খেলোয়াড় মেয়েদের জয় হোক

মেয়েদের দলের সাফল্যের চেয়ে ব্যর্থতাকে বড় করে দেখানোর যে প্রবণতা এতদিন দেখা গেছে, তার ব্যাখ্যা নারীবিদ্বেষ ছাড়া অন্য কিছু দিয়ে হয় না।

‘খেলোয়াড় মেয়ে’ কথাটা প্রথম কার মুখে শুনেছিলাম মনে করতে পারছি না, কিন্তু কয়েকশোবার শুনেছি। কোনও মেয়েকে খারাপ মেয়ে বলে দেগে দিতে এই শব্দবন্ধ বেশ জনপ্রিয়। রবিবার মাঝরাতে যখন নাদিন দে ক্লার্কের ব্যাট থেকে বেরোনো উড়ন্ত বলটাকে টেনে নামিয়ে দু-হাত ছড়িয়ে উড়ান শুরু করলেন হরমনপ্রীত কৌর আর তাঁকে ধরতে দৌড়লেন স্মৃতি মান্ধনা, শেফালি বর্মা, জেমিমা রডরিগস, দীপ্তি শর্মা, অমনজ্যোত কৌর, রিচা ঘোষ, রাধা যাদব, শ্রী চরনি, ক্রান্তি গৌড়, রেণুকা সিং ঠাকুররা— ঠিক তখন, এ-যুগের সেরা ধারাভাষ্যকার ইয়ান বিশপ বলে উঠলেন ‘এই মুহূর্ত কয়েক প্রজন্মের উত্তরাধিকার তৈরি করল।’ আমার ভাবতে ইচ্ছে হল, সেই উত্তরাধিকারের জোরে খেলোয়াড় মেয়ে কথাটা আর গালাগালি থাকবে না। চারপাশ দেখে আমরা যতই হতাশ হই প্রায়শ, দুনিয়া যে বদলায় তাতে তো সন্দেহ নেই। একসময় ভালোঘরের মেয়েরা অভিনয় করে না— এই সংস্কার তো ছিল আমাদের সমাজে। সত্যিই ‘ভালো’-ঘরের মেয়েদের অভিনয় করতে দেওয়াও হত না। সেই পরিস্থিতি তো বদলেছে। মেয়ে অভিনেত্রী হলে, বিখ্যাত হলে তাকে নিয়ে তো আজ গর্ব করেন বাবা-মা, পাড়া-প্রতিবেশীরা। তেমন এমন ভবিষ্যৎও নিশ্চয়ই আসবে, এই ভারতেই আসবে, যখন একটা মেয়ের যৌন বিশুদ্ধতাই তাকে বিচার করার সবচেয়ে বড় মাপকাঠি হয়ে থাকবে না।

বাইরে আমরা যে যা-ই বলি, মেয়েরা বিশ্বখেতাব জিতেছে বলে যতই তাদের প্রশংসায় ভরিয়ে দিই এখন, সামগ্রিকভাবে কিন্তু আজও ওটাই মাপকাঠি। মান্ধাতার আমলের কথা বলছি না। মাত্র এক দশক আগে, রিও অলিম্পিকের সময়ে, এক সর্বভারতীয় ইংরেজি কাগজে কাজ করতাম। সেদিন নিউজ এজেন্সি একটা খবর পাঠিয়েছিল গেমস ভিলেজে কন্ডোমের চাহিদা সম্পর্কে। সন্ধেবেলার এডিট মিটিংয়ে অবাক হয়ে খেয়াল করলাম, উচ্চশিক্ষিত সাংবাদিকরা জানতেনই না যে গেমস ভিলেজে অ্যাথলিটদের মধ্যে যৌন সম্পর্ক হয়। কিন্তু ব্যাপারটা বিস্ময়ে সীমাবদ্ধ থাকলেও কথা ছিল। সবচেয়ে বয়োজ্যেষ্ঠ মহিলা সাংবাদিক বলে বসলেন ‘তাহলে বাপু মেয়েদের খেলতে না দেওয়াই ভালো।’ অর্থাৎ মেয়েদের ‘সতীত্ব’ বজায় রাখাই আসল। ওটা করতে না পারলে হাজার সাফল্যেও কিছু এসে যায় না। আশা করা যাক, হরমনপ্রীতদের বিশ্বজয়ের পরে অন্তত উচ্চশিক্ষিত বাবা-মায়েরা ওই সাংবাদিকের মতো ভাবা বন্ধ করবেন।

‘অনার কিলিং’-খ্যাত হরিয়ানার মেয়ে শেফালি, হিমাচল প্রদেশের ঠাকুর পরিবারের মেয়ে রেণুকা, মুম্বাইয়ের ধার্মিক খ্রিস্টান জেমিমা বা আমাদের শিলিগুড়ির রিচা— প্রায় সকলেরই ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যাচ্ছে, তাদের ক্রিকেট শুরু ছেলেদের সঙ্গে খেলতে গিয়ে। কিংবদন্তি ঝুলন গোস্বামীর শুরুটাও একইভাবে হয়েছিল চাকদায়। কারণ মাঠের দখল ছেলেদের হাতে। খেলোয়াড় জীবন তৈরি করতে হলে এ-দেশে আগে ছেলেদের সমকক্ষ হতে হয়, তাদের হারিয়ে দেখাতে হয়। ঠিক যেমন দঙ্গল (২০১৬) ছবিতে আমরা দেখেছিলাম— মহাবীর সিং ফোগতকে মেয়েদের এমনভাবে তৈরি করতে হয়েছিল যাতে তারা কুস্তিতে ছেলেদের হারাতে পারে। অস্ট্রেলিয়া, ইংল্যান্ডের মতো দেশের মেয়েদের পেশাদার খেলোয়াড় হতে হলে এমন অসম লড়াই দিয়ে শুরু করতে হয় না। ফলে রবিবারের জয় এ-দেশের নারীবাদীদের দায়িত্ব বাড়িয়ে দিল। রাতদখলের মতো মাঠদখলের আন্দোলনও তাঁদের করতে হবে। প্রাক্তন বোর্ড সভাপতি এন শ্রীনিবাসনের সোশাল মিডিয়ায় ভাইরাল পুরনো মন্তব্য থেকে নিশ্চয়ই সকলে জেনে গেছেন ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড যাঁরা চালান, তাঁরা মেয়েদের ক্রিকেটকে কী নজরে দেখেন। বর্তমান বোর্ডকর্তারাও খুব অন্যরকম ভাবেন এমন মনে করার কারণ নেই। ফাইনালের দিন মাঠে সপরিবার জয় শাহের উপস্থিতি দেখে ঠকবেন না।

প্রথমত, ভারতের জয়ে প্রকাশ্যে উল্লাস করা তাঁর বর্তমান পদের সঙ্গে মোটেই মানানসই নয়। কারণ তিনি এখন আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিলের চেয়ারম্যান, ভারতের বোর্ডের কেউ নন, যদিও বকলমে তিনিই সর্বেসর্বা। খেলাটার প্রতি গভীরে প্রোথিত অশ্রদ্ধা না থাকলে এবং নিজের পদমর্যাদা বুঝতে সম্পূর্ণ অক্ষম না হলে ওই পদের লোক অমন আচরণ করে না। অতীতে যে ভারতীয়রা আইসিসির সর্বোচ্চ পদ অলঙ্কৃত করেছেন (যেমন জগমোহন ডালমিয়া, শরদ পাওয়ার, শশাঙ্ক মনোহর) তাঁরা এই আদেখলেপনা করতেন না। দ্বিতীয়ত, জয়ের অনুগত ভারতীয় ক্রিকেট সাংবাদিকরা এখন কদিন বিস্তর প্রোপাগান্ডা চালাবেন, জয় মেয়েদের ক্রিকেটের জন্যে কত কিছু করেছেন তার ফিরিস্তি দিয়ে। ওতেও ভুলবেন না। তথ্যের আড়ালে লুকিয়ে ফেলা তথ্য জানতে এইটা পড়ে নিতে পারেন।

সত্যিই যদি বোর্ডের মেয়েদের ক্রিকেটের প্রতি দরদ থাকত, তাহলে টুর্নামেন্টের সেরা ক্রিকেটার দীপ্তি শর্মাকে মুখ ফুটে বলতে হত না— আরও বেশি ম্যাচ খেলার ব্যবস্থা হলে ভালো হয়। মনে রাখবেন, কিংবদন্তি ঝুলন গোস্বামী দুই দশকের আন্তর্জাতিক ক্রিকেটজীবনে খেলতে পেরেছিলেন মাত্র এক ডজন টেস্ট আর ২০৪ খানা একদিনের ম্যাচ। অথচ ভারতের হয়ে বছর বারো খেলেই ৯২ খানা টেস্ট আর ২০০ একদিনের ম্যাচ খেলেছিলেন জাহির খান। বিরাট কোহলি ১৩-১৪ বছরের আন্তর্জাতিক ক্রিকেট জীবনেই ১২৩ খানা টেস্ট আর তিনশোর বেশি একদিনের ম্যাচ খেলে ফেলেছেন। আজকের বিশ্বজয়ী দলের সহ-অধিনায়িকা স্মৃতি ২০১৩ সালে অভিষেকের পর থেকে খেলেছেন ১১৭ খানা একদিনের ম্যাচ আর ২০১৪ সালে টেস্ট অভিষেকের পর মাত্র সাতখানা টেস্ট। ওদিকে একই সময়ে অভিষেক হওয়া মহম্মদ শামি খেলে ফেলেছেন ৬৪ খানা টেস্ট আর ১০৮ খানা একদিনের ম্যাচ। ইচ্ছাকৃতভাবে মেয়েদের বিশ্বকাপকে যথেষ্ট গুরুত্ব না দিয়ে ছোট ছোট শহরে ম্যাচ দেওয়া, মুম্বাইয়ের তিনটে ক্রিকেট স্টেডিয়ামের মধ্যে সবচেয়ে ঐতিহ্যহীন এবং শহরের প্রান্তে থাকা স্টেডিয়ামকে সেমিফাইনাল ও ফাইনালের জন্যে বেছে নেওয়া আর বিশ্বকাপসুলভ প্রচারের ব্যবস্থা না করা তো আছেই। বোঝাই যায়, অ্যালিসা হিলির অস্ট্রেলিয়া, ন্যাট শিভার-ব্রান্টের ইংল্যান্ড বা লরা উলভার্টের দক্ষিণ আফ্রিকা খেলছিল প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে। হরমনপ্রীতের ভারত খেলছিল প্রতিপক্ষ এবং নিজেদের বোর্ডের বিরুদ্ধে। এখন দলকে এককালীন ৫১ কোটি টাকা পুরস্কার দিয়ে নারীদরদি সাজবে বোর্ড।

আরও পড়ুন আলতো ফ্লিক: ক্রিকেট নিয়ে ব্যতিক্রমী বই

অবশ্য কেবল বোর্ডই যে হরমনপ্রীতদের বিরুদ্ধে ছিল তা নয়। মেয়েদের দল এত বছরে যতবার হেরেছে, ততবার মেয়েদের দ্বারা যে ক্রিকেট হয় না, মেয়েদের দলের পিছনে টাকা খরচ করা যে অপচয়— সে-কথা আজ উদ্বাহু নৃত্য করা সাধারণ দর্শকরা তো বটেই, ক্রীড়া সাংবাদিকরাও বলে গেছেন সোশাল মিডিয়ায়। খবরের কাগজে বা টিভি চ্যানেলে যৎসামান্য জায়গা বরাদ্দ হয়েছে মেয়েদের ক্রিকেটের জন্য। এ-কথা ঠিকই যে খেলায় সাফল্য না এলে সাধারণ মানুষের আগ্রহ বাড়ে না, সংবাদমাধ্যমেও বেশি জায়গা দেওয়ার কোনও যুক্তি নেই। এখন চূড়ান্ত সাফল্য এসেছে, স্বভাবতই সব মহলের আগ্রহ বাড়বে। কিন্তু মেয়েদের দলের সাফল্যের চেয়ে ব্যর্থতাকে বড় করে দেখানোর যে প্রবণতা এতদিন দেখা গেছে, তার ব্যাখ্যা নারীবিদ্বেষ ছাড়া অন্য কিছু দিয়ে হয় না। ভারতের মেয়েরা এর আগেও দু-দুবার একদিনের ক্রিকেটের বিশ্বকাপ ফাইনালে পৌঁছেছিল। দুবারই হেরে যাওয়া মাত্রই লেখালিখি হয়েছে— এদের দিয়ে কিস্যু হবে না। এদের জন্যে এত করা হয়, তবু…। কত যে করা হয় তার সংক্ষিপ্ত বিবরণ উপরেই দিয়েছি। এদিকে ছেলেদের দল পৃথিবীর সবচেয়ে ধনী ক্রিকেট বোর্ডের বিরাট মুনাফার যাবতীয় সুবিধা পেয়ে থাকে। অথচ গত ১২ বছরে অসংখ্য সুযোগেও বিশ্বখেতাব মাত্র একটা, তাও কুড়ি-বিশের ক্রিকেটে। বরং গত দুবছরে একদিনের ম্যাচ আর টেস্ট ক্রিকেটে হারের সংখ্যা ক্রমশ বাড়ছে। কিন্তু ওই দলের ন্যূনতম সাফল্যকেও বিরাট করে দেখাতে উঠে পড়ে লাগে বোর্ড আর তার গোদি মিডিয়া। হারা সিরিজের গুরুত্বহীন ম্যাচে রোহিত শর্মা বা বিরাট শতরান করলে সেই ইনিংসকেই কাব্যিক করে তুলতে ঝাঁপিয়ে পড়েন প্রাক্তন ক্রিকেটার, সাংবাদিক আর সোশাল মিডিয়া ইনফ্লুয়েন্সাররা। অথচ ভেবে দেখুন, কতবার আপনি পড়েছেন যে, বর্তমানে মেয়েদের ক্রিকেটে বিশ্বের অন্যতম সেরা ব্যাটার হলেন স্মৃতি, আর সবচেয়ে ধারাবাহিক অলরাউন্ডারদের একজন দীপ্তি?

যা-ই হোক, হয়তো আমি পুরুষ বলেই এসব নিয়ে ভাবছি। স্মৃতি, দীপ্তি, রিচারা যেভাবে বেড়ে উঠেছেন তাতে ওঁরা জানেন যে এরকমই হওয়ার কথা ছিল, এরকমই হবে। কদিন পরেই যদি তাঁদের কারও উপরে মেয়ে বলে কোনও আক্রমণ চলে (যেমনটা বিশ্বকাপ চলাকালীন দুই অস্ট্রেলিয়া ক্রিকেটারের উপরে চলেছে), তখন আজ মাথায় তুলে নাচা ‘পাবলিক’ এবং ‘মিডিয়া’ পাশে দাঁড়াবে না। নিজের সম্মান বজায় রাখতে না পারার দোষ নিজের— এই জাতীয় কিছু বলে দেবেন কৈলাস বিজয়বর্গীয়ের মতো কোনও নেতা। বিশ্বকাপটা যে মধ্যরাতে জেতা হয়েছিল, সে-কথা ভুলে গিয়ে কোনও মহিলা মুখ্যমন্ত্রী বলে দিতে পারেন— অত রাতে বাইরে যাওয়া উচিত হয়নি। সাংবাদিকরা গসিপের খোঁজ করবেন, কেউ হয়তো লিখে দেবেন— বিশ্বকাপ জিতে ধরা কে সরা জ্ঞান করতে শুরু করেছিল এরা। তাই এই ঘটনা ঘটেছে। এরা মহা খেলোয়াড় মেয়ে।

সে যা-ই হোক, হরমনদের দৌলতে অনেকদিন পরে আস্ত একখানা প্রতিযোগিতা দেখা গেল, যেখানে প্রতিপক্ষকে আউট করে মুখের সামনে গিয়ে অসভ্যের মতো চিৎকার করলেন না ভারতীয় ক্রিকেটাররা। আউট হলে অসন্তোষ প্রকাশ করলেন না, আম্পায়ারদের সিদ্ধান্ত নিয়ে আক্রমণাত্মক বিবৃতি দিলেন না পৃথিবীর সবচেয়ে পয়সাওয়ালা বোর্ডের খেলোয়াড় হওয়ার রেলায়। নীল জার্সির গা বেয়ে উপচে পড়ল না উগ্র জাতীয়তাবাদ, গ্যালারির হিংস্র চেহারাও দেখা গেল না।

খেলোয়াড় মেয়েদের জয় হোক।

চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম ওয়েবসাইটে প্রকাশিত

অ্যাংকর-বাক্যই এ-যুগের বেদবাক্য

 একদিন রাতে আমি স্বপ্ন দেখিনু—
“চেয়ে দেখো” “চেয়ে দেখো” বলে যেন বিনু।
চেয়ে দেখি, ঠোকাঠুকি বরগা-কড়িতে,
কলিকাতা চলিয়াছে নড়িতে নড়িতে।
ইঁটে-গড়া গণ্ডার বাড়িগুলো সোজা
চলিয়াছে, দুদ্দাড় জানালা দরোজা।
রাস্তা চলেছে যত অজগর সাপ,
পিঠে তার ট্রামগাড়ি পড়ে ধুপধাপ্।

আমি মনে মনে ভাবি, চিন্তা তো নাই,
কলিকাতা যাক নাকো সোজা বোম্বাই।
দিল্লী লাহোরে যাক, যাক না আগরা—
মাথায় পাগড়ি দেব পায়েতে নাগরা।

সহজ পাঠ দ্বিতীয় ভাগ প্রকাশিত হওয়ার সময়ে ভাগ্যিস স্মার্টফোন, সোশাল মিডিয়া, দিনরাতের টিভি চ্যানেল, আর তাদের চিল্লানোসরাস অ্যাংকর— এসব কিছুই ছিল না। নইলে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যদি ফেসবুকে উপরের পংক্তিগুলো লিখে ফেলতেন, তাহলে কী কেলেঙ্কারিটাই না হত! নোবেল পুরস্কারজয়ী কবি বলে কথা। কয়েক মিনিটের মধ্যেই ভাইরাল হয়ে যেত এবং ভারতের বাংলা, ইংরেজি ও হিন্দি টিভি চ্যানেলগুলো ‘ব্রেকিং নিউজ’ হিসেবে দেখাত—

মাঝরাতে উধাও কলকাতা,
প্রত্যুত্তরে করাচি ভ্যানিশ করল ভারতীয় নৌসেনা।

কোনও চ্যানেলে হয়তো পর্দায় ভেসে উঠত—

‘কলকাতাকে রাতের অন্ধকারে লাহোরে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা পাকিস্তানের’,
‘ভারতীয় মিসাইলের আক্রমণে দিল্লিতেই অভিযান শেষ

রাতে কবিতাটি পোস্ট করে রবীন্দ্রনাথ যতক্ষণে সকালে ঘুম থেকে উঠতেন, ততক্ষণে দেখতেন কলকাতা যে কলকাতাতেই আছে, সে-কথা আর কেউ বিশ্বাস করছে না। এমনকি কলকাতা হারানোয় কেউ শোকপ্রকাশও করছে না। চারপাশে লাহোর, করাচি দখলের উল্লাস দেখতে দেখতে শান্তিনিকেতনে বসে তাঁরও হয়তো দুপুরের দিকে সন্দেহ হত— ‘কলকাতা সত্যি সত্যি কলকাতাতেই আছে তো?’ স্নেহভাজন কাজী নজরুল ইসলামকে হয়তো ফোন করতেন উদ্বিগ্ন হয়ে, তারপর তাঁর মুখ থেকে কলকাতা যথাস্থানে আছে শুনে হাঁফ ছেড়ে বাঁচতেন। ততক্ষণে তাঁর কাছে প্রতিক্রিয়া চেয়ে পৌঁছে যেত বিশিষ্ট নিউজ অ্যাংকরদের জুম কল। বিশ্বকবি প্রাণপণ চেষ্টা করতেন বোঝাতে যে ওটা তাঁর কল্পনা, কলকাতা যেখানে থাকার সেখানেই আছে। একচুলও নড়েনি, নড়া সম্ভবও নয়। একখানা আস্ত শহর যাবে কোথায়? কিন্তু বিশিষ্ট অ্যাংকররা এত সহজে ছেড়ে দেওয়ার পাত্র নন। রবীন্দ্রনাথের কাছে কলকাতা অবিচল থাকার প্রমাণ চাওয়া হত নিশ্চয়ই। তিনি হয়তো বলতেন, একটু আগে নজরুলের সঙ্গে কথা হয়েছে, তিনি জানিয়েছেন যে দুশ্চিন্তার কোনও কারণ ঘটেনি। বলামাত্রই ঝাঁপিয়ে পড়তেন জাতীয়তাবাদী অ্যাংকর, ‘আর কতদিন কুসুম কুসুম কবিদের কথায় ভুলে নিজের অস্তিত্ব যে বিপন্ন সেটা গোপন করবেন? এসব সেকুলারিজমের দিন শেষ। এত সেকুলার হওয়ার ইচ্ছে হলে পাকিস্তানে চলে যান।’ সালটা ১৯৩০, ফলে রবীন্দ্রনাথ হয়তো বেচারাথেরিয়ামের মতো মুখ করে ভাবতেন— সেটা আবার কোন দেশ রে বাবা!

হাসবেন না। ব্যাপারটা মোটেই হাস্যকর নয়। ১৯৭১ সালের পর ফের ভারত-পাকিস্তানের পূরোদস্তুর যুদ্ধ লাগার উপক্রম হয়েছিল এ-মাসের গোড়ায়। সেই বাজারে দেশের টিভি চ্যানেলগুলো যে কাণ্ড করেছে, তাতে পরিষ্কার বোঝা গেছে— যুদ্ধ করার উৎসাহ ভারতীয় সেনাবাহিনীর চেয়েও তাদের বেশি এবং সে অভিলাষ চরিতার্থ করতে তারা আক্ষরিক অর্থেই দিনকে রাত আর রাতকে দিন করতে প্রস্তুত।

আরও পড়ুন এবার মোদীর পথের চেয়েও কঠিন গোদি মিডিয়ার পথ

একদিন রাতে ভিডিও গেমের দৃশ্য, লস এঞ্জেলসে বিমান ভেঙে পড়ার দৃশ্য, ইজরায়েলের চার বছরের পুরনো ভিডিও ইত্যাদি দেখিয়ে ভারতীয় টিভি চ্যানেলগুলো প্রায় গোটা পাকিস্তানই ভারতের দখলে চলে এসেছে বলে জানিয়েছিল। পরদিন কিছু চ্যানেল ভালমানুষ সেজে ভুয়ো খবর ছড়ানোর বিরুদ্ধে বাণী দিয়েছিল বটে, কিন্তু এমন চ্যানেলও আছে যারা ওসবেরও তোয়াক্কা করেনি। করতে যাবেই বা কেন? কেন্দ্রীয় শাসক দলই তো নিজেদের সোশাল মিডিয়া হ্যান্ডেল থেকে পোস্ট করে জানিয়েছে, পাকিস্তানের সঙ্গে লড়াই করতে গেলে দেশের সরকার বা সেনাবাহিনীকে নিয়ে তো বটেই, মিডিয়ার এসব কীর্তি নিয়েও হাসাহাসি করা চলবে না। কারণ অনেক খবরের মধ্যে দু-চারটে ভুল খবর দেখিয়ে দিলে এমন কিছু দোষ হয় না, কিন্তু ভুল খবরকে ভুল খবর বললে দেশের মনোবল নষ্ট হয়। যুদ্ধ মানে হল ‘ন্যারেটিভ ওয়ার’। ভুয়ো খবর চিহ্নিত করা মানে সেই যুদ্ধে নিজের দেশকে হারিয়ে দেওয়া।

ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের ছড়ানো ভুয়ো খবরের পক্ষে দাঁড়িয়ে বুক চিতিয়ে লড়ে যাওয়া এই ভিডিওতে ভাষণ দিয়েছেন কে? টাইমস নাও নবভারতের কনসাল্টিং এডিটর সুশান্ত সিনহা। বুঝতেই পারছেন, তিনি কত বড় সাংবাদিক। অতএব, মোটেই হাসাহাসি করবেন না। নইলে কখনও দেখবেন, সরকারের সমালোচনা করার জন্য নয়, মোদিজি বা শাহজিকে নিয়ে রসিকতা করার জন্যও নয়, মিডিয়াকে নিয়ে হাসাহাসি করার জন্য অশোকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক আলি খান মাহমুদাবাদের মতো আপনিও গ্রেপ্তার হয়ে যাবেন।

অ্যাঁ, কী বললেন? উনি মুসলমান না হলে ওই পোস্টের জন্য গ্রেপ্তার হতেন না? আজ্ঞে, ঠিক ধরেছেন। কথাটা উমর খালিদের বেলায় সত্যি, গুলফিশা ফতিমার ক্ষেত্রে সত্যি, যে রিপোর্ট লেখাই হয়নি তার জন্য গ্রেপ্তার হওয়া সাংবাদিক সিদ্দিক কাপ্পানের ক্ষেত্রেও সত্যি, আরও অনেকের ক্ষেত্রেই সত্যি।

কিন্তু মাথায় রাখবেন, গুজরাতের ৯২ বছরের পুরনো জনপ্রিয় সংবাদপত্র ‘গুজরাত সমাচার’-এর দুই মালিকের অন্যতম, ৭৩ বছর বয়সী বাহুবলী শাহকে এ সপ্তাহেই গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তিনি মুসলমান নন। তাঁকে গ্রেপ্তার করেছে এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট, তবে কী অভিযোগে তা এখনও বলা হয়নি। তবে কাগজটির সরকারবিরোধী হিসেবে নাম বা বদনাম আছে। তাছাড়া, এ-ও মনে রাখবেন— ইদানীং উত্তরপ্রদেশের নেহা সিং রাঠোর, মাদ্রী কাকোটির মতো হিন্দু মহিলাদের বিরুদ্ধেও হাসিঠাট্টার জন্য এফআইআর দায়ের করা হচ্ছে।

সুতরাং, মোটেই হাসাহাসি করবেন না আমাদের লড়াকু টিভি চ্যানেল আর তাদের মহামহিম অ্যাংকরদের নিয়ে। এঁদের হাত কত লম্বা, জানেন তো? মৃত লোকও এঁদের আওতার বাইরে নন। কাশ্মিরের পুঞ্চে সীমান্তের ওপার থেকে আসা গোলায় নিহত মৌলানা মহম্মদ ইকবালকে এই মহান সাংবাদিকরা সন্ত্রাসবাদী বলে দেগে দিয়েছিলেন। অর্থাৎ, পুঞ্চ পুলিশের চেয়েও এঁরা বেশি জানেন। ভারতীয় সেনাবাহিনীর চেয়ে তো বটেই। পাকিস্তানের কিরানা হিলসে পরমাণু বোমার কেন্দ্রেও নাকি ভারতের বিমান বোম ফেলেছে বলে তাঁরা জানিয়েছিলেন। এদিকে সরকারি ব্রিফিংয়ে তা নিয়ে প্রশ্ন করা হলে, এয়ার মার্শাল একে ভারতী প্রশ্নকর্তা সাংবাদিককে বলেন, ‘আপনাকে ধন্যবাদ ওখানে পাকিস্তানের পরমাণু বোমা আছে এ-কথা আমাদের জানানোর জন্যে। আমরা কখনও বলিনি যে আমরা কিরানা হিলসে বোম ফেলেছি।

তাহলে বুঝলেন তো, সাংবাদিকদের চটালে মরেও শান্তি পাবেন না, মরার পরেও সন্ত্রাসবাদী হয়ে যেতে পারেন! বিশ্বকবিই যখন বলে গেছেন, ‘সেই সত্য যা রচিবে তুমি’, তখন নিউজ চ্যানেল আর তাদের জাতীয়তাবাদী অ্যাংকরদের নিয়ে খবরদার হাসাহাসি করবেন না। ভুয়ো খবর বলে যে কিছু হয়, তা ভুলে যান।

চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম ওয়েবসাইটে প্রকাশিত

সাংবাদিকদের অকালমৃত্যু যা যা শেখায়

আমার দ্বিতীয় চাকরিতে যিনি আমার বস ছিলেন, তিনি এক বিরল প্রজাতির ভদ্রলোক। একটুর জন্যে সতীশ হতে হতে বেঁচে গিয়েছিলেন।

লোকসভা নির্বাচনের বাজারে একটা মৃত্যু প্রায় সকলের নজর এড়িয়ে গেছে, কারণ বাংলা সংবাদমাধ্যমে তা নিয়ে এক লাইনও লেখা হয়নি। মূলধারার সংবাদমাধ্যমে অবশ্য সেই মৃত্যু নিয়ে লেখালিখি হওয়ার সম্ভাবনাও ছিল না। নিজের অপরাধ সকলেই ধামাচাপা দেয়। মূলধারার বাইরে আছি বলেই আমার লেখার সুযোগ ছিল। কিন্তু নির্বাচন সংক্রান্ত লেখালিখিতে মেতে গিয়ে আমিও সেই বর্ষীয়ান সাংবাদিকের মৃত্যুকে অগ্রাহ্য করার দোষে দুষ্ট হয়েছি। এই লেখা বস্তুত পাপস্খালনের চেষ্টা।

ভদ্রলোকের নাম সতীশ নন্দগাঁওকর। তিনি সর্বভারতীয় এবং স্বনামধন্য খবরের কাগজ হিন্দুস্তান টাইমস-এর মুম্বাই সংস্করণের মুম্বাই-থানে ব্যুরোর প্রধান ছিলেন। যাঁরা খবরের কাগজের কার্যপদ্ধতি সম্পর্কে ওয়াকিবহাল, তাঁরা জানেন যে পদটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই ধরনের পদগুলোতে সাধারণত থাকেন অত্যন্ত অভিজ্ঞ রিপোর্টাররা। তাঁদের অধীনে কাজ করেন অন্যরা। এই ব্যুরো প্রধানদের কাজের সময় বলে কিছু থাকে না, থাকা সম্ভব নয়। হয়ত অফিস থেকে বাড়ি চলে গেলেন রাত নটায়, কিন্তু দুটোর সময়ে ফোন আসতে পারে যে অমুক জায়গায় তমুক ঘটনা ঘটেছে। তখন নিজে না গেলেও, তাঁরই দায়িত্ব অন্য কোনো রিপোর্টারকে জানিয়ে খবরটা যেন পরদিন কাগজে বেরোয় তা নিশ্চিত করা। অফিসে নাইট ডিউটিতে থাকেন যে রিপোর্টার, তিনিও কোনো সিদ্ধান্ত নিতে অপারগ হলে যত রাতই হোক ব্যুরো প্রধানকে ঘুম থেকে তোলেন। এটাই দস্তুর। আবার কোনো খবর হাতছাড়া হয়ে গেলে, বা ভুল খবর বেরিয়ে গেলে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে জবাবদিহির দায়িত্বও প্রথমে ব্যুরো প্রধানের। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে অত বড় কাগজের ব্যুরো প্রধানরা নিজেরাও নামকরা সাংবাদিক হন। ফলে কাগজের উপর রাজনৈতিক/অরাজনৈতিক যেসব চাপ আসে বাইরে থেকে, তার অনেকটাও তাঁদেরই সামলাতে হয়। তার উপর রিপোর্টাররা অনেক ক্ষেত্রে অপাঠ্য, দুর্বোধ্য কপি লেখেন। সেই কপিকে বোধ্য করে তুলে তবে সম্পাদনার ডেস্কে পাঠানোও ব্যুরো প্রধানের দায়িত্ব।

এইরকম প্রচণ্ড চাপের একটা কাজ করতেন সতীশ। সঙ্গে আরও বেশকিছু অতিরিক্ত কাজ তাঁকে করতে হত। তিনি গত ২৮ ফেব্রুয়ারি মুম্বাইয়ে অফিসের কাছেই এক ওষুধের দোকানে ব্যথার ওষুধ কিনতে গিয়ে হৃদরোগে আক্রান্ত হন। নিকটবর্তী হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে চিকিৎসকরা বলেন সতীশ মারা গেছেন। এমন মৃত্যু নেহাত বিরল নয়। আমার আপনার অনেক পরিচিতই এরকম হঠাৎ হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান আজকাল। তাহলে সতীশকে নিয়ে লিখছি কেন? কারণ তাঁর মৃত্যুর পর কিছু অভূতপূর্ব ঘটনা ঘটেছে।

গত ১৩ মার্চ মুম্বাই প্রেস ক্লাবে সতীশের স্মরণসভায় তাঁর স্ত্রী অঞ্জলি অম্বেকর বলেন, ‘সাংবাদিক না হলে সতীশ একটা সুন্দর জীবন কাটাতে পারত।’ কথাটা নেহাত একজন অকালমৃতের স্ত্রীর বিলাপ বলে উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। কারণ তিনি হিন্দুস্তান টাইমসের মুম্বাই সংস্করণের রেসিডেন্ট এডিটর মীনা বাঘেলের বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন এডিটর্স গিল্ড অফ ইন্ডিয়া, প্রেস কাউন্সিল এবং মুম্বাই প্রেস ক্লাবে। তাঁর অভিযোগ, মীনা অনবরত অন্য সাংবাদিকদের সামনে সতীশকে অপমান করতেন, যা তাঁর মত সংবেদনশীল মানুষকে প্রবল আঘাত করত। মারা যাওয়ার খানিকক্ষণ আগে, শীতাতপনিয়ন্ত্রিত ঘরে বসে কুলকুল করে ঘামতে ঘামতে সতীশ বলেছিলেন যে তিনি পরদিনই পদত্যাগ করবেন। কারণ সেদিনও খানিক আগেই মীনা একই আচরণ করেছিলেন এবং এই আচরণ দীর্ঘদিন ধরে চলছিল। অঞ্জলির অভিযোগের ভিত্তিতে মুম্বাই প্রেস ক্লাব প্রাথমিক তদন্ত চালিয়ে রিপোর্ট তৈরি করেছে। তাতে বলা হয়েছে, যদিও সতীশের মৃত্যু আর মীনার ব্যবহারের মধ্যে কোনো সরাসরি সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করা যায়নি, তবু একথা সত্যি যে মীনা তাঁকে প্রচণ্ড মানসিক চাপে রাখতেন এবং নিয়মিত অপমান করতেন। এসব ‘কার্ডিয়াক এপিসোড’-এর কারণ হয়ে থাকতেই পারে।

এডিটর্স গিল্ডও এক বিবৃতিতে হিন্দুস্তান টাইমস কর্তৃপক্ষকে এই মৃত্যুর যথাযথ ও স্বচ্ছ তদন্ত করতে অনুরোধ করেছে। এর বেশি কিছু করার ক্ষমতা প্রেস ক্লাব বা গিল্ডের আইনত নেই, কারণ এগুলো সাংবাদিকদের সংগঠন মাত্র। ট্রেড ইউনিয়ন পর্যন্ত নয়। সত্যি কথা বলতে, ভারতের কর্পোরেট সংবাদমাধ্যমে বছর তিরিশেক হল সাংবাদিকদের ট্রেড ইউনিয়ন করা বন্ধ হয়ে গেছে। নয়ের দশকে উদারীকরণের সময়ে সংবাদমাধ্যমগুলো কর্মচারীদের চাকরিগুলোকে চুক্তিভিত্তিক করে ফেলার চেষ্টা শুরু করে। সংবাদমাধ্যমে যাঁরা শ্রমজীবী, অর্থাৎ ছাপার মেশিন চালানোর কাজ করেন বা অফিসগুলোতে পিওনের কাজ ইত্যাদি করতেন, তাঁদের মধ্যে এর বিরুদ্ধে কিছুটা প্রতিরোধ তৈরি হয়েছিল। তাই তাঁদের চুক্তিভিত্তিক কর্মচারী করে ফেলা সহজ হয়নি, অনেকে পুরনো ওয়েজ বোর্ডের অধীনেই রয়ে গিয়েছিলেন। তাঁদের যখন তখন তাড়ানো যায় না; যেমন ইচ্ছে ইনক্রিমেন্ট না দেওয়া বা মাইনে কমিয়ে দেওয়াও যায় না। অর্থাৎ নানা ঝামেলা পোয়াতে হয় মালিককে। অত টাকা দিতে পারব না, ব্যবসার অবস্থা ভাল না – এসব ওজর নিয়ে কোটিপতি কাগজগুলোর মালিকরা বিভিন্ন সময়ে আদালতে পর্যন্ত গেছেন ওই ধরনের কর্মচারীদের বিরুদ্ধে। কর্মচারীরাও গেছেন। অধিকাংশ ক্ষেত্রে কর্মচারীদেরই জয় হয়েছে।

কিন্তু যাঁরা নিজেদের বুদ্ধিজীবী মনে করেন, সেই সাংবাদিকরা, পাকা চাকরি থেকে চুক্তিভিত্তিক চাকরিতে চলে যেতে বিশেষ আপত্তি করেননি। কারণ তাঁদের সামনে মহার্ঘ প্যাকেজের গাজর ঝোলানো হয়েছিল। ফলে সাংবাদিকদের মধ্যে থেকে ইউনিয়ন তুলে দিতে মালিকদের বিশেষ কসরত করতে হয়নি। কিন্তু কেবল শ্রমজীবীদের মধ্যে ইউনিয়ন থাকতে থাকতে ক্রমশ দুর্বল হয়ে পড়ে; মালিকরা যে দুর্বল করে দিতে সক্রিয় ছিল তা বলাই বাহুল্য। যত পুরনো কর্মী অবসর নিয়েছেন, তত চুক্তিভিত্তিক কর্মী বেড়েছে, ইউনিয়ন ততই সাইন বোর্ডে পরিণত হয়েছে। সেই ৩০-৩৫ বছর আগে শুরু হওয়া প্রক্রিয়ার ফল এই, যে আজ সতীশরা কারণে-অকারণে গালমন্দ সহ্য করে কাজ করতে বাধ্য হন। পরিণামে জীবনটা পর্যন্ত চলে যায় অনেক সময়।

শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত হিন্দুস্তান টাইমস সতীশের বস মীনার বিরুদ্ধে কোনো তদন্ত করছে না। করলেও সতীশের মৃত্যুতে তাঁকে দায়ী করার মত কোনো প্রমাণ যে পাওয়া যাবে না তা বলাই বাহুল্য। আত্মহত্যায় প্ররোচনার অভিযোগই আদালতে প্রমাণ করা যথেষ্ট দুরূহ, আর এ তো ডাক্তারি পরিভাষায় স্বাভাবিক মৃত্যু। কিন্তু গত কয়েক বছরে সাংবাদিকদের মধ্যে ৫০-৬০ বছর বয়সে মৃত্যু কীভাবে বেড়েছে তার যদি কোনো সমীক্ষা করা যায়, তাহলে যে চোখ কপালে তোলার মত একটা সংখ্যা পাওয়া যাবে তা নিয়ে আমার কোনো সন্দেহ নেই। কেন সন্দেহ নেই?

কারণ যে পরিস্থিতিতে পড়ে সতীশের হৃদপিণ্ড কাজ বন্ধ করে দিয়েছে, তেমন পরিস্থিতিতে খবরের কাগজের দেড় দশকের কর্মজীবনে আমি নিজেও পড়েছি, অগ্রজ সহকর্মীদেরও পড়তে দেখেছি। হয়ত বয়স কম ছিল বলে আমার শরীর লড়ে গেছে। কিন্তু অগ্রজদের চল্লিশ না পেরোতেই নানারকম ছোট বড় রোগে আক্রান্ত হতে দেখেছি। সাংবাদিকদের মধ্যে ডায়বেটিস, হাইপার টেনশন, হৃদরোগ আজকাল জলভাত। আমার শেষ চাকরির এক অনুজ হঠাৎ একদিন রাতে সিলিং ফ্যান থেকে ঝুলে পড়েছিল। অন্য বিভাগের কর্মী হওয়ায় তার সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা ছিল না আমার। কিন্তু তার মৃত্যুর পরে তারই বিভাগের সাংবাদিকদের থেকে জেনেছিলাম, ওই ঝুলে পড়া মোটেই আকস্মিক নয়। তার কাজের সময় উদ্ভট হওয়ায় বৈবাহিক জীবনে অশান্তি চলছিল বেশ কিছুদিন ধরে। সে তার সুরাহা করার জন্যে বসের কাছে সামান্য পেশাদারি সাহায্য চেয়েছিল – কাজের সময়টা যদি অন্তত কিছুদিনের জন্য বদল করা যায়। তাকে প্রতিশ্রুতি দিয়েও সে বদল করা হয়নি। স্ত্রীর সঙ্গে অশান্তিও মেটেনি। ছেলেটি খুব বলিয়ে কইয়ে ছিল না। যাওয়ার সময়ে সুইসাইড নোট লেখার নাটকীয়তাটুকুও করেনি। এই মৃত্যুর দায়িত্ব কে নেবে? কেউ না। বেচারির তো অভিযোগ করারও কেউ ছিল না।

আমার দ্বিতীয় চাকরিতে যিনি আমার বস ছিলেন, তিনি এক বিরল প্রজাতির ভদ্রলোক। একটুর জন্যে সতীশ হতে হতে বেঁচে গিয়েছিলেন। আমি ওই কাগজের খেলার পাতায় যোগ দিয়েই শুনি, ক্রীড়া সম্পাদকের কয়েকদিন আগেই গুরুতর স্ট্রোক হয়েছে। তাই তিনি হাসপাতালে ভর্তি। মাস দেড়েক পরে যখন কাজে যোগ দিলেন, দেখলাম নিপাট ভালমানুষ এবং অফিসে অসম্ভব জনপ্রিয়। শুধু কাগজের সম্পাদক ভদ্রমহিলা, যিনি অত্যন্ত দক্ষ সহ-সম্পাদককেও ভরা নিউজরুমে হাঁটুর বয়সী ছেলেমেয়েদের সামনে অপদস্থ করতে ছাড়েন না, তিনিই আমাদের ক্রীড়া সম্পাদকের উপর খড়্গহস্ত। কোনো নির্দিষ্ট কারণ ছাড়াই। তাঁর সব কাজেই উনি ভুল ধরেন। মজার কথা, কাজ বলতে যা বোঝায় তা ওই ভদ্রমহিলাকে একদিনও করতে দেখিনি। আমি যে আট মাস ওই কাগজে ছিলাম, তার মধ্যে একদিনও সম্পাদক এক লাইন লেখেননি কাগজে। সম্পাদকীয় পর্যন্ত লিখতেন না। সারাদিন বসে বসে এর তার উপর চেঁচানো আর কয়েকটা পাতায় চোখ বোলানো ছাড়া তাঁর কাজ বলতে ছিল ম্যাড়মেড়ে ইংরিজিতে একে তাকে অপ্রয়োজনীয় ইমেল পাঠানো। কোনোদিন প্রথম পাতায় একটা শিরোনাম পর্যন্ত দিতে দেখিনি। অথচ তিনিই ওই কাগজের দণ্ডমুণ্ডের কর্তা। সদ্য মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে আসা আমার বসকে দেখতাম – সম্পাদকের চিৎকার শুরু হলেই হাত কাঁপছে। এর অনিবার্য ফল যা, একদিন ঠিক তাই ঘটল। সকালবেলা খবর পেলাম, আমাদের ক্রীড়া সম্পাদকের আবার হার্ট অ্যাটাক হয়েছে। তিনি ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিটে ভর্তি। আমি আর আমার এক সহকর্মী হাসপাতালে দেখতে গিয়ে ক্রীড়া সম্পাদকের স্ত্রীর মুখে যা শুনেছিলাম, তার সঙ্গে সতীশের স্ত্রীর বয়ানের শিউরে ওঠার মত মিল। সুখের কথা, তিনি কিছুদিন পরেই অবসর নেন। হয়ত সে কারণেই এখনো সুস্থ শরীরে জীবিত।

আরও পড়ুন টুইটার, বাইজু’স আঁধারে ছাঁটাই সম্পর্কে কয়েকটি কথা

এসব কথা লিখছি কেন? সব কর্পোরেট চাকুরেরই তো অল্পবিস্তর একইরকম অভিজ্ঞতা হয়। তাই তো আজকাল কাউকে জিজ্ঞেস করলে শোনা যায় না যে সে নিজের চাকরিতে সুখী। তাহলে সাংবাদিকরাই বা ব্যতিক্রম হবেন কেন? তাঁদের নিয়ে আলাদা করে লেখার কী আছে? সঙ্গত প্রশ্ন। আসলে ভারতের মূলধারার সাংবাদিকতা যে অতল খাদের মধ্যে পড়েছে গত এক দশকে, তাকে বুঝতে গেলে সাংবাদিকরা কোন অবস্থার মধ্যে কাজ করেন তা জানা দরকার। নইলে অন্ধের হস্তিদর্শন হয়।

শিক্ষকতার ব্যাপারে অনেকে বলে থাকেন, প্রচণ্ড মারধর করে সেইসব শিক্ষকরাই, যারা ভাল করে পড়াতে পারে না। সাংবাদিকতার ব্যাপারেও বললে ভুল হবে না যে অধস্তনদের উপর নিত্য চোটপাট চালানো, গালিগালাজ, অপমান করা অযোগ্য সাংবাদিকের লক্ষণ। ওই আচরণের পিছনে নিজের যোগ্যতার অভাবজনিত নিরাপত্তাহীনতার বড় ভূমিকা থাকে। বেশি যোগ্যতাসম্পন্ন কেউ তাকে অতিক্রম করে যাবে – এই উৎকণ্ঠা থেকে অধস্তনদের আত্মবিশ্বাস নষ্ট করে দেওয়ার প্রচেষ্টা থাকে। এর অজস্র উদাহরণ আছে। কিন্তু নাম করলে আইনি ঝামেলায় পড়তে হবে। কে না জানে, রাজনৈতিক নেতাদের পরেই সবচেয়ে লম্বা হাত বড় মিডিয়ার বড় সাংবাদিকদের? তাঁরা ক্ষমতাকে প্রশ্ন করতে না পারুন, কোটিপতি মালিকের মদতে এবং রাজনৈতিক ক্ষমতাবানদের সঙ্গে দহরমের সুবাদে ক্ষমতাহীনকে মাটিতে মিশিয়ে দিতে সিদ্ধহস্ত। দুঃখের বিষয়, নয়ের দশক থেকে মিডিয়ার দখল সম্পাদকদের হাত থেকে সরাসরি মালিকদের হাতে চলে যাওয়ায় এই ধরনের অযোগ্য অথচ বশংবদ সাংবাদিকদেরই তাঁরা উঁচু পদগুলোতে বসিয়েছেন। কারণ যোগ্য সাংবাদিক মালিককেও প্রশ্ন করবেন, মালিকের ব্যবসায়িক উদ্দেশ্য পালন করতে অস্বীকার করতেও পারেন। এরই ফলশ্রুতিতে সতীশের মত দশা হচ্ছে বহু সাংবাদিকের। তার চেয়েও বেশি সাংবাদিকের চাকরি যাচ্ছে করোনা অতিমারী বা কোম্পানির আর্থিক ক্ষতির অজুহাতে। ফলে মিডিয়া ভরে যাচ্ছে অশিক্ষিত, অর্ধশিক্ষিত সাংবাদিকে। তারাই হয়ে উঠছে সংবাদমাধ্যমগুলোর নীতি নির্ধারক। রবীশ কুমাররা সরে যাচ্ছেন ইউটিউবে, টিভি চ্যানেলে জাঁকিয়ে বসছেন অর্ণব গোস্বামীরা। নাম করা চ্যানেলে হোয়াটস্যাপে ফরোয়ার্ড হওয়া ভুয়ো খবর ঘটা করে প্রচারিত হচ্ছে। কোথাও সাম্প্রদায়িকতার বিষ ছড়াচ্ছেন অঞ্জনা ওম কাশ্যপ, কোথাও বিতর্ক আয়োজনের ভান করে এক পক্ষকে মৌপিয়া নন্দী ধমকাচ্ছেন ‘কে তুমি?’

এসবে তিতিবিরক্ত মানুষ ইদানীং ঝুঁকছেন বিকল্প সংবাদমাধ্যমের দিকে। তবে ভাবলে ভুল হবে যে এসব বালাই সেখানে একেবারেই নেই। তেমনটা হওয়া সম্ভবও নয়। কারণ বিকল্প সংবাদমাধ্যম আকাশ থেকে পড়েনি। যাঁরা এই মঞ্চগুলো গড়ে তুলেছেন বা তুলছেন, তাঁদের হাতেখড়ি হয়েছিল মূলধারাতেই। সকলেই যে আদর্শের কারণে অন্য পথে এসেছেন এমন নয়। অনেকে সেখানে যোগ্যতা প্রমাণ করতে না পেরেও বিকল্প পথে এসেছেন। তাঁরা হতে চান মূলধারার মহীরুহদের মতই। আসলে তাঁরাই এদের আদর্শ। অধস্তনদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার না করলে, যিনি টাকা জোগাচ্ছেন তাঁর পায়ে তৈলমর্দন না করলে, ক্ষমতাবানদের দাদা দিদি বানাতে না পারলে বড় সাংবাদিক হওয়া যায় না – এ ধারণা বিকল্প মাধ্যমের অনেকের মধ্যেও বদ্ধমূল। এই মনোভাবের ফল কাজে পড়তে বাধ্য। মূলধারার সংবাদমাধ্যমের কাজে পড়েছে, বিকল্প মাধ্যমেও অবশ্যই পড়বে। সত্যি কথা বলতে, এ দেশের বিকল্প সংবাদমাধ্যম এখনো বিকল্প ব্যবসায়িক মডেল হিসাবে সম্পূর্ণ বিকশিত হয়নি। অর্থাৎ মূলধারায় কাজ করে যতখানি রোজগার করা যায়, বিকল্পে এখনো যায় না। যশও এখনো মূলধারায় বেশি। বিকল্পে একই পরিমাণ যশলাভে পরিশ্রম অনেক বেশি। কোনোদিন ওগুলো মূলধারার সমান হয়ে গেলে বিকল্প মাধ্যমের সাংবাদিকদের আদর্শবাদের যথার্থ পরীক্ষা হবে। আমরা অনেকেই তো আসলে সুযোগের অভাবে চরিত্রবান।

ডুলুং পত্রিকার আষাঢ়-শ্রাবণ ১৪৩১ সংখ্যায় প্রকাশিত

এবার মোদীর পথের চেয়েও কঠিন গোদি মিডিয়ার পথ

লোকনীতি-সিএসডিএসের এক সমীক্ষার বিশ্লেষণ করতে গিয়ে যোগেন্দ্র যাদব ও তাঁর দুই সঙ্গী শ্রেয়স সরদেশাই, রাহুল শাস্ত্রী লিখেছেন যে গোদি মিডিয়া দিনরাত সরকারি প্রোপাগান্ডা না চালালে ২০২৪ নির্বাচন ২০০৪ সালের মতই হারতেন মোদী। সেই মিডিয়া কাল হঠাৎ পালটি খেলেই কি ক্ষমা করবেন ক্ষুব্ধ মানুষ?

শিং নেই তবু নাম তার সিংহ, ডিম নয় তবু অশ্বডিম্ব। তাহলে একটা নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের ও মতের প্রচার করা সংস্থাকে সংবাদমাধ্যম বলা যাবে না কেন? আলবাত যাবে। গণশক্তি অবশ্যই সংবাদমাধ্যম, জাগো বাংলা একই ধরনের আরেকটা সংবাদমাধ্যম। কিন্তু দুটোর কোনোটাই গোপন করে না যে তারা যথাক্রমে সিপিএম এবং তৃণমূল কংগ্রেসের মুখপত্র। ইদানীং গণশক্তির মালিকানায় কিছু পরিবর্তন আনা হয়েছে, ফলে কাগজটা আর সরাসরি পার্টির সম্পত্তি নয়। কিন্তু এখনও কাগজের সম্পাদক নির্ধারণ করে সিপিএমের রাজ্য কমিটি। সুতরাং এই ধরনের সংবাদমাধ্যমগুলোর পরিচয় নিয়ে কোনো সমস্যা নেই। সমস্যা অন্য আরেক ধরন নিয়ে। ভারতে গত এক দশকে এক ধরনের সংবাদমাধ্যম দেখা গেছে, যারা নিরপেক্ষ থাকার নাম করে চরিত্রহীন হয়ে গেছে। তাদের পরিচিতি আলাদা করতে রবীশ কুমার একখানা চমৎকার শব্দবন্ধ তৈরি করেছেন— গোদি মিডিয়া। অর্থাৎ মোদীর কোলে বসে থাকা মিডিয়া। সমস্যা তাদের নিয়ে। তাদের আর সংবাদমাধ্যম বলা চলে কিনা, তাদের সর্বশক্তিমান অ্যাঙ্করদের সাংবাদিক বলা চলে কিনা তা নিয়ে অনেকদিন ধরেই প্রশ্ন উঠছিল। ২০২৪ লোকসভা নির্বাচনে পরিষ্কার হয়ে গেল, এদের একটা বড় অংশ সীমানা পেরিয়ে এতদূর চলে গেছে যে আর ফিরে আসা অসম্ভব।

ইন্ডিয়া টুডে চ্যানেলের রাহুল কাঁওয়ালের কথাই ধরুন। ৪ জুন ভোটগণনা সবে আরম্ভ হয়েছে, পোস্টাল ব্যালট গোনা চলছে। তখনই রাহুল এক্সিট পোলের ফলের ভিত্তিতে বিরোধীদের বিরুদ্ধে এবং যাঁরা ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন সম্পর্কে প্রশ্ন তোলেন, তাঁদের বিরুদ্ধে বিষোদ্গার করতে শুরু করলেন। বললেন এই ধরনের লোকেরা ‘ডিলিউশনাল’। এরা কিছুতেই মানুষের রায় মেনে নেয় না, দশ বছর ধরে কিছুতেই মানতে রাজি নয় যে মোদী মানুষের মন জয় করেছেন। সকাল সকাল তাঁর অত চেঁচামেচির কারণ কী ছিল? তাঁর আশঙ্কা ছিল, ভোটের ফল বেরোবার পরেও সেই ধারা চলতেই থাকবে। কেন ছিল তা বোঝা শক্ত নয়। তিনি নিজের চ্যানেলের এবং অন্য সব চ্যানেলের বুথফেরত সমীক্ষাকেই ভোটের প্রকৃত ফল ধরে নিয়ে বসেছিলেন। কেন ধরলেন? একজন সাংবাদিকের তো বোঝার কথা এবং দর্শকদের বোঝানোর কথা, যে যে কোনো সমীক্ষাতেই ভুল থাকা সম্ভব। তার চেয়েও বড় কথা, মানুষ ভোট দিয়েছেন। তার গণনার ফলই নির্বাচনের ফল। বুথফেরত সমীক্ষাকে আসল ফল বলে ধরে নেওয়া ভোটারদের অপমান করাও বটে। রাহুল কম দিন সাংবাদিকতায় নেই। তাহলে এতগুলো ভুল করলেন কেন? আসলে সব সাংবাদিকই তো কোনো না কোনো দলের সমর্থক, কোনো না কোনো দলকে ভোট দেন। সেটা অন্যায়ও নয়। রাহুল অবশ্যই বিজেপি সমর্থক, তাই তিনি চাইছিলেন বিজেপি জিতুক। বুথফেরত সমীক্ষা সেটাই দেখিয়েছে বলে তাঁর বিশ্বাস হয়েছে। উত্তর-সত্যের যুগে তো বলাই হয়, সে তাই বিশ্বাস করে যা সে বিশ্বাস করতে চায়। কথা হল, সাংবাদিক হলে কিন্তু ব্যক্তিগত পছন্দটা প্রকাশ করা চলে না কাজ করার সময়ে। মতামত দেওয়ার জায়গা অবশ্যই আছে সাংবাদিকতায়। কিন্তু নির্বাচনের ফল নিয়ে উল্লাস করা বা দুঃখে শুয়ে পড়া তার মধ্যে পড়ে না। তার উপর নির্বাচন কমিশন এবারে যেভাবে ভোট পরিচালনা করেছে তাতে আপত্তি করার যথেষ্ট কারণ আছে। যে নির্বাচন কমিশন বহু দেরিতে ভোটদানের হার ঘোষণা করে বিরোধীদের চেঁচামেচির ফলে, তাতে দেখা যায় ভোটদান শতাংশের হিসাবে ভোট দেওয়ার দিনের চেয়ে ব্যাখ্যাহীনভাবে বেড়ে গেছে, তারপরেও ঠিক কত ভোট পড়েছে তা প্রকাশ করা হয় না— সেই কমিশনকে নিয়ে, তার পরিচালিত প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তো উঠবেই। বিজেপির রাজনৈতিক অ্যাজেন্ডা নিজের অ্যাজেন্ডা না হয়ে উঠলে কোনো সাংবাদিক এগুলো নিয়ে কেউ প্রশ্ন তুললে তাকে ‘ডিলিউশনাল’ বলতে পারেন না। বললে তিনি সাংবাদিক নন।

আবার ধরুন রজত শর্মা। ইন্ডিয়া টিভির সর্বেসর্বা এই সাংবাদিক গোদি মিডিয়ার অন্যতম বিখ্যাত মুখ। কথিত আছে যে মোদীর আমলে তাঁর সম্পত্তি নেতাদের থেকেও দ্রুত বেড়েছে। সেই রজত বিজেপির ফলাফলে এতই হতাশ যে একদিন লাইভ অনুষ্ঠানে কংগ্রেস মুখপাত্র রাগিণী নায়েককে রেগেমেগে খিস্তি দিয়ে বসলেন। কোনো সাংবাদিকের এত রাগ হয় না যে লাইভ অনুষ্ঠানে নেহাত স্বগতোক্তি হিসাবেও খিস্তি দিয়ে বসবেন। কিন্তু রজতের হল। স্পষ্টত সাংবাদিকতা আর তাঁর পেশা নেই। বিজেপির জয়-পরাজয়, বিজেপির আসন বাড়া-কমা রজতের সর্বস্ব হয়ে দাঁড়িয়েছে। এদের আর যা-ই হোক, সাংবাদিক বলা যায় না। এদের সংস্থাগুলোকেও সংবাদমাধ্যম বলা শক্ত।

ইন্ডিয়া টুডে গ্রুপের অরুণ পুরির মেয়ে কল্লি পুরি নির্বাচনের কিছুদিন আগেই ইন্ডিয়া টুডে কনক্লেভে বলেছিলেন ‘গণতন্ত্রে বিরোধী দলের ভূমিকা পালন করা মিডিয়ার কাজ নয়… গোদি মিডিয়া বা মোদী মিডিয়া বলে কোনো সংবাদমাধ্যমকে চিহ্নিত করা নেহাতই অন্যায়। দেশের বিরোধী পক্ষ যদি ছিন্নবিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়ে থাকে, তার জন্য মিডিয়াকে দায়ী করা যায় না। আমরা উল্টোদিকটাকে একইরকমভাবে দেখাব কী করে, যদি সেই পক্ষের অস্তিত্বই না থাকে? আমরা এই বক্সিং ম্যাচের দর্শক। খেলোয়াড় নই।’ দেশে বিজেপি ছাড়া এতগুলো দল থাকা সত্ত্বেও যখন কেউ বলে বিরোধী পক্ষের অস্তিত্বই নেই তখন সে যে আক্ষরিক ও প্রতীকী, দুই অর্থেই অন্ধ তা বলে দেওয়ার দরকার পড়ে না। এরকম অন্ধ মালিকের সংস্থাকে সংবাদমাধ্যম বলার কী যুক্তি থাকতে পারে?

উদাহরণের তালিকা লম্বা করার মানে হয় না। যে কোনো পাঠক আরও গোটা দশেক অ্যাঙ্কর আর চ্যানেলের নাম নিজেই বলে দিতে পারবেন, যারা সরাসরি ঘোষণা করে দিলেই পারত যে তারা বিজেপির প্রচারক। তাহলেই আর নিন্দা করার কোনো জায়গা থাকত না। কিন্তু ঘোষণা করে না, কারণ স্টক মার্কেটের দালালি ছাড়া আর কোনো দালালিই ঘোষণা করে করার জিনিস নয়। রিপাবলিক টিভি-র অর্ণব গোস্বামী অবশ্য ফল ঘোষণার দিন বারবার এনডিএর আসন বাড়লে উল্লাস করে বলছিলেন ‘আমরা…’। তবে উনি তো সর্বার্থে ব্যতিক্রম। সাধারণভাবে একটু রেখেঢেকে দালালি করতে হয়, নইলে অর্ধেক দর্শক/পাঠক হারাতে হয়। যেমন আনন্দবাজার পত্রিকা-র মালিক যত বড় পুঁজিবাদীই হোন না কেন, তিনি অবশ্যই চান তাঁর কাগজগুলো মার্কসবাদীরাও পড়ুক, তাঁর চ্যানেলগুলো মার্কসবাদীরাও দেখুক। ব্যবসায়ীর তো প্রধান লক্ষ্য মুনাফা করা, আর সব ধরনের দর্শক/পাঠক ধরতে না পারলে কমবে চ্যানেলের টিআরপি এবং কাগজের বিক্রি। তারই ভিত্তিতে আসে বিজ্ঞাপন, সেটাও কমে যাবে। বিজ্ঞাপন কমে গেলেই মুনাফাও কমে যাবে। তবে ভারতে বিজ্ঞাপনের একটা বড় অংশ হল সরকারি বিজ্ঞাপন। সেই বিজ্ঞাপনের জোরেই যে যেখানে ক্ষমতাসীন, সে সেখানকার সংবাদমাধ্যমকে নিয়ন্ত্রণ করে। বিজেপি এই খেলায় সবচেয়ে দড়। তাই তারা গোটা ভারত জুড়ে তৈরি করেছে গোদি মিডিয়া। উপরন্তু মুকেশ আম্বানি, গৌতম আদানি প্রায় সব সাবেকি মিডিয়া হাউসের আংশিক বা পূর্ণ দখল নিয়ে ফেলেছেন। ফলে সব ধরনের পাঠক/দর্শক ধরার তাগিদ গোদি মিডিয়ার নেই। তারা সোল্লাসে এক পক্ষের বয়ান প্রচার করে যাচ্ছে। কাল্লি পুরির বক্তৃতা বস্তুত সেকথা স্বীকার করা এবং সেটাকেই ন্যায়সঙ্গত বলে দেখানোর প্রয়াস।

আরও একটা কারণে নিরপেক্ষতার ভান করতে হয় ‘লেগ্যাসি মিডিয়া’-কে। ভারতে স্বাধীনতার পর থেকে ত্রুটিপূর্ণ হলেও সংসদীয় গণতন্ত্র বজায় আছে। নির্বাচনের পর নিয়মিত সরকার বদল হয়ে এসেছে শান্তিপূর্ণ উপায়েই। এমন একটা দেশে কোনো সংবাদমাধ্যম যদি নিজেকে সম্পূর্ণভাবে ক্ষমতাসীন দলের দূত হিসাবে প্রচার করে, তাহলে সরকার বদলে গেলে বিপদে পড়ার সম্ভাবনা আছে। পার্টি-মুখপত্রগুলোকে এমন বিপদে প্রায়শই পড়তে হয়। ত্রিপুরায় যেমন বিজেপি সরকার আসার পরে সিপিএমের মুখপত্র দেশের কথা বন্ধ করিয়ে দেওয়া হয়েছিল কিছুদিনের জন্য। পশ্চিমবঙ্গেও তৃণমূল সরকার গণশক্তিকে সরকারি বিজ্ঞাপন দেয় না। এমন ঝামেলায় কোন মূলধারার সংবাদমাধ্যম পড়তে চাইবে? তাই ধর্মেও আছি, জিরাফেও আছি পদ্ধতিতে চলে প্রায় সব সংবাদমাধ্যমই।

কিন্তু ২০১৪ সাল থেকে মিডিয়া হাউসগুলোর মালিক, সম্পাদকরা সেই কাণ্ডজ্ঞানটুকুও হারিয়েছেন। তাঁরা মোদীর যে অপরাজেয় ভাবমূর্তি তৈরি করেছেন তা নিজেরাই বিশ্বাস করতে শুরু করেছিলেন। ফলে সরকার বদলে গেলে কী হবে সে চিন্তা আর নেই। আবার এই কাণ্ডজ্ঞানহীনতাই তাঁদের মোদীর রাজনীতির ভাগীদার করে ফেলেছে। এখন মোদী হারলে তাঁদের সমূহ বিপদ। অতএব সর্বান্তকরণে মোদীকে জেতানোর চেষ্টা করতেই হয়। এবারের নির্বাচনের ফল সেই কারণেই কেবল বিজেপি বা আরএসএস নয়, গোদি মিডিয়ার জন্যেও ধাক্কা। মোদীর জনপ্রিয়তা যে নিম্নমুখী তা নির্বাচনের ফলই প্রমাণ করেছে। তার ফল গোদি মিডিয়ার উপর পড়া অনিবার্য, পড়তে শুরুও করেছে কয়েক বছর হল। সে কারণেই বিজেপিবিরোধীরা যেমন টিভির খবর দেখা ছেড়ে ধ্রুব রাঠি, রবীশ কুমার, পুণ্যপ্রসূন বাজপেয়ী, রাজীব রঞ্জনদের ইউটিউব চ্যানেল দেখতে শুরু করেছেন; তেমন বিজেপি সমর্থকদের মধ্যেও বিভিন্ন ইউটিউব চ্যানেল দেখার প্রবণতা বাড়ছে। উভয়পক্ষেই এই প্রবণতা আরও বাড়বে এবারের ন্যক্কারজনক বুথফেরত সমীক্ষার পরে।

আরও পড়ুন সরকারের কিছু দেশদ্রোহী দরকার, তাই নিউজক্লিক আক্রমণ

সংবাদমাধ্যমের আরও কিছু পরিবর্তনের লক্ষণ ইতিমধ্যেই দেখা গেছে। দেশের রাজনীতি কোন দিকে যায় তার উপর নির্ভর করবে এই লক্ষণগুলো অদূর ভবিষ্যতে আরও বড় হয়ে উঠবে কিনা। যেমন দিল্লির প্রেস ক্লাব অফ ইন্ডিয়া দেশের একাধিক সাংবাদিকদের সংগঠনের সঙ্গে মিলে সপ্তদশ লোকসভায় পাশ হওয়া নতুন টেলিকম আইন সম্পর্কে আপত্তি করার সাহস পেয়ে গেছে। এই আইনগুলো যে বাকস্বাধীনতার পরিপন্থী, বিশেষ করে বিকল্প সংবাদমাধ্যমের কণ্ঠরোধ করার উদ্দেশ্যে তৈরি, তা কিন্তু জানাই ছিল। অথচ এর আগে এমন সাহস এতগুলো সংগঠনের হয়নি। কাশ্মিরের বিভিন্ন সাংবাদিক বা নিউজক্লিক সম্পাদক প্রবীর পুরকায়স্থ গ্রেফতার হওয়ার সময়েও খুব বেশি সাংবাদিককে মুখ খুলতে দেখা যায়নি।

আজকাল গোদি মিডিয়ার কোনো কোনো অ্যাঙ্করও বেসুরো গাওয়ার সাহস পাচ্ছেন। ইন্ডিয়া টুডের রাজদীপ সরদেশাই বিজেপির চিৎকারসর্বস্ব মুখপাত্র সঞ্জু বর্মাকে সটান বলে দিচ্ছেন— এবার একটু গলা নামিয়ে কথা বলা শিখতে হবে। আপনাদের এখন আর ব্রুট মেজরিটি নেই। এবিপি নিউজের অ্যাঙ্করও বিজেপি নেতাকে লাইভ অনুষ্ঠানে ধমকে দিচ্ছেন। অষ্টাদশ লোকসভার প্রথম অধিবেশন শুরু হচ্ছে ২৪ জুন। নতুন প্রাণ পাওয়া বিরোধীরা যদি সরকারকে সংসদে কোণঠাসা করতে পারে, তাহলে মূলধারার সংবাদমাধ্যম নিজেদের সুর আরও বদলাতে বাধ্য হবে। মোদী সরকার যত দুর্বল হবে, তত ফাঁপরে পড়বে গোদি মিডিয়া। কারণ নিজেদের ভোল পাল্টে ফেলা শক্ত হবে। মানুষ বোকা নয়, মানুষ সবকিছু ভুলেও যায় না। একথা হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছেন মোদী। লোকনীতি-সিএসডিএসের এক সমীক্ষার বিশ্লেষণ করতে গিয়ে যোগেন্দ্র যাদব ও তাঁর দুই সঙ্গী শ্রেয়স সরদেশাই, রাহুল শাস্ত্রী লিখেছেন যে গোদি মিডিয়া দিনরাত সরকারি প্রোপাগান্ডা না চালালে ২০২৪ নির্বাচন ২০০৪ সালের মতই হারতেন মোদী। সেই মিডিয়া কাল হঠাৎ পালটি খেলেই কি ক্ষমা করবেন ক্ষুব্ধ মানুষ?

পুনশ্চ: ইন্ডিয়া জোটের নেতারা দাবি করছেন মোদী ৩.০ আসলে নড়বড়ে সরকার, যে কোনোদিন পড়ে যাবে। যদি তেমন হয় অথবা একেবারে ২০২৯ সালেই সরকার বদল হয়, তখন কিন্তু বিকল্প সংবাদমাধ্যমকেও পরীক্ষা দিতে হবে। কারণ শঠতা, কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের সঙ্গে গোপন আঁতাত, পেশাগত সুবিধাবাদ ও অযোগ্যতার দোষ যে বিকল্প সংবাদমাধ্যমে একেবারেই নেই— এমন বললে মিথ্যে বলা হবে। ফ্যাসিবাদবিরোধিতা আপাতত প্রাথমিক কর্তব্য। সেই সুযোগে অন্য অনেক ক্ষমতাবানের বিরুদ্ধে প্রশ্ন তোলার দায়িত্বও বিকল্প সংবাদমাধ্যম এখন এড়িয়ে যেতে পারছে। তখন কিন্তু আর তা করা চলবে না।

চার নম্বর প্ল্যাটফর্মে প্রকাশিত

নির্বাচনের ফলে হেরে গেছে দেশের অসাধু মিডিয়া

এই লেখা যখন লিখছি, ততক্ষণে প্রমাণ হয়ে গেছে যে মোদীর গ্যারান্টিতে খুব বেশি ভারতীয় নাগরিক বিশ্বাস করেননি। হিন্দুরাষ্ট্রের স্বপ্নেও খুব বেশি মানুষের গায়ে পুলক লেগে চোখে ঘোর ঘনায়নি। একাই তিনশোর বেশি এবং জোটে সাড়ে তিনশোর বেশি আসনের কৈলাস পর্বত থেকে ভোটাররা পরমাত্মা নরেন্দ্র মোদীকে টেনে নামিয়েছেন জোট রাজনীতির মাটিতে। তবে যেহেতু বিজেপি নেতৃত্বাধীন প্রাক-নির্বাচনী জোট ন্যাশনাল ডেমোক্র্যাটিক অ্যালায়েন্স (এনডিএ) ২৭২ আসনের বেশি পাচ্ছে, তাই হয়ত ফের মোদী তাঁর প্রিয় আসনে বসতে পারবেন। অবশ্য মোদী-অমিত শাহের ভয়ে যাঁরা এতদিন এনডিএতে ছিলেন, তাঁরা ভয় কমে যেতেই যদি কেটে পড়ার তাল করেন তাহলে অনেককিছু ঘটতে পারে। তা যদি না-ও ঘটে, বিজেপিই যে একক বৃহত্তম দল হয়েছে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। তাই একে তারা জয় বলে দাবি করতেই পারে, যতই তাদের তৈরি আলেখ্য স্পষ্টত প্রত্যাখ্যাত হয়ে থাক। কিন্তু এ লেখা ২০২৪ লোকসভা নির্বাচনে যারা হেরে ভূত হয়ে গেছে তাদের কথা বলার জন্যে। মূলধারার সংবাদমাধ্যম, বিশেষত জনপ্রিয় খবরের চ্যানেলগুলোর কথা বলছি।

২০১৪ সাল থেকে কারা গোদি মিডিয়া হয়ে গেছে তা আজ কাউকে নতুন করে বলে দেওয়ার দরকার নেই। যেসব সংবাদমাধ্যমকে সচরাচর ওই তালিকায় ফেলা হয় না, আজও নিরপেক্ষ বলেই মনে করেন বিজেপিবিরোধী দর্শকরা, তারাও গত এক-দেড় বছরে ভোল বদলেছে। গোদি মিডিয়ার হত্তাকত্তারা নিউজক্লিকের দিকে, অন্য বিকল্প সংবাদমাধ্যম ও সাংবাদিকদের দিকে সিবিআই, ইডিকে লেলিয়ে দিয়েছিলেন। তাঁদের নির্যাতনে উল্লসিত হয়ে নানা ষড়যন্ত্রের তত্ত্ব প্রচার করে আহ্লাদিত হয়েছিলেন। আর তথাকথিত নিরপেক্ষ সংবাদমাধ্যম প্রবীর পুরকায়স্থের মত সাংবাদিকদের সমর্থনে টুঁ শব্দ করেনি। বাংলায় তো রিপাবলিক বাংলা ছাড়া গোদি মিডিয়া নেই বলা হয়। নিন্দুকেরা বলে এখানে দিদি মিডিয়া আছে। তা সত্যি মিথ্যা যা-ই হোক, কোনো মিডিয়াই আর পাঁচটা গ্রেফতারির খবরের মত করে সংবাদটি পাঠক/দর্শকের কাছে পৌঁছে দেওয়ার বেশি তেমন কিছু করেনি। বাংলার স্বনামধন্য (অনেকের মত কিংবদন্তি) সাংবাদিকরা নিজেদের ব্লগে বা ভ্লগে, মায় ফেসবুক পোস্টেও এর প্রতিবাদ করেননি। সংবাদমাধ্যমের উপর রাষ্ট্রীয় আগ্রাসনের কালে নীরবতা অবশ্যই সম্মতির লক্ষণ। কারা নীরব ছিলেন মনে করে দেখুন। গোদি মিডিয়া সমেত তাঁদেরও উলঙ্গ করে দিল নির্বাচনের ফল, কারণ মাত্র তিনদিন আগে তাঁদেরই চ্যানেলে চ্যানেলে বুথফেরত সমীক্ষায় ৩০০-৪০০ আসন দিয়ে জিতিয়ে দেওয়া হয়েছিল মহামতি মোদীকে।

কেবল জিতিয়ে দেওয়া হয়েছিল বললে অবশ্য কিছুই বলা হয় না। বুথফেরত সমীক্ষা আর পাঁচটা সমীক্ষার মতই একটা সমীক্ষা মাত্র। তাতে ভুল হওয়ার সম্ভাবনা থাকেই। আজ যখন ইন্ডিয়া টুডের স্টুডিওতে অ্যাক্সিস-মাই ইন্ডিয়া সংস্থার প্রধান প্রদীপ গুপ্তা এসে নিজের পাহাড়প্রমাণ ভুলের ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে কেঁদেই ফেললেন, তখন রাজদীপ সরদেশাই, রাহুল কাঁওয়ালরা পরম স্নেহে তাঁর গায়ে হাত বুলিয়ে তাঁকে বোঝাচ্ছিলেনও বটে, যে মানুষ মাত্রেই ভুল করে।

কিন্তু মুশকিল হল, এর চেয়ে অনেক ছোট ভুলে টিভি চ্যানেলে বা খবরের কাগজে একজন সাংবাদিককে বিস্তর কৈফিয়ত দিতে হয়, লিখিত শোকজের জবাব দিতে হতে পারে, চাকরি পর্যন্ত চলে যেতে পারে। ২০২০-২১ সালে ভারতের যেসব সংবাদমাধ্যম করোনা অতিমারীর দোহাই দিয়ে কয়েক হাজার সাংবাদিককে ব্যবস্থা উদ্বৃত্ত ঘোষণা করে ছাঁটাই করেছিল, তারাই টাকা খরচ করে এইসব বুথফেরত সমীক্ষা করিয়েছে এবং প্রচার করিয়েছে। যে সাংবাদিকরা ছাঁটাই হয়েছিলেন, তাঁরা কেউই কখনো অ্যাক্সিস-মাই ইন্ডিয়ার প্রদীপ বা সি-ভোটারের যশবন্ত দেশমুখের চেয়ে বড় ভুল করেননি। করলে চাকরি আগেই যেত। অবশ্য যদি গুপ্তা, দেশমুখরা সত্যিই ভুল করে থাকেন।

একসঙ্গে সমস্ত বুথফেরত সমীক্ষাকারী সংস্থাই ভুল করতে পারে, যেমন ২০০৪ সালে করেছিল। আবার সব সংস্থা এক ভুলও করতে পারে। কিন্তু সব সমীক্ষাকারী সংস্থা একসঙ্গে একই ভুল করলে সেটা কাকতালীয় ঘটনা হিসাবে বড্ড বাড়াবাড়ি হয়ে যায়। বিশেষ করে সব সমীক্ষাতেই যদি স্রেফ কোথায় কটা আসন আছে সেই তথ্যে ভুল থাকে বা কোন দল কটা আসনে লড়ছে সেই তথ্যে ভুল থাকে। গোদি মিডিয়া অবশ্য সেখানেও থামেনি। প্রাক-নির্বাচনী মতামত সমীক্ষা বা বুথফেরত সমীক্ষা যে কোনোভাবেই নির্বাচনের ফল নয়, সেকথা বারবার করে দর্শকদের বলাই দস্তুর। অথচ এবারের বুথফেরত সমীক্ষায় ইন্ডিয়া জোট তথা কংগ্রেস গোহারান হারছে দেখানোর সঙ্গে সঙ্গে মোদী তৃতীয় মেয়াদে কী কী করবেন, ভারতকে কোন উচ্চতায় নিয়ে যাবেন – এসব গভীর আলোচনাও চালানো হয়েছে ঘন্টার পর ঘন্টা ধরে। আজ তক নেটওয়ার্কের বিখ্যাত গোদি অ্যাঙ্কর অঞ্জনা ওম কাশ্যপ রীতিমত নাকের পাটা ফুলিয়ে লাইভ অনুষ্ঠানে বলেছিলেন, তাঁদের মত বড় চ্যানেলে বিরোধীদের কোনো পরিসরই দেওয়া উচিত নয়।

এই সাংবাদিকের যে সাংবাদিকতা করা উদ্দেশ্য নয়, তার এর চেয়ে বড় কোনো প্রমাণ হয় না। লোকসভায় বিরোধীদের শক্তিবৃদ্ধির পর কী করবেন অঞ্জনা? সে তিনি ভাববেন, কিন্তু আমাদের ভুললে চলবে না যে অঞ্জনা বরং সরল বা বোকা বা উদ্ধত। তাই প্রকাশ্যে ওকথা বলেছেন। তাঁর চেয়ে চালাক চতুর সাংবাদিকরাও একই উদ্দেশ্যে কাজ করেন, তবে ভান করতে জানেন। গত এক দশকে ভারতের প্রায় প্রত্যেক সংবাদমাধ্যমের মালিক এই ধরনের মেধাহীন, অর্ধশিক্ষিত সাংবাদিকদেরই দায়িত্বপূর্ণ পদে উন্নীত করেছেন। সত্যিকারের সাংবাদিকদের হয় রবীশ কুমার বা পুণ্য প্রসূন বাজপেয়ীর মত নিজস্ব ইউটিউব চ্যানেল খুলতে হয়েছে, নয় মুখ বুজে পরিবার পরিজনের কথা চিন্তা করে ফ্যাসিবাদীদের হয়ে দিনরাত মিথ্যা প্রচারের কাজই করে যেতে হয়েছে। তৎসত্ত্বেও ভয়ে ভয়ে থাকতে হয়েছে, কখন মুনাফাখোর মালিকের মনে হয় – এত সাংবাদিক আমার দরকার নেই। শেষ দফার নির্বাচনের পরে তাঁর ইউটিউব চ্যানেলে আপলোড করা ভিডিওতে রবীশ বলেছেন যে চ্যানেলগুলোতে খরচ কমাতে রিপোর্টার যত কমানো হয়েছে, তত রমরমা হয়েছে অঞ্জনা জাতীয় অ্যাঙ্করদের। অর্থাৎ খবরকে এক ধরনের অসুস্থ বিনোদনে পরিণত করে মানুষের মন বিষিয়ে দেওয়া এবং সরকারকে, মোদীকে দোষগুণের অতীত এক সত্তা হিসাবে প্রতিষ্ঠা করার কাজই করে গেছে টিভি চ্যানেলগুলো। দিনরাত মোদীকে দেখানো, বিরোধীদের প্রায় না দেখানো, দেখালেও তাদের বক্তব্য এমনভাবে বিকৃত করা যাতে মোদীর সুবিধা হয় – এইসব কৌশল ইদানীং মোদীভক্তরাও বুঝে ফেলছিলেন। পুরাণে নির্মোক নৃত্যের কথা লেখা আছে, আজকাল যাকে বলা হয় স্ট্রিপটিজ। ভারতের মূলধারার সংবাদমাধ্যমের এক দশকব্যাপী এই স্ট্রিপটিজে কোমরে যে সরু অন্তর্বাসটুকু বাকি ছিল, সেটুকুও খুলে ফেলা হল এবারের বুথফেরত সমীক্ষায়।

আসল ফল যে অন্যরকম হবে, একথা প্রায় সব সাংবাদিক জানতেন। কিন্তু নিজের সংস্থার সাংবাদিকদের অভিজ্ঞতা ও নৈপুণ্যকে পাত্তা না দিয়ে বিপুল টাকা খরচ করে (নাকি অন্য কারোর অর্থানুকূল্যে?) এই বুথফেরত সমীক্ষাগুলো করিয়ে প্রকাশ করা হয়েছিল ১ জুন ২০২৪। অঞ্জনা, সুধীর চৌধুরী বা রাহুল কাঁওয়ালের মত অন্ধ সাংবাদিক ভেকধারীদের অবশ্য অভিজ্ঞতা বা নৈপুণ্য – কোনোটাই নেই। তাঁরা অত উপরে উঠেছেন মেধাহীন বদমাইশি নির্লজ্জভাবে করতে পারেন বলেই। ৪ জুন ২০২৪ কেবল প্রদীপ বা যশবন্ত নন, কেবল গোদি সাংবাদিকরাও নন, উদোম হয়ে গেলেন তাঁদের নিয়োগকারীরা। সবার চোখে ধরা পড়ে গেল, তাঁরা আসলে কিসের ব্যবসা করেন।

আরও পড়ুন সরকারের কিছু দেশদ্রোহী দরকার, তাই নিউজক্লিক আক্রমণ

তবে ও ব্যবসায় কিন্তু কেবল মার্কামারা গোদি মিডিয়াই যুক্ত তা নয়। যদি তা হত, তাহলে গত কয়েক মাসে তৃণমূল কংগ্রেসের সবেতেই দোষ দেখা এবং বিজেপির সবেতেই গুণ দেখা অতি বুদ্ধিমান সুটবুট পরা বাঙালি বাবু সুমন দে ওই বুথফেরত সমীক্ষা নিজের চ্যানেলে নিশ্চয়ই দেখাতে দিতেন না। মনে রাখবেন, সুমন দে-র মত বিভিন্ন চ্যানেলে সর্বেসর্বা যে অ্যাঙ্কররা আছেন তাঁরা প্রায় প্রত্যেকে কোম্পানির ম্যানেজমেন্টের অংশ। সাধারণ কর্মচারী নন। রাজদীপ সরদেশাইদের প্রজন্ম মাথার সব চুল পেকে গেলেও মুশাহারদের গ্রামে চলে যান খবর করতে। আজকের রাহুল কাঁওয়াল বা সুমন দে-রা রিপোর্টিং বলতে বোঝেন ঠান্ডা ঘরে বসে অমুক নেতা, তমুক নেতার সাক্ষাৎকার নেওয়া। অনেক ক্ষেত্রে সেই সাক্ষাৎকারে বিশেষ কিছুই করার থাকে না। কারণ আগেই স্থির করা থাকে যে প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার ভান করতে করতে আসলে নেতা আপন মনে শেক্সপিয়ারের চরিত্রের মত যা খুশি বলে যাবেন, সাংবাদিক ক্লাসের ফার্স্ট বয়ের মত মুখ করে শুনে যাবেন আর মাঝে মাঝে দন্তবিকাশ করে গল্প হলেও সত্যি ছবির ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়ের মত জানান দেবেন ‘থেমো না দাদা, বলে যাও। বড় ভাল বলছ।’

এ কাজ যে যত ভাল করতে পারে, মূলধারার সংবাদমাধ্যমে এখন তার তত দাম। সংসদে বিরোধীদের শক্তি বেড়ে যাওয়ায় এবার কিন্তু এই জাতের সাংবাদিকতা বিপদে পড়বে। কারণ দর্শকদের মধ্যে ইতিমধ্যেই ক্লান্তি এসেছে। সরকারভক্ত দর্শক/পাঠকরাও ইদানীং সেই কারণেই বিকল্প সংবাদমাধ্যম – অর্থাৎ ছোট-বড় ওয়েবসাইট, ইউটিউবার, ফেসবুকারদের দিকে ঝুঁকছেন। সরকারের শক্তি কমে যাওয়ার একটা মানে হল উলটো বয়ান শুনতে চাওয়া মানুষের সংখ্যা বেড়েছে। আরেকটা মানে হল, আগামীদিনে ওই সংখ্যা আরও বাড়বে। কেবল ময়ূখ ঘোষদের নয়, সুমন দে-দেরও সাবধান হওয়ার সময় বোধহয় এসে পড়ল।

নাগরিক ডট নেটে প্রকাশিত

আসল মোদী প্রকট হয়েছেন, এবার ভবিষ্যৎ বেছে নিন

রাকেশ শর্মা কেবল ভারতের একমাত্র মহাকাশচারীর নাম নয়। একই নামে একজন তথ্যচিত্র নির্মাতাও আছেন। তাঁর নির্মিত সবচেয়ে আলোচিত ও পুরস্কৃত তথ্যচিত্রের নাম ফাইনাল সলিউশন (২০০৪)। এই মুহূর্তে ইউটিউব অথবা ভাইমিও ওয়েবসাইটে গিয়ে দেখে নেওয়া সম্ভব, তবে দুটো জায়গাতেই মোটামুটি আড়াই ঘন্টার ছবি রয়েছে। কিন্তু ২০০৪ লোকসভা নির্বাচনের কিছুদিন আগে রাকেশ শর্মার এক বাঙালি সহকারীর সৌজন্যে যাদবপুর এবং কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে ওই তথ্যচিত্রের দুটো প্রদর্শনী হয়েছিল। তাতে ঘন্টা চারেকের ছবি দেখেছিলাম আমরা অনেকে। দেখেছিলাম বলেই গত রবিবার রাজস্থানের বনসোয়াড়ায় নরেন্দ্র মোদীর বক্তৃতা শুনে একটুও অবাক হইনি। ‘মুসলমানদের বেশি বাচ্চা হয়’ বলা বা মুসলমানদের অনুপ্রবেশকারী বলা মোদীর পক্ষে অস্বাভাবিক তো নয়ই, নতুনও নয়। নতুন হল প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পরে নির্বাচনী প্রচারে বলা। ২০০২ সালে গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী থাকার সময়ে মোদী এই ভাষাতেই কথা বলতেন বিজেপির সমাবেশে। বস্তুত আরও প্ররোচনামূলক, বর্বর ভাষায় কথা বলতেন। জানি না আড়াই ঘন্টার সম্পাদিত তথ্যচিত্রে তার কতটুকু দেখা যায়, তবে মনে হয় না রাকেশ খুব বেশি কাটছাঁট করেছিলেন। কারণ ছবিটাকে অটলবিহারী বাজপেয়ীর এনডিএ সরকারের আমলে অনুপম খেরের নেতৃত্বাধীন সেন্ট্রাল বোর্ড অফ ফিল্ম সার্টিফিকেশন (চালু লব্জে সেন্সর বোর্ড) প্রথমে ভারতে প্রদর্শনের অনুমতি দিতে চায়নি। কীভাবে রাকেশ সে ছবি সর্বত্র ছড়িয়ে দিয়েছিলেন তা নিজেই এক রোমাঞ্চকর কাহিনি। পরে মনমোহন সিংয়ের ইউপিএ সরকার ক্ষমতায় এলে সেন্সরের ছাড়পত্র পাওয়া গিয়েছিল। ২০১৪ লোকসভা নির্বাচনের আগে যখন মোদীর নতুন ভাবমূর্তি তৈরি করা হচ্ছিল, আজকের অনেক মোদীবিরোধীও লিখতে/বলতে শুরু করেছিলেন – এদেশে চণ্ডাশোক ধর্মাশোক হয়েছিলেন, মোদীও বদলে গেছেন; তখন রাকেশ তাঁর ছবি থেকে কেটে রাখা বেশকিছু ক্লিপ আলাদা করে প্রকাশ করেছিলেন। আগ্রহীরা সেগুলোও খুঁজে দেখতে পারেন।

এই ইতিহাস স্মরণ করানো এই কারণে, যে মোদীর বনসোয়াড়ার কুরুচিকর বক্তৃতা নিয়ে মোদীবিরোধীদের মধ্যে একটা প্রতিক্রিয়া খুব বেশি মাত্রায় দেখা যাচ্ছে। তা হল, প্রথম দফার নির্বাচনের পর মোদী বুঝেছেন যে হাওয়া ভাল নয়। ভোট আসছে না। চারশো পার দূরের কথা, দুশো পার হবে কিনা সন্দেহ। তাই ‘মোদী কি গ্যারান্টি’, ‘বিকাশ’ ইত্যাদি ছেড়ে দিয়ে চূড়ান্ত ধর্মীয় মেরুকরণের খেলা খেলেই ভোট কুড়োতে হবে। তাতে রক্তগঙ্গা বয়ে গেলেও কিছু যায় আসে না। এই ব্যাখ্যা উড়িয়ে দেওয়া যাবে না। কারণ হঠাৎ দেখা যাচ্ছে সুধীর চৌধুরীর মত গোদি মিডিয়ার তারকা মোদীর বনসোয়াড়ার বক্তৃতায় মনমোহনের বক্তব্যকে যে বিকৃত করা হয়েছে তা ঘোষণা করে অনুষ্ঠান করছেন।

আরেক গোদি তারকা রাহুল কাঁওয়াল অমিত শাহকে ‘ওয়াশিং মেশিন’ নিয়ে প্রশ্ন করার সাহস দেখিয়ে ফেলছেন।

আনন্দবাজার পত্রিকার ঈশানী দত্ত রায় আর দেবাশিস চৌধুরী তো অমিতকে সিএএ থেকে মণিপুর পর্যন্ত নানা বিষয়ে চোখা চোখা প্রশ্ন করে একেবারে ল্যাজেগোবরে করে দিয়েছেন। ২০১৪ সাল থেকে দেশের মূলধারার সংবাদমাধ্যম যেভাবে চলছে তার বিচারে এসব সাহস নয়, রীতিমত দুঃসাহস। শুধু তাই নয়। কদিন আগেও যেসব সেফোলজিস্ট (বাংলা কি ভোটজ্যোতিষী?) বিজেপি একাই ৩৫০-৩৮০ পেয়ে যাবে বলছিলেন জোর গলায়, তাঁরাও কেমন কিন্তু কিন্তু করছেন। অ্যাক্সিস-মাই ইন্ডিয়া সংস্থার কর্ণধার প্রদীপ গুপ্ত একটা ওয়েবসাইটকে বলেছেন ১৩টা গুরুত্বপূর্ণ রাজ্যে (মহারাষ্ট্র, বিহার, মধ্যপ্রদেশ, কর্ণাটক, গুজরাট, রাজস্থান, ঝাড়খণ্ড, ছত্তিসগড়, হরিয়ানা, দিল্লি, উত্তরাখণ্ড, হিমাচল প্রদেশ, গোয়া) এবং কিছু কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে এনডিএ-র পক্ষে ২০১৯ সালের সমান আসন ধরে রাখা শক্ত। সেই খবরের লিঙ্ক অ্যাক্সিস-মাই ইন্ডিয়ার এক্স হ্যান্ডেল থেকে পোস্ট করা হয়, প্রদীপ নিজে তা রিপোস্টও করেন। কিন্তু কিছুক্ষণ পরেই সেই পোস্ট ডিলিট করে দেওয়া হয়। তারপর প্রদীপের সংস্থার করা সমীক্ষা বলে কিছু কম্পিউটার প্রিন্ট আউটের ছবি ভাইরাল হয়, যেখানে দেখা যাচ্ছে এনডিএ আর ইন্ডিয়া প্রায় সমান ভোট পাবে এবং আসন সংখ্যাতেও খুব বেশি হেরফের হবে না। তা নিয়ে অ্যাক্সিস-মাই ইন্ডিয়া এফআইআর দায়ের করেছে। সংস্থার দাবি ওগুলো ভুয়ো, আদৌ তেমন কোনো সমীক্ষা করা হয়নি। তারা প্রাক-নির্বাচনী মতামত সমীক্ষা করেই না, শুধু বুথফেরত সমীক্ষা করে। কিন্তু তাহলে প্রদীপ কিসের ভিত্তিতে বললেন, ১৩ রাজ্যে কী হবে? সে প্রশ্ন রয়েই গেল। ওদিকে সিভোটার সংস্থার কর্ণধার যশবন্ত দেশমুখ বলেছেন পশ্চিমবঙ্গ, তামিলনাড়ুর মত রাজ্যে প্রথম দফায় এমন হয়ে থাকতেই পারে যে বিজেপির ভোটাররা অনেকে ভোট দিতে আসেননি। ভেবেছেন বিজেপির ওসব জায়গায় জেতার সম্ভাবনা নেই, তাই ভোট দিতে গিয়ে লাভ নেই।

এঁদের চেয়েও মানুষ কোন দিকে ঝুঁকছে তা ঢের ভাল বোঝে আরএসএস-বিজেপির সংগঠন। তাদের নয়নের মণি মোদী নিজেই ১৯ এপ্রিল প্রথম দফার ভোটদানের পরে এক সমাবেশে ভোটারদের বলেছিলেন ভোট না দেওয়া ভাল নয়, ভোট দেওয়া নাগরিক কর্তব্য ইত্যাদি। অর্থাৎ তিনিও কম ভোট পড়া নিয়ে চিন্তিত ছিলেন। সুতরাং এমন হতেই পারে যে তারই প্রভাবে ২০০২ সালের মোদীকে ভিতর থেকে বার করে এনেছেন। রবিবারের পরে সোমবারই যেভাবে উত্তরপ্রদেশের আলিগড়ে ভোল বদলে ফেলে সৌদি আরবের যুবরাজের সঙ্গে কথা বলে ভারতীয় মুসলমানদের হজ করতে যাওয়ার কোটা কত বাড়িয়েছেন সেকথা ফলাও করে বলেছেন, তাতে আরও বেশি সন্দেহ হয় – মোদী বুঝতে পারছেন না এই নির্বাচনে জিততে গেলে কোনটা করলে বেশি ভাল হবে। মুসলমানদের যথাসম্ভব গালাগালি দিয়ে ২০০২ সালের মূর্তি ধরা, নাকি আপাতত হিন্দুত্বকে ঝুড়ি চাপা দিয়ে মুসলমানদের ভোটও যাতে পাওয়া যায় তা নিশ্চিত করা।

সবই সত্যি। কিন্তু এসব দেখে উল্লসিত হওয়া বোকামি হবে। কেবল এ জন্যে নয় যে এগুলো অনুমান মাত্র। এ জন্যেও যে রবিবারের মোদীই আসল মোদী এবং মোদীর জনপ্রিয়তা মূলত ওই মোদীরই জনপ্রিয়তা। গণতন্ত্রে মানুষের উপর বিশ্বাস রাখা ছাড়া যেমন কোনো উপায় নেই, তেমন বিনা প্রমাণে মানুষকে স্বর্গীয় জীব বলে ভেবে নেওয়ারও কোনো কারণ নেই। আপনার চারপাশের মানুষের মধ্যে গত এক যুগ বা তারও বেশি সময় ধরে যে সংখ্যালঘুবিদ্বেষ দেখেছেন তা হঠাৎ কমে গেছে – এমন কোনো লক্ষণ দেখছেন কি? যদি না দেখেন, তাহলে মোদীর মুসলমানদের বিরুদ্ধে বিষোদ্গার তাঁকে ভোটারদের কাছে আরও অপ্রিয় করবে এমন ভেবে নেওয়া অর্থহীন। মোদীর সাফল্যের রহস্যই হল, সংখ্যাগুরু মানুষ আগে যা নিজস্ব আড্ডায় চুপিচুপি বলাবলি করত তিনি তা প্রকাশ্যে বলা ফ্যাশনে পরিণত করেছেন। প্রথমে করেছিলেন গুজরাটে, ২০১৪ সালের পর ক্রমশ সারা ভারতে। একমাত্র কেরালা আর তামিলনাড়ুই এই সামাজিক, সাংস্কৃতিক পরিবর্তন অনেকখানি প্রতিহত করতে পেরেছে। তাই সেখানে আজও বিজেপি রাজনৈতিকভাবে প্রান্তিক শক্তি। তামিলনাড়ুতে বিজেপির রাজ্য সভাপতিকে বলতে হয় তিনি রাজদীপ সরদেশাইয়ের সঙ্গে মুরগি খাবেন, আমিষ-নিরামিষ নিয়ে তাঁর বাছবিচার নেই। কেরালায় আবার এক বিজেপি প্রার্থী ২০১৭ সালে উপনির্বাচনের প্রচারে বলেছিলেন, জিতলে ভাল মানের গোমাংসের সরবরাহ নিশ্চিত করবেন। আগামী ৪ জুনও ওই রাজ্যগুলোর ছবি বদলানোর সম্ভাবনা কম। কিন্তু ভারতের আর কোনো অংশই সংঘের ঘৃণার রাজনীতির আওতার বাইরে নেই।

মুসলমানদের চারটে বউ আর চল্লিশটা বাচ্চা – একথা আমার, আপনার মামা কাকা পিসে জ্যাঠা মাসি পিসিরাই প্রবলভাবে বিশ্বাস করে আজকাল। অথচ জিজ্ঞেস করলে দেখা যায় এমন কোনো মুসলমানকে তাঁরা চেনেন না যার একাধিক স্ত্রী। অনেকে জীবনে কখনো কোনো মুসলমান মহিলা বা পুরুষের সঙ্গে আলাপই করেননি। অথচ মোদী এ বিশ্বাস তাঁদের মধ্যে গেঁথে দিতে পেরেছেন যে তেমন মুসলমান দেশের কোথাও না কোথাও আছে। বামপন্থী দলের কর্মী, সমর্থকদেরও কত সহজে সোশাল মিডিয়ায় ইন্ডিয়ান সেকুলার ফ্রন্টের সঙ্গে জোট ভেঙে গেলে বলতে দেখা যায় – মুসলমানদের কখনো বিশ্বাস করা উচিত নয়। মুসলমানরাই ভোটের দিন মারামারি করে, বিভিন্ন দলের হয়ে তারাই বোমা ছোড়ে – এসব বিজেপিবিরোধী ভোটাররাও ভোটের লাইনে দাঁড়িয়েই বলেন। নিজে কানেই পঞ্চায়েত নির্বাচনের সময়ে শুনেছি একজন বলছেন, আমাদের এলাকায় মুসলমান নেই বলেই ভোটে অশান্তি হয় না, অনেকে সম্মতিসূচক মাথা নাড়ছেন। গত পুজোতেই তো মুসলমান মানেই সন্ত্রাসবাদী – এমন বক্তব্যের একখানা বাংলা ছবি দিব্যি হিট হয়ে গেল।

এইসব প্রবণতাই ইংরেজ আমলের সমান বেকারত্ব আর আকাশছোঁয়া মূল্যবৃদ্ধির যুগেও মোদীর রক্ষাকবচ। তিনি ভাল করেই জানেন, যখন আর কিছু কাজ করবে না তখনো মুসলমানদের সম্পর্কে ভয় দেখানো কাজে লাগবে। হিন্দু মহিলাদের গলার মঙ্গলসূত্রটা পর্যন্ত কংগ্রেস ছিনিয়ে নিয়ে তাদের দিয়ে দেবে যাদের বাচ্চা বেশি হয় – হয়ত আপনি আশা করছেন এ তত্ত্ব হিন্দি বলয়ে আর কাজে লাগবে না। হয়ত আপনি ঠিকই ভাবছেন। কারণ যে ন্যাড়া আগে বেলতলায় গেছে সে যাওয়া থামাবে অন্যদের আগে – এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু হয়ত দেখলেন আপনার উচ্চশিক্ষিত ইঞ্জিনিয়ার মামাই বিশ্বাস করে ফেলেছেন কথাটা। কারণ তিনি সারাদিনে পড়ার মধ্যে পড়েন হোয়াটস্যাপ আর তাতে দশ বছর ধরে পড়ে চলেছেন যে গোপাল পাঁঠা ছিলেন বলে তিনি আছেন, প্রেরক আছেন, হাওড়া ব্রিজ আছে।

এঁরা আদিবাসী নন, দলিত নন, সংখ্যালঘু নন। এঁরা আশৈশব কল্যাণকামী ভারত রাষ্ট্রের সমস্ত সুযোগসুবিধা পেয়ে সরকারি স্কুল কলেজে পড়াশোনা করে মোটা মাইনের চাকরি বাগিয়েছেন। ভারতের গলতিওলা গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতার সুবাদে যা ইচ্ছে খেয়েছেন, যা ইচ্ছে পরেছেন, যেখানে ইচ্ছে বেড়িয়েছেন। তারপর মনমোহনী আমল থেকে ছেলেমেয়েদের শিখিয়েছেন – ‘বেসরকারি হলে পরিষেবা ভাল হবে’, ‘গান্ধী, নেহরু মহা বদমাইশ’, ‘মুসলমানদের বিশ্বাস করতে নেই’, ‘ভাল ছেলেমেয়েরা সাইন্স পড়ে, সাইন্সে চান্স না পেলে আর্টস পড়তে হয়’, ‘ইতিহাস ফালতু সাবজেক্ট’ ইত্যাদি। এখন এঁরা ধেড়ে বয়সে এবং এঁদের সন্তানরা কচি বয়সে হোয়াটস্যাপ বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃতী ছাত্রছাত্রী। এখন ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে পড়া বিজ্ঞান ভুলে, স্কুলে মুখস্থ করে খাতায় উগরে দিয়ে ভুলে যাওয়া ইতিহাস আর নাক সিঁটকে এড়িয়ে যাওয়া রাষ্ট্রবিজ্ঞান টপাটপ শিখে ফেলছেন হোয়াটস্যাপ, ফেসবুক থেকে। সেখান থেকেই শিখেছেন – হিন্দু ঘরে জন্মে এতদিন তাঁরা অত্যাচারিত, নিপীড়িত ছিলেন। মোদীর আমলে মাথা উঁচু করে বাঁচতে পারছেন। ভারতের অন্য সব রাজনৈতিক দলই মুসলমানদের তোষণ করে গেছে চিরকাল। অতএব বাবরি মসজিদের জায়গায় রামমন্দির তৈরি করা বহুযুগের অন্যায়ের প্রতিশোধ। রামনবমীতে অস্ত্র মিছিল করা অন্যায় নয়। ক্রুদ্ধ রাম আর ক্রুদ্ধ হনুমান বাঙালির দেবতা।

আরও পড়ুন ওয়কীল হাসানের গণতন্ত্র, না মুকেশ আম্বানির ধনতন্ত্র?

এই বাঙালিরা এখনো রবীন্দ্রনাথ, সত্যজিৎ কপচান। নিজেদের ভারতের অন্য সব জাতির লোকেদের চেয়ে শিক্ষিত মনে করেন, কিন্তু হতে চান মাড়োয়ারিদের মত ধনী। হোয়াটস্যাপ বিশ্ববিদ্যালয় এঁদের শিখিয়েছে যে সেটা হওয়ার পথে একমাত্র বাধা বাংলাদেশ থেকে আসা কাতারে কাতারে মুসলমান, যাদের মোদী বনসোয়াড়ায় বলেছেন ‘ঘুসপেটিয়া’। আপনি যতই এই বাঙালিদের দ্য হিন্দু কাগজের এই প্রতিবেদনের মত তথ্য দিয়ে বোঝান যে মুসলমানদের গাদা গাদা বাচ্চা হয় আর হিন্দুরা সব একটি-দুটিতে থেমে থাকে এমনটা ঘটনা নয়, বা কাতারে কাতারে মুসলমান বাংলাদেশ থেকে পশ্চিমবঙ্গে ঢুকে পড়েছে এমনটাও নয়, এঁরা চোখ বন্ধ করে থাকবেন।

নিজেদের সুরক্ষিত অতীত আর আরামদায়ক বর্তমানে হেলান দিয়ে এঁরা ইদানীং হিন্দুরাষ্ট্রের স্বপ্ন সফল করতে ভোট দেন, যাতে আমাদের এবং আমাদের সন্তানদের ভবিষ্যৎ ঝরঝরে হয়। ইরান, পাকিস্তান, আফগানিস্তানের মত ধর্মকেন্দ্রিক রাষ্ট্র যে খুব খারাপ তা এঁরা হোয়াটস্যাপ থেকে বিলক্ষণ শিখেছেন। কিন্তু হিন্দুরাষ্ট্র নিয়ে গদগদ হওয়ার বেলায় সেসব মনে থাকে না। এঁদের মধ্যে যাঁদের বয়স কম, হিন্দুরাষ্ট্র নিঃসন্দেহে তাঁদের জন্যেও বেদনাদায়ক হবে। কিন্তু কালিদাসের উত্তরাধিকারী তো এদেশে কম নেই। এই বাঙালিদের মোদী বিলক্ষণ চেনেন আর এও জানেন যে এরকম মানুষ কেবল বাংলায় নয়, সারা ভারতে রয়েছে। তাঁর বনসোয়াড়ার ভাষণের লক্ষ্য তারাই।

অর্থাৎ এবারের ভোট কেবল আপনার সাংসদ বেছে নেওয়ার বা কোন দল সরকার চালাবে তা বেছে নেওয়ার ভোট নয়। ভবিষ্যৎ বেছে নেওয়ারও। উন্নয়ন ইত্যাদি ঢক্কানিনাদে এখন আর মোদীও সময় ব্যয় করছেন না। ‘মোদী কি গ্যারান্টি’ কথাটাও আর বলছেন না। এখন স্রেফ মুসলমানকে হিন্দুর শত্রু হিসাবে খাড়া করে, নিজের দলকে হিন্দুদের দল আর বিরোধী দলগুলোকে মুসলমানদের দল প্রতিপন্ন করেই ভোট চাইছেন। এবার আপনাকে বেছে নিতে হবে, আপনি সোশাল মিডিয়া থেকে গেলা বিষ পান করে আরও বিষ পান করার জন্যে ভোট দেবেন, না নিজের এবং সন্তানদের ভবিষ্যতের জন্য ভোট দেবেন। এবার মোদীর বিরুদ্ধে দাঁড়াতে হলে অনেক বিষাক্ত আপনজনের বিরুদ্ধে যেতে হবে। অথচ আপনজনদের ভবিষ্যৎ রক্ষা করতে হলে তাছাড়া উপায় নেই। কবি তো ভরসা দিয়েছেন ‘তোর আপন জনে ছাড়বে তোরে/তা ব’লে ভাবনা করা চলবে না’।

নাগরিক ডট নেটে প্রকাশিত

সরকারের কিছু দেশদ্রোহী দরকার, তাই নিউজক্লিক আক্রমণ

এতগুলো রাজ্যের ভোট নিয়ে যেরকম হইচই হওয়ার কথা, বিশেষ করে নরেন্দ্র মোদী নিজে প্রচারে নামলে যেরকম হয়ে এসেছে ২০১৪ সাল থেকে – তেমনটা দেখা যাচ্ছে না।

আজ আমরা ঘুম থেকে উঠে আড়মোড়া ভেঙে বেড টি খাওয়ার আগেই নিউজক্লিক ওয়েবসাইটের সম্পাদক প্রবীর পুরকায়স্থ; ওই সাইটের সঙ্গে যুক্ত সাংবাদিক অভিসার শর্মা, অনিন্দ্য চক্রবর্তী, অরিত্রী, ভাষা সিং, উর্মিলেশ; ইতিহাসবিদ সোহেল হাশমি, দিল্লি সাইন্স ফোরামের সঙ্গে যুক্ত ডি রঘুনন্দন, ঋজু বিদুষক সঞ্জয় রাজৌরার বাড়িতে হানা দেয় দিল্লি পুলিস। তাঁদের ল্যাপটপ, ফোন ইত্যাদি বাজেয়াপ্ত করা হয় ১৭ অগাস্ট দায়ের করা একটি কেসের ‘তদন্তের স্বার্থে’। যে যে আইনে এই কেস করা হয়েছে তার মধ্যে কুখ্যাত ইউএপিএ-ও রয়েছে। যখন এই লেখা লিখছি, তখন জানা যাচ্ছে স্বাধীন সাংবাদিক পরঞ্জয় গুহঠাকুরতা এবং মুম্বাইয়ের বাসিন্দা সমাজকর্মী তিস্তা শেতলবাদের বাড়িতেও হানা দেওয়া হয়েছে। তিস্তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে, রঘুনন্দন আর সঞ্জয়কে থানায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে। এখন অব্দি অবশ্য কোনো গ্রেফতারির খবর নেই। শুধু সাংবাদিক, সমাজকর্মী, বিজ্ঞানী, ইতিহাসবিদ নয়; নিউজক্লিক ওয়েবসাইটের সাধারণ কর্মীদের বাড়িতেও হানা দেওয়া হয়েছে। নিয়ে নেওয়া হয়েছে তাঁদের ল্যাপটপ, ফোন ইত্যাদিও। সেই সূত্রেই সিপিএমের সাধারণ সম্পাদক সীতারাম ইয়েচুরির নামে বরাদ্দ একটি বাড়িতেও হানা দেওয়া হয়। সেখানে সপরিবারে থাকেন সিপিএমের কৃষক সংগঠনের কিছু কর্মী। তাঁদের পরিবারে নিউজক্লিকের একজন কর্মচারী আছেন।

নিউজক্লিক সংবাদ সংগঠনের বিরুদ্ধে সরকারি অভিযান এই প্রথম নয়। গত কয়েক বছর ধরে বারবার ইডি তাদের দফতরে হানা দিয়েছে, ঘন্টার পর ঘন্টা জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে সম্পাদকমশাইকে, সর্বস্ব ঘেঁটে দেখা হয়েছে, এ অ্যাকাউন্ট সে অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ করা হয়েছে। আপত্তিকর, বেআইনি কিছুই পাওয়া যায়নি। এবারের হানা নিউইয়র্ক টাইমস কাগজে প্রকাশিত এক প্রতিবেদন নিয়ে, যাতে অভিযোগ করা হয়েছিল নিউজক্লিক নাকি চীনের হয়ে প্রোপাগান্ডা চালানোর জন্যে টাকা পেয়েছে। এখন পর্যন্ত তার বিন্দুমাত্র প্রমাণ পাওয়া যায়নি। কিন্তু যদি তর্কের খাতিরে ধরে নেওয়া হয় অভিযোগটা সত্যি, তাহলেও নিউজক্লিক সাইটে বিভিন্ন সময়ে লিখেছেন যাঁরা, সেখানকার কর্মচারী যাঁরা, তাঁদের বাড়িতে হানা দেওয়া এবং যন্ত্রপাতি বাজেয়াপ্ত করার একটাই যুক্তি হতে পারে – ভয় দেখানো, চুপ করানো।

চুপ করানোর দরকার যে পড়েছে তাতে সন্দেহ নেই। সামনে পাঁচ রাজ্যে বিধানসভা ভোট। বিজেপি নেতারা যথারীতি পুরোদমে প্রচার করছেন। কিন্তু স্বয়ং প্রধানমন্ত্রীও তাঁর দলকে ভোট দেওয়ার জন্যে নিজের সরকারের একটা কাজ তুলে ধরতে পারছেন না। ২০১৪ সাল থেকে বাজিয়ে আসা বস্তাপচা সিডিগুলোই বাজিয়ে চলেছেন। মানুষের কানে যে সেগুলো একঘেয়ে লাগছে তা যে বুঝছেন না তাও নয়। কারণ গোদি মিডিয়াও বুক ঠুকে বলতে পারছে না বিজেপি বা তার জোট তেলেঙ্গানা, রাজস্থান, মধ্যপ্রদেশ, ছত্তিসগড়, মিজোরামের মধ্যে অন্তত তিনটে রাজ্যে জিতবেই। উলটে শোনা যাচ্ছে মণিপুরের প্রভাবে মিজোরামে বিজেপি অচ্ছুত হয়ে গেছে। সঙ্গী দল ক্ষমতাসীন মিজো ন্যাশনাল ফ্রন্ট (এমএনএফ) ইতিমধ্যেই একতরফা ৪০ আসনের মধ্যে ৩৮ আসনে প্রার্থী ঘোষণা করে দিয়েছে। সম্প্রতি লোকসভায় বিরোধীদের আনা অনাস্থা প্রস্তাবে এমএনএফের একমাত্র সাংসদ সি লালরোসাঙ্গা সরকারের বিরুদ্ধে ভোটও দেন মণিপুরে বিজেপির ভূমিকার প্রতিবাদে।

এদিকে চাণক্য সংস্থার সার্ভে চলছে তেলেঙ্গানায়। তাদের কর্মী পার্থ দাস এলাকা ঘুরে ঘুরে টুইট করছেন। তাঁর মতে ওই রাজ্যে বিজেপি এক অঙ্কের আসন পাবে, সম্ভবত কংগ্রেস সরকার হবে। ছত্তিসগড়ে কংগ্রেস হারবে, এমন দাবি অতি বড় বিজেপি সমর্থককেও করতে দেখা যাচ্ছে না। মধ্যপ্রদেশে নেতাদের বিজেপি ছেড়ে কংগ্রেসে যাওয়ার খবর পাওয়া যাচ্ছে প্রায় রোজ, মুখ্যমন্ত্রী শিবরাজ সিং চৌহানের যে দাপট প্রচার পর্বে দেখতে পাওয়ার কথা, তাও দেখা যাচ্ছে না। ঢাকঢোল পিটিয়ে কংগ্রেস থেকে বিজেপিতে যাওয়া জ্যোতিরাদিত্য সিন্ধিয়াকেও মিইয়ে যাওয়া থিন অ্যারারুট বিস্কুটের মত দেখাচ্ছে। ওদিকে রাজস্থানে অশোক গেহলত আর শচীন পাইলটের মধ্যে ঝগড়া হয় না অনেকদিন। কর্ণাটকে পর্যুদস্ত হওয়া বিজেপি ইউনিটের মত রাজস্থানেও বিজেপির কোনো অবিসংবাদী নেতা নেই যাঁকে গেহলত বা পাইলটের প্রতিস্পর্ধী বলে ভাবা চলে। শোনা যাচ্ছে এমতাবস্থায় গোদি মিডিয়াকে এই নির্বাচনগুলোর খবর নিয়ে মাতামাতি করতে বারণ করা হয়েছে। এই গুজব সত্যি হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল, কারণ এতগুলো রাজ্যের ভোট নিয়ে যেরকম হইচই হওয়ার কথা, বিশেষ করে নরেন্দ্র মোদী নিজে প্রচারে নামলে যেরকম হয়ে এসেছে ২০১৪ সাল থেকে – তেমনটা দেখা যাচ্ছে না। মোদীজির সভা লাইভ দেখানো চলছে, কিন্তু বিজেপি জিতবেই, কংগ্রেস জিতলে তা হবে পাকিস্তানের জয় – এই জাতীয় ঘোষণা করে দিনরাত চিৎকৃত সাংবাদিকতা কোথায়? মণিপুরে তো বিজেপি ল্যাজেগোবরে বললেও কম বলা হয়, কারণ অবস্থা এতই সঙ্গিন যে উন্মত্ত জনতা মুখ্যমন্ত্রী বীরেন সিংয়ের বাড়ি আক্রমণ করছে, সেনাবাহিনীর সঙ্গে রাজ্য পুলিসের চুলোচুলি বেধে যাচ্ছে

এই পরিস্থিতিতে বিহারের জেডিইউ-আরজেডি-বাম-কংগ্রেস সরকার প্রকাশ করে দিল জাতিভিত্তিক জনগণনার ফল। অর্থাৎ একা রামে রামভক্তদের রক্ষে নেই, সুগ্রীব দোসর। হিন্দি বলয়ের রাজ্য মধ্যপ্রদেশ আর রাজস্থানে নির্বাচন। ওই রাজ্যগুলো সামাজিক-সাংস্কৃতিক-রাজনৈতিক দিক থেকে বিহারের কাছাকাছি। হিন্দুদের মধ্যে ভেদাভেদ নেই, উঁচু নিচু সব হিন্দুরই অভিন্ন শত্রু মুসলমান – এই রাজনীতির সাড়ে বারোটা বাজিয়ে দিতে পারে এই ফল। যে নিম্নবর্গীয় হিন্দুদের বিজেপি গত দশকের শুরু থেকে দলে টানতে পেরেছিল ত্রাতা হওয়ার ভান করে, তারা এবার নিজেদের সঠিক সংখ্যা জেনে গেল। তার চেয়ে অনেক কম সংরক্ষণ যে তারা পায় সেকথাও প্রকাশ পেয়ে গেল। এই গণনাকে স্বাগত জানালে আরও বেশি সংরক্ষণের দাবি উঠতে পারে, সে দাবি মেটাতে গেলে বিজেপি-আরএসএসের আদর্শগত কর্তৃত্ব যাদের হাতে সেই উচ্চবর্গীয়রা চটবে। আবার এর কড়া নিন্দা করলে নিম্নবর্গীয়দের ভোটের মায়া ত্যাগ করতে হবে। তাদের ভোট না পেলে আজ আরএসএস হিন্দুরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করার দোরগোড়ায় পৌঁছতে পারত না। ২০২৪ জিততে গেলেও তাদের ভোট ছাড়া চলবে না। জাতপাতের সমীকরণ বদলে যাওয়া বিজেপির সবচেয়ে বড় ভরসাস্থল উত্তরপ্রদেশেও বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে। ফলে মোদী-শাহের মাথায় হাত পড়েছে গতকাল। প্রধানমন্ত্রী ভোটের প্রচারে বেরিয়ে কিছু আবোল তাবোল প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। বিরোধীরা আগেও জাতপাতের ভিত্তিতে দেশকে ভাগ করেছে, আবার সেই ব্যবস্থাই করতে চাইছে বলে অভিযোগ করেছেন। কিন্তু ও কথায় উচ্চবর্গীয়রা বেজায় খুশি হলেও নিম্নবর্গীয়দের চিড়ে ভিজবে না। তাই বিজেপি মুখপাত্ররা জনে জনে প্রতিক্রিয়া দিচ্ছেন না। তাদের টুইটার হ্যান্ডেলও চুপচাপ। মনে কী দ্বিধা!

এমন দিনে তারে বলা যায় – ওই ওরা সব দেশদ্রোহী। চীনের সঙ্গে হাত মিলিয়ে দেশের বিরুদ্ধে চক্রান্ত করছে। শতমুখে বলার জন্যে তৈরি আছে গোদি মিডিয়া। তাদের তারকা সাংবাদিকদের কদিন আগেই বয়কট করেছে ইন্ডিয়া জোট, তাই পাণ্ডারা বাকস্বাধীনতা হরণ করা হচ্ছে বলে চিৎকার চেঁচামেচি করেছে। অথচ দেশদ্রোহের অভিযোগ তুলে দিলেই তারা বাকস্বাধীনতার পাঠ ভুলে অন্য সাংবাদিকদের উপর এই রাষ্ট্রীয় আক্রমণের পক্ষে দাঁড়াবে, সারা দেশের সাধারণ মানুষকে গলাবাজি করে বোঝাবে – ভারতের বিরুদ্ধে গভীর ষড়যন্ত্র চলছে। মোদীজিই একমাত্র এদের হাত থেকে দেশকে বাঁচাতে পারেন। মানুষ যদি এ কথায় আরও একবার বিশ্বাস করে তাহলে ভোট বৈতরণী পার হওয়া সহজ হয়।

আরও পড়ুন এনডিটিভি বিসর্জন: শোক নিষ্প্রয়োজন, উল্লাস অন্যায়

ফলে যত দিন যাবে, লোকসভা নির্বাচন যত এগিয়ে আসবে তত আক্রমণ বাড়বে স্বাধীন সংবাদমাধ্যমের উপর। এনডিটিভিকে গৌতম আদানির হাত দিয়ে কিনে নেওয়া গেছে। কিন্তু নিউজক্লিক শেয়ার বাজারে নেই, কর্পোরেট অর্থে চলে না। তাই তাকে কিনে নেওয়া যাচ্ছে না। যে সংবাদমাধ্যমকে কেনা যায় না তার চেয়ে বিপজ্জনক আর কী আছে সরকারের পক্ষে? অতএব তাকে গলা টিপেই চুপ করাতে হবে। উপরি পাওনা ভোটারদের দেশদ্রোহী জুজু দেখিয়ে ভোট আদায়।

এমনিতে সংবাদমাধ্যম বা সাংবাদিকদের উপর আক্রমণ এ দেশে এই প্রথম হল এমন নয়। একা বিজেপি সরকার এমন আক্রমণ করে তাও নয়। কিন্তু মনে রাখা ভাল, জরুরি অবস্থার সময়েও স্রেফ কোনো সংবাদমাধ্যমে লেখালিখি করেন বলে কাউকে আক্রমণ করার ঘটনা বিরল। সংবাদমাধ্যমের পাশাপাশি সমাজকর্মী, ইতিহাসবিদ, বিজ্ঞানীদের উপর একযোগে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস জরুরি অবস্থা ছাড়া অন্য সময়ে এ দেশে বিশেষ ঘটেনি। এর তুলনা নাজি জার্মানিতে বা ফ্যাসিবাদী ইতালিতে পাওয়া যেতে পারে। অবশ্যই এখনো কিছু লোক বেড়ার উপর বসে পা দোলাবে অথবা বলবে ‘নিশ্চয়ই কিছু করেছে। এমনি এমনি কি আর কারোর বাড়িতে পুলিস যায়?’ তাদের বাড়িতে পুলিস আসা কিন্তু সময়ের অপেক্ষা। বেগতিক বুঝলে আসন্ন সমস্ত নির্বাচন ভেস্তে দিতে কেবল বিরোধী রাজনীতিবিদ নয়, যে কোনো ধরনের বিরোধী স্বরকেই দেশদ্রোহে অভিযুক্ত করতে, উমর খালিদের মত বিনা বিচারে বছরের পর বছরে অন্ধকূপে ফেলে রাখতে কসুর করবে না এই সরকার। আমাদের যে কারোর বাড়িতেই সাতসকালে হাজির হতে পারে পেয়াদারা, বেড টি খাওয়ার আগেই।

নাগরিক ডট নেটে প্রকাশিত

অ্যাঙ্কর বয়কট আবশ্যিক কিন্তু পর্যাপ্ত নয়

বিজেপিবিরোধী সাংবাদিকরা বহুকাল ধরেই বিরাট মূল্য দিচ্ছেন, বিজেপির ধ্বজাধারীরাই বা দেবেন না কেন? যুক্তি দিয়ে বিচার করলে তো এই ১৪ জনকে সাংবাদিক বলে ধরাই যায় না।

আমাদের দেশের অলিখিত প্রাচীন নিয়ম – দূত অবধ্য। সাহেবরাও একই মেজাজে বলে থাকে – দূতকে গুলি করবেন না (Don’t shoot the messenger)। দুটো কথার পিছনে যুক্তিটা একই – দূত কোনো পক্ষের লোক নয়, অতএব তাকে প্রতিপক্ষ হিসাবে আক্রমণ করা অন্যায়। সে এক পক্ষের কাছে অন্য পক্ষের বার্তাবাহকমাত্র। ফলে সে নিরস্ত্রও বটে। কিন্তু ধরুন, একজন দূত প্রতিপক্ষের শিবিরে বার্তা দিতে ঢুকল ছত্রপতি শিবাজীর মত বাঘনখ পরে। বার্তা দেওয়ার নাম করে শিবিরে ঢুকে যিনি বার্তা নেবেন তাঁকে ক্ষতবিক্ষত করে দিয়ে চলে গেল। এরপর কি তার আর দূত হিসাবে ছাড় প্রাপ্য? একেবারেই নয়। সে যে ক্ষতি করল তা কিন্তু স্রেফ একজনকে খুন করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। তার এই আচরণের ফলে অন্য দূতেরাও বিপদে পড়বে, কারণ তাদের আর কেউ বিশ্বাস করতে পারবে না। ফলে দূতীয়ালি ব্যাপারটাই ক্ষতিগ্রস্ত হবে। ২০১৪ সালের পর থেকে (আসলে তার কিছু আগে থেকেই) ভারতের সাংবাদিকতা যেদিকে মোড় নিয়েছে তাকে এইভাবে দেখাই শ্রেয়। বেশিরভাগ মূলধারার সংবাদমাধ্যমের ভূমিকা হয়ে গেছে বাঘনখ পরা দূতের মত। ইদানীং অবশ্য দূত সেজে থাকার নাটকটুকুও ত্যাগ করেছে অনেক সংবাদমাধ্যমই, অথচ দূত হওয়ার সুবিধাগুলো নিয়েই চলেছে। এমতাবস্থায় ইন্ডিয়া জোট ১৪ জন অ্যাঙ্করের তালিকা প্রকাশ করেছে, যাদের শোতে এই দলগুলোর প্রতিনিধিরা যাবেন না। ওয়ার্ল্ড প্রেস ফ্রিডম ইনডেক্সে ভারতের স্থান যতই নেমে যাক, যত সাংবাদিকই গ্রেফতার হয়ে যান না কেন, এই অ্যাঙ্কররা কিন্তু দিনরাত দর্শকদের বলে থাকে ভারতের সব ক্ষেত্রেই দারুণ অগ্রগতি হচ্ছে। এমনকি গণতান্ত্রিক অধিকারের দিক থেকেও। সেই অ্যাঙ্কররাই এই তালিকা প্রকাশিত হওয়ার পর একে গণতন্ত্রের উপর আঘাত, বাকস্বাধীনতা হরণ ইত্যাদি আখ্যা দিচ্ছে। এরা অবশ্য রবীশ কুমার কথিত গোদি মিডিয়ার লোক। কিন্তু যাঁদের কেউ গোদি মিডিয়ার লোক মনে করে না, তেমন কয়েকজনও এই বয়কটের বিরোধিতা করেছেন। যেমন করণ থাপার, রাজদীপ সরদেশাই, সাগরিকা ঘোষ। সুতরাং ব্যাপারটাকে নানা দিক থেকে দেখা প্রয়োজন।

প্রথমেই নিরপেক্ষতার ধারণাটা পরিষ্কার হওয়া দরকার। আসলে কেউ নিরপেক্ষ নয়। সাংবাদিক দূরে থাক, ক্রিকেট খেলার আম্পায়ার পর্যন্ত নিরপেক্ষ নন। বোল্ড আর দিনের আলোর মত পরিষ্কার ক্যাচ আউট ছাড়া আর সব আউটের ক্ষেত্রেই ফিল্ডিং দল আম্পায়ারের কাছে আবেদন করে। তিনি আইন মেনে নিজের বিবেচনা মত আউট দেন, প্রয়োজনে অন্য আম্পায়ারের পরামর্শ নেন, কখনো বা প্রযুক্তির সাহায্য নেন। কিন্তু সিদ্ধান্ত এক দলের পক্ষে যায়, অন্য দলের বিপক্ষে। অর্থাৎ সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময়ে তাঁকে একটা পক্ষ বাছতেই হয়। বিশেষ করে লেগ বিফোর উইকেটের মত আউটের ক্ষেত্রে শেষ কথা বলে আম্পায়ারের ব্যক্তিগত মত। আগে এই মতের গুরুত্ব অনেক বেশি ছিল, এখন বিপুল পরিমাণ প্রযুক্তির ব্যবহারে অনেকখানি কমেছে। তবু দেখা যায়, অনেক ক্ষেত্রে প্রযুক্তিও শেষ কথা বলতে পারছে না। তখন টিভি আম্পায়ারের বিবেচনা অনুযায়ী সিদ্ধান্ত হয়। সেই সিদ্ধান্তের যৌক্তিকতা নিয়ে কেউ প্রশ্ন তুলতে ছাড়ে না, অনেকসময় পক্ষপাতদুষ্ট হওয়ার অভিযোগও ওঠে। ক্রিকেট খেলার দৃষ্টান্ত এই কারণেই দেওয়া, যে জীবনের মত ক্রিকেট খেলাতেও বহু জিনিস মানবিক বিবেচনার উপরেই শেষপর্যন্ত নির্ভরশীল। যেমন বৃষ্টি হওয়ার পরে মাঠ খেলার উপযুক্ত হয়েছে কিনা সেই সিদ্ধান্ত অন্তত এখন পর্যন্ত শুধুমাত্র দুই আম্পায়ারের বিবেচনার ভিত্তিতেই ঠিক হয়। যেখানেই এই অবকাশ আছে সেখানেই নিরপেক্ষতা বজায় থাকল কিনা তা নিয়ে সন্দেহের অবকাশ থাকে। এ তো গেল খেলার বিচারকদের কথা। একই কথা আদালতের বিচারকদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। একই আইনে একই মামলার বিচারে বিচারক বদলালে রায়ও বদলে যায় অনেক সময়। এমনটাই যে স্বাভাবিকতা আইনও তা বিশ্বাস করে। সেই কারণেই নিম্ন আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে উচ্চতর আদালতে আবেদন জানানোর ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। বিচারকের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুললে আদালত অবমাননার দায়ে পড়তে হয়, কিন্তু রায় নিয়ে প্রশ্ন তোলা আইনসম্মত। বিচারকের রায়ের যে ভালমন্দ আছে তাও সর্বজনস্বীকৃত। তাই রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন “…দণ্ডিতের সাথে/দণ্ডদাতা কাঁদে যবে সমান আঘাতে/সর্বশ্রেষ্ঠ সে বিচার।” এই বিচারে বিচারকের ব্যক্তিগত আদর্শ, মতামত – সবই প্রভাব ফেলে। ফেলতে বাধ্য। সুতরাং আক্ষরিক অর্থে নিরপেক্ষতা সোনার পাথরবাটি।

এ তো গেল বিচারকদের কথা। সাংবাদিকরা বিচারক নন, হওয়া অন্যায়ও বটে। খোদ সুপ্রিম কোর্ট সংবাদমাধ্যমের বিচারক হয়ে বসা নিয়ে অসন্তুষ্ট। সম্প্রতি প্রধান বিচারপতি ডি ওয়াই চন্দ্রচূড়ের নেতৃত্বাধীন তিন বিচারকের বেঞ্চ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রককে নির্দেশ দিয়েছে, পুলিস ব্রিফিং যেন মিডিয়া ট্রায়ালের সুযোগ না করে দেয় তা নিশ্চিত করতে হবে। সাংবাদিকদের বরং দূত হওয়ারই কথা। কার দূত? এই প্রশ্নের উত্তরটাই সম্পূর্ণ উলটে দেওয়া হয়েছে আজকের ভারতে।

ইন্ডিয়া জোটের তালিকায় যে ১৪ জন অ্যাঙ্করের নাম রয়েছে তাদের একজন রুবিকা লিয়াকত। তাকে পাশে দাঁড় করিয়ে ‘হিন্দি নিউজ’ চ্যানেলের সিইও জগদীশ চন্দ্র প্রকাশ্যে বলেছে, আমরা কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে নেই। কিন্তু আমরা দেশের জনপ্রিয় সরকারের পক্ষে আছি। কেন থাকব না? আজ দেশের প্রধানমন্ত্রী যদি গ্লোবাল লিডার হয়ে থাকেন, পৃথিবীর সবচেয়ে জনপ্রিয় নেতা বলে গণ্য হয়ে থাকেন, যদি অমিত শাহ ৩৭০ তুলে দিয়ে কাশ্মীরের পরিবেশ বদলে দিয়ে থাকেন… তাহলে তাঁকে অগ্রাহ্য করব কী করে? তাঁকে তাঁর জনপ্রিয়তা অনুযায়ী গুরুত্ব দিতেই হবে। দেশের উপর রাজত্ব করলে আমাদের নেটওয়ার্কের পর্দাতেও রাজত্ব করবেন। এ নিয়ে আমাদের কোনো দ্বিধা নেই। যাঁরা আমাদের গোদি মিডিয়া বলেন আমি তাঁদের খুব বিনীতভাবে বলছি, আমরা গোদি মিডিয়া নই। কিন্তু যা বাস্তব তাকে কী করে অস্বীকার করি? এই তো ২০২৪ নির্বাচন এসে গেল। কাল আপনারা সরকারে আসুন; প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হয়ে যান। কথা দিচ্ছি যতখানি কভারেজ আর লাইভ টেলিকাস্ট মোদী আর অমিত শাহের করেছি ততটাই আপনাদেরও করব।

অন্য এক অ্যাঙ্কর ‘আজ তক’ চ্যানেলের চিত্রা ত্রিপাঠী। সে এক টক শোতে উত্তরপ্রদেশ, মধ্যপ্রদেশে ইদানীং সোশাল মিডিয়ার সূত্রে বিপুল জনপ্রিয় ব্যঙ্গাত্মক গানের শিল্পী নেহা সিং রাঠোরকে ডেকে কেন তিনি বিজেপির মুখ্যমন্ত্রীদের ব্যঙ্গ করে গান করেন তা জিজ্ঞেস করেছিল। নেহা পালটা পক্ষপাতের প্রশ্ন তোলায় চিত্রা বলে, আপনি যাঁদের বিরুদ্ধে প্রশ্ন তোলেন তাঁরা কিন্তু ৫-৭ লাখ ভোটে জিতে ক্ষমতায় এসেছেন। জনগণ ভোট দিয়েছে, নিজের পকেট থেকে তো আর ভোট বার করেননি।

দুজনেরই বক্তব্য আসলে এক। যে জিতেছে তার পক্ষে আছি, তার পক্ষে থাকাই আমাদের কাজ। আসলে দুজনেই জানে, গণতন্ত্রে সংবাদমাধ্যমের হওয়ার কথা দর্শকের, অর্থাৎ নাগরিকদের, দূত। সেই ভানটা বজায় রাখার জন্যেই একজন যোগী আদিত্যনাথ আর শিবরাজ সিং চৌহান কত বড় ব্যবধানে জিতে এসেছেন তা উল্লেখ করেছে। অন্যজন বলেছে যারা জনপ্রিয় হবে তাদেরই কভারেজ দেব। এই ভানের সরটুকু আলাদা করে নিলে যা পড়ে থাকে তা হল, যে ক্ষমতায় থাকবে তার পক্ষেই থাকব। আমি তার দূত।

এই ভাবনাই ভারতের মূলধারার সংবাদমাধ্যমে সর্বব্যাপী হয়ে দাঁড়িয়েছে। গোদি মিডিয়া বলা যায় না যাদের, সেইসব সংবাদমাধ্যমের সম্পাদক ও প্রতিবেদকরাও অনেকে এরকমই মনে করেন। ক্ষমতার সমর্থনে দাঁড়ানো নয়, ক্ষমতাকে প্রশ্ন করাই যে সংবাদমাধ্যমের কাজ — তা বিস্মৃত। ভারতে একসময় ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ মাস কমিউনিকেশন, এশিয়ান কলেজ অফ জার্নালিজমের মত দু-একটা জায়গা ছাড়া কোথাও সাংবাদিকতা ও গণসংযোগ আলাদা করে পড়ানো হত না। গত কুড়ি বছরে ব্যাঙের ছাতার মত অসংখ্য প্রতিষ্ঠান তৈরি হয়েছে, সেখান থেকে বছর বছর পাস করে বেরিয়ে অনেকে সাংবাদিকও হচ্ছেন। অথচ দেখা যাচ্ছে প্রথাগতভাবে লেখাপড়া না করা সাংবাদিকদের আমলেই সাংবাদিকতার উদ্দেশ্য সম্পর্কে ধারণা ঠিক ছিল। এর পিছনে আসলে ক্লাসরুমের দায় তত নয়, যতটা পাস করে সকলে যেখানে কাজ করতে যায় তার। ডাক্তারির মত সাংবাদিকতাও সবটা শেখা হয় না ‘প্র্যাকটিস’ না করলে। সেখানেই গলদ। ডাক্তাররা তবু প্রাইভেট প্র্যাকটিস করতে পারেন। সাংবাদিকতায় প্রাইভেট প্র্যাকটিস বলে কিছু এখনো সেভাবে নেই। এতকাল উপায়ও ছিল না। আগে রবীশ কুমারের মত সাংবাদিককে চাকরি ছাড়তে হলে একেবারে চুপ হয়ে যেতে হত। কারণ অন্য কোনো সংবাদমাধ্যম জায়গা না দিলে নিজের সাংবাদিকতা লোকের কাছে পৌঁছে দেওয়ার উপায় ছিল না। এখন ইউটিউব চ্যানেল, টেলিগ্রাম চ্যানেল, ফেসবুক পেজ ইত্যাদি নানা ব্যবস্থা হয়েছে। ফ্রিলান্স সাংবাদিকতা আগেও ছিল, এখনো আছে বটে। কিন্তু সেই সাংবাদিকের কাজ প্রকাশ করতে রাজি এমন সংবাদমাধ্যম তো দরকার। সরকারবিরোধী কাজ করতে উৎসাহী ফ্রিলান্স সাংবাদিকদের ভরসা কিন্তু এখন বিকল্প সংবাদমাধ্যম। মূলধারার সংবাদমাধ্যমে তাঁদের জায়গা ক্রমশ কমে আসছে। আর কেউ যদি মূলধারার চাকুরে সাংবাদিক হন, তাহলে তিনি সত্যিকারের সাংবাদিকতা করতে চাইলেও পারবেন না। মালিকরা জগদীশ চন্দ্রের মত সরকারের সঙ্গে হাত মিলিয়ে বসে আছে। যেহেতু টিভি দেখেন অনেক বেশি মানুষ, সেহেতু ইন্ডিয়া জোট আপাতত অ্যাঙ্করদের বয়কট করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। কিন্তু এমন নয় যে খবরের কাগজের চিত্রটা একেবারে আলাদা।

এখানেই এসে পড়ে ইন্ডিয়া জোটের সিদ্ধান্তের সার্থকতার প্রশ্ন। সাংবাদিকের স্বাধীনতা আর সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা কিন্তু এক নয়। সাংবাদিক নিজের ইচ্ছানুযায়ী কাজ করতে পারেন না। আজকের ভারতে তো আরওই পারেন না। বহু সম্পাদক, প্রতিবেদকের চাকরি গেছে বিজেপির ঢাক বাজাতে রাজি না হওয়ায়। মাত্র কয়েকদিন আগে জানা গেছে এনডিটিভির ব্যুরো চিফ সোহিত মিশ্রের পদত্যাগের খবর। তাঁকে নাকি বলা হয়েছিল গৌতম আদানির সম্পর্কে অভিযোগ নিয়ে রাহুল গান্ধীর সাংবাদিক সম্মেলন ভেস্তে দিতে। তিনি রাজি হননি, তাই পদত্যাগ করতে হয়।

এই পরিস্থিতিতে আস্ত চ্যানেল বয়কট না করে শুধুমাত্র কয়েকজন অ্যাঙ্করকে বয়কট করে কী লাভ, সে প্রশ্ন তোলা সঙ্গত। কিন্তু বয়কটের সিদ্ধান্তটাই ভুল — এ কথা আদৌ বলা চলে না। কারণ একাধিক, যদিও ইন্ডিয়া জোট প্রকাশিত প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে কোনো কারণ নির্দিষ্ট করে বলা হয়নি। জোটের বিভিন্ন নেতা ব্যক্তিগতভাবে নানা কারণ দর্শিয়েছেন।

প্রথমত, এই চ্যানেলগুলোর প্রধান আকর্ষণ ওই অ্যাঙ্করদের ঘৃণা বর্ষণকারী তথাকথিত বিতর্ক সভা। সেখানে বিতর্ক হয় না, হয় অ্যাঙ্করের মদতে ভারতের সংখ্যালঘু এবং সমস্তরকম বিজেপিবিরোধী মানুষের প্রতি অবিরাম ঘৃণার চাষ। সে কাজে প্রয়োজন মত ভুয়ো খবর, নির্জলা মিথ্যাভাষণ – সবই ব্যবহার করা হয়। অ্যাঙ্করের যে বক্তব্য পছন্দ তার বিপরীতে যে মুখপাত্ররা বলতে আসেন তাঁদের প্রায় কিছুই বলতে দেওয়া হয় না। হয় ধমকে চুপ করিয়ে দেওয়া হয়, নয়ত তাঁর মত যে ‘অ্যান্টি-ন্যাশনাল’, ‘দেশদ্রোহী’, ‘জেহাদি’ তা চিৎকার করে বারবার বলা হয়। ফলে এই শোগুলোতে যাওয়ার যে যুক্তি রাজনৈতিক দলগুলো দেখিয়ে থাকে – নিজেদের মত জনপরিসরে জানানো – বিজেপিবিরোধীদের ক্ষেত্রে তা ভোঁতা হয়ে গেছে। এইসব শোতে যাওয়া মানে বরং বিজেপির সুবিধা করে দেওয়া। তার চেয়েও বড় কথা, ১৯৯০-এর দশকে আফ্রিকার দেশ রোয়ান্ডার গৃহযুদ্ধে রেডিও রোয়ান্ডা সংখ্যালঘু হুটুদের বিরুদ্ধে ক্রমাগত ঘৃণাভাষণ চালিয়ে তাদের যেভাবে অবমানবে পরিণত করেছিল টুটসিদের চোখে, ঠিক সেই কাজ এই অ্যাঙ্কররা করে চলেছে। সুতরাং এদের শোতে গিয়ে বসা মানে সেই কাজকে স্বীকৃতি দেওয়া, পরোক্ষে মদত জোগানো।

দ্বিতীয়ত, এই অ্যাঙ্করদের সঙ্গে অন্য সংবাদমাধ্যমের সাংবাদিকদের তো বটেই, ওই চ্যানেলগুলোরই আর পাঁচজন সাংবাদিকেরও তফাত আছে। এরা প্রত্যেকে মহার্ঘ মাইনে পায় এবং অনেকেই কোম্পানির ডিরেক্টর হয়ে বসেছে। অর্ণব গোস্বামী তো ‘টাইমস নাও’ চ্যানেলে এই অসভ্যতা চালিয়ে এত জনপ্রিয় হল যে নিজস্ব চ্যানেলই খুলে ফেলল। সুতরাং এরা নেহাত ঠেকায় পড়ে একপেশে সরকারি প্রচার চালায় না, ঘৃণাভাষণ দেয় না। বরং এরাই চ্যানেলের এজেন্ডা তৈরি করে। ফলে এদের ঘৃণা ছড়াতে বাধা দেওয়া যথেষ্ট না হলেও আবশ্যিক। বহু ভাসমান ভোটার এবং বিজেপিবিরোধী ভোটারও হাঁ করে এইসব চ্যানেল দেখে থাকেন। এই বয়কট তাঁদেরও এক প্রচ্ছন্ন বার্তা দেবে যে এই অ্যাঙ্কররা যা করে তা যথার্থ নয়, কারোর জন্যে ভাল নয়। এতে ভাসমান ভোটারদের কেউ কেউ হয়ত বিজেপির দিকে ঢলে পড়বেন, কিন্তু উলটোটাও ঘটবে। ইন্ডিয়া জোটের দলগুলোর সমর্থক যে ভোটাররা, তাঁদের উপর তো এই সিদ্ধান্তের স্পষ্ট প্রভাব পড়া উচিত।

তৃতীয়ত, এই বয়কট কোনোভাবেই সংবাদমাধ্যম বা সাংবাদিকের স্বাধীনতা হরণ নয়। এখানে কোনো সাংবাদিককে তার মতামতের জন্য চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হচ্ছে না, তাকে গ্রেফতার করা হচ্ছে না, খুন করা হচ্ছে না। এর প্রত্যেকটাই ভারতে প্রতিনিয়ত বেড়ে চলেছে বিজেপি আমলে (ইন্ডিয়া জোটের কোনো কোনো দলের শাসনে থাকা রাজ্যেও ঘটছে। খড়্গপুরের সাংবাদিক দেবমাল্য বাগচীর কথা স্মর্তব্য), অথচ তার বিরুদ্ধে কোনোদিন টুঁ শব্দ করেনি এই অ্যাঙ্কররা। সে না হয় তাদের স্বাধীনতা। কথা হল এই বয়কট সত্ত্বেও তারা শো চালিয়ে যেতে পারে, শুধু কয়েকটা রাজনৈতিক দল সেই শোয়ে অংশগ্রহণ করবে না। আপনার বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে কয়েকজন মাতাল চিৎকার করে আপনাকে, আপনার পরিবারকে অকথ্য গালিগালাজ করছে। আপনি যদি বাড়ির জানলা বন্ধ করে দেন, তাহলে মাতালরা কি বলতে পারে, বাকস্বাধীনতা হরণ করা হল? এ প্রসঙ্গে বাকস্বাধীনতার প্রশ্ন তোলা একইরকম হাস্যকর।

চতুর্থত, সরকার তথা বিজেপির বিজ্ঞাপনের লোভে এবং/অথবা সরকারি চাপে যেসব সংবাদমাধ্যম বিজেপির মুখ হয়ে দাঁড়িয়েছে তারা আর সাংবাদিকতার বিশেষ ছাড়গুলো দাবি করতে পারে না। কারণ সরকারবিরোধীদের সেই ছাড় এরা নিজেরাই দেয়নি। যে কোনো দেশে সরকারের দমনপীড়নের বিরুদ্ধে সংবাদমাধ্যমের অন্যতম প্রধান রক্ষাকবচ হল একতা। পাঠক/দর্শকদের অবাক লাগতে পারে, কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে বাম আমলে বর্তমানের সাংবাদিককে প্রশাসনের কেউ কিছু বললে গণশক্তির সাংবাদিকও বর্তমানের সাংবাদিকের পাশে দাঁড়াবেন – এটাই ছিল নিয়ম। সারা পৃথিবীতেই তাই হয়। ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর সাংবাদিক সম্মেলনে অপছন্দের প্রশ্ন করার জন্যে একজন সাংবাদিককে আক্রমণ করলে অন্য সব সাংবাদিক একজোট হয়ে তাঁর পাশে দাঁড়াতেন। প্রায় সব পেশাতেই এটাই নিয়ম। কারণ পেশাদারি প্রতিদ্বন্দ্বিতা যতই তীব্র হোক, নিজেদের মধ্যে একতা না থাকলে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো যায় না। আর সাংবাদিকতা করা মানেই রাষ্ট্রের ত্রুটিবিচ্যুতির দিকে আঙুল তোলা। ভারতে এই একতা কিন্তু যত্ন করে নষ্ট করেছে গোদি মিডিয়া। অর্ণবই প্রথম টাইমস নাওয়ের স্টুডিও থেকে সরকারবিরোধী খবর করে এমন চ্যানেলের অ্যাঙ্কররা পাকিস্তানের মদতপুষ্ট, শহুরে নকশাল – এমন সব অভিযোগ করতে শুরু করে। দর্শকরা মুসলমান, জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রী, রাহুল গান্ধী-সোনিয়া গান্ধী, কমিউনিস্ট ইত্যাদির মত ওইসব সাংবাদিকদেরও যেন ঘৃণা করে – এই কামনা অর্ণব সরাসরিই করত। তার পদাঙ্ক অনুসরণ করে অন্যান্য চ্যানেলের অ্যাঙ্কররাও। এখন ঝাঁকের কই হতে চাইলে চলবে কেন?

এবার একটু নিরপেক্ষতার বিচারে ফেরত আসা যাক। গোদি মিডিয়ার বিরুদ্ধে কথা বলতে গেলেই অনেকে বলেন, অন্য মিডিয়াগুলো নিরপেক্ষ নাকি? চাকরিজীবনে সিনিয়র সহকর্মীদের সঙ্গে বিজেপির সংবাদমাধ্যমকে করতলগত করা নিয়ে কথা বলতে গিয়ে দেখেছি, তাঁরা এর সপক্ষে যুক্তি খাড়া করেই রেখেছেন – “এসব চিরকালই হয়”। বস্তুত পৃথিবীর সমস্ত অন্যায়ই চিরকাল হয়। রামায়ণ-মহাভারত খুললেই তা টের পাওয়া যায়, কোনো প্রবীণ সাংবাদিকের প্রজ্ঞার প্রয়োজন নেই। ইদানীং অন্যায়ের কোন দিকটা নতুন তা চিহ্নিত করতে হয় এবং তার বিরুদ্ধে দাঁড়াতে হয়। নইলে ঝাড়ে বংশে বিনষ্ট হতে হয়।

গত কয়েক বছরে যা নতুন তা হল বিজেপির বিপুল আর্থিক ক্ষমতা। ইলেক্টোরাল বন্ডের সুবাদে বিজেপি যে টাকার পাহাড়ে বসে আছে তা ভারতের কোনো দল কখনো স্বপ্নেও ভাবতে পারেনি। এর প্রমাণ বিজেপির পার্টি অফিসের কলেবর থেকে শুরু করে তাদের নির্বাচনী প্রচারের জাঁকজমক – সবেতেই টের পাওয়া যায়। সেই টাকার ভাগ পাওয়ার জন্য, সরকারি বিজ্ঞাপনের জন্য, বিজেপির সঙ্গে খাতিরের সুবাদে নিজের অন্য ব্যবসাগুলোর শ্রীবৃদ্ধি করার জন্য সংবাদমাধ্যমগুলোর মালিকরা দিনকে রাত, রাতকে দিন করছেন। অর্থাৎ সাংবাদিকতায় দুর্নীতি প্রাতিষ্ঠানিক হয়ে দাঁড়িয়েছে। আগে কিছু সাংবাদিক দুর্নীতিগ্রস্ত হতেন বা বিশেষ কোনো দলের প্রতি পক্ষপাতদুষ্ট হতেন। মালিকেরও বিলক্ষণ পক্ষপাত থাকত। কিন্তু অন্তত বাজারের স্বার্থে, দর্শক/পাঠক ধরে রাখতে তাঁকে কিছুটা ভারসাম্য রক্ষা করে চলতে হত। একই সংবাদমাধ্যমে নানা দলের প্রতি পক্ষপাতদুষ্ট সাংবাদিক থাকতেন। তাঁদের মধ্যে আলাপ আলোচনা, ঝগড়াঝাঁটি, লেঙ্গি মারা, হাসিঠাট্টা সবই চলত। এই দ্বন্দ্বের ফলে দর্শক/পাঠক যা পেতেন তাতে শেষমেশ এক ধরনের সাম্যবিধান হত। তিনটে চ্যানেল দেখলে হয়ত একটা ঘটনাকে তিনরকম দেখাত। কিন্তু তা থেকে দর্শক সত্যের অনেক কাছাকাছি পৌঁছতে পারতেন। এখনকার মত সর্বত্র একই মিথ্যা বয়ান চলত না। কোনো দ্বন্দ্ব নেই বলেই আগে নিউজরুমগুলোকে মনে হত মাছের বাজার, এখন মনে হয় কল সেন্টার। দারুণ নিয়মানুবর্তী, দারুণ শান্তিপূর্ণ। শ্মশানের শান্তি। এই শান্তি যে সাংবাদিক ভাঙেন তাঁর চাকরি যায় বা তাঁকে চাকরি ছাড়তে হয়। যেমন রবীশ ছেড়েছেন, সোভিত ছেড়েছেন।

আগেই বলেছি কেউ নিরপেক্ষ নয়। আক্ষরিক অর্থে নিরপেক্ষ হওয়া প্রার্থনীয়ও নয়। কয়েকজন মানুষ মিলে একজনকে সাংবাদিকের চোখের সামনে পিটিয়ে মারল। সাংবাদিক যদি প্রতিবেদনে বলেন ‘এরা মেরে অন্যায় করেছে, তবে লোকটাও প্ররোচনা দিয়েছিল’, তাহলে তিনি তো আসলে খুনীদের পক্ষে দাঁড়ালেন। তাঁকে বলতেই হবে খুনীরা অন্যায় করেছে, কোনো প্ররোচনা থাকুক আর না-ই থাকুক। অর্থাৎ তাঁকে সত্যের পক্ষে দাঁড়াতে হবে, এক্ষেত্রে যার অর্থ হবে যে খুন হয়েছে তার পক্ষে দাঁড়ানো। এলবিডব্লিউ আবেদন নাকচ করে দেওয়ার সময়ে যেমন আম্পায়ার ব্যাটারের পক্ষের লোক হয়ে যান ক্ষণিকের জন্য। সুতরাং সংবাদমাধ্যম সত্যের পক্ষে দাঁড়াক – এটুকুই ন্যায্য দাবি। সংবাদমাধ্যম নিরপেক্ষ হোক – এ দাবি অর্থহীন। বিশেষত আজকের ভারতে সংবাদমাধ্যমকে পক্ষ নিতেই হবে এবং তার মূল্যও চোকাতে হবে। বিজেপিবিরোধী সাংবাদিকরা বহুকাল ধরেই বিরাট মূল্য দিচ্ছেন, বিজেপির ধ্বজাধারীরাই বা দেবেন না কেন? যুক্তি দিয়ে বিচার করলে তো এই ১৪ জনকে সাংবাদিক বলে ধরাই যায় না। তাদের নরেন্দ্র মোদীর গুণমুগ্ধ বলা যেতে পারে, সরকারের মুখপাত্রও বলা যেতে পারে। এগুলো তো গালাগালি নয়। এরা নিজেরা বা এদের চ্যানেলের মালিকরা নিজমুখেই তো অন্য সময় এগুলো বলে। এখন হঠাৎ রেগে যাওয়ার যুক্তি নেই। কিন্তু রেগে যাচ্ছে, এই বয়কটে জরুরি অবস্থার মানসিকতার প্রমাণ দেখা যাচ্ছে বলছে

আরও পড়ুন কর্ণাটক নির্বাচনের ফল: মিডিয়া, জিভ কাটো লজ্জায়

অর্ণবভক্তরা শুধু নয়, অর্ণবের শো দেখেন না এবং পছন্দ করেন না এমন অনেকেরও ধারণা এই বয়কটে অর্ণবের কোনো ক্ষতি নেই। কিন্তু তেমন হলে এ নিয়ে সে এত উত্তেজিত হত না। অর্ণব এবং তার দর্শকদের যে ধর্ষকাম মানসিকতা বিপক্ষের লোকেদের ডেকে এনে ধমকে তৃপ্তিলাভ করে, এই বয়কটের ফলে তাতে অসুবিধা হবে। ধর্ষকাম মানুষ কামনা চরিতার্থ না হলে কতটা রিপাবলিক টিভি দেখবেন তা নিশ্চিত নয়। টিআরপি পড়ে যেতে পারে। তা যদি না-ও হয়, কানাঘুষো যা শোনা যাচ্ছে তা যদি সত্যি হয় তাহলে ১৪ জন অ্যাঙ্করের চ্যানেলেরই সমূহ বিপদ। শোনা যাচ্ছে ইন্ডিয়া জোটের দলগুলো যেসব রাজ্যে আছে সেখানকার সরকারগুলো নাকি এই চ্যানেলগুলোকে বিজ্ঞাপন দেওয়া বন্ধ করে দিতে পারে। আগেও লিখেছি যে এখন সকালে যে কাগজটা হাতে পান সেটা আসলে আপনার কথা ভেবে তৈরি নয়, ওটা বিজ্ঞাপনদাতার রসিদ। কারণ কাগজ ছাপার খরচটুকুও আপনার দেওয়া কাগজের দামে ওঠে না। তেমনই টিভি চ্যানেলও চলে বিজ্ঞাপনদাতার টাকায়। সেখানে অতগুলো রাজ্যের সরকারি বিজ্ঞাপন আসা বন্ধ হয়ে গেলে টানাটানির সংসার হয়ে যাবে। অতএব অর্ণবের উত্তেজনার মধ্যে চাপা ভয়ও লুকিয়ে আছে।

তবে ইন্ডিয়া জোটের এই ব্যবস্থা সম্পর্কে কয়েকটা প্রশ্ন রয়েই যাচ্ছে।

১) এই কজন অ্যাঙ্করের বাইরে কি আর কেউ নেই যে একই দোষে দুষ্ট?
২) হিন্দি বাদে অন্যান্য আঞ্চলিক ভাষার চ্যানেল এবং তাদের অতি উদ্ধত, অপছন্দের মুখপাত্রকে “কে তুমি” বলে ধমকানো, অ্যাঙ্করদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার প্রয়োজন নেই?
৩) ভোটের আর ৭-৮ মাস বাকি। এখন এই ব্যবস্থায় কতটা আটকানো যাবে গণমাধ্যমে ঘৃণাভাষণ আর মিথ্যার বেসাতি?
৪) এই অ্যাঙ্করদের বাদ দিয়ে বিকল্প সংবাদমাধ্যমগুলোকে বেশি কভারেজের সুযোগ দেবে কি ইন্ডিয়া জোট? যেমন ধরা যাক, রবীশ কুমারের সঙ্গে একান্ত সাক্ষাৎকারে রাহুল গান্ধী।

বিকল্প পথের সন্ধান করতে না পারলে কিন্তু এই সদুদ্দেশ্যে নেওয়া সিদ্ধান্ত সফল হবে না। দেশের সংবাদমাধ্যমের ভোল পালটানোর কাজ শুরু হবে না।

নাগরিক ডট নেটে প্রকাশিত