সংবাদ, রিল, বিজ্ঞাপন: ঘেঁটে ঘ

বাজারের মাছ, মাংস বিক্রেতা এবং ছোট দোকানদাররা অনেকে ১৫ অক্টোবরের অপেক্ষা না করে এখন থেকেই নগদ ছাড়া জিনিসপত্র বেচা বন্ধ করে দিয়েছেন। অথচ এটা বাংলার কোনো সংবাদমাধ্যমের বিতর্কের বিষয় নয়।

‘গণতন্ত্রে রাজার জন্মদিন’। এই হল শনিবারের (১৯ সেপ্টেম্বর) গণশক্তির সম্পাদকীয় কলামের শিরোনাম। ঠিক তার আগের দিন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর আবির্ভাব দিবস উপলক্ষে দেশজুড়ে সরকারি পয়সায় যে মোচ্ছবটি করা হয়েছে তার এর চেয়ে সঠিক বর্ণনা দেওয়া সম্ভব নয়। অথচ সিপিএমের এই দলীয় মুখপত্র ছাড়া আর কোনো সংবাদমাধ্যম বুক ঠুকে এই কথাটা বলতে পেরেছে বলে দেখলাম না। বরং বড় বড় মিডিয়ার ওয়েবসাইটে শুক্রবার সারাদিন দেখা গেছে দেশের কোথায় কত লক্ষ প্রদীপ জ্বালিয়ে মানুষ মোদীজিকে আশীর্বাদ করেছেন। আনন্দবাজার ডট কমের এক ভিডিওতে দেখছিলাম, খোদ কলকাতায় ঘটা করে যজ্ঞ হচ্ছে। প্রবীণ কংগ্রেসি, থুড়ি তৃণমূলী, থুড়ি বিজেপি নেতা তথা রাজ্যের মন্ত্রী তাপস রায় স্বয়ং যজ্ঞের আগুনে চামচে করে ঘি ঢালছেন। গেরুয়া কেকেরও নাকি আয়োজন হয়েছিল। জন্মদিনের কেক পর্যন্ত গেরুয়া হতে হবে— এই বিধান কোন শাস্ত্রে দেওয়া আছে জানি না। অবশ্য কতকিছুই তো জানি না। পরিবারের জ্যেষ্ঠ ছোটদের জন্মদিনে আশীর্বাদ করেন জানতাম, এখন জানলাম পরিবারের জ্যেষ্ঠকেই আশীর্বাদ করতে হয় সবাই মিলে। অবশ্য এই মোচ্ছবের ফলে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী কতটা আশীর্বাদ কুড়োলেন আর কতটা অভিশাপ— তা নিয়ে সন্দেহ আছে। পরিচিত বিজেপি সমর্থকদের মধ্যেও উচ্ছ্বাসের প্রকাশ দেখলাম না। করোনা অতিমারীর সময়ে যাঁর এক কথায় পাড়াসুদ্ধ লোক থালা বাজিয়েছিল, তাঁর জন্মদিনে সরকারি উদ্যোগ সত্ত্বেও কেউ বাড়িতে প্রদীপ জ্বেলেছে চোখে পড়ল না। যেসব সরকারি কর্মচারীর রুটিরুজি নিয়ে টানাটানি পড়তে পারে প্রদীপ না জ্বালালে, তাদেরই দেখলাম প্রদীপ জ্বালিয়ে ছবি-টবি তুলে জিও ট্যাগ করে সোশাল মিডিয়ায় পোস্ট করতে। যদিও সোশাল মিডিয়ায় পোস্ট করাও নির্দেশের অন্তর্ভুক্ত ছিল কিনা জানি না। সেদিন সন্ধেবেলা বরং গেরুয়া পতাকা লাগানো একখানা টোটোতে উঠে টোটোচালকের মুখে এক রাশ অভিযোগ শুনলাম বিজেপি শাসন এবং এভাবে জন্মদিন পালন নিয়ে। শেষে তো তিনি প্রশ্ন তুলে বসলেন “এত কোটি টাকা খরচ করে যে জন্মদিন করা হচ্ছে, একটা গরিব মানুষের একটা মিষ্টি দেয়া হয়েছে? বড়দের হাতেও দিতে হবে না। দেশে এত মানুষ খেতে পায় না, তাদের বাড়ির বাচ্চাদের হাতে একটা করে এক টাকা দামের লজেন্স দিলেও বুঝতাম।” অথচ সংবাদমাধ্যমে এসব চেহারা উঠে আসছে না। তাদের চোখে তো সকলই শোভন, সকলই নবীন, সকলই বিমল। কিন্তু গোলমাল পাকিয়েছে হাতে হাতে ইন্টারনেট। বিবিসি নিজেদের সোশাল মিডিয়া হ্যান্ডেল থেকে পোস্ট করেছিল— মোদীকে তাঁর জন্মদিনে আপনি কী উপহার দিতে চান? উত্তরে বিস্তর গালিগালাজ আসতে শুরু করে। তখন বিবিসি পোস্টে লেখে— দয়া করে কুরুচিপূর্ণ ভাষা প্রয়োগ করবেন না। তাতেও চিঁড়ে ভেজেনি, অগত্যা বিবিসি ওই পোস্টের কমেন্টস সেকশন বন্ধ করে দেয়। অর্থাৎ জন্মদিন পালন ঠিক পরিকল্পনামাফিক এগোয়নি। অথচ চেষ্টার ত্রুটি ছিল না। মালদা টাইমসের ক্যামেরায় ধরা পড়েছে যে, ভূতনির চরে বানভাসি মানুষের হাতে ত্রাণ তুলে দেওয়ার আগে তাঁদের দিয়ে বার্থডে বয়ের নামে জয়ধ্বনি করানো হয়েছে।

মালদা টাইমস নামটা শুনে আবার ভারতবিখ্যাত টাইমস গ্রুপের কোনো সংবাদমাধ্যম বলে ভেবে বসবেন না। দুয়ের মধ্যে কোনো সম্বন্ধ নেই, থাকলে অমন একখানা খবর কখনো তারা প্রচার করত না। আজকের ভারতে তথা বাংলায়, ততক্ষণই ক্ষমতাসীনের পক্ষে অপ্রীতিকর খবর প্রচার করা চলে, যতক্ষণ সংবাদমাধ্যমটি ক্ষুদ্র বা অতি ক্ষুদ্র। অবশ্য কোন খবর অপ্রীতিকর তা ঠিকও হয় ক্ষমতাসীনের মর্জি অনুযায়ী। ভূতনির কাণ্ড যেহেতু লুকিয়ে চুরিয়ে করা হয়নি, সেহেতু মনে করা অন্যায় নয় যে ও কাজ লুকোনো সরকারের উদ্দেশ্যও ছিল না। বরং পশ্চিমবঙ্গের মন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পালের মত বুক ফুলিয়ে সকলকে দেখিয়ে কাজ করাই হয়ত শুভেন্দু অধিকারীর সরকারের পন্থা। যদিও তাঁর কাজ খুব জনপ্রিয় হচ্ছে বলে মনে হয় না, যদি না তিনি জনপ্রিয় হওয়া বলতে মিম ও রিলের বিষয়বস্তু হয়ে যাওয়া বোঝেন। ইনস্টাগ্রাম বা ফেসবুকের রিলে যে মানুষদের দেখা যাচ্ছে, তাঁদের বেশভূষা যদি শ্রেণির পরিচায়ক হয় তাহলে বলতে হবে যে পশ্চিমবঙ্গের মধ্যবিত্ত বা গরিব, কেউই খুশি নন মন্ত্রীর কর্মকাণ্ডে। কিন্তু আজ এই তালিকা, কাল ওই তালিকা থেকে বাদ পড়ে যাওয়ার ভারতে, যেখানে নাগরিক সরকারকে বেছে নেন না, সরকার নাগরিককে বেছে নেন, সেখানে মন্ত্রীসান্ত্রীদের উপর রুষ্ট হলে তাঁদের নিয়ে হাসাহাসি করা ছাড়া কী-ই বা করতে পারে সাধারণ মানুষ? তাই চতুর্দিক ভরে গেছে অগ্নিমিত্রাকে নিয়ে তৈরি মিম আর রিলে। একটায় যেমন দেখলাম— প্রথম শটে কয়েকটি ছেলে রাস্তা দিয়ে হেঁটে আসছে। পরের শটে মেগাফোন নিয়ে তিনি বলছেন “রাস্তা দিয়ে হাঁটবেন না”। তৃতীয় শটে ছেলেগুলি রাস্তা ছেড়ে ব্রিজের রেলিংয়ের উপর দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে। বাগেশ্বর বাবার বিরুদ্ধে কথা বললে গ্রেফতার করার নির্দেশ দিয়েছিলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। এখন পর্যন্ত তাঁর মন্ত্রিসভার সদস্যদের নিয়ে রিল বা মিম বানানো/শেয়ার করার জন্য গ্রেফতারির আদেশ নেই ভাগ্যিস! নইলে পশ্চিমবঙ্গের হাজতগুলোতে জায়গা কম পড়ে যেতে পারে।

আজকাল অবশ্য কোনটা রিল, কোনটা খবর আর কোনটা বিজ্ঞাপন তা বোঝা দায়। যেমন গত কয়েক দিনে সাধারণ মানুষের মধ্যে যে সরকারি ঘোষণা নিয়ে সর্বাধিক চাঞ্চল্য দেখা দিয়েছে তা হল ইউপিআই পেমেন্টের উপরে মাশুল বসা। সরকার বারবারই বলছে, এ নিয়ে ক্রেতা/উপভোক্তাদের চিন্তা করার কিছু নেই। তাঁদের পকেট থেকে একটি টাকাও খসবে না, ও টাকা দেবেন ব্যবসায়ীরা। তাও লেনদেন দু হাজার টাকার বেশি হলে তবেই। কিন্তু রাস্তাঘাটে কান পাতলে দেখা যাচ্ছে, সাধারণ মানুষ ব্যাপারটা নিয়ে খুশি নন। কিছুতেই আশ্বস্ত হচ্ছেন না। বাজারের মাছ, মাংস বিক্রেতা এবং ছোট দোকানদাররা অনেকে ১৫ অক্টোবরের অপেক্ষা না করে এখন থেকেই নগদ ছাড়া জিনিসপত্র বেচা বন্ধ করে দিয়েছেন। অথচ এটা বাংলার কোনো সংবাদমাধ্যমের বিতর্কের বিষয় নয়। জাতীয় স্তরের গোদি মিডিয়া তবু এ নিয়ে আলোচনা করেছে, ইন্ডিয়া টুডে টিভির লাইভ অনুষ্ঠানে পেমেন্টস পার্টনার কোম্পানি ভারতপে-র প্রতিষ্ঠাতা ও প্রাক্তন ম্যানেজিং ডিরেক্টর অশনীর গ্রোভার সরকারকে তুলোধোনা করেছেন। সাত তাড়াতাড়ি ভারতপে-র বর্তমান সিইও নলিন নেগি বলে দিয়েছেন যে তাঁরা নতুন নিয়মের পক্ষে। ভারতপে-র মুখপত্র আরও এক ধাপ এগিয়ে বলেছেন— ওসব অশনীরের ব্যক্তিগত মতামত, ওর সঙ্গে ভারতপে-র কোনো সম্পর্ক নেই। অর্থাৎ সমাজের উপর থেকে নিচ পর্যন্ত মানুষ ইউপিআই পেমেন্টের উপর খরচ চাপা নিয়ে অসন্তুষ্ট। এই অসন্তোষ বাংলার সংবাদমাধ্যম সযত্নে এড়িয়ে গেলেও সরকার পাতা জোড়া বিজ্ঞাপন দিয়েছেন শনিবারের কাগজে। সরকার মানে রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা ন্যাশনাল পেমেন্টস কর্পোরেশন অফ ইন্ডিয়া, সঙ্গী হয়েছে ভারতের ডিজিটাল পেমেন্ট বাস্তুতন্ত্রে উপস্থিত নন-ব্যাংকিং কোম্পানিগুলোর সংগঠন পেমেন্টস কাউন্সিল অফ ইন্ডিয়া। তাতে আপ্রাণ চেষ্টা করা হয়েছে প্রমাণ করার, যে ইউপিআই পেমেন্টের জন্য ব্যবসায়ীদের মাশুল দিতে হলে তা নাগরিকদের জন্য ভালো। এ কাজ নাকি করা হচ্ছে আরও বেশি মানুষ যাতে ইউপিআই ব্যবহার করেন তারই জন্য। হিসাবও দেওয়া হয়েছে— এই ১২০ কোটি মোবাইল ব্যবহারকারীর মধ্যে মাত্র ৫৬.৫ কোটি ইউপিআই ব্যবহার করেন। অর্থাৎ ভাবুন, সংবাদমাধ্যম এই সরকারি সিদ্ধান্তের খবর দিয়েছে, তাতে মানুষের প্রতিক্রিয়া তুলে ধরেনি, অথচ সরকারের বয়ানটা বিজ্ঞাপন হিসাবে তুলে ধরে লক্ষ লক্ষ টাকা কামিয়ে নিল। কোন কোন কাগজ ছেপেছে এই বিজ্ঞাপন? আমার চোখে একটা কাগজই পড়েছে— সিপিএমের মুখপত্র গণশক্তি। জানি না এবিপি গ্রুপের ভাগ্যে শিকে ছেঁড়েনি কেন। এখনো ‘গেরুয়া গুন্ডামি’-র প্রভাব কাটেনি কি? গণশক্তির একই সংস্করণের ছ নম্বর পাতায় খবর হিসাবে এ ব্যাপারে সরকারের দাবি কী তা লেখা হয়েছে, সঙ্গে বিশ্লেষকরা যে একে অর্থনীতির মৌলিক নিয়মের পরিপন্থী বলছেন, তা-ও লেখা হয়েছে।

আরও দেখুন গিলি গিলি গে: মোদী ম্যাজিক বলতে যা বোঝায়

যা দিনকাল, তাতে মমতা ব্যানার্জির তৃণমূল কংগ্রেসের হাত থেকে প্রতীক কেড়ে নেওয়া এবং কংগ্রেস প্রার্থীকে পুরনো মামলায় গ্রেফতার করে নন্দীগ্রামের উপনির্বাচনকে বিরোধীশূন্য করে দেওয়ার প্রয়াসকে যে বাংলার প্রায় সব সংবাদমাধ্যমই সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়েছে, তাতেই আমাদের আপ্লুত হওয়া উচিত। কে এতে উল্লাস করল আর কে সাংবিধানিক অন্যায় বলে চিহ্নিত করল তা নিয়ে না ভাবাই ভালো। পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতি বহুকাল ধরেই আবর্তিত হচ্ছে এক লাইনের একটা নীতির উপর ভিত্তি করে— আমার যে বিরোধী তার প্রতি অন্যায় করা হলে সেটা অন্যায় নয়। আমার প্রতি করা হলে তবেই অন্যায়। এই নীতি নিয়ে কংগ্রেস চলেছে, মমতা ব্যানার্জি চলেছেন সেই আটের দশক থেকে, সিপিএম চলেছে এবং চলছে, বিজেপি তো চলেই। কোনো রাজ্যের বা দেশের সংবাদমাধ্যম তার রাজনৈতিক ধারার একেবারে বিপরীতে চলে না। কারণ সংবাদমাধ্যম একই বাস্তুতন্ত্রের অংশ।

a2onuswor.com ওয়েবসাইটে প্রকাশিত

সংবাদ ও সংবাদমাধ্যমে যা দেখি নতুন লাগে

“ধর্ম যার যার উৎসব সবার” বলার মধ্যে ভদ্রলোকি ভণ্ডামি আছে নিশ্চিত। কারণ ঈদকে হিন্দু বাঙালি একই যুক্তিতে উৎসব হিসাবে পালন করে না। তা বলে একটা উৎসবকে যে যা খুশি নামে ডাকতে পারবে না, যেমনভাবে খুশি পালন করতে পারবে না— এরকম রাষ্ট্রীয় নির্দেশ নেহাত গা-জোয়ারি।

একদা এক বিখ্যাত সাংবাদিকের অধীনে কাজ করতাম, ধরা যাক তাঁর নাম লোকুবাবু। লোকুবাবুর একটা অদ্ভুত অভ্যাস ছিল। তিনি হঠাৎ হঠাৎ রাগের মাথায় একেকটা শব্দ নিষিদ্ধ করে দিতেন। মানে ধরুন, তাঁর মনে হল comeback শব্দটা বড্ড বেশি ব্যবহার করা হচ্ছে সেই কাগজের শিরোনামে। অমনি একদিন অফিসের ছাদ ফাটিয়ে ঘোষণা করতেন “Comeback is banned.” এমন করতে করতে হয়ত কোনোদিন দেখা যেত win কথাটা নিষিদ্ধ, মানে লেখা বারণ। খবরের কাগজের খেলার পাতায় সে কী বিপত্তি!

পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর ‘শারদোৎসব’ শব্দটা নিষিদ্ধ করে দেওয়া দেখে তাই স্মৃতিমেদুর হয়ে পড়লাম। স্মৃতিমেদুরতা খুব বিপজ্জনক জিনিস। স্মৃতিমেদুরতার চশমা পরে দেখলে অ্যাডলফ হিটলারকেও উত্তমকুমার অভিনীত ভালো ছেলেদের মত মনে হয় অনেকসময়। উপরন্তু স্বৈরাচার বা ফ্যাসিবাদের সঙ্গে সময়ের দূরত্ব তৈরি হলে তাকে আর তত ভয়ঙ্কর লাগে না, বরং “কেমন কড়া লোক ছিল” বলে প্রশংসা করতেও মন চায় অনেকের। অতএব চারপাশটা স্মৃতিমেদুরতার চশমা খুলেই দেখা ভালো। সেভাবে দেখলে লোকুবাবুর এই খুঁতখুঁতেমি আর মজাদার লাগে না, স্বৈরাচার বলে স্পষ্ট চেনা যায়। কারণ একটা ভাষা তৈরি হয় বহু প্রজন্ম ধরে কয়েক কোটি মানুষের যৌথ প্রয়াসে। সেই ভাষার বহুল ব্যবহৃত একটা শব্দকে কোনো ব্যক্তি, তিনি যত ক্ষমতাবানই হোন না কেন, হঠাৎ এক ঘোষণায় নিষিদ্ধ করে দিতে পারেন না। ক্ষমতার চোখরাঙানিতে ভয় পেয়ে যদি বা মানুষ লেখা বন্ধ রাখে, মুখে মুখে শব্দটা চালু থাকবেই। ঠেকায় কার সাধ্যি? এ আসলে কেবল একটা ভাষার উপর সন্ত্রাস নয়, সেই ভাষাভাষী মানুষের সংস্কৃতির উপর আক্রমণ। লোকুবাবুর সমর্থনে তবু বলা যেতে পারে— কাগজের পাতার শিরোনামে একই শব্দের বারবার ব্যবহার আটকানো তাঁর কর্তব্য। কিন্তু যখন কোনো নির্দিষ্ট শব্দকে নিষিদ্ধ করার কাজটা করেন রাজ্যের প্রশাসনিক প্রধান, আর যে শব্দটা নিষিদ্ধ করেছেন সেটা এমন এক উৎসবের নাম যেটা আবেগের দিক থেকে তো বটেই, অর্থনৈতিকভাবেও পশ্চিমবঙ্গের বাঙালির সবচেয়ে বড় উৎসব; তখন এ কাজের পক্ষে যে কোনো যুক্তিই কুযুক্তি। দুর্গাপুজোকে শারদোৎসব বলে, তারপর “ধর্ম যার যার উৎসব সবার” বলার মধ্যে ভদ্রলোকি ভণ্ডামি আছে নিশ্চিত। কারণ ঈদকে হিন্দু বাঙালি একই যুক্তিতে উৎসব হিসাবে পালন করে না। তা বলে একটা উৎসবকে যে যা খুশি নামে ডাকতে পারবে না, যেমনভাবে খুশি পালন করতে পারবে না— এরকম রাষ্ট্রীয় নির্দেশ নেহাত গা-জোয়ারি।

ভাগ্যিস দুর্গাপুজো অর্থনৈতিকভাবে পশ্চিমবঙ্গে অতি গুরুত্বপূর্ণ, নইলে সংবাদমাধ্যমে মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্য নিয়ে হইচই কতটা হত কে জানে! শনিবার (১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬) সকালের গণশক্তি-র এক প্রতিবেদন বলছে, কুমোরটুলিতে গতবার সাড়ে ছয় হাজার প্রতিমার বরাত এসেছিল, এবারে বায়না হয়েছে সাড়ে পাঁচ হাজার। যদি খবরটা ঠিক হয়, তাহলে এখানেই তো এক হাজার পুজো কমে যাওয়ার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। রাজ্যের অন্যান্য জায়গার অবস্থা তাহলে সহজেই অনুমেয়। মানে পুজো কেমন হতে হবে তা নিয়ে একাধিক রাজনৈতিক ও ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব (যত দোষ সবই বাগেশ্বর বাবাকে দিলে তো চলবে না) যেসব মন্তব্য করেছেন, তার হাতেনাতে ফল হয়েছে। এর ধাক্কা যে অর্থনীতির উপর পড়বে তা বলাই বাহুল্য। হয়ত সেই কারণেই পশ্চিমবঙ্গের প্রায় সব সংবাদমাধ্যম মৃদু বা সোচ্চার প্রতিবাদ সহ বড় করে তুলে ধরেছে মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্য (আনন্দবাজার পত্রিকা আবার রবীন্দ্রনাথের লেখা থেকে উদ্ধৃতি সমেত)। নইলে খোদ কলকাতার বুকে যে একটা আস্ত পাড়াকে তিন মাসের বেশি সময় ধরে জলহীন করে রাখা হয়েছে স্রেফ বাসিন্দাদের ধর্মবিশ্বাসের কারণে, এত বড় খবরটা রাজ্যের কোন মূলধারার সংবাদমাধ্যম কতবার তুলে ধরেছে গত একমাসে? বরং সর্বভারতীয় বিকল্প সংবাদমাধ্যম সে কাজ করছে বেশি।

আরও পড়ুন নির্বাচনের ফলে হেরে গেছে দেশের অসাধু মিডিয়া

অবশ্য মুখ্যমন্ত্রী ভালোমন্দ যা-ই বলুন, তাকে লঘু করবে কে? রাবণের মত দশটা মাথা কার আছে? উপরন্তু লোকুবাবুরাই এখন সংবাদমাধ্যমের উপর থেকে নিচ পর্যন্ত বিরাজ করছেন। লোকুবাবু বিখ্যাত হয়েছিলেন বিখ্যাত খেলোয়াড়, প্রাক্তন খেলোয়াড়, আইপিএলের যুগে পেজ থ্রি সেলেবদের লম্বা লম্বা সাক্ষাৎকার নিয়ে। ফলে তাঁর অধীন সমস্ত পাতা জুড়েই ‘কী ঘটিয়াছে’-র থেকে বড় করে তুলেছিলেন ‘কে কী বলিয়াছে’-কে। সেইসময় তবু এ জিনিসের নিন্দেবান্দা করার লোক ছিল মিডিয়ায়। কিন্তু তাঁরা তখনই প্রান্তিক, এখন ভ্যানিশ। লোকুবাবুদের নাম যশ দেখে পরবর্তী প্রজন্মের ছকুবাবুরা শিখেছেন যে ওকেই সাংবাদিকতা বলে। তার উপর অমৃতকালের ভারতে মন্ত্রীসান্ত্রীরা কী বললেন সেটাকেই খবর করে না তুলে অধিকাংশ সংবাদমাধ্যমের উপায় নেই। স্রেফ অনুলিখন করো, নইলে সরকারি বিজ্ঞাপন বন্ধ। কী করলেন সেটাও ছাপা বা দেখানো যাবে, যদি কাজটা হয় ফিতে কাটা বা ট্রেনের সামনে পতাকা নাড়া, কিংবা হিমালয়ের গুহায় বসে ধ্যান করা। যা একেবারেই প্রকাশ করা চলে না ইদানীং, তা হল মন্ত্রীসান্ত্রীরা কী করলেন না। সেসব জায়গা ভরাতে কাগজে ছাপতে হলেও, ভিতরের পাতায় ছোট করে। আর টিভির সান্ধ্য কাজিয়ায় ওসবকে বিষয় করে তোলার প্রশ্নই নেই। সুতরাং বিশ্ববিদ্যালয় বিল বা নাগা সন্ন্যাসীদের নিয়ে মুখ্যমন্ত্রীর যাদবপুর অভিযান নিশ্চয়ই যথাযোগ্য সম্মান পাবে কাগজে এবং টিভি চ্যানেলে। কিন্তু রাজ্যের প্রায় প্রত্যেক পৌরসভা আর পঞ্চায়েত এলাকাতেই যে নানা কারণে জঞ্জাল সাফাই হচ্ছে না দীর্ঘদিন ধরে— সে খবর নিজ নিজ জেলার পাতায় চুপিসারে গেলেই যথেষ্ট। আবার নাগা সন্ন্যাসীদের যে ছবি সবাই দেখে ফেলেছে, সোশাল মিডিয়ায় ভাইরাল, সে ছবি কাগজে প্রায় দেখাই গেল না। জানি না এর পিছনে শ্লীলতা-অশ্লীলতার যুক্তি আছে কিনা। যদি থাকে তাহলে আবার কিঞ্চিৎ স্মৃতিমেদুরতা তৈরি হবে। কারণ যেসব কাগজ সর্বত্যাগী সাধুদের নগ্নতা দেখাতে লজ্জায় নতমুখ, কৈশোরে তাদেরই পাতায় অসংখ্য বিখ্যাত, আধাবিখ্যাত মডেল ও অভিনেত্রীর প্রায়-নগ্নতা দেখে আমাদের দাড়িগোঁফ গজানোর গতি বেড়ে গিয়েছিল। কথাটা বিশেষত ইংরিজি ভাষার কাগজগুলোর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। তখন সোশাল মিডিয়ার যুগ হলে ভাইরাল হওয়ার সমস্ত রেকর্ড ভেঙে ফেলত সেইসব কাগজের সেইসব পাতা।

অবশ্য সোশাল মিডিয়া থাকায় কিছু উপকারও হয়েছে। যেমন কাগজ খুললে বা টিভির খবর দেখলে কেবল জানা যাচ্ছে, দিল্লিতে ব্রিকস সামিটে নরেন্দ্র মোদী গোলের পর গোল দিচ্ছেন। সোশাল মিডিয়া না থাকলে জানাই যেত না যে ওদিকে দিল্লি শহরের ট্র্যাফিকের ইট খসে পড়েছে। দিল্লিবাসীরা সোশাল মিডিয়ায় অভিযোগ করছেন— রাস্তায় বেরোলে এত ডাইভার্শন, যে ঘুরে যেতে যেতে কেউ শেষে নিউ ইয়র্কও পৌঁছে যেতে পারে। যদিও বিশ্বগুরু হওয়ার গুরুত্ব যারা বোঝে না, সেইসব মূঢ়রাই এরকম অভিযোগ করে থাকে। রাস্তায় গর্ত, ট্র্যাফিক জ্যাম, সরকারি ইমারতের ছাদ ফুটো হয়ে জল পড়া বা পুর পরিষেবার গাফিলতিতে সরকারকে প্রশ্ন করা সংবাদমাধ্যমের কাজ ছিল সেই জুরাসিক যুগে। এখন তো ভারত আনন্দ আশ্রম। মিডিয়ার কাজ গেয়ে যাওয়া “পৃথিবী বদলে গেছে/যা দেখি নতুন লাগে।” প্রশ্ন করার ব্যাপারটা ছেড়ে দেওয়া হয়েছে দিমাগী নকশাল বিকল্প সংবাদমাধ্যমের হাতে।

a2onuswor.com ওয়েবসাইটে প্রকাশিত

এক মুখ দিয়ে রাম বলব, অন্য মুখ দিয়ে শ্যাম

আসলে কর্পোরেট মিডিয়া সম্পর্কে একটা অপ্রিয় সত্য হল, কোন সাংবাদিক লোকের চোখে ‘হিরো’ হবেন আর কে রাজাগোপালের মত বিস্মৃত হবেন, তা-ও ঠিক করে মালিক।

যদি ধরে নিই ৭০ বছর বাঁচব, তাহলে জীবনের বেশিরভাগটাই পেরিয়ে এসেছি। এর মধ্যে প্রথম বছর ছয়েক বাদ দিলে, যে জিনিসটা ছাড়া এই সেদিন পর্যন্তও চলত না, সেটা হল খবরের কাগজ। ও জিনিসটার প্রতি আকর্ষণ এত প্রবল ছিল এবং পড়তে এত সময় ব্যয় করতাম যে মাধ্যমিক পরীক্ষার আগে বাবা বাড়ি থেকে বেরোবার সময়ে মাকে বলে যেতেন— আমাকে যেন কাগজের ধারে কাছে যেতে না দেওয়া হয়। আমি কী করতাম? বাবা-মায়েরও আগে ঘুম থেকে উঠে পড়ে, বারান্দায় এসে পড়ে থাকা কাগজটা তুলে নিয়ে অন্তত সবকটা শিরোনাম আর খেলার পাতাটা পড়ে ফেলতাম। তারপর যেখানে যেভাবে পড়ে ছিল, সেখানে ঠিক সেইভাবে ফেলে রেখে দাঁত মাজতে যেতাম। ফলে মাঝে মাঝে অবিশ্বাস্য লাগে যে, খবরের কাগজ দিয়ে যাওয়ার জন্যে যে ব্যাগটা আমাদের বহুতলের বারান্দা থেকে ঝুলিয়ে রাখার কথা, সেটা ঝোলাতে আজকাল প্রায়ই ভুলে যাই। যেদিন ভুলি না সেদিনও কাগজ আসার সঙ্গে সঙ্গেই যে পড়ে ফেলতে ইচ্ছে করে তা নয়। আদ্যোপান্ত পড়া ছেড়েই দিয়েছি; পড়ি মূলত শিরোনামগুলো আর উত্তর-সম্পাদকীয় পাতার কোনো লেখা কৌতূহলোদ্দীপক মনে হলে। মাঝে মাঝে এমনও হয়— কাগজ তোলা হল, কিন্তু সারাদিনে পড়েই উঠতে পারলাম না। পড়ে রইল একপাশে দুয়োরানির মত। বহুতলের বাকি পরিবারগুলোর কাছেও যে খবরের কাগজের আর কদর নেই তা বুঝতে পারি, যখন দেখি একমাত্র আমার ফ্ল্যাট থেকেই কাগজের ব্যাগ ঝোলে সকালে। সিঁড়িতে দিনের পর দিন জমতে থাকে আরও উপরতলার ফ্ল্যাটমালিকদের তুলে নিয়ে না যাওয়া কাগজ। অথচ প্রতিবেশীদের সঙ্গে কথাবার্তা বলতে গিয়ে বোঝা যায়— প্রায় সব ঘটনাই সকলের জানা। অনেকের ক্ষেত্রে তার কারণ টিভির খবর দেখার অভ্যাস, আমার ক্ষেত্রে তার চেয়েও বড় কারণ মোবাইল ফোন।

ছোটবেলার সংবাদপত্র-প্রীতি শুধু নয়, পরবর্তীকালে দেড় দশক খবরের কাগজের সাংবাদিক হিসাবে কাটানোর ফলেও এই পরিস্থিতি মনকে ভারাক্রান্ত করে তোলে। দেখতে পাই, আমার পরের প্রজন্মের কাছে খবরের কাগজ ইতিমধ্যেই একেবারে মূল্যহীন হয়ে গেছে। পৃথিবীতে পরিবর্তনই যে একমাত্র অপরিবর্তনীয় সত্য, সেকথা জানি। প্রযুক্তির বদল জীবনযাত্রায় বদল আনবে— এ-ও অনিবার্য। কিন্তু কোভিড অতিমারীর পর থেকে খবরের কাগজের জনপ্রিয়তায় (বা প্রয়োজনীয়তায়) এই যে ধস, তার পিছনে কাগজগুলোর নিজেদের দায়ও কম নয়।

ডিজিটাল সংবাদমাধ্যমের যুগে সকালের কাগজের বাসি হয়ে যাওয়া আটকানোর কোনো উপায় নেই। খবরের কাগজগুলোরও সোশাল মিডিয়া হ্যান্ডেল আছে, সেখান থেকে নিয়মিত আপডেট দেওয়া হয়। যেমন আছে টিভি চ্যানেলগুলোর। সুতরাং তাজা থাকতে গেলে, পাঠকের কাছে প্রয়োজনীয় হয়ে উঠতে গেলে, কাগজগুলোর ক্রমশ বিশ্লেষণাত্মক হয়ে ওঠা দরকার ছিল। কিন্তু এখনো তারা আগের দিন সকালবেলায় কী ঘটেছে তা-ই লিখে চলেছে মোটের উপর, কেমনভাবে ঘটেছে তাতে জোর নেই। যেহেতু কী ঘটেছে তা জানানোর দায়মুক্ত হওয়া যায় এ যুগে, সেহেতু তাড়াহুড়ো না করে অনেক বেশি তদন্তমূলক সাংবাদিকতা করার সুযোগও এখন খবরের কাগজের হাতে। আরও স্থানীয় হওয়ারও সুযোগ তৈরি হয়েছে। কিন্তু দু-একটা কাগজ বাদ দিলে সকলেই থোড় বড়ি খাড়া আর খাড়া বড়ি থোড় পরিবেশন করতে ব্যস্ত। এর দায় অবশ্যই অনেকটা মালিকপক্ষের। কাগজের ভোল বদল করতে গেলে যে বিশেষ পারদর্শিতা ও অভিজ্ঞতা দরকার, তা পেতে গাঁটের কড়ি খরচ করতে হয়। করোনা অতিমারীর সময়ে “লোকে কাগজ পড়ছে না” এই অজুহাতে তাঁরা বিশেষত মাঝারি ও উপরের স্তরের সাংবাদিকদের ব্যাপক ছাঁটাই করে মাইনের খরচ বাঁচিয়ে নিজেদের লাভের গুড়ের হাঁড়ি ভর্তি রেখেছেন। ফলে ওসব বদল-টদল করবে কারা?

কিন্তু এখানেই শেষ নয়। টিভি চ্যানেলগুলোর মত কাগজগুলোও যে একপেশে, সরকারের পদলেহনকারী হয়ে গেছে— সেকথা পাঠকদের কাছে গোপন নেই। একদা বলা হত, পাঠককে আকর্ষণ করতে গেলে সরকারবিরোধী লেখালিখিই করতে হবে। সত্যিই পশ্চিমবঙ্গে বছরের পর বছর সর্বাধিক বিক্রীত দুটো কাগজের নাম ছিল আনন্দবাজার পত্রিকা আর বর্তমান, যারা বামফ্রন্ট সরকারের তীব্র বিরোধী ছিল। বামেদের প্রতি নরম আজকাল তুমুল বিক্রি হত বিশেষ কোনো খেলা থাকলে। এদের চেয়ে বয়সে নবীন সংবাদ প্রতিদিন-ও সরকারবিরোধী বলে পরিচিত ছিল। আরও তরুণ দৈনিক স্টেটসম্যান তো সিঙ্গুর-নন্দীগ্রাম পর্বে বিক্রি বাড়িয়ে ফেলেছিল সরকারবিরোধিতার কারণেই। কলকাতার প্রাচীন ইংরিজি কাগজ দ্য স্টেটসম্যান আর ১৯৮০-র দশকে স্থাপিত আনন্দবাজার গ্রুপের ইংরিজি কাগজ দ্য টেলিগ্রাফ-ও সরকারবিরোধী হিসাবে প্রসিদ্ধ ছিল। ২০১১ সালে কলকাতায় আর ২০১৪ সালে দিল্লিতে সরকার বদলানোর পরে ক্রমশ এমন হয়েছে যে, আজ বিজেপিশাসিত পশ্চিমবঙ্গে আনন্দবাজার প্রথম পাতায় ‘গেরুয়া গুন্ডামি’ শিরোনাম দিলে বাম, ডান, মধ্যপন্থী— সব পক্ষ আপ্লুত হচ্ছে। স্রেফ শিরোনাম এবং যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে যা ঘটেছে, আগেরদিনই হাতের মোবাইলে যা দেখে ফেলেছে সবাই— সেটুকু হুবহু বিবৃত করার জন্যেই। তার বেশি কিছু নয়। অর্থাৎ যা ঘটেছে, কাগজে ঠিক তা লেখা হবে না, যেমনটি ঘটেছে তেমনটি লেখা হবে না— এটাই আমাদের প্রত্যাশা হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমরা জেনে গেছি, কেবল সেই বয়ানই লেখা হবে বা টিভিতে দেখানো হবে, যা সরকার চায়। অন্য বয়ানের জন্যে আমাদের তাকিয়ে থাকতে হবে বিকল্প সংবাদমাধ্যমের দিকে। মূলধারার সংবাদমাধ্যম যদ্দৃষ্টং তদ লিখিতং করলেই আমরা উল্লসিত হয়ে বলে উঠছি “অহো! কী দুঃসহ স্পর্ধা!”

আমরা যে ইতিহাস-বিস্মৃত তার প্রচুর প্রমাণ রোজই পাওয়া যায়, এ-ও তেমনই একটা প্রমাণ। সেদিনের প্রথম পাতার জন্যে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর হুমকি, অতঃপর আনন্দবাজারের সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে মামলা এবং আনন্দবাজার অফিসের গায়ে গেরুয়া রং লেপে দেওয়া— এসব আমরা আর কাগজটার প্রথম পাতায় দেখিনি কিন্তু। দেখেছি অন্য সংবাদমাধ্যমে বা সোশাল মিডিয়ায়। যে কাগজের গায়ে হাত পড়ল তারা নিজেদের উপর আক্রমণের খবরই ক্রমশ ঠেলে দিল ভিতরের পাতায়, আকারে ছোট হতে হতে এখন মিলিয়ে গেছে। গেরুয়া ছিল, আবার সাদা করে দিয়েছি— এ নিয়ে রাবীন্দ্রিক বাহাদুরিটা পর্যন্ত কাগজের পাতায় হল না। হল সোশাল মিডিয়ায়। অর্থাৎ যে কাগজের সাংবাদিকরা আক্রান্ত, সেই কাগজই সেই খবর ছাপার উপযুক্ত জায়গা দিচ্ছে না। একে সাধারণ পাঠক কাগজের মহানুভবতা বলে ভাবতে পারেন, মনে করতে পারেন নিজেদের ঊর্ধ্বে কাগজ অন্য খবরকে রেখেছে। নিউজরুমে কাজ করার অভিজ্ঞতায়, একে মিটমাট করে নেওয়ার চেষ্টা ছাড়া অন্য কিছু বলে ভাবা আমার পক্ষে শক্ত। বিশেষত যখন সবেমাত্র জুন মাসে জানতে পেরেছি যে, এবিপি গ্রুপেরই ইংরিজি কাগজ দ্য টেলিগ্রাফ-এর প্রাক্তন সম্পাদক আর রাজাগোপালের নাম ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধনী থেকে বাদ দেওয়া হয়েছিল এবং তার ফলে তাঁর পাসপোর্ট দিনের পর দিন পুনর্নবীকরণ করা হয়নি; তাঁকে হয়রান করা হয়েছে বহুদিন ধরে। তাতে আজকের বিদ্রোহী মিডিয়া এবিপি গ্রুপ কিন্তু পাশে দাঁড়ায়নি। শেষমেশ রাজাগোপাল লিখিত বার্তা পরঞ্জয় গুহঠাকুরতার মত বিকল্প মাধ্যমের সাংবাদিক সোশাল মিডিয়ায় পোস্ট করে দেন, তা ভাইরাল হয় এবং তারপর বিভিন্ন বিকল্প সংবাদমাধ্যমে তা নিয়ে খবর প্রকাশিত হয়। তারপর কেরালার মুখ্যমন্ত্রী প্রতিকার চেয়ে চিঠি লেখেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রীকে, তবে রাজাগোপাল পাসপোর্ট পান। এই গোটা পর্বে টেলিগ্রাফ বা আনন্দবাজার অথবা তাদের নিউজ চ্যানেল এবিপি আনন্দ কিন্তু এক লাইন আলোচনা করেনি এ নিয়ে।

আরও পড়ুন ব্যাকফুটে গোদি মিডিয়া

এই যদি স্পর্ধা হয়, তাহলে ভণ্ডামি কোনটা? জরুরি অবস্থার সময়ে বরুণ সেনগুপ্ত, গৌরকিশোর ঘোষ, সি আর ইরানিরা যা দেখিয়েছিলেন তাকেই বা কী বলা উচিত? বস্তুত, সাংবাদিকের নামে মামলা হওয়া কোনো অভিনব ব্যাপার নয়। তৃণমূল সরকারের আমলেও হয়েছে, এবিপি গ্রুপের সাংবাদিকদের নামেও হয়েছে। তা নিয়ে সোশাল মিডিয়ায় কেউ হইচই করেনি এই যা। আসলে কর্পোরেট মিডিয়া সম্পর্কে একটা অপ্রিয় সত্য হল, কোন সাংবাদিক লোকের চোখে ‘হিরো’ হবেন আর কে রাজাগোপালের মত বিস্মৃত হবেন, তা-ও ঠিক করে মালিক। মনে রাখা ভালো, রাজাগোপাল হলেন সেই সম্পাদক যাঁর আমলে টেলিগ্রাফের প্রথম পাতা উদ্ভাবনীমূলক শিরোনাম এবং চেহারার কারণে যেসব জায়গায় কাগজ পৌঁছয় না সেখানেও প্রসিদ্ধ হয়ে উঠেছিল। সোশাল মিডিয়ার মাধ্যমে সেসব পাতা নিয়মিত ভাইরাল হত এবং বিজেপিবিরোধী মহলে লড়াকু কাগজ হিসাবে পরিচিত হয়েছিল টেলিগ্রাফ। আনন্দবাজার পত্রিকা বা এবিপি আনন্দ কিন্তু ওরকম বিদ্রোহী চেহারা নেয়নি কখনো। বরং এবিপি আনন্দ পশ্চিমবঙ্গে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধনী চলাকালীন বিজেপি-প্রচারিত “পশ্চিমবঙ্গ রোহিঙ্গা আর বাংলাদেশিতে ভরে গেছে” এবং “তারা এসআইআরের ভয়ে বাংলাদেশে পালাচ্ছে” বয়ানের প্রচারে অগ্রণী ভূমিকা নিয়েছিল। এসব আসলে কর্পোরেট কৌশল। এক মুখ দিয়ে রাম বলব, আরেক মুখ দিয়ে শ্যাম। সংবাদ মূলত ব্যবসা, আর সব পক্ষের লোককেই ক্রেতা হিসাবে বজায় রাখা দরকার। এর মধ্যে বিদ্রোহও তো নেই-ই, স্পর্ধাও নেই। সত্যি কথা বলতে, ভারতের মিডিয়ার অর্থনীতি যে চেহারা নিয়েছে তাতে বড় সংবাদমাধ্যমগুলোর স্পর্ধা দেখানোর বিশেষ অবকাশও নেই। বিশ্বাস না হয়, প্রণয় রায়কে জিজ্ঞেস করুন। স্পর্ধা দেখাচ্ছিলেন বলেই বিভিন্ন সরকারি দফতর মিথ্যা অভিযোগ (আদালতে ইতিমধ্যে প্রমাণিত) করে বছরের পর বছর হয়রান করে তাঁর এবং স্ত্রী রাধিকা রায়ের তৈরি বিজেপিবিরোধী বড় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভি-কে কেড়ে নিল।

অতএব বড় সংবাদমাধ্যমে স্পর্ধা খুঁজতে না যাওয়াই ভালো। স্পর্ধা কি কম পড়িয়াছে? বাংলায় হয়ত পড়িয়াছে, কিন্তু বাংলার বাইরে তাকিয়ে দেখুন। জেন জি আন্দোলনের সত্য মার খেয়ে, জীবনের ঝুঁকি নিয়ে আপনার হাতের মোবাইলে পৌঁছে দিল যেসব ছোট ছোট ইউটিউব চ্যানেল বা ইনস্টাগ্রামার, তাঁরা সাংবাদিক নন? ক্ষমতাকে প্রশ্ন করাই যদি সংবাদমাধ্যমের কাজ হয়, তাহলে সেই কাজটা এখন সবচেয়ে ভালো করছেন ওঁরাই। করতে গিয়ে কত বড় ঝুঁকি নিচ্ছেন তার হাতে গরম প্রমাণ ৪ পিএম নিউজ নেটওয়ার্ক নামের ডিজিটাল মিডিয়ার দুই সাংবাদিক শাহীন খান আর নাফিসা খান। তাঁরা দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী রেখা গুপ্তাকে প্রশ্ন করতে গিয়ে সাকেত থানায় পুলিশের হাতে বেদম মার খেয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। শুধু তাই নয়, তাঁরা মুসলমান বলে বেশি মারা হয়েছে— এমন অভিযোগও উঠেছে দিল্লি পুলিশের বিরুদ্ধে। এর প্রতিবাদে দিল্লির বহু সাংবাদিক মিলে থানা ঘেরাও করে ফেলেন ৪ সেপ্টেম্বর। প্রেস ক্লাব, বিভিন্ন সাংবাদিক সংগঠন, কংগ্রেস, আম আদমি পার্টি ইত্যাদি মহল থেকে প্রতিবাদ এবং নিন্দার পরেও এই কলাম লেখার সময় পর্যন্ত পুলিশ এফআইআর নেয়নি।

এবার ভেবে দেখুন, স্পর্ধা কথাটাকে খুব শস্তা করে দেওয়া কি উচিত? যা বিরল, তারই তো দাম বেশি।

a2onuswor.com ওয়েবসাইটে প্রকাশিত

অরাজনীতির হাত থেকে কবে স্বাধীন হবে পশ্চিমবঙ্গের মানুষ?

আমরা ছোট থেকেই শিখে এসেছি – রাজনীতি খুব খারাপ জিনিস। পশ্চিমবঙ্গের যাবতীয় দুরবস্থার মূলে হল রাজনীতি। আমাদের বড়রা আনন্দবাজার পত্রিকা পড়ে দিনরাত এই আলোচনাই করতেন

স্বাধীনতা দিবসে খুব ভোরবেলা ঘুম ভেঙে গেল। মাইকে দেশাত্মবোধক গান ভেসে এসে নয়, একটা স্বপ্ন দেখে।

দেখলাম সেলুলার জেলের সামনে দাঁড়িয়ে নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর আর বাঘাযতীন কীসব আলোচনা করছেন। পাশেই একটা লম্বা বাঁশে ভারতের পতাকা ফুল-টুল দিয়ে বাঁধা রয়েছে, ওঁরা কেউ তুলবেন বোধহয়। মাইকে ঝাঁ ঝাঁ করে ‘কদম কদম বঢ়ায়ে যা’ বাজছে আর আজাদ হিন্দ ফৌজ সাবধান পজিশনে দাঁড়িয়ে আছে। আমি একখানা রেকর্ডার বাগিয়ে ধরে এগিয়ে গেছি, তিনজনের বক্তব্য রেকর্ড করব বলে। কিন্তু তার আগেই নেতাজি হাত নেড়ে কাকে একটা ডাকলেন। দেখি – ক্ষুদিরাম বসু। তিন বয়োজ্যেষ্ঠ মিলে তাঁকেই এগিয়ে দিলেন পতাকা তুলতে। দেখে আমার বুকের ছাতি তো ৫৬ ইঞ্চি হবার জোগাড়। নেতাদের কোট চাইতে ভুলেই গেছি। ক্ষুদিরাম পতাকা তুললেন, একগাদা গাঁদা ফুল ঝরে পড়ল আর গোটা আজাদ হিন্দ ফৌজ ‘জয় হিন্দ’ বলে স্যালুট করল। আমিও উৎসাহের চোটে ‘জয় হিন্দ’ বলে সেলাম ঠুকে ফেলেছি। অমনি কানের কাছে কে যেন বলে উঠল ‘এ কী! এখানে স্লোগান দিচ্ছেন! ছিঃ! এটা একটা জাতীয় অনুষ্ঠান। দয়া করে এটাকে পলিটিসাইজ করবেন না।’ তাকিয়ে দেখি হাফপ্যান্ট পরা সুমন দে। আমি বলতে যাচ্ছিলাম, স্বাধীনতা সংগ্রাম ব্যাপারটাই তো রাজনৈতিক। তাহলে স্বাধীনতা দিবস অরাজনৈতিক হয় কী করে? সেখানে স্লোগান দেওয়া যাবে না-ই বা কেন? কিন্তু তার আগেই রবীন্দ্রনাথ সুমনবাবুর পিঠে মারলেন এক রদ্দা। অঙ্ক না পারলে আমাদের স্কুলের জহরবাবু যেরকম মারতেন, একেবারে সেইরকম। সুমনবাবু করুণ মুখে পিঠে হাত বুলোতে বুলোতে বললেন ‘কেস দেবেন না, প্লিজ’। অমনি আমার ঘুমটা ভেঙে গেল।

এরকম জগাখিচুড়ি স্বপ্ন কেন দেখলাম ভাবতে ভাবতে মনে হল, আমি যে প্রজন্মের লোক তাতে স্বাধীনতা দিবসে এই স্বপ্ন দেখাই স্বাভাবিক। কারণ আমরা ছোট থেকেই শিখে এসেছি – রাজনীতি খুব খারাপ জিনিস। পশ্চিমবঙ্গের যাবতীয় দুরবস্থার মূলে হল রাজনীতি। আমাদের বড়রা আনন্দবাজার পত্রিকা পড়ে দিনরাত যা আলোচনা করতেন তার মোটামুটি নির্যাস হল –

১) পশ্চিমবঙ্গে কোনো কাজ হয় না, কারণ বনধ হয়।
২) পশ্চিমবঙ্গে শিল্প হয় না, কারণ শ্রমিকরা রাজনীতি করে।
৩) পশ্চিমবঙ্গের স্কুলে লেখাপড়া হয় না, কারণ মাস্টাররা রাজনীতি করে।
৪) পশ্চিমবঙ্গের কলেজে ছাত্রছাত্রীরা পড়াশোনা করে না, কারণ রাজনীতি করে।

ফলে ২০১১ সালে যখন বামফ্রন্ট সরকার বিদায় নিল, তখন আমাদের প্রজন্মের অনেকেই স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছিল। আমাদের বড়দের কারো কারো মুখ দেখে মনে হয়েছিল, বাকি জীবনটা বাম শাসনে কাটাতে হবে না বলে দারুণ শান্তি পেয়েছেন। তখন চারপাশে সবাই বলত যে এবার থেকে পশ্চিমবঙ্গে শিল্প হবে, স্কুলে লেখাপড়া হবে, কলেজে ছাত্রছাত্রীরা মন দিয়ে পড়াশোনা করবে, হাসপাতালে চিকিৎসা হবে, ‘চলবে না, চলবে না’ আর চলবে না। এবার থেকে সব চলবে। কারণ রাজনীতি আর চলবে না। রাজনীতি না চললে যে খুব খারাপ হবে, সেকথা তখন বামপন্থী কয়েকজন ক্ষীণ কণ্ঠে বলেছিলেন। কিন্তু সদ্য যে হেরে গেছে তার কথায় কে কান দেয়? তার উপর একটানা ৩৪ বছর শাসন করে যারা হারে, তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগের লম্বা তালিকা থাকে। সেসব থেকে মুখ তুলতে কে চায়? তখন প্রায় সকলেই নিঃসন্দেহ, যে রাজ্যটা একেবারে শেষ হয়ে গেছে। তার জন্যে দায়ী বাম শাসন, কিন্তু কারণ রাজনীতি।

হা হুতাশ ছিল শুধু একজনের জন্য – বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য। কারণ তিনি বামপন্থী সরকারের মুখ্যমন্ত্রী হলেও বুঝেছিলেন যে সবকিছুতে রাজনীতি করা ঠিক নয়। যেমন উন্নয়ন নিয়ে রাজনীতি করা ভীষণ অন্যায়। তাই তিনি রাজনীতির ঊর্ধ্বে উঠে রাজ্যের ছেলেমেয়েদের ভালর জন্যে বাংলায় শিল্প আনতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তাঁর পার্টিই তাঁকে পিছন থেকে ছুরি মারল। তাই তিনি হেরে গেলেন। নেহাত তিনি অসম্ভব ভদ্রলোক, তাই মুখ ফুটে বলেননি ‘ব্রুটাস, তুমিও?’ তাঁর হয়ে আনন্দবাজার আর অন্যান্য সংবাদমাধ্যমগুলোই বলে দিয়েছিল। বিধানচন্দ্র রায় যদি বাংলার রূপকার হন, বুদ্ধদেব তাহলে বাংলার অরাজনীতির জন্মদাতা। তিনি মনে করতেন উন্নয়ন অরাজনৈতিক, তাই পার্টির কৃষক সংগঠনকে না জানিয়ে সিঙ্গুরের জমির প্রতিশ্রুতি দিয়ে দেন রতন টাটাকে। তিনি মনে করতেন শিল্প অরাজনৈতিক, তাই সটান বলে দেন – তাঁর দুর্ভাগ্য যে তিনি এমন একটা পার্টি করেন যারা বনধ ডাকে। বোধহয় তিনি মনে করতেন রাজনীতিও অরাজনৈতিক হলেই ভাল হয়। সেই কারণেই অন্য বামপন্থী দলের কর্মীদের পিছনে পুলিস লাগানো, ইউএপিএ আইনে গ্রেফতার করা ইত্যাদি তাঁর আমলে বেড়ে গিয়েছিল। এসবে অবশ্য আমাদের, মানে ভদ্রলোকদের, কোনো আপত্তি ছিল না। কারণ ওই যে – রাজনীতি খুব খারাপ জিনিস। তখন বিস্তর লেখালিখি হয়েছিল, এখনো বলাবলি হয় – মানুষটা তো ভাল, কিন্তু পার্টিটাই যে খারাপ। মানে কোনোভাবে যদি তৃণমূল কংগ্রেসের সরকারের মুখ্যমন্ত্রী হতে পারতেন বুদ্ধবাবু, তাহলে ভদ্রলোক-ভদ্রমহিলারা সবচেয়ে খুশি হতেন।

এসব ব্যাপার মমতা ব্যানার্জি ভালই বুঝতেন। তাঁকে তো আর এমনি এমনি বড় নেত্রী বলা হয় না। তিনি বুদ্ধবাবুর মত বই-টই লেখা শুরু করলেন। তা দিয়ে ভদ্রলোকদের খুব একটা সন্তুষ্ট করতে পারেননি, কিন্তু একে একে সব জায়গা থেকে রাজনীতি তুলে দিয়ে যারপরনাই প্রিয় হয়েছেন। পশ্চিমবঙ্গে ২০১১ সালের পর থেকে আর কোনো সফল বনধ হয় না। কারণ যে নেত্রী নিজে বিরোধী থাকার সময়ে নিজেই ঘনঘন বনধ ডাকতেন, তিনি মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পরে আর বনধ ডাকেন না। কোনো বিরোধী দল বনধ ডাকলে সরকারি কর্মচারীদের আগের রাতে অফিসে থেকে যেতে হয়, নইলে যে করেই হোক অফিসে পৌঁছতে হয়। ‘ব্রেক অফ সার্ভিস’ ইত্যাদি হুমকি থাকে। বামফ্রন্ট আমলে হাতে মাথা কাটা কো-অর্ডিনেশন কমিটির বিপ্লবী নেতারা কোথায় গেলেন? বিপন্ন সরকারি কর্মচারীরা অনেকসময় বুঝে পান না। বাস ইউনিয়ন, ট্যাক্সি ইউনিয়ন, অটো ইউনিয়ন, টোটো ইউনিয়ন – সবই যেহেতু বাম আমলের মতই শাসক দলের দখলে সেহেতু বনধ ব্যর্থই হয়। কিন্তু কাজ হয় কি? শনি, রবিবারকে কোনো ছুটির দিনের সঙ্গে একদিন বেশি ছুটি দিয়ে যোগ করে দেওয়া, পুজোর অনুদানের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে পুজোর ছুটি বৃদ্ধি – এসব তো হয়েই চলেছে। অবশ্য অরাজনৈতিক কারণে কাজ বন্ধ থাকলে পশ্চিমবঙ্গে কেউ আপত্তি করে না। যত দোষ, রাজনীতি ঘোষ।

পশ্চিমবঙ্গের শ্রমিকরাও আর রাজনীতি করেন না। বাম আমলের প্রবল প্রতাপান্বিত সিটু নিষ্প্রভ। শাসক দলের শ্রমিক সংগঠন শ্রমিকদের অধিকারের জন্যে কী করে কেউ জানে না। কিন্তু বাংলায় শিল্প এসেছে কি? বাংলায় শিল্পপতিরা বছর বছর আসতেন বর্ণাঢ্য শিল্প সম্মেলনে। বাংলায় সৌরভ গাঙ্গুলির মত নতুন শিল্পপতির জন্মও দেখা গেছে তৃণমূল শাসনে। কিন্তু শিল্প কোথায়? শিল্পপতির দেখা পেলেও শিল্পের দেখা না পেয়ে বোধহয় স্বয়ং মুখ্যমন্ত্রীও হতাশ হয়ে পড়েছেন। তাই এবছর আর বিশ্ব বঙ্গ বাণিজ্য সম্মেলন হচ্ছে না।

পশ্চিমবঙ্গের স্কুল নিয়ে বলতে শুরু করলে তো এ লেখা আর শেষ হবে না। বাম আমলের নিখিলবঙ্গ শিক্ষক সমিতির চেয়ে ঢের বেশি দাপট নিয়ে স্কুলে স্কুলে রয়েছে শুধুমাত্র তৃণমূলের শিক্ষক সংগঠন শিক্ষা সেল। বহু স্কুলে প্রধান শিক্ষক নেই, বছরের পর বছর কাজ চলছে ‘টিচার ইন চার্জ’ দিয়ে। বলা বাহুল্য তাঁরা কারা। তাঁদের অনেকের সঙ্গেই শিক্ষকদের গোলমাল গড়াচ্ছে আদালত পর্যন্ত। রাজনীতি নেই, সংগঠন নেই। তাই একা একাই লড়তে হচ্ছে শিক্ষকদের। অবশ্য সে তো সামান্য ব্যাপার। তার চেয়ে অনেক বড় কথা হল, কোনো স্কুলে ছাত্রছাত্রী আছে অথচ মাস্টার নেই। কোথাও আবার মাস্টার আছে অথচ ছাত্রছাত্রী নেই। কেন নেই? সে কেলেঙ্কারি কে না জানে! কিন্তু তা নিয়ে আজ অবধি বিরোধীরা কোনো বড় রাজনৈতিক আন্দোলন করতে পারলেন না। চাকরিপ্রার্থীরা অবশ্য রাজনীতি দূরে রাখার চেষ্টা করে গেছেন আপ্রাণ। মাঝরাত্তিরে পুলিস মহিলা আন্দোলনকারীদের পর্যন্ত টেনে হিঁচড়ে রাস্তা থেকে তুলে নিয়ে গেলেও তাঁরা বলেছেন ‘আমরা কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত নই’। কারণ ওই যে – রাজনীতি খুব খারাপ জিনিস। সে না হয় হল, কিন্তু স্কুলে লেখাপড়া হচ্ছে কি? স্কুলগুলো তো বন্ধ হতে বসেছে। রমরমা বেড়েছে বেসরকারি শীতাতপনিয়ন্ত্রিত স্কুলের। তাতে অবশ্য ভদ্রলোকদের অসুবিধা নেই। ছেলেমেয়েকে ওসব স্কুলে পড়ানোর রেস্ত তাঁদের আছে। তাছাড়া ওইসব স্কুলের একটা বড় গুণ হল – রাজনীতি নেই।

আমাদের বাবা-মায়েদের স্বপ্ন পূরণ করে মমতা কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়েও রাজনীতি বন্ধ করে দিয়েছেন। যাদবপুর বা প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয়ের মত দু-একটা ব্যতিক্রম বাদ দিলে সর্বত্র জাঁকিয়ে বসেছে একমেবাদ্বিতীয়ম তৃণমূল ছাত্র পরিষদ। মাঝে আবার কলেজে ভর্তি হতে গেলে তাদের মোটা টাকা উৎকোচ দিতে হচ্ছিল। নিজে বকাঝকা করেও তা বন্ধ করতে না পেরে কলেজে ভর্তির ব্যবস্থা অনলাইন করে ফেলেছে মমতা সরকার। ছাত্র ইউনিয়নের নির্বাচন বন্ধ সেই ২০১৭ সাল থেকে। আগে নাকি ছাত্রছাত্রীরা রাজনীতি করত বলে কলেজে লেখাপড়া হত না। এখন ছেলেমেয়েরা আর কলেজমুখো হতেই চাইছে না। নামকরা কলেজেও আসন খালি পড়ে থাকছে। কারণ ছাত্রছাত্রীরা জানে, জাতীয় শিক্ষানীতি আর রাজ্য শিক্ষানীতি (এবং দুর্নীতি) মিলিয়ে যা অবস্থা তাতে কলেজে পড়ে ভাত জোটানোর ব্যবস্থা হবে কিনা তার ঠিক নেই। এ রাজ্যে তো স্কুল, কলেজে শিক্ষক নিয়োগও প্রায় বন্ধ। এমএ/এমএসসি, এমনকি পিএইচডি করা ছেলেমেয়েরা সরকারি চাকরিপ্রাপ্ত শিক্ষাকর্মীদের চেয়েও কম বেতনে পড়াতে বাধ্য হচ্ছে আংশিক সময়ের অধ্যাপক হিসাবে অথবা দেদার অনুমোদন দিয়ে রাখা বেসরকারি নড়বড়ে কলেজে। অর্থাৎ কলেজ থেকে রাজনীতি তাড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে শিক্ষাকেও তাড়ানো হয়েছে।

মানে রাজ্যের সবকিছু অরাজনৈতিক হয়ে একটাও উপকার হয়েছে বলা যাবে না। তবু কিন্তু বাঙালির অরাজনীতি প্রেম অম্লান। সংসদে দাঁড়িয়ে যখন নরেন্দ্র মোদী বা অমিত শাহ যে কোনো বিষয়ে ফাঁপরে পড়লেই বলেন ‘বিরোধীরা রাজনীতি করছে’, আমাদের হাসি পায় না, রাগও হয় না। তৃণমূল কংগ্রেস নেতারা ওরকম বললেও আমাদের এখনো মনে হয় – ঠিকই বলছে। যে কোনো আন্দোলনকে বদনাম করার, নাগরিকদের চোখে হেয় করার একই উপায় বিজেপি ও তৃণমূল অবলম্বন করে – ‘দাবি ন্যায্য। কিন্তু বিরোধীরা এ নিয়ে রাজনীতি করছেন।’ যেন রাজনীতি করা এদেশে নিষিদ্ধ। একমাত্র ক্ষমতাসীন পক্ষই যে রাজনীতি অপছন্দ করে তা আমরা খেয়ালই করি না। ক্ষমতাসীনদের সুরে সুর মিলিয়ে আমরা রাজনীতি চাই না, অথচ গণতন্ত্র চাই। মানে স্নান করব, কিন্তু চুল ভেজাব না। অরাজনীতির সাধনা যে আমাদের প্রকৃতপক্ষে হিংস্র একদলীয় শাসনের দিকে নিয়ে গেছে, তা আমরা বুঝেও বুঝতে চাই না। জাতীয় স্তরে কী চলছে সে তো সবাই জানে। অন্য রাজ্যের বহু মানুষ এই অরাজনীতির ফাঁকি ধরে ফেলেছেন। তাই বিজেপিকে ছেঁটে দিয়েছেন ২০২৪ লোকসভা নির্বাচনে। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের অবস্থা কী?

এখানে দ্বিমেরু ভোট হওয়ায় বিজেপির আসন অনেক কমে গেলেও, ভোট কিন্তু বিশেষ কমছে না। উপরন্তু শুধু যে পঞ্চায়েত নির্বাচন ব্যাপারটা পরপর দুবার প্রহসনে পরিণত হল তা নয়, আর সব কলেজের মত মেডিকাল কলেজগুলোতেও প্রায় মাফিয়া হয়ে উঠেছে শাসক দলের ছাত্র সংগঠন। তৃণমূল কংগ্রেস সংলগ্ন ডাক্তার-অধ্যাপকদের একাংশের প্রশ্রয়ে আর জি কর মেডিকাল কলেজ ও হাসপাতাল যে নরককুণ্ড হয়ে উঠেছে তা এখন নিজ মুখে স্বীকার করছেন তৃণমূলেরই নেতা শান্তনু সেন। অবশ্য ওই হাসপাতালের স্নাতকোত্তর স্তরের ছাত্রীর নৃশংস ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ড না ঘটলে এবং নিজের মেয়ে ওই কলেজেরই ছাত্রী না হলে শান্তনু মুখ খুলতেন কিনা সন্দেহ।

আর জি করে অন্য ইউনিয়ন করতে গেলে ছাত্রছাত্রীদের কী হাল করা হয় তা কিন্তু আগেও এই ওয়েবসাইটেই প্রকাশিত হয়েছে। এবারের হত্যাকাণ্ডের মত আরও কত কাণ্ড অন্য মেডিকাল কলেজগুলোতে হওয়ার অপেক্ষায় আছে আমরা জানি না। অথচ আমরা সকলেই বুঝি, এমন আরও ঘটনা অনিবার্য। তবু শাসককে প্রশ্ন করার থেকে বাঙালি ভদ্রজনের কাছে এখনো বেশি গুরুত্বপূর্ণ অরাজনৈতিক থাকা। তাই এবারের স্বাধীনতা দিবস শুরু হল মধ্যরাতে মহিলাদের ডাকা যে আন্দোলন দিয়ে, সেই আন্দোলনের হোতারা বারবার ঘোষণা করে গেলেন – এটা অরাজনৈতিক আন্দোলন। বিখ্যাত অভিনেত্রী সোহিনী সেনগুপ্ত টিভি স্টুডিওতে বসে ধর্ষণ আটকাতে গেলে সমাজের, শিক্ষাব্যবস্থার কী কী সংস্কার করা দরকার সেসব বলার পাশাপাশি জোর দিয়ে বললেন – সরকারি রোষানলে তাঁকে কখনো পড়তে হয়নি। তাই সরকারের বিরুদ্ধে তাঁর কোনো রাগ নেই। এই আন্দোলন মহিলাদের নিরাপত্তা বিষয়ক। তাই কেউ যদি কোনো রাজনৈতিক পতাকা নিয়ে আসে, তাহলে তাকে ‘rudely’ বারণ করা হবে। অরাজনৈতিক সঞ্চালক সুমন দে বা স্টুডিওতে উপস্থিত রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিরাও তাঁকে প্রশ্ন করলেন না, এ রাজ্যের মহিলাদের নিরাপত্তা দেওয়ার দায়িত্ব কার? ভগবানের? তাহলে সরকারের দায়িত্ব কী? সোহিনীকে সরকারি রোষানলে পড়তে হয়নি বলেই যদি সরকারের বিরুদ্ধে তাঁর কোনো বক্তব্য না থাকে, তাহলে আর পাঁচজনের সঙ্গে আন্দোলনে নামার প্রয়োজন কী? আন্দোলনের কেন্দ্রে কি তাঁর স্বার্থ, নাকি যে মেয়েটি নৃশংসভাবে খুন হয়েছে তার স্বার্থ? বিখ্যাতরা এইরকম গা বাঁচানো অবস্থান নিয়ে দিব্যি চলতে পারেন, কারণ সরকারকে যদি বা সংবাদমাধ্যম ক্কচিৎ কদাচিৎ প্রশ্নের মুখে ফেলে, বিখ্যাতদের ফেলে না। তাই পরমব্রত চট্টোপাধ্যায়ও মাঝরাতে অ্যাকাডেমি অফ ফাইন আর্টসের সামনে দাঁড়িয়ে অবলীলাক্রমে বলে যেতে পারেন – কলকাতা দেশের অন্যান্য শহরের থেকে মহিলাদের নিরাপত্তায় এখনো অনেক এগিয়ে। তাই তো এরকম ঘটনা বেশি আঘাত দেয়। তাই তো তাঁরা পথে নেমেছেন। এটা এ দল বনাম ও দলের বিষয় নয় ইত্যাদি।

যে ঘটনার প্রতিবাদে মহিলারা রাস্তায় নেমেছিলেন বুধবার রাতে, সেটা ঘটেছে সরকারি হাসপাতালে। সরকার চালাচ্ছে একটা দল, সেই দলেরই অধীনে রয়েছে পুলিস। সেই পুলিসের বিরুদ্ধেই তথ্যপ্রমাণ লোপাটের অভিযোগ উঠেছে। সরকারি দলের নেতা এক ডাক্তারই মেডিকাল কলেজটা চালান, তিনিই কটু মন্তব্য করেছিলেন মৃতার বিরুদ্ধে। সেই মন্তব্যের প্রতিবাদেই রাতের দখল নেওয়ার ডাক। তাঁরই বিরুদ্ধে উঠেছে মারাত্মক সব অভিযোগ। সুতরাং পরমব্রত ঠিকই বলেছেন। এটা এ দল বনাম ও দলের বিষয় তো নয়ই। এটা একটাই দল বনাম মৃতার পরিবারকে ন্যায়বিচার পাইয়ে দেওয়ার বিষয়। অথচ তিনি ওই দলটার নামে কিছু বলবেন না। কারণ ওই যে – রাজনীতি খুব খারাপ জিনিস।

আনন্দের কথা, অরাজনীতির ধ্বজাধারীদের ডাকে যে হাজার হাজার অখ্যাত মহিলা (এবং পুরুষ) বুধবার রাতে পথে নেমে এসেছিলেন পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন জায়গায় এবং দেশের বিভিন্ন শহরে, তাঁরা এসব ন্যাকামি বোঝেন না। তাঁরা দ্ব্যর্থহীন ভাষায় আর জি কর হাসপাতালের মৃতা ছাত্রীর জন্যে ন্যায়বিচার চেয়ে স্লোগান তুলেছেন। অনেকে টিভি ক্যামেরার সামনে সরাসরি বলেছেন, যাকে গ্রেফতার করা হয়েছে সে সাক্ষীগোপাল। আসল অপরাধীদের ধরতে হবে এবং শাস্তি দিতে হবে। সরকারের কাছ থেকে সরাসরি জবাবদিহি চেয়েছেন তাঁরা। এসব দৃশ্য কালীঘাটের বাড়িতে বসে টিভিতে দেখে মমতা হয়ত অবাক হয়েছেন। অভিমানও করে থাকতে পারেন। তাঁর সরকার এই ‘বেনজির অরাজনৈতিক আন্দোলনের’ (এবিপি আনন্দের ভাষায়) সঙ্গে যে সহযোগিতা করেছে, তার এই প্রতিদান হয়ত তিনি আশা করেননি।

আন্দোলনের হোতারা এতে খুশি হলেন না রেগে গেলেন, তা-ই বা কে জানে! তাঁরা তো ব্যাপারটা অরাজনৈতিক রাখতেই চেয়েছিলেন। তাঁদের তো লক্ষ্য ছিল রাতের দখল নেওয়া, সরকারের বিরোধিতা করা তো নয়। অরাজনৈতিক বলে যে কিছু হয় না তা হয়ত তাঁরা ভুলে গিয়েছিলেন। ফলে রাশ আর হাতে থাকেনি, রাস্তায় নেমে আসা মানুষ সরকারের বিরুদ্ধে পুঞ্জীভূত ক্ষোভ উগরে দিয়েছে। আসলে দুনিয়ায় অরাজনৈতিক বলে যে কিছু হয় না, এটা যেমন ভোলা চলে না, তেমনি একথা ভুললেও চলে না যে জনতা সকলকে চমকে দিতে পারে। বুধবার রাতেও দিয়েছে। নইলে যে কাগজ একদা লিখত ‘যে দেশে ব্রিগেড নাই সেখানে কি গণতন্ত্র নাই?’, তারই টিভি চ্যানেলকে বুধবার লিখতে হত না ‘বিবেকের ডাকে বাংলা জুড়ে ব্রিগেড’। অবশ্য এর মানে হয়ত এটাও হতে পারে, যে ব্রিগেডেও আপত্তি নেই। যদি সেটা অরাজনৈতিক ব্রিগেড হয়।

আরও পড়ুন এই নির্বাচনে দেশ পশ্চাদপসরণ আটকাতে লড়ছে, কিন্তু পশ্চিমবঙ্গ?

মুশকিল হল, অরাজনৈতিক আন্দোলন একবিংশ শতাব্দীতে সারা বিশ্বে বেশ কেতাদুরস্ত হয়ে দাঁড়ালেও কোনো পরিবর্তন ঘটাতে পারেনি, যতক্ষণ না প্রবলভাবে রাজনৈতিক হয়ে উঠেছে। বাংলাদেশে সম্প্রতি যা ঘটেছে তা থেকেও একথাই প্রমাণ হয়। তবে পরিবর্তন ঘটাক আর না-ই ঘটাক, পশ্চিমবঙ্গের ভদ্রমহিলারা যে পথে নেমে আন্দোলন করার প্রয়োজন স্বীকার করেছেন – এটা নিঃসন্দেহে ভাল লক্ষণ। রাত তো দখল হল। আশা করি এরপর থেকে কলকাতার রাস্তায় দিনে মিছিল, জমায়েত বা অবরোধ দেখলে তাঁরা আর বিরক্ত হবেন না। ব্রিগেডে বা একুশে জুলাইয়ের মিটিংয়ে গ্রাম, মফস্বল থেকে আসা মানুষকে দেখে নাক সিঁটকে বলবেন না ‘চিড়িয়াখানা, ভিক্টোরিয়া বেড়াতে এসেছে।’ যার গায়ে লাঠি এসে পড়ে, তার জন্যে রাস্তাই যে একমাত্র রাস্তা – এটুকু মেট্রো, নিজের গাড়ি বা অ্যাপ ক্যাবে চেপে রাত দখল করতে আসা মহিলারা বুঝলেই অরাজনীতির বিরুদ্ধে স্বাধীনতা সংগ্রাম বেশ খানিকটা এগোবে। আর না বুঝলে?

বুধবার রাতেই কে বা কারা আর জি কর হাসপাতালে ঢুকে পড়ে তাণ্ডব চালিয়েছে, এমার্জেন্সি ডিপার্টমেন্টে ভাংচুর করেছে। আন্দোলনরত একমাত্র রাজনৈতিক শক্তি ভারতের গণতান্ত্রিক যুব ফেডারেশন ওই চত্বরে যেখানে অবস্থান বিক্ষোভ করছিল সেই জায়গাটা ভেঙে দেওয়া হয়েছে। তৃণমূল কংগ্রেসের দু নম্বর নেতা অভিষেক ব্যানার্জি জানিয়ে দিয়েছেন, ডাক্তারদের আন্দোলন ন্যায্য। তাঁদের নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। এসব যারা করেছে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

মানে নির্ঘাত স্বাধীনতা দিবস থেকেই ধর্ষণ, খুনের ঘটনার চেয়ে বড় করে তোলা হবে সরকারি হাসপাতালে হামলার ঘটনাকে। অন্যদিকে শনিবার থেকে মমতার দলই পথে নামবে মৃতাকে ন্যায়বিচার পাইয়ে দেওয়ার দাবিতে। অর্থাৎ যাঁর অধীন হাসপাতাল প্রশাসন ঘটনা ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করল, প্রমাণ লোপাট করতে হাসপাতালে ভাঙাভাঙি শুরু করে দিয়েছিল, সেই প্রশাসনের মাথাকে যিনি অন্য হাসপাতালে পুনর্বাসন দিয়েছিলেন – সেই স্বাস্থ্যমন্ত্রী ও পুলিসমন্ত্রীই এবার আন্দোলনকারী সাজবেন। বুধবার রাতের আন্দোলনের হোতাদের যুক্তি মানলে এতে কোনো অসঙ্গতি নেই। কারণ ব্যাপারটার মধ্যে রাজনীতি টেনে আনা অনুচিত। ব্যাপারটা নারী অধিকার সংক্রান্ত। মুখ্যমন্ত্রী নিজে নারী। অতএব।

অরাজনীতির হাত থেকে স্বাধীন হতে না পারলে মানুষকে বোকা বানানোর এই চেষ্টা পশ্চিমবঙ্গে চলতেই থাকবে। আশা করা যাক, বুধবার রাতের পর বাঙালি ভদ্রমহিলারা আর বোকা বনবেন না।

নাগরিক ডট নেটে প্রকাশিত