সব ধর্ষণ সমান নয়

কাউকে তো দেখছি না ফেসবুক বিদীর্ণ করে লিখছে “উন্নাওয়ের ধর্ষক বিধায়কের ফাঁসি চাই” বা “আসিফার ধর্ষকদের মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হোক”? এখনো পাড়ায় পাড়ায় মোমবাতি মিছিলের কোন খবর পাইনি। কাল রাতে দিল্লীতে একখানা হয়েছে বটে কিন্তু তার আয়োজক আবার একটা রাজনৈতিক দল। সেখানে রাহুল গান্ধী ছিলেন। কোথায় গেল নির্ভয়াকান্ডে জাগরূক সেই “নাগরিক সমাজ”?

কথাটা অনেকদিন ধরেই লিখব লিখব করছি। কিন্তু এমনও কথা আছে যা লিখতে হাত সরে না। কেবলই মনে হয় “ভুল ভাবছি। এ সত্যি নয়।“ কিন্তু নিজেকে এ হেন প্রবোধ দিয়েই বা কতদিন চলে? স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ যখন লিখে গেছেন যুগান্তের কবিকেও মানহারা মানবীর দ্বারে দাঁড়াতেই হবে, তখন আমার — দু পয়সার সাংবাদিক আর ফেসবুকে রাগ, ক্ষোভ, ঘৃণা উগরে দেওয়া মূল্যহীন ব্লগার — সাধ্য কী যে একথা না লিখে থাকি? আর সত্যি বলতে যা লিখি তা তো কোথাও কোন মনের কোণে কোন প্রভাব ফেলে না। লিখি নিজের নিষ্ক্রিয়তার পাপস্খালন হচ্ছে — এই ভেবে। ঐ, এরিস্টটল যাকে catharsis বলতেন আর কি। তাই বুক ঠুকে কথাটা লিখেই ফেলি।
সব ধর্ষণ সমান নয়।
কথাটা খুব আপত্তিকর মনে হচ্ছে, না? হতে পারে। কিন্তু গত কয়েকবছরের ঘটনাবলী প্রমাণ করেছে যে সব ধর্ষণ সমান নয়।
২০১২ র ডিসেম্বরের কথা মনে করুন। দিল্লীর সেই মেয়েটি, যার আমরা বাহারী নাম রেখেছি নির্ভয়া (যেন সে নির্ভয়ে বুক ফুলিয়ে ধর্ষিত হতে গিয়েছিল, যেন তার ধর্ষণোত্তর মৃত্যু অত্যন্ত বীরোচিত ঘটনা, যেন একটা তাজা প্রাণের এই মর্মন্তুদ পরিণতি জাতির বিবেক জাগিয়ে তোলার জন্য এক মহান আত্মত্যাগ), সে যখন হাসপাতালে মৃত্যুর চেয়েও বেশি বেদনা নিয়ে শুয়ে ছিল, তখন সারা ভারত জুড়ে কত মোমবাতি মিছিল! ফেসবুকে সরকার কত অপদার্থ সেই নিয়ে লক্ষ লক্ষ পোস্ট! দেশটাকে বদলে ফেলা দরকার — এই মর্মে আমাদের যুবসমাজের কি চিল চিৎকার! বহু মানুষ তো মিছিল করে খোদ দিল্লীতে প্রতিবাদ জানাতে গেলেন ক্ষমতার অলিন্দে। সহসা কি আপাদমস্তক আলোড়ন এই পোড়া দেশটার শরীরে!
সেই একই পরিমাণ আলোড়ন কি হয়েছিল এই বাংলায় যখন কামদুনির মেয়েটা ধর্ষিতা হল? যখন মধ্যমগ্রামে এক ট্যাক্সি ড্রাইভারের মেয়ে ধর্ষণ এবং তারপরেও চলতে থাকা দীর্ঘ লাঞ্ছনার শেষে মারা গেল এবং মৃত্যুটা আত্মহত্যা না হত্যা তা নিয়ে ধোঁয়াশা দেখা দিল? সুজেট জর্ডানের ধর্ষক যেন এখন কোথায়?
যদি ঐ ঘটনাগুলো নিয়ে সংবাদমাধ্যম এবং বিরোধী দলগুলোর প্রতিক্রিয়া ঘেঁটে দেখেন তাহলে হয়ত বলবেন “কম কিছু তো হয়নি।” কিন্তু আমি সংবাদমাধ্যম আর বিরোধী দলগুলোর কথা বলছিই না। বলছি আমাদের মত ক্ষমতার বৃত্তের বাইরে থাকা মানুষদের কথা। আমরা কজন ধর্ষণ হলেই মুখ্যমন্ত্রীর সেটাকে “সাজানো ঘটনা” বা “সিপিএমের চক্রান্ত” বলা শুনে শিউরে উঠেছি, বমি বমি লাগায় বেসিনে থুতু ফেলেছি? কী বলছেন? অনেকেই? তাই নাকি? তার প্রতিফলন তো ভোটবাক্সে দেখলাম না। চৌত্রিশ বছর যারা অপশাসন করেছে তাদের তুলনায় পরিবর্তনের সরকার ভালই চলেছে যদি ধরেও নিই, তাহলে সরকারের পতন না হলেও এত সব ঘটনায় সমর্থন তো অন্তত কমে যাওয়া উচিৎ ছিল। হয়েছে তো উলটো। মুখ্যমন্ত্রীর পার্টির সমর্থন বেড়েই গেছে। ২০১৬ র ফলাফল নিয়ে অনেকের সাথে কথা বলে দেখেছি। সকলেই একমত যে ধর্ষণগুলো কোন ইস্যু নয় যতক্ষণ আমার বাড়ির সামনের কাঁচা নর্দমা পাকা হচ্ছে, আমার গাড়ির চাকা রাস্তার গাড্ডায় পড়ে সার্ভিসিঙের খরচ বাড়িয়ে না দিচ্ছে। অতএব বোঝাই যাচ্ছে যে নির্ভয়ার ধর্ষণ আর কামদুনির মেয়েটার ধর্ষণ এক নয়।
এইসব অপ্রিয় কথা হয়ত লিখতাম না। কিন্তু মুশকিল হল এই যে দেখলাম ধর্ষণের অবমূল্যায়ন চলতেই থাকল (মুখ্যমন্ত্রী সেই যে কত লাখ যেন মূল্য ধার্য করেছিলেন সেই মূল্যের কথা বলছি না কিন্তু) এবং প্রায় দেড় শতক পরে গোপালকৃষ্ণ গোখেলের সেই বিখ্যাত উক্তিকে আবার সত্য প্রমাণ করে এই রোগটা সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ল। সংরক্ষণ চেয়ে জাঠরা দক্ষযজ্ঞ করল, সেই বাবদ নাকি ধর্ষণও করল। সেটা নিয়ে একটু হৈ চৈ হতেই সরকারগুলো ঘোষণা করল কিছুই নাকি হয়নি। সব ধর্ষণ কাল্পনিক। তারপর নয়ডায় জাতীয় সড়কের ধারে এক মহিলার ধর্ষণও এক দিনের মধ্যেই পারিবারিক কলহ, আদৌ ধর্ষণ হয়নি — এসবে পর্যবসিত হল। কোনটা যে সত্য, কোনটা উত্তরসত্য কে বা জানে!
কিন্তু তারপর একটা ঘটনা ঘটল যা তীব্রতার কারণে অস্বীকার করার কোন উপায় রাখেনি। অবশ্য কেউ অস্বীকার করতে চায়ওনি। সেটা হল আপাদমস্তক দুর্নীতিগ্রস্ত, যৌনবিকৃতিসম্পন্ন, বহু নারীর ধর্ষক এক গুরুর গ্রেপ্তারের প্রতিবাদে শত শত ভক্তের দাঙ্গা করা। হরিয়ানার রাজ্য সরকার স্পষ্টতই হাত গুটিয়ে বসে রইল। বুঝে নেওয়া শক্ত নয় যে রাষ্ট্রযন্ত্রের এবং, মানুন আর না-ই মানুন, সাধারণ মানুষের এক বিরাট অংশের সমর্থন ঐ গুরমিত রাম রহিমের দিকে ছিল।
এর পরেও ধর্ষণ এবং সে সম্পর্কে আমাদের উদাসীনতার গল্পটা যেন একতা কাপুরের কে সিরিয়ালের মত — শেষই হয় না। কিন্তু রাম রহিমের সময় থেকেই দেখা যাচ্ছে আমরা আর শুধু উদাসীনতায় থেমে নেই। আমরা ক্রমশ যৌন অপরাধীদের সমর্থনে সোচ্চার।
কলকাতার নাম করা স্কুলে দুজন শিক্ষকের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠল ধর্ষণের। অবিলম্বে সরকারের মদতপুষ্ট লোকেরা গোপনে এবং প্রকাশ্যে বলতে শুরু করল এসব রাজ্যকে অশান্ত করার জন্যে বামপন্থী চক্রান্ত। একটা কাগজে তো প্রতিবাদী অভিভাবকদের ছবি ছেপে দাবী করা হল যে ওঁরা আসলে মাওবাদী। ফেসবুকে যে যা-ই লিখুক নিজেকে প্রগতিশীল প্রমাণ করতে, সেই সময় অন্তত পাঁচজন পরিচিত ব্যক্তিগত কথাবার্তায় আমাকে বোঝানোর চেষ্টা করেছিল জি ডি বিড়লা স্কুলের মেয়েটা মিথ্যে বলছে এবং গোটা ব্যাপারটা আসলে তৃণমূল বনাম বিজেপি ছাড়া কিছুই নয়। এমন তাদের যুক্তির বাহার যে একটা সময়ে আমিও ধন্দে পড়ে যাই। তখন আবার বুঝলাম যে সব ধর্ষণ সমান নয়। কোন দলের লোক যুক্ত, কোন দলের শাসনে ঘটেছে ব্যাপারটা সেসব দেখে আমরা, মানে শিক্ষিত, রুচিশীলরা ধর্ষণের দর ঠিক করি।
কিন্তু তখনো বুঝিনি দর ঠিক করার ওটাই একমাত্র মানদণ্ড নয়। সেটা বোঝার জন্যে অপেক্ষা করতে হল একটা আট বছরের মেয়ের ধর্ষণ এবং খুন পর্যন্ত, একটা ধর্ষিত মেয়ের বাবা পুলিশের হাতে খুন হওয়া পর্যন্ত।
স্পষ্ট মনে আছে যখন নির্ভয়ার ঘটনা প্রকাশ হল, দোষীরা গ্রেপ্তার হল তখন নাবালক ছেলেটিকেও প্রাপ্তবয়স্ক হিসাবে বিচার করা হোক, মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হোক — এই দাবীতে আমার কত বন্ধু, পরিজন সোচ্চার ছিলেন। আমি এর বিরোধিতা করেছিলাম বলে তারা আমাকেই ধর্ষক বলে ফেলে প্রায়। এখন কোথায় তারা? কাউকে তো দেখছি না ফেসবুক বিদীর্ণ করে লিখছে “উন্নাওয়ের ধর্ষক বিধায়কের ফাঁসি চাই” বা “আসিফার ধর্ষকদের মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হোক”? এখনো পাড়ায় পাড়ায় মোমবাতি মিছিলের কোন খবর পাইনি। কাল রাতে দিল্লীতে একখানা হয়েছে বটে কিন্তু তার আয়োজক আবার একটা রাজনৈতিক দল। সেখানে রাহুল গান্ধী ছিলেন। কোথায় গেল নির্ভয়াকান্ডে জাগরূক সেই “নাগরিক সমাজ”?
নব্বইয়ের দশকের শেষদিক থেকে ক্রমশ “স্বতঃস্ফূর্ত” কথাটা খুব জনপ্রিয় হয়েছে। প্রতিবাদ নাকি স্বতঃস্ফূর্ত হলে তবেই গ্রাহ্য হবে, নইলে নয়। অর্থাৎ আমি যদি বুদ্ধি খাটিয়ে, শ্রম দিয়ে, সময় দিয়ে আমার বক্তব্যের সমর্থনে আপনাকে রাস্তায় নামাতে পারি তাহলে সে প্রতিবাদ হল সাজানো ঘটনা। আপনার যদি একা একা স্কচ বা ইনস্ট্যান্ট কফিতে চুমুক দিতে দিতে মনে হয় “নাঃ! একটু মিছিলে হেঁটে আসি”, তবেই সেটা প্রতিবাদ হবে। যাদের স্কচ বা কফি খাওয়ার সাধ্য নেই তাদের প্রতিবাদ, অতএব, গ্রাহ্য নয়। তাদের হাতে থাকে পতাকা, অর্থাৎ তারা সংগঠিত। অর্থাৎ স্বতঃস্ফূর্ত নয়। ভাগ্যিস এইরকম স্বতঃস্ফূর্ততার ধারণা এমনকি অহিংসার পূজারী মহাত্মা গান্ধীরও ছিল না। থাকলে অসহযোগ, ভারত ছাড়ো ওসব করতেন না। সুভাষচন্দ্রও সাত মুলুক পাড়ি দিয়ে সেনাবাহিনী টাহিনী গড়ার ঝামেলায় যেতেন না। মার্টিন লুথার কিংও অপেক্ষা করতেন কবে সাদা চামড়ার লোকেরা এসে চোখের জল ফেলতে ফেলতে “ভাই রে” বলে কালো মানুষদের গলা জড়িয়ে ধরে নিজেদের আমোদের জায়গাগুলোয় নিয়ে যাবে। তা সে যাই হোক, কথা হচ্ছে নির্ভয়ার জন্যে যে “স্বতঃস্ফূর্ত আবেগের বিস্ফোরণ” দেখেছিলাম সে আবেগ কিন্তু উন্নাওয়ের মেয়েটির জন্যে দেখতে পাচ্ছি না। আসিফার জন্যে তো আরোই পাচ্ছি না। উলটে দেখছি এদের ধর্ষকদের জন্যে, হত্যাকারীদের জন্যে বেশ একটা সহানুভূতির আবহ।
আবার বলছি, রাষ্ট্রযন্ত্রের যে সক্রিয় সমর্থন ঐ ইতরগুলোর প্রতি তার চেয়েও আমি বেশি আতঙ্কিত আমাদের মত মানুষদের আচরণ নিয়ে। কোন সন্দেহ নেই গত কয়েকবছরে এদেশে খুনী এবং ধর্ষকদের রাষ্ট্র নজিরবিহীন সমর্থন দিয়েছে। কিন্তু আমার প্রশ্ন এই যে এরকম একটা রাষ্ট্রশক্তি তো তৈরি করেছি আমরা। সেজন্যে আমাদের কেউ কি অনুতপ্ত? আমাদের গণতন্ত্রের হাজারটা ত্রুটি আছে। কিন্তু কেউ কি বলতে পারবে অন্যদের মনোনয়ন জমা দিতে না দিয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় মুখ্যমন্ত্রী হয়েছিলেন? একজনও কি বলবে যোগী আদিত্যনাথ মুখ্যমন্ত্রী হয়েছে লোকের ভোট দেওয়া আটকে? কেউ বলবে ২০১৪ র লোকসভা নির্বাচন বিজেপি জিতেছিল কাউকে ভোট দিতে না দিয়ে?
তাহলে দাঁড়াল কী? ধর্ষকদের ক্ষমতায়ন করেছি আমরাই। দয়া করে বলবেন না “বুঝিনি এমন হবে।” ২০১১ থেকে ১৬ অব্দি অত ধর্ষণের ঘটনার পরেও আপনি বোঝেননি? যোগী আদিত্যনাথের অনেক দোষ আছে। কিন্তু সে কোনদিন নিজের চিন্তাধারা, উদ্দেশ্য গোপন করেছে এমন অপবাদ তার চরম শত্রুও দেবে না। সে কোন ধরণের মানুষ সম্পর্কে কী ভাবে, কী করতে চায় সেসব সে প্রকাশ্যেই বহুবার বলেছে। তার ভিডিও আছে, খবরেও প্রকাশিত হয়েছে। ওসব জেনেও উত্তরপ্রদেশে যে লোক তাকে মুখ্যমন্ত্রী বানিয়েছে আর অন্য কোথাও বসে যারা সমর্থন জানিয়েছে তারা উন্নাওয়ের ঐ মানহারা মানবীর দ্বারে কোন মুখে দাঁড়াবে?
আসিফার ঘটনা আরো বেশি অবাক করার মত। এবং তার প্রতিক্রিয়াও চমকপ্রদ। কোন সভ্য দেশে একটা আট বছরের মেয়েকে একমাত্র কোন বিকৃতমনা অপরাধীই অপহরণ করে বন্দী করে রেখে বারবার ধর্ষণ করতে এবং তারপর খুন করতে পারে। ‘Silence of the lambs’ এর বাফেলো বিলের মত কেউ। এ কাজে কোন সঙ্গী পাওয়ার তার কথা নয় এবং যখন সে ধরা পড়বে তখন বিনা বিলম্বে কঠোরতম শাস্তি তার হওয়ার কথা। কিন্তু আসিফার দুর্ভাগ্য সে জন্মেছিল একটা অসভ্য দেশে। যে দেশের মানুষ ধর্মান্ধ, বর্বর। দুধের শিশুকে মন্দিরে নিয়ে গিয়ে বিগ্রহের সামনে দল বেঁধে ধর্ষণ করে বারবার এবং সেটা হয় তাদের পূজার অঙ্গ। আর কী দারুণ ব্যাপার! যে রাজ্যের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ আসিফার ধর্মের, এমন এক ধর্ম যা নাকি, ধর্ষকদের ধর্মের লোকেদের কথানুযায়ী ভীষণ হিংস্র, সেই রাজ্যে পুলিশ অনেকদিন অব্দি অভিযোগই না নিয়ে গ্যাঁট হয়ে বসে থাকতে পারে! শেষ অব্দি যখন নেয়, তখন জানা যায় কর্তাদের আগেই অনেক টাকাপয়সা দেওয়া হয়েছিল চেপে যাওয়ার জন্য। শুধু তাও নয়, ধর্ষণপুজোর পেরসাদ তাঁরাও পেয়েছেন। এতসব আয়োজন কেন? না আসিফার পরিবার পরিজন ভাই বেরাদরদের ঐ এলাকা থেকে সরানোর জন্যে। আচ্ছা এই অব্দিও না হয় বোঝা গেল। দোষীদের যথাযোগ্য শাস্তির ব্যবস্থা করুক রাষ্ট্র। এর বেশি আর কী করণীয়? ক্ষতি তো যা হওয়ার হয়েই গেছে। কিন্তু বিপদের শেষ তো সেখানে নয়। লোকে যে মিছিল করতে বেরিয়েছে ধর্ষকদের সমর্থনে! উকিলরা আন্দোলন শুরু করেছেন পুলিশকে চার্জশিটই দাখিল করতে দেবেন না বলে! আসিফার পরিবারের পক্ষের উকিলকে হুমকি দেওয়া হচ্ছে “ভিটেমাটি চাটি করে দেব”!
তা এসবে আমাদের স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিক্রিয়াগুলি কী কী রকমের?

১) নীরবতা
২) নিশ্চয়ই পাকিস্তানের হাত আছে
৩) কাশ্মীরীদের বিশ্বাস করা যায় না। কে জানে আসলে কী ব্যাপার? মিডিয়া তো সবেতেই “ওদের” দিকে ঝোল টানে
৪) হয়েছে বেশ হয়েছে। বেঁচে থাকলে তো বড় হয়ে টেররিস্ট হত
৫) তুমি এত লাফাচ্ছ কেন? তোমার বোনকে তো কেউ রেপ করেনি

দু নম্বর থেকে পাঁচ নম্বর হচ্ছে তাদের প্রতিক্রিয়া যারা ইদানীং হিন্দু বলে গর্বিত। এক থেকে পাঁচ তাদেরও প্রতিক্রিয়া যারা অত গর্বিত টর্বিত নয়, তবে মোগাদিশুতে মুসলমান সন্ত্রাসবাদীরা বোম মারলে মুর্শিদাবাদের মুসলমান সম্পর্কে বলে “কৈ, নিন্দা করল না তো? ওদের ধর্মটাই এইরকম। কোরানে পরিষ্কার লেখা আছে।”
এখন যদি জিজ্ঞেস করি এই যে আপনারা আসিফার ধর্ষণকে নির্ভয়ার ধর্ষণের পাশে রাখছেনই না, নিন্দাও করছেন না — এ থেকে কী বুঝব? হিন্দু ধর্মটাই এরকম? ঐ ধর্ষণপুজোর কথা বেদে পরিষ্কার লেখা আছে? কারা যেন ইংরিজিটা লিখতে পারে বলে মুসলমানদের উঠতে বসতে জ্ঞান দেয় “Educated Muslims should reclaim their religion from fundamentalists?” তেনারা হিন্দুধর্মটাকে মৌলবাদীদের হাত থেকে পুনরুদ্ধার করার কাজটা কবে শুরু করছেন জানতে ভারী ইচ্ছা করছে।
ইতিমধ্যে বুকে হাত রেখে একটা সত্যি কথা বলে ফেলতে পারলে ভাল হয়। সেটা এই যে আমরা অনেকেই জেনেশুনে বিষ করেছি পান। কারণ বাইরে উন্নয়ন ইত্যাদি যা-ই বলে থাকি না কেন, মনে মনে জপছিলাম “মুসলমানগুলোকে একটু শিক্ষা দেওয়া দরকার,” “সোনার চাঁদ, সোনার টুকরোগুলোর বড্ড বাড় বেড়েছে” ইত্যাদি। এসব যখন ভেবেছি তখন যোগী আদিত্যনাথের বক্তৃতায় ধর্ষণের হুমকি আমাদের ভালই লেগেছে। এ বিষ বড় মিষ্টি। খাওয়ার সময়ে ভেবেছি আমার কী? আমি তো সংখ্যালঘুও নই, দলিতও নই। এখনো মিষ্টি মিষ্টি লাগছে তাই ধর্ষণগুলোকে সেইভাবেই মাপছি।
এমন বিষ আছে খাওয়ার সাথে সাথে কেউ মরে না, মরে ধীরে ধীরে, অনেক মাস, বছর ধরে। যেমন আর্সেনিক। ঘৃণাও আর্সেনিকের মতই। মনে রাখবেন, যে ধর্ষক একটা আট বছরের মেয়েকে ধর্ষণ করবে বলে মীরাট থেকে কাঠুয়া যেতে পারে, সে কিন্তু মুসলমান না পেলে ধর্ষণ করা বন্ধ রাখবে না। এ দেশের সব মুসলমান, দলিত, আদিবাসী হিটলারের জার্মানির ইহুদীদের মত হাওয়া হয়ে গেলেও তার চোখ লোভে চকচক করবেই। তা বিষ যখন গিলেছেন এবং আমাদের সক্কলকে গিলিয়েছেন তখন আর কী করা? দরজা, জানালা এঁটে শোবেন দয়া করে আর ছেলেমেয়েদের একা কোথাও ছাড়বেন না। মনে রাখবেন, ধর্ষণকে নানা লোক নানা উদ্দেশ্যে ব্যবহার করে কিন্তু ধর্ষণ করার ইচ্ছাটি একদম ধর্মনিরপেক্ষ। ওখানে কিন্তু জাতের ভিত্তিতে সংরক্ষণও নেই।
সব ধর্ষণ সমান নয় কিন্তু সব ধর্ষক সমান।

ধর্মনিরপেক্ষতার ধাঁধা

শুধু দক্ষিণপন্থীরা নয়, মধ্যপন্থী, এমনকি অনেক বামপন্থীও বলে থাকেন “ভারত আবার ধর্মনিরপেক্ষ কোথায়? ধর্মনিরপেক্ষ মানে কোন ধর্মকেই সরকার পাত্তা দেবে না। এখানে কি সেটা হয়? এখানে তো সবেতেই ধর্ম”

আগামী বছর লালকৃষ্ণ আদবানির রথযাত্রার ৩০ বছর পূর্ণ হবে। এই তিরিশ বছরে দুটো শব্দবন্ধ আদবানি এবং তাঁর সাঙ্গোপাঙ্গদের কল্যাণে দারুণ জনপ্রিয় হয়েছে — মেকি ধর্মনিরপেক্ষতা (pseduo secularism) আর প্রকৃত ধর্মনিরপেক্ষতা (true secularism)। নরেন্দ্র মোদীর সরকারের হজযাত্রায় ভর্তুকি তুলে দেওয়ার সূত্রে ঐদুটো শব্দবন্ধ আবার বেশি বেশি করে শোনা যাচ্ছে। মোটের উপর বিজেপি এবং তার সমর্থকরা যা বলছেন তার সার এই যে ধর্মনিরপেক্ষ দেশে একটা বিশেষ ধর্মের লোক তীর্থ করতে যাবে বলে সরকার পয়সা খরচা করবে কেন? এগুলো হচ্ছে মেকি ধর্মনিরপেক্ষতা। এই যে নরেন্দ্রবাবু ভর্তুকি তুলে দিলেন — এইটেই হচ্ছে প্রকৃত ধর্মনিরপেক্ষতা। কথাটা শুনতে ভারী ভাল এবং কথাটা সত্যিও — যতক্ষণ না আপনি এটা জানছেন যে মানস সরোবরে তীর্থ করতে যাওয়ার জন্যে ভারত সরকার কত হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দেয়। এছাড়াও কোন রাজ্যের সরকার পাকিস্তানের নানকানা সাহিবে তীর্থ করতে যাওয়ার জন্যে ভর্তুকি দেয়, কোন রাজ্যের সরকার কুম্ভমেলার আয়োজন করে। এবং সেসব মিলিয়ে যা খরচা হয় তা হজযাত্রার ভর্তুকির চেয়ে অনেক অনেক বেশি। এই দেখুন

https://www.outlookindia.com/website/amp/rs-200-cr-haj-subsidy-gone-but-what-about-rs-2500-crore-set-aside-by-up-alone-fo/306961?__twitter_impression=true

পার্থক্যটা আরো কুশ্রী হয়ে দাঁড়ায় হজে যাতায়াতের খরচ হিসাব করলে। হিসাব করলে ফল যা বেরোয় তার মানে দাঁড়ায় এই যে ভর্তুকিটা তীর্থযাত্রীরা পায় না, পায় এয়ার ইন্ডিয়া — হজ করতে যেতে হলে যাদের বিমানে যাওয়া বাধ্যতামূলক। গোটা আষ্টেক অনুচ্ছেদ পড়ে দেখুন

https://thewire.in/214513/haj-subsidy-cancelled-air-india/

তা সত্ত্বেও হজের ভর্তুকি তুলে দেওয়ার সিদ্ধান্তের পর এখন অব্দি কোন ইসলাম ধর্মাবলম্বী বা কোন মুসলিম সংগঠনকে হাঁই হাঁই করে উঠতে দেখা গেল না যে “এটা আমাদের অধিকার, এটা দিতেই হবে।” বস্তুত সেই প্রথম এন ডি এ সরকারের আমল থেকে হজযাত্রীদের ভর্তুকি দেওয়া নিয়ে “প্রকৃত ধর্মনিরপেক্ষ” পার্টি এবং তাদের প্রতি সহানুভূতিশীল লোকেদের চিৎকার চেঁচামেচি শুনছি। এই বছরগুলোতে এ নিয়ে বন্ধুবান্ধব, পরিচিত, অপরিচিত যত ইসলাম ধর্মাবলম্বীর সাথে কথা হয়েছে, সকলেই বলেছে যে এই ভর্তুকি অপ্রয়োজনীয়। ইসলামেও নাকি তাদেরই হজযাত্রা করতে বলা হয়েছে যাদের সামর্থ্য আছে। সুতরাং সরকারী আনুকূল্যে তীর্থ করতে যাওয়ার কোন যুক্তি নেই।
অথচ দেখুন, হজের ভর্তুকির সঙ্গে সঙ্গে হিন্দু তীর্থযাত্রীদের ভর্তুকি তুলে দেওয়ার কথা যেইমাত্র বলা হয়েছে অমনি চিৎকার শুরু হয়ে গেছে “হিন্দু খতরে মে হ্যায়”। কথাটা যে বলবে সে-ই যে হিন্দুদের শত্রু এটা যেন স্বতঃসিদ্ধ। এই চিৎকারে সবচেয়ে জোরালো গলাগুলো হিন্দুত্ববাদী মোদীর সাঙ্গোপাঙ্গদের। এটাকে, অতএব, প্রকৃত ধর্মনিরপেক্ষতা বলা যাচ্ছে না।
কিন্তু মূল প্রশ্নটা এর চেয়ে অনেক বড় এবং সেই প্রশ্নটার উত্তর নিয়ে সর্বশক্তি দিয়ে লড়াই করার দরকার আছে। প্রশ্নটা এই যে ধর্মনিরপেক্ষতা মানে কী? শুধু দক্ষিণপন্থীরা নয়, মধ্যপন্থী, এমনকি অনেক বামপন্থীও বলে থাকেন “ভারত আবার ধর্মনিরপেক্ষ কোথায়? ধর্মনিরপেক্ষ মানে কোন ধর্মকেই সরকার পাত্তা দেবে না। এখানে কি সেটা হয়? এখানে তো সবেতেই ধর্ম।”
কথাটা উড়িয়ে দেওয়ার নয়। ধর্মনিরপেক্ষতার ধারণাটা এসেছে ইউরোপের secular ধারণা থেকে। এবং secular রাজনৈতিক ব্যবস্থার মানে এমন একটা ব্যবস্থা যাতে চার্চের কোন ভূমিকা থাকবে না। চার্চ, মানে ধর্মযাজকদের, রাষ্ট্রের ব্যাপারে কোন কথাই বলতে দেওয়া হবে না। ইউরোপে ব্যাপারটা এভাবেই ঘটেছিল কারণ মধ্যযুগে ঐ মহাদেশে চার্চ দণ্ডমুণ্ডের কর্তা হয়ে বসেছিল, রাজার সমান বা কোন কোন ক্ষেত্রে রাজার চেয়েও ক্ষমতাশালী হয়ে উঠে যারপরনাই অত্যাচার করত সাধারণ মানুষের উপর। নবজাগরণ চার্চের সেই ক্ষমতার বিরুদ্ধে একটা আন্দোলনও বটে। নবজাগরণ সমাজকে ধর্মকেন্দ্রীক (theocentric) থেকে করল মানবকেন্দ্রীক (anthropocentric)। সেখান থেকেই কালে কালে এল secular রাষ্ট্রব্যবস্থার ধারণা। তা চার্চনিরপেক্ষ শাসনব্যবস্থা যদি কায়েম করতে হয় তাহলে স্বভাবতই রাষ্ট্রকেও ধর্ম থেকে দূরে থাকতে হবে। সেটাই যথার্থ ধর্মনিরপেক্ষতা।
কিন্তু ধর্মনিরপেক্ষতার যে এই একটাই চেহারা হতে পারে, একথাটা কে বলে দিল? অন্তত ভারতবর্ষে শাসকের কাছ থেকে এবং সাধারণ মানুষের কাছ থেকে (যেহেতু গণতন্ত্রে শাসক আকাশ থেকে পড়েন না, সাধারণ মানুষের মধ্যে থেকেই উঠে আসেন) ওরকম ধর্মনিরপেক্ষতা আশা করা নির্বুদ্ধিতা। কেউ ওরকম হলে নিশ্চয়ই ভাল কথা, যেমন প্রথম প্রধানমন্ত্রী জহরলাল নেহরু নাস্তিক ছিলেন। কিন্তু বেশিরভাগ মানুষ আর বেশিরভাগ শাসক যে তেমন হবেন না সেটাই এদেশে স্বাভাবিক। কেন, সেটা ভারতের ইতিহাস যে একটুও বুঝেছে তাকে বুঝিয়ে বলতে হয় না। বিবেকানন্দ তো বলেইছিলেন, সব জাতির একটা করে মূলমন্ত্র থাকে, ফরাসীদের যেমন liberte, egalite, fraternite; ভারতীয়দের মূলমন্ত্র তেমনি ধর্ম। কোন দেশের মূলমন্ত্র ধর্ম হওয়া মোটেই ভাল কথা নয়, হলে কী ধরণের পশ্চাদপসরণ হতে পারে তার বহু নিদর্শন আমরা পাচ্ছি এখন, অন্য অনেক দেশের উদাহরণ থেকেও বোঝা যায়। তবুও এটাই যে ভারতের বাস্তবতা সেটা অস্বীকার করা মূর্খামি। আমাদের রাষ্ট্রপিতারা (founding fathers অর্থে। আমি গান্ধীভক্ত নই, তাই একা মহাত্মা গান্ধীই রাষ্ট্রপিতা এমনটা মনে করি না। তবে তিনিও একজন) ওরকম মূর্খ ছিলেন না। ধর্মকে বাদ দিয়ে এই দেশ চালানো যাবে না সেটা তাঁরা ভালই বুঝতেন কিন্তু ধর্মের উপর ভর দিয়ে তো আর একটা বিংশ শতকের সভ্য দেশ গড়ে উঠতে পারে না। তাছাড়া কোন ধর্মের উপর ভর দেওয়া হবে? এ তো আর পঞ্চদশ, ষোড়শ শতাব্দীর ইউরোপ নয় যে খ্রীষ্টান ধর্মটাকে সামলে দিলেই হল। এখানে অজস্র ধর্ম, একই ধর্মের মধ্যেও অজস্র মত (ইংরিজিতে যাকে sect বলে আর কি)। সেখানে কোন একটাকে প্রাধান্য দেওয়া মানেই বাকি সকলকে জোর করে সেই ধর্মের অধীন করে দেওয়া।
অতিচালাক কয়েকজন সঙ্ঘ পরিবারের নেতা বলতেন এবং এখনো বলেন “হিন্দুরা এদেশে সংখ্যাগরিষ্ঠ, অতএব তাদেরই প্রাধান্য দেওয়া উচিৎ। অন্যদের তো কেউ তাড়িয়ে দিতে বলছে না, তারাও থাকবে এদেশে।” আপনি যদি সংখ্যাগরিষ্ঠ সম্প্রদায়ের মানুষ হন তাহলে কথাটা আপনার দিব্য পছন্দ হবে। কিন্তু এভাবে যে একটা সুস্থ, স্বাভাবিক দেশ তৈরি হয় না তার জলজ্যান্ত প্রমাণ পাকিস্তান। সঙ্ঘ পরিবারের উপর্যুক্ত তত্ত্বটার মতই পাকিস্তানের সংখ্যালঘুদের অধিকার সম্পর্কে অনেক মিষ্টি মিষ্টি কথা মহম্মদ আলি জিন্নাও বলে গেছেন। তাতে আদপে কোন লাভ হয়নি ওদেশের হিন্দুদের। এদেশের “প্রকৃত ধর্মনিরপেক্ষ” লোকেরাই তো উঠতে বসতে শোনান ১৯৪৭ এর পর থেকে ভারতে কিভাবে সংখ্যালঘুরা বেড়েছে আর পাকিস্তানে কমেছে। মুজিবহত্যা পরবর্তী বাংলাদেশ নিয়েও একই কথা প্রযোজ্য। ভারতে যদি হিন্দুধর্মকে প্রাধান্য দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিতেন রাষ্ট্রপিতারা তাহলে ভারতও যে হিন্দু পাকিস্তান হত সেটা বুঝতে বৈদিক বুদ্ধির প্রয়োজন হয় কি? তাহলে বিকল্প কী ছিল? একটাই। সব ধর্মেরই পৃষ্ঠপোষকতা করা। বাম, দক্ষিণ সকলেরই বোঝা উচিৎ ইউরোপীয় ঢঙে রাষ্ট্র যদি সব ধর্ম থেকে সমদূরত্বের নীতি নিত তাহলে এখানে যা হত সেটা হল মাৎস্যন্যায়। যে সংখ্যালঘু তাকে নিজের ধর্মাচরণ করতে হত লুকিয়ে আর যে সংখ্যাগুরু সে আইনগতভাবে না হলেও, গায়ের জোরে নিজের ধর্ম চাপিয়ে দিত সংখ্যালঘুদের উপর। না মানলে মারধোর খেতে হত, মরতে হত। ঠিক যেভাবে সরকারী নিষ্ক্রিয়তার সুযোগে এখন পশ্চিমবঙ্গেও দিব্যি অস্ত্রশিক্ষা শিবির চালাচ্ছে আর এস এস।
কেউ কেউ বলবেন, আচ্ছা সে না হয় দেশের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের সময় হল। গান্ধী তো খুন হলেন ১৯৪৮ এ, প্যাটেল চলে গেলেন ১৯৫০ এ, আম্বেদকর ১৯৫৬ এ আর নেহরু ১৯৬৪ তে। কিন্তু পরবর্তী শাসকেরা কী করলেন? কী করলেন তারপরের প্রধানমন্ত্রীরা, মুখ্যমন্ত্রীরা? এবং অনিবার্যভাবেই দক্ষিণপন্থীরা সেই বোকা বোকা কথাটা আবার বলবেন “Secularism শব্দটা তো সংবিধানের প্রস্তাবনায় ছিল না। ইন্দিরা কেন ঢোকালেন?” প্রশ্নকর্তারা ভান করেন যেন ধর্মীয় স্বাধীনতার অধিকার তার আগে থেকেই ২৫-২৮ নম্বর অনুচ্ছেদে ছিল না, ইন্দিরা চক্রান্ত করে সেটাও ঢুকিয়েছিলেন। তাহলে secularism শব্দটায় আপত্তিটা কিসের? আপনারা তো নাকি “প্রকৃত ধর্মনিরপেক্ষ”। তাহলে তো ধর্মনিরপেক্ষ শব্দটা সংবিধানে ঢোকানোর জন্যে ইন্দিরার আপনাদের ধন্যবাদার্হ হওয়া কথা!
এই কথোপকথন মুখোমুখি বসে চালালে এরপরেই টিভি বিতর্কের মত প্রবল চিৎকার চেঁচামেচি লেগে যাবে, সীমান্তে কত সৈনিক মরছে সেসব নিয়ে আলোচনা শুরু হয়ে যাবে। সুতরাং এবার ইতিহাস, সংবিধানের মত যা কেউ পড়ার দরকার মনে করে না এমন বিষয় বাদ দিয়ে একেবারে গোদা ব্যাপারে চলে আসা যাক। ভারত যে আসলে ধর্মনিরপেক্ষ নয় তা প্রমাণ করতে যে বহুল প্রচলিত উদাহরণগুলো দেওয়া হয় তার তেমন একটা নিয়ে কথা বলা যাক। তাহলে সরকারগুলোর পক্ষে কতটা কী করা সম্ভব সেটাও পরিষ্কার হবে।
ভারত ধর্মনিরপেক্ষ হলে মুসলমানরা রাস্তায় বসে নমাজ পড়ে কেন? এসব বন্ধ হওয়া উচিৎ
ঠিক কথা। রাস্তা আটকে ধর্মাচরণ কোন কাজের কথা নয়। মুসলমানদের রাস্তায় নমাজ পড়া বন্ধ হওয়া উচিৎ, রাস্তা আটকে পুজো প্যান্ডেল বন্ধ হওয়া উচিৎ, তাজিয়া বন্ধ হওয়া উচিৎ, চারদিনের পুজোকে দশদিন অব্দি টেনে নিয়ে গিয়ে রাস্তাজুড়ে কানফাটানো ব্যান্ড পার্টি নিয়ে ভাসান বন্ধ হওয়া উচিৎ, রাষ্ট্রের পৃষ্ঠপোষকতায় কুম্ভমেলা থেকে শুরু করে দুর্গা ভাসানোর কার্নিভাল অব্দি সবকিছু বন্ধ হওয়া উচিৎ। স্কুলে সরস্বতীপুজো এবং নবীদিবস — দুটোই বন্ধ হওয়া উচিৎ। শুধু তাই নয়, রাস্তা জুড়ে, ট্রেনের কামরা জুড়ে গাঁজা খেতে খেতে জোয়ান লোকেদের তীর্থ করতে যাওয়া বন্ধ হওয়া উচিৎ।
আমাদের বাংলায় তারকেশ্বরের মাথায় শ্রাবণ মাসে জল ঢালতে যায় যারা তারা অন্য সব যাত্রীরই মাথা কিনে নেয়। আপনি বয়স্ক হোন, অসুস্থ হোন, সাথে কোলের শিশু থাকুক বা অন্তঃসত্ত্বা মহিলা থাকুক, ওঁরা আপনাকে দয়া করে বসার জায়গা না-ও দিতে পারেন। ওখানে নিজের হিন্দু পরিচয় দিয়ে কোন খাতির পাবেন না। উপরন্তু দুর্গন্ধ এবং অনবরত ঢাকঢোলের আওয়াজে লিলুয়া থেকে হাওড়া যেতে মনে হবে সশরীরে নরকযাত্রা করছেন। এবং আর যাই করুন, ভুলেও শ্রাবণ মাসের শনিবারে শের শাহের করা গ্র‍্যাণ্ড ট্রাঙ্ক রোড ধরে গাড়িতে চেপে কোথাও যেতে যাবেন না। বাবার ভক্তবৃন্দ গোটা রাস্তার দখল নিয়ে নেন। রাস্তার ঠিক মাঝখানে বসে বিশ্রামও নিতে পারেন ইচ্ছা হলে। আর শব্দদূষণ যা হয় সেটাও বন্ধ হওয়া উচিৎ, আজানের মাইকের মতই। কিছু দিল্লীবাসীর কাছে শুনছিলাম কাঁওয়ারিয়ারা যেসব এলাকা দিয়ে হরিদ্বার যায় সেখানকার লোকেদের অভিজ্ঞতাও নাকি কতকটা এরকমই। তা যেসব রাজ্যে “মেকি ধর্মনিরপেক্ষ” সরকার আছে তাদের কথা বাদই দিলাম। যেখানে “প্রকৃত ধর্মনিরপেক্ষ” সরকার সেখানে এগুলো বন্ধ করে দেখান দেখি।
পারবেন না। কারণ সবচেয়ে উদার হিন্দুটিও গর্জে উঠে বলবে “আমার ধর্মীয় স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করা হচ্ছে।” তা যে সংখ্যায় কম তাকে আইন দেখাব, ধর্মনিরপেক্ষতা দেখাব আর যে সংখ্যাগুরু তার ধর্মাচরণ যেমন ইচ্ছা চলবে সেটা আর যা-ই হোক, গণতন্ত্র নয়, ধর্মনিরপেক্ষতা তো নয়ই।
তাই ভারতের ধর্মনিরপেক্ষতা কখনোই ইউরোপের মডেল অনুসরণ করে চলতে পারে না। ভারতে সরকারকে ধর্মগুলোর মধ্যে সমতা বজায় রাখার কাজে সক্রিয় হতেই হবে। একদেশদর্শিতাই সাম্প্রদায়িক, সমদর্শিতাই ধর্মনিরপেক্ষতা এদেশে।
সেই কারণেই সরকারের প্রধানের নিজের ধর্মীয় পরিচয়ের প্রদর্শনী সাম্প্রদায়িক। কারণ ব্যক্তি হিসাবে তিনি যা-ই হোন, তিনি শুধু নিজের ধর্মের মানুষের প্রধান নন, সব ধর্মের মানুষের প্রধান। সেইজন্যেই মমতার ইফতারে গিয়ে মাথায় কাপড় দিয়ে নমাজ পড়া এবং মোদীর দশাশ্বমেধ ঘাটে সন্ধ্যারতি অন্যায়। মমতা জন্মসূত্রে হিন্দু হলেও ইচ্ছা হলে নিজের বাড়িতে দিনে পাঁচবার নমাজ পড়তেই পারেন, সেটা ব্যক্তি মমতার স্বাধীনতা। নরেন্দ্র মোদীও দুবেলা বাড়ির ঠাকুরকে পুজো করুন, কিচ্ছু এসে যায় না। কিন্তু প্রকাশ্যে একটা বিশেষ ধর্মাচরণ করে এই বার্তা দিতে পারেন না যে “আমি তোমাদেরই লোক”। সেটাই সাম্প্রদায়িকতা, ভর্তুকি দেওয়াটা নয়।

ফ্যাসিবাদের মানবজমিন

শাশ্বত ভারতীয় পরিবার এমন এক প্রতিষ্ঠান যেখানে একনায়কত্ব স্বীকৃত এবং প্রার্থিত। বাবা কি জেঠু কি দাদু — কেউ একজন যা সিদ্ধান্ত নেবেন সেটাই চূড়ান্ত। এই মডেলটা যৌথ পরিবারের বিলুপ্তির সঙ্গে সঙ্গে কিছুটা ক্ষয়প্রাপ্ত হলেও ডোডোপাখি হয়ে গেছে বলে যদি কেউ ভাবেন তাহলে তিনি নিজের চারপাশে ভাল করে তাকিয়ে দেখছেন না। শুধু পরিবার নয়, ক্রমশ ছোট হয়ে আসা অফিসগুলোর তস্য ছোট ডিপার্টমেন্টগুলোয় উঁকি মেরে দেখুন। যিনি মোটে তিনজনের বস তিনিও বাকি দুজনের শ্বাস প্রশ্বাসের উপর মালিকানা দাবী করেন

ভারতে ফ্যাসিবাদের জন্য জমি কেমন উর্বর এবং নরেন্দ্র মোদীর মত লোককে উপড়ে ফেলা কেন শক্ত সেটা বোঝা খুব সোজা। এর কারণটা হল এখানে ফ্যাসিবাদের অনেকগুলো মাথা। মোদী বা অমিত শাহ বা কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে খবর করার জন্য সম্পাদকের চাকরি যাওয়া, সাংবাদিকদের খুন বা ধর্ষণের হুমকি পাওয়া, সাধারণ মানুষ বা বিখ্যাত কেউ সরকারের কোনরকম সমালোচনা করলেই অনলাইন বা অফলাইনে গালাগাল, তাকে ভাতে মারার চেষ্টা — এসব গত কয়েকবছরে জলভাত হয়ে দাঁড়িয়েছে। পরিস্থিতি এমন যে এটা যে ঘটছে তাও আপনি বলতে পারবেন না। বললেই “পাকিস্তান চলে যাও” ইত্যাদি। আজও কানহাইয়া কুমারকে এক জায়গায় মেরেধরে নীরব করে দেওয়ার চেষ্টা হয়েছে।
কিন্তু সমস্যাটা যত ব্যাপক ভাবছেন তার চেয়েও অনেক বড় কারণ প্রাক-দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালীন জার্মানিতে একটাই দল এভাবে বিরোধীদের গলা টিপে ধরত কিন্তু ভারতে শুধু সঙ্ঘ পরিবার এমন করছে তা নয়, ফলে এসব যে অন্যায় এটুকুই অনেক মানুষকে বোঝানো শক্ত। এমনিতেই শাশ্বত ভারতীয় পরিবার এমন এক প্রতিষ্ঠান যেখানে একনায়কত্ব স্বীকৃত এবং প্রার্থিত। বাবা কি জেঠু কি দাদু — কেউ একজন যা সিদ্ধান্ত নেবেন সেটাই চূড়ান্ত। এই মডেলটা যৌথ পরিবারের বিলুপ্তির সঙ্গে সঙ্গে কিছুটা ক্ষয়প্রাপ্ত হলেও ডোডোপাখি হয়ে গেছে বলে যদি কেউ ভাবেন তাহলে তিনি নিজের চারপাশে ভাল করে তাকিয়ে দেখছেন না। শুধু পরিবার নয়, ক্রমশ ছোট হয়ে আসা অফিসগুলোর তস্য ছোট ডিপার্টমেন্টগুলোয় উঁকি মেরে দেখুন। যিনি মোটে তিনজনের বস তিনিও বাকি দুজনের শ্বাস প্রশ্বাসের উপর মালিকানা দাবী করেন। সুতরাং যার ক্ষমতা কম বা নেই তাকে কথা বলতে না দেওয়া আমাদের সংস্কৃতি আর সেই সংস্কৃতির সবচেয়ে নির্লজ্জ ব্যবহার করেন আমাদের রাজনৈতিক নেতা-নেত্রীরা। না, শুধু বিজেপি নয়।
কয়েকদিন আগেই তামিলনাডুর কার্টুনিস্ট জি বালাকে হাজতবাস করতে হল। তাঁর অপরাধ তিনি মুখ্যমন্ত্রী, পুলিশ কমিশনার আর ডিস্ট্রিক্ট কালেকটরকে নগ্ন দেখিয়েছেন তাঁর এক কার্টুনে। অতএব প্রশাসন ভীষণ সক্রিয় হয়ে ব্যবস্থা নিয়ে নিল ঝটপট।
মনে রাখবেন তামিলনাড়ু এমন রাজ্য যেখানে কিছুদিন আগে প্রবল প্রাকৃতিক দুর্যোগে প্রশাসনের টিকি পাওয়া যায়নি দীর্ঘদিন। জয়ললিতা মারা যাওয়ার পর থেকে কে কার পক্ষে, কে জয়ললিতার বড় ভক্ত তা নিয়ে ডামাডোলে বেশ কিছুদিন কোন মুখ্যমন্ত্রীই ছিল না। অথচ যেই কার্টুনিস্টকে গ্রেপ্তার করার কথা এল, প্রশাসন যন্ত্রের মত দ্রুত কাজ করল। দুর্নীতিগ্রস্ত ক্ষমতাশালীদের ল্যাংটো করে দেওয়াই যে কার্টুনিস্টের কাজ সেকথা আর শুনছে কে?
আরো ঘরের কাছে আসুন। ডেঙ্গু হয়েছে কি হয়নি তাই নিয়ে আমরা সাধারণ মানুষ আর সরকারের মধ্যে তর্কাতর্কি চলতে চলতে কতগুলো প্রাণ চলে গেল, প্রশাসন চলছিল গদাই লস্করী চালে এবং ডেঙ্গুর চেয়ে বড় শত্রু ঠাউরেছিল ডেঙ্গুর খবরকে। যেই না এক ডাক্তারবাবু ফেসবুকে পোস্ট করলেন ডেঙ্গু নিয়ে, অমনি দারুণ দ্রুততায় তিনি সাসপেন্ড হয়ে গেলেন। অম্বিকেশ, শিলাদিত্য ইত্যাদি পুরনো নামগুলো আর নাহয় না-ই বললাম।
আমি হাসপাতাল থেকে ফিরে ডেঙ্গু নিয়ে একটা পোস্ট দেওয়ার পরে এক শুভাকাঙ্ক্ষী অগ্রজ সাংবাদিক ফোন করে সতর্ক করেছিলেন “খুব সাবধান। তুমি যা লিখেছ তার চেয়েও নিরীহ কথা লিখে কিন্তু এরাজ্যে লোকে গ্রেপ্তার হয়েছে।” ডাক্তার দত্তচৌধুরীর হাল থেকে স্পষ্ট যে সতর্কবার্তাটি অত্যন্ত সঙ্গত।
তা এই দেশে আর আপনি লোককে বোঝাবেন কী করে যে বিজেপি সরকার যা করছে তা এমার্জেন্সিরই নামান্তর! পঁচাত্তর থেকে সাতাত্তর পর্যন্ত গণতন্ত্রকে গণধর্ষণ করার পরেও তো আজও অনেক শিক্ষিত লোক ইন্দিরাকে ভারতের সেরা প্রধানমন্ত্রী বলেন। স্বাভাবিকভাবেই মোদীবাবু তাঁকেও ছাড়িয়ে যাবেন। ওনার আমল নিয়ে হয়ত বইটই লেখা হবে। তবে মমতার সাথে যতই শত্রুতা করুন, একনায়কত্বের ইতিহাসে অন্তত কয়েকটা পাতা পাওয়ার থেকে আমাদের দিদিকে উনি বঞ্চিত করতে পারবেন না।