নয়ের দশক থেকে কলকাতার বড় বড় সংবাদমাধ্যম যে শহুরে দরকচা মারা ছবিগুলোকে বাংলা ছবির পুনরুত্থান বলে দাগিয়ে দিল, সেগুলো বস্তুত বিভিন্ন মেজ সেজ ফেস্টিভালে পুরস্কার জেতা ছাড়া বাংলা ছবির হোমেও লাগেনি যজ্ঞেও লাগেনি।
এখনো বছরে যে দু-চারটে দিন পশ্চিমবঙ্গের বাঙালির নিজস্ব সংস্কৃতির জন্য গর্ববোধ হয় এবং সেটাকে বাঁচানো প্রয়োজন বলে মনে হয়, আজ তার মধ্যে এক দিন। আজ বাংলা সিনেমার আন্তর্জাতিকভাবে সবচেয়ে উদযাপিত পরিচালক সত্যজিৎ রায়ের জন্মদিন। মুর্শিদাবাদোত্তর, পহলগামোত্তর বাঙালি ভদ্রলোক-ভদ্রমহিলার সহসা নিজের হিন্দু সত্তা আবিষ্কার এবং দিঘার উপকূলে তাঁদের আদরের রামমোহন-বিদ্যাসাগর-রবীন্দ্রনাথ-নজরুলের প্রগতিশীলতা জগন্নাথদেবের পায়ে সঁপে দেওয়ার পর বলতে হবে, কপাল জোরে এই দিনটা পাওয়া গেছে। কেবল আজকের দিনেই বাংলা সিনেমা সম্পর্কে কখানা কথা লিখলে কেউ কেউ হয়ত গুরুত্ব দিয়ে পড়বেন। আগামীকালই আর তা হবে না। কারণ বিষয় হিসাবে কাশ্মীর-মুসলমান-পাকিস্তানের সহজ সমীকরণ বা কার বাড়িতে দিঘার মন্দিরের প্রসাদ পৌঁছল আর কোথায় পৌঁছল না, তা বাংলা সিনেমার হাল হকিকতের চেয়ে অনেক বেশি মুখরোচক।
সাংবাদিকতার সাবেকি নিয়ম মেনে সাম্প্রতিকতম ঘটনাটার উল্লেখ করেই আলোচনা শুরু করা যাক। গত বুধবার (৩০ এপ্রিল) বাংলা ছবির ছজন পরিচালক – অনির্বাণ ভট্টাচার্য, ইন্দ্রনীল রায়চৌধুরী, কিংশুক দে, পরমব্রত চট্টোপাধ্যায়, বিদুলা ভট্টাচার্য, সুদেষ্ণা রায় – একখানা মিনিট পনেরোর ভিডিও বার্তা প্রকাশ করেছেন। সে বার্তা টালিগঞ্জের কলাকুশলীদের প্রতি। ভিডিওতে বলা হয়েছে যে টালিগঞ্জ পাড়ার ফেডারেশন – যার সভাপতি পশ্চিমবঙ্গ সরকারের মন্ত্রী অরূপ বিশ্বাসের ভাই স্বরূপ বিশ্বাস – এবং এই পরিচালকরা, এখন বিবদমান। যাঁরা বাংলা কাগজগুলোর বিনোদনের পাতায় নিয়মিত চোখ বোলান, তাঁদের কাছে এটা খবর নয়। কিন্তু পরিচালকরা বলছেন – কলাকুশলীদের ফেডারেশনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে যে পরিচালকরা কলাকুশলীদের বিপক্ষে। এই ভিডিও নির্মাণের উদ্দেশ্য – সেই ‘ভুল’ ধারণা দূর করা।
ভিডিওটা না দেখে থাকলেও, এই পর্যন্ত পড়েই বুঝতে অসুবিধা হওয়ার কথা নয় যে গণ্ডগোল এতদূর গড়িয়েছে, এ রাজ্যের সমস্ত বিবাদেরই নিষ্পত্তি করে দেওয়ার ক্ষমতা ধরেন যিনি, তাঁর উপরেও ভরসা রাখতে পারেনি কোনো পক্ষই। টালিগঞ্জ মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জির বাসস্থান থেকে বেশি দূরে নয়। তার উপর ফেডারেশন সভাপতি তাঁরই মন্ত্রিসভার সদস্যের ভাই। তা সত্ত্বেও তাঁরা দিদির হস্তক্ষেপে পরিচালকদের সঙ্গে বিবাদ মিটিয়ে নেননি। নিলে পরিচালকরা এই অভিযোগ করতেন না। আবার পরিচালকরাও মুখ্যমন্ত্রীর ছত্রছায়ায় গেলেই নিজেদের অভাব অভিযোগ দূর হবে – এ বিশ্বাস রাখতে পারেননি। ফলে ভিডিও করে ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির ভিতরের বিবাদ প্রকাশ্যে এনে ফেলেছেন। পুরো ভিডিও দেখলে মালুম হয় – বাধ্য হয়েছেন।
কেন হল এরকম?
সংবাদমাধ্যমে আগে প্রকাশিত হয়েছে, এই ভিডিওতেও পরিচালকরা জানিয়েছেন যে তাঁরা মুখ্যমন্ত্রীর কাছে যাননি তা নয়। মুখ্যমন্ত্রী তাঁদের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন যে তিনি একটি কমিটি তৈরি করে দেবেন, যে কমিটি সব পক্ষের কথাবার্তা শুনে বিবাদ মেটানোর ব্যবস্থা করবে। কিন্তু সেই কমিটি গঠন করতে গেলে যে সরকারি বিজ্ঞপ্তি জারি করতে হয়, সেটাই পরবর্তী তিন মাসে হয়নি। পরিচালকরা তারপরেও এক মাস অপেক্ষা করেন। সরকার নট নড়নচড়ন। পরিচালকদের একাধিক ইমেলেরও জবাব দেওয়া হয়নি। অতঃপর তাঁরা সাংবাদিক সম্মেলন করে ফেডারেশনের কীর্তিকলাপ সম্পর্কে সর্বসমক্ষে অভিযোগ করেন। এই তাঁদের মহাপাপ। পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন প্রান্তে বিভিন্ন পেশার মানুষ জানেন, কর্মস্থলে যা অত্যাচার অবিচার হয় সেসব নিয়ে প্রকাশ্যে কথা না বলাই দস্তুর। সমাধান চাইলে যাঁরা অত্যাচার অবিচার করলেন তাঁদের কাছেই হাতজোড় করে দাঁড়ানো নিয়ম। তাঁরা সদয় না হলে খুব বড় অপরাধেও পুলিস এফআইআর নিতে চায় না। সেখানে এই পরিচালকরা একেবারে সাংবাদিক সম্মেলন করে বসলেন! ঘাড়ে কটা মাথা! ভিডিওতে পরিচালকদের অভিযোগ – এরপর থেকেই শুরু হয় সেই সাংবাদিক সম্মেলনে উপস্থিত পরিচালকদের কাজ করতে না দেওয়ার ব্যবস্থা। ওঁদের শুটিংয়ে কলাকুশলীদের কাজ করতে বারণ করা হয়। তার ফলেই নাকি তাঁরা (এই ছজন সমেত মোট ১৫ জন পরিচালক) আদালতের দ্বারস্থ হয়েছেন।
যে বাংলায় পুলিসে যাওয়াই সাধারণ মানুষের পক্ষে স্থানে স্থানে মহাপাতক, সেখানে একেবারে কলকাতা হাইকোর্টে ফেডারেশনের সর্বময় কর্তার বিরুদ্ধে মানহানির মামলা করে বসেছেন এঁরা। সে মামলার ইতিমধ্যেই দুটি শুনানি হয়েছে, সে খবর সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিতও হয়েছে। বিচারপতি অমৃতা সিনহা যে নির্দেশগুলো দিয়েছেন তাতে পরিচালকদের হাত শক্ত হয়েছে। তিনি স্পষ্ট বলেছেন, পরিচালকদের কাজে ফেডারেশন কোনো হস্তক্ষেপ করতে পারবে না। এমনকি যে ইউনিক কার্ড ফেডারেশনের তুরুপের তাস, যা না থাকলে সিনেমাপাড়ায় কাউকে কাজ করতে দেয় না তারা, সেই কার্ডকেও মূল্যহীন বলেছেন বিচারক। কিন্তু হলে হবে কী? আদালত নির্দেশ দিলেই মানব – এত সুবোধ বালকদের রাজ্য পশ্চিমবঙ্গ নয়। ওই নির্দেশের পরেও সুদেষ্ণা রায়ের ছবির শুটিং শুরু করতে গিয়ে ঠিক তাই ঘটেছে, যা রাহুল মুখার্জির ছবির শুটিং নিয়ে গতবছর জুলাই মাসে ঘটায় টলিপাড়ার সমস্ত কাজ বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। অর্থাৎ শুটিং সূচি ঘোষণা হওয়ার পরেও একজন কুশীলবও কাজ করতে আসেননি।
সেই থেকে অচলাবস্থা চলছে টালিগঞ্জে। মুখ্যমন্ত্রী হয় মেটাননি, অথবা ধরে নিতে হবে, তাঁর নির্দেশকেও অগ্রাহ্য করার মত শক্তি টলিপাড়ার দণ্ডমুণ্ডের কর্তা স্বরূপবাবুর আছে। আদালতের নির্দেশের পরেও সুদেষ্ণার ছবির কাজ বাতিল হয়ে যাওয়ায় আদালত অবমাননা হয়েছে কিনা, হয়ে থাকলে স্বরূপবাবু বা অন্য কেউ শাস্তির পাত্র কিনা, নাকি গোটা ঘটনায় তাঁর কোনো ভূমিকাই নেই – তার বিচার আদালতে হবে। কিন্তু সাড়ে ১৫ মিনিটের ভিডিওতে পরিচালকরা অভিযোগ করেছেন যে ফেডারেশনের ভয়েই কুশীলবরা নির্দিষ্ট কিছু পরিচালকের ছবিতে কাজ করতে আসছেন না। একথা সত্যি না মিথ্যা তা বলা মুশকিল, তবে হাইকোর্ট যে এই অভিযোগকে সত্যি বলেই গণ্য করেছে তার ইঙ্গিত বিচারপতির নির্দেশে রয়েছে। স্বরূপবাবু অবশ্য প্রকাশ্যে খুবই ভদ্রলোক। যতবার সংবাদমাধ্যম তাঁর কাছে এই গণ্ডগোল নিয়ে কিছু জানতে চায়, তিনি হয় বলেন আদালতে বিচারাধীন বিষয়ে কোনো মন্তব্য করবেন না, নতুবা বলেন এসব তাঁর ফেডারেশনের বিরুদ্ধে চক্রান্ত। যেমনটা বুধবারের ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পরে বলেছেন।
পশ্চিমবঙ্গে এখন বিরাট বিরাট ঘটনা ঘটছে। শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মীদের নিয়োগ দুর্নীতির ফলে এক লপ্তে ২৬,০০০ মানুষের চাকরি গেছে। এদিকে মুর্শিদাবাদের দাঙ্গা এবং পহলগামের সন্ত্রাসবাদী হামলার পর সাম্প্রদায়িকতার সমস্যাও বাংলার বাসিন্দাদের এ রাজ্যে এবং ভিনরাজ্যে নানাভাবে বিপদে ফেলছে। সরকারি টাকায় মন্দির তৈরি এবং তার উদ্বোধন উপলক্ষে ঘুরপথে আমিষ খাওয়াদাওয়া বন্ধ করার চেষ্টার মত অভূতপূর্ব ঘটনাও ঘটে গেছে। এতকিছুর মধ্যে বাংলা সিনেমার জগতে কী হচ্ছে না হচ্ছে তা নিয়ে দীর্ঘ লেখা ফেঁদে বসার কী দরকার? প্রশ্নটা সঙ্গত এবং উত্তরটা জরুরি।
যা যা ঘটছে সবই রাজনৈতিক এবং সিনেমাপাড়ায় যা ঘটছে তাও মোটেই অরাজনৈতিক নয়। একেবারে গোদা অর্থে রাজনৈতিক তো বটেই, কারণ পরিচালকদের অভিযোগের তির শাসক দলের নেতা স্বরূপবাবুর দিকে। কিন্তু কেবল দলীয় রাজনীতির কথা ভাবলে চলবে না। জুলাই মাস থেকে এ পর্যন্ত ঘটনা পরম্পরা লক্ষ করলে বোঝা যায় যে টালিগঞ্জের এই ‘বিদ্রোহী’ পরিচালকরা যে অভিযোগ করছেন, তার সঙ্গে আর জি কর কাণ্ডের পর রাজ্যের বিভিন্ন মেডিকাল কলেজের ডাক্তাররা যে অভিযোগ করেছিলেন তার কোনো মৌলিক তফাত নেই। দুই ক্ষেত্রেই মূল অভিযোগ হল – হুমকি সংস্কৃতি চলছে। চোখ রাঙিয়ে, ভয় দেখিয়ে এক পক্ষ তাদের যা ইচ্ছে তাই করিয়ে নিতে চাইছে। প্রতিবাদ করলে কাজ করতে দেওয়া হচ্ছে না। ঠিক যেভাবে সেকালে গ্রামদেশে মোড়লের বিরুদ্ধাচরণ করলে ধোপা নাপিত বন্ধ করিয়ে দেওয়া হত।
আমি, আপনি কোন ছার; রুপোলি পর্দার লোকেরা, তারকারা, এরকম ভয়ের পরিবেশে কাজ করতে হচ্ছে বলে অভিযোগ করছেন। ব্যাপারটা এই রাজ্যের শুভাকাঙ্ক্ষী সকলকে ভাবিয়ে তোলার মত। শাসক দলের অনুগতরা টালিগঞ্জ পাড়ায় কলাকুশলী হিসাবে কাজ পায়, ছবিতে কাজ করতে যত লোক লাগা উচিত চাপ দিয়ে তার চেয়ে বেশি লোককে কাজ পাইয়ে দেওয়া হয় – এসব অভিযোগ যে তৃণমূল সরকারের আমলেই প্রথম উঠছে এমন নয়। কিন্তু কথা হল, স্বাস্থ্যবান মানুষের খানিকটা রক্ত মশা খেলে বিশেষ ক্ষতি হয় না। কিন্তু যে রক্তাল্পতায় ভুগছে তাকেও যদি রোজ একপাল মশা ছেঁকে ধরে, তাহলে অল্পদিনেই মৃত্যু অবশ্যম্ভাবী। ইন্ডাস্ট্রি হিসাবে বাংলা ছবি এখন সেই স্তরে পৌঁছে গেছে, অথচ ফেডারেশনের প্রতাপ কমছে না। ফলে কাজ আরও কমে যাচ্ছে। ২০২৪ সালে মাত্র ৩৬ খানা ছবি তৈরি হয়েছে, যা নাকি গত ১৫ বছরে সর্বনিম্ন। ফেডারেশনের উদ্ভট সব নিয়মের ঠ্যালায় (পড়ুন দাবির ঠ্যালায়, কারণ আইনত কোনো নিয়ম বানানোর অধিকার ফেডারেশনের নেই) বাংলা ছবির প্রযোজকের সংখ্যা কমছে, বাইরের কোনো ফিল্ম ইউনিটও আর পারতপক্ষে কলকাতায় শুটিং করতে আসছে না। বাংলা ছবির অভিনেতারা কাজের অভাবে কেউ মুম্বাই পাড়ি দিচ্ছেন, কেউ ইউটিউব চ্যানেল খুলে টক শো চালাচ্ছেন, কেউ অন্য ব্যবসাপত্র খোলার কথা ভাবছেন। বেশকিছু উল্লেখযোগ্য ছবির পরিচালক ইন্দ্রাশিস আচার্য, কেবল সিনেমা করে জীবিকা নির্বাহ করা শক্ত হয়ে দাঁড়াচ্ছে – একথা স্পষ্টাস্পষ্টি বলে গতবছর কর্পোরেট চাকরিতে যোগ দিয়েছেন। কিন্তু অভিনেতা, পরিচালকদের হাতে না হয় এসব বিকল্প রয়েছে। যাঁরা মেক আপ করেন, আলোর কাজ করেন, জুনিয়র আর্টিস্ট হিসাবে কাজ করেন অথবা স্রেফ সেটে ফাইফরমাশ খাটেন – তাঁদের তো আর নেই। এমন চললে তাঁরা যাবেন কোথায়? ফেডারেশন নিজেদের যাদের লোক বলে দাবি করছে, তাঁদেরই তো আক্ষরিক অর্থে পথে বসতে হবে। সান্ত্বনা হিসাবে তখন বড়জোর বলা যাবে ‘মনখারাপ করবেন না। আপনাদের আগে ডাক্তার আর শিক্ষকরাও পথে বসেছেন।’
গুন্ডামিই আইন হয়ে দাঁড়াবে, তার সঙ্গে আপোস করে স্রেফ নিজেরটুকু নিয়ে ভেবে তথাকথিত ‘ফার্স্ট বয়’-রা ছবি বানাবেন, বিশেষ ক্ষমতাশালী নায়কের ছবি নিয়ে বিপুল সোশাল মিডিয়া প্রচার চলবে – মাঝরাতে অমুক জায়গায় শো হাউসফুল, তমুক ছবি ব্লকবাস্টার। আর যাঁরা ইন্ডাস্ট্রির দমবন্ধ করা বর্তমান ও ভয়াবহ ভবিষ্যৎ ভেবে প্রতিবাদ করবেন তাঁদের একঘরে করা হবে। ফলে ইন্ডাস্ট্রিতে ক্রমশ কাজ কমবে। এভাবে ধুঁকতে ধুঁকতে একটা ভাষার ছবি কতদিন বেঁচে থাকতে পারে? এমনিতেই দুনিয়া জুড়ে সিনেমাশিল্পের এক ধরনের সংকট চলছে। হলিউড বা বলিউডও তার বাইরে নয়। তার উপর টলিউডের মত ছোট বাজারসম্পন্ন, আগে থেকেই দুর্বল হয়ে থাকা ইন্ডাস্ট্রিতে যদি সিনেমার বাইরের লোকেদের গা জোয়ারিই শেষ কথা হয়ে দাঁড়ায়, তাহলে বাংলা ছবি বাঁচবে কী করে?
বাঙালিদের মধ্যে এমন সিনেমাবোদ্ধার অভাব নেই, যাঁরা নাকটা আকাশের দিকে তুলে বলবেন ‘বাংলা ছবি না বাঁচলেই বা কী? যা সব ছবি বানায়…’। একথার উত্তর দেওয়ার আগে কতকগুলো তেতো কথা বলা দরকার।
প্রথমত, ফেডারেশন বনাম পরিচালকদের দ্বন্দ্ব টলিউডের যে কঙ্কালসার চেহারা তুলে ধরেছে তা দিয়ে শৈল্পিক দিক থেকে ভাল ছবি হওয়া অসম্ভব বললেই চলে। প্রয়াত অশোক মিত্রের কথা ধার করে বলতে হয়, অভাবের সংসারে ‘তেইশ বছরের আপাত-উঠতি শরীরেও, স্তন আর স্তন থাকে না, দুদিনেই তা হেলে প’ড়ে মাই হয়ে যায়।’ আজকাল বাংলা পূর্ণদৈর্ঘ্যের ছায়াছবির শুটিং হয় ১৪-১৫ দিনে। এতেই মাস্টারপিস বানাতে গেলে নির্দেশক, চিত্রগ্রাহক, সঙ্গীত পরিচালক, অভিনেতা – সকলকেই জিনিয়াস হতে হবে। একসঙ্গে এত জিনিয়াস কোনো দেশে কোনোকালেই সুলভ ছিল না।
দ্বিতীয়ত, যে তিন বাঙালি পরিচালককে জিনিয়াস গণ্য করে আজকাল আমরা বুক ফোলাই, তাঁদের কর্মজীবনে মোটেই সমস্ত ছবি হল ভরে দেখতে যায়নি বাঙালি দর্শক। গেলে ঋত্বিক ঘটক হতাশায় ক্রমশ বেশি বেশি করে মদে ডুবে যেতেন না, অকালে মারাও যেতেন না হয়ত। তাঁর মৃত্যুর পরেও কলকাতা এমন কিছু উদ্বেল হয়নি। সত্যজিৎই বাণিজ্যিক সাফল্যের মুখ দেখেছেন অনেকটা। তাও তাঁর সবচেয়ে শৈল্পিক কাজগুলোর চেয়ে বেশি জনপ্রিয় হয়েছে গুগাবাবা, হীরক রাজার দেশে আর ফেলুদার ছবিগুলো। মৃণাল সেনের ছবি তো খুব জনপ্রিয় হওয়ার কথাও নয়। তাঁর বক্তব্য আলাদা, শৈলীও আলাদা। বাংলা ছবিকে বাঁচিয়ে রেখেছিল আসলে সিনেমাবোদ্ধাদের হেলাশ্রদ্ধার পাত্র হয়ে থাকা ছবিগুলো। সেসব ছবি বানাতেন তপন সিংহ, অজয় কর, দীনেন গুপ্ত, অরবিন্দ মুখোপাধ্যায়, তরুণ মজুমদার, প্রভাত রায়, অঞ্জন চৌধুরী প্রমুখ। নিখাদ প্রেমের ছবি বা মজার ছবি, আটপৌরে সাংসারিক জটিলতার ছবি, সাধারণ মানুষের রোজকার সমস্যার ছবি – এসব দেখতে দর্শক হল ভরাত বলে শিল্পী ও কলাকুশলীদের সংসার চলত, প্রযোজকদের ঘরে টাকা আসত। তাই তাঁরা হিট হবে না ধরে নিয়েই সত্যজিৎ বা মৃণালের মত শিল্পীদের ছবিতে টাকা ঢালতে পারতেন। নয়ের দশক থেকে কলকাতার বড় বড় সংবাদমাধ্যম যে শহুরে দরকচা মারা ছবিগুলোকে বাংলা ছবির পুনরুত্থান বলে দাগিয়ে দিল, সেগুলো বস্তুত বিভিন্ন মেজ সেজ ফেস্টিভালে পুরস্কার জেতা ছাড়া বাংলা ছবির হোমেও লাগেনি যজ্ঞেও লাগেনি। এক পর্দার সিনেমা হলগুলো উঠে যাওয়ার আগে থেকেই ওইসব ছবি গ্রাম আর শহরের দর্শকের মধ্যে কাঁটাতার বসিয়ে দিয়েছে। মাল্টিপ্লেক্স এসে সর্বনাশ সম্পূর্ণ করেছে। বিপুল সংখ্যক দর্শক বাংলা ছবির হাতছাড়া হয়ে গেছেন অত টাকার টিকিট কাটার ক্ষমতা নেই বলে আর গ্রামেগঞ্জে সিনেমা হল প্রায় নেই বলে। যাঁরা আছেন, তাঁদের পক্ষে হাতে ইয়াব্বড় পপকর্নের বালতি নিয়ে বাংলা ছবি কেন, কোনো ছবির পাশেই দাঁড়ানো কঠিন। মনোযোগ স্বভাবতই ৪০০ টাকার পপকর্ন নষ্ট না হওয়ার দিকেই রাখতে হবে।
এবার বলা যাক, বাংলা ছবি না বাঁচলে কী হবে। শুধু শিল্পী আর কলাকুশলীদের রুজি রোজগার বন্ধ হবে তা নয়। পৃথিবীর বিশিষ্ট সংস্কৃতিবান জাতিগুলোর অন্যতম হিসাবে বাঙালির যে পরিচিতি, তা অনেকটাই মুছে যাবে। আজ গোটা ভারতকে এক ধর্ম, এক ভাষা, এক সংস্কৃতির দেশ করে তোলার যে আপ্রাণ লড়াই চালাচ্ছে সংঘ পরিবার, তাতে সেটা হবে তাদের গুরুত্বপূর্ণ জিত। আপনি আজ সত্যজিতের অস্কার আর ঋত্বিকের মৃত্যুর এতবছর পরে তাঁকে নিয়ে মার্টিন স্করসেসির মুগ্ধতার কথা শতমুখে বলে সম্মান পান বাংলা সিনেমা বলে একটা কিছুর অস্তিত্ব আছে বলে। না থাকলে যাকেই বলতে যাবেন, সে বলবে ‘হ্যাঁ হ্যাঁ, তোমাদের একসময় নাকি সবই ছিল। এখন কী আছে বলো?’ বাংলা মাধ্যম স্কুলগুলোকে উঠে যাওয়ার দ্বারপ্রান্তে এনে দাঁড় করিয়েছে পশ্চিমবঙ্গ সরকার। এর সঙ্গে বাংলা সিনেমাশিল্পটা তুলে দিতে পারলে সোনায় সোহাগা। পাড়ায় পাড়ায় রবীন্দ্র জয়ন্তী কমে এসেছে অনেকদিন হল, আজ থেকে ৫০ বছর পরে সত্যজিতের জন্মদিন পালন করার লোকও পাওয়া যাবে না।
ব্যাপারটা কিন্তু গভীরভাবে রাজনৈতিক। আপনি মাছি তাড়ানোর ভঙ্গিতে বলতেই পারেন ‘পরমব্রত চাটুজ্জে তো সরকারের দেউচা-পাঁচামির কমিটিতে ঢুকেছিল। এখন বুঝুক ঠ্যালা’, অথবা ‘অনির্বাণ ভটচায্যি তো আর জি করের বেলায় চুপ ছিল। এখন কেন?’, কিম্বা ‘সুদেষ্ণা রায় তো সরকারের কীসব কমিশনের মেম্বার। এদের পাত্তা না দেওয়াই উচিত।’ কিন্তু আপনি যত উদাসীন থাকবেন, আপনার ভাষা-সংস্কৃতির বারোটা বাজানোর জন্যে যে বড় রাজনীতিটা চলছে তার পথ তত পরিষ্কার হবে।
সিনেমা হলে ঢুকে হিয়া টুপটাপ, জিয়া নস্ট্যাল হলেই হাততালি দিই। পরিচালক আদিত্যবিক্রম সেনগুপ্ত মায়ানগর ছবিতে করেছেন ঠিক উল্টোটা। শেষ বছর বিশেকে কলকাতা যেভাবে গোল্লায় গেছে তার স্মৃতি নিখুঁত নির্মমতায় পর্দায় তুলে এনেছেন।
বামুন চিনি পৈতে প্রমাণ, বাঙালি চিনি কেমনে? নস্ট্যালজিয়া দিয়ে। ওই জিনিসটারই বিক্রয়যোগ্যতা বাঙালি সমাজে এখনো নিশ্চিত। তাই বাংলায় দুজন এখনো বিক্রি হন – রবীন্দ্রনাথ আর সত্যজিৎ রায়। ওটা আছে বলেই শতবর্ষ এসে পড়লে বিক্রি হন মৃণাল সেন, ঋত্বিক ঘটকও। নস্ট্যালজিয়ার তোড়ে রবীন্দ্রনাথের লেখা বিশেষ কেউ পড়ে না, অথচ সিগনালে তাঁর গান বাজে। ছোটরা সত্যজিতের গুগাবাবা দেখতে শেখে না, বড়রা ফেলুদাকে নিয়ে বছরের পর বছর ছেলেমানুষি চালিয়ে যায়, ভুলেও কেউ দেবী (১৯৬০) বা সীমাবদ্ধ (১৯৭১) দেখে না। তবে সত্যজিতের মেলায় হারিয়ে যাওয়া নাতিকে নায়ক বানিয়ে ছবি করলে হাউজ ফুল হয়। লোকে পথের পাঁচালী (১৯৫৫)-র বিখ্যাত দৃশ্যের হুবহু নকল দেখে আহা, উহু করে। মৃণালের রাজনীতি যতই বাতিল হয়ে যাক কলকাতা শহরে, ছবিগুলো যতই বিস্মৃত হোক, তাঁর বায়োপিকের বাহুল্য হয় বাংলা সিনেমায়। খারিজ (১৯৮২) কেউ দেখে না, কিন্তু তার সিকুয়েল তৈরি হয়। ঋত্বিকের ছবি কলকাতা শহরে দেখানোর অনুমতি বাতিল হয়, কিন্তু তাঁর নাম করে এবং না করে একাধিক বায়োপিক বানানো হয়, তাঁর নামে মেট্রো স্টেশন হয়। এসব নস্ট্যালজিয়া ছাড়া আর কী? এমনিতে স্মৃতি খুবই কাজের জিনিস, নইলে সাহিত্যিক মিলান কুন্দেরা লিখতেন না ‘ক্ষমতার বিরুদ্ধে মানুষের সংগ্রাম হল বিস্মৃতির বিরুদ্ধে স্মৃতির সংগ্রাম।’ কিন্তু কলকাতা তথা বাংলায় আমরা সমস্ত অস্বস্তিকর স্মৃতি থেকে মুখ ফিরিয়ে ন্যাকা স্মৃতিমেদুরতায় ডুবে আছি। তাই সিনেমা হলে ঢুকে হিয়া টুপটাপ, জিয়া নস্ট্যাল হলেই হাততালি দিই। পরিচালক আদিত্যবিক্রম সেনগুপ্ত মায়ানগর ছবিতে করেছেন ঠিক উল্টোটা। শেষ বছর বিশেকে কলকাতা যেভাবে গোল্লায় গেছে তার স্মৃতি নিখুঁত নির্মমতায় পর্দায় তুলে এনেছেন।
কেন এমন হয়ে গেল কলকাতা? দেখতে দেখতে পপকর্ন খাওয়া যায় এমন স্মৃতিমেদুরতা বজায় রাখতে হলে সিনেমায় দোষটা চাপিয়ে দিতে হয় কোনো অনির্দেশ্য শক্তির ঘাড়ে। ক্ষমতাশালীদের দিকে আঙুল তোলা তো নৈব নৈব চ, এমনকি নিজেদের দিকেও আঙুল তোলা চলে না। অথচ আদিত্যবিক্রম দেখিয়েছেন – লোভের গুড় ছড়িয়ে দিয়েছে ক্ষমতাশালীরা আর তা চেটেপুটে নিতে পিঁপড়ের মত এগিয়ে গেছে অভিনেত্রী হয়ে ওঠার স্বপ্ন মুছে যাওয়া গৃহবধূ এলার (শ্রীলেখা মিত্র) মত মানুষ। এই কালপর্বে বড় ফ্ল্যাট, নতুন বাইক, অনেক টাকা, বিদেশযাত্রার স্বপ্নে বিভোর করে দেওয়া হয়েছে রোজগারের অন্য পথ খুঁজে না পাওয়া রাজা (সায়ক রায়), পিংকিদের (রিকিতা নন্দিনী শিমু)। তারপর সর্বস্বান্ত করে দেওয়া হয়েছে। এই লোভের গুড়ের কল্পতরু বেয়ে শিখরে পৌঁছবার প্রতিযোগিতায় যারা নামেনি তাদের প্রায় সমাজচ্যুত করেছে কলকাতা। মাস্টারির চাকরি জোটাতে না পারা শিশির (সত্রাজিৎ সরকার), যে প্রাঞ্জল করে ছেলেমেয়েদের বুঝিয়ে দিতে পারে পদার্থবিদ্যার গূঢ় তত্ত্ব, তাকে প্রায়ান্ধকার পুরনো বাড়িতে গৃহশিক্ষক হয়েই থেকে যেতে হয়েছে। নিজের বউয়ের কাছেও বাতিল হয়ে গেছে সে। ভীতু হলেও প্রোমোটারদের হাতে বন্ধ থিয়েটার হল তুলে না দেওয়ার মরণপণ সংকল্প নিয়ে একা একা মদ খেতে খেতে অবসাদে ডুবে গেছে বুবুদা (ব্রাত্য বসু)। ওরা ডাইনোসর, ওদের সরিয়ে দিয়ে আধুনিক হয়ে উঠেছে কলকাতা।
আদিত্যবিক্রম দেখালেন বলে খেয়াল হল, আমাদের চোখের সামনে কী দারুণ এক মায়ানগর নির্মাণ সম্পূর্ণ হয়েছে! এখানে নগদে রোজগার করলে ব্যাংক ঋণ দেয় না। অথচ গরিব, নিম্নবিত্ত মানুষের বহু কষ্টে সঞ্চিত কোটি কোটি টাকা নগদে আত্মসাৎ করে ধনী হয়ে যায় প্রদীপ্ত পাল (অনির্বাণ চক্রবর্তী)। কলকাতার ইন্দ্রপ্রস্থের মত এক মায়ানগর হয়ে ওঠার ইতিহাস আদিত্যবিক্রম ধরে রেখেছেন গোখান তিরয়াকির ক্যামেরায়। এই ইন্দ্রপ্রস্থে স্ফটিকের ফাঁকিতে উপরে ওঠাকেই সুখ ভেবে একেবারে একলা হয়ে যায় এলা। তারপর দুর্যোধনের পুষ্পশোভিত সরোবরকে শুকনো ডাঙা ভেবে ঝপাং করে পড়ে যাওয়ার মত আছড়ে পড়তে হয় সহায়সম্বলহীন মাটিতে। এই মায়ানগর রাজাকেও ফকির বানিয়ে ছাড়ে। এ মায়ানগর এমন এক সিন্ডিকেট যেখানে সৎ থাকতে চেয়েও পারে না ইঞ্জিনিয়ার ভাস্কর (অরিন্দম ঘোষ)। এ শহরে একমাত্র ডেঙ্গুর মশা তাড়ানোর ধোঁয়াই রচনা করতে পারে স্বপ্নের মায়াজাল।
এবং রবীন্দ্রনাথ। তিনিও বিকৃত ও বিক্রীত হন এই মায়ানগরে। মোটের উপর নরম শব্দ এবং নৈঃশব্দ্যে নির্মিত মিংকো এগার্সম্যানের সাউন্ডট্র্যাকে কান ঝালাপালা করে দেয় শুধুমাত্র রবীন্দ্রনাথের গান। আজকের বাঙালির দুই শালগ্রাম শিলার আসলে কী অবস্থা করেছে কলকাতা, তা এতদিনে কোনো বাংলা ছবি দেখিয়ে দিল। আদিত্যবিক্রম রবীন্দ্রনাথের রক্তাক্ত হয়ে যাওয়া দেখিয়েছেন কোনো রাখঢাক না রেখে, আর সত্যজিতের অবস্থা দেখাতে চেয়েছেন কিনা নিশ্চিত হওয়া যায় না। কিন্তু এলা যখন ফ্ল্যাট পাওয়ার লোভে প্রদীপ্তর হোটেলের ঘরে পৌঁছে যায়, তখন কিছুতেই অগ্রাহ্য করা যায় না এই অনুভূতি, যে জন অরণ্য (১৯৭৬) ছবির সেই দৃশ্যই আবার দেখছি, যেখানে নিজের কাজ হাসিল করতে বন্ধুর বোনকে ক্লায়েন্টের ঘরের দরজায় পৌঁছে দেয় বিবেকের দংশনে ছিন্নভিন্ন সোমনাথ। তফাত বলতে, আজকের কলকাতায় অভাব নয়, এলার কম্পাস ঠিক করে লোভ। তাই তার কোনো ‘মিডলম্যান’ প্রয়োজন হয় না।
বিলাস যাদের প্রয়োজনে পরিণত হয়েছে আর প্রয়োজনটুকুও যাদের বিলাসে পরিণত হয়েছে, তাদের কাছে জলজ্যান্ত একটা শহরের মায়ানগর হয়ে যাওয়ার ইতিহাস তুলে ধরেছেন পরিচালক। বাংলা ছবি অরাজনৈতিক হয়ে গেছে বলে আমাদের অনেকেরই আক্ষেপ। অদূর ভবিষ্যতে সে আক্ষেপ দূর হওয়ার সম্ভাবনা নেই। কারণ এই ছবি করতেও বিদেশি প্রযোজক, বিদেশি কলাকুশলীদের সাহায্য নিতে হয়েছে পরিচালককে। তবে তার সদ্ব্যবহার করে তিনি বানিয়ে ফেলেছেন গত দেড় দশকের সবচেয়ে স্পষ্ট রাজনৈতিক ছবি। ফলে এই তথ্য অবাক করে না যে ২০২১ সালে মুক্তি পাওয়া এই ছবির পটভূমিকা যে কলকাতা শহর, সেখানকার সিনেমা হলেই ছবিটা এসে পৌঁছল চার বছর পরে।
তবে ছবির রাজনীতি ব্যর্থ হয়ে যেত, একজন দর্শকের কাছেও নিজের বার্তা পৌঁছে দিতে পারতেন না পরিচালক, যদি তাঁর প্রয়াস শিল্পোত্তীর্ণ না হত। আশ্চর্য সব দৃশ্যের জন্ম দিয়েছেন আদিত্য বিক্রম। ডেঙ্গু তাড়ানোর ধোঁয়াকে সিনেমার চিরাচরিত স্বপ্নদৃশ্যের কায়দায় ব্যবহার করার কথা আগেই বলেছি। তার চেয়েও বেশি অবাক করে পরিবারের কনিষ্ঠতমের মৃত্যুতে বিষণ্ণ পোষা কুকুর, প্রেমের ফুর্তির বাঁশির সঙ্গে সুর মিলিয়ে জ্বলে ওঠা নকল তাজমহলের আলো। শেষ দৃশ্যের ম্যাজিক গোপন থাক। যাঁরা এই পরিচালকের প্রথম ছবি আসা যাওয়ার মাঝে (২০১৪) দেখেছেন তাঁরা জানেন, আদ্যন্ত বাস্তবে পা রেখে দাঁড়িয়ে থেকে হঠাৎ কল্পনার রাজ্যে চলে গিয়ে কী অসামান্য ম্যাজিক দেখাতে পারেন আদিত্য বিক্রম। রবীন্দ্রনাথের কথাও তোলা থাক যাঁরা এখনো ছবিটা দেখেননি তাঁদের জন্য। না, ট্রেলারে দেখানো শটগুলোর কথা হচ্ছে না। এটা সেই জাতের বাংলা ছবি নয় যার ট্রেলার দেখাই যথেষ্ট।
তা বলে কোনো দুর্ধর্ষ চমক আশা করবেন না। পরিচালক নিচু তারে বেঁধেছেন দৃশ্যগুলোকে, আর সেই সুরেই সুর মিলিয়ে কাজ করেছেন ক্যামেরার সামনের শিল্পীরা। এই ছবির চমক বলতে ওই নিচু তারের উঁচু মানের অভিনয়ই। শ্রীলেখা আশ্চর্য দক্ষতায় একইসঙ্গে লাস্যময়ী এবং ঘরোয়া; কৌশলী এবং অগোছালো; কুটিল এবং বোকা। বস্তুত একই চরিত্রে দুজন মেয়ের অভিনয় করেছেন তিনি। এমন এক মেয়ে যাকে অপাপবিদ্ধ কিশোরী থেকে উচ্চাকাঙ্ক্ষী চতুর মহিলা করে তুলেছে জীবন। যার লোভ ষোল আনা, কিন্তু কল্পতরুর মালিক প্রদীপ্তর মত নির্দ্বিধায় অন্য মানুষের ক্ষতির বিনিময়ে লাভবান হতে যার বাধে।
এলার স্বামী শিশিরের চরিত্রে সত্রাজিৎকে পুরুষ দর্শকের মাঝে মাঝে মনে হবে ভেড়ুয়া। কী নির্লিপ্তভাবে বিয়ে করা বউয়ের দিকে প্রায় না তাকিয়ে কাটিয়ে দেয় লোকটা! নিজের ব্যর্থতা মেনে নেওয়া একজন মানুষের অভিনয়ে সত্রাজিৎ আবেগ চেপে রাখেন আশ্চর্য দক্ষতায়, অথচ রসবোধ একটুও চিড় খায় না। তা ছাত্রকে কুকুরের ভয় দেখানোতেই হোক, আর সেই কুকুরের সামনে পড়ে গিয়ে সন্ত্রস্ত রাজাকে ‘আমি কী করব? ও আমার কথা শোনে না’ বলাতেই হোক। কণ্ঠস্বরের ওঠানামা ছাড়াই সত্রাজিৎ এমন একজন মানুষকে দেখিয়ে দেন যার মমত্ববোধ আছে পুরোমাত্রায়, স্ত্রীর প্রতি প্রেমও আছে যথেষ্ট। কিন্তু সেসব সে প্রকাশ করে না, কারণ জানে তাতে লাভ নেই। শ্রীলেখা শেষমেশ গৃহত্যাগ করার পরে সত্রাজিতের চোখ ভরে আসে, তবু তিনি কাঁদেন না। আবার ঝড়জলের রাতে মত্ত স্ত্রী হঠাৎ ফিরে এলেও আবেগে বিহ্বল হয়ে পড়েন না।
ব্রাত্য বসু এতটাই বুবুদা হয়ে গেছেন যে সন্দেহ জাগে, তিনি আদৌ অভিনয় করছেন কিনা। তাঁর চেয়ারে বসতে গিয়ে মাঝপথে থমকে যাওয়া, জবুথবু বসার ভঙ্গি, দরদরিয়ে ঘেমে চলা, একই কথা বারবার ঘুরিয়ে ফিরিয়ে জিজ্ঞেস করা শারীরিক ও মানসিক অস্থিরতার প্রমাণ দেয়। তাঁর সারা শরীরে আতঙ্ক জেগে থাকে সারাক্ষণ। অথচ অঙ্গপ্রত্যঙ্গ ও মস্তিষ্কের উপর নিয়ন্ত্রণ হারালেও, মুখে ‘বাড়ি বেচে দেব’ বললেও নিজের জায়গা ছেড়ে না যাওয়ার আকুতি পরিষ্কার ফুটে ওঠে।
মানুষ মাত্রেই বহুমাত্রিক। তেমন এক আপাত ভালমানুষ, বহুমাত্রিক চরিত্রে যথাযথ অভিনয় করেছেন অরিন্দম।
সায়ক তাঁর উচ্চাকাঙ্ক্ষায়, অক্ষম রাগে, ভয়ে কুঁকড়ে যাওয়ায় এবং অব্যক্ত হতাশায় আমাদের সকলের পরিচিত নিম্নবিত্ত পরিবারের চিট ফান্ড এজেন্টদের একজন হয়ে উঠেছেন। রিকিতাও তাঁর চরিত্রে যথাযথ। অতি স্বল্প সুযোগেও চিট ফান্ডের সর্বদা মিষ্টি কথা বলা চালু কর্মকর্তা হিসাবে জ্যান্ত হয়ে উঠেছেন লোকনাথ দে।
গত কয়েক বছরে কলকাতার যেসব মানুষকে আমরা দেখি না, দেখতে চাই না, তাদের সিনেমার পর্দায় তুলে এনেছে অন্তত তিনটে ছবি – মায়ার জঞ্জাল (২০২০), ঝিল্লি (২০২১) আর মানিকবাবুর মেঘ (২০২১)। আদিত্যবিক্রম মায়ানগর ছবিতে ধরে রেখেছেন আমাদের দেখা লোকেদের বদলে যাওয়া, আমাদের চেনা শহরের হাওয়ায় মিলিয়ে যাওয়া। তা করতে গিয়ে তিনি ক্যামেরাবন্দি করে ফেলেছেন গোটা রাজ্যটার যুগান্তর। তিনি যে সচেতনভাবেই ঘটনা আর কল্পনা মিশিয়ে দিচ্ছেন, গুলিয়ে দিচ্ছেন, তা পরিষ্কার হয় যখন একটা শটে এক বাড়ির ছাদে মোবাইলে কথোপকথনে ব্যস্ত রাজার পিছনে দেখা যায় পোস্তার ভেঙে পড়া ফ্লাইওভারের অবশিষ্টাংশ; আর এক রডের মাথায় হাওয়ায় দোলে অধুনা দেশের সকলের পরিচিত তিনকোণা পতাকা। উপরন্তু কল্পতরুর মালিক প্রদীপ্ত হাওয়া খারাপ দেখে বিমানবন্দরের দিকে রওনা দেন, গন্তব্য কাশ্মীর। এ রাজ্যের যেসব মানুষের স্মৃতি দুর্বল নয়, তাঁদের স্থান মাহাত্ম্য বলে বোঝাতে হবে না।
এই ছবিতে যে কালপর্ব দেখানো হয়েছে, সেই পর্ব আমাদের প্রজন্মের প্রথম যৌবন। ফলত, বৃদ্ধ যুগের গলিত শবের পাশে প্রাণকল্লোলে নবযুগ আসার যে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল সেইসময়, তা যে নেহাতই ফাঁকা বুলি ছিল তা আমরা এতদিনে বুঝে গেছি। কিন্তু সেই উপলব্ধি সবিস্তারে বাংলা ছবিতে বড় পর্দায় এতদিন দেখা যায়নি। সে অর্থে আদিত্যবিক্রমের এই ছবি আমাদের প্রজন্মের বয়ান। এটা আমাদের ছবি। তাই সত্যজিতের মহানগর (১৯৬৩)-এর অকারণ আশাবাদী সমাপ্তি আদিত্যবিক্রমের মায়ানগরে সম্ভব হয় না। তাঁকে ম্যাজিকের আশ্রয় নিতে হয়।
ঋত্বিকের একটা অসমাপ্ত জাতীয় বিপ্লবের ধারণা ছিল। কোমল গান্ধার ছবিতে দেখবে অনসূয়া ভৃগুকে একটা ডায়রি দেয়। ওটা তো আসলে রূপক। তখন পি সি যোশীর আমল। ভাবা হয়েছিল যে অসমাপ্ত জাতীয় বিপ্লব সমাপ্ত করার দায়িত্ব ইতিহাস নিয়তির মত এসে কমিউনিস্ট পার্টিকে দেবে। সেই স্বপ্ন সফল হয়নি। সলিল ভেবেছিলেন তিনি প্রাচ্য আর পাশ্চাত্যের মিলন ঘটিয়ে ভারতীয় সঙ্গীতের যে আধুনিকীকরণ করছিলেন তা ক্রমশ এগিয়ে যাবে। গানকে ক্রমশ সরল হতে হবে, গানকে মানুষের হাতে তুলে দিতে হবে।
এ মাসের ‘সঞ্জয় উবাচ’ অন্যরকম, কারণ এই মাসটাই অন্যরকম। বাঙালির সর্বকালের অন্যতম সেরা দুই শিল্পী – ঋত্বিক ঘটক আর সলিল চৌধুরী – এ মাসে শতবর্ষে পা দিলেন। তাই নাগরিক ডট নেট মনে করেছে সঞ্জয় মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে কথোপকথন চালালে ওই দুই কিংবদন্তি সম্পর্কে এমন অনেক কথা উঠে আসতে পারে আলোচনায়, যা প্রতি মাসের নিয়মমাফিক কলামের পরিসরে ধরা মুশকিল। এই দীর্ঘ আলোচনা তাই আজ ছুটির দিনে শেষও হবে না। চলবে।
প্রথমেই আপনাকে জিজ্ঞেস করতে চাই, ঋত্বিক ঘটকের জীবদ্দশায় তাঁর কাজকে বাঙালি সমাজ যেভাবে দেখেছে আর এখন যেভাবে দেখে, তার মধ্যে আপনি নিশ্চয়ই একটা তফাত দেখতে পান? সেই তফাতটাকে কীভাবে ব্যাখ্যা করেন? প্রশ্নটা করছি, তার কারণ ঋত্বিককে তো একেকটা ছবি বানাতে বহু কষ্ট করতে হয়েছে। তারপর ছবিগুলো দর্শকের আনুকূল্য পায়নি বললেই হয়। আর আজ সোশাল মিডিয়া খুললেই ঋত্বিক পুজো দেখা যায় তাঁর প্রত্যেক জন্মদিনের আশপাশে। ‘তুমি গেছ। স্পর্ধা গেছে, বিনয় এসেছে’ লিখে তাঁর ছবি মুড়ি মুড়কির মত শেয়ার করে তরুণ প্রজন্ম। তাঁর লেখা বা তাঁর ছবির সংলাপ থেকে কথায় কথায় ভুল উদ্ধৃতি দিতেও দেখা যায় অনেককে। ঋত্বিককে ঘিরে এই আবেগের বিস্ফোরণ কীভাবে এবং কেন ঘটতে শুরু করল?
তোমার প্রশ্নটা শুনেই আমার মনে হল, তুমি একটা স্বখাতসলিলে নিমজ্জমান জাতির কথা বলছ, যারা বাঙালি নামে পরিচিত। তারা এখন কেবল ঋত্বিক নয়, বা সলিল নয়, যে কাউকে নিয়েই মেতে উঠতে চায় এবং পারে। আমার সোশাল মিডিয়া হ্যান্ডেল না থাকলেও চোখ তো রাখি। যা দেখতে পাই তা থেকে সোশাল মিডিয়ায় জানানো শ্রদ্ধার প্রতি আমার এক ধরনের তাচ্ছিল্য তৈরি হয়েছে। কারণ, কাউকে ছোট না করেই বলছি, ওখানে দেখেছি নীরেন্দ্রনাথ আর রবীন্দ্রনাথকে প্রায় একই ভাষায় শ্রদ্ধা জানানো হয়। আসলে ওটা গুগলের প্রতি দায়িত্বপালন। গুগল সকলকে মনে করিয়ে দেয় যে আজ অমুকের জন্মদিন। সুতরাং দল বেঁধে স্মরণ করা শুরু হয়ে যায়। আর বাংলায় তো এখন নস্ট্যালজিয়া ইন্ডাস্ট্রি ছাড়া কোনো ইন্ডাস্ট্রি নেই, তা এই ইন্ডাস্ট্রির জন্যে ঋত্বিক, সলিল – এঁরা অতি লোভনীয় কাঁচামাল। আজকের বাঙালি মনে করে যে এঁরা এক ধরনের প্রত্যাখ্যানের মাতৃভাষা। ঋত্বিকের সঙ্গে সলিলের একটা পার্থক্য হল সলিল জনপ্রিয় ছিলেন। যা-ই হোক, এই দুজনকে, এখনকার বাঙালি ইংরিজিতে যাকে appropriate করা বলে সেটা যে করতে পারছে তাতে বোধহয় এক ধরনের আত্মশ্লাঘা বোধ করে।
দুজনের মধ্যে জীবদ্দশায় জনপ্রিয়তার ফারাকের কথা আপনি বললেন। এখন তাঁদের যেভাবে দেখা হয় তাতে কোনো মিল দেখতে পান কি?
দেখো, প্রথমেই বলতে হবে যে ঋত্বিক জনপ্রিয়তা পাননি আর সলিল দারুণ জনপ্রিয় – এরকম হওয়া সত্ত্বেও আমি দেখেছি যে এঁরা অতি ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন। সলিল নিজে খুব বিনীত মানুষ ছিলেন। কিন্তু ঋত্বিক সম্পর্কে স্পষ্টই বলতেন যে ভবা (ঋত্বিককে যে নামে ডাকতেন) অসম্ভব এক জিনিয়াস। যেমন ম্যাক্সমুলার ভবনে তিতাস একটি নদীর নাম (১৯৭৩) দেখে এসে সলিল বলেছিলেন, কী মিউজিক! আমাকে কলকাতার কিছু লোক বলেছিল যে ভবার সেই টাচ আর নেই। আমি তো ছবিটা দেখে ভাবলাম, এরা কারা? এরা কোনোদিন গান-টান শুনেছে? এরা মিউজিক কাকে বলে জানে? ভবার সঙ্গে কারোর তুলনা হয় না।
এবার ওই মিলের প্রসঙ্গে বলি। দুজনেই নিজের শিল্পমাধ্যমকে এবং শিল্পের বিষয়কে নানা প্রশ্নের মুখে ফেলেছেন। অনেকসময় দুজনে একসঙ্গে কাজও করেছেন। যেমন বাড়ি থেকে পালিয়ে (১৯৫৮) ছবিতে, কোমল গান্ধার (১৯৬১) ছবিতে। সেসব নিয়ে আজকাল যে হইচই করা হয় তার মধ্যে কোনো মৌলিক জিজ্ঞাসা নেই। যা আছে তা নিতান্ত বাইরের কথাবার্তা। অনেকটা বিয়েবাড়ির মত। যেন একটু সাজুগুজু করে ঋত্বিক চর্চা করা, কেননা তাতে বিকল্প সংস্কৃতি চর্চার বড়াই করা যায়। সলিলকে নিয়ে চর্চা করলেও বেশ প্রমাণ করা যায় যে আমরা গান-টান বুঝি। কিন্তু ধরো, আমার মত একজন লোক যে পাশ্চাত্য সঙ্গীত, ভারতীয় মার্গসঙ্গীত বিশেষ বোঝে না; সে যদি আজকের সঙ্গীতকার যাঁরা, সিনেমায় কাজ করেন যাঁরা, তাঁদের জিজ্ঞেস করে যে সলিল একজন প্রতিভাবান সঙ্গীতশিল্পী – একথা কেন মানব? সঙ্গীতে সলিলের মৌলিক অবদানটা কী? তাহলে দেখেছি, গুছিয়ে কিছু বলতে পারেন না। আড্ডাচ্ছলে কিছু উদাহরণ তুলে ধরে কিছু কথা বলেন তাঁরা। কিন্তু ভারতীয় বা আন্তর্জাতিক সঙ্গীতের ইতিহাসে যদি সলিলের স্থান চিহ্নিত করতে চাই, তার উপায়টা কী? এই প্রশ্নের কোনো সদুত্তর এঁদের কাছ থেকে পাই না।
একই ব্যাপার ঋত্বিককে নিয়েও হয়। তিনি খুব বড় চলচ্চিত্রকার ছিলেন, তাঁকে তাঁর জীবদ্দশায় আমরা ঠিক বুঝতে পারিনি – এমন হতেই পারে। শিল্পের ইতিহাসে বহু শিল্পীর ক্ষেত্রেই এমন হয়েছে। কিন্তু আজ যে বুঝতে পারছি তার কারণ কী? এই প্রশ্ন নিয়ে কাউকে আলোচনা করতে আমি তো দেখি না। আমি যদিও সোশাল মিডিয়ায় নেই, তবু কিছুটা খেয়াল করি। নামকরা বাঙালি, সাধারণ বাঙালি – সকলেই ঋত্বিককে নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে আবেগে ভেসে যায় এবং বাঙালির ধারণা, আবেগ হল ঋত্বিককে বোঝার পাসওয়ার্ড। কিন্তু দেখাই তো যাচ্ছে যে কেবল আবেগে কিছু হয় না। স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে রামমোহন রায়, মাইকেল মধুসূদন দত্ত, রবীন্দ্রনাথের উত্তরসূরিরা কোন অতল চোরাবালিতে পড়েছে। এখান থেকে শুধু আবেগ দিয়ে উদ্ধার পাওয়া যাবে না।
ঋত্বিক তো বহুকাল আগেই লিখেছিলেন যে তিনি একটা ইতরের দেশে বাস করেন, যেখানে বণিকরা লেখক উদ্ভাবন করে এবং লেখকরা উদ্ভাবিত হন। তিনি যদি দেখতেন যে সোশাল মিডিয়া কেবল লেখক নয়, সঙ্গীতশিল্পী, অভিনেতা, নেতা – সবই উদ্ভাবন করছে; আবার অনেক শিল্পী সম্পর্কে নিদানও দিচ্ছে যে অমুক ওই বিষয়ে কথা বলেনি বা এক লাইনও লেখেনি বলে ও কোনো শিল্পীই নয়, তমুককে সাহিত্যিক বলে মনেই করি না, তাহলে ঋত্বিকের প্রতিক্রিয়া কেমন হত বলে মনে হয়? তিনি যে একবার বলেছিলেন সিনেমার থেকে ভাল কোনো মাধ্যম পেলে সিনেমাকে লাথি মেরে দিয়ে চলে যাবেন, এখন কি তিনি সেই কাজটাই করে অন্য কোনো মাধ্যমের খোঁজ করতেন?
যথেষ্ট সম্ভাবনা আছে যে ঋত্বিক ডিজিটাল মাধ্যমকে আয়ত্ত করতেন নিজের মত করে। অন্তত তিনি যে কোথাও আটকে থাকার লোক নন তা তাঁর মাত্র আটটা ফিচার ফিল্মেই পরিষ্কার হয়ে গেছে। ওটুকুতেই তিনি বুঝিয়ে দিয়েছেন যে তিনি কতখানি পাল্টাতে পারেন এবং সিনেমায় কতখানি উদ্ভাবনী শক্তির পরিচয় দিতে পারেন বিষয় এবং বক্তব্যে। তবে আমার এও মনে হয় যে আজকের নরকযাত্রার মধ্যে তিনি হয়ত রাজা লিয়রের মত হয়ে যেতেন। সম্পূর্ণ উন্মাদ, একজন unaccommodated man। তাঁকে যুক্তি তক্কো আর গপ্পো (১৯৭৪) তৈরি করার সময়ে আমি দেখেছিলাম, ক্রমশই কলকাতার বুদ্ধিজীবী মহল থেকে বিচ্ছিন্ন হচ্ছিলেন। এমন তো নয় যে ঋত্বিককে কলকাতার সাংস্কৃতিক গ্রহ, জ্যোতিষ্করা চিনতেন না; তিনিও তাদের চিনতেন। তাদের বৃত্তে তিনি আমন্ত্রিত হতেই পারতেন। কিন্তু তিনি নিজেকে আলাদা করে নিচ্ছিলেন। তার বদলে তিনি মিশতেন এমন লোকেদের সঙ্গে যাদের আমরা করুণার চোখে দেখি। তেমন তথাকথিত অশিক্ষিত লোকেদের সঙ্গে মেলামেশা করা, মদ খাওয়া তাঁর রোজকার জীবনের অঙ্গ হয়ে গিয়েছিল। আর মিশতেন আমাদের মত অখ্যাত, অনামী ছোটদের সঙ্গে। তিনি ছোটদের বিশ্বাস করতেন।
ওই ছবিতে যে তিনি নীলকণ্ঠ বাগচী হয়ে নকশালপন্থীদের সঙ্গে রাত কাটান বীরভূমের জঙ্গলে, তা কিন্তু নকশালপন্থীদের প্রতি তাঁর সমর্থন ছিল বলে নয়। ওখানে ঋত্বিকের ভাবনাটা এরকম যে একটা গোটা প্রজন্ম বিশ্বাসঘাতকতা করেছে। তারপর তোমাদের প্রজন্ম তবু নতুন করে কিছু একটা ভাবছে। আর আমি মাতাল হতে পারি, লোক ঠকিয়ে মদের বোতল জোগাড় করতে পারি। ব্যর্থ চলচ্চিত্রকারও হতে পারি, কিন্তু ভোরের আলোয় সত্যের মুখটা একবার দেখতে চাই। সত্যের জন্যে তাঁর এই আকুতিটা খাঁটি ছিল। এখন যা চলছে তা হল টুর্নামেন্ট। একটা ক্রিকেট টুর্নামেন্টের সঙ্গে এই কালচারাল টুর্নামেন্টের কোনো তফাত নেই। মানে বাংলায় এখন একটা কালচার ইন্ডাস্ট্রি চলছে। আমি তোমার পিঠ চাপড়ে দেব, তুমি রামের পিঠ চাপড়ে দেবে, রাম নবীনার পিঠ চাপড়ে দেবে, নবীনা মৃদুলার পিঠ চাপড়ে দেবে – এইভাবে চলতে থাকবে। ওইজন্যেই বললাম যে স্মরণ করার ভঙ্গিতেও নীরেন্দ্রনাথ আর রবীন্দ্রনাথের মধ্যে কোনো তফাত করা হয় না। ভাষাটা একই থাকে। ওটা আসলে জনসংযোগের ভাষা। আমরা কোনো টেলি সার্ভিসে ফোন করলে এই করতে হলে ১ টিপুন, ওই করতে হলে ২ টিপুন – এগুলো যেরকম যান্ত্রিকভাবে বলা হয়, বাঙালির গুণী মানুষদের নিয়ে আলোচনাও তেমনই যান্ত্রিক বা প্রোগ্রামড হয়ে গেছে। কতকগুলো গতে বাঁধা কথাই বলা হয়, সে জীবনানন্দ দাশ সম্পর্কেই বলা হোক আর মুকুন্দ দাস সম্পর্কেই বলা হোক।
এবার একটু সলিল চৌধুরীর প্রসঙ্গে আসি। সলিল আর ঋত্বিক দুজনেই ভারতীয় গণনাট্য সঙ্ঘের সঙ্গে দীর্ঘদিন যুক্ত ছিলেন এবং কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য ছিলেন। কিন্তু দুজনের কেউই একটা সময়ের পরে পার্টিতে টিকতে পারেননি। আজ এতদিন পরে তাঁদের সঙ্গে কমিউনিস্ট পার্টি বা বামপন্থার সম্পর্ককে আপনি কীভাবে দেখেন? পার্টির সঙ্গে বিচ্ছেদ কি শিল্পী হিসাবে তাঁদের উপর কোনো প্রভাব ফেলেছিল?
এখানে একটা গল্প বলতেই হবে। একবার যাদবপুরে একটা সেমিনারে আমি যুক্তি, তক্কো আর গপ্পো নিয়ে আলোচনা করছিলাম। ঘটনাচক্রে সেখানে শ্রোতাদের মধ্যে কবি ভারভারা রাও ছিলেন। আমার যা বক্তব্য ছিল তা নিয়ে তিনি কিছু বলেননি, কিন্তু পরে চা চক্র চলাকালীন বললেন, আচ্ছা, এই ছবিটা পাওয়া যায়? আমি তো ভাবতেই পারছি না যে উনি ওই সময়ে এইসব ভেবেছিলেন! ভারতের সমাজ এবং রাজনীতি তো ঠিক এরকমই! এত জ্যান্ত করে কী করে ভাবলেন উনি!
গল্পটা বললাম এইজন্যে যে ঋত্বিকের গুরুত্ব বামপন্থীরা সেইসময় পুরোপুরি বোঝেননি। তাঁরা ঋত্বিককে একজন সমকালীন সমাজবাস্তবের রূপকার ভেবেছিলেন। আর মনে করেছিলেন, যে উদ্বাস্তু সমস্যা নিয়ে কেউ কথা বলে না, ঋত্বিক সেই কাজটা করছেন, নিচুতলার মানুষকে পর্দায় তুলে আনছেন। বামপন্থীরা তলিয়ে দেখেননি যে এই নিচুতলার মানুষ বলতে আজাদগড় উদ্বাস্তু কলোনির মানুষ আর ওরাওঁ পল্লীর মানুষ এক কিনা। ঋত্বিক ঠিক কী বলতে চাইছেন? যদি শুধু উদ্বাস্তু সমস্যার কথা বলতেন, তাহলে কিন্তু তাঁর গুরুত্ব এতদিনে ফুরিয়ে যেত। ওই সমস্যার দিনগুলো তো অনেক দূরে চলে গেছে। কিন্তু উনি যে আসলে মানুষের আত্মচ্যুতি, শিকড়চ্যুতির কথা বলছিলেন এবং বলতে বলতে একটা দার্শনিক জায়গায় পৌঁছচ্ছিলেন; সলিলের গানেও গণসঙ্গীত বা বিদ্রোহের সঙ্গীত লেবেল লাগিয়ে যে লাভ নেই এবং তাঁর আধুনিক গান বা বম্বের সিনেমার গানকেও তুচ্ছ করে যে লাভ নেই – সে উপলব্ধি কমিউনিস্ট পার্টির হয়নি।
এমনকি আমি বলব যে আমাদের মেধাচর্চার জগতেও সলিলকে নিয়ে কোনো মৌলিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিচয় আমি প্রায় দেখিনি। দু-একজন কখনো কখনো আত্মপক্ষ সমর্থন করার জন্য সলিলকে ব্যবহার করেছেন। কিন্তু সলিলের মহত্ত্ব ঠিক কোথায় – এ নিয়ে আমি অন্তত কোনো গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা দেখিনি। আর ঋত্বিককে নিয়ে, আমার মনে হয় বাঙালিদের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা শুরু করেছিলেন বিষ্ণু দে। কিন্তু সেই স্তরের আলোচনাকে পরে কেউ অনুসরণ করেননি। তারপর হয়েছিল আবেগের বিচ্ছুরণ। বরং ঋত্বিকের মৃত্যুর পর থেকে তরুণতর প্রজন্মের যাঁরা তাঁকে নিয়ে আলোচনা করতে শুরু করেন, আমি বলব তাঁরা অনেকটা চেষ্টা করেছেন এবং করছেন। ঋত্বিককে নিয়ে এই চেষ্টা সারা বিশ্বেই হচ্ছে।
সলিলকে নিয়ে আলোচনায় মৌলিক দৃষ্টিভঙ্গির যে অভাবের কথা বলছেন, সেটা একটু বুঝিয়ে বলুন না।
ধরো, আজকাল তো বাংলায় থিওডোর অ্যাডর্নো ইত্যাদি বড় বড় নামের চর্চা চলে। কিন্তু অ্যাডর্নো বেঠোফেনকে নিয়ে যেরকম আলোচনা করেছেন সেরকম কিছু কিন্তু বাংলায় সলিলকে নিয়ে হচ্ছে না। আমিই অনেকদিন আগে একটা লেখায় লিখেছিলাম যে বাংলা আধুনিক সঙ্গীত মানে মূলত রামপ্রসাদ সেন, রবীন্দ্রনাথ আর সলিল। যদি বলো, কেন? আমি আমার মত একটা উত্তর দিতে পারি। কিন্তু আমি তো সঙ্গীত বিশেষজ্ঞ নই। সঙ্গীত বিশেষজ্ঞরা এ নিয়ে তাত্ত্বিক আলোচনা করলেন কোথায়? ঋত্বিককে নিয়েও কিন্তু যত সিরিয়াস আলোচনা হয় প্রায় সবই বাংলার বাইরে এবং দেশের বাইরে। বাঙালিদের এতসব করার সময় নেই। এমনকি কমিউনিস্টরাও এঁদের অনেকটা জনসংযোগের জন্য ব্যবহার করে আর সাধারণ মধ্যবিত্ত বাঙালি তাদের আবেগবিধুরতায় এঁদের ছুঁয়ে থাকে।
অনেকদিন আগে আপনার আর সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের একটা কথোপকথন শুনেছিলাম। সেখানে আপনি বলেছিলেন যে ঋত্বিক আদ্যন্ত বামপন্থী হলেও মনে করতেন তিনি মূলত একজন শিল্পী। তাঁকে রাজনীতিটাও শিল্পের মধ্যে দিয়েই করতে হবে। সলিলও তো আজীবন তাঁর সঙ্গীতের মধ্যে রাজনীতি বাঁচিয়ে রেখেছেন। সেক্ষেত্রে ইদানীং পশ্চিমবঙ্গে শিল্পীদের দলীয় রাজনীতিতে যোগ দেওয়া, ভোটে দাঁড়ানো, কিছুদিন পরে বেরিয়ে যাওয়া বা আর জি করের ঘটনার মত বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে কারো কারো পথে নামা – এগুলোকে আপনি কী চোখে দেখেন? এই শিল্পীদের কাজে তো আমরা ডান, বাম, মধ্য – কোনো রাজনীতিরই ছাপ দেখি না। মানে অধিকাংশ বাংলা সিনেমায় বা গানে বা নাটকে তো আটপৌরে জীবনটাই দেখতে পাই না। তার রাজনীতি দূরের কথা।
দেখো আজকাল বেশিরভাগ সময়েই আমি হয়ত খুব তেতোভাবে কথা বলি। কিন্তু জানি না আজকের শিল্পীরা যে রাজনীতিটা করছেন সেটার সম্পর্কে কী করে এর চেয়ে নরম করে বলা সম্ভব। আমার মনে হয়, আগে কলকাতা ফুটবলে যেমন দলবদল হত বা এখন যেমন আইপিএলের নিলাম হয়, নীতা আম্বানির মত ধনকুবেররা ক্রিকেটার কেনাবেচা করেন, আজকাল রাজনীতি তেমনই হয়ে গেছে। যদি আরেকটু সিরিয়াস ভাষায় বলি, তাহলে যা চলছে সেটাকে সোজাসুজি ওয়াল্টার বেঞ্জামিনের ভাষায় বলা উচিত aestheticization of politics – একেবারে আদর্শ ফ্যাসিবাদী শাসনে যা হয়ে থাকে। রাজনীতিকে এক ধরনের শিল্প, মানে spectacle, বানিয়ে দাও। আজ যদি পশ্চিমবঙ্গের দিকে তাকাও, তাহলে দেখবে সমস্ত রাজনৈতিক ঘটনা নিয়েই কবিতা লেখা হচ্ছে। সেসব খুব ভাববিহ্বল কবিতা। তাতে কুঠারকে কুঠার বলার চেষ্টা খুব কম। ফলে সাহিত্যে, শিল্পে ওই প্রতিবাদে শাসকের কিছু এসে যাবে না।
এবার ঋত্বিক আর সলিলের শিল্পকর্মের কথা যদি ভাবি, তাহলে দেখব যে তাঁরা ফর্ম আর বিষয়, দুটোরই এমনভাবে রাজনীতিকরণ করেছিলেন যে তাকে বলা যায় এক ধরনের দার্শনিক হস্তক্ষেপ। সেই কারণেই এঁরা নিজের সময়ের মুখপাত্র হয়ে উঠেছেন। ঋত্বিক আসলে কী করেছিলেন? দেশভাগ একটা উপলক্ষ মাত্র। আসলে মানুষের ছিন্নমূল হওয়া তার একটা অন্তর্গত সমস্যা। এই সমস্যাকে তিনি কোথায় রাখবেন – প্রকৃতপক্ষে এই নিয়েই ঋত্বিকের কাজ। অনেকেরই ধারণা মেঘে ঢাকা তারা (১৯৬০), কোমল গান্ধার (১৯৬১) আর সুবর্ণরেখা (১৯৬৫)- ই তাঁর উদ্বাস্তু সমস্যা নিয়ে ছবি। কিন্তু ঋত্বিকের প্রথম ছবি নাগরিক (১৯৫২, মুক্তি ১৯৭৭) দেখলেও একটা ছোট্ট দৃশ্য দেখা যাবে। কলকাতায় দুর্গা প্রতিমা প্রবেশ করছে এবং এক ভাড়াটে পরিবার বাড়ি থেকে উচ্ছেদ হচ্ছে। বাড়ি থেকে পালিয়ে ছবিতেও এই জিনিস দেখতে পাব। আমার তো তাই মাঝে মাঝে মনে হয় ওটা আসলে বাচ্চাদের ছবিই নয়। ওই ছবির কাঞ্চন যে বাড়ি থেকে পালিয়ে কলকাতা শহরে আসে এবং ওয়াইড অ্যাঙ্গলের প্রভু ঋত্বিক এক্সট্রিম ওয়াইড অ্যাঙ্গলে যেভাবে কলকাতা শহরকে দেখেন, সে এক বিশেষ দেখা। ওখানে বাড়িছাড়া হওয়ার আরেকটা স্তর দেখা যায়, তা হল পথেঘাটে থাকতে হওয়া। যেসব মানুষকে কাঞ্চন দেখে তারা কেবল উদ্বাস্তু নয়, তারা হল যাকে বলে underclass। এমনকি তিতাস একটি নদীর নাম ছবিতেও কিন্তু এই ব্যাপারটা ফিরে আসে, কারণ ভারতে প্রথমবার সভ্যতার স্থানচ্যুতি হয়েছিল সিন্ধু নদ গতিপথ পরিবর্তন করায়। সুতরাং তিতাসের শুকিয়ে যাওয়ার সঙ্গে এখানে ঋত্বিক সিন্ধুনদের ইতিহাসকে যুক্ত করছেন। যুক্তি তক্কো আর গপ্পো তো বলাই বাহুল্য, এক উন্মাদের বুড়ো আংলা হওয়ার প্রয়াস। নীলকণ্ঠের বাড়ি থেকে বেরিয়ে গ্রামের দিকে চলে যাওয়া, ছৌ নাচ, লোকাচার, মানে একেবারে people’s art বলতে যা বোঝায় – এসবের সঙ্গে আমাদের মধ্যবিত্ত শিল্পের সম্পর্ককেই ঋত্বিক প্রশ্ন করেন।
আমরা জানি যে গণসঙ্গীতে সলিল যখন পাশ্চাত্য সুরের প্রয়োগ শুরু করেন, তা নিয়ে গণনাট্য সঙ্ঘের মধ্যে বিতর্ক হয়েছিল। হেমাঙ্গ বিশ্বাসের মত মানুষ মনে করতেন যে বিদেশি সুর এদেশের একেবারে নিচের তলার মানুষ, যাঁরা গণসঙ্গীতের মূল লক্ষ্য, তাঁদের ছুঁতে পারবে না। কিন্তু সলিল এই যুক্তি মানতে চাননি। অন্যদিকে আমরা ঋত্বিকের ছবিতে দেখেছি দেশজ সংস্কৃতি একেবারে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে আছে। তিনি অযান্ত্রিক (১৯৫৮) ছবিতে ওরাওঁদের নাচ দেখান। বিশেষত ‘পার্টিশন ট্রিলজি’-তে পুরাণ বা এদেশের প্রাচীন কিংবদন্তিগুলোকে ব্যবহার করেন। সত্যজিৎ রায়ও একবার বলেছিলেন যে ঋত্বিকের মত একেবারে পাশ্চাত্য প্রভাবমুক্ত ভারতীয় চলচ্চিত্র নির্মাতা বিরল। আবার জীবনের শেষ ছবি যুক্তি, তক্কো আর গপ্পো, যে ছবি প্রায় আত্মজীবনী এবং যখন তিনি আর কমিউনিস্ট পার্টির সদস্যও নন, সেখানে ছৌ নাচ আসে। চরিত্রগুলোর নামও দুর্গা, নচিকেতা – এইরকম। তাই জানতে ইচ্ছা করছে যে সলিল আর ঋত্বিক কি ওই বিতর্কে দুটো আলাদা মতের লোক? নাকি এগুলোকে সেই সময়কার কমিউনিস্টরা অতিসরলীকৃত বাইনারিতে দেখতেন বলে ওই বিতর্ক তৈরি হয়েছিল?
আমি সম্প্রতি জ্যোতিরিন্দ্র মৈত্রের গান বা পি সি যোশীর সাংস্কৃতিক নীতি সম্বন্ধে বলতে বলতে এই ব্যাপারটাই ভাবছিলাম। লোকসংস্কৃতি আর আমাদের উচ্চবর্গীয় আধুনিকতা কীভাবে মিলতে পারে – এটা খুব গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। বস্তুত সলিল আর ঋত্বিক শুধু যে সমবয়স্ক ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন তা নয়, দুজনেই এই দুটো ধারাকে কীভাবে ব্যবহার করা যায় তা নিয়ে ভাবছিলেন। আসলে একটা স্বরের বদলে বহু স্বরে কথা বলা, দৈনন্দিনতাকে মহাকাব্যের স্তরে পৌঁছে দেওয়া দুজনেরই লক্ষ্য ছিল। কমিউনিস্ট পার্টির ওই বিতর্কের মূল্যায়ন করতে গেলে আমি মনে করিয়ে দেব, সলিল ১৯৬০-এর দশকের শুরুর দিকে যে গানগুলো রচনা করেছেন…জনপ্রিয় গান, আজও প্যান্ডেলে প্যান্ডেলে বাজে… সেগুলো এখন শুনলে এক অন্যরকম চিন্তা মাথায় আসে। কী গান? যেমন ধরো ‘পথ হারাব বলেই এবার পথে নেমেছি/সোজা পথের ধাঁধায় আমি অনেক ধেঁধেছি’ বা ‘নিষেধের পাহারাতে ছিলেম রেখে ঢেকে/সে কখন গেছে ফিরে আমায় ডেকে ডেকে’। এগুলো কি কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে তাঁর সংলাপ নয়? যে সরলরৈখিক আখ্যান পার্টির মত একটা প্রতিষ্ঠান তৈরি করে, সেটা ঠিক না-ও হতে পারে। ফলে পথ হারাব বলে পথে নামা সলিলের ক্ষেত্রে যেমন সত্যি, ঋত্বিকের ক্ষেত্রেও তেমন সত্যি।
এটা কেন বলছেন?
ধরো, সলিলদা একটা একান্ত ব্যক্তিগত মুহূর্তে আমাকে বলেছিলেন, যে কোমল গান্ধারে ব্যবহার করার জন্যে ঋত্বিকের অনুরোধে উনি একটা প্রেমের গান লিখেছিলেন। সেটা শেষপর্যন্ত ছবিতে রাখা হয়নি। কোন গান? ‘আমি ঝড়ের কাছে রেখে গেলাম আমার ঠিকানা’। এটা আলাদা করে আধুনিক গান হিসাবে প্রকাশ পেয়ে প্রবল জনপ্রিয় হয়। তা গানটাকে তলিয়ে দেখলে দেখা যাবে যে এটা এক ধরনের আত্মবিবরণী। ‘ওগো ঝরাপাতা, যদি আবার কখনো ডাকো’। এই লাইনটা শুনলেই আমার মনে পড়ে যে ঋত্বিক সুরমা ঘটককে একটা চিঠিতে লিখেছেন, পি সি যোশী গতকাল আমাকে জড়িয়ে ধরে বললেন, ‘ঋত্বিক, ইউ আর দি ওনলি পিপলস আর্টিস্ট ইন ইন্ডিয়া।’ এর থেকে বেশি কিছু চাই না। তাহলে কমিউনিস্ট পার্টি আবার কখনো ফিরে ডাকবে, এই ভাবনাই কি কাজ করছিল মনের মধ্যে? দুজনেরই? আমার তো এই কথাগুলোকে খেয়াল করলে সেরকমই মনে হয়। সে ডাক যে কখনো আসবে না তা হয়ত দুজনেই বুঝতেন। তবু…এ যেন এক রাজনৈতিক সংলাপ।
আর সলিল যা করছিলেন, সেটা তো আসলে ভারতীয় সঙ্গীতের এক বিরাট আধুনিকীকরণের চেষ্টা। কীরকম? এই যে আমি একটু আগে রামপ্রসাদ, রবীন্দ্রনাথ আর সলিলকে বাংলা আধুনিক গানের তিনটে মাইলস্টোন বলে চিহ্নিত করলাম। সেটা কেন? কারণ রামপ্রসাদের গানের যে আধ্যাত্মিক দিক সেটা বাদ দিয়েও যদি শুধু ভাষার দিকে নজর দিই, তাহলে দেখব যে উনি বাংলা গানের ভাষার ঝুঁটি ধরে দিক বদলে দিচ্ছেন। খাজাঞ্চিখানায় কাজ করতেন। ফলে তাঁর গানে অজস্র ফারসি শব্দ চলে আসছে, যেমন ‘দে মা আমায় তবিলদারী/আমি নিমকহারাম নই শঙ্করী’। রূপক আনছেন কৃষিকার্য থেকে, যেমন ‘এমন মানবজমিন রইল পতিত/আবাদ করলে ফলত সোনা’। এ তো বৈপ্লবিক। রামপ্রসাদ গানকে একেবারে সাধারণ মানুষের জিনিস করে তুলছেন। এমনিতে তো ভারতীয় মার্গসঙ্গীত সাধারণ মানুষের সমতলে নামতে পারে না। পণ্ডিত ভীমসেন যোশী বা ওস্তাদ আমির খাঁ, ওস্তাদ ফৈয়াজ খাঁদের সঙ্গীত উচ্চতায় মহাকাশে পৌঁছে যায়, কিন্তু তা দিয়ে তো বাজারের পোকাকাটা জিনিসের কেনাকাটা করা মানুষের মনের খিদে মেটে না সাধারণত। ভারতের লোকসঙ্গীত, যা হাবিব তনবীর বা ঋত্বিকের কাজে এসে পড়েছে, তার সঙ্গে উচ্চবর্গীয়দের সঙ্গীতের একটা বিরোধ থেকে গেছে। অথচ রাগ হংসধ্বনির সঙ্গে ‘কান্দিয়া আকুল হইলাম ভবনদীর পাড়ে’-তে তেমন বিরোধ নেই।
রবীন্দ্রনাথও ১৮৮১ সালে একটা প্রবন্ধে লিখেছেন যে ওস্তাদরা ‘গানের কথার উপরে সুরকে দাঁড় করাইতে চান, আমি গানের কথাগুলিকে সুরের উপরে দাঁড় করাইতে চাই। তাঁহারা কথা বসাইয়া যান সুর বাহির করিবার জন্য, আমি সুর বসাইয়া যাই কথা বাহির করিবার জন্য।’ এইজন্যেই আমার মনে হয় রবীন্দ্রনাথ ভারতীয় সঙ্গীতের সম্প্রসারণ ঘটিয়েছেন। আর সলিল কী করলেন? তিনি প্রাচ্য সঙ্গীত আর পাশ্চাত্য সঙ্গীতের মূল ভেদটা বুঝতেন। বুঝে কী করলেন? আপাতভাবে খাপ খায় না, যা contrapuntal, এমন জিনিসকে সফলভাবে মিলিয়ে দিলেন। গণসঙ্গীতের ক্ষেত্রে তো বটেই। আমি তোমাকে একেবারে সিনেমার গান থেকে উদাহরণ দিচ্ছি। হিন্দি ছবিতে সলিলের সুরারোপিত প্রথম জনপ্রিয় গান হল ‘আ যা রে পরদেশী…ম্যায় তো কব সে খড়ি ইস পার’।
বিমল রায়ের মধুমতী (১৯৫৮) ছবির গান, যে ছবির আবার চিত্রনাট্যকারদের একজন ঋত্বিক। সলিলদা নিজেই বলেছিলেন যে ওই গানে আসামের বিহু, পাঞ্জাবের ভাংড়া মেশানো হয়েছে। আবার ইন্টারল্যুডে মোজার্ট ঢোকানো হয়েছে। অথচ গানটা শুনলে কিন্তু সম্পূর্ণ দেশি গান বলেই মনে হয়। আর সারা দেশেই লতা মঙ্গেশকরের গলায় এটা আজও জনপ্রিয়।
সুতরাং ভারতীয় সংস্কৃতির আধুনিকীকরণের প্রয়োজন যে ছিল তা অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই। নাটকে এই কাজটা সেইসময় হাবিব তনবীর করছিলেন, সিনেমায় ঋত্বিক, সঙ্গীতে সলিল – এরকম আরও অনেকে। বস্তুত ভারতীয় গণনাট্য সঙ্ঘ সংগঠন হিসাবেই সচেতনভাবে এই কাজটা করছিল। ওই প্রয়াস সম্পর্কেই অশোক মিত্র একটু আলগা সুরে বলেছিলেন, ভারতীয় গণনাট্য সঙ্ঘ ১৯৪০-এর দশকে আমাদের দ্বিতীয় সাংস্কৃতিক রেনেসাঁ ঘটাচ্ছিল।
মানে আপনি বলছেন ঋত্বিক, সলিল দুজনেই শিল্পী হিসাবে একই লক্ষ্যে এগোচ্ছিলেন, কমিউনিস্ট পার্টির বাইরে চলে যাওয়ার পরেও?
আমার মনে হয় পি সি যোশীর নেতৃত্বে ভারতীয় গণনাট্য সঙ্ঘ যেটা করতে চেয়েছিল – নাটকে নবান্ন (১৯৪৪) দিয়ে, সাহিত্যে মাণিক বন্দ্যোপাধ্যায় যা করছিলেন ‘দুঃশাসনীয়’ বা ‘ছোট বকুলপুরের যাত্রী’-র মত গল্পের মধ্যে দিয়ে, কবিতায় সুভাষ মুখোপাধ্যায় বা সুকান্ত ভট্টাচার্য – সেটা হল উনবিংশ শতকের তথাকথিত রেনেসাঁয় যা হয়নি, সেই কাজটা করা। অর্থাৎ সংস্কৃতিকে একেবারে নিম্নবর্গীয় মানুষের কাছে নিয়ে যাওয়া। সলিল আর ঋত্বিক সঙ্গীতে এবং সিনেমায় সেটাই চেষ্টা করছিলেন। সিনেমার মত একটা যন্ত্রভিত্তিক মাধ্যমে এটা কিন্তু দুঃসাহসিক কাজ। কারণ আমরা সাধারণভাবে যন্ত্রকে সন্দেহই করি। আজও বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে রবীন্দ্রনাথের মুক্তধারা আর রক্তকরবী এত জনপ্রিয় কেন? বা মহাত্মা গান্ধীর আমেদাবাদ টেক্সটাইল সম্পর্কে বক্তৃতাগুলোর আজও আবেদন রয়েছে কেন? কারণ গান্ধী আর রবীন্দ্রনাথ – দুজনেই খেয়াল করেছেন যে যন্ত্রের দাঁতে অনেক রক্ত লেগে আছে। যন্ত্রের আগমন তো স্রেফ শিল্পবিপ্লবের ফলাফল নয়। যন্ত্রকে এদেশে এনেছে ঔপনিবেশিক শক্তি। এর সঙ্গে পুঁজি আর মুনাফার সরাসরি যোগ রয়েছে। তার ফলে ঢাকার মসলিন নষ্ট হয়েছে, বহু কুটির শিল্প উঠে গেছে, জমি জায়গার ব্যাপক দখলদারি করে রেললাইন পাতা হয়েছে। এসবে হয়ত জাতিরাষ্ট্র গঠনে সুবিধা হয়েছে, কিন্তু আমাদের সমাজের তন্তুজাল ছিন্নভিন্ন হয়ে গিয়েছিল।
তা ঋত্বিক দেখলেন যে এটা খুব জটিল একটা বিষয়। কারণ এই যুগে তো আর যন্ত্রের সাহায্য ছাড়াই বাঁচব – একথা বলা যায় না। ওরাওঁদের কারোর যদি হার্ট অ্যাটাক হয় তাহলে তাদেরও তো ইসিজি, বাইপাস সার্জারি ইত্যাদি করতেই হবে। তন্ত্র মন্ত্র, তুকতাকে তো আমরা থেমে থাকব না। কারণ মানুষের উপকারে যন্ত্রের ব্যবহার এখন সম্ভব হয়েছে আর আমরা তো চাইও এমন একটা সমাজ যেখানে ওরাওঁদের কাউকে এই সুবিধাগুলো থেকে বঞ্চিত হতে হবে না। কিন্তু এই দুয়ের সমন্বয় হবে কী করে? সেটা ঘটাতে গেলে অযান্ত্রিক করতে হবে। সুবোধ ঘোষের মূল গল্পে কিন্তু ওরাওঁদের নামগন্ধ ছিল না। তাহলে ঋত্বিক তাদের আনলেন কেন? আসলে এটা মনে করিয়ে দেওয়ার জন্যে যে আমাদের দেশে প্রাচীনকাল থেকে বৈজ্ঞানিক পরীক্ষানিরীক্ষা কখনো অনাদৃত থাকেনি। মহেঞ্জাদারো বা পাটলিপুত্রেও তার চিহ্ন আছে। সুতরাং যন্ত্র জিনিসটাকেই ভারতীয় হলে প্রত্যাখ্যান করতে হবে তা নয়। কিন্তু সেই যন্ত্র কাদের হাতে, কারা তাকে কীভাবে ব্যবহার করছে সেগুলো গুরুত্বপূর্ণ।
সলিলের কাজে এই জিনিসটা কীভাবে হয়েছে যদি একটু উদাহরণ দিয়ে বলেন…
একসময় ফ্র্যাঙ্কফুর্ট স্কুলের অ্যাডর্নো, ওয়াল্টার বেঞ্জামিনকে উদ্ধৃত করে বলেছিলেন যে দৃশ্যকলা যেমন বস্তুকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করে, তেমনি এমন গানও আছে যা পাখিদের গানকে নশ্বরতা থেকে উদ্ধার করে। এটা কী করে করা যায় সে প্রশ্ন খুব গুরুত্বপূর্ণ। সবসময় যে লোকসঙ্গীতকে অনুসরণ করলেই তা করা যাবে এমন নয়। বরং ১৯৫৯ সালে লতার গাওয়া ‘যা রে উড়ে যা রে পাখি’ গানটায় দেখো, কীভাবে শব্দকে নশ্বরতার হাত থেকে মুক্তি দেওয়া হচ্ছে। ‘যা ফিরে আপন নীড়ে’ বলা হচ্ছে, অথচ সুরটা কিন্তু রুট কর্ডে ফিরছে না। আবার ‘রানার’ গানটার কথা যদি ভাবি। রানার ক্ষুধার ক্লান্তিতে ক্ষয়ে যাচ্ছে, সলিল সুরটাকে ছবার রুট কর্ডে ফিরিয়েছেন। হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের মত শিল্পীও বলে ফেলেছিলেন, সলিল, এ গান গাওয়া খুব মুশকিল। কিন্তু গানটাতে শুধু শ্রমজীবী মানুষের সংগ্রাম তুলে ধরার জন্যে সলিল কী অসাধ্য স্বরলিপি তৈরি করেছিলেন! তার জন্যে পাশ্চাত্য সঙ্গীতের সাহায্য নিয়েছেন। তাতে তো দোষের কিছু নেই। পল রবসন ১৯৩৪ সালে বলেছিলেন যে যিশুখ্রিস্ট সাদা চামড়ার মানুষের কাছে এক ধরনের বিমূর্ত অনুভূতি। তারা তাঁকে চার্চে খুঁজে পায়। কিন্তু কালো মানুষদের কাছে যিশু স্পর্শযোগ্য বিষয়। সেই অনুভূতি থেকে কালো মানুষদের কথ্য ভাষায় যেসব গান রচিত হয়েছিল সেগুলোকে রবসন মার্কিন মূলধারার সংস্কৃতিতে নিয়ে আসার চেষ্টা করেছিলেন।
আচ্ছা, এবার একটু অন্য প্রসঙ্গে যাই। রাজনৈতিক মতাদর্শের সঙ্গে সম্পৃক্ত শিল্পীকেও তো ঘর সংসার চালাতে হয়। সকলে ঋত্বিকের মত সারাজীবন নিজের মত করে শিল্প করতে পারলে করব, নইলে করবই না – এই সঙ্কল্প নিয়ে চলতে পারেন না। ঋত্বিক বিমল রায়ের মধুমতী-র মত হিট ছবির চিত্রনাট্য লেখার মত দু-একটা কাজই করেছেন। সিনেমা শেখানোর সরকারি চাকরিও বেশিদিন করেননি। সলিল আবার প্রচুর সিনেমার কাজ করেছেন, বাংলা আধুনিক গান রচনা এবং সুর দেওয়ার কাজ করেছেন। তাতেও বহু উৎকৃষ্ট শিল্প সৃষ্টি হয়েছে। কিন্তু এই যে আমাদের একটা প্রবণতা আছে, আমরা কেউ বাণিজ্যিক পরিসরে করা কাজগুলোকে কম গুরুত্ব দিই, আবার কেউ ‘ঘুমভাঙার গান’ নামে পরিচিত সলিলের সরাসরি রাজনৈতিক কাজগুলোকে পাত্তা দিতে চাই না। এটা কি ঠিক? মানে গরিব শিল্পীর শিল্পই সৎ শিল্প, বাকি সব স্রেফ আপোস – এরকম ভাবে কি শিল্পকে দেখা যায়?
একদমই যায় না। ওভাবে দেখলে তো বলতে হবে যে শিল্পীর গান কেউ শোনে না সে-ই সবচেয়ে বড় শিল্পী। ওটা একেবারেই ভুল চিন্তা পদ্ধতি। আসলে ঋত্বিকও কিন্তু চাইতেন লোকে তাঁর ছবি দেখুক। দেখে না বলে যথেষ্ট কষ্টও পেতেন। আমি যদি এখন পিয়ানো বাজাই, একটা লোকও শুনবে না। তাতে কি প্রমাণ হয় আমি বেঠোফেন? ধরো, আমি যদি সাহিত্যের কথা বলি। সাহিত্য শব্দটাই তো ‘সহিত’ থেকে এসেছে। অর্থাৎ অন্যের সঙ্গে যোগাযোগ, সমাজের সঙ্গে যোগাযোগ – এটাই তো সাহিত্য এবং শিল্পের কাছে মানুষের চাহিদা। যেমন প্রাচীন কবিরা কিন্তু ছন্দের উত্তম ব্যবহার করেছেন বলে কবি নন। তাঁরা সমাজের কথা বলতেন, সেই জন্যে কবি। মহাকাব্যগুলো তো সেভাবেই তৈরি হয়েছে। রামায়ণ, মহাভারত, ইলিয়াড, ওডিসি – সবই তো কবিতা। কিন্তু সেগুলো একেকটা জাতির অলিখিত ইতিহাস। সেইখানেই মহাকাব্যের মহত্ত্ব। সুতরাং শিল্পের জনপ্রিয় হওয়া বা শিল্পীর লক্ষ্মীলাভ মোটেই খারাপ নয়। কিন্তু আমাদের সময়ে আমরা ব্যাপারটাকে সন্দেহ করতে শুরু করেছি কেন?
কারণ পুঁজিবাদ যে কোনো জিনিসকেই বিক্রয়যোগ্য পণ্য হিসাবে দেখে। শার্ল বোদলেয়ার বা জীবনানন্দ দাশ তার কাছে স্রেফ বিক্রয়যোগ্য বস্তু। সেইজন্যেই পুঁজিবাদ মনে করে যে আরও বিক্রি করতে গেলে শুধু জীবনানন্দের কবিতা বিক্রি করলে চলবে না। তাঁকে star বানাতে হবে। যেমন পাবলো পিকাসো বলতেন যে লোকে আমার ছবি নিয়ে মাথা ঘামায় না, অথচ আমি যে চুল কাটতে ভয় পাই সেটা নিয়ে বিস্তর আলোচনা করে। উনি কিন্তু সত্যিই চুল কাটার ব্যাপারে কুসংস্কারাচ্ছন্ন ছিলেন। মনে করতেন চুলের মধ্যেই ওঁর প্রতিভা রয়েছে। ফলে ওই টাক মাথায় যে কটা চুল আছে সেগুলো কাটতেও খুব গাঁইগুঁই করতেন। এখন বুর্জোয়া প্রচারযন্ত্র ওই কুসংস্কারটারই বিপুল প্রচার করত। মানে ওটাকেও বিক্রি করা হত। জীবনানন্দের ক্ষেত্রেও দেখবে একই ব্যাপার হয়। তিনি কোনো আত্মীয়ার প্রতি অনুরক্ত ছিলেন কিনা আসলে তো তা দিয়ে কিছু এসে যায় না, তিনি তো মহান তাঁর কবিতার জন্য। বিশেষ করে সাতটি তারার তিমির থেকে তিনি যখন পাল্টে গেলেন, কলকাতার জরায়ু এবং দুর্গত মানুষের কথা লিখতে শুরু করলেন, সেগুলো নিয়ে লোকে তত কথা বলে না। বেশি কথা হয় বনলতা সেন আসলে কে – এই নিয়ে। শিল্পের বনলতা সেন যে আসলে কোনো বাস্তব রমণী নন, ওই কল্পনার পিছনে কোন মহিলা ছিলেন তা নিয়ে ভেবে যে লাভ নেই – একথা পুঁজিবাদ তোমাকে ভুলিয়ে দেয়।
রবীন্দ্রনাথের কবিতা বা গানের মালবিকা, মালিনী বা নলিনীদের নিয়েও এমনই করা হয়। ওই নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করে বড়জোর কোনো নির্দিষ্ট মহিলাকে চিহ্নিত করা যেতে পারে। তাতে এটুকুই প্রমাণিত হবে যে রবীন্দ্রনাথ ভালবাসতে জানতেন। সে আর বেশি কথা কী? ভালবাসতে না জানলে ওরকম কবিতা লেখা যায়? কিন্তু রবীন্দ্রনাথের কাব্য নিয়ে না ভেবে তিনি কবে কোন বিদেশিনী সম্পর্কে কতটা আগ্রহী হয়েছিলেন এবং সেই আগ্রহে কতটা যৌন ইশারা ছিল তা নিয়ে আমরা যত গবেষণা করি, তাঁর লেখা নিয়ে তত মাথা ঘামানো হয় না। এইটাই পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় শিল্প, সাহিত্য জনপ্রিয় হওয়ার বিপদ।
কিন্তু উল্টোটাও তো করা হয়। যেমন বিশেষ করে বামপন্থীরা, শিল্পের রাজনৈতিক দিকটা পছন্দ না হলেই সেটাকে অবজ্ঞা করতে চান।
সেটাও নিঃসন্দেহে আরেক ধরনের ভ্রান্তি। ধরো, ফ্রান্সে রোম্যান্টিসিজমের জনক থিওফিল গোতিয়ে বলেছিলেন যে একজন নগ্ন রূপসী বা রাফায়েলের একটা আসল পেন্টিং দেখতে পাওয়া গেলে আমি আমার ফরাসি নাগরিক অধিকারও ছেড়ে দিতে রাজি আছি। এটাকেই কলাকৈবল্যবাদ বা art for art’s sake বলে। সাধারণ মার্কসবাদীরা এই মনোভাবকে কিন্তু প্রবল আক্রমণ করবেন। বলবেন, সে কী! ফরাসি নাগরিক আদর্শ – সাম্য, মৈত্রী, স্বাধীনতা – তার অধিকার তো আধুনিক বিশ্বের সবচেয়ে বড় অধিকার! যে শিল্পী একজন নগ্ন সুন্দরী বা রাফায়েলের আঁকা ছবি দেখার জন্যে এটাকে বর্জন করার কথা বলে, সে তো প্রতিক্রিয়াশীল! কিন্তু রুশ দেশে মার্কসবাদের যিনি বিরাট এক স্তম্ভ, যাঁর কথা আমরা ভুলে গেছি, এমনকি বিপ্লবের পর যিনি মেনশেভিক হওয়া সত্ত্বেও লেনিন বলেছিলেন যে ওঁর প্রতি যেন অন্যায় ব্যবহার না হয়, সেই জর্জি প্লেখানভ আর্ট অ্যান্ড সোশাল লাইফ (১৯১২) বইতে দেখিয়েছিলেন যে এটাই শিল্পীর স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া। যখন সর্বস্ব যায় বস্তুকামী ঘৃধ্নুতায় নানাবিধ কাজে, তখন এই সৌন্দর্য চর্চাই বিপ্লব। বঙ্কিমচন্দ্র যখন দুর্গেশনন্দিনী (১৮৬৫) উপন্যাসে আয়েষার মুখে বসালেন ‘বন্দী আমার প্রাণেশ্বর’, সেটা স্রেফ একটা রোম্যান্টিক উক্তি নয়। সেটা আমাদের দেশে নারী স্বাধীনতার প্রথম উচ্চারণ।
আসলে আমার মনে হয় আমাদের মার্কসবাদী চিন্তানায়করা, বিশেষত বাঙালিরা, অকল্পনীয় ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছেন শিল্পের ব্যাখ্যায়। নিজেদের সাংবাদিকদের সঙ্গে মিলিয়ে ফেলেছেন এবং কেবল ঘটনার বিবরণ দিয়ে গেছেন। স্বয়ং কার্ল মার্কস লিখেছেন যে উইলিয়ম শেক্সপিয়র ষোড়শ শতকের অন্যান্য সমাজতাত্ত্বিকদের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। হ্যামলেট নাটকটা মার্কসের বিশেষ পছন্দ ছিল। গোটা দাস কাপিটাল জুড়ে শেক্সপিয়র ভজনা রয়েছে। এ থেকে বোঝা যায় যে মার্কসের দেখার মধ্যে বিশালতা রয়েছে। আর আমাদের এখানকার মার্কসবাদীদের দেখা অত্যন্ত সংকীর্ণ দেখা। এই মুহূর্তের কর্পোরেট পুঁজিবাদও এই দেখাকে প্রশ্রয় দিচ্ছে। তাই মধুসূদন দত্ত আর সুবল দত্তের মধ্যে তফাত করা হচ্ছে না।
এখান থেকে একটা অনিবার্য সমসাময়িক প্রশ্ন এসে পড়ে। আমরা দেখতে পাচ্ছি স্বাধীনতার পর থেকে জওহরলাল নেহরুর মডেলে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় শিল্প সৃষ্টির যে ধারা ভারতে ছিল সেটা দ্রুত তুলে দেওয়া হচ্ছে। ন্যাশনাল ফিল্ম আর্কাইভ তুলে দেওয়া হচ্ছে, ন্যাশনাল ফিল্ম ডেভেলপমেন্ট কর্পোরেশনের মত সংস্থাগুলোর প্রযোজনায় ছবি আর আমাদের চোখে পড়ে না। কিন্তু এর বিপরীতে অন্য এক ধরনের সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা দেখছি। সেটা হল, তুমি সরকারি দলের হয়ে প্রোপাগান্ডা ফিল্ম বানাও, খোদ প্রধানমন্ত্রী তোমার ফিল্মের প্রোমোশন করবেন। কাশ্মীর ফাইলস, কেরালা ফাইলস, সবরমতী এক্সপ্রেস – এরকম প্রচুর ছবি হচ্ছে। এর মধ্যেও যাঁরা কোনোভাবে সরকারের বা সংখ্যাগুরুর অপছন্দের ছবি করতে যাচ্ছেন তাঁদের হাতে এবং ভাতে মারা হচ্ছে। ধরুন, সঞ্জয় লীলা বনশালির সেট ভাংচুর করা হয়েছিল পদ্মাবত ছবির শুটিংয়ের সময়ে। আবার নেটফ্লিক্স দিবাকর ব্যানার্জির তীস ছবিটা করাল, কিন্তু ঝামেলা হতে পারে এই আশঙ্কায় মুক্তি পেতে দিল না। এরকম একটা পরিবেশে ঋত্বিকের মত করে ছবি করা কি সম্ভব হত বলে আপনার মনে হয়? মানে ছবিটা না হয় ঘটিবাটি বেচে বানালাম। কিন্তু মুক্তি পাওয়ার নিশ্চয়তাটুকু তো থাকতে হবে? আবার ধরুন, কলকাতার ইন্ডাস্ট্রিতে আমরা দেখছি যে নির্দেশকরা একজোট হয়ে বলছেন – শাসক দলের খবরদারি, তোলাবাজি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে ছবি করাই ঝকমারি হয়ে দাঁড়াচ্ছে। এইরকম পরিস্থিতিতে কি ঋত্বিকের পক্ষেও তখনকার মত ঋজু থেকে ছবি করা সম্ভব হত বলে আপনার মনে হয়?
খুবই কঠিন হত। কারণ একজন কবি বা ঔপন্যাসিক বা চিত্রশিল্পী এই যুগেও কাগজ, কলম, তুলি বা কম্পিউটার কিনে নিজের মর্জি মত শিল্প সৃষ্টি করে যেতে পারেন। কিন্তু সিনেমা তো ওভাবে করা যায় না, সিনেমা করতে আরও অনেককিছুর সঙ্গে কয়েক কোটি টাকাও লাগে। এই পরিস্থিতিতে সেই ক্ষতিস্বীকার করতে যাবে কে? ফলে ঋত্বিকের মত করে এই যুগে ছবি করা সত্যিই খুব শক্ত হত এবং সেই লড়াইটা শেষপর্যন্ত হয়ত রাজনৈতিক সংগ্রামে পর্যবসিত হত।
এই প্রশ্নটা শুনে আমার মনে পড়ে গেল ঋত্বিক শেষ যে ছবিটা করতে চেয়েছিলেন সেইটার কথা। সেটা আশ্চর্যভাবে আর জি করের ঘটনাটার সঙ্গে মিলে যায়। আর জি করের নৃশংস ঘটনার পরে যে জনরোষ আমরা দেখলাম তা নিয়ে কোনোদিন কোনো ছবি-টবি হবে কিনা আমার খুব সন্দেহ আছে, তার কারণ তুমি যা বললে। তো ঋত্বিকের শেষ কাজ ছিল সেই বিষ্ণুপ্রিয়া নামে একটা চিত্রনাট্য। সেটা কী ব্যাপার? না জরুরি অবস্থা চলাকালীন নবদ্বীপ শহরে একটি মেয়ের অগ্নিদগ্ধ মৃতদেহ পাওয়া যায়। পুলিস যথারীতি প্রথমে ওটাকে নিতান্ত দুর্ঘটনা বলে চালানোর চেষ্টা করেছিল, পরে দেখা যায়, একেবারে জ্যামিতির উপপাদ্যের মতই, আসলে নবদ্বীপের কিছু দুষ্কৃতী মেয়েটিকে ধর্ষণ করে খুন করেছে। এই খবর কানে যাওয়ার পরেই ঋত্বিক ওই চিত্রনাট্য লিখে ফেলেন। তাতে একটা গান ছিল, যার বক্তব্য হল – যিনি ত্রেতায় সীতা, দ্বাপরে দ্রৌপদী, তিনিই এখন বিষ্ণুপ্রিয়া। নবদ্বীপে একটি মেয়ের ধর্ষণ এবং হত্যার কথা শুনেই ওঁর চৈতন্যদেবের স্ত্রী বিষ্ণুপ্রিয়ার কথা মাথায় আসে।
বুঝতেই পারছ ছবিটা কী দাঁড়াত। কিন্তু ও জিনিস কি আদৌ করতে দেওয়া হত? কে ফান্ডিং করত? রাষ্ট্র তো করত না, কারণ রাষ্ট্রীয় অপরাধ নিয়েই ছবিটা। আর আজ যা অবস্থা, তাতে কোনো ব্যক্তি বা সংস্থা করতে চাইলেও তাকে হাজারবার ভাবতে হবে যে অন্য কাজ কারবারের জন্যে তাকে রাষ্ট্রের সঙ্গে সমঝোতা করে চলতেই হবে। রাষ্ট্র সরাসরি বারণ করে দিলে তো আর সম্ভবই নয়। যেমন নাজি জার্মানিতে ব্রেশটের পক্ষে নাটক করা সম্ভব ছিল না। একসময় পর্যন্ত পেরেছিলেন। তারপর আর করা যায়নি। করলেও এমনভাবে করতে হয় যে শাসক যেন ধরতেই না পারে কী করা হল। যেমন জঁ পল সার্ত্র লিখেছিলেন আই অ্যাম মাই ওন ফ্রিডম । ফ্যাসিবাদীরা বুঝতেই পারেনি যে ওতে গ্রীক পুরাণের আশ্রয়ে যা বলা আছে তা আসলে নাগরিক স্বাধীনতার পক্ষে একটা বয়ান। তারপর নাজিরা প্যারিস দখল করার ঠিক আগেই জঁ রেনোয়া ল্য রেগলে দ্য জু (১৯৩৯) বলে যে ছবিটা করেন, সেই ছবি দেখলে কিন্তু আপাতদৃষ্টিতে মনে হবে বড়লোকরা এ ওর বউয়ের দিকে হাত বাড়াচ্ছে, সে তার বউয়ের সঙ্গে পরকীয়া করছে – এইসব নিয়েই ছবি। অনেকটা আজকাল বড় কাগজের প্রকাশ করা শারদ পত্রিকায় যেসব গল্প, উপন্যাস ছাপা হয় সেগুলোর বাঁধা বিষয়বস্তুর মত। ওগুলো শুধু যে অরাজনৈতিক তা নয়, ওগুলো আসলে মানুষকে একটা বৃত্তের মধ্যে আটকে রাখা। কিন্তু বড় শিল্পী ওর মধ্যেও অন্তর্ঘাত ঘটিয়ে দিতে পারেন। রেনোয়াঁ তাই করেছিলেন।
ব্রেশটও করেছেন। তাঁর নাটকে অনেক রগরগে শব্দ আছে, অনেক জনপ্রিয় থিম আছে। কিন্তু তার মধ্যে দিয়েই তিনি অন্য বয়ান উপস্থাপন করেন। এমনকি শেক্সপিয়রও এটা করেছেন। প্রোটেস্ট্যান্ট রানি এলিজাবেথের আমলে রোমান ক্যাথলিক শেক্সপিয়র তাঁর নাটকে যা সব নাশকতামূলক কাণ্ড করেছেন তা দেখে আজও অবাক হতে হয়।
কিন্তু আজকের অবস্থা যে খুব জটিল তা মানতেই হবে। ইরানে আব্বাস কিয়ারোস্তামি বা মোহসেন মাখমলবফকে তো অনেকটাই প্রবাসে কাজ করতে হয়েছে, জাফর পানাহিকে বারবার কারাবাস করতে হয়েছে। ফলে এখানকার শিল্পীরা আজ কী করে কী করবেন তা তাঁদেরই ঠিক করতে হবে। এর কোনো বাঁধা ফর্মুলা নেই।
কিন্তু আমাদের দুর্ভাগ্য হল, আমাদের শিল্পীদের চিন্তা করার অভ্যাস চলে গেছে। তাঁরা শিল্পকে স্রেফ পেশা হিসাবে দেখছেন। যে কোনো পেশাতেই যেমন আয়কর দিতে হয়, এটা ওটা নিয়ম মানতে হয়, সেসব মেনেই তাঁরা চলছেন। ফলে ওইসব প্রোপাগান্ডা ছবি তৈরি হচ্ছে। সেগুলোতে চিত্রভাষা বা আঙ্গিকের দিক থেকেও কোনো বলার মত জিনিস নেই।
যদি বাংলা সিনেমার আলোচনা করি, তাহলে দেখব যে বাংলা ছবি দীর্ঘকাল ধরে দর্শককে কিছুই দিতে পারছে না। একেবারে সাধারণ দর্শক যা চায় সেটুকু দেওয়ার কথাই বলছি। কিন্তু লোকে তাই নিয়েই চলছে। পিটুলি গোলা খেয়ে ভাবছে পায়েস খাচ্ছে। এই সমস্যার সমাধান কীভাবে হবে আমি জানি না। তবে ক্রমশই আমার মনে হচ্ছে যে এই সাংস্কৃতিক সমস্যা আসলে একটা রাজনৈতিক সমাধান দাবি করে। এখন সেটা দলীয় রাজনীতি দিতে পারবে কিনা তা আমি বলতে পারব না। আজকের বাংলায় তো এমন কোনো রাজনৈতিক দল দেখি না যারা এককভাবে অথবা একাধিক দল মিলে একটা সাংস্কৃতিক রূপান্তর ঘটাতে পারবে। ফলে এই নরকযাত্রা থামিয়ে আমরা কীভাবে আবার রবীন্দ্রনাথ, জীবনানন্দের উত্তরাধিকার ফের অর্জন করতে পারব তা আমি সত্যিই জানি না।
ঋত্বিক, সলিলের শতবর্ষে আপনি কি তাহলে বাঙালি সংস্কৃতির জন্যে কোনো আশার আলো দেখতে পাচ্ছেন না?
দেখো, ঋত্বিকের একটা অসমাপ্ত জাতীয় বিপ্লবের ধারণা ছিল। কোমল গান্ধার ছবিতে দেখবে অনসূয়া ভৃগুকে একটা ডায়রি দেয়। ওটা তো আসলে রূপক। তখন পি সি যোশীর আমল। ভাবা হয়েছিল যে অসমাপ্ত জাতীয় বিপ্লব সমাপ্ত করার দায়িত্ব ইতিহাস নিয়তির মত এসে কমিউনিস্ট পার্টিকে দেবে। সেই স্বপ্ন সফল হয়নি। সলিল ভেবেছিলেন তিনি প্রাচ্য আর পাশ্চাত্যের মিলন ঘটিয়ে ভারতীয় সঙ্গীতের যে আধুনিকীকরণ করছিলেন তা ক্রমশ এগিয়ে যাবে। গানকে ক্রমশ সরল হতে হবে, গানকে মানুষের হাতে তুলে দিতে হবে। এই ধারণাটা গুপি গাইন বাঘা বাইন (১৯৬৯) ছবিতেও সেই রাজসভায় গানের দৃশ্যে পাওয়া যায়। কালোয়াতি গান শুনে রাজা ঘুমিয়ে পড়ছিল। তখন গুপি আর বাঘা, দুটো চাষাভুষো মার্কা লোক, এসে এমন গান গাইল যার ‘ভাষা এমন কথা বলে/বোঝে রে সকলে’। বিজন ভট্টাচার্য, হেমাঙ্গ বিশ্বাস, জ্যোতিরিন্দ্র মৈত্র, সলিল চৌধুরী, ঋত্বিক ঘটক, উৎপল দত্ত অথবা মাণিক বন্দ্যোপাধ্যায় – এঁরা সেই উনিশ শতকের তথাকথিত নবজাগরণের দিকপালদের স্তরের ছিলেন কিনা সেই আলোচনায় আমি যাচ্ছি না। কিন্তু এই দ্বিতীয় নবজাগরণের একেবারে হাসিম শেখ, রামা কৈবর্তের কাছে পৌঁছবার চেষ্টা ছিল। ইতিহাসকে তলা থেকে লেখার একটা প্রয়াস ছিল। সে প্রয়াস তো বিফল হয়েছে। এখন আর কীভাবে তা করা যাবে আমি জানি না। কিন্তু সলিল আর ঋত্বিকের শতবর্ষে তাঁদের কাজকে ঐতিহাসিক ও দার্শনিক প্রেক্ষিতে বিচার করলে কিছু সুবিধা হতে পারে। এঁরা কত দক্ষ শিল্পী তা নিয়ে ভেবে খুব একটা উপকার হবে না বলেই আমার মনে হয়।
‘বাংলায় শিল্প নেই, শিক্ষা নেই, চাকরি নেই, আইনশৃঙ্খলা নেই’-এর মত ‘ভাল সিনেমা নেই’ কথাটাও বহু আলোচিত। মানিকবাবুর মেঘ দেখার পর সন্দেহ হতে বাধ্য – সত্যিই কি আমাদের ভাল সিনেমা নেই, নাকি ভাল সিনেমার দর্শক নেই?
‘আমার ইচ্ছে করে শূন্যে উঠে মেঘের ওপর দিয়ে হাঁটি’ – বাংলা ছবির গানে এই লাইন লেখা হয়েছিল ৫০ বছরেরও কম সময় আগে। সেই ছবি দর্শক হল ভরিয়ে দেখেছিল, গৌরীপ্রসন্ন মজুমদার রচিত এই গান এবং তার গায়ক মান্না দে-কে মাথায় করে রেখেছিল। বাংলা সিনেমার সেই জমজমাট আসর মাটি হয়ে গেছে। কোন শশীকান্ত কবে কীভাবে মাটি করল তা নিয়ে ইদানীং কিছু কথাবার্তা হয়, নিঃসন্দেহে আরও হওয়া দরকার। তবে শিল্পসুষমার স্বাদ নেওয়ার অধিকার সব দেশে, সব কালেই দর্শককে অর্জন করতে হয়। সে অধিকার না থাকলে শিল্পের সমস্ত আয়োজন ‘অরসিকেষু রস নিবেদনম্’ হয়ে দাঁড়ায়। ‘বাংলায় শিল্প নেই, শিক্ষা নেই, চাকরি নেই, আইনশৃঙ্খলা নেই’-এর মত ‘ভাল সিনেমা নেই’ কথাটাও বহু আলোচিত। মানিকবাবুর মেঘ দেখার পর সন্দেহ হতে বাধ্য – সত্যিই কি আমাদের ভাল সিনেমা নেই, নাকি ভাল সিনেমার দর্শক নেই? গত এক যুগেই পশ্চিমবঙ্গে অন্তত গোটা আষ্টেক বেশি ছবি হয়েছে যেগুলো রহস্য রোমাঞ্চ, সম্পর্কের টানাপোড়েন বা প্রেম-ঢিসুম ঢিসুম-মধুরেণ সমাপয়েৎ ফর্মুলার বাইরে গিয়ে রসোত্তীর্ণ শিল্প হতে চেষ্টা করেছে। ভূতের ভবিষ্যৎ (২০১২), বল্লভপুরের রূপকথা (২০২২)-র মত দু-একটা ব্যতিক্রম বাদ দিলে সেই প্রয়াসগুলো কিন্তু দর্শকের দাক্ষিণ্য পায়নি। বাকিটা ব্যক্তিগত (২০১৩) বা আসা যাওয়ার মাঝে (২০১৪) তত দর্শক পায়নি, যত দর্শক পেয়েছে যেমন তেমনভাবে নির্মিত ব্যোমকেশের ছবিগুলো। পুনরাবৃত্তিমূলক ফেলুদা বা কাকাবাবুর গল্প নিয়ে নির্মিত ছবিগুলোর অর্ধেক দর্শকও মায়ার জঞ্জাল (২০২০) ঝিল্লি (২০২১), ভটভটি (২০২২), নীহারিকা (২০২৩) ভূতপরী (২০২৪) বা অথৈ (২০২৪) দেখেননি। সম্ভবত সেই কারণেই ২০২১ সাল থেকে পৃথিবীর বিভিন্ন ফিল্মোৎসবে পুরস্কৃত মানিকবাবুর মেঘকে পশ্চিমবঙ্গে সাধারণ দর্শকের জন্য মুক্তি পেতে অপেক্ষা করতে হল ২০২৪ সাল পর্যন্ত। অনির্বাণ ভট্টাচার্যের মত বিখ্যাত শিল্পী এ ছবির নিবেদক না হলে এবং ছবির একখানা গান না গাইলে হয়ত এরপরেও ছবিটা নিয়ে বিশেষ আলোচনা হত না।
মেঘের কথা হচ্ছিল। বাংলা সিনেমার মেঘের উপর দিয়ে হাঁটার ইচ্ছাশক্তি খর্ব হতে হতে কী করে গেটেড কমিউনিটির কোনো একটা টাওয়ারের বিলাসবহুল ফ্ল্যাটের ঘরে নেমে এল – তার ইতিহাস হয়ত কোনোদিন লেখা হবে। এই ছবির পরিচালক অভিনন্দন ব্যানার্জি কিন্তু আমাদের সেই আর্থসামাজিক সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছেন। কথাসর্বস্ব বাংলা ছবির যুগে তিনি এমন এক ছবি বানিয়েছেন যেখানে ক্যামেরার প্রত্যেকটা ফ্রেম কথা বলে, চরিত্রগুলো কথা বলে যতটুকু দরকার ততটুকুই। তেমনই এক মুখর ফ্রেমে পরিচালক ধরেছেন এক রিয়েল এস্টেট কোম্পানির হোর্ডিং। সেই বিজ্ঞাপন সম্ভাব্য ক্রেতাকে লোভ দেখাচ্ছে – আসুন, মেঘেদের সঙ্গে বাস করুন। অথচ তখন ক্রয়ক্ষমতাহীন মানিকবাবু – এ ছবির প্রধান চরিত্র – একখানা ছাদওয়ালা বাড়ি খুঁজছেন তাঁর গাছগুলোর জন্যে। বন্ধুর কাছে মুখঝামটা শুনছেন – নিজের মাথা গোঁজার ঠাঁই হয় না, বৃক্ষরোপণের শখ!
ক্রমশ গরম বেড়ে চলা, বৃষ্টিবিরল কলকাতা শহরের এক নিঃসঙ্গ বাসিন্দার এই সাদাকালো বাস্তবতা পর্দায় তুলে আনা, একইসঙ্গে রোম্যান্টিক থাকার সাহসের জন্য পরিচালককে অভিনন্দন না জানিয়ে উপায় নেই। না, মানিকবাবু মানে এখানে সত্যজিৎ রায় নন। এ ছবি সত্যজিতের জীবনের কোনো সফল বা বিফল মুহূর্ত নিয়ে নয়, তাঁর কোনো কাজের অনুপ্রেরণাও এখানে চোখে পড়ে না। বরং অতি সামান্য চাকরি করার পাশাপাশি ছোটদের আবৃত্তির টিউশনি করা এই মানিকবাবু শেখান সুকুমার রায়ের ‘মেঘ মুলুকে ঝাপসা রাতে,/রামধনুকের আবছায়াতে,/তাল বেতালে খেয়াল সুরে,/তান ধরেছি কণ্ঠ পুরে।/হেথায় নিষেধ নাইরে দাদা,/নাইরে বাঁধন নাইরে বাধা।/হেথায় রঙিন আকাশতলে/স্বপন দোলা হাওয়ায় দোলে,/সুরের নেশায় ঝরনা ছোটে,/আকাশ কুসুম আপনি ফোটে, রঙিয়ে আকাশ, রঙিয়ে মন/চমক জাগে ক্ষণে ক্ষণ!’ দূষিত বাতাসে ঢেকে যাওয়া কংক্রিটের জঙ্গল একবিংশ শতকের কলকাতা শহরে সুকুমারের এই রোম্যান্স যিনি ছুঁতে পারেন তিনি ছাড়া আর কে-ই বা মরা গাছেও রোজ জল দেবে, বাবার মৃত্যুর দিনেও রুটি কিনে আনবে রাস্তার কুকুরের জন্যে, অদেখা প্রেমিকার সঙ্গে ভাগ করে খাবে ডালভাত আর ঢ্যাঁড়শ ভাজা? হ্যাঁ, এটা প্রেমের ছবি। আর সব ব্যাপারে অত্যন্ত সাধারণ মানিকবাবু, দালালকে কোনো লেখাপড়া ছাড়াই টাকা দিয়ে সর্বস্বান্ত হওয়ার মত বোকা মানিকবাবু, একজন দুরারোগ্য রোম্যান্টিক। আজকের কলকাতার পক্ষে বেমানান রোম্যান্টিক, যেমন বেমানান ছিলেন সে যুগের ইউরোপে সেরভান্তেসের ‘রোম্যান্টিক’ নায়ক দন কিহোতে। এ ছবির সমাপ্তি যেভাবে ঘটিয়েছেন অভিনন্দন, তা একেবারেই সুকুমারীয় – যে সুকুমারকে শিশুসাহিত্যের আড়ালখানা ভেদ করে আমরা দেখতে পাই না।
ছবির যে কথা বলতে সংলাপ লাগে না তা যেমন আমরা ক্রমশ ভুলে যাচ্ছি, তেমনি সংলাপ না থাকলেও শব্দ যে কথা বলতে পারে তাও ভুলে যাচ্ছি। কারণ শব্দগুলোকে আলাদা করার মত নৈঃশব্দ্য ক্রমশই বিরল হচ্ছে আমাদের চারপাশে। প্রথমবার ফিল্মে কাজ করা অনুপ সিংয়ের নয়নাভিরাম ক্যামেরার সঙ্গে মুপ্পালা কিরণ কুমার, টেনি আর শুভজিৎ মুখার্জি যে শব্দ-নৈঃশব্দ্য-আবহসঙ্গীতের নকশা বুনেছেন, তা অতি পরিচিত দৃশ্য থেকে চমকে ওঠার মত ছবি উদ্ধার করে এনেছে বারবার। নইলে রাস্তার আলোর মাধ্যমে কথোপকথন সম্ভব হত না। কেবল কণ্ঠস্বর দিয়ে একটা চরিত্র হয়ে উঠতেও পারতেন না মানিকবাবুর বাড়িওয়ালি। একেবারে শয্যাশায়ী বাবাও সন্তানের জীবনে কতখানি গুরুত্বপূর্ণ, তাঁর প্রস্থানে কী বিরাট শূন্যতা তৈরি হয় তাও কেবল শব্দ আর সঙ্গীতের গুণে দেখিয়ে দেওয়া গেছে কোনো সংলাপ ছাড়াই। বোঝা গেল না? স্বাভাবিক। কারণ এই ছবি অনির্বচনীয় দৃশ্যে ভরপুর, অনির্বচনীয় কল্পনায় ঋদ্ধ। না দেখলে বোঝা যাবে না, বেশি বোঝানোর চেষ্টা করাও বাচালতা।
এই বাচালতা জিনিসটা এ ছবির একেবারেই নেই। একা মানুষের শোক বা তার অবদমিত কাম – কোনোটা বোঝাতেই অভিনন্দনকে বচন ব্যবহার করতে হয় না। জীবনানন্দ দাশের ভাষায় ‘বাজারের পোকাকাটা জিনিসের কেনাকাটা’ করা মানুষ মানিকবাবুর চরিত্রে চন্দন সেন এই অনির্বচনীয়তা সারা শরীরে ধারণ করায় দারুণ সফল। ছবির প্রথমার্ধের বিমর্ষ চন্দন আর দ্বিতীয়ার্ধের খুশিয়াল চন্দন কীভাবে একই ব্যক্তি থেকেও দুজন আলাদা মানুষ হয়ে যান – দেখে আশ্চর্য হয়ে যেতে হয়। মুখে যে প্রেমিক হাসি তিনি ফুটিয়েছেন, তা কেবল মনোমুগ্ধকর নয়, রোমাঞ্চকরও। যোগ্য সঙ্গত করেছেন দেবেশ রায়চৌধুরী, নিমাই ঘোষ, অরুণ গুহঠাকুরতা এবং ব্রাত্য বসু।
চন্দন যে মসৃণভাবে সিনেমার পর্দার মাঝবয়সী রোম্যান্টিক নায়ক হয়ে উঠতে পারেন, তা কি দশকের পর দশক তাঁর অভিনয়ের গুণগ্রাহী দর্শকরাও কেউ কল্পনা করেছিলেন? অভিনন্দন কিন্তু করেছেন। কল্পনাশক্তিতে, এবং সেই কারণে চিত্রনাট্যে, তিনি একশোয় একশো। অভিনন্দন কলকাতার রাজপথ, গলিপথ, ফুটপাথ, দেওয়ালগুলোকে তো বটেই; ধাপার মাঠ আর ময়দানকেও এ ছবির চরিত্র করে তুলেছেন চিত্রনাট্যের গুণে। তবে সেখানেই তাঁর নৈপুণ্য শেষ নয়। আজকের বাংলা ছবির দর্শক হিসাবে দুরুদুরু বুকে না বলে উপায় নেই যে এই পরিচালকের হাতে একখানা জাদুদণ্ড আছে বলে মনে হয়। তার ছোঁয়ায় সেকেলে বাক্স টিভির ফ্রেমের ভিতর টবে ফুল ধরে; চিত্রনাট্যের তালে তাল দেয় দেয়ালের টিকটিকি, মাকড়সা; আঁকা ছবি হয়েও রোম্যান্সে পর্দা মুড়ে দেন উত্তমকুমার আর সুচিত্রা সেন। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্য নিয়ে তাঁদের জ্যান্ত করে তুলতে হয় না। এমন জাদু বাংলা ছবিতে আমাদের বয়সের দর্শকরা অন্তত দেখেনি। প্রবীণরা বলতে পারবেন আদৌ কোনোদিন দেখা গেছে কিনা। তবে একটাই অনুযোগ – এত যত্নে নির্মিত ছবির শেষে নাম দেখানোর সময়ে দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের ‘দ্বীজেন্দ্রলাল’ হয়ে যাওয়া অনভিপ্রেত।
দুরুদুরু বুকে কেন বললাম? প্রথমত, প্রথম ছবিটাই এমন বানান যে তরুণ পরিচালক তাঁর ভবিষ্যৎ নিয়ে যুগপৎ আশা আর আশঙ্কা হয়। আমাদের মা-মাসিরা এসব ক্ষেত্রে পরিচালকের কড়ে আঙুল দাঁতে কেটে মাথায় তিনবার থুতু দিতেন। দ্বিতীয়ত, দর্শক যদি এই ছবিকে মা-মাসিদের মত করে আশীর্বাদ না করেন তাহলে অভিনন্দনকেও হয়ত পরের ছবিটা ফর্মুলায় ফেলেই বানাতে হবে। অন্য কোনো পরিচালকও হয়ত এমন কিছু করার সাহস করবেন না, কারণ এই ছবির প্রযোজক হয়ে যে ঝুঁকি বৌদ্ধায়ন মুখার্জি আর মোনালিসা মুখার্জি নিয়েছেন, সে ঝুঁকি আর কোনো প্রযোজক নেবেন না। বাংলা ছবির কোনো ভবিষ্যৎ থাকবে না, আমরা কেবল সত্যজিৎ-ঋত্বিক-মৃণালের জাবর কেটে যাব।
অনেকে বলছেন, মানিকবাবুর মেঘ আন্তর্জাতিক মানের ছবি। সেসব বোদ্ধারা জানেন। কিন্তু নিঃসন্দেহে বলা যায়, বাংলা ছবির সাধারণ দর্শকের জন্য এ ছবি এক অনন্য অভিজ্ঞতা। এই উচ্চতার রোম্যান্টিক ছবি আমরা বহুকাল দেখিনি। বারবার রোম্যান্টিক ছবি বলছি, প্রেমের ছবি বলছি। তাহলে ছবির নায়িকাকে নিয়ে কিছু বলছি না কেন? তাঁর কথা উহ্যই থাক, কারণ তিনি অনির্বচনীয়। নিজে চোখে দেখে আসুন।
বাঙালির সংস্কৃতির পিণ্ডি যে বাঙালিই সবচেয়ে বেশি চটকাচ্ছে সেটা খেয়াল করুন, তার প্রতিকারের ব্যবস্থা করুন। নইলে অন্যদের আক্রমণ আটকাবেন কী করে? ভেবে দেখুন তো, পাড়ায় পাড়ায় মে-জুন মাসে রবীন্দ্র-নজরুল সন্ধ্যা (কোথাও কোথাও জুড়ে যেতেন সুকান্তও) বন্ধ হয়ে গেছে কতদিন হল?
ছবি পিনটারেস্ট থেকে
ক্যালেন্ডার বলছে ফেব্রুয়ারি মাস আসতে এখনো ঢের দেরি, বৈশাখ মাস তো আরও দূরে। এবার বাঙালি ভাবাবেগ (আজকাল বাঙালিরা হিন্দিভাষী নেতাদের বক্তৃতা শুনে শুনে যেটাকে ‘অস্মিতা’ বলে আর কি) মরসুম অনেক আগেই শুরু হয়ে গেছে। কোনো সন্দেহ নেই যে প্রায় এক দশক ধরে সঙ্ঘ পরিবারের হিন্দি-হিন্দু-হিন্দুস্তান প্রকল্পের প্রকাশ্য ও গোপন আক্রমণ বাঙালি জাতির উপর চলছে। ফলে সাংস্কৃতিকভাবে আক্রান্ত জাতির মধ্যে যেসব প্রতিক্রিয়া দেখা যায়, পশ্চিমবঙ্গের বাঙালির মধ্যেও সেসব দেখা যাচ্ছে। কিন্তু হিন্দি আগ্রাসনের বিরুদ্ধে লড়াই করার উৎসাহ হাতে গোনা কয়েকজন ছাড়া বিশেষ কারোর মধ্যে দেখা যায় না। না, একটু ভুল হল। সোশাল মিডিয়া খুললে মনে হয় সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালিই লড়ার জন্যে কোমর বেঁধে তৈরি। কিন্তু লড়তে গেলে ঠিক কী যে করতে হবে তার কোনো নীল নকশা কারোর কাছে নেই। যারা কিঞ্চিৎ সংগঠিত তারা ঠিক করেছে হিন্দিভাষী মানুষকে ধমকানো চমকানোই একমাত্র রাস্তা। তার বাইরে যে কয়েকজনের মাথায় দু-একটা পরিকল্পনা আছে, তাদের সঙ্গ দিতে গেলে নিজের জীবনচর্যায় বেশকিছু পরিবর্তন আনতে হবে, বেশকিছু ছোট-বড় সিদ্ধান্ত নিতে হবে। অধিকাংশ বাঙালি সেসব করতে তৈরি নয়। না করার একগুচ্ছ অজুহাতও পকেটে বা হাতব্যাগে সবসময় থাকে। বলামাত্রই বার করে ফেলে। এদিকে সোজাসুজি “পারব না বাপু বাঙালিয়ানা করতে। অনেক কাজ আছে” বলে হাত ঝেড়ে ফেলার ক্ষমতাও নেই। কারণ কতকগুলো বিগ্রহ বাড়িতে এবং/অথবা জীবনে প্রতিষ্ঠা করে গেছেন গুরুজনেরা। যেমন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, রামমোহন রায়, কাজী নজরুল ইসলাম, সত্যজিৎ রায়, মৃণাল সেন, ঋত্বিক ঘটক ইত্যাদি। বিগ্রহগুলোর নিয়মিত পুজো করতে হয়, নইলে মনে পাপবোধ তৈরি হয়। কিন্তু বিগ্রহের তো চর্চা বলে কিছু হয় না। ফলে যে সংস্কৃতি বিগ্রহনির্ভর তার চর্চা বলে কিছু থাকা সম্ভব নয়, আর যে সংস্কৃতির চর্চা নেই তাকে শেষ করতে বেশি শক্তির প্রয়োজন হয় না। তাই হিন্দি সাম্রাজ্যবাদও প্রায় ফাঁকা মাঠে জিতে যাচ্ছে। বাঙালি কী করছে? অবাঙালিদের বিরুদ্ধে বিষোদ্গার করছে। যদি বাঙালি সংস্কৃতি মানে রবীন্দ্র-নজরুল সংস্কৃতি হয়, তাহলে এই প্রবণতা সেই সংস্কৃতির ঠিক উলটো পিঠ।
হ্যাঁ, আল্লারাখা রহমান সুরারোপিত ‘কারার ওই লৌহকপাট’ গানের সূত্রেই এত কথা বলছি। প্রথম চোটে গোটা ১৫ সেকেন্ড শুনে বন্ধ করে দিয়েছিলাম ভাল লাগছিল না বলে। কিন্তু ওই গান এবং তা নিয়ে বাঙালির প্রতিক্রিয়া সংবাদ হয়ে উঠেছে আর কোনো ওয়েবসাইট যা সংবাদ তাকে এড়িয়ে যেতে পারে না। ফলে লিখতে হবে, তাই শুনতে হল। অন্য অনেকের মত আমার কানেও মোটেই সুবিধের লাগল না। রহমান মহান শিল্পী, কিন্তু তাঁর সুরারোপিত কিছু হিন্দি গান আছে যেগুলো শুনলে মনে হয় তিনি কথাগুলোকে ঠিক সামলে উঠতে পারেননি, তাই কিছু অর্থহীন ধ্বনি ঢুকিয়ে দিয়ে ছেঁড়া মশারিতে তালি মেরেছেন (স্বদেশ ছবির ‘ইয়ে যো দেস হ্যায় তেরা’, লগান ছবির ‘কোঈ হম সে জিত ন পাওয়ে’ স্মর্তব্য)। এই গান শুনেও তেমনটাই মনে হল। আরও বড় গোলমাল হল, কথা যাচ্ছে লন্ডন আর সুর যাচ্ছে টোকিও। নজরুলের গানের কথায় বিদ্রোহে উৎসাহ দেওয়া হয়েছে। ফলে প্রবল উদ্যম এবং গনগনে রাগ আছে।
কিন্তু রহমানের সুর শুনলে মনে হচ্ছে এ গান ‘ধিতাং ধিতাং বোলে’ জাতীয় আনন্দের গান। সবাই মিলে বেশ নেচেকুঁদে নেওয়া যায় এই গান শুনতে শুনতে। যাঁরা গেয়েছেন তাঁদের হাসি হাসি মুখগুলোও যেন চোখের সামনে ভেসে উঠল। ফলে জ্ঞানত এই সুরারোপকে ব্যর্থ বলা ছাড়া উপায় নেই। সুরকার এবং তাঁর গায়েনরা গানের কথাগুলো বুঝে উঠতে পারেননি বলে সন্দেহ হয়।
গান ভাল না লাগলে নিন্দা করার অধিকার মানুষের জন্মগত, ভাল লাগলে প্রশংসা করার অধিকারের মতই। সুতরাং যখন কোনো শিল্পী নিজের কাজ জনসমক্ষে নিয়ে আসেন তখন তাঁকে বিরূপ প্রতিক্রিয়ার জন্যে তৈরি থাকতে হয়। নইলে অবস্থা হয় বিবেক অগ্নিহোত্রীর মত। ছবি ফ্লপ হলে বলতে হয়, গীতার চেয়ে তো প্লেবয় বেশি বিক্রি হয়। তা বলে কি গীতাকে ফ্লপ বলব? কিন্তু অমুক গান আমার ভাল লাগেনি বলা এক জিনিস, আর অমুক গান তৈরি করাই অনুচিত হয়েছে, নজরুলকে অপমান করা হয়েছে, বাঙালি জাতিকে অপমান করা হয়েছে, অবাঙালি বলেই এমন করতে পারল, বাঙালিরা কিছু বলে না বলে… ইত্যাদি চেঁচামেচি করা আরেক জিনিস। এই কোলাহল কিছুদূর পর্যন্ত স্রেফ হাস্যকর, তারপর ক্ষতিকর। ইতিমধ্যেই এত বেশি ধুলো ওড়ানো হয়েছে যে পিপ্পা ছবির নির্মাতারা বিবৃতি দিয়ে দুঃখপ্রকাশ করেছেন। সেই বিবৃতিতে অবশ্য একটি মোক্ষম কথা বলা হয়েছে “আমাদের উদ্দেশ্য ছিল আমাদের চুক্তির শর্তাবলী অনুযায়ী গানটির সাংস্কৃতিক তাৎপর্যকে শ্রদ্ধা জানানো, যে চুক্তি আমাদের গানের কথাগুলিকে নতুন নির্মাণে ব্যবহার করার অধিকার দিয়েছিল” (Our intent was to pay homage to the cultural significance of the song while adhering to the terms set forth in our agreement, which permitted us to use the lyrics with a new composition)।
বিবৃতিতে প্রকাশ, চুক্তি স্বাক্ষর করেছিলেন নজরুলের পুত্রবধূ প্রয়াত কল্যাণী কাজী এবং পৌত্র অনির্বাণ কাজী। এখন বাঙালির আবেগের বিস্ফোরণ দেখে অনির্বাণ এবং তাঁর ভাইবোনেরা আমতা আমতা করছেন। জল্পনা চলছে ‘পরিবারেরই ভুলে কি বিকৃতি নজরুল-গীতে?’ কবির পরিবারের সদস্যরা আপ্রাণ চেষ্টা করছেন এই দায় ঝেড়ে ফেলতে। গোটা দুনিয়ার বাঙালির চোখে তাঁরা এখন অভিযুক্ত। অপরাধ কী? না নজরুলের রচিত একটি গানকে অন্য সুরে গাওয়ার অনুমতি দিয়ে ফেলেছেন। এখন নজরুলের নাতনি খিলখিল কাজীকেও বলতে হচ্ছে “যা হয়েছে তা শুধু নজরুল ইসলামকে নয়, বাংলা সংস্কৃতি, বাঙালি জাতিকে অপমান!”
কী হয়েছে? না নজরুলের একটি একদা জনপ্রিয় গানকে অন্যরকম সুরে গাওয়া হয়েছে এবং সে সুর বাঙালির পছন্দ হয়নি। এতদ্বারা বাঙালি দুনিয়াসুদ্ধ লোককে জানিয়ে দিল, নজরুলের গান বেদ, কোরান, বাইবেল বা আবেস্তার মত একটি অপরিবর্তনীয় বস্তু। এদিক ওদিক করলে মহাপাতক হয়। এ স্রেফ শিল্প নয়, যে তুমি পুনর্নির্মাণ করবে। চুক্তি-টুক্তিতে চিঁড়ে ভিজবে না। কপিরাইট আইনকে মারো গুলি। আমাদের বিগ্রহের লেখা গান আমাদের সবার সম্পত্তি। দেশের আইন যা-ই বলুক। আবেগের কাছে আইন, শিল্পের ইতিহাস – এসবের আবার কোনো দাম আছে নাকি? ঠিক যেমন ইতিহাসে রামের অস্তিত্ব থাক আর না-ই থাক, আমাদের আবেগ যখন বলছে ওখানে রাম জন্মেছিলেন, তখন মন্দির ওয়হি বনায়েঙ্গে।
নজরুলের প্রতি অন্যায় করা হল বলে যারা চোখের জল ধরে রাখতে পারছে না, তারা খেয়ালও করছে না, একজন শিল্পীর প্রতি সবচেয়ে বড় অন্যায় হল তাঁর কপিরাইটকে সম্মান না করা। স্লোগান সকলের সম্পত্তি, গান অবশ্যই শিল্পীর একার। কারণ তিনি একাই তা সৃষ্টি করেন। ‘কারার ওই লৌহকপাট’-এর মত মহান সৃষ্টির পিছনে যে পরিশ্রম এবং যন্ত্রণা থাকে তার তুলনা একমাত্র প্রসববেদনা। ও জিনিসের ভাগ হয় না। শিশুকে যে যতই আদর করুক, সে একমাত্র তার মায়ের সন্তান। মায়ের মৃত্যুর পরেও। একজন শিল্পী অন্য এক শিল্পীর কাজকে স্বীকৃতি দিয়ে তা নিয়ে নতুন পরীক্ষা নিরীক্ষা চালাতেই পারেন। সফল হলে প্রশংসা করা আর বিফল হলে নিন্দা করার বেশি অধিকার শ্রোতা, দর্শক বা পাঠকের নেই। যা করা হয়েছে তা শিল্প হিসাবে ভাল-খারাপ ছাড়িয়ে ক্ষতিকর মনে হলে অন্যকে সে কথা বলতে পারেন, পয়সা দিয়ে ও জিনিসের পৃষ্ঠপোষকতা করা থেকে নিরস্ত করার চেষ্টা করতে পারেন। ব্যাস।
এরপরেও একটা কথা আছে। সারা পৃথিবীতে প্রতিবাদী শিল্পের যে ধারা (protest art), তাতে অনেক সময় কোনো গানের রচয়িতা খুঁজে পাওয়াই দুষ্কর হয়ে পড়ে, অর্থাৎ আক্ষরিক অর্থেই সেই গানটা সকলের হয়ে যায়। সে গানের অসংখ্য সংস্করণ তৈরি হয়ে যায়। নজরুলের গানের যে পবিত্রতা নষ্ট হয়েছে বলে হাত-পা ছোড়া হচ্ছে, সেই পবিত্রতা তখন চুলোয় যায়। সেখানেই গানটার সাফল্য। এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ ‘উই শ্যাল ওভারকাম’ আর ‘বেলা চাও’। পৃথিবীর বিভিন্ন ভাষায় এই গানদুটোর নানা রূপ। সাধারণত দেখা যায় সুর এক আছে, কথা পালটে গেছে। কেবল বাংলা ভাষাতেই ‘উই শ্যাল ওভারকাম’ গানের অন্তত দুটো রূপ (‘আমরা করব জয়’, ‘একদিন সূর্যের ভোর’) পাওয়া যায়। এ যদি অন্যায় না হয়, তাহলে সুর বদল হলে মহাভারত অশুদ্ধ হবে কেন? নাকি রাগের কারণ আসলে একটা আশঙ্কা, যে নজরুলের উপর আমাদের মৌরসি পাট্টা নষ্ট হয়ে যাবে। তিনি আর কেবল বাঙালির থাকবেন না?
তার মানে! যে যেমন ইচ্ছা আমাদের সংস্কৃতির পিণ্ডি চটকাবে আর বাঙালি চুপচাপ বসে দেখবে?
তা কেন? বাঙালির সংস্কৃতির পিণ্ডি যে বাঙালিই সবচেয়ে বেশি চটকাচ্ছে সেটা খেয়াল করুন, তার প্রতিকারের ব্যবস্থা করুন। নইলে অন্যদের আক্রমণ আটকাবেন কী করে? ভেবে দেখুন তো, পাড়ায় পাড়ায় মে-জুন মাসে রবীন্দ্র-নজরুল সন্ধ্যা (কোথাও কোথাও জুড়ে যেতেন সুকান্তও) বন্ধ হয়ে গেছে কতদিন হল? ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা নজরুলের ‘ঝিঙে ফুল’ কবিতাটা জানে? বাবুদের তালপুকুরে হাবুদের ডালকুকুরে কী কেলেঙ্কারি ঘটিয়েছিল সে খবর আজকালকার কনভেন্ট শিক্ষিত, সেকেন্ড ল্যাঙ্গুয়েজ হিসাবে হিন্দি পড়া ছেলেমেয়েদের জানানোর জন্যে কী উদ্যোগ নিচ্ছে নজরুলপ্রেমী বাঙালি সমাজ? গোঁফের রেখা ওঠা ছেলেরা আর মেয়ে থেকে মহিলা হয়ে ওঠার পথে পা বাড়ানো মেয়েরা এখনো ‘বিদ্রোহী’ বা ‘আমার কৈফিয়ৎ’ পড়ছে? মেগা সিরিয়াল থেকে শুরু করে রাস্তার সিগনাল – সর্বত্র রবীন্দ্রসঙ্গীত তো বাজছে, নজরুলগীতি গাওয়া হয় কটা জায়গায়?
মেগা সিরিয়াল বলতে খেয়াল হল – কেবল আবহসঙ্গীতে নয়, মেগায় যে পরিস্থিতির সঙ্গে লাগসই আস্ত হিন্দি ছবির গান বাজানো হয় তাতে হিন্দি আগ্রাসন দেখতে পান না? কোনো প্রতিবাদ হয়? মহিলা পুরুত দিয়ে করানো প্রগতিশীল বাঙালির বিয়েতে বর-কনের শেরওয়ানি আর ঘাগরা কি বাঙালি সংস্কৃতির পিণ্ডি চটকায় না? কোন এ আর রহমান এসে বাঙালি মেয়েদের মাথায় বন্দুকে ঠেকিয়ে বিয়ের আগে মেহেন্দি অনুষ্ঠান বাধ্যতামূলক করে তুলেছেন? ধনতেরাস উপলক্ষে ঝাঁটা না কিনলে মানসম্মান থাকছে না বাঙালি সংস্কৃতির কোন ধারা অনুযায়ী?
এসব প্রশ্নের উত্তর না খুঁজে সোশাল মিডিয়ায় রে রে করে কোনো শিল্পীর দিকে তেড়ে যাওয়া অনেক সহজ। তাতে অ্যাড্রিনালিন ক্ষরণ, নিজের সংস্কৃতি বাঁচাতে লড়াই করার আনন্দ পাওয়া যায়। রবীন্দ্রনাথ বা নজরুলের ক্ষেত্রে আবার উপরি পাওনা বিগ্রহের মান বাঁচাতে লড়াই করার আনন্দ। ধর্মান্ধরা কোনোদিনই বোঝে না যে তাদের দেবতা তাদের চেয়ে অনেক বড়। তিনি নিজেকে নিজেই বাঁচাতে পারেন, চুনোপুঁটি ভক্তদের মুখাপেক্ষী নন। সাংস্কৃতিক বিগ্রহের পূজারী বাঙালিও বোঝে না, রবীন্দ্রনাথ বা নজরুল এত সামান্য শিল্পী নন যে তাঁদের বাঁচাতে হবে। ১৯৯১ সালে যখন আইন মোতাবেক রবীন্দ্রনাথের কপিরাইট উঠে যাওয়ার কথা ছিল, তখন কেবল বিশ্বভারতী নয়, প্রায় সমস্ত শিক্ষিত (ডিগ্রিধারী অর্থে) বাঙালি গেল গেল রব তুলেছিল। কপিরাইট উঠে গেলেই নাকি সর্বনাশ হয়ে যাবে। রবীন্দ্রনাথের গানের সাড়ে বারোটা বাজিয়ে দেবে লোকে, লেখাগুলোর কী যেন একটা ভয়ঙ্কর ক্ষতি হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা ছিল। সেবার এত দাপাদাপি শুরু হল যে ভারতের সংসদ দেশের আইন পরিবর্তন করে ফেলল। কপিরাইটের মেয়াদ ছিল স্রষ্টার মৃত্যুর ৫০ বছর পর পর্যন্ত। তা বাড়িয়ে করা হল ৬০ বছর পর পর্যন্ত। শেষমেশ ২০০১ সালে রবীন্দ্রনাথের লেখাপত্র কপিরাইটের আওতার বাইরে এসেছে। গত ২২ বছরে বিশ্বভারতী ছাড়া রবীন্দ্রনাথের আর কোন সৃষ্টি তিনি যেমন ছেড়ে গিয়েছিলেন তার চেয়ে নিকৃষ্ট মানের হয়ে গেছে? একথা ঠিক, আজকাল একেকজন এত বাজনা সহযোগে রবীন্দ্রসঙ্গীত গেয়ে থাকেন যে গান ছাড়া আর সবকিছু শোনা যায়। কেউ আবার কালোয়াতি করে বোঝাতে চান শাস্ত্রীয় সঙ্গীতে তিনি একজন ওস্তাদ। কেউ বা বাহাদুরি করে মাঝখান থেকে গান শুরু করেন। কিন্তু তাতে কী? যার যেমন রুচি সে তেমনই শোনে। যার যেটা ভাল লাগে না, সে সেটা শোনে না। এসবে গীতিকার রবীন্দ্রনাথের কী ক্ষতি হয়েছে?
প্রগতিশীল বাঙালিরা নিজস্ব দেবতাকুল বানিয়ে নিয়েছেন, তাতে নতুন নতুন বিগ্রহও যোগ করে যাচ্ছেন। গত বিশ বছরে যোগ হওয়া এক বিগ্রহের নাম ঋতুপর্ণ ঘোষ। তিনি কিন্তু রবীন্দ্রনাথের জন্মশতবর্ষ উপলক্ষে একটা পরীক্ষামূলক কাজ শুরু করেছিলেন টিভির জন্যে (প্রযোজকদের সঙ্গে গোলমালে নাকি সে কাজে শেষ পর্যন্ত থাকেননি)। শাশুড়ি-বউমার কোন্দল আর এক পুরুষের দুই নারী ছকের বাইরে সে ছিল এক ব্যতিক্রমী মেগা সিরিয়াল – গানের ওপারে। রবীন্দ্রনাথকে যারা বিগ্রহ বানিয়ে রাখে তাদের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের আধুনিকীকরণের দ্বন্দ্ব ছিল সেই সিরিয়ালের মূল উপজীব্য। সেখানে বেশকিছু রবীন্দ্রসঙ্গীত এমনভাবে গাওয়া হয়েছিল যা অভ্যস্ত কানে মোটেই সইবে না।
তাতে রবীন্দ্রসঙ্গীত হয়ত সমৃদ্ধ হয়নি, কিন্তু দরিদ্রতর হয়ে গিয়েছিল এমন প্রমাণ পাওয়া যায়নি। ঋতুপর্ণকেও আজ আর সে কাজের জন্যে কেউ রহমানের মত আক্রমণ করে না। তখন যারা করেছিল তারাও ক্ষমা করে দিয়েছে। সে কি তিনি বাঙালি বলে, নাকি তিনি নিজেই বিগ্রহে পরিণত হয়েছেন বলে?
মজা হল, বাঙালির এই শতকের বিগ্রহরা কেউ বাংলার সঙ্গে হিন্দি, ইংরিজির মিশেল ছাড়া চলতে পারেন না। সৌরভ গাঙ্গুলির মুখের ভাষা শুনলেই টের পাওয়া যায়। বাংলা ভাষার সাংবাদিকতায় বিগ্রহ হতে চলা গৌতম ভট্টাচার্যের একটি বই প্রকাশিত হয়েছে সম্প্রতি। তার নাম আবার বিশ্বকাপ তুঝে সেলাম। এসবে তাঁদের কারোর জনপ্রিয়তায় ভাঁটা পড়ছে না, কেউ বাংলার সংস্কৃতির সর্বনাশ হয়ে যাচ্ছে বলেও অভিযোগ করছে না। যত দোষ এ আর রহমানের। যেহেতু তিনি বাঙালি নন, যেহেতু আক্রমণকারী বনাম আক্রান্তের বয়ান খাড়া করার পক্ষে ব্যাপারটা সুবিধাজনক।
ব্যর্থ শিল্পপ্রচেষ্টাকে ব্যর্থ বলে বুঝে নিয়ে অন্য জিনিসে মন দেওয়ার নির্লিপ্তি না থাকলে, শিল্পে পরীক্ষা নিরীক্ষা সম্পর্কে অনমনীয় হলে যা হয়, পশ্চিমবঙ্গে ঠিক তাই হচ্ছে। গড়ে উঠেছে পুনরাবৃত্তির সংস্কৃতি। সাহিত্য ভূতে, গোঁজামিল ইতিহাসে আর রহস্য রোমাঞ্চে ছয়লাপ। কারণ ‘ওটা পাবলিক খায়’। সিনেমার বড় অংশ জনপ্রিয় গোয়েন্দা গল্পের চলচ্চিত্রায়ন। তাও আবার একই গল্পকে একবার, দুবার, তিনবার পর্দায় আনা হচ্ছে। আরেকটা অংশ? এই শতকের প্রথম দিকে চলছিল দক্ষিণ ভারতীয় ছবির পুনরাবৃত্তি, তারপর থেকে চলছে পুরনো জনপ্রিয় বাংলা ছবির পুনরাবৃত্তি। পুনর্নির্মাণ বলা যাবে না। কারণ এসব ছবি মূল বয়ানে নতুন কিছু যোগ করে না, কোনো নতুন ব্যাখ্যা দেয় না।
এরই পিছু পিছু এসে পড়েছে জেরক্স সংস্কৃতি।
‘অপরাজিত ছবিটা দারুণ হয়েছে।’
কেন? না সত্যজিৎ রায়ের চরিত্রে যে অভিনয় করেছে তাকে দেখতে অবিকল সত্যজিতের মত। পথের পাঁচালীর দৃশ্যগুলো একেবারে পথের পাঁচালীর মত। এদিকে পরিচালক অনীক দত্ত সাহস করে চরিত্রের নামটাই সত্যজিৎ রাখতে পারেননি, সে চরিত্রের তৈরি পুরস্কৃত ছবির নামও করে দিয়েছেন পথের পদাবলী।
‘মৃণাল সেনের বায়োপিকটা দারুণ হবে।’
কেন? না টিজারে দেখা গেছে মৃণালের চরিত্রাভিনেতাকে অবিকল তাঁর মত দেখাচ্ছে।
নির্দেশকরা কেনই বা এই ছকের বাইরে যেতে যাবেন? ছক ভাঙতে গিয়ে রহমানাতঙ্কের মত কিছুর কবলে পড়ার ঝুঁকি কে নেবে বাপু?
বাঙালি সংস্কৃতিকে এই বিষচক্র থেকে এবং হিন্দি, ইংরেজি ইত্যাদি আগ্রাসন থেকে বাঁচাতে পারে একমাত্র বাঙালি। কিন্তু তা করতে হলে রহমানাতঙ্ক কাটিয়ে উঠে বাঙালি সংস্কৃতি জিনিসটা ঠিক কী সে প্রশ্ন তুলতে হবে। পশ্চিমবঙ্গ বিজেপির একদা সভাপতি তথাগত রায়, সোশাল মিডিয়ায় হিন্দি আগ্রাসনবিরোধী বাঙালির বাপ বাপান্ত করাই ইদানীং যাঁর জীবনের ব্রত, প্রায়ই মন্তব্য করেন যে বাঙালির সর্বনাশ করেছে ‘রসুন’ সংস্কৃতি। অর্থাৎ রবীন্দ্র-সুকান্ত-নজরুল। তৃতীয়জনকে নিয়ে তথাগতবাবুর আপত্তির কারণ অতি সহজবোধ্য আর বাঙালি সংস্কৃতির ধারক ও বাহক হিসাবে সুকান্ত ভট্টাচার্যের স্থান আদৌ রবীন্দ্রনাথ, নজরুলের পাশে নয়। তাই ও নিয়ে আলোচনা করা সময় নষ্ট। কিন্তু বাকি দুজন যে বাঙালি সংস্কৃতির অনেকখানি তা নিয়ে বিতর্কের অবকাশ নেই। আরএসএসের দীক্ষায় দীক্ষিত তথাগতবাবুর ওই দুজনকে প্রবল অপছন্দ প্রমাণ করে তাঁরা স্রেফ শৈল্পিক উৎকর্ষে নয়, সামাজিক-রাজনৈতিক ভাবনায় এবং কার্যকলাপেও যথার্থ মানবতাবাদী, অতএব প্রয়োজনীয়। কথা হল, ওঁদের নিয়ে আমাদের যে উথাল পাথাল আবেগ প্রকাশ পায় ক্ষণে ক্ষণে, তা কি খাঁটি? যদি খাঁটি হয়, তাহলে সন্তোষ মিত্র স্কোয়্যারে লাইন দিয়ে অযোধ্যার রামমন্দিরের আদলে তৈরি প্যান্ডেল দেখতে গিয়েছিল কারা? যারা নজরুলের অপমান নিয়ে বেজায় উত্তেজিত তাদেরই ভাই বেরাদররা তো। রহমানের বিরুদ্ধে বিবৃতি, ফেসবুক পোস্ট, আইনি ব্যবস্থার হুমকি কত কী দেওয়া হচ্ছে এখন। বিখ্যাতরাও দিচ্ছেন। তখন এত প্রতিবাদ ছিল কোথায়? নাকি রবীন্দ্রনাথ আর নজরুলের গান, কবিতাই কেবল বাঙালি সংস্কৃতির অঙ্গ; তাঁদের সামাজিক, রাজনৈতিক ভাবনা নয়, জীবনচর্যাও নয়?