সংবাদ ও সংবাদমাধ্যমে যা দেখি নতুন লাগে

“ধর্ম যার যার উৎসব সবার” বলার মধ্যে ভদ্রলোকি ভণ্ডামি আছে নিশ্চিত। কারণ ঈদকে হিন্দু বাঙালি একই যুক্তিতে উৎসব হিসাবে পালন করে না। তা বলে একটা উৎসবকে যে যা খুশি নামে ডাকতে পারবে না, যেমনভাবে খুশি পালন করতে পারবে না— এরকম রাষ্ট্রীয় নির্দেশ নেহাত গা-জোয়ারি।

একদা এক বিখ্যাত সাংবাদিকের অধীনে কাজ করতাম, ধরা যাক তাঁর নাম লোকুবাবু। লোকুবাবুর একটা অদ্ভুত অভ্যাস ছিল। তিনি হঠাৎ হঠাৎ রাগের মাথায় একেকটা শব্দ নিষিদ্ধ করে দিতেন। মানে ধরুন, তাঁর মনে হল comeback শব্দটা বড্ড বেশি ব্যবহার করা হচ্ছে সেই কাগজের শিরোনামে। অমনি একদিন অফিসের ছাদ ফাটিয়ে ঘোষণা করতেন “Comeback is banned.” এমন করতে করতে হয়ত কোনোদিন দেখা যেত win কথাটা নিষিদ্ধ, মানে লেখা বারণ। খবরের কাগজের খেলার পাতায় সে কী বিপত্তি!

পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর ‘শারদোৎসব’ শব্দটা নিষিদ্ধ করে দেওয়া দেখে তাই স্মৃতিমেদুর হয়ে পড়লাম। স্মৃতিমেদুরতা খুব বিপজ্জনক জিনিস। স্মৃতিমেদুরতার চশমা পরে দেখলে অ্যাডলফ হিটলারকেও উত্তমকুমার অভিনীত ভালো ছেলেদের মত মনে হয় অনেকসময়। উপরন্তু স্বৈরাচার বা ফ্যাসিবাদের সঙ্গে সময়ের দূরত্ব তৈরি হলে তাকে আর তত ভয়ঙ্কর লাগে না, বরং “কেমন কড়া লোক ছিল” বলে প্রশংসা করতেও মন চায় অনেকের। অতএব চারপাশটা স্মৃতিমেদুরতার চশমা খুলেই দেখা ভালো। সেভাবে দেখলে লোকুবাবুর এই খুঁতখুঁতেমি আর মজাদার লাগে না, স্বৈরাচার বলে স্পষ্ট চেনা যায়। কারণ একটা ভাষা তৈরি হয় বহু প্রজন্ম ধরে কয়েক কোটি মানুষের যৌথ প্রয়াসে। সেই ভাষার বহুল ব্যবহৃত একটা শব্দকে কোনো ব্যক্তি, তিনি যত ক্ষমতাবানই হোন না কেন, হঠাৎ এক ঘোষণায় নিষিদ্ধ করে দিতে পারেন না। ক্ষমতার চোখরাঙানিতে ভয় পেয়ে যদি বা মানুষ লেখা বন্ধ রাখে, মুখে মুখে শব্দটা চালু থাকবেই। ঠেকায় কার সাধ্যি? এ আসলে কেবল একটা ভাষার উপর সন্ত্রাস নয়, সেই ভাষাভাষী মানুষের সংস্কৃতির উপর আক্রমণ। লোকুবাবুর সমর্থনে তবু বলা যেতে পারে— কাগজের পাতার শিরোনামে একই শব্দের বারবার ব্যবহার আটকানো তাঁর কর্তব্য। কিন্তু যখন কোনো নির্দিষ্ট শব্দকে নিষিদ্ধ করার কাজটা করেন রাজ্যের প্রশাসনিক প্রধান, আর যে শব্দটা নিষিদ্ধ করেছেন সেটা এমন এক উৎসবের নাম যেটা আবেগের দিক থেকে তো বটেই, অর্থনৈতিকভাবেও পশ্চিমবঙ্গের বাঙালির সবচেয়ে বড় উৎসব; তখন এ কাজের পক্ষে যে কোনো যুক্তিই কুযুক্তি। দুর্গাপুজোকে শারদোৎসব বলে, তারপর “ধর্ম যার যার উৎসব সবার” বলার মধ্যে ভদ্রলোকি ভণ্ডামি আছে নিশ্চিত। কারণ ঈদকে হিন্দু বাঙালি একই যুক্তিতে উৎসব হিসাবে পালন করে না। তা বলে একটা উৎসবকে যে যা খুশি নামে ডাকতে পারবে না, যেমনভাবে খুশি পালন করতে পারবে না— এরকম রাষ্ট্রীয় নির্দেশ নেহাত গা-জোয়ারি।

ভাগ্যিস দুর্গাপুজো অর্থনৈতিকভাবে পশ্চিমবঙ্গে অতি গুরুত্বপূর্ণ, নইলে সংবাদমাধ্যমে মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্য নিয়ে হইচই কতটা হত কে জানে! শনিবার (১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬) সকালের গণশক্তি-র এক প্রতিবেদন বলছে, কুমোরটুলিতে গতবার সাড়ে ছয় হাজার প্রতিমার বরাত এসেছিল, এবারে বায়না হয়েছে সাড়ে পাঁচ হাজার। যদি খবরটা ঠিক হয়, তাহলে এখানেই তো এক হাজার পুজো কমে যাওয়ার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। রাজ্যের অন্যান্য জায়গার অবস্থা তাহলে সহজেই অনুমেয়। মানে পুজো কেমন হতে হবে তা নিয়ে একাধিক রাজনৈতিক ও ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব (যত দোষ সবই বাগেশ্বর বাবাকে দিলে তো চলবে না) যেসব মন্তব্য করেছেন, তার হাতেনাতে ফল হয়েছে। এর ধাক্কা যে অর্থনীতির উপর পড়বে তা বলাই বাহুল্য। হয়ত সেই কারণেই পশ্চিমবঙ্গের প্রায় সব সংবাদমাধ্যম মৃদু বা সোচ্চার প্রতিবাদ সহ বড় করে তুলে ধরেছে মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্য (আনন্দবাজার পত্রিকা আবার রবীন্দ্রনাথের লেখা থেকে উদ্ধৃতি সমেত)। নইলে খোদ কলকাতার বুকে যে একটা আস্ত পাড়াকে তিন মাসের বেশি সময় ধরে জলহীন করে রাখা হয়েছে স্রেফ বাসিন্দাদের ধর্মবিশ্বাসের কারণে, এত বড় খবরটা রাজ্যের কোন মূলধারার সংবাদমাধ্যম কতবার তুলে ধরেছে গত একমাসে? বরং সর্বভারতীয় বিকল্প সংবাদমাধ্যম সে কাজ করছে বেশি।

আরও পড়ুন নির্বাচনের ফলে হেরে গেছে দেশের অসাধু মিডিয়া

অবশ্য মুখ্যমন্ত্রী ভালোমন্দ যা-ই বলুন, তাকে লঘু করবে কে? রাবণের মত দশটা মাথা কার আছে? উপরন্তু লোকুবাবুরাই এখন সংবাদমাধ্যমের উপর থেকে নিচ পর্যন্ত বিরাজ করছেন। লোকুবাবু বিখ্যাত হয়েছিলেন বিখ্যাত খেলোয়াড়, প্রাক্তন খেলোয়াড়, আইপিএলের যুগে পেজ থ্রি সেলেবদের লম্বা লম্বা সাক্ষাৎকার নিয়ে। ফলে তাঁর অধীন সমস্ত পাতা জুড়েই ‘কী ঘটিয়াছে’-র থেকে বড় করে তুলেছিলেন ‘কে কী বলিয়াছে’-কে। সেইসময় তবু এ জিনিসের নিন্দেবান্দা করার লোক ছিল মিডিয়ায়। কিন্তু তাঁরা তখনই প্রান্তিক, এখন ভ্যানিশ। লোকুবাবুদের নাম যশ দেখে পরবর্তী প্রজন্মের ছকুবাবুরা শিখেছেন যে ওকেই সাংবাদিকতা বলে। তার উপর অমৃতকালের ভারতে মন্ত্রীসান্ত্রীরা কী বললেন সেটাকেই খবর করে না তুলে অধিকাংশ সংবাদমাধ্যমের উপায় নেই। স্রেফ অনুলিখন করো, নইলে সরকারি বিজ্ঞাপন বন্ধ। কী করলেন সেটাও ছাপা বা দেখানো যাবে, যদি কাজটা হয় ফিতে কাটা বা ট্রেনের সামনে পতাকা নাড়া, কিংবা হিমালয়ের গুহায় বসে ধ্যান করা। যা একেবারেই প্রকাশ করা চলে না ইদানীং, তা হল মন্ত্রীসান্ত্রীরা কী করলেন না। সেসব জায়গা ভরাতে কাগজে ছাপতে হলেও, ভিতরের পাতায় ছোট করে। আর টিভির সান্ধ্য কাজিয়ায় ওসবকে বিষয় করে তোলার প্রশ্নই নেই। সুতরাং বিশ্ববিদ্যালয় বিল বা নাগা সন্ন্যাসীদের নিয়ে মুখ্যমন্ত্রীর যাদবপুর অভিযান নিশ্চয়ই যথাযোগ্য সম্মান পাবে কাগজে এবং টিভি চ্যানেলে। কিন্তু রাজ্যের প্রায় প্রত্যেক পৌরসভা আর পঞ্চায়েত এলাকাতেই যে নানা কারণে জঞ্জাল সাফাই হচ্ছে না দীর্ঘদিন ধরে— সে খবর নিজ নিজ জেলার পাতায় চুপিসারে গেলেই যথেষ্ট। আবার নাগা সন্ন্যাসীদের যে ছবি সবাই দেখে ফেলেছে, সোশাল মিডিয়ায় ভাইরাল, সে ছবি কাগজে প্রায় দেখাই গেল না। জানি না এর পিছনে শ্লীলতা-অশ্লীলতার যুক্তি আছে কিনা। যদি থাকে তাহলে আবার কিঞ্চিৎ স্মৃতিমেদুরতা তৈরি হবে। কারণ যেসব কাগজ সর্বত্যাগী সাধুদের নগ্নতা দেখাতে লজ্জায় নতমুখ, কৈশোরে তাদেরই পাতায় অসংখ্য বিখ্যাত, আধাবিখ্যাত মডেল ও অভিনেত্রীর প্রায়-নগ্নতা দেখে আমাদের দাড়িগোঁফ গজানোর গতি বেড়ে গিয়েছিল। কথাটা বিশেষত ইংরিজি ভাষার কাগজগুলোর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। তখন সোশাল মিডিয়ার যুগ হলে ভাইরাল হওয়ার সমস্ত রেকর্ড ভেঙে ফেলত সেইসব কাগজের সেইসব পাতা।

অবশ্য সোশাল মিডিয়া থাকায় কিছু উপকারও হয়েছে। যেমন কাগজ খুললে বা টিভির খবর দেখলে কেবল জানা যাচ্ছে, দিল্লিতে ব্রিকস সামিটে নরেন্দ্র মোদী গোলের পর গোল দিচ্ছেন। সোশাল মিডিয়া না থাকলে জানাই যেত না যে ওদিকে দিল্লি শহরের ট্র্যাফিকের ইট খসে পড়েছে। দিল্লিবাসীরা সোশাল মিডিয়ায় অভিযোগ করছেন— রাস্তায় বেরোলে এত ডাইভার্শন, যে ঘুরে যেতে যেতে কেউ শেষে নিউ ইয়র্কও পৌঁছে যেতে পারে। যদিও বিশ্বগুরু হওয়ার গুরুত্ব যারা বোঝে না, সেইসব মূঢ়রাই এরকম অভিযোগ করে থাকে। রাস্তায় গর্ত, ট্র্যাফিক জ্যাম, সরকারি ইমারতের ছাদ ফুটো হয়ে জল পড়া বা পুর পরিষেবার গাফিলতিতে সরকারকে প্রশ্ন করা সংবাদমাধ্যমের কাজ ছিল সেই জুরাসিক যুগে। এখন তো ভারত আনন্দ আশ্রম। মিডিয়ার কাজ গেয়ে যাওয়া “পৃথিবী বদলে গেছে/যা দেখি নতুন লাগে।” প্রশ্ন করার ব্যাপারটা ছেড়ে দেওয়া হয়েছে দিমাগী নকশাল বিকল্প সংবাদমাধ্যমের হাতে।

a2onuswor.com ওয়েবসাইটে প্রকাশিত

দিমাগী নকশাল: সমস্যা নকশাল নিয়ে, নাকি মগজ নিয়ে?

শুনেছি মার্কিন দেশে অ্যালবার্ট আইনস্টাইনের মগজ নানা ভাগে ভাগ করে রীতিমত সংরক্ষণ করে রাখা হয়েছে, কারণ এক জীবনে অত বিরাট বিরাট কাজ করে যাওয়া লোক মানুষের ইতিহাসে বিরল। কিন্তু সে তো তাঁর আশ্চর্য মেধার প্রকাশ দেখে তাঁর মৃত্যুর পর করা হয়েছে। জ্যান্ত লোকের মগজ দেখতে পান নাকি আমাদের প্রধানমন্ত্রী! তাঁর কাছে কি সুকুমার রায় বর্ণিত ফুটোস্কোপ রয়েছে?

আনন্দময় বর্মণকে বোধহয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এবং তাঁর মন্ত্রিসভার সদস্যরা চেনেন না। চিনে নিতে চাইলে কাজটা কঠিন নয়, কারণ উনি ভারতীয় জনতা পার্টির টিকিটেই নির্বাচিত বিধায়ক।

স্বাধীনতা দিবসের ভাষণে ‘দিমাগী নকশাল’ বলতে প্রধানমন্ত্রী ঠিক কী বুঝিয়েছেন তার ব্যাখ্যা দিতে হয়েছে মন্ত্রিসভার সদস্য কিরেণ রিজিজুকে। নকশাল আন্দোলন কী এবং নকশাল কারা— সে ব্যাপারে যাঁদের সামান্য ধারণা আছে তাঁদের রিজিজুর ব্যাখ্যা শুনে হাসি পাওয়া স্বাভাবিক। তিনি যেসব বৈশিষ্ট্য নির্ধারণ করেছেন তার সঙ্গে নকশাল হওয়ার কোনও আবশ্যিক সম্পর্ক নেই। তার উপর আলাদা করে ‘দিমাগী’ বলতে কী বোঝানো হয়েছে তার ব্যাখ্যাও নেই।

অথচ ভারতের নকশাল আন্দোলন যেখান থেকে শুরু হয়েছিল, সেই নকশালবাড়ি জায়গাটা যে বিধানসভার অধীনে (মাটিগাড়া-নকশালবাড়ি), তা এখন বিজেপিরই দখলে। সেখানকারই বিধায়ক আনন্দময়বাবু। প্রধানমন্ত্রী বা কিরেণবাবু যদি একবারটি তাঁর সঙ্গে কথা বলতেন, তাহলেই হয়ত এমন ঘেঁটে ঘ অবস্থা হত না যাতে প্রধানমন্ত্রীর বক্তৃতার ‘মেড ইজি’ দিতে হয় আরেকজন মন্ত্রীকে; তাতেও এমন সব অদ্ভুত কথা বেরোয় যে সোশাল মিডিয়ায় হাসাহাসি চলে।

অবশ্য এসব গ্রহের কারসাজিও হতে পারে। কারণ ২০১৪ থেকে এই সেদিন পর্যন্ত মোদীজি ও তাঁর দল কাউকে ‘আর্বান নকশাল’, ‘টুকড়ে টুকড়ে গ্যাং’, ‘অ্যান্টি-ন্যাশনাল’, ‘আন্দোলনজীবী’, ‘খালিস্তানি’ ইত্যাদি তকমা দিলে দেশসুদ্ধ লোক তা শিরোধার্য করে সেইসব লোককে দেশের শত্রু হিসাবে মেনে নিত। যারা চিহ্নিত হল তাদের পত্রপাঠ গ্রেফতারি, তাদের নামে এফআইআর দায়ের, বাড়িতে বা অফিসে তল্লাশি চলত। তাদের বন্ধুবান্ধবরাও কিঞ্চিৎ ভীত হয়ে পড়তেন, পাছে সঙ্গদোষে তাঁদেরও একই হাল হয়। কিন্তু কে জানে কোন গ্রহের ষড়যন্ত্রে সেসব চলতে থাকলেও ভয় আউট, ঠাট্টা ইন হয়ে গেছে। দেশের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত আন্দোলনকারী, মানবাধিকার কর্মী, তথ্যের অধিকার আইন নিয়ে মামলা মোকদ্দমা করা লোকজনের (যাদের মধ্যে আবার তরুণ আইনজীবীরাও আছেন) উপর ক্ষিপ্ত হয়ে তাদের আরশোলার সঙ্গে তুলনা করলেন। ও মা! কিছুদিনের মধ্যেই ককরোচ জনতা পার্টি তৈরি হয়ে গেল! তারপর তাদের সঙ্গে গুচ্ছের বামপন্থী ও আম্বেদকরপন্থী ছেলেমেয়ে জুটে গেল। দিল্লির যন্তর মন্তর থেকে শুরু হয়ে তারা গোটা উত্তর ভারতে ওড়াউড়ি শুরু করে দিল; বিভিন্ন রাজ্যের পুলিশ ‘হিট’ দিতে দিতে নাজেহাল, কিছুতেই কিছু হয় না। অমিত শাহের চাণক্যসুলভ বুদ্ধি পর্যন্ত ফেল। আরশোলা মারতে গিয়ে এমন হল যে তিনি নিজেই সংসদে ঢোকা ছেড়ে দিতে বাধ্য হলেন। প্রধানমন্ত্রী বাংকারে আশ্রয় নিয়েছিলেন কিনা কে জানে! যা-ই হোক, আরশোলাদের ইনস্টাগ্রামে ক্ষমা করে দিয়ে তিনি লালকেল্লা থেকে দেশের মানুষকে ‘দিমাগী নকশাল’ সম্পর্কে সাবধান করলেন। এবারে দেখা গেল মোটেই কেউ ঘাবড়াচ্ছে না। সোশাল মিডিয়ায় দিমাগী নকশাল পার্টিও তৈরি হয়ে গেছে। কেউ আর ভয় তো পাচ্ছেই না, এমনকী ব্যাপারটা এমন ‘কুল’ হয়ে দাঁড়িয়েছে যে নকশাল (মাওবাদী) সংগঠনগুলোর বিরুদ্ধে অপারেশন গ্রীন হান্ট চালু করে অমিত শাহকে অপারেশন কাগারের পথ দেখিয়েছিলেন যে পি চিদম্বরম, তিনিও নিজেকে দিমাগী নকশাল বলে দাবি করে বসেছেন। বল মা তারা দাঁড়াই কোথা!

প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন, নকশালরা শেষ হয়ে গেছে। কিন্তু দিমাগী নকশালরা এখনও আছে। তাদের থেকেই সাবধান হতে হবে। একথা শুনে আমার মত ছাপোষা নাগরিকদের কিছুটা আশ্বস্ত লাগে। নকশালরা নিজেরাও গুনে বলতে পারবে না তাদের কতরকমের প্রকারভেদ আছে, তার মধ্যে কারা অবশিষ্ট আছে আর কারা অপারেশন কাগারের ফলে অবলুপ্ত। কিন্তু মোদীজি যখন বলছেন আর কেউ নেই, তখন নিশ্চিত নেই।

আরও পড়ুন ওয়ারেন হেস্টিংস যা শেখালেন

সেই ২০১৬ সালে নোটবন্দির পর থেকে শুনে আসছি, নকশালরা শেষ হয়ে গেছে। কথাটা এতবার বলা হয়েছে যে এবার গুনে দেখতে হবে এ পর্যন্ত কতবার নকশালরা শেষ হয়েছে। যা-ই হোক, আরও একবার শেষ হলে ক্ষতি কী? শাস্ত্রে বলেছে অধিকন্তু ন দোষায়। তাই স্বাধীনতা দিবসের বক্তৃতা শুনে আশায় বুক বেঁধেছিলাম। কিন্তু দিমাগী নকশাল আবার কোথা থেকে এল রে বাপু! দিমাগ মানে তো মগজ। তাহলে দিমাগী নকশাল মানে হল মগুজে নকশাল। এটা কি কাগুজে বাঘের মত ব্যাপার? তা বাপু বাঘশুমারির সময়ে আলাদা করে কাগুজে বাঘও গোনা হয় বলে তো শুনিনি। কাগুজে বাঘ আসল বাঘের সমান বিপজ্জনক, এমনও শুনিনি। তাহলে নকশালরা আর না থাকলে মগুজে নকশালদের নিয়ে এত চিন্তা কীসের? তাছাড়া কোন মানুষটারই বা মগজ নেই? যারা প্রধানমন্ত্রীর দলের লোক তারা কি বিনা মগজেই এত বড় দেশ চালাচ্ছে?

তাহলে সমস্যা কি কিছু মানুষের মগজে যা আছে তা নিয়ে? তবে তো ভারি মুশকিল। শুনেছি মার্কিন দেশে অ্যালবার্ট আইনস্টাইনের মগজ নানা ভাগে ভাগ করে রীতিমত সংরক্ষণ করে রাখা হয়েছে, কারণ এক জীবনে অত বিরাট বিরাট কাজ করে যাওয়া লোক মানুষের ইতিহাসে বিরল। কিন্তু সে তো তাঁর আশ্চর্য মেধার প্রকাশ দেখে তাঁর মৃত্যুর পর করা হয়েছে। জ্যান্ত লোকের মগজ দেখতে পান নাকি আমাদের প্রধানমন্ত্রী! তাঁর কাছে কি সুকুমার রায় বর্ণিত ফুটোস্কোপ রয়েছে? অবশ্য মোদীজি পারেন না এমন জিনিস নেই। সেই কোন ছেলেবেলায় কুমিরের মুখ থেকে খেলার বল উদ্ধার করে এনেছিলেন। এই তো সেদিন সশরীরে উপস্থিত না হয়েও কয়েক ঘন্টার জন্যে রুশ-ইউক্রেন যুদ্ধ থামিয়ে দিয়েছিলেন। তাঁর পক্ষে জ্যান্ত মানুষের মগজে কী আছে তা জানা আর এমন কী ব্যাপার?

কিন্তু যদি জানেনই যে যা আছে তা দেশের পক্ষে ক্ষতিকর, তাহলে এতদিন কোনো ব্যবস্থা নেননি কেন? তিনিই তো আমাদের দণ্ডমুণ্ডের কর্তা। পেট্রল পাম্প থেকে ভ্যাকসিন সার্টিফিকেট (সুনীল শেঠির ঠাকুরঘরেও)— তিনি সর্বত্রগামী। কেবল দেশের শত্রুদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার বেলাতেই সব দায়িত্ব আমাদের ঘাড়ে এসে পড়বে নাকি? করোনা ভাইরাস আটকানোর মত মগুজে নকশালদের আটকানোর জন্যেও এবার থালা বাজানোর হোমটাস্ক দেবেন আমাদের, নাকি মোমবাতি জ্বালানোর? নাকি কোথাও লাইন-টাইন দিতে হবে আবার? গত বারো বছরে এই একটা শিল্পেই তো নিয়মিত কর্মসংস্থান হয়েছে। টাকা তুলতে লাইন, অমুকের সঙ্গে তমুকের লিংক করাতে লাইন, এসআইআরে নাম তুলতে লাইন, ট্রাইব্যুনালে লাইনে দাঁড়ানোর পর এবার কি মগুজে নকশাল নই প্রমাণ করতে লাইনে দাঁড় করানো হবে আবালবৃদ্ধবণিতাকে?

নাকি সমস্যা মগজ থাকলেই? তাই যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় বা জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের মত মগজের চর্চা করার জায়গাগুলোতে রাত বিরেতে হামলা হবে? সে সরকার মাইবাপ, যদি তাই চান তো তাই হবে। ঠেকাবে কে? কিন্তু যাদবপুর বা জেএনইউ-কে মেরে ধরে গলগোটিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের স্তরে নামিয়ে আনলেই কি মগজের সমস্যা মিটবে? মগজ যে সকলেরই আছে, আর সেটা থাকে মুণ্ডুতে। তা মুণ্ডু গেলে খাবটা কী? অবশ্য গ্যাসের দাম, জিনিসপত্রের দাম যেভাবে বাড়ছে তাতে খাওয়ার খরচ অনেক। হিতৈষী সরকার হয়ত খরচ বাঁচিয়ে দিতে চাইছেন। এটাই মাস্টারস্ট্রোক।

a2onuswor.com ওয়েবসাইটে প্রকাশিত

সাহসী পাঠকের জন্য সাহসী লেখকের প্রথম গল্পের বই

এ বই পড়লে আর কখনো কোনো ভাষার কোনো আখ্যানের শেষে ‘And they lived happily ever after’ বাক্যটি বা ওর সমার্থক কোনো বাক্য পড়ে পাঠক বিশ্বাস করতে পারবেন কিনা সন্দেহ।

সরকার থেকে একটা বড় যজ্ঞের আসর বসানো হয়েছে। ত্রিকালসিদ্ধ নাগা জ্যোতিষ আর একটা কানা গেরুয়া কৌপীনধারী যজ্ঞে ঘি ঢালছে। কেজি কেজি ঘি। মণ মণ বেলকাঠ। গম্ভীর মন্ত্রপাঠ। ধোঁয়ায় ভরে যাচ্ছে চারদিক। অনুভূতি যথাযথ করার জন্যে যজ্ঞ হচ্ছে। ভয়, বিরক্তি, খুশি, রাগ, দুঃখ, লজ্জা, আশ্চর্য/অবাক সব যেন ব্যাকরণমাফিক হয়। তারপর সমস্ত কিছু আগের মতো যথাযথ হয়ে গেলে এই গল্পগুলো মিথ হয়ে যাবে। মুখফেরতা আখ্যান। আর, আখ্যানের শেষে জেগে থাকবে, ‘And they lived happily ever after.’

এই অনুচ্ছেদটি যে বইয়ের শেষ অনুচ্ছেদ, সেই বইটির নাম আয়না উধাও, লেখক প্রবুদ্ধ ঘোষ। এটি উপন্যাস নয়, ছোটগল্পের বই। তবু এই বই পড়লে মনে হয়, লেখক আসলে একটিই আখ্যান নানাভাবে পাঠকের সামনে তুলে ধরছেন। তার কারণ শুধু এটুকু নয় যে এক গল্পের চরিত্রকে অন্য গল্পেও পাওয়া যাচ্ছে। কেবল এটুকুও নয়, যে এক গল্পের পটভূমি ‘হরষেবিষাদ’ শহরের নাম সরকার পালটে ‘হরষবিলাসী’ করে দিচ্ছে অন্য এক গল্পে। এসবের চেয়ে বড় কথা হল, লেখক গোটা বইটি জুড়েই আমাদের জানা ঘটনাবলীকে, বিস্মৃত ঘটনাবলীকে অজানা করে তুলছেন গল্প বলার গুণে। আবার অজানাকে জানার গণ্ডির মধ্যে এনে ফেলছেন। এ কাজ করতে গিয়ে সাধারণত অপ্রিয় সত্যে প্রলেপ দেওয়া হয়, প্রবুদ্ধ করেছেন ঠিক উল্টো। তিনি কখনো পাঠকের স্মৃতির পুরুষাঙ্গে হাতুড়ি মেরেছেন, কখনো পাঠকের স্তনের বোঁটা ছিঁড়ে নিয়েছেন। এ বই পড়লে আর কখনো কোনো ভাষার কোনো আখ্যানের শেষে ‘And they lived happily ever after’ বাক্যটি বা ওর সমার্থক কোনো বাক্য পড়ে পাঠক বিশ্বাস করতে পারবেন কিনা সন্দেহ। বইয়ের প্রচ্ছদ থেকে পৃষ্ঠপ্রচ্ছদ পর্যন্ত পাঠককে সুখী, মেদুর গল্পের সন্ধান দেওয়ার বদলে লেখক কেবলই অস্বস্তিকর অভিজ্ঞতার মধ্যে ঠেলে দিয়েছেন। কখনো কখনো তিনি পাঠকের প্রতি এতই নির্দয় যে গল্পের পিছনের আসল ঘটনাটি সরাসরি উদ্ধৃত করেছেন সংবাদমাধ্যম থেকে। যেমন ‘জাদু-বাস্তারবাদ ও পুতনার আখ্যান’ গল্পের বন্ধনীর মধ্যে রাখা এই অংশটি

(পাঠক নিশ্চয় ভাবছেন, “এ-সব হয় নাকি সভ্য দেশে?” বা। “কেআরপি-র নামে কুৎসা রটানো” ভেবে অশ্লীলতার মামলা ঠুকতে তৈরি হচ্ছেন? প্লিজ রেগে যাবেন না। এগুলো হয়েছে। এরকমই হয়। সিএনএন-১৮ মিডিয়ার সাংবাদিক তনুশ্রী পাণ্ডে বাস্তারের আদিবাসী মহিলাদের সাক্ষাৎকার নিয়েছিলেন। ২০১৫ থেকে ২০১৬ সালের মধ্যে বাস্তারের মহিলাদের অভিজ্ঞতা রেকর্ড করেছিলেন। প্রকাশিত হবার পরে কিছু হইচই হয়েছিল। “I was four months pregnant when I was raped. They (the security forces) did not care I was pregnant,” said a feeble voice, her face blurred by the channel. Another said, she had just delivered (eight hours before) and lactating. “They were not convinced and a cop squeezed my breasts to see if there was milk.” Another woman said “they groped me, sexually assaulted and beat me.”) সাংবাদিক তনুশ্রীর এই রেকর্ডিং এবং লেখার আগে ও পরে এমন অনেকবার হয়েছে। হরবখত হতেই থাকে। যেহেতু গল্পের মধ্যে কিছুটা বিশ্বাসযোগ্যতা রাখতে হয়, তাই তথ্যসূত্র দেওয়া। অবিশ্যি আমাদের গণতন্ত্রে এ-সব অবিশ্বাস্য বা অলীক সংলাপ। যাই হোক, সত্যি লেখা লেখকের কাজ নয়, গল্প লেখা কাজ। আসুন, আবার গল্পে ফিরি।)

লেখক পাঠককে বারবার চমকে দেওয়ার ব্যাপারে কতখানি সচেতন তা বই পড়া শেষ করে গল্পগুলির নামের দিকে তাকালেই টের পাওয়া যাচ্ছে – ১) ‘লোকটা এই পাড়াতেই কোথাও থাকে’, ২) ‘আশু কেন গোয়েন্দা হতে পারছে না’, ৩) ‘আলোমানুষ ও আগুনের লোককথা’, ৪) ‘একঘণ্টার ভাবনায় প্রতিমা যেভাবে বাঁচতে চাইছিল’, ৫) ‘উধাও-আয়না আর আকাশপ্রদীপের লোককথা’, ৬) ‘একটা ভীষণ সুখী সময় আর কয়েকটা থেমে যাওয়া ট্রামের গল্প’, ৭) ‘ক্যাপ্টেন আজ নিশ্চিন্তে ঘুমোবে’, ৮) ‘জাদু-বাস্তারবাদ ও পুতনার আখ্যান’, ৯) ‘একজন ও এবং ওদের আখ্যান’, ১০) ‘আনন্দ ময়দান ছেড়ে পালায়নি’, ১১) ‘সরকার সব ঠিক ক’রে দেবে’।

প্রথম দুটি নামে অনিশ্চয়তা স্পষ্ট, এবং গল্পদুটিও, পাঠক যত এগোবেন, তত তাঁকে এমন এক জগতের সন্ধান দেবে যেখানে লোকটা এবং আশু কিছুতেই থিতু হতে পারছে না। পাঠকও সেই অনিশ্চয়তার, অস্বস্তির ফাঁসে ছটফট করবেন, পালাতে পারবেন না। আলো আর আগুন পাশাপাশি দেখে যে আশঙ্কা মনে উঁকি দেয়, তৃতীয় গল্পে সেই আশঙ্কাই ক্রমশ বিরাট আকার ধারণ করেছে। বিরাট করে তুলতে লোককথার প্রকরণের সার্থক ব্যবহার করেছেন লেখক। চতুর্থ গল্পের নামে বলেই দেওয়া হয়েছে যে এ মাত্র একটি ঘন্টার ভাবনা। কিন্তু এক ঘন্টার মধ্যে একজন মানুষের আস্ত জীবনভাবনা যখন সেঁধিয়ে যায় তখন তো চিঁড়েচ্যাপ্টা হয়ে যেতে হয়। তারপর ভাবুন, আয়নাবিহীন বাড়ির কথা ভাবলেই অস্বস্তি হয় না? অসম্ভব মনে হয় না? প্রায় প্রত্যেক গল্পেই কলমের খোঁচায় বাস্তবের নাড়ি ভুঁড়ি বার করে এনেছেন লেখক, পঞ্চম গল্পে তা তুঙ্গে উঠেছে। ষষ্ঠ গল্পের নামে পাঠকের যে প্রত্যাশা তৈরি হয়, গল্প চলে ঠিক উল্টো পথে। ফলে পাঠককে ফের চমকে উঠতে হয়। ক্রমশ পরিষ্কার হয় যে গল্পের নামে ‘সুখী’ শব্দটি নয়, ‘ভীষণ’ শব্দটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। সপ্তম গল্পেও শিরোনামের প্রত্যাশার ঠিক উল্টো মেরুতে পাঠককে নিয়ে যান লেখক। অষ্টম গল্পটি, এই আলোচকের মতে, এই বইয়ের সবচেয়ে সচকিত করার মত এবং সেরা গল্প। নামটি একইসঙ্গে মার্কেজ এবং মহাভারত মনে পড়িয়ে দেয়। গল্প সে উচ্চতায় না পৌঁছলে পরিতাপের বিষয় হত। কিন্তু লেখক নিপুণভাবে বিস্তৃত ক্যানভাসে অত্যাচারের আখ্যান লিখতে পেরেছেন। সে আখ্যান সত্যিই বাস্তবের ঊর্ধ্বে এবং পুতনার মত দৈত্যাকৃতি। নবম গল্পটির নাম প্রথম দুটি গল্পের মত কেবল অনিশ্চয়তা নয়, অকিঞ্চিৎকরতারও আভাস দেয়। আমরা সকলেই নিজের কাছে গুরুত্বপূর্ণ, আমাদের পরিবার পরিজন ততোধিক গুরুত্বপূর্ণ। সুতরাং অতিমারীর সময়ে অকিঞ্চিৎকর মানুষের যে আখ্যান রচনা করেছেন লেখক, তা পাঠককে নড়বড়ে করে দেবে। দশম গল্পে আনন্দের ময়দান ছেড়ে না পালানোর পরিণতিও পাঠককে সুখী করবে না। আর শেষ গল্পের নাম? এই লেখার প্রথম অনুচ্ছেদ আবার পড়ুন। সরকার কীভাবে সব ঠিক করে দেয় তার আঁচ পাবেন।

এখন কথা হল, গাঁটের কড়ি খরচ করে এমন ঘেঁটি ধরে নেড়ে দেওয়া বই পড়বেন কেন? প্রথমত, লেখক মনে করেছেন ভোরের বেলার তারার কাছে তাঁর কিছু কথা আছে। তাই তিনি লিখেছেন, পড়া না পড়া পাঠকের ব্যাপার। এটি প্রথম গল্পের বই হলেও প্রবুদ্ধ স্পষ্টতই পাঠকের মন জোগানোর কথা ভেবে লেখেননি। সে কারণেই গল্পগুলি ব্যতিক্রমী। যদি কোনো পাঠক নিজের পাঠাভ্যাসের বাইরে যেতে না চান, অজ্ঞাত অনুভূতির সন্ধান যদি তাঁর সাহিত্য পড়ার কারণ না হয়, তাহলে এ বই না পড়াই ভাল। যে পাঠক ঝুঁকি নিতে ভালবাসেন – এ বই তাঁর জন্য। এখানে প্রেম আছে, কিন্তু পরিচিত চেহারায় নেই। যৌনতা আছে, হিংসা আছে প্রবলভাবে, গায়ের লোম খাড়া করে দেওয়ার মত রোমাঞ্চ আছে। কিন্তু রহস্য রোমাঞ্চ সিরিজের মত করে নয়। বরং গোয়েন্দাপ্রেমী পাঠককে গোটা বাংলা গোয়েন্দা সাহিত্য সম্পর্কেই ভাবিয়ে তোলার মত গল্প ‘আশু কেন গোয়েন্দা হতে পারছে না’। যে পাঠক বিশ্বাস করেন সাহিত্য মানে তাতে দুটি জিনিস থাকতেই হবে – ভাষাশিল্প আর কল্পনাশক্তি, এ বই তাঁরও মনের খোরাক হবে। আলোচককে বিশ্বাস করা নিষ্প্রয়োজন। নিজেই পড়ে দেখুন ‘একঘণ্টার ভাবনায় প্রতিমা যেভাবে বাঁচতে চাইছিল’ গল্পের প্রথম অনুচ্ছেদের এই অংশ

বাপির কাটা মাথা ভেসে ওঠে। ‘সিলি হাওয়া ছুঁ গয়ি, সিলা বদন ছিল্ গয়া’ গানটা ভেসে আসছে। বাবুদা রেডিয়ো শোনে এখনও। ক্ষয়া ক্ষয়া রেডিয়োর গায়ে আশি দশক থেকে ধুলো জমেছে। সুরেলা আওয়াজও তাই ধুলোমাখা ধূসর হয়ে আসে। ভাঙা ভাঙা। এ-সব সারাবে না কেউ আর। ‘বেচে দাও বাবুদা, ভালো ফোন কেনো একটা’ – এই অনুরোধের আসরে পাত্তা না দিয়েই বাবুদা চা পাতা ফোটায়। বাবুদার দোকানে উঠে যাওয়া গেঞ্জিকলের সুতো লেগে থাকে। ভেঙে যাওয়া ভেপার ল্যাম্পের ফিকে আলো ছড়িয়ে থাকে। বাবুদার দোকানে এখনও তৃণমূল বা বিজেপির পতাকা লাগানোর ধক দেখায়নি কেউ। অথচ পাঁচটা দশের চা খেতে খেতে শ্যামল, বলাই, অমররা বাবুদার দোকানের পতাকা পালটে দেওয়ার আলোচনা করছে অনেক বছর ধরেই। প্রত্যেক পাড়াতেই একটা-দু’টো এমন দোকান থেকে যায়। রেডিয়োর নব ঘোরে, পছন্দের স্টেশন। সন্ধের মুখে সিলি হাওয়া ছুঁয়ে যায়। শরীরে আনচান করে ফ্রিকোয়েন্সি মিলে গেলে। প্রতিমা বাপির মাথাটা দুলতে দেখে। সারা শরীরে কোথাও কোনো আঘাতের দাগ নেই। ক্ষত নেই। শ্মশানে যখন বাপির বডিটা বাঁশের চ্যাঁচাড়িতে শোয়ানো হল, টুপ ক’রে মাথাটা আলাদা হয়ে গেল।

বিশ শতকে একটা সময়ে অনেক গল্পকার বলতেন, পৃথিবীতে বলার মত গল্প শেষ হয়ে গেছে। সুতরাং প্লটের আর গুরুত্ব নেই, এখন গল্পকারের কাজ হল কতরকমভাবে গল্প বলা যায় তা দেখানো। দেখতে দেখতে এই তত্ত্বের বয়সও কম হল না। কিন্তু আজকাল যাঁরা এই তত্ত্বে বিশ্বাস করে গল্প লেখেন, প্রায়শই দেখা যায় তাঁরা গল্প লেখার অছিলায় প্রবন্ধ লিখছেন। তাঁরা মনে করেন, যা বলছেন তা এতটাই গুরুত্বপূর্ণ যে প্লট তৈরি করার দরকার নেই। প্রবুদ্ধ যথেষ্ট গম্ভীর বিষয় নিয়ে গল্প লিখেছেন, ভাষার উপর তাঁর যথেষ্ট দখল। তবুও তিনি অভিনব গল্প বলেছেন, প্লট নির্মাণে যত্ন নিয়েছেন। কোনো গল্পে একটি শহরের সমস্ত আয়না উধাও হয়ে যাচ্ছে, কোনো গল্পে একজন গোয়েন্দা হতে চেষ্টা করছে। কিন্তু তদন্ত শেষ করার আগেই তাকে নিরস্ত করছে একের পর এক মক্কেল। কেন? তা জানতে গেলে গল্পটি পড়তে হবে। প্রবুদ্ধ একটি গল্পে অনায়াসে ঘটনাকে কল্পনার জোরে বীভৎস রসে সিক্ত করে লোককথার সঙ্গে মিলিয়ে দিচ্ছেন, তো আরেকটি গল্পে একেবারে কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে অর্জুন ও শ্রীকৃষ্ণের কথোপকথন থেকে নিঃসৃত হচ্ছে তাঁর আখ্যান।

আরও পড়ুন অবসাদের গল্প: বিপন্ন বিস্ময়ের গল্পকার গৌতম

এর জন্য প্রবুদ্ধর প্রশংসা প্রাপ্য। কিন্তু তাঁর কলমের জোর যেখান থেকে আসছে, হয়ত সেখানেই তাঁর দুর্বলতাও। প্রবুদ্ধর গল্পের রাজনীতির কথা বলছি। প্রবুদ্ধ ঠিক করে নিয়েছেন তিনি কাদের গল্প বলবেন, কাদের পক্ষে দাঁড়াবেন। এই স্থিরতা না থাকলে তাঁর গল্প এত তীক্ষ্ণ হত না। কিন্তু এর ফলে কোনো কোনো গল্পে বহু চরিত্র ভিড় করছে, কিন্তু কোনো চরিত্রই জ্যান্ত হয়ে উঠছে না। তাদের উপর ঘটে যাওয়া নির্যাতন যত স্পষ্ট, মানুষগুলিকে কি তত স্পষ্ট দেখাচ্ছে? লেখক ভেবে দেখতে পারেন।

দ্বিতীয়ত, বেশকিছু ক্ষেত্রে রাজনৈতিক বক্তব্য প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে গল্প অতিকথনের শিকার বলে মনে হয়। এই সমস্যা সবচেয়ে প্রকট ‘আশু কেন গোয়েন্দা হতে পারছে না’ গল্পে। চমৎকার প্লট, চমৎকার বক্তব্য এবং তার যথোপযুক্ত ভাষা এই গল্পের। কিন্তু মনে হয় লেখক কিছুতেই নিশ্চিত হতে পারছিলেন না যে তাঁর বক্তব্য পাঠক বুঝে উঠতে পারবেন কিনা। তাই একের পর এক ঘটনা যোগ করে গেছেন, যা গল্পটির দৈর্ঘ্য বৃদ্ধি করা ছাড়া কিছু করতে পারেনি। কিংবা ধরা যাক, ‘একজন ও এবং ওদের আখ্যান’ গল্পের এই কটি লাইন

‘ও’-র কোনো নাম নেই। থেকেই বা কী হবে? আধার আছে, নম্বর। খিদে আছে। ওদের দিকে তাচ্ছিল্যের বিস্কুট, ব্লিচিং আর রুটি ছুঁড়ে দেওয়া আছে। আমাদের পবিত্রস্তোত্র বা পুরাণকথনের থেকে বহুদূরে ও।

গল্পটি আসলে আগেই শেষ হয়ে গিয়েছিল। শেষাংশে গল্পের ব্যাখ্যা দেওয়া এই অংশের প্রয়োজন ছিল না। মনোযোগী পাঠক নির্ঘাত বুঝতে পারবেন ‘ও’ কেন একটি নামহীন চরিত্র। পাঠককে অস্বীকার করে গল্প লেখার যে সাহস এ বইতে অধিকাংশ ক্ষেত্রে প্রবুদ্ধ দেখিয়েছেন, এখানে এসে সেই সাহস তিনি ত্যাগ করেছেন। এত প্রতিভাবান লেখকের এই দোলাচল কিঞ্চিৎ হতাশ করে। তবে ভরসার কথা, প্রবুদ্ধ অত্যন্ত তরুণ লেখক এবং এই তাঁর প্রথম গল্পের বই। ফলে সামলে নেওয়ার সময় এবং সুযোগ তাঁর আছে। আর যে জিনিসটি রসভঙ্গ করেছে দু-একটি গল্পে, সেটি হল স্লোগান অর্থে ‘নাড়া’ শব্দটি। বুঝতে অসুবিধা হয় না, লেখক যে অঞ্চলের গল্পে শব্দটি ব্যবহার করেছেন সে অঞ্চলের কথ্য হিন্দির কথা মাথায় রেখে ওই শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। কিন্তু সেক্ষেত্রে ‘নারা’ লেখাই সমীচীন। কারণ হিন্দিতে ‘নাড়া’ বলা হয় পায়জামার দড়িকে বা গুরুর শিষ্যত্ব গ্রহণ করে হাতে যে জিনিসটি বাঁধা হয় তাকে।

তবে এই বই লেখক প্রবুদ্ধ সম্পর্কে প্রত্যাশার পারদ চড়িয়ে দিল। অদ্বয় চৌধুরীর প্রচ্ছদও প্রশংসার দাবি রাখে। কারণ তা ছিমছাম অথচ ব্যতিক্রমী।

আয়না উধাও
লেখক: প্রবুদ্ধ ঘোষ
প্রকাশক: বৈভাষিক
প্রচ্ছদ: অদ্বয় চৌধুরী
দাম: ৩০০ টাকা

নাগরিক ডট নেটে প্রকাশিত

চিরতরে কমিউনিস্টদের পর হয়ে যাবেন না কানহাইয়া

রাহুল গান্ধীর কংগ্রেসে ডাঙ্গের দল থেকে যাওয়া কানহাইয়ার সাথে আম্বেদকরপন্থী জিগ্নেশেরও জায়গা হয়েছে। কানহাইয়া আবার প্রায় সব বক্তৃতাতেই আম্বেদকরের কথা বলে থাকেন।

পরলোক থাকলে সেখানে হয়ত শ্রীপাদ অমৃত ডাঙ্গে মুচকি হাসছেন। কারণ দীর্ঘকাল তিনি যে পার্টির প্রবাদপ্রতিম নেতা ছিলেন এবং যে পার্টি থেকে তাঁর বহিষ্কারের অন্যতম কারণ কংগ্রেসকে ভারতীয় গণতন্ত্রের কালো দিনগুলোতে সমর্থন করা, সেই পার্টির উদীয়মান নেতা দল বদলে কংগ্রেসে যোগ দিয়েছেন।

এতদিনে সবাই জেনে গেছেন, কানহাইয়া জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদের প্রথম প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট নন, যিনি পরবর্তীকালে কংগ্রেসে যোগদান করলেন। কিন্তু কানহাইয়া আগের সকলের থেকে আলাদা। কারণ বিশ্ববিদ্যালয়ের চৌকাঠ পেরোবার আগেই সারা দেশ তাঁকে চিনে গেছে। ইচ্ছামত এডিট করা ভিডিও ক্লিপকে হাতিয়ার করে তাঁকে কারারুদ্ধ করা হয়েছিল। হাজতবাস করে এসেই তিনি যে বক্তৃতা দেন, তা তাঁকে রাতারাতি ঘরে ঘরে পৌঁছে দিয়েছিল। অতঃপর সুবক্তা কানহাইয়া ভাইরাল হয়ে যান। ভাইরাল ভিডিওর প্রভাব এখন ভাইরাল অসুখের চেয়ে কম নয়। ফলত কানহাইয়াকে নিয়ে কেবল বামপন্থী নয়, সমস্ত বিজেপিবিরোধী মানুষেরই প্রত্যাশা আকাশচুম্বী হয়েছিল। তিনি সিপিআই ছেড়ে কংগ্রেসে যোগ দেওয়ায় স্বভাবতই নৈতিকতার প্রশ্ন উঠেছে। কিন্তু তাছাড়াও বিষয়টিকে ভারতীয় বামপন্থার সাথে কংগ্রেসের সম্পর্কের নিরিখে দেখা প্রয়োজন।

স্বাধীনতা পরবর্তী যুগে কমিউনিস্টরা কংগ্রেসকে কীভাবে দেখবেন তা নিয়ে বরাবর ধন্দে ভুগেছেন। তার অন্যতম কারণ জওহরলাল নেহরু। ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী কেবল সামাজিক চিন্তাধারার দিক দিয়ে প্রগতিশীল ছিলেন না, তাঁর অর্থনীতিও আধা-সমাজতান্ত্রিক। তার উপর তাঁর সোভিয়েত প্রীতি সর্বজনবিদিত। সোভিয়েত সরকার স্বাধীন ভারতের প্রথম দিককার উন্নয়নেও যথেষ্ট সহায়তা করেছিল। ফলত ডাঙ্গের মত নেতারা কংগ্রেসকে শত্রু বলে ভাবতে চাননি। ১৯৫৯ সালে কেরালার নাম্বুদিরিপাদ সরকারকে নেহরু অন্যায়ভাবে ভেঙে দেওয়ার পরও নয়। অনতিকাল পরেই ভারত-চীন যুদ্ধ, কংগ্রেসের পক্ষাবলম্বন নিয়ে মতভেদ অবিভক্ত কমিউনিস্ট পার্টিতে এমন পর্যায়ে পৌঁছল, যে প্রথমবার পার্টি ভাঙল। সেই ভাঙনের মাশুল ভারতের কমিউনিস্ট আন্দোলন আজও দিয়ে চলেছে। তারপর থেকে অন্য কমিউনিস্ট পার্টিগুলোর সাথে কংগ্রেসের সম্পর্ক বেশিরভাগ সময়ে আদায় কাঁচকলায় হলেও, সিপিআইয়ের সাথে অম্লমধুর। সত্তরের দশকে কেরালায় একসঙ্গে সরকার চালিয়েছে কংগ্রেস, সিপিআই। জরুরি অবস্থার সময়ে বোধহয় অনেক কংগ্রেসির চেয়েও ইন্দিরার প্রতি সিপিআইয়ের সমর্থন বেশি সোচ্চার ছিল।

সিদ্ধার্থশঙ্কর রায়ের কংগ্রেস সরকারের আগ্রাসন সিপিএম ও নকশালদের সাথে কংগ্রেসের শত্রুতাকে চিরস্থায়ী করেছে বলে মনে হত অনেকদিন পর্যন্ত। কিন্তু নব্বইয়ের দশক থেকে সিপিএমের সাথেও কংগ্রেসের সম্পর্ক বদলেছে। দিল্লিতে কংগ্রেসি প্রধানমন্ত্রীর সরকার চলছে সিপিএমের সমর্থনে — এ একসময় অকল্পনীয় ছিল। এমনকি ২০০৪-০৯ সেই সরকার চলার পরেও ভাবা যায়নি পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভায় সিপিএম, কংগ্রেস জোট বেঁধে লড়তে পারে। তা-ও সম্ভব হয়েছে। সিদ্ধার্থশঙ্করের দমননীতিতে সম্ভবত সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিলেন নকশালরা। এই মুহূর্তে সবচেয়ে বড় সংসদীয় নকশালপন্থী দলটি কিন্তু সিদ্ধার্থশঙ্করের স্নেহভাজন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে গণতন্ত্রের রক্ষাকর্তা হিসাবে দেখে। মমতার দল কংগ্রেস থেকে বেরিয়েই তৈরি এবং পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে সর্বার্থে কংগ্রেসের জায়গাই অধিকার করেছে। অতএব ব্যক্তির নৈতিকতার প্রশ্নে কানহাইয়ার দলবদল নিন্দার্হ হতে পারে, রাজনৈতিক নীতির দিক থেকে তিনি কতটা বিচ্যুত, তা তর্কসাপেক্ষ।

আরও পড়ুন কানহাইয়ার কেরিয়ার আর কমিউনিস্ট আদর্শবাদ: তার ছিঁড়ে গেছে কবে

ভারতের কমিউনিস্ট আন্দোলন যে একশো বছরেও সারা দেশে প্রভাব বিস্তার করতে পারল না, তার কারণ হিসাবে অনেকেই আম্বেদকরপন্থীদের সঙ্গে ঐক্যের চেষ্টা না করাকে দায়ী করেন। ডাঙ্গে যখন মহারাষ্ট্রের গিরনি কামগর ট্রেড ইউনিয়নের নেতা, তখন সুবর্ণ সুযোগ এসেছিল। কিন্তু আম্বেদকরের প্রস্তাব অনুযায়ী দলিত শ্রমিকদের বস্ত্রশিল্পের বয়ন বিভাগে কাজ করতে দেওয়ার দাবিকে ডাঙ্গে আন্দোলনের দাবিতে যুক্ত করতে রাজি হননি, ফলে ঐক্য হয়নি। মজার কথা, রাহুল গান্ধীর কংগ্রেসে ডাঙ্গের দল থেকে যাওয়া কানহাইয়ার সাথে আম্বেদকরপন্থী জিগ্নেশেরও জায়গা হয়েছে। কানহাইয়া আবার প্রায় সব বক্তৃতাতেই আম্বেদকরের কথা বলে থাকেন। কংগ্রেসে বাম ঘেঁষা আর্থসামাজিক চিন্তার রাহুলই শেষ কথা হয়ে উঠবেন, নাকি কপিল সিবালের মত বৃদ্ধ সিংহেরা নিজেদের মত চাপিয়ে দিতে সমর্থ হবেন — কানহাইয়ার ভবিষ্যৎ নিঃসন্দেহে অনেকটা তার উপরেও নির্ভর করবে। তবে অদূর ভবিষ্যতেই এমন দিন আসতে পারে, যখন আজ বিশ্বাসঘাতক মনে হওয়া কানহাইয়ার হয়ে তাঁর প্রাক্তন কমরেডদের প্রচারে বেরোতে হবে।

উত্তরবঙ্গ সংবাদে প্রকাশিত