তসলিমার জয়ধ্বনি: রাজনীতি ভুলে সংস্কৃতি চর্চা স্থগিত রাখলে হয় না?

ভয় পেলে চুপ করে থাকা যায়। ক্ষমতার পক্ষ নিয়ে, সংখ্যাগুরুর পক্ষ নিয়ে ইনিয়েবিনিয়ে বা সোচ্চারে বলাবলি, লেখালিখি করার দরকার হয় না। তাদের মঞ্চে যাওয়ারও দরকার হয় না। সে কাজ যাঁরা করছেন এবং করাকে যাঁরা সমর্থন করছেন, তাঁরা ওটা না করলে মোটেই খাওয়া-পরা বন্ধ হবে না। খুব বেশি হলে যা হবে তা হল, পুজোর ছুটিতে প্যারিস বা মায়ামি বেড়াতে যাওয়ার সঙ্গতি থাকবে না, মন্দারমণি দিয়ে কাজ সারতে হবে।

কারও কাছে কিছু দাবি করা চলবে না। নেতাদের কাছ থেকে তাদের কাজের কৈফিয়ত দাবি করা চলবে না। ফুটবলারদের কাছ থেকে অন্য ফুটবলারদের অপমানে প্রতিবাদ দাবি করা চলবে না। দেশের যুবসমাজের উন্মাদনা এবং পকেটের পয়সায় যারা কোটিপতি, সেই খেলোয়াড় বা অভিনেতাদের কাছ থেকে ওই যুবসমাজের উপর দমনপীড়ন নেমে এলে তার বিরোধিতা দাবি করা চলবে না। সংবাদমাধ্যমের কাছে সত্যনিষ্ঠা দাবি করা চলবে না। এমনকী সাহিত্যিকরা বিবেকবান হবেন, যিনি ধর্মীয় মৌলবাদের ও সংখ্যাগুরুবাদের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার কারণে দেশছাড়া, তিনি অন্য দেশের মৌলবাদ ও সংখ্যাগুরুবাদের সঙ্গে আপস করবেন না— এ দাবিও করা চলবে না। এমনটাই আমাদের সময়ের দাবি।

কারণ? সকলেরই নাকি রুটিরুজির প্রশ্ন আছে, অস্তিত্বের প্রশ্ন আছে। যেন ইতিহাসের একমাত্র এই কালখণ্ডেই সত্যি কথা বলতে হলে, প্রতিবাদ করতে হলে মানুষকে নিজের রোজগার, নিজের অস্তিত্বের ঝুঁকি নিতে হচ্ছে। যেন অতীতে সর্বদেশে সর্বকালে প্রতিবাদ করা ভারি আরামের কাজ ছিল। দমনপীড়নে বিশ্বাসী সরকার বা মৌলবাদীরা প্রতিবাদীদের চাকরি দিত, চাকুরে হলে মাইনে বাড়িয়ে দিত, বোনাস দিত, মাঝেমধ্যে পুরস্কারও দিত। একে-৪৭ হাতে নিয়ে ভিন্ন মতের মানুষের বাড়ির বাইরে নিজেরাই পাহারা দিত, বলত “আমি আপনার বিরোধী হতে পারি, কিন্তু আপনার কথা বলার অধিকার আমি নিজের জীবন দিয়েও রক্ষা করব।”

মজা হল, রুটিরুজির যুক্তি যাঁরা দিচ্ছেন তাঁরা কেউ ‘দিন আনি দিন খাই’ শ্রেণির মানুষ নন। সরকারি দমন বা সংখ্যাগুরুবাদী গুন্ডাদের হাতে মারধর, হয়রানির ভয় সকলের আছে (এই লেখকেরও আছে)। নাট্যকর্মী থেকে শুরু করে ১৫ বছরের বাচ্চা মেয়েকে পর্যন্ত যেভাবে সদলবলে আক্রমণ করা হচ্ছে, তাতে ভয় পেলে কাউকে দোষ দেওয়াও যায় না। কিন্তু ভয় পেলে চুপ করে থাকা যায়। ক্ষমতার পক্ষ নিয়ে, সংখ্যাগুরুর পক্ষ নিয়ে ইনিয়েবিনিয়ে বা সোচ্চারে বলাবলি, লেখালিখি করার দরকার হয় না। তাদের মঞ্চে যাওয়ারও দরকার হয় না। সে কাজ যাঁরা করছেন এবং করাকে যাঁরা সমর্থন করছেন, তাঁরা ওটা না করলে মোটেই খাওয়া-পরা বন্ধ হবে না। খুব বেশি হলে যা হবে তা হল, পুজোর ছুটিতে প্যারিস বা মায়ামি বেড়াতে যাওয়ার সঙ্গতি থাকবে না, মন্দারমণি দিয়ে কাজ সারতে হবে। পশ্চিমবঙ্গের বাঙালি লেখকদের রবীন্দ্র পুরস্কার, বঙ্কিম পুরস্কার, বাংলা আকাদেমি পুরস্কার, সাহিত্য আকাদেমি পুরস্কারের দরজা বন্ধ হয়ে যাবে। তেতো সত্য হল— ভোগবাদ আর ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদে আমরা এমন গলা পর্যন্ত ডুবে গেছি যে ওসব ছাড়াও যে বাঁচা যায় তা আমাদের পাড়ার ছাপোষা গোঁসাই থেকে শুরু করে নামকরা কবি গোঁসাই পর্যন্ত কেউ কল্পনাও করতে পারে না। কিন্তু সকলের বাড়িতেই আয়না আছে। যিনি যত বিখ্যাত, তাঁর আয়না তত বড়। তার সামনে দাঁড়ালে নিজের এই চেহারা দেখে আমাদের সকলেরই লজ্জা করে। সেই লজ্জা ঢাকতে পাতার পোশাক হল “রুটিরুজি”। এ রাজ্যের বাংলা ভাষার লেখকরা ভালো করেই জানেন (এখন সোশাল মিডিয়ার দৌলতে অনেক পাঠকও জেনে ফেলেছেন) যে বাংলায় সাহিত্য রচনা করে রুটিরুজির ব্যবস্থা হয় না। লেখকদের প্রায় সকলেরই অন্য পেশা আছে, যাঁদের নেই তাঁরা অন্য পেশার খোঁজে আছেন। শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের পসার বিখ্যাত, তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় বইয়ের রয়্যালটি দিয়ে গাড়ি কিনেছিলেন শোনা যায়। গজেন্দ্রকুমার মিত্র আরেকজনের সঙ্গে মিলে আস্ত প্রকাশনা সংস্থা খুলে ফেলেছিলেন। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, বুদ্ধদেব গুহ, শংকরও বহুবিক্রীত ছিলেন। কিন্তু সেসব দিন চলে গেছে। আজকের সবচেয়ে জনপ্রিয় লেখকের বইও পাঁচশো বা হাজার কপি বিক্রি হয় বলে তাঁদের প্রকাশকদের দাবি করতে দেখা যায় না। সেই কারণে কি পুরস্কারই কি রুটিরুজি হয়ে দাঁড়িয়েছে? যাঁদের ব্যাপারটা তাই, তাঁরা মনের সুখে তসলিমা থেকে সন্তোষী মা— যাকে খুশি বন্দনা করুন, আপত্তি নেই। যাঁদের তেমন স্বার্থ নেই, তাঁরাও নিজ নিজ প্রিয় সাহিত্যিকের পাশে দাঁড়ানোর জন্যে যদি এমন করতে চান তো করুন। কিন্তু একে বাকস্বাধীনতার পক্ষে দাঁড়ানো বলে তত্ত্বায়ন করা চলছে। তাই কিছু কথা না বলে থাকা যাচ্ছে না।

বাংলার কালচার্ড বাবু-বিবি আজও যাঁকে নিয়ে “আহা! সত্যিকারের ভদ্রলোক ছিলেন” বলে হাহুতাশ করে, সেই বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য নিজের দলের তথা ভারতবর্ষের বামপন্থী আন্দোলনের যে দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি করেছিলেন মুখ্যমন্ত্রী থাকার সময়ে, তা সিপিএমের কর্মী-সমর্থকরা কেউ কেউ আজকাল জনান্তিকে স্বীকার করেন। পার্টি স্বীকার করে না, হয়তো কোনওদিন করবেও না। তাতে অবশ্য ইতিহাস বদলাবে না। বুদ্ধদেব সরকারের যেসব ভুলভাল সিদ্ধান্ত নরেন্দ্র মোদি, শুভেন্দু অধিকারীদের অক্সিজেন জুগিয়েছে তার অন্যতম হল কলকাতা থেকে তসলিমা নাসরিনকে বিদায় নিতে বাধ্য করা। হাতে ২৩৫ জন বিধায়ক আর তিরিশের বেশি সাংসদ থাকা সত্ত্বেও, দিন দুয়েকের কলকাতাকেন্দ্রিক অশান্তিতে যদি কোনও সরকারের মনে হয়ে থাকে যে একজন সাহিত্যিককে নিরাপত্তা দিতে তারা অপারগ এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সামলে উঠতে পারবে না, তাহলে সেই সরকার অযোগ্য। জ্যোতি বসুর আমলে ভারতজুড়ে শিখ গণহত্যার সময়ে এ রাজ্যে কেউ ট্যাঁ ফোঁ করতে পারেনি, বাবরি মসজিদ ভাঙা-পরবর্তী দাঙ্গাও পশ্চিমবঙ্গে লাগামছাড়া হতে পারেনি। সেখানে বুদ্ধবাবুরা একজন সাহিত্যিকের বিরুদ্ধে কিছু সংগঠিত অশান্তিতে ঘাবড়ে গেলেন এবং তাঁকে রাজ্যছাড়া করলেন। ফলে হিন্দুত্ববাদীরা দ্বিবিধ সুবিধা পেয়ে গেল। প্রথমত, পশ্চিমবঙ্গের গোটা মুসলমান সমাজ ভীষণ অসহিষ্ণু— এ-কথা প্রচার করার পরিসর তৈরি হয়ে গেল। দ্বিতীয়ত, বামপন্থীরা সংখ্যালঘু তোষণ করে, মুসলমান মৌলবাদীদের প্রশ্রয় দেয়— এ-কথা বলার জন্যেও চিরকালীন দৃষ্টান্ত হাতে এসে গেল। তসলিমা যে স্বমহিমায় তার আগে বহুবছর কলকাতায় ছিলেন, সেই সত্য সম্পূর্ণ অর্থহীন হয়ে গেল। আজ দেখা যাচ্ছে অনেকের সে-কথা মনেই নেই। না থাকা দোষেরও নয়। এক বালতি দুধে এক ফোঁটা চোনা ফেলে দেওয়ার পর কাটা দুধ আগে ভালো ছিল বলে বিক্রি করতে গেলে কেউ কিনবে না। যে সময়ে দিল্লি, মুম্বইতে শিবসেনার হুমকিতে ভারত-পাকিস্তান টেস্ট ম্যাচ হতে পারত না সেইসময় এই কলকাতাতেই যে ম্যাচ হয়েছে, বা এই বামফ্রন্ট সরকারই যে কাশীতে শুটিং করতে না পারা চলচ্চিত্র পরিচালক দীপা মেহতাকে কলকাতায় শুটিং করলে নিরাপত্তার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল— সেই সত্য তসলিমার বিতাড়নে নতুন অর্থ পরিগ্রহ করে। হিন্দুত্ববাদীদের পক্ষে বলা সহজ হয়ে যায় যে ওগুলো ধর্মনিরপেক্ষতার লক্ষণ নয়। কমিউনিস্টরা আসলে হিন্দুবিরোধী, তাই ওগুলো করেছিল। বাকস্বাধীনতার পক্ষে বলে করেনি।

এই পর্যন্ত মানতে অসুবিধা আজকের সাহিত্যিক, শিল্পী, বাকস্বাধীনতাপ্রেমী নাগরিকদের প্রায় কারও নেই দেখা যাচ্ছে। কিন্তু এসব বুঝেও কী করে যে তসলিমার এতদিন পরে কলকাতায় আগমনকে বাকস্বাধীনতার জয় বলে অভিনন্দিত করা যাচ্ছে তা বোঝা দায়। তাঁকে ফিরিয়ে এনেছে কারা এবং কী উদ্দেশ্যে, তা নিয়ে সংশয়ের অবকাশ কী করে থাকছে? যে-ই আনুক, যে উদ্দেশ্যেই আনুক— এটা আপাতদৃষ্টিতে ভারি উদার যুক্তি মনে হলেও, আসলে হাস্যকর। যাদের অধীনে থাকা সাহিত্য আকাদেমি এমএম কলবুর্গির মতো লেখকের হত্যার কোনও নিন্দা করেনি, যারা অপছন্দের কথা লেখার জন্যে (সিদ্দিক কাপ্পানের ক্ষেত্রে, স্রেফ লিখতে পারে ভেবেই) সারা দেশে বহু সাংবাদিককে গ্রেপ্তার করে কঠোরতম আইনে মামলা ঠুকে দিনের পর দিন কারাবন্দি করে রাখে, যারা তাদের অপছন্দের কথা সোশাল মিডিয়ায় পোস্ট করার জন্যে নিত্য লেখক, শিল্পীদের বিরুদ্ধে এফআইআর দায়ের করছে, এমনকি দলবদ্ধভাবে বাড়ি গিয়ে ভয়ও দেখাচ্ছে, তারাই আজ পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতায়। সেই দল তসলিমাকে কলকাতায় ফিরিয়ে নিয়ে এসেছে বাকস্বাধীনতায় বিশ্বাস করে বলে, রাজনৈতিক অ্যাজেন্ডার স্বার্থে নয়— এ-কথায় কেন বিশ্বাস করতে হবে? বা উদ্দেশ্য সেটা হলেও ব্যাপারটা ভালো— এ-কথারই বা মানে কী? তাহলে আগামীকাল তালিবানরা যদি অরুন্ধতী রায়কে কাবুলে ডেকে সংবর্ধনা দেয়, আমরা তালিবানদের প্রশংসা করব? বলব, উদ্দেশ্য যা-ই হোক, ব্যাপারটা ভালো?

তা-ই করব হয়তো, কারণ আমাদের সাহিত্যিক, শিল্পীরা তো সেরকমই। তাঁরা একেবারে আজকের জয় গোস্বামীর মতই, ক্ষমতাসীনের বিরুদ্ধে মুখ খোলেন সে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর। অন্তত ২০১১ সালের পর থেকে তাই। ২০১৫ সালে যখন সারা ভারতের শিল্পী, সাহিত্যিকরা কেন্দ্রীয় সরকারের কাছ থেকে পাওয়া পুরস্কার ফিরিয়ে দিচ্ছিলেন তথাকথিত গোরক্ষকদের হাতে গণপিটুনিতে হত্যা; কলবুর্গি, নরেন্দ্র দাভোলকরের মতো মানুষের হত্যা এবং তা নিয়ে সাহিত্য আকাদেমির মতো সংস্থাগুলোর নীরবতার প্রতিবাদে, তখন এই বাংলা থেকে কেবল মন্দাক্রান্তা সেন পুরস্কার ফিরিয়ে দিয়েছিলেন। আর জ্ঞানপীঠ পুরস্কার নিতে গিয়ে নিজের প্রতিবাদ জ্ঞাপন করেছিলেন প্রয়াত শঙ্খ ঘোষ। আজ তসলিমার নামে জয়ধ্বনি করা, আনন্দবাজারের প্রথম পাতায় তাঁর গুণগান করা জয় গোস্বামীই বা কোথায় ছিলেন আর বাকিরাই বা কটা মিটিং, মিছিল করেছিলেন? আচ্ছা, জাতীয় স্তরের ব্যাপারস্যাপার থাক। তসলিমাকে ফেরানোর দাবিতেই বা কটা মিটিং, মিছিল হয়েছিল তৃণমূল কংগ্রেস সরকারের আমলে? জয়-সহ কত গুণীজনই তো মমতা ব্যানার্জির ঘনিষ্ঠ ছিলেন, তখন উদ্যোগ নেননি কেন? আজ জয় বলছেন, আরও অনেকেই বলছেন, তাঁরা নাকি চুপ করে থাকতে বাধ্য হয়েছিলেন হুমকি সংস্কৃতির কারণে। তাহলে সোজা মেনে নিলেই তো হয়— আমরা ভীতু, তাই মুখ খুলতে পারব না। আবার তত্ত্বায়নের দরকার কী? কালের নিয়মে যখন বিজেপি সরকার চলে যাবে, তখন আবার বাকস্বাধীনতার ধ্বজাধারী শিল্পী, সাহিত্যিক, সাহিত্যপ্রেমীরা বলবেন না তো “আমাদের দিয়ে জোর করে তসলিমা বন্দনা করানো হয়েছিল?”

তসলিমা কলকাতায় আসার পর থেকে অভ্যর্থনা আর শেষ হচ্ছে না। সম্ভবত রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নোবেল পুরস্কার নিয়ে দেশে ফেরার পরে বা স্বামী বিবেকানন্দ শিকাগো বক্তৃতা দিয়ে ফেরার পরেও এই শহরে এরকম লাগাতার অভ্যর্থনার ব্যবস্থা হয়নি। জয়কে দুয়ো দিয়ে যারা মঞ্চ থেকে নামিয়ে দিয়েছে তারা যদি ভেবে থাকে বিরাট কাজ করেছে, তাহলে তারা নেহাতই বোকা। পরদিন পড়তে হয় নইলে পিছিয়ে পড়তে হয় যে কাগজ, তার প্রথম পাতার তসলিমামুখী কলামটা কিন্তু জয়ই লিখেছেন। একদা যে শহরে ছিলেন সে শহরে ফিরে এসেছেন বলে নামকরা পত্রিকার প্রচ্ছদকাহিনি হয়েছে কোনও কবির কবিতা— এমনটাই বা আমাদের অকাব্যিক যুগে কতবার কোন শহরে ঘটেছে? তসলিমার বেলায় কলকাতায় ঘটল। কলকাতার সংবাদমাধ্যমগুলোর অন্যতম খবর হয়ে গেছেন তসলিমা। তিনি স্রেফ কলকাতায় পা রাখতেই ধন্য হল ধন্য হল আমাদের বাঙালি জীবন। সমস্তটাই বাংলার মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত ভালোবাসা, সংবাদমাধ্যমের স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিক্রিয়া— এই যদি বিশ্বাস করতে হয়, তাহলে মা দুর্গা সত্যি, মহিষাসুর সত্যি, ক্যাপ্টেন স্পার্ক সত্যি।

আরও পড়ুন মঈন সম্পর্কে কুৎসিত বিদ্রূপে সন্দেহ জাগে, তসলিমা কি হিন্দুত্বের ট্রোজান ঘোড়া? 

এবার কেউ চোখ রাঙিয়েই বলতেই পারেন “তবে রে, এসব সত্যি না হলে সত্যিটা কী?” সবিনয়ে বলব, আজ্ঞে সত্যিটা হল তসলিমা এই বাংলায় একে একটি বিক্রয়যোগ্য ব্র্যান্ড, তার উপর ডবল ইঞ্জিন সরকার পশ্চিমবঙ্গকে যে ছাঁচে ঢালতে চায় তার পক্ষেও নিখুঁত। কারণ তিনি কেবল মুসলমান মৌলবাদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী চরিত্র নন। একবার টুইটারে ইংল্যান্ডের মুসলমান ক্রিকেটার মঈন আলি লম্বা দাড়ি রাখেন বলে তিনিও সন্ত্রাসবাদী হতে পারেন বলে রসিকতা করেছিলেন খাঁটি হিন্দুত্ববাদী কায়দায়। ইংল্যান্ডের খ্রিস্টান ক্রিকেটাররা দল বেঁধে প্রতিবাদ করায় বুঝতে পারেন বাড়াবাড়ি হয়ে গেছে। তখন টুইটটি মুছে দিয়ে দাবি করেন ওটা নাকি সারকাজম ছিল। বলা বাহুল্য, সে-কথা সত্যি হলে টুইট মুছে দেওয়ার দরকার ছিল না। যা-ই হোক, লম্বা দাড়ি মানেই মৌলবাদী, হিজাব বা বোরখা পরে মানেই মৌলবাদের শিকার— এগুলো আমার মতো পশ্চিমবঙ্গীয় ভদ্রলোকের খুব পছন্দের স্টিরিওটাইপ। অতএব তসলিমাকে দিয়ে সেইসব বয়ান বাঙালি সমাজে চারিয়ে দেওয়া সহজ হতে পারে, যেগুলো বাকি ভারত আস্তাকুঁড়ে ফেলে দিচ্ছে ক্রমশ। সাম্প্রতিক ‘জেন জি’ আন্দোলন তার প্রমাণ।

সুতরাং তসলিমার আগমন, জয়ের গমন— সবই রাজনৈতিক। আমরা যে খুবই কালচারাল জাতি তা দুনিয়াসুদ্ধ লোক জানে। নইলে বিপুল উৎসাহে ঠিক অন্য সংস্কৃতি দ্বারা আক্রান্ত হওয়ার যুগেই রামমোহন, বিদ্যাসাগর, রবীন্দ্রনাথের মতো আইকনদের ক্যানসেল কালচারে ফেলে দিই? তাই করতে করতে এখন এমন হাল হয়েছে যে নেতাজি সুভাষচন্দ্র পড়েছেন জুতোর তলায়, আর তসলিমা চড়েছেন মাথায়। রাজনীতির ঊর্ধ্বে উঠে সাংস্কৃতিক হওয়ার চেষ্টা অন্তত এবারটা না করলেই নয়?

চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম ওয়েবসাইটে প্রকাশিত

অরাজনীতির হাত থেকে কবে স্বাধীন হবে পশ্চিমবঙ্গের মানুষ?

আমরা ছোট থেকেই শিখে এসেছি – রাজনীতি খুব খারাপ জিনিস। পশ্চিমবঙ্গের যাবতীয় দুরবস্থার মূলে হল রাজনীতি। আমাদের বড়রা আনন্দবাজার পত্রিকা পড়ে দিনরাত এই আলোচনাই করতেন

স্বাধীনতা দিবসে খুব ভোরবেলা ঘুম ভেঙে গেল। মাইকে দেশাত্মবোধক গান ভেসে এসে নয়, একটা স্বপ্ন দেখে।

দেখলাম সেলুলার জেলের সামনে দাঁড়িয়ে নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর আর বাঘাযতীন কীসব আলোচনা করছেন। পাশেই একটা লম্বা বাঁশে ভারতের পতাকা ফুল-টুল দিয়ে বাঁধা রয়েছে, ওঁরা কেউ তুলবেন বোধহয়। মাইকে ঝাঁ ঝাঁ করে ‘কদম কদম বঢ়ায়ে যা’ বাজছে আর আজাদ হিন্দ ফৌজ সাবধান পজিশনে দাঁড়িয়ে আছে। আমি একখানা রেকর্ডার বাগিয়ে ধরে এগিয়ে গেছি, তিনজনের বক্তব্য রেকর্ড করব বলে। কিন্তু তার আগেই নেতাজি হাত নেড়ে কাকে একটা ডাকলেন। দেখি – ক্ষুদিরাম বসু। তিন বয়োজ্যেষ্ঠ মিলে তাঁকেই এগিয়ে দিলেন পতাকা তুলতে। দেখে আমার বুকের ছাতি তো ৫৬ ইঞ্চি হবার জোগাড়। নেতাদের কোট চাইতে ভুলেই গেছি। ক্ষুদিরাম পতাকা তুললেন, একগাদা গাঁদা ফুল ঝরে পড়ল আর গোটা আজাদ হিন্দ ফৌজ ‘জয় হিন্দ’ বলে স্যালুট করল। আমিও উৎসাহের চোটে ‘জয় হিন্দ’ বলে সেলাম ঠুকে ফেলেছি। অমনি কানের কাছে কে যেন বলে উঠল ‘এ কী! এখানে স্লোগান দিচ্ছেন! ছিঃ! এটা একটা জাতীয় অনুষ্ঠান। দয়া করে এটাকে পলিটিসাইজ করবেন না।’ তাকিয়ে দেখি হাফপ্যান্ট পরা সুমন দে। আমি বলতে যাচ্ছিলাম, স্বাধীনতা সংগ্রাম ব্যাপারটাই তো রাজনৈতিক। তাহলে স্বাধীনতা দিবস অরাজনৈতিক হয় কী করে? সেখানে স্লোগান দেওয়া যাবে না-ই বা কেন? কিন্তু তার আগেই রবীন্দ্রনাথ সুমনবাবুর পিঠে মারলেন এক রদ্দা। অঙ্ক না পারলে আমাদের স্কুলের জহরবাবু যেরকম মারতেন, একেবারে সেইরকম। সুমনবাবু করুণ মুখে পিঠে হাত বুলোতে বুলোতে বললেন ‘কেস দেবেন না, প্লিজ’। অমনি আমার ঘুমটা ভেঙে গেল।

এরকম জগাখিচুড়ি স্বপ্ন কেন দেখলাম ভাবতে ভাবতে মনে হল, আমি যে প্রজন্মের লোক তাতে স্বাধীনতা দিবসে এই স্বপ্ন দেখাই স্বাভাবিক। কারণ আমরা ছোট থেকেই শিখে এসেছি – রাজনীতি খুব খারাপ জিনিস। পশ্চিমবঙ্গের যাবতীয় দুরবস্থার মূলে হল রাজনীতি। আমাদের বড়রা আনন্দবাজার পত্রিকা পড়ে দিনরাত যা আলোচনা করতেন তার মোটামুটি নির্যাস হল –

১) পশ্চিমবঙ্গে কোনো কাজ হয় না, কারণ বনধ হয়।
২) পশ্চিমবঙ্গে শিল্প হয় না, কারণ শ্রমিকরা রাজনীতি করে।
৩) পশ্চিমবঙ্গের স্কুলে লেখাপড়া হয় না, কারণ মাস্টাররা রাজনীতি করে।
৪) পশ্চিমবঙ্গের কলেজে ছাত্রছাত্রীরা পড়াশোনা করে না, কারণ রাজনীতি করে।

ফলে ২০১১ সালে যখন বামফ্রন্ট সরকার বিদায় নিল, তখন আমাদের প্রজন্মের অনেকেই স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছিল। আমাদের বড়দের কারো কারো মুখ দেখে মনে হয়েছিল, বাকি জীবনটা বাম শাসনে কাটাতে হবে না বলে দারুণ শান্তি পেয়েছেন। তখন চারপাশে সবাই বলত যে এবার থেকে পশ্চিমবঙ্গে শিল্প হবে, স্কুলে লেখাপড়া হবে, কলেজে ছাত্রছাত্রীরা মন দিয়ে পড়াশোনা করবে, হাসপাতালে চিকিৎসা হবে, ‘চলবে না, চলবে না’ আর চলবে না। এবার থেকে সব চলবে। কারণ রাজনীতি আর চলবে না। রাজনীতি না চললে যে খুব খারাপ হবে, সেকথা তখন বামপন্থী কয়েকজন ক্ষীণ কণ্ঠে বলেছিলেন। কিন্তু সদ্য যে হেরে গেছে তার কথায় কে কান দেয়? তার উপর একটানা ৩৪ বছর শাসন করে যারা হারে, তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগের লম্বা তালিকা থাকে। সেসব থেকে মুখ তুলতে কে চায়? তখন প্রায় সকলেই নিঃসন্দেহ, যে রাজ্যটা একেবারে শেষ হয়ে গেছে। তার জন্যে দায়ী বাম শাসন, কিন্তু কারণ রাজনীতি।

হা হুতাশ ছিল শুধু একজনের জন্য – বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য। কারণ তিনি বামপন্থী সরকারের মুখ্যমন্ত্রী হলেও বুঝেছিলেন যে সবকিছুতে রাজনীতি করা ঠিক নয়। যেমন উন্নয়ন নিয়ে রাজনীতি করা ভীষণ অন্যায়। তাই তিনি রাজনীতির ঊর্ধ্বে উঠে রাজ্যের ছেলেমেয়েদের ভালর জন্যে বাংলায় শিল্প আনতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তাঁর পার্টিই তাঁকে পিছন থেকে ছুরি মারল। তাই তিনি হেরে গেলেন। নেহাত তিনি অসম্ভব ভদ্রলোক, তাই মুখ ফুটে বলেননি ‘ব্রুটাস, তুমিও?’ তাঁর হয়ে আনন্দবাজার আর অন্যান্য সংবাদমাধ্যমগুলোই বলে দিয়েছিল। বিধানচন্দ্র রায় যদি বাংলার রূপকার হন, বুদ্ধদেব তাহলে বাংলার অরাজনীতির জন্মদাতা। তিনি মনে করতেন উন্নয়ন অরাজনৈতিক, তাই পার্টির কৃষক সংগঠনকে না জানিয়ে সিঙ্গুরের জমির প্রতিশ্রুতি দিয়ে দেন রতন টাটাকে। তিনি মনে করতেন শিল্প অরাজনৈতিক, তাই সটান বলে দেন – তাঁর দুর্ভাগ্য যে তিনি এমন একটা পার্টি করেন যারা বনধ ডাকে। বোধহয় তিনি মনে করতেন রাজনীতিও অরাজনৈতিক হলেই ভাল হয়। সেই কারণেই অন্য বামপন্থী দলের কর্মীদের পিছনে পুলিস লাগানো, ইউএপিএ আইনে গ্রেফতার করা ইত্যাদি তাঁর আমলে বেড়ে গিয়েছিল। এসবে অবশ্য আমাদের, মানে ভদ্রলোকদের, কোনো আপত্তি ছিল না। কারণ ওই যে – রাজনীতি খুব খারাপ জিনিস। তখন বিস্তর লেখালিখি হয়েছিল, এখনো বলাবলি হয় – মানুষটা তো ভাল, কিন্তু পার্টিটাই যে খারাপ। মানে কোনোভাবে যদি তৃণমূল কংগ্রেসের সরকারের মুখ্যমন্ত্রী হতে পারতেন বুদ্ধবাবু, তাহলে ভদ্রলোক-ভদ্রমহিলারা সবচেয়ে খুশি হতেন।

এসব ব্যাপার মমতা ব্যানার্জি ভালই বুঝতেন। তাঁকে তো আর এমনি এমনি বড় নেত্রী বলা হয় না। তিনি বুদ্ধবাবুর মত বই-টই লেখা শুরু করলেন। তা দিয়ে ভদ্রলোকদের খুব একটা সন্তুষ্ট করতে পারেননি, কিন্তু একে একে সব জায়গা থেকে রাজনীতি তুলে দিয়ে যারপরনাই প্রিয় হয়েছেন। পশ্চিমবঙ্গে ২০১১ সালের পর থেকে আর কোনো সফল বনধ হয় না। কারণ যে নেত্রী নিজে বিরোধী থাকার সময়ে নিজেই ঘনঘন বনধ ডাকতেন, তিনি মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পরে আর বনধ ডাকেন না। কোনো বিরোধী দল বনধ ডাকলে সরকারি কর্মচারীদের আগের রাতে অফিসে থেকে যেতে হয়, নইলে যে করেই হোক অফিসে পৌঁছতে হয়। ‘ব্রেক অফ সার্ভিস’ ইত্যাদি হুমকি থাকে। বামফ্রন্ট আমলে হাতে মাথা কাটা কো-অর্ডিনেশন কমিটির বিপ্লবী নেতারা কোথায় গেলেন? বিপন্ন সরকারি কর্মচারীরা অনেকসময় বুঝে পান না। বাস ইউনিয়ন, ট্যাক্সি ইউনিয়ন, অটো ইউনিয়ন, টোটো ইউনিয়ন – সবই যেহেতু বাম আমলের মতই শাসক দলের দখলে সেহেতু বনধ ব্যর্থই হয়। কিন্তু কাজ হয় কি? শনি, রবিবারকে কোনো ছুটির দিনের সঙ্গে একদিন বেশি ছুটি দিয়ে যোগ করে দেওয়া, পুজোর অনুদানের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে পুজোর ছুটি বৃদ্ধি – এসব তো হয়েই চলেছে। অবশ্য অরাজনৈতিক কারণে কাজ বন্ধ থাকলে পশ্চিমবঙ্গে কেউ আপত্তি করে না। যত দোষ, রাজনীতি ঘোষ।

পশ্চিমবঙ্গের শ্রমিকরাও আর রাজনীতি করেন না। বাম আমলের প্রবল প্রতাপান্বিত সিটু নিষ্প্রভ। শাসক দলের শ্রমিক সংগঠন শ্রমিকদের অধিকারের জন্যে কী করে কেউ জানে না। কিন্তু বাংলায় শিল্প এসেছে কি? বাংলায় শিল্পপতিরা বছর বছর আসতেন বর্ণাঢ্য শিল্প সম্মেলনে। বাংলায় সৌরভ গাঙ্গুলির মত নতুন শিল্পপতির জন্মও দেখা গেছে তৃণমূল শাসনে। কিন্তু শিল্প কোথায়? শিল্পপতির দেখা পেলেও শিল্পের দেখা না পেয়ে বোধহয় স্বয়ং মুখ্যমন্ত্রীও হতাশ হয়ে পড়েছেন। তাই এবছর আর বিশ্ব বঙ্গ বাণিজ্য সম্মেলন হচ্ছে না।

পশ্চিমবঙ্গের স্কুল নিয়ে বলতে শুরু করলে তো এ লেখা আর শেষ হবে না। বাম আমলের নিখিলবঙ্গ শিক্ষক সমিতির চেয়ে ঢের বেশি দাপট নিয়ে স্কুলে স্কুলে রয়েছে শুধুমাত্র তৃণমূলের শিক্ষক সংগঠন শিক্ষা সেল। বহু স্কুলে প্রধান শিক্ষক নেই, বছরের পর বছর কাজ চলছে ‘টিচার ইন চার্জ’ দিয়ে। বলা বাহুল্য তাঁরা কারা। তাঁদের অনেকের সঙ্গেই শিক্ষকদের গোলমাল গড়াচ্ছে আদালত পর্যন্ত। রাজনীতি নেই, সংগঠন নেই। তাই একা একাই লড়তে হচ্ছে শিক্ষকদের। অবশ্য সে তো সামান্য ব্যাপার। তার চেয়ে অনেক বড় কথা হল, কোনো স্কুলে ছাত্রছাত্রী আছে অথচ মাস্টার নেই। কোথাও আবার মাস্টার আছে অথচ ছাত্রছাত্রী নেই। কেন নেই? সে কেলেঙ্কারি কে না জানে! কিন্তু তা নিয়ে আজ অবধি বিরোধীরা কোনো বড় রাজনৈতিক আন্দোলন করতে পারলেন না। চাকরিপ্রার্থীরা অবশ্য রাজনীতি দূরে রাখার চেষ্টা করে গেছেন আপ্রাণ। মাঝরাত্তিরে পুলিস মহিলা আন্দোলনকারীদের পর্যন্ত টেনে হিঁচড়ে রাস্তা থেকে তুলে নিয়ে গেলেও তাঁরা বলেছেন ‘আমরা কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত নই’। কারণ ওই যে – রাজনীতি খুব খারাপ জিনিস। সে না হয় হল, কিন্তু স্কুলে লেখাপড়া হচ্ছে কি? স্কুলগুলো তো বন্ধ হতে বসেছে। রমরমা বেড়েছে বেসরকারি শীতাতপনিয়ন্ত্রিত স্কুলের। তাতে অবশ্য ভদ্রলোকদের অসুবিধা নেই। ছেলেমেয়েকে ওসব স্কুলে পড়ানোর রেস্ত তাঁদের আছে। তাছাড়া ওইসব স্কুলের একটা বড় গুণ হল – রাজনীতি নেই।

আমাদের বাবা-মায়েদের স্বপ্ন পূরণ করে মমতা কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়েও রাজনীতি বন্ধ করে দিয়েছেন। যাদবপুর বা প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয়ের মত দু-একটা ব্যতিক্রম বাদ দিলে সর্বত্র জাঁকিয়ে বসেছে একমেবাদ্বিতীয়ম তৃণমূল ছাত্র পরিষদ। মাঝে আবার কলেজে ভর্তি হতে গেলে তাদের মোটা টাকা উৎকোচ দিতে হচ্ছিল। নিজে বকাঝকা করেও তা বন্ধ করতে না পেরে কলেজে ভর্তির ব্যবস্থা অনলাইন করে ফেলেছে মমতা সরকার। ছাত্র ইউনিয়নের নির্বাচন বন্ধ সেই ২০১৭ সাল থেকে। আগে নাকি ছাত্রছাত্রীরা রাজনীতি করত বলে কলেজে লেখাপড়া হত না। এখন ছেলেমেয়েরা আর কলেজমুখো হতেই চাইছে না। নামকরা কলেজেও আসন খালি পড়ে থাকছে। কারণ ছাত্রছাত্রীরা জানে, জাতীয় শিক্ষানীতি আর রাজ্য শিক্ষানীতি (এবং দুর্নীতি) মিলিয়ে যা অবস্থা তাতে কলেজে পড়ে ভাত জোটানোর ব্যবস্থা হবে কিনা তার ঠিক নেই। এ রাজ্যে তো স্কুল, কলেজে শিক্ষক নিয়োগও প্রায় বন্ধ। এমএ/এমএসসি, এমনকি পিএইচডি করা ছেলেমেয়েরা সরকারি চাকরিপ্রাপ্ত শিক্ষাকর্মীদের চেয়েও কম বেতনে পড়াতে বাধ্য হচ্ছে আংশিক সময়ের অধ্যাপক হিসাবে অথবা দেদার অনুমোদন দিয়ে রাখা বেসরকারি নড়বড়ে কলেজে। অর্থাৎ কলেজ থেকে রাজনীতি তাড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে শিক্ষাকেও তাড়ানো হয়েছে।

মানে রাজ্যের সবকিছু অরাজনৈতিক হয়ে একটাও উপকার হয়েছে বলা যাবে না। তবু কিন্তু বাঙালির অরাজনীতি প্রেম অম্লান। সংসদে দাঁড়িয়ে যখন নরেন্দ্র মোদী বা অমিত শাহ যে কোনো বিষয়ে ফাঁপরে পড়লেই বলেন ‘বিরোধীরা রাজনীতি করছে’, আমাদের হাসি পায় না, রাগও হয় না। তৃণমূল কংগ্রেস নেতারা ওরকম বললেও আমাদের এখনো মনে হয় – ঠিকই বলছে। যে কোনো আন্দোলনকে বদনাম করার, নাগরিকদের চোখে হেয় করার একই উপায় বিজেপি ও তৃণমূল অবলম্বন করে – ‘দাবি ন্যায্য। কিন্তু বিরোধীরা এ নিয়ে রাজনীতি করছেন।’ যেন রাজনীতি করা এদেশে নিষিদ্ধ। একমাত্র ক্ষমতাসীন পক্ষই যে রাজনীতি অপছন্দ করে তা আমরা খেয়ালই করি না। ক্ষমতাসীনদের সুরে সুর মিলিয়ে আমরা রাজনীতি চাই না, অথচ গণতন্ত্র চাই। মানে স্নান করব, কিন্তু চুল ভেজাব না। অরাজনীতির সাধনা যে আমাদের প্রকৃতপক্ষে হিংস্র একদলীয় শাসনের দিকে নিয়ে গেছে, তা আমরা বুঝেও বুঝতে চাই না। জাতীয় স্তরে কী চলছে সে তো সবাই জানে। অন্য রাজ্যের বহু মানুষ এই অরাজনীতির ফাঁকি ধরে ফেলেছেন। তাই বিজেপিকে ছেঁটে দিয়েছেন ২০২৪ লোকসভা নির্বাচনে। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের অবস্থা কী?

এখানে দ্বিমেরু ভোট হওয়ায় বিজেপির আসন অনেক কমে গেলেও, ভোট কিন্তু বিশেষ কমছে না। উপরন্তু শুধু যে পঞ্চায়েত নির্বাচন ব্যাপারটা পরপর দুবার প্রহসনে পরিণত হল তা নয়, আর সব কলেজের মত মেডিকাল কলেজগুলোতেও প্রায় মাফিয়া হয়ে উঠেছে শাসক দলের ছাত্র সংগঠন। তৃণমূল কংগ্রেস সংলগ্ন ডাক্তার-অধ্যাপকদের একাংশের প্রশ্রয়ে আর জি কর মেডিকাল কলেজ ও হাসপাতাল যে নরককুণ্ড হয়ে উঠেছে তা এখন নিজ মুখে স্বীকার করছেন তৃণমূলেরই নেতা শান্তনু সেন। অবশ্য ওই হাসপাতালের স্নাতকোত্তর স্তরের ছাত্রীর নৃশংস ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ড না ঘটলে এবং নিজের মেয়ে ওই কলেজেরই ছাত্রী না হলে শান্তনু মুখ খুলতেন কিনা সন্দেহ।

আর জি করে অন্য ইউনিয়ন করতে গেলে ছাত্রছাত্রীদের কী হাল করা হয় তা কিন্তু আগেও এই ওয়েবসাইটেই প্রকাশিত হয়েছে। এবারের হত্যাকাণ্ডের মত আরও কত কাণ্ড অন্য মেডিকাল কলেজগুলোতে হওয়ার অপেক্ষায় আছে আমরা জানি না। অথচ আমরা সকলেই বুঝি, এমন আরও ঘটনা অনিবার্য। তবু শাসককে প্রশ্ন করার থেকে বাঙালি ভদ্রজনের কাছে এখনো বেশি গুরুত্বপূর্ণ অরাজনৈতিক থাকা। তাই এবারের স্বাধীনতা দিবস শুরু হল মধ্যরাতে মহিলাদের ডাকা যে আন্দোলন দিয়ে, সেই আন্দোলনের হোতারা বারবার ঘোষণা করে গেলেন – এটা অরাজনৈতিক আন্দোলন। বিখ্যাত অভিনেত্রী সোহিনী সেনগুপ্ত টিভি স্টুডিওতে বসে ধর্ষণ আটকাতে গেলে সমাজের, শিক্ষাব্যবস্থার কী কী সংস্কার করা দরকার সেসব বলার পাশাপাশি জোর দিয়ে বললেন – সরকারি রোষানলে তাঁকে কখনো পড়তে হয়নি। তাই সরকারের বিরুদ্ধে তাঁর কোনো রাগ নেই। এই আন্দোলন মহিলাদের নিরাপত্তা বিষয়ক। তাই কেউ যদি কোনো রাজনৈতিক পতাকা নিয়ে আসে, তাহলে তাকে ‘rudely’ বারণ করা হবে। অরাজনৈতিক সঞ্চালক সুমন দে বা স্টুডিওতে উপস্থিত রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিরাও তাঁকে প্রশ্ন করলেন না, এ রাজ্যের মহিলাদের নিরাপত্তা দেওয়ার দায়িত্ব কার? ভগবানের? তাহলে সরকারের দায়িত্ব কী? সোহিনীকে সরকারি রোষানলে পড়তে হয়নি বলেই যদি সরকারের বিরুদ্ধে তাঁর কোনো বক্তব্য না থাকে, তাহলে আর পাঁচজনের সঙ্গে আন্দোলনে নামার প্রয়োজন কী? আন্দোলনের কেন্দ্রে কি তাঁর স্বার্থ, নাকি যে মেয়েটি নৃশংসভাবে খুন হয়েছে তার স্বার্থ? বিখ্যাতরা এইরকম গা বাঁচানো অবস্থান নিয়ে দিব্যি চলতে পারেন, কারণ সরকারকে যদি বা সংবাদমাধ্যম ক্কচিৎ কদাচিৎ প্রশ্নের মুখে ফেলে, বিখ্যাতদের ফেলে না। তাই পরমব্রত চট্টোপাধ্যায়ও মাঝরাতে অ্যাকাডেমি অফ ফাইন আর্টসের সামনে দাঁড়িয়ে অবলীলাক্রমে বলে যেতে পারেন – কলকাতা দেশের অন্যান্য শহরের থেকে মহিলাদের নিরাপত্তায় এখনো অনেক এগিয়ে। তাই তো এরকম ঘটনা বেশি আঘাত দেয়। তাই তো তাঁরা পথে নেমেছেন। এটা এ দল বনাম ও দলের বিষয় নয় ইত্যাদি।

যে ঘটনার প্রতিবাদে মহিলারা রাস্তায় নেমেছিলেন বুধবার রাতে, সেটা ঘটেছে সরকারি হাসপাতালে। সরকার চালাচ্ছে একটা দল, সেই দলেরই অধীনে রয়েছে পুলিস। সেই পুলিসের বিরুদ্ধেই তথ্যপ্রমাণ লোপাটের অভিযোগ উঠেছে। সরকারি দলের নেতা এক ডাক্তারই মেডিকাল কলেজটা চালান, তিনিই কটু মন্তব্য করেছিলেন মৃতার বিরুদ্ধে। সেই মন্তব্যের প্রতিবাদেই রাতের দখল নেওয়ার ডাক। তাঁরই বিরুদ্ধে উঠেছে মারাত্মক সব অভিযোগ। সুতরাং পরমব্রত ঠিকই বলেছেন। এটা এ দল বনাম ও দলের বিষয় তো নয়ই। এটা একটাই দল বনাম মৃতার পরিবারকে ন্যায়বিচার পাইয়ে দেওয়ার বিষয়। অথচ তিনি ওই দলটার নামে কিছু বলবেন না। কারণ ওই যে – রাজনীতি খুব খারাপ জিনিস।

আনন্দের কথা, অরাজনীতির ধ্বজাধারীদের ডাকে যে হাজার হাজার অখ্যাত মহিলা (এবং পুরুষ) বুধবার রাতে পথে নেমে এসেছিলেন পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন জায়গায় এবং দেশের বিভিন্ন শহরে, তাঁরা এসব ন্যাকামি বোঝেন না। তাঁরা দ্ব্যর্থহীন ভাষায় আর জি কর হাসপাতালের মৃতা ছাত্রীর জন্যে ন্যায়বিচার চেয়ে স্লোগান তুলেছেন। অনেকে টিভি ক্যামেরার সামনে সরাসরি বলেছেন, যাকে গ্রেফতার করা হয়েছে সে সাক্ষীগোপাল। আসল অপরাধীদের ধরতে হবে এবং শাস্তি দিতে হবে। সরকারের কাছ থেকে সরাসরি জবাবদিহি চেয়েছেন তাঁরা। এসব দৃশ্য কালীঘাটের বাড়িতে বসে টিভিতে দেখে মমতা হয়ত অবাক হয়েছেন। অভিমানও করে থাকতে পারেন। তাঁর সরকার এই ‘বেনজির অরাজনৈতিক আন্দোলনের’ (এবিপি আনন্দের ভাষায়) সঙ্গে যে সহযোগিতা করেছে, তার এই প্রতিদান হয়ত তিনি আশা করেননি।

আন্দোলনের হোতারা এতে খুশি হলেন না রেগে গেলেন, তা-ই বা কে জানে! তাঁরা তো ব্যাপারটা অরাজনৈতিক রাখতেই চেয়েছিলেন। তাঁদের তো লক্ষ্য ছিল রাতের দখল নেওয়া, সরকারের বিরোধিতা করা তো নয়। অরাজনৈতিক বলে যে কিছু হয় না তা হয়ত তাঁরা ভুলে গিয়েছিলেন। ফলে রাশ আর হাতে থাকেনি, রাস্তায় নেমে আসা মানুষ সরকারের বিরুদ্ধে পুঞ্জীভূত ক্ষোভ উগরে দিয়েছে। আসলে দুনিয়ায় অরাজনৈতিক বলে যে কিছু হয় না, এটা যেমন ভোলা চলে না, তেমনি একথা ভুললেও চলে না যে জনতা সকলকে চমকে দিতে পারে। বুধবার রাতেও দিয়েছে। নইলে যে কাগজ একদা লিখত ‘যে দেশে ব্রিগেড নাই সেখানে কি গণতন্ত্র নাই?’, তারই টিভি চ্যানেলকে বুধবার লিখতে হত না ‘বিবেকের ডাকে বাংলা জুড়ে ব্রিগেড’। অবশ্য এর মানে হয়ত এটাও হতে পারে, যে ব্রিগেডেও আপত্তি নেই। যদি সেটা অরাজনৈতিক ব্রিগেড হয়।

আরও পড়ুন এই নির্বাচনে দেশ পশ্চাদপসরণ আটকাতে লড়ছে, কিন্তু পশ্চিমবঙ্গ?

মুশকিল হল, অরাজনৈতিক আন্দোলন একবিংশ শতাব্দীতে সারা বিশ্বে বেশ কেতাদুরস্ত হয়ে দাঁড়ালেও কোনো পরিবর্তন ঘটাতে পারেনি, যতক্ষণ না প্রবলভাবে রাজনৈতিক হয়ে উঠেছে। বাংলাদেশে সম্প্রতি যা ঘটেছে তা থেকেও একথাই প্রমাণ হয়। তবে পরিবর্তন ঘটাক আর না-ই ঘটাক, পশ্চিমবঙ্গের ভদ্রমহিলারা যে পথে নেমে আন্দোলন করার প্রয়োজন স্বীকার করেছেন – এটা নিঃসন্দেহে ভাল লক্ষণ। রাত তো দখল হল। আশা করি এরপর থেকে কলকাতার রাস্তায় দিনে মিছিল, জমায়েত বা অবরোধ দেখলে তাঁরা আর বিরক্ত হবেন না। ব্রিগেডে বা একুশে জুলাইয়ের মিটিংয়ে গ্রাম, মফস্বল থেকে আসা মানুষকে দেখে নাক সিঁটকে বলবেন না ‘চিড়িয়াখানা, ভিক্টোরিয়া বেড়াতে এসেছে।’ যার গায়ে লাঠি এসে পড়ে, তার জন্যে রাস্তাই যে একমাত্র রাস্তা – এটুকু মেট্রো, নিজের গাড়ি বা অ্যাপ ক্যাবে চেপে রাত দখল করতে আসা মহিলারা বুঝলেই অরাজনীতির বিরুদ্ধে স্বাধীনতা সংগ্রাম বেশ খানিকটা এগোবে। আর না বুঝলে?

বুধবার রাতেই কে বা কারা আর জি কর হাসপাতালে ঢুকে পড়ে তাণ্ডব চালিয়েছে, এমার্জেন্সি ডিপার্টমেন্টে ভাংচুর করেছে। আন্দোলনরত একমাত্র রাজনৈতিক শক্তি ভারতের গণতান্ত্রিক যুব ফেডারেশন ওই চত্বরে যেখানে অবস্থান বিক্ষোভ করছিল সেই জায়গাটা ভেঙে দেওয়া হয়েছে। তৃণমূল কংগ্রেসের দু নম্বর নেতা অভিষেক ব্যানার্জি জানিয়ে দিয়েছেন, ডাক্তারদের আন্দোলন ন্যায্য। তাঁদের নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। এসব যারা করেছে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

মানে নির্ঘাত স্বাধীনতা দিবস থেকেই ধর্ষণ, খুনের ঘটনার চেয়ে বড় করে তোলা হবে সরকারি হাসপাতালে হামলার ঘটনাকে। অন্যদিকে শনিবার থেকে মমতার দলই পথে নামবে মৃতাকে ন্যায়বিচার পাইয়ে দেওয়ার দাবিতে। অর্থাৎ যাঁর অধীন হাসপাতাল প্রশাসন ঘটনা ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করল, প্রমাণ লোপাট করতে হাসপাতালে ভাঙাভাঙি শুরু করে দিয়েছিল, সেই প্রশাসনের মাথাকে যিনি অন্য হাসপাতালে পুনর্বাসন দিয়েছিলেন – সেই স্বাস্থ্যমন্ত্রী ও পুলিসমন্ত্রীই এবার আন্দোলনকারী সাজবেন। বুধবার রাতের আন্দোলনের হোতাদের যুক্তি মানলে এতে কোনো অসঙ্গতি নেই। কারণ ব্যাপারটার মধ্যে রাজনীতি টেনে আনা অনুচিত। ব্যাপারটা নারী অধিকার সংক্রান্ত। মুখ্যমন্ত্রী নিজে নারী। অতএব।

অরাজনীতির হাত থেকে স্বাধীন হতে না পারলে মানুষকে বোকা বানানোর এই চেষ্টা পশ্চিমবঙ্গে চলতেই থাকবে। আশা করা যাক, বুধবার রাতের পর বাঙালি ভদ্রমহিলারা আর বোকা বনবেন না।

নাগরিক ডট নেটে প্রকাশিত