এবার মোদীর পথের চেয়েও কঠিন গোদি মিডিয়ার পথ

লোকনীতি-সিএসডিএসের এক সমীক্ষার বিশ্লেষণ করতে গিয়ে যোগেন্দ্র যাদব ও তাঁর দুই সঙ্গী শ্রেয়স সরদেশাই, রাহুল শাস্ত্রী লিখেছেন যে গোদি মিডিয়া দিনরাত সরকারি প্রোপাগান্ডা না চালালে ২০২৪ নির্বাচন ২০০৪ সালের মতই হারতেন মোদী। সেই মিডিয়া কাল হঠাৎ পালটি খেলেই কি ক্ষমা করবেন ক্ষুব্ধ মানুষ?

শিং নেই তবু নাম তার সিংহ, ডিম নয় তবু অশ্বডিম্ব। তাহলে একটা নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের ও মতের প্রচার করা সংস্থাকে সংবাদমাধ্যম বলা যাবে না কেন? আলবাত যাবে। গণশক্তি অবশ্যই সংবাদমাধ্যম, জাগো বাংলা একই ধরনের আরেকটা সংবাদমাধ্যম। কিন্তু দুটোর কোনোটাই গোপন করে না যে তারা যথাক্রমে সিপিএম এবং তৃণমূল কংগ্রেসের মুখপত্র। ইদানীং গণশক্তির মালিকানায় কিছু পরিবর্তন আনা হয়েছে, ফলে কাগজটা আর সরাসরি পার্টির সম্পত্তি নয়। কিন্তু এখনও কাগজের সম্পাদক নির্ধারণ করে সিপিএমের রাজ্য কমিটি। সুতরাং এই ধরনের সংবাদমাধ্যমগুলোর পরিচয় নিয়ে কোনো সমস্যা নেই। সমস্যা অন্য আরেক ধরন নিয়ে। ভারতে গত এক দশকে এক ধরনের সংবাদমাধ্যম দেখা গেছে, যারা নিরপেক্ষ থাকার নাম করে চরিত্রহীন হয়ে গেছে। তাদের পরিচিতি আলাদা করতে রবীশ কুমার একখানা চমৎকার শব্দবন্ধ তৈরি করেছেন— গোদি মিডিয়া। অর্থাৎ মোদীর কোলে বসে থাকা মিডিয়া। সমস্যা তাদের নিয়ে। তাদের আর সংবাদমাধ্যম বলা চলে কিনা, তাদের সর্বশক্তিমান অ্যাঙ্করদের সাংবাদিক বলা চলে কিনা তা নিয়ে অনেকদিন ধরেই প্রশ্ন উঠছিল। ২০২৪ লোকসভা নির্বাচনে পরিষ্কার হয়ে গেল, এদের একটা বড় অংশ সীমানা পেরিয়ে এতদূর চলে গেছে যে আর ফিরে আসা অসম্ভব।

ইন্ডিয়া টুডে চ্যানেলের রাহুল কাঁওয়ালের কথাই ধরুন। ৪ জুন ভোটগণনা সবে আরম্ভ হয়েছে, পোস্টাল ব্যালট গোনা চলছে। তখনই রাহুল এক্সিট পোলের ফলের ভিত্তিতে বিরোধীদের বিরুদ্ধে এবং যাঁরা ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন সম্পর্কে প্রশ্ন তোলেন, তাঁদের বিরুদ্ধে বিষোদ্গার করতে শুরু করলেন। বললেন এই ধরনের লোকেরা ‘ডিলিউশনাল’। এরা কিছুতেই মানুষের রায় মেনে নেয় না, দশ বছর ধরে কিছুতেই মানতে রাজি নয় যে মোদী মানুষের মন জয় করেছেন। সকাল সকাল তাঁর অত চেঁচামেচির কারণ কী ছিল? তাঁর আশঙ্কা ছিল, ভোটের ফল বেরোবার পরেও সেই ধারা চলতেই থাকবে। কেন ছিল তা বোঝা শক্ত নয়। তিনি নিজের চ্যানেলের এবং অন্য সব চ্যানেলের বুথফেরত সমীক্ষাকেই ভোটের প্রকৃত ফল ধরে নিয়ে বসেছিলেন। কেন ধরলেন? একজন সাংবাদিকের তো বোঝার কথা এবং দর্শকদের বোঝানোর কথা, যে যে কোনো সমীক্ষাতেই ভুল থাকা সম্ভব। তার চেয়েও বড় কথা, মানুষ ভোট দিয়েছেন। তার গণনার ফলই নির্বাচনের ফল। বুথফেরত সমীক্ষাকে আসল ফল বলে ধরে নেওয়া ভোটারদের অপমান করাও বটে। রাহুল কম দিন সাংবাদিকতায় নেই। তাহলে এতগুলো ভুল করলেন কেন? আসলে সব সাংবাদিকই তো কোনো না কোনো দলের সমর্থক, কোনো না কোনো দলকে ভোট দেন। সেটা অন্যায়ও নয়। রাহুল অবশ্যই বিজেপি সমর্থক, তাই তিনি চাইছিলেন বিজেপি জিতুক। বুথফেরত সমীক্ষা সেটাই দেখিয়েছে বলে তাঁর বিশ্বাস হয়েছে। উত্তর-সত্যের যুগে তো বলাই হয়, সে তাই বিশ্বাস করে যা সে বিশ্বাস করতে চায়। কথা হল, সাংবাদিক হলে কিন্তু ব্যক্তিগত পছন্দটা প্রকাশ করা চলে না কাজ করার সময়ে। মতামত দেওয়ার জায়গা অবশ্যই আছে সাংবাদিকতায়। কিন্তু নির্বাচনের ফল নিয়ে উল্লাস করা বা দুঃখে শুয়ে পড়া তার মধ্যে পড়ে না। তার উপর নির্বাচন কমিশন এবারে যেভাবে ভোট পরিচালনা করেছে তাতে আপত্তি করার যথেষ্ট কারণ আছে। যে নির্বাচন কমিশন বহু দেরিতে ভোটদানের হার ঘোষণা করে বিরোধীদের চেঁচামেচির ফলে, তাতে দেখা যায় ভোটদান শতাংশের হিসাবে ভোট দেওয়ার দিনের চেয়ে ব্যাখ্যাহীনভাবে বেড়ে গেছে, তারপরেও ঠিক কত ভোট পড়েছে তা প্রকাশ করা হয় না— সেই কমিশনকে নিয়ে, তার পরিচালিত প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তো উঠবেই। বিজেপির রাজনৈতিক অ্যাজেন্ডা নিজের অ্যাজেন্ডা না হয়ে উঠলে কোনো সাংবাদিক এগুলো নিয়ে কেউ প্রশ্ন তুললে তাকে ‘ডিলিউশনাল’ বলতে পারেন না। বললে তিনি সাংবাদিক নন।

আবার ধরুন রজত শর্মা। ইন্ডিয়া টিভির সর্বেসর্বা এই সাংবাদিক গোদি মিডিয়ার অন্যতম বিখ্যাত মুখ। কথিত আছে যে মোদীর আমলে তাঁর সম্পত্তি নেতাদের থেকেও দ্রুত বেড়েছে। সেই রজত বিজেপির ফলাফলে এতই হতাশ যে একদিন লাইভ অনুষ্ঠানে কংগ্রেস মুখপাত্র রাগিণী নায়েককে রেগেমেগে খিস্তি দিয়ে বসলেন। কোনো সাংবাদিকের এত রাগ হয় না যে লাইভ অনুষ্ঠানে নেহাত স্বগতোক্তি হিসাবেও খিস্তি দিয়ে বসবেন। কিন্তু রজতের হল। স্পষ্টত সাংবাদিকতা আর তাঁর পেশা নেই। বিজেপির জয়-পরাজয়, বিজেপির আসন বাড়া-কমা রজতের সর্বস্ব হয়ে দাঁড়িয়েছে। এদের আর যা-ই হোক, সাংবাদিক বলা যায় না। এদের সংস্থাগুলোকেও সংবাদমাধ্যম বলা শক্ত।

ইন্ডিয়া টুডে গ্রুপের অরুণ পুরির মেয়ে কল্লি পুরি নির্বাচনের কিছুদিন আগেই ইন্ডিয়া টুডে কনক্লেভে বলেছিলেন ‘গণতন্ত্রে বিরোধী দলের ভূমিকা পালন করা মিডিয়ার কাজ নয়… গোদি মিডিয়া বা মোদী মিডিয়া বলে কোনো সংবাদমাধ্যমকে চিহ্নিত করা নেহাতই অন্যায়। দেশের বিরোধী পক্ষ যদি ছিন্নবিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়ে থাকে, তার জন্য মিডিয়াকে দায়ী করা যায় না। আমরা উল্টোদিকটাকে একইরকমভাবে দেখাব কী করে, যদি সেই পক্ষের অস্তিত্বই না থাকে? আমরা এই বক্সিং ম্যাচের দর্শক। খেলোয়াড় নই।’ দেশে বিজেপি ছাড়া এতগুলো দল থাকা সত্ত্বেও যখন কেউ বলে বিরোধী পক্ষের অস্তিত্বই নেই তখন সে যে আক্ষরিক ও প্রতীকী, দুই অর্থেই অন্ধ তা বলে দেওয়ার দরকার পড়ে না। এরকম অন্ধ মালিকের সংস্থাকে সংবাদমাধ্যম বলার কী যুক্তি থাকতে পারে?

উদাহরণের তালিকা লম্বা করার মানে হয় না। যে কোনো পাঠক আরও গোটা দশেক অ্যাঙ্কর আর চ্যানেলের নাম নিজেই বলে দিতে পারবেন, যারা সরাসরি ঘোষণা করে দিলেই পারত যে তারা বিজেপির প্রচারক। তাহলেই আর নিন্দা করার কোনো জায়গা থাকত না। কিন্তু ঘোষণা করে না, কারণ স্টক মার্কেটের দালালি ছাড়া আর কোনো দালালিই ঘোষণা করে করার জিনিস নয়। রিপাবলিক টিভি-র অর্ণব গোস্বামী অবশ্য ফল ঘোষণার দিন বারবার এনডিএর আসন বাড়লে উল্লাস করে বলছিলেন ‘আমরা…’। তবে উনি তো সর্বার্থে ব্যতিক্রম। সাধারণভাবে একটু রেখেঢেকে দালালি করতে হয়, নইলে অর্ধেক দর্শক/পাঠক হারাতে হয়। যেমন আনন্দবাজার পত্রিকা-র মালিক যত বড় পুঁজিবাদীই হোন না কেন, তিনি অবশ্যই চান তাঁর কাগজগুলো মার্কসবাদীরাও পড়ুক, তাঁর চ্যানেলগুলো মার্কসবাদীরাও দেখুক। ব্যবসায়ীর তো প্রধান লক্ষ্য মুনাফা করা, আর সব ধরনের দর্শক/পাঠক ধরতে না পারলে কমবে চ্যানেলের টিআরপি এবং কাগজের বিক্রি। তারই ভিত্তিতে আসে বিজ্ঞাপন, সেটাও কমে যাবে। বিজ্ঞাপন কমে গেলেই মুনাফাও কমে যাবে। তবে ভারতে বিজ্ঞাপনের একটা বড় অংশ হল সরকারি বিজ্ঞাপন। সেই বিজ্ঞাপনের জোরেই যে যেখানে ক্ষমতাসীন, সে সেখানকার সংবাদমাধ্যমকে নিয়ন্ত্রণ করে। বিজেপি এই খেলায় সবচেয়ে দড়। তাই তারা গোটা ভারত জুড়ে তৈরি করেছে গোদি মিডিয়া। উপরন্তু মুকেশ আম্বানি, গৌতম আদানি প্রায় সব সাবেকি মিডিয়া হাউসের আংশিক বা পূর্ণ দখল নিয়ে ফেলেছেন। ফলে সব ধরনের পাঠক/দর্শক ধরার তাগিদ গোদি মিডিয়ার নেই। তারা সোল্লাসে এক পক্ষের বয়ান প্রচার করে যাচ্ছে। কাল্লি পুরির বক্তৃতা বস্তুত সেকথা স্বীকার করা এবং সেটাকেই ন্যায়সঙ্গত বলে দেখানোর প্রয়াস।

আরও একটা কারণে নিরপেক্ষতার ভান করতে হয় ‘লেগ্যাসি মিডিয়া’-কে। ভারতে স্বাধীনতার পর থেকে ত্রুটিপূর্ণ হলেও সংসদীয় গণতন্ত্র বজায় আছে। নির্বাচনের পর নিয়মিত সরকার বদল হয়ে এসেছে শান্তিপূর্ণ উপায়েই। এমন একটা দেশে কোনো সংবাদমাধ্যম যদি নিজেকে সম্পূর্ণভাবে ক্ষমতাসীন দলের দূত হিসাবে প্রচার করে, তাহলে সরকার বদলে গেলে বিপদে পড়ার সম্ভাবনা আছে। পার্টি-মুখপত্রগুলোকে এমন বিপদে প্রায়শই পড়তে হয়। ত্রিপুরায় যেমন বিজেপি সরকার আসার পরে সিপিএমের মুখপত্র দেশের কথা বন্ধ করিয়ে দেওয়া হয়েছিল কিছুদিনের জন্য। পশ্চিমবঙ্গেও তৃণমূল সরকার গণশক্তিকে সরকারি বিজ্ঞাপন দেয় না। এমন ঝামেলায় কোন মূলধারার সংবাদমাধ্যম পড়তে চাইবে? তাই ধর্মেও আছি, জিরাফেও আছি পদ্ধতিতে চলে প্রায় সব সংবাদমাধ্যমই।

কিন্তু ২০১৪ সাল থেকে মিডিয়া হাউসগুলোর মালিক, সম্পাদকরা সেই কাণ্ডজ্ঞানটুকুও হারিয়েছেন। তাঁরা মোদীর যে অপরাজেয় ভাবমূর্তি তৈরি করেছেন তা নিজেরাই বিশ্বাস করতে শুরু করেছিলেন। ফলে সরকার বদলে গেলে কী হবে সে চিন্তা আর নেই। আবার এই কাণ্ডজ্ঞানহীনতাই তাঁদের মোদীর রাজনীতির ভাগীদার করে ফেলেছে। এখন মোদী হারলে তাঁদের সমূহ বিপদ। অতএব সর্বান্তকরণে মোদীকে জেতানোর চেষ্টা করতেই হয়। এবারের নির্বাচনের ফল সেই কারণেই কেবল বিজেপি বা আরএসএস নয়, গোদি মিডিয়ার জন্যেও ধাক্কা। মোদীর জনপ্রিয়তা যে নিম্নমুখী তা নির্বাচনের ফলই প্রমাণ করেছে। তার ফল গোদি মিডিয়ার উপর পড়া অনিবার্য, পড়তে শুরুও করেছে কয়েক বছর হল। সে কারণেই বিজেপিবিরোধীরা যেমন টিভির খবর দেখা ছেড়ে ধ্রুব রাঠি, রবীশ কুমার, পুণ্যপ্রসূন বাজপেয়ী, রাজীব রঞ্জনদের ইউটিউব চ্যানেল দেখতে শুরু করেছেন; তেমন বিজেপি সমর্থকদের মধ্যেও বিভিন্ন ইউটিউব চ্যানেল দেখার প্রবণতা বাড়ছে। উভয়পক্ষেই এই প্রবণতা আরও বাড়বে এবারের ন্যক্কারজনক বুথফেরত সমীক্ষার পরে।

আরও পড়ুন সরকারের কিছু দেশদ্রোহী দরকার, তাই নিউজক্লিক আক্রমণ

সংবাদমাধ্যমের আরও কিছু পরিবর্তনের লক্ষণ ইতিমধ্যেই দেখা গেছে। দেশের রাজনীতি কোন দিকে যায় তার উপর নির্ভর করবে এই লক্ষণগুলো অদূর ভবিষ্যতে আরও বড় হয়ে উঠবে কিনা। যেমন দিল্লির প্রেস ক্লাব অফ ইন্ডিয়া দেশের একাধিক সাংবাদিকদের সংগঠনের সঙ্গে মিলে সপ্তদশ লোকসভায় পাশ হওয়া নতুন টেলিকম আইন সম্পর্কে আপত্তি করার সাহস পেয়ে গেছে। এই আইনগুলো যে বাকস্বাধীনতার পরিপন্থী, বিশেষ করে বিকল্প সংবাদমাধ্যমের কণ্ঠরোধ করার উদ্দেশ্যে তৈরি, তা কিন্তু জানাই ছিল। অথচ এর আগে এমন সাহস এতগুলো সংগঠনের হয়নি। কাশ্মিরের বিভিন্ন সাংবাদিক বা নিউজক্লিক সম্পাদক প্রবীর পুরকায়স্থ গ্রেফতার হওয়ার সময়েও খুব বেশি সাংবাদিককে মুখ খুলতে দেখা যায়নি।

আজকাল গোদি মিডিয়ার কোনো কোনো অ্যাঙ্করও বেসুরো গাওয়ার সাহস পাচ্ছেন। ইন্ডিয়া টুডের রাজদীপ সরদেশাই বিজেপির চিৎকারসর্বস্ব মুখপাত্র সঞ্জু বর্মাকে সটান বলে দিচ্ছেন— এবার একটু গলা নামিয়ে কথা বলা শিখতে হবে। আপনাদের এখন আর ব্রুট মেজরিটি নেই। এবিপি নিউজের অ্যাঙ্করও বিজেপি নেতাকে লাইভ অনুষ্ঠানে ধমকে দিচ্ছেন। অষ্টাদশ লোকসভার প্রথম অধিবেশন শুরু হচ্ছে ২৪ জুন। নতুন প্রাণ পাওয়া বিরোধীরা যদি সরকারকে সংসদে কোণঠাসা করতে পারে, তাহলে মূলধারার সংবাদমাধ্যম নিজেদের সুর আরও বদলাতে বাধ্য হবে। মোদী সরকার যত দুর্বল হবে, তত ফাঁপরে পড়বে গোদি মিডিয়া। কারণ নিজেদের ভোল পাল্টে ফেলা শক্ত হবে। মানুষ বোকা নয়, মানুষ সবকিছু ভুলেও যায় না। একথা হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছেন মোদী। লোকনীতি-সিএসডিএসের এক সমীক্ষার বিশ্লেষণ করতে গিয়ে যোগেন্দ্র যাদব ও তাঁর দুই সঙ্গী শ্রেয়স সরদেশাই, রাহুল শাস্ত্রী লিখেছেন যে গোদি মিডিয়া দিনরাত সরকারি প্রোপাগান্ডা না চালালে ২০২৪ নির্বাচন ২০০৪ সালের মতই হারতেন মোদী। সেই মিডিয়া কাল হঠাৎ পালটি খেলেই কি ক্ষমা করবেন ক্ষুব্ধ মানুষ?

পুনশ্চ: ইন্ডিয়া জোটের নেতারা দাবি করছেন মোদী ৩.০ আসলে নড়বড়ে সরকার, যে কোনোদিন পড়ে যাবে। যদি তেমন হয় অথবা একেবারে ২০২৯ সালেই সরকার বদল হয়, তখন কিন্তু বিকল্প সংবাদমাধ্যমকেও পরীক্ষা দিতে হবে। কারণ শঠতা, কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের সঙ্গে গোপন আঁতাত, পেশাগত সুবিধাবাদ ও অযোগ্যতার দোষ যে বিকল্প সংবাদমাধ্যমে একেবারেই নেই— এমন বললে মিথ্যে বলা হবে। ফ্যাসিবাদবিরোধিতা আপাতত প্রাথমিক কর্তব্য। সেই সুযোগে অন্য অনেক ক্ষমতাবানের বিরুদ্ধে প্রশ্ন তোলার দায়িত্বও বিকল্প সংবাদমাধ্যম এখন এড়িয়ে যেতে পারছে। তখন কিন্তু আর তা করা চলবে না।

চার নম্বর প্ল্যাটফর্মে প্রকাশিত

নির্বাচনের ফলে হেরে গেছে দেশের অসাধু মিডিয়া

এই লেখা যখন লিখছি, ততক্ষণে প্রমাণ হয়ে গেছে যে মোদীর গ্যারান্টিতে খুব বেশি ভারতীয় নাগরিক বিশ্বাস করেননি। হিন্দুরাষ্ট্রের স্বপ্নেও খুব বেশি মানুষের গায়ে পুলক লেগে চোখে ঘোর ঘনায়নি। একাই তিনশোর বেশি এবং জোটে সাড়ে তিনশোর বেশি আসনের কৈলাস পর্বত থেকে ভোটাররা পরমাত্মা নরেন্দ্র মোদীকে টেনে নামিয়েছেন জোট রাজনীতির মাটিতে। তবে যেহেতু বিজেপি নেতৃত্বাধীন প্রাক-নির্বাচনী জোট ন্যাশনাল ডেমোক্র্যাটিক অ্যালায়েন্স (এনডিএ) ২৭২ আসনের বেশি পাচ্ছে, তাই হয়ত ফের মোদী তাঁর প্রিয় আসনে বসতে পারবেন। অবশ্য মোদী-অমিত শাহের ভয়ে যাঁরা এতদিন এনডিএতে ছিলেন, তাঁরা ভয় কমে যেতেই যদি কেটে পড়ার তাল করেন তাহলে অনেককিছু ঘটতে পারে। তা যদি না-ও ঘটে, বিজেপিই যে একক বৃহত্তম দল হয়েছে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। তাই একে তারা জয় বলে দাবি করতেই পারে, যতই তাদের তৈরি আলেখ্য স্পষ্টত প্রত্যাখ্যাত হয়ে থাক। কিন্তু এ লেখা ২০২৪ লোকসভা নির্বাচনে যারা হেরে ভূত হয়ে গেছে তাদের কথা বলার জন্যে। মূলধারার সংবাদমাধ্যম, বিশেষত জনপ্রিয় খবরের চ্যানেলগুলোর কথা বলছি।

২০১৪ সাল থেকে কারা গোদি মিডিয়া হয়ে গেছে তা আজ কাউকে নতুন করে বলে দেওয়ার দরকার নেই। যেসব সংবাদমাধ্যমকে সচরাচর ওই তালিকায় ফেলা হয় না, আজও নিরপেক্ষ বলেই মনে করেন বিজেপিবিরোধী দর্শকরা, তারাও গত এক-দেড় বছরে ভোল বদলেছে। গোদি মিডিয়ার হত্তাকত্তারা নিউজক্লিকের দিকে, অন্য বিকল্প সংবাদমাধ্যম ও সাংবাদিকদের দিকে সিবিআই, ইডিকে লেলিয়ে দিয়েছিলেন। তাঁদের নির্যাতনে উল্লসিত হয়ে নানা ষড়যন্ত্রের তত্ত্ব প্রচার করে আহ্লাদিত হয়েছিলেন। আর তথাকথিত নিরপেক্ষ সংবাদমাধ্যম প্রবীর পুরকায়স্থের মত সাংবাদিকদের সমর্থনে টুঁ শব্দ করেনি। বাংলায় তো রিপাবলিক বাংলা ছাড়া গোদি মিডিয়া নেই বলা হয়। নিন্দুকেরা বলে এখানে দিদি মিডিয়া আছে। তা সত্যি মিথ্যা যা-ই হোক, কোনো মিডিয়াই আর পাঁচটা গ্রেফতারির খবরের মত করে সংবাদটি পাঠক/দর্শকের কাছে পৌঁছে দেওয়ার বেশি তেমন কিছু করেনি। বাংলার স্বনামধন্য (অনেকের মত কিংবদন্তি) সাংবাদিকরা নিজেদের ব্লগে বা ভ্লগে, মায় ফেসবুক পোস্টেও এর প্রতিবাদ করেননি। সংবাদমাধ্যমের উপর রাষ্ট্রীয় আগ্রাসনের কালে নীরবতা অবশ্যই সম্মতির লক্ষণ। কারা নীরব ছিলেন মনে করে দেখুন। গোদি মিডিয়া সমেত তাঁদেরও উলঙ্গ করে দিল নির্বাচনের ফল, কারণ মাত্র তিনদিন আগে তাঁদেরই চ্যানেলে চ্যানেলে বুথফেরত সমীক্ষায় ৩০০-৪০০ আসন দিয়ে জিতিয়ে দেওয়া হয়েছিল মহামতি মোদীকে।

কেবল জিতিয়ে দেওয়া হয়েছিল বললে অবশ্য কিছুই বলা হয় না। বুথফেরত সমীক্ষা আর পাঁচটা সমীক্ষার মতই একটা সমীক্ষা মাত্র। তাতে ভুল হওয়ার সম্ভাবনা থাকেই। আজ যখন ইন্ডিয়া টুডের স্টুডিওতে অ্যাক্সিস-মাই ইন্ডিয়া সংস্থার প্রধান প্রদীপ গুপ্তা এসে নিজের পাহাড়প্রমাণ ভুলের ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে কেঁদেই ফেললেন, তখন রাজদীপ সরদেশাই, রাহুল কাঁওয়ালরা পরম স্নেহে তাঁর গায়ে হাত বুলিয়ে তাঁকে বোঝাচ্ছিলেনও বটে, যে মানুষ মাত্রেই ভুল করে।

কিন্তু মুশকিল হল, এর চেয়ে অনেক ছোট ভুলে টিভি চ্যানেলে বা খবরের কাগজে একজন সাংবাদিককে বিস্তর কৈফিয়ত দিতে হয়, লিখিত শোকজের জবাব দিতে হতে পারে, চাকরি পর্যন্ত চলে যেতে পারে। ২০২০-২১ সালে ভারতের যেসব সংবাদমাধ্যম করোনা অতিমারীর দোহাই দিয়ে কয়েক হাজার সাংবাদিককে ব্যবস্থা উদ্বৃত্ত ঘোষণা করে ছাঁটাই করেছিল, তারাই টাকা খরচ করে এইসব বুথফেরত সমীক্ষা করিয়েছে এবং প্রচার করিয়েছে। যে সাংবাদিকরা ছাঁটাই হয়েছিলেন, তাঁরা কেউই কখনো অ্যাক্সিস-মাই ইন্ডিয়ার প্রদীপ বা সি-ভোটারের যশবন্ত দেশমুখের চেয়ে বড় ভুল করেননি। করলে চাকরি আগেই যেত। অবশ্য যদি গুপ্তা, দেশমুখরা সত্যিই ভুল করে থাকেন।

একসঙ্গে সমস্ত বুথফেরত সমীক্ষাকারী সংস্থাই ভুল করতে পারে, যেমন ২০০৪ সালে করেছিল। আবার সব সংস্থা এক ভুলও করতে পারে। কিন্তু সব সমীক্ষাকারী সংস্থা একসঙ্গে একই ভুল করলে সেটা কাকতালীয় ঘটনা হিসাবে বড্ড বাড়াবাড়ি হয়ে যায়। বিশেষ করে সব সমীক্ষাতেই যদি স্রেফ কোথায় কটা আসন আছে সেই তথ্যে ভুল থাকে বা কোন দল কটা আসনে লড়ছে সেই তথ্যে ভুল থাকে। গোদি মিডিয়া অবশ্য সেখানেও থামেনি। প্রাক-নির্বাচনী মতামত সমীক্ষা বা বুথফেরত সমীক্ষা যে কোনোভাবেই নির্বাচনের ফল নয়, সেকথা বারবার করে দর্শকদের বলাই দস্তুর। অথচ এবারের বুথফেরত সমীক্ষায় ইন্ডিয়া জোট তথা কংগ্রেস গোহারান হারছে দেখানোর সঙ্গে সঙ্গে মোদী তৃতীয় মেয়াদে কী কী করবেন, ভারতকে কোন উচ্চতায় নিয়ে যাবেন – এসব গভীর আলোচনাও চালানো হয়েছে ঘন্টার পর ঘন্টা ধরে। আজ তক নেটওয়ার্কের বিখ্যাত গোদি অ্যাঙ্কর অঞ্জনা ওম কাশ্যপ রীতিমত নাকের পাটা ফুলিয়ে লাইভ অনুষ্ঠানে বলেছিলেন, তাঁদের মত বড় চ্যানেলে বিরোধীদের কোনো পরিসরই দেওয়া উচিত নয়।

এই সাংবাদিকের যে সাংবাদিকতা করা উদ্দেশ্য নয়, তার এর চেয়ে বড় কোনো প্রমাণ হয় না। লোকসভায় বিরোধীদের শক্তিবৃদ্ধির পর কী করবেন অঞ্জনা? সে তিনি ভাববেন, কিন্তু আমাদের ভুললে চলবে না যে অঞ্জনা বরং সরল বা বোকা বা উদ্ধত। তাই প্রকাশ্যে ওকথা বলেছেন। তাঁর চেয়ে চালাক চতুর সাংবাদিকরাও একই উদ্দেশ্যে কাজ করেন, তবে ভান করতে জানেন। গত এক দশকে ভারতের প্রায় প্রত্যেক সংবাদমাধ্যমের মালিক এই ধরনের মেধাহীন, অর্ধশিক্ষিত সাংবাদিকদেরই দায়িত্বপূর্ণ পদে উন্নীত করেছেন। সত্যিকারের সাংবাদিকদের হয় রবীশ কুমার বা পুণ্য প্রসূন বাজপেয়ীর মত নিজস্ব ইউটিউব চ্যানেল খুলতে হয়েছে, নয় মুখ বুজে পরিবার পরিজনের কথা চিন্তা করে ফ্যাসিবাদীদের হয়ে দিনরাত মিথ্যা প্রচারের কাজই করে যেতে হয়েছে। তৎসত্ত্বেও ভয়ে ভয়ে থাকতে হয়েছে, কখন মুনাফাখোর মালিকের মনে হয় – এত সাংবাদিক আমার দরকার নেই। শেষ দফার নির্বাচনের পরে তাঁর ইউটিউব চ্যানেলে আপলোড করা ভিডিওতে রবীশ বলেছেন যে চ্যানেলগুলোতে খরচ কমাতে রিপোর্টার যত কমানো হয়েছে, তত রমরমা হয়েছে অঞ্জনা জাতীয় অ্যাঙ্করদের। অর্থাৎ খবরকে এক ধরনের অসুস্থ বিনোদনে পরিণত করে মানুষের মন বিষিয়ে দেওয়া এবং সরকারকে, মোদীকে দোষগুণের অতীত এক সত্তা হিসাবে প্রতিষ্ঠা করার কাজই করে গেছে টিভি চ্যানেলগুলো। দিনরাত মোদীকে দেখানো, বিরোধীদের প্রায় না দেখানো, দেখালেও তাদের বক্তব্য এমনভাবে বিকৃত করা যাতে মোদীর সুবিধা হয় – এইসব কৌশল ইদানীং মোদীভক্তরাও বুঝে ফেলছিলেন। পুরাণে নির্মোক নৃত্যের কথা লেখা আছে, আজকাল যাকে বলা হয় স্ট্রিপটিজ। ভারতের মূলধারার সংবাদমাধ্যমের এক দশকব্যাপী এই স্ট্রিপটিজে কোমরে যে সরু অন্তর্বাসটুকু বাকি ছিল, সেটুকুও খুলে ফেলা হল এবারের বুথফেরত সমীক্ষায়।

আসল ফল যে অন্যরকম হবে, একথা প্রায় সব সাংবাদিক জানতেন। কিন্তু নিজের সংস্থার সাংবাদিকদের অভিজ্ঞতা ও নৈপুণ্যকে পাত্তা না দিয়ে বিপুল টাকা খরচ করে (নাকি অন্য কারোর অর্থানুকূল্যে?) এই বুথফেরত সমীক্ষাগুলো করিয়ে প্রকাশ করা হয়েছিল ১ জুন ২০২৪। অঞ্জনা, সুধীর চৌধুরী বা রাহুল কাঁওয়ালের মত অন্ধ সাংবাদিক ভেকধারীদের অবশ্য অভিজ্ঞতা বা নৈপুণ্য – কোনোটাই নেই। তাঁরা অত উপরে উঠেছেন মেধাহীন বদমাইশি নির্লজ্জভাবে করতে পারেন বলেই। ৪ জুন ২০২৪ কেবল প্রদীপ বা যশবন্ত নন, কেবল গোদি সাংবাদিকরাও নন, উদোম হয়ে গেলেন তাঁদের নিয়োগকারীরা। সবার চোখে ধরা পড়ে গেল, তাঁরা আসলে কিসের ব্যবসা করেন।

আরও পড়ুন সরকারের কিছু দেশদ্রোহী দরকার, তাই নিউজক্লিক আক্রমণ

তবে ও ব্যবসায় কিন্তু কেবল মার্কামারা গোদি মিডিয়াই যুক্ত তা নয়। যদি তা হত, তাহলে গত কয়েক মাসে তৃণমূল কংগ্রেসের সবেতেই দোষ দেখা এবং বিজেপির সবেতেই গুণ দেখা অতি বুদ্ধিমান সুটবুট পরা বাঙালি বাবু সুমন দে ওই বুথফেরত সমীক্ষা নিজের চ্যানেলে নিশ্চয়ই দেখাতে দিতেন না। মনে রাখবেন, সুমন দে-র মত বিভিন্ন চ্যানেলে সর্বেসর্বা যে অ্যাঙ্কররা আছেন তাঁরা প্রায় প্রত্যেকে কোম্পানির ম্যানেজমেন্টের অংশ। সাধারণ কর্মচারী নন। রাজদীপ সরদেশাইদের প্রজন্ম মাথার সব চুল পেকে গেলেও মুশাহারদের গ্রামে চলে যান খবর করতে। আজকের রাহুল কাঁওয়াল বা সুমন দে-রা রিপোর্টিং বলতে বোঝেন ঠান্ডা ঘরে বসে অমুক নেতা, তমুক নেতার সাক্ষাৎকার নেওয়া। অনেক ক্ষেত্রে সেই সাক্ষাৎকারে বিশেষ কিছুই করার থাকে না। কারণ আগেই স্থির করা থাকে যে প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার ভান করতে করতে আসলে নেতা আপন মনে শেক্সপিয়ারের চরিত্রের মত যা খুশি বলে যাবেন, সাংবাদিক ক্লাসের ফার্স্ট বয়ের মত মুখ করে শুনে যাবেন আর মাঝে মাঝে দন্তবিকাশ করে গল্প হলেও সত্যি ছবির ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়ের মত জানান দেবেন ‘থেমো না দাদা, বলে যাও। বড় ভাল বলছ।’

এ কাজ যে যত ভাল করতে পারে, মূলধারার সংবাদমাধ্যমে এখন তার তত দাম। সংসদে বিরোধীদের শক্তি বেড়ে যাওয়ায় এবার কিন্তু এই জাতের সাংবাদিকতা বিপদে পড়বে। কারণ দর্শকদের মধ্যে ইতিমধ্যেই ক্লান্তি এসেছে। সরকারভক্ত দর্শক/পাঠকরাও ইদানীং সেই কারণেই বিকল্প সংবাদমাধ্যম – অর্থাৎ ছোট-বড় ওয়েবসাইট, ইউটিউবার, ফেসবুকারদের দিকে ঝুঁকছেন। সরকারের শক্তি কমে যাওয়ার একটা মানে হল উলটো বয়ান শুনতে চাওয়া মানুষের সংখ্যা বেড়েছে। আরেকটা মানে হল, আগামীদিনে ওই সংখ্যা আরও বাড়বে। কেবল ময়ূখ ঘোষদের নয়, সুমন দে-দেরও সাবধান হওয়ার সময় বোধহয় এসে পড়ল।

নাগরিক ডট নেটে প্রকাশিত

কর্ণাটক নির্বাচনের ফল: মিডিয়া, জিভ কাটো লজ্জায়

কর্ণাটক নির্বাচন নিয়ে সাংবাদিকতা আজ কদর্যতার নতুন শৃঙ্গে আরোহণ করল বিজেপি হেরে যাওয়ায়। এর বিপদ দীর্ঘমেয়াদি।

কর্ণাটকের বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফল রাজনৈতিকভাবে নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু যেভাবে এই নির্বাচনের ফলাফল সম্প্রচারিত হতে দেখলাম টিভির পর্দায়, সাংবাদিক হিসাবে সেটা নিয়ে আলোচনা করাও আমার অসম্ভব গুরুত্বপূর্ণ মনে হল। ব্যাপারটার শুরু নির্বাচনের কয়েকদিন আগে থেকেই।

নতুন সহস্রাব্দের গোড়ায় এ দেশে চব্বিশ ঘন্টার খবরের চ্যানেলের ছড়াছড়ি হওয়ার পর থেকেই প্রাক-নির্বাচনী মতামত সমীক্ষা বা ওপিনিয়ন পোল এবং বুথফেরত সমীক্ষা বা এক্সিট পোলের বিপুল জনপ্রিয়তা। প্রাক-নির্বাচনী মতামত সমীক্ষা ভোটারদের প্রভাবিত করে কিনা বা এক দফা ভোটের পর টিভিতে বুথফেরত সমীক্ষা হলে পরের দফাগুলোয় যেখানে ভোটদান হবে সেখানকার ভোটদাতারা প্রভাবিত হন কিনা – এ নিয়ে একসময় বিস্তর বিতর্ক হয়েছে। ফলে এখন নিয়ম হয়ে গেছে, যে কোনো স্তরের নির্বাচনের ৪৮ ঘন্টা আগে থেকে প্রাক-নির্বাচনী মতামত সমীক্ষার ফল প্রকাশ করা যাবে না, আর শেষ দফার ভোটদান সমাপ্ত না হওয়া পর্যন্ত বুথফেরত সমীক্ষার ফলাফল প্রকাশ করা যাবে না। ভারতের সংবাদমাধ্যমগুলো গত কয়েক বছরে নিরপেক্ষতার ভান ত্যাগ করে ক্রমশ যত একচোখা হয়ে উঠেছে, তত এইসব সমীক্ষার বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। তা সত্ত্বেও গত ডিসেম্বর মাসেই সংসদে মন্ত্রী কিরেন রিজিজু জানিয়ে দিয়েছেন, এইসব সমীক্ষা নিষিদ্ধ করার কোনো পরিকল্পনা সরকারের নেই।

খুব ভাল কথা। গত দশ বছরে লোকসভা তো বটেই, বেশিরভাগ নির্বাচনের প্রাক্কালে মতামত সমীক্ষায় দেখা গেছে বিজেপি ভাল জায়গায় আছে, বুথফেরত সমীক্ষাতেও তাই। সবসময় যে সেইসব সমীক্ষার ফল মিলেছে তা নয়, সব নির্বাচনেও বিজেপি জেতেনি। কিন্তু ভুল কোন সমীক্ষায় না হয়? কোন দলই বা সব নির্বাচনে জেতে? ফলে নরেন্দ্র মোদীর সরকারের এইসব সমীক্ষা নিষিদ্ধ করতে চাওয়ার কারণও ছিল না। কিন্তু এবারে কর্ণাটক নির্বাচনের আগে একটা অন্যরকম প্রবণতা লক্ষ করা গেল। যেই দেখা গেল প্রাক-নির্বাচনী মতামত সমীক্ষাগুলোতে ক্ষমতাসীন বিজেপির হাল ভাল নয় বলে দেখা যাচ্ছে, অমনি চ্যানেলগুলো ওইসব সমীক্ষা নিয়ে হইচই করা বন্ধ করে দিল। কোন চ্যানেলের সমীক্ষায় কী পাওয়া গেছে তা নিয়ে খবরের কাগজগুলোও বিশেষ জায়গা খরচ করল না। অথচ কাগজের রাশিফলের কলাম অনেকে যেভাবে গেলে, সেইভাবে ভোটে কী হতে চলেছে তা নিয়ে অনুষ্ঠান হলেও লোকে বিলক্ষণ গেলে। কারণ ভবিষ্যৎ নিয়ে জল্পনা কল্পনা করতে প্রায় প্রত্যেকটা মানুষ ভালবাসে। অতএব টিআরপি আদায় করতে যে কোনো চ্যানেলের কাছে সমীক্ষাগুলো দারুণ লোভনীয়। তবু ঢাকঢোল পিটিয়ে সেগুলো নিয়ে প্রচার করতে দেখা গেল না। অথচ অতীতে খোদ বিজেপিকে দেখা গেছে বিজ্ঞাপন দিতে, যার বয়ান খানিকটা এইরকম – সমস্ত ওপিনিয়ন পোল বলছে আমরা জিতব। তাই আমাদেরই ভোট দিন। এবারে প্রায় কোনো প্রাক-নির্বাচনী মতামত সমীক্ষাকেই সেভাবে ব্যবহার করার সুযোগ ছিল না। তাই কি গোদা বাংলায় যাকে চেপে যাওয়া বলে, গোদী মিডিয়া তাই করতে শুরু করল?

এ সন্দেহ দৃঢ় হয় রায় দম্পতির হাত থেকে গৌতম আদানির করতলগত হওয়া এনডিটিভির কাণ্ড খেয়াল করলে। তারা ১০ মে ভোটদানের আগে দুদিন ধরে বিস্তারিত প্রাক-নির্বাচনী সমীক্ষার ফলাফল সম্প্রচার করল। তাতে ভোটাররা কোন ইস্যুকে প্রধান ইস্যু বলে ভাবছেন, কেন্দ্রীয় সরকারের কাজ সম্পর্কে মতামত কী, রাজ্য সরকারের কাজ সম্পর্কে কী ভাবছেন – এইসব গভীর প্রশ্ন ছিল। এমনকি মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে কত শতাংশ মানুষ কাকে দেখতে চান – এ প্রশ্নও ছিল। অথচ কে কত আসন পেতে পারে সেই হিসাবটাই দেখানো হল না।

আরও মজা হল গত বুধবার ভোটদানের পর সন্ধেবেলা। একমাত্র নিউজ নেশন-সিজিএস বুথফেরত সমীক্ষা নির্দিষ্ট সংখ্যা দিয়ে বলল, বিজেপি সংখ্যাগরিষ্ঠ হতে পারে ১১৪ আসন নিয়ে, কংগ্রেস পাবে ৮৬, জেডিএস ২১ আর অন্যরা তিন। আর কোনো সর্বভারতীয় সমীক্ষাই নির্দিষ্ট সংখ্যা বলতে রাজি হল না। “এত আসন থেকে অত আসনের মধ্যে পাবে” – এটাই দেখা গেল সকলের পছন্দের নীতি। তাতেও সমস্যা ছিল না। কিন্তু কংগ্রেস আর বিজেপি – দুই প্রধান পক্ষকে যে সংখ্যাগুলো দেওয়া হল, সেগুলোর কোনো সীমা পরিসীমা নেই। যেমন এবিপি নিউজ-সি ভোটার বলল বিজেপি পাবে ৬৬-৮৬ আসন আর কংগ্রেস ৮১-১০১। রিপাবলিক টিভি-পি মার্কের মতে বিজেপি ৮৫-১০০; কংগ্রেস ৯৪-১০৮। সুবর্ণ নিউজ-জন কি বাত বিজেপিকে দিল ৯৪-১১৭, কংগ্রেসকে ৯১-১০৬। টিভি ৯ ভারতবর্ষ-পোলস্ট্র্যাট বলল বিজেপি পাবে ৮৮-৯৮, কংগ্রেস ৯৯-১০৯।

সংখ্যাগুলোর দিকে একবার তাকিয়ে দেখুন। একটা দল ৯৪ আসন পাওয়া মানে তার বিরোধী আসনে বসা প্রায় নিশ্চিত, অন্যদিকে ১১৭ আসন পাওয়া মানে নিশ্চিন্ত সংখ্যাগরিষ্ঠতা। ছেলে পরীক্ষা দিয়ে এল, বাবা জিজ্ঞেস করলেন “কত পাবি?” ছেলে বলল “পাসও করতে পারি, ফেলও করতে পারি।” এ তো সেইরকম সমীক্ষা হয়ে গেল। একটা দল ৮৫ পেতে পারে, আবার একশোও পেতে পারে – একথা বলার জন্যে সমীক্ষা করার প্রয়োজন কী? এনডিটিভি নিজে কোনো সংস্থার সাহায্য নিয়ে এবারে বুথফেরত সমীক্ষা করেনি। এই সংখ্যাগুলো যখন বুধবার সন্ধ্যায় তাদের চ্যানেলে দেখানো হচ্ছিল, তখন বিজেপি মুখপাত্র দেশরতন নিগম সঙ্গত কারণেই বলেছিলেন “এবার দেখছি আমিও একটা পোল সার্ভে এজেন্সি খুলে ফেলতে পারি।”

চূড়ান্ত ফল এই সমস্ত সমীক্ষাকেই ভুল প্রমাণ করেছে। যখন এই লেখা লিখছি, তখন নির্বাচন কমিশনের ওয়েবসাইট বলছে কংগ্রেস ১১৭ আসনে জিতে গেছে, আরও ১৯ আসনে এগিয়ে। অর্থাৎ মোট ১৩৬। বিজেপি ৫৩ আসনে জয়ী, আরও ১১ আসনে এগিয়ে। অর্থাৎ মোট ৬৪। এছাড়া জেডিএস ১৮ আসনে জয়ী, আরও দুই আসনে এগিয়ে। গত কয়েক বছর ধরে এই সমীক্ষাগুলোর ভুলের পরিমাণ কিন্তু লাগাতার কমছিল। এমনকি পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার মত হাড্ডাহাড্ডি নির্বাচনের ফলাফল কোনদিকে যাবে তা সঠিকভাবে অনুমান করতে পেরেছিলেন অনেক সংস্থার সমীক্ষকই, দু-একটা সংস্থা আসন সংখ্যাও প্রায় নিখুঁতভাবে বলে দিয়েছিল। তাহলে কর্ণাটকে গিয়ে কি তাঁরা সকলে রাতারাতি সব দক্ষতা হারিয়ে ফেললেন? নাকি সমীক্ষকদের দেওয়া সত্যিকারের সংখ্যাগুলো মিডিয়া আমাদের দেখতেই দিল না প্রলোভনে বা ভয়ে?

কোনো সন্দেহ নেই যে বিজেপি পশ্চিমবঙ্গের ২০২১ সালের নির্বাচন জিততে চেয়েছিল। কিন্তু হারলেও তাদের পক্ষে ফলটা তো নেহাত খারাপ হয়নি। সেই প্রথম তারা এই রাজ্যে একক বিরোধী দল হিসাবে উঠে আসে। ২০১৬ বিধানসভার তুলনায় বিধায়কের সংখ্যা বেড়ে যায় ২৫ গুণেরও বেশি। ফলে হারলেও সেই ফলকে যে একাদশাবতার মোদীজির সাফল্য হিসাবে দেখানো সম্ভব হবে তা তো বিজেপির জানাই ছিল। কিন্তু লোকসভা নির্বাচনের এক বছরও যখন বাকি নেই, সেইসময় কর্ণাটকের মত বড় রাজ্যে প্রধানমন্ত্রী দিনরাত প্রচার করার পরেও কেবল ক্ষমতা খোয়ানো নয়, গোটা ষাটেক আসনে নেমে আসাকে যে কোনোভাবেই সাফল্য বলে প্রমাণ করা যাবে না – তা বোধহয় অমিত শাহের মত পাকা মাথার লোকেদের বুঝতে অসুবিধা হয়নি। তাই কি এত-থেকে-অত শাক দিয়ে মাছ ঢাকতে বলা হয়েছিল বৃহৎ পুঁজির মালিকানায় থাকা সর্বভারতীয় টিভি চ্যানেলগুলোকে?

ইন্দিরা গান্ধী আরোপিত জরুরি অবস্থা সম্পর্কে লালকৃষ্ণ আদবানির একটা উক্তি বিজেপি নেতারা কয়েক বছর আগে পর্যন্তও খুব আওড়াতেন। আদবানি বলেছিলেন “শ্রীমতি গান্ধী মিডিয়াকে নত হতে বলেছিলেন, মিডিয়া হামাগুড়ি দিয়েছিল।” ২০১৪ সাল থেকে মূলধারার মিডিয়া যেভাবে চলছে সে সম্পর্কে অধুনা মার্গদর্শকমণ্ডলীর সদস্য আদবানির মতামত আমরা জানি না। কিন্তু আজ ফল প্রকাশের দিন সর্বভারতীয় টিভি চ্যানেলগুলো যা করল, তাকে বোধহয় একমাত্র দণ্ডি কাটার সঙ্গে তুলনা করে চলে।

ব্যাপারটা শুরু হয়েছিল সকালের দিকেই। ইন্ডিয়া টুডের অ্যাঙ্কর রাহুল কাঁওয়াল কংগ্রেসের অফিসিয়াল হ্যান্ডেল থেকে টুইট করা একটা ভিডিও নিয়ে বেজায় আপত্তি করতে লাগলেন। কেন সেই ভিডিওতে রাহুল গান্ধীকে নায়কোচিতভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে? কেন লেখা হয়েছে “আমি অপরাজেয়। আমি আত্মবিশ্বাসী। হ্যাঁ, আজ আমি অপ্রতিরোধ্য।” ভিডিওটায় আপত্তিকর কী আছে তা কাঁওয়াল কিছুতেই বুঝিয়ে উঠতে পারছিলেন না, কিন্তু কী যেন খচখচ করে বিঁধছিল। সত্যি কথা বলতে, দেখে সেই বিশ্ববিদ্যালয়ের দিনগুলো মনে পড়ে যাচ্ছিল। ক্লাসের কোনো একটা ছেলের দিকে একাধিক মেয়ে মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকালে আমরা বাকিরা যেনতেনপ্রকারেণ প্রমাণ করার চেষ্টা করতাম তার মধ্যে বিশেষ কিছুই নেই – না রূপের দিক থেকে, না গুণের দিক থেকে। এও যেন সেই ব্যাপার।

যদিও কাঁওয়াল মোটেই আমাদের মত যৌন ঈর্ষায় ভুগছিলেন না। পর্দার নিচের দিকে তাকালেই দেখা যাচ্ছিল কংগ্রেস তখন ১২১, বিজেপি ৭৬। সংখ্যার উপর তো আর রাগ দেখানো চলে না, তাই গায়ের ঝালটা কংগ্রেস নেতাটির উপরেই ঝাড়ছিলেন তিনি। ব্যাপারটা আরও পরিষ্কার হল খানিক পরে যখন কংগ্রেস মুখপাত্র সুপ্রিয়া শ্রীনাতে অনুষ্ঠানে অতিথি হয়ে এলেন। কংগ্রেস কেন এগিয়ে বা আরও এগিয়ে নেই কেন, সেসব প্রশ্নে না গিয়ে কাঁওয়ালবাবুর বর্ষীয়ান সহকর্মী রাজদীপ সরদেশাই প্রবল বিক্রমে প্রশ্ন করলেন, কংগ্রেস কর্মীরা কেন পোস্টাল ব্যালট গণনার সময় থেকেই ঢাকঢোল পিটিয়ে নাচ করছিলেন। যেন তাতে বিরাট কিছু হেরফের হয়ে যাবে বা কোনো নির্বাচনী বিধি ভঙ্গ করা হয়েছে। কাঁওয়ালও সঙ্গত করলেন। সুপ্রিয়া পাল্টা আক্রমণে গিয়ে যা বললেন তার নির্যাস হল, নেচেছে বেশ করেছে। আপনাদের স্টুডিওতে তো সকাল থেকে শোকপালন চলছে বলে মনে হচ্ছে। এহেন আক্রমণের মুখে দুজনকেই ব্যাকফুটে যেতে হল। কিন্তু তাতে অনুষ্ঠানের গুণগত পরিবর্তন কিছু হয়নি। সারাদিন ধরেই নানাবিধ গ্রাফিক্স তুলে ধরে প্রমাণ করার চেষ্টা চলল যে বিজেপির এই হার তেমন বড় হার নয়। মাঝে মাঝে উত্তরপ্রদেশের পঞ্চায়েত, পৌরসভার নির্বাচনে বিজেপির সাফল্য তুলে ধরার চেষ্টাও করা হল। উপরন্তু দিন দুয়েক আগে লাইভ অনুষ্ঠানে যোগেন্দ্র যাদবের খোঁচা উপেক্ষা করে আগাগোড়া ইন্ডিয়া টুডে মল্লিকার্জুন খড়গে আর জেপি নাড্ডার ছবি ব্যবহার করে গেল। কংগ্রেস হারলে আর বিজেপি জিতলে যেভাবে রাহুল আর মোদীর ছবি ব্যবহার করা হয় তা এ দিন করা হল না।

রাজদীপ অবশ্য নিজেকে নিরপেক্ষ প্রমাণ করতে অত্যুৎসাহী হওয়ার ফল হাতেনাতে পেলেন কিছুক্ষণ পরেই, যখন বিজেপির আই টি সেলের সর্বেসর্বা অমিত মালব্য তাঁকে কুৎসিত ভাষায় অকারণে ব্যক্তিগত আক্রমণ করলেন।

কতটা বেহায়া এবং অসাংবাদিক হলে শাসক দলের মুখপাত্রের হাতে সহকর্মীর অমন অপমানে চুপ করে থাকা যায় কাঁওয়াল তা দেখিয়ে দিলেন। সেই তিনিই আবার বিকেলের দিকে সুপ্রিয়া যখন ফেরত এলেন, তখন পুরুষসিংহের মত গর্জন করে গেলেন “আজ কেন বলছেন না গণতন্ত্র মৃত? আজ কেন বলছেন না ইভিএমে গণ্ডগোল আছে?” অবশ্য ফ্যাক্ট চেকার মহম্মদ জুবেরের টুইট দেখে জানতে পারছি, বিজেপির পরাজয় থেকে নজর ঘুরিয়ে দেওয়ার জন্য আজ ওটাই গোদী মিডিয়ার বিশিষ্ট সাংবাদিকদের অন্তিম হাতিয়ার হিসাবে স্থির হয়েছিল।

এ তো গেল ইন্ডিয়া টুডের কথা। সাধারণত কোলাহল সবচেয়ে কম হয় বলে এখনো এনডিটিভি দেখে থাকি। প্রণয় রায়দের প্রস্থানের পর সেখানেও অন্য চ্যানেলের মত অত্যন্ত হাস্যকর কার্যকলাপ শুরু হয়েছে। আজ যেমন স্টুডিওর এক কোণে একজনকে কন্নড় খাবারদাবার তৈরি করতে দাঁড় করিয়ে দেওয়া হয়েছিল। পরিচিত মুখ বিষ্ণু সোম এবং আদানি আমলে নতুন যোগ দেওয়া দুই অপেক্ষাকৃত তরুণ সাংবাদিকের সঙ্গে বিশেষজ্ঞ বলতে যাঁরা ছিলেন, তাঁরাও কেবলই বোঝানোর চেষ্টা করছিলেন কেন এই হার বিজেপির পক্ষে রীতিমত সম্মানজনক। ব্যাপারটা একসময় এমন পর্যায়ে পৌঁছাল যে দুই তরুণ মুখের একজন ‘সিনিয়র জার্নালিস্ট’ শ্রীনিবাস রাজুকে বলেই ফেললেন “কংগ্রেস যখন হারে তখন তো আমাদের এক্সপার্টরা বলেন ‘ডেসিমেটেড’। আজ বিজেপি হারছে অথচ ‘তেমনভাবে হারছে না’ বলছেন কেন বলুন তো?” রাজু বলার চেষ্টা করলেন, তিনি কিছু বলছেন না। যা বলার ডেটাই বলছে। সামনে ল্যাপটপ নিয়ে বসা অ্যাঙ্কর বললেন “কই, ডেটা তা বলছে না তো!” বেচারির কাল সকাল পর্যন্ত চাকরিটা থাকলে হয়।

আরও পড়ুন রাজদীপের দ্বীপান্তর: নিরপেক্ষতার পুরস্কার?

এবং অর্ণব গোস্বামী। প্রিন্স অফ ডেনমার্ককে বাদ দিয়ে যেমন হ্যামলেট হয় না, ভারতীয় মিডিয়া আলোচনাও তেমনি এ গোঁসাইকে বাদ দিয়ে হয় না। তবে যে যা-ই মনে করুক, আমার মত স্বাধীন সাংবাদিকের বাড়িতে মাস গেলে কোনো রাজনৈতিক দলের দপ্তর থেকে মোটাসোটা প্যাকেট এসে তো পৌঁছয় না, ফলে কোন চ্যানেল রাখব আর কোনটা রাখব না সে সিদ্ধান্ত নিতে হয়। সারাক্ষণ গোঁসা করে থাকা গোঁসাইয়ের চ্যানেল পয়সা খরচ করে দেখার শখ আমার নেই। তাই রিপাবলিক নেটওয়ার্ক দেখি না। কিন্তু আজ অন্য সূত্র থেকে একটু-আধটু দেখতেই হল। দেখলাম তাঁর মেজাজ বরাবরের মতই সপ্তমে চড়ে যাচ্ছে যখন তখন, তবে সে চাপ বেশিক্ষণ নিলে শরীরের ক্ষতি হতে পারে ভেবেই হয়ত কভারেজ কখনো জলন্ধর লোকসভার উপনির্বাচন, কখনো পাকিস্তানের সঙ্কটে চলে গেছে তাঁর গোটা নেটওয়ার্কেই।

বাংলা চ্যানেলগুলোর কথা আর কী বলব? বছরে ৩৬৪ দিন তারা পশ্চিমবঙ্গ ছাড়া অন্যকিছুর খবর রাখে না। সেই কূপমণ্ডূকতা একদিনে কাটিয়ে উঠে কি আর জাতীয় হয়ে ওঠা যায়? এবিপি আনন্দে দেখলাম নানা ছুতোয় তৃণমূল কংগ্রেস এরপর কী করবে আর পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি কর্ণাটক থেকে কিছু শিখবে কিনা এই নিয়েই চিল চিৎকার চলছে। টিভি৯ বাংলা আরও এককাঠি সরেস। তারা বেশ বেলা পর্যন্ত পর্দায় সংখ্যাগুলো উপস্থাপন করা ছাড়া কর্ণাটক নির্বাচন নিয়ে কিছুই দেখাচ্ছিল না, ব্যস্ত ছিল অয়ন শীলকে নিয়ে। পরে দায়সারা সম্প্রচার শুরু হল। বাকি চ্যানেলগুলো দেখার আর প্রবৃত্তি হয়নি।

এত লম্বা লেখা পড়ে কেউ প্রশ্ন করতেই পারেন, আজ মিডিয়ার ভূমিকা নিয়ে আলাদা করে লেখার কী দরকার ছিল?

উত্তরে বলি, সংবাদমাধ্যমের নিরপেক্ষতা যে একটি সোনার পাথরবাটি তাতে সন্দেহ নেই। বড় অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক কারণগুলো বাদ দিলেও, সাংবাদিকরা মানুষ এবং কোনো মানুষ নিরপেক্ষ নয়। ফলে মানুষের সাংবাদিকতাও ১০০% নিরপেক্ষ হতে পারে না। সে কারণেই সমস্ত পেশার মত সাংবাদিকতাতেও কিছু নিয়মকানুন (যার পোশাকি নাম এথিক্স) মেনে চলা হয় চিরকাল। সেগুলোর সময়োচিত পরিবর্তনও ঘটে। কিন্তু অমৃতকালে ভারতের মূলধারার সংবাদমাধ্যম, বিশেষ করে সর্বভারতীয় টিভি চ্যানেলগুলো ন্যূনতম এথিক্স বিসর্জন দিয়ে এতটাই পক্ষ নিয়ে ফেলেছে যে বিশ্বাসযোগ্যতা বলে আর কিছু অবশিষ্ট নেই। উল্টে সাংবাদিকতার অর্থটাই সাধারণ দর্শকের কাছে উল্টে গেছে। এখন তাঁরা মনে করেন একজন সাংবাদিক অমুক দলের কোনো কাজের সমালোচনা করেছেন মানেই তিনি ওই দলের বিরোধী। পরে আবার একই দলের কোনো কাজের প্রশংসা করলে মনে করেন পালটি খেল, বা এতদিনে আসল চেহারা বের করল। এই অভিজ্ঞতা রাজদীপের মত স্বনামধন্য সাংবাদিক থেকে শুরু করে আমার মত চুনোপুঁটি – সকলেরই। কর্ণাটক নির্বাচন নিয়ে সাংবাদিকতা আজ কদর্যতার নতুন শৃঙ্গে আরোহণ করল বিজেপি হেরে যাওয়ায়। এর বিপদ দীর্ঘমেয়াদি। বহুদিন পরে জয়ী হওয়া দলের সদস্য, সমর্থকরা আজ নিশ্চিত হয়ে গেলেন যে মিডিয়া নামেই সাংবাদিকতা করে, এরা আসলে ক্ষমতাসীন দলের দালাল। অতএব কেন্দ্রীয় সরকারের জোয়াল ২০২৪ বা পরবর্তী যে সময়েই বিজেপি-আরএসএসের হাত থেকে বেরিয়ে যাক না কেন, নতুন যে দল ক্ষমতায় আসবে তারাও মিডিয়ার কাছ থেকে দালালিই দাবি করবে। একবার যে দালাল বলে প্রমাণিত হয়েছে তাকে তো আর সাংবাদিক বলে বিশ্বাস করা যায় না।

এই ক্ষতি সমস্ত সাংবাদিকের। তার চেয়েও বড় কথা, এই ক্ষতি গণতন্ত্রের।

নাগরিক ডট নেটে প্রকাশিত