গণতন্ত্রের কঙ্কাল দেখিয়ে দিলেন জিতু মুন্ডা

যে ‘গণতন্ত্রের উৎসব’ সম্পর্কে আমাদের প্রত্যাশা নামতে এইখানে এসে ঠেকেছে— এ থেকেই প্রমাণ হয় যে ভারতীয় গণতন্ত্রের চামড়া, মাংস, মজ্জা সব খুবলে খাওয়া হয়ে গেছে। পড়ে আছে কঙ্কাল।

নির্বাচনের ভরা মরশুমে একথা বললে নিশ্চয়ই মহাপাপ হবে যে গণতন্ত্র মানে কেবল ভোট দেওয়া, ভোট নেওয়া আর সরকার গঠন নয়। কিন্তু আমরা অনেকেই অনেক পাপ জানতে বা অজান্তে রোজ করে চলেছি। সুতরাং এ পাপও করেই ফেলা যাক। পশ্চিমবঙ্গে এবারে যেভাবে ভোট হচ্ছে, তার সঙ্গে নাজি জার্মানির নির্বাচনের মিল খুঁজতে খুব বেশি কষ্ট করতে হবে না, অমিল বোধহয় একটাই— এখনো কোনো বুথে ভোটারের পাশে দাঁড়িয়ে সশস্ত্র বাহিনীর লোককে কাকে ভোট দেওয়া হচ্ছে নজর রেখেছে বলে খবর নেই। আশা করা যাক, দ্বিতীয় দফার শেষেও অন্তত এইটুকু সান্ত্বনা থাকবে যে তেমনটা হয়নি। এই যে ‘গণতন্ত্রের উৎসব’ সম্পর্কে আমাদের প্রত্যাশা নামতে এইখানে এসে ঠেকেছে— এ থেকেই প্রমাণ হয় যে ভারতীয় গণতন্ত্রের চামড়া, মাংস, মজ্জা সব খুবলে খাওয়া হয়ে গেছে। পড়ে আছে কঙ্কাল।

ব্যাপারটা একেবারে সাদা চোখে দেখতে পাওয়ার ব্যবস্থা করে দেওয়ার জন্যে ধন্যবাদ প্রাপ্য আমাদের প্রতিবেশী রাজ্য ওড়িশার কেওনঝার জেলার বাসিন্দা জিতু মুন্ডার। ‘আমরা পৃথিবীর বৃহত্তম গণতন্ত্র, আমরা পৃথিবীর চতুর্থ বৃহত্তম অর্থনীতি’ বলে গোরিলা গোষ্ঠীর দলনেতার মত বুক বাজানো আমাদের অভ্যাসে দাঁড়িয়ে গেছে। কিন্তু জিতুকে মাত্র হাজার বিশেক টাকা ব্যাংক থেকে তোলার জন্যে যা করতে হয়েছে, তাতে প্রমাণ হয় যে পৃথিবীর যে কোনো গোরিলা সমাজ আজকের ভারতের চেয়ে সভ্য। গোরিলা সমাজে প্রয়াত বোনের কষ্টার্জিত ফলমূল অধিকার করতে বোনের কঙ্কাল মাটি খুঁড়ে তুলে এনে অপেক্ষাকৃত বেশি ক্ষমতাশালী গোরিলার সামনে যে রাখতে হত না— একথা ডায়ান ফসির মত কোনো বিশেষজ্ঞকে জিজ্ঞেস না করেই হলফ করে বলা যায়। জিতুর বোন গবাদি পশু বিক্রি করে ওই কটা টাকা পেয়েছিলেন, তারপর তাঁর মৃত্যু হয়। হতদরিদ্র জিতুকে বারবার ব্যাংকে গিয়ে শুনতে হয়েছে— মৃত্যুর প্রমাণ চাই, অর্থাৎ কাগজ চাই। জিতুর পক্ষে ‘কাগজ দেখাব না’ বলার বিলাসিতা করা সম্ভব নয়, এদিকে তাঁর কাগজও অমিল। জিতুর মত আদিবাসী, প্রান্তিক মানুষের কাছে অনেক কাগজই থাকে না। আগামীদিনে ওড়িশায় এসআইআর হলে হয়ত জিতুকে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার বাইরে ছুড়ে ফেলা হবে, যেভাবে পশ্চিমবঙ্গের ৬৬ লাখ মানুষকে ফেলা হয়েছে (অধিকাংশের কাগজ থাকা সত্ত্বেও)। এমনই রক্তমাংসহীন হিংস্র একটা ব্যবস্থা আমাদের দেশে গণতন্ত্রের নামে চলছে।

অনেকেই বলবেন, ব্যাংকের সঙ্গে গণতন্ত্রের সম্পর্ক কী? কারণ শুরুতেই বললাম, গণতন্ত্র মানে কেবল ভোট— একথা বিশ্বাস করা আমাদের বদভ্যাসে দাঁড়িয়ে গেছে। নিজের টাকা বা প্রয়াত নিকটাত্মীয়ের ব্যাংকে গচ্ছিত টাকা তোলা যে একজন মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার— তা আমাদের মনেই হয় না। যে কোনোদিন যে কোনো ব্যাংকে গেলেই কোনো না কোনো মানুষকে দেখা যায় মৃত আত্মীয়ের টাকাপয়সার ব্যাপারে এসেছেন। ব্যাংক থেকে কিছু কাগজপত্রের তালিকা দিয়ে দেওয়া হয় ভাবলেশহীন মুখে। তার মধ্যে অবশ্যই থাকে KYC, যা জীবিত অবস্থায় ওই গ্রাহক নির্ঘাত ৯৯ বার জমা দিয়েছেন। ডিজিটাল ইন্ডিয়াতেও কেন ব্যাংকের একজন গ্রাহককে বারবার KYC জমা দিতে হবে— এ প্রশ্ন করা হলে নিম্নতম ব্যাংককর্মী থেকে জেনারেল ম্যানেজার পর্যন্ত সকলেই হাত উলটে উত্তর দেন— নিয়ম। এমন নির্বোধ নিয়ম আছে কেন, বাতিল হচ্ছে না কেন— এসব প্রশ্ন আমরা করি না। নিয়ম যে দৈবনির্দেশিত নয়, মানুষের তৈরি, তাতে গোলমাল থাকতে পারে এবং তা পরিবর্তনযোগ্য— সেকথা আমরা ভুলে গেছি। যেমন আমরা মাঝেমধ্যে কাগজে পড়ি বা হাতের মোবাইলে দেখতে পাই, অমুক জায়গায় তমুক লোক আধার কার্ডের বায়োমেট্রিক্স মেলেনি বলে সরকারি প্রকল্পের টাকা পাচ্ছেন না। তারপর আমরা স্ক্রোল করে অন্যকিছুতে চলে যাই। ২০১৮ সালে আমাদের আরেক প্রতিবেশী রাজ্য ঝাড়খণ্ডের পাকুড় জেলার লুখি মুর্মু অনাহারে মারা গিয়েছিলেন ২৩ জানুয়ারি, কারণ অক্টোবর মাস থেকে বায়োমেট্রিক্স মিলছিল না বলে রেশন তুলতে পারেননি। ওই রেশন ছিল তাঁর বেঁচে থাকার চাবিকাঠি। এসব দেখে আমরা আধার কার্ড সম্পর্কে কোনো প্রশ্ন তুলি না। অথচ সুপ্রিম কোর্ট ২০১৬ সালেই রায় দিয়েছে যে সরকারি প্রকল্পে আধার কার্ড ব্যবহার করা যেতে পারে, কিন্তু বাধ্যতামূলক করা যাবে না।

এগুলো আমাদের গণতান্ত্রিক আলোচনার বিষয় নয়। কারণ আমাদের বায়োমেট্রিক্স মেলা না মেলা নিয়ে ভাবতে হয় কেবল মোবাইলের নতুন সিম কার্ড দরকার হলে। দোকানের মালিক বা কর্মচারীদের নিজেদের দায় সিম বিক্রি করা, তাই তারা বেজায় ভদ্রতা করে। আধার না মিললে ‘ভোটার কার্ড আর প্যান কার্ড দিয়ে হয়ে যাবে স্যার’। জিতুর বা লুখির কাছে হয়ত জরুরি কাগজ নেই, বিকল্প কাগজও নেই। কিন্তু তাঁদের জন্যে কেউ অন্য রাস্তার খোঁজ করবে না। কারণ তাঁদের ক্রয়ক্ষমতা নেই, তাই কানাকড়ি দাম নেই। না দোকানে, না ব্যাংকে, না নির্বাচন কমিশনের কাছে। কারণ আমাদের ব্যবস্থায় মানুষের দাম (পড়ুন বৈধতা, শুনতে গণতান্ত্রিক হবে) মানুষ দিয়ে নয়, কাগজ দিয়ে। কোন কাগজ? সেটা আবার ব্যাংক বা রাষ্ট্র ইচ্ছামত বদলে ফেলতে পারে রোজ। পশ্চিমবঙ্গের এসআইআরে ঠিক তাই হয়েছে, এখনো হয়ে চলেছে। ভোটার তালিকায় উঠে যাওয়া নামও এখন ট্রাইব্যুনালের আদেশে বাদ হয়ে যাচ্ছে।

এদিকে এসআইআরে বাদ যাওয়া বিচারাধীন ভোটারদের মধ্যে যাঁদের বিচার হয়েছে, তাঁদের প্রায় ৯৯% বৈধ ভোটার বলে গণ্য হয়েছেন। মানে তাঁদের অবৈধ ঘোষণা করার কোনো কারণই ছিল না। অর্থাৎ গণতন্ত্রের লাগাম আর জনগণের হাতে নেই। এখনো কেউ কেউ ভোট দিতে পারছেন, এই যা। মানে ওই কঙ্কালটাই এখনো অবশিষ্ট আছে। তারও উপকারিতা আছে, দেখালে একটু-আধটু অধিকার পাওয়া যায়। জিতু যেমন ব্যাংকের দরজার সামনে বোনের কঙ্কালটাকে শুইয়ে দেওয়ায় হঠাৎ ব্যাংক সদয় হয়ে গেছে, তাদের KYC-র প্রয়োজনও রাতারাতি মিটে গেছে। জিতুর হাতে বোনের গচ্ছিত টাকা তো তুলে দেওয়া হয়েছেই, সঙ্গে সাহায্য বাবদ আরও টাকা দেওয়া হয়েছে। আহা! দয়ার শরীর বাবুদের!

আরও পড়ুন ভোটচুরির অভিযোগ আমাদের এনে ফেলেছে এক সন্ধিক্ষণে

আমরা অনেকে অবশ্য এটুকু গণতন্ত্রেই খুশি। আমাদের আধ কোটি সহনাগরিক বিনা দোষে ভোট দিতে পারলেন না, তাতে কী হয়েছে? রিগিং হলেও তো কত লোক ভোট দিতে পারে না। আমি ভোট দিতে পারছি মানেই গণতন্ত্র সজীব। আমাদের ফ্ল্যাটের বাইরে পর্যন্ত পা রাখতে হচ্ছে না, হাউজিংয়েই বুথ হয়েছে। এমন গণতন্ত্র কোথাও খুঁজে পাবে নাকো তুমি। রাজ্যটা কাশ্মীর এবং সব নিয়মকানুনের বাইরে চলে যাওয়া মণিপুরের চেয়েও বেশি সশস্ত্র বাহিনীতে ভরে গেল দেখে আমরা আরও নিশ্চিত হচ্ছি যে দেশে গণতন্ত্র বেঁচে আছে। ফরসা টুকটুকে, সুবেশী, হিন্দিভাষী পুলিশ অফিসার আঙুল উঁচিয়ে গ্রামে ঢুকে লোককে শাসাচ্ছেন দেখে আমাদের দারুণ লাগছে। কারণ আমরা হিন্দি সিনেমায় নায়ককে ওরকমভাবে খলনায়ক ও তার দলবলকে শাসাতে দেখেছি। মিডিয়া আবার বলছে, লোকটা ‘এনকাউন্টার স্পেশালিস্ট’। সোনায় সোহাগা। যে অফিসাররা এনকাউন্টার করে তাদের মত বাহাদুর যে আর হয় না, সে তো আমরা সেই অব তক ছপ্পন থেকেই জানি। মিডিয়া লোকটার নাম দিয়েছে সিঙ্ঘম। ওই ছবিটা আরও সাম্প্রতিক, ফলে আমাদের আরও ভালো মনে আছে। অতএব আমরা আহ্লাদে আটখানা। যে লোক আইন আদালতের তোয়াক্কা না করে সোজা ঠুকে দেয়, তার হাতেই যে আমাদের গণতন্ত্র সবচেয়ে নিরাপদ— এতে আর সন্দেহ কী? বিশেষত যার পরিবার পরিজনকে শাসাচ্ছে, সে নিজেই যখন অনেকের মতে অপরাধী। উত্তরপ্রদেশের মত, জাহাঙ্গীরের বাড়ির উপরেই বুলডোজার চালিয়ে দিলে আমরা আরও নিশ্চিত হতে পারতাম যে আমাদের গণতন্ত্রের এই রক্ষীটি জবরদস্ত। ডান, বাম নির্বিশেষে আমাদের এই যে ভাবনা— এটাই প্রমাণ করে যে গণতন্ত্রের কঙ্কালকে জ্যান্ত জিনিস বলে ভুল করছি। জিতু একেবারে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিলেন।

কঙ্কালপুজোর শুভেচ্ছা।

নাগরিক ডট নেট ওয়েবসাইটে প্রকাশিত

না হয় আজ চ্যাম্পিয়ন হলাম, কিন্তু ভারতীয় দলটা আসলে কার?

নয়ের দশকে রঙিন জামার ক্রিকেট চালু হওয়ার পর থেকে নানা ধরনের নীল জার্সি পরে আসছে ভারত, তার মধ্যেও গেরুয়া রং ঢুকে পড়েছে।

যদি বলি আজ গ্রহ, উপগ্রহগুলো চিন্তায় আছে— তাহলে হাসাহাসি করবেন না। ব্যাপার খুব গুরুতর। টানা দ্বিতীয়বার যদি ভারতীয় দল কুড়ি বিশের বিশ্বকাপ জিতে যায়, তাহলে কোনও কথা নেই। কিন্তু যদি হেরে যায়, তখন বৃহস্পতি কোন অবস্থানে থাকার জন্যে চরম মুহূর্তে ঈশান কিষণের হাত থেকে অমুক ক্যাচটা পড়ে গেল, অথবা শনির কোন চক্রান্তে যশপ্রীত বুমরার ইয়র্কারটা লেংথ মিস করে ফুলটস হয়ে গেল আর ড্যারিল মিচেল বোল্ড হওয়ার বদলে ছক্কা মেরে দিলেন— তা নিয়ে শোরগোল পড়ে যেতে পারে। তাতে কোন জ্যোতিষীর কপাল পুড়বে আমরা জানি না। যাঁর পুড়বে তিনি নিজের পিঠ বাঁচাতে বলতেই পারেন “আমার গণনায় ভুল ছিল না। হতভাগা শনি নিজের গতি কমিয়ে ফেলেছে চক্রান্ত করে। ভাগ্যিস বৃহস্পতিটাকে বেঁধে রেখেছিলাম, তাই শেষ ওভার পর্যন্ত গেছে। নইলে দু ওভার আগেই খেল খতম হয়ে যেত।”

আষাঢ়ে গপ্পো লিখছি ভেবে অন্য লেখায় চলে যাচ্ছেন তো? আচ্ছা যাবেন নাহয়। যাওয়ার আগে শুনে যান, বাংলার সাংবাদিক বা ইউটিউবাররা আপনাকে খবরটা না দিলেও, দি ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস কাগজের সাংবাদিক দেবেন্দ্র পাণ্ডে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে সেমিফাইনালের আগেরদিন লিখেছিলেন যে, ভারতীয় দলের ওয়াংখেড়ে স্টেডিয়ামে অনুশীলন করার কথা ছিল সন্ধে ছটা থেকে। কিন্তু যেহেতু সেদিন চন্দ্রগ্রহণ চলার কথা বিকেল তিনটে কুড়ি থেকে ছটা বেজে সাতচল্লিশ মিনিট পর্যন্ত, সেহেতু টিম ম্যানেজমেন্ট ঠিক করে, এই অশুভ সময়ে শুভ কাজ করতে না যাওয়াই ভালো। তাই অনুশীলন শুরু হয় চন্দ্রগ্রহণের পরে।

শাস্ত্রে বলেছে— মহান ব্যক্তিরা যে পথে চলেন সেটাই সঠিক পথ। আর কে না জানে, ভারতীয় ক্রিকেটের ভাগ্যনিয়ন্তারা সকলেই মহান! গৌতম গম্ভীর থেকে শুরু করে বোর্ড সভাপতি মিঠুন মানহাস, সকলেই সনাতনী। ২০১৫-১৬ মরশুমে গম্ভীর যখন দিল্লির রঞ্জি দলের অধিনায়ক ছিলেন, তখনও নাকি এসব হতো। তবে তফাতটা হল, তখন গম্ভীর আর কোচ বিজয় দাহিয়া বুক ফুলিয়ে বলতেন যে তাঁরাই এটা করাচ্ছেন। এখন কে যে চন্দ্রগ্রহণের সময়ে অনুশীলন না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তা কিন্তু প্রকাশ্যে বলা হচ্ছে না। দেবেন্দ্র পাণ্ডের ওই প্রতিবেদনেও বলা নেই। প্রতিবেদনে কেবল বলা আছে ‘টিম ম্যানেজমেন্ট’। সাধারণত এই শব্দগুলো দিয়ে বোঝানো হয় অধিনায়ক, কোচ আর নির্বাচকদের। আজকাল ‘সাপোর্ট স্টাফ’-ও গুরুত্বপূর্ণ, ফলে ব্যাটিং কোচ সীতাংশু কোটকও সিদ্ধান্তটা নিয়ে থাকতে পারেন। বোলিং কোচ মর্নি মর্কেলের ধর্মে চন্দ্রগ্রহণ অশুভ বলা আছে বলে তো জানা নেই। সিদ্ধান্তটা সূর্যকুমার যাদব, গম্ভীর, কোটক, নির্বাচন সমিতির প্রধান অজিত আগরকর— সকলে মিলেও নিয়ে থাকতে পারেন। দলে যতই সঞ্জু স্যামসনের মত খ্রিস্টান, অর্শদীপ সিংহের মতো শিখ আর মহম্মদ সিরাজের মত মুসলমান ক্রিকেটার থাকুন, দলটা তো সনাতনীদেরই। ফলে তাঁদের ধর্মে যে সময়টাকে অশুভ বলা হয়েছে, সেইসময় অনুশীলন করা যে কোনওভাবেই চলতে পারে না তাতে সন্দেহ কী?

এ মা! রেগে গেলেন নাকি? আরে আমি কি বলেছি যে ব্যাপারটা অন্যায় হয়েছে? আমি শুধু বলছি, অক্ষরে অক্ষরে শাস্তর মেনে পাঁজি-টাজি দেখে যখন মাঠে নামা হচ্ছে, তখন দল হেরে গেলে তার দোষ কখনওই খেলোয়াড়দের বা কোচদের হতে পারে না। সব গ্রহদোষ। এমনিতেও সর্বশক্তিমান জয় শাহ বিসিসিআই ছেড়ে আইসিসির চেয়ারম্যান হয়ে যাওয়ার পরে বিসিসিআইয়ের কোনও সিদ্ধান্ত যে কে নেন তা কেউ বলে না। সিদ্ধান্তগুলো সর্বসমক্ষে জানান বোর্ড সচিব দেবজিৎ শইকিয়া, কিন্তু নেন কে? সেকথা কিন্তু দেবজিৎও বলেন না।

যেমন ধরুন, বাংলাদেশে দীপু দাসকে হত্যা করা হয়েছে বলে বাংলাদেশের ক্রিকেটার মুস্তাফিজুর রহমানকে ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগে খেলতে দেওয়া যাবে না— এই সিদ্ধান্ত কে নিয়েছে? ভারত সরকার? না তো! বিদেশমন্ত্রী এস জয়শংকর বা প্রতিরক্ষা মন্ত্রী রাজনাথ সিংহ মোটেই এরকম কিছু বলেননি। তাঁদের মন্ত্রকের কোনও উচ্চপদস্থ অফিসারও বলেননি। বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে আমাদের সরকারের সম্পর্কেরও কোনও অবনতি হয়নি ওদেশের প্রাক-নির্বাচনী খুনোখুনির কারণে। বেগম খালেদা জিয়া মারা যাওয়ার পরে জয়শংকর, রাজনাথ তাঁকে শ্রদ্ধা জানিয়েছেন। খালেদা-পুত্র তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পরে তাঁর সঙ্গে কুশল বিনিময়ও হয়েছে। তাহলে মুস্তাফিজুরের অপরাধটা কী? কেউ জানে না। আপাতত বাংলাদেশে হিন্দুবিদ্বেষী জামাত-এ-ইসলামি তো হেরে ভূত, তাহলে আইপিএলের সময়ে মুস্তাফিজুরকে ডেকে নেওয়া হবে কি? কেউ জানে না। কারণ তাড়ানোর সিদ্ধান্তটা কে নিয়েছিল তা-ই কেউ জানে না। কেবল দেবজিৎ একদিন ঘোষণা করে দিয়েছিলেন যে কলকাতা নাইট রাইডার্সকে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে— ওকে বাড়ি পাঠাতে হবে।

তেমনই পহলগামে সন্ত্রাসবাদীরা হানা দিয়ে অনেককে খুন করেছে বলে ভারতীয় ক্রিকেটাররা পাকিস্তানিদের সঙ্গে খেলবেন কিন্তু করমর্দন করবেন না, অর্থাৎ ‘যেমন বেণী তেমনি রবে চুল ভিজাব না’— এই সিদ্ধান্ত কে নিয়েছিল, তাও কেউ জানে না। বলা হয়, বিসিসিআই সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বিসিসিআই কি গা ছমছমে হলিউডি কল্পবিজ্ঞান ফিল্মে দেখা সর্বশক্তিমান কোনও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, যে মানুষকে দিয়ে যা ইচ্ছে করিয়ে নেয়, মানুষ টেরই পায় না? বিসিসিআইয়ের তো একজন সভাপতি আছেন। বোর্ডের সংবিধান অনুযায়ী তিনিই সর্বোচ্চ নীতি নির্ধারক। অথচ তিনি তো কই কিছু বলেননি! আচ্ছা কে এই ভদ্রলোক? চেনেন তাঁকে? না চিনলে লজ্জা পাওয়ার কিছু নেই। দিল্লির বাইরে তাঁকে বিশেষ কেউ চেনে না। প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে মন্দ ব্যাট করতেন না, দিল্লির হয়ে খেলতেন। বিসিসিআইয়ের সভাপতির আসনে বসেছেন জগমোহন ডালমিয়া, এন শ্রীনিবাসনের মত নামকরা শিল্পপতিরা; কখনও এনকেপি সালভে, মাধবরাও সিন্ধিয়া, শরদ পাওয়ারের মত বড় মাপের রাজনৈতিক নেতারা, কিম্বা রাজ সিংহ দুঙ্গারপুর, সৌরভ গাঙ্গুলির মতো প্রাক্তন ক্রিকেটার অথবা শশাঙ্ক মনোহরের মত ক্রিকেটপ্রেমী ক্ষমতাশালী লোকেরা। এই আসনে মিঠুনকে বসানো মানে হল “চন্দ্র সূর্য অস্ত গেল/জোনাক ধরে বাতি/ভীষ্ম দ্রোণ কর্ণ গেল/শল্য হল রথী।” এই লজ্জাতেই হয়তো মিঠুন মুখ খোলেন না বা সংবাদমাধ্যম তাঁর কাছে কিছু জানতেও চায় না, যা বলার দেবজিতই বলেন। তাহলে দেবজিৎ কি শ্রীরামকৃষ্ণ, আর মিঠুন গিরিশ ঘোষ? দেবজিতকে বকলমা দিয়েছেন? কেন দিলেন? কার নির্দেশে দিলেন? উত্তর নেই।

অবশ্য মিঠুনের পূর্বসুরি রজার বিনি, যাঁর ক্রিকেটিয় কীর্তি ভোলার নয় কারণ তিনি ভারতের প্রথম বিশ্বকাপ জয়ী দলের সদস্য, তিনিও কোনও সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন বলে জানা যায় না। যা ঘটত সবই যে তৎকালীন সচিব জয়ের নির্দেশে, তা নিয়ে তখন রাখঢাক ছিল না। ব্যাপারটা রেখে ঢেকে করা হতো সৌরভ বিসিসিআই সভাপতি থাকাকালীন।

সাংবাদিক শারদা উগ্রা ২০২৩ সালেদ্য ক্যারাভ্যান পত্রিকায় এক দীর্ঘ প্রতিবদনে লেখেন যে, সৌরভের আমলের শেষদিকে জয়ের নির্দেশে বিসিসিআইয়ের অন্যরা সৌরভের ফোনই ধরতেন না। সৌরভ যে বোর্ড সভাপতি হতে পেরেছিলেন জয়ের বাবা, দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের আনুকূল্যে— সেকথা এখন অনেকেরই জানা। সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে তৈরি নতুন সংবিধান ফের বদলাতে আদালতে বারবার আবেদন করে সৌরভ অনেকদিন পদে টিকে ছিলেন জয়ের সঙ্গে গলাগলি করে। তার মূল্য তাঁকে চোকাতে হয়েছে। যা-ই হোক, কথা হল, এখন তো আর জয় বিসিসিআই কর্তা নন। তাহলে বিসিসিআই চালাচ্ছে কে? এই প্রশ্ন মনে জাগতে পারে। তাই মনে রাখবেন— শারদার ওই প্রতিবেদনের শিরোনাম ‘Shah’s Playground: BJP’s Control of Cricket in India’।

অর্থাৎ বিসিসিআই হল জয়ের খেলার মাঠ তথা বিজেপির শাখা অফিস। এই কথাটি ক্রিকেটমহলে জানে সবাই, কিন্তু লেখার মত মেরুদণ্ড গোটা ভারতে হাতে গোনা যে কজনের আছে (বাংলায় কারও নেই), তাঁদের মধ্যে এক নম্বরে আছেন শারদা। ২০২৩ সালের অগাস্ট মাসে প্রকাশিত ওই প্রতিবেদন ইংরিজিতে লিখিত এবং বেশ দামি একটা পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল বলেই বেশিরভাগ ক্রিকেটপ্রেমীর নজরে পড়েনি। পড়লেও যে খুব বিশ্বাস করতেন তা অবশ্য নয়। কারণ ক্রিকেট ভারতে ধর্মের স্তরে উন্নীত হয়েছে অনেককাল হলো। এই ধর্মের ভক্তরা আবার হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধ, জৈন বা খ্রিস্টানদের চেয়েও এককাঠি সরেস। সারা পৃথিবীতে সব ধর্মের গোঁড়া লোকেরা চিরকাল নিজের ধর্মের না হোক, অন্য ধর্মের দোষ দেখতে পায়। তা নিয়ে খুনোখুনি করে। সহিষ্ণু ধর্মাবলম্বীরা এবং নাস্তিকরা তাদের নিন্দা করেন। গত বিশ-তিরিশ বছরে যেহেতু বিজেপি এদেশে ধর্মকে রাজনৈতিক হাতিয়ারে পরিণত করেছে, সেহেতু রাজনৈতিকভাবে যাঁরা বিজেপির বিরোধী তাঁরাও চারদিকে এত ধর্মের বাড়বাড়ন্তের নিন্দা করেন। সবেতে ধর্মকে টেনে আনা, নিজের ধর্মবিশ্বাসের উগ্র প্রকাশের মাধ্যমে অন্য ধর্মের মানুষের পিছনে লাগার বিরুদ্ধে প্রতিবাদী মানুষ এদেশে এখনও পাওয়া যায়। কিছুদিন আগেই যেমন হিমাচল প্রদেশের এক যুবককে পেয়েছি, যিনি উন্মত্ত হিন্দু গুন্ডাদের হাত থেকে এক মুসলমান বৃদ্ধকে বাঁচাতে নিজের নাম বলেছেন মহম্মদ দীপক। কিন্তু ভারতে ক্রিকেট এমন এক ধর্ম, যার কোনো দোষ উপরে উল্লিখিত ধর্মগুলোর কেউই দেখতে পান না। ফলে দেশের ক্রিকেট চালাচ্ছে বিজেপি— একথা নাস্তিক, ঘোর বামপন্থী ক্রিকেটপ্রেমীদের বললেও তাঁরা পাত্তা দেন না। নার্সারি স্কুলের বাচ্চাদের মতই তাঁদের চোখে ভারতীয় ক্রিকেট দল আজও ফুলের মত নিষ্পাপ এবং ক্রিকেটাররা স্রেফ ননীচোর বালগোপাল।

বিজেপি আমলে যেমন, তেমনই চন্দ্রগ্রহণের সময়ে অনুশীলন না করার মত ন্যক্কারজনক ঘটনা ঘটিয়েছে ক্রিকেট দল। বিসিসিআইকে তুষ্ট করতে ব্যস্ত সম্প্রচারকারী সংস্থা একেবারে বিজেপির ঢঙেই উগ্র জাতীয়তাবাদী, খেলোয়াড়ি মনোভাব বর্জিত কুরুচিকর প্রোমো প্রচার করে যাচ্ছে বছরের পর বছর। এশিয়া কাপ জিতে ক্রিকেট অধিনায়ক বলে দিয়েছেন, মনে হচ্ছিল নরেন্দ্র মোদী নিজেই স্ট্রাইক নিয়ে রান করে দিলেন। ভাবা যায়!

নয়ের দশকে রঙিন জামার ক্রিকেট চালু হওয়ার পর থেকে নানা ধরনের নীল জার্সি পরে আসছে ভারত, তার মধ্যেও গেরুয়া রং ঢুকে পড়েছে। এদিকে চ্যাম্পিয়নস ট্রফির সর্বোচ্চ উইকেট শিকারী মহম্মদ শামি এখন আগরকরের কথা মতো ঘরোয়া ক্রিকেট খেলে ঝুড়ি ঝুড়ি উইকেট নেওয়ার পরেও দলে সুযোগ পাচ্ছেন না (কুড়ি বিশের দলে সুযোগ দেওয়া উচিত বলছি না)। সরফরাজ খান শয়ে শয়ে রান করেও নড়বড়ে ভারতীয় টেস্ট ব্যাটিংয়ের অংশ হওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন না। হর্ষিত রানা আহত না হলে মহম্মদ সিরাজকেও চলতি বিশ্বকাপের ১৬ জনের মধ্যে রাখা যাচ্ছিল না। অথচ তিনি ভারতীয় পেসারদের মধ্যে গত কয়েক বছরে সবচেয়ে ফিট, লম্বা লম্বা স্পেলে বল করেছেন, ম্যাচ জেতানো বোলিংও করেছেন। এসবের কোনওটাই ক্রিকেটপ্রেমীদের কাছে ভারতীয় ক্রিকেটের বিজেপি-চালিত হওয়ার প্রমাণ নয়। কারণ ওঁদের মধ্যে যাঁরা নিজেদের অসাম্প্রদায়িক, ধর্মনিরপেক্ষ, যুক্তিবাদী ইত্যাদি বলেন, তাঁদের চোখেও ক্রিকেটাররা ‘নন-বায়োলজিকাল’।

যাঁরা বিজেপির দেশ শাসনের ব্যর্থতা দেখতে পান না, তাঁদের বিসিসিআইয়ের অপদার্থতা দেখতে না পাওয়ার মধ্যে তবু ধারাবাহিকতা আছে। কিন্তু যাঁরা প্রথমটা নিয়ে রীতিমতো সোচ্চার, তাঁরা ২০২৩ বিশ্বকাপের মতও এবারও টিকিট বিক্রির অব্যবস্থা নিয়ে টুঁ শব্দ করলেন না। স্রেফ গা জোয়ারি করে, বিসিসিআইয়ের জেদ বজায় রাখতে, জয়ের নেতৃত্বাধীন আইসিসির বাংলাদেশকে বিশ্বকাপ থেকে বাদ দিয়ে দেওয়াও চার হাত-পা তুলে সমর্থন করলেন। এ হল বিশ্বের অষ্টমাশ্চর্য!

আরো পড়ুন ভারতের দাপুটে বিশ্বকাপ: কিছু কাঁটা রহিয়া গেল

ভারত, ইংল্যান্ড আর অস্ট্রেলিয়ার বোর্ড ক্রিকেট বাণিজ্যের মুনাফার সিংহভাগ নিজেদের মধ্যে ভাগ বাঁটোয়ারা করে নিয়ে একদা প্রতিষ্ঠিত দেশগুলোতেও যে খেলাটার কফিনে পেরেক ঠুকে দিচ্ছে— সেকথা স্বীকার করার মানসিকতাও ভারতীয় ক্রিকেটপ্রেমীরা হারিয়েছেন। তাই সেমিফাইনালে হারার পর ইংল্যান্ড দল দেশে ফিরছে চার্টার্ড বিমানে আর আগেই হেরে যাওয়া ওয়েস্ট ইন্ডিজ, দক্ষিণ আফ্রিকাকে ভারতেই বসে থাকতে হচ্ছে— এ নিয়ে খেলোয়াড়রা অসন্তোষ প্রকাশ করলে সোশাল মিডিয়ায় কুযুক্তি এবং গালাগালির শিকার হচ্ছেন। কী আশ্চর্য দেখুন! যে সুনীল গাভাসকর আজকাল কথায় কথায় বিসিসিআইয়ের ধ্বজা ধরে ইংল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়ার অতীতের অপরাধের প্রতিশোধ নেওয়ার তত্ত্ব আওড়ান, তিনি এই বৈষম্যের বিরুদ্ধে মুখ খোলেননি। যে ওয়েস্ট ইন্ডিজের ক্রিকেটপ্রেমীরা একসময় গাভসকরের নামে গান বেঁধেছেন, নিজেদের দেশে রাস্তার নাম রেখেছেন, সেই ওয়েস্ট ইন্ডিজের ক্রিকেটারদের প্রতি বৈষম্য দেখেও তিনি কিন্তু চুপ। যে দক্ষিণ আফ্রিকাকে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ফেরাতে মুখ্য ভূমিকা ছিল বিসিসিআইয়ের, তাদের প্রতি বৈষম্য নিয়ে বিসিসিআই (যদি সরল শিশুর মত ধরে নিই, আইসিসিকে বিসিসিআই নিয়ন্ত্রণ করে না) চুপ। মুখ খুলেছেন কে? ইংল্যান্ডেরই প্রাক্তন অধিনায়ক মাইকেল ভন। তিনি সোশাল মিডিয়ায় লিখেছেন, ব্যবহার সব দলের প্রতি সমান হওয়া উচিত। কার আইসিসিতে কত প্রভাব তার ভিত্তিতে কাজ হওয়া উচিত নয়।

পণ্ডিতরা বলেন, হিন্দুশাস্ত্রে লেখা আছে “অতিথি দেবো ভব”। মানে অতিথি হল ঈশ্বর। সংবিধানকে মারো গুলি, আমাদের ক্রিকেটে সবই হিন্দু মতে চলছে। শুধু অতিথিদের বেলায় ব্যতিক্রম। অন্য দেশের সমর্থকরা যাতে বেশি সংখ্যায় বিশ্বকাপ দেখতে আসতে না পারে, তার ব্যবস্থা পাকা করা হয় ভিসা নিয়ে নানা গ্যাঁড়াকল করে। এমনকি অস্ট্রেলিয়া, ইংল্যান্ডের পাক বংশোদ্ভূত ক্রিকেটারদের ভিসা নিয়েও প্রতিবার ঝামেলা পাকানো হয়।

অ্যাঁ, কী বলছেন? বিজেপি ক্রিকেট চালাচ্ছে তো কী হল, আসল কথা হল মাঠে জেতা? আজ্ঞে তা তো বটেই। তবে কিনা জগতের নিয়ম হল, কোনো দেশ চিরকাল জেতে না। কে ভেবেছিল ক্লাইভ লয়েড, ভিভিয়ান রিচার্ডসদের ওয়েস্ট ইন্ডিজের আজকের অবস্থা হবে? কে-ই বা ভেবেছিল, অস্ট্রেলিয়া চলতি বিশ্বকাপের শেষ চারেও উঠতে পারবে না? কেবল খেলার মাঠে নয়, জগতের কোনও ময়দানেই কেউ চিরকাল জেতে না। হারার সময় যখন আসে, তখন মানসম্মান তাদেরই বজায় থাকে, যারা নিজেদের সুসময়ে পরাজিতকে সম্মান দিয়েছিল। বেপরোয়া মস্তানদের শেষ পরিণতি নিয়ে বিস্তর বই-টই, সিনেমা-টিনেমা হয়েছে। চ্যাটজিপিটিকে তালিকা বানিয়ে দিতে বলুন।

অ2অনুস্বর ডট কম ওয়েবসাইটে প্রকাশিত

এসএসসি: স্থান কাল পাত্র গুলিয়ে যাওয়া সাংবাদিকের স্বীকারোক্তি

কখন সিপিএমের নেতৃত্বে ক্ষমতায় ফিরল বামফ্রন্ট, কখন বিকাশ ভট্টাচার্য মুখ্যমন্ত্রী হয়ে গেলেন, ২৬,০০০-এর বেশি শিক্ষক, শিক্ষাকর্মীর চাকরি খেয়ে নিলেন – কিছুই খেয়াল করলাম না! এর চেয়ে লজ্জার কথা আর কী হতে পারে?

কয়েকদিন হল বেশ লজ্জায় পড়ে গেছি। ২০০৫ সাল থেকে সাংবাদিকতায় আছি। শিশু যেমন হাঁটতে শেখার সময়ে বারবার হোঁচট খায়, পড়ে যায়, তেমন আমিও সাংবাদিকতার শুরুর দিনগুলোতে বিস্তর ভুল করেছি। তখন সিনিয়রদের ধমক খেয়েছি, খেতে খেতে কাজে ভুল কমেছে। সব সাংবাদিকেরই বেড়ে ওঠার এটাই প্রক্রিয়া। তিনি খেলা, গান-নাটক-সিনেমা-সাহিত্য, রাজনীতি, অর্থনীতি – যে শাখার সাংবাদিকই হোন। কিন্তু বিশ বছর কাজ করার পরেও এরকম বিচ্ছিরি ভুল করে ফেলেছি জানতে পারলে আমাকে যাঁরা সাংবাদিকতা শিখিয়েছিলেন তাঁরা আজও কান মুলে দেবেন। খেয়ালই করিনি কবে অষ্টম বামফ্রন্ট সরকার এসে গেছে রাজ্যে।

২০১১ সালে মমতা ব্যানার্জির নেতৃত্বে ক্ষমতায় আসা তৃণমূল কংগ্রেস সরকার কখন পড়ে গেল, কখন সিপিএমের নেতৃত্বে ক্ষমতায় ফিরল বামফ্রন্ট, কখন বিকাশ ভট্টাচার্য মুখ্যমন্ত্রী হয়ে গেলেন, ২৬,০০০-এর বেশি শিক্ষক, শিক্ষাকর্মীর চাকরি খেয়ে নিলেন – কিছুই খেয়াল করলাম না! এর চেয়ে লজ্জার কথা আর কী হতে পারে? একদা এক সম্পাদকের অধীনে কাজ করতাম, তাঁর একটা অদ্ভুত ধারণা ছিল। কোনো সাংবাদিক কাজে ভুল করেছে মানেই নাকি সে কাজ করতে করতে ঘুমোচ্ছিল। ভুলটা যা-ই হোক, যেমনই হোক, ভুলের কারণ যে এই একটাই – সে ব্যাপারে তিনি আশ্চর্য রকমের নিশ্চিত ছিলেন। আমরা যারা তাঁর অধীনস্থ তারা এতে যারপরনাই রেগে যেতাম, কারণ সাংবাদিকদের নানাবিধ চাপের মধ্যে কাজ করতে হয়। রিপোর্টারদের একরকম চাপ থাকে, সাব-এডিটরদের অন্যরকম। একেকটা চাপের কারণে একেকরকম ভুল হওয়া সম্ভব। কিন্তু সকলকেই এত গতির মধ্যে সারাক্ষণ কাজ করতে হয় যে ঘুমোবার বা ঝিমোবার কোনো অবকাশ নেই। ফলে বস ওই অভিযোগ করলে যে কোনো সাংবাদিকের প্রবল ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠাই স্বাভাবিক। অথচ এই যে ভুলটা আমার হল সারাক্ষণ খবরের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকা সত্ত্বেও – এর ব্যাখ্যা সেই খড়্গহস্ত সম্পাদকের অনড় মতটা ছাড়া আর কী দিয়েই বা করা যায়?

২০১৬ সালের এসএসসি পরীক্ষার ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে ছিল তৃণমূল পরিচালিত সরকার দ্বারা নিযুক্ত স্বায়ত্তশাসিত সংস্থা স্কুল সার্ভিস কমিশন। তার আধিকারিকদের নিযুক্ত করেছিল তৃণমূল সরকার। সেবারের এসএসসি পরীক্ষার ফল বেরোবার সময়ে শিক্ষামন্ত্রী ছিলেন তৃণমূল নেতা পার্থ চট্টোপাধ্যায়। পরীক্ষার ফল নির্ধারণে এবং চাকরিতে নিযুক্তির ক্ষেত্রে দুর্নীতি হয়েছে বলে মামলা করেন সেবারে পরীক্ষা দিয়ে চাকরি না পাওয়া প্রার্থীরা। তাঁদের কৌঁসুলি সিপিএম নেতা এবং একদা কলকাতা কর্পোরেশনের মেয়র বিকাশবাবু। তদন্তে পার্থবাবুর বিস্তর স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তির হদিশ মেলে এবং তিনি সমেত যতজন গ্রেফতার হন, সকলেই হয় সরাসরি তৃণমূল কংগ্রেস দলের নেতা, মন্ত্রী, কর্মী; নয়ত কোনো না কোনোভাবে ওই দলের সঙ্গে যুক্ত অথবা তৃণমূল সরকারের আমলে শিক্ষাক্ষেত্রের কোনো প্রশাসনিক পদে ছিলেন।

এই পর্যন্ত জানতাম। কিন্তু ২০১৬ সালের এসএসসি পরীক্ষার নিয়োগ দুর্নীতি সংক্রান্ত মামলায় সুপ্রিম কোর্টের রায় বেরোতেই সব গুলিয়ে গেল। ভিনগ্রহের জীবদের এই গ্রহে আগমন নিয়ে তৈরি হলিউডি ছবিতে যেমন দেখায়, আমার বোধহয় তেমন কোনো অভিজ্ঞতা হয়েছিল যার স্মৃতি মুছে গেছে। ফলে মাঝের সময়টার হিসাব মেলাতে পারছি না। এমনও হতে পারে যে বর্তমান শিক্ষামন্ত্রী, নট ও নাট্যকার ব্রাত্য বসু রচিত উইঙ্কল টুইঙ্কল নাটকের কেন্দ্রীয় চরিত্রটার মত কিছু একটা হয়েছিল আমার। কারণ কখন যে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বিরোধী দলনেত্রী হয়ে গেছেন তা টেরই পাইনি। গতকাল বাড়ির সামনে দিয়ে একটা মিছিল যাচ্ছে আওয়াজ পেলাম। ভাবলাম চাকরিহারাদের দাবি নিয়ে, বা সামগ্রিকভাবে পশ্চিমবঙ্গের স্কুলশিক্ষার দুরবস্থা নিয়ে, বামেদের মিছিল-টিছিল হবে (রামনবমী পেরিয়ে গেছে বলে বিজেপির মিছিল আশা করিনি)। ও মা! বারান্দায় গিয়ে দেখি তৃণমূল ছাত্র পরিষদের মিছিল যাচ্ছে – ধিক্কার মিছিল। ছাব্বিশ হাজার শিক্ষকের চাকরি যাওয়ায় সিপিএম ও বিজেপিকে ধিক্কার। এমনিতেই নিজেকে কেমন ‘টাইম ট্র্যাভেলার’ মনে হচ্ছিল, আরও ঘেঁটে গেলাম কারণ দেখলাম মিছিল যেখান দিয়ে যাচ্ছে, ঠিক সেখানেই একটা দেওয়ালে বিরোধী দলনেত্রী আর তাঁর ভাইপো অভিষেক ব্যানার্জির ছবিওলা একখানা লম্বালম্বি পোস্টার। তাতে সিপিএম যে পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনে শূন্য পাওয়ার হ্যাটট্রিক করে ফেলেছে সেকথা স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়েছে। স্পষ্ট দেখলাম – বছরগুলো হল ২০১৯, ২০২৪, ২০২১।

তৃণমূল
ছবি লেখকের

বিপদটা বুঝুন একবার! ৩ এপ্রিলের পর থেকে সব গুলিয়ে যাচ্ছে দেখে সবে নিজেকে বোঝাতে শুরু করেছিলাম যে কোনোভাবে টাইম মেশিনে চড়ে বসেছি। পিছিয়ে বাম আমলে চলে গেছি। তাই দেখছি নিয়োগ কেলেঙ্কারির জন্যে আগুনে বিরোধী নেত্রী সিপিএমের মুণ্ডপাত করছেন আর তাঁর দলের ছাত্র সংগঠন সরকারকে ধিক্কার জানাতে মিছিল বার করেছে। বেশ করেছে। এত বড় কেলেঙ্কারি যে সরকারের আমলে হয়, যে সরকার যোগ্য শিক্ষক, শিক্ষাকর্মীদের চাকরি যাওয়ার উপক্রম হলেও হাইকোর্ট থেকে সুপ্রিম কোর্টে অযোগ্য ব্যক্তিদের তালিকা দেয় না, সেই সরকারকে ধিক্কার জানানোই তো উচিত। কিন্তু তাহলে পোস্টারে ওই বছরগুলো জ্বলজ্বল করছে কী করে! তবে কি টাইম মেশিন আমাকে ভবিষ্যতে নিয়ে গিয়ে ফেলল? এমনিতেই এখনো আর জি কর কাণ্ডের পর রাজ্যের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তথা স্বাস্থ্যমন্ত্রীর নিজেরই সরকারের বিরুদ্ধে (নাকি ধর্ষকের বিরুদ্ধে?) প্রতিবাদ মিছিলের ধাক্কা এখনো কাটিয়ে উঠতে পারিনি, তার উপর এই? এ যে শিশুর আত্মার উপর নরকের দুঃস্বপ্ন!

যত দিন যাচ্ছে, মাথাটা পরিষ্কার হওয়ার বদলে আরও ঘেঁটে যাচ্ছে। তিন তারিখ এসএসসি মামলায় সুপ্রিম কোর্টের রায় বেরোবার পরে আমরা সকলেই বলছিলাম – যোগ্য ব্যক্তিদের চাকরি যাওয়া অন্যায়। ক্রমশ দেখছি সুরটা বদলে যাচ্ছে। নেতাজি ইন্ডোরের সভা থেকে মুখ্যমন্ত্রীই (নাকি বিরোধী নেত্রী?) বোধহয় অন্য সুর বেঁধে দিলেন। এখন অনেককে বলতে শুনছি – সকলের চাকরি যাওয়াই অন্যায়, অমানবিক। মানে যারা ঘুষ দিয়ে চাকরি পেয়েছে, তাদেরও চাকরি যাওয়া উচিত নয়। মুখ্যমন্ত্রী সেদিন মঞ্চ থেকেই বলেছেন যে আগে তিনি যোগ্যদের ব্যবস্থা করবেন, তারপর যারা অযোগ্য তাদের ব্যাপারটাও দেখবেন। এখন দেখছি চারপাশে অনেকেরই সেরকম মনোভাব। বরং যাঁরা মামলাকারী, অর্থাৎ যাঁরা ২০১৬ সালের এসএসসি পরীক্ষায় বসেছিলেন এবং দুর্নীতির কারণে আদৌ চাকরি পাননি, তাঁদের কথা কাউকে আর বিশেষ বলতে শুনছি না। তাঁদের উকিল বিকাশবাবুকেই যেহেতু এত শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মীর চাকরি হারানোর জন্যে দায়ী করেছেন মমতা, সেহেতু সেই মামলাকারীরাই প্রায় খলনায়ক হয়ে গেছেন অনেকের চোখে। বিশেষত আদালতের রায়ে যাঁরা চাকরি হারিয়েছেন তাঁদের চোখে। পার্থবাবু নির্ঘাত এখন প্রেসিডেন্সি সংশোধনাগারে বসে হাসছেন। এই মামলায় একে একে জামিন পেয়ে বেরিয়ে আসা শুরু হয়ে গিয়েছিল সুপ্রিম কোর্টের রায়ের আগেই, এই সংক্রান্ত আরেক মামলার রায়ে রাজ্য মন্ত্রিসভার অতিরিক্ত পদ তৈরি করার সিদ্ধান্ত নিয়ে সিবিআইয়ের তদন্তও বন্ধ করে দিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট। ফলে পার্থবাবু নিশ্চয়ই অদূর ভবিষ্যতে বসন্তের হাওয়ায় শ্বাস নেবেন বলে আশা করছেন।

পশ্চিমবঙ্গ জটিল জায়গা। আমার মত ঘেঁটে যাওয়া লোকের পক্ষে তো আরও জটিল। চুরি হয়েছে তা প্রমাণিত, কিছু চোর ধরাও পড়েছে। আরও চোর ভিড়ের মধ্যে মিশে আছে বলে আদালত রায় দিয়েছে। অথচ এ রাজ্যে সবাই মিলে বলছে না ‘যারা চোরকে দরজা খুলে দিয়েছে তারা দোষী।’ বরং যারা দরজা খুলে দিয়েছে বলে সন্দেহ, তাদের সঙ্গেই গলা মিলিয়ে অনেকে বলছে ‘যাদের জিনিস চুরি হয়েছে তারা মামলা করল কেন? ও ব্যাটারাই দোষী। ওদের উকিলটাই যত নষ্টের গোড়া।’ আইনের চোখে, বিচারসভায় উকিল যে মক্কেলের চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ, তিনি ভাল লোক না মন্দ লোক তা তিনি কোন মামলায় কাদের হয়ে লড়ছেন তা দিয়ে প্রমাণিত হয় – এ কথাটাও নতুন জানছি। এই যুক্তি সমাজ মেনে নিলে সবচেয়ে বড় বিপদ কিন্তু কোনো কারণে রাষ্ট্রের বা সংখ্যাগুরুর বিরাগভাজন হন যাঁরা, তাঁদের। এমনিতেই ভারতে মাওবাদীদের উকিলকে মাওবাদী বলে দাগিয়ে দেওয়া, সন্ত্রাসবাদী হানার অভিযোগে গ্রেফতার হওয়া মুসলমানদের আইনজীবীকে জেহাদি বলা – এসব চালু আছে। মক্কেল আর তার আইনজীবীকে এক ধরলে গোটা বিচারব্যবস্থারই যে আর কোনো মানে থাকে না তা দেখছি পশ্চিমবঙ্গের প্রগতিশীল, বামপন্থী মানুষরাও অনেকে ভুলে গেছেন। এই যুক্তিতে খুনির উকিলকেও খুনি, ডাকাতের উকিলকেও ডাকাত বলে ধরতে হয়। পশ্চিমবঙ্গ অবশ্য আরও জটিল জায়গা। এখানে যারা দোষী সাব্যস্ত হয়েছে তাদের উকিলদের কেউ দোষী বলছে না (নামও করছে না), অভিযোগকারীদের উকিলকে দোষী বলছে।

আরও পড়ুন সততা ও বাংলার সংবাদমাধ্যম: কোনো প্রশ্ন নয়

আপনারা কী করে মাথা ঠিক রাখছেন জানি না, আমার ঘেঁটে যাওয়া কিন্তু এখানেই শেষ নয়। বিরোধী দলনেত্রী, থুড়ি মুখ্যমন্ত্রী, চাকরি যাওয়া শিক্ষক, শিক্ষাকর্মীদের এমনি এমনি হরলিক্স খাওয়ার মত এমনি এমনি স্কুলে গিয়ে কাজ করতে বলেছিলেন। বলেছিলেন তা নাকি কেউ আটকাতে পারে না। অথচ তার কদিন পরেই ডি আই অফিসে প্রতিবাদ জানাতে গিয়ে পশ্চিমবঙ্গ পুলিসের হাতে বেধড়ক মার খেয়ে গেলেন চাকরিহারা মানুষগুলো। কেবল পুলিসের চিরপরিচিত লাঠি নয়, লাথির ব্যবহারও বাদ থাকেনি। শিক্ষক, শিক্ষাকর্মীরা জেলার স্কুল ইন্সপেক্টরের অফিসে গেলে মার জুটবে আর স্কুলে গেলে গোল্লা? কোন মহাপাপে এই শাস্তি? শিক্ষামন্ত্রী জানিয়েছেন – পাপটা হল আলোচনার টেবিলে এসে বসার পাশাপাশি আন্দোলন করতে ডি আই অফিসে চলে যাওয়া। আর জি কর আন্দোলনের সময়ে সরকারি দলের প্রতিনিধিদের মুখে শোনা গিয়েছিল রাজনীতি করা অন্যায়, এখন শোনা যাচ্ছে আন্দোলন করা অন্যায়। এটা ২০২৫ সালের গণতান্ত্রিক পশ্চিমবঙ্গ তো? নাকি অতীত বা ভবিষ্যতের কোনো একনায়কতান্ত্রিক ব্যবস্থায় ঢুকে পড়েছি? কেবল গুলিয়ে যাচ্ছে।

নাঃ! আর বেশি বলব না। বিজ্ঞজনে বলেছেন ‘বোবার শত্রু নেই’। সেই তুলনায় এমনিতেই অনেক বেশি কথা বলে ফেলেছি। থেমে যাওয়ার আগে সাম্প্রতিকতম ঘেঁটে যাওয়ার কারণটা বলে নিই। ১১ এপ্রিল শিক্ষামন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করে বেরিয়ে চাকরিহারারা সংবাদমাধ্যমের সামনে বেশ আশ্বস্ত গলায় বলেছেন, শিক্ষামন্ত্রীর উপস্থিতিতে নাকি এসএসসি জানিয়েছে যে যোগ্য আর অযোগ্যের আলাদা তালিকা তৈরি করা ইতিমধ্যেই শুরু হয়ে গেছে। ২১ এপ্রিল নাগাদ প্রকাশও করা হতে পারে।

এখন কথা হল, ব্যাপারটা যদি এতই জলভাত হয়, তাহলে এতদিন এসএসসি এই তালিকা তৈরি করেনি কেন আদালত বারবার বলা সত্ত্বেও? এখনই বা কিসের ভিত্তিতে বলা হচ্ছে তালিকা তৈরি করে দেওয়া হবে? এর উত্তরে চাকরিহারাদের মুখপাত্ররা জানিয়েছেন যে, ওএমআর শিটের ‘মিরর ইমেজ’ এসএসসির কাছে না থাকলেও তাঁরা সিবিআইয়ের আদালতে দাখিল করা মিরর ইমেজকেই ‘সার্টিফাই’ করতে রাজি। সেই ২২ লক্ষ ‘মিরর ইমেজ’ থেকেই জানা যাবে কে যোগ্য আর কে অযোগ্য।

কিমাশ্চর্যম তৎপরম! সিবিআইয়ের দেওয়া ওই প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও তো সুপ্রিম কোর্ট গোটা প্যানেল বাতিল করার রায় দিয়েছে। কেন দিয়েছে? কারণ রায়ের ৩৮ নম্বর অনুচ্ছেদে উল্লেখ করা হয়েছে যে ‘টেইন্টেড ক্যান্ডিডেট’-দের আইনজীবী বলেছেন – ওএমআর শিটের স্ক্যানড কপি বা ‘মিরর ইমেজ’-কে প্রমাণ হিসাবে ধরে তাঁদের শাস্তি দেওয়া উচিত নয়। কারণ ওগুলো তাঁরা যে শিটে পরীক্ষা দিয়েছিলেন সেই শিট নয়। আদালত তাঁদের আপত্তি উড়িয়েও দেয়নি। কেন দেয়নি তার ব্যাখ্যা পরের কয়েকটা অনুচ্ছেদে রয়েছে। নিচে দেখুন:

‘টেইন্টেড ক্যান্ডিডেট’-দের কথা সত্যি না মিথ্যে, তা পরীক্ষা করার কোনো উপায় ছিল না, আজও নেই। কারণ ওএমআর শিটগুলো তো নষ্ট করে ফেলা হয়েছে, যা এসএসসি আদালতে স্বীকার করেছে। তাহলে এখন যদি ওই মিরর ইমেজগুলোকে যোগ্যতার প্রমাণ হিসাবে দাখিল করা হয়, তা কি সকলে মেনে নেবেন? অবশ্য হিন্দিতে বলা হয় – মিঞা বিবি রাজি হলে কাজির কিছু করার থাকে না। তাই এখানেই থেমে যাই। নইলে কে আবার বলবে – আমারও কোনো দুরভিসন্ধি আছে, আমিও চাই না চাকরিহারারা চাকরি ফিরে পান।

পশ্চিমবঙ্গ বড় শক্ত ঠাঁই।

নাগরিক ডট নেট ওয়েবসাইটে প্রকাশিত

কুণাল, যাঁর কৌতুক আজ কামড়ায়

‘পরেরবার যদি রাজনৈতিক কৌতুক করি, তাহলে এত ব্যাকফুটে থাকার দরকার নেই। সোজা মোদী, অমিত শাহ, আম্বানি, আদানি – যা প্রাণে চায় বলে দেওয়াই ভাল। কারণ যা-ই করো, গালি তো খেতেই হবে। সুতরাং অল আউট খেলাই ভাল। অত ভাবার দরকার নেই যে লোকে অমুক জোকের যুক্তিটা নিয়ে বলবে…ইন্টারনেটে দুই ধরনের লোক আছে। এক ধরনের লোক শাসক দলের ভক্ত, আরেক ধরনের লোক শাসক দলকে রীতিমত ঘৃণা করে। অতএব…আমাকে অনেকেই বলেছে, এত ফেন্স সিটিং করছ কেন? সুতরাং ঠিক করে নিয়েছি…সেরা কমেডি হয় ক্ষমতার বিরুদ্ধে কথা বললে, তাই না? পাঞ্চ ডাউন করার চেয়ে পাঞ্চ আপ করা ভাল, আর সেটা যদি করতেই হয় তাহলে পাঞ্চটা জোরে মারাই ভাল। সুতরাং এখন যদি আমি রাজনৈতিক কৌতুক করি, তাহলে সেটা অনেক বেশি তীক্ষ্ণ হবে।’

গাম্ভীর্য নির্বোধের মুখোশ। কথাটা অনেককাল আগে বলেছিলেন এক মাস্টারমশাই। মোটেই বিশ্বাস করিনি, কারণ ততদিনে একাধিক জায়গা থেকে জেনেছি যে রাজশেখর বসু অত সরস সব গল্প লিখলেও, খুব গম্ভীর মানুষ ছিলেন। তারাপদ রায়ের সঙ্গে আলাপ ছিল এরকম একজনের মুখ থেকেও একইরকম কথা শুনেছিলাম। কিন্তু মাস্টারমশাই যে নেহাত ভুল বলেননি তার প্রমাণ গত কয়েক দিনে পাওয়া গেছে। ঋজু বিদূষক কুণাল কামরার কমেডি শো যে হলে হয়েছিল, মুম্বইয়ের সেই দ্য হ্যাবিট্যাট -এর মালিক আর কর্মচারীদের জিজ্ঞেস করলে তাঁরা নির্ঘাত বলবেন – হাড়ে হাড়ে টের পাওয়া গেছে। তবে নির্বোধ মানেই কিন্তু নিরীহ নয়। সুকুমার রায়ের রামগরুড়ের ছানাদের হাসতে মানা; একনাথ শিন্ডে, দেবেন্দ্র ফড়নবীশের দলবল আরও এককাঠি সরেস। তারা নিজেরা না হেসেই খুশি নয়, অন্যদেরও হাসতে মানা করে ভাংচুর করে।

অবশ্য এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। হাসাহাসি করলে ফ্যাসিবাদী হওয়া যায় না। তাছাড়া শিবসেনার জন্মই হয়েছিল ঠ্যাঙাড়ে বাহিনি হিসাবে, মুম্বই ও সংলগ্ন শিল্পাঞ্চলে অত্যন্ত শক্তিশালী বামপন্থী ট্রেড ইউনিয়নগুলোকে ভাঙার জন্যে (দুর্জনে বলে কংগ্রেসের উদ্যোগে)। কুণাল কামরার কমেডি শো নিয়ে শিবসেনার গুন্ডামি দেখে অনেকে খেয়াল করিয়ে দিচ্ছেন, শিবসেনার আদিপুরুষ বালাসাহেব ঠাকরে নিজে কার্টুনিস্ট ছিলেন, ইন্দিরা গান্ধীর ব্যঙ্গচিত্রও এঁকেছেন ইত্যাদি। কিন্তু ওসব কথা বলে লাভ নেই। বাল ঠাকরে শিবসেনার নেতা হিসাবে মোটেই কোনো গণতান্ত্রিক ব্যক্তি ছিলেন না। শিবসেনা কীভাবে মুম্বই চালাত সেকথা সে যুগের মুম্বই তথা মহারাষ্ট্রের বাসিন্দারা প্রত্যেকেই জানেন। নয়ের দশকের মুম্বই দাঙ্গায় শিবসেনার ভূমিকাও কোনো গোপন তথ্য নয়। আজ যে সারা ভারতে সুনির্দিষ্ট পরধর্মবিদ্বেষী এবং/অথবা পরজাতিবিদ্বেষী গুন্ডামি চালু করেছে সংঘ পরিবার, তার সূচনা অনেক আগেই বালাসাহেব করে দিয়েছিলেন মহারাষ্ট্রে। মুসলমান তো বটেই, সেইসময় শিবসেনার আক্রমণের বড় লক্ষ্য ছিলেন দক্ষিণ ভারতীয় শ্রমজীবী মানুষজন। ফলে কুণালের শো নিয়ে গুন্ডামি করে এক অর্থে একনাথরা প্রমাণ করে দিলেন যে তাঁরাই বাল ঠাকরের যথার্থ উত্তরাধিকারী, উদ্ধব ঠাকরেরা নন। চলচ্চিত্র পরিচালক হনসল মেহতা ২৪ মার্চ তাঁর এক্স হ্যান্ডেলে এক পোস্টে মনে করিয়ে দিয়েছেন যে আজ থেকে ২৫ বছর আগে তাঁর একখানা ছবির একটামাত্র সংলাপের জন্যে শিবসৈনিকরা তাঁর অফিসে ঢুকে তাণ্ডব চালিয়েছিল। তাঁকে মারধোর করা হয়, মুখে কালি লেপে দেওয়া হয়, তারপর জনা বিশেক রাজনৈতিক নেতা এবং হাজার দশেক লোকের সামনে এক বৃদ্ধার পা ধরে ক্ষমা চাওয়ানো হয়। মুম্বই পুলিস দ্য হ্যাবিট্যাট ভাংচুরে দর্শকের ভূমিকা পালন করেছে, সেদিনও তাই করেছিল। শিবসেনা কেমনভাবে চলত তা বোঝার জন্যে একথাও মনে করা দরকার যে বালাসাহেব ঠাকরের মৃত্যুর পর গোটা মহারাষ্ট্রে প্রায় বনধ করে দেওয়ার সমালোচনা করে সোশাল মিডিয়ায় পোস্ট করার জন্যে শিবসৈনিকরা পালঘরের দুই নিরীহ মেয়ের পিছনে লেগেছিল। তাদের পুলিস গ্রেফতার করে এবং একজনের আত্মীয়ের দোকান ভাংচুর করে শিবসৈনিকরা।

তবুও এবারের ঘটনা আর বাল ঠাকরের আমলের বিবিধ গুন্ডামিতে বিলক্ষণ তফাত আছে। তখন শিবসেনা ছিল রাষ্ট্রকেও তোয়াক্কা না করা অথবা রাষ্ট্রশক্তিকে নিজের ইচ্ছা মত চলতে বাধ্য করা শক্তি। আজ একনাথের শিবসেনা রাষ্ট্রের অংশ। স্রেফ তাঁর চ্যালাদের গুন্ডামিতে ব্যাপারটা থেমে থাকেনি, খোদ বৃহন্মুম্বই মিউনিসিপাল কর্পোরেশনের আধিকারিকরা গিয়ে দ্য হ্যাবিট্যাট ভেঙে এসেছেন। উপরন্তু মহারাষ্ট্রের মুখ্যমন্ত্রী ফড়নবীশ বলেছেন, কুণালকে ক্ষমা চাইতে হবে। তিনি যা খুশি তাই বলতে পারেন না। বাকস্বাধীনতার সীমা আছে ইত্যাদি। বালাসাহেব আইনের পথে যেতেন না, নিজের পথ নিজে কেটে নিতেন। কুণালের বিরুদ্ধে কিন্তু একাধিক এফআইআর ফাইল করা হয়েছে। যারা দ্য হ্যাবিট্যাট ভেঙে দিয়ে এসেছে, তারাই থানায় গিয়ে এফআইআর করেছে কুণালের নামে। অথচ তাদের বিরুদ্ধে কোনো মামলা মোকদ্দমা হওয়ার খবর নেই এখন পর্যন্ত। এখানেই সাধারণ গুন্ডামি আর ফ্যাসিবাদী হিংসার তফাত। এর বিরুদ্ধে শিরদাঁড়া সোজা করে দাঁড়াতে গেলে দুটো জিনিস অবশ্য প্রয়োজনীয় – সাহস আর কৌশল। কুণালের দুটোই আছে। কীরকম? দেখা যাক।

নায়কোচিত সাহস

দ্য হ্যাবিট্যাটের শোয়ের পর থেকে যা যা ঘটেছে তাতে কুণাল নায়ক হয়ে গেছেন – এতে অনেক আরএসএসবিরোধীকেও অসন্তুষ্ট হতে দেখছি। তাঁদের মধ্যে কারোর নায়ক ব্যাপারটাতেই আপত্তি, কারোর আবার আপত্তি কুণাল শোয়ের শেষে ভারতের সংবিধান তুলে ধরে নিজের অধিকারের কথা জানান দিয়েছিলেন বলে। আজ দেশের যা অবস্থা, সুপ্রিম কোর্টের আদেশেরও তোয়াক্কা না করে যেভাবে সংঘবিরোধীদের বাড়িঘর দোকানপাট বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়া চলছে, অপছন্দের লোক হলেই যা ইচ্ছা অভিযোগ দায়ের করে কারাবন্দি করে রাখা চলছে – তাতে কুণালের মত প্রকাশ্যে নাম করে ক্ষমতাসীন লোকেদের নিয়ে যিনি খিল্লি করবেন তিনি তো বহু মানুষের চোখে নায়ক হয়ে যাবেনই। আটকাবেন কী করে? আটকাতে হবেই বা কেন? পৃথিবীর কোন দেশে কোন বিদ্রোহ, কোন বিপ্লব আবার নায়ক ছাড়া হয়েছে? আমাদের স্বাধীনতা আন্দোলনেও তো অনেক নায়ক। সকলে আবার একই মত, একই পথেরও নন। ক্ষুদিরাম বসু নায়ক, মাস্টারদা সূর্য সেন নায়ক, ভগৎ সিং নায়ক, নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু নায়ক; আবার জওহরলাল নেহরু, মৌলানা আবুল কালাম আজাদ, মহাত্মা গান্ধীও নায়ক। শিল্পী সাহিত্যিকদের মধ্যে কাজী নজরুল ইসলাম নায়ক, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় নায়ক, আবার পীতাম্বর দাসও নায়ক। তাঁর নাম আজ প্রায় কারোর মনে নেই, কিন্তু তাঁর রচনা করা ‘একবার বিদায় দে মা ঘুরে আসি’ গানটা রয়ে গেছে। একটা সময় পর্যন্ত অল্লামা ইকবালও আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামের নায়ক ছিলেন। উর্দু, হিন্দি ভাষা নিয়ে অ্যালার্জি না থাকলে ‘সারে জহাঁ সে অচ্ছা’ গানটা আজও যে কোনো দেশপ্রেমিক মানুষের প্রিয় হবে, দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের ‘ধনধান্য পুষ্প ভরা’-র মতই। এঁরাও সকলে এক মতের লোক নন। যিনি আমার লড়াইটাই লড়ছেন কিন্তু একই মতের লোক নন, তাঁর সাহসকে সেলাম জানাতে না পারলে আমারই ক্ষুদ্রতা প্রকাশ পায়। তাঁর নয়।

রইল সংবিধানের কথা। পৃথিবীর কোনো সংবিধান নিখুঁত নয়, ভারতের সংবিধানও নয়। আবার যে কোনো দেশের সংবিধান খুললেই দেখা যায় অনেক ভাল ভাল কথা লেখা আছে যার প্রয়োগ নেই। কথাটা ভারতের সংবিধানের ক্ষেত্রেও সত্যি। সংবিধান প্রণেতাদের অন্যতম, বাবাসাহেব ভীমরাও আম্বেদকর, নিজেই সংবিধান সভার শেষ অধিবেশনে বলেছিলেন যে সংবিধানে সমতাবিধান করা হল, কিন্তু ভারতের সমাজ রইল অসাম্যে পরিপূর্ণ। এভাবে কতদিন ভারতে গণতন্ত্র টিকবে তা নিয়ে তিনি পরেও বারবার সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। কিন্তু ভারতের বহু মানুষ যে এই সংবিধানের দ্বারা নানা মাত্রায় উপকৃত হয়েছে তা অস্বীকার করার উপায় নেই। ঠিক যেমন অনস্বীকার্য যে অনেক মানুষের উপর নিপীড়ন চালানো হয়েছে এবং হচ্ছে এই সংবিধানকে হাতিয়ার করেই। তা বলে যে কোটি কোটি ভারতীয় সংবিধানের উপর আস্থা রাখেন, ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে আজকের লড়াইয়ে সংবিধানকে নিজের অস্ত্র মনে করছেন তাঁদের বিরুদ্ধ পক্ষ বলে মনে করা বা তাঁদের দিকেই বাক্যবাণ ছোড়া এককথায় নির্বুদ্ধিতা। ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে নানা জন নানাভাবে লড়বে, যার যতটুকু ক্ষমতা সে ততটুকুই দিয়েই লড়বে। কেউ লোক হাসিয়ে লড়বে, কেউ গান গেয়ে লড়বে, কেউ লিখে লড়বে, কেউ রাস্তায় মিছিল, মিটিং করে লড়বে, কেউ আইনি লড়াই করবে। এখন ‘এই সংবিধান মানি না’ বলার সময় নয়, কারণ এখন যুদ্ধটা সংবিধানের বিরুদ্ধে নয়। এটুকু বুঝতে খুব অসুবিধা হওয়ার কথা নয়, যদি আপনার সোশাল মিডিয়ার বাইরে একটা সত্যিকারের লড়াই থাকে।

উপযুক্ত কৌশল

কুণালকে মুম্বই থেকে ফোনে হুমকি দিচ্ছে কিছু লোক আর কুণাল তাদের বলছেন ‘আ যা তামিলনাড়ু’ – এমন একটা অডিও ক্লিপ ভাইরাল হয়েছে। অনেক খবরের চ্যানেলেও শোনানো হয়েছে। এটা ভুয়ো বলে এখন পর্যন্ত জানা যায়নি আর ঘটনা হল, মুম্বইয়ের বাসিন্দা কুণাল কয়েক বছর হল তামিলনাড়ুতে থাকতে শুরু করেছেন। ফলে তিনি যে হলে শো করেছিলেন সেখানে ভাংচুর চালাতে পারলেও একনাথের ভক্তরা কুণালকে শারীরিকভাবে আক্রমণ করতে পারেনি। পারলে কী করত তা অনুমান করাও অসম্ভব। স্রেফ হনসলের হাল করে ছেড়ে দিত – একথা আজকের ভারতে নিশ্চিত করে বলা যায় না। মনে রাখতে হবে, বিনা বিচারে উমর খালিদকে বছরের পর বছর আটক করে রাখার আগে তাঁর দিকে গুলি চালানো হয়েছিল। কুণাল মুসলমান নন বলে তেমন সম্ভাবনা নেই – এরকম যাঁরা ভাবেন তাঁরা হয়ত ২০২০ সালে জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের মেয়েদের হোস্টেলে হামলার কথা ভুলে গেছেন। কুণাল অবশ্যই ভোলেননি। উপরন্তু অন্য এক বিদূষক মুনাওয়ার ফারুকীর শো যখন ২০২১ সালে ইন্দোরে বলপূর্বক বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল এবং যে কৌতুক তিনি করেননি তার জন্যে কারারুদ্ধ করা হয়েছিল, তখন যে বিদূষকরা মুনাওয়ারের হয়ে লড়াই লড়েছিলেন, কুণাল তাঁদের একজন। ফলে বুঝতে অসুবিধা হয় না যে কুণাল সচেতনভাবেই এমন এক রাজ্যে চলে গেছেন যে রাজ্যের সরকার সংঘ পরিবারের সঙ্গে আদর্শগত লড়াইয়ে লিপ্ত, অত্যন্ত আক্রমণাত্মক। শুধু তাই নয়, অদূর ভবিষ্যতে এম কে স্ট্যালিনের নেতৃত্বাধীন ডিএমকে ক্ষমতাচ্যুত হলেও বিজেপির তামিলনাড়ুতে ক্ষমতায় আসার কোনো সম্ভাবনা নেই (পশ্চিমবঙ্গে কিন্তু আছে)। তামিলনাড়ুতে সংঘ পরিবারের বিরুদ্ধে সামাজিক-সাংস্কৃতিক প্রতিরোধ এত তীব্র যে সম্প্রতি কেন্দ্রের তিন ভাষা নীতি নিয়ে বিতর্কের আবহে সেখানকার বিজেপি নেত্রী রঞ্জনা নাচিয়ার পার্টি থেকে পদত্যাগ করেছেন

মুম্বইতে দাঁড়িয়ে নাম করে নরেন্দ্র মোদী, অমিত শাহ, ফড়নবীশ, মুকেশ আম্বানি, তাঁর ছেলে, আনন্দ মাহিন্দ্রা, এবং নাম না করে একনাথকে নিয়ে মস্করা করার সাহসের পিছনে যে কুণাল যে রাজ্যে থাকেন তার নিরাপত্তা কাজ করেছে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু ব্যাপারটার মধ্যে কৌশল আছে বলে কুণালের সাহসকে এক বিন্দুও ছোট করা যায় না। কারণ সাম্প্রতিক অতীতে বিজেপিশাসিত রাজ্যে অভিযোগ দায়ের করে অন্য রাজ্যের লোককে গ্রেফতার করার দৃষ্টান্ত বিরল নয়। আসাম পুলিস ২০২০ সাল থেকে তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী সর্বানন্দ সোনোয়ালের নির্দেশে গর্গ চ্যাটার্জিকে গ্রেফতার করতে চাইছিল। কলকাতা পুলিস নাকি সহযোগিতা করছিল না। শেষমেশ ২০২২ সালে গৌহাটি হাইকোর্ট কলকাতার পুলিস কমিশনারকে গর্গবাবুকে গ্রেফতার করার নির্দেশ দেয়, কলকাতা পুলিসকে সে নির্দেশ মানতেই হয়। গুজরাটের বিধায়ক জিগ্নেশ মেওয়ানিকেও আসাম পুলিস গ্রেফতার করে নিয়ে গিয়েছিল। অবশ্যই গুজরাট সরকার বিজেপির হওয়ায় সুবিধা হয়েছিল। কংগ্রেস নেতা পবন খেরাকে তো স্রেফ প্রধানমন্ত্রীকে ‘নরেন্দ্র গৌতমদাস মোদী’ বলার জন্যে দিল্লি বিমানবন্দরে বিমান থেকে নামিয়ে গ্রেফতার করেছিল আসাম পুলিস। তবে সুপ্রিম কোর্টের হস্তক্ষেপে তিনি কয়েক ঘন্টার মধ্যেই জামিন পেয়ে যান।

একথা ঠিক যে কুণালের এখন যেরকম নাম হয়েছে তাতে তাঁকে গ্রেফতার করা হলে প্রশান্ত ভূষণ বা ইন্দিরা জয়সিংয়ের মত দেশের সবচেয়ে নামকরা আইনজীবীরা হয়ত তাঁর হয়ে লড়বেন। তবে মনে রাখতে হবে, কুণাল কিন্তু গর্গ, জিগ্নেশ বা পবনের মত সক্রিয় রাজনীতির লোক নন। তাঁর কাছে গ্রেফতার হওয়া অতখানি জলভাত ব্যাপার না হওয়ারই কথা। আরও বড় কথা হল, কুণাল সুপ্রিম কোর্টকে আগে থেকেই চটিয়ে রেখেছেন। ২০২১ সালে তিনি সুপ্রিম কোর্ট যে দ্রুততায় অর্ণব গোস্বামীর জামিন মঞ্জুর করেছিল, তাকে ব্যঙ্গ করে একগুচ্ছ টুইট করেন। তার জন্যে তাঁর নামে সুপ্রিম কোর্টে মামলা করে কিছু লোক, বিচারপতিরাও আদালত অবমাননার নোটিস পাঠান। কুণাল তার যে জবাব দিয়েছিলেন তাও একই সঙ্গে সাহস ও রসবোধের নিদর্শন। মোদ্দা কথা, তিনি বিচারপতিদের সামনেও মাথা নোয়াননি। শুধু কি তাই? নিজের এক শোয়ে সুপ্রিম কোর্টকে ‘ব্রাহ্মণ-বানিয়া অ্যাফেয়ার’ পর্যন্ত বলে বসে আছেন। এমন লোকের উপর কি আর বিচারপতিরা সদয় হবেন?

কুণালের পরিবর্তন

কুণাল ঋজু বিদূষক হিসাবে কাজ করছেন বছর দশেক হতে চলল। কিন্তু তিনি কি বরাবর এতটা রাজনৈতিক, এত প্রতিবাদী, এতখানি সাহসী ছিলেন? উত্তর হল – না। ২০১৬-১৭ সালে কুণালের যে ভিডিও প্রথম ভাইরাল হয় এবং তাঁর নাম ছড়িয়ে পড়ে, তার নাম ছিল প্যাট্রিয়টিজম অ্যান্ড দ্য গভমেন্ট

এখানে তিনি যেসব কৌতুক করছেন সেগুলোও রাজনৈতিক। তিনি সেইসময় যা যা নিয়ে সর্বত্র আলোচনা হত, যেমন নোটবন্দি, জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয় – সব নিয়েই কথা বলছেন। কিন্তু তাতে আরও নানারকম কৌতুক মিশে আছে। তিনি সমাজের নানা ধরনের লোককে নিয়ে মজা করছেন, সোশাল মিডিয়া ট্রেন্ডগুলো নিয়ে কথা বলছেন, নেটফ্লিক্স নিয়ে মজা করছেন। তখন তাঁর মতে সরকার ছিল ভোডাফোনের মত ‘সার্ভিস প্রোভাইডার’, আর নাগরিক উপভোক্তা। এরপর ২০১৭ সালে তাঁর যে শোয়ের ভিডিও ইউটিউবে আপলোড হয়, সেখানে কুণাল মূলত ট্যাক্সিচালকদের নিয়ে মজা করেন। বিশেষত উবের ড্রাইভারদের নিয়ে। বলেন যে উবের একটা ভাল অ্যাপ কিন্তু ভারতে সেটা কাজ করে না, কারণ এখানকার ড্রাইভাররা ওই অ্যাপের নিয়ম অনুযায়ী চলতে চান না। ২০১৮ সালে দেশ কে বুডঢে ভিডিও। এটাও রাজনৈতিক এবং বিজেপিবিরোধী। কিন্তু ব্যঙ্গের চাঁদমারি বৃদ্ধ দক্ষিণপন্থীরা।

তারপরের ভিডিও আবার অনেকটা অরাজনৈতিক। সেখানে কুণাল মূলত মুম্বই আর ইন্দোর – এই দুই শহরের নানা গোলমালকে ব্যবহার করে হাস্যরস উৎপাদন করেন। এসবের পাশাপাশি চলছিল তাঁর পডকাস্ট শাট আপ ইয়া কুণাল, যেখানে তিনি উমর খালিদ আর কানহাইয়া কুমারের সাক্ষাৎকার নেন। আবার বিজেপি নেতাদেরও সাক্ষাৎকার নেন। কিন্তু এই ২০১৮ সালে কুণালের মধ্যে একটা পরিবর্তন লক্ষ করা যায়। অ্যাবিশ ম্যাথিউ নামে একজন ঋজু বিদূষক আছেন যিনি কুণালের মত অতটা জনপ্রিয় নন। তাঁর ইউটিউব চ্যানেলে তিনি জার্নি অফ আ জোক নামে একখানা পডকাস্ট করেন। সেই পডকাস্টের এক পর্বে কুণাল আসেন সেবছর। সেখানে অ্যাবিশ কুণালের থেকে জানছিলেন প্যাট্রিয়টিজম অ্যান্ড দ্য গভমেন্ট শোয়ের কৌতুকগুলো কীভাবে তৈরি করা হয়েছিল। পর্বের শেষদিকে অ্যাবিশ জিজ্ঞেস করেন, ওই ভিডিওর যে প্রতিক্রিয়া হয়েছে তা থেকে কুণাল কী শিখলেন? উত্তরে কুণাল বলেন ‘পরেরবার যদি রাজনৈতিক কৌতুক করি, তাহলে এত ব্যাকফুটে থাকার দরকার নেই। সোজা মোদী, অমিত শাহ, আম্বানি, আদানি – যা প্রাণে চায় বলে দেওয়াই ভাল। কারণ যা-ই করো, গালি তো খেতেই হবে। সুতরাং অল আউট খেলাই ভাল। অত ভাবার দরকার নেই যে লোকে অমুক জোকের যুক্তিটা নিয়ে বলবে…ইন্টারনেটে দুই ধরনের লোক আছে। এক ধরনের লোক শাসক দলের ভক্ত, আরেক ধরনের লোক শাসক দলকে রীতিমত ঘৃণা করে। অতএব…আমাকে অনেকেই বলেছে, এত ফেন্স সিটিং করছ কেন? সুতরাং ঠিক করে নিয়েছি…সেরা কমেডি হয় ক্ষমতার বিরুদ্ধে কথা বললে, তাই না? পাঞ্চ ডাউন করার চেয়ে পাঞ্চ আপ করা ভাল, আর সেটা যদি করতেই হয় তাহলে পাঞ্চটা জোরে মারাই ভাল। সুতরাং এখন যদি আমি রাজনৈতিক কৌতুক করি, তাহলে সেটা অনেক বেশি তীক্ষ্ণ হবে।’

আজকের কুণালের দিকে সেদিনের কুণালের যাত্রা শুরু তখন থেকে। ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনের আগে তাঁর যে ভিডিও আপলোড হয় সেখানে কুণাল এসে দাঁড়ান একখানা কালো টি শার্ট পরে, যার উপর বড় বড় অক্ষরে লেখা WAH MODIJI WAH। মঞ্চে এসেই তিনি দর্শকদের জিজ্ঞেস করেন ‘আমার আর আম্বানিজির মধ্যে মোদীজি কী করছেন? আমি সোজা আম্বানিকে কেন ভোট দিতে পারি না?’ হাসাহাসির মধ্যে দিয়ে কুণাল একবিংশ শতকের বিশ্ব রাজনীতির এক নিদারুণ সত্য উদ্ঘাটন করে ফেলেন – আজকের রাজনীতিকে চালায় আসলে বড় বড় কর্পোরেশনগুলো। তখনো কিন্তু মোদীর সঙ্গে আম্বানি, গৌতম আদানির সম্পর্ক নিয়ে রাহুল গান্ধী সরব হননি। ডোনাল্ড ট্রাম্পের হয়ে ইলন মাস্কের লম্ফঝম্প কোনোদিন দেখতে হবে – একথাও কেউ কল্পনা করেনি। অথচ কুণাল বলেন ‘আমার মনে হয় কর্পোরেশনগুলোরই ভোটে লড়া উচিত। রতন টাটা বনাম মুকেশ আম্বানি। লড়ো ২০১৯।’ এই কৌতুককে এগিয়ে নিতে নিতেও কুণাল আমাদের এক বুনিয়াদি বিতর্কের দিকে নিয়ে যান। সেটা হল – উন্নয়ন বা বিকাশ মানে কী?

নয়া উদারনীতিবাদ আমাদের এমন মাথা খেয়েছে, এটা যে বিতর্কের বিষয় তা এদেশের মার্কসবাদের নামে শপথ নেওয়া অনেক পার্টিও এই সহস্রাব্দে ভুলেই গেছে। লক্ষ করুন, যে কুণাল আগে সরকারকে ভোডাফোনের মত একটা কোম্পানি বলেই আখ্যা দিতেন, তিনি বছর তিনেক পরেই কর্পোরেশনগুলোর মুখোশ খুলছেন হাসাতে হাসাতে। পরের পাঁচ বছরে কুণাল কী কী করলেন? একদা উবের ড্রাইভারদের আচরণ নিয়ে কৌতুক করা মানুষটি গিগ শ্রমিকদের নিয়ে তৈরি গানের ভিডিও শেয়ার করলেন নিজের ইউটিউব চ্যানেলে। দেশের গোদি মিডিয়ার মুকুটহীন সম্রাট এবং জাতীয়তাবাদের ধ্বজাধারী সাংবাদিক অর্ণবের যে নিজের স্টুডিওর স্বাচ্ছন্দ্যের বাইরে এলে গলা দিয়ে আওয়াজ বেরোয় না তা ফাঁস করে দিলেন বিস্তর ঝামেলার ঝুঁকি নিয়েও। উমর, শার্জিল ইমামের মত রাজনৈতিক বন্দিদের মুক্তির দাবিতে সভায় বক্তৃতা দিলেন। হাস্যকৌতুকের ভিডিওগুলোতেও কৃষক আন্দোলনের প্রতি সহমর্মিতা দেখালেন, পডকাস্টে পি সাইনাথের মত লোককে ডেকে আনলেন। ২০২৪ লোকসভা নির্বাচনের সময়ে পুরোদস্তুর সাংবাদিকসুলভ অধ্যবসায়ে পর্বের পর পর্বে সরকারের রিপোর্ট কার্ড বার করলেন। অতঃপর এই সাম্প্রতিকতম ভিডিও, যা মহারাষ্ট্রের বিধানসভা নির্বাচনে বিরোধীদের ভরাডুবির পর সারা দেশে ঝুলে পড়া অনেক কাঁধকে মাথা তোলার সাহস দিল।

এই ভিডিওতে কুণাল যাদের আক্রমণ করেছেন তারা বুদ্ধিমানের মত, অতি ক্ষুদ্র এক ব্যক্তি, যার নামও নেওয়া হয়নি, তাকে অপমান করা হয়েছে অভিযোগ করে হল্লা করছে। সেই হল্লায় বিরোধী পক্ষের অনেকেও ভুলছেন। তাঁরা খেয়াল করছেন না, ভারতের কোনো রাজনৈতিক নেতা এখনো যা বলেননি কুণাল প্রথমবার সেটাই বলে দিয়েছেন এই ভিডিওতে। দেশের কমিউনিস্টরা পর্যন্ত যখন ফ্যাসিবাদী শাসন চলছে না নয়া ফ্যাসিবাদী – তা নিয়ে তাত্ত্বিক তর্কে মেতে আছেন, তখন এই বিদূষক শাহরুখ খান অভিনীত বাদশা ছবির টাইটেল সংটার প্যারডি বানিয়ে মোদীকে ‘তানাশাহ’ (একনায়ক) বলে দিয়েছেন। ওঁদের লেগেছে তো আসলে ওইখানে। আজকের দিনে গণতান্ত্রিক ভড়ংটা বজায় রাখতে সব একনায়কই চায়। রচপ তায়িপ এর্দোগান, ভ্লাদিমির পুতিনও সর্বক্ষণ প্রমাণ করার চেষ্টা করেন যে তাঁদের দেশে গণতন্ত্র চলছে। মোদীও ব্যতিক্রম নন। সেখানে একজন লোক হাসানোর লোক যদি সরাসরি একনায়ক শব্দটা উচ্চারণ করে ফেলে, তা হজম করা শক্ত। হাসিকে ভয় পায় না এমন কোনো একনায়ক হয় না। কারণ মানুষের উপর তাদের নিয়ন্ত্রণ বজায় থাকে ভয়ের কারণে, আর হাসি একনায়ককে খিল্লির পাত্র করে ফেলে। তাতে ভয় কেটে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। কোনো বিরোধী নেতার মুখ থেকে এই শব্দ বেরোলে খুব বেশি লোক পাত্তা না-ও দিতে পারে। কারণ একে তো অনেকে রাজনৈতিক বক্তৃতা শোনে না, তার উপর বিরোধীরা তো ক্ষমতাসীনের নামে দু-চারটে খারাপ কথা বলবেই। কিন্তু যে লোক হাসায় তার কথা স্রেফ রাগ করার জন্যেও অনেকে শোনে। ফলে কুণালের এই ভিডিও এক মূর্তিমান বিপদ। বিজেপি আই টি সেল ইতিমধ্যেই নেমে পড়েছে কুণালের পিছনে ডীপ স্টেটের ভূমিকা আছে, মার্কসবাদীদের টাকায় কুণাল চলেন – এইসব বলে পরিস্থিতি সামলাতে। মহারাষ্ট্র পুলিস কুণালের মুম্বইয়ের বাড়িতে গিয়ে, তিনি কাদের থেকে টাকাপয়সা পেয়েছেন তা নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করার জন্য তাঁর বাবা-মায়ের কাছে শমনও দিয়ে এসেছে। মজা হল, যত এসব করা হচ্ছে তত কুণালের কৌতুকগুলোর শক্তি বেড়ে যাচ্ছে। কারণ কুণাল বহুদিন আগে থেকে নিজেই হাসি হাসি মুখে বলে থাকেন ‘কমিউনিস্ট পার্টি অফ ইন্ডিয়া নে বহত প্যায়সে দিয়ে হ্যাঁয় মেরে কো’।

একটা কথা না বলে এ আলোচনা শেষ করতে পারছি না।

ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে নিজেদের অগ্রণী সৈনিক ভাবার এক অকারণ অভ্যাস বাঙালিদের আছে। সংঘ পরিবারের গোটা ভারতের উপর হিন্দি চাপিয়ে দেওয়ার আবহে এখন আরও বেশি করে পশ্চিমবঙ্গে বেশকিছু বাংলাবাদীর উদ্ভব হয়েছে। তাঁদের অনেকে অনাবাসী ভারতীয় হয়ে বাঙালি জাতীয়তাবাদের স্বপ্ন বিক্রি করেন সোশাল মিডিয়ায়, অবিভক্ত বাংলা আলাদা রাষ্ট্র হলে কী হত না হত তা নিয়ে বাষ্পাকুল হয়ে পড়েন। অনেকে আবার পশ্চিমবঙ্গে থেকেই নিজের ছেলেমেয়েকে ইংরিজি মাধ্যম স্কুলে দ্বিতীয় ভাষা হিসাবে হিন্দি পড়িয়ে বাংলার সংস্কৃতি বাঁচাতে ব্যাকুল। কুণালের মত হিন্দিভাষীদের কাজের প্রশংসা করলেই তাঁরা ভীষণ রেগে যান। কিন্তু কী করা যাবে? বাংলায় একজনও যে আজ পর্যন্ত হিন্দিভাষী রবীশ কুমার বা কুণালের মত ঋজু হয়ে দাঁড়াতে পারলেন না ফ্যাসিবাদের সামনে। না কোনো সাংবাদিক, না কোনো ঋজু বিদূষক, না কোনো গায়ক, না কোনো কবি। সারা ভারতে জনপ্রিয় হওয়ার কথা বলছি না। তার জন্যে অবশ্যই কুণালরা হিন্দি, ইংরিজি ব্যবহার করার সুবিধা পান। কিন্তু বাংলা ভাষায় বাঙালিদের আলোড়িত করার মত আমির আজিজ সুলভ গনগনে একখানা কবিতা কোন কবি লিখেছেন মোদী সরকারের দশ বছরে? স্লোগান হয়ে ওঠা কবিতার আবশ্যিক গুণ নয়। কিন্তু বরুণ গ্রোভার রচিত ‘হম কাগজ নহি দিখায়েঙ্গে’ যেভাবে সারা দেশে স্লোগান হয়ে উঠেছিল, তেমন একখানা কবিতাই বা কে লিখেছেন বাংলায়? বাংলা ভাষার কোন সাংবাদিক (এমনকি বিকল্প মাধ্যমেরও) রবীশের মত লাগাতার লিখে যাচ্ছেন/বলে যাচ্ছেন কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে?

আরও পড়ুন হাসছি মোরা হাসছি দেখো: বীর দাসের বীরত্বে দুই ভারতের পর্দা ফাঁস

কেন্দ্রের সরকারের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর কথা বলছি, রাজ্য সরকারের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে বলছি না। কাজটা তো খুব কঠিন হওয়ার কথা নয়, কারণ কুণালের তামিলনাড়ুর মত পশ্চিমবঙ্গও তো বিজেপিবিরোধী দলের (অন্তত তাদের বয়ান অনুযায়ী) শাসনে থাকা রাজ্য। কুণালের পিছনে যদি স্ট্যালিনের বরাভয় থেকে থাকে, এখান থেকে তাঁর মত কেউ উঠে দাঁড়ালে তাঁর পিছনেও নিশ্চয়ই মমতা ব্যানার্জির বরাভয় থাকবে। তাহলে ভয় কিসের?

আসলে বোধহয় স্বীকার করে নেওয়া ভাল, আমাদের সে মুরোদ নেই। আমরা মুখেন (এবং ফেসবুকেন) মারিতং জগৎ। আমাদের রাজ্য সরকারও তাই। নইলে যে ডিলিমিটেশন হলে আমাদের সাড়ে সর্বনাশ, তার বিরুদ্ধে অবিজেপি মুখ্যমন্ত্রীদের বৈঠক ডাকলেন স্ট্যালিন, তাতে গেলেনই না আমাদের রাজ্য সরকারের কোনো প্রতিনিধি!

অতএব আমাদের হয়ে লড়বেও অন্যরাই। আমরা কেবল পায়ের উপর পা তুলে তাদের দোষ ধরে যাব, কেন তারা যথেষ্ট বিপ্লবী নয় তা লিখে সোশাল মিডিয়া ভরাব। যেমন এখন কুণাল সম্পর্কে ভরাচ্ছি।

নাগরিক ডট নেট ওয়েবসাইটে প্রকাশিত

পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতি: আর জি কর পেরিয়ে

২০১১ সালে পশ্চিমবঙ্গে মমতা ব্যানার্জির সরকার আসার পরে আর ২০১৪ সালে দিল্লিতে নরেন্দ্র মোদীর সরকার আসার পরে ভারতীয় রাজনীতিতে, সমাজে এবং সংবাদমাধ্যমে একটা নতুন কায়দা চালু হয়েছে। প্রশ্ন যা করার বিরোধীদের করা হয়, সরকারকে নয়। অথচ গণতন্ত্র মানে ঠিক উলটো। অন্তত ১৯৪৭ সাল থেকে ভারতে গণতন্ত্র মানে ছিল – প্রশ্ন সরকারকে করা হবে, আন্দোলন হবে সরকারের নীতির বিরুদ্ধে বা কাজের বিরুদ্ধে। সেটা উলটে গেছে। এখন সরকার অপকর্ম করলে সরকার আর সরকারি দলের সুরে সুর মিলিয়ে সংবাদমাধ্যম, এমনকি সাধারণ মানুষও ফিরিস্তি দেন – বিরোধীরা সরকারে থাকার সময়ে কী কী অপকর্ম করেছিল। বিজেপি এবং গোদি মিডিয়ার এই কাজটা করার জন্যে আছে দুটো হাতিয়ার – ‘নেহরু’ আর ‘কংগ্রেস কে ৬০ সাল’। তৃণমূল আর তাদের সোচ্চার ও নিরুচ্চার সমর্থকদের জন্যে আছে ‘বামফ্রন্টের ৩৪ বছর’। আপনি বলতেই পারেন, ‘বাপু, ওই কারণেই তো ওদের সরিয়ে তোমাদের ক্ষমতায় এনেছি। তোমাদের এতদিন হয়ে গেল সরকারে, তাও ওরা কবে কী করেছিল কেন শুনব?’ ওই ফাটা রেকর্ড কিন্তু বেজেই চলবে।

এবারের লোকসভা ভোটে দেশের মানুষ বিজেপির ফাটা রেকর্ড বাজানো অনেকটা বন্ধ করে দিয়েছেন। তার কৃতিত্ব খানিকটা অবশ্যই বিকল্প সংবাদমাধ্যম এবং সাংবাদিকদের। কিন্তু বেশিটাই দেশের বিরোধী দলগুলোর। কোনো সাংবাদিক বা বিকল্প সংবাদমাধ্যম, তাদের যত লক্ষ ফলোয়ারই থাকুক না কেন, যদি ভাবে রাজনৈতিক দলগুলোর কর্মীদের তুলনায় তারা বেশি পরিশ্রম করে বা সাধারণ মানুষ তাদের উপর বেশি নির্ভর করেন, তাহলে সেই সাংবাদিক বা ওয়েবসাইট মাটির সঙ্গে সম্পর্কহীন। রাজনীতির র-ও তারা বোঝে না। তবে তাদের অবদান অন্যূন নয়। ঘটনা হল, বিরোধীদের আন্দোলন করার মত একটা সুস্থ স্বাভাবিক গণতান্ত্রিক ব্যাপারকে ভারতে দশবছর ধরে অস্বাভাবিক, দেশবিরোধী বলে তুলে ধরা হত। ওটাই যে স্বাভাবিক, ওভাবেই যে সরকার বদলায় এবং ওভাবেই যে নরেন্দ্র মোদীও ক্ষমতায় এসেছিলেন, সেকথা মানুষকে ভুলিয়ে দেওয়া হয়েছিল। গত এক-দেড় বছরে মানুষের সেই মনোভাব অনেকটাই কেটেছে। আরএসএস-বিজেপি ও তাদের বশংবদ মিডিয়া, বিরোধীরা আন্দোলন করলেই তাকে নানাভাবে বদনাম করে আর পার পাচ্ছে না। মানুষের মানসিকতার এই পরিবর্তনের কৃতিত্ব অনেকটাই বিকল্প ওয়েবসাইট, স্বাধীন সাংবাদিক, ইউটিউবারদের।

কিন্তু পশ্চিমবঙ্গ এখনো বাকি দেশের চেয়ে পিছিয়ে আছে। এখানে একে বিজেপি ক্ষমতায় নেই, তার উপর এখানেও দিদি মিডিয়া সেই ২০১১ সাল থেকেই আছে। সরকারি বিজ্ঞাপন বন্ধ করে, বন্ধ করার হুমকি দিয়ে বা বিজ্ঞাপন দেওয়ার লোভ দেখিয়ে মমতা ব্যানার্জির সরকার পশ্চিমবঙ্গে দিদি মিডিয়া তৈরি করেছে সচেতনভাবে। উপরি সমস্যা হিসাবে আছেন বাম এবং/অথবা প্রগতিশীল মানুষদের একাংশ। তাঁরা ‘বিজেপি এসে যাবে’, এই যুক্তিতে তৃণমূল সরকারের যাবতীয় অপকর্ম চাপা দেন। বিরোধীরা (বামেদের কথা বলছি, এ রাজ্যে বিজেপি বিরোধীসুলভ কোন কাজটা করে?) গত ১৩ বছরে পর্যাপ্ত পরিমাণে বা তীব্রতায় আন্দোলন করেননি এটা যেমন সত্যি, তেমন এটাও সত্যি যে কোনো বিষয়ে তাঁরা প্রতিবাদ করলেই, মমতা বা তৃণমূল কংগ্রেসের অন্য কোনো নেতা কিছু বলারও আগে খবরের কাগজে বা সোশাল মিডিয়ায় লেখা শুরু হয়ে যায় ‘ওরা আবার কথা বলছে কী? ওরা তো অত সালে অমুকটা করেছিল।’ সংবাদপত্রের উত্তর সম্পাদকীয় লেখক, বিকল্প ওয়েবসাইটগুলোর লেখক এবং জনপ্রিয় ফেসবুকারদের মধ্যে বেশকিছু মানুষ সর্বদা তালিকা নিয়ে তৈরি থাকেন – কবে, কোথায়, কখন তৃণমূল দল বা সরকারের করা কোন অন্যায়টা বামফ্রন্ট সরকারের আমলে সিপিএম বা জোট শরিক অন্য কোনো দল করেছিল। যুক্তি হিসাবে এটা অবশ্যই বনলতা সেনগিরি (whataboutery), যা আজকাল সারা পৃথিবীতে বাম, মধ্য, ডান – সব পক্ষের লোকেরাই করে থাকেন। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সর্বাধিক বিক্রীত বাংলা দৈনিক আনন্দবাজার পত্রিকা ও অন্যান্য মিডিয়ার কয়েক দশকের যত্নে গড়ে তোলা এই নাগরিক বিশ্বাস, যে রাজনীতি অত্যন্ত নোংরা একটা ব্যাপার এবং শুধুমাত্র বদ লোকেরাই রাজনৈতিক দলের সদস্য হয়।

ফলে সরকারের বিরুদ্ধে কোনোরকম আন্দোলনে যুক্ত হতে গেলেই রাজ্যের প্রতিষ্ঠিত বাম দলগুলোকে আন্দোলনকারীরাই বাধা দেন। শিক্ষক নিয়োগে দুর্নীতির বিরুদ্ধে আন্দোলনে এ জিনিস ঘটেছে, সরকারি কর্মচারীদের মহার্ঘ ভাতা বৃদ্ধির দাবিতে আন্দোলনও বামপন্থীদের বাইরে রাখতে গিয়ে দুভাগ হয়ে গিয়েছিল – বামফ্রন্টের সদস্য দলগুলোর সংগঠনের যৌথ মঞ্চ, বাকিদের সংগ্রামী যৌথ মঞ্চ। তারপর কোন মঞ্চ দিল্লিতে বিক্ষোভ দেখাতে গিয়ে হিন্দু মহাসভার আতিথ্য গ্রহণ করল তা নিয়ে ভুল খবরও রটেছিল তৃণমূলের উদ্যোগে। যেহেতু সিপিএমের শিক্ষক সংগঠন নিখিল বঙ্গ শিক্ষক সমিতির নাম ওই পেশার বাইরের মানুষের কাছে বেশি পরিচিত এবং আন্দোলনের বাইরে থাকা অনেক শিক্ষকও খবর রাখতেন না আন্দোলনের কতগুলো ভাগ হয়েছে, সেহেতু অনেকে সাক্ষ্যপ্রমাণ না দেখেই ধরে নিয়েছিলেন কাজটা সিপিএমের সংগঠনের নেতৃত্বে থাকা অংশেরই। তৃণমূল নেতা কুণাল ঘোষও সুযোগ বুঝে সোশাল মিডিয়ায় রাম-বাম-কং আঁতাত প্রমাণিত হল বলে ধুয়ো তুলেছিলেন। অথচ ঘটনা ছিল উলটো

সবচেয়ে বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে যে বিরোধীরা, তাদের এইভাবে যে কোনো আন্দোলন থেকে দূরে রাখার এই কৌশল কংগ্রেস সম্পর্কে সেই ২০১৪ সাল থেকে সারা দেশে প্রয়োগ করে যাচ্ছিল বিজেপি। তাদের দ্বারা শাসিত কোনো রাজ্যে ধর্ষণ নিয়ে অসন্তোষ তৈরি হলেই বিজেপি নেতারা এবং গোদি মিডিয়া মনে করিয়ে দিত – নির্ভয়া কাণ্ড হয়েছে কংগ্রেস আমলে। অতএব কংগ্রেসের ও নিয়ে কোনো কথা বলার অধিকার নেই। নরেন্দ্র মোদী সরকারের কোনো অগণতান্ত্রিক কাজ নিয়ে প্রতিবাদ করলেই ইন্দিরা গান্ধীর জরুরি অবস্থা মনে করিয়ে দেওয়া হত। ধর্মনিরপেক্ষতা নিয়ে কথা বললেই শাহ বানো মামলার নাম করা হত। দেশের সাধারণ মানুষও এই একপেশে ধারণায় বিশ্বাস করছিলেন, যে কংগ্রেসের ৬০ বছরের শাসনে দেশে একটাও ভাল কাজ হয়নি। উপরন্তু বিজেপি এমন কিছুই করছে না, যা কংগ্রেস আগে করেনি। পশ্চিমবঙ্গের মতই কোথাও কোনো আন্দোলন দানা বাঁধলেই সংগঠকরা আগেভাগে বলে দিতেন ‘আমাদের এখানে কোনো রাজনৈতিক দল নেই। আমরা আন্দোলনের রাজনীতিকরণ চাই না।’ ফলে কংগ্রেসও হয়ে পড়েছিল রক্ষণাত্মক। যখন সারা দেশে এনআরসি-সিএএবিরোধী আন্দোলন চলছে, তখন এআইসিসি অফিসে বসে সাংবাদিক সম্মেলন করা ছাড়া ওই আন্দোলনে কোনো ভূমিকা নিতে ভয় পেয়েছে। সংগঠনকে কাজে লাগায়নি। কখনো দিল্লিতে অনুষ্ঠিত কোনো আন্দোলনে কংগ্রেসের কেউ গিয়ে হাজির হলেই সমবেত গোদি মিডিয়া এবং বিজেপি সেই আন্দোলনকে ‘রাজনৈতিক সুবিধাবাদ’ বলে দেগে দিয়েছে। এমনকি আন্দোলনকারীরাও আপত্তি করেছেন। ২০১৫ সালে যন্তর মন্তরে প্রাক্তন সেনাকর্মীদের আন্দোলনে রাহুল হাজির হওয়ায় তাঁকে আন্দোলনকারীরাই চলে যেতে বলেন।

২০২০-২১ সালের কৃষক আন্দোলনের সময়ে পাঞ্জাবে কংগ্রেস সরকার থাকা সত্ত্বেও দিল্লির আন্দোলনে কংগ্রেসের কোনো ভূমিকা ছিল না বললেই চলে। পাঞ্জাবের মুখ্যমন্ত্রী ক্যাপ্টেন অমরিন্দর সিং (পরে কংগ্রেস ছেড়ে নিজের দল খোলেন, এখন আবার বিজেপিতে যোগ দিয়েছেন) আন্দোলনকে মৌখিক সমর্থন জানিয়েছিলেন কেবল। কংগ্রেসের এই নিজের মধ্যে গুটিয়ে থাকা বিজেপিকে ভয়ানক হয়ে উঠতে সাহায্য করেছে। কংগ্রেস শেষমেশ এই সংকোচ কাটিয়ে ওঠে রাহুলের ভারত জোড়ো যাত্রার মধ্যে দিয়ে।

পশ্চিমবঙ্গে সিপিএম তথা বাম দলগুলোর সংকোচ আজও কাটেনি। তার অন্যতম কারণ, তাঁরা কংগ্রেসের মত কোনো নতুন বয়ান খাড়া করতে পারেননি। যে শিল্পায়ন হয়নি তার জন্য এবং ব্যর্থ মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের জন্য অশ্রুপাত করা ছাড়া তাঁদের বক্তব্য বলতে তৃণমূলের দোষগুলো দেখিয়ে দেওয়া। সিপিএম সদস্য, সমর্থকরা এখনো ‘গর্বের ৩৪’ নিয়ে বিভোর। এখনো নিজেরাই মেনে নিতে পারেননি যে ৩৪ বছরের সবটাই গর্বের হলে সংখ্যাটা উনচল্লিশে পৌঁছত, চৌত্রিশে থেমে যেত না। ফলে এখনো তাঁদের আমল নিয়ে বনলতা সেনগিরি করে সিপিএম নেতাকর্মীদের স্তব্ধ করে দেওয়া যায়। কোনো আন্দোলনের নেতৃত্ব হাতে তুলে নেওয়ার সাহস তাঁরা করে উঠতে পারেন না, পতাকাহীন মিছিলের ডাক দেন। বড়জোর ছাত্র সংগঠন বা যুব সংগঠনের নামে মিছিল, জমায়েত ইত্যাদি করা হয়। এই সংকোচের ফলে পশ্চিমবঙ্গে এক অদ্ভুত রাজনীতি রমরমিয়ে চলছে।

তৃণমূল সরকারের আমলে সরকারি হাসপাতালের ভিতরে সরকারি ডাক্তার ধর্ষিত হয়ে খুন হলেন। ইতিমধ্যেই পরিষ্কার যে প্রথম থেকে ঘটনাটা চেপে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে হাসপাতাল ও পুলিসের তরফ থেকে। স্বাস্থ্য আর স্বরাষ্ট্র – দুটো দফতরই স্বয়ং মুখ্যমন্ত্রীর হাতে। খুনের ঘটনা ৯ অগাস্ট সকালে প্রকাশ্যে আসার পর থেকেই হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ও পুলিসের কাজে, অর্থাৎ সরকারি কাজে, এত অসঙ্গতি যে কলকাতা হাইকোর্টে তো বটেই, সুপ্রিম কোর্টে পর্যন্ত ‘হ্যাঁ স্যার, ভুল হয়ে গেছে স্যার’-এর বাইরে যেতে পারেননি রাজ্য সরকারের কৌঁসুলি।

তবু এখনো তৃণমূল তো বটেই, পশ্চিমবঙ্গের নাগরিক সমাজের একটা অংশও এই আলোচনায় বানতলা, ধানতলা টেনে আনছেন। রাত দখল আন্দোলনের অন্যতম নেত্রী বলে পরিচিত শতাব্দী দাশ গত বুধবারের আনন্দবাজার পত্রিকায় ‘অ-দলীয়, প্রবল রাজনৈতিক’ শীর্ষক প্রবন্ধে লিখেছেন ‘সাধারণ মানুষই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, তাঁদের কাঁধে চেপে কাউকে রাজনৈতিক আখের গোছাতে দেবেন না তাঁরা। বর্তমান শাসনহীনতার বিরুদ্ধে সংগঠিত মিছিল থেকেই হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে, মনুবাদী পিতৃতান্ত্রিক বিজেপিকে এই আন্দোলনের সুবিধা তুলতে দেওয়া হবে না। মনে করিয়ে দেওয়া হয়েছে সিপিএম যুগের বানতলা আর তৃণমূলের কামদুনি, একই সঙ্গে।’ পড়ে গুলিয়ে গেল – আন্দোলনের দাবিটা কী? অনেকের হাতে পোস্টার ছিল এবং মুখে স্লোগান ছিল ‘We want justice’, অর্থাৎ ‘আমরা ন্যায়বিচার চাই’। কার জন্য ন্যায়বিচার? আর জি করে মৃত মেয়েটার জন্যে ন্যায়বিচার, নাকি কামদুনির ধর্ষিতার জন্য ন্যায়বিচার, নাকি বানতলার ধর্ষিতার জন্য ন্যায়বিচার, নাকি এদের সকলের জন্য ন্যায়বিচার? মুশকিল হল, বানতলা আর কামদুনি – দুটো মামলারই নিষ্পত্তি হয়ে গেছে আগেই। ন্যায়বিচার হয়েছে কিনা তা ভিন্ন প্রশ্ন, কিন্তু আর জি করের ঘটনার পরে ওইসব ঘটনার জন্যে আন্দোলন করার তো মানে নেই। বিশেষত বানতলার ন্যায়বিচার তৃণমূল সরকারের কাছে তো চাওয়া যেতে পারে না। চাইলে বামফ্রন্ট সরকারের কাছে চাইতে হয়। যে সরকারের এখন আর অস্তিত্বই নেই, তার বিরুদ্ধে আন্দোলন মোদীর ভারত আর দিদির পশ্চিমবঙ্গেই শুধু সম্ভব। অবশ্য শতাব্দী বা সমমনস্করা বলতেই পারেন, ওই বাক্যগুলোর অর্থ তা নয়। অর্থ হল – এসব অনাচার সিপিএমও আগে করেছে, তৃণমূলও করেছে। অতএব তাদের এই আন্দোলনে প্রবেশ নিষেধ। পশ্চিমবঙ্গের নাগরিক সমাজের অরাজনৈতিক নেতারা এরকমই বলেন সাধারণত। কিন্তু একথা বললে আন্দোলনের লক্ষ্য আরও অস্পষ্ট হবে।

রাজনৈতিক দলগুলোর প্রবেশ না হয় আটকানো গেল, তাদের সহযোগিতা অগ্রাহ্য করা গেল কি? কামদুনির তৃণমূল সরকার রাত দখলের আন্দোলনের বিরোধিতা করেনি। বরং তাদের দখলে থাকা অটো, টোটো ইউনিয়ন বেশি রাতেও যানবাহন সচল রেখে সাহায্য করেছে। বানতলার সিপিএমের শ্রমিক সংগঠন সিটুর দখলে থাকা অ্যাপ ক্যাব চালকদের ইউনিয়নও সহযোগিতা করেছে। তার উপর আন্দোলনকারীরা নিজেরাই মনুবাদী পিতৃতান্ত্রিক বিজেপি সরকারের অধীনে থাকা মেট্রো রেলকে ইমেল করে অনুরোধ জানিয়েছিলেন মেট্রো চালু রাখতে। মেট্রো রেল সে দাবি পূরণ করেছে। এসব না হলে ১৪ তারিখ রাতে কলকাতায় অমন জমায়েত হত কি? হয়েছে ভাল কথা। কিন্তু মেয়েদের রাত দখল কি সফল হয়েছে? প্রশ্নটা তুলতে হচ্ছে, কারণ কদিন পরেই রাজ্য সরকার মহিলাদের রাতে সুরক্ষিত রাখতে যেসব ব্যবস্থা ঘোষণা করেছে, তার অন্যতম হল – মহিলাদের নাইট ডিউটি কম দেওয়া, সম্ভব হলে না দেওয়া। অর্থাৎ রাতের যেটুকু দখল মেয়েদের হাতে এখন আছে, সরকার নিজের অক্ষমতা ঢাকতে সেটুকুও কেড়ে নিতে চায়। তাহলে ‘শাসনহীনতার বিরুদ্ধে সংগঠিত মিছিল’ থেকে দেওয়া হুঁশিয়ারিটা যথেষ্ট জোরদার ছিল কিনা – এই প্রশ্নটা ওঠা উচিত নয় কি?

ঘটনা হল, তথাকথিত নাগরিক আন্দোলনের হুঁশিয়ারি এর চেয়ে বেশি জোরদার হয় না। সেকথা সরকারও জানে। সেই কারণেই কোনো রাজনৈতিক দলের সভা, সমাবেশ, মিছিল হলে যত পুলিস মজুত করা হয় তা এই ধরনের আন্দোলনের জন্য করা হয় না। ২০ অগাস্ট মোহনবাগান-ইস্টবেঙ্গল ম্যাচ বাতিলের পর সমর্থকরা যে প্রতিবাদী জমায়েতের ডাক দিয়েছিলেন, সেটাও অ-দলীয় কিন্তু রাজনৈতিক জমায়েত। অথচ তার প্রতি সরকারের অবিশ্বাস অনেক বেশি ছিল। তাই জমায়েতের ঘোষিত জায়গা (যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গন) পর্যন্ত কাউকে যেতেই দেওয়া হয়নি। উপরন্তু কেবল পুলিস নয়, ইস্টার্ন মেট্রোপলিটান বাইপাসে র‍্যাফ পর্যন্ত নামানো হয়। লাঠিও চালানো হয়।

যা-ই হোক, ১৪ অগাস্টের কর্মসূচি অন্তত একটা ব্যাপারে সফল। সরকার ভেবেছিল ওইদিন ওই প্রতিবাদ হতে দিলে পরদিন থেকে প্রতিবাদ থিতিয়ে যাবে। কিন্তু তা ঘটেনি। ফলে এখন দেখা যাচ্ছে সরকার বলছে, সাধারণ মানুষের আন্দোলনে বিরোধীরা ঢুকে পড়ে সরকারের বিরুদ্ধে চক্রান্ত করছে। মৃতার জন্যে ন্যায়বিচার আদায় করা নয়, এর উদ্দেশ্য সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করা। যেহেতু বিজেপি নেতা শুভেন্দু অধিকারী, পরে বামেরাও, মমতার পদত্যাগের দাবি তুলেছেন, সেহেতু একথা আরও বেশি করে বলা হচ্ছে। এতে তৃণমূল আপত্তি করতেই পারে, শঙ্কিতও হতে পারে। কিন্তু তৃণমূলের স্বার্থ যাঁদের স্বার্থ নয়, তাঁরা আপত্তি করবেন কেন? অথচ করছেন। এখানেই পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতির জটিলতা, দ্বিধা।

একনায়কতন্ত্রের সঙ্গে মিল বাড়ছে পশ্চিমবঙ্গের

লক্ষণীয় যে ২০১১ সালের পর থেকে পশ্চিমবঙ্গে একাধিক ভয়ানক ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে এবং পার্ক স্ট্রিট থেকে হাঁসখালি – প্রায় কোথাও মুখ্যমন্ত্রী ধর্ষিতাকে নিয়ে কুমন্তব্য করে ব্যাপারটাকে লঘু করে দিতে ছাড়েননি। তবু বিরোধীরা তাঁর পদত্যাগ দাবি করেনি। তুলনায় এবারে মুখ্যমন্ত্রী অনেক সংযত। প্রথমদিনই বলে দিয়েছিলেন যে মৃতার বাবা-মা চাইলে সিবিআই তদন্তে তাঁর আপত্তি নেই। তাহলে এবার বিরোধীরা পদত্যাগ চাইছেন কেন? কারণটা সহজবোধ্য। মুখ্যমন্ত্রীর কাজের চেয়ে তো আর কথার গুরুত্ব বেশি নয়। এবারের ঘটনায় যুক্ত দুটো দফতরই মুখ্যমন্ত্রীর নিজের হাতে এবং তারা নিজেদের কাজে বিস্তর গাফিলতি করেছে তা ঘটনার দিন থেকেই বোঝা যাচ্ছিল। পরবর্তীকালে হাইকোর্ট এবং সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিরাও সেই মতই ব্যক্ত করেছেন। এ রাজ্যে এমনিতে তৃণমূলের রাজনৈতিক বিরোধীরা ছাড়া প্রায় সকলেই যে কোনো দুর্নীতি, আইনশৃঙ্খলার অবনতির ঘটনায় বলেন – দোষীরা তৃণমূলের লোক হলেও মুখ্যমন্ত্রীর দোষ নেই। সাধারণ ভোটাররাও সাধারণত তাই মনে করেন। হাজারো কেলেঙ্কারি সত্ত্বেও একের পর এক নির্বাচনে তৃণমূলের জয়ের বড় কারণ মমতার এই ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা। রাজ্যের সবচেয়ে গরিব মানুষ, যিনি হয়ত স্থানীয় তৃণমূল নেতাদের দৌরাত্ম্যে অতিষ্ঠ, তাঁরও বিশ্বাস ‘দিদির পার্টির ছেলেগুলো বদমাইশ। দিদি কী করবে?’ কিন্তু আর জি করের ঘটনায় এরকম বলার কোনো উপায় নেই।

শিক্ষা দুর্নীতিতে সব দোষই শিক্ষামন্ত্রী পার্থ চ্যাটার্জি এবং আমলাদের উপর চাপিয়ে দেওয়া গিয়েছিল। গরু পাচার, কয়লা পাচার ইত্যাদি মামলায় তো অভিযুক্ত বা গ্রেফতার হওয়া ব্যক্তিদের সঙ্গে মুখ্যমন্ত্রীর সংযোগ আবিষ্কার করার প্রশ্নই নেই। অনুব্রত মণ্ডল তৃণমূল নেতা বলেই যে মমতা তাঁর থেকে টাকা পান – এমন কথা ইডিও বলেনি। সারদা কেলেঙ্কারিতে দু-একবার মুখ্যমন্ত্রীর নাম এলেও তা গুজবের বেশি এগোয়নি। নারদ কেলেঙ্কারির অভিযুক্তদের সম্পর্কেও মমতা বলতে পেরেছিলেন ‘আগে জানলে ভোটে দাঁড় করাতাম না’। কিন্তু তাঁরই অধীন দুটো দফতর একযোগে খুনের ঘটনায় অবহেলা করল, তিনি কিছুই জানলেন না। উপরন্তু আর জি করের কুখ্যাত অধ্যক্ষ সন্দীপ ঘোষের প্রতি সমবেদনা জ্ঞাপন করলেন সর্বসমক্ষে, তারপর পদত্যাগের কয়েক ঘন্টার মধ্যে তাঁকে অন্য হাসপাতালের অধ্যক্ষ করে দিল তাঁরই দফতর। আদালতের ধমক খেয়ে বাধ্যতামূলক ছুটিতে পাঠানো হল। এত কিছু মুখ্যমন্ত্রীর অগোচরে হয়েছে – একথা চরম মমতাভক্তও কি বিশ্বাস করবে? ২২ তারিখই সুপ্রিম কোর্টে আর জি কর মামলার দ্বিতীয় শুনানিতে সিবিআই অভিযোগ করেছে – অপরাধের অকুস্থলের অবস্থার পরিবর্তন করা হয়েছে মামলা তাদের হাতে যাওয়ার আগেই। প্রধান বিচারপতি ডি ওয়াই চন্দ্রচূড় দেখিয়ে দিয়েছেন যে রাজ্য সরকারের জমা দেওয়া টাইমলাইনে অপরাধীকে শাস্তি দিতে তাদের একনিষ্ঠতা নয়, অনীহাই প্রমাণ হয়।

আইনকানুনের কোনো তোয়াক্কা করা হয়নি। আইনজীবী কপিল সিব্বাল এহেন আচরণের ব্যাখ্যা দিতে খাবি খেয়েছেন। তাই বিচারপতি পরবর্তী শুনানিতে কলকাতা পুলিসের একজন দায়িত্বশীল অফিসারকে উপস্থিত থাকতে বলেছেন, যাঁর কাছে এই অসঙ্গতির সন্তোষজনক উত্তর আছে।

এমতাবস্থায় বিরোধীরা স্বাস্থ্যমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি করলে মহাভারত অশুদ্ধ হবে কেন? যাঁরা বনলতা সেনগিরি অন্যায় মনে করেন না তাঁদের জ্ঞাতার্থে বলা যাক, মমতা নিজে বিরোধী নেত্রী থাকার সময়ে একাধিকবার মুখ্যমন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি করেছেন।

উপরের ছবির তারিখগুলো দেখলেই বোঝা যাচ্ছে, ২০০৬ সালে বামফ্রন্ট ২৯৪ আসনের মধ্যে ২৩৫ আসন জিতে আসার পরেও ওই দাবি করেছেন। অর্থাৎ তখন কিন্তু বামফ্রন্টের জনপ্রিয়তা নিয়ে অন্তত সংসদীয় পথে প্রশ্ন তোলার কোনো অবকাশ ছিল না। তবু। সত্যি কথা বলতে, অন্যায় কিছু করেননি। গণতন্ত্রে বিরোধী দলের কাজই হল সরকারের পান থেকে চুন খসলে ক্ষেপে ওঠা। কাজটা মমতা চমৎকার পারতেন। বাম দলগুলো আজ পারে না, জাতীয় স্তরে কংগ্রেসও এই সেদিন পর্যন্ত পারত না। মমতার অবশ্য একটা সুবিধা ছিল। ২০১১ সালের আগের সংবাদমাধ্যম এবং নাগরিক সমাজ মমতাকে ‘আন্দোলনের সুবিধা তুলতে দেওয়া হবে না’ বলত না। সরকারের সমালোচনা করে মমতা রাজ্যের বদনাম করছেন – এই জাতীয় কথা সিপিএম নেতাদের মুখে শোনা গেলেও, নাগরিক সমাজের লোকেরা কখনো বলতেন না। ইতিহাস তো সকলেরই থাকে। মমতারও আছে। তিনি তৃণমূল দল খোলার আগে দীর্ঘকাল কংগ্রেসে ছিলেন। কংগ্রেস আমলে পশ্চিমবঙ্গে যেসব অত্যাচার, অনাচার হয়েছে সেগুলোর দায়ও তাঁর ঘাড়ে চাপা উচিত তাহলে। কারণ তিনি কোনোদিন বলেননি যে তিনি সেসবের জন্যে লজ্জিত। উপরন্তু তিনি পশ্চিমবঙ্গের ইতিহাসের সবচেয়ে কুখ্যাত মুখ্যমন্ত্রী সিদ্ধার্থশঙ্কর রায়ের স্নেহভাজনও ছিলেন। এতৎসত্ত্বেও মমতাকে কংগ্রেসের কুকীর্তি মনে করিয়ে দিয়ে চুপ থাকতে বলত না কেউ। কারণ সেটা অপ্রাসঙ্গিক। কে আগে ক্ষমতায় থাকার সময়ে কী করেছিল, তার জন্যে তার পরবর্তী সরকারের বিরুদ্ধে কথা বলার অধিকার নেই, আন্দোলন করার অধিকার নেই – একথা যারা বলে তারা আসলে স্থিতাবস্থার সমর্থক। কোনো দল বা জোট সরকারে থাকাকালীন কুকর্ম করলে তার শাস্তি হিসাবে ভোটাররা তাদের ক্ষমতাচ্যুত করে অন্য কাউকে ক্ষমতায় আনেন। তাদের শাসন অপছন্দ হলে আবার তাদেরও তাড়ান – এভাবেই গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা চলে। ভোটারদের বিশ্বাস অর্জন করতে বিরোধী দলগুলোকে অনবরত লড়াই করে যেতে হয়, সরকার পক্ষের ভুলের ফায়দা তোলার চেষ্টা করতে হয়। এই কাঠামোর বাইরেও একজন বা কয়েকজন নাগরিক অথবা কোনো সংগঠন নির্দিষ্ট দাবি বা দাবিসমূহ নিয়ে আন্দোলন করতেই পারে। কিন্তু কোনো আন্দোলনে অমুককে ঢুকতে দেব না, তমুককে থাকতে দেব না বলাও যে অগণতান্ত্রিক এবং এক ধরনের বামনাই – তা মনুবাদের বিরুদ্ধে আন্দোলন করা ব্যক্তিরাও উপলব্ধি করছেন না।

আরও পড়ুন সব ধর্ষণ সমান নয়

আন্দোলনে একমাত্র তাকেই ঢুকতে দেব না বলা সঙ্গত, যার বিরুদ্ধে আন্দোলন। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গ জুড়ে এই মুহূর্তে নাগরিক সমাজের বিভিন্ন অংশ যে তথাকথিত অরাজনৈতিক আন্দোলনগুলো করছেন, সেগুলো যে কার বিরুদ্ধে তা প্রায়শই বোঝা যাচ্ছে না। অনেক সময় আন্দোলনকারীরা নিজেরাই জোরের সঙ্গে বলছেন – কারোর বিরুদ্ধে নয়। ২২ তারিখ রাত দখল আন্দোলনের আহ্বায়ক বলে পরিচিত রিমঝিম সিনহা ২৫ অগাস্ট (রবিবার) রাতে ফের টর্চ জ্বেলে, বেগুনি পতাকা নিয়ে এক আন্দোলনের ডাক দিয়েছিলেন। সেই ডাক দেওয়ার ভিডিওতেও এই আন্দোলন কার বিরুদ্ধে তা বলা হয়নি, যদিও বলা হয়েছে ‘আজ ২২ অগাস্ট, প্রায় ১২ দিন কেটে গেল, সুবিচার আসেনি। আর জি করের ঘটনার সঙ্গে জড়িত সকলকে গ্রেফতার করাও হয়নি।’ আন্দোলনের এক বিখ্যাত মুখ, অভিনেত্রী সোহিনী সেনগুপ্ত ২৩ অগাস্ট (শুক্রবার) তারিখের আনন্দবাজার পত্রিকায় লিখেছেন ‘একজনকে থামালে হাজার হাজার গলা আরও জোরে চিৎকার করবে’। এই শিরোনাম দেখে ভাবলাম যে থামাচ্ছে তার বিরুদ্ধে শেষমেশ বোধহয় দুকথা লিখেছেন। কিন্তু পড়তে গিয়ে হতাশ হলাম। উনি বরং লিখেছেন ‘আমাদের প্রত্যেকের নিজস্ব রাজনৈতিক বোধ রয়েছে। সেটা দিয়ে, আর নিজেদের সুবুদ্ধি দিয়ে আমরা ‘অ্যাপলিটিক্যাল’ শব্দটি ব্যবহার করছি। এটার মানে কিন্তু এই নয় যে, আমাদের কোনও পক্ষ নিতে হবে। আমাদের কেন কোনও পক্ষ নিতে হবে? আমাদের নিজের কণ্ঠস্বরই আমাদের পক্ষ।’

ন্যায়বিচার চাই বলছি, কিন্তু কার কাছে চাই বলছি না – এর কারণ কী? দুটো কারণ সম্ভব। ১) কার কাছে ন্যায়বিচার চাইছি নিজেও জানি না, ২) জানি, কিন্তু বলতে চাইছি না। কারণ বললেই বোঝা যাবে যে সে ন্যায়বিচার দিচ্ছে না। এই সত্য তাকে বিপদে ফেলবে। কিন্তু আমি কোনো কারণে তাকে বিপদে ফেলতে চাই না।

সমাজের উচ্চকোটির যথেষ্ট লেখাপড়া জানা নারী (এবং পুরুষরা) যেহেতু এই নাগরিক আন্দোলনের মুখ, সেহেতু প্রথম সম্ভাবনাটা বাতিল করে দেওয়াই শ্রেয়। সোহিনী তাঁর লেখার উপর্যুক্ত অংশের পরেই একটা বাচ্চা মেয়ের উল্লেখ করে লিখেছেন সে-ও হাতে মোমবাতি নিয়ে চিৎকার করতে করতে ন্যায়বিচার দাবি করেছে। তারপর মন্তব্য করেছেন ‘সে রাজনীতির কী বোঝে?’ প্রশ্ন হল, সে ন্যায়বিচারেরই বা কী বোঝে? তাকে বড়রা কিছু একটা বুঝিয়েই তো নিয়ে এসেছিলেন প্রতিবাদে? তা আর জি কর কাণ্ড যেভাবে গড়িয়েছে গত কয়েক দিনে, তাতে ওই বাচ্চা মেয়ের বড়রা নিশ্চয়ই বুঝে গেছেন যে যথাসময়ে এফআইআর না করে, মৃতার বাবা-মাকে বিভ্রান্ত করে, এমনকি তড়িঘড়ি মৃতদেহ হাসপাতাল থেকে বার করে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে ন্যায়বিচারের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে এ রাজ্যের সরকারই। কথাটা অনেকে বুঝে গেছেন বলেই শতাব্দী, রিমঝিম, সোহিনীরা ঢোঁক গিললেও ১৪ তারিখ রাতেই এবং তারপর থেকে কোনো কোনো নাগরিক মিছিলেও সরাসরি সরকারবিরোধী স্লোগান শোনা গেছে। তাহলে এবার দ্বিতীয় সম্ভাবনার আলোচনায় আসা যাক।

কী কারণে তৃণমূল সরকারকে বিপদে ফেলতে চাই না? এটাই বাংলার রাজনীতির সেই দ্বিধা, যার কথা এই লেখার প্রথম পর্বে উল্লেখ করেছিলাম। এই রাজ্যে বহু মানুষ আছেন যাঁরা আন্তরিকভাবে বিজেপি-আরএসএসের বিরোধী, আবার এও বোঝেন যে তৃণমূল সরকার বিস্তর অন্যায় করে চলেছে। কিন্তু মনে করেন সিপিএম/বামফ্রন্টকে আর ভোট দেওয়া চলে না (এরকম মনে হওয়ার জন্যে বাম নেতৃত্বের দিশাহীনতা, সাংগঠনিক ব্যর্থতা এবং বিজেপিবিরোধিতায় সিদ্ধান্তহীনতা যথেষ্ট পরিমাণে দায়ী)। অতএব বিজেপিকে আটকাতে তৃণমূলকেই ক্ষমতায় রাখতে হবে।

এই মনোভাবকে প্রশ্ন করার সময় এসে গেছে। নিঃসন্দেহে বিজেপি-আরএসএস যে কোনো রাজ্যের পক্ষেই ধ্বংসাত্মক শক্তি। কিন্তু তৃণমূল যে ধ্বংসাত্মক নয় – একথা কি আর বলা চলে? স্রেফ উল্টোদিকে আরও খারাপ একটা শক্তি আছে – এই যুক্তিতে পার্শ্ববর্তী বাংলাদেশেও শেখ হাসিনার দলের দমনপীড়ন, এমনকি নির্বাচনকে প্রহসনে পরিণত করা মেনে নিয়েও তাঁকেই বহুকাল ধরে সমর্থন করছিলেন প্রগতিশীলরা। কিন্তু মানুষের সহ্যের সীমা থাকে। চৈনিক চক্রান্তই বলুন আর মার্কিন চক্রান্তই বলুন – একটা দল কোনো ভূখণ্ডে বারবার ভোটই হতে দেবে না, সেই ভূখণ্ডের মানুষ তা কতবার কোন কোন যুক্তিতে মেনে নেবেন? পুলিস, অন্যান্য সশস্ত্র বাহিনী এবং শাসক দলের গুন্ডাদের গুলিতে প্রাণ গেলেও মানুষ অন্যদিকে মৌলবাদীরা আছে বলে মুখ বুজে থাকবে – এ জিনিস তো চিরকাল চলে না। স্বীকার্য যে পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভা, লোকসভায় ভোটদানে যে হিংসা, কারচুপি হয় তা এ আমলে নতুন নয়। মমতা ভোটকে হাসিনার মত প্রহসনে পরিণত করেছেন বলা যাবে না। কিন্তু ক্রমশ সেদিকেই এগোচ্ছেন বললে নেহাত ভুল বলা হবে কি?

পরপর দুটো পঞ্চায়েত নির্বাচন কিন্তু প্রহসনেই পরিণত হয়েছে। ২০১৮ সালে পশ্চিমবঙ্গের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি সংখ্যক আসনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছিলেন শাসক দলের প্রার্থীরা। ভোটের দিন রক্তারক্তি দেখতে অভ্যস্ত এই রাজ্যের মানুষও মনোনয়ন পত্র জমা দেওয়ার সময়েই অত মারামারি, মহিলাদের শাড়ি খুলে নেওয়া ইত্যাদি দেখতে অভ্যস্ত ছিলেন না। ২০২৩ পঞ্চায়েত নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয়নি এমন আসনের সংখ্যা নেমে আসে ৯.৫ শতাংশে। কিন্তু তা যত না শাসকের বদান্যতায়, তার চেয়ে বেশি বিরোধীদের লড়াকু মনোভাবের কারণে। মনোনয়ন জমা দেওয়ায় অত্যন্ত কম সময় দিয়ে, জমা দিতে আসা প্রার্থীদের নিরাপত্তা দিতে না পেরে ভোটের আগেই শিরোনামে চলে আসেন রাজ্য নির্বাচন কমিশনার রাজীব সিনহা। তবে আসল খেলা হল ভোট গণনার সময়ে। হিংসা তো হলই, জয়ী প্রার্থীকে আমলারা সার্টিফিকেট দেননি এমন অভিযোগ উঠল। মাঠে ঘাটে ব্যালট ও ব্যালট বাক্স পড়ে থাকতে দেখা গেল, প্রচুর মামলা হল এবং আদালতের নির্দেশে বহু আমলার চাকরি নিয়ে টানাটানি পড়ল।

সিবিআই আর ইডি যে অসংখ্য দুর্নীতির মামলায় তৃণমূলের বিভিন্ন নেতা, মন্ত্রীকে গ্রেফতার ও জিজ্ঞাসাবাদ করেছে সেগুলো থমকে গেছে। ঠিক যেভাবে সারদা ও নারদ মামলার কোনো নিষ্পত্তি হয়নি। তার মানে এই নয় যে তৃণমূল দুর্নীতিমুক্ত। একথা তৃণমূলকে ফ্যাসাদে ফেলতে না চাওয়া মানুষও জানেন। আজ এখানে বাড়ি ভেঙে পড়ছে, কাল ওখানে বাজি তৈরির কারখানায় বিস্ফোরণ হওয়ার পর দেখা যাচ্ছে সেখানে বোমা তৈরি হত, পরশু তৃণমূলের কাউন্সিলররাই প্রকাশ্যে মারামারি করছেন, তার পরদিন কোনো সমাজবিরোধী গ্রেফতার হওয়ায় প্রবীণ বিধায়ক আর সাংসদ (মদন মিত্র, সৌগত রায়) ফোনে খুনের হুমকি পাওয়ার অভিযোগ করছেন – এসব তো এ রাজ্যে চলছিলই। আর জি কর কাণ্ডে দেখা গেল সরকারি হেফাজতে সরকারি কর্মচারীর জান, মালের সুরক্ষাও নেই। সেটা শুধু ধর্ষণ, খুনে প্রমাণিত হয়নি; ১৪ অগাস্ট রাতে হাসপাতালে যে তাণ্ডব চলেছে তাতেও প্রমাণিত হয়েছে। সেদিন ডিউটিতে থাকা নার্সরা জানিয়েছেন, পুলিস তাঁদের নিরাপত্তা দিতে তো ব্যর্থ বটেই, নিজেদের নিরাপত্তার জন্যও তাঁদের কাছেই হাত পেতেছিল। বিজেপি এসে যেতে পারে – স্রেফ এই যুক্তিতে এই চরম নৈরাজ্য দেখেও কি তৃণমূলকে যেনতেনপ্রকারেণ সুরক্ষা দেওয়া চলে? রাজ্যের সব মানুষেরই ভাবার সময় এসেছে।

ভোট তো এখনো অনেক দূরে। ইতিমধ্যে তৃণমূল শুধরেও তো যেতে পারে, যদি টের পায় মানুষ তাদের কর্মকাণ্ডে খুশি নন। কিন্তু প্রাণপণে তাদের অন্যায় ঢাকা দেওয়ার চেষ্টা করলে তো দমনপীড়ন বেড়েই চলবে। ঠিক যা এই মুহূর্তে ঘটছে। ফুটবল মাঠে সমর্থকরা কিছু টিফো দেখাবেন – এই আশঙ্কায় একটা নিরীহ ফুটবল ম্যাচ বাতিল করে দিয়ে আরও বড় প্রতিবাদের রাস্তা খুলে দেওয়া হল। তারপর সেই প্রতিবাদও আটকাতে নিরস্ত্র ফুটবলপ্রেমীদের উপরে লাঠি চালানো হল। এখন স্কুলগুলোকে পর্যন্ত সরকার আদেশ দিচ্ছে – সরকারি অনুষ্ঠান ছাড়া কোনোকিছুতে ছাত্রছাত্রীদের নিয়ে যাওয়া চলবে না।

গণতন্ত্রের চেয়ে একনায়কতন্ত্রের সঙ্গেই যে এই আচরণের মিল বেশি, তা নাগরিক সমাজ স্বীকার না করলে নিজেদের কোনো দলীয় পরিচয় নেই বলে কোন মুখে?

দলহীন প্রতিবাদ সংঘ পরিবারের পক্ষে সুবিধাজনক

সব কথার পরেও রাজনৈতিক দলগুলো সম্পর্কে একটা অরাজনৈতিক আপত্তি উঠবেই। তা হল, দলগুলো নিজেদের রাজনৈতিক স্বার্থ ছাড়া কিছু দেখে না। অতএব প্রতিবাদকে তাদের হাতে চলে যেতে দেওয়া যায় না। এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত হওয়া উচিত কোন রাজনৈতিক দলের স্বার্থ কী তার বিচার করে। যেমন বিজেপি, কংগ্রেস, সিপিএম – সকলেরই রাজনৈতিক স্বার্থ ক্ষমতায় আসা। বিরোধীদের ক্ষমতায় আসতে চাওয়া যে পাপ নয়, একথাটা ২০১১ সালের পর থেকে পশ্চিমবঙ্গের এবং ২০১৪ সালের পর থেকে গোটা দেশের মানুষকে বলে বোঝাতে হয়। সে না হয় হল। কিন্তু এরপরেও বিচার করা দরকার, ক্ষমতায় এলে কে কী করতে পারে? সিপিএম আর কংগ্রেস (একলা বা জোটে) কী করতে পারে তা বোধহয় তারা নিজেরাও ভেবে দেখেনি। সেই কারণেই তাদের ভোট দেওয়ার কথা কেউ ভাবতে পারে না। কিন্তু বিজেপি ক্ষমতায় এলে কী করবে তা নিয়ে বুদ্ধি বিসর্জন না দেওয়া মানুষের সন্দেহের কোনো অবকাশ নেই। নরেন্দ্র মোদী সরকারের কার্যকলাপ দেখে যদি যথেষ্ট শিক্ষা না হয়ে থাকে, তাহলে বিজেপিশাসিত গুজরাট, মণিপুর, ত্রিপুরা, উত্তরপ্রদেশ, হরিয়ানা, মহারাষ্ট্র, আসাম – যে রাজ্য ইচ্ছা হয় দেখে নিন। তাহলেই বিজেপির হাতে প্রতিবাদ চলে যাওয়ার বিপদের সঙ্গে অন্যদের হাতে চলে যাওয়ার ফলের তফাত স্পষ্ট হবে। কিন্তু এসব রাজনৈতিক বিচারে আবার নাগরিক সমাজের লোকেরা যেতে চান না। রাজনৈতিক স্বার্থ তাঁদের কাছে প্রায় অপশব্দ। অনেক মানুষের কাছেই তাই হয়ে দাঁড়ানোর পিছনে রাজনৈতিক দলগুলোর যে কোনো দায় নেই তা নয়। কিন্তু যাঁরা দলগুলোর ঊর্ধ্বে উঠে ন্যায়ের জন্য, রাজ্যের ভালর জন্য দাঁড়িয়েছেন বলে দাবি করেন, তাঁদের কি কোনো স্বার্থ নেই? সেটাও একটু পরখ করে নেওয়া ভাল।

২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনের জন্যে ‘নো ভোট টু বিজেপি’ বলে এক প্রচারাভিযানে নেমেছিল বাংলার নাগরিক সমাজ। বাম কর্মী, সমর্থকরা রুষ্ট হয়েছিলেন। তাঁরা মনে করেছিলেন, এটা ঘুরিয়ে নাক দেখানোর মত করে তৃণমূলকে ভোট দিতে বলা। এই প্রচারাভিযানে যুক্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে তৃণমূলের থেকে টাকাপয়সা নেওয়ার ভিত্তিহীন অভিযোগও তুলেছিলেন। তবে পরে বালিগঞ্জ বিধানসভা কেন্দ্রের উপনির্বাচনে এবং ২০২৪ সালে দক্ষিণ কলকাতা লোকসভা কেন্দ্রে ওই প্রচারাভিযানের অন্যতম মুখ সায়রা শাহ হালিমকে সিপিএম প্রার্থী করে। কিন্তু ঘটনা হল, ওই প্রচারাভিযানের উদ্যোগীদের একজন – সামিরুল ইসলাম – পরে তৃণমূলের হয়ে রাজ্যসভায় চলে গেছেন।

‘নো ভোট টু বিজেপি’-কে জনপ্রিয় করতে জরুরি ভূমিকা নিয়েছিল একখানা মিউজিক ভিডিও। সেখানে দেখা গিয়েছিল বাংলা থিয়েটার ও সিনেমা জগতের একগুচ্ছ তারকাকে। সেখানে যেমন সব্যসাচী চক্রবর্তী, চন্দন সেন, রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায়ের মত মার্কামারা সিপিএম ছিলেন; তেমন ছিলেন দলহীন পরমব্রত চট্টোপাধ্যায়। তিনি সেইসময় বিজেপির বিরুদ্ধে কাগজে লেখালিখিও করেছিলেন। ২০২১ নির্বাচনের কিছুদিন পরেই দেখা গেল, তিনি দেউচা পাঁচামিতে কয়লাখনি হওয়া নিয়ে স্থানীয় মানুষের সঙ্গে সরকারের সমন্বয় সাধনের জন্য তৈরি এক রাজ্য সরকারি কমিটির প্রধান নিযুক্ত হয়েছেন। তিনি কয়লার কী জানেন, খনির কী জানেন, আদিবাসীদেরই বা কী জানেন – তা কি নিজেও জানেন? ২০২৩ সালে এসে এক সাক্ষাৎকারে পরমব্রত জানান যে তিনি ওই কমিটি থেকে পদত্যাগ করেছেন, ‘সেপ্টেম্বর বা অক্টোবরে।’ কারণ তাঁকে যে কাজ দেওয়া হয়েছিল সে কাজ নাকি শেষ হয়ে গেছে। কী কাজ, সে কাজ করতে গিয়ে কী পাওয়া গেল – এই ধরনের কমিটি সম্পর্কে এসব প্রশ্ন ভারতবর্ষে কোনোদিনই কেউ তোলে না। কিন্তু ব্যক্তিগতভাবে অন্তত দুজনকে চিনি, যাঁরা ‘নো ভোট টু বিজেপি’-র লোকেদের তৃণমূল সরকারের থেকে এরকম সুবিধা গ্রহণ করা দেখে বিতৃষ্ণায় ২০২৪ নির্বাচনের আগে আর এই ধরনের কোনো উদ্যোগে জড়িত হতে চাননি। নিশ্চিতভাবে এমন মানুষ আরও আছেন। সম্ভবত সে কারণেই এবারে আর ওই ক্যাম্পেনকে অন্তত ওই নামে দেখা যায়নি। কথা হল, দলের ঊর্ধ্বে দণ্ডায়মানরা যদি এমনভাবে ব্যক্তিস্বার্থ চরিতার্থ করেন, তাহলে দলগুলোর দোষ কী? তারা তো তবু কোনো একটা সমষ্টির স্বার্থ চরিতার্থ করতে চায়।

দলগুলোর সততা নেই, বিশেষত কাজে আর কথায় মিল নেই, তাই তাদের বিশ্বাস করা যায় না – এই বয়ান বাংলার নাগরিক সমাজে খুব জনপ্রিয়। কথাটা যে পুরোপুরি মিথ্যে তাও নয়। দলগুলোও সেকথা জানে। গত কয়েক বছরে বামেদের দলের পতাকা বাদ দিয়ে মিছিল, মিটিংয়ের ডাক দেওয়ার অভ্যাস হয়ত তারই স্বীকৃতি। সিপিএমের লোকেদের সংগঠিত মিছিল, রাজ্য সম্পাদক মহম্মদ সেলিম স্বয়ং হাঁটছেন, অথচ বলা হচ্ছে নাগরিক মিছিল – এমন অসংখ্য দৃষ্টান্ত আছে। এমন ব্যানারবিহীন দলীয় অভিযানের সাম্প্রতিকতম উদ্যোগ অবশ্য দক্ষিণপন্থীদের – মঙ্গলবারের নবান্ন অভিযান, যার ডাক দিয়েছিল ‘বাংলার ছাত্রসমাজ’। সে এমন ছাত্রসমাজ যে তাতে সহজেই যুক্ত হয়ে যান ব্যারাকপুরের অর্জুন সিং, সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করে নেন লম্বা সাদা দাড়িওলা এক সাধু। কিন্তু অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে রাজনৈতিক দলগুলোকে অস্বীকার করে বিশ্ব ছাড়ায়ে উঠতে চান যে বিদ্রোহীরা, তাঁদের সততার উদাহরণগুলোও যে নিদারুণ।

যেমন ধরুন দামিনী বেণী বসু। কয়েক মাস আগেই তাঁর একটা লেখা নিয়ে হইচই পড়ে গিয়েছিল। টিনের তলোয়ার নাটকে ধর্ষণে অভিযুক্ত অভিনেতা সুদীপ্ত চট্টোপাধ্যায়কে অভিনয়ের সুযোগ দেওয়ার প্রতিবাদ করে নির্দেশক সুমন মুখোপাধ্যায়কে সোশাল মিডিয়ায় খোলা চিঠি লিখেছিলেন দামিনী। তা নিয়ে একটা ওয়েবসাইটে খবর হয়, পরে সে খবর সরিয়ে দেওয়া হয়। দামিনী দাবি করেন যে সুমনের অঙ্গুলিহেলনেই ওই লেখা সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। এর প্রতিবাদে অন্য এক সাইটে লেখেন। সে লেখায় অন্য অনেক কথার সঙ্গে দামিনী লেখেন, বাংলা থিয়েটারে ‘রেপ-কালচার’ চালু আছে। সুমন দামিনীর সেই লেখার লিখিত উত্তরও দেন। বলা বাহুল্য, দামিনী মিথ্যা অভিযোগ করেছিলেন এমন প্রমাণ যখন নেই, তখন বেশ করেছিলেন। কিন্তু মুশকিল হয়েছে ওই কথায় আর কাজে মিল নিয়ে। গত সপ্তাহে কলকাতার এক বিলাসবহুল হোটেলে বিতরণ করা হয়েছে দেবী অ্যাওয়ার্ডস ২০২৪। অতীতে এই পুরস্কার যাঁরা প্রত্যাখ্যান করেছেন তাঁদের মধ্যে আছেন তামিলনাড়ুর দলিত কবি সুকীর্তা রানি। গতবছর ফেব্রুয়ারি মাসে এই পুরস্কার প্রত্যাখ্যান করার কারণ হিসাবে তিনি ফেসবুকে লেখেন ‘আমি সবে গতকাল জানতে পেরেছি যে এই অনুষ্ঠানের প্রধান স্পনসর হল আদানি গ্রুপ। আমি এমন কোনো সংগঠনের হাত থেকে বা এমন কোনো অনুষ্ঠানে পুরস্কার নিয়ে খুশি হব না, যা আদানির আর্থিক সাহায্যপ্রাপ্ত। কারণ সেটা আমি যে রাজনীতির কথা বলি বা যে আদর্শে বিশ্বাস করি তার পরিপন্থী। তাই আমি এই পুরস্কার গ্রহণ করব না।’

লিঙ্গ রাজনীতি, আদর্শ ইত্যাদি সম্পর্কে দামিনীকে অত্যন্ত সচেতন একজন শিল্পী হিসাবেই আমরা চিনেছি। এবছর ওই পুরস্কারপ্রাপ্ত ১৩ জন মহিলার মধ্যে একজন সেই দামিনী। তাঁর হাতে পুরস্কার তুলে দিয়েছেন কে? বিজেপি নেত্রী স্মৃতি ইরানি। বিজেপি ভারতের একমাত্র রাজনৈতিক দল যাদের নেতারা ধর্ষকের সমর্থনে মিছিল করে; যাদের সরকার ধর্ষণে শাস্তিপ্রাপ্তদের কেবল ক্ষমা করে দেয় না, মালা পরিয়ে, মিষ্টি খাইয়ে বরণ করে নেয়; রাতের অন্ধকারে পুলিস পাঠিয়ে ধর্ষিতার পরিবারকে আটকে রেখে দেহ ছিনিয়ে নিয়ে পুড়িয়ে দেয়। সেই দলের নেত্রীর হাত থেকে হাসিমুখে পুরস্কার নিয়েই দামিনী ক্ষান্ত দেননি। আর জি কর কাণ্ড নিয়েও দুকথা বলে দিয়েছেন সুললিত ইংরিজিতে। হরিবংশ রাই বচ্চন রচিত ‘অগ্নিপথ’ কবিতার লাইন আউড়ে যৌন অপরাধের বিরুদ্ধে লড়ার শপথ-টপথ নিয়েছেন, সেই শপথে গলা মেলানোর জন্য মাইকটা স্মৃতির দিকে এগিয়েও দিয়েছেন।

পুরস্কৃতদের মধ্যে ছিলেন টালিগঞ্জের অভিনেত্রী শুভশ্রী গাঙ্গুলিও। তিনিও পুরস্কার গ্রহণ করে বলেন ‘আমি সম্মানিত এবং কৃতজ্ঞ। কিন্তু সেই কথাতেই ফিরে আসতে হচ্ছে। খুশি নই। আমরা সবাই ভেঙে পড়েছি। আজকে এই পুরস্কার পেয়ে আমি নিশ্চয়ই খুশি, কিন্তু আনন্দ করতে পারছি না।’ শুভশ্রীকে এই পুরস্কার নেওয়ার কয়েকদিন পরে আর জি কর কাণ্ডে ন্যায়বিচার চেয়ে সিনেমা পাড়ার শিল্পীদের মিছিলেও হাঁটতে দেখা গেছে।

একই অঙ্গে এত রূপ দেখে সন্দেহ হয় – এঁদের প্রতিবাদ, আন্দোলনের পিছনেও আসলে নিজের যশলোভ। ওটা নিশ্চিত করতেই কখনো ক্ষমতাসীন তৃণমূলের দোষ নিয়ে চুপ করে থাকা, কখনো বিজেপি নেত্রীর হাত থেকে পুরস্কার নিয়ে যৌন অপরাধের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের ডাক দেওয়া। রাজনৈতিক নেতাদের সম্পর্কে খুব চালু কথা – তাঁরা জনতাকে ভুলিয়ে নিজেদের স্বার্থসিদ্ধি করেন। ১৪ তারিখ রাতে যে মহিলারা রাত দখলের ডাক পেয়ে পথে বেরিয়েছিলেন বা এখন শিল্পীদের মিছিল দেখে উদ্বুদ্ধ হচ্ছেন, তাঁদেরও কি তথাকথিত নাগরিক সমাজের এই নেতৃস্থানীয়রা ভোলাচ্ছেন না? নেতাদের নিদেনপক্ষে ভোট চাইতে আসতে হয়, তাই খানিকটা দায়বদ্ধতা থাকে। নাগরিক সমাজের নেতাদের তো সে চিন্তাও নেই। একটা রাজ্যসভার আসন অথবা সরকারি কমিটির সদস্যপদ, নিদেন কাগজে লেখা বা নাম বেরনো, খবরের চ্যানেলের প্যানেলে গিয়ে বসার ব্যবস্থা করতে পারলেই কাজ হাসিল। তার চেয়ে মহত্তর কোনো ন্যায়বিচার কি সত্যিই তাঁরা চান?

একবিংশ শতকে পৃথিবীর বহু দেশেই অবশ্য এরকম দলবিহীন নাগরিক সমাজের আন্দোলন দেখা যাচ্ছে। অনেকে এই প্রবণতা নিয়ে খুব উৎসাহিত। তাঁরা বলেন এটাই নতুন যুগের রাজনীতি। যুগে যুগে রাজনীতি যে বদলায় সেকথা তো ঠিকই। তবে এখন পর্যন্ত এ ধরনের রাজনীতি কিন্তু কোথাও প্রগতিশীলদের জয়যুক্ত করেনি। ‘অক্যুপাই ওয়াল স্ট্রিট’ কিছু অর্জন করতে পারেনি। তাহরীর স্কোয়ার থেকে শুরু হওয়া আরব বসন্তও কোনো নতুন ভোর নিয়ে আসেনি। বাংলাদেশে কদিন আগে হওয়া বিদ্রোহের পরিণামও যে প্রগতিশীল হবে তা এখনই বলা যাচ্ছে না। সেদেশের বামপন্থী, প্রগতিশীল শক্তির বেশকিছু অপছন্দের ঘটনাও ঘটছে মুহাম্মদ ইউনুসের সরকারের আমলে। উপরন্তু আমাদের দেশে দলবিহীন, পতাকাবিহীন ‘ইন্ডিয়া আগেনস্ট করাপশন’ এবং নির্ভয়া কাণ্ডের পরবর্তী আন্দোলনের পরিণাম হয়েছে ভয়াবহ। হিন্দুত্ববাদীদের ক্ষমতায় আনতে বড় ভূমিকা পালন করেছিল ওই দুটো আন্দোলন। কারণ বোধহয় এই, যে যেখানে কোনো পতাকা নেই সেখানে সংঘ পরিবারের লোকেরা সামাজিক সংগঠন করার দীর্ঘ অভিজ্ঞতা ব্যবহার করে খুব সহজেই সেঁধিয়ে যেতে পারে। সুতরাং রাজনৈতিক দলগুলোকে বাইরে রেখে নাগরিক সমাজের স্বয়ংক্রিয় আন্দোলনকে জয় বলে ভেবে নেওয়া বিপজ্জনক। এতে বেয়াদপ শাসককে শিক্ষা দেওয়া হচ্ছে কিনা তা যেমন ভাবার, তেমনই বিজেপিকে আটকানো হচ্ছে মনে করে বিজেপির রাস্তাই পরিষ্কার করা হচ্ছে কিনা তাও ভেবে দেখা দরকার।

২০১৪ সালে মোদী সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকে এই প্রথম কোনো অ-বিজেপি রাজ্য সরকারের বিরুদ্ধে এত বড় গণআন্দোলন হচ্ছে। কেন পশ্চিমবঙ্গেই এমন হল? যে প্রতিবাদীরা একাধারে ফ্যাসিবিরোধী এবং তৃণমূলের কোনো দোষ দেখতে পান না, তাঁরা কি ভেবে দেখবেন?

নাগরিক ডট নেটে প্রকাশিত

জাতের নামে বজ্জাতিতেও বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্য

মানুষ যে আজও জাতের ভিত্তিতে অন্যায়ের সম্মুখীন হন, তা বাঙালিরা অনেকে বিশ্বাসই করেন না।

চিরাগ পাসোয়ান বেজায় চটেছেন। কে তিনি? তিনি এখন কেবল রামবিলাস পাসোয়ানের ছেলে নন। রীতিমত কেন্দ্রীয় মন্ত্রী এবং এনডিএ সরকারের অন্যতম শরিক। কার উপর চটেছেন? দেশের সর্বোচ্চ আদালতের একটা রায়ের উপর। গত সপ্তাহে সুপ্রিম কোর্টের সাত বিচারপতির সাংবিধানিক বেঞ্চ রায় দিয়েছে – তফসিলি জাতি, উপজাতির মানুষের জন্য সরকারি চাকরি এবং শিক্ষায় যে সংরক্ষণের ব্যবস্থা আছে তার মধ্যে আলাদা করে বেশি পিছিয়ে থাকা শ্রেণিগুলোর জন্যে রাজ্য সরকারগুলো সংরক্ষণের ব্যবস্থা করতে পারবে।

এই রায়ে কেন চিরাগ চটে গেলেন? তিনি দলের নেতৃত্ব পেয়েছেন উত্তরাধিকার সূত্রে, কিন্তু তাঁর বাবার রাজনীতিতে উত্থান বিহারে পিছিয়ে পড়া জাতের মানুষের অধিকারের রাজনীতি করে। তাই সংবিধানে সংরক্ষণের ব্যবস্থা কেন রাখা হয়েছে তা নিয়ে চিরাগের ধারণা খুব পরিষ্কার। যে কথা এদেশের উচ্চবর্গীয় মানুষ বোঝেন না অথবা না বোঝার ভান করেন, তা হল, দেশের গরিব মানুষকে ধনী বা মধ্যবিত্ত করে তোলার জন্য সংবিধানপ্রণেতারা সংরক্ষণের ব্যবস্থা করেননি। ওই ব্যবস্থা করা হয়েছিল কয়েক হাজার বছর ধরে বর্ণাশ্রমমাফিক যাদের নিচু জাত বলে দেগে দিয়ে যাবতীয় অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে, তাদের হাতে অধিকার তুলে দিতে। স্বাধীনতার ৭৭ বছর হতে চলল, সংরক্ষণের সুফল পেয়ে কিছু মানুষ আর্থসামাজিক দিক থেকে অনেকটা অগ্রসর হয়ে থাকলেও ভারতীয় সমাজ কিন্তু এখনো বর্ণাশ্রম মেনেই চলে। বিহারে অফিসের ব্রাহ্মণ চাপরাশি দলিত কালেক্টরকে আজও এক গ্লাস জল দেয় না। কালেক্টর বিচক্ষণ ব্যক্তি হলে জল চেয়ে ঝামেলা বাড়ান না। তাই চিরাগ ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন – সাতজন বিচারপতি নিজ নিজ রায়ে এত কথা বললেন আর ‘অস্পৃশ্যতা’ শব্দটাই উচ্চারণ করলেন না!

চাপরাশি-কালেক্টরের ব্যাপারটা বিশ্বাস না-ও হতে পারে, কারণ এইভাবে অস্পৃশ্যতার অনুশীলন পশ্চিমবঙ্গে সাধারণত দেখা যায় না। বাঙালি ভদ্রলোকদের অস্পৃশ্যতা অনুশীলন বাড়িতে মুসলমান অতিথি এলে তাঁর ব্যবহৃত কাপ প্লেট আলাদা করে সরিয়ে রেখে মেজে নেওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ। অতিথি দেখতে পান না বলে প্রগতিশীলতা আর জাত – দুটোই বজায় থাকে। তাই মানুষ যে আজও জাতের ভিত্তিতে অন্যায়ের সম্মুখীন হন, তা বাঙালিরা অনেকে বিশ্বাসই করেন না। অতএব নামধাম সমেত ঘটনা তুলে ধরা আবশ্যক।

জুলাই ২০১৫। উত্তরপ্রদেশের রেহুয়া লালগঞ্জের এক দলিত পরিবারের রাজু সরোজ আর ব্রিজেশ সরোজ নামে দুই ভাই আইআইটির প্রবেশিকা পরীক্ষায় পাস করেছিলেন বলে গ্রামের উচ্চবর্ণের লোকেরা তাঁদের বাড়িতে ঢিল পাটকেল ছুড়েছিল। তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী অখিলেশ যাদব রাজু আর সরোজকে সংবর্ধনা দেওয়ার পরে গ্রামের লোকের ব্যবহারে পরিবর্তন আসে। কিন্তু এক সর্বভারতীয় দৈনিকের প্রতিবেদককে তাঁরা জানিয়েছিলেন, ছোটবেলা থেকেই পড়াশোনায় নিরুৎসাহ করত গ্রামের লোকেরা। বলা হত, দলিতদের দ্বারা লেখাপড়া হয় না। আইআইটির প্রবেশিকা পরীক্ষার কয়েক সপ্তাহ আগে গ্রামের লোকেরা তাঁদের বাড়ির জলের লাইন পর্যন্ত কেটে দিয়েছিল। ২০২০ সালে হাথরসে উচ্চবর্গীয় ছেলেরা একটা দলিত মেয়েকে ধর্ষণ করে খুন করে দিয়েছিল। আজও কারোর শাস্তি তো হয়নি বটেই, মেয়েটার পরিবারই গৃহবন্দি হয়ে আছে। সেকথা এই কাগজেই ২০২৪ লোকসভা নির্বাচন পর্বে প্রকাশিত হয়েছে। এছাড়া অমুক জায়গায় দলিত বর ঘোড়ার পিঠে চেপে বিয়ে করতে যাচ্ছিল বলে তাকে উচ্চবর্গীয়রা পিটিয়েছে (যেমন ফেব্রুয়ারি ২০২৪), তমুক জায়গায় একজন দলিতের মুখে এক উচ্চবর্ণ কুলাঙ্গার পেচ্ছাপ করে দিয়েছে (যেমন জুন ২০২৪) – এসব সংবাদ তো কদিন অন্তরই আসতে থাকে।

মহামান্য বিচারপতিরা হয়ত এসব জানতে পারেন না। তাই তাঁদের বিচার্য মামলার বিষয় না হওয়া সত্ত্বেও কয়েকজন বিচারপতি স্বপ্নের মত সব কথা লিখেছেন রায়ে। যেমন ওই বেঞ্চের একমাত্র দলিত বিচারপতি বি আর গাওয়াই লিখেছেন ‘ক্রিমি লেয়ার’-এর কথা। অর্থাৎ তফসিলি জাতি, উপজাতিভুক্ত মানুষের মধ্যে যেসব পরিবার আর্থিকভাবে সচ্ছল হয়ে গেছে কয়েক প্রজন্ম ধরে সংরক্ষণের সুবিধা পেয়ে, তাদের সংরক্ষণের সুবিধা থেকে বাদ দেওয়া উচিত। বিচারপতি পঙ্কজ মিথাল আবার লিখেছেন, সংরক্ষণের সুবিধা কোনো পরিবারকে এক প্রজন্মের বেশি দেওয়া উচিত নয়।

এই দুই বিচারপতির কথার পিছনে যে ভাবনা কাজ করছে, তা হল সংরক্ষণ আর্থিক উত্তরণের এক উপায় মাত্র। সামাজিক বৈষম্যের প্রতিষেধক নয়। মোদী সরকারের মন্ত্রী চিরাগ তাই বলেছেন, জাতভিত্তিক বৈষম্য আপনি আর্থিকভাবে কত উপরে উঠেছেন বা কত বড় পদে আছেন তার উপর নির্ভর করে না। চূড়ান্ত সফল হলেও এই বৈষম্যের মুখোমুখি হতে হয়। তিনি যে ১০০% ঠিক কথা বলেছেন তা কয়েকদিন আগেই প্রমাণ করে দিয়েছেন মন্ত্রিসভায় চিরাগের সহকর্মী অনুরাগ ঠাকুর। তিনি বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধীর বর্ণভিত্তিক জনগণনার দাবিকে নস্যাৎ করার যুক্তি হিসাবে বলেছেন – যার নিজের জাতের ঠিক নেই সে আবার জাতভিত্তিক জনগণনার দাবি করে। বস্তুত ভারতের উঁচু জাতের লোকেরা নিচু জাতের লোকেদের সঙ্গে পেরে না উঠলে এই ভাষাতেই কথা বলে থাকে। নরেন্দ্র মোদীর নেতৃত্বে অমৃতকাল চলছে বলে সংসদের ভিতরেও এভাবে বলা গেল। এই দেশে ‘ক্রিমি লেয়ার’ কী? দেবা ন জানন্তি। বিচারপতি মিথাল তো আবার শ্রীমদ্ভগবদগীতা উদ্ধৃত করে বলেছেন প্রাচীন ভারতে বর্ণভিত্তিক অসাম্য ছিলই না। তাহলে মনুস্মৃতি বোধহয় কোনো ইংরেজের লেখা।

আরও পড়ুন বিহারের লালু: যে শত্রুকে মোদী ভোলেন না

তবে এসবের জন্য বিচারপতিদের ‘দক্ষিণপন্থী’, ‘কাউ বেল্টের লোক’ – এসব আখ্যা দিলে কিন্তু অন্যায় হবে। বাংলাদেশের চলতি হাসিনা সরকার-বিরোধী আন্দোলন নিয়ে প্রগতিশীল, বামপন্থী ভদ্রলোক শ্রেণির অনেক বাঙালি সোশাল মিডিয়ায় যা পোস্ট করেছেন তা থেকে স্পষ্ট বোঝা যায় – তাঁরা বাংলাদেশের সংরক্ষণ নীতি আর ভারতের সংরক্ষণ নীতির তফাত বোঝেননি এবং তাঁদের মনোভাব উক্ত বিচারপতিদের থেকে কিছুমাত্র আলাদা নয়। শুধু কি কয়েকজন ব্যক্তিরই এহেন মতামত? পশ্চিমবঙ্গে ৩৪ বছর বামপন্থী সরকারে নেতৃত্বকারী মার্কসবাদী দলটার মুখপত্রের সম্পাদকীয় এই রায় সম্পর্কে বলেছে ‘এটা ঠিক দারিদ্র্য দূরীকরণ, সমাজের সব অংশের কাছে উন্নয়নের সুফল সমানভাবে পৌঁছে দেবার ক্ষেত্রে সংরক্ষণ ব্যবস্থা অন্তর্বর্তীকালীন পদক্ষেপ হতে পারে কিন্তু স্থায়ী ব্যবস্থা নয়। তাই এই ব্যবস্থা অনন্তকাল চলতে পারে না। তেমনি সময়ের সাথে সাথে বিভিন্ন জাতি গোষ্ঠীর মধ্যে আর্থ-সামাজিক পরিবর্তন হয়। আজ যারা পশ্চাদপদ কাল তারা পশ্চাদপদ নাও থাকতে পারে। তেমনি শুধু জাতির পরিচয়ে কোনও অংশ প্রজন্মের পর প্রজন্ম সুবিধা ভোগ করে যেতে পারে না।’ অনিল বিশ্বাস এই পার্টিরই রাজ্য সম্পাদক তথা সর্বময় নেতা ছিলেন দীর্ঘকাল। বামফ্রন্ট সরকারের গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রী ছিলেন কান্তি বিশ্বাস। তারপরেও সংরক্ষণ সম্পর্কে এরকম ভ্রান্ত, বামনাই ভাবনা যখন এ রাজ্যের এককালীন শাসক দলের রয়ে গেছে, তখন পশ্চিমবঙ্গে জাতভিত্তিক বৈষম্য যে দিব্যি খেয়ে পরে বেঁচে আছে তা আর বলে দিতে হয় না।

অবশ্য এতে আশ্চর্যের কিছু নেই। যোগেন মণ্ডলকে তো বাংলার রাজনীতিতে কেউ স্মরণ করে না, চুনী কোটালকে স্মরণ করা হয় কেবল সিপিএমকে গাল দেওয়ার দরকার হলে। আর বিশ্ববিদ্যালয়ের দিদিমণি মেরুনা মুর্মুকে সোশাল মিডিয়ায় আজও উচ্চবর্ণ কন্যাসমা ছাত্রী গাল দেয় ‘কোটায় চাকরি পেয়েছেন’ বলে। এসবের বোধহয় একটাই সমাধান। বিহারের মত জাতভিত্তিক জনগণনা এ রাজ্যেও হয়ে যাক। দেখা যাক, সোনার চাঁদ আর সোনার টুকরো বলে যাদের কটাক্ষ করা হয় তারাই সব চাকরি-বাকরি নিয়ে বসে আছে আর বেচারা বামুন কায়েতরা সবার পিছে সবার নিচে পড়ে আছে কিনা।

উত্তরবঙ্গ সংবাদে প্রকাশিত

এসএসসি কেলেঙ্কারি: বনলতা সেন, রবীন্দ্রসঙ্গীত আর পরের ছেলে

রাম পরীক্ষায় পাস করে চাকরি পেয়েছে জানলে শ্যাম এসএসসির উপর হামলা করতে যাবে কেন? ১৯৯৮ সাল থেকে তো তেমন কিছু ঘটেনি।

ছোটবেলায় এক নিকটাত্মীয়কে দেখতাম ‘গনি খান’ বলতে অজ্ঞান। তখনো আবু বরকত আলি গনি খান চৌধুরী কংগ্রেসের কত বড় নেতা, কোথাকার নেতা, কী তাঁর দোষ বা গুণ – সেসব জানার বয়স আমার হয়নি। এটুকু জানতাম যে তিনি কংগ্রেস নেতা এবং কংগ্রেস আমাদের শত্রু। কারণ কংগ্রেস আমলে আমার বাবাকে অন্য পার্টি করার অপরাধে জেল খাটতে হয়েছে, পরিবারের অন্যদের উপরেও দমনপীড়ন চলেছে। ফলে ওই আত্মীয়ের গনি-মুগ্ধতা দেখে রাগে ফুলতাম। একদিন আমার মা বোঝালেন ‘আরে রাগ করিস কেন? গনি খানের জন্যে চাকরি পেয়েছেন উনি। নুন খাবেন আর গুণ গাবেন না?’ বড় হয়ে জেনেছি, গনি খান রেলমন্ত্রী থাকার সময়ে অনেক বঙ্গসন্তানকেই রেলে চাকরি দিয়েছিলেন এবং সেজন্যে বহু পরিবার আজীবন তাঁকে ভগবানের মত ভক্তি করত। তাঁর ভাইপো ঈশা খান যদি মালদা দক্ষিণ কেন্দ্রে জেতেন, তাতেও ওই কাজের কিছুটা অবদান থাকবে। সেই বঙ্গসন্তানরা সকলেই কি যোগ্য ছিল? আমার আত্মীয় কি যোগ্য ছিলেন? জানি না। তখন যোগ্যতার মাপকাঠি কী ছিল, আদৌ কিছু ছিল কিনা – তাও জানি না। মোদ্দাকথা গনি খান যে বিস্তর লোককে ক্ষমতা প্রয়োগ করে চাকরি পাইয়ে দিয়েছিলেন তা একটি সর্বজনবিদিত গোপনীয় তথ্য। শুনেছি কলকাতার শিয়ালদা অঞ্চলেও বহু পরিবার আছে যারা একসময় সোমেন মিত্র বলতে অজ্ঞান ছিল অনেকটা একই কারণে। বামফ্রন্ট আমলেও পার্টি-ঘনিষ্ঠ বলেই যে অনেকে চাকরি পেয়েছে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। তার উদাহরণও আমার পরিচিতদের মধ্যে আছে। তারা সকলে যে অযোগ্য তা নয়, কিন্তু পার্টি-ঘনিষ্ঠ হওয়ায় তারা যে অগ্রাধিকার পেয়েছিল তাতে ভুল নেই। কিন্তু ওসবের সঙ্গে এখন যে নিয়োগ দুর্নীতির রায় নিয়ে পশ্চিমবঙ্গ উত্তাল, সেই দুর্নীতির কোনো তুলনা চলে না।

কেন চলে না সে ব্যাখ্যায় আসব, তার আগে বলে নিই প্রথম অনুচ্ছেদেই কংগ্রেস আমল, বাম আমলের পিছন দরজা দিয়ে নিয়োগের কথা কেন বললাম। বনলতা সেনগিরি (‘এতদিন কোথায় ছিলেন?’) যে কোনো আলোচনাকে লাইনচ্যুত করে। ওই বিড়ালটি প্রথম রাত্রে মেরে রাখার জন্যেই বললাম। বিচারপতিদের কলমের এক আঁচড়ে পঁচিশ হাজারের বেশি স্কুলশিক্ষক ও শিক্ষাকর্মীর চাকরি চলে গেল যে দুর্নীতির জেরে, তার সঙ্গে অতীতে কোনো আমলে শাসকের ঘনিষ্ঠ হওয়ার সুবাদে পাওয়া চাকরির তুলনা চলে না প্রথমত এই কারণে, যে সেখানে শাসক চাকরি বিক্রির ব্যবসা ফেঁদে বসেনি। এখন অবধি যতটুকু আদালতে প্রমাণিত এবং সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত, তাতেই দেখা যাচ্ছে তৃণমূল কংগ্রেস নেতারা স্কুলের চাকরি কেনাবেচার রাজ্যজোড়া বাজার খুলে বসেছিলেন। ও জিনিস এ রাজ্যে অভূতপূর্ব। মধ্যপ্রদেশের ব্যাপম কেলেঙ্কারির সঙ্গে হয়ত তুলনা চলতে পারে।

দ্বিতীয়ত, মাপকাঠির প্রশ্ন। পশ্চিমবঙ্গে বহুকাল ধরে কলেজে শিক্ষক নিয়োগের জন্য কলেজ সার্ভিস কমিশনের পরীক্ষা চালু থাকলেও স্কুলশিক্ষক নিয়োগের কোনো মাপকাঠি ছিল না। স্কুলগুলো শূন্য পদ থাকলে নিজেরাই বিজ্ঞাপন দিত, ইন্টারভিউ নিত, নিয়োগ করত। এই ব্যবস্থারই সুযোগে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপে নিয়োগ চলত। সে রাস্তা বন্ধ করতেই স্কুল সার্ভিস কমিশন চালু করা হয়েছিল। কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগের জন্য সর্বভারতীয় নেট (National Eligibility Test) বা রাজ্যস্তরের স্লেট (State Level Eligibility Test) পরীক্ষার মত ১৯৯৭ সালে আইন করে পশ্চিমবঙ্গে চালু হয় স্কুল সার্ভিস কমিশনের পরীক্ষা (প্রথম পরীক্ষা ১৯৯৮ সালে)। অর্থাৎ রাজ্যের সব সরকারপোষিত স্কুলে শিক্ষক এবং শিক্ষাকর্মী নিয়োগের জন্য একটিই পরীক্ষা। লিখিত পরীক্ষা এবং কমিশনের বিশেষজ্ঞদের কাছে ইন্টারভিউতে পাস করলেই স্কুলের চাকরির পাকাপাকি ব্যবস্থা।

বাম আমলের শেষ দেড় দশকে পশ্চিমবঙ্গের উচ্চশিক্ষিত ছেলেমেয়েরা জানত, এ রাজ্যে তাদের জন্যে আর কিছু না থাক, একটা সরকারি চাকরি আছেই – স্কুলের চাকরি। ১৯৯৮-২০১০ – এক যুগ এই পরীক্ষা হয়েছে, মেধা তালিকা প্রকাশিত হয়েছে, নিয়োগ হয়েছে। যোগ্যতার যে মাপকাঠি এসএসসি ঠিক করেছিল সেটাই সঠিক কিনা, যারা এই পরীক্ষায় পাস করতে পারেনি তারাই যে অযোগ্য তার প্রমাণ কী – এসব সূক্ষ্ম তর্ক করাই যায়। কিন্তু ওই বছরগুলোতে অমুককে টপকে তমুক চাকরি পেয়ে গেল কী করে, অমুক তমুকের থেকে কম নম্বর পেয়েছে তাও আগে চাকরি পেল কী করে – এইসব অভিযোগ নিয়ে থানা পুলিস মামলা মোকদ্দমা হয়নি। অন্যায়ভাবে বাদ পড়ার অভিযোগ করে কাউকে রাজপথে বসে থাকতে হয়নি একদিনও। রাজ্যের শিক্ষামন্ত্রী ব্রাত্য বসু অবশ্য গতবছর মার্চে বলেছিলেন যে সিএজি রিপোর্টে উল্লেখ আছে, বাম আমলেও ৪৬,০০০ নিয়োগে অনিয়ম ছিল। তাঁদের সরকার ভদ্রতাবশত সেই অভিযোগের ভিত্তিতে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। তবে যেভাবে তৃণমূল সরকারের নিয়োগ দুর্নীতি নিয়ে রাজনীতি করছে বিরোধীরা, তাতে এইবার মুখ্যমন্ত্রীকে জানানো হবে। তিনি যা বলবেন তাই হবে। ব্রাত্যবাবু কি আজও জানাননি, নাকি মুখ্যমন্ত্রী এখনো চিরশত্রু বামেদের সঙ্গে ভদ্রতা করছেন? জানি না। সেইসময় ব্রাত্যবাবু বলেছিলেন ১৯৯৭ থেকে পশ্চিমবঙ্গে স্কুলে যত নিয়োগ হয়েছে তা নিয়ে শ্বেতপত্রও প্রকাশ করবে রাজ্য সরকার। সেই শ্বেতপত্রই বা কোথায় গেল?

এমনি ক’রেই যায় যদি দিন যাক না
যা-ই হোক, এসএসসি পরীক্ষা চালু রেখেই কীভাবে চাকরি বিক্রির বাজার খোলা যায়, সে বুদ্ধি সম্ভবত তৃণমূল সরকারের আমলে কেউ জোগাড় করে উঠতে পারেনি। তাই ব্যবস্থাটাকেই ধসিয়ে দেওয়া হল ক্রমশ। ২০১৩-১৪ থেকেই নানা অভিযোগ উঠতে শুরু করে, ২০১৬ থেকে অভিযোগের বন্যা। এখন যে ছেলেমেয়েরা কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করে তাদের সঙ্গে কথা বললে জানা যায় যে শিক্ষক হওয়ার প্রত্যাশা তারা অনেকেই ত্যাগ করেছে। এসএসসি পরীক্ষা আর কখনো সুষ্ঠুভাবে হয়ে স্কুলে তাদের চাকরি হবে বলে তারা মনে করে না। এই হতাশা নেহাত যুক্তিহীন বলা যাবে না। কারণ আজকাল নিজের ঘরে আগুন লাগার আগে পর্যন্ত কেউ কোথাও আগুন লেগেছে দেখলে গা করে না, আর স্কুলে নিয়োগের সংকট শেষ বিচারে খুব বেশি সংখ্যক পশ্চিমবঙ্গবাসীর সংকট নয়। যাদের চাকরি গেল তাদের সংকট, যারা এসএসসি পরীক্ষা দিয়েছিল তাদের সংকট, হয়ত যারা দেবে ভেবেছিল তাদের মানসিক হতাশার কারণ। আর সংকট স্কুল চালাতে নাকের জলে চোখের জলে হওয়া শিক্ষক-শিক্ষিকাদের, যাঁরা আদালতের সাম্প্রতিকতম রায়ের পরে আরও বিপদে পড়ে গেলেন। কারণ ইতিমধ্যেই বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন থেকে আমরা জেনে গেছি যে অনেক স্কুলে আর কোনো স্থায়ী শিক্ষকই থাকবেন না ২০১৬ সালে এসএসসি পাস করা ব্যক্তিরা বরখাস্ত হওয়ার পর। অনেক স্কুলে কোনো কোনো বিষয় আর পড়ানো যাবে না শিক্ষক নেই বলে। বিচারপতি দেবাংশু বসাক আর বিচারপতি মহম্মদ শব্বর রশীদি এই রায় দেওয়ার অনেক আগে থেকেই তো জানা যাচ্ছিল, কোথাও মাসিক তিন-চার হাজার টাকা বেতনে আংশিক সময়ের শিক্ষক চাইছে স্কুল, কোথাও আবার স্থানীয় মানুষের কাছে আবেদন জানানো হচ্ছে – যদি কোনো সহৃদয় ব্যক্তি এসে অমুক বিষয়টা বিনামূল্যে পড়িয়ে দিয়ে যান তো ভাল হয়। স্কুলে ওই বিষয়ের শিক্ষক নেই, অথচ ছাত্রছাত্রী আছে।

কিন্তু এসব স্কুলশিক্ষার সঙ্গে জড়িত মানুষের সমস্যা। যাঁরা পড়ান তাঁদের সমস্যা, যারা পড়ে তাদের আর তাদের বাবা-মায়েদের সমস্যা। এ নিয়ে নিয়মিত সান্ধ্য টিভি বিতর্ক হয় না। আজকাল তো এতরকম সমীক্ষা হয়। কেউ যদি সমীক্ষা করে, কলকাতার সম্পাদকদের কতজনের ছেলেমেয়ে সরকারপোষিত স্কুলে পড়ে আর যাঁরা স্টুডিওতে এসে গলা ফাটান তাঁদের কতজনের সন্তান ওসব স্কুলে পড়ে – তাহলেই বোঝা যাবে কেন সান্ধ্য বিতর্ক হয় না। এবারে নির্বাচন পর্বের মধ্যে এতগুলো লোকের চাকরি গেছে তাই, নইলে রাজ্যের মূলধারার সংবাদমাধ্যম কতদূর পাত্তা দিত সন্দেহ আছে। কলকাতা নাকি প্রতিবাদের শহর। সেখানে কয়েকশো ছেলেমেয়ে হাজার দিনের বেশি রাস্তায় বসে আছে (সকলে চাকরির দাবি করেও নয়, অনেকে যোগ্যতা প্রমাণের সুযোগ দাবি করে), অথচ সরকারি স্কুলশিক্ষায় কিছু এসে যায় না এমন কজন মানুষ একবার গিয়ে দাঁড়িয়েছেন সেখানে? টিভি ক্যামেরাও পৌঁছয় কখনো সরকার বা বিরোধী পক্ষের কোনো নেতার কথায়, কি আদালতের খোঁচায় এই ইস্যু উঠে এলে তবেই। এমনকি এই ১১০০ দিন পেরিয়ে যাওয়া আন্দোলনের পাশে দাঁড়ানোর কথা চাকরি পেয়ে যাওয়া শিক্ষক-শিক্ষিকাদেরও কোনোদিন মনে পড়েনি। তাঁরা বিভিন্ন শিক্ষক সংগঠনের উদ্যোগে কলকাতার বিভিন্ন জায়গায় গিয়ে বসলেন কখন? যখন রাজ্য সরকার মহার্ঘ ভাতার দাবি উড়িয়ে দিল। তার আগে চাকরিপ্রার্থীদের হয়ে একটাও মিছিল করেছেন এসএসসির যুগে চাকরি পাওয়া নবীন বা তার আগের যুগে চাকরি পাওয়া প্রবীণ শিক্ষকরা? একদিনও আন্দোলনের সঙ্গে সহমর্মিতা জানাতে গিয়ে বসেছেন পথে?

২০১৯ সালে যখন ধর্মতলায় প্রায় একমাস ধরে অনশন করেছিলেন চাকরিপ্রার্থীরা, তখন একদিন অফিস যাওয়ার পথে গিয়েছিলাম সেখানে। সেদিনও প্রবল গরম আর অদূরে ইডেন উদ্যানে আইপিএলের প্রথম খেলা। কাতারে কাতারে মানুষ ইডেনমুখো। তার মধ্যে ভরদুপুরে মুখ অন্ধকার করে শহরের একেবারে মধ্যিখানে বসেছিল কতকগুলো ছেলেমেয়ে। কখনো বিমান বসু গেছেন বলে টিভি ক্যামেরা গেছে, কখনো কোনো বিজেপি নেতা গেছেন বলে গেছে। সেবার ব্যাপারটা একটু বিপজ্জনক দিকে চলে যাওয়ায় (আসলে বোধহয় সেটাও নির্বাচনের বছর হওয়ায়) শেষমেশ মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি নিজে গিয়ে চাকরি হবে আশ্বাস দিয়ে অনশন ভাঙিয়েছিলেন। চাকরি হয়নি। কিন্তু সেকথা কে মনে রেখেছিল এতদিন? যে কোনো আন্দোলন অবশ্য এ রাজ্যে এমন প্রতিক্রিয়াই পায়। ছন্দা সাহা, রেবতী রাউত, তাপস বর – এই মানুষগুলোর কারোর মনে আছে আজ? করুণাময়ী মোড় থেকে অত্যন্ত নির্দয়ভাবে যখন রাস্তা দিয়ে টেনে হিঁচড়ে আন্দোলনকারীদের নিয়ে গেছে পুলিস, তখন মনে করতে বাধ্য হয়েছেন অনেকে। কারণ টিভিতে দেখা গেছে, কাগজে ছবি বেরিয়েছে। ব্যাস ওটুকুই।

এখন হাজার পঁচিশেক মানুষের চাকরি গেছে শুনে প্রায় অর্ধশতক আগের বেকারত্বের হারে পৌঁছে যাওয়া দেশের কিছু মানুষ আশ্চর্য রকম খুশি। কেন খুশি জানি না। এদের অনেককেই তো বেকারত্ব নিয়ে অন্য সময়ে চিন্তিত দেখি। ওই যে অটোর পিছনে লেখা থাকে ‘দ্যাখ কেমন লাগে’ – তেমন কোনো ধর্ষকাম মানসিকতা ছাড়া এর কোনো ব্যাখ্যা নেই বলেই মনে হয়। অবশ্য যে মানুষ পাশের বাড়িতে আগুন লেগেছে দেখে বালতি ভরে জল নিয়ে দৌড়ে যাওয়া দূরে থাক, হায় হায় বলে আর্তনাদও করে না, সে যে ধর্ষকাম তাতে আর সন্দেহ কী? এ যুগে ক্ষেত্রবিশেষে আমরা সবাই ধর্ষকাম। সুতরাং আমাদের তৈরি রাষ্ট্র যে ধর্ষকাম হবে তা বলাই বাহুল্য। আদালত বারবার চাইলেও নিয়ামক সংস্থা কারা পাস করেছিল আর কারা টাকা দিয়ে চাকরি পেয়েছে তা ঝাড়াই বাছাই করার জন্যে প্রয়োজনীয় ওএমআর শিট জমা দেয় না। সরকার ওএমআর শিট তিনবছর রেখে দেওয়ার নিয়ম বদলে একবছর করে দেয়, তারপর বিপদ বুঝে বলে – এবার থেকে দশবছর রাখা থাকবে। আর আদালত ঝাড়াই বাছাই করা যাচ্ছে না বলে সকলেরই চাকরি খায়।

এমনিতে যে ভারতীয় আদালতে কোনো মামলার নিষ্পত্তি হওয়ার গতি সবচেয়ে বেশি, সেটা হল হিন্দি সিনেমার আদালত – আড়াই থেকে তিন ঘন্টায় পুলিস তদন্ত শেষ করে আদালতে রিপোর্ট দাখিল করে, বিচারপতি সাক্ষী সাবুদ যাচাই করে রায় দিয়ে দেন। এদেশের অন্য সব আদালতই রাবীন্দ্রিক – এমনি ক’রেই যায় যদি দিন যাক না। কিন্তু এই মামলায় দেখা গেল আদালত রীতিমত ‘ফাস্ট ট্র্যাক’। গত ৯ নভেম্বর সুপ্রিম কোর্ট নিয়োগ সংক্রান্ত সব মামলার একত্রে বিচার করার জন্য কলকাতা হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতিকে বিশেষ বেঞ্চ গঠন করতে অনুরোধ করেছিল। তৎকালীন বিচারপতি অভিজিৎ গঙ্গোপাধ্যায়ের রায়ে যাদের চাকরি গিয়েছিল তাদের বরখাস্ত করার নির্দেশও ছমাসের জন্য রদ করে দিয়েছিল, যাতে ইতিমধ্যে বিশেষ বেঞ্চ বিচারের কাজ শেষ করতে পারে। পাঁচ মাস ২১ দিনের মাথায় রায় ঘোষণা করে দিলেন মহামান্য বিচারপতিরা। এমন নির্দিষ্ট তারিখ মেনে দেশে খুন, ধর্ষণ, সন্ত্রাসবাদী হামলার অভিযোগের বিচারও যদি হত! বোঝা যাচ্ছে আদালতের তাড়া ছিল। এত তাড়া ছিল যে তিনবার বৈধ চাকুরেদের তালিকা দিতে বলা সত্ত্বেও যখন স্কুল সার্ভিস কমিশন দিল না, তখন তার চেয়ারম্যানকে গ্রেফতার করানো বা বরখাস্ত করার সময় পেল না আদালত। গোটা কেলেঙ্কারিতে ক্যাবিনেটের দায় আছে বোঝা সত্ত্বেও যিনি এ রাজ্যের শিক্ষামন্ত্রী তাঁকেও তখনই ধরতে বলা হল না সিবিআইকে। ঘুষ দেওয়া-নেওয়ার মামলায় ঘুষ কে বা কারা নিয়েছে তার খোঁজ পরে হবে, আগে বরখাস্ত হল যারা ঘুষ দিয়েছে তারা। সঙ্গে যারা ঘুষ দেয়নি বলে আদালতেরও বিশ্বাস, তারাও।

পরের ছেলে পরমানন্দ
বিচারকদের তাড়া থাকতেই পারে। কার রাজ্যপাল হওয়ার তাড়া, কার সাংসদ হওয়ার তাড়া তা আমাদের মত সাধারণ মানুষের পক্ষে বোঝা সম্ভব নয়। আমরা আইন-টাইনও তত বুঝি না। কিন্তু আশ্চর্য লাগে যখন দেখি ঘুষ নেওয়ার চেয়েও বড় অপরাধ হয়ে দাঁড়াচ্ছে ঘুষ দেওয়া। আমাদের উদাসীনতা বা ধর্ষকাম মানসিকতা স্বীকার করে নিয়ে মনে করিয়ে দিই, আমরা এমন এক রাজ্যে বাস করি যেখানে কয়েক বছর আগে যথেষ্ট নম্বর পেয়েও কলেজে ভর্তি হতে গেলে শাসক দলের ছাত্র সংসদকে মোটা টাকা ঘুষ দিতে হচ্ছিল। সেই রাজ্যে ঘুষ দিয়ে চাকরি পাওয়াকে ঠিক কতখানি অপরাধ বলে গণ্য করা উচিত, সেই নৈতিক প্রশ্নের উত্তর আমি নিজেকে দিয়ে উঠতে পারছি না। আইনে সবকিছু মোটা হরফে লেখা আছে, নীতি ব্যাপারটা তো অত সোজা নয়। পশ্চিমবঙ্গে বসে সন্দেহ করা আদৌ অন্যায় নয় যে যাঁরা টাকা দিয়ে চাকরি পেয়েছেন তাঁদের মধ্যেও এমন প্রার্থী আছেন, যিনি সসম্মানে পরীক্ষায় পাস করেছিলেন। কিন্তু অমুক দাদা বা তমুক দিদি হয়ত ডেকে বলেছিলেন, অমুক পরিমাণ টাকা না দিলে নিয়োগপত্র দেওয়া হবে না।

এমন কোনো মতলব না থাকলে পার্থ চ্যাটার্জি শিক্ষামন্ত্রী থাকাকালীন প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার মেধা তালিকা প্রকাশ না করে এসএমএসে যোগ্য প্রার্থীদের জানানো হবে বলেছিলেন কেন? পাবলিক পরীক্ষায় কে কে পাস করেছে সে তথ্য প্রাইভেট হবে কেন? এ তো নির্বাচনী বন্ডের মত হয়ে গেল – কে টাকা দিল, কাকে টাকা দিল তা তৃতীয় ব্যক্তি যেন জানতে না পারে। শুধু যে টাকা পেল সে জানবে আর যে দিল সে জানবে। এক্ষেত্রেও যে চাকরি পেল শুধু সে-ই জানল আর যে চাকরি দিল সে জানল। নির্বাচনী বন্ডে ওই ব্যবস্থা করার পক্ষে তবু একটা অজুহাত ছিল। কোন দলকে কে চাঁদা দিচ্ছে জানলে অন্য দল দাতার উপর হামলা করতে পারে। কিন্তু রাম পরীক্ষায় পাস করে চাকরি পেয়েছে জানলে শ্যাম এসএসসির উপর হামলা করতে যাবে কেন? ১৯৯৮ সাল থেকে তো তেমন কিছু ঘটেনি। বরং বহু চাকরিপ্রার্থীই একবার পাস করতে না পেরে আবার পরীক্ষা দিয়েছেন, দ্বিতীয় বা তৃতীয় বারে উত্তীর্ণ হয়ে চাকরি পেয়েছেন। আর এখন হাজার জোরাজুরিতেও কমিশন জানিয়ে উঠতে পারছে না যে কারা উত্তীর্ণ হয়েছিলেন? এ তো বড় রঙ্গ যাদু।

এই কারণেই না ভেবে উপায় নেই যে আদালতকে যোগ্য-অযোগ্য আলাদা করতে সাহায্য না করার কারণ আসলে অনুত্তীর্ণরা। কমিশনের বর্তমান চেয়ারম্যান সিদ্ধার্থ মজুমদার জোর দিয়ে বলছেন চাকরি যাওয়া ২৫,৭৫৩ জনের মধ্যে মাত্র ৫,২৫০ জন অযোগ্য। অথচ ‘(বাকিরা যে প্রত্যেকে যোগ্য) সেই বিষয়ে নিশ্চিত নই। পুরোপুরি শংসাপত্র দিতে পারব না।’ কেন পারবেন না? ওএমআর শিট নেই বলে? কেন নেই? ঠিক ২০১৬ সালেই নিয়ম বদলে ওএমআর শিট তিন বছরের বদলে এক বছর রাখলেই চলবে এই নিয়ম করা হয়েছিল বলে? সেই নিয়ম কি করাই হয়েছিল ওএমআর শিট পুড়িয়ে দেওয়া হবে বলে? পুড়িয়ে দেওয়ার তাড়াহুড়ো কি আজকের মত পরিস্থিতির কথা ভেবে করা হয়েছিল? যদি আদালতকে ২০,৫০৩ জন যোগ্য প্রার্থীর নাম জানিয়ে দেওয়া হত তাহলে তাঁদের চাকরি যেত না। যেত কেবল বাকিদের। তখন ওই হাজার পাঁচেক মানুষ সদলবলে যাঁদের হাতে টাকা দিয়েছেন তাঁদের কাছে টাকা ফেরত চাইতেন এবং ব্যাপারটা একেবারে অহিংস থাকত, এমন সম্ভাবনা কম। অর্থাৎ আদালতের রায়ে এই দূরদৃষ্টিসম্পন্ন অপরাধের কারবারীদের পিঠ আক্ষরিক অর্থে বেঁচে গেল। এখন মুখ্যমন্ত্রী, তাঁর ভাইপো, শিক্ষামন্ত্রী, এসএসসি চেয়ারম্যান – সকলেই সুপ্রিম কোর্ট দেখিয়ে বলতে পারছেন, এই তো আবেদন করেছি। কোনো চিন্তা নেই।

ঘটনা হল, আবেদন করলেও চিন্তার যথেষ্ট কারণ আছে। হাইকোর্টের এই বিশেষ বেঞ্চ গঠিতই হয়েছিল সুপ্রিম কোর্টের অনুরোধে (পড়ুন নির্দেশে)। সেই বেঞ্চের রায় কি একেবারে উল্টে দেবেন সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিরা? বড়জোর তমলুকের বিজেপি প্রার্থী, থুড়ি প্রাক্তন বিচারপতি, অভিজিৎ গঙ্গোপাধ্যায়ের রায়ের যেমন প্রয়োগ আটকে দেওয়া হয়েছিল কিছুদিনের জন্যে, তেমন কিছু হতে পারে। নির্বাচন পর্ব শেষ হওয়ার আগেই তা হলে তৃণমূলের লাভ, না হলে বিজেপির। যাঁদের চাকরি গেল তাঁদের অবস্থা উনিশ-বিশ হবে আর যাঁরা রাস্তায় বসে আছেন তাঁদের দুর্দশারও কোনো সুরাহা হবে না। ইতিমধ্যে যারা ঘুষ নিয়েছিল তারা হয়ত বাঙ্কার-টাঙ্কার বানাবে অথবা য পলায়তি স জীবতি উপদেশ শিরোধার্য করবে।

আর আমরা? কদিন পরেই যোগ্য, অযোগ্য, যোগ্যতা প্রমাণের সুযোগ না পাওয়া – সকলের কথাই ভুলে যাব। তারপর হয়ত একদিন সুপ্রিম কোর্টের রায় বেরোবে। তাতে যদি রায় উল্টে যায় তাহলে যাঁদের চাকরি বেঁচে গেল তাঁদের এবং তাঁদের পরিবার পরিজনের কাছে তৃণমূল স্বচ্ছ দল হয়ে যাবে; যদি হাইকোর্টের রায় বহাল থাকে তাঁরা সুদ্ধ সকলের কাছে তৃণমূল চোর বলে প্রমাণিত হবে। বাংলার লক্ষ স্কুল নিরাশায়, আলোহীনতায় ডুবে নিস্তব্ধ নিস্তেল হয়ে গেলে তৃণমূলের কী, বিজেপির কী, আদালতের কী আর আমাদেরই বা কী? আমাদের ছেলেমেয়েরা তো আর ওসব স্কুলে পড়ে না। ওগুলো না হয় কদিন পরে উঠে যাবে বা বেসরকারি হয়ে যাবে। সকলেই জানে – বেসরকারি হলে পরিষেবা ভাল হবে।

অতএব ও নিয়ে ভেবে লাভ নেই। নির্বাচনে কে জিতল সেটাই আসল কথা।

পিপলস রিপোর্টারে প্রকাশিত

গিলি গিলি গে: মোদী ম্যাজিক বলতে যা বোঝায়

মোদী ম্যাজিক কথাটা তো সেই ২০১৪ সাল থেকে শুনে আসছেন। কিন্তু ভেবে দেখেছেন কি, ম্যাজিকটা ঠিক কী? এমনিতে বাঙালি পি সি সরকারের জাত। হাত-পা বেঁধে গালা দিয়ে সিল করা প্যাকিং বাক্সে পুরে সমুদ্রে ফেলে দিলেও সাঁতরে পাড়ে এসে ওঠা, লোকের চোখে সামনে আস্ত ট্রেন বা তাজমহল ভ্যানিশ করে দেওয়াই যে ম্যাজিকের সর্বোচ্চ স্তর তা আমরা ছোটবেলা থেকে জানি। ফলে জাত জাদুকর চিনতে আমাদের ভুল হয় না। পি সি সরকার জুনিয়র যে দলের প্রার্থী হয়েছিলেন একদা, সেই দলের সর্বকালের সবচেয়ে জনপ্রিয় নেতা নরেন্দ্র মোদীর ম্যাজিকগুলো এইবেলা চিনে নেওয়া আমাদের কর্তব্য। কারণ প্রথম দু দফা ভোটদানের পরে অনেক বিশ্লেষক বলছেন ২০১৪ আর ২০১৯ সালের মত মোদী ম্যাজিক নাকি হচ্ছে না। এঁদের বাড়া ভাতে ছাই দিয়ে ৪ জুন মোদী চারশো পার করে ফেলতেই পারেন। তখন এঁরা কী বলবেন? আমরা বরং একটু এগিয়ে থাকার চেষ্টা করি। ইন্দ্রজাল কেমন করে হয় তা তো শুধু জাদুকর জানেন। আমাদের সাধ্য কী বুঝে ফেলি? আমরা কেবল জাদুকর মঞ্চের উপরে যা যা করেন সেগুলো চিহ্নিত করতে পারি। সেটাই করা যাক।

ছিল নির্বাচন কমিশন, হল ঠুঁটো জগন্নাথ

এবারের ভোটে সোজা পথে জেতা সহজ হবে না আন্দাজ করে সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে প্রধান নির্বাচন কমিশনার বেছে নেওয়ার কমিটিতে দেশের প্রধান বিচারপতির বদলে একজন ক্যাবিনেট মন্ত্রীকে রাখার আইন পাস করা হয়েছে। তারপর সেই আইন অনুযায়ী এমন লোকেদের বেছে নেওয়া হয়েছে যাঁরা মোদীর গত রবিবারের ঘৃণাভাষণ নিয়ে মন্তব্য করতেও ভয় পান। সতেরো হাজার নাগরিক স্বাক্ষরিত চিঠি বা মোদীর মন্তব্য নিয়ে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের সমালোচনাও নির্বাচন কমিশনের মুখ খোলাতে পারেনি। এর জন্যে নির্বাচন কমিশনারদের আবার রামভক্ত বলে বসবেন না। তাঁরা কুম্ভকর্ণের ভক্ত। তবে চক্ষুলজ্জা বলে তো একটা জিনিস আছে। তাই তাঁরা নিরপেক্ষতা দেখাতে রাহুল গান্ধী আর মোদী – দুজনের বক্তব্যেই আপত্তি জানিয়ে দুই ব্যক্তিকে নয়, তাঁদের পার্টিকে নোটিস পাঠিয়েছেন। অভূতপূর্ব ঘটনা, অর্থাৎ ম্যাজিক।

প্রার্থী ভ্যানিশ

যে কোনো বড় ঐন্দ্রজালিকের মত মোদীর ঝুলিতে আরও অনেক তাস আছে। তাঁর খাসতালুক গুজরাটের সুরাটে যাতে এই গরমে ভোটারদের ভোট দিতে বেরোতে না হয় তার ব্যবস্থা করে ফেলেছে দল। কংগ্রেস প্রার্থী নীলেশ কুম্ভানির প্রস্তাবকদের সই নিয়ে সন্দেহ আছে বলে অভিযোগ করেছিল বিজেপি। রিটার্নিং অফিসার সৌরভ পাড়হি সেই অভিযোগে সায় দেন। বলেন প্রস্তাবকরা নাকি হলফনামা জমা দিয়ে জানিয়েছেন যে ওগুলো তাঁদের সই নয়। কংগ্রেস অভিযোগ করেছে সেই প্রস্তাবকদের অপহরণ করা হয়েছিল, যাতে প্রার্থী তাঁদের সশরীরে রিটার্নিং অফিসারের সামনে হাজির করতে না পারেন। ঘটনা এইটুকু হলেও না হয় কথা ছিল। কিন্তু কংগ্রেসের বিকল্প প্রার্থী সুরেশ পাড়সালার মনোনয়নও বাতিল করে দেওয়া হয়েছে। শুধু কি তাই? সুরাট কেন্দ্রের নির্দল প্রার্থীরাও কোনো অজ্ঞাত কারণে মনোনয়ন প্রত্যাহার করেছেন। ফলে বিজেপি প্রার্থী মুকেশ দালাল ইতিমধ্যেই হাসি হাসি মুখে রিটার্নিং অফিসারের হাত থেকে জয়ীর শংসাপত্র নিয়ে ছবি তুলে ফেলেছেন। এদিকে কুম্ভানি নিজেও সোমবারের পর উধাও। কংগ্রেসের কেউ কেউ মনে করছেন উনি কয়েকদিনের মধ্যেই বিজেপিতে যোগ দেবেন। গুজরাট প্রদেশ কংগ্রেস কমিটি তাঁকে ছ বছরের জন্য দল থেকে বহিষ্কারও করেছে বিজেপির সঙ্গে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত থাকার অভিযোগ করে।

এর আগেই আমেদাবাদ পূর্ব আসনের কংগ্রেস প্রার্থী রোহন গুপ্তা নাম ঘোষণা হয়ে যাওয়ার পর বাবার অসুস্থতার দোহাই দিয়ে ভোটে দাঁড়াবেন না বলেন, তারপর দলত্যাগ করেন। আগামী কয়েক দফার নির্বাচনে আরও কত আসনে এরকম ঘটবে কে বলতে পারে?

এক পার্টি থেকে দুই, দুই থেকে চার

কংগ্রেস মোদীর ঘৃণাভাষণ এবং সুরাটের ঘটনার প্রতিবাদ করে নির্বাচন কমিশনে লম্বা চিঠি দিয়ে এসেছে। কিন্তু নির্বাচন কমিশন কী করবে? অনেক আগেই মহারাষ্ট্রের দুই শক্তিশালী দল শিবসেনা আর এনসিপিকে ভেঙে দিয়েছে মোদীর বিকাশ। তারপর বিজেপির সঙ্গে চলে যাওয়া অংশকেই আসল দল তকমা দিয়ে তাদেরই দলীয় প্রতীক ব্যবহারের ক্ষমতা দিয়েছে নির্বাচন কমিশন। মোদী সাত্ত্বিক মানুষ, মদ্যপান করেন না। তাই দীপ জ্বেলে যাই ছবির অনিল চ্যাটার্জির মত জলের বোতল হাতে নিয়ে গাইতেই পারেন ‘এমন বন্ধু আর কে আছে?’

লোকাল ট্রেনে দশ টাকায় দশখানা কলম বিক্রি করা হকারদের দেখেছেন তো? তাঁরা একটা করে কলম বার করেন আর এমন বিশদে তার গুণাবলী বর্ণনা করেন যে মনে হয় এটাই শেষ কলম। তারপর বলেন ‘এখানেই শেষ নয়…’। মোদীর চারশো পারের ম্যাজিকও সেইরকম।

যেমন সিপিএম অভিযোগ করেছে, ত্রিপুরা পশ্চিম কেন্দ্রের সরকারি নথিই বলছে কোথাও কোথাও ১০০ শতাংশের বেশি ভোট পড়েছে।

নমো যন্ত্র, নমো যন্ত্র, নমো যন্ত্র…

এখানেই শেষ নয়। আছে ইভিএম। মোদীভক্তদের কথা আলাদা। তার বাইরে যাঁরা কাল অবধিও ইভিএমে কারচুপি আছে শুনলেই বিরোধীদের ছিঁচকাঁদুনে বলতেন, তাঁরাও এখন ব্যাপারটাকে নেহাত ষড়যন্ত্রের তত্ত্ব বলে উড়িয়ে দিতে পারছেন না। কারণ নির্বাচন কমিশন ইভিএম নিয়ে প্রশ্ন উঠলেই যা করে, তাকে বাংলায় বহুকাল ধরে বলা হয় ‘ঠাকুরঘরে কে রে? আমি তো কলা খাইনি’।

নির্বাচনী বন্ড নিয়ে যাঁরা মামলা করেছিলেন তাঁদের অন্যতম, অ্যাসোসিয়েশন ফর ডেমোক্র্যাটিক রাইটস (এডিআর), এবং আরও অনেকে মিলে সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হয়েছিলেন ইভিএম নিয়ে। ইভিএম বাতিল করার দাবি করা হয়নি। দাবি ছিল ইভিএমের ভোট যে ভোটারের মতই প্রতিফলিত করছে তা নিশ্চিত করতে সমস্ত ভোটার ভেরিফায়েবল পেপার অডিট ট্রেল (ভিভিপ্যাট) স্লিপ গোনা হোক। নির্বাচন কমিশন সেটুকুও এড়াতে মরিয়া। ভিভিপ্যাট গোনার জন্যে নয়, গুনতে গেলে পাঁচদিন লেগে যাবে ইত্যাদি অদ্ভুত যুক্তি দেওয়া হয়েছিল কমিশনের পক্ষ থেকে। কোনো প্রযুক্তিগত গোলমাল যে নেই তাও কেবল মুখের কথায় বিশ্বাস করতে হবে – এরকমই দাবি নির্বাচন কমিশনের। শুনানি চলাকালীনই কেরালার কসরগোড় থেকে খবর আসে যে মক পোলে বিজেপির প্রতীকে একটা করে অতিরিক্ত ভোট চলে যাচ্ছে কিছু ইভিএমে। বিচারপতি সঞ্জীব খান্না ও বিচারপতি দীপঙ্কর দত্তের বেঞ্চ কমিশনকে খতিয়ে দেখতে বলে। কমিশন বলে দেয় খবরটাই নাকি মিথ্যে।

আরও পড়ুন এক যে ছিল সংসদ

মজার কথা, নির্বাচন কমিশনের যে চার বিশেষজ্ঞের দল আছে ইভিএম-ভিভিপ্যাট ব্যবস্থা সুরক্ষিত আছে কিনা তা দেখার জন্য, তার সদস্যরা নিজেরাই ভিভিপ্যাট নির্মাণ করেছেন। দ্য নিউজ মিনিট ওয়েবসাইটের এই তাক লাগানো প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে গত সোমবার। মানে আপনার বানানো মেশিন যে ঠিক কাজ করছে তার সার্টিফিকেট দিচ্ছেন আপনিই। এরকম একটা ব্যবস্থায় চলছে গোটা দেশের লোকসভা ও বিধানসভা নির্বাচন। কখনো কোনো বাইরের লোককে পরীক্ষা করে দেখতে দেওয়া হয়নি এই ব্যবস্থায় কোনো গলদ আছে কিনা। কিন্তু শেষমেশ বিচারপতিরা রায় দিয়েছেন, সমস্ত ভিভিপ্যাট স্লিপ গোনার কোনো দরকার নেই। তবে যে কম্পিউটার থেকে ইভিএমে পার্টিগুলোর প্রতীক ঢোকানো হয়, সেগুলোকেও ইভিএম আর ভিভিপ্যাট মেশিনের সঙ্গে ফল ঘোষণার ৪৫ দিন পর পর্যন্ত সংরক্ষণ করতে হবে। পরাজিত প্রার্থীরা ৫% ইভিএম যাচাই করতে চাইতে পারবেন স্বখরচায়।

বিচারপতি খান্না আর বিচারপতি দত্ত এই রায় দিতে গিয়ে বলেছেন, সবসময় অন্ধভাবে নির্বাচন প্রক্রিয়াকে অবিশ্বাস করলে অপ্রীতিকর সন্দেহ তৈরি হতে পারে। শ্রীরামকৃষ্ণ বলেছিলেন, যতদিন বাঁচি ততদিন শিখি। এতদিন জানতাম বিশ্বাস অন্ধ হয়। বিচারপতিদ্বয় আমাদের শেখালেন, অবিশ্বাসও অন্ধ হয়।

ট্রেন ভ্যানিশ

এখানেও শেষ নয়। অভিযোগ উঠেছে যে আসামের প্রবাসী শ্রমিকরা (যাঁদের বড় অংশ মুসলমান) যাতে ভোট দিতে আসতে না পারেন, সেই উদ্দেশ্যে আসামগামী ছটা ট্রেন বাতিল করা হয়েছে।

জাদুকর মোদী যখন ঝুলি থেকে এত পায়রা, খরগোশ ইত্যাদি বার করতে পারেন তখন তাঁর চারশো পার করা কি নিশ্চিত?

মোটেই না। গত কয়েক বছর ধরে যেভাবে বিরোধী মতের রাজনীতিবিদ, সমাজকর্মী, ছাত্রনেতা এবং সাংবাদিকদের কারারুদ্ধ করা হচ্ছে; গত কয়েক মাসে যেভাবে বিরোধী দলের মুখ্যমন্ত্রীদেরও জেলে পোরা হয়েছে; গত কয়েক দিন ধরে মোদী যেভাবে কংগ্রেসকেও মাওবাদী বলে দেগে দিচ্ছেন তাঁর বক্তৃতায় এবং তাঁর ডান হাত শাহ যেভাবে বলেছেন এবার ক্ষমতায় এলে দুবছরের মধ্যে ভারতে মাওবাদ শেষ করে দেওয়া হবে, তার সঙ্গে অনেকটা মিলে যায় ১৯৩৩ সালে জার্মানির ফেডারেল ইলেকশনের আগে নাজি সরকারের কার্যকলাপ। অত কাণ্ড করেও কিন্তু তারা সেবার নির্বাচনে একা সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়নি। জার্মান ন্যাশনাল পিপলস পার্টির (ডিএনভিপি) মদত দরকার হয়েছিল। সেই দলকে অনতিবিলম্বেই গিলে নেয় অ্যাডলফ হিটলারের দল এবং প্রতিষ্ঠিত হয় একনায়কতান্ত্রিক শাসন। মোদীর দলেরও জোটসঙ্গী আছে। ২০১৯ সালের চেয়ে কম, কারণ অনেকেই বিপদের আশঙ্কা করে কেটে পড়েছে। তবু আছে। তার বাইরেও আছে কিছু দল, যাদের দুর্নীতির সুযোগ নিয়ে ভ্যানিশ করার জন্যে মোদীর হাতে আছে আয়কর বিভাগ, ইডি, সিবিআই। গত সোমবারই যেমন কলকাতা হাইকোর্টের এসএসসি মামলার রায়ে সিবিআই তদন্তের আওতায় চলে এসেছে মমতা ব্যানার্জির পুরো ক্যাবিনেট। অর্থাৎ এই রায়ে আর কিছু হোক না হোক, অন্তত লোকসভা ত্রিশঙ্কু হলে মোদীর তৃণমূলের সমর্থন আদায় করার ব্যবস্থা হয়ে রইল।

১৯৩৩ সালের পর জার্মানিতে আর বহুদলীয় নির্বাচন হয়নি দেড় দশক। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে নাজি জার্মানির শোচনীয় পরাজয় না হলে আরও কতদিন হত না তা বলা কঠিন। সুতরাং যে ভারতীয় ভোট দেওয়ার অধিকারকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন, তিনি যে দলেরই সমর্থক হোন, এই নির্বাচনে তাঁর একটাই কাজ – আর পাঁচটা দলের সমর্থন নিয়েও মোদীর ক্ষমতায় ফিরতে না পারা নিশ্চিত করা। ম্যাজিক মঞ্চেই ভাল। কারণ সে ম্যাজিকে যারা ভ্যানিশ হয় তাদের জাদুকর আবার ফিরিয়ে আনেন। নাজিরা যাদের ভ্যানিশ করে দিয়েছিল তারা কিন্তু আর ফেরেনি। তাদের মধ্যে কেবল কমিউনিস্ট, সোশালিস্ট আর নাজিবিরোধী, ইহুদি আর সমকামীরা ছিল না।

নাগরিক ডট নেটে প্রকাশিত

বিবিসিকে বাদ দিয়ে বিশ্বগুরু থাকতে পারবেন মোদী?

বিবিসি যতখানি সম্পাদকীয় স্বাধীনতা ভোগ করে এসেছে চিরকাল, ততখানি আমাদের দূরদর্শন বা অল ইন্ডিয়া রেডিও কোনো দলের সরকারের আমলেই ভোগ করেনি

এই লেখা যখন লিখতে বসেছি, তখন টানা তৃতীয় দিন ব্রিটিশ ব্রডকাস্টিং কর্পোরেশনের দিল্লি ও মুম্বাই অফিস জুড়ে বসে আছেন আয়কর আধিকারিকরা। বিবিসি কর্তৃপক্ষ কর্মচারীদের ইমেল পাঠিয়ে জানিয়েছেন আপাতত যেন দফতরে না এসে বাড়ি থেকেই তাঁরা কাজ চালিয়ে যান। এডিটর্স গিল্ড অফ ইন্ডিয়া, ভারতের সম্পাদকদের একটি অগ্রগণ্য সংগঠন, এবং প্রেস ক্লাব অফ ইন্ডিয়ার মত সাংবাদিকদের সংগঠন একে সংবাদমাধ্যমকে ভয় দেখানোর প্রচেষ্টা হিসাবে দেখছে জানিয়ে প্রথম দিনেই (১৪ ফেব্রুয়ারি) বিবৃতি দিয়েছে। কিন্তু সরকারপক্ষ কিন্তু বলেই যাচ্ছে, এটা বিবিসির দফতরে হানা নয়, সমীক্ষা (সার্ভে) মাত্র। এ এক আইনানুগ নিয়মিত প্রক্রিয়া। আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ আছে বলেই নাকি এই সার্ভে করা হচ্ছে।

বলা বাহুল্য, বিবিসি এ দেশের কোনো আইন ভেঙে থাকলে তদন্তের স্বার্থে তাদের দফতরে সার্ভে করা বা হানা দেওয়া এবং তদন্তে অপরাধ প্রমাণিত হলে শাস্তি দেওয়া ভারত সরকারের আয়কর বিভাগের অধিকার এবং কর্তব্য। কিন্তু মুশকিল হল, এরকম সার্ভে আয়কর বিভাগ এবং এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট গত কয়েক বছরে একাধিকবার দেশের একাধিক সংবাদমাধ্যমের দফতরে চালিয়েছে। অথচ একবারও কোনো সার্ভে বা হানা থেকে কোনো সংবাদমাধ্যমের অপরাধের কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। এডিটর্স গিল্ডের বিবৃতিতেই উল্লেখ করা হয়েছে নিউজক্লিক, নিউজলন্ড্রি, দৈনিক ভাস্কর এবং ভারত সমাচারের দফতরে আয়কর ও ইডি হানার কথা। তার বাইরেও বেশকিছু সংবাদমাধ্যমের দফতরে এমন ঘটনা ঘটেছে। কাশ্মীরের সংবাদমাধ্যম এবং সাংবাদিকদের কাছে তো এসব জলভাত। তাঁরা কথায় কথায় কাগজ বন্ধ করে দেওয়া, নিগ্রহ, ইউএপিএ আইনে কারাবাস – এসবে অভ্যস্ত। এমনকি পশ্চিমবঙ্গের কলকাতা টিভির অফিসেও ডিসেম্বর মাসে ইডি হানা দিয়েছিল। এই সবকটি সংবাদমাধ্যমই আবার কেন্দ্রীয় সরকারকে অসুবিধায় ফেলে এমন প্রতিবেদন বা বিরোধী মতামত প্রকাশ করার জন্য বিখ্যাত (বা সরকারের কাছে কুখ্যাত)। এ যদি নেহাত কাকতালীয় ব্যাপার হয়, তাহলে বলতেই হবে এই কাক আর এই তাল একেবারে রাজযোটক। ফলে বিবিসির দফতরে যা চলছে তিনদিন ধরে, তাকে বাঁকা নজরে না দেখে উপায় নেই।

এডিটর্স গিল্ডের বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০০২ সালের গুজরাটের ঘটনাবলী এবং নরেন্দ্র মোদীর রাজত্বে দেশজুড়ে সংখ্যালঘু মানুষের উপর আক্রমণ নিয়ে বিবিসির দুই পর্বের তথ্যচিত্রের পরেই এই সার্ভে। সে তথ্যচিত্র দেশের মানুষকে দেখতে না দেওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা করেছিল এই সরকার। ইউটিউব, ফেসবুক, টুইটারকে দিয়ে ওই তথ্যচিত্রের সমস্ত লিঙ্ক ব্লকও করানো হয়েছিল। ফলে দুয়ে দুয়ে চার করতে কোনো অসুবিধা নেই।

তা বাদেও সরকার যে আসলে বিবিসির উপর ওই তথ্যচিত্রের শোধ তুলছে, আর্থিক অনিয়ম স্রেফ ছুতো – এমন মনে করার কারণ ঘটিয়ে দিচ্ছে নিজেই। কারণ বিবিসি দফতরে হানা নিয়ে এখন পর্যন্ত কোনো ‘সরকারি’ ভাষ্য নেই। একটি আন্তর্জাতিক সংবাদসংস্থার দফতরে এইরকম হানা (আচ্ছা সার্ভেই হল) আন্তর্জাতিক খবরে পরিণত হয়ে গেছে, অথচ আয়কর বিভাগের কোনো শীর্ষস্থানীয় আধিকারিক বা অর্থমন্ত্রকের কোনো সচিব স্তরের আধিকারিক এ নিয়ে কোনো প্রেস বিবৃতি দেননি। অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারামনের দুটি টুইটার হ্যান্ডেলের একটিতেও এ নিয়ে একটি লাইন দেখলাম না। তাহলে প্রথম অনুচ্ছেদে লিখলাম কেন, সরকারপক্ষ বলেই যাচ্ছে…? সেখানেই মজা। ২০০২ সালে গুজরাটে ঠিক কী হয়েছিল, তা নিয়ে সঙ্ঘ পরিবার কখনো এক স্বরে কথা বলে না। একটি অংশ বলে, যা হয়েছিল বেশ হয়েছিল। সন্ত্রাসবাদীদের উচিত শিক্ষা দিয়েছিলেন মোদী। আরেকটি অংশ বলে, খোদ সুপ্রিম কোর্ট রায় দিয়েছে মোদীজির কোনো দোষ ছিল না। এর উপর আর কথা হয় নাকি? সব বিরোধীদের অপপ্রচার।

আরো পড়ুন এই মৃত্যু উপত্যকাই আমার দেশ

বিবিসির দফতরে আয়কর বিভাগের বিচরণ সম্পর্কেও একই পদ্ধতি নেওয়া হয়েছে। এক দল সাংবাদিকের কাছে কিছু তথ্য পাঠিয়ে আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ করা হয়েছে। একদা সরকারবিরোধী বলে পরিচিত, রায় দম্পতির প্রস্থানের পর সরকারি হয়ে ওঠা এনডিটিভির সাংবাদিক সংকেত উপাধ্যায়ই যেমন। তিনি টুইট করে এই অভিযোগের কথা জনসমক্ষে এনেছেন। অথচ এই তথ্যের সূত্র কী জিজ্ঞেস করা হলে তিনি জানিয়েছেন, সরকার প্রেস নোট হিসাবে ওই তথ্যগুলি জানিয়েছে। সরকার মানে কে? প্রেস নোটের উপর লেটারহেড কার ছিল? নিচের স্বাক্ষরটি কার? কোন মন্ত্রক থেকে পাঠানো হয়েছে এই নোট? এসবের কোনো উত্তর এই সাংবাদিকরা দিতে পারেননি। অন্যদিকে বিজেপির মুখপাত্ররা বিভিন্ন টিভি চ্যানেলে প্রতিক্রিয়া দেওয়ার সময়ে বিবিসিকে তেড়ে গাল পাড়ছেন। বিবিসি দুর্নীতিগ্রস্ত, মিথ্যের ঝাঁপি খুলে বসেছে – এরকম নানা অভিযোগ করছেন। ঠিক যে অভিযোগগুলো ‘ইন্ডিয়া: দ্য মোদী কোয়েশ্চেন’ তথ্যচিত্র মুক্তি পাওয়ার পরেও তাঁরা করেছিলেন। এই অভিযোগগুলো সত্যি হতেই পারে। কিন্তু তার সঙ্গে আয়কর বিভাগের কী সম্পর্ক? এর কোনো উত্তর তাঁদের কাছে নেই। অর্থাৎ প্রকারান্তরে মেনে নেওয়া হচ্ছে, আর্থিক অনিয়ম নয়। আপত্তি বিবিসি কী দেখাচ্ছে তা নিয়ে।

স্বাভাবিকভাবেই ভারতের বিরোধী রাজনৈতিক শক্তিগুলি এক সুরে সরকারকে সংবাদমাধ্যমের কণ্ঠরোধের অভিযোগে অভিযুক্ত করছে। কংগ্রেস নেতা জয়রাম রমেশ থেকে শুরু করে সিপিআই (এম-এল) লিবারেশনের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক দীপঙ্কর ভট্টাচার্য পর্যন্ত সকলেই দ্ব্যর্থহীন ভাষায় সরকারের নিন্দা করেছেন। কিন্তু তাতে মোদী সরকারের কী-ই বা এসে যায়? দেশের অধিকাংশ সংবাদমাধ্যম হয় ভক্তিতে নয় ভয়ে সরকারকে প্রশ্ন করা বন্ধ করে দিয়েছে। এনডিটিভির মত দু-একটি নাছোড়বান্দা সংবাদমাধ্যমকে মুকেশ আম্বানি বা গৌতম আদানি কিনে ফেলছেন – চুকে গেল ঝামেলা। কিন্তু বিবিসির বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ তোলা হয়েছে তার কিছু অন্তত প্রমাণ করতে না পারলে অন্য ক্ষতির সম্ভাবনা। আজকের দুনিয়ায় নিজের দেশের সাড়ে বারোটা বাজিয়েও রাষ্ট্রনেতা হিসাবে বিদেশে নাম কুড়ানো অসম্ভব নয়। বিশেষ করে ভারতের মত দেশ, যার বিরাট বাজার বহুজাতিকদের দরকার এবং যে দেশ পরমাণু শক্তিধর – সে দেশের ভিতরে সংখ্যালঘুরা বাঁচল কি মরল, জনা দুয়েক পুঁজিপতি মিলে দেশের সমস্ত সম্পদের দখল নিয়ে নিল কিনা তা নিয়ে অন্য কোনো দেশ মাথা ঘামাতে যায় না। কিন্তু সেসব দেশের সংবাদমাধ্যমের গায়ে হাত পড়লে যা হয়, তা হল গণতান্ত্রিক দেশ হিসাবে পরিচিতির বারোটা বাজে। সে পরিচিতি নিয়ে কমিউনিস্ট চীনের রাষ্ট্রপ্রধান বিশেষ মাথা ঘামান না। শি জিনপিং নিজের দেশের সকলকে নিজের ইচ্ছামত চালাতে পারলে খুশি, বিশ্বগুরু হতে চান না। কিন্তু মোদী তো চান। তাঁকে যদি ব্রিটেন, আমেরিকার সংবাদমাধ্যম ভ্লাদিমির পুতিন আর জিনপিংয়ের সঙ্গে একাসনে বসিয়ে একনায়ক বলে দেগে দেয় – তা কী পছন্দ হবে মোদীজির?

বিবিসি ব্রিটেনের রাজকীয় সনদের মাধ্যমে গঠিত সরকারের একটি মন্ত্রকের অধীন অথচ স্বায়ত্তশাসিত কর্পোরেশন। একে আমাদের প্রসার ভারতীর সঙ্গে গুলিয়ে ফেললে ভুল হবে। বিবিসি যতখানি সম্পাদকীয় স্বাধীনতা ভোগ করে এসেছে চিরকাল, ততখানি আমাদের দূরদর্শন বা অল ইন্ডিয়া রেডিও কোনো দলের সরকারের আমলেই ভোগ করেনি। ফলে ব্রিটেনে কনজারভেটিভ বা লেবার – যার সরকারই থাক, ক্ষমতাসীন প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে মোদী যতই দহরম মহরম করুন, বিবিসি চটলে তারা আরও বেশি করে ভারত সরকার সম্পর্কে বিরূপ প্রচার করবে। বিবিসির দেখাদেখি অন্য বিদেশি সংবাদমাধ্যমও করবে। বিশ্বগুরুর ভাবমূর্তিতে অনবরত আঁচড় পড়তে থাকলে কি খুশি হবেন মোদী? বিবিসি ধোয়া তুলসীপাতা নয়, তবে মনে রাখা ভাল, তারা কিন্তু নিজেদের দেশের ইতিহাসের বিশালকায় রাষ্ট্রনেতা উইনস্টন চার্চিলকেও ছেড়ে কথা বলে না। কথাটা বুঝতেন বলেই ইন্দিরা গান্ধী একসময়ে বিদেশি সংবাদমাধ্যমগুলোর প্রতি খড়্গহস্ত হয়েও পরে তাদের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণ শুরু করেন।

উত্তরবঙ্গ সংবাদে প্রকাশিত

ফিফা থেকে নির্বাসন মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা মাত্র

এমন কি হতে পারে যে ফিফা সর্বভারতীয় ফুটবল ফেডারেশনকে (এআইএফএফ) নির্বাসন দেওয়ায় কোনো ভারতীয় খুশি হয়েছে? খেলোয়াড় বা ফুটবলপ্রেমীদের খুশি হওয়ার তো প্রশ্নই ওঠে না। ক্লাবকর্তারাই বা খুশি হবেন কী কারণে? এমনিতেই তো ইন্ডিয়ান সুপার লিগের বাইরের ক্লাবগুলো ধুঁকছে। তার উপর ফিফার নির্বাসন মানে ফিফা থেকে এশিয়ান ফুটবল কনফেডারেশন (এএফসি) মারফত যা টাকাকড়ি এআইএফএফের কাছে আসত তা-ও বন্ধ থাকবে। ফলে ছিটেফোঁটা যা চুঁইয়ে পড়ত ক্লাবগুলোর দিকে, সে পথও বন্ধ হয়ে যাবে। স্পনসরদেরও খুশি হওয়ার কারণ নেই। স্পনসর মানে মোটের উপর আইএসএলের স্পনসরদের কথাই ধরতে হবে, কারণ তার বাইরে ভারতীয় ফুটবলে আগ্রহী স্পনসর পাওয়া বেশ কঠিন। নিষেধাজ্ঞার ফলে ভারতের আর সব ফুটবল প্রতিযোগিতার মত আইএসএলও হয়ে গেল ফিফার অনুমোদনহীন লিগ। অর্থাৎ আগামী জানুয়ারির ট্রান্সফার উইন্ডোতে নতুন করে বিদেশি ফুটবলার আর নেওয়া যাবে না। বিদেশিরাই যে আইএসএলের জাঁকজমকের অর্ধেক, তাতে সন্দেহ নেই। তাহলে এই নির্বাসনে খুশি হতে পারে কে?

আপাতদৃষ্টিতে মনে হয় কেউ না। কিন্তু ভারত হল রামায়ণ-মহাভারতের দেশ। এখানে গল্পের মধ্যে গল্প, তার মধ্যে গল্প, সে গল্পের মধ্যেও আরেকখানা গল্প থাকে। এখানে আপাতদৃষ্টির ধোঁকা খাওয়াই স্বাভাবিক। সুতরাং হতেই পারে যে একদল ফুটবল প্রশাসক এই নির্বাসনে খুশিই হয়েছেন। দেশের ফুটবল এতে গোল্লায় গেলেও তাঁদের কিছু যায় আসে না। ভারতীয় ফুটবল ফেডারেশনকে পৈতৃক জমিদারি বানিয়ে ফেলেছিলেন তাঁরা, সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে সেই জমিদারি হাতছাড়া হয়েছে মাত্র কয়েক মাস আগে। তখনই তাঁরা হুমকি দিয়েছিলেন, আদালত দেশের ফুটবল প্রশাসনে হস্তক্ষেপ করলে ফিফা এ দেশের ফেডারেশনকে ব্যান করে দিতে পারে। সেই হুমকি ফলে যাওয়ায় আজ তাঁরা বাঁকা হাসতেই পারেন, মনে মনে বলতেই পারেন “দ্যাখ কেমন লাগে।” এই তাঁরা কারা? রহস্য করবার দরকার নেই, কারণ দেশের আপামর ফুটবলপ্রেমী জানেন প্রফুল প্যাটেল আর তাঁর সাঙ্গোপাঙ্গরাই আইনত মেয়াদ ফুরিয়ে যাওয়ার পরেও এআইএফএফ এক্সিকিউটিভ কমিটি আলো করে বসেছিলেন। সুপ্রিম কোর্টের গুঁতোয় আসনচ্যুত হওয়ার পর এবার যদি তিনি প্রফুল্ল অন্তরে এস্রাজ বাজান তাহলে অবাক হওয়ার কিছু নেই।

আদালতের নির্দেশে ভারতীয় ফুটবল ফেডারেশনের সভাপতি পদ হারালেও প্রফুল কিন্তু এখনো ফিফায় ভারতের প্রতিনিধি। ফলে কোনো কোনো মহল থেকে এমন আশঙ্কাও প্রকাশ করা হচ্ছে, যে ফিফার সিদ্ধান্তে তাঁর হাত আছে। কিন্তু ঘটনা হল, এর জন্য প্রফুলকে খুব একটা দায়ী করা চলে না। ফিফা আন্তর্জাতিক অলিম্পিক কমিটির (আইওসি) সনদে স্বাক্ষরকারী। সেই সনদ অনুযায়ী বিশ্বের কোনো দেশের কোনো খেলার জাতীয় ফেডারেশনে সরকার বা কোনো তৃতীয় পক্ষ হস্তক্ষেপ করলে সেই ফেডারেশনের অনুমোদন বাতিল করা হয়। সুতরাং যে মুহূর্তে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট কমিটি অফ অ্যাডমিনিস্ট্রেটর্স (সিওএ) গঠন করে ফেডারেশনের দায়িত্ব তাদের হাতে দিয়েছে, সেই মুহূর্তেই নির্বাসনের সম্ভাবনা তৈরি হয়ে গিয়েছিল।

১৬ অগাস্ট সিওএ যে বিবৃতি দিয়েছে, তাতে বলা হয়েছে ফিফার সিদ্ধান্ত তাদের অবাক করেছে। কারণ সর্বোচ্চ আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী, ভারত সরকারের জাতীয় ক্রীড়া বিধি মেনে নতুন এক্সিকিউটিভ কমিটি গঠনের জন্য নির্বাচনের কাজ দ্রুত এগোচ্ছিল এবং এই প্রক্রিয়া নিয়ে অনবরত ফিফা, এএফসি সহ সব পক্ষের সঙ্গে আলাপ আলোচনা চলছিল। উপরন্তু, ২৫ জুলাই ফিফা-এএফসি এআইএফএফের অ্যাক্টিং সেক্রেটারি জেনারেলকে যে চিঠি দিয়েছিল প্রস্তাবিত স্ট্যাটিউট সম্পর্কে, সেই চিঠির সুপারিশ মেনে স্ট্যাটিউটে বদলও করা হয়েছে। কিন্তু ২৫ জুলাইয়ের চিঠিটি পড়লে সিওএ-র যুক্তি অসার বলে মনে হবে। কারণ ওই চিঠিতে প্রস্তাবিত স্ট্যাটিউট সম্পর্কে ফিফা-এএফসি কিছু আপত্তি প্রকাশ করেছিল। সেই আপত্তিগুলোতে বিশেষ আমল দেওয়া হয়নি, কোনো মতে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। ১৫ অগাস্ট সাসপেনশনের চিঠিতে ফিফা সেকথাই উল্লেখ করেছে।

তবে এই নির্বাসন দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার সম্ভাবনা কম। ফিফা কাউন্সিল নির্বাসনের সিদ্ধান্ত জানানোর পাশাপাশিই বলেছে, ভারত সরকারের ক্রীড়া ও যুবকল্যাণ দপ্তরের সঙ্গে তারা যোগাযোগ রাখছে এবং আশাবাদী যে সমস্যা মিটে যাবে। আসলে এই সিদ্ধান্তের তাৎক্ষণিক ফলগুলোর অন্যতম হল অক্টোবর মাসে এ দেশে যে মেয়েদের অনূর্ধ্ব-১৭ ফুটবল বিশ্বকাপ হওয়ার কথা, তা বাতিল হয়ে যাওয়া। সেটা হলে এ দেশের মেয়েদের ক্ষতি, ফিফাও তেমনটা চায় না। এমনকি ভারত সরকারও চায় না। সবেমাত্র স্বাধীনতা দিবসের ভাষণে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী নারী অধিকার নিয়ে একগাদা ভাল ভাল কথা বলেছেন, এখনই মহিলাদের বিশ্বকাপ ভারত থেকে সরে গেলে তাঁর ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে বলেই হয়ত সরকারপক্ষের বিশ্বাস। নইলে সলিসিটর জেনারেল তুষার মেহতা স্বয়ং সুপ্রিম কোর্টের কাছে জরুরি ভিত্তিতে ১৭ তারিখই এ বিষয়ে শুনানির আর্জি জানাবেন কেন? সকাল সকাল শুনানি হওয়ার কথা এবং সর্বোচ্চ আদালত যদি সিওএকে ফিফার কথামত কাজ করার নির্দেশ দেন, তাহলে ভারতের নির্বাসন উঠে যেতে সপ্তাহ খানেকের বেশি লাগবে না।

কিন্তু নির্বাসন ক্ষণস্থায়ী বা দীর্ঘস্থায়ী – যা-ই হোক না কেন, দেশের ফুটবল এ অবস্থায় পৌঁছল কেন তা নিয়ে কিন্তু আলোচনা করতেই হবে। সুপ্রিম কোর্ট তো স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে ফুটবল প্রশাসনে নাক গলায়নি। দিল্লির আইনজীবী রাহুল মেহরাকে আদালতের দ্বারস্থ হতে হয়েছিল কেন? সেসবের বিস্তারিত আলোচনা এখানে পাবেন।

প্রফুল প্যাটেল শুধু অগণতান্ত্রিক উপায়ে ফেডারেশনের মাথায় বসেছিলেন তা নয়, তাঁর আমলে কুকীর্তির তালিকা বেশ লম্বা। তাঁর আমলেই ফেডারেশনকে কার্যত ঠুঁটো জগন্নাথে পরিণত করে দেশের ফুটবলের দণ্ডমুণ্ডের কর্তায় পরিণত হয়েছে একটি ফ্র্যাঞ্চাইজ লিগ, যার দৃষ্টান্ত পৃথিবীর কোনো দেশের ফুটবল ইতিহাসে পাওয়া যাবে না। আজ যে ফুটবলপ্রেমীরা গেল গেল রব তুলছেন, তাঁদের স্বীকার করে নেওয়ার সময় এসেছে, যে ফিফার সিদ্ধান্ত আসলে মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা। এমন নয় যে ভারতীয় ফুটবল দারুণ স্বাস্থ্যের অধিকারী ছিল, হঠাৎ বিনা মেঘে বজ্রপাত হয়ে প্রাণহানি হয়েছে। মোহনবাগান আর ইস্টবেঙ্গল আইএসএল খেলছে – বাংলার ফুটবলপ্রেমীরা এতেই খুশি হয়েছেন। দেশের আর কোথায় ফুটবল খেলাটার কী হল না হল তা নিয়ে তাঁরা মাথা ঘামাতে রাজি হননি। তাঁরা খেয়ালই করেননি কলকাতা লিগটা পর্যন্ত ছেলেখেলায় পরিণত হয়েছে। কখন হয়, কেমন করে হয় তার কোনো ঠিক নেই। দুই বড় ক্লাব নিজেদের মর্জি অনুসারে খেলে অথবা খেলে না। বছর ১০-১৫ আগে কলকাতায় তিন প্রধান ছাড়াও কিছু ক্লাব দেখা যেত যারা চমকে দেওয়ার মত ফুটবল খেলত। একসময় জাতীয় লিগে খেলা টালিগঞ্জ অগ্রগামী গেল কোথায়? নতুন দল গড়ে মোহনবাগান, ইস্টবেঙ্গলের সাথে সমানে সমানে লড়ে যাওয়া ইউনাইটেড এসসি তো আইএসএল থেকে শত হস্ত দূরে। এমনকি মহমেডান স্পোর্টিংও অনেকখানি পিছিয়ে পড়েছে।

একই চিত্র জাতীয় স্তরে। মাহিন্দ্রা কোম্পানি দল তুলে দিয়েছে অনেকদিন হল। জেসিটির নাম আর শোনা যায় এখন? সবই আইএসএলের দোষে হয়েছে তা নয়, কিন্তু আইএসএল সব সংকটের শীর্ষবিন্দু। মুমূর্ষু ভারতীয় ফুটবলের চিকিৎসা করার বদলে প্রফুলের আমলে স্যালাইন, অক্সিজেন খুলে নিয়ে শেষ করে দেওয়ার ব্যবস্থা হয়েছে আইএসএলের মাধ্যমে। গত দুই দশকে জাতীয় দলের সেরা খেলোয়াড়দের ধাত্রীভূমি উত্তর-পূর্বাঞ্চলের ছোট ছোট ক্লাবগুলো। শিলং লাজং, আইজল এফসির মত ক্লাবের বহু বছরের পরিশ্রমকে পাত্তা না দিয়ে তাদের করে দেওয়া হয়েছে দ্বিতীয় শ্রেণির (অর্থাৎ আই লিগের) নাগরিক। আর স্রেফ বিত্তের জোরে প্রথম সারির নাগরিক হয়েছে ইতিহাসবিহীন নর্থ ইস্ট ইউনাইটেড এফসি। ডেম্পো বা সালগাঁওকারের মত দল পড়ে রইল, গোয়া ফুটবলের ধারক ও বাহক হয়ে গেল এফসি গোয়া। বিজয়ন, সত্যেন, আনচেরি, পাপ্পাচানদের কেরল পুলিস কোথায় মিলিয়ে গেছে। টাইটেনিয়াম ক্লাবের কথা কজনেরই বা মনে আছে? সারা ভারত চিনছে কেরালা ব্লাস্টার্সকে।

আরও পড়ুন বড়লোকের খেলা

যে মোহনবাগান, ইস্টবেঙ্গলকে ফুটবল জগতের কেন্দ্রবিন্দু মনে করেন বাংলার ফুটবল পাগলরা, তাদের অবস্থাও তো কহতব্য নয়। প্রতি মরসুমের শুরুতেই মনে হয় এই বুঝি ইস্টবেঙ্গল দলটা উঠে গেল। তখন মুখ্যমন্ত্রী হস্তক্ষেপ করেন আর একটি জোড়াতালি দেওয়া ব্যবস্থা হয়। আর মোহনবাগান? তাদের নাম আদৌ মোহনবাগান কিনা তা নিয়েই সন্দেহ দেখা দেয় মাঝেমধ্যে। আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার প্রস্তুতি হিসাবে কলকাতা লিগ খেলে না দলটি, তারপর সেই প্রতিযোগিতায় হজম করে আসে আধ ডজন গোল।

এভাবে ভারতীয় ফুটবল কোনদিকে যাচ্ছিল? সুনীল ছেত্রী গোল করায় লায়োনেল মেসি আর ক্রিস্টিয়ানো রোনাল্ডোর সঙ্গে পাল্লা দেন বটে, কিন্তু জাতীয় দলের ফলাফলে বিশেষ তারতম্য হয়নি। বাইচুং ভুটিয়া থেকে সুনীল হয়ে জেজে লালপেখলুয়া – জাতীয় দল ফিফা র‍্যাঙ্কিংয়ে সেই একশোর আশপাশে ঘোরাফেরা করছে (২৩ জুন ২০২২ তারিখে সর্বশেষ আপডেটের সময়ে ১০৪)।

এই নির্বাসনে আশু ক্ষতি হল বরং মেয়েদের ফুটবলের। আমরা অনেকেই খবর রাখি না, মেয়েদের ফুটবলে ভারত অনেক এগিয়ে (৫ অগাস্ট ২০২২ তারিখে সর্বশেষ আপডেটের সময়ে র‍্যাঙ্কিং ৫৮)। সেই ফুটবল নিয়েও চরম ছেলেখেলা চলেছে প্রফুলের আমলে। শুধু যে অতি অযত্নে ইন্ডিয়ান উইমেন্স লিগ চালানো হয় তা-ই নয়, এ বছরের গোড়ায় দেশে এশিয়ান কাপের আয়োজন করতে গিয়ে চরম কেলেঙ্কারি হয়েছে। প্রতিযোগিতা চলাকালীন ভারতীয় দলের ১২ জন কোভিডাক্রান্ত হওয়ার মেয়েদের আর সেই প্রতিযোগিতায় খেলাই হয়নি। অথচ তার জন্যে কে দায়ী তা নিয়ে ফেডারেশন মাথা ঘামায়নি, আজ অবধি কারোর শাস্তিও হয়নি। ভারতের ফুটবল মহল, সংবাদমাধ্যম – সকলেই এত সচেতন যে ওসব হওয়ার আশাও বোধহয় কেউ করেনি। শুধু কি তাই? অনূর্ধ্ব-১৭ মহিলাদের জাতীয় দলের সহকারী প্রশিক্ষক অ্যালেক্স অ্যামব্রোসের বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির অভিযোগ পর্যন্ত উঠেছে। সিওএ পত্রপাঠ তাঁকে বরখাস্ত করেছে। প্রফুলের আমল হলে কী হত কে জানে?

স্বভাবতই ফেডারেশনের নির্বাসনের খবরে যেরকম চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়েছে, কোমর ভেঙে যাওয়া ভারতীয় ফুটবলকে উঠে দাঁড়াতে গেলে কী করতে হবে তা নিয়ে সেরকম আলোচনা হবে না ধরে নেওয়া যায়। কারণ কোনো উপায়ে আইএসএল যথাসময়ে অনুষ্ঠিত হওয়া নিশ্চিত করা গেলেই কোমর যে আদৌ ভাঙেনি তা বিশ্বাস করে নেবেন ফুটবলপ্রেমীরাও।

নাগরিক ডট নেট-এ প্রকাশিত