‘১৯৯১ থেকে জনকল্যাণমূলক রাষ্ট্রের পথ ত্যাগ করার ফল গ্লোবাল হাঙ্গার ইনডেক্সে ১০১তম স্থান’

কেবল বলা হয়, সবকিছু খুলে দাও। সারা পৃথিবীতে আজ যতগুলো সফল অর্থনীতি আছে, কোনোটাই সবকিছু খুলে দিয়ে সফল হয়নি।

এয়ার ইন্ডিয়া বিক্রি হয়ে যাওয়া দারুণ অখুশি হওয়ার মত কোনো ঘটনা নয়, বলছেন অর্থনীতিবিদ

পশ্চিমবঙ্গের মানুষ, অধুনা দিল্লির বাসিন্দা নিত্য নন্দ অর্থনীতির সঙ্গে দীর্ঘকাল যুক্ত রয়েছেন। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, শিল্পায়ন, উন্নয়ন এবং পরিবেশগত ইস্যুগুলোতেই তাঁর আগ্রহ বেশি। ভারত সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রক ও সরকারি সংস্থার পরামর্শদাতা হিসাবে বহু বছর ধরে তিনি অর্থনৈতিক নীতি প্রণয়নের কাজ করেছেন। তাছাড়া UNCTAD (United Nations Conference on Trade and Development), UNESCAP (United Nations Economic and Social Commission for Asia and the Pacific), UNDP (United Nations Development Programme)-র মত সংস্থা এবং ইউরোপিয়ান কমিশনের কনসালট্যান্টের ভূমিকাও পালন করেছেন। এই মুহূর্তে তিনি কাউন্সিল ফর সোশাল ডেভেলপমেন্টের ডিরেক্টর। অতি সম্প্রতি লন্ডন ও নিউইয়র্ক থেকে প্রকাশিত হয়েছে তাঁর বই India’s Industrial Policy and Performance: Growth, competition and competitiveness। নাগরিক ডট নেটের সাথে আলাপচারিতায় নিত্যবাবু ভারতের অর্থনীতির অভিমুখ, জনকল্যাণমূলক রাষ্ট্রের পশ্চাদপসরণ থেকে শুরু করে এয়ার ইন্ডিয়ার বেসরকারিকরণ ও বিশ্ব অর্থনীতি নিয়ে অনেক ধোঁয়াশা সরিয়ে দিলেন।

গত কয়েক বছরের অভিজ্ঞতা থেকে ভারতের মত দেশে জনকল্যাণমূলক রাষ্ট্রের ধারণাকে কতটা উপযোগী বলে মনে করেন? অরবিন্দ কেজরিওয়াল যে বিপুল ভর্তুকি দিয়ে প্রায় জলের দরে বিদ্যুৎ জোগান, বা মমতা ব্যানার্জি যেভাবে নানা প্রকল্পের মাধ্যমে বিভিন্ন জরুরি পরিষেবা বিনামূল্যে নাগরিকদের দিয়ে থাকেন — তাকে কীভাবে দেখেন?

দেখুন, সকলের জন্য ন্যূনতম খাদ্যের জোগান নিশ্চিত করা যে কোনো রাষ্ট্রের কর্তব্য। সেটাও আমরা করে উঠতে পারছি না। গ্লোবাল হাঙ্গার ইনডেক্সে ১১৬টা দেশের মধ্যে ১০১ নম্বরে পৌঁছে গেছি। নেপাল, পাকিস্তানের চেয়েও পিছনে। এই অবস্থায় রাষ্ট্রের জনকল্যাণমূলক কাজকর্মের উপযোগিতা আলাদা করে বুঝিয়ে বলার আর দরকার পড়ে না। তবে একটা কথা বলতেই হবে, এই দুর্দশা কিন্তু স্রেফ গত এক-দেড় বছরের নয়। আমরা এই সময়টায় কী দেখলাম? কয়েক লক্ষ মানুষ লকডাউন আরম্ভ হতেই পায়ে হেঁটে বাড়ি ফিরতে শুরু করলেন। তা এঁরা সব মহানগরগুলোতে কেন এসেছিলেন? কাজ করে একটা ভাল জীবন পাবেন আশা করে তো? কিন্তু ভেবে দেখুন, কতটা ভঙ্গুর তাঁদের অবস্থা, যে এক মাস কাজ না থাকলেই না খেয়ে থাকতে হবে, সেই আশঙ্কায় তাঁরা ফিরে যেতে শুরু করলেন। এই অবস্থা তো আর তক্ষুণি হয়নি। তার মানে আমরা যতই গলা ফাটাই যে ১৯৯১ সালের পরে আমাদের জিডিপি বেড়েছে, মাথাপিছু আয় বেড়েছে, আসলে কিন্তু বিরাট অংশের মানুষ চরম দুর্দশার মধ্যে রয়ে গেছে। গ্লোবাল হাঙ্গার ইনডেক্সে আমরা ৯৪ থেকে ১০১ হয়েছি। আগের সংখ্যাটাও কি গর্বের? আসলে গত তিরিশ বছর ধরেই আমরা ক্রমশ জনকল্যাণমূলক রাষ্ট্রের ধারণা থেকে সরে এসেছি। এগুলো তারই ফল।

আপনার দ্বিতীয় প্রশ্নটার কোনো সহজ উত্তর নেই। আমি নীতিগতভাবে এইসব পদক্ষেপের বিরোধী নই, কারণ গরীব নাগরিকদের সাহায্য করা দরকার। কিন্তু নির্দিষ্ট কিছু সমালোচনার জায়গা আছে। যেমন ধরুন কেজরিওয়াল যতখানি বিদ্যুৎ ভর্তুকি দিয়ে প্রায় বিনামূল্যে দিচ্ছেন, ততটা বোধহয় কোনো গরীব মানুষের দরকার হয় না। আমি মনে করি না কাউকে বাড়িতে এয়ার কন্ডিশনার চালানোর জন্য বিনামূল্যে বিদ্যুৎ দেওয়া উচিত। সেটা পরিবেশরক্ষার দৃষ্টিভঙ্গিতেও খারাপ, অর্থনীতির দিক থেকেও খারাপ। দিল্লিতে কেজরিওয়াল নিঃসন্দেহে স্বাস্থ্যব্যবস্থা, শিক্ষাব্যবস্থাকে অনেকটা গুরুত্ব দিয়েছেন। কিন্তু কোভিড অতিমারীতে আমরা দেখলাম এখানকার স্বাস্থ্যব্যবস্থা কিন্তু তাতেও প্রয়োজন মেটানোর পক্ষে একেবারেই যথেষ্ট নয়। আমার মনে হয় বিদ্যুতে যে পরিমাণ ভর্তুকি দিল্লি সরকার দিচ্ছে, তাতে কাটছাঁট করে স্বাস্থ্যব্যবস্থায় সেই টাকা কাজে লাগালে তা অনেক বেশি জনকল্যাণমুখী হবে।

একটা কথা বলা দরকার। যে দেশটাকে আমরা গণতন্ত্রের স্বর্গ বা মক্কা বলে থাকি, সেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে কিন্তু আর কিছু থাকুক না থাকুক, গরীব বলেই আপনার ছেলেমেয়ে শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হবে — এমনটা হয় না। ওখানকার সরকারি স্কুলগুলো যথেষ্ট ভাল। নিঃসন্দেহে কিছু বেসরকারি স্কুল আছে যেখানে লেখাপড়ার বাইরেও অনেককিছু শেখানো হয়। ঘোড়ায় চড়া, এটিকেট ইত্যাদি। সেখানে অনেক টাকাপয়সা থাকলে তবেই পড়াশোনা করা যায়। কিন্তু ওগুলো না শিখলেও তেমন ক্ষতি নেই। কিন্তু একজন গরীব ছাত্র বা ছাত্রী যে শিক্ষাটা না পেলেই নয়, তা থেকে কিন্তু বঞ্চিত হবে না। এ কথা কিন্তু আমাদের দেশ সম্বন্ধে নিঃসংশয়ে বলা যায় না। আমি নিজে পশ্চিমবঙ্গে পড়াশোনা করেছি বলে জানি, অনেককিছু ইতিমধ্যে বদলে গিয়ে থাকলেও আজও পশ্চিমবঙ্গের সরকারি স্কুলগুলো নেহাত ফ্যালনা নয়। কিন্তু উত্তর ভারতের বিভিন্ন রাজ্যের সরকারি স্কুলগুলোর অবস্থা মোটেই ভাল নয়। একেবারেই পড়াশোনা হয় না। মানে শেষমেশ ব্যাপারটা এই, যে গরীবের ছেলেমেয়ে শিক্ষার সুযোগ থেকে পুরোপুরি বঞ্চিত। ন্যূনতম খাদ্য নিশ্চিত করার মত সবচেয়ে গরীবের ছেলেমেয়েরও ন্যূনতম শিক্ষা নিশ্চিত করাও কিন্তু যে কোনো রাষ্ট্রের কর্তব্য।

আচ্ছা, বিশ্বায়নের যুগে ভারতের মত উদার অর্থনীতি নিয়ে চলেছে যেসব বড় বড় রাষ্ট্র, তারা এখন কোন পথে হাঁটছে? বিশ্ব জুড়ে পুঁজিবাদের যে সঙ্কটের কথা আমরা ইদানীং বামপন্থীদের মুখে শুনি, সেটা কতটা ঠিক বা ভুল?

আমাদের দেশে চীন কীভাবে চলেছে, দক্ষিণ কোরিয়া কীভাবে চলেছে, ব্রাজিল বা জার্মানি কীভাবে চলেছে সে সম্পর্কে যা বলা হয় আর আসলে দেশগুলোর অর্থনীতি যেভাবে চলেছে, তার মধ্যে কিন্তু অনেক তফাত আছে। বাম, দক্ষিণ — দু পক্ষই কোথাও না কোথাও পুরো সত্যিটা বলে না। এটাই বাস্তব।

আজ যদি আপনি বলেন চীন উদার অর্থনীতি অবলম্বন করে বিরাট এগিয়ে গেছে সেটা যেমন সম্পূর্ণ মিথ্যে, তেমনি যদি বলেন ওরা সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতি নিয়ে এগিয়েছে, তা-ও মিথ্যে। চীন আসলে দুরকম অর্থনীতির একরকম মেলবন্ধনের চেষ্টা করেছে। চীনের অর্থনীতিতে রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ কিন্তু বেশ জোরালো। পরিকাঠামো ক্ষেত্রে যেমন প্রবল নিয়ন্ত্রণ আছে। ব্যাঙ্কিং ক্ষেত্রেও চূড়ান্ত নিয়ন্ত্রণ আছে। বিশ্বব্যাপী এখন যে চীনা কোম্পানিগুলো বিনিয়োগ করছে, সেগুলো বেশিরভাগই কিন্তু সরকারি কোম্পানি। এভাবেই চীনের অর্থনীতি এমন জায়গায় পৌঁছেছে, যে ফরচুন ৫০০ তালিকায় আমাদের দেশের যতগুলো কোম্পানি থাকে, তার চেয়ে ওদের কোম্পানির সংখ্যা অনেক বেশি।

আবার ছোট দেশ সিঙ্গাপুরের দিকে যদি তাকান। ওদের পাশ্চাত্যের অর্থনীতিবিদরা উদারনৈতিক দেশ বলে থাকেন। আসলে ওদের দেশে আমদানি শুল্ক বেশ কম। এইদিক থেকে ওরা উদার। কিন্তু অন্য যে কোনো ক্ষেত্রে প্রবল সরকারি নিয়ন্ত্রণ আছে। এমনকি কোনো আবাসনে কোন জনগোষ্ঠীর কতজন লোক থাকবে সেটাও সরকার নিয়ন্ত্রণ করে।

দক্ষিণ কোরিয়ায় গেলেও দেখতে পাবেন সরকার কিছু ক্ষেত্রে উদার হলেও অনেক ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখেছে। আসলে সব দেশই নিজের মত করে কোথাও না কোথাও সরকারি নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, জার্মানির মত দেশও এর ব্যতিক্রম নয়। এই সত্যিটা আমাদের দেশের লোকের সামনে বলা হয় না সাধারণত। কেবল বলা হয়, সবকিছু খুলে দাও। সারা পৃথিবীতে আজ যতগুলো সফল অর্থনীতি আছে, কোনোটাই সবকিছু খুলে দিয়ে সফল হয়নি।

আপনার কথা থেকেই এসে পড়ে বেসরকারিকরণের প্রসঙ্গ। সদ্য এয়ার ইন্ডিয়া কিনে নিল টাটা। অনেকে বলছেন জওহরলাল নেহরু পুঁজিপতিদের বিরোধী ছিলেন। তাই এয়ার ইন্ডিয়া টাটাদের হাত থেকে ছিনিয়ে নিয়েছিলেন, নরেন্দ্র মোদি ফিরিয়ে দিলেন। ভারতীয় অর্থনীতির একটা বড় ভুল এতদিনে সংশোধন করা হল। এই ব্যাখ্যা কতটা ঠিক? কারণ টাটাদের প্রকাশ করা হিসাব অনুযায়ী যখন ভারত সরকার এয়ার ইন্ডিয়া অধিগ্রহণ করেন, তখন তো কোম্পানি ঘাটতিতেই চলছিল, তাই না?

আসলে ১৯৫০-এর দশকে কী হয়েছিল, কেন হয়েছিল — সেগুলো না জেনেই যদি আজ কেন হচ্ছে তা নিয়ে মন্তব্য করি, তাহলে খুব বড় ভুল হয়ে যাবে। সেইসময় আমাদের দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, কোম্পানিগুলোর আর্থিক সঙ্গতির কথা মাথায় রাখা দরকার। এটা ঠিক যে টাটারাই এয়ার ইন্ডিয়ার ব্যবসাটা শুরু করেছিলেন। কিন্তু এয়ার ইন্ডিয়া যেভাবে বাড়ছিল, তাঁরা কি সেই অনুযায়ী বাড়াতে পারতেন বা বাড়াতেন? সেটা আমরা কেউ জানি না। ১৯৬০-এর দশকে কিন্তু এয়ার ইন্ডিয়া এশিয়ার অন্যতম বড় এয়ারলাইন্স কোম্পানি হিসাবে প্রতিষ্ঠিত হয়ে গিয়েছিল। বলা ভাল, এয়ার ইন্ডিয়াকে আমরা, অর্থাৎ আমাদের সরকার, ঠিকমত চালাতে পারল না। বা চালাতে চাইল না। কারণ প্রথমত, মোটামুটি ১৯৮০-র দশক থেকে, আরও বেশি করে ১৯৯১ সাল থেকে, আমরা চাই না কোনোকিছুর মালিকানা সরকারের হাতে থাকুক। এটা এমন একটা আদর্শগত ব্যাপার, যার ভালমন্দ আমরা ভেবে দেখি না। সেই অবস্থান থেকেই এত বছর ধরে এয়ার ইন্ডিয়াকে কী করে পুনরুজ্জীবিত করা যায়, ঠিক করে চালানো যায় — সে চিন্তাকে যথেষ্ট গুরুত্ব দিইনি।

দ্বিতীয়ত, মাথায় যদি সাপে কামড়ায় আপনি কোথায় বাঁধন দেবেন? আজ মূল প্রশ্ন হল রাষ্ট্র কি জনকল্যাণের জন্য, নাকি পুঁজিপতিদের ব্যক্তিগত স্বার্থে সমস্ত রাষ্ট্রীয় সংস্থান তাদের হাতে তুলে দেওয়ার জন্য? আমি কিন্তু বলছি না, যে নেহরুর সময়ে সবকিছু একেবারে উল্টো ছিল, তিনি পুঁজিপতিদের মোটেই রেয়াত করেননি। তখন সরকারিভাবে যেসব সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল তার সবই যে পুঁজিপতিদের বিরুদ্ধে তা কিন্তু নয়। অনেক ক্ষেত্রেই পুঁজিপতিদের সাহায্য করার জন্যই কাজগুলো করা হয়েছিল। কারণ তখন পুঁজিপতিদের হাতে তেমন টাকা ছিল না। আমাদের পরিকাঠামোগত শিল্প এবং ভারী শিল্প তৈরি করতে বড় বড় বিনিয়োগের প্রয়োজন ছিল। তেমন বিনিয়োগ করতে পারার মত কটা কোম্পানি ছিল তখন এ দেশে, আর আজ কটা কোম্পানি আছে? দুটো বাস্তবতা একেবারে আলাদা। নেহরু একেবারে সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে চাইছিলেন আর এখন শতকরা একশো ভাগ ধনতান্ত্রিক ব্যবস্থা চলছে — এমন কথা আমি বলব না। কিন্তু সরকার কিছুই করবে না — আজকের এই যে মতাদর্শ। একে প্রশ্ন করা দরকার।

প্রায় দশ বছর বা তারও বেশি সময় ধরে এয়ার ইন্ডিয়া যেভাবে লসে রান করছিল, তাতে অদূর ভবিষ্যতে তার কোনো পুনরুজ্জীবনের আশা দেখছিলাম না। সেদিক থেকে এয়ার ইন্ডিয়া সরকারের হাত থেকে চলে যাওয়ায় যে আমরা খুব বেশি কিছু হারালাম তা মনে করার কারণ নেই। কিন্তু এটাও ঠিক যে টাটার কাছে এয়ার ইন্ডিয়া বিক্রি করে দেওয়ার সময়ে কোম্পানির বিপুল পরিমাণ দেনার বোঝা কিন্তু সরকারই ঘাড়ে নিয়ে নিয়েছে। সরকারের ঘাড় মানেই তো সাধারণ মানুষের ঘাড়। সুতরাং এয়ার ইন্ডিয়া বিক্রি করে মানুষের লাভ হল, তাও বলা যাবে না।

আবার ভেবে দেখুন, এয়ার ইন্ডিয়া চালিয়ে কি একেবারে সাধারণ, গরীব ভারতবাসীর কোনো লাভ হয়? তা কিন্তু নয়। এয়ার ইন্ডিয়ায় যারা কাজ করে তারা সবাই যথেষ্ট ভাল বেতন পায়, বিমানচালক বা বিমানসেবিকার কাজ খুবই গ্ল্যামারাস পেশা হিসাবে সমাজে স্বীকৃত। আমাদের মত দেশে ওই পেশায় অত বেতন না দিলেও কিন্তু চলে। তাছাড়া আমরা যারা এয়ার ইন্ডিয়ার পরিষেবা ব্যবহার করি, তারাও কিন্তু কেউ গরীব লোক নই। সুতরাং গরীব মানুষের এতে কোনো ক্ষতিবৃদ্ধি নেই। তবে সব মিলিয়ে একটা সরকারি এয়ারলাইন্স বেসরকারি হয়ে গেল বলে খুব অখুশি হওয়ার কিছু আছে বলে আমি মনে করছি না।

সিঙ্গাপুর এয়ারলাইন্স, যার মেজরিটি শেয়ার হোল্ডার হল সিঙ্গাপুর সরকারের অধীন টেমাসেক হোল্ডিংস, তারা যথেষ্ট লাভজনক একটি সংস্থা। এমিরেটস, কাতার, এয়ার চায়না, স্ক্যান্ডিনেভিয়ান এয়ারলাইন্সের মত আরও বেশকিছুসরকারি বিমান সংস্থা আছে, যাদের কোভিড-১৯ অতিমারির আগে অব্দি ধারাবাহিক বৃদ্ধি হচ্ছিল এবং লাভে চলছিল। এয়ার ইন্ডিয়া তেমনটা পারল না কেন?

ঠিক কথাই যে পৃথিবীর সবচেয়ে ভাল এয়ারলাইন্স বলে যেগুলো গণ্য হয়, তার অনেকগুলোই পুরোপুরি সরকারি মালিকানায় চলে। আপনি যে নামগুলো করলেন তার মধ্যে আমি আরব দেশের এয়ারলাইন্সগুলোকে একটু আলাদাভাবে দেখি, কারণ ওরা যেহেতু তৈল উৎপাদক দেশ সেহেতু একটা বাড়তি সুবিধা পেয়ে থাকে। ওরা একেবারে বেস থেকে কম দামে তেল কিনে এয়ারলাইন্সগুলোকে একটু অন্যভাবে চালায়। ফলে ওদের সাথে অন্য এয়ারলাইন্সগুলোর তুলনা করা মুশকিল। কিন্তু সিঙ্গাপুরের ক্ষেত্রে তো আর সে যুক্তি খাটে না। থাই এয়ারওয়েজও আলাদা কোনো সুবিধা পায় না। নিউজিল্যান্ড ছোট দেশ ঠিকই, তবু তার সরকারি মালিকানার এয়ারলাইন্স দিব্যি চলছে। এরকম অনেক উদাহরণ তো আছেই। আর্জেন্টিনার কথাও আলাদা করে বলা দরকার। ওদের সরকারি এয়ারলাইন্সের একসময় বেসরকারিকরণ করা হয়েছিল। কিন্তু বেসরকারিকরণ সত্যি হল কিনা সেটা পরিষ্কার হল না। কারণ কোম্পানিটা কিনল কে? না ইউরোপের এক কোম্পানি। তারপর তারা চালাতে পারল না। যখন দেখা গেল এয়ারলাইন্সটা উঠে যাওয়ার জোগাড়, তখন জাতীয় সম্মানের প্রশ্ন এসে গেল। তাছাড়া কোম্পানি উঠে গেলে বহু কর্মচারী, যারা আর্জেন্টাইন নাগরিক, তাদের চাকরি চলে যাবে। সরকার মনে করল এটা হতে দেওয়া যায় না। তাই অনেক বেশি দামে তারাই আবার এয়ারলাইন্সটা কিনে নিল। আমাদের এখানেও যে সেরকম ঘটবে না সে গ্যারান্টি কেউ দিতে পারবে না।

সরকারের ব্যবসা করা কাজ নয়, ওটা ব্যবসায়ীদের উপরেই ছেড়ে দেওয়া উচিত। এই যে কথাটা আমরা মনমোহন সিং অর্থমন্ত্রী থাকার সময় থেকে শুনে আসছি, সেটা কতটা ঠিক বলে মনে করেন? সরকার ব্যবসা না করলে অর্থনীতিতে তার প্রভাব কি সর্বদা ভাল? ভারতীয় কর্পোরেটরা তো অনেকেই রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্ক থেকে ঋণ নিয়ে অপচয় করেছে, যার ফলে বিপুল পরিমাণ নন-পারফর্মিং অ্যাসেটের দায় এখন ব্যাঙ্কগুলোর ঘাড়ে চেপেছে।

মনমোহন সিং কথাটা প্রথম যখন বলেছিলেন, তখন বলেছিলেন সরকারের ব্যবসা না করে শিক্ষা, স্বাস্থ্যের মত সামাজিক ক্ষেত্রগুলোকে শক্তিশালী করার দিকে মন দেবে। কিন্তু আমরা দেখতেই পাচ্ছি, হয়েছে কিন্তু তার উল্টো। শুধু যে বিভিন্ন রাষ্ট্রায়ত্ত ক্ষেত্রের বেসরকারিকরণ হল তা নয়; শিক্ষা, স্বাস্থ্যকেও তুলে দেওয়া হল বেসরকারি হাতে। তার ফলাফল আমরা স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি। সুতরাং সরকার ব্যবসা করবে কি করবে না, তার চেয়েও বড় প্রশ্ন হল ব্যবসা কেন করা হয় আর ব্যবসার সুফল কারা পায়? বেসরকারি হাতে ব্যবসা ছেড়ে দিতে চান ভাল কথা। কিন্তু তার ফল সাধারণ মানুষের জন্য ভাল হবে কিনা সেটা হল আসল কথা। প্রচুর বেসরকারি হাসপাতাল আর শিক্ষা প্রতিষ্ঠান তো বানানো হয়েছে গত তিরিশ বছরে। তার সুফল কি আমরা পেয়েছি? মনে হয় না, খুব বেশি লোক বলবে পেয়েছি। ঘটছে কী? গরীব পরিবারের ছেলেমেয়েরা শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। শুধু তা-ই নয়, বিদ্যুৎ বা রেলের মত পরিকাঠামোগত শিল্পকে শুধু ব্যবসা হিসাবে দেখা কিন্তু অত্যন্ত অন্যায়। ধরুন রেলওয়ের সাথে যে কীভাবে কত লোক জড়িয়ে আছে তা বলে শেষ করা যাবে না। শুধু যাত্রী আর রেল কোম্পানি নয়, রেলওয়ের নানারকম জিনিসের সাপ্লায়ার, ট্রেন আর প্ল্যাটফর্মের হকার — সকলেই রেলের সাথে যুক্ত। অতএব রেলওয়ে ব্যবসা হিসাবে কতটা লাভ করছে বা করছে না — এই হিসাব দিয়ে যদি রেলওয়ের মূল্যায়ন করা হয়, তা খুবই দুর্ভাগ্যজনক। তার ফল হবে মারাত্মক।

একটা ছোট উদাহরণ দিই। ধরুন একজন ব্যবসায়ী দুর্গাপুর থেকে কলকাতায় যাতায়াত করে একটা ছোট ব্যবসা করত। সে শস্তায় কিছু জিনিস বিক্রি করে করেকম্মে খাচ্ছিল। এখন রেলকে লাভজনক করতে গিয়ে আপনি যদি খুব বেশি ব্যয়সাধ্য করে তোলেন, তাহলে এই ধরনের ছোট ব্যবসায়ীর উৎপাদন খরচ কিন্তু বেড়ে যাবে। এরা আবার অনেকে বড় ব্যবসায়ীর সাপ্লাই লাইন হিসাবে কাজ করে। ফলে সেই ব্যবসার উৎপাদন খরচও বাড়বে। এইভাবে সবরকম ব্যবসায়ীর উপরেই চাপ বাড়বে। এক দিকে এসব করবেন আর অন্য দিকে আপনি অভিযোগ করবেন, চীনা জিনিসের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় পেরে উঠছেন না, তারা আপনার বাজার দখল করে নিচ্ছে। আপনি তেলের দাম লিটার পিছু ১০০ টাকার বেশি করবেন, বিদ্যুতের খরচ চীনের দ্বিগুণ করবেন, পরিবহণ খরচ চীনের দ্বিগুণ করবেন। তারপর বলবেন, আমার ব্যবসায়ীরা কোনো কাজের নয়। এ তো কোনো কাজের কথা নয়।

অর্থাৎ সরকার এমন অনেক ব্যবসার সাথে যুক্ত, যেগুলো এক দিকে যেমন মানুষকে, বিশেষ করে গরীব মানুষকে নানারকম পরিষেবা দেয়, তেমনি অন্য দিকে আমাদের উৎপাদন ব্যবস্থাটাকে সচল রাখে। কম খরচে নানারকম উৎপাদনে এই ক্ষেত্রগুলোর উল্লেখযোগ্য অবদান আছে। একথা অগ্রাহ্য করে আপনি যদি লাভ কত হল, তা বিচার করেন তা হলে সে বিচার সম্পূর্ণ ভুল।

এই যে বহু বছর ধরে করদাতাদের টাকায় গড়ে ওঠা কোম্পানিগুলো সরকার এমন শর্তে বেসরকারি হাতে তুলে দিচ্ছেন, যা তাদের পক্ষে বেশ সুবিধাজনক। এই সরকারিগুলো সংস্থাগুলোর অবস্থার কিছুটা উন্নতি করে নিয়ে তারপর বিক্রির চেষ্টা করলে কি ভাল হত?

দেখুন, আজ সরকার যদি কোনো সরকারি সংস্থাকে বেসরকারি করার নীতিগত সিদ্ধান্ত নেয়, তাহলে কাজটা করে ফেলার অনেকরকম উপায় আছে। আপনি করদাতাদের স্বার্থের কথা বললেন। সত্যিই তো। আপনি দুর্গাপুরে যান, রাঁচিতে যান, ভোপালে যান বা অন্য কোথাও গিয়ে দেখুন, বিভিন্ন সরকারি প্রকল্পগুলো করার সময়ে কৃষক এবং অন্যান্য সাধারণ মানুষের থেকে জমি নেওয়া হয়েছিল। প্রকল্পের জন্য যত জমি দরকার তার চেয়ে অনেক বেশি জমি নেওয়া হয়েছিল। গরীব মানুষ নামমাত্র দামে বা বিনামূল্যে সরকারকে জমি দিয়েছিল। আমাদের গ্রামের দিকে অনেক জায়গায় সরকারি হাসপাতাল করার জন্য মানুষ স্বেচ্ছায় প্রায় বিনা পয়সায় জমি দিয়ে দিয়েছে। কেন? না তাদের প্রত্যাশা ছিল যে এই জমিতে হাসপাতাল হলে সেটা দেশের কাজে লাগবে, দেশের মানুষ শস্তায় বা বিনামূল্যে চিকিৎসা পাবে। এটাও তো এক ধরনের বিনিয়োগ। আজ যদি সেই কারখানা, সেই হাসপাতাল বেসরকারিকরণ করে দেওয়া হয় তাহলে সেই মানুষগুলোর বিনিয়োগের মূল্য কীভাবে দেওয়া হবে? এগুলো নৈতিক প্রশ্ন।

দ্বিতীয়ত, আমি যদি বিক্রিই করি, তাহলে একই ধারায় কেন ভাবব? মানে যেমন ধরুন, এয়ার ইন্ডিয়া একটা দেনায় ডুবে থাকা কোম্পানি। কেউ কিনতেই চাইছিল না। তা বলে টাটা যে খুব ক্ষতিস্বীকার করে কিনেছে তা কিন্তু নয়। এই কেনাবেচায় ওদের একটাই বড় দায়ভার নিতে হল, সেটা হল এয়ার ইন্ডিয়ার বিপুল কর্মীবাহিনী। এয়ার ইন্ডিয়াতে একসময় যত কর্মী নিয়োগ করা হয়েছে, হয়ত তত কর্মীর প্রয়োজন ছিল না। তাছাড়া এয়ার ইন্ডিয়া তার কর্মচারীদের যেসব সুযোগ সুবিধা দিয়ে এসেছে — বিনামূল্যে ভ্রমণ ইত্যাদি — সেগুলো কোথাও দেওয়া হয় না। আমার মতে সরকারের এই সুবিধাগুলো দেওয়া উচিত নয়। পর্যাপ্ত বেতন দেওয়া সত্ত্বেও এইসব সুযোগ সুবিধা দেওয়ার কোনো মানে হয় না। এটা এয়ার ইন্ডিয়ার ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়ার একমাত্র কারণ না হলেও অন্যতম কারণ। সরকার কেন এইসব ক্ষেত্রে কাটছাঁট করে কোম্পানিটার পুনরুজ্জীবনের চেষ্টা করেনি সেটাও ভাবা দরকার।

https://nagorik.net/ এ প্রকাশিত

ফুটন্ত সকালের পুরনো স্বপ্ন

আমার জন্ম হয়েছিল সরকারী হাসপাতালে, আমার বউকে আমি সেই পূতিগন্ধময় হাসপাতালের ধারে কাছে নিয়ে যাইনি

নতুন নয়, আজ পুরনো কথার দিন।

ইতিমধ্যেই দিকে দিকে বার্তা রটে গেছে যে মানুষ বিভিন্ন দেশে রাস্তায় নেমে পড়েছেন। লেবানন আর চিলির ছবি উল্কার বেগে ছড়াচ্ছে সারা পৃথিবীর মানুষের কাছে। চিলির আতঙ্কিত রাষ্ট্রপ্রধান সেবাস্তিয়ান পিনেরা পুরো ক্যাবিনেটকেই বরখাস্ত করেছেন। কিছুদিন আগে বিশাল আন্দোলন হয়েছে হংকঙে। সে আন্দোলন সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে মহাশক্তিধর চীনও। অনেকেই ভয় পাচ্ছিলেন (আমিও পাচ্ছিলাম) চীন না আবার একটা তিয়েন আন মেন স্কোয়ার ঘটিয়ে দেয়। এখন পর্যন্ত তেমনটা ঘটেনি। অর্থাৎ লক্ষ লক্ষ মানুষ রাস্তায় নেমে পড়লে এই একবিংশ শতাব্দীর পরমাণু শক্তিধর, নেট নজরদার রাষ্ট্রও কিন্তু আতান্তরে পড়ে। “শাসনে যতই ঘেরো, আছে বল দুর্বলেরও”।

কথাগুলো পুরনো, নাকি চিরনতুন? এদিকে আজ নয়া উদারবাদী (neo-liberal) অর্থনীতিতে ব্যতিব্যস্ত, দুর্দশাগ্রস্ত আর্জেন্টিনার মানুষ রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে বাম-মধ্যপন্থী প্রার্থী আলবার্তো ফার্নান্ডেজকে জিতিয়ে দিলেন। তাঁর পাশে উপরাষ্ট্রপতি হতে লড়ছিলেন ভূতপূর্ব বামপন্থী রাষ্ট্রপতি ক্রিস্টিনা কির্শনার। এইমাত্র দেখলাম বিবিসির দক্ষিণ আমেরিকার প্রতিবেদক কেটি ওয়াটসন তাঁর বিশ্লেষণে লিখেছেন আলবার্তোর জয়ে ক্রিস্টিনার রাজনীতির অবদান এতটাই যে অনেক ভোটার ভোট দিতে যাওয়ার সময়ে বলেছিলেন তাঁরা ক্রিস্টিনাকে ভোট দেবেন। যেন তিনিই রাষ্ট্রপতি পদপ্রার্থী, আলবার্তো নন।

পৃথিবীর মানচিত্রে সবচেয়ে ওজনদার দেশ, আর্জেন্টিনা থেকে আরো উত্তরে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। সেখানে ডেমোক্র্যাট নেতা বার্নি স্যান্ডার্স ক্রমশ সুর চড়াচ্ছেন অর্থনৈতিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে। তিনি অতি ধনীদের উপর আলাদা কর চালু করার কথা বলছেন। শিক্ষা এবং স্বাস্থ্য সকলের অধিকার হওয়া উচিৎ বলছেন। কখনো বা টুইট করছেন পৃথিবীতে বিলিয়নেয়ার থাকাই উচিৎ নয়। আমাদের কানে এসব শুনতে লাগে নন্দ ঘোষ নেহরুর মত, বা যারা নাকি দেশটার (বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গের) সর্বনাশ করেছে, সেই কমিউনিস্টদের মত। মার্কিন দেশে কিন্তু এসব কথা ব্লাসফেমির সামিল ছিল এই সেদিন অব্দিও। অথচ এই মুহূর্তে বার্নির জনপ্রিয়তার গ্রাফ ঊর্ধ্বমুখী। তাঁর সমর্থকদের মধ্যে অনেকেই আবার শ্রমজীবী মানুষ। বার্নি প্রকাশ্যে ধর্মঘটের অধিকারের পক্ষে বলছেন, ধর্মঘটী শ্রমিকদের সমর্থন করছেন। কী কাণ্ড বলুন তো!

লক্ষ্য করুন মধ্যপ্রাচ্যের লেবাননই হোক আর লাতিন আমেরিকার চিলি বা আর্জেন্টিনা কিংবা উত্তর আমেরিকার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র অথবা আমাদের প্রতিবেশী চীন। মানুষ রাস্তায় নামছেন কিন্তু আরো বেশি অধিকারের দাবীতে। হংকঙের আন্দোলন সেখানকার স্বায়ত্তশাসনকে খর্ব করার প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে, অর্থাৎ সেখানে রাজনৈতিক অধিকারের প্রশ্নটাই প্রধান। অন্য সবকটা দেশের ক্ষেত্রেই ক্ষোভ আসলে সাধারণ চাকুরিজীবী এবং শ্রমজীবী গরীব এবং মধ্যবিত্ত মানুষের রোজগার কেড়ে নেয় যে অর্থনীতি, কর্পোরেটদেরই দন্ডমুন্ডের কর্তা করে তোলে যে অর্থনীতি, যার ভুরি ভুরি আছে তাকে আরো পাইয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করে আর শিক্ষা স্বাস্থ্যকে বেসরকারীকরণ করে সাধারণের ধরা ছোঁয়ার বাইরে নিয়ে যায় যে অর্থনীতি — তার বিরুদ্ধে।

ভারতের অবস্থা কি অন্যরকম? সেই নব্বইয়ের দশকের গোড়ায় যখন সারা বিশ্ব শিখল সমাজতন্ত্র মৃত, রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত অর্থনীতি উন্নয়নের পরিপন্থী, ট্রেড ইউনিয়ন শিল্পের ক্ষতি করে, বেসরকারীকরণই মুক্তির পথ — তখন থেকেই তো এ দেশের সরকারগুলো আই এম এফ, বিশ্বব্যাঙ্ক ইত্যাদির বাধ্য ছাত্র হয়ে ঢালাও বেসরকারীকরণ করেছে। জওহরলাল নেহরুর নিজের পার্টিই কাণ্ডটি করায় এখনকার মত তাঁকে অকথ্য গালাগাল তখন করা হয়নি সত্য, কিন্তু নেহরুর “সমাজবাদী অর্থনীতির অচলায়তন” থেকে নরসিমা, মনমোহন ভারতকে মুক্ত করেছেন একথা তো তখন থেকেই কাগজে, টিভিতে বলাবলি শুরু হয়েছে। শ্রম আইনকে ক্রমশ দুর্বল করে বেসরকারী ক্ষেত্রের কর্মীদের চাকরির নিরাপত্তা কেড়ে নেওয়া শুরু হয়েছে তখন থেকেই, বর্তমান সরকারের আমলে মজা টের পাওয়ানো হচ্ছে সরকারী কর্মচারীদেরও। গ্রামীণ অর্থনীতি তখন থেকেই দুয়োরানী, তাই কৃষকদের মৃত্যু মিছিলও তো শুরু হয়েছে মনমোহিনী অর্থনীতির আমলেই। বিভিন্ন প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য আক্রমণের মাধ্যমে ট্রেড ইউনিয়ন ব্যাপারটাকে অপ্রাসঙ্গিক করে দেওয়া হয়েছে, তুলে দেওয়া হয়েছে বহু শিল্পক্ষেত্রে। আমি আপনি, মানে ভদ্রলোকেরা, খুশি হয়েছি। কারণ আমাদের বলা হয়েছিল এতে শেষ পর্যন্ত দেশের উন্নতি হবে। মনমোহন সিং নোটবন্দীর বিতর্কে জন মেনার্ড কেনসকে উদ্ধৃত করে বললেন বটে “In the long run we are all dead,” কিন্তু এই লং রানের কথা সেসময় তাঁরাও শুনিয়েছিলেন। সে যা-ই হোক, আসল কথা হল দেশের উন্নতি হয়েছে কিনা।

প্রশ্নটার উত্তর পেতে গেলে জানা দরকার দেশ মানে কে? বঙ্কিম লিখেছিলেন হাসিম শেখ আর রামা কৈবর্তর কথা। জানি না তাদের লাভ হয়েছে কিনা, তবে আমার আপনার তো লাভ হয়েছে বটেই। আমার বাবার সাদা-কালো টিভির বেশি কেনার সামর্থ্য হয়নি, আমি রঙিন টিভি দিয়ে শুরু করে এখন স্মার্ট টিভিতে পৌঁছে গেছি। বাবার জীবন কেটেছে ট্রেনে বাসে ঘামে ভিজে, আমি যখন তখন ওলা উবের। সত্যি বলতে কি গাড়ি কেনার জন্যে ধার দিতে চেয়ে ব্যাঙ্কের লোকেরা আমার পায়ে ধরতে বাকি রাখে। উন্নতি হয়নি?

আমার জন্যে চকলেট কিনতে ঢুকে দাম শুনে মুখ চুন করে দোকান থেকে বেরিয়ে আসতে দেখেছি বাবাকে, আর আমার মেয়ে এখন ডিপার্টমেন্টাল স্টোরে ঢুকে বাছাই করে কোন কোন চকলেট সে কিনবে না। উন্নতি নয়, বলুন? বাবার জীবন কেটে গেছে পাড়ার দর্জির তৈরি জামাকাপড় পরে, আজ আমি ব্র‍্যান্ডেড শার্ট ছাড়া পরি না, বিদেশী ব্র‍্যান্ডের ঘড়ি থাকে হাতে। উন্নতি নয়?

বাড়িতে একখানা ল্যান্ড ফোন নেওয়া খুব দরকার হয়ে পড়েছিল বলে রেকারিং ডিপোজিট করতে হয়েছিল বাবা-মাকে, আজ আমি আর আমার বউ হাতের মোবাইলে সামান্য টাকায় সারা পৃথিবীর কথা বলা ছাড়াও বিশ্বায়িত বিনোদন ভোগ করছি। তবুও বলবেন উন্নতি হয়নি?

এদেশে মুক্ত বাজার অর্থনীতি চালু হওয়ার সময়ে আমার কিছু ক্রয় ক্ষমতা ছিল, তাই সেই অর্থনীতি আমাকে আরো আয় করার সুযোগ দিয়েছে, যাতে আমি আরো ব্যয় করে যে আমার চেয়ে অনেক বেশি ধনী তাকে আরো ধনী করতে পারি। আমার যে সহপাঠীর বাবার ছোট মুদির দোকান, তার যে জয়েন্টে পেছন দিকে র‍্যাঙ্ক করে বেসরকারী ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে পড়ার টাকা না থাকায় লেখাপড়া শেষ হয়ে গেল সেকথা থাক। আমি তো কয়েক লক্ষ টাকা ফিজ দিয়ে ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করে আজ এ দেশে কাল সে দেশে কাজ করে বেড়াচ্ছি। সেটা উন্নতি নয়?

আমার জন্ম হয়েছিল সরকারী হাসপাতালে, আমার বউকে আমি সেই পূতিগন্ধময় হাসপাতালের ধারে কাছে নিয়ে যাইনি। আমার সন্তান জন্মেছে ঝাঁ চকচকে নার্সিংহোমে। মনমোহন সিং না থাকলে কে দিত আমাকে এই সুযোগ? আমার চটকলের শ্রমিক বন্ধুর স্ত্রী যে সরকারী হাসপাতালে সন্তান প্রসব করতে গিয়ে সংক্রমণের ফলে মাত্র বাইশ বছর বয়সে মারা গেল সে কথা থাক। একদিন তো সকলকেই মরতে হবে।

সুতরাং দেশ মানে আমার কাছে যেহেতু আগে আমি, আমার পরিবার, তাই উন্নতি যে হয়েছে তাতে সন্দেহ নেই। যার লাভ হয়নি সে করুক চিলি, লেবানন বা ফ্রান্সের ইয়েলো ভেস্টস আন্দোলনের মত কিছু। বা আর্জেন্টিনার লোকেদের মত ভোট দিক বামপন্থীদের, ভিড় জমাক তাদের মিটিঙে যারা বার্নির মত বলে চিকিৎসার জন্যে গাদা গাদা ইনশিওরেন্স প্রিমিয়াম দিতে হওয়া অন্যায়, যে পড়তে চায় তার পড়ার খরচ সরকারের দেওয়া উচিৎ। আমি কেন এসবের মধ্যে থাকব? আমার তো প্রিমিয়াম দেওয়ার ক্ষমতা আছে, ছেলেমেয়েকে পয়সা খরচ করে যেখানে ইচ্ছে পড়ানোর ক্ষমতাও আছে আমার।

অবশ্য এত উন্নতির সঙ্গে কিছু উদ্বেগও আমি পেয়েছি, যা আমার বাবার ছিল না।

নিজের যৌবনে আমার চাকুরিজীবী বাবা মাইনে পেলে মায়ের সাথে মাস খরচের হিসাব করতে বসে দেখতেন এটা করলে সেটা হবে না, অমুক শখটা পরের মাসের জন্যে তুলে রাখতে হবে। কিন্তু জানতেন পরের মাসেও চাকরিটা থাকবে, স্ত্রী পুত্র কন্যা নিয়ে দুটো খাওয়া পরার অভাব হবে না। আমার সে নিশ্চয়তা নেই। শুধু নিজের কাজটুকু মন দিয়ে করেই নিশ্চিন্ত থাকার আমার উপায় নেই। কোম্পানি যদি তার লাভের লক্ষ্যমাত্রা ছুঁতে না পারে তার মানে হবে কোম্পানির ক্ষতি হয়েছে। সেই ক্ষতি পূরণ করতে কর্মী সঙ্কোচন হবে, বস বলবেন “সবাই তো ব্যবসা করতে এসেছে। কেউ তো মাদার টেরেসা নয়”। অতএব গত মাসের এমপ্লয়ি অফ দ্য মান্থ আমি বছর চল্লিশেক বয়সে হয়ে যাব বেকার, সামার ভ্যাকেশনে ফুকেটের বীচে যে বউকে দীপিকা পাড়ুকোন মনে হচ্ছিল অচিরে দেখব তার চোখের কোলে কালি পড়ে সে নিরুপা রায় হয়ে গেল। মেয়েকে ভেবেছিলাম বিদেশে পড়তে পাঠাব, এখন স্কুলের মাইনে দেওয়াই কঠিন হয়ে দাঁড়াবে।

অবশ্য বউ আমার যথেষ্ট যোগ্যতাসম্পন্ন। তার সরকারী চাকরি আছে আমার বাবার মতই। তাই ভেবেছিলাম অবসর জীবনে অন্তত তার পেনশনে আমাদের দুজনের চলে যাবে। কিন্তু এখন দেখছি সরকার তার পেনশন না-ও দিতে পারে, জিনিসপত্রের দাম বাড়ছে অথচ গিন্নীর মাইনে কাল কমিয়ে দিলেও কিছু বলার নেই। ওদিকে ব্যাঙ্কে যা টাকা জমিয়েছিলাম, ব্যাঙ্ক ফেল পড়লে শুনছি তার সবটা পাব না। অন্যত্র যা জমিয়েছি তার পাওনা গণ্ডাও নাকি শেয়ার বাজারের মর্জি মাফিক।

এসব মনে পড়লে বোধ হয় কি মিছিলে নামা উচিৎ? নাকি কেবলই মনে হয় ঐ ব্যাটা সোনার চাঁদ, সোনার টুকরো — ওর জন্যেই আমি সরকারী চাকরি পাইনি, পেলে একবার…? ঐ যে সব মুসলমান বাংলাদেশ থেকে হুড়মুড়িয়ে আসছে, ওদেরকে বার করে দিতে পারলেই…? মনে হয় কি অমুকে কেন তমুকের মাংস খায় এটাই মূল সমস্যা? নাকি আমরা যারা আতঙ্কে ভুগছি আপনি তাদের দলে? ডিটেনশন ক্যাম্পের আতঙ্ক, গণপিটুনির আতঙ্ক। আমরা সকলেই যে ঘুমোচ্ছি, সকলেই যে বিশ্বাস করছি “সব চাঙ্গা সি”, তা তো নয়। তাহলে কেন আমরা রাস্তায় নেই?

নেই তার বড় কারণ যাঁরা মিছিল ডাকবেন, মিটিং করে রাস্তায় নামাবেন আমাদের তাঁরাই নিজেদের জায়গায় নেই। বার্নি স্যান্ডার্স সারাজীবন লড়ে গেলেন। যখন কেউ তাঁর কথা শুনত না তখনো লড়েছেন, আজও লড়ছেন। আজ অনেকে তাঁর কথা শুনছে। ক্রিস্টিনা কির্শনারের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ ছিল, তিনি পদচ্যুত হয়েছিলেন। তবুও লড়াইয়ের ময়দান ছেড়ে যাননি, মানুষ আজ তাঁর লড়াইকে জয়যুক্ত করলেন। বিবিসি লিখেছে “A comeback for the old politics”। এ দেশে পুরনো সমাজবাদী, কল্যাণকামী রাজনীতিকে ফিরিয়ে আনার এই তো সময়। মানুষ, জল, জঙ্গল বাঁচাতে সেই রাজনীতিরই তো প্রয়োজন। কিন্তু দু একটি অঞ্চলে ছাড়া কোথায় সেই রাজনীতির লোকেরা? তাঁদের ঐক্যবদ্ধ হওয়ার প্রচেষ্টা কোথায়? তাঁদের কেউ কেউ যে চূড়ান্ত আক্রমণাত্মক, ধ্বংসোন্মুখ নয়া উদারবাদী মোদী সরকারের থেকে মনমোহিনী পথেই নিস্তার খুঁজছেন!

পৃথিবী জুড়ে নয়া উদারবাদী অর্থনীতির (রাজনীতিরও, কারণ প্রয়াত অশোক মিত্র যথার্থই বলতেন “রাজনীতিই অর্থনীতি”) শিয়রে শমন। ট্রাম্প, মোদী জানেন যে এই সঙ্কট থেকে উত্তরণের পথ তাঁরা জানেন না। তাই উনি বলেন ইমিগ্র‍্যান্টদের কথা, ইনি বলেন এন আর সি করব, নাগরিকত্ব আইন করব, মুসলমানরাই যত নষ্টের গোড়া ইত্যাদি।

এই দুঃসময়ে, এই সম্ভাবনার সুসময়ে, কোথায় তাঁরা যাঁরা রাত্রির বৃন্ত থেকে ফুটন্ত সকাল ছিঁড়ে আনার স্বপ্ন দেখাতে পারেন?

%d bloggers like this: