সবার উপরে জয় শাহ সত্য

আমরা তো ছোটবেলায় শুনতাম যা রাজার নীতি সেটাই নাকি রাজনীতি। সুতরাং রাজা যা করেন সেটাকেই নৈতিক বলে ধরতে হবে। দয়া করে আবার জিজ্ঞেস করে বসবেন না ‘কে রাজা?’

পশ্চিমবঙ্গে অনেকেই সেই শনিবার থেকে আমাদের প্রধানমন্ত্রীর উপর চটে রয়েছেন। তাঁদের বক্তব্য— বিজেপির নির্বাচনী প্রচার করতে এসে কেন সেই প্রচারেরই পাশের মঞ্চ থেকে সরকারি কাজ করা হবে? এটা অনৈতিক। এত রাগ করার কোনো মানেই হয় না। আরে বাপু, রাজনীতি কথাটার মধ্যে আগে তো ‘রাজ’, পরে ‘নীতি’। তাছাড়া আমরা তো ছোটবেলায় শুনতাম যা রাজার নীতি সেটাই নাকি রাজনীতি। সুতরাং রাজা যা করেন সেটাকেই নৈতিক বলে ধরতে হবে। দয়া করে আবার জিজ্ঞেস করে বসবেন না ‘কে রাজা?’ যিনি শাসক, তিনিই রাজা। কী বলছেন? ভারত রাজতান্ত্রিক দেশ নয়, গণতান্ত্রিক? হ্যাঁ সে তো বটেই। মোদীজি নিজেই তো বারবার বলেন যে আমরা হলাম পৃথিবীর বৃহত্তম গণতান্ত্রিক দেশ, আমাদের গর্ব হওয়া উচিত। ঠিকই বলেন। আমরা তো ভোট দিয়ে রাজা নির্বাচন করি, অতএব আমরা গণতন্ত্র।

এখন কথা হচ্ছে, এত বড় দেশের সবকিছু তো আর একজন রাজার পক্ষে চালানো সম্ভব নয় (এমনিতেই মোদীজি দিনে চার ঘন্টার বেশি ঘুমোন না)। তাই সবকিছুর জন্যে আবার আলাদা করে ছোট ছোট রাজা রাখতে হয়। ক্রিকেটের রাজা হলেন মোদীজির প্রধান মন্ত্রণাদাতা অমিত শাহের সুপুত্র জয় শাহ। ভারতকে বিশ্বগুরু করার যে স্বপ্ন মোদীজি দেখেছিলেন, তা আপাতত হরমুজ প্রণালীতে আটকে পড়েছে বলে আপনারা অনেকে খিল্লি করছেন বটে, কিন্তু সে স্বপ্ন ক্রিকেটবিশ্বে সফল করে ফেলেছেন মোদীজির স্নেহভাজন জয়।

মোদীজির মত পরিশ্রমী মানুষকে ছোট থেকে দেখে বড় হওয়া জয় তাঁকেই যে জীবনের ধ্রুবতারা করেছেন তা একেবারে পদে পদে টের পাওয়া যায়। যেমন ধরুন, মোদীজি যেমন সরকারে আর পার্টিতে তফাত করেননি ব্রিগেডে, জয়ও ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড আর আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিলে তফাত করেন না। তিনি এখন আর ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের কেউ নন, আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিলের চেয়ারম্যান। অথচ ভারত জিতলে তিনি উল্লাস প্রকাশ করেন। ২০২৫ চ্যাম্পিয়নস ট্রফির পরে করেছিলেন, কয়েকদিন আগে ভারত কুড়ি বিশের বিশ্বকাপ জেতার পরেও করেছেন। এবারে আরও এক ধাপ এগিয়ে ভারত অধিনায়ক সূর্যকুমার যাদব আর কোচ গৌতম গম্ভীরকে সঙ্গে করে ট্রফিসুদ্ধ মন্দিরে নিয়ে গেছেন, পুজো দিয়েছেন। যেন তিনি বিশ্ব ক্রিকেটের কর্তা নন, ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডেরই কর্তা। জয় প্রথম ভারতীয় নন যিনি আইসিসির মাথায় বসেছেন। ভারত পৃথিবীর সবচেয়ে ধনী (তথা প্রভাবশালী) ক্রিকেট বোর্ড হওয়ায়, ভারতীয় বোর্ডের সর্বোচ্চ পদাধিকারীরা অনেকেই পরে আইসিসি প্রধান হয়েছেন। আইসিসির সংবিধান বদল করার আগে সর্বোচ্চ পদ ছিল সভাপতির। বাংলা থেকে জগমোহন ডালমিয়া, মুম্বাই ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশন থেকে শরদ পাওয়ার, বিদর্ভ ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশন থেকে শশাঙ্ক মনোহর সেই দায়িত্ব সামলেছেন। চেন্নাইয়ের এন শ্রীনিবাসন প্রথম চেয়ারম্যান ছিলেন। ওঁদের কাউকেই এই কাণ্ড করতে দেখা যায়নি। যে অস্ট্রেলীয় আর ইংরেজ ক্রিকেট প্রশাসকদের একসময় আইসিসিতে একাধিপত্য ছিল, তাঁদের কাউকেও নিজের দেশের কোনো ট্রফি জয়ে উল্লাস করতে দেখা যায়নি।

যাবেই বা কেন? যাঁর উপরে গোটা পৃথিবীর খেলাটার দায়িত্ব, তিনি কখনো নিজের দেশের সাফল্য নিয়ে মেতে থাকতে পারেন? থাকলে তাঁকে অন্যরা অভিভাবক হিসাবে বিশ্বাস করবে? ব্রিটিশ কিংবদন্তি অ্যাথলিট সেবাস্তিয়ান কো একসময় ইন্টারন্যাশনাল অ্যাসোসিয়েশন অফ অ্যাথলেটিক্স ফেডারেশনসের সভাপতি ছিলেন। অলিম্পিকে ব্রিটেনের অ্যাথলিটরা সোনা জিতলে তিনি লাফালাফি করছেন— এমন দৃশ্য কল্পনাও করা যায়নি। অবশ্য ওঁদের জয় কেনই বা অনুসরণ করতে যাবেন মোদীজির মত আদর্শ সামনে থাকতে? মোদীজি প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর থেকে দিল্লির চেয়ে আমাদের জাতীয় জীবনে যে আমেদাবাদের গুরুত্ব বেড়ে গেছে, সেকথা কে না জানে? অন্য দেশের রাষ্ট্রপ্রধানরা এলে আমেদাবাদে তাঁদের নিয়ে যাওয়া হবেই। মার্কিন রাষ্ট্রপতি, জাপানের প্রধানমন্ত্রী, চীনের রাষ্ট্রপতি, অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী— তালিকায় কে নেই? পুরনো সর্দার প্যাটেল স্টেডিয়াম ভেঙে দিয়ে প্রধানমন্ত্রীর নামাঙ্কিত দেশের সবচেয়ে বড় ক্রিকেট স্টেডিয়ামও তৈরি করা হয়েছে আমেদাবাদে, যদিও হালে যশপ্রীত বুমরা-অক্ষর প্যাটেল আসার আগে পর্যন্ত ভারতের ক্রিকেট ইতিহাসে ওই শহরের অবদান শূন্য বললে ভুল বলা হয় না। রঞ্জি সিং থেকে শুরু করে চেতেশ্বর পূজারা, রবীন্দ্র জাদেজা পর্যন্ত যে কজন ভারতীয় ক্রিকেটার গুজরাট রাজ্য থেকে জাতীয় দলে এসে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ছাপ ফেলেছেন, তাঁরা কেউই আমেদাবাদের ক্রিকেটার নন। ওঁরা খেলতেন সৌরাষ্ট্র ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশনের হয়ে। আমেদাবাদ যে ক্রিকেট সংস্থার ঘরের মাঠ, সেই গুজরাট ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশনের দলটা আজ পর্যন্ত রঞ্জি ট্রফি জিতেছে মোটে একবার, তাও মোটে এক দশক আগে, ২০১৬-১৭ মরশুমে। মানে ঐতিহ্য বলতে তেমন কিছুই নেই। সবচেয়ে বড় কথা— আমেদাবাদে ক্রিকেটের জনপ্রিয়তা মুম্বাই, কলকাতা, বেঙ্গালুরু, চেন্নাই, দিল্লির চেয়ে অনেক কম। কলকাতায় এবারের বিশ্বকাপেও ইতালি বনাম ওয়েস্ট ইন্ডিজ ম্যাচ দেখতে মেলা লোক হয়েছিল, আমেদাবাদে ২০২৩ বিশ্বকাপের উদ্বোধনী ম্যাচ প্রায় ফাঁকা গ্যালারিতে হয়েছে। সেই স্টেডিয়ামের উদ্বোধন আবার ক্রিকেট ম্যাচ দিয়ে হয়নি, হয়েছিল মোদী-ট্রাম্পের যুগ্ম সমাবেশ দিয়ে। সেদিন কিন্তু দর্শকের অভাব হয়নি।
স্পষ্ট বোঝা যায়, জয় মোদীজির যে জীবনাদর্শ অক্ষরে অক্ষরে মেনে চলেন তা হল— সবার উপরে গুজরাট সত্য তাহার উপরে নাই। এ পথেই তিনি চলতেন ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের সচিব থাকার সময়ে, গোটা ভারত নিয়ে ভাবতেন না।

অতএব আইসিসি কর্তা হয়ে গিয়ে তাঁর ভারত নিয়েই মেতে থাকায় আশ্চর্যের কিছু নেই। বরং এই আচরণ যে রীতিমত প্রশংসনীয়, তা দেশের সংবাদমাধ্যমও মনে করছে। তাই গত শনিবার সিএনবিসি-টিভি১৮ ইন্ডিয়া বিজনেস লিডার অ্যাওয়ার্ডসে তাঁকে ক্রিকেটের প্রতি ব্যতিক্রমী অবদানের জন্য পুরস্কারও দেওয়া হয়েছে। সত্যিই তো! জয়ের আগে কে-ই বা নিজের দায়িত্ব, কর্তব্য, পদমর্যাদার তোয়াক্কা না করে দেশসেবা করতে পেরেছে!

সেবা বলে সেবা? ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড গত রবিবার ভারতের ২০২৬ কুড়ি বিশের বিশ্বকাপ জয়ী পুরুষদের দল এবং ২০২৫ চ্যাম্পিয়নস ট্রফি জয়ী দল, ২০২৬ অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপ জয়ী ছেলেদের দল, ২০২৫ পঞ্চাশ ওভারের বিশ্বকাপ জয়ী মহিলাদের দল এবং ২০২৬ অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপ জয়ী মেয়েদের দলকে সংবর্ধনা দিয়েছে। সেখানেও সশরীরে হাজির ছিলেন জয়। বোর্ড সভাপতি মিঠুন মনহাসের চেয়ে তাঁরই ছবি দেখা যাচ্ছে বেশি।

আরও পড়ুন জয় জয় জয় জয় হে

আবার ভারতের ক্রীড়া সাংবাদিকদের সংগঠন জয়কে সংবর্ধনা জানিয়েছে। সেখানে তিনি বড় মুখ করে বলেছেন, তিনি নাকি বোর্ডের কর্তা থাকার সময়ে একেবারে ২০২৮ অলিম্পিক পর্যন্ত কী কী করতে হবে তার পরিকল্পনা করে দিয়েছেন। এখন যাঁরা বোর্ড চালাচ্ছেন তাঁদের ২০৩৬ অলিম্পিক পর্যন্ত কীভাবে কী করা হবে তা ছকে ফেলা উচিত। এখানেও জয় অনন্য। অতীতে কোনো ক্রিকেট প্রশাসককে ক্রীড়া সাংবাদিকরা সংবর্ধনা জানিয়েছেন কিনা খুঁজে বের করতে গবেষক লাগবে। প্রশাসকদের সাংবাদিকরা সংবর্ধনা দেবেন কী জন্যে? দিল্লির এডিটর্স গিল্ড কোনোদিন কোনো ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীকে ডেকে সংবর্ধনা দিয়েছে নাকি? দেশ চালানোটাই কি একটা অভিনন্দনযোগ্য কাজ, যার জন্যে প্রধানমন্ত্রীর সংবর্ধনা প্রাপ্য? যদি তা না হয়, তাহলে ক্রীড়া সাংবাদিকরাই বা কোন অর্জনের জন্যে জয়কে সংবর্ধনা দিলেন? ভারতীয় ক্রিকেট দলের সাফল্যের জন্যে নাকি? তাহলে তো ক্রিকেটারদের সংবর্ধনা দেওয়া উচিত ছিল। বড় জোর বোর্ড সভাপতি বা সচিবদের। আইসিসি চেয়ারম্যানকে যদি ভারতীয় ক্রিকেট সাংবাদিকরা ভারতীয় ক্রিকেটের সাফল্যের জন্যে সংবর্ধনা দেন, তাহলে তো…
যাকগে, অমৃতকালের ভারতে সবই সম্ভব। “পাঞ্জাব সিন্ধু গুজরাট মারাঠা দ্রাবিড় উৎকল বঙ্গ” গেয়ে খেলতে নামা হিন্দু, বৌদ্ধ, শিখ, জৈন, পারসিকদের ক্রিকেট দল বিশ্বকাপ জেতার পর সেই ট্রফি নিয়ে যদি হিন্দু অধিনায়ক, কোচ আর জয় শাহ দেশের মন্দিরে মন্দিরে ঘুরে বেড়ালে দোষ না হয়, তাহলে সাংবাদিকরা প্রশাসকদের প্রশ্ন করার কর্তব্য ভুলে তাঁদের সংবর্ধনা দিতে ব্যস্ত হয়ে পড়লেও দোষ হয় না। শেষে “জয় জয় জয় জয় হে” গেয়ে নিলেই সাত খুন মাপ।

অ2অনুস্বর ডট কম ওয়েবসাইটে প্রকাশিত

না হয় আজ চ্যাম্পিয়ন হলাম, কিন্তু ভারতীয় দলটা আসলে কার?

নয়ের দশকে রঙিন জামার ক্রিকেট চালু হওয়ার পর থেকে নানা ধরনের নীল জার্সি পরে আসছে ভারত, তার মধ্যেও গেরুয়া রং ঢুকে পড়েছে।

যদি বলি আজ গ্রহ, উপগ্রহগুলো চিন্তায় আছে— তাহলে হাসাহাসি করবেন না। ব্যাপার খুব গুরুতর। টানা দ্বিতীয়বার যদি ভারতীয় দল কুড়ি বিশের বিশ্বকাপ জিতে যায়, তাহলে কোনও কথা নেই। কিন্তু যদি হেরে যায়, তখন বৃহস্পতি কোন অবস্থানে থাকার জন্যে চরম মুহূর্তে ঈশান কিষণের হাত থেকে অমুক ক্যাচটা পড়ে গেল, অথবা শনির কোন চক্রান্তে যশপ্রীত বুমরার ইয়র্কারটা লেংথ মিস করে ফুলটস হয়ে গেল আর ড্যারিল মিচেল বোল্ড হওয়ার বদলে ছক্কা মেরে দিলেন— তা নিয়ে শোরগোল পড়ে যেতে পারে। তাতে কোন জ্যোতিষীর কপাল পুড়বে আমরা জানি না। যাঁর পুড়বে তিনি নিজের পিঠ বাঁচাতে বলতেই পারেন “আমার গণনায় ভুল ছিল না। হতভাগা শনি নিজের গতি কমিয়ে ফেলেছে চক্রান্ত করে। ভাগ্যিস বৃহস্পতিটাকে বেঁধে রেখেছিলাম, তাই শেষ ওভার পর্যন্ত গেছে। নইলে দু ওভার আগেই খেল খতম হয়ে যেত।”

আষাঢ়ে গপ্পো লিখছি ভেবে অন্য লেখায় চলে যাচ্ছেন তো? আচ্ছা যাবেন নাহয়। যাওয়ার আগে শুনে যান, বাংলার সাংবাদিক বা ইউটিউবাররা আপনাকে খবরটা না দিলেও, দি ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস কাগজের সাংবাদিক দেবেন্দ্র পাণ্ডে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে সেমিফাইনালের আগেরদিন লিখেছিলেন যে, ভারতীয় দলের ওয়াংখেড়ে স্টেডিয়ামে অনুশীলন করার কথা ছিল সন্ধে ছটা থেকে। কিন্তু যেহেতু সেদিন চন্দ্রগ্রহণ চলার কথা বিকেল তিনটে কুড়ি থেকে ছটা বেজে সাতচল্লিশ মিনিট পর্যন্ত, সেহেতু টিম ম্যানেজমেন্ট ঠিক করে, এই অশুভ সময়ে শুভ কাজ করতে না যাওয়াই ভালো। তাই অনুশীলন শুরু হয় চন্দ্রগ্রহণের পরে।

শাস্ত্রে বলেছে— মহান ব্যক্তিরা যে পথে চলেন সেটাই সঠিক পথ। আর কে না জানে, ভারতীয় ক্রিকেটের ভাগ্যনিয়ন্তারা সকলেই মহান! গৌতম গম্ভীর থেকে শুরু করে বোর্ড সভাপতি মিঠুন মানহাস, সকলেই সনাতনী। ২০১৫-১৬ মরশুমে গম্ভীর যখন দিল্লির রঞ্জি দলের অধিনায়ক ছিলেন, তখনও নাকি এসব হতো। তবে তফাতটা হল, তখন গম্ভীর আর কোচ বিজয় দাহিয়া বুক ফুলিয়ে বলতেন যে তাঁরাই এটা করাচ্ছেন। এখন কে যে চন্দ্রগ্রহণের সময়ে অনুশীলন না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তা কিন্তু প্রকাশ্যে বলা হচ্ছে না। দেবেন্দ্র পাণ্ডের ওই প্রতিবেদনেও বলা নেই। প্রতিবেদনে কেবল বলা আছে ‘টিম ম্যানেজমেন্ট’। সাধারণত এই শব্দগুলো দিয়ে বোঝানো হয় অধিনায়ক, কোচ আর নির্বাচকদের। আজকাল ‘সাপোর্ট স্টাফ’-ও গুরুত্বপূর্ণ, ফলে ব্যাটিং কোচ সীতাংশু কোটকও সিদ্ধান্তটা নিয়ে থাকতে পারেন। বোলিং কোচ মর্নি মর্কেলের ধর্মে চন্দ্রগ্রহণ অশুভ বলা আছে বলে তো জানা নেই। সিদ্ধান্তটা সূর্যকুমার যাদব, গম্ভীর, কোটক, নির্বাচন সমিতির প্রধান অজিত আগরকর— সকলে মিলেও নিয়ে থাকতে পারেন। দলে যতই সঞ্জু স্যামসনের মত খ্রিস্টান, অর্শদীপ সিংহের মতো শিখ আর মহম্মদ সিরাজের মত মুসলমান ক্রিকেটার থাকুন, দলটা তো সনাতনীদেরই। ফলে তাঁদের ধর্মে যে সময়টাকে অশুভ বলা হয়েছে, সেইসময় অনুশীলন করা যে কোনওভাবেই চলতে পারে না তাতে সন্দেহ কী?

এ মা! রেগে গেলেন নাকি? আরে আমি কি বলেছি যে ব্যাপারটা অন্যায় হয়েছে? আমি শুধু বলছি, অক্ষরে অক্ষরে শাস্তর মেনে পাঁজি-টাজি দেখে যখন মাঠে নামা হচ্ছে, তখন দল হেরে গেলে তার দোষ কখনওই খেলোয়াড়দের বা কোচদের হতে পারে না। সব গ্রহদোষ। এমনিতেও সর্বশক্তিমান জয় শাহ বিসিসিআই ছেড়ে আইসিসির চেয়ারম্যান হয়ে যাওয়ার পরে বিসিসিআইয়ের কোনও সিদ্ধান্ত যে কে নেন তা কেউ বলে না। সিদ্ধান্তগুলো সর্বসমক্ষে জানান বোর্ড সচিব দেবজিৎ শইকিয়া, কিন্তু নেন কে? সেকথা কিন্তু দেবজিৎও বলেন না।

যেমন ধরুন, বাংলাদেশে দীপু দাসকে হত্যা করা হয়েছে বলে বাংলাদেশের ক্রিকেটার মুস্তাফিজুর রহমানকে ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগে খেলতে দেওয়া যাবে না— এই সিদ্ধান্ত কে নিয়েছে? ভারত সরকার? না তো! বিদেশমন্ত্রী এস জয়শংকর বা প্রতিরক্ষা মন্ত্রী রাজনাথ সিংহ মোটেই এরকম কিছু বলেননি। তাঁদের মন্ত্রকের কোনও উচ্চপদস্থ অফিসারও বলেননি। বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে আমাদের সরকারের সম্পর্কেরও কোনও অবনতি হয়নি ওদেশের প্রাক-নির্বাচনী খুনোখুনির কারণে। বেগম খালেদা জিয়া মারা যাওয়ার পরে জয়শংকর, রাজনাথ তাঁকে শ্রদ্ধা জানিয়েছেন। খালেদা-পুত্র তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পরে তাঁর সঙ্গে কুশল বিনিময়ও হয়েছে। তাহলে মুস্তাফিজুরের অপরাধটা কী? কেউ জানে না। আপাতত বাংলাদেশে হিন্দুবিদ্বেষী জামাত-এ-ইসলামি তো হেরে ভূত, তাহলে আইপিএলের সময়ে মুস্তাফিজুরকে ডেকে নেওয়া হবে কি? কেউ জানে না। কারণ তাড়ানোর সিদ্ধান্তটা কে নিয়েছিল তা-ই কেউ জানে না। কেবল দেবজিৎ একদিন ঘোষণা করে দিয়েছিলেন যে কলকাতা নাইট রাইডার্সকে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে— ওকে বাড়ি পাঠাতে হবে।

তেমনই পহলগামে সন্ত্রাসবাদীরা হানা দিয়ে অনেককে খুন করেছে বলে ভারতীয় ক্রিকেটাররা পাকিস্তানিদের সঙ্গে খেলবেন কিন্তু করমর্দন করবেন না, অর্থাৎ ‘যেমন বেণী তেমনি রবে চুল ভিজাব না’— এই সিদ্ধান্ত কে নিয়েছিল, তাও কেউ জানে না। বলা হয়, বিসিসিআই সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বিসিসিআই কি গা ছমছমে হলিউডি কল্পবিজ্ঞান ফিল্মে দেখা সর্বশক্তিমান কোনও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, যে মানুষকে দিয়ে যা ইচ্ছে করিয়ে নেয়, মানুষ টেরই পায় না? বিসিসিআইয়ের তো একজন সভাপতি আছেন। বোর্ডের সংবিধান অনুযায়ী তিনিই সর্বোচ্চ নীতি নির্ধারক। অথচ তিনি তো কই কিছু বলেননি! আচ্ছা কে এই ভদ্রলোক? চেনেন তাঁকে? না চিনলে লজ্জা পাওয়ার কিছু নেই। দিল্লির বাইরে তাঁকে বিশেষ কেউ চেনে না। প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে মন্দ ব্যাট করতেন না, দিল্লির হয়ে খেলতেন। বিসিসিআইয়ের সভাপতির আসনে বসেছেন জগমোহন ডালমিয়া, এন শ্রীনিবাসনের মত নামকরা শিল্পপতিরা; কখনও এনকেপি সালভে, মাধবরাও সিন্ধিয়া, শরদ পাওয়ারের মত বড় মাপের রাজনৈতিক নেতারা, কিম্বা রাজ সিংহ দুঙ্গারপুর, সৌরভ গাঙ্গুলির মতো প্রাক্তন ক্রিকেটার অথবা শশাঙ্ক মনোহরের মত ক্রিকেটপ্রেমী ক্ষমতাশালী লোকেরা। এই আসনে মিঠুনকে বসানো মানে হল “চন্দ্র সূর্য অস্ত গেল/জোনাক ধরে বাতি/ভীষ্ম দ্রোণ কর্ণ গেল/শল্য হল রথী।” এই লজ্জাতেই হয়তো মিঠুন মুখ খোলেন না বা সংবাদমাধ্যম তাঁর কাছে কিছু জানতেও চায় না, যা বলার দেবজিতই বলেন। তাহলে দেবজিৎ কি শ্রীরামকৃষ্ণ, আর মিঠুন গিরিশ ঘোষ? দেবজিতকে বকলমা দিয়েছেন? কেন দিলেন? কার নির্দেশে দিলেন? উত্তর নেই।

অবশ্য মিঠুনের পূর্বসুরি রজার বিনি, যাঁর ক্রিকেটিয় কীর্তি ভোলার নয় কারণ তিনি ভারতের প্রথম বিশ্বকাপ জয়ী দলের সদস্য, তিনিও কোনও সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন বলে জানা যায় না। যা ঘটত সবই যে তৎকালীন সচিব জয়ের নির্দেশে, তা নিয়ে তখন রাখঢাক ছিল না। ব্যাপারটা রেখে ঢেকে করা হতো সৌরভ বিসিসিআই সভাপতি থাকাকালীন।

সাংবাদিক শারদা উগ্রা ২০২৩ সালেদ্য ক্যারাভ্যান পত্রিকায় এক দীর্ঘ প্রতিবদনে লেখেন যে, সৌরভের আমলের শেষদিকে জয়ের নির্দেশে বিসিসিআইয়ের অন্যরা সৌরভের ফোনই ধরতেন না। সৌরভ যে বোর্ড সভাপতি হতে পেরেছিলেন জয়ের বাবা, দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের আনুকূল্যে— সেকথা এখন অনেকেরই জানা। সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে তৈরি নতুন সংবিধান ফের বদলাতে আদালতে বারবার আবেদন করে সৌরভ অনেকদিন পদে টিকে ছিলেন জয়ের সঙ্গে গলাগলি করে। তার মূল্য তাঁকে চোকাতে হয়েছে। যা-ই হোক, কথা হল, এখন তো আর জয় বিসিসিআই কর্তা নন। তাহলে বিসিসিআই চালাচ্ছে কে? এই প্রশ্ন মনে জাগতে পারে। তাই মনে রাখবেন— শারদার ওই প্রতিবেদনের শিরোনাম ‘Shah’s Playground: BJP’s Control of Cricket in India’।

অর্থাৎ বিসিসিআই হল জয়ের খেলার মাঠ তথা বিজেপির শাখা অফিস। এই কথাটি ক্রিকেটমহলে জানে সবাই, কিন্তু লেখার মত মেরুদণ্ড গোটা ভারতে হাতে গোনা যে কজনের আছে (বাংলায় কারও নেই), তাঁদের মধ্যে এক নম্বরে আছেন শারদা। ২০২৩ সালের অগাস্ট মাসে প্রকাশিত ওই প্রতিবেদন ইংরিজিতে লিখিত এবং বেশ দামি একটা পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল বলেই বেশিরভাগ ক্রিকেটপ্রেমীর নজরে পড়েনি। পড়লেও যে খুব বিশ্বাস করতেন তা অবশ্য নয়। কারণ ক্রিকেট ভারতে ধর্মের স্তরে উন্নীত হয়েছে অনেককাল হলো। এই ধর্মের ভক্তরা আবার হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধ, জৈন বা খ্রিস্টানদের চেয়েও এককাঠি সরেস। সারা পৃথিবীতে সব ধর্মের গোঁড়া লোকেরা চিরকাল নিজের ধর্মের না হোক, অন্য ধর্মের দোষ দেখতে পায়। তা নিয়ে খুনোখুনি করে। সহিষ্ণু ধর্মাবলম্বীরা এবং নাস্তিকরা তাদের নিন্দা করেন। গত বিশ-তিরিশ বছরে যেহেতু বিজেপি এদেশে ধর্মকে রাজনৈতিক হাতিয়ারে পরিণত করেছে, সেহেতু রাজনৈতিকভাবে যাঁরা বিজেপির বিরোধী তাঁরাও চারদিকে এত ধর্মের বাড়বাড়ন্তের নিন্দা করেন। সবেতে ধর্মকে টেনে আনা, নিজের ধর্মবিশ্বাসের উগ্র প্রকাশের মাধ্যমে অন্য ধর্মের মানুষের পিছনে লাগার বিরুদ্ধে প্রতিবাদী মানুষ এদেশে এখনও পাওয়া যায়। কিছুদিন আগেই যেমন হিমাচল প্রদেশের এক যুবককে পেয়েছি, যিনি উন্মত্ত হিন্দু গুন্ডাদের হাত থেকে এক মুসলমান বৃদ্ধকে বাঁচাতে নিজের নাম বলেছেন মহম্মদ দীপক। কিন্তু ভারতে ক্রিকেট এমন এক ধর্ম, যার কোনো দোষ উপরে উল্লিখিত ধর্মগুলোর কেউই দেখতে পান না। ফলে দেশের ক্রিকেট চালাচ্ছে বিজেপি— একথা নাস্তিক, ঘোর বামপন্থী ক্রিকেটপ্রেমীদের বললেও তাঁরা পাত্তা দেন না। নার্সারি স্কুলের বাচ্চাদের মতই তাঁদের চোখে ভারতীয় ক্রিকেট দল আজও ফুলের মত নিষ্পাপ এবং ক্রিকেটাররা স্রেফ ননীচোর বালগোপাল।

বিজেপি আমলে যেমন, তেমনই চন্দ্রগ্রহণের সময়ে অনুশীলন না করার মত ন্যক্কারজনক ঘটনা ঘটিয়েছে ক্রিকেট দল। বিসিসিআইকে তুষ্ট করতে ব্যস্ত সম্প্রচারকারী সংস্থা একেবারে বিজেপির ঢঙেই উগ্র জাতীয়তাবাদী, খেলোয়াড়ি মনোভাব বর্জিত কুরুচিকর প্রোমো প্রচার করে যাচ্ছে বছরের পর বছর। এশিয়া কাপ জিতে ক্রিকেট অধিনায়ক বলে দিয়েছেন, মনে হচ্ছিল নরেন্দ্র মোদী নিজেই স্ট্রাইক নিয়ে রান করে দিলেন। ভাবা যায়!

নয়ের দশকে রঙিন জামার ক্রিকেট চালু হওয়ার পর থেকে নানা ধরনের নীল জার্সি পরে আসছে ভারত, তার মধ্যেও গেরুয়া রং ঢুকে পড়েছে। এদিকে চ্যাম্পিয়নস ট্রফির সর্বোচ্চ উইকেট শিকারী মহম্মদ শামি এখন আগরকরের কথা মতো ঘরোয়া ক্রিকেট খেলে ঝুড়ি ঝুড়ি উইকেট নেওয়ার পরেও দলে সুযোগ পাচ্ছেন না (কুড়ি বিশের দলে সুযোগ দেওয়া উচিত বলছি না)। সরফরাজ খান শয়ে শয়ে রান করেও নড়বড়ে ভারতীয় টেস্ট ব্যাটিংয়ের অংশ হওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন না। হর্ষিত রানা আহত না হলে মহম্মদ সিরাজকেও চলতি বিশ্বকাপের ১৬ জনের মধ্যে রাখা যাচ্ছিল না। অথচ তিনি ভারতীয় পেসারদের মধ্যে গত কয়েক বছরে সবচেয়ে ফিট, লম্বা লম্বা স্পেলে বল করেছেন, ম্যাচ জেতানো বোলিংও করেছেন। এসবের কোনওটাই ক্রিকেটপ্রেমীদের কাছে ভারতীয় ক্রিকেটের বিজেপি-চালিত হওয়ার প্রমাণ নয়। কারণ ওঁদের মধ্যে যাঁরা নিজেদের অসাম্প্রদায়িক, ধর্মনিরপেক্ষ, যুক্তিবাদী ইত্যাদি বলেন, তাঁদের চোখেও ক্রিকেটাররা ‘নন-বায়োলজিকাল’।

যাঁরা বিজেপির দেশ শাসনের ব্যর্থতা দেখতে পান না, তাঁদের বিসিসিআইয়ের অপদার্থতা দেখতে না পাওয়ার মধ্যে তবু ধারাবাহিকতা আছে। কিন্তু যাঁরা প্রথমটা নিয়ে রীতিমতো সোচ্চার, তাঁরা ২০২৩ বিশ্বকাপের মতও এবারও টিকিট বিক্রির অব্যবস্থা নিয়ে টুঁ শব্দ করলেন না। স্রেফ গা জোয়ারি করে, বিসিসিআইয়ের জেদ বজায় রাখতে, জয়ের নেতৃত্বাধীন আইসিসির বাংলাদেশকে বিশ্বকাপ থেকে বাদ দিয়ে দেওয়াও চার হাত-পা তুলে সমর্থন করলেন। এ হল বিশ্বের অষ্টমাশ্চর্য!

আরো পড়ুন ভারতের দাপুটে বিশ্বকাপ: কিছু কাঁটা রহিয়া গেল

ভারত, ইংল্যান্ড আর অস্ট্রেলিয়ার বোর্ড ক্রিকেট বাণিজ্যের মুনাফার সিংহভাগ নিজেদের মধ্যে ভাগ বাঁটোয়ারা করে নিয়ে একদা প্রতিষ্ঠিত দেশগুলোতেও যে খেলাটার কফিনে পেরেক ঠুকে দিচ্ছে— সেকথা স্বীকার করার মানসিকতাও ভারতীয় ক্রিকেটপ্রেমীরা হারিয়েছেন। তাই সেমিফাইনালে হারার পর ইংল্যান্ড দল দেশে ফিরছে চার্টার্ড বিমানে আর আগেই হেরে যাওয়া ওয়েস্ট ইন্ডিজ, দক্ষিণ আফ্রিকাকে ভারতেই বসে থাকতে হচ্ছে— এ নিয়ে খেলোয়াড়রা অসন্তোষ প্রকাশ করলে সোশাল মিডিয়ায় কুযুক্তি এবং গালাগালির শিকার হচ্ছেন। কী আশ্চর্য দেখুন! যে সুনীল গাভাসকর আজকাল কথায় কথায় বিসিসিআইয়ের ধ্বজা ধরে ইংল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়ার অতীতের অপরাধের প্রতিশোধ নেওয়ার তত্ত্ব আওড়ান, তিনি এই বৈষম্যের বিরুদ্ধে মুখ খোলেননি। যে ওয়েস্ট ইন্ডিজের ক্রিকেটপ্রেমীরা একসময় গাভসকরের নামে গান বেঁধেছেন, নিজেদের দেশে রাস্তার নাম রেখেছেন, সেই ওয়েস্ট ইন্ডিজের ক্রিকেটারদের প্রতি বৈষম্য দেখেও তিনি কিন্তু চুপ। যে দক্ষিণ আফ্রিকাকে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ফেরাতে মুখ্য ভূমিকা ছিল বিসিসিআইয়ের, তাদের প্রতি বৈষম্য নিয়ে বিসিসিআই (যদি সরল শিশুর মত ধরে নিই, আইসিসিকে বিসিসিআই নিয়ন্ত্রণ করে না) চুপ। মুখ খুলেছেন কে? ইংল্যান্ডেরই প্রাক্তন অধিনায়ক মাইকেল ভন। তিনি সোশাল মিডিয়ায় লিখেছেন, ব্যবহার সব দলের প্রতি সমান হওয়া উচিত। কার আইসিসিতে কত প্রভাব তার ভিত্তিতে কাজ হওয়া উচিত নয়।

পণ্ডিতরা বলেন, হিন্দুশাস্ত্রে লেখা আছে “অতিথি দেবো ভব”। মানে অতিথি হল ঈশ্বর। সংবিধানকে মারো গুলি, আমাদের ক্রিকেটে সবই হিন্দু মতে চলছে। শুধু অতিথিদের বেলায় ব্যতিক্রম। অন্য দেশের সমর্থকরা যাতে বেশি সংখ্যায় বিশ্বকাপ দেখতে আসতে না পারে, তার ব্যবস্থা পাকা করা হয় ভিসা নিয়ে নানা গ্যাঁড়াকল করে। এমনকি অস্ট্রেলিয়া, ইংল্যান্ডের পাক বংশোদ্ভূত ক্রিকেটারদের ভিসা নিয়েও প্রতিবার ঝামেলা পাকানো হয়।

অ্যাঁ, কী বলছেন? বিজেপি ক্রিকেট চালাচ্ছে তো কী হল, আসল কথা হল মাঠে জেতা? আজ্ঞে তা তো বটেই। তবে কিনা জগতের নিয়ম হল, কোনো দেশ চিরকাল জেতে না। কে ভেবেছিল ক্লাইভ লয়েড, ভিভিয়ান রিচার্ডসদের ওয়েস্ট ইন্ডিজের আজকের অবস্থা হবে? কে-ই বা ভেবেছিল, অস্ট্রেলিয়া চলতি বিশ্বকাপের শেষ চারেও উঠতে পারবে না? কেবল খেলার মাঠে নয়, জগতের কোনও ময়দানেই কেউ চিরকাল জেতে না। হারার সময় যখন আসে, তখন মানসম্মান তাদেরই বজায় থাকে, যারা নিজেদের সুসময়ে পরাজিতকে সম্মান দিয়েছিল। বেপরোয়া মস্তানদের শেষ পরিণতি নিয়ে বিস্তর বই-টই, সিনেমা-টিনেমা হয়েছে। চ্যাটজিপিটিকে তালিকা বানিয়ে দিতে বলুন।

অ2অনুস্বর ডট কম ওয়েবসাইটে প্রকাশিত

সাংবাদিকরাই এখন ক্রিকেট বোর্ডের ‘চিয়ারলিডার’

এই জাতীয় সাংবাদিকরাই তাই মালিকদের পছন্দের লোক হয়ে উঠলেন, কারণ এঁদের মাধ্যমে ক্রিকেটজগতের সবচেয়ে নামকরা খেলোয়াড় আর সবচেয়ে ক্ষমতাশালী প্রশাসকদের সঙ্গ পাওয়া যায়। ব্যবসায়িক সম্পর্ক স্থাপন করা যায়। কর্পোরেট মিডিয়ায় মালিকের পছন্দের লোক হওয়া মানেই উত্তরোত্তর শ্রীবৃদ্ধি। ফলে ওই সাংবাদিকরাই একতলা বাড়ি থেকে ফট্টি টু পৌঁছলেন, বিখ্যাতও হলেন। পরবর্তী প্রজন্মের সাংবাদিকরা শিখলেন— ওটাই পথ, ব্যাকওয়ার্ড পয়েন্ট আর সিলি পয়েন্টের তফাত না জানলেও ক্ষতি নেই।

নয়ের দশকে অক্ষয় কুমার অভিনীত একখানা হিন্দি ছবিতে একটি মহা চটুল গান ছিল। গানের স্থায়ীতে নায়কের বক্তব্য হল— কোথা থেকে প্রেম শুরু করব বুঝতে পারছি না।
লিখতে বসে আমারও একই অবস্থা হয়েছিল। কারণ অ2অনুস্বর সম্পাদক যে বিষয়টি বেছে দিয়েছেন তা নিয়ে অনেককিছু বলার আছে। আমাকে উদ্ধার করলেন টি টোয়েন্টি বিশ্বকাপের প্রতিবেদন লেখার দায়িত্বপ্রাপ্ত এক সাংবাদিক। তাঁর নামটি উহ্যই থাক, কামটি যখন গর্ব করার মতো নয়। তবে সোশাল মিডিয়ার দৌলতে তাঁর কামটি দুনিয়াসুদ্ধ লোক জেনে ফেলেছে।
২৬ ফেব্রুয়ারির ভারত-জিম্বাবোয়ে ম্যাচের পর সাংবাদিক সম্মেলনে আমাদের আলোচ্য সাংবাদিকটি জিম্বাবোয়ের পক্ষ থেকে আসা ক্রিকেটারটিকে প্রশ্ন করেন— আপনাদের দলের ব্যাটাররা ব্রায়ান বেনেটকে শতরান করার সুযোগ দিল না কেন? ভিডিওতে ক্রিকেটারটির মুখের চেহারা দেখে আপনার স্কুলজীবনের সেইসব বন্ধুদের মনে পড়বে, যারা ইতিহাসের সব প্রশ্নের উত্তর কণ্ঠস্থ করে স্কুলে পৌঁছে আবিষ্কার করত যে সেদিন অঙ্ক পরীক্ষা।

আপনি যদি না জেনে থাকেন যে সাংবাদিক সম্মেলনে কোন ক্রিকেটার এসেছিলেন, তাহলে আপনি হয়তো ভাবছেন—এভাবে লেখার কী আছে? প্রশ্নটা তো সঙ্গত। দল তো এমনিতেও হারত, বেচারা ৯৭ রানে অপরাজিত রয়ে গেল। সতীর্থরা একটু চেষ্টা করলে কি ওর শতরানটা হয়ে যেত না?

আবার আপনি যদি ভারতীয় ক্রিকেট ব্যক্তিসর্বস্ব বলে মনে করেন, তাহলে ভাবছেন— ঠিকই তো করেছে। দলগত খেলায় কে সেঞ্চুরি পেল না পেল তা নিয়ে ভাববে কেন? দয়া করে অত গভীরে ভাবতে যাবেন না। কারণ সাংবাদিক সম্মেলনে যিনি এসেছিলেন তিনিই বেনেট।
তিনি প্রশ্নটা শুনে অবাক হয়ে, কী প্রশ্ন করা হল জিজ্ঞেস করছেন দেখেও, সাংবাদিকটি অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে প্রশ্নটি বুঝিয়ে বলেন। তখন বেনেটকে বলতে হয়— আমিই বেনেট। তাতে হাসির রোল ওঠে এবং লজ্জাজনক ব্যাপারটির মধুরেণ সমাপয়েৎ হয়। এই হল আমাদের দেশে ক্রিকেট সাংবাদিকতার বর্তমান অবস্থা। এমন সব দুর্দান্ত পরিশ্রমী ও প্রতিভাবান লোকেরা কাজটা করছে যে, কার সাংবাদিক সম্মেলনে বসে আছে তা-ই জেনে উঠতে পারছে না।

অবশ্য অ্যালবার্ট আইনস্টাইন সম্পর্কেও কথিত আছে যে তিনি নাকি একবার ট্রেনে উঠে টিকিট হারিয়ে ফেলে যারপরনাই লজ্জিত বোধ করছিলেন, তখন টিকিট চেকার তাঁকে আশ্বস্ত করেন— আমি জানি আপনি ডক্টর আইনস্টাইন। টিকিট নিয়ে ব্যস্ত হবেন না, আপনি যখন বলছেন টিকিট কেটেছিলেন, তখন আমি বিশ্বাস করলাম। কিন্তু আইনস্টাইন আশ্বস্ত হলেন না, কারণ টিকিটটার দরকার চেকারের নয়, তাঁর নিজেরই। কোথায় যাচ্ছেন সেটাই ভুলে বসে আছেন যে।

এটি ঘটনাই হোক আর রটনাই হোক, ব্যবহার করা হয় একথা বোঝাতে যে জিনিয়াসরা এমন সব ভুল করে থাকেন যা সাধারণ মানুষের কাছে হাস্যকর। তা আমাদের সাংবাদিক বন্ধুটি যদি আপেক্ষিকতার তত্ত্ব জাতীয় কিছু আবিষ্কার করে ফেলতে পারেন, তাহলে তাঁকেও জিনিয়াস বলে মেনে নিয়ে প্রমাণস্বরূপ এই ঘটনাটি প্রচার করা যাবেখন। কিন্তু আপাতত এ ঘটনা থেকে একটি জিনিসই প্রমাণিত হচ্ছে— এদেশে ক্রিকেট সাংবাদিকতা করতে এখন ন্যূনতম যোগ্যতারও প্রয়োজন হচ্ছে না।

একথায় অনেক সাংবাদিকই তেলে বেগুনে জ্বলে উঠবেন। ভারত-দক্ষিণ আফ্রিকা ম্যাচের পরে যেমন জ্বলে উঠেছিলেন, তার কারণ আরেকখানা ভিডিও। তাতে দেখা যাচ্ছে, এক সোশাল মিডিয়া ইনফ্লুয়েন্সার ম্যাচের পরে পৌঁছে গেছেন একেবারে মাঠের মাঝখানে, যেখানে কোনো সাংবাদিক যাওয়ার অনুমতি পান না। গিয়ে কী করছেন? ম্যাচের সেরা খেলোয়াড় ডেভিড মিলারকে দাঁড় করিয়ে তাঁর চারপাশে ঘুরে ঘুরে ঠোঁট ফুলিয়ে রাগ দেখাচ্ছেন। ব্যাপারটি পড়তে যত ন্যাকা ন্যাকা লাগছে, আসলে তার চেয়েও বেশি ন্যাকা ছিল।
তবে সে ভিডিও আর দেখতে পাবেন না, কারণ সাংবাদিকদের রাগ এবং কিছু ক্ষিপ্ত ক্রিকেটভক্তের অশ্লীল মন্তব্যের ঠ্যালায় সেই ইনফ্লুয়েন্সার মহিলা ভিডিওটি মুছে দিয়েছেন। তবে তিনি একা নন, আরও কয়েকজন ইনফ্লুয়েন্সার চলতি বিশ্বকাপে এমন গুরুত্ব পাচ্ছেন আয়োজক ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের থেকে, যা নিয়ে সাংবাদিকরা সঙ্গত কারণেই রুষ্ট হয়েছেন।

এই ইনফ্লুয়েন্সারদের ক্রিকেটারদের এত কাছে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়েছে, স্টেডিয়ামের এমন সব জায়গা থেকে তাঁরা ভিডিও করার সুযোগ পাচ্ছেন যেখানে কোনও ক্রীড়া সাংবাদিক (আলোকচিত্রী এবং ক্যামেরাপার্সনদের ধরে বলছি) যাওয়ার অধিকার পান না। অধিকার পেয়ে যেসব কনটেন্ট এই ইনফ্লুয়েন্সাররা তৈরি করছেন, তাতে ক্রিকেটের ক নেই। বিনোদন আছে, তাও অত্যন্ত মেধাহীন বিনোদন। যে কোনো খেলা থেকে একজন ক্রীড়াপ্রেমী মানুষ যে ধরনের বিনোদন পেতে পারে, সে জিনিস নয়।

কিন্তু ক্রিকেট বোর্ড সাংবাদিকদের চেয়ে এই ইনফ্লুয়েন্সারদের বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে কেন? সে প্রশ্নের উত্তর সৎভাবে খুঁজতে গেলে এদেশের ক্রীড়া সাংবাদিকদের আত্মসমালোচনা করতে হবে। করতে গিয়ে নিজেদের সম্পর্কে এত তেতো সব কথা উঠে আসবে, যে নিমপাতা মিষ্টি মনে হবে।

একটু পিছন থেকে শুরু করা যাক। ললিত মোদী ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগ চালু করার কিছুদিনের মধ্যে যেই বুঝে গেলেন যে এখান থেকে অভূতপূর্ব টাকা রোজগার করার সুযোগ রয়েছে, অমনি নিয়ম করে দিলেন— খেলার দিন খেলার মাঠে কোনে সংবাদমাধ্যম ক্যামেরা নিয়ে ঢুকতে পারবে না। মানে ভিডিও তোলা তো এমনিতেই বারণ, কারণ ভিডিও স্বত্ব সম্প্রচারকারীর দখলে; কাগজে ছাপার জন্য বা টিভির খবরে দেখানোর জন্য স্টিল ছবিও তোলা যাবে না।

তাহলে কী হবে? আইপিএল আয়োজকরা কি নিজেদের খেলার প্রচার কমিয়ে ফেলতে চান? মোটেই তা নয়। নিয়ম করা হল, ছবি নিতে হবে শুধুমাত্র আইপিএলের নিজের ওয়েবসাইট থেকে। ভারতের সংবাদমাধ্যম বিনা প্রতিবাদে এই ব্যবস্থা মেনে নিয়েছিল। নিজেদের মত করে ছবি তুলতে না পারা যে নিজের বাকস্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ— সেকথা মিডিয়ার বাবুদের কারও মাথায় আসেনি। আইপিএলের ছবি আইপিএলের হাত থেকে নেওয়া মানেই হল, যেসব ছবি তারা প্রকাশিত হতে দিতে চায়, কেবল সেসব ছবিই প্রকাশিত হবে। আয়োজকদের পক্ষে অপ্রীতিকর কোনো দৃশ্যের অবতারণা হলে তা সংবাদমাধ্যমের চোখে পড়ার রাস্তা বন্ধ করে দেওয়া হল। সংবাদমাধ্যম সোনামুখ করে এই ব্যবস্থা সেদিন মেনে নিয়েছিল।

যা অপ্রিয় তা প্রকাশ করাই যে আমাদের কাজ এবং খেলার মাঠেও তেমন কিছু ঘটতেই পারে— একথা হয় খেয়াল করেনি, অথবা সংবাদমাধ্যমের মালিক আর উচ্চপদস্থ সাংবাদিকরা ভারতীয় ক্রিকেটের নিয়ন্তাদের সঙ্গে হাত মিলিয়েই এমনটি ঘটিয়েছিলেন। কোন আশঙ্কাটি ঠিক তা আমার পক্ষে বলা সম্ভব নয়, কারণ তখন মূলধারার মিডিয়ায় (বস্তুত তখন ওই একটি ধারাই ছিল) কাজ করলেও অত উচ্চপদস্থ আমি কোনোদিনই ছিলাম না।

ললিতবাবু পরে আইপিএল সংক্রান্ত দুর্নীতির মামলায় জড়িয়ে পদচ্যুত হন এবং দেশত্যাগ করেন। ছবি সম্পর্কে ওই নিষেধাজ্ঞাও প্রত্যাহৃত হয়। কিন্তু অধিকার এমন জিনিস যে একবার ছাড়তে শুরু করলে ক্ষমতাবান ক্রমশ একটু একটু করে তা কেড়েই নিতে থাকে।

আইপিএলের মুনাফার ফলে ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড (বিসিসিআই) ফুলে ফেঁপে উঠতে থাকে এবং অর্থের জোরে তার শক্তিও বাড়তে থাকে। ভারতের মাটিতে যে কোনো আন্তর্জাতিক সিরিজের টিভি প্রযোজনা বোর্ড নিজের হাতে তুলে নিল। মানে সম্প্রচার স্বত্ব যে সংস্থার হাতেই যাক, প্রযোজনা করবে বিসিসিআই। মানে দর্শক টিভিতে কী দেখতে পাবেন, কোনটা পাবেন না— সবই চলে গেল বোর্ডের হাতে। যে সংস্থার হাতেই ক্যামেরা থাকুক, তাদের ঘাড়ে কটা মাথা যে এমন কিছু দেখাবে যা বিসিসিআইয়ের বাবুরা লোককে দেখতে দিতে চান না? আপনি বলবেন, ক্রিকেট খেলার সরাসরি সম্প্রচারে এমন কী দেখানোর থাকতে পারে, যা ক্রিকেট বোর্ড লুকোতে চায়? যাঁর বছরের পর বছর মাঠে বসে ক্রিকেট ম্যাচ কভার করার অভিজ্ঞতা নেই, তাঁকে এটা বোঝানো শক্ত।

একটা নিরীহ উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে, আপনি অনুমান করে নিতে পারেন আর কী কী না দেখানো সম্ভব। মহেন্দ্র সিং ধোনি তখনো একদিনের দলের অধিনায়ক, যদিও টেস্ট থেকে অবসর নিয়েছেন। রাঁচিতে একটা একদিনের ম্যাচ কভার করতে গেছি, ম্যাচ চলাকালীন বারবারই বিরাট কোহলি মিড অফ বা মিড অনে দাঁড়িয়ে ফিল্ডিং বদলাচ্ছিলেন, বোলারকে বিভিন্ন নির্দেশ দিচ্ছিলেন। ধোনি দর্শকের ভূমিকায়। প্রেস বক্সেও টিভি চলে, সেখানে কিন্তু একবারও এ দৃশ্য দেখানো হয়নি।

তবে প্রযোজনা বিসিসিআই নিজের হাতে নিয়ে নেওয়ায় আসল ক্ষতি দৃশ্যের দিক থেকে হয়নি, হয়েছে শ্রাব্যের দিক থেকে। মোটামুটি নয়ের দশক থেকে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের এই পরিমাণ সরাসরি সম্প্রচার দেখার সুযোগ হচ্ছে ভারতের ক্রিকেটপ্রেমীদের। যাঁদের স্মৃতি দুর্বল নয়, তাঁরা স্পষ্ট বুঝতে পারছেন ধারাভাষ্য কোথা থেকে কোথায় নেমেছে। আগে প্রাক্তন ক্রিকেটারদের ধারাভাষ্য মন দিয়ে শুনলে খেলাটা সম্পর্কে সত্যিই অনেককিছু শেখা যেত। কারণ রিচি বেনো, সুনীল গাভস্কর, জিওফ্রে বয়কট, ইয়ান চ্যাপেল প্রমুখ ধারাভাষ্যকার তাঁদের বিপুল অভিজ্ঞতা আর জ্ঞানের সদ্ব্যবহার মাঠে যা হচ্ছে তার বিশ্লেষণ করতেন। তার চেয়েও বড় কথা, দল নির্বিশেষে ভালো খেলার প্রশংসা করতেন এবং নিজের দেশের খেলোয়াড়রা খারাপ খেললেও নির্মম সমালোচনা করতেন।

আর এখন? বেনো আর টনি গ্রেগ প্রয়াত। বয়কট স্বাস্থ্যের কারণে এবং চ্যাপেল বয়সের কারণে আর ধারাভাষ্যে নেই। মাইকেল হোল্ডিং সরে যাওয়ার সময়ে বলেছিলেন বটে যে, আর মন চাইছে না; কিন্তু তিনি যেভাবে কমেন্ট্রির মাইক হাতে নিয়ে খেলার বিশ্লেষণের পাশাপাশি ক্রিকেট প্রশাসকদের বিরুদ্ধে খেলোয়াড় জীবনের মতই ভীষণ গতির বাউন্সার হাঁকাতেন, তাতে তাঁর প্রস্থানে কারা খুশি হয়েছে তা বুঝে নেওয়া শক্ত নয়। তবে সবচেয়ে শোচনীয় অবস্থা ভারতীয় ধারাভাষ্যের।

সেকালের সুরেশ সারাইয়া, নরোত্তম পুরীরা অসাধারণ ছিলেন না; প্রবাদপ্রতিম প্রাক্তন ক্রিকেটারও ছিলেন না। কিন্তু কোদালকে কোদাল বলতেন। অনেকদিন পর্যন্ত হর্ষ ভোগলেও তাই। কিন্তু অমিতাভ বচ্চন আর ধোনির টুইটের ঠ্যালায় একবার বিসিসিআইয়ের চুক্তি হারাবার পর থেকে তিনি ভারতীয়দের বেলায় কোদাল দেখলে কেবল চুপ করে থাকেন না, অনেকসময় কোদালকে এরোপ্লেনও বলে দেন। রবি শাস্ত্রী তো চিরকালই প্রশাসকদের চিৎকৃত আনুগত্য দেখিয়েছেন। তার পুরস্কারস্বরূপ ভারতীয় দলের ম্যানেজারি করার দায়িত্ব পেয়েছিলেন। কমেন্ট্রি বক্সে ফেরত এসেও একই কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। কেবল বিরাট বা রোহিত শর্মা নন, শাস্ত্রীর ধারাভাষ্য অনুসারে সূর্যকুমার যাদব, অক্ষর প্যাটেল, হার্দিক পান্ডিয়া, বরুণ চক্রবর্তীরাও একেকজন ‘গ্রেট’।

ভারতীয় দল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বা নামিবিয়াকে হারালেও ঐতিহাসিক জয় হয় আর পরপর সিরিজ হারলেও শাস্ত্রী ও সম্প্রদায় বলে যান— একটা হার একটা বিশ্বসেরা দলকে রাতারাতি খারাপ করে দেয় না। কী করে যে বিশ্বসেরা প্রমাণ হল তা বোঝা মুশকিল, তবে এই আনুগত্যের পুরস্কারস্বরূপ শিগগির মুম্বাইয়ের ওয়াংখেড়ে স্টেডিয়ামের একটি গ্যালারি শাস্ত্রীর নামাঙ্কিত হতে চলেছে।

আকাশ চোপড়া ও অন্যান্য প্রাক্তন ভারতীয় ক্রিকেটার, যাঁরা একইভাবে সমস্ত ভারতীয় ক্রিকেটারকে অন্য গ্রহের জীব বলে প্রচার করতে সদাব্যস্ত এবং বিসিসিআই ও জয় শাহের গুণগান করতে পিছপা নন, তাঁরাও আশা করতে পারেন এরকম কিছু পুরস্কার পাবেন। ভারতে তো আর ক্রিকেট স্টেডিয়ামের অভাব নেই, যতই সেখানে খেলা দেখতে যাওয়া সাধারণ দর্শকের কাছে নরকযন্ত্রণা হোক। এই নুন খাও আর গুণ গাও ব্যবস্থায় মানিয়ে নিতে পারলেন না বলে, সঞ্জয় মঞ্জরেকর বহুদিন হয়ে গেল নিয়মিত ধারাভাষ্য দেওয়ার ডাক পান না। এই সাইট সেই সাইটের বিশেষজ্ঞ হয়ে কাটে। অথচ তাঁর চেয়ে ভাষার উপর অনেক কম দখল থাকা এবং অগভীর বিশ্লেষণ করা বহু প্রাক্তন ক্রিকেটার প্রত্যেক সিরিজে এবং আইপিএলে ধারাভাষ্যকার হিসাবে থাকেন।

ভাবছেন তো, ধারাভাষ্যকারদের কথাবার্তা বিসিসিআই নিয়ন্ত্রণ করার সঙ্গে ক্রিকেট সাংবাদিকতার কী সম্পর্ক? সম্পর্কটা খুবই ঘনিষ্ঠ। প্রথমত, ধারাভাষ্য ব্যাপারটাও ক্রীড়া সাংবাদিকতারই একটা দিক। ওখানেও সত্যি কথাটা বলাই কাজ। সে কাজ আজও ইয়ান বিশপ, ইয়ান স্মিথ, নাসের হুসেন, মাইকেল অ্যাথারটনদের করতে দেখা যায়। তাঁরা ভারতের সমালোচনা করেন বলে আপনি হয়ত রুষ্ট এবং ওঁদের কথায় বর্ণবৈষম্য খুঁজছেন। কিন্তু অ্যাশেজ চলাকালীন ইংল্যান্ডের কী তীব্র সমালোচনা করেছিলেন নাসের আর অ্যাথারটন, সেটা সোশাল মিডিয়ায় খুঁজলেই পেয়ে যাবেন। আমাদের ধারাভাষ্যকাররা কী করেন? শুধু যে নিজেদের ক্রিকেটারদের কোনো দোষ দেখেন না তা নয়, ইদানীং আবার হিন্দুত্ববাদের প্রচারও করেন। কথায় কথায় লাইভ ম্যাচে মা ভবানী, বিষ্ণু, ভোলেনাথ প্রমুখ ভগবানের নাম নেন বিবেক রাজদানরা। উপরন্তু দল নির্বাচনে যত ভুলই হোক, কমেন্ট্রি বক্সে বসে সেটাকে প্রাণপণে ঠিক বলে প্রমাণ করাই তাঁদের কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এই মিথ্যাচারের ফল কিন্তু ভুগছে ভারতীয় ক্রিকেট। বহু যোগ্য ক্রিকেটার জাতীয় দলে সুযোগ পাচ্ছেন না, অযোগ্যরা খেলেই যাচ্ছেন। যদি বলেন খেলায় ফলাফলই শেষ কথা, তাহলে নিজেই বলুন, টেস্ট ক্রিকেটে ভারতীয় দলের সাফল্যের লেখচিত্র উঠছে না নামছে? একদিনের দলও নড়বড় করতে শুরু করেছে। ২০২৩ বিশ্বকাপের ফাইনালে ওঠার পর থেকে ২০২৫ চ্যাম্পিয়নস ট্রফি জিতলেও, দুর্বল শ্রীলঙ্কার কাছে ২৭ বছর পরে সিরিজ হেরেছে। নতুন বছরের শুরুতেই ঘরের মাঠে নিউজিল্যান্ডের কাছেও হারল। টি টোয়েন্টি বিশ্বকাপ পর্যন্ত জয়ের পর জয় এলেও, বিশ্বকাপ শুরু হতেই নড়বড়ে দেখাচ্ছে। দক্ষিণ আফ্রিকা ম্যাচে তো মনে হল দুই দলের মধ্যে এক সমুদ্র ব্যবধান। কিন্তু ধারাভাষ্যে কান দিন। সেই এক কথা শুনবেন— একটা ম্যাচ বা একটা সিরিজ হারলেই বিশ্বসেরা দল খারাপ হয়ে যায় না।
সবচেয়ে চোখে পড়ার মত অধঃপতন হয়েছে গাভস্করের। তিনি এখন ভারতীয় দলের ক্রিকেটারদের চেয়েও বেশি প্রশংসা করেন বিসিসিআইয়ের। এমন ভালো বোর্ড নাকি ক্রিকেটের ইতিহাসে হয়নি। ক্রিকেট দুনিয়ায় যা কিছু ভালো হচ্ছে সবই নাকি বিসিসিআইয়ের দাক্ষিণ্যে, আর যা যা খারাপ হচ্ছে? সেগুলো সবই ইংল্যান্ড আর অস্ট্রেলিয়া যখন ক্রিকেট দুনিয়াকে শাসন করত তখন আরও খারাপ ছিল। অতএব বিসিসিআই যা করছে বেশ করছে।
এবার ভাবুন, যদি কোনো দেশের ক্রিকেট বোর্ড বুঝতে পারে যে টাকার জোরে তারা তাবড় প্রাক্তন ক্রিকেটারদের দিয়ে যা খুশি বলিয়ে নিতে পারে, বলতে না চাইলে মুখ বন্ধ করিয়ে দিতে পারে, তাহলে মাস মাইনেয় বিভিন্ন কাগজে বা টিভি চ্যানেলে অথবা ওয়েবসাইটে কাজ করা সাংবাদিকদের তো এলেবেলে জ্ঞান করবেই। তাদের গলা টিপে ধরবেই। প্রেস ফ্রিডম ইনডেক্সে ভারত যে গত এক-দেড় দশকে ক্রমাগত নিচে নামছে, সেকথা তো এখন সবাই জেনে গেছেন।

সাংবাদিকদের গ্রেফতার হওয়া বা খুন হওয়ার খবরেও আজকাল আমরা আর অবাক হই না। অমুক জায়গায় সংবাদমাধ্যমের ঢোকা নিষিদ্ধ করে দেওয়া হয়েছে, তমুক জায়গায় বিশেষ একটি সংবাদমাধ্যমের সাংবাদিকদের ঢোকা বারণ— এসবও আজকাল প্রায়ই আমরা জানতে পারি। কিন্তু ভারত সরকার বা বিভিন্ন রাজ্যের সরকারগুলো এ কাজ নিয়মিত শুরু করার আগেই করেছিল বিসিসিআই। করোনা অতিমারীর সময়ে অকালমৃত আমার একদা সহকর্মী রুচির মিশ্র, নাগপুরের সাংবাদিক হয়েও জীবনের শেষ ৫-৭ বছর বিদর্ভ ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশন স্টেডিয়ামে (যে মাঠে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট ম্যাচ হয়) ঢুকতে পারেননি। কারণ তিনি ওই ক্রিকেট সংস্থার কর্তাদের বিপক্ষে যায়, এমন একটি প্রতিবেদন লিখেছিলেন।
স্বভাবতই, দ্য হিন্দু বা দি ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস-এর মত দু-একটি সংবাদমাধ্যম ছাড়া কোথাও আপনি এ নিয়ে কোনো প্রতিবেদন পড়বেন না যে, বিসিসিআই পৃথিবীর সবচেয়ে ধনী ক্রিকেট বোর্ড হওয়া সত্ত্বেও, অধিকাংশ স্টেডিয়ামে খেলা দেখতে গিয়ে দর্শকরা দুর্গন্ধযুক্ত, নোংরা বাথরুম পান। খাবার জলের সুব্যবস্থাও থাকে না প্রায়শই। কেবল দর্শকদেরই এই অভিজ্ঞতা হয় তা নয়। আমি নিজে ২০১১ ক্রিকেট বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালের প্রতিবেদন লিখতে আমেদাবাদে গিয়ে দেখেছি, প্রেস বক্সের বাথরুমের অবস্থা কোনো মফসসলের রেলস্টেশনের বাথরুমের থেকেও খারাপ।

কিন্তু এসব তখনো লেখা যেত না, এখনো অধিকাংশ জায়গায় যায় না। লিখলেও ছাপা হবে না, বস বলবেন ‘এটা খবর নয়।’ প্রতিবেদক বেশি চাপাচাপি করলে বেঘোরে চাকরিটা খোয়াতে হতে পারে।

ভাবুন। আপনি দর্শক, আপনার জন্যেই ক্রিকেট চলে কিন্তু। আপনি টিকিট কেটে মাঠে যান বলে বোর্ডের আয় হয়। তার থেকেও বহুগুণ বেশি আয় হয় আপনারা টিভিতে বা ওটিটিতে খেলা দেখেন বলে। আপনাদের বিজ্ঞাপনদাতারা নিজের পণ্য বা পরিষেবা চেনাতে চায় বলে বড় বড় কোম্পানি বিজ্ঞাপন দেয়, সে বাবদ টাকা নিয়েই বিসিসিআই আর আইসিসি ধনী হচ্ছে। নিজেদের আইপিএল ছাড়াও, আইসিসির টাকার সিংহভাগ বিসিসিআই নিয়ে নিচ্ছে আপনার ঘাড়ে বন্দুক রেখে ‘আমাদের জন্যেই তো এত টাকা ওঠে’ যুক্তি দিয়ে। অথচ আপনি যে ন্যূনতম পরিষেবা পান না, সেটা খবর নয়। খবর তাহলে কোনটা? গৌতম গম্ভীর কখন কালীঘাটে পুজো দিতে যাবেন।

মোদ্দাকথা, ভারতের ক্রিকেট সাংবাদিকরা এখন বিসিসিআইয়ের ‘চিয়ারলিডার’। কথাটার বাংলা নেই, তবে রবীশ কুমার ভারতের রাজনৈতিক মিডিয়ার একাংশকে চিহ্নিত করেছেন গোদি মিডিয়া বলে। কারণ তারা নরেন্দ্র মোদী সরকারের কোলে বসে শাসক দল যা বলায় তাই বলে। সেভাবে এই ক্রিকেট সাংবাদিকদেরও গোদি মিডিয়া বলা যেতে পারে। এঁরা প্রলয় দেখেও অন্ধ সেজে থাকতে পারেন এবং সোশাল মিডিয়ার যুগে যেহেতু দায়িত্ব প্রতিবেদন লেখা বা শুট করা দিয়ে শেষ হয় না, সেহেতু সোশাল মিডিয়াকে ব্যবহার করে ঠিক সেই কাজই করে থাকেন, যার সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন ‘বাবু যত বলে/পারিষদ দলে/বলে তার শতগুণ।’
ধরুন, মহম্মদ শামি প্রথম শ্রেণি, লিস্ট এ, কুড়ি বিশ— সবরকম ক্রিকেটে ঝুড়ি ঝুড়ি উইকেট নেওয়ার পরেও কেন বাদ? সরফরাজ খান আর কত রান করলে টেস্ট দলে জায়গা পাবেন? বিশেষত যেখানে দল সিরিজের পর সিরিজ হেরেই চলেছে। মুখ্য নির্বাচক অজিত আগরকর এসব প্রশ্নের উত্তর দিয়ে উঠতে পারছেন না, এদিকে এই সাংবাদিকরা একশো যুক্তি দিয়ে যাচ্ছেন। কে এঁদের দায়িত্ব দিল? কেনই বা নির্বাচকদের যে কোনো সিদ্ধান্তের সপক্ষে এঁদের যুক্তি জোগাতেই হবে? উত্তর একটাই। এঁরা বোঝেন না বা ইচ্ছে করেই ভুলে গেছেন যে এঁরা সাংবাদিক, বোর্ডের মুখপাত্র নন। একই কাজ এঁরা অনেকে কোনো নির্দিষ্ট ক্রিকেটারের হয়েও করেন। দুর্জনে বলে মোটেই নিষ্কাম কর্ম নয় এগুলো, তবে প্রমাণাভাবে সে প্রশ্নে যাচ্ছি না।
এখন কথা হল, বিনা পয়সার চিয়ারলিডারদের বিসিসিআই বা ক্রিকেটাররা কেনই বা গুরুত্ব দেবে, সম্মান করবে? প্রযুক্তির প্রভাবে খবরের কাগজ পড়া অনেক কমে গেছে। টিভির খবরের প্রতিও মানুষের আকর্ষণ দ্রুত কমছে। বহু ক্রিকেটপ্রেমীই এখন খেলার পাশাপাশি খেলার খবরও দেখেন হাতের মোবাইলেই। তাঁদের কাছে পৌঁছবার জন্যে সত্যিই তো সাংবাদিকদের চেয়ে অনেক ভালো মাধ্যম ইনস্টাগ্রামার বা ইউটিউবাররা। তাঁদের আচার আচরণ আমাদের চোখে যতই কুরুচিকর মনে হোক।

আরও পড়ুন রাষ্ট্রীয় ক্রিকেট-সেবক সংঘ

ক্রিকেটার ও প্রশাসকদের চিয়ারলিডার হয়ে যাওয়া অবশ্য শুরু করেছিলেন আগের প্রজন্মের সাংবাদিকরা। বিশেষত পশ্চিমবাংলার ক্রিকেট সাংবাদিকরা সাংবাদিকতাকে ‘পেজ থ্রি’ সাংবাদিকতায় পরিণত করার ব্যাপারে পথিকৃৎ। কী কুক্ষণে কবি বিষ্ণু দে একবার লিখে ফেলেছিলেন ‘সংবাদ মূলত কাব্য’। আজ থেকে বছর তিরিশেক আগে, বাংলার কিছু সাংবাদিক কথাটাকে আক্ষরিক অর্থে নিয়ে ফেলে ক্রিকেটের প্রতিবেদনে কাব্যি করা শুরু করে দিলেন। হয়ত খেলাটাকে বোঝা এবং বিশ্লেষণ করতে পারার খামতি ঢাকতেই। যেহেতু ওঁরা জনপ্রিয় কাগজের সাংবাদিক ছিলেন, তাই ওটাই দস্তুর হয়ে দাঁড়াল। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ওসব পড়ে শিখল— ক্রিকেট সাংবাদিকতা মানে হল, মাঠে কী ঘটছে সেটা বাদ দিয়ে ড্রেসিংরুমের অন্দরের কার সঙ্গে কার ঝগড়া হল বা গলাগলি হল, কে রাতের অন্ধকারে কোন নায়িকার সঙ্গে প্রেম করতে বেরোল— এইসব সুললিত গদ্যে লেখা।

এরকম সাংবাদিকতা করার একটা মস্ত সুবিধা আছে। কারও সমালোচনা করতে হয় না, কেউ খুব একটা চটে না। সকলের প্রিয় থাকা যায় এবং ইনি কী বললেন আর উনি কী বললেন, তাই লিখেই দিনের পর দিন চালিয়ে দেওয়া যায়। খেলোয়াড় আর প্রশাসকদের খুশি রাখতে পারলে কাঁড়ি কাঁড়ি সাক্ষাৎকার পাওয়া যায়। তাতে পরিশ্রম আরও কমে যায়। যদ শুনিতং তদ লিখিতং। উচ্চ পদে উঠে গেলে শুনে শুনে লেখার পরিশ্রমটাও করতে হয় না।
একসময় এক প্রথিতযশা ক্রিকেট সাংবাদিকের অধীনে কাজ করতাম, যাঁর কাজ বলতে ছিল রেকর্ডার নিয়ে গিয়ে কোনো একজন নামকরা বর্তমান বা প্রাক্তন ক্রিকেটারের সাক্ষাৎকার নেওয়া। তারপর সেটা নিজে টাইপ করার পরিশ্রমটুকুও করতেন না। কোনো একজন অধীনস্থ সাংবাদিকের হাতে রেকর্ডারটি ধরিয়ে দিতেন। তারপর একদিন গোটা পাতা বা অর্ধেক পাতা জুড়ে সেই হাজার হাজার শব্দের উদ্দেশ্যহীন, অর্থহীন সাক্ষাৎকার প্রকাশিত হত। কার সাক্ষাৎকার নেবেন তার পিছনেও কোন ভাবনাচিন্তা থাকত না। যাকে পেতেন তারই সাক্ষাৎকার নিতেন, খবরের দিক থেকে তাঁর ওই সময়ে কোনো প্রাসঙ্গিকতা থাক আর না-ই থাক।

এর নাম নাকি সাংবাদিকতা। এ জিনিস দিনের পর দিন চালিয়ে যেতে গেলে একটি ব্যাপারই খেয়াল রাখতে হয়— ক্ষমতাশালীদের খুশি রাখা। সে কাজটা আমার সেই বস এবং তাঁর সমসাময়িক বাংলা কাগজের ক্রীড়া সম্পাদকরা, খুব মন দিয়েই করতেন। আমার বসটি তো একবার ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশন অফ বেঙ্গলের নির্বাচনের আগেরদিন জগমোহন ডালমিয়া গোষ্ঠীর ইশতেহারই কাগজে ছাপিয়ে দিয়েছিলেন। সেসব পাপের ফলই এখন ফলছে। এসব হল খোলা বাজার অর্থনীতি ভারতে চালু হওয়ার পরের সাংবাদিকতার নিদর্শন। তখন সারা ভারতের সংবাদমাধ্যম সবে জনকল্যাণের লক্ষ্যে কাজ করার খোলস ছাড়তে শুরু করেছে, সংবাদমাধ্যমের মালিকরা টাকা করার নতুন নতুন রাস্তা খুঁজছেন।

এই জাতীয় সাংবাদিকরাই তাই মালিকদের পছন্দের লোক হয়ে উঠলেন, কারণ এঁদের মাধ্যমে ক্রিকেটজগতের সবচেয়ে নামকরা খেলোয়াড় আর সবচেয়ে ক্ষমতাশালী প্রশাসকদের সঙ্গ পাওয়া যায়। ব্যবসায়িক সম্পর্ক স্থাপন করা যায়। কর্পোরেট মিডিয়ায় মালিকের পছন্দের লোক হওয়া মানেই উত্তরোত্তর শ্রীবৃদ্ধি। ফলে ওই সাংবাদিকরাই একতলা বাড়ি থেকে ফট্টি টু পৌঁছলেন, বিখ্যাতও হলেন। পরবর্তী প্রজন্মের সাংবাদিকরা শিখলেন— ওটাই পথ, ব্যাকওয়ার্ড পয়েন্ট আর সিলি পয়েন্টের তফাত না জানলেও ক্ষতি নেই।

সব মিলিয়ে ভারতীয় ক্রিকেটে তৈরি হয়ে গেল এমন এক বাস্তুতন্ত্র, যেখানে কেউ কারও ভুল ধরে না। আমিও ভালো, তুমিও ভালো। কিন্তু সবার চাইতে ভালো পাঁউরুটি আর লাভের গুড়। ইতিমধ্যে এসে পড়েছে হিন্দুত্ববাদ, উগ্র জাতীয়তাবাদ। প্রথমে সরকারের গোদি মিডিয়া এই বয়ানটি দাঁড় করাল যে, সরকার মানেই দেশ। এখন বিসিসিআইয়ের গোদি মিডিয়া এই বয়ান প্রতিষ্ঠা করিয়েছে যে, জাতীয় ক্রিকেট দল মানেই দেশ। ফলে এখন ‘অ্যান্টি-ন্যাশনাল’ তকমা পেতে আর সরকারের সমালোচনা করতে হয় না, ক্রিকেট দলের সমালোচনা করাই যথেষ্ট। সমালোচনা করতে না হলে বিশ্লেষণ করতে হয় না, বিশ্লেষণ করতে না হলে পরিশ্রম করতে হয় না, মেধার দরকার হয় না। অতএব ক্রিকেট সাংবাদিকরা ক্রমশ ডোডোপাখি হয়ে যাবেন, দাপিয়ে বেড়াবেন ইনফ্লুয়েন্সাররা।

১৯৯৪ সালের ডিসেম্বরে মহম্মদ আজহারউদ্দিনের ভারত মোহালির সবুজ পিচে ওয়েস্ট ইন্ডিজের কাছে শোচনীয়ভাবে তৃতীয় টেস্টে হেরে যাওয়ার পর মতি নন্দী লিখেছিলেন ‘বিনোদ কাম্বলির ব্যাটিং বাহাদুরি সবই দেশি মন্থর বাউন্সহীন পিচে। পাথরের ওপর মাটি ফেলে তৈরি মোহালির শক্ত নিখুঁত নতুন পিচের বাউন্স এবং ওয়ালশের বলে নাক ফেটে যাওয়া প্রভাকরের রক্তাক্ত মুখ দেখার পর ভারতীয় ব্যাটিংয়ের অবস্থাটা ধরা পড়ল স্কোর বোর্ডে— এক কথায় সেটি হল ভয়।’ সমালোচনার তীক্ষ্ণতায় এর ধারেকাছে পৌঁছতে পারে এমন কোনো লেখা ভারত দেশের মাটিতে নিউজিল্যান্ডের কাছে রসগোল্লা পাওয়ার পরে আপনার প্রিয় সাংবাদিকরা কেউ লিখেছেন কি? মতিবাবু আজ এমন লিখলে সোশাল মিডিয়ায় তাঁর মা-মাসিকে ধর্ষণের হুমকি দিতেন তথাকথিত ক্রিকেটপ্রেমীরাই। অন্য সাংবাদিকরাও পোস্ট করতেন, এসব লেখা অন্যায়। একটা ম্যাচে ব্যর্থ হলেই বিশ্বসেরা দল খারাপ হয়ে যায় না।
অতএব ব্রায়ান বেনেটকে না চিনে সাংবাদিক সম্মেলনে বসাই যুগোপযোগী।

অ2অনুস্বর ডট কম ওয়েবসাইটে প্রকাশিত

ভারত-পাক ম্যাচ এখন ক্রিকেটের দুর্বিপাক

নেদারল্যান্ডস একের পর এক বিশ্বকাপে নজরকাড়া ক্রিকেট খেললেও তাদের খেলা বাড়ানোর কোনো উদ্যোগ নেয় না আইসিসি। নেপালও আটকে আছে একই জায়গায়, অথচ সেখানে ক্রিকেটের বিপুল জনপ্রিয়তা। এসব হচ্ছে, কারণ আইসিসি ফিফার মত শক্তিমান নিয়ামক সংস্থা নয়, তাকে ঘাড় ধরে চালাচ্ছে বিসিসিআই।

ব্যাট, বল, উইকেট, প্যাড, গ্লাভস, এমনকি মাঠের মালিকও আপনি হতে পারেন। কিন্তু খেলতে হলে আরেকটা দল লাগে। কথাটা বাচ্চারাও বোঝে, কিন্তু বড়রা ভুলে যায়— টাকার গরমে, এবং অনেক টাকা যে বিপুল ক্ষমতা দেয় তার মদে মত্ত হয়ে। ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিসিআই) ঠিক তাই হয়েছে। অসুখটা আজকের নয়, অনেকদিনের। কিন্তু চলতি বছরের আগে টাকা আছে এবং ক্ষমতা আছে বলে যা ইচ্ছে তাই করার বিরুদ্ধে কোনো প্রতিরোধ হয়নি, ফলে সেরকম ল্যাজেগোবরেও হতে হয়নি, যা ভারত-পাকিস্তান ম্যাচ নিয়ে হল। আপনি হাঁই হাঁই করে উঠতে পারেন এই বলে যে, মোটেই বিসিসিআই ল্যাজেগোবরে হয়নি। হয়েছে পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ড (পিসিবি)। আপনার দোষ নেই। আপনার সন্ধেবেলার টিভি চ্যানেল, সকালবেলার খবরের কাগজ আর হাতের মোবাইল ফোন আপনাকে একথাই বোঝাচ্ছে। অনেক প্রথিতযশা সাংবাদিক তো এমনও লিখছেন এবং বলছেন যে প্রথমে রেলা নিয়ে খেলবে না বলার পর, শেষমেশ পাকিস্তান ম্যাচটা খেলার জন্য ভিখারির মত আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিলের (আইসিসি) কাছে ছুটে গেছে। কথাগুলো ঠিক কিনা তা বিচার করার জন্যে আমরা স্রেফ সেটুকু নিয়েই আলোচনা করব যা প্রকাশ্যে ঘোষণা করা হয়েছে। কারণ ‘সূত্রের খবর’ কথাটার কী পরিমাণ অপব্যবহার এদেশের সাংবাদিকরা করে থাকেন তা এখন প্রায় সবাই জানেন। অতএব ওসব থাক।

তথ্য বনাম মনগড়া তত্ত্ব

প্রথমেই খেয়াল করুন, পাকিস্তানই রবিবারের ম্যাচটা খেলতে মরিয়া হয়ে উঠেছিল (বা ভিক্ষা চেয়েছিল আইসিসির কাছে)— এমন বলার মত কোনো ঘটনা আমরা দেখিনি। ভিক্ষা চাইতে ভিখারিকেই যেতে হয়। কোনোদিন এমন হয়েছে, আপনি কোনো ভিখারির বাড়ি খুঁজতে বেরিয়েছেন ভিক্ষা দেবেন বলে? খুঁজে বের করে ভিখারির হাতে পায়ে ধরেছেন ‘ওগো, আমার থেকে ভিক্ষা নাও গো’? পাকিস্তান ভারতের বিরুদ্ধে খেলব না বলার পরে আমরা কী দেখলাম? পিসিবির কোনো কর্তাকে দুবাইতে আইসিসির দফতরে যেতে দেখলাম কি? না, বরং উলটোটা ঘটল। আইসিসি চিফ এক্সিকিউটিভ সংযোগ গুপ্তাই পাকিস্তানে উড়ে গেলেন পিসিবি প্রধান মহসীন নকভির সঙ্গে কথা বলতে। সেই বৈঠকে গেলেন বিশ্বকাপ থেকে আগেই বিতাড়িত বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) সভাপতি আমিনুল ইসলাম বুলবুল।

সেই বৈঠকে কে কী বলেছিল, পাকিস্তান কী কী দাবি করেছিল আর আইসিসি ফুৎকারে কোন কোন দাবি উড়িয়ে দিয়েছে— তা নিয়ে এখন বাজার গরম করছেন বিভিন্ন প্রথিতযশা ভারতীয় ক্রিকেট সাংবাদিক। অন্যদিকে পাকিস্তানি সংবাদমাধ্যম বোঝানোর চেষ্টা করছে— তাদের ক্রিকেট বোর্ড যা চেয়েছিল তাই পেয়েছে। আমরা এই আকচা-আকচির মধ্যে ঢুকবই না। এদের কাউকে পুরোপুরি বিশ্বাস করার কোনো কারণ নেই, কারণ বৈঠকটা ছিল রুদ্ধদ্বার। কোনো সাংবাদিকই সেখানে উপস্থিত ছিলেন না। অতএব এ ওকে ভিক্ষা দিল, না ও একে— সে তর্ক ট্রোলরা করুক গে। বরং দেখা যাক, সেই বৈঠকের পরে কী কী ঘটল।

প্রথমত, আমিনুল দেশে ফিরে একখানা বিবৃতি দিলেন। সেই বিবৃতিতে তিনি পাকিস্তানকে ধন্যবাদ জানালেন সংকট মুহূর্তে বাংলাদেশের পাশে দাঁড়ানোর জন্য, কামনা করলেন— এই সৌভ্রাতৃত্ব যেন দিন দিন বাড়ে। তারপর ‘সম্পূর্ণ ক্রিকেট বাস্তুতন্ত্রের সুবিধার্থে’ অনুরোধ করলেন ১৫ ফেব্রুয়ারির ম্যাচটা খেলতে। দ্বিতীয়ত, আইসিসি একখানা লম্বা বিবৃতি দিল। সেই বিবৃতিতে দেখা যাচ্ছে, সংযোগ স্বীকার করে নিয়েছেন যে বিশ্বকাপে বাংলাদেশের না থাকা দুঃখজনক।

বাংলাদেশ সম্পর্কে আরও অনেক ভালো ভালো কথা বলার পাশাপাশি এই বিবৃতিতে লেখা হয়েছে যে বাংলাদেশকে কোনো শাস্তি দেওয়া হবে না বা জরিমানা করা হবে না। বরং তারা চাইলে আইসিসির ‘ডিসপিউট রেজলিউশন কমিটি’-র কাছেও আবেদন করতে পারে এই গোলমাল নিয়ে। উপরন্তু ২০৩১ ক্রিকেট বিশ্বকাপের আগেই তাদের কোনো একটা আইসিসি প্রতিযোগিতা আয়োজনের দায়িত্ব দেওয়া হবে। সোজা কথায়, বিশ্বকাপ না খেলতে পারায় বাংলাদেশের যে ক্ষতি হয়েছে, তা খানিকটা পূরণ করার ব্যবস্থা হল। দোষটা বাংলাদেশেরই ছিল— এমনটা মানলে নিশ্চয়ই তা করা হত না। আইসিসির গোটা বিবৃতিতে ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের নামগন্ধ নেই। স্রেফ বলা আছে, আইসিসি, পিসিবি ও বিসিবি অন্যান্য সদস্যদের সঙ্গে মিলে খেলাটার স্বার্থে আলাপ আলোচনা, সহযোগিতা এবং গঠনমূলক ব্যবস্থাপনার প্রতি দায়বদ্ধ।

অপারেশন সিঁদুরের সময়ে একদিন রাতে ভারতীয় সংবাদমাধ্যম লাহোর, করাচি, ইসলামাবাদ দখল করে ফেলেছিল। অনেকটা সেই কায়দায় ৯ তারিখের ওই বৈঠকের আগে পর্যন্ত ভারতের প্রায় গোটা ক্রিকেট মিডিয়া বলে যাচ্ছিল— বাংলাদেশ নিজেদের কত বড় ক্ষতি করল জানে না। এরপর ওদের দেশে কেউ খেলতে যাবে না। ভারত তো যাবেই না। ওদের সমস্ত আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা থেকে আইসিসি নিষিদ্ধও করে দিতে পারে ইত্যাদি। একইভাবে পাকিস্তান যেই বাংলাদেশকে বাদ দেওয়ার প্রতিবাদে ভারত ম্যাচ খেলতে চাইল না, অমনি বলা হচ্ছিল, না খেললে পাকিস্তান বিরাট বিপদে পড়বে। বিশ্বকাপের সম্প্রচারকারীকে অনেক টাকা ক্ষতিপূরণ দিতে হবে, পাকিস্তান সুপার লিগ (পিএসএল)-কে আইসিসি নিষিদ্ধ করে দেবে, সমস্ত আইসিসি প্রতিযোগিতা থেকে ওদের বাদ দিয়ে দেবে ইত্যাদি প্রভৃতি।

তথ্য অগ্রাহ্য না করলে এবং ইতিহাস-বিস্মৃত না হলে এসব দিনের পর দিন বলে/লিখে যাওয়া মুশকিল। কারণ প্রথমত, সম্প্রচারকারীর চুক্তি হয় আইসিসির সঙ্গে। কেবল কোনো প্রতিযোগী দেশের সঙ্গে নয়। যদি ধরেও নিই ক্ষতিপূরণের টাকা আইসিসি পাকিস্তানের থেকেই আদায় করত, তাহলেও আইসিসিকে প্রমাণ করতে হত যে পিসিবি অকারণে ম্যাচ বয়কট করছে। খেলব না— এই ঘোষণা কিন্তু এসেছিল পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর দফতর থেকে। কোনো দেশের কোনো খেলার ফেডারেশনই সেদেশের সরকারের নির্দেশ অমান্য করতে পারে না।

ভারত এই যুক্তিতেই পাকিস্তানের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক সিরিজ খেলে না, বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের অংশ হিসাবে পাকিস্তান ভারতে আসে না বা ভারত পাকিস্তানে যায় না। সে কারণেই বাংলাদেশ নিজের সরকারের নির্দেশ অনুযায়ী ‘ভারতে খেলতে যাব না’ বলায় তাদের বাদ দেওয়া আইসিসির অন্যায় হয়েছে বলা হচ্ছে। আইসিসি বলতে পারে না— ক যা করলে ঠিক, খ আর গ করলে সেটা বেঠিক। আর যেকথা গত কয়েকদিনে কোনো ভারতীয় সংবাদমাধ্যমকে বলতে দেখলাম না, সেটা হল, আইসিসি তেমন কিছু বললেও বাংলাদেশ আর পাকিস্তানের কাছে এমন একটা জায়গার দরজা খোলা থাকত, যেখানে বিসিসিআই বা আইসিসির বিশেষ প্রভাব নেই। জায়গাটার নাম কোর্ট অফ আরবিট্রেশন ফর স্পোর্ট (ক্যাস)। এই ঝামেলা সেখানে চলে গেলে কী হত বলা যায় না। একথা ঠিক যে আইসিসি এখন পর্যন্ত নিজেদের ‘ডিসপিউট রেজলিউশন কমিটি’-কেই সর্বোচ্চ বলে মানে এবং ক্রিকেটের ঝামেলা ক্যাস পর্যন্ত কখনো নিয়ে যাওয়া হয়নি, কিন্তু ক্রিকেট এখন আন্তর্জাতিক অলিম্পিক কমিটির আওতায় এসে পড়েছে। ২০২৮ লস এঞ্জেলস অলিম্পিকে খেলা হবে। এমতাবস্থায় ক্যাসকে মানব না বলা যায় কি?

দ্বিতীয়ত, ১৯৯৬ বিশ্বকাপে অস্ট্রেলিয়া আর ওয়েস্ট ইন্ডিজ শ্রীলঙ্কায় বিশ্বকাপের ম্যাচ খেলতে যায়নি। তার জন্যে তাদের পয়েন্ট কেটে নেওয়া ছাড়া আর কোনো শাস্তি দেওয়া হয়নি। ২০০৩ বিশ্বকাপেও ইংল্যান্ড জিম্বাবোয়েতে খেলতে যায়নি, নিউজিল্যান্ড কেনিয়ায় যায়নি। সেক্ষেত্রেও একই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল। মামলা মোকদ্দমা হলে এসব দৃষ্টান্ত আইসিসির বিপক্ষেই যেত। আর পিএসএল? সেটা ঘরোয়া লিগ, তাকে নিষিদ্ধ করার ক্ষমতা আইসিসির নেই। যেমন আইপিএলকেও আইসিসি নিষিদ্ধ করতে পারে না। যা-ই হোক, এত আইনি জটিলতার দরকার পড়েনি, কারণ আইসিসির সঙ্গে পিসিবি আর বিসিবির বৈঠক সফল হয়েছে।

রাজনৈতিক হার

কে জিতল কে হারল তা নিয়ে কাজিয়ার মধ্যে মহসীন ১০ ফেব্রুয়ারি বলেছেন, ভারতের ম্যাচ বয়কট করার পিছনে তাঁদের একটাই লক্ষ্য ছিল— বাংলাদেশের সঙ্গে যে অবিচার হয়েছে তার প্রতিকার করা। তাই বাংলাদেশের দাবিই তাঁদের দাবি, নিজেদের অন্য কোনো দাবি ছিল না। বাংলাদেশের সম্মান পুনরুদ্ধার হয়েছে বলেই তাঁরা খেলতে রাজি হয়েছেন। কথাটা বিশ্বাস করার প্রয়োজন নেই। কিন্তু বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থরক্ষা যে হয়েছে তাতে সন্দেহ নেই, আর পাকিস্তান এই কাণ্ড না করলেও যে স্বার্থরক্ষা হত তার গ্যারান্টি নেই। কিন্তু ভেবে দেখুন, পিসিবি এ জিনিস করল কেন? পাকিস্তান এক মহান দেশ বলে? নাকি বাংলাদেশের ক্রিকেটার ও ক্রিকেটভক্তদের দুঃখে পাকিস্তানি কর্মকর্তাদের বুকের ভিতরটা হু হু করছিল বলে? দুটোর কোনোটাই নয়। পাকিস্তান যে কোনো মহান দেশ নয় তা আমরা ভারতীয়রা ভালো করেই জানি, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ভুলে না যাওয়া বাংলাদেশীরাও জানেন।

আসলে মহসীন একজন দুঁদে রাজনীতিবিদ। তিনি পাকিস্তানের মন্ত্রিসভার সদস্য। বাংলাদেশের পাশে দাঁড়ানো পুরোপুরি রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত, এবং ক্রিকেট নিয়ে রাজনীতি করতে গিয়ে দেবজিৎ শইকিয়াদের ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড রাজনীতিতেই ল্যাজেগোবরে হল। স্রেফ সোশাল মিডিয়া ট্রোলদের কথায় কান দিয়ে ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগ থেকে বাংলাদেশের ক্রিকেটার মুস্তাফিজুর রহমানকে তাড়ানো হয়েছিল। অথচ এর কোনো রাজনৈতিক যুক্তি ছিল না, কারণ পাকিস্তানের মত বাংলাদেশ আমাদের শত্রু রাষ্ট্র নয়। তাদের সঙ্গে আমাদের কোনোদিন যুদ্ধ হয়নি, বরং তাদের ইতিহাসের একমাত্র যুদ্ধে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে আমরাই সহায়তা করেছিলাম। বাংলাদেশে যে দলের সরকারই এসে থাক, কোনোদিন আমাদের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক ভেঙে পড়েনি। ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনাকে ভারতই আশ্রয় দিয়েছে, আবার বর্তমান তদারক সরকারের সঙ্গেও আমাদের সম্পর্ক বজায় আছে। খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পরে শোকপ্রকাশ করতে আমাদের বিদেশমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর স্বয়ং বাংলাদেশে গিয়েছিলেন। সেই দেশের ক্রিকেটারকে আমাদের দেশের লিগে খেলতে দেওয়া হল না কোন যুক্তিতে?

মুসলমানবিদ্বেষ, এবং বোর্ডের সেক্রেটারি দেবজিৎ যে রাজ্যের লোক সেই রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মার স্পষ্ট বাঙালিবিদ্বেষ— এছাড়া আর কোনো যুক্তিই খাটে না। সেই যুক্তি প্রয়োগ করেই গণ্ডগোলটা পাকাল বিসিসিআই। জবাবে বিসিবি ভারতে খেলতে আসতে অস্বীকার করল। আইসিসি যে বিসিসিআইয়ের দুবাই শাখা মাত্র, সেকথা নিতান্ত বোকা আর ন্যাকা ছাড়া ক্রিকেট-দুনিয়ার সবাই জানে। তা যদি না হত, তাহলে আইসিসি বাংলাদেশের দাবি মেনে নিয়ে তাদের শ্রীলঙ্কায় খেলতে দিত। ঠিক যেমন গতবছর চ্যাম্পিয়নস ট্রফিতে ভারতকে পাকিস্তানের বদলে সংযুক্ত আরব আমীরশাহীতে খেলতে দিয়েছিল। বাংলাদেশের নিরাপত্তার অভাববোধ করার দাবি উড়িয়ে দেওয়া যায় না, আইসিসির নিরাপত্তা দল যা-ই বলে থাক। কারণ ততদিনে কলকাতা নাইট রাইডার্সে মুস্তাফিজুরকে নেওয়ার জন্যে শাহরুখ খানকে এবং মুস্তাফিজুরকে ভারতের শাসক দলের নেতারা হুমকি দিয়ে ফেলেছেন। শেষ মুহূর্তে সূচি পরিবর্তন করা মোটেই কঠিন নয়।

কিন্তু তাতে ভারত আর বাংলাদেশকে সমানভাবে দেখা হয়ে যেত। আইসিসি মানে তো আসলে বিসিসিআই। নইলে আইসিসি চেয়ারম্যান জয় শাহ ভারত জিতলে বাচ্চা ছেলের মত লাফালাফি করেন কেন? সেই লোকের অধীন আইসিসি মুড়ি মিছরি এক দর করে দিতে পারে না। ফলে বাংলাদেশের দাবি মানা হল না। ক্রিকেটপাগল দেশের জনগণ, যাদের মধ্যে এমনিতেই রাজনৈতিক কারণে ভারতবিরোধিতা দিন দিন বাড়ছে, তাদের বাদ দিয়ে দেওয়া হল বিশ্বকাপ থেকে। এই সুযোগটাই নিলেন মহসীন। গোটা ঘটনাবলীতে সবচেয়ে ক্ষতি হল ভারতের বিদেশনীতির। ‘বিজেপিচালিত’ ক্রিকেট বোর্ড এবং আইসিসির নৈপুণ্যে আমাদের পশ্চিম সীমান্তের শত্রু রাষ্ট্রটির সঙ্গে পূর্ব সীমান্তের বন্ধু রাষ্ট্রটির গলাগলি হয়ে গেল। এবার বাংলাদেশের নির্বাচনে যে দলই জিতুক, তাদের সঙ্গে সুসম্পর্ক তৈরি করতে ভারত সরকারকে দ্বিগুণ পরিশ্রম করতে হবে।

কেলোর কীর্তি এখানেই শেষ নয়। দক্ষিণদিকের প্রতিবেশী শ্রীলঙ্কার সঙ্গেও আমাদের সম্পর্ক মোটের উপর বরাবরই ভালো, এবং পাকিস্তানের সঙ্গে সীমান্ত না থাকায় শ্রীলঙ্কার সম্পর্ক যৎসামান্য। একসময় বরং একটু গোলমেলেই হয়ে গিয়েছিল, কারণ ২০০৯ সালের ৩ মার্চ পাকিস্তানে খেলতে গিয়ে সন্ত্রাসবাদী হামলার শিকার হয়েছিলেন শ্রীলঙ্কার ক্রিকেটাররা। এবারে ভারত-পাকিস্তান ম্যাচ হচ্ছে কলম্বোয়, সেহেতু ম্যাচটা না হলে শ্রীলঙ্কার ব্যাপক আর্থিক ক্ষতির সম্ভাবনা ছিল। তাই তারাও পাকিস্তানকে অনুরোধ করেছিল ম্যাচটা খেলতে। পাকিস্তান শেষপর্যন্ত রাজি হয়ে যাওয়ার পরে শ্রীলঙ্কার বিদেশমন্ত্রী ও পর্যটন মন্ত্রী সোশাল মিডিয়া পোস্টে ধন্যবাদ জানিয়েছেন কাকে? পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরীফ আর পিসিবিকে। উপরন্তু লিখেছেন, পাকিস্তানের এই সিদ্ধান্ত খেলোয়াড়ি মনোভাব, মিত্রতা এবং দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের শক্তির নিদর্শন। অর্থাৎ শ্রীলঙ্কার থেকেও হাততালি কুড়িয়ে নিল পাকিস্তান, আইসিসি নয়।

অতি দর্পে…

সেই জগমোহন ডালমিয়ার আমলে ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, বাংলাদেশ একত্রে বিশ্ব ক্রিকেটে উপমহাদেশের আধিপত্য কায়েম করার চেষ্টা শুরু করেছিল এবং সফল হয়েছিল। কারণটা ব্যবসায়িক। যতগুলো দেশ ক্রিকেট খেলে, তার মধ্যে খেলাটার জনপ্রিয়তা এই অঞ্চলেই সবচেয়ে বেশি এবং প্রত্যেকটা জনবহুল দেশ। এখন যুক্ত হয়েছে নেপাল আর আফগানিস্তান। ফলে এই উপমহাদেশই স্পনসরদের জন্যে সবচেয়ে বড় বাজার। অন্যান্য কুড়ি বিশের লিগের তুলনায় আইপিএলের রমরমাও এই কারণেই বেশি, বিসিসিআইও এই কারণেই পৃথিবীর সবচেয়ে ধনী ক্রিকেট বোর্ড হতে পেরেছে। কিন্তু অস্ট্রেলিয়া, ইংল্যান্ডের হাত থেকে বিশ্ব ক্রিকেটের রাশ কেড়ে নেওয়ার পরে ডালমিয়া চেষ্টা করেছিলেন ক্রিকেটকে আরও ছড়িয়ে দিতে। দক্ষিণ আফ্রিকাকে নির্বাসন থেকে ফিরিয়ে আনা, বাংলাদেশকে টেস্ট ক্রিকেটের আঙিনায় নিয়ে আসা সেই চেষ্টারই অংশ। সে আমলেই অ্যাসোসিয়েট দেশগুলোর মধ্যে ক্রিকেট আরও ছড়াচ্ছিল। কেনিয়া ভাগ্যের সামান্য সহায়তা পেয়ে ২০০৩ বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে পৌঁছে গিয়েছিল। সিঙ্গাপুর, টরন্টো, নাইরোবির মত নতুন নতুন জায়গায় আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের আসর বসছিল। কিন্তু এন শ্রীনিবাসনের আমল থেকে, বলা ভালো, আইপিএলের টাকায় পকেট ভীষণ গরম হওয়ার পর থেকে, উপমহাদেশীয় ঐক্যের তোয়াক্কা না করে বিসিসিআই এককালে সকলের উপর ছড়ি ঘোরানো অস্ট্রেলিয়া আর ইংল্যান্ডের সঙ্গেই জোট বেঁধে তৈরি করেছে ‘বিগ থ্রি’ মডেল।

এই মডেল অনুযায়ী, আইসিসির আয়ের সিংহভাগ নিয়ে নেয় এই তিন দেশের ক্রিকেট বোর্ড। বাকিদের দিকে কাঁটা কুটো ছুড়ে দেওয়া হয়। ওয়েস্ট ইন্ডিজ, পাকিস্তান, দক্ষিণ আফ্রিকার মত জায়গায় একাধিক কারণে ক্রিকেটের নাভিশ্বাস উঠে গেছে গত ১০-১৫ বছরে। অ্যাসোসিয়েট দেশগুলোর অবস্থা স্বভাবতই আরও সঙ্গীন। দুর্বল দেশগুলোকে বেশি সাহায্য করাই তো যে কোনো খেলার নিয়ামক সংস্থার দায়িত্ব হওয়ার কথা। কিন্তু ত্রিদেবের যুক্তি হল— আমাদের এখান থেকে আইসিসির সবচেয়ে বেশি টাকা আয় হয়, অতএব আমরাই সবচেয়ে বেশি টাকা নেব।

অর্থাৎ পুঁজিবাদের যতরকম মডেল হয়, তার মধ্যে সবচেয়ে শোষণমূলক মডেলটাতেই চালানো হচ্ছে বিশ্ব ক্রিকেট। টাকার নেশায় চুর এই ক্রিকেট প্রশাসকদের মাথায় ঢোকে না যে, পুঁজিবাদের যুক্তি অনুযায়ীই বাজার ক্রমাগত বড় করে যেতে হয়, ছোট করলে ব্যবসার পঞ্চত্বপ্রাপ্তির পথ খুলে দেওয়া হয়। ফলে বিসিসিআই তার দুই স্যাঙাতের সঙ্গেই বারবার খেলছে, বেশি ম্যাচের সিরিজ খেলছে। নিউজিল্যান্ড, দক্ষিণ আফ্রিকাকেও বিশেষ পাত্তা দিচ্ছে না। আফগানিস্তান আর আয়ারল্যান্ডকে তো টেস্ট খেলার অধিকার দেওয়া হয়েছে নামেই। তারা টেস্ট দূরের কথা, বড় দলগুলোর সঙ্গে নিয়মিত বা কুড়ি বিশ বা একদিনের ম্যাচের সিরিজ খেলারও সুযোগ পায় না। নেদারল্যান্ডস একের পর এক বিশ্বকাপে নজরকাড়া ক্রিকেট খেললেও তাদের খেলা বাড়ানোর কোনো উদ্যোগ নেয় না আইসিসি। নেপালও আটকে আছে একই জায়গায়, অথচ সেখানে ক্রিকেটের বিপুল জনপ্রিয়তা। এসব হচ্ছে, কারণ আইসিসি ফিফার মত শক্তিমান নিয়ামক সংস্থা নয়, তাকে ঘাড় ধরে চালাচ্ছে বিসিসিআই। তার যাতে আগ্রহ নেই, আইসিসি তা করতে পারবে না।

এই ব্যবস্থায় বিসিসিআই ফুলে ফেঁপে উঠছে, ফলে তার গোদি মিডিয়া (প্রাক্তন ক্রিকেটার সমেত) আপনাকে সারা বছর বোঝাচ্ছে— এটাই ঠিক ব্যবস্থা। যখন সাহেবদের ক্ষমতা ছিল সাহেবরা যা করত, আমরাও তাই করছি। একে তো খ-এর আজকের খারাপ কাজটা ক আগে করত বলেই সেটা ভালো কাজ হয়ে যায় না, তার উপর একথা সম্পূর্ণ চেপে যাওয়া হচ্ছে যে সাহেবদের সঙ্গে গলাগলি করেই ব্যাপারটা করছি। এটা মোটেই তাদের বিরুদ্ধে কোনো জাতীয়তাবাদী আন্দোলন নয়। যা-ই হোক, ব্যাপারটা চলছিল ভালোই। কিন্তু এক মাঘে যে শীত যায় না সেটা ভুলে গিয়েই গোলমাল হয়ে গেল। ক্রিকেটের অর্থনীতি যে ভিতর থেকে ফোঁপরা হয়ে গেছে, তা প্রকাশ হয়ে গেল পাকিস্তান ভারতের বিরুদ্ধে খেলতে অস্বীকার করতেই। দেখা গেল, যে যার নিজের দেশে কুড়ি বিশের ফ্র্যাঞ্চাইজ লিগ চালু করে নিজেদের পকেট যতটা পারছে ভরাচ্ছে ঠিকই, কিন্তু আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের ভিতেই উই ধরে গেছে। বাকি ম্যাচগুলোকে অবহেলা করতে করতে আর ভারত-পাক ম্যাচের বেলুনে ফুঁ দিতে দিতে (২০২৩ বিশ্বকাপে কোনো উদ্বোধনী অনুষ্ঠান করা হয়নি। মনে আছে তো? ঝলমলে নাচাগানা হয়েছিল ভারত-পাক ম্যাচের দিন) এত বড় করা হয়েছে যে ওই ম্যাচের উপরেই দাঁড়িয়ে আছে সকলের আয়। কোনো কোনো হিসাব বলছে, আইসিসি প্রতিযোগিতায় একটা ভারত-পাকিস্তান ম্যাচ থেকে ২,২০০ কোটি টাকার বেশি উঠে আসে (প্রায় ২৫০ মিলিয়ন ডলার)। মানে ভারত-পাক রাজনৈতিক উত্তেজনার আগুনেই আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের রান্নাবাড়ি চলছে। আচ্ছা তা-ও নাহয় মানা গেল। কিন্তু কথাটা যখন জানাই আছে, তখন ম্যাচটা খেলতে গেলে যে পাকিস্তানকে লাগবে একথা তো বোঝা উচিত ছিল। সেক্ষেত্রে পায়ে পা দিয়ে ঝগড়া করার কী প্রয়োজন ছিল?

দেশপ্রেম বনাম ডলার-প্রেম

এই প্রশ্নটা শুনেই অনেকে তেড়ে এসে বলবেন ‘পাকিস্তান আমাদের দেশের এত ক্ষতি করেছে, ওদের সঙ্গে কি গলাগলি করতে হবে?’ আজ্ঞে না, গলাগলি করা একেবারেই অনুচিত। দেশপ্রেমের যুক্তি বলে, পহলগামের সন্ত্রাসবাদী হানার পরে খেলাই উচিত নয় তাদের সঙ্গে। মানে ভারতেরই বরং পাকিস্তান ম্যাচ বয়কট করা উচিত। কী হবে তাতে? দুটো পয়েন্ট কাটা যাবে। আমাদের তো বিশ্বসেরা দল, তারা সে ক্ষতি পুষিয়ে দিয়ে খেতাব জিততে পারবে না? নির্ঘাত পারবে। তাহলে আমরা খেলি কেন পাকিস্তানের বিরুদ্ধে?

শুধু খেলি তা নয়। বিসিসিআই যে আইসিসির ঘাড় ধরে দুনিয়ার ক্রিকেট চালায়, সেটা আমাদের অনেকেরই গর্বের বিষয়। অথচ তা সত্ত্বেও সব আইসিসি প্রতিযোগিতায় পাকিস্তানকে আমাদের গ্রুপেই রাখা হয়, যাতে নিদেনপক্ষে একবার ভারত-পাক ম্যাচ হয়। এশিয়ান ক্রিকেট কাউন্সিল (এসিসি) আয়োজিত এশিয়া কাপে তো ভারত-পাক ম্যাচ হতেই হবে, এড়ানোর উপায় নেই। কিন্তু ২০২৫ এশিয়া কাপে এমন ব্যবস্থা করা হল যে ফাইনালের আগেই দু-দুবার এই দুই দলের খেলা হল, ফাইনালে আরও একবার।

রাজনৈতিক কারণে এক দেশের আরেক দেশের বিরুদ্ধে না খেলা কিন্তু পৃথিবীর কোনো খেলাতেই বিরল ব্যাপার নয়। আফগানিস্তানে সোভিয়েত ইউনিয়নের সেনা নামানোর প্রতিবাদে ১৯৮০ সালের মস্কো অলিম্পিক বয়কট করেছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সমেত ৬০ খানার বেশি দেশ। তার বদলা নিতে সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং তার বন্ধু দেশগুলো ১৯৮৪ সালের লস এঞ্জেলস অলিম্পিক বয়কট করে। আস্ত অলিম্পিক বয়কট করতে পেরেছে অতগুলো দেশ, আমরা একটা ম্যাচ বয়কট করতে পারি না?

আরো পড়ুন ভারত-পাক ম্যাচ এখন ক্রিকেটের দুর্বিপাক

কেন পারি না? উত্তর একটাই। ওই ২৫০ মিলিয়ন ডলার। ও হিসাবটা তবু পাওয়া যায়, এই খেলা ঘিরে যে উন্মাদনা তাকে ব্যবহার করে সংবাদমাধ্যম, তথাকথিত স্বাধীন সাংবাদিক, সোশাল মিডিয়া ইনফ্লুয়েন্সাররা যে কত টাকা রোজগার করেন তার হিসাব পাওয়াও সম্ভব নয়। ওই ভাগটা কেউই ত্যাগ করতে রাজি নয়। তাই পাকিস্তান বয়কটের কথা বলতেই, বিসিসিআইয়ের চেয়েও বেশি উৎসাহে এই ম্যাচ না খেলা কেন পাকিস্তানের অন্যায়, তা আপনার মাথায় ঢোকাতে কদিন অক্লান্ত পরিশ্রম করলেন আপনার প্রিয় সাংবাদিকরা। এদিকে দেশপ্রেমও দেখাতে হবে। তাই কী বুদ্ধি বের করেছিল বিসিসিআই?

খেলব, কিন্তু খেলার মাঠের দস্তুর অনুযায়ী পাকিস্তানের ক্রিকেটারদের সঙ্গে আমাদের ক্রিকেটাররা হাত মেলাবেন না। উপরন্তু আমাদের অধিনায়ক সাংবাদিক সম্মেলনে গিয়ে রাজনৈতিক বক্তৃতা দেবেন। গোদি মিডিয়া হাততালি দেবে, আপনাকে জানাবে যে পহলগামের মুখের মত জবাব এইটাই। সন্ত্রাসবাদীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া নয়। এক বাংলা কাগজে তো লেখা হয়েছিল, ভারত এতদ্বারা পাকিস্তানকে বলল ‘চল ফোট’।

এই নাটুকেপনা পৃথিবীর অন্য কোনো খেলার নিয়ামক সংস্থা করতে দিত না। তার প্রমাণ— এশিয়া কাপে যেদিন (২১ সেপ্টেম্বর ২০২৫) সূর্যকুমার যাদবের দল পাকিস্তানের বিরুদ্ধে দ্বিতীয়বার খেলেছিল, সেদিনই কাঠমান্ডুতে সাফ অনূর্ধ্ব-১৯ ফুটবলে ভারত বনাম পাকিস্তানের খেলা ছিল। সেই ম্যাচ ভারত ৩-০ জেতে এবং প্রতিপক্ষের সঙ্গে করমর্দন করেই মাঠ ছাড়ে। কিন্তু এশিয়া কাপে ফাইনালের পরে আরও বড় নাটক করে ভারতীয় দল। তারা নাকি কোনো পাকিস্তানির হাত থেকে কাপ নেবে না। অথচ আগে থেকেই জানা ছিল যে, এসিসির প্রধান এখন মহসীন নকভি। ফলে কাপ জিতলে তাঁর হাত থেকেই নিতে হবে। জেদ করে সেই কাপ না নিয়েই ফিরে এসেছিলেন সূর্যকুমাররা।

তখনো ভারতের প্রথিতযশা ক্রিকেট সাংবাদিকরা এবারকার মতই প্রবল জাতীয়তাবাদী হয়ে উঠেছিলেন এবং রেলা নিয়ে লিখেছিলেন, ও কাপ নাকি দিয়ে যেতে বাধ্য হবেন নকভি। পাঁচ মাস হয়ে গেল, আজও সে কাপ এল না। বিসিসিআই এ নিয়ে আইসিসির কাছে, মানে প্রবল পরাক্রমশালী জয় শাহের কাছে, ছুটে গিয়েছিল। তিনিও সুবিধা করতে পারেননি। তাঁর আইসিসি মধ্যস্থতা করার জন্যে একখানা কমিটি গড়ে দিয়েছিল, সেই কমিটি ততটাই সফল হয়েছে যতটা গাজার গণহত্যা থামাতে সম্মিলিত জাতিপুঞ্জ সফল। মহসীন বলেছেন, কাপটা রাখাই আছে। একখানা অনুষ্ঠানের আয়োজন করতে পারি, এসে নিয়ে যেতে হবে এসিসি অফিস থেকে। হয়ত বিসিসিআই ভিখারি নয় বলেই হকের কাপ নিতেও ক্রিকেটারদের পাঠাতে রাজি নয়।

এসব অসোয়াস্তি এড়ানো যায় ২৫০ মিলিয়ন ডলারের মায়া ছাড়তে পারলে। কিন্তু তা তো হয় না, গোটা ক্রিকেট-দুনিয়ার দায়িত্ব যেখানে আমাদের ঘাড়ে। এই গুরুদায়িত্ব পালন করতে গিয়ে আর কী কী যে করতে হবে? দেখুন আবার, আজ থেকে ফের পাকিস্তানিদের সঙ্গে করমর্দন শুরু করতে হয় কিনা। গতকাল সাংবাদিক সম্মেলনে করমর্দনের প্রশ্ন উঠতেই সূর্যকুমার যেভাবে সরাসরি উত্তর না দিয়ে স্মার্ট সাজার চেষ্টা করেছেন, তাতে সন্দেহ হয়, তাঁকেও বলা হয়েছে ‘জো আপ উচিত সমঝো।’ তাঁকে অবশ্য এ যাত্রায় বাঁচিয়ে দিতে পারে কলম্বোর বৃষ্টি।

নাগরিক ডট নেট ওয়েবসাইটে প্রকাশিত

খেলোয়াড় মেয়েদের জয় হোক

মেয়েদের দলের সাফল্যের চেয়ে ব্যর্থতাকে বড় করে দেখানোর যে প্রবণতা এতদিন দেখা গেছে, তার ব্যাখ্যা নারীবিদ্বেষ ছাড়া অন্য কিছু দিয়ে হয় না।

‘খেলোয়াড় মেয়ে’ কথাটা প্রথম কার মুখে শুনেছিলাম মনে করতে পারছি না, কিন্তু কয়েকশোবার শুনেছি। কোনও মেয়েকে খারাপ মেয়ে বলে দেগে দিতে এই শব্দবন্ধ বেশ জনপ্রিয়। রবিবার মাঝরাতে যখন নাদিন দে ক্লার্কের ব্যাট থেকে বেরোনো উড়ন্ত বলটাকে টেনে নামিয়ে দু-হাত ছড়িয়ে উড়ান শুরু করলেন হরমনপ্রীত কৌর আর তাঁকে ধরতে দৌড়লেন স্মৃতি মান্ধনা, শেফালি বর্মা, জেমিমা রডরিগস, দীপ্তি শর্মা, অমনজ্যোত কৌর, রিচা ঘোষ, রাধা যাদব, শ্রী চরনি, ক্রান্তি গৌড়, রেণুকা সিং ঠাকুররা— ঠিক তখন, এ-যুগের সেরা ধারাভাষ্যকার ইয়ান বিশপ বলে উঠলেন ‘এই মুহূর্ত কয়েক প্রজন্মের উত্তরাধিকার তৈরি করল।’ আমার ভাবতে ইচ্ছে হল, সেই উত্তরাধিকারের জোরে খেলোয়াড় মেয়ে কথাটা আর গালাগালি থাকবে না। চারপাশ দেখে আমরা যতই হতাশ হই প্রায়শ, দুনিয়া যে বদলায় তাতে তো সন্দেহ নেই। একসময় ভালোঘরের মেয়েরা অভিনয় করে না— এই সংস্কার তো ছিল আমাদের সমাজে। সত্যিই ‘ভালো’-ঘরের মেয়েদের অভিনয় করতে দেওয়াও হত না। সেই পরিস্থিতি তো বদলেছে। মেয়ে অভিনেত্রী হলে, বিখ্যাত হলে তাকে নিয়ে তো আজ গর্ব করেন বাবা-মা, পাড়া-প্রতিবেশীরা। তেমন এমন ভবিষ্যৎও নিশ্চয়ই আসবে, এই ভারতেই আসবে, যখন একটা মেয়ের যৌন বিশুদ্ধতাই তাকে বিচার করার সবচেয়ে বড় মাপকাঠি হয়ে থাকবে না।

বাইরে আমরা যে যা-ই বলি, মেয়েরা বিশ্বখেতাব জিতেছে বলে যতই তাদের প্রশংসায় ভরিয়ে দিই এখন, সামগ্রিকভাবে কিন্তু আজও ওটাই মাপকাঠি। মান্ধাতার আমলের কথা বলছি না। মাত্র এক দশক আগে, রিও অলিম্পিকের সময়ে, এক সর্বভারতীয় ইংরেজি কাগজে কাজ করতাম। সেদিন নিউজ এজেন্সি একটা খবর পাঠিয়েছিল গেমস ভিলেজে কন্ডোমের চাহিদা সম্পর্কে। সন্ধেবেলার এডিট মিটিংয়ে অবাক হয়ে খেয়াল করলাম, উচ্চশিক্ষিত সাংবাদিকরা জানতেনই না যে গেমস ভিলেজে অ্যাথলিটদের মধ্যে যৌন সম্পর্ক হয়। কিন্তু ব্যাপারটা বিস্ময়ে সীমাবদ্ধ থাকলেও কথা ছিল। সবচেয়ে বয়োজ্যেষ্ঠ মহিলা সাংবাদিক বলে বসলেন ‘তাহলে বাপু মেয়েদের খেলতে না দেওয়াই ভালো।’ অর্থাৎ মেয়েদের ‘সতীত্ব’ বজায় রাখাই আসল। ওটা করতে না পারলে হাজার সাফল্যেও কিছু এসে যায় না। আশা করা যাক, হরমনপ্রীতদের বিশ্বজয়ের পরে অন্তত উচ্চশিক্ষিত বাবা-মায়েরা ওই সাংবাদিকের মতো ভাবা বন্ধ করবেন।

‘অনার কিলিং’-খ্যাত হরিয়ানার মেয়ে শেফালি, হিমাচল প্রদেশের ঠাকুর পরিবারের মেয়ে রেণুকা, মুম্বাইয়ের ধার্মিক খ্রিস্টান জেমিমা বা আমাদের শিলিগুড়ির রিচা— প্রায় সকলেরই ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যাচ্ছে, তাদের ক্রিকেট শুরু ছেলেদের সঙ্গে খেলতে গিয়ে। কিংবদন্তি ঝুলন গোস্বামীর শুরুটাও একইভাবে হয়েছিল চাকদায়। কারণ মাঠের দখল ছেলেদের হাতে। খেলোয়াড় জীবন তৈরি করতে হলে এ-দেশে আগে ছেলেদের সমকক্ষ হতে হয়, তাদের হারিয়ে দেখাতে হয়। ঠিক যেমন দঙ্গল (২০১৬) ছবিতে আমরা দেখেছিলাম— মহাবীর সিং ফোগতকে মেয়েদের এমনভাবে তৈরি করতে হয়েছিল যাতে তারা কুস্তিতে ছেলেদের হারাতে পারে। অস্ট্রেলিয়া, ইংল্যান্ডের মতো দেশের মেয়েদের পেশাদার খেলোয়াড় হতে হলে এমন অসম লড়াই দিয়ে শুরু করতে হয় না। ফলে রবিবারের জয় এ-দেশের নারীবাদীদের দায়িত্ব বাড়িয়ে দিল। রাতদখলের মতো মাঠদখলের আন্দোলনও তাঁদের করতে হবে। প্রাক্তন বোর্ড সভাপতি এন শ্রীনিবাসনের সোশাল মিডিয়ায় ভাইরাল পুরনো মন্তব্য থেকে নিশ্চয়ই সকলে জেনে গেছেন ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড যাঁরা চালান, তাঁরা মেয়েদের ক্রিকেটকে কী নজরে দেখেন। বর্তমান বোর্ডকর্তারাও খুব অন্যরকম ভাবেন এমন মনে করার কারণ নেই। ফাইনালের দিন মাঠে সপরিবার জয় শাহের উপস্থিতি দেখে ঠকবেন না।

প্রথমত, ভারতের জয়ে প্রকাশ্যে উল্লাস করা তাঁর বর্তমান পদের সঙ্গে মোটেই মানানসই নয়। কারণ তিনি এখন আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিলের চেয়ারম্যান, ভারতের বোর্ডের কেউ নন, যদিও বকলমে তিনিই সর্বেসর্বা। খেলাটার প্রতি গভীরে প্রোথিত অশ্রদ্ধা না থাকলে এবং নিজের পদমর্যাদা বুঝতে সম্পূর্ণ অক্ষম না হলে ওই পদের লোক অমন আচরণ করে না। অতীতে যে ভারতীয়রা আইসিসির সর্বোচ্চ পদ অলঙ্কৃত করেছেন (যেমন জগমোহন ডালমিয়া, শরদ পাওয়ার, শশাঙ্ক মনোহর) তাঁরা এই আদেখলেপনা করতেন না। দ্বিতীয়ত, জয়ের অনুগত ভারতীয় ক্রিকেট সাংবাদিকরা এখন কদিন বিস্তর প্রোপাগান্ডা চালাবেন, জয় মেয়েদের ক্রিকেটের জন্যে কত কিছু করেছেন তার ফিরিস্তি দিয়ে। ওতেও ভুলবেন না। তথ্যের আড়ালে লুকিয়ে ফেলা তথ্য জানতে এইটা পড়ে নিতে পারেন।

সত্যিই যদি বোর্ডের মেয়েদের ক্রিকেটের প্রতি দরদ থাকত, তাহলে টুর্নামেন্টের সেরা ক্রিকেটার দীপ্তি শর্মাকে মুখ ফুটে বলতে হত না— আরও বেশি ম্যাচ খেলার ব্যবস্থা হলে ভালো হয়। মনে রাখবেন, কিংবদন্তি ঝুলন গোস্বামী দুই দশকের আন্তর্জাতিক ক্রিকেটজীবনে খেলতে পেরেছিলেন মাত্র এক ডজন টেস্ট আর ২০৪ খানা একদিনের ম্যাচ। অথচ ভারতের হয়ে বছর বারো খেলেই ৯২ খানা টেস্ট আর ২০০ একদিনের ম্যাচ খেলেছিলেন জাহির খান। বিরাট কোহলি ১৩-১৪ বছরের আন্তর্জাতিক ক্রিকেট জীবনেই ১২৩ খানা টেস্ট আর তিনশোর বেশি একদিনের ম্যাচ খেলে ফেলেছেন। আজকের বিশ্বজয়ী দলের সহ-অধিনায়িকা স্মৃতি ২০১৩ সালে অভিষেকের পর থেকে খেলেছেন ১১৭ খানা একদিনের ম্যাচ আর ২০১৪ সালে টেস্ট অভিষেকের পর মাত্র সাতখানা টেস্ট। ওদিকে একই সময়ে অভিষেক হওয়া মহম্মদ শামি খেলে ফেলেছেন ৬৪ খানা টেস্ট আর ১০৮ খানা একদিনের ম্যাচ। ইচ্ছাকৃতভাবে মেয়েদের বিশ্বকাপকে যথেষ্ট গুরুত্ব না দিয়ে ছোট ছোট শহরে ম্যাচ দেওয়া, মুম্বাইয়ের তিনটে ক্রিকেট স্টেডিয়ামের মধ্যে সবচেয়ে ঐতিহ্যহীন এবং শহরের প্রান্তে থাকা স্টেডিয়ামকে সেমিফাইনাল ও ফাইনালের জন্যে বেছে নেওয়া আর বিশ্বকাপসুলভ প্রচারের ব্যবস্থা না করা তো আছেই। বোঝাই যায়, অ্যালিসা হিলির অস্ট্রেলিয়া, ন্যাট শিভার-ব্রান্টের ইংল্যান্ড বা লরা উলভার্টের দক্ষিণ আফ্রিকা খেলছিল প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে। হরমনপ্রীতের ভারত খেলছিল প্রতিপক্ষ এবং নিজেদের বোর্ডের বিরুদ্ধে। এখন দলকে এককালীন ৫১ কোটি টাকা পুরস্কার দিয়ে নারীদরদি সাজবে বোর্ড।

আরও পড়ুন আলতো ফ্লিক: ক্রিকেট নিয়ে ব্যতিক্রমী বই

অবশ্য কেবল বোর্ডই যে হরমনপ্রীতদের বিরুদ্ধে ছিল তা নয়। মেয়েদের দল এত বছরে যতবার হেরেছে, ততবার মেয়েদের দ্বারা যে ক্রিকেট হয় না, মেয়েদের দলের পিছনে টাকা খরচ করা যে অপচয়— সে-কথা আজ উদ্বাহু নৃত্য করা সাধারণ দর্শকরা তো বটেই, ক্রীড়া সাংবাদিকরাও বলে গেছেন সোশাল মিডিয়ায়। খবরের কাগজে বা টিভি চ্যানেলে যৎসামান্য জায়গা বরাদ্দ হয়েছে মেয়েদের ক্রিকেটের জন্য। এ-কথা ঠিকই যে খেলায় সাফল্য না এলে সাধারণ মানুষের আগ্রহ বাড়ে না, সংবাদমাধ্যমেও বেশি জায়গা দেওয়ার কোনও যুক্তি নেই। এখন চূড়ান্ত সাফল্য এসেছে, স্বভাবতই সব মহলের আগ্রহ বাড়বে। কিন্তু মেয়েদের দলের সাফল্যের চেয়ে ব্যর্থতাকে বড় করে দেখানোর যে প্রবণতা এতদিন দেখা গেছে, তার ব্যাখ্যা নারীবিদ্বেষ ছাড়া অন্য কিছু দিয়ে হয় না। ভারতের মেয়েরা এর আগেও দু-দুবার একদিনের ক্রিকেটের বিশ্বকাপ ফাইনালে পৌঁছেছিল। দুবারই হেরে যাওয়া মাত্রই লেখালিখি হয়েছে— এদের দিয়ে কিস্যু হবে না। এদের জন্যে এত করা হয়, তবু…। কত যে করা হয় তার সংক্ষিপ্ত বিবরণ উপরেই দিয়েছি। এদিকে ছেলেদের দল পৃথিবীর সবচেয়ে ধনী ক্রিকেট বোর্ডের বিরাট মুনাফার যাবতীয় সুবিধা পেয়ে থাকে। অথচ গত ১২ বছরে অসংখ্য সুযোগেও বিশ্বখেতাব মাত্র একটা, তাও কুড়ি-বিশের ক্রিকেটে। বরং গত দুবছরে একদিনের ম্যাচ আর টেস্ট ক্রিকেটে হারের সংখ্যা ক্রমশ বাড়ছে। কিন্তু ওই দলের ন্যূনতম সাফল্যকেও বিরাট করে দেখাতে উঠে পড়ে লাগে বোর্ড আর তার গোদি মিডিয়া। হারা সিরিজের গুরুত্বহীন ম্যাচে রোহিত শর্মা বা বিরাট শতরান করলে সেই ইনিংসকেই কাব্যিক করে তুলতে ঝাঁপিয়ে পড়েন প্রাক্তন ক্রিকেটার, সাংবাদিক আর সোশাল মিডিয়া ইনফ্লুয়েন্সাররা। অথচ ভেবে দেখুন, কতবার আপনি পড়েছেন যে, বর্তমানে মেয়েদের ক্রিকেটে বিশ্বের অন্যতম সেরা ব্যাটার হলেন স্মৃতি, আর সবচেয়ে ধারাবাহিক অলরাউন্ডারদের একজন দীপ্তি?

যা-ই হোক, হয়তো আমি পুরুষ বলেই এসব নিয়ে ভাবছি। স্মৃতি, দীপ্তি, রিচারা যেভাবে বেড়ে উঠেছেন তাতে ওঁরা জানেন যে এরকমই হওয়ার কথা ছিল, এরকমই হবে। কদিন পরেই যদি তাঁদের কারও উপরে মেয়ে বলে কোনও আক্রমণ চলে (যেমনটা বিশ্বকাপ চলাকালীন দুই অস্ট্রেলিয়া ক্রিকেটারের উপরে চলেছে), তখন আজ মাথায় তুলে নাচা ‘পাবলিক’ এবং ‘মিডিয়া’ পাশে দাঁড়াবে না। নিজের সম্মান বজায় রাখতে না পারার দোষ নিজের— এই জাতীয় কিছু বলে দেবেন কৈলাস বিজয়বর্গীয়ের মতো কোনও নেতা। বিশ্বকাপটা যে মধ্যরাতে জেতা হয়েছিল, সে-কথা ভুলে গিয়ে কোনও মহিলা মুখ্যমন্ত্রী বলে দিতে পারেন— অত রাতে বাইরে যাওয়া উচিত হয়নি। সাংবাদিকরা গসিপের খোঁজ করবেন, কেউ হয়তো লিখে দেবেন— বিশ্বকাপ জিতে ধরা কে সরা জ্ঞান করতে শুরু করেছিল এরা। তাই এই ঘটনা ঘটেছে। এরা মহা খেলোয়াড় মেয়ে।

সে যা-ই হোক, হরমনদের দৌলতে অনেকদিন পরে আস্ত একখানা প্রতিযোগিতা দেখা গেল, যেখানে প্রতিপক্ষকে আউট করে মুখের সামনে গিয়ে অসভ্যের মতো চিৎকার করলেন না ভারতীয় ক্রিকেটাররা। আউট হলে অসন্তোষ প্রকাশ করলেন না, আম্পায়ারদের সিদ্ধান্ত নিয়ে আক্রমণাত্মক বিবৃতি দিলেন না পৃথিবীর সবচেয়ে পয়সাওয়ালা বোর্ডের খেলোয়াড় হওয়ার রেলায়। নীল জার্সির গা বেয়ে উপচে পড়ল না উগ্র জাতীয়তাবাদ, গ্যালারির হিংস্র চেহারাও দেখা গেল না।

খেলোয়াড় মেয়েদের জয় হোক।

চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম ওয়েবসাইটে প্রকাশিত

ভারতে মেয়েদের ক্রিকেটের পথ এখনো বন্ধুর

জেমিমাকে মাঠের মধ্যে এনে ধর্ষণ করা উচিত – এমন কথাও পোস্ট করা হচ্ছিল সোশাল মিডিয়ায়। নারীবাদীরা কেউ তখন টুঁ শব্দ করেছিলেন বলে জানি না। এখন করছেন, কারণ জেমিমাকে চেনা গেছে। বোধহয় স্বীকার করে নেওয়া ভাল যে, মহিলাদের ক্রিকেটের খবর নারীবাদীরাও বিশেষ রাখেন না।

লক্ষ করে দেখলাম, বিশেষজ্ঞদের মধ্যে এ নিয়ে কোনো মতপার্থক্য নেই যে ৩০ অক্টোবর ২০২৫ মেয়েদের ক্রিকেটের ইতিহাসে একটা বিশেষ দিন ছিল। মেয়েদের ক্রিকেটে এত রান তাড়া করে কোনো দল কখনো জেতেনি। শুধু তাই নয়, ছেলেদের বিশ্বকাপেও নক আউট ম্যাচে এত রান তাড়া করে জেতার রেকর্ড নেই। জেমিমা রডরিগসের অপরাজিত ১২৭ রান যে বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে কোনো ভারতীয়ের সেরা ইনিংস তা নিয়েও মনে হয় না বিশেষ তর্কের অবকাশ আছে। ২০১১ বিশ্বকাপ সেমিফাইনালে শচীন তেন্ডুলকর পাকিস্তানের বিরুদ্ধে একা কুম্ভ হয়ে ৮৫ রান করেছিলেন, যা পার্থক্য গড়ে দিয়েছিল। শচীনও একাধিকবার আউট হতে হতে বেঁচে গিয়েছিলেন জেমিমার মতই। কিন্তু সেদিন ভারত প্রথমে ব্যাট করেছিল, ঘাড়ে পাহাড়প্রমাণ রানের বোঝা ছিল না। সেই পাকিস্তান কোনো ভয় ধরানো দলও ছিল না। বৃহস্পতিবার রাতে যে অস্ট্রেলিয়াকে হরমনপ্রীত কৌররা হারালেন, তারা কিন্তু ছেলেদের ক্রিকেটে ১৯৯৯-২০১১ পর্বের অস্ট্রেলিয়ার মত দুর্ধর্ষ। এরা বিশ্বকাপে শেষবার একটা ম্যাচ হেরেছিল সেই ২০১৭ সালে। এই অবিস্মরণীয় রাতের পর দেশজুড়ে সবাই উচ্ছ্বসিত। অনেকে বলছেন, এরপর জেমিমারা বিশ্বকাপ জিতুন আর না-ই জিতুন, ভারতে মেয়েদের ক্রিকেটের দারুণ উন্নতি হতে চলেছে। সুতরাং অপ্রিয় কথাগুলো বলে ফেলার এটাই সঠিক সময়।

ভারত ও শ্রীলঙ্কায় অনুষ্ঠিত মেয়েদের ৫০ ওভারের বিশ্বকাপ শেষ লগ্নে পৌঁছে গেছে। এই বিশ্বকাপ নিয়ে কথাবার্তা সম্ভবত বহুবছর পরেও শেষ হবে না। তার কারণটা স্রেফ ক্রিকেটীয় হলে চমৎকার হত। জেমিমার ঐতিহাসিক ইনিংস, ভারতের ঐতিহাসিক জয় তো রইলই, ফাইনালে যে দল জিতবে তাদেরই এটা প্রথমবার বিশ্বকাপ জয় হবে। কেবল সেগুলোই চর্চার বিষয় হয়ে থাকলে ভালো হত। প্রথম সেমিফাইনালে দক্ষিণ আফ্রিকার অধিনায়িকা লরা উলভার্ট যে অনবদ্য শতরান (১৪৩ বলে ১৬৯) করেছেন, যদি তা নিয়ে আলোচনা হয় তাহলেও ক্ষতি নেই। দ্বিতীয় সেমিফাইনালে অস্ট্রেলিয়ার ফিবি লিচফিল্ডের মারকাটারি শতরান (৯৩ বলে ১১৯), হরমনপ্রীত কৌরের নেতৃত্বাধীন ভারতীয় দলের খেলা নিয়ে কাটাছেঁড়া হলেও কোনো কথা ছিল না। কিন্তু নিশ্চিত থাকতে পারেন, বিশ্বকাপ শেষ হয়ে যাওয়ার পর থেকে, এদেশে না হলেও বাকি ক্রিকেট দুনিয়ায় এসবের চেয়ে বেশি আলোচনা হবে মাঠের বাইরের একটা ঘটনা নিয়ে। তার কারণ গত ২৬ অক্টোবর (রবিবার) ইন্দোরে যে ঘটনা ঘটেছে, তা ক্রিকেটে কেন, কোনো খেলার আন্তর্জাতিক আঙিনাতেই বিরল। বিশ্বকাপ খেলতে এসে অস্ট্রেলিয়ার দুই মহিলা ক্রিকেটারের সেই অভিজ্ঞতা হয়েছে যা এদেশের মেয়েদের রাস্তাঘাটে প্রায় রোজই হয়। অর্থাৎ তাঁরা যৌন হয়রানির শিকার হয়েছেন। টিম হোটেল থেকে বেরিয়ে তাঁরা কাছাকাছি এক কাফেতে যাচ্ছিলেন, পথে আকিল খান নামে একজন বাইক নিয়ে তাঁদের পিছু ধাওয়া করে, এমনকি তাঁদের শরীরেও হাত দেয়।

ব্যাপারটা নিয়ে ভারতীয় সংবাদমাধ্যমে দেড় দিনের বেশি হইচই হয়নি, ফলে হয়ত অনেকেরই নজর এড়িয়ে গেছে। কেনই বা হবে? ভারতের বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে কর্মরত নিত্যযাত্রী মহিলারাই তো এমন অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হন প্রায়ই। ছাত্রীজীবন থেকে সাংবাদিক জীবনে পৌঁছতে পৌঁছতেই এটা এমন অভ্যাসে দাঁড়িয়ে যায় যে তাঁরা অফিসে বা বাড়িতে – কোথাও আর এ নিয়ে বাক্য ব্যয় করেন না। করলে বাড়িতে যার যেমন অভিজ্ঞতাই হোক, অফিসের পুরুষ সহকর্মীরা যে এটাকে কোনো ব্যাপার বলেই মনে করবেন না – একথা তাঁরা জেনে যান। অফিসের ভিতরেই তাঁদের যৌন হয়রানির ঘটনা যে ঘটে তা তো ‘মি টু’ আন্দোলনের সময়ে সংবাদমাধ্যমের বাইরের লোকেরাও জেনে গেছেন। যৌন হয়রানি প্রতিরোধের উদ্দেশ্যে তৈরি আভ্যন্তরীণ অভিযোগ কমিটিগুলো (ICC) অনেক অফিসেই হয় নিষ্ক্রিয়, নয় যারা হয়রান করে তাদেরই আখড়া। তাছাড়া আর সব পেশার মত সাংবাদিকতাতেও অধিকাংশ জায়গাতেই লাগাম তো পুরুষদের হাতে। কোনটা খবর আর কোনটা নয়, কোনটা কত বড় খবর – এসব সিদ্ধান্ত পুরুষরাই নেন। ফলে যে দিন দুয়েক অস্ট্রেলিয়ার মেয়েদের খবরটা টিভি চ্যানেল এবং খবরের কাগজে জায়গা জুড়ে ছিল, তখনো সেটা এমনকি খেলার বিভাগেরও সবচেয়ে বড় খবর হয়ে দাঁড়ায়নি। মধ্যপ্রদেশের শাসক দল বিজেপির অন্যতম পরিচিত মুখ কৈলাস বিজয়বর্গীয় যদি খাঁটি ভারতীয় কায়দায়, আক্রান্ত ক্রিকেটারদেরই এই ঘটনা থেকে শিক্ষা নেওয়া উচিত – এই মর্মে বক্তব্য না রাখতেন, তাহলে আরও কমেই নটে গাছ মুড়িয়ে যেত।

সত্যি বলতে, অস্ট্রেলিয়ার ক্রিকেটারদের সম্ভবত ভারতের মেয়েরা কীভাবে বাঁচে সে ব্যাপারে কোনো ধারণা নেই। হোটেলে আসা খবরের কাগজও তাঁরা বিশেষ পড়েন না বা ভারতীয় খবরের চ্যানেলগুলো দেখেন না। দেখলে হয়ত কৈলাসকেই শুভাকাঙ্ক্ষী বলে মনে করতেন, কারণ ওই ঘটনার ঠিক দুদিন আগে মহারাষ্ট্রের সাতারা জেলায় এক মহিলা ডাক্তার হাতের তালুতে সুইসাইড নোট লিখে আত্মহত্যা করেন। কারণ একজন পুলিশকর্মী তাঁকে পাঁচ মাস ধরে বারবার ধর্ষণ করেছেন এবং অন্য এক পুলিশকর্মী তাঁর উপর মানসিক অত্যাচার চালাচ্ছিলেন। রক্ষকই ভক্ষক কথাটার এমন প্রাঞ্জল উদাহরণ চট করে পাওয়া যায় না। কিন্তু আমাদের দেশের মেয়েরা এমন ঘটনাতেও অবাক হবেন না। কারণ তাঁরা হাথরাসের কথা জানেন, মহিলা কুস্তিগিরদের দুর্দশাও দেখেছেন। অস্ট্রেলিয় ক্রিকেটাররা অত খবর পাবেন কোথায়? ফলে নিশ্চয়ই তাঁদের মনে হয়েছিল – শহরের মাঝখানে রয়েছি, রাস্তায় লোকজনও আছে, অতএব একটু এদিক ওদিক ঘুরে আসাই যায়। ওঁরা কী করে জানবেন যে ভারতের রাস্তায় নির্জনতাই কোনো মেয়ের একমাত্র শত্রু নয়, বরং লোক বেশি থাকলে ভয় বেশি!

এ মাসের গোড়ার দিকে হায়দরাবাদ বেড়াতে গিয়ে একদিন চারমিনার দেখতে গিয়েছিলাম, সঙ্গীদের মধ্যে তিনজন লিঙ্গ পরিচয়ে নারী। একজনের বয়স ১৩, একজন চল্লিশোর্ধ্ব, আরেকজন প্রায় ৭০। সেদিন রবিবার, সন্ধে হয়ে গেছে। সামনে দেখতে পাচ্ছি চারমিনার, কিন্তু যত এগোচ্ছি সেটা যেন পিছিয়ে যাচ্ছে, কিছুতেই পৌঁছতে পারছি না। কারণ রাস্তাটায় তিলধারণের জায়গা নেই। নিজের শরীরটাকে ওই ভিড়ের মধ্যে দিয়ে দুমড়ে মুচড়ে এদিক ওদিক করে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া আক্ষরিক অর্থে রুদ্ধশ্বাস ‘অ্যাডভেঞ্চার স্পোর্ট’। সেই ভিড় পেরিয়ে যখন গন্তব্যে পৌঁছলাম, তখন সঙ্গী তিন নারী এক যোগে যে মন্তব্য করলেন তাতেই টের পাওয়া যায় ভারতের রাস্তাঘাট মেয়েদের জন্যে কেমন। বললেন ‘জীবনে এই প্রথম ভিড়ের মধ্যে কেউ অসভ্যতা করল না’।

এই অবস্থা অস্ট্রেলিয় ক্রিকেটারদের জানার কথা নয়। কিন্তু ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডও নাকি জানে না। অস্ট্রেলিয়ার দুই মহিলা ক্রিকেটার আক্রান্ত হওয়ার পর বোর্ডের অনারারি সেক্রেটারি দেবজিৎ শইকিয়া যে বিবৃতি দেন, তাতে বলা হয় ‘এটা গভীরভাবে দুঃখজনক এবং বিচ্ছিন্ন ঘটনা। ভারত চিরকাল তার সমস্ত অতিথির প্রতি উষ্ণতা, আতিথ্য ও যত্নের জন্য পরিচিত।’ বিচ্ছিন্ন ঘটনা! মধ্যপ্রদেশ ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশন, যাদের আতিথ্যে অস্ট্রেলিয়া দল ছিল, তাদের অনারারি সেক্রেটারি সুধীর আসনানির বিবৃতির একটা অংশ আরও এককাঠি সরেস – ‘এই দুর্ভাগ্যজনক ঘটনায় এটা পরীক্ষা করে দেখতেই হবে যে খেলোয়াড়রা হোটেলের বাইরে ঘোরাফেরা করার জন্যে নিরাপত্তার ব্যবস্থা করার অনুরোধ করেছিলেন, নাকি তেমন কোনো অনুরোধ ছাড়াই বেরিয়েছিলেন।’ যদিও অস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেটার্স অ্যাসোসিয়েশনের চিফ এক্সিকিউটিভ পল মার্শ অচিরেই জানিয়ে দেন, খেলোয়াড়রা নিরাপত্তা প্রোটোকল মেনেই বাইরে বেরিয়েছিলেন।

এইসব কথাও আমাদের অতি পরিচিত। বাইরে বেরোল কেন, না বেরোলেই তো ধর্ষণ হত না – একথা ভারতের কত নেতা যে কতবার বলেছেন তার ঠিক নেই। নেহাত এক্ষেত্রে ব্যাপারটা আন্তর্জাতিক, বিশ্বগুরুর সম্মানের প্রশ্ন জড়িত। তার উপর যে লোকটি এই কাণ্ড করে ধরা পড়েছে সে মুসলমান। নইলে হয়ত বলা হত – মেয়েগুলো উত্তেজক জামাকাপড় পরে বেরিয়েছিল। অথবা এমনও বলা যেতে পারত যে মেয়েগুলোই লোকটাকে উত্তেজিত করে আকর্ষণ করেছিল। মানে আগামীকাল অমনজোত কৌর বা রিচা ঘোষ এমনভাবে আক্রান্ত হলে যে কর্তারা সেরকম বলবেন না তার গ্যারান্টি কিন্তু বিশ্বকাপ জিতলেও পাওয়া যাবে না। সাক্ষী মালিক, বিনেশ ফোগতদের বেলায় আমরা দেখেছি যে দেশের জন্যে সোনার মেডেল জেতাও ভারতের মেয়েদের নিরাপত্তার বা যৌন অত্যাচারের শিকার হলে তার প্রতিকারের গ্যারান্টি নয়।

আসলে মেয়েরা বাইরে বেরোবে, নিজেদের মত করে ঘুরে বেড়াবে, ক্রিকেট খেলবে – এসব ভারতের বড় অংশের মানুষের আজও পছন্দ নয় (মানুষই লিখলাম, কারণ পিতৃতান্ত্রিক সমাজে অনেক মেয়েও ঘোর পিতৃতান্ত্রিক)। তেমন লোকেদের হাতেই এখন দেশের ভার এবং সেই সূত্রে ক্রিকেট বোর্ডের ভার। সম্ভব হলে এঁরা নতুন বন্ধু তালিবানদের মত মেয়েদের ক্রিকেট দলটা তুলেই দিতেন। কিন্তু স্বাধীনতার পরের প্রায় আট দশকে দেশটা যেখানে পৌঁছেছে সেটা তো দুম করে অস্বীকার করা যায় না, চোখের চামড়া আছে তো। সুট বুট পরা ইংরিজি জানা মৌলবাদীদের ‘মেয়েদের ক্রিকেট খেলা চলবে না’ বলতেও একটু কেমন কেমন লাগে। নইলে বিজেপির করতলগত ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের মেয়েদের ক্রিকেট সম্পর্কে অবজ্ঞা কিছু কম নয়।

প্রমাণ চান? ভারতে কোথায় কোথায় বিশ্বকাপের খেলাগুলো হল দেখুন – গৌহাটি, ইন্দোর, বিশাখাপত্তনম আর মুম্বই। কল্পনা করতে পারেন, ভারতে ছেলেদের বিশ্বকাপ হচ্ছে আর কলকাতার ইডেন উদ্যান, দিল্লির ফিরোজ শাহ কোটলা (ইদানীং অরুণ জেটলি স্টেডিয়াম), চেন্নাইয়ের চিপক বা বেঙ্গালুরুর চিন্নাস্বামী স্টেডিয়ামে একটাও খেলা নেই? ২০২৩ সালে যখন এদেশে ছেলেদের বিশ্বকাপ হল, তখন এই প্রত্যেকটা জায়গায় খেলা ছিল। মেয়েদের খেলা দেখতে এইসব বড় শহরে লোক আসবে না, তাই ছোট শহরে খেলা দেওয়া হয়েছে – এই যুক্তির কিন্তু কোনো পরিমাপযোগ্য প্রমাণ নেই। বরং বোর্ডের পক্ষ থেকে বিশ্বকাপসুলভ প্রচার না থাকা সত্ত্বেও যে চার শহরে খেলা হয়েছে, সেখানে ভারতের ম্যাচগুলোতে নিয়মিত ২৫,০০০-৩০,০০০ দর্শক হয়েছে। এর বেশি দর্শক আজকাল ছেলেদের ৫০ ওভারের ম্যাচেও প্রায়শই হয় না। এমনকি আমেদাবাদে ভারত-অস্ট্রেলিয়া টেস্ট ম্যাচ হচ্ছে, বিরাট কোহলি বহুদিন পরে শতরান করছেন, অথচ গ্যালারি খাঁ খাঁ – এই দৃশ্যও সাম্প্রতিক অতীতে দেখা গেছে। উপরন্তু ভারত ফাইনালে ওঠায় এখন ফাইনালের টিকিটের দাম বেড়ে গেছে বহুগুণ, কারণ চাহিদা বিপুল বেড়েছে।

মুম্বইতেও ঐতিহ্যশালী ওয়াংখেড়ে স্টেডিয়াম বা ব্র্যাবোর্ন স্টেডিয়ামে খেলা দেওয়া হয়নি। ডি ওয়াই পাতিল স্টেডিয়াম এমন জায়গায়, যার সম্পর্কে ২০০৮ সালে মুম্বইয়ের সাংবাদিকরা মজা করে বলতেন ‘ওটা মুম্বইয়ের চেয়ে পুনের বেশি কাছাকাছি।’ শ্রীলঙ্কায় যে খেলাগুলো ছিল তার সবকটাই কিন্তু রাজধানী কলম্বোর বিখ্যাত রণসিঙ্ঘে প্রেমদাসা স্টেডিয়ামে হয়েছে। ডাম্বুলা বা ক্যান্ডিতে নয়।

তবে মেয়েদের ক্রিকেটের প্রতি বোর্ডের অবহেলা এটুকুই নয়। বিজেপির মত বিসিসিআইয়েরও গোদি মিডিয়া আছে। তার সাংবাদিকরা সোশাল মিডিয়া বিদীর্ণ করে লিখে থাকেন, মেয়েদের ক্রিকেটের জন্যে বোর্ড কতকিছু করছে। ২০২২ সালে জয় শাহ বোর্ডের সরাসরি দায়িত্বে থাকার সময়ে ঘটা করে ঘোষণা করা হয়েছিল – এখন থেকে বোর্ডের সঙ্গে কেন্দ্রীয় চুক্তিতে আবদ্ধ ছেলে আর মেয়ে ক্রিকেটাররা সমান ম্যাচ ফি (টেস্ট পিছু ১৫ লক্ষ টাকা, একদিনের ম্যাচ পিছু ৬ লক্ষ টাকা, কুড়ি বিশের ম্যাচ পিছু ৩ লক্ষ টাকা) পাবেন। গোদি মিডিয়া ঢাকঢোল পিটিয়ে একে ঐতিহাসিক পদক্ষেপ বলেছিল। কিন্তু এর চেয়ে ন্যক্কারজনক অর্ধসত্য কমই হয়। কারণ কোহলি, রোহিত শর্মা, শুভমান গিলরা এক বছরে যত ম্যাচ খেলেন হরমনপ্রীত, জেমিমারা তার অর্ধেকেরও কম খেলেন। ২০২২ সালের উদাহরণই নেওয়া যাক। ভারতের ছেলেদের দল খেলেছিল ১১ খানা টেস্ট ম্যাচ, ২৯ খানা একদিনের ম্যাচ আর ২২ খানা কুড়ি বিশের ম্যাচ। ভারতের মেয়েরা খেলেছিলেন মাত্র দুটো টেস্ট, ২১ খানা একদিনের ম্যাচ আর ১৭ খানা কুড়ি বিশের ম্যাচ। ২০২১ সালে করোনা অতিমারীর জন্যে স্থগিত মেয়েদের একদিনের ম্যাচের বিশ্বকাপ ২০২২ সালে হয়েছিল। নইলে একদিনের ম্যাচের সংখ্যাটা আরও কম হত। মেয়েদের ক্রিকেট এভাবে চলে বলেই ২০২৩ সালে টেস্ট অভিষেক হওয়া জেমিমা এ পর্যন্ত খেলেছেন মাত্র তিনটে টেস্ট, অথচ একই বছরে টেস্ট খেলা শুরু করে যশস্বী জয়সোয়াল খেলে ফেলেছেন ২৬ খানা ম্যাচ। সমান কাজ না দিলে সমান পারিশ্রমিক দেওয়ার ঘোষণা যে বিশুদ্ধ গঞ্জিকা, তা বলাই বাহুল্য।

পৃথিবীর যে কোনো খেলায় সাফল্য অনেককিছু বদলে দেয়। এই বিশ্বকাপের ফাইনালে ওঠা বা খেতাব জিতে নেওয়া মেয়েদের ক্রিকেট সম্পর্কে বোর্ডের ভাবনাচিন্তা বদলাবে কিনা সেটা সময় বলবে। লোকের আগ্রহ নেই কথাটা কিন্তু মিথ্যে। যে হাজার হাজার দর্শক মাঠে এসেছেন তাঁরা সকলে যে মহিলা নন তা নিশ্চয়ই বলে দিতে হবে না। উপরন্তু আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিলের তথ্য বলছে, এই বিশ্বকাপের প্রথম ১১ ম্যাচেই লিনিয়ার ও ডিজিটাল রিচের সমস্ত রেকর্ড ভেঙে গেছে। বাহাত্তর মিলিয়ন দর্শকের কাছে পৌঁছেছে এই ম্যাচগুলো। গত বিশ্বকাপের চেয়ে এটা ১৬৬% বেশি। বিশেষত ৫ অক্টোবরের ভারত-পাকিস্তান ম্যাচ মেয়েদের ক্রিকেটের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি দর্শকের দেখা ম্যাচ হয়ে গেছে।

আরও পড়ুন ঝুলন সেরা বাঙালি ক্রিকেটার? মোটেই না

শেষে যে কথাটা বলব, সেটা সম্ভবত অনেক নারীবাদীরও ভালো লাগবে না। যে জেমিমার হাউ হাউ করে কান্না নিয়ে সকলে মিলে কাব্যি করা চলছে এখন, গতবছর অক্টোবরে কুৎসিতভাবে তাঁরই পিছনে লেগেছিল এদেশের সংবাদমাধ্যম থেকে শুরু করে অনেকেই। মুম্বইয়ের খার জিমখানার প্রথম মহিলা সদস্য জেমিমাকে সেই ক্লাব ছাড়তে বাধ্য করা হয়েছিল, তাঁর বাবার বিরুদ্ধে ক্লাব চত্বরে ধর্মান্তরের আসর বসানোর অভিযোগ তুলে। ধর্মপ্রাণ ইভান রডরিগসকে বিবৃতি দিয়ে জানাতে হয়েছিল – তিনি প্রার্থনা সভার আয়োজন করেছিলেন, তাও ক্লাব কর্তৃপক্ষের আপত্তিতে বন্ধ করে দেন। সেইসময় জেমিমাকে মাঠের মধ্যে এনে ধর্ষণ করা উচিত – এমন কথাও পোস্ট করা হচ্ছিল সোশাল মিডিয়ায়। নারীবাদীরা কেউ তখন টুঁ শব্দ করেছিলেন বলে জানি না। এখন করছেন, কারণ জেমিমাকে চেনা গেছে। বোধহয় স্বীকার করে নেওয়া ভাল যে, মহিলাদের ক্রিকেটের খবর নারীবাদীরাও বিশেষ রাখেন না। সেটা যে খুব দোষের তা নয়। খেলার জগতে জয় না এলে মানুষের আগ্রহ তৈরি হয় না। ঠিক যে কারণে ভারতের ছেলেদের জাতীয় ফুটবল দলের থেকে ক্রিকেট দলের খবর বেশি রাখি আমরা, নারী-পুরুষ নির্বিশেষে। যে কারণে সায়না নেহওয়াল, পি ভি সিন্ধুর সাফল্যের পর আমাদের সকলের ব্যাডমিন্টনে আগ্রহ বেড়েছে। নীরজ চোপড়ার কারণেই তো আমরা জ্যাভেলিনের খবর রাখতে শুরু করেছি।

বলার কথা এটুকুই যে খেলার মাঠে কেঁদে ফেলা অভিনব কোনো ব্যাপার নয়, পুরুষরাও কাঁদেন। ভারতীয় পুরুষরাও। স্মৃতিশক্তি নিতান্ত দুর্বল না হলে সকলেরই মনে থাকার কথা। ২০১১ বিশ্বকাপ ফাইনালের পরের ফুটেজ দেখুন, শচীনের অবসর নেওয়ার দিনের ফুটেজ দেখুন। দিয়েগো মারাদোনার সবচেয়ে জনপ্রিয় ছবিগুলোর মধ্যে পড়ে তাঁর কান্নার ছবি। সামনের বছর ফুটবল বিশ্বকাপে আবার তেমন দৃশ্য দেখতে পাবেন। কিন্তু জেমিমার কান্না মাঠে থামেনি। তিনি ম্যাচের পর সাংবাদিক সম্মেলনে গিয়েও ফোঁপাচ্ছিলেন। বলেছেন তিনি প্রবল উদ্বেগের শিকার (‘anxiety’) হয়েছেন গোটা বিশ্বকাপ জুড়ে। কেন এই উদ্বেগ, তাঁর কান্না কেবলই আনন্দাশ্রু কিনা, তা তলিয়ে ভাবার প্রয়োজন আছে। মাত্র কয়েক ঘন্টার প্রশংসার পরেই সোশাল মিডিয়ায় জেমিমার কৈশোরের ভিডিও খুঁড়ে আনা শুরু হয়ে গেছে, যেখানে তিনি খ্রিস্টানদের সভায় কিছু ধর্মীয় কথাবার্তা বলছেন। সেটা নাকি ভীষণ অপরাধ। দাঁত নখ বেরিয়ে এসেছে হিন্দুত্ববাদীদের, কারণ জেমিমা ম্যাচ জেতানো ইনিংস খেলতে পারার জন্যে বাইবেলকে, যিশুকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন। ক্রিকেট অনিশ্চয়তার খেলা। ফাইনালে জেমিমা শূন্য রানে আউট হতে পারেন, লোপ্পা ক্যাচ ফেলে দিতে পারেন। তাঁর জন্যে আমাদের গদগদ আবেগ যেন সেদিনও অক্ষত থাকে।

নাগরিক ডট নেট ওয়েবসাইটে প্রকাশিত

ইতিহাস মুছে দেওয়ার প্রকল্পের অঙ্গ পতৌদি ট্রফির নাম বদল

আর্য, অনার্য, দ্রাবিড়, চীন, শক, হুন, পাঠান, মোগলকে এক দেহে লীন করার যে ক্ষমতা ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাসেও খুব বেশি নেতা দেখাতে পারেননি; ঠিক সেটাই ছিল ‘টাইগার’ পতৌদির।

২০২২ সালে করোনা অতিমারীর চোটে স্কুল বন্ধ থাকায় ছাত্রছাত্রীদের উপর পাঠ্যক্রমের ভার কমানোর দোহাই দিয়ে যে প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল, তার অঙ্গ হিসাবে ধাপে ধাপে গত তিন বছরে ন্যাশনাল কাউন্সিল অফ এডুকেশনাল রিসার্চ অ্যান্ড ট্রেনিং (এনসিইআরটি) তাদের বিভিন্ন ক্লাসের ইতিহাস বই থেকে মোগল যুগ একেবারে বাদ দিয়ে দিয়েছে। এর ফল কী? সারা দেশের সেন্ট্রাল বোর্ড অফ সেকেন্ডারি এডুকেশনের অধীন স্কুল এবং বহু রাজ্যের বোর্ডের স্কুল এনসিইআরটি-র বই পড়ায়। সেইসব স্কুলের ছেলেমেয়েরা মোগল সম্রাটদের শাসন সম্পর্কে জানবে না, তাঁদের ভাল কাজ মন্দ কাজ জানবে না। ভারতের ধর্মীয় সমন্বয়ের ইতিহাসে মোগলদের অবদান সম্পর্কেও কিছু জানবে না। ঋজু বিদূষক বরুণ গ্রোভার সকৌতুকে বলেছেন, তাজমহল কারা বানিয়েছিল – এ প্রশ্নের উত্তর হল ‘ইউ পি পি ডব্লিউ ডি কে এক ইঞ্জিনিয়ার থে… শ্রীবাস্তব সাহব। উনহো নে বিজলি বিভাগ কা এক দফতর বনওয়ায়া থা, ইস লিয়ে মিনার হ্যাঁয়… চার সাইড পে চার মিনার হ্যাঁয়, উস সে চার ফেজ – এ বি সি ডি – নিকলতে হ্যাঁয়। আগ্রা কে চার হিসসোঁ মে বিজলি জাতি থি ইয়হাঁ সে। ১৫২৬ মে পানিপথ কি পহলি লড়াই মে ইব্রাহিম লোদী কো হরা কর ইন্ডিয়া মে শ্রীবাস্তব ডাইনেস্টি আয়ি থি। করীবন তিনসো সাল উনহো নে রাজ কিয়া, ফির ১৮৫৭ মে কুইন ভিক্টোরিয়া আঈ, শ্রীবাস্তব সাহব কো পকড়ি, মুহ দবাঈ, বোলি বিয়া হো গয়া তুমহারা? শ্রীবাস্তব সাহব কি থোড়ি ফট গঈ… বোলি কাঁপ কাহে রহে হো? শ্রীবাস্তব সাহব বোলে অচ্ছা ঠিক হ্যায়, হম নিকল লেতে হ্যাঁয়। আপ দেখ লো আপ কো জো করনা হ্যায়।’

এই কৌতুকের বাংলা তরজমা করার প্রয়োজন নেই, কারণ আজকের বাঙালি এটুকু হিন্দি জানে। কিন্তু একথা বলা এইজন্যে যে ভারতের ইতিহাস থেকে নিজেদের অপছন্দের পর্বগুলো মুছে দেওয়ার যে হাস্যকর কিন্তু ভয়ঙ্কর ফ্যাসিবাদী প্রকল্প ভারতে চালু করেছে বিজেপিচালিত কেন্দ্রীয় সরকার, তা এবার স্কুলপাঠ্য বই থেকে বেরিয়ে পৌঁছে গেছে ক্রিকেট মাঠেও। আপনি যদি বোকা বা ন্যাকা না হন, তাহলে অস্বীকার করবেন না যে বিশ্ব ক্রিকেটকে এখন নিয়ন্ত্রণ করে ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড (বিসিসিআই)। জাতীয়তাবাদী হলে তো আপনি এ নিয়ে গর্বিতই হবেন। বিসিসিআই বহুদিন ধরেই গোটা ক্রিকেট দুনিয়ার উপর ছড়ি ঘোরাচ্ছে টাকার জোরে, আর এখন তো বিশ্ব ক্রিকেটের নিয়ামক সংস্থা আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিলের (আইসিসি) সম্পাদকই হয়ে বসেছেন অমিত শাহের ছেলে জয় শাহ। ঔপনিবেশিক যুগের ইতিহাস যা-ই থাক, এখন কিন্তু ইংল্যান্ড অ্যান্ড ওয়েলস ক্রিকেট বোর্ড (ইসিবি) ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের লেজুড় ছাড়া কিছুই নয়। তাদের ঘাড়ে কটা মাথা, যে ভারতীয় বোর্ডের অনুমতি ছাড়া ট্রফির নাম বদল করবে? ইংল্যান্ডের মাটিতে অনুষ্ঠেয় ভারত-ইংল্যান্ড টেস্ট সিরিজের বিজয়ীকে দেয় ট্রফির নাম ২০০৭ সালে রাখা হয়েছিল পতৌদি ট্রফি। সে নাম বদলে ফেলা হয়েছে বেমালুম। ২০ জুন থেকে যে সিরিজ শুরু হতে যাচ্ছে, তাতে জয়ী দলকে দেওয়া হবে তেন্ডুলকর-অ্যান্ডারসন ট্রফি। এটাও ইতিহাস মুছে দেওয়ার চেষ্টা।

২০০৭ সালে কেন ট্রফির নাম রাখা হয়েছিল পতৌদি ট্রফি? কারণ সেবার ভারতীয় দলের ইংল্যান্ড সফরের ৭৫ বছর পূর্তি হল। তাকে স্মরণীয় করে রাখতেই এমন একটা নাম রাখা হয়, যে নামের সঙ্গে দুই দেশের ক্রিকেটই জড়িয়ে আছে। ইফতিকার আলি খান পতৌদি ভারত, ইংল্যান্ড – দুই দেশের হয়েই টেস্ট খেলেছেন। ভারতের অধিনায়কত্বও করেছেন। ক্রিকেটার হিসাবে সাধারণ ছিলেন, কিন্তু ক্রিকেটের ইতিহাসে তাঁর একটা কাজের অসাধারণত্ব অস্বীকার করার উপায় নেই। ১৯৩২-৩৩ সালের অ্যাশেজ সিরিজে যখন ইংল্যান্ড অধিনায়ক ডগলাস জার্ডিন বডিলাইন কৌশল (লেগ সাইডে যত বেশি সম্ভব ফিল্ডার রেখে ক্রমাগত ব্যাটারদের শরীর লক্ষ্য করে শর্টপিচ বল করে যাওয়া) অবলম্বন করেন ডন ব্র্যাডম্যানের রান আটকাতে, তখন ইফতিকার বলেন যে ওটা ক্রিকেট নয় এবং তিনি লেগ সাইডে ফিল্ডিং করবেন না। ফলে অধিনায়ক জার্ডিন তাঁকে দল থেকে বাদ দিয়ে দেন এবং কথিত আছে যে হুমকি দিয়েছিলেন, আর কোনোদিন ইফতিকার ইংল্যান্ড দলে জায়গা পাবেন না। ইফতিকার কিন্তু নিজের সিদ্ধান্ত বদল করেননি। মনে রাখা ভাল, ভারতের স্বাধীনতা তখন দূর অস্ত। ফলে আর কখনো টেস্ট খেলা হবে না – এ সম্ভাবনা জেনেই তিনি ওই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। কেউ বলতেই পারেন, ক্রিকেট ইফতিকারের পেশা ছিল না। তাঁর মত ধনীর দুলালের টেস্ট না খেললে কী-ই বা এসে যেত? তাই তিনি ওই সিদ্ধান্ত নিতে পেরেছিলেন। যুক্তিটা ভুল নয়, কিন্তু পরাধীন দেশের একজন ক্রিকেটারের শাসক জাতির অধিনায়কের বিরুদ্ধে ওই অবস্থান যে ইংরেজদেরও শ্রদ্ধা অর্জন করেছিল তার প্রমাণ আছে। ১৯৮৪ সালে ব্রিটিশ ব্রডকাস্টিং কর্পোরেশন একখানা টিভি মিনি সিরিজ নির্মাণ করে ওই বডিলাইন সিরিজ নিয়ে। সেখানে জার্ডিন আর ইফতিকারের ওই কথোপকথন দেখানো হয়েছে। নয়ের দশকে দূরদর্শনে আমরা কেউ কেউ সেই সিরিজ খানিকটা দেখেছি। আজকের তরুণরা, যাঁরা মনে করেন যা নাই ইন্টারনেটে তা নাই ভুবনে – তাঁরা এই লিংকে ক্লিক করে দৃশ্যটা দেখে নিতে পারেন।

কিন্তু ইফতিকারের চেয়ে ক্রিকেটার এবং ভারত অধিনায়ক হিসাবে অনেক বড় ছিলেন, ঐতিহাসিকভাবে অনেক মহত্তর ভূমিকা পালন করেছেন তাঁর ছেলে মনসুর আলি খান পতৌদি। তাঁরও ইংল্যান্ড, ভারত – দুই দেশের ক্রিকেটের সঙ্গেই সম্পর্ক। ভারতের হয়ে টেস্ট খেলেছেন, নেতৃত্ব দিয়েছেন আর সাসেক্স কাউন্টির হয়ে দীর্ঘদিন খেলেছেন। মনসুর মাত্র ২১ বছর বয়সে ভারত অধিনায়ক হন। তার আগেই গাড়ি দুর্ঘটনায় একটা চোখ নষ্ট হয়ে যাওয়ায় তাঁর ব্যাটিংয়ের অনেকখানি ক্ষতি হয়। ছেচল্লিশটা টেস্ট খেলে ছটা শতরান সমেত ৩৪.৯১ গড়ে ২৭৯৩ রান একজন সাধারণ ক্রিকেটারের পরিসংখ্যান। কিন্তু যাঁরা তাঁকে ব্যাট করতে দেখেছেন, তাঁরা কেউ কেউ বলেছেন, লিখেছেন যে দুটো চোখই ঠিক থাকলে তিনি হয়ত বিশ্বের সেরা ব্যাটার হতে পারতেন। সেই আমলে ফিল্ডার হিসাবেও তিনি যে অন্যদের চেয়ে অনেক এগিয়ে ছিলেন, সেকথা বহু প্রত্যক্ষদর্শীর বয়ানে পাওয়া যায়। ওসব না হয় বাদই দেওয়া গেল। এটুকুই যথেষ্ট যে মনসুর সেই অধিনায়ক যিনি ভারতকে প্রথমবার বিদেশে সিরিজ জেতান (নিউজিল্যান্ড, ১৯৬৭-৬৮)। বস্তুত ভারতীয় ক্রিকেটে তিনি বৈপ্লবিক পরিবর্তন ঘটান। বিদেশের মাঠে, যেখানে স্পিন সহায়ক পিচ হয় না, সেখানেও তিন স্পিনার খেলানোর সিদ্ধান্ত তাঁরই। সেটাই ইতিহাস বদলে দেয়। নিউজিল্যান্ডের ওই ঐতিহাসিক জয়ে সবচেয়ে বড় ভূমিকা নিয়েছিলেন অফস্পিনার এরাপল্লি প্রসন্ন, সঙ্গে ছিলেন বিষাণ সিং বেদি। প্রবাদপ্রতিম বেদি কারোর উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করার লোক ছিলেন না, কিন্তু তিনিও আজীবন বলেছেন, মনসুর তাঁদের সময়ের সেরা ক্রিকেটার। অন্যত্র তিনি বলেছেন, ভারতীয় দলের ক্রিকেটারদের মধ্যে মনসুর ভারতীয়ত্ব জাগিয়ে তোলেন।

অর্থাৎ আর্য, অনার্য, দ্রাবিড়, চীন, শক, হুন, পাঠান, মোগলকে এক দেহে লীন করার যে ক্ষমতা ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাসেও খুব বেশি নেতা দেখাতে পারেননি; ঠিক সেটাই ছিল ‘টাইগার’ পতৌদির। দুঃখের বিষয়, ভারতের সমাজের কোনো শাখাতেই সুঅভ্যাসগুলো বেশিদিন টেকে না। ফলে মনসুরের প্রস্থানের পর প্রাদেশিকতা, স্বজনপোষণ ইত্যাদি ব্যাপারগুলো ফিরে এসেছিল। একুশ শতকের শুরুতে আবার সেসব দূর করে জাতীয় দলকে যথার্থ ভারতীয় দল করে তুলতে দেখা গিয়েছিল অধিনায়ক সৌরভ গাঙ্গুলিকে। মনসুর আর সৌরভের যুগের ক্রিকেটারদের মধ্যে যোগ্যতার বিস্তর পার্থক্য ছিল। স্বভাবতই অধিনায়ক সৌরভের সাফল্য অনেক বেশি। সৌরভের পরবর্তীকালের মহেন্দ্র সিং ধোনি বা বিরাট কোহলিরা আরও বেশি সফল হয়েছেন অধিনায়ক হিসাবে। কিন্তু মনে রাখতে হবে, শিকড় ছাড়া গাছ হয় না; ইতিহাস ছাড়া মানুষ হয় না। ফলে টাইগার ছাড়া আজকের বিরাটও হয় না। কিন্তু এই সত্য স্বীকার করা আজকের ভারতীয় ক্রিকেটের নিয়ামকদের পক্ষে অসম্ভব। ভারত নামক ‘একটি বিরাট হিয়া’ জাগিয়ে তুলতে মোগল শাসকদের ভূমিকার কথা স্বীকার করা সংঘ পরিবারের পক্ষে অসম্ভব, কারণ তাহলে ‘ভারত আসলে একটি হিন্দুরাষ্ট্র’ – এই তত্ত্ব ধূলিসাৎ হয়ে যায়। ঠিক তেমনি, ভারতীয় ক্রিকেট আজ পত্রে পুষ্পে পল্লবিত হয়ে যে চেহারা নিয়েছে তার শিকড় যে একজন মুসলমান অধিনায়ক – সেকথাও স্বীকার করা চলে না। হিন্দুরাষ্ট্রের জনতার আফিম যে ক্রিকেট, তা যে আদ্যোপান্ত হিন্দুদের হাতেই তৈরি – এমনটা প্রতিষ্ঠা করতে না পারলে চলবে কেন? ইতিহাসে অন্য কিছু থাকলে তা ধুয়ে মুছে সাফ করে দিতে হবে।

টাইগার পতৌদিকে ব্যক্তি হিসাবেও অপছন্দ করার কারণ আছে সংঘ পরিবারের। তিনি বিয়ে করেছিলেন বাঙালি বামুনের মেয়ে শর্মিলা ঠাকুরকে। তাঁদের ছেলে সঈফ দুবার বিয়ে করেছেন, দুবারই বউ অমুসলমান। সংঘ পরিবারের আজকের লব্জে যাকে বলে ‘লভ জিহাদ’। টাইগার-শর্মিলার মেয়ে সোহার বর আবার কেবল হিন্দু নন, একেবারে কাশ্মীরী পণ্ডিত। কুণাল খেমুর জন্মও শ্রীনগরে। ভারতের সর্বত্র কাশ্মীরী পণ্ডিতদের দুর্দশার কথা তুলে ধরেই মুসলমানরা কত খারাপ সেকথা প্রচার করে থাকে হিন্দুত্ববাদীরা, অথচ এই পরিবারের সকলে মিলে সব ধর্মীয় গোঁড়ামির বারোটা বাজিয়ে ছেড়েছেন। শর্মিলা, অমৃতা বা করিনাকে হিজাব বা বোরখা পরে ঘুরতে দেখা যায়নি। কুণালকেও সোহার সঙ্গে বিয়ের পর দাড়ি রেখে ফেজ পরে ঘুরতে দেখা যায় না। মুসলমানদের যে যে স্টিরিওটাইপ হিন্দুদের সামনে তুলে ধরে ভয় দেখায় সংঘ পরিবার, তাকে এভাবে প্রতিনিয়ত নস্যাৎ করে চলা পরিবারের নাম কী করে জড়িয়ে থাকতে দেওয়া যায় নরেন্দ্র মোদীর ভারতের এক নম্বর জনপ্রিয় খেলার সঙ্গে? পারে না বলেই বোধহয় ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড ২০১৩ সালে চালু হওয়া বার্ষিক পতৌদি স্মারক বক্তৃতাও বন্ধ করে দিয়েছে ২০২০ সালের পর থেকে।

লক্ষণীয়, বিশেষ করে ২০১৯ সাল থেকে, এদেশের জনপরিসর থেকে ইসলাম ধর্মাবলম্বীদের উপস্থিতি মুছে দেওয়ার সযত্ন প্রচেষ্টা চলছে। বলিউডে ক্রমাগত মুসলমানবিরোধী, ইতিহাসবিকৃত, যুদ্ধবাজ ছবি বানানো হচ্ছে। উপরন্তু বলিউড শাসন করতেন যে তিন খান – তাঁদের বিরুদ্ধেও নানা শক্তি সক্রিয় হয়ে উঠেছে। শাহরুখ খানের ছেলেকে অতি সামান্য অভিযোগে হাজতবাস করানো হয়েছে, সলমন খানকে খুন করার পরিকল্পনা হয়েছে, আমির খানের ছবি মুক্তি পাওয়ার সময় এলেই দক্ষিণপন্থী আই টি সেল বয়কটের ডাক দিয়েছে। এর বাইরে মনসুর-শর্মিলার ছেলেকেও খুনের চেষ্টা হয়েছে কিছুদিন আগে।

এই দেশের ক্রিকেট ইতিহাসে তিষ্ঠোতে দেওয়া হবে পতৌদি পিতা-পুত্রকে? কক্ষনো না। বরং থাকুন বাধ্য মারাঠি ব্রাহ্মণ তেন্ডুলকর, যিনি হাসিমুখে অযোধ্যার রামমন্দিরের উদ্বোধনে গিয়েছিলেন। সঙ্গে থাকুন সর্বকালের সেরা ইংরেজ ক্রিকেটারদের একজন – জেমস অ্যান্ডারসন। তাহলে সাপও মরে, লাঠিও ভাঙে না।

আরও পড়ুন অপমানে হতে হবে মহম্মদ শামির সমান

যাঁদের এখনো ধারণা ক্রিকেট খেলা হয় শুধু মাঠের ভিতরে, এসব রাজনৈতিক প্রসঙ্গ টেনে আনা নেহাত বাচালতা (অল্পবয়সীদের ভাষায় ‘ফেসবুকের কাকুদের হ্যাজ’), তাঁরা বলবেন শচীনের মত মহান ক্রিকেটারের নামে ট্রফির নাম রাখা হলে আপত্তির কী আছে? লোকটা টেস্টের ইতিহাসে সর্বোচ্চ রান এবং শতরান করেছে। সে কি অযোগ্য? নাকি অ্যান্ডারসন অযোগ্য? তিনি তো জোরে বোলারদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি টেস্ট উইকেট নিয়েছেন (৭০৪)। আজ্ঞে না, দুজনের কেউই অযোগ্য নন। সমস্যা অন্য জায়গায়। সাধারণ গ্র্যাজুয়েট বাবা-মায়ের ছেলে যদি নোবেল পুরস্কার পেয়ে বলে ‘বাড়িটা ওঁদের নামে থাকবে কেন? আমার যোগ্যতা বেশি, বাড়ি আমার নামে করে নেব’, তাহলে কি আমরা হাততালি দেব? অবশ্য আজকের ভারতে দেব হয়ত। কারণ এই ভারতের ইতিহাস তো ২০১৪ সাল থেকে শুরু। তার আগে ভারতীয়রা নাকি খুবই লজ্জা পেতেন নিজেদের ভারতীয় হিসাবে পরিচয় দিতে। ঠিক তেমনি আমাদের ক্রিকেট ইতিহাসও শুরু করতে হবে ক্রিকেট নামক ধর্মের ভগবান শচীন থেকে।

তাই হোক, তবে তাই হোক। বরাবর কামনা করেছি, লালকৃষ্ণ আদবানি শতায়ু হোন। যাতে তাঁর রথযাত্রার চাকার নিচে গোটা দেশটার তলিয়ে যাওয়া তাঁকে দেখে যেতে হয়। এখন থেকে কামনা করব, শচীনও শতায়ু হোন। যাতে বছর দশেক পরেই তাঁকে দেখতে হয়, এই ট্রফির নাম বদলে হয়ে গেল কোহলি-রুট ট্রফি। তার বছর দশেক পরে হয়ত জয়সোয়াল-ব্রুক ট্রফি। তারপর আর টেস্ট ক্রিকেট বেঁচে থাকুক না থাকুক, শচীন আর বিরাট যেন সুস্থ শরীরে বেঁচে থাকেন। পূর্বসুরিদের অস্বীকার করার অসম্মান যেন তাঁদেরও ভোগ করতে হয়। যে দেশে ক্রিকেটপ্রেমীদের জীবনের দাম ফুটো পয়সার সমানও নয় আর ক্রিকেটাররা হয়ে গেছেন ভগবান, সেদেশে কোনো ভগবানই যে চিরায়ু নন – এই উপলব্ধি যেন তাঁদের ইহকালেই হয়।

আর দেশটার কী হবে? সেকথা বোধহয় জর্জ সান্তায়ানার এই উক্তিতে আছে ‘Those who cannot remember the past are condemned to repeat it.’ অর্থাৎ যারা ইতিহাস ভুলে যায়, তারা ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি করার অভিশাপে অভিশপ্ত।

নাগরিক ডট নেট ওয়েবসাইটে প্রকাশিত

জয় শাহের দুয়ারে হাস্যকর ট্রফি প্রকল্প

ফাইনালের মঞ্চে পুরস্কার দেওয়ার সময় আয়োজক দেশ পাকিস্তানের কাউকে দেখা গেল না কর্তাদের মধ্যে। বিশ্বের কোথাও কোনও টুর্নামেন্টে এ দৃশ্য দেখেছেন?

নহবত বসেছিল, গায়ে গোলাপ জল ছেটানোর জন্যে লোক তৈরি ছিল, হেঁশেলের দিক থেকে ভেসে আসছিল বেগুনির সুগন্ধ, বরকে অভ্যর্থনা করার জন্যে কনে কর্তা জমাটি পোশাক পরে তৈরি, কিন্তু শেষপর্যন্ত বর এসে পৌঁছল না। ফলে সব আয়োজন ভেস্তে গেল। কনে কর্তা ব্যাজার মুখ করে অতিথিদের কোনোমতে নমস্কার করে খাইয়ে দাইয়ে বাড়ি পাঠিয়ে কর্তব্য সমাধা করলেন।

এই ছিল ২০২৩ বিশ্বকাপ ফাইনালের পরের অবস্থা। ভারত জিতে গেলে গোটা দলকে নিয়ে কী বিপুল নির্বাচনী প্রচারাভিযান চালাত বিজেপি, সে পরিকল্পনা কোথাও কোথাও প্রকাশিত হয়েছিল। কংগ্রেস মুখপাত্র সুপ্রিয়া শ্রীনেত দাবি করেছিলেন, রাজস্থানের এক বিজেপি নেতা তাঁকে বলেছিলেন যে বিজেপির সমস্ত হোর্ডিংয়ে বিশ্বকাপ হাতে মোদীর ছবি দেওয়ার ব্যবস্থা তৈরি ছিল। কিন্তু সে গুড়ে বালি ছড়িয়ে দিয়েছিল প্যাট কামিন্সের বাহিনি। ২০২৪ সালের ওয়ার্ল্ড টি টোয়েন্টি অবশ্য রোহিত শর্মারা জিতেছিলেন, কিন্তু ততদিনে লোকসভা নির্বাচন মিটে গেছে। ক্রমশ বিরাট হয়ে ওঠা নরেন্দ্র মোদীকে কেটে ছেঁটে দেশের অন্য নেতাদের মাপে এনে দিয়েছেন ভোটাররা। তখন আর হইচই করে কী লাভ?

সেই শোক বুঝি এতদিনে দূর হল। বিশ্বকাপ ফাইনালের পরে মোদীর পিছনে যেরকম বেচারা ভঙ্গিতে হাঁটছিলেন তৎকালীন বিসিসিআই যুগ্ম সচিব জয় শাহ, তাতে মনে হচ্ছিল বাবার বন্ধু নরেনজেঠু প্রচণ্ড ধমকেছেন ‘একটা কাজ যদি তোকে দিয়ে হয়!’ কিন্তু তাঁর নামও জয় শাহ। তিনি পরাজয় মেনে নিয়ে চুপ করে বসে থাকার লোক নন। ইতিমধ্যে আইসিসির শীর্ষপদ দখল করে জেঠুকে এবার তিনি যে উপহার দিলেন তা একেবারে নিখুঁত।

নিজে মাঠে নেমে তো খেলতে পারেন না, কিন্তু রোহিতদের সর্বোচ্চ সুযোগসুবিধা দেওয়ার ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। ১৯৩৪ সালের ফুটবল বিশ্বকাপ ইতালিকে জেতানোর জন্যে বেনিতো মুসোলিনি কী করেছিলেন বা ১৯৭৮ সালের বিশ্বকাপ আর্জেন্টিনাকে জেতাতে সে দেশের জুন্টা সরকার কত কলকাঠি নেড়েছিল তা আজ খুব গোপন তথ্য নয়। কিন্তু সেই দুই বিশ্বকাপেও ইতালি আর আর্জেন্টিনা সে আরাম পায়নি যা এবারে রোহিতরা পেলেন।

আইসিসি চেয়ারম্যান হিসেবে ভারতের জয়ে মাঠে তাঁর উচ্ছ্বাস প্রকাশও অত্যন্ত দৃষ্টিকটু, হাসির খোরাক। ডালমিয়া, শ্রীনিবাসন, শশাঙ্ক মনোহররা অতীতে এই পদে থেকেছেন, এমন বালখিল্যসুলভ আচরণ করেননি কোনওদিন। আরও অবাক কাণ্ড, ফাইনালের মঞ্চে পুরস্কার দেওয়ার সময় আয়োজক দেশ পাকিস্তানের কাউকে দেখা গেল না কর্তাদের মধ্যে। বিশ্বের কোথাও কোনও টুর্নামেন্টে এ দৃশ্য দেখেছেন? শোয়েব আখতারের ক্ষোভ প্রকাশ স্বাভাবিক। বৈষম্য তো আরও আছে!

প্রতিযোগিতার অন্য সব দল খেলল পাকিস্তানের একাধিক মাঠে ঘুরে ঘুরে, ভারতীয় দল একেবারে অন্য দেশের একটা শহরেই পায়ের উপর পা তুলে বসে রইল। অন্য দলগুলোকে পাকিস্তান থেকে উড়ে আসতে হল, আবার ফিরে যেতে হল। এই কাণ্ড করতে গিয়ে সবচেয়ে বিরক্তিকর অবস্থা হল দক্ষিণ আফ্রিকার। ভারত কোন সেমিফাইনালে উঠবে তা জানা না থাকায় অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে তাদেরও দুবাই যেতে হল সেমিফাইনালের আগে। তারপর যখন বোঝা গেল ভারতের সঙ্গে অস্ট্রেলিয়ারই সেমিফাইনাল হবে, তখন ফেরত আসতে হল পাকিস্তানে। বিশ্রাম নেওয়ার বিশেষ সময় না পেয়েই নিউজিল্যান্ডের বিরুদ্ধে সেমিফাইনাল। সেই সেমিফাইনালে হারলেও, ৬৭ বলে অপরাজিত ১০০ রান করা ডেভিড মিলার বিরক্তি প্রকাশ করেই ফেললেন

আরও পড়ুন জয় জয় জয় জয় হে

ভারত অন্যায় সুবিধা পেয়েছে – একথা বলার সাহস ক্রিকেট দুনিয়ায় কারোর হয় না। যেমন বিশ্ব রাজনীতিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে ধমকানোর সাহস এই সেদিন পর্যন্ত কারোর হত না। কারণটা একই – সোজা কথায় টাকার গরম। আমরা আইসিসিকে সবচেয়ে বেশি ব্যবসা দিই, অতএব আইসিসির আয়ের বেশিরভাগটা আমরাই নেব – এই গা জোয়ারি যুক্তিতে ভারত, অস্ট্রেলিয়া আর ইংল্যান্ড দীর্ঘদিন হল বাকি ক্রিকেট দুনিয়াকে শুকিয়ে মারছে।

এরা যেটুকু উচ্ছিষ্ট ছুড়ে দেয় বাকিদের প্রতি, তা নিয়েই তাদের চলতে হয়। তাই কোনো বোর্ড মুখ খোলে না। বোর্ডের বারণ আছে বলে ক্রিকেটাররাও কিছু বলেন না। কিন্তু পাকিস্তানে চলল চ্যাম্পিয়নস ট্রফি আর ভারত খেলল দুবাই ট্রফি – এটা বোধহয় সহ্যের সীমা ছাড়িয়ে গেছে। তাই বোর্ডগুলো কিছু না বললেও অনেক বিদেশি সাংবাদিক ও প্রাক্তন ক্রিকেটার এবার এ নিয়ে প্রশ্ন তুলে ফেলেছেন, মিলারও মুখ খুলেছেন। সুবোধ বালক ভারতীয় মিডিয়া আর ধারাভাষ্যকাররা অবশ্য মানছেন না। তাঁরা দিল্লির প্রাক্তন বিজেপি বিধায়ক, অধুনা ভারতীয় দলের কোচ গৌতম গম্ভীরের সঙ্গে একমত। কিন্তু মহম্মদ শামি সোজা সরল লোক, তিনি মেনে নিয়েছেন যে সব ম্যাচ একই মাঠে খেলায় ভারত বিশেষ সুবিধা পেয়েছে।

বস্তুত, ক্রিকেটের অ আ ক খ জানলে এবং অন্ধ ভক্ত না হলে যে কেউ মানবেন যে সব ম্যাচ এক মাঠে খেললে সুবিধা হয়। কারণ ক্রিকেট অন্য যে কোনো খেলার চেয়ে অনেক বেশি নির্ভর করে আবহাওয়া এবং পিচের উপরে। চার স্পিনার খেলানোর জন্যে বিস্তর হাততালি কুড়োচ্ছেন গম্ভীর, রোহিত আর প্রধান নির্বাচক অজিত আগরকর। এই সিদ্ধান্ত তাঁরা নিতে পেরেছেন কারণ জানতেন, একই মাঠে ভারত সব ম্যাচ খেলবে আর সে মাঠের পিচ হবে স্পিন সহায়ক। অন্য সব দলকে কিন্তু একাধিক মাঠের পিচের কথা ভেবে দল গড়তে হয়েছিল।

একথা বললেই যা বলা হচ্ছে, তা হল – আর কী উপায় ছিল? ভারত তো পাকিস্তানে খেলতে যেতে পারত না। কারণটা রাজনৈতিক, অর্থাৎ ভারত সরকারের বারণ। কথাটা ঠিক। কিন্তু সেক্ষেত্রে ভারতের গ্রুপের সবকটা খেলাই সংযুক্ত আরব আমিরশাহীতে করা যেতে পারত, দুবাই আর শারজা মিলিয়ে। তাহলে অন্তত গ্রুপের অন্য দলগুলোও একই ধরনের পিচে একাধিক ম্যাচ খেলার সুযোগ পেত।

পাকিস্তানে খেলতে না যাওয়ার রাজনৈতিক কারণটাকেও প্রশ্ন করা দরকার। ২০০৮ সালের সন্ত্রাসবাদী হানার কথা তুলে আর কত যুগ দুই দেশের ক্রিকেটিয় সম্পর্ক অস্বাভাবিক করে রাখা হবে? মোদীর আচমকা নওয়াজ শরীফের নাতনির বিয়েতে খেতে যাওয়া, পাঠানকোটের সন্ত্রাসবাদী হানার তদন্ত করতে পাক গোয়েন্দা বিভাগকে ভারতের সেনা ছাউনিতে ঢুকতে দেওয়া – এসব তো ২০০৮ সালের অনেক পরে ঘটেছে। এমনকি গতবছর ফেব্রুয়ারি মাসে ডেভিস কাপে ভারতের টেনিস দল ইসলামাবাদে গিয়ে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে খেলে এসেছে। কেবল ক্রিকেট দল পাকিস্তানে গেলেই মহাভারত অশুদ্ধ হবে?

আজ্ঞে না, পুলওয়ামা ভুলিনি। সে ঘটনা যারা ঘটিয়েছিল তাদের শাস্তি হয়েছে? কোনো জোরদার তদন্ত হয়েছে? দাভিন্দর সিং বলে এক ভারতীয় পুলিস অফিসারকে গ্রেফতার করা হয়েছিল। তিনিও জামিন পেয়ে গেছেন ২০২০ সালে। তাহলে ক্রিকেট দলের ঘাড়ে বন্দুক রেখে জাতীয়তাবাদের নাটক করা কেন? আর সত্যিই যদি পাকিস্তান অচ্ছুত হয়, তাহলে প্রত্যেক আইসিসি প্রতিযোগিতায় ভারত আর পাকিস্তানকে এক গ্রুপে রাখাই বা কেন?

ধরা যাক, রাখা হয় না। ওটা এমনিই হয়ে যায়। তাহলেই বা ভারতীয় দল ম্যাচটা খেলে কেন? বোর্ড তো বলতে পারে – পাকিস্তানের সঙ্গে আমরা খেলব না, ওই ম্যাচের পয়েন্ট পাকিস্তানকে দিয়ে দেওয়া হোক। কেন বলে না? টিভি সম্প্রচার থেকে যে বিপুল টাকা আয় হয় তার নেশা তাহলে জাতীয়তাবাদের চেয়েও বেশি তো?

উত্তরগুলো অস্বস্তিকর। ফলে যিনি ভিন্নমত হবেন, তিনি সহজ রাস্তাটা নেবেন। বলবেন – এসব বলে ভারতের জয়কে ছোট করবেন না। ওরা পাকিস্তানে খেললেও জিতত। দুবাইতেও জিততে তো হয়েছে। আজ্ঞে হ্যাঁ, সেকথা ঠিক। তবে কথা হচ্ছে, আমাদের দেশের নির্বাচনগুলোতে যেসব দল রিগিং করে, অনেক ক্ষেত্রে রিগিং না করলেও তারাই জিতত। তাহলে কি ‘আহা! কী সুন্দর রিগিং করে!’ বলে হাততালি দিতে হবে?

উত্তরবঙ্গ সংবাদে প্রকাশিত

পাখির চোখ বাংলাদেশের হিন্দুর নিরাপত্তা, না পশ্চিমবঙ্গের হিন্দুর ভোট?

তথাগত রায়, তরুণজ্যোতি তিওয়ারি প্রমুখের সোশাল মিডিয়া হ্যান্ডেলে যেসব কথোপকথন চলে সেগুলোতে চোখ রাখুন। তাঁরা কিন্তু সজলবাবুর মতো আবেগপ্রবণ হয়ে বাংলাদেশ আক্রমণ করার কথা-টথা বলেন না। বরং বিপন্ন হিন্দুদের এ-দেশে জায়গা দেওয়ার কথা উঠলেই তাঁরা এবং তাঁদের সাঙ্গপাঙ্গরা বলতে শুরু করেন— ভারতবর্ষ ধর্মশালা নয়।

একটা দেশের সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সরকারের দায়িত্ব।

এই কথাটা বলামাত্র সেই ২০১২-১৩ সাল থেকে যেসব আত্মীয়-বন্ধু-সহপাঠী-সহকর্মী রেগে-আগুন তেলেবেগুন হয়েছেন, সম্পর্ক তুলে দিয়েছেন (বা আমিই তুলে দিয়ে বেঁচেছি), হঠাৎ সেদিন আবিষ্কার করলাম তাঁরা সকলে ঠিক ওই কথাটাই বলছেন। দেখে অ্যাইসা ফুর্তি হল যে লতা মঙ্গেশকরের মতো মিহি গলায় শতবর্ষে পা দেওয়া সলিল চৌধুরী রচিত ও সুরারোপিত ‘হঠাৎ ভীষণ ভাল লাগছে’ গানটা গাইতে শুরু করলাম। কিন্তু কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে নিজের কানই জানিয়ে দিল যে আমার গলার সঙ্গে লতার গলার তফাত বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে মহাত্মা গান্ধির মতো। ফলে চুপ করে গেলাম। ফুর্তিটাকেও কান ধরে টেনে নামিয়ে আনন্দের বেঞ্চে বসিয়ে দিলাম। একটু আনন্দ তো করাই উচিত। কারণ কবি বলেছেন— কেবল রাত্রির অবসান হলে প্রভাত হয় না। চিত্ত জাগলেও প্রভাত হয়। তা চারপাশে এত মানুষের চিত্ত জেগেছে মানে প্রভাত হয়েছে, অচিরেই প্রভাতফেরি বেরোবে, তার আওয়াজের ঠ্যালাতেই বাকি অন্ধকার দূরীভূত হবে— এরকম ভাবছিলাম আর কি। কিন্তু সে আনন্দও দিন দুয়েকের বেশি টেকানো গেল না। কেন? সে-কথাই বলব।

গোঁফ গজানোর বয়সে আমরা মাধুরী দীক্ষিত বলতে পাগল ছিলাম। যেহেতু বলিউডের হাত অনেক লম্বা, সেহেতু কেবল ভারতে নয়, গোটা উপমহাদেশেই তখন মাধুরী অধরা বলে নানা বয়সের পুরুষদের হৃদয় দাউদাউ করে জ্বলে। এতটাই, যে কাগজে পড়েছিলাম, পাকিস্তানিরা নাকি সকৌতুকে বলত ‘তোমরা মাধুরী আর শচীন তেন্ডুলকরকে দিয়ে দাও, আমরা কাশ্মিরের দাবি ছেড়ে দেব।’ তা সেই মাধুরী নেপালে এক অনুষ্ঠানে গিয়ে একখানা কেলেঙ্কারি করে বসেছিলেন। আদর-আপ্যায়নে আহ্লাদিত হয়ে বলে বসেছিলেন— নেপাল তো ভারতেই ছিল… ইত্যাদি। সে অবশ্য ১৯৯৮-৯৯ সালের কথা। তখন ভারত সরকারের সঙ্গে নেপাল সরকারের সম্পর্ক মন্দ ছিল না, ফলে নায়িকা ক্ষমা-টমা চাওয়াতেই ব্যাপারটা মিটে গিয়েছিল। মুশকিল হল, বাংলাদেশের ব্যাপারে পশ্চিমবঙ্গীয় বাঙালিরা অনেকে এখনও মাধুরী হয়ে আছেন। ১৯৪৭ সালে দেশভাগ তথা বাংলা ভাগ হয়েছে। পরে ১৯৭১ সালে পূর্ব পাকিস্তান মুক্তিযুদ্ধের মধ্যে দিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশ হয়ে গেছে। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের অনেকেই এখনও ওটাকে আলাদা দেশ বলে মেনে নিতে পারেন না। আরও সমস্যার কথা হল, যেহেতু বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পাশে দাঁড়িয়ে ভারত পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছিল, তাই আমাদের অনেকেরই ধারণা— বাংলাদেশের যে-কোনও ব্যাপারে ভারতের ছড়ি ঘোরানোর অধিকার আছে। দুটো দেশের সরকার এবং মানুষের মধ্যে আন্তর্জাতিক রীতিনীতি অনুসারে যেমন সম্পর্ক কাঙ্ক্ষিত, তার বদলে বাংলাদেশের সঙ্গে বড়দাসুলভ ব্যবহার করা উচিত— এমনটাই মনে করেন আমাদের ভাই-বেরাদররা অনেকে। ফলে যে যে-দলেরই সমর্থক হোন, বাংলাদেশে কোনও গোলমাল শুরু হলেই একযোগে আশ্চর্য সব দাবি করতে শুরু করেন এঁরা। যেমন এই মুহূর্তে কলকাতা কর্পোরেশনের বিজেপি কাউন্সিলর সজল ঘোষের মতো অনেক সিপিএম সমর্থককেও ভারতীয় সেনাবাহিনিকে দিয়ে বাংলাদেশ আক্রমণের দাবি তুলতে দেখা যাচ্ছে।

এমনিতে সজলবাবুকে যত গুরুত্ব পশ্চিমবঙ্গের সংবাদমাধ্যম দেয় তত গুরুত্ব তাঁর নিজের দলের নেতা অমিত শাহও দেন না। দিলে সজলবাবুর আপ্রাণ চেষ্টা সত্ত্বেও কলকাতায় এসে আরজিকর-কাণ্ডে মৃতার বাবা-মায়ের সঙ্গে দেখা না করেই চলে যেতেন না। সুতরাং সজলবাবুর ওই চ্যানেল গরম করা মন্তব্যে যে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শাহ, বিদেশমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর, প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং বা প্রধানমন্ত্রী মোদি কানই দেবেন না তা বলাই বাহুল্য। কিন্তু দলমতনির্বিশেষে বাঙালিরা যে এই দাবিকে ন্যায্য বলে মনে করছেন— তা যথেষ্ট উদ্বেগজনক। একে তো অন্য একটা দেশ সম্পর্কে এত প্রবল অধিকারবোধ মনের মধ্যে পুষে রেখেছে কয়েক লক্ষ লোক— এই ব্যাপারটাই ভয়ঙ্কর। তার উপর দেখা যাচ্ছে বাম দলগুলোর সমর্থকরাও দাবি করছেন— এখানকার বামপন্থীদের বাংলাদেশের হিন্দুদের জন্যে পথে নামতে হবে, তৃণমূল সমর্থকরা দাবি করছেন তাঁদের দলকেও পথে নামতে হবে। অবশ্য বামেরা যেহেতু ক্ষমতায় নেই, সেহেতু তাঁরা যেমন প্যালেস্তাইনের মানুষের উপর ইজরায়েলি গণহত্যার বিরুদ্ধে মিছিল করেন তেমন বাংলাদেশে হিন্দুদের উপর আক্রমণের বিরুদ্ধেও মিছিল করা যেতে পারে (যদিও এখন পর্যন্ত প্যালেস্তাইনে ইজরায়েল যা চালাচ্ছে তার সঙ্গে বাংলাদেশের পরিস্থিতির পরিমাণগত বা গুণগত কোনও মিল নেই), তবে দুই মিছিলেরই গুরুত্ব প্রতীকী। কিন্তু বাংলাদেশের ঘটনা নিয়ে পশ্চিমবঙ্গের শাসক দলকে পথে নামতে হবে— এ আবার কী আবদার? যে-কোনও দলের সরকারকেই ভারতের সংবিধান মেনে চলতে হয় আর সংবিধান অনুসারে বিদেশনীতি কেন্দ্রীয় সরকারের কাজের তালিকাভুক্ত। নেহাত বাংলাদেশ প্রায় এক শতাব্দী আগে একই প্রদেশ ছিল এবং দুই জায়গার ভাষা অভিন্ন, দুইপারে রক্তের সম্পর্কে জড়িয়ে থাকা বহু পরিবার রয়েছে, তাই পশ্চিমবঙ্গ সরকার সম্পূর্ণ উদাসীন থাকতে পারে না। সেই কারণে মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি একখানা বিবৃতি দিয়েছেন। কিন্তু তিনি পথে নামতে যাবেন কেন? সত্যিই তো এ-ব্যাপারে কেন্দ্রীয় সরকার যা সিদ্ধান্ত নেবে তা মেনে নিতে তিনি বাধ্য। অথচ এই দাবি কেবল আইনকানুনের ধারণাবিহীন সাধারণ মানুষ সোশাল মিডিয়ায় তুলছেন তা নয়। এবিপি আনন্দের মতো জনপ্রিয় চ্যানেলে বসে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক বিশ্বনাথ চক্রবর্তীও এই কিম্ভূত দাবি তুলে ফেলেছেন।

নিজের এক্তিয়ারের বাইরে গিয়ে কেন এমন কাজ করতে হবে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রীকে? রাজনৈতিক বিশ্লেষক বিশ্বনাথবাবুর দর্শানো কারণটি চিত্তাকর্ষক। এতে নাকি মহম্মদ ইউনুসের সরকারের উপরে চাপ তৈরি হবে এবং বাংলাদেশের ধর্মনিরপেক্ষ মানুষজন বুকে বল পাবেন। বাংলাদেশ যত ছোট রাষ্ট্রই হোক, পশ্চিমবঙ্গের মতো একটা অঙ্গরাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী নিজের রাজ্যে বাংলাদেশের বিষয় নিয়ে মিছিল করেছেন বলে চাপে পড়বে কেন? বিশেষত ভারত সমেত পৃথিবীর কোনও বড় রাষ্ট্রই যখন এই তদারকি সরকারকে স্বীকৃতি না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়নি? আর বাংলাদেশের ধর্মনিরপেক্ষ মানুষজনই বা মমতার মিছিলে আলাদা করে সাহস কেন পাবেন? ইসলামিক মৌলবাদীরা তাঁদের আক্রমণ করলে কি মমতার পুলিশ বা অনুব্রত মণ্ডলের ঢাক তাঁদের বাঁচাতে যাবে? নাকি কেন্দ্রীয় সরকারকে না জানিয়ে, মমতা নিজের সিদ্ধান্তে তাঁদের কাউকে পশ্চিমবঙ্গে আশ্রয় দিতে পারবেন?

কিমাশ্চর্যম অতঃপরম! মমতা এই হাস্যকর দাবি মেনে নিয়ে পথে নামলেন না বটে, আরও এককাঠি সরেস কাজ করলেন। দাবি করে বসলেন যে সম্মিলিত জাতিপুঞ্জকে বাংলাদেশে শান্তিরক্ষা বাহিনি পাঠাতে হবে। তাঁর সঙ্গে প্রায় হুবহু মিলে গেল পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার বিরোধী দলনেতা এবং মমতার একদা-স্নেহভাজন শুভেন্দু অধিকারীর বয়ান ‘রাষ্ট্রপুঞ্জের কাছে আবেদন করছি, বাংলাদেশে হিন্দুদের অস্তিত্ব বাঁচানোর জন্য হস্তক্ষেপ করুক’।

বাংলাদেশে গত কয়েকদিনের নতুন অশান্তিতে ঠিক কত মানুষ নিহত, কটা পরিবার বাস্তুহারা, কোনও নারীনির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে কিনা— এসবের কোনও সুনির্দিষ্ট তথ্য কিন্তু ভারতের সংবাদমাধ্যম আমাদের জানাতে পারেনি। সজলবাবু, বিশ্বনাথবাবু, শুভেন্দুবাবু বা আমাদের মুখ্যমন্ত্রীও জানাননি। অথচ ক্রমাগত এরকম আক্রমণাত্মক মন্তব্য বেড়েই চলেছে। এসবের একটাই ফল— বাংলাদেশ নিয়ে পশ্চিমবঙ্গে উত্তেজনা বৃদ্ধি এবং তার ফলে সাম্প্রদায়িক উন্মাদনা তৈরি হওয়া। যেহেতু বাংলাদেশে শেখ হাসিনার অপসারণের পর থেকেই হিন্দুরা আক্রান্ত হচ্ছেন বলে খবরে প্রকাশ, তাই পশ্চিমবঙ্গের হিন্দু বাঙালি এখন বাংলাদেশ বলতেই মুসলমান ভাবছেন। জুলাই অভ্যুত্থানের সময় থেকেই দেখা যাচ্ছিল, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের মতোই এবারেও যে লড়াইয়ে লিপ্ত শক্তিগুলো সমসত্ত্ব নয় তা মেনে নিতে পশ্চিমবঙ্গের ভদ্রলোকদের ঘোর আপত্তি। ছাত্রনেতাদের মধ্যে হিন্দু নামগুলোর উপস্থিতিকে তাঁরা অগ্রাহ্য করে যাচ্ছেন, তাতে ধুয়ো দিয়ে যাচ্ছে পশ্চিমবঙ্গ তথা ভারতের মূলধারার সংবাদমাধ্যম। যখন বাংলাদেশের রাস্তায় সোজা বুকে গুলি চালিয়ে মানুষ মারছিল হাসিনার পুলিশ, তখনও হাসিনা না থাকলে বাংলাদেশের কী হবে তার আলোচনায় পশ্চিমবঙ্গের সংবাদমাধ্যম ব্যবহার করে যাচ্ছিল— ‘বাংলাদেশ আফগানিস্তান হওয়ার দিকে এগোচ্ছে’, ‘বাংলাদেশে তালিবানি শাসন প্রতিষ্ঠা হতে চলেছে’ ইত্যাদি শব্দবন্ধ।

পৃথিবীর ইতিহাসে বিদ্রোহ, তারপর নৈরাজ্য এবং অত্যাচারী শাসনের অজস্র উদাহরণ আছে। যেমন বলা যেতেই পারত বাংলাদেশ রোবসপিয়রের গিলোটিনের ফ্রান্স হওয়ার দিকে এগোচ্ছে। তুলনায় সাম্প্রতিক উদাহরণ দিতে চাইলে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাওয়ার পরে পূর্ব ইউরোপের দেশগুলোর কথা বলা যেত। আরও সাম্প্রতিক উদাহরণ দেওয়ার ইচ্ছে থাকলে গৃহযুদ্ধোত্তর সিরিয়া হওয়ার দিকে এগোচ্ছে বললেও চলত। তেমন কিছু না বলে আফগানিস্তান এবং তালিবানের কথা বলার উদ্দেশ্য পরিষ্কার— মাথায় ফেজ পরা, গালে লম্বা দাড়িওয়ালা মুসলমানের ছবি তুলে ধরে আতঙ্ক ছড়ানো, যার সঙ্গে অপরিহার্যভাবে এসে পড়বে বোরখা পরা মহিলাদের ছবি। হিন্দুত্ববাদীরা মুসলমানের ঠিক যে স্টিরিওটাইপ হিন্দুদের গেলাতে চায়। অথচ তদারকি সরকারের প্রধান মহম্মদ ইউনুস কিন্তু কামানো গালের, মাথায় ফেজ না-পরা পুরুষ। তাঁর সরকারের গুরুত্বপূর্ণ সদস্যদের একজন হলেন সাঈদা রিজওয়ানা হাসান, যিনি ২৯ নভেম্বর সাংবাদিক সম্মেলনে জানিয়েছেন যে গ্রেফতার হওয়া সন্ন্যাসী চিন্ময়কৃষ্ণ দাসের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের তদন্ত হবে, কিন্তু তার জন্যে ইস্কনকে বাংলাদেশে নিষিদ্ধ করার কোনও ভাবনা তদারকি সরকারের নেই। রিজওয়ানা বোরখা পরেন না, এমনকি হিজাবও নয়।

নিয়মিত নির্বাচন হচ্ছে মানেই যে একটা দেশ গণতান্ত্রিক পথে আছে তা নয়— এ-কথা বুঝতে আজকের ভারতীয়দের অন্তত কোনও অসুবিধা হওয়ার কথা নয়। দেশদ্রোহবিরোধী আইনের দোহাই দিয়ে উমর খালিদ, শার্জিল ইমাম-সহ আরও বহু মানুষকে বিনা বিচারে বন্দি করে রাখার কাজ এ-দেশের ভোটে জিতে আসা সরকারই করে চলেছে দশ বছর ধরে। রাস্তায় নেমে প্রতিবাদ করলে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ঘরবাড়ি, দোকানপাট বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়ার কাজও করছে বিভিন্ন রাজ্যের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় নির্বাচিত সরকারগুলোই। কোনও আইনকানুনের তোয়াক্কা না করে, এমনকি সুপ্রিম কোর্টের নিষেধকেও বুড়ো আঙুল দেখিয়ে জঘন্য পলাতক অপরাধীদের মতো করে প্রতিবাদীদের ছবি দেওয়ালে দেওয়ালে সেঁটে দেওয়ার কাজ করছে ভোটে জিতে ক্ষমতায় আসা উত্তরপ্রদেশের আদিত্যনাথ সরকার। গত দশ বছরে কতজন সংখ্যালঘুকে গোমাংস খাওয়ার, বিক্রি করার বা স্রেফ বহন করার ‘অপরাধে’ মেরে ফেলা হয়েছে এবং রাষ্ট্র হত্যাকারীদের শাস্তি দেওয়ার বদলে মদত দিয়েছে, তার তালিকা চিনের প্রাচীরের মতো লম্বা হবে। কদিন হল মুসলমানদের উত্যক্ত করার নতুন কায়দা চালু হয়েছে। যে-কোনও মসজিদের নিচেই মন্দির ছিল কিনা মাটি খুঁড়ে দেখার দাবিতে আদালতে মামলা ঠুকে দিচ্ছে হিন্দুত্ববাদীরা, আর আদালত পত্রপাঠ খোঁড়ার নির্দেশও দিয়ে দিচ্ছে। অথচ দেশে স্পষ্ট আইন আছে— ১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট দেশের যেখানে যে ধর্মস্থান ছিল সেগুলোর চরিত্র পরিবর্তন করা যাবে না। সে আইনের তোয়াক্কা করছে না এমনকি নিম্ন আদালতগুলোও। এই বেমক্কা রায়ের জেরে হিংসা ছড়িয়ে উত্তরপ্রদেশের সম্ভলে ইতিমধ্যেই কিছু মানুষের প্রাণ গেছে। এখন এমনকি প্রাচীন আজমের শরীফ নিয়েও তেমন একটা মামলা ঠোকা হয়েছে। এমন রায় দেওয়ার পথ কিন্তু খুলে দিয়ে গেছেন সুপ্রিম কোর্টের প্রাক্তন প্রধান বিচারপতি ডিওয়াই চন্দ্রচূড়, জ্ঞানবাপী মসজিদে মাটি খুঁড়ে সার্ভে করার অনুমতি দিয়ে। কিন্তু এতে কি প্রমাণ হয় যে ভারতের অধিকাংশ মানুষ, এমনকি অধিকাংশ হিন্দু ভারতীয়, সাম্প্রদায়িক? একেবারেই না।

হাসিনার আমলেও বাংলাদেশে হিন্দু হত্যা ঘটেছে। আর সব ভুলে গিয়ে থাকলেও ব্লগার অভিজিৎ রায়ের খুনের কথা আশা করি এপারের হিন্দু বা মুসলমান কোনও বাঙালিই ভোলেননি। সেইসময় হিন্দুদের পুজোআচ্চায় আক্রমণ হয়েছে, সম্পত্তি দখল করে নেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। সুতরাং ভোট হত আর হাসিনা জিততেন মানেই বাংলাদেশ দারুণ গণতান্ত্রিক ছিল— এ-কথা বলার কোনও মানে নেই। আবার সেই আমলে বা এই আমলে বাংলাদেশে হিন্দুদের উপর আক্রমণও প্রমাণ করে না যে অধিকাংশ বাংলাদেশি, এমনকি অধিকাংশ মুসলমান বাংলাদেশি, সাম্প্রদায়িক।

কিন্তু সোশাল মিডিয়া আর ভারতের মিডিয়ার কল্যাণে ঠিক উল্টো ছবিটাই গাঢ় রঙে আঁকা হয়ে গেছে পশ্চিমবঙ্গের সংখ্যাগুরু সম্প্রদায়ের বাঙালির মনে। তাই ‘একটা দেশের সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সরকারের দায়িত্ব’— এই কথাটা তাঁরা আজ যখন বলছেন, তখন বলছেন বাংলাদেশের দিকে মুখ করে। নিজের দেশের দিকে না-তাকিয়ে। তাই আমার আনন্দ টিকল না। দেখলাম বিজেপি সমর্থকরা তো বটেই, সিপিএম সমর্থকরাও গোটা উপমহাদেশে সংখ্যাগুরুবাদের প্রসারের নিন্দা করে পার্টির রাজ্য সম্পাদক মহম্মদ সেলিমের বিবৃতিতে অসন্তুষ্টি প্রকাশ করছেন। বলছেন, এসব চালাকি। বাংলাদেশের ঘটনার নিন্দা করতে গেলেই সঙ্গে এ-দেশের সংখ্যালঘুদের উপর যে আক্রমণ হচ্ছে তার কথা কেন বলতে হবে? গোদা বাংলায় তাঁদের মত হল— বাংলাদেশের সংখ্যালঘু হিন্দুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সে-দেশের সরকারের দায়িত্ব, কিন্তু এ-দেশের সংখ্যালঘু মুসলমানদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এ-দেশের সরকারের দায়িত্ব নয়।

এই তো সেদিন এ-রাজ্যের মহিলারা রাত দখল করলেন, ধর্ষকের মৃত্যুদণ্ডের দাবিতে রাস্তায় নামলেন মহিলা মুখ্যমন্ত্রীও, পরে নতুন আইনও পাশ করালেন বিধানসভায়। আন্দোলনকারীদের অনেকেরই বক্তব্য ছিল আরজিকর-কাণ্ডে দোষী একজন নয়, অনেকে। তাদের সকলের শাস্তি চাই। তা নিয়েও টানা আন্দোলন হল। অথচ আজ চিন্ময়কৃষ্ণের বিরুদ্ধে যে শিশুদের যৌন নিপীড়নের অভিযোগ আছে, সে-অভিযোগে তাঁর উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে তাঁর নিজেরই সংগঠন— তা নিয়ে আলোচনা করতে দেখছি না এমনকি মহিলাদেরও। উনি অবশ্য সেই অভিযোগে গ্রেফতার হননি। কী অভিযোগে গ্রেফতার হয়েছেন? তা নিয়েও পশ্চিমবঙ্গের মিডিয়ায় বা সোশাল মিডিয়ায় বিশেষ আলোচনা নেই। অর্থাৎ হয় এখানকার মানুষ জানার প্রয়োজন বোধ করেন না, নয়তো নিঃসংশয়ে জানেন ব্যাপারটা স্রেফ রাষ্ট্রের বদমাইশি। সেটা হওয়া অবশ্যই অসম্ভব নয়। কিন্তু একইরকম অভিযোগে উমর, শার্জিলের জামিনের তো শুনানিই হয় না এ-দেশে। তা নিয়ে কারও এত মাথাব্যথা নেই তো?

সব মিলিয়ে যা বুঝলাম, ‘হঠাৎ ভীষণ ভাল লাগছে’ গানটা আমার নয়, শুভেন্দুবাবুর গাওয়া উচিত। কারণ রাজ্য বিজেপি যতই অন্তর্দ্বন্দ্বে নাজেহাল হোক, যতই লোকসভা নির্বাচনে বা উপনির্বাচনে ভোট কমুক, দেশজুড়ে মোদি-ম্যাজিক যতই ফিকে হয়ে যাক, ঘৃণার জমি এমন চমৎকার চষা হয়ে গেছে পশ্চিমবঙ্গে যে, সঙ্ঘ পরিবারের ফসল তোলা স্রেফ সময়ের অপেক্ষা। সে-ফসল ২০২৬ সালে তোলা হবে, নাকি আরও পরে— সে আলাদা কথা। নিজের মালিকানাধীন হাসপাতালে বাংলাদেশি রোগীদের চিকিৎসা বন্ধ করার ঘোষণা করে সজলবাবু আপ্রাণ চেষ্টা করছেন ২০২৬ সালেই ফসল তুলতে। অনেক ডাক্তারও সগর্বে সোশাল মিডিয়ায় ঘোষণা করছেন বাংলাদেশি রোগী দেখবেন না। বহু ঘোষিত বিজেপিবিরোধীও এই সিদ্ধান্তকে বাহবা দিচ্ছেন। কেন? না দেখা গেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভারতের পতাকার অবমাননা করা হয়েছে। ক-জন ওই কাজে লিপ্ত আর তাদের অপকর্মের দায় সমস্ত বাংলাদেশির ঘাড়ে চাপবে কেন— এই যুক্তিতর্কের পরিবেশই আর পশ্চিমবঙ্গে নেই। এ-তথ্যও প্রচারিত হচ্ছে না যে ২৮ নভেম্বরই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সংশ্লিষ্ট হলের প্রভোস্ট ‘অতীব জরুরি বিজ্ঞপ্তি’ জারি করে শিক্ষার্থীদের ওই কাজ করা থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দিয়েছেন।

যে রাজনৈতিক বিশ্লেষক বাংলাদেশের ধর্মনিরপেক্ষ মানুষকে সাহস দেওয়ার জন্যে মমতাকে মাঠে নামতে হবে বলেছেন, তিনি এই রাজ্যে এমন অমানবিক এবং ডাক্তারি নীতিবোধবিরোধী পদক্ষেপের বিরুদ্ধে মমতাকে মুখ খুলতে হবে বলে দাবি করেছেন বলে শুনিনি। রাজ্যের প্রশাসনিক প্রধান হিসাবে মমতা নিজে থেকেও বলতে পারতেন— এ-জিনিস এখানে করতে দেওয়া হবে না, করলে ওই হাসপাতালের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বলেছেন কি? তাঁর দলের নেতা ফিরহাদ হাকিম তবু বলেছেন যে এই সিদ্ধান্ত সমর্থনযোগ্য নয়। কিন্তু ফিরহাদ নিজে মুসলমান হওয়ায় যথারীতি তাঁর বক্তব্যকে বাংলাদেশের সংখ্যাগুরুর প্রতি দরদ বলে দেখা হচ্ছে। সোশাল মিডিয়ায় গালিগালাজ করা হচ্ছে।

এসব থেকে একটা জিনিস পরিষ্কার। আমাদের রাজ্যে হিন্দুত্ববাদকে আটকাতে তৃণমূল কংগ্রেসের যাবতীয় কুকর্ম সত্ত্বেও তাদের ভোট দেওয়াই যে শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষের কর্তব্য— এ-কথা যে-যুক্তিতে ২০১৯ সাল থেকে বলা হয়ে আসছে, সেই যুক্তিটাকে আর বিশ্বাস করার মানে হয় না। বিজেপি এ-রাজ্যে ক্ষমতায় আসেনি ঠিকই, কিন্তু তাতে সমাজে সঙ্ঘবাদের প্রসারে কোনও বাধা সৃষ্টি হয়নি। সঙ্ঘ একই মডেলে সর্বত্র লড়ে না। পশ্চিমবঙ্গে সম্ভবত ওড়িশা মডেল অনুসরণ করা হচ্ছে।

ওড়িশায় কংগ্রেস থেকে বেরিয়ে এসে তৈরি হওয়া বিজু জনতা দলের নেতা নবীন পট্টনায়ক কংগ্রেসকে শেষ করে বিজেপিকেই তাঁর একমাত্র বিকল্প করে তুলেছিলেন। জাতীয় রাজনীতির ইস্যুগুলোতে তিনি বিজেপিকে ঘাঁটাননি। তৃণমূল সাংসদদের মতোই নবীনের দলের সাংসদরাও বহু বিলে ভোটাভুটির সময়ে হয় ভোট দিতেন না, অথবা সরকারের পক্ষে ভোট দিতেন। ওড়িশায় বিজেপিও তাঁর দলকে হারাতে গা লাগায়নি বহুকাল, কেবল নিচুতলায় আরএসএস নিবিড় কাজ চালিয়ে গেছে। শেষমেশ ২০২৪ সালে এসে নবীনের রথ উল্টে দেওয়া হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গে কংগ্রেস তো বটেই, তার চেয়েও বড় কথা, কমিউনিস্টদের শেষ করার কাজ প্রায় শেষ করে এনেছে কংগ্রেস থেকে বেরিয়ে এসে তৈরি হওয়া তৃণমূল কংগ্রেস। নিচুতলায় আরএসএসের বাড়বাড়ন্ত ঠেকাতেও তারা কোনও ভূমিকা নিয়েছে বলে অভিযোগ নেই। এখন বাংলাদেশে হিন্দুদের উপর অত্যাচার পশ্চিমবঙ্গে আরএসএস-বিজেপির কাজ আরও সহজ করে দেবে। তারপর কবে মমতার রথ উলটানো হবে, কীভাবে হবে— সেসব সিদ্ধান্ত বোধহয় দিল্লি থেকে নেওয়া হবে।

আরো পড়ুন জাতীয় সঙ্গীত এবং নেশন: ইরান যা ভাবায়

তা শুভেন্দুবাবুরা গান-টান করুন, কেবল হিন্দুদের উদ্দেশে একটা কথা বলে যাই। বিজেপি বা সঙ্ঘ পরিবারের আসল লক্ষ্য যে পশ্চিমবঙ্গের হিন্দুদের ভোট পাওয়া, বাংলাদেশের হিন্দুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা নয়— তা বুঝতে খুব বেশি কষ্ট করার দরকার নেই। তথাগত রায়, তরুণজ্যোতি তিওয়ারি প্রমুখের সোশাল মিডিয়া হ্যান্ডেলে যেসব কথোপকথন চলে সেগুলোতে চোখ রাখলেই বোঝা যায়। তাঁরা কিন্তু সজলবাবুর মতো আবেগপ্রবণ হয়ে বাংলাদেশ আক্রমণ করার কথা-টথা বলেন না। বরং বিপন্ন হিন্দুদের এ-দেশে জায়গা দেওয়ার কথা উঠলেই তাঁরা এবং তাঁদের সাঙ্গপাঙ্গরা বলতে শুরু করেন— ভারতবর্ষ ধর্মশালা নয়। বাংলাদেশি হিন্দুদের প্রতি সত্যিই টান থাকলে এই উপমহাদেশের মুসলমান বাদে অন্য ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের নাগরিকত্ব দেওয়ার জন্য যে আইন তথাগতবাবুদের সরকার তৈরি করেছে, তাতে নির্দিষ্ট এ-দেশে আসার শেষ তারিখটা তুলে দিলেই তো হত। ৩১ ডিসেম্বর ২০১৪-র পরে বিপদে পড়া হিন্দুরা কি যথেষ্ট হিন্দু নন? আজ বাংলাদেশে যে হিন্দুরা বিপন্ন, তাঁদের জন্য তাহলে বিজেপির ভারতে কোনও জায়গা নেই? তাঁরা কেবল এ-দেশের মুসলমানদের বিরুদ্ধে ঘৃণা উৎপাদন করার খেলায় ব্যবহৃত বোড়ে?

চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম ওয়েবসাইটে প্রকাশিত

জয় জয় জয় জয় হে

ডেমোক্রেসিতে গভমেন্টই সকলের মাইবাপ। কিন্তু কজনের বাপই গভমেন্ট হয়? যাদের হয় তারা এতকাল হাতে মাথা কেটে এসেছে, আর এখন একজন একটু সব ছবিতে থাকতে চেয়েছে বলে আপনারা তাকে ট্রোল করছেন! এমনি এমনি তো আর সাহেবরা বলেনি যে ভারত পরশ্রীকাতর লোকেদের দেশ। কোথায় বলেছে সেকথা জিজ্ঞেস করবেন না। একবার যখন লিখেছি সাহেবরা বলেছে, তখন অবশ্যই বলেছে। না বলে থাকলেও আপনাদের কীর্তিকলাপ দেখে শিগগির বলবে। সোশাল মিডিয়া হয়ে এই হয়েছে ঝামেলা। সকলেরই হাতে একখানা ফোন আছে, ফলে কারোর কোনো ণত্ব ষত্ব জ্ঞান নেই। যার যা সম্মান তাকে যে সেটা দিতে হয়, সেই বোধ নেই। যিনি এত বড় বোর্ডটাকে কাঁধে করে টেনে নিয়ে যাচ্ছেন, তিনি একটু বিশ্বকাপে হাত দিয়েছেন বলে সকলে যা খুশি তাই পোস্ট করে চলেছে। অবশ্য এ দেশের লোকের ধর্মই তো এই। যে দেশে প্রধানমন্ত্রীকেই লোকে সম্মান দেয় না, মিম বানায়; সে দেশে ক্রিকেট বোর্ডের প্রেসিডেন্টকে আর কে সম্মান দেবে?

অ্যাঁ, কী বলছেন? জয় শাহ প্রেসিডেন্ট নন, সেক্রেটারি? প্রেসিডেন্ট কে তাহলে? রজার বিনি? আরে ওসব বিনি পয়সার লোককে অত পাত্তা দেওয়ার কী আছে? তাছাড়া তেনাকে তো দেখাও যায় না চট করে, কথা-টথাও শোনা যায় না। ক্রিকেট কি যক্ষপুরী নাকি, যে রজারকে রক্তকরবীর রাজা বলে মেনে নিতে হবে? ওসব ছাড়ুন। মানিব্যাগ যার কাছে, সে-ই হল আসল রাজা। আজ দেশের ক্রিকেট চালাচ্ছেন, এশিয়ার ক্রিকেট চালাচ্ছেন, অন্যদের ঘাড় ধরে দুনিয়ার ক্রিকেটও নিজের মর্জি মত চালিয়ে নিচ্ছেন। কাল হয়ত বসেই পড়বেন আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিলের চেয়ারম্যানের চেয়ারে। যে দেশে কানার নাম হয় পদ্মলোচন, সে দেশে বিশ্বকাপে জয় পাওয়া এবং বিশ্বক্রিকেটের শাহ হতে চলা লোককে এত লোক গাল দিচ্ছে দেখলে মানুষটার প্রতি মায়া হয়। মানুষটার কতখানি মায়া দয়া সে খবর আপনারা রাখেন? এই যে হারিকেন বেরিলে আপনাদের প্রিয় ক্রিকেটাররা ওয়েস্ট ইন্ডিজে আটকে পড়েছিলেন, চার্টার্ড ফ্লাইট পাঠিয়ে তাঁদের উড়িয়ে আনল কে? ওই শর্মা, থুড়ি শাহই তো। শুধু কি তাই? ক্রিকেটাররা কে কোথায় কার সঙ্গে কানাকানি করলেন, কার সঙ্গে চুপিচুপি দেখা করলেন, ডিনার খেতে গেলেন, খেয়ে হোটেলে নিজের ঘরে গেলেন নাকি তার ঘরে গেলেন – এসব জরুরি ইনফর্মেশন আপনাদের ফোনে পৌঁছে দেন যে ধুরন্ধর জার্নালিস্টরা, তাঁদের পর্যন্ত উড়িয়ে এনেছেন বিসিসিআই সেক্রেটারি জয়। এমন লোকের নামে জয়ধ্বনি না দিয়ে তাকে নিয়ে চালাক চালাক জোক ক্র্যাক করা! এসব ধম্মে সইবে? নেহাত লোকটা বায়োলজিকাল, তাই অভিশাপ-টাপ দিতে পারে না। তা বলে লোকটাকে নাহক ছোট করবে দেশসুদ্ধ ক্রিকেটপ্রেমী মিলে?

বলা হচ্ছে যশপ্রীত বুমরার হাত থেকে নাকি কোনো এক দুর্বল মুহূর্তে জয় কাপটা ছিনিয়ে নিয়েছিলেন রোহিত শর্মার সঙ্গে ছবি তুলবেন বলে।

কী এমন মহাভারত অশুদ্ধ হয়েছে তাতে? বছর বছর আইপিএলের ম্যাচ বাড়িয়ে খেলোয়াড়দের আরও ধনী করার ব্যবস্থা করছেন, ফি বছর আইসিসি টুর্নামেন্টের বন্দোবস্ত করেছেন (২০১৯ – ৫০ ওভারের বিশ্বকাপ, ২০২১ – বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপ ফাইনাল আর ২০ ওভারের বিশ্বকাপ, ২০২২ – আবার ২০ ওভারের বিশ্বকাপ, ২০২৩ – বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপ ফাইনাল আর ৫০ ওভারের বিশ্বকাপ, ২০২৪ – আরও একবার ২০ ওভারের বিশ্বকাপ, ২০২৫ – চ্যাম্পিয়নস ট্রফি আর বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপ ফাইনাল) যাতে ক্রিকেটাররা বড় ট্রফি জেতার অনেক সুযোগ পান, বৃষ্টির সম্ভাবনা থাকলে অন্য সেমিফাইনালে রিজার্ভ ডে রেখে ভারতের ম্যাচে না রাখার ব্যবস্থা করেছেন, গতবছর দেশের মাঠে বিশ্বকাপের আয়োজন করে অন্য দেশের সমর্থকদের আসার রাস্তা এমনভাবে বন্ধ করেছিলেন যে খেলোয়াড়রা গ্যালারিতে কেবল নীল সমুদ্রই দেখতে পেতেন। মানে রোহিত, বুমরারা দারুণ খেলেন তাই। যদি না-ও খেলতেন, তাহলেও তাঁদেরই হাতে ট্রফি তুলে দেওয়ার জন্যে যতটা করা সম্ভব, সবটাই শাহ করেছেন। এশিয়া কাপ থেকে শুরু করে বিশ্বকাপ – সর্বত্রই করে থাকেন। এত কিছু করার পরেও যারা প্রশ্ন তোলে – এই লোকটার কী যোগ্যতা আছে কাপ হাতে নেওয়ার, তারা দেশদ্রোহী ছাড়া কী?

তাছাড়া আপনারা খেয়ালই করেন না যে আপনাদের জন্যেও মানুষটা কত করে। সাত সমুদ্দুর তেরো নদীর পারে বিশ্বকাপ হল, তবু কেমন সন্ধেবেলা অফিস থেকে ফিরে মাঝরাত অব্দি খেলা দেখে আবার পরদিন সকাল সকাল অফিস চলে গেলেন। ওদিকে যেখানে খেলা হল সেখানকার লোকেরা সাতসকালে বা ভরদুপুরে কাজকম্ম ফেলে মাঠে যেতে পারল না বলে অনেক খেলায় গ্যালারি বিজেপির ভোটের মিটিংয়ের মাঠের মত খালি গেল। শাহের বোর্ড না থাকলে আপনারই চেতনার রঙে পান্না সবুজ হতে পারে, চুনি রাঙা হয়ে উঠতে পারে আর আপনার প্রাইম টাইমে ভারতের ক্রিকেট ম্যাচ হতে পারে একেবারে অন্য গোলার্ধে – এ কি স্বপ্নেও ভাবতে পারতেন? তা এত কাণ্ড যে টাকার গরমে সম্ভব হল, সে টাকার মালিককে আপনারা ফ্রেমের বাইরে রাখতে চান? নিজেদের ইচ্ছা মত টুর্নামেন্ট সাজিয়ে নেয়া নিয়ে সায়েবরা লেখালিখি করলে গোঁফে তা দিয়ে আপনারা বলেন – ‘এসব সাদা চামড়ারা অনেক করেছে। এখন আমাদের সময়, আমরা করব।’ আর এদেশের দু-একজন সাংবাদিক ভুল করে লিখে ফেললে দুর্বাসা মুনির মতন রেগে বলেন ‘অ্যান্টি-ন্যাশনাল।’ সত্যযুগ হলে বেচারিরা ভস্মই হয়ে যেত। তা এখন শাহের জন্যেও চাড্ডি হাততালি দিলেন না হয়।

আরও পড়ুন ভারতীয় ক্রিকেট: জাহান্নামের আগুনে পুষ্পের হাসি

কী দরাজ মন দেখুন তো লোকটার! আইসিসি চ্যাম্পিয়ন টিমকে দিয়েছে এদেশের কারেন্সিতে ২০ কোটি টাকা মত, আর উনি দিচ্ছেন ১২৫ কোটি। পঞ্চাশ গ্রামের টুর্নামেন্টে কোনোদিন দেখেছেন, কমিটি দিল ৫০১ টাকা আর আপনার ক্লাব দিল ৩০০১ টাকা? আহা! অমন হলে দুনিয়াটাই অন্যরকম হত মশাই। একবার ভাবুন। দুনিয়ার ফিফথ লার্জেস্ট ইকোনমির দেশ আমাদের, তাও এত লোক গরিব যে জয়ের জেঠুমণির সরকার ৮০ কোটি লোককে ফ্রিতে রেশন দেয়ার ব্যবস্থা করেছে। সেই দেশের ক্রিকেট দলকে ২০ ওভারের বিশ্বকাপ জেতার জন্যে ১২৫ কোটি টাকা দিলেন জয়। কিছু লোক আবার কেমন নিন্দুক দেখুন – বলে বেড়াচ্ছে যে এটা তেলা মাথায় তেল দেয়া। একেকজনের ভাগে কোটি পাঁচেক করে পড়বে, ওর চেয়ে বেশি ওরা এনডর্সমেন্ট থেকেই পায়। এদিকে মেয়েদের আর ছেলেদের দলের ম্যাচ ফি সমান করে দিয়ে মেয়েদের ম্যাচের আয়োজনই করা হয় না। তা ওদের জন্যে কিছু ভাবলে হত। কোভিডে রঞ্জি ট্রফি বন্ধ থাকার সময়ে দিন আনি দিন খাই অবস্থা হয়েছিল অনেক ঘরোয়া ক্রিকেটারের। তাদের জন্যেও কিছু করে না জয়ের বোর্ড। আরে বাপু, মানুষটার মনটা নরম বলে কি দানসত্র খুলে বসতে হবে নাকি? যারা টাকা করার ব্যবস্থা করে তাদেরই দেয়ার বন্দোবস্ত করা হয়েছে। যে সে মাথায় তেল দিলে চলবে? তেলের যা দাম বেড়েছে।

তা ক্রিকেটাররা কি কিছু মাইন্ড করেছেন? দেখে মনে তো হল না। তাঁরা জানেন যে জয় হলেন গোপাল পাঁঠার মত। তিনি আছেন বলে আমি আছি, আপনি আছেন, রোহিত আছেন, বিরাট আছেন, বুমরা আছেন, হার্দিক আছেন। তাই লক্ষ্মী ছেলের মত তাঁরা বিভিন্ন ব্যাপারে জয়ের জেঠুমণির সরকারের পক্ষ নিয়ে পোস্ট করে দেন। আবার লক্ষ্মী ছেলের মত পোস্ট করেন না, যখন দেশের মহিলা অলিম্পিয়ানদের রাতের অন্ধকারে টেনে হিঁচড়ে রাস্তা থেকে তুলে নিয়ে যায় জয়ের বাবার পুলিস।

দেশের লোক কি কিছু মাইন্ড করেছে? মোটেও না। নিদেনপক্ষে মুম্বাইয়ের লোকেরা তো একেবারেই মাইন্ড করেনি। ১৯৮৩ সালের কথা বাদ দিন, ২০০৭ বা ২০১১ সালেও মেরিন ড্রাইভে এত লোক দেখা যায়নি উইক ডে-তে ভর সন্ধেবেলা। এই অনন্ত আনন্দধারার মধ্যে স্রেফ মুখখানা অপছন্দ বলে ছুতোয় নাতায় মিষ্টি লোকটার পিছনে লেগে অ্যাম্বিয়েন্সটা বিগড়ে দেবেন না মাইরি। কটা দিন অন্তত নিট, নেট, ব্রিজ ভাঙা, এয়ারপোর্টের ছাদ ধসে পড়ে অক্কা পাওয়া, দেশের রাজধানীতে জলের অভাবে মিনিস্টারের অনশন, অগ্নিবীর, ঠেঙিয়ে মুসলমান হত্যা – এসব পলিটিকাল কচকচি ভুলে থাকতে দিন। আচ্ছে দিন না আসুক, আচ্ছে উইন তো এসেছে। গলা ছেড়ে গেয়ে উঠুন ‘জয় জয় জয় জয় হে’।

নাগরিক ডট নেটে প্রকাশিত