অথৈ: যত্নে নির্মিত ভারতের ট্র্যাজেডি

অথৈ ভদ্রলোকের ছবি নয়। ভদ্রলোকেরা ভদ্রলোকের খেলার নাম করে যা যা অক্রিকেটিয় আচরণ করে, সেগুলোকে উলঙ্গ করে ফেলার ছবি। এ ছবির নায়ক একজন ‘ছোটলোক’, অথৈ লোধা, যার গোটা সম্প্রদায় স্বাধীনতার পরেও বেশ কিছুদিন দেশের আইনের চোখে অপরাধপ্রবণ জাত ছিল। আর খলনায়ক একজন ভদ্রলোক। যে সে ভদ্রলোক নয়, একেবারে কুলীন বামুন – অনগ্র চট্টোপাধ্যায়। সে আবার বিদেশে এক পা দিয়ে ফেলা ডাক্তার। এদের জন্যই আনন্দবাজার পত্রিকার রবিবারের পাতায় ‘পাত্রী চাই’ বিজ্ঞাপন দিয়ে লেখা হয় – ব্রাহ্মণবংশীয়, প্রকৃত সুন্দরী মেয়ে চাই। পশ্চিমবঙ্গের সংস্কৃতি জগৎ বরাবর এদেরই নিয়ন্ত্রণে। সিনেমা হলগুলোর মালিকদের মধ্যেও লোধাদের সংখ্যা যে শূন্য তা চোখ বুজে বলে দেওয়া যায় (আজকাল তো আবার সিনেমা হল ঢুকে গেছে অতি ধনী, প্রায়শই অবাঙালি উচ্চবর্গীয় মালিকদের মলের পেটে)। তাই ছবিটাও আমাদের দেখতে হয় ভদ্রলোকের চোখ দিয়েই। অনগ্র স্বয়ং এই আখ্যানের সূত্রধার। সে ছোট থেকেই বাড়িতে আশ্রিত সমবয়স্ক অথৈকে ঈর্ষা করেছে, অথচ সবকিছুতেই তার কাছে হেরেছে। খালি পায়ের ফুটবলে তাকে কাটিয়ে ভূপতিত করে গোল করেছে অথৈ। ফলে অনগ্র ওরফে গোগোর প্রিয় খেলা ক্রিকেট। সে ভদ্রলোকের খেলা ক্রিকেটের আদবকায়দা অনুসরণ করে অথৈকে চূড়ান্ত খেলাটায় হারিয়ে দিতে নেমেছে — দিয়াকে অথৈয়ের কাছ থেকে ছিনিয়ে নেওয়ার খেলা।

বহুতলবাসী, শহুরে, অরাজনৈতিক বাংলা ছায়াছবির একঘেয়ে জগতে বহুকাল পরে অথৈ একখানা আদ্যন্ত গ্রামীণ এবং রাজনৈতিক ছবি। চিত্রনাট্যকার ও পরিচালক অর্ণ আর সৃজনশীল পরিচালক অনির্বাণ সে রাজনীতি শুরু করেছেন একেবারে শিল্পী ও কলাকুশলীদের নাম দেখানো থেকে। এ ছবির টাইটেল কার্ডে কারোর নামের সঙ্গে পদবি লেখা নেই। প্রয়োজনে অমুকদা, তমুকদি আছেন। দুজন কৌশিক থাকায় একজন কৌশিকদা আছেন আর একজন কৌশিকবাবু আছেন। অর্ণর চিত্রনাট্য অতীতের বহু শেক্সপিয়রাশ্রয়ী ছবির মত তাঁর আখ্যানকে অবলম্বন করেছে বটে, কিন্তু নিজের রাজনীতির প্রতি বিশ্বস্ততার কারণে ওথেলো ছাড়িয়ে বহুদূর চলে গেছে। বাংলায় জাতপাত নেই – ভদ্রলোকদের এই নিশ্চিন্ত, আত্মপ্রতারক ধারণার গোড়া ধরে টানতে গেলে ঈর্ষা দেখানো দরকার ছিল। যে ঈর্ষায় ভদ্রলোকেরা অথৈয়ের মত সংরক্ষণপ্রাপ্ত ছাত্রদের বলে – সোনার চাঁদ, সোনার টুকরো। যৌন ঈর্ষার চেয়ে বড় ঈর্ষা নেই। তাই শেক্সপিয়রের নাটকে ইয়াগোর চক্রান্তের মূলে ছিল ক্যাসিওর প্রতি ঈর্ষা, কারণ ওথেলো তার বদলে ক্যাসিওর পদোন্নতি ঘটিয়েছে। অর্ণর চিত্রনাট্যে গোগোর ঈর্ষা কিন্তু অথৈকেই, এবং তা চরমে পৌঁছেছে নিজের কামনার বস্তু দিয়া অথৈকে ভালবেসে তার সঙ্গিনী হয়ে যাওয়ায়।

গোগোর চরিত্রের দিকনির্ণয় করে তার যৌন হতাশা। অথৈ জানে গোগো তার প্রাণের বন্ধু। দুজনের অনেক মিল। দুজনে একই পুরুষের অভিভাবকত্বে একই বাড়িতে বড় হয়েছে। একই স্কুলে, একই মেডিকাল কলেজে পড়েছে। কিন্তু অথৈয়ের শয্যায় থাকে দিয়া, গোগোর শয্যাসঙ্গিনী অকালমৃতা মায়ের ছবি। দুজনেই মায়ের মৃত্যুর দৃশ্য স্বপ্নে দেখে ঘেমে নেয়ে জেগে ওঠে। কিন্তু অথৈকে শান্ত করে বিছানায় ফিরিয়ে আনার জন্য আছে দিয়া, গোগোর আছে শুধু অয়দিপাউস এষণা। মিলির সঙ্গে ভিনসুরার এক ভাঙা বাড়িতে সঙ্গমে তার শরীর সাময়িক সুখ পায়, তার মন শান্তি পায় না।

ভিনসুরা কোথায়? যাঁরা ভাবেন বাংলায় আছে ‘ছায়াসুনিবিড় শান্তির নীড়    ছোটো ছোটো গ্রামগুলি’, তাঁরা ভিনসুরাকে খুঁজে পাবেন না। কিন্তু যাঁরা গজদন্তমিনারে থাকেন না, তাঁরা জানেন ভিনসুরা যে কোনো শহরের মতই পাপবিদ্ধ। সেখানে সুন্দরী মেয়ের বাথরুমে উঁকি মারার চেষ্টা করে গ্রামের গাঁটকাটা, কোনো মেয়ের ফেলে যাওয়া ওড়না নিয়ে হস্তমৈথুন করে পাঁড় মাতাল, বোকা রসিকতায় একদল মেয়ের মন জয় করার চেষ্টা করে সুদর্শন যুবক, সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে দায়সারা রবীন্দ্রসঙ্গীত গাওয়া হয় এবং তাতে মন ওঠে না গ্রামের অল্পবয়সীদের। ছেলেরা তো বটেই, গ্রামের মেয়েরাও চটুল আইটেম নাম্বারে মত্ত হয়ে নাচে।

বাঙালি দর্শকের সিনেমা দেখার চোখ কান হয় আবর্জনা, নয় ওপরচালাক ছবি দেখে দেখে এত ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে যে সাধারণ দর্শক শুধু নয়, পেশাদার সিনেমা আলোচকরাও আইটেম নাম্বারে কেবল নর্তকীর শরীরটুকুই দেখতে পান। গানের কথাগুলো খেয়ালই করেন না। তাই এই ছবির আলোচনায় এক জনপ্রিয় বাংলা দৈনিকে লেখা হয়েছে, আইটেম নাম্বারটা নাকি অপ্রয়োজনীয় এবং হাস্যকর। কী সেই গানের কথাগুলো?

ওরে তুই ভালোর দলে নাম লিখিয়ে
কী-ই বা পেলি বল
কে করল কদর তোর ভালোকে
(সবাই) পাল্টে নিল দল

(ওরে) আর কতকাল থাকবি বোকা
ভালোর ঘরে শুধুই ধোঁকা
(এসব) ভালোর পোকা পায়ে মাড়িয়ে
দ্বন্দ্ব ভুলে যা

মন্দ হয়ে যা রে
বাবু মন্দ হয়ে যা

ওরে তুই মন্দ হয়ে মজা পাবি
অন্ধকারে ঘর সাজাবি
থাকবি আলোর থেকে দূরে
সাঁতার দিবি রাত পুকুরে

দেখলি অনেক ভালোবেসে
শূন্য পেলি দিনের শেষে
(এবার) যুগের তালে মোহের বিষে
অন্ধ হয়ে যা

মন্দ হয়ে যা রে
বাবু মন্দ হয়ে যা।

সেই অ্যারিস্টটলের আমল থেকে ট্র্যাজেডি কী, ট্র্যাজিক নায়ককে কেন ট্র্যাজেডির সম্মুখীন হতে হয় তা নিয়ে বিস্তর আলোচনা হয়েছে। পণ্ডিতরা বলেছেন ট্র্যাজিক নায়কের চরিত্রে এমন একটা উপাদান (tragic flaw) থাকে যা তাকে অনিবার্যভাবে ট্র্যাজেডির দিকে ঠেলে দেয়। সেই উপাদানের নাম দেওয়া হয়েছে – হ্যামার্শিয়া (Hamartia)। উদাহরণস্বরূপ, ম্যাকবেথের বেলায় সেই উপাদান উচ্চাকাঙ্ক্ষা, হ্যামলেটের বেলায় সিদ্ধান্তহীনতা, ওথেলোর বেলায় সন্দেহ বা ঈর্ষা। কিন্তু আধুনিক সমালোচকদের মতে হ্যামার্শিয়া কোনো চারিত্রিক উপাদান নয়, আসলে ওটা সিদ্ধান্ত নেওয়ার ভ্রান্তি (error of judgment)। অথৈয়ের ভ্রান্তিটা তাহলে কী?

সে ভিনসুরাকে, সেখানকার মানুষকে বড় বেশি ভালবাসে, সেই ভালবাসায় অন্ধ হয়ে তাদের ভাল করতে চায়। সে সগর্বে বলে ‘এটা আমার ভিনসুরা’। সে ভিনসুরার সকলকে নিজের মত মনে করে। মুকুলকে (ক্যাসিও), গোগোকে (ইয়াগো), এমনকি দিয়াকেও (ডেসডিমোনা)। কিন্তু তারা মোটেই অথৈয়ের মত নয়। একথা উপলব্ধি না করাই অথৈয়ের ট্র্যাজেডির কারণ। সে যদি মুকুলের এক রাতের মাতলামি ক্ষমা করে দিতে পারত, যদি গোগো তার সঙ্গে এক নোংরা খেলা খেলছে সন্দেহ করেও তাকে বিশ্বাস করে না বসত, যদি দিয়ার মুকুলের প্রতি স্নেহ বুঝতে পারত – তাহলে তার পরিণতি ট্র্যাজিক হত না। কিন্তু আসলে যে ভিনসুরা তার নয়, ভিনসুরার সবাই তার মত নয় – একথা বোঝার ব্যর্থতাই অথৈকে ট্র্যাজিক নায়কে পরিণত করে। ভদ্রলোকেদের ভিনসুরায় অথৈকে একা করে দেয় তার জাতি পরিচয়। সেই পরিচয়জনিত অতীতের বিষময় স্মৃতি, তা থেকে জন্ম নেওয়া হীনমন্যতাই দিয়ার প্রতি আর মুকুলের প্রতি তার সন্দেহকে পুষ্ট করে। অথচ ওই অতীতকে সে ভুলতে পারে না, কারণ সে সগর্বে বলে, অতীতটাই তার পুঁজি।

প্রিয় ভিনসুরার সঙ্গে তার এই অমিল ফুটিয়ে তুলতে যথার্থ ভূমিকা নিয়েছে ওই আইটেম নাম্বার। সকলের উদ্দাম নৃত্য দেখে অথৈ যখন দিয়াকে নিয়ে স্থানত্যাগ করে, তখন পর্দা জুড়ে লেগে থাকে বিষাদ। হাঁ করে আইটেম নাম্বারের আইটেমের দিকে তাকিয়ে থাকলে অবশ্য তা চোখ এড়িয়ে যাবে।

হয়ত নির্দেশক ও চিত্রনাট্যকার হিসাবে অর্ণর এটা প্রথম ছবি বলে এবং সৃজনশীল পরিচালক হিসাবে সঙ্গে অনির্বাণ ছিলেন বলে এ ছবিতে সাবধানী হওয়ার কোনো ব্যাপার নেই, পরীক্ষা নিরীক্ষার কোনো খামতি নেই। কোনটা সফল হয়েছে, কোনটা ব্যর্থ – তা নিয়ে তর্ক চলতে পারে। কিন্তু বাংলা ছবির বাঁধা ছকের একেবারে বাইরে চলে গিয়ে যে এ ছবি বানানো হয়েছে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। এতখানি পরীক্ষামূলক হওয়া সম্ভব হত না সৌমিকের অসাধারণ ক্যামেরার কাজ এবং সংলাপের সম্পাদনা ছাড়া। অর্ণ (অথৈ) আর অনির্বাণের (গোগো) অভিনয় দক্ষতার সবটুকু সৌমিকের ক্যামেরা চেটেপুটে নিয়েছে অসাধারণ সব ক্লোজ আপে, আলো আর অন্ধকারের বৈচিত্র্যে, রঙিন আলোর শিহরণ জাগানো ব্যবহারে। অবিস্মরণীয় দৃশ্য তৈরি হয়েছে, যখন দিয়ার (সোহিনী) প্রতি অথৈয়ের বিশ্বাস একেবারে ভেঙে পড়ে। তারই সঙ্গে ভেঙে পড়ে ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল, আকাদেমি অফ ফাইন আর্টস, শহিদ মিনার – স্মৃতির শহরের, ভদ্রলোকদের তৈরি প্রেমের শহরের একেকটা স্তম্ভ।

আরও পড়ুন মায়ার জঞ্জাল: যে কলকাতা দেখতে পাই না, দেখতে চাই না

আজকের বাংলা ছবির পক্ষে বিরল যত্ন রয়েছে এই ছবির শব্দ ব্যবহারেও। সুগত, দেবাশিস, প্রসূন, অনিন্দিতরা সচরাচর কানে আসে না নেপথ্যের যেসব শব্দ, সেগুলোকেও দর্শকের কানে পৌঁছে দিয়েছেন এবং আখ্যান তার মধ্যে দিয়েও কথা বলেছে। দূরাগত মাইকের বা চলমান পথিকের গুনগুন গানও কানে এসেছে।

এবার অভিনয়ের কথায় আসা যাক। এই চিত্রনাট্য অতি উচ্চমানের অভিনয় দাবি করেছিল। সাধারণ অভিনয় দিয়ে ভিনসুরার লোধা ডাক্তার অথৈয়ের দুনিয়ার ভাঙনকে জলবায়ু পরিবর্তন বা গাজার গণহত্যার সঙ্গে যুক্ত করার কোনো উপায় ছিল না। এই অসাধ্য সাধন করেছেন অর্ণ। গত কয়েক বছরে কলকাতার থিয়েটার জগতে যে তরুণ অভিনেতারা সবচেয়ে বেশি চোখে পড়েছেন, অর্ণ তাঁদের অন্যতম। কিন্তু বড় পর্দায় এত গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে তাঁকে আগে দেখা যায়নি। এই অভিনয় কেবল চোখে পড়ার মত নয়, মনে থেকে যাওয়ার মত। অনির্বাণের সঙ্গে মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধের মুহূর্তগুলোই হোক বা সোহিনীর সঙ্গে প্রেম-অপ্রেমের অতি দ্রুত যাতায়াতের মুহূর্ত – অর্ণর মাথার চুল থেকে পায়ের নখ পর্যন্ত সবকিছু কথা বলেছে। একজন সৎ, হৃদয়বান মানুষ থেকে পশুত্বে ক্রমাবতরণ তিনি নিজের মুখে এঁকেছেন সফলভাবে।

শেক্সপিয়রের ডেসডিমোনা আর বিশাল ভরদ্বাজের ডলি – দুজনের চেয়েই বেশি স্বাবলম্বী ও স্বাধীনচেতা এই ছবির দিয়া। তাকে নায়ক তুলে আনেনি, সে স্বেচ্ছায় নিজের পরিবার ও কেরিয়ার বিসর্জন দিয়ে অথৈয়ের সঙ্গে গণ্ডগ্রামে এসে ঘর বেঁধেছে। এই চরিত্রে সোহিনীর নারীবাদ কখনো শাপমোচন (১৯৫৫) ছবির সুচিত্রা সেনের মত নীরব আত্মবিশ্বাসী, আবার কখনো হলিউডি নায়িকাদের মত সোচ্চার। সোহিনী পর্দায় পাগলের মত প্রেম করেছেন, আবার যার জন্যে সর্বস্ব ত্যাগ করে আসা, তাকে ঠিক সময়ে ঘা মেরে বাঁচানোর চেষ্টাতেও তিনি সপাট। গলা তুলে বলেন, আসলে তো অথৈয়ের প্রশ্ন এটা নয় যে দিয়া মুকুলকে ভালবাসে কিনা। আসল প্রশ্ন হল সে মুকুলের সঙ্গে শুয়েছে কিনা। সোহিনীকে কিছুটা নিষ্প্রভ দেখিয়েছে ক্লাইম্যাক্সে, যখন চলে যাওয়া প্রেমের দিন স্মরণ করে দিয়া গাইছে ‘জীবন মরণের সীমানা ছাড়ায়ে’।

এই নিষ্প্রভতার কিছুটা দায় অবশ্য চিত্রনাট্যকারকেও নিতে হবে। কারণ ওই গান যে অথৈ আর দিয়ার ব্যক্তিগত গান ছিল, তা একবারও দুজনে মিলে গোটাটা না গাওয়ায় খুব ছাপ ফেলেনি। ফলে শেষে ওই গানের অভিঘাত তেমন তীব্র হয় না। চিত্রনাট্যের এই খামতির সঙ্গে একটা বাহুল্যের উল্লেখও করতে হয়। স্টিফেন মোফাত নির্মিত বিবিসির শার্লক ওয়েব সিরিজের পর থেকে অনেক সিরিজ এবং ছবিতেই দেখা যায়, ফ্ল্যাশব্যাক দেখানোর সময়ে বর্তমানের চরিত্র সেখানে উপস্থিত। অথৈ ছবিতেও এই কৌশল ব্যবহার করা হয়েছে অথৈ আর গোগোর ছোটবেলা দেখাতে। কিন্তু ততক্ষণে গোগোর বর্ণনায় এবং অন্যান্য দৃশ্যের কারণে দর্শকের পক্ষে আর বোঝা শক্ত নয় যে ছোট ছেলে দুটো কে, কাদের শৈশব দেখানো হচ্ছে। সুতরাং সেখানে আর প্রাপ্তবয়স্ক গোগোকে না দেখালেও চলত।

‘জীবন মরণের সীমানা ছাড়ায়ে’ একবার শোনা গেছে অনির্বাণের গলায়, অথৈয়ের সংবর্ধনা সভায়। অনির্বাণ যে সুরেলা কণ্ঠের অধিকারী তা এতদিনে বাংলা সিনেমা ও নাটকের দর্শকরা জেনে গেছেন। সেই অনির্বাণের ছবির প্রয়োজনে ঈষৎ বেসুরো করে গাওয়া মুনশিয়ানার পরিচায়ক। মঞ্চসফল অথৈ নাটকে অনির্বাণ প্রায় সারাক্ষণ মঞ্চে থাকতেন, ছবিতেও বেশিরভাগ সময়েই পর্দায় তিনি উপস্থিত। এতখানি পরিশ্রম তাঁর অভিনয়ে একবারও ছায়া ফেলেনি। ফুর্তিবাজ অথচ কুটিল, দিলখোলা অথচ নির্দয় গোগো হিসাবে তিনি সারাক্ষণই ফুরফুরে মেজাজ বজায় রাখতে সফল। বস্তুত তাঁর সূক্ষ্ম নির্দয়তা এত প্রবল যে মাঝে মাঝে হেমেন গুপ্তের ৪২ ছবির বিকাশ রায়ের কথা মনে পড়ে যায়। বাংলা ছবি নিয়ে সেই উন্মাদনার যুগ অতিক্রান্ত। নইলে বিকাশ রায়কে দেখে লোকে যেমন ঢিল ছুড়ত শোনা যায়, তেমন অনির্বাণের দিকেও হয়ত উড়ে যেত কিছু চটি জুতো। মোটামুটি ফাঁকা প্রেক্ষাগৃহেও তাঁর দিকে বর্ষিত দু-একটা অভিশাপ কানে এল। এই চরিত্রের অভিনেতার জন্যে তা স্বর্ণপদকের সামিল। এই বহুস্তরীয় চরিত্রের জটিলতা বিচার করলে এটা কি এ পর্যন্ত সিনেমায় অনির্বাণের সেরা অভিনয়? তাঁর ভক্তরা ভেবে দেখতে পারেন।

মুকুলের চরিত্রে অর্পণ, মিলির চরিত্রে মিমি, পিঙ্কির চরিত্রে দিতিপ্রিয়া, রাধুর চরিত্রে সুমিত, মন্টুর চরিত্রে মিলন যথাযথ। গোগোর বাবার চরিত্রে প্রবীণ অভিনেতা কৌশিককে অবশ্য কিছুটা দ্বিধান্বিত মনে হয়। যেন ঠিক বুঝে উঠতে পারেননি তাঁর কতটা কী করা উচিত।

শেক্সপিয়রের ওথেলো নাটক কীভাবে শেষ হয় সকলেই জানেন, তাই এখানে স্পয়লার দেওয়ার ভয় নেই। অথৈও শেষ হয় একাধিক মৃত্যুতে। কিন্তু অনিবার্য মৃত্যুগুলোকে যে ক্যানভাসে এঁকেছে অর্ণর চিত্রনাট্য, তাতে যেন পড়া যায় অদৃশ্য কালিতে লেখা

যারে তুমি নীচে ফেল সে তোমারে বাঁধিবে যে নীচে
পশ্চাতে রেখেছ যারে সে তোমারে পশ্চাতে টানিছে।

ছোটলোক অথৈয়ের ট্র্যাজিক পরিণতি সত্ত্বেও ভদ্রলোক গোগোর চক্রান্ত তাই ব্যর্থ হয়ে যায়। ট্র্যাজেডির মারে বেশ খানিকক্ষণ চেয়ার ছেড়ে ওঠা যায় না।

বাংলা সিনেমার পক্ষে অবশ্য এ ছবি ট্র্যাজেডি নয়, বরং রীতিমত আশাব্যঞ্জক। অর্ণ স্রেফ এমন একখানা চিত্রনাট্যের জন্যেই প্রশংসা পেতে পারতেন। সঙ্গে নির্দেশনার দায়িত্ব পালন করেছেন, আবার উঁচু দরের অভিনয়ও করেছেন। অনির্বাণও নির্দেশনার কাজে হাত লাগানোর পাশাপাশি ছবির গান লিখেছেন, এত বড় এবং গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে অনায়াস দক্ষতায় অভিনয় করেছেন। একই প্রজন্মে এমন দু-দুজন শিল্পী যে ইন্ডাস্ট্রির সিনেমায় আছেন, সেই ইন্ডাস্ট্রি সম্পর্কে একেবারে আশা ছেড়ে দেওয়া অনুচিত।

এ ছবির পাশে দাঁড়াতে হবে না, স্বচ্ছন্দে সামনে বসা যায়।

নাগরিক ডট নেটে প্রকাশিত

প্রশান্ত বুদবুদ ফেটে যাওয়ায় প্রশ্ন: গণতন্ত্র চালাচ্ছে মার্কেট রিসার্চ?

রাজনৈতিক দলের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে এখন দলের কর্মীদের লড়তে হচ্ছে মার্কেট রিসার্চ কোম্পানির সঙ্গে? গরিব মানুষের গণতন্ত্র ভারতের জন্য এটা কি ভালো লক্ষণ?

অতি সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে প্রশান্ত কিশোর বলেছেন, ২০২৪ লোকসভা নির্বাচনে কংগ্রেস এমন কিছু উন্নতি করেনি। কারণ দেশের ২০% মানুষ সংখ্যালঘু – ১৮% মুসলমান আর অন্যান্য সংখ্যালঘু আরও ২%। তারা কংগ্রেসের ‘ফ্রি ভোটব্যাংক’, আর কংগ্রেস পেয়েছে ২৩ শতাংশ ভোট। অর্থাৎ সংখ্যালঘু বাদে মাত্র ৩% ভোটারের ভোট আদায় করতে পেরেছে রাহুল গান্ধির দল। এই তত্ত্বের আগাগোড়া সবটাই ভুল তথ্যের উপর দাঁড়িয়ে আছে। যেহেতু তথ্যগুলোই ভুল, সেহেতু তত্ত্বটির একমাত্র ঠিকানা বাজে কাগজের ঝুড়ি।

প্রথমত, কংগ্রেস পেয়েছে ২১.১৯% ভোট (২০১৯ সালে পেয়েছিল ১৯.৪৬%)। দ্বিতীয়ত, সর্বশেষ আদমশুমারি অনুসারে মুসলমানরা এদেশের জনসংখ্যার ১৪.২%। তার সঙ্গে খ্রিস্টান, শিখ, বৌদ্ধ, জৈন, আরও ছোট ছোট ধর্মের মানুষ এবং যাঁরা নিজেদের কোনও ধর্মের সঙ্গে যুক্ত বলেননি তাঁদের যোগ করলে তবে হয় ২০.২%। কিন্তু সংখ্যালঘুরা গোটা দেশে কংগ্রেস ছাড়া কাউকে ভোট দেন না – একথা একেবারে ভুল। পশ্চিমবঙ্গেই যেমন সেই ২০১১ সাল থেকে বেশিরভাগ সংখ্যালঘু মানুষ ভোট দিয়ে আসছেন তৃণমূল কংগ্রেসকে, তার আগে দিতেন বামফ্রন্টকে। তামিলনাডু সহ অনেক রাজ্যেই আঞ্চলিক দলগুলো বেশিরভাগ সংখ্যালঘুর ভোট পেয়ে থাকে। এবারেও পেয়েছে।

সবচেয়ে বড় কথা, জনসংখ্যার সকলেই ভোটার নাকি? শিশুরাও ভোট দেয়? তার উপর কংগ্রেস এবার লড়েছে ৩২৮ আসনে, কিন্তু ২০১৯ সালে লড়েছিল ৪২৩ আসনে। প্রায় একশো কম আসনে লড়ে কংগ্রেস ভোট বাড়িয়েছে প্রায় ২ শতাংশ। আসন যে প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে তা বলাই বাহুল্য। অতএব এটা ফেলে দেওয়ার মতো সাফল্য নয়।

এখন কথা হল, প্রশান্তের তত্ত্বটি যখন নেহাত আবর্জনা, তখন লেখার শুরুতেই এতগুলো শব্দ তা নিয়ে খরচ করলাম কেন? কারণ প্রশান্তকে যে ভারতীয় রাজনীতির একজন বিশেষজ্ঞ বলে মনে করা হয়, করণ থাপারের হাতে ল্যাজেগোবরে হওয়ার পরেও যে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম তাঁর সাক্ষাৎকার নিতে এখনও উদ্গ্রীব, তার কারণ ভোট কুশলী হিসাবে তাঁর কীর্তি। ২০১৪ সালে নরেন্দ্র মোদি ক্ষমতায় আসার সঙ্গে সঙ্গে সারা দেশে প্রশান্ত বিখ্যাত হয়েছিলেন। সংবাদমাধ্যম জানিয়েছিল, ওই জয়ের কারিগর তিনিই। প্রশান্তের খ্যাতির সূত্রে ভারতীয় রাজনীতিতে প্রতিষ্ঠা পেয়েছিল এক নতুন পেশা, যার নাম ইংরেজিতে ‘ইলেকশন স্ট্র্যাটেজিস্ট’। বাংলায় ভোট কুশলী বলতে পারি।

ভোট কুশলী ব্যাপারটা দেখতে শুনতে এত ভালো যে বঙ্গে দিশেহারা বামপন্থীদের মধ্যেও কথাবার্তা শুরু হয়েছে – একজন প্রশান্ত বা সুনীল কানুগোলু (কংগ্রেসের ভোট কুশলী সংস্থা মাইন্ডশেয়ার অ্যানালিটিক্সের কর্ণধার) দরকার। পশ্চিমবঙ্গ, বিহার, তামিলনাডু, উত্তরপ্রদেশের মতো যথেষ্ট সংখ্যালঘু থাকা রাজ্যে কাজ করা সংস্থার একদা কর্ণধার প্রশান্তের মূর্খামি দেখে সেই বামপন্থীরা কী বুঝবেন জানি না, আমি যা বুঝলাম বলি।

হয় প্রশান্ত এতটাই কংগ্রেসবিদ্বেষী ও মুসলমানবিদ্বেষী যে বিদ্বেষে তাঁর বুদ্ধিসুদ্ধি লোপ পেয়েছে। নয় তাঁর সাফল্যের পিছনে ১০০% কৃতিত্ব আইপ্যাকের সেইসব কর্মীদের, যাঁদের নাম কেউ জানে না। তিনি শুধু মাইনে করা কর্মীদের পরিশ্রম আত্মসাৎ করে নাম কিনেছেন। কিন্তু কর্পোরেট দুনিয়ায় এ তো প্রায় নিয়ম। ফলে তেমন হয়ে থাকলে রাজনীতির দিক থেকে ভাবনার কিছু নেই। তৃতীয় একটা সম্ভাবনা আছে, যা বেশি চিন্তার।

ব্যাপারটা কি আসলে এরকম, যে এই সংস্থাগুলো যা করে তা আসলে বিজ্ঞাপন জগতে যাকে ‘মার্কেট রিসার্চ’ বলে তার বেশি কিছুই নয়? লক্ষণীয়, আইপ্যাক বা মাইন্ডশেয়ার সেইসব মক্কেলকেই জেতাতে পেরেছে যারা জেতার অবস্থায় ছিল। ২০১৪ লোকসভা নির্বাচন বিজেপি জিততই, কারণ ইউপিএ সরকারের প্রতি বিপুল অসন্তোষ তৈরি হয়েছিল। ২০২১ পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচন বিজেপি জিতে যাবে বলে যতই হাওয়া তৈরি হয়ে থাক, বিজেপির না ছিল সংগঠন, না ছিল মমতার সমতুল্য কোনও মুখ।

২০০৫ সালে বিহারের মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পর থেকে নীতীশ কুমারের সরকার যে অনেক কাজ করেছিল তা তাঁর অতি বড় শত্রুও অস্বীকার করে না। ফলে ২০১৫ সালে জেডিইউ-আরজেডি জোটের জয়ও এমন কিছু অত্যাশ্চর্য ব্যাপার ছিল না, খিঁচ ছিল নীতীশ মহাগঠবন্ধনে যোগ দেওয়ায়। তামিলনাডুর মানুষ পরপর দু’বার একই দলকে জেতান না। ১৯৮৪ সাল থেকে চলে আসা সেই ধারা ভেঙে এমনিতেই ২০১৬ সালে এআইএডিএমকে পরপর দু’বার জিতে গিয়েছিল। সুতরাং ২০২১ সালে ডিএমকের জয় প্রায় অনিবার্য ছিল। ২০১৭ সালের উত্তরপ্রদেশ বিধানসভা নির্বাচনে কিন্তু সংগঠনহীন, কর্মসূচিহীন কংগ্রেস আইপ্যাকের সাহায্য নিয়েও সাতটার বেশি আসন জেতেনি। সুনীলও কি কংগ্রেসকে তেলেঙ্গানা জেতাতে পারতেন সংগঠন এবং রেবন্ত রেড্ডির মতো আক্রমণাত্মক নেতা না থাকলে? কর্ণাটক জেতা হত সিদ্দারামাইয়া আর ডিকে শিবকুমার ছাড়া?

আরও পড়ুন কানহাইয়ার কেরিয়ার আর কমিউনিস্ট আদর্শবাদ: তার ছিঁড়ে গেছে কবে

অনেকে অবশ্য স্বীকার করেন যে এই সংস্থাগুলো বা তাদের কর্ণধাররা জাদুকর নন। কিন্তু তাঁদের মতে, এরা ‘ভ্যালু অ্যাড করে’। সে ভ্যালু কি পরিমাপযোগ্য? হলে প্রশান্তের মতো মহাপণ্ডিত কি ভ্যালু অ্যাড করেন? যদি পরিমাপযোগ্য না হয়, তাহলে কীসের ভিত্তিতে রাজনৈতিক দলগুলো কোটি কোটি টাকা খরচ করছে এদের পিছনে? দলগুলোর টাকা মানে তো আসলে নাগরিকদেরই টাকা। কর্পোরেটগুলো পিছন দরজা দিয়ে যে চাঁদা দলগুলোকে দেয় (নির্বাচনি বন্ডেই হোক আর নগদেই হোক) সে টাকাও তো তারা উশুল করে নেয় নাগরিকদের পকেট থেকেই। শুধু তাই নয়, এই সংস্থাগুলোর পরামর্শেই তো আজকাল ক্ষমতাসীন দলগুলোর, অর্থাৎ রাষ্ট্রের নীতি নির্ধারণ হচ্ছে। তাহলে কি কতকগুলো মার্কেট রিসার্চ কোম্পানি নির্ধারণ করছে আমাদের গণতন্ত্রের অভিমুখ?

এদের কাজের সীমা কতটুকু? কেউ বলেন, এরাই নাকি দলের প্রার্থীতালিকা থেকে নির্বাচনি প্রচার – সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করে। আবার কিছুদিন আগে মমতা এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, আইপ্যাকের ভূমিকা নেহাতই সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রচার চালানো। এসব গোপনীয় ব্যাপার, ফলে সম্যক জানা অসম্ভব। কিন্তু একটা ব্যাপারে সকলেই একমত। ভোট কুশলী সংস্থার আবশ্যিক কাজ হল মক্কেল পার্টির জন্য ভোটারদের সম্পর্কে পুঙ্খানুপুঙ্খ তথ্য সংগ্রহ এবং বিশ্লেষণ। তথ্য কাটাছেঁড়া করেই তারা দলগুলোকে পরামর্শ দেয় – এটা বলুন, ওটা বলবেন না। অমুক প্রকল্প চালু করুন, তমুক কাজে পার্টির ভাবমূর্তি নষ্ট হচ্ছে।

সন্দেহ নেই, তথ্যপ্রযুক্তির যুগে রাজনীতিতে সাফল্য পেতে গেলে তথ্য আর প্রযুক্তিকে কাজে লাগাতে হবে। সে কারণেই তো আইপ্যাকের প্রস্থানের পর ডিএমকে ভোট কুশলী হিসাবে নিযুক্ত করেছে পপুলাস এমপাওয়ারমেন্ট নেটওয়ার্ক (পেন)-কে। তবে আইপ্যাক বা মাইন্ডশেয়ারের সঙ্গে পেনের তফাত আছে। পেনের কর্ণধার এমকে স্ট্যালিনের জামাই ভি সবরীসন। এখনও পর্যন্ত পেন অন্য কোনও দলের হয়ে কাজ করেনি। তারা মূলত পার্টি এবং ডিএমকে সরকারের বার্তা ডিজিটাল উপায়ে সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার কাজ করে। সেই লক্ষ্যে স্ট্যালিনের মোবাইল অ্যাপ বানিয়েছে তারা এবং মুখ্যমন্ত্রীর নিয়মিত পডকাস্ট চালু করেছে। কীভাবে মানুষের কাছ থেকে ডিজিটাল পদ্ধতিতে তথ্য সংগ্রহ করে রাজনৈতিক কাজে লাগানো যায়, তা নিয়ে প্রশিক্ষণও দেয় ডিএমকে কর্মীদের। কিন্তু ডিএমকের রাজনীতি তারাই নিয়ন্ত্রণ করছে, এমন অভিযোগ বা প্রশংসা এখনও অবধি শোনা যায়নি। অথচ তৃণমূল কংগ্রেসের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত আইপ্যাক নিচ্ছে – এমন অভিযোগ উঠেছে প্রশান্ত ছেড়ে যাওয়ার আগে ও পরে।

আবার মধ্যপ্রদেশ, ছত্তিশগড়, রাজস্থানের নির্বাচনে সুনীল কাজ করুন – এমনটা নাকি সেখানকার কংগ্রেস নেতারা চাননি। তাহলে রাজনৈতিক দলের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে এখন দলের কর্মীদের লড়তে হচ্ছে মার্কেট রিসার্চ কোম্পানির সঙ্গে? গরিব মানুষের গণতন্ত্র ভারতের জন্য এটা কি ভালো লক্ষণ?

উত্তরবঙ্গ সংবাদে প্রকাশিত

হিন্দিভাষী ইউটিউবার যা করলেন, বাঙালিরা যা করলেন না

হিন্দি বলয়ের রাজ্যগুলোর গ্রামে-মফস্সলে ছড়িয়ে আছেন আরও অনেকে, যাঁদের ফলোয়ার রবীশ, ধ্রুব, আকাশ, কুণাল, সমদীশদের চেয়ে অনেক কম। তাঁদের কারও একটা ইউটিউব চ্যানেল আছে, কারও স্রেফ একটা ফেসবুক পেজ। কিন্তু গ্রামের যে সামান্য লেখাপড়া জানা বা নিরক্ষর মানুষের কাছে ইংরেজি ভাষায় কাজ করা প্রগতিশীলরা পৌঁছতে পারেন না, তাঁদের মধ্যে বিষ ঢোকা আটকাতে বা বিষ ঝাড়তে অতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা এই অখ্যাত মানুষগুলোর।

বেঙ্গালুরু নিবাসী আমার এক বন্ধুপত্নীর অভিজ্ঞতা বলি। সে একটি বাচ্চাদের স্কুলের দিদিমণি। বছর ছয়েকের এক ছাত্রীকে তার একটু বেশি মিষ্টি লাগে, মেয়েটিরও দিদিমণিকে বেশ পছন্দ। একই রুটের বাসে তাদের বাড়ি ফেরা। ফলে দু’জনের মধ্যে স্কুলের বাইরেও কথাবার্তা হয়। সেই মেয়েটি হঠাৎ একদিন দিদিমণিকে অনুরোধ করে বসল– ‘আমার একটা ইউটিউব চ্যানেল আছে। আপনি প্লিজ সাবস্ক্রাইব করুন।’ হতচকিত দিদিমণি পরে করবেন বলে এড়িয়ে গিয়েছিলেন, কিন্তু পরদিন আবার মেয়েটি ধরল, তার পরদিন আবার। কতবার না বলা যায়? একটা ছোট মেয়েকে প্রত্যাখ্যান করতে খারাপও লাগে। কিন্তু শেষমেশ বিরক্তি জিতে গেল। দিদিমণি বলতে বাধ্য হলেন– ‘আমাকে এই অনুরোধ কোরো না।’

এমন অভিজ্ঞতা আজকাল পশ্চিমবঙ্গেও অনেকের হয়। ইউটিউব ঘাঁটলেও দেখা যায়, সারা পৃথিবীর দুধের শিশু থেকে লোলচর্ম বৃদ্ধ পর্যন্ত সকলেরই নিজস্ব ইউটিউব চ্যানেল আছে। যার চ্যানেলে যা আপলোড করা হয়, তা যতই অপ্রয়োজনীয় হোক, দেখার লোকও আছে। ব্যাপারটা স্রেফ অপ্রয়োজনীয়তায় আটকে থাকলে সমস্যা ছিল না। কিন্তু ইউটিউব এমন এক মাধ্যম হয়ে দাঁড়িয়েছে, যা দিয়ে ফেসবুক বা টুইটারের মতোই ঘৃণা ছড়ানোর কাজও করা হচ্ছে। সাংবাদিক কুণাল পুরোহিত আস্ত একখানা বই লিখেছেন, কীভাবে কিছু ইউটিউব চ্যানেল মুসলমানবিদ্বেষে পরিপূর্ণ গানের ভিডিও তৈরি করে প্রত্যন্ত এলাকাতেও অসংখ্য মানুষকে প্রতিদিন আরও হিংস্র করে তুলছে, তা নিয়ে। বইয়ের নাম ‘H-POP: THE SECRETIVE WORLD OF HINDUTVA POP STARS’। এ জিনিসটা কেবল ভারতেই হচ্ছে এমন নয়। সব দেশেই ইউটিউব ঘৃণা ছড়ানোর চমৎকার অস্ত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু সেটাই শেষ কথা নয়।

২০১৬ সালে যখন ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রথমবার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে দাঁড়িয়েছিলেন, তখন দেখা গিয়েছিল যে ইউটিউব সমেত সোশাল মিডিয়া তাঁর প্রচারে বড় অস্ত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষত ফেসবুকের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছিল, তারা বর্ণবিদ্বেষ এবং কুৎসা তো আটকাচ্ছেই না; উল্টে‌ ওসব ছড়াতে সাহায্য করছে। ফেসবুকের মালিক মেটা আর ইউটিউবের মালিক গুগল– দুই কোম্পানির বিরুদ্ধেই এই অভিযোগ আছে; যেমন আছে আড়ি পাতার অভিযোগ, ব্যবহারকারীদের অজান্তে তাদের তথ্য বিক্রি করে মুনাফা করার অভিযোগ। এসব প্রায় সবাই জানে। তবু বহু মানুষ ইউটিউবকে ব্যবহার করেই কিছু বৃহত্তর ভালো কাজ করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।

সারা পৃথিবীতেই নির্বাচনী গণতন্ত্রের সংকট চলছে, বড় বড় দেশগুলোর শাসকদের মধ্যে স্বৈরতান্ত্রিক প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। তাঁরা সংবাদমাধ্যমের কণ্ঠরোধ করছেন, ভারতের মতো দেশে সংবাদমাধ্যমগুলোও মুনাফার লোভে সরকারের মুখপত্রে পরিণত হচ্ছে। দিনরাত মিথ্যাচার এবং ঘৃণাভাষণের এই ঢেউয়ে সাধারণ মানুষের কাছে সত্য তুলে ধরার কাজে ঋজু বিদূষক এবং স্বাধীন সাংবাদিকরা ব্যবহার করছেন ইউটিউবকে। বস্তুত বিদূষক আর সাংবাদিকের সীমানা মুছে যাচ্ছে। ট্রাম্পের আমলে তাঁর অন্যতম শত্রু হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন জন অলিভার, হাসান মিনহাজ, ট্রেভর নোয়ার মতো বিদূষকরা। তাঁদের শো প্রায় নিউজ বুলেটিনই। লোক হাসাতেও তাঁরা খবরকেই ব্যবহার করেন। ২০২৪ সাধারণ নির্বাচনে ভারতেও ঠিক তাই ঘটতে দেখা গেল।

সত্যি কথা বলতে, এবারের নির্বাচনে ধ্রুব রাঠি, রবীশ কুমার, আকাশ ব্যানার্জি, কুণাল কামরারা তাঁদের চ্যানেলের মাধ্যমে যে কাজ করলেন, তা মার্কিন দেশের ইউটিউবারদের থেকে ঢের বেশি কঠিন ছিল। কারণ ও দেশে ট্রাম্পের আমলে আদালত, নির্বাচন কমিশন, সেনাবাহিনী এবং মূলধারার সংবাদমাধ্যম রামলালার সামনে মোদির সাষ্টাঙ্গ প্রণামের মতো ট্রাম্পের সামনে শুয়ে পড়েনি। ট্রাম্পকে পদে পদে প্রতিরোধের সম্মুখীন হতে হয়েছিল। ফলে বাকস্বাধীনতা এ দেশের মতো অতখানি বিপদে পড়েনি, বিদূষক বা সাংবাদিকদের পদে পদে গ্রেফতার হওয়ার ভয়ে থাকতে হয়নি। কিন্তু এদেশে কুণালের বিরুদ্ধে একাধিক মামলা হয়েছে, একাধিক বিদূষকের শো বাতিল করতে হয়েছে ক্ষমতাসীন দলের সমর্থক গুন্ডাদের আক্রমণে, নিত্য তাঁদের হুমকি সহ্য করতে হয়েছে। মুনাওয়ার ফারুকির মতো ঋজু বিদূষক গ্রেফতারও হয়েছেন। কাশ্মীর থেকে কন্যাকুমারিকা পর্যন্ত মোট কতজন সাংবাদিক গ্রেফতার হয়েছেন, খুন হয়েছেন তার তালিকা করতে বসলে রামায়ণে কুলোবে না, মহাভারত হয়ে যাবে। সিদ্দিক কাপ্পানের মতো কেউ কেউ যে প্রতিবেদন লেখাই হয়নি, তার জন্যও গ্রেফতার হয়েছেন। সাতবছর আগে খুন হওয়া গৌরী লঙ্কেশের হত্যাকারীরা আজও অধরা। রবীশের মতো সাংবাদিকদের চুপ করিয়ে দেওয়ার জন্য আস্ত চ্যানেল কিনে নিয়েছে সরকারবান্ধব পুঁজিপতিরা।

এতৎসত্ত্বেও রবীশ কেবল তাঁর চ্যানেলের গ্রাহকদের টাকায়, সামান্য সংস্থান আর ছোট্ট একটা দল নিয়ে যে সাংবাদিকতার নিদর্শন রাখলেন, তা ঐতিহাসিক। কুণাল আর আকাশ তো নির্বাচনের আগে পুরোদস্তুর সাংবাদিক হয়ে গেলেন। কুণাল দশবছর ধরে মোদি সরকার কী কী করেছে আর করেনি, তা নিয়ে রিপোর্ট কার্ড সিরিজ করলেন। পর্বগুলোর শেষে তিনি মনে করাতেন– যেভাবে দেশ চালানো হয়েছে তাতে প্রধানমন্ত্রী হিসাবে মোদির জায়গায় খালি চেয়ার রাখলেও চলবে। নতুন টেলিকম আইনে কীভাবে বিকল্প সংবাদমাধ্যম, ইউটিউবার, ইনস্টাগ্রামারদেরও কণ্ঠরোধের ব্যবস্থা করা হয়েছে, তা নিয়ে আকাশের ভিডিও ভাইরাল হয়েছিল। সেই ভাইরাল ভিডিওতে তিনি ভিপিএন (ভার্চুয়াল প্রাইভেট নেটওয়ার্ক) সম্পর্কেও দর্শকদের সচেতন করেন। তারপর ধ্রুবর প্রচণ্ড ভাইরাল ভিডিও সম্পর্কে তাঁর সাক্ষাৎকার নেন, যথার্থ সাংবাদিকের মতোই তাঁকে ব্যাখ্যা করতে বলেন– কেন তিনি বলছেন ভারত একনায়কতন্ত্রের দিকে এগোচ্ছে। আর ধ্রুব যা করেছেন, তা নিয়ে তো আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমেও আলাদা করে চর্চা হচ্ছে। বিপুল জনপ্রিয় ইউটিউবার তো অনেকেই আছেন, কিন্তু দেশের বিপদ দেখে নিজের নিশ্চিন্ত কোণ ছেড়ে বেরিয়ে এসে সরাসরি ক্ষমতাকে আক্রমণ করার ঝুঁকি কি সকলে নেয়?

এখনও তিরিশে পা না দেওয়া ধ্রুব যদিও জার্মানিতে থাকেন, তিনি ভারতের নাগরিক। তাঁর পরিবার পরিজনও এখানে আছেন। সেক্ষেত্রে এতখানি ঝুঁকি নিয়ে সরাসরি মোদির বিরুদ্ধে রীতিমতো প্রচারাভিযান চালানো কম সাহসের কাজ নয়। ধ্রুব এমনিতে তেমন বৈপ্লবিক চিন্তাধারার লোক নন, অতীতে অনেক ব্যাপারেই তিনি বিজেপিকে সমর্থন করে ভিডিও বানিয়েছেন। সংবিধানের ৩৭০ নং অনুচ্ছেদ বাতিল করাও তিনি সমর্থন করেছিলেন। কিন্তু এই নির্বাচনে তাঁর অবদান ভোলার নয়।

পাঞ্জাবি যুবক সমদীশ ভাটিয়া ইউটিউবার হিসাবে প্রথম জনপ্রিয় হন ২০২০-’২১ সালে দিল্লি শহরকে ঘিরে কৃষক আন্দোলনের সময়ে। আন্দোলনকারীদের ভিতরে চলে গিয়ে তাঁদের কথা তিনি তুলে আনতেন। মাঝে কিছুদিন সিনেমা জগতের বিখ্যাতদের লম্বা লম্বা সাক্ষাৎকার নিচ্ছিলেন, যার জন্য তাঁর শো-তে এসে নির্দেশক দিবাকর ব্যানার্জি ঈষৎ ক্ষোভও প্রকাশ করেন। এবার নির্বাচনের মুখে সমদীশ আবার স্টুডিও ছেড়ে ক্যামেরা নিয়ে বেরিয়ে পড়েন ভারত খুঁজতে। কখনও সে ভারত দিল্লি শহরের একেবারে মাঝখানে, অথচ মানুষ সেখানে জঞ্জালের মধ্যে বেঁচে আছে। কখনও সে ভারত বিহারের এক গ্রাম, যেখানে হরিজনরা এখনও হ্যান্ড পাম্পে হাত দিলে হাঙ্গামা বেধে যায়।

এমন আরও অনেকে আছেন। হিন্দি বলয়ের রাজ্যগুলোর গ্রামে-মফস্সলে ছড়িয়ে আছেন আরও অনেকে, যাঁদের ফলোয়ার রবীশ, ধ্রুব, আকাশ, কুণাল, সমদীশদের চেয়ে অনেক কম। তাঁদের কারও একটা ইউটিউব চ্যানেল আছে, কারও স্রেফ একটা ফেসবুক পেজ। কিন্তু গ্রামের যে সামান্য লেখাপড়া জানা বা নিরক্ষর মানুষের কাছে ইংরেজি ভাষায় কাজ করা প্রগতিশীলরা পৌঁছতে পারেন না, তাঁদের মধ্যে বিষ ঢোকা আটকাতে বা বিষ ঝাড়তে অতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা এই অখ্যাত মানুষগুলোর। তাঁদের অনেকের ইউটিউবার বা সাংবাদিক তকমা নেই। কেউ কেউ দিন গুজরান করেন আসলে দিল্লি, মুম্বইয়ের বড় সংবাদমাধ্যমকে খবর সরবরাহ করার বিনিময়ে অতি সামান্য টাকা পেয়ে। সেই টাকায় সংসার চালিয়ে, তা থেকেই খরচ করে এসব করেন কোন তাগিদে, তা আমাদের মতো আলোকপ্রাপ্ত বাঙালিদের পক্ষে বোঝা প্রায় অসম্ভব।

আরও পড়ুন এনডিটিভি বিসর্জন: শোক নিষ্প্রয়োজন, উল্লাস অন্যায়

পশ্চিমবঙ্গে কি ইউটিউবার নেই? কয়েক হাজার ইউটিউবার আছেন। তবে তাঁদের অধিকাংশ হাসি-মশকরায় ব্যস্ত। কেউ ক্রমশ ছোট হয়ে আসা টালিগঞ্জ ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির কেষ্টবিষ্টুদের সাক্ষাৎকার নিয়ে ফলোয়ার বাড়ান, রোজগার করেন। বাংলার যে প্রবীণ সাংবাদিকরা ইউটিউব চ্যানেল চালান তাঁদের মধ্যেও রবীশের মতো মেরুদণ্ড এবং অধ্যবসায় বিরল। তবু সাংবাদিকদের মধ্যে আছেন দু’-একজন, কিন্তু বিশুদ্ধ ইউটিউবারদের কথা না বলাই ভালো। ফলে বাঙালির ইউটিউব চ্যানেল মানে সাধারণত রান্নার চ্যানেল বা বেড়ানোর জায়গার সুলুকসন্ধান দেওয়ার চ্যানেল। নয়তো সংস্কৃতির ঢাক তেরে কেটে তাক তাক। বাঙালি তো শিল্পী হয়েই জন্মায়। ফলে গান, নাচ, আবৃত্তিতে ইউটিউব ভরিয়ে দেয় বুকের দুধ খাওয়ার বয়সটা পার হলেই। এছাড়া যা আছে তা স্রেফ আবর্জনা। হয় অর্থহীন, নয় ঘৃণা ছড়ানোর প্রয়াস।

এমনিতেই ভারতের বিরাট অংশের মানুষের ভাষা হিন্দি। তাঁদের প্রভাবিত করতে না পারলে যে ভালো বা মন্দ কোনও কাজই এদেশে করা সম্ভব নয়, তা বলা বাহুল্য। কিন্তু সেকথা এদেশের আলোকপ্রাপ্তদের সচরাচর মনে থাকে না। অথচ গণতন্ত্র বাঁচানোর জন্যে যে শহর থেকে, সংবাদমাধ্যম থেকে সবচেয়ে দূরে থাকা মানুষটার কাছেও সত্য পৌঁছে দিতে হবে, সব ভাষার মানুষের কাছে পৌঁছতে হবে– তা রবীশ, ধ্রুবরা বুঝতে পেরেছিলেন। ফলে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে হিন্দি বাদে অন্য ভাষাতেও নিজেদের ভিডিও প্রকাশ করেছেন। আবার যে হিন্দিতে সংবাদমাধ্যমের কথাবার্তা চালানো হয়, সেই হিন্দি সকলের বোধগম্য নয় বুঝে রবীশ আলাদা করে ভোজপুরী ভাষাতেও ভিডিও প্রকাশ করেছেন।

এই সুদূরপ্রসারী চিন্তা, এই যত্ন বাংলায় কোথায়? বাঙালিরা কেবল রবীশদের বাংলা ভিডিও দেখে হিন্দি আগ্রাসনের তত্ত্ব কপচাতে পারে। নিজেরা নিজের ভাষাকে বুকনি ছাড়া আর কিছু দিতে রাজি নয়।

রোববার ডট ইন ওয়েবসাইটে প্রকাশিত

নির্বাচনের ফলে হেরে গেছে দেশের অসাধু মিডিয়া

এই লেখা যখন লিখছি, ততক্ষণে প্রমাণ হয়ে গেছে যে মোদীর গ্যারান্টিতে খুব বেশি ভারতীয় নাগরিক বিশ্বাস করেননি। হিন্দুরাষ্ট্রের স্বপ্নেও খুব বেশি মানুষের গায়ে পুলক লেগে চোখে ঘোর ঘনায়নি। একাই তিনশোর বেশি এবং জোটে সাড়ে তিনশোর বেশি আসনের কৈলাস পর্বত থেকে ভোটাররা পরমাত্মা নরেন্দ্র মোদীকে টেনে নামিয়েছেন জোট রাজনীতির মাটিতে। তবে যেহেতু বিজেপি নেতৃত্বাধীন প্রাক-নির্বাচনী জোট ন্যাশনাল ডেমোক্র্যাটিক অ্যালায়েন্স (এনডিএ) ২৭২ আসনের বেশি পাচ্ছে, তাই হয়ত ফের মোদী তাঁর প্রিয় আসনে বসতে পারবেন। অবশ্য মোদী-অমিত শাহের ভয়ে যাঁরা এতদিন এনডিএতে ছিলেন, তাঁরা ভয় কমে যেতেই যদি কেটে পড়ার তাল করেন তাহলে অনেককিছু ঘটতে পারে। তা যদি না-ও ঘটে, বিজেপিই যে একক বৃহত্তম দল হয়েছে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। তাই একে তারা জয় বলে দাবি করতেই পারে, যতই তাদের তৈরি আলেখ্য স্পষ্টত প্রত্যাখ্যাত হয়ে থাক। কিন্তু এ লেখা ২০২৪ লোকসভা নির্বাচনে যারা হেরে ভূত হয়ে গেছে তাদের কথা বলার জন্যে। মূলধারার সংবাদমাধ্যম, বিশেষত জনপ্রিয় খবরের চ্যানেলগুলোর কথা বলছি।

২০১৪ সাল থেকে কারা গোদি মিডিয়া হয়ে গেছে তা আজ কাউকে নতুন করে বলে দেওয়ার দরকার নেই। যেসব সংবাদমাধ্যমকে সচরাচর ওই তালিকায় ফেলা হয় না, আজও নিরপেক্ষ বলেই মনে করেন বিজেপিবিরোধী দর্শকরা, তারাও গত এক-দেড় বছরে ভোল বদলেছে। গোদি মিডিয়ার হত্তাকত্তারা নিউজক্লিকের দিকে, অন্য বিকল্প সংবাদমাধ্যম ও সাংবাদিকদের দিকে সিবিআই, ইডিকে লেলিয়ে দিয়েছিলেন। তাঁদের নির্যাতনে উল্লসিত হয়ে নানা ষড়যন্ত্রের তত্ত্ব প্রচার করে আহ্লাদিত হয়েছিলেন। আর তথাকথিত নিরপেক্ষ সংবাদমাধ্যম প্রবীর পুরকায়স্থের মত সাংবাদিকদের সমর্থনে টুঁ শব্দ করেনি। বাংলায় তো রিপাবলিক বাংলা ছাড়া গোদি মিডিয়া নেই বলা হয়। নিন্দুকেরা বলে এখানে দিদি মিডিয়া আছে। তা সত্যি মিথ্যা যা-ই হোক, কোনো মিডিয়াই আর পাঁচটা গ্রেফতারির খবরের মত করে সংবাদটি পাঠক/দর্শকের কাছে পৌঁছে দেওয়ার বেশি তেমন কিছু করেনি। বাংলার স্বনামধন্য (অনেকের মত কিংবদন্তি) সাংবাদিকরা নিজেদের ব্লগে বা ভ্লগে, মায় ফেসবুক পোস্টেও এর প্রতিবাদ করেননি। সংবাদমাধ্যমের উপর রাষ্ট্রীয় আগ্রাসনের কালে নীরবতা অবশ্যই সম্মতির লক্ষণ। কারা নীরব ছিলেন মনে করে দেখুন। গোদি মিডিয়া সমেত তাঁদেরও উলঙ্গ করে দিল নির্বাচনের ফল, কারণ মাত্র তিনদিন আগে তাঁদেরই চ্যানেলে চ্যানেলে বুথফেরত সমীক্ষায় ৩০০-৪০০ আসন দিয়ে জিতিয়ে দেওয়া হয়েছিল মহামতি মোদীকে।

কেবল জিতিয়ে দেওয়া হয়েছিল বললে অবশ্য কিছুই বলা হয় না। বুথফেরত সমীক্ষা আর পাঁচটা সমীক্ষার মতই একটা সমীক্ষা মাত্র। তাতে ভুল হওয়ার সম্ভাবনা থাকেই। আজ যখন ইন্ডিয়া টুডের স্টুডিওতে অ্যাক্সিস-মাই ইন্ডিয়া সংস্থার প্রধান প্রদীপ গুপ্তা এসে নিজের পাহাড়প্রমাণ ভুলের ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে কেঁদেই ফেললেন, তখন রাজদীপ সরদেশাই, রাহুল কাঁওয়ালরা পরম স্নেহে তাঁর গায়ে হাত বুলিয়ে তাঁকে বোঝাচ্ছিলেনও বটে, যে মানুষ মাত্রেই ভুল করে।

কিন্তু মুশকিল হল, এর চেয়ে অনেক ছোট ভুলে টিভি চ্যানেলে বা খবরের কাগজে একজন সাংবাদিককে বিস্তর কৈফিয়ত দিতে হয়, লিখিত শোকজের জবাব দিতে হতে পারে, চাকরি পর্যন্ত চলে যেতে পারে। ২০২০-২১ সালে ভারতের যেসব সংবাদমাধ্যম করোনা অতিমারীর দোহাই দিয়ে কয়েক হাজার সাংবাদিককে ব্যবস্থা উদ্বৃত্ত ঘোষণা করে ছাঁটাই করেছিল, তারাই টাকা খরচ করে এইসব বুথফেরত সমীক্ষা করিয়েছে এবং প্রচার করিয়েছে। যে সাংবাদিকরা ছাঁটাই হয়েছিলেন, তাঁরা কেউই কখনো অ্যাক্সিস-মাই ইন্ডিয়ার প্রদীপ বা সি-ভোটারের যশবন্ত দেশমুখের চেয়ে বড় ভুল করেননি। করলে চাকরি আগেই যেত। অবশ্য যদি গুপ্তা, দেশমুখরা সত্যিই ভুল করে থাকেন।

একসঙ্গে সমস্ত বুথফেরত সমীক্ষাকারী সংস্থাই ভুল করতে পারে, যেমন ২০০৪ সালে করেছিল। আবার সব সংস্থা এক ভুলও করতে পারে। কিন্তু সব সমীক্ষাকারী সংস্থা একসঙ্গে একই ভুল করলে সেটা কাকতালীয় ঘটনা হিসাবে বড্ড বাড়াবাড়ি হয়ে যায়। বিশেষ করে সব সমীক্ষাতেই যদি স্রেফ কোথায় কটা আসন আছে সেই তথ্যে ভুল থাকে বা কোন দল কটা আসনে লড়ছে সেই তথ্যে ভুল থাকে। গোদি মিডিয়া অবশ্য সেখানেও থামেনি। প্রাক-নির্বাচনী মতামত সমীক্ষা বা বুথফেরত সমীক্ষা যে কোনোভাবেই নির্বাচনের ফল নয়, সেকথা বারবার করে দর্শকদের বলাই দস্তুর। অথচ এবারের বুথফেরত সমীক্ষায় ইন্ডিয়া জোট তথা কংগ্রেস গোহারান হারছে দেখানোর সঙ্গে সঙ্গে মোদী তৃতীয় মেয়াদে কী কী করবেন, ভারতকে কোন উচ্চতায় নিয়ে যাবেন – এসব গভীর আলোচনাও চালানো হয়েছে ঘন্টার পর ঘন্টা ধরে। আজ তক নেটওয়ার্কের বিখ্যাত গোদি অ্যাঙ্কর অঞ্জনা ওম কাশ্যপ রীতিমত নাকের পাটা ফুলিয়ে লাইভ অনুষ্ঠানে বলেছিলেন, তাঁদের মত বড় চ্যানেলে বিরোধীদের কোনো পরিসরই দেওয়া উচিত নয়।

এই সাংবাদিকের যে সাংবাদিকতা করা উদ্দেশ্য নয়, তার এর চেয়ে বড় কোনো প্রমাণ হয় না। লোকসভায় বিরোধীদের শক্তিবৃদ্ধির পর কী করবেন অঞ্জনা? সে তিনি ভাববেন, কিন্তু আমাদের ভুললে চলবে না যে অঞ্জনা বরং সরল বা বোকা বা উদ্ধত। তাই প্রকাশ্যে ওকথা বলেছেন। তাঁর চেয়ে চালাক চতুর সাংবাদিকরাও একই উদ্দেশ্যে কাজ করেন, তবে ভান করতে জানেন। গত এক দশকে ভারতের প্রায় প্রত্যেক সংবাদমাধ্যমের মালিক এই ধরনের মেধাহীন, অর্ধশিক্ষিত সাংবাদিকদেরই দায়িত্বপূর্ণ পদে উন্নীত করেছেন। সত্যিকারের সাংবাদিকদের হয় রবীশ কুমার বা পুণ্য প্রসূন বাজপেয়ীর মত নিজস্ব ইউটিউব চ্যানেল খুলতে হয়েছে, নয় মুখ বুজে পরিবার পরিজনের কথা চিন্তা করে ফ্যাসিবাদীদের হয়ে দিনরাত মিথ্যা প্রচারের কাজই করে যেতে হয়েছে। তৎসত্ত্বেও ভয়ে ভয়ে থাকতে হয়েছে, কখন মুনাফাখোর মালিকের মনে হয় – এত সাংবাদিক আমার দরকার নেই। শেষ দফার নির্বাচনের পরে তাঁর ইউটিউব চ্যানেলে আপলোড করা ভিডিওতে রবীশ বলেছেন যে চ্যানেলগুলোতে খরচ কমাতে রিপোর্টার যত কমানো হয়েছে, তত রমরমা হয়েছে অঞ্জনা জাতীয় অ্যাঙ্করদের। অর্থাৎ খবরকে এক ধরনের অসুস্থ বিনোদনে পরিণত করে মানুষের মন বিষিয়ে দেওয়া এবং সরকারকে, মোদীকে দোষগুণের অতীত এক সত্তা হিসাবে প্রতিষ্ঠা করার কাজই করে গেছে টিভি চ্যানেলগুলো। দিনরাত মোদীকে দেখানো, বিরোধীদের প্রায় না দেখানো, দেখালেও তাদের বক্তব্য এমনভাবে বিকৃত করা যাতে মোদীর সুবিধা হয় – এইসব কৌশল ইদানীং মোদীভক্তরাও বুঝে ফেলছিলেন। পুরাণে নির্মোক নৃত্যের কথা লেখা আছে, আজকাল যাকে বলা হয় স্ট্রিপটিজ। ভারতের মূলধারার সংবাদমাধ্যমের এক দশকব্যাপী এই স্ট্রিপটিজে কোমরে যে সরু অন্তর্বাসটুকু বাকি ছিল, সেটুকুও খুলে ফেলা হল এবারের বুথফেরত সমীক্ষায়।

আসল ফল যে অন্যরকম হবে, একথা প্রায় সব সাংবাদিক জানতেন। কিন্তু নিজের সংস্থার সাংবাদিকদের অভিজ্ঞতা ও নৈপুণ্যকে পাত্তা না দিয়ে বিপুল টাকা খরচ করে (নাকি অন্য কারোর অর্থানুকূল্যে?) এই বুথফেরত সমীক্ষাগুলো করিয়ে প্রকাশ করা হয়েছিল ১ জুন ২০২৪। অঞ্জনা, সুধীর চৌধুরী বা রাহুল কাঁওয়ালের মত অন্ধ সাংবাদিক ভেকধারীদের অবশ্য অভিজ্ঞতা বা নৈপুণ্য – কোনোটাই নেই। তাঁরা অত উপরে উঠেছেন মেধাহীন বদমাইশি নির্লজ্জভাবে করতে পারেন বলেই। ৪ জুন ২০২৪ কেবল প্রদীপ বা যশবন্ত নন, কেবল গোদি সাংবাদিকরাও নন, উদোম হয়ে গেলেন তাঁদের নিয়োগকারীরা। সবার চোখে ধরা পড়ে গেল, তাঁরা আসলে কিসের ব্যবসা করেন।

আরও পড়ুন সরকারের কিছু দেশদ্রোহী দরকার, তাই নিউজক্লিক আক্রমণ

তবে ও ব্যবসায় কিন্তু কেবল মার্কামারা গোদি মিডিয়াই যুক্ত তা নয়। যদি তা হত, তাহলে গত কয়েক মাসে তৃণমূল কংগ্রেসের সবেতেই দোষ দেখা এবং বিজেপির সবেতেই গুণ দেখা অতি বুদ্ধিমান সুটবুট পরা বাঙালি বাবু সুমন দে ওই বুথফেরত সমীক্ষা নিজের চ্যানেলে নিশ্চয়ই দেখাতে দিতেন না। মনে রাখবেন, সুমন দে-র মত বিভিন্ন চ্যানেলে সর্বেসর্বা যে অ্যাঙ্কররা আছেন তাঁরা প্রায় প্রত্যেকে কোম্পানির ম্যানেজমেন্টের অংশ। সাধারণ কর্মচারী নন। রাজদীপ সরদেশাইদের প্রজন্ম মাথার সব চুল পেকে গেলেও মুশাহারদের গ্রামে চলে যান খবর করতে। আজকের রাহুল কাঁওয়াল বা সুমন দে-রা রিপোর্টিং বলতে বোঝেন ঠান্ডা ঘরে বসে অমুক নেতা, তমুক নেতার সাক্ষাৎকার নেওয়া। অনেক ক্ষেত্রে সেই সাক্ষাৎকারে বিশেষ কিছুই করার থাকে না। কারণ আগেই স্থির করা থাকে যে প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার ভান করতে করতে আসলে নেতা আপন মনে শেক্সপিয়ারের চরিত্রের মত যা খুশি বলে যাবেন, সাংবাদিক ক্লাসের ফার্স্ট বয়ের মত মুখ করে শুনে যাবেন আর মাঝে মাঝে দন্তবিকাশ করে গল্প হলেও সত্যি ছবির ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়ের মত জানান দেবেন ‘থেমো না দাদা, বলে যাও। বড় ভাল বলছ।’

এ কাজ যে যত ভাল করতে পারে, মূলধারার সংবাদমাধ্যমে এখন তার তত দাম। সংসদে বিরোধীদের শক্তি বেড়ে যাওয়ায় এবার কিন্তু এই জাতের সাংবাদিকতা বিপদে পড়বে। কারণ দর্শকদের মধ্যে ইতিমধ্যেই ক্লান্তি এসেছে। সরকারভক্ত দর্শক/পাঠকরাও ইদানীং সেই কারণেই বিকল্প সংবাদমাধ্যম – অর্থাৎ ছোট-বড় ওয়েবসাইট, ইউটিউবার, ফেসবুকারদের দিকে ঝুঁকছেন। সরকারের শক্তি কমে যাওয়ার একটা মানে হল উলটো বয়ান শুনতে চাওয়া মানুষের সংখ্যা বেড়েছে। আরেকটা মানে হল, আগামীদিনে ওই সংখ্যা আরও বাড়বে। কেবল ময়ূখ ঘোষদের নয়, সুমন দে-দেরও সাবধান হওয়ার সময় বোধহয় এসে পড়ল।

নাগরিক ডট নেটে প্রকাশিত

বিহারের লালু: যে শত্রুকে মোদী ভোলেন না

লালু মুখ্যমন্ত্রী থাকাকালীন যখন নিজের বাসভবনে জনতার সঙ্গে দেখা করতেন, উঁচু জাতের আইএএস বা আইপিএস পদমর্যাদার অফিসারদের দিয়ে খৈনি ডলাতেন। অনেকেই অপমানিত বোধ করতেন এবং অপমান করাই লালুর উদ্দেশ্য ছিল।

এবারের নির্বাচনে লড়া দলগুলো শেষপর্যন্ত পরিষ্কার দুটো পক্ষে ভাগ হয়ে গেছে। এক পক্ষের অবিসংবাদী নেতৃত্বে বিজেপি, অন্য পক্ষের তর্কসাপেক্ষ নেতৃত্বে কংগ্রেস। মমতা ব্যানার্জি বা অরবিন্দ কেজরিওয়ালের মত উচ্চাকাঙ্ক্ষী নেতাদের আপ্রাণ চেষ্টা সত্ত্বেও এটা ঘটে গেছে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী যত মিথ্যে কথা বলছেন, যত আতঙ্ক ছড়াচ্ছেন, তার বেশিরভাগই কংগ্রেসের ইশতেহার নিয়ে। ব্যক্তিগত আক্রমণেরও মূল লক্ষ করেছেন গান্ধী পরিবারকে। ফলে অন্য অনেকের প্রতি তাঁর আক্রমণ আমাদের নজর এড়িয়ে যাচ্ছে। অথচ খেয়াল করলে দেখা যাবে, মোদী কিন্তু কোনো বক্তৃতাতেই তাঁদের ভুলছেন না। কারণ মোদী রন্ধ্রে রন্ধ্রে একজন আরএসএস প্রচারক; অরুণ শৌরি বা যশবন্ত সিনহাদের মত কংগ্রেসকে পছন্দ করেন না এবং আর্থসামাজিক ভাবনায় দক্ষিণপন্থী বলে ব্যক্তিগত উচ্চাকাঙ্ক্ষা চরিতার্থ করতে বিজেপিতে যাওয়া লোক নন। ফলে মোদী আরএসএসের আদর্শগত শত্রুদের কখনো ভোলেন না। সেই কারণেই সংসদীয় শক্তি নগণ্য হওয়া সত্ত্বেও তাঁর বক্তৃতার খানিকটা জুড়ে সবসময় থাকে কমিউনিস্ট এবং/অথবা নকশালরা। কংগ্রেস কত ভয়ঙ্কর তা বোঝাতেও তিনি বলেন – ওদের ইশতেহার তৈরি হয়েছে নকশাল চিন্তাভাবনা থেকে। একই কারণে মোদী এবং বিজেপির অন্যান্য শীর্ষনেতারা জওহরলাল নেহরুকে যত গালাগালি দেন, ততটা দেন না ইন্দিরা গান্ধীকে। রাজীব গান্ধীর নাম টেনে আনেন শুধুমাত্র সোনিয়া বা রাহুলকে আক্রমণ করার সময়ে। একই কারণে মোদী কখনোই ভোলেন না লালুপ্রসাদকে। তাঁর এবারের জনসভাগুলোর ভিডিও লক্ষ করলে দেখা যাবে, বারবার তিনি ইন্ডিয়া ব্লক কতখানি ভ্রষ্ট তা বোঝাতে গিয়ে বলেন একজন নেতার কথা, যাঁকে দেশের আদালত দুর্নীতিতে দোষী সাব্যস্ত করে শাস্তি দিয়েছে। তবে তিনি এখন জামিনে বাইরে আছেন। মোদী বলেন, শাহজাদা এত ভ্রষ্ট যে সেই লোকটার সঙ্গে শ্রাবণ মাসে মাংস রান্নার ভিডিও শেয়ার করে হিন্দুদের ভাবাবেগে আঘাত করে! সেই নেতার এত দুঃসাহস যে তিনি বলেন দেশের সকলের সম্পদ কেড়ে নিয়ে মুসলমানদের দিয়ে দেওয়া হবে! বলা বাহুল্য, প্রথম কথাটা অর্থহীন, কারণ দেশসুদ্ধ সব হিন্দু মোটেই শ্রাবণ মাসে নিরামিষ খায় না। আর দ্বিতীয় কথাটা ডাহা মিথ্যা। কিন্তু এখানে সে আলোচনায় যাব না। কথা বলব লালুপ্রসাদ সম্পর্কে, যিনি বয়স এবং স্বাস্থ্যের কারণে হীনবল হয়ে যাওয়া সত্ত্বেও সরাসরি পরমাত্মা হতে আবির্ভূত হিন্দু হৃদয়সম্রাটের দুঃস্বপ্নে এখনো হানা দেন। কেন দেন? সেই প্রশ্নেরই উত্তর খুঁজব। এই আলোচনা আজই, এখনই করা দরকার। কারণ লালুর বয়স এখন ৭৫, শরীরের অবস্থাও বিশেষ ভাল নয়। যদি ভারতের সংসদীয় গণতন্ত্র এ যাত্রায় বেঁচে যায় এবং ২০২৯ সালে আবার নির্বাচনের মত নির্বাচন হয়, তখন স্বাধীন ভারতের ইতিহাসে অতি গুরুত্বপূর্ণ এই মানুষটি আর আমাদের মধ্যে থাকবেন কিনা ঠিক নেই।

প্রথম অনুচ্ছেদের শেষ বাক্যটি পড়ে অনেক পাঠকই নাক কুঁচকোবেন। বিমানযাত্রায় গা গুলিয়ে উঠলে বমি করার জন্যে যে কাগজের ব্যাগ দেওয়া হয়, কেউ কেউ তার প্রয়োজনও বোধ করতে পারেন। কারণ কেবল বাঙালি ভদ্দরলোক নয়, অন্য রাজ্যের ভদ্রজনের সঙ্গে কথা বলতে গিয়েও দেখেছি, লালু সম্পর্কে একটা শব্দই সকলে জানে – ‘করাপ্ট’ (দুর্নীতিগ্রস্ত)। শুধু তাই নয়, সকলেই নিঃসন্দেহ যে ভারতের ইতিহাসে লালুর চেয়ে বেশি দুর্নীতিগ্রস্ত নেতা আর আসেনি। অথচ লালু মূলত যে পশুখাদ্য নিয়ে দুর্নীতির মামলায় শাস্তিপ্রাপ্ত অপরাধী, সেই মামলাতেই বিহারের আরেক প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী জগন্নাথ মিশ্রও যে দোষী সাব্যস্ত হয়ে চার বছরের কারাদণ্ড পেয়েছিলেন সেকথা কারোর মনে নেই। দেশজুড়ে কংগ্রেস, বিজেপি এবং অন্যান্য দলের নেতা, মন্ত্রীদের বহু কেলেঙ্কারি মানুষ ভুলে গেছেন। বিজেপির সাম্প্রতিক ওয়াশিং মেশিনে তো হাজার হাজার কোটি টাকার কেলেঙ্কারির কলঙ্ক ধুয়ে যাচ্ছে, কিন্তু সেটা আইন আদালতের চোখে। সাধারণ মানুষের চোখে চিরকালই বহু নেতার দুর্নীতি মাফ হয়ে চলেছে। কেবল লালুর কোনো মাফ নেই, তাঁর ছেলেমেয়েদেরও মাফ নেই। মহারাষ্ট্রের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী শরদ পাওয়ারেরও কোটি কোটি টাকার সম্পত্তি আছে এবং তাঁর বিরুদ্ধেও একাধিক দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। কখনো শুনেছেন তাঁকে স্রেফ ‘করাপ্ট’ বলে উড়িয়ে দিতে? তিনি মহারাষ্ট্রের বাইরেও রীতিমত সম্মানিত নেতা। কেবল রাজনৈতিক মহলের কথা বলছি না। তিনি ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের সভাপতিও ছিলেন। কোনো ক্রীড়া সাংবাদিকও কখনো লেখেননি পাওয়ারের বিরুদ্ধে কী কী দুর্নীতির অভিযোগ আছে। তাঁর সম্পর্কে বরং ভাল ভাল সব বিশেষণ ব্যবহার করা হয়। তামিলনাড়ুর দুই প্রবাদপ্রতিম নেতা এম করুণানিধি আর জয়ললিতা। তাঁদের বিরুদ্ধেও বিপুল দুর্নীতির অভিযোগ ছিল। মামলা, গ্রেফতারি সবকিছুই হয়েছে। কিন্তু কোনো সাংবাদিক বা রাজনৈতিক বিশ্লেষককে দেখবেন না প্রধানত তা নিয়েই আলোচনা করছেন। ওঁদের বিরোধীরাও তা করেন না। ফলে সাধারণ মানুষের মধ্যেও তাঁদের ভাবমূর্তি তেমন নয়। যত দোষ লালু ঘোষ।

লালু সম্পর্কে আরেকটি বহুল প্রচলিত ধারণা হল – অশিক্ষিত। লালুকে দৃষ্টান্ত হিসাবে তুলে ধরে পশ্চিমবঙ্গের ভদ্দরলোকেরা সেই নয়ের দশক থেকে বলে আসছেন, ক্ষমতায় আসতে হলে একটা স্তর পর্যন্ত লেখাপড়া জানা আইন করে বাধ্যতামূলক করে দেওয়া উচিত। এঁরা খবর রাখেন না, যে লালু এলএলবি পাস। ইস্ট জর্জিয়া ইউনিভার্সিটির মত মানচিত্রে খুঁজে পাওয়া যায় না এমন কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি নয়, পাটনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি। তারপর এম এ পাস করেছেন রাষ্ট্রবিজ্ঞানে। মানে পলিটিকাল সাইন্স, ‘এন্টায়ার পলিটিকাল সাইন্স’ নয়। বস্তুত ছাত্র রাজনীতির পথেই তাঁর উত্থান, যেমন উত্থান পশ্চিমবঙ্গের প্রিয়রঞ্জন দাশমুন্সী, সুব্রত মুখার্জি, বিমান বসু, অনিল বিশ্বাস, ভদ্রলোকদের ভগবান বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য, মহম্মদ সেলিম বা আজকের সৃজন ভট্টাচার্য, দীপ্সিতা ধরদের।

পশ্চিমবঙ্গ তথা ভারতের ভদ্রসমাজ লালুকে এক বিশেষ চশমা দিয়ে দেখে। সে চশমার একদিকের লেন্সে দুর্নীতি, অন্য লেন্সে অশিক্ষা। লালুর বিরুদ্ধে আরও একটা অভিযোগ প্রবল। তিনি বিহারে গুন্ডারাজ চালিয়েছেন। একথায় জোর দিতে বিহারে বহু যুগ আগে যখন কংগ্রেস ক্ষমতায় ছিল, সে যুগের গল্প এমনভাবে শোনানো হয় যেন সে এক স্বর্ণযুগ ছিল। সেই শুণ্ডির মত মাঠে মাঠে ফসল, গাছে গাছে পাখি। লালু ক্ষমতায় এলেন আর বিহার ছারখার হয়ে গেল। অথচ পশুখাদ্য মামলায় কারাদণ্ডপ্রাপ্ত, অধুনা প্রয়াত জগন্নাথ মিশ্র কংগ্রেস আমলেই মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন। ভারতের আর সব রাজ্যের রাজনীতি যেন একেবারে শীতকালের ডাউকি লেকের মত স্বচ্ছ এবং সমাজবিরোধীমুক্ত। নিঃসন্দেহে লালুর আমলে দুর্নীতি হয়েছে, গুন্ডারা অনেককিছু নিয়ন্ত্রণ করেছে। কিন্তু লালুর রাজনীতি যদি শুধু ওটুকুই হত, তাহলে ভারতের আর পাঁচজন নেতার সঙ্গে তাঁর তফাত থাকত না। ২০২৪ সালের নির্বাচনে মোদীকেও ঘুরে ফিরে তাঁকে আক্রমণ করতে হত না। কেন লালুর নীতি আর শিক্ষা ভদ্দরলোকেরা দেখতে পান না তা বুঝতে পারলেই মোদী কেন লালুকে ভুলতে পারেন না তা বোঝা যাবে।

পশুখাদ্য কেলেঙ্কারি আজকের টাকার হিসাবে মোটামুটি ৪,০০০ কোটি টাকার কেলেঙ্কারি, যাতে তাঁর সময়ের আগের সরকারও যুক্ত ছিল। এর চেয়ে অনেক বড় বড় কেলেঙ্কারি ভারতে ঘটে গেছে। যে সেচ কেলেঙ্কারিতে মহারাষ্ট্রের বর্তমান উপমুখ্যমন্ত্রী অজিত পাওয়ার যুক্ত বলে অভিযোগ, তা ৭০,০০০ কোটি টাকার ব্যাপার। ২জি স্পেকট্রাম বরাদ্দ করা নিয়ে দুর্নীতিতে দেশের ১,৭৬,০০০ কোটি টাকা লোকসান হয়েছে বলে অভিযোগ করেছিলেন তৎকালীন কম্পট্রোলার অ্যান্ড অডিটর জেনারেল বিনোদ রাই। পশ্চিমবঙ্গের সারদা কেলেঙ্কারি যে ঠিক কত টাকার ব্যাপার তা আজও পরিষ্কার নয়, নিয়োগ কেলেঙ্কারির হিসাব বোধহয় কোনোদিন পাওয়াই যাবে না। তবে আমরা প্রাক্তন শিক্ষামন্ত্রীর বান্ধবীর ফ্ল্যাট থেকে নগদ ৫০ কোটি টাকা উদ্ধার হতে দেখেছি। তা এইসব বড় বড় দুর্নীতিতে অভিযুক্ত নেতাদের কী হয় সাধারণত? কিচ্ছু হয় না। অজিত নিজের দলকে দুভাগ করে বিজেপির সঙ্গে হাত মিলিয়ে নিয়ে ধপধপে সাদা হয়ে গেছেন। আদর্শ আবাসন কেলেঙ্কারিতে অভিযুক্ত কংগ্রেস নেতা অশোক চ্যবনও বিজেপির ওয়াশিং মেশিনে সাফসুতরো হয়ে গেছেন। স্পেকট্রাম কেলেঙ্কারিতে ডিএমকে নেতা এবং তৎকালীন টেলিকম মন্ত্রী এ রাজাকে বিচারাধীন বন্দি হিসাবে কারাবাস করতে হয়েছিল বটে, কিন্তু অভিযোগটা আদৌ প্রমাণ করা যায়নি। নারদ কেলেঙ্কারি অত টাকার ব্যাপার নয়, কিন্তু ক্যামেরার সামনে হাত পেতে টাকা নেওয়া নেতাদের শাস্তি দেওয়ার ব্যাপারে কোনো পক্ষের কোনো উৎসাহ নেই। সেই নেতারা তারপরেও নির্বাচনের টিকিট পেয়েছেন, ভোটারদের ভোটও পেয়েছেন। শুভেন্দু অধিকারী তো দল বদলে পশ্চিমবঙ্গের বিরোধী দলনেতা পর্যন্ত হয়ে গেছেন। আর পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রীর দলের বড়, মেজ, সেজ, ছোট সবরকম নেতাই দুর্নীতিতে যুক্ত বলে অল্পবিস্তর প্রমাণ হওয়ার পরেও মমতা সততার প্রতীক বলে ভদ্দরলোকেরা এখনো বিশ্বাস করেন। অর্থাৎ ধরে নেওয়া যায় এঁদের সকলকেই ক্ষমাঘেন্না করে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু লালু তাঁর পুরনো বন্ধু নীতীশ কুমারের মত এক বা একাধিকবার পক্ষ বদল করে কংগ্রেস বা বিজেপির ওয়াশিং মেশিনে ঢুকে পরিষ্কার হয়ে বেরিয়ে আসেননি। সম্ভবত তাই তিনি কেবল অভিযুক্ত নন, শাস্তিপ্রাপ্ত। উপরন্তু একথাও প্রমাণিত যে তাঁকে মন্ত্রিত্বের প্রলোভন দেখিয়ে বা ইডি, সিবিআইয়ের ভয় দেখিয়ে দলে টানা যায় না। স্বভাবতই তিনি এক দেশ, এক নির্বাচন, এক দল করতে চাওয়া একনায়কের মাথাব্যথার কারণ।

আরও পড়ুন যেন ভুলে না যাই, বেদনা পাই

কিন্তু এ তো নেহাত ব্যবহারিক কারণ। গভীরতর আদর্শগত কারণও আছে। এই যে আমাদের ধারণা – লালু অশিক্ষিত, তাঁর পার্টির লোকেরাও সব অশিক্ষিত। এই ধারণার কারণ কী? কারণ হিন্দি সিনেমা, সিরিয়াল এবং অন্যান্য হিন্দিভাষী নেতাদের মুখে আমরা যে ভাষায় কথা শুনি; লালু সে ভাষায় কোনোদিন কথা বলেন না। তিনি পারতপক্ষে ইংরিজিও বলেন না। কেন্দ্রে রেলমন্ত্রী থাকার সময়ে বাজেট বক্তৃতাও দিতেন হিন্দিতে। মাঝে মাঝে যখন ইংরিজি বলতেন, সে উচ্চারণ ইন্দ্রজিৎ গুপ্ত বা সোমনাথ চ্যাটার্জির মত হত না। মানে গায়ত্রী চক্রবর্তী স্পিভাককে সন্তুষ্ট করতে পারত না। অথচ বিহারের রাজনীতিতে লালু এবং তাঁর দলের উত্থান যথার্থই সাবল্টার্নের উত্থান। প্রান্তিক জনগোষ্ঠী থেকে উঠে এসে নিজের হাবভাব, চালচলন বদলে ফেলা সফল মানুষ অসংখ্য পাওয়া যায়। কিন্তু লালু বিহারের মুখ্যমন্ত্রী হলেন, পরে জাতীয় স্তরে গুরুত্বপূর্ণ নেতা হলেন, রেলমন্ত্রকের গুরুদায়িত্ব সামলালেন পোশাকআশাক তো বটেই, মুখের ভাষাটি পর্যন্ত না বদলে। বিহারের গোপালগঞ্জ জেলার ফুলওয়াড়িয়া গ্রামের কুন্দন রায় আর মরছিয়া দেবীর মেজ ছেলে গোটা জীবন ধরে দেখিয়ে যাচ্ছেন যে দেশোয়ালি ভাষাতেই যাবতীয় রাজনৈতিক, প্রশাসনিক কথোপকথন চালানো যায়। তাঁর ভাষার কারণে কখনোই তাঁর রাজনীতি সবচেয়ে নিচের তলার মানুষটার মাথার উপর দিয়ে বেরিয়ে যায় না। বরং সরসতার কারণে অনেক জটিল বিষয়ও তিনি সকলের বোধগম্য করে দিতে পারেন। আজকাল বড় একটা বেরোন না বাড়ি থেকে, আগেকার মত দীর্ঘ বক্তৃতাও দিতে পারেন না। কিন্তু যেটুকু বলেন সরসভাবেই বলেন এবং বক্তব্যে বিন্দুমাত্র অস্পষ্টতা থাকে না। যেমন যখন ইন্ডিয়া ব্লক গঠনের চেষ্টা চলছিল, তখন এক সভার পর সাংবাদিক সম্মেলনে এসে রাহুলকে উদ্দেশ্য করে বলেছিলেন – আপনি বিয়ে করছেন না কেন? আপনার মা আমাকে বলেছেন, আপনি কথা শুনছেন না, বিয়ে করছেন না। এখনো সময় আছে, বিয়ে করুন। আমরা সবাই বরযাত্রী যাব। উত্তরে রাহুল হেসে বলেন, আপনি যখন বলে দিয়েছেন তখন বিয়ে এবার হয়ে যাবে। কারোর বুঝতে অসুবিধা হয়নি যে লালু আসলে রাহুলকে বিজেপির বিরুদ্ধে জোটে থাকার ব্যাপারে ভরসা দিচ্ছিলেন বয়োজ্যেষ্ঠ নেতা হিসাবে। দিল্লির ক্ষমতার অলিন্দে যে হিন্দি চলে, লালু তার ধারে কাছে গেলেন না কোনোদিন। ফলে দেশের উচ্চবর্গচালিত সংবাদমাধ্যম চিরকাল তাঁকে অশিক্ষিত বলে প্রচার করে গেল। লালু সকলকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে নিজের রাজনীতি নিজের মত করে চালিয়ে গেলেন। এ জিনিস এক দেশ, এক ভাষা করতে চাওয়া একনায়ককে যন্ত্রণা দেবে না?

লালুর আরও বড় দোষ হল, তাঁর কথার দাম আছে। তিনি নীতীশের মত পালটি খান না, মমতার মত ক্ষমতায় আসার জন্যে ‘বাংলাদেশ থেকে অনুপ্রবেশ হচ্ছে’ বলার মত দক্ষিণপন্থী এজেন্ডা গ্রহণ করেন না, হিন্দুত্ববাদী শক্তির হাত ধরেন না। আবার ক্ষমতায় এসে গেলে সংখ্যালঘু ভোটের কথা ভেবে মুসলমানদরদীও সাজেন না। তিনি হিন্দুত্ববাদের বিরুদ্ধে চিরকাল কথা বলেন এবং কাজ করেন। তিনি একমাত্র মুখ্যমন্ত্রী যিনি গোটা দেশে দাঙ্গা লাগিয়ে দেওয়ার উদ্দেশ্য নিয়ে বেরিয়ে পড়া লালকৃষ্ণ আদবানির রথ থামিয়ে তাঁকে গারদে পুরে দিয়েছিলেন। গত শতকের শেষ প্রান্তে যখন বারবার ত্রিশঙ্কু লোকসভা হচ্ছিল, তখন জয়প্রকাশ নারায়ণের অনেক শিষ্যই নিজেদের অবস্থান বদলেছেন নানা অজুহাতে। ক্ষমতার স্বাদ পেয়েছেন। কিন্তু লালু কখনো ধর্মনিরপেক্ষতার পক্ষ ত্যাগ করেননি। তিনি বা তাঁর দলের নেতারা মন্ত্রিত্ব পেলেন কিনা সে প্রশ্ন কখনো তাঁর কাছে বড় হয়ে ওঠেনি।

লালুই যে ভারতের ইতিহাসে সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত নেতা – এ সম্পর্কে দেশের সাংবাদিককুল, রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞ এবং ভদ্দরলোকেরা এত নিশ্চিত যে তাঁকে নিয়ে নানাবিধ কৌতুক কাহিনি চালু আছে। যেমন

লালু একবার সংসদের প্রতিনিধি দলের সদস্য হয়ে বিদেশে গিয়েছিলেন। সে দেশের এক সাংসদের বাড়িতে গেছেন। জানতে চেয়েছেন, আপনাদের এখানে করাপশন নেই?

সাংসদ বলেছেন, আলবাত আছে।

কীরকম?

ওই দূরে একটা নদী দেখতে পাচ্ছেন?

পাচ্ছি।

তার উপরে একটা ব্রিজ?

হ্যাঁ।

ফিফটি পার্সেন্ট।

পরের বছর সেই সাংসদ ভারতে এসে লালুর বাড়িতে গেছেন। জিজ্ঞেস করেছেন, আপনাদের এখানে করাপশন নেই?

আলবাত আছে।

কীরকম?

ওই দূরে একটা নদী দেখতে পাচ্ছেন?

পাচ্ছি।

তার উপরে একটা ব্রিজ?

কই, না তো!

হান্ড্রেড পার্সেন্ট।

এসব গল্প বাঙালি ভদ্রজনের আড্ডায় আসর মাতিয়ে রেখেছে বছর তিরিশেক হল। অথচ এই লালু রেলমন্ত্রী থাকাকালীনই ক্ষতিতে চলা ভারতীয় রেল লাভের মুখ দেখেছিল। তাঁর কর্মপদ্ধতি বিজনেস ম্যানেজমেন্ট প্রতিষ্ঠানগুলোতে পড়ানো শুরু হয়েছিল। এমনকি হার্ভার্ড বিজনেস স্কুল থেকেও তাঁকে ছাত্রছাত্রীদের সামনে বলতে ডাকা হয়েছিল। এমন লোককে ‘মেরিট’-এর দোহাই দিয়ে সংরক্ষণ ব্যবস্থাকে গালাগালি করা ভদ্রসমাজের কী করেই বা হজম হবে? লালুর রাজনীতি তো শতকরা একশো ভাগ সংরক্ষণের পক্ষে।

এসব কথা বহু বাঙালির তেতো লাগবে। তথ্য অস্বীকার করতে না পারলেও তাঁরা প্রশ্ন তুলবেন – বিহারের জন্যে লোকটা কী করেছে? একথা ঠিক যে লালুর নেতৃত্বাধীন সরকার বিহারকে অর্থনৈতিকভাবে মহারাষ্ট্র, তামিলনাড়ু বা কেরালার স্তরে নিয়ে যেতে পারেননি। কিন্তু লালু ক্ষমতায় আসার আগে বিহারে সব ভাল ছিল, এ নেহাত গালগল্প। অর্থনীতিবিদ আশিস বোস যখন প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধীর কাছে জমা দেওয়া এক রিপোর্টে দেশের রুগ্ন অংশ হিসাবে BIMARU (বিহার, মধ্যপ্রদেশ, রাজস্থান, উত্তরপ্রদেশ) রাজ্যগুলোর কথা উল্লেখ করেন তখনো লালু ক্ষমতায় আসেননি। লালুর রাষ্ট্রীয় জনতা দল একক ক্ষমতা হারিয়েছে তাও কম দিন হল না। অথচ দেশের সংবাদমাধ্যমের প্রিয় কাজের মানুষ নীতীশ অর্থনীতির ক্ষেত্রে তেমন কোনো নাটকীয় পরিবর্তন আনতে পারেননি বিহারে। পারলে এবারের নির্বাচনেও কর্মসংস্থান বড় ইস্যু হয়ে দাঁড়াত না, কয়েক মাসের সরকারে উপমুখ্যমন্ত্রী থাকা লালুপুত্র তেজস্বীর চাকরি দেওয়ার প্রকল্প তাঁকে বিপুল জনপ্রিয় করে তুলত না। কিন্তু সাহেবরা ঠিকই বলে – ‘Man cannot live with bread only’ (মানুষ কেবল খাবার খেয়ে বাঁচে না)। সুতরাং কেবল অর্থনৈতিক অবদান দিয়েই একজন নেতা বা তাঁর দলের রাজনীতিকে বিচার করা মূর্খামি এবং অন্যায়। লালুর বিহারের মানুষের প্রতি সবচেয়ে বড় অবদান আজকের লব্জে যাকে ‘উন্নয়ন’ বলে তার চেয়ে অনেক গভীর, অনেক সুদূরপ্রসারী।

মনে রাখতে হবে, লালু এমন এক পরিবারের ছেলে, যাদের জন্যে গ্রামে জলের কলটা পর্যন্ত আলাদা হত। বিশিষ্ট সাংবাদিক রাহুল শ্রীবাস্তব গতবছর এক অনুষ্ঠানে বলেছিলেন, লালু যখন প্রথমবার মুখ্যমন্ত্রী হন, নিজের মাকে খবরটা দিতে গিয়ে বলেন ‘মা, আমি হাতুয়ার রাজা হয়ে গেছি’। হাতুয়া তাঁর গ্রামের সবচেয়ে নিকটবর্তী বড় জায়গা। মা লেখাপড়া জানেন না, প্রান্তিক পরিবারের গৃহবধূ। মুখ্যমন্ত্রী মানে কী, তা তিনি বুঝবেন না। তাই লালুকে ওভাবে বলতে হয়েছিল। কিন্তু ওই অবস্থা থেকে ক্ষমতা হাতে পেয়ে অনেকেরই মাথা ঘুরে যায়। নিজের জীবনযাত্রার মান উন্নত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে নিজের মত মানুষের থেকে সচেতনভাবেই তারা দূরে সরে যায়। লালুর বিশেষত্ব হল তিনি তা করেননি। জাতপাত এখনো বিহারে যথেষ্ট বড় বিষয়। সরকারি দফতরেও উঁচু জাতের চাপরাশি নিচু জাতের অফিসারকে খাওয়ার জল দেয় না। কিন্তু এই ব্যবস্থার মূলে লালুর আমলে যেভাবে কুঠারাঘাত করা হয়েছে তা ঐতিহাসিক। আট বা নয়ের দশকে বিহারে যাতায়াত ছিল এমন লোকেদের কাছে শোনা যায়, বাসে উঁচু জাতের লোক উঠলে নিচু জাতের লোকেদের উঠে দাঁড়িয়ে বসার জায়গা দিতে হত। সেসব লালুর আমলে তুলে দেওয়া হয়। একদিনে হয়নি। প্রবীণ সাংবাদিকরা বলেন, লালু মুখ্যমন্ত্রী থাকাকালীন যখন নিজের বাসভবনে জনতার সঙ্গে দেখা করতেন, উঁচু জাতের আইএএস বা আইপিএস পদমর্যাদার অফিসারদের দিয়ে খৈনি ডলাতেন। অনেকেই অপমানিত বোধ করতেন এবং অপমান করাই লালুর উদ্দেশ্য ছিল। তিনি উঁচু জাতের অফিসারদের এবং সামনে উপস্থিত নানা জাতের গরিবগুরবো মানুষকে বার্তা দিতে চাইতেন, যে জাত কোনো ব্যাপার নয়। যে পদে আছে, তাকে সবাই মানতে বাধ্য। উঁচু জাত বলে ছাড় পাবে না।

রাহুল শ্রীবাস্তবেরই বলা মুখ্যমন্ত্রী লালুর দুটো কীর্তির কথা বলে শেষ করি। বোঝা যাবে, লালু যখন থাকবেন না, কেন তখনো মোদীর মত ব্রাহ্মণ্যবাদীরা লালুর ভূত দেখবে।

লালু হঠাৎ কিছুদিন রাতের বেলা সুট, বুট, হ্যাট পরে পুরোদস্তুর সাহেব সেজে পাটনার আশপাশের ইটভাটাগুলোতে যাওয়া শুরু করেছিলেন। কারণ তাঁর কাছে খবর ছিল, উচ্চবর্ণের বাবুরা ইটভাটায় রাতে আসর জমান আর বিছানায় তাঁদের শিকার হতে হয় নিম্নবর্গীয় মহিলাদের। লালু স্বয়ং দলবল নিয়ে উপস্থিত হয়ে টানা কিছুদিন উত্তম মধ্যম দেওয়ার পরে বাবুদের মহফিল বন্ধ হয়।

দ্বিতীয় ঘটনা অভিজাত পাটনা ক্লাব নিয়ে। কলকাতার বেঙ্গল ক্লাব বা ক্যালকাটা ক্লাবের মতই ওটাও অভিজাতদের আয়েশ করার জায়গা। তফাত বলতে সব বর্ণের লোককে ঢুকতে দেওয়া হত না। লালু ডিস্ট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেটকে ডেকে বলেন, ওই ক্লাব আমি বন্ধ করে দেব সবাইকে ঢুকতে না দিলে। তারপর ক্লাবের নিয়ম ভেঙে প্রথম যে অসবর্ণ পরিবারের বিয়ের অনুষ্ঠান হয় ওই ক্লাবে, তারা জাতিতে ডোম।

পিপলস রিপোর্টার ওয়েবসাইটে প্রকাশিত

হিন্দুরাষ্ট্রের ক্রিকেট দলের কোচ হিসাবে গম্ভীর সেরা পছন্দ

২০১৫-১৬ মরশুমে গম্ভীর যখন দিল্লি দলের অধিনায়ক তখন প্রত্যেক দিন খেলার শুরুতে তিনি ও কোচ বিজয় দাহিয়া গোটা দলকে দিয়ে সূর্যপ্রণাম করাতেন।

ভালমানুষ রাহুল দ্রাবিড় আর পেরে উঠছেন না। তাই ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড পুরুষদের জাতীয় দলের নতুন কর্ণধারের খোঁজ করছে। শোনা যাচ্ছে বোর্ড একজন শাঁসালো কোচ চায়। স্টিফেন ফ্লেমিংকে নাকি মহেন্দ্র সিং ধোনি রাজি করানোর চেষ্টা করছেন। রিকি পন্টিংকে নাকি বোর্ডের পক্ষ থেকে প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু তিনি রাজি নন। জাস্টিন ল্যাঙ্গারও রাজি হচ্ছেন না বলে শোনা যাচ্ছে। এসব অবশ্য নেহাত গুজব বলে বিবৃতি দিয়েছেন বোর্ডের সর্বেসর্বা জয় শাহ। তবে গৌতম গম্ভীরের নাম যে উঠে এসেছে, এই প্রচার সম্পর্কে কিছু বলেননি। এই কাজের জন্যে ওই নামটি কিন্তু কৌতূহলোদ্দীপক।

গৌতম সত্যিই গম্ভীর। তাঁকে চট করে হাসতে দেখা যায় না। সম্প্রতি রবিচন্দ্রন অশ্বিনের পডকাস্টে এসে গৌতম বলেছেন ‘লোকে আমার হাসি দেখতে আসে না। আমার জয় দেখতে আসে।’ ফুর্তিবাজ রবি শাস্ত্রীর সঙ্গে এতবছর ঘর করার পরে রোহিত শর্মা, বিরাটরা কি এত গম্ভীর লোকের সঙ্গে মানিয়ে চলতে পারবেন? গুরুতর প্রশ্ন।

গম্ভীরের কথা উঠলেই এসে পড়ে বিরাটের কথাও। দুজনেই দিল্লির ছেলে। শুধু জাতীয় দল নয়, রঞ্জি দলেও একসঙ্গে খেলেছেন। কিন্তু সম্পর্ক আদায় কাঁচকলায়। প্রাক্তন ক্রিকেটারদের যে কজন আজও বিরাটের ব্যাটিংয়ের সমালোচনা করার সাহস দেখান, গম্ভীর তাঁদের একজন। গতবছর আইপিএলে গম্ভীরের তখনকার দল লখনৌ সুপার জায়ান্টস আর বিরাটের রয়্যাল চ্যালেঞ্জার্স ব্যাঙ্গালোর ম্যাচের পর তো হাতাহাতির উপক্রম হয়েছিল। ভারতীয় ক্রিকেটের বর্তমান মহাতারকার সঙ্গে এমন সম্পর্ক যাঁর, তিনি কী করে দল চালাবেন? কুম্বলের সময়ে  অবশ্য বিরাট অধিনায়ক ছিলেন, এখন সে ঝামেলা নেই। কিন্তু এই প্রজন্ম তো আবার সৌরভ গাঙ্গুলিদের প্রজন্ম নয়। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে মাত্র হাজার নয়েক রানের মালিক জন রাইট তাঁর ইন্ডিয়ান সামার্স বইয়ে লিখেছেন, ভারতীয় দলের কোচ থাকার সময়ে তিনি একবার খারাপ শট খেলে আউট হওয়ার জন্যে রাগের চোটে বীরেন্দ্র সেওয়াগের কলার ধরেছিলেন, মারতে গিয়েছিলেন। অথচ সেই ঘটনা দায়িত্ব ছেড়ে দেওয়ার বহুবছর পরে রাইট নিজেই লেখার আগে কেউ জানতেও পারেনি। আজ এর অর্ধেক ঘটলেও সোশাল মিডিয়ায় ‘সূত্রের খবর’ বলে ঘটনাটা ভাইরাল হবে, বোর্ড বিবৃতি দেবে এমন কিচ্ছু ঘটেনি। কিন্তু কোচের চাকরিটি চলে যাবে।

গম্ভীর যে কোচ হওয়ার যোগ্য তাতে সন্দেহ নেই। ২০০৭ আর ২০১১ – দুই ধরনের ক্রিকেটে ভারতের দুই বিশ্ব খেতাব জয়েই তাঁর বড় অবদান ছিল। দুটো ফাইনালেই তিনি সর্বোচ্চ রান করেন। আটান্নটা টেস্ট ম্যাচেও তাঁর কীর্তি ফেলে দেওয়ার মত নয়। আর কিচ্ছু না করে শুধু যদি ২০০৯ সালে নিউজিল্যান্ডের নেপিয়ারে এগারো ঘন্টা ব্যাট করে ম্যাচ বাঁচানো ইনিংসটাই খেলতেন, তাহলেও তাঁর নাম ভারতীয় ক্রিকেটের ইতিহাসে লেখা থাকত। তার উপর তিনি দুবার কলকাতা নাইট রাইডার্স অধিনায়ক হিসাবে আইপিএল খেতাব জিতেছেন। লখনৌ সুপার জায়ান্টস তাঁর মেন্টরশিপে আইপিএলে যোগ দিয়েই শেষ চারে পৌঁছেছিল। ফলে দল চালানোর ক্ষমতা যে তাঁর আছে, তা নিয়েও সংশয় নেই।

কিন্তু ভারতীয় দল আর পাঁচটা দলের চেয়ে আলাদা। অস্ট্রেলিয় ল্যাঙ্গার অতশত বোঝেন না। তিনি সরল মনে সংবাদমাধ্যমকে বলে বসেছেন, কে এল রাহুল নাকি তাঁকে বলেছেন – আইপিএলের দলে যদি চাপ আর রাজনীতি আছে বলে মনে করো, সেটাকে হাজার দিয়ে গুণ করলে তবে ভারতীয় দলের কোচিং কীরকম চাপের সেটা বুঝতে পারবে। তাই ল্যাঙ্গার ঠিক করেছেন ও কাজ তাঁর জন্যে নয়।

বলে ফেলার জন্যে রাহুলের হয়ত গর্দান যাবে, কিন্তু কথাটা অক্ষরে অক্ষরে সত্যি। প্রসিদ্ধ আন্তর্জাতিক ক্রিকেট পত্রিকা উইজডেন-এর সাম্প্রতিক সংখ্যায় বর্ষীয়ান সাংবাদিক শারদা উগ্রা ‘মোদী অপারেন্ডি: দ্য পলিটিসাইজেশন অফ ইন্ডিয়ান ক্রিকেট’ শীর্ষক নিবন্ধে সবিস্তারে লিখেছেন, কীভাবে ক্রিকেট বোর্ডকে বিজেপি দলের একটা ইউনিটে পরিণত করা হয়েছে। ২০২৩ বিশ্বকাপকেও কীভাবে বিজেপির স্বার্থে চালানো হচ্ছিল। সবচেয়ে চমকপ্রদ ঘটনা – ২০২৩ বিশ্বকাপে পাকিস্তান ম্যাচে নীল জার্সির বদলে সম্পূর্ণ গেরুয়া জার্সি পরতে বলা হয়েছিল ভারতীয় দলকে। কিন্তু ক্রিকেটাররা বেঁকে বসেন। কেন? শারদা দুটো সূত্র থেকে দুরকম খবর পেয়েছেন। একটা বলছে, ক্রিকেটাররা ওই জার্সি বাতিল করেন জার্সিটা হল্যান্ডের মত দেখতে বলে। দ্বিতীয়টা বলছে, ক্রিকেটাররা বলেন – এ কাজ আমরা করব না। এতে আমাদের দলের ক্রিকেটারদেরই অসম্মান করা হবে। কারণ ভারত বনাম পাকিস্তান ম্যাচ দৃশ্যতই হয়ে দাঁড়াবে হিন্দু বনাম মুসলমান ম্যাচ। অথচ ভারতীয় দলে আছেন মহম্মদ শামি আর মহম্মদ সিরাজ। অনেক পাঠকের হয়ত খেয়াল আছে, ওই গেরুয়া জার্সির ছবি সোশাল মিডিয়ায় প্রকাশ পেয়ে গিয়েছিল। তখন বোর্ডের হিসাবরক্ষক বলেছিলেন, ওটা ভুয়ো। কিন্তু শারদা লিখেছেন, দল, ক্রিকেট বোর্ড এবং আন্তর্জাতিক নিয়ামক সংস্থা আইসিসি – তিনটে সূত্র থেকে তিনি খবর পেয়েছেন যে এমন পরিকল্পনা সত্যিই নেওয়া হয়েছিল।

আগামী ৪ জুন নরেন্দ্র মোদী ক্ষমতায় ফিরলে হয়ত ভারতীয় দলের ক্রিকেটাররা জার্সির রং বদল আর আটকাতে পারবেন না। এমন একটা সময়ে দাঁড়িয়ে মনে হয়, গম্ভীরই দ্রাবিড়ের স্থলাভিষিক্ত হওয়ার উপযুক্ত লোক। কারণ তিনি ‘মোদী কা পরিবার’-এর গর্বিত সদস্য, বিদায়ী লোকসভায় বিজেপি সাংসদও ছিলেন। জাতীয় ক্রিকেট দলের লাগাম নিজেদের হাতে রাখতে গেলে মোদীর তো গম্ভীরকেই দরকার। যদি মোদী ক্ষমতায় না ফেরেন তাহলে গম্ভীরের গুরুত্ব আরও বেড়ে যাবে। কারণ একটা নির্বাচনে হার হলেই দেশের জন্যে মোদীর এক হাজার বছরের পরিকল্পনার পরিসমাপ্তি ঘটবে না। ভারতীয় সংস্কৃতির সমস্ত অভিজ্ঞান শরীরে ধারণ করা ক্রিকেট দল যাতে বেপথু না হয়ে যায়, তার জন্যে তো গম্ভীরের মত নির্ভরযোগ্য লোককেই দরকার। ভুললে চলবে না, ২০১৫-১৬ মরশুমে গম্ভীর যখন দিল্লি দলের অধিনায়ক তখন প্রত্যেক দিন খেলার শুরুতে তিনি ও কোচ বিজয় দাহিয়া গোটা দলকে দিয়ে সূর্যপ্রণাম করাতেন। এক সাংবাদিক দাহিয়াকে বলেছিলেন যে কাণ্ডটা দেখে ইনজামাম উল হকের নেতৃত্বাধীন পাকিস্তান দলের মাঠেই নমাজ পড়ার মত হয়ে যাচ্ছে। দাহিয়া বলেছিলেন, মোটেই তা নয়। সূর্যপ্রণামটা নাকি ব্যক্তিগত পছন্দের ব্যাপার। ওতে চাপ কমে, মন শান্ত হয়।

সরকার হাতে থাক আর না-ই থাক, এই ‘পরম্পরা, প্রতিষ্ঠা, অনুশাসন’ তো বজায় রাখতে হবে জাতীয় ক্রিকেট দলে। তার জন্যে গম্ভীরের চেয়ে উপযুক্ত আর কে আছে?

এই সময় কাগজে প্রকাশিত

এই নির্বাচনে দেশ পশ্চাদপসরণ আটকাতে লড়ছে, কিন্তু পশ্চিমবঙ্গ?

মূল্যবৃদ্ধি, কর্মসংস্থানের অভাব, ধনী-দরিদ্রের ব্যবধান বৃদ্ধি, নির্বাচনী বন্ডের মত ইস্যু নিয়ে কথা বললে নিজেরই ফাঁপরে পড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা – একথা বুঝেই কি মমতা শেষ দু-তিন দফার নির্বাচনে পশ্চিমবঙ্গে প্রাসঙ্গিক করে তুললেন ধর্মীয় সংগঠনগুলোকে?

গোপালকৃষ্ণ গোখেলের একটা বাক্যকে সম্বল করে আমরা পশ্চিমবঙ্গের বাঙালিরা প্রায় একশো বছর ধরে রেলা নিয়েই চলেছি – ‘হোয়াট বেঙ্গল থিঙ্কস টুডে, ইন্ডিয়া থিঙ্কস টুমরো’ (বাংলা আজ যা ভাবে, ভারত কাল তা ভাবে)। অথচ কথাটা বহুদিন হল অর্থহীন হয়ে গেছে। একে তো গোখেল যে বাংলার কথা বলেছিলেন, সে বাংলার অর্ধেকটা এখন আলাদা দেশ। তার উপর বাংলার রাজনীতির সর্বভারতীয় রাজনীতিকে প্রভাবিত করার ক্ষমতাও দীর্ঘকাল হল অন্তর্হিত। বাংলার সাংসদদের সমর্থন ছাড়া সরকার পড়ে যাবে – এমন সরকার দিল্লিতে শেষবার হয়েছিল ২০০৪ সালে। বাংলার রাজনীতিতে যোগ্য রাজনীতিবিদের এখন এতই আকাল, যে প্রধান বিরোধী দল তো বটেই, পরপর তিনবার বিপুল সমর্থন নিয়ে ক্ষমতায় আসা শাসক দলকেও নির্বাচনে প্রার্থী বেছে নিতে বারবার বাংলা সিনেমা বা বাংলার ক্রিকেট, ফুটবলের দ্বারস্থ হতে হয়। সব কুড়িয়ে কাচিয়েও ৪২ খানা আসনে বাংলা থেকে প্রার্থী দিয়ে উঠতে পারেনি বাঙালির শাসক দল, কিছু শূন্যস্থান রয়েই গিয়েছিল। সেগুলো পূরণ করতে বিহার থেকে প্রাক্তন বলিউড অভিনেতা, গুজরাট থেকে প্রাক্তন ক্রিকেটার ডেকে আনতে হয়েছে। অথচ ২০২১ বিধানসভা নির্বাচনে এই দলেরই প্রচারের অন্যতম অভিমুখ ছিল – তৃণমূল কংগ্রেসই বাঙালির দল। দেয়ালে দেয়ালে লেখা হয়েছিল স্লোগান – ‘বাংলা নিজের মেয়েকেই চায়’। এখন দেখা যাচ্ছে, কয়েকজন ‘পরের ছেলে’-কে পাশে দাঁড় না করালে নিজের মেয়ের কাজ চলে না।

এ অবস্থাতেও গত এক দশকে বাঙালি বামপন্থী ও উদারপন্থীদের গর্বের শেষ ছিল না কিছু ব্যাপার নিয়ে – এ রাজ্যের রাজনীতি গোবলয়ের মত নয়। এখানে নাকি জাতপাতের রাজনীতি চলে না, হিন্দুত্ব চলে না, ধর্ম নির্বাচনে কোনো ইস্যু হয় না, আরও নানা ভাল ভাল ব্যাপার।

কিন্তু সেই ২০১১ সাল থেকেই দেখা গেছে যে মতুয়ারা বাংলার ভোটে যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ। এখন দেখা যাচ্ছে কুড়মিরাও আলাদা করে গুরুত্বপূর্ণ।

হিন্দুত্বও দিব্যি চলে। নইলে রামনবমী এলেই দাঙ্গা, বকরি ঈদ এসে পড়লেই সোশাল মিডিয়ায় হিন্দু ধর্মনিরপেক্ষদের নিরীহ গবাদি পশুদের জন্যে প্রাণ কেঁদে ওঠা, সর্বোপরি বিধানসভায় ৭৭ খানা আসন পেয়ে হিন্দুত্ববাদী ভারতীয় জনতা পার্টির প্রধান বিরোধী দল হয়ে বসা সম্ভব হত না। ২০২১ সালের ফলাফল দেখে যে সরলমতি ধর্মনিরপেক্ষ বাঙালিরা হিন্দুত্ববাদী শক্তিকে আটকে দিলেন ভেবে প্রবল আত্মপ্রসাদ অনুভব করেছেন, তাঁরা আসলে কল্পনার জগতে বাস করেন। নইলে নির্বাচন কমিশনের ওয়েবসাইটে গিয়ে দেখে নিতে পারতেন – কতগুলো আসনে কয়েকশো, হাজার দুয়েক, হাজার তিনেক – এরকম ব্যবধানে ফয়সালা হয়েছিল। একটা আসনে তো সাত ভোটের ব্যবধানেও ফয়সালা হয়েছিল। প্রকৃতপক্ষে তৃণমূল কংগ্রেসকে জিতিয়েছিল জনকল্যাণমূলক কর্মসূচি আর আতঙ্কিত সংখ্যালঘু মানুষের ভোট। সংখ্যাগুরু বাঙালির দুর্গাপুজোর সময়ে চাগাড় দিয়ে ওঠা ‘ধর্ম যার যার উৎসব সবার’ মার্কা বাছাই করা ধর্মনিরপেক্ষতা নয়।

ধর্মকে যে পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনে ইস্যু করে তোলা যায় তা গত দেড় দশকে নিঃসংশয়ে প্রমাণিত হয়েছে। গত বিধানসভা নির্বাচনে নন্দীগ্রাম কেন্দ্রে মুখ্যমন্ত্রীর বিরুদ্ধে শুভেন্দু অধিকারীর বিষাক্ত প্রচার জয়যুক্ত হওয়ার পর আর বাঙালিদের বড় বড় কথা না বলাই ভাল। বিজেপি আইটি সেলের তৈরি মমতাকে ‘মমতাজ’ নাম দিয়ে নানারকম রসিকতা যেভাবে কট্টর সিপিএম সমর্থকরাও হোয়াটস্যাপ, ফেসবুকে শেয়ার করেন তাতে ধর্মের মদ এক চুমুকও খায় না এমন বাঙালি খুঁজে পাওয়া যে দুষ্কর হয়ে উঠেছে তা অস্বীকার করা মানে নিজেকে ঠকানো।

সুতরাং গুজরাট-রাজস্থান-উত্তরপ্রদেশ-মধ্যপ্রদেশ-বিহার-ঝাড়খণ্ডের নাগরিকদের যে জাতপাত নির্ভরতা, যে রাজনৈতিক সচেতনতার অভাব, যে ধর্মসর্বস্বতায় অভিযুক্ত করে এসেছে সুমিত, প্রমিত বাঙালি; এবারের নির্বাচনে গোটা দেশের মধ্যে পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনেই সেই দোষগুলো সবচেয়ে বেশি দেখা যাচ্ছে। বাকি দেশের সঙ্গে ব্যবধান চোখে পড়ার মত বেশি। কী রাজনৈতিক দলগুলোর প্রচারে, কী মূলধারার সংবাদমাধ্যমগুলোর অবস্থানে, গোটা দেশের প্রবণতার বিপরীতে চলছে বাংলার ভোট।

বাকি দেশের নির্বাচনী প্রচারের দিকে তাকালে সাদা চোখেই দেখা যাচ্ছে, নরেন্দ্র মোদী ২০১৪ আর ২০১৯ সালের মত আলেখ্য নির্মাণ ও নিয়ন্ত্রণ করার খেলায় হেরে গেছেন। মোদী কি গ্যারান্টি নামের ইশতেহার প্রকাশ করে বিকশিত ভারতের প্রতিশ্রুতি দিয়ে শুরুটা ভালই করেছিলেন। কিন্তু অনতিবিলম্বেই – কংগ্রেসের ইশতেহারে সম্পত্তি কেড়ে নেওয়ার কথা আছে, ওটা মুসলিম লিগ মার্কা ইশতেহার, ওরা হিন্দুদের সম্পত্তি শুধু নয় মহিলাদের মঙ্গলসূত্র পর্যন্ত ছিনিয়ে নিয়ে মুসলমানদের দিয়ে দেবে – এইসব আষাঢ়ে গল্প বলতে শুরু করেন। শেষপর্যন্ত নির্বাচনে ফলাফল যা-ই হোক,

এইসব ভুয়ো তথ্য ছড়িয়েও যে মোদী প্রত্যাশিত মাত্রায় ভোট আদায় করতে পারছেন না, তার প্রমাণ হল তিনি আবার মাঝে এক সাক্ষাৎকারে বলে বসেছেন, যে তিনি কখনো সাম্প্রদায়িক প্রচার করেন না। যেদিন করবেন সেদিন জনজীবনে থাকার অধিকার হারাবেন। পরদিন আবার জনসভায় ঘৃণা ছড়ানোর কাজে ফিরে গেছেন। ফলে রাহুল গান্ধী বলতে বাধ্য হয়েছেন, মোদীজি কি গজনী হয়ে গেছেন? কিছুই মনে থাকে না!

কিন্তু এত আক্রমণ সত্ত্বেও কংগ্রেস বা তার জোটসঙ্গী রাষ্ট্রীয় জনতা দল, সমাজবাদী পার্টি, ডিএমকে, জেএমএম, সিপিআই, সিপিএম, লিবারেশন এই সাম্প্রদায়িক কাদা ছোড়াছুড়িতে প্রশ্রয় দেয়নি। তারা কেবলই সংবিধান বাঁচানোর কথা, জাতভিত্তিক আদমশুমারির প্রতিশ্রুতির কথা, বিপুল বেকারত্ব, মূল্যবৃদ্ধি, কৃষকদের দুর্দশার কথা বলে যাচ্ছে। নিজেরা ক্ষমতায় এলে এসবের কী সমাধান করবে তার উত্তরও বেশ বিস্তারিতভাবেই কংগ্রেস ও অন্যান্য বিরোধী দলগুলো দিয়ে চলেছে। উত্তরপ্রদেশে যোগী আদিত্যনাথের রাজত্বে চাকরির পরীক্ষা হলেই প্রশ্ন ফাঁস হয় যায় বলে অভিযোগ, কিন্তু আদিত্যনাথ প্রিয় মোদীজির জন্যে যে বিরোধীদের এই প্রশ্নপত্র আসতে চলেছে তা আগে থেকে জেনে উঠতে পারেননি বোধহয়। ফলে তথাকথিত দারুণ বক্তা মোদীকে এবার নির্বাচনে আক্ষরিক অর্থেই কান্নাকাটি করতে হচ্ছে। মাতৃগর্ভে জন্মাননি, পরমাত্মা থেকে সরাসরি জন্ম হয়েছে – এসব রূপকথার গল্পই তাঁর নির্বাচনী প্রচার হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে ডিসেম্বর মাসে বিধানসভা নির্বাচনের ফল বেরোবার পর যেসব নির্বাচন-জ্যোতিষী এবং সাংবাদিক ঘোষণা করে দিয়েছিলেন বিজেপি ২০২৪ জিতেই গেছে, তাঁরা এখন সাবধানী সুরে কথা বলছেন।

অন্যদিকে পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনী প্রচারের দিকে তাকিয়ে দেখুন। নীতীশ কুমার কেটে পড়ার পরে ইন্ডিয়া ব্লককে তাসের ঘরের মত মনে হচ্ছিল। কিন্তু অতি গুরুত্বপূর্ণ তিনটে রাজ্যেই শেষপর্যন্ত জমাট জোট হয়েছে – উত্তরপ্রদেশ, বিহার, মহারাষ্ট্র। বিশ্লেষকরা প্রায় সকলেই একমত যে এবারের ভোটের ফল নির্ধারিত হবে পাঁচটা রাজ্যের ফল দিয়ে। উপরিলিখিত তিনটে, কর্ণাটক আর পশ্চিমবঙ্গ। কর্ণাটকে কংগ্রেস সদ্য বিপুল ভোটে বিধানসভা নির্বাচনে জিতে সরকারে এসেছে, তার উপর বিজেপির জোটসঙ্গী জেডিএসের হাসান কেন্দ্রের সাংসদ প্রোজ্জ্বল রেবন্নর পর্যায়ক্রমিক ধর্ষণের কাণ্ড প্রকাশ্যে এসে যাওয়ায় বিজেপি বিপাকে। উত্তরপ্রদেশে সমাজবাদী পার্টির নেতা অখিলেশ যাদব আর রাহুল যেভাবে একসঙ্গে একের পর এক জনসভা করছেন তাতে বিজেপির বিরুদ্ধে যে আন্তরিক লড়াই করছে ইন্ডিয়া ব্লক, তাতে সন্দেহ থাকে না। একই দৃশ্য বিহারেও। সেখানে আরজেডি নেতা তেজস্বী যাদব আর রাহুলের রসায়ন যে দারুণ জমেছে তা বিরাট বিরাট জনসভায় দেখা গেছে। মহারাষ্ট্রেও শেষপর্যন্ত উদ্ধব ঠাকরের শিবসেনা আর শরদ পাওয়ারের এনসিপির সঙ্গে কংগ্রেসের জোট জমাট বেঁধেছে। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে মমতা বলে দিয়েছিলেন ‘এখানে তৃণমূলই ইন্ডিয়া’।

তেরো বছর ক্ষমতায় থাকা মমতা মনেই করেননি তাঁর বিরুদ্ধে রাজ্যের মানুষের কোনো অংশের কোনো অসন্তোষ থাকতে পারে। টানা এতদিন ক্ষমতায় থাকলে যে প্রতিষ্ঠানবিরোধিতার মনোভাব তৈরি হওয়া স্বাভাবিক তাও তিনি বিশ্বাস করেননি। তাই যখন জোটের কথাবার্তা চলছিল তখনো তিনি এবং তাঁর দলের মুখপাত্ররা কংগ্রেস বিজেপিকে হারাতে কত অযোগ্য, রাহুল কতবার সর্বভারতীয় নেতা হয়ে ওঠার চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়েছেন – এইসব বলে নিজেদের ওজনের ভারে কংগ্রেসকে চাপা দেওয়ার চেষ্টা করছিলেন। বিজেপিশাসিত মণিপুর আর আসাম বাদ দিলে এই রাজ্যের সরকারই রাহুলের ন্যায় যাত্রার সময়ে সবচেয়ে বেশি অসুবিধা সৃষ্টি করেছিল। অমুক জায়গায় রাত্রিবাস করা যাবে না, তমুক জায়গা দিয়ে যাওয়া যাবে না – এসব নানাবিধ বায়নাক্কা ছিল প্রশাসনের। এমনকি ন্যায় যাত্রার পালের হাওয়া কেড়ে নিতে ঠিক ন্যায় যাত্রার এলাকাতেই পদযাত্রা করেছিলেন মমতা স্বয়ং। শেষমেশ একতরফা ৪২ আসনেই প্রার্থী ঘোষণা করে দেওয়া হয় ব্রিগেডের জনগর্জন সভা থেকে। তখনো মমতা রীতিমত খড়্গহস্ত ছিলেন কংগ্রেস বা ইন্ডিয়া ব্লকের প্রতি। যুক্তি ছিল, পশ্চিমবঙ্গে কংগ্রেস আর সিপিএম তৃণমূলের বিরুদ্ধে বিজেপির সঙ্গে যোগসাজশে কাজ করে। তাই তাদের সঙ্গে জোট করা যায় না। উপরন্তু তৃণমূল একাই বিজেপিকে হারিয়ে দিতে পারে, বিধানসভায় হারিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে। কংগ্রেসের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব এতৎসত্ত্বেও মমতা সম্পর্কে কড়া মন্তব্য করেননি। মমতাকে যা আক্রমণ করার তা করেছেন প্রদেশ কংগ্রেস নেতারা, বিশেষত সভাপতি অধীররঞ্জন চৌধুরী। মমতা সেটাকেই বিজেপির সহায়তা করা বলে গণ্য করেছেন।

এ পর্যন্ত ঠিকই ছিল। এত প্রবীণ এবং পোড়খাওয়া একজন জননেত্রী যদি মনে করেন তিনি একাই একশো, তাতে আপত্তির কিছু নেই। মুশকিল হল প্রচার শুরু হতেই বাকি ভারতে যে কৌশলে বিজেপিকে কোণঠাসা করার চেষ্টা করছে বিরোধীরা, মমতা তার উল্টো পথে হেঁটেছেন। ফলে রাজ্যের রাজনৈতিক বিতর্কের মান ক্রমশ নিম্নগামী হয়েছে। বাকি ভারতের চেয়েও নিম্নগামী।

বিজেপির কৌশলে অবশ্য কিছুমাত্র বদল হয়নি। তাদের ১৮ জন সাংসদ বলার মত কোনো কাজ করেননি, প্রচারে কী আর বলবেন? বিজেপির সেই ২০১৯ সাল থেকে একটাই কাজ – তৃণমূলকে হিন্দুবিরোধী দল হিসাবে প্রমাণ করার চেষ্টা করে যাওয়া। এবারেও তার ব্যতিক্রম হয়নি। এ কাজে এবার তারা ব্যবহার করল সন্দেশখালির ঘটনাবলীকে। মূল অভিযুক্ত যেহেতু শাহজাহান, তাই তাদের কাজটা সহজ হয়ে গিয়েছিল। প্রচার পর্বের প্রথম দিকটা তৃণমূলকে কেবলই আত্মপক্ষ সমর্থন করে যেতে হয়েছে। বিজেপি কর্মী গঙ্গাধর কয়ালের ভিডিও প্রকাশ্যে আসার পর তৃণমূল আক্রমণে যাওয়ার সুযোগ পায়। কে সত্যি বলছে কে মিথ্যে বলছে তা আমরা জানি না। কিন্তু কোনো পক্ষ অবলম্বন না করেও নিশ্চিতভাবে বলা যায়, বিজেপি ফাঁপরে পড়েছে ওই ভিডিও নিয়ে। বিশেষত যখন মহিলারা একের পরে এক মামলা প্রত্যাহার করতে শুরু করলেন, ভিডিও ক্যামেরার সামনে বললেন তাঁদের ভুল বুঝিয়ে সাদা কাগজে সই করিয়ে পুলিসে অভিযোগ করানো হয়েছিল। বসিরহাট কেন্দ্রের প্রার্থী রেখা পাত্র স্বয়ং বলে বসলেন, রাষ্ট্রপতির কাছে ধর্ষিতা বলে যে মেয়েদের নিয়ে যাওয়া হয়েছে তাদের তিনি চেনেন না। শুভেন্দু অধিকারী, যিনি এই চক্রান্তের মাথা বলে তৃণমূল অভিযোগ করেছে, তিনিও কোনো সদুত্তর দিয়ে উঠতে পারেননি। না পারার আক্রোশে সাংবাদিকদের খিস্তি দিতে পেরেছিলেন কেবল।

কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, বামাল সমেত যদি বিজেপির চক্রান্তকারীরা ধরা পড়েই থাকে, তাহলে তারা গ্রেফতার হল না কেন? গঙ্গাধরবাবু মন মজায়ে লুকালেন কোথায়? পুলিস তাঁকে এই জঘন্য চক্রান্তের জন্য গ্রেফতার করেছে বলে তো আমাদের জানা নেই। আমরা সংবাদমাধ্যম থেকে জেনেছিলাম তিনি নাকি পুলিসের কাছে কাদের বিরুদ্ধে কীসব অভিযোগ জানিয়েছিলেন তাঁকে ফাঁসিয়ে দেওয়া হয়েছে বলে। সেই অভিযোগেরই বা কী হল? কদিন সন্দেশখালি নিয়ে প্রচণ্ড হইচই হওয়ার পরে, দুই প্রধান প্রতিপক্ষের সমস্ত নির্বাচনী সভায় সন্দেশখালি নিয়ে বাদানুবাদ হওয়ার পরে দুপক্ষই কি ঠিক করল সন্দেশখালিতে সন্দেশ নাই? কজন মহিলার অভিযোগ সত্যি, কজনের অভিযোগ মিথ্যা, আদৌ কোনোটা সত্যি কিনা – তা তো আমাদের জানা হল না। লাভের লাভ যা হল, তা হচ্ছে রাজ্য সরকারের কাজের খতিয়ান বিজেপি চাইল না, কেন্দ্রীয় সরকারের কাজ বা অকাজ নিয়েও তৃণমূলের প্রচারে কথাবার্তা কমে গেল। নির্বাচনী বন্ড নিয়ে কটা সভায় কথা বলেছেন মমতা বা অভিষেক? কর্মসংস্থানের অভাব নিয়েই বা কবার আক্রমণ করেছেন মোদীকে? মোদী, শাহরাই বা পশ্চিমবঙ্গে প্রচারে এসে গোদাভাবে তৃণমূলকে চোর বলা ছাড়া কী সমালোচনা করেছেন? নির্দিষ্ট করে নিয়োগ দুর্নীতি নিয়েই বা কতটা কথা বলেছেন? মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে তো কোনো পক্ষই পারতপক্ষে কথা বলছে না। সেসব আলোচনা কেবল শোনা যাচ্ছে বাম, কংগ্রেস জোটের প্রার্থীদের মিটিং মিছিলে।

সাংসদের সংখ্যার বিচারে রাজ্যের দুই বৃহত্তম শক্তি কী নিয়ে তর্ক চালাচ্ছে? প্রথমে চলল সন্দেশখালিতে ধর্ষণ হয়েছে নাকি হয়নি। তারপর চলল রাজ্যপালের রিপুকর্ম নিয়ে বাদানুবাদ। সে বাদানুবাদও কোনো গুরুত্বপূর্ণ অভিমুখ নিল না। মুখ্যমন্ত্রী একবার রাজ্যপালের পদত্যাগের দাবি তুললেন, প্রধানমন্ত্রী মুখই খুললেন না, রাজ্যপাল অভিযোগকারিণী মহিলার সম্মান এবং প্রাইভেসির অধিকারের তোয়াক্কা না করে সাংবাদিকদের রাজভবনে ডেকে সিসিটিভি ফুটেজ দেখিয়ে দিলেন। সংবাদমাধ্যমগুলো রাজ্য পুলিসের ‘সূত্র’ উদ্ধৃত করে জানাল, পুলিসের কাছে নাকি বিস্ফোরক তথ্য আছে। এবিপি আনন্দের মত সদ্য গোদি মিডিয়া হয়ে ওঠা টিভি চ্যানেলের বিশেষজ্ঞ ও সঞ্চালকরা আবার, কোন জাদুতে কে জানে, নিঃসন্দেহে বলে গেলেন সবটাই রাজ্যপালের বিরুদ্ধে তৃণমূলের চক্রান্ত। এমতাবস্থায় শ্লীলতাহানিতে অভিযুক্ত রাজ্যপালকে সরে দাঁড়াতে বলার সভ্যতা যে বিজেপির নেই, তা জানতে কারোর বাকি নেই। আর সেই নিয়ে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার সময় ও সদিচ্ছা যে ভোটের মরশুমে তৃণমূলের নেই তাও পরিষ্কার হয়ে গেল।

তাহলে? সন্দেশখালি বা রাজ্যপাল – কোনোটাই নির্বাচনের ইস্যু নয়, তাই তো? কিন্তু দিব্যি ভোটারদের ওই আলোচনাতেই ব্যস্ত রাখা গেল। অতঃপর মুখ্যমন্ত্রী চালু করলেন সেই খেলা, যা মোদীর ভীষণ পছন্দের। মমতা মুর্শিদাবাদের বেলডাঙার ভারত সেবাশ্রম সঙ্ঘের সন্ন্যাসী কার্তিক মহারাজের নাম করে বললেন, ওঁকে সাধু বলেই মনে করেন না। কারণ ওঁর কাছে খবর আছে, ওই সন্ন্যাসী ভোটে তৃণমূলের এজেন্ট বসতে দেন না। মানে পুরোদস্তুর রাজনীতি করেন। একইসঙ্গে ইস্কন আর রামকৃষ্ণ মিশনও নিজেদের ভক্তদের বিজেপিকে ভোট দিতে বলছে বলে মুখ্যমন্ত্রী অভিযোগ করে বসলেন।

হিন্দুপ্রধান ভারতে ইসলামিক ধর্মীয় সংগঠন মানেই সন্ত্রাসবাদীদের আখড়া – এই ধারণা সমস্ত রাষ্ট্রীয় শক্তি, সিনেমা আর সংবাদমাধ্যম মিলে বহু যুগ ধরে জনমানসে গেঁথে দিয়েছে। কিন্তু হিন্দু ধর্মীয় সংগঠনগুলো যে ধোয়া তুলসীপাতা নয়, সেকথা চট করে কেউ বলে না। গেরুয়া সন্ত্রাস নিয়ে এস এম মুশরিফের বইগুলোর কথা এখনো বিশেষ আলোচিত না হলেও রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ বা আরএসএস যে বহুকাল ধরে তলে তলে এদেশের অনেককিছুতে ছড়ি ঘুরিয়েছে তা এখন অনেকের কাছে স্পষ্ট হচ্ছে। এই মুহূর্তে দেশের প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, বহু কেন্দ্রীয় মন্ত্রী, উপরাষ্ট্রপতি, বিজেপিশাসিত সমস্ত রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী আরএসএসের শিক্ষায় শিক্ষিত। উপরন্তু কলকাতা হাইকোর্টের বিচারপতি চিত্তরঞ্জন দাশ অবসর নেওয়ার সময়ে বিদায়ী ভাষণে খোশমেজাজে জানিয়েছেন, তিনি বরাবর আরএসএসের সঙ্গে ছিলেন। আরেক বিচারপতি অভিজিৎ গঙ্গোপাধ্যায় তো আজ অবসর নিয়ে কাল বিজেপিতে যোগ দিয়ে নির্বাচনে প্রার্থী হয়ে গেছেন। তাঁর মুখের ভাষা এমন, যে ঠুঁটো জগন্নাথ নির্বাচন কমিশনও চক্ষুলজ্জার খাতিরে মমতার বিরুদ্ধে অশালীন মন্তব্যের কারণে অভিজিৎকে ২৪ ঘন্টা প্রচারে নিরস্ত করেছে।

আরও পড়ুন যারা বিজেপিতে ভিজেছিল

ভারত সেবাশ্রমের কার্তিক মহারাজ মুখ্যমন্ত্রীকে আইনি নোটিস পাঠিয়ে বলেছেন তাঁর বিরুদ্ধে কুৎসা করা হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী নিশ্চয়ই তার মুখের মত জবাব দেবেন, নতুবা ক্ষমা চাইবেন। কিন্তু কার্তিক মহারাজ যে ওই তল্লাটে রীতিমত রাজনৈতিক বক্তৃতা দিয়ে বেড়ান তার পর্যাপ্ত ভিডিও প্রমাণ রয়েছে। সেসব ভিডিওতে তাঁকে মোটেই সর্বত্যাগী, সংসারে আসক্তিহীন সন্ন্যাসী বলে মনে হয় না। বরং তাঁর শরীরী ভাষা ও মুখের ভাষা মুখ্যমন্ত্রী হয়ে বসা গোরক্ষ মঠের যোগীর বেশি কাছাকাছি।

বিদেশি মুদ্রায় বলীয়ান আন্তর্জাতিক সংগঠন ইস্কন তার ভক্তমণ্ডলীকে বিজেপিকে ভোট দিতে বলছে কিনা সে খবর মুখ্যমন্ত্রীর কাছে থাকতেই পারে। তেমনটা ঘটা আদৌ অসম্ভব নয়। কারণ আরএসএস এক আদ্যন্ত বাঙালিবিদ্বেষী সংগঠন, আর ইস্কনের মধ্যে যে বাঙালিবিদ্বেষ পুরোমাত্রায় আছে তার প্রমাণ একবছর আগেই পাওয়া গিয়েছিল, যখন অমোঘ লীলা দাস বলে ওই সংগঠনের এক সন্ন্যাসী স্বামী বিবেকানন্দকে সিদ্ধপুরুষ বলে মানতে অস্বীকার করেন তিনি আমিষ খেতেন, চুরুট খেতেন বলে। ইস্কন কী ব্যবস্থা নিয়েছিল লোকটির বিরুদ্ধে? কয়েকদিন মুখ বন্ধ করে থাকতে বলা হয়েছিল। ব্যাস!

আসলে বাঙালির মান-অপমান বোধ সম্পর্কে কারোরই খুব উচ্চ ধারণা নেই। বাঙালির আদরের সংগঠন রামকৃষ্ণ মিশনেরও নেই। থাকলে সেইসময় তারা অমোঘ লীলাকে বুঝিয়ে দিত শ্রীরামকৃষ্ণের ধর্মাচরণে কেন আমিষ-নিরামিষ ভেদ নেই। শ্রীরামকৃষ্ণ আদতে একজন ধর্মগুরু হলেও সত্যের সন্ধান করেছেন গবেষকের মত। শিষ্যদের মধ্যেও অনুসন্ধিৎসা উস্কে দিতেন, বলতেন ‘সাধুকে দিনে দেখবি, রাতে দেখবি’। অর্থাৎ পরখ করে নিবি, লোকটা সত্যিই সাধু কিনা। ফলে ‘যত মত তত পথ’ কথাটা তিনি স্রেফ বাণী বিতরণ করার জন্যে বলেননি। কলমা পড়ে মুসলমান হয়েছিলেন, খ্রিস্টধর্মও অবলম্বন করে দেখেছিলেন। তিনি খুঁজছিলেন আধ্যাত্মিক সত্য। নিজের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে যেখানে যেখানে তা পাওয়া গেছে, সেই সব পথকেই সত্য বলতে তাঁর কোথাও বাধেনি। ফলে আমিষাশী তন্ত্রসাধক বা নিরামিষাশী বৈষ্ণব – কেউই তাঁর কাছে ব্রাত্য নয়, অহিন্দুও নয়। সেই কারণেই রামকৃষ্ণ মিশনের সন্ন্যাসীদের আমিষ খাওয়ায় বারণ নেই। সিদ্ধপুরুষ কী করে হতে হয় বা আদৌ হওয়া যায় কিনা তা অন্য তর্ক। কিন্তু রামকৃষ্ণের তত্ত্বানুযায়ী, তাঁর কোনো শিষ্যের এই কারণেই আমিষ খেয়েও সিদ্ধপুরুষ হতে বাধা নেই।

মিশন কিন্তু এসব ধর্মালোচনায় যায়নি। কারণ হিন্দু উদারপন্থী – এমনকি বামপন্থী – বাঙালির ন্যাকা আবদার রক্ষা করে ধর্মীয়, অথচ ধর্মনিরপেক্ষ, জগাখিচুড়ি হওয়ার কোনো দায় রামকৃষ্ণ মিশনের নেই। তারা পুরোদস্তুর ধর্মীয় সংগঠন এবং বিশাল আকারের কারণে রীতিমত ব্যবসায়িক সংগঠন বললেও ভুল হয় না। বউবাজারের গয়নার দোকানগুলো যেমন নিজেদের মধ্যে ঝগড়াঝাঁটি করে না, রামকৃষ্ণ মিশনও ইস্কন বা ভারত সেবাশ্রমের সঙ্গে কোনোরকম তর্কে জড়ায় না। উপরন্তু দেশে হিন্দু আধিপত্যবাদী সরকার হলে এরা সকলেই খুশি হয়, কারণ কলাটা মুলোটা পাওয়ার সম্ভাবনা বাড়ে। কেন্দ্রে অটলবিহারী বাজপেয়ীর সরকার থাকার সময়েই সুদৃশ্য বেলুড় মঠ স্টেশন তৈরি করে হাওড়া-বেলুড় মঠ লোকাল ট্রেন চালু হয়েছিল। বিশেষ উৎসবের দিন ছাড়া সে ট্রেনে কাকপক্ষীও চাপত না। অথচ অলাভজনক রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা বিক্রি করে দেওয়ায় উৎসাহী একটা সরকারও ওই লাইন তুলে দেওয়ার কথা ভাবেনি। রামকৃষ্ণ মিশনের সাধুদের মোদীমুগ্ধতাও এমন কিছু ঢাকঢাক গুড়গুড় করার জিনিস নয়। তিনি যখন বেলুড় মঠে এসে রাত্রিযাপন করেছিলেন, সেইসময় তাঁর সঙ্গে দন্তবিকাশ করে সন্ন্যাসীদের সেলফি তোলার বহর আমরা সকলেই দেখেছি। একজন রাজনৈতিক নেতাকে নিয়ে মিশনের সন্ন্যাসীদের এমন নালে ঝোলে অম্বলে হতে দেখলে কী মনে করতেন মিশনের সেইসব প্রতিষ্ঠাতা সন্ন্যাসীরা, যাঁদের জন্যে ভগিনী নিবেদিতাকে মিশনের সংস্রব ত্যাগ করতে হয়েছিল, কারণ তিনি স্বাধীনতা সংগ্রামীদের সক্রিয়ভাবে সাহায্য করছিলেন?

যা-ই মনে করুন, মোদ্দাকথা হল, মমতা পশ্চিমবঙ্গের তিনটে জনপ্রিয় ধর্মীয় সংগঠনের বিরুদ্ধে যে অভিযোগ করেছেন তা মোটেই পাগলের প্রলাপ বলে উড়িয়ে দেওয়ার জিনিস নয়। কিন্তু ঘটনাগুলো তো আজ ঘটতে শুরু করেনি। কার্তিক মহারাজের দাঙ্গায় উস্কানি দেওয়ার কথা যদি সত্যি হয় তাহলে তা বেআইনি কাজ, তাঁর বিরুদ্ধে পুলিসি ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। কিন্তু কোনো সংগঠনের নিজেদের সদস্যদের কোনো বিশেষ দলকে ভোট দিতে বলা তো বেআইনি নয়। তাছাড়া মমতা নিজেই তো রাজ্যে ইমাম ভাতা, পুরোহিত ভাতা চালু করেছেন, সরকারি টাকায় দীঘায় বিরাট মন্দির বানাচ্ছেন। আবার ঈদের নমাজে গিয়ে রাজনৈতিক বক্তৃতাও দিয়েছেন। সেক্ষেত্রে ধর্মীয় সংগঠনগুলো রাজনীতি বিযুক্ত হয়ে থাকবে – এমনটা আশা করা কি যৌক্তিক? তাহলে নির্বাচনে এই কথাগুলো মমতা কেন বললেন? মূল্যবৃদ্ধি, কর্মসংস্থানের অভাব, ধনী-দরিদ্রের ব্যবধান বৃদ্ধি, নির্বাচনী বন্ডের মত ইস্যু নিয়ে কথা বললে নিজেরই ফাঁপরে পড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা – একথা বুঝেই কি মমতা শেষ দু-তিন দফার নির্বাচনে পশ্চিমবঙ্গে প্রাসঙ্গিক করে তুললেন ধর্মীয় সংগঠনগুলোকে? তাহলে গোটা দেশে অনর্গল মিথ্যাভাষণ আর ধর্মীয় মেরুকরণ করে মোদী নির্বাচনটাকে যেভাবে নিজের দিকে টেনে আনতে চাইছেন, সেভাবেই কি মমতাও চাইছেন পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচন হয়ে দাঁড়াক হিন্দু বনাম মুসলমানের? ভারত সেবাশ্রম, ইস্কন ও রামকৃষ্ণ মিশন কর্তৃপক্ষ ইতিমধ্যেই মুখ্যমন্ত্রীর মন্তব্যে অসন্তোষ জ্ঞাপন করেছেন আর বিজেপি নেতারা মহানন্দে প্রচার করে বেড়াচ্ছেন – মমতা সংখ্যালঘু তোষণ করার জন্যে এখন হিন্দু সাধু সন্তদের আক্রমণ করছেন। পশ্চিমবঙ্গকে মনে হচ্ছে নয়ের দশকের উত্তরপ্রদেশ, যেখানে রাজনৈতিক আলেখ্য আবর্তিত হয় অমুক স্বামী, তমুক সরস্বতী, অমুক শঙ্করাচার্যকে ঘিরে।

২০২৪ সালের ঐতিহাসিক সাধারণ নির্বাচনে এই তবে বাঙালির সবচেয়ে বড় অবদান।

নাগরিক ডট নেটে প্রকাশিত

গোট কত বেড়া খেয়ে যাচ্ছে

গাভস্কর যখন খেলতেন তখন সোশাল মিডিয়া ছিল না, গোট কে তা নিয়েও আলোচনাই হত না। সবার উপরে স্যার ডোনাল্ড জর্জ ব্র্যাডম্যান আর স্যার গারফিল্ড সোবার্স। বাকিরা তারপর – এই সহজ ভাবনায় ক্রিকেট দুনিয়া চলত।

সম্প্রতি কিংবদন্তি সুনীল গাভস্করের সঙ্গে বিবাদে জড়িয়ে পড়েছেন মহাতারকা বিরাট কোহলি। সামনেই টি টোয়েন্টি বিশ্বকাপ। বিরাট তার আগে আইপিএলে রয়্যাল চ্যালেঞ্জার্স ব্যাঙ্গালোরের হয়ে প্রচুর রান করছেন (এই লেখার সময়ে ১৩ ইনিংসে ৬৬৮; গড় ৬৬.১০)। ধারাভাষ্যকাররা, যাঁদের অনেকেই বিশ্ব ক্রিকেটে একদা সফল প্রাক্তন ক্রিকেটার, বিরাটের স্ট্রাইক রেটের সমালোচনা করছিলেন। তাই একটি ম্যাচ জিতিয়ে বিরাট তাঁদের বিরুদ্ধে ক্যামেরার সামনে বিবৃতি দেন। বিরাটের দল এবারের আইপিএলের হারতে হারতে প্রায় প্লে অফের ওঠার দৌড় থেকে ছিটকে গেছে। এমতাবস্থায় প্রাক্তন ক্রিকেটাররা বিরাটের মন্থর ব্যাটিং এবং স্পিনারদের মারার অক্ষমতার সমালোচনা করছেন। বিরাট সেই সমালোচনা থেকে কিছু শেখার বদলে সমালোচকদের দিকেই তোপ দেগেছেন। বলে দিয়েছেন, যারা তাঁর পরিস্থিতিতে পড়েনি তাদের পক্ষে বক্সে বসে সমালোচনা করা সহজ। বাইরের লোক যা খুশি ভেবে নিতে পারে। তিনি বাইরের কে কী বলল তাতে কান দেন না। একথায় গাভস্কর বেজায় চটে বলে দিয়েছেন, বাইরের লোকের কথায় যদি কান না-ই দেয় তো কথার উত্তর দিচ্ছে কেন? আমরা যা দেখব তাই তো বলব। আমাদের তো কারোর বিরুদ্ধে কোনো এজেন্ডা নেই। টিভির পর্দায় দেখা গেছে, গাভস্কর যখন একটি ম্যাচ শুরু হওয়ার আগে মাঠে দাঁড়িয়ে মাইক হাতে এসব কথা বলছেন, তখন কাছেই অনুশীলনরত বিরাট কথাগুলো শুনে কটমটিয়ে তাকিয়েছেন।

এমন হতে পারে না যে বিরাট জানেন না গাভস্কর কত বড় ব্যাটার ছিলেন। আর পাঁচজনের কথার দাম না থাক, গাভস্করের কথার অবশ্যই দাম আছে। অন্যান্য বিশেষজ্ঞদের কথারও বিলক্ষণ দাম আছে। নইলে তাঁদের সমালোচনায় বিরাট ক্ষেপে যেতেন না। তাহলে তিনি ওরকম আক্রমণাত্মক মন্তব্য করলেন কেন? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে আমরা যা পাব, তা হল ঔদ্ধত্য। টেস্ট ক্রিকেটে যখন হেলমেট প্রায় ছিলই না, প্রত্যেক আন্তর্জাতিক দলেই এক বা একাধিক ঘন্টায় ৯০ মাইলের বেশি গতিতে বল করা বোলার ছিল, সেইসময় যিনি প্রথম ব্যাটার হিসাবে দশ হাজার রান করেছিলেন বেশ দুর্বল একটা দলে খেলে, তাঁকে আমল না দেওয়ার ঔদ্ধত্য কী করে তৈরি হল? এর উত্তর লুকিয়ে আছে সোশাল মিডিয়া যুগের এক অদ্ভুত প্রবণতার মধ্যে। প্রবণতাটা হল বিভিন্ন যুগের খেলোয়াড়দের মধ্যে তুলনা করে, এক ধরনের কাল্পনিক র‍্যাঙ্কিং তৈরি করে নিজের সময়ের সেরাকে সর্বকালের সেরা প্রতিপন্ন করা। হালে একটি শব্দের জন্ম হয়েছে খেলার জগতে – GOAT, অর্থাৎ ‘গ্রেটেস্ট অফ অল টাইম’। গাভস্কর যখন খেলতেন তখন সোশাল মিডিয়া ছিল না, গোট কে তা নিয়েও আলোচনাই হত না। সবার উপরে স্যার ডোনাল্ড জর্জ ব্র্যাডম্যান আর স্যার গারফিল্ড সোবার্স। বাকিরা তারপর – এই সহজ ভাবনায় ক্রিকেট দুনিয়া চলত। শচীন তেন্ডুলকরের আমল থেকে এনডর্সমেন্টের দুনিয়ায় কে সর্বকালের সেরা তা নিয়ে মশলাদার আলোচনা শুরু হয়। শচীনের বিদায়ের পর কবে যেন মহেন্দ্র সিং ধোনি গোট হয়ে গেলেন, তাঁর বিদায়ের পর বিরাট।

গাভস্করের হয়ে কথা বলার জন্যে সোশাল মিডিয়ায় ট্রোলবাহিনী নেই, বিরাটের জন্যে আছে। তারা বলে দিয়েছে বিরাটই গোট, কেউ অন্য কিছু বললে দল বেঁধে তেড়ে আসে তাকে গাল দিতে। শুধু তাই নয়, প্রাক্তন ক্রিকেটাররাও অনেকদিন ধরে বিরাটকে ভিভিয়ান রিচার্ডস বা শচীনের সমান বা তার চেয়েও মহান ক্রিকেটারের তকমা দিয়ে চলেছেন। ফলে নির্ঘাত বিরাট নিজেও মনে করেন তিনি সর্বকালের সেরা। তাই গাভস্কর, ম্যাথু হেডেনরা এলেবেলে।

এই গোটে যে আজকাল কত বেড়া খেয়ে ফেলছে খেলার জগতে, তার হিসাব নেই। আমরা যে যুগে বাস করি, সেখানে হাতের ফোনটাতেই চাইলে দেখে ফেলা যায় যে কোনো খেলার কিংবদন্তিদের স্মরণীয় এবং সাধারণ খেলাগুলো। বর্তমান প্রজন্ম চাইলেই পেলে বা দিয়েগো মারাদোনার খেলা দেখে ফেলতে পারে। শচীন বা ভিভ তো বটেই, এমনকি ব্র্যাডম্যানের খেলারও এক-আধটা ক্লিপ সোশাল মিডিয়ায় পাওয়া যায়। সেগুলো দেখলে মাঠের তারতম্য, প্রতিপক্ষের গুণমানের তারতম্য নিজের চোখে দেখা যায়। অন্ধ ভক্ত না হলে বোঝাই যায়, এক যুগের সঙ্গে অন্য যুগের খেলোয়াড় তুলনীয় নয়। খেলার মান নির্ভর করে যে যে জিনিসগুলোর উপরে তার প্রায় কোনোটাই এক নেই, থাকার কথাও নয়। দুনিয়ার সবকিছুই তো প্রতি মুহূর্তে বদলাচ্ছে। সেখানে সর্বকালের সেরা দশ বা পাঁচ বা এক মুখরোচক আড্ডার বিষয়বস্তু হতে পারে বড়জোর। এছাড়া কোনোরকম র‍্যাঙ্কিংয়ের কোনো মানে হয় না।

আরও পড়ুন বড় ক্রিকেটারে নয়, বিরাট ব্র্যান্ডে মোহিত জনগণমন

মুশকিল হল, অধিকাংশ ক্রীড়ামোদী সুচিন্তিত মতামতের মানুষ হয়ে গেলে একনিষ্ঠ ভক্তকুল গড়ে উঠবে না। সেটা না হলে জনপ্রিয় খেলোয়াড়রা যে শত শত ব্র্যান্ডের বিজ্ঞাপনে কাজ করেন, সেগুলো চোখ বন্ধ করে কেনার লোক কমে যাবে। তাহলে স্পনসর পাওয়া যাবে না, খেলাধুলো করে কোটি কোটি টাকা কামানোর রাস্তা বন্ধ হয়ে যাবে। এসব হতে দেওয়া যায় না। তাই খেলোয়াড় নিজে, তার সোশাল মিডিয়া টিম, সংবাদমাধ্যম, খেলার সম্প্রচারক, ধারাভাষ্যকাররা – সকলে মিলে কাল্পনিক র‍্যাঙ্কিং গড়ে তোলেন। তাতে সমসাময়িক কাউকে সর্বকালের সেরার মুকুট দিয়ে দেন। যদি কোনো সম ক্ষমতার খেলোয়াড় থাকেন, তাহলে পোয়া বারো। কে সত্যিকারের গোট তা নিয়ে তর্ক বাধিয়ে ব্যাপারটাকে আরও মুখরোচক করে তোলা হয়। ফুটবলে যেমন লিওনেল মেসি বনাম ক্রিস্টিয়ানো রোনাল্ডো। আমিই সেরা – এই কথা ২৪ ঘন্টার মধ্যে ২৬ ঘন্টা শুনতে শুনতে কোনো কোনো খেলোয়াড়ের বিশ্বাস হয়ে যেতে পারে তিনিই সর্বকালের সেরা। তখন তিনি লিওনেল মেসির মত, রামছাগলের সঙ্গে ছবি তোলাতে পারেন বা বিরাটের মত, প্রাক্তন ক্রিকেটারদের ফালতু মনে করতে পারেন।

কোনো খেলোয়াড় নিজেকে সর্বকালের সেরা মনে করলে এমনিতে বিশেষ ক্ষতি ছিল না। কিন্তু তাঁদের ব্যবহারে সেই মনোভাব প্রকাশ হয়ে পড়লে এখন যা হয়, তা হল তাঁদের অন্ধ ভক্তরা প্রাক্তন খেলোয়াড়দের এবং যারা তেমন ভক্ত নয় তাদের গালিগালাজ করার লাইসেন্স পেয়ে যায়। যখন অতীতের খেলা দেখা প্রায় অসম্ভব ছিল, তখন কিন্তু গাভস্করের ভক্তরা বলত না – বিজয় মার্চেন্ট বা সি কে নাইডু ক্রিকেটের কী বোঝে? এমনকি শচীনের দীর্ঘ ক্রিকেটজীবনের প্রথমদিকের ভক্তরাও বলত না গাভস্কর কী বোঝে? বলত না, কারণ গাভস্কর কখনো তেমন ভাবার মত আচরণ করতেন না। বরং আজীবন নিজের আগের প্রজন্মের ক্রিকেটারদের সম্পর্কে শ্রদ্ধা দেখিয়ে এসেছেন। শচীনও গাভস্করের সঙ্গে কথা বলতেন মাথা নিচু করে, কখনো ফর্ম পড়ে গেলে গাভস্করের পরামর্শ নিতেন। অথচ টেস্ট ক্রিকেটে গাভস্করের সব রেকর্ডই তো শচীন ভেঙে দিয়েছেন। এখন কিন্তু বিরাটের ভক্তরা বলেন, গাভস্কর কে? ও কী বোঝে? রোহিত শর্মার ভক্তরা সোশাল মিডিয়ায় মাঝেমধ্যেই বলে যান, রোহিত একদিনের ক্রিকেটে ভারতের গোট ক্রিকেটার। বিরাট দূরের কথা, শচীনও তাঁর ধারে কাছে আসতে পারেন না। এর কারণ আজকের খেলোয়াড়দের আচরণে এক ধরনের ঔদ্ধত্য প্রকাশ পায়। কারোর কম, কারোর বেশি। কথায় কথায় কাল্পনিক, অযৌক্তিক র‍্যাঙ্কিং তৈরি করে সেই ঔদ্ধত্য উস্কে দেওয়া হয়। কারণ ঔদ্ধত্যের ভাল বাজার আছে। আজকাল খেলার মাঠে সভ্যতা, ভদ্রতার চেয়ে ঔদ্ধত্য, অসভ্যতার কাটতি বেশি।

উত্তরবঙ্গ সংবাদে প্রকাশিত

শুধু মোদী নয়, আম্বানি-আদানিদের হাত থেকেও উদ্ধার পাওয়া দরকার

২০১৯ লোকসভা নির্বাচনের আগে ঋজু বিদূষক কুণাল কামরা তাঁর কমেডি রুটিনের একখানা ভিডিও প্রকাশ করেছিলেন। ততদিনে মুকেশ আম্বানি কীভাবে ভারতের অর্থনীতির উপরে একচ্ছত্র আধিপত্য কায়েম করছেন তা পরিষ্কার হয়ে গিয়েছিল, কিন্তু গৌতম আদানির নাম তখনো মুখে মুখে ফেরার পর্যায়ে পৌঁছয়নি। সেই ভিডিওর শুরুতেই কুণাল বলেন ‘আমার আর আম্বানিজির মধ্যে মোদীজি কী করছেন? আমি সোজাসুজি আম্বানিকে কেন ভোট দিতে পারব না? আমাদের আম্বানির সঙ্গে কোনো ঝামেলা আছে? বানাও না পিএম।’ তারপর বলেন ‘আমার সত্যিই মনে হয় কর্পোরেশনগুলোর ভোটে লড়া উচিত। যেমন মুকেশ আম্বানি বনাম রতন টাটা – লড়ো ২০১৯। সত্যিই দারুণ ভোট হবে। ওরা তো একটা বিষয় নিয়েই কথা বলবে – ডেভেলপমেন্ট। বিকাশ। ওরা তো আর কিছু জানেই না। ধরুন রতন টাটা তো আর উত্তরপ্রদেশে গিয়ে ঘর ভর্তি লোকের দিকে তাকিয়ে বলবে না, মন্দির ইয়হি বনেগা।’ বলা বাহুল্য কথাগুলো ঠাট্টা করে বলা, লোক হাসাতে বলা। কিন্তু ইতিহাস সাক্ষী, বিদূষকরা চিরকাল রসিকতা করতে করতে তেতো সত্যও বলে এসেছেন। তা করতে না পারলে বিদূষক হওয়ার মানে হয় না। এ প্রসঙ্গে রবীন্দ্রনাথের বিদূষক গল্প দ্রষ্টব্য। উপরন্তু আমাদের দেশে গত এক দশক ধরে কুণাল, আকাশ ব্যানার্জিরা যে কাজ করছেন তা বিদূষকের সীমায় আটকে নেই। রীতিমত সাংবাদিকতা হয়ে উঠেছে। ঠিক মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে যে কাজ জন অলিভার, হাসান মিনহাজ, ট্রেভর নোয়ারা করে থাকেন। সুতরাং কুণালের রসিকতাতেও খুঁজলে হাসির আড়ালের সত্যগুলো অনায়াসেই পাওয়া যাবে।

আসলে কুণাল ঠাট্টা করে যা বলেছিলেন তা পৃথিবী জুড়ে উদারনৈতিক গণতন্ত্রের ভালমন্দ নিয়ে যে আলোচনা চলছে তারই অঙ্গ। কোনো দেশের নির্বাচনী গণতন্ত্রই কোনোদিন অতিধনীদের প্রভাবমুক্ত ছিল না। কিন্তু একবিংশ শতাব্দীতে এসে প্রায় সব দেশের গণতন্ত্রপ্রেমী মানুষের মনেই এই সন্দেহ দেখা দিয়েছে, যে অতিধনীরাই হয়ত গণতন্ত্রের রাশ হাতে তুলে নিয়েছে। প্রকাশ্য রাষ্ট্রীয় নজরদারি ব্যবস্থা, সোশাল মিডিয়া আর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে জনমত প্রভাবিত করার উপায় এবং রাজনৈতিক দলগুলোকে বিপুল টাকা দেওয়ার ক্ষমতা মিলিয়ে বড় বড় কর্পোরেশনগুলোই কোথায় কে সরকার গড়বে আর কে সরকার চালাবে তা নিয়ন্ত্রণ করছে কিনা – এ নিয়ে সারা পৃথিবীতেই কথা হচ্ছে। কুণাল যে কাল্পনিক নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বিতার কথা বলেছিলেন তা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে তার আগেই অর্ধেক বাস্তবে পরিণত হয়েছে। কারণ ডোনাল্ড ট্রাম্প আম্বানির মতই একজন ধনকুবের। রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে দাঁড়িয়ে পড়ার আগে পর্যন্ত তাঁকে কোনোভাবেই রাজনীতিবিদদের সারিতে বসানো যেত না। আমাদের দেশে ব্যাপারটা অতদূর না গেলেও সরকারি নীতি নির্ধারণে যে কর্পোরেট শক্তি বড় ভূমিকা নিচ্ছে তার একাধিক প্রমাণ তো আমাদের চোখের সামনেই রয়েছে। যাদের সন্দেহ ছিল তারাও দেখে ফেলেছে নির্বাচনী বন্ডে কোথা থেকে কে কত টাকা পেয়েছে। কর্পোরেট স্বার্থে আইন বদলে আদিবাসীদের জমির অধিকার কেড়ে নেওয়া, কাশ্মীরে কেন্দ্রীয় শাসন কায়েম করার মত বহু ঘটনা ঘটেছে। কতগুলো বন্দর, বিমানবন্দর আদানির হাতে গেছে; আম্বানি কীভাবে খুচরো ব্যবসা থেকে শুরু করে খনিজ তেল – দেশের সমস্ত ব্যবসায় জাল বিছিয়েছেন তা-ও অনেকেরই জানা। ফলে কিছুদিন আগে অবধি ক্রোনি পুঁজিবাদ কথাটা যার শোনা ছিল না, সেও জেনে গেছে।

কোনো সন্দেহ নেই, এদেশে ক্রোনি পুঁজিবাদকে রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু করে তোলায় সবচেয়ে বেশি অবদান যাঁর, তাঁর নাম রাহুল গান্ধী। সপ্তদশ লোকসভায় বামপন্থী দলগুলোর সাংসদ ছিলেন হাতে গোনা কয়েকজন, সংসদের বাইরেও তাঁদের ক্ষমতা অত্যন্ত সীমিত। এমন অবস্থায় পুঁজিবাদ বা ক্রোনি পুঁজিবাদ নিয়ে দিনরাত আওয়াজ তোলার মত কেউ ছিলেন না। সংসদের ভিতরে তো নয়ই। রাহুলই প্রথমে সংসদের বাইরে নাম করে আম্বানি, আদানি দেশের সম্পদ কীভাবে লুটেপুটে খাচ্ছেন তা বলা শুরু করলেন। তারপর সংসদের ভিতরে আদানি আর নরেন্দ্র মোদীর একত্র ছবি এনলার্জ করে দেশের সামনে তুলে ধরলেন। মোদীর প্রাণভোমরা যে সত্যিই আরএসএস নয়, কর্পোরেটের হাতে – তা প্রমাণ হয়ে যায় কিছুদিন পরেই রাহুলকে সংসদ থেকে সাসপেন্ড করার ঘটনায়। রাহুল আদালত ঘুরে সংসদে ফিরে আসার পরেও আম্বানি, আদানিকে আক্রমণ করা ছাড়েননি। তবু এবারের নির্বাচনে ইতিহাস গড়লেন কিন্তু সেই মোদী। ক্রোনি পুঁজিবাদ নিয়ে সারা পৃথিবীতে যতই আলোচনা হোক, এত বড় গণতান্ত্রিক দেশের নির্বাচনে দুজন পুঁজিপতির নাম নির্বাচনী প্রচারে সর্বত্র আলোচিত হচ্ছে – এমন ঘটনা বিরল।

মিথ্যা বলা, সত্যকে বিকৃত করে উপস্থাপন করা এবারের নির্বাচনে জলভাত করে ফেলেছেন প্রধানমন্ত্রী। নির্বাচন শুরু হওয়ার পর থেকে কংগ্রেসের ইশতেহার সম্পর্কে বানিয়ে বানিয়ে নানা কথা বলে চলেছেন সাম্প্রদায়িক বিভাজন তৈরি করতে। অনেকেই বলছিলেন নিজের দলের ইশতেহার সম্পর্কে একটিও বাক্য খরচ না করে কেবলই কংগ্রেসের ইশতেহার সম্পর্কে অপপ্রচার আসলে প্রধানমন্ত্রীর উদ্বেগের প্রকাশ। তিনি সংসদের ভিতরে দাঁড়িয়ে প্রবল আত্মবিশ্বাসে ৪০০ আসন পার করার কথা বলেছিলেন। কিন্তু ভোটের ময়দানে যে প্রবণতার খোঁজ তিনি পাচ্ছেন তা ৫৬ ইঞ্চি বুকে ভরসা জোগাচ্ছে না। তাই সেই লালকৃষ্ণ আদবানির আমল থেকে বিজেপির যে পরীক্ষিত জয়ের ফর্মুলা, তাতেই ফিরে গেছেন – মুসলমানের ভয় দেখিয়ে হিন্দুদের ভোট কুড়াও।

এর না হয় তবু একটা ব্যাখ্যা হয়। কিন্তু তৃতীয় দফার ভোটের পরে তেলেঙ্গানার ওয়ারাঙ্গলে বক্তৃতা দিতে গিয়ে যে কথা মোদী বললেন, তার পিছনে যুক্তি কী? পাঁচ বছর ধরে কংগ্রেসের শাহজাদা সকাল থেকে মালা জপার মত আম্বানি, আদানির নাম বলতেন। ভোট ঘোষণা হতেই কেন এদের নাম বলা বন্ধ হয়ে গেল? নির্ঘাত আম্বানি, আদানির কাছ থেকে টেম্পো করে বস্তা বস্তা মাল কংগ্রেসের কাছে গেছে? শাহজাদা জবাব দিন – এই তাঁর বক্তব্য। রাজনীতিতে তো বটেই, নির্বাচনী প্রচারেও প্রত্যেকটা শব্দ মেপে খরচ করাই নিয়ম। তার উপর দশ বছর ধরে শুনে আসছি মোদী ভারতের সর্বকালের সেরা প্রধানমন্ত্রী। তিনি কি না ভেবেচিন্তে কিছু বলতে পারেন? তাহলে হঠাৎ নিজের সবচেয়ে বড় বন্ধুদের এভাবে বিরোধী দলকে গোপনে টাকা দেওয়ায় অভিযুক্ত করতে গেলেন কেন? অতীতে সংসদে রাহুল তথা বিরোধীরা আদানির সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে তাঁকে বারবার আক্রমণ করা সত্ত্বেও তিনি তো মুখ খোলেননি। তাহলে ভোটের ভরা বাজারে কেন এমন করলেন? ওই বক্তৃতার পরে বেশ কয়েকদিন কেটে গেছে। পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে, ওই কথায় বিজেপির সদস্য সমর্থকদের মধ্যে কোনো নতুন উদ্দীপনার সঞ্চার তো হয়নি বটেই, উল্টে রাহুলের ভিডিও জবাব ভাইরাল হয়ে গেছে। সমস্ত মূলধারার সংবাদমাধ্যমেও মোদীর কথার সঙ্গে সমান গুরুত্বে সেই জবাব সম্প্রচারিত হয়েছে এবং রাহুলের জবাবে রক্ষণাত্মক হওয়ার বিন্দুমাত্র প্রচেষ্টা নেই। বরং তিনি পালটা আক্রমণের রাস্তায় গিয়ে ফের ক্রোনি পুঁজিবাদ চালানোয় অভিযুক্ত করেছেন মোদী সরকারকে। বলেছেন, মোদী সরকার ২২ জন অতিধনী তৈরি করেছে, আমরা কয়েক কোটি লাখপতি বানাব। শুক্রবার উত্তরপ্রদেশে এক সভায় আরও এক ধাপ এগিয়ে বলেছেন, যখন কেউ ভয় পেয়ে যায় তখন আপন লোকেদের ডাকাডাকি করতে থাকে। মোদী হারের ভয় পেয়েছেন। তাই আম্বানি, আদানির নাম করছেন যাতে তাঁরা ওঁকে বাঁচান।

আমরা রাহুলের এসব কথায় বিশ্বাস করব না। কারণ নির্বাচনী প্রচারে গরম গরম কথা বলতেই হয়, বিশেষ করে বিরোধী পক্ষের নেতা হলে। আমরা খানিকক্ষণের জন্য একথাও ভুলে যাই, যে মোদী এক্ষেত্রেও মিথ্যাভাষণ করেছেন। রাহুল মোটেই ভোটের প্রচারে আম্বানি, আদানির নাম বলা বন্ধ করে দেননি। দি ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের এই প্রতিবেদনে পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে, নির্বাচন ঘোষণা হওয়ার পর থেকে রাহুল সাতবার সাতটা বক্তৃতায় ওই দুজনের নাম করেছেন।

আমরা বরং তর্কের খাতিরে ধরে নিই, মোদী সত্যি কথাই বলছেন। আমরা ধরে নিচ্ছি টেম্পোয় করে টাকা পাঠানোর কথাটা লোকের বুঝতে সুবিধা হবে বলে মোদী বলেছেন। মোদ্দাকথা হল, আম্বানি আর আদানি কংগ্রেসকে টাকা দিচ্ছেন এই নির্বাচনে। যদি একথা সত্যি হয়, তাও কিন্তু বিজেপির পক্ষে দুঃসংবাদ। কর্পোরেটবান্ধব মোদী সরকারের মাথার উপর থেকে যদি ভারতের সবচেয়ে ধনী দুই ব্যবসায়ীর হাত সরে গিয়ে থাকে তাহলে মোদীর সমূহ বিপদ। কারণ তাহলে বুঝতে হবে, তাঁরা হাওয়া খারাপ বুঝে পরবর্তী সরকারে নির্ণায়ক শক্তি হবে যারা, তাদের তুষ্ট করবেন ঠিক করেছেন। বস্তুত, অনেকেই খেয়াল করেছেন যে মোদীর এই বক্তব্য ধামাচাপা দেওয়ার জন্যে আদানির মালিকানাধীন চ্যানেল এনডিটিভি সেদিন মাতামাতি করছিল স্যাম পিত্রোদার মন্তব্য নিয়ে, যে মন্তব্যের সঙ্গে কংগ্রেস একমত নয় বলে পত্রপাঠ জানায়। তারপর পিত্রোদাকে কংগ্রেসের বৈদেশিক শাখার কর্তার পদ ছাড়তেও বাধ্য করা হয় সেইদিনই। কিন্তু পরদিন এনডিটিভি যা করেছে তা আরও কৌতূহলোদ্দীপক। সন্দেশখালির বিজেপি নেতা গঙ্গাধর কয়ালের গোপন ক্যামেরার সামনে শুভেন্দু অধিকারীর নির্দেশে ধর্ষণের মিথ্যা অভিযোগ দায়ের করানোর চক্রান্ত যেদিন ফাঁস হল, সেদিন থেকে সমস্ত গোদি মিডিয়ার মত এনডিটিভিও খবরটা যথাসম্ভব চেপে গিয়েছিল। কিন্তু বুধবার মোদীর ওই বক্তৃতার পরে বৃহস্পতিবার যখন রেখা পাত্রের ভিডিও প্রকাশ্যে এল, সে খবর এনডিটিভি দেখিয়েছে যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে।

এ কিন্তু মোদীর পক্ষে অশনি সংকেত। আদানি আর আম্বানি মিলে ভারতের মূলধারার সংবাদমাধ্যমের অনেকখানি দখল করে আছেন। ক্রোনি পুঁজিবাদ ভারতের সংবাদমাধ্যমেও মোদীর আমলে কাজ করেছে পুরোদমে। নিজের চা বিক্রেতার অতীত থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রির মত বহু নড়বড়ে সত্যের উপরে মোদীর যে বিশালকায় ভাবমূর্তি নির্মিত হয়েছে তা সম্ভব হত না এতগুলো সংবাদমাধ্যমের শতকরা একশো ভাগ সমর্থন না থাকলে। সেই সমর্থন যদি সরতে শুরু করে, ওই ভাবমূর্তি ভেঙে পড়তে বিশেষ সময় লাগবে না। এখন সোশাল মিডিয়ার যুগ, সবকিছু ঘটে বড্ড তাড়াতাড়ি। নির্বাচন কমিশনের বদান্যতায় এক দীর্ঘ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এখনো চারটে দফা বাকি, প্রথম তিন দফায় বিজেপি দারুণ ফল করবে এমনটা মোদীর ভাবভঙ্গি দেখে মনে হচ্ছে না। সে ভরসা থাকলে তাঁকে মরিয়া হয়ে আম্বানি, আদানির নাম করে রাহুলকে আক্রমণ করতে হত না। এমতাবস্থায় টিভি কভারেজ কমে গেলে মোদী যাবেন কোথায়? বিশেষত জি নেটওয়ার্কের মালিক এবং মোদীর একদা ঘনিষ্ঠ সুভাষ চন্দ্র যখন আগে থেকেই চটে আছেন ফের রাজ্যসভার টিকিট না পেয়ে। তিনি ওয়ার্ল্ড প্রেস ফ্রিডম ডে উপলক্ষে বলে বসেছেন যে ভারতে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা মোটেই ভাল জায়গায় নেই। তার চেয়েও বড় কথা, গোদি মিডিয়ার অন্যতম মুখ দীপক চৌরাসিয়াকে জি নিউজ ছাড়তে বাধ্য করা হয়েছে। সুধীর চৌধুরীর মত লোকও হঠাৎই মোদীর বক্তৃতার মিথ্যা দর্শকদের সামনে উদ্ঘাটন করতে শুরু করেছেন। এ সময় আম্বানি, আদানিকে কেউ চটায়?

আরও পড়ুন এনডিটিভি বিসর্জন: শোক নিষ্প্রয়োজন, উল্লাস অন্যায়

এই যে ভারতের মত এত বড় দেশের নির্বাচনে অন্যতম ইস্যু হয়ে উঠেছেন দুজন পুঁজিপতি – এটাই প্রমাণ করে একবিংশ শতাব্দীর গণতন্ত্র পুঁজিপতিদের উপরে কতখানি নির্ভরশীল। বিজেপি মুখপাত্ররা অনেকে প্রধানমন্ত্রীর সেদিনের বক্তৃতার পক্ষে দাঁড়াতে গিয়ে বলছেন – ঠিকই বলছেন – যে রাহুল উঠতে বসতে আম্বানি-আদানির চোদ্দ পুরুষ উদ্ধার করেন, সেই রাহুলের দলের মুখ্যমন্ত্রীরাই ওই দুজনের শিল্প নিজের রাজ্যে টেনে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। এই দ্বিচারিতা কেন? কথা হল, পুঁজিবাদ নয়া উদারবাদী অর্থনীতির সাহায্যে এই শতকে গণতন্ত্রের ঘাড়ে এমনই চেপে বসেছে যে এই দ্বিচারিতা না করে কোনো সরকারে থাকা দলের উপায় নেই। সরকারি সম্পত্তি, সরকারি শিল্পগুলোর বারোটা বাজিয়ে দেওয়া শুরু হয়েছিল ১৯৯১ সাল থেকেই। সেই প্রকল্পের দ্রুততা বাড়িয়ে মোদী সরকার প্রায় সমস্ত রাষ্ট্রীয় সম্পত্তিই তুলে দিয়েছে কর্পোরেটের হাতে। এখন যে সরকার জনকল্যাণমুখী হতে চায়, তার নিজের টাকা রোজগারের পথ এত সংকীর্ণ হয়েছে যে পুঁজিপতিদের উপরে নির্ভর করা ছাড়া উপায় নেই। অথচ তারা তা হতে দেবে না। কারণ রাষ্ট্র নাগরিকে পরিষেবা দিতে সক্ষম হলে কর্পোরেটের থেকে পরিষেবা কিনবে কে? সরকারি হাসপাতাল ঝকঝকে তকতকে হলে, ভাল চিকিৎসা শস্তায় করে দিলে বেসরকারি হাসপাতালে কে যাবে?

সুতরাং রাহুলের আসল পরীক্ষা শুরু হবে সরকারে আসতে পারলে। এখন মোদীকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়ে কয়েক কোটি লাখপতি তৈরি করার কথা বলা সোজা। কিন্তু মোদীর চেয়ারে বসার সুযোগ পাওয়া গেলে দলের ইশতেহারে যে গুচ্ছ গুচ্ছ জনকল্যাণমুখী প্রকল্পের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে তা পূরণ করতে গেলে আম্বানি, আদানিদের সঙ্গে সরাসরি সংঘাতে যেতে হবে। চোখ বুজে বলে দেওয়া যায়, বিরোধিতা হবে তাঁর নিজের দলের ভিতর থেকেও। সেসব সামলে কি ইশতেহারের প্রতিশ্রুতি পূরণ করা সম্ভব হবে? পারলে তা গোটা পৃথিবীতে উদাহরণ হয়ে থাকবে। কারণ ক্রোনি পুঁজিবাদের হাত থেকে উদ্ধারের পথ এখন সব দেশেই খোঁজা হচ্ছে। উদারনৈতিক গণতন্ত্রের পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেছে। ঋজু বিদূষক কুণাল তাঁর সাম্প্রতিক এক ভিডিওতে মোদীর বদলে কে – এই প্রশ্নের যে উত্তর দিয়েছেন, তা এখন অনেক দেশেরই দুর্দশাগ্রস্ত মানুষের মনের কথা – ‘খালি চেয়ারও চলবে’।

পিপলস রিপোর্টারে প্রকাশিত

রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে ৪২ বছর

অনেকসময় দার্জিলিঙে হঠাৎ মেঘ সরে গিয়ে কাঞ্চনজঙ্ঘা যেভাবে নিজেকে উদ্ঘাটন করে, সেভাবে কোনো ঘটনায় আচমকা জলের মত পরিষ্কার হয়ে যায় রবীন্দ্রনাথের একেকটা লাইন।

মা মারা গেছেন খুব বেশিদিন হয়নি। তবু এবছর মায়ের মৃত্যুদিনটা ভুলে গিয়েছিলাম। বেলার দিকে বোন ফোন করে মনে না করালে মনে পড়ত না। আসলে ওই দিনটার চেয়ে মাকে অনেক বেশি মনে পড়ে প্রতিবছর পঁচিশে বৈশাখে। আমার মায়ের বেশ বেলা করেই ঘুম থেকে ওঠার অভ্যাস ছিল, কিন্তু বছরে ওই একটা দিন ঘুম থেকে উঠে পড়তেন খুব ভোরে। দূরদর্শনে জোড়াসাঁকো আর রবীন্দ্র সদনের কবিপ্রণাম দেখবেন বলে। বাড়িতে টিভি এসেছিল আটের দশকের শেষ দিকে। তখন থেকেই এই রুটিন চলছিল। মা যথারীতি ঈশ্বরে বিশ্বাসী, একসময় বাড়িতে ঠাকুরের আসন পেতে পুজোও করতেন। কিন্তু মহালয়ার দিন ভোর ভোর উঠতেই হবে, উঠে বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের চণ্ডীপাঠ শুনতেই হবে – ‘মহিষাসুরমর্দিনী’ নিয়ে এত গদগদ ছিলেন না। কোনোবার উঠতেন, কোনোবার উঠতেন না। কিন্তু পঁচিশে বৈশাখে ছাড়াছাড়ি নেই। খুব ইচ্ছা ছিল, একবার জোড়াসাঁকো বা রবীন্দ্র সদনের অনুষ্ঠানে গিয়ে ওখানে বসে গোটাটা দেখবেন। আমার কাছে আবদার ছিল, যখন বড় হয়ে চাকরি করব, তখন যেন নিয়ে যাই। আমি চাকরি পাওয়ার পরেও মা ১৬ বছর বেঁচেছিলেন। তখন আর মুখ ফুটে বলেননি, আমারও খেয়াল হয়নি। মুনীর নিয়াজি যথার্থই লিখেছেন “হমেশা দের কর দেতা হুঁ ম্যায়…” (সর্বদা দেরি করে ফেলি আমি)।

মা মারা গিয়েছিলেন শীতের শেষ দিকে। সেবার পঁচিশে বৈশাখে আমার ভোর ভোর ঘুম ভেঙে গেল, যদিও আমার বরাবর বেলা করে ঘুম থেকে ওঠা অভ্যাস। মা কবিপ্রণাম দেখতে উঠে পড়তেন, আমি বিছানা ছাড়তাম না। ঘুমটা পাতলা হয়ে গেলে গান, আবৃত্তি, ভাষ্যপাঠের আওয়াজ কানে ভেসে আসত। মা মারা যাওয়ার বছরের রবীন্দ্র জয়ন্তীতে তেমন আওয়াজ কানে আসতেই ধড়মড়িয়ে উঠে বসেছিলাম। কিন্তু উঠে বসতেই সে আওয়াজ মিলিয়ে গেল। না, কোথাও তো টিভি চলছে না! না আমাদের ফ্ল্যাটে, না পাশের বাড়িটায়, যেখান থেকে মেগা সিরিয়ালের সংলাপ বা ইউটিউবে চালানো হিন্দি সিনেমার গান ভেসে আসে প্রায়শই। বুঝলাম, স্বপ্ন দেখছিলাম। স্বপ্ন তো আসলে ইচ্ছাপূরণ – সিগমুন্ড ফ্রয়েড কবেই বলে গেছেন।

আমার একেবারে ছোটবেলায় বাড়িতে টিভি ছিল না, কেনার সামর্থ্য ছিল না বলে। এক নিকটাত্মীয় রঙিন টিভি কেনার সময়ে সাদাকালো টিভিটা যখন আমাদের দিয়ে দেন, তখন আমার বয়স ছয় কি সাত। তার আগে পর্যন্ত আমাদের বাড়িতে বিনোদন বলতে ছিল বই আর আমার অদেখা ঠাকুর্দার রেকর্ড প্লেয়ার। আমার হাতেখড়ির আগে থেকে টিভি আসার সময় পর্যন্ত সন্ধেবেলা আমার প্রিয় বিনোদন ছিল মায়ের মুখে সঞ্চয়িতার কোনো কবিতা পাঠ শোনা, বা মায়ের গলায় রবীন্দ্রসঙ্গীত। গীতবিতানটা খুলে রাখতেন পাশে, কিন্তু কোনোদিন দেখতে হয়েছে বলে মনে পড়ে না। শুনে শুনে বেশকিছু কবিতা আর গানের প্রতি আমার পক্ষপাত জন্মেছিল। বারবার সেগুলোই শুনতে চাইতাম।

যেমন পলাতকা কাব্যগ্রন্থের ‘নিষ্কৃতি’ কবিতাটা। কুলীন এবং নিষ্ঠুর বাপের মেয়ে মঞ্জুলিকার কষ্টের কথা পড়তে পড়তে মায়ের চোখ দিয়ে জল গড়াত, আমার চোখ দিয়েও। পথের পাঁচালী পড়েছি অনেক পরে। অপরের দুঃখে কষ্ট পাওয়ার শুরু মঞ্জুলিকার জন্যে কাঁদতে কাঁদতেই।

মায়ের নিজের বেশি প্রিয় ছিল “ডাক্তারে যা বলে বলুক নাকো,/রাখো রাখো খুলে রাখো,/শিয়রের ওই জানলা দুটো, – গায়ে লাগুক হাওয়া।/ওষুধ? আমার ফুরিয়ে গেছে ওষুধ খাওয়া।” বড় হয়ে সকৌতুকে লক্ষ করেছি, বাবার সঙ্গে ঝগড়া-টগড়া হলে এই কবিতাটা বেশি পড়তেন। মনোমালিন্য ২৪ ঘন্টার বেশি স্থায়ী হলে আবার পড়তেন ‘সাধারণ মেয়ে’।

লোডশেডিং তখন নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার ছিল, আর লোডশেডিং হয়ে গেলে হ্যারিকেন বা মোমবাতির আলোয় শুয়ে শুয়ে কবিতা পড়া যায় না। সেরকম পরিস্থিতিতে মা গান ধরতেন। আমার প্রায় ৪২ বছরের জীবনে আর কোনো অগায়কের এতগুলো রবীন্দ্রসঙ্গীত সুর সমেত মুখস্থ আছে বলে দেখিনি। অক্ষর পরিচয় হওয়ার আগেই রবীন্দ্রসঙ্গীত যে অন্য গানের চেয়ে আলাদা – এটা বুঝতে শিখেছিলাম মায়ের গান শুনে। কথাগুলোর মানে বোঝার বয়স তখন হয়নি, কিন্তু বারবার শুনে প্রায় মুখস্থ হয়ে গিয়েছিল মায়ের প্রিয় গানগুলো – “তোমার অসীমে প্রাণমন লয়ে”, “আমি রূপে তোমায় ভোলাব না”, “আমার সকল নিয়ে বসে আছি”, “সুখের মাঝে তোমায় দেখেছি”।

সুচিত্রা মিত্র আর কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায়ের লং প্লেয়িং রেকর্ড বেশ কয়েকটা ছিল আমাদের। বাগবাজারে মায়ের বড়মাসির বাড়ি যাওয়া হলেই ফেরার সময়ে মেট্রোরেলের জন্যে খুঁড়ে ফেলা এবড়োখেবড়ো রাস্তা অগ্রাহ্য করে, লাইন দিয়ে যে রেকর্ডের দোকানগুলো ছিল মা সেখানে খোঁজ করতেন নতুন কী এসেছে। ঋতু গুহ আর পূর্বা দামের নাম জানতে পারি তখনই। তবে অনেক খোঁজাখুঁজির পরেও ঋতুর গলায় “তোমার  সোনার থালায় সাজাব আজ” খুঁজে পাননি মা। যে রেকর্ডটা কিনে এনেছিলেন তার দুটো গান কে জানে কী কারণে আমার খুব প্রিয় হয়ে গিয়েছিল – “এরা  পরকে আপন করে, আপনারে পর”, “পেয়েছি ছুটি বিদায় দেহ ভাই”। সেই থেকে আজ পর্যন্ত আমার কাছে বুদ্ধদেব গুহ ঋতু গুহর স্বামী। আর কিছু নন।

বাবার অতখানি রাবীন্দ্রিক হওয়ার সময় ছিল না। বছর বিশেক বয়সে মার্কসবাদী কমিউনিস্ট পার্টির সদস্যপদ পেয়েছিলেন। মৃত্যুর আড়াই মাস আগে শয্যাশায়ী হয়ে যাওয়া পর্যন্ত দিনের বেশিরভাগ সময়টা পার্টির কাজেই কাটাতেন। তার উপর আমার শৈশবে প্রশাসনিক দায়িত্বেও ছিলেন। তবু একবার বিবাহবার্ষিকীতে মাকে উপহার দিলেন একটা এলপি রেকর্ড, যার এক পিঠে কণিকা, অন্য পিঠে দেবব্রত বিশ্বাস। সুচিত্রার গান বাবার তত পছন্দ ছিল না। রেকর্ডে দেবব্রতর গলায় সম্ভবত প্রথম গানটাই ছিল ‘আকাশ ভরা সূর্য তারা’। তখন আমার বয়স সাত বা আট। শুনেই মনে হল, এ কী আশ্চর্য গান রে বাবা! এমন কথা হয় গানের! এমন গলা হয় মানুষের! সেই বিস্ময় আমার আজও কাটেনি।

পার্টি সংগঠন, প্রশাসন, পরিবার সামলেও বাবা যে সুযোগটা পারতপক্ষে ছাড়তেন না সেটা হল অপেশাদার যাত্রায়, নাটকে অভিনয় করার সুযোগ। বাবা আর তাঁর বন্ধুরা কয়েকজন মিলে যাত্রা ক্লাব খুলেছিলেন, বছরে অন্তত একটা যাত্রা হত। আজকাল যাকে ‘টল, ডার্ক অ্যান্ড হ্যানসাম’ চেহারা বলে, তেমন চেহারা থাকার সুবাদে বাবা বেশ কয়েকবার নায়কের ভূমিকায় অভিনয় করেছেন। কিন্তু চেহারা নয়, যাত্রায় অভিনয় করতে গেলে যা অপরিহার্য, তা হল শক্তিশালী কণ্ঠস্বর। সেরিবেল্লা ডিজেনারেশন নামে এক আরোগ্যহীন রোগে গলাটা নষ্ট হয়ে যাওয়ার আগে বাবার দারুণ একখানা কণ্ঠস্বরও ছিল। সেই সুবাদে বাবা চমৎকার কবিতা আবৃত্তিও করতেন। বহুকাল চর্চা না থাকলেও অনর্গল আবৃত্তি করতে পারতেন নজরুলের ‘আমার কৈফিয়ত’। বাড়িটা গমগম করত। রবীন্দ্রনাথের কবিতার মধ্যে বাবা বারবার আবৃত্তি করতেন ‘ছেলেটা’ আর ‘বাঁশি’। বাবার অনেকটা সময় বাড়িতে থাকা আমাদের দুই ভাইবোনের কাছে অনেকদিন পর্যন্ত ছিল লটারি পাওয়ার মত ব্যাপার। তেমন দিনে মনমেজাজ বিশেষ রকমের ভাল থাকলে বাবা সঞ্চয়িতা টেনে নিয়ে উদাত্ত কণ্ঠে পড়তেন “যদি  পরজন্মে পাই রে হতে/ব্রজের রাখাল বালক/তবে  নিবিয়ে দেব নিজের ঘরে/সুসভ্যতার আলোক।” মা পড়তেন ‘পুরাতন ভৃত্য’ বা ‘দুই বিঘা জমি’। বাবা মাঝে মাঝে গেয়েও উঠতেন। সবই দেবব্রতর গলায় শোনা গান – ‘আমি যখন তাঁর দুয়ারে ভিক্ষা নিতে যাই’, ‘তোরা যে যা বলিস ভাই’, ‘যেতে যেতে একলা পথে/নিবেছে মোর বাতি,’ ‘যে রাতে মোর দুয়ারগুলি’।

একসময় রেকর্ড প্লেয়ারটার দিন ফুরোল। গানহীন দীর্ঘ কয়েকটা বছরের পরে বাড়িতে এল ফিলিপসের ক্যাসেট প্লেয়ার, যাকে আমরা বলতাম টেপ রেকর্ডার। তখন উঁচু ক্লাসে পড়ি। এক ছুটির দিনে মা ঠিক করলেন, আমাদের চারজনের গলা টেপে ধরে রাখা হবে। ব্ল্যাঙ্ক ক্যাসেট ছিল না, কিন্তু যখন ঝোঁক চেপেছে তখন করতেই হবে কাজটা। উনিশ বছর বয়সী এ আর রহমানের সৃষ্টি রোজা-র সাউন্ড ট্র‍্যাকের খানিকটা ধ্বংস করে রেকর্ড করা হল – বাবার গলায় ‘বিষ্টি পড়ে টাপুর টুপুর’, মায়ের গলায় “সন্ন্যাসী উপগুপ্ত/মথুরাপুরীর প্রাচীরের তলে/একদা ছিলেন সুপ্ত – ”। ধরে রাখা হয়েছিল, কিন্তু সংরক্ষণ করা হয়নি। ক্যাসেটের যুগ চলে গেছে, ওই কণ্ঠস্বরগুলো আমাদের সন্তানদের শোনার জন্যে এ যুগের উপযোগী ফর্ম্যাটে রাখা হয়নি। আমার মায়ের আরেকটা প্রিয় গান “যা  হারিয়ে যায় তা আগলে বসে/রইব কত আর?”

গত সহস্রাব্দের শেষে প্রাপ্তবয়স্ক হলাম। জন্মদিনে বাবা-মা বরাবরই বই দিতেন, জামাকাপড় বা খেলনা নয়। আঠারোতম জন্মদিনের আগেরদিন দেখি মা রিকশা করে এসে বাড়ির সামনে নামলেন আর রিকশাকাকু একটা ইয়াব্বড় প্যাকিং বাক্স ঘরে নামিয়ে দিয়ে গেলেন। কী আছে তাতে? সেবারের জন্মদিনের উপহার – বিশ্বভারতী প্রকাশিত রবীন্দ্র রচনাবলীর প্রথম ১৫ খণ্ড। বারো তারিখের আগে মাইনে হত না বাবার। সাত-আট তারিখে অত দামি জিনিস বাড়িতে এসে পড়ায় দেখলাম বাবার ভুরু সামান্য কুঁচকে গেছে। দাম শুনে চোখ কপালে। তখনই বোধহয় ১৭০০-১৮০০ টাকা দাম ছিল। কিন্তু একটু পরেই বাবার রাগ পড়ে গেল। বললেন “যাকগে, এ জিনিস তো জীবনে একবারই কেনা। আমরা যখন থাকব না তখনো ওর কাজে লাগবে এরকম একটা জিনিস দেওয়া গেল।” পরবর্তী এক বছরে সমস্ত কবিতা পড়ে ফেলেছিলাম। তারপর ক্রমশ গল্প, উপন্যাস, নাটক। প্রবন্ধগুলো পড়তে ভারি আলস্য লাগত। সে আলস্য কাটাতে কাটাতে বাবা, মা দুজনেই বিদায় নিলেন; আমার চশমাটা বাইফোকাল হয়ে গেল। রাশিয়ার চিঠি, কালান্তর, শান্তিনিকেতন, মহাত্মা গান্ধী, ইতিহাস, ভারতবর্ষ – এসব পড়তে পড়তে এতদিন যে জিনিস যে চোখে দেখে এসেছি তা বদলে যায় আর মনে পড়ে বাবার মন্তব্য “আমরা যখন থাকব না তখনো ওর কাজে লাগবে এরকম একটা জিনিস দেওয়া গেল।”

বাবার যখন শেষ সময় – মানে অসুখটা জেনে গেছি, বাবাও টের পেয়ে গেছে, চোখে আর ভাল দেখতে পাচ্ছে না, গলা দিয়ে স্বর বেরনো একেবারেই বন্ধ হয়ে গেছে, তখনো শ্রবণেন্দ্রিয় ঠিক ছিল। একদিন সন্ধেবেলা কোনো কারণে আমি, মা, বোন বাবাকে ঘিরে বসে একসঙ্গে গাইছিলাম “আগুনের পরশমণি ছোঁয়াও প্রাণে।” “ব্যথা মোর/উঠবে জ্বলে/ঊর্ধ্ব-পানে” পংক্তিতে এসে এক অদ্ভুত অনুভূতি হল। মনে হল, জীবনটা যদি সিনেমা হত তাহলে এই শটটার পরের শটে দেখা যেত – বিছানাটা খালি, বাবা নেই। সাউন্ড ট্র্যাকে গানটা চলতে থাকত। রবীন্দ্রনাথের আর সব থেমে গেলেও গান কখনো থামে না, জীবন মরণের সীমানা ছাড়ায়ে চলতেই থাকে। সেই হাতেখড়ির আগের যুগে রান্নাঘরে আটা মাখতে মাখতে গাওয়ার মাঝে মা বলেছিলেন “জীবনের সব পরিস্থিতির জন্যেই দেখবি রবীন্দ্রনাথের একটা না একটা গান আছে।” তখন মনে হয়েছিল, এই কয়েকবছর আগেও মনে হত, মা রবীন্দ্রভক্ত বলে বাড়িয়ে বলেছেন। কিন্তু বয়স যত বাড়ছে, ততই কথাটা বিশ্বাস না করে উপায় থাকছে না। বরং এখন মনে হয় মা একটু রক্ষণশীল হয়েই কথাটা বলেছিলেন। কেবল রবীন্দ্রনাথের গান নয়, বোধহয় রবীন্দ্রনাথের কাব্যের ক্ষেত্রেও কথাটা সত্যি। কোভিড হাসপাতাল থেকে যখন মায়ের মৃতদেহ নিয়ে বাড়ি আসছিলাম, রাস্তা খুঁড়ে পৌরসভা কোনো কাজ করছিল বলে সোজা পথে না এসে ঘুরপথে আসতে হয়েছিল। তখন মা রবীন্দ্রনাথের যে কবিতা আমাকে একেবারে ছোটবেলায় আবৃত্তি করতে শিখিয়েছিলেন, তার প্রথম কয়েক লাইন মনে পড়ছিল “মনে করো যেন বিদেশ ঘুরে/মাকে নিয়ে যাচ্ছি অনেক দূরে।”

অনেককাল হল, শ্মশানে গেলেই আমার কানে বাজতে থাকে দেবব্রতর গলায় “আছে দুঃখ, আছে মৃত্যু, বিরহদহন লাগে/তবুও শান্তি, তবু আনন্দ, তবু অনন্ত জাগে।” সদ্যমৃত কোনো কাছের মানুষকে দাহ করতে শ্মশানে গিয়ে দ্বিতীয় লাইনটা অবিশ্বাস্য, অবাস্তব মনে হওয়াই স্বাভাবিক। কিন্তু আমার দিব্যি বিশ্বাসযোগ্য মনে হয়। কারণ যে বছর বাবা মারা গেলেন, সেবছরই আমার মেয়ে জন্মাল। যে বছর মা মারা গেলেন, সে বছরই আমার ভাগ্নী জন্মাল। কোনো সন্দেহ নেই – “নাহি ক্ষয়, নাহি শেষ,  নাহি নাহি দৈন্যলেশ।”

মাস দেড়েক পরেই বিয়াল্লিশে পা দেব। জীবনের কাছে এখনো যা যা প্রত্যাশা আছে তার অন্যতম হল রবীন্দ্রনাথের যেসব লাইনের অর্থ আজও বুঝিনি সেগুলোর মর্মোদ্ধার। বুঝে গেছি, সবসময় বুঝতে চেষ্টা করলেই বোঝা যায় না। অনেকসময় দার্জিলিঙে হঠাৎ মেঘ সরে গিয়ে কাঞ্চনজঙ্ঘা যেভাবে নিজেকে উদ্ঘাটন করে, সেভাবে কোনো ঘটনায় আচমকা জলের মত পরিষ্কার হয়ে যায় রবীন্দ্রনাথের একেকটা লাইন। নইলে ভেনেজুয়েলার জগদ্বিখ্যাত নেতা উগো শাভেজ, জাপানের সাংবাদিক জুনিচি কোদামা আর তার স্ত্রী রিয়েকো আসাতোর সঙ্গে ভারতের এক নগণ্য মফস্বলের ছাপোষা প্রতীক যে বিশ্বসাথে যোগে যুক্ত – তা কখনো আমার বুঝে ওঠা হত না।