ডেমোক্রেসিতে গভমেন্টই সকলের মাইবাপ। কিন্তু কজনের বাপই গভমেন্ট হয়? যাদের হয় তারা এতকাল হাতে মাথা কেটে এসেছে, আর এখন একজন একটু সব ছবিতে থাকতে চেয়েছে বলে আপনারা তাকে ট্রোল করছেন! এমনি এমনি তো আর সাহেবরা বলেনি যে ভারত পরশ্রীকাতর লোকেদের দেশ। কোথায় বলেছে সেকথা জিজ্ঞেস করবেন না। একবার যখন লিখেছি সাহেবরা বলেছে, তখন অবশ্যই বলেছে। না বলে থাকলেও আপনাদের কীর্তিকলাপ দেখে শিগগির বলবে। সোশাল মিডিয়া হয়ে এই হয়েছে ঝামেলা। সকলেরই হাতে একখানা ফোন আছে, ফলে কারোর কোনো ণত্ব ষত্ব জ্ঞান নেই। যার যা সম্মান তাকে যে সেটা দিতে হয়, সেই বোধ নেই। যিনি এত বড় বোর্ডটাকে কাঁধে করে টেনে নিয়ে যাচ্ছেন, তিনি একটু বিশ্বকাপে হাত দিয়েছেন বলে সকলে যা খুশি তাই পোস্ট করে চলেছে। অবশ্য এ দেশের লোকের ধর্মই তো এই। যে দেশে প্রধানমন্ত্রীকেই লোকে সম্মান দেয় না, মিম বানায়; সে দেশে ক্রিকেট বোর্ডের প্রেসিডেন্টকে আর কে সম্মান দেবে?
অ্যাঁ, কী বলছেন? জয় শাহ প্রেসিডেন্ট নন, সেক্রেটারি? প্রেসিডেন্ট কে তাহলে? রজার বিনি? আরে ওসব বিনি পয়সার লোককে অত পাত্তা দেওয়ার কী আছে? তাছাড়া তেনাকে তো দেখাও যায় না চট করে, কথা-টথাও শোনা যায় না। ক্রিকেট কি যক্ষপুরী নাকি, যে রজারকে রক্তকরবীর রাজা বলে মেনে নিতে হবে? ওসব ছাড়ুন। মানিব্যাগ যার কাছে, সে-ই হল আসল রাজা। আজ দেশের ক্রিকেট চালাচ্ছেন, এশিয়ার ক্রিকেট চালাচ্ছেন, অন্যদের ঘাড় ধরে দুনিয়ার ক্রিকেটও নিজের মর্জি মত চালিয়ে নিচ্ছেন। কাল হয়ত বসেই পড়বেন আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিলের চেয়ারম্যানের চেয়ারে। যে দেশে কানার নাম হয় পদ্মলোচন, সে দেশে বিশ্বকাপে জয় পাওয়া এবং বিশ্বক্রিকেটের শাহ হতে চলা লোককে এত লোক গাল দিচ্ছে দেখলে মানুষটার প্রতি মায়া হয়। মানুষটার কতখানি মায়া দয়া সে খবর আপনারা রাখেন? এই যে হারিকেন বেরিলে আপনাদের প্রিয় ক্রিকেটাররা ওয়েস্ট ইন্ডিজে আটকে পড়েছিলেন, চার্টার্ড ফ্লাইট পাঠিয়ে তাঁদের উড়িয়ে আনল কে? ওই শর্মা, থুড়ি শাহই তো। শুধু কি তাই? ক্রিকেটাররা কে কোথায় কার সঙ্গে কানাকানি করলেন, কার সঙ্গে চুপিচুপি দেখা করলেন, ডিনার খেতে গেলেন, খেয়ে হোটেলে নিজের ঘরে গেলেন নাকি তার ঘরে গেলেন – এসব জরুরি ইনফর্মেশন আপনাদের ফোনে পৌঁছে দেন যে ধুরন্ধর জার্নালিস্টরা, তাঁদের পর্যন্ত উড়িয়ে এনেছেন বিসিসিআই সেক্রেটারি জয়। এমন লোকের নামে জয়ধ্বনি না দিয়ে তাকে নিয়ে চালাক চালাক জোক ক্র্যাক করা! এসব ধম্মে সইবে? নেহাত লোকটা বায়োলজিকাল, তাই অভিশাপ-টাপ দিতে পারে না। তা বলে লোকটাকে নাহক ছোট করবে দেশসুদ্ধ ক্রিকেটপ্রেমী মিলে?
বলা হচ্ছে যশপ্রীত বুমরার হাত থেকে নাকি কোনো এক দুর্বল মুহূর্তে জয় কাপটা ছিনিয়ে নিয়েছিলেন রোহিত শর্মার সঙ্গে ছবি তুলবেন বলে।
কী এমন মহাভারত অশুদ্ধ হয়েছে তাতে? বছর বছর আইপিএলের ম্যাচ বাড়িয়ে খেলোয়াড়দের আরও ধনী করার ব্যবস্থা করছেন, ফি বছর আইসিসি টুর্নামেন্টের বন্দোবস্ত করেছেন (২০১৯ – ৫০ ওভারের বিশ্বকাপ, ২০২১ – বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপ ফাইনাল আর ২০ ওভারের বিশ্বকাপ, ২০২২ – আবার ২০ ওভারের বিশ্বকাপ, ২০২৩ – বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপ ফাইনাল আর ৫০ ওভারের বিশ্বকাপ, ২০২৪ – আরও একবার ২০ ওভারের বিশ্বকাপ, ২০২৫ – চ্যাম্পিয়নস ট্রফি আর বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপ ফাইনাল) যাতে ক্রিকেটাররা বড় ট্রফি জেতার অনেক সুযোগ পান, বৃষ্টির সম্ভাবনা থাকলে অন্য সেমিফাইনালে রিজার্ভ ডে রেখে ভারতের ম্যাচে না রাখার ব্যবস্থা করেছেন, গতবছর দেশের মাঠে বিশ্বকাপের আয়োজন করে অন্য দেশের সমর্থকদের আসার রাস্তা এমনভাবে বন্ধ করেছিলেন যে খেলোয়াড়রা গ্যালারিতে কেবল নীল সমুদ্রই দেখতে পেতেন। মানে রোহিত, বুমরারা দারুণ খেলেন তাই। যদি না-ও খেলতেন, তাহলেও তাঁদেরই হাতে ট্রফি তুলে দেওয়ার জন্যে যতটা করা সম্ভব, সবটাই শাহ করেছেন। এশিয়া কাপ থেকে শুরু করে বিশ্বকাপ – সর্বত্রই করে থাকেন। এত কিছু করার পরেও যারা প্রশ্ন তোলে – এই লোকটার কী যোগ্যতা আছে কাপ হাতে নেওয়ার, তারা দেশদ্রোহী ছাড়া কী?
তাছাড়া আপনারা খেয়ালই করেন না যে আপনাদের জন্যেও মানুষটা কত করে। সাত সমুদ্দুর তেরো নদীর পারে বিশ্বকাপ হল, তবু কেমন সন্ধেবেলা অফিস থেকে ফিরে মাঝরাত অব্দি খেলা দেখে আবার পরদিন সকাল সকাল অফিস চলে গেলেন। ওদিকে যেখানে খেলা হল সেখানকার লোকেরা সাতসকালে বা ভরদুপুরে কাজকম্ম ফেলে মাঠে যেতে পারল না বলে অনেক খেলায় গ্যালারি বিজেপির ভোটের মিটিংয়ের মাঠের মত খালি গেল। শাহের বোর্ড না থাকলে আপনারই চেতনার রঙে পান্না সবুজ হতে পারে, চুনি রাঙা হয়ে উঠতে পারে আর আপনার প্রাইম টাইমে ভারতের ক্রিকেট ম্যাচ হতে পারে একেবারে অন্য গোলার্ধে – এ কি স্বপ্নেও ভাবতে পারতেন? তা এত কাণ্ড যে টাকার গরমে সম্ভব হল, সে টাকার মালিককে আপনারা ফ্রেমের বাইরে রাখতে চান? নিজেদের ইচ্ছা মত টুর্নামেন্ট সাজিয়ে নেয়া নিয়ে সায়েবরা লেখালিখি করলে গোঁফে তা দিয়ে আপনারা বলেন – ‘এসব সাদা চামড়ারা অনেক করেছে। এখন আমাদের সময়, আমরা করব।’ আর এদেশের দু-একজন সাংবাদিক ভুল করে লিখে ফেললে দুর্বাসা মুনির মতন রেগে বলেন ‘অ্যান্টি-ন্যাশনাল।’ সত্যযুগ হলে বেচারিরা ভস্মই হয়ে যেত। তা এখন শাহের জন্যেও চাড্ডি হাততালি দিলেন না হয়।
আরও পড়ুন ভারতীয় ক্রিকেট: জাহান্নামের আগুনে পুষ্পের হাসি
কী দরাজ মন দেখুন তো লোকটার! আইসিসি চ্যাম্পিয়ন টিমকে দিয়েছে এদেশের কারেন্সিতে ২০ কোটি টাকা মত, আর উনি দিচ্ছেন ১২৫ কোটি। পঞ্চাশ গ্রামের টুর্নামেন্টে কোনোদিন দেখেছেন, কমিটি দিল ৫০১ টাকা আর আপনার ক্লাব দিল ৩০০১ টাকা? আহা! অমন হলে দুনিয়াটাই অন্যরকম হত মশাই। একবার ভাবুন। দুনিয়ার ফিফথ লার্জেস্ট ইকোনমির দেশ আমাদের, তাও এত লোক গরিব যে জয়ের জেঠুমণির সরকার ৮০ কোটি লোককে ফ্রিতে রেশন দেয়ার ব্যবস্থা করেছে। সেই দেশের ক্রিকেট দলকে ২০ ওভারের বিশ্বকাপ জেতার জন্যে ১২৫ কোটি টাকা দিলেন জয়। কিছু লোক আবার কেমন নিন্দুক দেখুন – বলে বেড়াচ্ছে যে এটা তেলা মাথায় তেল দেয়া। একেকজনের ভাগে কোটি পাঁচেক করে পড়বে, ওর চেয়ে বেশি ওরা এনডর্সমেন্ট থেকেই পায়। এদিকে মেয়েদের আর ছেলেদের দলের ম্যাচ ফি সমান করে দিয়ে মেয়েদের ম্যাচের আয়োজনই করা হয় না। তা ওদের জন্যে কিছু ভাবলে হত। কোভিডে রঞ্জি ট্রফি বন্ধ থাকার সময়ে দিন আনি দিন খাই অবস্থা হয়েছিল অনেক ঘরোয়া ক্রিকেটারের। তাদের জন্যেও কিছু করে না জয়ের বোর্ড। আরে বাপু, মানুষটার মনটা নরম বলে কি দানসত্র খুলে বসতে হবে নাকি? যারা টাকা করার ব্যবস্থা করে তাদেরই দেয়ার বন্দোবস্ত করা হয়েছে। যে সে মাথায় তেল দিলে চলবে? তেলের যা দাম বেড়েছে।
তা ক্রিকেটাররা কি কিছু মাইন্ড করেছেন? দেখে মনে তো হল না। তাঁরা জানেন যে জয় হলেন গোপাল পাঁঠার মত। তিনি আছেন বলে আমি আছি, আপনি আছেন, রোহিত আছেন, বিরাট আছেন, বুমরা আছেন, হার্দিক আছেন। তাই লক্ষ্মী ছেলের মত তাঁরা বিভিন্ন ব্যাপারে জয়ের জেঠুমণির সরকারের পক্ষ নিয়ে পোস্ট করে দেন। আবার লক্ষ্মী ছেলের মত পোস্ট করেন না, যখন দেশের মহিলা অলিম্পিয়ানদের রাতের অন্ধকারে টেনে হিঁচড়ে রাস্তা থেকে তুলে নিয়ে যায় জয়ের বাবার পুলিস।
দেশের লোক কি কিছু মাইন্ড করেছে? মোটেও না। নিদেনপক্ষে মুম্বাইয়ের লোকেরা তো একেবারেই মাইন্ড করেনি। ১৯৮৩ সালের কথা বাদ দিন, ২০০৭ বা ২০১১ সালেও মেরিন ড্রাইভে এত লোক দেখা যায়নি উইক ডে-তে ভর সন্ধেবেলা। এই অনন্ত আনন্দধারার মধ্যে স্রেফ মুখখানা অপছন্দ বলে ছুতোয় নাতায় মিষ্টি লোকটার পিছনে লেগে অ্যাম্বিয়েন্সটা বিগড়ে দেবেন না মাইরি। কটা দিন অন্তত নিট, নেট, ব্রিজ ভাঙা, এয়ারপোর্টের ছাদ ধসে পড়ে অক্কা পাওয়া, দেশের রাজধানীতে জলের অভাবে মিনিস্টারের অনশন, অগ্নিবীর, ঠেঙিয়ে মুসলমান হত্যা – এসব পলিটিকাল কচকচি ভুলে থাকতে দিন। আচ্ছে দিন না আসুক, আচ্ছে উইন তো এসেছে। গলা ছেড়ে গেয়ে উঠুন ‘জয় জয় জয় জয় হে’।
নাগরিক ডট নেটে প্রকাশিত

2 thoughts on “জয় জয় জয় জয় হে”