তথাগত রায়, তরুণজ্যোতি তিওয়ারি প্রমুখের সোশাল মিডিয়া হ্যান্ডেলে যেসব কথোপকথন চলে সেগুলোতে চোখ রাখুন। তাঁরা কিন্তু সজলবাবুর মতো আবেগপ্রবণ হয়ে বাংলাদেশ আক্রমণ করার কথা-টথা বলেন না। বরং বিপন্ন হিন্দুদের এ-দেশে জায়গা দেওয়ার কথা উঠলেই তাঁরা এবং তাঁদের সাঙ্গপাঙ্গরা বলতে শুরু করেন— ভারতবর্ষ ধর্মশালা নয়।
একটা দেশের সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সরকারের দায়িত্ব।
এই কথাটা বলামাত্র সেই ২০১২-১৩ সাল থেকে যেসব আত্মীয়-বন্ধু-সহপাঠী-সহকর্মী রেগে-আগুন তেলেবেগুন হয়েছেন, সম্পর্ক তুলে দিয়েছেন (বা আমিই তুলে দিয়ে বেঁচেছি), হঠাৎ সেদিন আবিষ্কার করলাম তাঁরা সকলে ঠিক ওই কথাটাই বলছেন। দেখে অ্যাইসা ফুর্তি হল যে লতা মঙ্গেশকরের মতো মিহি গলায় শতবর্ষে পা দেওয়া সলিল চৌধুরী রচিত ও সুরারোপিত ‘হঠাৎ ভীষণ ভাল লাগছে’ গানটা গাইতে শুরু করলাম। কিন্তু কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে নিজের কানই জানিয়ে দিল যে আমার গলার সঙ্গে লতার গলার তফাত বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে মহাত্মা গান্ধির মতো। ফলে চুপ করে গেলাম। ফুর্তিটাকেও কান ধরে টেনে নামিয়ে আনন্দের বেঞ্চে বসিয়ে দিলাম। একটু আনন্দ তো করাই উচিত। কারণ কবি বলেছেন— কেবল রাত্রির অবসান হলে প্রভাত হয় না। চিত্ত জাগলেও প্রভাত হয়। তা চারপাশে এত মানুষের চিত্ত জেগেছে মানে প্রভাত হয়েছে, অচিরেই প্রভাতফেরি বেরোবে, তার আওয়াজের ঠ্যালাতেই বাকি অন্ধকার দূরীভূত হবে— এরকম ভাবছিলাম আর কি। কিন্তু সে আনন্দও দিন দুয়েকের বেশি টেকানো গেল না। কেন? সে-কথাই বলব।
গোঁফ গজানোর বয়সে আমরা মাধুরী দীক্ষিত বলতে পাগল ছিলাম। যেহেতু বলিউডের হাত অনেক লম্বা, সেহেতু কেবল ভারতে নয়, গোটা উপমহাদেশেই তখন মাধুরী অধরা বলে নানা বয়সের পুরুষদের হৃদয় দাউদাউ করে জ্বলে। এতটাই, যে কাগজে পড়েছিলাম, পাকিস্তানিরা নাকি সকৌতুকে বলত ‘তোমরা মাধুরী আর শচীন তেন্ডুলকরকে দিয়ে দাও, আমরা কাশ্মিরের দাবি ছেড়ে দেব।’ তা সেই মাধুরী নেপালে এক অনুষ্ঠানে গিয়ে একখানা কেলেঙ্কারি করে বসেছিলেন। আদর-আপ্যায়নে আহ্লাদিত হয়ে বলে বসেছিলেন— নেপাল তো ভারতেই ছিল… ইত্যাদি। সে অবশ্য ১৯৯৮-৯৯ সালের কথা। তখন ভারত সরকারের সঙ্গে নেপাল সরকারের সম্পর্ক মন্দ ছিল না, ফলে নায়িকা ক্ষমা-টমা চাওয়াতেই ব্যাপারটা মিটে গিয়েছিল। মুশকিল হল, বাংলাদেশের ব্যাপারে পশ্চিমবঙ্গীয় বাঙালিরা অনেকে এখনও মাধুরী হয়ে আছেন। ১৯৪৭ সালে দেশভাগ তথা বাংলা ভাগ হয়েছে। পরে ১৯৭১ সালে পূর্ব পাকিস্তান মুক্তিযুদ্ধের মধ্যে দিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশ হয়ে গেছে। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের অনেকেই এখনও ওটাকে আলাদা দেশ বলে মেনে নিতে পারেন না। আরও সমস্যার কথা হল, যেহেতু বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পাশে দাঁড়িয়ে ভারত পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছিল, তাই আমাদের অনেকেরই ধারণা— বাংলাদেশের যে-কোনও ব্যাপারে ভারতের ছড়ি ঘোরানোর অধিকার আছে। দুটো দেশের সরকার এবং মানুষের মধ্যে আন্তর্জাতিক রীতিনীতি অনুসারে যেমন সম্পর্ক কাঙ্ক্ষিত, তার বদলে বাংলাদেশের সঙ্গে বড়দাসুলভ ব্যবহার করা উচিত— এমনটাই মনে করেন আমাদের ভাই-বেরাদররা অনেকে। ফলে যে যে-দলেরই সমর্থক হোন, বাংলাদেশে কোনও গোলমাল শুরু হলেই একযোগে আশ্চর্য সব দাবি করতে শুরু করেন এঁরা। যেমন এই মুহূর্তে কলকাতা কর্পোরেশনের বিজেপি কাউন্সিলর সজল ঘোষের মতো অনেক সিপিএম সমর্থককেও ভারতীয় সেনাবাহিনিকে দিয়ে বাংলাদেশ আক্রমণের দাবি তুলতে দেখা যাচ্ছে।
এমনিতে সজলবাবুকে যত গুরুত্ব পশ্চিমবঙ্গের সংবাদমাধ্যম দেয় তত গুরুত্ব তাঁর নিজের দলের নেতা অমিত শাহও দেন না। দিলে সজলবাবুর আপ্রাণ চেষ্টা সত্ত্বেও কলকাতায় এসে আরজিকর-কাণ্ডে মৃতার বাবা-মায়ের সঙ্গে দেখা না করেই চলে যেতেন না। সুতরাং সজলবাবুর ওই চ্যানেল গরম করা মন্তব্যে যে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শাহ, বিদেশমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর, প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং বা প্রধানমন্ত্রী মোদি কানই দেবেন না তা বলাই বাহুল্য। কিন্তু দলমতনির্বিশেষে বাঙালিরা যে এই দাবিকে ন্যায্য বলে মনে করছেন— তা যথেষ্ট উদ্বেগজনক। একে তো অন্য একটা দেশ সম্পর্কে এত প্রবল অধিকারবোধ মনের মধ্যে পুষে রেখেছে কয়েক লক্ষ লোক— এই ব্যাপারটাই ভয়ঙ্কর। তার উপর দেখা যাচ্ছে বাম দলগুলোর সমর্থকরাও দাবি করছেন— এখানকার বামপন্থীদের বাংলাদেশের হিন্দুদের জন্যে পথে নামতে হবে, তৃণমূল সমর্থকরা দাবি করছেন তাঁদের দলকেও পথে নামতে হবে। অবশ্য বামেরা যেহেতু ক্ষমতায় নেই, সেহেতু তাঁরা যেমন প্যালেস্তাইনের মানুষের উপর ইজরায়েলি গণহত্যার বিরুদ্ধে মিছিল করেন তেমন বাংলাদেশে হিন্দুদের উপর আক্রমণের বিরুদ্ধেও মিছিল করা যেতে পারে (যদিও এখন পর্যন্ত প্যালেস্তাইনে ইজরায়েল যা চালাচ্ছে তার সঙ্গে বাংলাদেশের পরিস্থিতির পরিমাণগত বা গুণগত কোনও মিল নেই), তবে দুই মিছিলেরই গুরুত্ব প্রতীকী। কিন্তু বাংলাদেশের ঘটনা নিয়ে পশ্চিমবঙ্গের শাসক দলকে পথে নামতে হবে— এ আবার কী আবদার? যে-কোনও দলের সরকারকেই ভারতের সংবিধান মেনে চলতে হয় আর সংবিধান অনুসারে বিদেশনীতি কেন্দ্রীয় সরকারের কাজের তালিকাভুক্ত। নেহাত বাংলাদেশ প্রায় এক শতাব্দী আগে একই প্রদেশ ছিল এবং দুই জায়গার ভাষা অভিন্ন, দুইপারে রক্তের সম্পর্কে জড়িয়ে থাকা বহু পরিবার রয়েছে, তাই পশ্চিমবঙ্গ সরকার সম্পূর্ণ উদাসীন থাকতে পারে না। সেই কারণে মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি একখানা বিবৃতি দিয়েছেন। কিন্তু তিনি পথে নামতে যাবেন কেন? সত্যিই তো এ-ব্যাপারে কেন্দ্রীয় সরকার যা সিদ্ধান্ত নেবে তা মেনে নিতে তিনি বাধ্য। অথচ এই দাবি কেবল আইনকানুনের ধারণাবিহীন সাধারণ মানুষ সোশাল মিডিয়ায় তুলছেন তা নয়। এবিপি আনন্দের মতো জনপ্রিয় চ্যানেলে বসে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক বিশ্বনাথ চক্রবর্তীও এই কিম্ভূত দাবি তুলে ফেলেছেন।
নিজের এক্তিয়ারের বাইরে গিয়ে কেন এমন কাজ করতে হবে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রীকে? রাজনৈতিক বিশ্লেষক বিশ্বনাথবাবুর দর্শানো কারণটি চিত্তাকর্ষক। এতে নাকি মহম্মদ ইউনুসের সরকারের উপরে চাপ তৈরি হবে এবং বাংলাদেশের ধর্মনিরপেক্ষ মানুষজন বুকে বল পাবেন। বাংলাদেশ যত ছোট রাষ্ট্রই হোক, পশ্চিমবঙ্গের মতো একটা অঙ্গরাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী নিজের রাজ্যে বাংলাদেশের বিষয় নিয়ে মিছিল করেছেন বলে চাপে পড়বে কেন? বিশেষত ভারত সমেত পৃথিবীর কোনও বড় রাষ্ট্রই যখন এই তদারকি সরকারকে স্বীকৃতি না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়নি? আর বাংলাদেশের ধর্মনিরপেক্ষ মানুষজনই বা মমতার মিছিলে আলাদা করে সাহস কেন পাবেন? ইসলামিক মৌলবাদীরা তাঁদের আক্রমণ করলে কি মমতার পুলিশ বা অনুব্রত মণ্ডলের ঢাক তাঁদের বাঁচাতে যাবে? নাকি কেন্দ্রীয় সরকারকে না জানিয়ে, মমতা নিজের সিদ্ধান্তে তাঁদের কাউকে পশ্চিমবঙ্গে আশ্রয় দিতে পারবেন?
কিমাশ্চর্যম অতঃপরম! মমতা এই হাস্যকর দাবি মেনে নিয়ে পথে নামলেন না বটে, আরও এককাঠি সরেস কাজ করলেন। দাবি করে বসলেন যে সম্মিলিত জাতিপুঞ্জকে বাংলাদেশে শান্তিরক্ষা বাহিনি পাঠাতে হবে। তাঁর সঙ্গে প্রায় হুবহু মিলে গেল পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার বিরোধী দলনেতা এবং মমতার একদা-স্নেহভাজন শুভেন্দু অধিকারীর বয়ান ‘রাষ্ট্রপুঞ্জের কাছে আবেদন করছি, বাংলাদেশে হিন্দুদের অস্তিত্ব বাঁচানোর জন্য হস্তক্ষেপ করুক’।
বাংলাদেশে গত কয়েকদিনের নতুন অশান্তিতে ঠিক কত মানুষ নিহত, কটা পরিবার বাস্তুহারা, কোনও নারীনির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে কিনা— এসবের কোনও সুনির্দিষ্ট তথ্য কিন্তু ভারতের সংবাদমাধ্যম আমাদের জানাতে পারেনি। সজলবাবু, বিশ্বনাথবাবু, শুভেন্দুবাবু বা আমাদের মুখ্যমন্ত্রীও জানাননি। অথচ ক্রমাগত এরকম আক্রমণাত্মক মন্তব্য বেড়েই চলেছে। এসবের একটাই ফল— বাংলাদেশ নিয়ে পশ্চিমবঙ্গে উত্তেজনা বৃদ্ধি এবং তার ফলে সাম্প্রদায়িক উন্মাদনা তৈরি হওয়া। যেহেতু বাংলাদেশে শেখ হাসিনার অপসারণের পর থেকেই হিন্দুরা আক্রান্ত হচ্ছেন বলে খবরে প্রকাশ, তাই পশ্চিমবঙ্গের হিন্দু বাঙালি এখন বাংলাদেশ বলতেই মুসলমান ভাবছেন। জুলাই অভ্যুত্থানের সময় থেকেই দেখা যাচ্ছিল, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের মতোই এবারেও যে লড়াইয়ে লিপ্ত শক্তিগুলো সমসত্ত্ব নয় তা মেনে নিতে পশ্চিমবঙ্গের ভদ্রলোকদের ঘোর আপত্তি। ছাত্রনেতাদের মধ্যে হিন্দু নামগুলোর উপস্থিতিকে তাঁরা অগ্রাহ্য করে যাচ্ছেন, তাতে ধুয়ো দিয়ে যাচ্ছে পশ্চিমবঙ্গ তথা ভারতের মূলধারার সংবাদমাধ্যম। যখন বাংলাদেশের রাস্তায় সোজা বুকে গুলি চালিয়ে মানুষ মারছিল হাসিনার পুলিশ, তখনও হাসিনা না থাকলে বাংলাদেশের কী হবে তার আলোচনায় পশ্চিমবঙ্গের সংবাদমাধ্যম ব্যবহার করে যাচ্ছিল— ‘বাংলাদেশ আফগানিস্তান হওয়ার দিকে এগোচ্ছে’, ‘বাংলাদেশে তালিবানি শাসন প্রতিষ্ঠা হতে চলেছে’ ইত্যাদি শব্দবন্ধ।
পৃথিবীর ইতিহাসে বিদ্রোহ, তারপর নৈরাজ্য এবং অত্যাচারী শাসনের অজস্র উদাহরণ আছে। যেমন বলা যেতেই পারত বাংলাদেশ রোবসপিয়রের গিলোটিনের ফ্রান্স হওয়ার দিকে এগোচ্ছে। তুলনায় সাম্প্রতিক উদাহরণ দিতে চাইলে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাওয়ার পরে পূর্ব ইউরোপের দেশগুলোর কথা বলা যেত। আরও সাম্প্রতিক উদাহরণ দেওয়ার ইচ্ছে থাকলে গৃহযুদ্ধোত্তর সিরিয়া হওয়ার দিকে এগোচ্ছে বললেও চলত। তেমন কিছু না বলে আফগানিস্তান এবং তালিবানের কথা বলার উদ্দেশ্য পরিষ্কার— মাথায় ফেজ পরা, গালে লম্বা দাড়িওয়ালা মুসলমানের ছবি তুলে ধরে আতঙ্ক ছড়ানো, যার সঙ্গে অপরিহার্যভাবে এসে পড়বে বোরখা পরা মহিলাদের ছবি। হিন্দুত্ববাদীরা মুসলমানের ঠিক যে স্টিরিওটাইপ হিন্দুদের গেলাতে চায়। অথচ তদারকি সরকারের প্রধান মহম্মদ ইউনুস কিন্তু কামানো গালের, মাথায় ফেজ না-পরা পুরুষ। তাঁর সরকারের গুরুত্বপূর্ণ সদস্যদের একজন হলেন সাঈদা রিজওয়ানা হাসান, যিনি ২৯ নভেম্বর সাংবাদিক সম্মেলনে জানিয়েছেন যে গ্রেফতার হওয়া সন্ন্যাসী চিন্ময়কৃষ্ণ দাসের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের তদন্ত হবে, কিন্তু তার জন্যে ইস্কনকে বাংলাদেশে নিষিদ্ধ করার কোনও ভাবনা তদারকি সরকারের নেই। রিজওয়ানা বোরখা পরেন না, এমনকি হিজাবও নয়।
নিয়মিত নির্বাচন হচ্ছে মানেই যে একটা দেশ গণতান্ত্রিক পথে আছে তা নয়— এ-কথা বুঝতে আজকের ভারতীয়দের অন্তত কোনও অসুবিধা হওয়ার কথা নয়। দেশদ্রোহবিরোধী আইনের দোহাই দিয়ে উমর খালিদ, শার্জিল ইমাম-সহ আরও বহু মানুষকে বিনা বিচারে বন্দি করে রাখার কাজ এ-দেশের ভোটে জিতে আসা সরকারই করে চলেছে দশ বছর ধরে। রাস্তায় নেমে প্রতিবাদ করলে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ঘরবাড়ি, দোকানপাট বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়ার কাজও করছে বিভিন্ন রাজ্যের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় নির্বাচিত সরকারগুলোই। কোনও আইনকানুনের তোয়াক্কা না করে, এমনকি সুপ্রিম কোর্টের নিষেধকেও বুড়ো আঙুল দেখিয়ে জঘন্য পলাতক অপরাধীদের মতো করে প্রতিবাদীদের ছবি দেওয়ালে দেওয়ালে সেঁটে দেওয়ার কাজ করছে ভোটে জিতে ক্ষমতায় আসা উত্তরপ্রদেশের আদিত্যনাথ সরকার। গত দশ বছরে কতজন সংখ্যালঘুকে গোমাংস খাওয়ার, বিক্রি করার বা স্রেফ বহন করার ‘অপরাধে’ মেরে ফেলা হয়েছে এবং রাষ্ট্র হত্যাকারীদের শাস্তি দেওয়ার বদলে মদত দিয়েছে, তার তালিকা চিনের প্রাচীরের মতো লম্বা হবে। কদিন হল মুসলমানদের উত্যক্ত করার নতুন কায়দা চালু হয়েছে। যে-কোনও মসজিদের নিচেই মন্দির ছিল কিনা মাটি খুঁড়ে দেখার দাবিতে আদালতে মামলা ঠুকে দিচ্ছে হিন্দুত্ববাদীরা, আর আদালত পত্রপাঠ খোঁড়ার নির্দেশও দিয়ে দিচ্ছে। অথচ দেশে স্পষ্ট আইন আছে— ১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট দেশের যেখানে যে ধর্মস্থান ছিল সেগুলোর চরিত্র পরিবর্তন করা যাবে না। সে আইনের তোয়াক্কা করছে না এমনকি নিম্ন আদালতগুলোও। এই বেমক্কা রায়ের জেরে হিংসা ছড়িয়ে উত্তরপ্রদেশের সম্ভলে ইতিমধ্যেই কিছু মানুষের প্রাণ গেছে। এখন এমনকি প্রাচীন আজমের শরীফ নিয়েও তেমন একটা মামলা ঠোকা হয়েছে। এমন রায় দেওয়ার পথ কিন্তু খুলে দিয়ে গেছেন সুপ্রিম কোর্টের প্রাক্তন প্রধান বিচারপতি ডিওয়াই চন্দ্রচূড়, জ্ঞানবাপী মসজিদে মাটি খুঁড়ে সার্ভে করার অনুমতি দিয়ে। কিন্তু এতে কি প্রমাণ হয় যে ভারতের অধিকাংশ মানুষ, এমনকি অধিকাংশ হিন্দু ভারতীয়, সাম্প্রদায়িক? একেবারেই না।
হাসিনার আমলেও বাংলাদেশে হিন্দু হত্যা ঘটেছে। আর সব ভুলে গিয়ে থাকলেও ব্লগার অভিজিৎ রায়ের খুনের কথা আশা করি এপারের হিন্দু বা মুসলমান কোনও বাঙালিই ভোলেননি। সেইসময় হিন্দুদের পুজোআচ্চায় আক্রমণ হয়েছে, সম্পত্তি দখল করে নেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। সুতরাং ভোট হত আর হাসিনা জিততেন মানেই বাংলাদেশ দারুণ গণতান্ত্রিক ছিল— এ-কথা বলার কোনও মানে নেই। আবার সেই আমলে বা এই আমলে বাংলাদেশে হিন্দুদের উপর আক্রমণও প্রমাণ করে না যে অধিকাংশ বাংলাদেশি, এমনকি অধিকাংশ মুসলমান বাংলাদেশি, সাম্প্রদায়িক।
কিন্তু সোশাল মিডিয়া আর ভারতের মিডিয়ার কল্যাণে ঠিক উল্টো ছবিটাই গাঢ় রঙে আঁকা হয়ে গেছে পশ্চিমবঙ্গের সংখ্যাগুরু সম্প্রদায়ের বাঙালির মনে। তাই ‘একটা দেশের সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সরকারের দায়িত্ব’— এই কথাটা তাঁরা আজ যখন বলছেন, তখন বলছেন বাংলাদেশের দিকে মুখ করে। নিজের দেশের দিকে না-তাকিয়ে। তাই আমার আনন্দ টিকল না। দেখলাম বিজেপি সমর্থকরা তো বটেই, সিপিএম সমর্থকরাও গোটা উপমহাদেশে সংখ্যাগুরুবাদের প্রসারের নিন্দা করে পার্টির রাজ্য সম্পাদক মহম্মদ সেলিমের বিবৃতিতে অসন্তুষ্টি প্রকাশ করছেন। বলছেন, এসব চালাকি। বাংলাদেশের ঘটনার নিন্দা করতে গেলেই সঙ্গে এ-দেশের সংখ্যালঘুদের উপর যে আক্রমণ হচ্ছে তার কথা কেন বলতে হবে? গোদা বাংলায় তাঁদের মত হল— বাংলাদেশের সংখ্যালঘু হিন্দুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সে-দেশের সরকারের দায়িত্ব, কিন্তু এ-দেশের সংখ্যালঘু মুসলমানদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এ-দেশের সরকারের দায়িত্ব নয়।
এই তো সেদিন এ-রাজ্যের মহিলারা রাত দখল করলেন, ধর্ষকের মৃত্যুদণ্ডের দাবিতে রাস্তায় নামলেন মহিলা মুখ্যমন্ত্রীও, পরে নতুন আইনও পাশ করালেন বিধানসভায়। আন্দোলনকারীদের অনেকেরই বক্তব্য ছিল আরজিকর-কাণ্ডে দোষী একজন নয়, অনেকে। তাদের সকলের শাস্তি চাই। তা নিয়েও টানা আন্দোলন হল। অথচ আজ চিন্ময়কৃষ্ণের বিরুদ্ধে যে শিশুদের যৌন নিপীড়নের অভিযোগ আছে, সে-অভিযোগে তাঁর উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে তাঁর নিজেরই সংগঠন— তা নিয়ে আলোচনা করতে দেখছি না এমনকি মহিলাদেরও। উনি অবশ্য সেই অভিযোগে গ্রেফতার হননি। কী অভিযোগে গ্রেফতার হয়েছেন? তা নিয়েও পশ্চিমবঙ্গের মিডিয়ায় বা সোশাল মিডিয়ায় বিশেষ আলোচনা নেই। অর্থাৎ হয় এখানকার মানুষ জানার প্রয়োজন বোধ করেন না, নয়তো নিঃসংশয়ে জানেন ব্যাপারটা স্রেফ রাষ্ট্রের বদমাইশি। সেটা হওয়া অবশ্যই অসম্ভব নয়। কিন্তু একইরকম অভিযোগে উমর, শার্জিলের জামিনের তো শুনানিই হয় না এ-দেশে। তা নিয়ে কারও এত মাথাব্যথা নেই তো?
সব মিলিয়ে যা বুঝলাম, ‘হঠাৎ ভীষণ ভাল লাগছে’ গানটা আমার নয়, শুভেন্দুবাবুর গাওয়া উচিত। কারণ রাজ্য বিজেপি যতই অন্তর্দ্বন্দ্বে নাজেহাল হোক, যতই লোকসভা নির্বাচনে বা উপনির্বাচনে ভোট কমুক, দেশজুড়ে মোদি-ম্যাজিক যতই ফিকে হয়ে যাক, ঘৃণার জমি এমন চমৎকার চষা হয়ে গেছে পশ্চিমবঙ্গে যে, সঙ্ঘ পরিবারের ফসল তোলা স্রেফ সময়ের অপেক্ষা। সে-ফসল ২০২৬ সালে তোলা হবে, নাকি আরও পরে— সে আলাদা কথা। নিজের মালিকানাধীন হাসপাতালে বাংলাদেশি রোগীদের চিকিৎসা বন্ধ করার ঘোষণা করে সজলবাবু আপ্রাণ চেষ্টা করছেন ২০২৬ সালেই ফসল তুলতে। অনেক ডাক্তারও সগর্বে সোশাল মিডিয়ায় ঘোষণা করছেন বাংলাদেশি রোগী দেখবেন না। বহু ঘোষিত বিজেপিবিরোধীও এই সিদ্ধান্তকে বাহবা দিচ্ছেন। কেন? না দেখা গেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভারতের পতাকার অবমাননা করা হয়েছে। ক-জন ওই কাজে লিপ্ত আর তাদের অপকর্মের দায় সমস্ত বাংলাদেশির ঘাড়ে চাপবে কেন— এই যুক্তিতর্কের পরিবেশই আর পশ্চিমবঙ্গে নেই। এ-তথ্যও প্রচারিত হচ্ছে না যে ২৮ নভেম্বরই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সংশ্লিষ্ট হলের প্রভোস্ট ‘অতীব জরুরি বিজ্ঞপ্তি’ জারি করে শিক্ষার্থীদের ওই কাজ করা থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দিয়েছেন।
যে রাজনৈতিক বিশ্লেষক বাংলাদেশের ধর্মনিরপেক্ষ মানুষকে সাহস দেওয়ার জন্যে মমতাকে মাঠে নামতে হবে বলেছেন, তিনি এই রাজ্যে এমন অমানবিক এবং ডাক্তারি নীতিবোধবিরোধী পদক্ষেপের বিরুদ্ধে মমতাকে মুখ খুলতে হবে বলে দাবি করেছেন বলে শুনিনি। রাজ্যের প্রশাসনিক প্রধান হিসাবে মমতা নিজে থেকেও বলতে পারতেন— এ-জিনিস এখানে করতে দেওয়া হবে না, করলে ওই হাসপাতালের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বলেছেন কি? তাঁর দলের নেতা ফিরহাদ হাকিম তবু বলেছেন যে এই সিদ্ধান্ত সমর্থনযোগ্য নয়। কিন্তু ফিরহাদ নিজে মুসলমান হওয়ায় যথারীতি তাঁর বক্তব্যকে বাংলাদেশের সংখ্যাগুরুর প্রতি দরদ বলে দেখা হচ্ছে। সোশাল মিডিয়ায় গালিগালাজ করা হচ্ছে।
এসব থেকে একটা জিনিস পরিষ্কার। আমাদের রাজ্যে হিন্দুত্ববাদকে আটকাতে তৃণমূল কংগ্রেসের যাবতীয় কুকর্ম সত্ত্বেও তাদের ভোট দেওয়াই যে শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষের কর্তব্য— এ-কথা যে-যুক্তিতে ২০১৯ সাল থেকে বলা হয়ে আসছে, সেই যুক্তিটাকে আর বিশ্বাস করার মানে হয় না। বিজেপি এ-রাজ্যে ক্ষমতায় আসেনি ঠিকই, কিন্তু তাতে সমাজে সঙ্ঘবাদের প্রসারে কোনও বাধা সৃষ্টি হয়নি। সঙ্ঘ একই মডেলে সর্বত্র লড়ে না। পশ্চিমবঙ্গে সম্ভবত ওড়িশা মডেল অনুসরণ করা হচ্ছে।
ওড়িশায় কংগ্রেস থেকে বেরিয়ে এসে তৈরি হওয়া বিজু জনতা দলের নেতা নবীন পট্টনায়ক কংগ্রেসকে শেষ করে বিজেপিকেই তাঁর একমাত্র বিকল্প করে তুলেছিলেন। জাতীয় রাজনীতির ইস্যুগুলোতে তিনি বিজেপিকে ঘাঁটাননি। তৃণমূল সাংসদদের মতোই নবীনের দলের সাংসদরাও বহু বিলে ভোটাভুটির সময়ে হয় ভোট দিতেন না, অথবা সরকারের পক্ষে ভোট দিতেন। ওড়িশায় বিজেপিও তাঁর দলকে হারাতে গা লাগায়নি বহুকাল, কেবল নিচুতলায় আরএসএস নিবিড় কাজ চালিয়ে গেছে। শেষমেশ ২০২৪ সালে এসে নবীনের রথ উল্টে দেওয়া হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গে কংগ্রেস তো বটেই, তার চেয়েও বড় কথা, কমিউনিস্টদের শেষ করার কাজ প্রায় শেষ করে এনেছে কংগ্রেস থেকে বেরিয়ে এসে তৈরি হওয়া তৃণমূল কংগ্রেস। নিচুতলায় আরএসএসের বাড়বাড়ন্ত ঠেকাতেও তারা কোনও ভূমিকা নিয়েছে বলে অভিযোগ নেই। এখন বাংলাদেশে হিন্দুদের উপর অত্যাচার পশ্চিমবঙ্গে আরএসএস-বিজেপির কাজ আরও সহজ করে দেবে। তারপর কবে মমতার রথ উলটানো হবে, কীভাবে হবে— সেসব সিদ্ধান্ত বোধহয় দিল্লি থেকে নেওয়া হবে।
তা শুভেন্দুবাবুরা গান-টান করুন, কেবল হিন্দুদের উদ্দেশে একটা কথা বলে যাই। বিজেপি বা সঙ্ঘ পরিবারের আসল লক্ষ্য যে পশ্চিমবঙ্গের হিন্দুদের ভোট পাওয়া, বাংলাদেশের হিন্দুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা নয়— তা বুঝতে খুব বেশি কষ্ট করার দরকার নেই। তথাগত রায়, তরুণজ্যোতি তিওয়ারি প্রমুখের সোশাল মিডিয়া হ্যান্ডেলে যেসব কথোপকথন চলে সেগুলোতে চোখ রাখলেই বোঝা যায়। তাঁরা কিন্তু সজলবাবুর মতো আবেগপ্রবণ হয়ে বাংলাদেশ আক্রমণ করার কথা-টথা বলেন না। বরং বিপন্ন হিন্দুদের এ-দেশে জায়গা দেওয়ার কথা উঠলেই তাঁরা এবং তাঁদের সাঙ্গপাঙ্গরা বলতে শুরু করেন— ভারতবর্ষ ধর্মশালা নয়। বাংলাদেশি হিন্দুদের প্রতি সত্যিই টান থাকলে এই উপমহাদেশের মুসলমান বাদে অন্য ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের নাগরিকত্ব দেওয়ার জন্য যে আইন তথাগতবাবুদের সরকার তৈরি করেছে, তাতে নির্দিষ্ট এ-দেশে আসার শেষ তারিখটা তুলে দিলেই তো হত। ৩১ ডিসেম্বর ২০১৪-র পরে বিপদে পড়া হিন্দুরা কি যথেষ্ট হিন্দু নন? আজ বাংলাদেশে যে হিন্দুরা বিপন্ন, তাঁদের জন্য তাহলে বিজেপির ভারতে কোনও জায়গা নেই? তাঁরা কেবল এ-দেশের মুসলমানদের বিরুদ্ধে ঘৃণা উৎপাদন করার খেলায় ব্যবহৃত বোড়ে?
ঋত্বিকের একটা অসমাপ্ত জাতীয় বিপ্লবের ধারণা ছিল। কোমল গান্ধার ছবিতে দেখবে অনসূয়া ভৃগুকে একটা ডায়রি দেয়। ওটা তো আসলে রূপক। তখন পি সি যোশীর আমল। ভাবা হয়েছিল যে অসমাপ্ত জাতীয় বিপ্লব সমাপ্ত করার দায়িত্ব ইতিহাস নিয়তির মত এসে কমিউনিস্ট পার্টিকে দেবে। সেই স্বপ্ন সফল হয়নি। সলিল ভেবেছিলেন তিনি প্রাচ্য আর পাশ্চাত্যের মিলন ঘটিয়ে ভারতীয় সঙ্গীতের যে আধুনিকীকরণ করছিলেন তা ক্রমশ এগিয়ে যাবে। গানকে ক্রমশ সরল হতে হবে, গানকে মানুষের হাতে তুলে দিতে হবে।
এ মাসের ‘সঞ্জয় উবাচ’ অন্যরকম, কারণ এই মাসটাই অন্যরকম। বাঙালির সর্বকালের অন্যতম সেরা দুই শিল্পী – ঋত্বিক ঘটক আর সলিল চৌধুরী – এ মাসে শতবর্ষে পা দিলেন। তাই নাগরিক ডট নেট মনে করেছে সঞ্জয় মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে কথোপকথন চালালে ওই দুই কিংবদন্তি সম্পর্কে এমন অনেক কথা উঠে আসতে পারে আলোচনায়, যা প্রতি মাসের নিয়মমাফিক কলামের পরিসরে ধরা মুশকিল। এই দীর্ঘ আলোচনা তাই আজ ছুটির দিনে শেষও হবে না। চলবে।
প্রথমেই আপনাকে জিজ্ঞেস করতে চাই, ঋত্বিক ঘটকের জীবদ্দশায় তাঁর কাজকে বাঙালি সমাজ যেভাবে দেখেছে আর এখন যেভাবে দেখে, তার মধ্যে আপনি নিশ্চয়ই একটা তফাত দেখতে পান? সেই তফাতটাকে কীভাবে ব্যাখ্যা করেন? প্রশ্নটা করছি, তার কারণ ঋত্বিককে তো একেকটা ছবি বানাতে বহু কষ্ট করতে হয়েছে। তারপর ছবিগুলো দর্শকের আনুকূল্য পায়নি বললেই হয়। আর আজ সোশাল মিডিয়া খুললেই ঋত্বিক পুজো দেখা যায় তাঁর প্রত্যেক জন্মদিনের আশপাশে। ‘তুমি গেছ। স্পর্ধা গেছে, বিনয় এসেছে’ লিখে তাঁর ছবি মুড়ি মুড়কির মত শেয়ার করে তরুণ প্রজন্ম। তাঁর লেখা বা তাঁর ছবির সংলাপ থেকে কথায় কথায় ভুল উদ্ধৃতি দিতেও দেখা যায় অনেককে। ঋত্বিককে ঘিরে এই আবেগের বিস্ফোরণ কীভাবে এবং কেন ঘটতে শুরু করল?
তোমার প্রশ্নটা শুনেই আমার মনে হল, তুমি একটা স্বখাতসলিলে নিমজ্জমান জাতির কথা বলছ, যারা বাঙালি নামে পরিচিত। তারা এখন কেবল ঋত্বিক নয়, বা সলিল নয়, যে কাউকে নিয়েই মেতে উঠতে চায় এবং পারে। আমার সোশাল মিডিয়া হ্যান্ডেল না থাকলেও চোখ তো রাখি। যা দেখতে পাই তা থেকে সোশাল মিডিয়ায় জানানো শ্রদ্ধার প্রতি আমার এক ধরনের তাচ্ছিল্য তৈরি হয়েছে। কারণ, কাউকে ছোট না করেই বলছি, ওখানে দেখেছি নীরেন্দ্রনাথ আর রবীন্দ্রনাথকে প্রায় একই ভাষায় শ্রদ্ধা জানানো হয়। আসলে ওটা গুগলের প্রতি দায়িত্বপালন। গুগল সকলকে মনে করিয়ে দেয় যে আজ অমুকের জন্মদিন। সুতরাং দল বেঁধে স্মরণ করা শুরু হয়ে যায়। আর বাংলায় তো এখন নস্ট্যালজিয়া ইন্ডাস্ট্রি ছাড়া কোনো ইন্ডাস্ট্রি নেই, তা এই ইন্ডাস্ট্রির জন্যে ঋত্বিক, সলিল – এঁরা অতি লোভনীয় কাঁচামাল। আজকের বাঙালি মনে করে যে এঁরা এক ধরনের প্রত্যাখ্যানের মাতৃভাষা। ঋত্বিকের সঙ্গে সলিলের একটা পার্থক্য হল সলিল জনপ্রিয় ছিলেন। যা-ই হোক, এই দুজনকে, এখনকার বাঙালি ইংরিজিতে যাকে appropriate করা বলে সেটা যে করতে পারছে তাতে বোধহয় এক ধরনের আত্মশ্লাঘা বোধ করে।
দুজনের মধ্যে জীবদ্দশায় জনপ্রিয়তার ফারাকের কথা আপনি বললেন। এখন তাঁদের যেভাবে দেখা হয় তাতে কোনো মিল দেখতে পান কি?
দেখো, প্রথমেই বলতে হবে যে ঋত্বিক জনপ্রিয়তা পাননি আর সলিল দারুণ জনপ্রিয় – এরকম হওয়া সত্ত্বেও আমি দেখেছি যে এঁরা অতি ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন। সলিল নিজে খুব বিনীত মানুষ ছিলেন। কিন্তু ঋত্বিক সম্পর্কে স্পষ্টই বলতেন যে ভবা (ঋত্বিককে যে নামে ডাকতেন) অসম্ভব এক জিনিয়াস। যেমন ম্যাক্সমুলার ভবনে তিতাস একটি নদীর নাম (১৯৭৩) দেখে এসে সলিল বলেছিলেন, কী মিউজিক! আমাকে কলকাতার কিছু লোক বলেছিল যে ভবার সেই টাচ আর নেই। আমি তো ছবিটা দেখে ভাবলাম, এরা কারা? এরা কোনোদিন গান-টান শুনেছে? এরা মিউজিক কাকে বলে জানে? ভবার সঙ্গে কারোর তুলনা হয় না।
এবার ওই মিলের প্রসঙ্গে বলি। দুজনেই নিজের শিল্পমাধ্যমকে এবং শিল্পের বিষয়কে নানা প্রশ্নের মুখে ফেলেছেন। অনেকসময় দুজনে একসঙ্গে কাজও করেছেন। যেমন বাড়ি থেকে পালিয়ে (১৯৫৮) ছবিতে, কোমল গান্ধার (১৯৬১) ছবিতে। সেসব নিয়ে আজকাল যে হইচই করা হয় তার মধ্যে কোনো মৌলিক জিজ্ঞাসা নেই। যা আছে তা নিতান্ত বাইরের কথাবার্তা। অনেকটা বিয়েবাড়ির মত। যেন একটু সাজুগুজু করে ঋত্বিক চর্চা করা, কেননা তাতে বিকল্প সংস্কৃতি চর্চার বড়াই করা যায়। সলিলকে নিয়ে চর্চা করলেও বেশ প্রমাণ করা যায় যে আমরা গান-টান বুঝি। কিন্তু ধরো, আমার মত একজন লোক যে পাশ্চাত্য সঙ্গীত, ভারতীয় মার্গসঙ্গীত বিশেষ বোঝে না; সে যদি আজকের সঙ্গীতকার যাঁরা, সিনেমায় কাজ করেন যাঁরা, তাঁদের জিজ্ঞেস করে যে সলিল একজন প্রতিভাবান সঙ্গীতশিল্পী – একথা কেন মানব? সঙ্গীতে সলিলের মৌলিক অবদানটা কী? তাহলে দেখেছি, গুছিয়ে কিছু বলতে পারেন না। আড্ডাচ্ছলে কিছু উদাহরণ তুলে ধরে কিছু কথা বলেন তাঁরা। কিন্তু ভারতীয় বা আন্তর্জাতিক সঙ্গীতের ইতিহাসে যদি সলিলের স্থান চিহ্নিত করতে চাই, তার উপায়টা কী? এই প্রশ্নের কোনো সদুত্তর এঁদের কাছ থেকে পাই না।
একই ব্যাপার ঋত্বিককে নিয়েও হয়। তিনি খুব বড় চলচ্চিত্রকার ছিলেন, তাঁকে তাঁর জীবদ্দশায় আমরা ঠিক বুঝতে পারিনি – এমন হতেই পারে। শিল্পের ইতিহাসে বহু শিল্পীর ক্ষেত্রেই এমন হয়েছে। কিন্তু আজ যে বুঝতে পারছি তার কারণ কী? এই প্রশ্ন নিয়ে কাউকে আলোচনা করতে আমি তো দেখি না। আমি যদিও সোশাল মিডিয়ায় নেই, তবু কিছুটা খেয়াল করি। নামকরা বাঙালি, সাধারণ বাঙালি – সকলেই ঋত্বিককে নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে আবেগে ভেসে যায় এবং বাঙালির ধারণা, আবেগ হল ঋত্বিককে বোঝার পাসওয়ার্ড। কিন্তু দেখাই তো যাচ্ছে যে কেবল আবেগে কিছু হয় না। স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে রামমোহন রায়, মাইকেল মধুসূদন দত্ত, রবীন্দ্রনাথের উত্তরসূরিরা কোন অতল চোরাবালিতে পড়েছে। এখান থেকে শুধু আবেগ দিয়ে উদ্ধার পাওয়া যাবে না।
ঋত্বিক তো বহুকাল আগেই লিখেছিলেন যে তিনি একটা ইতরের দেশে বাস করেন, যেখানে বণিকরা লেখক উদ্ভাবন করে এবং লেখকরা উদ্ভাবিত হন। তিনি যদি দেখতেন যে সোশাল মিডিয়া কেবল লেখক নয়, সঙ্গীতশিল্পী, অভিনেতা, নেতা – সবই উদ্ভাবন করছে; আবার অনেক শিল্পী সম্পর্কে নিদানও দিচ্ছে যে অমুক ওই বিষয়ে কথা বলেনি বা এক লাইনও লেখেনি বলে ও কোনো শিল্পীই নয়, তমুককে সাহিত্যিক বলে মনেই করি না, তাহলে ঋত্বিকের প্রতিক্রিয়া কেমন হত বলে মনে হয়? তিনি যে একবার বলেছিলেন সিনেমার থেকে ভাল কোনো মাধ্যম পেলে সিনেমাকে লাথি মেরে দিয়ে চলে যাবেন, এখন কি তিনি সেই কাজটাই করে অন্য কোনো মাধ্যমের খোঁজ করতেন?
যথেষ্ট সম্ভাবনা আছে যে ঋত্বিক ডিজিটাল মাধ্যমকে আয়ত্ত করতেন নিজের মত করে। অন্তত তিনি যে কোথাও আটকে থাকার লোক নন তা তাঁর মাত্র আটটা ফিচার ফিল্মেই পরিষ্কার হয়ে গেছে। ওটুকুতেই তিনি বুঝিয়ে দিয়েছেন যে তিনি কতখানি পাল্টাতে পারেন এবং সিনেমায় কতখানি উদ্ভাবনী শক্তির পরিচয় দিতে পারেন বিষয় এবং বক্তব্যে। তবে আমার এও মনে হয় যে আজকের নরকযাত্রার মধ্যে তিনি হয়ত রাজা লিয়রের মত হয়ে যেতেন। সম্পূর্ণ উন্মাদ, একজন unaccommodated man। তাঁকে যুক্তি তক্কো আর গপ্পো (১৯৭৪) তৈরি করার সময়ে আমি দেখেছিলাম, ক্রমশই কলকাতার বুদ্ধিজীবী মহল থেকে বিচ্ছিন্ন হচ্ছিলেন। এমন তো নয় যে ঋত্বিককে কলকাতার সাংস্কৃতিক গ্রহ, জ্যোতিষ্করা চিনতেন না; তিনিও তাদের চিনতেন। তাদের বৃত্তে তিনি আমন্ত্রিত হতেই পারতেন। কিন্তু তিনি নিজেকে আলাদা করে নিচ্ছিলেন। তার বদলে তিনি মিশতেন এমন লোকেদের সঙ্গে যাদের আমরা করুণার চোখে দেখি। তেমন তথাকথিত অশিক্ষিত লোকেদের সঙ্গে মেলামেশা করা, মদ খাওয়া তাঁর রোজকার জীবনের অঙ্গ হয়ে গিয়েছিল। আর মিশতেন আমাদের মত অখ্যাত, অনামী ছোটদের সঙ্গে। তিনি ছোটদের বিশ্বাস করতেন।
ওই ছবিতে যে তিনি নীলকণ্ঠ বাগচী হয়ে নকশালপন্থীদের সঙ্গে রাত কাটান বীরভূমের জঙ্গলে, তা কিন্তু নকশালপন্থীদের প্রতি তাঁর সমর্থন ছিল বলে নয়। ওখানে ঋত্বিকের ভাবনাটা এরকম যে একটা গোটা প্রজন্ম বিশ্বাসঘাতকতা করেছে। তারপর তোমাদের প্রজন্ম তবু নতুন করে কিছু একটা ভাবছে। আর আমি মাতাল হতে পারি, লোক ঠকিয়ে মদের বোতল জোগাড় করতে পারি। ব্যর্থ চলচ্চিত্রকারও হতে পারি, কিন্তু ভোরের আলোয় সত্যের মুখটা একবার দেখতে চাই। সত্যের জন্যে তাঁর এই আকুতিটা খাঁটি ছিল। এখন যা চলছে তা হল টুর্নামেন্ট। একটা ক্রিকেট টুর্নামেন্টের সঙ্গে এই কালচারাল টুর্নামেন্টের কোনো তফাত নেই। মানে বাংলায় এখন একটা কালচার ইন্ডাস্ট্রি চলছে। আমি তোমার পিঠ চাপড়ে দেব, তুমি রামের পিঠ চাপড়ে দেবে, রাম নবীনার পিঠ চাপড়ে দেবে, নবীনা মৃদুলার পিঠ চাপড়ে দেবে – এইভাবে চলতে থাকবে। ওইজন্যেই বললাম যে স্মরণ করার ভঙ্গিতেও নীরেন্দ্রনাথ আর রবীন্দ্রনাথের মধ্যে কোনো তফাত করা হয় না। ভাষাটা একই থাকে। ওটা আসলে জনসংযোগের ভাষা। আমরা কোনো টেলি সার্ভিসে ফোন করলে এই করতে হলে ১ টিপুন, ওই করতে হলে ২ টিপুন – এগুলো যেরকম যান্ত্রিকভাবে বলা হয়, বাঙালির গুণী মানুষদের নিয়ে আলোচনাও তেমনই যান্ত্রিক বা প্রোগ্রামড হয়ে গেছে। কতকগুলো গতে বাঁধা কথাই বলা হয়, সে জীবনানন্দ দাশ সম্পর্কেই বলা হোক আর মুকুন্দ দাস সম্পর্কেই বলা হোক।
এবার একটু সলিল চৌধুরীর প্রসঙ্গে আসি। সলিল আর ঋত্বিক দুজনেই ভারতীয় গণনাট্য সঙ্ঘের সঙ্গে দীর্ঘদিন যুক্ত ছিলেন এবং কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য ছিলেন। কিন্তু দুজনের কেউই একটা সময়ের পরে পার্টিতে টিকতে পারেননি। আজ এতদিন পরে তাঁদের সঙ্গে কমিউনিস্ট পার্টি বা বামপন্থার সম্পর্ককে আপনি কীভাবে দেখেন? পার্টির সঙ্গে বিচ্ছেদ কি শিল্পী হিসাবে তাঁদের উপর কোনো প্রভাব ফেলেছিল?
এখানে একটা গল্প বলতেই হবে। একবার যাদবপুরে একটা সেমিনারে আমি যুক্তি, তক্কো আর গপ্পো নিয়ে আলোচনা করছিলাম। ঘটনাচক্রে সেখানে শ্রোতাদের মধ্যে কবি ভারভারা রাও ছিলেন। আমার যা বক্তব্য ছিল তা নিয়ে তিনি কিছু বলেননি, কিন্তু পরে চা চক্র চলাকালীন বললেন, আচ্ছা, এই ছবিটা পাওয়া যায়? আমি তো ভাবতেই পারছি না যে উনি ওই সময়ে এইসব ভেবেছিলেন! ভারতের সমাজ এবং রাজনীতি তো ঠিক এরকমই! এত জ্যান্ত করে কী করে ভাবলেন উনি!
গল্পটা বললাম এইজন্যে যে ঋত্বিকের গুরুত্ব বামপন্থীরা সেইসময় পুরোপুরি বোঝেননি। তাঁরা ঋত্বিককে একজন সমকালীন সমাজবাস্তবের রূপকার ভেবেছিলেন। আর মনে করেছিলেন, যে উদ্বাস্তু সমস্যা নিয়ে কেউ কথা বলে না, ঋত্বিক সেই কাজটা করছেন, নিচুতলার মানুষকে পর্দায় তুলে আনছেন। বামপন্থীরা তলিয়ে দেখেননি যে এই নিচুতলার মানুষ বলতে আজাদগড় উদ্বাস্তু কলোনির মানুষ আর ওরাওঁ পল্লীর মানুষ এক কিনা। ঋত্বিক ঠিক কী বলতে চাইছেন? যদি শুধু উদ্বাস্তু সমস্যার কথা বলতেন, তাহলে কিন্তু তাঁর গুরুত্ব এতদিনে ফুরিয়ে যেত। ওই সমস্যার দিনগুলো তো অনেক দূরে চলে গেছে। কিন্তু উনি যে আসলে মানুষের আত্মচ্যুতি, শিকড়চ্যুতির কথা বলছিলেন এবং বলতে বলতে একটা দার্শনিক জায়গায় পৌঁছচ্ছিলেন; সলিলের গানেও গণসঙ্গীত বা বিদ্রোহের সঙ্গীত লেবেল লাগিয়ে যে লাভ নেই এবং তাঁর আধুনিক গান বা বম্বের সিনেমার গানকেও তুচ্ছ করে যে লাভ নেই – সে উপলব্ধি কমিউনিস্ট পার্টির হয়নি।
এমনকি আমি বলব যে আমাদের মেধাচর্চার জগতেও সলিলকে নিয়ে কোনো মৌলিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিচয় আমি প্রায় দেখিনি। দু-একজন কখনো কখনো আত্মপক্ষ সমর্থন করার জন্য সলিলকে ব্যবহার করেছেন। কিন্তু সলিলের মহত্ত্ব ঠিক কোথায় – এ নিয়ে আমি অন্তত কোনো গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা দেখিনি। আর ঋত্বিককে নিয়ে, আমার মনে হয় বাঙালিদের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা শুরু করেছিলেন বিষ্ণু দে। কিন্তু সেই স্তরের আলোচনাকে পরে কেউ অনুসরণ করেননি। তারপর হয়েছিল আবেগের বিচ্ছুরণ। বরং ঋত্বিকের মৃত্যুর পর থেকে তরুণতর প্রজন্মের যাঁরা তাঁকে নিয়ে আলোচনা করতে শুরু করেন, আমি বলব তাঁরা অনেকটা চেষ্টা করেছেন এবং করছেন। ঋত্বিককে নিয়ে এই চেষ্টা সারা বিশ্বেই হচ্ছে।
সলিলকে নিয়ে আলোচনায় মৌলিক দৃষ্টিভঙ্গির যে অভাবের কথা বলছেন, সেটা একটু বুঝিয়ে বলুন না।
ধরো, আজকাল তো বাংলায় থিওডোর অ্যাডর্নো ইত্যাদি বড় বড় নামের চর্চা চলে। কিন্তু অ্যাডর্নো বেঠোফেনকে নিয়ে যেরকম আলোচনা করেছেন সেরকম কিছু কিন্তু বাংলায় সলিলকে নিয়ে হচ্ছে না। আমিই অনেকদিন আগে একটা লেখায় লিখেছিলাম যে বাংলা আধুনিক সঙ্গীত মানে মূলত রামপ্রসাদ সেন, রবীন্দ্রনাথ আর সলিল। যদি বলো, কেন? আমি আমার মত একটা উত্তর দিতে পারি। কিন্তু আমি তো সঙ্গীত বিশেষজ্ঞ নই। সঙ্গীত বিশেষজ্ঞরা এ নিয়ে তাত্ত্বিক আলোচনা করলেন কোথায়? ঋত্বিককে নিয়েও কিন্তু যত সিরিয়াস আলোচনা হয় প্রায় সবই বাংলার বাইরে এবং দেশের বাইরে। বাঙালিদের এতসব করার সময় নেই। এমনকি কমিউনিস্টরাও এঁদের অনেকটা জনসংযোগের জন্য ব্যবহার করে আর সাধারণ মধ্যবিত্ত বাঙালি তাদের আবেগবিধুরতায় এঁদের ছুঁয়ে থাকে।
অনেকদিন আগে আপনার আর সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের একটা কথোপকথন শুনেছিলাম। সেখানে আপনি বলেছিলেন যে ঋত্বিক আদ্যন্ত বামপন্থী হলেও মনে করতেন তিনি মূলত একজন শিল্পী। তাঁকে রাজনীতিটাও শিল্পের মধ্যে দিয়েই করতে হবে। সলিলও তো আজীবন তাঁর সঙ্গীতের মধ্যে রাজনীতি বাঁচিয়ে রেখেছেন। সেক্ষেত্রে ইদানীং পশ্চিমবঙ্গে শিল্পীদের দলীয় রাজনীতিতে যোগ দেওয়া, ভোটে দাঁড়ানো, কিছুদিন পরে বেরিয়ে যাওয়া বা আর জি করের ঘটনার মত বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে কারো কারো পথে নামা – এগুলোকে আপনি কী চোখে দেখেন? এই শিল্পীদের কাজে তো আমরা ডান, বাম, মধ্য – কোনো রাজনীতিরই ছাপ দেখি না। মানে অধিকাংশ বাংলা সিনেমায় বা গানে বা নাটকে তো আটপৌরে জীবনটাই দেখতে পাই না। তার রাজনীতি দূরের কথা।
দেখো আজকাল বেশিরভাগ সময়েই আমি হয়ত খুব তেতোভাবে কথা বলি। কিন্তু জানি না আজকের শিল্পীরা যে রাজনীতিটা করছেন সেটার সম্পর্কে কী করে এর চেয়ে নরম করে বলা সম্ভব। আমার মনে হয়, আগে কলকাতা ফুটবলে যেমন দলবদল হত বা এখন যেমন আইপিএলের নিলাম হয়, নীতা আম্বানির মত ধনকুবেররা ক্রিকেটার কেনাবেচা করেন, আজকাল রাজনীতি তেমনই হয়ে গেছে। যদি আরেকটু সিরিয়াস ভাষায় বলি, তাহলে যা চলছে সেটাকে সোজাসুজি ওয়াল্টার বেঞ্জামিনের ভাষায় বলা উচিত aestheticization of politics – একেবারে আদর্শ ফ্যাসিবাদী শাসনে যা হয়ে থাকে। রাজনীতিকে এক ধরনের শিল্প, মানে spectacle, বানিয়ে দাও। আজ যদি পশ্চিমবঙ্গের দিকে তাকাও, তাহলে দেখবে সমস্ত রাজনৈতিক ঘটনা নিয়েই কবিতা লেখা হচ্ছে। সেসব খুব ভাববিহ্বল কবিতা। তাতে কুঠারকে কুঠার বলার চেষ্টা খুব কম। ফলে সাহিত্যে, শিল্পে ওই প্রতিবাদে শাসকের কিছু এসে যাবে না।
এবার ঋত্বিক আর সলিলের শিল্পকর্মের কথা যদি ভাবি, তাহলে দেখব যে তাঁরা ফর্ম আর বিষয়, দুটোরই এমনভাবে রাজনীতিকরণ করেছিলেন যে তাকে বলা যায় এক ধরনের দার্শনিক হস্তক্ষেপ। সেই কারণেই এঁরা নিজের সময়ের মুখপাত্র হয়ে উঠেছেন। ঋত্বিক আসলে কী করেছিলেন? দেশভাগ একটা উপলক্ষ মাত্র। আসলে মানুষের ছিন্নমূল হওয়া তার একটা অন্তর্গত সমস্যা। এই সমস্যাকে তিনি কোথায় রাখবেন – প্রকৃতপক্ষে এই নিয়েই ঋত্বিকের কাজ। অনেকেরই ধারণা মেঘে ঢাকা তারা (১৯৬০), কোমল গান্ধার (১৯৬১) আর সুবর্ণরেখা (১৯৬৫)- ই তাঁর উদ্বাস্তু সমস্যা নিয়ে ছবি। কিন্তু ঋত্বিকের প্রথম ছবি নাগরিক (১৯৫২, মুক্তি ১৯৭৭) দেখলেও একটা ছোট্ট দৃশ্য দেখা যাবে। কলকাতায় দুর্গা প্রতিমা প্রবেশ করছে এবং এক ভাড়াটে পরিবার বাড়ি থেকে উচ্ছেদ হচ্ছে। বাড়ি থেকে পালিয়ে ছবিতেও এই জিনিস দেখতে পাব। আমার তো তাই মাঝে মাঝে মনে হয় ওটা আসলে বাচ্চাদের ছবিই নয়। ওই ছবির কাঞ্চন যে বাড়ি থেকে পালিয়ে কলকাতা শহরে আসে এবং ওয়াইড অ্যাঙ্গলের প্রভু ঋত্বিক এক্সট্রিম ওয়াইড অ্যাঙ্গলে যেভাবে কলকাতা শহরকে দেখেন, সে এক বিশেষ দেখা। ওখানে বাড়িছাড়া হওয়ার আরেকটা স্তর দেখা যায়, তা হল পথেঘাটে থাকতে হওয়া। যেসব মানুষকে কাঞ্চন দেখে তারা কেবল উদ্বাস্তু নয়, তারা হল যাকে বলে underclass। এমনকি তিতাস একটি নদীর নাম ছবিতেও কিন্তু এই ব্যাপারটা ফিরে আসে, কারণ ভারতে প্রথমবার সভ্যতার স্থানচ্যুতি হয়েছিল সিন্ধু নদ গতিপথ পরিবর্তন করায়। সুতরাং তিতাসের শুকিয়ে যাওয়ার সঙ্গে এখানে ঋত্বিক সিন্ধুনদের ইতিহাসকে যুক্ত করছেন। যুক্তি তক্কো আর গপ্পো তো বলাই বাহুল্য, এক উন্মাদের বুড়ো আংলা হওয়ার প্রয়াস। নীলকণ্ঠের বাড়ি থেকে বেরিয়ে গ্রামের দিকে চলে যাওয়া, ছৌ নাচ, লোকাচার, মানে একেবারে people’s art বলতে যা বোঝায় – এসবের সঙ্গে আমাদের মধ্যবিত্ত শিল্পের সম্পর্ককেই ঋত্বিক প্রশ্ন করেন।
আমরা জানি যে গণসঙ্গীতে সলিল যখন পাশ্চাত্য সুরের প্রয়োগ শুরু করেন, তা নিয়ে গণনাট্য সঙ্ঘের মধ্যে বিতর্ক হয়েছিল। হেমাঙ্গ বিশ্বাসের মত মানুষ মনে করতেন যে বিদেশি সুর এদেশের একেবারে নিচের তলার মানুষ, যাঁরা গণসঙ্গীতের মূল লক্ষ্য, তাঁদের ছুঁতে পারবে না। কিন্তু সলিল এই যুক্তি মানতে চাননি। অন্যদিকে আমরা ঋত্বিকের ছবিতে দেখেছি দেশজ সংস্কৃতি একেবারে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে আছে। তিনি অযান্ত্রিক (১৯৫৮) ছবিতে ওরাওঁদের নাচ দেখান। বিশেষত ‘পার্টিশন ট্রিলজি’-তে পুরাণ বা এদেশের প্রাচীন কিংবদন্তিগুলোকে ব্যবহার করেন। সত্যজিৎ রায়ও একবার বলেছিলেন যে ঋত্বিকের মত একেবারে পাশ্চাত্য প্রভাবমুক্ত ভারতীয় চলচ্চিত্র নির্মাতা বিরল। আবার জীবনের শেষ ছবি যুক্তি, তক্কো আর গপ্পো, যে ছবি প্রায় আত্মজীবনী এবং যখন তিনি আর কমিউনিস্ট পার্টির সদস্যও নন, সেখানে ছৌ নাচ আসে। চরিত্রগুলোর নামও দুর্গা, নচিকেতা – এইরকম। তাই জানতে ইচ্ছা করছে যে সলিল আর ঋত্বিক কি ওই বিতর্কে দুটো আলাদা মতের লোক? নাকি এগুলোকে সেই সময়কার কমিউনিস্টরা অতিসরলীকৃত বাইনারিতে দেখতেন বলে ওই বিতর্ক তৈরি হয়েছিল?
আমি সম্প্রতি জ্যোতিরিন্দ্র মৈত্রের গান বা পি সি যোশীর সাংস্কৃতিক নীতি সম্বন্ধে বলতে বলতে এই ব্যাপারটাই ভাবছিলাম। লোকসংস্কৃতি আর আমাদের উচ্চবর্গীয় আধুনিকতা কীভাবে মিলতে পারে – এটা খুব গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। বস্তুত সলিল আর ঋত্বিক শুধু যে সমবয়স্ক ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন তা নয়, দুজনেই এই দুটো ধারাকে কীভাবে ব্যবহার করা যায় তা নিয়ে ভাবছিলেন। আসলে একটা স্বরের বদলে বহু স্বরে কথা বলা, দৈনন্দিনতাকে মহাকাব্যের স্তরে পৌঁছে দেওয়া দুজনেরই লক্ষ্য ছিল। কমিউনিস্ট পার্টির ওই বিতর্কের মূল্যায়ন করতে গেলে আমি মনে করিয়ে দেব, সলিল ১৯৬০-এর দশকের শুরুর দিকে যে গানগুলো রচনা করেছেন…জনপ্রিয় গান, আজও প্যান্ডেলে প্যান্ডেলে বাজে… সেগুলো এখন শুনলে এক অন্যরকম চিন্তা মাথায় আসে। কী গান? যেমন ধরো ‘পথ হারাব বলেই এবার পথে নেমেছি/সোজা পথের ধাঁধায় আমি অনেক ধেঁধেছি’ বা ‘নিষেধের পাহারাতে ছিলেম রেখে ঢেকে/সে কখন গেছে ফিরে আমায় ডেকে ডেকে’। এগুলো কি কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে তাঁর সংলাপ নয়? যে সরলরৈখিক আখ্যান পার্টির মত একটা প্রতিষ্ঠান তৈরি করে, সেটা ঠিক না-ও হতে পারে। ফলে পথ হারাব বলে পথে নামা সলিলের ক্ষেত্রে যেমন সত্যি, ঋত্বিকের ক্ষেত্রেও তেমন সত্যি।
এটা কেন বলছেন?
ধরো, সলিলদা একটা একান্ত ব্যক্তিগত মুহূর্তে আমাকে বলেছিলেন, যে কোমল গান্ধারে ব্যবহার করার জন্যে ঋত্বিকের অনুরোধে উনি একটা প্রেমের গান লিখেছিলেন। সেটা শেষপর্যন্ত ছবিতে রাখা হয়নি। কোন গান? ‘আমি ঝড়ের কাছে রেখে গেলাম আমার ঠিকানা’। এটা আলাদা করে আধুনিক গান হিসাবে প্রকাশ পেয়ে প্রবল জনপ্রিয় হয়। তা গানটাকে তলিয়ে দেখলে দেখা যাবে যে এটা এক ধরনের আত্মবিবরণী। ‘ওগো ঝরাপাতা, যদি আবার কখনো ডাকো’। এই লাইনটা শুনলেই আমার মনে পড়ে যে ঋত্বিক সুরমা ঘটককে একটা চিঠিতে লিখেছেন, পি সি যোশী গতকাল আমাকে জড়িয়ে ধরে বললেন, ‘ঋত্বিক, ইউ আর দি ওনলি পিপলস আর্টিস্ট ইন ইন্ডিয়া।’ এর থেকে বেশি কিছু চাই না। তাহলে কমিউনিস্ট পার্টি আবার কখনো ফিরে ডাকবে, এই ভাবনাই কি কাজ করছিল মনের মধ্যে? দুজনেরই? আমার তো এই কথাগুলোকে খেয়াল করলে সেরকমই মনে হয়। সে ডাক যে কখনো আসবে না তা হয়ত দুজনেই বুঝতেন। তবু…এ যেন এক রাজনৈতিক সংলাপ।
আর সলিল যা করছিলেন, সেটা তো আসলে ভারতীয় সঙ্গীতের এক বিরাট আধুনিকীকরণের চেষ্টা। কীরকম? এই যে আমি একটু আগে রামপ্রসাদ, রবীন্দ্রনাথ আর সলিলকে বাংলা আধুনিক গানের তিনটে মাইলস্টোন বলে চিহ্নিত করলাম। সেটা কেন? কারণ রামপ্রসাদের গানের যে আধ্যাত্মিক দিক সেটা বাদ দিয়েও যদি শুধু ভাষার দিকে নজর দিই, তাহলে দেখব যে উনি বাংলা গানের ভাষার ঝুঁটি ধরে দিক বদলে দিচ্ছেন। খাজাঞ্চিখানায় কাজ করতেন। ফলে তাঁর গানে অজস্র ফারসি শব্দ চলে আসছে, যেমন ‘দে মা আমায় তবিলদারী/আমি নিমকহারাম নই শঙ্করী’। রূপক আনছেন কৃষিকার্য থেকে, যেমন ‘এমন মানবজমিন রইল পতিত/আবাদ করলে ফলত সোনা’। এ তো বৈপ্লবিক। রামপ্রসাদ গানকে একেবারে সাধারণ মানুষের জিনিস করে তুলছেন। এমনিতে তো ভারতীয় মার্গসঙ্গীত সাধারণ মানুষের সমতলে নামতে পারে না। পণ্ডিত ভীমসেন যোশী বা ওস্তাদ আমির খাঁ, ওস্তাদ ফৈয়াজ খাঁদের সঙ্গীত উচ্চতায় মহাকাশে পৌঁছে যায়, কিন্তু তা দিয়ে তো বাজারের পোকাকাটা জিনিসের কেনাকাটা করা মানুষের মনের খিদে মেটে না সাধারণত। ভারতের লোকসঙ্গীত, যা হাবিব তনবীর বা ঋত্বিকের কাজে এসে পড়েছে, তার সঙ্গে উচ্চবর্গীয়দের সঙ্গীতের একটা বিরোধ থেকে গেছে। অথচ রাগ হংসধ্বনির সঙ্গে ‘কান্দিয়া আকুল হইলাম ভবনদীর পাড়ে’-তে তেমন বিরোধ নেই।
রবীন্দ্রনাথও ১৮৮১ সালে একটা প্রবন্ধে লিখেছেন যে ওস্তাদরা ‘গানের কথার উপরে সুরকে দাঁড় করাইতে চান, আমি গানের কথাগুলিকে সুরের উপরে দাঁড় করাইতে চাই। তাঁহারা কথা বসাইয়া যান সুর বাহির করিবার জন্য, আমি সুর বসাইয়া যাই কথা বাহির করিবার জন্য।’ এইজন্যেই আমার মনে হয় রবীন্দ্রনাথ ভারতীয় সঙ্গীতের সম্প্রসারণ ঘটিয়েছেন। আর সলিল কী করলেন? তিনি প্রাচ্য সঙ্গীত আর পাশ্চাত্য সঙ্গীতের মূল ভেদটা বুঝতেন। বুঝে কী করলেন? আপাতভাবে খাপ খায় না, যা contrapuntal, এমন জিনিসকে সফলভাবে মিলিয়ে দিলেন। গণসঙ্গীতের ক্ষেত্রে তো বটেই। আমি তোমাকে একেবারে সিনেমার গান থেকে উদাহরণ দিচ্ছি। হিন্দি ছবিতে সলিলের সুরারোপিত প্রথম জনপ্রিয় গান হল ‘আ যা রে পরদেশী…ম্যায় তো কব সে খড়ি ইস পার’।
বিমল রায়ের মধুমতী (১৯৫৮) ছবির গান, যে ছবির আবার চিত্রনাট্যকারদের একজন ঋত্বিক। সলিলদা নিজেই বলেছিলেন যে ওই গানে আসামের বিহু, পাঞ্জাবের ভাংড়া মেশানো হয়েছে। আবার ইন্টারল্যুডে মোজার্ট ঢোকানো হয়েছে। অথচ গানটা শুনলে কিন্তু সম্পূর্ণ দেশি গান বলেই মনে হয়। আর সারা দেশেই লতা মঙ্গেশকরের গলায় এটা আজও জনপ্রিয়।
সুতরাং ভারতীয় সংস্কৃতির আধুনিকীকরণের প্রয়োজন যে ছিল তা অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই। নাটকে এই কাজটা সেইসময় হাবিব তনবীর করছিলেন, সিনেমায় ঋত্বিক, সঙ্গীতে সলিল – এরকম আরও অনেকে। বস্তুত ভারতীয় গণনাট্য সঙ্ঘ সংগঠন হিসাবেই সচেতনভাবে এই কাজটা করছিল। ওই প্রয়াস সম্পর্কেই অশোক মিত্র একটু আলগা সুরে বলেছিলেন, ভারতীয় গণনাট্য সঙ্ঘ ১৯৪০-এর দশকে আমাদের দ্বিতীয় সাংস্কৃতিক রেনেসাঁ ঘটাচ্ছিল।
মানে আপনি বলছেন ঋত্বিক, সলিল দুজনেই শিল্পী হিসাবে একই লক্ষ্যে এগোচ্ছিলেন, কমিউনিস্ট পার্টির বাইরে চলে যাওয়ার পরেও?
আমার মনে হয় পি সি যোশীর নেতৃত্বে ভারতীয় গণনাট্য সঙ্ঘ যেটা করতে চেয়েছিল – নাটকে নবান্ন (১৯৪৪) দিয়ে, সাহিত্যে মাণিক বন্দ্যোপাধ্যায় যা করছিলেন ‘দুঃশাসনীয়’ বা ‘ছোট বকুলপুরের যাত্রী’-র মত গল্পের মধ্যে দিয়ে, কবিতায় সুভাষ মুখোপাধ্যায় বা সুকান্ত ভট্টাচার্য – সেটা হল উনবিংশ শতকের তথাকথিত রেনেসাঁয় যা হয়নি, সেই কাজটা করা। অর্থাৎ সংস্কৃতিকে একেবারে নিম্নবর্গীয় মানুষের কাছে নিয়ে যাওয়া। সলিল আর ঋত্বিক সঙ্গীতে এবং সিনেমায় সেটাই চেষ্টা করছিলেন। সিনেমার মত একটা যন্ত্রভিত্তিক মাধ্যমে এটা কিন্তু দুঃসাহসিক কাজ। কারণ আমরা সাধারণভাবে যন্ত্রকে সন্দেহই করি। আজও বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে রবীন্দ্রনাথের মুক্তধারা আর রক্তকরবী এত জনপ্রিয় কেন? বা মহাত্মা গান্ধীর আমেদাবাদ টেক্সটাইল সম্পর্কে বক্তৃতাগুলোর আজও আবেদন রয়েছে কেন? কারণ গান্ধী আর রবীন্দ্রনাথ – দুজনেই খেয়াল করেছেন যে যন্ত্রের দাঁতে অনেক রক্ত লেগে আছে। যন্ত্রের আগমন তো স্রেফ শিল্পবিপ্লবের ফলাফল নয়। যন্ত্রকে এদেশে এনেছে ঔপনিবেশিক শক্তি। এর সঙ্গে পুঁজি আর মুনাফার সরাসরি যোগ রয়েছে। তার ফলে ঢাকার মসলিন নষ্ট হয়েছে, বহু কুটির শিল্প উঠে গেছে, জমি জায়গার ব্যাপক দখলদারি করে রেললাইন পাতা হয়েছে। এসবে হয়ত জাতিরাষ্ট্র গঠনে সুবিধা হয়েছে, কিন্তু আমাদের সমাজের তন্তুজাল ছিন্নভিন্ন হয়ে গিয়েছিল।
তা ঋত্বিক দেখলেন যে এটা খুব জটিল একটা বিষয়। কারণ এই যুগে তো আর যন্ত্রের সাহায্য ছাড়াই বাঁচব – একথা বলা যায় না। ওরাওঁদের কারোর যদি হার্ট অ্যাটাক হয় তাহলে তাদেরও তো ইসিজি, বাইপাস সার্জারি ইত্যাদি করতেই হবে। তন্ত্র মন্ত্র, তুকতাকে তো আমরা থেমে থাকব না। কারণ মানুষের উপকারে যন্ত্রের ব্যবহার এখন সম্ভব হয়েছে আর আমরা তো চাইও এমন একটা সমাজ যেখানে ওরাওঁদের কাউকে এই সুবিধাগুলো থেকে বঞ্চিত হতে হবে না। কিন্তু এই দুয়ের সমন্বয় হবে কী করে? সেটা ঘটাতে গেলে অযান্ত্রিক করতে হবে। সুবোধ ঘোষের মূল গল্পে কিন্তু ওরাওঁদের নামগন্ধ ছিল না। তাহলে ঋত্বিক তাদের আনলেন কেন? আসলে এটা মনে করিয়ে দেওয়ার জন্যে যে আমাদের দেশে প্রাচীনকাল থেকে বৈজ্ঞানিক পরীক্ষানিরীক্ষা কখনো অনাদৃত থাকেনি। মহেঞ্জাদারো বা পাটলিপুত্রেও তার চিহ্ন আছে। সুতরাং যন্ত্র জিনিসটাকেই ভারতীয় হলে প্রত্যাখ্যান করতে হবে তা নয়। কিন্তু সেই যন্ত্র কাদের হাতে, কারা তাকে কীভাবে ব্যবহার করছে সেগুলো গুরুত্বপূর্ণ।
সলিলের কাজে এই জিনিসটা কীভাবে হয়েছে যদি একটু উদাহরণ দিয়ে বলেন…
একসময় ফ্র্যাঙ্কফুর্ট স্কুলের অ্যাডর্নো, ওয়াল্টার বেঞ্জামিনকে উদ্ধৃত করে বলেছিলেন যে দৃশ্যকলা যেমন বস্তুকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করে, তেমনি এমন গানও আছে যা পাখিদের গানকে নশ্বরতা থেকে উদ্ধার করে। এটা কী করে করা যায় সে প্রশ্ন খুব গুরুত্বপূর্ণ। সবসময় যে লোকসঙ্গীতকে অনুসরণ করলেই তা করা যাবে এমন নয়। বরং ১৯৫৯ সালে লতার গাওয়া ‘যা রে উড়ে যা রে পাখি’ গানটায় দেখো, কীভাবে শব্দকে নশ্বরতার হাত থেকে মুক্তি দেওয়া হচ্ছে। ‘যা ফিরে আপন নীড়ে’ বলা হচ্ছে, অথচ সুরটা কিন্তু রুট কর্ডে ফিরছে না। আবার ‘রানার’ গানটার কথা যদি ভাবি। রানার ক্ষুধার ক্লান্তিতে ক্ষয়ে যাচ্ছে, সলিল সুরটাকে ছবার রুট কর্ডে ফিরিয়েছেন। হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের মত শিল্পীও বলে ফেলেছিলেন, সলিল, এ গান গাওয়া খুব মুশকিল। কিন্তু গানটাতে শুধু শ্রমজীবী মানুষের সংগ্রাম তুলে ধরার জন্যে সলিল কী অসাধ্য স্বরলিপি তৈরি করেছিলেন! তার জন্যে পাশ্চাত্য সঙ্গীতের সাহায্য নিয়েছেন। তাতে তো দোষের কিছু নেই। পল রবসন ১৯৩৪ সালে বলেছিলেন যে যিশুখ্রিস্ট সাদা চামড়ার মানুষের কাছে এক ধরনের বিমূর্ত অনুভূতি। তারা তাঁকে চার্চে খুঁজে পায়। কিন্তু কালো মানুষদের কাছে যিশু স্পর্শযোগ্য বিষয়। সেই অনুভূতি থেকে কালো মানুষদের কথ্য ভাষায় যেসব গান রচিত হয়েছিল সেগুলোকে রবসন মার্কিন মূলধারার সংস্কৃতিতে নিয়ে আসার চেষ্টা করেছিলেন।
আচ্ছা, এবার একটু অন্য প্রসঙ্গে যাই। রাজনৈতিক মতাদর্শের সঙ্গে সম্পৃক্ত শিল্পীকেও তো ঘর সংসার চালাতে হয়। সকলে ঋত্বিকের মত সারাজীবন নিজের মত করে শিল্প করতে পারলে করব, নইলে করবই না – এই সঙ্কল্প নিয়ে চলতে পারেন না। ঋত্বিক বিমল রায়ের মধুমতী-র মত হিট ছবির চিত্রনাট্য লেখার মত দু-একটা কাজই করেছেন। সিনেমা শেখানোর সরকারি চাকরিও বেশিদিন করেননি। সলিল আবার প্রচুর সিনেমার কাজ করেছেন, বাংলা আধুনিক গান রচনা এবং সুর দেওয়ার কাজ করেছেন। তাতেও বহু উৎকৃষ্ট শিল্প সৃষ্টি হয়েছে। কিন্তু এই যে আমাদের একটা প্রবণতা আছে, আমরা কেউ বাণিজ্যিক পরিসরে করা কাজগুলোকে কম গুরুত্ব দিই, আবার কেউ ‘ঘুমভাঙার গান’ নামে পরিচিত সলিলের সরাসরি রাজনৈতিক কাজগুলোকে পাত্তা দিতে চাই না। এটা কি ঠিক? মানে গরিব শিল্পীর শিল্পই সৎ শিল্প, বাকি সব স্রেফ আপোস – এরকম ভাবে কি শিল্পকে দেখা যায়?
একদমই যায় না। ওভাবে দেখলে তো বলতে হবে যে শিল্পীর গান কেউ শোনে না সে-ই সবচেয়ে বড় শিল্পী। ওটা একেবারেই ভুল চিন্তা পদ্ধতি। আসলে ঋত্বিকও কিন্তু চাইতেন লোকে তাঁর ছবি দেখুক। দেখে না বলে যথেষ্ট কষ্টও পেতেন। আমি যদি এখন পিয়ানো বাজাই, একটা লোকও শুনবে না। তাতে কি প্রমাণ হয় আমি বেঠোফেন? ধরো, আমি যদি সাহিত্যের কথা বলি। সাহিত্য শব্দটাই তো ‘সহিত’ থেকে এসেছে। অর্থাৎ অন্যের সঙ্গে যোগাযোগ, সমাজের সঙ্গে যোগাযোগ – এটাই তো সাহিত্য এবং শিল্পের কাছে মানুষের চাহিদা। যেমন প্রাচীন কবিরা কিন্তু ছন্দের উত্তম ব্যবহার করেছেন বলে কবি নন। তাঁরা সমাজের কথা বলতেন, সেই জন্যে কবি। মহাকাব্যগুলো তো সেভাবেই তৈরি হয়েছে। রামায়ণ, মহাভারত, ইলিয়াড, ওডিসি – সবই তো কবিতা। কিন্তু সেগুলো একেকটা জাতির অলিখিত ইতিহাস। সেইখানেই মহাকাব্যের মহত্ত্ব। সুতরাং শিল্পের জনপ্রিয় হওয়া বা শিল্পীর লক্ষ্মীলাভ মোটেই খারাপ নয়। কিন্তু আমাদের সময়ে আমরা ব্যাপারটাকে সন্দেহ করতে শুরু করেছি কেন?
কারণ পুঁজিবাদ যে কোনো জিনিসকেই বিক্রয়যোগ্য পণ্য হিসাবে দেখে। শার্ল বোদলেয়ার বা জীবনানন্দ দাশ তার কাছে স্রেফ বিক্রয়যোগ্য বস্তু। সেইজন্যেই পুঁজিবাদ মনে করে যে আরও বিক্রি করতে গেলে শুধু জীবনানন্দের কবিতা বিক্রি করলে চলবে না। তাঁকে star বানাতে হবে। যেমন পাবলো পিকাসো বলতেন যে লোকে আমার ছবি নিয়ে মাথা ঘামায় না, অথচ আমি যে চুল কাটতে ভয় পাই সেটা নিয়ে বিস্তর আলোচনা করে। উনি কিন্তু সত্যিই চুল কাটার ব্যাপারে কুসংস্কারাচ্ছন্ন ছিলেন। মনে করতেন চুলের মধ্যেই ওঁর প্রতিভা রয়েছে। ফলে ওই টাক মাথায় যে কটা চুল আছে সেগুলো কাটতেও খুব গাঁইগুঁই করতেন। এখন বুর্জোয়া প্রচারযন্ত্র ওই কুসংস্কারটারই বিপুল প্রচার করত। মানে ওটাকেও বিক্রি করা হত। জীবনানন্দের ক্ষেত্রেও দেখবে একই ব্যাপার হয়। তিনি কোনো আত্মীয়ার প্রতি অনুরক্ত ছিলেন কিনা আসলে তো তা দিয়ে কিছু এসে যায় না, তিনি তো মহান তাঁর কবিতার জন্য। বিশেষ করে সাতটি তারার তিমির থেকে তিনি যখন পাল্টে গেলেন, কলকাতার জরায়ু এবং দুর্গত মানুষের কথা লিখতে শুরু করলেন, সেগুলো নিয়ে লোকে তত কথা বলে না। বেশি কথা হয় বনলতা সেন আসলে কে – এই নিয়ে। শিল্পের বনলতা সেন যে আসলে কোনো বাস্তব রমণী নন, ওই কল্পনার পিছনে কোন মহিলা ছিলেন তা নিয়ে ভেবে যে লাভ নেই – একথা পুঁজিবাদ তোমাকে ভুলিয়ে দেয়।
রবীন্দ্রনাথের কবিতা বা গানের মালবিকা, মালিনী বা নলিনীদের নিয়েও এমনই করা হয়। ওই নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করে বড়জোর কোনো নির্দিষ্ট মহিলাকে চিহ্নিত করা যেতে পারে। তাতে এটুকুই প্রমাণিত হবে যে রবীন্দ্রনাথ ভালবাসতে জানতেন। সে আর বেশি কথা কী? ভালবাসতে না জানলে ওরকম কবিতা লেখা যায়? কিন্তু রবীন্দ্রনাথের কাব্য নিয়ে না ভেবে তিনি কবে কোন বিদেশিনী সম্পর্কে কতটা আগ্রহী হয়েছিলেন এবং সেই আগ্রহে কতটা যৌন ইশারা ছিল তা নিয়ে আমরা যত গবেষণা করি, তাঁর লেখা নিয়ে তত মাথা ঘামানো হয় না। এইটাই পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় শিল্প, সাহিত্য জনপ্রিয় হওয়ার বিপদ।
কিন্তু উল্টোটাও তো করা হয়। যেমন বিশেষ করে বামপন্থীরা, শিল্পের রাজনৈতিক দিকটা পছন্দ না হলেই সেটাকে অবজ্ঞা করতে চান।
সেটাও নিঃসন্দেহে আরেক ধরনের ভ্রান্তি। ধরো, ফ্রান্সে রোম্যান্টিসিজমের জনক থিওফিল গোতিয়ে বলেছিলেন যে একজন নগ্ন রূপসী বা রাফায়েলের একটা আসল পেন্টিং দেখতে পাওয়া গেলে আমি আমার ফরাসি নাগরিক অধিকারও ছেড়ে দিতে রাজি আছি। এটাকেই কলাকৈবল্যবাদ বা art for art’s sake বলে। সাধারণ মার্কসবাদীরা এই মনোভাবকে কিন্তু প্রবল আক্রমণ করবেন। বলবেন, সে কী! ফরাসি নাগরিক আদর্শ – সাম্য, মৈত্রী, স্বাধীনতা – তার অধিকার তো আধুনিক বিশ্বের সবচেয়ে বড় অধিকার! যে শিল্পী একজন নগ্ন সুন্দরী বা রাফায়েলের আঁকা ছবি দেখার জন্যে এটাকে বর্জন করার কথা বলে, সে তো প্রতিক্রিয়াশীল! কিন্তু রুশ দেশে মার্কসবাদের যিনি বিরাট এক স্তম্ভ, যাঁর কথা আমরা ভুলে গেছি, এমনকি বিপ্লবের পর যিনি মেনশেভিক হওয়া সত্ত্বেও লেনিন বলেছিলেন যে ওঁর প্রতি যেন অন্যায় ব্যবহার না হয়, সেই জর্জি প্লেখানভ আর্ট অ্যান্ড সোশাল লাইফ (১৯১২) বইতে দেখিয়েছিলেন যে এটাই শিল্পীর স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া। যখন সর্বস্ব যায় বস্তুকামী ঘৃধ্নুতায় নানাবিধ কাজে, তখন এই সৌন্দর্য চর্চাই বিপ্লব। বঙ্কিমচন্দ্র যখন দুর্গেশনন্দিনী (১৮৬৫) উপন্যাসে আয়েষার মুখে বসালেন ‘বন্দী আমার প্রাণেশ্বর’, সেটা স্রেফ একটা রোম্যান্টিক উক্তি নয়। সেটা আমাদের দেশে নারী স্বাধীনতার প্রথম উচ্চারণ।
আসলে আমার মনে হয় আমাদের মার্কসবাদী চিন্তানায়করা, বিশেষত বাঙালিরা, অকল্পনীয় ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছেন শিল্পের ব্যাখ্যায়। নিজেদের সাংবাদিকদের সঙ্গে মিলিয়ে ফেলেছেন এবং কেবল ঘটনার বিবরণ দিয়ে গেছেন। স্বয়ং কার্ল মার্কস লিখেছেন যে উইলিয়ম শেক্সপিয়র ষোড়শ শতকের অন্যান্য সমাজতাত্ত্বিকদের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। হ্যামলেট নাটকটা মার্কসের বিশেষ পছন্দ ছিল। গোটা দাস কাপিটাল জুড়ে শেক্সপিয়র ভজনা রয়েছে। এ থেকে বোঝা যায় যে মার্কসের দেখার মধ্যে বিশালতা রয়েছে। আর আমাদের এখানকার মার্কসবাদীদের দেখা অত্যন্ত সংকীর্ণ দেখা। এই মুহূর্তের কর্পোরেট পুঁজিবাদও এই দেখাকে প্রশ্রয় দিচ্ছে। তাই মধুসূদন দত্ত আর সুবল দত্তের মধ্যে তফাত করা হচ্ছে না।
এখান থেকে একটা অনিবার্য সমসাময়িক প্রশ্ন এসে পড়ে। আমরা দেখতে পাচ্ছি স্বাধীনতার পর থেকে জওহরলাল নেহরুর মডেলে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় শিল্প সৃষ্টির যে ধারা ভারতে ছিল সেটা দ্রুত তুলে দেওয়া হচ্ছে। ন্যাশনাল ফিল্ম আর্কাইভ তুলে দেওয়া হচ্ছে, ন্যাশনাল ফিল্ম ডেভেলপমেন্ট কর্পোরেশনের মত সংস্থাগুলোর প্রযোজনায় ছবি আর আমাদের চোখে পড়ে না। কিন্তু এর বিপরীতে অন্য এক ধরনের সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা দেখছি। সেটা হল, তুমি সরকারি দলের হয়ে প্রোপাগান্ডা ফিল্ম বানাও, খোদ প্রধানমন্ত্রী তোমার ফিল্মের প্রোমোশন করবেন। কাশ্মীর ফাইলস, কেরালা ফাইলস, সবরমতী এক্সপ্রেস – এরকম প্রচুর ছবি হচ্ছে। এর মধ্যেও যাঁরা কোনোভাবে সরকারের বা সংখ্যাগুরুর অপছন্দের ছবি করতে যাচ্ছেন তাঁদের হাতে এবং ভাতে মারা হচ্ছে। ধরুন, সঞ্জয় লীলা বনশালির সেট ভাংচুর করা হয়েছিল পদ্মাবত ছবির শুটিংয়ের সময়ে। আবার নেটফ্লিক্স দিবাকর ব্যানার্জির তীস ছবিটা করাল, কিন্তু ঝামেলা হতে পারে এই আশঙ্কায় মুক্তি পেতে দিল না। এরকম একটা পরিবেশে ঋত্বিকের মত করে ছবি করা কি সম্ভব হত বলে আপনার মনে হয়? মানে ছবিটা না হয় ঘটিবাটি বেচে বানালাম। কিন্তু মুক্তি পাওয়ার নিশ্চয়তাটুকু তো থাকতে হবে? আবার ধরুন, কলকাতার ইন্ডাস্ট্রিতে আমরা দেখছি যে নির্দেশকরা একজোট হয়ে বলছেন – শাসক দলের খবরদারি, তোলাবাজি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে ছবি করাই ঝকমারি হয়ে দাঁড়াচ্ছে। এইরকম পরিস্থিতিতে কি ঋত্বিকের পক্ষেও তখনকার মত ঋজু থেকে ছবি করা সম্ভব হত বলে আপনার মনে হয়?
খুবই কঠিন হত। কারণ একজন কবি বা ঔপন্যাসিক বা চিত্রশিল্পী এই যুগেও কাগজ, কলম, তুলি বা কম্পিউটার কিনে নিজের মর্জি মত শিল্প সৃষ্টি করে যেতে পারেন। কিন্তু সিনেমা তো ওভাবে করা যায় না, সিনেমা করতে আরও অনেককিছুর সঙ্গে কয়েক কোটি টাকাও লাগে। এই পরিস্থিতিতে সেই ক্ষতিস্বীকার করতে যাবে কে? ফলে ঋত্বিকের মত করে এই যুগে ছবি করা সত্যিই খুব শক্ত হত এবং সেই লড়াইটা শেষপর্যন্ত হয়ত রাজনৈতিক সংগ্রামে পর্যবসিত হত।
এই প্রশ্নটা শুনে আমার মনে পড়ে গেল ঋত্বিক শেষ যে ছবিটা করতে চেয়েছিলেন সেইটার কথা। সেটা আশ্চর্যভাবে আর জি করের ঘটনাটার সঙ্গে মিলে যায়। আর জি করের নৃশংস ঘটনার পরে যে জনরোষ আমরা দেখলাম তা নিয়ে কোনোদিন কোনো ছবি-টবি হবে কিনা আমার খুব সন্দেহ আছে, তার কারণ তুমি যা বললে। তো ঋত্বিকের শেষ কাজ ছিল সেই বিষ্ণুপ্রিয়া নামে একটা চিত্রনাট্য। সেটা কী ব্যাপার? না জরুরি অবস্থা চলাকালীন নবদ্বীপ শহরে একটি মেয়ের অগ্নিদগ্ধ মৃতদেহ পাওয়া যায়। পুলিস যথারীতি প্রথমে ওটাকে নিতান্ত দুর্ঘটনা বলে চালানোর চেষ্টা করেছিল, পরে দেখা যায়, একেবারে জ্যামিতির উপপাদ্যের মতই, আসলে নবদ্বীপের কিছু দুষ্কৃতী মেয়েটিকে ধর্ষণ করে খুন করেছে। এই খবর কানে যাওয়ার পরেই ঋত্বিক ওই চিত্রনাট্য লিখে ফেলেন। তাতে একটা গান ছিল, যার বক্তব্য হল – যিনি ত্রেতায় সীতা, দ্বাপরে দ্রৌপদী, তিনিই এখন বিষ্ণুপ্রিয়া। নবদ্বীপে একটি মেয়ের ধর্ষণ এবং হত্যার কথা শুনেই ওঁর চৈতন্যদেবের স্ত্রী বিষ্ণুপ্রিয়ার কথা মাথায় আসে।
বুঝতেই পারছ ছবিটা কী দাঁড়াত। কিন্তু ও জিনিস কি আদৌ করতে দেওয়া হত? কে ফান্ডিং করত? রাষ্ট্র তো করত না, কারণ রাষ্ট্রীয় অপরাধ নিয়েই ছবিটা। আর আজ যা অবস্থা, তাতে কোনো ব্যক্তি বা সংস্থা করতে চাইলেও তাকে হাজারবার ভাবতে হবে যে অন্য কাজ কারবারের জন্যে তাকে রাষ্ট্রের সঙ্গে সমঝোতা করে চলতেই হবে। রাষ্ট্র সরাসরি বারণ করে দিলে তো আর সম্ভবই নয়। যেমন নাজি জার্মানিতে ব্রেশটের পক্ষে নাটক করা সম্ভব ছিল না। একসময় পর্যন্ত পেরেছিলেন। তারপর আর করা যায়নি। করলেও এমনভাবে করতে হয় যে শাসক যেন ধরতেই না পারে কী করা হল। যেমন জঁ পল সার্ত্র লিখেছিলেন আই অ্যাম মাই ওন ফ্রিডম । ফ্যাসিবাদীরা বুঝতেই পারেনি যে ওতে গ্রীক পুরাণের আশ্রয়ে যা বলা আছে তা আসলে নাগরিক স্বাধীনতার পক্ষে একটা বয়ান। তারপর নাজিরা প্যারিস দখল করার ঠিক আগেই জঁ রেনোয়া ল্য রেগলে দ্য জু (১৯৩৯) বলে যে ছবিটা করেন, সেই ছবি দেখলে কিন্তু আপাতদৃষ্টিতে মনে হবে বড়লোকরা এ ওর বউয়ের দিকে হাত বাড়াচ্ছে, সে তার বউয়ের সঙ্গে পরকীয়া করছে – এইসব নিয়েই ছবি। অনেকটা আজকাল বড় কাগজের প্রকাশ করা শারদ পত্রিকায় যেসব গল্প, উপন্যাস ছাপা হয় সেগুলোর বাঁধা বিষয়বস্তুর মত। ওগুলো শুধু যে অরাজনৈতিক তা নয়, ওগুলো আসলে মানুষকে একটা বৃত্তের মধ্যে আটকে রাখা। কিন্তু বড় শিল্পী ওর মধ্যেও অন্তর্ঘাত ঘটিয়ে দিতে পারেন। রেনোয়াঁ তাই করেছিলেন।
ব্রেশটও করেছেন। তাঁর নাটকে অনেক রগরগে শব্দ আছে, অনেক জনপ্রিয় থিম আছে। কিন্তু তার মধ্যে দিয়েই তিনি অন্য বয়ান উপস্থাপন করেন। এমনকি শেক্সপিয়রও এটা করেছেন। প্রোটেস্ট্যান্ট রানি এলিজাবেথের আমলে রোমান ক্যাথলিক শেক্সপিয়র তাঁর নাটকে যা সব নাশকতামূলক কাণ্ড করেছেন তা দেখে আজও অবাক হতে হয়।
কিন্তু আজকের অবস্থা যে খুব জটিল তা মানতেই হবে। ইরানে আব্বাস কিয়ারোস্তামি বা মোহসেন মাখমলবফকে তো অনেকটাই প্রবাসে কাজ করতে হয়েছে, জাফর পানাহিকে বারবার কারাবাস করতে হয়েছে। ফলে এখানকার শিল্পীরা আজ কী করে কী করবেন তা তাঁদেরই ঠিক করতে হবে। এর কোনো বাঁধা ফর্মুলা নেই।
কিন্তু আমাদের দুর্ভাগ্য হল, আমাদের শিল্পীদের চিন্তা করার অভ্যাস চলে গেছে। তাঁরা শিল্পকে স্রেফ পেশা হিসাবে দেখছেন। যে কোনো পেশাতেই যেমন আয়কর দিতে হয়, এটা ওটা নিয়ম মানতে হয়, সেসব মেনেই তাঁরা চলছেন। ফলে ওইসব প্রোপাগান্ডা ছবি তৈরি হচ্ছে। সেগুলোতে চিত্রভাষা বা আঙ্গিকের দিক থেকেও কোনো বলার মত জিনিস নেই।
যদি বাংলা সিনেমার আলোচনা করি, তাহলে দেখব যে বাংলা ছবি দীর্ঘকাল ধরে দর্শককে কিছুই দিতে পারছে না। একেবারে সাধারণ দর্শক যা চায় সেটুকু দেওয়ার কথাই বলছি। কিন্তু লোকে তাই নিয়েই চলছে। পিটুলি গোলা খেয়ে ভাবছে পায়েস খাচ্ছে। এই সমস্যার সমাধান কীভাবে হবে আমি জানি না। তবে ক্রমশই আমার মনে হচ্ছে যে এই সাংস্কৃতিক সমস্যা আসলে একটা রাজনৈতিক সমাধান দাবি করে। এখন সেটা দলীয় রাজনীতি দিতে পারবে কিনা তা আমি বলতে পারব না। আজকের বাংলায় তো এমন কোনো রাজনৈতিক দল দেখি না যারা এককভাবে অথবা একাধিক দল মিলে একটা সাংস্কৃতিক রূপান্তর ঘটাতে পারবে। ফলে এই নরকযাত্রা থামিয়ে আমরা কীভাবে আবার রবীন্দ্রনাথ, জীবনানন্দের উত্তরাধিকার ফের অর্জন করতে পারব তা আমি সত্যিই জানি না।
ঋত্বিক, সলিলের শতবর্ষে আপনি কি তাহলে বাঙালি সংস্কৃতির জন্যে কোনো আশার আলো দেখতে পাচ্ছেন না?
দেখো, ঋত্বিকের একটা অসমাপ্ত জাতীয় বিপ্লবের ধারণা ছিল। কোমল গান্ধার ছবিতে দেখবে অনসূয়া ভৃগুকে একটা ডায়রি দেয়। ওটা তো আসলে রূপক। তখন পি সি যোশীর আমল। ভাবা হয়েছিল যে অসমাপ্ত জাতীয় বিপ্লব সমাপ্ত করার দায়িত্ব ইতিহাস নিয়তির মত এসে কমিউনিস্ট পার্টিকে দেবে। সেই স্বপ্ন সফল হয়নি। সলিল ভেবেছিলেন তিনি প্রাচ্য আর পাশ্চাত্যের মিলন ঘটিয়ে ভারতীয় সঙ্গীতের যে আধুনিকীকরণ করছিলেন তা ক্রমশ এগিয়ে যাবে। গানকে ক্রমশ সরল হতে হবে, গানকে মানুষের হাতে তুলে দিতে হবে। এই ধারণাটা গুপি গাইন বাঘা বাইন (১৯৬৯) ছবিতেও সেই রাজসভায় গানের দৃশ্যে পাওয়া যায়। কালোয়াতি গান শুনে রাজা ঘুমিয়ে পড়ছিল। তখন গুপি আর বাঘা, দুটো চাষাভুষো মার্কা লোক, এসে এমন গান গাইল যার ‘ভাষা এমন কথা বলে/বোঝে রে সকলে’। বিজন ভট্টাচার্য, হেমাঙ্গ বিশ্বাস, জ্যোতিরিন্দ্র মৈত্র, সলিল চৌধুরী, ঋত্বিক ঘটক, উৎপল দত্ত অথবা মাণিক বন্দ্যোপাধ্যায় – এঁরা সেই উনিশ শতকের তথাকথিত নবজাগরণের দিকপালদের স্তরের ছিলেন কিনা সেই আলোচনায় আমি যাচ্ছি না। কিন্তু এই দ্বিতীয় নবজাগরণের একেবারে হাসিম শেখ, রামা কৈবর্তের কাছে পৌঁছবার চেষ্টা ছিল। ইতিহাসকে তলা থেকে লেখার একটা প্রয়াস ছিল। সে প্রয়াস তো বিফল হয়েছে। এখন আর কীভাবে তা করা যাবে আমি জানি না। কিন্তু সলিল আর ঋত্বিকের শতবর্ষে তাঁদের কাজকে ঐতিহাসিক ও দার্শনিক প্রেক্ষিতে বিচার করলে কিছু সুবিধা হতে পারে। এঁরা কত দক্ষ শিল্পী তা নিয়ে ভেবে খুব একটা উপকার হবে না বলেই আমার মনে হয়।
নয়ের দশকে যখন ভারত-পাক সম্পর্ক আজকের মত এত খারাপ হয়নি, তখন পাকিস্তানিরা ভারতীয়দের সঙ্গে রসিকতা করত – শচীন তেন্ডুলকর আর মাধুরী দীক্ষিতকে দিয়ে দাও। আমরা কাশ্মীরের দাবি ছেড়ে দেব।
গতবছর জুবিলি নামের এক ওয়েব সিরিজে গত শতকের পাঁচের দশকের মুম্বাই ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি নিয়ে সত্যাশ্রয়ী গল্প ফাঁদা হয়েছিল। সেই প্লট অনুযায়ী, পূর্বতন সোভিয়েত ইউনিয়ন ভারতে কমিউনিস্ট প্রোপাগান্ডা ছড়ানোর জন্যে বম্বের সিনেমা জগতের একটা অংশকে অর্থের জোগান দিত। জওহরলাল নেহরুর নেতৃত্বাধীন ভারত সরকারও তাতে মদত দিত। সেই প্রকল্পে সায় না দেওয়ায় অন্য এক অংশের ছবির গান অল ইন্ডিয়া রেডিওতে বাজানো বন্ধ করে দেওয়া হয়। তারই মোকাবিলায় সেই অংশ মার্কিনি সহায়তায় রেডিও সিলোন থেকে হিন্দি ছবির গান বাজানোর ব্যবস্থা করা হয়। এই কাহিনির কতটা সত্যি কতটা মিথ্যা তা নিয়ে আলোচনা করার মানে হয় না, কারণ নির্মাতারা প্রথমেই হাত ধুয়ে ফেলেছিলেন পর্দায় ‘সব চরিত্র কাল্পনিক’ জাতীয় বিবৃতি দিয়ে। কিন্তু শাস্ত্রে জল থেকে দুধ আলাদা করে খাওয়ার ক্ষমতাসম্পন্ন যে রাজহাঁসের কথা আছে, আমরা যদি তেমন করে এই গপ্পোটাকে দেখি, তাহলে বুঝতে পারব – সদ্যস্বাধীন ভারতের হিন্দি ছবির আন্তর্জাতিক আবেদন ছিল। সেই আবেদন আজও অনেকের বুকে জ্বালা ধরায়। ‘সফট পাওয়ার’ কথাটা ইদানীং খুব ব্যবহৃত হয় আন্তর্জাতিক সম্পর্কের আলোচনায়। স্বাধীন ভারতের সফট পাওয়ার কিন্তু প্রথম থেকেই সবচেয়ে বেশি বলিউডি ছবিতেই (বলিউড নামটা অবশ্য অনেক পরে এসেছে)।
উজ্জ্বল গৌরবর্ণ এবং ভারতীয়দের মধ্যে বিরল রঙের চোখের মণির অধিকারী রাজ কাপুরের ছবি যে পূর্বতন সোভিয়েত ইউনিয়নে প্রবল জনপ্রিয় ছিল তা সর্বজনবিদিত। আওয়ারা (১৯৫১) দিনের পর দিন মস্কোর সিনেমা হলে হাউজফুল হত এবং রাজকে দেখতে প্রায় মারামারি লেগে যেত – এরকম একাধিক জবানবন্দি পাওয়া যায়। শ্রী ৪২০ (১৯৫৫) ছবিতে মুকেশের কণ্ঠে রাজের ঠোঁটে ‘মেরা জুতা হ্যায় জাপানি/ইয়ে পাতলুন ইংলিশস্তানী/সর পে লাল টোপি রুশি/ফির ভি দিল হ্যায় হিন্দুস্তানী’ যতখানি নেহরুর ভারতের জোট নিরপেক্ষ আন্তর্জাতিকতাবাদের ঘোষণা, ততটাই আন্তর্জাতিক দর্শকদের কাছে পৌঁছবার চেষ্টা। কমিউনিস্ট রাশিয়ায় রাজের বিপুল ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তার কারণেই নেহরুর মৃত্যুর ছবছর পরেও মেরা নাম জোকার (১৯৭০) ছবির জন্য একগুচ্ছ রুশ অভিনেতা, অভিনেত্রীকে রাজ ব্যবহার করতে পেরেছিলেন। সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রথম রাষ্ট্রপ্রধান লেনিন শিল্পমাধ্যম হিসাবে সিনেমার অমিত শক্তি বিলক্ষণ বুঝতেন। সেই কারণেই সদ্যোজাত কমিউনিস্ট রাষ্ট্র টানাটানির সংসারেও সের্গেই আইজেনস্টাইনের ছবির পৃষ্ঠপোষকতা করেছে। অনেকটা বামমনস্ক নেহরুও সিনেমার শক্তি বুঝতেন। সেই সময়কার বম্বের তিন প্রধান তারকা – রাজ, দিলীপকুমার আর দেব আনন্দ – নেহরুর প্রিয়পাত্র ছিলেন।
আজকাল পশ্চিমবঙ্গে নতুন করে বাংলা জাতীয়তাবাদের হুঙ্কার শোনা যাচ্ছে। সেই জাতীয়তাবাদীরা যুগপৎ আফসোস এবং অভিযোগ করেন যে নেহরু তথা কংগ্রেসের পৃষ্ঠপোষকতার কারণেই হিন্দি ছবি গোড়া থেকেই আন্তর্জাতিক বাজার পেয়েছে, বাংলা ছবি পায়নি। কথাটার মধ্যে কিছু সত্যতা থাকলেও থাকতে পারে, তবে ভুললে চলবে না যে বাংলা ছবি কিন্তু নিজগুণে আন্তর্জাতিক বাজার না হোক, বিস্তর আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেয়েছে একসময়। সত্যজিৎ রায় আর মৃণাল সেনের ছবি বিদেশের বিভিন্ন ফিল্মোৎসবে সমাদৃত ও পুরস্কৃত হয়েছে। উত্তমকুমার হিন্দি ছবি করতে গিয়ে মোটেই সফল হননি, কিন্তু নায়ক (১৯৬৬) ছবিতে অভিনয়ের জন্য আন্তর্জাতিক প্রশংসা পেয়েছেন। জীবদ্দশায় প্রাপ্য সম্মান না পাওয়া ঋত্বিক ঘটকের ছবি যত দিন যাচ্ছে তত বেশি করে আলোচিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে। বিখ্যাত ফিল্ম পত্রিকা সাইট অ্যান্ড সাউন্ড এখনো ঋত্বিকের ছবি নিয়ে আলোচনা প্রকাশ করে। অর্থাৎ বিশ্বজয় করার নানা পথ আছে এবং সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা না পেলেই সব পথ বন্ধ হয়ে যায় না। বিশেষ করে সিনেমার ক্ষেত্রে, যার নিজস্ব ভাষা আছে। সেই ভাষা দিয়ে পৃথিবীর যে কোনো দেশের দর্শককেই মোহিত করা সম্ভব, সিনেমার সংলাপের ভাষা সে বুঝুক আর না-ই বুঝুক।
যেমন বারাক ওবামা হিন্দি জানেন না, কিন্তু শাহরুখ খানের দিলওয়ালে দুলহনিয়া লে জায়েঙ্গে ছবি এত জনপ্রিয় হয়েছিল যে তার সংলাপ মার্কিন রাষ্ট্রপতি থাকার সময়ে তাঁর কানেও পৌঁছে গেছিল। তিনি (বা তাঁর বক্তৃতালেখকরা) জানতেন যে ভারত সফরে এসে শাহরুখের সংলাপ বললে বড় অংশের ভারতীয়কে মুগ্ধ করে দেওয়া যাবে। নিঃসন্দেহে বলিউড ছবির দৌড় অতদূর হওয়ার পিছনে একটা কারণ অনাবাসী ভারতীয়দের মধ্যে হিন্দিভাষীদের আধিক্য। নয়ের দশক থেকে দেখা গেছে অনেক ক্ষেত্রে বলিউড তাঁদের কথা মাথায় রেখেই ছবি করেছে। শাহরুখেরই একাধিক ছবি আছে যার প্রধান পাত্রপাত্রীরা অনাবাসী ভারতীয়। শাহরুখের ঘনিষ্ঠ বন্ধু করণ জোহর প্রায় আলাদা জঁরই বানিয়ে ফেলেছিলেন অনাবাসী ভারতীয়দের দিকে মুখ করে থাকা ছবির। তা বলে একথা ভাবলে ভুল হবে যে বম্বের ছবি কেবল বিদেশবাসী ভারতীয়রাই দেখে। আমার এক সুইটজারল্যান্ডবাসী বন্ধু গতবছর অ্যাটলি নির্দেশিত শাহরুখের জওয়ান দেখতে গিয়ে ও দেশের আফগান, শ্রীলঙ্কান বাসিন্দাদেরও দেখা পেয়েছিল। তারা তবু এই উপমহাদেশের লোক। ইউরোপ, আমেরিকায় বসবাসকারী ভারতীয়রা অনেকেই হলে হিন্দি ছবি দেখতে গিয়ে শ্বেতাঙ্গদেরও দেখা পায়।
সিনেমা সীমান্ত তো বটেই, রাজনৈতিক বৈরিতার বেড়াও যে টপকাতে পারে তার প্রমাণ পাকিস্তানে হিন্দি ছবির জনপ্রিয়তা। নয়ের দশকে যখন ভারত-পাক সম্পর্ক আজকের মত এত খারাপ হয়নি, তখন পাকিস্তানিরা ভারতীয়দের সঙ্গে রসিকতা করত – শচীন তেন্ডুলকর আর মাধুরী দীক্ষিতকে দিয়ে দাও। আমরা কাশ্মীরের দাবি ছেড়ে দেব। এক দশক আগেও তো পাকিস্তানের ফওয়াদ খান, মাহিরা খানরা বলিউডি ছবিতে অভিনয় করে গেছেন। মাহিরা এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, তাঁর মা যখন জানতে পারেন মাহিরা একটা ছবিতে (রঈস, ২০১৭) শাহরুখের নায়িকা হচ্ছেন তখন তিনি এমন আচরণ করেছিলেন যেন কৃতার্থ হয়ে গেছেন। মাহিরা রসিকতা করে বলেছিলেন – মা এমন করল, মনে হল, আমি যে পাকিস্তানের একজন নামকরা নায়িকা সেটা যেন কিছুই না।
তবে হিন্দি ছবি কতরকম মানুষকে জয় করতে পারে সে সম্পর্কে চমকপ্রদ অভিজ্ঞতা হয়েছিল আমার এক অগ্রজ সাংবাদিকের। বেজিং অলিম্পিক কভার করতে গিয়ে যে অল্পবয়সী চীনা স্বেচ্ছাসেবকদের সঙ্গে তাঁরা আলাপ হয়, তারা চোস্ত ইংরিজি বলতে পারত না। আবার এই সাংবাদিক মোটেই চীনা ভাষা জানেন না। কিন্তু ওই ছেলেমেয়েরা তাঁর সঙ্গে শাহরুখের ছবি নিয়ে গল্প করত। তিনি কিছুদিনের মধ্যেই বুঝতে পারেন, ওরা ওঁর চেয়ে বেশি ছবি দেখেছে শাহরুখের। অথচ চীনে বসে ভারতীয় ছবি দেখা নাকি খুব সহজ কাজ ছিল না সেইসময়, কারণ ইন্টারনেটের উপর সরকারের বিস্তর নজরদারি ছিল। ভার্চুয়াল প্রাইভেট নেটওয়ার্ক ইত্যাদি লাগত। সেসব বাধা পেরিয়েই তারা শাহরুখের ভক্ত হয়েছে। নিজের দেশের যে কোনো ক্ষেত্রে জয়ের কথা শুনতে এবং পড়তে কার না ভাল লাগে? তবে আনন্দ করার সময়ে পা মাটিতে রাখা ভাল। যে জয়ে আমার কোনো কৃতিত্বই নেই তা নিয়ে কলার তোলা আমাদের মজ্জাগত। যেমন এবারের কান ফিল্মোৎসবে নির্দেশক পায়েল কাপাডিয়ার ছবি, কলকাতার মেয়ে অনসূয়া সেনগুপ্তের অভিনয় পুরস্কৃত হওয়ার পরে এগুলোকে ‘ভারতের জয়’ বলে তুলে ধরা হয়েছে। পায়েল যে প্রতিষ্ঠানের ছাত্রী, সেই ফিল্ম অ্যান্ড টেলিভিশন ইনস্টিটিউটের প্রাক্তন কর্তা গজেন্দ্র চৌহান পর্যন্ত ছাত্রীর জন্যে তিনি গর্বিত বলে সোশাল মিডিয়ায় দাবি করেছেন। অথচ পায়েল যখন ছাত্রী ছিলেন, তখন তাঁকে মোটেই আদর করা হয়নি। প্রতিবাদী চরিত্রের ফল হিসাবে এখনো তাঁর বিরুদ্ধে মামলা চলছে। বলিউডের বিশিষ্ট সিনেমাশিল্পী অনুরাগ কাশ্যপ অপ্রিয় সত্য বলার জন্য বিখ্যাত। তিনি বলেই দিয়েছেন, কানে যে ভারতীয়রা পুরস্কৃত হয়েছে তাদের জন্য ভারতের গর্বিত হওয়ার কিছু নেই। পুরো কৃতিত্বই তাদের নিজেদের। কারণ ভারত তাদের জন্য কিচ্ছু করেনি। পায়েলের ছবির প্রযোজনা করেছেন অনেকে মিলে, সকলে ভারতীয় নন। এমনকি ছবিটা ভারতে দেখানোর ব্যবস্থা পর্যন্ত করা যায়নি এখনো।
এই আবহে যে নির্বাচন হবে তা যদি অবাধ হয়, তাহলে ফড়িংও পাখি, জলহস্তীও হাতি, দেবও মহানায়ক।
আগামী ৪ জুন আসন্ন লোকসভা নির্বাচনের ফল ঘোষিত হবে। তার ঠিক ২১ দিন পরেই জরুরি অবস্থা ৪৯ পেরিয়ে পঞ্চাশে পা দেবে। নরেন্দ্র মোদী সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকে ওই দিনটা কাউকে ভুলতে দেয় না। প্রতিবছরই ষোড়শোপচারে মনে করিয়ে দেওয়া হয়, ওই ২১ মাস ভারতের ইতিহাসে অন্ধকার সময়। এবার যদি মোদী ক্ষমতায় ফিরতে পারেন, হয়ত গোটা বছর ধরেই বারবার মনে করিয়ে দেওয়া হবে ইন্দিরা গান্ধী কী মারাত্মক স্বৈরতন্ত্রী ছিলেন, কংগ্রেস দেশের কত ক্ষতি করেছে ইত্যাদি। সুখের কথা, তার জন্যে আলাদা করে আয়োজন না করলেও চলবে। কারণ মনে করিয়ে দেওয়ার কাজটা ইতিমধ্যেই আরম্ভ হয়ে গেছে। ইনস্টা রিল প্রজন্মের অনেকেই জানত না কীভাবে সারা ভারতে বিরোধী দলের নেতা, কর্মীদের উপর অত্যাচার চালানো হয়েছিল, গ্রেফতার করা হয়েছিল, সংবাদপত্রের কণ্ঠরোধ করা হয়েছিল, সাংবাদিকদেরও কারারুদ্ধ করা হয়েছিল। দশ বছরের মোদী রাজত্বে সেসব দেখানো হয়েছে। তবে ২২ জানুয়ারি প্রধানমন্ত্রী স্বকণ্ঠে নতুন কালের সূচনা ঘোষণা করার পরে তাও ঘটেছে যা জরুরি অবস্থার সময়ে ঘটেনি – দুটো রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীকে কেন্দ্রীয় এজেন্সি গ্রেফতার করেছে।
তথ্যের খাতিরে অবশ্য বলতে হবে যে ঝাড়খণ্ডের মুখ্যমন্ত্রী জেএমএম নেতা হেমন্ত সোরেন গ্রেফতার হবেন বুঝতে পেরে আগেভাগেই মুখ্যমন্ত্রীর দায়িত্বভার চম্পাই সোরেনকে সঁপে দিয়েছিলেন। কিন্তু ঘটনা হল, মুখ্যমন্ত্রীকে গ্রেফতার করে দিল্লির আম আদমি পার্টি সরকারের মত ঝাড়খণ্ডের জোট সরকারকেও ভেঙে ফেলাই ছিল বিজেপির লক্ষ্য। হেমন্ত আর অরবিন্দ কেজরিওয়াল এই কৌশলের বিরুদ্ধে লড়াই করার দুটো আলাদা পথ বেছে নিয়েছেন। হেমন্ত ক্ষমতা হস্তান্তর করে কারাবরণ করার পর, বিধানসভায় আস্থা ভোটে জয়ী হয়ে ক্ষমতাসীন জোট সরকার ফেলে দেওয়ার চক্রান্ত ব্যর্থ করে দেয়। কিন্তু শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত কেজরিওয়াল ঠিক করেছেন পদত্যাগ করবেন না, কারারুদ্ধ থেকেই প্রশাসন চালিয়ে যাবেন। হয়ত এমনটা করবেন ঠিক করে রেখেছিলেন বলেই তিনি গতমাসে দিল্লি বিধানসভায় নিজেই আস্থা প্রস্তাব এনে আরও একবার সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রমাণ করেছেন। ক্ষমতাসীন মুখ্যমন্ত্রীর গ্রেফতারি অভূতপূর্ব ঘটনা। ফলে সম্ভব-অসম্ভবের কথা আলাদা, আইনত এমনটা করা যায় কিনা তা নিয়ে বিশেষজ্ঞরাও দ্বিধায়। অমৃতকালে বোধহয় এমনই হয়ে থাকে।
কেবল দুই মুখ্যমন্ত্রীর গ্রেফতারিই অবশ্য একমাত্র অভূতপূর্ব ঘটনা নয়। দেশের প্রধান বিরোধী দল কংগ্রেসের অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ করে দিয়েছে আয়কর বিভাগ। বিশ বছর আগের কর নাকি বকেয়া আছে, এই যুক্তিতে জরিমানা হিসাবে বিপুল পরিমাণ টাকা কেটে নেওয়া হয়েছে। সিবিআই, ইডি, আয়কর বিভাগকে ব্যবহার করে কীভাবে নিজেদের তহবিলে পাহাড়প্রমাণ টাকা জড়ো করেছে বিজেপি, তা তো সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে নির্বাচনী বন্ডের প্রথম দফার তথ্য প্রকাশ্যে আসার পরেই পরিষ্কার হয়ে গিয়েছিল। ২১ মার্চ বন্ডের নম্বরগুলো প্রকাশিত হওয়ার পরে এখন পর্যন্ত বিভিন্ন বিকল্প সংবাদমাধ্যম এবং বিশ্লেষকদের তদন্তে প্রকাশ পেয়েছে আরও নানা তথ্য। তার অন্যতম হল দিল্লি সরকারের আবগারি নীতির সঙ্গে সম্পর্কিত এক কাহিনি।
এই সেই নীতি, যা দিয়ে দুর্নীতি করা হয়েছে অভিযোগ তুলে দিল্লির উপমুখ্যমন্ত্রী মনীশ সিসোদিয়াকে দীর্ঘদিন বন্দি রাখা হয়েছে, আপের রাজ্যসভার সাংসদ সঞ্জয় সিংকে গ্রেফতার করা হয়েছে এবং এখন কেজরিওয়ালকেও গ্রেফতার করা হল। একই মামলায় এছাড়াও গ্রেফতার হয়েছেন তেলেঙ্গানার সদ্যপ্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী কে চন্দ্রশেখর রাওয়ের মেয়ে কে কবিতা। এঁদের সকলের গ্রেফতারির পিছনেই রাজসাক্ষী পি শরৎ চন্দ্র রেড্ডির বয়ান। ইনি হায়দরাবাদের অরবিন্দ ফার্মা লিমিটেডের অন্যতম ডিরেক্টর। স্ক্রোল ওয়েবসাইটের তদন্ত বলছে, ২০২২ সালে গ্রেফতার হওয়ার পাঁচদিন পরে শরৎ বিজেপিকে নির্বাচনী বন্ডের মাধ্যমে পাঁচ কোটি টাকা দেন। এর কিছুদিন পরে তিনি জামিনের আবেদন করেন এবং কী আশ্চর্য! ইডি জামিনের আবেদনের বিরোধিতা করেনি! তারপরেই তিনি দিল্লির আবগারি নীতি নিয়ে মামলায় রাজসাক্ষী হয়ে যান।
অতঃপর শরৎ বিজেপিকে আরও ২৫ কোটি টাকা দেন। এর সঙ্গে কেজরিওয়ালদের গ্রেফতারির সম্পর্ক বুঝিয়ে বলার প্রয়োজন নেই, পাঠক বুদ্ধিমান।
হেমন্তের বিরুদ্ধে মামলা নিয়েও বিস্তর প্রশ্ন আছে। দেশজুড়ে যতজন বিরোধী নেতাকে ইডি গ্রেফতার করেছে, তাঁদের কারোর বিরুদ্ধেই মামলা কিন্তু কোথাও পৌঁছচ্ছে না। প্রায়শই এ আদালত সে আদালতের বিচারক ইডিকে ধমকে জিজ্ঞেস করছেন, আপনারা কি সত্যিই মামলার নিষ্পত্তি চান? শিবসেনার সঞ্জয় রাউতকে জামিন দেওয়ার সময়ে মুম্বাই হাইকোর্টের বিচারক জিজ্ঞেস করেছিলেন, মুখ্য অভিযুক্তদের গ্রেফতার না করে সঞ্জয়ের জামিন আটকানোর চেষ্টা করা হচ্ছে কেন? ইডির আচরণ কোথাও প্রশ্নাতীত নয়। ফলে কয়েকদিন আগেই সুপ্রিম কোর্ট আদেশ দেয়, ইডি কাউকে গ্রেফতার করলে লিখিতভাবে জানাতে হবে কেন গ্রেফতার করা হচ্ছে। কেন্দ্রীয় সরকার সেই আদেশ পুনর্বিবেচনার আবেদন করে। ২০ মার্চ সুপ্রিম কোর্ট সরকারের আবেদন খারিজ করে দেয়।
অর্থাৎ দেশের সরকার কোনোরকম কার্যকারণ না দেখিয়েই মানুষকে গ্রেফতার করার অধিকার দাবি করেছিল। প্রিভেনশন অফ মানি লন্ডারিং অ্যাক্ট, ২০০২ আইনটার অবশ্য বদনামই আছে অযৌক্তিক দমনমূলক আইন হিসাবে। কিন্তু সে অন্য আলোচনার বিষয়। আমরা বরং দেখি, জরুরি অবস্থার ইন্দিরা-সঞ্জয়কেও লজ্জায় ফেলে দেওয়ার মত কী কী কাজ হয়ে চলেছে লোকসভা নির্বাচনের মুখে।
বিদায়ী সংসদের শীতকালীন অধিবেশনে দুই কক্ষ মিলিয়ে বিরোধী পক্ষের ১৪৬ জন সাংসদকে নানা ছুতোয় সাসপেন্ড করে একতরফা পাস করিয়ে নেওয়া হল নতুন টেলিকম আইন আর পুরনো ফৌজদারি আইন বাতিল করা তিনটে নতুন আইন, যেগুলো মারাত্মক দমনমূলক বলে অভিযোগ উঠেছে।
সামান্য চণ্ডীগড়ের কর্পোরেশনও যাতে বিরোধী জোটের হাতে না যায় তার জন্যে অনিল মাসি নামক এক নির্লজ্জ আধিকারিককে দিয়ে মেয়র নির্বাচনের দিন ব্যালট বিকৃতি ঘটিয়ে আপের প্রার্থীকে হারিয়ে জিতিয়ে দেওয়া হল বিজেপি প্রার্থীকে। সুপ্রিম কোর্ট হস্তক্ষেপ করা মাত্রই দেখা গেল কয়েকজন আপ কাউন্সিলর দলবদল করে ফেলেছেন। মোদীজির নেতৃত্বে হঠাৎ আস্থা জেগে উঠেছে। শেষপর্যন্ত অবশ্য সর্বোচ্চ আদালত কড়া অবস্থান নেওয়ায় চণ্ডীগড় কর্পোরেশনে ভোটারদের রায়ই প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদের নির্বাচনকেও ছাড়া হচ্ছে না। সেখানেও রাত দুটোর সময়ে এক প্রার্থীকে বাতিল করে দিয়েছে প্রশাসন।
After Chandigarh Mayor polls, ‘admin’ at play in JNUSU polls.
Candidature of Swati Singh, for the post of General Secretary, from left alliance, cancelled at 2 AM when the polling was to begin at 9 AM.
হিমাচল প্রদেশে রাজ্যসভা নির্বাচনের ভোটাভুটির আগে কংগ্রেসের কয়েকজন বিধায়ক উধাও হয়ে গেলেন। সেই ছজন কংগ্রেস বিধায়ক বিজেপি প্রার্থীকে ভোট দেওয়ায় ক্ষমতাসীন কংগ্রেসের প্রার্থীর সঙ্গে ভোট ‘টাই’ হয়ে যায়। টসে জিতে যান বিজেপি প্রার্থী। ওই বিধায়কদের স্পিকার পরে সাসপেন্ড করেন। একই দিনে উত্তরপ্রদেশের রাজ্যসভা নির্বাচনেও ক্রস ভোটিংয়ের ফলে বিজেপির একজন অতিরিক্ত প্রার্থী জিতে যান। সবই অবশ্য বিবেকের সহসা জাগরণ, মোদীজির নেতৃত্বে ভারতের দুর্বার অগ্রগতিতে আস্থা তৈরি হওয়ার ফল।
মহারাষ্ট্রে শিবসেনাকে দ্বিখণ্ডিত করে একনাথ শিন্ডেকে সমর্থন দিয়ে সরকার গড়েছিল বিজেপি। অতঃপর নির্বাচন কমিশন দল ভেঙে বেরিয়ে আসা শিন্ডে গোষ্ঠীকেই আসল শিবসেনা বলে রায় দিয়ে শিবসেনার প্রতীক তাদেরই দিয়ে দিয়েছে। একই ঘটনা ঘটানো হয়েছে রাজ্যের আরেক দল ন্যাশনালিস্ট কংগ্রেস পার্টির প্রতিও। শরদ পাওয়ারের ভাইপো অজিত পাওয়ারের বিরুদ্ধে দুর্নীতির বিরাট অভিযোগ ছিল। তিনি বিজেপিতে যোগ দিতেই হয়ে গেলেন ধপধপে সাদা। তারপর নির্বাচন কমিশন তাঁর গোষ্ঠীকেই আসল এনসিপি গণ্য করে দলীয় প্রতীক দিয়ে দিল। দলের প্রতিষ্ঠাতা এবং মহারাষ্ট্রের প্রবীণ নেতা শরদের দলকে এখন লড়তে হবে অন্য প্রতীকে।
বুঝতে অসুবিধা হয় না যে লোকসভায় দাঁড়িয়ে প্রধানমন্ত্রীর ৪০০ পার করার নির্দেশ অক্ষরে অক্ষরে পালন করারই অঙ্গ এসব। রাজ্যসভা, লোকসভা – দুই কক্ষেই দু-তৃতীয়াংশের বেশি সংখ্যাগরিষ্ঠতা চাই বিজেপির। নইলে সংবিধানের ল্যাজা মুড়ো বদলে দেওয়া যাবে না, ২০২৫ সালের মধ্যে হিন্দুরাষ্ট্র তৈরি করাও স্বপ্নই থেকে যাবে। ২০১৮ সালে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী বিরোধীশূন্য পঞ্চায়েত চেয়েছিলেন। অনেকেরই মনে হয়েছিল তা অসম্ভব। কীভাবে সম্ভব করতে হয় তা দেখিয়ে দিয়েছিল মুখ্যমন্ত্রীর দল। ২০১৯ লোকসভা নির্বাচনের চূড়ান্ত সাফল্যের পর বিজেপি বা এনডিএর পক্ষে আসন আরও বাড়ানোও অনেকের অসম্ভব মনে হচ্ছে। কিন্তু মমতা ব্যানার্জির হাতে ছিল কেবল দলীয় কর্মীবাহিনী আর রাজ্য প্রশাসন। মোদীর হাতে আছে যাবতীয় কেন্দ্রীয় এজেন্সি।
নির্বাচন কমিশনটাকেও করতলগত করার ব্যবস্থা করে ফেলেছেন। নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ করার জন্যে গঠিত কমিটিতে আগে ছিলেন প্রধানমন্ত্রী, লোকসভার বিরোধী দলনেতা আর সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি। মোদী সরকার নতুন আইন করে প্রধান বিচারপতিকে বাদ দিয়ে ঢুকিয়েছে মন্ত্রিসভার এক সদস্যকে, অর্থাৎ বিরোধী দলনেতার ভূমিকা হয়ে গেল দর্শকের। নির্বাচনী বন্ডকে অসাংবিধানিক বলে দাবি করে যেমন সুপ্রিম কোর্টে মামলা হয়েছিল, তেমন এই আইনকে চ্যালেঞ্জ করেও মামলা হয়েছে। সে মামলার শুনানি হওয়ার আগেই সাত তাড়াতাড়ি সভা ডেকে দুজন নতুন নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ করেছে সরকার। বিরোধী দলনেতা অধীররঞ্জন চৌধুরী অভিযোগ করেছেন, মাত্র ২৪ ঘন্টা সময় দিয়ে শ দুয়েক নামের তালিকা হাতে ধরিয়ে বেছে নিতে বলা হয়েছিল। মামলা গ্রহণ করে বিচারপতিরা বলেছেন, নির্বাচন এসে যাওয়ায় ওই আইনে স্থগিতাদেশ দিতে চান না। কিন্তু আর যা যা বলেছেন, তাতে আইনটি সম্পর্কে তাঁরা খুব সদয় বলে মনে হচ্ছে না। সরকারের এত তাড়া কিসের – সে প্রশ্ন তুলেছেন।
#SupremeCourt expresses concern about the procedure adopted for the selection of 2 new Election Commissioners.
"Such selections should be made with full details and particulars of the candidates being circulated to all members of the Selection Committee.
কিন্তু তাতে কী? যতদিনে এ মামলার রায় বেরোবে, ততদিনে হয়ত নির্বাচন মিটে যাবে। ঠিক যেমন নির্বাচনী বন্ড নিয়ে মামলা হয়েছিল ২০১৮ সালে, রায় বেরোল ২০২৪ সালে। স্টেট ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়া আবার চেয়েছিল নির্বাচন পর্ব চুকলে নির্বাচনী বন্ডের তথ্য প্রকাশ করতে। তারপর সুপ্রিম কোর্টের ধমকের জোর যত বাড়ল, তথ্য প্রকাশের গতিও তত বাড়ল। এখন দেখা যাচ্ছে, গত নভেম্বরে সুপ্রিম কোর্ট বন্ডের মামলায় নিজেদের রায় রিজার্ভ করার পরেও বিজেপি সরকার বন্ড ছাপা বন্ধ করেনি। ২০২৪ সালের তৃতীয় মাস এখনো শেষ হয়নি, এর মধ্যেই ৮,৩৫০ কোটি টাকার নির্বাচনী বন্ড ছাপা হয়ে গেছে। নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, বিজেপি ২০১৮ সাল থেকে বন্ডে মোট ৮,২৫১ কোটি টাকা পেয়েছে। আর যে যে দল বন্ডে টাকা নিয়েছে তারা সকলে মিলেও এত টাকা পায়নি। এর পাশে রাখুন দেশের প্রধান বিরোধী দলের অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ করে দেওয়া, টাকা কেড়ে নেওয়া। কোনো সন্দেহ নেই, এরপর কংগ্রেস অনেক আসনে প্রার্থী দিতেই খাবি খাবে। ইতিমধ্যেই গুজরাটের এক আসনে নাম ঘোষণা হয়ে যাওয়া প্রার্থী প্রথমে বাবা অসুস্থ – এই কারণ দেখিয়ে নিজের নাম তুলে নেন, তারপর পার্টি থেকেই পদত্যাগ করেছেন। এক্স হ্যান্ডেলে জানিয়েছেন, দুই প্রজন্ম ধরে তাঁকে আর তাঁর বাবাকে নাকি কংগ্রেস নেতৃত্ব চরম অসম্মান করে এসেছেন। তাই এই সিদ্ধান্ত। সঙ্গে জুড়ে দিয়েছেন, কংগ্রেস নেতারা সনাতন ধর্মকে সম্মান করেন না।
Amidst the personal crisis , I spent last 3 days with my father while he is battling serious health conditions which has really helped me understand his perspective. He narrated the incidences of betrayal and sabotage for last 40 years and how the leaders got away in spite of… pic.twitter.com/b4qi5bE7SG
এরপর কী হতে যাচ্ছে, কোন বিরোধী নেতা গ্রেফতার হতে যাচ্ছেন আমরা জানি না। শনিবার তৃণমূল কংগ্রেসের প্রার্থী মহুয়া মৈত্রের বাড়িতেও সিবিআই হানা দেয় এবং শূন্য হাতে ফিরে যায়। দেশের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা এমন জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছে যে সরকারবিরোধী দল এবং ব্যক্তিদের একমাত্র আশার জায়গা হয়ে দাঁড়িয়েছে সুপ্রিম কোর্ট। চাতক পাখির মত আদালতের দিকে তাকিয়ে আছেন সবাই – যদি এমন কোনো রায় দেওয়া হয় যাতে সরকার কোণঠাসা হয়। এমনটা যে দেশে হয়, বুঝতে হবে সে দেশের গণতন্ত্রের নাভিশ্বাস উঠে গেছে। পার্শ্ববর্তী পাকিস্তানেই এমন হতে দেখা যায়। আমাদের দেশের মধ্যবিত্ত, উচ্চবিত্ত লোকেরা আবার অবাধ নির্বাচন বলতে বোঝেন রক্তপাতহীন নির্বাচন। সেই সরলমতি মানুষগুলোর উদ্দেশে বলা যাক, এই আবহে যে নির্বাচন হবে তা যদি অবাধ হয়, তাহলে ফড়িংও পাখি, জলহস্তীও হাতি, দেবও মহানায়ক। এমনিতেই ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন নিয়ে হাজারটা প্রশ্ন আছে যার সন্তোষজনক উত্তর দিতে নির্বাচন কমিশনের ভারি অনীহা। উত্তর দিয়ে দিলে কথা ছিল না, কিন্তু আলোচনাই করতে না চাওয়া যে প্রবণতার দিকে নির্দেশ করে তাকে গোদা বাংলায় বলে ‘ঠাকুরঘরে কে রে?’, ‘আমি তো কলা খাইনি।’ আলোচনা দীর্ঘায়িত করতে চাই না, তাই কেবল একটা তথ্য উল্লেখ করা যাক। ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনের পর দ্য কুইন্ট এক প্রতিবেদনে জানিয়েছিল, একটা-দুটো নয়, মোট ৩৭৩ আসনে নির্বাচন কমিশনের হিসাব অনুযায়ী প্রদত্ত ভোটের সঙ্গে গোনা ভোটের বিস্তর তফাত ছিল। এই তফাতের কোনো ব্যাখ্যা কমিশন আজ পর্যন্ত দেয়নি।
তাহলে করণীয় কী? আমার-আপনার মত সাধারণ নাগরিকের কী করা উচিত জানি না, বিরোধী দলগুলোর অবশ্যই সর্বশক্তি দিয়ে পথেঘাটে আন্দোলনে নামা উচিত এই সরকারের বিরুদ্ধে। কারণ নির্বাচনে তারা যাতে নিজেদের শক্তি অনুযায়ীও লড়তে না পারে সরকারের তরফে তার যাবতীয় ব্যবস্থা করা হয়েছে এবং হচ্ছে। হয়ত এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি করা হবে যে বিরোধীপক্ষের সেরা বক্তারা প্রায় সবাই কারান্তরালে থাকবেন প্রচার পর্বে। সুতরাং এখন আর আলাদা করে প্রচার, আসন সমঝোতা – এসব নিয়ে ভেবে লাভ কী? পথে নামা ছাড়া বিরোধীদের সামনে প্রচারেরই বা আর কোন পথ খোলা আছে? প্রায় কোনো মূলধারার সংবাদমাধ্যমই তো বিরোধীদের জায়গা দেবে না। টাকাপয়সার বিপুল অসাম্যে বিজ্ঞাপন দিয়ে বিজেপির সঙ্গে এঁটে ওঠাও তৃণমূল কংগ্রেসের মত দু-একটা দল ছাড়া বাকিদের পক্ষে অসম্ভব। সুতরাং রাস্তাই একমাত্র রাস্তা নয় কি?
অথচ আমরা কী দেখছি? কংগ্রেসের তিন প্রধান নেতা রাহুল গান্ধী, সোনিয়া গান্ধী, মল্লিকার্জুন খড়্গেকে সাংবাদিক সম্মেলন করতে দেখছি। ইন্ডিয়া জোটের নেতাদের কেজরিওয়ালের গ্রেফতারির বিরুদ্ধে নির্বাচন কমিশনের কাছে আবেদন নিবেদন করতে দেখছি। দিল্লির রাজপথে লাগাতার আন্দোলনে সব দলের শীর্ষ নেতৃত্বকে কবে দেখব? কেরালায় কংগ্রেস, সিপিএম দুই দলই পথে নেমেছে। কিন্তু দেশজুড়ে বিরোধীদের পাড়ায় পাড়ায় আন্দোলন কবে দেখব? এদেশের বিরোধীরা কি তেমন আন্দোলন করতে ভুলে গেছেন? ২০১২ সালে নির্ভয়া কাণ্ডের পরে দিল্লির চেহারা এর মধ্যেই ভুলে গেলেন? আম আদমি পার্টির উত্থানই তো রামলীলা ময়দান আঁকড়ে পড়ে থাকা দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলনের মাধ্যমে। সে আন্দোলনে যিনি কেজরিওয়ালের গুরু ছিলেন, সেই আন্না হাজারে বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর থেকে অনন্ত শয্যায় শায়িত ছিলেন। কেজরিওয়াল গ্রেফতার হওয়ার পর জেগে উঠে সংবাদসংস্থা এএনআইকে বিবৃতি দিয়ে গ্রেফতার সমর্থন করেছেন। সমর্থন করার কারণটি জব্বর।
ওসব কথা থাক। প্রশ্ন হল, নিজেরা ক্ষমতায় থাকার সময়ে আন্দোলন, রাজনীতি সম্পর্কে যে বিতৃষ্ণা তৈরি করিয়েছিলেন সাধারণ নাগরিকদের মনে, বিজেপিবিরোধীরা কি এখন তারই ফাঁদে পড়েছেন? ১৯৯১ সালের উদারীকরণের পর থেকেই তো কেন্দ্রে ক্ষমতাসীন কংগ্রেস, উদারপন্থী বুদ্ধিজীবী, সাংবাদিক, বিচারপতি, এমনকি এই শতাব্দীর গোড়া থেকে এ রাজ্যের কমিউনিস্ট শাসকদেরও আমরা বলতে দেখেছি – মিছিল মানুষকে অসুবিধায় ফেলে, বনধ কর্মনাশা ইত্যাদি। তাই বোধহয় এখন আন্দোলনের বদলে আদালতে ভরসা রাখতে হচ্ছে। যেসব দলের নির্বাচনে আসন পাওয়ার সম্ভাবনা শূন্য থেকে মাইনাসে, তারাও গণতন্ত্র বাঁচানোর চেয়ে কে কোন আসনে লড়বে তা নিয়ে দরাদরি করতে ব্যস্ত। কেউ বলছে ‘অমুক আসন আমাদের সেন্টিমেন্ট’, ‘কেউ বলছে তমুক আসনে আমরা যথেষ্ট শক্তিশালী’। যেন দাঁড়ালেই ‘এলেম, দেখলেম, জয় করলেম’ হয়ে যাবে।
এদেশের বিপন্ন মানুষ কিন্তু রাজনৈতিক দলগুলোর ভরসায় না থেকে নিজের মত করে লড়াই করে যাচ্ছেন। দেশের কৃষকরা আবার পথে। মোদী সরকার তাঁদের পথে আক্ষরিক অর্থে কাঁটা বিছিয়ে দেওয়া সত্ত্বেও তাঁরা পিছু হটছেন না। যদিও সরকারের বদান্যতায় মূলধারার সংবাদমাধ্যম তো বটেই, সোশাল মিডিয়া থেকেও কৃষক আন্দোলনের খবর উধাও।
ভারতের মত বিরাট দেশের অমিত ক্ষমতাশালী রাষ্ট্রশক্তির বিরুদ্ধে এ ধরনের আন্দোলন যে একেবারেই সফল হতে পারে না তা নয়। ২০২০-২১ সালের কৃষক আন্দোলনই দেখিয়ে দিয়েছে গণআন্দোলনের ক্ষমতা কতখানি। কিন্তু রাজনৈতিক দলগুলো নেতৃত্ব দিচ্ছে না এমন আন্দোলনের ক্ষমতার সীমাবদ্ধতাও আছে। ২০১৯-২০ সালের এনআরসি, সিএএবিরোধী আন্দোলনেরও সেই সীমাবদ্ধতা ছিল। রাজনৈতিক দলগুলো সেই আন্দোলনেও ঝাঁপিয়ে পড়েনি, আন্দোলনকে এবং তার দাবিগুলোকে পাড়ায় পাড়ায় পৌঁছে দেয়নি। ফলে দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ধারণা হয়ে যায় – এটা মুসলমানদের সমস্যা, তাই ওরা আন্দোলন করছে। একইভাবে এখনো বহু মানুষ ভাবছেন কৃষি আইনগুলো কৃষকদের সমস্যা, লাদাখের ব্যাপারটা লাদাখের মানুষের সমস্যা আর মণিপুর তো বিস্মৃত, কাশ্মীর মুসলমানপ্রধান হওয়ায় সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের কল্পনাতেও নেই। এককথায় দেশের বিরোধী রাজনীতি সময়ের চেয়ে, পরিস্থিতির চেয়ে পিছিয়ে রয়েছে। যতদিন পিছিয়ে থাকবে তত দ্রুত ভারত ভ্লাদিমির পুতিনের রাশিয়া বা রচপ তায়িপ এরদোগানের তুরস্ক হওয়ার দিকে এগিয়ে যাবে। এখন জরুরি অবস্থা।
যে যুগে কমিউনিস্টরাও দুর্নীতি বলতে শুধু ঘুষ খাওয়া বোঝেন আর ২২ লাখ টাকার গাড়ি কেনা বৈধ বলে গলা ফাটান, যেহেতু সেটা কালো টাকায় কেনা হয়নি – সে যুগে পর্দায় যৌনতা নিংড়ে নীতিহীনতা দেখানো ঘ্যাচাং ফু পরিচালকের সবচেয়ে প্রশংসনীয় কাজ।
ছোটবেলা থেকে ‘কমরেড’, ‘বিপ্লব’, ‘ক্যাপিটালিজম’ ইত্যাদি শব্দগুলোর সঙ্গে ওঠাবসা করলে (কেবল ওঠাবসাই করলে) যা হয়, তা হল মাঝবয়সে এসেও শব্দগুলো শুনলেই চোখদুটো নিভু নিভু হয়ে আসে, মাথাটা একদিকে হেলে পড়ে, গালটাকে আশ্রয় দেওয়ার জন্যে হাতটা উঠে আসে সুকান্ত ভট্টাচার্যের ছবিটার মত। জয়রাজ ভট্টাচার্য নির্দেশিত ঘ্যাচাং ফু ছবিটা দেখতে শুরু করার কয়েক মিনিটের মধ্যে অন্য গালে এমন একটা চড় পড়ল যে পিঠ সোজা করে উঠে বসতে হল। ছোটবেলায় ভোর ভোর ঘুম থেকে উঠে পড়তে বসে ঝিমোলে আমার কমিউনিস্ট পার্টি করা বাবা এরকম চড় কষাতেন। জয়রাজ দেখলাম জানেন, যে এক চড়ে ঝিমুনি উধাও হয়ে যায় না। খানিক পরেই আবার ফিরে আসে। তখন কানমলা দিতে হয়। গোটা ছবি জুড়ে সে কাজটাই করে গেছেন ক্রমাগত। ফলে ঘ্যাচাং ফু দেখা মোটেই সুখকর অভিজ্ঞতা নয়, বরং বেজায় অস্বস্তিকর।
এদেশে কোনোদিন বিপ্লব হয়নি। তা বলে মুখেন মারিতং জগৎ মার্কসবাদী দেখার সুযোগ আমরা পাইনি এমন নয়। বরং মার্কসবাদীদের রাজনৈতিক কার্যকলাপ যত কমেছে, জনবিচ্ছিন্নতা যত বেড়েছে, ততই এই ছবির সুরজিৎ সেনের মত ধপধপে সাদা ধুতি পাঞ্জাবি পরা তত্ত্ব কপচানো মার্কসবাদীতে ভরে গেছে আমাদের চারপাশ। এই ছবির সবকটি চরিত্র রীতিমত বইপড়া মার্কসবাদী, বিপ্লবে নিবেদিতপ্রাণ পার্টিকর্মী। কিন্তু কেউ শ্রমজীবী নয়, সকলেই উচ্চশ্রেণিভুক্ত। দামি মদ, দামি খাবার, রবীন্দ্রসঙ্গীত (পিচ কারেক্টর সমেত) ছাড়া এদের চলে না। কিন্তু ও গান তাদের মরমে প্রবেশ করে না। রবীন্দ্রসঙ্গীতটির ইতিহাস জানা থাকলেও তারা বুঝতে পারে না কেন ওই গান ওখানে গাওয়া হল। দেখে মনে পড়ে যায় উৎপল দত্তের প্রতিবিপ্লব বইয়ে উল্লিখিত সোভিয়েত ইউনিয়নের কমিউনিস্ট পার্টির উনবিংশ পার্টি কংগ্রেসের কথা
… পার্টির ম্যাণ্ডেট কমিশন গর্ব ক’রে রিপোর্ট দিচ্ছেন: প্রতিনিধি সংখ্যা: ১১৯২। এদের মধ্যে ৭০৯ জন বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্র্যাজুয়েট। ৮৪ জন বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষাপ্রাপ্ত। ২২৩ জন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষাপ্রাপ্ত। ১৭৬ জন আংশিক স্কুলে শিক্ষিত। ২৮২ জন ইঞ্জিনিয়ার। ৬৮ জন কৃষি বিশেষজ্ঞ। ৯৮ জন অধ্যাপক। ১৮ জন অর্থনীতিবিদ। ১১ জন ডাক্তার। ৭ জন উকীল।
শ্রমিকশ্রেণীর পার্টি-কংগ্রেসে শ্রমিক ক’জন ছিলেন তার উল্লেখ করারও প্রয়োজন দেখেন নি সংশোধনবাদী নেতারা। দেখা যাচ্ছে কংগ্রেসের শতকরা ৬০ জন প্রতিনিধি এসেছেন নূতন শিক্ষিত সুবিধাভোগী শ্রেণী থেকে।
ঔতরখানভ লিখেছেন:
“এই সূত্র-অনুসারে যে কমিউনিস্ট পার্টি এককালে শ্রমিকের পার্টি বলে গর্ব করত, তা আজ ইঞ্জিনিয়ার, অধ্যাপক ও আমলাদের পার্টি হয়ে গেছে, নানা পেশায় নিযুক্ত কর্মচারীদের পার্টি হয়ে গেছে।”
এই ছবির চরিত্রেরা বাবাকে ডাকে ‘কমরেড বাবা’, স্বামী ‘ডার্লিং’ বা ‘সুইটহার্ট’ বলে ডাকলে শুনতে পায় না, শুনতে পায় ‘কমরেড’ বলে ডাকলে। তবে পেটে দু পাত্তর পড়লেই বেরিয়ে আসে আসল কথা – আমাদের কথায় সাধারণ লোকে বিশ্বাস করল কি না করল, কিছু আসে যায় না। কারণ আমরা নিজেরাই নিজেদের কথাগুলো বিশ্বাস করি না।
আদ্যন্ত নীতিহীনতা বোঝাতে সাধারণত সিনেমায় দেখানো হয় আর্থিক দুর্নীতিকে। আমার কাছে এই ছবির শ্রেষ্ঠ দিক হল নীতিহীনতা, ভণ্ডামিকে ল্যাংটো করতে আগাগোড়া যৌনতার ব্যবহার। ছবির শুরুতেই, চরিত্রগুলো কারা, কী বৃত্তান্ত তা বুঝতে পারারও আগে দেখা যায় লিফটে চোরাগোপ্তা এর হাত ওর কোমরে, কার আঙুল যেন কার প্যান্টের চেন খুলছে। পরে লম্বা টেবিলের এক প্রান্তে যখন বাকুনিন বনাম এঙ্গেলস বনাম লেনিন বনাম অমুক বনাম তমুক চলছে, তখন অন্য প্রান্তে এক কমরেড আরেক কমরেডের পাছা দেখতে ব্যস্ত থাকেন। বিপ্লবোত্তর সমাজে যৌনতার ভূমিকা কী হবে সে আলোচনাই করতে দিতে চান না যে কমরেড (সুদীপা বসু), তিনি যত্রতত্র হস্তমৈথুনে লিপ্ত হন। প্রত্যেকটা চরিত্রই অতৃপ্ত যৌনক্ষুধায় ভুগছে। তাদের যৌন অবদমনেরই প্রকাশ অন্যের উপর আধিপত্য বিস্তার করতে চাওয়ায়। কেউ কেউ যৌন তৃপ্তির রাস্তা খুঁজে নেয় – খোলা ছাদে অর্জিতে অথবা নির্জন ডাইনিং রুমে পায়ুমৈথুনে। যারা পায় না, তারা কিউয়ের মত প্রবল বিক্রমে ঘড়িগুলোকে হাতুড়ি পেটা করতে থাকে। সত্যিই তো আমাদের বহু হিংসার পিছনেই অবদমিত কাম। নইলে যে মন্ত্রীর ফ্ল্যাট থেকে নগদ ৫০ কোটি টাকা বেরোয়, তার ক্ষমতার অপব্যবহারের থেকেও ক্রমশ কেন আমাদের আলোচনার কেন্দ্রে চলে আসে অল্পবয়সী সুন্দরীর সঙ্গে তার সম্পর্ক? যে যুগে কমিউনিস্টরাও দুর্নীতি বলতে শুধু ঘুষ খাওয়া বোঝেন আর ২২ লাখ টাকার গাড়ি কেনা বৈধ বলে গলা ফাটান, যেহেতু সেটা কালো টাকায় কেনা হয়নি – সে যুগে পর্দায় যৌনতা নিংড়ে নীতিহীনতা দেখানো ঘ্যাচাং ফু পরিচালকের সবচেয়ে প্রশংসনীয় কাজ। এমনটা না করে যদি পরিচালক সরাসরি নিজের সময়টা দেখাতেন, সেই সময়ের কোনো কমিউনিস্ট কবিকে দেখাতেন, যিনি এক হাতে দক্ষিণপন্থী সরকারের বিরুদ্ধে কবিতা লেখেন আর অন্য হাতে সেই সরকারের অনুষ্ঠানে যাওয়ার আমন্ত্রণপত্রটা ফেসবুকে পোস্ট করেন – তাহলে কোনো অভিঘাতই তৈরি হত না। কারণ অমন আমরা রোজ দেখছি।
এ পর্যন্ত পড়ে অনেকেই রে রে করে তেড়ে আসবেন, বলবেন আলোচক নেহাত বদমাইশ। নিজের গায়ের ঝাল মেটাতে একটা শিল্পকর্মকে ব্যবহার করছে। পার্থ চ্যাটার্জির ফ্ল্যাট থেকে টাকা উদ্ধার হওয়া এবং শতরূপ ঘোষের গাড়ি বিতর্কের বহু আগেই ঘ্যাচাং ফু নির্মিত। তাহলে এটা সে যুগের ছবি কী করে হয়? কথা হল, যুগ মানে স্রেফ কয়েকটা বছর নয়। ছবিটা যদি নির্মাণের সময়কালটুকুর বাইরে কোনোকিছু সম্পর্কে কোনো সন্দর্ভ হয়ে উঠতে না পারত, তাহলে নির্মাণের এত বছর পরে তা নিয়ে আলোচনাই করতাম না। প্রগতির মুখোশ পরে থাকা প্রতিক্রিয়াশীলরা কোনো দেশে কোনো যুগেই ঘোষিত প্রতিক্রিয়াশীলদের চেয়ে কিছু কম বিপজ্জনক নয়। এক কাল্পনিক সময়ের বয়ানে নিজের সময়ের সেই প্রতিক্রিয়াশীলদের উলঙ্গ করতে পেরেছে বলেই ঘ্যাচাং ফু গুরুত্বপূর্ণ। এ ছবি যদি অন্য কোনো দেশে বানানো হত, তাহলে হয়ত যৌনতাকে ভণ্ডামির মাধ্যম হিসাবে ব্যবহার করা আলাদা করে প্রশংসনীয় হত না। কিন্তু দেশটা ভারতবর্ষ বলেই এ কাজ অত্যন্ত জরুরি। এ দেশেই তো কমিউনিস্টদের যৌনতা, মদ্যপান ইত্যাদি ব্যাপারে চিন্তাভাবনা দক্ষিণপন্থীদের সবচেয়ে কাছাকাছি। এই শতকের শুরুতেও এ দেশের বড় অংশের কমিউনিস্ট সমকামিতাকে মনে করতেন পুঁজিবাদী বিকৃতি। এখনো এমন মার্কসবাদী দল আছে যারা ওই ধারণাতেই অনড়। একগামিতার সূক্ষ্মতর প্রশ্ন (যা এ ছবিতে বেণীর চরিত্র তুলেছে) না হয় বাদই দেওয়া গেল।
এই ডিসটোপিয়া ঘনীভূত হয়েছে পরিচালকের ঠাট্টার গুণে। মাঝেমাঝেই তিনি এবং ক্যামেরার পিছনের অন্য কুশীলবরা কণ্ঠস্বর হয়ে ঢুকে পড়েছেন ছবিতে, মরা মানুষকে জ্যান্ত করে তোলার মত কাণ্ডও ঘটিয়েছেন। সে ঘটনার ব্যাখ্যা বস্তুবাদী হল কি হল না, তা নিয়ে জবরদস্ত রসিকতাও করা হয়েছে। শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে যে যা ঘটছে তা আসলে স্রেফ খেলা, ভিডিও গেমের মতই। ফলে শেষদিকে যখন মত্ত অবস্থায় এক বিশেষ যৌন আকাঙ্ক্ষা পূরণ হয়নি বলে কেঁদে ভাসায় একটা চরিত্র আর তার বউয়ের চরিত্রে কমলিকা শতকরা দুশো ভাগ আবেগ ঢেলে বলে ফেলেন ছবির সবচেয়ে রসিক সংলাপ, তখন টেবিলে বসা অনির্বাণ আর অরিত্রীর মত আমিও খ্যাকখ্যাক করে হেসেই ফেললাম।
আকাশে থুতু ছেটালে সে থুতু নিজের গায়েই পড়ে। এ হাসিও কি নিজের দিকেই ফিরে এল? কেন বাপু? আমি তো কমিউনিস্ট নই, পার্টিও করি না। আমি বড়জোর বিশ্বাসঘাতক। অতএব কমিউনিস্ট সাজা বুর্জোয়াদের নিয়ে কেউ হাসাহাসি করলে আমার কী এসে যায়? এসে যাওয়া উচিত নয়, কিন্তু ওই যে গোড়াতেই বললাম – কেন জানি না আগাগোড়া মনে হয় পরিচালক ধরে ধরে তাঁর উদ্দিষ্ট দর্শককে চড়াচ্ছেন, কান মুলে দিচ্ছেন। এক নাগাড়ে মারতে থাকলে খানিক পরে ব্যাপারটা সয়ে যায়, ততটা ব্যথা লাগে না। কিন্তু মারের তীব্রতা বজায় রাখতে পরিচালক কিছুটা নিষ্পাপ সারল্য মিশিয়ে দিয়েছেন। যেমন সেই বাচ্চা মেয়েটা, যে বড়দের তাত্ত্বিক ভাঁড়ামি ছেড়ে উঠে গিয়ে একা ঘুরতে ঘুরতে পেয়ে যায় ধুলো জমে যাওয়া লেনিনকে, যে ফাঁস করে দেয় নীতিবাগীশ মায়ের কামুকতার কাহিনি।
এবং অনির্বাণ, অরিত্রী। একমাত্র তাদের স্মৃতিতেই ক্যামেরা বদ্ধ ইনডোর ছেড়ে বেরিয়ে যায় ফাঁকা মাঠের নরম সকালে, পেলব আবহসঙ্গীতে। তারাই কেবল মার্কস, এঙ্গেলস হ্যানো ত্যানো কপচায় না। শুধু তাদের চোখেই আসে জল, তাদেরই রক্তপাত হয়। কিন্তু ওই পেলবতায় শেষ করা হয়নি ছবিটা। শেষের জন্যেই সবচেয়ে বড় আঘাতটা তুলে রেখেছিলেন জয়রাজ। একেবারে ঘ্যাচাং ফু।
ছবিটা কি নিখুঁত? অত বোঝার বিদ্যে আমার নেই বাপু। তবে ফ্রিজে কাটা হাতখানা না রাখলে কি কোনো তফাত হত?
বিঃ দ্রঃ ঘ্যাচাং ফু কোথায় দেখা যাবে? এ প্রশ্ন আমাকে করবেন না। অনেকেই বেছে বেছে যৌনদৃশ্যগুলো দেখেছেন। কেবল যৌনদৃশ্য দেখতে হলে ইন্টারনেটে ক্লিপ খুঁজে নেওয়াই ভাল। পুরো ছবি দেখতে চাইলে অনুসন্ধান করুন। ও দায়িত্ব নিচ্ছি না।
প্রশ্ন একটাই— ভারত এক ধর্ম এক ভাষার দেশ হবে, নাকি নানা ভাষা নানা মত নানা পরিধানের দেশ থাকবে। প্রথমটার মুখ নরেন্দ্র মোদী, দ্বিতীয়টার রাহুল গান্ধী।
সেই কোন কালে চকোলেট কোম্পানি ক্যাডবেরি’জ অমিতাভ বচ্চনকে ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসাডর করে একগুচ্ছ বিজ্ঞাপন তৈরি করেছিল। তার একটায় তিনি পাপ্পু নামে একটি ছেলের বাবা, যার বয়স বেড়েই চলেছে কিন্তু সে স্কুলের গণ্ডি আর পেরোতে পারছেন না। তা পাপ্পুর হতাশ দোকানদার বাবাকে ছেলের বন্ধুরা এসে খবর দিল, পাপ্পু পাশ করে গেছে। অতএব তারা চকোলেট খাবে, পয়সা পাপ্পু দেবে। বাবা মহানন্দে সকলকে বিনিপয়সায় চকোলেট বিলোতে লাগলেন। এমন খুশির খবরে কি মিষ্টিমুখ না করে থাকা যায়? ওই সিরিজেরই আরেকটি বিজ্ঞাপনে অমিতাভ কলেজের অধ্যাপক। সিঁড়ি দিয়ে নামতে গিয়ে দেখেন, ছেলেমেয়েরা সব ঊর্ধ্বশ্বাসে কোথায় যেন দৌড়চ্ছে। একজনকে জিজ্ঞেস করে জানতে পারলেন, পাপ্পুর নাকি পরীক্ষা, তাই তারা সবাই দৌড়চ্ছে। অবাক অধ্যাপক সরেজমিনে তদন্ত করতে গিয়ে দেখেন পরীক্ষা মানে হল, একটি সুন্দরী মেয়ে (রাইমা সেন) কলেজে ঢুকছে আর মোটা কাচের চশমা পরা, সচরাচর যাদের ক্যাবলা বলা হয় তেমন ছেলে পাপ্পু প্রেম নিবেদন করবে বলে ফুল হাতে দাঁড়িয়ে আছে। মেয়েটি এল, দেখল এবং পাপ্পুকে জয়যুক্ত করল। ফলে সকলে মিলে পাপ্পু পাশ করে গেছে বলে ফের নাচানাচি শুরু করল। এ খবরেও মিষ্টিমুখ না-করে থাকা যায় না, অতএব ফের চকোলেট খাওয়া হল। এই পাপ্পু যে ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাসে জায়গা করে নিতে চলেছে, তখন কে জানত!
আরএসএস-বিজেপির প্রচারযন্ত্র তুলনাহীন। আজ না হয় যাবতীয় টিভি চ্যানেল এবং অধিকাংশ সর্বভারতীয় খবরের কাগজের উপর আম্বানি-আদানির সহায়তায় তাদের নিরঙ্কুশ আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, নরেন্দ্র মোদীর সর্বভারতীয় উত্থানের সময়ে তো এতখানি আধিপত্য ছিল না। তবু বিজেপি নেতারা বারবার আউড়ে এবং হোয়াটস্যাপ, ফেসবুকের বিপুল ব্যবহারের মাধ্যমে জনমনে প্রতিষ্ঠা করে দিতে পেরেছিলেন এই কথা যে, হার্ভার্ড ও কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া রাহুল গান্ধি হলেন ওই বিজ্ঞাপন সিরিজের অকর্মণ্য, অজস্রবার ফেল করা পাপ্পু। অন্যদিকে তথ্যের অধিকার আইন ব্যবহার করে যাঁর পাশ করার বছরের তথ্য জানতে চাইলে দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয় গোপনীয়তার দোহাই দিয়ে মুখে কুলুপ আঁটে, সেই মোদী হলেন এক প্রাজ্ঞ ব্যক্তি, বিশ্বগুরু হওয়ার উপযুক্ত। যেহেতু মোদীর শিক্ষাগত যোগ্যতা সন্দেহজনক (গুজরাট বিশ্ববিদ্যালয় প্রকাশিত তাঁর মার্কশিটে অধ্যয়নের বিষয় লেখা ছিল “entire political science”), সেহেতু ডিগ্রি ব্যাপারটাই যে অপ্রয়োজনীয় তা প্রমাণ করতে অক্লান্ত পরিশ্রম করেছে আরএসএস-বিজেপির প্রচারযন্ত্র। বারো ক্লাসের গণ্ডি না-পেরনো স্মৃতি ইরানিকে মানবসম্পদ উন্নয়ন মন্ত্রী করা হয়েছিল এবং ডিগ্রি যে কিছুই প্রমাণ করে না তা প্রমাণ করতে দ্য টাইমস অফ ইন্ডিয়া-র মতো বিরাট কাগজ রীতিমত গ্রাফিক্স তৈরি করেছিল— যাতে দেখানো হয়েছিল, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর-সহ বহু ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বেরই ডিগ্রির বালাই ছিল না। মনে রাখতে হবে, এই স্মৃতি সংসদে পৌঁছেছিলেন অমেঠি কেন্দ্রে রাহুলকে পরাজিত করে। অর্থাৎ স্মৃতিকে মাথায় তোলার পিছনেও অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল রাহুলকে পাপ্পু প্রমাণ করা।
স্বীকার্য যে, প্রচুর লেখাপড়া জেনেও রাজনীতিতে কেউ অকর্মণ্য হতেই পারেন। আবার বেশিদূর লেখাপড়া না-করেও ক্ষুরধার বুদ্ধি, সাহস এবং পরিশ্রমের জোরে একজন রাজনীতিবিদ দারুণ সফল হতে পারেন। সাফল্য বলতে কী বোঝানো হচ্ছে সেটা অবশ্য গুরুতর প্রশ্ন। আমাদের প্রধানমন্ত্রী যেমন স্পষ্টতই মনে করেন, চা বিক্রেতার ছেলে হয়েও দেশের প্রধানমন্ত্রীর চেয়ারে বসাই সাফল্য। কীভাবে সে চেয়ার অবধি পৌঁছনো হল এবং চেয়ারে বসে কী করা হচ্ছে তার তেমন গুরুত্ব নেই। তিনি যে গত আট বছরে এমনকি কাশ্মিরি পণ্ডিতদের জন্যও গঠনমূলক কিছু করে উঠতে পারেননি, তা তাঁর কাছে ব্যর্থতা বলে প্রতিভাত হয় বলে তো মনে হয় না। উলটে সারাক্ষণ নিজেই নিজেকে শংসাপত্র দিয়ে বেড়াচ্ছেন— “সব চঙ্গা সি”। এহেন প্রধানমন্ত্রী এবং তাঁর দলের মানদণ্ডে রাহুল যা-ই করুন, প্রধানমন্ত্রী না-হতে পারলে পাপ্পুই থাকবেন। তাতে কিছু এসে যায় না। মুশকিল হল, পাপ্পু মিথ নির্মাণ এতই সফল হয়েছে যে, বিজেপিবিরোধী মানুষও কিছুতেই ওই মিথ ভুলে রাহুলকে দেখে উঠতে পারছেন না। ২০২৪ লোকসভা নির্বাচনের আগে তাঁদের এই ভুল না ভাঙলে বিপদ।
গত কয়েক দিনে যে চরম অন্যায় অত্যন্ত তৎপরতার সঙ্গে সম্পন্ন করে রাহুলকে লোকসভা থেকে বিতাড়িত করা হয়েছে, বহু উদারপন্থী, এমনকি বামপন্থী মানুষও তাতে তেমন দোষ দেখছেন না। বিজেপি বাদে সব দলের নেতৃস্থানীয়রাই অবশ্য এর নিন্দা করেছেন, কিন্তু তার অনেকটাই “চাচা আপন প্রাণ বাঁচা” যুক্তিতে। কারণ, আজ এর প্রতিবাদ না-করলে কাল এত বড় দেশের কোনও এক নিম্ন আদালতে তাঁদের কারও কোনও প্রধানমন্ত্রীবিরোধী মন্তব্যকে হাতিয়ার করে কেউ যদি মানহানির মামলা ঠুকে দেয় আর আদালত তুরন্ত দুবছরের কারাদণ্ড দিয়ে দেয়, তাহলে তাঁদের সাংসদ বা বিধায়ক পদও নিমেষে খারিজ হয়ে যাবে। কিছু বলার মুখ থাকবে না। এই নেতা-নেত্রীদের কে কে ভারতের গণতন্ত্রের এই হত্যাকাণ্ড নিয়ে সত্যিই চিন্তিত তা আরও কিছুদিন না কাটলে, তাঁদের দলের কার্যকলাপ না দেখলে নিশ্চিত হওয়া যাবে না। যেমন ধরুন, এর পরেও যদি আম আদমি পার্টি মধ্যপ্রদেশের বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপিবিরোধী ধ্বজা উড়িয়ে কংগ্রেসের ভোট কাটতে যায়, তা হলে বুঝতে হবে অরবিন্দ কেজরিওয়ালের লুকোবার মতো আরও অনেক কিছু আছে। সেসবের গুরুত্ব ভারতের গণতন্ত্র বাঁচানোর চেয়ে বেশি।
কিন্তু ইতিমধ্যেই দলগুলোর সাধারণ সদস্য, সমর্থকদের অনেকেরই দেখা যাচ্ছে রাহুল পাদপ্রদীপের আলোয় চলে এসেছেন এবং অনেকে তাঁর মধ্যে আশার আলো দেখছেন বলে প্রবল গাত্রদাহ। এর কারণ রাহুলের কার্যকলাপ তাঁরা এত বছর ধরে ভাল করে লক্ষই করেননি। নিজেদের অজান্তেই সরকারি প্রচারযন্ত্রের চোখ দিয়ে রাহুলকে দেখেছেন। তাই এখন চোখকান যা বলছে, মস্তিষ্ক কিছুতেই তা মানতে চাইছে না। স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে ভারত জোড়ো যাত্রার পরে রাহুল সর্বক্ষণের রাজনীতিবিদ নন— এই অভিযোগ আর করা যাচ্ছে না। লৌহমানব মোদীর বিপরীতে তিনি যে ঠুনকো পুতুল নন, তা সাধারণ মানুষ বুঝতে পেরেছেন। কংগ্রেসেও যে নেতৃত্বের সঙ্কট দীর্ঘকাল ধরে চলছিল তার নিষ্পত্তি ঘটেছে। গুলাম নবি আজাদের মতো সুযোগসন্ধানীরা বিদায় হয়েছেন। কপিল সিব্বলের মতো অতিবৃদ্ধ, জনসংযোগহীন আইনজীবী নেতারা পথপার্শ্বে পড়ে আছেন। সুদর্শন, সাহেবদের মতো ইংরেজি বলায় দক্ষ শশী থারুর টিভি স্টুডিও আর টুইটার আলো করেই বসে আছেন। মল্লিকার্জুন খড়গেকে সর্বভারতীয় সভাপতির দায়িত্ব দিয়ে ঝাড়া হাত-পা রাহুল জনপ্রিয়তায় অনেক এগিয়ে গেছেন।
কিন্তু সেটা বড় কথা নয়। দেশ কীভাবে চালানো উচিত, ভারতের আগামীদিনের অর্থনীতি কেমন হওয়া উচিত, আজকের দুনিয়ায় জনকল্যাণমূলক রাষ্ট্রের ধারণার পুনঃপ্রয়োগ কীভাবে করা সম্ভব— এসব নিয়ে গত কয়েক বছরে মৌলিক চিন্তাভাবনার পরিচয় দিয়েছেন রাহুল। কিন্তু গোদি মিডিয়া আর বিজেপি-র আইটি সেল সেসব দিকে আলো ফেলেনি। কেবলই পাপ্পু ভাবমূর্তি তুলে ধরেছে এবং জওহরলাল নেহরুর চিন-নীতির ব্যর্থতা থেকে শুরু করে ইন্দিরা গান্ধীর জরুরি অবস্থা জারির স্বৈরতান্ত্রিকতা— এগুলোকে রাহুল গান্ধীর সমার্থক করে দিয়েছে। দুঃখের বিষয়, বহু বিজেপি-বিরোধী, বিশেষত বামপন্থীরা, এই চশমা দিয়েই রাহুলকে দেখেছেন এবং এখনও দেখে চলেছেন। তাঁরা খেয়ালই করেন না, ২০১৯ নির্বাচনের প্রাক্কালে রাহুল সকলের জন্য ন্যূনতম আয়ের যে প্রস্তাব রেখেছিলেন তা এই মুহূর্তে যে নব্য উদারবাদী অর্থনীতির কবলে আমরা পড়েছি তার প্রেক্ষিতে বৈপ্লবিক, এবং বলা বাহুল্য, বামপন্থী। নোবেল পুরস্কার বিজয়ী অর্থনীতিবিদ অভিজিৎ বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায়ও মনে করেন ভারতে অমন একটা প্রকল্প দারুণ কাজে দেবে। এ নিয়ে বিতর্কের অবকাশ অবশ্যই আছে। কিন্তু অন্তত এই শতকে ভারতের কোনও বামপন্থী দলের নেতাকে অর্থনীতি নিয়ে এরকম বিকল্প চিন্তা করতে দেখা যায়নি। পশ্চিমবঙ্গের শেষ বামফ্রন্ট সরকার বরং অনেকাংশে নব্য উদারবাদী অর্থনীতি নিয়ে চলছিল, কেরলের বাম সরকারও যে মৌলিকভাবে আলাদা কোনও পথ দেখাতে পারছে এমন নয়। ভারতের যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামো যেমন (যাকে আরও দুর্বল করে দিয়েছে মোদী সরকার) তাতে কেন্দ্রীয় সরকারের চেয়ে খুব আলাদা কোনও পথ নেওয়া হয়তো কোনও রাজ্য সরকারের পক্ষে সম্ভবও নয়। কিন্তু প্রস্তাব হিসেবে, পরিকল্পনা হিসেবেও ডি রাজা, পিনারাই বিজয়ন বা দীপঙ্কর ভট্টাচার্যরা কোনও মৌলিক অর্থনৈতিক নীতির কথা বলেছেন কি? সরকারে এলে কী করবেন সে তো পরের কথা, রাহুল অন্তত অন্য কিছু ভাবার এবং বলার সাহস তো দেখিয়েছেন।
ভারত জোড়ো যাত্রা চলাকালীন রাহুল রিজার্ভ ব্যাঙ্কের প্রাক্তন গভর্নর রঘুরাম রাজনের সঙ্গে আলাপচারিতায় বসেছিলেন। সেই আলোচনা শুনলে বোঝা যায় গোটা বিশ্বের অর্থনীতিকে রাহুল কীভাবে দেখেন এবং ভারতের ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক অসাম্যকে কতটা গভীরভাবে জানেন। বাংলাদেশের টেক্সটাইল শিল্পের সাফল্য কীভাবে এল, ভারতে সেরকম কিছু করা সম্ভব কিনা জানতে চান এবং সেই প্রসঙ্গে জিএসটি ও নোটবন্দির ফলে কর্নাটকের বেল্লারির রমরমা জিনস শিল্পের অপূরণীয় ক্ষতির কথা জানান। দ্বিতীয় সবুজ বিপ্লবের সম্ভাবনা নিয়েও সুনির্দিষ্ট আলোচনা করেন। কন্যাকুমারী থেকে কাশ্মির পর্যন্ত হাঁটতে হাঁটতে তিনি সাধারণ মানুষের জীবনকে কতটা গভীরভাবে দেখেছেন তা মিনিট পঁচিশেকের ওই ভিডিওতে বেশ বোঝা যায়। রঘুরাম কিন্তু ঘোর পুঁজিবাদী অর্থনীতিবিদ। রাহুল আলোচনার এক জায়গায় প্রশ্ন করেন, “দেখতে পাচ্ছি স্টক এক্সচেঞ্জে টাকা লাগিয়ে দেশের সাধারণ মানুষ নিঃস্ব হয়ে যাচ্ছেন। এ বিষয়ে আপনার কী মত?”
দিল্লির রাজনৈতিক মহলে সকলেই জানেন, রাহুলকে কংগ্রেসের প্রবীণ নেতাদের অপছন্দ হওয়ার অন্যতম কারণ তাঁর এই বামপন্থী প্রবণতা। তিনি যেভাবে নাম করে দেশের সবচেয়ে বড় দুই ধনী— মুকেশ আম্বানি আর গৌতম আদানিকে আক্রমণ করেন, তা অনেকেরই পছন্দ নয়। কারণ অর্থনীতির দিক থেকে কংগ্রেসের ক্রমশ ডাইনে সরে যাওয়া আরম্ভ হয়েছিল রাহুলের বাবা রাজীব গান্ধীর আমলে, যা তুঙ্গে পৌঁছয় নরসিংহ-মনমোহন জুটির নেতৃত্বে। সেই কারণেই নরসিংহ বিজেপির বিশেষ পছন্দের লোক। শেখর গুপ্তার মত দক্ষিণপন্থী সাংবাদিকরা তাঁকে ‘ভারতের প্রথম বিজেপি প্রধানমন্ত্রী’ আখ্যাও দিয়ে থাকেন। সেই দলের নেতা হয়ে রাহুলের এভাবে বৃহৎ পুঁজিকে আক্রমণ, বারবার ‘ক্রোনি ক্যাপিটালিজম’ নিয়ে কথা বলা অনেক কংগ্রেসিরই না-পসন্দ।
তা বলে রাহুল বিপ্লবী নন, লেনিন বা মাও জে দং নন। কিন্তু তাঁকে অমন হতে হবে— এমন প্রত্যাশা করবই বা কেন? এ দেশে কমিউনিস্ট আন্দোলনের ইতিহাস শতবর্ষ পেরিয়ে গেলেও যখন বহুধাবিভক্ত কমিউনিস্ট পার্টিগুলোর মধ্যে থেকে তেমন কেউ উঠে এলেন না, তখন বহুত্ববাদী ভারত থাকবে কি থাকবে না— এই প্রশ্নের মুখে দাঁড়িয়ে কমিউনিজমের দাঁড়িপাল্লায় রাহুলকে মাপার মূঢ়তা ক্ষমার অযোগ্য। ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি আর রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল প্রায় একই সময়ে। একশো বছর পূর্ণ করার আগেই আরএসএস ভারতকে হিন্দুরাষ্ট্রে পরিণত করার পরিকল্পনায় চূড়ান্ত সাফল্যের কাছাকাছি পৌঁছে গেছে। সেখানে ভারতীয় কমিউনিস্টরা দারুণ শুরু করেও ১৯৬৪ সালের পর থেকে নিজেদের ভাঙতে-ভাঙতে এমন জায়গায় নিয়ে এসেছেন যে, অস্তিত্বেরই সঙ্কট তৈরি হয়েছে। ১৯৮৯ থেকে সংঘের শক্তি দ্রুত বেড়েছে, অথচ কমিউনিস্টরা সম্মুখসমরে যাওয়ার শক্তি ক্রমশ হারিয়েছেন। নব্বইয়ের দশকে তবু বিকল্প সরকার তৈরি করার ক্ষেত্রে নির্ণায়ক ভূমিকা নেওয়ার শক্তি ছিল, ২০০৯ সালের পর থেকে তা-ও আর অবশিষ্ট নেই।
স্বাধীনতার পর থেকে ভারতীয় রাজনীতির বাস্তুতন্ত্র মানে ছিল বামপন্থা বনাম মধ্যপন্থার লড়াই। সংঘ পরিবার সফলভাবে অটলবিহারী বাজপেয়ির আমল থেকে সেই বাস্তুতন্ত্রকে মধ্যপন্থা বনাম দক্ষিণপন্থার লড়াইয়ে পরিণত করতে শুরু করে। ২০২৪ নির্বাচনে রাহুল তথা কংগ্রেসকে উড়িয়ে দিয়ে জিততে পারলে ব্যাপারটা পুরোপুরি দক্ষিণপন্থা বনাম দক্ষিণপন্থা হয়ে দাঁড়াবে। কেবল মমতা ব্যানার্জি, অরবিন্দ কেজরিওয়াল, নবীন পট্টনায়করাই যদি বিরোধী দল হিসেবে টিঁকে থাকেন তা হলে বনাম শব্দটারও আর প্রয়োজন থাকবে কি না, সন্দেহ। পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় যেমন শাসক-বিরোধী সংঘাত বলে কিছু হয় না। যা হয় সব বিধানসভার বাইরে টিভি ক্যামেরার সামনে। সুতরাং গণতান্ত্রিক, বহুত্ববাদী ভারতকে বাঁচাতে হলে ভারতের আরএসএসবিরোধী শক্তিগুলোর হাতে কংগ্রেসের পাশে দাঁড়ানো ছাড়া কোনও বিকল্প নেই। বামপন্থীদের সামনেও নেই। নেহরুর নাম্বুদ্রিপাদ সরকারকে অকারণে বরখাস্ত করা, ইন্দিরার জরুরি অবস্থা, মনমোহনের অপারেশন গ্রিন হান্ট ইত্যাদি কারণে কংগ্রেস সম্পর্কে যত বিতৃষ্ণাই থাক, রাজনীতিতে আশু বিপদের চেয়ে বড় কোনও বিপদ নেই, কোনওদিন ছিল না। সে কারণেই ইন্দিরা যখন দেশের গণতন্ত্রের জন্য মূর্তিমান বিপদ হয়ে দেখা দিয়েছিলেন তখন জ্যোতি বসুর মতো প্রবাদপ্রতিম বাম নেতারা সংঘ-ঘেঁষা শক্তির উপস্থিতি সত্ত্বেও জয়প্রকাশ নারায়ণের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন।
রাহুল আরও একটা জায়গায় দেশের অন্য সব বিরোধী নেতার চেয়ে এগিয়ে আছেন, তা হল সরাসরি সংঘ-বিরোধিতা। অন্য সব দলের নেতাদেরই বিজেপির বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে দেখা যায়। একমাত্র রাহুলই বারবার বলেন, লড়াইটা আরএসএসের বিরুদ্ধে। দেশের মাটিতে জনসভায় বলেন, সাংবাদিক সম্মেলনে বলেন। আবার কেমব্রিজে বক্তৃতা দিতে গিয়েও বলেন। এ দেশের কমিউনিস্টদের চিরকালীন বদভ্যাস, তাঁরা অর্থনৈতিক বিভাজন ছাড়া আর কোনও বিভাজন স্বীকারই করতে চান না। গত শতকের তিনের দশকে এই কারণেই গিরনি কামগর ইউনিয়নের ধর্মঘটে শ্রীপাদ অমৃত ডাঙ্গের নেতৃত্বাধীন শ্রমিকদের সঙ্গে বাবাসাহেব ভীমরাও অম্বেডকরের নেতৃত্বাধীন দলিত শ্রমিকদের ঐক্য হয়নি। একশো বছর হতে চলল, কমিউনিস্টরা নিজেদের অবস্থানে অনড়। তাই রামমন্দির, হিজাব পরার জন্য মেয়েদের শিক্ষায়তনে ঢুকতে না-দেওয়া কিংবা গোমাংস ভক্ষণ বা পাচারের অভিযোগে মুসলমান হত্যার মতো ঘটনাগুলোকে বামপন্থীরা বলেন— আসল ইস্যু থেকে নজর ঘুরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা। আসল ইস্যুগুলো কী? না বেকারত্ব, দারিদ্র্য, মূল্যবৃদ্ধি ইত্যাদি। তাঁরা কিছুতেই মানবেন না, আরএসএস-বিজেপি মন্দির-মসজিদ, শিবাজি-মোগল ইত্যাদিকেই বৃহদংশের মানুষের কাছে আসল ইস্যু বলে প্রতিষ্ঠিত করতে সমর্থ হয়েছে। সে কারণেই উত্তরভারতের বিভিন্ন জায়গায় ধর্ম সংসদ আয়োজিত হয়, যেখানে প্রকাশ্যে গণহত্যার ডাক দেওয়া হয়। প্রশাসন যে কিছুই করে না সে তো প্রত্যাশিত, কিন্তু আমার-আপনার মতো সাধারণ মানুষই যে এইসব সংসদে যান তা সম্ভবই হত না তাঁদের কাছে বামপন্থীরা যেগুলোকে আসল ইস্যু বলেন সেগুলো নকল ইস্যু হয়ে না-গিয়ে থাকলে।
রাহুল কিন্তু এই কথাটা বোঝেন। তিনি জানেন, আসলে লড়াইটা সাংস্কৃতিক। সংঘ মানুষের মস্তিষ্কের দখল নিয়ে ফেলেছে। ভারত জোড়ো যাত্রায় তিনি যে বারবার বলছিলেন “নফরত কে বাজার মে মহব্বত কা দুকান খোলনে আয়া হুঁ” (ঘৃণার বাজারে ভালবাসার দোকান খুলতে এসেছি) তা স্রেফ কাব্যি নয়, সচেতন রাজনৈতিক স্লোগান। এই সময়ের প্রয়োজনীয় স্লোগান। সম্প্রতি এক আলোচনাসভায় নাগরিকত্ব আইন-বিরোধী আন্দোলন করতে গিয়ে কারাবাস করে আসা লেখক মনীশ আজাদের কথা শোনার সৌভাগ্য হয়েছিল। শ্রোতাদের একজন প্রশ্ন করলেন, হাথরসের সেই ভয়ঙ্কর ধর্ষণ ও খুনের পরেও সেখানকার নির্বাচনে বিজেপি কেন জেতে? লখিমপুর খেড়িতে বিজেপি নেতার ছেলে গাড়ির চাকার তলায় কৃষকদের পিষে দেওয়ার পরেও সেখানে বিজেপি কী করে জেতে? মনীশ বললেন, ৪০-৫০ বছরের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় সংঘ মানুষের মধ্যে এই ভাবনা প্রোথিত করতে সক্ষম হয়েছে যে, আসল ইস্যু হল ধর্ম, বর্ণ, জাতি— এইসব। অন্যান্য ইস্যুতে তুমি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারো, রেগেও যেতে পারো। কিন্তু ভোট দেওয়ার সময়ে সেসব ভুলে ধর্মের ভিত্তিতে দেবে। উদাহরণ দিয়ে বললেন, জিএসটি নিয়ে ক্ষুব্ধ গুজরাতের ব্যবসায়ীরা কয়েকদিন প্রবল আন্দোলন করার পরেই একটা শহরের রাজপথের ফেস্টুন ঝুলিয়ে দিয়েছিলেন, “হম নারাজ হ্যাঁয়, গদ্দার নহি” (আমরা বিরক্ত, কিন্তু বিশ্বাসঘাতক নই)। তারপর গুজরাত বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপি যথারীতি জেতে। সুতরাং বিজেপিকে হারাতে হলে এই মানসিকতাকে হারাতে হবে। অর্থনৈতিক অভাব অনটনই আসল ইস্যু, বাকি সবই নজর ঘুরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা— এই বালখিল্য রাজনীতি ফল দেবে না। কারণ, অপ্রিয় হলেও এটাই সত্য যে, বাজারটা ঘৃণার। রাহুল তাই ভালবাসার দোকান খোলার কথা বলেছেন। দোকানে কতজন খদ্দের আসবে, সে তো পরের কথা। কিন্তু যত বেশি দোকান খোলা হবে বাজারের পরিবেশ যে তত বদলাবে, তাতে তো সন্দেহ নেই। সত্যিকারের বিজেপি-বিরোধীরা এ কথা যত তাড়াতাড়ি বোঝেন তত ভাল। রাহুল মহাপুরুষ নন, সাধুসন্ত নন, বিপ্লবী তো ননই। তিনি একা কতটুকু পারবেন? তাঁর ক্ষয়িষ্ণু পার্টিই বা কতটা পারবে?
২০২৪ সালের নির্বাচন বস্তুত গণভোটে পরিণত হতে যাচ্ছে। প্রশ্ন একটাই— ভারত এক ধর্ম এক ভাষার দেশ হবে, নাকি নানা ভাষা নানা মত নানা পরিধানের দেশ থাকবে। প্রথমটার মুখ নরেন্দ্র মোদী, দ্বিতীয়টার রাহুল গান্ধী। কার সঙ্গে কার কোথায় নির্বাচনী আসন সমঝোতা হবে না-হবে সেসব পরের কথা, পাটিগাণিতিক আলোচনার বিষয়। রাজনৈতিক প্রশ্ন ওই একটাই। এ কথা অস্বীকার করলে আত্মপ্রতারণা হবে।
এমন বাইনারি নিঃসন্দেহে বহুদলীয় গণতন্ত্রের পক্ষে স্বাস্থ্যকর নয়। কিন্তু আমাদের সামনে আশু বিপদটা যে একদলীয় শাসন।