স্বর্গহারা মাঝারিয়ানার দেবদূত: অশ্বিন, জাদেজা

ভারত টেস্ট ক্রিকেট খেলছে ১৯৩২ সাল থেকে, আর ভারতের মাটিতে প্রথম টেস্ট খেলা হয় ১৯৩৩ সালে। একানব্বই বছরের ইতিহাসে প্রথমবার তিন বা তার বেশি ম্যাচসম্পন্ন সিরিজের সবকটা ম্যাচ হেরে যাওয়ায় যাঁরা এখন মুহ্যমান, তাঁদের মাঝারিয়ানা এবং অশ্বিন, জাদেজার প্রসঙ্গে নিয়ে যাওয়ার আগে কয়েকটা কথা একটু বলে নেওয়া দরকার।

২০২৩-২০২৭ আইপিএলের সম্প্রচার স্বত্ব বেচার জন্য যখন দরপত্র আহ্বান করা হয়েছিল, তখন ঘোষণা করা হয়েছিল ২০২৪ সালে আইপিএলে খেলা হবে ৭৪ খানা ম্যাচ, ২০২৫ ও ২০২৬ আইপিএলে ৮৪ এবং ২০২৭ আইপিএলে ৯৪। তবে এবছর সেপ্টেম্বর মাসে ক্রিকইনফো ওয়েবসাইট এক প্রতিবেদনে জানায় – ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড (বিসিসিআই) ২০২৫ আইপিএলে ম্যাচের সংখ্যা না বাড়ানোই ভাল বলে মনে করছে, কারণ ভারত বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনালে ওঠার মত জায়গায় আছে। আর ফাইনাল হবে মে-জুন নাগাদ। সুতরাং আইপিএল বেশি লম্বা হলে ভারতীয় দলের ক্রিকেটারদের চাপ বেড়ে যাবে। এখনো আইপিএলের সূচি ঘোষণা হয়নি, ইতিমধ্যে ভারতের বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপ ফাইনালে ওঠার সম্ভাবনা বড়সড় ধাক্কা খেয়েছে। অস্ট্রেলিয়ায় নিদেনপক্ষে চারটে টেস্ট জিততে না পারলে অন্য দলগুলোর জেতা-হারার উপর নির্ভর করতে হবে। সুতরাং অস্ট্রেলিয়া সফরে ভারতীয় দলের ব্যর্থতা বিসিসিআইয়ের কাছে পূর্ব ঘোষণা অনুযায়ী ৮৪ ম্যাচের আইপিএল করার সুবর্ণ সুযোগ এনে দিতে পারে। বেশি ম্যাচ খেলা মানে খেলোয়াড়দের জন্যেও বেশি টাকা।

গন্ধটা খুব সন্দেহজনক লাগছে? কিছু করার নেই। এটাই আজকের ক্রিকেটের বাস্তবতা। ভারতের সংবাদমাধ্যমের বেশিরভাগটাই বিসিসিআইয়ের অনুগত বলে এসব নিয়ে বিশেষ লেখালিখি হয় না, কিন্তু ইংল্যান্ডের দ্য ডেইলি টেলিগ্রাফ কাগজের সাংবাদিক টিম উইগমোর সম্প্রতি এক বিশেষ প্রতিবেদন লিখেছেন। শিরোনাম ‘হাউ ক্রিকেট এট ইটসেলফ’, অর্থাৎ ক্রিকেট কীভাবে নিজেকে খেয়ে ফেলল। সেই লম্বা প্রতিবেদনে টিম দেখিয়েছেন যে সারা পৃথিবীতে এখন এত বিপুল সংখ্যক ফ্র্যাঞ্চাইজ লিগ হচ্ছে যে প্রকৃতপক্ষে ৫০০ দিনের ক্রিকেট খেলা হচ্ছে ৩৬৫ দিনে। একই ক্রিকেটার সাত-আটটা লিগে খেলছেন, অনেকসময় একই সপ্তাহে তিনটে আলাদা আলাদা লিগে খেলছেন। ফলে এক লিগে খেলতে খেলতে অনেকেই চাইছেন যেন তাঁর দল হেরে যায়, যাতে তিনি অন্য একটা লিগে গিয়ে যোগ দিতে পারেন। কারণ তাতে রোজগার বাড়বে। অনেক লিগে আবার লগ্নি ব্যাপারটা এত গোলমেলে যে অনেক দলের মালিক নিজের দলের বিরুদ্ধেই বাজি ধরেন বেটিং সাইটে। আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিল এবং বিভিন্ন দেশের ক্রিকেট নিয়ামক সংস্থাগুলো ঢালাও এইসব লিগকে অনুমোদন দিয়ে যাচ্ছে আগাপাশতলা না ভেবে। ফলে এমন লিগও আছে যেগুলোতে দল গঠন করা হচ্ছে, খেলোয়াড়দের নেওয়া হচ্ছে টিভি সম্প্রচার স্বত্ব থেকে টাকা আসবে আশা করে। তারপর টাকা না আসায় একটা বলও খেলা হওয়ার আগেই লিগ বাতিল হয়ে যাচ্ছে। অনেক জায়গায় আবার খেলোয়াড়রা টাকা পাচ্ছেন না বলে মাঠে পৌঁছে খেলতে নামতে চাইছেন না। ব্রেন্ডন ম্যাককালাম, আন্দ্রে রাসেলের মত লোকেরও এই অভিজ্ঞতা হয়েছে।

এসব খবর দিয়ে এই ইঙ্গিত করছি না যে ভারতীয় দল ইচ্ছা করে নিউজিল্যান্ডের কাছে গোহারা হেরেছে বা অস্ট্রেলিয়ায় ইচ্ছে করে হারবে। যাঁরা ক্রিকেট খেলা ন্যূনতম মনোযোগ দিয়ে দেখেন এবং অন্তত কিছুটা বোঝেন, তাঁদেরও বুঝিয়ে বলার দরকার নেই যে এই ভারতীয় দলের ইচ্ছে করে হারার যোগ্যতা নেই। তবু খবরগুলো দিলাম এইজন্যে যে ৩-০ হওয়ার পর থেকে উদ্ধারের উপায় হিসাবে কোনো কোনো প্রাক্তন ক্রিকেটার, সাংবাদিক এবং বহু ক্রিকেটপ্রেমী আইপিএলকে এই দুরবস্থার একমাত্র কারণ বলে ঠাওরাচ্ছেন এবং আইপিএল বন্ধ করা বা আইপিএলকে কম গুরুত্ব দেওয়ার নিদান দিচ্ছেন। প্রথম দুই অনুচ্ছেদ পড়লে দুটো জিনিস বুঝতে পারা উচিত – ১) ওসব দিবাস্বপ্ন দেখে লাভ নেই, ২) কেবল আইপিএলের ঘাড়ে দোষ চাপালে চলবে না, কারণ ফ্র্যাঞ্চাইজ লিগ নিয়ে বাড়াবাড়ি গোটা ক্রিকেট দুনিয়ায় হচ্ছে এবং তার ফলে একা ভারতীয় দল ভুগছে না।

ভারত-নিউজিল্যান্ড সিরিজের পাশাপাশিই চলছিল পাকিস্তান-ইংল্যান্ড সিরিজ। ভারতে এসে নিউজিল্যান্ডের ৩-০ জয়কে বলা হচ্ছে টেস্ট ক্রিকেটের ইতিহাসের অন্যতম বড় অঘটন, কিন্তু পাকিস্তানের সিরিজটাতে যা হয়েছে তাও কম চমকপ্রদ নয়। পাকিস্তান গত কয়েকবছর ধরে হাইওয়ের মত পিচ বানিয়ে যাচ্ছিল। ইংল্যান্ডের এর আগের পাকিস্তান সফরে সেইসব পিচে ম্যাককালাম-বেন স্টোকসের মস্তিষ্কপ্রসূত ব্যাজবল দারুণ কাজ দিয়েছিল। ইংল্যান্ডের ব্যাটাররা এত দ্রুত এত রান তুলছিলেন যে সেই রানের চাপেই পাকিস্তানের ব্যাটিং ধসে পড়ছিল। ফলে ইংল্যান্ড সিরিজ জিতে ফিরেছিল। এবারেও প্রথম টেস্টে সেই একইরকম পিচ তৈরি করা হয়েছিল মুলতানে। সেখানে পাকিস্তানের ৫৫৬ রানের জবাবে ইংল্যান্ড সাত উইকেটে ৮২৩ রান করে, মারকুটে হ্যারি ব্রুক একাই ৩১৭। ওই রানের চাপে দ্বিতীয় ইনিংসে পাকিস্তান মাত্র ৫৪.৫ ওভারে ২২০ রানে গুটিয়ে যায়।

তারপর পাকিস্তানের ক্রিকেট বোর্ড কী করল? নির্বাচক কমিটি বদলে দিল। আকিব জাভেদের নেতৃত্বাধীন নতুন নির্বাচক কমিটি দায়িত্ব নিয়েই দলের খোলনলচে বদলে ফেলল। দলের এক নম্বর ব্যাটিং তারকা বাবর আজমকে বিশ্রামে পাঠিয়ে দিল; বোলিং তারকা শাহীন আফ্রিদি, নাসিম শাহদেরও বসিয়ে দেওয়া হল। দলে এলেন ত্রিশোর্ধ্ব দুই স্পিনার নোমান আলি আর সাজিদ খান। আরও অদ্ভুত সিদ্ধান্ত – দ্বিতীয় টেস্টও মুলতানের একই পিচে খেলা। শেষপর্যন্ত সবকটা সিদ্ধান্তই কিন্তু খেটে গেল। টানা দুটো টেস্ট হওয়া পিচে বল ঘুরল বনবনিয়ে আর ইংল্যান্ডের কুড়িটা উইকেটই তুলে নিলেন সাজিদ আর নোমান। দ্বিতীয় ইনিংসে তো ওই দুজন ছাড়া কাউকে বলই করতে হল না। দেখা গেল ইংল্যান্ডের ব্যাটাররা পাটা উইকেটে যত রানই করুন, বল ঘুরলেই চোখে সর্ষেফুল দেখছেন। রাওয়ালপিণ্ডির তৃতীয় টেস্টেও একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি। এখানে সাজিদ-নোমান প্রথম ইনিংসে নিলেন নটা উইকেট, দ্বিতীয় ইনিংসে দশটাই।

ক্রিকেট দুনিয়ায় এখন সবচেয়ে ধনী তিনটে ক্রিকেট বোর্ডের দুটো হল আমাদের বিসিসিআই আর স্টোকসদের ইংল্যান্ড অ্যান্ড ওয়েলস ক্রিকেট বোর্ড (ইসিবি)। কোন দুটো বোর্ড ফ্র্যাঞ্চাইজ লিগ নিয়ে সবচেয়ে বেশি বাড়াবাড়ি করে? এই দুটো দেশই। ভারতীয় ক্রিকেটে বিপণন থেকে দল নির্বাচন – সবকিছু আইপিএলকেন্দ্রিক হয়ে গেছে। ইংল্যান্ডে আবার শুধু কুড়ি বিশের লিগ ‘টি টোয়েন্টি ব্লাস্ট’ নয়, ১০০ বলের খেলা ‘দ্য হান্ড্রেড’ বলেও একটা প্রতিযোগিতা চালু হয়েছে। পাঁচ বলের ওভার, বাহারি রংদার জামা, সাদা বল, ছোট মাঠ, একইসঙ্গে ছেলেদের আর মেয়েদের লিগ – সে এক মোচ্ছব। এত কাণ্ড করতে গিয়ে কাউন্টি ক্রিকেটের মরশুম বদলাতে হয়েছে, অর্থাৎ প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটের গুরুত্ব কমেছে। এদিকে টেস্ট দল পড়েছে গাড্ডায়। জো রুটের আমলে দুর্বল ওয়েস্ট ইন্ডিজে গিয়েও সিরিজ হারার পরে দায়িত্ব দেওয়া হয় স্টোকস-ম্যাককালামকে। তাঁরা ব্যাজবল চালু করে দেশের মাঠে নিউজিল্যান্ড আর ভারতের বিরুদ্ধে বেশ কিছুটা সাফল্য পেয়েছিলেন, পাকিস্তানে এসে সিরিজ জিতেছিলেন। কিন্তু অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে অ্যাশেজের ফলাফলের বিশেষ তারতম্য হয়নি, এবছরের গোড়ার দিকে ভারতে এসে সিরিজ হেরেছেন, এখন ছন্নছাড়া পাকিস্তানের কাছেও হারলেন। উপরন্তু ২০২১ সালে বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপ চালু হওয়ার পর থেকে দুবার ফাইনাল হয়েছে, একবারও ইংল্যান্ড ফাইনালে উঠতে পারেনি। ভারত সফরে আর সদ্যসমাপ্ত পাকিস্তান সফরে – দুবারই দেখা গেছে যে রুটকে বাদ দিলে ইংল্যান্ডের ব্যাটাররা স্পিন একেবারেই খেলতে পারছেন না। এক-আধটা ইনিংসে অলিভার পোপ বা বেন ডাকেট রান করে ফেলছেন। কিন্তু সেগুলো ব্যতিক্রম। সুতরাং স্পিন খেলতে না পারার দোষে শুধু রোহিত শর্মারা দুষ্ট নন। কুড়ি বিশের খেলা যে সব দলের ব্যাটারদেরই স্পিন খেলার দক্ষতার বারোটা বাজাচ্ছে তাতে সন্দেহ নেই। কেভিন পিটারসেন সেকথা স্পষ্ট বলেও দিয়েছেন।

কিন্তু মুশকিল হল, এসব বলে রোহিতরা পার পেতে পারেন না। কারণ প্রথমত, স্টোকসরা খেলছিলেন বিদেশে, রোহিতরা দেশে। টেস্ট ক্রিকেটের প্রায় দেড়শো বছরের ইতিহাসে মাত্র দশবার কোনো দল নিজের দেশে তিন বা তার বেশি টেস্টের সিরিজের সবকটা ম্যাচে হেরেছে। দ্বিতীয়ত, স্টোকসদের জন্ম বেদি-প্রসন্ন-চন্দ্রশেখর-ভেঙ্কটরাঘবন, অনিল কুম্বলে, হরভজন সিংদের দেশে নয়। তৃতীয়ত, কিথ ফ্লেচার, অ্যালাস্টেয়ার কুক, পিটারসেন, রুটের মত কয়েকজনকে বাদ দিলে কোনোদিনই ইংল্যান্ডের ব্যাটাররা স্পিন খেলতে দারুণ পারদর্শী ছিলেন না।

ভারতীয়দের ইতিহাস ঠিক উল্টো। আমাদের দলকে যে ‘দেশে বাঘ বিদেশে বেড়াল’ বলা হত তার বড় কারণ – আমাদের নেহাত মাঝারি মানের ব্যাটাররা জোরে বলে চোখ বুজে ফেললেও স্পিনারদের ছিঁড়ে খেতেন। সেই কারণেই সর্বকালের সেরা লেগস্পিনার শেন ওয়ার্ন ভারতের বিরুদ্ধে এক ইনিংসে পাঁচ উইকেট নিয়েছেন ১৪ টেস্টে মাত্র একবার। তিনি যখন ১৯৯৮ সালে ভারতে প্রথম টেস্ট খেলতে আসেন, তখন শচীন তেন্ডুলকর ব্যাট করতে নামার আগেই ওয়ার্নকে মেরে আধমরা করে রাখতেন নভজ্যোৎ সিং সিধু। ইনি কিন্তু ভারতের সর্বকালের সেরা ১৫ জন ব্যাটারের তালিকাতেও থাকবেন না। মুথাইয়া মুরলীধরনের ভারতের বিরুদ্ধে সাফল্য ওয়ার্নের চেয়ে বেশি, কিন্তু তারও বেশিরভাগটা শ্রীলঙ্কায়। ভারতে এসে তিনি এক ইনিংসে দুবারের বেশি পাঁচ উইকেট নিতে পারেননি। দুজনেরই ভারতের বিরুদ্ধে গড় সামগ্রিক গড়ের চেয়ে অনেক বেশি।

ইংল্যান্ড থেকে সেই প্রাচীনকালের জিম লেকার আর ছয়, সাতের দশকের ডেরেক আন্ডারউড ছাড়া বিশ্বমানের স্পিনারই বা এসেছে কজন? ২০১২-১৩ মরশুমে তারা ভারতে এসে সিরিজ জিতেছিল যে দুজনের জন্যে, তাঁদের মধ্যে গ্রেম সোয়ান তো বেশিদিন খেললেনই না। আর মন্টি পানেসার সম্পর্কে ওয়ার্ন একবার বলেছিলেন – ও পঞ্চাশটা টেস্ট খেলেনি, একই টেস্ট পঞ্চাশবার খেলেছে। সাম্প্রতিক ভারত সফর আর পাকিস্তান সফরে প্রমাণ হয়ে গেছে যে এখনো ইংল্যান্ডের ব্যাটাররা তেমন দরের স্পিনারদের বিরুদ্ধে অনুশীলনের সুযোগ পান না। জ্যাক লিচের সীমাবদ্ধতা অসীম, শোয়েব বশির আর রেহান আহমেদ ভবিষ্যতে কেমন হবেন তা ভবিষ্যৎ বলবে – কিন্তু এখনো ৩৮ বছরের নোমান আর ৩১ বছরের সাজিদের সমকক্ষ নন। এই সমস্যা তো রোহিত, বিরাট কোহলি, শুভমান গিলদের নেই। তাঁরা এখন ঠাসা আন্তর্জাতিক ক্যালেন্ডারের ঠ্যালায় না হয় ঘরোয়া ক্রিকেট খেলার সময় করতে পারেন না, উঠে এসেছিলেন তো ঘরোয়া ক্রিকেট খেলেই। সেখানে তো একগাদা ভাল মানের স্পিনারকে খেলতে হয়েছিল। যদি ধরে নিই এই ব্যাপারটা সাইকেল চালাতে শেখার মত নয়, ছোট থেকে শিখে আসা জিনিসও খেলোয়াড়রা ভুলে যান, তাহলেও ভারতীয় দলে এই মুহূর্তে এমন অন্তত দুজন স্পিনার আছেন যাঁদের একজনকে সারাক্ষণই আমাদের প্রাক্তন ক্রিকেটার এবং সাংবাদিকরা ভারতের সর্বকালের সেরা বলেন – রবিচন্দ্রন অশ্বিন। অন্যজন বিশ্বের সর্বকালের সেরা অলরাউন্ডারদের একজন, এমন দাবিও নিউজিল্যান্ড সিরিজের আগে পর্যন্ত শোনা গেছে – রবীন্দ্র জাদেজা। তা আমাদের ব্যাটাররা তো নেটে এঁদের বোলিংয়ে ব্যাট করেন। তা সত্ত্বেও এই ধেড়ে বয়সে ঘরোয়া ক্রিকেট খেলেন না বলেই বিরাট, রোহিতরা স্পিনারদের বিরুদ্ধে রান করতে পারেননি, আর রঞ্জি ট্রফিতে ফেরত গেলেই আবার তরতরিয়ে রান করতে শুরু করবেন? বিশ্বাস করা শক্ত।

আসল কথা হল, ভারতের টেস্ট দলের সদস্যদের মাঝারিয়ানা ধরা পড়ে গিয়েছে। বোর্ডের বিপুল অর্থবলে চালিত সর্বব্যাপী প্রচারযন্ত্র যে সত্য চাপা দিয়ে রেখেছিল, টেস্ট ক্রিকেটের ইতিহাসে সবচেয়ে কম প্রতিযোগিতামূলক ১২-১৩ বছর যে সত্যকে চেপে রাখা সম্ভব করেছিল, পরিশ্রমী নিউজিল্যান্ড দল সেই সত্যকে একেবারে উলঙ্গ করে দিয়েছে। তাই এখন রেখে ঢেকে সমালোচনা করে পরিত্রাণ পাওয়ার চেষ্টা করছে এ দেশের ক্রিকেট বাস্তুতন্ত্র।

ক্রিকেটভক্তরা এখনই তেড়ে আসবেন – ‘১২ বছরে দেশের মাঠে পরপর ১৮ খানা সিরিজ জিতেছে যে দল, তারা মাঝারি? এই রেকর্ড আর কোনো দলের নেই তা জানেন?’ আজ্ঞে জানি। কথাটা একদম সত্যি। ঠিক যেমন ‘অশ্বত্থামা হত’ কথাটাও সত্যি। এক্ষেত্রে ‘ইতি গজ’-র হাতিটা একটা বড়সড় দাঁতাল। তার একটা দাঁত হল অতীতের ভারতীয় দলগুলোর ঘরের মাঠের রেকর্ড, যা নিয়ে কদিন আগেই এইখানে বিস্তারিত লিখেছি। সে দাঁতের কথা জেনেও কেউ কেউ নিশ্চয়ই বলবেন – আগের দলগুলো যতই জিতুক, বিরাট আর রোহিতের দলের মত পরপর ১৮ খানা তো জেতেনি। ঠিক। কেন এই রেকর্ডটা হয়েছে তা বোঝা যাবে অন্য দাঁতটার কথা বললে।

বিরাট-রবি শাস্ত্রী জমানার আগেও ভারতে ঘূর্ণি পিচই হত বটে, কিন্তু বল প্রথম দিন মধ্যাহ্নভোজনের বিরতির আগে থেকেই ঘুরছে – এমনটা কমই দেখা যেত। বল তাক লাগিয়ে দেওয়ার মত ঘুরত তৃতীয় দিন থেকে। তার আগে পর্যন্ত স্পিনারদের ঘাম ঝরাতে হত। মূলত গতি আর লাইন, লেংথের বৈচিত্র্যের উপর নির্ভর করে উইকেট নিতে হত। বেদি-প্রসন্ন-চন্দ্রশেখর থেকে আরম্ভ করে কুম্বলে-হরভজন ওরকম পিচেই বল করেছেন এবং ম্যাচ জিতিয়েছেন বছরের পর বছর। এই কথাটা অবশ্য পরিসংখ্যান দিয়ে প্রমাণ করার উপায় নেই, কারণ এর কোনো পরিসংখ্যান হয় না। যাঁরা সেই যুগ থেকে খেলা দেখছেন তাঁরা হয় একবাক্যে একমত হবেন, নয় একেবারেই মানবেন না। তরুণরা তো মানতেই চাইবেন না, কারণ কুড়ি বিশ প্রজন্মের ইউটিউব থাকলেও ধৈর্য নেই। কিন্তু অন্য একটা ব্যাপার আছে যার প্রমাণ দেওয়া যায়।

বিরাট-শাস্ত্রী জমানার আগে পর্যন্ত কিন্তু প্রত্যেক সিরিজেই এমন এক-আধটা মাঠে খেলা দেওয়া হত যেখানকার পিচ, আবহাওয়া মিলিয়ে সফরকারী দলেরও কিছুটা সাহায্য পাওয়ার আশা থাকত। যেমন কলকাতার ইডেন উদ্যানে অনেক সময়েই বিপক্ষের জোরে বোলাররা গঙ্গার হাওয়াকে কাজে লাগাতে পারতেন, পিচেও অনেক সময় বেশ ঘাস থাকত। ইতিহাস বলছে ইডেনে অস্ট্রেলিয়া আর ইংল্যান্ড জিতেছে দুবার করে। ওয়েস্ট ইন্ডিজ জিতেছে তিনবার আর পাকিস্তান, দক্ষিণ আফ্রিকাও একবার করে জিতেছে। সেই ইডেনে ভারত শেষ তিনটে টেস্ট খেলেছে যথাক্রমে নিউজিল্যান্ড, শ্রীলঙ্কা আর বাংলাদেশের বিরুদ্ধে। শেষ ম্যাচটা ছিল সেই ২০১৯ সালে। অস্ট্রেলিয়ার মত দলের বিরুদ্ধে ২০০১ সালের সেই অবিস্মরণীয় টেস্টের পর থেকে আর খেলাই হয়নি ইডেনে।

এমন আরেকটা মাঠ ছিল মোহালির পিসিএ স্টেডিয়াম। ওই মাঠে সফরকারী দলগুলো জিততে না পারলেও অন্তত ড্র করতে পারত। কোর্টনি ওয়ালশের ওয়েস্ট ইন্ডিজ তো ১৯৯৪ সালে গোটা সফরে কিছু জিততে না পারলেও ওখানে শেষ টেস্টে ভারতকে হারিয়েছিল। ওই মাঠে ইংল্যান্ড ড্র করেছে একবার, নিউজিল্যান্ড দুবার, পাকিস্তান একবার, শ্রীলঙ্কা একবার। সে মাঠেও গত ১১ বছরে খেলা হয়েছে মাত্র চারটে টেস্ট।

তাহলে আজকাল খেলা দেওয়া হয় কোথায়? এরও গোটা দুয়েক উদাহরণ দেওয়া যাক।

২০১৭ সালে প্রথম টেস্ট ম্যাচ হওয়া পুনের এমসিএ স্টেডিয়ামে সাত বছরের মধ্যে তিনটে ম্যাচ হয়ে গেল এবং তিনটেই ঘূর্ণি পিচে। রান উঠল কম। ২০১৭ সালের প্রথম খেলাটায় আমাদের রবি-অ্যাশ জুটিকে টপকে গিয়েছিলেন অস্ট্রেলিয়ায় স্টিভেন ও’কিফ আর নাথান লায়ন। ২০১৯ সালে দুর্বল স্পিন আক্রমণের দক্ষিণ আফ্রিকার সঙ্গে অবশ্য ভারত ছশোর বেশি রান করেছিল, দক্ষিণ আফ্রিকা ফলো অন করে হেরেছিল। এবারেও টেস্টে অনিয়মিত মিচেল স্যান্টনার ম্যাচে ১৩ খানা উইকেট তুলে নিলেন, আমাদের সর্বকালের সেরা দুই স্পিনারকে টেক্কা দিলেন। ভাগ্যে ওয়াশিংটন সুন্দর ছিলেন, নইলে অবস্থা আরও শোচনীয় হত।

আমেদাবাদের সর্দার প্যাটেল স্টেডিয়াম ভেঙেচুরে নতুন করে নরেন্দ্র মোদী স্টেডিয়ামে পরিণত করা হল, সেখানে প্রথম টেস্ট হল ২০২১ সালে। একেবারে পরপর দুটো টেস্ট। প্রথমটা শেষ হল দুদিনে, দ্বিতীয়টা তিনদিনে। প্রথম টেস্টে দুদলের কেউ দেড়শো পেরোতে পারেনি, ইংল্যান্ড দ্বিতীয় ইনিংসে ৮১ রানে অল আউট। এরকম পিচ কুম্বলেরা গোটা জীবনে পাননি। মাত্র দুবছর বয়সী ওই স্টেডিয়ামে তিন নম্বর টেস্টও খেলা হয়ে গেছে গতবছর। আগের দুই টেস্টে পিচ নিয়ে বড্ড বাড়াবাড়ি করা হয়ে গেছে ভেবেই বোধহয় একেবারে ঢ্যাবঢেবে পিচ বানানো হয়েছিল অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে। আড়াই খানা ইনিংস খেলা হয়েছিল, চারজন শতরান করেছিলেন। তাছাড়া ট্রেভিস হেড ৯০, অক্ষর প্যাটেল ৭৯।

তালিকা আরও লম্বা করা যায়, কিন্তু যাঁর বোঝার তিনি এতেই বুঝে নেবেন পরপর ১৮ খানা সিরিজ জেতার মাস্তানি আসলে কোথায়। অশ্বিন আর জাদেজার মাঝারিয়ানা আরও পরিষ্কার হয় দেশের মাঠের সঙ্গে বিদেশের মাঠে তাঁদের পরিসংখ্যান মিলিয়ে দেখলে। অশ্বিনের ৫৩৬ খানা উইকেটের মাত্র ১৪৯টা এসেছে বিদেশে, গড় ৩০.৪০। উনচল্লিশটা টেস্টে এক ইনিংসে পাঁচ উইকেট নিয়েছেন আটবার। এই পরিসংখ্যান খারাপ নয়, মাঝারি। দেশের মাঠে ৬৫ খানা টেস্ট খেলে নিয়েছেন ৩৮৩ খানা উইকেট, গড় ২১.৫৭, এক ইনিংসে পাঁচ উইকেট নিয়েছেন ২৯ বার। মানে দুজন অশ্বিন একেবারে দুজন আলাদা বোলার।

জাদেজার পরিসংখ্যান দেখবেন? উনি ভারতের মাটিতে ৪৯ টেস্টে ২৩৮ উইকেট নিয়েছেন মাত্র ২০.৭১ গড়ে, এক ইনিংসে পাঁচ উইকেট ১৩ বার। কিন্তু বিদেশে? ২৬ খানা টেস্ট খেলে মোটে ৭৬ খানা উইকেট, গড় ৩২.৭৮। এক ইনিংসে পাঁচ উইকেট মোটে দুবার। হিন্দি সিনেমা হলে দেখানো হত দেশে খেলেন জাদেজা, আর বিদেশে ভিলেন তাঁকে তালা বন্ধ ঘরে রেখে তাঁরই মত দেখতে অন্য একজনকে খেলতে নামায়। একথা ঠিকই যে প্রায় সব বোলারই নিজের দেশে বেশি ভাল বল করেন। কিন্তু সর্বকালের সেরার তকমাধারীদের পরিসংখ্যানে দেশে আর বিদেশে এত তফাত ঘটে না। আমাদের দেশের সবচেয়ে সফল স্পিনারদেরই দেখুন না:

এই পরিসংখ্যানগুলো দেখলেই পরিষ্কার হয়, অশ্বিন-জাদেজার চেয়ে অনেক বড় স্পিনার ছিলেন অজিত ওয়াড়েকরের স্পিন ত্রয়ী। কারণ তাঁদের দেশে আর বিদেশে উইকেট সংখ্যা আর এক ইনিংসে পাঁচ উইকেট নেওয়ার ঘটনা প্রায় সমান। সেই কারণেই তাঁরা ওয়েস্ট ইন্ডিজ, ইংল্যান্ডেও সিরিজ জেতাতে পেরেছিলেন। কুম্বলে, হরভজন বিদেশে ওঁদের মত ভাল না হলেও নেহাত ফেলনা ছিলেন না। বিদেশে অন্তত দুটো টেস্ট ম্যাচের কথা উল্লেখ করা যায় যেখানে এঁরা দুজনে ম্যাচ জিতিয়েছিলেন – ১) ২০০৬ সালে কিংস্টনে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিরুদ্ধে প্রথম ইনিংসে হরভজন পাঁচ উইকেট নেন আর দ্বিতীয় ইনিংসে কুম্বলে ছয় উইকেট নিয়ে ৪৯ রানে ম্যাচ জেতান। ২) ২০০২ সালে লিডসের ইনিংস জয়ে তাঁদের অবদান আরও উল্লেখযোগ্য, কারণ ভিজে আবহাওয়ায় পিচটা ছিল জোরে বোলারদের জন্য আদর্শ। সেখানে কুম্বলে-হরভজন বিপক্ষের কুড়িটা উইকেটের ১১ খানা তুলে নেন। অশ্বিন আর জাদেজা কিন্তু এমন দুজন বোলার যাঁদের উপমহাদেশের বাইরে একসঙ্গে খেলানোর কথা ভারত অধিনায়করাই ভেবে উঠতে পারেন না। অধিকাংশ ক্ষেত্রে যে অশ্বিনকে বসিয়ে রাখা হয় তার কারণ কিন্তু বোলিং নয়। সম্ভবত তার কারণ কোহলি-শাস্ত্রীর মত দ্রাবিড়-রোহিতেরও ধারণা ছিল, জাদেজা অশ্বিনের চেয়ে ব্যাট ভাল করেন।

আরও পড়ুন এ যুগে তৃতীয় নয়নও জিরো

নিউজিল্যান্ড সিরিজে ব্যাটাররা চূড়ান্ত ব্যর্থ, অথচ অশ্বিন আর জাদেজার মাঝারিয়ানা নিয়ে এত বড় লেখা কেন লিখলাম? তার কারণ টেস্ট জিততে গেলে কুড়িটা উইকেট নিতে হয় এবং ভারতের মাটিতে জিততে গেলে স্পিনারদের সাফল্য অপরিহার্য। ব্যাটারদের ব্যর্থতায় মুহ্যমান হয়ে আলোচকরা অশ্বিন-জাদেজার ব্যর্থতাকে তত গুরুত্ব দিচ্ছেন না। ‘একটা সিরিজে হতেই পারে’ বলে উড়িয়ে দিচ্ছেন। লেখার এই পর্বে এ জন্যেই দেখানো দরকার ছিল যে এই ব্যর্থতা একটা সিরিজের ব্যাপার নয়। এতদিন এক বানানো স্বর্গের দেবদূত করে রাখা হয়েছিল ওঁদের। তাই এই পতন অনিবার্য ছিল। অতীতেও একাধিকবার ওঁদের মাঝারিয়ানা দেখিয়ে দিয়ে গেছেন অন্য দেশের স্পিনাররা। কিন্তু ভারত শেষপর্যন্ত সিরিজ জিতে গেছে বলে চোখে পড়েনি। ভারতে এসে বেদি, প্রসন্ন, চন্দ্রশেখর, কুম্বলে, হরভজনের থেকে বেশি উইকেট নিয়ে চলে যাওয়ার ক্ষমতা হয়নি ওয়ার্ন বা মুরলীদেরও। অথচ অশ্বিন-জাদেজার চেয়ে বেশ কয়েকবার বেশি উইকেট নিয়েছেন সোয়ান-পানেসার, ও’কিফ-লায়ন, লায়ন-ম্যাট কুনেমান-টড মার্ফি, টম হার্টলি-বশির স্যান্টনার, আজাজ প্যাটেল, গ্লেন ফিলিপসরা।

রবি-অ্যাশের এই ব্যর্থতা ঢাকতে এখন নতুন কায়দা চালু করেছেন ভারতীয় বিশেষজ্ঞরা। বলা এবং লেখা হচ্ছে, যত দোষ টিম ম্যানেজমেন্টের। বেশি ঘূর্ণি উইকেট বানালে মুড়ি মিছরি এক দর হয়ে যায়। ফলে রবি-অ্যাশের মুনশিয়ানার আর দাম থাকে না। কিমাশ্চর্যমতৎপরম! ওঁরা যদি এত বড় স্পিনার হন যে যেখানে বল তেমন ঘোরে না সেখানেও কেরামতি দেখাতে পারেন, তাহলে যেখানে বল বেশি ঘোরে সেখানে তো ওঁদের ধারেকাছে অন্যদের আসতে পারার কথা নয়। কোনো ব্যাটার সম্পর্কে কখনো শুনেছেন যে ব্যাটিং সহায়ক পিচে অন্যরা বেশি রান করে দেয়, কিন্তু শক্ত পিচে সে-ই সেরা? তাছাড়া রবি-অ্যাশ বরাবর কম ঘূর্ণির পিচেই এত উইকেট নিয়ে এসেছেন – সাক্ষ্যপ্রমাণ তো তা বলছে না। আর বিদেশে, যেখানে বল বিশেষ ঘোরে না, সেখানে তো ওঁদের একসঙ্গে খেলানোই যায় না।

আজ এ পর্যন্তই। ভারতীয় দলের তারকা ব্যাটাররাও যে মাঝারিয়ানার বানানো স্বর্গের দেবদূত, কেবল স্পিন খেলতে না পারা যে ৩-০ ফলাফলের কারণ নয়, সেসব কথা সবিস্তারে না লিখলে এই লেখা সম্পূর্ণ হবে না। সে কাজ পরের পর্বের জন্য তোলা রইল।

সমস্ত পরিসংখ্যান ক্রিকইনফো থেকে

নাগরিক ডট নেট ওয়েবসাইটে প্রকাশিত

ভারতীয় ক্রিকেটের জন্য আরও আঘাত অপেক্ষা করছে

একজন-দুজন নয়, গোটা ক্লাসই ফেল। এরপরেও রোহিত বুক ফুলিয়ে বললেন, কাটাছেঁড়া করার দরকার নেই।

মনে করুন আপনি একটা ক্লাসের ক্লাস টিচার। আপনার ক্লাসের সবকটা ছাত্রছাত্রী বার্ষিক পরীক্ষায় ফেল করেছে। হেডমাস্টার আপনার কাছে কৈফিয়ত চাইলেন। আপনি বললেন “এ নিয়ে এত ভাবার কিছু নেই। এতবছর তো সবাই পাস করেছে। একদিন তো এই রেকর্ড ভাঙতই, না হয় এবছরই ভাঙল।” কী ফল হবে? স্কুল বেসরকারি হলে চাকরিটি যাবে। সরকারি স্কুলে তা হবে না, কিন্তু বিলক্ষণ গালমন্দ হজম করতে হবে। ঘটনা হল, নিউজিল্যান্ডের কাছে একটা টেস্ট বাকি থাকতেই সিরিজ হেরে যাওয়ার পরে ভারত অধিনায়ক রোহিত শর্মা প্রায় এই কথাগুলোই বলেছেন।

বলেছেন, এত কাটাছেঁড়া করার কী আছে? বারো বছর পরে একটা সিরিজ (ঘরের মাঠে) তো দল হারতেই পারে। যা চেপে গেছেন, তা হল দল সমানে সমানে লড়াই করে হারেনি, ল্যাজেগোবরে হয়েছে। প্রথম টেস্টের প্রথম দিনে ভিজে আবহাওয়ায় বল সুইং করতেই রোহিত বাহিনী ৪৬ রানে অল আউট হয়ে গিয়েছিল। দ্বিতীয় ইনিংসে ঋষভ পন্থ আর সরফরাজ খান দুর্দান্ত ব্যাটিং করায় ইনিংস হার বেঁচেছে। পুনের দ্বিতীয় টেস্টের প্রথম ইনিংসে স্পিনারদের পিচেও দেড়শো রানেই জারিজুরি শেষ। দ্বিতীয় ইনিংসেও যশস্বী জয়সোয়াল ছাড়া সব ব্যাটার ব্যর্থ। নিচের দিকে রবীন্দ্র জাদেজা কিছু রান না করলে আবার দুশোর নিচে ইনিংস গুটিয়ে যেত। শুধু কি তাই? প্রথম টেস্টে জোরে বোলিং সহায়ক পিচকে বুঝতে ভুল করে তিন স্পিনারে খেলা হল। ফলে আবহাওয়া যেমনই থাকুক, টস জিতে ব্যাটিং নেওয়া ছাড়া উপায় রইল না। ওদিকে এখনই যাঁকে কপিলদেবের চেয়েও ভাল বলা শুরু হয়ে গেছে, সেই যশপ্রীত বুমরা ওই পিচে বিশেষ কিছু করতে পারলেন না। আরেক ‘গোট’ (গ্রেটেস্ট অফ অল টাইম) রবিচন্দ্রন অশ্বিনকেও নির্বিষ দেখাল। জাদেজা আর কুলদীপ যাদব তিনটে করে উইকেট নিলেন বটে, কিন্তু নিউজিল্যান্ড চারশো রান তুলে ফেলল। দ্বিতীয় টেস্টেও ভারতের আটশোর বেশি উইকেট নিয়ে ফেলা ‘রবি-অ্যাশ’ জুটি ব্যর্থ। এক ব্যাগ অভিজ্ঞতা নিয়ে, ওয়াশিংটন সুন্দর আর মিচেল স্যান্টনারের বোলিং দেখেও, তাঁরা বুঝেই উঠতে পারলেন না যে এই পিচে আস্তে বল করতে হবে। জোরে জোরে বল করে লাভ নেই। বুমরা এখানেও রিভার্স সুইং-টুইং করাতে পারলেন না। মানে একজন-দুজন নয়, গোটা ক্লাসই ফেল। এরপরেও রোহিত বুক ফুলিয়ে বললেন, কাটাছেঁড়া করার দরকার নেই।

আসলে রোহিত জানেন, তিনি যে ক্রিকেট বোর্ডের কর্মচারী তারা টাকা দিয়ে কিনে রেখেছে যাদের কাটাছেঁড়া করা কাজ তাদের এক বড় অংশকে। প্রাক্তন ক্রিকেটার, ধারাভাষ্যকার আর সাংবাদিকদের কথা বলছি। আরেকটা অংশ ভয়েই চুপ করে থাকবে। কারণ সত্যি কথা বলে/লিখে ফেললে ক্রিকেট বোর্ড ধারাভাষ্যের চুক্তি থেকে বাদ দিয়ে দেবে বা আর মাঠে ঢুকতে দেবে না। হাতে না মেরে ভাতে মারা যাকে বলে আর কি। রোহিত নির্ভুল আন্দাজ করেছেন। একই দিনে পাকিস্তানে, অর্থাৎ বিদেশের মাঠে, ইংল্যান্ডের হারের পর নাসের হুসেন, মাইকেল আথারটনরা চুলচেরা সমালোচনা করছেন বেন স্টোকসের দলের। অন্যদিকে সুনীল গাভস্কর, রবি শাস্ত্রী, সঞ্জয় মঞ্জরেকর, অনিল কুম্বলেরা ‘আহা! ওরা তো খারাপ খেলোয়াড় নয়। খেলায় হার জিত তো আছেই। ঘরের মাঠে টানা ১২ বছর, ১৮ খানা সিরিজ জিতেছে। সেটা তো মনে রাখতে হবে’ – এই জাতীয় কথাবার্তা বলছেন। বেশ, ওঁদের কথাও থাক। অত বড় ক্রিকেটারদের তো উড়িয়ে দেওয়া যায় না। এই ১২ বছর অপরাজিত থাকার রেকর্ডটা নিয়েই বরং কাটাছেঁড়া করা যাক।

ভারত কি কোনোদিন ঘরের মাঠে দুর্বল দল ছিল, বা মাঝেমধ্যেই এর তার কাছে সিরিজ হারত? সোজা উত্তর – না। এই শতাব্দীর ইতিহাসে ২০১২ সালে অ্যালাস্টেয়ার কুকের ইংল্যান্ডের আগে ভারত শেষ সিরিজে হেরেছিল আরও আট বছর আগে, অ্যাডাম গিলক্রিস্ট-রিকি পন্টিংয়ের অস্ট্রেলিয়ার কাছে। অর্থাৎ আড়াই দশকে মোটে চারটে সিরিজ হার। তার আগের সিরিজ হার ছিল ২০০০ সালে, হ্যানসি ক্রোনিয়ের দক্ষিণ আফ্রিকার বিরুদ্ধে। আর গত শতকের ইতিহাস?

অস্ট্রেলিয়া হল টেস্ট ক্রিকেটের ইতিহাসে সবচেয়ে সফল দল। সেই অস্ট্রেলিয়া ২০০৪-০৫ মরশুমের ওই জয়ের আগে ভারতে শেষ জিতেছিল ১৯৬৯-৭০ সালে। ইংল্যান্ডের ভারতের মাঠে কুকের দলের আগে শেষ সিরিজ জয় ছিল ১৯৮৪-৮৫ মরশুমে। ওয়েস্ট ইন্ডিজ এ দেশে এসে শেষবার সিরিজ জিতেছে ১৯৮৩-৮৪ মরশুমে। শ্রীলঙ্কা আজ পর্যন্ত জেতেনি, নিউজিল্যান্ড যে আগে কখনো জেতেনি তা তো এখন সকলেই জানেন। তারা শেষবার এ দেশে একটা টেস্ট ম্যাচই জিতেছিল সেই ১৯৮৮ সালে, তাও ১৯৬৯ সালের পর প্রথমবার। এমনকি পাকিস্তান, যাদের সঙ্গে আমাদের আবহাওয়া এবং পিচের চরিত্র সবচেয়ে বেশি মেলে, তারাও ১৯৫২-৫৩ থেকে ২০০৭-০৮ পর্যন্ত ভারত সফরে এসে সিরিজ জিততে পেরেছিল মাত্র একবার – ১৯৮৬-৮৭ মরশুমে। সুতরাং ভারত চিরকালই নিজের দেশে বাঘ। কোহলি, রোহিতরা নতুন কিছু করেননি। বস্তুত, সব দলই নিজের দেশে বাঘ। তাই যে কোনো টেস্ট দলেরই উৎকর্ষ বিচার করা হয় বিদেশে তারা কেমন তাই দিয়ে। অজিত ওয়াড়েকরের ভারতীয় দল শ্রদ্ধেয়, কারণ ১৯৭১ সালে তারা ওয়েস্ট ইন্ডিজ এবং ইংল্যান্ডে সিরিজ জিতেছিল। সৌরভ গাঙ্গুলির দল ভারতের ক্রিকেট ইতিহাসে চিরকাল উঁচু জায়গায় থাকবে, কারণ তারা নিয়মিত বিদেশে টেস্ট ম্যাচ জেতা শুরু করেছিল। গত এক দশকে কোহলির নেতৃত্বাধীন ভারতীয় দলের কলার তোলার মত সাফল্যও দুবার অস্ট্রেলিয়ায় সিরিজ জেতা। দেশের মাঠে একের পর এক দলকে দুরমুশ করা নয়।

আরও পড়ুন জয় জয় জয় জয় হে

এর সঙ্গে আরেকটা কথা না বললেই নয়, যা এক পডকাস্টে বলে বিস্তর ট্রোলড হয়েছিলেন হর্ষ ভোগলে। কথাটা হল, গত ১০-১২ বছরে টেস্ট ক্রিকেট সম্ভবত খেলাটার ইতিহাসে সবচেয়ে কম প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ছিল। ২০১১ বিশ্বকাপের পর থেকে ধাপে ধাপে অবসর নিলেন শ্রীলঙ্কা ক্রিকেটের মহীরুহরা। ছোট্ট দেশে চট করে সর্বোচ্চ মানের ক্রিকেটার পাওয়া শক্ত, ফলে দলটা একেবারে দুর্বল হয়ে গিয়েছিল। রাজনৈতিক কারণে ভারত পাকিস্তানের বিরুদ্ধে খেলেনি। মাঝেমধ্যে এক-আধটা অঘটন ছাড়া ওয়েস্ট ইন্ডিজও অতি দুর্বল হয়ে পড়েছে এইসময়। ওখানে বাস্কেটবল, বেসবলের দিকেই বেশি ধাবিত হচ্ছে তরুণ প্রজন্ম। দক্ষিণ আফ্রিকার ক্রিকেট বিপদে পড়েছিল কালো মানুষদের জন্য সংরক্ষণ নীতির প্রভাবে বহু ক্রিকেটার দেশত্যাগ করায়। অর্থাৎ ভাল মানের আন্তর্জাতিক দল ছিল ভারতকে নিয়ে বড়জোর চারটে। সুতরাং ১২ বছর দেশে হারিনি – এই নিয়ে উদ্বাহু না হয়ে বরং মনে রাখা ভাল, এই যুগেও কিন্তু আমরা দক্ষিণ আফ্রিকাকে ও দেশে হারাতে পারিনি, ইংল্যান্ডে সিরিজ জিততে পারিনি, নিউজিল্যান্ডেও নয়। এমনকি বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের শুধু ফাইনালটা ইংল্যান্ডে হতেই পরপর দুবার হেরে বসেছি।

বাংলাদেশকে দুদিনে হারিয়েছি বলে পেশি ফোলানোর ফল এই সিরিজে দেখা যাচ্ছে। এখনো ভুল কারণে নাচানাচি চালু রাখলে অদূর ভবিষ্যতে আরও আঘাত পেতে হবে। অবশ্য সেটা প্রায় অনিবার্য। কারণ এই সিরিজ ৩-০ হারলে, এমনকি আসন্ন অস্ট্রেলিয়া সফরে ৫-০ হারলেও, কিছু বদলানোর আশা কম। কারণ ২০১১-১২ মরশুমে পরপর আটটা টেস্ট হারার পরেও মহেন্দ্র সিং ধোনির অধিনায়কত্ব যায়নি, শচীনকে অবসর নিতে বাধ্য করা হয়নি। ফলাফলকে সেদিনই গুরুত্বহীন করে দেওয়া হয়েছে ভারতীয় ক্রিকেটে।

উত্তরবঙ্গ সংবাদ কাগজে প্রকাশিত

নীলকণ্ঠ হয়ে সময়ের বিষ ধারণ করেছে নটধার নাটক

সংলাপের এবং অভিব্যক্তির অন্তরঙ্গতায় নাটক শুরু হওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই দর্শকের সামনে থেকে মুছে যায় রসিকতা আর হিংসার, প্রশংসা আর বিদ্রুপের, বাস্তব আর কল্পনার, ভালবাসা আর ষড়যন্ত্রের সীমারেখা।

১৯৮৭ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত মহেশ ভাটের ছবি কাশ, জনপ্রিয় সিনেমার এক ব্যর্থ নায়ক ও তার স্ত্রীর প্রেম-অপ্রেমের আখ্যান। সেই বেদনাবিধুর ছবিতে দুজনের মাঝখানে ছিল এক শিশুসন্তান। তার আসন্ন অনুপস্থিতি ছবিটিকে শেষপর্যন্ত এক ট্র্যাজিক অথচ শান্ত পরিণতির দিকে নিয়ে গিয়েছিল। এখন ২০২৪। মাঝের এই চার দশকে পৃথিবী আমূল বদলে গেছে, সিনেমাসহ সমস্ত শিল্পমাধ্যমের ভোল পালটে গেছে। জঁ লুক গোদারের মত দিকপাল স্বেচ্ছামৃত্যু বেছে নেওয়ার আগে সিনেমার মৃত্যুই ঘোষণা করে গেছেন। এ যুগে প্রথমে দারুণ সফল, তারপর ‘আর্ট সাইকেলের নিয়মে’ ব্যর্থ এক চলচ্চিত্র নির্মাতা, যে বিশ্বাস করে সিনেমা স্রেফ দুরকম – ভাল আর খারাপ, এবং তার সফল অধ্যাপিকা স্ত্রীর সন্তানহীন জীবন অনেক বেশি জটিল তথা রোমাঞ্চকর হতে বাধ্য; সে শিল্পীর মনোজগতেই হোক বা বহির্জগতে। বলিউডি ছবি বানাতে গেলে দর্শককে কিছুটা শ্বাস ফেলার জায়গা দিতেই হয়। মহেশের সেই বাধ্যবাধকতা ছিল। নাটকের নির্দেশক অর্ণ মুখোপাধ্যায়ের সেই বাধ্যবাধকতা নেই। ফলে সৌমিত দেবের কলমে বিজনে বিষের নীল নাটক, ইরা লেভিনের ডেথট্র্যাপ নাটকের স্বীকরণ হলেও, থ্রিলারের সীমা ছাড়িয়ে হয়ে উঠেছে আজকের মানুষের একাকিত্ব, ঈর্ষা, অবসাদ, অবদমিত কামনা বিষয়ক রোমহর্ষক সন্দর্ভ।

বিজনে বিষের নীল টানটান নাটক, দর্শককে পলক ফেলতে দেয় না – এসবই ঠিক কথা, তবে আলাদা করে না বললেও চলে। দর্শককে সচকিত রাখতে যেসব কৌশল ব্যবহার করা হয়েছে সেগুলোও নাটকের দর্শকদের কাছে যে খুব অভিনব তা নয়। যা অভিনব তা হল অভিনেতাদের, বিশেষত দুই মুখ্য চরিত্র সুদর্শন ব্যানার্জি আর মায়া চৌধুরীর ভূমিকায় যথাক্রমে অর্ণ আর উপাবেলার, ব্যক্তিগত জীবন আর অভিনয়ের সীমা মুছে দেওয়ার দুঃসাহসিক প্রয়াস। মঞ্চসজ্জায় নিজেদেরই অল্পবয়সের অন্তরঙ্গ ছবি ঝুলিয়ে দেওয়া সেই দুঃসাহসের কণামাত্র। সংলাপের এবং অভিব্যক্তির অন্তরঙ্গতায় নাটক শুরু হওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই দর্শকের সামনে থেকে মুছে যায় রসিকতা আর হিংসার, প্রশংসা আর বিদ্রুপের, বাস্তব আর কল্পনার, ভালবাসা আর ষড়যন্ত্রের সীমারেখা।

সিনেমার দুনিয়ায় একসময় গগনচারী, অধুনা পরপর তিনটে ফ্লপ ছবির পর দূরে নিক্ষিপ্ত নির্দেশক চরিত্রের অবসাদ আর ঈর্ষা শরীরে ফুটিয়ে তুলতে অর্ণ যে চঞ্চল পদচারণা, বিক্ষিপ্ত দৃষ্টিপাত এবং ক্রমাগত গা চুলকে যাওয়ার অবতারণা করেছেন তা বিস্ময়কর। নাটকের দ্বিতীয়ার্ধে তাঁর গা চুলকানোর যন্ত্রটাই যখন শিষ্য কণিষ্কের (অর্পণ ঘোষাল) হস্তগত হয়, তা চরিত্রগুলোর পালটাতে থাকা মানসিকতার চমৎকার প্রতিফলন হয়ে দাঁড়ায়।

আরও পড়ুন অথৈ: যত্নে নির্মিত ভারতের ট্র্যাজেডি

সুদর্শনের উকিল তলাপাত্র (সুমিত) এবং শালী হৈমন্তীর (তনুজা) চরিত্র এই নাটকে কেবল হাস্যরস উদ্রেককারী নয়, প্লটে তাদের গুরুত্ব অপরিসীম। তবু নাটকের তিনটে পায়া সুদর্শন, মায়া আর কণিষ্কই। মূলত তাদের বিষেই নীল হয়ে থাকে মঞ্চ। ফলে অর্পণের সুদূর মফস্বল থেকে আসা ডোমসন্তানের অভিনয় এক চুল এদিক ওদিক হলে নাটকের বারোটা বাজতে পারত। বস্তুত চরিত্রটা বেশ জটিল। কারণ কণিষ্ক একদিকে আজন্ম হীনমন্যতার শিকার, অন্যদিকে তার মধ্যে আছে প্রবল উচ্চাকাঙ্ক্ষা। সে বোকা সাজতে জানে। সুদর্শনের প্রতি তার যেমন শ্রদ্ধা আছে, তেমন তাকে অতিক্রম করে যাওয়ার প্রবল খিদেও আছে। কণিষ্কের মধ্যে আত্মসমর্পণ আছে, আবার আক্রান্ত হলে দ্বিগুণ আক্রোশে প্রত্যাঘাত করার সাহসও আছে। মুখে আপাত সরল হাসি ঝুলিয়ে রেখে এই বৈপরীত্য তুলে ধরার কাজটা চমৎকার করেছেন অর্পণ।

উপাবেলা মায়ার চরিত্রের দুর্বলতা, ভঙ্গুরতা সফলভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। আবার পারিবারিক ক্ষমতার বিন্যাসে নারী হিসাবে সুদর্শনের নিচে থাকলেও, সেই নতিস্বীকার যে আসলে স্বেচ্ছায় ক্ষমতা অন্যের হাতে জমা রাখা – তাও ধরিয়ে দিয়েছেন ঋজু অভিনয়ে, বিশেষত শেষাংশে।

অভিনেতাদের যোগ্য সঙ্গত করেছে আবহসঙ্গীত এবং আলোকসম্পাত। তবে মঞ্চের পিছনের পর্দার যে সিনেমাসুলভ ব্যবহার নটধা নাট্যদলের অন্য নাটক নক্ষত্র শিকার-এরও অন্যতম বৈশিষ্ট্য, তা এখানে কোনো কোনো সময়ে বাহুল্য মনে হয়েছে। নাটকের শুরুতে সুদর্শনের মনোজগৎ, তার সিনেমারুচি বোঝাতে ওই পর্দা যথাযথ ভূমিকা নিয়েছে। কিন্তু সর্বদা নাটকে যা চলছে তার লাগসই উদ্ধৃতি ওই পর্দায় ফুটিয়ে না তুললেই বোধহয় ভাল হত। ব্যাপারটা দর্শকের নিজের মত করে দৃশ্য ব্যাখ্যা করে নেওয়ার অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে কখনো কখনো। হয়ত এমন দমবন্ধ করা মনস্তাত্ত্বিক থ্রিলারে মনোযোগ দিতে গিয়ে দর্শক গভীরতর বক্তব্য খেয়াল না-ও করতে পারেন – এমন আশঙ্কা থেকে ওই উদ্ধৃতিগুলো পর্দায় দেখানো হয়েছে। কিন্তু কেনই বা নির্দেশক নিজেকে শিক্ষক আর দর্শককে দুর্বল ছাত্রছাত্রী বলে ভাববেন? হাত ধরে পরীক্ষা বৈতরণী পার করিয়ে দেওয়া তো নির্দেশকের কাজ নয়। তিনি এবং তাঁর সহশিল্পীরা নিজেদের যা বলার আছে, যা করার আছে, তাই তো করবেন। বুঝে নেওয়ার দায়িত্ব দর্শককেই নিতে হবে। সবাই নিজের মত করে বুঝে নেবেন, সবাই হয়ত সবটা বুঝবেনও না। কে ঠিক বুঝলেন, কে ভুল বুঝলেন তার কোনো সুনির্দিষ্ট সংজ্ঞাও তো শিল্পে স্থির করে দেওয়া নেই। মঞ্চে যা দেখা যাচ্ছে আর দর্শক যা দেখছেন, দুয়ে মিলেই তো নাটক। দুয়ের খানিক তফাত থাকলে ক্ষতি কী? দর্শকের বিনোদনের কথা বেশি ভাবতে গিয়েই বোধহয় দ্বিতীয়ার্ধ ঈষৎ দীর্ঘায়িতও হয়েছে। এইটুকু অনুযোগ রইল।

তৎসত্ত্বেও একথা না বললেই নয় যে, বর্তমান কালপর্বে আমাদের সকলের ভিতরেই যে জমা হয়েছে অনেক বিষ, সেই বিষে নীল হয়ে যাচ্ছি প্রতিনিয়ত, বাইরে থেকে দেখাও যাচ্ছে না সবসময় – এই তেতো সত্যের মুখোমুখি আমাদের দাঁড় করিয়েছে বিজনে বিষের নীল। এত কাছ থেকে সেই ভয়ানক সত্যকে দেখা গেছে এই নাটকে, যে যাঁরা সঙ্গী বা সঙ্গিনীকে নিয়ে দেখতে যাবেন তাঁদের জন্য বিধিসম্মত সতর্কীকরণ হিসাবে বলা যায় – মনে হতে পারে আপনাদের ঝগড়া আড়ি পেতে শুনে নিয়েছেন নাট্যকার ও অভিনেতারা। সুতরাং কেবল থ্রিলারের অভিনয় দেখার রোমাঞ্চ নয়, আয়নার সামনে উলঙ্গ হয়ে দাঁড়ানোর অস্বস্তিও এই নাটক দেখার প্রাপ্তি।

নাগরিক ডট নেট ওয়েবসাইটে প্রকাশিত

নির্মম সরকার, অনশন এবং কিছু অস্বস্তিকর প্রশ্ন

তৃণমূল সরকার কেন, কোনো দলের সরকারই এই যুগে এই সমস্যার সমাধান করতে পারবে কিনা সন্দেহ। একজন বিশেষজ্ঞ হয়ত সরকারি কলেজের শূন্য পদে যোগ দিলে যা বেতন পাবেন, তার চেয়ে অনেক বেশি বেতন পাবেন কর্পোরেট হাসপাতালে যোগ দিলে।

হপ্তা তিনেক আগে কলকাতায় এসেছিলেন ডাঃ কাফিল খান। সেই কাফিল, যিনি আদিত্যনাথশাসিত উত্তরপ্রদেশে নিজের পেশাগত দায়িত্বের ঊর্ধ্বে উঠে পকেটের পয়সা দিয়ে মরণাপন্ন শিশুদের জন্য অক্সিজেনের ব্যবস্থা করতে গিয়েছিলেন। অথচ সেই শিশুদের মৃত্যুতে তাঁকেই অপরাধী সাজিয়ে কারাবাস করিয়েছিল উত্তরপ্রদেশ সরকার। কাফিল কলকাতায় এসে আর জি কর হাসপাতালে ঘটে যাওয়া ধর্ষণ ও খুনের ঘটনার নিন্দা করে আন্দোলনকারীদের পাশে থাকার বার্তা দিয়েছেন, ঘটনাটাকে ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টারও নিন্দা করেছেন। কিন্তু সঙ্গে আরও কিছু কথা বলেছেন, যার বাংলা তরজমা করলে এরকম দাঁড়ায় – ‘চলতি প্রতিবাদের জন্য পশ্চিমবঙ্গের মানুষের প্রশংসা প্রাপ্য, কিন্তু আমরা অস্বীকার করতে পারি না যে মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি ক্রুদ্ধ ডাক্তারদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছিলেন এবং তাঁদের দাবি মেনে নিতে রাজি হয়েছিলেন। আপনারা এখন যতই রেগে থাকুন, দয়া করে বোঝার চেষ্টা করুন যে আজও বাংলায় নিজের ক্ষোভ প্রকাশ করার, প্রতিবাদ করার পরিসর আছে। এটা উত্তরপ্রদেশ হলে সমস্ত প্রতিবাদীকে জেলে পোরা হত আর তাদের নামে ন্যাশনাল সিকিউরিটি অ্যাক্টে মামলা ঠুকে দেওয়া হত।’

কাফিলের দোষ নেই। তিনি এ রাজ্যের মানুষ নন, রাজনীতির লোকও নন। ফলে এখানকার আন্দোলনের ইতিহাস বা তৃণমূল কংগ্রেস আমলে আর কী কী ঘটেছে – সেসব জানা তাঁর থেকে প্রত্যাশিত নয়। উপরন্তু দেশের বেশিরভাগ মানুষের বাংলা না জানা এবং এ রাজ্যের ইংরিজি জানা মানুষের বিজেপি-বিরোধিতা এবং/অথবা সিপিএম-বিদ্বেষের সুযোগ নিয়ে মমতা ব্যানার্জির সরকার সফলভাবে নিজেদের যাবতীয় কুকীর্তি বাকি ভারতের কাছে ঢেকে রাখতে সমর্থ হয়েছে। ফলে কাফিলের কানে নিশ্চয়ই এ খবর পৌঁছয়নি, যে এ রাজ্যেও সরকারবিরোধীদের বাড়িঘর বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়ার দৃষ্টান্ত আছে।

মনে হয় না কাফিলকে যাঁরা কলকাতায় এনেছিলেন তাঁরা আনিস খানের কথাও জানিয়েছেন। পশ্চিমবঙ্গে কোনো দাবিতে কেউ সামান্যতম প্রতিবাদ করলেই শাসক দল সেই প্রতিবাদকে মানুষের চোখে হেয় করার চেষ্টা করে রাজনীতির জুজু দেখিয়ে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এতদিন বলা হত ‘এর পিছনে বিজেপি আছে’। যেহেতু আর জি কর আন্দোলনে বিজেপি বহু চেষ্টা করেও পা রাখতে পারেনি এবং সকলেই টিভির পর্দায় লাইভ দেখে নিয়েছেন যে অভিজিৎ গাঙ্গুলির মত বিজেপি নেতা আন্দোলনে যোগ দেওয়ার চেষ্টা করলে কীভাবে তাঁদের বিতাড়িত করেছেন আন্দোলনকারীরা; সেহেতু এখন বলা হচ্ছে, এই আন্দোলনের পিছনে সিপিএম আছে, অতিবাম শক্তি আছে। যেন এরা সব নিষিদ্ধ সংগঠন অথবা সংবিধানে লেখা আছে বিরোধীরা কোনো আন্দোলনে মদত দিতে পারবে না। কিন্তু সে বিতর্কে না গিয়ে ভাবা যাক যে আনিস তো বিজেপি, সিপিএম বা কংগ্রেস করতেন না। তবু প্রতিবাদী হওয়ার অপরাধে তাঁকে মরতে হয়েছে এবং বহু আইনি ও রাজনৈতিক লড়াই সত্ত্বেও তাঁর পরিবার আজও বিচার পায়নি। বর্তমান আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত থাকার জন্যেও পুলিস অনেককে বাড়ি গিয়ে হুমকি দিচ্ছে, ভয় দেখাচ্ছে বলে খবরে প্রকাশ। নৈহাটির মত শারীরিক আক্রমণের কথা না-ই বা বললাম। ফলে পশ্চিমবঙ্গ প্রতিবাদের মরুদ্যান – এই ধারণার কোনো ভিত্তি নেই।

মমতা প্রতিবাদীদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে এই প্রথম যাননি। ২০১৪ সালের হোক কলরব আন্দোলনও শেষ হয়েছিল তিনি শেষপর্যন্ত যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে দেখা করে তৎকালীন উপাচার্যকে সরিয়ে দেওয়ার ঘোষণা করার পরে। ২০১৯ সালেও লোকসভা নির্বাচনের মুখে স্কুলশিক্ষকের চাকরির দাবিতে প্রেস ক্লাবের সামনে অনশনে থাকা ছেলেমেয়েদের কাছে মমতা গিয়েছিলেন আন্দোলন তুলে নেওয়ার অনুরোধ নিয়ে। কিন্তু দুবারই সেটা করেছিলেন আন্দোলন দমন করতে না পেরে, শেষে নিরুপায় হয়ে। এর কৃতিত্ব আন্দোলনকারীদের, এর জন্যে মুখ্যমন্ত্রীকে মমতাময়ী আখ্যা দিলে সত্যের অপলাপ করা হয়। এবারেও মমতা নানা টালবাহানার পরে জুনিয়র ডাক্তারদের সঙ্গে বৈঠকে বসেছিলেন অনন্যোপায় হয়ে। গত ১৬ সেপ্টেম্বরের সেই বৈঠকের পর মমতার যাবতীয় ঘোষণা এবং সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশের পরেও ডাক্তাররা একাধিক হাসপাতালে আক্রান্ত হয়েছেন। তার পরিণামেই চলতি অনশন। ইতিমধ্যে শেঠ সুখলাল কারনানি মেমোরিয়াল হাসপাতালে (এসএসকেএম) দুদল দুষ্কৃতীর মারামারিতে এক রোগীর আত্মীয়ও আহত হয়েছেন। সুতরাং এ রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী জেলে পোরেন না, আলোচনা করেন – এই সন্তোষ হাস্যকর। তেমনই হাস্যকর মুখ্যমন্ত্রীর ধূর্ততা বুঝতে না পারা। সমাধান করতে আলোচনা করা আর ধামাচাপা দিতে আলোচনা করা – দুটোই একইরকম প্রশংসাযোগ্য হতে পারে না। ২০১৯ সালে ভোট মিটলেই চাকরি হবে প্রতিশ্রুতি দিয়ে মমতা যে শিক্ষক পদপ্রার্থীদের ২৯ দিনের অনশন প্রত্যাহার করিয়েছিলেন, তাঁদের অধিকাংশ আজও যে তিমিরে সেই তিমিরেই আছেন।

বস্তুত, কোনো প্রতিবাদ, কোনো আন্দোলনকে পাত্তা না দেওয়াই তৃণমূল সরকারের ট্রেডমার্ক। আরও অনেককিছুর মত, এখানেও কেন্দ্রের বিজেপি সরকারের সঙ্গে মিল। নরেন্দ্র মোদীও ভেবেছিলেন কৃষকদের পাত্তা দেবেন না। বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে সংসদে তিনটে কৃষি আইন পাস করিয়ে নিয়েছেন, প্রয়োগ করা ঠেকায় কে? চাষাভুষোরা থাক না রাস্তায় বসে। পাত্তা না দিলেই হল। উলটে তাদের পথে ব্যারিকেড বসিয়ে দাও, কংক্রিটের দেওয়াল তুলে দাও, রাস্তায় আক্ষরিক অর্থে কাঁটা বিছিয়ে দাও। দিল্লির প্রচণ্ড ঠাণ্ডা সহ্য করতে না পেরে একসময় সুড়সুড় করে বাড়ি চলে যাবে। কিন্তু তা ঘটেনি। কৃষকরা মাঠেঘাটে কাজ করে অভ্যস্ত। পাঞ্জাবের ধনী কৃষকরাও নিজের জমিতে গায়ে গতরে খাটেন। ফলে শারীরিক কষ্ট তাঁদের অত সহজে কাবু করতে পারে না, যতটা বাঙালি ভদ্রসন্তানদের পারে। তার চেয়েও বড় কথা, সেই আন্দোলনের নেতৃত্বে ছিলেন পাকা মাথার অভিজ্ঞ আন্দোলনকারীরা। তাঁরা যেমন আক্রমণাত্মক হতে জানেন, কখন পিছিয়ে আসতে হয় তাও জানেন। ফলে সেই আন্দোলন জয়যুক্ত হয়েছিল। মোদী দিল্লি সীমান্তে গিয়ে কৃষকদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেননি বটে, কিন্তু তাঁর সরকারকে মাথা নোয়াতে হয়েছিল, আইনগুলো প্রত্যাহার করতে হয়েছিল। বিজেপির সদস্য, সমর্থক ছাড়া কেউ তার জন্যে মোদীর প্রশংসা করে না। বলে না যে আজও ভারতের নিজের ক্ষোভ প্রকাশ করার, প্রতিবাদ করার পরিসর আছে। ন্যায্য দাবির আন্দোলনকে প্রথমে পাত্তা না দিয়ে তারপর প্রতিবাদের সামনে মাথা নোয়ানোর জন্যে, কখনো বা মিথ্যা আশ্বাস দেওয়ার জন্যে শাসকের প্রশংসা করার ন্যাকা রাজনীতি পশ্চিমবঙ্গ ছাড়া ভারতের আর কোথাও চলে না।

কিন্তু যেহেতু কৃষক আন্দোলনের কথা এসে পড়ল এবং পশ্চিমবঙ্গ যেহেতু ভারতের বাইরে নয়, সেহেতু চলমান আন্দোলনের ত্রুটিগুলোর দিকেও দৃষ্টি না দিয়ে উপায় নেই। শনিবার দুপুরে মুখ্যসচিবের ফোনে অনশনকারীদের সঙ্গে মুখ্যমন্ত্রীর কথা এবং সোমবার বৈঠকের পরে হয়ত এই অনশন শিগগির উঠে যাবে। কিন্তু ভবিষ্যতের কথা ভেবে এই আলোচনা প্রয়োজন।

#

আন্দোলনরত জুনিয়র ডাক্তাররা শুক্রবার সিনিয়র ডাক্তারদের সঙ্গে বৈঠক করে ঘোষণা করেছিলেন, আগামী সোমবারের মধ্যে সরকার তাঁদের সঙ্গে আলোচনায় বসে দশ দফা দাবি পূরণ না করলে মঙ্গলবার তাঁরা সর্বাত্মক ধর্মঘট করবেন। কোনো সন্দেহ নেই, সরকার তাঁদের দাবিগুলোতে মোটেই আমল দেয়নি। আর জি করের ঘটনার পর প্রথম দিকে ঘটনাপ্রবাহকে নিজেদের পক্ষে নিয়ে আসার যে রাজনৈতিক প্রচেষ্টা দেখা গিয়েছিল তৃণমূলের তরফে (যার সবচেয়ে বড় দৃষ্টান্ত মুখ্যমন্ত্রীর বিচার চেয়ে রাস্তায় নেমে পড়া), এখন আর তাও দেখা যাচ্ছে না। প্রায় সবটাই টিভি স্টুডিও আর সোশাল মিডিয়া থেকে আন্দোলনকারী ডাক্তারদের বিরুদ্ধে কুৎসা ছড়ানোয়, হুমকি দেওয়ায় সীমাবদ্ধ। স্থানীয় স্তরেও তৃণমূল দলের কোনো কর্মসূচি নেই এই আন্দোলনকে ভ্রান্ত প্রমাণ করার জন্যে অথবা দাবিগুলোকে অসার প্রমাণ করার জন্যে। এর দুটো কারণ থাকতে পারে – ১) তৃণমূল মনে করছে এই আন্দোলন তাদের বৃহত্তম ভোটার গোষ্ঠীর মধ্যে কোনো প্রভাব ফেলছে না। অতএব ছেলেমেয়েগুলো না খেয়ে মরুক গে; কিছু এসে যায় না। ২) এই দশ দফা দাবি পূরণ করার ক্ষমতা সরকারের নেই। উদাসীনতার ভান না করলে কথাটা সর্বসমক্ষে প্রকাশ হয়ে যাবে। তাই উচ্চবাচ্য করা হচ্ছে না।

প্রথম সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়ার নয়, যতই অমানবিক হোক। ২০২৪ সালে এসেও এই সরকারের কাছে মানবিকতা আশা করার কোনো মানে হয় কি? যে সরকার বারবার ধর্ষণের মত ঘটনাকে ছোট্ট ঘটনা, প্রেম ছিল, খদ্দেরের সঙ্গে যৌনকর্মীর দরাদরি নিয়ে ঝামেলা ইত্যাদি বলে উড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছে, তারা আজ হঠাৎ মানবিক হবে কী করে? আর মানবিক নয় বলেই ডাক্তারদের আমরণ অনশনে বসার সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন তোলার অবকাশ আছে। এ হল ব্রহ্মাস্ত্র। আর কে না জানে, ব্রহ্মাস্ত্র রেখে দিতে হয়ে শেষ যুদ্ধের জন্য। যখন অন্য সব অস্ত্র ব্যর্থ হয়ে যায়, তখন তূণ থেকে বার করতে হয়। এক্ষেত্রে আন্দোলনের সেই অবস্থা হয়েছিল কি? যতদিন কর্মবিরতি চালু ছিল, ততদিন তবু শাসক দল ডাক্তারদের গণশত্রু হিসাবে দাগিয়ে দেওয়ার মত কিছু পাচ্ছিল। কারণ সরকারি হাসপাতালে গরিব মানুষ সম্পূর্ণ পরিষেবা পাচ্ছিলেন না, তার কাঠামোগত ত্রুটির কারণ আড়াল করে গোটা দোষটা ডাক্তারদের ঘাড়ে চাপিয়ে দেওয়া যাচ্ছিল। এই আন্দোলনের পিছনে বেসরকারি হাসপাতালের লবি কাজ করছে – এই ষড়যন্ত্রের তত্ত্বও বাজারে চালানো যাচ্ছিল। কিন্তু কর্মবিরতি উঠে যাওয়ার পরে তো সেসব অস্ত্র ভোঁতা হয়ে গিয়েছিল। সুপ্রিম কোর্টেও গত শুনানিতে ফের ধমক খেয়েছে রাজ্য সরকার। কেবল হাসপাতালের সুরক্ষায় নয়, সামগ্রিকভাবে সিভিক ভলান্টিয়ার নিয়োগ করা নিয়ে প্রশ্ন তুলে দিয়েছেন বিচারপতিরা। এমতাবস্থায় অনশনে বসা ছাড়া কি অন্য কোনো রাস্তা ছিল না? হ্যাঁ, একজন ডাক্তারও অনশন করতে গিয়ে মারা গেলে সরকারকে অভূতপূর্ব বিপদে পড়তে হবে। কিন্তু অপ্রিয় সত্য হল, নির্মম শাসক দল একের পর এক ডাক্তারের অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া আর অন্য কারোর অনশনে বসা দেখে বুঝে ফেলেছে যে এখানে কারোর মৃত্যুর সম্ভাবনা কম। শ্রীরামপুরের সাংসদ কল্যাণ ব্যানার্জি এ সম্পর্কে যে স্বভাবসিদ্ধ অসভ্য মন্তব্য করেছেন – তাতেই তাঁর দল এবং সরকারের এই মনোভাব পরিষ্কার। অর্থাৎ ডাক্তারদের ব্রহ্মাস্ত্র সরকার হজম করে ফেলেছে। ব্রহ্মাস্ত্রের পর যে অস্ত্রই প্রয়োগ করা হোক, তার প্রভাব কম হয়। ফলে এখন একদিনের ধর্মঘটকে সরকার কতটা গুরুত্ব দেবে বলা মুশকিল। এই ধর্মঘট অনশনের আগে ডাকা হলে ফল অন্যরকম হতে পারত।

এখানে প্রশ্ন উঠবে, সাধারণ মানুষের যে সমর্থন ধর্মতলার অনশন মঞ্চে দেখা যাচ্ছে, তা কি মিথ্যা, নাকি অপ্রাসঙ্গিক? মিথ্যা তো নয় বটেই, কিন্তু সরকার হয়ত প্রাসঙ্গিক মনে করছে না। নিশ্চিত হওয়ার জন্য সম্ভবত আসন্ন উপনির্বাচনের দিকে তাকিয়ে আছে। অপ্রিয় হলেও সত্যি, ভোট ছাড়া অন্য কিছু দিয়ে ন্যায়-অন্যায় বিচার ভারতের গণতন্ত্রে বন্ধ হয়ে গেছে। সেই কারণেই কুণাল ঘোষ বুক ফুলিয়ে বলতে পেরেছেন, বিরোধীরা নির্বাচনে জিতে প্রমাণ করুক যে মানুষ তাদের পক্ষে।

যেমন ২০০২ সালের পর থেকে গুজরাটে বিজেপি হারেনি, তাই সেবছরের গণহত্যা সঠিক ছিল। ২০১১ সালের পর থেকে যত বড় বড় কেলেঙ্কারিই প্রকাশিত হয়ে থাকুক, তৃণমূল হইহই করে ভোটে জিতেছে। অতএব সব ঠিক আছে। একইভাবে উপনির্বাচনে সাতটা আসনের অধিকাংশ জিতলেই কুণালরা বলে দেবেন, আর জি করে সরকারের কোনো অন্যায় নেই। পশ্চিমবঙ্গের সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থাতেও কোনো গোলমাল নেই। ‘সব চাঙ্গা সি’। এরকম মানসিকতার সরকারের বিরুদ্ধে আমরণ অনশনের সিদ্ধান্ত কতটা কার্যকরী?

একটা কথা সত্যি, যে ভারতবর্ষের ইতিহাসে অনশন ব্যাপারটার এমন স্থান রয়েছে যে অনশন যে-ই করুক, যে কারণেই করুক, মানুষ তার প্রতি সহানুভূতিশীল হয়ে ওঠে। গৌতম বুদ্ধ বোধিলাভের জন্য অনশন করেছিলেন, মহাত্মা গান্ধী অনশনকে রাজনৈতিক আন্দোলনের হাতিয়ার হিসাবে প্রতিষ্ঠা দেন। কারণ এতে অন্য কারোর ক্ষতি করা হয় না, নিজের ছাড়া। ফলে মানুষের বিশ্বাস জন্মাতে বাধ্য যে অনশনকারী নিজের ফায়দার জন্যে আন্দোলন করছে না। পরের কল্যাণের জন্য আত্মত্যাগ করছে। বাঙালিদের মধ্যে যাঁরা ইতিহাসসচেতন, তাঁরা নিঃসন্দেহে যতীন দাসের কথাও মনে রেখেছেন। ফলে অনশনে বসলে গরিব-বড়লোক, গেঁয়ো-শহুরে সব ধরনের মানুষের সহানুভূতিই পাওয়া যায়। মমতা স্বয়ং একসময় পেয়েছেন, আন্না হাজারের মত ভণ্ড আন্দোলনকারীও পেয়েছেন। ফলে ভাবা অমূলক নয় যে কর্মবিরতির সময়ে যত মানুষ ডাক্তারদের আন্দোলনের পক্ষে ছিলেন, তার চেয়ে বেশি মানুষ অনশন চালু হওয়ার পরে তাঁদের প্রতি নরম হয়েছেন। কিন্তু তাতে তো সরকারের কাছ থেকে দাবি আদায়ে সুবিধা হবে না। কেবল পশ্চিমবঙ্গ নয়, দুনিয়া জুড়ে উদারনৈতিক গণতন্ত্রের সাম্প্রতিক সংকট তো এটাই, যে জনগণের দ্বারা নির্বাচিত সরকার জনগণের প্রভু হয়ে দাঁড়াচ্ছে। উপরন্তু একথাও মনে রাখা দরকার, যে গান্ধীর সমালোচক অরুন্ধতী রায় বলেছেন, অহিংসা-অসহযোগ-অনশন নীতি সফল হতে পারে ‘অডিয়েন্স’ থাকলে, নচেৎ নয়। অরুন্ধতীর কথাটা প্রশ্নের ঊর্ধ্বে নয়, আবার ফেলে দেওয়ার মতও নয়। তৃণমূল সরকার যে খুব সহানুভূতিশীল ‘অডিয়েন্স’ নয়, তা কিন্তু ইতিমধ্যেই প্রমাণিত। অনশন মঞ্চের অনতিদূরে নির্বিকার কার্নিভালে প্রমাণিত, আজ মুখ্যমন্ত্রী যে সুরে ফোনে কথা বলেছেন, তাতেও প্রমাণিত।

এই আন্দোলন সম্পর্কে আরেকটা বড় প্রশ্ন হল, এটা কি শুধুই ডাক্তারদের আন্দোলন? নাকি এটা গণআন্দোলন? ৯ অগাস্টের পর থেকে যে বিপুলসংখ্যক মানুষ মৃতার ধর্ষণ ও খুনের প্রতিবাদে, রাজ্য সরকারের ঘটনা ধামাচাপা দেওয়ার প্রতিবাদে রাস্তায় নেমেছেন তাঁরা একে নিজেদের আন্দোলন করে নিয়েছেন। আর যে কোনো গণআন্দোলনই আদতে রাজনৈতিক আন্দোলন। কিন্তু এতগুলো মাস কেটে যাওয়ার পরেও এই আন্দোলনের চরিত্র সম্পর্কে জুনিয়র ডাক্তাররা নিজেরাই দ্বিধায় ভুগছেন বলে মনে হয়। নয়ত মাঝেমাঝেই গোপাল ভাঁড়ের গল্পের রাজার বিধবা পিসির লাউতে চিংড়ি আছে অভিযোগ শুনে ‘ছি, ছি, ছি’ বলে আর্তনাদ করার মত কোনো কোনো ডাক্তার নেতা ‘আমাদের আন্দোলন অরাজনৈতিক’ বলছেন কেন? কোনো সন্দেহ নেই যে সিপিএম কর্মীরা কদিন আগে ধর্মতলায় দলীয় পতাকা নিয়ে না গেলেই পারতেন। কিন্তু গেছেন বলে মঞ্চ থেকে উত্তেজিত সাফাই গাওয়ারই বা দরকার কী? যে আন্দোলন স্পষ্টত সরকারের বিরুদ্ধে এবং যা সাধারণ মানুষের হাতে চলে গেছে, সেখানে কে কোন পতাকা নিয়ে এল না এল – তার দায়িত্ব জুনিয়র ডাক্তাররা নেবেন কী করে এবং কেন? ভয় কি তৃণমূলের প্রোপাগান্ডা মেশিনারিকে? সে তো দিনরাত চলছেই। মঞ্চের সামনে পতাকা এসে পড়ার আগেও চলছিল, পরেও চলছে, না এলেও চলত। সরকার যে দলের হাতে তারা তো চাইবেই যেনতেনপ্রকারেণ এই আন্দোলনকে হেয় করতে। তা নিয়ে আন্দোলনকারীরা বিচলিত হবেন কেন, যদি তাঁদের চোখ অর্জুনের পাখির চোখ দেখার মত দশ দফা দাবিতেই নিবদ্ধ থাকে? আন্দোলন রাজনৈতিক মানেই অবৈধ – এই যুক্তিই বা তাঁরা মেনে নেবেন কেন? একথা তো অস্বীকার করা যায় না যে পৃথিবীর কোনো আন্দোলন কোনোদিন আক্ষরিক অর্থে স্বতঃস্ফূর্ত ছিল না। বিভিন্ন ছোট বড় রাজনৈতিক দল ও সংগঠন উদ্যোগ না নিলে আর জি কর আন্দোলনও যতটা ছড়িয়েছে তা ছড়াত না। ফলে ডাক্তারদের আন্দোলন এই গুরুত্ব পেত না। ব্যাপারটা বোঝার জন্যে বেশি দূরে তাকানোর দরকার নেই। এসএসসি, টেট, মাদ্রাসার চাকরিপ্রার্থীদের আন্দোলনের কথা স্মরণ করলেই বোঝা যাবে।

বলা বাহুল্য, ডাক্তারদের আন্দোলনকে এত বড় আন্দোলনের রূপ দিয়েছে যে দল এবং সংগঠনগুলো, তারা সকলেই কোনো না কোনো মতের বামপন্থী। কারণ ঘটনার দিন থেকে কয়েকদিন পর পর্যন্ত অগ্নিমিত্রা পাল, সজল ঘোষরা আর জি কর নিয়ে সক্রিয় থাকলেও মিইয়ে গেছেন বহুদিন হল। বস্তুত অদ্ভুতুড়ে সংগঠনের নামে নবান্ন অভিযানের পর থেকেই বিজেপি বুঝে উঠতে পারছে না এই আন্দোলন নিয়ে কী করিতে হইবে। কারণ একে দাঙ্গা করার অভিজ্ঞতা হিন্দুত্ববাদীদের যতখানি, তার দু আনাও আন্দোলন করার ব্যাপারে নেই। তার উপর হোয়াটস্যাপ গ্রুপগুলোতে বিস্তর বিষ ছড়িয়েও ব্যাপারটাকে কিছুতেই হিন্দু-মুসলমান বাইনারিতে ফেলা যায়নি। গোদের উপর বিষফোঁড়ার মত ডাক্তারদের অবস্থানে যোগ দিতে গিয়ে ‘গো ব্যাক’ স্লোগান শুনতে হয়েছে বিজেপি নেতাদের। ফলে কখনো শুভেন্দু অধিকারী একেবারে তৃণমূল নেতাদের সুরেই আন্দোলনকারীদের নেশাখোর বলছেন, আবার কখনো তৃণমূলবিরোধী ভাবমূর্তি ঠিক রাখতে সরকারি কার্নিভালের পালটা কার্নিভালকে সমর্থন করছেন। বিজেপির কুখ্যাত আই টি সেলের প্রধান অমিত মালব্য তাঁর এক্স হ্যান্ডেলে ৩ অক্টোবরের একখানা দুর্গার সঙ্গে আর জি কর মেলানো জগাখিচুড়ি ভিডিও পিন করে রেখেছেন। এই আন্দোলন নিয়ে মোটেই পোস্ট করছেন না। বিজেপির আইনজীবী নেতা তরুণজ্যোতি তিওয়ারি তাঁর পোস্টগুলোতে রাজ্য সরকারের চেয়ে বেশি আক্রমণ করছেন সিপিএমকে। টিভি স্টুডিওতে আসা বিজেপি মুখপাত্রদের কথাবার্তা শুনলেও বোঝা যাচ্ছে তাঁরা তৃণমূলকে কিছু সাধারণ গালাগালি দেওয়াতেই সীমাবদ্ধ থাকতে চান। কোনোভাবেই যেন ডাক্তারদের আন্দোলনের উপরে ফোকাস না চলে যায় – সে ব্যাপারে তাঁরা সতর্ক। বাকি রইল কংগ্রেস, যাদের কর্মী সমর্থক রাজ্যের খুব ছোট একটা এলাকার মধ্যেই সীমাবদ্ধ।

এমতাবস্থায় নিজেদের আন্দোলন রাজনৈতিক নয় বলে চেঁচামেচি করার কোনো দরকার আছে কি? আন্দোলনকারী ডাক্তাররাও তো অধিকাংশই কোনো না কোনো বামপন্থী ছাত্র সংগঠনের সদস্য।

এটা কি শুধুই ডাক্তারদের আন্দোলন? এই প্রশ্নের আরও একটা দিক আছে, যেদিক থেকে এই আন্দোলনের সমালোচনা হওয়া দরকার।

দশ দফা দাবি নিয়ে জুনিয়র ডাক্তাররা অনশনে বসার কিছুদিন আগেই এই আন্দোলনের সমালোচক এক বন্ধু বলছিলেন ‘ওটা ডাক্তারদের আন্দোলন। আর কারোর আন্দোলন নয়।’ তাঁর উষ্মা অকারণ ছিল না। সে পর্যন্ত ডাক্তাররা যা যা দাবি করছিলেন তার সবই নিজেদের নিরাপত্তা, সুযোগসুবিধা সংক্রান্ত। তিনি বলছিলেন, গত শতকের আটের দশকের ডাক্তারদের আন্দোলনের মত স্বাস্থ্যব্যবস্থার ফাঁকফোকর নিয়ে ডাক্তাররা প্রশ্ন তুলছেন না। সে কাজ না করলে এই আন্দোলন নিয়ে সাধারণ মানুষের উত্তেজিত হওয়া ভুল। নিম্নলিখিত দশ দফা দাবির পরে আর সেকথা বলা চলে না।

জুনিয়র ডাক্তার

প্রথম দাবি সম্পর্কে সরকার বলতেই পারে যে এর সুরাহা আদালতের হাতে। দ্বিতীয় দাবি সম্পর্কেও বলা যেতে পারে যে এতে রোগীদের কিছু এসে যায় না। তবে সবকটা দাবিই জরুরি এবং ন্যায্য, ২-১০ পূরণ করাও সরকারের হাতে। কিন্তু ৩-৭ একেবারেই রোগীদের স্বার্থের সঙ্গে জড়িত। পশ্চিমবঙ্গের সরকারি হাসপাতালগুলোর যা হাল তাতে এগুলোর চেয়ে প্রয়োজনীয় কিছু হতে পারে না রোগীদের পক্ষে। এই দশ দফা দাবি পশ্চিমবঙ্গের সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থার মৌলিক সমস্যাগুলো নিয়ে প্রশ্ন তুলে দিয়েছে, যার সন্তোষজনক উত্তর দিতে হলে তৃণমূল সরকার যেসব দালাল চক্র, কুচক্রের উপর ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে সেগুলো ভাঙতে হবে। তার চেয়ে নিজের সরকার নিজে ভেঙে দিয়ে চলে যাওয়া সহজ। শুধু তাই নয়, ৩-৭ নম্বর দাবি পূরণ করলে একথা প্রকাশ্যে আসবে যে যেখানে যত ডাক্তার থাকা উচিত তত ডাক্তার নেই। যত শয্যা একটা হাসপাতালে আছে বলে দাবি করা হয়, তাও নেই। ফলে স্বাস্থ্যসাথী প্রকল্পকে সর্বরোগহর বড়ি হিসাবে দেখানো যে আসলে সরকারি ব্যবস্থার ফাঁক গোপন করতে, তাও প্রমাণিত হবে।

আরও পড়ুন পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতি: আর জি কর পেরিয়ে

ডাক্তারদের আন্দোলন চালু হওয়ার পর থেকে তৃণমূল তো বটেই, স্বঘোষিত বামেরা অনেকেও বলে চলেছেন যে এই আন্দোলনকে আসলে চালাচ্ছে কর্পোরেট হাসপাতালের মালিকরা, যাতে তাদের কাছে আরও বেশি সংখ্যক রোগী যায়। একে এই লেখার গোড়ার দিকে ষড়যন্ত্রের তত্ত্ব বলেছি। কারণ প্রথমত, একথা তথ্য দিয়ে কোনোদিন প্রমাণ করা যাবে না। যেমন প্রয়াত রতন টাটা কোনোদিন প্রমাণ করতে পারেননি যে মমতার সিঙ্গুরে কারখানা হতে না দেওয়ার আন্দোলনের পিছনে টাটার প্রতিদ্বন্দ্বী গাড়ি নির্মাণ কোম্পানিগুলোর হাত ছিল। দ্বিতীয়ত, মূলত যে শ্রেণির মানুষ আজও সরকারি হাসপাতালে যান, পশ্চিমবঙ্গের সমস্ত সরকারি হাসপাতাল বন্ধ হয়ে গেলেও তাঁরা কর্পোরেট হাসপাতালের গেট পেরিয়ে ঢুকতেই পারবেন না। অদৃষ্টের দোহাই দিয়ে বাড়িতেই মরতে দেবেন নিকটাত্মীয়কে। কারণ ওই হাসপাতালগুলোতে প্রথমবার গেলে যে ‘পেশেন্ট রেজিস্ট্রেশন’ করাতে হয় তার খরচই কোথাও হাজার টাকা, কোথাও দু হাজার টাকা। অথচ ওই শ্রেণির মানুষের অনেকের গোটা মাসের পারিবারিক আয় ১০-১২ হাজার টাকা। এখানেই শেষ নয়। ওই হাসপাতালগুলোতে মরণাপন্ন রোগীকে নিয়ে দৌড়লেও এমার্জেন্সিতে ঢুকিয়েই আগে ‘ডিপোজিট মানি’ দিতে হয়। তার অঙ্কটা ওই শ্রেণির মানুষের বাড়িঘর বেচে দিলেও আসবে কিনা সন্দেহ। ফলে সরকারি হাসপাতালের ডাক্তারদের প্রায় আড়াই মাসের আন্দোলনে কর্পোরেট হাসপাতালগুলো ফুলে ফেঁপে উঠেছে আর তার আগে কষ্টেসৃষ্টে দিন কাটাচ্ছিল – এমন আষাঢ়ে গপ্প কার্তিক মাসে একেবারেই অচল।

হঠাৎ এমন ভান করা হচ্ছে যেন পশ্চিমবঙ্গ সরকার কর্পোরেট হাসপাতালগুলোর ভীষণ বিরোধী। ব্যাপারটা সত্যি হলে চমৎকার হত। কিন্তু সেক্ষেত্রে স্বাস্থ্যসাথী প্রকল্প চালু করার দরকারই ছিল না। সম্প্রতি সংবাদ প্রতিদিন একটা প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে, যেখানে দেখানো হয়েছে যে ডাক্তারদের আন্দোলন চলাকালীন স্বাস্থ্যসাথী প্রকল্পে সরকারের খরচ বেড়ে গেছে। তা থেকে সিদ্ধান্ত করা হয়েছে যে এর কারণ এই পর্বে সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা না পেয়ে মানুষের বেসরকারি হাসপাতালে গিয়ে চিকিৎসা করানো।

সংবাদ প্রতিদিন

এখানে চেপে যাওয়া গুরুত্বপূর্ণ তথ্যটা হল, আপনার স্বাস্থ্যসাথী কার্ড না থাকলে এখন সরকারি হাসপাতালে গিয়ে চিকিৎসা পাবেন, কিন্তু বেশকিছু খরচসাপেক্ষ পরীক্ষা নিরীক্ষা করা হবে না, কোনোরকম অস্ত্রোপচারও হবে না। অর্থাৎ স্বাস্থ্যসাথী প্রকল্প থেকেই সরকারি হাসপাতালের রোগীদের পরীক্ষা নিরীক্ষা, অস্ত্রোপচারের খরচও দেওয়া হয়। অথচ এই প্রতিবেদনে কেবল সরকারের খরচ বেড়েছে বলা হয়েছে, কোন হাসপাতাল থেকে কত টাকার ‘ক্লেম’ এসেছে তা লেখা হয়নি। ফলে এই অঙ্কের সবটাই যে বেসরকারি হাসপাতালে হওয়া খরচ, তা মোটেই নিশ্চিত করে বলা যায় না। আর্থিক বর্ষের মাঝখানে, এত নির্দিষ্ট কয়েকটা দিনের সরকারি জমা, খরচের হিসাব এভাবে পাওয়া যায় কিনা, কে করল এই সমীক্ষা, সেসব প্রশ্ন না হয় ছেড়েই দেওয়া গেল।

কিন্তু যে কথা বলার, তা হল স্বাস্থ্যসাথী প্রকল্প চালু করা হয়েছে মানেই সরকার তো মেনে নিয়েছে যে তার নিজস্ব স্বাস্থ্যব্যবস্থায় রাজ্যের সব মানুষের চিকিৎসা করা সম্ভব নয়। তাই মানুষকে বেসরকারি ব্যবস্থায় চিকিৎসা করানোর খরচও সরকার জোগাচ্ছে ওই প্রকল্পের মাধ্যমে। সেক্ষেত্রে সরকার কর্পোরেট হাসপাতালে চিকিৎসার খরচ কীভাবে কমানো যায় তা দেখছে না কেন? এর উত্তর সরকারপন্থীদের ঠোঁটস্থ থাকা উচিত। ২০১৭ সালে পশ্চিমবঙ্গ সরকার ঘোষণা করেছিল যে কর্পোরেট হাসপাতালগুলোকে লাগাম পরানো হবে। সেই অনুযায়ী কলকাতায় ঘটা করে মালিকদের সঙ্গে অন-ক্যামেরা সভা করেছিলেন স্বয়ং মমতা। এমনকি জেলা সফরের সময়ে সেখানকার নার্সিংহোমগুলোর কর্তৃপক্ষের সঙ্গেও সভা করেন দফায় দফায়।

২০১৭ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত কলকাতার টাউন হলের সভায় মমতা রীতিমত বকাঝকা করেছিলেন কর্পোরেট হাসপাতালগুলোর প্রতিনিধিদের। তাদের যাবতীয় অনিয়ম, আকাশছোঁয়া বিল নিয়ে সরকারের কাছে অনেক অভিযোগ আছে বলে জানা গিয়েছিল। সেসব আটকাতে কমিশন তৈরি, আইন পাস করা ইত্যাদি অনেক কাণ্ড হয়েছিল। খুব ভাল কথা। কিন্তু তাহলে সাতবছর পরেও বেসরকারি হাসপাতালগুলোর খরচ একইরকম রয়ে গেল কেন? কর্পোরেট হাসপাতালের অসাধুতা, ডাক্তারদের অসাধুতার যে অভিযোগ এখন সরকারপন্থীরা তুলছেন সেগুলোরই বা সুরাহা হল না কেন? তার মানে ওখানেও ফাঁকি? একথা সত্যি যে সরকারি হাসপাতালের শয্যাসংখ্যা যথেষ্ট না হওয়া, পর্যাপ্ত পরিমাণ ডাক্তার না থাকার সমস্যা ২০১১ সাল থেকে তৈরি হয়নি। কিন্তু ২০১১ সালে পশ্চিমবঙ্গের মানুষ তো লুডো খেলতে দেওয়ার জন্য সরকার বদলে ফেলেননি? তাহলে এতদিন এই সমস্যাগুলোর সমাধান করতে বারণ করেছিল কে? এসব প্রশ্নের উত্তর কিন্তু ডাক্তাররা এই আন্দোলনেও চাইতে পারলেন না।

এছাড়াও কিছু প্রশ্ন আছে, যার জন্যে জবাবদিহি সরকারের পাশাপাশি ডাক্তার-সমাজকেও করতে হবে। যেমন ডাক্তাররা ব্যবস্থার বিরুদ্ধে এতগুলো মৌলিক প্রশ্ন তুললেও নার্স এবং আয়াদের কথা কিন্তু তুললেন না। অথচ সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা করানো মানুষমাত্রই জানেন, রোগীর সারাদিনের পরিচর্যা থাকে ওঁদের হাতেই। সিনিয়র, জুনিয়র মিলিয়েও প্রয়োজনের তুলনায় ডাক্তার এতই অপ্রতুল যে রোগীকে সুস্থ করে তোলা এবং সুস্থ রাখার জন্যে দক্ষ শ্রমিক নার্স আর অদক্ষ শ্রমিক আয়াদের ভূমিকা বিরাট। এঁদের দাবিদাওয়া বাদ দিয়ে সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থার যে কোনো সংস্কার অপূর্ণই থেকে যাবে।

দ্বিতীয়ত, সিভিক ভলান্টিয়ারদের দিয়ে ডাক্তার, স্বাস্থ্যকর্মী এবং রোগীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যাবে না তো বটেই; কয়েকশো পুলিস দিয়েও নিশ্চিত করা যাবে না, যদি রোগীর বাড়ির লোক আর ডাক্তারদের মধ্যে অবিশ্বাসের বাতাবরণ থাকে। এই বাতাবরণ তৈরি হওয়ার জন্যে অনেকখানি দায়ী সরকার। কারণ বহু হাসপাতালে ডাক্তার থাকলেও চিকিৎসার সরঞ্জাম থাকে না, ওষুধপত্র থাকে না। উত্তেজিত, উদ্বিগ্ন রোগীর বাড়ির লোকেরা বোঝার অবস্থায় থাকেন না যে এতে ডাক্তারের কিছু করার নেই। তাঁরা ডাক্তারকে সামনে পান বলে তাঁকেই ধরে পিটিয়ে দেন। কিন্তু এই অবিশ্বাস তৈরি হওয়ার পিছনে ডাক্তারদেরও খানিকটা দায় আছে। রোগী যখন দেখেন সিনিয়র ডাক্তাররা গুরুতর অবস্থার রোগীকেও দিনে একবার দেখতে আসেন, অথচ বাইরে চেম্বার আর নার্সিংহোম কামাই যায় না, তখন তাঁদের ভিতরে ক্ষোভ জমা হয়। সেই ক্ষোভের মার তারপর এসে পড়ে জুনিয়র ডাক্তার আর অন্য স্বাস্থ্যকর্মীদের উপর।

তৃতীয়ত, সংখ্যার বিচারে জুনিয়র ডাক্তাররা সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থার দশ শতাংশের কম হলেও, সিনিয়রদের বাইরের ব্যস্ততার কারণে তাঁরাই এই ব্যবস্থার মেরুদণ্ড। তাঁদের বিরুদ্ধেই সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা করাতে যাওয়া মানুষের নানা অভিযোগ থাকে। ‘যত্ন করে দেখেন না’, ‘ছোট ডাক্তারবাবুর ব্যবহার খারাপ’ ইত্যাদি। আর জি করের যে জুনিয়র ডাক্তার ধর্ষিত হয়ে খুন হয়েছেন তিনি যে টানা ৩৬ ঘন্টা ডিউটি করে তারপর শুতে গিয়েছিলেন তা এখন আমরা সকলেই জানি। বস্তুত অধিকাংশ জুনিয়র ডাক্তারেরই ওটাই রুটিন। নাওয়া-খাওয়া দূরের কথা, শোয়ার সময়ও নেই। তেমন একজনের রোগীর প্রতি বা তাঁর পরিবারের প্রতি ব্যবহার ভাল হবে – এমন আশা করাই অন্যায়। যত্ন করে দেখবেন – এও প্রায় আবদারের পর্যায়ে পড়ে। বরং রোগী দেখতে গিয়ে যে রোজই ওঁরা চরম ভুলভাল করেন না তার জন্যেই প্রশংসা করা উচিত। এর সুরাহা কিন্তু অনেকটাই সিনিয়র ডাক্তারদের হাতে। তাঁরা যেভাবে আজকের আন্দোলনের পাশে দাঁড়িয়েছেন, সেভাবে যদি বছরে ৩৬৫ দিন বিভিন্ন বেসরকারি হাসপাতালে খেপ খেলা বন্ধ করে সরকারি হাসপাতালে সময় দেন, তাহলেই জুনিয়ররা অনেকটা শারীরিক ও মানসিক স্বস্তি পাবেন। রোগীর পরিবারেরও অসন্তোষ কমবে।

চতুর্থত, বহু হাসপাতালের বহু বিভাগে ডাক্তারের অভাবের একটা কারণ যেমন সরকারের উদ্দেশ্যপ্রণোদিত, প্রায়শই রাজনৈতিক কারণে, বদলি; বিজ্ঞাপন দেওয়া সত্ত্বেও আবেদনপত্র জমা না পড়াও একটা কারণ। কেন জমা পড়ে না আবেদনপত্র? সাধারণত বিশেষজ্ঞদের শূন্য পদ পূরণ করার ক্ষেত্রে এই সমস্যা দেখা দেয়। এর কারণ সামাজিক। তৃণমূল সরকার কেন, কোনো দলের সরকারই এই যুগে এই সমস্যার সমাধান করতে পারবে কিনা সন্দেহ। একজন বিশেষজ্ঞ হয়ত সরকারি কলেজের শূন্য পদে যোগ দিলে যা বেতন পাবেন, তার চেয়ে অনেক বেশি বেতন পাবেন কর্পোরেট হাসপাতালে যোগ দিলে। ১৯৮০-র দশক থেকে বাঙালি বাবা-মায়েদের মধ্যে একটা মৌলিক বদল এসেছে। তাঁরা ছেলেমেয়েদের প্রাণপণে কেবল ডাক্তার বা ইঞ্জিনিয়ার করতে চেয়েছেন। মানুষের সেবা করবে বলে নয়, অনেক টাকা কামাবে বলে। ১৯৯১ সালে অর্থনৈতিক উদারীকরণের পর থেকে তাল মিলিয়ে উচ্চাকাঙ্ক্ষা বেড়েছে সকলেরই। আজকাল অনেক শিক্ষক, অধ্যাপক, সাংবাদিকও তো নিজের চারচাকার গাড়ি না থাকলে জীবন বৃথা মনে করেন। আজ হ্যাচব্যাক হলে কাল সেডান কিনতে চান। নইলে মনখারাপ হয়। সেখানে একজন ডাক্তার উচ্চতর বেতন, বিদেশযাত্রা, শীতাতপনিয়ন্ত্রিত হাসপাতালের হাতছানি এড়িয়ে আউটডোর, ইন-পেশেন্ট মিলিয়ে দৈনিক কয়েক হাজার রোগী সামলানোর ঝামেলা ঘাড়ে নিতে সরকারি হাসপাতালে ঢুকবেন কেন?

#

অভয়ার জন্য ন্যায়বিচারের দাবি ছাড়িয়ে অনেকদূর চলে আসা হল মনে হচ্ছে তো? রাজ্য সরকারও ঠিক এই কথা বলেই এসব মৌলিক প্রশ্ন তোলার পথ বন্ধ করে দিতে চাইছে, যাতে স্থিতাবস্থা বজায় থাকে। কিন্তু নিশ্চিত থাকতে পারেন, স্থিতাবস্থা বজায় থাকলে অভয়া কাণ্ড আবার হবে। এবারে একজন ডাক্তারের উপর অমন আক্রমণ হয়েছে, কাল একজন নার্সের উপর হতে পারে, পরশু কোনো আয়ার উপর হতে পারে, তার পরদিন কোনো শয্যাশায়ী রোগীর উপরেও হতে পারে। ডাক্তাররাও কি স্থিতাবস্থাই বজায় রাখতে চান স্রেফ নিজেদের কয়েকটা নির্দিষ্ট দাবি পূরণ করে নিয়ে? নাকি আমূল পরিবর্তন চান? এই সিদ্ধান্ত তাঁদেরই নিতে হবে। লক্ষ লক্ষ মানুষ তাঁদের বিপদে পাশে দাঁড়িয়েছেন। আমূল পরিবর্তনে সেইসব মানুষের স্বার্থ জড়িত। কথাটা কিন্তু ডাক্তারদের মাথায় রাখতে হবে।

তবে এত কিছু বদলে দেওয়ার জন্যে লড়াই করার দায়িত্ব একা তাঁদের নয়। অনেকখানি দায়িত্ব সরকারের রাজনৈতিক বিরোধীদের। উপরন্তু দলমত নির্বিশেষে যত মানুষ এতদিন ধরে লড়ছেন, দায়িত্ব তাঁদেরও। ডাক্তাররা বা রাজনৈতিক নেতারা তো আকাশ থেকে পড়েন না। আমাদের সবার লোভ, লালসা বজায় থাকবে আর ডাক্তাররা নিষ্কাম কর্ম করবেন, নেতারা কেবল আমাদের কল্যাণের জন্যে কাজ করে যাবেন – এমন হয় না।

নাগরিক ডট নেট ওয়েবসাইটে প্রকাশিত

গৌরী লঙ্কেশ এখন অবান্তর স্মৃতি

যেহেতু সাংবাদিকরা আকাশ থেকে পড়েন না, আর সকলের মত তাঁরাও একটা আর্থসামাজিক ব্যবস্থা এবং রাষ্ট্রব্যবস্থার উৎপাদন, সেহেতু গৌরীর খুনে অভিযুক্তদের সাম্প্রতিক জামিন এবং মালা পরিয়ে বরণের দৃশ্যও আমাকে অবাক করেনি। মুচকি হেসে স্ক্রোল করে অন্য খবরে চলে যেতে আমার অসুবিধা হয়নি।

“বাট গৌরী লঙ্কেশ ওয়াজ নট আ জার্নালিস্ট। শি ওয়াজ অ্যান অ্যাক্টিভিস্ট।”

৬ সেপ্টেম্বর ২০১৭। বক্তা পঞ্চাশের বেশি সংস্করণবিশিষ্ট একটি ভারতীয় ইংরিজি কাগজের একাধিক সংস্করণের একজন সম্পাদক। ঠিক তার আগের দিন গৌরী নিজের বাড়ির সামনে গুলিতে ঝাঁঝরা হয়ে গেছেন। কথাগুলো ভদ্রলোক বলছিলেন একঝাঁক অতি তরুণ সাংবাদিককে, যারা সদ্য কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণ্ডি পেরিয়ে সাংবাদিকতায় পা রেখেছে। স্বাধীনতার ৭০ বছর পরে কলকাতার যে শীতাতপনিয়ন্ত্রিত অফিসে দাঁড়িয়ে নিজের পদের সুযোগ নিয়ে উনি কথাগুলো বলছিলেন, পরাধীন দেশে নীলকর সাহেবদের বিরুদ্ধে লিখে লিখে মরে যাওয়া হিন্দু প্যাট্রিয়ট কাগজের সম্পাদক হরিশ্চন্দ্র মুখোপাধ্যায়ের নামাঙ্কিত রাস্তাটা সেখান থেকে কিলোমিটার দেড়েক। এমনকি যে অফিসে দাঁড়িয়ে তিনি কথা বলছিলেন, সেই অফিসের সামনের রাস্তার নামকরণ হয়েছিল সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের নামে। হরিশ তবু সরকারি কর্মচারী ছিলেন, দলীয় রাজনীতি করতেন না। সুরেন বাঁড়ুজ্জে রীতিমত কংগ্রেস সভাপতি ছিলেন। সেইসঙ্গে দ্য বেঙ্গলি নামের কাগজ সম্পাদনা করতেন। সম্ভবত তিনিই প্রথম ভারতীয় সাংবাদিক, যাঁকে কাগজের একটি লেখার জন্যে কারাদণ্ডে দণ্ডিত হতে হয়। আরও পিছিয়ে গেলে এই কলকাতাতেই রামমোহন রায় বলে একজন সাংবাদিকের নাম পাওয়া যাবে। রামমোহনের কলমের জোরে ইংরেজ আমলের সুপ্রিম কোর্টকেও গেঁয়ো রায়তের চাবুক খেয়ে মৃত্যুর ঘটনায় জেলা জজের কৈফিয়ত তলব করতে হয়েছিল। সেই শহরে বসে একজন শীর্ষস্থানীয় সম্পাদক গৌরীর মৃত্যুর পরদিনই বলতে পেরেছিলেন যে গৌরী সাংবাদিক ছিলেন না, কারণ তিনি অ্যাক্টিভিস্ট ছিলেন।

দৃশ্যটা দেখেছিলাম এবং কথাগুলো শুনেছিলাম ফুটখানেক দূর থেকে। চুপ করে থাকতে হয়েছিল, কারণ ওই যে বললাম – আমি তখন কর্পোরেট ক্রীতদাস। ক্রীতদাসের প্রতিবাদ করার অধিকার থাকে না, সাহসও থাকে না। তবে আমাদের পায়ের তলার জমি যে সরছে সেটা সেদিনই পরিষ্কার হয়ে গিয়েছিল আমার কাছে। যে দেশে একজন সাংবাদিক খুন হলে অন্য সাংবাদিকরা বলে – ও সাংবাদিক নয় কারণ ও অ্যাক্টিভিস্ট, সে দেশে কোনো সাংবাদিকের জীবনেরই যে দাম থাকবে না অদূর ভবিষ্যতে, চাকরি থাকা দূর অস্ত, তা বুঝতে আমার অসুবিধা হয়নি। আমার অনুমান নির্ভুল প্রমাণ করে বছর তিনেকের মধ্যেই অতিমারীর অজুহাতে ভারতের মিডিয়ায় ব্যাপক সাংবাদিক ছাঁটাই শুরু হয়। যেহেতু সাংবাদিকরা আকাশ থেকে পড়েন না, আর সকলের মত তাঁরাও একটা আর্থসামাজিক ব্যবস্থা এবং রাষ্ট্রব্যবস্থার উৎপাদন, সেহেতু গৌরীর খুনে অভিযুক্তদের সাম্প্রতিক জামিন এবং মালা পরিয়ে বরণের দৃশ্যও আমাকে অবাক করেনি। মুচকি হেসে স্ক্রোল করে অন্য খবরে চলে যেতে আমার অসুবিধা হয়নি। কারণ সাংবাদিক হত্যা আর সাংবাদিক ছাঁটাইয়ের উদ্দেশ্য একই – ক্ষমতাশালীর সমালোচনা বন্ধ করা, ক্ষমতার দিকে আঙুল তোলা বন্ধ করা, ক্ষমতাহীনের কণ্ঠ সকলের কানে পৌঁছবার ব্যবস্থা নষ্ট করা।

আরও পড়ুন তালিবান শাসন: ঘর হতে শুধু দুই পা ফেলিয়া

লজ্জাজনক হলেও স্বীকার না করে উপায় নেই, যে খুন হওয়ার আগে পর্যন্ত গৌরী আমার কাছে খুব পরিচিত ছিলেন না। দু-একবার নাম শুনেছিলাম। কিন্তু দ্য টাইমস অফ ইন্ডিয়া, সানডে পত্রিকা, ইনাড়ু টিভি চ্যানেলের মত বড় বড় কর্পোরেট সংবাদমাধ্যমে দেড় দশক কাজ করলেও গৌরীকে আমরা যেসব কাজের জন্য আজও মনে রেখেছি সেসব তিনি করেছেন মাতৃভাষা কন্নড়ে, মূলত তাঁর বাবা পলিয়া লঙ্কেশের মৃত্যুর পর তাঁরই প্রতিষ্ঠিত কাগজ লঙ্কেশ পত্রিকে (পরবর্তীকালে গৌরী লঙ্কেশ পত্রিকে)-র দায়িত্ব নিয়ে। আমরা বাঙালিরা আমেরিকায় কী হচ্ছে খবর রাখি, ইউরোপের সাংবাদিকতার হাল হকিকতও জানি। কিন্তু বিভিন্ন ভারতীয় ভাষার সাংবাদিকদের খবর জানি না। বড়জোর হিন্দি ভাষার রবীশ কুমারদের আমরা চিনি। তাও তাঁরা কর্পোরেট টিভি চ্যানেলে তারকা হয়ে উঠেছিলেন বলে। গৌরীর মত বিভিন্ন ভারতীয় ভাষার সংবাদমাধ্যমে যাঁরা মরণপণ সাংবাদিকতা করেন তাঁদের খবর আমরা পাই কোথায়? হয়ত চাই না বলেই পাই না। তাই আমাদের নিজেদের বিকল্প সাংবাদিকতা হয়ে দাঁড়ায় শিকড়হীন, কোনো কোনো ক্ষেত্রে সুবিধাবাদীও। লিটল ম্যাগাজিনের দীর্ঘ ঐতিহ্য থাকলেও বাংলায় বিকল্প সংবাদমাধ্যম সম্ভবত তৈরিই হত না মূলধারার সংবাদমাধ্যমে সাংবাদিকতার পরিসর ক্রমশ সংকীর্ণ হয়ে না গেলে। অন্যদের দোষ দেব না, আমারও তো দিব্যি চলে যাচ্ছিল দেড় দশক কর্পোরেট ক্রীতদাস হয়ে মাসান্তে মোটা মাইনে পকেটস্থ করে। গৌরীর হত্যা নাড়া দিলেও, নড়াতে তো পারেনি। বিকল্প হওয়ার জ্বালা যে অনেক। যা পাওয়া যায় তার চেয়ে ছাড়তে হয় অনেক বেশি।

আসলে গৌরীর মৃত্যু কেবল তাদেরই নড়াতে পেরেছে, গৌরী যাদের জন্য নিজের কলমকে হাতিয়ারের মত ব্যবহার করেছিলেন। নইলে নিজের বাড়ির সামনে খুন হওয়ার সাতবছর পরেও, কারা সম্ভাব্য খুনি তার মোটামুটি হদিশ থাকা সত্ত্বেও গৌরীর হত্যাকারীরা শাস্তি পাবে না কেন? মনে রাখা ভাল, গৌরী হিন্দুত্ববাদীদের দীর্ঘদিনের শত্রু হলেও তাঁকে যখন খুন করা হয় তখন কর্ণাটকে ছিল সিদ্দারামাইয়ার নেতৃত্বাধীন কংগ্রেস সরকার। সেই সরকারের পুলিসও অপরাধীদের শাস্তি দেওয়ার কাজে তেমন এগোয়নি। ইতিমধ্যে একাধিকবার সরকার বদল হয়ে গতবছর গৌরীর রাজ্যে আবার ক্ষমতায় এসেছে কংগ্রেস, আবার মুখ্যমন্ত্রী হয়েছেন সিদ্দারামাইয়া। বহু রাজনৈতিক বিশ্লেষকের মতে কংগ্রেসের কর্ণাটক জয়ের অন্যতম কারণ রাহুল গান্ধীর ভারত জোড়ো যাত্রা এবং হিন্দুত্ববাদের বিরুদ্ধে সোচ্চার অবস্থান। তবু কিন্তু হিন্দুত্ববাদের আমৃত্যু প্রতিপক্ষ গৌরীর হত্যার অভিযোগে গ্রেফতার হওয়া ১৭ জনের মধ্যে ১১ জন ইতিমধ্যেই জামিনে মুক্ত। রাহুলের মহব্বতের দোকানে গৌরীর জন্যে কি তবে কিছুই নেই? যেমন চারবছর ধরে বিনা বিচারে আটক সেই উমর খালিদের জন্য তাঁর দোকানে নেই একটা শব্দও, যাঁকে গৌরী নিজের ছেলে বলতেন?

আসলে বোবার যেমন শত্রু নেই, তেমনি যথার্থ সাংবাদিকের শত্রুর অভাব নেই। গৌরীরও ছিল না। কর্ণাটকের আজকের উপমুখ্যমন্ত্রী ডি কে শিবকুমারের বিরুদ্ধেও গৌরী একসময় লেখালিখি করেছিলেন। এমনকি সিদ্দারামাইয়া সরকারের টিপু সুলতান জয়ন্তী পালন করার সিদ্ধান্তকেও তিনি ভাল চোখে দেখেননি। তিনি ওই সিদ্ধান্তকে ‘নরম সাম্প্রদায়িকতা’ আখ্যা দিয়েছিলেন। এমন একজনের হত্যাকারীরা শাস্তি পেল কি পেল না, তা নিয়ে কেনই বা মাথা ঘামাতে যাবে কোনো দল বা তার নেতৃত্ব? যে ভারতে প্রয়োজনীয় অর্ণব গোস্বামী, নাভিকা কুমার, মৌপিয়া নন্দীর মত সরকারি তোতাপাখিরা; সেখানে গৌরী যে অপ্রয়োজনীয় তা বলাই বাহুল্য।

গৌরীর মৃত্যুর পর তাঁর আমৃত্যু বন্ধু এবং প্রাক্তন স্বামী সাংবাদিক চিদানন্দ রাজঘাট্টা এক দীর্ঘ ফেসবুক পোস্ট করেছিলেন, যা একান্ত ব্যক্তিগত অথচ গৌরী লঙ্কেশের শত্রু কারা এবং কেন – তা বোঝার সবচেয়ে ভাল উপায়। সেই পোস্ট পড়ে হয়ত বাঙালি বদভ্যাসেই আমার মনে পড়েছিল শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের সেইসব লাইন ‘অবান্তর স্মৃতির ভিতর আছে/তোমার মুখ অশ্রু-ঝলোমলো/লিখিও, উহা ফিরৎ চাহো কিনা?’ আজ সাতবছর পরে মনে হচ্ছে, ব্যাপারটা আর কাব্যে আটকে নেই। গৌরী এই দেশের কাছে ব্যবহারিকভাবেও অবান্তর স্মৃতিই হয়ে গেছেন।

রোববার.ইন ওয়েবসাইটে প্রকাশিত

সাংবাদিকদের অকালমৃত্যু যা যা শেখায়

আমার দ্বিতীয় চাকরিতে যিনি আমার বস ছিলেন, তিনি এক বিরল প্রজাতির ভদ্রলোক। একটুর জন্যে সতীশ হতে হতে বেঁচে গিয়েছিলেন।

লোকসভা নির্বাচনের বাজারে একটা মৃত্যু প্রায় সকলের নজর এড়িয়ে গেছে, কারণ বাংলা সংবাদমাধ্যমে তা নিয়ে এক লাইনও লেখা হয়নি। মূলধারার সংবাদমাধ্যমে অবশ্য সেই মৃত্যু নিয়ে লেখালিখি হওয়ার সম্ভাবনাও ছিল না। নিজের অপরাধ সকলেই ধামাচাপা দেয়। মূলধারার বাইরে আছি বলেই আমার লেখার সুযোগ ছিল। কিন্তু নির্বাচন সংক্রান্ত লেখালিখিতে মেতে গিয়ে আমিও সেই বর্ষীয়ান সাংবাদিকের মৃত্যুকে অগ্রাহ্য করার দোষে দুষ্ট হয়েছি। এই লেখা বস্তুত পাপস্খালনের চেষ্টা।

ভদ্রলোকের নাম সতীশ নন্দগাঁওকর। তিনি সর্বভারতীয় এবং স্বনামধন্য খবরের কাগজ হিন্দুস্তান টাইমস-এর মুম্বাই সংস্করণের মুম্বাই-থানে ব্যুরোর প্রধান ছিলেন। যাঁরা খবরের কাগজের কার্যপদ্ধতি সম্পর্কে ওয়াকিবহাল, তাঁরা জানেন যে পদটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই ধরনের পদগুলোতে সাধারণত থাকেন অত্যন্ত অভিজ্ঞ রিপোর্টাররা। তাঁদের অধীনে কাজ করেন অন্যরা। এই ব্যুরো প্রধানদের কাজের সময় বলে কিছু থাকে না, থাকা সম্ভব নয়। হয়ত অফিস থেকে বাড়ি চলে গেলেন রাত নটায়, কিন্তু দুটোর সময়ে ফোন আসতে পারে যে অমুক জায়গায় তমুক ঘটনা ঘটেছে। তখন নিজে না গেলেও, তাঁরই দায়িত্ব অন্য কোনো রিপোর্টারকে জানিয়ে খবরটা যেন পরদিন কাগজে বেরোয় তা নিশ্চিত করা। অফিসে নাইট ডিউটিতে থাকেন যে রিপোর্টার, তিনিও কোনো সিদ্ধান্ত নিতে অপারগ হলে যত রাতই হোক ব্যুরো প্রধানকে ঘুম থেকে তোলেন। এটাই দস্তুর। আবার কোনো খবর হাতছাড়া হয়ে গেলে, বা ভুল খবর বেরিয়ে গেলে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে জবাবদিহির দায়িত্বও প্রথমে ব্যুরো প্রধানের। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে অত বড় কাগজের ব্যুরো প্রধানরা নিজেরাও নামকরা সাংবাদিক হন। ফলে কাগজের উপর রাজনৈতিক/অরাজনৈতিক যেসব চাপ আসে বাইরে থেকে, তার অনেকটাও তাঁদেরই সামলাতে হয়। তার উপর রিপোর্টাররা অনেক ক্ষেত্রে অপাঠ্য, দুর্বোধ্য কপি লেখেন। সেই কপিকে বোধ্য করে তুলে তবে সম্পাদনার ডেস্কে পাঠানোও ব্যুরো প্রধানের দায়িত্ব।

এইরকম প্রচণ্ড চাপের একটা কাজ করতেন সতীশ। সঙ্গে আরও বেশকিছু অতিরিক্ত কাজ তাঁকে করতে হত। তিনি গত ২৮ ফেব্রুয়ারি মুম্বাইয়ে অফিসের কাছেই এক ওষুধের দোকানে ব্যথার ওষুধ কিনতে গিয়ে হৃদরোগে আক্রান্ত হন। নিকটবর্তী হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে চিকিৎসকরা বলেন সতীশ মারা গেছেন। এমন মৃত্যু নেহাত বিরল নয়। আমার আপনার অনেক পরিচিতই এরকম হঠাৎ হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান আজকাল। তাহলে সতীশকে নিয়ে লিখছি কেন? কারণ তাঁর মৃত্যুর পর কিছু অভূতপূর্ব ঘটনা ঘটেছে।

গত ১৩ মার্চ মুম্বাই প্রেস ক্লাবে সতীশের স্মরণসভায় তাঁর স্ত্রী অঞ্জলি অম্বেকর বলেন, ‘সাংবাদিক না হলে সতীশ একটা সুন্দর জীবন কাটাতে পারত।’ কথাটা নেহাত একজন অকালমৃতের স্ত্রীর বিলাপ বলে উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। কারণ তিনি হিন্দুস্তান টাইমসের মুম্বাই সংস্করণের রেসিডেন্ট এডিটর মীনা বাঘেলের বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন এডিটর্স গিল্ড অফ ইন্ডিয়া, প্রেস কাউন্সিল এবং মুম্বাই প্রেস ক্লাবে। তাঁর অভিযোগ, মীনা অনবরত অন্য সাংবাদিকদের সামনে সতীশকে অপমান করতেন, যা তাঁর মত সংবেদনশীল মানুষকে প্রবল আঘাত করত। মারা যাওয়ার খানিকক্ষণ আগে, শীতাতপনিয়ন্ত্রিত ঘরে বসে কুলকুল করে ঘামতে ঘামতে সতীশ বলেছিলেন যে তিনি পরদিনই পদত্যাগ করবেন। কারণ সেদিনও খানিক আগেই মীনা একই আচরণ করেছিলেন এবং এই আচরণ দীর্ঘদিন ধরে চলছিল। অঞ্জলির অভিযোগের ভিত্তিতে মুম্বাই প্রেস ক্লাব প্রাথমিক তদন্ত চালিয়ে রিপোর্ট তৈরি করেছে। তাতে বলা হয়েছে, যদিও সতীশের মৃত্যু আর মীনার ব্যবহারের মধ্যে কোনো সরাসরি সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করা যায়নি, তবু একথা সত্যি যে মীনা তাঁকে প্রচণ্ড মানসিক চাপে রাখতেন এবং নিয়মিত অপমান করতেন। এসব ‘কার্ডিয়াক এপিসোড’-এর কারণ হয়ে থাকতেই পারে।

এডিটর্স গিল্ডও এক বিবৃতিতে হিন্দুস্তান টাইমস কর্তৃপক্ষকে এই মৃত্যুর যথাযথ ও স্বচ্ছ তদন্ত করতে অনুরোধ করেছে। এর বেশি কিছু করার ক্ষমতা প্রেস ক্লাব বা গিল্ডের আইনত নেই, কারণ এগুলো সাংবাদিকদের সংগঠন মাত্র। ট্রেড ইউনিয়ন পর্যন্ত নয়। সত্যি কথা বলতে, ভারতের কর্পোরেট সংবাদমাধ্যমে বছর তিরিশেক হল সাংবাদিকদের ট্রেড ইউনিয়ন করা বন্ধ হয়ে গেছে। নয়ের দশকে উদারীকরণের সময়ে সংবাদমাধ্যমগুলো কর্মচারীদের চাকরিগুলোকে চুক্তিভিত্তিক করে ফেলার চেষ্টা শুরু করে। সংবাদমাধ্যমে যাঁরা শ্রমজীবী, অর্থাৎ ছাপার মেশিন চালানোর কাজ করেন বা অফিসগুলোতে পিওনের কাজ ইত্যাদি করতেন, তাঁদের মধ্যে এর বিরুদ্ধে কিছুটা প্রতিরোধ তৈরি হয়েছিল। তাই তাঁদের চুক্তিভিত্তিক কর্মচারী করে ফেলা সহজ হয়নি, অনেকে পুরনো ওয়েজ বোর্ডের অধীনেই রয়ে গিয়েছিলেন। তাঁদের যখন তখন তাড়ানো যায় না; যেমন ইচ্ছে ইনক্রিমেন্ট না দেওয়া বা মাইনে কমিয়ে দেওয়াও যায় না। অর্থাৎ নানা ঝামেলা পোয়াতে হয় মালিককে। অত টাকা দিতে পারব না, ব্যবসার অবস্থা ভাল না – এসব ওজর নিয়ে কোটিপতি কাগজগুলোর মালিকরা বিভিন্ন সময়ে আদালতে পর্যন্ত গেছেন ওই ধরনের কর্মচারীদের বিরুদ্ধে। কর্মচারীরাও গেছেন। অধিকাংশ ক্ষেত্রে কর্মচারীদেরই জয় হয়েছে।

কিন্তু যাঁরা নিজেদের বুদ্ধিজীবী মনে করেন, সেই সাংবাদিকরা, পাকা চাকরি থেকে চুক্তিভিত্তিক চাকরিতে চলে যেতে বিশেষ আপত্তি করেননি। কারণ তাঁদের সামনে মহার্ঘ প্যাকেজের গাজর ঝোলানো হয়েছিল। ফলে সাংবাদিকদের মধ্যে থেকে ইউনিয়ন তুলে দিতে মালিকদের বিশেষ কসরত করতে হয়নি। কিন্তু কেবল শ্রমজীবীদের মধ্যে ইউনিয়ন থাকতে থাকতে ক্রমশ দুর্বল হয়ে পড়ে; মালিকরা যে দুর্বল করে দিতে সক্রিয় ছিল তা বলাই বাহুল্য। যত পুরনো কর্মী অবসর নিয়েছেন, তত চুক্তিভিত্তিক কর্মী বেড়েছে, ইউনিয়ন ততই সাইন বোর্ডে পরিণত হয়েছে। সেই ৩০-৩৫ বছর আগে শুরু হওয়া প্রক্রিয়ার ফল এই, যে আজ সতীশরা কারণে-অকারণে গালমন্দ সহ্য করে কাজ করতে বাধ্য হন। পরিণামে জীবনটা পর্যন্ত চলে যায় অনেক সময়।

শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত হিন্দুস্তান টাইমস সতীশের বস মীনার বিরুদ্ধে কোনো তদন্ত করছে না। করলেও সতীশের মৃত্যুতে তাঁকে দায়ী করার মত কোনো প্রমাণ যে পাওয়া যাবে না তা বলাই বাহুল্য। আত্মহত্যায় প্ররোচনার অভিযোগই আদালতে প্রমাণ করা যথেষ্ট দুরূহ, আর এ তো ডাক্তারি পরিভাষায় স্বাভাবিক মৃত্যু। কিন্তু গত কয়েক বছরে সাংবাদিকদের মধ্যে ৫০-৬০ বছর বয়সে মৃত্যু কীভাবে বেড়েছে তার যদি কোনো সমীক্ষা করা যায়, তাহলে যে চোখ কপালে তোলার মত একটা সংখ্যা পাওয়া যাবে তা নিয়ে আমার কোনো সন্দেহ নেই। কেন সন্দেহ নেই?

কারণ যে পরিস্থিতিতে পড়ে সতীশের হৃদপিণ্ড কাজ বন্ধ করে দিয়েছে, তেমন পরিস্থিতিতে খবরের কাগজের দেড় দশকের কর্মজীবনে আমি নিজেও পড়েছি, অগ্রজ সহকর্মীদেরও পড়তে দেখেছি। হয়ত বয়স কম ছিল বলে আমার শরীর লড়ে গেছে। কিন্তু অগ্রজদের চল্লিশ না পেরোতেই নানারকম ছোট বড় রোগে আক্রান্ত হতে দেখেছি। সাংবাদিকদের মধ্যে ডায়বেটিস, হাইপার টেনশন, হৃদরোগ আজকাল জলভাত। আমার শেষ চাকরির এক অনুজ হঠাৎ একদিন রাতে সিলিং ফ্যান থেকে ঝুলে পড়েছিল। অন্য বিভাগের কর্মী হওয়ায় তার সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা ছিল না আমার। কিন্তু তার মৃত্যুর পরে তারই বিভাগের সাংবাদিকদের থেকে জেনেছিলাম, ওই ঝুলে পড়া মোটেই আকস্মিক নয়। তার কাজের সময় উদ্ভট হওয়ায় বৈবাহিক জীবনে অশান্তি চলছিল বেশ কিছুদিন ধরে। সে তার সুরাহা করার জন্যে বসের কাছে সামান্য পেশাদারি সাহায্য চেয়েছিল – কাজের সময়টা যদি অন্তত কিছুদিনের জন্য বদল করা যায়। তাকে প্রতিশ্রুতি দিয়েও সে বদল করা হয়নি। স্ত্রীর সঙ্গে অশান্তিও মেটেনি। ছেলেটি খুব বলিয়ে কইয়ে ছিল না। যাওয়ার সময়ে সুইসাইড নোট লেখার নাটকীয়তাটুকুও করেনি। এই মৃত্যুর দায়িত্ব কে নেবে? কেউ না। বেচারির তো অভিযোগ করারও কেউ ছিল না।

আমার দ্বিতীয় চাকরিতে যিনি আমার বস ছিলেন, তিনি এক বিরল প্রজাতির ভদ্রলোক। একটুর জন্যে সতীশ হতে হতে বেঁচে গিয়েছিলেন। আমি ওই কাগজের খেলার পাতায় যোগ দিয়েই শুনি, ক্রীড়া সম্পাদকের কয়েকদিন আগেই গুরুতর স্ট্রোক হয়েছে। তাই তিনি হাসপাতালে ভর্তি। মাস দেড়েক পরে যখন কাজে যোগ দিলেন, দেখলাম নিপাট ভালমানুষ এবং অফিসে অসম্ভব জনপ্রিয়। শুধু কাগজের সম্পাদক ভদ্রমহিলা, যিনি অত্যন্ত দক্ষ সহ-সম্পাদককেও ভরা নিউজরুমে হাঁটুর বয়সী ছেলেমেয়েদের সামনে অপদস্থ করতে ছাড়েন না, তিনিই আমাদের ক্রীড়া সম্পাদকের উপর খড়্গহস্ত। কোনো নির্দিষ্ট কারণ ছাড়াই। তাঁর সব কাজেই উনি ভুল ধরেন। মজার কথা, কাজ বলতে যা বোঝায় তা ওই ভদ্রমহিলাকে একদিনও করতে দেখিনি। আমি যে আট মাস ওই কাগজে ছিলাম, তার মধ্যে একদিনও সম্পাদক এক লাইন লেখেননি কাগজে। সম্পাদকীয় পর্যন্ত লিখতেন না। সারাদিন বসে বসে এর তার উপর চেঁচানো আর কয়েকটা পাতায় চোখ বোলানো ছাড়া তাঁর কাজ বলতে ছিল ম্যাড়মেড়ে ইংরিজিতে একে তাকে অপ্রয়োজনীয় ইমেল পাঠানো। কোনোদিন প্রথম পাতায় একটা শিরোনাম পর্যন্ত দিতে দেখিনি। অথচ তিনিই ওই কাগজের দণ্ডমুণ্ডের কর্তা। সদ্য মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে আসা আমার বসকে দেখতাম – সম্পাদকের চিৎকার শুরু হলেই হাত কাঁপছে। এর অনিবার্য ফল যা, একদিন ঠিক তাই ঘটল। সকালবেলা খবর পেলাম, আমাদের ক্রীড়া সম্পাদকের আবার হার্ট অ্যাটাক হয়েছে। তিনি ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিটে ভর্তি। আমি আর আমার এক সহকর্মী হাসপাতালে দেখতে গিয়ে ক্রীড়া সম্পাদকের স্ত্রীর মুখে যা শুনেছিলাম, তার সঙ্গে সতীশের স্ত্রীর বয়ানের শিউরে ওঠার মত মিল। সুখের কথা, তিনি কিছুদিন পরেই অবসর নেন। হয়ত সে কারণেই এখনো সুস্থ শরীরে জীবিত।

আরও পড়ুন টুইটার, বাইজু’স আঁধারে ছাঁটাই সম্পর্কে কয়েকটি কথা

এসব কথা লিখছি কেন? সব কর্পোরেট চাকুরেরই তো অল্পবিস্তর একইরকম অভিজ্ঞতা হয়। তাই তো আজকাল কাউকে জিজ্ঞেস করলে শোনা যায় না যে সে নিজের চাকরিতে সুখী। তাহলে সাংবাদিকরাই বা ব্যতিক্রম হবেন কেন? তাঁদের নিয়ে আলাদা করে লেখার কী আছে? সঙ্গত প্রশ্ন। আসলে ভারতের মূলধারার সাংবাদিকতা যে অতল খাদের মধ্যে পড়েছে গত এক দশকে, তাকে বুঝতে গেলে সাংবাদিকরা কোন অবস্থার মধ্যে কাজ করেন তা জানা দরকার। নইলে অন্ধের হস্তিদর্শন হয়।

শিক্ষকতার ব্যাপারে অনেকে বলে থাকেন, প্রচণ্ড মারধর করে সেইসব শিক্ষকরাই, যারা ভাল করে পড়াতে পারে না। সাংবাদিকতার ব্যাপারেও বললে ভুল হবে না যে অধস্তনদের উপর নিত্য চোটপাট চালানো, গালিগালাজ, অপমান করা অযোগ্য সাংবাদিকের লক্ষণ। ওই আচরণের পিছনে নিজের যোগ্যতার অভাবজনিত নিরাপত্তাহীনতার বড় ভূমিকা থাকে। বেশি যোগ্যতাসম্পন্ন কেউ তাকে অতিক্রম করে যাবে – এই উৎকণ্ঠা থেকে অধস্তনদের আত্মবিশ্বাস নষ্ট করে দেওয়ার প্রচেষ্টা থাকে। এর অজস্র উদাহরণ আছে। কিন্তু নাম করলে আইনি ঝামেলায় পড়তে হবে। কে না জানে, রাজনৈতিক নেতাদের পরেই সবচেয়ে লম্বা হাত বড় মিডিয়ার বড় সাংবাদিকদের? তাঁরা ক্ষমতাকে প্রশ্ন করতে না পারুন, কোটিপতি মালিকের মদতে এবং রাজনৈতিক ক্ষমতাবানদের সঙ্গে দহরমের সুবাদে ক্ষমতাহীনকে মাটিতে মিশিয়ে দিতে সিদ্ধহস্ত। দুঃখের বিষয়, নয়ের দশক থেকে মিডিয়ার দখল সম্পাদকদের হাত থেকে সরাসরি মালিকদের হাতে চলে যাওয়ায় এই ধরনের অযোগ্য অথচ বশংবদ সাংবাদিকদেরই তাঁরা উঁচু পদগুলোতে বসিয়েছেন। কারণ যোগ্য সাংবাদিক মালিককেও প্রশ্ন করবেন, মালিকের ব্যবসায়িক উদ্দেশ্য পালন করতে অস্বীকার করতেও পারেন। এরই ফলশ্রুতিতে সতীশের মত দশা হচ্ছে বহু সাংবাদিকের। তার চেয়েও বেশি সাংবাদিকের চাকরি যাচ্ছে করোনা অতিমারী বা কোম্পানির আর্থিক ক্ষতির অজুহাতে। ফলে মিডিয়া ভরে যাচ্ছে অশিক্ষিত, অর্ধশিক্ষিত সাংবাদিকে। তারাই হয়ে উঠছে সংবাদমাধ্যমগুলোর নীতি নির্ধারক। রবীশ কুমাররা সরে যাচ্ছেন ইউটিউবে, টিভি চ্যানেলে জাঁকিয়ে বসছেন অর্ণব গোস্বামীরা। নাম করা চ্যানেলে হোয়াটস্যাপে ফরোয়ার্ড হওয়া ভুয়ো খবর ঘটা করে প্রচারিত হচ্ছে। কোথাও সাম্প্রদায়িকতার বিষ ছড়াচ্ছেন অঞ্জনা ওম কাশ্যপ, কোথাও বিতর্ক আয়োজনের ভান করে এক পক্ষকে মৌপিয়া নন্দী ধমকাচ্ছেন ‘কে তুমি?’

এসবে তিতিবিরক্ত মানুষ ইদানীং ঝুঁকছেন বিকল্প সংবাদমাধ্যমের দিকে। তবে ভাবলে ভুল হবে যে এসব বালাই সেখানে একেবারেই নেই। তেমনটা হওয়া সম্ভবও নয়। কারণ বিকল্প সংবাদমাধ্যম আকাশ থেকে পড়েনি। যাঁরা এই মঞ্চগুলো গড়ে তুলেছেন বা তুলছেন, তাঁদের হাতেখড়ি হয়েছিল মূলধারাতেই। সকলেই যে আদর্শের কারণে অন্য পথে এসেছেন এমন নয়। অনেকে সেখানে যোগ্যতা প্রমাণ করতে না পেরেও বিকল্প পথে এসেছেন। তাঁরা হতে চান মূলধারার মহীরুহদের মতই। আসলে তাঁরাই এদের আদর্শ। অধস্তনদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার না করলে, যিনি টাকা জোগাচ্ছেন তাঁর পায়ে তৈলমর্দন না করলে, ক্ষমতাবানদের দাদা দিদি বানাতে না পারলে বড় সাংবাদিক হওয়া যায় না – এ ধারণা বিকল্প মাধ্যমের অনেকের মধ্যেও বদ্ধমূল। এই মনোভাবের ফল কাজে পড়তে বাধ্য। মূলধারার সংবাদমাধ্যমের কাজে পড়েছে, বিকল্প মাধ্যমেও অবশ্যই পড়বে। সত্যি কথা বলতে, এ দেশের বিকল্প সংবাদমাধ্যম এখনো বিকল্প ব্যবসায়িক মডেল হিসাবে সম্পূর্ণ বিকশিত হয়নি। অর্থাৎ মূলধারায় কাজ করে যতখানি রোজগার করা যায়, বিকল্পে এখনো যায় না। যশও এখনো মূলধারায় বেশি। বিকল্পে একই পরিমাণ যশলাভে পরিশ্রম অনেক বেশি। কোনোদিন ওগুলো মূলধারার সমান হয়ে গেলে বিকল্প মাধ্যমের সাংবাদিকদের আদর্শবাদের যথার্থ পরীক্ষা হবে। আমরা অনেকেই তো আসলে সুযোগের অভাবে চরিত্রবান।

ডুলুং পত্রিকার আষাঢ়-শ্রাবণ ১৪৩১ সংখ্যায় প্রকাশিত

মর্গের মত ঠান্ডা প্রেক্ষাগৃহে দর্শককে উলঙ্গ করে দিলেন শিল্পীরা

সবশেষে বারবার ধর্ষিতারা উঠে দাঁড়ালেন, আর কেন্দ্রে থাকা শ্রাবন্তী ভট্টাচার্য আমার এবং আমার ডানদিকে বসে থাকা বৃদ্ধের মাথা নিচু করে দিয়ে বিবস্ত্র হলেন।

ভারতীয় ছেলেদের যে বয়সে পুরুষদেহ যে নারীদেহের চেয়ে আলাদা সেই চেতনা জাগ্রত হয়, নারীদেহের প্রতি যৌন আকর্ষণ এবং সেই কারণে কৌতূহল তৈরি হয়; সেই বয়সে বন্ধুদের মাধ্যমে পর্নোগ্রাফির সঙ্গে পরিচয় হয়, ফলে উলঙ্গ নারীশরীর দেখার সুযোগ হয়। সেই বয়স পেরিয়ে যাওয়ার পর যখন মেয়ে বন্ধুদের সঙ্গে যৌনতা নিয়ে কথাবার্তা বলার, ঠাট্টা ইয়ার্কি করার বয়সে পৌঁছেছি, নগ্নতা আর যৌনতা সমার্থক হয়ে গেছে এবং সে সম্পর্কে আকর্ষণ আরও তীব্র হয়ে উঠেছে – সেইসময় ওই পর্যন্ত গড়ে ওঠা সমস্ত ফ্যান্টাসি চুরমার করে দিয়েছিল একটা ছবি। মণিপুরের রাজধানী ইম্ফলের রাস্তায় প্রকাশ্য দিবালোকে ১২ জন মহিলা নিজেদের জামাকাপড় ছুড়ে ফেলে দিয়েছিলেন সশস্ত্র বাহিনীর দীর্ঘকালীন ধর্ষণ ও হত্যার প্রতিবাদে। ২০০৪ সালে তাঁদের ওই উলঙ্গ প্রতিবাদের প্ররোচক ছিল আসাম রাইফেলসের হাতে থাংজাম মনোরমা নামে একটি মেয়ের ধর্ষণ ও খুন। ওই ১২ জনের হাতের সাদা ফেস্টুনে লাল কালিতে লেখা ছিল ‘INDIAN ARMY RAPE US’ (ভারতীয় সেনাবাহিনী, আমাদের ধর্ষণ করো)। অনেক পরে অগ্রজদের মুখে শুনেছি মহাশ্বেতা দেবীর গল্প অবলম্বনে মণিপুরী নাট্যকর্মী কানহাইয়ালাল হেইসনাম রচিত দ্রৌপদী নাটকের কথা। এক দাদা বলেছিলেন, শেষ দৃশ্যে অভিনেত্রী সাবিত্রী হেইসনাম যখন সম্পূর্ণ উলঙ্গ হয়ে দাঁড়ালেন, তখন তিনি লজ্জা পাননি। লজ্জা পেয়েছিলেন, ভয় পেয়েছিলেন আমার দাদাটিই। একই অভিজ্ঞতা আমার কখনো হবে বলে ভাবিনি। হল ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৪, বুধবার, অ্যাকাডেমি অফ ফাইন আর্টসে।

ওই সন্ধেয় পরপর ছটি পরিবেশনার (অন্য কোনো শব্দের আওতায় সবকটিকে আনতে পারছি না। কারণ নাটক ছিল, নাচ ছিল, গল্প বলা ছিল, ছবি আঁকা ছিল, মূকাভিনয় ছিল) শেষে ছিল ক্যান্টিন আর্ট কালেক্টিভের মুজাহেমাৎ (প্রতিরোধ)। ছজন অভিনেত্রী, এক অভিনেতা (একজন বৃহন্নলার ভূমিকায়) এবং এক শিশুশিল্পী মঞ্চে নিজেদের শরীরে ফুটিয়ে তুললেন পাচার হয়ে যাওয়া, যৌনকর্মী হয়ে যাওয়া, তারপরেও ধর্ষিত হয়ে চলা মেয়েদের রক্তাক্ত জীবন। পুরুষ (জয়রাজ ভট্টাচার্য) সেখানে দুটি নির্বাক ভূমিকায় – একবার খদ্দের, পরেরবার চাবুক হাতে রাষ্ট্র। সবশেষে বারবার ধর্ষিতারা উঠে দাঁড়ালেন, আর কেন্দ্রে থাকা শ্রাবন্তী ভট্টাচার্য আমার এবং আমার ডানদিকে বসে থাকা বৃদ্ধের মাথা নিচু করে দিয়ে বিবস্ত্র হলেন। আমাদের লজ্জা নিবারণের জন্য তাঁকে জাপটে ধরলেন অন্য শিল্পীরা, তুলে ধরলেন মণিপুরের স্মৃতি উস্কে দেওয়া সাদা ফেস্টুন। লাল কালিতে লেখা ‘KOLKATA POLICE RAPE US’।

তার আগেই প্রাচ্য নাট্যদলের ইনকিলাব নাটকের শিল্পীরা মঞ্চের একেবারে সামনে এসে আঙুল তুলে অভিযুক্ত করে দিয়েছেন ‘তুমি ধর্ষক, তুমি পুলিস, তুমি…’। ফলে আর পালাবার পথ নেই। দারিও ফো আর ফ্রাঙ্কা রামে-এর রচনা অবলম্বনে তৈরি সেই নাটকে ধর্ষণ, খুনের ধারাবিবরণীর সঙ্গে সঙ্গে মঞ্চে চলকে পড়েছে রক্ত। এক অভিনেত্রীর মত বমি ঠেলে উঠেছে আমার পেট থেকেও, অনেক কষ্টে সামলেছি। আমার বাঁদিকে বসা তরুণীর ফোঁপানোর আওয়াজ কানে এসেছে। তারও আগে অনিতা অগ্নিহোত্রীর দীর্ঘ কবিতা ‘পুনরুত্থান কাব্য’ অবলম্বনে তৈরি ইন্দুদীপা সিনহা নির্দেশিত নাটকের অভিনেত্রীরা দাঁড় করিয়েছেন মৌলিক প্রশ্নের সামনে – আমিও কখনো অজান্তে আমার স্ত্রীর স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করি না তো?

সন্ধের শুরু থেকেই অরাজনৈতিক চতুর্থ দেওয়াল ভেঙে দিয়েছেন সঞ্চালক সঞ্জিতা। মঞ্চের উপর মাইক হাতে বলতে শুরু করে কিছু পরেই দর্শকাসনে নেমে এসেছেন। কথা বলতে শুরু করেছেন আমাদের চোখে চোখ রেখে, খালি গলায়। সংগ্রাম মুখার্জি তাঁর নৃত্য পরিবেশনা ডান্স ফর হোয়াট-এ ব্যবহার করেছেন নিউজ চ্যানেলের কোলাহল, ডোনা গাঙ্গুলির সাউন্ড বাইট, মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জির সাউন্ড বাইট। ন্যাকা উচ্চারণে আমাদের ন্যাকামিকে ব্যঙ্গ করে বলেছেন ‘আমরা কী সুন্দর প্রতিবাদ করছি!’ তারপর নিরাময়ের মত ভেসে এসেছে তারাসুন্দরী বালিকা বিদ্যাভবনের প্রধান শিক্ষিকা মোনালিসা মাইতির কণ্ঠ। মঞ্চের শিল্পীরা কখন যে চরিত্রের আড়ালে রয়েছেন আর কখন যে দেখছি ভিতরের আসল মানুষটাকে – তা ক্রমশ গুলিয়ে গেছে। কারণ দেখতে পেয়েছি নিকটাত্মীয়ের হাতে যৌন নির্যাতনের কথা বলতে বলতে এক অভিনেত্রীর চোখ থেকে গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে জল। ওটা অভিনয় কিনা, পাঠক, আপনি সেদিন অ্যাকাডেমিতে উপস্থিত থাকলে আপনারও গুলিয়ে যেত। আসলে আমার মন তো জানে, যে কথাগুলোকে সংলাপ বলে ভাবছি, যে দৃশ্যগুলোকে সাজানো বলে মনে করছি মঞ্চে ঘটছে বলে, সেগুলো সত্যি সত্যি ঘটে চলে আমার আশেপাশে। হয়ত সেই সচেতনতায় আমার অ্যাকাডেমির ছোট্ট হলকে আরও ছোট মনে হতে শুরু করেছিল। সংগ্রাম নাচতে নাচতে এক ফাঁকে দর্শকদের বলেই দিলেন ‘You don’t deserve light’। ফলত আরও অন্ধকার, আরও ঠান্ডা মনে হচ্ছিল হলটাকে। ঠিক যেরকম ঠান্ডা লাগছিল বছর দুয়েক আগে এক নিকটাত্মীয়ের দেহ নিয়ে মর্গের ভিতর দাঁড়িয়ে।

শিল্পীরা এই পরিবেশনা দিয়ে ধীরে ধীরে দর্শককে ঘেরাও করেন। শুরুতে মধুরিমা গোস্বামীর বিজয়লক্ষ্মী কোঠারি রচিত বাত কুছ দিল কি কথন আর সঙ্গে সঙ্গে ত্রিগুণার ছবি আঁকা রীতিমত সহনীয় ছিল, যদিও মানুষের অবচেতনের দিকে এক অস্বস্তিকর ইঙ্গিত ছিল তার মধ্যে। সেখান থেকে পরতে পরতে দর্শকের অস্বস্তির মাত্রা বাড়িয়ে শেষবার যবনিকা পতনের আগে শ্রাবন্তীর ওইভাবে আমাদের ল্যাংটো করে দেওয়া – এক সুচিন্তিত আক্রমণ।

আরও পড়ুন হারানের নাতজামাই: স্মৃতিমেদুরতার নাটক

বুধবার কলকাতায় রীতিমত দুর্যোগ, অন্ধকার নেমেছিল অন্যদিনের চেয়ে তাড়াতাড়ি। নাছোড় বৃষ্টিতে অ্যাকাডেমি, রবীন্দ্র সদন চত্বর সন্ধে থেকেই জনবিরল। অ্যাকাডেমি থেকে যখন ছাতা মাথায় বেরোলাম, তখন রীতিমত নির্জন। তাই হেঁটে এক্সাইড মোড় পর্যন্ত আসতে সুবিধা হল। ল্যাংটো অবস্থায় কে-ই বা অন্য মানুষের মুখোমুখি হতে চায়? মনে হচ্ছিল পথটা আরও দীর্ঘ হলে মন্দ হত না। সবচেয়ে ভাল হত হেঁটে হেঁটেই আমার গন্তব্যে পৌঁছনো গেলে। বাসে, ট্রেনে ওঠা মানেই ওই অবস্থায় অন্য মানুষের, বিভিন্ন নারীর মুখোমুখি হওয়া। বাড়ি ফেরা মানেও দুজন নারীর সামনে দাঁড়ানো। আরও দেরি হলে ভাল হত। নিজেকে একটু সামলে নেওয়া যেত। প্রবল অস্বস্তি নিয়ে যখন বাড়ি পৌঁছলাম, তখনো কানে বাজছে ‘আমি চিৎকার করে কাঁদিতে চাহিয়া/করিতে পারিনি চিৎকার।’

শিল্পীদের এমনি এমনি দ্রষ্টা বলা হয় না। কানহাইয়ালাল আর সাবিত্রী দ্রৌপদী নাটকে ওই কাণ্ড ঘটিয়েছিলেন মণিপুরের মহিলারা রাজপথে ওই প্রতিবাদ করার আগেই। কামনা করি, শ্রাবন্তীরা যেন দ্রষ্টা না হয়ে ওঠেন। পশ্চিমবঙ্গের মেয়েদের যেন মণিপুরের মেয়ে না হতে হয়। যদিও শিল্পীরা প্রশ্ন তুলে দিলেন ‘নির্মমতা কতদূর হলে জাতি হবে নির্লজ্জ’?

নাগরিক ডট নেট ওয়েবসাইটে প্রকাশিত

 

বিচিত্র বিপন্নতার গল্প সংকলন

দেবতোষ দাশ থ্রিলার লেখেন (থ্রিলার লেখেন! ছিঃ!)। দেবতোষ দাশ জনপ্রিয় লেখক (এ মা! জনপ্রিয়!)।

এত বড় বড় অভিযোগ আজকাল পশ্চিমবঙ্গের বাংলা ভাষার খুব কম লেখক সম্পর্কেই করা যায়। দুটো অভিযোগই প্রমাণিত। তা সত্ত্বেও দেবতোষ দাশ কোনো এক প্রণোদনায় ছোটগল্পও লেখেন, যার পাঠক দিনদিন কমছে। ফেসবুকের বিভিন্ন গল্প লেখার গ্রুপে কমছে না, কিন্তু বইয়ের পাঠকদের মধ্যে কমছে। তা কি ফেসবুক গ্রুপের মত বইতে নিজেও লিখে লাইক পাওয়া যায় না বলে, নাকি বইয়ের গল্প মোবাইলে পড়ার সুবিধা নেই বলে? নাকি সত্যিই এমন গল্প পর্যাপ্ত পরিমাণে লেখা হচ্ছে না এই বাংলায়, যা পাঠককে টানে? পাঠককে কোন লেখা টানে, কেন টানে – এসবও গুরুতর প্রশ্ন বটে। এত প্রশ্নের সম্মুখীন সাহিত্যের এক ধারায় দেবতোষবাবু সাঁতরানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন একটি কাঁঠাল ও পাকিস্তানের গল্প নামক তাঁর দ্বিতীয় গল্প সংকলন ধরে।

নামের মতই এই বইয়ের অধিকাংশ গল্পও কৌতূহলোদ্দীপক। লেখক যেমন বাংলা গল্পে সচরাচর অপরিচিত বিষয় নিয়ে লিখেছেন, তেমন পরিচিত পরিবেশ, পরিস্থিতিকেও এমন এক চোখ দিয়ে দেখেছেন যা গল্পে নতুনত্ব আনে। তিব্বতে চীন রাষ্ট্রের হানাদারি নিয়ে বাংলায় কি নিয়মিত লেখা হয়? গল্প উপন্যাস দূরের কথা, প্রতিবেদনই বা কটা লেখা হয়? হয় না যে, তাতে হয়ত লেখকদের অধ্যয়ন আর কল্পনাশক্তির অভাবের পাশাপাশি এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে ভারত-চীনের সম্পর্কেরও ভূমিকা আছে। পশ্চিমবঙ্গে বামপন্থী রাজনীতির যেসব ধারা বহমান, সেগুলোর সঙ্গে বাংলা ভাষার লেখকদের বিভিন্ন সময়ের ঘনিষ্ঠতা এবং তজ্জনিত গণপ্রজাতন্ত্রী চীনের প্রতি পক্ষপাতও সম্ভবত খানিকটা দায়ী। যাঁরা দেবতোষবাবুর অন্য লেখার সঙ্গে পরিচিত, তাঁরা কিন্তু জানেন যে তিব্বতের রাজনীতি এই লেখকের প্রিয় বিষয়। এই সংকলনের ‘দখল’ গল্পেও সেই হানাদারির কাহিনি রয়েছে।

অফিসারের প্রশ্নের প্রত্যুত্তরে সে একটা বাক্যই বলেছিল – কীসের পারমিট, এই দেশ তো আমার!

গল্পের এই শেষ বাক্য যে বাস্তবের সামনে পাঠককে দাঁড় করায়, তাতে তিব্বতের মানুষের সঙ্গে তফাতের চেয়ে মিলের দিকটাই বেশি প্রকট হয়। সেই মিল হাড়ে কাঁপন ধরিয়ে দেওয়ার মত হয়ে ওঠে সংকলনের শেষ গল্পে, যার নাম ‘এনআরসি ও আমাদের অভিজ্ঞানপত্র’। পশ্চিমবঙ্গের বাসিন্দা বাঙাল বৃদ্ধ সুনীল ফোনে খবর পান – তাঁর আসামের অধিবাসী দিদির নাম ওঠেনি এনআরসিতে। তা নিয়ে তাঁর নিরাপত্তাহীনতা, দুশ্চিন্তা এই গল্পের কেন্দ্রে। মানুষকে রাষ্ট্রের কাছে অনবরত প্রমাণ করে যেতে হবে তার অস্তিত্বের বৈধতা, মানুষের তৈরি রাষ্ট্র মানুষকেই অবৈধ ঘোষণা করবে – বিশ্বজুড়ে অতিমারী হয়ে উঠেছে এই ব্যবস্থা। তার শিকার যেমন নামহীন তিব্বতি যুবক, তেমনই ৬০-৭০ বছর আগে পূর্ববাংলা থেকে উদ্বাস্তু হয়ে পশ্চিমে চলে আসা বাঙালি বৃদ্ধ। লেখক তিব্বতি যুবকের জন্যে কোনো উপশম রাখেননি। তবে সুনীলের জন্য, কাল্পনিক হলেও, এক স্বস্তির পরিসর তৈরি করে দিয়েছেন।

‘দিদি, তর নাম নাই রেজিস্টারে আর আমিও ছিঁড়ি উড়াই দিসি কাগজ! আমরা আর হিন্দুস্তানের না, দিদি চল চলি যাই ফেনী। আমগো ফেনী। মধুপুর! নিব না আমগোরে? নিব না? নিব না?’

স্বামীর বিড়বিড়ানি শুনে এগিয়ে আসেন মণিমালা। হাত রাখেন পিঠে।

হালকা হয়ে যান সুনীল। মাধ্যাকর্ষণটুকু যেন এখন অগ্রাহ্য করতে পারছেন। সীমানাও তিনি পেরিয়ে যেতে পারছেন সহজেই।

এই বিপন্নতাকে লেখক একেবারে নতুন প্রকরণে পেশ করেছেন ‘কাগজ’ গল্পে। সাংবাদিক আইরিন যা লিখতে চায় তা লিখতে দেওয়া হচ্ছে না। কারণ তা ‘পলিসির বিরুদ্ধে’। সেই চাকরি থেকে বেরিয়ে এসে যখন স্বাধীন সাংবাদিক হয়ে গেল সে, তখন

অফিস থেকে বেরিয়েই টের পেল স্বস্তি, যা পা থেকে মাথা পর্যন্ত পিলপিল করে উঠে আসছে।

কিন্তু অচিরেই

ইনডিপেন্ডেন্ট প্রেস বলে যে কিছু হয় না, কিছুদিন একা-একা কাজ করেই বুঝে গেল। আবার হয় না বললেও ভুল বলা হয়, হয়, একটু কায়দা করে প্রকাশ করলেই যা-বলার ইচ্ছে, বলা যায়। আর্ট অব ডাইভারশন।

কীভাবে এই ‘আর্ট অব ডাইভারশন’ ব্যবহার করে যা বলতে চায় তা বলে আইরিন – সেটাই গল্প। কিন্তু লেখক সে গল্প বলতে যেমন চলে গেছেন ‘আর্ট অব ডাইভারশন’-এর ইতিহাসে, তেমন ব্যবহার করেছেন চিত্রনাট্যের স্টোরি বোর্ডও। এভাবে গল্পের প্রকরণ বাদ দিয়ে একেবারে অন্য প্রকরণে গল্প লেখা যে সহজ নয় তা যাঁরা চেষ্টা করেছেন তাঁরা জানেন। যাঁরা কারদানি দেখানোর জন্য করতে গিয়ে ব্যর্থ হয়েছেন, তাঁরা হয়ত আরও বেশি জানেন। কিন্তু সে তো গেল লেখকদের কথা। পাঠককে এই নিরীক্ষার সামনে এসে থমকে দাঁড়াতেই হবে। সাহিত্য পড়া মানে যে এমন এক অভিজ্ঞতা যা পাঠককেও বদলে দেয়, তা টের পাওয়া যাবে। কারণ এই অভিজ্ঞতা নতুন।

আরও পড়ুন অবসাদের গল্প: বিপন্ন বিস্ময়ের গল্পকার গৌতম

লক্ষণীয় যে এই সংকলনের যে গল্পগুলো ছুঁয়ে যায়, ভাবায় – তার প্রত্যেকটাই নানাবিধ বিপন্নতার গল্প। যেগুলো তেমন ছাপ ফেলে না, সেগুলোতে বরং লেখক কিছু নিস্তরঙ্গ জীবনের আখ্যান পেশ করেছেন। সেসব গল্পের যে সংকট, সেগুলো হয় চরিত্রদের একান্ত ব্যক্তিগত অথবা আরোপিত। ‘শান’, ‘জন্মদিনের সেলফি’ বা ‘রি-ইউনিয়ন’ সেই ধরনের গল্প। বই বন্ধ করা মাত্রই ওই গল্পগুলো সম্ভবত বিস্মৃত হবেন পাঠক। কিন্তু ভোলা যাবে না ‘ম্যানিকিনের শরীর’-এর অটোচালক নন্দকে, যার উপলব্ধিতে ‘ম্যানিকিন হলেও, বলাৎকার তো বলাৎকারই!’ সংবেদনহীন সমাজ, সংবাদমাধ্যম এবং সোশাল মিডিয়ার যুগে একজন বোকা নন্দ যে যুগপৎ অমূল্য এবং মূল্যহীন – তা লেখক উন্মোচন করেছেন পরতে পরতে

দেয়ালে দেয়ালে ঘুঁটের মতো আছড়ে পড়ে জনতার বিভিন্ন বয়ান।…

রাত আটটার টক-শোয়ে, উজ্জ্বল আলো ও ক্যামেরার সামনে এনে বসানো হয় নন্দকে। সেই অনুষ্ঠানে হাজির আরও একজন। এক ম্যানিকিন। নগ্নিকা। নন্দকে হতবাক করে, সঞ্চালক তাকে অভিনয় করে দেখাতে বলেন, কীভাবে সে ম্যানিকিনের সম্মান বাঁচাতে চেষ্টা করেছিল। তিনি নন্দ’র দিকে এগিয়ে দেন নগ্ন ম্যানিকিনের শরীর।…

‘শেষ ট্রেনের আলো’ বা ‘অনলাইন অফলাইন’-এর মত আপাত নিরীহ এবং ‘এরকম আগেও পড়েছি’ মনে হওয়া গল্পেও মানুষের বিপন্নতার আখ্যান বলতে ছাড়েননি লেখক। এমনকি এই সংকলনের সবচেয়ে পেলব যে গল্প, যার নামে বইয়ের নামকরণ হয়েছে, সেখানেও লেখক যেন এক নিষ্ঠুর শল্য চিকিৎসক। লোকাল অ্যানাস্থেশিয়া ছাড়াই পাঠককে পড়িয়ে দেন

বেরং সেই প্রাচীন মানুষটির কাছে গিয়ে আজ দাঁড়াবেন বহুদিন পরে যিনি গল্পে গল্পে বলবেন, যেন অবধারিত, বয়স বাড়ার লগে লগে পাকিস্তানের কথা ক্যান এত মনে পড়ে কইতে পার বউমা!

‘চামরমনি চালের ভাত ও বোয়ালের ঝাল’ এমন একটা গল্প, যেখানে কাহিনির কথককে সুখস্মৃতি আর নিশ্চিত মৃত্যুর সম্ভাবনার মাঝে বাঁধা এক দড়ির তৈরি সাঁকো দিয়ে হাঁটতে বাধ্য করেন লেখক।

ভাতের গন্ধ নাকে আসে আমার। এদিকে প্রশস্ত করিডোর জুড়ে শুরু হয়ে গিয়েছে নীরব শৈত্যপ্রবাহ। প্রতিটি প্রশ্বাস ক্রমাগত শীতল। মৃত্যুপ্রবণ।

এই তিনটি লাইনে ধরা আছে গল্পের দোলাচল। হাঁটছে কথক। ক্যান্সার হয়েছে কি হয়নি সে খবর জানতে গিয়ে দেখা হয়ে গেছে বহুকাল আগে পরিচিত, আজ মৃত্যুপথযাত্রী উমাদার সঙ্গে, মানুষের ঘরে ফেরা যাঁর বিশেষ পছন্দের। কথক বাঁচল কি বাঁচল না, তা পাঠক পড়ে নেবেন। কিন্তু এই আলোচনায় যা বলার তা হল, এই অত্যন্ত সুখপাঠ্য খাঁটি গল্পটাতেও ঘুরে ফিরে ঘরে ফেরার অভিলাষ, ফিরতে না পারার আশঙ্কা ও বিপন্নতার কথাই বলেছেন লেখক।

এত কথার পর বলা বাহুল্য যে, এই সংকলন বর্তমান আলোচকের ভাল লেগেছে। কিন্তু এই বই নিয়ে আলোচনা করার এক মস্ত বিপদ আছে। তা হল, এই বইয়ের সেরা গল্প সম্পর্কে বেশি কিছু লেখা যাবে না। কারণ মুগ্ধতা প্রকাশ করতে গেলেই গল্পটার বিশেষত্ব একেবারে ফাঁস হয়ে যাবে। শুধু এইটুকু বলা যাক, যৌন ঈর্ষা নিয়ে এরকম ভয় ধরিয়ে দেওয়া গল্প চট করে পাওয়া যায় না। গল্পের নাম ‘ৎ’। এরপরে বর্ণমালাতেও কেবল অনুস্বার, বিসর্গ আর চন্দ্রবিন্দু পড়ে থাকে। তাই লেখা শেষ করা যাক ওই গল্পের সামান্য উদ্ধৃতি দিয়ে, যাতে গল্পটার বিপজ্জনক গতিপথ খানিকটা বোঝা যায়।

নিষ্ক্রিয় এই দু’বছর সময়কালের আগে তাদের যে ছিল এক-দেড় বছরের বিবাহিত জীবন, ভুলতেই বসেছিল সে! সোহাগে-সংরাগে বাঁচতে বাঁচতে যখন সংসারে তৃতীয় জীবন আনার ইচ্ছা জাগ্রত, দু-জনেই সম্মত, এমনকি রথের মেলা থেকে দুটো ছোট্ট লাল জুতো কিনে আনে তারা, তখনই পরিমলের পতন। জগৎসংসার অচল। ভুবনজোড়া আকাশ ভেঙে পড়ে ঝুম্পার ছোট্ট মাথায়। দু’পায়ের ওপর বসে, বালতি থেকে মগ কেটে, ঝপঝপ করে জল ঢালে গায়ে-মাথায়। তলপেটে হাত বোলায়। মায়ার হাত। ঠান্ডা করে শরীর। শরীরের ভিতর মন। মনের ভিতর বেঁচে থাকার তীব্র ইচ্ছাটুকুও পায় জল।

একটি কাঁঠাল ও পাকিস্তানের গল্প
লেখক: দেবতোষ দাশ
প্রকাশক: বৈভাষিক
প্রচ্ছদ: মৃণাল শীল
দাম: ২৮০ টাকা

আন্দোলন, ন্যায়বিচার, পুজো: একটি অরোম্যান্টিক বয়ান

একটা রাজ্যের সরকারের প্রত্যক্ষ মদতে, বা নিদেনপক্ষে অপদার্থতায়, একটা মেয়েকে ধর্ষণ করে খুন করা হয়েছে। তার বিরুদ্ধে সর্বশক্তি দিয়ে আন্দোলন করা দরকার। তা বলে সবাইকে সবকিছু থামিয়ে যারা এই অপরাধে কোনওভাবেই যুক্ত নয়, তাদের শাস্তি দিতে হবে? এ আবার কী আহ্লাদ? প্রতিবাদে পথনাটিকা হতে পারে, প্রেক্ষাগৃহে নাটকের শো করা যাবে না? হলে সিনেমা মুক্তি পেতে পারবে না? যে শিশুরা এখনও জানে না বাবা মায়ের কে হয়— তাদেরও পুজোয় মুখ ভার করে থাকতে হবে? এ তো চোরের উপর রাগ করে মাটিতে ভাত খাওয়া।

কদিন হল বৃষ্টির পরে বেশ মিঠে রোদ উঠছে। নীল আকাশে সাদা মেঘের ভেলা-টেলা ভেসে বেড়াচ্ছে। বোঝাই যাচ্ছে শরৎকাল এসে পড়ল বলে। এই সময়ে বাংলার বাঙালির মন উড়ু উড়ু হয়, আর প্রবাসী বাঙালির মন ঘুরু ঘুরু হয়। অর্থাৎ ঘুরতে ঘুরতে বাড়ি চলে আসতে ইচ্ছে করে। তা এমন দিনে যদি পশ্চিমবাংলার মুখ্যমন্ত্রী বলেন উৎসবে ফিরে আসতে – তাহাতে এ জগতে ক্ষতি কার? অন্যান্য বছরে তো কেউ গোঁসা করে না। মুখ্যমন্ত্রী চারদিনের পুজোকে টানতে টানতে এক সপ্তাহের করেছেন, লোকে সোৎসাহে মহালয়া থেকেই সপরিবারে ঠাকুর দেখতে বেরিয়ে পড়ছে, সরকারি টাকায় পুজোগুলোর বাজেট বছর বছর বাড়ছে। দুর্গাপুজোকে আন্তর্জাতিক কার্নিভাল বানিয়ে ফেলেছেন মুখ্যমন্ত্রী। কার প্যান্ডেল কত বড়, কার ঠাকুর এত লম্বা যে চাঁদ থেকে দেখা যায়— এসবের বাৎসরিক প্রতিযোগিতা হয়। বছরে একদিন রেড রোডে বসে মুসলমানরা নমাজ পড়ে বলে যাদের বাকি ৩৬৪ দিন ঘুম হয় না, তারাও রেড রোড জুড়ে দশমীর পরের কার্নিভাল হাঁ করে ইউটিউবে লাইভ দেখে। স্কুল কলেজে পুজোর ছুটি বাড়তে বাড়তে একমাস পেরিয়ে যাওয়ার উপক্রম। তা নিয়েও ছাত্রছাত্রী, অভিভাবক, শিক্ষকদের বেশিরভাগকেই উচ্চবাচ্য করতে দেখা যায় না। প্রায় দেড় দশক ধরে এই মজা পুরোদমে উপভোগ করছে যে রাজ্যের মানুষ, তারা যে এবারে পুজোর নাম শুনেই খচে বোম হবে, বেচারি মমতা ব্যানার্জি বুঝবেন কী করে? আমরা জানি তিনি উকিল, তিনি বহুভাষাবিদ, তিনি সাহিত্যিক, তিনি চিত্রশিল্পী। তা বলে তো জ্যোতিষী নন।

জননেতাদের অবশ্য অঙ্কে ভাল হতে হয়, কে কী ভাবতে পারে সেটা পাকা দাবা খেলোয়াড়দের মতো আগে থেকে হিসাব করে ফেলতে হয়। মমতা ব্যানার্জিও অঙ্কে ভালই ছিলেন অ্যাদ্দিন, নইলে এতবছর আন্দোলন করে ক্ষমতায় আসা যায় না। ক্ষমতায় টিকে থাকাও যায় না। তবে বয়স বাড়ায় বিশ্বনাথন আনন্দের ধার কমে গেছে, আর মমতার কমবে না তা কি হয়? আরজিকর-কাণ্ডের পর থেকেই নিজের চালে অন্যপক্ষের প্রতিক্রিয়া তাঁকে চমকে দিচ্ছে। আমোদগেঁড়ে বাঙালির আমোদগেঁড়েমির মাত্রাটা কেবল মমতা নয়, প্রতিবাদীরাও অনেকেই বেশি ভেবে ফেলেছিলেন। ফলে এখন মহা মুশকিল হয়েছে।

একটা জলজ্যান্ত মেয়ে ওভাবে মরেছে। এ নিয়ে বারবার নানারকম বিশ্লেষণ করতে ভালও লাগে না। নিজের উপরেই রাগ হতে থাকে। তাই চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম থেকে টুক করে লাইনে নেমে পালিয়ে যাব ভেবেছিলাম। কিন্তু টিকিট-কালেক্টর সোমেনদা যে মোবাইল চেকিং করে গ্রেফতার করবেন সেটা ঠাহর করতে পারিনি। অগত্যা বর্তমান ও অদূর ভবিষ্যৎ সম্পর্কে আমার ধারণা লিখতে গিয়ে রীতিমতো রচনা হয়ে গেল। পর্শ গাড়িতে চেপে কাউকে চাপা না দিয়েও এত বড় শাস্তি আমায় ভোগ করতে হল। অতএব পাঠককেও শাস্তির ভাগ না দিয়ে ছাড়ব না। এর যা প্রতিক্রিয়া হবে, তার দায়িত্ব সোমেনদার। সরকারি হাসপাতালে হওয়া ঘটনার দায়িত্ব যদি স্বাস্থ্যমন্ত্রী এড়াতে পারেন, আমিও আমার লেখার দায়িত্ব এড়াব।

 

আন্দোলন

অনেকে অনেকরকম প্রত্যাশা নিয়ে এই আন্দোলনে নেমেছিলেন। রাজ্যজুড়ে মানুষের মনে যে এত ক্ষোভ জমে আছে তা সরকারও ভাবেনি, যাঁরা আন্দোলন শুরু করেছিলেন তাঁরাও ভাবেননি। ফলে ১৪ আগস্ট রাতদখল কর্মসূচিকে রাজ্য সরকার বা তৃণমূল কংগ্রেস একেবারেই বাধা দেয়নি। অনেক জায়গায় পুলিশ নিজে গিয়ে দোকানদারদের বলে এসেছিল ‘আজ সারারাত দোকান খোলা রাখবি। আন্দোলন আছে।’ পশ্চিমবঙ্গে আগের আমল থেকেই যা হয়— অটোচালক, টোটোচালক ইউনিয়নগুলো সরকারি দলের অনুগত। তারাও সব চালু রেখেছিল। মানে নিজেদের ইচ্ছা ছিল না বলছি না। কিন্তু নিজেদের ইচ্ছা থাকলেও, দাদাদের ইচ্ছা না থাকলে এ কাজ করার মতো গণতান্ত্রিক পরিবেশ যদি পশ্চিমবঙ্গে থাকত, তাহলে এই আন্দোলন এত বড় হয়ে উঠত না। কেন্দ্রের শাসক দল এবং রাজ্যের বিরোধী দল বিজেপিও ভেবেছিল ‘দ্যাখ কেমন লাগে’। ফলে তাদের অধীন মেট্রো পরিষেবাও আন্দোলনকারীদের দাবিতে আন্দোলনের সুবিধার্থে সে রাতে দীর্ঘায়িত হয়েছিল। আবার কলকাতার অ্যাপ ক্যাব চালকদের মধ্যে যাদের ইউনিয়ন আছে, সেই সিপিএমের বদান্যতায় ওলা, উবেরও সারারাত চলেছিল। এরকম সার্বিক পৃষ্ঠপোষকতা কেন? উত্তরটা সহজ।

মমতার সরকার ও তাঁর দল ভেবেছিল সোশাল মিডিয়ায় ডাকা আন্দোলন, কত বড় আর হবে? লোকে খেপেছে যখন, রাস্তায় বেরিয়ে একটু চেঁচামেচি করে নিক। তাহলেই ভিতরের ক্ষোভ সব বেরিয়ে যাবে, তারপর স্বাধীনতা দিবসে ছুটি কাটিয়ে ১৬ তারিখ ঢেঁকুর তুলতে তুলতে সবাই অফিস চলে যাবে। আন্দোলন খতম। আন্দোলনের অভিমুখ নিয়েও আন্দোলনকারীরা যারপরনাই আশ্বস্ত করেছিলেন সরকারকে। আহ্বায়করা মা সারদার মতো আধ্যাত্মিক বাণী দিয়েছিলেন— কোনও দলকে এর ফায়দা তুলতে দেওয়া হবে না, কেউ কোনও দলের পক্ষ থেকে এলে তাকে ফেরত পাঠানো হবে। আন্দোলনটা তাহলে কার বিরুদ্ধে আর কার পক্ষে? এসব পার্থিব প্রশ্নের অনেক ঊর্ধ্বে ওঁরা। কোনও আহ্বায়ক আবার বেগম রোকেয়া শাখাওয়াতের স্তরের। তাঁর বক্তব্য হল তিনি ‘সিস্টেমিক চেঞ্জ’ করতে নেমেছেন, তার মধ্যে আরজিকরের মৃতা মেয়েটির জন্যে ‘জাস্টিস’ চাওয়াও আছে। ফলে সরকারের উতলা হওয়ার কিছু ছিল না। তাই মুখ্যমন্ত্রী ১৬ আগস্ট নিজেও আন্দোলনে নেমে পড়েছিলেন। কার বিরুদ্ধে জিজ্ঞাসা করিয়া লজ্জা দিবেন না, কারণ আন্দোলন ইস্যুর চেয়ে বড়।

কিন্তু হিসাবে ভুল ছিল। সকলের হিসাবেই। যাঁরা রাতদখল আন্দোলনের ডাক দিয়েছিলেন তাঁরাও বোঝেননি যে আরজিকর কেবল বন্দুকের ঘোড়া টেপার কাজটা করেছে। বহুবছর ধরে সংগঠিত গণআন্দোলনের অভাবে রাজ্যের মানুষের, বিশেষত মহিলাদের, যত ক্ষোভ পুঞ্জীভূত হয়েছিল সবটাই রাস্তায় উপচে পড়বে।

আমাদের মফস্বলের বিয়েবাড়িতে ক্যাটারিং ব্যবসার রমরমা হওয়ার আগে পাড়ার সেরা রাঁধুনিই রান্নার কাজে নিযুক্ত হতেন আর পাড়ার জোয়ানরা প্যান্টের উপর গামছা বেঁধে নিয়ে পরিবেশন করতেন। যদি তিনশো লোককে নেমন্তন্ন করা হত, রান্না করা হত আড়াইশো লোকের। কারণ জানা কথা যে জনা পঞ্চাশেক অনুপস্থিত থাকবে। শেষমেশ আসত ২৪০-৪৫ জন। যে ৫-১০ জনের রান্না বেঁচে যেত, তা দিয়ে বড় পরিবারের নিজেদেরই পরের দিনের খাওয়াদাওয়া সারা হত। ছোট পরিবার প্রতিবেশীদের মধ্যে বিলিয়ে দিত। কিন্তু কোনও কোনও বিয়েবাড়িতে একটা ঝামেলা বেধে যেত। হয়তো ২৮০-৯০ জন চলে এল। তখন দুম করে আরও ৪০-৪৫ জনের রান্না হবে কী করে? রান্না করতে গেলে অত পিস মাছ, মাংসও তো লাগবে? মিষ্টিও আনতে হবে। তখন হুলুস্থূল বেধে যেত। দেখা যেত একজন বসে থেকে থেকে পরের পদটা না পেয়ে রেগে উঠে যাচ্ছে, তাকে শান্ত করার চেষ্টায় আয়োজক বাড়ির লোকজন হয়রান। আরেক নামকরা খাইয়ে রসগোল্লার হাঁড়ি হাতে ছেলেটা তার ধারেকাছে আসছে না দেখে চেঁচামেচি করছে। ওদিকে যাকে কতজন খাচ্ছে তা দেখার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল সে বেপাত্তা। গৃহকর্তা অপমানে মুখ লাল করে রাঁধুনির উপর চোটপাট করছেন ‘এতদিন কাজ করছ, হিসাবে এত বড় ভুল কী করে হয়?’ সে বেচারা সাহস করে বলতে পারছে না ‘আপনিও তো এর আগে তিনটে ছেলেমেয়ের বিয়ে দিয়েছেন। মালমশলার হিসাব করার সময়ে আপনিও তো বলতে পারতেন, এত কমে হবে না।’

১৪ আগস্টের পর ব্যাপারটা অনেকটা সেইরকম দাঁড়াল। ফেসবুক আহ্বায়করা নিজেদের ফলোয়ারের সংখ্যা দিয়ে বিচার করেছিলেন কতজন আসবে, কারা আসবে। তাদের স্লোগান-টোগান নিজেদের সুবিধামতো সামলে নেওয়া যাবে। সরকার ভেবেছিল ব্যাপারটা প্রেশারকুকারের সেফটিভালভের মতো কাজ করবে। সমাজের ভিতরে যত রাগ জমেছে, কয়েকটা সিটি মেরে উড়ে যাবে। কিন্তু না! পরিকল্পনা ছিল কেবল ‘উই ওয়ান্ট জাস্টিস’, ‘জাস্টিস ফর আরজিকর’ ইত্যাদি স্লোগান দেওয়া হবে। কিন্তু দেখা গেল যার যা প্রাণ চায় বলছে। ইস্টবেঙ্গল-মোহনবাগান সমর্থকদের ‘এক হয়েছে বাঙাল ঘটি/ভয় পেয়েছে হাওয়াই চটি’ স্লোগানও এসে পড়েছে। আন্দোলনকারী অরাজনৈতিক (থুড়ি, অদলীয়) নেতৃত্ব বুঝলেন যে জনতা তাঁদের চেয়ে অনেক বেশি আক্রমণাত্মক। কাণ্ড দেখে মুখ্যমন্ত্রী আর তাঁর দলও বুঝলেন, লক্ষণ ভাল নয়। ফলে গত একমাসে আন্দোলনের দিকে বারবার ধেয়ে এসেছে তৃণমূলের উপর থেকে তলা পর্যন্ত নানাজনের নানাবিধ আক্রমণ। কখনও মুখ্যমন্ত্রী স্বয়ং আন্দোলনরত জুনিয়র ডাক্তারদের হুমকি দিচ্ছেন— এখনও এফআইআর ঠুকিনি, ঠুকলে কিন্তু কেরিয়ারের সাড়ে বারোটা বেজে যাবে। কখনও কোনও মন্ত্রী বলছেন আন্দোলনকারীরা সব নেশাখোর। কখনও মুখপাত্ররা বলছেন বিরোধীরা সাধারণ মানুষের আন্দোলন হাইজ্যাক করছে, কখনও স্থানীয় নেতা গিয়ে রাস্তায় লেখা আন্দোলনের স্লোগান মুছে দিচ্ছে।

অর্থাৎ রাষ্ট্রের সঙ্গে ‘সাধারণ মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত’ আন্দোলনের মধুচন্দ্রিমা শেষ। আগে মুখ্যমন্ত্রী হুমকি দিয়েছিলেন, এবার সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতিও সাবধান করেছেন— জুনিয়র ডাক্তাররা কাজে না ফিরলে রাজ্য সরকারকে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া থেকে আটকাবেন না। যে কোনও আন্দোলনের বিরুদ্ধেই যে অভিযোগ তোলা হয়, জুনিয়র ডাক্তারদের আন্দোলনের বিরুদ্ধেও সেই আপত্তিই রাষ্ট্র তুলছে এবার— মানুষের অসুবিধা হচ্ছে, তাদের পরিষেবা বন্ধ করে আন্দোলন করা চলবে না। রাজ্যের কৌঁসুলি কপিল সিবাল কোত্থেকে কিছু সংখ্যাও জোগাড় করে ফেলেছেন। ইতিমধ্যেই নাকি জুনিয়র ডাক্তাররা কাজ করছেন না বলে সারা রাজ্যে ২৩ জন রোগী মারা গেছেন। এই সংখ্যার উৎস কী? মুখ্যমন্ত্রীর সাংবাদিক সম্মেলনে দেখলাম স্বাস্থ্যসচিব বলছেন— সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী। কী অপূর্ব স্বাস্থ্যমন্ত্রক! টিভি দেখে, কাগজ পড়ে জানতে পারে কতজন রোগী মারা গেছেন। যা-ই হোক, সরকার যখন বলেছে ২৩ জন, তখন অঙ্ক ঠিক মিলিয়ে দেওয়া হবে। যেমন দুর্ঘটনায় প্রবল আঘাত পাওয়া কোন্নগরের বিক্রম ভট্টাচার্যের মৃত্যু সম্পর্কে আরজিকর হাসপাতালের ডাক্তাররা যা-ই বলুন না কেন, ওটাকে জুনিয়র ডাক্তারদের কর্মবিরতির ফলে হওয়া মৃত্যু হিসাবে ধরতেই হবে। আন্দোলনরত ডাক্তাররা সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, তাঁরা বিচারপতি ডিওয়াই চন্দ্রচূড়ের কথামতো কাজে ফিরবেন না। ফলে এরপর থেকে সরকারি হাসপাতালগুলোতে হওয়া প্রত্যেকটা মৃত্যুর দায় যে তাঁদের ঘাড়েই চাপবে— এ বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া যায়। এতদিন যে কর্পোরেট সংবাদমাধ্যম স্বভাববিরুদ্ধভাবে তাঁদের আন্দোলনের পাশে দাঁড়িয়েছে, তারাও এবার ক্রমশ আন্দোলনবিরোধী হয়ে উঠবে ধরে নেওয়া যায়। কারণ এতদিন ছিল মধ্যবিত্ত দর্শক/পাঠক ধরে রাখার তাগিদ। তা বলে তো আর কর্পোরেটরা কোনও আন্দোলনের পক্ষে থাকার চিজ নয়। তার উপর এবার ক্রমশ গ্রাম, শহরের নিম্নবিত্ত দর্শককে/পাঠককে ধরে রাখার তাগিদ বড় হয়ে দেখা দেবে। কারণ?

এক জেলা হাসপাতালের জুনিয়র ডাক্তারের সঙ্গে কথা হচ্ছিল। সে বলল ‘দাদা, এই আন্দোলন এখন এলিটদের ইন্ধনে চলছে। গ্রামের লোক আমাদের উপর ক্ষিপ্ত।’ ডাক্তার ভাইটির ভয়— এরপর এই ক্ষোভকে কাজে লাগিয়ে ডাক্তারদের বিরুদ্ধে শারীরিক আক্রমণ চালাতে পারে তৃণমূল। ভয়টা যে অমূলক নয় তা তৃণমূলের অনেকের সোশাল মিডিয়ায় এসে পড়া কথাবার্তা দেখেই বোঝা যাচ্ছে। কিন্তু এই আন্দোলন যে বৈধ, কেবল ডাক্তার বা নার্স নয়, এই পচাগলা ব্যবস্থা চলতে দিলে যে হাসপাতালে ভর্তি অসুস্থ মহিলারাও ধর্ষণ, খুনের শিকার হতে পারেন— এটা কেন রোগীদের বোঝাতে পারছ না? সব হাসপাতালে তো আরজিকরের মতো নিরাপত্তা দিতে সিআইএসএফ হাজির হয়নি, হওয়া সম্ভবও নয়। এটা গ্রামাঞ্চলের রোগীদের কেন বোঝানো যাচ্ছে না? প্রশ্নের উত্তরে আমার ডাক্তার ভাই যা বলল, তা মোক্ষম।

‘আসলে আমরা খুব অসংগঠিত।’

বাইরের আন্দোলনের যে অরাজনৈতিক, সংগঠনহীনতার রোম্যান্টিকতা— তা দিয়ে ডাক্তাররা বাঁচতে পারবেন না। বাইরের আন্দোলনকারীরা ওঁদের বাঁচাতেও পারবে না। মেডিকেল কলেজগুলোতে যে হুমকি সংস্কৃতি সন্দীপ ঘোষ, বিরূপাক্ষ বিশ্বাসরা চালু করেছেন গত ১৩ বছরে (যার কিছুই আমাদের বহুমুখী প্রতিভাসম্পন্ন স্বাস্থ্যমন্ত্রী জানতেন না), তার ফলে তৃণমূল ছাত্র পরিষদ ছাড়া অন্য ছাত্র সংগঠনগুলোর অস্তিত্ব প্রায় বিলুপ্ত করে দেওয়া গিয়েছিল। তার উপর বাঙালি বাবা-মায়েরা তো ছেলেমেয়েদের এমনিতেই শিখিয়ে এসেছেন ‘কলেজে গিয়ে লেখাপড়া করবে। পলিটিক্স করার দরকার নেই।’ এখন প্রাণের দায়ে রাজনীতি করতে হচ্ছে, সংগঠিত হওয়ার প্রয়োজনীয়তা টের পাওয়া যাচ্ছে। কিন্তু ও জিনিস কি দু-একদিনে শেখা যায়? স্বাস্থ্যবিভাগের যে ভয়ঙ্কর চেহারা এখন প্রকাশিত হচ্ছে (আনন্দবাজার পত্রিকার সাংবাদিক সোমা মুখোপাধ্যায়ের ধারাবাহিক প্রতিবেদন লক্ষণীয়), তার মধ্যেও এত বছর ধরে যেসব দুঃসাহসী ছেলেমেয়ে সংগঠিত হওয়ার চেষ্টা চালিয়ে গেছে, তারাই এখন ভরসা। তাদেরই এখন ঠিক করতে হবে কী করে রোগীদের বিশ্বাস অর্জন করেও এই আন্দোলন চালিয়ে যাওয়া যায়। কারণ টালিগঞ্জের তারকারা যে যত জনপ্রিয়ই হোন, আর তথাকথিত নাগরিক সমাজের দলহীন নেতা-নেত্রীদের সোশাল মিডিয়ায় যত ফলোয়ারই থাকুক, ডাক্তাররা আন্দোলন বন্ধ করে দিলে বাইরের আন্দোলন এমনিই ঠান্ডা হয়ে যাবে। সোম থেকে শুক্র অফিস করে শনি, রবিবারে আন্দোলন করবেন— সে গুড়ে বালি। কারণ এবার গুন্ডাবাহিনি আসবে মারতে, যেমনটা নৈহাটিতে এসেছিল ৮ সেপ্টেম্বর রাতে। খান্না মোড়ের মহিলাদের মতো জবাব দিতে যাঁরা পারবেন না, তাঁদের এবার আন্দোলন গুটিয়ে ফেলা ছাড়া উপায় থাকবে না।

 

ন্যায়বিচার

শব্দটা নতুন লাগছে? অস্বাভাবিক নয়। কারণ আরজিকর নিয়ে আন্দোলনটা যেহেতু আমরা শুরু করেছি— আমরা যারা ইংরেজি বলতে পারি এবং ছেলেমেয়েকে বাংলা মাধ্যম স্কুল থেকে সবসময় হাত পঞ্চাশেক দূরে রাখি, যাদের একাধিক আত্মীয় বা বন্ধু বিদেশে আছে, তরুণ আত্মীয়রা প্রায় সবাই রাজ্যের বাইরে আছে— সেহেতু প্রথম থেকেই এই আন্দোলনে সরকার ও পুলিশের কাছে ন্যায়বিচারের দাবি না তুলে আকাশের দিকে মুখ করে #WeWantJustice, #JusticeforRGKar স্লোগান ছোড়া হচ্ছে। যার গায়ে লাগে লাগুক, আমার স্লোগান দেওয়ার আমি দিলাম, আমার বিবেক পরিষ্কার— ভাবখানা এইরকম। যদ্দিন সরকারের গায়ে লাগছিল না, তদ্দিন মাঝরাত্তিরেও মনের সুখে এই স্লোগান দিয়ে নির্বিঘ্নে বাড়ি ফেরা গেছে। এখন যে আর যাবে না সে-কথা আগেই প্রকাশ করেছি। এবার বলি, ন্যায়বিচার আদায় করতে গেলে যারা ইংরেজি জানে না, শহরে থাকে না, যাদের বাড়ির লোক রাজ্য বা দেশের বাইরে যায় কেবল শস্তার শ্রমিক হিসাবে— তাদের সমর্থন লাগবে। তার জন্যে আন্দোলনকে তাদের কাছে নিয়ে যেতে হবে। যদি ন্যায়বিচারের চেয়েও সহজ কোনও শব্দ ব্যবহার করলে তা সম্ভব হয়, তাহলে সেই শব্দটাই খুঁজে বার করতে হবে। তা করার তাগিদ অবশ্য আমাদের নেই, থাকার কথাও নয়। সে তাগিদ থাকার কথা বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর, কারণ তাদের ভোটে জিততে হবে। আমাদের এবং আমাদের মহান অরাজনৈতিক নেতানেত্রীরা ভোট-রাজনীতিকে ঘৃণা করেন, কারণ ভোট না দিলেও তাঁদের বেঁচে থাকতে বিন্দুমাত্র অসুবিধা হয় না। গরিব মানুষের হয়। গ্রামের গরিব মানুষের তো হয়ই। যদি তাঁদের বোঝানো যায় যে সন্দীপ, বিরূপাক্ষরা সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে যেদিকে নিয়ে গেছে তার প্রতিকার করতে না পারলে আগামীদিনে বেঘোরে তাঁরাই মরবেন বেশি; একমাত্র তাহলেই জুনিয়র ডাক্তারদের কর্মবিরতিতে আজকের অসুবিধা সয়ে নিতে তাঁরা রাজি হবেন।

এটা বোঝানো শক্ত কাজ। কেবল আমার ডাক্তার ভাই যে কারণে বলেছে সে কারণে নয়। ভাইয়ের সিনিয়ররা গত ৩০-৩৫ বছর ধরে যেভাবে ডাক্তারি করেছেন তার জন্যেও। ২০১৯ সালে রাজ্যের বিভিন্ন হাসপাতালে রোগীর পরিবার-পরিজনের হাতে ডাক্তারদের নিগ্রহ বাড়াবাড়ির পর্যায়ে পৌঁছে গিয়েছিল এবং নীলরতন সরকার মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের ঘটনার পরে রাজ্যজুড়ে সরকারি হাসপাতালের ডাক্তাররা ধর্মঘট করেছিলেন। তখন একাধিক ডাক্তার আত্মীয়-বন্ধুকে বোঝানোর চেষ্টা করেছিলাম যে যতদিন না নার্সদের এবং রোগীদের ভালমন্দ সুবিধা-অসুবিধা নিয়ে ডাক্তাররা কথা বলছেন, সরকারি হাসপাতালে চাকরি করে কর্পোরেট হাসপাতালের দাসত্ব করা বন্ধ করছেন, ঢালাও নার্সিংহোম খোলা আর পাড়ায় পাড়ায় গজিয়ে ওঠা প্যাথলজিকাল সেন্টারগুলোকে টাকার বিনিময়ে সই বিলিয়ে যাওয়া বন্ধ করছেন, ততদিন রোগীরা ডাক্তারদের প্রতিপক্ষ ভাবা বন্ধ করবেন না। সেসব ব্যাপার আজও বদলায়নি।

শুধু তাই নয়। ২০১৯ সালের জুন মাসে সরকারি গোঁয়ার্তুমির চোটে পরিস্থিতি যখন হাতের বাইরে চলে গেল, ডাক্তাররা সিনিয়র জুনিয়র নির্বিশেষে দলে দলে পদত্যাগ করতে লাগলেন, তখন অবস্থা সামাল দিতে মমতা নবান্নে জুনিয়র ডাক্তারদের সঙ্গে টিভিক্যামেরার সামনে ঘটা করে এক সভা করেন এবং ছাত্রনেতাদের প্রায় সব দাবিই মেনে নেন। সুরক্ষা বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি দেন। সেদিন যা যা প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, সেগুলো সব পূরণ হয়ে থাকলে আরজিকরের মেয়েটার ধর্ষণ ও মৃত্যু হয়তো ঘটত না। ১৪ আগস্ট রাতে আরজিকরে যে তাণ্ডব চালানো হয়েছে তা তো অবশ্যই আটকানো যেত। এই নজরদারিটুকুও সিনিয়র ডাক্তাররা গত পাঁচ বছরে করেছেন কি? প্রশ্নটা কাউকে করতে দেখছি না। উত্তর বোধহয় স্বস্তিদায়ক হবে না।

এখন কথা হল, এর সঙ্গে তিলোত্তমার ন্যায়বিচারের সম্পর্ক কী?

নারীবাদীরা যত ইচ্ছে রাগ করুন। এটা বোঝা দরকার যে একজন নেশাড়ু হাসপাতালে ঢুকে সেখানকারই একজন ডাক্তারকে ধর্ষণ করে খুন করে দিয়েছে— ঘটনা যদি এইটুকু হত, তাহলে ন্যায়বিচার পাওয়ার জন্যে এত আন্দোলন করার দরকার হত না। ন্যায়বিচার আদৌ পাওয়া যাবে কিনা তা নিয়ে যে সংশয় তৈরি হয়েছে সকলের মনে— তাও ঘটত না। কারণ অভিযুক্ত সঞ্জয় রাইয়ের দ্রুত গ্রেফতারি প্রমাণ করছে যে তার বিরাট কোনও দাদা দিদি নেই। কিন্তু যে কলকাতা পুলিশ তাকে ঘটনার চারদিনের মধ্যেই গ্রেফতার করেছে, তারই কমিশনারের পদত্যাগ দাবি করছে ডাক্তারদের আন্দোলন। কারণ ওই পুলিশই প্রাণপণে প্রমাণ লোপাট করেছে, ময়নাতদন্তে কারচুপি করেছে, সাততাড়াতাড়ি মৃতার দেহ পুড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছে; এমনকি মেয়ের বাবা-মাকে টাকা দিয়ে মুখ বন্ধ করতে চেয়েছে বলেও অভিযোগ উঠেছে। এগুলো তো আর সঞ্জয়কে বাঁচানোর জন্যে করা হয়নি। সুতরাং এই ঘটনায় বৃহত্তর অপরাধ খুন, সে খুনের কারণ পাহাড়প্রমাণ দুর্নীতি। এতকিছু ঢাকতেই এমনভাবে প্রমাণ লোপাট করা হয়েছে, সাধারণ নিয়মকানুনও অগ্রাহ্য করা হয়েছে। যে মুখ্যমন্ত্রী সিবিআই শব্দটা শুনলেই প্রায় সিপিএম শব্দটা শোনার মতোই তেলেবেগুনে জ্বলে উঠতেন, তিনি প্রথম থেকেই সিবিআইয়ের হাতে এই মামলা তুলে দেওয়ার জন্যে উদগ্রীব ছিলেন। কলকাতা পুলিশকে সাতদিন সময় দিয়েছিলেন।

কেন সাতদিন? এখন দেখা যাচ্ছে আদালত আগেই হস্তক্ষেপ করায় যে চারদিন সময় বিনীত গোয়েলের বাহিনি পেয়েছিল, তার মধ্যেই সাক্ষ্যপ্রমাণের এমন হাল করা হয়েছে যে সিবিআই আন্তরিক তদন্ত চালালেও সত্য উদ্ঘাটিত হবে কিনা সন্দেহ। ফলে ন্যায়বিচার বিশ বাঁও জলে। সিবিআই আন্তরিক হোক বা না হোক, সুপ্রিম কোর্ট যথাযথ ভূমিকা নিক বা না নিক, সুপ্রিম কোর্টে শুনানির আগের রাতে পথে নামলে আদালত প্রভাবিত হবে— এসব যাঁরা ভাবছেন তাঁরা ভারতের বিচারব্যবস্থার ইতিহাস সম্পর্কে খবর রাখেন না। সত্যি কথা বলতে, জনমত মাথায় রেখে কাজ করা আদালতের উচিতও নয়। কারণ তা করলে আইনের শাসনের জায়গায় প্রতিষ্ঠিত হবে জনতার আবেগের শাসন, যা অনেক ক্ষেত্রেই ন্যায়বিচারের বিপরীতে দাঁড়ায়।

তাহলে ন্যায়বিচার পেতে গরিব মানুষ, বিশেষত গ্রামের মানুষের সমর্থন দরকার কেন বলছি? কারণ আরজিকরের ঘটনায় ন্যায়বিচার বলতে যা পাওয়া সম্ভব তা হল— ১) যারা এই প্রমাণ লোপাটের কাজ করেছে তাদের শাস্তি (এটা ঘটলে ধর্ষণ, খুনের রহস্যভেদ হওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যাবে); ২) ভবিষ্যতে এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তির সম্ভাবনার বিনাশ। এ দুটো সম্ভব একমাত্র ২০২৬ সালে সরকার বদল হলে, নচেৎ নয়।

আরও পড়ুন অরাজনীতির হাত থেকে কবে স্বাধীন হবে পশ্চিমবঙ্গের মানুষ?

অনেকেই এ-কথায় মহা ক্ষেপে উঠবেন। প্রশ্ন তুলবেন— সরকার বদলালেই যে দুর্নীতি আর হবে না তার গ্যারান্টি কী? এ কেবল রাজনৈতিক অভিসন্ধির প্রকাশ। ঠিক কথা। কোনও গ্যারান্টি নেই যে আবার দুর্নীতি হবে না, নতুন র‍্যাকেট গড়ে উঠবে না। কিন্তু যে বাচ্চা জন্মায়নি তাকে যেমন স্কুলে ভর্তি করা যায় না, তেমনি যে সরকার এখনও ক্ষমতায় আসেনি তাকে দুর্নীতির জন্যে শাস্তি দেওয়াও যায় না। শাস্তি যে সরকার আছে তাকেই দিতে হয় আর গণতান্ত্রিক শাস্তির দৃষ্টান্ত ১৯৭৭ সালের কংগ্রেস বা ২০১১ সালের বামফ্রন্ট। এখন যদি বলেন ‘এদের সরকারে কী হয় আগে দেখেছি, এদের বিশ্বাস করি না’ তাহলে কাজটা হয়ে দাঁড়াবে আরও কঠিন। একটা বিশ্বাসযোগ্য বিকল্প সংগঠন (অর্থাৎ রাজনৈতিক দল) গড়ে তুলতে হবে, তারপর এখন যারা সরকারে আছে তাদের হারাতে হবে। এমনও যে হয় না তা নয়। আন্দোলন থেকে দল উঠে আসার হাতেগরম ইতিহাস রয়েছে আম আদমি পার্টির। তবে দিল্লি কিন্তু রাজ্য হিসাবে ছোট্ট, পশ্চিমবঙ্গ অনেক বড় রাজ্য। যাদবপুর এইট-বি মোড়ে বা শ্যামবাজারে নাচ করা, গান গাওয়া, ছবি আঁকা বা কবিতা বলার চেয়ে অনেক কঠিন কাজ দিল্লির মতো ওইটুকু রাজ্যে একটা দল গড়ে ভোটে জেতা। পশ্চিমবঙ্গে যে কাজটা আরও বহুগুণ কঠিন তা বলাই বাহুল্য। পারলে লেগে পড়ুন আজ থেকেই, কারণ রাজনীতি করা ৩৬৫ দিনের কাজ।

অনেকে দিন গুনছেন দেখছি। ‘বিচারহীন ২৯ দিন, ৩০ দিন, ৩১ দিন…’ ইত্যাদি। ভুলেও এই ভুলটি করবেন না। দীর্ঘসূত্রিতা করলে যেমন ন্যায়বিচার হয় না, তেমন তাড়াহুড়ো করলেও ন্যায়বিচার হয় না। যত দিন গুনবেন, তত হতাশ হবেন। যত বেশি মানুষ হতাশ হবেন, তত আন্দোলনের জোর কমবে। আপনার চেয়েও বেশি তাড়া আছে রাজ্য সরকারের। তাই তড়িঘড়ি নিজেদের উদ্যোগ দেখাতে একটা অর্থহীন নতুন আইন পাশ করানো হয়েছে। এরপর কোনওমতে সঞ্জয় রাইকে দোষী প্রমাণ করে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে দিতে পারলেই কেল্লা ফতে। মমতা, অভিষেক এবং তাঁদের পারিষদরা বলবেন ‘উন্নাও, হাথরাসে শাস্তি হয়নি। বানতলা, ধানতলায় শাস্তি হলেও ফাঁসি হয়নি। আমরা অপরাধীকে ধরে ফাঁসি দিয়ে দিয়েছি। বিরোধীরা চক্রান্ত করে খামোখা আমাদের বদনাম করল।’ ইতিমধ্যে দুর্নীতির মামলায় কিছুদিন বিচারাধীন বন্দি হিসাবে হাজতবাস করে অথবা শাস্তিপ্রাপ্ত বন্দি হিসাবে কারাবাস করে সন্দীপও বেরিয়ে পড়বেন। তারপর সব যেমন চলছিল তেমনই চলবে। আমি, আপনি মাথা চুলকে ভাবব— কী হল কেসটা? তারপর একদিন সন্দীপদের ব্যবস্থার উৎপাদন কোনও এক ডাক্তার আপনার কোনও প্রিয়জনের কিডনি অপারেশন করতে গিয়ে লিভারটা কেটে বাদ দিয়ে দেবেন।

মানে ন্যায়বিচার পেতে গেলে টেস্ট ম্যাচ খেলার ধৈর্য থাকতে হবে। কিন্তু সরকার জানে আপনি আইপিএলের ভক্ত।

 

পুজো

আচ্ছা, পুজো হবে না এ-কথা পশ্চিমবঙ্গের একজন মানুষও বলেছে কি? পুজো হলেই যে উৎসব হবে তাও তো জানা কথা। তাহলে মমতা হঠাৎ উৎসবে ফেরার কথা বলতে গেলেন কেন? ওই যে শুরুতেই বলেছি, বয়স বাড়লে আনন্দেরও ভুল হয়। কিন্তু ওটাই একমাত্র কারণ নয়।

১৯৯৪ বিশ্বকাপ ফুটবল ফাইনাল সম্পর্কে এক প্রবীণ ক্রীড়া সাংবাদিক আমাকে বলেছিলেন ‘লোকে এত ব্রাজিল ব্রাজিল করে। কিন্তু ভাব, রোমারিও আর বেবেতোকে ১২০ মিনিট গোল করতে দেয়নি বুড়ো ফ্রাঙ্কো বারেসি। অথচ বারেসি তখন, প্লেয়িং এন্টায়ারলি ফ্রম মেমরি।’ মানে একজন জাত রক্ষণভাগের খেলোয়াড় স্রেফ অভিজ্ঞতার জোরে বয়সের কারণে জোয়ান স্ট্রাইকারদের চেয়ে শারীরিকভাবে পিছিয়ে থেকেও তাদের আটকে দিতে পারেন। মমতা এখন বারেসির খেলাই খেলছেন। তিনি জানেন, সোশাল মিডিয়ার যুগে সবকিছুই হুজুগ হয়ে দাঁড়ায়। এই আন্দোলনের একটা বড় অংশ যেহেতু অসংগঠিত মানুষের আন্দোলন, সেহেতু হুজুগ আছে বইকি। হোয়াটস্যাপ গ্রুপগুলোতে চোখ রাখলেই দেখা যাচ্ছে কেউ জিজ্ঞেস করছে ‘কী শাড়ি পরা উচিত বল তো? সাদা, না কালো?’ কেউ আবার ফেসবুকে প্রতিবাদী কবিতা পোস্ট করে লাইক গুনতে ব্যস্ত। মমতা জানেন, এই আন্দোলনকারীদের অন্য হুজুগে মাতিয়ে দিতে পারলেই সমস্যা অনেকটা মিটে যাবে। ইতিমধ্যে ডাক্তারদের যদি কোনওভাবে কাজে ফিরতে বাধ্য করা যায়, তাহলে তো কথাই নেই। এদের উৎসাহ আরও কমে যাবে। অতএব এই তো সময় পুজোর কথা মনে করিয়ে দেওয়ার।

তাছাড়া মমতাকে নির্ঘাত চিন্তায় ফেলেছে বহু ক্লাবের সরকারি অনুদান প্রত্যাখ্যান করার সিদ্ধান্ত। সরকার কেন একটা ধর্মের উৎসবে টাকা দেবে— এই প্রশ্ন করার সংস্কৃতি পশ্চিমবঙ্গ থেকে উঠেই গেছে। এমনকি কেউ একথাও জিজ্ঞেস করে না যে ক্লাবগুলো সরকারের থেকে টাকা পাওয়ার পরেও এলাকার লোকের থেকে চাঁদা তোলে কেন? কারণ অন্নপ্রাশন থেকে শ্রাদ্ধ— কোনওকিছুই বিরাট করে করতে না পারলে আমাদের আজকাল চলে না। সুতরাং দুর্গাপুজো যত বড় হয় তত ভাল। এমন এক গিগ-অর্থনীতিতে বাস করি আমরা, যে মানুষের ভোগ করার ইচ্ছে যত বাড়ে তত ভাল। ভোগ কমলেই সঙ্কট। রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী একটুও লজ্জা না পেয়ে সাংবাদিক সম্মেলনে বলেন, পুজোর সময়ে ঢাকিদের রোজগার হয়। বাকি বছরটা তারা কী করে সংসার চালায় সে প্রশ্ন একবার মনেও আসে না তাঁর? আজকাল পুজোগুলোর যা বাজেট হয় তার তুলনায় ঢাকিরা কতটুকু রোজগার করে সে খবর কি রাখেন মুখ্যমন্ত্রী? আসলে তাঁর দুশ্চিন্তা ওসব নিয়ে নয়। তিনি ক্লাবগুলোকে টাকা দেন যাতে সভ্যরা তাঁকে ভোট দেয়, যাদের উপর তাদের প্রভাব আছে তাদেরও দিতে বলে। বিশেষত পঞ্চায়েত বা পৌরসভার নির্বাচন যাঁরা মন দিয়ে অনুসরণ করেন, তাঁরা জানেন এই কৌশলের সাফল্য বিরাট। ফলে ক্লাবগুলো বেঁকে বসলে মুশকিল। সুতরাং উৎসবে ফিরে আসার পরামর্শ আসলে ক্লাবগুলোকে টাকা নিয়ে যেতে বলা।

অনেকে দেখছি ছোট ব্যবসায়ীদের কী হবে তা নিয়ে খুব চিন্তিত। চিন্তা প্রকাশ করার পরের বাক্যেই বলছেন ‘পুজোর সময়ে এ রাজ্যে দেশের মধ্যে সবচেয়ে বেশি জিএসটি কালেকশন হয়। পুজো না হলে কী হবে?’ তথ্যটা সঠিক কিনা জানি না, কিন্তু তত্ত্বটা মজাদার। জিএসটি যে জমিদারি ট্যাক্স হয়ে উঠেছে তা এখন গোটা দেশের মানুষ জানেন। কেন্দ্রীয় সরকার পর্যন্ত এমন লজ্জায় পড়েছে যে জুলাই মাসে কত টাকা জিএসটি উঠেছে তা আর প্রকাশই করেনি। কারণ ধরা পড়ে যেত যে ছোট ব্যবসায়ীদের রক্ত চোষা হচ্ছে। এদিকে আমার পুজোবাদীরা জিএসটি কালেকশনকে রাজ্যের ছোট ব্যবসায়ীদের সমৃদ্ধির লক্ষণ বলে ধরছেন। গত কয়েক বছর ধরেই যে পুজোর সময়েও দোকানে তেমন ভিড় হচ্ছে না, কারণ মানুষের হাতে খরচ করার মতো পয়সা নেই— তা চোখ কান খোলা থাকলে, ছোট দোকানিদের সঙ্গে কথা বলার অভ্যাস থাকলেই জানা যায়।

কিন্তু আবার ওই প্রশ্নে ফিরে আসি। পুজো একেবারে করব না— এ-কথা কে বলেছে? কেউ না। জামাকাপড় কিনবই না— এমন ধনুর্ভঙ্গ পণ কে করেছে? কেউ না। কেনই বা করতে হবে? একটা রাজ্যের সরকারের প্রত্যক্ষ মদতে, বা নিদেনপক্ষে অপদার্থতায়, একটা মেয়েকে ধর্ষণ করে খুন করা হয়েছে। তার বিরুদ্ধে সর্বশক্তি দিয়ে আন্দোলন করা দরকার। তা বলে সবাইকে সবকিছু থামিয়ে যারা এই অপরাধে কোনওভাবেই যুক্ত নয়, তাদের শাস্তি দিতে হবে? এ আবার কী আহ্লাদ? প্রতিবাদে পথনাটিকা হতে পারে, প্রেক্ষাগৃহে নাটকের শো করা যাবে না? হলে সিনেমা মুক্তি পেতে পারবে না? যে শিশুরা এখনও জানে না বাবা মায়ের কে হয়— তাদেরও পুজোয় মুখ ভার করে থাকতে হবে? এ তো চোরের উপর রাগ করে মাটিতে ভাত খাওয়া। যদি আমরা পুজোর হুজুগে তিলোত্তমার জন্য ন্যায়বিচার ছিনিয়ে আনার কথা ভুলে না যাই, পুজোর ছুটিতে আন্দোলন থেকেও ছুটি নিয়ে না ফেলি, তাহলেই যথেষ্ট। বরং এই অবসরে পুজোর আড়ম্বর যদি একটু কমে, তাহলে অত্যধিক আলোয় চারপাশে জমে ওঠা যেসব অন্ধকার আমরা ঢেকে রাখি সেগুলো চোখে পড়বে। সরকারের পক্ষে সেটাই সবচেয়ে বিপজ্জনক। তাই হুজুগান্তরে যাওয়ার তাড়া দেওয়া। এখন আমাদেরই প্রমাণ করতে হবে— এই আন্দোলন আমাদের আরেকটা হুজুগমাত্র নয়।

চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম ওয়েবসাইটে প্রকাশিত

Flag or no flag, the city of the protest march has risen

Even as the Left Front extended its winning streak, Kolkata became deeply anti-protest as a city, and West Bengal, an anti-protest state. The last Left chief minister of West Bengal, the late Buddhadeb Bhattacharya, played no mean part in this political emasculation of the people’s strength.

Since the days of British rule, Kolkata had been both famous and infamous for being the michhil nagori (city of protest march). The Hindu upper caste middle class, known as bhadralok, used to have a big presence in those marches because, apart from their own troubles, they had fellow feeling for the poor, downtrodden. All that rapidly changed after liberalisation in 1991.

The Bengali bhadralok, now upwardly mobile, started losing touch with the poor. The only relation that remained between the two classes was of master and domestic help, or master and driver of the car brought on loan. To this new middle class – whose earlier generations had stood like a rock behind leftist movements in the state – words like strike, protest, rally, march and Brigade (a ground owned by the Indian army, that hosts huge rallies of all political parties) became dirty words. From the 1990s, the Bengali middle class started believing that all of the above meant loss of time and working days. Only ‘jobless’ people – as if jobless because of their own fault – went to rallies and protest marches. The big newspapers published from Kolkata always wrote more about how many people missed their flights because of a protest march, than about what necessitated that march. Whenever there was a rally at Brigade, the papers would invariably run stories about people from rural Bengal visiting Alipore Zoo or Victoria Memorial after the rally. The suggestion was that they actually came to Kolkata for sightseeing sponsored by the party that called the meeting. The meeting at Brigade was a sideshow.

Thus, even as the Left Front extended its winning streak, Kolkata became deeply anti-protest as a city, and West Bengal, an anti-protest state. The last Left chief minister of West Bengal, the late Buddhadeb Bhattacharya, played no mean part in this political emasculation of the people’s strength. He went as far as to say that he unfortunately belonged to a party that calls for strikes.

The Mamata Banerjee-led Trinamool Congress has been making full use of this anti-protest, therefore anti-politics, psyche since 2011.

There have been multiple cases of rape and government denial since Banerjee became the chief minister. But the outrage remained local, at best spilled on to social media. Also, during her rule, the state has seen unprecedented corruption in the highest ranks of the ruling party (as Sarada scam, Narada scam, the School Service Commission scam etc bear out) but no large-scale popular movement against the government. Not only that, two consecutive panchayat elections (2018 and 2023) were literally stolen from the people. Even filing nomination became a matter of life and death for opposition candidates. In 2018, West Bengal broke a record. TMC won 20,076 seats out of 58,692 – the highest in terms of percentage since the first panchayat elections held in 1978. The number dipped last year but there were allegations that government officers played active roles in ensuring TMC win even during the counting of votes. The Calcutta high court suspended government officers for this.

Students of colleges have long forgotten what students’ union elections look like. Barring a few exceptions like Presidency and Jadavpur University, the last elections were held way back in 2017. Bengal has not seen a mass movement despite this. Almost three decades of vilification of protest politics had achieved what two centuries of British rule could not – making Bengalis silent sufferers who do not shout back.

All that has changed in last one month.

The stupor is over. It is sad that an aspiring doctor from an urban middle-class family had to go through inscrutable pain and die to impress upon the people of West Bengal and its capital the usefulness of protests. The fact that there are things more important than somebody being able to follow their daily routine has finally dawned on the bhadralok and bhadramohila (ladies and gentlemen). Sitting in stranded buses and cars, the very people who used to curse political parties and mass organisations are now looking for protest marches to join.

However, a section of the opinion-shaping urban middle class of Bengal is still averse to joining any protest held by the political opposition to Mamata Banerjee. Even though BJP is the main opposition party in the assembly, socio-culturally RSS-BJP is still unacceptable to many Bengalis. Even the BJP leaders know it. That is why they held a Nabanna Abhijan (seize the secretariat) programme under the banner of a ‘Paschimbanga Chhatra Samaj’, a name nobody had ever heard of.

On the other hand, it is still not deemed cool to march under the red flag of the Communist Party of India (Marxist) or other Left parties that were part of the Left Front government. Therefore, leaders of #ReclaimTheNight movement in and around Kolkata have declared that they would not allow any political flags in their programmes. Notwithstanding this arguable decision, their movement is drawing huge crowds. First held on August 14 night as a one-time protest, it has grown into a full-fledged movement and is catching on in rural Bengal. This became clear on the night of September 4. Ironically, at many places, it is the CPI(M) or its youth wing/students’ wing or the TMC that is egging people on to participate in these non-political marches.

Alumni associations of educational institutions, pensioners’ associations, local clubs and even school students are taking to the streets all over Bengal. Many of them find political parties nauseating. August 14 leaders of #ReclaimTheNight are on record, saying their movement is against rape culture and not just for justice in the R.G. Kar case. Rimjhim Sinha, one of the women who initiated the protest, said on a Bengali TV channel that no political party has created a safe environment for women. So, they have no faith in parties.

Under these circumstances, I was curious to know how successful the Left Front’s September 3 protest march against the alleged cover-up of RG Kar rape and murder case could be.

Even today, a large number of people turning up for something called by the Left Front or CPI(M) is common in most parts of Bengal. However, election results, particularly since 2016, have shown that those numbers hardly mean anything in terms of support. Therefore, I was keen to find out what kind of slogans were being raised, what kind of people had come to walk the talk and how the people outside the march received it.

Also read Falling from the sky: Insignificance of being human

The slogans were expectedly more directly aimed at the government than the abstract ‘We want justice’ or ‘Justice for RG Kar’ that are heard in the so-called apolitical marches. Those two slogans were not done away with. But in this rally flaunting red flags, some slogans promised a long vigil for the deceased doctor in polished Bangla, others demanded catching the kingpin of the RG Kar case in more mundane language. The more interesting part of the march was the composition of people. There were urban elites clad in branded attire as well as rural people in cheap shirts and trousers. Over-dependence on the former class and alienation from the latter have been major reasons for the Left’s decline in Bengal and the process started when they were in power. Bengal’s poor have been identifying Mamata Banerjee as one of their own for almost two decades now. As a result, their presence in left front’s protest marches in the last few years have not been as common as they should be. Hence this was something to take note of.

I could not reach the starting point (Rajabazar Tram Depot) by bus because so many people had started to gather that traffic had to be halted half-a-mile away. Experience told me that the passengers of the bus I was on would start cursing the organisers of this march, with the common refrain “They destroyed West Bengal with all these meetings and marches for 34 years. Here they come again.” But to my surprise, everyone got off without a word. A boy returning from school was telling his mother “I’m too tired. I can’t walk from here.” The mother scolded him “Of course you can. Try and adjust for a day.”

Right from the start of the march, I was looking at the roads that meet APC Road from both sides. APC Road is among Kolkata’s busiest arterial roads and once it is blocked, traffic comes to a halt on all those connecting roads as well. On a Tuesday afternoon like that, I expected a lot of irked – even angry – faces among the bike riders, car drivers and bus riders. There were none. On the contrary, many were shooting videos of the march.

The nearer the march got to the end point, the crazier the scenes on both sides of the road became. Families standing on the balconies of multi-storied buildings were shouting slogans at full pitch. Mothers, bringing their children home from school, stood by for the march to pass. A man from the march went and handed one of the children a big flag. The child found a high stool to stand on and started waving the flag with all the strength he had, the mothers sloganeering at the top of their voices. Working class people employed in the shops on the footpath poured on to the street and started sloganeering.

But the fiercest support came from palpably poor women. They had come to show their support, leaving whatever they were doing. Some were carrying their small children. Some had rushed out in the middle of housework. They joined in with the sloganeerings even more ferociously than those walking. At one point, their participation felt like a loud guard of honour to the walkers.

Mind you, this group is the core voters of TMC. These are women who have to work from dawn to dusk – just to survive. They are the prime beneficiaries of the TMC government’s pet project – Lakshmir Bhandar (purse of Lakshmi) that provides them with Rs 1,000 every month (Rs 1,200 for women of the Scheduled Caste and Scheduled Tribe communities). The influence of TMC in those areas could be seen from the party’s flags hanging from the buildings behind those women. Near Khanna crossing, there is an old building waiting to collapse. On its first floor stood some women leaning over the rusty railing, jostling for space and shouting slogans, throwing fists in the air. They had so much energy that I feared the balcony would fall at any moment. Interestingly, a triangular flag with angry Hanuman painted on it, was hanging from a rod.

It seemed to me that these women, at least for now, have no qualms shouting for the red flag. It could well be the case that they do not mind who carries which flag. They only know which flag they dislike today. This should set alarm bells ringing in the TMC. On the other hand, the Left Front should realise that this is the class they had abandoned.

Originally published on The Wire