃণা ছড়ানোর কাজও করা হচ্ছে। সাংবাদিক কুণাল পুরোহিত আস্ত একখানা বই লিখেছেন, কীভাবে কিছু ইউটিউব চ্যানেল মুসলমানবিদ্বেষে পরিপূর্ণ গানের ভিডিও তৈরি করে প্রত্যন্ত এলাকাতেও অসংখ্য মানুষকে প্রতিদিন আরও হিংস্র করে তুলছে, তা নিয়ে। বইয়ের নাম ‘H-POP: THE SECRETIVE WORLD OF HINDUTVA POP STARS’। এ জিনিসটা কেবল ভারতেই হচ্ছে এমন নয়। সব দেশেই ইউটিউব ঘৃণা ছড়ানোর চমৎকার অস্ত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু সেটাই শেষ কথা নয়।

২০১৬ সালে যখন ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রথমবার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে দাঁড়িয়েছিলেন, তখন দেখা গিয়েছিল যে ইউটিউব সমেত সোশাল মিডিয়া তাঁর প্রচারে বড় অস্ত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষত ফেসবুকের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছিল, তারা বর্ণবিদ্বেষ এবং কুৎসা তো আটকাচ্ছেই না; উল্টে‌ ওসব ছড়াতে সাহায্য করছে। ফেসবুকের মালিক মেটা আর ইউটিউবের মালিক গুগল– দুই কোম্পানির বিরুদ্ধেই এই অভিযোগ আছে; যেমন আছে আড়ি পাতার অভিযোগ, ব্যবহারকারীদের অজান্তে তাদের তথ্য বিক্রি করে মুনাফা করার অভিযোগ। এসব প্রায় সবাই জানে। তবু বহু মানুষ ইউটিউবকে ব্যবহার করেই কিছু বৃহত্তর ভালো কাজ করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।

সারা পৃথিবীতেই নির্বাচনী গণতন্ত্রের সংকট চলছে, বড় বড় দেশগুলোর শাসকদের মধ্যে স্বৈরতান্ত্রিক প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। তাঁরা সংবাদমাধ্যমের কণ্ঠরোধ করছেন, ভারতের মতো দেশে সংবাদমাধ্যমগুলোও মুনাফার লোভে সরকারের মুখপত্রে পরিণত হচ্ছে। দিনরাত মিথ্যাচার এবং ঘৃণাভাষণের এই ঢেউয়ে সাধারণ মানুষের কাছে সত্য তুলে ধরার কাজে ঋজু বিদূষক এবং স্বাধীন সাংবাদিকরা ব্যবহার করছেন ইউটিউবকে। বস্তুত বিদূষক আর সাংবাদিকের সীমানা মুছে যাচ্ছে। ট্রাম্পের আমলে তাঁর অন্যতম শত্রু হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন জন অলিভার, হাসান মিনহাজ, ট্রেভর নোয়ার মতো বিদূষকরা। তাঁদের শো প্রায় নিউজ বুলেটিনই। লোক হাসাতেও তাঁরা খবরকেই ব্যবহার করেন। ২০২৪ সাধারণ নির্বাচনে ভারতেও ঠিক তাই ঘটতে দেখা গেল।

সত্যি কথা বলতে, এবারের নির্বাচনে ধ্রুব রাঠি, রবীশ কুমার, আকাশ ব্যানার্জি, কুণাল কামরারা তাঁদের চ্যানেলের মাধ্যমে যে কাজ করলেন, তা মার্কিন দেশের ইউটিউবারদের থেকে ঢের বেশি কঠিন ছিল। কারণ ও দেশে ট্রাম্পের আমলে আদালত, নির্বাচন কমিশন, সেনাবাহিনী এবং মূলধারার সংবাদমাধ্যম রামলালার সামনে মোদির সাষ্টাঙ্গ প্রণামের মতো ট্রাম্পের সামনে শুয়ে পড়েনি। ট্রাম্পকে পদে পদে প্রতিরোধের সম্মুখীন হতে হয়েছিল। ফলে বাকস্বাধীনতা এ দেশের মতো অতখানি বিপদে পড়েনি, বিদূষক বা সাংবাদিকদের পদে পদে গ্রেফতার হওয়ার ভয়ে থাকতে হয়নি। কিন্তু এদেশে কুণালের বিরুদ্ধে একাধিক মামলা হয়েছে, একাধিক বিদূষকের শো বাতিল করতে হয়েছে ক্ষমতাসীন দলের সমর্থক গুন্ডাদের আক্রমণে, নিত্য তাঁদের হুমকি সহ্য করতে হয়েছে। মুনাওয়ার ফারুকির মতো ঋজু বিদূষক গ্রেফতারও হয়েছেন। কাশ্মীর থেকে কন্যাকুমারিকা পর্যন্ত মোট কতজন সাংবাদিক গ্রেফতার হয়েছেন, খুন হয়েছেন তার তালিকা করতে বসলে রামায়ণে কুলোবে না, মহাভারত হয়ে যাবে। সিদ্দিক কাপ্পানের মতো কেউ কেউ যে প্রতিবেদন লেখাই হয়নি, তার জন্যও গ্রেফতার হয়েছেন। সাতবছর আগে খুন হওয়া গৌরী লঙ্কেশের হত্যাকারীরা আজও অধরা। রবীশের মতো সাংবাদিকদের চুপ করিয়ে দেওয়ার জন্য আস্ত চ্যানেল কিনে নিয়েছে সরকারবান্ধব পুঁজিপতিরা।

এতৎসত্ত্বেও রবীশ কেবল তাঁর চ্যানেলের গ্রাহকদের টাকায়, সামান্য সংস্থান আর ছোট্ট একটা দল নিয়ে যে সাংবাদিকতার নিদর্শন রাখলেন, তা ঐতিহাসিক। কুণাল আর আকাশ তো নির্বাচনের আগে পুরোদস্তুর সাংবাদিক হয়ে গেলেন। কুণাল দশবছর ধরে মোদি সরকার কী কী করেছে আর করেনি, তা নিয়ে রিপোর্ট কার্ড সিরিজ করলেন। পর্বগুলোর শেষে তিনি মনে করাতেন– যেভাবে দেশ চালানো হয়েছে তাতে প্রধানমন্ত্রী হিসাবে মোদির জায়গায় খালি চেয়ার রাখলেও চলবে। নতুন টেলিকম আইনে কীভাবে বিকল্প সংবাদমাধ্যম, ইউটিউবার, ইনস্টাগ্রামারদেরও কণ্ঠরোধের ব্যবস্থা করা হয়েছে, তা নিয়ে আকাশের ভিডিও ভাইরাল হয়েছিল। সেই ভাইরাল ভিডিওতে তিনি ভিপিএন (ভার্চুয়াল প্রাইভেট নেটওয়ার্ক) সম্পর্কেও দর্শকদের সচেতন করেন। তারপর ধ্রুবর প্রচণ্ড ভাইরাল ভিডিও সম্পর্কে তাঁর সাক্ষাৎকার নেন, যথার্থ সাংবাদিকের মতোই তাঁকে ব্যাখ্যা করতে বলেন– কেন তিনি বলছেন ভারত একনায়কতন্ত্রের দিকে এগোচ্ছে। আর ধ্রুব যা করেছেন, তা নিয়ে তো আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমেও আলাদা করে চর্চা হচ্ছে। বিপুল জনপ্রিয় ইউটিউবার তো অনেকেই আছেন, কিন্তু দেশের বিপদ দেখে নিজের নিশ্চিন্ত কোণ ছেড়ে বেরিয়ে এসে সরাসরি ক্ষমতাকে আক্রমণ করার ঝুঁকি কি সকলে নেয়?

এখনও তিরিশে পা না দেওয়া ধ্রুব যদিও জার্মানিতে থাকেন, তিনি ভারতের নাগরিক। তাঁর পরিবার পরিজনও এখানে আছেন। সেক্ষেত্রে এতখানি ঝুঁকি নিয়ে সরাসরি মোদির বিরুদ্ধে রীতিমতো প্রচারাভিযান চালানো কম সাহসের কাজ নয়। ধ্রুব এমনিতে তেমন বৈপ্লবিক চিন্তাধারার লোক নন, অতীতে অনেক ব্যাপারেই তিনি বিজেপিকে সমর্থন করে ভিডিও বানিয়েছেন। সংবিধানের ৩৭০ নং অনুচ্ছেদ বাতিল করাও তিনি সমর্থন করেছিলেন। কিন্তু এই নির্বাচনে তাঁর অবদান ভোলার নয়।

পাঞ্জাবি যুবক সমদীশ ভাটিয়া ইউটিউবার হিসাবে প্রথম জনপ্রিয় হন ২০২০-’২১ সালে দিল্লি শহরকে ঘিরে কৃষক আন্দোলনের সময়ে। আন্দোলনকারীদের ভিতরে চলে গিয়ে তাঁদের কথা তিনি তুলে আনতেন। মাঝে কিছুদিন সিনেমা জগতের বিখ্যাতদের লম্বা লম্বা সাক্ষাৎকার নিচ্ছিলেন, যার জন্য তাঁর শো-তে এসে নির্দেশক দিবাকর ব্যানার্জি ঈষৎ ক্ষোভও প্রকাশ করেন। এবার নির্বাচনের মুখে সমদীশ আবার স্টুডিও ছেড়ে ক্যামেরা নিয়ে বেরিয়ে পড়েন ভারত খুঁজতে। কখনও সে ভারত দিল্লি শহরের একেবারে মাঝখানে, অথচ মানুষ সেখানে জঞ্জালের মধ্যে বেঁচে আছে। কখনও সে ভারত বিহারের এক গ্রাম, যেখানে হরিজনরা এখনও হ্যান্ড পাম্পে হাত দিলে হাঙ্গামা বেধে যায়।

এমন আরও অনেকে আছেন। হিন্দি বলয়ের রাজ্যগুলোর গ্রামে-মফস্সলে ছড়িয়ে আছেন আরও অনেকে, যাঁদের ফলোয়ার রবীশ, ধ্রুব, আকাশ, কুণাল, সমদীশদের চেয়ে অনেক কম। তাঁদের কারও একটা ইউটিউব চ্যানেল আছে, কারও স্রেফ একটা ফেসবুক পেজ। কিন্তু গ্রামের যে সামান্য লেখাপড়া জানা বা নিরক্ষর মানুষের কাছে ইংরেজি ভাষায় কাজ করা প্রগতিশীলরা পৌঁছতে পারেন না, তাঁদের মধ্যে বিষ ঢোকা আটকাতে বা বিষ ঝাড়তে অতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা এই অখ্যাত মানুষগুলোর। তাঁদের অনেকের ইউটিউবার বা সাংবাদিক তকমা নেই। কেউ কেউ দিন গুজরান করেন আসলে দিল্লি, মুম্বইয়ের বড় সংবাদমাধ্যমকে খবর সরবরাহ করার বিনিময়ে অতি সামান্য টাকা পেয়ে। সেই টাকায় সংসার চালিয়ে, তা থেকেই খরচ করে এসব করেন কোন তাগিদে, তা আমাদের মতো আলোকপ্রাপ্ত বাঙালিদের পক্ষে বোঝা প্রায় অসম্ভব।

আরও পড়ুন এনডিটিভি বিসর্জন: শোক নিষ্প্রয়োজন, উল্লাস অন্যায়

পশ্চিমবঙ্গে কি ইউটিউবার নেই? কয়েক হাজার ইউটিউবার আছেন। তবে তাঁদের অধিকাংশ হাসি-মশকরায় ব্যস্ত। কেউ ক্রমশ ছোট হয়ে আসা টালিগঞ্জ ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির কেষ্টবিষ্টুদের সাক্ষাৎকার নিয়ে ফলোয়ার বাড়ান, রোজগার করেন। বাংলার যে প্রবীণ সাংবাদিকরা ইউটিউব চ্যানেল চালান তাঁদের মধ্যেও রবীশের মতো মেরুদণ্ড এবং অধ্যবসায় বিরল। তবু সাংবাদিকদের মধ্যে আছেন দু’-একজন, কিন্তু বিশুদ্ধ ইউটিউবারদের কথা না বলাই ভালো। ফলে বাঙালির ইউটিউব চ্যানেল মানে সাধারণত রান্নার চ্যানেল বা বেড়ানোর জায়গার সুলুকসন্ধান দেওয়ার চ্যানেল। নয়তো সংস্কৃতির ঢাক তেরে কেটে তাক তাক। বাঙালি তো শিল্পী হয়েই জন্মায়। ফলে গান, নাচ, আবৃত্তিতে ইউটিউব ভরিয়ে দেয় বুকের দুধ খাওয়ার বয়সটা পার হলেই। এছাড়া যা আছে তা স্রেফ আবর্জনা। হয় অর্থহীন, নয় ঘৃণা ছড়ানোর প্রয়াস।

এমনিতেই ভারতের বিরাট অংশের মানুষের ভাষা হিন্দি। তাঁদের প্রভাবিত করতে না পারলে যে ভালো বা মন্দ কোনও কাজই এদেশে করা সম্ভব নয়, তা বলা বাহুল্য। কিন্তু সেকথা এদেশের আলোকপ্রাপ্তদের সচরাচর মনে থাকে না। অথচ গণতন্ত্র বাঁচানোর জন্যে যে শহর থেকে, সংবাদমাধ্যম থেকে সবচেয়ে দূরে থাকা মানুষটার কাছেও সত্য পৌঁছে দিতে হবে, সব ভাষার মানুষের কাছে পৌঁছতে হবে– তা রবীশ, ধ্রুবরা বুঝতে পেরেছিলেন। ফলে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে হিন্দি বাদে অন্য ভাষাতেও নিজেদের ভিডিও প্রকাশ করেছেন। আবার যে হিন্দিতে সংবাদমাধ্যমের কথাবার্তা চালানো হয়, সেই হিন্দি সকলের বোধগম্য নয় বুঝে রবীশ আলাদা করে ভোজপুরী ভাষাতেও ভিডিও প্রকাশ করেছেন।

এই সুদূরপ্রসারী চিন্তা, এই যত্ন বাংলায় কোথায়? বাঙালিরা কেবল রবীশদের বাংলা ভিডিও দেখে হিন্দি আগ্রাসনের তত্ত্ব কপচাতে পারে। নিজেরা নিজের ভাষাকে বুকনি ছাড়া আর কিছু দিতে রাজি নয়।

রোববার ডট ইন ওয়েবসাইটে প্রকাশিত

অ্যাঙ্কর বয়কট আবশ্যিক কিন্তু পর্যাপ্ত নয়

বিজেপিবিরোধী সাংবাদিকরা বহুকাল ধরেই বিরাট মূল্য দিচ্ছেন, বিজেপির ধ্বজাধারীরাই বা দেবেন না কেন? যুক্তি দিয়ে বিচার করলে তো এই ১৪ জনকে সাংবাদিক বলে ধরাই যায় না।

আমাদের দেশের অলিখিত প্রাচীন নিয়ম – দূত অবধ্য। সাহেবরাও একই মেজাজে বলে থাকে – দূতকে গুলি করবেন না (Don’t shoot the messenger)। দুটো কথার পিছনে যুক্তিটা একই – দূত কোনো পক্ষের লোক নয়, অতএব তাকে প্রতিপক্ষ হিসাবে আক্রমণ করা অন্যায়। সে এক পক্ষের কাছে অন্য পক্ষের বার্তাবাহকমাত্র। ফলে সে নিরস্ত্রও বটে। কিন্তু ধরুন, একজন দূত প্রতিপক্ষের শিবিরে বার্তা দিতে ঢুকল ছত্রপতি শিবাজীর মত বাঘনখ পরে। বার্তা দেওয়ার নাম করে শিবিরে ঢুকে যিনি বার্তা নেবেন তাঁকে ক্ষতবিক্ষত করে দিয়ে চলে গেল। এরপর কি তার আর দূত হিসাবে ছাড় প্রাপ্য? একেবারেই নয়। সে যে ক্ষতি করল তা কিন্তু স্রেফ একজনকে খুন করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। তার এই আচরণের ফলে অন্য দূতেরাও বিপদে পড়বে, কারণ তাদের আর কেউ বিশ্বাস করতে পারবে না। ফলে দূতীয়ালি ব্যাপারটাই ক্ষতিগ্রস্ত হবে। ২০১৪ সালের পর থেকে (আসলে তার কিছু আগে থেকেই) ভারতের সাংবাদিকতা যেদিকে মোড় নিয়েছে তাকে এইভাবে দেখাই শ্রেয়। বেশিরভাগ মূলধারার সংবাদমাধ্যমের ভূমিকা হয়ে গেছে বাঘনখ পরা দূতের মত। ইদানীং অবশ্য দূত সেজে থাকার নাটকটুকুও ত্যাগ করেছে অনেক সংবাদমাধ্যমই, অথচ দূত হওয়ার সুবিধাগুলো নিয়েই চলেছে। এমতাবস্থায় ইন্ডিয়া জোট ১৪ জন অ্যাঙ্করের তালিকা প্রকাশ করেছে, যাদের শোতে এই দলগুলোর প্রতিনিধিরা যাবেন না। ওয়ার্ল্ড প্রেস ফ্রিডম ইনডেক্সে ভারতের স্থান যতই নেমে যাক, যত সাংবাদিকই গ্রেফতার হয়ে যান না কেন, এই অ্যাঙ্কররা কিন্তু দিনরাত দর্শকদের বলে থাকে ভারতের সব ক্ষেত্রেই দারুণ অগ্রগতি হচ্ছে। এমনকি গণতান্ত্রিক অধিকারের দিক থেকেও। সেই অ্যাঙ্কররাই এই তালিকা প্রকাশিত হওয়ার পর একে গণতন্ত্রের উপর আঘাত, বাকস্বাধীনতা হরণ ইত্যাদি আখ্যা দিচ্ছে। এরা অবশ্য রবীশ কুমার কথিত গোদি মিডিয়ার লোক। কিন্তু যাঁদের কেউ গোদি মিডিয়ার লোক মনে করে না, তেমন কয়েকজনও এই বয়কটের বিরোধিতা করেছেন। যেমন করণ থাপার, রাজদীপ সরদেশাই, সাগরিকা ঘোষ। সুতরাং ব্যাপারটাকে নানা দিক থেকে দেখা প্রয়োজন।

প্রথমেই নিরপেক্ষতার ধারণাটা পরিষ্কার হওয়া দরকার। আসলে কেউ নিরপেক্ষ নয়। সাংবাদিক দূরে থাক, ক্রিকেট খেলার আম্পায়ার পর্যন্ত নিরপেক্ষ নন। বোল্ড আর দিনের আলোর মত পরিষ্কার ক্যাচ আউট ছাড়া আর সব আউটের ক্ষেত্রেই ফিল্ডিং দল আম্পায়ারের কাছে আবেদন করে। তিনি আইন মেনে নিজের বিবেচনা মত আউট দেন, প্রয়োজনে অন্য আম্পায়ারের পরামর্শ নেন, কখনো বা প্রযুক্তির সাহায্য নেন। কিন্তু সিদ্ধান্ত এক দলের পক্ষে যায়, অন্য দলের বিপক্ষে। অর্থাৎ সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময়ে তাঁকে একটা পক্ষ বাছতেই হয়। বিশেষ করে লেগ বিফোর উইকেটের মত আউটের ক্ষেত্রে শেষ কথা বলে আম্পায়ারের ব্যক্তিগত মত। আগে এই মতের গুরুত্ব অনেক বেশি ছিল, এখন বিপুল পরিমাণ প্রযুক্তির ব্যবহারে অনেকখানি কমেছে। তবু দেখা যায়, অনেক ক্ষেত্রে প্রযুক্তিও শেষ কথা বলতে পারছে না। তখন টিভি আম্পায়ারের বিবেচনা অনুযায়ী সিদ্ধান্ত হয়। সেই সিদ্ধান্তের যৌক্তিকতা নিয়ে কেউ প্রশ্ন তুলতে ছাড়ে না, অনেকসময় পক্ষপাতদুষ্ট হওয়ার অভিযোগও ওঠে। ক্রিকেট খেলার দৃষ্টান্ত এই কারণেই দেওয়া, যে জীবনের মত ক্রিকেট খেলাতেও বহু জিনিস মানবিক বিবেচনার উপরেই শেষপর্যন্ত নির্ভরশীল। যেমন বৃষ্টি হওয়ার পরে মাঠ খেলার উপযুক্ত হয়েছে কিনা সেই সিদ্ধান্ত অন্তত এখন পর্যন্ত শুধুমাত্র দুই আম্পায়ারের বিবেচনার ভিত্তিতেই ঠিক হয়। যেখানেই এই অবকাশ আছে সেখানেই নিরপেক্ষতা বজায় থাকল কিনা তা নিয়ে সন্দেহের অবকাশ থাকে। এ তো গেল খেলার বিচারকদের কথা। একই কথা আদালতের বিচারকদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। একই আইনে একই মামলার বিচারে বিচারক বদলালে রায়ও বদলে যায় অনেক সময়। এমনটাই যে স্বাভাবিকতা আইনও তা বিশ্বাস করে। সেই কারণেই নিম্ন আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে উচ্চতর আদালতে আবেদন জানানোর ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। বিচারকের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুললে আদালত অবমাননার দায়ে পড়তে হয়, কিন্তু রায় নিয়ে প্রশ্ন তোলা আইনসম্মত। বিচারকের রায়ের যে ভালমন্দ আছে তাও সর্বজনস্বীকৃত। তাই রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন “…দণ্ডিতের সাথে/দণ্ডদাতা কাঁদে যবে সমান আঘাতে/সর্বশ্রেষ্ঠ সে বিচার।” এই বিচারে বিচারকের ব্যক্তিগত আদর্শ, মতামত – সবই প্রভাব ফেলে। ফেলতে বাধ্য। সুতরাং আক্ষরিক অর্থে নিরপেক্ষতা সোনার পাথরবাটি।

এ তো গেল বিচারকদের কথা। সাংবাদিকরা বিচারক নন, হওয়া অন্যায়ও বটে। খোদ সুপ্রিম কোর্ট সংবাদমাধ্যমের বিচারক হয়ে বসা নিয়ে অসন্তুষ্ট। সম্প্রতি প্রধান বিচারপতি ডি ওয়াই চন্দ্রচূড়ের নেতৃত্বাধীন তিন বিচারকের বেঞ্চ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রককে নির্দেশ দিয়েছে, পুলিস ব্রিফিং যেন মিডিয়া ট্রায়ালের সুযোগ না করে দেয় তা নিশ্চিত করতে হবে। সাংবাদিকদের বরং দূত হওয়ারই কথা। কার দূত? এই প্রশ্নের উত্তরটাই সম্পূর্ণ উলটে দেওয়া হয়েছে আজকের ভারতে।

ইন্ডিয়া জোটের তালিকায় যে ১৪ জন অ্যাঙ্করের নাম রয়েছে তাদের একজন রুবিকা লিয়াকত। তাকে পাশে দাঁড় করিয়ে ‘হিন্দি নিউজ’ চ্যানেলের সিইও জগদীশ চন্দ্র প্রকাশ্যে বলেছে, আমরা কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে নেই। কিন্তু আমরা দেশের জনপ্রিয় সরকারের পক্ষে আছি। কেন থাকব না? আজ দেশের প্রধানমন্ত্রী যদি গ্লোবাল লিডার হয়ে থাকেন, পৃথিবীর সবচেয়ে জনপ্রিয় নেতা বলে গণ্য হয়ে থাকেন, যদি অমিত শাহ ৩৭০ তুলে দিয়ে কাশ্মীরের পরিবেশ বদলে দিয়ে থাকেন… তাহলে তাঁকে অগ্রাহ্য করব কী করে? তাঁকে তাঁর জনপ্রিয়তা অনুযায়ী গুরুত্ব দিতেই হবে। দেশের উপর রাজত্ব করলে আমাদের নেটওয়ার্কের পর্দাতেও রাজত্ব করবেন। এ নিয়ে আমাদের কোনো দ্বিধা নেই। যাঁরা আমাদের গোদি মিডিয়া বলেন আমি তাঁদের খুব বিনীতভাবে বলছি, আমরা গোদি মিডিয়া নই। কিন্তু যা বাস্তব তাকে কী করে অস্বীকার করি? এই তো ২০২৪ নির্বাচন এসে গেল। কাল আপনারা সরকারে আসুন; প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হয়ে যান। কথা দিচ্ছি যতখানি কভারেজ আর লাইভ টেলিকাস্ট মোদী আর অমিত শাহের করেছি ততটাই আপনাদেরও করব।

অন্য এক অ্যাঙ্কর ‘আজ তক’ চ্যানেলের চিত্রা ত্রিপাঠী। সে এক টক শোতে উত্তরপ্রদেশ, মধ্যপ্রদেশে ইদানীং সোশাল মিডিয়ার সূত্রে বিপুল জনপ্রিয় ব্যঙ্গাত্মক গানের শিল্পী নেহা সিং রাঠোরকে ডেকে কেন তিনি বিজেপির মুখ্যমন্ত্রীদের ব্যঙ্গ করে গান করেন তা জিজ্ঞেস করেছিল। নেহা পালটা পক্ষপাতের প্রশ্ন তোলায় চিত্রা বলে, আপনি যাঁদের বিরুদ্ধে প্রশ্ন তোলেন তাঁরা কিন্তু ৫-৭ লাখ ভোটে জিতে ক্ষমতায় এসেছেন। জনগণ ভোট দিয়েছে, নিজের পকেট থেকে তো আর ভোট বার করেননি।

দুজনেরই বক্তব্য আসলে এক। যে জিতেছে তার পক্ষে আছি, তার পক্ষে থাকাই আমাদের কাজ। আসলে দুজনেই জানে, গণতন্ত্রে সংবাদমাধ্যমের হওয়ার কথা দর্শকের, অর্থাৎ নাগরিকদের, দূত। সেই ভানটা বজায় রাখার জন্যেই একজন যোগী আদিত্যনাথ আর শিবরাজ সিং চৌহান কত বড় ব্যবধানে জিতে এসেছেন তা উল্লেখ করেছে। অন্যজন বলেছে যারা জনপ্রিয় হবে তাদেরই কভারেজ দেব। এই ভানের সরটুকু আলাদা করে নিলে যা পড়ে থাকে তা হল, যে ক্ষমতায় থাকবে তার পক্ষেই থাকব। আমি তার দূত।

এই ভাবনাই ভারতের মূলধারার সংবাদমাধ্যমে সর্বব্যাপী হয়ে দাঁড়িয়েছে। গোদি মিডিয়া বলা যায় না যাদের, সেইসব সংবাদমাধ্যমের সম্পাদক ও প্রতিবেদকরাও অনেকে এরকমই মনে করেন। ক্ষমতার সমর্থনে দাঁড়ানো নয়, ক্ষমতাকে প্রশ্ন করাই যে সংবাদমাধ্যমের কাজ — তা বিস্মৃত। ভারতে একসময় ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ মাস কমিউনিকেশন, এশিয়ান কলেজ অফ জার্নালিজমের মত দু-একটা জায়গা ছাড়া কোথাও সাংবাদিকতা ও গণসংযোগ আলাদা করে পড়ানো হত না। গত কুড়ি বছরে ব্যাঙের ছাতার মত অসংখ্য প্রতিষ্ঠান তৈরি হয়েছে, সেখান থেকে বছর বছর পাস করে বেরিয়ে অনেকে সাংবাদিকও হচ্ছেন। অথচ দেখা যাচ্ছে প্রথাগতভাবে লেখাপড়া না করা সাংবাদিকদের আমলেই সাংবাদিকতার উদ্দেশ্য সম্পর্কে ধারণা ঠিক ছিল। এর পিছনে আসলে ক্লাসরুমের দায় তত নয়, যতটা পাস করে সকলে যেখানে কাজ করতে যায় তার। ডাক্তারির মত সাংবাদিকতাও সবটা শেখা হয় না ‘প্র্যাকটিস’ না করলে। সেখানেই গলদ। ডাক্তাররা তবু প্রাইভেট প্র্যাকটিস করতে পারেন। সাংবাদিকতায় প্রাইভেট প্র্যাকটিস বলে কিছু এখনো সেভাবে নেই। এতকাল উপায়ও ছিল না। আগে রবীশ কুমারের মত সাংবাদিককে চাকরি ছাড়তে হলে একেবারে চুপ হয়ে যেতে হত। কারণ অন্য কোনো সংবাদমাধ্যম জায়গা না দিলে নিজের সাংবাদিকতা লোকের কাছে পৌঁছে দেওয়ার উপায় ছিল না। এখন ইউটিউব চ্যানেল, টেলিগ্রাম চ্যানেল, ফেসবুক পেজ ইত্যাদি নানা ব্যবস্থা হয়েছে। ফ্রিলান্স সাংবাদিকতা আগেও ছিল, এখনো আছে বটে। কিন্তু সেই সাংবাদিকের কাজ প্রকাশ করতে রাজি এমন সংবাদমাধ্যম তো দরকার। সরকারবিরোধী কাজ করতে উৎসাহী ফ্রিলান্স সাংবাদিকদের ভরসা কিন্তু এখন বিকল্প সংবাদমাধ্যম। মূলধারার সংবাদমাধ্যমে তাঁদের জায়গা ক্রমশ কমে আসছে। আর কেউ যদি মূলধারার চাকুরে সাংবাদিক হন, তাহলে তিনি সত্যিকারের সাংবাদিকতা করতে চাইলেও পারবেন না। মালিকরা জগদীশ চন্দ্রের মত সরকারের সঙ্গে হাত মিলিয়ে বসে আছে। যেহেতু টিভি দেখেন অনেক বেশি মানুষ, সেহেতু ইন্ডিয়া জোট আপাতত অ্যাঙ্করদের বয়কট করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। কিন্তু এমন নয় যে খবরের কাগজের চিত্রটা একেবারে আলাদা।

এখানেই এসে পড়ে ইন্ডিয়া জোটের সিদ্ধান্তের সার্থকতার প্রশ্ন। সাংবাদিকের স্বাধীনতা আর সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা কিন্তু এক নয়। সাংবাদিক নিজের ইচ্ছানুযায়ী কাজ করতে পারেন না। আজকের ভারতে তো আরওই পারেন না। বহু সম্পাদক, প্রতিবেদকের চাকরি গেছে বিজেপির ঢাক বাজাতে রাজি না হওয়ায়। মাত্র কয়েকদিন আগে জানা গেছে এনডিটিভির ব্যুরো চিফ সোহিত মিশ্রের পদত্যাগের খবর। তাঁকে নাকি বলা হয়েছিল গৌতম আদানির সম্পর্কে অভিযোগ নিয়ে রাহুল গান্ধীর সাংবাদিক সম্মেলন ভেস্তে দিতে। তিনি রাজি হননি, তাই পদত্যাগ করতে হয়।

এই পরিস্থিতিতে আস্ত চ্যানেল বয়কট না করে শুধুমাত্র কয়েকজন অ্যাঙ্করকে বয়কট করে কী লাভ, সে প্রশ্ন তোলা সঙ্গত। কিন্তু বয়কটের সিদ্ধান্তটাই ভুল — এ কথা আদৌ বলা চলে না। কারণ একাধিক, যদিও ইন্ডিয়া জোট প্রকাশিত প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে কোনো কারণ নির্দিষ্ট করে বলা হয়নি। জোটের বিভিন্ন নেতা ব্যক্তিগতভাবে নানা কারণ দর্শিয়েছেন।

প্রথমত, এই চ্যানেলগুলোর প্রধান আকর্ষণ ওই অ্যাঙ্করদের ঘৃণা বর্ষণকারী তথাকথিত বিতর্ক সভা। সেখানে বিতর্ক হয় না, হয় অ্যাঙ্করের মদতে ভারতের সংখ্যালঘু এবং সমস্তরকম বিজেপিবিরোধী মানুষের প্রতি অবিরাম ঘৃণার চাষ। সে কাজে প্রয়োজন মত ভুয়ো খবর, নির্জলা মিথ্যাভাষণ – সবই ব্যবহার করা হয়। অ্যাঙ্করের যে বক্তব্য পছন্দ তার বিপরীতে যে মুখপাত্ররা বলতে আসেন তাঁদের প্রায় কিছুই বলতে দেওয়া হয় না। হয় ধমকে চুপ করিয়ে দেওয়া হয়, নয়ত তাঁর মত যে ‘অ্যান্টি-ন্যাশনাল’, ‘দেশদ্রোহী’, ‘জেহাদি’ তা চিৎকার করে বারবার বলা হয়। ফলে এই শোগুলোতে যাওয়ার যে যুক্তি রাজনৈতিক দলগুলো দেখিয়ে থাকে – নিজেদের মত জনপরিসরে জানানো – বিজেপিবিরোধীদের ক্ষেত্রে তা ভোঁতা হয়ে গেছে। এইসব শোতে যাওয়া মানে বরং বিজেপির সুবিধা করে দেওয়া। তার চেয়েও বড় কথা, ১৯৯০-এর দশকে আফ্রিকার দেশ রোয়ান্ডার গৃহযুদ্ধে রেডিও রোয়ান্ডা সংখ্যালঘু হুটুদের বিরুদ্ধে ক্রমাগত ঘৃণাভাষণ চালিয়ে তাদের যেভাবে অবমানবে পরিণত করেছিল টুটসিদের চোখে, ঠিক সেই কাজ এই অ্যাঙ্কররা করে চলেছে। সুতরাং এদের শোতে গিয়ে বসা মানে সেই কাজকে স্বীকৃতি দেওয়া, পরোক্ষে মদত জোগানো।

দ্বিতীয়ত, এই অ্যাঙ্করদের সঙ্গে অন্য সংবাদমাধ্যমের সাংবাদিকদের তো বটেই, ওই চ্যানেলগুলোরই আর পাঁচজন সাংবাদিকেরও তফাত আছে। এরা প্রত্যেকে মহার্ঘ মাইনে পায় এবং অনেকেই কোম্পানির ডিরেক্টর হয়ে বসেছে। অর্ণব গোস্বামী তো ‘টাইমস নাও’ চ্যানেলে এই অসভ্যতা চালিয়ে এত জনপ্রিয় হল যে নিজস্ব চ্যানেলই খুলে ফেলল। সুতরাং এরা নেহাত ঠেকায় পড়ে একপেশে সরকারি প্রচার চালায় না, ঘৃণাভাষণ দেয় না। বরং এরাই চ্যানেলের এজেন্ডা তৈরি করে। ফলে এদের ঘৃণা ছড়াতে বাধা দেওয়া যথেষ্ট না হলেও আবশ্যিক। বহু ভাসমান ভোটার এবং বিজেপিবিরোধী ভোটারও হাঁ করে এইসব চ্যানেল দেখে থাকেন। এই বয়কট তাঁদেরও এক প্রচ্ছন্ন বার্তা দেবে যে এই অ্যাঙ্কররা যা করে তা যথার্থ নয়, কারোর জন্যে ভাল নয়। এতে ভাসমান ভোটারদের কেউ কেউ হয়ত বিজেপির দিকে ঢলে পড়বেন, কিন্তু উলটোটাও ঘটবে। ইন্ডিয়া জোটের দলগুলোর সমর্থক যে ভোটাররা, তাঁদের উপর তো এই সিদ্ধান্তের স্পষ্ট প্রভাব পড়া উচিত।

তৃতীয়ত, এই বয়কট কোনোভাবেই সংবাদমাধ্যম বা সাংবাদিকের স্বাধীনতা হরণ নয়। এখানে কোনো সাংবাদিককে তার মতামতের জন্য চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হচ্ছে না, তাকে গ্রেফতার করা হচ্ছে না, খুন করা হচ্ছে না। এর প্রত্যেকটাই ভারতে প্রতিনিয়ত বেড়ে চলেছে বিজেপি আমলে (ইন্ডিয়া জোটের কোনো কোনো দলের শাসনে থাকা রাজ্যেও ঘটছে। খড়্গপুরের সাংবাদিক দেবমাল্য বাগচীর কথা স্মর্তব্য), অথচ তার বিরুদ্ধে কোনোদিন টুঁ শব্দ করেনি এই অ্যাঙ্কররা। সে না হয় তাদের স্বাধীনতা। কথা হল এই বয়কট সত্ত্বেও তারা শো চালিয়ে যেতে পারে, শুধু কয়েকটা রাজনৈতিক দল সেই শোয়ে অংশগ্রহণ করবে না। আপনার বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে কয়েকজন মাতাল চিৎকার করে আপনাকে, আপনার পরিবারকে অকথ্য গালিগালাজ করছে। আপনি যদি বাড়ির জানলা বন্ধ করে দেন, তাহলে মাতালরা কি বলতে পারে, বাকস্বাধীনতা হরণ করা হল? এ প্রসঙ্গে বাকস্বাধীনতার প্রশ্ন তোলা একইরকম হাস্যকর।

চতুর্থত, সরকার তথা বিজেপির বিজ্ঞাপনের লোভে এবং/অথবা সরকারি চাপে যেসব সংবাদমাধ্যম বিজেপির মুখ হয়ে দাঁড়িয়েছে তারা আর সাংবাদিকতার বিশেষ ছাড়গুলো দাবি করতে পারে না। কারণ সরকারবিরোধীদের সেই ছাড় এরা নিজেরাই দেয়নি। যে কোনো দেশে সরকারের দমনপীড়নের বিরুদ্ধে সংবাদমাধ্যমের অন্যতম প্রধান রক্ষাকবচ হল একতা। পাঠক/দর্শকদের অবাক লাগতে পারে, কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে বাম আমলে বর্তমানের সাংবাদিককে প্রশাসনের কেউ কিছু বললে গণশক্তির সাংবাদিকও বর্তমানের সাংবাদিকের পাশে দাঁড়াবেন – এটাই ছিল নিয়ম। সারা পৃথিবীতেই তাই হয়। ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর সাংবাদিক সম্মেলনে অপছন্দের প্রশ্ন করার জন্যে একজন সাংবাদিককে আক্রমণ করলে অন্য সব সাংবাদিক একজোট হয়ে তাঁর পাশে দাঁড়াতেন। প্রায় সব পেশাতেই এটাই নিয়ম। কারণ পেশাদারি প্রতিদ্বন্দ্বিতা যতই তীব্র হোক, নিজেদের মধ্যে একতা না থাকলে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো যায় না। আর সাংবাদিকতা করা মানেই রাষ্ট্রের ত্রুটিবিচ্যুতির দিকে আঙুল তোলা। ভারতে এই একতা কিন্তু যত্ন করে নষ্ট করেছে গোদি মিডিয়া। অর্ণবই প্রথম টাইমস নাওয়ের স্টুডিও থেকে সরকারবিরোধী খবর করে এমন চ্যানেলের অ্যাঙ্কররা পাকিস্তানের মদতপুষ্ট, শহুরে নকশাল – এমন সব অভিযোগ করতে শুরু করে। দর্শকরা মুসলমান, জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রী, রাহুল গান্ধী-সোনিয়া গান্ধী, কমিউনিস্ট ইত্যাদির মত ওইসব সাংবাদিকদেরও যেন ঘৃণা করে – এই কামনা অর্ণব সরাসরিই করত। তার পদাঙ্ক অনুসরণ করে অন্যান্য চ্যানেলের অ্যাঙ্কররাও। এখন ঝাঁকের কই হতে চাইলে চলবে কেন?

এবার একটু নিরপেক্ষতার বিচারে ফেরত আসা যাক। গোদি মিডিয়ার বিরুদ্ধে কথা বলতে গেলেই অনেকে বলেন, অন্য মিডিয়াগুলো নিরপেক্ষ নাকি? চাকরিজীবনে সিনিয়র সহকর্মীদের সঙ্গে বিজেপির সংবাদমাধ্যমকে করতলগত করা নিয়ে কথা বলতে গিয়ে দেখেছি, তাঁরা এর সপক্ষে যুক্তি খাড়া করেই রেখেছেন – “এসব চিরকালই হয়”। বস্তুত পৃথিবীর সমস্ত অন্যায়ই চিরকাল হয়। রামায়ণ-মহাভারত খুললেই তা টের পাওয়া যায়, কোনো প্রবীণ সাংবাদিকের প্রজ্ঞার প্রয়োজন নেই। ইদানীং অন্যায়ের কোন দিকটা নতুন তা চিহ্নিত করতে হয় এবং তার বিরুদ্ধে দাঁড়াতে হয়। নইলে ঝাড়ে বংশে বিনষ্ট হতে হয়।

গত কয়েক বছরে যা নতুন তা হল বিজেপির বিপুল আর্থিক ক্ষমতা। ইলেক্টোরাল বন্ডের সুবাদে বিজেপি যে টাকার পাহাড়ে বসে আছে তা ভারতের কোনো দল কখনো স্বপ্নেও ভাবতে পারেনি। এর প্রমাণ বিজেপির পার্টি অফিসের কলেবর থেকে শুরু করে তাদের নির্বাচনী প্রচারের জাঁকজমক – সবেতেই টের পাওয়া যায়। সেই টাকার ভাগ পাওয়ার জন্য, সরকারি বিজ্ঞাপনের জন্য, বিজেপির সঙ্গে খাতিরের সুবাদে নিজের অন্য ব্যবসাগুলোর শ্রীবৃদ্ধি করার জন্য সংবাদমাধ্যমগুলোর মালিকরা দিনকে রাত, রাতকে দিন করছেন। অর্থাৎ সাংবাদিকতায় দুর্নীতি প্রাতিষ্ঠানিক হয়ে দাঁড়িয়েছে। আগে কিছু সাংবাদিক দুর্নীতিগ্রস্ত হতেন বা বিশেষ কোনো দলের প্রতি পক্ষপাতদুষ্ট হতেন। মালিকেরও বিলক্ষণ পক্ষপাত থাকত। কিন্তু অন্তত বাজারের স্বার্থে, দর্শক/পাঠক ধরে রাখতে তাঁকে কিছুটা ভারসাম্য রক্ষা করে চলতে হত। একই সংবাদমাধ্যমে নানা দলের প্রতি পক্ষপাতদুষ্ট সাংবাদিক থাকতেন। তাঁদের মধ্যে আলাপ আলোচনা, ঝগড়াঝাঁটি, লেঙ্গি মারা, হাসিঠাট্টা সবই চলত। এই দ্বন্দ্বের ফলে দর্শক/পাঠক যা পেতেন তাতে শেষমেশ এক ধরনের সাম্যবিধান হত। তিনটে চ্যানেল দেখলে হয়ত একটা ঘটনাকে তিনরকম দেখাত। কিন্তু তা থেকে দর্শক সত্যের অনেক কাছাকাছি পৌঁছতে পারতেন। এখনকার মত সর্বত্র একই মিথ্যা বয়ান চলত না। কোনো দ্বন্দ্ব নেই বলেই আগে নিউজরুমগুলোকে মনে হত মাছের বাজার, এখন মনে হয় কল সেন্টার। দারুণ নিয়মানুবর্তী, দারুণ শান্তিপূর্ণ। শ্মশানের শান্তি। এই শান্তি যে সাংবাদিক ভাঙেন তাঁর চাকরি যায় বা তাঁকে চাকরি ছাড়তে হয়। যেমন রবীশ ছেড়েছেন, সোভিত ছেড়েছেন।

আগেই বলেছি কেউ নিরপেক্ষ নয়। আক্ষরিক অর্থে নিরপেক্ষ হওয়া প্রার্থনীয়ও নয়। কয়েকজন মানুষ মিলে একজনকে সাংবাদিকের চোখের সামনে পিটিয়ে মারল। সাংবাদিক যদি প্রতিবেদনে বলেন ‘এরা মেরে অন্যায় করেছে, তবে লোকটাও প্ররোচনা দিয়েছিল’, তাহলে তিনি তো আসলে খুনীদের পক্ষে দাঁড়ালেন। তাঁকে বলতেই হবে খুনীরা অন্যায় করেছে, কোনো প্ররোচনা থাকুক আর না-ই থাকুক। অর্থাৎ তাঁকে সত্যের পক্ষে দাঁড়াতে হবে, এক্ষেত্রে যার অর্থ হবে যে খুন হয়েছে তার পক্ষে দাঁড়ানো। এলবিডব্লিউ আবেদন নাকচ করে দেওয়ার সময়ে যেমন আম্পায়ার ব্যাটারের পক্ষের লোক হয়ে যান ক্ষণিকের জন্য। সুতরাং সংবাদমাধ্যম সত্যের পক্ষে দাঁড়াক – এটুকুই ন্যায্য দাবি। সংবাদমাধ্যম নিরপেক্ষ হোক – এ দাবি অর্থহীন। বিশেষত আজকের ভারতে সংবাদমাধ্যমকে পক্ষ নিতেই হবে এবং তার মূল্যও চোকাতে হবে। বিজেপিবিরোধী সাংবাদিকরা বহুকাল ধরেই বিরাট মূল্য দিচ্ছেন, বিজেপির ধ্বজাধারীরাই বা দেবেন না কেন? যুক্তি দিয়ে বিচার করলে তো এই ১৪ জনকে সাংবাদিক বলে ধরাই যায় না। তাদের নরেন্দ্র মোদীর গুণমুগ্ধ বলা যেতে পারে, সরকারের মুখপাত্রও বলা যেতে পারে। এগুলো তো গালাগালি নয়। এরা নিজেরা বা এদের চ্যানেলের মালিকরা নিজমুখেই তো অন্য সময় এগুলো বলে। এখন হঠাৎ রেগে যাওয়ার যুক্তি নেই। কিন্তু রেগে যাচ্ছে, এই বয়কটে জরুরি অবস্থার মানসিকতার প্রমাণ দেখা যাচ্ছে বলছে

আরও পড়ুন কর্ণাটক নির্বাচনের ফল: মিডিয়া, জিভ কাটো লজ্জায়

অর্ণবভক্তরা শুধু নয়, অর্ণবের শো দেখেন না এবং পছন্দ করেন না এমন অনেকেরও ধারণা এই বয়কটে অর্ণবের কোনো ক্ষতি নেই। কিন্তু তেমন হলে এ নিয়ে সে এত উত্তেজিত হত না। অর্ণব এবং তার দর্শকদের যে ধর্ষকাম মানসিকতা বিপক্ষের লোকেদের ডেকে এনে ধমকে তৃপ্তিলাভ করে, এই বয়কটের ফলে তাতে অসুবিধা হবে। ধর্ষকাম মানুষ কামনা চরিতার্থ না হলে কতটা রিপাবলিক টিভি দেখবেন তা নিশ্চিত নয়। টিআরপি পড়ে যেতে পারে। তা যদি না-ও হয়, কানাঘুষো যা শোনা যাচ্ছে তা যদি সত্যি হয় তাহলে ১৪ জন অ্যাঙ্করের চ্যানেলেরই সমূহ বিপদ। শোনা যাচ্ছে ইন্ডিয়া জোটের দলগুলো যেসব রাজ্যে আছে সেখানকার সরকারগুলো নাকি এই চ্যানেলগুলোকে বিজ্ঞাপন দেওয়া বন্ধ করে দিতে পারে। আগেও লিখেছি যে এখন সকালে যে কাগজটা হাতে পান সেটা আসলে আপনার কথা ভেবে তৈরি নয়, ওটা বিজ্ঞাপনদাতার রসিদ। কারণ কাগজ ছাপার খরচটুকুও আপনার দেওয়া কাগজের দামে ওঠে না। তেমনই টিভি চ্যানেলও চলে বিজ্ঞাপনদাতার টাকায়। সেখানে অতগুলো রাজ্যের সরকারি বিজ্ঞাপন আসা বন্ধ হয়ে গেলে টানাটানির সংসার হয়ে যাবে। অতএব অর্ণবের উত্তেজনার মধ্যে চাপা ভয়ও লুকিয়ে আছে।

তবে ইন্ডিয়া জোটের এই ব্যবস্থা সম্পর্কে কয়েকটা প্রশ্ন রয়েই যাচ্ছে।

১) এই কজন অ্যাঙ্করের বাইরে কি আর কেউ নেই যে একই দোষে দুষ্ট?
২) হিন্দি বাদে অন্যান্য আঞ্চলিক ভাষার চ্যানেল এবং তাদের অতি উদ্ধত, অপছন্দের মুখপাত্রকে “কে তুমি” বলে ধমকানো, অ্যাঙ্করদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার প্রয়োজন নেই?
৩) ভোটের আর ৭-৮ মাস বাকি। এখন এই ব্যবস্থায় কতটা আটকানো যাবে গণমাধ্যমে ঘৃণাভাষণ আর মিথ্যার বেসাতি?
৪) এই অ্যাঙ্করদের বাদ দিয়ে বিকল্প সংবাদমাধ্যমগুলোকে বেশি কভারেজের সুযোগ দেবে কি ইন্ডিয়া জোট? যেমন ধরা যাক, রবীশ কুমারের সঙ্গে একান্ত সাক্ষাৎকারে রাহুল গান্ধী।

বিকল্প পথের সন্ধান করতে না পারলে কিন্তু এই সদুদ্দেশ্যে নেওয়া সিদ্ধান্ত সফল হবে না। দেশের সংবাদমাধ্যমের ভোল পালটানোর কাজ শুরু হবে না।

নাগরিক ডট নেটে প্রকাশিত

ব্যাকফুটে গোদি মিডিয়া

পবন খেরা, সুপ্রিয়া শ্রীনাতেরা লাইভ টিভিতে গোদি মিডিয়ার অ্যাঙ্করদের ধমকাতে শুরু করলেন – বিজেপির দালালি করবেন না।

প্রাক-নির্বাচনী সমীক্ষা আর বুথফেরত সমীক্ষার দৌলতে লোকনীতি-সিএসডিএস নামটা এখন ওয়াকিবহাল পাঠকদের কারোর অজানা নয়। কিন্তু এই সংস্থাটি আরও কিছু সমীক্ষা করে থাকে যেগুলো নিয়ে মূলধারার সংবাদমাধ্যমে শুধু যে হইচই হয় না তা নয়, আদৌ কোনো খবরই প্রকাশ করা হয় না। কারণ করলে হাটে হাঁড়ি ভেঙে যাবে। তেমনই এক সমীক্ষার ফল প্রকাশিত হয়েছে গত সপ্তাহে। এই সমীক্ষার মজা হল, এখানে উত্তরদাতা সাংবাদিকরাই। যে কোনো গণতন্ত্রপ্রেমী মানুষের সমীক্ষাটির ফল দেখে আতঙ্কিত হওয়ার মত নানা বিষয় আছে, তবে এই লেখার পক্ষে যা সবচেয়ে প্রাসঙ্গিক তথ্য তা হল, ৮২% সাংবাদিক বলেছেন তাঁরা মনে করেন তাঁদের নিয়োগকর্তা বিজেপিকে সমর্থন করেন।

এমনিতে স্বাধীন, সংসদীয় গণতন্ত্রের দেশে যে কোনো ব্যক্তিরই যে কোনো দলকে সমর্থন করার অধিকার আছে। উপরন্তু উদারনৈতিক গণতন্ত্রের গালভরা বাণীগুলোর গলদ বুঝে ফেলা যে কোনো মানুষই জানেন কোনো দেশেই কোনো সংবাদমাধ্যম সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ হতে পারে না। বস্তুত, হওয়া উচিতও নয়। কারণ রাজনীতিহীন সাংবাদিকতা হল অর্থহীন তথ্যের সমাহার। ও জিনিস হোমেও লাগে না, যজ্ঞেও লাগে না। সম্প্রতি নেটফ্লিক্সে মুক্তি পাওয়া স্কুপ নামক ওয়েব সিরিজে একজন আদর্শবাদী সম্পাদকের একটি সংলাপ আছে। তিনি চাকরি ছাড়ার আগে মালিককে মনে করিয়ে দিচ্ছেন, যখন কেউ বলে বাইরে বৃষ্টি হচ্ছে আর অন্য একজন বলে হচ্ছে না, তখন সাংবাদিকের কাজ দুজনকেই উদ্ধৃত করা নয়। জানলা খুলে দেখা কোনটা ঠিক এবং সেটাই লেখা। সাংবাদিকের কাজ কোনটা তা ঠিক করা কিন্তু শতকরা একশো ভাগ রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত। সুতরাং সাংবাদিকের এবং সংবাদমাধ্যমের রাজনৈতিক প্রবণতা থাকতে বাধ্য। সেই প্রবণতা কোনদিকে থাকবে তা অনেককিছুর ভিত্তিতে ঠিক হয়, যার একটা অবশ্যই মালিকের ব্যবসায়িক স্বার্থ। ফলে কোনো তথাকথিত নিরপেক্ষ সংবাদমাধ্যমই যে কোনোদিন সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ ছিল না একথা বলাই বাহুল্য। যেমন কেউ বলে না দিলেও পশ্চিমবঙ্গে নেহাত বালক-বালিকারাও চিরকাল জানত আনন্দবাজার পত্রিকা এবং ওই সংস্থারই ইংরিজি কাগজ দ্য টেলিগ্রাফ কংগ্রেসপন্থী; বর্তমান, দ্য স্টেটসম্যান বামফ্রন্ট সরকারের বিরোধী; আবার আজকাল বাম ঘেঁষা। তাহলে লোকনীতি-সিএসডিএস সমীক্ষার ফল আলাদা করে আলোচনা করার মত কেন? কারণ ভারতের মত এত বড় একটা দেশ, যেখানে এতগুলো রাজনৈতিক দল রয়েছে, সেখানে চালানো সমীক্ষায় দেখা যাচ্ছে এই বিপুল সংখ্যক সাংবাদিক মনে করছেন তাঁদের সংস্থা একটা দলকেই সমর্থন করে। অর্থাৎ বিভিন্ন নাগরিক বিভিন্ন দলকে সমর্থন করার মত বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে বিভিন্ন দলের দিকে ঢলে থাকলে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় যে ভারসাম্য বজায় থাকে তা সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে গেছে বলে ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে এই সমীক্ষা থেকে।

২০১৪ সালের পর থেকে বিভিন্ন খবরের চ্যানেল দেখার অভিজ্ঞতা যাঁদের আছে তাঁরা সমীক্ষার এই ফলাফলে অবিশ্বাস করবেন না। কেউ কেউ বলবেন বেশ হয়েছে, এমনটাই হওয়া উচিত কারণ বিজেপিই একমাত্র জাতীয়তাবাদী পার্টি। আর বিজেপিবিরোধী শঙ্কিত হবেন। এই যা তফাত। কিন্তু কে নিজের রাজনৈতিক পছন্দ অনুযায়ী সংবাদমাধ্যমের এই একপেশে হয়ে যাওয়াকে কীভাবে দেখবেন তার চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ হল দেশের সংবাদমাধ্যমের এতখানি একচোখামির ফল কী হচ্ছে? অর্ণব গোস্বামী, রাহুল শিবশঙ্কর, রাহুল কাঁওয়াল, শিব অরুর, সুধীর চৌধুরী, রুবিকা লিয়াকত, দীপক চৌরাসিয়া, অঞ্জনা ওম কাশ্যপ, সুরেশ চওনঙ্কে বা অমন চোপড়ারা যে পরিমাণ ঘৃণা ছড়িয়েছেন গত এক দশকে – তার ফল আর শুধু উত্তেজনা সৃষ্টি করে দাঙ্গা ছড়ানোয় সীমাবদ্ধ নেই। ও কাজ তো হোয়াটস্যাপ, ফেসবুকও করে। ধর্মান্ধ টিভি অ্যাঙ্করদের অবদানে উঠে এসেছে চেতন সিংয়ের মত ভয়ঙ্কর অপরাধী, যে সরকারি উর্দি পরে সরকারি বন্দুক দিয়ে ট্রেনের কামরায় প্রথমে নিজের ঊর্ধ্বতন অফিসারকে খুন করে। তারপর এক কামরা থেকে আরেক কামরায় গিয়ে ইসলাম ধর্মাবলম্বী যাত্রী খুঁজে বার করে খুন করে। অবশেষে সেখানে দাঁড়িয়ে বাকি যাত্রীদের হুমকি দেয়, ভারতের দুজনই আছে – মোদীজি আর যোগীজি। এখানে থাকতে হলে এদেরই ভোট দিতে হবে।

এতদ্বারা ২০২৪ লোকসভার নির্বাচনের জন্য বিজেপির প্রচার শুরু হয়ে গেল কি? রবীশ কুমার যাদের গোদি মিডিয়া বলেন, তারা যখন অমিত শাহকে বিধায়ক কেনাবেচা করার গুণে ‘মডার্ন চাণক্য’ আখ্যা দিতে পারে তখন এই প্রণালীকেও ব্যাপারটা থিতিয়ে গেলে যে বিজেপির ‘অ্যাগ্রেসিভ ক্যাম্পেনিং’ নাম দেবে না তার নিশ্চয়তা কী? আপাতত খাঁটি আমেরিকান কায়দায় চেতন সিংকে মানসিক ভারসাম্যহীন বলা চলছে। যদিও রেলমন্ত্রীকে কোনো সাংবাদিক প্রশ্ন করবে না, একজন মানসিক ভারসাম্যহীন ব্যক্তিকে বন্দুক হাতে ট্রেনযাত্রীদের নিরাপত্তা রক্ষার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছি কেন? কারণ বিজেপি সরকারকে প্রশ্ন করা বারণ, করলে চাকরি যায়। লোকনীতি-সিএসডিএস সমীক্ষা যে সঠিক, এই তার হাতে গরম প্রমাণ।

নিজের বৃত্তের বাইরে বেরিয়ে আশপাশের লোকের সঙ্গে কথা বললেই টের পাওয়া যায় মূলধারার মিডিয়ার ছড়ানো ভুয়ো খবর এবং একচোখা খবর ইতিমধ্যেই কতখানি ক্ষতি করে ফেলেছে। দিন দুয়েক আগে একজন প্রাইভেট গাড়ির চালকের সঙ্গে কথা হচ্ছিল। সেদিন কাগজে বেরিয়েছে বিজেপি মণিপুরের এই টালমাটাল অবস্থার মধ্যেই এনআরসি করার কথা ঘোষণা করেছে। চালকের পাশে বসে কাগজ পড়তে গিয়ে সক্ষোভে আমার স্ত্রীকে বলতেই চালক বলে উঠলেন “ঠিক হয়েছে। এনআরসি তো করাই উচিত।” কেন করা উচিত জিজ্ঞাসা করায় তাঁর উত্তর “বর্ডার পেরিয়ে বাংলাদেশ থেকে মুসলমানগুলো এসেই তো মণিপুরে অশান্তিটা করছে।” তাঁকে বলা গেল যে মণিপুরে মুসলমান প্রায় নেই বললেই চলে এবং ওই রাজ্যের সীমান্ত মায়ানমারের সঙ্গে, বাংলাদেশের সঙ্গে নয়। তাঁর নাছোড়বান্দা উত্তর “মুসলমান সব জায়গাতেই আছে।” অতঃপর তাঁকে জিজ্ঞেস করতে হল, মণিপুর সম্পর্কে তাঁর তথ্যের উৎস কী? উত্তর “খবরেই তো দেখাচ্ছে।” কোন চ্যানেলের খবরে দেখাচ্ছে সে প্রশ্ন করে আর সময় নষ্ট করিনি, কারণ কোন খবর মুসলমান বিদ্বেষ ছড়ায় না সে প্রশ্নের উত্তর দেওয়া বরং সহজ। তাই তাঁকে মণিপুরের ভূগোল, ইতিহাস এবং বর্তমান অশান্তি যে মেইতেই আর কুকিদের মধ্যে তা জানাতে খানিকটা সময় ব্যয় করলাম। এনআরসি যে এর প্রতিকার নয় তাও বোঝানোর চেষ্টা করলাম। সফল হলাম কিনা জানি না, ব্যর্থ হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। কারণ মানুষ বহুবছর ধরে সারাদিন যা দেখে চলেছে তার প্রভাব কয়েক মিনিটের কথায় দূর হওয়া অসম্ভব।

ভারতীয় সমাজকে এই খাদের কিনারে নিয়ে আসার দোষ সবটাই টিআরপিখোর টিভি চ্যানেলগুলোর ঘাড়ে চাপিয়ে দিলে অবশ্য অন্যায় হবে। খবরের কাগজগুলোও কোনো অংশে কম যায়নি। ‘পেইড নিউজ’ নিয়ে সাংবাদিক পি সাইনাথের যে কাজ আছে তা প্রমাণ করে টাকার জন্যে ভারতের বড় বড় কাগজগুলো সবকিছু করতে রাজি। ২০১৮ সালে কোবরাপোস্টের স্টিং অপারেশনেও তেমনই দেখা গিয়েছিল। কোবরাপোস্টের প্রতিনিধিরা একটি হিন্দুত্ববাদী সংগঠনের প্রতিনিধি সেজে ভারতের অনেকগুলো বড় বড় সংবাদমাধ্যমের কর্তাদের কাছে গিয়েছিলেন। প্রস্তাব ছিল, আমরা টাকা দেব, সাম্প্রদায়িক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত খবর করতে হবে এবং ২০১৯ লোকসভা নির্বাচনে ক্ষমতাসীন দলের সুবিধা হয় এমন খবর করতে হবে, নানারকম ইভেন্টের আয়োজন করতে হবে। দুটো মাত্র সংবাদমাধ্যম রাজি হয়নি – পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান আর ত্রিপুরার দৈনিক সংবাদ।

সংবাদমাধ্যমের প্রাতিষ্ঠানিক অর্থলোলুপতা এবং বিজেপি সরকারের ভয় দেখানো, সরকারবিরোধী খবর করলে সরকারি বিজ্ঞাপন বন্ধ করে দেওয়া ইত্যাদি নানা কৃৎকৌশলের ফল হল দেশের মূলধারার সংবাদমাধ্যমে বিজেপি-আরএসএসের বয়ানের একাধিপত্য। স্বাধীন ভারতের ইতিহাসে কখনো যা হয়নি ২০১৪ সালের পর থেকে ঠিক তাই হয়ে চলেছে। সংবাদমাধ্যম কেবলই বিরোধী রাজনৈতিক শক্তিগুলোকে প্রশ্নের মুখে ফেলে। যাদের হাতে দেশ চালানোর দায়িত্ব তাদের প্রশ্ন করে না। অর্থাৎ কয়েকশো বছর ধরে সারা পৃথিবীতে উদারনৈতিক গণতন্ত্রে সাংবাদিকতার মূল কর্তব্য বলে যা স্থির হয়েছে – ক্ষমতাকে প্রশ্ন করা – সেই কাজটাই বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। প্রশ্ন করা অপরাধ, যে সংবাদমাধ্যম বা সাংবাদিক ক্ষমতাকে প্রশ্ন করে না তারাই সঠিক কাজ করে – একথাই সারা দেশে সব ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠা পেয়ে গেছে। সাংবাদিকরা ক্ষমতাসীন দলের নেতাদের সঙ্গে গদগদ সেলফি তুলে সোশাল মিডিয়ায় পোস্ট করেছেন। কে কত বড় সাংবাদিক তার মানদণ্ড হয়ে দাঁড়িয়েছে শাসক দলের নেতাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা। পশ্চিমবঙ্গে মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি প্রশাসনিক বৈঠকে দাঁড়িয়ে সাংবাদিকদের বলেছেন “পজিটিভ (ইতিবাচক) খবর করুন। বিজ্ঞাপন পাবেন।” এত বড় খবর সর্বাধিক বিক্রীত বাংলা দৈনিকের এক কোণে ১৭৮ শব্দে প্রকাশিত হয়েছে এবং পশ্চিমবঙ্গের বাঘা বাঘা সাংবাদিকদের একজনও এর প্রতিবাদে একটি শব্দও লেখেননি বা বলেননি।

এভাবে চলছিল ভালই, কিছুদিন হল এই ধামাধরা মিডিয়া কিঞ্চিৎ ফাঁপরে পড়েছে। এমনিতে পৃথিবীর যে কোনো ব্যবসায় নিয়ম হল কাক কাকের মাংস খায় না। কিন্তু ভারতের সাংবাদিকতায় সেই নিয়ম বারবার ভেঙেছে গোদি মিডিয়া। অর্ণব গোস্বামী টাইমস নাওতে থাকার সময়েই বিজেপির পক্ষে বলে না এনডিটিভির মত যেসব চ্যানেল তার সাংবাদিকদের ‘অ্যান্টি-ন্যাশনাল’ বলা আরম্ভ করেছিলেন। একেবারে আরএসএসের তত্ত্ব অনুসরণ করে কংগ্রেস, কমিউনিস্ট, মুসলমান তো বটেই, যে কোনো ইস্যুতে সরকারের সামান্যতম বিরোধিতা করা ব্যক্তিদেরও দেশদ্রোহী বলা শুরু হয়ে গিয়েছিল ২০১৪ সাল থেকে। টিভি বিতর্কে বিরোধী দলের একজন মুখপাত্রকে ডেকে চিৎকার করে তাঁকে কথা বলতে না দেওয়া, অন্যদিকে নানা পরিচয়ে বিজেপি-আরএসএসপন্থী একাধিক লোককে প্যানেলে বসিয়ে একতরফা প্রচার চালিয়ে যাওয়া দস্তুর হয়ে দাঁড়িয়েছিল। ইন্দিরা গান্ধীর জরুরি অবস্থার সময়টুকু বাদ দিলে ভারতের সংবাদমাধ্যম এমন কখনো করেনি বলেই সম্ভবত বিরোধী দলগুলোর নেতারা হতবুদ্ধি হয়ে গিয়েছিলেন। ইংরেজিতে যাকে ‘ওয়াল টু ওয়াল কভারেজ’ বলে, সমস্ত নির্বাচনী প্রচারে এবং সারাবছরই বিজেপি তাই পেয়ে চলছিল আর বিরোধীদের কথা সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছবার রাস্তা প্রায় বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছিল। এর পাল্টা কৌশল কারোর মাথায় আসেনি। কোনো কোনো রাজনৈতিক দলের সদস্য, সমর্থকরা ভেবে বসেছিলেন সোশাল মিডিয়া দিয়ে মাত করে দেবেন। কিন্তু বিপুল অর্থবলের কারণে সেখানেও বিজেপির সঙ্গে এঁটে ওঠা শক্ত। উপরন্তু আমাদের মত শহুরে মধ্যবিত্তদের নিজের চারপাশ দেখে যা-ই মনে হোক, ভারতের বেশিরভাগ মানুষের কাছেই এখনো স্মার্টফোন নেই, থাকলেও শস্তা ডেটা নেই, কানেক্টিভিটি নেই। ফলে ফেসবুক বা টুইটার দিয়ে তাঁদের কাছে পৌঁছনো যায় না।

নেপথ্যে কে আছেন জানি না, কিন্তু বিজেপির এই সর্বগ্রাসী প্রচারের বিকল্প পথ প্রথম দেখালেন রাহুল গান্ধী – ভারত জোড়ো যাত্রা। শুধু যে সাবেকি ভারতীয় কায়দায় মাইলের পর মাইল হেঁটে নিজের ভাবমূর্তি খানিকটা পুনরুদ্ধার করলেন এবং কংগ্রেসকে জাতীয় স্তরে ফের প্রাসঙ্গিক করে তুললেন তাই নয়, রাহুল ওই যাত্রায় এমন একটা জিনিস করলেন যা এমনকি বিজেপিও ভেবে উঠতে পারেনি। ভারত জোড়ো যাত্রাকে মূলধারার সংবাদমাধ্যম কোনো কভারেজ দেবে না বুঝে রাহুল ছোট বড় বিচার না করে বিকল্প সংবাদমাধ্যম, এমনকি ইউটিউবারদেরও সাক্ষাৎকার দেওয়া শুরু করলেন। কিছুদিনের মধ্যেই দেখা গেল, বড় বড় কাগজে রাহুল নেই। টিভিতে রাহুল নেই। অথচ কর্ণাটকে চলা ভারত জোড়ো যাত্রা নিয়ে পশ্চিমবঙ্গের মানুষও আলোচনা করছেন। আসলে রাহুল (বা কংগ্রেস) যথার্থই বুঝতে পেরেছিলেন যে একটা বড় অংশের মানুষ খবরের জন্য আর কাগজ বা টিভির উপর ভরসা করেন না। বিশেষত যাঁদের মস্তিষ্কের সবটাই এখনো হিন্দুত্ব গ্রাস করতে পারেনি, তাঁরা অনেকেই এখন ধ্রুব রাঠি বা আকাশ ব্যানার্জির মত ইউটিউবারের দিকে তাকিয়ে থাকেন খবর সংগ্রহের জন্য। পশ্চিমবঙ্গের বিকল্প সংবাদমাধ্যম এখনো সঠিক অর্থে বিকল্প হয়ে উঠতে পারেনি বলেই হয়ত এই ধারা এখনো শীর্ণকায়। কিন্তু উত্তরপ্রদেশের মত বুলডোজারশাসিত রাজ্যেও হিন্দি ভাষার ইউটিউবাররা প্রবল জনপ্রিয়। যোগী সরকারকে বেগ দেওয়ার মত খবর, হাস্যকৌতুক, গান সবই তাঁরাই তৈরি করছেন। কাশ্মীর থেকে কন্যাকুমারী পর্যন্ত বহু রাজ্যেই ঘটনা তাই। এই প্রবণতার পূর্ণ সদ্ব্যবহার করা হল ভারত জোড়ো যাত্রায়।

এর সঙ্গে কংগ্রেস আরও একটি কৌশল নিল, যা প্রথম চোটে যে কোনো গণতন্ত্রপ্রেমী মানুষের আপত্তিকর মনে হবে। শাস্ত্রে বলা আছে, দূত অবধ্য। সাহেবরাও বলে থাকে “Don’t shoot the messenger”। কিন্তু রাহুল ভারত জোড়ো যাত্রা চলাকালীন একটি সাংবাদিক সম্মেলনে এক সাংবাদিককে সরাসরি বলে দিলেন, বিজেপির হয়ে কাজ করতে হলে বুকে বিজেপির লোগো লাগিয়ে আসুন। তাহলে ওদের যেভাবে উত্তর দিই আপনাদেরও সেভাবেই উত্তর দেব। সাংবাদিক হওয়ার ভান করবেন না। সাংবাদিক দমে যেতে আরও আক্রমণাত্মক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, হাওয়া বেরিয়ে গেল?

এরপর থেকে একই ঢঙে কথা বলা শুরু করলেন তাঁর দলের অন্য মুখপাত্ররাও। পবন খেরা, সুপ্রিয়া শ্রীনাতেরা লাইভ টিভিতে গোদি মিডিয়ার অ্যাঙ্করদের ধমকাতে শুরু করলেন – বিজেপির দালালি করবেন না। কর্ণাটকের বিধানসভা নির্বাচনের ফল প্রকাশের দিন ইন্ডিয়া টুডের শোতে সুপ্রিয়া সটান রাহুল কাঁওয়াল এবং রাজদীপ সরদেশাইকে বলে দিলেন, আপনাদের স্টুডিওতে তো সকাল থেকে শোকপালন চলছে বলে মনে হচ্ছে। এই আক্রমণাত্মক মেজাজ কংগ্রেসের মুখপাত্ররা বজায় রেখে চলেছেন। সম্প্রতি টাইমস নাওয়ের সাক্ষাৎকারে কপিল সিবাল নাভিকা কুমারকে ল্যাজেগোবরে করে ছেড়েছেন। ভারি মোলায়েম গলায় বলেছেন, আশা করি এখন পর্যন্ত নাভিকা প্রধানমন্ত্রীর মাউথপিস নয়?

ক্রমশ এই রণনীতি অন্য বিরোধী দলের নেতাদেরও নিতে দেখা যাচ্ছে। পশ্চিমবঙ্গে সবকিছুই বাকি দেশের চেয়ে একটু দেরিতে হয় আজকাল। তাই হয়ত সিপিএমের রাজ্য সম্পাদক মহম্মদ সেলিম অতি সম্প্রতি একেবারে পার্টিজান হয়ে যাওয়া সংবাদমাধ্যমকে কড়া ভাষায় প্রত্যুত্তর দেওয়া শুরু করেছেন। লাইভ অনুষ্ঠানে জি ২৪ ঘন্টার অ্যাঙ্কর মৌপিয়া নন্দীকে সটান বলে দিয়েছেন, দালালি করা চলবে না। ওই চ্যানেলের মালিক সুভাষ চন্দ্র যে রাজ্যসভার বিজেপি সমর্থিত সাংসদ, টেনে এনেছেন সেকথাও।

আত্মপক্ষ সমর্থনে মৌপিয়া প্রথমে ওই তথ্যটাই অস্বীকার করেছেন, তারপর সেটা সফল হবে না বুঝে জাঁক করে বলেছেন, সেলিম চাইলেও ২৪ ঘন্টা গণশক্তির মত রিপোর্টিং করবে না। তারপর, যেন হঠাৎ খেয়াল হওয়ায়, যোগ করেছেন, জাগো বাংলার মত রিপোর্টিংও করবে না।

স্বাভাবিক অবস্থায় রাজনৈতিক নেতাদের এইভাবে সাংবাদিকদের তথা সংবাদমাধ্যমকে আক্রমণ করা একেবারেই সমর্থনযোগ্য নয়। কিন্তু ভারত যে স্বাভাবিক অবস্থায় নেই তা নিয়ে সন্দেহের কোনো অবকাশ নেই এবং এই অস্বাভাবিক অবস্থা তৈরি করতে মূলধারার সংবাদমাধ্যমের ভূমিকা অস্বীকার করারও কোনো উপায় নেই। বস্তুত অধিকাংশ তথাকথিত নিরপেক্ষ সংবাদমাধ্যম এখন এতটাই একচোখো হয়ে দাঁড়িয়েছে যে তাদের খবর না দেখে বা না পড়ে কেউ যদি গণশক্তি আর জাগো বাংলা পড়ে নিজের মত করে ঠিক কী ঘটেছে বুঝে নেওয়ার চেষ্টা করেন, তাহলে হয়ত সত্যের বেশি কাছাকাছি পৌঁছবেন।

একথা পাঠক/দর্শক মাত্রেই আজকাল উপলব্ধি করেন। সেই কারণেই রবীশ কুমারের ইউটিউব চ্যানেলের গ্রাহক সংখ্যা লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে, এমনকি কুণাল কামরার মত ঋজু বিদূষক, যাঁর মূল কাজ লোক হাসানো, তাঁর পডকাস্টও মানুষ আগ্রহ নিয়ে দ্যাখেন। সেদিক থেকে যে বাঙালি হিন্দি বা ইংরিজিতে স্বচ্ছন্দ নন তাঁদের দুর্ভাগা বলতে হবে। বাংলা ভাষায় ওই মানের কাজ এখনো হচ্ছে না।

যা-ই হোক, ধামাধরা মিডিয়ার সংকটের কথা ফেরত আসি। সম্প্রতি রিপাবলিক চ্যানেলের কর্ণধার অর্ণব মণিপুর নিয়ে মোদী সরকারের সমালোচনা করেছেন, রাষ্ট্রপতি শাসনের দাবিও তুলেছেন। তা নিয়ে বিজেপিবিরোধী মানুষ যুগপৎ হাসাহাসি করছেন এবং বিস্মিত হচ্ছেন। আসলে এতে বিস্ময়ের কোনো কারণ নেই। বিজেপিকে তো বটেই, এমনকি বিজেপিবিরোধীদেরও বিস্মিত করে পরস্পরবিরোধী স্বার্থ থাকা সত্ত্বেও ২৬টি দলের ইন্ডিয়া জোট গড়ে উঠেছে। শেষপর্যন্ত সে জোট টিকবে কিনা সেটা পরের কথা, কিন্তু গোদি মিডিয়ার কাছে আশু সমস্যা হল এই দলগুলির অধীনে থাকা রাজ্য সরকারগুলো। গোটা দক্ষিণ ভারতে কোথাও বিজেপি সরকার নেই, অথচ ওই রাজ্যগুলোর অর্থনৈতিক অবস্থা ভাল, প্রচুর বিজ্ঞাপন পাওয়া যেতে পারে। বাড়াবাড়ি করলে বিজেপির দেখানো পথে ওই সরকারগুলো বিজ্ঞাপন দেবে না। গোবলয়ের রাজ্যগুলোর মধ্যেও বিহার, ঝাড়খণ্ড, রাজস্থানের সরকার ইন্ডিয়া জোটের দলগুলোর হাতে। দিল্লি, পাঞ্জাবের সরকারও তাই। বলা বাহুল্য, পশ্চিমবঙ্গের মত বড় রাজ্য, ছত্তিসগড়ের মত উন্নতি করতে থাকা রাজ্যও ইন্ডিয়ার হাতে। তাহলে গোদি মিডিয়ার হাতের পাঁচ বলতে রইল মডেলের হাড়গোড় বেরিয়ে পড়া গুজরাট, মহারাষ্ট্র, ধুঁকতে থাকা অর্থনীতির উত্তরপ্রদেশ, উত্তরাখণ্ড, ছোট্ট রাজ্য হরিয়ানা আর মধ্যপ্রদেশ। শেষেরটি আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনের পর বিজেপির হাতে থাকবে কিনা তা নিয়েও ঘোর সন্দেহ দেখা দিয়েছে। উত্তর-পূর্বাঞ্চলের রাজ্যগুলো থেকে তেমন ব্যবসা হয় না নয়ডাকেন্দ্রিক তথাকথিত সর্বভারতীয় মিডিয়ার। কারণ তারা ওই অঞ্চল এবং তার মানুষজনকে চেনেই না। স্বভাবতই তাঁরাও এদের পাত্তা দেন না। এমতাবস্থায় স্রেফ দাঙ্গাবাজি করে চলে কী করে অর্ণব, রুবিকাদের?

লাইভ টিভিতে বিরোধী দলের নেতাদের প্রতিআক্রমণের ফলে হিন্দুত্বে একান্ত দীক্ষিত দর্শক ছাড়া আর সকলের কাছেই বিশ্বাসযোগ্যতা যে তলানিতে ঠেকেছে একথা বুঝতে সর্বভারতীয় সংবাদমাধ্যমগুলোর পাকা মাথাদের কারোর বুঝতে বাকি নেই। বিকল্প সংবাদমাধ্যম বিপুল সরকারি বাধা সত্ত্বেও যে প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠছে তাতেও সন্দেহ নেই। অতএব মাঝেমধ্যে বিজেপিবিরোধী ভান করতে হবে বইকি। মুশকিল হল, অনেক দেরি হয়ে গেছে। এখন সম্ভবত বিজেপিও ভাবতে শুরু করেছে, এদের দিয়ে প্রোপাগান্ডা করালে তা আর আগের মত প্রভাবশালী হবে না। তাই তারাও এখন ‘সোশাল মিডিয়া ইনফ্লুয়েন্সার’ ধরার চেষ্টা করছে। সম্প্রতি বিজেপিপন্থী লেখক, সাংবাদিক, এমনকি মন্ত্রীরাও বেশকিছু ইউটিউবারকে সাক্ষাৎকার দিতে শুরু করেছেন। এমনটা বিজেপি আগে কখনো করেনি। এই ইউটিউবারদের অন্যতম beerbiceps বলে একজন। ইউটিউবে তার প্রায় ছয় মিলিয়ন ফলোয়ার। অতীতে সে ক্রিকেটার যজুবেন্দ্র চহল, সানি লিওন, সারা আলি খান জাতীয় মানুষের সাক্ষাৎকার নিত। এমনকি ডিমনেটাইজেশনকে ব্যঙ্গ করেও ভিডিওও বানিয়েছে একসময়। ইদানীং দেখা যাচ্ছে সে পরম সাত্ত্বিক হয়ে উঠেছে। বারবার ভুয়ো খবর ছড়িয়ে ভ্রম সংশোধন করা এজেন্সি এএনআইয়ের সম্পাদক স্মিতা প্রকাশ থেকে শুরু করে অমুক প্রভু, তমুক দক্ষিণপন্থী স্ট্র্যাটেজিস্ট – সকলেই বিয়ারবাইসেপসের শোতে উপস্থিত হচ্ছেন। বিজেপি যদি ২০২৪ নির্বাচন জিতেও যায়, রাহুল, সেলিমরা মূলধারার সংবাদমাধ্যম সম্পর্কে তাঁদের তিরিক্ষে মেজাজ বজায় রাখলে হয়ত বিয়ারবাইসেপসদেরই পোয়া বারো হবে, কপাল পুড়বে অর্ণব, মৌপিয়াদের।

তবে আক্রমণের ধারাবাহিকতা থাকা চাই। সেলিম জি নেটওয়ার্কের অ্যাঙ্করকে হাঁকড়াবেন আর তাঁর দলের মুখপাত্র ও বুদ্ধিজীবীরা রিপাবলিক টিভির মত আরও উগ্র দক্ষিণপন্থী চ্যানেলের বিতর্কে হাসিমুখে অংশগ্রহণ করবেন, অনুষ্ঠানের আগে পরে দিলদরিয়া হয়ে ছবিও তুলবেন – তা কী করে হয়?

পিপলস রিপোর্টার ওয়েবসাইটে প্রকাশিত

এনডিটিভি বিসর্জন: শোক নিষ্প্রয়োজন, উল্লাস অন্যায়

এনডিটিভি প্রথম নেটওয়ার্ক নয় যা সরকারের মুখপত্র হতে চলেছে, শেষ নেটওয়ার্ক। বিপদটা সেইখানে।

এনডিটিভির দখল এশিয়ার সবচেয়ে বড় ধনী গৌতম আদানির হাতে চলে যাওয়া নিয়ে আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে। প্রণয়-রাধিকার হাত থেকে লাগাম ছুটে যাওয়া মাত্রই পদত্যাগ করেছেন ম্যাগসাসে পুরস্কার জয়ী সাংবাদিক রবীশ কুমার। এই খবরটা আরও বেশি পীড়া দিচ্ছে অনেককে। কারণটা শুধুমাত্র কিছু মানুষের প্রিয় টিভি নেটওয়ার্ক অপ্রিয় লোকের হাতে চলে যাওয়া বা সেখান থেকে প্রিয় অ্যাঙ্করের প্রস্থান নয়। এনডিটিভির আদানিকরণ নিয়ে সারা পৃথিবীতে আলোচনা হচ্ছে। বিশ্বের সবচেয়ে ধনী ব্যক্তিদের তালিকায় থাকা লোকেদের হাতে কোনো সংবাদমাধ্যম বা সোশাল মিডিয়ার মালিকানা চলে যাওয়া যে গণতন্ত্রের পক্ষে ক্ষতিকর, বাকস্বাধীনতার বারোটা বাজানোর পক্ষে যথেষ্ট, তা সারা পৃথিবীর গণতন্ত্রপ্রেমী মানুষ বুঝে ফেলেছেন। উপরন্তু আদানি এনডিটিভিকে নিয়ে কী করবেন তা নিয়েও কোনো সংশয় রাখেননি। তিনি ফাইন্যানশিয়াল টাইমসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন “স্বাধীনতা মানে হল সরকার ভুল কিছু করলে তা বলার স্বাধীনতা। কিন্তু একইসঙ্গে সরকার যখন রোজ ঠিক কাজ করে তখন সেটা বলার সাহসও থাকা উচিত। সেটাও আপনাকে বলতে হবে।” পৃথিবীর সবচেয়ে জনদরদী সরকারও যে রোজ ঠিক কাজ করে না তা বোঝার জন্য নোবেল পুরস্কার প্রাপকদের মত বুদ্ধিমান হওয়ার দরকার নেই আর আদানির মত সফল ব্যবসায়ী নির্বোধও নন। ফলে তিনি যে আসলে বলতে চাইছেন সরকারের বিরুদ্ধে কথা বলা সংবাদমাধ্যমের কাজ নয় – তা স্পষ্ট। একটা সাড়ে তিন দশকের পুরনো মিডিয়া নেটওয়ার্কের মালিকানা এমন লোকের হাতে চলে যাওয়া নিঃসন্দেহে উদ্বেগজনক।

কিন্তু এনডিটিভি কি প্রথম চ্যানেল যা শাসকের মুখপাত্র হতে বসেছে? নাকি এনডিটিভি ছিল বলে ভারতের গণতন্ত্র জীবন্ত ছিল, আর আদানির নিয়ন্ত্রণে চলে গেলেই নিমেষে তার মৃত্যু হবে? যদি দুটো প্রশ্নের উত্তরই ‘না’ হয়, তাহলে এত কান্নাকাটির কী আছে? নাগরিক ডট নেটের মত একটা বিকল্প সংবাদমাধ্যমে আমারই বা এ নিয়ে প্রবন্ধ ফেঁদে বসার কী আছে? রবীশ কিছুদিন আগেই, সম্ভবত কী হতে চলেছে জেনে, নিজের ইউটিউব চ্যানেল খুলেছেন। সাবস্ক্রাইবারের যথারীতি অভাব হয়নি, তাঁর পদত্যাগের কথা চাউর হওয়ার পর সংখ্যা লাফিয়ে বেড়েছে। সুতরাং সেই চ্যানেল থেকে যে বিস্তর আয় হবে তাতে সন্দেহ নেই। রবীশের সে আয়ের ভাগ তো আমি পাব না, নাগরিক ডট নেটও পাবে না। তাহলে দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের মত “কিসের শোক করিস ভাই/আবার তোরা মানুষ হ” বলে অন্য কাজে লেগে পড়লেই তো হয়। কী দরকার এ বিষয়ে ভাবনাচিন্তার?

এসব কথা অনেকেই বলাবলি করছেন। আরও বলাবলি হচ্ছে, এনডিটিভির ভারতীয় সাংবাদিকতায় এমন কিছু অবদান নেই যে তাদের জন্য চোখের জল ফেলতে হবে। তারাও আর পাঁচটা সংবাদমাধ্যমের চেয়ে আলাদা কিছু নয়। যাঁরা মনে করছেন এনডিটিভি ক্ষমতাকে প্রশ্ন করা শেষ চ্যানেল ছিল, তাঁদের মনে করিয়ে দেওয়া হচ্ছে, এনডিটিভি কেন্দ্রের শাসককে প্রশ্ন করলেও বহু রাজ্যের শাসককে ছাড় দিয়েছে। পশ্চিমবঙ্গের তৃণমূল সরকারই সম্ভবত তার সবচেয়ে বড় উদাহরণ। সুতরাং শোকার্ত হয়ে পড়ার কোনো প্রয়োজন নেই। আবার কংগ্রেসের অনেক সদস্য, সমর্থক এনডিটিভির উপর চটে আছেন অন্য কারণে। তাঁদের বক্তব্য এরা বিজেপিকে যত প্রশ্ন করেছে, বিরোধী আসনে থাকা সত্ত্বেও কংগ্রেসকে তার চেয়ে বেশি প্রশ্ন করেছে। নরেন্দ্র মোদীর চেয়ে বেশি আক্রমণ করেছে রাহুল গান্ধীকে। কংগ্রেসের অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র নিয়ে দিনরাত আলোচনা করেছে, বিজেপির অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র নিয়ে উচ্চবাচ্য নেই।

উপরের সবকটা অভিযোগেরই কিছু না কিছু সারবত্তা আছে। ঠিক সেজন্যেই এনডিটিভির আদানিকরণ নিয়ে আলোচনা অপরিহার্য।

প্রথমেই বলে নেওয়া দরকার, অনেকেই একটা কথা ভুল বুঝেছেন। এনডিটিভির নিয়ন্ত্রণ এখনো প্রণয় রায় ও তাঁর স্ত্রী রাধিকা রায়ের হাত থেকে বেরিয়ে যায়নি। তাঁরা এখনো এনডিটিভির বোর্ড অফ ডিরেক্টর্সে আছেন, থাকতে বাধাও নেই। কারণ দুজনের হাতেই এনডিটিভির বেশকিছু শেয়ার রয়েছে।

কিন্তু এনডিটিভির প্রোমোটার হল আরআরপিআর হোল্ডিং নামক সংস্থা। তাঁরা পদত্যাগ করেছেন সেই সংস্থার ডিরেক্টরের পদ থেকে, কারণ আরআরপিআরের দখল অগাস্ট মাসেই আদানি গ্রুপের হাতে চলে গেছে, ফলে এনডিটিভির ২৯.১৮% শেয়ারও এখন আদানি গ্রুপেরই হাতে। এনডিটিভির আরও ২৬% শেয়ার দখল করার জন্য গৌতম আদানি ২২ নভেম্বর এক ওপেন অফার লঞ্চ করেছেন, যার মেয়াদ শেষ হচ্ছে আজ। আদানির লক্ষ্যপূরণ হলে এনডিটিভির বেশিরভাগ শেয়ার চলে যাবে আদানি গ্রুপের হাতে। পূরণ না হলেও অন্য যারা শেয়ার কিনে নেবে তাদের শেয়ারগুলো আরও বেশি দামে কিনে নেওয়ার রেস্ত আদানির আছে, রায় দম্পতির নেই। ফলে আদানির এনডিটিভির ম্যানেজমেন্টের সম্পূর্ণ দখল নিয়ে নেওয়া এখন সময়ের অপেক্ষা। ইতিমধ্যেই আদানি গ্রুপের চিফ টেকনোলজি অফিসার সুদীপ্ত ভট্টাচার্য, সাংবাদিক সঞ্জয় পুগলিয়া ও সেন্থিল চেঙ্গলবরায়ন আরআরপিআরের ডিরেক্টর নিযুক্ত হয়েছেন। প্রণয়-রাধিকার এনডিটিভি থেকে বিদায় অনিবার্য – একথাও বলাই যায়। কারণ আদানির চেয়ে বেশি টাকা দিয়ে ওপেন অফারে যারা শেয়ার কিনেছে তাদের শেয়ারগুলো ফের কিনে নেওয়ার অবস্থা রায় দম্পতির থাকলে এই পরিস্থিতির সৃষ্টিই হত না। তাঁরা ২০০৯-১০ সালে বিশ্বপ্রধান কমার্শিয়াল প্রাইভেট লিমিটেড নামে এক সংস্থা থেকে ৪০৩ কোটি টাকা ধার নিয়েছিলেন। সে ঋণের শর্তই ছিল, ঋণ শোধ করতে না পারলে আরআরপিআরের ৯৯.৯% শেয়ার বিশ্বপ্রধান দখল করে নিতে পারবে। আদানি প্রথমে ওই বিশ্বপ্রধানেরই প্রধান হয়ে বসেন টাকার জোরে, তারপর অনাদায়ী ঋণের দায়ে এনডিটিভির দখল নেওয়ার কাজ শুরু করেন।

শোধ দিতে পারবেন না এমন ঋণ নিলেন কেন, তা-ও আবার ২০০৮ সালে তৈরি হওয়া বিশ্বপ্রধানের মত এক গোলমেলে ‘হোলসেল ট্রেডিং ফার্ম’ থেকে, যার মালিকানা হাত বদলাতেই থাকে, যার মালিকানা একসময় ছিল রিলায়েন্স ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের হাতে, পরে মুকেশ আম্বানিরই ঘনিষ্ঠ মহেন্দ্র নাহাতার হাতে চলে যায়? এসব প্রশ্ন তুলে এনডিটিভির আজকের অবস্থার জন্য রায় দম্পতিকে দায়ী করাই যায়। এমনকি সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ বোর্ড অফ ইন্ডিয়া (সেবি)-ও এ নিয়ে প্রণয়-রাধিকাকে শোকজ করেছিল। এনডিটিভিতে কাজ করেই বিখ্যাত হওয়া বরখা দত্তের মত কেউ কেউ এখন পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে তির্যক ভাষায় টুইট করতে লেগেছেন, এনডিটিভি আগে আম্বানির হাতে ছিল। তখন যদি স্বাধীন থেকে থাকে, এখন আদানির হাতে গেলেই পরাধীন হবে কেন? আসলে ইস্যুটা হল টিভির রেভিনিউ মডেলটাই ভেঙে পড়েছে।

AM CONFUSED. WHEN MUKESH AMBANI OWNED 30% OF NDTV IT WAS FREE AND WHEN GAUTAM ADANI PURCHASES THAT 30% ITS OBITUARY TIME? PRAY, HOW? SO MUCH POLITICKING & HUMBUG IN THE DISCOURSE BOTH FOR OR AGAINST, BOTH NARRATIVES IGNORE THE ELEPHANT IN THE ROOM- REVENUE MODEL OF TV IS BROKEN.— barkha dutt (@BDUTT) December 1, 2022

এতদ্বারা বরখা আম্বানিকে গণতান্ত্রিক বললেন, নাকি আদানিকে গণতান্ত্রিক বললেন? নাকি দুজনের কেউই বাকস্বাধীনতার পক্ষে বিপজ্জনক নন বললেন? বোঝা কঠিন। কিন্তু ঘটনা হল কর্পোরেট মিডিয়ার রেভিনিউ মডেল যে গোলমেলে তা কোনো নতুন কথা নয়। আয়ের জন্যে বিজ্ঞাপন নির্ভরতা এবং বিজ্ঞাপনের জন্য টিআরপি নির্ভরতা বহুকালের সত্য। বরখা যখন স্বয়ং কর্পোরেট মিডিয়ার হর্তাকর্তা ছিলেন তখনো তাই ছিল। ভারতে অর্থনৈতিক উদারীকরণের পর সংবাদমাধ্যমে, বিশেষত ইংরেজি ভাষার সংবাদমাধ্যমে, দুটো জিনিস ক্রমান্বয়ে ঘটেছিল। এক, সংবাদমাধ্যমে চুক্তিভিত্তিক চাকরি চালু হওয়া আর সাংবাদিকদের পারিশ্রমিক অনেকখানি বেড়ে যাওয়া। এককথায় অন্যদের ঘাড়ে পা দিয়ে সাংবাদিকদের স্বর্গারোহণ আরম্ভ হয়। যে সাংবাদিক যত উপরে আছেন তাঁর মাইনে তত বাড়ে। রাজস্ব বেড়েছে কিনা, এত মাইনের টাকা আসবে কোথা থেকে – এসব প্রশ্ন তখন বরখার মত শীর্ষস্থানীয়রা করেননি। ২০০৮-০৯ বা ২০১০, অর্থাৎ যে সময়ে প্রণয়-রাধিকা ওই বিপুল পরিমাণ ঋণ নিয়েছিলেন, ঠিক সেই সময়টাতে এই মাইনে বাড়ার হার চরমে পৌঁছয় সারা দেশের সংবাদমাধ্যমে। কেবল টিভি চ্যানেলগুলোতে নয়, খবরের কাগজেও।

আমার নিজের অভিজ্ঞতাই বলি। ২০০৭ সালের নভেম্বর মাসে কলকাতার ধুঁকতে থাকা দ্য স্টেটসম্যান কাগজের চাকরি ছেড়ে পাড়ি দিই হায়দরাবাদে, ২৮,০০০ টাকা মাস মাইনেয়। সেখানে যে কাগজে যোগ দিই, সেখানে কয়েক মাসের মধ্যেই কোনো অজ্ঞাত কারণে বেতন কাঠামোর পুনর্বিন্যাস হয়। নিউজরুমের বড়, মেজ, সেজ, ছোট সকলেরই বেতনের বিপুল বৃদ্ধি হয়। যাদের পদোন্নতি হয়নি তাদেরও বেতন প্রায় দ্বিগুণ হয়। আমার মত যাদের পদোন্নতি হয়েছিল তাদের বৃদ্ধি হয় চোখ কপালে তোলার মত। আমার বেতন গিয়ে দাঁড়িয়েছিল মাসিক ৭০,০০০ টাকায়। আমি তখন নেহাতই মাঝের স্তরের সাংবাদিক, সবে সিনিয়র সাব-এডিটর থেকে চিফ সাব হয়েছি। অ্যাসিস্ট্যান্ট এডিটর, এক্সিকিউটিভ এডিটর বা এডিটরদের মাইনে কোথায় পৌঁছেছিল তা কেবল কল্পনাই করতে পারি। আমরা কেউ কি খোঁজ নিতে গিয়েছিলাম কাগজের আয় বেড়েছে কিনা? অথচ সকলেই জানতাম কাগজের বিক্রি কিন্তু রাতারাতি বাড়েনি।

সেটা ২০০৮ সালের কথা। তখন সারা ভারতের ইংরেজি সংবাদমাধ্যমে প্রতিযোগিতা চলছে সাংবাদিকদের মাইনে বাড়ানোর। আবার ২০১০ সালে পশ্চিমবঙ্গে সারদা গ্রুপের বাংলা কাগজ চালু হওয়ার সময়ে একইরকম জিনিস দেখা গিয়েছিল। সে কাগজ বছর দুয়েকের বেশি না চললেও বাংলা ভাষার সাংবাদিকদের সঙ্গে ইংরেজির সাংবাদিকদের পারিশ্রমিকের যে লজ্জাজনক ব্যবধান ছিল, তা কমাতে ঘটনাটা কিছুটা সাহায্য করেছিল।

এখন কথা হল, টিআরপির খোঁজে বহুকাল ধরেই ভূত পেত্নী দত্যি দানো তাবিজ কবচ দেখায় বহু হিন্দি চ্যানেল। সে কাজ রবীশরা কখনো করেননি। ২০১২-১৩ সাল থেকে ওসবের সঙ্গে হিন্দি, ইংরেজি সব চ্যানেলেই যুক্ত হয়েছে প্রায় আঁচড়ে কামড়ে দেওয়ার মত সান্ধ্য মজলিশ, মুসলমান বিদ্বেষ ছড়ানো, উদারনৈতিক ব্যক্তি এবং প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে লোক ক্ষ্যাপানো, সব ধরনের বামপন্থীদের দেশদ্রোহী বলে দেগে দেওয়া, ভুয়ো খবর প্রচার, বিজেপির অলিখিত মুখপত্রের কাজ করা। এনডিটিভি এগুলোর কোনোটাই করেনি। অথচ প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে গেলে বাজারের চলতি হারের কমে মাইনে দেওয়া চলে না। উপরন্তু সাংবাদিকদের মাইনে একটা সংবাদমাধ্যমের খরচের একটা অংশ মাত্র। তথ্যপ্রমাণ বলছে খুব বড় অংশও নয়। তার চেয়ে খবর সংগ্রহ করা এবং টিভির ক্ষেত্রে যন্ত্রপাতি ও প্রযুক্তির ক্রমোন্নয়নের খরচ অনেক বেশি। সেখানেও প্রতিযোগীদের সঙ্গে তাল মেলাতে টাকার প্রয়োজন হয়। আমরা যারা স্বাধীন সংবাদমাধ্যম চাই, ক্ষমতাকে প্রশ্ন করে এমন সংবাদমাধ্যম চাই, তারা কি টিআরপি বাড়িয়ে বেশি বিজ্ঞাপন পাওয়ার দিকে মন না দিয়ে যেনতেনপ্রকারেণ ঋণ নিয়ে টিকে থাকার চেষ্টাকে বেশি অপরাধ বলে গণ্য করব? বরখার টুইটসূত্রে খেয়াল করলেই দেখা যাবে, এনডিটিভির শেয়ার হোল্ডাররা মন্তব্য করছেন, ওটা বাজে কোম্পানি। আমাদের কী করে ডিভিডেন্ড দেওয়া যায় তার দিকে কোনোদিন নজর দেয়নি। একটা সংবাদমাধ্যমকে স্রেফ কোম্পানি হিসাবে দেখার এই দৃষ্টিভঙ্গিই কি আমাদের মূল্যায়নের মাপকাঠি হওয়া উচিত? ভেবে দেখা প্রয়োজন। আমরা তো কোম্পানির শেয়ার হোল্ডার নই। আমরা বরং, পুঁজিবাদী লবজে, স্বাধীন সংবাদমাধ্যমের স্টেক হোল্ডার।

এনডিটিভি প্রথম নেটওয়ার্ক নয় যা সরকারের মুখপত্র হতে চলেছে, শেষ নেটওয়ার্ক। বিপদটা সেইখানে। ভারতে যতগুলো বড় বড় টিভি নেটওয়ার্ক আছে তার প্রায় সবকটাই ইতিমধ্যেই শাসক দলের গর্ভে চলে গেছে। বাকি ছিল এনডিটিভি। বলতে দ্বিধা নেই, এনডিটিভিও একটি পুঁজিবাদী সংস্থা। সে পুঁজিবাদের নিয়মেই চলেছে। এমন নয় যে সারা ভারতের সংবাদমাধ্যমে যখন ছাঁটাই চলেছে, এনডিটিভি তখন সমস্ত কর্মচারীর স্বার্থরক্ষা করেছে। কিন্তু রায় দম্পতি কখনো কারাত দম্পতির মত নিজেদের বিপ্লবী বলে দাবি করেছেন বলে তো মনে পড়ে না। তাঁরাও ব্যবসাই করছিলেন। ব্যবসা প্রায় তিন দশক ক্রমশ বড় হয়েছে, সংবাদমাধ্যমের যা কাজ তা করতে নিতান্ত ব্যর্থ হয়নি, দায়িত্ব অস্বীকারও করেনি। কোনো সন্দেহ নেই, সব ইস্যুতেই এনডিটিভির অবস্থান ন্যায়ের পক্ষে বা দুর্বলের পক্ষে ছিল না। থাকার কথাও নয়। অন্তত বামপন্থীদের বুঝতে অসুবিধা হওয়ার কথা নয়, যে সংবাদমাধ্যম শেষপর্যন্ত মালিকের শ্রেণিস্বার্থেরই প্রতিভূ। এনডিটিভি তার চেয়ে আলাদা হবে এরকম প্রত্যাশা ছিল কি? থাকলে কেন ছিল? তবে এই একটি নেটওয়ার্কে কিন্তু বুলডোজার দিয়ে দিল্লি, উত্তরপ্রদেশ বা আসামে প্রতিবাদীদের ঘর ভেঙে দেওয়ার জন্যে বিজেপি নেতাদের দিকে আঙুল তোলা চলত। উমর খালিদ, ভারভারা রাও, স্ট্যান স্বামী, জি এন সাইবাবা, গৌতম নওলাখারা যে খলনায়ক নন সেটা বলা চলত। বিহার বিধানসভা নির্বাচনের আগে পরে লিবারেশন নেতা দীপঙ্কর ভট্টাচার্যকে যথেষ্ট গুরুত্ব দেওয়া হত। মূল্যবৃদ্ধি, বেকারত্ব, দারিদ্র্য নিয়ে কথা হত। আজ দেশের যা অবস্থা, তাতে এমন একটা মঞ্চের গুরুত্ব কম নয়। এই মঞ্চের অবলুপ্তিতে শোকাহত না হলেও উল্লসিত হওয়া বুদ্ধিমানের কাজ নয়।

ভারতীয় সাংবাদিকতায় এনডিটিভির অবদান কী, সে সম্পর্কে সম্ভবত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কথাটা বলেছেন অনিন্দ্য চক্রবর্তী। এনডিটিভি নেটওয়ার্কের দু-দুটো চ্যানেলের একদা ম্যানেজিং এডিটর এই সাংবাদিক রায় দম্পতির আরও অনেক অবদানের কথা লেখার সঙ্গে সঙ্গে লিখেছেন, ভারতের আর সব প্রতিষ্ঠানের মতই এনডিটিভিতেও বিলক্ষণ লুটিয়েন্স এলিটসুলভ ব্যাপার-স্যাপার আছে। কিন্তু অন্য কোনো সংবাদ প্রতিষ্ঠান একজন রবীশ তৈরি করতে পারেনি। কারণ একজন হিন্দি ভাষার সাংবাদিককে অতখানি জায়গা এবং কাজের স্বাধীনতাই কেউ দেয়নি।

এ কথার মাহাত্ম্য বোঝানো শক্ত। কারণ আমরা বাঙালি অ্যাংলোফাইলরা বুঝে উঠতে পারি না আঞ্চলিক ভাষার সাংবাদিকতার গুরুত্ব কতখানি। স্বাধীনতার পর ৭৫ বছর কেটে গেল, অথচ আজও ভারতে প্রগতিশীলতার ভাষা ইংরেজি। আমরা দ্য ওয়্যার, নিউজলন্ড্রি, ক্যারাভ্যান, অল্টনিউজ, বুম লাইভ ইত্যাদি ইংরেজি ভাষার বিকল্প সংবাদমাধ্যম পড়ি/দেখি বলে হোয়াটস্যাপ ইউনিভার্সিটির বাইরের সত্য জানতে পারি। কিন্তু এ দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ ইংরেজি পড়তে পারেন না, বলতে পারেন না, শুনে বুঝতেও পারেন না। তাঁদের কাছে উদারনৈতিক মতবাদ, ভুয়ো খবর পেরিয়ে সত্য পৌঁছে দেওয়ার দায় আমরা নিই না। আমরা কেবল তাঁদের নিয়ে ব্যঙ্গ করেই খালাস। যে কারণে বাংলায় বিকল্প সংবাদমাধ্যম তৈরি করার তেমন প্রয়াস নেই। বাংলার টিভি চ্যানেলগুলোও দুর্গাপুজোয় অ্যাঙ্করদের শাড়ি পরিয়ে, তৃণমূল-বিজেপি তরজা দেখিয়ে, শোভন-বৈশাখী কেচ্ছা দেখিয়ে চালিয়ে যাচ্ছে। যে দক্ষিণপন্থীদের আমরা ঘোর অপছন্দ করি, তারা কিন্তু আঞ্চলিক ভাষার গুরুত্ব বোঝে। তাই রিপাবলিক হিন্দি খুলে গেছে, রিপাবলিক বাংলাও চলে এসেছে। এই আবহে রবীশকে রায় দম্পতি যে স্থান দিয়েছিলেন তার গুরুত্ব অপরিসীম। আমাদের সময়ের কোনো বাঙালি সম্পাদক বাংলায় সাংবাদিকতা করে বিশ্বমানের পুরস্কার পেতে পারবেন? পুরস্কার পাওয়া অবশ্য সবচেয়ে বড় কথা নয়। কিন্তু কলকাতার যে সম্পাদকদের ইদানীং আমরা প্রবাদপ্রতিম বলে মনে করি, রবীশের মত জনগণের দুঃখ দুর্দশা সাংবাদিকতায় নিয়ে আসার ব্যাপারেও তো তাঁদের অবদান শূন্য। ফলে রবীশের মত বিস্তীর্ণ এলাকার বিপুল সংখ্যক মানুষের উপর ইতিবাচক তো নয়ই, নেতিবাচক প্রভাব ফেলার ক্ষমতাও তাঁদের নেই। এঁদের প্রভাব হাওড়া ব্রিজ পেরোলেই শেষ বললে ভুল হয় না।

তার উপর আছে ম্যানেজারি করে সম্পাদক হওয়ার ভান। যে কারণে দেবেশ রায় অশোক দাশগুপ্তের কলামের সংকলনের আলোচনা করতে গিয়ে লিখেছিলেন “এক সময় বাংলা খবরের কাগজে সম্পাদকের সক্রিয় সাংবাদিক হওয়ার বাধ্যতা ছিল। তাঁদের লিখতে হত – চাকরির কারণে নয়, নিজেদের মত দশজনকে জানানোর দরকারে ও দশজনের মত তৈরি করে তোলার দায় স্বীকার করে। রামানন্দ চট্টোপাধ্যায় থেকে সত্যেন্দ্রনাথ মজুমদার বাংলা সাংবাদিকতার সেই ইতিহাস তৈরি করেছেন। বিবেকানন্দ মুখোপাধ্যায় শেষ সম্পাদক যিনি নিজে লিখতেন। যদিও তাঁর লেখা তাঁর নামে বেরোত না, তবু পাঠক এমনই চিনত তাঁর লেখা যে সম্পাদকীয়র নৈর্ব্যক্তিকে তিনি হারিয়ে যেতেন না। তারপর বাংলা কাগজে সম্পাদকের লেখালেখি উঠে গেছে।” বাংলার টিভি চ্যানেলের সম্পাদকরা আরও কম সাংবাদিক। তাঁরা সুটেড বুটেড হয়ে সান্ধ্য বিতর্ক পরিচালনা করা আর বিশিষ্টদের সাক্ষাৎকার নেওয়া ছাড়া আর কিছুই করেন না। রবীশের মত আবর্জনার মধ্যে দাঁড়িয়ে “প্লিজ টেল মনমোহন সিং টু ওয়াচ রবীশ কি রিপোর্ট। ইংলিশ মে ওয়সে ভি ইন্ডিয়া ডেভেলপড লগতা হ্যায়” বলা এঁদের কল্পনাতীত। এই রবীশ টিভি মিডিয়ার বাইরে চলে গেলেন। এতে সত্যিই হয়ত তাঁর ক্ষতি নেই, কিন্তু টিভির দর্শকদের ক্ষতি। টিভির মাধ্যমে তিনি যত হিন্দিভাষী দর্শকের কাছে পৌঁছতে পারতেন, যত ইংরেজি না জানা মানুষকে বিষাক্ত দক্ষিণপন্থার উল্টো ছবি দেখাতে পারতেন, ইউটিউব চ্যানেল দিয়ে পারবেন কিনা তা নিয়ে সন্দেহের অবকাশ আছে। কারণ ভারতে মোবাইল ডেটার দাম আবার বাড়তে শুরু করেছে।

শেষ প্রশ্নে আসব, অর্থাৎ এসব নিয়ে নাগরিক ডট নেট কেন ভাবছে? তার আগে সংক্ষেপে কংগ্রেসি বন্ধুদের এনডিটিভির প্রতি রাগ নিয়ে দু-চার কথা বলে নিই। এনডিটিভি যে উদারনীতির অনুশীলন করেছে সেই ‘দ্য ওয়ার্ল্ড দিস উইক’-এর সময় থেকে, তা কিন্তু আসলে নেহরুসুলভ উদারনীতি। জওহরলাল নেহরু যে গণতান্ত্রিক উদারতার ধারণায় বিশ্বাসী হয়ে বিদ্যায়তনিক ইতিহাস চর্চায় বামপন্থীদের জায়গা দিয়েছিলেন, ললিতকলা আকাদেমি বা সাহিত্য আকাদেমি নির্মাণ করেছিলেন – সেই উদারতা। ন্যাশনাল ফিল্ম অ্যান্ড টেলিভিশন ইনস্টিটিউটে ঋত্বিক ঘটকের মত ঘোর বামপন্থী, যাঁকে কমিউনিস্ট পার্টি নিজেই হজম করতে পারেনি, তিনি পড়ানোর সুযোগ পেয়েছিলেন যে উদারনৈতিক ধারাবাহিকতায়, এনডিটিভি বস্তুত তারই অনুশীলন করেছে। ফলে তা মনমোহনী অর্থনীতির পক্ষ নেয়, আবার গান্ধী পরিবারের সমালোচনাও করে। এই জাতীয় উদারবাদীদের সঙ্ঘ পরিবারের কাছে কোনো প্রত্যাশা নেই, যত প্রত্যাশা কংগ্রেসের কাছে। স্বভাবতই কংগ্রেসের সভাপতি নির্বাচন যখন দেশের অধিকাংশ মানুষের কাছে কোনো আগ্রহের বিষয়ই নয়, তখন এনডিটিভি ঘন্টার পর ঘন্টা শশী থারুর আর মল্লিকার্জুন খড়গের সাক্ষাৎকার দেখিয়ে গেছে। মোদী সারাক্ষণের রাজনীতিবিদ, রাহুলের কেন মাঝে মাঝেই ছুটির দরকার হয় – এ কথাও এনডিটিভির মঞ্চ থেকে বহুবার উঠেছে সম্ভবত এই কারণেই। কংগ্রেস এইসব সমালোচনা খোলা মনে নিতে পারলে তাদেরই লাভ হত। সমর্থকরা না নিলেও, রাহুল স্বয়ং বোধহয় নিয়েছেন। ভারত জোড়ো যাত্রা দেখে অন্তত সেরকমই মনে হয়।

দীর্ঘ লেখা এবার শেষ করব কেন এত দীর্ঘ লেখা, কেন আদৌ এ লেখা – সে প্রশ্নের উত্তর দিয়ে।

এ দেশের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সবকটাকে পরিকল্পিতভাবে ধ্বংস করা চলছে। শুধু ধর্মীয় ফ্যাসিবাদী এজেন্ডা তার কারণ নয়। একুশ শতকের পুঁজিবাদ কোনো প্রতিষ্ঠান পছন্দ করে না। সবকিছুকেই কোম্পানি করে তোলাই তার উদ্দেশ্য। কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় হবে কেন্দ্রীয়ভাবে শীতাতপনিয়ন্ত্রিত বিলাসবহুল কোম্পানি – লেখাপড়া হোক আর না-ই হোক। সেটা লাভজনক থাকলে চালানো হবে, নয়ত বন্ধ করে দিতে হবে। কারণ শিক্ষা পণ্য। খবর এবং/অথবা তথ্য তো পণ্য বটেই। ফলে সংবাদমাধ্যমকেও প্রতিষ্ঠান থাকতে দেওয়া চলে না, তাকেও হতে হবে কোম্পানি। লাভজনক হলে চলবে, নইলে বন্ধ করে দেওয়া হবে। প্রতিষ্ঠানবিরোধী হওয়া ভাল, যদি প্রতিস্পর্ধী প্রতিষ্ঠান তৈরি করার দম থাকে। সেসব যখন আমাদের নেই, তখন আজকের পরিস্থিতিতে প্রতিষ্ঠান ভেঙে পড়া উদযাপন করা মূর্খামি। এতে গণতন্ত্রের পরিসরই যে সংকুচিত হচ্ছে সেকথা বুঝতে অসুবিধা হওয়ার কথা নয়।

অনেকেই দেখছি বিকল্প সংবাদমাধ্যমের উপর যাবতীয় দায়িত্ব চাপিয়ে দিয়ে নিশ্চিন্ত হচ্ছেন। নাগরিক ডট নেটের সদস্য হিসাবে তা দেখে মন্দ লাগে না। কিন্তু মনে রাখা ভাল, ‘বিকল্প’ কথাটা অতি গুরুত্বপূর্ণ। বিকল্পের ক্ষমতা সীমিত। যাঁরা পড়বেন তাঁরাই টাকা দেবেন, বিজ্ঞাপনের পরোয়া করতে হবে না – এই বিকল্প তৈরি হয়েছে বরখা কথিত অচল রেভিনিউ মডেলের বিকল্প খুঁজতে গিয়ে। ইংরেজিতে এই মডেল (পোশাকি নাম ক্রাউড-ফান্ডেড মিডিয়া) অনেক ক্ষেত্রেই বেশ সফল, বাংলাতেও এই মডেল নিয়ে পরীক্ষা নিরীক্ষা হবে নির্ঘাত। নাগরিক ডট নেট তো করবেই, আরও অনেকে করলে ভাল। কিন্তু এই মডেলের একটা সীমাবদ্ধতা আছে। বিজ্ঞাপন মডেলের মতই এই ব্যবস্থাতেও যিনি টাকা দেবেন নির্ঘাত তাঁর নিয়ন্ত্রণ থাকবে কনটেন্টের উপর। এক্ষেত্রে যেহেতু টাকা দিচ্ছেন অনেকে, সেহেতু একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ চলবে না বলে কনটেন্টে ভারসাম্য বজায় থাকার সম্ভাবনা অনেক বেশি অবশ্য। কিন্তু যিনি একেবারেই টাকা দিতে পারবেন না, তাঁর কথা কতটা উঠে আসবে? বাজারের যে সবজি বিক্রেতা পাঁচ টাকা দিয়ে দোকানে একটা কাগজ রাখেন বা যে রিকশাচালক বাড়ির টিভিতে দিনে অন্তত একবার খবর দেখেন, তিনি কি মোবাইলে নাগরিক ডট নেট পড়বেন টাকা দিয়ে? যদি না পড়েন, নাগরিক ডট নেট কি তাঁর সুখ দুঃখ তুলে আনার পরিশ্রম করতে পারবে? শ্রমের তো মূল্য আছে। অন্তত থাকা উচিত।

এছাড়াও আছে ঝুঁকির প্রশ্ন। ভারতের সব রাজ্যেই সাংবাদিক ও তাঁর পরিবার পরিজনদের উপর আক্রমণ ক্রমশ বাড়ছে, যে কোনো সমীক্ষায় উঠে আসছে সেই তথ্য। এনডিটিভির মত মূলধারার সংবাদমাধ্যমের সাংবাদিক তবু বিপদে পড়লে সংগঠনের আইনি ও সাংগঠনিক সাহায্য পান। নাগরিক ডট নেটের কেউ বিপদে পড়লে কার সাহায্য পাবে?

বিকল্প সংবাদমাধ্যম বা স্বাধীন সংবাদমাধ্যমগুলোর মধ্যে ইতিমধ্যেই বেশ প্রতিষ্ঠিত যারা, সেই নিউজক্লিকের দপ্তরেও কারণে অকারণে সরকারি সংস্থার রেড হয়ে থাকে। মামলা ঠুকে হয়রানি চলে নিয়মিত। এই ধরনের মিডিয়ার মধ্যে সম্ভবত সবচেয়ে জনপ্রিয় দ্য ওয়্যার। তারা কিছুদিন আগে এক কেলেঙ্কারি করে বসেছিল। বিরাট খবর করছে মনে করে বিজেপির আই টি সেলের কর্তা অমিত মালব্য এবং ফেসবুককে জড়িয়ে সম্পূর্ণ ভুল খবর পরিবেশন করেছিল। সেই খবর পরে প্রত্যাহার করতে বাধ্য হয়। ন্যক্কারজনক ঘটনা, কিন্তু সাংবাদিকতার ইতিহাসে অভূতপূর্ব নয়। যে কোনো কাজ করতে গেলেই ভুল হয়, খবর করতে গেলেও। কিন্তু সরকারবিরোধী সংবাদমাধ্যম হওয়া এখন এ দেশে বিরাট অপরাধ। তাদের ভুল অমার্জনীয়। তাই কেবল দপ্তরে নয়, দ্য ওয়্যারের প্রধান সিদ্ধার্থ বরদারাজনের বাড়িতেও পুলিস হানা দিয়ে তাঁর ল্যাপটপ, ফোন ইত্যাদি বাজেয়াপ্ত করে। সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ছাড়াই। এনডিটিভি গেল তো কী হল, বিকল্প সংবাদমাধ্যম দিয়েই কাজ চলে যাবে এই স্বপ্নে যাঁরা বুঁদ হয়ে আছেন তাঁরা এগুলো খেয়াল রাখবেন দয়া করে। এখানেই শেষ নয়। তথ্যপ্রযুক্তি আইন সংশোধন করে অনলাইন কনটেন্টের উপর সরকারি নিয়ন্ত্রণের রাস্তাও পরিষ্কার করা হয়েছে।

ফলে নাগরিক ডট নেটের মত ওয়েবসাইটও খুব নিরাপদ নয়। অতএব স্বাধীন তথা বিকল্প সংবাদমাধ্যমের উপর ভরসা রাখুন, পাশে থাকুন। পকেটের পয়সা দিয়ে এবং আরও যে যে উপায়ে পারেন। কিন্তু পা মাটিতে রাখুন। কোনো মূলধারার সংবাদ প্রতিষ্ঠানের পৃথিবীর সবচেয়ে ধনী ব্যক্তিদের একজনের হাতে চলে যাওয়ার ঘটনা উড়িয়ে দেওয়ার নয়, উল্লাস করার তো নয়ই।

নাগরিক ডট নেটে প্রকাশিত